মদীনায় সাহায্যকারীদের গুণাবলী (আনসার) (৩৭৭৬-৩৯৪৮)
গাইলান ইবন জারীর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের আনসার নামকরণ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? এ নাম কি আপনারা করেছেন, না আল্লাহ আপনাদের এ নামকরণ করেছেন? আনাস বললেন, বরং আল্লাহ তাআলা আমাদের এ নামকরণ করেছেন। [গাইলান বলেন] আমরা যখন আনাস-এর নিকট যেতাম, তখন তিনি আমাদেরকে আনসারদের গুণাবলী ও কার্যাবলী বর্ণনা করে শুনাতেন। তিনি আমাকে অথবা আয্দ গোত্রের এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলতেন, তোমার গোত্র অমুক দিন অমুক কাজ করেছেন, অমুক দিন অমুক কাজ করেছেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বু'আস যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ ছিল, যা আল্লাহ তাআলা তার মদিনা আগমনের পূর্বেই ঘটিয়েছিলেন। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন সেখানকার গণ্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ এ যুদ্ধে নিহত ও আহত হয়েছিল। তাদের ইসলাম গ্রহণকে আল্লাহ তাআলা তার রাসূল (ﷺ)-এর জন্য অনুকূল করে দিয়েছিলেন।
আবূ তাইয়্যাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস-কে বলতে শুনেছি, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশদেরকে মালে গনীমত দিলে কিছু সংখ্যক আনসার বলেছিলেন যে, এ বড় আশ্চর্যের বিষয় যে, তিনি কুরাইশদের মাল দিলেন অথচ আমাদের তলোয়ার হতে তাদের রক্ত এখনও ঝরছে। নবী (ﷺ)-এর নিকট এ কথা পৌছলে তিনি আনসারদেরকে ডেকে বললেন, আমি তোমাদের হতে যে কথাটি শুনতে পেলাম, সে কথাটি কী? যেহেতু তারা মিথ্যা কথা বলতেন না, সেহেতু তারা বললেন, আপনার নিকট যা পৌছেছে তা সত্যই। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোকজন গনীমতের মাল নিয়ে তাদের ঘরে ফিরে যাবে আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে নিজ ঘরে ফিরবে। যদি আনসারগণ উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে চলে তবে আমি আনসারদের উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়েই চলব।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) অথবা তিনি বলেছেন, আবুল কাসিম (ﷺ) বলেন, আনসারগণ যদি কোন উপত্যকা বা গিরিপথে চলে তবে আমি আনসারদের উপত্যকা দিয়েই চলব। যদি হিজরাত না হত, তবে আমি আনসারদেরই একজন হতাম। আবূ হুরাইরাহ বলেন, নবী (ﷺ) এ কথায় কোন অত্যুক্তি করেননি। আমার মাতা-পিতা তার উপর কুরবান হোক তারা তাকে আশ্রয় দিয়েছেন, সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন। কিংবা এমন কিছু বলেছেন।
আবদুর রহমান ইবন 'আওফ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন মুহাজিরগণ মদিনায় আগমন করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবদুর রাহমান ইবন 'আউফ ও সাদ ইবন রাবী' এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে দিলেন। তখন তিনি [সাদ] আবদুর রাহমান কে বললেন, আনসারদের মধ্যে আমিই সব থেকে বেশি সম্পদের অধিকারী। আপনি আমার সম্পদকে দু'ভাগ করে নিন। আমার দু'জন স্ত্রী রয়েছে, আপনার যাকে পছন্দ হয় বলুন, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত শেষে আপনি তাকে বিয়ে করে নিবেন। আবদুর রহমান বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবারে এবং সম্পদে বরকত দান করুন। আপনাদের বাজার কোথায়? তারা তাকে বনূ কায়নুকার বাজার দেখিয়ে দিলেন। যখন ঘরে ফিরলেন তখন কিছু পনির ও কিছু ঘি সাথে নিয়ে ফিরলেন। এরপর প্রতিদিন সকাল বেলা বাজার যেতে লাগলেন। একদিন নবী (ﷺ)-এর কাছে এমন অবস্থায় আসলেন যে, তার শরীর ও কাপড়ে হলুদ রং এর চিহ্ন ছিল। নবী (ﷺ) বললেন, ব্যাপার কী! তিনি বললেন, আমি বিয়ে করেছি। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, তাকে কী পরিমাণ মাহর দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আটির পরিমাণ অথবা খেজুরের এক আটির ওজন পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি।
আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুর রাহমান ইবন আউফ হিজরাত করে আমাদের কাছে এলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার ও সাদ ইবন রাবী'-এর মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়ে দিলেন। সাদ ছিলেন অনেক সম্পদশালী। সাদ বললেন, সকল আনসারগণ জানেন যে আমি তাদের মধ্যে অধিক সম্পদশালী। আমি শীঘ্রই আমার ও তোমার মাঝে আমার সম্পদ ভাগাভাগি করে দিব দুই ভাগে। আমার দু'জন স্ত্রী রয়েছে; তোমার যাকে পছন্দ হয় বল, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। ইদ্দত শেষে তুমি তাকে বিয়ে করে নিবে। আবদুর রাহমান বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবার পরিজনের মধ্যে বরকত দান করুন। ব্যবসা আরম্ভ করে বাজার হতে মুনাফা স্বরূপ ঘি ও পনির সাথে নিয়ে ফিরলেন। অল্প কয়েকদিন পর তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলেন। তখন তার শরীরে ও কাপড়ে হলুদ রংয়ের চিহ্ন ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী? তিনি বললেন, আমি একজন আনসারী মহিলাকে বিয়ে করেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাকে কী পরিমাণ মাহর দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আটির ওজন পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি অথবা একটি আটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমা কর।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারগণ বললেন, আমাদের খেজুরের বাগানগুলি আমাদের এবং তাদের (মুহাজিরদের) মাঝে বণ্টন করে দিন। তিনি (নবী (ﷺ)) বললেন, না, তখন আনসারগণ বললেন, আপনারা বাগানগুলির রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের সাহায্য করুন এবং ফসলের অংশীদার হয়ে যান। মুহাজিরগণ বললেন, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।
বারা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, মুমিন ছাড়া আনসারদেরকে কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে না। যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালবাসবে আল্লাহ তাআলা তাকে ভালবাসবেন আর যে ব্যক্তি তাদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ঘৃণা করবেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, আনসারদের প্রতি ভালবাসা ঈমানেরই নিদর্শন এবং তাদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ রাখা মুনাফিকীর নিদর্শন।
আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (আনসারের) কতিপয় বালক-বালিকা ও নারীকে রাবী (বর্ণনাকারী) বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছিলেন, কোন বিবাহ অনুষ্ঠান শেষে ফিরে আসতে দেখে নবী (ﷺ) তাদের উদ্দেশে দাড়িয়ে গেলেন। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ জানেন, তোমরাই আমার সবচেয়ে প্রিয়জন। কথাটি তিনি তিনবার বললেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন আনসারী মহিলা তার শিশুসহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সঙ্গে কথা বললেন এবং বললেন, ঐ আল্লাহর কসম যার হাতে আমার প্রাণ, লোকদের মধ্যে তোমরাই আমার সবচেয়ে প্রিয়জন। কথাটি তিনি দু'বার বললেন।
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রত্যেক নবীরই অনুসারী ছিলেন। আমরাও আপনার অনুসারী। আপনি আমাদের উত্তরসুরীদের জন্য দু'আ করুন যেন তারা আপনার অনুসারী হয়। তিনি দোয়া করলেন।
আবূ হামযাহ নামক একজন আনসারী হতে বর্ণিত, কতিপয় আনসার বললেন, প্রত্যেক জাতির মধ্যে অনুসরণকারী একটি দল থাকে। হে আল্লাহর রাসূল! আমরাও আপনার অনুসরণ করছি। আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন যেন আমাদের উত্তরসুরিরা আমাদের অনুসারী হয়। নবী (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ তাদের উত্তরসুরীদেরকে তাদের মত করে দাও।
আবূ উসায়দ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, সবচেয়ে উত্তম গোত্র হল বানূ নাজ্জার, তারপর বানূ আবদুল আশহাল তারপর বনূ হারিস ইবন খাযরাজ তারপর বানূ সায়িদা এবং আনসারদের সকল গোত্রের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। এ শুনে সাদ বললেন, নবী (ﷺ) কি অন্যদেরকে আমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন? তখন তাকে বলা হল, তোমাদেরকে তো অনেক গোত্রের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।
আবূ উসায়দ বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আনসারদের মধ্যে বা আনসার গোত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম গোত্র হল বানূ নাজ্জার, বানূ আবদুল আশহাল, বানূ হারিস ও বানূ সা'য়িদা।
আবূ হুমায়দ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম গোত্র হল বানূ নাজ্জার, তারপর বানূ আবদুল আশহাল, তারপর বানূ হারিস এরপর বানূ সা'য়িদা। আনসারদের সকল গোত্রে রয়েছে কল্যাণ। (আবূ হুমায়দ বলেন,) আমরা সাদ ইবন উবাদাহ -এর নিকট গেলাম। তখন আবূ উসায়দ বললেন, আপনি কি শোনেননি যে, নবী (ﷺ) আনসারদের পরস্পরের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আমাদেরকে সকলের শেষ পর্যায়ে স্থান দিয়েছেন? তা শুনে সাদ নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আনসার গোত্রগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং আমাদেরকে সকলের শেষ স্তরে স্থান দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমরাও শ্রেষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছ?
উসায়দ ইবন হুযায়র হতে বর্ণিত, একজন আনসারী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাকে অমুকের ন্যায় দায়িত্বে নিয়োজিত করবেন না? তিনি (ﷺ) বললেন, তোমরা আমার ওফাতের পর অপরকে অগ্রাধিকার দেওয়া দেখতে পাবে, তখন তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে অবশেষে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং তোমাদের সাথে সাক্ষাতের স্থান হল হাউয।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আনসারদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা অচিরেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। অতএব তোমরা আমার সাথে সাক্ষাৎ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ কর প্রতিশ্রুত হাউযের নিকট গমন পর্যন্ত।
ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ হতে বর্ণিত তিনি যখন আনাস ইবন মালিক-এর সঙ্গে ওয়ালীদ (ইবন আবদুল মালিক)-এর নিকট সাক্ষাতের উদ্দেশে বাসরা হতে দামেস্ক সফর করতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি আনাস-কে বলতে শুনেছেন, নবী (ﷺ) বাহরাইনের জমি তাদের জন্য বরাদ্দ করার জন্য আনসারদেরকে ডাকলে তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মুহাজির ভাইদের জন্য এরূপ জায়গীর বরাদ্দ না করা পর্যন্ত আমরা তা গ্রহণ করব না। নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা যদি তা গ্রহণ করতে না চাও, তবে (কিয়ামতের ময়দানে) হাউযের নিকটে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য অবলম্বন কর। কেননা শীঘ্রই তোমরা দেখতে পাবে, আমার পরে তোমাদের উপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। হে আল্লাহ! আনসার ও মুহাজিরদের কল্যাণ করুন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারগণ খন্দক যুদ্ধের পরিখা খননের সময় বলছিলেন, আমরা হলাম ঐ সমস্ত লোক যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হাতে জিহাদের জন্য বায়আত করেছি যত দিন আমরা বেচে থাকব। এর উত্তরে নবী (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই আসল জীবন। (হে আল্লাহ) আনসার ও মুহাজিরদের সম্মান বাড়িয়ে দাও।
সাহল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা যখন পরিখা খনন করে আমাদের স্কন্ধে করে মাটি বহন করছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই আসল জীবন। মুহাজির ও আনসারদেরকে আপনি মাফ করে দিন।
আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণিত, এক লোক নবী (ﷺ)-এর খেদমতে এল। তিনি (ﷺ) তার স্ত্রীদের কাছে লোক পাঠালেন। তারা জানালেন, আমাদের নিকট পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কে আছ যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সাথে খাওয়াতে পার? তখন এক আনসারী সাহাবী [আবূ ত্বলহা] বললেন, আমি। এ বলে তিনি মেহমানকে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মেহমানকে সম্মান কর। স্ত্রী বললেন, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসারী বললেন, তুমি আহার প্রস্তুত কর এবং বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। সে বাতি জ্বালাল, বাচ্চাদেরকে ঘুম পাড়াল এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল তা উপস্থিত করল। বাতি ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর তারা স্বামী-স্ত্রী দু'জনই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মত শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বুঝাতে লাগলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন। তারা উভয়েই সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কান্ড দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা বলেছেন খুশী হয়েছেন এবং এ আয়াত নাযিল করেছেন। "তারা অভাবগ্রস্ত সত্ত্বেও নিজেদের উপর অন্যদেরকে অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদেরকে অন্তরের কৃপণতা হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।" (আল-হাশর ৯)
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন অন্তিম রোগে আক্রান্ত তখন আবূ বাকর ও আব্বাস আনসারদের কোন একটি মজলিসের পাশ দিয়ে যাওয়ার কালে দেখতে পেলেন যে, তারা কাঁদছেন। তাদের একজন জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কাঁদছেন কেন? তারা বললেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সাথে আমাদের মজলিস স্মরণ করে কাঁদছি। তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে আনসারদের অবস্থা বললেন, রাবী (বর্ণনাকারী) বললেন, নবী (ﷺ) চাদরের কোণা দিয়ে মাথা বেধে বেরিয়ে আসলেন এবং মিম্বরে উঠে বসলেন। এ দিনের পর আর তিনি মিম্বরে আরোহণ করেননি। তারপর হামদ ও সানা পাঠ করে সমবেত সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি আনসারগণের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখার জন্য তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি; কেননা তারাই আমার অতি আপন জন, তারাই আমার বিশ্বস্ত লোক। তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পরিপূর্ণভাবে পালন করেছে। তাদের যা প্রাপ্য তা তারা এখনো পায়নি। তাদের নেক লোকদের নেক আমলগুলো গ্রহণ করবে এবং তাদের ভুল-ত্রুটি মাফ করে দিবে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে, চাদরের দু-প্রান্ত দু'কাধে পেঁচিয়ে এবং মাথায় একটি কাল রঙের পাগড়ী বেধে বের হলেন এবং মিম্বরে উঠে বসলেন। হাম্দ ও সানার পর বললেন, হে লোক সকল, জনসংখ্যা ক্রমশঃ বাড়তে থাকবে আর আনসারগণের সংখ্যা ক্রমশঃ কমতে থাকবে! এমনকি তারা খাবারে লবণের পরিমাণের মত হয়ে যাবে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ এমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভ করে যে ইচ্ছা করলে কারো উপকার বা অপকার করতে পারে, তখন সে যেন নেক্কার আনসারদের নেক্ আমলগুলো গ্রহণ করে এবং তাদের ভুল-ত্রুটি মাফ করে দেয়।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, আনসারগণ আমার অতি আপনজন ও বিশ্বস্ত লোক। লোকসংখ্যা বাড়তে থাকবে আর তাদের সংখ্যা কমতে থাকবে। তাই তাদের নেক্কারদের নেক আমলগুলো কবূল কর এবং তাদের ভুল-ত্রুটি মাফ করে দাও।
বারা' হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে এক জোড়া রেশমী কাপড় হাদীয়া দেয়া হল। সহাবায়ে কেরাম তা স্পর্শ করে এর কোমলতায় অবাক হয়ে গেলেন। নবী (ﷺ) বললেন, এর কোমলতায় তোমরা অবাক হচ্ছ? অথচ সাদ ইবন মুআয-এর (জান্নাতের) রুমাল এর চেয়ে অনেক উত্তম, অথবা বলেছেন অনেক মোলায়েম।
জাবির বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি সাদ ইবন মুআয-এর মৃত্যুতে আল্লাহ তাআলার আরশ কেঁপে উঠেছিল। আমাশ.....নবী (ﷺ) হতে এ রকমই বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি জাবির-কে বলল, বারা ইবন আযিব তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির বললেন, সাদ ও বারা-এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, কেননা আমি নবী (ﷺ)-কে "আল্লাহর আরশ্ সাদ ইবন মুআযের (ওফাতে) কেঁপে উঠল" (কথাটি) বলতে শুনেছি।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, কতিপয় লোক (বনী কুরায়যার ইয়াহূদীগণ) সাদ ইবন মুআয-কে সালিশ মেনে (দুর্গ থেকে) নেমে আসে। তাকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠানো হল। তিনি গাধায় সাওয়ার হয়ে আসলেন। যখন মসজিদের নিকটে আসলেন, তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি অথবা (বললেন) তোমাদের সরদার আসছেন তার দিকে দাড়াও। তারপর তিনি বললেন, হে সাদ! তারা তোমাকে সালিশ মেনে বেরিয়ে এসেছে। সাদ বললেন, আমি তাদের সম্পর্কে এ ফয়সালা দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হোক এবং শিশু ও মহিলাদেরকে বন্দী করে রাখা হোক। নবী (ﷺ) বললেন, তুমি আল্লাহ তাআলার ফায়সালা মোতাবেক ফায়সালা দিয়েছ অথবা (বলেছিলেন) তুমি বাদশাহর আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী ফায়সালা করেছ।
আনাস হতে বর্ণিত, দু' ব্যক্তি অন্ধকার রাতে নবী (ﷺ)-এর নিকট হতে বের হলেন। হঠাৎ তারা তাদের সম্মুখে একটি উজ্জ্বল আলো দেখতে পেলেন। রাস্তায় তারা যখন আলাদা হলেন তখন আলোটিও তাদের উভয়ের সাথে আলাদা আলাদা হয়ে গেল।
আবদুল্লাহ্ ইবন আমর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, কুরআন পাঠ শিখ চার জনের নিকট হতেঃ ইবন মাসউদ, আবূ হুযাইফার আযাদকৃত গোলাম সালিম, উবাই (ইবন কা'ব) ও মুআয ইবন জাবাল থেকে।
আবূ উসাইদ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আনসার গোত্রগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম গোত্র হল, বানু নাজ্জার, তারপর বানু 'আবদ-ই-আশহাল, তারপর বানু হারিস ইবন খাযরাজ তারপর বানু সায়িদাহ। আনসারদের সব গোত্রের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তখন সাদ ইবন উবাদাহ যিনি ছিলেন প্রথম যুগের অন্যতম মুসলিম বললেন, আমার ধারণা যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অন্যদেরকে আমাদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন, তাকে বলা হল, আপনাদেরকে বহু গোত্রের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে।
