বিশ্বাস (ঈমান) (৮-৫৮)
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাচটি। ১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চই মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সালাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা।
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন, সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ এবং সে-ই প্রকৃত মুহাজির, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা যে ত্যাগ করে।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তারা (সহাবাগণ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামে কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি (ﷺ) বললেনঃ যার জিহবা ও হাত হতে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।
আবদুল্লাহ্ ইবন আমর হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন, তুমি খাদ্য খাওয়াবে ও চেনা অচেনা সকলকে সালাম দিবে।
আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ সেই আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালবাসার পাত্র হই।
আনাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই।
আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তিনটি গুণ যার মধ্যে আছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেঃ ১। আল্লাহ ও তার রাসূল তার নিকট অন্য সকল কিছু হতে অধিক প্রিয় হওয়া; ২। কাউকে একমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসা; ৩। কুফরীতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মত অপছন্দ করা।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ ঈমানের আলামত হল আনসারকে ভালবাসা এবং মুনাফিকীর চিহ্ন হল আনসারের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা।
উবাদাহ ইবন সামিত যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও লায়লাতুল আকাবার একজন নকীব উবাদাহ ইবনস সামিত বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর পাশে একজন সাহাবীর উপস্থিতিতে তিনি বলেনঃ তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়আত গ্রহণ কর যে, আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎকাজে নাফরমানী করবে না। তোমাদের মধ্যে যে তা পূর্ণ করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হলো এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি পেয়ে গেলে, তবে তা হবে তার জন্য কাফ্ফারা। আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং আল্লাহ তা অপ্রকাশিত রাখলে, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তিনি যদি চান, তাকে মার্জনা করবেন আর যদি চান, তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। আমরা এর উপর বায়আত গ্রহণ করলাম।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ সেদিন দূরে নয়, যেদিন মুসলিমের উত্তম সম্পদ হবে কয়েকটি বকরী, যা নিয়ে সে পাহাড়ের চূড়ায় অথবা বৃষ্টিপাতের স্থানে চলে যাবে। ফিতনা হতে সে তার ধর্ম সহকারে পলায়ন করবে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সাহাবীদের যখন কোন কাজের নির্দেশ দিতেন, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দেশ দিতেন। একবার তারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো আপনার মত নই। আল্লাহ তাআলা আপনার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।' তা শুনে তিনি রাগ করলেন, এমনকি তার চেহারায় রাগের চিহ্ন ফুটে উঠল। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমাদের চেয়ে আমিই আল্লাহকে অধিক ভয় করি ও বেশী জানি।
আনাস হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তিনটি গুণ যার মধ্যে বিদ্যমান, সে ঈমানের স্বাদ পায়- (১) যার নিকট আল্লাহ ও তার রাসূল অন্য সকল বস্তু হতে অধিক প্রিয়; (২) যে একমাত্র আল্লাহরই জন্য কোন বান্দাকে ভালবাসে এবং (৩) আল্লাহ তাআলা কুফর হতে মুক্তি প্রদানের পর যে কুফর-এ প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হবার মতোই অপছন্দ করে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ বেহেশতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনো। তারপর তাদের জাহান্নাম হতে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা (পুড়ে) কালো হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের বৃষ্টিতে বা হায়াতের [বর্ণনাকারী মালিক শব্দ দু'টির কোনটি এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন] নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন নদীর তীরে ঘাসের বীজ গজিয়ে উঠে। তুমি কি দেখতে পাও না সেগুলো কেমন হলুদ বর্ণের হয় ও ঘন হয়ে গজায়?
