bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নবী (ﷺ) এর নেতৃত্বে সামরিক অভিযান (৩৯৪৯-৪৪৭৩)

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যায়দ ইবন আরকামের পাশে ছিলাম। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, নবী (ﷺ) কয়টি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বললেন, ঊনিশটি। আবার জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কয়টি যুদ্ধে তার সঙ্গে ছিলেন? তিনি বললেন, সতেরটিতে। বললাম, এসব যুদ্ধের কোনটি সর্বপ্রথম সংঘটিত হয়েছিল? তিনি বললেন, উশাইরাহ বা উশায়র। বিষয়টি আমি ক্বাতাদাহ-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনিও বললেন, উশায়র।

সাদ ইবন মুআয হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তার ও উমাইয়াহ ইবন খালফের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। উমাইয়াহ মদিনায় আসলে সাদ ইবন মু'আযের মেহমান হত এবং সাদ মক্কায় গেলে উমাইয়াহর আতিথ্য গ্রহণ করতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় হিজরাত করার পর একবার সাদ উমরাহ করার উদ্দেশে মক্কা গেলেন এবং উমাইয়াহর বাড়িতে অবস্থান করলেন। তিনি উমাইয়াহ্কে বললেন, আমাকে এমন একটি নিরিবিলি সময়ের কথা বল যখন আমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারব। তাই দুপুরের কাছাকাছি সময়ে একদিন উমাইয়াহ তাকে সঙ্গে নিয়ে বের হল, তখন তাদের সঙ্গে আবূ জাহলের দেখা হল। তখন সে (উমাইয়াহ্কে লক্ষ্য করে) বলল, হে আবূ সফ্ওয়ান! তোমার সঙ্গে ইনি কে? সে বলল, ইনি সাদ। তখন আবূ জাহ্ল তাকে (সাদ ইবন মুআযকে) বলল, আমি তোমাকে নিরাপদে মক্কায় তাওয়াফ করতে দেখছি অথচ তোমরা ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দিয়েছ এবং তাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে চলেছ। আল্লাহর কসম, তুমি আবূ সফওয়ানের (উমাইয়াহ) সঙ্গে না থাকলে তোমার পরিজনদের কাছে নিরাপদে ফিরে যেতে পারতে না। সাদ এর চেয়েও উচ্চস্বরে বললেন, আল্লাহর কসম, তুমি এতে যদি আমাকে বাধা দাও তাহলে আমিও এমন একটি বিষয়ে তোমাকে বাধা দেব যা তোমার জন্য এর চেয়েও কঠিন হবে। মদিনার পার্শ্ব দিয়ে তোমার যাতায়াতের রাস্তা (বন্ধ করে দেব)। তখন উমাইয়াহ তাকে বলল, হে সাদ! এ উপত্যকার সর্দার আবুল হাকামের সঙ্গে এরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না। তখন সাদ বললেন, হে উমাইয়াহ! তুমি চুপ কর। আল্লাহর কসম, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, তারা তোমার হত্যাকারী। উমাইয়াহ জিজ্ঞেস করল, মক্কার বুকে? সাদ বললেন, তা জানি না। উমাইয়াহ এতে অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। এরপর উমাইয়াহ বাড়ী গিয়ে তার (স্ত্রীকে) বলল, হে উম্মু সফওয়ান! সাদ আমার ব্যাপারে কী বলেছে জান? সে বলল, সাদ তোমাকে কী বলেছে? উমাইয়াহ বলল, সে বলেছে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তাদেরকে জানিয়েছেন যে, তারা আমার হত্যাকারী। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তা কি মক্কায়? সে বলল, তা জানি না। অতঃপর উমাইয়াহ বলল, আল্লাহর কসম, আমি কখনো মক্কা হতে বের হব না। কিন্তু বদর যুদ্ধের দিন আগত হলে আবূ জাহ্ল সকল জনসাধারণকে সদলবলে বের হওয়ার আহবান জানিয়ে বলল, তোমরা তোমাদের কাফেলা রক্ষা করার জন্য অগ্রসর হও। উমাইয়াহ বের হাওয়াকে অপছন্দ করলে আবূ জাহ্ল এসে তাকে বলল, হে আবূ সফ্ওয়ান। তুমি এ উপত্যকার অধিবাসীদের নেতা, তাই লোকেরা যখন দেখবে তুমি পেছনে রয়ে গেছ তখন তারাও তোমার সঙ্গে পেছনেই থেকে যাবে। এ বলে আবূ জাহ্ল তার সঙ্গে পীড়াপীড়ি করতে থাকলে সে বলল, তুমি যেহেতু আমাকে বাধ্য করে ফেলছ তাই আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি এমন একটি উষ্ট্র ক্রয় করব যা মক্কার মধ্যে সবচেয়ে ভাল। এরপর উমাইয়াহ (স্ত্রীকে) বলল, হে উম্মু সফ্ওয়ান! আমার সফরের ব্যবস্থা কর। স্ত্রী বলল, হে আবূ সফ্ওয়ান! তোমার মদিনাবাসী ভাই যা বলেছিলেন তা কি তুমি ভুলে গিয়েছ? সে বলল, না। আমি তাদের সঙ্গে মাত্র কিছু দূর যেতে চাই। রওয়ানা হওয়ার পর রাস্তায় যে মান্যিলেই উমাইয়াহ কিছুক্ষণ অবস্থান করেছে সেখানেই সে তার উট বেধে রেখেছে। সারা রাস্তায় সে এমন করল, শেষে বদর প্রান্তরে মহান আল্লাহ তাকে হত্যা করলেন।

আবদুল্লাহ ইবন কা'ব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক-কে বলতে শুনেছি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে সব যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে তাবূকের যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম না। তবে বদর যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। কিন্তু বদর যুদ্ধে যারা যোগদান করেননি তাদেরকে কোন প্রকার দোষারোপ করা হয়নি। আসলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশ কাফিলার উদ্দেশেই যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা ব্যতীতই আল্লাহ তাআলা তাদের (মুসলিমদের) সঙ্গে তাদের দুশমনদের মুকাবালা করিয়ে দেন।

ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মিকদাদ ইবন আসওয়াদের এমন একটি বিষয় দেখেছি যা আমি করলে তা দুনিয়ার সব কিছুর তুলনায় আমার নিকট প্রিয় হত। তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি (ﷺ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে দু'আ করছিলেন। এতে মিকদাদ ইবন আসওয়াদ বললেন, মূসা এর কাওম যেমন বলেছিল যে, "তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর"- (আল-মায়িদাহ ৫/২৪)। আমরা তেমন বলব না, বরং আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে, পেছনে সর্বদিক থেকে যুদ্ধ করব। ইবন মাস'উদ বলেন, আমি দেখলাম, নবী (ﷺ)-এর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তার কথা তাকে খুব আনন্দিত করল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের দিন নবী (ﷺ) বলেছিলেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আপনি যদি চান (কাফিররা জয়লাভ করুক) তাহলে আপনার ইবাদাত আর হবে না। আবূ বাকর তার হাত ধরে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ আয়াত পড়তে পড়তে বের হলেনঃ "শীঘ্রই দুশমনরা পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে"- (ক্বামার ৫৪/৪৫)।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "মুমিনদের মধ্যে তারা সমান নয় যারা (বদরে না গিয়ে) বসে ছিল"- (আন-নিসা ৪/৯৫)। এবং যারা বদরে হাজির হয়েছিল মর্মে (আয়াতটি) বাদর এবং তদুদ্দেশে ঘর ছেড়ে বের হওয়া সাহাবীদের ব্যাপারে (নাযিল হয়)।

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের দিন আমাকে ও ইবন উমারকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক গণ্য করা হয়েছিল।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের দিন আমাকে ও ইবন উমারকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক গণ্য করা হয়েছিল, এ যুদ্ধে মুহাজিরদের সংখ্যা ছিল ষাটের বেশী এবং আনসারদের সংখ্যা ছিল দুশ' চল্লিশেরও অধিক।

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর যে সব সাহাবী বদরে উপস্থিত ছিলেন তারা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সংখ্যা তালুতের যে সব সঙ্গী নদী পার হয়েছিলেন তাদের সমান ছিল। তাদের সংখ্যা ছিল তিনশ' দশেরও কিছু বেশী। বারা' বলেন, আল্লাহর কসম, ঈমানদার ব্যতীত আর কেউই তার সঙ্গে নদী পার হতে পারেনি।

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ পরস্পর আলোচনা করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সংখ্যা তালুতের সঙ্গে যারা নদী পার হয়েছিলেন তাদের সমানই ছিল এবং তিনশ' দশ জনের অধিক ঈমানদার ব্যতীত কেউ তার সঙ্গে নদী পার হতে পারেনি।

বারা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা পরস্পর আলোচনা করতাম যে, বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সাহাবীগণের সংখ্যা তিনশ' দশ জনেরও কিছু অধিক ছিল, তালুতের যে সংখ্যক সাথী তার সঙ্গে নদী পার হয়েছিল; মুমিন ব্যতীত কেউ তার সঙ্গে নদী পার হতে পারেনি।

আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কাবার দিকে মুখ করে কুরাইশের কতিপয় লোকের তথা- শায়বাহ্ ইবন রাবীআহ, 'উত্বাহ ইবন রাবীআ, ওয়ালীদ ইবন 'উত্বাহ এবং আবূ জাহ্ল ইবন হিশামের বিরুদ্ধে দু'আ করেন। আমি আল্লাহর নামে সাক্ষ্য দিচ্ছি, অবশ্যই আমি এ সমস্ত লোকদেরকে (বদরের ময়দানে) নিহত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখেছি। প্রচন্ড রোদ তাদের দেহগুলোকে বিকৃত করে দিয়েছিল। দিনটি ছিল প্রচন্ড গরম।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, বদর যুদ্ধের দিন আবূ জাহ্ল যখন মৃত্যুর মুখোমুখী তখন তিনি (আবদুল্লাহ) তার কাছে গেলেন। তখন আবূ জাহ্ল বলল, (আজ) তোমরা যাকে হত্যা করলে তার চেয়ে নির্ভরযোগ্য লোক আর আছে কি?

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (বদরের দিন) নবী (ﷺ) বললেন, আবূ জাহলের কী অবস্থা হল কেউ তা দেখতে পার কি? তখন ইবন মাসঊদ বের হলেন এবং দেখতে পেলেন যে, 'আফ্রার দুই পুত্র তাকে এমনিভাবে মেরেছে যে, মুমূর্ষু অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বললেন, তুমিই কি আবূ জাহ্ল? রাবী বলেনঃ আবূ জাহ্ল বললঃ সেই লোকটির চেয়ে উত্তম আর কেউ আছে কি যাকে তার গোত্রের লোকেরা হত্যা করল অথবা বলল তোমরা যাকে হত্যা করলে? আহমাদ ইবন ইউনুসের বর্ণনায় এসেছে, তুমি আবূ জাহ্ল।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, বদরের দিন নবী (ﷺ) বললেন, আবূ জাহ্ল কী করল, তোমাদের মধ্যে কে তা জেনে আসবে? তখন ইবন মাস'উদ চলে গেলেন এবং তিনি দেখতে পেলেন, 'আফরার দুই পুত্র তাকে এমনিভাবে পিটিয়েছে যে, সে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। তখন তিনি তার দাড়ি ধরে বললেন,তুমি কি আবূ জাহ্ল? উত্তরে সে বলল, সেই লোকটির চেয়ে উত্তম আর কেউ আছে কি যাকে তার গোত্রের লোকেরা হত্যা করল অথবা বলল তোমরা যাকে হত্যা করলে?

ইব্রাহীমের দাদা থেকে বাদর তথা 'আফরার দুই ছেলের সম্পর্কে এক রেওয়ায়ত বর্ণনা করেছেন।

আলী ইবন আবূ তালিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সর্বপ্রথম আমিই কিয়ামতের দিন দয়াময়ের সামনে বিবাদ মীমাংসার জন্য হাটু গেড়ে বসব। ক্বায়স ইবন 'উবাদ বলেন, এদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছেঃ "এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে"- (হাজ্জ ২২/১৯)। তিনি বলেন, (মুসলিম পক্ষের) তারা হলেন হাম্যা, আলী ও উবাইদাহ অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) আবূ উবাইদাহ ইবন হারিস (অপরপক্ষে) শায়বা ইবন রাবীআহ, 'উত্বাহ ইবন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ ইবন 'উত্বাহ যারা বদর যুদ্ধের দিন পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ "এরা দু'টি বিবদমান দল তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে"- (হাজ্জ ২২/১৯) আয়াতটি কুরাইশ গোত্রীয় ছয়জন লোক সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা হলেন, (মুসলিম পক্ষ) আলী, হামযাহ, উবাইদাহ ইবন হারিস ও (কাফির পক্ষে) শায়বা ইবন রাবীআহ, 'উত্বাহ ইবন রাবীআহ এবং ওয়ালীদ ইবন 'উত্বাহ।

কায়স ইবন উবাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী বলেছেনঃ "এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ, তারা তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে বিতর্ক করে"- ( হাজ্জ ২২/১৯) আয়াতটি আমাদের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে।

কায়স ইবন উবাদ হতে বর্ণিত। (তিনি বলেছেন) আমি আবূ যার-কে কসম করে বলতে শুনেছি যে, উপর্যুক্ত আয়াতগুলো উল্লিখিত বদরের দিন ঐ ছয় ব্যক্তি সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল।

ক্বায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি আবূ যার-কে কসম করে বলতে শুনেছি যে, "এরা দু'টি বিবদমান পক্ষ তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্ক করে" আয়াতটি বদরের দিন পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হামযা, আলী, উবাইদাহ ইবন হারিস, রাবীআহর দুই পুত্র 'উত্বাহ ও শায়বাহ এবং ওয়ালীদ ইবন 'উত্বাহর সম্বন্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত যে, আমি শুনলাম, এক ব্যক্তি বারা-কে জিজ্ঞেস করল, আলী কি বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন? তিনি বললেন, আলী ঐ যুদ্ধে মুকাবালা করেছিলেন এবং হাক্কে বিজয়ী করেছিলেন।

আবদুর রাহমান ইবন 'আওফ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমাইয়াহ ইবন খালফে্র সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলাম। বদর যুদ্ধের দিন তিনি উমাইয়াহ ইবন খালাফ ও তার পুত্রের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করলে বিলাল বললেন, যদি উমাইয়াহ ইবন খালাফ প্রাণে বেচে যেত তাহলে আমি সফল হতাম না।

আবদুল্লাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত যে, তিনি সূরাহ নাজ্ম তিলাওয়াত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সাজ্দাহ করলেন। এক বৃদ্ধ ব্যতীত নবীজীর নিকট যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সকলেই সাজ্দাহ করলেন। সে বৃদ্ধ একমুষ্ঠি মাটি উঠিয়ে কপালে লাগিয়ে বলল, আমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। আবদুল্লাহ বলেন, কিছু দিন পর আমি তাকে কাফির অবস্থায় নিহত হতে দেখেছি।

ইব্রাহীম ইবন মূসা হিশামের পিতা (উরওয়াহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (তার পিতা) যুবায়রের শরীরে তিনটি মারাত্মক জখমের চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। এর একটি ছিল তার স্কন্ধে। উরওয়াহ বলেন, আমি আমার আঙ্গুলগুলো ঐ ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে দিতাম, বর্ণনাকারী উরওয়াহ বলেন, ঐ আঘাত তিনটির দু'টি ছিল বদর যুদ্ধের এবং একটি ছিল ইয়ারমুক যুদ্ধের। উরওয়াহ বলেন, আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়র শহীদ হলেন তখন আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান আমাকে বললেন, হে উরওয়াহ, যুবায়রের তরবারি তুমি কি চিন? আমি বললাম হা চিনি। আবদুল মালিক বললেন, এর কি কোন নিশানা আছে? আমি বললাম, এর ধারে এক জায়গায় ভাঙ্গা আছে যা বদর যুদ্ধের দিন ভেঙ্গে ছিল। তখন তিনি বললেন, হা তুমি ঠিক বলেছ, (তারপর তিনি একটি কবিতাংশ আবৃত্তি করলেন) "সে তরবারির ভাঙ্গন ছিল শত্রু সেনাদের আঘাত করার কারণে।" এরপর আবদুল মালিক তরবারি খানা 'উরওয়ার নিকট ফিরিয়ে দিলেন। হিশাম বলেন, আমরা নিজেরা এর মূল্য স্থির করেছিলাম তিন হাজার দিরহাম। এরপর আমাদের এক ব্যক্তি সেটা নিল। আমার ইচ্ছে হয়েছিল যদি আমি তরবারিটি নিয়ে নিতাম।

হিশামের পিতা (উরওয়াহ) হতে বর্ণিত যে, যুবায়র-এর তরবারি রৌপ্যের কারুকার্য মন্ডিত ছিল। হিশাম বলেন, উরওয়াহ-এর তরবারিটিও রৌপ্যের কারুকার্য মন্ডিত ছিল।

উরওয়াহ হতে বর্ণিত যে, ইয়ারমুকের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহাবাগণ যুবায়র কে বলেন যে, (মুশরিকদের প্রতি) আপনি কি আক্রমণ জোরদার করবেন না তাহলে আমরাও আপনার সঙ্গে আক্রমণ জোরদার করব। তখন তিনি বলেন, আমি যদি আক্রমণ জোরালো করি তখন তোমরা পিছে সরে পড়বে। তখন তারা বললেন, আমরা তা করব না। এরপর তিনি তাদের উপর আক্রমণ করলেন। এমনকি শত্রুদের ব্যুহ ভেদ করে সামনে এগিয়ে গেলেন। তার সঙ্গে আর কেউই ছিল না। ফেরার সময় শত্রুর মুখে পড়লে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে ফেলে এবং তার কাঁধের উপর দু'টি আঘাত করে, যে আঘাত দু'টির মাঝেই রয়েছে বাদর দিনের আঘাতের চিহ্নটি। উরওয়াহ বলেন, বাল্যাবস্থায় ঐ ক্ষত চিহ্নগুলোতে আমার সবগুলো আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে আমি খেলা করতাম। উরওয়াহ আরো বলেন, ঐদিন তার সঙ্গে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র-ও ছিলেন, তখন তার বয়স ছিল দশ বছর। যুবায়র, তাকে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে নিলেন এবং এক ব্যক্তিকে তার দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন।

