স্বপ্নের ব্যাখ্যা করা (৬৯৮২-৭০৪৭)
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওয়াহীর শুরু হয় ঘুমের ঘোরে ভালো স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের আলোর মত উদ্ভাসিত হতো। তিনি হেরা গুহায় গিয়ে সেখানে বেশ কয়েক রাত ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন এবং এজন্য খাদ্য দ্রব্যও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এরপর খাদীজাহ-এর কাছে ফিরে আসতেন এবং তিনি তাকে এরূপ খাদ্য দ্রব্য তৈরি করে দিতেন। শেষে তার কাছে সত্যের বাণী (ওয়াহী) আসল। আর এ সময় তিনি হেরা গুহায় ছিলেন। সেখানে ফেরেশতা এসে তাকে বলল, আপনি পড়ুন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আমি বললামঃ আমি তো পাঠক নই। তখন তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চেপে ধরলেন। এমনকি এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি পাঠক নই। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে শক্ত করে চেপে ধরলেন। এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। অতঃপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, আপনি পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পাঠক নই। এরপর তিনি তৃতীয়বার আমাকে শক্ত করে এমন চেপে ধরলেন যে, এবারেও এতে আমার খুব কষ্ট হল। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন......যা সে জানত না (আল-আলাক ৯৬/১-৫) এ আয়াত পর্যন্ত। এরপর তিনি তা নিয়ে খাদীজাহ-এর কাছে কম্পিত হৃদয়ে ফিরে এলেন। আর বললেন, আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। ফলে তারা তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অবশেষে তার থেকে ভীতি দূর হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, হে খাদীজাহ! আমার কী হল? এবং তাকে সমস্ত ঘটনা জানালেন। আর বললেনঃ আমি আমার জীবন সম্পর্কে শঙ্কাবোধ করছি। খাদীজাহ তাকে বললেন, কক্ষনো না। আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনই লাঞ্ছিত করবেন না। কেননা, আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন জুড়ে রাখেন, সত্যকথা বলেন, অনাথ অক্ষমদের বোঝা বহন করেন, মেহমানদের মেহমানদারী করেন এবং হকের পথে আগত যাবতীয় বিপদে সাহায্য করেন। অতপর খাদীজাহ তাকে নিয়ে চললেন। অতঃপর তাকে নিয়ে ওরাকা ইবন নাওফল ইবন আসাদ ইবন আবদুল উযযা ইবন কুসাই-এর কাছে এলেন। আর তিনি, খাজীদাহ-এর চাচার পুত্র (চাচাত ভাই) এবং তার পিতার পক্ষ থেকে চাচাও ছিলেন। তিনি জাহিলীয়াতের যুগে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবী কিতাব লিখতেন। তাই সে ইন্জীল আরবীতে অনুবাদ করতেন- যতখানি লেখা আল্লাহর মনযুর হত। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ, দৃষ্টিশক্তিহীন লোক। খাদীজাহ তাকে বললেন, হে আমার চাচাতো ভাই! তোমার ভাতিজার কথা শুন। তখন ওরাকা বললেন, হে ভাতিজা! তুমি কী দেখেছ? নবী (ﷺ) যা কিছু দেখেছিলেন তা তাকে জানালেন। তখন ওরাকা বললেন, এতো আল্লাহর সেই নামুস (দূত) যাকে মূসা-এর কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। হায় আফসোস! যদি সেদিন আমি জীবিত থাকতাম যেদিন তোমার কাওম তোমাকে বের করে দেবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন ঃ তারা কি আমাকে বের করে দেবে? ওরাকা বললেন, হ্যা তুমি যা নিয়ে এসেছ, এমন বস্তু নিয়ে কোনদিনই কেউ আসেনি যার সঙ্গে শত্রুতা করা হয়নি। যদি তোমার জীবনকাল আমাকে পায়, তাহলে আমি সর্বতোভাবে তোমাকে সাহায্য করব। এরপর কিছু দিনের মধ্যেই ওরাকার মৃত্যু হয়। আর কিছু দিনের জন্য ওয়াহীও বন্ধ থাকে। এমনকি নবী (ﷺ) এ অবস্থার কারণে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এমনকি আমরা এ সম্পর্কে তার থেকে জানতে পেরেছি যে, তিনি পর্বতের চূড়া থেকে নিচে পড়ে যাবার জন্য একাধিকবার দ্রুত সেখানে চলে গেছেন। যখনই নিজেকে ফেলে দেয়ার জন্য পর্বতের চূড়ায় পৌছতেন, তখনই জিবরীল তার সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলতেন, হে মুহাম্মাদ! নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তার অস্থিরতা দূর হত এবং নিজ মনে শান্তিবোধ করতেন। তাই সেখান থেকে ফিরে আসতেন। ওয়াহী বন্ধ অবস্থা যখন তার উপর দীর্ঘ হত তখনই তিনি ঐরূপ উদ্দেশে দ্রুত চলে যেতেন। যখনই তিনি পর্বতের চূড়ায় পৌছতেন, তখনই জিবরীল তার সামনে আত্মপ্রকাশ করে আগের মত বলতেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ নেককার লোকের ভাল স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
আবূ ক্বাতাদাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, যেখন তোমাদের কেউ এমন স্বপ্ন দেখে, যা সে পছন্দ করে, তাহলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই সে যেন এ জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে এবং অন্যের কাছে তা বর্ণনা করে। আর যদি এর বিপরীত অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তাহলে তা শয়তানের পক্ষ থেকে। তাই সে যেন এর ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়। আর কারো কাছে যেন তা বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করবে না।
