bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

কুরআন ও সুন্নাহকে শক্তভাবে ধরে থাকা (৭২৬৮-৭৩৭০)

ত্বারিক ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদীদের এক লোক উমার-কে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আমাদের উপর যদি এ আয়াতঃ "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামাত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবূল করে নিলাম"- ( আল-মায়িদাহ ৫/৩) অবতীর্ণ হত, তাহলে সে দিনটিকে আমরা অবশ্যই ঈদের দিন হিসাবে গণ্য করতাম। উমার বললেন, আমি অবশ্যই জানি এ আয়াতটি কোন দিন অবতীর্ণ হয়েছিল। আরাফাহর দিন জুমুআহর দিনে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, দ্বিতীয় দিনে যখন মুসলিমরা আবূ বকর-এর বায়আত গ্রহণ করেছিল এবং তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মিম্বারের উপর উপবিষ্ট ছিলেন; উমার-কে আবূ বকর-এর পূর্বে হামদ ও ছানা ও কালেমা শাহাদাত পাঠ করতে তিনি (আনাস) শুনেছেন। তিনি বললেন, অতঃপর আল্লাহ তার রাসূলের জন্য তোমাদের কাছে যা ছিল তার চেয়ে তার নিকট যা আছে সেটাকেই পছন্দ করেছেন। আর এই সে কিতাব যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদের রাসূল (ﷺ)-কে হিদায়াত দিয়েছিলেন। কাজেই একে তোমরা আকড়ে ধর। তাহলে এর মাধ্যমে আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-কে যে হিদায়াত দিয়েছিলেন তোমরাও সেই হিদায়াত পাবে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (তার শরীরের সঙ্গে) আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহ! তাকে কিতাবের ইলম দাও।

আবূ বারযা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে ইসলাম দ্বারা ও মুহাম্মাদ (ﷺ)এর দ্বারা মুখাপেক্ষীহীন কিংবা পরিপূর্ণ করেছেন।

আবদুল্লাহ্ ইবন দ্বীনার হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন উমার আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের বাই'আত করে লিখলেনঃ আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাতের ভিত্তিতে আমার সাধ্যমত (আপনার নির্দেশ) শোনা ও মানার অঙ্গীকার করছি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমি 'জাওয়ামিউল কালিম' (ব্যাপক অর্থবহ সংক্ষিপ্ত কথা) সহ প্রেরিত হয়েছি এবং আমাকে প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। একবার আমি ঘুমের অবস্থায় দেখলাম, পৃথিবীর ভান্ডারগুলোর চাবি আমাকে দেয়া হয়েছে এবং তা আমার হাতে রেখে দেয়া হয়েছে। আবূ হুরাইরাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তিকাল করে গেছেন। আর তোমরা তা ব্যবহার করছ কিংবা বলেছিলেন তোমরা তা থেকে উপকার লাভ করছ কিংবা তিনি এরকমই কোন কথা বলেছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ প্রত্যেক নবীকেই কোন-না-কোন অতুলনীয় নিদর্শন দেয়া হয়েছে যার উপর ঈমান আনা হয়েছে, কিংবা লোকেরা তার উপর ঈমান এনেছে। আর আমাকে দেয়া হয়েছে ওয়াহী, যা আল্লাহ আমার উপর অবতীর্ণ করেছেন। সুতরাং আমি আশা করি যে, কিয়ামতের দিন আমার অনুসারীর সংখ্যা তাদের সবার চেয়ে বেশি হবে।

আবূ ওয়ায়িল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এই মসজিদে শায়বাহর কাছে বসেছিলাম। তিনি বললেন, তুমি যেমন বসে আছ, উমার তেমনি এ জাগায় বসা ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, আমি ইচ্ছা করছি যে, এতে সোনা ও রুপার কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখব না বরং সবকিছু মুসলিমদের মাঝে বণ্টন করে দেব। আমি বললাম, আপনি তা করবেন না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? আমি বললাম, আপনার সঙ্গীদ্বয় এমনটা করেননি। তিনি বললেন, তারা দু'জন অনুসরণ করার মত লোকই ছিলেন।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, আমানাত আসমান হতে মানুষের অন্তরের অন্তঃস্তলে অবতীর্ণ হয়েছে, তারপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং মানুষ কুরআন পাঠ করেছে এবং সুন্নাত শিক্ষা করেছে।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত যে, সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। "তোমাদের কাছে যার ওয়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না"- (আনআম ৬/১৩৪)।

আবূ হুরাইরাহ ও যায়দ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত। তারা বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। (এ সময়) তিনি বললেনঃ আমি অবশ্য অবশ্যই মহান আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুযায়ী তোমাদের মাঝে ফায়সালা করব।

পূর্বের হাদিসের মতই (৭২৭৮)।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেনঃ যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদল ফেরেশ্তা নবী (ﷺ)-এর নিকট আসলেন। তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। একজন ফেরেশ্তা বললেন, তিনি (নবী (ﷺ)) ঘুমিয়ে আছেন। অন্য একজন বললেন, চোখ ঘুমিয়ে বটে, কিন্তু অন্তর জেগে আছে। তখন তারা বললেন, তোমাদের এ সাথীর একটি উদাহরণ আছে। সুতরাং তার উদাহরণ তোমরা বর্ণনা কর। তখন তাদের কেউ বলল- তিনি তো ঘুমন্ত, আর কেউ বলল, চোখ ঘুমন্ত তবে অন্তর জাগ্রত। তখন তারা বলল, তার উদাহরণ হল সেই লোকের মত, যে একটি বাড়ী তৈরি করল। তারপর সেখানে খানার আয়োজন করল এবং একজন আহবানকারীকে (লোকদের ডাকতে) পাঠাল। যারা আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিল, তারা ঘরে প্রবেশ করে খানা খাওয়ার সুযোগ পেল। আর যারা আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিল না, তারা ঘরেও প্রবেশ করতে পারল না এবং খানাও খেতে পারল না। তখন তারা বললেন, উদাহরণটির ব্যাখ্যা করুন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন। তখন কেউ বলল, তিনি তো ঘুমন্ত, আর কেউ বলল, চোখ ঘুমন্ত, তবে অন্তর জাগ্রত। তখন তারা বললেন, ঘরটি হল জান্নাত, আহবানকারী হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)। যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুসরণ করল, তারা আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অবাধ্যতা করল, তারা আসলে আল্লাহরই অবাধ্যতা করল। মুহাম্মাদ (ﷺ) হলেন মানুষের মাঝে পার্থক্যের মাপকাঠি। কুতাইবাহ জাবির থেকে এরকম হাদীস বর্ণনা করেছেন, তবে তিনি "নবী (ﷺ) আমাদের কাছে বের হয়ে আসলেন" এ কথাটি বলেছেন।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে কুরআন পাঠকারী সমাজ! তোমরা (কুরআন ও সুন্নাহর উপর) সুদৃঢ় থাক। নিশ্চই তোমরা অনেক পশ্চাতে পড়ে আছ। আর যদি তোমরা ডানদিকের কিংবা বামদিকের পথ অনুসরণ কর তাহলে তোমরা সঠিকপথ বহু দূরে সরে পড়বে।

আবূ মূসা নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমার ও আমাকে আল্লাহ যা কিছু দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হল এমন যে, এক লোক কোন এক কাওমের নিকট এসে বলল, হে কাওম! আমি নিজের চোখে সেনাবাহিনীকে দেখে এসেছি। আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী। কাজেই তোমরা আত্মরক্ষার চেষ্টা কর। কাওমের কিছু লোক তার কথা মেনে নিল, সুতরাং রাতের প্রথম প্রহরে তারা সে জায়গা ছেড়ে রওনা হল এবং একটি নিরাপদ জায়গায় গিয়ে পৌছল। ফলে তারা রক্ষা পেল। তাদের মধ্যেকার আর একদল লোক তার কথা মিথ্যা জানল, ফলে তারা নিজেদের জায়গাতেই রয়ে গেল। সকাল বেলায় শত্রুবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ চালাল, তাদেরকে ধ্বংস করে দিল এবং তাদেরকে উৎপাটিত করে দিল। এই হল তাদের উদাহরণ যারা আমার আনুগত্য করে এবং আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করে। আর যারা আমার কথা অমান্য করে তাদের দৃষ্টান্ত হল আমি যে সত্য নিয়ে এসেছি তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তিকাল করলেন আর তার পরে আবূ বকর-কে খালীফা করা হলো এবং আরবের যারা কাফির হবার তারা কাফির হয়ে গিয়েছিল, তখন উমার আবূ বকর-কে বললেন, আপনি কী করে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমি মানুষের সঙ্গে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত। অতএব যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলল, সে তার জান ও মালকে আমার থেকে নিরাপদ করে নিল। তবে ইসলামী বিধানের আওতায় পড়লে আলাদা। তাদের প্রকৃত হিসাব আল্লাহর কাছে হবে। আবূ বকর বললেন, যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। কেননা, যাকাত হল মালের হক। আল্লাহর শপথ! যদি তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট যা আদায় করত, এখন তা (সেভাবে) দিতে অস্বীকার করে, তাহলেও আমি অবশ্যই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। উমার বললেন, আল্লাহর কসম! আমি দেখছিলাম যে, যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ তাআলা আবূ বকরের সিনা খুলে দিয়েছেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম এ সিদ্ধান্ত সঠিক।

