bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

আল্লাহর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা (জিহাদ) (২৭৮২-৩০৯০)

আবদুল্লাহ্ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! কোন কাজ সর্বোত্তম?' তিনি বললেন, 'সময় মত সালাত আদায় করা।' আমি বললাম, 'অতঃপর কোনটি?' তিনি বলেন, 'অতঃপর পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা।' আমি বললাম, 'অতঃপর কোনটি?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ।' অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে আমি চুপ রইলাম। আমি যদি আরো বলতাম, তবে তিনি আরও অধিক বলতেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, '(মক্কা) বিজয়ের পর আর হিজরত নেই। বরং রয়েছে কেবল জিহাদ ও নিয়্যাত। যখন তোমাদের জিহাদের ডাক দেয়া হয়, তখন বেরিয়ে পড়।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করি, তবে কি আমরা জিহাদ করব না?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, 'তোমাদের জন্য উত্তম জিহাদ হচ্ছে মকবুল হজ্জ।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন কাজের কথা বলে দিন, যা জিহাদের সমতুল্য হয়। তিনি বলেন, আমি তা পাচ্ছি না। (অতঃপর বললেন,) তুমি কি এতে সক্ষম হবে যে, মুজাহিদ যখন বেরিয়ে যায়, তখন থেকে তুমি মসজিদে প্রবেশ করবে এবং দাড়িয়ে ইবাদাত করবে এবং আলস্য করবে না, আর সিয়াম পালন করতে থাকবে এবং সিয়াম ভাঙ্গবে না। ব্যক্তিটি বলল, এটা কে পারবে? আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, 'মুজাহিদের ঘোড়া রশির দৈর্ঘ্য পর্যন্ত ঘোরাফেরা করে, এতেও তার জন্য নেকী লেখা হয়।'

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কে উত্তম?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, 'সেই মুমিন যে নিজ জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে।' সাহাবীগণ বললেন, 'অতঃপর কে?' তিনি বললেন, 'সেই মুমিন আল্লাহর ভয়ে যে পাহাড়ের কোন গুহায় অবস্থান নেয় এবং স্বীয় অনিষ্ট থেকে লোকদেরকে নিরাপদ রাখে।'

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, অবশ্য আল্লাহই অধিক জ্ঞাত কে তার পথে জিহাদ করছে, সর্বদা সিয়াম পালনকারী ও সালাত আদায়কারীর মত। আল্লাহ তাআলা তার পথে জিহাদকারীর জন্য এই দায়িত্ব নিয়েছেন, যদি তাকে মৃত্যু দেন তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন অথবা পুরস্কার বা গানীমতসহ নিরাপদে ফিরিয়ে আনবেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উম্মু হারাম বিনতু মিলহান-এর নিকট যাতায়াত করতেন এবং তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে খেতে দিতেন। উম্মু হারাম ছিলেন, উবাদাহ ইবন সামিত-এর স্ত্রী। একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার ঘরে গেলে তিনি তাকে আহার করান এবং তার মাথার উকুন বাছতে থাকেন। এক সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি হাসতে হাসতে ঘুম থেকে জাগলেন। উম্মু হারাম বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! হাসির কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মাতের কিছু ব্যক্তিকে আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় আমার সামনে পেশ করা হয়। তারা এ সমুদ্রের মাঝে এমনভাবে আরোহী যেমন বাদশাহ তখতের উপর, অথবা বলেছেন, বাদশাহর মত তখতে উপবিষ্ট।' এ শব্দ বর্ণনায় ইসহাক সন্দেহ করেছেন। উম্মু হারাম বলেন, 'আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আবার ঘুমিয়ে পড়েন। অতঃপর হাসতে হাসতে জেগে উঠলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসার কারণ কী?' তিনি বললেন, 'আমার উম্মাতের মধ্য থেকে আল্লাহর পথে জিহাদরত কিছু ব্যক্তিকে আমার সামনে পেশ করা হয়।' পরবর্তী অংশ প্রথম উক্তির মত। উম্মু হারাম বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, তুমি তো প্রথম দলের মধ্যেই আছ। অতঃপর মুআবিয়াহ ইবন আবূ সুফ্ইয়ান-এর সময় উম্মু হারাম জিহাদের উদ্দেশে সামুদ্রিক সফরে যান এবং সমুদ্র থেকে যখন বের হন তখন তিনি তার সওয়ারী থেকে ছিটকে পড়েন। এতে তিনি শাহাদাত লাভ করেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৭৮৮)।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি যে ঈমান আনল, সালাত আদায় করল ও রমাযানের সিয়াম পালন করল সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক কিংবা স্বীয় জন্মভূমিতে বসে থাকুক, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি লোকদের এ সুসংবাদ পৌছে দিব না? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একশ'টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু'টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মত। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। মুহাম্মদ ইবন ফুলাইহ্ তার পিতার সূত্রে (নিঃসন্দেহে) বলেন, এর উপর রয়েছে আরশে রহমান।

সামুরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি আজ রাতে (স্বপ্নে) দেখতে পেলাম যে, দু'ব্যক্তি আমার নিকট এল এবং আমাকে নিয়ে একটি গাছে উঠলো। অতঃপর আমাকে এমন উৎকৃষ্ট একটি ঘরে প্রবেশ করিয়ে দিল এর আগে আমি কখনো এর চেয়ে সুন্দর ঘর দেখিনি। সে দু'ব্যক্তি আমাকে বলল, এই ঘরটি হচ্ছে শহীদদের ঘর।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল কিংবা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে, তার চেয়ে উত্তম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, জান্নাতে ধনুক পরিমাণ স্থান, তা থেকে উত্তম যার উপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আরো বলেন, আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল অতিবাহিত করা তা থেকে উত্তম যেখানে সূর্যের উদয়াস্ত হয়।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল কিংবা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও তার ভিতরের সকল কিছু থেকে উত্তম।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর কোন বান্দা এমতাবস্থায় মারা যায় যে, আল্লাহর কাছে তার সাওয়াব রয়েছে তাকে দুনিয়ার সব কিছু দিলেও দুনিয়ায় ফিরে আসতে আগ্রহী হবে না। একমাত্র শহীদ ব্যতীত। সে শাহাদাতের ফযীলত দেখার কারণে আবার দুনিয়ায় ফিরে এসে আল্লাহর পথে শহীদ হবার প্রতি আগ্রহী হবে।

হুমাইদ বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হতে এ কথাও বর্ণনা করতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল অথবা একটি বিকাল অতিবাহিত করা দুনিয়া ও এর সব কিছু থেকে উত্তম। তোমাদের কারোর ধনুকের কিংবা চাবুক রাখার মত জান্নাতের জায়গাটুকু দুনিয়া ও এর সব কিছু থেকে উত্তম। জান্নাতী কোন মহিলা যদি দুনিয়াবাসীদের প্রতি উকি দেয় তাহলে আসমান ও যমীনের মাঝের সব কিছু আলোকিত এবং সুরভিত হয়ে যাবে। আর তার মাথার ওড়না দুনিয়া ও তার সব কিছু চেয়ে উত্তম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, যদি মুমিনদের এমন একটি দল না থাকত, যারা যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে পছন্দ করে না এবং যাদের সকলকে সওয়ারী দিতে পারব না বলে আশংকা করতাম, তা হলে যারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করছে, আমি সেই ক্ষুদ্র দলটির সঙ্গী হওয়া থেকে বিরত থাকতাম না। সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, আমি পছন্দ করি আমাকে যেন আল্লাহর রাস্তায় শহীদ করা হয়। আবার জীবিত করা হয়, অতঃপর শহীদ করা হয়। আবার জীবিত করা হয়, পুনরায় শহীদ করা হয়। আবার জীবিত করা হয়, আবার শহীদ করা হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মুতায় সৈন্য প্রেরণের পর) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুত্বা দিতে গিয়ে বললেন, যায়দ পতাকা ধারণ করল এবং শহীদ হল, অতঃপর জাফর পতাকা ধরল সেও শহীদ হল। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা ধরল এবং সেও শহীদ হল। অতঃপর খালিদ ইবন ওয়ালিদ বিনা নির্দেশেই পতাকা ধরল এবং সে বিজয় লাভ করল। তিনি আরো বলেন, তারা আমাদের মাঝে জীবিত থাকুক তা আমাদের নিকট আনন্দদায়ক নয়। আইয়ুব বলেন, অথবা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তারা আমাদের মাঝে জীবিত থাকুক তা তাদের নিকট মোটেই আনন্দদায়ক নয়, এ সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল।

উম্মু হারাম বিনতু মিলহান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার নিকটবর্তী এক স্থানে শুয়েছিলেন, অতঃপর জেগে উঠে মুচকি হাসতে লাগলেন। আমি বললাম আপনি হাসলেন কেন? তিনি বললেন, আমার উম্মাতের এমন কিছু লোককে আমার সামনে উপস্থিত করা হলো যারা এই নীল সমুদ্রে আরোহণ করছে, যেমন বাদশাহ সিংহাসনে আরোহণ করে। উম্মু হারাম বললেন, আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি তার জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর তিনি দ্বিতীয়বার নিদ্রা গেলেন এবং আগের মতই করলেন। উম্মু হারাম আগের মতই বললেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আগের মতই জবাব দিলেন। উম্মু হারাম বললেন, আল্লাহর নিকট দোয়া করুন তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মুআবিয়াহ-এর সঙ্গে মুসলিমরা যখন প্রথম সমুদ্র পথে অভিযানে বের হয়, তখন তিনি তার স্বামী উবাদাহ ইবন সামিতের সঙ্গে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে তাদের কাফেলা সিরিয়ায় যাত্রা বিরতি করে। আরোহণের জন্য উম্মু হারামকে একটি সওয়ারী দেয়া হলো, তিনি সওয়ারীর উপর থেকে পড়ে মারা গেলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৭৯৯)।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বানূ সুলায়মের সত্তর জন লোকের একটি দলকে কুরআন শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে বানূ 'আমিরের নিকট পাঠান। দলটি সেখানে পৌছলে আমার মামা (হারাম ইবন মিলহান) তাদেরকে বললেন, আমি সর্বাগ্রে বনূ 'আমিরের নিকট যাব। যদি তারা আমাকে নিরাপত্তা দেয় আর আমি তাদের নিকট আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর বাণী পৌছাতে পারি, (তবে তো ভাল) অন্যথায় তোমরা আমার কাছেই থাকবে। অতঃপর তিনি এগিয়ে গেলেন। কাফিররা তাকে নিরাপত্তা দিল, কিন্তু তিনি যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর বাণী শুনাতে লাগলেন, সেই সময় 'আমির গোত্রীয়রা এক ব্যক্তিকে ইঙ্গিত করলো। আর সেই ব্যক্তি তার প্রতি তীর মারল এবং তীর শরীর ভেদ করে বের হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন আল্লাহু আকবার, কাবার রবের কসম! আমি সফলকাম হয়েছি। অতঃপর কাফিররা তার অন্যান্য সংগীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং সকলকে শহীদ করল, কিন্তু একজন খোড়া ব্যক্তি বেচে গেলেন, তিনি পাহাড়ে আরোহণ করেছিলেন। হাম্মাম অতিরিক্ত উল্লেখ করেন, আমার মনে হয় তার সঙ্গে অন্য একজন ছিলেন। অতঃপর জিব্রাঈল নবী (ﷺ)-কে খবর দিলেন যে, প্রেরিত দলটি তাদের রবের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তিনি (রব) তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের সন্তুষ্ট করেছেন। (রাবী বলেন) আমরা এই আয়াতটি পাঠ করতাম, আমাদের কাওমকে জানিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের রবের সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরও সন্তুষ্ট করেছেন। পরে এ আয়াতটি মানসুখ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ক্রমাগত চল্লিশ দিন রি'ল, যাকওয়ান, বানূ লিহয়ান ও বানূ উসাইয়্যার বিরুদ্ধে দোয়া করেন।

জুনদুব ইবন সুফিয়ান হতে বর্ণিত। কোন এক যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর একটি আঙ্গুল রক্তাক্ত হলে তিনি বলেছিলেনঃ তুমি একটি আঙ্গুল ছাড়া কিছু নও; তুমি রক্তাক্ত হয়েছ আল্লাহরই পথে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, কোন ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহত হলে এবং আল্লাহই ভাল জানেন কে তার পথে আহত হবে কিয়ামতের দিন সে তাজা রক্ত বর্ণে রঞ্জিত হয়ে আসবে এবং তা থেকে মিশ্কের সুগন্ধি ছড়াবে।

আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারব তাকে জানিয়েছেন যে, হিরাকল তাকে বলেছিলেন, আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তার সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ ছিল? তুমি বলেছ যে, যুদ্ধ বড় পানির পাত্র এবং ধন সম্পদের মত। রাসূলগণ এভাবেই পরীক্ষিত হয়ে থাকেন। অতঃপর ভাল পরিণতি তাদেরই হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার চাচা আনাস ইবন নাযার বাদারের যুদ্ধের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের সঙ্গে আপনি প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন, আমি সে সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধে শরীক হবার সুযোগ দেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখতে পাবেন যে, আমি কী করি।' অতঃপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আনাস ইবন নাযার বলেছিলেন, আল্লাহ! এরা তার সাহাবীরা যা করেছেন, তার সম্বন্ধে আপনার নিকট ওযর পেশ করছি এবং এরা মুশরিকরা যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে সম্পর্কহীন বলে ঘোষণা করছি। অতঃপর তিনি এগিয়ে গেলেন, এবং সাদ ইবন মুআযের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, হে সাদ ইবন মুআয, (আমার কাম্য)। নাযারের রবের কসম, উহুদের দিক থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। সাদ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি যা করেছেন, আমি তা করতে পারিনি। আনাস বলেন, আমরা তাকে এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তার দেহে আশিটিরও অধিক তলোয়ার, বর্শা ও তীরের যখম রয়েছে। আমরা তাকে নিহত অবস্থায় পেলাম। মুশরিকরা তার দেহ বিকৃত করে দিয়েছিল। তার বোন ব্যতীত কেউ তাকে চিনতে পারেনি এবং বোন তার আঙ্গুলের ডগা দেখে চিনতে পেরেছিল। আনাস বলেন, আমাদের ধারণা, কুরআনের এই আয়াতটি তার এবং তার মত মুমিনদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। "মুমিনদের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।"

আনাস আরো বলেন, রুবায়্যি' নামক তার এক বোন কোন এক মহিলার সামনের দাত ভেঙ্গে দিলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার কিসাসের নির্দেশ দিলেন, আনাস বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তার দাত ভাঙ্গা হবে না।' পরবর্তীতে তার বাদীপক্ষ কিসাসের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ নিতে রাযী হলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, নিশ্চই আল্লাহর বান্দাহ্দের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে যে আল্লাহর নামে শপথ করলে তিনি তার শপথ রক্ষা করেন [সে কারণ তাকে আর সে শপথ (কসম) ভঙ্গ করতে হয় না]।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কুরআনের আয়াতসমূহ একত্রিত করে একটি মুসহাফে লিপিবদ্ধ করলাম, তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমি পেলাম না যা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে পড়তে শুনেছি। একমাত্র খুযাইমাহ ইবন সাবিত আনসারী-এর নিকট পেলাম। যার সাক্ষ্যকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু'ব্যক্তির সাক্ষ্যের সমান গণ্য করেছিলেন। সে আয়াতটি হলোঃ "মুমিনদের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।"

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লৌহ বর্মে আবৃত এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি যুদ্ধে শরীক হবো, না ইসলাম গ্রহণ করব?' তিনি বললেন, 'ইসলাম গ্রহণ কর, অতঃপর যুদ্ধে যাও।' অতঃপর সে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে যুদ্ধে গেল এবং শাহাদাত লাভ করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'সে কম আমল করে অধিক পুরস্কার পেল।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। উম্মু রুবায়্যি বিনতে বারা, যিনি হারিস ইবন সুরাকার মা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এসে বলেন, 'হে আল্লাহর নবী! আপনি হারিসাহ সম্পর্কে আমাকে কিছু বলবেন কি? হারিসা বাদারের যুদ্ধে অজ্ঞাত তীরের আঘাতে শাহাদাত লাভ করেন। সে যদি জান্নাতবাসী হয়ে থাকে তবে আমি সবর করব, তা না হলে আমি তার জন্য অবিরাম কাঁদতে থাকবো।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হে হারিসার মা! জান্নাতে অসংখ্য বাগান আছে, আর তোমার ছেলে সর্বোচ্চ জান্নাতুল ফেরদাউস পেয়ে গেছে।'

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, এক ব্যক্তি গনীমতের জন্য, এক ব্যক্তি প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য এবং এক ব্যক্তি বীরত্ব দেখানোর জন্য জিহাদে শরীক হলো। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর আদেশকে উচ্চতর রাখার উদ্দেশে যুদ্ধ করল, সে-ই আল্লাহর পথে জিহাদ করল।'

আবদুর রাহমান ইবন জাবর হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহর পথে যে বান্দার দু'পা ধূলায় মলিন হয়, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে এমন হয় না।'

ইকরিমাহ বর্ণনা করেন যে, ইবন আব্বাস তাকে ও আলী ইবন আবদুল্লাহকে বলেছিলেন যে, তোমরা আবূ সাঈদ-এর নিকট যাও এবং তার কিছু বর্ণনা শোন। অতঃপর আমরা তার নিকট গেলাম। সে সময় তিনি ও তার ভাই বাগানে পানি সেচের কাজে ছিলেন। আমাদের দেখে তিনি আসলেন এবং দু' হাটু বুকের সঙ্গে লাগিয়ে বসে বললেন, মসজিদে নববীর জন্য আমরা এক একটি করে ইট বহন করছিলাম। আর আম্মার দু' দু'টি করে বহন করছিল। সে সময় নবী (ﷺ) তার পাশ দিয়ে গেলেন এবং তার মাথা থেকে ধূলাবালি মুছলেন এবং বললেন, আম্মারের জন্য বড় দুঃখ হয়, বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে। সে (আম্মার) তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকবে এবং তারা আম্মারকে জাহান্নামের দিকে ডাকবে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। খন্দকের যুদ্ধ থেকে যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফিরে এসে অস্ত্র রাখলেন এবং গোসল করলেন, তখন জিব্রীল তার নিকট এলেন, আর তার মাথায় পট্টির মত ধুলি জমেছিল। তিনি বললেন, আপনি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন অথচ আল্লাহর কসম, আমি এখনো অস্ত্র রাখিনি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, কোথায় যেতে হবে? তিনি বানূ কুরায়যার প্রতি ইশারা করে বললেন, এদিকে। আয়িশাহ বলেন, অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের দিকে বেরিয়ে পড়লেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যারা বীরে মাউনায় শরীক সাহাবীদেরকে শহীদ করেছিল, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেই রি'ল ও যাক্ওয়ানের বিরুদ্ধে ত্রিশ দিন পর্যন্ত ফজরে দোয়া করেছিলেন এবং উসাইয়্যাহ গোত্রের বিরুদ্ধেও যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। আনাস বলেন, বী'রে মাউনার নিকট শহীদ সাহাবীদের সম্পর্কে কুরআনের আযাত নাযিল হয়েছিল, যা আমরা পাঠ করেছি। পরে তা মানসুখ হয়ে যায়। আয়াতটি হলো: "তোমরা আমাদের কাওমের নিকট এ খবর পৌছে দাও যে, আমরা আমাদের রবের সাক্ষাত লাভ করেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং আমরাও তার প্রতি সন্তুষ্ট।"

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন কিছু সংখ্যক সাহাবী সকাল বেলায় শরাব পান করেন, অতঃপর যুদ্ধে তারা শাহাদাত লাভ করেন। সুফ্ইয়ান-কে প্রশ্ন করা হলঃ সেই দিনের শেষ প্রহরে? তিনি বললেন, এ কথাটি তাতে নেই।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধ শেষে আমার পিতাকে (তার লাশ) নবী (ﷺ)-এর নিকট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটা অবস্থায় আনা হল এবং তার সামনে রাখা হল। আমি তার চেহারা খুলতে চাইলাম আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে নিষেধ করল। এমন সময় তিনি কোন বিলাপকারিণীর বিলাপ ধ্বনি শুনতে পেলেন। বলা হলো, সে আমরের কন্যা বা ভগ্নি। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, সে কাঁদছে কেন? অথবা বলেছিলেন, সে যেন না কাঁদে। ফেরেশতামন্ডলী তাকে ডানা দ্বারা ছায়াদান করছেন। আমি [ইমাম বুখারী বলেন] সাদাকা-কে জিজ্ঞেস করলাম, এও কি বর্ণিত আছে যে, তাকে উঠিয়ে নেয়া পর্যন্ত? তিনি বললেন, (জাবির কখনো সেটাও বলেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, জান্নাতে প্রবেশের পর আর কেউ দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে না, যদিও দুনিয়ার সকল জিনিস তাকে দেয়া হয়। একমাত্র শহীদ ব্যতীত; সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে যেন দশবার শহীদ হয়। কেননা সে শাহাদাতের মর্যাদা দেখেছে।

উমার ইবন 'উবায়দুল্লাহ্-এর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূন নাযর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা তাকে লিখেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা জেনে রাখ, তরবারির ছায়া-তলেই জান্নাত।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, সুলায়মান ইবন দাউদ বলেছিলেন, আজ রাতে আমি একশ অথবা বলেছেন নিরানব্বই জন স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গত হব। তাদের প্রত্যেকেই একজন বীর মুজাহিদ প্রসব করবে। তার একজন সাথী বললেন, বলুন, ইনশাআল্লাহ! কিন্তু তিনি ইনশাআল্লাহ বলেননি। ফলে একজন স্ত্রী ব্যতীত কেউই গর্ভবতী হলেন না। তিনিও একটি অপূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসব করলেন। সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ, যদি তিনি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তবে সকলের সন্তান হত এবং তারা সকলেই ঘোড় সওয়ার হয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করত।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সর্বাপেক্ষা সুশ্রী, সাহসী ও দানশীল ছিলেন। মদিনা্বাসীগণ একবার ভীত-শংকিত হয়ে পড়ল। নবী (ﷺ) ঘোড়ায় চড়ে সবার আগে এগিয়ে গিয়ে বললেন, আমরা আমরা এই ঘোড়াটিকে খুব দ্রুত পেয়েছি।

জুবাইর ইবন মুত্'ইম হতে বর্ণিত। হুনাইন থেকে ফেরার পথে তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে চলছিলেন। তার সঙ্গে আরো অনেক সাহাবী ছিলেন। এমন সময় কিছু গ্রাম্য ব্যক্তি এসে তাকে জড়িয়ে ধরল এবং তাদের কিছু দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করল। এমনকি তারা তাকে একটি গাছের নিকট নিয়ে গেল এবং তার চাদর আটকে গেল। নবী (ﷺ) সেখানে দাড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, আমার চাদরটি ফিরিয়ে দাও। আমার নিকট যদি এই সব কাঁটাদার গাছের পরিমাণ বক্রী থাকত, তাহলে এর সবই তোমাদের ভাগ করে দিতাম। আর তোমরা আমাকে কৃপণ, মিথ্যুক ও কাপুরুষ দেখতে পেতে না।

আমর ইবন মায়মূন আউদী হতে বর্ণিত। শিক্ষক যেমন ছাত্রদের লেখা শিক্ষা দেন, সাদ তেমনি তার সন্তানদের এ বাক্যগুলো শিক্ষা দিতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সালাতের পর এগুলো থেকে পানাহ চাইতেন, 'হে আল্লাহ! আমি ভীরুতা, অতি বার্ধক্য, দুনিয়ার ফিতনা ও কবরের শাস্তি থেকে আপনার নিকট পানাহ চাই।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এই দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি অক্ষমতা, ভীরুতা ও বার্ধক্য থেকে আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি এবং জীবন ও মরণের ফিতনা থেকে এবং কবরের আযাব থেকে আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি।'

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ত্বলহা ইবন 'উবায়দুল্লাহ, সাদ, মিকদাদ ইবন আসওয়াদ এবং আবদুর রাহমান ইবন আওফ-এর সাহচর্য লাভ করেছি। আমি তাদের কাউকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনিনি। তবে ত্বলহা-কে উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলী বর্ণনা করতে শুনেছি।

ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছিলেন, এই বিজয়ের পর আর হিজরাতের প্রয়োজন নেই। এখন কেবল জিহাদ ও নিয়্যাত। যখনই তোমাদের বের হবার আহবান জানানো হবে, তখনই তোমরা বেরিয়ে পড়বে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, দু'ব্যক্তিও ক্ষেত্রে আল্লাহ হাসেন। যারা একে অপরকে হত্যা করে উভয়েই জান্নাতবাসী হবে। একজন তো এ কারণে জান্নাতবাসী হবে যে, সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে শহীদ হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীর তওবা কবুল করেছেন। ফলে সেও আল্লাহর রাস্তায় শহীদ বলে গণ্য হয়েছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার বিজয়ের পর আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সেখানে অবস্থানকালেই আমি তার নিকট গিয়ে বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকেও অংশ দিন।' তখন সাঈদ ইবন 'আসের কোন এক পুত্র বলে উঠল, 'হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তাকে অংশ দিবেন না।' আবূ হুরাইরাহ্ বললেন, সে তো ইবন কাউকালের হত্যাকারী। তা শুনে সাঈদ ইবন 'আসের পুত্র বললেন, 'যান' পাহাড়ের নিম্নদেশ থেকে আমাদের নিকট আগত বিড়াল মাশি জন্তুটি, তার কথায় আশ্চর্যবোধ করছি, সে আমাকে এমন একজন মুসলিমকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করেছে যাকে আল্লাহ তাআলা আমার হাতে সম্মানিত করেছেন এবং যার দ্বারা আমাকে লাঞ্ছিত করেননি। আব্বাস বলেন, পরে তাকে অংশ দিয়েছেন কি দেননি, তা আমার জানা নেই।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় আবূ ত্বলহা জিহাদের কারণে সিয়াম পালন করতেন না। কিন্তু আল্লাহর রসূল (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পর 'ঈদুল ফিতর ও 'ঈদুল আয্হা ব্যতীত তাকে কখনো সিয়াম বাদ দিতে দেখিনি।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, পাচ প্রকার মৃত শহীদঃ মহামারীতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, মহামারীতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত।

