bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

শপথের কাফফারাসমূহ (৬৭০৮-৬৭২২)

কা'ব ইবন উজরা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলাম। তখন তিনি বললেনঃ কাছে এসো। তখন আমি তার কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেনঃ তোমাকে কি তোমার উকুন কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেনঃ সওম অথবা সদাকাহ অথবা কুরবানী করে ফিদ্ইয়া আদায় কর। ইবন আউন আইউব থেকে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, সওম তিন দিন, কুরবানী একটি বকরী আর মিস্কীনের সংখ্যা হচ্ছে ছয়।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর কাছে এক লোক এসে বলল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেনঃ তোমার কী হয়েছে? লোকটি বলল, রমযানে (দিনের বেলা) আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম করেছি। তিনি বললেনঃ তুমি কি একটি গোলাম আযাদ করতে পার? লোকটি বলল, না। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি কি এক নাগাড়ে দু' মাস সওম পালন করতে পার? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তা হলে কি তুমি ষাটজন মিস্কীনকে খানা খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ বস। লোকটি বসল। তারপর নবী (ﷺ)-এর কাছে এক 'আরক' আনা হলো যাতে ছিল খেজুর। আর 'আরক' হল মাপ করার জন্য বড় ধরণের পাত্র। তিনি বললেনঃ এটা নিয়ে যাও এবং তা সদাকাহ করে দাও। লোকটি বলল, আমার চেয়েও অভাবীকে (তা দান করব)? তখন নবী (ﷺ) হেসে ফেললেনঃ এমন কি তার মাড়ির দাত পর্যন্ত দেখা গেল। তিনি বললেনঃ এটা তোমার পরিজনকেই খাওয়াও।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেনঃ সেটা কী? লোকটি বলল, রমযানে (দিনের বেলা) আমি স্ত্রী সহবাস করেছি। তিনি বললেনঃ তুমি কি একটি গোলাম আযাদ করতে পারবে? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তাহলে কি তুমি দু'মাস লাগাতার সওম পালন করতে পারবে? সে বলল, না। তাহলে কি তুমি ষাটজন মিস্কীনকে খাদ্য খাওয়াতে পারবে? লোকটি বলল, না। রাবী বলেন, এমন সময় এক আনসার লোক একটি 'আরক' নিয়ে আসল। আর আরক হচ্ছে পরিমাপ পাত্র; তার মাঝে খেজুর ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এটা নিয়ে গিয়ে সদাকাহ করে দাও। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার চেয়ে অভাবী লোককে কি তা দান করব? যিনি আপনাকে হকের সাথে পাঠিয়েছেন সেই সত্ত্বার কসম! মদিনার দু'উপত্যকার মাঝে আমার চেয়ে বেশি অভাবী আর কেউ নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ বললেনঃ যাও, এগুলো নিয়ে তোমার পরিবারকে খাওয়াও।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার কী হয়েছে? লোকটি বলল, রমযানে (দিনের বেলায়) আমি আমার স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছি। তিনি বললেনঃ একটি গোলাম আযাদ করার মত তুমি কিছু পাবে কি? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি এক নাগাড়ে দু'মাস সওম পালন করতে পারবে কি? সে বলল, না। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি ষাটজন মিস্কীনকে খাওয়াতে পারবে কি? সে বলল, আমার কাছে কিছুই নেই। এমন সময় নবী (ﷺ)-এর কাছে একটি 'আরক' আনা হল, যাতে খেজুর ছিল। তখন তিনি বললেনঃ এটা নাও এবং গিয়ে তা সদাকাহ করে দাও। সে বলল, আমার চেয়ে বেশি অভাবীকে কি দেব? এখানকার দু' উপত্যকার মাঝে আমাদের চেয়ে অভাবী তো কেউ নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এটা নিয়ে যাও এবং তোমার পরিবারকে খাওয়াও।

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগে সা' ছিল তোমাদের এখনকার মুদ্দের এক মুদ্দ ও এক মুদ্দের তৃতীয়াংশ পরিমাণ। অতঃপর উমার ইবন আবদুল আযীয-এর যুগে তার পরিমাণ বর্দ্ধিত করা হয়েছে।

