নবী (ﷺ) এর সাথীরা (৩৬৪৯-৩৭৭৫)
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, লোকেদের উপর এমন এক সময় আসবে যখন তাদের বিরাট সৈন্যবাহিনী জিহাদের জন্য বের হবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য লাভ করেছেন? তারা বলবেন, হা আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে। অতঃপর জনগণের উপর পুনরায় এমন এক সময় আসবে যখন তাদের বিরাট বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত থাকবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য প্রাপ্ত কোন ব্যক্তির সাহচর্য লাভ করেছেন? তখন তারা বলবেন, হা আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে। অতঃপর লোকদের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন তাদের বিরাট বাহিনী জিহাদে অংশগ্রহণ করবে। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীগণের সাহচর্য প্রাপ্ত কোন ব্যক্তির সাহচর্য প্রাপ্ত হয়েছেন? বলা হবে আছেন। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে।
ইমরান ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। ইমরান বলেন, তিনি তার যুগের পর দু'যুগ অথবা তিন যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। অতঃপর এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না। তারা হবে চর্বিওয়ালা মোটাসোটা।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেন, আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। ইব্রাহীম (নাখ্য়ী; রাবী) বলেন, ছোট বেলায় আমাদের মুরুববীগণ আল্লাহর নামে কসম করে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য এবং ওয়াদা-অঙ্গীকার করার কারণে আমাদেরকে মারধর করতেন।
বারাআ (ইবন আযিব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর আযিব-এর নিকট হতে তের দিরহামের একটি হাওদা কিনলেন। আবূ বাকর আযিবকে বললেন, তোমার ছেলে বারাকে হাওদাটি আমার নিকট পৌছে দিতে বল। আযিব বললেন, আমি বারাকে বলব না যতক্ষণ আপনি আমাদেরকে সবিস্তারে বর্ণনা করে না শুনাবেন যে আপনি ও নবী (ﷺ) কী করছিলেন যখন আপনারা মক্কা হতে বেরিয়ে পড়েছিলেন? আর মক্কার মুশরিকগণ আপনাদের পিছু ধাওয়া করেছিল। আবূ বাকর বললেন, আমরা মক্কা হতে বেরিয়ে সারা রাত এবং পরের দিন দুপুর পর্যন্ত অবিরত চললাম। যখন ঠিক দুপুর হয়ে গেল, এবং উত্তাপ তীব্র হলো আমি চারদিকে চেয়ে দেখলাম কোথাও কোন ছায়া দেখা যায় কিনা, যেন আমরা সেখানে বিশ্রাম নিতে পারি। তখন একটি বড় আকারের পাথরে চোখে পড়ল। এই পাথরটির পাশে কিছু ছায়াও আছে। আমি সেখানে আসলাম এবং ঐ ছায়াপূর্ণ জায়গাটি সমতল করে নবী (ﷺ)-এর জন্য বিছানা করে দিলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর নবী! আপনি এখানে শুয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। আমি চারদিকের অবস্থা দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম, আমাদের খোজে কেউ আসছে কিনা? ঐ সময় আমি দেখতে পেলাম, একজন মেষ পালক তার ভেড়া ছাগল হাকিয়ে ঐ পাথরের দিকে আসছে। সেও আমাদের মত ছায়া খোজ করছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে যুবক! তুমি কার রাখাল? সে একজন কুরাঈশের নাম বলল, আমি তাকে চিনতে পারলাম। আমি তাকে শুধালাম, তোমার বক্রীর পালে দুধেল বকরী আছে কি? সে বলল, হা আছে। আমি বললাম। তুমি কি আমাদেরকে দুধ দোহন করে দিবে? সে বলল, হা, দিব। আমি তাকে তা দিতে বললে তৎক্ষণাৎ সে বক্রীর পাল হতে একটি বক্রী ধরে নিয়ে এল এবং পিছনের পা দু'টি বেধে নিল। আমি তাকে বললাম, বকরীর স্তন দু'টি ঝেড়ে মুছে ধূলাবালি হতে পরিষ্কার করে নাও এবং তোমার হাত দু'টি পরিষ্কার কর। তিনি এক হাত অন্য হাতের উপর মেরে (পরিষ্কারের ধরণ) দেখালেন। অতঃপর সে আমাদেরকে পাত্র ভরে দুধ এনে দিল। আমি নবী (ﷺ)-এর জন্য একটি চামড়ার পাত্র সঙ্গে রেখে ছিলাম যার মুখ কাপড় দ্বারা বাধা ছিল। আমি দুধে অল্প পানি মিশিয়ে দিলাম যেন দুধের নিম্নভাগও ঠান্ডা হয়ে যায়। অতঃপর আমি দুধ নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির হয়ে দেখলাম তিনি জেগেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দুধ পান করুন। তিনি দুধ পান করলেন। আমি খুশী হলাম। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় হয়েছে কি? তিনি বললেন, হা হয়েছে। আমরা রওয়ানা দিলাম। মক্কাবাসী মুশরিকরা আমাদের খোজে ছুটাছুটি করছে। কিন্তু সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু'শাম ছাড়া আমাদের সন্ধান তাদের অন্য কেউ পায়নি। সে ঘোড়ায় চড়ে আসছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! খোজকারী আমাদের দেখা পেয়ে গেল। তিনি বললেন, চিন্তা করো না, নিশ্চই মহান আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।
আবূ বাকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন গুহায় আত্মগোপন করেছিলাম তখন আমি নবী (ﷺ)-কে বললাম, যদি কাফিররা তাদের পায়ের নীচের দিকে দৃষ্টিপাত করে তবে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বাকর, ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা আল্লাহ যাদের তৃতীয় জন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদা সাহাবীদের উদ্দেশ্যে খুত্বার কালে বললেন, আল্লাহ তার এক প্রিয় বান্দাকে পার্থিব ভোগ বিলাস এবং তার নিকট রক্ষিত নিয়ামাতসমূহ এ দু'য়ের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দান করেছেন এবং ঐ বান্দা আল্লাহর নিকট রক্ষিত নিয়ামতসমূহ বেছে নিয়েছে। রাবী বলেন তখন আবূ বাকর কাঁদতে লাগলেন। তার কান্না দেখে আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম। নবী (ﷺ) এক বান্দার খবর দিচ্ছেন যাকে এভাবে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে (তাতে কান্নার কী কারণ থাকতে পারে?) কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারলাম, ঐ বান্দা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ছিলেন এবং আবূ বাকর আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন। নবী (ﷺ) বললেন, যে ব্যক্তি তার ধন-সম্পদ দিয়ে, তার সঙ্গ দিয়ে আমার উপর সর্বাধিক ইহসান করেছে সে ব্যক্তি হল আবূ বাকর। আমি যদি আমার রব ছাড়া অন্য কাউকে আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তাহলে অবশ্যই আবূ বাকরকে করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব, আন্তরিক ভালবাসা আছে। মসজিদের দিকে আবূ বাকরের দরজা ছাড়া অন্য কোন দরজা খোলা রাখা যাবে না।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যুগে সাহাবীগণের পারস্পরিক মর্যাদা নির্ণয় করতাম। আমরা সর্বাপেক্ষা মর্যাদা দিতাম আবূ বাকর -কে তারপর উমার ইবন খাত্তাব-কে, অতঃপর উসমান ইবন আফ্ফান-কে।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমি আমার উম্মাতের কাউকে যদি আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবূ বাকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তিনি আমার ভাই ও আমার সাহাবী।
আইয়ুব হতে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বলেন, আমি কাউকে আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে তাকেই আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম। কিন্তু ইসলামী ভ্রাতৃত্বই শ্রেয়তম।
আবদুল্লাহ ইবন আবূ মুলায়কা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুফাবাসীগণ দাদার (অংশ) সম্পর্কে জানতে চেয়ে ইবন যুবায়রের নিকট পত্র পাঠালেন, তিনি বললেন, ঐ মহান ব্যক্তি যার সম্পর্কে নবী (ﷺ) বলেছেন, এ উম্মাতের কাউকে যদি আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তবে তাকেই করতাম, (আবূ বাকর তিনি দাদাকে মিরাসের ক্ষেত্রে পিতার সম মর্যাদা দিয়েছেন।
জুবায়র ইবন মুত'ঈম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক স্ত্রীলোক নবী (ﷺ)-এর নিকট এল। তিনি তাকে আবার আসার জন্য বললেন। স্ত্রীলোকটি বলল, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই তবে কী করব? এ কথা দ্বারা স্ত্রীলোকটি নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর প্রতি ইশারা করেছিল। তিনি (ﷺ) বললেন, যদি আমাকে না পাও তাহলে আবূ বাকরের নিকট আসবে।
আম্মার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে এমন অবস্থায় দেখেছি যে তার সঙ্গে মাত্র পাচজন গোলাম, দু'জন মহিলা এবং আবূ বাকর ছাড়া অন্য কেউ ছিল না।
আবূ দারদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবূ বাকর পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে তার দু' হাটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের এ সাথী এই মাত্র কারো সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে। তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার এবং উমার ইবন খাত্তাবের মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর আমি লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাযির হয়েছি। নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবূ বাকর! এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। অতঃপর উমার লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবূ বাকর-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ বাকর কি বাড়িতে আছেন? তারা বলল, 'না'। তখন উমার নবী (ﷺ)-এর নিকট চলে আসলেন। (তাকে দেখে) নবী (ﷺ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবূ বাকর ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, তুমি মিথ্যা বলছ আর আবূ বাকর বলেছে, আপনি সত্য বলছেন। তার জান মাল সবকিছু দিয়ে আমার সহানুভূতি দেখিয়েছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথীকে অব্যাহতি দিবে? এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন। অতঃপর আবূ বাকর-কে আর কখনও কষ্ট দেয়া হয়নি।
আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তাকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তার নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার পিতা (আবূ বাকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, উমার ইবন খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি; এক সময় এক রাখাল তার বকরীর পালের নিকট ছিল। এমন সময় একটি নেকড়ে বাঘ আক্রমণ করে পাল হতে একটি বকরী নিয়ে গেল। রাখাল নেকড়ে বাঘের পিছু ধাওয়া করে বকরীটি ছিনিয়ে আনল। তখন বাঘটি তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, তুমি বকরীটি ছিনিয়ে নিলে? হিংস্র জন্তুর আক্রমণের দিন কে তাকে রক্ষা করবে, যেদিন তার জন্য আমি ছাড়া কোন রাখাল থাকবে না। এক সময় এক লোক একটি গাভীর পিঠে আরোহণ করে সেটিকে হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন গাভীটি তাকে লক্ষ্য করে বলল, আমি এ কাজের জন্য সৃষ্ট হয়নি। বরং আমি কৃষি কাজের জন্য সৃষ্ট হয়েছি। একথা শুনে সকলেই বিস্ময়ের সঙ্গে বলতে লাগল "সুবহানাল্লাহ"! নবী (ﷺ) বললেন আমি, আবূ বাকর এবং উমার ইবন খাত্তাব এ কথা বিশ্বাস করি।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে আমি আমাকে এমন একটি কূপের কিনারায় দেখতে পেলাম যেখানে বালতিও রয়েছে আমি কূপ হতে পানি উঠালাম যে পরিমাণ আল্লাহ ইচ্ছা করলেন। অতঃপর বালতিটি ইবন আবূ কুহাফা নিলেন এবং এক বা দু'বালতি পানি উঠালেন। তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তার দুর্বলতাকে ক্ষমা করে দিবেন। অতঃপর উমার ইবন খাত্তাব বালতিটি তার হাতে নিলেন। তার হাতে বালতিটির আয়তন বেড়ে গেল। পানি উঠানোতে আমি উমারের মত শক্তিশালী বাহাদুর ব্যক্তি কাউকে দেখিনি। শেষে মানুষ নিজ নিজ আবাসে অবস্থান নিল।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে পরনের কাপড় টাখ্নুর নিম্নভাগে ঝুলিয়ে চলাফিরা করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দিবেন না। এ শুনে আবূ বাকর বললেন, আমার অজ্ঞাতে কাপড়ের একপাশ কোন কোন সময় নীচে নেমে যায়। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি তো ফখরের সঙ্গে তা করছ না। মূসা বলেন, আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আবদুল্লাহ কি 'যে ব্যক্তি তার লুঙ্গি ঝুলিয়ে চলল' বলেছেন? সালিম বললেন, আমি তাকে শুধু কাপড়ের কথা উল্লেখ করতে শুনেছি।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোন জিনিসের জোড়া জোড়া আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবে তাকে জান্নাতে প্রবেশের জন্য সকল দরজা হতে আহবান করা হবে। বলা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এ দরজাই উত্তম। যে ব্যক্তি সালাত সম্পাদনকারী হবে তাকে সালাতের দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্য ডাকা হবে। যে ব্যক্তি জিহাদকারী হবে তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। যে ব্যক্তি সদাকাহকারী হবে, তাকে সদাকাহর দরজা দিয়ে ডাকা হবে। যে ব্যক্তি সওম পালনকারী হবে তাকে সওমের দরজা বাবুররাইয়ান হতে ডাকা হবে। আবূ বাকর বললেন, কোন ব্যক্তিকে সকল দরজা দিয়ে ডাকা হবে এমন তো অবশ্য জরুরী নয়, তবে কি এরূপ কাউকে ডাকা হবে? নবী (ﷺ) বললেন, হা, হবে। আমি আশা করছি তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে, হে আবূ বাকর।
নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ থেকে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যখন মৃত্যু হয়, তখন আবূ বাকর সুন্হ-এ ছিলেন। ইসমাঈল (রাবী) বলেন, সুন্হ মদিনার উচু এলাকার একটি স্থানের নাম। উমার দাড়িয়ে বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যু হয়নি। আয়িশাহ বলেন, উমার বললেন, আল্লাহর কসম, তখন আমার অন্তরে এ বিশ্বাসই ছিল আল্লাহ অবশ্যই তাকে পুনরায় জীবিত করবেন এবং তিনি কিছু সংখ্যক লোকের হাত-পা কেটে ফেলবেন। অতঃপর আবূ বাকর এলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চেহারা হতে আবরণ সরিয়ে তার কপালে চুম্বন করলেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান। আপনি জীবনে মরণে পবিত্র। ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহ আপনাকে কখনও দু'বার মৃত্যু আস্বাদন করাবেন না। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, হে হলফকারী! ধৈর্য অবলন্বন কর। আবূ বাকর যখন কথা বলতে লাগলেন, তখন উমার বসে পড়লেন।
আবূ বাকর আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ইবাদাতকারী ছিলে তারা জেনে রাখ, মুহাম্মাদ (ﷺ) মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদাত করতে তারা নিশ্চিত জেনে রাখ আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি অমর। অতঃপর আবূ বাকর এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ "নিশ্চই আপনি মরণশীল আর তারা সকলেই মরণশীল"- (আয্ যুমার ৩০)। আরো তিলাওয়াত করলেনঃ মুহাম্মাদ তো একজন রাসূল ব্যতিরেকে আর কিছু নয়। তার পূর্বেও অনেক রাসূল চলে গেছে। অতএব যদি সে মারা যায় অথবা নিহত হয় তাহলে কি তোমরা ইসলাম ত্যাগ কর?? আর যদি কেউ সেরূপ পেছনে ফিরেও যায়, তবে সে কখনও আল্লাহর বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না- (আলে ইমরান ১৪৪)। আল্লাহ তার কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। রাবী বলেন, আবূ বাকর-এর এ কথাগুলি শুনে সবাই ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। রাবী বলেন, আনসারগণ সাকীফা বনূ সায়িদায়ে সাদ ইবন উবাইদাহ-এর নিকট সমবেত হলেন এবং বলতে লাগলেন, আমাদের মধ্য হতে একজন আমীর হবেন এবং তোমাদের মধ্য হতে একজন আমীর হবেন। আবূ বাকর, উমার ইবন খাত্তাব, আবূ উবাইদাহ ইবন জার্রাহ-এ তিনজন আনসারদের নিকট গমন করলেন। উমার কথা বলতে চাইলে, আবূ বাকর তাকে থামিয়ে দিলেন। উমার বলেন, আল্লাহর কসম, আমি বক্তব্য রাখতে চেয়েছিলাম এই জন্য যে, আমি আনসারদের মাহফিলে বলার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে এমন কিছু যুক্তিযুক্ত কথা প্রস্তুত করেছিলাম যার প্রেক্ষিতে আমার ধারণা ছিল হয়ত আবূ বাকর-এর চিন্তা চেতনা এতটা গভীরে নাও যেতে পারে। কিন্তু আবূ বাকর অত্যন্ত জোরালো ও যুক্তিপূর্ণ ভাষণ রাখলেন। তিনি তার বক্তব্যে বললেন, আমীর আমাদের মধ্য হতে একজন হবেন এবং তোমাদের মধ্য হতে হবেন উযীর। তখন হুবাব ইবন মুনযির বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা এমন করব না বরং আমাদের মধ্যে একজন ও আপনাদের মধ্যে একজন আমীর হবেন। আবূ বাকর বললেন, না, তা হয় না। আমাদের মধ্য হতে খলীফা এবং তোমাদের মধ্য হতে উযীর হবেন। কেননা কুরাইশ গোত্র অবস্থানের দিক দিয়ে যেমন আরবের মধ্যস্থানে, বংশ ও রক্তের দিকে থেকেও তারা তেমনি শ্রেষ্ঠ। তারা নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতায় সবার শীর্ষে। "তোমরা উমার অথবা আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ-এর হাতে বায়আত করে নাও। উমার বললেন, আমরা কিন্তু আপনার হাতেই বায়আত করব। আপনি আমাদের নেতা। আপনিই আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমাদের মাঝে আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রিয়তম ব্যক্তি। এ বলে উমার তার হাত ধরে বায়আত করে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলেই বায়আত করলেন। তখন জনৈক ব্যক্তি বলে উঠলেন, আপনারা সাদ ইবন উবাইদাহ-কে মেরে ফেললেন? উমার বললেন, আল্লাহ তাকে মেরে ফেলেছেন।
আয়িশাহ বলেন, মৃত্যুর সময় নবী (ﷺ)-এর চোখ দু'টি বার বার উপর দিকে উঠছিল এবং তিনি বার বার বলছিলেন, সর্বোচ্চ বন্ধুর সাক্ষাতের আমি আগ্রহী। আয়িশাহ বলেন, আবূ বাকর ও উমার-এর খুত্বা দ্বারা আল্লাহ তাআলা এ চরম মুহূর্তে উম্মাতকে রক্ষা করেছেন। উমার জনগণকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অন্তরে কপটতা আছে আল্লাহ তাদের ফাঁদ হতে উম্মাতকে রক্ষা করেছেন।
এবং আবূ বাকর লোকেদেরকে সত্য সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন। হক ও ন্যায়ের পথ নির্দেশ করেছেন, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর সহাবাগণ এ আয়াত পড়তে পড়তে চলে গেলেনঃ "মুহাম্মাদ (ﷺ) একজন রাসূল মাত্র। তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন.....কৃতজ্ঞ বান্দাদের।" (আল ইমরানঃ ১৪৪)
মুহাম্মাদ ইবন হানাফীয়া বলেন, আমি আমার পিতা আলী-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ)-এর পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ কে? তিনি বললেন, আবূ বাকর। আমি বললাম, অতঃপর কে? তিনি বললেন, উমার। আমার আশংকা হল যে, অতঃপর তিনি উসমান-এর নাম বলবেন, তাই আমি বললাম, অতঃপর আপনি? তিনি বললেন, না, আমি তো মুসলিমদের একজন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে এক যুদ্ধ সফরে গিয়েছিলাম। আমরা যখন বায়দা অথবা যাতুল জায়শ নামক স্থানে গিয়েছিলাম; তখন আমার হারটি গলা হতে ছিঁড়ে পড়ে যায়। হারটি খোজার জন্য নবী (ﷺ) সেখানে অবস্থান করেন। এজন্য সাহাবীগণও তার সঙ্গে সেখানে অবস্থান করেন। সেখানে পানি ছিল না এবং তাদের সঙ্গেও পানি ছিল না। তাই সাহাবীগণ আবূ বাকর-এ নিকট এসে বললেন, আপনি কি দেখছেন না, আয়িশাহ কী করলেন? তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং তার সঙ্গে সাহাবীগণকে এমন স্থানে অবস্থান করালেন যেখানে পানি নেই এবং তাদের সঙ্গেও পানি নেই। তখন আবূ বাকর আমার নিকট আসলেন। আর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার ঊরুর উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে বলতে লাগলেন, তুমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে এবং সাহাবীগণকে এমন এক স্থানে আটকিয়ে রেখেছ, যেখানে পানি নেই এবং তাদের সঙ্গেও পানি নেই। আয়িশাহ বলেন, তিনি আমাকে অনেক বকাবকি করলেন। এমনকি তিনি হাত দ্বারা আমার কোমরে খোচা মারতে লাগলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার ঊরুর উপর মাথা রেখে শুয়ে থাকার কারণে আমি নড়াচড়াও করতে পারছিলাম না। এমনি পানি না থাকা অবস্থায় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সকাল পর্যন্ত ঘুমন্ত থাকলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ করলেন এবং সকলেই তায়াম্মুম করলেন। উসাইদ ইবন হুযাইর বলেন, হে আবূ বাকর-এর পরিবারবর্গ, এটা আপনাদের প্রথম বরকত নয়। আয়িশাহ বলেন, অতঃপর আমরা সে উটটিকে উঠালাম যে উটের উপর আমি সাওয়ার ছিলাম। আমরা হারটি তার নীচে পেয়ে গেলাম।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না।
আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত যে, তিনি একদা ঘরে উযূ করে বের হলেন এবং আমি আজ সারাদিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে কাটাব, তার হতে পৃথক হব না। তিনি মসজিদে গিয়ে নবী (ﷺ)-এর খবর নিলেন, সাহাবীগণ বললেন, তিনি এদিকে বেরিয়ে গেছেন, আমিও ঐ পথ ধরে তার অনুসরণ করলাম। তার খোজে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলাম। তিনি শেষ পর্যন্ত আরীস কূপের নিকট গিয়ে পৌছলেন। আমি কূপের দরজার নিকট বসে পড়লাম। দরজাটি খেজুরের শাখা দিয়ে তৈরি ছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন তার প্রয়োজন সেরে উযূ করলেন। তখন আমি তার নিকটে দাড়ালাম এবং দেখতে পেলাম তিনি আরীস কূপের কিনারার বাধের মাঝখানে বসে হাটু পর্যন্ত পা দু'টি খুলে কূপের ভিতরে ঝুলিয়ে রেখেছেন, আমি তাকে সালাম করলাম। এবং ফিরে এসে দরজায় বসে রইলাম এবং মনে মনে স্থির করে নিলাম যে আজ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করব। এ সময় আবূ বাকর এসে দরজায় ধাক্কা দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? তিনি বললেন, আবূ বাকর! আমি বললাম থামুন, আমি গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আবূ বাকর ভিতরে আসার অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি বললেন, ভিতরে আসার অনুমতি দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি ফিরে এসে আবূ বাকর কে বললাম, ভিতরে আসুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন। আবূ বাকর ভিতরে আসলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ডানপাশে কুপের ধারে বসে দু'পায়ের কাপড় হাটু পর্যন্ত উঠিয়ে নবী (ﷺ)-এর মত কূপের ভিতর ভাগে পা ঝুলিয়ে দিয়ে বসে পড়েন। আমি ফিরে এসে বসে পড়লাম। আমি আমার ভাইকে উযূ রত অবস্থায় রেখে এসেছিলাম। তারও আমার সঙ্গে মিলিত হবার কথা ছিল। তাই আমি বলতে লাগলাম, আল্লাহ যদি তার কল্যাণ চান তবে তাকে নিয়ে আসুন। এমন সময় এক ব্যক্তি দরজা নাড়তে লাগল। আমি বললাম, কে? তিনি বললেন, আমি উমার ইবন খাত্তাব। আমি বললাম, অপেক্ষা করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট সালাম পেশ করে আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! উমার ইবন খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি বললেন, তাকে ভিতরে আসার অনুমতি এবং জান্নাতের সুসংবাদ জানিয়ে দাও। আমি এসে তাকে বললাম, ভিতরে আসুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনাকে জান্নাতের সু-সংবাদ দিচ্ছেন। তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর বামপাশে হাটু পর্যন্ত কাপড় উঠিয়ে কূপের ভিতর দিকে পা ঝুলিয়ে বসে গেলেন। আমি আবার ফিরে আসলাম এবং বলতে থাকলাম আল্লাহ যদি আমার ভাইয়ের কল্যাণ চান, তবে যেন তাকে নিয়ে আসেন। অতঃপর আর এক ব্যক্তি এসে দরজা নাড়তে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কে? তিনি বললেন, আমি উসমান ইবন আফ্ফান। আমি বললাম, থামুন। নবী (ﷺ)-এর খেদমতে গিয়ে জানালাম। তিনি বললেন, তাকে ভিতরে আসতে বল এবং তাকেও জান্নাতের সু-সংবাদ দিয়ে দাও। তবে কঠিন পরীক্ষা হবে। আমি এসে বললাম, ভিতরে আসুন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপনাকে জান্নাতের সু-সংবাদ দিচ্ছেন, তবে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে। তিনি ভিতরে এসে দেখলেন, কূপের ধারে খালি জায়গা নাই। তাই তিনি নবী (ﷺ)-এর সম্মুখে অপর এক স্থানে বসে পড়লেন। শরীফ বলেন, সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব বলেছেন, আমি এর দ্বারা তাদের কবর এরূপ হবে এই অর্থ করেছি।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, (একবার) নবী (ﷺ), আবূ বাকর, উমর, উসমান উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়টি নড়ে উঠল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হে উহুদ! থামো তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু'জন শহীদ রয়েছেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, একদা আমি একটি কূপ হতে পানি টেনে তুলছি। তখন আবূ বাকর ও উমার আসলেন। আবূ বাকর আমার হাত হতে বালতি তার হাতে নিয়ে এক বালতি কি দু'বালতি পানি টেনে তুললেন। তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। অতঃপর ইবন খাত্তাব বালতিটি আবূ বাকরের হাত হতে নিলেন, তার হাতে যাবার সঙ্গে সঙ্গে বালতির আকার বড় হয়ে গেল। কোন শক্তিশালী জোরওয়ালাকে তার মত পানি আমি উঠাতে দেখিনি। লোকজন তাদের উটগুলিকে পরিতৃপ্ত করে পানি পান করিয়ে উটশালায় নিয়ে গেল। ওয়াহাব (রাবী) বলেন, এমনকি উটগুলি পানি পান করে তৃপ্ত হয়ে বসে গেল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমিও ঐ দলের সঙ্গে দোয়ায় রত ছিলাম, যারা উমার ইবন খাত্তাবের জন্য দোয়া করেছিল। তখন তার লাশটি খাটের উপর রাখা ছিল। এমন সময় এক লোক হঠাৎ আমার পিছন দিক হতে তার কনুই আমার কাঁধের উপর রেখে উমার-কে লক্ষ্য করে বলল, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আমি অবশ্য এ আশা পোষণ করি যে, আল্লাহ আপনাকে আপনার উভয় সঙ্গীর সঙ্গেই রাখবেন। কেননা, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে অনেক বার বলতে শুনেছি, আমি, আবূ বাকর ও উমার এক সঙ্গে ছিলাম, আমি, আবূ বাকর ও উমার এ কাজ করেছি। আমি, আবূ বাকর ও উমার চলেছি। আমি এ আশাই পোষণ করি যে, আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাদের দু'জনের সাথেই রাখবেন। আমি পেছনে চেয়ে দেখলাম, তিনি আলী ইবন আবূ তালিব।
উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর-কে জিজ্ঞেস করলাম, মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে সবচেয়ে কঠিন আচরণ কী করেছিল? তিনি বললেন, আমি 'উক্বাহ ইবন আবূ মুআইতকে দেখেছি; সে নবী (ﷺ)-এর নিকট আসল যখন তিনি সালাত আদায় করছিলেন। সে নিজের চাদর দিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর গলায় জড়িয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। আবূ বাকর এসে উকবাহ্কে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, "তোমরা কি এমন লোককে মেরে ফেলতে চাও, যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব। যিনি তার দাবীর স্বপক্ষে তোমাদের রবের কাছ হতে স্পষ্ট প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন?" (গাফিরঃ ২৮)
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি স্বপ্নে আমাকে দেখলাম যে, আমি জান্নাতে প্রবেশ করেছি। হঠাৎ আবূ ত্বলহা-এর স্ত্রী রুমায়সাকে দেখতে পেলাম এবং আমি পদচারণার শব্দও শুনতে পেলাম। তখন আমি বললাম, এই ব্যক্তি কে? এক ব্যক্তি বলল, তিনি বিলাল। আমি একটি প্রাসাদও দেখতে পেলাম যার উঠানে এক মহিলা আছে। আমি বললাম, ঐ প্রাসাদটি কার? এক ব্যক্তি বলল, প্রাসাদটি উমার ইবন খাত্তাবের। আমি প্রাসাদটিতে প্রবেশ করে দেখার ইচ্ছা করলাম। তখন তোমার [উমার] সূক্ষ্ম মর্যাদাবোধের কথা স্মরণ করলাম। উমার বললেন, আমার বাপ-মা আপনার উপর কুরবান, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছেও কি মর্যাদাবোধ দেখাতে পারি?
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকটে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, একবার আমি ঘুমিয়েছিলাম। স্বপ্নে আমি নিজেকে জান্নাতে দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম, এক নারী একটি প্রাসাদের উঠানে উযূ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ প্রাসাদটি কার? ফেরেশতামন্ডলী বললেন, তা উমার-এর। আমি উমার-এর সূক্ষ্ম মর্যাদাবোধের কথা মনে করে ফিরে এলাম। উমার (শুনে) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আপনার নিকটও কি মর্যাদাবোধ দেখাব হে আল্লাহর রাসূল?
হামযাহ-এর পিতা [আবদুল্লাহ ইবন উমার] হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, আমি ঘুমিয়েছিলাম। (স্বপ্নে) দুধ পান করতে দেখলাম যে তৃপ্তির নিদর্শন যেন আমার নখগুলির মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর দুধ উমার-কে দিলাম। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন? তিনি বললেন, ইলম।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, একটি কূপের পাড়ে বড় বালতি দিয়ে পানি তুলছি। তখন আবূ বাকর এসে এক বালতি বা দু'বালতি পানি তুললেন। তবে পানি তোলার মধ্যে তার দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর উমার ইবন খাত্তাব এলেন। বালতিটি তার হাতে গিয়ে বড় আকার ধারণ করল। তার মত এমন দৃঢ়ভাবে পানি উঠাতে আমি কোন তাকৎওয়ালাকেও দেখেনি। এমনকি লোকেরা তৃপ্তির সাথে পানি পান করে গৃহে বিশ্রাম নিল।
সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার উমার ইবন খাত্তাব আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আসার অনুমতি চাইলেন। তখন তার সঙ্গে কুরাইশের কয়েকজন নারী কথা বলছিলেন এবং তারা অধিক পরিমাণ দাবী দাওয়া করতে গিয়ে তার আওয়াজের চেয়ে তাদের আওয়াজ উচ্চ ছিল। যখন উমার ইবন খাত্তাব প্রবেশের অনুমতি চাইলেন তখন তারা উঠে দ্রুত পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে অনুমতি দিলেন। আর উমার ঘরে প্রবেশ করলেন, রাসূলে (ﷺ) হাসছিলেন। উমার বললেন, আল্লাহ আপনাকে সদা হাস্য রাখুন হে আল্লাহর রাসূল। নবী (ﷺ) বললেন, নারীদের ব্যাপার দেখে আমি অবাক হচ্ছি, তারা আমার নিকট ছিল, অথচ তোমার আওয়াজ শুনা মাত্র তারা সব দ্রুত পর্দার আড়ালে চলে গেল। উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকেই-তো অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর উমার ঐ মহিলাগণকে লক্ষ্য করে বললেন, ওহে নিজের ক্ষতিকারী নারীরা! তোমরা আমাকে ভয় কর, অথচ আল্লাহর রাসূলকে ভয় কর না? তারা উত্তরে বললেন, আপনি রাসূল (ﷺ) হতে অনেক কঠোর ভাষী ও শক্ত অন্তরের। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হা ঠিকই হে ইবন খাত্তাব! যে সত্তার হাতে আমার জান, তার কসম, শয়তান যখনই কোন রাস্তায় তোমাকে দেখতে পায় সে তখনই তোমার ভয়ে এ রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরে।
আবদুল্লাহ্ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেদিন উমার ইসলাম গ্রহণ করেন, সেদিন হতে আমরা অত্যন্ত মর্যাদাশীল হয়ে আসছি।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার-এর লাশ খাটের উপর রাখা হল। খাটটি কাঁধে তুলে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত লোকজন তা ঘিরে দু'আ পাঠ করছিল। আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। হঠাৎ একজন আমার স্কন্ধে হাত রাখায় আমি চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখলাম, তিনি আলী। তিনি উমার-এর জন্য আল্লাহর অশেষ রহমতের দোয়া করছিলেন। তিনি বলছিলেন, হে উমার! আমার জন্য আপনার চেয়ে বেশি প্রিয় এমন কোন ব্যক্তি আপনি রেখে যাননি, যার কালের অনুসরণ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করব। আল্লাহর কসম। আমার এ বিশ্বাস যে আল্লাহ আপনাকে আপনার সঙ্গীদ্বয়ের সঙ্গে রাখবেন। আমার মনে আছে, আমি অনেকবার নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমি, আবূ বাকর ও উমার গেলাম। আমি, আবূ বাকর ও উমার প্রবেশ করলাম এবং আমি, আবূ বাকর ও উমার বাহির হলাম ইত্যাদি।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) উহুদ পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবূ বাক্ও, উমার ও উসমান। তাদেরকে নিয়ে পাহাড়টি দুলে উঠল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পাহাড়কে পায়ে আঘাত করে বললেন, হে উহুদ, থামো। তোমার উপর নবী, সিদ্দীক ও শহীদ ছাড়া অন্য কেউ নেই।
আসলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন উমার আমাকে উমার-এর বিভিন্ন গুণাবলী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি তাকে সে সম্পর্কে জ্ঞাত করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর কাউকে (এ সব গুণের অধিকারী) আমি দেখিনি। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা দানবীর ছিলেন। এ সকল গুণাগুণ যেন উমার পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে।
আনাস হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি বললেন, তুমি কিয়ামতের জন্য কী জোগাড় করেছ? সে বলল, কোন কিছুই জোগাড় করতে পারিনি, তবে আমি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসি। তখন তিনি বললেন, তুমি তাদের সঙ্গেই থাকবে যাদেরকে তুমি ভালবাস। আনাস বলেন, নবী (ﷺ)-এর এ কথা দ্বারা আমরা এত আনন্দিত হয়েছি যে, অন্য কোন কথায় এত আনন্দিত হইনি। আনাস বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে ভালবাসি এবং আবূ বাকর ও উমার-কেও। আশা করি তাদেরকে আমার ভালবাসার কারণে তাদের সঙ্গে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাদের আমলের মত আমল আমি করতে পারিনি।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের আগের উম্মাতগণের মধ্যে অনেক মুহাদ্দাস (যার ক্বলবে সত্য কথা অবতীর্ণ হয়) ব্যক্তি ছিলেন। আমার উম্মাতের মধ্যে যদি কেউ মুহাদ্দাস হন তবে সে ব্যক্তি উমর। যাকারিয়া....আবূ হুরাইরাহ্ হতে অধিক বর্ণিত আছে যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের আগের বনী ইসরাঈলের মধ্যে এমন কতক লোক ছিলেন, যারা নবী ছিলেন না বটে, তবে ফেরেশতামন্ডলী তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। আমার উম্মাতে এমন কোন লোক হলে সে হবে উমার।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, একদা এক রাখাল তার বকরীর পালের সঙ্গে ছিল। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ পাল আক্রমণ করে একটি বকরী নিয়ে গেল। রাখাল বাঘের পিছে দৌড়ে বকরীকে উদ্ধার করে আনল। তখন বাঘ রাখালকে বলল, যখন আমি ছাড়া অন্য কেউ থাকবে না তখন হিংস্র জন্তুদের আক্রমণ হতে তাদের কে রক্ষা করবে? সাহাবীগণ বললেন, সুবহানাল্লাহ। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আমি এটা বিশ্বাস করি এবং আবূ বাকর ও উমরও বিশ্বাস করে। অথচ আবূ বাকর ও উমার সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। দেখতে পেলাম, অনেক লোককে আমার সামনে উপস্থিত করা হল। তাদের গায়ে জামা ছিল। কারো কারো জামা এত ছোট ছিল যে, কোন ভাবে বুক পর্যন্ত পৌছেছে। আর কারো জামা এথেকেও ছোট ছিল। আর উমার-কেও আমার সামনে পেশ করা হল। তার শরীরে এত লম্বা জামা ছিল যে, সে জামাটি হেঁচড়িয়ে চলছিল। সহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ স্বপ্নের কি তাবীর করলেন। তিনি বললেন, দ্বীনদারী।
মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন উমার আহত হলেন, তখন তিনি বেদনা অনুভব করছিলেন। তখন তাকে সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বলতে লাগলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ আঘাত জনিত কারণে যদি আপনার কিছু হয় দুঃখের কোন কারণ নেই। আপনি তো আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য পেয়েছেন এবং তার সাহচর্যের হক ভালভাবে আদায় করেছেন। অতঃপর আপনি এ অবস্থায় পৃথক হয়েছেন, তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। অতঃপর আপনি আবূ বাকর-এর সঙ্গ লাভ করেন এবং এর হকও পূর্ণরূপে আদায় করেন। অতঃপর আপনি এ অবস্থায় পৃথক হয়েছেন যে, তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। অতঃপর আপনি সহাবাগণের সাহচর্য পেয়েছেন এবং তাদের হকও সঠিকভাবে আদায় করেছেন। যদি আপনি তাদের হতে আলাদা হয়ে পড়েন তবে আপনি অবশ্যই তাদের হতে এমন অবস্থায় আলাদা হবেন যে তারাও আপনার প্রতি সন্তুষ্ট। উমার বললেন, তুমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গ ও সন্তুষ্টির ব্যাপারে যা বলেছ, তাতো আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা তিনি আমার প্রতি করেছেন। এবং আবূ বাকর এর সঙ্গ ও সন্তুষ্টির ব্যাপারে যা তুমি বলেছ তাও একমাত্র মহান আল্লাহর অনুগ্রহ যা তিনি আমার উপর করেছেন। আর আমার যে অস্থিরতা তুমি দেখছ তা তোমার এবং তোমার সাথীদের কারণেই। আল্লাহর কসম, আমার নিকট যদি দুনিয়া ভরা সোনা থাকত তবে আল্লাহর আযাব দেখার আগেই তা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য ফিদয়া হিসাবে বিলিয়ে দিতাম।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মদিনার এক বাগানের ভিতর আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে বাগানের দরজা খুলে দেয়ার জন্য বলল। নবী (ﷺ) বললেন, তার জন্য দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি তার জন্য দরজা খুলে দিয়ে দেখলাম যে, তিনি আবূ বাকর। তাকে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর দেয়া সুসংবাদ দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে দরজা খোলার জন্য বলল। নবী (ﷺ) বললেন, তার জন্য দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি তার জন্য দরজা খুলে দিয়ে দেখলাম, তিনি উমার। তাকে আমি নবী (ﷺ)-এর সুসংবাদ জানিয়ে দিলাম। তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। অতঃপর আর একজন দরজা খুলে দেয়ার জন্য বললেন। নবী (ﷺ) বললেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সু-সংবাদ জানিয়ে দাও। কিন্তু তার উপর ভয়ানক বিপদ আসবে। দেখলাম যে, তিনি উসমান। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা বলেছেন, আমি তাকে বললাম। তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন আর বললেন, আল্লাহই সাহায্যকারী।
আবদুল্লাহ ইবন হিশাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। নবী (ﷺ) উমার ইবন খাত্তাব-এর হস্তধারণকৃত অবস্থায় ছিলেন।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একটি বাগানে প্রবেশ করলেন এবং বাগানের দরজা পাহারা দেয়ার জন্য আমাকে আদেশ করলেন। তখন এক ব্যক্তি এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। নবী (ﷺ) বললেন, তাকে আসতে দাও এবং তাকে জান্নাতের সু-সংবাদ দাও। আমি দেখলাম যে, তিনি আবূ বাকর। অতঃপর আর একজন এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি (ﷺ) বললেন, তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সু-সংবাদ দাও। দেখতে পেলেন, তিনি উমার। অতঃপর আর একজন এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। নবী (ﷺ) কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন, তাকেও প্রবেশের অনুমতি দাও এবং শীঘ্রই তার উপর বিপদ আসবে এ কথা বলে জান্নাতের সু-সংবাদ দাও। দেখতে পেলাম যে, তিনি উসমান ইবন আফ্ফান। হাম্মাদ.....আবূ মূসা হতে এ রকমই বর্ণিত আছে। আসিম উক্ত বর্ণনায় আরো বলেন, নবী (ﷺ) বাগানের এমন এক জায়গায় বসেছিলেন যেখানে পানি ছিল এবং তার হাটুদ্বয় অথবা এক হাটু খোলা রেখে ছিলেন। যখন উসমান আসলেন তখন হাটু কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন।
উবাইদুল্লাহ ইবন আদী ইবন খিয়ার হতে বর্ণিত যে, মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ ও আবদুর রাহমান ইবন আসওয়াদ ইবন 'আবদ ইয়াগুস আমাকে বললেন যে, উসমান-এর সঙ্গে তার (বৈপিত্রিয় ভাই) অলীদের ব্যাপারে আলোচনা করতে তোমাকে কিসে বাধা দেয়? লোকেরা তার সম্পর্কে নানারূপ কথাবার্তা বলছে। উসমান যখন সালাত আদায়ের উদ্দেশে বের হলেন তখন আমি তার নিকটে গিয়ে বললাম, আপনার সঙ্গে আমার একটি দরকার আছে এবং তা আমি আপনার ভালোর জন্যই বলবো। উসমান বললেন, ওহে, আমি তোমা হতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি। আমি তাদের নিকট ফিরে আসলাম। তৎক্ষণাৎ উসমান-এর দূত এসে হাযির হলো। আমি তার নিকট গেলাম। তিনি বললেন, বল, তোমার নাসীহাত কী? আমি বললাম, আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন। কুরআন তার উপর অবতীর্ণ করেছেন। আপনি ঐ সকলের একজন যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছেন। আপনি উভয় হিজরাত করেছেন এবং আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য লাভ করেছেন এবং তার চরিত্রের মাধুর্য লক্ষ্য করেছেন। অলীদ সম্পর্কে লোকেরা নানা ধরনের কথাবার্তা বলাবলি করছে। উসমান আমাকে বললেন, তুমি কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর দর্শন পেয়েছ? আমি বললাম, না। তবে তার 'ইল্ম আমার পর্দানশীন কুমারীগণের নিকট যখন পৌছেছে তখন আমার নিকট অবশ্যই পৌছেছে। উসমান হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেন, নিশ্চই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন। আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দানকারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। তার আনা শরীয়তের উপর আমিও ঈমান এনেছি। আমি উভয় হিজরাত করেছি, যেমন তুমি বলছ। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য লাভ করেছি, তার হাতে বায়আত করেছি। আল্লাহর কসম, আমি তার অবাধ্যতা করিনি ও তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। অতঃপর আল্লাহ তার রাসূলকে দুনিয়া হতে নিয়ে গিয়েছেন। অতঃপর আবূ বাকর-এর সঙ্গে ঐরূপই সম্পর্ক ছিল। অতঃপর উমার-এর সঙ্গেও তেমনই সম্পর্ক ছিল। অতঃপর আমার কাঁধে খিলাফতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমার কি ঐ সকল অধিকার নেই যা তাদের ছিল? আমি বললাম হা, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমাদের পক্ষ হতে কী সব কথাবার্তা আমার নিকট পৌছেছে? অবশ্য অলীদের ব্যাপারে তুমি যা বলছ অতি শীঘ্র আমি সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিব। এ বলে তিনি আলী-কে ডেকে এনে অলীদকে বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দিলেন। আলী তাকে আশিটি বেত্রাঘাত করলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ওহুদ পাহাড়ে আরোহণ করলেন। তার সাথে ছিলেন আবূ বাকর, উমার ও উসমান। তাদেরকে পেয়ে পাহাড়টি কেঁপে উঠল। রাসূল (ﷺ) বললেনঃ স্থির হও উহুদ। আমার ধারণা তিনি তার পা দ্বারা আঘাত করলেন। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক এবং দু'জন শহীদ ছাড়া আর কেউ নেই।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সময়ে আবূ বাকর-এর ন্যায় মর্যাদাবান কাউকে মনে করতাম না, অতঃপর উমার-কে, অতঃপর উসমান-কে, অতঃপর সহাবাগণের মধ্যে কাউকে কারও উপর মর্যাদা দিতাম না।
উসমান ইবন মাওহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মিসরবাসী মক্কায় এসে হাজ্জ করে দেখতে পেল যে, কিছু লোক একত্রে বসে আছে। সে বলল, এ লোকজন কারা? তাকে জানানো হল এরা কুরাইশ বংশের লোকজন। সে বলল, তাদের মধ্যে শায়খ কে? তারা বললেন, ইনি আবদুল্লাহ ইবন উমার। সে ব্যক্তি (তার নিকট এসে) বলল, হে আবদুল্লাহ ইবন উমার, আমি আপনাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করব; আপনি আমাকে বলুন, (১) আপনি কি এটা জানেন যে, উসমান উহুদ যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি উত্তর দিলেন, হা। (২) সে বলল, আপনি জানেন কি উসমান বাদার যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন? ইবন উমার উত্তরে বললেন, হা। (৩) আপনি জানেন কি বায়আতে রিযওয়ানে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন? ইবন উমার বললেন, হা। লোকটি বলে উঠল, আল্লাহু আকবার। ইবন উমার তাকে বললেন, এস, তোমাকে আসল ঘটনা বলে দেই। উসমান-এর উহুদ যুদ্ধ হতে পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছেন ও ক্ষমা করেছেন। আর তিনি বাদার যুদ্ধে এজন্য অনুপস্থিত ছিলেন যে, নবী (ﷺ)-এর কন্যা তার স্ত্রী রোগাক্রান্ত ছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেন, বাদারে অংশ গ্রহণকারী ব্যক্তির সমপরিমাণ সাওয়াব ও গনীমতের অংশ মিলবে। আর বায়আত রিযওয়ান হতে তার অনুপস্থিতির কারণ হল, মক্কার বুকে তার চেয়ে সম্ভ্রান্ত অন্য কেউ যদি থাকতো তবে তাকেই তিনি উসমানের বদলে পাঠাতেন। অতঃপর রাসূল (ﷺ) উসমান-কে মক্কায় পাঠান।এবং তার চলে যাবার পর বায়আতে রিযওয়ান অনুষ্ঠিত হয়। তখন রাসূল (ﷺ) তার ডান হাতের প্রতি ঈঙ্গিত করে বললেন, এটি উসমানের হাত। অতঃপর ডান হাত বাম হাতে স্থাপন করে বললেন যে, এ হল উসমানের বায়আত। ইবন উমার ঐ লোকটিকে বললেন, তুমি এই জবাব তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।
আমর ইবন মায়মূন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার ইবন খাত্তাব-কে আহত হবার কিছুদিন পূর্বে মদিনায় দেখেছি যে তিনি হুযায়ফাহ ইবন ইয়ামান ও উসমান ইবন হুনায়ফ-এর নিকট দাড়িয়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, তোমরা এটা কী করলে? তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখন্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূ-খন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে বাড়তি কোন বোঝা চাপান হয়নি। তখন উমার বললেন, তোমরা আবার চিন্তা করে দেখ যে, তোমরা এ ভূখন্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহন সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তারা বললেন, না। অতঃপর উমার বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর চতুর্থ দিন তিনি আহত হলেন। যেদিন ভোরে তিনি আহত হন, আমি তার কাছে দাড়িয়েছিলাম এবং তার ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। উমার দু'কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহ্ল অথবা এ ধরনের সূরা প্রথম রাকাতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকআতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক 'ইলজ' দ্রুত পলায়নের সময় দু'ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তের জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হলেন। এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমার আব্দুর রাহমান ইবন আউফ-এর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। উমার-এর নিকটে যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, উমার-এর কন্ঠস্বর শুনা যাচ্ছে না। তাই তারা "সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ" বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইবন আউফ তাদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে সালাত আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমার বললেন, হে ইবন আব্বাস দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরাহ ইবন শুবাহ্-এর গোলাম (আবূ লুলু)। উমার জিজ্ঞেস করলেন, ঐ কারিগর গোলামটি? তিনি বললেন, হা। উমার বললেন, আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ্, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যক্তির হাতে ঘটান নি। হে ইবন আব্বাস তুমি এবং তোমার পিতা মদিনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতে। আব্বাস-এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবন আব্বাস বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। উমার বললেন, তুমি ভুল বলছ। কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায় করে, তোমাদের মত হাজ্জ করে। অতঃপর তাকে তার ঘরে নেয়া হল। আমরা তার সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতোপূর্বে তাদের উপর এত বড় মুসীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তার সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হল, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন; তাও তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তার অবশ্যম্ভাবী। আমরা তার নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন। আপনার জন্য আল্লাহর সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী (ﷺ)-এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন। উমার বললেন, আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে যাক। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। উমার বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি বললেন- হে ভাতিজা! তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়। হে আবদুল্লাহ ইবন উমার, তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত। তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি উমারের পরিবার পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবন কা'ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহণ কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবিলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাহিরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। আয়িশাহ-এর খিদমতে তুমি যাও এবং বল উমার আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। আমীরুল মুমিনীন' শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মুমিনগণের আমীর নই। তাকে বল উমার ইব্ন খাত্তাব তার সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন। ইবন উমার আয়িশাহ-এর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, আয়িশাহ বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, উমার ইবন খাত্তাব আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। আয়িশাহ বললেন, তা আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার উপরে তাকে অগ্রগণ্য করছি। আবদুল্লাহ ইবন উমার, যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল- এই যে আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমার জিজ্ঞেস করলেন, কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। উমার বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, উমার ইবন খাত্তাব আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে। এ সময় হাফসাহ-কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসাহ তার নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর গেলে ঘরের ভেতর হতেও আমরা তার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি ওয়াসিয়াত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। উমার বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাদের প্রতি নবী (ﷺ) তার ইন্তিকালের সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। অতঃপর তিনি তাদের নাম বললেন, আলী, উসমান, যুবায়র, ত্বলহা, সাদ ও আবদুর রাহমান ইবন আউফ এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবন উমার তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সাদের উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সাদের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাকে আনসার সাহাবীগণের যারা মুহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে (মদিনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওয়াসিয়াত করছি যে তাদের মধ্যে নেককারগণের ওযর আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাদের মধ্যে কারোর ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি তাকে এ ওয়সিয়াতও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তারাও ইসলামের হিফাযতকারী। এবং তারাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাকে পল্লীবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও ওয়াসিয়ত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাকে আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর জিম্মীদের (সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়। উমার-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তার লাশ নিয়ে পায়ে হেটে চললাম। আবদুল্লাহ ইবন উমার আয়িশাহ-কে সালাম করলেন এবং বললেন, উমার ইবন খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন। আয়িশাহ বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। অতঃপর তাকে প্রবেশ করান হল এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তার দাফন কাজ শেষ হল, তখন ঐ ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন আবদুর রাহমান বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য হতে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়র বললেন, আমি আমার বিষয়টি আলী-এর উপর অর্পণ করলাম। ত্বলহা বললেন, আমার বিষয়টি উসমান-এর উপর ন্যস্ত করলাম। সাদ বললেন, আমার বিষয়টি আবদুর রাহমান ইবন আউফ-এর উপর ন্যস্ত করলাম। অতঃপর আবদুর রহমান উসমান ও আলী-কে বললেন, আপনাদের দু'জনের মধ্য হতে কে এই দায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পণ করব। আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করা তার অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দু'জনেরই চিন্তা করা উচিত। ব্যক্তিদ্বয় চুপ থাকলেন। তখন আবদুর রাহমান নিজেই বললেন, আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করতে পারেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তারা উভয়ে বললেন, হা। তাদের একজনের হাত ধরে বললেন, রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা আছে তা আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য জরুরী হবে যে, যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইন্সাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি উসমান-কে মনোনীত করি তবে আপনি তার কথা শুনবেন এবং তার প্রতি অনুগত থাকবেন। অতঃপর তিনি অপর জনের সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তিনি বললেন, হে উসমান আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি [আবদুর রাহমান], তার হাতে বায়আত করলেন। অতঃপর আলী তার উসমান-এর বায়আত করলেন। অতঃপর মদিনাবাসীগণ এগিয়ে এসে সকলেই বায়আত করলেন।
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, আমি আগামীকাল এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দিব যার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করবেন। রাবী বলেন, তারা এই আগ্রহ ভরে রাত্রি যাপন করলেন যে, কাকে এ পতাকা দেয়া হবে। যখন ভোর হল তখন সকলেই আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাদের প্রত্যেকেই এ আশা করছিলেন যে পতাকা তাকে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি বললেন, আলী ইবন আবূ তালিব কোথায়? তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তিনি চোখ রোগে আক্রান্ত। তিনি বললেন, কাউকে পাঠিয়ে তাকে আমার নিকট নিয়ে এস। যখন তিনি এলেন, তখন রাসুল (ﷺ) তার দু'চোখে থুথু লাগিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়াও করলেন। এতে তিনি এমন সুস্থ হয়ে গেলেন যেন তার চোখে কোন রোগই ছিল না। রাসূল (ﷺ) তাকে পতাকাটি দিলেন। আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মত না হয়ে যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। তিনি বললেন, তুমি সোজা এগিয়ে যেতে থাক এবং তাদের আঙ্গিণায় পৌছে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দাও। তাদের উপর আল্লাহর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে তাও তাদেরকে জানিয়ে দাও। আল্লাহর কসম, তোমার দ্বারা যদি একটি মানুষও হিদায়াত লাভ করে, তা হবে তোমার জন্য লাল রং এর উট পাওয়ার চেয়েও উত্তম।
সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী নবী (ﷺ)- এর সঙ্গে খায়বার যুদ্ধে যাননি। কেননা তার চোখে অসুখ ছিল। এতে তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে যাব না? অতঃপর তিনি বেরিয়ে পড়লেন এবং নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হলেন। যেদিন সকালে আল্লাহ বিজয় দান করলেন, তার আগের রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আগামী কাল ভোরে আমি এমন এক লোককে পতাকা দিব, অথবা বলেছিলেন যে, এমন এক লোক ঝান্ডা ধারণ করবে যাকে আল্লাহ এবং তার রাসূল (ﷺ) ভালবাসেন, অথবা বলেছিলেন, সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে। তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন। অতঃপর আমরা দেখতে পেলাম তিনি হলেন আলী, অথচ আমরা তার সম্পর্কে এমনটি আশা করিনি। তাই সকলেই বলে উঠলেন, এই যে আলী। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকেই দিলেন এবং তার মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলা বিজয় দিলেন।
আবূ হাযিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক সাহল ইবন সাদ-এর নিকট হাযির হয়ে বললেন, মদিনার অমুক আমীর মিম্বরের নিকটে বসে আলী সম্পর্কে অপ্রিয় কথা বলছে। তিনি বললেন, সে কী বলছে? সে বলল, সে তাকে আবূ তুরাব বলে উল্লেখ করছে। সাহল হেসে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম, তার এ নাম নবী (ﷺ)-ই রেখেছিলেন। এ নাম অপেক্ষা তার নিকট বেশি প্রিয় আর কোন নাম ছিল না। আমি ঘটনাটি জানার জন্য সাহল-এর নিকট ইচ্ছে প্রকাশ করলাম এবং তাকে বললাম, হে আবূ আব্বাস! এটা কিভাবে হয়েছিল। তিনি বললেন, আলী ফাতিমা-এর নিকট গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এস মসজিদে শুয়ে রইলেন। নবী (ﷺ) এসে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার চাচাত ভাই কোথায়? তিনি বললেন, মসজিদে। রাসূল (ﷺ) তার খোজে বেরিয়ে পড়লেন। পরে তিনি তাকে এমন অবস্থায় পেলেন যে তার চাদর পিঠ হতে সরে গিয়েছে। তার পিঠে ধূলা-বালি লেগে গেছে। রাসূল (ﷺ) তার পিঠ হতে ধূলা-বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, উঠে বস হে আবূ তুরাব! কথাটি দু'বার বলেছিলেন।
সাদ ইবন উবাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক ইবন উমার-এর কাছে এসে উসমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করল। তিনি উসমান-এর কতিপয় ভাল গুণ বর্ণনা করলেন। ইবন উমার ঐ লোককে বললেন, মনে হয় এটা তোমার নিকট খারাপ লাগছে। সে বলল, হা। ইবন উমার বললেন, আল্লাহ (তোমাকে) অপমানিত করুন! অতঃপর সে ব্যক্তি আলী-এর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তারও কতিপয় ভাল গুণ বর্ণনা করলেন এবং বললেন, ঐ দেখ! তার ঘরটি নবী (ﷺ)-এর ঘরগুলির মধ্যে অবস্থিত। অতঃপর তিনি বললেন, মনে হয় এ সব কথা শুনতে তোমার খারাপ লাগছে। সে বলল, হা। ইবন উমার বললেন, আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন। যাও, আমার বিরুদ্ধে যত পার কর।
আলী হতে বর্ণিত যে, ফাতিমা যাতা চালানোর কষ্ট সম্পর্কে একদা অভিযোগ প্রকাশ করলেন। এপর নবী (ﷺ)-এর নিকট কিছু সংখ্যক যুদ্ধবন্দী আসল। ফাতিমা নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলেন। কিন্তু তাকে না পেয়ে আয়িশাহ-এর নিকট তার কথা বলে আসলেন। নবী (ﷺ) যখন ঘরে আসলেন তখন ফাতিমা এর আগমন ও উদ্দেশ্যের ব্যাপারে আয়িশাহ তাকে জানালেন। (আলী বলেন) নবী (ﷺ) আমাদের এখানে আসলেন, যখন আমরা বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। তাকে দেখে আমি উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন, তোমরা নিজ নিজ অবস্থায় থাক এবং তিনি আমাদের মাঝে এমনভাবে বসে পড়লেন যে আমি তার দুই পায়ের শীতলতা আমার বক্ষে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, তোমরা যা চেয়েছিলে আমি কি তার চেয়েও উত্তম জিনিস শিক্ষা দিব না? তোমরা যখন ঘুমানোর উদ্দেশে বিছানায় যাবে তখন চৌত্রিশ বার "আল্লাহ আকবার" তেত্রিশবার "সুবহানাল্লাহ" তেত্রিশবার "আল হামদুলিল্লাহ" পড়ে নিবে। এটা খাদিম অপেক্ষা অনেক উত্তম।
সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আলী-কে বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, যেভাবে হারূন মূসা-এর নিকট হতে মর্যাদা লাভ করেছিলেন, তুমিও আমার নিকট সেই মর্যাদা লাভ কর।