বারা' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "মুমিনদের মধ্যে যারা (ঘরে বসে)" আয়াতটি নাযিল হলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যায়দ-কে ডেকে আনলেন। তিনি কোন জন্তুর একটি চওড়া হাড় নিয়ে আসেন এবং তাতে উক্ত আয়াতটি লিখে রাখেন। ইবন উম্মু মাকতুম জিহাদে শরীক হওয়ার ব্যাপারে তার অক্ষমতা প্রকাশ করলে "সেসব মুমিন সমান নয় যারা (ঘরে) বসে আছে তারা ছাড়া যারা অক্ষম (আঘাতে, বা অন্ধ বা খোড়া ইত্যাদি) এবং যারা তাদের ধন-সম্পদ ও জান দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করে)।" (৪.৯৫) আয়াতটি নাযিল হয়।

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি মারওয়ান ইবন হাকামকে মসজিদে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখলাম। অতঃপর আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তার পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে বর্ণনা করেন যে, যায়দ ইবন সাবিত তাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উপর অবতীর্ণ আয়াত, "মুসলিমদের মধ্যে যারা ঘরে বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারা সমান নয়" (আন-নিসাঃ ৯৫) যখন তাকে দিয়ে লিখেছিলেন, ঠিক সে সময় অন্ধ ইবন উম্মু মাকতুম সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি জিহাদে যেতে সক্ষম হতাম, তবে অবশ্যই অংশ গ্রহণ করতাম।' সে সময় আল্লাহ তাআলা তার রাসূল (ﷺ)-এর উপর ওয়াহী নাযিল করেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর উরু আমার উরুর উপর রাখা ছিল এবং তা আমার নিকট এতই ভারী মনে হচ্ছিল যে, আমি আমার উরু ভেঙ্গে যাবার আশংকা করছিলাম। অতঃপর ওয়াহী অবতীর্ণ হবার অবস্থা দূর হল, এ সময় "...ব্যতীত যারা অক্ষম (আঘাতের কারণে বা অন্ধ বা খোড়া ইত্যাদি) (4.95)" আয়াতটি আল্লাহ নাযিল করেন।

সালিম আবু নাযর হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা লিখে পাঠালেন, আর আমি তাতে পড়লাম যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যখন তোমরা তাদের (শত্রুদের) মুখোমুখী হবে তখন ধৈর্য অবলম্বন করবে।

আনাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খন্দকের দিকে বের হলেন, হিম শীতল সকালে আনসার ও মুহাজিররা পরিখা খনন করছেন, আর তাদের এ কাজ করার জন্য তাদের কোন গোলাম ছিল না। যখন তিনি তাদের দেখতে পেলেন যে, তারা কষ্ট এবং ক্ষুধায় আক্রান্ত, তখন বললেন, হে আল্লাহ! সত্যিকারে আয়েশ হচ্ছে আখেরাতের আয়েশ। তুমি আনসার ও মুহাজিরদের ক্ষমা করে দাও। এর উত্তরে তারা বলে উঠেনঃ আমরা তারাই যারা মুহাম্মাদের হাতে বায়আত করেছি জিহাদের, যদ্দিন আমরা বেচে আছি।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরগণ মদিনার পাশে পরিখা খনন করছিলেন এবং তারা পিঠে করে মাটি বহন করছিলেন। আর তারা এই কবিতা আবৃত্তি করছিলেনঃ আমরা ইসলামের উপর মুহাম্মদের হাতে বায়আত নিয়েছি, ততদিন পর্যন্ত যদ্দিন আমরা বেচে থাকি। আর নবী (ﷺ) তাদের উত্তরে বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ব্যতীত কোন কল্যাণ নেই। তাই আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি বরকত নাযিল করুন।

বারা হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মাটি উঠাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন, যদি আপনি না হতেন তাহলে আমরা হিদায়াত লাভ করতাম না।

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাবের দিন আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে দেখেছি যে, তিনি মাটি বহন করছেন। আর তার পেটের শুভ্রতা মাটি ঢেকে ফেলেছে। সে সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেন, হে আল্লাহ: আপনি না হলে আমরা হিদায়াত পেতাম না; সদাকাহ দিতাম না এবং সালাত আদায় করতাম না। তাই আমাদের উপর শান্তি নাযিল করুন। যখন আমরা শত্রু সম্মুখীন হই তখন আমাদের পা সুদৃঢ় করুন। ওরা আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। তারা যখনই কোন ফিতনা সৃষ্টি করতে চায় তখনই আমরা তা থেকে বিরত থাকি।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা তাবূকের যুদ্ধ থেকে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছি।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এক যুদ্ধে ছিলেন, তখন তিনি বললেন, কিছু ব্যক্তি মদিনায় আমাদের পেছনে রয়েছে। আমরা কোন ঘাঁটি বা কোন উপত্যকায় চলিনি, তাদের সঙ্গে ব্যতীত। ওযরই তাদের বাধা দিয়েছে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিনও সিয়াম পালন করে, আল্লাহ তার মুখমন্ডলকে দোযখের আগুন হতে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় দু'টি করে কোন জিনিস ব্যয় করবে, জান্নাতের প্রত্যেক দরজায় প্রহরী তাকে ডাক দিবে। (তারা বলবে), হে অমুক। এদিকে আস। আবূ বাকর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে তো তার জন্য কোন ক্ষতি নেই। নবী (ﷺ) বললেন, 'আমি আশা করি যে, তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মিম্বারে দাড়ালেন এবং বললেন, আমি আমার পর তোমাদের জন্য ভয় করি এ ব্যাপারে যে, তোমাদের জন্য দুনিয়ার কল্যাণের দরজা খুলে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি দুনিয়ার নিয়ামতের উল্লেখ করেন। এতে তিনি প্রথমে একটির কথা বলেন, পরে দ্বিতীয়টির বর্ণনা করেন। এক ব্যক্তি দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! কল্যাণও কি অকল্যাণ বয়ে আনবে?' নবী (ﷺ) নীরব রইলেন, আমরা বললাম, তার উপর ওয়াহী নাযিল হচ্ছে। সমস্ত লোকও এমনভাবে নীরবতা অবলম্বন করল, যেন তাদের মাথার উপর পাখী বসে আছে। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মুখের ঘাম মুছে বললেন, সেই প্রশ্নকারী কোথায়? তা কী কল্যাণকর? তিনি তিনবার এ কথাটি বললেন। কল্যাণ কল্যাণই বয়ে আনে। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বসন্তকালীন উদ্ভিদ পশুকে ধ্বংস অথবা ধ্বংসের মুখে নিয়ে আসে। কিন্তু যে পশু সেই ঘাস এ পরিমাণ খায় যাতে তার ক্ষুধা মিটে, অতঃপর রোদ পোহায় এবং মলমূত্র ত্যাগ করে, অতঃপর আবার ঘাস খায়। নিশ্চই এ মাল সবুজ শ্যামল সুস্বাদু। সেই মুসলিমের সম্পদই উত্তম যে ন্যায়সঙ্গতভাবে তা উপার্জন করেছে এবং আল্লাহর পথে, ইয়াতীম ও মিসকীন ও মুসাফিরের জন্য খরচ করেছে। আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অর্জন করে তার দৃষ্টান্ত এমন ভক্ষণকারীর মত যার ক্ষুধা মিটে না এবং তা কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।

যায়দ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর আসবাবপত্র সরবরাহ করল সে যেন জিহাদ করল। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোন জিহাদকারীর পরিবার-পরিজনকে উত্তমরূপে দেখাশোনা করল, সেও যেন জিহাদ করল।

আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) মদিনায় উম্মু সুলাইম ছাড়া কারো ঘরে যাতায়াত করতেন না তার স্ত্রীদের ব্যতীত। এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, 'উম্মু সুলাইমের ভাই আমার সঙ্গে জিহাদে শরীক হয়ে সে শহীদ হয়েছে, তাই আমি তার প্রতি সহানুভূতি জানাই।

মূসা ইবন আনাস হতে বর্ণিত। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, তিনি সাবিত ইবন কায়সের নিকট গিয়ে দেখতে পেলেন যে, তিনি তার উভয় উরু থেকে কাপড় সরিয়ে সুগন্ধি ব্যবহার করছেন। আনাস জিজ্ঞেস করলেন, 'হে চাচা! যুদ্ধে যাওয়া থেকে আপনাকে কিসে বিরত রাখল?' তিনি বললেন, 'ভাতিজা, এখনই যাব।' অতঃপর তিনি সুগন্ধি মালিশ করতে লাগলেন। অতঃপর তিনি বসলেন এবং যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে লোকদের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা আমাদের সম্মুখ থেকে সরে যাও। যাতে আমরা শত্রুর মুখোমুখি লড়তে পারি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে আমরা কখনো এরূপ করিনি। কত নিকৃষ্ট তা যা তোমরা তোমাদের শত্রুদেরকে অভ্যস্ত করেছ।'

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধের সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'কে আমাকে শত্রু পক্ষের খবরাখবর এনে দিবে?' যুবাইর বললেন, 'আমি আনব।' তিনি আবার বললেন, 'আমার শত্রু পক্ষের খবরাখবর কে এনে দিবে?' যুবায়র আবারও বললেন, 'আমি আনব।' অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, 'প্রত্যেক নবীরই সাহায্যকারী থাকে আর আমার সাহায্যকারী যুবাইর।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) লোকদের ডাক দিলেন। সদাকাহ বলেন, আমার মনে হয়, এটি খন্দকের যুদ্ধের সময়ের ঘটনা। যুবাইর তার ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি আবার লোকদের আহবান করলেন, এবারও যুবাইর সাড়া দিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পুনরায় লোকদের ডাক দিলেন। এবারও কেবল যুবাইর সাড়া দিলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, 'প্রত্যেক নবীর জন্য বিশেষ সাহায্যকারী থাকে। আমার বিশেষ সাহায্যকারী যুবাইর ইবন আওয়াম।'

মালিক ইবন হুয়ায়রিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট হতে ফিরে এলাম। তিনি আমাকে ও আমার একজন সঙ্গীকে বললেন, তোমরা আযান দিবে ও ইকামত দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যে বয়সে বড় সে ইমামত করবে।

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে কল্যাণ আছে কিয়ামত অবধি।

উরওয়াহ ইবন জা'দ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঘোড়ার কপালের কেশগুচ্ছে কিয়ামত পর্যন্ত কল্যাণ আছে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ঘোড়ার কপালের কেশ দামে বরকত আছে।

উরওয়াহ বারিকী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, ঘোড়ার কপালের কেশ গুচ্ছে কল্যাণ রয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত। (আখিরাতের) পুরস্কার এবং গনীমতের মাল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তার প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাস রেখে আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য ঘোড়া প্রস্তুত রাখে, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির পাল্লায় ঘোড়ার খাদ্য, পানীয়, গোবর ও পেশাব ওজন করা হবে।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি একদা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হন। কিন্তু তিনি কয়েকজন সংগী সহ পেছনে পড়ে গেলেন। আবূ ক্বাতাদাহ ব্যতীত তার সঙ্গীরা সকলেই ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। আবূ ক্বাতাদাহ দেখার পূর্বে তার সঙ্গীরা একটি বন্য গাধা দেখতে পান এবং তাকে চলে যেতে দেন; আবূ ক্বাতাদাহ গাধাটি দেখা মাত্রই জারাদা নামক তার ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন এবং ঘোড়ার চাবুকটি উঠিয়ে দিতে সঙ্গীদের বলেন; কিন্তু সঙ্গীরা অস্বীকার করলে তখন আবূ ক্বাতাদাহ নিজেই চাবুকটি তুলে নেন এবং গাধাটি শিকার করে সঙ্গীদের নিয়ে এর গোশ্ত আহার করেন। এতে তারা লজ্জিত হন। অতঃপর তারা যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট পৌছলেন তখন তিনি বলেন, গাধাটির কোন অংশ তোমাদের নিকট আছে কি? তারা বললেন, আমাদের সঙ্গে একটি পায়া আছে। নবী (ﷺ) তা নিয়ে আহার করলেন।

সাহল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের বাগানে নবী (ﷺ)-এর একটি ঘোড়া থাকত, যাকে লুহাইফ বলা হত। আর কেউ কেউ বলেছেন "লুখাইফ"।

মুআয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পেছনে আরোহী ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মুআয, তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহর হক কী? এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, বান্দা তার ইবাদাত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, তার ইবাদাতে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি লোকদের এ সুসংবাদ দিব না? তিনি বললেন, তুমি তাদের সুসংবাদটি দিও না, তাহলে লোকেরা এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, এক সময় মদিনায় আতংক ছড়িয়ে পড়লে নবী (ﷺ) আমাদের মানদূব নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন। পরে তিনি বললেন, 'আতংকের কোন কারণ তো আমি দেখতে পেলাম না। আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত (দ্রুতগামী) পেয়েছি।'

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনটি জিনিসে অকল্যাণ আছেঃ ঘোড়ায়, নারীতে ও বাড়িতে।

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যদি কোন কিছুতে অকল্যাণ থেকে থাকে, তবে তা আছে নারী, ঘোড়া ও বাড়িতে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ঘোড়া তিন শ্রেণীর লোকের জন্য। একজনের জন্য পুরস্কার; একজনের জন্য আবরণ এবং একজনের জন্য (পাপের) বোঝা। যার জন্য পুরস্কার, সে হলো, ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়া বেধে রাখে এবং রশি কোন চারণভূমি বা বাগানে লম্বা করে দেয়, আর ঘোড়াটি সে চারণভূমি বা বাগানে ঘাস খায়, তবে এর জন্য তার পুণ্য রয়েছে। আর ঘোড়াটি যদি রশি ছিঁড়ে এক বা দু'টি টিলা অতিক্রম করে তাহলেও তার গোবর ও পদক্ষেপ সমূহের বিনিময়ে তার জন্য পুণ্য রয়েছে। এমনকি ঐ ঘোড়া যদি কোন নহরে গিয়ে তা থেকে পানি পান করে, অথচ তার মালিক পানি পান করানোর ইচ্ছা করেনি, তবে এর ফলেও তার জন্য পুণ্য রয়েছে। আর যে ব্যক্তি অহংকার, লৌকিকতা প্রদর্শন এবং মুসলিমদের সঙ্গে শত্রুতা করার জন্য ঘোড়া বেধে রাখে তবে তার জন্য তা (পাপের) বোঝা। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে আমার উপর আর কিছু অবতীর্ণ হয়নি, ব্যাপক অর্থপূর্ণ এই একটি আয়াত ব্যতীত। (আল্লাহর বাণীঃ) কেউ অণু পরিমাণ নেক কাজ করে থাকলে, সে তা দেখতে পাবে; আর কেউ অণু পরিমাণ বদ কাজ করে থাকলে, সে তাও দেখতে পাবে।

আবুল মুতাওয়াক্কিল নাজী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবন আবুদল্লাহ্ আনসারী-এর নিকট গিয়ে তাকে বললাম, আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হতে যা শুনেছেন, তা থেকে আমার নিকট কিছু বলুন। তখন জাবির বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কোন এক সফরে তার সঙ্গে ছিলাম। আবূ আকীল বললেন, সেটি কি জিহাদের সফর ছিল, না উমরাহ পালনের, তা আমার জানা নেই। আমরা যখন প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা পরিজনদের নিকট তাড়াতাড়ি যেতে আগ্রহী, তারা তাড়াতাড়ি যাও। জাবির বলেন, অতঃপর আমি একটি উটের পিঠে চড়ে বেরিয়ে পড়লাম, সেটির দেহে কোন দাগ ছিল না এবং বর্ণ ছিল লাল-কালো মিশ্রিত। লোকেরা আমার পেছনে পেছনে চলছিল। পথিমধ্যে আমার উটটি ক্লান্ত হয়ে থেমে পড়লে নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, হে জাবির! তুমি থাম। অতঃপর তিনি চাবুক দিয়ে উটটিকে একটি আঘাত করলেন, আর উটটি হঠাৎ দ্রুত চলতে লাগল। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি উটটি বিক্রি করবে? আমি বললাম, হ্যা। অতঃপর মদিনায় পৌছলে নবী (ﷺ) সাহাবীদের একদল সহ মসজিদে প্রবেশ করলেন। আমি আমার উটটিকে মসজিদের বালাত-এর পার্শ্বে বেধে রেখে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এগিয়ে গেলাম এবং বললাম, এই আপনার উট। তখন তিনি বেরিয়ে এসে উটটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, হ্যা, উটটিতো আমারই। অতঃপর তিনি কয়েক উকিয়া স্বর্ণসহ এই বলে পাঠালেন যে, এগুলো জাবিরকে দাও। অতঃপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি উটের পুরা মূল্য পেয়েছ? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, মূল্য এবং উট তোমারই।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে বলতে শুনেছি যে, এক সময় মদিনা্তে আতংক দেখা দিলে নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহার মানদূব নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন এবং এর উপর আরোহণ করলেন আর বললেন, আমি কোন আতংক দেখিনি। কিন্তু ঘোড়াটি সমুদ্রের মত গতিশীল পেয়েছি।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) গনীমাতের মাল থেকে ঘোড়ার জন্য দু' অংশ এবং আরোহীর জন্য এক অংশ নির্ধারণ করেছিলেন।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বারা ইবন আযিব-কে বলল, আপনারা কি হুনায়নের যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে ময়দানে রেখে পলায়ন করেছিলেন? বারা ইবন আযিব বলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পলায়ন করেননি। হাওয়াযিনরা ছিল সূদক্ষ তীরন্দাজ। আমরা সামনা-সামনি যুদ্ধে তাদের পরাস্ত করলে তারা পালিয়ে যেতে লাগল। তখন মুসলিমরা তাদের পিছু ধাওয়া না করে গনীমাতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হল। তখন শত্রুরা তীর বর্ষণের মাধ্যমে আমাদের আক্রমণ করে বসল। তবে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) স্থান ত্যাগ করেননি। আমি তাকে তার সাদা খচ্চরটির উপর অটল অবস্থায় দেখেছি। আবূ সুফ্ইয়ান তার বাহনের লাগাম ধরে টানছেন; আর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলছেন, 'আমি মিথ্যা নবী নই, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।'

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) সাওয়ার হয়ে পা-দানিতে পা রাখার পর উটটি দাড়িয়ে গেলে যুল-হুলাইফা মসজিদের নিকট তিনি ইহরাম বেধে নিতেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) গদিহীন ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে লোকদের সম্মুখে হাজির হলেন; তার কাঁধে ছিল তলোয়ার।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, একবার মদিনা্বাসীগণ আতংকিত হয়ে পড়লে নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহা-এর ধীরগতি সম্পন্ন ঘোড়ায় চড়লেন। তিনি ফিরে এসে বললেন, আমি তোমার ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত গতিশীল পেয়েছি। এরপর ঘোড়াটিকে আর কখনো পেছনে ফেলা যেতো না।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অশ্বের জন্য হাফ্য়া থেকে সানিয়্যাতুল বিদা পর্যন্ত এবং প্রশিক্ষণহীন অশ্বের জন্য সানিয়্যা থেকে বানূ যুরায়কের মাসজিদ পর্যন্ত দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। ইবন উমার বলেন, আমি উক্ত প্রতিযোগিতার একজন প্রতিযোগী ছিলাম। সুফ্ইয়ান বলেন, হাফ্য়া থেকে সানিয়্যাতুল বিদার দূরত্ব পাচ কিংবা ছয় মাইল এবং সানিয়্যা থেকে বানূ যুরায়কের মসজিদের দূরত্ব এক মাইল।

আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) প্রশিক্ষণহীন ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছেন এবং এই দৌড়ের সীমানা ছিল সানিয়্যা থেকে বানু যুরায়কের মাসজিদ পর্যন্ত। আবদুল্লাহ ইবন উমার এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছেন। এই প্রতিযোগিতা হাফয়া থেকে শুরু হত এবং সানিয়্যাতুল বিদায় শেষ হত। (রাবী আবূ ইসহাক বলেন), আমি মূসা-কে বললাম, এর দূরত্ব কী পরিমাণ হবে? তিনি বললেন, ছয় বা সাত মাইল। প্রশিক্ষণহীন ঘোড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হতো সানিয়্যাতুল বিদা থেকে এবং শেষ হতো বানূ যুরাইকের মসজিদে। আমি বললাম, এর মধ্যে দূরত্ব কত? তিনি বললেন, এক মাইল বা তার তদ্রূপ। ইবন উমার এতে প্রতিযোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ)-এর একটি উষ্ট্রী ছিল যেটিকে আযবা বলা হত।

আনাস হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর 'আযবা নামের একটি উষ্ট্রী ছিল। কোন উষ্ট্রী তার আগে যেতে পারত না। হুমাইদ বলেন, কোন উষ্ট্রী তার আগে যেতে সক্ষম হতো না। একদা এক বেদুইন একটি জওয়ান উটে চড়ে আসল এবং আযবা-এর আগে চলে গেল। এতে মুসলিমদের মনে কষ্ট হল। এমনকি নবী (ﷺ)-ও তা বুঝতে পারলেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর নিয়ম এই যে, 'দুনিয়ার সব কিছুরই উত্থানের পর পতন আছে।'

আমর ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তার সাদা খচ্চর, কিছু যুদ্ধ সামগ্রী ও সামান্য ভূমি ছাড়া আর কিছুই রেখে যাননি। এগুলোও তিনি সদাকাহ স্বরূপ ছেড়ে যান।

বারা' হতে বর্ণিত যে, কোন এক ব্যক্তি তাকে বললেন, হে আবূ উমারাহ্! আপনারা হুনায়নের দিন পলায়ন করেছিলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, না। নবী (ﷺ) কখনো পলায়ন করেননি বরং অতি উৎসাহী অগ্রবর্তী কতিপয় ব্যক্তি হাওয়াযিনদের তীর নিক্ষেপের ফলে পালিয়ে ছিলেন। আর নবী (ﷺ) তার সাদা খচ্চরটির উপর উপবিষ্ট ছিলেন এবং আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারিস এর লাগাম ধরে দাড়িয়েছিলেন। তখন নবী (ﷺ) বলেছিলেন, আমি মিথ্যা নবী নই, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।'

আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট জিহাদের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, 'তোমাদের জিহাদ হলো হাজ্জ।' আবদুল্লাহ ইবন অলীদ বলেছেন, সুফ্ইয়ান এ সম্পর্কে আমাদের হাদীস শুনিয়েছেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট তার স্ত্রীগণ জিহাদের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি বললেন, (মহিলাদের জন্য) উত্তম জিহাদ হলো হাজ্জ।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মিলহানের কন্যার নিকট গেলেন এবং সেখানে তিনি বিশ্রাম করলেন। অতঃপর তিনি হেসে উঠলেন। মিলহান -এর কন্যা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন হাসছেন?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদের উদ্দেশে এই সবুজ সমুদ্রে সফর করবে। তাদের উপমা সিংহাসনে উপবিষ্ট বাদশাহদের মত। মিলহান-এর কন্যা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট আমার জন্য দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আপনি মিলহানের কন্যাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আবার তিনি বিশ্রাম নিলেন, অতঃপর হেসে উঠলেন। মিলহান-এর কন্যা তাকে একইভাবে জিজ্ঞেস করলেন অথবা বললেন, এ কেন? আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-ও পূর্বের মত জবাব দিলেন। মিলহান-এর কন্যা বললেন, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বললেন, তুমি তাদের প্রথম দলে আছ, পেছনের দলে নয়। বর্ণনাকারী বলেন, আনাস বলেছেন, অতঃপর তিনি উবাদাহ ইবন সামিতের সঙ্গে বিবাহ করেন এবং কারাযার কন্যার সঙ্গে সমুদ্র ভ্রমণ করেন। অতঃপর ফেরার সময় নিজের সাওয়ারীতে আরোহণ করলেন, তখন তা থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় মটকে মারা যান।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৮৭৭)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বাইরে কোথাও যাবার ইচ্ছা করলে তিনি তার স্ত্রীদের মধ্যে করআর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং এতে যার নাম আসত তাকেই নবী (ﷺ) সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে এভাবে তিনি আমাদের মধ্যে করআর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। এতে আমার নাম আসল এবং আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হলাম। এ ছিল পর্দার আয়াত নাযিল হবার পরবর্তী ঘটনা।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদের যুদ্ধে সাহাবীগণ নবী (ﷺ) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। আমি দেখলাম, আয়িশাহ বিন্তে আবূ বাকর ও উম্মু সুলাইম তাদের আচল এতটুকু উঠিয়ে নিয়েছেন যে, আমি তাদের উভয় পায়ের গহনা দেখছিলাম। তারা উভয়েই মশক পিঠে বয়ে সাহাবীগণের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। আবার ফিরে গিয়ে মশ্ক ভর্তি করে নিয়ে এসে সাহাবীগণের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন।