মাসরূক হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন আমর-এর মজলিসে আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ-এর আলোচনা হচ্ছিল। তখন তিনি বললেন; তিনি সে ব্যক্তি যাকে নবী (ﷺ)-এর বক্তব্য শুনার পর হতে আমি খুব ভালবাসি। নবী (ﷺ) বলেছেন, কুরআন শিক্ষা কর চারজনের নিকট থেকে, আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (সর্ব প্রথম তিনি এ নামটি বললেন), সালিম- আবূ হুযাইফার আযাদকৃত গোলাম, মুআয ইবন জাবাল ও উবাই ইবন কা'ব।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) উবাই ইবন কা'ব-কে বললেন, আল্লাহ সূরা "যারা অবিশ্বাস করে(বাইয়্যিনাহ ৯৮)" তোমাকে পড়ে শুনানোর জন্য আমাকে আদেশ করেছেন। উবাই ইবন কা'ব জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ কি আমার নাম করেছেন? নবী (ﷺ) বললেন, হা। তখন তিনি কেঁদে ফেললেন।
আনাস হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ)-এর যুগে (সর্বপ্রথম) যে চার ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করেছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন আনসারী। (তারা হলেন) উবাই ইবন কা'ব মু'আয ইবন জাবাল আবূ যায়দ ও যায়দ ইবন সাবিত। কাতাদাহ্ বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, আবূ যায়দ কে? তিনি বললেন, তিনি আমার চাচাদের একজন।
আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওহুদ যুদ্ধের এক সময়ে সহাবাগণ নবী (ﷺ) হতে আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। তখন আবূ ত্বলহা ঢাল হাতে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর সামনে প্রাচীরের মত দৃঢ় হয়ে দাড়ালেন। আবূ ত্বলহা সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। এক নাগাড়ে তীর ছুঁড়তে থাকায় তার হাতে ঐদিন দু' বা তিনটি ধনুক ভেঙ্গে যায়। ঐ সময় তীর ভর্তি তীরাধার নিয়ে যে কেউ তার নিকট দিয়ে যেতো নবী (ﷺ) তাকেই বলতেন, তোমরা তীরগুলি আবূ ত্বলহার জন্য রেখে দাও। এক সময় নবী (ﷺ) মাথা উচু করে শত্রুদের অবস্থা দেখতে চাইলে আবূ ত্বলহা বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমার মাতা পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি মাথা উচু করবেন না। হয়ত শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর এসে আপনার গায়ে লাগতে পারে। আমার বক্ষ আপনাকে রক্ষার জন্য ঢাল স্বরূপ। আনাস বলেন, ঐদিন আমি আবূ বাকর-এর কন্যা আয়িশাহ -কে এবং (আমার মাতা) উম্মে সুলায়মকে দেখতে পেলাম যে, তারা পরনের কাপড় এতটুকু পরিমাণ উঠিয়েছেন যে, তাদের পায়ের খাঁড়ু আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। তারা পানির মশক ভরে নিজেদের পিঠে বহন করে এনে আহতদের মুখে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। পুনরায় ফিরে গিয়ে পানি ভরে নিয়ে আহতদেরকে পান করাচ্ছিলেন। ঐ সময় আবূ ত্বলহা-এর হাত হতে (তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে) তার তরবারিটি দু'বার অথবা তিনবার পড়ে গিয়েছিল।
সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে আবদুল্লাহ ইবন সালাম ছাড়া যমীনে বিচরণশীল কারো ব্যাপারে এ কথাটি বলতে শুনিনি যে, 'নিশ্চই তিনি জান্নাতবাসী'। সাদ বলেন, তারই ব্যাপারে সূরাহ আহকাফের এ আয়াত নাযিল হয়েছেঃ "এ ব্যাপারে বনী ইসরাঈলের মধ্য থেকেও একজন সাক্ষ্য দান করেছে। (46.10)
কায়স ইবন 'উবাদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদিনার মসজিদে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন এমন এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলেন যার চেহারায় বিনয় ও নম্রতার ছাপ ছিল। লোকজন বলতে লাগলেন, এই ব্যক্তি জান্নাতীগণের একজন। তিনি হালকাভাবে দু'রাকআত সালাত আদায় করে মাসজিদ হতে বেরিয়ে এলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলাম এবং তাকে বললাম, আপনি যখন মসজিদে প্রবেশ করছিলেন তখন লোকজন বলাবলি করছিল যে, ইনি জান্নাতবাসীগণের একজন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম কারো জন্য এমন কথা বলা উচিত নয়, যা সে জানে না। আমি তোমাকে আসল কথা বলছি কেন তা বলা হয়। আমি নবী (ﷺ)-এর যামানায় একটি স্বপ্ন দেখে তার নিকট বর্ণনা করলাম। আমি দেখলাম যে, আমি যেন একটি বাগানে অবস্থান করছি; বাগানটি বেশ প্রশস্ত, সবুজ। বাগানের মধ্যে একটি লোহার স্তম্ভ যার নিম্নভাগ মাটিতে এবং উপরিভাগ আকাশ স্পর্শ করেছে; স্তম্ভের উপরে একটি শক্ত কড়া সংযুক্ত রয়েছে। আমাকে বলা হল, উপরে উঠ। আমি বললাম, এটাতো আমার সামর্থ্যের বাইরে। তখন একজন খাদিম এসে পিছন দিক হতে আমার কাপড় সহ চেপে ধরে আমাকে উঠতে সাহায্য করলেন। আমি উঠতে লাগলাম এবং উপরে গিয়ে আংটাটি ধরলাম। তখন আমাকে বলা হল, শক্তভাবে আংটাটি ধর। তারপর কড়াটি আমার হাতের মুঠায় ধরা অবস্থায় আমি জেগে গেলাম। নবী (ﷺ)-এর নিকট স্বপ্নটি বললে, তিনি বললেন, এ বাগান হল ইসলাম, আর স্তম্ভটি হল ইসলামের খুটিসমূহ কড়াটি হল "উরুয়াতুল উস্কা" (শক্ত ও অটুট কড়া) এবং তুুমি আজীবন ইসলামের উপর কায়েম থাকবে। (রাবী বলেন) এই ব্যক্তি হলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম।
আবূ বুরদাহ বলেন, আমি মদিনায় গেলাম; আবদুল্লাহ ইবন সালামের সাথে আমার দেখা হল। তিনি আমাকে বললেন, তুমি আমাদের এখানে আসবে না? তোমাকে আমি খেজুর ও ছাতু খেতে দেব এবং একটি ঘরে থাকতে দেব। অতঃপর তিনি বললেন, তুমি এমন স্থানে (ইরাকে) বসবাস কর, যেখানে সুদের কারবার খুব ব্যাপক। যখন কোন মানুষের নিকট তোমার কোন প্রাপ্য থাকে আর সেই মানুষটি যদি তোমাকে কিছু ঘাস, খড় অথবা খড়ের ন্যায় সামান্য কিছুও হাদীয়া পেশ করে তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করো না, যেহেতু তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, মারিয়াম ছিলেন (পূর্বের) নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতমা নারী। আর খাদীজাহ (এ উম্মাতের) নারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠা।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী (ﷺ)-কে তার কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নবী (ﷺ)-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী (ﷺ) উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর অন্য কোন স্ত্রীর ব্যাপারে এত ঈর্ষা পোষণ করিনি, যতটুকু খাদীজাহ-এর প্রতি করেছি। যেহেতু নবী (ﷺ) তার আলোচনা বেশি করতেন। তিনি (আরো) বলেন, খাদীজাহ-এর (ইন্তিকালের) তিন বছর পর তিনি আমাকে বিবাহ করেন। আল্লাহ নিজে অথবা জিব্রাঈল নবী (ﷺ)-কে আদেশ করলেন যে, খাদীজাহ-কে জান্নাতে মণিমুক্তা খচিত একটি ভবনের খোশ খবর দিন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী (ﷺ) তার কথা বেশি সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবহ করে গোশ্তের পরিমাণ বিবেচনায় হাড়-গোশ্তকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদীজাহ-এর বান্ধবীদের ঘরে পৌছে দিতেন। আমি কোন সময় ঈর্ষা ভরে নবী (ﷺ)-কে বলতাম, মনে হয়, খাদীজাহ ছাড়া দুনিয়াতে যেন আর কোন নারী নাই। উত্তরে তিনি (ﷺ) বলতেন, হা। তিনি এমন ছিলেন, এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তানাদি জন্মেছিল।
ইসমাঈল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আবূ আউফা-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ) খাদীজাহ-কে জান্নাতের খোশ খবর দিয়েছিলেন কি? তিনি বললেন, হা। এমন একটি ভবনের খোশ খবর দিয়েছিলেন, যে ভবনটি তৈরি করা হয়েছে এমন মোতি দ্বারা যার ভিতরদেশ ফাকা। আর সেখানে থাকবে না শোরগোল, কোন প্রকার ক্লেশ ও দুঃখ।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, জিব্রাঈল নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ঐ যে খাদীজাহ একটি পাত্র হাতে নিয়ে আসছেন। ঐ পাত্রে তরকারী, অথবা খাদ্যদ্রব্য অথবা পানীয় ছিল। যখন তিনি পৌছে যাবেন তখন তাকে তার প্রতিপালকের পক্ষ হতে এবং আমার পক্ষ থেকেও সালাম জানাবেন আর তাকে জান্নাতের এমন একটি ভবনের খোশ খবর দিবেন যার অভ্যন্তর ভাগ ফাকা-মোতি দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে থাকবে না কোন প্রকার শোরগোল। কোন প্রকার দুঃখ-ক্লেশ।
আয়িশাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ খাদীজাহর বোন হালা বিনতে খুয়াইলিদ (একদিন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চাইলেন। (দু'বোনের গলার স্বর ও অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গি একই রকম ছিল বলে) নবী (ﷺ) খাদীজাহর অনুমতি চাওয়ার কথা মনে করে হতচকিত হয়ে পড়েন। তারপর (প্রকৃতিস্থ হয়ে) তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! এতো দেখছি হালা! আয়িশাহ্ বলেনঃ এতে আমার ভারী ঈর্ষা হলো। আমি বললাম, কুরাইশদের বুড়ীদের মধ্য থেকে এমন এক বুড়ীর কথা আপনি আলোচনা করেন যার দাতের মাড়ির লাল বর্ণটাই শুধু বাকি রয়ে গিয়েছিল, যে শেষ হয়ে গেছে কত কাল আগে। তার পরিবর্তে আল্লাহ তো আপনাকে তার চাইতেও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।
জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার গৃহে প্রবেশ করতে কোনদিন আমাকে বাধা প্রদান করেননি এবং যখনই আমাকে দেখেছেন, মুচকি হাসি দিয়েছেন।
জারীর আরো বলেন, জাহিলী যুগে যুল-খালাসা নামে একটি ঘর ছিল। যাকে কাবায়ে ইয়ামানী ও কাবায়ে শামী বলা হত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমি কি যুল-খালাসার ব্যাপারে আমাকে শান্তি দিতে পার? জারীর বলেন, আমি আহমাস গোত্রের একশ পঞ্চাশ জন ঘোড়-সওয়ার সৈন্য নিয়ে যাত্রা করলাম এবং (প্রতীমা ঘরটি) বিধ্বস্ত করে দিলাম। সেখানে যাদেরকে পেলাম হত্যা করলাম। এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে খবর জানালাম। তিনি আমাদের জন্য এবং আহমাস গোত্রের জন্য দোয়া করলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওহুদ যুদ্ধে মুশরিকগণ যখন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে পড়লো, তখন ইব্লীস চীৎকার করে (মুসলিমগণকে) বলল, হে আল্লাহর বান্দাগণ! পিছনের দিকে লক্ষ্য কর। তখন অগ্রগামী দল পিছন দিকে ফিরে (শত্রুদল মনে করে) নিজদলের উপর আক্রমণ করে বসল এবং একে অন্যকে হত্যা করতে লাগল। এমন সময় হুযাইফাহ পিছনের দলে তার পিতাকে দেখতে পেয়ে চীৎকার করে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই যে আমার পিতা, এই যে আমার পিতা। আয়িশাহ বলেন, আল্লাহর শপথ, কিন্তু তারা কেউই বিরত হয়নি। অবশেষে তাকে হত্যা করে ফেলল। হুযাইফাহ বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। (অধস্তন রাবী হিশাম বলেন,) আমার পিতা উরওয়াহ বলেন, আল্লাহর কসম, এ কথার কারণে হুযাইফাহ-এর মধ্যে তার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত কল্যাণের চিহ্ন বিদ্যমান ছিল।
আয়িশাহ বলেন, উতবাহর মেয়ে হিন্দ এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এক সময় আমার মনের অবস্থা পৃথিবীর বুকে কোন পরিবারের লাঞ্ছিত হতে দেখা আমার নিকট আপনার পরিবারের অপমানিত দেখার চেয়ে অধিক কাঙ্ক্ষিত ছিল না। কিন্তু এখন আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে দুনিয়ার বুকে কোন পরিবারের সম্মানিত হতে দেখা আমার নিকট আপনার পরিবারের সম্মানিত দেখার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। তিনি বললেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। তারপর সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আবূ সুফইয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি। যদি তার মাল আমি ছেলে-মেয়েদের জন্য ব্যয় করি তবে তাতে কি আমার কিছু হবে? তিনি বললেন, না, যদি যথাযথ ব্যয় করা হয়।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, ওয়াহী নাযিল হওয়ার পূর্বে একবার নবী (ﷺ) মক্কার নিম্ন অঞ্চলের বালদাহ নামক জায়গায় যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়লের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তখন নবী (ﷺ)-এর সামনে খাদ্য পূর্ণ একটি 'খানচা' পেশ করা হল। তিনি তা হতে কিছু খেতে অস্বীকার করলেন। এরপর যায়দ বললেন, আমিও ঐ সব জন্তুর গোশ্ত খাই না যা তোমরা তোমাদের দেব-দেবীর নামে যবাহ কর। আল্লাহর নামে যবহকৃত ছাড়া অন্যের নামে যবহ করা জন্তুর গোশ্ত আমি কিছুতেই খাই না। যায়দ ইবন আমর কুরাইশের যবহকৃত জন্তু সম্পর্কে তাদের উপর দোষারোপ করতেন এবং বলতেন; বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ, তাকে বাচিয়ে রাখার জন্য আকাশ হতে বারি বর্ষণ করলেন। ভূমি হতে উৎপন্ন করলেন তৃণ-লতা অথচ তোমরা আল্লাহ তাআলার সমূহদান অস্বীকার করে প্রতিমার প্রতি সম্মান করে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে যবহ করছ।
মূসা (সনদসহ) বলেন, সালিম ইবন আবদুল্লাহ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। মূসা বলেন, আমার জানা মতে তিনি ইবন উমার হতে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন যে, যায়দ ইবন আমর সঠিক তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনের খোজে সিরিয়ায় যান। সে সময় একজন ইয়াহূদী আলেমের সাথে তার সাক্ষাৎ হল। তিনি তার নিকট তাদের দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন এবং বললেন, হয়ত আমি তোমাদের দ্বীনের অনুসারী হব, আমাকে সে সম্পর্কে জানাও। তিনি বললেন, তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যতখানি গ্রহণ করবে সে পরিমাণ আল্লাহর গযব তোমার উপর পতিত হবে। যায়দ বললেন, আমি তো আল্লাহর গযব হতে পালিয়ে আসছি। আমি যথাসাধ্য আল্লাহর সামান্য পরিমাণ গযবও বহন করব না। আর আমার কি তা বহনের শক্তি-সামর্থ্য আছে? তুমি কি আমাকে এছাড়া অন্য কোন পথের দিশা দিতে পার? সে বলল, আমি তা জানি না, তবে তুমি দ্বীনে হানীফ কবুল করে নাও। যায়দ জিজ্ঞেস করলেন (দ্বীনে) হানীফ কী? সে বলল, তা হল ইব্রাহীম-এর দ্বীন। তিনি ইয়াহূদীও ছিলেন না, নাসারাও ছিলেন না। তিনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করতেন না। তখন যায়দ বের হলেন এবং তার সাথে একজন খ্রিস্টান আলিমের সাক্ষাৎ হল। ইয়াহূদী 'আলিমের নিকট ইতিপূর্বে তিনি যা যা বলেছিলেন তার কাছেও তা বললেন। তিনি বললেন, তুমি আমাদের দ্বীন গ্রহণ করবে না। গ্রহণ করলে যত পরিমাণ গ্রহণ করবে তত পরিমাণ আল্লাহর লানত তোমার উপর পতিত হবে। যায়দ বললেন, আমি তো আল্লাহর লানত হতে পালিয়ে আসছি। আর আমি যথাসাধ্য সামান্য আল্লাহর লানতও বহন করব না। আমি কি তা বহনের শক্তি রাখি? তুমি কি আমাকে এছাড়া অন্য কোন পথের দিশা দেবে? সে বলল, আমি অন্য কিছু জানি না। শুধু এতটুকু বলতে পারি যে, তুমি দ্বীনে হানীফ গ্রহণ কর। তিনি বললেন, হানীফ কী? উত্তরে তিনি বললেন, তা হল ইব্রাহীম-এর দ্বীন, তিনি ইয়াহূদীও ছিলেন না এবং খ্রিস্টানও ছিলেন না এবং আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করতেন না। যায়দ যখন ইব্রাহীম সম্পর্কে তাদের মন্তব্য জানতে পারলেন, তখন তিনি বেরিয়ে পড়ে দু'হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ! আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি দ্বীনে ইব্রাহীম-এর উপর আছি। লায়স বলেন হিশাম তার পিতা সূত্রে তিনি আসমা বিন্ত আবূ বাকর হতে বর্ণনা করতে গিয়ে আমার কাছে লিখছেন যে, তিনি (আসমা) বলেন, আমি দেখলাম যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল কাবা শরীফের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাড়িয়ে আছেন এবং বলছেন, হে কুরাইশ গোত্র, আল্লাহর কসম, আমি ব্যতীত তোমাদের কেউ-ই দ্বীনে ইব্রাহীমের উপর নেই। আর তিনি যেসব কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়ার জন্য নেয়া হত তাদেরকে তিনি বাচাবার ব্যবস্থা করতেন। যখন কোন লোক তার কন্যা সন্তানকে হত্যা করার জন্য ইচ্ছা করত, তখন তিনি এসে বলতেন, হত্যা করো না, আমি তার জীবিকার ব্যয়ভার গ্রহণ করবো। এ বলে তিনি শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতেন। শিশুটি বড় হলে তার পিতাকে বলতেন, তুমি যদি তোমার কন্যাকে নিয়ে যেতে চাও, তাহলে আমি দিয়ে দেব। আর তুমি যদি নিতে না চাও, তবে আমিই এর সকল ব্যয় ভার বহন করে যাব।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৮২৭)।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন কাবা গৃহ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন নবী (ﷺ) ও আব্বাস পাথর বয়ে আনছিলেন। আব্বাস নবী (ﷺ)-কে বললেন, তোমার লুঙ্গিটি কাঁধের উপর রাখ, পাথরের ঘর্ষণ হতে তোমাকে রক্ষা করবে। (লুঙ্গি খুলতেই) তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। তার চোখ দু'টি আকাশের দিকে নিবিষ্ট ছিল। তার চেতনা ফিরে এল, তখন তিনি বলতে লাগলেন, আমার লুঙ্গি, আমার লুঙ্গি। তৎক্ষণাৎ তার লুঙ্গি পরিয়ে দেয়া হল।
আমর ইবন দ্বীনার ও 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবূ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত, তারা বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগে কাবা ঘরের চারিপাশে কোন প্রাচীর ছিল না। লোকজন কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে সালাত আদায় করত। উমার কাবার চতুষ্পার্শ্বে প্রাচীর নির্মাণ করেন। 'উবায়দুল্লাহ বলেন, এ প্রাচীর ছিল নীচু, অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র তা নির্মাণ করেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলি যুগে আশুরার দিন কুরাইশগণ ও নবী (ﷺ) সাওম পালন করতেন। যখন হিজরাত করে মদিনায় আগমন করলেন, তখন তিনি নিজেও আশুরার সাওম পালন করতেন এবং অন্যকেও তা পালনের নির্দেশ দিতেন। যখন রমাযানের সাওম ফরয করা হল তখন যার ইচ্ছা (আশুরা) সওম করতেন আর যার ইচ্ছা করতেন না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাজ্জের মাসগুলোতে উমরাহ পালন করাকে কুরাইশগণ পাপ কাজ বলে মনে করত। তারা মুহাররম মাসের নামকে পরিবর্তন করে সফর মাস নাম দিত এবং বলত, (উটের) যখম যখন শুকিয়ে যাবে এবং পায়ের চিহ্ন মুছে যাবে তখন উমরাহ পালন করা হালাল হবে যারা তা পালন করতে চায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সঙ্গী সাথীগণ যিলহাজ্জ মাসের চার তারিখে হাজ্জের তালবিয়াহ পড়তে পড়তে মক্কায় হাযির হলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সঙ্গী-সাথীদেরকে বললেন, তোমরা উমরাহ্য় পরিণত করে নেও। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য কোন কোন বিষয় হালাল হবে? তিনি বললেন, সকল বিষয় হালাল হয়ে যাবে।
সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব তার পিতার মাধ্যমে দাদা হতে বর্ণনা করেন যে, জাহিলীয়্যাতের যুগে একটি বন্যা হয়েছিল। যাতে মক্কায় দু'টি পাহাড়ের মধ্যস্থল সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছিল।
