রক্তপণ (৬৮৬১-৬৯১৭)
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (ﷺ) আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেনঃ তুমি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ গণ্য কর অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। লোকটি বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তারপর হলো, তুমি তোমার সন্তানকে এ ভয়ে হত্যা কর যে, সে তোমার সঙ্গে খাদ্য খাবে। লোকটি বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তারপর হলো, তুমি তোমার প্রতিবেশির স্ত্রীর সঙ্গে যিনা কর। অতঃপর আল্লাহ এ কথার সত্যতায় অবতীর্ণ করলেনঃ "এবং তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে আহবান করে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন উপযুক্ত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে"- (ফুরক্বান ২৫/৬৮)।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বস্তিতে থাকে, যে পর্যন্ত না সে কোন হারাম ঘটায়।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে কেউ নিজেকে জড়িয়ে ফেলার পরে তার ধ্বংস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় থাকে না, সেগুলোর একটি হচ্ছে হালাল ছাড়া হারাম রক্ত প্রবাহিত করা (অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করা)।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সবার আগে মানুষের মাঝে যে বিষয়ের ফায়সালা করা হবে তা হলো হত্যা।
বানী যুহরা গোত্রের মিত্র মিকদাদ ইবন আমর কিন্দী হতে বর্ণিত যিনি বদরের যুদ্ধে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এক কাফেরের সঙ্গে আমার মুকাবিলা হল এবং আমাদের মধ্যে লড়াই বাধল। সে তলোয়ার দিয়ে আমার হাতে আঘাত করল এবং তা কেটে ফেলল। তারপর সে কোন গাছের আড়ালে আশ্রয় নিল আর বলল, আমি আল্লাহর জন্য মুসলিম হয়ে গেলাম। এ কথা বলার পর কি আমি তাকে হত্যা করতে পারব? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি তাকে হত্যা করবে না। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো আমার এক হাত কেটে দিয়েছে। আর কেটে ফেলার পরই এ কথা বলেছে, এতে কি আমি তাকে হত্যা করতে পারব? তিনি বললেনঃ তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি যদি তাকে হত্যা কর তাহলে তাকে হত্যা করার আগে তুমি যেখানে ছিলে সে সেখানে এসে যাবে। আর সে ঐ কালিমা উচ্চারণ করার আগে যেখানে ছিল তুমি সেখানে চলে যাবে।
হাবীব ইবন আবূ আমরা সাঈদ-এর সূত্রে ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন। নবী (ﷺ) মিকদাদ-কে বলেছেনঃ উক্ত মুমিন লোকটি যখন কাফেরদের মাঝে অবস্থান করছিল তখন সে আপন ঈমান গোপন রেখেছিল। এরপর সে তার ঈমান প্রকাশ করল আর তুমি তাকে হত্যা করে ফেললে। তুমিও তো এর আগে মক্কায় থাকাকালে আপন ঈমান লুকিয়ে রেখেছিলে।
আবদুল্লাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কোন মানুষকে হত্যা করা হলে আদম-এর প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর (অপরাধের) কিছু অংশ অবশ্যই পড়বে।
আবদুল্লাহ ইবন উমার সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ তোমরা আমার পরে কুফরিতে ফিরে যেয়ো না যে (সে অবস্থায়) তোমরা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দিবে।
জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বিদায় হাজ্জের সময় বলেছেন, লোকদেরকে নীরব কর, তোমরা আমার পরে কুফরিতে ফিরে যেয়ো না যে, তোমরা একে অপরের গর্দান উড়িয়ে দিবে।
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কবীরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া অথবা বলেছেন, মিথ্যা কসম করা। শুবাহ তাতে সন্দেহ করেন। এবং মুয়ায বলেন, শুবাহ আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, কবীরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, মিথ্যা কসম করা আর মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া অথবা বলেছেন প্রাণ হত্যা করা।
আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শারীক করা, প্রাণ হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া আর মিথ্যা বলা, কিংবা বলেছেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।