পূর্বের হাদিসের মতই (৭২৮৪)।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উয়াইনাহ ইবন হিস্ন ইবন হুযাইফাহ ইবন বাদ্র তার ভাতিজা হুর ইবন কায়স ইবন হিস্ন-এর কাছে আসলেন। উমার যাদের নিজে সন্নিকটে রাখতেন, হুর ইবন কায়স ছিলেন তাদেরই একজন। যুবক হোক কিঙবা বৃদ্ধ কারী (আলিম) ব্যক্তিরাই উমার-এর মজলিসের সদস্য ও পরামর্শদাতা ছিলেন। উয়ায়না তার ভাতিজাকে বললেন, হে ভাতিজা! তোমার কি আমীরের নিকট এতটুকু প্রভাব আছে যে আমার জন্য সাক্ষাতের অনুমতি গ্রহণ করতে পারবে? সে বলল, আমি আপনার ব্যাপারে তার কাছে অনুমতি চাইব। ইবন আব্বাস বলেন, তিনি (হুর) 'উয়াইনাহর জন্য অনুমতি চাইলেন। তারপর যখন উয়াইনাহ উমার-এর নিকট গেলেন, তখন সে বলল, হে ইবন খাত্তাব! আল্লাহর কসম! আপনি আমাদের মাল দিচ্ছেন না, আবার ইনসাফের ভিত্তিতে আমাদের মাঝে ফায়সালাও করছেন না। তখন উমার রেগে গেলেন, এমন কি তিনি তাকে মারতে উদ্যত হলেন। তখন হুর বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন। আল্লাহ তার নবী (ﷺ)-কে বলেছেনঃ "তুমি ক্ষমা অবলম্বন কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, আর নির্বোধদের উপেক্ষা কর"- (আল-আরাফ ৭/১৯৯)। এ লোকটি একজন মূর্খ। আল্লাহর শপথ! উমার -এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলে তিনি তা এতটুকু লঙ্ঘন করলেন না। তিনি আল্লাহর কিতাবের খুবই অনুগত ছিলেন।

আসমা বিনত আবূ বকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার সূর্যগ্রহণের সময় আমি আয়িশাহ-এর কাছে এলাম। লোকেরা তখন (সালাতে) দাড়িয়েছিল এবং তিনিও দাড়িয়ে সালাত পড়ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, লোকদের কী হল? তিনি হাত দিয়ে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করলেন এবং বললেন, সুবহানাল্লাহ্! আমি বললাম, এটা কি কোন নিদর্শন? তখন তিনি মাথা নেড়ে হা বললেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সালাত পড়া শেষ করলেন, তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন ও ছানা পড়লেন। তারপর বললেন, আমি যা দেখিনি তার সবকিছুই আজকে আমার এ জায়গায় দেখলাম। এমন কি জান্নাত ও জাহান্নামও দেখলাম। আর আমার কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, কবরে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে, প্রায় দাজ্জালের পরীক্ষার মতই। তবে যারা মুমিন হবে, অথবা (বলেছিলেন) মুসলিম হবে। তারা বলবে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিলেন, আমরা তার ডাকে সাড়া দিয়েছি এবং ঈমান এনেছি। তখন তাকে বলা হবে, শান্তিতে ঘুমোও, আমরা জানি তুমি দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলে। আর যারা মুনাফিক হবে অথবা (বলেছিলেন) সন্দেহকারী হবে- বর্ণনাকারী বলেন, আসমা 'মুনাফিক' বলেছিলেন না 'সন্দেহকারী' বলেছিলেন তা আমার মনে নেই- তারা বলবে, আমি কিছুই জানি না, আমি মানুষকে কথা বলতে শুনেছি, আর তাই বলেছি।

আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ তোমরা আমাকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাক, যে পর্যন্ত না আমি তোমাদের কিছু না বলি। কেননা, তোমাদের আগে যারা ছিল, তারা তাদের নবীদেরকে বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও নবীদের (নবীদের) সঙ্গে মতভেদ করার জন্যই ধ্বংস হয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন ব্যাপারে নিষেধ করি, তখন তাথেকে বেচে থাক। আর যদি কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহলে সাধ্য অনুসারে মেনে চল।

আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিমদের সর্বাপেক্ষা বড় অপরাধী ঐ লোক যে এমন বিষয়ে প্রশ্ন করে যা আগে হারাম ছিল না, কিন্তু তার প্রশ্ন করার কারণে তা হারাম করা হয়েছে।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) চাটাই দিয়ে মসজিদে একটি হুজরা বানিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার ভিতর কয়েক রাত সালাত পড়লেন। এতে লোকেরা তার সঙ্গে একত্রিত হত। তারপর এক রাতে তারা তার আওয়াজ শুনতে পেল না এবং তারা ভাবল, তিনি ঘুমিয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ গলা খাঁকার দিতে লাগল, যাতে তিনি তাদের নিকট বেরিয়ে আসেন। তখন তিনি [নবী (ﷺ)] বললেনঃ তোমাদের এ ক' দিনের কর্মকান্ড আমি দেখেছি, এতে আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তোমাদের উপর তা ফরজ করে দেয়া হতে পারে। কিন্তু যদি তোমাদের উপর ফরজ করে দেয়া হয় তাহলে তোমরা তা প্রতিষ্ঠিত করবে না। কাজেই ওহে লোকেরা! তোমরা নিজ নিজ ঘরে সালাত পড়। কারণ, মানুষের সবচেয়ে উত্তম সালাত হল যা সে তার ঘরে আদায় করে ফরয সালাত ছাড়া।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কতকগুলো বিষয়ে প্রশ্ন করা হল যা তিনি অপছন্দ করলেন। লোকেরা যখন তাকে অধিক অধিক প্রশ্ন করতে লাগল, তিনি রাগান্বিত হলেন এবং বললেনঃ আমাকে প্রশ্ন কর। তখন এক লোক দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কে? তিনি বললেনঃ তোমার পিতা হল হুযাফা। এরপর আরেকজন দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কে? তিনি বললেনঃ তোমার পিতা শায়বাহর আযাদকৃত গোলাম সালিম। উমার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারায় রাগের আলামাত দেখে বললেন, আমরা আল্লাহর কাছে তওবা করছি।

মুগীরাহ ইবন শুবাহ-এর লেখক ওয়াররাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআবিয়াহ মুগীরাহ-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা কিছু শুনেছ তা আমার কাছে লিখে পাঠাও। তিনি বলেন, তিনি তাকে লিখলেন যে, আল্লাহর নবী (ﷺ) প্রতি সালাতের পর বলতেনঃ "লা ইলাহা ইল্লাল্লা-হ ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুলা আলা কুল্লি শাইইন কাদির। আল্লাহুম্মা লা মানিআ লিমা আ'তাইতা, ওয়ালা মুতিয়া লিমা মানা'তা, ওয়ালা ইয়ানফাউ জুলজাদ্দ মিনকাল-জাদ্দ।" (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তার কোন শারীক নেই, সাম্রাজ্য মালিক তিনিই, আর সকল প্রশংসা তারই জন্য, তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ! তুমি যা দান করবে তাকে আটকানোর কেউ নেই, আর তুমি আটকাবে তা দেয়ার মত কেউ নেই। তোমার বিপক্ষে সম্পদশালীদের ধন সম্পদ কোন উপকার করবে না।) তিনি আরো লিখেছিলেন যে, নবী (ﷺ) তর্কে লিপ্ত হওয়া, বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও সম্পদ বিনষ্ট করা থেকে নিষেধ করতেন। আর তিনি মায়েদের অবাধ্য হতে, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দিতে ও প্রাপকের পাওনা দেয়া থেকে হাত গুটাতে আর নেয়ার ব্যাপারে হাত বাড়িয়ে দিতে নিষেধ করতেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা উমার-এর কাছে ছিলাম। তখন তিনি বললেনঃ (যাবতীয়) কৃত্রিমতা হতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। (ধর্মীয় সীমা অতিক্রম করা)

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। দুপুরের পর নবী (ﷺ) বেরিয়ে আসলেন এবং যুহরের সালাত পড়লেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি মিম্বরে দাড়ালেন এবং কিয়ামাত (কিয়ামত) সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি উল্লেখ করলেন যে, কিয়ামতের আগে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটবে। তারপর তিনি বললেনঃ কেউ যদি আমাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা পছন্দ করে, তাহলে সে তা করতে পারে। আল্লাহর শপথ! আমি এখানে অবস্থান করা পর্যন্ত তোমরা আমাকে যে বিষয়েই প্রশ্ন করবে, আমি তা তোমাদেরকে জানাব। আনাস বলেন, এতে লোকেরা খুব বেশি কাঁদল। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেশি বেশি বলতে থাকলেন তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন কর। আনাস বলেন, তখন এক লোক দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার আশ্রয়ের জায়গা কোথায়? তিনি বললেন, জাহান্নাম। তারপর আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা দাড়িয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কে? তিনি বললেনঃ তোমার পিতা হুযাফা। আনাস বলেন, তারপর তিনি বার বার বলতে লাগলেনঃ তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন কর, আমার কাছে প্রশ্ন কর। এতে উমার হাটু গেড়ে বসে গেলেন এবং বললেন, আমরা আল্লাহকে রব হিসাবে মেনে ইসলামকে দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসাবে বিশ্বাস করে সন্তুষ্ট আছি। আনাস বলেন, উমার যখন এ কথা বললেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চুপ করলেন। তারপর নবী (ﷺ) বললেন: উত্তম! যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এই মুহূর্তে আমি যখন সালাতে ছিলাম তখন এ দেয়ালের প্রস্থে জান্নাত ও জাহান্নাম আমার সামনে পেশ করা হয়েছিল। আজকের মত এমন ভাল আর মন্দ আমি আর দেখিনি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর নবী! কে আমার পিতা? তিনি বললেনঃ তোমার পিতা অমুক। তারপর এ আয়াত নাযিল হলঃ "হে মুমিনরা! তোমরা এমন বিষয়ে প্রশ্ন কর না, যা প্রকাশিত হলে তোমরা দুঃখিত হবে....." (আল-মায়িদাহ ৫/১০১)।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, লোকেরা একে অপরকে প্রশ্ন করতে থাকবে যে, এ আল্লাহ সব কিছুরই স্রষ্টা, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করল?

ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মাদ্বীনাহ্য় এক শস্য ক্ষেতে ছিলাম। তিনি একটি খেজুরের ডালে ভর দিয়ে ইয়াহূদীদের একটি দলের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের কেউ বলল, তাকে রূহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। আর কেউ বলল তাকে জিজ্ঞেস করো না, এতে তোমাদেরকে এমন উত্তর শুনতে হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ কর। অতঃপর তারা তার কাছে উঠে গিয়ে বলল, হে আবুল কাসিম! আমাদেরকে রূহ্ সম্পর্কে জানান। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। আমি বুঝলাম, তার কাছে ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছে, আমি তার থেকে একটু পিছে সরে দাড়ালাম। ওয়াহী শেষ হল। তারপর তিনি বললেনঃ 'তারা তোমাকে রূহ্ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, 'রূহ্ আমার প্রতিপালকের আদেশ......' (ইসরা ১৭/৮৫)।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একটি সোনার আংটি পরতেন। তখন লোকেরাও সোনার আংটি পরতে লাগল। এরপর (একদিন) নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি সোনার আংটি পরছিলাম- তারপর তিনি তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং বললেনঃ আমি আর কোন দিনই তা পরিধান করব না। ফলে লোকেরাও তাদের আংটিগুলো ছুঁড়ে ফেলল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা ইফতার না করে লাগাতার সওম রেখো না। সাহাবীরা বললেন, আপনি তো ইফতার না করে লাগাতার সওম রাখেন। তিনি বললেনঃ আমি তোমাদের মতো নই। আমি রাত কাটাই যাতে আমার রব আমাকে খাওয়ান ও পান করান। কিন্তু তারা লাগাতার সওম রাখা থেকে বিরত হলো না। ফলে তাদের সঙ্গে নবী (ﷺ) ও দু'দিন অথবা (বর্ণনাকারী বলেছিলেন) দু' রাত লাগাতার সওম রাখলেন। এরপর তারা নতুন চাঁদ দেখতে পেলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ যদি চাঁদ (আরও কয়েক দিন) দেরী করে উঠত, তাহলে আমিও (লাগাতার সওম রেখে) তোমাদের সওমের সময়কে বাড়িয়ে দিতাম, তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য।

ইবরাহীম তায়মী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা বর্ণনা করেছেন যে, একবার আলী পাকা ইটের তৈরী একটি মিম্বরে উঠে আমাদের উদ্দেশে খুত্বা দিলেন। তার সাথে একটা তলোয়ার ছিল, যার মাঝে একটি সহীফা ঝুলছিল। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব এবং যা এই সহীফাতে লেখা আছে এ ব্যতীত অন্য এমন কোন কিতাব নেই যা পাঠ করা যেতে পারে। তারপর তিনি তা খুললেন। তাতে উটের বয়স সম্পর্কে লেখা ছিল এবং লেখা ছিল যে, 'আয়র' পর্বত থেকে অমুক স্থান পর্যন্ত মাদ্বীনাহ হারাম (পবিত্র এলাকা) বলে গণ্য হবে। যে কেউ এখানে কোন অন্যায় করবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তামন্ডলী ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। আর আল্লাহ তার ফরজ ও নফল কোন ইবাদাতই কবূল করবেন না এবং তাতে আরও ছিল যে, এখানকার সকল মুসলিমের নিরাপত্তা একই স্তরের। একজন নিম্ন স্তরের লোকও (অন্যকে) নিরাপত্তা দিতে পারবে। যদি কেউ অন্য মুসলিমের প্রদত্ত নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করে, তাহলে তার উপর আল্লাহর, ফেরেশ্তামন্ডলীর ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তার ফরজ ও নফল কোন ইবাদাতই গ্রহণ করবেন না। তাতে আরও ছিল, যদি কেউ তার (মুক্তি দাতা) মনিবের অনুমতি ছাড়া অন্যকে নিজের (গোলামী কালীন সময়ের) মনিব বলে উল্লেখ করে, তাহলে তার উপর আল্লাহর, ফেরেশ্তামন্ডলীর ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। আর আল্লাহ তাআলা তার ফার্য (ফরয), নফল কোন ইবাদাতই কবূল করবেন না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) নিজে একটি কাজ করলেন এবং তাতে তিনি অবকাশ দিলেন। তবে কিছু লোক এর থেকে নিবৃত্ত থাকল। নবী (ﷺ)-এর কাছে এ খবর পৌছল। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন ও ছানা পাঠ করলেন, তারপর বললেনঃ লোকদের কী হল যে, তারা এমন কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকে যা আমি করি। আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহ সম্পর্কে তাদের চেয়ে বেশি জানি এবং আমি তাদের চেয়ে আল্লাহকে অনেক বেশি ভয় করি।

ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু'জন অতি ভাল লোক আবূ বকর ও উমার ধ্বংসের কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিলেন। বানী তামীমের প্রতিনিধি দল যখন নবী (ﷺ)-এর কাছে আসল, তখন তাদের একজন [উমার] আকরা ইবন হাবিস হানযালী নামে বানী মুজাশে গোত্রের ভ্রাতা এক লোকের দিকে ইঙ্গিত করলেন, অন্যজন [আবূ বকর] আরেক জনের দিকে ইঙ্গিত করলেন। এতে আবূ বকর উমার-কে বললেন, আপনার ইচ্ছা হল আমার বিরোধিতা করা। উমার বললেন, আমি আপনার বিরোধিতার ইচ্ছা করিনি। নবী (ﷺ)-এর সামনে তাদের দু'জনেরই আওয়াজ উচ্চ হয়ে যায়। ফলে অবতীর্ণ হয়: "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর গলার আওয়াজের উপর তোমাদের গলার আওয়াজ উচ্চ করো না....." (আল-হুজুরাত ৪৯/২)। ইবন আবূ মুলাইকাহ বলেন, ইবন যুবায়র বর্ণনা করেন যে, এরপরে উমার যখন নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কোন কথা বলতেন, তখন গোপন বিষয়ে আলাপকারীর মত চুপে চুপে বলতেন, এমন কি তা শোনা যেত না, যতক্ষণ নবী (ﷺ) তার থেকে আবার জিজ্ঞেস না করতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার অসুখের সময় বললেনঃ তোমরা আবূ বকরকে বল, লোকদের তিনি নিয়ে যেন সালাত আদায় করে নেন। আয়িশাহ বলেন, আমি বললাম যে, আবূ বকর যদি আপনার জায়গায় দাড়ান তাহলে কান্নার কারণে মানুষকে তার আওয়াজ শোনাতে পারবেন না। কাজেই আপনি উমার-কে আদেশ করুন, তিনি যেন লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। তিনি আবার বললেন, তোমরা আবূ বকরকে বল, তিনি যেন লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। আয়িশাহ বলেন, আমি হাফসাহ-কে বললাম, তুমি বল যে, আবূ বকর আপনার জায়গায় দাড়ালে কান্নার কারণে লোকেদেরকে তার আওয়াজ শোনাতে পারবেন না। কাজেই আপনি উমার-কে আদেশ করুন। তিনি যেন লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। হাফসাহ তাই করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা তো ইউসুফ-এর মহিলাদের মত (যারা তাকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল)। আবূ বকরকে বল, তিনি যেন লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করেন। হাফসাহ আয়িশাহ-কে বললেন, আমি আপনার নিকট হতে কখনই কল্যাণ পাইনি।

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উওয়ায়মির আসিম ইবন আদীর কাছে এসে বলল, আপনার কী অভিমত, যদি কেউ তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কাউকে পায় এবং তাকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে এজন্য আপনারা কি তাকে হত্যা করবেন? হে আসিম! আপনি আমার জন্য এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করুন। তিনি জিজ্ঞেস করলে নবী (ﷺ) এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করাকে অপছন্দ করলেন এবং উত্তর দিতে অস্বীকার করলেন। আসিম ফিরে এসে তাকে জানাল যে, নবী (ﷺ) বিষয়টিকে অপছন্দ মনে করেছেন। উওয়াইমির বললেন, আল্লাহর কসম! অবশ্য অবশ্যই আমি নিজেই নবী (ﷺ)-এর নিকট যাব। তারপর তিনি আসলেন। আসিম চলে যাবার পরেই আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। তিনি তাদের দু'জনকেই (সে ও তার স্ত্রী) ডাকলেন। তারা উপস্থিত হল এবং 'লি'আন' করল। তারপর উওয়ায়মির বলল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তাকে আটকে রাখি তাহলে তো আমি তার উপর মিথ্যারোপ করেছি, এ বলে তিনি তার সঙ্গে বিবাহ ছিন্ন করলেন। অবশ্য নবী (ﷺ) তাকে বিবাহ ছিন্ন করতে বলেননি। পরে 'লি'আন'কারীদের মাঝে এ প্রথাই চালু হয়ে গেল। নবী (মহিলাটি সম্পর্কে) বললেনঃ একে লক্ষ্য রেখ, যদি সে খাটো ওয়াহারার (এক রকমের পোকা) মত লালচে সন্তান প্রসব করে, তাহলে আমি মনে করব উওয়াইমির মিথ্যাই বলেছে। আর যদি সে কাল চোখওয়ালা ও বড় নিতম্বধারী সন্তান প্রসব করে, তাহলে মনে করব উওয়াইমির তার ব্যাপারে সত্যই বলেছে। পরে সে অপকর্মের ফল নিয়ে হাজির হয়।

