bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

বৃষ্টি প্রার্থনা (১০০৫-১০৩৯)

'আববাদ ইবন তামীম-এর চাচা আবদুল্লাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বৃষ্টির জন্য দোয়ায় বের হলেন এবং তিনি স্বীয় চাদর পরিবর্তন করলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) যখন শেষ রাকাত হতে মাথা উঠালেন, তখন বললেন, হে আল্লাহ! আইয়্যাশ ইবন আবূ রাবীআহ্কে মুক্তি দাও। হে আল্লাহ! সালামাহ্ ইবন হিশামকে মুক্তি দাও। হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদকে রক্ষা কর। হে আল্লাহ! দুর্বল মুমিনদেরকে মুক্তি কর। হে আল্লাহ! মুযার গোত্রের উপর তোমার শাস্তি কঠোর করে দাও। হে আল্লাহ! ইউসুফ-এর সময়ের দুর্ভিক্ষের বছরগুলোর মত (এদের উপরে) ও কয়েক বছর দুর্ভিক্ষ দাও। নবী (ﷺ) আরো বললেন, গিফার গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা কর। আর আসলাম গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে নিরাপদে রাখ। ইবন আবূ যিনাদ তার পিতা হতে বলেন, এ সমস্ত দোয়া ফজরের সালাতে ছিল।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন লোকদেরকে ইসলাম বিমুখ ভূমিকায় দেখলেন, তখন দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! ইউসুফ-এর সময়ের সাত বছরের (দুর্ভিক্ষের) ন্যায় তাদের উপর সাতটি বছর দুর্ভিক্ষ দাও। ফলে তাদের উপর এমন দুর্ভিক্ষ আপতিত হল যে, তা সব কিছুই ধ্বংস করে দিল। এমন কি মানুষ তখন চামড়া, মৃতদেহ এবং পচা ও গলিত জানোয়ারও খেতে লাগল। ক্ষুধার তাড়নায় অবস্থা এতদূর চরম আকার ধারণ করল যে, কেউ যখন আকাশের দিকে তাকাত তখন সে ধোয়া দেখতে পেত। এমতাবস্থায় আবূ সুফ্ইয়ান (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! তুমি তো আল্লাহর আদেশ মেনে চল এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ দান কর। কিন্তু তোমার কওমের লোকেরা তো মরে যাচ্ছে। তুমি তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া কর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ "তুমি সে দিনটির অপেক্ষায় থাক যখন আকাশ সুস্পষ্ট ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাবে...সেদিন আমি প্রবলভাবে তোমাদের পাকড়াও করব"- (দুখান ৪৪/১০-১৬)। আবদুল্লাহ বলেন, সে কঠিন আঘাতের দিন ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। ধোয়াও দেখা গেছে, আঘাতও এসেছে। আর মক্কার মুশ্রিকদের নিহত ও গ্রেফতার হওয়ার যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তাও সত্য হয়েছে। সত্য হয়েছে সূরাহ্ রূম-এর এ আয়াতও (রুমবাসী দশ বছরের মধ্যে পারসিকদের উপর আবার বিজয়ী হবে)।

আবদুল্লাহ ইবন দ্বীনার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন উমার-কে আবূ তালিব-এর এই কবিতা পাঠ করতে শুনেছিঃ তিনি শুভ্র, তার চেহারার অসীলাহ দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করা হতো। তিনি ইয়াতীমদের খাবার পরিবেশনকারী আর বিধবাদের তত্ত্বাবধায়ক।

সালিমের পিতা আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর বৃষ্টির জন্য দোয়ারত অবস্থায় আমি তার পবিত্র চেহারার দিকে তাকালাম এবং কবির এ কবিতাটি আমার মনে পড়লো। আর তার (মিম্বার হতে) নামতে না নামতেই প্রবলবেগে মীযাব হতে পানি প্রবাহিত হতে দেখলাম। তিনি শুভ্র, তার চেহারার অসীলাহ দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করা হতো। তিনি ইয়াতীমদের খাবার পরিবেশনকারী আর বিধবাদের তত্ত্বাবধায়ক। আর এটা হলো আবূ তালিবের বাণী (কবিতা)।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। উমার ইবন খাত্তাব অনাবৃষ্টির সময় আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব-এর ওয়াসীলাহ দিয়ে বৃষ্টির জন্য দোয়া করতেন এবং বলতেন, হে আল্লাহ! (আগে) আমরা আমাদের নবী (ﷺ) -এর ওয়াসীলাহ দিয়ে দোয়া করতাম এবং আপনি বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নবী (ﷺ) -এর চাচার ওয়াসীলাহ দিয়ে দোয়া করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। বর্ণনাকারী বলেন, দোয়ার সাথে সাথেই বৃষ্টি বর্ষিত হত।