কাইস ইবন আবূ হাযিম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আবূ বাকর আহমাস গোত্রের যায়নাব নামের এক নারীর নিকট গেলেন। তিনি গিয়ে দেখতে পেলেন, নারীটি কথাবার্তা বলছে না। তিনি (লোকজনকে) জিজ্ঞেস করলেন, নারীটির এ অবস্থা কেন, কথাবার্তা বলছে না কেন? তারা তাকে জানালেন, এ নারী নীরব থেকে থেকে হাজ্জ পালন করে আসছেন। আবূ বাকর তাকে বললেন, কথা বল, কেননা এটা হালাল নয়। এটা জাহিলীয়্যাত যুগের কাজ। তখন নারীটি কথাবার্তা বলল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কে? আবূ বাকর উত্তরে বললেন, আমি একজন মুহাজির লোক। মহিলাটি জিজ্ঞেস করল, আপনি কোন গোত্রের মুহাজির? আবূ বাকর বললেন, কুরাইশ গোত্রের। মহিলাটি জিজ্ঞেস করলেন, কোন কুরাইশের কোন শাখার আপনি? আবূ বাকর বললেন, তুমি তো অত্যধিক উত্তম প্রশ্নকারিণী। আমি আবূ বকর। তখন মহিলাটি তাকে জিজ্ঞেস করল, জাহিলীয়্যা যুগের পর যে উত্তম দ্বীন ও কল্যাণময় জীবন বিধান আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন সে দ্বীনের উপর আমরা কতদিন সঠিকভাবে টিকে থাকতে পারব? আবূ বাকর বললেন, যতদিন তোমাদের ইমামগণ তোমাদেরকে নিয়ে দ্বীনের উপর অটল থাকবেন। মহিলা জিজ্ঞেস করল, ইমামগণ কারা? আবূ বাকর বললেন, তোমাদের গোত্রে ও সমাজে এমন সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় লোক কি দেখনি যারা নির্দেশ দিলে সকলেই তা মেনে চলে। নারীটি উত্তর দিল, হা। আবূ বাকর বললেন, এরাই হলেন জনগণের ইমাম।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আরবের কোন এক গোত্রের এক (মুক্তিপ্রাপ্ত) কৃষ্ণকায় মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেন। মসজিদের পাশে ছিল তার একটি ছোট ঘর। আয়িশাহ বলেন, সে আমাদের নিকট আসত এবং আমাদের সাথে কথাবার্তা বলত। যখন তার বাক্যালাপ শেষ হত তখন প্রায়ই বলতো, ইয়াওমূল বিশাহ (মণিমুক্তা খচিত হারের দিন) আমাদের রবের পক্ষ হতে আশ্চর্যজনক ঘটনাবলীর একটি দিন জেনে রাখুন! আমার রব আমাকে কুফর এর দেশ হতে মুক্তি দিয়েছেন। সে এ কথাটি প্রায়ই বলত। একদিন আয়িশাহ ঐ মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়ামুল বিশাহ' কী? তখন সে বলল যে, আমার মুনিবের পরিবারের এক শিশু কন্যা ঘর হতে বের হল। তার গলায় চামড়ার (উপর মণিমুক্তা খচিত) একটি হার ছিল। হারটি (ছিড়ে) গলা হতে পড়ে গেল। তখন একটি চিল ওটা গোশ্তের টুকরা মনে করে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। তারা আমাকে হার চুরির সন্দেহে শাস্তি ও নির্যাতন করতে লাগল। অবশেষে তারা আমার লজ্জাস্থানে তল্লাশী চালাল। যখন তারা আমার চারপাশে ছিল এবং আমি চরম দুঃখে ছিলাম এমন সময় একটি চিল কোথেকে উড়ে আসল এবং আমাদের মাথার উপরে এসে হারটি ফেলে দিল। তারা হারটি তুলে নিল। তখন আমি বললাম, এটা হল সেই হার যেটা চুরির জন্য আমার উপর অপবাদ দিয়েছ, অথচ এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ।
ইবন উমর সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাবধান! যদি তোমাদের কসম করতে হয় তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম কারো না। লোকজন তাদের বাপ-দাদার নামে কসম করত। তিনি বললেন, সাবধান! বাপ-দাদার নামে কসম করো না।
আমর হতে বর্ণিত যে, আবদুর রাহমান ইবন কাসিম তার কাছে বলেছেন যে, কাসিম জানাযা বহন করার সময় আগে আগে চলতেন। জানাযা দেখলে তিনি দাড়াতেন না এবং তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আয়িশাহ বলতেন, জাহিলী যুগে মুশরিকগণ জানাযা দেখলে দাড়াত এবং মৃত ব্যক্তির রূহকে লক্ষ্য করে বলত, তুমি তোমার আপন জনদের সাথেই আছ যেমন তোমার জীবদ্দশায় ছিলে। এ কথাটি তারা দু'বার বলত।
আমর ইবন মায়মূন হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব বলেন, মুশরিকগণ সাবীর পাহাড়ের উপর সূর্যের কিরণ না পড়া পর্যন্ত মুয্দালাফা হতে রওয়ানা হত না। নবী (ﷺ) সূর্য উঠার আগে রাওয়ানা হয়ে তাদের প্রথার খেলাফ করেন।
ইকরিমাহ বলেন, আল্লাহর বাণীঃ "কাসান দিহাকা" (আন-নাবাঃ ৩৪) এর তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, একের পর এক শরাবে পূর্ণ পেয়ালা।
ইবন আব্বাস বলেন, আমার পিতা আব্বাস -কে ইসলামের পূর্ব যুগে বলতে শুনেছি, আমাদেরকে পাত্র ভর্তি শরাব একের পর এক পান করাও।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, সবচেয়ে সঠিক বাক্য যা কোন কবি বলেছেন তা হল লাবীদ এর এ পংক্তিটি- সাবধান, আল্লাহ ছাড়া সব জিনিসই বাতিল ও অসার। এবং কবি উমাইয়্যা ইবন আবূ সাল্ত ইসলাম গ্রহণের কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বাকর-এর একজন ক্রীতদাস ছিল। সে প্রতিদিন তার উপর ধার্য কর আদায় করত। আর আবূ বাকর তার দেওয়া কর হতে আহার করতেন। একদিন সে কিছু খাবার জিনিস এনে দিল। তা হতে তিনি আহার করলেন। তারপর গোলাম বলল, আপনি জানেন কি ওটা কিভাবে উপার্জিত করা হয়েছে যা আপনি খেয়েছেন? তিনি বললেন, বলত কিভাবে? গোলাম উত্তরে বলল, আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভবিষ্যৎ গণনা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভবিষ্যৎ গণনা করা আমার ভালভাবে জানা ছিল না। তথাপি প্রতারণা করে তা করেছিলাম। আমার সাথে তার দেখা হলে গণনার বিনিময়ে এ দব্যাদি সে আমাকে হাদীয়া দিল যা হতে আপনি আহার করলেন। আবূ বাকর এটা শুনামাত্র মুখের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং পেটের ভিতর যা কিছু ছিল সবই বমি করে দিলেন।
ইবন উমর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইসলামের পূর্ব যুগে মানুষ 'হাবালুল হাবালা' রূপে উটের গোশ্ত ক্রয়-বিক্রয় করত। রাবী বলেন, হাবালুল হাবালার অর্থ হল- তারা উট কেনা বেচা করত এই শর্তে যে, কোন নির্দিষ্ট গর্ভবতী উটনী বাচ্চা প্রসব করলে পর ঐ প্রসব করা বাচ্চা যখন গর্ভবতী হবে তখন উটের দাম পরিশোধ করা হবে। নবী (ﷺ) তাদেরকে এরূপ কেনা বেচা করতে নিষেধ করে দিলেন।
গায়লান ইবন জারীর হতে বর্ণিত, আমরা আনাস ইবন মালিক-এর কাছে গেলে তিনি আমাদের কাছে আনসারদের ঘটনা বর্ণনা করতেন। রাবী বলেন, আমাকে লক্ষ্য করে তিনি বলতেন, তোমার জাতি অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কাজ করেছে, অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কাজ করেছে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বপ্রথম কাসামাহ হত্যাকারী গোত্রের লোকের (শপথ গ্রহণ) জাহিলী যুগে অনুষ্ঠিত হয় আমাদের হাশেম গোত্রে। কুরাইশের কোন একটি শাখা গোত্রের একজন লোক বনু হাশিমের একজন মানুষকে মজুর হিসাবে নিয়োগ করল। ঐ মজুর তার সাথে উটগুলির নিকট গমন করল। ঘটনাক্রমে বনু হাশিমের অপর এক ব্যক্তি তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর খাদ্যপূর্ণ বস্তার বাধন ছিড়ে গেল। তখন সে মজুর ব্যক্তিটিকে বলল, আমাকে একটি রশি দিয়ে সাহায্য কর, যেন আমার বস্তার মুখ বাধতে পারি এবং উটটিও যেন পালিয়ে যেতে না পারে। মজুর তাকে একটি রশি দিল। ঐ ব্যক্তি তার বস্তার মুখ বেধে নিল। যখন তারা অবতরণ করল তখন একটি ছাড়া সকল উট বেধে রাখা হল। মজুর নিয়োগকারী মজুরকে জিজ্ঞেস করল, সকল উট বাধা হল কিন্তু এ উটটি বাধা হল না কেন? মজুর উত্তরে বলল, এ উটটি বাধার কোন রশি নেই। তখন সে বলল, এই উটটির রশি কোথায়? রাবী বলেন, এ কথা শুনে মালিক মজুরকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে আঘাত করল যে শেষ পর্যন্ত এ আঘাতেই তার মৃত্যু হল। আহত মজুরটি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুণছিল, তখন ইয়ামানের একজন লোক তার নিকট দিয়ে যাচ্ছিল। আহত মজুর তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি এবার হাজ্জে যাবেন? সে বলল, না, তবে অনেকবার গিয়েছি। আহত মজুরটি বলল, আপনি কি আমার সংবাদটি আপনার জীবনে যে কোন সময় পৌছে দিতে পারেন? ইয়ামানী লোকটি উত্তরে বলল, হা তা পারব। তারপর মজুরটি বলল, আপনি যখন হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় উপস্থিত হবেন তখন হে কুরাইশের লোকজন বলে ঘোষণা দিবেন। যখন তারা আপনার ডাকে সাড়া দিবে, তখন আপনি বনু হাশিম গোত্রকে ডাক দিবেন, যদি তারা আপনার ডাকে সাড়া দেয়, তবে আপনি তাদেরকে আবূ তালিব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন এবং তাকে পেলে জানিয়ে দিবেন যে, অমুক ব্যক্তি একটি রশির কারণে আমাকে হত্যা করেছে। কিছুক্ষণ পর আহত মজুরটির মৃত্যু হল। মজুর নিয়োগকারী যখন মক্কায় ফিরে এল তখন আবূ তালিব তার নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের ভাইটি কোথায়? তার কী হয়েছে? এখনও ফিরছে না কেন? সে বলল, আপনার ভাই হঠাৎ ভীষণ রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছে। আমি যথাসাধ্য সেবা শুশ্রূষা করেছি। মারা যাওয়ার পর আমি তাকে যথারীতি সমাহিত করেছি। আবূ তালিব বললেন, তুমি এরূপ করবে আমরা এ আশাই পোষণ করি। এভাবে কিছুদিন কেটে গেল। তারপর ঐ ইয়ামানী ব্যক্তি যাকে সংবাদ পৌছে দেয়ার জন্য মজুর ব্যক্তিটি অসিয়াত করেছিল, হজ্জব্রত পালনে মক্কায় উপস্থিত হল এবং 'হে কুরাইশগণ' বলে ডাক দিল। তখন তাকে বলা হল, এই যে, কুরাইশ। সে আবার বলল, হে বনু হাশিম, বলা হল; এই যে, বনু হাশিম। সে জিজ্ঞেস করল, আবূ তালিব কোথায়? লোকজন আবূ তালিবকে দেখিয়ে দিল। তখন ইয়ামানী লোকটি বলল, আপনাদের অমুক ব্যক্তি আপনার নিকট এ সংবাদটি পৌছে দেয়ার জন্য আমাকে অসিয়াত করেছিল যে অমুক ব্যক্তি মাত্র একটি রশির কারণে তাকে হত্যা করেছে। এ কথা শুনে আবূ তালিব মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তির নিকট গমন করে বলল; (তুমি আমাদের ভাইকে হত্যা করেছ) কাজেই আমাদের তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি তোমাকে মেনে নিতে হবে। তুমি হয়ত হত্যার বিনিময়ে একশ উট দিবে অথবা তোমার গোত্রের বিশ্বাসযোগ্য পঞ্চাশ জন লোক হলফ করে বলবে যে তুমি তাকে হত্যা করনি। যদি তুমি এও করতে অস্বীকার কর তবে আমরা তোমাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করব। তখন হত্যাকারী ব্যক্তিটি নিজ গোত্রীয় লোকদের নিকট গমন করে ঘটনা বর্ণনা করল। ঘটনা শুনে তারা বলল, আমরা হলফ করে বলব। তখন বনু হাশিম গোত্রের এক মহিলা যার বিবাহ হত্যাকারীর গোত্রে হয়েছিল এবং তার একটি সন্তানও হয়েছিল, আবূ তালিবের নিকট এসে বলল, হে আবূ তালিব, আমি এ আশা নিয়ে এসেছি যে, আপনি পঞ্চাশ জন হলফকারী হতে আমার এ সন্তানটিকে রেহাই দিবেন এবং ঐ স্থানে তার হলফ নিবেন না যে স্থানে হলফ নেয়া হয়। আবূ তালিব তার আবদারটি মনজুর করলেন। তারপর হত্যাকারীর গোত্রের এক পুরুষ আবূ তালিবের নিকট এসে বলল, হে আবূ তালিব, আপনি একশ উটের পরিবর্তে পঞ্চাশ জনের হলফ নিতে চাচ্ছেন, এ হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি হলফকারীর উপর দু'টি উট পড়ে। আমার দু'টি উট গ্রহণ করুন এবং যেখানে হলফ করার জন্য দাড় করানো হয় সেখানে দাড় করানো হতে আমাকে অব্যাহতি দেন। অপর আট চল্লিশজন এসে যথাস্থানে হলফ করল। ইবন আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম, হলফ করার পর একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই ঐ আটচল্লিশ জনের একজনও বেচে ছিল না।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বু'আস যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ ছিল যা আল্লাহ তাআলা তার রাসূল (ﷺ)-এর অনুকূলে হিজরাতের পূর্বেই সংঘটিত করেছিলেন। এ যুদ্ধের কারণে তারা বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়েছিল এবং এদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই যুদ্ধে নিহত ও আহত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা এ যুদ্ধ ঘটিয়ে ছিলেন এ কারণে যেন তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয়। ইবন আব্বাস বলেন, সাফা ও মারওয়ার মধ্যে অবস্থিত বাতনে ওয়াদী নামক স্থানে সাঈ (দৌড়ান) করা সুন্নাত নয়। জাহিলী যুগের লোকেরাই কেবল সেখানে সাঈ করত এবং বলত, আমরা বাতহা নামক জায়গাটি তাড়াতাড়ি দৌড়ে পার হব।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৮৪৬)।
আবুস্ সাফার বলেন, আমি ইবন আব্বাস -কে এ কথা বলতে শুনেছি, হে লোকেরা! আমি যা বলছি তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং তোমরা যা বলতে চাও তাও আমাকে শুনাও এবং এমন যেন না হয় যে তোমরা এখান হতে চলে গিয়ে বলবে ইবন আব্বাস এমন বলেছেন। যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহ শরীফের তাওয়াফ করতে ইচ্ছা করে সে যেন হিজর এর বাহির হতে তাওয়াফ করে এবং এ জায়গাকে হাতীম বলবে না কারণ, জাহিলী যুগে কোন লোক এ জায়গাটিতে তার চাবুক, জুতা, তীর ধনু ইত্যাদি নিক্ষেপ করে হলফ করত।
আমর ইবন মাইমূন হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাহিলীয়্যাতের যুগে দেখেছি, একটি বানরী ব্যাভিচার করার কারণে অনেকগুলো বানর একত্র হয়ে প্রস্তর নিক্ষেপে তাকে হত্যা করল। আমিও তাদের সাথে প্রস্তর নিক্ষেপ করলাম।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাহিলী যুগের কাজের মধ্যে একটি হলঃ কারো বংশ-কুল নিয়ে খুটা দেয়া, কারো মৃত্যুতে বিলাপ করা। তৃতীয়টি (রাবী উবাইদুল্লাহ) ভুলে গেছেন। তবে সুফিয়ান বলেন, তৃতীয় কাজটি হল, তারকার সাহায্যে বৃষ্টি চাওয়া।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর উপর যখন (ওয়াহী) নাযিল করা হয় তখন তার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। অতঃপর তিনি মক্কায় তের বছর অবস্থান করেন। অতঃপর তাকে হিজরাত করার আদেশ দেয়া হয়। তিনি হিজরাত করে মদিনায় চলে গেলেন এবং সেখানে দশ বছর অবস্থান করলেন, তারপর তার মৃত্যু হয় (ﷺ)।
খাব্বাব বলেন, আমি নবী (ﷺ) নিকট হাযির হলাম। তখন তিনি তার নিজের চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা গৃহের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করছিলেন। আমরা মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতন ভোগ করছিলাম। তাই আমি বললাম, আপনি কি আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন না? তখন তিনি উঠে বসলেন এবং তার চেহারা লাল হয়ে গেল। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বের ঈমানদারদের মধ্যে কারো কারো শরীরের হাড় পর্যন্ত তামাম গোশত ও শিরা উপশিরাগুলি লোহার চিরুণী দিয়ে আচড়ে বের করে ফেলা হত। কিন্তু এসব নির্যাতনও তাদেরকে দ্বীন হতে বিমুখ করতে পারত না। তাদের মধ্যে কারো মাথার মাঝখানে করাত রেখে তাকে দ্বিখন্ডিত করে ফেলা হত। কিন্তু এ নির্যাতনও তাদেরকে তাদের দ্বীন হতে ফিরাতে পারত না। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাআলা অবশ্যই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন, ফলে একজন উষ্ট্রারোহী সান'আ হতে হাযারা মাউত পর্যন্ত একাই সফর করবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সে ভয় করবে না। রাবী আরো বেশি বর্ণনা করেন- এবং তার মেষ পালের উপর নেকড়ে বাঘের আক্রমণ ছাড়া অন্য কোন ভয় সে করবে না।
আবদুল্লাহ [ইবন মাসউদ] হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সূরা আন-নাজ্ম তিলাওয়াত করে সিজদা করলেন। তখন এক ব্যক্তি ছাড়া সকলেই সাজ্দাহ করলেন। ঐ ব্যক্তিকে আমি দেখলাম, সে এক মুষ্ঠি কাঁকর তুলে নিয়ে তার উপর সাজ্দাহ করল এবং সে বলল, আমার জন্য এমন সাজ্দাহ করাই যথেষ্ট। [আবদুল্লাহ বলেন] পরবর্তী সময়ে আমি তাকে কাফির অবস্থায় নিহত হতে দেখেছি।
আবদুল্লাহ (ইবন মাস'উদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) সিজদা করলেন। তার আশেপাশে কয়েকজন কুরাইশ লোক বসেছিল। এমন সময় উক্বা ইবন আবূ মুয়াইত উটের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে উপস্থিত হল এবং নবী (ﷺ)-এর পিঠের উপর চাপিয়ে দিল। ফলে তিনি তার মাথা উঠাতে পারলেন না। ফাতিমা এসে তার পিঠের উপর হতে তা হটিয়ে দিলেন এবং যে এ কাজটি করেছে তার জন্য বদ দু'আ করলেন। এরপর নবী (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ! পাকড়াও কর কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে- আবূ জাহাল ইবন হিশাম, 'উৎবা ইবন রাবি'য়াহ, শায়বাহ ইবন রাবি'য়াহ, উমাইয়াহ ইবন খালফ অথবা উবাই ইবন খালাফ। উমাইয়াহ ইবন খালফ না উবাই ইবন খালফ এ বিষয়ে শু'বা রাবী সন্দেহ করেন। (ইবন মাসউদ বলেন, আমি এদের সবাইকে বাদ্র যুদ্ধে নিহত অবস্থায় দেখেছি। উমাইয়া অথবা উবাই ছাড়া তাদের সকলকে সে দিন একটি কূপে ফেলা হয়েছিল। তার জোড়গুলি এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল যে তাকে কূপে ফেলা যায়নি।
সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুর রাহমান ইবন আবযা একদিন আমাকে আদেশ করলেন যে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস কে এ আয়াত দু'টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর, এর অর্থ কী? আয়াতটি হল এই "আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করবে না।" (আল-ফুরকানঃ ৬৮) এবং "যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে।" (আন-নিসাঃ ৯৩) আমি ইবন আব্বাস কে জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি বললেন, যখন সূরা আল-ফুরকানের আয়াতটি নাযিল করা হল তখন মক্কার মুশ্রিকরা বলল, আমরা তো মানুষকে হত্যা করেছি যা আল্লাহ হারাম করেছেন এবং আল্লাহর সাথে অন্যকে মা'বুদ হিসেবে শরীক করেছি। আরো নানা রকম অশ্লীল কাজ কর্ম করেছি। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, "কিন্তু যারা তওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে....." (আল-ফুরকানঃ ৭০) সুতরাং এ আয়াতটি তাদের জন্য প্রযোজ্য। আর সূরা নিসার যে আয়াতটি রয়েছে তা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে ইসলাম ও তার বিধি-বিধানকে জেনে বুঝে কবূল করার পর কাউকে (ইচ্ছাকৃত) হত্যা করেছে। তখন তার শাস্তি জাহান্নাম। তারপর মুজাহিদ কে আমি এ বিষয় জানালাম। তিনি বললেন, তবে যদি কেউ অনুশোচনা করে....।
উরওয়াহ ইবন যুবায়র বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস এর নিকটে বললাম, মক্কার মুশ্রিক কর্তৃক নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সর্বাপেক্ষা কঠোর আচরণের বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, একদিন নবী (ﷺ) কাবা শরীফের হিজর নামক স্থানে সালাত আদায় করছিলেন। তখন উকবাহ ইবন আবূ মু'য়াইত এল এবং তার চাদর দিয়ে নবী (ﷺ)-এর কন্ঠনালি পেচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলল। তখন আবূ বাকর এগিয়ে এসে উকবাহ্কে কাঁধে ধরে নবী (ﷺ)-এর নিকট হতে হটিয়ে দিলেন এবং বললেন, "তোমরা এমন লোককে হত্যা করতে চাও যিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহই আমার রব।" (গাফিরঃ ২৮)