আবূ ক্বাতাদাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। তাই যখন কেউ খারাপ স্বপ্ন দেখে তখন যেন তার থেকে আশ্রয় চায় এবং বাম দিকে থু থু ফেলে। তাহলে সে স্বপ্ন আর তার কোন ক্ষতি করবে না।
উবাদাহ ইবন সামিত সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, ভাল স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি। সু-সংবাদ বহনকারী বিষয়াদি ব্যতীত নবুয়তের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সু-সংবাদ বহনকারী বিষয়াদি কী? তিনি বললেন, ভাল স্বপ্ন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, একদল লোককে শবে কাদর (রমাযানের) শেষ সাত রাতের মধ্যে রয়েছে বলে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আর কিছু সংখ্যক লোককে তা শেষ দশ রাতের মাঝে আছে দেখানো হয়েছে। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা শবে কাদ্র শেষ সাত রাতের মধ্যেই খোজ কর।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ ইউসুফ যতদিন জেলে কাটিয়েছেন, যদি আমি ততদিন কাটাতাম, আর আমার কাছে (বাদশাহর) আহবানকারী আসত, সেক্ষেত্রে আমি অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দিতাম।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ যে লোক আমাকে স্বপ্নে দেখে সে শীঘ্রই জাগ্রত অবস্থাতেও আমাকে দেখবে। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখল সে আমাকেই দেখল। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না। আর মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।
আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর তরফ থেকে ও খারাপ স্বপ্ন শয়তানের তরফ থেকে হয়ে থাকে। কেউ এমন কিছু দেখল, যা সে অপছন্দ করে, সে যেন বামদিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চায়। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করবে না। আর শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না।
আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে প্রকৃতই দেখে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, যে আমাকে স্বপ্ন দেখে সে প্রকৃতই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতি ধরতে পারে না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্তারিত অর্থবহ বাক্য দান করা হয়েছে। এবং আমাকে ভীতি সঞ্চারক প্রভাব দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। এক রাতে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সে সময় ভূপৃষ্ঠের সকল ভান্ডারের চাবি আমার কাছে এনে আমার হাতে রাখা হলো। আবূ হুরাইরাহ বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চলে গেছেন। আর তোমরা ঐ ভান্ডারগুলো সংগ্রহ করে চলেছ।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ এক রাতে আমাকে কাবার নিকট স্বপ্ন দেখানো হল। তখন আমি গৌর বর্ণের সুন্দর এক পুরুষকে দেখলাম। তার মাথায় খুবই সুন্দর লম্বা লম্বা চুল ছিল, যেগুলো আচড়ে রাখা হয়েছে। চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছিল। তিনি দু'জনের ওপর অথবা বলেছেন, দু'জনের কাঁধের ওপর ভর করে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ কে? বলা হলঃ মাসীহ ইবন মারইয়াম। এরপর আরেক লোকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটল। সে ছিল কোঁকড়ানো চুলওয়ালা, ডান চোখ কানা, চোখটি যেন (পানির ওপর) ভাসমান আঙুর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ কে? বলা হল মাসীহ দাজ্জাল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমি রাতে স্বপ্ন দেখেছি। এরপর পুরো হাদীসটি বর্ণনা করেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রায়ই উম্মু হারাম বিনত মিলহান-এর গৃহে যেতেন। আর সে ছিল উবাদাহ ইবন সামিত-এর স্ত্রী। একদা তিনি তার কাছে এলেন। সে তাকে খানা খাওয়াল। তারপর তার মাথার উকুন বাছতে শুরু করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘুমিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর হেসে হেসে জেগে উঠলেন।
উম্মু হারাম বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন হাসলেন? তিনি বললেনঃ আমার উম্মাতের একদল লোককে আমার কাছে পেশ করা হয়েছে। যারা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত সাগরের মধ্যে জাহাজের ওপর আরোহণ করে বাদশাহর সিংহাসনে অথবা বাদশাহ্দের মত তারা সিংহাসনে বসে আছে। ইসহাক রাবী সন্দেহ করেছেন। উম্মু হারাম বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য দোয়া করলেন। এরপর আবার তিনি মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর আবার হেসে হেসে জেগে উঠলেন। আমি বললাম, আপনি হাসলেন কেন হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত আমার একদল উম্মাতকে আমার কাছে পেশ করা হয়েছে। আগের মত এ দল সম্পর্কেও বললেন। উম্মু হারাম বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে এ দলভুক্ত করে দেন। তিনি বললেনঃ তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত। উম্মু হারাম মুআবীয়াহ ইবন সুফ্ইয়ান-এর আমলে সামুদ্রিক জাহাজে উঠেন এবং সমুদ্র থেকে পেরিয়ে আসার সময় আপন সাওয়ারী থেকে মাটিতে পড়ে গিয়ে মারা যান।