সা'লাবাহ ইবন আবূ মালিক হতে বর্ণিত যে, উমার ইবন খাত্তাব মদিনার কিছু সংখ্যক মহিলার মধ্যে কয়েকখানা (রেশমী) চাদর বণ্টন করেন। অতঃপর একটি ভাল চাদর রয়ে গেল। তার নিকট উপস্থিত একজন তাকে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ চাদরটি আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নাতনী উম্মু কুলসুম বিন্তে আলী যিনি আপনার নিকট আছেন, তাকে দিয়ে দিন। উমার বলেন, উম্মু সালীত এই চাদরটির অধিক হক্দার। উম্মু সালীত আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর হাতে বায়আতকারিণী আনসার মহিলাদের একজন। উমার বলেন, কেননা, উম্মু সালীত উহুদের যুদ্ধে আমাদের নিকট মশক বহন করে নিয়ে আসতেন।

রুবাইয়ি বিনতু মআব্বিয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (যুদ্ধের ময়দানে) নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে থেকে লোকেদের পানি পান করাতাম, আহতদের পরিচর্যা করতাম এবং নিহতদের মদিনায় পাঠাতাম।

রুবাইয়ি বিনতু মু'আব্বিয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধে শরীক হয়ে লোকেদের পানি পান করাতাম ও তাদের পরিচর্যা করতাম এবং আহত ও নিহত লোকদের মদিনায় ফেরত পাঠাতাম।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (যুদ্ধে) আবূ 'আমিরের হাটুতে তীর বিদ্ধ হলো, আমি তার নিকট গেলাম। আবূ 'আমির বললেন, এই তীরটি বের কর। তখন আমি তীরটি টেনে বের করলাম। ফলে তাথেকে পানি প্রবাহিত হতে লাগল। আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলাম এবং তাকে ঘটনাটি জানালাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হে আল্লাহ! আবূ 'আমির 'উবায়দকে ক্ষমা করুন।'

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (এক রাতে) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জেগে কাটান। অতঃপর তিনি যখন মদিনায় এলেন এই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন যে, আমার সাহাবীদের মধ্যে কোন যোগ্য ব্যক্তি যদি রাতে আমার পাহারায় থাকত। এমন সময় আমরা অস্ত্রের শব্দ শুনতে পেলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? ব্যক্তিটি বলল, আমি সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস, আপনার পাহারার জন্য এসেছি। তখন নবী (ﷺ) ঘুমিয়ে গেলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, লাঞ্ছিত হোক দ্বীনার ও দিরহামের গোলাম এবং চাদর ও শালের গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এই হাদীসটির সনদ ইসরাঈল এবং মুহাম্মাদ ইবন জুহাদা, আবূ হুসাইনের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পর্যন্ত পৌছাননি।

আবূ হুরাইরাহ্ থেকে আমাদের অতিরিক্ত বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, লাঞ্ছিত হোক দ্বীনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং শালের গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। (তাদের পায়ে) কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ তুলে দিবে না। ঐ ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ, যে ঘোড়ার লাগাম ধরে জিহাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, যার মাথার চুল উস্ক খুস্ক এবং পা ধূলি মলিন। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে পাহারায় থাকে আর (দলের) পেছনে পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে। সে (এত সহজ এবং দ্ব্যর্থহীন যে) কারো সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না এবং কোন বিষয়ে সুপারিশ করলে তার সুপারিশ কবূল করা হয় না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমি জারীর ইবন আবদুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি আমার খিদমাত করতেন। যদিও তিনি আনাস -এর চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। জারীর বলেন, আমি আন্সারদের এমন কিছু কাজ দেখেছি, যার কারণে তাদের কাউকে পেলেই সম্মান করি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে খায়বার যুদ্ধে গিয়ে তার খিদমত করছিলাম। যখন নবী (ﷺ) সেখান থেকে ফিরলেন এবং উহুদ পর্বত তার দৃষ্টিগোচর হলো, তিনি বললেন, 'এই পর্বত আমাদের ভালবাসে এবং আমরাও তাকে ভালবাসি।' অতঃপর তিনি হাত দ্বারা মদিনার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'হে আল্লাহ! ইব্রাহীম যেমন মক্কাকে হারাম বানিয়েছিলেন, তেমনি আমিও এ দুই কংকরময় ময়দানের মধ্যবর্তী স্থান (মদিনা্)-কে হারাম বলে ঘোষণা করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সা' ও মুদে বরকত দান করুন।'

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক সফরে আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তির ছায়াই ছিল সর্বাধিক যে তার চাদর দ্বারা ছায়া গ্রহণ করছিল। তাই যারা সিয়াম পালন করছিল তারা কোন কাজই করতে পারছিল না। যারা সিয়াম রত ছিল না, তারা উটের দেখাশুনা করছিল, খিদমতের দায়িত্ব পালন করছিল এবং পরিশ্রমের কাজ করছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, 'যারা সওম পালন করে নি তারাই আজ সাওয়াব নিয়ে গেল।'

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, 'শরীরের প্রতিটি জোড়ার উপর প্রতিদিন একটি করে সদাকাহ রয়েছে। কোন ব্যক্তিকে তার সাওয়ারীতে উঠার ক্ষেত্রে সাহায্য করা, অথবা তার মাল-সরঞ্জাম তুলে দেয়া সদাকাহ। উত্তম কথা বলা ও সালাতের উদ্দেশ্যে গমনের প্রতিটি পদক্ষেপ সদাকাহ এবং রাস্তা বাতলিয়ে দেয়া সদাকাহ।'

সাহল ইবন সাদ সায়ি'দী হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, 'আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত প্রহরা দেয়া দুনিয়া ও এর উপর যা কিছু আছে তার চেয়ে উত্তম। জান্নাতে তোমাদের কারো চাবুক পরিমান জায়গা দুনিয়া এবং ভূপৃষ্ঠের সমস্ত কিছুর চেয়ে উত্তম। আল্লাহর পথে বান্দার একটি সকাল বা বিকাল ব্যয় করা দুনিয়া এবং ভূপৃষ্ঠের সব কিছুর চেয়ে উত্তম।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহাকে বলেন, তোমাদের ছেলেদের মধ্য থেকে একটি ছেলে খুজে আন, যে আমার খেদমত করতে পারে। এমনকি তাকে আমি খায়বারেও নিয়ে যেতে পারি। অতঃপর আবূ ত্বলহা আমাকে তার সাওয়ারীর পেছনে বসিয়ে নিয়ে চললেন। আমি তখন প্রায় সাবালক। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর খেদমত করতে লাগলাম। তিনি যখন অবতরণ করতেন, তখন প্রায়ই তাকে এই দোয়া পড়তে শুনতামঃ 'হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানী থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার নিকট পানাহ চাচ্ছি।' পরে আমরা খায়বারে গিয়ে হাজির হলাম। অতঃপর যখন আল্লাহ তাআলা তাকে দুর্গের উপর বিজয়ী করলেন, তখন তার নিকট সাফিয়্যা বিনতু হুয়াই ইবন আখতাবের সৌন্দর্যের কথা উল্লেখ করা হলো, তিনি ছিলেন সদ্য বিবাহিতা; তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে নিজের জন্য মনোনীত করলেন। অতঃপর তাকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন। আমরা যখন সাদ্দুস্ সাহ্বা নামক স্থানে পৌছলাম তখন সফিয়্যাহ হায়েয থেকে পবিত্র হন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেখানে তার সঙ্গে বাসর যাপন করেন। অতঃপর তিনি চামড়ার ছোট দস্তরখানে 'হায়সা' প্রস্তুত করে আমাকে আশেপাশের লোকজনকে ডাকার নির্দেশ দিলেন। এই ছিল আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে সাফিয়্যার বিয়ের ওয়ালিমা। অতঃপর আমরা মদিনার দিকে রওয়ানা দিলাম। আনাস বলেন, আমি দেখতে পেলাম যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার পেছনে চাদর দিয়ে সফিয়্যাহ্কে পর্দা করছেন। উঠানামার প্রয়োজন হলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উটের কাছে হাটু বাড়িয়ে বসতেন, আর সাফিয়্যা তার উপর পা রেখে উটে আরোহণ করতেন। এভাবে আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উহুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটি এমন এক পর্বত যা আমাদের ভালবাসে এবং আমরাও তাকে ভালবাসি। অতঃপর মদিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, ' হে আল্লাহ, এই কঙ্করময় দু'টি ময়দানের মধ্যবর্তী স্থানকে আমি 'হারাম' বলে ঘোষণা করছি, যেমন ইব্রাহীম মক্কাকে 'হারাম' ঘোষণা করেছিলেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদের মুদ এবং সা'তে বরকত দান করুন।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মু হারাম আমাকে বলেছেন, একদা নবী (ﷺ) তার বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে তিনি হাসতে হাসতে জেগে উঠেন। উম্মু হারাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিসে আপনাকে হাসাচ্ছে? তিনি বললেন, আমি আমার উম্মাতের একদলের ব্যাপারে বিস্মিত হয়েছি, তারা সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজা-বাদশাহদের মত সমুদ্র সফর করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি তাদের মধ্যে থাকবে। অতঃপর তিনি আবার ঘুমালেন এবং হাসতে হাসতে জেগে উঠেন। আর তিনি দু'বার অথবা তিনবার অনুরূপ বললেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর নিকট দু'আ করুন যেন তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি তাদের অগ্রগামীদের মধ্যে রয়েছ। পরে উবাদাহ ইবন সামিত তাকে বিয়ে করেন এবং তাকে নিয়ে জিহাদে বের হন। তাকে তার আরোহণের জন্য একটি সাওয়ারীর জানোয়ারের নিকটবর্তী করা হল। কিন্তু তিনি তা থেকে পড়ে যান এবং তার ঘাড় ভেঙ্গে যায়।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৮৯৪)।

মুস'আব ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন সাদ-এর ধারণা ছিল অন্যদের চেয়ে তার মর্যাদা অধিক। তখন নবী (ﷺ) বললেন, 'তোমরা দুর্বলদের (দোয়ায়) ওয়াসীলায়ই সাহায্য প্রাপ্ত ও রিযিক প্রাপ্ত হচ্ছ।'

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, 'এমন এক সময় আসবে যখন একদল লোক আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের সঙ্গে কি নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের কেউ আছেন? বলা হবে, হ্যা। অতঃপর (তার বরকতে) বিজয় দান করা হবে। অতঃপর এমন এক সময় আসবে, যখন জিজ্ঞেস করা হবে, নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের সহচরদের মধ্যে কেউ কি তোমাদের মধ্যে আছেন? বলা হবে, হ্যা, অতঃপর তাদের বিজয় দান করা হবে। অতঃপর এক যুগ এমন আসবে যে, জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছেন, যিনি নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের সহচরদের সাহচর্য লাভ করেছে, (তাবি-তাবিঈন)? বলা হবে, হ্যা। তখন তাদেরও বিজয় দান করা হবে।'

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত যে, একবার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও মুশ্রিকদের মধ্যে মুকাবিলা হয় এবং উভয়পক্ষ ভীষণ যুদ্ধ লিপ্ত হয়। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজ সৈন্যদলের নিকট ফিরে এলেন, মুশ্রিকরাও নিজ সৈন্যদলে ফিরে গেল। সেই যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গীদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিল, যে কোন মুশরিককে একাকী দেখলেই তার পশ্চাতে ছুটত এবং তাকে তলোয়ার দিয়ে আক্রমণ করত। বর্ণনাকারী (সাহল ইবন সাদ বলেন, আজ আমাদের কেউ অমুকের মত যুদ্ধ করতে পারেনি। তা শুনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, সে তো জাহান্নামের অধিবাসী হবে। একজন সাহাবী বলে উঠলেন, আমি তার সঙ্গী হব। অতঃপর তিনি তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন, সে দাড়ালে তিনিও দাড়াতেন এবং সে শীঘ্র চললে তিনিও দ্রুত চলতেন। তিনি বললেন, এক সময় সে মারাত্মকভাবে আহত হলো এবং সে দ্রুত মৃত্যু কামনা করতে লাগল। এক সময় তলোয়ারের বাট মাটিতে রাখল এবং এর তীক্ষ্ণ দিক বুকে চেপে ধরে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল। অনুসরণকারী ব্যক্তিটি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, কী ব্যাপার? তিনি বললেন, যে ব্যক্তিটি সম্পর্কে আপনি কিছুক্ষণ আগেই বলেছিলেন যে, সে জাহান্নামী হবে, তা শুনে সাহাবীগণ বিষয়টিকে অস্বাভাবিক মনে করলেন। আমি তাদের বললাম যে, আমি ব্যক্তিটির সম্পর্কে খবর তোমাদের জানাব। অতঃপর আমি তার পিছু পিছু বের হলাম। এক সময় লোকটি মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং সে শীঘ্র মৃত্যু কামনা করতে থাকে। অতঃপর তার তলোয়ারের বাট মাটিতে রেখে এর তীক্ষ্ণধার বুকে চেপে ধরল এবং তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন বললেন, 'মানুষের বাহ্যিক বিচারে অনেক সময় কোন ব্যক্তি জান্নাতবাসীর মত আমল করতে থাকে, আসলে সে জাহান্নামী হয় এবং তেমনি মানুষের বাহ্যিক বিচারে কোন ব্যক্তি জাহান্নামীর মত আমল করলেও প্রকৃতপক্ষে সে জান্নাতী হয়।'

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আসলাম গোত্রের একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তীরন্দাজি চর্চা করছিল। নবী (ﷺ) বললেন, হে বানূ ইসমাঈল! তোমরা তীর নিক্ষেপ করতে থাক। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষ দক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন এবং আমি অমুক গোত্রের সঙ্গে আছি। রাবী বলেন, এ কথা শুনে দু'দলের এক দল তীর নিক্ষেপ বন্ধ করে দিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমাদের কী হলো যে, তোমরা তীর নিক্ষেপ করছ না? তারা জবাব দিল, আমরা কিভাবে তীর নিক্ষেপ করতে পারি, অথচ আপনি তাদের সঙ্গে আছেন? নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা তীর নিক্ষেপ করতে থাক, আমি তোমাদের সকলের সঙ্গে আছি।

আবূ উসাইদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বাদারের দিন বলেছেন, আমরা যখন কুরাইশদের বিপক্ষে সারিবদ্ধ হয়েছিলাম এবং কুরাইশরা আমাদের বিপক্ষে সারিবদ্ধ হয়েছিল, তখন নবী (ﷺ) আমাদের বললেন, যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হবে, তখন তোমরা তীর চালনা করবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার একদল হাব্শী নবী (ﷺ)-এর নিকট বর্শা নিয়ে খেলা করছিলেন। এমন সময় উমার সেখানে এলেন এবং হাতে কাঁকর তুলে নিয়ে তাদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হে উমার! তাদের করতে দাও। আলী......মা'মার সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করেন, (এ ঘটনা) মসজিদে ঘটেছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ তাল্হা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে একই ঢাল ব্যবহার করেছেন। আর আবূ ত্বলহা ছিলেন একজন ভাল তীরন্দাজ। তিনি যখন তীর ছুঁড়তেন, তখন নবী (ﷺ) মাথা উচু করে তীর যে স্থানে পড়ত তা নযর রাখতেন।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যুদ্ধের ময়দানে যখন নবী (ﷺ)-এর মাথার শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে গেল ও তার মুখমন্ডল রক্তে ভিজে গেল এবং তার সামনের দাত ভেঙ্গে গেল, তখন আলী ঢালে ভরে ভরে পানি আনতেন এবং ফাতিমা ক্ষতস্থান ধুয়ে দিচ্ছিলেন। যখন ফাতিমা দেখলেন যে, পানির চেয়ে রক্ত পড়া আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন একখানা চাটাই নিয়ে তা পোড়ালেন এবং তার ছাই ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন, তাতে রক্ত বন্ধ হয়ে গেল।

উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ নযীরের সম্পদ আল্লাহ তাআলা তার রাসূল (ﷺ)-কে 'ফায়' হিসেবে দান করেছিলেন। এতে মুসলিমগণ অশ্ব বা সাওয়ারী চালনা করেনি। এ কারণে তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এ সম্পদ থেকে নবী (ﷺ) তার পরিবারকে এক বছরের খরচ দিয়ে দিতেন এবং বাকী আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের প্রস্তুতির জন্য হাতিয়ার ও ঘোড়া ইত্যাদিতে ব্যয় করতেন।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে সাদ ব্যতীত আর কারো জন্যও তার পিতা-মাতাকে উৎসর্গ করার কথা বলতে দেখিনি। আমি তাকে বলতে শুনেছি, 'তুমি তীর নিক্ষেপ কর, তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ (ফিদা) হোক।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) আমার নিকট আসলেন। সে সময় দু'টি বালিকা বু'আস যুদ্ধের গৌরবগাঁথা গাচ্ছিল। তিনি এসেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন এবং তার মুখ ফিরিয়ে রাখলেন। এমন সময় আবূ বাকর এলেন এবং আমাকে ধমক দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূলের নিকট শয়তানের বাজনা? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার দিকে ফিরে বললেন, ওদের ছেড়ে দাও। অতঃপর যখন তিনি অন্য দিকে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমি বালিকা দু'টিকে খোচা দিলাম। আর তারা বেরিয়ে গেল।

আয়িশাহ বলেন, ঈদের দিনে হাবশী লোকেরা ঢাল ও বর্শা নিয়ে খেলা করত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলেছিলাম কিংবা তিনিই আমাকে বলেছিলেন, তুমি কি দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যা। অতঃপর তিনি আমাকে তার পেছনে দাড় করালেন। আমার গাল তার গালের উপর ছিল। তিনি বলছিলেন, হে বানূ আরফিদা, চালিয়ে যাও। যখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তিনি আমাকে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে? বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, তাহলে যাও। আহমদ ইবন ওয়াহব সূত্রে বলেন, তিনি যখন অন্য মনস্ক হলেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সকল লোকের চেয়ে সুশ্রী ও সাহসী ছিলেন। এক রাতে মদিনার লোকেরা ভীত হয়ে শব্দের দিকে বের হলো। তখন নবী (ﷺ) তাদের সামনে এলেন এমন অবস্থায় যে, তিনি শব্দের কারণ অন্বেষণ করে ফেলেছেন। তিনি আবূ ত্বলহার জিনবিহীন ঘোড়ার পিঠে সাওয়ার ছিলেন এবং তার কাঁধে তরবারি ছিল। তিনি বলছিলেন, তোমরা ভীত হয়ো না। অতঃপর তিনি বললেন, আমি ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত গতিশীল পেয়েছি, অথবা তিনি বললেন, এটি সমুদ্র।

আবূ উমামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এই সব বিজয় এমন সব লোকদের দ্বারা অর্জিত হয়েছিল, যাদের তলোয়ার স্বর্ণ বা রৌপ্য খচিত ছিল না, বরং তাদের তলোয়ার ছিল উটের গর্দানের চামড়া এবং লৌহ কারুকার্য খচিত।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে নাজদের দিকে কোন এক যুদ্ধে বের হয়েছিলেন। নবী (ﷺ) ফিরে আসলে তিনিও তার সঙ্গে ফিরে আসলেন। তারা যখন কণ্টকময় বৃক্ষরাজীতে আবৃত এক উপত্যকায় উপস্থিত হলেন তখন তাদের দিবা বিশ্রামের সময় এলো। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সেখানে অবতরণ করেন। লোকেরা ছায়ার আশ্রয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একটি বাবলা গাছের নীচে অবতরণ করলেন এবং তাতে তার তরবারী ঝুলিয়ে রাখলেন। অতঃপর আমরা সকলেই ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ এক সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের ডাকতে লাগলেন। দেখলাম তার পার্শ্বে একজন গ্রাম্য আরব। তিনি বললেন, আমার নিদ্রাবস্থায় এই ব্যক্তি আমারই তরবারী আমারই উপর বের করে ধরেছে। জেগে উঠে দেখতে পেলাম যে, তার হাতে খোলা তরবারী। সে বলল, আমার থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে, আমি বললাম, আল্লাহ! আল্লাহ! তিনবার। তারপরও তিনি কোন প্রতিশোধ নেননি, অথচ সে সেখানে বসে আছে।

সাহল হতে বর্ণিত যে, তাকে উহুদের দিনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর আঘাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, নবী (ﷺ)-এর মুখমন্ডল আহত হল এবং তার সামনের দু'টি দাত ভেঙ্গে গেল, তার মাথার শিরস্ত্রান ভেঙ্গে গেল। ফাতেমাহ রক্ত ধুচ্ছিলেন আর আলী পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। তিনি যখন দেখতে পেলেন যে, রক্ত পড়া বাড়ছেই, তখন একটি চাটাই নিয়ে তা পুড়িয়ে ছাই করলেন এবং তা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন। অতঃপর রক্ত পড়া বন্ধ হল।

আমর ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কিছুই রেখে যাননি, কেবল তার অস্ত্র, একটি সাদা খচ্চর ও এক টুকরো জমি, যা সদাকাহ করে গিয়েছিলেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে একটি যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন। তাদের দুপুরের বিশ্রামের সময় হল এমন একটি উপত্যকায় যাতে কাঁটাদার প্রচুর বৃক্ষ ছিল। লোকেরা কাঁটাদার বৃক্ষরাজির ছায়ায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ল। আর নবী (ﷺ)একটি বৃক্ষের নীচে অবতরণ করেন এবং একটি বৃক্ষে তার তরবারি ঝুলিয়ে সেখানে ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি জেগে উঠলেন এবং হঠাৎ তার পার্শ্বে দেখতে পেলেন যে, জনৈক ব্যক্তি, অথচ তিনি তার ব্যাপারে টের পাননি। তখন নবী (ﷺ) বললেন, এই ব্যক্তিটি হঠাৎ আমার তরবারীটি উচিয়ে বলল, কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ! তখন সে ব্যক্তি তলোয়ারটি খাপে রেখে দিল। আর এই সে ব্যক্তি, এখনো বসা, কিন্তু তিনি তার প্রতিশোধ নেননি।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। মক্কার পথে কোন এক স্থানে পৌছার পর আবূ ক্বাতাদাহ কয়েকজন সঙ্গীসহ তার পেছনে রয়ে গেলেন। সঙ্গীরা ছিলেন ইহরাম অবস্থায় আর তিনি ছিলেন ইহরাম বিহীন। এ সময় তিনি একটি বুনো গাধা দেখতে পান এবং তার ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন। তিনি তার সঙ্গীদের তার চাবুকটি উঠিয়ে দিতে বলেন; কিন্তু তারা তা দিতে অস্বীকার করলেন। আবার তিনি তার বর্শাটি উঠিয়ে দিতে বলেন। তারা তাও দিতে অস্বীকার করলেন। তখন তিনি নিজেই তা উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর গাধাটির উপর আক্রমণ চালালেন এবং তাকে হত্যা করলেন। সাথীরা কেউ কেউ এর গোশ্ত খেলেন এবং কেউ কেউ তা খেতে অস্বীকার করলেন। অতঃপর তারা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে এ সম্পর্কে তার নিকট জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, এটি একটি আহারের বস্তু, যা আল্লাহ তাআলা তোমাদের আহারের জন্য দিয়েছেন। যায়িদ ইবন আসলাম আবূ ক্বাতাদাহ থেকে আবূ নাযর-এর মতই বুনো গাধা সম্পর্কে হাদীস বর্ণনা করেছেন। এতে আছে, নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের সঙ্গে তার কিছু গোশ্ত আছে কি?