উসামাহ ইবন যায়দ ইবন হারিসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে জুহাইনা কওমের হারাকা শাখার বিরুদ্ধে পাঠালেন। আমরা ভোরে এ কওমের কাছে এলাম এবং তাদেরকে পরাস্ত করে ফেললাম। তিনি বলেন, আমি ও আনসারদের এক ব্যক্তি তাদের একজনকে ধাওয়া করে তার কাছে পৌছে গেলাম। তিনি বলেন, আমরা যখন আক্রমণ করতে উদ্যত হলাম তখন সে বলে উঠল, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি বলেন, আনসারী ব্যক্তি তার থেকে বিরত হয়ে গেল। কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করলাম। তিনি বলেন, আমরা যখন মদিনায় আসলাম, তখন নবী (ﷺ) এর কাছে এ সংবাদ পৌছল। তিনি বলেন, আমাকে তিনি বললেনঃ হে উসামাহ! তুমি কি তাকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও হত্যা করলে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে আসলে হত্যা থেকে বাচতে চেয়েছিল। তিনি বললেনঃ আহা! তুমি কি তাকে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলার পরও হত্যা করলে? তিনি বলেন, তিনি বারবার কথাটি আমাকে বলতে থাকলেন। এমন কি আমি কামনা করতে লাগলাম, যদি আমি ঐ দিনের আগে মুসলিম না হতাম।
উবাদাহ ইবন সামিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঐ নির্বাচিত নেতাদের একজন ছিলাম যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বায়আত করেছিলেন। আমরা তার হাতে এ শর্তে বায়আত করেছি যে, আমরা আল্লাহর সঙ্গে কিছুকে শারীক করব না, যিনা করব না, চুরি করব না, এমন প্রাণ হত্যা করব না যা আল্লাহ হারাম করেছেন, আমরা লুন্ঠন করব না, নাফরমানী করব না। যদি আমরা ওগুলো ঠিকভাবে পালন করি তবে জান্নাত লাভ হবে। আর যদি এর মধ্য থেকে কোন একটা করে ফেলি তাহলে তার ফায়সালা আল্লাহর কাছে সমর্পিত।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোক আমাদের বিপক্ষে অস্ত্র ধারণ করবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
আহনাফ ইবন কায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তাকে (আলী) সাহায্য করার জন্য যাচ্ছিলাম। এমন সময় আমার সঙ্গে আবূ বাকরাহ-এর সাক্ষাৎ ঘটল। তিনি বললেন, কোথায় যাচ্ছ? আমি বললাম, ঐ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে। তিনি বললেন, ফিরে যাও। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, যখন দু'জন মুসলিম তলোয়ার নিয়ে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তির অবস্থান হবে জাহান্নাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর ব্যাপারটা তো বুঝা গেল। কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার সে কেমন? তিনি বললেনঃ সেও তার বিরোধীকে হত্যা করতে আগ্রহান্বিত ছিল।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। এক ইয়াহূদী একটি বালিকার মাথা দু'টি পাথরের মাঝে রেখে চূর্ণ করে দিল। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করা হল কে তোমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছে? অমুক অথবা অমুক? শেষ পর্যন্ত ইয়াহূদীটির নাম বলা হল। তাকে নবী (ﷺ)-এর কাছে আনা হল এবং তিনি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলেন। অবশেষে সে তা স্বীকার করল। কাজেই পাথরের আঘাতে তার মাথা চূর্ণ করে দেয়া হল।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুপার গহনা পরিহিতা এক বালিকা মদিনায় বের হল। রাবী বলেন, তখন এক ইয়াহূদী তার প্রতি পাথর নিক্ষেপ করল। রাবী বলেন, তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় নবী (ﷺ)-এর কাছে আনা হল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অমুক কি তোমাকে হত্যা করেছে? সে তার মাথা উঠাল। তিনি তাকে আবার বললেন, অমুক কি তোমাকে হত্যা করেছে? সে তার মাথা উঠাল। তিনি তাকে তৃতীয়বার বললেন, অমুক কি তোমাকে হত্যা করেছে? সে তার মাথা নিচু করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রস্তর নিক্ষেপকারীকে ডেকে আনলেন এবং দু'টি পাথরের মাঝে রেখে তাকে হত্যা করলেন।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল, তিন-তিনটি কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করা বৈধ নয়। (যথা) জানের বদলে জান, বিবাহিত ব্যভিচারী, আর নিজের দ্বীন ত্যাগকারী মুসলিম জামাআত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া ব্যক্তি।