আবূ ত্বলহা হতে বর্ণিত যে, বদরের দিন আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর নির্দেশে চবিবশজন কুরাইশ সর্দারের লাশ বদর প্রান্তরের একটি নোংরা আবর্জনাপূর্ণ কূপে নিক্ষেপ করা হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন দলের বিরুদ্ধে জয় লাভ করলে সে স্থানের পার্শ্বে তিন দিন অবস্থান করতেন। বদর প্রান্তরে অবস্থানের পর তৃতীয় দিনে তিনি তার সাওয়ারী প্রস্তুত করার আদেশ দিলেন, সাওয়ারীর জিন শক্ত করে বাধা হল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পদব্রজে অগ্রসর হলে সাহাবীগণও তার পেছনে পেছনে চললেন। তারা বলেন, আমরা ভাবছিলাম, কোন প্রয়োজনে তিনি কোথাও যাচ্ছেন। অতঃপর তিনি ঐ কূপের কিনারে গিয়ে দাড়ালেন এবং কূপে নিক্ষিপ্ত ঐ নিহত ব্যক্তিদের নাম ও তাদের পিতার নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন, হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা কি এখন অনুভব করতে পারছ যে, আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য তোমাদের জন্য পরম খুশীর বিষয় ছিল? আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তোমরাও তা সত্য পেয়েছ কি? বর্ণনাকারী বলেন, উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি আত্মাহীন দেহগুলোর সঙ্গে কী কথা বলছেন? নবী (ﷺ) বললেন, ঐ মহান সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, আমি যা বলছি তা তাদের চেয়ে তোমরা অধিক শুনতে পাচ্ছ না। ক্বাতাদাহ বলেন, আল্লাহ রাসূল (ﷺ)-এর কথার মাধ্যমে তাদেরকে ধমক, লাঞ্ছনা, দুঃখ-কষ্ট, আফসোস এবং লজ্জা দেয়ার জন্য (সাময়িকভাবে) তাদের দেহে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি "যারা আল্লাহর অনুগ্রহের পরিবর্তে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে" সূরা ইবরাহীম-এর ২৮ আয়াতাংশ সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহর কসম, এরা হল কাফির কুরাইশ গোষ্ঠী। আমর বলেন, এরা হচ্ছে কুরাইশ গোষ্ঠী এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) হচ্ছেন আল্লাহর নিয়ামাত এবং (নিজেদের জাতিকে তারা নামিয়ে আনে ধ্বংসের পর্যায়ে) সূরা ইবরাহীম-এর ২৮ আয়াতাংশের মাঝে বর্ণিত জাহান্নাম। (বদর যুদ্ধের দিন তারা তাদের জাতিকে জাহান্নামে পৌছিয়ে দিয়েছে।)

হিশামের পিতা (উরওয়াহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'মৃত ব্যক্তিকে তার পরিবার পরিজনদের কান্নাকাটি করার ফলে কবরে শাস্তি দেয়া হয়। ইবন উমার হতে বর্ণিত নবী (ﷺ)-এর কথাটি আয়িশাহ-এর নিকট উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, রাসূল (ﷺ) তো বলেছেন, মৃত ব্যক্তির অন্যায় ও পাপের কারণে তাকে কবরে শাস্তি দেয়া হয়। অথচ তখনও তার পরিবারের লোকেরা তার জন্য কান্নাকাটি করছে।

তিনি [আয়িশাহ] বলেন, এ কথাটি ঐ কথাটিরই মত যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ কূপের পাশে দাড়িয়ে বলেছিলেন, যে কূপে বদর যুদ্ধে নিহত মুশরিকদের নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তিনি তাদেরকে যা বলার বললেন (এবং জানালেন) যে, আমি যা বলছি তারা তা সবই শুনতে পাচ্ছে। তিনি বললেন, এখন তারা ভালভাবে জানতে পারছে যে, আমি তাদেরকে যা বলছিলাম তা ছিল সঠিক। এরপর আয়িশাহ "তুমি তো মৃতকে শুনাতে পারবে না"- (নামল ২৭/৮০) "এবং তুমি শুনাতে সমর্থ হবে না তাদেরকে যারা কবরে রয়েছে"- (ফাতির ৩৫/২২) আয়াতাংশ দু'টো তিলাওয়াত করলেন। উরওয়াহ বলেন, এর মানে হচ্ছে জাহান্নামে যখন তারা তাদের আসন গ্রহণ করে নেবে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বদরে অবস্থিত কূপের পাশে দাড়িয়ে বললেন, (হে মুশরিকগণ) তোমাদের রব তোমাদের কাছে যা ওয়াদা করেছিলেন তা তোমরা সত্য হিসেবে পেয়েছ কি? পরে তিনি বললেন, এ মুহূর্তে তাদেরকে আমি যা বলছি তারা তা সবই শুনতে পাচ্ছে। এ বিষয়টি আয়িশাহ এর সামনে উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, নবী (ﷺ) যা বলেছেন তার অর্থ হল, তারা এখন জানতে পারছে যে, আমি তাদেরকে যা বলতাম তাই সঠিক ছিল। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: "তুমি তো মৃতকে শুনাতে পার না"- (নামল ২৭/৮০) এভাবে পুরো আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৩৯৮০)।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, হারিসাহ একজন নও জওয়ান লোক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করার পর তার আম্মা নবী (ﷺ) নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! হারিসাহ আমার কত প্রিয় ছিল আপনি তা অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি সবর করব এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা পোষণ করব। আর যদি ব্যাপার অন্য রকম হয় তাহলে আপনি তো দেখতেই পাবেন, আমি যা করব। তখন তিনি (ﷺ) বললেন, তোমার কী হল, তুমি কি অজ্ঞান হয়ে গেলে? জান্নাত কি একটি? জান্নাত অনেকগুলি, সে তো জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ মারসাদ, যুবায়র ও আমাকে কোন স্থানে প্রেরণ করেছিলেন এবং আমরা সকলেই ছিলাম অশ্বারোহী। তিনি আমাদেরকে বললেন, তোমরা যাও। যেতে যেতে তোমরা 'রাওযা খাখ' নামক জায়গায় পৌছে সেখানে একজন স্ত্রীলোক দেখতে পাবে। তার কাছে মুশরিকদের প্রতি লিখিত হাতিব ইবন আবূ বালতার একটি চিঠি আছে। (সেটা নিয়ে আসবে।) আলী বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নির্দেশিত জায়গায় গিয়ে তাকে ধরে ফেললাম। সে তখন তার একটি উটের উপর চড়ে পথ অতিক্রম করছিল। আমরা তাকে বললাম, পত্রখানা আমাদের নিকট দিয়ে দাও। সে বলল, আমার নিকট কোন পত্র নেই। আমরা তখন তার উটটিকে বসিয়ে তার তল্লাশী করলাম। কিন্তু পত্রখানা বের করতে পারলাম না। আমরা বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিথ্যা বলেননি। তোমাকে চিঠিটি বের করতেই হবে। নতুবা আমরা তোমাকে উলঙ্গ করে ছাড়ব। যখন আমাদের শক্ত মনোভাব বুঝতে পারল তখন স্ত্রীলোকটি তার কোমরের পরিহিত বস্ত্রের গিঁটে কাপড়ের পুঁটুলির মধ্য থেকে চিঠিখানা বের করে দিল। আমরা তা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সে তো আল্লাহ ও তার রাসূল এবং মুমিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই। তখন নবী [হাতিব ইবন আবূ বালতা কে ডেকে] বললেন, তোমাকে এ কাজ করতে কিসে বাধ্য করল? হাতিব বললেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি আমি অবিশ্বাসী নই। বরং আমার মূল উদ্দেশ্য হল শত্রু দলের প্রতি কিছু অনুগ্রহ করা যাতে আল্লাহ এ উসিলায় আমার মাল এবং পরিবার ও পরিজনকে রক্ষা করেন। আর আপনার সাহাবীদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন আত্মীয় সেখানে রয়েছে, যার দ্বারা আল্লাহ তার ধন-মাল ও পরিজনকে রক্ষা করছেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সে ঠিক কথাই বলেছে। সুতরাং তোমরা তার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত আর কিছু বলো না। তখন উমার বললেন, সে তো আল্লাহ, তার রাসূল ও মুমিনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং আপনি আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তার গর্দার উড়িয়ে দেই। রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, সে কি বাদ্রী সাহাবী নয়? অবশ্যই বদর যুদ্ধে যোগদানকারীদেরকে বুঝে শুনেই আল্লাহ বলেছেনঃ "তোমাদের যা ইচ্ছে কর" তোমাদের জন্য জান্নাত অবধারিত অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এতে উমার-এর দু'নয়ন অশ্রু সিক্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই সবচেয়ে অধিক জ্ঞাত।

আবূ উসায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন নবী (ﷺ) আমাদেরকে বলেছিলেন, দুশমনরা তোমাদের নিকটবর্তী হলে তোমরা তীর চালনা করবে এবং তীর ব্যবহারে সংযম অবলম্বন করবে।

আবূ উসায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তারা তোমাদের নিকটবর্তী হলে তাদের প্রতি তীর চালনা করবে এবং তীর ব্যবহারে সংযম অবলম্বন করবে।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন নবী (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে তীরন্দাজ বাহিনীর নেতা নিযুক্ত করেছিলেন। তারা (মুশরিকরা) আমাদের সত্তর জনকে শহীদ করে দেয়। বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীগণ মুশরিকদের একশ চল্লিশ জনকে নিহত ও গ্রেফতার করে ফেলেছিলেন। যাদের সত্তর জন বন্দী হয়েছিল এবং সত্তর জন নিহত হয়েছিল। আবূ সুফইয়ান বললেন, আজকের দিন হল বদরের বদলা। যুদ্ধ কূপের বালতির মত যাতে হাত বদল হয়।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি স্বপ্নে যে কল্যাণ দেখেছিলাম সে তো ঐ কল্যাণ যা পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন। আর উত্তম প্রতিদান বিষয়ে যা দেখেছিলাম তা তো আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন বদর যুদ্ধের পর।

আবদুর রাহমান ইবন 'আওফ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, বদরের দিন সৈনিক সারিতে দাড়িয়ে আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, আমার ডানে ও বামে কম বয়সের দু'জন যুবক তাদের মত অল্প বয়স্ক দু'জন যুবকের পাশে আমি নিজেকে নিরাপদ বোধ করছিলাম না। এমতাবস্থায় তাদের একজন তার সঙ্গী থেকে লুকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল চাচাজী, আবূ জাহ্ল কোনটি আমাকে দেখিয়ে দিন? আমি বললাম, ভাতিজা, তা দিয়ে তুমি কী করবে? সে বলল, আমি আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি, তাকে দেখলে তাকে হত্যা করব অন্যথায় নিজেই শহীদ হয়ে যাব। এরপর দ্বিতীয় যুবকটিও তার সঙ্গী থেকে লুকিয়ে আমাকে এভাবেই জিজ্ঞেস করল। আমি এত সন্তুষ্ট হলাম যে, দু'জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মাঝে আমি ততটুকু সন্তুষ্ট হতাম না। অতঃপর আমি তাদের দু'জনকে ইশারায় আবূ জাহ্লকে দেখিয়ে দিলাম। তখন তারা বাজ পাখির তীব্রতায় তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে আঘাত করল। এরা হল 'আফরার দু' পুত্র।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইবন উমার ইবন খাত্তাবের নাতি আসিম ইবন সাবিত আনসারীর পরিচালনায় দশজন সাহাবীর একটি দল গোয়েন্দা কাজের জন্য পাঠালেন। তারা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থান হান্দায় পৌছলে হুযাইল গোত্রের একটি শাখা বানু লিহয়ানকে তাদের আগমনের কারণ সম্পর্কে জানানো হয়। (এ সংবাদ শুনে) তারা প্রায় একশ জন তীরন্দাজ প্রস্তুত হয়ে মুসলিমদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য রওয়ানা হয়ে তাদের পদচিহ্ন ধরে পথ চলতে আরম্ভ করে। যেতে যেতে তারা এমন জায়গায় পৌছে যায় যেখানে অবস্থান করে সাহাবীগণ খেজুর খেয়েছিলেন। তা দেখে বানু লিহ্য়ানের লোকেরা ইয়াসরিবের খেজুর বলে তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাদেরকে খুজতে লাগল। আসিম ও তার সঙ্গীগণ তাদের আগমন সম্পর্কে বুঝতে পেরে একটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেন। লিহয়ান কাওমের লোকেরা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। তারপর তারা মুসলিমদেরকে নিচে নেমে আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে বলল, তোমাদেরকে ওয়াদা দিচ্ছি, আমরা তোমাদের কাউকে হত্যা করব না। তখন আসিম ইবন সাবিত বললেন, হে আমার সাথী ভ্রাতৃবৃন্দ! কাফিরের নিরাপত্তায় আশ্বস্ত হয়ে আমি কখনো নিচে নামব না। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমাদের খবর আপনার নবীকে জানিয়ে দিন। এরপর তারা মুসলিমদের প্রতি তীর ছুঁড়তে শুরু করল এবং 'আসিমকে (ছয়জন সহ) শহীদ করে ফেলল। বাকী তিনজন, খুবায়ব, যায়দ ইবন দাসিনা এবং অপর একজন তাদের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে তাদের নিকট নেমে আসলেন। শত্রুগণ তাদেরকে পরাস্ত করে নিজেদের ধনুকের রশি খুলে তা দিয়ে তাদেরকে বেধে ফেলল। এ দেখে তৃতীয়জন বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না, আমার জন্য শহীদ সঙ্গীদের আদর্শই অনুসরণীয়। আমিও শহীদ হয়ে যাব। তারা তাকে বহু টানা হেচড়া করল। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। (তারা তাকে শহীদ করে দিল) এরপর খুবায়ব এবং যায়িদ ইবন দাসিনাকে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে বিক্রি করে দিল। এটা ছিল বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। বদর যুদ্ধে খুবায়ব যেহেতু হারিস ইবন আমিরকে হত্যা করেছিলেন। তাই (বদলা নেয়ার জন্য) হারিস ইবন আমির ইবন নাওফিলের পুত্রগণ তাকে ক্রয় করে নিল। খুবায়ব তাদের নিকট বন্দী অবস্থায় কাটাতে লাগলেন। এরপর তারা সবাই তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করল। তিনি হারিসের কোন এক কন্যার নিকট থেকে ক্ষৌরকর্মের জন্য একটি ক্ষুর চেয়ে নিলেন। হারিসের কন্যার অসতর্ক অবস্থায় তার একটি ছোট বাচ্চা খুবাইবের কাছে গিয়ে পৌছল। হারিসের কন্যা দেখতে পেল খুবায়ব তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রানের উপর বসিয়ে ক্ষুরখানা হাতে ধরে আছেন। হারিসের কন্যা বর্ণনা করেছে, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, খুবায়ব তা বুঝতে পারলেন, তিনি বললেন, আমি শিশুটিকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পেয়েছ? আমি কখনো এমন কাজ করব না। সে আরো বলেছে, আল্লাহর কসম! আমি খুবায়বের মত উত্তম বন্দী আর কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম একদিন আমি তাকে আঙ্গুরের গুচ্ছ হাতে নিয়ে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ সে লোহার শিকলে বাধা ছিল এবং সে সময় মক্কায় কোন ফলই ছিল না। হারিসের কন্যা বলত, ঐ আঙ্গুরগুলো আল্লাহ তাআলা খুবায়বকে রিযিকস্বরূপ দান করেছিলেন। অবশেষে একদিন তারা খুবায়বকে হত্যা করার জন্য যখন হারামের সীমানার বাইরে নিয়ে গেল তখন খুবায়ব তাদেরকে বললেন, আমাকে দু' রাকাত সালাত আদায় করার সুযোগ দাও, তারা সুযোগ দিলে তিনি দু' রাকাত সালাত আদায় করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তোমরা এ কথা না ভাবলে আমি সালাত আরো দীর্ঘায়িত করতাম। এরপর তিনি এ বলে দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে গুণে রাখ, তাদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে হত্যা কর এবং তাদের একজনকেও বাকী রেখ না। তারপর তিনি আবৃত্তি করলেনঃ "আমি যখন মুসলিম হয়ে মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভ করছি, তাই আমার কোনই ভয় নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে কোন অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হোক। তা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই, তাই তিনি ইচ্ছে করলে আমার প্রতিটি কর্তিত অঙ্গে বারাকাত প্রদান করতে পারেন।" এরপর হারিসের পুত্র আবূ সারুআ উকবাহ তার দিকে দাড়াল এবং তাকে শহীদ করে দিল। এভাবেই খুবায়ব সে সব মুসলিমের জন্য দু' রাকাত সালাতের সুন্নাত চালু করে গেলেন যারা ধৈর্যের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐদিনই সাহাবীদেরকে জানিয়েছিলেন যে দিন তারা শত্রু বেষ্টিত হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। কুরাইশদের নিকট আসিম-এর নিহত হওয়ার খবর পৌছলে তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসিমের শরীরের কোন অঙ্গ কেটে আনার জন্য কতক কুরাইশ কাফিরকে প্রেরণ করল। যেহেতু (বদরের দিন) আসিম ইবন সাবিত তাদের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। এদিকে আল্লাহ 'আসিমের লাশকে হিফাযাত করার জন্য মেঘের মত এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন। মৌমাছিগুলো আসিম-এর লাশকে শত্রু সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করল। ফলে তারা তার দেহের কোন অঙ্গ কেটে নিতে পারল না। কা'ব ইবন মালিক বলেন, মুরারাহ ইবন রাবী' আল উমারী এবং হিলাল ইবন উমাইয়াহ আল ওয়াকিফী সম্পর্কে লোকেরা বলেছেন যে, তারা দু'জনই আল্লাহর নেক বান্দা ছিলেন এবং দু'জনই বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।

নাফি হতে বর্ণিত যে, সাঈদ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ছিলেন বদর যুদ্ধে যোগদানকারী একজন সাহাবী। তিনি জুমুআহর দিন অসুস্থ হয়ে পড়লে ইবন উমারের নিকট জুমুআহর দিন এ খবর পৌছলে তিনি সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করে তাকে দেখতে গেলেন। তখন বেলা হয়ে গেছে এবং জুমুআহর সালাতের সময়ও ঘনিয়ে আসছে দেখে তিনি জুমুআহর সালাত ছেড়ে দিলেন।