আবদুল্লাহ ইবন যায়িদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন এবং নিজের চাদর উল্টিয়ে দেন।

আবদুল্লাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) ঈদগাহে গেলেন এবং বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর কিব্লামুখী হয়ে নিজের চাদরখানি উল্টিয়ে নিলেন এবং দু' রাকাত সালাত আদায় করলেন। ইমাম বুখারী বলেন, ইবন 'উয়াইনাহ বলতেন, এ হাদীসের বর্ণনাকারী আবদুল্লাহ ইবন যায়দ হলেন আযানের ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সাহাবী। কিন্তু তা ঠিক নয়। কারণ ইনি হলেন, সেই আবদুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন 'আসিম মাযিনী, যিনি আনসারের মাযিন গোত্রের লোক।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জুমুআহ'র দিন মিম্বরের সোজাসুজি দরওয়াজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দাড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। সে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সম্মুখে দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! গবাদি পশু ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাগুলোর চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আমাদের বৃষ্টি দেন। বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন তার উভয় হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ! বৃষ্টি দিন। আনাস বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তখন আকাশে মেঘমালা, মেঘের চিহ্ন বা কিছুই দেখতে পাইনি। অথচ সাল'আ (মদিনার একটি পাহাড়) পর্বত ও আমাদের মধ্যে কোন ঘর-বাড়ি ছিল না। আনাস বলেন, হঠাৎ সাল'আ পর্বতের পিছন হতে ঢালের মত মেঘ বেরিয়ে এল এবং তা মধ্য আকাশে পৌছে বিস্তৃত হয়ে পড়ল। অতঃপর বর্ষণ শুরু হল। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা ছয়দিন সূর্য দেখতে পাইনি। অতঃপর এক ব্যক্তি পরবর্তী জুমুআহ'র দিন সে দরজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দাড়িয়ে খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। লোকটি দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাটও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কাজেই আপনি আল্লাহর নিকট বৃষ্টি বন্ধের জন্য দোয়া করুন। আনাস বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উভয় হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমাদের আশেপাশে, আমাদের উপর নয়; টিলা, পাহাড়, উচ্চভূমি, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন। আনাস বলেন, এতে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল এবং আমরা (মাসজিদ হতে বেরিয়ে) রোদে চলতে লাগলাম। শরীক (বর্ণনাকারী) বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কি আগের সেই লোকটি? তিনি বললেন, আমি জানি না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি জুমুআহ'র দিন দারুল কাযা (বিচার করার স্থান)-এর দিকের দরজা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করল। এ সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দাড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। লোকটি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর দিকে মুখ করে দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদ নষ্ট হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেল। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন তিনি আমাদের বৃষ্টি দান করেন।তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু' হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান করুন। আনাস বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মেঘ নেই, মেঘের সামান্য টুকরা ও নেই। অথচ সাল'আ পর্বত ও আমাদের মধ্যে কোন ঘরবাড়ি ছিল না। তিনি বলেন, হঠাৎ সাল'আর ওপাশ হতে ঢালের মত মেঘ উঠে এল এবং মধ্য আকাশে এসে ছড়িয়ে পড়লো। অতঃপর প্রচুর বর্ষণ হতে লাগল। আল্লাহর কসম! আমরা ছয়দিন সূর্য দেখতে পাইনি। এর পরের জুমুআয় সে দরজা দিয়ে এক ব্যক্তি প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দাড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। লোকটি তার সম্মুখে দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কাজেই আপনি বৃষ্টি বন্ধের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। আনাস বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দু' হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা, মালভূমি, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন। আনাস বলেন, তখন বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল এবং আমরা বেরিয়ে রোদে চলতে লাগলাম। (রাবী) শরীক বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কি আগের সেই লোক? তিনি বললেন, আমি জানি না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জুমুআহ'র দিন খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। তিনি যেন আমাদেরকে বৃষ্টি দান করেন। তিনি তখন দোয়া করলেন। ফলে এত অধিক বৃষ্টি হল যে, আমাদের নিজ নিজ ঘরে পৌছতে পারছিলাম না। এমনকি পরের জুমুআ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে থাকল। আনাস বলেন, তখন সে লোকটি অথবা অন্য একটি লোক দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমাদের উপর হতে বৃষ্টি সরিয়ে দেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। আনাস বলেন, আমি তখন দেখতে পেলাম, মেঘ ডানে ও বামে পৃথক হয়ে বৃষ্টি হতে লাগল, মদিনা্বাসীর উপর বর্ষণ হচ্ছিল না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, গৃহপালিত পশুগুলো মরে যাচ্ছে এবং রাস্তাগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি দোয়া করলেন। ফলে সে জুমুআহ হতে পরবর্তী জুমুআহ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকল। অতঃপর সে ব্যক্তি আবার এসে বলল, (অতি বৃষ্টির ফলে) ঘরবাড়ী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, রাস্তা অচল হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলোও মরে যাচ্ছে। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দাড়িয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! টিলা, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন। তখন মদিনা হতে মেঘ এমনভাবে কেটে গেল, যেমন কাপড় ছিঁড়ে ফাক হয়ে যায়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! পশুগুলো মারা যাচ্ছে, এবং রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করলেন। ফলে সে জুমুআ হতে পরবর্তী জুমুআ পর্যন্ত তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকল। অতঃপর এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছে, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলোও মরে যাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন বললেনঃ হে আল্লাহ! পাহাড়ের চূড়ায়, টিলায়, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণ করুন। অতঃপর মাদ্বীনার আকাশ হতে মেঘ সরে গেল, যেমন কাপড় ছিঁড়ে ফাক হয়ে যায়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর নিকট সম্পদ বিনষ্ট হবার এবং পরিবার-পরিজনের দুঃখ-কষ্টের অভিযোগ জানান। তখন তিনি আল্লাহর নিকট বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন। বর্ণনাকারী এ কথা বলেননি, তিনি (আল্লাহর রাসূল (ﷺ)) তার চাদর উল্টিয়ে ছিলেন এবং এও বলেননি, তিনি কিবলামুখী হয়েছিলেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! পশুগুলো মরে যাচ্ছে এবং রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট (বৃষ্টির জন্য) দোয়া করুন। তখন তিনি দোয়া করলেন। ফলে এক জুমুআহ হতে পরের জুমুআহ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হতে থাকল। অতঃপর এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলোও মরে যাচ্ছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! পাহাড়ের উপর, টিলার উপর, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন। ফলে মদিনা হতে মেঘ এমনভাবে কেটে গেল যেমন কাপড় ছিড়ে ফাক হয়ে যায়।

ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরাইশরা যখন ইসলাম গ্রহণে দেরি করছিল, তখন নবী (ﷺ) তাদের বিরুদ্ধে দোয়া করলেন। পরিণামে তাদেরকে দুর্ভিক্ষ এমনভাবে গ্রাস করল যে, তারা ধ্বংস হতে লাগল এবং মৃত দেহ ও হাড়গোড় খেতে লাগল। তখন আবূ সুফ্ইয়ান (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! তুমি তো আত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে থাক। অথচ তোমার জাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তুমি মহান আল্লাহর নিকট দোয়া কর। তখন তিনি তিলাওয়াত করলেন, "তুমি অপেক্ষা কর সে দিনের যে দিন আসমানে প্রকাশ্য ধোয়া দেখা দিবে"- (দুখান ৪৪/১০)। অতঃপর (আল্লাহ যখন তাদের বিপদমুক্ত করলেন তখন) তারা আবার কুফরীর দিকে ফিরে গেল। এর পরিণতি স্বরূপ আল্লাহর এ বাণীঃ "যেদিন আমি কঠোরভাবে পাকড়াও করব"- (দুখান ৪৪/১৬) বদরের দিন। মানসূর হতে (বর্ণনাকারী) আসবাত আরো বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করেন। ফলে লোকজনের উপর বৃষ্টিপাত হয় এবং অবিরাম সাতদিন পর্যন্ত বর্ষিত হতে থাকে। লোকেরা অতিবৃষ্টির বিষয়টি পেশ করল। তখন নবী (ﷺ) দোয়া করে বলেন, হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। অতঃপর তার মাথার উপর হতে মেঘ সরে গেল। তাদের পার্শ্ববর্তী লোকদের উপর বর্ষিত হল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জুমুআহর দিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। তখন লোকেরা দাড়িয়ে উচ্চস্বরে বলতে লাগল, হে আল্লাহর রাসূল! বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে, গাছপালা লাল হয়ে গেছে এবং পশুগুলো মারা যাচ্ছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, যেন তিনি আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করুন। এভাবে দু'বার বললেন। (বর্ণনাকারী বলেন,) আল্লাহর কসম! আমরা তখন আকাশে এক খন্ড মেঘও দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ মেঘ দেখা দিল এবং বর্ষণ হলো। তিনি (রাসূলুল্লাহ) মিম্বার হতে নেমে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর যখন তিনি চলে গেলেন, তখন হতে পরবর্তী জুমুআহ পর্যন্ত বৃষ্টি হতে থাকে। অতঃপর যখন তিনি (দাড়িয়ে) জুমুআহর খুৎবাহ দিচ্ছিলেন, তখন লোকেরা উচ্চস্বরে তার নিকট নিবেদন করল, ঘরবাড়ী বিধ্বস্ত হচ্ছে, রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন আমাদের হতে তিনি বৃষ্টি বন্ধ করেন। তখন নবী (ﷺ) মৃদু হেসে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। তখন মদিনার আকাশ মুক্ত হলো আর এর আশে পাশে বৃষ্টি হতে লাগল। মদিনায় তখন এক ফোঁটা বৃষ্টিও হচ্ছিল না। আমি মদিনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মদিনা যেন মুকুটের ন্যায় শোভা পাচ্ছিল।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আনসারী বের হলেন এবং, বারাআ ইবন আযিব ও যায়দ ইবন আরকাম ও তার সঙ্গে বের হলেন। তিনি মিম্বার ছাড়াই পায়ের উপরে দাড়িয়ে তাদের সঙ্গে নিয়ে বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর ইস্তিগফার করে আযান ও ইকামাত ব্যতীত সশব্দে কিরাআত পড়ে দু' রাকাত সালাত আদায় করেন। (রাবী) আবূ ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ (আনসারী) নবী (ﷺ) -কে দেখেছেন।