খারিজাহ ইবন যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত যে, উম্মুল আলা নামক এক আনসারী মহিলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বাই'আত গ্রহণ করেন। তিনি তাকে জানান যে, আনসারগণ লটারির সাহায্যে মুহাজিরগণকে ভাগ করে নিয়েছিল। আমাদের ভাগে আসলেন উসমান ইবন মাযউন। আমরা তাকে আমাদের ঘরের মেহমান করে নিলাম। এরপর তিনি এমন এক ব্যথায় আক্রান্ত হলেন যে, সে ব্যথায় তার মৃত্যু হল। মৃত্যুর পর তাকে গোসল দেয়া হল। তার কাপড় দিয়েই তাকে কাফন পরানো হল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এলেন। উম্মুল আলা বলেন, আমি বললাম, তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক, হে আবূ সাইব! আমার সাক্ষ্য তোমার বেলায় এটাই যে আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তুমি কী করে জানলে যে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতা কুরবান হোক! তাহলে কাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন ঃ আল্লাহর কসম! তার ব্যাপার তো হল, তার মৃত্যু হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! তার জন্য আমি কল্যাণই আশা করি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না, আমার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে? তখন উম্মুল আলা বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আগামীতে কখনো কারো পবিত্র হওয়ার সাক্ষ্য দেব না।
যুহরী থেকে এ হাদীসে বলা হয়েছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আমি জানি না, তার সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে? উম্মুল আলা বললেন, আমি এতে চিন্তিত হয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। তখন আমি স্বপ্নে উসমান ইবন মাযউনএর জন্য প্রবহমান ঝর্ণা দেখতে পেলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ সম্পর্কে জানালাম। তিনি বললেনঃ এটা তার আমল।
আবূ ক্বাতাদাহ আনসারী হতে বর্ণিত, যিনি নবী (ﷺ)-এর সাহাবী ও অশ্বারোহী যোদ্ধা ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ভাল স্বপ্ন আল্লাহর তরফ থেকে এবং খারাপ স্বপ্ন শয়তানের তরফ থেকে হয়ে থাকে। যখন তোমাদের কেউ খারাপ স্বপ্ন দেখে যা তার কাছে অপছন্দনীয় মনে হয়, তখন সে যেন তার বামদিকে থু থু নিক্ষেপ করে এবং এ স্বপ্ন থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায়। সেক্ষেত্রে এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করবে না।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম। আমার কাছে একটি দুধের পেয়ালা পেশ করা হল, আমি তা থেকে পরিতৃপ্ত হয়ে পান করলাম। তৃপ্তির চিহ্ন আমার নখ দিয়ে প্রকাশ পেতে লাগল। অতঃপর বাকী অংশ অবশিষ্টাংশ উমারকে দিলাম। সহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর কী ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেনঃ ইলম।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একবার আমি ঘুমিয়েছিলাম। আমার কাছে দুধের একটি পেয়ালা হাজির করা হল। আমি পরিতৃপ্ত হয়ে তা থেকে পান করলাম। এমনকি তৃপ্তির চিহ্ন আমার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। অতঃপর বাকী অংশ উমার ইবন খাত্তাবকে দিলাম। তার পাশের লোকজন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এর কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেন হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ ইলম।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি একবার ঘুমিয়েছিলাম। একদল লোককে স্বপ্নে দেখলাম, তাদেরকে আমার কাছে আনা হচ্ছে। তাদের গায়ে ছিল জামা। কারো কারো জামা স্তন পর্যন্ত, আর কারো কারো তার নিচ পর্যন্ত। উমার ইবন খাত্তাব আমার নিকট দিয়ে গেল। তার গায়ের জামা মাটিতে হেঁচড়ে চলছিল। সহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কী ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেনঃ দ্বীন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ আমি একসময় ঘুমিয়ে ছিলাম। আমি দেখলাম, আমরা কাছে একদল লোককে আনা হল, তাদের গায়ে ছিল জামা। কারো কারো জামা স্তন পর্যন্ত। আর কারো কারো এর নিচ পর্যন্ত। আর উমার ইবন খাত্তাবকে এমন অবস্থায় আমার কাছে আনা হল যে, সে তার গায়ের জামা হেঁচড়িয়ে চলছিল। সহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর কী ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেনঃ দ্বীন।