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মালিক ইবন আওস নাযরী আমাকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অবশ্য মুহাম্মাদ ইবন যুবায়র ইবন মুতঈম এ ব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলেন। পরে আমি মালিকের নিকট যাই এবং তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি। তখন তিনি বলেন, উমার-এর সঙ্গে দেখা করার জন্য রওনা হয়ে তার কাছে হাজির হলাম। এমন সময় তার দ্বাররক্ষক ইয়ারফা এসে বলল, উসমান, আবদুর রহমান, যুবায়র এবং সাদ আসতে চাচ্ছেন। আপনার অনুমতি আছে কি? তিনি বললেন, হ্যা। তারপর তারা প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে আসনে বসলেন। দ্বাররক্ষক (আবার) বলল, আলী এবং আব্বাসের ব্যাপারে আপনার অনুমতি আছে কি? তিনি তাদের দু'জনকে অনুমতি দিলেন। আব্বাস এসে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার ও সীমালঙ্ঘনকারীর মাঝে ফায়সালা করে দিন। এবং তারা পরস্পরকে গালমন্দ করলেন। তখন দলটি বললেন উসমান ও তার সঙ্গীরা, হে আমীরুল মুমিনীন! এ দু'জনের মাঝে ফায়সালা করে দিয়ে একজনকে অন্যজন হতে শান্তি দিন। উমার বললেন, আপনারা একটু ধৈর্য ধারণ করুন। আমি আপনাদেরকে সেই আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি যার হুকুমে আসমান ও যমীন নিজ স্থানে বিদ্যমান, আপনারা কি এ কথা জানেন যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন ঃ আমাদের সম্পদ ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হয় না, আমরা যা রেখে যাই তা সদাকাহ হিসাবে গণ্য হয়? এ কথা দ্বারা নবী (ﷺ) নিজেকেই বুঝিয়েছিলেন। দলের সবাই বললেন, হ্যা তিনি এ কথা বলেছিলেন। তারপর উমার আলী ও আব্বাস-এর দিকে ফিরে বললেন, আপনাদের দু'জনকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আপনারা কি জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ কথা বলেছিলেন? তারা দু'জনেই আল্লাহর কসম দিয়ে বললেন, হ্যা। উমার বললেন, আমি আপনাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে, আল্লাহ এ সম্পদের একাংশ তার রাসূল (ﷺ)'র নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন, অপর কারো জন্য দেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ ইয়াহূদীদের নিকট হতে তার রাসূলকে যে ফায় দিয়েছেন তার জন্য তোমরা ঘোড়া কিংবা উটে চড়ে যুদ্ধ করনি...(৫৯ঃ ৬)। কাজেই এ সম্পদ একমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)'র জন্যই নির্দিষ্ট ছিল। তারপর আল্লাহর কসম! তিনি আপনাদেরকে বাদ দিয়ে এককভাবে নিজের জন্য তা সঞ্চিত করে রাখেননি, কিংবা এককভাবে আপনাদেরকেও দিয়ে দেননি। বরং তিনি আপনাদের সকলকেই তাথেকে দিয়েছেন এবং সকলের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। অবশেষে তাথেকে এ পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট রয়েছে। নবী (ﷺ) এ সম্পদ থেকে তার পরিবারের জন্য তাদের বছরের খরচ দিতেন। এরপর যা অবশিষ্ট থাকত তা আল্লাহর মাল যে পথে ব্যয় হয় সে পথে খরচের জন্য রেখে দিতেন। নবী (ﷺ) তার জীবিত অবস্থায় এমন করতেন। আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি! আপনারা কি এ ব্যাপারে জ্ঞাত আছেন? সকলেই বললেন, হ্যা। তারপর আলী ও আব্বাস-কে লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহর কসম দিয়ে আপনাদের দু'জনকে জিজ্ঞেস করছি! আপনারা কি এ ব্যাপারে জ্ঞাত আছেন? তারা দু'জনেই বললেন, হ্যা। এরপর আল্লাহ তাআলা তার নবী (ﷺ)-কে মৃত্যু দিলেন। তখন আবূ বকর বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্থলাভিষিক্ত। কাজেই তিনি সে সম্পদ অধিগ্রহণ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে খাতে এ সম্পদ ব্যয় করতেন তিনিও ঠিক সেভাবেই ব্যয় করতেন। আপনারা তখন ছিলেন। তারপর আলী ও আব্বাসএর দিকে ফিরে বললেন, আপনারা দু'জন তখনও মনে করতেন যে আবূ বকর এ ব্যাপারে এরূপ ছিলেন। আল্লাহ জানেন তিনি এ ব্যাপারে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, সত্যনিষ্ঠ ও হক্কের অনুসারী ছিলেন। তারপর আল্লাহ আবূ বকর-কেও মৃত্যু দিলেন। তখন আমি বললাম, এখন আমি আবূ বকর ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্থলাভিষিক্ত। সুতরাং দু'বছর আমি তা আমার তত্ত্বাবধানে রাখলাম এবং আবূ বকর ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা যে খাতে খরচ করতেন, আমিও তেমনি করতে লাগলাম। তারপর আপনারা দু'জন আমার কাছে এলেন। আপনাদের দু'জনের একই কথা ছিল, দাবিও ছিল একই। আপনি এসেছিলেন নিজের ভাতিজার থেকে নিজের অংশ আদায় করে নেয়ার দাবি নিয়ে, আর ইনি (আলী) এসেছিলেন তার স্ত্রীর পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত অংশ আদায় করে নেয়ার দাবি নিয়ে। আমি বললাম, যদি আপনারা চান তাহলে আমি আপনাদেরকে তা দিয়ে দিতে পারি, তবে শর্ত এই যে, আপনারা আল্লাহর নামে এই ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হবেন যে, এ সম্পদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বকর যে ভাবে খরচ করতেন এবং আমি এর দায়িত্ব নেয়ার পর যেভাবে তা খরচ করেছি, আপনারাও তেমনিভাবে ব্যয় করবেন। তখন আপনারা দু'জনে বলেছিলেন, এ শর্তেই আপনি তা আমাদের হাতে দিয়ে দিন। ফলে আমি তা আপনাদের কাছে দিয়ে দিয়েছিলাম। আল্লাহর কসম দিয়ে আপনাদেরকে জিজ্ঞেস করছি! আমি কি সেই শর্তাধীনে এদের কাছে সে সম্পদ দিয়ে দেইনি? সকলেই বলল, হ্যা। তখন তিনি আলী ও আব্বাস -এর দিকে তাকিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম দিয়ে আপনাদের দু'জনকে জিজ্ঞেস করছি! আমি কি ঐ শর্তাধীনে আপনাদেরকে সে সম্পদ দিয়ে দেইনি? তারা দু'জন বললেন, হ্যা। তখন তিনি বললেন, আপনারা কি আমার নিকট হতে এর ভিন্ন কোন ফয়সালা পেতে চান? সে সত্তার কসম করে বলছি, যার হুকুমে আকাশ ও যমীন নিজ স্থানে বিরাজমান, কিয়ামতের পূর্বে আমি এ বিষয়ে নতুন কোন ফয়সালা করব না। যদি আপনারা এর তত্ত্বাবধানে অক্ষম হন, তা হলেতা আমার নিকট সোপর্দ করুন। আপনাদের দু'জনের বদলে আমি একাই এর তত্ত্বাবধানের জন্য যথেষ্ট।

আসিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, নবী (ﷺ) কি মাদ্বীনাহ্কে হারাম (পবিত্র এলাকা) হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। উত্তরে তিনি বললেন, হ্যা, অমুক জায়গা থেকে অমুক জায়গা পর্যন্ত। এখানকার কোন গাছ কাটা যাবে না, আর যে ব্যক্তি এখানে বিদ্আত করবে তার উপর আল্লাহ, ফেরেশ্তা ও সকল মানুষের অভিশাপ।

উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আমর আমাদের এ দিক দিয়ে হাজ্জে যাচ্ছিলেন। আমি শুনতে পেলাম, তিনি বলেছেন যে, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদেরকে যে ইল্ম দান করেছেন, তা হঠাৎ ছিনিয়ে নেবেন না বরং উলামাগণকে তাদের ইলমসহ ক্রমশ তুলে নেয়ার মাধ্যমে তা ছিনিয়ে নেবেন। তখন কেবল মূর্খ লোকেরা অবশিষ্ট থাকবে। তাদের কাছে ফাত্ওয়া চাওয়া হবে। তারা মনগড়া ফাত্ওয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে। উরওয়াহ বলেন, আমি এ হাদীসটি নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ-কে বললাম। তারপর আবদুল্লাহ ইবন আমর আবার হাজ্জ করতে এলেন। তখন আয়িশাহ আমাকে বললেন, হে ভাগ্নে! তুমি আবদুল্লাহর কাছে যাও এবং তার থেকে যে হাদীসটি তুমি আমাকে বর্ণনা করেছিলেন, তা তার নিকট থেকে যাচাই করে আস। আমি তার নিকট গেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আমাকে ঠিক সে রকমই বর্ণনা করলেন, যেরকম আগে বর্ণনা করেছিলেন। আমি আয়িশাহ-'র কাছে ফিরে এসে তাকে জানালাম। তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আবদুল্লাহ ইবন আমর মনে রেখেছে।

আমাস বলেন। আমি আবূ ওয়ায়িলকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি সিফফীনের যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যা। মূসা ইবন ইসমাঈল ..... সাহল ইবন হুনায়ফ বলেন, হে লোকেরা! দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের নিজস্ব মতামতকে গ্রহণযোগ্য মনে করো না। কেননা আবূ জান্দাল দিবসে (হুদাইবিয়াহর দিন) আমি ভেবেছিলাম, যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করতে পারতাম, তাহলে অবশ্যই আমি তা প্রত্যাখ্যান করতাম। যে কোন ভয়াবহ অবস্থার জন্য আমরা যখনই তলোয়ার কাঁধে নিয়েছি, তখনই তলোয়ার আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের পথ সহজ করে দিয়েছে। বর্তমান বিষয়টি আলাদা। রাবী বলেন, আবূ ওয়ায়িল বলেছেন, আমি সিফফীনের যুদ্ধে শরীক ছিলাম; কতই না মন্দ ছিল সিফফীনের লড়াই!