আম্মার ইবন ইয়াসির বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করলাম যে, তখন তার সঙ্গে মুসলিম পাচজন কৃতদাস, দু'জন মহিলা ও আবূ বাকর ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না।
সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস বলেন, যেদিন আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম সেদিন ছাড়া তার পূর্বে কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। আর আমি সাতদিন পর্যন্ত (বয়স্কদের মধ্যে) ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় জন ছিলাম।
(মান বিন) আবদুর রহমান বলেন, আমি মাসরূক-কে জিজ্ঞেস করলাম, যে রাতে জ্বিনরা মনোযোগের সঙ্গে কুরআন শ্রবণ করেছিল ঐ রাতে নবী (ﷺ)-কে তাদের উপস্থিতির খবর কে দিয়েছিল? তিনি বললেন, তোমার পিতা আবদুল্লাহ [ইবন মাসউদ] আমাকে বলেছেন যে, একটি গাছ তাদের উপস্থিতির খবর দিয়েছিল।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী (ﷺ)-এর উযু ও ইস্তিন্জার ব্যবহারের জন্য পানি ভর্তি একটি পাত্র নিয়ে পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ তিনি তাকিয়ে বললেন, কে? আমি বললাম, আমি আবূ হুরাইরাহ। তিনি বললেন, আমাকে কয়েকটি পাথর তালাশ করে দাও। আমি তা দিয়ে ইস্তিন্জা করব। তবে, হাড় এবং গোবর আনবে না। আমি আমার কাপড়ের কিনারায় কয়েকটি পাথর এনে তার কাছে রেখে দিলাম এবং আমি সেখান থেকে কিছুটা দূরে গেলাম। তিনি যখন ইস্তিন্জা হতে বেরোলেন, তখন আমি এগিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হাড় ও গোবর এর ব্যাপার কী? তিনি বললেন, এগুলো জ্বিনের খাবার। আমার কাছে নাসীবীন নামের জায়গা হতে জ্বিনের একটি প্রতিনিধি দল এসেছিল। তারা ভাল জ্বিন ছিল। তারা আমার কাছে খাদ্যদ্রব্যের আবেদন জানাল। তখন আমি আল্লাহর নিকট দোয়া করলাম যে, যখন কোন হাড্ডি বা গোবর তারা লাভ করে তখন তারা যেন তাতে খাদ্য পায়।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর আবির্ভাবের খবর যখন আবূ যার এর কাছে পৌছল, তখন তিনি তার ভাইকে বললেন, তুমি এই উপত্যকায় গিয়ে ঐ লোক সম্পর্কে জেনে আস যে লোক নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন ও তার কাছে আসমান হতে সংবাদ আসে। তার কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শুন এবং ফিরে এসে আমাকে শুনাও। তার ভাই রওয়ানা হয়ে ঐ লোকের কাছে পৌছে তার কথাবার্তা শুনলেন। এরপর তিনি আবূ যারের নিকট ফিরে গিয়ে বললেন, আমি তাকে দেখেছি যে, তিনি উত্তম আখলাক গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দান করছেন এবং এমন কালাম যা পদ্য নয়। এতে আবূ যার বললেন, আমি যে জন্য তোমাকে পাঠিয়েছিলাম সে বিষয়ে তুমি আমাকে সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারলে না। আবূ যার সফরের জন্য সামান্য পাথেয় সংগ্রহ করলেন এবং একটি ছোট্ট পানির মশকসহ মক্কায় উপস্থিত হলেন। মসজিদে হারামে প্রবেশ করে নবী (ﷺ)-কে খোজ করতে লাগলেন। তিনি তাকে চিনতেন না। আবার কাউকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাও পছন্দ করলেন না। এ অবস্থায় রাত হয়ে গেল। তিনি শুয়ে পড়লেন। আলী তাকে দেখে বুঝলেন যে, লোকটি বিদেশী। যখন আবূ যার আলী -কে দেখলেন, তখন তিনি তার পিছনে পিছনে গেলেন। কিন্তু সকাল পর্যন্ত একে অন্যকে কোন কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না। আবূ যার পুনরায় তার পাথেয় ও মশক নিয়ে মসজিদে হারামের দিকে চলে গেলেন। এ দিনটি এমনিভাবে কেটে গেল, কিন্তু নবী (ﷺ) তাকে দেখতে পেলেন না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। তিনি শোয়ার জায়গায় ফিরে গেলেন। তখন আলী তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, এখনও কি মুসাফিরের গন্তব্য স্থানের সন্ধান হয়নি? সে এখনও এ জায়গায় অবস্থান করছে। তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। কেউ কাউকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এ অবস্থায় তৃতীয় দিন হয়ে গেল। আলী পূর্বের ন্যায় তার পাশ দিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। এরপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি আমাকে বলবে না কোন জিনিস এখানে আসতে তোমাকে অনুপ্রেরিত করেছে? আবূ যার বললেন, তুমি যদি আমাকে সঠিক রাস্তা দেখানোর পাকা অঙ্গীকার কর তবেই আমি তোমাকে বলতে পারি। আলী অঙ্গীকার করলেন এবং আবূ যারও তার আগমনের উদ্দেশ্য বললেন। আলী বললেন, তিনি সত্য, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। যখন ভোর হয়ে যাবে তখন তুমি আমার অনুসরণ করবে। তোমার জন্য ভয়ের কারণ আছে এমন যদি কোন ব্যাপার আমি দেখতে পাই তবে আমি রাস্তার পাশে চলে যাব যেন আমি পেশাব করতে চাই। আর যদি আমি সোজা চলতে থাকি তবে তুমিও আমার অনুসরণ করতে থাকবে এবং যে ঘরে আমি প্রবেশ করি সে ঘরে তুমিও প্রবেশ করবে। আবূ যার তাই করলেন। আলী নবী (ﷺ)-এর কাছে প্রবেশ করলেন এবং তিনিও তার [আলী ] সাথে প্রবেশ করলেন। তিনি (নবী (ﷺ)-এর কথাবার্তা শুনলেন এবং ঐখানেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। নবী (ﷺ) বললেন, তুমি তোমার স্বগোত্রে ফিরে যাও এবং আমার নির্দেশ না পৌছা পর্যন্ত আমার ব্যাপারে তাদেরকে অবহিত করবে। আবূ যার বললেন, ঐ সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমি আমার ইসলাম গ্রহণকে মুশরিকদের সম্মুখে উচ্চস্বরে ঘোষণা করব। এই বলে তিনি বেরিয়ে পড়লেন ও মসজিদে হারামে গিয়ে হাজির হলেন এবং উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করলেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।" (তৎক্ষণাৎ) লোকেরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং মারতে মারতে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। এমন সময় আব্বাস এসে তাকে রক্ষা করলেন এবং বললেন, তোমাদের বিপদ অবধারিত। তোমরা কি জান না, এ লোকটি গিফার গোত্রের? আর তোমাদের ব্যবসায়ী কাফেলাগুলিকে গিফার গোত্রের নিকট দিয়েই সিরিয়া যাতায়াত করতে হয়। এ কথা বলে তিনি তাদের হাত হতে আবূ যারকে রক্ষা করলেন। পরদিন সকালে তিনি ঐরূপই বলতে লাগলেন। লোকেরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ভীষণভাবে মারতে লাগল। আব্বাস এসে তাকে সামলে নিলেন।
কায়স বলেন, আমি সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল-কে কুফার মসজিদে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, উমরের ইসলাম গ্রহণের আগে আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে তার হাতে আমাকে বন্দী হতে দেখেছি। তোমরা উসমান এর সাথে যে আচরণ করলে এ কারণে যদি ওহুদ পাহাড় বিদীর্ণ হয়ে যায় তবে তা হওয়া ঠিকই হবে।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার যেদিন থেকে ইসলাম গ্রহণ করলেন ঐ দিন হতে আমরা সর্বদা সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত আছি।
ইবন উমার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তার পিতা উমারএকদিন নিজ গৃহে ভীত অবস্থায় অবস্থান করছিলেন। তখন আবূ আমর 'আস ইবন ওয়াইল সাহমী তার নিকট এলেন। তার গায়ে ছিল ধারিদার চাদর ও রেশমী জরির জামা। তিনি বানু সাহম গোত্রের লোক ছিলেন। জাহিলী যুগে তারা আমাদের হালীফ (বিপদ কালে সাহায্যের চুক্তি যাদের সাথে করা হয়) ছিল। 'আস উমার-কে জিজ্ঞেস করলেন আপনার অবস্থা কেমন? উমার উত্তর দিলেন ইসলাম গ্রহণ করার কারণে তোমার গোত্রের লোকজন অচিরেই আমাকে হত্যা করবে। তা শুনে 'আস বললেন, তোমার কোন কিছু করার শক্তি ক্ষমতা তাদের নেই। তার কথা শুনে উমর বললেন, তোমার কথা শুনে আমি নিঃশঙ্ক হলাম। 'আস বেরিয়ে পড়লেন এবং দেখতে পেলেন, মক্কা ভূমি লোকে ভরপুর। তিনি তাদেরকে বললেন, তোমরা কোথায় যাচ্ছ? তারা বলল, আমরা উমার ইবন খাত্তাবের নিকট যাচ্ছি, সে নিজ ধর্ম ত্যাগ করতঃ বিধর্মী হয়ে গেছে। 'আস বললেন তার নিকট যাওয়ার, তার কোন কিছু করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। এতে লোকজন ফিরে গেল।
আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, যখন উমার ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন লোকেরা তার গৃহের কাছে জড় হল এবং বলতে লাগল, উমার স্বধর্ম ত্যাগ করেছে। আমি তখন ছোট ছেলে। আমাদের ঘরের ছাদে দাড়িয়ে এ দৃশ্য দেখতেছিলাম। তখন একজন লোক এসে বলল,তার গায়ে রেশমী জুববা ছিল, উমার স্বধর্ম ত্যাগ করেছে, কিন্তু এ সমাবেশ কেন? আমি তাকে আশ্রয় দিচ্ছি। ইবন উমার বলেন, তখন আমি দেখলাম, লোকজন চারিদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? লোকেরা বলল, 'আস ইবন ওয়াইল।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যখনই উমার-কে কোন ব্যাপারে এ কথা বলতে শুনেছি যে, আমার মনে হয় ব্যাপারটি এমন হবে, তবে তার ধারণা মত ব্যাপারটি সংঘটিত হয়েছে। একবার উমার উপবিষ্ট ছিলেন, এমন সময় এক সুদর্শন লোক তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। উমার বললেন, আমার ধারণা ভুলও হতে পারে তবে আমার মনে হয় লোকটি জাহেলী ধর্মাবলম্বী কিংবা ভবিষ্যৎ গণনাকারীও হতে পারে। লোকটিকে আমার কাছে নিয়ে এস। তাকে তার কাছে ডেকে আনা হল। উমার তার ধারণার কথা তাকে শুনালেন। তখন সে বলল, ইতিপূর্বে আমি কোন মুসলিম ব্যক্তিকে এরূপ কথা বলতে দেখিনি। উমার বললেন, আমি তোমাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি আমাকে তোমার বিষয়টি খুলে বল। সে বলল, জাহিলী যুগে আমি তাদের ভবিষ্যৎ গণনাকারী ছিলাম। উমার বললেন, জ্বিনেরা তোমাকে যে সব কথাবার্তা বলেছে, তন্মধ্যে কোন কথাটি তোমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল। সে বলল, আমি একদিন বাজারে ছিলাম। তখন একটি মহিলা জ্বিন আমার নিকট আসল। আমি তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত দেখতে পেলাম। তখন সে বলল, তুমি কি জ্বিন জাতির অবস্থা দেখছনা, তারা কেমন দুর্বল হয়ে পড়ছে? তাদের মধ্যে হতাশার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। তারা ক্রমশঃ উটওয়ালাদের এবং চাদর জুববা পরিধানকারীদের অনুগত হয়ে পড়ছে। উমার বললেন, সে সত্য কথা বলেছে। আমি একদিন তাদের দেবতাদের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন এক লোক একটি গরুর বাছুর নিয়ে হাযির হল এবং সেটা যবহ করে দিল। ঐ সময় এক লোক এমন বিকট চীৎকার করে উঠল, যা আমি আর কখনও শুনিনি। সে চীৎকার করে বলছিল, হে জলীহ্! একটি সাধারণ কল্যাণময় ব্যাপার শীঘ্রই প্রকাশ লাভ করবে। তা হল- একজন শুদ্ধভাষী লোক বলবেন; 'আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ' (শুনে) লোকজন ছুটাছুটি করে পলায়ন করল। আমি বললাম, এ ঘোষণার রহস্য অবশ্যই বের করব। তারপর আবার ঘোষণা দেয়া হল। হে জলীহ্! একটি সাধারণ ও কল্যাণময় ব্যাপার অতি শীঘ্র প্রকাশ পাবে। তাহল একজন বাগ্মী ব্যক্তি 'আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ' নেই এর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিবে। তারপর আমি উঠে দাড়ালাম। এর কিছুদিন পরেই বলা হল যে, ইনিই নবী।
কাইস বলেন, আমি সাঈদ ইবন যায়দ-কে তার গোত্রকে লক্ষ্য করে একথা বলতে শুনেছি যে, আমি দেখেছি উমার আমাকে এবং তার বোন ফাতিমাকে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে বেধে রেখেছেন। তখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তোমরা উসমান-এর সাথে যে অসদাচরণ করেছ তার কারণে যদি ওহুদ পাহাড় বিদীর্ণ হয় তবে তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, মক্কাবাসী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার নবুওয়াতের নিদর্শন দেখানোর দাবী জানাল। তিনি তাদেরকে চাঁদ দু'খন্ড করে দেখালেন। এমনকি তারা দু'খন্ডের মাঝে হেরা পাহাড়কে দেখতে পেল।
আবদুল্লাহ (ইবন মাসউদ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয় তখন আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মিনায় ছিলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক। তখন আমরা দেখলাম, চাঁদের একটি খন্ড হেরা পাহাড়ের দিকে চলে গেল। আবূ যুহা মাসরূকের বরাত দিয়ে আবদুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন যে, চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয় মক্কায়।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে চাঁদ দু' খন্ড হয়েছিল।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (নবী (ﷺ)-এর যুগে) চাঁদ দু' খন্ড হয়েছিল।
উবাইদুল্লাহ ইবন আদী ইবন খিয়ার উরওয়াহ ইবন যুবায়রকে বলেন যে, মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ এবং আবদুর রহমান ইবন আসওয়াদ ইবন 'আবদ ইয়াগুস উভয়ই তাকে বলেন, তুমি তোমার মামা উসমান-এর সাথে তার (বৈপিত্রেয়) ভাই ওয়ালীদ ইবন উকবাহ সম্পর্কে কোন আলাপ-আলোচনা করছ না কেন? জনগণ তার বিরুদ্ধে শক্তভাবে সমালোচনা করছে। উবাইদুল্লাহ বলেন, উসমান যখন সালাতের জন্য মসজিদে আসছিলেন তখন আমি তার সামনে গিয়ে দাড়ালাম এবং তাকে লক্ষ্য করে বললাম, আপনার সাথে আমার কথা বলার দরকার আছে এবং তা আপনার কল্যাণের জন্যই। তিনি বললেন, ওহে, আমি তোমা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তখন ফিরে আসলাম এবং যখন সালাত শেষ করলাম, তখন মিসওয়ার ও ইবন 'আবদ ইয়াগুস-এর নিকট গিয়ে বসলাম এবং উসমান-কে আমি যা বলেছি এবং তিনি যে উত্তর দিয়েছেন তা দু'জনকে শুনালাম। তারা বললেন, তোমার উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল তা তুমি আদায় করেছ। আমি তাদের নিকট উপবিষ্টই আছি এ সময়উসমান-এর পক্ষ হতে একজন দূত আমাকে ডেকে নেয়ার জন্য আসলেন। তারা দু'জন আমাকে বললেন, আল্লাহ তোমাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন। আমি চললাম এবং উসমান-এর নিকট প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী উপদেশ যা তুমি কিছুক্ষণ আগে বলতে চেয়েছিলে? তখন আমি কালিমা শাহাদাত পাঠ করে বললাম, আল্লাহ মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন, তার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর আপনি ঐ দলেরই অন্তর্ভুক্ত যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছেন, আপনি তার উপর ঈমান এনেছেন, এবং প্রথম দু' হিজরতে আপনি অংশ নিয়েছেন, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গ লাভ করেছেন এবং তার স্বভাব-চরিত্র চক্ষে দেখেছেন। জন সাধারণ ওয়ালিদ ইবন উকবাহ্ সম্পর্কে অনেক সমালোচনা করছে, আপনার কর্তব্য তার উপর দন্ড জারি করা। উসমান আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে পেয়েছ? আমি বললাম না, পাইনি। তবে তার বিষয় আমার নিকট এমন ভাবে পৌছেছে যেমন ভাবে কুমারী মেয়েদের নিকট পর্দার সংবাদ পৌছে থাকে। উবাইদুল্লাহ বলেন, উসমান কালিমা শাহাদত পাঠ করলেন এবং বললেন, নিশ্চই আল্লাহ মুহম্মাদ (ﷺ)-কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছেন তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে যা সহ প্রেরণ করা হয়েছিল আমি তার প্রতি ঈমান এনেছি। ইসলামের প্রথম যুগের দু' হিজরতে অংশ গ্রহণ করেছি যেমন তুমি বলছ। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গ লাভ করেছি, তার হাতে বায়আত করেছি। আল্লাহর কসম, আমি তার অবাধ্যতা করিনি। তার সাথে প্রতারণা করিনি। এমতাবস্থায় তার ওফাত হয়ে যায়। তারপর আল্লাহ তাআলা আবূ বাকর কে খালীফাহ নিযুক্ত করলেন। আল্লাহর কসম, আমি তারও নাফরমানী করিনি, তার সাথে প্রতারণা করিনি। অতঃপর উমার খালীফাহ মনোনীত হলেন। আল্লাহর কসম, আমি তারও অবাধ্য হইনি, তার সাথে প্রতারণা করিনি। তিনিও মৃত্যুপ্রাপ্ত হলেন। এবং তারপর আমাকে খলীফা নিযুক্ত করা হল। আমার উপর তাদের বাধ্য থাকার যে রূপ হক ছিল তোমাদের উপর তাদের ন্যায় আমার প্রতি বাধ্য থাকার কি কোন কর্তব নেই? উবাইদুল্লাহ বললেন, হা। অবশ্যই হক আছে। উসমান বললেন, তাহলে এসব কথাবার্তা কী, তোমাদের পক্ষ হতে আমার নিকট আসছে? আর ওয়ালীদ ইবন উকবাহর ব্যাপারে তুমি যা বললে, সে ব্যাপারে আমি অতি সত্বর সঠিক পদক্ষেপ নিব ইন্শাআল্লাহ। অতঃপর তিনি ওয়ালীদকে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করার রায় প্রদান করলেন এবং তা বাস্তবায়িত করার জন্য 'আলী-কে আদেশ করলেন। সেকালে অপরাধীদেরকে শাস্তি প্রদানের দায়িত্বে আলী নিযুক্ত ছিলেন। ইউনুস এবং যুহরীর ভাতিজা যুহরী সূত্রে যে বর্ণনা করেন তাতে রয়েছে; 'তোমাদের উপর আমার কি অধিকার নেই যেমন অধিকার ছিল তাদের জন্য।' আবূ 'আব্দুল্লাহ বলেন, অতঃপর ওয়ালীদকে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করা হলো এবং আলী-কে নির্দেশ করা হলো তাকে বেত্রাঘাত করার। এবং তিনি তাকে বেত্রাঘাত করেছিলেন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন উম্মু হাবীবাহ ও উম্মু সালামাহ তার সাথে আলোচনা করলেন যে তারা হাবাশায় খ্রিস্টানদের একটি গির্জা দেখে এসেছেন। সে গির্জায় নানা ধরনের চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। তারা দু'জন এসব কথা নবী (ﷺ)-এর কাছে উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন, তাদের কোন নেক্কার লোক মারা গেলে তার কবরের উপর মাসজিদ তৈরি করত এবং এসব ছবি অঙ্কিত করে রাখত, এরাই কিয়ামতের দিনে আল্লাহ সর্ব নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হবে।
উম্মু খালিদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যখন হাবাশা হতে মদিনায় আসলাম তখন আমি ছোট্ট বালিকা ছিলাম। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) আমাকে একটি চাদর পরিয়ে দিলেন যাতে ডোরা কাটা ছিল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)& ঐ ডোরাগুলির উপর হাত বুলাতে লাগলেন, এবং বলতে ছিলেন সানাহ-সানাহ। হুমায়দী বলেন, সুন্দর সুন্দর।
আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালাতে রত অবস্থায় নবী (ﷺ)-কে আমরা সালাম করতাম, তিনিও আমাদের সালামের উত্তর দিতেন। যখন আমরা নাজাশীর কাছ থেকে ফিরে এলাম, তখন সালাতে রত অবস্থায় তাকে সালাম করলাম, কিন্তু তিনি সালামের জবাব দিলেন না। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা আপনাকে সালাম করতাম এবং আপনিও সালামের উত্তর দিতেন। কিন্তু আজ আপনি আমাদের সালামের জবাব দিলেন না? তিনি বললেন, সালাতের মধ্যে আল্লাহর দিকে একাগ্রতা থাকে। রাবী বলেন, আমি ইবরাহীম নাখয়ীকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী করেন? তিনি বললেন, আমি মনে মনে জবাব দিয়ে দেই।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের কাছে নবী (ﷺ)-এর আবির্ভাবের খবর এসে পৌছল। তখন আমরা ইয়ামানে ছিলাম। আমরা একটি নৌকায় আরোহণ করলাম। কিন্তু আমাদের নৌকা হাবাশায় নাজাশীর নিকট নিয়ে গেল। সেখানে জাফর ইবন আবূ তালিবের সাথে সাক্ষাৎ হল। আমরা তার সাথে থাকতে লাগলাম। কিছুদিন পর আমরা সেখান হতে রওয়ানা হলাম। এবং নবী (ﷺ) যখন খায়বার বিজয় করলেন তখন আমরা তার সাথে মিলিত হলাম। আমাদেরকে দেখে তিনি বললেন, হে নৌকার আরোহীরা! তোমরা দু'টি হিজরাত লাভ করেছ।