কায়স ইবন উবাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক মজলিসে ছিলাম। যেখানে সাদ ইবন মালিক এবং ইবন উমার-ও ছিলেন। এ সময় আবদুল্লাহ ইবন সালাম ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকেরা বলল, ঐ লোকটি জান্নাতবাসীদের একজন। আমি তাকে বললাম, লোকেরা এমন এমন বলছে। তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ্! তাদের জন্য উচিত নয় মতামত ব্যক্ত করা, যে বিষয় সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম, যেন একটা স্তম্ভ একটি সবুজ বাগানে রাখা হয়েছে এবং সেটা যেখানে রাখা হয়েছে তার উপর ভাগে একটি রশি ছিল। আর নিচের দিকে ছিল একজন খাদিম। 'মিনসাফ' অর্থ খাদিম। বলা হল, এ স্তম্ভ বেয়ে উপরে উঠ। আমি উপরের দিকে উঠে রশিটি ধরে ফেললাম। এরপর এ স্বপ্ন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করেছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন, আবদুল্লাহ মযবূত রশি ধরা অবস্থায় মারা যাবে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাকে আমায় দু'বার স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, এক ব্যক্তি তোমাকে রেশমী এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে বয়ে নিয়ে আসছে আর বলছে ইনি আপনার স্ত্রী। আমি তার নিকাব উন্মোচন করে দেখতে পাই যে ঐ মহিলাটি তুমিই এবং আমি বলছি, যদি এটা আল্লাহর তরফ থেকে হয়ে থাকে তা হলে তিনি তা সত্যে পরিণত করবেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাকে (আয়িশাহকে) বিয়ে করার আগে দু'বার আমাকে দেখানো হয়েছে। আমি দেখেছি, একজন ফেরেশতা তোমাকে রেশমী এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে বয়ে নিয়ে আসছে। আমি বললাম, আপনি নিকাব সরিয়ে দিন। যখন সে নিকার সরিয়ে দিল তখন আমি দেখতে পেলাম যে, সেই মহিলা তুমিই। আমি তখন বললাম, এটা যদি আল্লাহর তরফ থেকে হয়ে থাকে তাহলে তিনি তা সত্যে পরিণত করবেন। এরপর আবার আমাকে দেখানো হল যে, ফেরেশতা তোমাকে রেশমী এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে বহন করে নিয়ে আসছে। আমি বললাম, আপনি (তার নিকাব) সরিয়ে দিন। সে তা সরিয়ে দিলে আমি দেখতে পাই যে, সেই মহিলা তুমিই। তখন আমি বললামঃ এটা যদি আল্লাহর তরফ থেকে হয়ে থাকে তাহলে তিনি সত্যে পরিণত করবেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্তারিত অর্থবহ বাণী দিয়ে পাঠানো হয়েছে এবং ভীতি সঞ্চারকারী প্রভাব দিয়ে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। একবার আমি ঘুমিয়েছিলাম। আমার কাছে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহের চাবি পেশ করে আমার সামনে দেয়া হল। (আবূ আবদুল্লাহ) মুহাম্মাদ বুখারী বলেন, আমার কাছে এ কথা পৌছেছে যে, 'সংক্ষিপ্ত অথচ বিশদ অর্থবহ বাণী'-এর অর্থ হল, আল্লাহর অনেক বিষয় যা আগের কিতাবসমূহে লেখা হত একটি অথবা দু'টি বিষয়ে বিন্যস্ত করে দেন। অথবা এর অর্থ তেমনি কিছু।
আবদুল্লাহ ইবন সালাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি একটি বাগানে আছি। বাগানের মাঝে একটি স্তম্ভ। স্তম্ভের শিরোভাগে একটি হাতল। তখন আমাকে বলা হল, উপরের দিকে উঠ। আমি বললাম, পারছি না। তখন আমার কাছে একজন খাদিম আসল এবং আমার কাপড় গুটিয়ে দিল। আমি উপরের দিকে উঠতে উঠতে হাতলটি ধরে ফেললাম। হাতলটি ধরে থাকা অবস্থায় আমি জেগে গেলাম। তারপর এ স্বপ্ন নবী (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করলাম। তিনি বললেনঃ ঐ বাগান ইসলামের বাগান, ঐ স্তম্ভ ইসলামের স্তম্ভ, আর ঐ হাতল হল মযবুত হাতল। তুমি মৃত্যু অবধি ইসলামকে শক্তভাবে ধরে থাকবে।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পাই, আমার হাতে যেন রেশমী এক টুকরা কাপড়। জান্নাতের যেখানেই তা আমি নিক্ষেপ করি তা আমাকে সেখানেই উড়িয়ে নিয়ে যায়। এ স্বপ্ন আমি হাফসাহ-এর নিকট বর্ণনা করলাম।
আর হাফসাহ তা নবী (ﷺ)-এর নিকট বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেনঃ তোমার ভাই একজন নেককার লোক। অথবা বললেনঃ আবদুল্লাহ তো একজন নেককার লোক।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যখন কিয়ামত নিকটবর্তী হবে তখন মুমিনের স্বপ্ন খুব কমই অবাস্তবায়িত থাকবে। আর মুমিনের স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। আর নবুয়তের কোন কিছুই অসত্য হতে পারে না। রাবী মুহাম্মাদ বলেন, আমি এমন বলছি। তিনি বলেন, এ কথা বলা হয় যে, স্বপ্ন তিন প্রকার, মনের কল্পনা, শয়তানের তরফ থেকে ভয় দেখানো এবং আল্লাহর তরফ হতে সুসংবাদ। তাই যদি কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখে তবে সে যেন তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। বরং উঠে যেন (নফল) সালাত আদায় করে নেয়। রাবী বলেন, স্বপ্নে শিকল দেখা অপছন্দনীয় মনে করা হত এবং পায়ে বেড়ি দেখাকে তারা পছন্দ করতেন। বলা হত, পায়ে বেড়ি দেখার ব্যাখ্যা হলো দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা।