আনাস হতে বর্ণিত। এক ইয়াহূদী একটি বালিকাকে তার রুপার অলঙ্কারের লোভে হত্যা করল। সে তাকে পাথর দিয়ে হত্যা করল। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে নবী (ﷺ) এর কাছে আনা হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, অমুক কি তোমাকে হত্যা করেছে? সে তার মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করল যে, না। এরপর দ্বিতীয়বার তিনি জিজ্ঞেস করলেন। সে তার মাথা দিয়ে ইশারা করল যে, না। অতঃপর তৃতীয়বার তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন। সে তার মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করল যে, হ্যা। তখন নবী (ﷺ) তাকে (হত্যাকারীকে) দু'টি পাথর দিয়ে হত্যা করলেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। খুযা'আ গোত্রের লোকেরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করল। আবদুল্লাহ ইবন রাজা.. আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর খুযা'আ গোত্রের লোকেরা জাহিলী যুগের স্বগোত্রীয় নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ হিসেবে বানী লায়স গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন এবং বললেনঃ আল্লাহ মক্কা থেকে হস্তীদলকে প্রতিহত করেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আপন রাসূল ও মুমিনদেরকে কর্তৃত্ব দান করেছেন। জেনে রেখো! মক্কা আমার পূর্বে কারো জন্য হালাল হয়নি, আর আমার পরও কারো জন্য হালাল হবে না। জেনে রেখো! আমার বেলায় তা দিনের কিছু সময়ের জন্য হালাল করা হয়েছিল। সাবধান! তা আমার এ সময়ে এমন সম্মানিত, তার কাঁটা উপড়ানো যাবে না, তার গাছ কাটা যাবে না,তাতে পড়ে থাকা বস্তু মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া তুলে নেয়া যাবে না। আর যার কাউকে হত্যা করা হয় সে দু'প্রকার দন্ডের যে কোন একটি দেয়ার অধিকার লাভ করবে। হয়ত রক্তপণ নেয়া হবে, নতুবা কিসাস নেয়া হবে। এ সময় ইয়ামনবাসী এক লোক দাড়াল, যাকে আবূ শাহ্ বলা হয়। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে লিখে দিন। তখন রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন তোমরা আবূ শাহ্কে লিখে দাও। তখন কুরাইশ গোত্রের এক লোক দাড়াল। আর বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইয্খির ব্যতীত। কেননা, আমরা সেটা আমাদের ঘরে, আমাদের কবরে কাজে লাগাই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ ইয্খির ছাড়া।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনী ইসরাঈলদের মাঝে কিসাসের বিধান কার্যকর ছিল। তাদের মাঝে রক্তপণের বিধান ছিল না। তবে আল্লাহ এ উম্মাতকে বললেনঃ নরহত্যার ক্ষেত্রে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে .... কিন্তু তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছুটা ক্ষমা করা হলে পর্যন্ত- (আল-বাক্বারাহ ২/১৭৮)। ইবন আব্বাস বলেন, ক্ষমা করার অর্থ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার ক্ষেত্রে রক্তপণ গ্রহণ করা। তিনি বলেন, আর প্রচলিত প্রথার অনুসরণ করার অর্থ হচ্ছে, ন্যায়সঙ্গত দাবি ও দয়ার সঙ্গে দায়িত্ব আদায় করা।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত লোক হচ্ছে তিনজন। যে লোক হারাম শরীফে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে লোক ইসলামী যুগে জাহিলী যুগের রেওয়াজ অন্বেষণ করে। যে লোক ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কারো রক্তপাত দাবি করে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের দিন ইবলীস লোকদের মধ্যে চিৎকার দিয়ে বলল, হে আল্লাহর বান্দারা! পিছনের দলের ওপর আক্রমণ চালাও। ফলে তাদের সামনের লোকেরা পেছনের লোকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এমন কি তারা ইয়ামানকে হত্যা করে ফেলল। তখন হুযাইফাহ বললেন, আমার পিতা! আমার পিতা! কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে ফেলল। তখন হুযাইফাহ বললেন, আল্লাহ তোমাদের মাফ করুন। রাবী বলেন, মুশরিকদের একটি দল পরাজিত হয়ে তায়েফ চলে গিয়েছিল।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, এক ইয়াহূদী একটি বালিকার মাথা দু'টি পাথরের মাঝে রেখে চূর্ণ করে দিল। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কে তোমার সাথে এমন ব্যবহার করেছে? অমুক? না অমুক? শেষে ইয়াহূদী লোকটির নাম উল্লেখ করা হল। তখন সে তার মাথা দিয়ে (হ্যা-সূচক) ইশারা করল। তখন ইয়াহূদী লোকটিকে আনা হল এবং সে স্বীকার করল। তখন নবী (ﷺ) তার ব্যাপারে আদেশ করলেন, তাই তার মাথা একটি পাথর দিয়ে চূর্ণ করা হল, এবং হাম্মা বলেন, দু'টো পাথর দিয়ে।