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা আগে হতে যেভাবে ফয়সালা করে আসছ সেভাবেই কর কেননা পারস্পরিক বিবাদ আমি অপছন্দ করি। যেন সকল লোক এক দল ভুক্ত হয়ে থাকে। অথবা আমি এমন অবস্থায় দুনিয়া হতে বিদায় হই যেভাবে আমার সাথীগণ দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছেন। (মুহাম্মদ) ইবন সীরীন এ ধারণা পোষণ করতেন যে, আলী এর (১ম খলীফা হওয়া সম্পর্কে) যে সব কথা তার হতে (রাফিযী সম্প্রদায় কর্তৃক) বর্ণিত তার অধিকাংশই ভিত্তিহীন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। লোকেরা বলে থাকেন যে, আবূ হুরাইরাহ্ অনেক বেশি হাদীস বর্ণনা করে থাকেন। বস্তুতঃ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আত্মতৃপ্তি নিয়ে পড়ে থাকতাম। ঐ সময়ে আমি সুস্বাদু রুটি ভক্ষণ করিনি, দামী কাপড় পরিনি। তখন কেউ আমার সেবা করত না। এবং আমি ক্ষুধার জ্বালায় পাথুরে ভূমির সঙ্গে পেট চেপে ধরতাম। কোন কোন সময় কুরআনে কারীমের কোন আয়াত, আমার জানা থাকা সত্ত্বেও অন্যদের জিজ্ঞেস করতাম যেন, তারা আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কিছু খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। গরীব মিসকীনদের জন্য সবার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি ছিলেন জাফর ইবন আবূ তালিব। তিনি প্রায়ই আমাকে নিজ ঘরে নিয়ে যেতেন এবং যা ঘরে থাকত তাই আমাকে আহার করিয়ে দিতেন। কোন সময় ঘিয়ের খালি পাত্র এনে দিতেন, আমরা ভেঙ্গে দিয়ে তা চেটে খেতাম।
শাবী হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন উমার যখন জাফর-এর ছেলেকে সালাম করতেন তখন বলতেন, হে, দু'বাহু ওয়ালা ব্যক্তির ছেলে।
আনাস হতে বর্ণিত যে, উমার অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব এর ওয়াসীলাহ নিয়ে বৃষ্টি বর্ষণের দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আমরা অনাবৃষ্টি দেখা দিলে আমাদের নবীর (ﷺ) ওয়াসীলাহ নিয়ে দোয়া করতাম, তুমি বৃষ্টি বর্ষণ করতে; এখন আমরা আমাদের নবী (ﷺ) এর চাচা আব্বাস-এর ওয়াসীলাহ্য় বৃষ্টি বর্ষণের দোয়া করছি। তুমি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ কর। তখন বৃষ্টি হত।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর এর নিকট ফাতিমা নবী (ﷺ) হতে তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অংশ দাবী করলেন যা আল্লাহ তাআলা তাকে বিনাযুদ্ধে দান করেছিলেন, যা তিনি সদাকাহ স্বরূপ মদিনা, ফাদাকে রেখে গিয়েছিলেন এবং খায়বারের এক-পঞ্চমাংশ হতে যে অবশিষ্ট ছিল তাও।
আবূ বাকর বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমাদের মালের কেউ ওয়ারিস হয় না। আমরা যা কিছু রেখে যাই তা সবই সদাকাহ্। মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরিবারবর্গ এ মাল হতে আল্লাহর মাল হতে খেতে পারবে। তবে প্রয়োজনের বেশি নিতে পারবে না। আল্লাহর কসম, আমি নবী (ﷺ)-এর পরিত্যক্ত মালে তার যুগে যে নিয়ম ছিল তার পরিবর্তন করব না। আমি অবশ্যই তা করব যা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) করে গেছেন। অতঃপর আলী শাহাদাত পাঠ করে বললেন, হে আবূ বাকর! আমরা আপনার মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞাত এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে তাদের যে আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তা এবং তাদের অধিকারের কথাও উল্লেখ করলেন। আবূ বাকরও এ বিষয়ে উল্লেখ করে বললেন, আল্লাহর কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, আমার আত্মীয়দের সঙ্গে উত্তম আচরণ করার চেয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর আত্মীয়দের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা আমি অধিক পছন্দ করি।
আবূ বাকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরিবার-পরিজনের প্রতি তোমরা অধিক সম্মান প্রদর্শন করবে।
মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, ফাতিমা আমার টুকরা। যে তাকে দুঃখ দিবে, সে যেন আমাকে দুঃখ দিল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মৃত্যুর সময় রোগে আক্রান্ত হলে তার কন্যা ফাতিমা-কে ডেকে পাঠালেন। চুপিচুপি কি যেন তাকে বললেন, তিনি এতে কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর তিনি তাকে ডেকে পুনরায় চুপিচুপি কি যেন বললেন, এবারে তিনি হাসতে লাগলেন। আমি তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) আমাকে জানালেন যে, তিনি এ রোগে মারা যাবেন, এতে আমি ক্রন্দন করি। অতঃপর তিনি চুপেচুপে বললেন, আমি তার পরিবারবর্গের মধ্যে সর্বপ্রথম তার সঙ্গে মিলিত হব, তখন আমি হাসি।
মারওয়ান ইবন হাকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসমান কঠিন নাকের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন যে সনকে নাকের পীড়ার সন বলা হয়। এ কারণে তিনি ঐ বছর হাজ্জ পালন করতে পারলেন না এবং ওয়াসিয়াত করলেন। ঐ সময় কুরাইশের এক লোক তার কাছে এসে বলল, আপনি কাউকে আপনার খলীফা মনোনীত করুন। উসমান জিজ্ঞেস করলেন, জনগণ কি এ কথা বলেছে? সে বললো, হা, উসমান বললেন, বলতো কাকে? রাবী বলেন তখন সে ব্যক্তি চুপ হয়ে গেল। অতঃপর অপর এক লোক আসল, (রাবী বলেন) আমার ধারণা সে হারিস (ইবন হাকাম মারওয়ানের ভাই) ছিল। সেও বলল, আপনি খলীফা মনোনীত করুন। উসমান জিজ্ঞেস করলেন, জনগণ কি চায়? সে বলল, হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন কাকে? রাবী বলেন সে চুপ হয়ে গেল। উসমান বললেন, সম্ভবতঃ তারা যুবায়র এর নাম প্রস্তাব করেছে। সে বলল, হা। উসমান বললেন, ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমার জানা মতে তিনিই সব চেয়ে উত্তম ব্যক্তি এবং নবী (ﷺ)-এর সব চেয়ে প্রিয় পাত্র ছিলেন।
মারওয়ান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসমান এর নিকট হাজির ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে তাকে বলল, আপনি খলীফা মনোনীত করুন। তিনি বললেন, তা কি বলাবলি হচ্ছে? সে বলল, হা, তিনি হলেন যুবায়র। এই শুনে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম তোমরা নিশ্চই জান যে যুবায়র তোমাদের মধ্যে সব চেয়ে উত্তম ব্যক্তি। এ কথাটি তিনি তিন বার বললেন।
জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যেক নবীরই হাওয়ারী ছিলেন। আর আমার হাওয়ারী হলেন যুবায়র।
আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধ চলা কালে আমি এবং উমার ইবন আবূ সালামাহ (অল্প বয়সি বলে) মহিলাদের দলে চলছিলাম। হঠাৎ যুবায়রকে দেখতে পেলাম যে, তিনি অশ্বারোহণ করে বনী কুরায়যা গোত্রের দিকে দু'বার অথবা তিনবার আসা যাওয়া করছেন। যখন ফিরে আসলাম তখন বললাম, আববা! আমি আপনাকে কয়েকবার যাতায়াত করতে দেখেছি। তিনি বললেন, হে প্রিয় বৎস! তুমি কি আমাকে দেখতে পেয়েছিলে? আমি বললাম, হা। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন, কে বনী কুরায়যা গোত্রের নিকট গিয়ে তাদের খবরা-খবর জেনে আসবে? তখন আমিই গিয়েছিলাম। যখন আমি ফিরে আসলাম তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার জন্য তার মাতা-পিতাকে একত্র করে বললেন, আমার মাতাপিতা তোমার জন্য কুরবান হোক।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। ইয়ারমুক যুদ্ধে যোগদানকারী মুজাহিদগণ যুবায়রকে বললেন, আপনি কি আক্রমণ কঠোরতর করবেন না? তা হলে আমরাও আপনার সঙ্গে (সর্বশক্তি নিয়ে) আক্রমণ করব। এবার তিনি ভীষণভাবে আক্রমণ করলেন। শত্রুরা তার স্কন্ধে দু'টি আঘাত করল। ক্ষতদ্বয়ের মধ্যে আরো একটি ক্ষতের দাগ ছিল যা বাদার যুদ্ধে হয়েছিল। উরওয়াহ বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আঘাতের জায়গাগুলোতে আঙ্গুল ঢুকিয়ে খেলা করতাম।
আবূ উসমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে সব যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) স্বয়ং যোগদান করেছিলেন, তন্মধ্যে এক যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে কোন এক সময় ত্বলহা ও সাদ ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৭২২)।
কাইস ইবন আবূ হাযিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ত্বলহা-এর ঐ হাতকে অবশ অবস্থায় দেখেছি, যে হাত দিয়ে (উহুদ যুদ্ধে) নবী (ﷺ)-কে রক্ষা করেছিলেন।
সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধে নবী (ﷺ) আমার জন্য তার মাতা-পিতাকে একত্র করেছিলেন, (তোমার উপর আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক)।
সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমাকে খুব ভালভাবে জানি, ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি ছিলাম তৃতীয় ব্যক্তি।
সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেদিন আমি ইসলাম গ্রহণ করি সেদিন [এর পূর্বে খাদীজাহ ও আবূ বাকর ব্যতীত] অন্য কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। আমি সাতদিন এমনিভাবে অতিবাহিত করেছি যে, আমি ইসলাম গ্রহণে তৃতীয় জন ছিলাম।
কায়েস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাদ-কে বলতে শুনেছি যে, আরবদের মধ্যে আমিই সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর রাস্তায় প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছে। আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে থেকেই লড়াই করেছি। তখন গাছের পাতা ছাড়া আমাদের কোন খাবার ছিল না। এমনকি আমাদেরকে উট অথবা ছাগলের মত বড়ির ন্যায় মল ত্যাগ করতে হত। আর এখন বনু আসাদ আমাকে ইসলামের ব্যাপারে লজ্জা দিচ্ছে। আমি তখন অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হব এবং আমার আমলসমূহ নষ্ট হবে। বনূ আসাদ উমার এর নিকট সাদ-এর বিরুদ্ধে যথা নিয়মে সালাত আদায় না করার অভিযোগ করেছিল। আবূ আবদুল্লাহ ইমাম বুখারী বলেন ইসলামের তৃতীয় ব্যক্তি দ্বারা তিনি বলতে চান যে, নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে যারা প্রথমে ইসলাম এনেছিল আমি এদের তিন জনের তৃতীয়।
মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ জেহেলের কন্যাকে আলী বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে পাঠালেন। ফাতিমা এই খবর শুনতে পেয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকটে এসে বললেন, আপনার গোত্রের লোকজন মনে করে যে, আপনি আপনার মেয়েদের সম্মানে রাগান্বিত হন না। আলী তো আবূ জেহেলের কন্যাকে বিবাহ করতে প্রস্তুত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুৎবা দিতে প্রস্তুত হলেন। (মিস্ওয়ার বলেন) তিনি যখন হামদ ও সানা পাঠ করেন, তখন আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, আমি আবূল 'আস ইবন রাবির নিকট আমার মেয়েকে শাদী দিয়েছিলোম। সে আমার সঙ্গে যা বলেছে সত্যই বলেছে। আর ফাতিমা আমার টুকরা; তার কোন কষ্ট হোক তা আমি কখনও পছন্দ করি না। আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের মেয়ে এবং আল্লাহর দুশমনের মেয়ে একই লোকের নিকট একত্রিত হতে পারে না। আলী তার বিবাহের প্রস্তাব উঠিয়ে নিলেন। মুহাম্মাদ ইবন আমার ইবন হালহালা.....মিস্ওয়ার হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করে বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বনী আবদে শামস গোত্রে তার এক জামাতার ব্যাপারে অত্যন্ত প্রশংসা করতে শুনেছি। নবী (ﷺ) বলেন, সে আমাকে যা বলেছে- সত্য বলেছে। যা ওয়াদা করেছে, তা পূর্ণ করেছে।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একটি সেনাবাহিনী পাঠানোর জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং উসামাহ ইবন যায়দ কে উক্ত বাহিনীর নেতা মনোনীত করেন। কিছু সংখ্যক লোক তার নেতৃত্বের উপর মন্তব্য প্রকাশ করতে লাগলো। নবী (ﷺ) বললেন, তার নেতৃত্বের প্রতি তোমরা সমালোচনা করছ। ইতোপূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের প্রতিও তোমরা সমালোচনা করেছ। আল্লাহর কসম, নিশ্চই সে নেতৃত্বের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি ছিল এবং আমার প্রিয়পাত্রদের একজন ছিল। অতঃপর তার পুত্র আমার প্রিয়পাত্রদের একজন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক কায়িফ (রেখা চিহ্নে অভিজ্ঞ) ব্যক্তি আসে, সে সময় নবী (ﷺ) উপস্থিত ছিলেন। উসামাহ ও তার পিতা শুয়েছিলেন। কায়িফ বলে উঠল, এ পাগুলো একটি অন্যটির অংশ। রাবী বলেন, নবী (ﷺ) অত্যন্ত খুশি হলেন এবং আয়িশাহ-কেও এ খবর জানালেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। মাখযুম গোত্রের এক নারীর চুরির ঘটনায় কুরাইশগণ চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রিয় পাত্র উসামাহ ইবন যায়দ ছাড়া কে আর তার নিকট বলার সাহস করবে?