উম্মুল আলা হতে বর্ণিত। যিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বায়আত করেছিলেন তিনি তাদের একজন। তিনি বলেন, যখন মুহাজিরদের বাসস্থান নির্ধারণের জন্য আনসারগণ লটারী দিলেন, তখন আমাদের ঘরে বসবাসের জন্য উসমান ইবন মাযউন আমাদের ভাগে পড়েন। তিনি রোগগ্রস্ত হয়ে পড়লে আমরা তার সেবা-শুশ্রূষা করি। অবশেষে তিনি মারা যান। এরপর আমরা তাকে তার কাপড় দিয়েই কাফন পরিয়ে দেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের ঘরে আসলেন। আমি বললাম, হে আবূ সাঈব! তোমার ওপর আল্লাহর রহমত হোক। তোমার বেলায় আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তিনি বললেনঃ তুমি কী করে জানলে? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি জানি না। তিনি বললেনঃ তার তো মৃত্যু হয়ে গেছে, আমি তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণই আশা করছি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না যে, আমার সঙ্গে এবং তোমাদের সঙ্গে কী ব্যবহার করা হবে? উম্মুল আলা বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আর কক্ষনো কারো পবিত্রতার প্রত্যয়ন করব না। উম্মুল আলা বলেন, আমি স্বপ্নে উসমান-এর জন্য প্রবাহিত ঝর্ণা দেখেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে সেটা বর্ণনা করলাম। তখন তিনি বললেনঃ এটা তার আমল' তার জন্য জারি থাকবে।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একবার (আমি স্বপ্নে দেখলাম) আমি একটি কুপের কাছে বসে কূপ থেকে পানি তুলছি। এমন সময় আমার কাছে আবূ বকর ও উমার আসল। আবূ বকর বালতিটি হাতে নিয়ে এক বা দু'বালতি পানি উঠাল। আর তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। এরপর আবূ বকরের হাত থেকে উমার তা নিল। তার হাতে বালতিটি বেশ বড় হয়ে গেল। আমি কোন শক্তিশালী লোককে উমারের মত এত অভিজ্ঞ কর্মঠ দেখিনি। যার ফলে লোকেরা তাদের পরিতৃপ্ত উটগুলো নিয়ে বাসস্থানে পৌছে গেল।
সালিমের পিতা [আবদুল্লাহ ইবন উমার] হতে বর্ণিত। তিনি আবূ বকর ও উমার সম্পর্কে নবী (ﷺ)-এর স্বপ্ন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি লোকদেরকে জড় হতে দেখলাম। তখন আবূ বকর দাড়িয়ে এক বা দু'বালতি পানি উঠালো। আর তার উঠানোতে কিছু দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। এরপর ইবন খাত্তাব দাড়াল। আর তার হাতে বালতিটি বেশ বড় হয়ে গেল। আমি লোকদের মধ্যে উমারের মত এতটা অভিজ্ঞ কর্মঠ কাউকে দেখিনি। যার ফলে লোকেরা তাদের পরিতৃপ্ত উটগুলো নিয়ে বাসস্থানে পৌছে গেল।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একবার আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। দেখলাম, আমি একটি কূপের কাছে আছি। আর এর নিকট একটি বালতি আছে। আমি কুপ থেকে পানি উঠালাম- যতখানি আল্লাহর ইচ্ছা ছিল। এরপর বালতিটি ইবন আবূ কুহাফা নিলেন। তিনি কূপ থেকে এক বা দু'বালতি পানি উঠালেন। তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। তারপর বালতিটি বেশ বড় হয়ে গেল। তখন তা উমার ইবন খাত্তাব নিলেন। আমি কোন শক্তিশালী লোককে উমারের মত পানি উঠাতে দেখিনি। অবশেষে লোকেরা তাদের পরিতৃপ্ত উটগুলো নিয়ে বাসস্থানে পৌছে গেল।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম। দেখলাম, আমি একটি হাউযের নিকট হতে লোকদেরকে পানি পান করাচ্ছি। তখন আমার কাছে আবূ বকর আসল। আমাকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য আমার হাত থেকে সে বালতিটি নিয়ে গেল এবং দু'বালতি পানি উঠাল। আর তার উঠানোতে কিছুটা দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। এরপর ইবন খাত্তাব এসে তার নিকট হতে তা নিয়ে নিল এবং পানি উঠাতে থাকল। অবশেষে লোকেরা (তৃপ্ত হয়ে) ফিরে গেল, অথচ হাউযের পানি প্রবাহিত হচ্ছিল।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি বললেনঃ আমি একবার নিদ্রিত ছিলাম। আমি আমাকে জান্নাতে দেখতে পেলাম। একজন মহিলা একটি প্রাসাদের পাশে উযূ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই প্রাসাদটি কার? তারা বলল, উমারের। তখন তার আত্মমর্যাদাবোধের কথা স্মরণ করলাম। তাই আমি ফিরে এলাম। আবূ হুরাইরাহ বলেন, এ কথা শুনে উমার ইবন খাত্তাব কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক! হে আল্লাহর রাসূল (আপনার কাছেও কি) আমি আত্মমর্যাদাবোধ প্রদর্শন করব?
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। আমি আমাকে একটা স্বর্ণের প্রাসাদের কাছে দেখতে পেলাম। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার? তারা বলল, কুরাইশের এক লোকের। হে ইবন খাত্তাব! এ প্রাসাদে ঢুকতে আমাকে কিছুই বাধা দিচ্ছিল না। কেবল তোমার আত্মমর্যাদাবোধ, যা আমার জানা ছিল। উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছেও কি আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাবো?
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আমরা রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি বললেন: আমি একবার নিদ্রিত ছিলাম। আমি আমাকে জান্নাতে দেখতে পেলাম এবং (দেখতে পেলাম) যে এক মহিলা একটি প্রাসাদের পাশে ওযূ করছে। আমি বললাম: এ প্রাসাদটি কার? তারা বলল, উমরের। তখন তার আত্মমর্যাদাবোধের কথা মনে করে আমি ফিরে এলাম। তা শুনে উমার কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আমার পিতা-মাতা আপনার ওপর কুরবান হোক। হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছেও কি আমি আত্মমর্যাদাবোধ দেখাব?