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একজন ইয়াহূদীকে একজন বালিকার বদলে হত্যা করেছেন। সে রূপার গহনার লোভে মেয়েটিকে হত্যা করেছিল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর অসুখের সময় তার মুখের এক কিনারায় ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা আমার মুখের কিনারায় ঔষধ দিও না। আমরা মনে করলাম, রোগী ঔষধ সেবন অপছন্দ করেই থাকে। যখন তার হুশ ফিরে এলো, তখন তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যেন এমন কেউ থাকে না, যার মুখের কিনারায় জোরপূর্বক ঔষধ ঢেলে দেয়া না হয় শুধুমাত্র আব্বাস ব্যতীত। কেননা, সে তোমাদের কাছে হাযির ছিল না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমরা (দুনিয়াতে) সর্বশেষ ও (আখিরাতে) সর্বপ্রথম।
উক্ত হাদীসের সূত্রে এও বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ যদি কেউ তোমার ঘরে তোমার অনুমতি ব্যতীত উকি মারে আর তুমি পাথর মেরে তার চোখ ফুটা করে দাও, তাতে তোমার কোন গুনাহ হবে না।
হুমায়দ হতে বর্ণিত যে, এক লোক নবী (ﷺ)-এর ঘরে উকি মারল। নবী (ﷺ) তার দিকে চাকু নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, (এ হাদীস) আপনাকে কে বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, আনাস ইবন মালিক।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের দিন যখন মুশরিকরা পরাজিত হয়ে গেল তখন ইব্লীস চিৎকার দিয়ে বলল, হে আল্লাহর বান্দাগণ! পিছনের দলের উপর আক্রমণ কর। তখন সামনের লোকেরা পেছনের লোকেদের উপর আক্রমণ করল ও পরস্পরে লড়াইয়ে লিপ্ত হল। তখন হুযাইফাহ তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে তার বাবা ইয়ামান আক্রান্ত হয়েছেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! (এতো) আমার পিতা! আমার পিতা! তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! তারা তাকে হত্যা না করে থামল না। হুযাইফাহ বলেন, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। উরওয়াহ বলেন, এ কারণে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত না হওয়া পর্যন্ত হুযাইফাহ-এর অন্তরে এই স্মৃতি জাগরুক ছিল।
সালামা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে খায়বারের পথে রওয়ানা হলাম। তখন তাদের এক ব্যক্তি বলল, হে আমির! তোমরা আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও। সে তাদেরকে তা গেয়ে শোনাল। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ চালকটি কে? তারা বলল, আমির। তিনি বললেন আল্লাহ তাকে রহম করুন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে তার থেকে দীর্ঘকাল উপকার লাভের সুযোগ করে দিন। পরদিন সকালে আমির নিহত হল। তখন লোকেরা বলতে লাগল তার আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে, সে নিজেকে হত্যা করেছে। যখন আমি ফিরলাম, আর লোকেরা বলাবলি করছিল যে, আমিরের আমল বিনষ্ট হয়ে গেছে, তখন আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি কুরবান। তাদের ধারণা, আমিরের আমল নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বললেনঃ যে এ কথা বলেছে মিথ্যা বলেছে। কারণ, আমিরের জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার। কারণ সে আল্লাহর পথে সাধ্যমত চেষ্টা করেছে, অন্য কোন প্রকারের হত্যা তাকে এর চেয়ে অধিক পুরস্কারের অধিকারী করত?
ইমরান ইবন হুসায়ন হতে বর্ণিত যে, এক লোক অন্য এক লোকের হাত দাত দিয়ে কামড়ে ধরল। সে তার হাত ঐ লোকের মুখ থেকে টেনে বের করল। ফলে তার দু'টো দাত উপড়ে গেল। তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট তাদের মুকাদ্দমা হাজির করল। তখন তিনি বললেনঃ তোমাদের কেউ তার ভাইকে কি কামড়াবে উট যেমন কামড়ায়? তোমার জন্য কোন রক্তপণ নেই।
ইয়া'লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কোন একটি যুদ্ধে বেরিয়েছিলাম। তখন এক লোক দাত দিয়ে কামড়ে ধরে, যার ফলে তার দাত উপড়ে যায়। তখন নবী (ﷺ) তার (দাতের) রক্তপণকে বাতিল করে দেন।
আনাস হতে বর্ণিত যে, নাযরের কন্যা একটি বালিকাকে চড় দিয়ে তার দাত ভেঙ্গে ফেলল। তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট এল। তখন তিনি কিসাসের হুকুম দিলেন।