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মাখযুম গোত্রের এক নারী চুরি করেছিল। তখন তারা বলল, এ ব্যাপারে কে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কথা বলতে পারবে? কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ-ই কথা বলার সাহস করল না। উসামাহ এ সম্পর্কে তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, বনী ইসরাইল তাদের গণ্যমান্য পরিবারের কেউ চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত। এবং দুর্বল কেউ চুরি করলে তারা তার হাত কেটে দিত। ফাতিমা হলেও অবশ্যই আমি তার হাত কেটে ফেলতাম।
আবদুল্লাহ ইবন দিনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উমার এক লোককে দেখতে পেলেন যে, মসজিদের এক কোণে তার কাপড় টেনে নিচ্ছে, তিনি বললেন, দেখতো, লোকটি কে? সে যদি আমার নিকট থাকত! তখন একজন তাকে বলল, হে আবূ আবদুর রাহমান, আপনি কি তাকে চিনতে পেরেছেন। তিনি উসামাহ -এর পুত্র মুহাম্মাদ। এ কথা শুনে ইবন উমার মাথা নীচু করে দু'হাত দিয়ে মাটি আচড়াতে লাগলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে দেখলে নিশ্চই আদর করতেন।
উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) তাকে এবং হাসান-কে এক সঙ্গে তুলে নিতেন এবং বলতেন, হে আল্লাহ! তুমি এদেরকে ভালবাস। কেননা আমিও এদেরকে ভালবাসি।
মু'আইয উসামাহ-এর আযাদকৃত গোলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সে আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর সঙ্গে ছিল। তখন তার ভাই হাজ্জাজ ইবন আয়মান প্রবেশ করল, এবং সালাতে রুকু ও সিজদা পূর্ণভাবে আদায় করেনি। ইবন উমার তাকে বললেন, সালাত আবার আদায় কর।
যখন সে চলে গেল তখন ইবন উমার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ ব্যক্তি কে? আমি বললাম, হাজ্জাজ ইবন আয়মন ইবন উম্মু আয়মান। ইবন উমার বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যদি তাকে দেখতেন তবে স্নেহ করতেন। অতঃপর এ পরিবারের প্রতি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কত ভালবাসা ছিল তা বর্ণনা করতে লাগলেন এবং উম্মু আয়মানের সন্তানদের কথাও বললেন। আবূ আবদুল্লাহ বলেন আমার কোন কোন সাথী আরো বলেছেন যে উম্মু আয়মান নবী (ﷺ)-কে শিশুকালে কোলে নিয়েছেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় কেউ কোন স্বপ্ন দেখলে তা নবী (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করতেন। আমিও স্বপ্ন দেখার জন্য আকাঙ্ক্ষা করতাম এ উদ্দেশে যে, তা নবী (ﷺ)-এর নিকট বর্ণনা করব। আমি ছিলাম অবিবাহিত একজন তরুণ যুবক। তাই আমি নবী (ﷺ)-এর যুগে মাস্জিদেই ঘুমাতাম। এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম যে, যেন দু'জন ফেরেশতা আমাকে ধরে জাহান্নামের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি দেখতে পেলাম যে কূপের মত তার দু'টি উচু পাড়ও রয়েছে। তাতে এমন সব মানুষও আছে যাদেরকে আমি চিনতে পারলাম। তখন আমি (জাহান্নামের আগুন হতে আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি) বার বার পড়তে লাগলাম। তখন তৃতীয় একজন ফেরেশতা তাদের দু'জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তিনি আমাকে বললেন, ভয় করো না (অতঃপর আমি জেগে গেলাম) স্বপ্নটি (আমার বোন) হাফসাহ এর নিকট বললাম।
তিনি তা নবী (ﷺ)-এর নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বললেন, আবদুল্লাহ খুব চমৎকার মানুষ। যদি সে রাতে সালাত আদায় করত। (তার পুত্র) সালিম বলেন, অতঃপর আবদুল্লাহ রাতে খুব অল্প সময়ই ঘুমাতেন।
হাফসাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) তার নিকট বলেছেন যে, আবদুল্লাহ অত্যন্ত নেক ব্যক্তি।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৭৪০)।
মালিক ইবন ইসমাঈল ... 'আলকামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গমন করলাম। দু' রাকাত সালাত আদায় করে দোয়া করলাম, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে একজন নেককার সাথী মিলিয়ে দিন। অতঃপর আমি একটি জামা'আতের নিকট এসে তাদের নিকট বসলাম। তখন একজন বৃদ্ধ লোক এসে আমার পাশেই বসলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তারা উত্তরে বললেন, ইনি আবূ দারদা। আমি তখন তাকে বললাম, একজন নেক্কার সঙ্গীর জন্য আমি আল্লাহর নিকট দু'আ করেছিলাম। আল্লাহ আপনাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেন, তুমি কোথাকার অধিবাসী? আমি বললাম, আমি কুফার অধিবাসী। তিনি বললেন, (নবী (ﷺ)-এর) জুতা, বালিশ এবং উযূর পাত্র বহনকারী সর্বক্ষণের সহচর ইবন উম্মু 'আবদ কি তোমাদের ওখানে নেই? তোমাদের মাঝে কি ঐ ব্যক্তি নেই যাকে আল্লাহ শয়তান হতে নিরাপত্তা দান করেছেন? [আম্মার ইবন ইয়াসির] তোমাদের মধ্যে কি নবী (ﷺ)-এর গোপন তথ্যবিদ লোকটি নেই? যিনি ছাড়া অন্য কেউ এসব রহস্য জানেন না। হুযাইফাহ অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ সূরা "আল-লাইল" কিভাবে পাঠ করতেন? তখন আমি তাকে সূরাটি পড়ে শুনালামঃ "শপথ রাতের যখন তা [আলোকে] ঢেকে দেয়। শপথ দিনের যখন তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। ..." তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে সূরাটি সরাসরি এভাবেই শিক্ষা দিয়েছিলেন।
ইব্রাহীম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আলকামাহ একবার সিরিয়ায় গেলেন। যখন মসজিদে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আমাকে একজন নেক্কার সঙ্গী মিলিয়ে দিন। তখন তিনি আবূ দারদা-এর নিকট গিয়ে বসলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথাকার লোক। আমি বললাম, কুফার অধিবাসী। তিনি বললেন, তোমাদের মাঝে কি ঐ ব্যক্তিটি নেই যাকে আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-এর জবানীতে শয়তান হতে নিরাপত্তা দান করেছেন। আম্মার (ইবন ইয়াসির) । আমি বললাম, হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে নবী (ﷺ)-এর গোপন তথ্যবিদ লোকটি কি নেই যিনি ছাড়া অন্য কেউ এ সব গোপন রহস্যাদি জানেন না? হুযাইফাহ। আমি বললাম, হা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন তোমাদের মধ্যে কি নবী (ﷺ)-এর মিস্ওয়াক ও সামান বহনকারী আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ নেই? আমি বললাম, হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আবদুল্লাহ সূরা "আল-লাইল" কিভাবে পাঠ করেন। আমি বললাম "এবং পুরুষ এবং মহিলা দ্বারা।" তখন তিনি বললেন, (এভাবে পড়ার কারণে) নবী (ﷺ) হতে যেভাবে শুনেছিলাম এরা (অন্যান্য সাহাবীরা) তা হতে আমাকে সরিয়ে দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকেন আর আমাদের এই উম্মাতের মধ্যে বিশ্বস্ত ব্যক্তি হচ্ছে আবূ উবাইদাহ ইবন জার্রাহ।
হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) নাজরানবাসীকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন; আমি এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাব যিনি হবেন প্রকৃতই বিশ্বস্ত। একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলেন। পরে তিনি (রাসূল (ﷺ)) আবূ উবাইদাহ-কে পাঠালেন।
আবূ বাকর হতে বর্ণিত। আমি নবী (ﷺ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি, ঐ সময় হাসান তার পার্শ্বে ছিলেন। তিনি একবার উপস্থিত লোকদের দিকে আবার হাসান-এর দিকে তাকালেন এবং বললেন, আমার এ সন্তান হচ্ছে নেতা। আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে বিবদমান দু'দল মুসলিমের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দিবেন।
উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) তাকে এবং হাসান-কে এক সঙ্গে কোলে তুলে নিয়ে বলতেন, হে আল্লাহ! আমি এদের দু'জনকে ভালবাসি, আপনিও এদেরকে ভালবাসুন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের সামনে হুসাইন-এর মস্তক আনা হল এবং একটি বড় পাত্রে তা রাখা হল। তখন ইবন যিয়াদ তা খুচাতে লাগল এবং তার রূপ লাবণ্য সম্পর্কে কটুক্তি করল। আনাস বললেন, হুসাইন গঠন ও আকৃতিতে নবী (ﷺ)-এর অবয়বের সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিলেন। তার চুল ও দাড়িতে ওয়াসমা দ্বারা কলপ লাগানো ছিল।
বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হাসানকে নবী (ﷺ)-এর স্কন্ধের উপর দেখেছি। সে সময় তিনি (রাসূল (ﷺ)) বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আমি একে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস।
উকবাহ ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ বাকর-কে দেখলাম, তিনি হাসান-কে কোলে তুললেন এবং বলতে লাগলেন, এ-ত নবী (ﷺ)-এর সদৃশ, আলীর সদৃশ নয়। তখন আলী হাসছিলেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সন্তুষ্টি তার পরিবারবর্গের (প্রতি সদাচরণের) মাধ্যমে অর্জন কর।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর পরিবারে হাসান ইবন আলী-এর চেয়ে নবী (ﷺ)-এর সাথে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আর কেউ ছিলেন না। আবদুর রায্যাক ...আনাস হতে একইভাবে বর্ণিত।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, তাকে ইরাকের এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইহরামের অবস্থায় মশা-মাছি মারা যাবে কি? তিনি বললেন, ইরাকবাসী মশা-মাছি মারা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে অথচ তারা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নাতিকে হত্যা করেছে। নবী (ﷺ) বলতেন, হাসান ও হুসাইন আমার নিকট দুনিয়ায় যেন দু'টি ফুল।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলতেন, আবূ বাকর আমাদের নেতা আর তিনি মুক্ত করেছেন আমাদের একজন নেতাকে বিলাল।
কায়েস হতে বর্ণিত যে, বিলাল আবূ বাকর-কে বললেন, আপনি যদি আপনার স্বীয় কাজের জন্য আমাকে কিনে থাকেন তাহলে আপনার খিদমতেই আমাকে নিয়োজিত রাখুন। আর যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কামনায় আমাকে কিনে থাকেন, তবে আমাকে আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করার সুযোগ দান করুন!
