bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

ভালো আচার-ব্যবহার (আদব) (৫৯৭০-৬২২৬)

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নিকট কোন কাজ সব থেকে অধিক পছন্দনীয়? তিনি বললেনঃ সময় মত সালাত আদায় করা। (আবদুল্লাহ) জিজ্ঞেস করলেনঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা। আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ তারপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। আবদুল্লাহ বললেনঃ নবী (ﷺ) এগুলো সম্পর্কে আমাকে বলেছেন। আমি তাকে আরও অধিক প্রশ্ন করলে, তিনি আমাকে আরো জানাতেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার? তিনি বললেনঃ তোমার মা। লোকটি বললঃ অতঃপর কে? নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার মা। সে বললঃ অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললঃ অতঃপর কে? তিনি বললেনঃ অতঃপর তোমার বাপ।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলঃ আমি কি জিহাদে যাব? তিনি বললেনঃ তোমার কি পিতা-মাতা আছে? সে বললঃ হা। তিনি বললেনঃ তা হলে তাদের (সেবা করার মাধ্যমে) জিহাদ কর।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লানত করা। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কীভাবে লানত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনজন লোক হেটে চলছিল। তাদের উপর বৃষ্টি শুরু হলে তারা এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয়। এমন সময় পাহাড় হতে একটি পাথর তাদের গুহার মুখের উপর গড়িয়ে পড়ে এবং মুখ বন্ধ করে ফেলে। তাদের একজন অন্যদের বললঃ তোমরা তোমাদের কৃত আমলের প্রতি লক্ষ্য করো যে নেক আমল তোমরা আল্লাহর জন্য করেছ; তার ওয়াসীলাহ্য় আল্লাহর নিকট দোয়া করো। হয়তো তিনি এটি হটিয়ে দেবেন। তখন তাদের একজন বললঃ হে আল্লাহ! আমার বয়োবৃদ্ধ মাতা-পিতা ছিল এবং ছোট ছোট শিশু ছিল। আমি তাদের (জীবিকার) জন্যে মাঠে পশু চরাতাম। যখন সন্ধ্যায় ফিরতাম, তখন দুধ দোহন করতাম এবং আমার সন্তানদের আগেই পিতা-মাতাকে পান করতে দিতাম। একদিন পশুগুলো দূরে বনের মধ্যে চলে যায়। ফলে আমার ফিরে আসতে দেরী হয়ে যায়। ফিরে দেখলাম তারা উভয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি যেমন দুধ দোহন করতাম, তেমনি দোহন করলাম। তারপর দুধ নিয়ে এলাম এবং উভয়ের মাথার কাছে দাড়িয়ে রইলাম। ঘুম থেকে তাদের উভয়কে জাগানো ভাল মনে করলাম না। আর তাদের আগে শিশুদের পান করানোও অপছন্দ করলাম। আর শিশুরা আমাদের দু'পায়ের কাছে কান্নাকাটি করছিল। তাদের ও আমার মাঝে এ অবস্থা চলতে থাকে। শেষে ভোর হয়ে গেল। (হে আল্লাহ) আপনি জানেন যে, আমি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্যেই এ কাজ করেছি। তাই আপনি আমাদের জন্য একটু ফাক করে দিন, যাতে আমরা আকাশ দেখতে পাই। তখন আল্লাহ তাদের জন্যে একটু ফাক করে দিলেন, যাতে তারা আকাশ দেখতে পায়। দ্বিতীয় ব্যক্তি বললঃ হে আল্লাহ! আমার একটি চাচাত বোন ছিল। আমি তাকে এতখানি ভালবাসতাম, যতখানি একজন পুরুষ কোন নারীকে ভালবাসতে পারে। আমি তাকে একান্তে পেতে চাইলাম। সে অসম্মতি জানাল, যতক্ষণ আমি তার কাছে একশ দ্বীনার উপস্থিত না করি। আমি চেষ্টা করলাম এবং একশ স্বর্ণমুদ্রা জোগাড় করলাম। এগুলো নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম। যখন আমি তার দু'পায়ের মধ্যে বসলাম, তখন সে বললঃ হে আল্লাহর বান্দাহ! আল্লাহকে ভয় করো, আমার কুমারিত্ব নষ্ট করো না। তখন আমি উঠে গেলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্যেই আমি তা করেছি। তাই আমাদের জন্যে এটি ফাক করে দিন। তখন তাদের জন্যে আল্লাহ আরও কিছু ফাক করে দিলেন। শেষের লোকটি বললঃ হে আল্লাহ! আমি একজন মজদুরকে এক 'ফারক' চাউলের বিনিময়ে কাজে নিয়োগ করেছিলাম। সে তার কাজ শেষ করে এসে বলল, আমার প্রাপ্য দিয়ে দিন। আমি তার প্রাপ্য তার সামনে উপস্থিত করলাম। কিন্তু সে তা ছেড়ে দিল ও প্রত্যাখ্যান করলো। তারপর তার প্রাপ্যটা আমি ক্রমাগত কৃষিকাজে খাটাতে লাগলাম। তা দিয়ে অনেকগুলো গরু ও রাখাল জমা করলাম। এরপর সে একদিন আমার কাছে এসে বললঃ আল্লাহকে ভয় কর, আমার উপর যুল্ম করো না এবং আমার প্রাপ্য দিয়ে দাও। আমি বললামঃ ঐ গরু ও রাখালের কাছে চলে যাও। সে বললঃ আল্লাহকে ভয় করো, আমার সাথে উপহাস কর না। আমি বললামঃ তোমার সাথে আমি উপহাস করছি না। তুমি ঐ গরুগুলো ও তার রাখাল নিয়ে যাও। তারপর সে ওগুলো নিয়ে চলে গেল। (হে আল্লাহ!) আপনি জানেন যে, তা আমি আপনার সন্তুষ্টি লাভের জন্যেই করেছি, তাই আপনি অবশিষ্ট অংশ উন্মুক্ত করে দিন। তারপর আল্লাহ তাদের জন্য তা উন্মুক্ত করে দিলেন।

মুগীরা ইবন শু'বা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মা-বাপের নাফরমানী করা, প্রাপকের প্রাপ্য আটক রাখা, যে জিনিস গ্রহণ করা তোমাদের জন্য ঠিক নয় তা তলব করা এবং কন্যা সন্তানকে জীবিত কবর দেয়া। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন গল্প-গুজব করা, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও সম্পদ অপচয় করা।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমি কি তোমাদের সব থেকে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? আমরা বললামঃ অবশ্যই সতর্ক করবেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে অংশীদার গণ্য করা, পিতা-মাতার নাফরমানী করা। এ কথা বলার সময় তিনি হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর (সোজা হয়ে) বসলেন এবং বললেনঃ মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, দু'বার করে বললেন এবং ক্রমাগত বলেই চললেন। এমনকি আমি বললাম, তিনি মনে হয় থামবেন না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাবীরা গুনাহর কথা উল্লেখ করলেন অথবা তাকে কবীরা গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহর সঙ্গে শারীক করা, মানুষ হত্যা করা ও মা-বাপের নাফরমানী করা। তারপর তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাদের কবীরা গুনাহর অন্যতম গুনাহ হতে সতর্ক করবো না? পরে বললেনঃ মিথ্যা কথা বলা, অথবা বলেছেনঃ মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।

আবূ বাকর-এর কন্যা আসমা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার কাছে এলেন। আমি নবী (ﷺ) এর নিকট জিজ্ঞেস করলামঃ তার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবো কি না? তিনি বললেন, হা। ইবন উয়াইনাহ বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ "দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি, আর তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দেয়নি তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি।" (আল-মুমতাহিনাহ ৬০:৮)

আসমা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ কুরাইশরা যে সময়ে নবী (ﷺ) এর সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করেছিল, ঐ চুক্তিবদ্ধ সময়ে আমার মা তার পিতার সঙ্গে এলেন। আমি নবী (ﷺ) এর কাছে জিজ্ঞেস করলামঃ আমার মা এসেছেন, তবে সে অমুসলিম। আমি কি তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করবো? তিনি বললেনঃ হা। তোমার মায়ের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করো।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, আবূ সুফ্ইয়ান থেকে জানিয়েছেন যে, (রোম সম্রাট) হিরাক্লিয়াস তাকে ডেকে পাঠায়। আবূ সুফ্ইয়ান বললো যে, তিনি নবী (ﷺ) আমাদের সালাত আদায় করতে, যাকাত দিতে, পবিত্র থাকতে এবং রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উমার এক জোড়া রেশমী ডোরাদার কাপড় বিক্রি হতে দেখেন। এরপর তিনি (নবী (ﷺ) -কে) বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এটি ক্রয় করুন, জুমুআর দিনে, আর আপনার কাছে যখন প্রতিনিধি দল আসে তখন আপনি তা পরবেন। তিনি বললেনঃ এটা সে-ই পরতে পারে, যার জন্য কল্যাণের কোন হিস্যা নেই। এরপর নবী (ﷺ) এর নিকট এ জাতীয় কারুকার্য খচিত কিছু কাপড় আসে। তিনি তা থেকে এক জোড়া কাপড় (হুল্লা) উমার-এর নিকট পাঠিয়ে দেন। তিনি (এসে) বললেনঃ আমি কীভাবে এটি পরবো? অথচ এ সম্পর্কে আপনি যা বলার তা বলেছেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি তোমাকে এটি পরার জন্য দেইনি, বরং এ জন্যেই দিয়েছি যে, তুমি ওটা বিক্রি করে দেবে অথবা অন্যকে পরতে দেবে। তখন উমার তা মক্কায় তার ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন, যে তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি।

আবূ আইউব আনসারী হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।

আবূ আইউব আনসারী হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বললোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল শিক্ষা দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। উপস্থিত লোকজন বললঃ তার কী হয়েছে? তার কী হয়েছে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তার একটি বিশেষ প্রয়োজন আছে। এরপর নবী (ﷺ) বললেনঃ তুমি আল্লাহর ইবাদাত করবে, তার সঙ্গে কাউকে অংশীদার গণ্য করবে না, সালাত কায়িম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে। একে সওয়ারীকে ছেড়ে দাও। বর্ণনাকারী বলেনঃ তিনি ঐ সময় তার সাওয়ারীর উপর ছিলেন।

যুবায়র ইবন মুত'ইম হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেনঃ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি চায় যে, তার রিযক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ যাবতীয় সৃষ্টিকে পয়দা করলেন। যখন তিনি সৃষ্টি কাজ সমাধা করলেন, তখন আত্মীয়তারসম্পর্ক বলে উঠলোঃ সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার আশ্রয় লাভকারীদের এটাই যথাযোগ্য স্থান। তিনি (আল্লাহ) বললেনঃ হা তুমি কি এতে খুশি নও যে, তোমার সাথে যে সুসম্পর্ক রাখবে, আমিও তার সাথে সুসম্পর্ক রাখবো। আর যে তোমা হতে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো। সে (রক্ত সম্পর্ক) বললোঃ হা আমি সন্তুষ্ট হে আমার রব! আল্লাহ বললেনঃ তা হলে এ মর্যাদা তোমাকে দেয়া হলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা ইচ্ছে করলে (এ আয়াতটি) পড়োঃ "ক্ষমতা পেলে সম্ভবতঃ তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে আর আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।" (মুহাম্মাদ ৪৭/২২)

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ রক্ত সম্পর্কে মূল হল রাহমান। আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ যে তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখবে, আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমা হতে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও সে লোক হতে সম্পর্ক ছিন্ন করব।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আত্মীয়তার হক রাহমানের মূল। যে তা সংরক্ষণ করবে, আমি তাকে সংরক্ষণ করব। আর যে তা ছিন্ন করবে, আমি তাকে আমা হতে ছিন্ন করবো।

আমর ইবন আস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) কে উচ্চস্বরে বলতে শুনেছি, আস্তে নয়। তিনি বলেছেনঃ অমুকের বংশ আমার বন্ধু নয়। আমর বলেনঃ মুহাম্মাদ ইবন জাফরের কিতাবে বংশের পরে জায়গা খালি রয়েছে। (কোন বংশের নাম নাই)। বরং আমার বন্ধু আল্লাহ ও নেককার মুমিনগণ। 'আনবাসা অন্য সূত্রে আমর ইবন আস থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) থেকে আমি শুনেছিঃ বরং তাদের সাথে (আমার) আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, আমি সুসম্পর্কের রস দিয়ে তা প্রাণবন্ত রাখি।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, আ'মাশ এ হাদীস মারফূ'রূপে বর্ণনা করেননি। অবশ্য হাসান (ইবন আমর) ও ফিতর একে নবী (ﷺ) থেকে মারফূ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ প্রতিদানকারী আত্মীয়তার হক সংরক্ষণকারী নয়। বরং আত্মীয়তার হক সংরক্ষণকারী সে ব্যক্তি, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হবার পরও তা বজায় রাখে।

হাকীম ইবন হিযাম হতে বর্ণিত। তিনি একবার আরয করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহিলী হালাতে অনেক সাওয়াবের কাজ করেছি। যেমন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, গোলাম আযাদ করা এবং দান-খয়রাত করা, এসব কাজে কি আমি কোন সাওয়াব পাব? হাকীম বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ পূর্বকৃত নেকীর বদৌলতে তুমি ইসলাম গ্রহণ করতে পেরেছ।

উম্মু খালিদ বিন্ত খালিদ ইবন সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পিতার সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এলাম। আমার গায়ে তখন হলুদ রং এর জামা ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সানাহ্ সানাহ্। আবদুল্লাহ বলেন, হাবশী ভাষায় এর অর্থ সুন্দর, সুন্দর। উম্মু খালিদ বলেনঃ আমি তখন মোহরে নবূওয়াত নিয়ে খেলতে লাগলাম। আমার পিতা আমাকে ধমক দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ ও যা করছে করতে দাও। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমার কাপড় পুরোনো কর ও জীর্ণ কর, আবার পুরোনো কর, জীর্ণ কর, আবার পুরোনো কর জীর্ণ কর। তিনবার বললেন। আবদুল্লাহ বলেনঃ তিনি দীর্ঘ জীবন লাভকারী হিসেবে আলোচিত হয়েছিলেন।

ইবন আবূ নুআম থেকে বণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন উমার-এর কাছে ছিলাম। তখন তার কাছে একটি লোক মশার রক্তের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেনঃ কোন দেশের লোক তুমি? সে বললোঃ আমি ইরাকের বাসিন্দা। ইবন উমার বললেনঃ তোমরা এর দিকে তাকাও, সে আমাকে মশার রক্তের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে, অথচ তারা নবী (ﷺ) এর সন্তানকে হত্যা করেছে। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ ওরা দু'জন (হাসান ও হুসাইন) দুনিয়াতে আমার দু'টি সুগদ্ধি ফুল।

নবী (ﷺ) এর স্ত্রী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একটি স্ত্রীলোক দু'টি মেয়ে সাথে নিয়ে আমার কাছে এসে কিছু চাইলো। আমার কাছে একটি খুরমা ব্যতীত আর কিছুই সে পেলো না। আমি তাকে ওটা দিলাম। স্ত্রীলোকটি তার দু'মেয়েকে খুরমাটি ভাগ করে দিল। তারপর সে উঠে বের হয়ে গেল। এ সময় নবী (ﷺ) এলেন। আমি তাকে ব্যাপারটি জানালাম। তখন তিনি বললেনঃ যাকে এ সব কন্যা সন্তান দিয়ে কোন পরীক্ষা করা হয়, অতঃপর সে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে, এ কন্যারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিবন্ধক হবে।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা নবী (ﷺ) আমাদের সম্মুখে আসলেন। তখন উমামাহ বিন্ত আবুল আস তার স্কন্ধের উপর ছিলেন। এই অবস্থায় নবী (ﷺ) সালাতে দন্ডায়মান হলেন। যখন তিনি রুকূতে যেতেন, তাকে নামিয়ে রাখতেন, আবার যখন উঠে দাড়াতেন, তখন তাকেও উঠিয়ে নিতেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদা হাসান ইবন আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তার নিকট আকরা' ইবন হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা' ইবন হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক বেদুঈন নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললো। আপনারা শিশুদের চুম্বন করেন, কিন্তু আমরা ওদের চুম্বন করি না। নবী (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহ যদি তোমার হৃদয় হতে দয়া উঠিয়ে নেন, তবে তোমার উপর আমার কি কোন অধিকার আছে?

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) এর নিকট কতকগুলো বন্দী আসে। বন্দীদের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক ছিল। তার স্তন ছিল দুধে পূর্ণ। সে বন্দীদের মধ্যে কোন শিশু পেলে তাকে কোলে তুলে নিত এবং দুধ পান করাত। নবী (ﷺ) আমাদের বললেনঃ তোমরা কি মনে কর এ স্ত্রীলোকটি তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারে? আমরা বললামঃ ফেলার ক্ষমতা রাখলেও সে কখনো ফেলবে না। তারপর তিনি বললেনঃ এ স্ত্রীলোকটি তার সন্তানের উপর যতটা দয়ালু, আল্লাহ তার বান্দার উপর তার চেয়েও বেশি দয়ালু।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ রহমতকে একশ ভাগে বিভক্ত করেছেন। তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ তিনি নিজের কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন। আর পৃথিবীতে একভাগ পাঠিয়েছেন। ঐ এক ভাগ পাওয়ার কারণেই সৃষ্ট জগত পরস্পরের প্রতি দয়া করে। এমনকি ঘোড়া তার বাচ্চার উপর থেকে পা উঠিয়ে নেয় এই আশঙ্কায় যে, সে ব্যথা পাবে।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! কোন গুনাহ সব হতে বড়? তিনি বললেনঃ কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ গণ্য করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বললেনঃ তারপরে কোনটি? নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার সাথে খাবে, এ আশঙ্কায় তোমার সন্তানকে হত্যা করা। তিনি বললেনঃ তারপরে কোনটি? নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করা। তখন নবী (ﷺ) এর কথার সত্যতা প্রতিপন্ন করে অবতীর্ণ হলোঃ "আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডাকে না"-(আল-ফুরক্বান (২৫/৬৮)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একটি শিশুকে নিজের কোলে উঠিয়ে নিলেন। তারপর তাকে তাহনীক করালেন। শিশুটি তার কোলে প্রস্রাব করে দিল। তখন তিনি পানি আনতে বললেন এবং তা প্রস্রাবের জায়গায়) ঢেলে দিলেন।

উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার হাত ধরে তার এক রানের উপর আমাকে বসাতেন এবং হাসানকে বসাতেন অন্য রানে। তারপর দু'জনকে একত্রে মিলিয়ে নিতেন। পরে বলতেনঃ হে আল্লাহ! আপনি এদের দু'জনের উপর রহম করুন, কেননা আমিও এদের ভালবাসি। অপর এক সূত্রে তামীমী বলেন, এ হাদীসটি সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহ জাগল। ভাবলাম, আবূ উসমান থেকে আমি এতো এতো হাদীস বর্ণনা করেছি, এ হাদীসটি মনে হয় তার কাছ হতে শুনিনি। পরে খোজ করে দেখলাম যে, আবূ উসমানের নিকট হতে শোনা যে সব হাদীস আমার কাছে লেখা ছিল, তাতে এটি পেয়ে গেলাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অন্য কোন মহিলার উপর ততটা ঈর্ষা পোষণ করতাম না, যতটা ঈর্ষা করতাম খাদীজার উপর। অথচ আমার বিয়ের তিন বছর আগেই তিনি মারা যান। কারণ, আমি শুনতাম, নবী (ﷺ) তার নাম উল্লেখ করতেন। আর জান্নাতের মাঝে মণি-মুক্তার একটি ঘরের খোশ-খবর খাদীজাকে শোনানোর জন্যে তার প্রতিপালক তাকে নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কখনও ছাগল যবহ করলে তার একটি টুকরো খাদীজার বান্ধবীদের কাছে অবশ্যই পাঠাতেন।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি ও ইয়াতীমের দেখাশুনাকারী জান্নাতে এভাবে (একত্রে) থাকব। এ কথা বলার সময় তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলদ্বয় মিলিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালেন।

