আল্লাহদ্রোহী ও ধর্মত্যাগীদেরকে তাওবার প্রতি আহবান ও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা (৬৯১৮-৬৯৩৯)
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলোঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি ..... (আনআম ৬/৮২)। তখন তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহাবাদের কাছে গুরুতর মনে হলো। তারা বললেন, আমাদের মাঝে এমন কে আছে যে তার ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করে না। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তা অবশ্যই এমনটা নয়, তোমরা কি লুকমানের কথা শ্রবণ করনি? শিরকই বিরাট জুলুম (সীমালঙ্ঘন)- (লুক্বমান ৩১/১৩)।
আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সবচেয়ে কঠিন কবীরা গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। মিথ্যা সাক্ষ্য কথাটি তিনবার বললেন। অথবা বলেছেন; মিথ্যা বক্তব্য। কথাটি বারবার বলতে থাকলেন, এমন কি আমরা আকাঙ্ক্ষা করতে লাগলাম, হায় যদি তিনি নীরব হয়ে যেতেন।
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক বেদুঈন নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কবীরা গুনাহসমূহ কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তারপর পিতা-মাতার অবাধ্যতা। সে বলল, তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ তারপর মিথ্যা কসম করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মিথ্যা শপথ কী? তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি (শপথের সাহায্যে) মুসলিমের ধন-সম্পদ হরণ করে নেয়। অথচ সে এ শপথের ক্ষেত্রে মিথ্যাচারী।
ইবন মাস্'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি জাহিলী যুগের কাজ কর্মের জন্য পাকড়াও হবো? তিনি বললেনঃ যে লোক ইসলামী যুগে সৎ কাজ করবে সে জাহিলী যুগের কাজ কর্মের জন্য পাকড়াও হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলাম কবুলের পর অসৎ কাজ করবে, সে প্রথম ও পরবর্তীর জন্য (উভয় সময়ের কৃতকর্মের জন্য) পাকড়াও হবে।
ইকরিমাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী-এর কাছে একদল যিনদীককে (নাস্তিক ও ধর্মত্যাগীকে) আনা হল। তিনি তাদেরকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। এ ঘটনা ইবন আব্বাস-এর কাছে পৌছলে তিনি বললেন, আমি কিন্তু তাদেরকে পুড়িয়ে ফেলতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিষেধাজ্ঞা আছে যে, তোমরা আল্লাহর শাস্তি দ্বারা শাস্তি দিও না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশ আছে, যে কেউ তার দ্বীন বদলে ফেলে তাকে তোমরা হত্যা কর।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে এলাম। আমার সঙ্গে আশআরী গোত্রের দু'জন লোক ছিল। একজন আমার ডানদিকে, অপরজন আমার বামদিকে। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন মিস্ওয়াক করছিলেন। উভয়েই তার কাছে আবদার জানাল। তখন তিনি বললেনঃ হে আবূ মূসা! অথবা বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স! রাবী বলেন, আমি বললামঃ ঐ সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, তারা তাদের অন্তরে কী আছে তা আমাকে জানায়নি এবং তারা যে চাকরি প্রার্থনা করবে তা আমি বুঝতে পারিনি। আমি যেন তখন তার ঠোঁটের নিচে মিস্ওয়াকের প্রতি লক্ষ্য করছিলাম যে তা এক কোণে সরে গেছে। তখন তিনি বললেন, আমরা আমাদের কাজে এমন কাউকে নিযুক্ত করব না বা করি না যে নিজেই তা চায়। বরং হে আবূ মূসা! অথবা বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স! তুমি ইয়ামনে যাও। এরপর তিনি তার পেছনে মুআয ইবন জাবাল-কে পাঠালেন। যখন তিনি সেখানে পৌছলেন, তখন আবূ মূসা তার জন্য একটি গদি বিছালেন আর বললেন, নেমে আসুন। ঘটনাক্রমে তার কাছে একজন লোক শেকলে বাধা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঐ লোকটি কে? আবূ মূসা বললেন, সে প্রথমে ইয়াহূদী ছিল এবং মুসলিম হয়েছিল। কিন্তু আবার সে ইয়াহূদী হয়ে গেছে। আবূ মূসা বললেন, বসুন। মুআয বললেন, না, বসব না, যতক্ষণ না তাকে হত্যা করা হবে। এটাই আল্লাহ ও তার রাসূলের ফায়সালা। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। এরপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হল এবং তাকে হত্যা করা হল। তারপর তারা উভয়ই কিয়ামুল্ লায়ল (রাত্রি জাগরণ) সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তখন একজন বললেন, আমি কিন্তু ইবাদাতও করি, নিদ্রাও যাই। আর নিদ্রার অবস্থায় ঐ আশা রাখি যা ইবাদাত অবস্থায় রাখি।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ)-এর মৃত্যু হল এবং আবূ বাকর খলীফা হলেন আর আরবের যারা কাফির হল, তখন উমার বললেন, হে আবূ বকর! আপনি কিভাবে লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন? অথচ নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই) বলবে। আর যে কেউ 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলে, যথার্থ কারণ না থাকলে সে তার জান-মাল আমার হাত থেকে রক্ষা করে নেয়। আর তার হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে।
আবূ বাকর বললেন, আল্লাহর কসম! যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমি যুদ্ধ করব। কেননা, যাকাত হল মালের হক। আল্লাহর কসম! যদি তারা একটি বকরীর বাচ্চাও না দেয় যা তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে দিত, তাহলে তা না দেয়ার কারণে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। উমার বলেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝতে পারলাম যে, এটা আর কিছু নয় এবং আল্লাহ আবূ বাকর-এর বক্ষ যুদ্ধের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। পরে আমি বুঝতে পারলাম যে, (আবূ বকর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন) এটি-ই হক।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ইয়াহূদী রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট দিয়ে গেল। আর বলল, আস্সামু আলাইকা। তার উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ ওয়া আলাইকা। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদের বললেনঃ তোমরা কি বুঝতে পেরেছ সে কী বলেছে? সে বলেছে, 'আস্সামু আলাইকা' (তোমার মরণ হোক)। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাকে হত্যা করব না? তিনি বললেনঃ না। বরং যখন কোন আহলে কিতাব তোমাদেরকে সালাম করবে তখন তোমরা বলবে, 'ওয়া আলাইকুম' (তোমাদের উপরও)।
আবূ নুআম আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদল ইয়াহূদী নবী (ﷺ)-এর নিকটে প্রবেশের অনুমতি চাইল। (প্রবেশ করার সময়) তারা বলল 'আস্সামু আলাইকা (তোমার মৃত্যু হোক)। তখন আমি বললাম, বরং তোদের উপর মৃত্যু ও লানত হোক। নবী (ﷺ) বললেনঃ হে আয়িশাহ! আল্লাহ কোমল। তিনি সকল কাজে কোমলতা পছন্দ করেন। আমি বললাম, আপনি কি শুনেননি তারা কী বলেছে? তিনি বললেনঃ আমিও তো বলেছি ওয়া-আলাইকুম (এবং তোমাদের উপরও)।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ ইয়াহূদীরা যখন তোমাদের কাউকে সালাম করে তারা 'সামু আলাইকুম' বলে। তাই তোমরা বলবে, 'আলাইকা'- তোমাদের উপর।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যেন লক্ষ্য করছিলাম যে, নবী (ﷺ) কোন এক নবীর কথা বর্ণনা করেছেন যাকে তার সম্প্রদায় প্রহার করে রক্তাক্ত করে ফেলে, আর তিনি আপন চেহারা থেকে রক্ত মুছছেন ও বলছেনঃ হে রব! তুমি আমার কাওমকে ক্ষমা করে দাও। কেননা, তারা বুঝে না।