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অসুস্থ ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বকর আমার নিকট আসলেন। তারা দু'জনেই হেটে এসেছিলেন। তারা যখন আমার কাছে আসলেন, তখন আমি বেহুঁশ ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উযূ করলেন এবং উযূর পানি আমার উপরে ঢেলে দিলেন। তাতে আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান কোন কোন সময় বলতেন হে আল্লাহর রাসূল- আমার সম্পদের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেব? আমার সম্পদগুলো কী করব? (বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন) তিনি আমাকে কোন জবাব দিলেন না, অবশেষে মীরাসের আয়াত অবতীর্ণ হল।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাদীস তো কেবল পুরুষেরা শুনতে পায়। সুতরাং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করে দিন, যে দিন আমরা আপনার কাছে আসব, আল্লাহ আপনাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তাথেকে আপনি আমাদের শিখাবেন। তিনি বললেনঃ তোমরা অমুক অমুক দিন অমুক অমুক জায়গায় একত্রিত হবে। সে মোতাবেক তারা একত্রিত হলেন এবং নবী (ﷺ) তাদের কাছে এলেন এবং আল্লাহ তাকে যা কিছু শিখিয়েছেন তা থেকে তাদের শিক্ষা দিলেন। এবং বললেনঃ তোমাদের কেউ যদি সন্তানদের থেকে তিনটি সন্তান আগে পাঠিয়ে দেয় (মৃত্যুবরণ করে) তাহলে এ সন্তানরা তার জন্য জাহান্নাম থেকে পর্দা যাবে। তাদের মাঝ থেকে একজন মহিলা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি দু'জন হয়? বর্ণনাকারী বলেন, মহিলা কথাটি দু' দু'বার জিজ্ঞেস করলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ দু'জন হলেও, দু'জন হলেও, দু'জন হলেও।

মুগীরাহ ইবন শুবাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামত আসা পর্যন্ত আমার উম্মাতের এক দল সর্বদাই বিজয়ী থাকবে। আর তারা হলেন বিজয়ী।

মু'আবিযা ইবন আবূ সুফয়ান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন। আমি (ইল্মের) বণ্টনকারী মাত্র; আল্লাহ তা দান করে থাকেন। এ উম্মাতের কার্যকলাপ কিয়ামত অবধি কিংবা বলেছিলেন, মহান আল্লাহ তাআলার হুকুম আসা পর্যন্ত (সত্যের উপর) সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর এ আয়াতঃ বল, তিনি সক্ষম তোমাদের ঊর্ধ্বদেশ থেকে শাস্তি প্রেরণ করতে... অবতীর্ণ হল, তখন তিনি বললেনঃ (হে আল্লাহ!) আমি আপনার কাছে (এমন আযাব থেকে) আশ্রয় প্রার্থনা করি (তারপর যখন অবতীর্ণ হল) অথবা তোমাদের পায়ের নিচে থেকে। তখনও তিনি বললেনঃ (হে আল্লাহ!) আমি আপনার নিকট (এমন আযাব থেকে) আশ্রয় প্রার্থনা করি। এরপর যখন নাযিল হলঃ অথবা তোমাদেরকে দলে দলে ভাগ করতে এবং একদলকে অপর দলের সংঘর্ষের স্বাদ আস্বাদন করাতে তখন তিনি বললেনঃ এ দুটি অপেক্ষাকৃত নরম অথবা বলেছেনঃ অপেক্ষাকৃত সহজ।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান জন্ম দিয়েছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমার কি উট আছে? সে বলল, হ্যা আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,সেগুলোর কী রঙ? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোন উট আছে কি? সে বলল, হ্যা, সাদা কালো মোশানো রঙের অনেকগুলো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ রং কিভাবে এল বলে তুমি মনে কর? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বংশ সূত্রের প্রভাবে এমন হয়েছে। তিনি বললেনঃ সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশ সূত্রের প্রভাবে (পূর্বপুরুষের কেউ কালো ছিল বলে) এমন হয়েছে। এবং তিনি এ সন্তানটিকে অস্বীকার করার অনুমতি লোকটিকে দিলেন না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, এক মহিলা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমার মা হাজ্জ করার মানৎ করেছিলেন। এরপর তিনি হাজ্জ করার আগেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হাজ্জ করব? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যা, তার পক্ষ থেকে হাজ্জ কর। মনে কর যদি তার উপর ঋণ থাকত তাহলে কি তুমি তা আদায় করতে? সে বলল, অবশ্যই। তিনি বললেনঃ কাজেই তার উপর যে মানত আছে তা তুমি আদায় কর। আল্লাহ অধিক হক্দার, যে তার জন্য কৃত মানত মানুষেরা পূর্ণ করবে।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ দু'রকম লোক ব্যতীত কারো উপর হিংসা করা যাবে না। (এক) যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং হকপথে খরচ করার ক্ষমতা দান করেছেন। (দুই) যাকে আল্লাহ হিক্মাত (দ্বীনের বিষয়ে তীক্ষ্ম বুদ্ধি) দান করেছেন, আর সে এর আলোকে বিচার করে এবং তা অন্যকে শিখায়।

মুগীরাহ ইবন শুবাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার মহিলাদের গর্ভপাত সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তার পেটে আঘাত করা হয়, যার ফলে সন্তানের গর্ভপাত ঘটে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে নবী (ﷺ) থেকে এ সম্পর্কে কিছু শুনেছ? আমি বললাম, আমি শুনেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী শুনেছ? আমি বললাম, নবী (ﷺ)-কে এ সম্পর্কে আমি বলতে শুনেছি যে, এ কারণে গুর্রা একটি দাস কিংবা দাসী দান করতে হবে। এ শুনে তিনি বললেন, তুমি যে হাদীস বর্ণনা করেছ এর প্রমাণ হাজির না করা পর্যন্ত তুমি এখান থেকে যেও না।

তারপর আমি বের হলাম এবং মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ-কে পেলাম। আমি তাকে নিয়ে হাজির হলাম, সে আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিল, তিনিও নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন যে, এতে গুর্রা একটি দাস কিংবা দাসী দান করতে হবে।

আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ কিয়ামত কায়েম হবে না যে পর্যন্ত না আমার উম্মাত পূর্বযুগের লোকেদের নীতি পদ্ধতিকে আচার-অভ্যাসকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে গ্রহণ না করবে। বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! পারসিক ও রোমকদের মত কি? তিনি বললেনঃ এরা ছাড়া মানুষের মধ্যে অন্য আর কারা?

আবূ সাঈদ খুদরী নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেনঃ অবশ্য অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকেদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি দবের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কি ইয়াহূদী ও নাসারা? তিনি বললেনঃ আর কারা?

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে কোন ব্যক্তিকেই অন্যায়ভাবে কতল করা হয়, তার পাপের ভাগ আদম-এর প্রথম (হত্যাকারী) পুত্রের উপরও পড়বে। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, তার রক্তপাত করার অপরাধ তার উপরেও পড়বে উল্লেখ করেছেন। কারণ সেই প্রথমে হত্যার রীতি চালু করে

জাবির ইবন আবদুল্লাহ সালাম হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ইসলামের উপর বায়আত নিল। এরপর সে মাদ্বীনাহয় জ্বরে আক্রান্ত হল। বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার বায়আত ফিরিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অস্বীকৃতি জানালেন। আবার সে এসে বলল, আমার বায়আত ফিরিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর সে আবার এসে বলল, আমার বায়আত ফিরিয়ে দিন। এবারও নবী (ﷺ) অস্বীকৃতি জানালেন, বেদুঈন বেরিয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ মাদ্বীনাহ হাপরের মত। সে তার মধ্যেকার ময়লাকে দূর করে দেয় এবং ভালটুকু ধরে রাখে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবন আওফ-কে কুরআন পড়াতাম। উমার যখন তার শেষ হাজ্জ পালন করতে আসলেন, তখন আবদুর রহমান মিনায় আমাকে বললেন, তুমি আজ আমীরুল মুমিনীনের কাছে থাকলে দেখতে পেতে যে, তার কাছে এক লোক এসে বলল, এক লোক বলেছে, যদি আমীরুল মুমিনীন মারা যেতেন, তাহলে আমরা অমুক লোকের হাতে বায়আত নিতে পারতাম। উমার বললেন, আজ বিকেলে অবশ্য অবশ্যই দাড়িয়ে আমি তাদেরকে সতর্ক করব, যারা মুসলিমদের হক ছিনিয়ে নিতে চায়। আমি বললাম, আপনি এমনটি করবেন না। কেননা, এখন হাজ্জের মৌসুম। এখন সাধারণ মানুষের সমবেত হওয়ার সময়। তারা আপনার মজলিসকে কাবু করে ফেলবে। আমার ভয় হচ্ছে যে, তারা আপনার বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না। হের-ফের করে চারদিকে রটিয়ে দেবে। বরং আপনি হিজরত ও সুন্নাতের আবাসভূমি মাদ্বীনাহয় পৌছা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর একমাত্র রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুহাজির ও আনসার সহাবাদের নিকট আপনার বক্তব্য তুলে ধরুন। তারা আপনার বক্তব্য হেফাযত করবে এবং তার উপযুক্ত মর্যাদা দিবে। উমার বললেন, আল্লাহর কসম! আমি মাদ্বীনাহয় পৌছলে অবশ্য অবশ্যই সবচেয়ে আগে এটি করব। ইবন আব্বাস বলেন, আমরা মাদ্বীনাহয় পৌছলাম। তখন উমার ভাষণ দিলেন, আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সত্য বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার উপর কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে 'রজ্ম'-এর আয়াতও রয়েছে।

মুহাম্মাদ ইবন সীরীন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবূ হুরাইরাহ-এর নিকটে ছিলাম। তিনি লাল রঙের দু'টো কাতান পরে ছিলেন। এরপর তিনি নাক পরিষ্কার করলেন এবং বললেন, বাহঃ! বাহঃ! আবূ হুরাইরাহ আজ কাতান দিয়ে নাক পরিষ্কার করছে। অথচ আমার অবস্থা এমনও ছিল যে, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মিম্বর ও আয়িশাহ-এর হুজ্রার মধ্যবর্তী স্থানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতাম। আগমনকারী আসত, তার নিজ পা আমার গর্দানে রাখত, মনে হতো আমি যেন পাগল। অথচ আমার তিলমাত্র পাগলামি ছিল না। আমার ছিল একমাত্র ক্ষুধার যন্ত্রণা।