জাবির হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নাজাশীর মৃত্যু হল তখন নবী (ﷺ) বললেন, আজ একজন সৎ ব্যক্তি মারা গেছেন। উঠো, এবং তোমাদের ভাই আসহামার জন্য জানাযার সালাত আদায় কর।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ আনসারী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) নাজাশীর উপর জানাযার সালাত আদায় করেন। আমরাও তার পিছনে সারিবদ্ধভাবে দাড়িয়ে গেলাম। আমি দ্বিতীয় বা তৃতীয় কাতারে ছিলাম।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) আসহামাহ নাজাশীর উপর জানাযার সালাত আদায় করেন এবং চারবার তাকবীর বলেন।
আবদুর রহমান ও ইবন মুসাইয়াব বলেন, আবূ হুরাইরাহ তাদেরকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহাবাদেরকে হাবাশা-এর বাদশাহ নাজাশীর মৃত্যু খবর সেদিন শুনালেন, যেদিন তিনি মারা গিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের (দ্বীনী) ভাই এর জন্য মাগফিরাত চাও।
আবূ হুরাইরাহ হতে এমনও বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহাবাদেরকে নিয়ে মুসল্লায় সারিবদ্ধভাবে দাড়ালেন এবং নাজাশীর জন্য জানাযার সালাত আদায় করলেন আর তিনি চারবার তাকবীরও দিলেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুনায়ন যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন, তখন তিনি বললেন, আমরা আগামীকল্য খায়ফে বনী কেনানায় অবতরণ করব 'ইনশা আল্লাহ' যেখানে কুরাইশরা সকলে কুফর ও শির্ক এর উপর থাকার শপথ করেছিল।
আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব বলেন, আমি একদিন নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আপনার চাচা আবূ তালিবের কী উপকার করলেন অথচ তিনি আপনাকে দুশমনের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হতেন। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আগুনে আছে। যদি আমি না হতাম তাহলে সে জাহান্নামের একে বারে নিম্ন স্তরে থাকত।
ইবন মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব হতে বর্ণনা করেন, যখন আবূ তালিবের মুমূর্ষু অবস্থা তখন নবী (ﷺ) তার নিকট গেলেন। আবূ জাহলও তার নিকট উপবিষ্ট ছিল। নবী (ﷺ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান, "আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই" কলেমাটি একবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবূ জাহাল ও আবদুল্লাহ ইবন আবূ উমাইয়া বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে? এরা দু'জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবূ তালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তাহল, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবী (ﷺ) বললেন, আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাযিল হলঃ নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয় যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী- (আত-তওবা ১১৩)। আরো নাযিল হলঃ আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে হিদায়াত করতে পারবেন না- (আল-কাসাস ৫৬)।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন তারই সামনে তার চাচা আবূ তালিবের আলোচনা করা হল, তিনি বললেন, আশা করি কিয়ামতের দিনে আমার সুপারিশ তার উপকারে আসবে। আগুনের হালকা স্তরে তাকে ফেলা হবে, যা তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পৌছবে আর এতে তার মগয ফুটতে থাকবে।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, যখন কুরাইশরা আমাকে অস্বীকার করল, তখন আমি কাবার হিজর অংশে দাড়ালাম। আল্লাহ তাআলা তখন আমার সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসকে তুলে ধরলেন, যার কারণে আমি দেখে দেখে বাইতুল মুকাদ্দাসের নিদর্শনগুলো তাদের কাছে ব্যক্ত করছিলাম।
মালিক ইবন সা'সা' হতে বর্ণিত, আল্লাহর নবী (ﷺ) যে রাতে তাকে ভ্রমণ করানো হয়েছে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এক সময় আমি কাবা ঘরের হাতিমের অংশে ছিলাম। কখনো কখনো রাবী (কাতাদাহ) বলেছেন, হিজরে শুয়েছিলাম। হঠাৎ একজন আগন্তুক আমার নিকট এলেন এবং আমার এস্থান হতে সে স্থানের মাঝের অংশটি চিরে ফেললেন। রাবী কাতাদাহ বলেন, আনাস কখনো কাদ্দা (চিরলেন) শব্দ আবার কখনো শাক্কা (বিদীর্ণ) শব্দ বলেছেন। রাবী বলেন, আমি আমার পার্শ্বে বসা জারূদ-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ দ্বারা কী বুঝিয়েছেন? তিনি বললেন, হলকূমের নিম্নদেশ হতে নাভি পর্যন্ত। কাতাদাহ বলেন, আমি আনাস-কে এ-ও বলতে শুনেছি বুকের উপরিভাগ হতে নাভির নীচ পর্যন্ত। তারপর আগন্তুক আমার হৃদপিন্ড বের করলেন। তারপর আমার নিকট একটি সোনার পাত্র আনা হল যা ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল। তারপর আমার হৃদপিন্ডটি ধৌত করা হল এবং ঈমান দ্বারা পরিপূর্ণ করে যথাস্থানে আবার রেখে দেয়া হল। তারপর সাদা রং এর একটি জন্তু আমার নিকট আনা হল। যা আকারে খচ্চর হতে ছোট ও গাধা হতে বড় ছিল। জারুদ তাকে বলেন, হে আবূ হামযা, এটাই কি বুরাক? আনাস বললেন, হা। সে একেক কদম রাখে দৃষ্টির শেষ সীমায়। আমাকে তার উপর সাওয়ার করানো হল। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল চললেন। প্রথম আসমানে নিয়ে এসে দরজা খোলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল, ইনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি বললেন, হা। তখন বলা হল, মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর আসমানের দরজা খুলে দেয়া হল। আমি যখন পৌছলাম, তখন সেখানে আদম -এর সাক্ষাৎ পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি আপনার আদি পিতা আদম তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নবীর প্রতি খোশ আমদেদ। তারপর উপরের দিকে চলে দ্বিতীয় আসমানে পৌছে দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, হা। তারপর বলা হল- মারহাবা! উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে। তারপর খুলে দেয়া হল। যখন সেখানে পৌছলাম তখন সেখানে ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা-এর সাক্ষাৎ পেলাম। তারা দু'জন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। তিনি (জিবরাঈল) বললেন, এরা হলেন, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা। তাদের প্রতি সালাম করুন। তখন আমি সালাম করলাম। তারা জবাব দিলেন, তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানের দিকে চললেন, সেখানে পৌছে জিবরাঈল বললেন, খুলে দাও। তাকে বলা হল কে? তিনি উত্তর দিলেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হা। বলা হল, তার জন্য খোশ-আমদেদ। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তারপর দরজা খুলে দেয়া হল। আমি তথায় পৌছে ইউসুফ -কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি ইউসুফ আপনি তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম, তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার ভাই, নেক্কার নবীর প্রতি খোশ-আমদেদ। তারপর জিবরাঈল আমাকে নিয়ে উপর দিকে চললেন এবং চতুর্থ আসমানে পৌছলেন। আর দরজা খুলে দিতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হা। তখন বলা হল, তার প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে। তখন খুলে দেয়া হল। আমি ইদ্রীস-এর কাছে পৌছলে জিবরাঈল বললেন, ইনি ইদ্রীস। তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনিও জবাব দিলেন। তারপর বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নবীর প্রতি মারহাবা। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে উপর দিকে গিয়ে পঞ্চম আসমানে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি উত্তর দিলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হল। তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হা। বলা হল, তার প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। তথায় পৌছে হারূন-কে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি হারূন তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম; তিনিও জবাব দিলেন, এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নবীর প্রতি মারহাবা। তারপর আমাকে নিয়ে যাত্রা করে ষষ্ঠ আকাশে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কে? তিনি বললেন, জিবরাঈল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। প্রশ্ন করা হল, তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হা। ফেরেশ্তা বললেন, তার প্রতি মারহাবা। উত্তম আগন্তুক এসেছেন। তথায় পৌছে আমি মূসা-কে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি মূসা। তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার ভাই ও নেক্কার নবীর প্রতি মারহাবা। আমি যখন অগ্রসর হলাম তখন তিনি কেঁদে ফেললেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কিসের জন্য কাঁদছেন? তিনি বললেন, আমি এজন্য কাঁদছি যে, আমার পর একজন যুবককে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার উম্মত আমার উম্মত হতে অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারপর জিবরাঈল আমাকে নিয়ে সপ্তম আকাশের দিকে গেলেন এবং দরজা খুলে দিতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হল এ কে? তিনি উত্তর দিলেন, আমি জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হল, তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, হা। বলা হল, তার প্রতি মারহাবা। উত্তম আগমনকারীর আগমন হয়েছে। আমি সেখানে পৌছে ইব্রাহীম-কে দেখতে পেলাম। জিবরাঈল বললেন, ইনি আপনার পিতা। তাকে সালাম করুন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, নেক্কার পুত্র ও নেক্কার নবীর প্রতি মারহাবা। তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠানো হল। দেখতে পেলাম, তার ফল 'হাজার' অঞ্চলের মটকার ন্যায় এবং তার পাতাগুলি হাতির কানের মত। আমাকে বলা হল, এ হল সিদরাতুল মুন্তাহা। সেখানে আমি চারটি নহর দেখতে পেলাম, যাদের দু'টি ছিল অপ্রকাশ্য দু'টি ছিল প্রকাশ্য। তখন আমি জিব্রাঈল-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ নহরগুলি কী? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য, দু'টি হল জান্নাতের দু'টি নহর। আর প্রকাশ্য দু'টি হল নীল নদী ও ফুরাত নদী। তারপর আমার সামনে 'আল-বায়তুল মামুর' প্রকাশ করা হল, এরপর আমার সামনে একটি শরাবের পাত্র, একটি দুধের পাত্র ও একটি মধুর পাত্র রাখা হল। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরাঈল বললেন, এ-ই হচ্ছে ফিতরাত। আপনি ও আপনার উম্মতগণ এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর আমার উপর দৈনিক ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হল। এরপর আমি ফিরে আসলাম। মূসা-এর সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ তাআলা আপনাকে কী আদেশ করেছেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমাকে দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে সমর্থ হবে না। আল্লাহর কসম। আমি আপনার আগে লোকদের পরীক্ষা করেছি এবং বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর শ্রম দিয়েছি। তাই আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের (বোঝা) হালকা করার জন্য আরয করুন। আমি ফিরে গেলাম। ফলে আমার উপর হতে দশ হ্রাস করে দিলেন। আমি আবার মূসা-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার আগের মত বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। ফলে আল্লাহ তাআলা আরো দশ কমিয়ে দিলেন। ফিরার পথে মূসা-এর নিকট পৌছলে, তিনি আবার আগের কথা বললেন, আমি আবার ফিরে গেলাম। আল্লাহ তাআলা আরো দশ হ্রাস করলেন। আমি মূসা-এর নিকট ফিরে এলাম। তিনি আবার ঐ কথাই বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম। তখন আমাকে প্রতিদিন দশ সালাতের আদেশ দেয়া হয়। আমি ফিরে এলাম। মূসা ঐ কথাই আগের মত বললেন। আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আমাকে পাচ সালাতের আদেশ করা হয়। তারপর মূসা নিকট ফিরে এলাম। তিনি বললেন, আপনাকে কী আদেশ দেয়া হয়েছে। আমি বললাম, আমাকে দৈনিক পাচবার সালাত আদায়ের আদেশ দেয়া হয়েছে? মূসা বললেন, আপনার উম্মত দৈনিক পাচ সালাত আদায় করতেও সমর্থ হবে না। আপনার পূর্বে আমি লোকদের পরীক্ষা করেছি। বনী ইসরাঈলের হিদায়াতের জন্য কঠোর শ্রম দিয়েছি। আপনি আপনার রবের নিকট ফিরে যান এবং আপনার উম্মতের জন্য আরো সহজ করার আরযি করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি আমার রবের নিকট আরজি করেছি, এতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আর আমি এতেই সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এরপর তিনি বললেন, আমি যখন অগ্রসর হলাম, তখন এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিলেন, আমি আমার অবশ্য প্রতিপাল্য নির্দেশ জারি করে দিলাম এবং আমার বান্দাদের উপর হালকা করে দিলাম।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহ তাআলার বাণী "আর আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্য" (ইসরা ২০) এর তাফসীরে বলেন, এটি হল প্রত্যক্ষভাবে চোখের দেখা যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সে রাতে দেখানো হয়েছে যে রাতে তাকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়েছিল ইবন আব্বাস আরো বলেন, কুরআনে যে অভিশপ্ত বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে, তা হল যাক্কুম বৃক্ষ।
আবদুল্লাহ ইবন কা'ব যিনি কা'ব এর পথ প্রদর্শক ছিলেন যখন কা'ব অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক-কে তাবূক যুদ্ধকালে নবী (ﷺ) হতে তার পশ্চাতে হতে যাওয়ার ঘটনাটি সবিস্তারে বর্ণনা করতে শুনেছি। ইবন বুকায়র তার বর্ণনায় এ কথাটিও বলেন যে, কা'ব বলেছেন, আমি 'আকাবার রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। যখন আমরা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকার অঙ্গীকার করেছিলাম। সে রাত্রের পরিবর্তে বাদ্র যুদ্ধে উপস্থিত হওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয় নয়, যদিও বাদ্র যুদ্ধ জনগণের মধ্যে 'আকাবার চেয়ে বেশি আলোচিত ছিল।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আকাবা রাতে আমার দু'জন মামা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ইমাম বুখারী বলেন, ইবন উয়ায়না বলেন, দু'জন মামার একজন হলেন বারা' ইবন মা'রূর।
আতা হতে বর্ণিত যে, জাবির বলেন, আমি, আমার পিতা আবদুল্লাহ এবং আমার মামা 'আকাবায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলাম।
আবূ ইদরীস আইযুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, উবাদাহ ইবন সামিত যিনি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বাদার যুদ্ধে এবং আকাবার রাতে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে ছিলেন- তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদের একটি দলকে লক্ষ্য করে বললেন, এস তোমরা আমার কাছে একথার উপর বায়আত কর যে, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, তোমরা চুরি করবে না, তোমরা ব্যভিচার করবে না; তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তোমরা অপবাদ আরোপ করবে না যা তোমরা নিজে হতে বানিয়ে নাও, তোমরা নেক কাজে আমার নাফরমানী করবে না, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এসব শর্ত পূরণ করে চলবে সে আল্লাহর তাআলার নিকট তার প্রতিদান অবশ্যই পাবে। আর যে এ সবের কোন কিছুতে লিপ্ত হয় এবং তাকে এ কারণে দুনিয়াতে শাস্তি দেয়া হয়, তবে এ শাস্তি তার প্রতি কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এ সবের কোনটিতে লিপ্ত হল আর আল্লাহ তা গোপন রাখেন, তবে তার ব্যাপারটি আল্লাহ তাআলার ওপর ন্যস্ত। তিনি ইচ্ছা করলে শাস্তি দিবেন আর ইচ্ছা করলে ক্ষমা করবেন। উবাদাহ বলেন, আমিও এসব শর্তের উপর নবী (ﷺ)-এর নিকট হাতে বায়আত করেছি।
উবাদাহ ইবন সামিত হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ঐ মনোনীত প্রতিনিধি দলে ছিলাম, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বায়আত গ্রহণ করেছিল। তিনি আরও বলেন, আমরা তারকাছে বায়আত গ্রহণ করেছিলাম জান্নাত লাভের জন্য যদি আমরা এই কাজগুলো করি এই শর্তে যে, আমরা আল্লাহর সঙ্গেকোন কিছুকেই শরীক করব না, ব্যভিচার করব না, চুরি করব না। আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে না হক হত্যা করব না, লুটতরাজ করব না এবং নাফরমানী করব না। আর যদি আমরা এর মধ্যে কোনটিতে লিপ্ত হই, তাহলে এর ফয়সালা আল্লাহ তাআলার উপর।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন আমাকে বিবাহ করেন, তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তারপর আমরা মদিনায় এলাম এবং বনু হারিস গোত্রে অবস্থান করলাম। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। পরে যখন আমার মাথার সামনের চুল জমে উঠল। সে সময় আমি একদিন আমার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় খেলা করছিলাম। তখন আমার মাতা উম্মে রূমান আমাকে উচ্চস্বরে ডাকলেন। আমি তার কাছে এলাম। আমি বুঝতে পারিনি, তার উদ্দেশ্য কী? তিনি আমার হাত দরে ঘরের দরজায় এসে আমাকে দাড় করালেন। আর আমি হাফাচ্ছিলাম। শেষে আমার শ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা প্রশমিত হল। এরপর তিনি কিছু পানি নিলেন এবং তা দিয়ে আমার মুখমন্ডল ও মাথা মাসেহ করে দিলেন। তারপর আমাকে ঘরের ভিতর প্রবেশ করালেন। সেখানে কয়েকজন আনসারী মহিলা ছিলেন। তারা বললেন, কল্যাণময়, বরকতময় এবং সৌভাগ্যমন্ডিত হোক। আমাকে তাদের কাছে দিয়ে দিলেন। তারা আমার অবস্থান ঠিক করে দিলেন, তখন ছিল দ্বিপ্রহরের পূর্ব মুহূর্ত। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখে আমি হকচকিয়ে গেলাম। তারা আমাকে তার কাছে তুলে দিল। সে সময় আমি নয় বছরের বালিকা।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তাকে বলেন, দু'বার তোমাকে আমায় স্বপ্নে দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম, তুমি একটি রেশমী কাপড়ে আবৃতা এবং আমাকে বলছে ইনি আপনার স্ত্রী, আমি তার ঘোমটা সরিয়ে দেখলাম, সে মহিলা তুমিই। তখন আমি ভাবছিলাম, যদি তা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে, তবে তিনি তা বাস্তবায়িত করবেন।
হিশাম এর পিতা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর মদিনার দিকে বের হওয়ার তিন বছর আগে খাদীজাহ-এর মৃত্যু হয়। তারপর দু'বছর অথবা এর কাছাকাছি সময় অতিবাহিত করে তিনি আয়িশাহ-কে বিবাহ করেন। যখন তিনি ছিলেন ছয় বছরের বালিকা। তারপর নয় বছর বয়সে বাসর উৎযাপন করেন।