সুয়ায়দ ইবন গাফালা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী বলেছেন, আমি যখন তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন হাদীস বয়ান করি 'আল্লাহর শপথ! তখন তার উপর মিথ্যা কথা আরোপ করার চেয়ে আকাশ থেকে নিচে পড়ে যাওয়াটা আমার কাছে শ্রেয়। কিন্তু আমি যদি আমার ও তোমাদের মধ্যকার বিষয় সম্পর্কে কিছু বলি, তাহলে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধ একটি কৌশল। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে অল্পবয়স্ক যুবক, নির্বোধ। তারা সৃষ্টির সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম কথা থেকে আবৃত্তি করবে। অথচ ঈমান তাদের গলা অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তাদেরকে যেখানেই তোমরা পাবে হত্যা করবে। কেননা তাদেরকে হত্যা করলে হত্যাকারীর জন্য কিয়ামতের দিনে প্রতিদান আছে।
আবূ সালামাহ ও আতা ইবন ইয়াসার হতে বর্ণিত যে, তারা আবূ সাঈদ খুদরী-এর কাছে এলেন। তারা তাকে 'হারূরিয়্যা' সম্প্রদায়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন যে, আপনি কি নবী (ﷺ) থেকে এদের ব্যাপারে কিছু শুনেছেন? তিনি বললেন, হারূরিয়্যা কী তা আমি জানি না। তবে নবী (ﷺ) কে বলতে শুনেছি এ উম্মাতের মধ্যে বের হবে। তার থেকে সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হবে কথাটি বলেননি। যাদের সালাতের তুলনায় তোমরা তোমাদের সালাতকে তুচ্ছ ভাববে। তারা কুরআন পড়বে বটে কিন্তু তা তাদের গলা অতিক্রম করবে না। তারা দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে যেমন তীর শিকার ভেদ করে বের হয়ে যায়। তীর নিক্ষেপকারী তীরের প্রতি, তার অগ্রাংশের প্রতি, তীরের মুখে বেষ্টনীর প্রতি লক্ষ্য করে, তীরের ছিলার বেলায়ও সন্দেহ হয় যে তাতে কিছু রক্ত লেগে থাকল কি না।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি হারুরিয়্যা সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তারা ইসলাম থেকে এমনিভাবে বের হয়ে যাবে যেমন তীর শিকার থেকে বের হয়ে যায়।
আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কোন কিছু বণ্টন করছিলেন। ঘটনাক্রমে আবদুল্লাহ ইবন যুলখুওয়ায়সিরা তামীমী এল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ইনসাফ করুন। তিনি বললেনঃ আফসোস তোমার জন্য! আমি যদি ইনসাফ না করি তা হলে আর কে ইন্সাফ করবে? উমার ইবন খাত্তাব বললেন, আমাকে অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেনঃ তাকে ছেড়ে দাও। তার জন্য সাথীরা আছে। যাদের সালাতের তুলনায় তোমরা তোমাদের সালাতকে তুচ্ছ মনে করবে। যাদের সিয়ামের তুলনায় তোমরা তোমাদের সিয়ামকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা দ্বীন থেকে এমনিভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়। তীরের প্রতি লক্ষ্য করলে তাতে কিছু পাওয়া যায় না। তীরের মুখের বেষ্টনীর প্রতি লক্ষ্য করলেও কিছু পাওয়া যায় না। তীরের কাঠের অংশের দিকে দেখলেও তাতে কিছু পাওয়া যায় না। বরং তীর তীব্র গতিতে বেরিয়ে যাবার সময় তাতে মল ও রক্তের দাগ পর্যন্ত লাগে না। তাদের পরিচয় এই যে, তাদের একটি লোকের একটি হাত অথবা বলেছেন, একটি স্তন হবে মহিলাদের স্তনের ন্যায়। অথবা বলেছেন, অতিরিক্ত গোশতের টুকরার ন্যায়। লোকদের মধ্যে বিরোধের সময় তাদের আবির্ভাব ঘটবে। আবূ সাঈদ বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি তা নবী (ﷺ) থেকে শুনেছি। এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী তাদেরকে হত্যা করেছেন। আমি তখন তার সঙ্গে ছিলাম। তখন নবী (ﷺ) এর দেয়া বর্ণনার সংগে মিলে এমন ব্যক্তিকে আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ওর সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছেঃ "ওদের মধ্যে এমন লোক আছে যে সাদাকাহ সম্পর্কে তোমাকে দোষারোপ করে"- (আত্-তওবা ৯/৫৮)।