সফওয়ান ইবন সুলায়ম হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে মারফূ'রূপে বর্ণনা করেছেন। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোক বিধবা ও মিসকীনদের ভরণ-পোষণের ব্যাপারে চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মত। অথবা সে ঐ ব্যক্তির মত, যে দিনে সিয়াম পালন করে ও রাতে (ইবাদাতে) দন্ডায়মান থাকে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ বিধবা ও মিসকীনদের অভাব দূর করার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদকারীর ন্যায়। [ইমাম বুখারী বলেন] আমার ধারণা যে কানবী (বুখারীর উস্তাদ আবদুল্লাহ) সন্দেহ প্রকাশ করেছেনঃ সে রাতভর দাড়ানো ব্যক্তির মত যে (ইবাদাতে) ক্লান্ত হয় না এবং এমন সিয়াম পালনকারীর মত, যে সিয়াম ভঙ্গ করে না।

আবূ সুলাইমান মালিক ইবন হুওয়ায়রিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা কয়জন নবী (ﷺ) এর নিকটে আসলাম। তখন আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী যুবক। বিশ দিন তার কাছে আমরা থাকলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা আমাদের পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছি। যাদের আমরা বাড়িতে রেখে এসেছি তাদের ব্যাপারে তিনি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তা তাকে জানালাম। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র। তাই তিনি বললেনঃ তোমরা তোমাদের পরিজনের নিকট ফিরে যাও। তাদের (কুরআন) শিক্ষা দাও, (সৎ কাজের) আদেশ কর এবং যে ভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক তেমনভাবে সালাত আদায় কর। সালাতের ওয়াক্ত হলে, তোমাদের একজন আযান দেবে এবং যে তোমাদের মধ্যে বড় সে ইমামাত করবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ একবার এক লোক পথে হেটে যাচ্ছিল। তার ভীষণ পিপাসা লাগে। সে একটি কূপ পেল। সে তাতে নামল এবং পানি পান করলো, তারপরে উঠে এলো। হঠাৎ দেখলো, একটি কুকুর হাপাচ্ছে। পিপাসার্ত হয়ে কাদা চাটছে। লোকটি ভাবলো, এ কুকুরটি পিপাসায় সেরূপ কষ্ট পাচ্ছে, যেরূপ কষ্ট আমার হয়েছিল। তখন সে কূপে নামল এবং তার মোজার মধ্যে পানি ভরলো, তারপর মুখ দিয়ে তা (কামড়ে) ধরে উপরে উঠে এলো। তারপর সে কুকুরটিকে পানি পান করালো। আল্লাহ তাকে এর প্রতিদান দিলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! জীব-জন্তুর (প্রতি দয়া প্রদর্শনের) জন্যও কি আমাদের পুরস্কার আছে? তিনি বললেনঃ হা, প্রত্যেক দয়ালু অন্তরের অধিকারীদের জন্যে প্রতিদান আছে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার সালাতে দন্ডায়মান। আমরাও তার সঙ্গে দন্ডায়মান হলাম। এ সময় এক বেদুঈন সালাতের মাঝেই বলে উঠলোঃ হে আল্লাহ! আমার ও মুহাম্মাদের উপর দয়া করো এবং আমাদের সঙ্গে আর কারো উপর দয়া করো না। নবী (ﷺ) সালাম ফিরানোর পর বেদুঈন লোকটিকে বললেনঃ তুমি একটি প্রশস্ত ব্যাপারকে সংকুচিত করেছো আল্লাহর দয়া।

নুমান ইবন বাশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মুমিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কোন মুসলিম যদি গাছ লাগায়, আর তাথেকে কোন মানুষ বা জানোয়ার কিছু খায়, তবে তা তার জন্য সদাকাহ্য় পরিগণিত হবে।

জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে (সৃষ্টির প্রতি) দয়া করে না, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তার প্রতি দয়া করা হয় না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমাকে জিবরীল সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করতে থাকেন। এমনকি, আমার ধারণা হয়, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ জিবরীল সর্বদা আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারেঅসীয়ত করে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হয় যে, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন।

আবূ শুরায়হ্ থেকে বণিত। নবী (ﷺ) একবার বলছিলেনঃ আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! কে সে লোক? তিনি বললেনঃ যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলতেনঃ হে মুসলিম মহিলাগণ! কোন প্রতিবেশী মহিলা যেন তার অপর প্রতিবেশী মহিলাকে (হাদিয়া ফেরত দিয়ে) হেয় প্রতিপন্ন না করে। তা ছাগলের পায়ের ক্ষুরই হোক না কেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।

আবূ শুরায়হ্ আদাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন কথা বলেছিলেন, তখন আমার দু'কান শুনছিল ও আমার দু'চোখ দেখছিল। তিনি বলছিলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান দেখায় তার প্রাপ্যের বিষয়ে। জিজ্ঞেস করা হলোঃ মেহমানের প্রাপ্য কী, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ একদিন একরাত ভালভাবে মেহমানদারী করা আর তিন দিন হলে (সাধারণ) মেহমানদারী, আর তার চেয়েও অধিক হলে তা হল তার প্রতি দয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে অথবা চুপ থাকে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার দু'জন প্রতিবেশী আছে। আমি তাদের কার কাছে হাদিয়া পাঠাব? তিনি বললেনঃ যার দরজা তোমার বেশি কাছে, তার কাছে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সকল সৎ আমল সদাকাহ হিসেবে গণ্য।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ প্রতিটি মুসলিমেরই সদাকাহ করা দরকার। উপস্থিত লোকজন বললঃ যদি সে সদাকাহ করার মত কিছু না পায়। তিনি বললেনঃ তাহলে সে নিজের হাতে কাজ করবে। এতে সে নিজেও উপকৃত হবে এবং সদাকাহ করবে। তারা বললঃ যদি সে সক্ষম না হয় অথবা বলেছেনঃ যদি সে না করে? তিনি বললেনঃ তাহলে সে যেন বিপন্ন মাযলূমের সাহায্য করে। লোকেরা বললঃ সে যদি তা না করে? তিনি বললেনঃ তা হলে সে সৎ কাজের আদেশ করবে, অথবা বলেছেন, সাওয়াবের কাজের নির্দেশ করবে। তারা বললঃ তাও যদি সে না করে? তিনি বললেনঃ তা হলে সে খারাপ কাজ থেকে বেচে থাকবে। কারণ, এটাই তার জন্য সদাক্বাহ হবে।

আদী ইবন হাতিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) জাহান্নামের আগুনের কথা উল্লেখ করলেন। তারপর তা'থেকে আশ্রয় চাইলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন। পরে আবার জাহান্নামের আগুনের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর তা'থেকে আশ্রয় চাইলেন এবং তার মুখ ফিরিয়ে নিলেন। শুবাহ বলেনঃ দু'বার যে বলেছেন, এতে আমার কোন সন্দেহ নেই। তারপর নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা জাহান্নামের আগুন হতে বাচো এক টুকরা খেজুর দিয়ে হলেও। আর যদি তা না পাও, তবে সুমিষ্ট ভাষার বিনিময়ে।

নবী সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদীদের একটি দল নবী (ﷺ) এর কাছে এসে বললঃ "আস-সামু-আলাইকুম।" (তোমাদের উপর মৃত্যু উপনীত হোক)। আয়িশাহ বলেনঃ আমি এর অর্থ বুঝলাম এবং বললামঃ "ওয়া-আলাইকুম আস-সামু ওয়াল-লানত" (তোমাদের উপরও মৃত্যু ও লানত উপনীত হোক)। আয়িশাহ বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ থাম, হে আয়িশাহ! আল্লাহ যাবতীয় কার্যে নম্রতা পছন্দ করেন। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি শোনেননি, তারা (ইহুদিরা) কী বলেছে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমি তো বলেছি 'আলাইকুম' আর তোমাদের উপরও।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিল। লোকেরা উঠে তার দিকে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তার প্রস্রাব করায় বাধা দিও না। অতঃপর তিনি এক বালতি পানি আনালেন এবং তাতে ঢেলে দিলেন।

আবূ মূসা (আশআরী) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুমিন মুমিনের জন্য ইমারাত সদৃশ, যার একাংশ অন্য অংশকে মযবূত করে। এরপর তিনি (হাতের) আঙ্গুলগুলো (অন্য হাতের) আঙ্গুলে (এ ফাকে) ঢুকালেন।

তখন নবী (ﷺ) উপবিষ্ট ছিলেন। ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি কিছু প্রশ্ন করার জন্য কিংবা কোন প্রয়োজনে আসলো। তখন নবী (ﷺ) আমাদের দিকে ফিরে চাইলেন এবং বললেনঃ তোমরা তার জন্য (তাকে কিছু দেয়ার) সুপারিশ করো। এতে তোমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। আল্লাহ তার নবীর দোয়া অনুসারে যা ইচ্ছে তা করেন।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এর কাছে কোন ভিখারী অথবা অভাবগ্রস্ত লোক এলে তিনি বলতেনঃ তোমরা সুপারিশ করো, তাহলে তোমরা সাওয়াব পাবে। অবশ্য আল্লাহ তাআলা তার রাসূলের দোয়া অনুযায়ী যা ইচ্ছে তা করেন।

ইবন মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবন আমর-এর নিকট গেলাম, যখন তিনি মুআবিয়াহ-এর সাথে কুফায় পদার্পণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথা উল্লেখ করতেন। অতঃপর বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বভাবগতভাবে অশালীন ছিলেন না, আর ইচ্ছে করে অশালীন কথা বলতেন না। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম স্বভাবে যে সবচেয়ে উত্তম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। একবার একদল ইয়াহূদী নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললঃ আস্-সামু 'আলাইকুম! (তোমার মরণ হোক)। আয়িশাহ বললেনঃ তোমাদের উপরই এবং তোমাদের উপর আল্লাহর লানত ও গযব পড়ুক। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ হে আয়িশাহ! একটু থামো। নম্রতা অবলম্বন করা তোমাদর কর্তব্য। রূঢ়তা ও অশালীনতা বর্জন করো। আয়িশাহ বললেনঃ তারা যা বলেছে, তা কি আপনি শোনেননি? তিনি বললেনঃ আমি যা বললাম, তুমি কি তা শোননি? কথাটি তাদের উপরই ফিরিয়ে দিয়েছি। সুতরাং তাদের ব্যাপারে (আল্লাহর কাছে) আমার কথাই কবূল হবে আর আমার সম্পর্কে তাদের কথা কবূল হবে না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) গালি-গালাজকারী, অশালীন ও লানতকারী ছিলেন না। তিনি আমাদের কারো উপর অসন্তুষ্ট হলে, শুধু এতটুকু বলতেন, তার কী হলো। তার কপাল ধূলিমলিন হোক।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইল। তিনি লোকটিকে দেখে বললেনঃ সে সমাজের নিকৃষ্ট লোক এবং সমাজের দুষ্ট সন্তান। এরপর সে যখন এসে বলল, তখন নবী (ﷺ) আনন্দ সহকারে তার সাথে মেলামেশা করলেন। লোকটি চলে গেলে আয়িশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যখন আপনি লোকটিকে দেখলেন তখন তার ব্যাপারে এমন বললেন, পরে তার সাথে আপনি আনন্দচিত্তে সাক্ষাৎ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে আয়িশাহ! তুমি কখন আমাকে অশালীন দেখেছ? কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার দুষ্টামির কারণে মানুষ তাকে ত্যাগ করে।

আনাস বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর, সর্বাপেক্ষা অধিক দানশীল এবং লোকেদের মধ্যে সর্বাধিক সাহসী ছিলেন। একবার রাত্রিবেলা (বিরাট শব্দে) মদিনাবাসীরা ভীত-শংকিত হয়ে পড়ে। তাই লোকেরা সেই শব্দের দিকে রওনা হয়। তখন তারা নবী (ﷺ)-কে সম্মুখেই পেলেন, তিনি সে শব্দের দিকে লোকেদের আগেই বের হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলতে লাগলেনঃ তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা ভয় পেয়ো না। এ সময় তিনি আবূ ত্বলহা-এর জিন বিহীন অশ্বোপরি সাওয়ার ছিলেন। আর তার স্কন্ধে একখানা তলোয়ার ঝুলছিল। এরপর তিনি বলতেনঃ এ ঘোড়াটিকে তো আমি সমুদ্রের মত (দ্রুত ধাবমান) পেয়েছি। অথবা বললেনঃ এ ঘোড়াটিতো একটি সমুদ্র।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর নিকট কোন জিনিস চাওয়া হলে, তিনি কক্ষনো 'না' বলেননি।

মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমরা আবদুল্লাহ ইবন আমর-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করছিলেন। তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বভাবগতভাবে অশালীন ছিলেন না এবং তিনি ইচ্ছা করে কাউকে অশালীন কথা বলতেন না। তিনি বলতেনঃ তোমাদের মধ্যে যার স্বভাব-চরিত্র উত্তম, সেই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক মহিলা নবী (ﷺ) এর নিকট একখানা বুরদাহ্ নিয়ে আসলেন। সাহল লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনারা কি জানেন বুরদাহ্ কী? তারা বললেনঃ তা চাদর। সাহল বললেনঃ এটি এমন চাদর যা ঝালরসহ বোনা। এরপর সেই মহিলা আরয করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে এটি পরার জন্য দিলাম। নবী (ﷺ) চাদরখানা এমনভাবে গ্রহণ করলেন, যেন তার এটির দরকার ছিল। এরপর তিনি এটি পরলেন। এরপর সাহাবীদের মধ্যে এক ব্যক্তি সেটি তার দেহে দেখে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! এটা কতই না সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন। নবী (ﷺ) বললেনঃ 'হা' (দিয়ে দেব)। নবী (ﷺ) উঠে চলে গেলে, অন্যান্য সাহাবীরা তাকে দোষারোপ করে বললেনঃ তুমি ভাল কাজ করোনি। যখন তুমি দেখলে যে, এটি তার প্রয়োজন ছিল বলেই তিনি চাদরখানা এমনভাবে গ্রহণ করেছেন। এরপরও তুমি সেটা চাইলে। অথচ তুমি অবশ্যই জানো যে, তার কাছে কোন জিনিস চাওয়া হলে তিনি কাউকে কখনো বিমুখ করেন না। তখন সেই ব্যক্তি বললঃ যখন নবী (ﷺ) এটি পরেছেন, তখন তার বারাকাত লাভের জন্যই আমি এ কাজ করেছি, যাতে এ চাদরে আমার কাফন হয়।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যখন কিয়ামত সন্নিকট হচ্ছে, আমল কমে যাবে, অন্তরে কৃপণতা ঢেলে দেয়া হবে এবং হারজ বেড়ে যাবে। সহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হারজ' কী? তিনি বললেনঃ হত্যা, হত্যা।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দশটি বছর নবী (ﷺ) এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কক্ষনো আমার প্রতি উঃ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?

আসওয়াদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলামঃ নবী (ﷺ) নিজ গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেনঃ তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন সালাতের সময় উপস্থিত হত, তখন উঠে সালাতে চলে যেতেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যখন আল্লাহ তাআলা কোন বান্দাকে ভালবাসেন, তখন তিনি জিবরীল-কে ডেকে বলেন, আল্লাহ তাআলা অমুক বান্দাকে ভালবাসেন, তুমিও তাকে ভালবাসবে। তখন জিবরীল তাকে ভালবাসেন এবং তিনি আসমানবাসীদের ডেকে বলেন, আল্লাহ তাআলা অমুককে ভালবাসেন, অতএব তোমরাও তাকে ভালবাসবে। তখন আসমানবাসীরাও তাকে ভালবাসে। তারপর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি করা হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না সে কোন মানুষকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে ভালবাসবে, আর যতক্ষণ না সে যে কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে উদ্ধার করেছেন, তার দিকে ফিরে যাবার চেয়ে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অধিক প্রিয় মনে না করবে এবং যতক্ষণ না আল্লাহ ও তার রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় না হবেন।

আবদুল্লাহ ইবন যাম্'আহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মানুষের বায়ু নির্গমনে কাউকে হাসতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরও বলেছেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে ষাঁড় পিটানোর মত পিটাবে? পরে হয়ত, সে আবার তার সাথে জড়িয়ে ধরবে (রাত কাটাবে)। হিশাম থেকে বর্ণনা করেন, 'ষাঁড় পিটানোর' স্থলে 'দাসকে বেত্রাঘাত করার ন্যায়'।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মিনায় (খুতবার কালে) জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান আজ কোন দিন? সকলেই বললেনঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি জানেন। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ আজ সম্মানিত দিন। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা জান, এটি কোন শহর? সবাই জবাব দিলেনঃ আল্লাহ তা তার রাসূলই অধিক জানেন। তখন তিনি বললেনঃ এটি সম্মানিত শহর। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান, এটা কোন মাস? তারা বললেনঃ আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জানেন। তখন তিনি বললেনঃ এটা সম্মানিত মাস। তারপর তিনি বললেনঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদের পরস্পরের) জান, মাল ও ইজ্জতকে হারাম করেছেন, যেমন হারাম তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরী।

আবূ যার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ একজন অপর জনকে ফাসিক বলে যেন গালি না দেয় এবং একজন অন্যজনকে কাফির বলে অপবাদ না দেয়। কেননা, অপরজন যদি তা না হয়, তবে সে অপবাদ তার নিজের উপরই আপতিত হবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত।তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অশালীন, লানতকারী ও গালিদাতা ছিলেন না। তিনি কাউকে তিরস্কার করার সময় শুধু এটুকু বলতেনঃ তার কী হলো? তার কপাল ধূলিমলিন হোক।

সাবিত ইবন যাহ্‌হাক হতে বর্ণিত। তিনি গাছের নীচে বাই'আত গ্রহণকারীদের অন্যতম সাহাবী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দলের উপর কসম খাবে, সে ঐ দলেরই শামিল হয়ে যাবে। আর মানুষ যে জিনিসের মালিক নয়, এমন জিনিসের নযর আদায় করা তার উপর ওয়াজিব নয়। আর কোন লোক দুনিয়াতে যে জিনিস দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন সে জিনিস দিয়েই তাকে আযাব দেয়া হবে। কোন লোক কোন মুমিনের উপর অভিশাপ দিলে, তা তাকে হত্যা করারই শামিল হবে। আর কোন মুমিনকে কাফির বললে, তাও তাকে হত্যা করার মতই হবে।