(আর এক সানাদে) লায়স উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ্ থেকে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা উমার ইবন আবদুল্লাহ ইবন আরকাম আয যুহরী সুবাই'আহ বিনত হারিস আসলামিয়্যা এর কাছে গিয়ে তার ঘটনা ও (গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত সম্পর্কে) তার প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (ﷺ) তাকে যা বলেছিলেন সে সম্পর্কে পত্র মারফত জিজ্ঞেস করে জানতে আদেশ করলেন। এরপর ইবন আবদুল্লাহ ইবন আরকাম আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ্কে লিখে জানালেন যে, সুবাই'আহ বিনতুল হাসির তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি বানু আমির ইবন লুয়াই গোত্রের সাদ ইবন খাওলার স্ত্রী ছিলেন, সাদ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি বিদায় হাজ্জের বছর মারা যান। তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। তার ইন্তিকালের কিছুদিন পরেই তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপর নিফাস থেকে পবিত্র হয়েই তিনি বিবাহের পয়গাম দাতাদের উদ্দেশে সাজসজ্জা আরম্ভ করলেন। এ সময় আবদুদ্দার গোত্রের আবুস সানাবিল ইবন বাকাক নামক এক ব্যক্তি তাকে গিয়ে বললেন, কী ব্যাপার, আমি তোমাকে দেখছি যে, তুমি বিবাহের আশায় পয়গাম দাতাদের উদ্দেশে সাজসজ্জা আরম্ভ করে দিয়েছ? আল্লাহর কসম! চার মাস দশদিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে তুমি বিবাহ করতে পারবে না। সুবাই'আহ বলেন, (আবুস সানাবিল আমাকে) এ কথা বলার পর আমি ঠিকঠাক মত কাপড় চোপড় পরিধান করে বিকেল বেলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গেলাম এবং এ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞস করলাম। তখন তিনি বললেন, যখন আমি সন্তান প্রসব করেছি তখন থেকেই আমি হালাল হয়ে গেছি। এরপর তিনি আমাকে বিয়ে করার নির্দেশ দিলেন যদি আমার ইচ্ছে হয়। ইমাম বুখারী বলেন, আসবাগ....ইউনুসের সূত্রে লায়সের মতই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। লায়স বলেছেন, ইউনুস আমার নিকট ইবন শিহাব থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবন শিহাব বলেন, বানু আমির ইবন লুয়াই গোত্রের আযাদকৃত গোলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুর রহমান ইবন সাওবান আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুহাম্মাদ ইবন ইয়াস ইবন বুকায়র-এর পিতা তাকে জানিয়েছেন।

মুআয ইবন রিফাআ' ইবন রাফি 'যুরাকী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বদর যুদ্ধে যোগদানকারীদের একজন। তিনি বলেন, একদা জিব্রীল নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন, আপনারা বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুসলিমদেরকে কিরূপ গণ্য করেন? তিনি বললেন, তারা সর্বোত্তম মুসলিম অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) এরূপ কোন শব্দ তিনি বলেছিলেন। জিব্রীল (আ) বললেন, মালায়িকাদের মধ্যে বদর যুদ্ধে যোগদানকারীগণও তেমনি মর্যাদার অধিকারী।

মুআয ইবন রিফাআ' ইবন রাফি' হতে বর্ণিত, রিফাঅ' ছিলেন বদর যুদ্ধে যোগদানকারী একজন সাহাবী আর রাফি' ছিলেন বায়আতে আকাবায় উপস্থিত একজন সাহাবী। রাফি' তার পুত্র (রিফাআ')-কে বলতেন, বায়আতে 'আকাবায় শরীক থাকার চেয়ে বদর যুদ্ধে হাজির থাকা আমার কাছে অধিক আনন্দের বিষয় বলে মনে হয় না। কেননা জিবরীল এ বিষয়ে নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

মুআয ইবন রিফাআ' হতে বর্ণিত যে, একজন ফেরেশতা নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। (ভিন্ন সনদে) ইয়াহ্ইয়া হতে বর্ণিত যে, ইয়াযীদ ইবন হাদ তাকে জানিয়েছেন যে, যেদিন মুআয এ হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন সেদিন আমি তার কাছেই ছিলাম। ইয়াযীদ বলেছেন, মুআয বর্ণনা করেছেন যে, প্রশ্নকারী ফেরেশ্তা হলেন জিবরীল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, বদরের দিন নবী (ﷺ) বলেছেন, এই তো জিবরীল সমর সাজে সজ্জিত হয়ে অশ্বের মস্তক হস্তে ধারণ করে আছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আবূ যায়দ মারা যান। তিনি কোন সন্তানাদি ছেড়ে যাননি। তিনি ছিলেন বাদ্রী সাহাবী।

ইবন খববাব হতে বর্ণিত যে, আবূ সাঈদ ইবন মালিক খুদরী সফর থেকে গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর তার পরিবারের লোকেরা তাকে কুরবানীর গোশ্ত থেকে কিছু গোশ্ত খেতে দিলেন। তিনি বললেন, আমি জিজ্ঞেস না করে এ গোশ্ত খেতে পারি না। তারপর তিনি তার মায়ের গর্ভজাত ভ্রাতা কাতাদাহ ইবন নুমানের কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি ছিলেন একজন বাদ্রী সাহাবী। তখন তিনি তাকে বললেন, তিন দিন পর কুরবানীর গোশ্ত খাওয়ার ক্ষেত্রে তোমাদের প্রতি যে নিষেধাজ্ঞা ছিল পরে তা পুরোপুরিভাবে রহিত করে দেয়া হয়েছে।

উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যুবায়র বলেছেন, বদরের দিন আমি উবাইদাহ ইবন সাঈদ ইবন আস কে এমনভাবে বস্ত্রাবৃত দেখলাম যে, তার দু'চোখ ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তাকে আবূ যাতুল কারিশ বলে ডাকা হত। সে বলল, আমি আবূ যাতুল কারিশ। (তা শুনে) বর্শা দিয়ে আমি তার উপর হামলা চালালাম এবং তার চোখ ফুড়ে দিলাম। সে তক্ষুণি মারা গেল। হিশাম বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, যুবায়র বলেছেন, উবাইদাহ ইবন সাঈদ ইবন আসের লাশের উপর পা রেখে বেশ শক্তি খাটিয়ে আমি বর্শাটি টেনে বের করলাম। এতে বর্শার দু' প্রান্তভাগ বাকা হয়ে যায়। উরওয়াহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুবায়রের নিকট বর্শাটি চাইলে তিনি তা তাকে দিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর তিনি তা নিয়ে যান এবং পরে আবূ বাকর তা চাইলে তিনি তাকে বর্শাটি দিয়ে দেন। আবূ বাকরের মৃত্যুর পর উমার তা চাইলেন। তিনি তাকে বর্শাটি দিয়ে দিলেন। কিন্তু উমারের মৃত্যুর পর যুবায়র পুনরায় বর্শাটি নিয়ে যান। এরপর উসমান তার নিকট বর্শাখানা চাইলে তিনি উসমানকে তা দিয়ে দেন। তবে উসমানের শাহাদতের পর তা আলীর লোকজনের হাতে যাওয়ার পর আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র তা চেয়ে নিয়ে যান। অতঃপর শহীদ হওয়া পর্যন্ত বর্শাটি তার নিকটই বিদ্যমান ছিল।

আবূ ইদরীস আয়িযুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, উবাদাহ ইবন সামিত- যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন- বর্ণনা করেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমার হাতে বায়আত গ্রহণ কর।

নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে যোগদানকারী সাহাবী আবূ হুযাইফাহ এক আনসারী মহিলার আযাদকৃত গোলাম সালিমকে পালকপুত্র গ্রহণ করেন, যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দকে পালকপুত্র গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি তাকে তার ভ্রাতুস্পুত্রী হিন্দা বিন্তে ওয়ালীদ ইবন উতবার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। জাহিলীয়্যাতের যুগে কেউ পালকপুত্র গ্রহণ করলে লোকেরা তাকে পালনকারীর প্রতিই সম্বোধন করত এবং সে তার ছেড়ে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকারী হত। অবশেষে আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, "তোমরা তাদেরকে ডাক তাদের পিতার পরিচয়ে।" এরপর (আবূ হুযাইফাহর স্ত্রী সাহলাহ নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে হাদীসে বর্ণিত ঘটনা বর্ণনা করলেন।

রুবায়ই বিনতু মু'আওয়িয হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী (ﷺ) আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবন যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ্ বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী (ﷺ) বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বদরে যোগদানকারী সাহাবী আবূ ত্বল্হা আমাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ঘরে কুকুর কিংবা ছবি থাকে সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করেন না। ইবন আব্বাসের মতে ছবির অর্থ প্রাণীর ছবি।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাদর দিনের গানীমাতের মাল থেকে আমার ভাগে আমি একটি উট পেয়েছিলাম। 'ফায়' থেকে প্রাপ্ত এক পঞ্চমাংশ থেকেও সেদিন নবী (ﷺ) আমাকে একটি উট দান করেন। আমি যখন নবী (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমার সঙ্গে বাসর রাত যাপন করার ইচ্ছে করলাম এবং বানু কায়নুকা গোত্রের একজন ইয়াহূদী স্বর্ণকারকে ঠিক করলাম যেন সে আমার সঙ্গে যায়। আমরা ইয্খির ঘাস সংগ্রহ করে নিয়ে আসব। অতঃপর সেই ঘাস স্বর্ণকারদের নিকট বিক্রি করে তা আমি আমার বিয়ের ওয়ালিমায় খরচ করার ইচ্ছে করেছিলাম। আমি আমার উট দু'টোর জন্য গদি, বস্তা এবং দড়ির ব্যবস্থা করছিলাম আর উট দু'টো এক আনসারীর ঘরের পাশে বসানো ছিল। আমার যা কিছু জোগাড় করার তা জোগাড় করে এনে দেখলাম উট দু'টির চূড়া কেটে দেয়া হয়েছে এবং সে দু'টির বুক ফেড়ে কলিজা বের করে নেয়া হয়েছে। এ দৃশ্য দেখে আমি আমার অশ্রু সংবরণ করতে পারলাম না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ কাজ কে করেছে? তারা বললেন, আবদুল মুত্তালিবের পুত্র হামযা এ কাজ করেছেন। এখন তিনি এ ঘরে আনসারদের কিছু মদ্যপায়ীদের সঙ্গে মদপান করছেন। সেখানে আছে একদল গায়িকা ও কতিপয় সঙ্গী সাথী। গায়িকা ও তার সঙ্গীগণ গানের মধ্যে বলেছিল, "হে হামযা! মোটা উট দু'টির প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়"। এ কথা শুনে হামযাহ দৌড়িয়ে গিয়ে তলোয়ার হাতে নিল এবং উট দু'টির চূড়া দু'টো কেটে নিল আর তাদের পেট ফেড়ে কলিজা বের করে নিয়ে আসল। আলী বলেন, তখন আমি পথ চলতে চলতে নবী (ﷺ)-এর নিকট চলে গেলাম। তখন তার নিকট যায়দ ইবন হারিসাহ উপস্থিত ছিলেন। আমি যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি নবী (ﷺ) তা বুঝে ফেললেন। তিনি বললেন, তোমার কী হয়েছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আজকের মত কষ্টদায়ক ঘটনা আমি কখনো দেখিনি। হামযা আমার উট দু'টোর উপর খুব জুলুম করেছেন, তিনি উট দু'টোর চূড়া কেটে ফেলেছেন এবং বুক ফেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি একটি ঘরে একদল মদ পানকারীর সঙ্গে আছেন। তখন নবী (ﷺ) তার চাদরখানা চেয়ে নিলেন এবং তা গায়ে দিয়ে হেটে চললেন। (আলী বলেন) এরপর আমি এবং যায়দ ইবন হারিসাহ তার পেছনে চললাম। (হাটতে হাটতে) তিনি যে ঘরে হামযা অবস্থান করছিলেন সে ঘরের কাছে পৌছে তার নিকট অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেয়া হলে রাসূল (ﷺ) হামযাকে তার কর্মের জন্য ভৎর্সনা করতে শুরু করলেন। হামযাহ তখন নেশাগ্রস্ত। চোখ দু'টো তার লাল। তিনি নবী (ﷺ)-এর দিকে তাকালেন এবং দৃষ্টি উপর দিকে উঠিয়ে তারপর তিনি নবী (ﷺ)-এর হাটুর দিকে তাকালেন। এরপর দৃষ্টি আরো একটু উপর দিকে উঠিয়ে তিনি তার (ﷺ) চেহারার প্রতি তাকালেন। এরপর হামযা বললেন, তোমরা তো আমার পিতার দাস। (শুনে) নবী (ﷺ) বুঝলেন যে, তিনি এখন নেশাগ্রস্ত। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পেছনের দিকে হটে বেরিয়ে পড়লেন, আমরাও তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম।

ইবন মা'কিল হতে বর্ণিত যে (তিনি বলেছেন), আলী সাহল ইবন হুনায়ফের (জানাযার সালাতে) তাকবীর উচ্চারণ করলেন এবং বললেন, তিনি (সাহল ইবন হুনায়ফ) বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার সালিম ইবন আবদুল্লাহ-এর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, উমার ইবন খাত্তাবের কন্যা হাফসাহর স্বামী খুনায়স ইবন হুযাইফাহ সাহ্মী যিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবী ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, মদিনায় ইন্তিকাল করলে হাফসাহ বিধবা হয়ে পড়লেন। উমার বলেন, তখন আমি উসমান ইবন আফফানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার নিকট হাফসাহর কথা উল্লেখ করে তাকে বললাম, আপনি ইচ্ছে করলে আমি আপনার সঙ্গে উমারের মেয়ে হাফসাহর বিয়ে দিয়ে দেব। উসমান বললেন, ব্যাপারটি আমি একটু চিন্তা করে দেখি। উমার বলেন, আমি কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম। পরে উসমান বললেন, আমার স্পষ্ট মতামত যে, এ সময় আমি বিয়ে করব না। উমার বলেন, এরপর আমি আবূ বাকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাকে বললাম, আপনি ইচ্ছা করলে উমারের কন্যা হাফসাকে আমি আপনার নিকট বিয়ে দিয়ে দেব। আবূ বাকর চুপ রইলেন, কোন জবাব দিলেন না। এতে আমি উসমানের চেয়েও অধিক দুঃখ পেলাম। এরপর আমি কয়েকদিন চুপ করে থাকলাম, এই অবস্থায় হাফসার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেই প্রস্তাব দিলেন। আমি তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলাম। এরপর আবূ বাকর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমার সঙ্গে হাফসার বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার পর আমি আপনাকে কোন উত্তর না দেয়ার কারণে সম্ভবত আপনি মনোকষ্ট পেয়েছেন। আমি বললাম, হ্যা। তখন আবূ বাকর বললেন, আপনার প্রস্তাবের জবাব দিতে একটি জিনিসই আমাকে বাধা দিয়েছে আর তা হল এই যে, আমি জানতাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেই হাফসাহ-এর সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন, তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোপনীয় বিষয়টি প্রকাশ করার আমার ইচ্ছে ছিল না। যদি তিনি (ﷺ) তাকে গ্রহণ না করতেন, তাকে অবশ্যই আমি গ্রহণ করতাম।

আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ বাদরী সাহাবী আবূ মাস'উদ-কে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করতে শুনেছেন, তিনি বলেন, স্বীয় আহলের (পরিবার পরিজনের) জন্য ব্যয় করাও সদাক্বাহ।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। উমার ইবন আবদুল আযীয তার খিলাফাত কালের বর্ণনা করেছেন যে, মুগীরাহ ইবন শুবাহ কুফার আমীর থাকা কালে একদা আসরের সালাত আদায় করতে দেরি করে ফেললে যায়দ ইবন হাসানের দাদা বাদ্রী সাহাবী আবূ মাস'উদ উকবাহ ইবন 'আমির আনসারী তার নিকট গিয়ে বললেন, আপনি তো জানেন যে, জিবরীল এসে সালাত আদায় করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সঙ্গে পাচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলেন এবং বললেন, আমি এভাবেই সালাত আদায় করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। বাশীর ইব্ন আবূ মাস'উদ তার পিতার নিকট হতে হাদীসটি এভাবেই বর্ণনা করতেন।

বাদরী সাহাবী আবূ মাস'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সূরাহ বাকারার শেষে এমন দু'টি আয়াত রয়েছে যে ব্যক্তি রাতের বেলা আয়াত দু'টি তিলাওয়াত করবে তার জন্য এ আয়াত দু'টোই যথেষ্ট। রাত্রে কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করার যে হাক রয়েছে, কমপক্ষে সূরাহ বাকারার শেষ দু'টি আয়াত তেলাওয়াত করলে তার জন্য তা যথেষ্ট। আবদুর রহমান বলেন, পরে আমি আবূ মাস'উদের সঙ্গে দেখা করলাম। তখন তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করছিলেন। এ হাদীসটির ব্যাপারে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সেটা আমার নিকট বর্ণনা করলেন।

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত যে, মাহমূদ ইবন রাবী' আমাকে জানিয়েছেন যে, 'ইতবান ইবন মালিক নবী (ﷺ)-এর আনসারী সাহাবী ছিলেন এবং তিনি বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তিনি (একদা) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসেছিলেন।

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, আমি বানী সালিম গোত্রের হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ-কে ইতবান ইবন মালিক থেকে মাহমুদ ইবন রাবী এর বর্ণিত হাদীসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি তার সত্যায়ন করলেন।

বানী আদী গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবীআ যার পিতা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, আমাকে বর্ণনা করেন যে, উমার কুদামাহ ইবন মায'উনকে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন। তিনি বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন উমার এবং হাফসাহ-এর মামা।

রাফি' ইবন খাদীজ আবদুল্লাহ ইবন উমারকে বলেছেন যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তার দু' চাচা তাকে জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবাদযোগ্য ভূমি ভাড়া দিতে নিষেধ করেছেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তো এমন জমি ভাড়া দিয়ে থাকেন? তিনি বললেন, হ্যা। রাফি' তো নিজের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪০১২)।