ইউসায়র ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাহল ইবন হুনায়ফ-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি নবী (ﷺ)-কে খারিজীদের সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছেন কি? তিনি বললেন, আমি তাকে বলতে শুনেছি, আর তখন তিনি তার হাত ইরাকের দিকে বাড়িয়েছিলেন যে, সেখান থেকে এমন একটি সম্প্রদায় বের হবে যারা কুরআন পড়বে সত্য, কিন্তু তা তাদের গলা অতিক্রম করবে না, তারা ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না এমন দু'টি দল পরস্পর লড়াই করবে, যাদের দাবী হবে অভিন্ন।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবন হাকীম-কে রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর জীবিত অবস্থায় সূরা ফুরকান পড়তে শুনেছি। আমি তার পড়ার প্রতি কর্ণপাত করলাম, (আমি লক্ষ্য করলাম) যে, তিনি এর অনেকগুলো অক্ষর এমন নিয়মে পড়ছেন, যে নিয়মে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে পড়াননি। ফলে আমি তাকে সালাতের মাঝেই আক্রমণ করতে প্রস্তুত হলাম। কিন্তু সালাম ফিরানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সালাম ফিরানোর পর আমি তাকে তার চাদর দিয়ে অথবা বললেন আমার চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। আর বললাম, তোমাকে এ সূরা কে পড়িয়েছে? তিনি বললেন, রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) আমাকে তা পড়িয়েছেন। আমি তাকে বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে এ সূরা পড়িয়েছেন যা তোমাকে পড়তে শুনেছি। তারপর আমি তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট টেনে নিয়ে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ লোককে সূরাহ ফুরক্বান এমন অক্ষর দিয়ে পড়তে শুনেছি যা আপনি আমাকে পড়াননি। আর আপনি তো আমাকে সূরাহ ফুরক্বান পড়িয়েছেন। তিনি বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে উমর! তাকে ছেড়ে দাও। (আর বললেন) হে হিশাম! তুমি পড় তো। হিশাম তার কাছে সেভাবেই পড়লেন, যেভাবে তাকে তা পড়তে আমি শুনেছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এভাবেই অবতীর্ণ করা হয়েছে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে উমার! তুমিও পড়। আমি পড়লাম। তখন তিনি বললেনঃ এভাবেও অবতীর্ণ করা হয়েছে। অতঃপর বললেনঃ এ কুরআন সাত (কিরাআতে) ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। কাজেই যে পদ্ধতিতেই সহজ হয় সে পদ্ধতিতেই তোমরা তা পাঠ কর।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুল্ম দ্বারা কলুষিত করেনি- (আনআম ৬/৮২), তখন তা নবী (ﷺ)-এর সহাবাদের জন্য কঠিন মনে হল। তারা বলল, আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তার ঈমানকে যুল্ম দ্বারা কলুষিত করে না? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা যেভাবে ধারণা করছ তা তেমন নয়। বরং এটা হচ্ছে ঐরূপ যেমন লুক্মান তার পুত্রকে বলেছিলেনঃ "হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে কোন শরীক করো না। শির্ক তো বড় যুল্ম (সীমালঙ্ঘন)"- (লুক্বমান ৩১/১৩)।