সুলাইমান ইবন সুরাদ নামক নবী (ﷺ) এর এক সাহাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ দু'জন লোক নবী (ﷺ) এর সম্মুখে পরস্পর গালাগালি করছিল। তাদের একজন এতই রাগান্বিত হয়েছিল যে, তার চেহারা ফুলে বিগড়ে গিয়েছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি অবশ্যই একটিই কালেমা জানি। সে ঐ কালেমাটি পড়লে তার রাগ চলে যেত। তখন এক লোক তার কাছে গিয়ে নবী (ﷺ) এর ঐ কথাটি তাকে জানালো আর বললো যে, তুমি শয়তান থেকে আশ্রয় চাও। তখন সে বললোঃ আমার মধ্যে কি কোন রোগ দেখতে পাচ্ছ? আমি কি পাগল? চলে যাও তুমি।

উবাদাহ ইবন সমিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লোকেদের 'লাইলাতুল কাদর' সম্বন্ধে অবহিত করার জন্য বের হলেন। তখন দু'জন মুসলিম ঝগড়া করছিলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি 'লাইলাতুল কাদর' সম্পর্কে তোমাদের খবর দিতে বেরিয়ে এসেছিলাম। এ সময় অমুক, অমুক ঝগড়া করছিল। এজন্য ঐ খবরের 'ইলম' আমার থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। এটা হয়ত তোমাদের জন্য ভালোই হবে। অতএব তোমরা তা রমাযানের শেষ দশকের নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে খোজ করবে।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ তার উপর একখানা চাদর ও তার গোলামের গায়ে একখানা চাদর দেখে বললাম, যদি আপনি ঐ চাদরটি নিতেন ও পরতেন, তাহলে আপনার এক জোড়া হয়ে যেত আর গোলামকে অন্য কাপড় দিয়ে দিতেন। তখন আবূ যার বললেনঃ একদিন আমার ও আরেক লোকের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। তার মা ছিল জনৈকা অনারব মহিলা। আমি তার মা তুলে গালি দিলাম। তখন লোকটি নবী (ﷺ) -এর নিকট তা বলল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি অমুককে গালি দিয়েছ? আমি বললামঃ হা। তিনি বললেনঃ তুমি কি তার মা তুলে গালি দিয়েছ? আমি বললামঃ হা। তিনি বললেনঃ নিশ্চই তুমি তো এমন লোক যার মধ্যে জাহিলী যুগের স্বভাব আছে। আমি বললামঃ এখনো? এ বৃদ্ধ বয়সেও? তিনি বললেনঃ হা! তারা তো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা ওদের তোমাদের অধীন করেছেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যার ভাইকে তার অধীন করে দেন, সে নিজে যা খায়, তাকেও যেন তা খাওয়ায়। সে নিজে যা পরে, তাকেও যেন তা পরায়। আর তার উপর যেন এমন কোন কাজ না চাপায়, যা তার শক্তির বাইরে। আর যদি তার উপর এমন কঠিন ভার দিতেই হয়, তাহলে সে নিজেও যেন তাকে সাহায্য করে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) আমাদের নিয়ে যুহরের সালাত দু'রাকাত আদায় করে সালাম ফিরালেন। তারপর সিজদার জায়গার সম্মুখে রাখা একটা কাঠের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার উপর তার এক হাত রাখলেন। সেদিন লোকেদের মাঝে আবূ বাকর, উমার-ও হাযির ছিলেন। তারা তার সঙ্গে কথা বলতে ভয় পেলেন। কিন্তু জলদি করে (কিছু) লোক বেরিয়ে গিয়ে বলতে লাগলঃ সালাত খাটো করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন ছিল, যাকে নবী (ﷺ) 'যুল্ ইয়াদাইন' লম্বা হাত বিশিষ্ট) বলে ডাকতেন, সে বললঃ হে আল্লাহর নবী! আপনি কি ভুল করেছেন, না সালাত কম করা হয়েছে? তিনি বললেনঃ আমি ভুলেও যাইনি এবং (সালাত) কমও করা হয়নি। তারা বললেনঃ বরং আপনিই ভুলে গেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেনঃ 'যুল্ ইয়াদাইন' ঠিকই বলেছে। তারপর তিনি উঠে দাড়িয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন ও সালাম ফিরালেন। এরপর 'তাকবীর' বলে আগের সিজদার মত অথবা তাথেকে লম্বা সিজদা করলেন। তারপর আবার মাথা তুললেন এবং তাকবীর বললেন এবং আগের সিজদার মত অথবা তাথেকে লম্বা সিজদা করলেন। এরপর মাথা উঠালেন এবং তাকবীর বললেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দু'টি কবরের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ নিশ্চই এ দু'জন কবরবাসীকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন গুনাহের কারণে কবরে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। এই কবরবাসী প্রস্রাব করার সময় সতর্ক থাকত না। আর ঐ কবরবাসী গীবত করে বেড়াত। এরপর তিনি খেজুরের একটি কাঁচা ডাল আনিয়ে সেটি দু'টুকরো করে এক টুকরো এক কবরের উপর এবং এক টুকরো অন্য কবরের উপর গেড়ে দিলেন। তারপর বললেনঃ এ ডালের টুকরো দু'টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের শাস্তি কমিয়ে দিবেন।

আবূ উসাইদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আনসারদের গৃহগুলোর মধ্যে নাজ্জার গোত্রের গৃহগুলোই উৎকৃষ্ট।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট আসার অনুমতি চাইলে তিনি বললেনঃ তাকে অনুমতি দাও। সে বংশের নিকৃষ্ট ভাই অথবা বললেনঃ সে গোত্রের নিকৃষ্ট সন্তান। লোকটি ভিতরে এলে তিনি তার সাথে নম্রতার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ লোকের ব্যাপারে যা বলার তা বলেছেন। পরে আপনি আবার তার সাথে নম্রতার সাথে কথাবার্তা বললেন। তখন তিনি বললেনঃ হে আয়িশাহ্! নিশ্চই সবচেয়ে খারাপ লোক সে-ই যার অশালীনতা থেকে বাচার জন্য মানুষ তার সংসর্গ পরিত্যাগ করে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) মদিনার কোন বাগানের বাইরে গেলেন। তখন তিনি এমন দু'জন লোকের শব্দ শুনলেন, যাদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছিল। তিনি বললেনঃ তাদের দু'জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে। তবে বড় গুনাহের কারণে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। আর তা হলো কবীরা গুনাহ। এদের একজন প্রস্রাবের সময় সতর্ক থাকত না। আর অন্য ব্যক্তি চোগলখোলী করে বেড়াতো। তারপর তিনি একটা কাঁচা ডাল আনিয়ে তা ভেঙ্গে দু' টুকরো করে, এক কবরে এক টুকরো আর অন্য কবরে এক টুকরো গেড়ে দিলেন এবং বললেনঃ দু'টি যতক্ষণ পর্যন্ত না শুকাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের আযাব হালকা করে দেয়া হবে।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, চোগলখোর কক্ষনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোক মিথ্যা কথা এবং সে অনুসারে কাজ করা আর মূর্খতা পরিহার করলো না, আল্লাহর নিকট তার পানাহার বর্জনের কোন প্রয়োজন নেই।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন তুমি আল্লাহর কাছে ঐ লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু'মুখো। সে এদের সম্মুখে এক রূপ নিয়ে আসতো, আর ওদের সম্মুখে অন্য রূপে আসত।

ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (গনীমত) ভাগ করলেন। তখন আনসারদের মধ্য থেকে এক (মুনাফিক) লোক বললঃ আল্লাহর কসম! এ কাজে মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর সন্তুষ্টি চাননি। তখন আমি এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথা জানালাম। এতে তার চেহারার রং পাল্টে গেল। তিনি বললেনঃ আল্লাহ মূসা -এর উপর দয়া করুন। তাকে এর থেকেও অনেক অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছে; তবুও তিনি ধৈর্য অবলম্বন করেছেন।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) এক লোককে অন্য লোকের প্রশংসা করতে শুনলেন এবং সে প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করল। তখন তিনি বললেনঃ তোমরা তো লোকটিকে মেরে ফেললে, কিংবা বললেনঃ লোকটির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিলে।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এর সম্মুখে এক ব্যক্তির আলোচনা হল। তখন এক লোক তার খুব প্রশংসা করলো। নবী (ﷺ) বললেনঃ আফসোস তোমার জন্য! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গলা কেটে ফেললে। এ কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। (তারপর তিনি বললেন) যদি কারো প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে, আমি তার ব্যাপারে এমন, এমন ধারণা পোষণ করি, যদি তার এরূপ হবার কথা মনে করা হয়। তার প্রকৃত হিসাব গ্রহণকারীতো হলেন আল্লাহ, আর আল্লাহর তুলনায় কেউ কারো পবিত্রতা বর্ণনা করবে না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইযার সম্পর্কে কঠিন আযাবের কথা উল্লেখ করলেন। তখন আবূ বাকর বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার লুঙ্গিও একদিক দিয়ে ঝুলে পড়ে। তিনি বললেন, তুমি তাদের মধ্যে শামিল নও।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এত এত দিন এমন অবস্থায় অতিবাহিত করছিলেন যে, তার খেয়াল হতো যেন তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, অথচ তিনি মিলিত হননি। আয়িশাহ বলেন, অতঃপর তিনি আমাকে বললেনঃ হে আয়িশাহ! আমি যে ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম, সে বিষয়ে আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। (আমি স্বপ্নে দেখলাম) আমার কাছে দু'জন লোক আসল। একজন বসলো আমার পায়ের কাছে এবং আরেকজন মাথার কাছে। পায়ের কাছে বসা ব্যক্তি মাথার কাছে বসা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলঃ এ ব্যক্তির অবস্থা কী? সে বললঃ তাকে যাদু করা হয়েছে। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ তাকে কে যাদু করেছে? সে বললঃ লাবীদ্ ইবন আ'সাম। সে আবার জিজ্ঞেস করলঃ কিসের মধ্যে? সে বলল, নর খেজুর গাছের খোসার ভিতরে তার চিরুনীর এক টুকরা ও আচড়ানো চুল ঢুকিয়ে দিয়ে 'যারওয়ান' কূপের মধ্যে একটা পাথরের নীচে রেখেছে। এরপর নবী (ﷺ) (সেখানে) গিয়ে দেখে বললেনঃ এ সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। সেখানের খেজুর গাছের মাথাগুলো যেন শয়তানের মাথা এবং সে কূপের পানি যেন মেহদী ভেজা পানি। এরপর নবী (ﷺ) এর হুকুমে তা কূপ থেকে বের করা হলো। আয়িশাহ বলেন, তখন আমি বললাম। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন এটি প্রকাশ করলেন না? নবী (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহ তো আমাকে আরোগ্য করে দিয়েছেন, আর আমি মানুষের নিকট কারো দুষ্কর্ম ছড়িয়ে দেয়া পছন্দ করি না। আয়িশাহ বলেনঃ লাবীদ্ ইবন আ'সাম ছিল ইয়াহূদীদের মিত্র বনূ যুরায়কের এক ব্যক্তি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পর হিংসা পোষণ করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোন মুসলিমের জন্য তিন দিনের অধিক তার ভাইকে ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয়।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা অনুমান থেকে বেচে চলো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ খুজে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পরকে ধোকা দিও না, আর পরস্পরকে হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করো না। বরং সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ অমুক অমুক ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে কিছু জানে বলে আমি ধারণা করি না। রাবী লায়স বর্ণনা করেন যে, লোক দু'টি মুনাফিক ছিল।

ইয়াহ্ইয়া ইবন বুকায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লায়স আমাদের কাছে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেন। (এতে রয়েছে) আয়িশাহ বলেন, একদিন নবী (ﷺ) আমার নিকট এসে বললেনঃ হে আয়িশাহ! অমুক অমুক লোক আমাদের দ্বীন, যার উপর আমরা রয়েছি, সে সম্পর্কে কিছু জানে বলে আমি ধারণা করি না।

আবূ হুরাইরা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমার সকল উম্মাতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চই এ বড়ই অন্যায় যে, কোন লোক রাতের বেলা অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন। কিন্তু সে সকাল হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটাল যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার উপর আল্লাহর দেয়া আবরণ খুলে ফেলল।

সফ্ওয়ান ইবন মুহরিয হতে বর্ণিত যে, এক লোক ইবন উমার-কে জিজ্ঞেস করলঃ আপনি 'নাজওয়া' (কিয়ামতের দিন আল্লাহ ও তার মুমিন বান্দার মধ্যে গোপন আলোচনা)। ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী বলতে শুনেছেন? বললেন, তিনি বলেছেনঃ তোমাদের এক ব্যক্তি তার প্রতিপালকের এত কাছাকাছি হবে যে, তিনি তার উপর তার নিজস্ব আবরণ টেনে দিয়ে দু'বার জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি এই এই কাজ করেছিলে? সে বলবেঃ হা। আবার তিনি জিজ্ঞেস করবেনঃ তুমি এই এই কাজ করেছিলে? সে বলবেঃ হা। এভাবে তিনি তার স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবেন। এরপর বলবেনঃ আমি দুনিয়াতে তোমার এগুলো লুকিয়ে রেখেছিলাম। আজ আমি তোমার এসব গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম।

হারিসাহ্ ইবন ওহাব খুযায়ী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি কি তোমাদের জান্নাতীদের সম্পর্কে জ্ঞাত করবো না? (তারা হলেন) ঐ সকল লোক যারা অসহায় এবং যাদের তুচ্ছ মনে করা হয়। তারা যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, তাহলে তা তিনি নিশ্চই পুরা করে দেন। আমি কি তোমাদের জাহান্নামীদের সম্পর্কে জ্ঞাত করবো না? তারা হলোঃ কর্কশ স্বভাব, শক্ত হৃদয় ও অহংকারী।

মুহাম্মাদ ইবন ঈসা সূত্রে আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মদিনাবাসীদের কোন এক দাসীও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হাত ধরে যেখানে চাইত নিয়ে যেত। আর তিনিও তার সাথে চলে যেতেন।

আওফ ইবন মালিক ইবন তুফায়ল আয়িশাহ-এর বৈপিত্রেয় ভ্রাতুষ্পুত্র হতে বর্ণিত। আয়িশাহ-কে জানানো হলো যে, তার কোন বিক্রীর কিংবা দান করা সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র বলেছেনঃ আল্লাহর কসম! আয়িশাহ অবশ্যই বিরত থাকবেন, নতুবা আমি নিশ্চই তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করবো। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ সত্যিই কি তিনি এ কথা বলেছেন? তারা বললেনঃ হা। তখন আয়িশাহ বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি আমার উপর মানৎ করে নিলাম যে, আমি ইবন যুবায়রের সাথে আর কখনও কথা বলবো না। যখন এ বর্জনকাল লম্বা হলো, তখন ইবন যুবায়র আয়িশাহ-এর নিকট সুপারিশ পাঠালেন। তখন তিনি বললেনঃ না, আল্লাহর কসম! এ ব্যাপারে আমি কখনো কোন সুপারিশ গ্রহণ করব না। আর আমার মানৎও ভাঙ্গব না। এভাবে যখন বিষয়টি ইবন যুবায়র-এর জন্য দীর্ঘ হতে লাগলো, তখন তিনি যহুরা গোত্রের দু'ব্যক্তি মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ ও আবদুর রহমান ইবন আসওয়াদ ইবন আবদ ইয়াগুসের সাথে আলোচনা করলেন। তিনি তাদের দু'জনকে বললেনঃ আমি তোমাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি যে, তোমরা দু'জন আমাকে আয়িশাহ-এর কাছে নিয়ে যাও। কারণ আমার সাথে তার বিচ্ছিন্ন থাকার মানৎ জায়িয নয়। তখন মিসওয়ার ও আবদুর রহমান উভয়ে চাদর দিয়ে ইবন যুবায়রকে ঢেকে নিয়ে এলেন এবং উভয়ে আয়িশাহ-এর কাছে অনুমতি চেয়ে বললেনঃ আসসালামু আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু' আমরা কি ভেতরে আসতে পারি? আয়িশাহ বললেনঃ আপনারা ভেতরে আসুন। তারা বললেনঃ আমরা সবাই? তিনি বললেনঃ হা, তোমরা সবাই প্রবেশ কর। তিনি জানতেন না যে, এদের সঙ্গে ইবন যুবায়র রয়েছেন। তাই যখন তারা ভেতরে প্রবেশ করলেন, তখন ইবন যুবায়র পর্দার ভেতর ঢুকে গেলেন এবং আয়িশাহ-কে জড়িয়ে ধরে, তাকে আল্লাহর কসম দিতে লাগলেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন। তখন মিসওয়ার ও আবদুর রহমান-ও তাকে আল্লাহর কসম দিতে শুরু করলেন। তখন আয়িশাহ ইবন যুবায়র-এর সঙ্গে কথা বললেন এবং তার ওযর গ্রহণ করলেন। আর তারা বলতে লাগলেনঃ আপনি তো নিশ্চই জানেন যে, নবী (ﷺ) সম্পর্ক বর্জন করতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ কোন মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন রাখা অবৈধ। যখন তারা আয়িশাহ -কে অধিক বুঝাতে ও চাপ দিতে লাগলেন, তখন তিনিও তাদের বুঝাতে ও কাঁদতে লাগলেন এবং বললেনঃ আমি 'মানৎ' করে ফেলেছি। আর মানৎ তো কঠিন ব্যাপার। কিন্তু তারা বারবার চাপ দিতেই থাকলেন, অবশেষে তিনি ইবন যুবায়র-এর সাথে কথা বললেন এবং তার নযরের জন্য (কাফফারা হিসেবে) চল্লিশ জন গোলাম মুক্ত করে দিলেন। এর পরে, যখনই তিনি তার মানতের কথা মনে করতেন তখন তিনি এত অধিক কাঁদতেন যে, তার চোখের পানিতে তার ওড়না ভিজে যেত।

পূর্বের হাদিসের মতই (৬০৭৩)।

পূর্বের হাদিসের মতই (৬০৭৩)।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ো না, হিংসা করো না এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন থেকো না। আর তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ও পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাই থেকে তিন দিনের অধিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে থাকবে।

আবূ আইউব আনসারী হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কোন লোকের জন্য বৈধ নয় যে, সে তার ভাই-এর সাথে তিন দিনের অধিক এমনভাবে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে যে, দু'জনে দেখা হলেও একজন এদিকে আরেকজন ওদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দিবে, সেই উত্তম লোক।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন (একদা) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমি তোমার রাগ ও খুশী উভয়টাই বুঝতে পারি। আয়িশাহ বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি তা কীভাবে বুঝে নেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ যখন তুমি খুশী থাক, তখন তুমি বলঃ হা, মুহম্মাদের প্রতিপালকের শপথ! আর যখন তুমি রাগান্বিত হও, তখন তুমি বলে থাকঃ না, ইব্রাহীমের প্রতিপালকের শপথ! আয়িশাহ বললেন, আমি বললাম, হা। আমিতো কেবল আপনার নামটি পরিহার করি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার জ্ঞান হবার পর থেকেই আমি আমার বাবা-মাকে ইসলামের অন্তর্ভুক্তই পেয়েছি। আমাদের উপর এমন কোন দিন যায়নি, যে দিনের দু' প্রান্তে সকালে ও বিকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিকট আসতেন না। একদিন দুপুর বেলা আমরা আবূ বাকর-এর কক্ষে উপবিষ্ট ছিলাম। একজন বলে উঠলেনঃ এই যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)! তিনি এমন সময় এসেছেন, যে সময় তিনি আমাদের এখানে আসেন না। আবূ বাকর বললেনঃ কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই তাকে এ মুহূর্তে নিয়ে এসেছে। নবী (ﷺ) বললেনঃ আমাকে (মক্কা থেকে) বহির্গমনের আদেশ দেয়া হয়েছে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, একবার নবী (ﷺ) এক আনসার পরিবারের সাথে দেখা করতে গেলেন, অতঃপর তিনি তাদের সেখানে খাবার খেলেন। যখন তিনি বেরিয়ে আসার ইচ্ছে করলেন, তখন ঘরের এক স্থানে (সালাতের জন্য) বিছানা পাতার আদেশ দিলেন। তখন তার জন্য পানি ছিটিয়ে একটা চাটাই বিছিয়ে দেয়া হলো। তিনি সেটির উপর সালাত আদায় করলেন এবং তাদের জন্য দোয়া করলেন।