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বাদারের দিন একটি গুম্বজওয়ালা তাবুতে অবস্থান কালে দোয়া করছিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রতিজ্ঞা ও ওয়াদার দোহাই দিয়ে বলছি, আপনি যদি চান, তাহলে আজকের পরে আর আপনার ইবাদাত করা হবে না।' এ সময় আবূ বাকর তার হাত ধরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যথেষ্ট হয়েছে। আপনি বার বার নত হয়ে আপনার প্রতিপালকের কাছে দোয়া করেছেন।' সে সময় নবী (ﷺ) বর্ম আচ্ছাদিত ছিলেন। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করতে করতে বেরিয়ে এলেনঃ শীঘ্রই দুশমনরা পরাস্ত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে তদুপরি কিয়ামত শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হবে অধিক কঠিন ও অধিক তিক্ত।(আল-ক্বামার ৪৫, ৪৬) ওহাইব বলেন, খালিদ বলেছেন, 'বাদারের দিন'।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর সময় তার বর্মটি ত্রিশ সা' যব-এর বিনিময়ে এক ইয়াহূদীর নিকট বন্ধক ছিল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, কৃপণ ও দানশীল ব্যক্তির উদাহরণ এমন দু' ব্যক্তির মত, যারা লৌহ বর্মে আচ্ছাদিত। বর্ম দু'টি এত আটসাঁট যে, তাদের উভয়ের হাত কব্জায় আবদ্ধ রয়েছে। দানশীল ব্যক্তি যখন দান করতে ইচ্ছা করে, তখন বর্মটি তার দেহের উপর প্রসারিত হয়, এমনকি তা তার পায়ের চিহ্ন মুছে ফেলে। আর কৃপণ ব্যক্তি যখন দান করতে ইচ্ছা করে তখন বর্মের কড়াগুলো পরস্পর গলে গিয়ে তার শরীরকে আকড়ে ধরে এবং তার উভয় হস্ত কন্ঠের সঙ্গে লেগে যায়। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, সে হাত দু'টিকে প্রসারিত করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে; কিন্তু প্রসারিত করতে পারে না।

মুগীরাহ ইবন শু'বা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদা হাজত পূরণের জন্য গেলেন। সেখান থেকে ফিরে এলে আমি তার নিকট পানি নিয়ে গেলাম। তিনি তা দিয়ে উযু করেন। তার পরিধানে ছিল সিরীয় জোববা। তিনি কুলি করেন, নাকে পানি দেন ও মুখমন্ডল ধৌত করেন। অতঃপর তিনি জামার আস্তিন গুটিয়ে দু'টি হাত বের করতে চাইলেন। কিন্তু আস্তিন দু'টি ছিল খুবই আটসাঁট। তাই তিনি ভেতরের দিক থেকে হাত বের করে উভয় হাত ধুলেন এবং মাথা মসেহ করলেন এবং উভয় মোজার উপর মাস্হ করলেন।

নাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) আবদুর রাহমান ইবন আওফ ও যুবায়র-কে তাদের শরীরে চুলকানি থাকায় রেশমী জামা পরিধান করতে অনুমতি দিয়েছিলেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, আবদুর রহমান ও যুবায়র নবী (ﷺ)-এর নিকট উকুনের অভিযোগ করলে তিনি তাদেরকে রেশমী পোষাক পরার অনুমতি দেন। আনাস বলেন, আমি যুদ্ধে তাদের দেহে তা দেখেছি।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) আবদুর রাহমান ইবন আওফ ও যুবায়র ইবন আওয়ামকে রেশমী পোষাক পরার অনুমতি দেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, শরীরে চুলকানী থাকার কারণে তাদের দু'জনকে (আবদুর রাহমান ও যুবায়রকে) রেশমী পোষাক পরার অনুমতি দিয়েছিলেন বা দেয়া হয়েছিল।

আমর ইবন উমায়্যাহ যামরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে (বকরির) হাত থেকে কেটে কেটে খেতে দেখেছি। অতঃপর তাকে সালাতের জন্য ডাকা হলে তিনি সালাত আদায় করলেন; কিন্তু তিনি উযু করলেন না। আবুল ইয়ামান শুয়াইব সূত্রে যুহরী থেকে অতিরিক্ত বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) ছুরি রেখে দিলেন।

উমাইর ইবন আসওয়াদ আনসী হতে বর্ণিত যে, তিনি উবাদাহ ইবন সামিত-এর নিকট আসলেন। তখন উবাদাহ হিম্স উপকূলে তার একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং তার সঙ্গে ছিলেন উম্মু হারাম। উমাইর বলেন, উম্মু হারাম আমাদের নিকট বর্ণনা করেন, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমার উম্মাতের মধ্যে প্রথম যে দলটি নৌ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবে তারা যেন জান্নাত অবধারিত করে ফেলল। উম্মু হারাম বলেন, আমি কি তাদের মধ্যে হবো? তিনি বললেন, তুমি তাদের মধ্যে হবে। উম্মু হারাম বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, আমার উম্মাতের প্রথম যে দলটি কায়সার-এর রাজধানী আক্রমণ করবে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। অতঃপর আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি তাদের মধ্যে হবো?' নবী (ﷺ) বললেন, 'না।'

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা ইয়াহূদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এমনকি তাদের কেউ যদি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তাহলে পাথরও বলবে, 'হে আল্লাহর বান্দা, আমার পেছনে ইয়াহূদী আছে, তাকে হত্যা কর।'

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত না তোমরা ইয়াহূদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এমনকি কোন ইয়াহূদী পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকলে, পাথর বলবে, 'হে মুসলিম, আমার পেছনে ইয়াহূদী আছে, তাকে হত্যা কর।'

আমর ইবন তাগলিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের আলামতসমূহের একটি এই যে, তোমরা এমন এক জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, যারা পশমের জুতা পরিধান করবে। কিয়ামতের আর একটি আলামত এই যে, তোমরা এমন এক জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ করবে, যাদের মুখমন্ডল হবে চওড়া, তাদের মুখমন্ডল যেন পিটানো চামড়ার ঢাল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ততদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন তোমরা এমন তুর্ক জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ না করবে, যাদের চোখ ছোট, চেহারা লাল, নাক চ্যাপ্টা এবং মুখমন্ডল পেটানো চামড়ার ঢালের মত। আর ততদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না তোমরা এমন এক জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ করবে, যাদের জুতা হবে পশমের।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ করবে যাদের জুতা হবে পশমের। আর কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন জাতির বিপক্ষে যুদ্ধ করবে, যাদের মুখমন্ডল হবে পিটানো চামড়ার ঢালের মত। সুফ্ইয়ান বলেন, আ'রাজ সূত্রে আবূ হুরাইরাহ্ থেকে আবূযযিনাদ এই রেওয়ায়তে অতিরিক্ত বর্ণনা করেন; তাদের চোখ হবে ছোট, নাক হবে চ্যাপ্টা, তাদের চেহারা যেন পিটানো চামড়ার ঢাল।

বারা হতে বর্ণিত। তাকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আবূ উমারা! হুনায়নের দিন আপনারা কি পলায়ন করেছিলেন? তিনি বললেন, না, আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পলায়ন করেননি। বরং তার কিছু সংখ্যক নওজোয়ান সাহাবী হাতিয়ার ছাড়াই অগ্রসর হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বানূ হাওয়াযিন ও বানূ নাসর গোত্রের সুদক্ষ তীরন্দাজদের সম্মুখীন হন। তাদের কোন তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। তারা এদের প্রতি এমনভাবে তীর বর্ষণ করল যে, তাদের কোন তীরই ব্যর্থ হয়নি। সেখান থেকে তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে উপস্থিত হলেন। নবী (ﷺ) তখন তার সাদা খচ্চরটির পিঠে ছিলেন এবং তার চাচাতো ভাই আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব তার লাগাম ধরে ছিলেন। তখন তিনি নামেন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। অতঃপর তিনি বলেন, আমি নবী, এ কথা মিথ্যা নয়। আমি আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। অতঃপর তিনি সাহাবীদের সারিবদ্ধ করেন।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করেন, 'আল্লাহ তাদের (মুশরিকদের) ঘর ও কবর আগুনে পূর্ণ করুন। কেননা তারা মধ্যম সালাত (তথা আসরের সালাত) থেকে আমাদেরকে ব্যস্ত করে রেখেছে, এমনকি সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়।'

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কুনূতে নাযিলায় এই দোয়া করতেন, 'হে আল্লাহ! আপনি সালামাহ ইবন হিশামকে নাজাত দিন। হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদকে নাজাত দিন। হে আল্লাহ! আয়্যাশ ইবন আবী রাবীআ-কে নাজাত দিন। হে আল্লাহ! দুর্বল মুমিনদের নাজাত দিন। হে আল্লাহ! মুযার গোত্রকে সমূলে উৎপাটিত করুন। হে আল্লাহ! কাফিরদের উপর ইউসুফ-এর সময়ের দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষ নাযিল করুন।'

আবদুল্লাহ ইবন আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাবের দিনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বলে মুশরিকদের বিরুদ্ধে দোয়া করেছিলেন যে, হে কিতাব নাযিলকারী, সত্বর হিসাব গ্রহণকারী আল্লাহ! হে আল্লাহ! তাদের সকল দলকে পরাজিত করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাদের পর্যুদস্ত ও প্রকম্পিত করুন।'

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কাবার ছায়ায় সালাত আদায় করছিলেন। তখন আবূ জাহল ও কুরায়েশদের কিছু ব্যক্তি পরামর্শ করে। সেই সময় মক্কার বাইরে একটি উট যব্হ হয়েছিল। কুরায়শরা একজন পাঠিয়ে সেখান থেকে এর ভুঁড়ি নিয়ে এলো এবং তারা নবী (ﷺ)-এর পিঠে ঢেলে দিল। অতঃপর ফাতিমা এসে এটি তার থেকে সরিয়ে দিলেন। এই সময় নবী (ﷺ) তাদের বিরুদ্ধে দোয়া করেন, হে আল্লাহ! আপনি কুরায়শদের ধ্বংস করুন। হে আল্লাহ! আপনি কুরায়শদের ধ্বংস করুন। হে আল্লাহ! আপনি কুরায়শদের ধ্বংস করুন। আবূ জাহ্ল, ইবন হিশাম, উতবা ইবন রবীআহ, শায়বা ইবন রবীআহ', ওয়ালীদ ইবন উতবাহ, উবাই ইবন খাল্ফ এবং উকবাহ ইবন আবী মু'আইত। আবদুল্লাহ বলেন, অতঃপর আমি তাদের সকলকে বাদারের একটি পরিত্যক্ত কূয়ায় নিহত দেখেছি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। একদা কয়েকজন ইয়াহূদী আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আসল এবং বলল, তোমার মরণ হোক। আয়িশাহ তাদের অভিশাপ দিলেন। তাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হলো? আয়িশাহ বললেন, তারা কী বলেছে, আপনি কি তা শুনেননি? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আমি বলেছি, 'তোমাদের উপর', তা কি তুমি শোননি?

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কায়সারের নিকট চিঠি লিখেছিলেন এবং এতে বলেছিলেন, যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে রাখ তাহলে প্রজাদের পাপের বোঝা তোমার উপরেই চাপানো হবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুফাইল ইবন আমর দাওসী ও তার সঙ্গীরা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! দাওস গোত্রের লোকেরা (ইসলাম গ্রহণে) অবাধ্যতা করেছে ও অস্বীকার করেছে। আপনি তাদের বিরুদ্ধে দোয়া করুন।' অতঃপর বলা হলো, দাওস গোত্র ধ্বংস হোক। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি দাওস গোত্রকে হিদায়াত করুন এবং তাদেরকে ইসলামে নিয়ে আসুন।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ) রোম- সম্রাটের প্রতি লেখার ইচ্ছা করেন তখন তাকে বলা হলো যে, তারা সীল মোহরকৃত পত্র ব্যতীত পাঠ করে না। অতঃপর তিনি রূপার একটি মোহর প্রস্তুত করেন। আমি এখনো যেন তার হাতে এর শুভ্রতা দেখছি। তিনি তাতে অংকিত করেছিলেন, "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ"।

আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার পত্রসহ কিসরার নিকট দূত পাঠালেন এবং দূতকে নির্দেশ দেন যে, তা যেন বাহরাইনের শাসনকর্তার কাছে দেয়া হয়। পরে বাহরায়নের শাসনকর্তা তা কিসরার নিকট পৌছিয়ে দেন। কিসরা যখন তা পড়ল তা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলল। আমার মনে হয়, সাঈদ ইবন মুসায়্যাব বলেছেন যে, নবী (ﷺ) তাদের ব্যাপারে দোয়া করেন, যেন তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হয়।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কায়সারকে ইসলামের প্রতি আহবান জানিয়ে চিঠি লেখেন এবং দেহইয়া কালবী-এর মারফত সে চিঠি পাঠান এবং তাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দেন যেন তা বুসরার গভর্নরের নিকট দেয়া হয়, যাতে তিনি তা কায়সারের নিকট পৌছিয়ে দেন। আল্লাহ যখন পারস্যের সৈন্য বাহিনীকে কায়সারের এলাকা থেকে হটিয়ে দেন, তখন আল্লাহর অনুগ্রহের এই শুকরিয়া হিসেবে কায়সার হিমস থেকে পায়ে হেটে বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করেন। এ সময় তার নিকট আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চিঠি এসে পৌছলে তা পাঠ করে তিনি বললেন যে, তার গোত্রের কাউকে খোজ কর যাতে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারি।

ইবন আব্বাস বলেন, আবূ সুফ্ইয়ান আমাকে জানিয়েছেন যে, সে সময় আবূ সুফ্ইয়ান কুরাইশদের কিছু লোকের সঙ্গে বাণিজ্য উপলক্ষে সিরিয়ায় ছিলেন। এ সময়টি ছিল আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও কাফির কুরাইশদের মধ্যে সন্ধির যুগ। আবূ সুফ্ইয়ান বর্ণনা করেন যে, কায়সারের সেই দূতের সঙ্গে সিরিয়ার কোন স্থানে আমাদের দেখা হলে সে আমাকে আমার সঙ্গী-সাথীসহ বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে গেল। অতঃপর আমাদের কায়সারের নিকটে হাজির করা হলো। তখন কায়সার মুকুট পরিহিত অবস্থায় রাজ সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। রোমের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তার পার্শ্বে ছিলেন। অতঃপর তিনি তার দোভাষীকে বললেন, তাদের জিজ্ঞেস কর, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন, এদের মধ্যে তার নিকটাত্মীয় কে? আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমি তার সর্বাধিক নিকটতম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ও তার মধ্যে কি ধরনের আত্মীয়তা রয়েছে? আমি বললাম, তিনি আমার চাচাতো ভাই। সে সময় উক্ত কাফেলায় আমি ব্যতীত 'আব্দ মানাফ গোত্রের আর কেউ ছিল না। কায়সার বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে এস। অতঃপর বাদশাহর নির্দেশে আমার সকল সঙ্গীকে আমার পেছনে কাঁধের নিকট সমবেত করা হল। অতঃপর কায়সার তর্জমাকারীকে বললেন, লোকটির সাথীদের জানিয়ে দাও, আমি তার নিকট সেই ব্যক্তিটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাই, যিনি নবী বলে দাবী করেন। যদি সে মিথ্যা বলে, তবে তোমরা তার প্রতিবাদ করবে। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি এ ব্যাপারে লজ্জাবোধ না করতাম যে, আমার সাথীরা আমাকে মিথ্যাচারী বলে প্রচার করবে, তাহলে তার প্রশ্নের জবাবে নবী সম্পর্কে কিছু (মিথ্যা) কথা বলতাম। কিন্তু আমি লজ্জাবোধ করলাম যে, আমার সঙ্গীরা আমি মিথ্যা বলেছি বলে প্রচার করবে। ফলে আমি সত্যই বললাম। অতঃপর তিনি তার দোভাষীকে বললেন, জিজ্ঞেস করো, তোমাদের মধ্যে নবীর বংশ মর্যাদা কিরূপ? আমি বললাম, আমাদের মধ্যে তিনি উচ্চ বংশীয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার বংশের অন্য কোন ব্যক্তি কি ইতোপূর্বে এরূপ দাবী করেছে? জবাব দিলাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার এ নবুওয়াতের আগে কোন সময় কি তাকে মিথ্যার অভিযোগে তোমরা অভিযুক্ত করেছ? আমি বললাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার পূর্ব পুরুষদের কেউ কি বাদশাহ ছিল? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সবলেরা তার অনুসারী হচ্ছে, না দুর্বল (শ্রেণীর) লোকেরা? আমি বললাম, বরং দুর্বলরাই। তিনি বললেন, এদের সংখ্যা কি বৃদ্ধি পাচ্ছে না কমছে? আমি বললাম, বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বললেন, তার দ্বীনে প্রবেশ করার পর কেউ কি সে দ্বীনের প্রতি অপছন্দ করে তা পরিত্যাগ করেছে? আমি বললাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি কখনো চুক্তি ভঙ্গ করেছেন? আমি বললাম, না। তবে আমরা বর্তমানে তার সঙ্গে একটি চুক্তির মেয়াদে আছি এবং আশঙ্কা করছি যে, তিনি তা ভঙ্গ করতে পারেন। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আমার বক্তব্যে এই কথা ব্যতীত এমন কোন কথা লুকানো সম্ভব হয়নি যাতে রাসূল (ﷺ)-কে খাট করা হয় আর আমার প্রতি অপপ্রচারের আশঙ্কা না হয়। কায়সার জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি তার বিরুদ্ধে এবং তিনি কি তোমাদের বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করেছেন? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, তার ও তোমাদের মধ্যে যুদ্ধে ফলাফল কী? আমি বললাম, যুদ্ধ কূয়ার বালতির মত। কখনো তিনি আমাদের উপর বিজয়ী হন, কখনো আমরা তার উপর বিজয়ী হই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কী বিষয়ে আদেশ করেন? আমি বললাম, তিনি আমাদের আদেশ করেন, একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করতে এবং তার সঙ্গে কিছুই শরীক না করতে। আমাদের পিতৃ পুরুষেরা যে সবের ইবাদাত করত, তিনি সে সবের ইবাদাত করতে আমাদের নিষেধ করেন। আর তিনি আমাদের আদেশ করেন সালাত আদায় করতে; সদাকাহ দিতে, পূত পবিত্র থাকতে, চুক্তি পালন করতে এবং আমানত আদায় করতে। আমি তাকে এসব জানালে তিনি দোভাষীকে আদেশ দিলেন, তাকে বলো, আমি তোমাদের মধ্যে তার বংশ মর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাইলে তুমি বলেছ যে, তিনি উচ্চ বংশীয়। সেরূপই রাসূলগণ তাদের কাওমের উচ্চ বংশেই প্রেরিত হন। আমি তোমাদের নিকট জানতে চেয়েছিলাম যে, তোমাদের কেউ কি এর আগে এ ধরনের দাবী করেছে? তুমি বললে, না। তোমাদের মধ্যে ইতোপূর্বে যদি কোন ব্যক্তি এরূপ কথা বলতে থাকতো, তাহলে আমি বলতাম, ব্যক্তিটি পূর্ব কথিত একটি কথারই অনুসরণ করছে। আমি জানতে চেয়েছি, তার এ (নবুওয়্যাত) দাবীর পূর্বে কি তোমরা তাকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলে? তুমি বলেছ, না। এতে আমি বুঝতে পেরেছি যে, যে ব্যক্তি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বলেননি, তিনি আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবেন, এমন হতে পারে না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তার পূর্বপুরুষদের কেউ কি বাদশাহ ছিলেন? তুমি বলেছ, না। আমি বলছি, যদি তার পিতৃ পুরুষদের কেউ বাদশাহ থাকতো, তাহলে আমি বলতাম, সে পিতৃ পুরুষদের রাজত্ব উদ্ধার করতে ইচ্ছুক। আমি তোমার নিকট জানতে চেয়েছি যে, প্রভাবশালী লোকেরাই তার অনুসরণ করছে, না দুর্বল (শ্রেণীর) লোকেরা? তুমি বলেছ, দুর্বলরাই। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের (দুর্বল) লোকেরাই রাসূলগণের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি তোমার নিকট জানতে চেয়েছি, তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। ঈমান এভাবেই (বাড়তে বাড়তে) পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তার দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা পরিত্যাগ করেছে? তুমি বলেছ, না। ঈমান এরূপই হয়ে থাকে, যখন তা হৃদয়ের গভীরে পৌছে, তখন কেউ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয় না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি যে, তিনি কি চুক্তিভঙ্গ করেন? তুমি বলেছ, না। ঠিকই, রাসূলগণ কখনো চুক্তিভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমরা কি কখনো তার সঙ্গে যুদ্ধ করেছ এবং তিনি কি কখনো তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন? তুমি বলেছ, করেছেন। তোমাদের ও তার মধ্যকার লড়াই কূপের বালতির মতো। কখনো তোমরা তার উপর জয়ী হয়েছ, আবার কখনো তিনি তোমাদের উপর জয়ী হয়েছেন। এভাবেই রাসূলগণ পরীক্ষিত হন এবং পরিণাম তাদেরই অনুকূল হয়। আমি আরো জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তোমাদের কী কী বিষয়ে আদেশ করে থাকেন? তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের আদেশ করেন যেন তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তার সঙ্গে কিছুই শরীক না কর। আর তিনি তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যে সবের ইবাদাত করত তা থেকে নিষেধ করেন আর তোমাদের নির্দেশ দেন, সালাত আদায় করতে, সদাকাহ দিতে, পূত পবিত্র থাকতে, চুক্তি পালন করতে, আমানত আদায় করতে। এসব নবীগণের গুণাবলী। আমি জানতাম, তার আগমন ঘটবে। কিন্তু তিনি তোমাদের মধ্যে আসবেন, সে ধারণা আমার ছিল না। তুমি যা যা বললে, তা যদি সত্য হয়, তবে অচিরেই তিনি আমার এই পায়ের নীচের জায়গার মালিক হয়ে যাবেন। আমি যদি আশা করতে পারতাম যে, তার নিকট পৌছতে পারবো, তবে কষ্ট করে তার সাক্ষাতের চেষ্টা করতাম। যদি আমি তার নিকট থাকতাম, তবে তার দু'টি পা ধুয়ে দিতাম। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, তার পর তিনি তার পত্রখানি চেয়ে নিলেন। তা পাঠ করে শুনানো হলো। তাতে ছিলঃ বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহীম। আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি.....যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। আপনি ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিফল দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে রোমের সমস্ত প্রজার পাপ আপনার উপর বর্তাবে। "হে কিতাবীগণ! এসো এমন একটি কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই, যেন আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারো ইবাদাত না করি, কোন কিছুকে তার শরীক না করি এবং আমাদের কেউ যেন আল্লাহ ব্যতীত কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ না করে। আর যদি তারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তবে বলঃ তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম।"(আল ইমরানঃ ৬৪) আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, তার কথা শেষ হলে তার পার্শ্বের রোমের পদস্থ ব্যক্তিরা চিৎকার করতে লাগল এবং হৈ চৈ করতে লাগল। তারা কী বলছিল তা আমি বুঝতে পারিনি এবং নির্দেশত্রুমে আমাদের বের করে দেয়া হলো। আমি সঙ্গীদের নিয়ে বেরিয়ে এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে, তাদের বললাম, নিশ্চই মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ব্যাপার তো বিরাট আকার ধারণ করেছে। এই যে রোমের বাদশাহ তাকে ভয় করছে। আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আল্লাহর কসম! অতঃপর থেকে আমি অপমানবোধ করতে লাগলাম এবং এ ব্যাপারে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মুহাম্মদের দাওয়াত অচিরেই বিজয় লাভ করবে, এমনকি শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন যদিও আমি অপছন্দ করছিলাম।

সাহল ইবন সা'আদ হতে বর্ণিত যে, তিনি খায়বারের যুদ্ধের সময় নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, আমি এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দিব যার হাতে বিজয় আসবে। অতঃপর কাকে পতাকা দেয়া হবে, সেজন্য সকলেই আশা করতে লাগলেন। পরদিন সকালে প্রত্যেকেই এ আশায় অপেক্ষা করতে লাগলেন যে, হয়ত তাকে পতাকা দেয়া হবে। কিন্তু নবী (ﷺ) বললেন, আলী কোথায়? তাকে জানানো হলো যে, তিনি চোখরোগে আক্রান্ত। তখন তিনি আলীকে ডেকে আনতে বললেন। তাকে ডেকে আনা হল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার মুখের লালা তার উভয় চোখে লাগিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলেন যে, তার যেন কোন অসুখই ছিল না। তখন আলী বললেন, আমি তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না তারা আমাদের মত হয়ে যায়। নবী (ﷺ) বললেন, তুমি সোজা এগিয়ে যাও। তুমি তাদের প্রান্তরে উপস্থিত হলে প্রথমে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান জানাও এবং তাদের কর্তব্য সম্পর্কে তাদের অবহিত কর। আল্লাহর কসম, যদি একটি ব্যক্তিও তোমার দ্বারা হিদায়াত লাভ করে, তবে তা তোমার জন্য লাল রংয়ের উটের চেয়েও উত্তম।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোন কাওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে সকাল না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ করতেন না। আযান শুনলে আক্রমণ থেকে বিরত থাকতেন। আযান না শুনলে সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করতেন। আমরা খায়বারে রাত্রিকালে অবতরণ করলাম।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) যখন আমাদেরকে নিয়ে কোন যুদ্ধে যেতেন .............

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) খায়বারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে রাতে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি জিহাদের উদ্দেশে রাত্রিকালে কোন জনপদে গেলে সকাল না হওয়া পর্যন্ত তাদের উপর আক্রমণ করেন না। যখন সকাল হলো ইয়াহূদীরা কোদাল ও ঝুড়ি নিয়ে বের হল তখন নবী (ﷺ)-কে দেখতে পেয়ে বলে উঠল, মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ তার পুরো সেনাবাহিনী নিয়ে উপস্থিত। নবী (ﷺ) তখন আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করেন এবং বললেন, খায়বার ধ্বংস হল, নিশ্চই আমরা যখন কোন জনপদের আঙ্গিণায় উপস্থিত হই, তখন সতর্ককৃত লোকদের সকাল কত মন্দ!