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন আমি আমাকে কাবা গৃহ তাওয়াফরত অবস্থায় দেখতে পেলাম। এমন সময় সোজা চুলওয়ালা একজন পুরুষকে দু'জন পুরুষের মাঝে দেখলাম, যার মাথা থেকে পানি ঝরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তারা বলল, ইবন মারইয়াম। এরপর আমি ফিরে আসতে লাগলাম। এ সময় একজন লাল রঙের মোটাসোটা, কোঁকড়ান চুলওয়ালা, ডানচোখ কানা ব্যক্তিকে দেখলাম। তার চোখটি যেন ভাসমান আঙুর। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ ব্যক্তি কে? তারা বলল, এ হচ্ছে দাজ্জাল। তার সঙ্গে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ লোক হল ইবন কাতান। আর ইবন কাতান হল বনূ মুস্তালিক গোত্রের খুযাআ বংশের একজন লোক।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম। আমি দেখলাম দুধের একটা পেয়ালা আমাকে দেয়া হল। তা থেকে আমি (এত অধিক) পান করলাম যে, আমা হতে তৃপ্তির চিহ্ন প্রকাশিত হচ্ছিল। অতঃপর (অবশিষ্টাংশ) উমরকে দিলাম। সহাবাগণ বললেন, এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী দিলেন হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ ইলম।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বেশ ক'জন সাহাবী রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর যুগে স্বপ্ন দেখতেন। অতঃপর তারা রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে তা বর্ণনা করতেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ব্যাখ্যা দিতেন যা আল্লাহ ইচ্ছা করতেন। আমি তখন অল্প বয়সের যুবক। আর বিয়ের আগে মাসজিদই ছিল আমার ঘর। আমি মনে মনে নিজেকে সম্বোধন করে বললাম, যদি তোমার মধ্যে কোন কল্যাণ থাকত তাহলে তুমি তাদের মত স্বপ্ন দেখতে। আমি এক রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বললাম, হে আল্লাহ! আপনি যদি জানেন যে, আমার মধ্যে কোন কল্যাণ আছে তাহলে আমাকে কোন একটি স্বপ্ন দেখান। আমি ঐ অবস্থায়ই (ঘুমিয়ে) থাকলাম। দেখলাম আমার কাছে দু'জন ফেরেশ্তা এসেছেন। তাদের প্রত্যেকের হাতেই লোহার একটি করে হাতুড়ি। তারা আমাকে নিয়ে (জাহান্নামের দিকে) এগোচ্ছে। আর আমি তাদের দু'জনের মাঝে থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, হে আল্লাহ! আমি জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এরপর আমাকে দেখান হল যে, একজন ফেরেশ্তা আমার কাছে এসেছেন। তার হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। সে আমাকে বলল, তোমার অবশ্যই কোন ভয় নেই। তুমি খুবই ভাল লোক, যদি অধিক করে সালাত আদায় করতে। তারা আমাকে নিয়ে চলল, অবশেষে তারা আমাকে জাহান্নামের (ধারে এনে) দাড় করাল, (যা দেখতে) কূপের মত গোল আকৃতির। আর কূপের মত এরও রয়েছে অনেক শিং। আর দু' শিং-এর মাঝখানে একজন ফেরেশতা, যার হাতে লোহার একটি হাতুড়ি। আর আমি এতে কিছু লোককে (জাহান্নামে) শিকল পরিহিত দেখলাম। তাদের মাথা ছিল নিচের দিকে। কুরাইশের এক ব্যক্তিকে সেখানে আমি চিনে ফেললাম। অতঃপর তারা আমাকে ডান দিকে নিয়ে ফিরল।
এ ঘটনা (স্বপ্ন) আমি হাফসাহ-এর নিকট বর্ণনা করলাম। আর হাফসাহ তা রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর নিকট বর্ণনা করলেনঃ তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আবদুল্লাহ তো নেক্কার লোক। নাফি বলেন, এরপর থেকে তিনি সর্বদা অধিক করে (নফল) সালাত আদায় করতেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর যুগে অবিবাহিত যুবক ছিলাম। আমি মসজিদেই রাত কাটাতাম। আর যারাই স্বপ্নে কিছু দেখত তারা তা নবী (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করত। আমি বললাম, হে আল্লাহ! যদি তোমার নিকট আমার জন্য কোন কল্যাণ নিহিত থাকে, তাহলে আমাকে কোন স্বপ্ন দেখাও, যাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আমি ঘুমিয়ে গেলাম, তখন দেখতে পেলাম যে দু'জন ফেরেশতা আমার কাছে এসে আমাকে নিয়ে চলল, এরপর তাদের সঙ্গে অপর একজন ফেরেশতার সাক্ষাৎ ঘটল। সে আমাকে বলল, তোমার কোন ভয়ের কারণ নেই। তুমি তো একজন নেক্কার লোক। এরপর তারা আমাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে চলল, এটি যেন কূপের মত গোলাকার নির্মিত। আর এর মধ্যে বেশ কিছু লোক রয়েছে। এদের কতককে আমি চিনতে পারলাম। এরপর তারা আমাকে ডানদিকে নিয়ে চলল। যখন সকাল হল, আমি হাফসাহ-এর নিকট সব ঘটনা উল্লেখ করলাম।
পরে হাফসাহ বললেন যে, তিনি তা নবী (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করেছেন। আর তিনি বলেছেনঃ আবদুল্লাহ নেক্কার লোক। (তিনি আরও বলেছেন) যদি সে রাতে অধিক করে সালাত আদায় করত। যুহরী বলেন, এরপর থেকে আবদুল্লাহ (ইবন উমার) রাতে অধিক করে সালাত আদায় করতে লাগলেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম। দেখলাম, আমার কাছে দুধের একটি পিয়ালা আনা হল। আমি তা থেকে পান করলাম। এরপর আমার বাকী অংশ উমার ইবন খাত্তাবকে দিলাম। সহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর ব্যাখ্যা কী দিলেন। তিনি বললেনঃ .....ইলম।
উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে সব স্বপ্নের উল্লেখ করেছেন আমি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস-কে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বললেন, আমার কাছে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি একবার ঘুমিয়ে ছিলাম, আমাকে দেখানো হলো যে আমার হাত দু'টিতে স্বর্ণের দু'টি চুড়ি রাখা হয়েছে। আমি সে দু'টি কেটে ফেললাম এবং অপছন্দ করলাম। অতঃপর আমাকে অনুমতি দেয়া হল, আমি উভয়টিকে ফু দিলাম, ফলে উভয়টি উড়ে গেল। আমি চুড়ি দু'টির এ ব্যাখ্যা করলাম যে, দু'জন মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার বের হবে। উবাইদুল্লাহ বলেন, এদের একজন হল, আল আন্সী যাকে ইয়ামানে ফায়রূয কতল করেছেন। আর অন্যজন হল মুসাইলিমা।