ইয়াহ্ইয়া ইবন আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত যে, সালিত ইবন আবদুল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ 'ইস্তাবরাক কী'? আমি বললাম, তা মোটা ও সুন্দর রেশমী কাপড়। তিনি বললেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবন উমারকে বলতে শুনেছি যে, উমার এক লোকের গায়ে একজোড়া মোটা রেশমী কাপড় দেখলেন। তখন তিনি সেটা নিয়ে নবী (ﷺ) এর খিদমাতে এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এটি কিনে নিন। যখন আপনার নিকট কোন প্রতিনিধি দল আসবে, তখন আপনি এটি পরবেন। তিনি বললেনঃ রেশমী কাপড় কেবল ঐ লোকই পরবে, যার আখিরাতে) কোন অংশ নেই। এরপর বেশ কিছুদিন পার হবার পর নবী (ﷺ) উমার-এর নিকট এরূপ একজোড়া কাপড় পাঠালেন। তখন তিনি সেটি নিয়ে নবী (ﷺ) এর খিদমতে এসে বললেনঃ আপনি এটা আমার নিকট পাঠালেন, অথচ নিজেই এ জাতীয় কাপড় সম্পর্কে যা বলার তা বলেছিলেন। তিনি বললেনঃ আমি তো এটা একমাত্র এ জন্যে তোমার নিকট পাঠিয়েছি, যেন তুমি এর বদলে কোন মাল সংগ্রহ করতে পার।

আনাস হতে বর্ণিত। আবদুর রহমান ইবন আওফ আমাদের নিকট আসলে নবী (ﷺ) তার ও সা'দ ইবন রাবী-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন জুড়ে দেন। তারপর নবী (ﷺ) তার বিয়ের পর তাকে বললেনঃ তুমি 'ওয়ালিমা' করো, কমপক্ষে একটি ছাগল দিয়ে হলেও।

আসিম হতে বর্ণিত যে, আমি আনাস ইবন মালিক-কে জিজ্ঞেস করলাম আপনি জানেন কি নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ইসলামে প্রতিশ্রুতি নেই? তিনি বললেনঃ নবী (ﷺ) তো আমার ঘরেই কুরায়শ আর আনসারদের মাঝে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির বন্ধন জুড়ে দেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, রিফাআ কুরাযী তার স্ত্রীকে তালাক দেন এবং অকাট্য তালাক দেন। এরপর আবদুর রহমান ইবন যুবায়র তাকে বিয়ে করেন। পরে তিনি নবী (ﷺ) এর কাছে এসে বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি রিফাআর কাছে ছিলেন এবং রিফাআ তাকে শেষ তিন তালাক দিয়ে দেন এবং তাকে আবদুর রহমান ইবন যুবায়র বিয়ে করেন। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! এর কাছে তো কেবল এই কাপড়ের মত আছে। (এ কথা বলে) তিনি তার ওড়নার আচল ধরে উঠালেন। রাবী বলেনঃ তখন আবূ বাকর নবী (ﷺ) এর নিকট উপবিষ্ট ছিলেন এবং সাঈদ ইবন আ'সও ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি লাভের জন্য হুজরার দরজার কাছে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন সা'দ আবূ বাকর-কে উচ্চঃস্বরে ডেকে বললেনঃ হে আবূ বাকর! আপনি এই স্ত্রী লোকটিকে কেন ধমক দিচ্ছেন না, যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সামনে (প্রকাশ্যে) এসব কথাবার্তা বলছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেবল মুচকি হাসছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ সম্ভবতঃ তুমি আবার রিফাআ' এর নিকট ফিরে যেতে চাও। তা হবে না। যতক্ষণ না তুমি তার এবং সে তোমার মিলনের আস্বাদ গ্রহণ করবে।

ইসমাঈল ... সা'দ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন উমার ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট (প্রবেশের) অনুমতি চাইলেন। তখন তার নিকট কুরাইশের কয়েকজন মহিলা প্রশ্নাদি করছিলেন এবং তাদের আওয়াজ তার আওয়াজের চেয়ে উচ্চ ছিল। যখন উমার অনুমতি চাইলেন, তখন তারা জলদি পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। নবী (ﷺ) তাকে অনুমতি দেয়ার পর যখন তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন, তখন নবী (ﷺ) হাসছিলেন। উমার বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে হাসি মুখে রাখুন; হে আল্লাহর রাসূল! তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ আমার নিকট যে সব মহিলা ছিলেন, তাদের প্রতি আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, তারা তোমার আওয়াজ শোনা মাত্রই জলদি পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। উমার বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! এদের ভয় করার ব্যাপারে আপনার হকই বেশি। এরপর তিনি মহিলাদেরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে নিজের জানের দুশমনরা! তোমরা কি আমাকে ভয় কর, আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ভয় কর না? তারা জবাব দিলেনঃ আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে অনেক অধিক শক্ত ও কঠোর লোক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে ইবন খাত্তাব! সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন, যখনই শয়তান পথ চলতে চলতে তোমার সামনে আসে, তখনই সে তোমার রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য রাস্তা ধরে।

কুতাইবাহ ইবন সাঈদ ... আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তায়েফে (অবরোধ করে) ছিলেন, তখন একদিন তিনি বললেনঃ ইনশাআল্লাহ আগামীকাল আমরা ফিরে যাব। নবী (ﷺ) এর কয়েকজন সাহাবী বললেনঃ আমরা তায়েফ জয় না করা পর্যন্ত এ স্থান ত্যাগ করব না। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তবে সকাল হলেই তোমরা যুদ্ধে নেমে পড়বে। রাবী বলেনঃ তারা ভোর থেকেই তাদের সাথে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু করলেন। এতে তাদের বহুলোক আহত হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ ইনশাআল্লাহ আমরা আগামীকাল ফিরে চলে যাবো এবং তারা সবাই নিশ্চুপ থাকলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হেসে দিলেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললঃ আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। আমি (রমাযানে দিনে) আমার স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম করে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ তুমি একটি গোলাম আযাদ করে দাও। সে বললঃ আমার গোলাম নেই। তিনি বললেনঃ তাহলে এক নাগাড়ে দু'মাস সিয়াম পালন কর। সে বললঃ এতেও আমি অপারগ। নবী (ﷺ) বললেনঃ তবে ষাটজন মিসকীনকে খাদ্য দাও। সে বললঃ তারও ব্যবস্থা নাই। তখন এক ঝুড়ি খেজুর এল। নবী (ﷺ) বললেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? এইটি নিয়ে সদাকাহ করে দাও। লোকটা বললঃ আমার চেয়েও অধিক অভাবগ্রস্ত আবার কে? আল্লাহর কসম! মদিনার দু' প্রান্তের মাঝে এমন কোন পরিবার নেই, যে আমাদের থেকে অধিক অভাবগ্রস্ত। তখন নবী (ﷺ) এমনভাবে হেসে দিলেন যে, তার চোয়ালের দাতগুলো প্রকাশ পেল এবং তিনি বললেনঃ তাহলে এখন এটা তোমরাই খাও।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে হাটছিলাম। তখন তার গায়ে একখানা গাঢ় পাড়যুক্ত নাজরানী চাদর ছিল। এক বেদুঈন তাকে পেয়ে চাদরখানা ধরে খুব জোরে টান দিল। আমি নবী (ﷺ) এর কাঁধের উপর তাকিয়ে দেখলাম যে, জোরে চাদরখানা টানার কারণে তার কাঁধে চাদরের পাড়ের দাগ বসে গেছে। তারপর বেদুঈনটি বললঃ হে মুহাম্মাদ! তোমার কাছে আল্লাহর দেয়া যে সম্পদ আছে, তাথেকে আমাকে দেয়ার আদেশ কর। তখন নবী (ﷺ) তার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন এবং তাকে কিছু দান করার আদেশ করলেন।

জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে নবী (ﷺ) আমাকে তার কাছে যেতে বাধা দেননি। তিনি আমাকে দেখলেই আমার সামনে মুচকি হাসতেন।

একদিন আমি অভিযোগ করে বললামঃ আমি ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে আকড়ে ধরে থাকতে পারি না। তখন তিনি আমার বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন। হে আল্লাহ! তাকে দৃঢ়চিত্ত করুন এবং তাকে সঠিক পথের সন্ধানদাতা ও সৎপথপ্রাপ্ত বানিয়ে দিন।

যাইনাব বিনত উম্মু সালামাহ ... উম্মু সালামা হতে বর্ণিত যে, একবার উম্মু সুলায়ম বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো সত্য কথা বলতে লজ্জা করেন না। মেয়ে লোকের স্বপ্নদোষ হলে তাদেরও কি গোসল করতে হবে? তিনি বললেনঃ হা। যদি সে পানি (বীর্য) দেখতে পায়। তখন উম্মু সালামাহ হেসে দিলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনঃ মেয়ে লোকেরও কি স্বপ্নদোষ হয়? নবী (ﷺ) বললেনঃ তা না হলে, সন্তানের সঙ্গে সাদৃশ্য হয় কীভাবে?

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে এমনভাবে হা করে দেখিনি যে, তার আলা জিহ্বা দেখা যেত। তিনি কেবল মুচকি হাসতেন।

আনাস হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট জুমুআহর দিন মদিনায় এল, যখন তিনি খুতবাহ দিচ্ছিলেন। সে বললঃ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে, আপনি বৃষ্টির জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট দোয়া করুন। তখন তিনি আকাশের দিকে তাকালেন তখন আমরা আকাশে কোন মেঘ দেখলাম না। তখন তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন। এ সময় মেঘ এসে মিলিত হতে লাগলো। তারপর এমন বৃষ্টি হলো যে, মদিনার খাল-নালাগুলো প্রবাহিত হতে লাগল এবং ক্রমাগত পরবর্তী জুমুআহ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে থাকল, মাঝে আর বিরতি হয়নি। পরবর্তী জুমুআহয় যখন নবী (ﷺ) খুতবাহ দিচ্ছিলেন, তখন ঐ ব্যক্তি অথবা অন্য এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, আমরা তো ডুবে গেছি। আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট দোয়া করুন, যেন তিনি আমাদের উপর থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। তখন তিনি হেসে দিলেন এবং দু'বার অথবা তিনবার দোয়া করলেন। হে আল্লাহ! (বৃষ্টি) আশে-পাশে নিয়ে যান, আমাদের উপর নয়। তখন মেঘপুঞ্জ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে মদিনার আশে-পাশে বর্ষণ করতে লাগল। আমাদের উপর আর বর্ষিত হলো না। এতে আল্লাহ তার নবী (ﷺ) এর কারামাত ও তার দোয়া কবূল হবার দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেন।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত করে আর নেকী জান্নাতে পৌছায়। আর মানুষ সত্যের উপর কায়িম থেকে অবশেষে সিদ্দীক-এর দরজা লাভ করে। আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, পাপ তাকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা কথা বলতে বলতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মহামিথ্যাচারী প্রতিপন্ন হয়ে যায়।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মুনাফিকের চিহ্ন তিনটিঃ যখন সে কথা বলে, তখন মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে, তখন তা ভঙ্গ করে, আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তাতে খিয়ানাত করে।

সামুরাহ ইবন জুনদুব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি আজ রাতে (স্বপ্নে), দু'জন লোককে দেখলাম। তারা বললঃ আপনি যে লোকটির গাল চিরে ফেলতে দেখলেন, সে বড়ই মিথ্যাচারী। সে এমন মিথ্যা বলত যে, দুনিয়ার সর্বত্র তা ছড়িয়ে দিত। ফলে, কিয়ামত পর্যন্ত তার সাথে এ রকম ব্যবহার চলতে থাকবে।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, মানুষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে চাল-চলনে, নীতিতে ও চরিত্রে, যার সবচেয়ে অধিক মিল ছিল, তিনি হলেন ইবন উম্মু আব্‌দ। যখন তিনি নিজ ঘর থেকে বের হন, তখন থেকে ঘরে ফিরে আসা পর্যন্ত এ মিল দেখা যায়। তবে তিনি একা নিজ গৃহে কেমন ব্যবহার করেন, তা আমরা জানি না।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ উত্তম বাণী হলো আল্লাহর কিতাব। আর সবচেয়ে উত্তম পথ প্রদর্শন হলো, মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পথ প্রদর্শন।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কষ্টদায়ক কথা শোনার পর আল্লাহ তাআলার চেয়ে বেশি ধৈর্যধারণকারী কেউ বা কোন কিছুই নেই। লোকেরা তার জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, এরপরও তিনি তাদের বিপদ মুক্ত রাখেন এবং রিযিক দান করেন।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা নবী (ﷺ) গানীমাতের মাল বণ্টন করলেন। তখন এক আনসারী ব্যক্তি বললঃ আল্লাহর কসম! এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়নি। তখন আমি বললামঃ জেনে রেখো, আমি নিশ্চই নবী (ﷺ) এর কাছে এ কথা বলব। সুতরাং আমি নবী (ﷺ) এর কাছে আসলাম। তখন তিনি তার সাহাবীগণের মধ্যে ছিলেন। এজন্য তার কাছে কথাটা চুপে চুপে বললাম। এ কথাটি নবী (ﷺ) এর কাছে খুবই কষ্টদায়ক ঠেকল, তার চেহারার রং বদলে গেল এবং তিনি এতই রাগান্বিত হলেন যে, আমি ভাবলাম, হায়! যদি আমি তার কাছে এ খবর না দিতাম, তবে কতই না ভাল হত! এরপর তিনি বললেনঃ মূসা-কে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছে। তারপরও তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার নবী (ﷺ) নিজে কোন কাজ করলেন এবং অন্যদের সেটা করার অনুমতি দিলেন। তা সত্ত্বেও একদল লোক তাথেকে বিরত রইল। এ সংবাদ নবী (ﷺ) এর কাছে পৌছলে তিনি ভাষণ দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসার পর বললেনঃ কিছু লোকের কী হয়েছে, তারা এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে চায়, যা আমি নিজে করছি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর সম্পর্কে তাদের থেকে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে অনেক অধিক তাকে ভয় করি।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ পর্দার অন্তরালের কুমারীদের চেয়েও নবী (ﷺ) অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। যখন তিনি তার কাছে অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন, তখন আমরা তার চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যখন কেউ তার মুসলিম ভাইকে 'হে কাফির' বলে ডাকে, তখন তা তাদের দু'জনের কোন একজনের উপর বর্তায়।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কেউ তার ভাইকে কাফির বললে, তাদের দু'জনের একজনের উপর তা বর্তাবে।

সাবিত ইবন যাহহাক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের মিথ্যা শপথ করে, সে যা বলে তা-ই হবে। আর যে বস্তু দিয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামের আগুনে তাকে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেয়া হবে। ঈমানদারকে লানত করা, তাকে হত্যা করার সমতুল্য। আর কেউ কোন ঈমানদারকে কুফরীর অপবাদ দিলে, তাও তাকে হত্যা করার সমতুল্য হবে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, মুআয ইবন জাবাল নবী (ﷺ) এর সাথে সালাত আদায় করতেন। অতঃপর আবার তিনি নিজ কাওমের নিকট এসে তাদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন। একবার তিনি তাদের নিয়ে সালাতে সূরা আল-বাক্বারাহ পড়লেন। তখন এক ব্যক্তি সালাত সংক্ষেপ করতে চাইল। কাজেই সে আলাদা হয়ে) সংক্ষেপে সালাত আদায় করলো। এ খবর মুআয -এর কাছ পৌছলে তিনি বললেনঃ সে মুনাফিক। লোকটির কাছে এ সংবাদ পৌছলে সে নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এমন এক কাওমের লোক, যারা নিজের হাতে কাজ করি, আর নিজের উট দিয়ে সেচের কাজ করি। মুআয গত রাতে সূরা আল-বাকারাহ দিয়ে সালাত আদায় করতে শুরু করলেন, তখন আমি সংক্ষেপে সালাত আদায় করে নিলাম। এতে মুআয বললেন যে, আমি মুনাফিক। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ হে মুআয! তুমি কি (লোকেদের) দ্বীনের ব্যাপারে অনাগ্রহী করতে চাও? এ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। পরে তিনি তাকে বললেনঃ তুমি 'ওয়াশশামসি ওয়াদ-উহাহা' (91) এবং 'সাব্বিহ ইসমা রাব্বি কা-ল-আলা' (87) এর মত ছোট সূরা পড়বে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যদি কসম করে এবং লাত্ ও উযযার কসম করে, তবে সে যেন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে। আর যদি কেউ তার সঙ্গীকে বলে, এসো আমরা জুয়া খেলি, তবে সে যেন সদাকাহ করে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, তিনি উমার ইবন খাত্তাব-কে একদিন আরোহীর মাঝে এমন সময় পেলেন, যখন তিনি তার পিতার নামে শপথ করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উচ্চস্বরে তাদের বললেনঃ জেনে রাখ! আল্লাহ তোমাদের নিজের পিতার নামে শপথ করতে নিষেধ করেছেন। যদি কাউকে শপথ করতেই হয়, তবে সে যেন আল্লাহর নামেই শপথ করে, তা না হলে সে যেন চুপ থাকে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) আমার নিকট আসলেন। তখন ঘরে একখানা পর্দা ঝুলানো ছিল। যাতে ছবি ছিল। তা দেখে নবী (ﷺ) এর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি পর্দাখানা হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন। আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ) লোকেদের মধ্যে বললেনঃ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ঐসব লোকের যারা এ সব ছবি অঙ্কণ করে।

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললেনঃ অমুক ব্যক্তি সালাত দীর্ঘ করে। যে কারণে আমি ফজরের সালাত থেকে পিছনে থাকি। বর্ণনাকারী বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোন ওয়াজের মধ্যে সেদিনের চেয়ে অধিক রাগান্বিত হতে দেখিনি। রাবী বলেন, এরপর তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘৃণা সৃষ্টিকারী আছে। সুতরাং তোমাদের যে কেউ লোকেদের নিয়ে সালাত আদায় করে, সে যেন সংক্ষেপ করে। কারণ তাদের মধ্যে রোগী, বৃদ্ধ এবং কাজের লোক থাকে।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) সালাত আদায় করলেন। তখন তিনি মসজিদের কিবলার দিকে নাকের শ্লেষ্মা দেখতে পান। এরপর তিনি তা নিজ হাতে খুচিয়ে সাফ করলেন এবং রাগান্বিত হয়ে বললেনঃ তোমাদের কেউ যতক্ষণ সালাতে থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার চেহারার সম্মুখে থাকেন। কাজেই সালাতরত অবস্থায় কখনো সামনের দিকে নাকের শ্লেষ্মা ফেলবে না।