আবূ সাঈদ খুদরী-কে বলতে শুনেছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ একবার আমি নিদ্রাবস্থায় (স্বপ্নে) দেখলাম যে, লোকদেরকে আমার সামনে আনা হচ্ছে। আর তাদের পরণে রয়েছে জামা। কারো জামা বুক পর্যন্ত আর কারো জামা এর নীচ পর্যন্ত। আর উমার ইবন খাত্তাব-কে আমার সামনে আনা হল এমন অবস্থায় যে, তিনি তার জামা (অধিক লম্বা হওয়ায়) টেনে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর কী তা'বীর করেছেন? তিনি বললেনঃ (এ জামা অর্থ) দ্বীন।
আব্দুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক আনসারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তার ভাইকে তখন (অধিক) লজ্জা ত্যাগের জন্য নাসীহাত করছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেনঃ ওকে ছেড়ে দাও। কারণ লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও যাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসাবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করা হল, 'কোন আমলটি উত্তম?' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।' জিজ্ঞেস করা হলো, 'অতঃপর কোনটি?' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' প্রশ্ন করা হল, 'অতঃপর কোনটি?' তিনি বললেনঃ 'মাকবূল হাজ্জ সম্পাদন করা।'
সাদ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদল লোককে কিছু দান করলেন। সাদ সেখানে বসেছিলেন। সাদ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের এক ব্যক্তিকে কিছু দিলেন না। সে ব্যক্তি আমার নিকট তাদের চেয়ে অধিক পছন্দের ছিল। তাই আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যক্তিকে আপনি বাদ দিলেন কেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি। তিনি বললেনঃ না, মুসলিম। তখন আমি কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম। অতঃপর আমি তার সম্পর্কে যা জানি, তা (ব্যক্ত করার) প্রবল ইচ্ছা হলো। তাই আমি আমার বক্তব্য আবার বললাম, আপনি অমুককে দান থেকে বাদ রাখলেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি। তিনি বললেনঃ 'না, মুসলিম?' তখন আমি কিছুক্ষণ নীরব থাকলাম। তারপর আমি তার সম্পর্কে যা জানি তা (ব্যক্ত করার) প্রবল ইচ্ছা হলো। তাই আমি আবার বললাম, আপনি অমুককে দান হতে বাদ রাখলেন? আল্লাহর শপথ! আমি তো তাকে মুমিন বলেই জানি। তিনি বললেনঃ 'না, মুসলিম?' তখন আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। তারপর আমি তার সম্পর্কে যা জানি তা (ব্যক্ত করার) প্রবল ইচ্ছা হলো। তাই আমি আমার বক্তব্য আবার বললাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পুনরায় সেই একই জবাব দিলেন। তারপর বললেনঃ 'সাদ! আমি কখনো ব্যক্তি বিশেষকে দান করি, অথচ অন্যলোক আমার নিকট তার চেয়ে অধিক প্রিয়। তা এ আশঙ্কায় যে (সে ঈমান থেকে ফিরে যেতে পারে পরিণামে), আল্লাহ তাআলা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করবেন।
আবদুল্লাহ্ ইবন আমর হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করল, ইসলামের কোন কাজ সবচেয়ে উত্তম?' তিনি বললেনঃ তুমি লোকদের খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা অচেনা সকলকে সালাম দিবে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, 'তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?' তিনি বললেনঃ 'তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।' তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, 'আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।'
মা'রূর হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি একবার রাবাযা নামক স্থানে আবূ যর-এর সঙ্গে দেখা করলাম। তখন তার পরনে ছিল এক জোড়া কাপড় (লুঙ্গি ও চাদর) আর তার ভৃত্যের পরনেও ছিল ঠিক একই ধরনের এক জোড়া কাপড়। আমি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ একবার আমি জনৈক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিলাম এবং আমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছিলাম। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, আবূ যার! তুমি তাকে তার মা সম্পর্কে লজ্জা দিয়েছ? তুমি তো এমন ব্যক্তি, তোমার মধ্যে এখনো অন্ধকার যুগের স্বভাব বিদ্যমান। জেনে রেখো, তোমাদের দাস-দাসী তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। তাই যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন তাকে নিজে যা খায় তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরিধান করে, তাকেও তা-ই পরায়। তাদের উপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না, যা তাদের জন্য অধিক কষ্টদায়ক। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সহযোগিতা করবে।
আহনাফ ইবন কায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (সিফফীনের যুদ্ধে) এ ব্যক্তিকে [আলী-কে] সাহায্য করতে যাচিছলাম। আবূ বাকরাহ্-এর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বললেনঃ 'তুমি কোথায় যাচ্ছ?' আমি বললাম, 'আমি এ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।' তিনি বললেনঃ 'ফিরে যাও। কারণ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি যে, দু'জন মুসলিম তাদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হলে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ হত্যাকারী (তো অপরাধী), কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেন, (নিশ্চই) সেও তার সাথীকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।'