'আববাদ ইবন তামীম হতে বর্ণিত। তার চাচা নবী (ﷺ) এর একজন সাহাবী ছিলেন, তিনি তার নিকট বর্ণনা করেছেন যে নবী (ﷺ) সাহাবীগণকে নিয়ে তাদের জন্য বৃষ্টির দোয়ার উদ্দেশে বের হলেন। তিনি দাড়ালেন এবং দাড়িয়েই আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন। অতঃপর কিবলামুখী হয়ে নিজ চাদর উল্টিয়ে দিলেন। অতঃপর তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হল।

'আববাদ ইবন তামীম তার চাচা হতে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বৃষ্টির দোয়ার জন্য বের হলেন, কিবলামুখী হয়ে দোয়া করলেন এবং নিজের চাদরখানি উল্টে দিলেন। অতঃপর দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। তিনি উভয় রাকাতে সশব্দে কিরাআত পাঠ করলেন।

'আববাদ ইবন তামীম তার চাচা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যেদিন বৃষ্টির দোয়ার উদ্দেশে বের হয়েছিলেন, আমি তা দেখেছি। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি লোকদের দিকে তার পিঠ ফিরালেন এবং কিবলামুখী হয়ে দোয়া করলেন। অতঃপর তিনি তার চাদর উল্টে দিলেন। আমাদের নিয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। তিনি উভয় রাকাতে সশব্দে কিরাআত পাঠ করেন।

'আববাদ ইবন তামীম তার চাচা হতে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর তিনি দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং চাদর উল্টিয়ে নিলেন।