যায়দ ইবন খালিদ জুহানী হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে পথে পড়ে থাকা বস্ত্ত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেনঃ তুমি তা এক বছর পর্যন্ত প্রচার করতে থাকো, তারপর তার বাধন থলে চিনে রাখ। তারপর তা তুমি ব্যয় কর। এরপর যদি এর মালিক এসে যায়, তবে তুমি তাকে ফিরিয়ে দাও। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! হারিয়ে যাওয়া ছাগলের কী হুকুম? তিনি বললেনঃ সেটা তুমি নিয়ে যাও। কারণ এটা হয়ত তোমার জন্য অথবা তোমার কোন ভাই এর অথবা চিতা বাঘের। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আর হারানো উটের কী হুকুম? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাগান্বিত হলেন। এমন কি তার গাল দু'টি লাল হয়ে গেল। তিনি বললেনঃ তাতে তোমার কী? তার সাথেই তার পা ও পানি রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সেটি তার মালিকের নাগাল পেয়ে যাবে।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার নবী (ﷺ) খেজুরের পাতা দিয়ে, অথবা চাটাই দিয়ে একটি ছোট হুজরা তৈরী করলেন এবং ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ঐ হুজরায় (রাতে নফল) সালাত আদায় করতে লাগলেন। তখন একদল লোক তার খোজে এসে তার সঙ্গে সালাত আদায় করতে লাগল। পরবর্তী রাতেও লোকজন সেখানে এসে হাযির হল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দেরী করলেন এবং তাদের দিকে বেরিয়ে আসলেন না। তারা উচ্চস্বরে আওয়াজ দিতে লাগল এবং ঘরের দরজায় কংকর নিক্ষেপ করল। তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে তাদের কাছে বেরিয়ে এসে বললেনঃ তোমরা যা করছ তাতে আমি ভয় করছি যে, এটি না তোমাদের উপর ফরজ করে দেয়া হয়। সুতরাং তোমাদের উচিত যে, তোমরা ঘরেই সালাত আদায় করবে। কারণ ফরজ ছাড়া অন্য সালাত নিজ নিজ ঘরে পড়াই উত্তম।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।

সুলাইমান ইবন সুরদ হতে বর্ণিত। একবার নবী (ﷺ) এর সম্মুখেই দু'ব্যক্তি গালাগালি করছিল। আমরাও তার কাছেই উপবিষ্ট ছিলাম, তাদের একজন অপর জনকে এত রেগে গিয়ে গালি দিচ্ছিল যে, তার চেহারা রক্তিম হয়ে গিয়েছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি একটি কালিমা জানি, যদি এ লোকটি তা পড়তো, তবে তার রাগ দূর হয়ে যেত। যদি লোকটি 'আউযু বিল্লাহি মিনাশশাইত্বনির রাজীম' পড়তো। তখন লোকেরা সে ব্যক্তিকে বলল, নবী (ﷺ) কী বলেছেন, তা কি তুমি শুনছো না? সে বললঃ আমি নিশ্চই পাগল নই।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) -এর নিকট বললঃ আপনি আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেনঃ তুমি রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার তা বললেন, নবী (ﷺ) প্রত্যেক বারেই বললেনঃ রাগ করো না।

ইমরান ইবন হুসায়ন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ লজ্জাশীলতা কল্যাণ ছাড়া কোন কিছুই নিয়ে আনে না। তখন বুশায়র ইবন কা'ব বললেনঃ হিকমাতের পুস্তকে লিখা আছে যে, কোন কোন লজ্জাশীলতা ধৈর্যশীলতা বয়ে আনে। আর কোন কোন লজ্জাশীলতা এনে দেয় শান্তি ও সুখ। তখন ইমরান বললেনঃ আমি তোমার কাছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করছি। আর তুমি কিনা (তার স্থলে) আমাকে তোমার পুস্তিকা থেকে বর্ণনা করছ।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) এক ব্যক্তির পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় লোকটি (তার ভাইকে) লজ্জা সম্পর্কে ভৎর্সনা করছিল এবং বলছিল যে, তুমি অধিক লজ্জা করছ, এমনকি সে যেন এ কথাও বলছিল যে, এটা তোমাকে ক্ষতির সম্মুখীন করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। কারণ নিশ্চই লজ্জা হল ঈমানের অঙ্গ।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ) নিজ গৃহে অবস্থানকারিণী কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন।

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ পূর্ববর্তী নবীদের (নবীদের) নাসীহাত থেকে মানুষ যা লাভ করেছে তার একটা হলো, যদি তুমি লজ্জাই না কর, তবে যা ইচ্ছে তাই কর।

উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন উম্মু সুলায়ম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো সত্য বলার ক্ষেত্রে লজ্জা করতে নির্দেশ দেন না। সুতরাং মেয়ে লোকের স্বপ্নদোষ হলে কি তার উপরও গোসল করা ফরয? তিনি বললেন, হা, যদি সে পানি, বীর্য দেখতে পায়।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুমিনের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি সবুজ গাছ, যার পাতা ঝরে না এবং একটির সঙ্গে আর একটি ঘেষা লাগে না। তখন কেউ কেউ বললঃ এটি অমুক গাছ, কেউ বলল অমুক গাছ। তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম যে, এটি খেজুর গাছ। তবে যেহেতু আমি অল্প বয়স্ক তরুণ ছিলাম, তাই বলতে লজ্জাবোধ করলাম। তখন নবী (ﷺ) নিজেই বলে দিলেন যে, সেটি খেজুর গাছ। আর শুবাহ থেকে ইবন উমার সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণিত হয়েছে যে, তারপর আমি উমার-এর নিকট এ সম্পর্কে জানালাম। তখন তিনি বললেনঃ যদি তুমি কথাটি বলে দিতে, তবে তা আমার কাছে এত এত অধিক খুশির কারণ হতো।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এলো এবং তার সামনে নিজেকে পেশ করে বললঃ আপনার কি আমার প্রয়োজন আছে? খবরটি জানার পরে আনাস-এর মেয়ে বলেছিলঃ এ মহিলার লজ্জা কত কম! আনাস বললেনঃ সে তোমার চেয়ে উত্তম। সে তো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর খিদমতে নিজেকে পেশ করেছে।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ) তাকে আর মুআয ইবন জাবাল-কে (ইয়ামানে) পাঠান, তখন তাদের ওয়াসীয়াত করেনঃ তোমরা (লোকের সাথে) নম্র ব্যবহার করবে, কঠোর হবে না। শুভ সংবাদ দেবে, বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে না। আর তোমরা দু'জনের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রাখবে। তখন আবূ মূসা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এমন এক দেশে যাচ্ছি, যেখানে মধু হতে শরাব প্রস্তুত হয়। একে 'বিত্উ' বলা হয়। আর 'যব' থেকেও শরাব প্রস্তুত হয়, তাকে বলা হয় 'মিযর'। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ প্রত্যেক নেশার বস্তুই হারাম।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা নম্র হও এবং কঠোর হয়ো না। শান্তি দান কর, বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে যখন কোন দু'টি কাজের মধ্যে এখতিয়ার দেয়া হতো, তখন তিনি দু'টির মধ্যে অপেক্ষাকৃত সহজটি গ্রহণ করতেন যদি তা গুনাহর কাজ না হত। আর যদি তা গুনাহের কাজ হতো, তা হলে তিনি তাথেকে সবার চেয়ে দূরে সরে থাকতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। অবশ্য কেউ আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে, তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার প্রতিশোধ নিতেন।

আযরাক ইবন ক্বায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা 'আহ্ওয়ায' নামক স্থানে একটা খালের ধারে অবস্থান করছিলাম। খালটির পানি শুকিয়ে গিয়েছিল। এমন সময় আবূ বারযা আসলামী একটি ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে সেখানে এলেন। তিনি ঘোড়াটিকে ছেড়ে দিয়ে সালাতে দাড়ালেন। তখন ঘোড়াটা (দূরে) চলে গেল দেখে তিনি সালাত ছেড়ে দিয়ে ঘোড়ার পিছু নিলেন এবং ঘোড়াটি পেয়ে ধরে আনলেন। তারপর সালাত পূর্ণ করলেন। এ সময় আমাদের মধ্যে একজন বিরূপ সমালোচক ছিলেন। তিনি তা দেখে বললেনঃ এই বৃদ্ধের প্রতি লক্ষ্য কর, সে ঘোড়ার কারণে সালাত ছেড়ে দিল। তখন আবূ বারযাহ এগিয়ে এসে বললেনঃ যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হারিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে এভাবে ভৎর্সনা করেননি। তিনি আরও বললেনঃ আমার বাড়ী অনেক দূরে। সুতরাং যদি আমি সালাত আদায় করতাম এবং ঘোড়াটিকে এভাবেই ছেড়ে দিতাম, তাহলে আমি রাতে নিজ পরিবারের কাছে পৌছতে পারতাম না। তিনি আরও উল্লেখ করলেন যে, তিনি নবী (ﷺ) এর সঙ্গ লাভ করেছেন এবং তার নম্র ব্যবহার দেখেছেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক বেদুঈন মসজিদে প্রস্রাব করে দিলো। তখন লোকজন তাকে শাসন করার জন্য উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের বললেনঃ তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং তার প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি অথবা একমাত্র পানি ঢেলে দাও। কারণ, তোমাদেরকে নম্র ব্যবহারকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, কঠোর ব্যবহারকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাদের সাথে মেলামেশা করতেন, এমনকি তিনি আমার এক ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আবূ উমায়র! কেমন আছে তোমার নুগায়র?

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইল। তিনি বললেনঃ তাকে অনুমতি দাও। সে তার বংশের নিকৃষ্ট সন্তান। অথবা বললেনঃ সে তার গোত্রের ঘৃণ্যতম ভাই। যখন সে প্রবেশ করল, তখন তিনি তার সাথে নম্রভাবে কথাবার্তা বললেন। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর ব্যাপারে যা বলার তা বলেছেন। এখন আপনি তার সাথে নম্রভাবে কথা বললেন। তিনি বললেনঃ হে আয়িশাহ! আল্লাহর কাছে মর্যাদায় নিকৃষ্ট সে ব্যক্তি, যার অশালীন ব্যবহার থেকে বেচে থাকার জন্য মানুষ তার সংসর্গ বর্জন করে চলে।

আবদুল্লাহ ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত যে, একবার নবী (ﷺ)-কে কয়েকটি রেশমের তৈরী সোনার বোতাম লাগান) 'কাবা' হাদিয়া দেয়া হলো। তিনি এগুলো সাহাবীদের মধ্যে বেটে দিলেন এবং তা থেকে একটি মাখরামাহ-এর জন্য আলাদা করে রাখলেন। পরে যখন তিনি এলেন, তখন তিনি বললেনঃ আমি এটি তোমার জন্য লুকিয়ে রেখেছিলাম। আইয়ূব নিজের কাপড়ের দিকে ইশারা করলেন, তিনি যেন তার কাপড় মাখ্রামাহ্কে দেখাচ্ছিলেন। মাখরামাহ-এর মেজাজের মধ্যে কিছু (অসন্তুষ্টির ভাব) ছিল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ প্রকৃত মুমিন একই গর্ত থেকে দু'বার দংশিত হয় না।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী (ﷺ) আমার নিকট এসে বললেনঃ আমাকে কি এ খবর জানানো হয়নি যে, তুমি সারা রাত সালাতে অতিবাহিত কর। আর সারা দিন সিয়াম পালন কর। তিনি বললেনঃ তুমি (এ রকম) করো না। রাতের কিয়দংশ সালাত আদায় কর, আর ঘুমাও। কয়েকদিন সওম পালন কর, আর কয়েকদিন ইফতার কর (সওম ভঙ্গ কর)। তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে। তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে, তোমার উপর তোমার মেহ্মানের হক আছে, আর তোমার উপর তোমার স্ত্রীরও হক আছে। নিশ্চই তুমি তোমার আয়ু দীর্ঘ হবার আশা কর। কাজেই প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম পালনই তোমার পক্ষে যথেষ্ট। কেননা, নিশ্চই প্রতিটি নেক কাজের পরিবর্তে তার দশগুণ সাওয়াব দেয়া হয়। সুতরাং এভাবে সারা বছরেই সিয়ামের সওয়াব পাওয়া যায়। তখন আমি কঠোর ব্যবস্থা চাইলে, আমাকে কঠোর ব্যবস্থা দেয়া হলো। আমি বললামঃ এর চেয়েও অধিক পালনের সামর্থ্য আমার আছে। তিনি বললেনঃ তা হলে তুমি প্রতি সপ্তাহে তিন দিন সিয়াম পালন কর। তখন আমি আরও কঠোর ব্যবস্থা চাইলে, আমাকে কঠোর দেয়া হলো। আমি বললামঃ আমি এর চেয়ে অধিক সিয়ামের সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেনঃ তবে তুমি আল্লাহর নবী দাঊদ -এর সিয়াম পালন কর। আমি বললামঃ হে আল্লাহর নবী! দাঊদ-এর সিয়াম কী রকম? তিনি বললেন, আধা বছর সিয়াম পালন।

আবূ শুরায়হ্ কা'বী হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন মেহমানের সম্মান করে। মেহমানের সম্মান একদিন ও একরাত। আর সাধারণ মেহমানদারী তিনদিন ও তিনরাত। এরপরে (তা হবে) 'সদাকাহ'। মেযবানকে কষ্ট দিয়ে, তার কাছে মেহমানের অবস্থান করা বৈধ নয়। (অন্যসূত্রে) মালিক এ রকম বর্ণনা করার পর আরো অধিক বলেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের উপর ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে, অথবা সে যেন চুপ থাকে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আর যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে সে যেন মেহমানের সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহতে ও শেষ দিনে ঈমান রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে।

উকবাহ ইবন আমির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের কোন জায়গায় পাঠালে আমরা এমন কাওমের কাছে হাজির হই, যারা আমাদের মেহমানদারী করে না। এ ব্যাপারে আপনার হুকুম কী? তখন তিনি আমাদের বললেনঃ যদি তোমরা কোন কাওমের নিকট হাজির হও, আর তারা তোমাদের মেহমানদারীর জন্য উপযুক্ত যত্ন নেয়, তবে তোমরা তা গ্রহণ করবে। আর যদি তারা না করে, তা হলে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের থেকে মেহমানের হক আদায় করে নেবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার রক্তের সম্পর্ক বজায় রাখে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, অথবা চুপ থাকে।

আবূ জুহাইফাহ-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সালমান ও আবূ দারদা-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপন করেন। এরপর একদিন সালমান আবূ দারদা-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তখন তিনি উম্মু দারদা-কে নিম্নমানের পোশাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেনঃ তোমার ভাই আবূ দারদার দুনিয়াতে কিছুর দরকার নেই। ইতোমধ্যে আবূ দারদা এলেন। অতঃপর তার জন্য খাবার তৈরি করে তাকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি তো সিয়াম পালন করছি।' তিনি বললেনঃ আপনি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও খেলেন। তারপর যখন রাত হলো, তখন আবূ দারদা সালাতে দাড়ালেন। তখন সালমান তাকে বললেনঃ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে দাড়ালে, তিনি বললেনঃ (আরও) ঘুমান। অবশেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন সালমান বললেনঃ এখন উঠুন এবং তারা উভয়েই সালাত আদায় করলেন। তারপর সালমান বললেনঃ তোমার উপর তোমার রবের হক আছে, (তেমনি) তোমার উপর তোমার হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের দাবী আদায় করবে। তারপর তিনি নবী (ﷺ) এর কাছে এসে, তার কাছে তার কথা উল্লেখ করলেনঃ তিনি বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে।

আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর হতে বর্ণিত যে, একবার আবূ বাকর সিদ্দীক কিছু লোককে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করলেন। তিনি (তার পুত্র) আবদুর রহমান-কে নির্দেশ দিলেন, তোমার এ মেহমানদের নিয়ে যাও। আমি নবী (ﷺ) এর নিকট যাচ্ছি। আমি ফিরে আসার পূর্বেই তুমি তাদের খাওয়ানো সেরে নিও। আবদুর রহমান তাদের নিয়ে চলে গেলেন এবং তার ঘরে যা ছিল তা সামনে পেশ করে দিয়ে তাদের বললেন আপনারা খেয়ে নিন। তারা বললেনঃ আমাদের এ বাড়ীর মালিক কোথায়? তিনি বললেনঃ আপনারা খেয়ে নিন। তারা বললেনঃ বাড়ীর মালিক না আসা পর্যন্ত আমরা খাবো না। তিনি বললেনঃ আমাদের তরফ থেকে আপনারা আপনাদের খাবার খেয়ে নিন। কারণ, আপনারা না খেলে তিনি এলে আমার উপর রাগান্বিত হবেন। কিন্তু তারা অস্বীকার করলেন। আমি ভাবলাম যে, তিনি অবশ্যই আমার উপর রাগান্বিত হবেন। তারপর তিনি ফিরে আসলে আমি তার থেকে এক পাশে সরে পড়লাম। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কী করেছেন। তখন তারা তাকে সব বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেনঃ হে আবদুর রহমান! তখন আমি চুপ থাকলাম। তিনি আবার ডাকলেন, হে আবদুর রহমান! এবারেও আমি চুপ থাকলাম। তিনি আবার ডেকে বললেনঃ ওরে মূর্খ! আমি তোকে কসম দিচ্ছি। যদি আমার কথা শুনে থাকিস, তবে কেন আসছিস না? তখন আমি বেরিয়ে এসে বললাম, আপনি আপনার মেহমানদের জিজ্ঞেস করুন। তখন তারা বললেন, সে ঠিকই আমাদের খাবার এনে দিয়েছিল। তিনি বললেন, তবুও কি আপনারা আমার অপেক্ষা করছেন? আল্লাহর কসম! আমি আজ রাতে তো খাবো না। মেহমানরাও বললেনঃ আল্লাহর কসম! আপনি যে পর্যন্ত না খাবেন ততক্ষণ আমরাও খাবো না। তখন তিনি বললেন, আমি আজ রাতের মত মন্দ রাত আর দেখিনি। আমাদের প্রতি আক্ষেপ। আপনারা কি আমাদের খাবার কবূল করলেন না? তখন তিনি আবদুর রহমানকে (ডেকে) বললেনঃ তোমার খাবার নিয়ে এসো। তিনি তা নিয়ে আসলে তিনিই খাবারের উপর নিজ হাত রেখে বললেন, বিসমিল্লাহ; এ প্রথম ঘটনাটা শয়তানের কারণেই ঘটেছে। তারপর তিনি খেলেন এবং তারাও খেলেন।

আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার আবূ বাকর তার একজন কিংবা কয়েকজন মেহমান নিয়ে এলেন এবং সন্ধ্যার সময় নবী (ﷺ) এর কছে গেলেন। তিনি ফিরে আসলে আমার মা তাকে বললেনঃ আপনি মেহমানকে, কিংবা বললেন, মেহমানদের (ঘরে) রেখে (এতো) রাত কোথায় আটকা পড়েছিলেন? তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি তাদের খাবার দাওনি? তিনি বললেনঃ আমি তাদের সামনে খাবার দিয়েছিলাম কিন্তু তারা, বা সে তা খেতে অস্বীকার করলেন। তখন আবূ বাকর রেগে গাল মন্দ করলেন ও বদ্ দোয়া করলেন। আর শপথ করলেন যে, তিনি খাবার খাবেন না। আমি লুকিয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে ডেকে বললেনঃ ওরে মূর্খ! তখন মহিলা (আমার মাও) কসম করলেন যে, যে পর্যন্ত তিনি না খাবেন ততক্ষণ মাও খাবেন না। এদিকে মেহমানটি বা মেহমানরাও কসম খেয়ে বসলেন যে, যে পর্যন্ত তিনি না খান, সে পর্যন্ত তারাও খাবেন না। তখন আবূ বাকর বললেনঃ এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে শয়তান থেকে। তারপর তিনি খাবার আনতে বললেন। আর তিনি খেলেন এবং মেহমানরাও খেলেন। কিন্তু তারা খাওয়া আরম্ভ করে যতবারই 'লুকমা' উঠাতে লাগলেন, তার নীচে থেকে তার চেয়েও অধিক খাবার বাড়তে লাগলো। তখন তিনি তার স্ত্রীকে ডেকে বললেনঃ হে বানী ফেরাসের বোন এ কী? তিনি বললেনঃ আমার চোখের প্রশান্তির কসম! এতো আমাদের পূর্বের খাবার থেকে এখন অনেক অধিক দেখছি। তখন সবাই খেলেন এবং তা থেকে তিনি নবী (ﷺ) এর নিকট কিছু পাঠিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বর্ণনা করেন যে, তা থেকে তিনিও খেয়েছিলেন।

রাফি ইবন খাদীজ ও সাহল ইবন আবূ হাসমাহ হতে বর্ণিত যে, একবার আবদুল্লাহ ইবন সাহল ও মুহাইসাহ্ ইবন মাসঊদ খাইবারে পৌছে উভয়েই খেজুরের বাগানের ভিন্ন ভিন্ন পথে চলে গেলেন। সেখানে আবদুল্লাহ ইবন সাহল-কে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর আবদুর রহমান ইবন সাহল ও ইবন মাসঊদ-এর দুই ছেলে হুওয়াইসাহ ও মুহাইসাহ নবী (ﷺ) এর কাছে এলেন এবং তার কাছে নিহত ব্যক্তির কথা বলতে লাগলেন। আবদুর রহমান কথা শুরু করলেন। তিনি ছোট ছিলেন। নবী (ﷺ) তাদের বললেনঃ তুমি বড়দের ইজ্জত করবে। বর্ণনাকারী ইয়াহ্ইয়া বলেনঃ কথা বলার দায়িত্ব যেন বড়রা পালন করে। তখন তারা তাদের লোক সম্পর্কে কথা বললেন। নবী (ﷺ) তাদের বললেনঃ তোমাদের পঞ্চাশ জন লোক কসম করে তোমাদের নিহত ভাইয়ের হত্যার হক প্রমাণ কর। তারা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! ঘটনা তো আমরা দেখিনি। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তা হলে ইয়াহূদীরা তাদের থেকে পঞ্চাশ জন কসম করে তোমাদের কসম থেকে মুক্তি দিবে। তখন তারা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! ওরা তো কাফির সম্প্রদায়। তারপর নবী (ﷺ) নিজের তরফ থেকে তাদের নিহত ব্যক্তির ফিদ্ইয়া দিয়ে দিলেন। সাহল বললেনঃ আমি সেই উটগুলো থেকে একটি উট পেলাম। সেটি নিয়ে আমি যখন আস্তাবলে গেলাম তখন উটনীটি তার পা দিয়ে আমাকে লাথি মারলো।

পূর্বের হাদিসের মতই (৬১৪২)।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা আমাকে এমন একটা বৃক্ষের খবর দাও, যার দৃষ্টান্ত মুসলিমের মত। তা সর্বদা তার প্রতিপালকের নির্দেশে খাদ্য দান করে, আর এর পাতাও ঝরে না। তখন আমার মনে হল যে, এটি খেজুর গাছ। কিন্তু যেহেতু সে স্থানে আবূ বাকর ও উমার উপস্থিত থেকেও কথা বলছিলেন না, তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করিনি। তখন নবী (ﷺ) নিজেই বললেন, সেটি হলো খেজুর গাছ। তারপর যখন আমি আমার আব্বার সঙ্গে বেরিয়ে এলাম, তখন আমি বললাম আববা! আমার মনেও খেয়াল এসেছিল যে, এটা নিশ্চই খেজুর গাছ। তিনি বললেনঃ তোমাকে তা বলতে কিসে বাধা দিয়েছিল? যদি তুমি তা বলতে, তাহলে এ কথা আমার কাছে এত এত ধন-সম্পদ পাওয়ার চেয়েও অধিক প্রিয় হতো। তিনি বললেনঃ আমাকে শুধু এ কথাই বাধা দিয়েছিল যে, আমি দেখলাম, আপনি ও আবূ বাকর কেউই কথা বলছেন না। তাই আমিও কথা বলা পছন্দ করলাম না।

উবাই ইবন কা'ব হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ নিশ্চই কোন কোন কবিতার মধ্যে জ্ঞানের কথাও আছে।

জুনদুব হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, একবার নবী (ﷺ) এক জিহাদে হেটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন এবং তার একটা আঙ্গুল রক্তে ভিজে গেল। তখন তিনি কবিতার ছন্দে বললেনঃ তুমি একটা রক্তে ভেজা আঙ্গুল ছাড়া কিছুই নও, আর যে কষ্ট ভোগ করছ তা তো কেবল আল্লাহর রাস্তাতেই।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কবিরা যে সব কথা বলেছেন, তার মধ্যে কবি লবীদের কথাটাই সর্বাধিক সত্য। (তিনি বলেছেনঃ) শোন! আল্লাহ ছাড়া সব কিছুই বাতিল। তিনি আরও বলেছেন, কবি উমাইয়াহ ইবন সালত ইসলাম গ্রহণের নিকটবর্তী হয়েছিল।

সালামাহ ইবন আকওয়া হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে খাইবার অভিযানে গেলাম। আমরা রাতে চলছিলাম। দলের মধ্যে থেকে একজন আমির ইবন আক্ওয়া বললেন যে, আপনি কি আপনার কবিতাগুলো থেকে কিছু পড়ে আমাদের শুনাবেন না? আমির ছিলেন একজন কবি। কাজেই তিনি দলের লোকদের হুদী গেয়ে শুনাতে লাগলেনঃ "হে আল্লাহ! তুমি না হলে, আমরা হিদায়াত পেতাম না। আমরা সদাকাহ দিতাম না, সালাত আদায় করতাম না। আমাদের পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করুন; যা আমরা আপনার জন্য উৎসর্গিত করেছি। যদি আমরা শত্রুর মুখোমুখী হই, তখন আমাদের পদদ্বয় সুদৃঢ় রাখুন। আমাদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন, শত্রুর ডাকের সময় আমরা যেন বীরের মত ধাবিত হই। যখন তারা হৈ-হুল্লোড় করে, আমাদের উপর আক্রমণ চালায়।" তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ এ উট চালক লোকটি কে? লোকেরা বললেনঃ তিনি আমির ইবন আক্ওয়া। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তার উপর রহম করুন। দলের একজন বললেনঃ হে আল্লাহর নবী! তার জন্য তো শাহাদাত নির্দিষ্ট হয়ে গেল। হায়! যদি আমাদের এ সুযোগ দান করতেন। তারপর আমরা খাইবারে পৌছে শত্রুদের অবরোধ করে ফেললাম। এ সময় আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লাম। অবশেষে আল্লাহ (খাইবারে যুদ্ধে) তাদের উপর আমাদের বিজয় দান করলেন। তারপর যেদিন খাইবার জয় হলো, সেদিন লোকেরা অনেক আগুন জ্বালাল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা এত সব আগুন কেন জ্বালাচ্ছ? লোকেরা বললোঃ গোশত রান্নার জন্য। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের গোশত? তারা বললঃ গৃহপালিত গাধার গোশত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এসব গোশত ফেলে দাও এবং হাড়িগুলো ভেঙ্গে দাও। এক ব্যক্তি বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! বরং গোশতগুলো ফেলে আমরা হাড়িগুলো ধুয়ে নেই? তিনি বললেনঃ আচ্ছা তাই কর। রাবী বলেনঃ যখন লোকেরা যুদ্ধে সারিবদ্ধ হল। আমির এর তলোয়ার খানা ছোট ছিল। তিনি এক ইয়াহূদীকে মারার উদ্দেশে এটি দিয়ে তার উপর আক্রমণ করলেন। কিন্তু তার তলোয়ারের ধারাল অংশ আমির-এরই হাটুতে এসে আঘাত করল। এতে তিনি মারা গেলেন। তারপর ফিরার সময় সবাই ফিরলেন। সালামাহ বলেনঃ আমার চেহারার রং বদল হওয়া দেখে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? আমি বললামঃ আমার বাপ-মা আপনার প্রতি কুরবান হোক! লোকেরা বলছে যে, আমিরের আমল সব বরবাদ হয়ে গেছে। তিনি বললেনঃ এ কথাটা কে বলেছে? আমি বললামঃ অমুক, অমুক, অমুক এবং উসায়দ ইবন হুযাইর আনসারী। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ যারা এ কথা বলেছে, তারা মিথ্যা বলেছে। তিনি বললেনঃ তার জন্য আছে দু'টি পুরস্কার, সে জাহিদ এবং মুজাহিদ। আরবে তার মত লোক অল্পই হবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) তার কতক স্ত্রীর নিকট আসলেন। তখন তাদের সঙ্গে উম্মু সুলায়মও ছিলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ সর্বনাশ, হে আনজাশাহ! তুমি (উট) ধীরে চালাও। কেননা, তুমি কাঁচপাত্র (মহিলা) নিয়ে চলেছ। রাবী আবূ কিলাবা বলেনঃ নবী (ﷺ) 'সাওকাকা বিল কাওয়ারীর' বাক্য দ্বারা এমন বিষয়ের প্রতি ইশারা করলেন, যা অন্য কেউ বললে, তোমরা তাকে ঠাট্টা করতে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার হাস্‌সান ইবন সাবিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট মুশরিকদের নিন্দা করার অনুমতি চাইলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তা হলে এ নিন্দা থেকে আমার বংশের মর্যাদা কীভাবে রক্ষা পাবে? তখন হাস্‌সান বললেনঃ আমি তাদের থেকে আপনাকে এমনভাবে বের করে নেব, যেভাবে মাখানো আটা থেকে চুল বের করা হয়। রাবী উরওয়াহ বর্ণনা করেন, একদিন আমি আয়িশাহ-এর কাছে হাস্‌সান-কে গালি দিতে লাগলাম, তখন তিনি বললেনঃ তুমি তাকে গালি দিওনা। কারণ, তিনি (নবী (ﷺ)) এর পক্ষ হতে মুশরিকদের প্রতিরোধ করতেন।

আবূ হুরাইরাহ তার বর্ণনায় নবী (ﷺ) এর কথা উল্লেখ করে বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের ভাই কবি ইবন রাওয়াহা অশ্লীল কথা বলেননি। তিনি বলতেনঃ আমাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রয়েছেন, তিনি কুরআন তিলাওয়াত করেন; যখন সকালের মন মাতানো আলো ফুটে উঠে। আমরা পথহারা হবার পর তিনি আমাদের সুপথ দেখিয়েছেন। আর আমরা অন্তরের সাথে একীন করলাম যে, তিনি যা বলেছেন, তা ঘটবেই। তিনি নিজ পৃষ্ঠদেশ বিছানা থেকে আলাদা রেখেই রাত্রি অতিবাহিত করেন। যখন কাফিরদের আনন্দের শয্যা তাদের পক্ষে খুব কষ্টকর হয়।

হাস্‌সান ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আবূ হুরাইরাহ! আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আপনি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, ওহে হাস্‌সান! তুমি আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে প্রত্যুত্তর দাও। হে আল্লাহ! তুমি জিব্রীল-এর দ্বারা তাকে সাহায্য কর। আবূ হুরাইরাহ বললেনঃ হা।

বারাআ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) হাসসান-কে বললেনঃ তুমি কাফিরদের নিন্দা করো। জিবরীল এ কাজে তোমাকে সাহায্য করবেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের কারো পেট কবিতা দিয়ে ভরার চেয়ে পুঁজে ভরা অনেক ভাল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তির পেট কবিতা দিয়ে ভরার চেয়ে এমন পুঁজে ভরা উত্তম, যা তোমাদের পেটকে ধ্বংস করে ফেলে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হবার পর আবূ কু'আইসের ভাই আফলাহ আমার ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। আমি বললামঃ আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে অনুমতি না নিয়ে তাকে অনুমতি দেব না। কারণ আবূ কু'আইসের স্ত্রী আমাকে দুগ্ধ পান করিয়েছেন। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! এ লোক আমাকে দুধ পান করাননি। বরং তার স্ত্রী আমাকে দুধ পান করিয়েছেন। তিনি বললেনঃ অনুমতি দাও। কারণ এ লোকটি তোমার (দুধ) চাচা। তোমার ডান হস্ত ধূলি ধূসরিত হোক। রাবী উরওয়াহ বলেন, এ কারণেই আয়িশাহ বলতেন যে, বংশগত সম্পর্কে যারা হারাম হয়, দুধ পান সম্পর্কেও তোমরা তাদের হারাম গণ্য করবে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (হাজ্জ সমাপন শেষে) ফিরে আসার ইচ্ছে পোষণ করলেন। তখন ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার কারণে তার দরজার সামনে সাফিয়্যাহ চিন্তিত ও বিষণ্ণ মুখে দাড়িয়ে আছেন দেখতে পেলেন। তখন তিনি কুরাইশদের বাগধারায় বললেনঃ 'আকরা হালকা'। তুমি তো দেখছি, আমাদের আটকে দিবে। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কুরবানীর দিনে ফরজ তাওয়াফ করেছিলে? তিনি বললেনঃ হা। তখন তিনি বললেনঃ তাহলে এখন রওনা দাও।

উম্মু হানী বিন্ত আবূ তালিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর আমি নবী (ﷺ) এর নিকট গিয়ে তাকে গোসলরত অবস্থায় পেলাম। তখন তার কন্যা ফাতিমা তাকে পর্দা দিয়ে আড়াল করছিলেন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ এ কে? আমি বললামঃ আমি আবূ তালিবের কন্যা উম্মু হানী। তিনি বললেনঃ উম্মু হানীর জন্য মারহাবা। তারপর তিনি যখন গোসল শেষ করলেন। তখন তিনি দাড়ালেন এবং এক কাপড় গায়ে জড়িয়ে আট রাকাত সালাত আদায় করলেন। তিনি সালাত শেষ করলে আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি হুবাইরার ছেলে অমুককে নিরাপত্তা দান করেছিলাম কিন্তু আমার ভাই বলছে, সে তাকে হত্যা করবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে উম্মু হানী! তুমি যাকে নিরাপত্তা দিয়েছ, আমিও তাকে নিরাপত্তা দিলাম। উম্মু হানী বলেনঃ এই সময়টি ছিল চাশতের সময়।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এক ব্যক্তিকে একটা কুরবানীর উট হাকিয়ে নিতে দেখে, তাকে বললেনঃ এতে সাওয়ার হও। সে বললঃ এটি তো কুরবানীর উট। তিনি পুনরায় বললেনঃ এতে সাওয়ার হও। সে বললঃ এটি তো কুরবানীর উট। তিনি বললেনঃ এতে সওয়ার হও। সে বলল, এটি তো কুরবানীর উট। তিনি বললেনঃ ওয়াইলাকা (তোমার অকল্যাণ হোক) তুমি এটির উপর সওয়ার হয়ে যাও।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ব্যক্তিকে একটা কুরবানীর উট হাকিয়ে নিয়ে যেতে দেখে বললেনঃ তুমি এর উপর সওয়ার হও। সে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! এটি তো কুরবানীর উট। তখন তিনি দ্বিতীয় বা কিংবা তৃতীয়বার বললেনঃ ওয়াইলাকা (তোমার অনিষ্ট হোক) তুমি এতে সওয়ার হও।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এক সফরে ছিলাম। তার সঙ্গে তখন আনজাশাহ নামের এক কালো গোলাম ছিল। সে পুঁথি গাইছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেনঃ ওহে আনজাশাহ! তোমার সর্বনাশ। তুমি উটটিকে কাঁচপাত্র সদৃশ সওয়ারীদের নিয়ে ধীরে চালাও।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর সামনে অন্য জনের প্রশংসা করলো। তিনি বললেনঃ 'ওয়াইলাকা' (তোমার অমঙ্গল হোক) তুমি তো তোমার ভাই এর গর্দান কেটে দিয়েছ। তিনি এ কথাটি তিনবার বললেন। তিনি আরও বললেনঃ যদি তোমাদের কাউকে কারো প্রশংসা করতেই হয়, আর সে তার ব্যাপারে অবগত থাকে, তবে শুধু এতটুকু বলবে যে, আমি এ ব্যক্তি সম্পর্কে এ রকম ধারণা পোষণ করি। প্রকৃত হিসাব নিকাশের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর আমি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর সামনে কারো পবিত্রতা বর্ণনা করছি না।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার নিজ অধিকারভুক্ত কিছু মাল নবী (ﷺ) বণ্টন করে দিচ্ছিলেন। এমন সময় তামীম গোত্রের যুল খুয়াইসিরা নামক এক ব্যক্তি বলে উঠলঃ হে আল্লাহর রাসূল! ইনসাফ করুন। তখন তিনি বললেনঃ ওয়াইলাকা (তোমার অমঙ্গল হোক) আমি ইনসাফ না করলে আর কে ইনসাফ করবে? তখন উমার বললেনঃ আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি এর গর্দান উড়িয়ে দেই। তিনি বললেনঃ না। কারণ, তার এমন কতকগুলো সঙ্গী আছে; যাদের সালাতের সামনে নিজেদের সালাতকে তুচ্ছ মনে করবে এবং তাদের সিয়ামের সামনে তোমাদের নিজেদের সিয়ামকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমন তীর শিকার ভেদ করে বেরিয়ে যায় ... গোবর ও রক্তকে এমনভাবে অতিক্রম করে যায় যে তীরের অগ্রভাগ দেখলে তাতে কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না, তার উপরিভাগে দেখলেও কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। তার কাঠামোতেও কোন চিহ্ন নেই। তার পাতির মধ্যেও কোন চিহ্ন নেই। এমন সময় তাদের আবির্ভাব হবে, যখন মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিবে। তাদের পরিচয় হলো, তাদের নেতা এমন এক ব্যক্তি হবে, যার একহাত স্ত্রীলোকের স্তনের মত অথবা পিত্তের মত কাঁপতে থাকবে। রাবী আবূ সাঈদ বলেন, আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি যে, আমি নিশ্চই নবী (ﷺ) থেকে এ কথা শুনেছি এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি নিজে আলী-এর সাথে ছিলাম যখন তিনি এ দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। তখন সে লোকটিকে যুদ্ধে নিহত লোকদের মধ্য থেকে তালাশ করে আনার পর তাকে ঠিক সেই হালাতেই পাওয়া গেল, যে হালাতের বর্ণনা নবী (ﷺ) দিয়েছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর খিদমাতে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো ধ্বংস হয়ে গেছি। তিনি বললেনঃ 'ওয়াইহাকা' (আফসোস তোমার জন্য) এরপর সে বললঃ আমি রমাযানের মধ্যেই দিনের বেলায় আমার স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম করে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ একটা গোলাম আযাদ করে দাও। সে বললঃ আমার কাছে তা নেই। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি এক নাগাড়ে দু' মাস সওম পালন কর। সে বললঃ আমি এতেও অপারগ। তিনি বললেনঃ তবে তুমি ষাটজন মিসকীনকে খাওয়াও। লোকটি বললঃ আমি এটাও পারি না। নবী (ﷺ) এর নিকট এক ঝুড়ি খেজুর এলো। তখন তিনি বললেনঃ এটা নিয়ে যাও এবং সদাকাহ করে দাও। সে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তা কি আমার পরিবার ছাড়া অন্যকে দেব? সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ। মদিনার উভয় প্রান্তের মধ্যস্থলে আমার চেয়ে অভাবী আর কেউ নেই। তখন নবী (ﷺ) এমনভাবে হাসলেন, তার পার্শ্বের ছেদন দন্ত পর্যন্ত প্রকাশ পেল। তিনি বললেনঃ তবে তুমিই নিয়ে যাও।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। একজন গ্রাম্য লোক এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে হিজরাতের বিষয়ে কিছু বলুন। তিনি বললেনঃ আফসোস তোমার প্রতি, হিজরাত তো খুব কঠিন কাজ। তোমার কি উট আছে? সে বললঃ হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি এর যাকাত দিয়ে থাক? লোকটি বললঃ হা। তিনি বললেনঃ তবে তুমি সমুদ্রের ঐ পাশ থেকেই আমল করে যাও। নিশ্চই আল্লাহ তোমার আমল এতটুকু কমিয়ে দিবেন না।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বললেনঃ 'ওয়াইলাকুম' অথবা 'ওয়াইহাকুম' (তোমাদের জন্য আফসোস) আমার পরে তোমরা আবার কাফির অবস্থায় ফিরে যেয়ো না। যাতে তোমরা একে অন্যের গর্দান উড়িয়ে দেবে।