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বলে আর যে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' বলবে সে তার জান ও মাল আমার হাত থেকে বাচিয়ে নিল। অবশ্য ইসলামের কর্তব্যাদি আলাদা, আর তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত।

আবদুল্লাহ্ ইবন কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি ছিলেন কা'বের পুত্রদের মধ্যে নেতা, তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক থেকে শুনেছি, যখন তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) যখনই কোথাও যুদ্ধে যাবার ইচ্ছা করতেন, তখন তিনি অন্য দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়ে তা গোপন রাখতেন।

কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অধিকাংশ সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোন নির্দিষ্ট জায়গায় যুদ্ধের ইচ্ছা করলে অন্য দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়ে তা গোপন রাখতেন কিন্তু যখন তাবুক যুদ্ধ এল, যে যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রওয়ানা দিলেন, প্রচন্ড গরম এবং সম্মুখীন হলেন দীর্ঘ সফরের ও মরুময় পথের আর অধিক সংখ্যক সৈন্যের মোকাবিলায় অগ্রসর হলেন। তাই তিনি মুসলিমদের সামনে বিষয়টি প্রকাশ করলেন, যাতে তারা শত্রুর মুকাবিলার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে এবং ইচ্ছার লক্ষ্য সবাইকে জানিয়ে দিলেন।

কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখনই কোন সফরে যাবার ইচ্ছা করতেন তখন বৃহস্পতিবারেই যাত্রা করতেন।

কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) তাবুকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবার বের হন আর বৃহস্পতিবার বের হওয়াই তিনি পছন্দ করতেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মদিনা্তে যুহরের সালাত চার রাকআত আদায় করেন এবং যুল-হুলায়ফাতে পৌছে দু'রাকআত আসর সালাত আদায় করেন। আমি তাদের হজ্জ ও উমরাহ উভয়টির তালবিয়া জোরে পাঠ করতে শুনেছি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যুল-কাদার ৫ রাত থাকতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। হজ্জ আদায় ব্যতীত আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। মক্কার নিকটবর্তী হলে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের আদেশ দিলেন যাদের নিকট কুরবানীর জন্তু নেই, তারা বায়তুল্লাহর তাওয়াফ এবং সাফা মারওয়ার সা'ঈ করার পর ইহরাম খুলে ফেলবে। আয়িশাহ বলেন, কুরবানীর দিন আমাদের নিকট গরুর গোশ্ত পৌছানো হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এগুলো কিসের? বলা হলো, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার স্ত্রীদের পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় করেছেন। ইয়াহ্ইয়া বলেন, আমি হাদীসটি কাসেম ইবন মুহাম্মদ-এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম বর্ণনাকারিণী এ হাদীসটি আপনার নিকট সঠিকভাবে বর্ণনা করেছেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রমাযান মাসে সফরে বের হন এবং সিয়াম পালন করেন। যখন তিনি কাদীদ নামক স্থানে পৌছলেন তখন সিয়াম ছেড়ে দেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে এক অভিযানে পাঠালেন। কুরাইশদের দু'জন লোকের নামোল্লেখ করে আমাদেরকে বললেন, তোমরা যদি অমুক ও অমুকের সাক্ষাৎ পাও তবে তাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে ফেলবে। আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, অতঃপর আমরা রওয়ানা করার প্রাক্কালে বিদায় গ্রহণ করার জন্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি বললেন, 'আমি তোমাদেরকে অমুক অমুককে আগুনে জ্বালিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিলাম, কিন্তু আগুনের শাস্তি দান করার অধিকার আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কারো নেই। তাই তোমরা যদি তাদেরকে ধরে ফেলতে সক্ষম হয়, তবে তাদের উভয়কে হত্যা করবে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, 'পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমরা সর্বশেষে আগমনকারী (পৃথিবীতে) সর্বাগ্রে প্রবেশকারী (জান্নাতে)।

আর এ সনদেই (আবূ হুরাইরাহ্ হতে) বর্ণিত হয়েছে যে, (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন,) যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানী করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই নাফরমানী করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানী করল সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানী করল। ইমাম তো ঢাল স্বরূপ। তার নেতৃত্বে যুদ্ধ এবং তারই মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জন করা হয়। অতঃপর যদি সে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার জন্য এর পুরস্কার রয়েছে আর যদি সে এর বিপরীত করে তবে এর মন্দ পরিণাম তার উপরই বর্তাবে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন হুদাইবিয়া সন্ধির পরবর্তী বছর প্রত্যাবর্তন করলাম, তখন আমাদের মধ্য হতে দু'জন লোকও যে বৃক্ষের নীচে আমরা বায়আত করেছিলাম সেটি চিহ্নিত করার ব্যাপারে একমত হতে সক্ষম হয়নি। তা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত স্বরূপ।' বর্ণনাকারী বলেন, 'আমি নাফি -কে জিজ্ঞেস করলাম যে, তাদের নিকট হতে কিসের বায়আত গ্রহণ করা হয়েছিল? তা কি মৃত্যুর উপর?' তিনি বললেন, 'না, বরং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের নিকট হতে দৃঢ় থাকার উপর বায়আত গ্রহণ করেছিলেন।'

আবদুল্লাহ্ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হার্রা নামক যুদ্ধের সময়ে তার নিকট এক ব্যক্তি এসে বললো, 'ইবন হানযালা মানুষের নিকট থেকে মৃত্যুর উপর বায়আত গ্রহণ করছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পর আমি তো কারো নিকট এমন বায়আত করব না।

সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট বায়আত করলাম। অতঃপর আমি একটি বৃক্ষের ছায়ায় গেলাম। মানুষের ভীড় কমে গেলে, (তার নিকট উপস্থিত হলে) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, 'ইবন আকওয়া'! তুমি কি বায়আত করবে না?' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো বায়আত করেছি।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আরেক বার।' তখন আমি দ্বিতীয় বার আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট বায়আত করলাম। (বর্ণনাকারী) বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'হে আবূ মুসলিম! সেদিন তোমরা কোন জিনিসের উপর বায়আত করেছিলে?' তিনি বললেন, 'মৃত্যুর উপর।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণ খন্দকে যুদ্ধের দিন আবৃত্তি করছিলেনঃ 'আমরাই হচ্ছি সে সকল ব্যক্তি, যারা মুহাম্মাদের হাতে জিহাদ করার উপর বায়আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা বেচে থাকব।" আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর উত্তর দিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! পরকালের সুখ হচ্ছে প্রকৃত সুখ; তাই তুমি আনসার ও মুহাজিরদেরকে সম্মানিত কর।

মুজাশি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আমি আমার ভ্রাতুস্পুত্রকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকটে উপস্থিত হলাম। অতঃপর আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে হিজরাতের উপর বায়আত নিন।' তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হিজরত তো হিজরতকারীগণের জন্য অতীত হয়ে গেছে।' আমি বললাম, 'তাহলে আপনি আমাদের কিসের উপর বায়আত নিবেন?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'ইসলাম ও জিহাদের উপর।'

পূর্বের হাদিসের মতই (২৯৬২)।

আবদুল্লাহ্ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'আজ আমার নিকট এক ব্যক্তি আগমন করে। সে আমাকে একটি বিষয়ে প্রশ্ন করে, যার উত্তর কী দিব, তা আমার বুঝে আসছিল না।' লোকটি বললো, 'বলুন তো, এক ব্যক্তি সশস্ত্র অবস্থায় সন্তুষ্টচিত্তে আমাদের আমীরের সঙ্গে যুদ্ধে বের হল। কিন্তু সেই আমীর এমন সব নির্দেশ দেন যা পালন করা সম্ভব নয়। আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! আমি বুঝতে পারছি না যে, তোমাদের এ প্রশ্নের কী উত্তর দিব? হ্যা, তবে এতটুকু বলতে পারি যে, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি সাধারণত আমাদেরকে কোন বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিতেন না। কিন্তু একবার মাত্র এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমরা তা পালন করেছিলাম। আর তোমাদের যে কেউ ততক্ষণ ভাল থাকবে, যতক্ষণ সে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকবে। আর যখন সে কোন বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়বে, তখন সে এমন ব্যক্তির নিকট প্রশ্ন করে নিবে, যে তাকে সন্দেহ মুক্ত করে দিবে। আর সে যুগ অতি নিকটে যে, তোমরা এমন ব্যক্তি পাবে না। শপথ সেই সত্তার যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। দুনিয়ায় যা অবশিষ্ট রয়েছে, তার উপমা এরূপ যেমন একটি পুকুরের মধ্যে পানি জমেছে। এর পরিষ্কার পানি তো পান করা হয়েছে, আর নীচের ঘোলা পানি বাকী রয়ে গেছে।

উমার ইবন উবাইদুল্লাহর আযাদকৃত গোলাম ও তার কাতিব সালিম আবূ নাযর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা তার মনিবের নিকট পত্র লিখেন যা আমি পাঠ করলাম, তাতে ছিল যে, শত্রুদের সঙ্গে কোন এক মুখোমুখী যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন।

অতঃপর তিনি তার সাহাবীদের সামনে দাড়িয়ে ঘোষণা দিলেনঃ হে লোক সকল! শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় অবতীর্ণ হবার কামনা করবে না এবং আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার দোয়া করবে। অতঃপর যখন তোমরা শত্রুর সম্মুখীন হবে তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রাখবে, জান্নাত তরবারীর ছায়ার নীচে অবস্থিত। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! কুরআন নাযিলকারী, মেঘমালা পরিচালনাকারী, সেনাদল পরাভূতকারী, আপনি কাফির সম্প্রদায়কে পরাজিত করুন এবং আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করুন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে এক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করি। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কিছুক্ষণ পরে এসে আমার সঙ্গে মিলিত হন; আমি তখন আমার পানি-সেচের উটনীর উপর আরোহী ছিলাম। উটনী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল; এটি মোটেই চলতে পারছিল না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার উটের কী হয়েছে? আমি বললাম, ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উটনীর পেছন দিক থেকে গিয়ে উটনীটিকে হাকালেন এবং এটির জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর এটি সবক'টি উটের আগে আগে চলতে থাকে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন তোমার উটনীটি কেমন মনে হচ্ছে? আমি বললাম, ভালই। এটি আপনার বরকত লাভ করেছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি কি এটি আমার নিকট বিক্রয় করবে? তিনি বলেন, আমি মনে মনে লজ্জাবোধ করলাম। (কারণ) আমার নিকট এ উটটি ব্যতীত পানি বহনের অন্য কোন উটনী ছিল না। আমি বললাম, হ্যা। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তাহলে আমার নিকট বিক্রয় কর। অনন্তর আমি উটনীটি তার নিকট এ শর্তে বিক্রয় করলাম যে, মদিনায় পৌছা পর্যন্ত এর উপর আরোহণ করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সদ্য বিবাহিত একজন পুরুষ। অতঃপর আমি তার নিকট অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি লোকদের আগে আগে চললাম এবং মদিনায় পৌছে গেলাম। তখন আমার মামা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি আমাকে উটনীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাকে সে বিষয়ে অবহিত করলাম যা আমি করেছিলাম। তিনি আমাকে তিরস্কার করলেন। তিনি (রাবী) বলেন, আর যখন আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট অনুমতি চেয়েছিলাম, তখন তিনি আমাকে প্রশ্ন করছিলেন, তুমি কি কুমারী বিবাহ করেছ, না এমন মহিলাকে বিবাহ করেছ যার পূর্বে বিবাহ হয়েছিল? আমি বললাম, এমন মহিলাকে বিবাহ করেছি যার পূর্বে বিবাহ হয়েছে। তিনি বললেন, তুমি কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তুমি তার সঙ্গে খেলা করতে এবং সেও তোমার সঙ্গে খেলা করত। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা শহীদ হয়েছেন। আমার কয়েকজন ছোট ছোট বোন রয়েছে। তাই আমি তাদের সমান বয়সের কোন মেয়ে বিবাহ করা পছন্দ করিনি; যে তাদেরকে আদব-আখলাক শিক্ষা দিতে পারবে না এবং তাদের দেখাশোনা করতে পারবে না। তাই আমি একজন পূর্ব বিবাহ হয়েছে এমন মহিলাকে বিবাহ করেছি; যাতে সে তাদের দেখাশোনা করতে পারে এবং তাদেরকে আদব-আখলাক শিক্ষা দিতে পারে। তিনি বলেন, যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মদিনায় আসেন, পরদিন আমি তার নিকট উটনীটি নিয়ে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে এর মূল্য দিলেন এবং উটটিও ফেরত দিলেন। মুগীরাহ বলেন, আমাদের বিবেচনায় এটি উত্তম। আমরা এতেকোন কোন দোষ মনে করি না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার মদিনায় ভীতি ছড়িয়ে পড়ল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আবূ ত্বলহা-এর ঘোড়ায় আরোহণ করেন এবং বলেন যে, আমি তো ভয়ের কিছু দেখতে পেলাম না। তবে আমি এ ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত গতিশীল পেয়েছি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় লোকেরা ভীত হয়ে পড়ল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আবূ ত্বলহা-এর ধীরগতি সম্পন্ন একটি ঘোড়ার উপর চড়লেন এবং একাকী ঘোড়াটিকে হাকিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। লোকেরা তখন তার পিছু পিছু ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা ভয় করো না। এ ঘোড়াটি তো দ্রুতগামী। বর্ণনাকারী বলেন, সেদিন হতে আর কখনো সে ঘোড়াটি কারো পেছনে পড়েনি।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাহে একটি অশ্ব আরোহণের জন্য দান করেছিলাম। অতঃপর আমি তা বিক্রয় হতে দেখতে পাই। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি কি সেটা কিনে নিব?' রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, 'না, তুমি তা ক্রয় করো না এবং তোমার সদাকাহ ফেরত নিও না।'

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। উমার ইবন খাত্তাব এক অশ্বারোহীকে আল্লাহর রাহে একটি অশ্ব দান করেন। অতঃপর তিনি দেখতে পান যে, তা বিক্রয় করা হচ্ছে। তখন তিনি তা কিনে নেয়ার ইচ্ছা করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি [রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)] বললেন, 'তুমি ওটা কিনিও না এবং তোমার সদাকাহ ফেরত নিও না।'

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমি যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর মনে না করতাম, তবে আমি কোন সেনা অভিযান থেকে পিছিয়ে থাকতাম না। কিন্তু আমি তো (সকলের জন্য) সাওয়ারী সংগ্রহ করতে পারছি না এবং আমি এতগুলো সাওয়ারী পাচ্ছি না যার উপর আমি তাদের আরোহণ করাতে পারি। আর আমার জন্য এটা কষ্টদায়ক হবে যে, তারা আমার থেকে পেছনে পড়ে থাকবে। আমি তো এটাই কামনা করি যে, আমি আল্লাহর রাহে জিহাদ করব এবং শহীদ হয়ে যাবো, অতঃপর আমাকে আবার জীবিত করা হবে এবং আমি আবার শহীদ হবো। অতঃপর আমাকে আবার জীবিত করা হবে।

ইয়া'লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তাবুক যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে জিহাদে শরীক হই। আমি একটি জওয়ান উট (জিহাদে) আরোহণের জন্য (এক ব্যক্তিকে) দেই। আমার সঙ্গে এটিই ছিল আমার অধিক নির্ভরযোগ্য কাজ। আমি এক ব্যক্তিকে মজুরীর বিনিময়ে নিয়োগ করলাম। তখন সে এক ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়া লেগে যায়, একজন আরেকজনের হাত কামড়ে ধরলে সে তার হাত মুখ হতে সজোরে বের করে আনে। ফলে তার সামনের দাত উপড়ে আসে। উক্ত ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার দাতের কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। আর তিনি বললেন, সে কি তার হাতটিকে তোমার মুখে রেখে দিবে, আর তুমি তাকে উটের মত কামড়াতে থাকবে।

কায়েস ইবন সাদ আনসারী হতে বর্ণিত। আর তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পতাকাবাহী, তিনি হজ্জের সংকল্প করেন, তখন তিনি মাথার চুল আচড়ে নিলেন।

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে আলী আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে পেছনে থেকে যান, (কারণ) তার চোখে অসুখ হয়েছিল। তখন তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে পিছিয়ে থাকব? অতঃপর আলী বেরিয়ে পড়লেন এবং নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে এসে মিলিত হলেন। যখন সে রাত এল, যে রাত শেষে সকালে আলী খায়বার জয় করেছিলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আগাীমকাল আমি এমন এক ব্যক্তিকে পতাকা দিব, কিংবা (বলেন) আগামীকাল এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করবে যাকে আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ) ভালবাসেন। অথবা তিনি বলেছিলেন, যে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)-কে ভালবাসে। আল্লাহ তাআলা তারই হাতে খায়বার বিজয় দান করবেন। হঠাৎ আমরা দেখতে পেলাম যে, আলী এসে হাজির, অথচ আমরা তার আগমন আশা করিনি। তারা বললেন, এই যে আলী চলে এসেছেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে পতাকা প্রদান করলেন। আর আল্লাহ তাআলা তারই হাতে বিজয় দিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি যুবাইর-কে বলেছিলেন, এখানেই কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আপনাকে পতাকা গাড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন?

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, অল্প শব্দে ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার শক্তি সহ আমাকে পাঠানো হয়েছে এবং শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। একবার আমি নিদ্রায় ছিলাম, তখন পৃথিবীর ধনভান্ডার সমূহের চাবি আমার হাতে দেয়া হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তো চলে গেছেন আর তোমরা ওগুলো বাহির করছ।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তাকে আবূ সুফ্ইয়ান জানিয়েছেন, হিরাক্ল আমাকে ডেকে পাঠান। তখন তিনি ইলিয়া নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর সম্রাট আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পত্রখানি আনতে আদেশ করেন যখন পত্র পাঠ সমাপ্ত হল, তখন বেশ হৈ চৈ ও শোরগোল পড়ে গেল। অতঃপর আমাদেরকে বাইরে নিয়ে আসা হল। যখন আমাদেরকে বের করে দেয়া হচ্ছিল তখন আমি আমার সঙ্গীদের উদ্দেশ্য করে বললাম, আবূ কাবশার পুত্রের ব্যাপারটার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেল। রোমের বাদশাহও তাকে ভয় করে।

আসমা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ বাকর-এর গৃহে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সফরের সরঞ্জাম গোছগাছ করে দিয়েছিলাম, যখন তিনি মদিনায় হিজরাত করার সংকল্প করেছিলেন। আসমা বলেন, আমি তখন মালপত্র কিংবা পানির মশক বাধার জন্য কিছুই পাচ্ছিলাম না। তখন আবূ বাকর-কে বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি আমার কোমর-বন্ধ ছাড়া বাধার কিছুই পাচ্ছি না। আবূ বাকর বললেন, একে দু'ভাগ কর। এক খন্ড দ্বারা মশক এবং অপর খন্ড দ্বারা মালপত্র বেধে দাও। আমি তাই করলাম। এজন্যই আমাকে বলা হত দু' কোমর বন্ধের মালিক।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যুগে কুরবানীর গোশত মদিনা্ পর্যন্ত পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করতাম।

সুয়াইদ ইবন নুমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, খায়বার যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে তিনি জিহাদে অংশ গ্রহণ করেন। তারা যখন খায়বারের সন্নিকটে অবস্থিত সাহবা নামক স্থানে পৌছলেন, তারা সেখানে আসরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খাবার নিয়ে আসতে বললেন। তখন নবী (ﷺ)-এর নিকট যবের ছাতু ছাড়া কিছুই নেয়া হয়নি। আমরা তা পানির সঙ্গে মিশিয়ে আহার করলাম ও পান করলাম। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উঠে দাড়ালেন এবং কুলি করলেন, আমরাও কুলি করলাম ও সালাত আদায় করলাম।

সালামাহ (ইবন আকওয়া') হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে লোকদের পাথেয় কমে যায় এবং তারা অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হাযির হয়ে তাদের উট যব্হ করার অনুমতি চাইলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদেরকে অনুমতি দিলেন। সে সময় উমার-এর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হল। তারা তাকে বিষয়টি জানালো। তিনি বললেন, উট যব্হ করে অতঃপর তোমরা কিরূপে টিকে থাকবে? উমার রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ সকল লোক উট যব্হ করে খেয়ে ফেলার পর কিভাবে বাচবে? তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, নিজ নিজ অবশিষ্ট পাথেয় নিয়ে হাজির করার জন্য তাদের মধ্যে ঘোষণা দাও। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খাবারের জন্য বরকতের দোয়া করলেন। অতঃপর তাদেরকে নিজ নিজ পাত্র নিয়ে হাজির হতে বললেন। তারা তাদের পাত্র ভরে নিতে লাগলো, অবশেষে সকলই নিয়ে নিল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই। আর আমি আল্লাহর রাসূল।'

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক জিহাদে বের হলাম এবং আমরা সংখ্যায় তিনশ' ছিলাম। প্রত্যেকে নিজ নিজ পাথেয় নিজেদের কাঁধে বহন করছিলাম। পথে আমাদের পাথেয় নিঃশেষ হয়ে গেল। এমনকি আমরা দৈনিক একটি মাত্র খেজুর খেতে থাকলাম। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আবূ আবদুল্লাহ! একটি মাত্র খেজুর একজন লোকের কী করে যথেষ্ট হত? তিনি বললেন, যখন আমরা তাও হারালাম তখন এর হারানোটা টের পেলাম। অবশেষে আমরা সমুদ্র তীরে এসে উপস্থিত হলাম। হঠাৎ সমুদ্র একটা বিরাট মাছ কূলে নিক্ষেপ করল। আমরা সে মাছটি মজা করে আঠার দিন পর্যন্ত খেলাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাহাবীগণ তো হাজ্জ ও উমরাহর সাওয়াব নিয়ে ফিরছেন, আর আমি তো হাজ্জের বেশি কিছুই করতে পারলাম না।' তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেন, তুমি যাও, আবদুর রহমান তোমাকে তার পেছনে সাওয়ারীতে বসিয়ে নিবে। তিনি আবদুর রহমানকে আদেশ করলেন, তাকে তানয়ীম থেকে উমরাহর ইহরাম করিয়ে আনতে। আর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মক্কায় উচুভূমিতে তার ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকলেন।

আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর সিদ্দীক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)আয়িশাহ-কে আমার পেছনে বসিয়ে তানয়ীম থেকে উমরাহর ইহরাম করিয়ে আনার জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ ত্বলহা-এর পেছনে একই সওয়ারীতে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন লোকেরা হজ্জ ও উমরাহ পালনের জন্য লাববায়ক ধ্বনি তুলছিল।

উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) গাধার পিঠে পালান চাপিয়ে তার উপর চাদর বিছিয়ে তাতে চড়লেন। আর উসামাহ-কে তার পেছনে বসিয়ে নিলেন।

আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন আপন সাওয়ারীর পিঠে নিজের পেছনে উসামাহ ইবন যায়দ-কে বসিয়ে মক্কার উচু ভূমির দিক থেকে আসলেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিলাল এবং চাবি রক্ষণকারী উসমান ইবন ত্বলহা। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মসজিদের পার্শ্বে উটটিকে বসালেন। অতঃপর উসমান -কে কাবা গৃহের চাবি নিয়ে আসতে আদেশ করলেন। কাবা খুলে দেয়া হল এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন উসামাহ, বিলাল ও উসমান। দিনের দীর্ঘ সময় তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। অতঃপর সেখান হতে বেরিয়ে এলেন। এ সময়ে লোকেরা প্রবেশ করার জন্য দৌঁড়িয়ে আসল। সকলের আগে আবদুল্লাহ ইবন উমার ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং বিলাল-কে দরজার পেছনে দাড়ানো দেখতে পেলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোন স্থানে সালাত আদায় করেছিলেন? আবদুল্লাহ বলেন, আমি তাকে একথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কত রাকাত সালাত আদায় করেছিলেন?