আবদুল্লাহ ইবন শাদ্দাদ ইবন হাদ লায়সী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রিফা'আ ইবন রাফি' আনসারী-কে দেখেছি, তিনি বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন।

নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে যোগদানকারী সাহাবী, বানী আমির ইবন লুওয়াই গোত্রের বন্ধু আমর ইবন 'আওফ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহকে জিযিয়া আনার জন্য বাহরাইনে প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাহরাইনবাসীদের সঙ্গে সন্ধি করে 'আলা ইবন হাযরামী-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। আবূ উবাইদাহ বাহরাইন থেকে মাল নিয়ে এসে পৌছলে আনসারগণ তার আগমনের খবর পেয়ে সকলেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ফজরের সালাত আদায়ের উদ্দেশে হাজির হলেন। সালাত শেষে পর ফিরে বসলে তারা সকলেই তার সামনে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে দেখে মুচকি হেসে বললেন, আমার মনে হয়, আবূ উবাইদাহ কিছু মাল নিয়ে এসেছে বলে তোমরা শুনতে পেয়েছ। তারা সকলেই বললেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল তিনি বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং তোমাদের আনন্দদায়ক বিষয়ের আশায় থাক, আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের জন্য দরিদ্রতার আশংকা করি না। বরং আমি আশংকা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য আসবে যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেদের কাছে এসেছিল, তখন তোমরা সেটা পাওয়ার জন্য পরস্পরে প্রতিযোগিতা করবে যেমনভাবে তারা করেছিল। আর তা তাদেরকে যেমনিভাবে ধ্বংস করেছিল তোমাদেরকেও তেমনিভাবে ধ্বংস করে দেবে।

নাফি হতে বর্ণিত যে, ইবন উমার সব ধরনের সাপকে হত্যা করতেন।

অবশেষে বাদরী সাহাবী আবূ লুবাবাহ তাকে বললেন, নবী (ﷺ) ঘরে বসবাসকারী (শ্বেতবর্ণের) ছোট সাপ মারতে নিষেধ করেছেন। এতে তিনি তা মারা থেকে নিবৃত্ত থাকেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, কতিপয় আনসারী সাহাবী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তারা বললেন, আমাদেরকে আমাদের ভাগিনা আব্বাসের ফিদ্য়া ক্ষমা করে দেয়ার অনুমতি দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তোমরা তার একটি দিরহামও ক্ষমা করবে না।

বানী যুহরা গোত্রের হালীফ (মিত্র) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে যোগদানকারী সাহাবী মিকদাদ ইবন আমর কিনদী হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাকে বলুন, কোন কাফিরের সঙ্গে আমার যদি (যুদ্ধক্ষেত্রে) সাক্ষাৎ হয় এবং আমি যদি তার সঙ্গে লড়াই করি আর সে যদি তলোয়ারের আঘাতে আমার একখানা হাত কেটে ফেলে এবং তারপর আমার থেকে বাচার জন্য গাছের আড়ালে গিয়ে বলে "আমি আল্লাহর উদ্দেশে ইসলাম গ্রহণ করলাম" এ কথা বলার পরেও কি আমি তাকে হত্যা করব? তখন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, তাকে হত্যা করবে না। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো আমার একখানা হাত কাটার পর এ কথা বলছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পুনরায় বললেন, না, তুমি তাকে হত্যা করবে না। কেননা, তুমি তাকে হত্যা করলে হত্যা করার পূর্বে তোমার যে মর্যাদা ছিল সে সেই মর্যাদা লাভ করবে, আর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়ার আগে তার যে স্তর ছিল তুমি সেই স্তরে পৌছে যাবে।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বদরের দিন বললেন, আবূ জাহলের কী অবস্থা কেউ দেখে আসতে পার কি? তখন আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ তার খোজে বের হলেন। এবং 'আফরার দুই ছেলে তাকে আঘাত করে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখেছে দেখতে পেলেন। তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি কি আবূ জাহ্ল? (আবূ জাহ্ল বলল) একজন লোককে হত্যা করা ব্যতীত তোমরা তো অধিক কিছু করনি? সুলায়মান বলেন, অথবা সে (আবূ জাহ্ল) বলেছিল, একজন লোককে তার কাওমের লোকেরা হত্যা করেছে? আবূ মিজলায বলেন, আবূ জাহ্ল বলেছিল, চাষী ব্যতীত অন্য কেউ যদি আমাকে হত্যা করত!

উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর যখন ওফাত হল তখন আমি আবূ বাকরকে বললাম, আমাদেরকে আনসার ভাইদের নিকট নিয়ে চলুন। পথে আমরা আনসারদের দু'জন সৎ ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেলাম যারা বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি উরওয়াহ ইবন যুবায়রের নিকট এ হাদীসটি বর্ণনা করলে তিনি বললেন, তারা হলেন উরওয়াহ ইবন সাঈদাহ এবং মান ইবন আদী।

কায়স হতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী সাহাবীদের ভাতা পাচ হাজার পাচ হাজার করে নির্ধারিত ছিল। উমার বলেছেন, অবশ্যই আমি বদর যুদ্ধে শরীক সাহাবীদেরকে পরবর্তী লোকদের হতে অধিক মর্যাদা দেব।

যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে মাগরিবের সালাতে সূরাহ তূর পড়তে শুনেছি। এ ঘটনা থেকেই সর্বপ্রথম ঈমান আমার অন্তরে স্থান করে নেয়।

যুহরী মুহাম্মাদ ইবন যুবায়র ইবন মুত'ঈমের মাধ্যমে তার পিতা যুবায়র ইবন মুত'ঈম থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে বলেছেন, আজ মুত'ঈম ইবন আদী যদি বেচে থাকতেন আর এসব অপবিত্র লোকদের সম্পর্কে যদি আমার নিকট সুপারিশ করতেন, তাহলে তার সম্মানে এদেরকে আমি (মুক্তিপণ ব্যতীতই) ছেড়ে দিতাম। লায়স ইয়াহ্ইয়ার সূত্রে সাঈদ ইবন মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন যে, প্রথম ফিতনা উসমানের হত্যাকান্ড সংঘটিত হবার পর বদরে যোগদানকারী সাহাবীদের আর কেউ বেচে ছিলেন না। দ্বিতীয় ফিতনা তথা হাররার ঘটনা সংঘটিত হবার পর হুদাইবিয়াহর সন্ধিকালীন সময়ের কোন সাহাবীই আর জীবিত ছিলেন না। এরপর তৃতীয় ফিতনা সংঘটিত হওয়ার পর তা কখনো শেষ হয়নি, যতদিন মানুষের মধ্যে আকল ও সৎ গুণাবলী বহাল ছিল।

যুহরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উরওয়াহ ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন মুসায়্যিব, আলক্বামাহ ইবন ওয়াক্কাস ও 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ থেকে নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহর প্রতি অপবাদের ঘটনা শুনেছি। তারা সকলেই হাদীসটির একটি অংশ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, আয়িশাহ বলেছেন, আমি এবং উম্মু মিসতাহ্ (প্রাকৃতিক প্রয়োজনে) বের হলাম। তখন উম্মু মিসতাহ তার চাদরে পেঁচিয়ে পড়ে গেল। এতে সে বলল, মিসতাহ এর জন্য ধ্বংস। [আয়িশাহ বলেন] তখন আমি বললাম, আপনি বড় খারাপ কথা বললেন। আপনি বদরে শরীক ব্যক্তিকে মন্দ বলছেন! অতঃপর অপবাদ-এর ঘটনা উল্লেখ করলেন।

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত (তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জিহাদসমূহের বর্ণনা দেয়ার পর) বলেছেন, এগুলোই ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামরিক অভিযান। এরপর তিনি ঘটনা বর্ণনা করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশ কাফিরদের লাশ কূপে নিক্ষেপ করার সময় বললেন, তোমাদের রব তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা পেয়েছ তো? মূসা নাফির মাধ্যমে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীদের থেকে কেউ কেউ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মৃতলোকদের আহবান জানাচ্ছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমার কথাগুলো তোমরা তাদের থেকে অধিক শুনতে পাচ্ছ না। আবূ আবদুল্লাহ বলেন, গানীমাত লাভ করেছিলেন, এমন কুরাইশী সাহাবী বদরে শরীক ছিলেন তাদের সংখ্যা হল একাশি। উরওয়াহ ইব্ন যুবায়র বললেন যে, যুবায়র বলেছেন, (বাদ্রী) কুরাইশী সাহাবীদের অংশগুলো বণ্টন করা হয়েছিল। তাদের সংখ্যা ছিল সর্বমোট একশ (আল্লাহই ভাল জানেন)।

যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, বদরের দিন মুহাজিরদেরকে গানীমাতের একশ অংশ দেয়া হয়েছিল।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, বনু নাযীর ও বনু কুরাইযাহ গোত্রের ইয়াহূদী সম্প্রদায় (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু নাযীর গোত্রকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন এবং বনু কুরাইযাহ গোত্রের প্রতি দয়া করে তাদেরকে থাকতে দেন। কিন্তু পরে বনূ কুরাইযাহ গোত্র (মুসলিমদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ শুরু করলে কতক লোক যারা নবী (ﷺ)-এর দলভুক্ত হবার পর তিনি তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন তারা মুসলিম হয়ে গিয়েছিল তারা ব্যতীত অন্য সব পুরুষ লোককে হত্যা করা হয় এবং মহিলা সন্তান-সন্ততি ও মালামাল মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। নবী (ﷺ) মদিনার সব ইয়াহূদীকে দেশান্তর করলেন। আবদুল্লাহ ইবন সালামের গোত্র বনু কায়নুকা ও বনু হারিসাসহ অন্যান্য ইয়াহূদী গোষ্ঠীকেও তিনি দেশান্তর করেন।

সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাসের নিকট সূরাহ হাশরকে সূরাহ হাশর নামে উল্লেখ করায়, তিনি বললেন, বরং তুমি বলবে 'সূরাহ নাযীর'। আবূ বিশর থেকে হুশাইমও এ বর্ণণায় তার (আবূ আওয়ানাহর) অনুসরণ করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণ কিছু কিছু খেজুর গাছ নবী (ﷺ)-এর জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। অবশেষে বনু কুরায়যা ও বনু নাযীর জয় করা হলে তিনি ঐ খেজুর গাছগুলো তাদেরকে ফেরত দিয়ে দেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বুওয়াইরাই নামক জায়গায় বনু নাযীর গোত্রের যে খেজুর গাছ ছিল তার কিছু জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এবং কিছু কেটে ফেলেছিলেন। এ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়ঃ "তোমরা যে খেজুর গাছগুলি কেটে ফেলেছ অথবা যেগুলো কান্ডের উপর ঠিক রেখে দিয়েছ, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে"- (হাশর ৫৯/৫)।

উবনু উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বনূ নাযীর গোত্রের খেজুর গাছগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। ইবন উমার বলেন, এ সম্বন্ধেই হাস্সান ইবন সাবিত বলেছেনঃ "বনূ লুওয়াই গোত্রের নেতাদের (কুরাইশদের) জন্য সহজ হয়ে গিয়েছে বুওয়াইরাহ নামক স্থানের সর্বত্রই অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত হওয়া।" বর্ণনাকারী ইবন উমার বলেন, এর উত্তরে আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারিস বলেছিলঃ "আল্লাহ এ কাজকে স্থায়ী করুন এবং জ্বালিয়ে রাখুন মদিনার আশে পাশে লেলিহান অগ্নিশিখা, শীঘ্রই জানবে আমাদের মাঝে কারা নিরাপত্তায় থাকবে এবং জানবে দুই নগরীর কোনটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।"

মালিক ইবন আ'ওস ইবন হাদসান নাসিরী বর্ণনা করেন যে, (একদা) উমার ইবন খাত্তাব তাকে ডাকলেন। এ সময় তার দ্বাররক্ষী ইয়ারফা এসে বলল, উসমান, আবদুর রাহমান, যুবায়র এবং সাদ আপনার নিকট আসার অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি বললেন, হা তাদেরকে আসতে বল। কিছুক্ষণ পরে এসে বলল, আব্বাস এবং আলী আপনার নিকট অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি বললেন, হা। তারা উভয়েই ভিতরে প্রবেশ করলেন। আব্বাস বললেন, হে, আমীরুল মুমিনীন! আমার এবং তার মাঝে (বিবাদের) মীমাংসা করে দিন। বনূ নাযীরের সম্পদ থেকে আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-কে ফাই (বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ) হিসেবে যা দিয়েছিলেন তা নিয়ে তাদের উভয়ের মাঝে বিবাদ চলছিল। এ নিয়ে তারা তর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন, (এ দেখে আগত) দলের সকলেই বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! তাদের মাঝে একটি মীমাংসা করে তাদের এ বিবাদ থেকে মুক্তি দিন। তখন উমার বললেন, তাড়াহুড়া করবেন না। আমি আপনাদেরকে আল্লাহর নামে শপথ দিয়ে বলছি, যার আদেশে আসমান ও যমীন প্রতিষ্ঠিত আছে। আপনারা কি জানেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের সম্বন্ধে বলেছেন, আমরা (নবীগণ) কাউকে উত্তরাধিকারী রেখে যাই না। যা রেখে যাই তা সদাকাহ হিসাবেই গণ্য হয়। এর দ্বারা তিনি নিজের কথাই বললেন। উপস্থিত সকলেই বললেন, হা, তিনি এ কথা বলেছেন। উমার আলী এবং আব্বাসের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আপনাদের উভয়কে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে এ কথা বলেছেন, আপনারা তা জানেন কি? তারা উভয়েই বললেন, হা, এরপর তিনি বললেন, এখন আমি আপনাদেরকে এ বিষয়ে আসল অবস্থা খুলে বলছি। ফাই এর কিছু অংশ আল্লাহ তাআলা তার রাসূলের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যা তিনি আর অন্য কাউকে দেননি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ "আল্লাহ ইয়াহূদীদের নিকট হতে তার রাসূলকে যে ফাই দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা অশ্ব কিংবা উষ্ট্র চালিয়ে যুদ্ধ করনি; আল্লাহ তো তার রাসূলকে যার উপর ইচ্ছা তার উপর কর্তৃত্ব দান করেন; আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান"- (আনআম ৬/৫৯)। অতএব এ ফাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্যই খাস ছিল। আল্লাহর কসম! এরপর তিনি তোমাদেরকে বাদ দিয়ে নিজের জন্য এ সম্পদকে সংরক্ষিতও রাখেননি এবং নিজের জন্য নির্ধারিতও করে যাননি। বরং এ অর্থকে তিনি তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। অবশেষে এ মাল উদ্বৃত্ত আছে। এ মাল থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার পরিবার পরিজনের এক বছরের খোরপোশ দিতেন। এর থেকে যা অবশিষ্ট থাকত তা তিনি আল্লাহর পথে খরচ করতে দিতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জীবদ্দশায় এরূপই করেছেন। নবী (ﷺ)-এর ওফাতের পর আবূ বাকর বললেন, এখন থেকে আমিই হলাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওলী (প্রতিনিধি)। এরপর আবূ বাকর তা স্বীয় তত্ত্বাবধানে নিয়ে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তিনিও সে নীতিই অনুসরণ করে চললেন। তিনি আলী ও আব্বাসের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আজ আপনারা যা বলছেন এ বিষয়ে আপনারা আবূ বাকরের সঙ্গেও এ ধরনেরই আলোচনা করেছিলেন। আল্লাহর কসম! তিনিই জানেন, এ বিষয়ে আবূ বাকর ছিলেন সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং হাকের অনুসারী এক মহান ব্যক্তিত্ব। এরপর আবূ বাকরের ইন্তিকাল হলে আমি বললাম, (আজ থেকে) আমিই হলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং আবূ বাকরের ওলী (প্রতিনিধি)। এরপর এ সম্পদকে আমি আমার খিলাফাতের দুই বছরকাল আমার তত্ত্বাবধানে রাখি এবং এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বকরের অনুসৃত নীতিই অনুসরণ করে চলছি। আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, এ বিষয়ে নিশ্চই আমি সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও হাকের একনিষ্ঠ অনুসারী। তা সত্ত্বেও পুনরায় আপনারা দু'জনই আমার নিকট এসেছেন। আমি আপনাদের উভয়কেই বলেছিলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমরা (নবীগণ) কাউকে উত্তরাধিকারী করি না, আমরা যা রেখে যাই তা সদকা হিসাবেই গণ্য হয়। এরপর এ সম্পদটি আপনাদের উভয়ের তত্ত্বাবধানে দেয়ার বিষয়টি যখন আমার নিকট স্পষ্ট হল তখন আমি বলেছিলাম, যদি আপনারা চান তাহলে একটি শর্তে তা আমি আপনাদের নিকট অর্পণ করব। শর্তটি হচ্ছে আপনারা আল্লাহর নির্দেশ ও তার দেয়া ওয়াদা অনুযায়ী এমনভাবে কাজ করবেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বাকর করেছেন এবং আমার তত্ত্বাবধানে আসার পর আমি করেছি। অন্যথায় এ বিষয়ে আপনারা আমার সঙ্গে আর কোন আলোচনা করবেন না। তখন আপনারা বলেছিলেন, এ শর্তেই আপনি তা আমাদের নিকট অর্পণ করুন। আমি তা আপনাদের হাতে অর্পণ করেছি। এখন আপনারা আমার নিকট অন্য কোন ফায়সালা কামনা করেন কি? আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যার আদেশে আসমান যমীনটিকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত আমি এর বাইরে অন্য কোন ফয়সালা দিতে পারব না। আপনারা যদি এর দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে থাকেন তাহলে আমার নিকট ফিরিয়ে দিন। আপনাদের এ দায়িত্ব পালনে আমিই যথেষ্ট।