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) বর্ণনা করেনঃ "যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করেনি"- (আন্'আম ৬/৮২)। এ আয়াত নাযিল হলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সাহাবীগণ বললেন, 'আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে যুলুম করেনি?' তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ "নিশ্চই শির্ক হচ্ছে অধিকতর যুলুম"- (লুকমান ৩১/১৩)।
আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, মুনাফিকের চিহ্ন তিনটিঃ ১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; ২. যখন অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে এবং ৩. আমানত রাখা হলে খিয়ানাত করে।
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেনঃ চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে নেকির আশায় কদরের রাতে ইবাদতের মধ্যে রাত্রি জাগবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
আবূ যুর'আহ ইবন আমর ইবন জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আবূ হুরাইরাহ-কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে বলতে শুনেছি, তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বের হয়, যদি সে শুধু আল্লাহর উপর ঈমান এবং তার রাসূলগণের প্রতি ঈমানের কারণে বের হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দেন যে, আমি তাকে তার পুণ্য বা গানীমাত (ও বাহন) সহ ঘরে ফিরিয়ে আনব কিংবা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাব। আর আমার উম্মতের উপর কষ্টদায়ক হবে বলে যদি মনে না করতাম তবে কোন সেনাদলের সঙ্গে না গিয়ে বসে থাকতাম না। আমি অবশ্যই এটা ভালবাসি যে, আল্লাহর রাস্তায় নিহত হই, পুনরায় জীবিত হই, পুনরায় নিহত হই, পুনরায় জীবিত হই, পুনরায় নিহত হই।
আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি রমাযানের রাতে ঈমানসহ পুণ্যের আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানসহ পুণ্যের আশায় রমাযানের সিয়াম ব্রত পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ নিশ্চই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদাত সহযোগে) সাহায্য চাও।
বারাআ (ইবন আযিব) হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মদিনায় হিজরত করে সর্বপ্রথম আনসারদের মধ্যে তার নানাদের গোত্র [আবূ ইসহাক বলেন] বা মামাদের গোত্রে এসে ওঠেন। তিনি ষোল-সতের মাস বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেন। কিন্তু তার পছন্দ ছিল যে, তার কিবলা বাইতুল্লাহর দিকে হোক। আর তিনি (বাইতুল্লাহর দিকে) প্রথম যে সালাত আদায় করেন, তা ছিল আসরের সালাত এবং তার সঙ্গে একদল লোক সে সালাত আদায় করেন। তার সঙ্গে যারা সালাত আদায় করেছিলেন তাদের একজন লোক বের হয়ে এক মসজিদে মুসল্লীদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা তখন রুকূ অবস্থায় ছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ "আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, এইমাত্র আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে মক্কার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে এসেছি। তখন তারা যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থায়ই বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলেন। রাসূল (ﷺ) যখন বায়তুল মাকদিস-এর দিকে সালাত আদায় করতেন তখন ইয়াহুদীদের ও আহলি-কিতাবদের নিকট এটা খুব ভাল লাগত; কিন্তু তিনি যখন বায়তুল্লাহর দিকে তার মুখ ফিরালেন তখন তারা এটা খুব অপছন্দ করল। যুহায়র বলেন, আবূ ইসহাক বারাআ থেকে আমার নিকট যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে এ কথাও রয়েছে যে, কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তাদের ব্যাপারে আমরা কী বলব, সেটা আমাদের জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ "আল্লাহ তাআলা তোমাদের সালাতকে বিনষ্ট করবেন না"। (বাকারা ২/১৪৩)
আবূ সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছেন, বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম উত্তম হয়, আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। অতঃপর শুরু হয় প্রতিফল; একটি পুণ্যের বিনিময়ে দশ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত; আর একটি পাপ কাজের বিনিময়ে ঠিক ততটুকু মন্দ প্রতিফল। অবশ্য আল্লাহ যদি ক্ষমা করে দেন তবে তা অন্য ব্যাপার।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন সে যে আমলে সালেহ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত (পুণ্য) লেখা হয়। আর সে যে পাপ কাজ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য ঠিক ততটুকুই পাপ লেখা হয়।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একবার তার নিকট আসেন, তার নিকট তখন এক মহিলা ছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ 'ইনি কে?' আয়িশাহ উত্তর দিলেন, অমুক মহিলা, এ বলে তিনি তার সালাতের উল্লেখ করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ 'থাম, তোমরা যতটুকু সামর্থ্য রাখ, ততটুকুই তোমাদের করা উচিত। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত (সওয়াব দিতে) বিরত হন না, যতক্ষণ না তোমরা নিজেরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়। আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আমল সেটাই, যা আমলকারী নিয়মিত করে থাকে।