আবূ ওয়াইল বলেন, আমরা পীড়িত খাববাব-কে দেখতে গেলাম। তিনি আমাদেরকে বললেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে হিজরাত করেছিলাম- আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আল্লাহর নিকট আমাদের সওয়াব রয়েছে। তবে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কোন প্রতিদানের কিছু না নিয়েই চলে গেছেন। এদের মধ্যে ছিলেন মুস'আব ইবন উমায়র । তিনি ওহুদের দিন শহীদ হন। তিনি একখানা চাদর রেখে যান। আমরা যখন এটি দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিতাম তখন তার পা বেরিয়ে পড়ত, আর যখন আমরা পা ঢেকে দিতাম, তখন তার মাথা বেরিয়ে পড়ত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নির্দেশ করলেন যে, আমরা যেন তার মাথা ঢেকে দিই এবং তার পায়ের উপর কিছু ইয্খির রেখে দিই। আর আমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন, যাদের ফল পরিপক্ক হয়েছে আর তারা তা পেড়ে খাচ্ছেন।
উমার বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমলের ফলাফল নির্ভর করে নিয়্যাতের উপর। সুতরাং যার হিজরাত হয় দুনিয়া লাভের জন্য কিংবা কোন স্ত্রীলোককে বিবাহ করার উদ্দেশে, তাহলে তার হিজরাত হবে যে উদ্দেশে সে হিজরাত করেছে। আর যার হিজরাত হবে আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরাত হবে আল্লাহ ও তার রাসূলেরই জন্য।
আবদুল্লাহ ইবন উমার বলতেন, (মক্কা) বিজয়ের পর হিজরাতের কোন প্রয়োজন নেই।
আওযায়ী ... 'আতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি ইবায়দ ইবন উমায়র লাইসী-এর সঙ্গে আয়িশাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তারপর তাকে হিজরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এখন হিজরাতের কোন প্রয়োজন নেই। অতীতে মুমিনদের কেউ তার দ্বীনের জন্য তার প্রতি ফিতনার ভয়ে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে হিজরাত করতেন আর আজ আল্লাহ ইসলামকে বিজয়ী করেছেন। এখন কোন মুমিন তার রবের ইবাদত যেখানে ইচ্ছা করতে পারে। তবে এখন আছে জিহাদ ও নিয়্যাত।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাদ দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আমার নিকট আপনার রাহে এ কাওমের বিরুদ্ধে, যারা আপনার রাসূলকে অবিশ্বাস করেছে ও তাকে বিতাড়িত করেছে। জিহাদ করা এত প্রিয় যতটুকু অন্য কারো বিরুদ্ধে নয়। হে আল্লাহ! আমার ধারণা আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যকার লড়াই শেষ করে দিয়েছেন। আবন ইবন ইয়াযীদ... আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, সে কাওম যারা তোমার নবী (ﷺ)-কে অবিশ্বাস করেছে এবং তাকে বের করে দিয়েছে, তারা কুরাইশ গোত্রই।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ-কে নবুওয়াত দেয়া হয় চল্লিশ বছর বয়সে, এরপর তিনি তের বছর মক্কায় কাটান। এ সময় তার প্রতি ওহী নাযিল হচ্ছিল। তারপর হিজরাতের নির্দেশ পান। এবং হিজরাতের পর দশ বছর কাটান। আর তিনি তেষট্টি বছর বয়সে মারা যান।
ইবন 'আববাদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় তের বছর কাটান। তিনি তিষট্টি বছর বয়সে মারা যান।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বরে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহ তার এক বান্দাকে দুটি বিষয়ের একটি বেছে নেয়ার অধিকার দিয়েছেন। তার একটি হল হল দুনিয়ার ভোগ-বিলাস আর একটি হল আল্লাহর নিকট যা রক্ষিত রয়েছে। তখন সে বান্দা আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তাই পছন্দ করলেন। একথা শুনে, আবূ বাকর কেঁদে ফেললেন, এবং বললেন, আমাদের পিতা-মাতাকে আপনার জন্য কুরবানী করলাম। তার অবস্থা দেখে আমরা বিস্মিত হলাম। লোকেরা বলতে লাগল, এ বৃদ্ধের অবস্থা দেখ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক বান্দা সম্বন্ধে খবর দিলেন যে, তাকে আল্লাহ ভোগ-সম্পদ দেওয়ার এবং তার কাছে যা রয়েছে, এ দু'য়ের মধ্যে বেছে নিতে বললেন আর এই বৃদ্ধ বলছে, আপনার জন্য আমাদের মাতাপিতা উৎসর্গ করলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ই হলেন সেই ইখতিয়ার প্রাপ্ত বান্দা। আর আবূ বাকরই হলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে ব্যক্তি তার সঙ্গ ও সম্পদ দিয়ে আমার প্রতি সবচেয়ে ইহসান করেছেন তিনি হলেন আবূ বাকর। যদি আমি আমার উম্মতের কোন ব্যক্তিকে অন্তরঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবূ বাকরকেই করতাম। তবে তার সঙ্গে আমার ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে। মসজিদের দিকে আবূ বাকর এর দরজা ছাড়া অন্য কারো দরজা খোলা থাকবে না।
নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোন দিন কাটেনি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের বাড়িতে আসেননি। যখন মুসলিমগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন আবূ বাকর হিজরাত করে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বের হলেন। শেষে বারকুল গিমাদ পৌছলে ইবন দাগিনার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। সে ছিল তার গোত্রের নেতা। সে বলল, হে আবূ বাকর! কোথায় যাচ্ছেন? উত্তর আবূ বাকর বললেন, আমার স্ব-জাতি আমাকে বের করে দিয়েছে। তাই আমি মনে করছি, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব এবং আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব। ইবন দাগিনা বলল, হে আবূ বাকর! আপনার মত ব্যক্তি বের হতে পারে না এবং বের করাও হতে পারে না। আপনি তো নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করে থাকেন এবং সত্য পথের পথিকদের বিপদ আপদে সাহায্য করেন। সুতরাং আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি, আপনাকে যাবতীয় সহযোগিতার ওয়াদা করছি। আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন। আবূ বাকর ফিরে এলেন। তার সঙ্গে ইবন দাগিনাও এল। ইবন দাগিনা বিকেল বেলা কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে গেল এবং তাদেরকে বলল, আবূ বাকরের মত লোক দেশ হতে বের হতে পারে না এবং তাকে বের করে দেয়া যায় না। আপনারা কি এমন ব্যক্তিকে বের করবেন, যে নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে বিপদ এলে সাহায্য করেন। ইবন দাগিনার আশ্রয়দান কুরাইশগণ মেনে নিল এবং তারা ইবন দাগিনাকে বলল, তুমি আবূ বকরকে বলে দাও, তিনি যেন তার রবের ইবাদত তার ঘরে করেন। সালাত সেখানেই আদায় করেন, ইচ্ছা মাফিক কুরআন তিলাওয়াত করবেন। কিন্তু এর দ্বারা আমাদের যেন কষ্ট না দেন। আর এসব ব্যাপারে যেন প্রকাশ্যে না করেন। কেননা, আমরা আমাদের মেয়েদের ও ছেলেদের ফিতনায় পড়ে যাওয়ার ভয় করি। ইবন দাগিনা এসব কথা আবূ বাকর-কে বলে দিলেন। সে মতে কিছুকাল আবূ বাকর নিজের ঘরে তার রবের ইবাদত করতে লাগলেন। সালাত প্রকাশ্যে আদায় করতেন না এবং ঘরেই কুরআন তিলওয়াত করতেন। এরপর আবূ বাকরের মনে খেয়াল জাগল। তাই তিনি তার ঘরের পার্শ্বেই একটি মসজিদ তৈরি করে নিলেন। এতে তিনি সালাত আদায় করতে ও কুরআন পড়তে লাগলেন। এতে তার কাছে মুশরিকা মহিলা ও যুবকরা ভীড় জমাতে লাগল। তারা আবূ বাকর-এর একাজে বিস্ময়বোধ করত এবং তার দিকে তাকিয়ে থাকত। আবূ বাকর ছিলেন একজন ক্রন্দনকারী ব্যক্তি, তিনি যখন কুরআন পড়তেন তখন তার অশ্রু সামলিয়ে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটি মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের ভীত করে তুলল এবং তারা ইবন দাগিনাকে ডেকে পাঠান। সে এল। তারা তাকে বলল, তোমার আশ্রয় প্রদানের কারণে আমরাও আবূ বাকরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এই শর্তে যে, তিনি তার রবের ইবাদত তার ঘরে করবেন কিন্তু সে শর্ত তিনি ভঙ্গ করেছেন এবং নিজ গৃহের পাশে এটি মসজিদ তৈরি করে প্রকাশ্যে সালাত ও তিলওয়াত শুরু করেছেন। আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মহিলা ও সন্তানরা ফিতনায় পড়ে যাবে। কাজেই তুমি তাকে নিষেধ করে দাও। তিনি তার রবের ইবাদত তার গৃহের ভিতর সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলে, তিনি তা করতে পারেন। আর যদি তিনি তা অমান্য করে প্রকাশ্যে তা করতে চান তবে তাকে তোমার আশ্রয় প্রদান ও দায় দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে বল। আমরা তোমার আশ্রয় দানের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করা অত্যন্ত অপছন্দ করি, আবার আবূ বাকরকেও এভাবে প্রকাশ্যে ইবাদাত করার জন্য ছেড়ে দিতে পারি না। আয়িশাহ বলেন, ইবন দাগিনা এসে আবূ বাকর-কে বলল, আপনি অবশ্যই জানেন যে, কী শর্তে আমি আপনার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাতে সীমিত থাকবেন অন্যথায় আমার জিম্মাদারী আমাকে ফিরত দিবেন। আমি এ কথা মোটেই পছন্দ করি না যে আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আমার আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি আমার বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ আরববাসীর নিকট প্রকাশিত হোক। আবূ বাকর তাকে বললেন, আমি তোমার আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আল্লাহর আশ্রয়ের উপর সন্তুষ্ট আছি। এ সময় নবী (ﷺ) মক্কায় ছিলেন। নবী (ﷺ) মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরাতের স্থান (স্বপ্নে) দেখান হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এরপর যারা হিজরাত করতে চাইলেন, তারা মদিনার দিকে হিজরাত করলেন। আর যারা হিজরাত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাদেরও অধিকাংশ সেখান হতে ফিরে মদিনায় চলে আসলেন। আবূ বাকরও মদিনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। আবূ বাকর বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান১! আপনিও কি হিজরাতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হা। তখন আবূ বাকর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে হিজরাত হতে বিরত রাখলেন এবং তার নিকট যে দু'টি উট ছিল এ দুটি চার মাস পর্যন্ত বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকেন। ইবন শিহাব উরওয়াহ সূত্রে আয়িশাহ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবূ বাকর এর ঘরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আবূ বাকরকে খবর দিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মস্তক আবৃত অবস্থায় আসছেন। তা এমন সময় ছিল যে সময় তিনি পূর্বে কখনো আমাদের এখানে আসেনি। আবূ বাকর তার আসার কথা শুনে বললেন, আমার মাতাপিতা তার প্রতি কুরবান। আল্লাহর কসম, তিনি এ সময় নিশ্চই কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণেই আসছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পৌছে অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেয়া হল। প্রবেশ করে নবী (ﷺ) আবূ বাকরকে বললেন, এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও। আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান! এখানে তো আপনারই পরিবার। তখন তিনি বললেন, আমাকেও হিজরাতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! আমি আপনার সফর সঙ্গী হতে ইচ্ছুক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ঠিক আছে। আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা কুরবান! আমার এ দু'টি উট হতে আপনি যে কোন একটি নিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তবে মূল্যের বিনিময়ে। আয়িশাহ বলেন, আমরা তাদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা অতি শীঘ্র সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে, তাদের খাদ্যসামগ্রী গুছিয়ে দিলাম। আমার বোন আসমা বিনতে আবূ বাকর তার কোমর বন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেধে দিলেন। এ কারণেই তাকে 'জাতুন নেতাক' (কোমর বন্ধ ওয়ালী) বলা হত। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তারা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। আবদুল্লাহ ইবন আবূ বাকর তাদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান হতে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তাদের দু'জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হত তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন। যখন আধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবূ বাকর-এর গোলাম আমির ইবন যুহাইরাহ তাদের কাছেই দুধালো বকরীর পাল চরিয়ে বেড়াত। রাতের কিছু সময় চলে গেলে পর সে বকরীর পাল নিয়ে তাদের নিকটে যেত এবং তারা দু'জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তারা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবন ফুহাইরাহ বকরীগুলি হাকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিন রাতের প্রতি রাতে সে এমনই করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর বনী আবদ ইবন আদি গোত্রের এক ব্যক্তিকে মজুরির বিনিময়ে 'খির্রীত' (পথ প্রদর্শক) নিযুক্ত করেছিলেন। দক্ষ পথপ্রদর্শককে 'খির্রীত' বলা হয়। আদী গোত্রের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফির কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তারা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাদের উট দু'টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু'টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌছিয়ে দিল। আর আমির ইবন ফুহাইরাহ ও পথপ্রদর্শক তাদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাদের নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল। আবদুর রহমান ইবন মালিক মুদলেজী আমাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইবন মালিকের ভ্রাতুষ্পুত্র। তার পিতা তাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইবন জু'শুমকে বলতে শুনেছেন যে, আমাদের নিকট কুরাইশী কাফিরদের দূত আসল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর এ দু'জনের যে কোন একজনকে যে হত্যা করবে অথবা বন্দী করতে পারবে তাকে পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিল। আমি আমার কওম বনী মুদলীজের এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তাদের নিকট হতে এক ব্যক্তি এসে আমাদের নিকটে দাড়াল। আমরা বসাই ছিলাম। সে বলল, হে সুরাকাহ! আমি এই মাত্র উপকূলের পথে কয়েকজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমার ধারণা, এরা মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তার সহযাত্রীরা হবেন। সুরাকাহ বলেন, আমি বুঝতে পারলাম যে এঁরা তারাই হবেন। কিন্তু তাকে বললাম, এরা তারা নয়, বরং তুমি অমুক অমুককে দেখছ। এরা এই মাত্র আমাদের সম্মুখ দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি কিছুক্ষণ মজলিসে অবস্থান করে চলে এলাম এবং আমার দাসীকে আদেশ করলাম, তুমি আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে যাও এবং অমুক টিলার আড়ালে ঘোড়াটি ধরে দাড়িয়ে থাক। আমি আমার বর্শা হাতে নিলাম এবং বাড়ির পিছন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বর্শাটির এক প্রান্ত হাতে ধরে অপর প্রান্ত মাটি হেচড়ানো অবস্থায় আমি টেনে নিয়ে চলছিলাম ঐ অবস্থায় বর্শার মাটি হেচড়ানো অংশ দ্বারা মাটির উপর রেখাপাত করতে করতে আমার ঘোড়ার নিকট গিয়ে পৌছলাম এবং ঘোড়ায় আরোহণ করে তাকে খুব দ্রুত ছুটালাম। সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। আমি প্রায় তাদের নিকট পৌছে গেলাম, এমন সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে নিয়ে পড়ে গেল। আমিও তার পিঠ হতে ছিটকে পড়লাম। তারপর আমি উঠে দাড়ালাম এবং তুণের দিকেহাত বাড়ালাম এবং তা হতে তীরগুলি বের করলাম ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিলাম যে আমি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবো কি-না। তখন তীরগুলি দুর্ভাগ্যবশতঃ এমনভাবে বেরিয়ে এল যে, ভাগ্য নির্ধারণের বেলায় এমন হওয়া পছন্দ করি না। আমি আবার ভাগ্য পরীক্ষার ফলাফল অমান্য করে অশ্বারোহণ করে সম্মুখ পানে এগুতে লাগলাম। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এত নিকটবর্তী হয়ে গেলাম যে তার তিলাওয়াতের আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি ফিরে তাকাচ্ছিলেন না কিন্তু আবূ বাকর বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন। এমন সময় হঠাৎ আমার ঘোড়ার সামনের পা দু'টি হাটু পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে গেল এবং আমি তার উপর হতে পড়ে গেলাম। তখন ঘোড়াটিকে ধমক দিলাম, সে দাড়াতে ইচ্ছা করল, কিন্তু পা দু'টি বের করতে পারছিল না। শেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দু'টি বের করতে পারছিল না। অবশেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দুটি যেখানে গেড়ে ছিল সেখান হতে ধুঁয়ার মত ধূলি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। তখন আমি তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারও যা আমার অপছন্দনীয় তা-ই প্রকাশ পেল। তখন উচ্চস্বরে তাদের নিরাপত্তা চাইলাম। এতে তারা থেমে গেলেন এবং আমি আমার ঘোড়ায় আরোহণ করে এলাম। আমি যখন এমন অবস্থায় বার বার বাধাপ্রাপ্ত ও বিপদে পড়ছিলাম তখনই আমার অন্তরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ মিশনটি অচিরেই প্রভাব বিস্তার করবে। তখন আমি তাকে বললাম আপনার কওম আপনাকে ধরে দিতে পারলে একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছে। মক্কায় কাফিরগণ তার সম্পর্কে যে ইচ্ছা করেছে তা তাকে জানালাম এবং আমি তাদের জন্য কিছু খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পেশ করলাম। তারা তা হতে কিছুই নিলেন না। আর আমার কাছে এ কথা ছাড়া কিছুই চাইলেন নাঃ "আমাদের খবরটি গোপন রেখ"। এরপর আমি আমাকে একটি নিরাপত্তা লিপি লিখে দেয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করলাম। তখন তিনি 'আমির ইবন ফুহাইরাহকে আদেশ দিলেন। তিনি এক টুকরো চামড়ায় তা লিখে দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রওয়ানা দিলেন। ইবন শিহাব বলেন, উরওয়াহ ইবন যুবায়র আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে নবী (ﷺ)-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলিমদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর-কে সাদা রঙ্গের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদিনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে নবী (ﷺ) মক্কা হতে মদিনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তারা প্রতিদিন সকালে মদিনার হার্রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতেন থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইয়াহূদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে নবী (ﷺ) ও তার সাথীসঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরা অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি- যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ। মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদিনার হাররার উপকন্ঠে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু আমর ইবন 'আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবি'উল আউয়াল মাসের সোমবার। আবূ বাকর দাড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যারা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখেননি তারা আবূ বাকর-কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নবীজী (ﷺ)-এর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বাকর অগ্রসর হয়ে তার চাদর দিয়ে নবী (ﷺ) উপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে চিনতে পারল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু 'আমার ইবন 'আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতে সালাত আদায় করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার উটনীতে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তার সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদিনায় মসজিদে নাবাবীর স্থানে পৌছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সালাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবন যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু'জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-কে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই বালক দু'টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মাসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মাসজিদ তৈরি করলেন। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) মাসজিদ নির্মাণকালে সহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ এ বোঝা খায়বারের বোঝা বহন নয়। ইয়া রব, এর বোঝা অত্যন্ত পুণ্যময় ও অতি পবিত্র। তিনি আরো বলছিলেন, হে আল্লাহ! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান। সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। এক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবন শিহাব বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এছাড়া অপর কোন পূর্ণ কবিতা পাঠ করছেন বলে, কোন কথা আমার কাছে পৌছেনি।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৯০৫)।