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন যে, মানুষের প্রত্যেক জোড়ার প্রতি সদাকাহ রয়েছে, প্রতি দিন যাতে সূর্য উদিত হয় দু'জন লোকের মধ্যে সুবিচার করাও সদাকাহ, কাউকে সাহায্য করে সাওয়ারীতে আরোহণ করিয়ে দেয়া বা তার উপরে তার মালপত্র তুলে দেয়াও সদাকাহ, ভাল কথাও সদাকাহ, সালাত আদায়ের উদ্দেশে পথ চলায় প্রতিটি কদমেও সদাকাহ, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও সদাকাহ।

আবদুল্লাহ্ ইবন উমর হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কুরআন সঙ্গে নিয়ে শত্রু-দেশে সফর করতে নিষেধ করেছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) অতি সকালে খায়বার প্রান্তরে প্রবেশ করেন। সে সময় ইয়াহূদীগণ কাঁধে কোদাল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তারা যখন তাকে দেখতে পেল, তখন বলতে লাগল, মুহাম্মদ সেনাদলসহ আগমন করেছে, মুহাম্মদ সেনাদলসহ আগমন করেছে ফলে তারা দূর্গে ঢুকে পড়ল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উভয় হাত তুলে বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের অঞ্চলে অবতরণ করি, তখন সাবধান করে দেয়া লোকদের সকাল মন্দ হয়। আমরা সেখানে কিছু গাধা পেলাম। অতঃপর আমরা এগুলোর (গোশ্ত) রান্না করলাম। এর মধ্যে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর ঘোষণা দানকারী ঘোষণা দিল, নিশ্চই আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ) তোমাদেরকে গাধার গোশত হতে নিষেধ করেছেন। ডেকগুলো উল্টে দেয়া হল তার সামগ্রীসহ। আলী সুফ্ইয়ান সূত্রে নবী (ﷺ) তার দু'হাত উপরে উঠান বর্ণনায় আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ-এর অনুসরণ করেছেন।

আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন কোন উপত্যকায় আরোহণ করতাম, তখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার বলতাম। আর আমাদের আওয়াজ অতি উচু হয়ে যেত। নবী (ﷺ) আমাদেরকে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা তো বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। বরং তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন, তিনি তো শ্রবণকারী ও নিকটবর্তী।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন কোন উচু স্থানে আরোহণ করতাম, তখন তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করতাম আর যখন কোন উপত্যকায় অবতরণ করতাম, সে সময় সুবহানাল্লাহ্ বলতাম।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন উচুস্থানে আরোহণ করতাম, তখন আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করতাম আর যখন নিম্ন ভূখন্ডে অবতরণ করতাম, সে সময় সুবহানাল্লাহ্ বলতাম।

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন হজ্জ কিংবা উমরাহ থেকে ফিরতেন, বর্ণনাকারী বলেন, আমি জানি না, নাকি এরূপ বলেছেন যে, যখন জিহাদ থেকে ফিরতেন, তখন তিনি ঘাঁটি অথবা প্রস্তরময় ভূমিতে পৌছে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন। অতঃপর এ দোয়া পাঠ করতেন, "আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই; তিনি এক, তার কোন শরীক নেই, কর্তৃত্ব তারই এবং প্রশংসা তারই; তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। আমরা সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী, গুনাহ থেকে তাওবাকারী, ইবাদাতকারী, সিজদাকারী, আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাআলা তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন, তার বান্দাহকে সাহায্য করেছেন, কাফির সৈন্যদলকে তিনি একাই পরাস্ত করেছেন।" সালেহ বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আবদুল্লাহ কি ইনশাআল্লাহ বলেননি? তিনি বললেন, না।

আবূ ইসমাঈল আসসাকসাকী বলেন, আবূ বুরদাহ্-কে বলতে শুনেছি, তিনি এবং ইয়াযিদ ইবন আবূ কাবশা সফরে ছিলেন। আর ইয়াযিদ মুসাফির অবস্থায় রোযা রাখতেন। আবূ বুরদাহ তাকে বললেন, আমি আবূ মূসা (আশআরী)-কে একাধিকবার বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যখন বান্দা পীড়িত হয় কিংবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য তা-ই লেখা হয়, যা সে আবাসে সুস্থ অবস্থায় আমল করত।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খন্দকের যুদ্ধের দিন লোকদেরকে ডাক দিলেন। যুবাইর সে ডাকে সাড়া দিলেন, পুনরায় তিনি লোকদেরকে ডাক দিলেন, আবারও যুবাইর সে ডাকে সাড়া দিলেন। পুনরায় তিনি লোকদেরকে ডাকলেন, এবারও যুবাইর সে ডাকে সাড়া দিলেন। নবী (ﷺ) বললেন, 'প্রত্যেক নবীর জন্য একজন বিশেষ সাহায্যকারী থাকে আর আমার বিশেষ সাহায্যকারী হচ্ছে যুবাইর।' সুফ্ইয়ান বলেন, হাওয়ারী সাহায্যকারীকে বলা হয়।

ইবন উমার সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যদি লোকেরা একা সফরে কী ক্ষতি আছে তা জানত, যা আমি জানি, তবে কোন আরোহী রাতে একাকী সফর করত না।

হিশাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, উসামাহ ইবন যায়দ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, বিদায় হজ্জে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কেমন গতিতে পথ চলেছিলেন। রাবী ইয়াহয়া বলতেন, উরওয়াহ বলেন, "আমি শুনতেছিলাম, তবে আমার বর্ণনায় তা ছুটে গেছে। উসামাহ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সহজ দ্রুতগতিতে চলতেন আর যখন প্রশস্ত ফাকা জায়গা পেতেন, তখন দ্রুত চলতেন। নাস হচ্ছে সহজ গতির চেয়ে দ্রুততর চলা।

আসলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মক্কার পথে আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর সঙ্গে ছিলাম। পথে তার নিকট সাফিয়্যাহ বিনতু আবূ উবাইদ-এর ভীষণ অসুস্থতার সংবাদ পৌছে। তখন তিনি দ্রতগতিতে চলতে থাকেন। এমনকি যখন সূর্যাস্তের পরে লালিমা কেটে গেল, তখন তিনি উট থেকে নেমে মাগরিব ও এশার সালাত একত্রে আদায় করেন। আর আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে দেখেছি, যখন তার দ্রুত গতিতে চলার প্রয়োজন দেখা দিত, তখন তিনি মাগরিবকে বিলম্বিত করে মাগরিব ও এশার উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, সফর আযাবের একটি অংশ। যা তোমাদেরকে নিদ্রা, আহার ও পান থেকে বিরত রাখে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন নিজের কাজ সেরে তার পরিজনের নিকট দ্রুত চলে আসে।

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, উমার ইবন খাত্তাব আল্লাহর রাহে আরোহণের জন্য একটি ঘোড়া দান করেন। অতঃপর তিনি সে ঘোড়াটিকে বিক্রি হতে দেখতে পান। তিনি তা কিনে নিতে ইচ্ছা করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি ওটা কিনিও না এবং তোমার দেয়া সদাকাহ ফেরত নিও না।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাহে একটি ঘোড়া দান করি। সে ওটা বিক্রি করতে চেয়েছিল কিংবা যার নিকট সেটা ছিল সে তাকে বিনষ্ট করার উপক্রম করেছিল। আমি ঘোড়াটি কেনার ইচ্ছা করলাম। আর আমি ধারণা করেছিলাম যে, সে তাকে সস্তায় বিক্রি করে দিবে। আমি এ বিষয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, তুমি ওটা ক্রয় কর না, যদিও তা একটি মাত্র দিরহামের বিনিময়ে হয়। কেননা সদাকাহ করার পর ফেরত গ্রহণকারী এমন কুকুরের মত, যে বমি করে আবার তা ভক্ষণ করে।

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে জিহাদে যাবার অনুমতি প্রার্থনা করল। তখন তিনি বললেন, তোমার পিতামাতা জীবিত আছেন কি? সে বলল, হ্যা। নবী (ﷺ) বললেন, 'তবে তাদের খিদমতের চেষ্টা কর।'

আবূ বাশীর আল-আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। (রাবী) আবদুল্লাহ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একজন সংবাদ বহনকারীকে পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়।

ইবন আব্বাস সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন পুরুষ যেন অপর মহিলার সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে, কোন স্ত্রীলোক যেন কোন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে। এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক যুদ্ধের জন্য আমার নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রী হাজ্জযাত্রী। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তবে যাও তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হাজ্জ কর।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে এবং যুবায়র ও মিকদাদ ইবন আসওয়াদ-কে পাঠিয়ে বললেন, 'তোমরা খাখ্ বাগানে যাও। সেখানে তোমরা এক মহিলাকে দেখতে পাবে। তার নিকট একটি পত্র আছে, তোমরা তার কাছ থেকে তা নিয়ে আসবে।' তখন আমরা রওনা দিলাম। আমাদের ঘোড়া আমাদের নিয়ে দ্রুত বেগে চলছিল। অবশেষে আমরা উক্ত খাখ্ নামক বাগানে পৌছে গেলাম এবং সেখানে আমরা মহিলাটিকে দেখতে পেলাম। আমরা বললাম, 'পত্র বাহির কর।' সে বলল, 'আমার নিকট তো কোন পত্র নেই।' আমরা বললাম, 'তুমি অবশ্যই পত্র বের করে দিবে, নচেৎ তোমার কাপড় খুলতে হবে।' তখন সে তার চুলের খোপা থেকে পত্রটি বের করে দিল। আমরা তখন সে পত্রটি নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হাজির হলাম। দেখা গেল, তা হাতিব ইবন বালতাআ-এর পক্ষ থেকে মক্কার কয়েকজন মুশরিকের প্রতি লেখা হয়েছে। যাতে তাদেরকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কোন পদক্ষেপ সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হে হাতিব! একি ব্যাপার?' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যাপারে কোন তড়িত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। আসলে আমি কুরাইশ বংশোদ্ভূত নই। তবে তাদের সঙ্গে মিশে ছিলাম। আর যারা আপনার সঙ্গে মুহাজিরগণ রয়েছেন, তাদের সকলেরই মক্কাবাসীদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। যার কারণে তাদের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ নিরাপদ। তাই আমি চেয়েছি, যেহেতু আমার বংশগতভাবে এ সম্পর্ক নেই, কাজেই আমি তাদের প্রতি এমন কিছু অনুগ্রহ দেখাই, যদ্দবারা অন্তত তারা আমার আপন জনদের রক্ষা করবে। আর আমি তা কুফরী কিংবা মুরতাদ হবার উদ্দেশ্যে করিনি এবং কুফরীর প্রতি আকৃষ্ট হবার কারণেও নয়।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'হাতিব তোমাদের নিকট সত্য কথা বলছে।' তখন উমার বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেই।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'সে বাদার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তোমার হয়ত জানা নেই, আল্লাহ তাআলা বাদার যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের ব্যাপারে অবহিত আছেন। তাই তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা আমল কর। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন বাদার যুদ্ধের দিন কাফির বন্দীদেরকে হাযির করা হল এবং আব্বাস-কেও আনা হল তখন তার শরীরে পোশাক ছিল না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার শরীরের জন্য উপযোগী জামা খুজতে গিয়ে দেখতে পেলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর জামা তার গায়ের উপযুক্ত। নবী (ﷺ) সে জামাটি তাকেই পরিয়ে দিলেন। এ কারণেই নবী (ﷺ) নিজের জামা খুলে আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে (মৃত্যুর পর) পরিয়ে দিয়েছিলেন। ইবন 'উয়াইনাহ্ বলেন, নবী (ﷺ)-এর প্রতি আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর এটি সৌজন্য ছিল, তাই তিনি তার প্রতিদান দিতে চেয়েছিলেন।

সাহল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খায়বার যুদ্ধের দিন বলেন, আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দিব, যার হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দিবেন। সে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)-কে ভালবাসে, আর আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)ও তাকে ভালবাসেন। লোকেরা সারা রাত কাটিয়ে দেয় যে, কাকে এ পতাকা দেয়া হয়? আর পরদিন সকালে প্রত্যেকেই সেটা পাবার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আলী কোথায়? বলা হল, তার চোখে অসুখ। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার চোখে আপন মুখের লালা লাগিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। তাতে তিনি আরোগ্য লাভ করলেন। যেন তার চোখে কোন অসুবিধাই ছিল না। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার হাতে পতাকা দিলেন। আলী জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাদের সঙ্গে ততক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাব যতক্ষণ না তারা আমাদের মত হয়ে যায়। তিনি (রাসূলুল্লাহ) বললেন, 'তুমি স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে গিয়ে তাদের আঙিণায় অবতরণ কর। অতঃপর তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান কর এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর তাদের জন্য যা আবশ্যকীয় তা তাদেরকে জানিয়ে দাও। আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তাআলা যদি তোমার মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে হিদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য রক্তিম বর্ণের উট পাওয়ার চেয়ে উত্তম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা সে সকল লোকের উপর সন্তুষ্ট হন, যারা শৃঙ্খলিত অবস্থায় জান্নাতে দাখিল হবে।

আবূ বুরদাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, তিন প্রকার লোককে দ্বিগুণ নেকী দান করা হবে। যে ব্যক্তির একটি বাদী আছে, সে তাকে শিক্ষা দান করে, উত্তমরূপে শিক্ষা দান করে, আদব শিক্ষা দেয় এবং তাকে উত্তমরূপে শিষ্টাচার শিক্ষা দান করে। অতঃপর তাকে আযাদ করে দিয়ে তাকে বিবাহ করে। সে ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ নেকী রয়েছে। আর আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মুমিন ব্যক্তি যে তার নবীর প্রতি ঈমান এনেছিল। অতঃপর নবী (ﷺ)-এর প্রতি ঈমান এনেছে। তার জন্য দ্বিগুণ নেকী রয়েছে। আর যে গোলাম আল্লাহর হক যথাযথভাবে আদায় করে এবং নিজ মনিবের দেয়া দায়িত্বও সঠিকরূপে পালন করে, (তার জন্যও দ্বিগুণ নেকী রয়েছে)।

সা'ব ইবন জাসসামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আবওয়া অথবা ওয়াদ্দান নামক স্থানে আমার কাছ দিয়ে অতিক্রম করেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, যে সকল মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ হচ্ছে, যদি রাত্রিকালীন আক্রমণে তাদের মহিলা ও শিশুরা নিহত হয়, তবে কী হবে? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, তারাও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আর আমি তাকে আরো বলতে শুনেছি যে, সংরক্ষিত চারণভূমি আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ) ছাড়া অন্য কারো জন্য হতে পারে না।

স'আব হতে মুশরিকদের সন্তান সম্পর্কে বর্ণিত আমর ইবন শিহাবের সূত্রে নবী হতে বর্ণনা করেছেন। . . . . . . . স'আব বলেন, তারা তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আমর একথা বলেননি যে, তারা তাদের পিতামাতাদের অর্ন্তভূক্ত।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর এক যুদ্ধে এক নারীকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নারী ও শিশুদের হত্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কোন এক যুদ্ধে জনৈকা মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মহিলা ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে এক অভিযানে প্রেরণ করেন এবং বলেন, 'তোমরা যদি অমুক ও অমুক ব্যক্তিকে পাও, তবে তাদের উভয়কে আগুনে জ্বালিয়ে ফেলবে।' অতঃপর আমরা যখন বের হতে চাইলাম, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া কেউ আগুন দিয়ে শাস্তি দিতে পারবে না। কাজেই তোমরা যদি তাদের উভয়কে পাও, তবে তাদেরকে হত্যা কর।'

ইকরামাহ হতে বর্ণিত। আলী এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস-এর নিকট পৌছলে তিনি বলেন, 'যদি আমি হতাম, তবে আমি তাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না। কেননা, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমরা আল্লাহর আযাব দ্বারা কাউকে আযাব দিবে না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন, যে লোক তার দ্বীন বদলে ফেলে, তাকে হত্যা করে ফেল।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, 'উক্ল নামক গোত্রের আট ব্যক্তির একটি দল নবী (ﷺ)-এর নিকট এল। মদিনার আবহাওয়া তারা উপযোগী মনে করেনি। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য দুগ্ধবতী উটনীর ব্যবস্থা করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা বরং সদাকাহর উটের পালের নিকট যাও। তারা সেখানে গিয়ে সেগুলোর পেশাব ও দুধ পান করে সুস্থ এবং মোটাতাজা হয়ে গেল। অতঃপর তারা উটের রাখালকে হত্যা করে উটের পাল হাকিয়ে নিয়ে গেল এবং মুসলিম হবার পর তারা মুরতাদ হয়ে গেল। তখন এক সংবাদ দাতা নবী (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হল। নবী (ﷺ) ঘোড়-সওয়ারদেরকে তাদের সন্ধানে পাঠালেন। তখন পর্যন্ত দিনের আলো প্রকাশ পায়নি 'সে সময় তাদেরকে নিয়ে আসা হল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের হাত পা কেটে ফেললেন। অতঃপর তার নির্দেশে লৌহ শলাকা গরম করে তাদের চোখে ঢুকানো হয় এবং তাদেরকে উত্তপ্ত ভূমিতে ফেলে রাখা হয়। তারা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। অবশেষে তাদের মৃত্যু ঘটে। আবূ কিলাবা বলেন, তারা হত্যা করেছে, চুরি করেছে, আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, কোন একজন নবীকে একটি পিপীলিকা কামড় দেয়। তিনি পিপীলিকার সমগ্র আবাসটি জ্বালিয়ে দেয়ার আদেশ করেন এবং তা জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ করেন, তোমাকে একটি পিপীলিকা কামড় দিয়েছে আর তুমি আল্লাহর তাসবীহকারী একটি জাতিকে জ্বালিয়ে দিয়েছ।

জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি কি আমাকে যুলখালাসার ব্যাপারে শান্তি দিবে না? খাশ'আম গোত্রের একটি মূর্তি ঘর ছিল। যাকে ইয়ামানের কাবা নামে আখ্যায়িত করা হত। জারীর বলেন, তখন আমি আহমাসের দেড়শ' অশ্বারোহীকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা করলাম। তারা সূদক্ষ অশ্বারোহী ছিল। জারীর বলেন, আর আমি অশ্বের উপর স্থির থাকতে পারতাম না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার বুকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, আমি আমার বুকে তার অঙ্গুলির চিহ্ন দেখতে পেলাম এবং তিনি আমার জন্য এ দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখুন এবং হিদায়াত প্রাপ্ত, পথ প্রদর্শনকারী করুন।' অতঃপর জারীর সেখানে যান এবং যুলখালাসা মন্দির ভেঙ্গে ফেলেন ও জ্বালিয়ে দেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে এ খবর দেখার জন্য এক ব্যক্তিকে তার নিকট প্রেরণ করেন। তখন জারীর-এর দূত বলতে লাগল, কসম সে মহান আল্লাহ তাআলার! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আপনার নিকট তখনই এসেছি যখন যুলখালাসাকে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। যুলখালাসার মন্দিরটি যে পাচড়া যুক্ত উটের মত। জারীর বলেন, অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আহমাসের অশ্ব ও অশ্বারোহীদের জন্য পাচবার বরকতের দোয়া করেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বনী নাযীরের খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন।

বারআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আনসারদের একটি দল আবূ রাফি' ইয়াহূদীকে হত্যা করার জন্য প্রেরণ করেন। তাদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে গিয়ে ইয়াহূদীদের দূর্গে প্রবেশ করল। তিনি বলেন, অতঃপর আমি তাদের পশুর আস্তাবলে প্রবেশ করলাম। অতঃপর তারা দূর্গের দরজা বন্ধ করে দিল। তারা তাদের একটি গাধা হারিয়ে ফেলেছিল এবং তার খোজে তারা বেরিয়ে পড়ে। আমিও তাদের সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম। তাদেরকে আমি জানাতে চেয়েছিলাম যে, আমি তাদের সঙ্গে গাধার খোজ করছি। অবশেষে তারা গাধাটি পেল। তখন তারা দূর্গে প্রবেশ করে এবং আমিও প্রবেশ করলাম। রাতে তারা দুর্গের দরজা বন্ধ করে দিল। আর তারা চাবিগুলো একটি কুলুঙ্গীর মধ্যে রাখল। আমি তা দেখতে পেলাম। যখন তারা ঘুমিয়ে পড়ল, আমি চাবিগুলো নিয়ে নিলাম এবং দূর্গের দরজা খুললাম। অতঃপর আমি আবূ রাফি'র নিকট পৌছলাম এবং বললাম, হে আবূ রাফে! সে আমার ডাকে সাড়া দিল। তখন আমি আওয়াজের প্রতি লক্ষ্য করে তরবারীর আঘাত হানলাম, অমনি সে চিৎকার দিয়ে উঠল। আমি বেরিয়ে এলাম। আমি আবার প্রবেশ করলাম, যেন আমি তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছি। আর আমি আমার গলার স্বর পরিবর্তন করে বললাম, হে আবূ রাফি'! সে বলল, তোমার কী হল, তোমার মা ধ্বংস হোক। আমি বললাম, তোমার কী অবস্থা? সে বলল, আমি জানি না, কে বা কারা আমার এখানে এসেছিল এবং আমাকে আঘাত করেছে। রাবী বলেন, অতঃপর আমি আমার তরবারী তার পেটের উপর রেখে সব শক্তি দিয়ে চেপে ধরলাম, ফলে তার হাড় পর্যন্ত ঠেকার আওয়াজ হল। অতঃপর আমি ভীত-শংকিত অবস্থায় বের হয়ে এলাম। আমি অবতরণের উদ্দেশ্যে তাদের সিড়ির নিকট এলাম। যখন আমি পড়ে গেলাম, তখন এতে আমার পায়ে আঘাত লাগল। আমি আমার সাথীদের সঙ্গে এসে মিলিত হলাম। আমি তাদেরকে বললাম, আমি এখান হতে ততক্ষণ পর্যন্ত যাব না, যতক্ষণ না আমি মৃত্যুর সংবাদ প্রচারকারিণীর আওয়াজ শুনতে পাই। হিজাযবাসী বণিক আবূ রাফি'র মৃত্যুর ঘোষণা না শোনা পর্যন্ত আমি সে স্থান ত্যাগ করলাম না। তিনি বললেন, তখন আমি দাড়িয়ে গেলাম এবং আমার তখন কোন ব্যথাই ছিল না। অবশেষে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট পৌছে তাকে খবর জানালাম।

বারআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আনসারীদের একদলকে আবূ রাফি' ইয়াহূদীর নিকট প্রেরণ করেন। তখন আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক রাত্রিকালে তার ঘরে ঢুকে তাকে হত্যা করে যখন সে ঘুমিয়ে ছিল।

উমার ইবন উবাইদুল্লাহর আযাদকৃত গোলাম আবুন নাযার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার ইবন উবাইদুল্লাহর লেখক ছিলাম। তিনি বলেন, তার নিকট আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফাহ একখানি পত্র লিখেন, যখন তিনি হারুরিয়ার দিকে অভিযানে বের হন। আমি পত্রটি পাঠ করলাম তাতে লেখা ছিল যে, শত্রুর সঙ্গে কোন এক মুখোমুখী যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সূর্য ঢলে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করলেন। অতঃপর তিনি তার সাহাবীদের সম্মুখে দাড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, 'হে লোক সকল! তোমরা শত্রুর সঙ্গে মুকাবিলা করার কামনা করবে না এবং আল্লাহ তাআলার নিকট নিরাপত্তার দোয়া করবে। অতঃপর যখন তোমরা শত্রুর সামনা-সামনি হবে তখন তোমরা ধৈর্যধারণ করবে। জেনে রাখবে, জান্নাত তরবারির ছায়ায় অবস্থিত।' অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করলেন, 'হে আল্লাহ! কুরআন অবতীর্ণকারী, মেঘমালা চালনাকারী, সৈন্য দলকে পরাভূতকারী, আপনি কাফিরদেরকে পরাস্ত করুন এবং আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করুন।'

মূসা ইবন উকবাহ বলেন, সালিম আবুন নযর আমাকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি উমার ইবন উবাইদুল্লাহর লেখক ছিলাম। তখন তার নিকট আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফাহ-এর একখানা পত্র পৌছল এ মর্মে যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা শত্রুর মুখোমুখী হওয়ার কামনা করবে না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, তোমরা শত্রুর মুখোমুখী হবার ব্যাপারে ইচ্ছা পোষণ করবে না। আর যখন তোমরা তাদের মুখোমুখী হবে তখন ধৈর্য অবলম্বন করবে।

আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিসরা ধ্বংস হবে, অতঃপর আর কিসরা হবে না। আর কায়সার অবশ্যই ধ্বংস হবে, অতঃপর আর কায়সার হবে না এবং এটা নিশ্চিত যে, তাদের ধনভান্ডার আল্লাহর পথে বণ্টিত হবে।

আর তিনি যুদ্ধকে কৌশল নামে অভিহিত করেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যুদ্ধকে কৌশল নামে অভিহিত করেছেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, 'যুদ্ধ হচ্ছে কৌশল।'

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একবার বললেন, 'কে আছ যে কা'ব ইবন আশরাফ-এর (হত্যার) দায়িত্ব নিবে? কেননা সে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)-কে কষ্ট দিয়েছে।' মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, 'হ্যা।' বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ কা'ব ইবন আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, 'এ ব্যক্তি নবী (ﷺ) আমাদের কষ্টে ফেলেছে এবং আমাদের নিকট হতে সদাকাহ চাচ্ছে।' রাবী বলেন, তখন কা'ব বলল, 'এখনই আর কী হয়েছে?' তোমরা তো তার থেকে আরো পেরেশান হয়ে পড়বে।' মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আমরা তার অনুগত হয়েছি, এখন তার শেষ ফল না দেখা পর্যন্ত তাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা পছন্দ করি না।' রাবী বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ এভাবে তার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত কথা বলতে থাকেন, অতঃপর তাকে হত্যা করে ফেলেন।

জাবির সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, 'কা'ব ইবন আশরাফকে হত্যা করার দায়িত্ব কে নিবে?' তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, 'আপনি কি পছন্দ করেন যে, আমি তাকে হত্যা করি?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হ্যা। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, 'তবে আমাকে অনুমতি দিন, আমি যেন তাকে কিছু বলি।' তিনি বললেন, 'আমি অনুমতি দিলাম।'

আবদুল্লাহ্ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উবাই ইবন কা'ব-কে সঙ্গে নিয়ে ইবন সাইয়াদের নিকট গমন করেন। তখন লোকেরা বলল, সে খেজুর বাগানে আছে। যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার নিকট খেজুর বাগানে পৌছলেন, তখন তিনি নিজেকে খেজুর গাছের শাখার আড়াল করতে লাগলেন। ইবন সাইয়াদ তখন তার চাদর জড়িয়ে গুণগুণ করছিল। তখন ইবন সাইয়াদের মা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে দেখে বলে উঠল, হে সাফ! (ইবন সাইয়াদের ডাক নাম) এই যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)। তখন ইবন সাইয়াদ লাফিয়ে উঠল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, যদি এ নারী তাকে তার নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিত, তবে আসল ব্যাপার প্রকাশিত হয়ে পড়ত।

বারা ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে খন্দক যুদ্ধের দিন দেখেছি, তিনি নিজে মাটি বহন করেছেন। এমনকি তার সম্পূর্ণ বক্ষের কেশরাজিকে মাটি ঢেকে ফেলেছে আর তার শরীরে অনেক পশম ছিল। তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রচিত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেনঃ ওগো আল্লাহ তুমি না চাইলে আমরা হিদায়াত পেতাম না। আর আমরা সদাকাহ করতাম না এবং সালাত আদায় করতাম না। তুমি আমাদের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ কর। এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদেরকে সুদৃঢ় রাখ। শত্রুরা আমাদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। তারা ফিতনা সৃষ্টির ইচ্ছে করলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি।" আর তিনি এ কবিতাগুলো আবৃত্তি কালে স্বর উচ্চ করেছিলেন।

জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে তার নিকট প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন তখন তিনি মুচকি হাসতেন।

আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আমার অসুবিধার কথা জানালাম যে, আমি অশ্ব পৃষ্ঠে স্থির থাকতে পারি না। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার বক্ষে হাত দিয়ে আঘাত করলেন এবং এ দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ! তাকে স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়াতকারী ও হিদায়তপ্রাপ্ত করুন।'