আনাস থেকে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। জনৈক ইয়াহূদী তাকে বললঃ হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহুদী জাতির উপর অবতীর্ণ হত, তবে অবশ্যই আমরা সে দিনকে খুশীর দিন হিসেবে পালন করতাম। তিনি বললেন, কোন আয়াত? সে বললঃ "আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম"- (মায়িদাহ্ ৫/৩)। উমার বললেন, এটি যে দিনে এবং যে স্থানে নবী (ﷺ) -এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি; তিনি সেদিন আরাফায় দাড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমুআহর দিন।
ত্বলহাহ ইবন উবাইদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক নাজ্দবাসী আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এলো। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। আমরা তার কথার মৃদু আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু সে কী বলছিল, আমরা তা বুঝতে পারছিলাম না। এভাবে সে নিকটে এসে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ 'দিন-রাতে পাচ ওয়াক্ত সালাত'। সে বলল, 'আমার উপর এ ছাড়া আরো সালাত আছে?' তিনি বললেনঃ 'না, তবে নফল আদায় করতে পার।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ 'আর রমাযানের সওম।' সে বলল, 'আমার উপর এছাড়া আরো সওম আছে?' তিনি বললেনঃ 'না, তবে নফল আদায় করতে পার।' বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার নিকট যাকাতের কথা বললেন। সে বলল, 'আমার উপর এছাড়া আরো আছে?' তিনি বললেনঃ 'না; তবে নফল হিসেবে দিতে পার।' বর্ণনাকারী বলেন, 'সে ব্যক্তি এই বলে চলে গেলেন; 'আল্লাহর শপথ" আমি এর চেয়ে অধিকও করব না এবং কমও করব না।' তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ 'সে কৃতকার্য হবে যদি সত্য বলে থাকে।'
আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও পুণ্যের আশায় কোন মুসলিমের জানাযার অনুগমন করে এবং তার সালাত-ই-জানাযা আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সঙ্গে থাকে, সে দুই কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরবে। প্রতিটি কীরাত হল উহুদ পর্বতের মতো। আর যে ব্যক্তি শুধু তার জানাযা আদায় করে, তারপর দাফন সম্পন্ন হবার পূর্বেই চলে আসে, সে এক কীরাত সওয়াব নিয়ে ফিরবে।
যুবায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আবূ ওয়াইল-কে মুরজিআ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) আমার নিকট বলেছেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।
উবাদাহ ইবন সামিত বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) লায়লাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হলেন। তখন দু'জন মুসলিম বিবাদ করছিল। তিনি বললেনঃ আমি তোমাদের লাইলাতুল ক্বাদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বেরিয়েছিলাম; কিন্তু তখন অমুক অমুক বিবাদে লিপ্ত থাকায় তা (লাইলাতুল ক্বদরের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কিত জ্ঞান) উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। আর হয়তো বা এটাই তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তোমরা তা অনুসন্ধান কর (রমাযানের) ২৭, ২৯ ও ২৫ তম রাতে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জনসমক্ষে উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন ঈমান কী?' তিনি বললেনঃ ঈমান হল, আপনি বিশ্বাস রাখবেন আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাগণের প্রতি, (কিয়ামতের দিন) তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতি এবং তার রাসূলগণের প্রতি। আপনি আরো বিশ্বাস রাখবেন পুনরুত্থানের প্রতি।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইসলাম কী?' তিনি বললেনঃ ইসলাম হল, আপনি আল্লাহর ইবাদত করবেন এবং তার সাথে অংশীদার স্থাপন করবেন না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবেন, ফরজ যাকাত আদায় করবেন এবং রমাযান-এর সিয়ামব্রত পালন করবেন।' ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ইহসান কী?' তিনি বললেনঃ 'আপনি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবেন যেন আপনি তাকে দেখছেন, আর যদি আপনি তাকে দেখতে না পান তবে (মনে করবেন) তিনি আপনাকে দেখছেন।' ঐ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, 'কিয়ামত কবে?' তিনি বললেনঃ 'এ ব্যাপারে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, তিনি জিজ্ঞেসকারী অপেক্ষা অধিক জ্ঞাত নন। তবে আমি আপনাকে কিয়ামতের আলামতসমূহ বলে দিচ্ছিঃ বাদী যখন তার প্রভুকে প্রসব করবে এবং উটের নগণ্য রাখালেরা যখন বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করবে। (কিয়ামতের জ্ঞান) সেই পাচটি জিনিসের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না।' অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এই আয়াতটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেনঃ 'কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহরই নিকট......।' (লুক্বমান ৩১/৩৪) এরপর ঐ ব্যক্তি চলে গেলে তিনি বললেনঃ 'তোমরা তাকে ফিরিয়ে আন।' তারা কিছুই দেখতে পেল না। তখন তিনি বললেন, 'ইনি জিবরীল (আ)। লোকদেরকে তাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন।'