আসমা হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এবং আবূ বাকর যখন মদিনায় যাওয়ার ইচ্ছা করলেন, তখন আমি তাদের জন্য সফরের খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করলাম। আর আমার পিতাকে বললাম, থলের মুখ বাধার জন্য আমার কোমরবন্দ ছাড়া অন্য কিছু পাচ্ছি না তিনি বললেন, ওটা তুমি টুকরো করে নাও। আমি তাই করলাম। এ কারণে আমার নাম হয়ে গেল, 'যাতুন্ নিতাকাইন' (কোমরবন্দ দু'ভাগে বিভক্তকারিণী)।
বারা' হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ) মদিনার দিকে যাচ্ছিলেন তখন সুরাকাহ ইবন মালিক ইবন জ'শুম তার পেছনে ধাওয়া করল। নবী (ﷺ) তার জন্য বদ্দোয়া করলেন। ফলে তার ঘোড়াটি তাকে নিয়ে মাটিতে দেবে গেল। তখন সে বলল, আপনি, আল্লাহর কাছে আমার জন্য দু'আ করুন। আমি আপনার কোন ক্ষতি করব না। নবী (ﷺ) তার জন্য দু'আ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তৃষ্ণার্ত হলেন। তখন তিনি এক রাখালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবূ বাকর সিদ্দীক বলেন, তখন আমি একটি বাটি নিয়ে এতে কিছু দুধ দোহন করে নবী (ﷺ)-এর কাছে নিয়ে এলাম, তিনি এমনভাবে তা পান করলেন যে, আমি তাতে সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম।
আসমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তখন তার পেটে ছিলেন আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের, তিনি বলেন, আমি এমন সময় হিজরাত করি যখন আমি আসন্ন প্রসবা। আমি মদিনায় এসে কুবা'তে অবতরণ করি। এ কুবায়ই আমি পুত্র সন্তানটি প্রসব করি। এরপর আমি তাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে তার কোলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনালেন এবং তা চিবিয়ে তার মুখে থুথু দিলেন। কাজেই সর্বপ্রথম যে বস্তুটি আবদুল্লাহর পেটে গেল তা হল নবী (ﷺ)-এর থুথু। নবী (ﷺ) সামান্য চিবানো খেজুর নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুর অংশে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দু'আ করলেন এবং বরকত চাইলেন। তিনি হলেন প্রথম নবজাতক সন্তান যিনি হিজরাতের পর মুসলিম পরিবারে জন্মলাভ করেন। খালিদ ইবন মাখলদ উক্ত রেওয়ায়াত বর্ণনায় যাকারিয়া ইবন ইয়াহ্ইয়া-এর অনুসরণ করেছেন। এতে রয়েছে যে, আসমা গর্ভবতী অবস্থায় হিজরাত করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আসেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হিজরাতের পর) মুসলিম পরিবারে সর্বপ্রথম আবদুল্লাহ ইবন যুবায়েরই জন্মলাভ করেন। তারা তাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলেন। তিনি একটি খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন। কাজেই প্রথম যে জিনিসটি তার পেটে গেল তা নবী (ﷺ)-এর থুথু।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নবী (ﷺ) যখন মদিনায় এলেন তখন উষ্ট্রে পৃষ্ঠে আবূ বাকর তার পশ্চাতে ছিলেন। আবূ বাকর ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ১ ও পরিচিত। আর নবী (ﷺ) ছিলেন জাওয়ান এবং অপরিচিত। তখন বর্ণনাকারী বলেন, যখন আবূ বকরের সঙ্গে কারো সাক্ষাৎ হত, সে জিজ্ঞেস করত হে আবূ বাকর! তোমার সম্মুখে উপবিষ্ট ঐ ব্যক্তি কে? আবূ বাকর বলতেন, তিনি আমার পথ প্রদর্শক। রাবী বলেন, প্রশ্নকারী সাধারণ পথ মনে করত এবং তিনি সত্যপথ উদ্দেশ্য করতেন। তারপর একবার আবূ বাকর পিছনে চেয়ে হঠাৎ দেখতে পেলেন এক ঘোড় সওয়ার তাদের কাছেই এসে পড়েছে। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই যে একজন ঘোড় সওয়ার আমাদের পিছনে প্রায় কাছে পৌছে গেছে। তখন নবী (ﷺ) পিছনের দিকে তাকিয়ে দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আপনি ওকে পাকড়াও করুন। তৎক্ষণাৎ ঘোড়াটি তাকে নীচে ফেলে দিয়ে দাড়িয়ে হরেষা রব করতে লাগল। তখন ঘোড় সওয়ার বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনার যা ইচ্ছা আমাকে আদেশ করুন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তুমি স্বস্থানেই থেমে যাও। কেউ আমাদের দিকে আসতে চাইলে তুমি তাকে বাধা দিবে। বর্ণনাকারী বলেন, দিনের প্রথম অংশে ছিল সে নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী আর দিনের শেষাংশে হয়ে গেল তার পক্ষ হতে অস্ত্রধারী। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনার হাররার২ একপাশে অবতরণ করলেন। এরপর আনসারদের খবর দিলেন। তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে এলেন এবং উভয়কে সালাম করে বললেন, আপনারা নিরাপদ ও মান্য হিসেবে আরোহণ করুন। নবী (ﷺ) ও আবূ বাকর উটে আরোহণ করলেন আর আনসারগণ অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদেরকে ঘিরে চলতে লাগলেন। মদিনায় লোকেররা বলতে লাগল, আল্লাহর নবী এসেছেন, আল্লাহর নবী এসেছেন, লোকজন উচু স্থানে উঠে তাদের দেখতে লাগল। আর বলতে লাগল আল্লাহর নবী এসেছেন, আল্লাহর নবী এসেছেন। তিনি সম্মুখ পানে চলতে লাগলেন। শেষে আবূ আইয়ুব -এর বাড়ির পার্শ্বে গিয়ে অবতরণ করলেন। আবূ আইয়ুব ঐ সময় তার পরিবারের লোকদের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ ইবন সালাম তার আগমনের কথা শুনলেন তখন তিনি তার নিজের বাগানে খেজুর সংগ্রহ করছিলেন। তখন তিনি শীঘ্র ফল সংগ্রহ করা হতে বিরত হলেন এবং সংগৃহীত খেজুরসহ নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলেন এবং নবী (ﷺ)-এর কিছু কথাবার্তা শুনে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। নবী (ﷺ) বললেন, আমাদের লোকদের মধ্যে কার বাড়ি এখান হতে সবচেয়ে নিকটে? আবূ আইয়ুব বললেন, হে আল্লাহর নবী (ﷺ)! এই তো বাড়ী, এই যে তার দরজা। নবী (ﷺ) বললেন, তবে চল, আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা কর। তিনি বললেন, আপনারা দু'জনেই চলুন। আল্লাহ বরকত দানকারী। যখন নবী (ﷺ) তার বাড়িতে এলেন তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম আসলেন এবং বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল; আপনি সত্য নিয়ে এসেছেন। হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদী সম্প্রদায় জানে যে আমি তাদের নেতা এবং আমি তাদের নেতার পুত্র। আমি তাদের মধ্যে বেশি জ্ঞানী এবং তাদের বড় জ্ঞানী সন্তান। আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এ কথাটি জানাজানি হওয়ার পূর্বে আপনি তাদের ডাকুন এবং আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করুন, আমার সম্পর্কে তাদের ধারণা জ্ঞাত হন। কেননা তারা যদি জানতে পারে যে আমি ইসলাম গ্রহণ কেরছি, তবে আমার সম্বন্ধে তারা এমন সব অলীক কথা বলবে যা আমার মধ্যে নেই। নবী (ﷺ) (ইয়াহূদী সম্প্রদায়কে) ডেকে পাঠালেন। তারা এসে তার কাছে হাযির হল। রাসূল (ﷺ) তাদের বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়, তোমাদের উপর অভিশাপ! তোমরা সেই আল্লাহকে ভয় কর, তিনি ছাড়া মাবুদ নেই। তোমরা নিশ্চই জান যে আমি সত্য রাসূল (ﷺ) সত্য নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছি। সুতরাং তোমার ইসলাম গ্রহণ কর। তারা উত্তর দিল, আমরা এসব জানিনা। তারা তিনবার একথা বলল। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক? তারা উত্তর দিল, তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার সন্তান। তিনি আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আলিম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আলিমের পুত্র। নবী (ﷺ) বললেন, তিনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে তোমাদের মতামত কী হবে? তারা বলল, আল্লাহ হিফাযত করুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন তা কিছুতেই হতে পারে না। তিনি আবার বললেন, আচ্ছা বলতো, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তবে তোমরা কী মনে করবে? তারা আবার বলল, আল্লাহ হেফাজত করুন, কিছুতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে পারেন না। নবী (ﷺ) আবার বললেন, আচ্ছা বলতো, তিনি যদি মুসলিম হয়েই যান তবে তোমাদের মত কী? তারা বলল, আল্লাহ হিফাযত করুন, তিনি মুসলিম হয়ে যাবেন তা কিছুতেই হতে পারে না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, হে ইবন সালাম! তুমি এদের সামনে বেরিয়ে আস। তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়। আল্লাহকে ভয় কর। ঐ আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া কোন মা'বুদ নেই। তোমরা নিশ্চই জান তিনি সত্য রাসূল, হক নিয়েই এসেছেন। তখন তারা বলে উঠল, তুমি মিথ্যা বলছ। তারপর নবী (ﷺ) তাদেরকে বের করে দিলেন।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত যে, তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের মুহাজিরদের জন্য চার কিস্তিতে বাৎসরিক চার হাজার দিরহাম ধার্য করলেন এবং ইবন উমারের জন্য নির্বাচন করলেন তিনি হাজার পাচশ। তাকে বলা হল, তিনিও তো মুহাজিরদের। তার জন্য চার হাজার হতে কম কেন করলেন? তিনি বললেন, সে তো তার পিতা-মাতার সাথে হিজরাত করেছে। কাজেই সে ঐ লোকের সমান হতে পারে না যে লোক একাকী হিজরাত করেছে।
খাব্বাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে হিজরাত করেছি। খাববাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে হিজরাত করেছি একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য। আমাদের পুরস্কার আল্লাহর নিকটই নির্ধারিত। আমাদের মধ্যে অনেকেই তাদের কুরবানীর ফল কিছুই দুনিয়ায় ভোগ না করে আখিরাতে চলে গিয়েছেন; তার মধ্যে মুসআব ইবন উমায়ের অন্যতম। তিনি ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। তাকে কাফন দেয়ার জন্য তার একটি চাদর ছাড়া আর অন্য কিছুই আমরা পেলাম না। আমরা এ চাদরটি দিয়ে যখন তার মাথা ঢাকলাম তার পা বের হয়ে গেল আর যখন তার পা ঢাকতে গেলাম তখন মাথা বের হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নির্দেশ দিলেন, চাদরটি দিয়ে তার মাথা ঢেকে দাও এবং পা দু'টির উপর ইয্খির ঘাস রেখে দাও। আজ আমাদের মধ্যে এমন আছেন যাদের ফল পেকে গেছে এবং এখন তারা তা সংগ্রহ করছেন।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৯১৩)।
আবূ বুরদাহ ইবন আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উমার আমাকে বললেন, তুমি কি জান আমার পিতা তোমার পিতাকে কী বলেছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার পিতা তোমার পিতাকে বলেছিলেন, হে আবূ মূসা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট আছ যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি, তার সঙ্গে হিজরাত করেছি, তার সঙ্গে জিহাদ করেছি এবং তার জীবদ্দশায় করা আমাদের প্রতিটি আমল যা করেছি তা আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক। তার মৃত্যুর পর, আমরা যে সব আমল করেছি, তা আমাদের জন্য সমান সমান হোক। তখন তোমার পিতা আবূ মূসা বললেন, না কেননা, আল্লাহর কসম, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পর জিহাদ করেছি, সালাত আদায় করেছি, সাওম পালন করেছি এবং বহু নেক আমল করেছি। আমাদের হাতে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমরা এসব কাজের সাওয়াব-এর আশা রাখি। তখন আমার পিতা [উমার] বললেন, কিন্তু আমি ঐ সত্তার কসম, যার হাতে উমারের প্রাণ, এতেই সন্তুষ্ট যে, (আগের আমল) আমাদের জন্য সঞ্চিত থাকুক আর তার মৃত্যুর পর আমরা যে সব আমল করেছি তা হতে যেন আমরা রেহাই পাই সমান সমানভাবে। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম নিশ্চই তোমার পিতা আমার পিতা হতে উত্তম।
আবূ উসমান বলেন, আমি ইবন উমার-কে বলতে শুনেছি যে, তাকে একথা বলা হলে, "আপনি আপনার পিতার আগে হিজরাত করেছেন" তিনি রাগ করতেন। ইবন উমার বলেন, আমি এবং উমার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলাম। তখন তাকে কায়লুলাহ অবস্থায় পেলাম। কাজেই আমরা আমাদের আবাসস্থলে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর উমার আমাকে পাঠালেন এবং বললেন যাও; গিয়ে দেখ নবী (ﷺ) জেগেছেন কিনা? আমি এসে তার কাছে হাযির হলাম এবং তার কাছে বায়আত করলাম। তারপর উমার এর নিকট এসে তাকে খবর দিলাম যে, তিনি জেগে গেছেন। তখন আমরা তার নিকট গেলাম দ্রুতবেগে। তিনি তার কাছে প্রবেশ করে বায়আত করলেন। তারপর আমিও নবী (ﷺ)-এর হাতে আবার বায়আত করলাম।
আবূ ইসহাক বলেন, আমি বারা-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবূ বাকর আমার পিতা আযিব-এর নিকট হাওদা কিনলেন। আমি আবূ বাকরের সাথে কেনা হাওদাটি বয়ে নিয়ে চললাম। তখন আমার পিতা আযিব নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে তার হিজাতের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আবূ বাকর বললেন, আমাদের খোজ করার জন্য মুশরিকরা লোক নিয়োগ করছিল। অবশেষে আমরা রাত্রিকালে বেরিয়ে পড়লাম এবং একরাত ও একদিন একটানা চলতে থাকলাম। যখন দুপুর হয়ে গেল, তখন একটি বিরাট পাথর নযরে পড়ল। আমরা সেটির কাছে এলাম, পাথরটির কিছু ছায়া পড়ছিল। আমি সেখানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য আমার সঙ্গের চামড়াখানি বিছিয়ে দিলাম। নবী (ﷺ) ওটার উপর শুয়ে পড়লেন। আমি এদিক-ওদিক খোজ নেয়ার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ এক বকরীর রাখালকে দেখতে পেলাম। সে তার বকরীগুলো নিয়ে আসছে। সেও আমাদের মত পাথরের ছায়ায় আশ্রয় নিতে চায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার গোলাম? সে বলল, আমি অমুকের। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বকরীর পালে দুধ আছে কি? সে বলল, হা। আমি বললাম, তুমি কি কিছু দোহন করে দিবে? সে বলল, হা। সে তার পাল হতে একটি বকরী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, বকরীর স্তন দু'টি ঝেড়ে মুছে সাফ করে নাও। সে একপাত্র ভর্তি দুধ দোহন করল। আমার সাথে একটি পানির পাত্র ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য কাপড় দিয়ে তার মুখ বেধে রেখেছিলাম। আমি তা হতে দুধের মধ্যে কিছু পানি ঢেলে দিলাম। ফলে পাত্রের তলা পর্যন্ত শীতল হয়ে গেল। আমিতা নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললাম, পান করুন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনভাবে পান করলেন যে, আমি সন্তুষ্ট হলাম। এরপর আমরা যাত্রা করলাম এবং অনুসন্ধানকারী আমাদের পিছনে ছিল।
বারা বলেন, আমি আবূ বকরের সঙ্গে তার ঘরে ঢুকালাম। তখন দেখলাম তার মেয়ে আয়িশাহ বিছানায় শুয়ে আছেন। তার জ্বর হয়েছে। তার পিতা আবূ বাকর -কে দেখলাম তিনি মেয়ের গালে চুমু খেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, মা তুমি কেমন আছ?
নবী (ﷺ)-এর খাদিম আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মদিনায় আগমন করলেন। এই সময় তার সাহাবীদের মধ্যে সাদা কাল চুলওয়ালা আবূ বাকর ছাড়া অন্য কেউ ছিলেন না। তিনি তার চুলে মেহদী ও কতম (এক প্রকার পাতা) একত্র করে কলপ লাগিয়েছিলেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মদিনায় এলেন, তখন তার সাহাবীদের মধ্যে আবূ বাকর ছিলেন সবচেয়ে বয়স্ক। তিনি মেহেদী ও কতম একত্র করে কলপ লাগিয়েছিলেন। এতে তার সাদা চুল টুকটুকে লাল রং ধারণ করেছিল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বাকর কালব গোত্রের উম্মে বাকর নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করলেন। যখন আবূ বাকর হিজরাত করেন, তখন তাকে তালাক দিয়ে যান। তারপর ঐ মহিলাকে তার চাচাত ভাই বিয়ে করে নিল। এই লোকটিই হল সেই কবি যে বদর যুদ্ধে নিহত কুরাইশ কাফিরদের শোকগাঁথা রচনা করেছিল। বাদ্র প্রান্তে কালীব নামক কূপে নিক্ষিপ্ত ঐ সব কাফিরগণ আজ কোথায় যাদের শিযা নামক কাঠের তৈরি খাদ্য-পাত্রে উটের কুঁজের গোশতে সুসজ্জিত থাকত। বদরের কালীব কূপে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিগণ আজ কোথায় যারা গায়িকা ও সম্মানিত মদ্যপানকারী নিয়ে নিমগ্ন ছিল। উম্মু বাকর শান্তির স্বাগত জানাচ্ছে। আর আমার কাওমের পর আমার জন্য শান্তি কোথায়? রাসূল আমাদের বলেছেন যে, শীঘ্রই আমাদের জীবিত করা হবে। কিন্তু চলে যাওয়া আত্মা ও মাথার খুলির জীবন ফিরবে আবার কিভাবে?"