নাফি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন উমার রমযানের ফিত্রা আদায় করতেন নবী (ﷺ)-এর মুদ্দ তথা প্রথম মুদ্দ-এর দ্বারা। আর কসমের কাফ্ফারাতেও তিনি নবী (ﷺ)-এর মুদ্দ ব্যবহার করতেন। আবূ কুতাইবাহ বলেন, মালিক আমাদেরকে বলেছেন যে, আমাদের মুদ্দ তোমাদের মুদ্দের চেয়ে বড়। আর আমরা নবী (ﷺ)-এর মুদ্দেই ফাযীলাত দেখতে পাই। রাবী বলেন, আমাকে মালিক বলেছেনঃ তোমাদের কাছে কোন শাসক এসে যদি নবী (ﷺ)-এর মুদ্দ থেকে তোমাদের মুদ্দকে ছোট করে দেন, তাহলে তোমরা কিসের মাধ্যমে (ওযন করে) মানুষদেরকে দিতে? আমি বললাম, নবী (ﷺ)-এর মুদ্দ দিয়েই দিতাম। তিনি বললেন, তোমরা কি দেখছ না যে, সাম্প্রতিককালে লেনদেনের বিষয়টি নবী (ﷺ) এর মুদ্দের দিকে ফিরে যাচ্ছে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দোয়া করেছেনঃ হে আল্লাহ! তুমি তাদের পরিমাপে সা'-এ এবং মুদ্দে বারাকাত দান কর।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ যে লোক একটি মুসলিম গোলাম আযাদ করবে আল্লাহ সে গোলামের প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে জাহান্নামের আগুন হতে তার প্রত্যেকটি অঙ্গকে মুক্ত করবেন। এমন কি গোলামের গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে তার গুপ্তাঙ্গকেও।

জাবির হতে বর্ণিত যে, আনসার গোত্রের এক লোক তার গোলামকে মুদাবিবর বানালো (মনিবের মৃত্যু হলে গোলাম মুক্ত হয়ে যাবে)। ঐ গোলাম ছাড়া তার আর কোন মাল ছিল না। খবরটি নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছল। তিনি বললেনঃ গোলামটিকে আমার নিকট হতে কে কিনে নেবে? নুআম ইবন নাহ্হা তাকে আটশ' দিরহামের বিনিময়ে কিনে নিল। রাবী আমর বলেন, আমি জাবির ইবন আবদুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি যে, গোলামটি ছিল কিব্তী আর (আযাদ করার) প্রথম বর্ষেই সে মারা গিয়েছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি বারীরা নামক বাদীকে কিনতে চাইলে তার মালিকগণ শর্ত আরোপ করল যে এর পরিত্যক্ত সম্পদের মালিক তারাই হবে। আয়িশাহ বিষয়টি নবী (ﷺ)-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেনঃ তুমি তাকে কিনে নাও। কেননা আযাদকৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের মালিকানা ঐ ব্যক্তির জন্য যে তাকে আযাদ করে।

আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার কতক আশআরী লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে একটি বাহন চাওয়ার জন্য এলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে বাহন দিতে পারব না। আমার কাছে কিছু নেই যা বাহন হিসাবে তোমাদেরকে দিতে পারি। অতঃপর আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন আমরা অবস্থান করলাম। এমন সময় তার কাছে কিছু উট আনা হল। তখন তিনি আমাদেরকে তিনটি উট দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আমরা যখন রওনা দিলাম, তখন আমরা বলাবলি করলাম যে, আল্লাহ আমাদের বরকত দেবেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বাহন চাওয়ার জন্য যখন এলাম তখন তিনি আমাদেরকে বাহন দেবেন না বলে শপথ করলেন। তারপরেও আমাদেরকে বাহন দিলেন। আবূ মূসা বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলাম এবং বিষয়টি তার কাছে উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেনঃ আমি তো তোমাদেরকে বাহন দেইনি; বরং আল্লাহ দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! ইনশাআল্লাহ আমি যখন কোন ব্যাপারে শপথ করি আর তার উল্টোটির মাঝে কল্যাণ দেখতে পাই তখন কসমের কাফ্ফারা আদায় করি। আর যেটি কল্যাণকর সেটিই করি।

হাম্মাদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি আমার কসমের কাফ্ফারা আদায় করি আর যেটি কল্যাণকর সেটি করি। অথবা বলেছেনঃ যেটি কল্যাণকর সেটি করি এবং আর (কসমের) কাফ্ফারা আদায় করি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুলায়মান একবার বলেছিলেন যে, অবশ্যই আজ রাতে আমি নব্বইজন স্ত্রীর সাথে মিলিত হব। তারা প্রত্যেকেই পুত্র সন্তান জন্ম দিবে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তখন তার সাথী (রাবী সুফ্ইয়ান সাথী দ্বারা ফেরেশতা বুঝিয়েছেন) তাকে বলল, আপনি ইনশাআল্লাহ বলুন। কিন্তু তিনি তা ভুলে গেলেন এবং স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হলেন। কিন্তু একজন ছাড়া অন্য কোন স্ত্রীর কোন সন্তান হল না; আর সেটাও ছিল অপূর্ণাঙ্গ। আবূ হুরাইরাহ এ ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তিনি কসমের মাঝে ইনশা আল্লাহ বললে তার কসমও ভঙ্গ হত না, আর উদ্দেশ্যও পূর্ণ হত।