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি মক্কা থেকে এমন এক জায়গার দিকে হিজরাত করছি যেখানে খেজুর গাছ আছে। তখন আমার ধারণা হল, সেই জায়গাটি 'ইয়ামামা' অথবা 'হাজার' হবে। অথচ সে জায়গাটি হল মাদ্বীনাহ তথা ইয়াসরিব। আর আমি (স্বপ্নে) সেখানে একটি গরু দেখলাম। আল্লাহর কসম! এটা কল্যাণকরই। গরুর ব্যাখ্যা হল উহুদের যুদ্ধে (শাহাদাত প্রাপ্ত) মুমিনগণ। আর কল্যাণের ব্যাখ্যা হল এটাই, যে কল্যাণ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন এবং সত্যের বিনিময় যা আল্লাহ বদর যুদ্ধের পর আমাদেরকে প্রদান করেছেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমরা সর্বশেষ এবং সর্বপ্রথম।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেনঃ একবার আমি নিদ্রিত ছিলাম। দেখলাম আমাকে পৃথিবীর ভান্ডারসমূহ দেয়া হয়েছে। আর আমার হাতে স্বর্ণের দু'টি চুড়ি রাখা হয়, যা আমার কাছে কষ্টকর মনে হল। আর আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল। তখন আমাকে নির্দেশ করা হল, যেন আমি চুড়ি দু'টিতে ফু দেই। তাই আমি ও দু'টিতে ফু দিলাম (চুড়ি দু'টি উড়ে গেল)। আমি চুড়ি দু'টির ব্যাখ্যা এভাবে করলাম যে, (নবুয়তের) দু'জন মিথ্যা দাবিদার রয়েছে, যাদের মাঝখানে আমি আছি। সান'আর বাসিন্দা (আলআনসী) ও ইয়ামামার বাসিন্দা (মুসায়লিমা)।
সালিমের পিতা আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি দেখেছি যেন এলোমেলো চুলওয়ালা একজন কালো মহিলা মাদ্বীনাহ থেকে বের হয়ে মাহইয়াআ নামক স্থানে গিয়ে দাড়িয়েছে আর এটিকে জুহ্ফা বলা হয়। আমি এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলাম যে, মাদ্বীনাহর মহামারী সেখানে স্থানান্তরিত হল।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি মাদ্বীনাহ সম্পর্কে নবী (ﷺ)-এর স্বপ্নের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন। তিনি বলেছেনঃ আমি দেখেছি এলোমেলো চুল ওয়ালা একজন কালো মহিলা মাদ্বীনাহ থেকে বের হয়েছে। অবশেষে মাহইয়ায়া নামক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম যে, মাদ্বীনাহর মহামারী মাহইয়া'আহ তথা জুহ্ফা নামক জায়গায় স্থানান্তরিত হল।
সালিমের পিতা আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমি স্বপ্নে দেখেছি। এলোমেলো চুলওয়ালা একজন কালো মহিলা মাদ্বীনাহ থেকে বের হয়ে মাহইয়াআ তথা জুহ্ফা নামক জায়গায় গিয়ে থেমেছে। আমি এর ব্যাখ্যা করলাম যে, মাদ্বীনাহর মহামারী সেখানে স্থানান্তরিত হল।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-এর স্বপ্ন বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি বলেছেনঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম একটা তরবারী নাড়াচাড়া করছি। আর এ মধ্যভাগ ভেঙ্গে গেল। এর ব্যাখ্যা হল বিপদ, যা উহুদের যুদ্ধে মুমিনদের ভাগ্যে ঘটেছে। আবার আমি তরবারিটি নাড়লাম। এতে তরবারীটি আগের থেকে সুন্দর অবস্থায় ফিরে এল। এর ব্যাখ্যা হল আল্লাহর দেয়া বিজয় ও মুমিনদের ঐক্য।
ইবন আব্বাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যে লোক এমন স্বপ্ন দেখার ভান করল যা সে দেখেনি তাকে দু'টি যবের দানায় গিট দেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে। অথচ সে তা কখনও পারবে না। যে কেউ কোন এক দলের কথার দিকে কান লাগাল। অথচ তারা এটা পছন্দ করে না অথবা বলেছেন, অথচ তারা তার থেকে পলায়নপর। কিয়ামতের দিন তার উভয় কানে সীসা ঢেলে দেয়া হবে। আর যে কেউ প্রাণীর ছবি আকে তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাতে প্রাণ ফুকে দেয়ার জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু সে প্রাণ ফুকতে পারবে না।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যা হল আপন চোখ দিয়ে এমন কিছু দেখার (দাবি করা) যা চোখদ্বয় দেখতে পায়নি।
আবূ সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এমন স্বপ্ন দেখতাম যা আমাকে রোগাক্রান্ত করে ফেলত। অবশেষে আমি আবূ ক্বাতাদাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি এমন স্বপ্ন দেখতাম যা আমাকে রোগাক্রান্ত করে দিত। শেষে আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। তাই যখন কেউ পছন্দনীয় কোন স্বপ্ন দেখে তখন এমন লোকের কাছেই বলবে, যাকে সে পছন্দ করে। আর যখন অপছন্দনীয় কোন স্বপ্ন দেখে তখন যেন সে এর ক্ষতি ও শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং তিনবার থু থু ফেলে আর সে যেন তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করবে না।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন কেউ এমন কোন স্বপ্ন দেখে যা সে পছন্দ করে, তবে মনে করবে যে তা আল্লাহর তরফ থেকে হয়েছে। তখন যেন সে এজন্য আল্লাহর শোকর আদায় করে এবং তা বর্ণনা করে। আর যখন এর বিপরীত কোন স্বপ্ন দেখে, যা সে পছন্দ করে না, মনে করবে তা শয়তানের তরফ থেকে হয়েছে। তখন যেন সে এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চায় এবং তা কারো কাছে বর্ণনা না করে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করবে না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমি গত রাতে স্বপ্নে একখন্ড মেঘ দেখলাম, যা থেকে ঘি ও মধু ঝরছে। আমি লোকদেরকে দেখলাম তারা তা থেকে তুলে নিচ্ছে। কেউ অধিক পরিমাণ আবার কেউ কম পরিমাণ। আর দেখলাম, একটা রশি যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত মিলে রয়েছে। আমি দেখলাম আপনি তা ধরে উপরে উঠছেন। তারপর অন্য এক লোক তা ধরল ও এর সাহায্যে উপরে উঠে গেল। এরপর আরেক লোক তা ধরে এর দ্বারা উপরে উঠে গেল। এরপর আরেক লোক তা ধরল। কিন্তু তা ছিঁড়ে গেল। পুনরায় তা জোড়া লেগে গেল। তখন আবূ বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতা কুরবান হোক! আল্লাহর কসম! আপনি অবশ্যই আমাকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ দিবেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ তুমি এর ব্যাখ্যা দাও। আবূ বকর বললেন, মেঘের ব্যাখ্যা হল ইসলাম। আর তার থেকে যে ঘি ও মধু ঝরছে তা হল কুরআন যার মিষ্টতা ঝরছে। কুরআন থেকে কেউ বেশি সংগ্রহ করছে, আর কেউ কম। আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত ঝুলন্ত দড়িটি হচ্ছে ঐ হক (মহাসত্য) যার উপর আপনি প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। আপনি তা ধরবেন, আর আল্লাহ আপনাকে উচ্চে উঠাবেন। আপনার পরে আকেরজন তা ধরবে। ফলে এর দ্বারা সে উচ্চে উঠবে। অতঃপর আরেকজন তা ধরে এর মাধ্যমে সে উচ্চে উঠবে। এরপর আকেরজন তা ধরবে। কিন্তু তা ছিঁড়ে যাবে। পুনরায় তা জোড়া লেগে যাবে, ফলে সে এর দ্বারা উচ্চে উঠবে। হে আল্লাহর রাসূল। আমার পিতা আপনার উপর কুরবান হোক। আমাকে বলুন, আমি ঠিক বলেছি, না ভুল? নবী (ﷺ) বললেনঃ কিছু ঠিক বলেছ। আর কিছু ভুল বলেছ। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! আপনি অবশ্যই আমাকে বলে দিবেন যা আমি ভুল করেছি। নবী (ﷺ) বললেনঃ কসম করো না।