ইবন আব্বাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ রক্তপণের ব্যাপারে) এটি এবং ওটি সমান। কনিষ্ঠাঙ্গুলি ও বৃদ্ধাঙ্গুলি।
আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) বলেন, আমাকে ইবন বাশশার ইবন উমার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, একটি বালককে গোপনে হত্যা করা হয়। তখন উমার বললেন, যদি গোটা সান্'আবাসী এতে অংশ নিত তাহলে আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। মুগীরাহ ইবন হাকীম আপন পিতা হাকীম থেকে বর্ণনা করেন যে, চারজন লোক একটি বালককে হত্যা করেছিল। তখন উমার ঐরকম কথা বলেছিলেন। আবূ বাকর ও ইবন যুবায়র, আলী ও সুওয়ায়দ ইবন মুকাররিন চড়ের বিষয়ে কিসাসের নির্দেশ দেন। উমার ছড়ি দিয়ে মারার ব্যাপারে কিসাসের নির্দেশ দেন। আর আলী তিনটি বেত্রাঘাতের জন্য কিসাসের নির্দেশ দেন এবং শুরায়হ্ একটি বেত্রাঘাত ও নখের আচড়ের জন্য কিসাস বলবৎ করেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর অসুস্থতার সময় তার মুখের এক পাশে ঔষধ ঢেলে দিলাম। আর তিনি আমাদের দিকে ইঙ্গিত করতে থাকলেন যে, তোমরা আমার মুখের এক পাশে ঔষধ ঢেলে দিও না। আমরা মনে করলাম যে, রোগীর ঔষধের প্রতি অনাসক্তিই এর কারণ। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন, তখন বললেনঃ আমাকে (জোর পূর্বক) ঔষধ সেবন করাতে কি তোমাদেরকে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, রোগীর ঔষধের প্রতি অনাসক্তিই এর কারণ বলে আমরা মনে করেছি। তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এমন কেউ যেন না থাকে যার মুখে জোরপূর্বক ঔষধ ঢালা না হবে আর আমি দেখব শুধু আব্বাস ছাড়া। কারণ, সে তোমাদের সাথে উপস্থিত ছিল না।
আবূ নুআম সাহল ইবন আবূ হাস্মা হতে বর্ণিত যে,তার গোত্রের একদল লোক খায়বার গেল ও সেখানে তারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ল। তারা তাদের একজনকে নিহত অবস্থায় পেল। এবং যাদের কাছে তাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল তাদেরকে তারা বলল, তোমরা আমাদের সাথীকে হত্যা করেছ। তারা বলল, আমরা তাকে হত্যা করিনি, আর হত্যাকারীকে জানিও না। এরপর তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে গেল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা খায়বার গিয়েছিলাম। আর আমাদের একজনকে সেখানে নিহত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি বললেন বড়দেরকে বলতে দাও, বড়দেরকে বলতে দাও। তারপর তিনি তাদেরকে বললেনঃ তোমাদেরকে তার হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করতে হবে। তারা বলল, আমাদের কাছে কোন প্রমাণ নেই। তিনি বললেনঃ তাহলে ওরা কসম করবে। তারা বলল, ইয়াহূদীদের কসমে আমাদের বিশ্বাস নেই। এ নিহতের রক্ত বৃথা হয়ে যাক তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পছন্দ করলেন না। তাই সদাকাহর একশ উট দিয়ে তার রক্তপণ আদায় করলেন।
কুতাইবাহ ইবন সাঈদ ... আবূ কিলাবাহ হতে বর্ণিত যে, একবার উমার ইবন আবদুল আযীয তার সিংহাসন মানুষদেরকে দেখানোর জন্য বের করলেন। তারপর লোকদেরকে তার নিকট আসার অনুমতি প্রদান করলেন। তারা প্রবেশ করল। তারপর বললেন, তোমরা কাসামার ব্যাপারে কী মত পোষণ কর? তারা বলল, আমাদের মতে কাসামার ভিত্তিতে কিসাস গ্রহণ করা বৈধ। খলীফাগণ এর ভিত্তিতে কিসাস কার্যকর করেছেন। তিনি আমাকে বললেন, হে আবূ কিলাবা! তুমি কী বল? তিনি আমাকে লোকদের সামনে দাড় করালেন। আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার কাছে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থগণ ও আরব নেতাগণ আছেন, বলুন তো! যদি তাদের থেকে পঞ্চাশ ব্যক্তি দামেশকের একজন বিবাহিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় যে সে যিনা করেছে, অথচ তারা তাকে দেখেনি, তাহলে আপনি তাকে রজম করবেন কি? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, বলুন তো! যদি তাদের মধ্য থেকে পঞ্চাশ জন হিম্স নিবাসী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় যে, সে চুরি করেছে অথচ তারা তাকে দেখেনি, তাহলে কি আপনি তার হাত কাটবেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তিন কারণের কোন একটি ছাড়া কাউকে হত্যা করেননি। (যথা) : (অন্যায়ভাবে) কাউকে হত্যা করলে তাকে হত্যা করা হবে। অথবা যে ব্যক্তি বিয়ের পর যিনা করে, অথবা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ও ইসলাম থেকে ফিরে মুরতাদ হয়ে যায়। তখন লোকেরা বলল, আনাস ইবন মালিক কি বর্ণনা করেননি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চুরির ব্যাপারে হাত কেটেছেন, লৌহশলাকা দ্বারা চোখ ফুড়ে দিয়েছেন, তারপর তাদেরকে উত্তপ্ত রৌদ্রে ফেলে রেখেছেন। তখন আমি বললাম, আমি তোমাদেরকে আনাস-এর হাদীস বর্ণনা করছি। আমাকে আনাস বর্ণনা করেছেন, উক্ল গোত্রের আটজন লোক রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে এল। তারা তার হাতে ইসলামের বায়আত গ্রহণ করল। কিন্তু সে এলাকার আবহাওয়া তাদের অনুকূলে হল না এবং তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এর অভিযোগ করল। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা কি আমার রাখালের সঙ্গে তার উটপালের কাছে গিয়ে সেগুলোর দুধ ও পেশাব পান করবে না? তারা বলল, হ্যা। তারপর তারা সেখানে গিয়ে সেগুলোর দুধ ও পেশাব পান করল। ফলে তারা সুস্থ হয়ে গেল। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রাখালকে হত্যা করে উটগুলো হাকিয়ে নিয়ে চলল। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পৌছলে তিনি তাদের পেছনে ধাওয়া করার জন্য লোক পাঠালেন। তারা ধরা পড়ল এবং তাদেরকে নিয়ে আসা হল। তাদের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হল। তাদের হাত-পা কাটা হল, লৌহশলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুড়ে দেয়া হল। এরপর তপ্ত রোদে তাদেরকে ফেলে রাখা হল। অবশেষে তারা মারা গেল। আমি বললাম, তারা যা করেছে এর চেয়ে জঘন্য আর কী হতে পারে? তারা ইসলাম থেকে মুরতাদ্ হল, হত্যা করল, চুরি করল। তখন আম্বাসা ইবন সাঈদ বললেন, আল্লাহর শপথ! আজকের মত আমি আর কখনো শুনিনি। আমি বললাম, হে আম্বাসা! তাহলে তুমি আমার বর্ণিত হাদীসটি প্রত্যাখ্যান করছ কি? তিনি বললেন, না, তুমি হাদীসটি সঠিকভাবে বর্ণনা করেছ। আল্লাহর কসম! এ লোকগুলো কল্যাণের উপর থাকবে যতদিন এ শায়খ (বুযর্গ) তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন। আমি বললাম, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে একটা নিয়ম আছে। আনসারদের একটি দল তার কাছে আসল। তারা তার কাছে আলোচনা করছিল। ইতোমধ্যে তাদের সামনে তাদের এক লোক বেরিয়ে গেল এবং নিহত হল। তারপর তারা বের হল। তারা তাদের সাথীকে দেখতে পেল যে, রক্তের মাঝে নড়াচড়া করছে। তারা রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে ফিরে এল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সাথী যে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করছিল এবং সে আমাদের সামনেই বের হয়ে গিয়েছিল, আমরা এখন তাকে রক্তের মাঝে নড়াচড়া করতে দেখতে পাচ্ছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেরিয়ে গেলেন এবং বললেনঃ তাকে হত্যা করার ব্যাপারে কাদের সম্বন্ধে তোমাদের ধারণা? তারা বলল, আমরা মনে করি, ইয়াহূদীরা তাকে হত্যা করেছে। তিনি ইয়াহূদীদেরকে ডেকে পাঠালেন। এরপর তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ওকে হত্যা করেছ? তারা বলল, না। তিনি আনসারদের বললেন, তোমরা কি এতে রাযী আছ যে, ইয়াহূদীদের পঞ্চাশ জন লোক শপথ করে বলবে যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। আনসাররা বলল, তারা এতে কোন পরওয়া করবে না, তারা আমাদের সকলকে হত্যা করার পরও শপথ করে নিতে পারবে। তিনি বললেনঃ তাহলে তোমরা কি এজন্য প্রস্তুত আছ যে, তোমাদের থেকে পঞ্চাশজনের শপথের মাধ্যমে তোমরা দীয়াতের অধিকারী হবে? তারা বলল, আমরা শপথ করব না। তখন তিনি নিজের পক্ষ থেকে দীয়াত প্রদান করে দেন। (রাবী আবূ কালাবা বলেন) আমি বললাম, হুযায়ল গোত্র জাহিলী যুগে তাদের গোত্রের লোকেরা এক ব্যক্তিকে সকল প্রকার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। এক রাতে সে লোক বাহ্হা নামক স্থানে ইয়ামনের এক পরিবারের উপর হঠাৎ হামলা চালায়। কিন্তু সে পরিবারের এক লোক তা টের পেয়ে যায় এবং তার প্রতি তরবারী নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করে ফেলে। অতঃপর হুযায়ল গোত্রের লোকেরা এসে ইয়ামনী ব্যক্তিটিকে ধরে ফেলে এবং (হাজ্জের) মৌসুমে উমার-এর কাছে তাকে নিয়ে পেশ করে। আর বলে সে আমাদের এক সঙ্গীকে হত্যা করেছে। ইয়ামনী লোকটি বলল, তারা কিন্তু ওকে সকল প্রকার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তখন তিনি বললেন, হুযায়ল গোত্রের পঞ্চাশ জন লোক এ মর্মে শপথ করবে যে তারা ওকে সকল দায়-দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বর্ণনাকারী বলেন, তাদের মধ্য থেকে ঊনপঞ্চাশ জন লোক শপথ করে নিল, অতঃপর তাদের একজন সিরিয়া থেকে এলো, তারা তাকে শপথ করতে বলল। কিন্তু সে এক হাজার দিরহামের বিনিময়ে শপথ থেকে তাদের সঙ্গে আপোস করে নিল। তখন তারা তার স্থলে অপর একজনকে যোগ করে নিল। তারা তাকে নিহত ব্যক্তির ভাইয়ের কাছে পেশ করল। তারা উভয়েই করমর্দন করল। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা এবং ঐ পঞ্চাশ জন লোক, যারা শপথ করেছে, চললাম। যখন তারা নাখ্লা নামক স্থানে পৌছল, তাদের উপর বৃষ্টি নেমে এল। তখন তারা পর্বতের এক গুহায় প্রবেশ করল। কিন্তু গুহা এ পঞ্চাশজন শপথকারীর উপর ভেঙ্গে পড়ল? এতে তারা সকলেই মারা গেল। তবে করমর্দনকারী দু'জন বেচে গেল। কিন্তু একটি পাথর তাদের উভয়ের প্রতি নিক্ষিপ্ত হল এবং নিহত লোকের ভাইয়ের পা ভেঙ্গে ফেলল। আর সে এক বছর জীবিত থাকার পর মারা গেল। (রাবী বলেন) আমি বললাম, আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান (এক সময়) কাসামার ভিত্তিতে এক ব্যক্তির কিসাস গ্রহণ করেন। এরপর আপন কৃতকর্মের উপর তিনি লজ্জিত হন এবং ঐ পঞ্চাশ জন লোক সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন যারা শপথ করেছিল, তাদেরকে রেজিস্ট্রার থেকে খারিজ করে দিয়ে সিরিয়ায় নির্বাসন দিলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। এক লোক নবী (ﷺ)-এর কোন একটি হুজরার ছিদ্র দিয়ে উকি মারল। তখন তিনি তার প্রতি লক্ষ্য করে একটি তীক্ষ্ণ প্রশস্ত ছুরি নিয়ে দাড়ালেন এবং তার অজান্তে তাকে খোচা দেয়ার সুযোগ খুজতে লাগলেন।
সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন হুজরার দরজার এক ছিদ্র দিয়ে উকি মারল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট চিরুনির মত একখন্ড লোহা ছিল। এ দিয়ে তিনি নিজ মাথা চুল্কাচ্ছিলেন। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে দেখলেন তখন বললেনঃ যদি আমি নিশ্চিত হতাম যে, তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ তাহলে এটা দিয়ে আমি তোমার চোখে আঘাত করতাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ চোখের কারণেই অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূল কাসিম বলেছেনঃ যদি কোন লোক অনুমতি ছাড়া তোমার দিকে উকি মারে আর তখন তুমি তার প্রতি কংকর ছুঁড়ে তার চোখ উপড়ে ফেল, এতে তোমার কোন অপরাধ হবে না।
আবূ জুহায়ফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আলী-কে জিজ্ঞেস করলাম, যা কুরআনে নেই এমন কিছু আপনাদের নিকট আছে কি? একবার তিনি বলেছেন, যা মানুষের নিকট নেই.....তখন তিনি বললেন, ঐ সত্তার কসম! যিনি খাদ্যশস্য অঙ্কুরিত করেন এবং প্রাণ সৃষ্টি করেন! কুরআনে যা কিছু আছে তা ছাড়া আমাদের নিকট অন্য কিছু নেই। তবে এমন জ্ঞান যা আল্লাহর কিতাব বুঝবার জন্য কোন ব্যক্তিকে দেয়া হয় এবং এ কাগজের টুকরায় যা রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাগজের টুকরায় কী রয়েছে? তিনি বললেন, রক্তপণ ও মুক্তিপণের বিধান। আর (এ নীতি) কোন কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা হবে না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, হুযায়ল গোত্রের দু'জন মহিলার একজন আরেক জনকে পাথর ছুঁড়ে গর্ভপাত ঘটিয়ে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ মহিলার ব্যাপারে একটি গোলাম অথবা বাদী প্রদানের ফায়সালা দিলেন।
উমার হতে বর্ণিত যে, তিনি মহিলাদের গর্ভপাত সম্বন্ধে সহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তখন মুগীরাহ বললেন, নবী (ﷺ) এমন ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত লোকটিকে একটি গোলাম অথবা বাদী প্রদানের ফায়সালা করেছেন।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ সাক্ষ্য দিলেন যে, তিনি নবী (ﷺ)-কে এ ফায়সালা করতে দেখেছেন।