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তাকে লোকেরা জিজ্ঞেস করেছিল যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যখম কিভাবে চিকিৎসা করা হয়েছিল? তখন সাহল বলেন, এখন আর এ ব্যাপারে আমার চেয়ে অধিক জানা কেউ অবশিষ্ট নেই। আলী তার ঢালে করে পানি বহন করে নিয়ে আনছিলেন, আর ফাতিমা তার মুখমন্ডল হতে রক্ত ধুয়ে দিচ্ছিলেন এবং একটি চাটাই নিয়ে পোড়ানো হয় আর তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যখমের মধ্যে পুরে দেয়া হয়।

আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মুআয ও আবূ মূসা-কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন ও আদেশ দেন যে, 'লোকদের প্রতি কোমলতা করবে, কঠোরতা করবে না, তাদের সুখবর দিবে, ঘৃণা সৃষ্টি করবে না। পরস্পর একমত হবে, মতভেদ করবে না।'

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উহুদের দিন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর-কে পঞ্চাশ জন পদাতিক যোদ্ধার উপর আমীর নিয়োগ করেন এবং বলেন, তোমরা যদি দেখ যে, আমাদেরকে পাখীরা ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে, তথাপি তোমরা আমার পক্ষ হতে সংবাদ পাওয়া ছাড়া স্বস্থান ত্যাগ করবে না। আর যদি তোমরা দেখ যে, আমরা শত্রু দলকে পরাস্ত করেছি এবং আমরা তাদেরকে পদদলিত করেছি, তখনও আমার পক্ষ হতে সংবাদ প্রেরণ করা ব্যতীত স্ব-স্থান ত্যাগ করবে না। অতঃপর মুসলিমগণ কাফিরদেরকে যুদ্ধে পরাস্ত করে দিল। বারাআ বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি মুশরিকদের নারীদেরকে দেখতে পেলাম তারা নিজ বস্ত্র উপরে উঠিয়ে পলায়ন করছে। যাতে পায়ের অলঙ্কার ও পায়ের নলা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছে। তখন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর-এর সহযোগীরা বলতে লাগলেন, 'লোক সকল! এখন তোমরা গনীমতের মাল সংগ্রহ কর। তোমাদের সাথীরা বিজয় লাভ করেছে। আর অপেক্ষা কেন?' তখন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর বললেন, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাদেরকে যা বলেছিলেন, তা তোমরা ভুলে গিয়েছো?' তারা বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমরা লোকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে গানীমাতের মাল সংগ্রহে যোগ দিব।' অতঃপর যখন তারা স্বস্থান ত্যাগ করে নিজেদের লোকজনের নিকট পৌছল, তখন তাদের মুখ ফিরিয়ে দেয়া হয় আর তারা পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে থাকেন। এটা সে সময় যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদেরকে পেছন থেকে ডাকছিলেন। তখন নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বার জন লোক ব্যতীত অপর কেউই বাকী ছিল না। কাফিররা এ সুযোগে মুসলিমদের সত্তর ব্যক্তিকে শহীদ করে ফেলে। এর পূর্বে বাদার যুদ্ধে নবী (ﷺ)-ও তার সাথীগণ মুশরিকদের সত্তরজনকে বন্দী ও সত্তরজনকে নিহত করেন। এ সময় আবূ সুফ্ইয়ান তিনবার আওয়াজ দিল, 'লোকদের মধ্যে কি মুহাম্মাদ জীবিত আছে?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উত্তর দিতে নিষেধ করেন। পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল- 'লোকদের মধ্যে কি আবূ কুহাফার পুত্র জীবিত আছে?' পুনরায় তিনবার আওয়াজ দিল, 'লোকদের মধ্যে কি খাত্তাবের পুত্র জীবিত আছে?' অতঃপর সে নিজ লোকদের নিকট গিয়ে বলল, 'এরা সবাই নিহত হয়েছে।' এ সময় উমার ধৈর্যধারণ করতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন, 'ওরে আল্লাহর শত্রু! আল্লাহর শপথ, তুই মিথ্যা বলছিস। যাদের তুমি নাম উচ্চারণ করছিস তারা সবাই জীবিত আছেন। তোদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।' আবূ সুফ্ইয়ান বলল, 'আজ বাদারের দিনের প্রতিশোধ। যুদ্ধ তো বালতির মত। তোমরা তোমাদের লোকদের মধ্যে নাক-কান কাটা দেখবে, আমি এর আদেশ দেইনি কিন্তু তা আমি পছন্দও করিনি।' অতঃপর বলতে লাগল, 'হে হুবাল! তোমার মাথা উচু হোক। হে হুবাল! তোমার মাথা উচু হোক।' তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তোমরা এর উত্তর দিবে না?' তারা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী বলব?' তিনি বললেন, 'তোমরা বল, আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে মর্যাদাবান, তিনিই মহা মহিমান্বিত।' আবূ সুফ্ইয়ান বলল, আমাদের জন্য উয্যা রয়েছে, তোমাদের উয্যা নেই।' নবী (ﷺ) বললেন, 'তোমরা কি তার উত্তর দিবে না?' বারাআ বলেন, 'সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী বলব?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তোমরা বল, আল্লাহ আমাদের সহায়তাকারী বন্ধু, তোমাদের কোন সহায়তাকারী বন্ধু নেই।'

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে দানশীল ও সবচেয়ে শৌর্য-বীর্যের অধিকারী ছিলেন। আনাস বলেন, একবার এমন হয়েছিল যে, মদিনা্বাসী রাতের বেলায় একটি আওয়াজ শুনে ভীত-শংকিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, তখন নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহা-এর গদীবিহীন ঘোড়ায় আরোহণ করে তরবারী ঝুলিয়ে তাদের সামনে এলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তোমরা ভয় করো না, তোমরা ভয় করো না।' অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আমি এ ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মত দ্রুতগামী পেয়েছি।'

সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি গাবাহ্ নামক স্থানে যাবার উদ্দেশ্যে মদিনা্ থেকে বের হলাম। যখন আমি গাবাহর উচুস্থানে পৌছলাম, সেখানে আমার সঙ্গে আবদুর রাহমান ইবন আউফ-এর গোলামের সাক্ষাৎ ঘটল। আমি বললাম, আশ্চর্য! তোমার কী হয়েছে? সে বলল, নবী (ﷺ)-এর দুগ্ধবতী উটনীগুলো ছিনতাই হয়েছে। আমি বললাম, কারা ছিনতাই করেছে? সে বলল, গাতফান ও ফাযারাহ্ গোত্রের লোকেরা। তখন আমি বিপদ, বিপদ বলে তিন বার চিৎকার দিলাম। আর মদিনার দুই কঙ্করময় ভূমির মাঝে যত লোক ছিল সবাইকে আওয়াজ শুনিয়ে দিলাম। অতঃপর আমি দ্রুত ছুটে গিয়ে ছিনতাইকারীদের পেয়ে গেলাম। তারা উটনীগুলোকে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে থাকলাম। আর বলতে লাগলাম, আমি আকওয়া'র পুত্র আর আজ কমিনাদের ধ্বংসের দিন। আমি তাদের থেকে উটগুলো উদ্ধার করলাম, তখনও তারা পানি পান করতে পারেনি। আর আমি সেগুলোকে হাকিয়ে নিয়ে আসছিলাম। এ সময়ে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! লোকগুলো তৃষ্ণার্ত। আমি এত তাড়াতাড়ি কাজ সেরেছি যে, তারা পানি পান করার সুযোগ পায়নি। শীঘ্র তাদের পেছনে সৈন্য পাঠিয়ে দিন। তখন তিনি বললেন, 'হে ইবন আক্ওয়া! তুমি তাদের উপর বিজয়ী হয়েছ, এখন তাদের কথা বাদ রাখ। তারা তাদের গোত্রের নিকট পৌছে গেছে।'

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বারাআ ইবন আযিব-কে জিজ্ঞেস করল এবং বলল, হে আবূ উমারাহ! আপনারা কি হুনাইনের যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিলেন? বারাআ বললেন, [আবূ ইসহাক বলেন], আর আমি তা শুনছিলাম, সেদিন তো আল্লাহর রাসূল (ﷺ) পালিয়ে যাননি। আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারিস তার খচ্চরের লাগাম ধরেছিলেন। যখন মুশরিকগণ তাকে ঘিরে ফেলল, তখন তিনি অবতরণ করলেন এবং বলতে লাগলেন, আমি আল্লাহর নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান। তিনি (বারা) বলেন, সেদিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) অপেক্ষা দৃঢ়চেতা আর কাউকে দেখা যায়নি।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন বনী কুরায়যার ইয়াহূদীরা সাদ ইবন মা'আয-এর ফায়সালা মুতাবিক দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসে, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে ডেকে পাঠান। আর তিনি তখন ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। তখন সাদ একটি গাধার পিঠে আরোহণ করে আসলেন। যখন তিনি কাছে আসলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা 'তোমাদের নেতার দিকে দন্ডায়মান হও।' তিনি এসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট বসলেন। তখন তাকে বললেন, 'এগিয়ে যাও এরা তোমার ফায়সালায় রাজী হয়েছে। সাদ বলেন, 'আমি এই রায় ঘোষণা করছি যে, তাদের মধ্য হতে যারা যুদ্ধ করতে পারে তাদেরকে হত্যা করা হবে এবং নারী ও শিশুদের বন্দী করা হবে।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তুমি তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার ফয়সালার মত ফয়সালাই করেছ।'

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। মক্কা জয়ের বছর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মাথায় শিরস্ত্রাণ পরা অবস্থায় প্রবেশ করেন। যখন তিনি তা খুলে ফেললেন, এক ব্যক্তি এসে বললো, ইবন খাতাল্ কাবার পর্দা ধরে আছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, 'তাকে কতল কর।'

আমর ইবন আবূ সুফ্ইয়ান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দশ ব্যক্তিকে গোয়েন্দা হিসেবে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন এবং আসিম ইবন সাবিত আনসারীকে তাদের দলপতি নিয়োগ করেন। যিনি আসিম ইবন উমার ইবন খাত্তাবের নানা ছিলেন। তারা রওনা করলেন, যখন তারা উসফান ও মক্কার মাঝে হাদআত নামক স্থানে পৌছেন, তখন হুযায়েল গোত্রের একটি প্রশাখা যাদেরকে লেহইয়ান বলা হয় তাদের নিকট তাদের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়। তারা প্রায় দু'শত তীরন্দাজকে তাদের পিছু ধাওয়ার জন্য পাঠান। এরা তাদের চিহ্ন দেখে চলতে থাকে। সাহাবীগণ মদিনা্ হতে সঙ্গে নিয়ে আসা খেজুর যেখানে বসে খেয়েছিলেন, অবশেষে এরা সে স্থানের সন্ধান পেয়ে গেল, তখন এরা বলল, ইয়াসরিবের খেজুর। অতঃপর এরা তাদের পদচিহ্ন দেখে চলতে লাগল। যখন আসিম ও তার সাথীগণ এদের দেখলেন, তখন তারা একটি উচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। আর কাফিররা তাদের ঘিরে ফেলল এবং তাদেরকে বলতে লাগল, তোমরা অবতরণ কর ও স্বেচ্ছায় বন্দীত্ব বরণ কর। আমরা তোমাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, তোমাদের মধ্য হতে কাউকে আমরা হত্যা করব না। তখন গোয়েন্দা দলের নেতা আসিম ইবন সাবিত বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি তো আজ কাফিরদের নিরাপত্তায় অবতরণ করবো না। হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে আপনার নবীকে সংবাদ পৌছিয়ে দিন।' অবশেষে কাফিররা তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। আর তারা আসিম সহ সাত জনকে শহীদ করলো। অতঃপর অবশিষ্ট তিনজন খুবাইব আনসারী, যায়দ ইবন দাসিনা ও অপর একজন তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করে তাদের নিকট অবতরণ করলেন। যখন কাফিররা তাদেরকে আয়ত্বে নিয়ে নিল, তখন তারা তাদের ধনুকের রশি খুলে ফেলে তাদের বেধে ফেললো। তখন তৃতীয় জন বলে উঠলেন, 'গোড়াতেই বিশ্বাসঘাতকতা! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো না, যারা শহীদ হয়েছেন আমি তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করব।' কাফিররা তাকে শহীদ করে ফেলে এবং তারা খুবাইব ও ইবন দাসিনাকে নিয়ে চলে যায়। অবশেষে তাদের উভয়কে মক্কায় বিক্রয় করে ফেলে। এটা বাদার যুদ্ধের পরের কথা। তখন খুবাইবকে হারিস ইবন 'আমিরের পুত্রগণ ক্রয় করে নেয়। আর বাদার যুদ্ধের দিন খুবাইব হারিস ইবন 'আমিরকে হত্যা করেছিলেন। খুবাইব কিছু দিন তাদের নিকট বন্দী থাকেন। ইবন শিহাব বলেন, আমাকে 'উবায়দুল্লাহ ইবন আয়ায্ অবহিত করেছেন, তাকে হারিসের কন্যা জানিয়েছে যে, যখন হারিসের পুত্রগণ খুবাইব-কে শহীদ করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিল, তখন তিনি তার কাছ থেকে ক্ষৌর কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশে একটা ক্ষুর ধার চাইলেন। তখন হারিসের কন্যা তাকে একখানা ক্ষুর ধার দিল। সে সময় ঘটনাক্রমে আমার এক ছেলে আমার অজ্ঞাতে খুবাইবের নিকট চলে যায় এবং আমি দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসে রয়েছে এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে বুঝতে পারলেন যে, আমি ভয় পাচ্ছি। তখন তিনি বললেন, তুমি কি এ ভয় করো যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না। আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের মত উত্তম বন্দী কখনো দেখিনি। আল্লাহর শপথ! আমি একদা দেখলাম, তিনি লোহার শিকলে আবদ্ধ অবস্থায় ছড়া হতে আঙ্গুর খাচ্ছেন, যা তার হাতেই ছিল। অথচ এ সময় মক্কায় কোন ফলই পাওয়া যাচ্ছিল না। হারিসের কন্যা বলতো, এ তো ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে প্রদত্ত জীবিকা, যা তিনি খুবাইবকে দান করেছেন। অতঃপর তারা খুবাইবকে শহীদ করার উদ্দেশে হারাম এর নিকট হতে হিল্লের দিকে নিয়ে বের হয়ে পড়ল, তখন খুবাইব তাদের বললেন, আমাকে দু'রাকাত সালাত আদায় করতে দাও। তারা তাকে সে অনুমতি দিল। তিনি দু'রাকআত সালাত আদায় করে নিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা যদি ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি তবে আমি সালাতকে দীর্ঘ করতাম। হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করুন।' (অতঃপর তিনি এ কবিতা দু'টি আবৃত্তি করলেন) "যখন আমি মুসলিম হিসেবে শহীদ হচ্ছি তখন আমি কোন রূপ ভয় করি না। আল্লাহর উদ্দেশ্যে আমাকে যেখানেই মাটিতে লুটিয়ে ফেলা হোক না কেন। আমার এ মৃত্যু আল্লাহ তাআলার জন্যই হচ্ছে। তিনি যদি ইচ্ছা করেন, তবে আমার দেহের প্রতিটি খন্ডিত জোড়াসমূহে বরকত সৃষ্টি করে দিবেন।" অবশেষে হারিসের পুত্র তাকে শহীদ করে ফেলে। বস্তুত যে মুসলিম ব্যক্তিকে বন্দী অবস্থায় শহীদ করা হয় তার জন্য দু'রাকাত সালাত আদায়ের এ রীতি খুবাইব-ই প্রবর্তন করে গেছেন। যে দিন আসিম শাহাদত বরণ করেছিলেন, সেদিন আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেছিলেন। সেদিনই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার সাহাবীগণকে তাদের সংবাদ ও তাদের উপর যা' যা' আপতিত হয়েছিল সবই অবহিত করেছিলেন। আর যখন কুরাইশ কাফিরদেরকে এ সংবাদ পৌছানো হয় যে, আসিম-কে শহীদ করা হয়েছে তখন তারা তার কাছে এক লোককে পাঠায়, যাতে সে ব্যক্তি তার লাশ হতে কিছু অংশ কেটে নিয়ে আসে, যেন তারা তা দেখে চিনতে পারে। কারণ, বাদার যুদ্ধের দিন আসিম কুরাইশদের এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। আসিমের লাশের (রক্ষার জন্য) মৌমাছির ঝাঁক প্রেরিত হল যারা তার দেহ আবৃত করে রেখে তাদের ষড়যন্ত্র হতে হিফাযত করল। ফলে তারা তার শরীর হতে এক খন্ড গোশ্তও কেটে নিতে পারেনি।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা বন্দী আযাদ কর, ক্ষুধার্তকে আহার্য দাও এবং রুগীর সেবা-শুশ্রূষা কর।

আবূ জুহাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আলী-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কুরআনে যা কিছু আছে তা ব্যতীত আপনাদের নিকট ওয়াহীর কোন কিছু আছে কি? তিনি বললেন, না, সে আল্লাহ তাআলার কসম! যিনি শস্যদানাকে বিদীর্ণ করেন এবং প্রাণী সৃষ্টি করেন। আল্লাহ কুরআন সম্পর্কে মানুষকে যে জ্ঞান দান করেছেন এবং সহীফার মধ্যে যা রয়েছে, এ ছাড়া আমি আর কিছু জানি না। আমি বললাম, এ সহীফাটিতে কী আছে? তিনি বললেন, 'দীয়াতের বিধান, বন্দী আযাদ করা এবং কোন মুসলিমকে যেন কোন কাফিরের পরিবর্তে হত্যা করা না হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আনসারগণের কয়েকজন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট অনুমতি চেয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আমাদের অনুমতি দান করেন, তবে আমরা আমাদের ভাগ্নে আব্বাসের মুক্তিপণ ছেড়ে দিতে পারি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, না, একটি দিরহামও ছাড় দিবে না।

আনাস হতে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ)-এর নিকট বাহরাইন হতে ধন-সম্পদ আনা হয়। তখন তার নিকট আব্বাস এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে কিছু দিন। আমি আমার নিজের মুক্তিপণ আদায় করেছি এবং আকীলেরও মুক্তিপণ আদায় করেছি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, নিন এবং তার কাপড়ে দিয়ে দিলেন।

জুবাইর (ইবন মুতয়িম) হতে বর্ণিত। আর তিনি বাদার যুদ্ধে বন্দীদের মুক্ত করার জন্য এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে মাগরিবের সালাতে সূরায়ে তূর পড়তে শুনেছি।

সালামাহ ইবন আক্ওয়া হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর কোন এক সফরে মুশরিকদের জনৈক গুপ্তচর তার নিকট এল এবং তার সাহাবীগণের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলতে লাগল ও কিছুক্ষণ পরে চলে গেল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, 'তাকে খুজে আন এবং হত্যা কর।' নবী (ﷺ) তার মালপত্র হত্যাকারীকে প্রদান করলেন।

উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এ অসীয়ত করেছি যে, 'আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল (ﷺ)-এর পক্ষ হতে কাফিরদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন যথাযথভাবে পূরণ করা হয়, তাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনে যুদ্ধ করা হয়, তাদের সামর্থ্যের বাইরে তাদের উপর যেন জিযিয়া ধার্য করা না হয়।'

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, বৃহস্পতিবার! হায় বৃহস্পতিবার! অতঃপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন, এমনকি তার অশ্রুতে কঙ্করগুলো সিক্ত হয়ে গেল। আর তিনি বলতে লাগলেন, 'বৃহস্পতিবারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর রোগ যাতনা বেড়ে যায়। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার জন্য লিখার কোন জিনিস নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখিয়ে দিব। যাতে অতঃপর তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট না হও। এতে সাহাবীগণ পরস্পরে মতভেদ করেন। অথচ নবীর সম্মুখে মতভেদ সমীচীন নয়। তাদের কেউ কেউ বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দুনিয়া ত্যাগ করছেন?' তিনি বললেন, 'আচ্ছা, আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দাও। তোমরা আমাকে যে অবস্থার দিকে আহবান করছো তার চেয়ে আমি যে অবস্থায় আছি তা উত্তম।' অবশেষে তিনি ইন্তিকালের সময় তিনটি বিষয়ে ওসীয়ত করেন। (১) মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ হতে বিতাড়িত কর, (২) প্রতিনিধি দলকে আমি যেরূপ উপঢৌকন দিয়েছি তোমরাও তেমন দিও (রাবী বলেন) তৃতীয় ওসীয়তটি আমি ভুলে গিয়েছি। আবূ আব্দুল্লাহ বলেন, ইবন মুহাম্মদ ও ইয়া'কূব বলেন, আমি মুগীরাহ ইবন আবদুর রহমানকে জাযীরাতুল আরব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, তাহলো মক্কা, মদিনা্, ইয়ামামা ও ইয়ামান। ইয়াকূব বলেন, 'তিহামাহ্ আরম্ভ হল 'আরজ থেকে।'

(আবদুল্লাহ) ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার এক জোড়া রেশমী কাপড় বাজারে বিক্রি হতে দেখতে পেলেন। তিনি তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ রেশমী কাপড় জোড়া আপনি ক্রয় করুন এবং 'ঈদ ও প্রতিনিধিদল আগমন উপলক্ষে এর দ্বারা আপনি সুসজ্জিত হবেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'এ পোশাক তো তার (আখিরাতে) যার কোন অংশ নেই। অথবা (বলেন) এরূপ পোশাক সে-ই পরিধান করে (আখিরাতে) যার কোন অংশ নেই।' এ অবস্থায় উমার কিছুদিন অবস্থান করেন, যে পরিমাণ সময় আল্লাহ তাআলার ইচ্ছে ছিল। অতঃপর নবী (ﷺ) একটি রেশমী জুববা উমার-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। তিনি তা নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এসে আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি বলেছিলেন যে, এ তো তারই লেবাস (আখিরাতে) যার কোন অংশ নেই, কিংবা (রাবীর সন্দেহ) এ পোশাক তো সে-ই পরিধান করে, যার (আখিরাতে) কোন অংশ নেই। এরপরও আপনি তা আমার জন্য পাঠালেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি তা বিক্রয় করে ফেলবে অথবা (রাবীর সন্দেহ) বলেছেন, তুমি তা তোমার কোন কাজে লাগাবে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার কয়েকজন সাহাবীসহ আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে ইবন সাইয়াদের নিকট যান। তারা তাকে বানী মাগালার টিলার উপর ছেলে-পেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে দেখতে পান। আর এ সময় ইবন সাইয়াদ বালিগ হবার নিকটবর্তী হয়েছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর (আগমন) সে কিছু টের না পেতেই নবী (ﷺ) তার পিঠে হাত দিয়ে মৃদু আঘাত করলেন। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল? তখন ইবন সাইয়াদ তার প্রতি তাকিয়ে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি উম্মী লোকদের রাসূল। ইবন সাইয়াদ নবী (ﷺ)-কে বলল, আপনি কি এ সাক্ষ্য দেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল? নবী (ﷺ) তাকে বললেন, আমি আল্লাহ তাআলা ও তার সকল রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। নবী (ﷺ) তাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কী দেখ? ইবন সাইয়াদ বলল, আমার নিকট সত্য খবর ও মিথ্যা খবর সবই আসে। নবী (ﷺ) বললেন, আসল অবস্থা তোমার কাছে সত্য মিথ্যা মিশিয়ে আছে। নবী (ﷺ) আরো বললেন, আচ্ছা, আমি আমার অন্তরে তোমার জন্য কিছু কথা গোপন রেখেছি। ইবন সাইয়াদ বলল, তা' হচ্ছে ধোয়া। নবী (ﷺ) বললেন, আরে থাম, তুমি তোমার সীমার বাইরে যেতে পার না। উমার বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে হুকুম দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। নবী (ﷺ) বললেন, যদি সে প্রকৃত দাজ্জাল হয়, তবে তুমি তাকে কাবু করতে পারবে না, যদি সে দাজ্জাল না হয়, তবে তাকে হত্যা করে তোমার কোন লাভ নেই।

ইবন উমার বলেন, আল্লাহর রাসূল ও উবাই ইবন কা'ব উভয়ে সে খেজুর বৃক্ষের নিকট গমন করেন, যেখানে ইবন সাইয়াদ অবস্থান করছিল। যখন নবী (ﷺ) সেখানে পৌছলেন, তখন তিনি খেজুর ডালের আড়ালে চলতে লাগলেন। তার ইচ্ছা ছিল যে, ইবন সাইয়াদের অজান্তে তিনি তার কিছু কথা শুনে নিবেন। ইবন সাইয়াদ নিজ বিছানা পেতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছিল এবং কী কী যেন গুনগুন করছিল। তার মা নবী (ﷺ)-কে দেখে ফেলেছিল যে, তিনি খেজুর বৃক্ষ শাখার আড়ালে আসছেন। তখন সে ইবন সাইয়াদকে বলে উঠল, হে সাফ! আর এ ছিল তার নাম। সে তাড়াতাড়ি উঠে দাড়াল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, নারীটি যদি তাকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দিত, তবে তার ব্যাপারটা প্রকাশ পেয়ে যেত।

সালিম বলেন, ইবন উমার বর্ণনা করেছেন যে, অতঃপর নবী লোকদের মাঝে দাড়ালেন। প্রথমে তিনি আল্লাহ তাআলার যথাযথ প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জাল সম্পর্কে উল্লেখ করলেন। আর বললেন, আমি তোমাদের দাজ্জাল হতে সতর্ক করে দিচ্ছি। প্রত্যেক নবীই তার সম্প্রদায়কে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। নূহ তার সম্প্রদায়কে দাজ্জাল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তার সম্পর্কে এমন একটি কথা জানিয়ে দিব, যা কোন নবী তার সম্প্রদায়কে জানাননি। তোমরা জেনে রেখ যে, সে হবে এক চোখ বিশিষ্ট আর অবশ্যই আল্লাহ এক চোখ বিশিষ্ট নন।

উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বিদায় হাজ্জে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আগামীকাল আপনি মক্কায় পৌছে কোথায় অবতরণ করবেন? তিনি বললেন, আকীল কি আমাদের জন্য কোন ঘর বাড়ি অবশিষ্ট রেখেছে? অতঃপর বললেন, আমরা আগামীকাল খায়ফে বানূ কানানার মুহাস্সাব নামক স্থানে অবতরণ করব। যেখানে কুরায়েশ লোকেরা কুফরীর উপর শপথ করেছিল। আর তা হচ্ছে এই যে, বানূ কানানা ও কুরায়শগণ একত্রে এ শপথ করেছিল যে, তারা বানূ হাশেমের সঙ্গে কেনা-বেচা করবে না এবং তাদের নিজ বাড়িতে আশ্রয়ও দিবে না। যুহরী বলেন, খায়ফ হচ্ছে একটি উপত্যকা।

যায়দ ইবন আসলাম কর্তৃক তার পিতা হতে বর্ণিত। উমার হুনাইয়াহ নামক তার এক আযাদকৃত গোলামকে সরকারী চারণভূমির তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত করেন। আর তাকে আদেশ করেন, হে হুনাইয়াহ! মুসলিমদের সঙ্গে অত্যন্ত বিনয়ী থাকবে, মজলুমের বদ দোয়া হতে বেচে থাকবে। কারণ, মজলুমের দোয়া কবূল হয়। আর অল্প সংখ্যক উট ও অল্প সংখ্যক বকরীর মালিককে এতে প্রবেশ করতে দিবে। আর আবদুর রহমান ইবন 'আউফ ও উসমান ইবন 'আফফান-এর পশুর ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। কেননা যদি তাদের পশুগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তারা তাদের কৃষি ক্ষেত ও খেজুর বাগানের প্রতি মনোযোগ দিবেন। কিন্তু অল্প সংখ্যক উট-বকরীর মালিকদের পশু ধ্বংস হয়ে গেলে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আমার নিকট উপস্থিত হবে। আর বলবে, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার পিতা ধ্বংস হোক! তখন আমি কি তাদের বঞ্চিত করতে পারব? সুতরাং পানি ও ঘাস দেয়া আমার পক্ষে সহজ, স্বর্ণ-রৌপ্য দেয়ার চাইতে। আল্লাহর শপথ! এ সব লোকেরা মনে করবে, আমি তাদের প্রতি জুলুম করেছি। এটা তাদেরই শহর, জাহিলী যুগে তারা এতে যুদ্ধ করেছে, ইসলামের যুগে তারা এতেই ইসলাম গ্রহণ করেছে। সে মহান আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, যে সব ঘোড়ার উপর আমি যোদ্ধাগণকে আল্লাহর রাস্তায় আরোহণ করিয়ে থাকি যদি সেগুলো না হতো তবে আমি তাদের দেশের এক বিঘত পরিমাণ জমিও সংরক্ষণ করতাম না।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, মানুষের মধ্যে যারা ইসলামের কালিমাহ উচ্চারণ করেছে, তাদের নাম লিখে আমাকে দাও। হুযাইফাহ বলেন, তখন আমরা এক হাজার পাচশ' লোকের নাম লিখে তার নিকট পেশ করি।১ তখন আমরা বলতে লাগলাম, আমরা এক হাজার পাচশত লোক, এক্ষণে আমাদের ভয় কিসের? (রাবী) হুযাইফাহ বলেন, পরবর্তীকালে আমরা দেখেছি যে, আমরা এমনভাবে ফিতনায় পড়েছি যাতে লোকেরা ভীত-শংকিত অবস্থায় একা একা সালাত আদায় করছে। আ'মাশ হতে এ রিওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন, তাতে উল্লেখ হয়েছে, আমরা তাদের পাচশ' পেয়েছি। আবূ মুআবিয়াহর বর্ণনায় উল্লেখিত হয়েছে, ছয়শ' হতে সাতশ' এর মাঝামাঝি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক অমুক যুদ্ধে আমার নাম লেখা হয়েছে আর আমার স্ত্রী হাজ্জ আদায়ের সংকল্প নিয়েছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, 'ফিরে যাও এবং তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হাজ্জ কর।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে এক যুদ্ধে উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি ইসলামের দাবীদার এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন, এ ব্যক্তি জাহান্নামী অথচ যখন যুদ্ধ শুরু হল, তখন সে লোকটি ভীষণ যুদ্ধ করল এবং আহত হল। তখন বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! যে লোকটি সম্পর্কে আপনি বলেছিলেন সে লোকটি জাহান্নামী, আজ সে ভীষণ যুদ্ধ করেছে এবং মারা গেছে। নবী (ﷺ) বললেন, সে জাহান্নামে গেছে। রাবী বলেন, একথার উপর কারো কারো অন্তরে এ বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টির উপক্রম হয় এবং তারা এ সম্পর্কিত কথাবার্তায় রয়েছেন, এ সময় খবর এল যে, লোকটি মরে যায়নি বরং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। যখন রাত্রি হল, সে আঘাতের কষ্টে ধৈর্যধারণ করতে পারল না এবং আত্মহত্যা করল। তখন নবী (ﷺ)-এর নিকট এ সংবাদ পৌছানো হল, তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহ আকবার! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি অবশ্যই আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং তার রাসুল। অতঃপর নবী (ﷺ) বিলাল-কে আদেশ করলেন, তখন তিনি লোকদের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, মুসলিম ব্যতীত কেউ বেহেশ্তে প্রবেশ করবে না। আর আল্লাহ তাআলা (কখনো কখনো) এই দ্বীনকে মন্দ লোকের দ্বারাও সাহায্য করেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুত্বা দিতে গিয়ে বললেন, যায়িদ পতাকা ধারণ করেছেন এবং শাহাদাত লাভ করেছেন, অতঃপর জাফর পতাকা ধারণ করেছেন এবং শাহাদাত বরণ করেছেন। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা ধারণ করেছেন এবং শাহাদাত লাভ করেছেন। অতঃপর খালিদ ইবন অলীদ মনোনয়ন ব্যতীতই পতাকা ধারণ করেছেন, আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে বিজয় দান করেছেন আর বললেন, এ আমার নিকট পছন্দনীয় নয় অথবা রাবী বলেন, তাদের নিকট পছন্দনীয় নয় যে, তারা দুনিয়ায় আমার নিকট অবস্থান করতো। রাবী বলেন, আর তার চোখদ্বয় হতে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ)-এর নিকট রি-ল, যাকওয়ান, উসাইয়াহ ও বানূ লাহ্ইয়ান গোত্রের কিছু লোক এসে বলল, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। এবং তারা তার নিকট তাদের গোত্রের মুকাবেলায় সাহায্য প্রার্থনা করল। তখন নবী (ﷺ) সত্তর জন আনসার পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করলেন। আনাস বলেন, আমরা তাদের ক্বারী নামে আখ্যায়িত করতাম। তারা দিনের বেলায় লাকড়ি সংগ্রহ করতেন, আর রাত্রিকালে সালাতে মগ্ন থাকতেন। তারা তাদের নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। যখন তারা 'বীরে মা'উনাহ নামক স্থানে পৌছল, তখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করল এবং তাদের হত্যা করে ফেলল। এ সংবাদ শোনার পর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রিল, যাকওয়ান ও বানূ লাহ্ইয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে দোয়া করে এক মাস যাবৎ কুনূতে নাযিলা পাঠ করেন। ক্বাতাদাহ বলেন, আনাস আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের সম্পর্কে কিছুকাল যাবৎ কুরআনের এ আয়াতটি পড়তে থাকেনঃ "আমাদের সংবাদ আমাদের কাওমের নিকট পৌছিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ পেয়েছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তিনি আমাদের সন্তুষ্ট করেছেন।' অতঃপর এ আয়াত উঠিয়ে নেয়া হয়।

আবূ ত্বলহা সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর বিজয় লাভ করতেন, তখন তিনি তাদের বাহির অঙ্গণে তিন রাত্রি অবস্থান করতেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) জিরানা নামক জায়গা হতে উমরাহর জন্য ইহরাম বাধলেন, যেখানে তিনি হুনাইন যুদ্ধের গনীমত বণ্টন করেছিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, তার একটি ঘোড়া ছুটে গেলে শত্রু তা আটক করে। অতঃপর মুসলিমগণ তাদের উপর বিজয় লাভ করেন। তখন সে ঘোড়াটি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যুগেই তাকে ফেরত দেয়া হয়। আর তার একটি গোলাম পলায়ন করে রোমের কাফিরদের সঙ্গে মিলিত হয়। অতঃপর মুসলিমগণ তাদের উপর বিজয় অর্জন করেন। তখন খালিদ ইবন ওয়ালীদ রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর যামানার পর তা তাকে ফেরত দিয়ে দেন।

নাফি হতে বর্ণিত যে, ইবন উমার-এর একটি গোলাম পালিয়ে গিয়ে রোমের মুশরিকদের সঙ্গে মিলিত হয়। অতঃপর খালিদ ইবন ওয়ালীদ রোম জয় করেন। তখন তিনি সে গোলামাটি আবদুল্লাহ (ইবন উমার)-কে ফেরত দিয়ে দেন। আর আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর একটি ঘোড়া ছুটে গিয়ে রোমে পৌছে যায়। অতঃপর উক্ত এলাকা মুসলিমদের দখলে আসলে তারা ঘোড়াটি ইবন উমার-কে ফেরত দিয়ে দেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, তিনি একটি ঘোড়ার উপর আরোহী ছিলেন। যখন মুসলিমগণ রোমীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন, সে সময় মুসলিমদের অধিনায়ক হিসেবে খালিদ ইবন ওয়ালীদ-কে আবূ বাকর সিদ্দীক নিযুক্ত করেছিলেন। সে সময় দুশমনরা তার ঘোড়াটিকে নিয়ে যায়। অতঃপর যখন দুশমনরা পরাজিত হল তখন খালিদ ইবন ওয়ালীদ তার ঘোড়াটি তাকে ফেরত দেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধের দিন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার একটি ছাগল ছানা যব্হ করেছি এবং আমার স্ত্রী এক সা যবের আটা পাকিয়েছে। আপনি কয়েকজন সঙ্গীসহ আসুন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, হে খন্দকের লোকেরা! জাবির তোমাদের জন্য খানার আয়োজন করেছে, তাই তোমরা চল।

উম্মু খালিদ বিনতে খালিদ ইবন সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে হলুদ বর্ণের জামা পরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট আসলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, সান্না-সান্না। (রাবী) আবদুল্লাহ বলেন, হাবশী ভাষায় তা 'সুন্দর' অর্থ বুঝায়। উম্মু খালিদ বলেন, অতঃপর আমি তার মহরে নবুয়্যতের স্থান নিয়ে কৌতুক করতে লাগলাম। আমার পিতা আমাকে ধমক দিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'ছোট মেয়ে তাকে করতে দাও।' অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, এ কাপড় পর আর পুরানো কর, আবার পর, পুরানো কর, আবার পর, পুরানো কর। আবদুল্লাহ (ইবন মুবারক) বলেন, উম্মু খালিদ যতদিন জীবিত থাকেন, তার আলোচনা চলতে থাকে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, হাসান ইবন আলী সদাকাহর খেজুর হতে একটি খেজুর নিয়ে তা তার মুখে দেন। তখন নবী (ﷺ) কাখ্-খাখ্ বললেন, তুমি কি জান না যে, আমরা সদা্কাহ খাই না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাদের মাঝে দাড়ান এবং গানীমাতের মাল আত্মসাৎ প্রসঙ্গে আলোচনা করেন। আর তিনি তা মারাত্মক অপরাধ ও তার ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের কাউকে যেন এ অবস্থায় কিয়ামতের দিন না পাই যে, তার কাঁধে বকরি বয়ে বেড়াচ্ছে আর তা ভ্যা ভ্যা করে চিৎকার দিচ্ছে। অথবা তার কাঁধে রয়েছে ঘোড়া আর তা হি হি করে আওয়াজ দিচ্ছে। ঐ ব্যক্তি আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সাহায্য করুন। আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারব না। আমি তো (দুনিয়ায়) তোমার নিকট পৌছে দিয়েছি। অথবা কেউ তার কাঁধে বয়ে বেড়াবে উট যা চিৎকার করছে, সে আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! একটু সাহায্য করুন। আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারব না। আমি তো তোমার নিকট পৌছে দিয়েছি। অথবা কেউ তার কাঁধে বয়ে বেড়াবে ধন-দৌলত এবং আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সাহায্য করুন। আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারব না। আমি তো তোমার নিকট পৌছে দিয়েছি। অথবা কেউ তার কাঁধে বয়ে বেড়াবে কাপড়ের টুকরাসমূহ যা দুলতে থাকবে। সে আমাকে বলবে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে সাহায্য করুন। আমি বলব, আমি তোমার জন্য কিছু করতে পারব না; আমি তো তোমার নিকট পৌছে দিয়েছি।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পাহারা দেয়ার জন্য এক ব্যক্তি নিযুক্ত ছিল। তাকে কার্কারা নামে ডাকা হত। সে মারা গেল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, সে জাহান্নামী! লোকেরা তাকে দেখতে গেল আর তারা একটি আবা পেল যা সে আত্মসাত করেছিল।

রাফি' ইবন খাদীজ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে যুল-হুলাইফায় অবস্থান করছিলাম। লোকেরা ক্ষুধার্ত হয়েছিল। আর আমরা গানীমাত স্বরূপ কিছু উট ও বকরী লাভ করেছিলাম। তখন নবী (ﷺ) লোকদের পেছনে সারিতে ছিলেন। লোকেরা তাড়াতাড়ি করে পাতিল চড়িয়ে দিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দিলেন এবং পাতিলগুলো উপুড় করে ফেলে দেয়া হল। অতঃপর তিনি দশটি বকরীকে একটি উটের সমান ধরে তা বণ্টন করে দিলেন। তার নিকট হতে একটি উট পালিয়ে গেল। লোকদের নিকট ঘোড়া কম ছিল। তারা তা অনুসন্ধানে বেরিয়ে গেল এবং তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। অতঃপর এক ব্যক্তি উটটির প্রতি তীর নিক্ষেপ করল, আল্লাহ তাআলা তার গতিরোধ করে দিলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'এ সকল গৃহপালিত জন্তুর মধ্যেও কতক বন্য পশুর মত অবাধ্য হয়ে যায়। সুতরাং যা তোমাদের নিকট হতে পলায়ন করে তার সঙ্গে এরূপ আচরণ করবে।' রাবী বলেন, আমার দাদা রাফি' ইবন খাদীজ বলেছেন, আমরা আশা করি কিংবা বলেছেন আশঙ্কা করি যে, আমরা আগামীকাল শত্রুর মুখোমুখী হব। আর আমাদের সঙ্গে ছুরি নেই। আমরা কি বাশের ধারালো চোকলা দ্বারা যব্হ করব? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'যা রক্ত প্রবাহিত করে এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে তা আহার কর। কিন্তু দাত ও নখ দিয়ে নয়। কারণ আমি বলে দিচ্ছিঃ তা এই যে, দাত হল হাড় আর নখ হল হাবশীদের ছুরি।'

জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, 'তুমি কি যুলখালাসা মন্দিরটিকে ধ্বংস করে আমাকে সান্ত্বনা দিবে না?' এ ঘরটি খাস'আম গোত্রের একটি মন্দির ছিল। যাকে ইয়ামানের কাবা বলা হতো। অতঃপর আমি আহমাস গোত্রের দেড়শ' লোক নিয়ে রওয়ানা হলাম। তারা সবাই দক্ষ ঘোড় সওয়ার ছিলেন। আমি নবী (ﷺ)-কে জানালাম যে, আমি ঘোড়ার উপর স্থির থাকতে পারি না। তখন তিনি আমার বুকে হাত দ্বারা আঘাত করলেন। এমন কি আমি আমার বুকে তার আঙ্গুলের ছাপ দেখতে পেলাম এবং তিনি আমার জন্য দোয়া করে বললেন, 'হে আল্লাহ! তাকে ঘোড়ার পিঠে স্থির রাখ এবং তাকে পথপ্রদর্শক ও সুপথপ্রাপ্ত করুন।' অবশেষে জারীর তথায় গমন করলেন। ঐ মন্দিরটি ভেঙ্গে দিলেন ও জ্বালিয়ে দিলেন। অতঃপর নবী (ﷺ)-কে সুসংবাদ প্রদানের জন্য দূত পাঠালেন। জারীর-এর দূত রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে বললেন, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, সে সত্তার কসম! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার নিকট আসিনি, যতক্ষণ না আমি তাকে জ্বালিয়ে কাল উটের মত করে ছেড়েছি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতিক লোকদের জন্য পাচবার বরকতের দু'আ করলেন। মুসাদ্দাদ বলেন, হাদীসে উল্লেখিত যুলখালাস অর্থ খাস'আম গোত্রের একটি ঘর।

আবদুল্লাহ্ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন, 'মক্কা বিজয়ের পর হতে (মক্কা থেকে) হিজরাতের প্রয়োজন নেই। কিন্তু জিহাদ ও নেক কাজের নিয়্যাত বাকী আছে আর যখন তোমাদের জিহাদের ডাক দেয়া হবে তখন তোমরা বেরিয়ে পড়বে।'

মুজাশি ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুজাশি তার ভাই মুজালিদ ইবন মাসঊদ-কে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন, 'এ মুজালিদ আপনার নিকট হিজরাত করার জন্য বাই'আত করতে চায়। 'তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'মক্কা জয়ের পর আর হিজরাতের দরকার নেই। কাজেই আমি তার নিকট হতে ইসলামের বাই'আত নিচ্ছি।'

পূর্বের হাদিসের মতই (৩০৭৮)।

আত্বা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাইদ ইবন উমাইর সহ আয়িশাহ-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি সাবীর পাহাড়ের উপর অবস্থান করছিলেন। তিনি আমাদেরকে বললেন, 'যখন হতে আল্লাহ তাআলা তার নবী (ﷺ)-কে মক্কা বিজয় দান করেছেন, তখন থেকে হিজরাত বন্ধ হয়ে গেছে।

আবূ আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত। আর তিনি ছিলেন উসমান-এর সমর্থক। তিনি ইবন আতিয়্যাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যিনি আলী-এর সমর্থক ছিলেন, কোন বস্তু তোমাদের সাথী (আলী-কে রক্তপাতে সাহস যুগিয়েছে, তা আমি জানি। আমি তার নিকট শুনেছি, তিনি বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে এবং যুবাইর (ইবন আওয়াম)-কে প্রেরণ করেছেন, আর বলেছেন, তোমরা খাক বাগানের দিকে চলে যাও, সেখানে তোমরা একজন মহিলাকে পাবে, হাতিব তাকে একটি পত্র দিয়েছে।' আমরা সে বাগানে পৌছলাম এবং মহিলাটিকে বললাম, পত্রখানি দাও, সে বলল, আমাকে কোন পত্র দেয়নি। তখন আমরা বললাম, 'হয় তুমি পত্র বের করে দাও, নচেৎ আমরা তোমাকে বিবস্ত্র করব।' তখন সে মহিলা তার কেশের ভাঁজ থেকে পত্রখানা বের করে দিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাতিবকে ডেকে পাঠান। তখন সে বলল, 'আমার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। আল্লাহর কসম! আমি কুফরী করিনি, আমার হৃদয়ে ইসলামের প্রতি অনুরাগই বর্ধিত হয়েছে। আপনার সাহাবীগণের মধ্যে কেউই এমন নেই, মক্কায় যার সাহায্যকারী আত্মীয়-স্বজন না আছে। যদ্দবারা আল্লাহ তাআলা তার পরিবার-পরিজন ধন-সম্পদ রক্ষা করেছেন। আর আমার এমন কেউ নেই। তাই আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে চেয়েছি। তখন নবী (ﷺ) তাকে সত্যবাদী হিসেবে স্বীকার করে নিলেন। উমার বললেন, 'লোকটিকে আমার হাতে ছেড়ে দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই, সে তো মুনাফিকী করেছে। তখন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, 'তুমি জান কি? অবশ্যই আল্লাহ তাআলা আহলে বাদার সম্পর্কে ভালভাবে জানেন এবং তাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'তোমরা যেমন ইচ্ছা আমল কর।' একথাই তাকে (আলী দুঃসাহসী করেছে।

ইবন আবূ মুলাইকা হতে বর্ণিত যে, ইবন যুবাইর, ইবন জাফর-কে বললেন, তোমার কি মনে আছে, যখন আমি ও তুমি এবং ইবন আব্বাস আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলাম? ইবন জাফর বললেন, হ্যা, স্মরণ আছে। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) আমাদেরকে বাহনে তুলে নিলেন আর তোমাকে ছেড়ে আসলেন।

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অন্যান্য শিশুদের সাথে আমরাও আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশে সানিয়্যাতুল বিদা পর্যন্ত গিয়েছিলাম।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, যখন নবী (ﷺ) জিহাদ হতে ফিরতেন, তখন তিনবার তাকবীর বলতেন। অতঃপর বলতেন, আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, গুনাহ হতে তাওবাকারী, তারই ইবাদাতকারী, প্রশংসাকারী, আমাদের প্রতিপালককে সিজ্দাকারী। আল্লাহ তাআলা তার অঙ্গীকার সত্য প্রমাণিত করেছেন, তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই শত্রু দলকে পরাভূত করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসফান হতে প্রত্যাবর্তনের সময় আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম, আর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার সাওয়ারীর উপর আরোহী ছিলেন। তিনি সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই-কে তার পেছনে সাওয়ারীর উপর বসিয়েছিলেন। এ সময় উট পিছলিয়ে গেল এবং তারা উভয়ে ছিটকে পড়েন। এ দেখে আবূ ত্বলহা দ্রুত এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আগে মহিলার খোজ নাও। আবূ ত্বলহা তখন একটা কাপড়ে নিজ মুখমন্ডল ঢেকে তার নিকট আসলেন এবং সে কাপড়টা দিয়ে তাকে ঢেকে দিলেন। অতঃপর তাদের দু'জনের জন্য সাওয়ারীকে ঠিক করলেন। তারা উভয়ে আরোহণ করলেন, আর আমরা সবাই আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চারপাশে বেষ্টন করে চললাম। যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)এ দোয়া পড়লেন "আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, আমরা তাওবাকারী, আমরা ইবাদাতকারী, আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী"। আর মদিনায় প্রবেশ করা পর্যন্ত তিনি এ দোয়া পড়তে থাকলেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, তিনি ও আবূ ত্বলহা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে চলছিলেন। আর নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাফিয়্যাহ-ও ছিলেন। তিনি তাকে নিজ সাওয়ারীতে তার পেছনে বসিয়ে ছিলেন। পথিমধ্যে এক জায়গায় উটনীটির পা পিছলে গেল। এতে নবী (ﷺ) ও সাফিয়্যাহ ছিটকে পড়ে গেলেন। আর আবূ ত্বলহা তার উট হতে তাড়াতাড়ি নেমে রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট বললেন, 'হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন। আপনার কি কোন আঘাত লেগেছে?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'না। তবে তুমি মহিলাটির খোজ নাও।' আবূ ত্বলহা একখানা কাপড় দিয়ে মুখমন্ডল ঢেকে তার নিকট গেলেন আর সেই কাপড় দিয়ে তাকে ঢেকে দিলেন। তখন সাফিয়্যাহ উঠে দাড়ালেন। অতঃপর তিনি আবূ ত্বলহা তাদের উভয়ের জন্য সাওয়ারীটি উত্তমরূপে বাধলেন। আর তারা উভয়ে (তার উপর) আরোহণ করে চলতে শুরু করেন। অবশেষে যখন তারা মদিনার উপকন্ঠে পৌছলেন অথবা বর্ণনাকারী বলেন, যখন মদিনার নিকটবর্তী হলেন, তখন নবী (ﷺ) এ দোয়া পড়লেন, 'আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তাওবাকারী, ইবাদাতকারী এবং আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসাকারী।' আর মদিনায় প্রবেশ করা পর্যন্ত তিনি এ দোয়া পড়তে থাকেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখন মদিনায় উপস্থিত হলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, 'মসজিদে প্রবেশ কর এবং দু' রাকাত সালাত আদায় কর।

কা'ব (ইবন মালিক) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) যখন চাশতের সময় সফর হতে ফিরতেন, তখন মসজিদে প্রবেশ করে বসার পূর্বে দু' রাকাত সালাত আদায় করে নিতেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মদিনায় ফিরতেন, তখন তিনি একটি উট অথবা একটি গাভী যব্হ করতেন। আর মুআয.... জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, [জাবির বলেন] আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার নিকট হতে এক উট দু' উকিয়া ও একটি দিরহাম কিংবা দু' দিরহাম দ্বারা কিনে নেন এবং তিনি যখন সিরার নামক স্থানে পৌছেন, তখন একটি গাভী যব্হ করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তা যব্হ করা হয় এবং সকলে তার গোশ্ত আহার করে। আর যখন তিনি মদিনায় উপস্থিত হলেন তখন আমাকে মসজিদে প্রবেশ করে দু' রাকাত সালাত আদায় করতে আদেশ করলেন এবং আমাকে উটের মূল্য পরিশোধ করে দিলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সফর হতে ফিরে এলাম। তখন নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, 'দু' রাকাত সালাত আদায় করে নাও।' সিরার হচ্ছে মদিনার সন্নিকটে একটি স্থানের নাম।