আনাস হতে বর্ণিত যে, এক গ্রাম্য লোক নবী (ﷺ) এর খিদমাতে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কবে হবে? তিনি বললেনঃ তোমার জন্য আক্ষেপ, তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ? সে জবাব দিলঃ আমি তো তার জন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি, তবে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসি। তিনি বললেনঃ তুমি যাকে ভালবাস, কিয়ামতের দিন তুমি তার সঙ্গেই থাকবে। তখন আমরা বললামঃ আমাদের জন্যও কি এরূপ? তিনি বললেনঃ হা। এতে আমরা সে দিন অতিশয় আনন্দিত হলাম। আনাস বলেন, এ সময় মুগীরাহ'র একটি যুবক বয়সের ছেলে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে ছিল আমার বয়সী। নবী (ﷺ) বললেনঃ যদি এ যুবকটি অধিক দিন বেচে থাকে, তবে সে বৃদ্ধ হবার আগেই কিয়ামত সংঘটিত হতে পারে।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মানুষ যাকে ভালবাসবে সে তারই সাথী হবে।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বলেছেনঃ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! এমন ব্যক্তির ব্যাপারে আপনি কী বলেন, যে ব্যক্তি কোন দলকে ভালবাসে, কিন্তু (আমলের ক্ষেত্রে) তাদের সমান হতে পারেনি? তিনি বললেনঃ মানুষ যাকে ভালবাসে সে তারই সাথী হবে।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ এক ব্যক্তি একদলকে ভালবাসে, কিন্তু (আমলে) তাদের সমপর্যায়ের হতে পারেনি। তিনি বললেনঃ মানুষ যাকে ভালবাসে, সে তারই সাথী হবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) কে জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কবে হবে? তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ? সে বলল­ঃ আমি এর জন্য তো অধিক কিছু সালাত, সওম এবং সদাকাহ আদায় করতে পারিনি। কিন্তু আমি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসি। তিনি বললেনঃ তুমি যাকে ভালবাস তারই সাথী হবে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইবন সাঈদকে বললেনঃ আমি তোমার জন্য একটি কথা গোপন রেখেছি, তুমি বলতো সে কথাটা কী? সে বললঃ 'দুখ' তখন তিনি বললেনঃ 'দূর হও'।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব একদল সাহাবীসহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে ইবন সাইয়্যাদের নিকট গমন করেন। তারা সেখানে গিয়ে তাকে বনূ মাগালাহের দুর্গের পার্শ্বে বালকদের খেলায় নগ্ন পেলেন। তখন সে বালেগ হবার নিকটবর্তী বয়সে পৌছেছে। সে নবী (ﷺ) এর আগমন টের পেল না যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার হাত দিয়ে তার পিঠে মারলেন। তারপর তিনি বললেনঃ তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিই আল্লাহর রাসূল! তখন সে নবী (ﷺ) এর দিকে তাকিয়ে বললোঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি উম্মী সম্প্রদায়ের রাসূল। এরপর ইবন সাইয়্যাদ বললঃ আপনি কি সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, আমিই আল্লাহর রাসূল? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ধাক্কা মেরে বললেনঃ আমি আল্লাহ ও তার রাসূলদের উপর ঈমান রাখি। তারপর আবার তিনি ইবন সাইয়্যাদকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কী দেখতে পাও? সে বললঃ আমার নিকট সত্যবাদী ও মিথ্যাচারী উভয়ই আসেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ বিষয়টি তোমার উপর এলোমেলো করে দেয়া হয়েছে। এরপর নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ আমি তোমার (পরীক্ষার) জন্য কিছু গোপন রাখছি। সে বললঃ তা 'দুখ'। তখন তিনি বললেনঃ 'দূর হও'। তুমি কখনো তোমার ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারবে না। উমার বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি তার ব্যাপারে আমাকে অনুমতি দেন যে, আমি তার গর্দান কেটে দেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এ যদি সেই (দাজ্জালই) হয়, তাহলে তার উপর তোমাকে ক্ষমতা দেয়া হবে না। আর এ যদি সে না হয়ে থাকে, তবে তাকে হত্যা করা তোমার জন্য ভাল হবে না।

সালিম বলেন, এরপর আমি আবদুল্লাহ ইবন উমার-কে বলতে শুনেছি যে, এ ঘটনার পর একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং উবাই ইবন কা'ব সেই খেজুর বাগানের দিকে রওয়ানা হলেন, যেখানে ইবন সাইয়্যাদ ছিল। অবশেষে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাগানে প্রবেশ করলেন, তখন তিনি খেজুরের গাছের আড়ালে চলতে লাগলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল যে, ইবন সাইয়্যাদ তাকে দেখার আগেই যেন তিনি তার কিছু কথাবার্তা শুনে নিতে পারেন। এ সময় ইবন সাইয়্যাদ তার বিছানায় একখানা চাদর গায়ে দিয়ে শুয়েছিল। আর তার চাদরের মধ্য হতে বিড়বিড় শব্দ শুনা যাচ্ছিল। ইতোমধ্যে ইবন সাইয়্যাদের মা নবী (ﷺ)-কে দেখল যে, তিনি খেজুরের গাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে আসছেন। তখন তার মা তাকে ডেকে বললঃ ওহে সাফ্! -এটা ছিল তার ডাক নাম- এই যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)। তখন ইবন সাইয়্যাদ চুপ হল। তখন রাসূলূল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ যদি তার মা তাকে সতর্ক না করতো তবে তার (ব্যাপার) প্রকাশ পেয়ে যেতো।

রাবী সালিম আরও বলেন, আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহাবাদের মধ্যে দাড়িয়ে আল্লাহ তাআলার যথাবিহিত প্রশংসার পর দাজ্জালের উল্লেখ করে বললেনঃ আমি তোমাদের তার ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছি। প্রত্যেক নবীই এর ব্যাপারে তার কওমকে সাবধান করে গিয়েছেন। আমি এর ব্যাপারে এমন কথা বলছি যা অন্য কোন নবী তার কওমকে বলেননি। তোমরা জেনে রাখ সে কানা; কিন্তু আল্লাহ কানা নন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আবদুল কায়সের প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ) এর কাছে এলে তিনি বললেনঃ এই প্রতিনিধি দলের প্রতি 'মারহাবা', যারা লাঞ্ছিত ও লজ্জিত হয়ে আসেনি। তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা রাবি'য়া গোত্রের লোক। আমরা ও আপনার মাঝে অবস্থান করছে 'মুযার' গোত্র। এজন্য আমরা হারাম মাস ব্যতীত আপনার খিদমতে পৌছতে পারি না। সুতরাং আপনি আমাদের এমন কিছু চূড়ান্ত নিয়ম-নীতি বাতলিয়ে দেন যা অনুসরণ করে আমরা জান্নাতে যেতে পারি এবং আমাদের পেছনে যারা রযেছে তাদের পথ দেখাতে পারি। তিনি বললেনঃ আমি চারটি ও চারটি নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা সালাত কায়িম করবে, যাকাত দিবে, রমাযান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং গানীমাতের মালের পঞ্চমাংশ দান করবে। আর কদুর খোলে, সবুজ রং করা কলসে, খেজুর মূলের পাত্রে এবং আলকাতরা রঙানো পাত্রে পান করবে না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ (কিয়ামতের দিন) শপথ ভঙ্গকারীর জন্য একটি পতাকা তোলা হবে এবং বলা হবে যে, এ হলো অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ শপথ ভঙ্গকারীর জন্য কিয়ামতের দিন একটা পতাকা দাড় করানো হবে। আর বলা হবে যে, এটা অমুকের পুত্র অমুকের বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ সাবধান! তোমাদের কেউ যেন এমন না বলে যে, আমার হৃদয় খবীস হয়ে গেছে। তবে এ কথা বলতে পারে যে, আমার হৃদয় কলুষিত হয়ে গেছে।

সাহল থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সাবধান! তোমাদের কেউ যেন এ কথা না বলে, আমার অন্তর 'খবীস' হয়ে গেছে। বরং সে বলবেঃ আমার অন্তর কলুষিত হয়েছে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ বলেন, মানুষ কালকে গালি দেয়, অথচ আমিই কাল, (এর নিয়ন্ত্রণের মালিক)। একমাত্র আমারই হাতে রাত ও দিনের পরিবর্তন ঘটে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা আঙ্গুরকে 'কারম' বলো না। আর বলবে না বঞ্চিত যুগ। কারণ আল্লাহই যুগ বা কাল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ লোকেরা (আঙ্গুরকে) 'কারম' বলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে 'কারম' হলো মুমিনের অন্তর।

আলী বলেন, আমি সাদ ছাড়া আর কারো ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে এ কথা বলতে শুনিনি যে, আমার মাতা-পিতা তোমার প্রতি কুরবান। আমি তাকে বলতে শুনেছিঃ হে সা'দ! তুমি তীর চালাও। আমার মাতা-পিতা তোমার প্রতি কুরবান। আমার ধারণা হচ্ছে যে, এ কথা তিনি উহুদের যুদ্ধে বলেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। একবার নবী (ﷺ) এর সঙ্গে তিনি ও আবূ ত্বলহা (মদিনায়) আসছিলেন। তখন নবী (ﷺ) এর সঙ্গে সফিয়্যাহ তার উটের পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। পথে এক জায়গায় উটের পা পিছলে যায় এবং নবী (ﷺ) ও তার স্ত্রী পড়ে যান। তখন আবূ ত্বলহা-ও তার উট থেকে লাফ দিয়ে নামলেন এবং নবী (ﷺ) এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর নবী! আপনার কি কোন চোট লেগেছে? আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি কুরবান করুন। তিনি বললেনঃ না। তবে মহিলাটির খোজ নাও। তখন আবূ ত্বলহা তার কাপড় দিয়ে চেহারা ঢেকে তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার উপরও একখানা বস্ত্র ফেলে দিলেন। তখন মহিলাটি উঠে দাড়ালেন। এরপর আবূ ত্বলহা তাদের হাওদাটি উটের উপর শক্ত করে বেধে দিলেন। তারা উভয়ে সাওয়ার হলেন এবং সবাই আবার রওয়ানা হলেন। অবশেষে যখন তারা মদিনার নিকটে পৌছলেন, তখন নবী (ﷺ) বলতে লাগলেনঃ আমরা প্রত্যাবর্তনকারী, তওবাকারী, ইবাদাতকারী এবং একমাত্র স্বীয় রবের প্রশংসাকারী"। তিনি মদিনায় প্রবেশ করা অবধি এ কথাগুলো বলছিলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের একজনের একটি ছেলে জন্ম নিল। সে তার নাম রাখলো 'কাসিম'। আমরা বললামঃ আমরা তোমাকে আবুল কাসিম ডাকবো না আর সে সম্মানও দেবো না। তিনি এ কথা নবী (ﷺ)-কে জানালে তিনি বললেনঃ তোমার ছেলের নাম রাখ আবদুর রহমান'।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমাদের এক লোকের একটি ছেলে জন্মাল। সে তার নাম রাখলো 'কাসিম'। তখন লোকেরা বললঃ আমরা নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত তাকে এ কুন্ইয়াতে ডাকবো না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা আমার নামে নাম রেখো, কিন্তু আমার কুন্ইয়াতে কারো কুন্ইয়াত রেখো না।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবুল কাসিম (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা আমার নামে নাম রেখো, কিন্তু আমার কুন্ইয়াতে কুন্ইয়াত রেখো না।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমাদের মধ্যেকার এক লোকের একটি ছেলে হলে সে তার নাম রাখলো 'কাসিম'। আমরা বললামঃ আমরা তোমাকে 'আবুল কাসিম' কুন্ইয়াতে ডাকবো না। আর এর মাধ্যমে তোমার চোখও ঠান্ডা করবো না। তখন লোকটি নবী (ﷺ) এর কাছে এ কথা জানাল। তিনি বললেনঃ তোমার ছেলের নাম রাখ আবদুর রহমান।

ইবন মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত যে, তার দাদা নবী (ﷺ) এর নিকট আসলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার নাম কী? তিনি বললেনঃ 'হায্‌ন'। নবী (ﷺ) বললেনঃ বরং তোমার নাম 'সাহল'। তিনি বললেনঃ আমার পিতা আমার যে নাম রেখেছেন, তা অন্য কোন নাম দিয়ে আমি বদলাবো না। ইবন মুসাইয়্যাব বলেনঃ এরপর থেকে আমাদের বংশের মধ্যে দুঃখকষ্টই চলে এসেছে।

সাহল হতে বর্ণিত যে, যখন মুনযির ইবন আবূ উসায়দ জন্মলাভ করলেন, তখন তাকে নবী (ﷺ) এর নিকট নিয়ে আসা হলো। তিনি তাকে নিজের উরুর উপর রাখলেন। আবূ উসায়দ পাশেই উপবিষ্ট ছিলেন। এ সময় নবী (ﷺ) তার সামনেই কোন জরুরী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইত্যবসরে আবূ উসায়দ কারো মাধ্যমে তার উরু থেকে তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন। পরে নবী (ﷺ) সে কাজ থেকে মুক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ শিশুটি কোথায়? আবূ উসায়দ বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তার নাম কী? তিনি বললেনঃ অমুক। নবী (ﷺ) বললেনঃ বরং তার নাম 'মুনযির'। সে দিন হতে তার নাম রাখলেন 'মুনযির'।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, যাইনাব-এর নাম ছিল 'বাররাহ' (নেককার)। তখন বলা হল যে, এর দ্বারা তিনি নিজের পবিত্রতা প্রকাশ করছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার নাম রাখলেনঃ 'যাইনাব'।

সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত। একবার তার দাদা নবী (ﷺ) এর কাছে আসলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার নাম কী? তিনি উত্তর দিলেনঃ আমার নাম হাযন। তিনি বললেনঃ না বরং তোমার নাম 'সাহল'। তিনি বললেনঃ আমার পিতা আমার যে নাম রেখে গিয়েছেন, তা আমি পাল্টাতে চাই না। ইবন মুসাইয়্যাব বলেন, ফলে এরপর থেকে আমাদের বংশে দুঃখকষ্টই লেগে আছে।

ইসমাঈল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আবূ আওফা-কে জিজ্ঞেস করলামঃ আপনি কি নবী (ﷺ) এর পুত্র ইবরাহীম-কে দেখেছেন? তিনি বললেনঃ তিনি তো বাল্যাবস্থায় মারা গিয়েছেন। যদি মুহাম্মাদ (ﷺ) এর পরে অন্য কেউ নবী হবার বিধান থাকত তবে তার পুত্র জীবিত থাকতেন। কিন্তু তার পরে কোন নবী নাই।

আদী ইবন সাবিত বলেন, আমি বারাআ-কে বলতে শুনেছি যে, যখন ইবরাহীম মারা যান তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তার জন্য জান্নাতে দুগ্ধদায়িনী থাকবে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা আমার নাম রাখ। কিন্তু আমার কুন্ইয়াতে কারো কুন্ইয়াত রেখ না। কেননা আমিই কাসিম। আমি তোমাদের মধ্যে (আল্লাহর নিয়ামাত) বণ্টন করি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা আমার নামে নাম রাখ। কিন্তু আমার কুন্ইয়াতে কারো কুন্ইয়াত রেখো না। আর যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমাকে দেখেছে, সে অবশ্যই আমাকে দেখেছে। শয়তান আমার সুরত গ্রহণ করতে পারে না। আর যে লোক ইচ্ছাপূর্বক আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে, সে যেন জাহান্নামেই তার বাসস্থান করে নেয়।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি ছেলে জন্মালে আমি তাকে নিয়ে নবী (ﷺ) এর কাছে আসলাম। তিনি তার নাম রেখে দিলেন ইবরাহীম। তারপর তিনি একটা খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিয়ে তার জন্য বারাকাতের দোয়া করলেন এবং তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। রাবী বলেন, সে ছিল আবূ মূসা এর বড় ছেলে।

যিয়াদ ইবন ইলাকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুগীরাহ ইবন শুবাহ-কে বলতে শুনেছিঃ যে দিন ইবরাহীম মারা যান, সে দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। এটি আবূ বাকরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সালাতের রুকু থেকে মাথা তুলে দোয়া করলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি ওয়ালীদ, সালামাহ ইবন হিশাম, আইয়্যাশ ইবন আবী রাবী'য়া এবং মক্কার দুর্বল মুসলিমদের শত্রুর জ্বালাতন থেকে মুক্তি দাও। আর হে আল্লাহ! মুযার গোত্রকে শক্তভাবে পাকড়াও করো। হে আল্লাহ! তুমি তাদের উপর এমন দুর্ভিক্ষ দাও, যেমন দুর্ভিক্ষ ইউসুফ-এর যুগে দিয়েছিলে।

নবী (ﷺ) এর স্ত্রী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে আয়িশাহ! এই যে জিবরীল তোমাকে সালাম বলছেন। তিনি বললেনঃ তার উপরও আল্লাহর শান্তি ও রহমত নাযিল হোক। এরপর তিনি বললেনঃ নবী (ﷺ) দেখেন, যা আমি দেখি না।