বর্ণনাকারী (যুহরী) বলেন, আমি হাদীসটি উরওয়াহ ইবন যুবায়রের নিকট বর্ণনা করার পর তিনি (আমাকে) বললেন, মালিক ইবন আওস ঠিকই বর্ণনা করেছেন। আমি নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ কে বলতে শুনেছি, (বানী নাযীর গোত্রের সম্পদ থেকে) ফায় হিসাবে আল্লাহ তার রাসূলকে যে সম্পদ দিয়েছেন তার অষ্টমাংশ আনার জন্য নবী (ﷺ) সহধর্মিণীগণ উসমানকে আবূ বাকরের নিকট পাঠাতে চাইলে এই বলে আমি তাদেরকে বারণ করছিলাম যে, আপনারা কি আল্লাহকে ভয় করেন না? আপনারা কি জানেন না যে নবী (ﷺ) বলতেন আমরা (নবী-রাসূলগণ) কাউকে উত্তরাধিকারী রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা সদাকাহ হিসাবেই থেকে যায়। এ দ্বারা তিনি নিজেকে মালিক করেছেন। এ সম্পদ থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরগণ খেতে পারবেন। (তারা এ সম্পদের মালিক হতে পারবেন না।) আমার এ কথা শুনে নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণীগণ বিরত হলেন। বর্ণনাকারী বলেন, অবশেষে সদাকাহর এ মাল আলীর তত্ত্বাবধানে ছিল। তিনি আব্বাসকে তা দিতে অস্বীকার করেন এবং পরিশেষে তিনি আব্বাসের উপর জয়ী হন। এরপর তা যথাক্রমে হাসান ইবন আলী এবং হুসাইন ইবন আলীর হাতে ছিল। পুনরায় তা আলী ইবন হুসাইন এবং হাসান ইবন হাসানের হস্তগত হয়। তারা উভয়ই পর্যায়ক্রমে তার দেখাশোনা করতেন। এরপর তা যায়দ ইবন হাসানের তত্ত্বাবধানে যায়। তা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সদাকাহ।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, ফাতিমা এবং আব্বাস আবূ বাকরের কাছে এসে ফাদাক এবং খাইবারের (ভূমির) অংশ দাবী করেন।

আবূ বাকর বললেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমরা (নবী-রাসূলগণ আমাদের সম্পদের) কাউকে উত্তরাধিকারী রেখে যাই না। আমরা যা রেখে যাই সদাকাহ হিসেবেই রেখে যাই। এ মাল থেকে মুহাম্মাদের পরিবার-পরিজনে ভোগ করবে। আল্লাহর কসম! আমার আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে আত্মীয়তা দৃঢ় করার চেয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আত্মীয়তাই আমার নিকট প্রিয়তর।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কা'ব ইবন আশরাফের হত্যা করার জন্য কে প্রস্তুত আছ? কেননা সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ দাড়ালেন, এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি চান যে, আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হা। তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, তাহলে আমাকে কিছু প্রতারণাময় কথা বলার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হা বল। এরপর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ কা'ব ইবন আশরাফের নিকট গিয়ে বললেন, এ লোকটি [রাসূল (ﷺ)] সদাকাহ চায় এবং সে আমাদেরকে বহু কষ্টে ফেলেছে। তাই আমি আপনার নিকট কিছু ঋণের জন্য এসেছি। কা'ব ইবন আশরাফ বলল, আল্লাহর কসম পরে সে তোমাদেরকে আরো বিরক্ত করবে এবং আরো অতিষ্ঠ করে তুলবে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আমরা তার অনুসরণ করছি। পরিণাম কী দাড়ায় তা না দেখে এখনই তার সঙ্গ ত্যাগ করা ভাল মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই। বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান বলেন, আমর আমার নিকট হাদীসটি কয়েকবার বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তিনি এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথা উল্লেখ করেননি। আমি তাকে বললাম, এ হাদীসে তো এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে, তিনি বললেন, মনে হয় হাদীসে এক ওসাক বা দুই ওসাকের কথাটি বর্ণিত আছে। কা'ব ইবন আশরাফ বলল, ধার তো পাবে তবে কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, কী জিনিস আপনি বন্ধক চান। সে বলল, তোমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আপনি আরবের একজন সুশ্রী ব্যক্তি, আপনার নিকট কীভাবে, আমাদের স্ত্রীদেরকে বন্ধক রাখব? তখন সে বলল, তাহলে তোমাদের ছেলে সন্তানদেরকে বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে আপনার নিকট কী করে বন্ধক রাখি? তাদেরকে এ বলে সমালোচনা করা হবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাকের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা তো আমাদের জন্য খুব লজ্জাজনক বিষয়। তবে আমরা আপনার নিকট অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, লামা শব্দের মানে হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র। শেষে তিনি (মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ) তার কাছে আবার যাওয়ার ওয়াদা করে চলে আসলেন। এরপর তিনি কা'ব ইবন আশরাফের দুধ ভাই আবূ নাইলাকে সঙ্গে করে রাতের বেলা তার নিকট গেলেন। কা'ব তাদেরকে দূর্গের মধ্যে ডেকে নিল এবং সে নিজে উপর তলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হল। তখন তার স্ত্রী বলল, এ সময় তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, এই তো মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ এবং আমার ভাই আবূ নাইলা এসেছে। আমর ব্যতীত বর্ণনাকারীগণ বলেন যে, কা'বের স্ত্রী বলল, আমি তো এমনই একটি ডাক শুনতে পাচ্ছি যার থেকে রক্তের ফোঁটা ঝরছে বলে আমার মনে হচ্ছে। কা'ব ইবন আশরাফ বলল, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ এবং দুধ ভাই আবূ নাইলা, (অপরিচিত কোন লোক তো নয়) ভদ্র মানুষকে রাতের বেলা বর্শা বিদ্ধ করার জন্য ডাকলে তার যাওয়া উচিত। (বর্ণনাকারী বলেন) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ সঙ্গে আরো দুই ব্যক্তিকে নিয়ে সেখানে গেলেন। সুফ্ইয়ানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আমর কি তাদের দু'জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন? উত্তরে সুফ্ইয়ান বললেন, একজনের নাম উল্লেখ করেছিলেন। আমর বর্ণনা করেন যে, তিনি আরো দু'জন মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, যখন সে (কা'ব ইবন আশরাফ) আসবে। আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ (মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার সাথীদের সম্পর্কে) বলেছেন যে (তারা হলেন) আবূ আবস্ ইবন জাব্র হারিস ইবন আওস এবং আববাদ ইবন বিশ্র। আমর বলেছেন, তিনি অপর দুই লোককে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, যখন সে আসবে তখন আমি তার মাথার চুল ধরে শুঁকতে থাকব। যখন তোমরা আমাকে দেখবে যে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা আকড়িয়ে ধরেছি, তখন তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে। তিনি (মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ) একবার বলেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকেও শুঁকাব। সে (কা'ব) চাদর নিয়ে নিচে নেমে আসলে তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আজকের মত এতো উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনো দেখিনি। আমর ব্যতীত অন্যান্য রাবীগণ বর্ণনা করেছেন যে, কা'ব বলল, আমার নিকট আরবের সম্ভ্রান্ত ও মর্যাদাসম্পন্ন সুগন্ধী ব্যবহারকারী মহিলা আছে। আমর বলেন, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাহ বললেন, আমাকে আপনার মাথা শুঁকতে অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হা। এরপর তিনি তার মাথা শুঁকলেন এবং এরপর তার সাথীদেরকে শুঁকালেন। তারপর তিনি আবার বললেন, আমাকে আবার শুকবার অনুমতি দেবেন কি? সে বলল, হা। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তাকে হত্যা কর। তারা তাকে হত্যা করলেন। এরপর নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে এ খবর দিলেন।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দশ জনের কম একটি দলকে আবূ রাফির উদ্দেশে পাঠালেন (তাদের একজন) আবদুল্লাহ ইবন আতীক রাতের বেলা তার ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে খুন করেন।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন আতীককে আমীর বানিয়ে তার নেতৃত্বে আনসারদের কয়েকজন সাহাবীকে ইয়াহূদী আবূ রাফির (হত্যার) উদ্দেশে প্রেরণ করেন। আবূ রাফি' রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কষ্ট দিত এবং এ ব্যাপারে লোকদেরকে সাহায্য করত। হিজায ভূমিতে তার একটি দূর্গ ছিল (যেখানে যে বাস করত)। তারা যখন তার দূর্গের কাছে গিয়ে পৌছলেন তখন সূর্য ডুবে গেছে এবং লোকজন নিজেদের পশু পাল নিয়ে রওয়ানা হয়েছে (নিজ নিজ গৃহে) আবদুল্লাহ (ইবন আতীক) তার সাথীদেরকে বললেন, তোমরা তোমাদের স্থানে বসে থাক। আমি চললাম, ভিতরে প্রবেশ করার জন্য দ্বার রক্ষীর সঙ্গে আমি কৌশল দেখাই। এরপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌছলেন এবং কাপড় দ্বারা নিজেকে এমনভাবে ঢাকলেন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে রত আছেন। তখন সবাই ভিতরে প্রবেশ করলে দারোয়ান তাকে ডেকে বলল, ওহে আবদুল্লাহ্! ভিতরে ঢুকতে চাইলে ঢুকে পড়। আমি এখনই দরজা বন্ধ করে দেব। আমি তখন ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং আত্মগোপন করে থাকলাম। সকলে ভিতরে প্রবেশ করার পর সে দরজা বন্ধ করে দিল এবং একটি পেরেকের সঙ্গে চাবিটা লটকিয়ে রাখল। [আবদুল্লাহ ইবন আতীক বলেন] এরপর আমি চাবিটার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং চাবিটা নিয়ে দরজাটি খুললাম। আবূ রাফি'র নিকট রাতের বেলা গল্পের আসর বসত, এ সময় সে তার উপর তলার কামরায় অবস্থান করছিল। গল্পের আসরে আগত লোকজন চলে গেলে, আমি সিড়ি বেয়ে তার কাছে গিয়ে পৌছলাম। এ সময় আমি একটি করে দরজা খুলছিলাম এবং ভিতর দিক থেকে তা আবার বন্ধ করে দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাতে লোকজন আমার ব্যাপারে জানতে পারলেও হত্যা না করা পর্যন্ত আমার নিকট পৌছতে না পারে। আমি তার কাছে গিয়ে পৌছলাম। এ সময় সে একটি অন্ধকার কক্ষে ছেলেমেয়েদের মাঝে শুয়েছিল। কক্ষের কোন অংশে সে শুয়ে আছে আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। তাই আবূ রাফি' বলে ডাক দিলাম। সে বলল, কে আমাকে ডাকছ? আমি তখন আওয়াজটি লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে তরবারি দ্বারা প্রচন্ড জোরে আঘাত করলাম। আমি তখন কাঁপছিলাম। এ আঘাতে আমি তার কোন কিছুই করতে পারলাম না। সে চীৎকার করে উঠলে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে চলে আসলাম। এরপর পুনরায় ঘরে প্রবেশ করে (কন্ঠস্বর পরিবর্তন করতঃ তার আপন লোকের ন্যায়) জিজ্ঞেস করলাম, আবূ রাফি' এ আওয়াজ হল কিসের? সে বলল, তোমার মায়ের সর্বনাশ হোক! একটু আগে ঘরের ভিতর কে যেন আমাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করেছে। আবদুল্লাহ ইবন আতীক বলেন, তখন আমি আবার তাকে ভীষণ আঘাত করলাম এবং মারাত্মকভাবে ক্ষত বিক্ষত করে ফেললাম। কিন্তু তাকে হত্যা করতে পারিনি। তাই তরবারির ধারাল দিকটি তার পেটের উপর চেপে ধরলাম এবং পিঠ পার করে দিলাম। এবার আমি নিশ্চিতরূপে বুঝলাম যে, এখন আমি তাকে হত্যা করতে পেরেছি। এরপর আমি এক এক করে দরজা খুলে নীচে নামতে শুরু করলাম। নামতে নামতে সিড়ির শেষ প্রান্তে এসে পৌছলাম। পূর্ণিমার রাত্র ছিল। (চাঁদের আলোতে তাড়াহুড়ার মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পেরে) আমি মনে করলাম, (সিড়ির সকল ধাপ অতিক্রম করে) আমি মাটির নিকটে এসে পড়েছি। (কিন্তু তখনও একটি ধাপ অবশিষ্ট ছিল) তাই নিচে পা রাখতেই আমি পড়ে গেলাম। অমনিই আমার পায়ের গোছার হাড় ভেঙ্গে গেল। আমি আমার মাথার পাগড়ি দিয়ে পা খানা বেধে নিলাম এবং একটু হেটে গিয়ে দরজার সামনে বসে রইলাম। মনে মনে স্থির করলাম, তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে আজ রাতে আমি এখান থেকে যাব না। ভোর রাতে মোরগের ডাক আরম্ভ হলে মৃত্যু ঘোষণাকারী প্রাচীরের উপরে উঠে ঘোষণা করল, হিজায অধিবাসীদের অন্যতম ব্যবসায়ী আবূ রাফির মৃত্যু সংবাদ শুন। তখন আমি আমার সাথীদের নিকট গিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি চল, আল্লাহ আবূ রাফিকে হত্যা করেছেন। এরপর নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলাম এবং সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, তোমার পা লম্বা করে দাও। আমি আমার পা লম্বা করে দিলে তিনি তাতে স্বীয় হাত বুলিয়ে দিলেন। (তাতে এমন সুস্থ হলাম) যেন আমি কোন আঘাতই পায়নি।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ রাফি'র হত্যার উদ্দেশে আবদুল্লাহ ইবন আতীক ও আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ্কে একদল লোকসহ প্রেরণ করেন। যেতে যেতে তারা দূর্গের কাছে গিয়ে পৌছলে আবদুল্লাহ ইবন আতীক তাদেরকে বললেন, তোমরা অপেক্ষা কর। আমি যাই, দেখি কীভাবে সুযোগ করা যায়। আবদুল্লাহ ইবন আতীক বলেন, দূর্গের ভিতর প্রবেশ করার জন্য আমি কৌশল করলাম। ইতোমধ্যে তারা একটি গাধা হারিয়ে ফেলল এবং একটি আলো নিয়ে এর খোজে বের হল। তিনি বলেন, আমাকে চিনে ফেলবে আমি এ আশংকা করছিলাম। তাই আমি আমার মাথা ও পা ঢেকে ফেললাম এবং এমনভাবে বসে রইলাম যেন আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য বসেছি। এরপর দারোয়ান ডাক দিয়ে বলল, কেউ ভিতরে প্রবেশ করতে চাইলে এখনই দরজা বন্ধ করার আগে ভিতরে ঢুকে পড়ুন। আমি প্রবেশ করলাম এবং দূর্গের দরজার পার্শ্বে গাধা বাধার জায়গায় আত্মগোপন করে থাকলাম। আবূ রাফি'র নিকট সবাই বসে রাতের খানা খেয়ে গল্প গুজব করল। এভাবে রাতের কিছু অংশ কেটে যাওয়ার পর সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেল। যখন হৈ চৈ থেমে গেল এবং কোন নড়াচড়া শুনতে পাচ্ছিলাম না তখন আমি বের হলাম। আবদুল্লাহ ইবন আতীক বলেন, দূর্গের চাবি যে ছিদ্রপথে রাখা হয়েছিল তা আমি পূর্বেই দেখেছিলাম। তাই রক্ষিত স্থান থেকে চাবিটি নিয়ে আমি দূর্গের দরজা খুললাম। তিনি বলেন, আমি মনে মনে ভাবলাম, কাওমের লোকেরা যদি আমাকে দেখে নেয় তাহলে সহজেই আমি পালিয়ে যেতে পারব। এরপর দূর্গের ভিতরে তাদের যত ঘর ছিল সবগুলোর দরজা আমি বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলাম। এরপর সিড়ি বেয়ে আবূ রাফি'র কক্ষে উঠলাম। বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে ঘরটি ছিল খুবই অন্ধকার। লোকটি কোথায়, কিছুতেই আমি তা বুঝতে পারছিলাম না। সুতরাং আমি তাকে ডাকলাম, হে আবূ রাফি'। সে বলল, কে ডাকছ? তিনি বলেন, আওয়াজটি লক্ষ্য করে আমি একটু এগিয়ে গেলাম এবং তাকে আঘাত করলাম। সে চীৎকার করে উঠল। এ আঘাতে কোন কাজই হয়নি। অতঃপর আবার আমি তার কাছে গেলাম, যেন আমি তাকে সাহায্য করব। আমি এবার স্বর বদল করে বললাম, হে আবূ রাফি'! তোমার কী হয়েছে? সে বলল, কী আশ্চর্য ব্যাপার, তার মায়ের সর্বনাশ হোক, এই তো এক ব্যক্তি আমার ঘরে ঢুকে আমাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করেছে। আবদুল্লাহ্ ইবন 'আতীক বলেন, তাকে লক্ষ্য করে আবার আমি আঘাত করলাম এবারও কোন কাজ হল না। সে চীৎকার করলে তার পরিবারের সবাই জেগে উঠল। তারপর আবার আমি সাহায্যকারীর ভান করে আওয়াজ বদল করে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। এ সময় সে পিঠের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে ছিল। আমি তরবারির অগ্রভাগ তার পেটের উপর রেখে এমন জোরে চাপ দিলাম যে, আমি তার হাড়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। এরপর আমি কাঁপতে কাঁপতে সিড়ির নিকট এসে পৌছলাম। ইচ্ছে ছিল নেমে যাব। কিন্তু আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম এবং এতে আমার পা খানা ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে (পাগড়ি দিয়ে) আমি তা বেধে ফেললাম এবং আস্তে আস্তে হেটে সাথীদের নিকট চলে এলাম। এরপর বললাম, তোমরা যাও এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সুসংবাদ দাও। আমি তার মৃত্যু সংবাদ না শুনে আসব না। প্রত্যুষে মৃত্যু ঘোষণাকারী প্রাচীরে উঠে বলল, আমি আবূ রাফি'র মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করছি। আবদুল্লাহ্ ইবন আতীক বলেন, এরপর আমি উঠে চলতে লাগলাম। এ সময় আমার কোন ব্যথাই ছিল না। আমার সাথীরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট পৌছার আগেই আমি তাদেরকে পেয়ে গেলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার মৃত্যুর সুসংবাদ দিলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) উহূদের দিন বলেছেন, এই তো জিবরীল, তার ঘোড়ার মস্তকে হাত রেখে আছেন; তার পরিধানে আছে যুদ্ধাস্ত্র।