আবদুর রহমান ইবন আবিস হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি কি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কোন ঈদে উপস্থিত ছিলেন? তিনি বললেন, হ্যা। যদি তার কাছে আমার বিশেষ একটা মর্যাদা না থাকত তবে এত অল্প বয়সে তার কাছে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। নবী (ﷺ) কাসীর ইবন সালাতের বাড়ির নিকটের পতাকার নিকট আসলেন। এরপর ঈদের সালাত পড়লেন। তারপর খুৎবা দিলেন। রাবী আযান এবং ইকামত-এর উল্লেখ করেননি। নবী (ﷺ) লোকেদেরকে সদাকাহ প্রদানের নির্দেশ দিলেন। নারীরা তাদের কান ও গলার (অলঙ্কারের) দিকে ইশারা করলে নবী (ﷺ) বিলাল-কে (তাদের কাছে যাবার) হুকুম করলেন। বিলাল (অলঙ্কারাদি নিয়ে) নবী (ﷺ)'র কাছে ফিরে আসলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) কুবার মসজিদে কখনো পায়ে হেটে আবার কখনো, সওয়ার হয়েও আসতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে বললেন, আমাকে আমার অন্যান্য সঙ্গিণীদের (নবীর স্ত্রীগণ) সঙ্গে দাফন করবে। আমাকে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ঘরে দাফন করবে না। কেননা তাতে আমাকে অধিক দ্বীনদার পরহেজগার মনে করা হবে, আমি তা পছন্দ করি না।

বর্ণনাকারী হিশাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, উমার আয়িশাহ-এর নিকট লোক পাঠালেন, আমাকে আমার দু' সঙ্গী [রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বকর ]-এর সঙ্গে দাফন হবার অনুমতি দিন। আয়িশাহ বললেন, হ্যা। আল্লাহর কসম! বর্ণনাকারী আরো বলেন, আয়িশাহ-এর কাছে সহাবাদের কেউ যখনই এই অনুমতির জন্য কাউকে পাঠাতেন, তখনি তিনি বলতেন, না। আল্লাহর কসম! আমি তাদের কাউকে কক্ষনো প্রাধান্য দেব না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসরের সালাত পড়তেন। তারপর আমরা 'আওয়ালী' (মাদ্বীনাহর নিকট উচু টিলার স্থান) যেতাম। তখনও সূর্য উপরে থাকত। বর্ণনাকারী লায়স ইউনুস হতে আরো বর্ণনা করেছেন যে, 'আওয়ালী'র দূরত্ব চার অথবা তিন মাইল।

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগের সা তোমাদের এ সময়ের এক মুদ ও এক মুদের এক-তৃতীয়াংশের মাপের ছিল। অবশ্য (পরবর্তী সময়ে) তা বৃদ্ধি পেয়েছে। (হাদীসটি) কাসিম ইবন মালিক যুআয়দ থেকে শুনেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই বলে দোয়া করেছেনঃ হে আল্লাহ! তাদের পরিমাপে বরকত দান করুন, তাদের সা-এ বরকত দিন এবং তাদের মুদে- মাদ্বীনাবাসীদের।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, ইয়াহূদীগণ নবী (ﷺ)-এর নিকট এক ব্যভিচারী পুরুষ এবং এক ব্যভিচারিণী নারীকে নিয়ে আসল। তখন তিনি তাদের দু'জনকে শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দিলে মসজিদে নাবাবীর নিকট জানাযা রাখার স্থানে তাদেরকে পাথর নিক্ষেপে মারা হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, একদা উহুদ পাহাড় নজরে পড়লে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এ পর্বত আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও একে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইব্রাহীম মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন, আর আমি এ মাদ্বীনাহর দু'টি কঙ্করময় প্রান্তের মাঝের স্থানকে হারাম ঘোষণা করছি।

সাহল হতে বর্ণিত যে, মসজিদে নববীর কিবলার দিকের দেয়াল ও মিম্বরের মাঝে মাত্র একটা বকরী যাতায়াতের জায়গা ছিল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝের জায়গা জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান। আর আমার মিম্বর আমার হাওযের উপর।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা করিয়েছিলেন। ক্ষিপ্র গতির জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর প্রতিযোগিতার স্থান ছিল হাফয়া হতে সানীয়্যাতুল বিদ্যা পর্যন্ত। আর প্রশিক্ষণবিহীনগুলোর স্থান ছিল সানীয়্যাতুল বিদা হতে বানী যুরায়ক-এর মাসজিদ পর্যন্ত। আবদুল্লাহও প্রতিযোগীদের মধ্যে ছিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মিম্বরে (খুৎবাহ দিতে) শুনেছি।

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসমান ইবন আফফান-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মিম্বারে (খুত্বাহ দিতে) শুনেছি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোসলের জন্য এ পাত্রটি রাখা হত। আমরা এক সাথে এর থেকে গোসল করতাম।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) আনসার ও মুহাজিরদেরকে আমার মাদ্বীনাহর বাড়িতে প্রীতির ডোরে বেধেছিলেন।

এবং বানী সুলায়মের গোত্রের উপর বদদোয়া করার জন্য মাসব্যাপী (তিনি (ফজরের সালাতে) কুনূত (নাযিলা) পড়েছিলেন।

আবূ বুরদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মাদ্বীনাহ্য় আসলে আবদুল্লাহ ইবন সালাম আমার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি আমাকে বললেন, চলুন ঘরে যাই। আমি আপনাকে একটি পাত্রে পান করাবো, যেটিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পান করেছেন। আপনি ঐ সালাতের জায়গায় সালাত পড়তে পারবেন, যেখানে নবী (ﷺ) সালাত পড়েছিলেন। অতঃপর আমি তার সঙ্গে গেলাম। তিনি আমাকে ছাতু গুলে খাওয়ালেন এবং খেজুর খাওয়ালেন। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সালাত পড়ার স্থানে সালাত পড়লাম।

উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বলেছেনঃ আকীক নামক জায়গায় থাকার সময় এক রাতে আমার রবেবর নিকট হতে একজন আগন্তুক (ফেরেশ্তা) আমার কাছে এলেন। তিনি বলেন, এই বারাকাতময় উপত্যকায় সালাত পড়ুন এবং বলুন, উমরাহ ও হাজ্জের নিয়ত করছি।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মীকাত নির্ধারণ করেছেন নাজদবাসীদের জন্য কারনকে, সিরিয়াবাসীদের জন্য জুহ্ফাকে এবং মাদ্বীনাবাসীদের জন্য যুল হুলায়ফাকে। ইবন উমার বলেন, আমি এগুলো নবী (ﷺ) থেকে শুনেছি। আমার কাছে খবর পৌছেছে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ইয়ামানের লোকেদের মীকাত হচ্ছে ইয়া'লামলাম এবং ইরাকের কথা উল্লেখ করা হল। তখন ইবন উমার বললেন, সে সময় ইরাক ছিল না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত যে, তিনি যুলহুলায়ফাতে রাতের শেষ ভাগে অবস্থানকালে তাকে বলা হলো আপনি একটি বরকতপূর্ণ জায়গায় আছেন।

বনু উমার হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী (ﷺ)-কে ফজরের সালাতের শেষে রুকু থেকে মাথা উঠানোর সময় বলতে শুনেছেন, হে আমাদের প্রতিপালক! সমস্ত প্রশংসা কেবলমাত্র আপনারই জন্য। তিনি আরো বললেন, হে আল্লাহ! আপনি অমুক অমুক লোকের উপর অভিশাপ দিন। তখন আল্লাহ নাযিল করলেনঃ "আল্লাহ তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি প্রদান করবেন- এ ব্যাপারে তোমার কিছু করার নেই। কেননা তারা হচ্ছে যালিম"- (আলে ইমরান ৩/১২৮)।

আলী ইবন আবূ তালিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার এবং রাসূলের মেয়ে ফাতিমা-এর নিকট আসলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সালাত পড়েছ কি? আলী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জীবন তো আল্লাহর হাতে। তিনি আমাদেরকে যখন জাগাতে চান, জাগিয়ে দেন। এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চলে গেলেন, তার কথার জবাব দিলেন না। আলী বলেন, আমি শুনতে পেলাম, তিনি চলে যাচ্ছেন, আর ঊরুতে হাত মেরে মেরে বলছেনঃ মানুষ অধিকাংশ বিষয়েই বিতর্কপ্রিয়। আবূ আবদুল্লাহ (বুখারী) বলেন, তোমার কাছে রাতের বেলা আগমনকারী আসে তাকে 'তারিক' বা রাতের অতিথি বলে। 'তারিক' একটি তারাকেও বলা হয়। আর 'সাকিব' অর্থ হল জ্যোতির্ময়। এজন্যই আগুন যে জ্বালায় তাকে বলা হয়, তুমি আগুন জ্বালাও।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা মসজিদে নাবাবীতে ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাসজিদ থেকে বের হয়ে আমাদেরকে বললেনঃ তোমরা চলো ইয়াহূদীদের সেখানে যাই। আমরা তার সঙ্গে বেরোলাম। শেষে আমরা বায়তুল মিদরাসে (তাদের শিক্ষালয়ে) পৌছলাম। তারপর নবী (ﷺ) সেখানে দাড়িয়ে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! তোমরা ইসলাম কবূল কর, এতে তোমরা নিরাপত্তা লাভ করবে। ইয়াহূদীরা বলল, হে আবূল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমার ইচ্ছা তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর এবং শান্তিতে থাক। তারাও আবার বলল, হে আবুল কাসিম! আপনার পৌছানোর দায়িত্ব আপনি পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমি এরকমই ইচ্ছে পোষণ করি। তৃতীয়বারেও তিনি তাই বললেন। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ জেনে রেখো, যমীন একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসূলের। আমি তোমাদেরকে এই এলাকা থেকে নির্বাসিত করতে চাই। কাজেই তোমাদের যাদের মালপত্র আছে, তা যেন সে বিক্রি করে দেয়। তা নাহলে জেনে রেখো যমীন আল্লাহ ও তার রাসূলের।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নূহ্-কে হাযির করে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি (দ্বীনের দাওয়াত) পৌছে দিয়েছ? তখন তিনি বলবেন, হ্যা। হে আমার রব। এরপর তার উম্মাতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে নূহ্ (দাওয়াত) পৌছিয়েছে কি? তারা সকলে বলে উঠবে, আমাদের কাছে কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন নূহ্-কে বলা হবে, তোমার কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তার উম্মাতরাই (আমার সাক্ষী)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেনঃ তোমাদেরকে তখন নিয়ে আসা হবে এবং তোমরা (তার পক্ষে) সাক্ষ্য দেবে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর বাণী পাঠ করলেনঃ এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মাত বানিয়েছেন। তাহলে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষী হতে পারবে আর রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন- (আল-বাক্বারাহ ২/১৪৩)।

আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বানী আদী আনসারী গোত্রের এক লোককে খায়বারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠালেন। এরপর সে ফিরে আসল উন্নতমানের খেজুর নিয়ে। তখন নবী (ﷺ) জিজ্ঞাসা করলেন, খায়বারের সব খেজুরই কি এ রকম? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! সব খেজুরই এমন নয়। আমরা দু' সা' মন্দ খেজুরের বিনিময়ে এরূপ এক সা' ভাল খেজুর খরিদ করেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এমন করো না। বরং সমানে সমানে কেনা বেচা করো। কিংবা এগুলো বিক্রি করে এর মূল্য দিয়ে সেগুলো খরিদ করো। ওজনের সব জিনিসের হুকুম এটাই।

পূর্বের হাদিসের মতই (৭৩৫০)।

আমর ইবন আস হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন, কোন বিচারক ইজ্তিহাদে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছলে তার জন্য আছে দু'টি পুরস্কার। আর বিচারক ইজ্তিহাদে ভুল করলে তার জন্যও রয়েছে একটি পুরস্কার।

উবায়দ ইবন উমায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ মূসা উমার-এর কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। আবূ মূসা তাকে যেন কোন কাজে ব্যস্ত মনে করে ফিরে যাচ্ছিলেন। উমার বললেন, আমি কি আবদুল্লাহ ইবন কায়স-এর শব্দ শুনিনি? তাকে এখানে আসার অনুমতি দাও। এরপর তাকে ডেকে আনা হলে উমার জিজ্ঞেস করলেন, কী জিনিস আপনাকে ফিরে বাধ্য করল? আবূ মূসা বললেন, আমাদেরকে এরকমই করার আদেশ দেয়া হত। উমার বললেন, আপনার কথার পক্ষে প্রমাণ পেশ দিন, অন্যথায় আপনার সঙ্গে মোকাবেলা করব। এরপর তিনি আনসারদের এক মজলিসে চলে গেলেন। তারা বলল, আমাদের বালকরাই এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। এরপর আবূ সাঈদ খুদরী দাড়িয়ে বললেন, হ্যা, আমাদেরকে এরকম করারই নির্দেশ দেয়া হত। এরপর উমার বললেন, নবী (ﷺ)-এর এ আদেশটি আমার অজানা থেকে গেল। বাজারের ব্যস্ততাই আমাকে জানা থেকে বিরত রেখেছে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের ধারণা আবূ হুরাইরাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে অতিরিক্ত হাদীস বর্ণনা করছে। আল্লাহর কাছে একদিন আমাদেরকে হাযির হতে হবে। আমি ছিলাম একজন মিসকীন। খেয়ে না খেয়েই আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট পড়ে থাকতাম। বাজারের বেচাকেনা মুহাজিরদেরকে ব্যস্ত রাখত। আর আনসারগণকে ব্যস্ত রাখত তাদের ধন-মালের প্রতিষ্ঠা। একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত যে ব্যক্তি তার চাদর প্রসারিত করে তারপর তা গুটিয়ে নেবে, সে আমার নিকট হতে শোনা কিছুই কোন দিন ভুলবে না। তখন আমি আমার গায়ের চাদরখানা প্রসারিত করলাম। সে সত্তার শপথ, যিনি তাকে হক্কের সঙ্গে পাঠিয়েছেন! অতঃপর তার কাছ থেকে শোনা কোন কিছুই আমি ভুলি নি।

মুহাম্মাদ ইবন মুনকাদির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবন আবদুল্লাহ-কে আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে শুনেছি যে, ইবন সাইয়্যাদ একটা দাজ্জাল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ আল্লাহর শপথ করে বলছেন? তিনি উত্তরে বললেন, আমি উমার-কে নবী (ﷺ)-এর নিকট শপথ করে এ কথা বলতে শুনেছি। তখন নবী (ﷺ) এ কথা অস্বীকার করেননি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ ঘোড়া ব্যবহারের দিক দিয়ে মানুষ তিন রকমের। এক রকম লোকের জন্য ঘোড়া সাওয়ারের মাধ্যম, আর এক রকম লোকের জন্য তা পাপ থেকে বাচার অবলম্বন এবং আর এক রকম লোকের জন্য তা শাস্তির কারণ। তার জন্য ঘোড়া সাওয়ারের মাধ্যম, যে ঘোড়াকে আল্লাহর রাস্তায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখে এবং চারণভূমি বা বাগানে প্রশস্ত রশিতে বেধে বিচরণ করতে দেয়। এই রশি যত লম্বা এবং যত দূরত্বে ঘোড়া চরতে পারে, সে তত বেশি সওয়াব পায়। যদি ঘোড়া এ দড়ি ছিঁড়ে এক চক্কর বা দু' চক্কর লাগায় তবে ঐ ঘোড়ার প্রতিটি পদক্ষেপ এবং মালের বিনিময়ে তাকে সওয়াব দেয়া হয়। ঘোড়া যদি কোন নদী বা নালায় গিয়ে পানি খেয়ে ফেলে অথচ মালিক পানি খাওয়ানোর নিয়ত করেনি, এগুলো খুবই নেক কাজ। এর জন্য এ লোকের সওয়াব আছে। আর যে লোক ঘোড়া পালন করে একমাত্র অমুখাপেক্ষিতা এবং স্বনির্ভরতা বজায় রাখার জন্য; এর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার ঘাড়ে ও পিঠে যে আল্লাহর হক আছে তা আদায় করতেও সে ভুলে যায় না। এ ঘোড়া তার জন্য শাস্তি থেকে পর্দা হবে। আর যে ব্যক্তি অহংকার ও বশ্যতঃ ও লোক দেখানোর জন্য ঘোড়া পোষে, তার জন্য এই ঘোড়া (পাপের) বোঝা হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তখন তিনি বললেনঃ এ সম্পর্কে আমার উপর ব্যাপক অর্থবোধক একটি আয়াত ব্যতীত আল্লাহ অন্য কিছু অবতীর্ণ করেন নিঃ "অতএব কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে, আর কেউ অণু পরিমাণও অসৎ কাজ করলে সে তা দেখবে।"- (যিলযালা ৯৯/৭-৮)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। এক স্ত্রীলোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করল, হায়েয থেকে গোসল কিভাবে করতে হয়? তিনি বললেনঃ তুমি সুগন্ধিযুক্ত এক টুকরা কাপড় নেবে। এবং এর দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে। স্ত্রীলোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এর দ্বারা কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করব? নবী (ﷺ) : তুমি এর দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে। মহিলা আবার বলল, এর দ্বারা কিভাবে পবিত্রতা লাভ করবে? নবী (ﷺ) বললেনঃ তুমি এর দ্বারা পবিত্রতা লাভ করবে। আয়িশাহ বলেন, আমি বুঝতে পারলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দ্বারা কী বোঝাতে চাচ্ছেন? অতঃপর আমি স্ত্রীলোকটিকে আমার দিকে টেনে নিলাম এবং বিষয়টি তাকে জানিয়ে দিলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হারিস ইবন হাযনের মেয়ে উম্মু হুফায়দ নবী (ﷺ)-এর জন্য ঘি, পনির এবং কতগুলো দবব হাদিয়া পাঠালেন। নবী (ﷺ) ওগুলো চেয়ে নিলেন এবং এগুলো তার দস্তরখানে খাওয়া হল। নবী (ﷺ) ঘৃণার কারণে খেতে অপছন্দ করলেন। ওগুলো হারাম হলে, তার দস্তরখানে তা খাওয়া হত না এবং তিনিও এগুলো খেতে অনুমতি দিতেন না।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেনঃ যে ব্যক্তি কাঁচা রসুন কিংবা পেঁয়াজ খায়, সে যেন আমাদের থেকে কিংবা আমাদের মাসজিদ থেকে আলাদা থাকে। আর সে যেন তার ঘরে বসে থাকে। এরপর তার কাছে একটি পাত্র আনা হল। বর্ণনাকারী ইবন ওয়াহ্ব বলেন, শাক-সবজির একটি বড় পাত্র। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই পাত্রে এক প্রকার গন্ধ পাওয়ায় সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাকে পাত্রের মধ্যকার শাক-সবজি সম্পর্কে জানানো হল। তিনি তা এক সাহাবীকে খেতে দিতে বললেন যিনি তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এরপর তিনি যখন দেখলেন, সে তা খেতে অপছন্দ করছে তখন তিনি বললেনঃ খাও, কারণ আমি যার সঙ্গে গোপনে কথোপকথন করি, তুমি তার সঙ্গে তা কর না।