'আববাদ ইবন তামীম তার চাচা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইসতিস্কার জন্য ঈদগাহর ময়দানে গমন করেন। তিনি কিব্লামুখী হলেন, অতঃপর দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং তার চাদর উল্টিয়ে নিলেন। সুফ্ইয়ান বলেন, আবূ বাকর হতে মাসঊদ আমাদের বলেছেন, তিনি (চাদর পাল্টানোর ব্যাপারে) বলেন, ডান পাশ বা পাশে দিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন যায়দ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সালাতের জন্য ঈদগাহের উদ্দেশে বের হলেন। তিনি যখন দোয়া করলেন অথবা দোয়া করার ইচ্ছা করলেন তখন কিবলামুখী হলেন এবং তার চাদর উল্টিয়ে নিলেন। ইমাম বুখারী বলেন, এ (হাদীসের বর্ণনাকারী) আবদুল্লাহ ইবন যায়দ মাযিন গোত্রীয়। পূর্বের হাদীসের বর্ণনাকারী হলেন কুফী এবং তিনি ইবন ইয়াযীদ।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক বেদুঈন জুমুআহ'র দিন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (অনাবৃষ্টিতে) পশুগুলো মরে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন মারা যাচ্ছে, মানুষ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়ার জন্য দু'হাত উঠালেন। লোকজনও দোয়ার জন্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে হাত উঠিয়ে দোয়া করতে লাগলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা মাসজিদ হতে বের হবার পূর্বেই বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল, এমন কি পরবর্তী জুমুআ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টি হতে থাকল। তখন লোকটি আল্লাহর নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মুসাফির ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তার উভয় হাত উঠিয়েছিলেন, এমন কি আমরা তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেয়েছি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইসতিস্কা ছাড়া অন্য কোথাও দোয়ার মধ্যে হাত উঠাতেন না। তিনি হাত এতটুকু উপরে উঠাতেন যে, তার বগলের শুভ্রতা দেখা যেত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বৃষ্টি দেখলে বলতেন, হে আল্লাহ! মুষলধারায় কল্যাণকর বৃষ্টি দাও।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর যুগে একবার লোকেরা অনাবৃষ্টিতে পতিত হল। সে সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একবার মিম্বারে দাড়িয়ে জুমুআহ'র খুৎবা দিচ্ছিলেন। তখন এক বেদুঈন দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (অনাবৃষ্টিতে) ধন-সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবার-পরিজন ক্ষুধার্ত। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাদের বৃষ্টি দান করেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার দু' হাত তুললেন। সে সময় আকাশে একখন্ড মেঘও ছিল না। বর্ণনাকারী বলেন, হঠাৎ পাহাড়ের মত বহু মেঘ একত্রিত হল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মিম্বার হতে নামার আগেই বৃষ্টি শুরু হলো। এমনকি আমি দেখলাম, নবী (ﷺ) -এর দাড়ি বেয়ে বৃষ্টির পানি ঝরছে। বর্ণনাকারী আরো বলেন, সেদিন, তার পরের দিন, তার পরের দিন এবং পরবর্তী জুমুআহ পর্যন্ত বৃষ্টি হল। অতঃপর সে বেদুঈন বা অন্য কেউ দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে গেল, সম্পদ ডুবে গেল, আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য দোয়া করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন তার দু'হাত তুলে বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের আশে পাশে, আমাদের উপর নয়। অতঃপর তিনি হাত দিয়ে আকাশের যে দিকে ইশারা করলেন, সে দিকের মেঘ কেটে গেল। এতে সমগ্র মাদ্বীনার আকাশ মেঘ মুক্ত চালের মত হয়ে গেল এবং কানাত উপত্যকায় এক মাস ধরে বৃষ্টি প্রবাহিত হতে থাকে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন যে এলাকা হতে লোক আসত, কেবল এ প্রবল বর্ষণের কথাই বলাবলি করত।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন প্রবল গতিতে বায়ু প্রবাহিত হত তখন নবী (ﷺ) -এর চেহারায় তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিত। (ভয়ের চিহ্ন দেখা দিত)।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত নবী (ﷺ) বলেন, আমাকে পূর্বের হাওয়া দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। আর আদ জাতিকে পশ্চিমা হাওয়া দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামত কায়িম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্ম উঠিয়ে নেয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বৃদ্ধি পাবে। হারজ খুন-খারাবী। তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, হে আল্লাহ! আমাদের শামে (সিরিয়া) ও ইয়ামনে বরকত দান করুন। লোকেরা বলল, আমাদের নজদেও। নবী (ﷺ) বললেনঃ হে আল্লাহ! আমাদের শামদেশে ও ইয়ামনে বরকত দান করুন। লোকেরা তখন বলল, আমাদের নজদেও। রাবী বলেন, নবী (ﷺ) তখন বললেনঃ সেখানে তো রয়েছে ভূমিকম্প ও ফিতনা-ফাসাদ আর শয়তানের শিং সেখান হতেই বের হবে (তার উত্থান ঘটবে)।

যায়দ ইবন খালিদ জুহানী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রাতে বৃষ্টিপাতের পরে আমাদের নিয়ে হুদাইবিয়ায় ফজরের সালাত আদায় করেন। অতঃপর নবী (ﷺ) সালাম ফিরিয়ে লোকদের দিকে মুখ করে বললেনঃ তোমরা কি জান, তোমাদের রব কী বলেছেন? তারা বললেন, আল্লাহ এবং তার রাসূলই ভাল জানেন। তিনি তখন বললেন, (আল্লাহ বলেছেন) আমার কিছু সংখ্যক বান্দা বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী হয়ে গেল। যে ব্যক্তি বলে, আল্লাহর ফযল ও রহমতে আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে, সে আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে ব্যক্তি বলে, অমুক অমুক নক্ষত্র উদয়ের ফলে (বৃষ্টি হয়েছে) সে ব্যক্তি আমার প্রতি অবিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ গায়বের চাবি হল পাচটি, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। (১) কেউ জানে না যে, আগামীকাল কী ঘটবে। (২) কেউ জানে না যে, আগামীকাল সে কী অর্জন করবে। (৩) কেউ জানে না যে, মায়ের গর্ভে কী আছে। (৪) কেউ জানে না যে, সে কোথায় মারা যাবে। (৫) কেউ জানে না যে, কখন বৃষ্টি হবে।