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আবূ সুফইয়ান ইবন হারব আমার নিকট বর্ণনা করেন, হিরাক্লিয়াস তাকে বলেছিল, আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা (ঈমানদারগণ) সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি উত্তর দিয়েছিলে, তারা সংখ্যায় বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানের ব্যাপার এরূপই থাকে যতক্ষণ না তা পূর্ণতা লাভ করে। আর আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেউ তার দ্বীন গ্রহণ করার পর তা অপছন্দ করে মুরতাদ হয়ে যায় কি-না? তুমি জবাব দিয়েছ, 'না।' প্রকৃত ঈমান এরূপই, ঈমানের স্বাদ অন্তরের সাথে মিশে গেলে কেউ তা অপছন্দ করে না।
নুমান ইবন বশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি যে, 'হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু'য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয়সমূহ হতে বেচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহ্ সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তার সংরক্ষিত এলাকা হলো তার নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরো আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে গোশতের টুকরোটি হল অন্তর।
আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তার আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেনঃ তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হতে কিয়দংশ প্রদান করব। আমি তার সাথে দু'মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আবদুল কায়েস-এর একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেনঃ তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন প্রতিনিধিদলের? তারা বলল, রাবীআ গোত্রের।' তিনি বললেনঃ স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! শাহরুল হারাম ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফিরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারি। তারা পানীয় সম্বন্ধেও জিজ্ঞেস করল। তখন রাসূল (ﷺ) তাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ এবং চারটি বিষয় হতে নিষেধ করলেন। তাদেরকে এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বললেনঃ 'এক আল্লাহর প্রতি কীভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা হয় তা কি তোমরা অবগত আছ?' তারা বলল, 'আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত।' তিনি বললেনঃ 'তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা; আর তোমরা গানীমাতের সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে। তিনি তাদেরকে চারটি বিষয় হতে বিরত থাকতে বললেন। আর তা হচ্ছেঃ সবুজ কলস, শুকনো কদুর খোল, খেজুর বৃক্ষের গুড়ি হতে তৈরী বাসন এবং আলকাতরা দ্বারা রাঙানো পাত্র। রাবী বলেন, বর্ণনাকারী (মুযাফ্ফাত-এর স্থলে) কখনও আন্নাক্বীর উল্লেখ করেছেন (দু'টি শব্দের অর্থ একইরূপ)। তিনি আরো বলেন, তোমরা এ বিষয়গুলো ভালো করে জেনে নাও এবং অন্যদেরও এগুলো অবগত কর।
উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ কর্মসমূহ সংকল্পের সাথে সম্পৃক্ত এবং প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য তার সংকল্প অনুযায়ী। কাজেই যার হিজরাত হবে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের উদ্দেশে, তার হিজরাত আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের উদ্দেশে হয়েছে বলেই ধরা হবে। আর যার হিজরাত হয় দুনিয়া অর্জনের জন্য বা কোন নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশে, তার হিজরাত সে উদ্দেশেই হবে যে উদ্দেশে সে হিজরাত করেছে।
আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে তখন সেটা তার জন্য সদাকাহ হয়ে যায়।
সা'আদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ 'তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।'
জারীর ইবন আবদুল্লাহ আল-বাজালী হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট বায়আত গ্রহণ করেছি সালাত কায়িম করার, যাকাত প্রদান করার এবং সমস্ত মুসলিমের মঙ্গল কামনা করার।
যিয়াদ ইবন 'ইলাকা হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ মুগীরাহ ইবন শুবাহ যেদিন ইন্তিকাল করেন সেদিন আমি জারীর ইবন আবদুল্লাহ-এর নিকটে শুনেছি, তিনি (মিম্বারে) দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা করে বললেন, তোমরা এক আল্লাহকে ভয় কর যার কোন অংশীদার নেই এবং নতুন কোন নেতার আগমন না হওয়া পর্যন্ত শৃঙ্খলা বজায় রাখ, অতি সত্বর তোমাদের নেতা আগমন করবেন। অতঃপর জারীর বললেন, তোমাদের নেতার জন্য ক্ষমা চাও; কেননা, তিনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অতঃপর বললেন, একদা আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকটে এসে আরয করলাম, আমি আপনার নিকট ইসলামের বায়আত নিতে চাই। তিনি (অন্যান্য বিষয়ের সাথে) আমার উপর শর্ত দিয়ে বললেনঃ আর সকল মুসলিমের মঙ্গল কামনা করবে। অতঃপর আমি তার নিকট এ শর্তের উপর বায়আত নিলাম। এ মসজিদের প্রতিপালকের শপথ! আমি তোমাদের মঙ্গলকামনাকারী। অতঃপর তিনি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং (মিম্বার হতে) নেমে গেলেন।