আবূ বাকর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে গুহায় ছিলাম। আমি আমার মাথা উঠিয়ে উপরের দিকে তাকালাম এবং লোকের পা দেখতে পেলাম। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! তাদের কেউ নীচের দিকে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে। তিনি বললেন, হে আবূ বাকর! চুপ থাক। আমরা দু'জন আল্লাহ হলেন যাদের তৃতীয়।
আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন বেদুঈন নবী (ﷺ)-এর কাছে এল এবং তাকে হিজরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি বললেন, ওহে! হিজরাত বড় কঠিন কাজ। এরপর বললেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, হা। তিনি বললেন, তুমি কি উটের সাদকা আদায় কর? সে বলল, হা। তিনি বললেন, তুমি কি উটনীর দুধ অন্যকে পান করতে দাও। সে বলল, হা। তিনি বললেন, যেদিন পানি পান করানোর উদ্দেশ্যে উটগুলি ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন কি তুমি দুধ দোহন করে দান কর? সে বলল, হা। তিনি বললেন, তবে তুমি সমুদ্রের অপর প্রাপ্ত থেকেই নেক আমল করতে থাক। নিশ্চই আল্লাহ তোমার আমলের কিছুই ঘাটতি করবেন না।
বারা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বাগ্রে আমাদের মধ্যে মদিনায় আগমন করেন মুস'আব ইবন উমায়ের ও ইবন উম্মু মাকতুম। অতঃপর আমাদের কাছে আসেন আম্মার ইবন ইয়াসির ও বিলাল
বারা' ইবন আযিব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সর্বাগ্রে আমাদের মধ্যে মদিনায় আসলেন মুস'আব ইবন উমায়ের এবং ইবন উম্মু মাকতুম। তারা লোকদের কুরআন পড়াতেন। তারপর আসলেন, বিলাল, সাদ ও আম্মার ইবন ইয়াসির এরপর উমার ইবন খাত্তাব নবী (ﷺ)-এর বিশজন সাহাবীসহ মদিনায় আসলেন। তারপর নবী (ﷺ) আগমন করলেন। তার আগমনে মদিনাবাসী যতখানি আনন্দিত হয়েছিল ততখানি আনন্দিত হতে কখনো দেখিনি। এমনকি দাসীগণও বলছিল, নবী (ﷺ) শুভাগমন করেছেন। বারা বলেন, তার আগমনের পূর্বেই মুফাস্সালের কয়েকটি সূরাহসহ আমি 'আল-আলা' সূরাহ পর্যন্ত পড়ে ফেলেছিলাম।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন, তখন আবূ বাকর ও বিলাল ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাদেরকে দেখতে গেলাম এবং বললাম, আববাজান, কেমন আছেন? হে বিলাল, আপনি কেমন আছেন? আয়িশাহ বলেন, আবূ বাকর জ্বরে পড়লেই এ পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতেন। "প্রতিটি ব্যক্তিকে নিজ পরিবারে সুপ্রভাত বলা হয়; অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও অতি নিকটে।" আর বিলাল-এর অবস্থা ছিল এই যখন তার জ্বর ছেড়ে যেত; তখন কন্ঠস্বর উচু করে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতেনঃ "হায়, আমি যদি জানতাম আমি এ মক্কা উপত্যকায় আবার রাত্রি কাটাতে পারব কিনা; যেখানে ইয্খির ও জলীল ঘাস আমার চারপাশের বিরাজমান থাকত। হায়, আর কি আমার ভাগ্যে জুটবে যে, আমি মাজান্নাহ নামক কূপের পানি পান করতে পারব! এবং শামাহ ও তাফিল পাহাড় কি আর আমার চোখে পড়বে!" আয়িশাহ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে এ সংবাদ জানালাম। তখন তিনি এ দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! মদিনাকে আমাদের প্রিয় করে দাও যেমন প্রিয় ছিল আমাদের মক্কা বরং তার থেকেও অধিক প্রিয় করে দাও। আমাদের জন্য মদিনাকে স্বাস্থ্যকর করে দাও। মদিনার সা ও মুদ এর মধ্যে বকরত দান কর। আর এখানকার জ্বরকে সরিয়ে জুহ্ফায় নিয়ে যাও।
উবাইদুল্লাহ ইবন আদী বলেন, আমি "উসমান-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তিনি আমার বক্তব্য শুনার পর তাশাহ্হুদ পাঠের পর বললেন, আম্মা বা'দু। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন। যারা আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর আহবানে সাড়া দিয়েছিলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে যে সত্যসহ প্রেরণ করা হয়েছিল তৎপ্রতি ঈমান এনেছিলেন আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম। উভয় হিজরাতে[১] অংশ নিয়েছি। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জামাতা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি। আমি তার হাতে বায়আত করেছি, আল্লাহর শপথ আমি কখনো তার নাফরমানী করিনি তার সাথে প্রতারণা করিনি। এই অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণনা করেন, যে বছর উমার শেষ হাজ্জ আদায় করেন সে বছর আবদুর রহমান ইবন 'আউফ মিনায় তার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন এবং সেখানে আমার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। আবদুর রহমান বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, হাজ্জ মওসুমে বুদ্ধিমান ও বুদ্ধিহীন সব রকমের মানুষ জড় হয়। তাই আমার বিবেচনায় আপনি ভাষণ দান করবেন না এবং মদিনা গিয়ে ভাষণ দান করুন। মদিনা হল দারুল হিজরাত, (হিজরাতের স্থান) রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাতের পবিত্র ভূমি। সেখানে আপনি অনেক জ্ঞানী, গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত লোককে একত্র পাবেন। উমার বললেন, মদিনায় গিয়েই প্রথমেই অবশ্যই আমার ভাষণ দিব।
খারিজাহ ইবন যায়দ ইবন সাবিত বলেন, উম্মুল 'আলা' নাম্নী এক আনসারী মহিলা নবী (ﷺ)-এর হাতে বায়আত করেন। তিনি বর্ণনা করেন, যখন মুহাজিরদের বাসস্থানের ব্যাপারে আনসারদের মধ্যে লটারী হয় তখন উসমান ইবন মায'উনের বসবাস আমাদের অংশে পড়ল। উম্মুল 'আলা বলেন, এরপর তিনি আমাদের এখানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি তার সেবা শুশ্রূষা করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়ে গেল। আমরা কাফনের কাপড় পরিয়ে দিলাম। তারপর নবী (ﷺ) আমাদের এখানে আসলেন। ঐ সময় আমি উসমান-কে লক্ষ্য করে বলছিলাম। হে আবূ সায়িব! তোমার উপর আল্লাহর রহমত হোক। তোমার সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ নিশ্চই তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নবী (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন করে জানলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার মাতা-পিতা আপনার উপর কুরবান হোক। হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো জানি না। তবে কাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন? নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহর শপথ! উসমানের মৃত্যু হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আমি তার সম্পর্কে কল্যাণের আশা পোষণ করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানিনা আল্লাহ আমার সাথে কী ব্যবহার করবেন। উম্মুল 'আলা' বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি এ কথা শুনার পর আর কাউকে পূত-পবিত্র বলব না। উম্মুল 'আলা' বলেন, নবী (ﷺ)-এর এ কথা আমাকে চিন্তিত করল। এরপর আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, "উসমান ইবন মায'উন-এর জন্য একটি নহর জারি রয়েছে। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে আমার স্বপ্নটি বললে তিনি বললেন, এ হচ্ছে তার সৎ আমল"।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বু'আস যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ ছিল যা আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-এর পক্ষে তার হিজরাতের পূর্বেই সংঘটিত করিয়েছিলেন, যা তাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সহায়ক হয়েছিল। রাসূল (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন তখন তাদের গোত্রগুলো ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে নানা দলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের অনেক নেতা নিহত হয়েছিল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, আবূ বাকর ঈদুল তিফত্র অথবা ঈদুল আযহার দিনে তাকে দেখতে এলেন। তখন নবী (ﷺ) আয়িশাহ-এর বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় দু'জন অল্প বয়স্কা বালিকা এ কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করছিল যা আনসারগণ বু'আস যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিল। তখন আবূ বাকর দু'বার বললেন, এ হল শয়তানের ঢাল। নবী (ﷺ) বললেন, হে আবূ বাকর, ওদেরকে ছাড়। প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই 'ঈদ আছে আর আজ হল আমাদের 'ঈদের দিন।
আনাস ইবন মালিক বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন তখন মদিনার উচু এলাকার আমর ইবন 'আউফ গোত্রে অবস্থান করলেন। আনাস বলেন, সেখানে তিনি চৌদ্দ দিন থাকলেন। এরপর তিনি বানু নাজ্জারের নেতৃস্থানীয় লোকেদের কাছে খবর পাঠালেন। তারা সকলেই তরবারি ঝুলিয়ে হাযির হলেন। আনাস বলেন, সেই দৃশ্য এখনো যেন আমি দেখতে পাচ্ছি। রাসূল (ﷺ) তার সওয়ারীর উপর এবং আবূ বাকর তার পিছনে উপবিষ্ট রয়েছেন, আর বনু নাজ্জারের নেতাগণ রয়েছেন তাদের পার্শ্বে। অবশেষে আবূ আইউব-এর বাড়ির চত্বরে তিনি (ﷺ) তার মালপত্র নামালেন। রাবী বলেন, ঐ সময় রাসূল (ﷺ) যেখানেই সালাতের সময় হত সেখানেই সালাত আদায় করে নিতেন। এবং তিনি কোন কোন সময় ছাগল-ভেড়ার খোয়াড়েও সালাত আদায় করতেন। রাবী বলেন, তারপর তিনি মাসজিদ তৈরির নির্দেশ দিলেন। তিনি বনী নাজ্জারের নেতাদের ডাকলেন এবং তারা এলে তিনি বললেন, তোমাদের এ বাগানটি আমার নিকট বিক্রি কর। তারা বলল, আল্লাহর শপথ, আমরা বিক্রি করব না। আল্লাহ শপথ-এর বিনিময় আল্লাহর নিকটই চাই। রাবী বলেন, এখানে কি ছিল, আমি তোমাদের বলছি স্থানে তখন ছিল মুশরিকদের পুরাতন কবর, বাড়ী ঘরের কিছু ভগ্নাবশেষ কয়েকটি খেজুরের গাছ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশে মুশরিকদের কবরগুলি মিশিয়ে দেয়া হল। ভগ্ন চিহ্ন সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলা হল। রাবী বলে, কাটা খেজুর গাছের কান্ডগুলি মসজিদের কেবলার দিকে এর খুটি হিসেবে এক লাইনে স্থাপন করা হল এবং খুটির ফাকা স্থানে রাখা হল পাথর। তখন সহাবাগণ পাথর বয়ে আনছিলেন এবং ছন্দ যুক্ত কবিতা আবৃত্তি করছিলেনঃ আর রাসূল (ﷺ) তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন এবং বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আসল কল্যাণ কেবলমাত্র আখিরাতের কল্যাণ। হে আল্লাহ! তুমি মুহাজির ও আনসারদের সাহায্য কর।
উমার ইবন আবদুল আযীয হতে বর্ণিত। তিনি সাইব ইবন উখতিননাম্র কে জিজ্ঞস করলেন, আপনি মক্কায় অবস্থান ব্যাপারে কী শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি 'আলা ইবন হাযরামী-এর কাছে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মুহাজিরদের জন্য তাওয়াফে সদর আদায় করার পর তিন দিন মক্কায় থাকার অনুমতি আছে।
সাহল ইবন সাদ বর্ণনা করেন, লোকেরা বছর গণনা নবী (ﷺ)-এর নবুয়াত প্রাপ্তির দিন হতে করেনি এবং তার মৃত্যুর দিন থেকেও করেনি বরং তার মদিনায় হিজরাত হতে বছর গণনা করা হয়েছে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রথম অবস্থায় দু' দু' রাকাত করে সালাত ফরয করা হয়েছিল। অতঃপর নবী (ﷺ) যখন হিজরাত করলেন, ঐ সময় সালাত চার রাকাত করে দেয়া হয়। এবং সফর কালে আগের অবস্থা দু' রাকাত বহাল রাখা হয়।
সাদ ইবন মালিক বলেন, বিদায় হাজ্জের বছর আমি ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কাছাকাঠি হই তখন রাসূল (ﷺ) আমাকে দেখতে আসেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার রোগ কি পর্যায় পৌছেছে তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন সম্পদশালী। আমার ওয়ারিশ হচ্ছে একটি মাত্র কন্যা। আমি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ আল্লাহর রাস্তায় সাদকা করে দিব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তবে কি অর্ধেক? তিনি বললেন, হে সাদ, এক তৃতীয়াংশ দান কর। এবং এক তৃতীয়াংশই অনেক বেশি। তুমি তোমার ছেলে-মেয়েদেরকে সম্পদশালী রেখে যাও তা-ই উত্তম, এর চেয়ে তুমি তাদেরকে নিঃস্ব রেখে গেলে যে তারা অন্যের নিকট ভিক্ষে করে। আহমাদ ইবন ইউসুফ.....ইব্রাহীম হতে এ কথাগুলোও বর্ণনা করেছেন। তুমি তোমার ওয়ারিশদের সম্পদশালী রেখে যাবে আর তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যা কিছু ব্যয় করবে, আল্লাহ তার প্রতিদান তোমাকে দেবেন। তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমাটি তুলে দিবে এর প্রতিদানও আল্লাহ তোমাকে দেবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার সাথী সঙ্গীদের হতে পশ্চাতে থাকব? তিনি বললেন, তুমি কক্ষনো পিছে পড়ে থাকবে না আর এ অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে তুমি যে কোন নেক আমল করবে তাহলে তোমার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি হবে। সম্ভবতঃ তুমি বয়স বেশি পাবে এবং এর ফলে তোমার দ্বারা অনেক মানুষ উপকৃত এবং অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবীদের হিজরাতকে অটুট রাখুন। তাদেরকে পশ্চাৎমুখী করে ফিরিয়ে নিবেন না। কিন্তু অভাবগ্রস্ত সাদ ইবন খাওলাহর মক্কায় মৃত্যুর কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। আহমাদ ইবন ইউনুস ও মূসা ইব্রাহীম সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তোমার ওয়ারিশদের রেখে যাওয়া....।
আনাস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবন 'আউফ যখন মদিনায় আসলেন, তখন নবী (ﷺ) তার ও সাদ ইবন রাবী' আনসারী-এর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন জুড়ে দিলেন। সাদ তার সম্পদ ভাগ করে অর্ধেক সম্পদ এবং দু'জন স্ত্রীর যে কোন একজন নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদুর রহমানকে অনুরোধ করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ আপনার পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে এখানকার বাজারের রাস্তাটি দেখিয়ে দিন। তিনি মুনাফা হিসেবে কিছু ঘি ও পনির লাভ করলেন। কিছুদিন পরে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে তার দেখা হল। তিনি (ﷺ) তখন তার গায়ে ও কাপড়ে হলুদ রং-এর চিহ্ন দেখতে পেয়ে বললেন, হে আবদুর রাহমান, ব্যাপার কি! তিনি বললেন, আমি একজন আনসারী মহিলাকে বিয়ে করেছি। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, তাকে কী পরিমাণ মোহর দিয়েছ? তিনি বললেন, তাকে খেজুর বিচির পরিমাণ সোনা দিয়েছি। তখন নবী (ﷺ) বললেন, একটি বকরি দিয়ে হলেও ওয়ালীমাহ করে নাও।
আনাস বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম-এর নিকট নবী (ﷺ)-এর মদিনায় আসার খবর পৌছলে তিনি এসে তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি। এগুলোর ঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (১) কিয়ামতের সর্বপ্রথম 'আলামত কী? (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাদ্য কী? (৩) কী কারণে সন্তান আকৃতিতে কখনও পিতার মত কখনো বা মায়ের মত হয়? নবী (ﷺ) বললেন, এ বিষয়গুলি সম্পর্কে এই মাত্র জিব্রাঈল আমাকে জানিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালাম একথা শুনে বললেন, তিনিই ফেরেশ্তাদের মধ্যে ইয়াহূদীদের দুশমন। নবী (ﷺ) বললেন, (১) কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সর্বপ্রথম আলামত লেলিহান অগ্নি যা মানুষকে পূর্বদিক হতে পশ্চিম দিকে ধাবিত করে নিয়ে যাবে এবং সবাইকে একত্র করবে। (২) সর্বপ্রথম খাদ্য যা জান্নাতবাসী খাবে তা হল মাছের কলিজার বাড়তি অংশ (৩) যদি নারীর আগে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান পিতার মত হয় আর যদি পুরুষের আগে নারীর বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান মায়ের মত হয়। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং নিশ্চই আপনি আল্লাহর রাসূল। হে আল্লাহর রাসূল, ইয়াহূদীগণ এমন একটি জাতি যারা অন্যের কুৎসা রটনায় খুব পটু। আমার ইসলাম গ্রহণ প্রকাশ হওয়ার পূর্বে আমার অবস্থা সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন। নবী (ﷺ) তাদেরকে ডাকলেন, তারা হাযির হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মাঝে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান। তিনি আমাদের সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তির সন্তান। নবী (ﷺ) বললেন, আচ্ছা বলত, যদি আবদুল্লাহ্ ইবন সালাম ইসলাম কবুল করে তাহলে কেমন হবে? তোমরা তখন কি করবে? তারা বলল, আল্লাহ তাকে একাজ হতে রক্ষা করুন। নবী (ﷺ) আবার এ কথাটি বললেন, তারাও আগের মত উত্তর দিল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম বেরিয়ে আসলেন, এবং বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল!"" তা শুনে ইয়াহূদীগণ বলতে লাগল, সে আমাদের মধ্যে খারাপ লোক এবং খারাপ লোকের সন্তান। অতঃপর তারা তাকে তুচ্ছ করার উদ্দেশে আরো অনেক কথাবার্তা বলল। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটাই আশংকা করেছিলাম।
আবদুর রাহমান ইবন মুত্'ঈম বলেন, আমার ব্যবসায়ের একজন অংশীদার কিছু দিরহাম বাজারে নিয়ে বাকীতে বিক্রি করে। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! এমন কেনাবেচা কি জায়িয? তিনিও বললেন, সুবহানাল্লাহ্! আল্লাহর শপথ, আমি তা খোলা বাজারে বিক্রি করেছি তাতে কেউ ত আপত্তি করেন নি। এরপর আমি বারা' ইবন আযিব কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন তখন আমরা এ রকম বাকীতে কেনাবেচা করতাম; তখন তিনি বললেন যদি নগদ হয় তবে তাতে কোন বাধা নেই। আর যদি ধারে হয় তবে জায়িয হবে না। তুমি যায়েদ ইবন আরকাম-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করে নাও। কেননা তিনি আমাদের মধ্যে একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। এরপর আমি যায়দ ইবন আরকামকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও এ রকমই বললেন। রাবী সুফইয়ান হাদীসটি কখনও এভাবে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) যখন মদিনায় আমাদের কাছে আসেন, তখন আমরা হাজ্জের মৌসুম পর্যন্ত মিয়াদে বাকীতে কেনাবেচা করতাম।
পূর্বের হাদিসের মতই (৩৯৩৯)।
আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যদি আমার উপর দশজন ইয়াহূদী ঈমান আনত তবে গোটা ইয়াহূদী সম্প্রদায়ই ঈমান আনত।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন মদিনায় আসলেন, তখন ইয়াহূদী সম্প্রদায়ের কিছু লোক আশুরার দিনকে খুব সম্মান করত এবং সেদিন তারা সাওম পালন করত। এতে নবী (ﷺ) বললেন, ইয়াহূদীদের চেয়ে ঐ দিন সাওম পালন করার আমরা বেশি হকদার। তারপর তিনি সবাইকে সাওম পালন করার নির্দেশ করলেন।
ইবন আব্বাস বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) যখন মদিনায় আসেন তখন দেখতে পেলেন ইয়াহূদীরা 'আশুরা দিবসে সাওম পালন করে। তাদেরকে সাওম পালনের কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এদিনই আল্লাহ তাআলা মূসা ও বনী ইসরাঈলকে ফিরাউনের উপর বিজয় দিয়েছিলেন। তাই আমরা ঐ দিনের সম্মানে সাওম পালন করি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মূসা-এর বেশি নিকটবর্তী। এরপর তিনি সাওম পালনের নির্দেশ দিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) চুলে সিঁথি না কেটে সোজা পিছনে দিতেন। আর মুশরিকরা তাদের চুলে সিঁথি কাটত। আহলে কিতাব সিঁথি কাটত না। নবী (ﷺ) আল্লাহর নিকট হতে কোন নির্দেশ না আসা পর্যন্ত আহলে কিতাবের অনুকরণ পছন্দ করতেন। তারপর (ওয়াহী মুতাবেক) তার মাথায় সিঁথি কাটলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এরাই তো সেই আহলে কিতাব যারা ভাগাভাগি করে ফেলেছে, কোন কোন বিষয়ের উপর ঈমান এনেছে আর কোন কোন বিষয়কে অস্বীকার করেছে। রাবী আল্লাহর এ বাণী বুঝাতে চেয়েছেন-"যারা কুরআনকে খন্ড খন্ড করেছে" (আল-হিজরঃ ৯১)
সালমান ফারসী হতে বর্ণিত, তিনি দশ জনেরও অধিক মালিকের অধীনে হাত বদল হতে থাকেন।
আবূ "উসমান বলেন, আমি সালমান-কে বলতে শুনেছি; তিনি বলেন, আমি রাম হুরমুয এর বাসিন্দা।
সালমান ফারসী বলেন, ঈসা এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মধ্যে ছয় শত বছরের পার্থক্য ছিল।