উকবাহ ইবন 'আমির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আট বছর পর নবী (ﷺ) উহূদের শহীদদের জন্য (কবরস্থানে) এমনভাবে দোয়া করলেন যেমন কোন বিদায় গ্রহণকারী জীবিত ও মৃতদের জন্য দোয়া করেন। তারপর তিনি (ফিরে এসে) মিম্বারে উঠে বললেন, আমি তোমাদের অগ্রে প্রেরিত এবং আমিই তোমাদের সাক্ষীদাতা। এরপর (কাউসার) হাউযের ধারে তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটবে। আমার এ স্থান থেকেই আমি হাউয দেখতে পাচ্ছি। তোমরা শির্কে জড়িয়ে যাবে আমি এ ভয় করি না। তবে আমার আশঙ্কা হয় যে, তোমরা দুনিয়ায় সুখ-শান্তি লাভে প্রতিযোগিতা করবে। বর্ণনাকারী বলেন, আমার এ দর্শনই ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে শেষবারের মতো দর্শন।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন আমরা মুখোমুখী অবতীর্ণ হলে নবী (ﷺ) আবদুল্লাহ [ইবন যুবায়র]-কে তীরন্দাজ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করে তাদেরকে (নির্দিষ্ট এক স্থানে) মোতায়েন করলেন এবং বললেন, যদি তোমরা আমাদেরকে দেখ যে, আমরা তাদের উপর বিজয় লাভ করেছি, তাহলেও তোমরা এখান থেকে নড়বে না। আর যদি তোমরা তাদেরকে দেখ যে, তারা আমাদের উপর বিজয় লাভ করেছে, তবুও তোমরা এই স্থান ত্যাগ করে আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে না। এরপর আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলে তারা পালাতে আরম্ভ করল। এমনকি আমরা দেখতে পেলাম যে, মহিলারা দ্রুত দৌড়ে পর্বতে আশ্রয় নিচ্ছে। তারা পায়ের গোছা থেকে কাপড় টেনে তুলেছে, ফলে পায়ের অলঙ্কারগুলো পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ছে। এ সময় তারা (তীরন্দাজরা) বলতে লাগলেন, গানীমাত-গানীমাত! তখন আবদুল্লাহ বললেন, তোমরা যাতে এ স্থান ত্যাগ না কর এ ব্যাপার নবী (ﷺ) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা অগ্রাহ্য করল। যখন তারা অগ্রাহ্য করল, তখন তাদের মুখ ফিরিয়ে দেয়া হলো এবং তাদের সত্তর জন শাহীদ হলেন। আবূ সুফ্ইয়ান একটি উচু স্থানে উঠে বলল, কাওমের মধ্যে মুহাম্মাদ জীবিত আছে কি? নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা তার কোন উত্তর দিও না। সে আবার বলল, কাওমের মধ্যে ইবন আবূ কুহাফা জীবিত আছে কি? নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা তার কোন জবাব দিও না। সে আবার বলল, কাওমের মধ্যে ইবন খাত্তাব বেচে আছে কি? তারপর সে বলল, এরা সকলেই নিহত হয়েছে। বেচে থাকলে নিশ্চই জবাব দিত। এ সময় উমার নিজেকে সামলাতে না পেরে বললেন, হে আল্লাহর দুশমন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। যে জিনিসে তোমাকে অপমানিত করবে আল্লাহ তা বাকী রেখেছেন। আবূ সুফ্ইয়ান বলল, হুবালের জয়। তখন নবী (ﷺ) সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা তার উত্তর দাও। তারা বললেন, আমরা কী বলব? তিনি বললেন, তোমরা বল, আল্লাহ সমুন্নত ও মহান। আবূ সুফ্ইয়ান বলল, আমাদের উয্যা আছে, তোমাদের উয্যা নেই। নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা তার জবাব দাও। তারা বললেন, আমরা কী জবাব দেব? তিনি বললেন, বল- আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, তোমাদের তো কোন অভিভাবক নেই। শেষে আবূ সুফ্ইয়ান বলল, আজ বদর যুদ্ধের বিনিময়ের দিন। যুদ্ধ কূপ থেকে পানি উঠানোর পাত্রের মতো (একবার এ হাতে আরেকবার ও হাতে) তোমরা নাক-কান কাটা কিছু লাশ দেখতে পাবে। আমি এরূপ করতে নির্দেশ দেইনি। অবশ্য তাতে আমি নাখোশও নই।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন কতক সাহাবী সকাল বেলা মদ পান করেছিলেন। অতঃপর তারা শাহাদাত লাভ করেন।

সাদ ইবন ইবরাহীমের পিতা ইবরাহীম হতে বর্ণিত যে, আবদুর রহমান ইবন 'আওফ-এর নিকট কিছু খানা আনা হল। তিনি তখন সায়েম ছিলেন। তিনি বললেন, মুস'আব ইবন উমায়র ছিলেন আমার চেয়েও উত্তম ব্যক্তি। তিনি শাহাদাত লাভ করেছেন। তাকে এমন একটি চাদরে কাফন দেয়া হয়েছিল যে, তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছিলেন যে, হামযাহ আমার চেয়েও উত্তম লোক ছিলেন। তিনি শাহাদাত লাভ করেছেন। এরপর দুনিয়াতে আমাদেরকে অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেয়া হয়েছে অথবা বলেছেন যথেষ্ট পরিমাণে দুনিয়ার ধন-মাল দেয়া হয়েছে। আমার ভয় হচ্ছে, হয়তো আমাদের নেকীর বদলা এখানেই দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন, এমনকি খাদ্য পরিহার করলেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি উহূদের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন, আমি যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে আমি কোথায় থাকব বলে আপনি মনে করেন? তিনি বললেন, জান্নাতে। তখন ঐ ব্যক্তি হাতের খেজুরগুলো ছুঁড়ে ফেললেন, এরপর তিনি লড়াই করলেন, এমনকি শহীদ হয়ে গেলেন।

খাব্বাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে হিজরত করেছিলাম। ফলে আল্লাহর কাছে আমাদের পুরস্কার লিখিত হয়ে গেছে। আমাদের কতক দুনিয়াতে কোন পুরস্কার ভোগ না করেই অতীত হয়ে গেছেন এবং চলে গেছেন। মাস'আব ইবন উমায়র তাদের একজন। তিনি উহূদ যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করেন। তিনি একটি পাড় বিশিষ্ট পশমী বস্ত্র ব্যতীত আর কিছুই রেখে যাননি। এ দিয়ে আমরা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যেত এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যেত। তখন নবী (ﷺ) বললেন, এ কাপড় দিয়ে তার মাথা ঢেকে দাও এবং পায়ের উপর দাও ইযখির অথবা তিনি বলেছেন, ইযখির দ্বারা তার পা ঢেকে দাও। আমাদের কতক এমনও আছেন, যাদের ফল পেকেছে এবং তিনি এখন তা সংগ্রহ করছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তার চাচা [আনাস ইবন নযর] বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি [আনাস ইবন নযর] বলেছেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সর্বপ্রথম যুদ্ধে তার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কোন যুদ্ধে শারীক করেন তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখবেন, আমি কত প্রাণপণে লড়াই করি। এরপর তিনি উহূদ যুদ্ধের দিন সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পর লোকেরা পরাজিত হলে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! এ সব লোক মুসলিমগণ যা করলেন, আমি এর জন্য আপনার নিকট ওযর পেশ করছি এবং মুশরিকগণ যা করল তা থেকে আমি আমার সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করছি। এরপর তিনি তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে গেলেন। এ সময় সাদ ইবন মুআয-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হল। তিনি বললেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ হে সাদ? আমি উহূদের অপর প্রান্ত হতে জান্নাতের খোশবু পাচ্ছি। এরপর তিনি যুদ্ধ করে শাহাদাত লাভ করলেন। তাকে চেনা যাচ্ছিল না। অবশেষে তার বোন তার শরীরের একটি তিল অথবা আঙ্গুলের মাথা দেখে তাকে চিনলেন। তার শরীরে আশিটিরও বেশী বর্শা, তরবারি ও তীরের আঘাত ছিল।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কুরআন মাজীদকে গ্রন্থের আকারে লিপিবদ্ধ করার সময় সূরাহ আহযাবের একটি আয়াত আমি হারিয়ে ফেলি, যা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে পাঠ করতে শুনতাম। তাই আমরা উক্ত আয়াতটি খুজতে লাগলাম। অবশেষে তা পেলাম খুযায়মা ইবন সাবিত আনসারী-এর কাছে। আয়াতটি হলঃ "মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে" (আহযাব ৩৩/২৩)। এরপর এ আয়াতটিকে আমরা কুরআন মজীদের ঐ সূরাতে যুক্ত করে নিলাম।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হলে যারা তার সঙ্গে বের হয়েছিল, তাদের কিছু সংখ্যক লোক ফিরে এলো। নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণ তাদের ব্যাপারে দু'দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর বললেন, আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। অপর দল বললেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এ সময় অবতীর্ণ হয় আয়াতটি।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "যখন তোমাদের মধ্যে দু'দলের সাহস হারাবার উপক্রম হয়েছিল" আয়াতটি আমাদের সম্পর্কে তথা বনূ সালিমাহ এবং বনু হারিসাহ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আয়াতটি অবতীর্ণ না হোক তা আমি চাইনি। কেননা এ আয়াতেই আল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহ উভয় দলেরই সাহায্যকারী"।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে জাবির! তুমি বিয়ে করেছ কি? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, কেমন, কুমারী না অকুমারী? আমি বললাম, না, বরং অকুমারী। তিনি বললেন, কোন কুমারী মেয়েকে বিয়ে করলে না কেন? সে তো তোমার সঙ্গে আমোদ-ফূর্তি করত। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার আববা উহূদের যুদ্ধে শাহাদাত লাভ করেছেন। রেখে গেছেন নয়টি মেয়ে। এখন আমার নয় বোন। এ কারণে আমি তাদের সঙ্গে তাদেরই মতো একজন আনাড়ি মেয়েকে এনে একত্রিত করা পছন্দ করিনি। বরং এমন একটি মহিলাকে (পছন্দ করলাম) যে তাদের চুল আচড়ে দিতে পারবে এবং তাদের দেখাশোনা করতে পারবে। তিনি বললেন, ঠিক করেছ।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, উহূদের দিন তার পিতা ছয়টি মেয়ে ও কিছু ঋণ তার উপর রেখে শাহাদাত লাভ করেন। এরপর যখন খেজুর কাটার সময় এল (তিনি বলেন) তখন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে বললাম, আপনি জানেন যে, আমার পিতা উহূদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং বিশাল ঋণ ভার রেখে গেছেন। এখন আমি চাই, ঋণদাতাগণ আপনাকে দেখুক। তখন তিনি বললেন, তুমি যাও এবং বাগানের এক কোণে সব খেজুর কেটে জমা কর। [জাবির বলেন] আমি তাই করলাম। এরপর নবী (ﷺ)-কে ডেকে আনলাম। যখন তারা নবী (ﷺ)-কে দেখলেন, সে সময় তারা আমার উপর আরো রাগান্বিত হলেন। নবী (ﷺ) তাদের আচরণ দেখে বাগানের বড় গাদাটির চারপার্শ্বে তিনবার ঘুরে এসে এর উপর বসে বললেন, তোমার ঋণদাতাদেরকে ডাক। তিনি তাদেরকে মেপে মেপে দিতে লাগলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমার পিতার আমানাত আদায় করে দিলেন। আমিও চাচ্ছিলাম যে, একটি খেজুর নিয়ে আমি আমার বোনদের নিকট না যেতে পারলেও আল্লাহ তাআলা যেন আমার পিতার আমানাত আদায় করে দেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা খেজুরের সবকটি গাদাই অবশিষ্ট রাখলেন। এমনকি আমি দেখলাম যে, নবী (ﷺ) যে গাধায় উপবিষ্ট ছিলেন তার থেকে যেন একটি খেজুরও কমেনি।

সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে আমি আরো দু' ব্যক্তিকে দেখলাম, যারা সাদা পোশাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষে তুমুল যুদ্ধ করছে। আমি তাদেরকে আগেও দেখিনি আর পরেও দেখিনি।

সাদ ইবন আবূ ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের দিন নবী (ﷺ) আমার জন্য তার তীরাধার খুলে দিয়ে বললেন, তোমার জন্য আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক; তুমি তীর চালাতে থাক।

সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের দিন নবী (ﷺ) আমার উদ্দেশে তার পিতা-মাতাকে এক সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহূদের দিন আমার জন্য তার পিতা-মাতা উভয়কে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এ কথা বলে তিনি বোঝাতে চান যে, তিনি লড়াই করছিলেন এমন সময় নবী (ﷺ) তাকে বলেছেন, তোমার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ ব্যতীত অন্য কারো জন্য নবী (ﷺ)-কে তার পিতা-মাতার নাম একত্রে উল্লেখ করতে আমি শুনিনি।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ ইবন মালিক ব্যতীত অন্য কারো জন্য নবী (ﷺ)-কে তার পিতা-মাতার নাম একত্রে উল্লেখ করতে আমি শুনিনি। উহূদ যুদ্ধের দিন আমি তাকে বলতে শুনেছি, তুমি তীর চালিয়ে যাও, আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কুরবান হোক।

আবূ উসমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে দিনগুলোতে নবী (ﷺ) যুদ্ধ করেছেন তার কোন এক সময়ে ত্বলহা এবং সাদ ব্যতীত অন্য কেউ নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন না। হাদীসটি আবূ উসমান তাদের উভয়ের নিকট থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪০৬০)।

সায়িব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবন 'আউফ, ত্বলহা ইবন উবাইদুল্লাহ, মিকদাদ এবং সাদ-এর সাহচর্য পেয়েছি। তাদের কাউকে নবী (ﷺ) থেকে হাদীস বর্ণনা করতে শুনিনি, তবে কেবল ত্বলহা-কে উহূদ যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণনা করতে শুনেছি।

ক্বায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ত্বলহা-এর হাত অবশ দেখেছি। উহূদের দিন তিনি এ হাত নবী (ﷺ)-এর প্রতিরক্ষায় লাগিয়েছিলেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের দিন লোকেরা নবী (ﷺ)-কে ছেড়ে যেতে লাগলেও আবূ ত্বলহা ঢাল হাতে নিয়ে তাকে আড়াল করে রাখলেন। আবূ ত্বলহা, ধনুক খুব জোরে টেনে তীর ছুঁড়লেন। সেদিন তিনি দু'টি অথবা তিনটি ধনুক ভেঙ্গে ছিলেন। সেদিন যে কেউ তীরাধার নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তাকেই তিনি বলেছেন, তীরগুলো খুলে আবূ ত্বলহার জন্য রেখে দাও। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (ﷺ) মাথা উচু করে যেমনই শত্রুদের প্রতি তাকাতেন, তখনই আবূ ত্বলহা বলতেন, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি মাথা উচু করবেন না। তাদের নিক্ষিপ্ত তীরের কোনটি আপনার শরীরে লেগে যেতে পারে। আপনার বক্ষের পরিবর্তে আছে আমার বক্ষ। [আনাস বলেন] সেদিন আমি আয়িশাহ বিনত আবূ বাকর এবং উম্মু সুলায়ম-কে দেখেছি, তারা দু'জনেই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের তলা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভর্তি করে পিঠে পানি বয়ে আনতেন এবং (আহত) লোকেদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার ফিরে যেতেন এবং মশক ভর্তি পানি এনে লোকেদের মুখে ঢেলে দিতেন। সেদিন আবূ ত্বলহা-এর হাত থেকে দু'বার কিংবা তিনবার তরবারিটি পড়ে গিয়েছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধে মুশরিকরা যখন পরাস্ত হল তখন অভিশপ্ত ইবলিস চীৎকার করে বলল, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমাদের পেছনে আরেকটি দল আসছে। তখন অগ্রসেনারা পেছনে ফিরলে তাদের ও পশ্চাদভাগের মধ্যে পরস্পর সংঘর্ষ হল। হুযাইফাহ দেখতে পেলেন যে, তার পিতা ইয়ামন-এর সম্মুখীন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর বান্দারা! (ইনি তো) আমার পিতা। বর্ণনাকারী (আয়িশাহ) বলেন, আল্লাহর কসম! এতে তারা তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হল না। তখন হুযাইফাহ বললেন, আল্লাহ আপনাদেরকে ক্ষমা করে দিন। (বর্ণনাকারী) উরওয়াহ বলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহর সঙ্গে মিলনের পূর্ব পর্যন্ত হুযাইফাহ-এর মনে এ ঘটনার অনুতাপ বাকী ছিল।

উসমান ইবন মাওহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাজ্জ পালনের উদ্দেশে এক ব্যক্তি বাইতুল্লাহয় এসে সেখানে একদল লোককে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এ উপবিষ্ট লোকগুলো কে? তারা বললেন, এরা হচ্ছেন কুরাইশ গোত্রের লোক। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এ বৃদ্ধ লোকটি কে? তারা বললেন, ইনি হচ্ছেন ইবন উমার । তখন লোকটি তার কাছে গিয়ে বললেন, আমি আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব, আপনি আমাকে বলে দেবেন কি? এরপর লোকটি বললেন, আমি আপনাকে এই ঘরের সম্মানের কসম দিয়ে বলছি, উহূদের দিন উসমান ইবন আফফান পালিয়েছিলেন, এ কথা আপনি কি জানেন? তিনি বললেন, হ্যা। লোকটি বললেন, তিনি বদরে অনুপস্থিত ছিলেন, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি- এ কথাও কি আপনি জানেন? তিনি বললেন, হ্যা। লোকটি আবার বললেন, তিনি বায়আতে রিদওয়ানেও অনুপস্থিত ছিলেন- এ কথাও কি আপনি জানেন? তিনি বললেন, হ্যা। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি তখন আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করল। তখন ইবন উমার বললেন, এসো, এখন আমি তোমাকে সব ব্যাপারে জানিয়ে দেই এবং তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর খুলে বলি। (১) উহূদের দিন তার পালানোর ব্যাপার সম্বন্ধে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। (২) বাদর থেকে তার অনুপস্থিত থাকার কারণ এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা (রুকাইয়া) তার স্ত্রী ছিলেন। তিনি ছিলেন অসুস্থ। তাই তাকে নবী (ﷺ) বলেছিলেন, বদর যুদ্ধে যোগদানকারীদের মতোই তুমি সাওয়াব পাবে এবং গানীমাতের অংশ পাবে। (৩) বায়আতে রিদওয়ান থেকে তার অনুপস্থিতির কারণ হল, মক্কা উপত্যকায় উসমান ইবন আফফান থেকে অধিক মর্যাদাবান কোন ব্যক্তি থাকলে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে তার স্থলে মক্কা পাঠাতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ জন্য উসমান-কে পাঠালেন। উসমান-এর মক্কা গমনের পরই বাই'আতে রিদওয়ান সংঘটিত হয়েছিল। তাই (নবী (ﷺ) তার ডান হাতখানা অপর হাতের উপর রেখে বলেছিলেন, এটাই উসমানের হাত। এরপর তিনি (আবদুল্লাহ ইবন উমার) বললেন, এই হল উসমান-এর অনুপস্থিতির কারণ। এখন তুমি এ কথাগুলো তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) উহূদের দিন আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র-কে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তারা পরাস্ত হয়ে (মদিনার পানে) ছুটে গিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে, রাসূল (ﷺ)-এর তাদেরকে পেছন থেকে ডাক দেয়া।