হিশামের পিতা উরওয়াহ হতে বর্ণিত যে, উমার লোকদেরকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, নবী (ﷺ)-কে ভ্রূণ হত্যার ব্যাপারে ফায়সালা দিতে কে শুনেছে? তখন মুগীরাহ বললেন, আমি তাকে এরূপ ক্ষেত্রে একটি গোলাম অথবা বাদী প্রদানের ফায়সালা প্রদান করতে শুনেছি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তোমার সাক্ষী নিয়ে এসো।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নবী (ﷺ) এরূপ ফায়সালা প্রদান করেছেন। মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ উমার হতে বর্ণিত যে, তিনি সাহাবীগণের সঙ্গে গর্ভপাত ঘটানোর বিষয়ে এরূপ পরামর্শ করেছেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বানী লিহয়ানের এক মহিলার ভ্রুণ হত্যার ব্যাপারে একটি গোলাম অথবা বাদী প্রদানের ফায়সালা করেন। তারপর দন্ডপ্রাপ্ত মহিলার মৃত্যু হল, যার ব্যাপারে নবী (ﷺ) ঐ ফায়সালা করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পুনরায় ফায়সালা প্রদান করলেন যে, তার ত্যাজ্য সম্পত্তি তার ছেলে সন্তান ও স্বামী পাবে। আর দিয়াত আদায় করবে তার আসাবা।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযায়ল গোত্রের দু'জন মহিলা ঝগড়াকালে একে অন্যের প্রতি পাথর ছুঁড়ে মারে এবং একজন অন্য জনের গর্ভস্থিত সন্তানকে হত্যা করে ফেলল। তারপর তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে বিচার নিয়ে এল। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, ভ্রূণের দিয়াত হলো একটি গোলাম অথবা বাদী আর এ ফায়সালাও দিলেন যে, নিহত মহিলার দিয়াত হত্যাকারিণীর আসাবার উপর আসবে।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় আসলেন, তখন আবূ ত্বল্হা আমার হাত ধরে আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আনাস একজন হুঁশিয়ার ছেলে। সে যেন আপনার খেদমত করে। আনাস বলেন, আমি মুকীম এবং সফরকালে তার খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! যে কাজ আমি করেছি এর জন্য তিনি আমাকে কোন দিন এ কথা বলেননি, এটা এমন কেন করেছ? আর যে কাজ আমি করিনি এ জন্য এ কথা বলেননি, এটা এরকম কেন করনি?
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কোন পশু কাউকে আহত করলে, কূপে বা খণিতে পড়ে কেউ নিহত বা আহত হলে তাতে কোন দন্ড বা রক্তপণ নেই। আর কেউ গুপ্তধন পেলে তার প্রতি এক-পঞ্চমাংশ দেয়া ওয়াজিব।
আবূ হুরাইরাহ এর মাধ্যমে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পশু আহত করলে, খণি বা কূপে পড়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাতে কোন ক্ষতিপূরণ নেই। গুপ্তধনের এক-পঞ্চমাংশ দেয়া ওয়াজিব।
আবদুল্লাহ ইবন আমর সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি প্রদত্ত কোন লোককে হত্যা করে, সে ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধির ঘ্রাণ নিতে পারবে না। অথচ তার সুগন্ধ চল্লিশ বছরের দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়।
আবূ জুহাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আলী-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের কাছে এমন কিছু আছে কি যা কুরআনে নেই? তিনি বললেন, দিয়াতের বিধান, বন্দী-মুক্তির বিধান এবং (এ বিধান যে) কাফেরের বদলে কোন মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না।
আবূ সাঈদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ তোমরা নবীদের একজনকে অন্য জনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ইয়াহূদী, যার মুখে চপেটাঘাত করা হয়েছিল, নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আপনার জনৈক আন্সারী সাহাবী আমার মুখে চপেটাঘাত করেছে। তিনি বললেন, তোমরা তাকে ডেকে আন। তারা তাকে ডেকে আনল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কেন চড় মারলে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক ইয়াহূদীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি তাকে বলতে শুনলাম যে, ঐ সত্তার কসম! যিনি মূসাকে মানবকুলের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তখন আমি বললাম, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপরেও কি? অতঃপর আমার ভীষণ রাগ এসে গেল। ফলে আমি তাকে চড় মেরে দেই। তিনি বলেনঃ তোমরা আমাকে নবীদের মাঝে কারোউপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কেননা সকল মানুষই কিয়ামতের দিন বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তখন আমিই হব প্রথম ব্যক্তি যে হুঁশ ফিরে পাবে। কিন্তু আমি তখন মূসা-কে এমন অবস্থায় পাব যে, তিনি আরশের খুটিগুলো থেকে একটি খুটি ধরে আছেন। আমি বুঝতে পারব না যে, তিনি আমার আগে হুঁশ ফিরে পেলেন, না তূর পর্বতে বেহুঁশ হবার প্রতিদান দেয়া হয়েছে (যে জন্য তিনি পুনরায় বেহুঁশই হননি)?