ইতবান ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সকালে আমার কাছে আসলেন। তখন এক লোক বলল, মালিক ইবন দুখ্শুন কোথায়? আমাদের এক ব্যক্তি বলল, সে তো মুনাফিক; সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে না। তা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা কি এ কথা বলনি যে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি চেয়ে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলে। তারা বললেন, হ্যা। তিনি বললেনঃ যে কোন বান্দা কিয়ামতের দিন ঐ কথা নিয়ে উপস্থিত হবে, আল্লাহ তার উপর জাহান্নাম হারাম করে দেবেন।
একজন রাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন কারণে আবূ আবদুর রহমান ও হিব্বান ইবন আতিয়্যার মাঝে ঝগড়া বাধে। আবূ আবদুর রহমান হিব্বানকে বললেন, আমি অবশ্যই জানি যে, কোন বিষয়টি আপনার সাথীকে রক্তপাতে দুঃসাহস জুগিয়েছে। সাথী, আলী। সে বলল, সে কী! তোমার পিতা জীবিত না থাকুক। আবূ আবদুর রহমান বলল, তা আলী-কে বলতে শুনেছি। হিববান বলল, সে কী? আবদুর রহমান বলল, যুবায়র, আবূ মারছাদ এবং আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পাঠালেন। আমরা সকলেই অশ্বারোহী ছিলাম। তিনি বললেনঃ তোমরা রওযায়ে হাজ পর্যন্ত যাবে। আবূ সালামাহ বলেন, আবূ আওয়ানা সেরকমই বলেছেন। সেখানে একজন মহিলা আছে, যার কাছে হাতিব ইবন আবূ বালতা'আ-এর পক্ষ থেকে (মক্কার) মুশরিকদের কাছে পাঠানো একখানা চিঠি আছে। তোমরা তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। আমরা আমাদের ঘোড়ায় চড়ে রওনা দিলাম। অবশেষে আমরা তাকে ঐ জায়গায় পেলাম যে জায়গার কথা আমাদের রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন। সে তার উটে চলছে। আবূ বালতা'আ মক্কাবাসীদের কাছে তাদের দিকে রাসূলুল্লাহর (ﷺ) রওনা হওয়ার সংবাদ জানিয়ে পত্র লিখেছেন। আমরা বললাম, তোমার সঙ্গে যে পত্র আছে তা কোথায়? সে বলল, আমার সঙ্গে কোন পত্র নেই। আমরা তার উটকে বসালাম এবং তার হাওদায় খুজলাম। কিন্তু কিছুই পেলাম না। তখন আমার সাথী দু'জন বলল, তার সঙ্গে তো আমরা কোন পত্র দেখছি না। আমি বললাম, আমরা অবশ্যই জানি যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিথ্যা বলেননি। তারপর আলী কসম করে বললেন, ঐ সত্তার কসম! যার নামে কসম করা হয়, অবশ্যই তোমাকে চিঠি বের করে দিতে হবে। নইলে তোমাকে উলঙ্গ করে ফেলব। তখন সে তার চাদর বাধা কোমরের প্রতি দৃষ্টি দিল এবং (সেখান থেকে) চিঠিটি বের করে দিল। তারা চিঠিটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাজির হলেন। তখন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনদের সঙ্গে খিয়ানত করেছে। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে হাতিব! এ কাজে তোমাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কেন আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান রাখব না। আসল কথা হল, আমি চাচ্ছিলাম যে, মক্কাবাসীর প্রতি আমার দ্বারা অনুগ্রহের কাজ হোক যার বিনিময়ে আমার পরিবারবর্গ ও মাল ধন রক্ষা পায়। আপনার সঙ্গীদের সকলেরই সেখানে নিজ গোত্রীয় এমন লোক আছে, যাদের মাধ্যমে আল্লাহ তার পরিবারবর্গ ও মাল ধন রক্ষার ব্যবস্থা করবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ সে ঠিকই বলেছে। কাজেই তোমরা তার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত মন্দ কোন কথা বলো না। বর্ণনাকারী বলেন, উমার পুনরায় বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনদের সঙ্গে খিয়ানত করেছে। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেন, সে কি বাদ্র যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নয়? তুমি কী করে জানবে আল্লাহ তাদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেছেনঃ তোমরা যা ইচ্ছে কর, তোমাদের জন্য জান্নাত নির্ধারিত করে দিয়েছি। এ কথা শুনে উমার-এর দু'চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জানেন।