ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসা (২৪১০-২৪২৫)
আবদুল্লাহ [ইবন মাসঊদ] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে একটি আয়াত পড়তে শুনলাম। অথচ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে (আয়াতটি) অন্যরূপে পড়তে শুনেছি। আমি তার হাত ধরে তাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, তোমরা উভয়েই ঠিক পড়েছ। শু'বা বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছিলেন, তোমরা বাদানুবাদ করো না। কেননা, তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বাদানুবাদ করে ধ্বংস হয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু' ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলিম, অন্যজন ইয়াহূদী। মুসলিম লোকটি বলল, তার কসম, যিনি মুহাম্মাদ (ﷺ) -কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত প্রদান করেছেন। আর ইয়াহূদী লোকটি বলল, সে সত্তার কসম, যিনি মূসা-কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত দান করেছেন। এ সময় মুসলিম ব্যক্তি নিজের হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীর মুখে চড় মারল। এতে ইয়াহূদী ব্যক্তিটি নবী (ﷺ) -এর কাছে গিয়ে তার এবং মুসলিম ব্যক্তিটির মধ্যে যা ঘটেছিল, তা তাকে অবহিত করল। নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা আমাকে মূসা-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন অথবা আল্লাহ তাআলা যাদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় এক ইয়াহূদী এসে বলল, হে আবুল কাসিম! আপনার এক সাহাবী আমার মুখে আঘাত করেছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? সে বলল, একজন আনসারী। তিনি বললেন, তাকে ডাক। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ওকে মেরেছ? সে বলল, আমি তাকে বাজারে শপথ করে বলতে শুনেছিঃ শপথ তার, যিনি মূসা-কে সকল মানুষের উপর ফযীলত দিয়েছেন। আমি বললাম, হে খবীস! বল, মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর উপরও কি? এতে আমার রাগ এসে গিয়েছিল, তাই আমি তার মুখের উপর আঘাত করি। নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা নবীদের একজনকে অপরজনের উপর ফযীলত দিও না। কারণ, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর জমিন ফাটবে এবং যারাই উঠবে, আমিই হব তাদের মধ্যে প্রথম। তখন দেখতে পাব মূসা আরশের একটি পায়া ধরে দাড়িয়ে আছেন। আমি জানি না, তিনিও বেহুঁশ লোকদের মধ্যে ছিলেন, না তার পূর্বেকার (তুর পাহাড়ের) বেহুঁশীই তার জন্য যথেষ্ট হয়েছে।
আনাস হতে বর্ণিত যে, এক ইয়াহূদী একটি দাসীর মাথা দু'টি পাথরের মাঝখানে রেখে পিষে দিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কে তোমাকে এরূপ করেছে? অমুক ব্যক্তি, অমুক ব্যক্তি? যখন জনৈক ইয়াহূদীর নাম বলা হল- তখন সে দাসী মাথার দ্বারা হ্যা সূচক ইশারা করল। ইয়াহূদীকে ধরে আনা হল। সে অপরাধ স্বীকার করলে নবী (ﷺ) তার সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন। তখন তার মাথা দু'টি পাথরের মাঝখানে রেখে পিষে দেয়া হল।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে এক ব্যক্তিকে ধোকা দেয়া হত। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তুমি যখন বেচা-কেনা কর তখন বলে দেবে যে, ধোকা দিবে না। অতঃপর সে অনুরূপ কথাই বলত।
জাবির হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি তার গোলাম আযাদ করে দিয়েছিল। তার কাছে এ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। নবী (ﷺ) তার গোলাম আযাদ করে দেয়া প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। পরে সে গোলামটি তার নিকট হতে ইবন নাহ্হাম কিনে নিলেন।
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি যদি কোন মুসলিমের অর্থ সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশে মিথ্যা শপথ করে, তা হলে সে আল্লাহর সমীপে এমন অবস্থায় হাযির হবে যে, আল্লাহ তার উপর রাগান্বিত থাকবেন। আশ'আস বলেন, আল্লাহর কসম! এটা আমার সম্পর্কেই ছিল, আমার ও এক ইয়াহূদী ব্যক্তির সাথে যৌথ মালিকানায় এক খন্ড জমি ছিল। সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে নবী (ﷺ) -এর কাছে নিয়ে গেলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, তোমার কোন সাক্ষী আছে কি? আমি বললাম, না। তখন তিনি [নবী (ﷺ)] ইয়াহূদীকে বললেন, তুমি কসম কর। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে। তখন আল্লাহ তাআলা (এ আয়াত) নাযিল করেনঃ "যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে ....... আয়াতের শেষ পর্যন্ত"- (আলে ইমরান ৭৭)।
পূর্বের হাদিসের মতই (২৪১৬)।
কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি মসজিদের মধ্যে ইবন আবূ হাদরাদের কাছে তার প্রাপ্য কাজের তাগাদা করেন। তাদের আওয়াজ বুলন্দ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার ঘর হতে তা শুনতে পেলেন। তিনি [নবী (ﷺ) ] হুজরার পর্দা তুলে বাইরে এলেন এবং 'হে কা'ব'! বলে ডাকলেন। কা'ব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হাযির। তিনি ইশারায় তাকে কর্জের অর্ধেক মাফ করে দিতে বললেন। কা'ব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মাফ করে দিলাম, তিনি [নবী (ﷺ) ] ইবন আবূ হাদরাদকে বললেন, উঠ, কর্জ পরিশোধ করে দাও।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবন হাকীম ইবন হিযামকে সূরা ফুরকান আমি যেভাবে পড়ি তা হতে ভিন্ন পড়তে শুনলাম। আর যেভাবে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে এ সূরা পড়িয়েছেন। আমি তাড়াতাড়ি তাকে বাধা দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তার সালাত শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। এরপর তার গলায় চাদর পেঁচিয়ে তাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে নিয়ে এলাম এবং বললাম, আপনি আমাকে যা পড়তে শিখিয়েছেন, আমি তাকে তা হতে ভিন্ন পড়তে শুনেছি। নবী (ﷺ) আমাকে বললেন তাকে ছেড়ে দিতে। তারপর তাকে পড়তে বললেন, সে পড়ল। তিনি [নবী (ﷺ) ] বললেন, এরূপ নাযিল হয়েছে। এরপর আমাকে পড়তে বললেন, আমিও তখন পড়লাম। আর তিনি [নবী (ﷺ) ] বললেন, এরূপই নাযিল হয়েছে। কুরআন সাত হরফে নাযিল হয়েছে। তাই যেরূপ সহজ হয় তোমরা সেরূপেই তা পড়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি ইচ্ছা করেছিলাম যে, সালাত আদায় করার আদেশ করব। সালাতে দাড়ানোর পর যে সম্প্রদায় সালাতে উপস্থিত হয় না, আমি তাদের বাড়ী গিয়ে তা জ্বালিয়ে দেই।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। আব্দ ইবন যাম'আহ ও সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস যাম'আর দাসীর পুত্র সংক্রান্ত বিবাদ নবী (ﷺ) এর কাছে পেশ করলেন। সাদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাই আমাকে ওয়াসিয়াত করে গেছেন যে, আমি (মক্কায়) পৌছলে যেন যাম'আর দাসীর পুত্রের প্রতি লক্ষ্য রাখি, দেখতে পেলে যেন তাকে হস্তগত করে নেই। কেননা, সে তার পুত্র। আব্দ ইবন যাম'আ বললেন, সে আমার ভাই এবং আমার পিতার দাসীর পুত্র। আমার পিতার ঔরসে তার জন্ম। নবী (ﷺ) উতবার সাথে তার চেহারা-সুরতের স্পষ্ট মিল দেখতে পেলেন, তখন তিনি [নবী (ﷺ) ] বললেন, হে আব্দ ইবন যাম'আ! তুমিই তার হাক্বদার। সন্তান যার ঔরসে জন্ম গ্রহণ করে তারই হয়। হে সাওদাহ! তুমি তার হতে পর্দা কর।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নাজদের দিকে এক অশ্বারোহী সেনাদল পাঠালেন। তারা ইয়ামানবাসীদের সরদার বনূ হানীফা গোত্রের সুমামা ইবন উসাল নামক একজন লোককে গ্রেফতার করে এনে মসজিদের একটি খুটির সাথে বেধে রাখলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, সুমামা, তোমার কী খবর? সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমার কাছে ভাল খবর আছে। সে (বর্ণনাকারী) সম্পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করল। নবী (ﷺ) বললেন, সুমামাকে ছেড়ে দাও।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) নাজদে একদল অশ্বারোহী সেনাদল পাঠালেন। তারা বনূ হানীফা গোত্রের সুমামা ইবন উসাল নামক ব্যক্তিকে নিয়ে এল এবং তাকে মসজিদের একটি খুটির সাথে বেধে রাখল।
কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন আবূ হাদরাদ আসলামী-এর কাছে তার কিছু পাওনা ছিল। তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং পিছনে লেগে থাকলেন। তারা উভয়ে কথা বলতে লাগলেন, এমনকি এক পর্যায়ে তাদের উভয়ের আওয়াজ উচু হল। নবী (ﷺ) সেখানে গেলেন এবং বললেন, হে কা'ব! উভয় হাত দিয়ে তিনি ইশারা করলেন; যেন অর্ধেক (গ্রহণ করার কথা) বুঝিয়েছিলেন। তাই তিনি (কা'ব) তার ঋণের অর্ধেক গ্রহণ করলেন এবং অর্ধেক ছেড়ে দিলেন।
খাববাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহেলী যুগে আমি ছিলাম একজন কর্মকার। আস ইবন ওয়ায়েলের কাছে আমার কিছু দিরহাম পাওনা ছিল। আমি তার কাছে তাগাদা করতে গেলাম। সে আমাকে বলল, যতক্ষণ না তুমি মুহাম্মাদকে অস্বীকার করছ ততক্ষণ আমি তোমার পাওনা পরিশোধ করব না। আমি বললাম, তা হতে পারে না। আল্লাহর কসম! যে পর্যন্ত না আল্লাহ তোমার মৃত্যু ঘটায় এবং তোমার পুনরুত্থান না হয় সে পর্যন্ত আমি মুহাম্মাদ (ﷺ) -কে অস্বীকার করব না। সে বলল, ঠিক আছে, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু হয় এবং পুনরুত্থান না হয় আমাকে অব্যাহতি দাও। তখন আমাকে মাল ও সন্তান দেয়া হবে এরপর তোমার পাওনা পরিশোধ করে দেব। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত নাযিল হয়ঃ "তুমি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছ, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে অবশ্যই ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে"- (মারইয়ামঃ ৭৭)।