যাহদাম জারমী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার আবূ মূসা আশআরী-এর নিকট ছিলাম। আমাদের এবং জার্ম সম্প্রদায়ের মাঝে ভ্রাতৃভাব ও সুসম্পর্ক বজায় ছিল। রাবী বলেন, তার জন্য খানা হাজির করা হল, আর তাতে ছিল মুরগীর গোশত। তাদের দলের মাঝে বানী তাইমিল্লাহ্ সম্প্রদায়ের এক লোক ছিল যার গায়ের রং ছিল লাল যেন দেখতে গোলাম। রাবী বলেন, লোকটি খানার কাছেও গেল না। আবূ মূসা আশআরী তাকে বললেন, কাছে এসো (খানা খাও) কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এর গোশ্ত খেতে দেখেছি। লোকটি বলল, আমি একে (মুরগীকে) কিছু খেতে দেখেছি; তাই আমি এটিকে ঘৃণা করি। আর আমি হলফ করেছি যে, আমি এটি কক্ষনো খাব না। আবূ মূসা বলেন, কাছে এসো; আমি তোমাকে এ সম্পর্কে জানাচ্ছি। একবার আমরা আশআরী গোত্রের একটি দলের সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বাহন চাওয়ার জন্য এলাম। তখন তিনি যাকাতের উট বণ্টন করছিলেন। আইয়্যুব বলেন, আমার মনে হয় তিনি তখন রাগান্বিত হয়ে বলেছিলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে বাহন দিব না। আমার কাছে কোন বাহন নেই। রাবী বলেন, তখন আমরা চলে গেলাম। এমন সময় তার নিকট যুদ্ধে প্রাপ্ত কয়েকটি উট আনা হল। তিনি বললেনঃ ঐ আশআরী লোকগুলো কোথায়? ঐ আশআরী লোকগুলো কোথায়? তখন আমরা ফিরে এলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পাচটি মোটা তাজা সুন্দর উট আমাদেরকে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমরা উটগুলো নিয়ে রওনা হলাম। তখন আমি আমার সাথীদের বললাম, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বাহন চাওয়ার জন্য এসেছিলাম। আর তিনি আমাদেরকে বাহন দিবেন না বলে কসম করেছিলেন। কিন্তু তারপর আমাদের কাছে লোক পাঠালেন এবং আমাদেরকে বাহন দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কসম ভূলে গেছেন। আল্লাহর কসম! আমরা যদি রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) তার কসম সম্পর্কে গাফেল রাখি তাহলে তো আমরা কখনও সফলকাম হব না। চল, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ফিরে যাই এবং তার কসমের কথা স্মরণ করিয়ে দেই। অতঃপর আমরা ফিরে গিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার কাছে বাহন চাওয়ার জন্য এসেছিলাম, আপনি আমাদেরকে বাহন দিবেন না বলে কসম করেছিলেন। কিন্তু পরে আবার বাহন দিলেন। এতে আমরা ধারণা করলাম বা বুঝতে পারলাম, আপনি আপনার কসমের কথা ভুলে গেছেন। তখন তিনি বললেনঃ তোমরা চলে যাও। আল্লাহই তো তোমাদেরকে বাহন দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! নিশ্চই আমি যখন আল্লাহর ইচ্ছায় কোন ব্যাপারে কসম করি আর অন্যটির ভিতর কল্যাণ দেখতে পাই তখন যেটার মাঝে কল্যাণ আছে সেটা করি এবং কসমের কাফ্ফারা আদায় করে দেই। হাম্মাদ ইবন যায়দ, আইউব, আবূ কিলাবা এবং কাসিম ইবন আসিম কুলায়বী থেকে এ হাদীসে ইসমাঈল ইবন ইব্রাহীমের অনুসরণ করেছেন।

আবদুর রাহমান ইবন সামুরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তুমি নেতৃত্ব চেও না। কেননা, চাওয়া ছাড়া যদি তোমাকে তা দেয়া হয় তাহলে তোমাকে তাতে সাহায্য করা হবে। আর যদি চাওয়ার পর তা তোমাকে দেয়া হয়, তবে তা তোমার দায়িত্বেই ছেড়ে দেয়া হবে (এর ভাল মন্দের দায়িত্ব তোমারই থাকবে)। তুমি যখন কোন বিষয়ে কসম কর আর অন্যটির মাঝে কল্যাণ দেখতে পাও, তখন যেটার মাঝে কল্যাণ সেটাই কর। আর তোমার কসমের কাফ্ফারা আদায় করে দাও।