আনাস হতে বর্ণিত। একবার উম্মু সালীম সফরের সামগ্রীবাহী উটে সাওয়ার ছিলেন। আর নবী (ﷺ) এর গোলাম আন্জাশ উটগুলোকে জলদি হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ ওহে আনজাশ! তুমি কাঁচের পাত্র বহনকারী উটগুলো আস্তে আস্তে হাকাও।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) সবচেয়ে অধিক সদাচারী ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল; 'তাকে আবূ উমায়র' বলে ডাকা হতো। আমার ধারণা যে, সে তখন মায়ের দুধ খেতো না। যখনই সে তার নিকট আসতো, তিনি বলতেনঃ হে আবূ উমায়র! কী করছে তোমার নুগায়র? সে নুগায়র পাখিটা নিয়ে খেলতো। আর প্রায়ই যখন সালাতের সময় হতো, আর তিনি আমাদের ঘরে থাকতেন, তখন তার নীচে যে বিছানা থাকতো, একটু পানি ছিটিয়ে ঝেড়ে দেয়ার জন্য আমাদের আদেশ করতেন। তারপর তিনি সালাতের জন্য দাড়াতেন এবং আমরাও তার পেছনে দাড়াতাম। আর তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আলী এর নিকট তার নামগুলোর মধ্যে 'আবূ তুরাব' কুন্ইয়াত ছিল সবচেয়ে অধিক প্রিয় এবং এ নামে ডাকলে তিনি খুব খুশী হতেন। নবী (ﷺ)-ই তাকে 'আবূ তুরাব' কুন্ইয়াতে ডেকেছিলেন। একদিন তিনি ফাতেমাহ এর সঙ্গে রাগ করে বেরিয়ে এসে মসজিদের দেয়ালের পাশে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় নবী (ﷺ) তাকে তালাশ করছিলেন। এক ব্যক্তি বললঃ তিনি তো ওখানে দেয়ালের পাশে শুয়ে আছেন। নবী (ﷺ) তার কাছে গিয়ে তাকে এমন হালতে পেলেন যে, তার পিঠে ধূলাবালি লেগে আছে। তিনি তার পিঠ থেকে ধূলা ঝাড়তে লাগলেন আর বলতে লাগলেনঃ হে আবূ তুরাব! উঠে বসো।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলার কাছে কিয়ামতের দিনে ঐ লোকের নাম সবচেয়ে ঘৃণিত, যে তার নাম রেখেছে 'রাজাদের রাজা'।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে খারাপ নামধারী অথবা বলেছেন, সব নামের মধ্যে ঘৃণিত নাম হলো সে ব্যক্তির,যে 'রাজাদের রাজা' নাম গ্রহণ করেছে।

উসামাহ ইবন যায়দ বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি গাধার উপর সাওয়ার ছিলেন। তখন তার গায়ে একখানা ফাদাকী চাদর ছিল এবং তার পেছনে উসামাহ বসাছিলেন। তিনি বদরের যুদ্ধের পূর্বে সা'দ ইবন উবাদাহ এর শুশ্রূষা করার উদ্দেশে হারিস ইবন খাযরাজ গোত্র অভিমুখে রওয়ানা হচ্ছিলেন। তারা চলতে চলতে এক মজলিসের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। সেখানে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল ছিল। এটা ছিল আবদুল্লাহ ইবন উবাইর এর (প্রকাশ্যে) ইসলাম গ্রহণের আগের ঘটনা। মজলিসটি ছিল মিশ্রিত। এতে ছিলেন মুসলিম, মুশরিক, মূর্তিপূজকও ইয়াহূদী। মুসলিমদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও ছিলেন। সাওয়ারীর চলার কারণে যখন উড়ন্ত ধূলাবালি মজলিসকে ঢেকে ফেলেছিল, তখন ইবন উবাই তার চাদর দিয়ে তার নাক ঢেকে নিয়ে বললঃ তোমরা আমাদের উপর ধূলি উড়িওনা। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের সালাম করলেন এবং সাওয়ারী থামিয়ে নামলেন। তারপর তিনি তাদের আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিয়ে কুরআন পড়ে শোনালেন। তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল তাকে বললঃ হে ব্যক্তি! আপনি যা বলেছেন যদি তা ঠিক হয়ে থাকে তবে তার চেয়ে উত্তম কথা আর কিছুই নেই। তবে আপনি আমাদের মজলিসসমূহে এসে আমাদের কষ্ট দিবেন না। যে আপনার কাছে যাবে, তাকেই আপনি নাসীহাত করবেন। তখন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বললেনঃ না, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মজলিসসমূহে আসবেন। আমরা আপনার এ বক্তব্য পছন্দ করি। তখন মজলিসের মুসলিম, মুশরিক ও ইয়াহূদীরা পরস্পর গালমন্দ করতে লাগল। এমনকি তাদের মধ্যে হাঙ্গামা হবার জোগাড় হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের নিবৃত্ত করতে লাগলেন, অবশেষে তারা চুপ করল। তারপর নবী (ﷺ) নিজ সওয়ারীর উপর সওয়ার হয়ে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং সা'দ ইবন উবাদাহ এর নিকট পৌছলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে সাদ! আবূ হুবাব আবদুল্লাহ ইবন উবাই আমাকে যা বলেছে, তা কি তুমি শোননি? সে এমন এমন কথা বলেছে। তখন সাদ ইবন উবাদাহ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা আপনার প্রতি কুরবান, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন এবং তার কথা ছেড়ে দিন। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনার উপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। নিশ্চই আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে আপনার প্রতি হক এমন সময় অবতীর্ণ হয়েছে, যখন এই শহরের অধিবাসীরা পরস্পর পরামর্শ করে স্থির করেছিল যে, তারা তাকে রাজ মুকুট পরাবে এবং (রাজকীয়) পাগড়ী তার মাথায় বাধবে। কিন্তু যখন আল্লাহ আপনাকে যে সত্য দিয়েছেন তা দিয়ে সেই সিদ্ধান্তকে বানচাল করে দিলেন, তখন সে এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে। এজন্যই সে আপনার সাথে এ ধরনের আচরণ করেছে যা আপনি দেখছেন। তারপর তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। আর আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীগণ তো এমনিই মুশরিক ও কিতাবীদের ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের নির্যাতনে ধৈর্য ধারণ করতেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণীঃ "তোমরা নিশ্চই তোমাদের আগের কিতাবধারীদের ও মুশরিকদের নিকট হতে দুঃখজনক অনেক কথা শুনবে.....। " (আলে ইমরান ৩ঃ ১৮৬) শেষ পর্যন্ত। আল্লাহ আরো বলেছেন, "কিতাবীরা অনেকেই কামনা করে.....।" (আল-বাকারাহ ২ঃ ১০৯) তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাদের ক্ষমা করতে থাকেন। অবশেষে তাকে তাদের সাথে জিহাদ করার অনুমতি দেয়া হয়। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বদর অভিযান চালালেন, তখন এর মাধ্যমে আল্লাহ কাফির বীর পুরুষদের এবং কুরাইশ সরদারদের মধ্যে যারা নিহত হবার তাদের হত্যা করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীগণ বিজয় বেশে গনীমত নিয়ে ফিরলেন। তাদের সাথে কাফিরদের অনেক বাহাদুর ও কুরাইশদের অনেক নেতাও বন্দী হয়ে আসে। সে সময় ইবন উবাই ইবন সালূল ও তার সাথী মূর্তিপূজক মুশরিকরা বললঃ এ ব্যাপার (দ্বীন ইসলাম) তো প্রবল হয়ে পড়ছে। সুতরাং এখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হাতে ইসলামের বায়আত গ্রহণ কর। তারপর তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করল।

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আবূ তালিবের কোন উপকার করতে পেরেছেন? তিনি তো সব সময় আপনার হিফাযত করতেন এবং আপনার জন্য অন্যের উপর রাগ করতেন। তিনি বললেন, হা। তিনি এখন জাহান্নামের হালকা স্তরে আছেন। যদি আমি না হতাম, তাহলে তিনি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকতেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। একবার নবী (ﷺ) (মহিলাদের সহ) এক সফরে ছিলেন। হুদী গায়ক হুদী গান গেয়ে চলেছিল। তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন, আফসোস তোমার প্রতি ওহে আনজাশা! তুমি কাঁচপাত্র তুল্য সাওয়ারীদের সাথে সদয় হও।

আনাস থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) এক সফরে ছিলেন। তার আনজাশা নামে এক গোলাম ছিল। সে হুদী গান গেয়ে উটগুলো হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেনঃ হে আনজাশা! তুমি ধীরে উট হাকাও, যেহেতু তুমি কাঁচপাত্র তুল্যদের (আরোহী) উট হাকিয়ে যাচ্ছ। আবূ কিলাবাহ বর্ণনা করেন, কাঁচপাত্র সদৃশ শব্দ দ্বারা নবী (ﷺ) স্ত্রীলোকদেরকে বুঝিয়েছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এর একটি হুদী গায়ক গোলাম ছিল। তাকে আনজাশা বলে ডাকা হতো। তার সুর ছিল মধুর। নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ হে আন্জাশা! তুমি ধীরে হাকাও, যেন কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙ্গে না ফেল। ক্বাতাদাহ বলেন, তিনি 'কাঁচপাত্রগুলো' শব্দ দ্বারা স্ত্রীলোকদেরকে বুঝিয়েছেন।

মুসাদ্দাদ ... আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, একবার মদিনাতে (ভয়ংকর শব্দ হলে) ভীতি দেখা দিল। নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহা এর একটা অশ্বে সওয়ার হয়ে এগিয়ে গেলেন এবং (ফিরে এসে) বললেনঃ আমি তো কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি এ ঘোড়াটিকে সমুদ্রের মতই পেয়েছি।

আয়িশাহ বলেন, কয়েকজন লোক নবী (ﷺ) এর নিকট গণকদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ ওরা কিছুই না। তারা আবার বললে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের বললেনঃ ওরা কিছুই না। তারা আবার বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! তারা তো কোন সময় এমন কথা বলে দেয়, যা বাস্তবে ঘটে যায়। নবী (ﷺ) বললেনঃ কথাটি জিন থেকে পাওয়া। জিনেরা তা আসমানের (ফেরেশতাদের থেকে) ছোঁ মেরে নিয়ে এসে তাদের বন্ধু গণকদের কানে তুলে দেয়, যেভাবে মুরগী তার বাচ্চাদের মুখে দানা তুলে দেয়। তারপর এ গণকরা এর সঙ্গে আরও শতাধিক মিথ্যা কথা মিলিয়ে দেয়।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেনঃ এরপর আমার প্রতি ওয়াহী আগমন বন্ধ হয়ে গেল। এ সময় আমি হেটে যাচ্ছিলাম। তখন আমি আসমানের দিক থেকে একটি আওয়াজ শুনে আকাশের পানে চোখ তুললাম। তখন হঠাৎ ঐ ফেরেশতাকে আসমান ও যমীনের মাঝে একটি কুরসীর উপর উপবিষ্ট দেখলাম, যিনি হেরায় আমার নিকট এসেছিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক রাতে মাইমূনাহ এর ঘরে অবস্থান করছিলাম। নবী (ﷺ)ও তার গৃহে ছিলেন। যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অথবা কিয়দংশ বাকী ছিল তখন তিনি উঠে বসলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে পাঠ করলেনঃ "নিশ্চই আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত্র ও দিনের আবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য বহু নিদর্শন আছে।" (আলে ইমরান ৩/১৯০)।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। একবার তিনি মদিনার এক বাগানে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। নবী (ﷺ) এর হাতে একটা লাঠি ছিল। তিনি তা দিয়ে পানি ও কাদার মাঝে খোচা দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ তার জন্য খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তখন আমি গিয়ে দেখলাম যে, তিনি আবূ বাকর। আমি তার জন্য দরজা খুললাম এবং জান্নাতের শুভ সংবাদ দিলাম। তারপর আরেক লোক দরজা খোলার অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ জানালাম। দেখলাম; তিনি উমার। আমি তার জন্য দরজা খুললাম এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। আবার আরেক লোক দরজা খোলার অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি হেলান দিয়েছিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসে বললেনঃ খুলে দাও এবং তাকে একটি কঠিন বিপদে পড়ার পর জান্নাতবাসী হবার সুসংবাদ দাও। আমি গিয়ে দেখি, তিনি উসমান। আমি তার জন্যও দরজা খুলে দিলাম এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। আর নবী (ﷺ) যা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আমি তাও বিবৃত করলাম। তিনি বললেনঃ আল্লাহ তাআলাই আমার সাহায্যকারী।

আলী হতে বর্ণিত যে, আমরা এক জানাযায় নবী (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি একটা লাকড়ি দিয়ে যমীনে মৃদু আঘাত দিয়ে বললেনঃ তোমাদের কোন লোক এমন নয় যার বাসস্থান জান্নাতে অথবা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়ে যায়নি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলঃ তা হলে কি আমরা তার উপর নির্ভর করব না। তিনি বললেনঃ আমল করে যাও। কারণ যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য তা সহজ করে দেয়া হবে। (এরপর তিলাওয়াত করলেন) "যে ব্যক্তি দান খয়রাত করবে, তাক্ওয়া অর্জন করবে ..... শেষ পর্যন্ত"- (আল-লায়ল ৯২/৫)।

উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী (ﷺ) ঘুম থেকে উঠে বললেনঃ সুব্হানাল্লাহ! অদ্যকার রাতে কত যে ধন-ভান্ডার এবং কত যে বিপদাপদ অবতীর্ণ করা হয়েছে। কে আছ যে এ হুজরাবাসিনীদের তার স্ত্রীদের জাগিয়ে দেবে যাতে তারা সালাত আদায় করে। দুনিয়ার কত বস্ত্র পরিহিতা, আখিরাতে উলঙ্গ হবে! উমার বর্ণনা করেন, আমি একদিন নবী (ﷺ) -কে বললাম, আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে 'তালাক' দিয়েছেন? তিনি বললেনঃ না। তখন আমি বললামঃ 'আল্লাহু আকবার'।

আলী ইবন হুসায়ন হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এর স্ত্রী সফীয়্যাহ বিন্ত হুইয়াই বর্ণনা করেন যে, রমাযানের শেষ দশ দিনে মসজিদে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ই'তিকাফের অবস্থায় তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন। তিনি রাতের প্রথম ভাগে কিছু সময় তার সঙ্গে কথাবার্তার পর ফিরে যাবার জন্য উঠে দাড়ালেন। নবী (ﷺ) তাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য উঠে দাড়ালেন। শেষে যখন তিনি মসজিদের দরজার নিকট পৌছলেন, যা নবী (ﷺ) এর বিবি উম্মু সালামাহর ঘরের নিকটে অবস্থিত, তখন তাদের পাশ দিয়ে আনসারের দু'জন লোক যাচ্ছিল। তারা দু'জনেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সালাম দিল এবং নিজ পথে রওয়ানা হল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের বললেনঃ ধীরে চল। ইনি হলেন সফীয়্যাহ বিন্ত হুইয়াই। তারা বললোঃ সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রাসূল। তাদের দু'জনের মনে তা গুরুত্বপূর্ণ মনে হল। তিনি বললেনঃ নিশ্চই শয়ত্বন মানুষের রক্তের ভিতর চলাচল করে থাকে। তাই আমার আশঙ্কা হলো যে, সম্ভবতঃ সে তোমাদের অন্তরে সন্দেহ জাগিয়ে দিতে পারে।

আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল মুযানী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ঢিল ছুঁড়তে নিষেধ করেছেন। আর বলেছেনঃ এটা শিকার মারতে পারে না এবং শত্রুকেও আহত করতে পারে না বরং কারো চোখ ফুড়ে দিতে পারে আবার কোন লোকের দাত ভেঙ্গে দিতে পারে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন নবী (ﷺ) -এর সম্মুখে দু' ব্যক্তি হাচি দিল। তখন নবী (ﷺ) একজনের জবাব দিলেন। অন্যজনের জবাব দিলেন না। তাকে কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ এ ব্যক্তি আল্হামদু লিল্লাহ বলেছে। আর ঐ ব্যক্তি আল্হামদু লিল্লাহ বলেনি।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ) আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং সাতটি কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। রোগীর সেবা-শুশ্রুষা করতে, জানাযার সঙ্গে চলতে, হাচিদাতার জবাব দিতে, দাওয়াত কবূল করতে, সালামের জওয়াব দিতে, মাযলূমকে সাহায্য করতে এবং শপথ পুরা করতে আমাদের আদেশ দিয়েছেন। আর সোনার আংটি অথবা বালা ব্যবহার করতে, সাধারণ রেশমী বস্ত্র পরিধান করতে, মিহিন রেশমী বস্ত্র, রেশমী যিন ব্যবহার করতে, কাসীই ব্যবহার করতে এবং রৌপ্য পাত্র ব্যবহার করতে আমাদের নিষেধ করেছেন।

আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আল্লাহ হাচি পছন্দ করেন এবং হাই তোলা অপছন্দ করেন, সুতরাং কেউ হাচি দিলে তার উচিত 'আলহামদুলিল্লাহ' (আল্লাহর প্রশংসা) বলা, তাহলে প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয যে তাকে শুনেছে: আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন (ইয়ার-হামুকাল্লাহ) বলা। কিন্তু হাই তোলার ক্ষেত্রে এটা শয়তানের পক্ষ থেকে, তাই একে বন্ধ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত, যদি কেউ হাই তোলার সময় 'হা' বলে, শয়তান তার প্রতি হাসে।"

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের কেউ হাচি দিলে সে যেন 'আল-হামদুলিল-লাহ' (আল্লাহর প্রশংসা) বলে এবং তার (মুসলিম) ভাই বা সঙ্গী যেন তাকে বলে, ইয়ার-হামুকাল-লাহ' (আল্লাহ আপনার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন)। পরেরজন যখন 'ইয়ার-হামুকা-আল্লাহ' বলে, পূর্বেরজনের বলা উচিত, 'ইয়াহদিকুমুল-লাহ ওয়া ইউসলিহ বালাকুম' (আল্লাহ আপনাকে হেদায়াত দান করুন এবং আপনার অবস্থার উন্নতি করুন)।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) এর সামনে দু' ব্যক্তি হাচি দিলেন। তিনি একজনের হাচির জবাব দিলেন এবং অন্যজনের জবাব দিলেন না। অন্য লোকটি বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তার হাচির জবাব দিলেন, কিন্তু আমার হাচির জবাব দিলেন না। তিনি বললেনঃ সে 'আলহামদু লিল্লা-হ' বলেছে, কিন্তু তুমি 'আলহামদু লিল্লা-হ' বলনি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা হাচি দেয়া পছন্দ করেন, আর হাই তোলা অপছন্দ করেন। যদি তোমাদের কেউ হাচি দিয়ে 'আলহামদু লিল্লাহ' বলে তবে প্রত্যেক মুসলিম শ্রোতার তার জবাবে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা ওয়াজিব। আর হাই তোলা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তির হাই উঠলে সে যেন তা যথাসম্ভব রোধ করে। কেননা কেউ হাই তুললে শয়তান তার প্রতি হাসে।