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে তার বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ, তাকে হিকমত শিক্ষা দিন। আবদুল ওয়ারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, [নবী (ﷺ)] এ কথাটিও বলেছিলেন, হে আল্লাহ! তাকে কিতাবের জ্ঞান দান করুন।
আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) যায়দ, জাফর ও আবদুল্লাহ-এর মৃত্যু সংবাদ যুদ্ধক্ষেত্র হতে সংবাদ আসার পূর্বেই আমাদেরকে শুনিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, যায়দ পতাকা ধারণ করে শাহাদাত লাভ করেছে। অতঃপর জাফর পতাকা ধারণ করে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করল। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা হাতে নিয়ে শাহাদাত লাভ করল। তিনি যখন এ কথাগুলি বলছিলেন তখন তার দু' চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। (অতঃপর বললেন) আল্লাহ তাআলার তরবারিগুলোর এক তরবারি খালিদ ইবন ওয়ালিদ পতাকা উঠিয়েছেন। অবশেষে আল্লাহ মুসলিমদেরকে বিজয় দিয়েছেন।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আমর-এর মজলিসে আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ-এর আলোচনা হলে তিনি বললেন, আমি এই লোককে ঐদিন হতে অত্যন্ত ভালবাসি যেদিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা চার ব্যক্তি হতে কুরআন শিক্ষা কর, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ সর্বপ্রথম তার নাম বললেন, আবূ হুযাইফাহ-এর মুক্ত গোলাম সালিম, উবাই ইবন কা'ব ও মুআয ইবন জাবাল থেকে। উবাই ও মুআয এ দু'জনের কার নাম আগে বলেছিলেন সেটুকু আমার স্মরণ নেই।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আমর বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জন্মগতভাবে বা ইচ্ছাপূর্বক অশ্লীল ভাষী ছিলেন না। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আমার সবচেয়ে প্রিয় যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।
তিনি আরো বলেছেন, তোমরা চার ব্যক্তির নিকট হতে কুরআন শিক্ষা কর, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ, সালিম মাওলা আবূ হুযায়ফাহ, উবাই ইবন কা'ব ও মুআয ইবন জাবাল।
আলকামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সিরিয়া গেলাম। মসজিদে দু'রাকআত সালাত আদায় করে দোয়া করলাম, হে আল্লাহ, আমাকে একজন সৎ সাথী মিলিয়ে দিন। তখন আমি একজন বৃদ্ধকে আসতে দেখলাম। তিনি ছিলেন আবূ দারদা। তিনি যখন আমার নিকটে আসলেন, তখন আমি বললাম, আশা করি আমার দোয়া কবুল হয়েছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথাকার লোক? আমি বললাম, আমার ঠিকানা কুফায়। তিনি বললেন, তোমাদের মাঝে নবী (ﷺ)-এর জুতা, বালিস ও উযূর পাত্র বহনকারী [আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ] কি বিদ্যমান নেই? তোমাদের মাঝে ঐ ব্যক্তি কি নেই, যাকে শয়তান হতে নিরাপদ করে দেয়া হয়েছে? [আম্মার ]। তোমাদের মাঝে কি গোপন তথ্যাভিজ্ঞ ব্যক্তিটি [হুযাইফাহ] নেই, যিনি ব্যতীত এসব গোপন রহস্য অন্য কেউ জানে না। (আমি বললাম, আছেন) অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইবন মাসঊদ "আল-লাইল" কিভাবে পাঠ করেন। আমি পড়লাম, "রাতের শপথ যেভাবে তা দিনকে আচ্ছন্ন করে, যেমনটি উজ্জ্বলভাবে প্রদর্শিত হয়। এবং পুরুষ ও নারীর দ্বারা।" তিনি বললেন, নবী (ﷺ) আমাকে সূরাটি সরাসরি এভাবে পড়তে শিখিয়েছেন। কিন্তু এসব লোক বার বার ব'লে আমাকে এ থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।
আবদুর রাহমান ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা হুযাইফাহ-কে এমন এক ব্যক্তির সন্ধান দিতে অনুরোধ করলাম যার আকার আকৃতি, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব-চরিত্রে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সবচেয়ে মিল আছে, আমরা তার হতে শিক্ষা গ্রহণ করব। হুযায়ফাহ বললেন, আকার-আকৃতি, চাল-চালন, আচার-ব্যবহার এবং স্বভাব-চরিত্রে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সবচেয়ে মিল আছে এমন লোক আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ ছাড়া অন্য কাউকেও আমি জানি না।
আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ মূসা আশআরী-কে বলতে শুনেছি যে, আমি এবং আমার ভাই ইয়ামান হতে মদিনা্তে আসি এবং বেশ কিছুদিন মদিনা্তে অবস্থান করি। তখন আমরা মনে করতাম যে, আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ নবী (ﷺ)-এর পরিবারেরই একজন লোক। কারণ আমরা তাকে এবং তার মাকে সর্বদা নবী (ﷺ)-এর ঘরে প্রবেশ করতে দেখতাম।
ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার মুআবিয়াহ 'ইশার সালাতের পর এক রাকাত বিতরের সালাত আদায় করেন। তখন তার নিকট ইবন আব্বাসের আযাদকৃত গোলাম হাযির ছিলেন। তিনি ইবন আব্বাস-এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করেন, তখন ইবন আব্বাস বললেন, তাকে কিছু বলোনা, কেননা, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সাহচর্য লাভ করেছেন।
ইবন আবূ মুলায়কাহ হতে বর্ণিত। ইবন আব্বাস-কে বলা হল, আপনি আমীরুল মুমিনীন মুআবিয়াহ-এর সঙ্গে এ বিষয় আলাপ করবেন কি? যেহেতু তিনি বিতর সালাত এক রাকাত আদায় করেছেন। ইবন আব্বাস বললেন, তিনি ঠিকই করেছেন, কারণ তিনি নিজেই একজন ফকীহ্।
মুআবিয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা এমন এক সালাত আদায় কর, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গ লাভ করেছি, আমরা তাকে তা আদায় করতে দেখিনি বরং তিনি এ দু'রাকাত সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। আসরের পর দু' রাকাত।
মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, ফাতিমা আমার অংশ বিশেষ। যে তাকে কষ্ট দিল সে আমাকেই কষ্ট দিল।
আয়িশাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আয়িশাহ! জিবরাঈল তোমাকে সালাম বলেছেন। আমি উত্তরে বললাম, "ওয়া আলাইহিস্ সালাম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। আপনি যা দেখতে পান আমি তা দেখতে পাই না। এ কথা দ্বারা তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বুঝিয়েছেন।
আবূ মূসা আশআরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনত ইমরান ও ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া ছাড়া অন্য কেউ তাদের মত পূর্ণতাপ্রাপ্ত হননি। আর আয়িশাহ-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য নারীদের উপর এমন যেমন সারীদ গোশ্ত এবং রুটি দ্বারা তৈরী খাদ্য বিশেষ এর মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর।
আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি, আয়িশাহ-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর।
কাসিম ইবন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত। আয়িশাহ যখন (মৃত্যু) রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। তখন ইবন আব্বাস এসে বললেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আপনি প্রথম সত্যবাদী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর-এর নিকট যাচ্ছেন।
আবূ ওয়াইল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী তার স্বপক্ষে জিহাদে সাহায্য করার জন্য লোক সংগ্রহের জন্য আম্মার ও হাসান-কে কুফায় পাঠান। আম্মার তার ভাষণে একদা বললেন, এ কথা আমি ভালভাবেই জানি যে, আয়িশাহ আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মানিতা স্ত্রী। কিন্তু এখন আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করছেন যে তোমরা কি আলী-এর আনুগত্য করবে, না আয়িশাহ-এর আনুগত্য করবে?
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি আসমা-এর নিকট হতে একটি হার চেয়ে নিয়েছিলেন। পরে হারটি হারিয়ে যায়। এর অনুসন্ধানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিছু সাহাবীকে পাঠালেন। ইতোমধ্যে সালাতের সময় হয়ে গেলে তারা পানির অভাবে উযূ ব্যতীতই সালাত আদায় করলেন। তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে এই বিষয়ে অভিযোগ পেশ করলেন। তখন তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হল। উসায়দ ইবন হুযায়র বললেন, (হে আয়িশাহ) আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদানে পুরস্কৃত করুন। আল্লাহর কসম! যখনই আপনি কোন সমস্যায় পড়েছেন, তখনই আল্লাহ তাআলা তা থেকে আপনাকে বের করে এনেছেন এবং মুসলিমদের জন্য এর মধ্যে বরকত রেখে দিয়েছেন।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মৃত্যু রোগে আক্রান্ত তখন সহধর্মিণীদের ঘরে পালাক্রমে থাকতে লাগলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)আয়িশাহ-এর ঘরে অবস্থানের ইচ্ছায় এ কথাটি বলতেন, "আগামীকাল আমি কার ঘরে থাকব? আগামীকাল আমি কার ঘরে থাকব? আয়িশাহ বলেন, আমার ঘরে অবস্থানের দিনই তিনি শান্তি লাভ করলেন।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে হাদীয়া প্রদানের জন্য আয়িশাহ-এর গৃহে তার অবস্থানের দিন হিসাব করতেন। আয়িশাহ বলেন, একদা আমার সতীনগণ উম্মু সালামাহ-এর নিকট সমবেত হয়ে বললেন, হে উম্মু সালামাহ! আল্লাহর কসম, লোকজন তাদের উপঢৌকনসমূহ প্রেরণের জন্য আয়িশাহ-এর গৃহে অবস্থানের দিন গণনা করেন। আয়িশাহ-এর মত আমরাও কল্যাণ আকাঙ্ক্ষা করি। আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলুন, তিনি যেন লোকদের বলে দেন, তারা যেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যেদিন যেখানেই অবস্থান করেন সেখানেই তারা হাদীয়া পাঠিয়ে দেন। উম্মু সালামাহ বলেন, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে এ বিষয় উল্লেখ করলেন। উম্মু সালামাহ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার কথা শুনে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরে আমার গৃহে অবস্থানের জন্য পুনরায় আসলে আমি ঐ কথা তাকে বলি। এবারও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তৃতীয়বারেও আমি ঐ কথা তাকে বললাম, তিনি বললেন, হে উম্মু সালামাহ! আয়িশাহ-এর ব্যাপারে তোমরা আমাকে কষ্ট দিও না। আল্লাহর কসম, তোমাদের মধ্যে আয়িশাহ ছাড়া অন্য কারো শয্যায় শায়িত থাকা কালীন আমার উপর ওয়াহী নাযিল হয়নি।