বর্ণনাকারী বলেন, খলীফা আমার নিকট ...... আবূ ত্বলহা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, উহূদ যুদ্ধের দিন যারা তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম একজন। এমনকি আমার তলোয়ারটি আমার হাত থেকে কয়েক দফা পড়েও গিয়েছিল। তলোয়ারটি পড়ে যেত, আমি তা তুলে নিতাম, আবার পড়ে যেত, আমি আবার তা তুলে নিতাম।

আবদুল্লাহ ইবন উমার থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ফজরের সালাতের শেষ রাকআতে রুকূ থেকে মাথা উঠিয়ে "আল্লাহ তার কথা শোনেন যে তার প্রশংসা করে। আমাদের পালনকর্তা, সমস্ত প্রশংসা আপনার জন্য!" বলার পর বলতে শুনেছেন, হে আল্লাহ! আপনি অমুক, অমুক এবং অমুকের উপর লানত বর্ষণ করুন। তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন, এ বিষয়ে আপনার কিছুই নেই। কারণ তারা যালিম।

সালিম ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফওয়ান ইবন উমাইয়াহ, সুহায়ল ইবন আমর এবং হারিস ইবন হিশামের জন্য বদদোয়া করতেন। এ ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে- "তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দেবেন, এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই করার নেই। কারণ তারা যালিম।"

সা'লাবাহ্ ইবন আবূ মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার উমার ইবন খাত্তাব কতকগুলো চাদর মদিনা্বাসী মহিলাদের মধ্যে বণ্টন করলেন। পরে একটি সুন্দর চাদর বাকী থেকে গেল। তার নিকট উপস্থিত লোকদের একজন বলে উঠলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ চাদরখানা আপনার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নাতনি আলী-এর কন্যা উম্মু কুলসুম-কে দিয়ে দিন। উমার বললেন, উম্মু সালীত্ব তার চেয়েও অধিক হাকদার। উম্মু সালীত্ব আনসারী মহিলা। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছেন। উমার বললেন, উহূদের দিন এ মহিলা আমাদের জন্য মশক ভরে পানি এনেছিলেন।

জা'ফার ইবন আমর ইবন উমাইয়াহ যামরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাইদুল্লাহ ইবন আদী ইবন খিয়ার-এর সঙ্গে ভ্রমণে বের হলাম। আমরা যখন হিম্স-এ পৌছলাম তখন উবাইদুল্লাহ আমাকে বললেন, ওয়াহ্শীর কাছে হামযাহ-এর শাহাদাত অর্জনের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাও কি? আমি বললাম, হ্যা। ওয়াহ্শী তখন হিম্সে বসবাস করছিলেন। আমরা তার সম্পর্কে (লোকেদেরকে) জিজ্ঞেস করলাম। আমাদেরকে বলা হল, ঐ তো তিনি তার প্রাসাদের ছায়ায় (বসে আছেন) যেন পশমহীন মশক। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা গিয়ে তার থেকে সামান্য কিছু দূরে থাকলাম এবং তাকে সালাম করলাম। তিনি আমাদের সালামের জবাব দিলেন। জা'ফার বর্ণনা করেন, তখন উবাইদুল্লাহ এমনভাবে পাগড়ি পরিহিত ছিলেন সে, ওয়াহ্শী তার দু' চোখ এবং দু' পা ব্যতীত আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। এ অবস্থায় উবাইদুল্লাহ ওয়াহ্শীকে বললেন, হে ওয়াহ্শী! আপনি আমাকে চিনেন কি? বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তখন তার দিকে তাকালেন, অতঃপর বললেন, না, আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে চিনি না। তবে এটুকু জানি যে, আদী ইবন খিয়ার উম্মু কিতাল বিনতু আবুল ঈস নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। মক্কায় তার একটি সন্তান জন্মিলে আমি তার ধাত্রী খোজ করছিলাম, তখন ঐ বাচ্চাকে নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে গিয়ে ধাত্রীমাতার কাছে তাকে সোপর্দ করলাম। সে বাচ্চার পা দু'টির মতো আপনার পা দু'টি দেখতে পাচ্ছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন উবাইদুল্লাহ তার মুখের আবরণ সরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হামযাহ-এর শাহাদাত সম্পর্কে আমাদেরকে বলবেন কি? তিনি বললেন, হ্যা। বদর যুদ্ধে হামযাহ তুআইমা ইবন আদী ইবন খিয়ারকে হত্যা করেছিলেন। তাই আমার মনিব জুবায়র ইবন মুতঈম আমাকে বললেন, তুমি যদি আমার চাচার বদলা হিসেবে হামযাকে হত্যা করতে পার তাহলে তুমি মুক্ত। রাবী বলেন, যে বছর উহূদ পর্বত সংলগ্ন আইনাইন পর্বতের উপত্যকায় যুদ্ধ হয়েছিল সে যুদ্ধে আমি সবার সঙ্গে বেরিয়ে যাই। এরপর লড়াইয়ের জন্য সকলে সারিবদ্ধ হলে সিবা নামক এক ব্যক্তি ময়দানে এসে বলল, দ্বনদ্ব যুদ্ধের জন্য কেউ প্রস্তুত আছ কি? ওয়াহ্শী বলেন, তখন হামযাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব তার সামনে গিয়ে বললেন, ওহে মেয়েদের খতনাকারিণী উম্মু আনমারের পোলা সিবা! তুমি কি আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে দুশমনী করছ? বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তার উপর প্রচন্ড আঘাত করলেন, যার ফলে সে বিগত দিনের মতো গত হয়ে গেল। ওয়াহ্শী বলেন, আমি হামযাহ -কে কতল করার উদ্দেশে একটি পাথরের নিচে আত্মগোপন করে ওত পেতে বসেছিলাম। যখন তিনি আমার নিকটবর্তী হলেন আমি আমার বর্শা এমন জোরে নিক্ষেপ করলাম যে, তার মূত্রথলি ভেদ করে নিতম্বের মাঝখান দিয়ে তা বেরিয়ে গেল। ওয়াহ্শী বলেন, এটাই হল তার শাহাদাতের মূল ঘটনা। এরপর সবাই ফিরে এলে আমিও তাদের সঙ্গে ফিরে এসে মক্কায় অবস্থান করতে লাগলাম। এরপর মক্কায় ইসলাম প্রসারিত হলে আমি তায়েফ চলে গেলাম। কিছুদিনের মধ্যে তায়েফবাসীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে দূত প্রেরণের ব্যবস্থা করলে আমাকে বলা হল যে, তিনি দূতদের প্রতি উত্তেজিত হন না। তাই আমি তাদের সঙ্গে রওয়ানা হলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে গিয়ে হাযির হলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, তুমিই কি ওয়াহ্শী? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেন, তুমিই কি হামযাকে কতল করেছিলে? আমি বললাম, আপনার কাছে যে সংবাদ পৌছেছে ব্যাপার তাই। তিনি বললেন, আমার সামনে থেকে তোমার চেহারা কি সরিয়ে রাখতে পার? ওয়াহ্শী বলেন, তখন আমি চলে আসলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পর মুসাইলামাতুল কায্যাব আবির্ভূত হলে আমি বললাম, আমি অবশ্যই মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব এবং তাকে হত্যা করে হামযাহ-কে হত্যা করার ক্ষতিপূরণ করব। ওয়াহ্শী বলেন, এক সময় আমি দেখলাম যে, হালকা কালো বর্ণের উটের মত উষ্কখুষ্ক চুলবিশিষ্ট এক ব্যক্তি একটি ভগ্ন দেয়ালের আড়ালে দাড়িয়ে আছে। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বর্শা দ্বারা তার উপর আঘাত করলাম এবং তার বুকের উপর এমনভাবে বসিয়ে দিলাম যে, তা তার দু' কাঁধের মাঝ দিয়ে বেরিয়ে গেল। এরপর আনসারী এক সাহাবী এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তলোয়ার দিয়ে তার মাথার খুলিতে প্রচন্ড আঘাত করলেন। আবদুল্লাহ ইবন ফাযল বর্ণনা করেছেন যে, সুলাইমান ইবন ইয়াসির আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবন উমার-কে বলতে শুনেছেন যে, ঘরের ছাদে একটি বালিকা বলছিল, হায়, হায়, আমীরুল মুমিনীন (মুসাইলামাহ)-কে এক কৃষ্ণকায় গোলাম হত্যা করল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার দন্তের প্রতি ইশারা করে বলছেন, যে সম্প্রদায় তাদের নবীর সঙ্গে এরূপ আচরণ করেছে তাদের প্রতি আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়াবহ এবং যে ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আল্লাহর পথে হত্যা করেছে তার প্রতিও আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়ানক।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তিকে নবী (ﷺ) আল্লাহর পথে হত্যা করেছে, তার জন্য আল্লাহর গযব ভয়াবহ। আর যে সম্প্রদায় আল্লাহর নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে তাদের প্রতিও আল্লাহর গযব ভয়াবহ।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আহত হওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি ভালভাবেই জানি কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জখম ধুয়ে দিচ্ছিলেন এবং কে পানি ঢালছিলেন আর কী দিয়ে তার চিকিৎসা করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা তা ধুয়ে দিচ্ছিলেন এবং আলী ঢালে করে পানি এনে ঢালছিলেন। ফাতিমা যখন দেখলেন যে, পানি রক্ত পড়া বন্ধ না করে কেবল তা বৃদ্ধি করছে, তখন তিনি এক টুকরা চাটাই নিয়ে তা পুড়িয়ে লাগিয়ে দিলেন। তখন রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। সেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ডান দিকের একটি দাত ভেঙ্গে গিয়েছিল, চেহারা জখম হয়েছিল এবং লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে মস্তকে বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়াবহ ঐ ব্যক্তির জন্য, যাকে নবী (ﷺ) হত্যা করেছেন এবং আল্লাহর গযব অত্যন্ত ভয়াবহ ঐ ব্যক্তির জন্যও যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি উরওয়াহ-কে বললেন, হে ভাগ্নে জান? "জখম হওয়ার পর যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছেন, তাদের মধ্যে যারা সৎকাজ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আছে বিরাট পুরস্কার।" (এ আয়াতটিতে যাদের কথা বলা হয়েছে) তাদের মধ্যে তোমার পিতা যুবায়র এবং আবূ বাকর-ও ছিলেন। উহূদের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বহু দুঃখ-কষ্টে আপতিত হয়েছিলেন। মুশরিকগণ চলে গেলে তিনি আশঙ্কা করলেন যে, তারা আবারও ফিরে আসতে পারে। তিনি বললেন, কে এদের পশ্চাদ্ধাবনের জন্য প্রস্তুত আছে। এতে সত্তরজন সাহাবী সাড়া দিয়ে প্রস্তুত হলেন। উরওয়াহ বলেন, তাদের মধ্যে আবূ বাকর ও যুবায়র-ও ছিলেন।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন আরবের কোন মানবগোষ্ঠীই আনসারদের তুলনায় অধিক সংখ্যায় শাহীদ এবং অধিক মর্যাদার অধিকারী হবে বলে আমরা জানি না। ক্বাতাদাহ বলেন, আনাস ইবন মালিক আমাকে বলেছেন, উহূদের দিন তাদের সত্তর জন শহীদ হয়েছেন, বিরে মাউনার দিন সত্তর জন শহীদ হয়েছেন এবং ইয়ামামার যুদ্ধের দিন সত্তর জন শহীদ হয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন যে, বিরে মাউনা ঘটেছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় এবং ইয়ামামার যুদ্ধ হয়েছিল মুসাইলামাতুল কায্যাবের বিরুদ্ধে আবূ বাকর-এর খিলাফতকালে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উহূদ যুদ্ধের শাহীদগণের দু'জনকে একই কাপড়ে দাফন করেছিলেন। জড়ানোর পর জিজ্ঞেস করতেন, এদের মধ্যে কে অধিক কুরআন জানে? যখন কোন একজনের প্রতি ইশারা করা হত তখন তিনি তাকেই কবরে আগে নামাতেন এবং বলতেন, কিয়ামতের দিন আমি তাদের জন্য সাক্ষী হব। সেদিন তিনি তাদেরকে তাদের রক্তসহ দাফন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাদের জানাযাও পড়ানো হয়নি এবং তাদেরকে গোসলও দেয়া হয়নি।

জাবির থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমার পিতা শাহীদ হলে আমি কাঁদতে লাগলাম এবং তার চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে দিচ্ছিলাম। তখন নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণ আমাকে নিষেধ করছিলেন। তবে নবী (ﷺ) নিষেধ করেননি। নবী (ﷺ) (আবদুল্লাহর ফুফুকে বললেন) তোমরা তার জন্য কাঁদছ! অথচ জানাযা না উঠানো পর্যন্ত মালায়িকাহ তাদের ডানা দিয়ে তার উপর ছায়া করে রেখেছিল।

আবূ মূসা সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি একটি তরবারি আন্দোলিত করলাম, অমনি এর মধ্যস্থলে ভেঙ্গে গেল। (বুঝলাম) এটা হল উহূদ যুদ্ধে মুমিনদের উপর আপতিত বিপদেরই স্বপ্ন রূপ। এরপর ওটিকে আবার আন্দোলিত করলাম। এতে ওটা আগের চেয়েও সুন্দর হয়ে গেল। এটা হল যে বিজয় আল্লাহ এনে দিয়েছিলেন এবং মুমিনদের একতাবদ্ধ হওয়া এবং স্বপ্নে আমি একটি গরুও দেখেছিলাম। উহূদ যুদ্ধে মুমিনদের শাহাদাত লাভ হচ্ছে এর ব্যাখ্যা। আল্লাহর সকল কাজ কল্যাণময়।

খাব্বাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে হিজরাত করেছিলাম। এতে আমরা চেয়েছি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিদান নির্ধারিত হয়ে গেছে। আমাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ গত হয়েছেন বা চলে গেছেন। অথচ প্রতিদান তিনি কিছুই ভোগ করতে পারেননি। মুস'আব ইবন উমায়র ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। উহূদের দিন তিনি শাহীদ হন। একখানা মোটা চাদর ব্যতীত তিনি আর কিছুই রেখে যাননি। এ দ্বারা আমরা তার মাথা ঢাকলে পা দু'খানা বেরিয়ে যেত এবং পা দু'খানা আবৃত করলে মাথা বেরিয়ে যেত। তখন নবী (ﷺ) আমাদেরকে বললেন, ওটা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দাও এবং উভয় পা ইযখির দ্বারা আবৃত করে দাও। অথবা বললেন (বর্ণনাকারীর সন্দেহ), তার উভয় পায়ের উপর ইযখির দিয়ে দাও। আর আমাদের মধ্যে কেউ এমনও আছেন, যার ফল ভালভাবে পেকেছে, আর তা তিনি ভোগ করছেন।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস-এর নিকট থেকে শুনেছি যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, এ (উহূদ) পর্বত আমাদেরকে ভালবাসে আর আমরাও একে ভালবাসি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, উহূদ পর্বত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বললেন, এ পর্বত আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরাও একে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইবরাহীম মক্কাকে হারাম হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এবং আমি দু'টি কঙ্করময় স্থানের মধ্যবর্তী জায়গাকে (মদিনা্কে) হারাম হিসেবে ঘোষণা করছি।