জুবায়র ইবন মুত্ঈম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক স্ত্রীলোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হল এবং তার সঙ্গে কোন ব্যাপারে কথাবার্তা বলল। নবী (ﷺ) তাকে কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলেন। এরপর স্ত্রীলোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল। আপনাকে যদি না পাই? তিনি বললেনঃ যখন আমাকে পাবে না, তখন আসবে আবূ বকর-এর কাছে। আবূ আবদুল্লাহ [(ইমাম বুখারী] বলেন, বর্ণনাকারী হুমায়দী ইবরাহীম ইবন সাদ থেকে আরো অতিরিক্ত বলেছেন, স্ত্রীলোকটি সম্ভবত তার কথা দ্বারা নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

আবুল ইয়ামান বলেন, শুআয়ব, ইমাম যুহরী হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মুআবীয়াহ-কে মাদ্বীনাহ্য় কুরায়শ বংশের কতকগুলো লোকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে শুনেছেন। তখন কা'ব আহবারের কথা আলোচনা হয়। মুআবীয়াহ বললেন, যারা আগেকার কিতাব সম্পর্কে আলোচনা করেন, তাদের মধ্যে তিনি অধিক সত্যবাদী, যদিও বর্ণিত বিষয়গুলোর ভিত্তি মিথ্যের উপর রচিত।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহলে কিতাব হিব্রু ভাষায় তাওরাত পড়ে মুসলিমদের কাছে তা আরবী ভাষায় ব্যাখ্যা করত। (এ সম্পর্কে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আহলে কিতাবকে তোমরা সত্যবাদী ভেবো না এবং তাদেরকে মিথ্যাবাদীও ভেবো না। তোমরা বলে দাও, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের উপর যা নাযিল হয়েছে তার প্রতি।

উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, ইবন আব্বাস বলেছেন, তোমরা কিভাবে আহলে কিতাবদেরকে কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর? অথচ তোমাদের কিতাব (আল-কুরআন) তার রাসূল (ﷺ)-এর উপর এখন অবতীর্ণ হয়েছে, তা তোমরা পড়ছ যা পূত-পবিত্র ও নির্ভেজাল। এ কিতাব তোমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে, আহলে কিতাবরা আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তিত ও বিকৃত করে দিয়েছে। তারা নিজ হাতে কিতাব লিখে তা আল্লাহর কিতাব বলে ঘোষণা দিয়েছে, যাতে এর দ্বারা সামান্য সুবিধা লাভ করতে পারে। তোমাদের কাছে যে ইল্ম আছে তা কি তোমাদেরকে তাদের কাছে কোন মাসআলা জিজ্ঞেস করতে নিষেধ করছে না? আল্লাহর কসম! আমরা তো তাদের কাউকে দেখিনি কখনো তোমাদের উপর নাযিল করা কিতাব সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করতে।

জুনদাব ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করতে থাক, যতক্ষণ এর প্রতি তোমাদের হৃদয়ের আকর্ষণ অব্যাহত থাকে। আর যখন তোমাদের মনে বিকর্ষণ দেখা দেয় তখন তাথেকে উঠে যাও।

জুনদাব হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা ততক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করতে থাক, যে পর্যন্ত এর প্রতি তোমাদের অন্তরের আকর্ষণ থাকে। আর যখন মনে বিকর্ষণ অনুভব কর, তখন তা থেকে উঠে যাও।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ)-এর মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হল। রাবী বলেন, ঘরের মধ্যে অনেক লোক ছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন উমার ইবন খাত্তাব। নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা এসো, আমি তোমাদের জন্য লিখে যাব যাতে তার পরে তোমরা কক্ষনো পথভ্রষ্ট হবে না। উমার মন্তব্য করলেন, নবী (ﷺ) খুবই কষ্টে নিপতিত। তোমাদের কাছে কুরআন আছে, আল্লাহর এই কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এ সময় গৃহে অবস্থানকারীদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হল এবং তারা বিতর্কে লিপ্ত হল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, তার কাছে যাও, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাদের জন্য লিখে দেবেন যাতে তার পরে তোমরা কক্ষনো পথহারা হবে না। আবার কেউ কেউ তাই বললেন যা উমার বলেছিলেন। যখন নবী (ﷺ)-এর সামনে তাদের কথা কাটাকাটি এবং মতপার্থক্য বেড়ে গেল,তখন তিনি বললেনঃ তোমরা আমার নিকট হতে উঠে যাও। বর্ণনাকারী উবাইদুল্লাহ বলেন, ইবন আব্বাস বলতেন, সমস্ত জটিলতার মূল ছিল তা-ই, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার লেখার মাঝখানে বাধা সৃষ্টি করেছিল। সেটা ছিল তাদের মতবিরোধ ও কথা কাটাকাটি।

আতা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির ইবন আবদুল্লাহকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তার সাথে আরো কিছু লোক ছিল। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ কেবল হজ্জের নিয়তে ইহরাম বেধেছিলাম। এর সাথে উমরার নিয়ত ছিল না। বর্ণনাকারী আতা বলেন, জাবির বলেছেন, নবী (ﷺ) যিলহজ্জ মাসের চার তারিখ সকাল বেলায় (মক্কায়) আসলেন। এরপর আমরাও যখন আসলাম, তখন নবী (ﷺ) আমাদেরকে ইহরাম খুলে ফেলার হুকুম করলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা ইহরাম খুলে ফেল এবং স্ত্রীদের সাথে মিলিত হও। (রাবী) আতা বর্ণনা করেন, জাবির বলেছেন, (স্ত্রী সহবাস) তিনি তাদের উপর বাধ্যতামূলক করেননি বরং বৈধ করেছেন। এরপর তিনি জানতে পারেন যে, আমরা বলাবলি করছি আমাদের ও আরাফার দিনের মাঝে কেবল পাচদিন বাকি। তিনি আমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, আমরা ইহরাম খুলে স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হই। তখন আমরা আরাফায় পৌছব আর আমাদের পুরুষাঙ্গ থেকে মযী বের হতে থাকবে। আতা বলেন, জাবির এ কথা বোঝানোর জন্য হাত দ্বারা ইশারা করেছিলেন কিংবা হাত নেড়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন এবং বললেনঃ তোমরা জান, আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে বেশি ভয় করি, তোমাদের চেয়ে আমি বেশি সত্যবাদী ও নিষ্ঠাবান। আমার সাথে যদি কুরবানী পশু না থাকত, আমিও তোমাদের মত ইহরাম খুলে ফেলতাম। সুতরাং তোমরা ইহরাম খুলে ফেল। আমি যদি আমার কাজের পরিণাম আগে জানতাম যা পরে জেনেছি তবে আমি কুরবানীর পশু সঙ্গে আনতাম না। কাজেই আমরা ইহরাম খুলে ফেললাম। নবী (ﷺ)-এর আদেশ শোনলাম এবং তার আনুগত্য করলাম।

আবদুল্লাহ মুযানী সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ মাগরিবের সালাতের আগে তোমরা সালাত আদায় করবে। তবে তৃতীয়বারে তিনি বললেনঃ লোকেরা এটাকে সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করুক- এটা অপছন্দ করার কারণে তিনি তৃতীয়বারে বললেন- যার ইচ্ছে সে আদায় করবে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। যখন মিথ্যা অপবাদকারীরা আয়িশাহর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপবাদ রটিয়েছিল। তিনি বলেন, ওয়াহী আসতে বিলম্ব হচ্ছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী ইবন আবূ তালিব ও উসামাহ ইবন যায়িদের কাছে কিছু পরামর্শ করার জন্য তাদেরকে ডাকলেন। এবং তার স্ত্রী আয়িশাহ-কে পৃথক করে দেয়া সম্পর্কে পরামর্শ চাইলেন। উসামাহ নবী (ﷺ)-এর পরিবারের পবিত্রতার ব্যাপারে তার যা জানা ছিল তা উল্লেখ করলেন। আর আলী বললেন, আল্লাহ আপনার জন্য তো কোন সীমাবদ্ধতা রাখেন নি। স্ত্রীলোক তিনি ছাড়া আরও অনেক আছেন। আপনি বাদীটির কাছে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য যা, তাই বলবে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বারীরাকে ডাকলেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সন্দেহের কিছু দেখেছ? তিনি বললেন, আমি এছাড়া আর অধিক কিছু জানি না যে, আয়িশাহ হচ্ছে অল্পবয়স্কা মেয়ে। তিনি নিজের ঘরের আটা পিষে ঘুমিয়ে পড়েন, এই অবস্থায় বক্রী এসে তা খেয়ে ফেলে। এরপর নবী (ﷺ) মিম্বরে দাড়িয়ে বললেনঃ হে মুসলিমগণ! যে ব্যক্তি আমার পরিবারের অপবাদ রটিয়ে আমাকে কষ্ট দিয়েছে তার প্রতিকার করতে আমাকে সাহায্য করার মত কেউ আছ কি? আল্লাহর শপথ! আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত মন্দ কিছুই জানি না এবং তিনি আয়িশাহ-এর পবিত্রতার কথা উল্লেখ করলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লোকেদের (সামনে) খুত্বাহ দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন। এরপর তিনি বললেনঃ যারা আমার স্ত্রীর অপবাদ রটিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের সম্পর্কে তোমরা আমাকে কী পরামর্শ দাও। আমি আমার পরিবারের কারো মধ্যে কক্ষনো খারাপ কিছু দেখি নি। উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশাহকে সেই অপবাদ সম্পর্কে জানানো হলে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে আমার পরিজনের (বাবা-মার) কাছে যাবার অনুমতি দিবেন কি? তখন রাসূল (ﷺ) অনুমতি দিলেন এবং তার সঙ্গে একজন গোলামও পাঠালেন। এক আনসারী বললেন, তুমিই পবিত্র, হে আল্লাহ! এ ধরনের কথা বলা আমাদের উচিত নয়। এটা তো এক বিরাট অপবাদ, তোমারই পবিত্রতা হে আল্লাহ!