সামুরাহ ইবন জুনদাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রায়ই তার সাহাবীদেরকে বলতেন, তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা, তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে আমাদেরকে বললেনঃ গত রাতে আমার কাছে দু'জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন। আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে আসলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার নিকট পাথর নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পড়ছে। এরপর আবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা আবার নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত আবার ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার তেমনি আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেন, আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। তিনি বলেন, আমরা চললাম, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক লোকের কাছে আসলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক লোক লোহার আকড়া নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমন্ডলের একদিক মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র,চোখ ও মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। আওফ বলেন, আবূ রাজা কোন কোন সময় 'ইয়ুশারশিরু' শব্দের পরিবর্তে 'ইয়াশুক্কু' শব্দ বলতেন। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মত ভাল হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মত আচরণ করে। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌছলাম। রাবী বলেন, আমার মনে হয় যেন তিনি বলেছিলেন, আর তথায় শোরগোলের শব্দ ছিল। তিনি বলেন, আমরা তাতে উকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। তিনি বলেন, আমরা চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌছলাম। রাবী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন, নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, এই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অন্য এক লোক আছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতারকারী লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সে লোক কাছে এসে পৌছে যে নিজের নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে; আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনইসে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বলল, চলুন, চলুন। তিনি বরৈন, আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে এসে পৌছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোকটি কে? তারা বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে হাজির হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চারপাশে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত অধিক আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এর ওপরে চড়ুন। আমরা ওপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা হাজির হলাম। আমরা শহরের দরজায় পৌছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক এমনই কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়। তিনি বলেন, সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়। আর সেটা ছিল প্রশস্ত প্রবাহিত নদী, যার পানি ছিল দুধের মত সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে এল, দেখা গেল তাদের এ শ্রীহীনতা দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান। তিনি বলেন, আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ আছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা আপনার বাসগৃহ। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আল্লাহ তোমাদের মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি। তারা বলল, আপনি অবশ্য এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়। তিনি বলেন, আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী? তারা আমাকে বলল, আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে কুরআন গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরজ সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে। আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল সে হল ঐ ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এমন কোন মিথ্যা বলে যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ গর্তের ভিতর আছে তারা হল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল। আর ঐ ব্যক্তি, যার কাছে পৌছে দেখেছিলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে সে হল সুদখোর। আর ঐ কুশ্রী ব্যক্তি, যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর সে এর চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, সে হল জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশ্তা। আর এ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন, তিনি হলেন, ইবরাহীম। আর তার আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিত্রাতের (স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও কি? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও। আর ঐসব লোক যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।