উকবাহ হতে বর্ণিত যে, একদা নবী (ﷺ) বের হলেন এবং উহূদের শাহীদগণের জন্য জানাযার সালাতের মতো সালাত আদায় করলেন। এরপর মিম্বরের দিকে ফিরে এসে বললেন, আমি তোমাদের অগ্রগামী ব্যক্তি এবং আমি তোমাদের সাক্ষ্যদাতা। আমি এ মুহূর্তে আমার হাউয (কাউসার) দেখতে পাচ্ছি। আমাকে পৃথিবীর ধনভান্ডারের চাবি দেয়া হয়েছে অথবা বললেন (বর্ণনাকারীর সন্দেহ), আমাকে পৃথিবীর চাবি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার ইন্তিকালের পর তোমরা শির্কে লিপ্ত হবে- তোমাদের ব্যাপারে আমার এ ধরনের কোন আশঙ্কা নেই। তবে আমি তোমাদের ব্যাপারে আশঙ্কা করি যে, তোমরা পৃথিবীতে পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আসিম ইবন উমার ইবন খাত্তাব-এর নানা আসিম ইবন সাবিত আনসারী-এর নেতৃত্বে একটি গোয়েন্দা দল প্রেরণ করলেন। যেতে যেতে তারা 'উসফান ও মক্কায় মধ্যবর্তী স্থানে পৌছলে হুযায়ল গোত্রের একটি শাখা বানী লিহ্ইয়ানের নিকট তাদের আগমনের কথা জানিয়ে দেয়া হল। এ সংবাদ পাওয়ার পর বানী লিহ্ইয়ানের প্রায় একশ তীরন্দাজ তাদের ধাওয়া করল। দলটি তাদের (মুসলিম গোয়েন্দা দলের) পদচিহ্ন অনুসরণ করে এমন এক স্থানে গিয়ে পৌছল, যে স্থানে অবতরণ করে সাহাবীগণ খেজুর খেয়েছিলেন। তারা সেখানে খেজুরের আটি দেখতে পেল যা সাহাবীগণ মদিনা থেকে পাথেয়রূপে এনেছিলেন। তখন তারা বলল, এগুলো তো ইয়াসরিবের খেজুর (এর আটি)। এরপর তারা পদচিহ্ন ধরে খুজতে খুজতে শেষ পর্যন্ত তাদেরকে ধরে ফেলল। আসিম ও তার সাথীগণ বুঝতে পেরে ফাদফাদ নামক টিলায় উঠে আশ্রয় নিলেন। এবার শত্রুদল এসে তাদেরকে ঘিরে ফেলল এবং বলল, আমরা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যদি তোমরা নেমে আস তাহলে আমরা তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না। আসিম বললেন, আমি কোন কাফেরের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে এখান থেকে অবতরণ করব না। হে আল্লাহ! আমাদের এ সংবাদ আপনার রাসূলের নিকট পৌছিয়ে দিন। এরপর তারা মুসলিম গোয়েন্দা দলের প্রতি আক্রমণ করল এবং তীর বর্ষণ করতে শুরু করল। এভাবে তারা আসিম-সহ সাতজনকে তীর নিক্ষেপ করে শহীদ করে দিল। এখন শুধু বাকী থাকলেন খুবায়ব, যায়দ এবং অপর একজন (আবদুল্লাহ ইবন তারিক) সাহাবী। পুনরায় তারা তাদেরকে ওয়াদা দিল। এই ওয়াদায় আশ্বস্ত হয়ে তারা তাদের কাছে নেমে এলেন। এবার তারা তাদেরকে কাবু করে ফেলার পর নিজেদের ধনুকের তার খুলে এর দ্বারা তাদেরকে বেধে ফেলল। এ দেখে তাদের সাথী তৃতীয় সাহাবী (আবদুল্লাহ ইবন তারিক) বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। তাই তিনি সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। তারা তাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য বহু টানা-হেঁচড়া করল এবং বহু চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি তাতে রাযী হলেন না। অবশেষে কাফিররা তাকে শহীদ করে দিল এবং খুবায়ব ও যায়দ-কে মক্কার বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দিল। বানী হারিস ইবন আমির ইবন নাওফল গোত্রের লোকেরা খুবায়ব-কে কিনে নিল। কেননা বদর যুদ্ধের দিন খুবায়ব হারিসকে হত্যা করেছিলেন। তাই তিনি তাদের নিকট বেশ কিছু দিন বন্দী অবস্থায় কাটান। অবশেষে তারা তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করলে তিনি নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করার জন্য হারিসের কোন এক কন্যার নিকট থেকে একখানা ক্ষুর চাইলেন। সে তাকে তা দিল। (পরবর্তীকালে মুসলিম হওয়ার পর) হারিসের উক্ত কন্যা বর্ণনা করছেন যে, আমি আমার একটি শিশু বাচ্চা সম্পর্কে অসাবধান থাকায় সে পায়ে হেটে তার কাছে চলে যায় এবং তিনি তাকে স্বীয় উরুর উপর বসিয়ে রাখেন। এ সময় তার হাতে ছিল সেই ক্ষুর। এ দেখে আমি অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। খুবায়ব তা বুঝতে পেরে বললেন, তাকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পাচ্ছ? ইনশাআল্লাহ আমি তা করার নই। সে (হারিসের কন্যা) বলত, আমি খুবায়ব থেকে উত্তম বন্দী আর কখনো দেখিনি। আমি তাকে আঙ্গুরের থোকা থেকে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ তখন মক্কায় কোন ফলই ছিল না। অধিকন্তু তিনি তখন লোহার শিকলে আবদ্ধ ছিলেন। এ আঙ্গুর তার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে প্রদত্ত রিযিক ব্যতীত আর কিছুই নয়। এরপর তারা তাকে হত্যা করার জন্য হারামের বাইরে নিয়ে গেল। তিনি তাদেরকে বললেন, আমাকে দু'রাকাত সালাত আদায় করার সুযোগ দাও। (সালাত আদায় করে) তিনি তাদের কাছে ফিরে এসে বললেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছি, তোমরা যদি এ কথা মনে না করতে তাহলে আমি (সালাতকে) আরো দীর্ঘায়িত করতাম। হত্যার পূর্বে দু'রাকাত সালাত আদায়ের সুন্নাত প্রবর্তন করেছেন সর্বপ্রথম তিনিই। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে গুণে রাখুন। এরপর তিনি দু'টি পংক্তি আবৃত্তি করলেন- "যেহেতু আমি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করছি তাই আমার শঙ্কা নেই, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে যে কোন পার্শ্বে আমি ঢলে পড়ি। আমি যেহেতু আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করছি তাই ইচ্ছা করলে, আল্লাহ ছিন্নভিন্ন প্রতিটি অঙ্গে বারাকাত দান করতে পারেন।" এরপর উকবাহ ইবন হারিস তার দিকে এগিয়ে গেল এবং তাকে শহীদ করে দিল। কুরায়শ গোত্রের লোকেরা আসিম-এ শাহাদাতের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার মৃতদেহ থেকে কিছু অংশ নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়েছিল। কারণ 'আসিম বদর যুদ্ধের দিন তাদের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। তখন আল্লাহ মেঘের মতো এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন, যা তাদের প্রেরিত লোকদের হাত থেকে আসিম-কে রক্ষা করল। ফলে তারা তার দেহ থেকে থেকে কোন অংশ নিতে সক্ষম হল না।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খুবায়ব-এর হত্যাকারী হল আবূ সিরওয়া (উকবাহ ইবন হারিস)।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কোন এক প্রয়োজনে সত্তরজন সাহাবীকে পাঠালেন, যাদের ক্বারী বলা হত। বানী সুলায়ম গোত্রের দু'টি শাখা- রিল ও যাকওয়ান বি'রে মাউনা নামক একটি কূপের নিকট তাদেরকে আক্রমণ করলে তারা বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করার উদ্দেশে আসিনি। আমরা তো কেবল নবী (ﷺ)-এর নির্দেশিত একটি কাজের জন্য এ পথ দিয়ে যাচ্ছি। তখন তারা তাদেরকে হত্যা করে ফেলল। তাই নবী (ﷺ) এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে তাদের জন্য বদদোয়া করলেন। এভাবেই কুনূত পড়া শুরু হয়। এর পূর্বে আমরা কুনূত পড়িনি। আবদুল আযীয বলেন, এক ব্যক্তি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলেন, কুনূত কি রুকূর পর পড়তে হবে, না কিরাআত শেষ করে পড়তে হবে? উত্তরে তিনি বললেন, না বরং কিরাআত শেষ করে পড়তে হবে।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক মাস ব্যাপী আরবের কতিপয় গোত্রের প্রতি বদদোয়া করার জন্য সালাতে রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, রি'ল, যাকওয়ান, উসায়্যা ও বনূ লিহ্ইয়ানের লোকেরা শত্রুর মুকাবালা করার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে সাহায্য চাইলে সত্তরজন আনসার সাহাবী পাঠিয়ে তিনি তদেরকে সাহায্য করলেন। সেকালে আমরা তাদেরকে ক্বারী নামে অভিহিত করতাম। তারা দিনে লাকড়ি জুটাতেন এবং রাতে সালাতে কাটাতেন। যেতে যেতে তারা বি'রে মাউনার নিকট পৌছলে তারা (ঐ গোত্রগুলির লোকেরা) তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং তাদেরকে শহীদ করে দেয়। এ সংবাদ নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছলে তিনি এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে আরবের কতিপয় গোত্র যথা রিল, যাকওয়ান, উসায়্যাহ এবং বনূ লিহ্ইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেন। আনাস বর্ণনা করেছেন যে, তাদের সম্পর্কিত কিছু আয়াত আমরা পাঠ করতাম। অবশ্য পরে এর তিলাওয়াত রহিত হয়ে যায়। (একটি আয়াত ছিল) আমাদের কাওমের লোকদেরকে জানিয়ে দাও। আমরা আমাদের প্রভুর সান্নিধ্যে পৌছে গেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন। ক্বাতাদাহ আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাকে বলেছেন, আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) এক মাস পর্যন্ত ফজরের সালাতে আরবের কতিপয় গোত্র- তথা রি'ল, যাকওয়ান, উসায়্যা এবং বনূ লিহ্ইয়ানের প্রতি বদদোয়া করে কুনূত পাঠ করেছেন। [ইমাম বুখারী-এর উস্তাদ] খলীফা এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, ইবন যুরায় ও সাঈদ ও ক্বাতাদাহ-এর মাধ্যমে আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা সত্তরজন সকলেই ছিলেন আনসার। তাদেরকে বি'রে মাউনা নামক স্থানে শাহীদ করা হয়েছিল।

আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তার মামা উম্মু সুলায়ম-এর ভাই [হারাম ইবন মিলহান]-কে সত্তরজন অশ্বারোহীসহ (আমির ইবন তুফাইলের নিকট) পাঠালেন। মুশরিকদের দলপতি আমির ইবন তুফায়ল (পূর্বে) নবী (ﷺ)-কে তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল। সে বলেছিল, পল্লী এলাকায় আপনার কর্তৃত্ব থাকবে এবং শহর এলাকায় আমার কর্তৃত্ব থাকবে। অথবা আমি আপনার খালীফাহ হব বা গাতফান গোত্রের দুই হাজার সৈন্য নিয়ে আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। এরপর আমির উম্মু ফুলানোর গৃহে মহামারীতে আক্রান্ত হল। সে বলল, অমুক গোত্রের মহিলার বাড়িতে উটের যেমন ফোঁড়া হয় আমারও তেমন ফোঁড়া হয়েছে। তোমরা আমার ঘোড়া নিয়ে আস। তারপর ঘোড়ার পিঠেই সে মারা যায়। উম্মু সুলায়ম-এর ভাই হারাম [ইবন মিলহান] এক খোড়া ব্যক্তি ও কোন এক গোত্রের অপর ব্যক্তি সহ সে এলাকার দিকে রওয়ানা করলেন। [হারাম ইবন মিলহান] তার দুই সঙ্গীকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা নিকটেই অবস্থান কর। আমিই তাদের নিকট যাচ্ছি। তারা যদি আমাকে নিরাপত্তা দেয়, তাহলে তোমরা এখানেই থাকবে। আর যদি তারা আমাকে শাহীদ করে দেয় তাহলে তোমরা তোমাদের সঙ্গীদের কাছে চলে যাবে। এরপর তিনি (তাদের নিকট গিয়ে) বললেন, তোমরা (আমাকে) নিরাপত্তা দিবে কি? দিলে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিতাম। তিনি তাদের সঙ্গে এ ধরনের আলাপ-আলোচনা করছিলেন। এমন সময় তারা এক ব্যক্তিকে ইশারা করলে সে পেছন থেকে এসে তাকে বর্শা দ্বারা আঘাত করল। হাম্মাম বলেন, আমার মনে হয় আমার শায়খ [ইসহাক] বলেছিলেন যে, বর্শা দ্বারা আঘাত করে এপার ওপার করে দিয়েছিল। (আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে) হারাম ইবন মিলহান বললেন, আল্লাহু আকবার, কাবার প্রভুর শপথ! আমি সফলকাম হয়েছি। এরপর উক্ত (হারামের সঙ্গী) লোকটি ব্যতীত সকলেই নিহত হলেন। খোড়া লোকটি ছিলেন পর্বতের চূড়ায়। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি (একখানা) আয়াত অবতীর্ণ করলেন যা পরে মানসূখ হয়ে যায়। আয়াতটি ছিল এইঃ আমরা আমাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌছে গেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমাদেরকেও সন্তুষ্ট করেছেন।" তাই নবী (ﷺ) ত্রিশ দিন পর্যন্ত ফজরের সালাতে রি'ল, যাকওয়ান, বনূ লিহ্ইয়ান এবং উসায়্যা গোত্রের জন্য বদদোয়া করেছেন, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্য হয়েছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মামা হারাম ইবন মিলহান-কে বি'রে মাউনার দিন বর্শা বিদ্ধ করা হলে তিনি এভাবে দু'হাতে রক্ত নিয়ে নিজের চেহারা ও মাথায় মেখে বললেন, কাবার প্রভুর কসম, আমি সফলকাম হয়েছি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কার কাফিরদের) অত্যাচার চরম আকার ধারণ করলে আবূ বাকর (মক্কা ছেড়ে) বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নবী (ﷺ)-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি তাকে বললেন, অবস্থান কর। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি কামনা করেন যে, আপনাকে অনুমতি দেয়া হোক? তিনি বললেন, আমি তো তাই আশা করি। আয়িশাহ বলেন, আবূ বাকর নবী (ﷺ)-এর জন্য অপেক্ষা করলেন। একদিন যুহরের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এসে তাকে ডেকে বললেন, তোমার কাছে যারা আছে তাদেরকে সরিয়ে দাও। তখন আবূ বাকর বললেন, এরা তো আমার দু' মেয়ে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি কি জান আমাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে? আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনার সঙ্গে যেতে পারব? নবী (ﷺ) বললেন, হ্যা আমার সঙ্গে যেতে পারবে। আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে দু'টি উটনী আছে। এখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্যই এ দু'টিকে আমি প্রস্তুত করে রেখেছি। এরপর তিনি নবী (ﷺ)-কে দু'টি উটের একটি উট প্রদান করলেন। এ উটটি ছিল কান-নাক কাটা। তারা উভয়ে সওয়ার হয়ে রওয়ানা হলেন এবং সওর পর্বতের গুহায় পৌছে তাতে লুকিয়ে থাকলেন। আয়িশাহ-এর বৈমাত্রের ভাই 'আমির ইবন ফুহাইরাহ ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন তুফাইল ইবন সাখ্বারার গোলাম। আবূ বাকর-এর একটি দুধের গাভী ছিল। তিনি (আমির ইবন ফুহাইরা) সেটিকে সন্ধ্যাবেলা চরাতে নিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকারে তাদের দু'জনের কাছে নিয়ে যেতেন এবং ভোরবেলা তাদের (কাফিরের) কাছে নিয়ে যেতেন। কোন রাখালই এ বিষয়টি বুঝতে পারত না। তারা দু'জন গারে সাওর থেকে বের হলে তিনিও তাদের সঙ্গে রওয়ানা হলেন। তারা মদিনা পৌছে যান। 'আমির ইবন ফুহাইরাহ পরবর্তীকালে বি'রে মাউনার দুর্ঘটনায় শাহাদাত লাভ করেন। (অন্য সানাদে) আবূ উসামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিশাম ইবন উরওয়াহ বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেছেন, বি'রে মাউনা গমনকারীরা শাহীদ হলে আমর ইবন উমাইয়াহ যামরী বন্দী হলেন। তাকে আমির ইবন তুফায়ল এক নিহত ব্যক্তির লাশ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এ ব্যক্তি কে? আমর ইবন উমাইয়াহ বললেন, ইনি হচ্ছেন 'আমির ইবন ফুহাইরাহ। তখন সে (আমির ইবন তুফায়ল) বলল, আমি দেখলাম, নিহত হওয়ার পর তার লাশ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এমনকি আমি তার লাশ আসমান যমীনের মাঝে দেখেছি। এরপর তা (যমীনের উপর) রেখে দেয়া হল। এ সংবাদ নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছলে তিনি সাহাবীগণকে তাদের শাহাদাতের সংবাদ জানিয়ে বললেন, তোমাদের সাথীদেরকে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর পূর্বে তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট এবং আপনিও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট- এ সংবাদ আমাদের ভাইদের কাছে পৌছে দিন। তাই মহান আল্লাহ তাদের এ সংবাদ মুসলিমদের কাছে পৌছিয়ে দিলেন। ঐ দিনের নিহতদের মধ্যে উরওয়াহ ইবন আসমা ইবন সাল্লাত-ও ছিলেন। তাই এ নামেই উরওয়াহ (ইবন যুবায়রের)-এর নামকরণ করা হয়েছে। আর মুনযির ইবন আমর-ও এ দিন শাহাদাত লাভ করেছিলেন। তাই এ নামেই মুনযির-এর নামকরণ করা হয়েছে।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এক মাস ব্যাপী সালাতে রুকূর পরে কুনূত পাঠ পড়েছেন। এতে তিনি রি'ল, যাকওয়ান গোত্রের জন্য বদদোয়া করেছেন। তিনি বলেন, উসায়্যা গোত্র আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্যতা করেছে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যারা বি'রে মাউনার নিকট নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণকে শহীদ করেছিল সে হত্যাকারী রি'ল, যাকওয়ান, বানী লিহ্ইয়ান এবং উসায়্যা গোত্রের প্রতি নবী (ﷺ) ত্রিশদিন ব্যাপী ফজরের সালাতে বদদোয়া করেছেন। তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের নাফরমানী করেছে। আনাস বর্ণনা করেছেন যে, বি'রে মাউনা নামক স্থানে যারা শাহাদাত লাভ করেছেন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তার নবীর প্রতি আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেন। আমরা তা পাঠ করতাম। অবশ্য পরে এর তিলাওয়াত রহিত হয়ে গেছে। (আয়াতটি হল) আমাদের কাওমের কাছে এ খবর পৌছিয়ে দাও যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের সান্নিধ্যে পৌছে গেছি। তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমরাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি।

আসিমুল আহ্ওয়াল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে সালাতে (দোয়া) কুনূত পড়তে হবে কি না-এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন, হ্যা পড়তে হবে। আমি বললাম, রুকূর আগে পড়তে হবে, না পরে? তিনি বললেন, রুকূর আগে। আমি বললাম, অমুক ব্যক্তি আপনার সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আপনি রুকূর পর কুনূত পাঠ করার কথা বলেছেন। তিনি বললেন, সে মিথ্যে বলেছে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মাত্র একমাস ব্যাপী রুকূর পর কুনূত পাঠ করেছেন। এর কারণ ছিল এই যে, নবী (ﷺ) সত্তরজন কারীর একটি দলকে মুশরিকদের নিকট কোন এক কাজে পাঠিয়েছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাদের মধ্যে চুক্তি ছিল। আক্রমণকারীরা বিজয়ী হল। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রতি বদদোয়া করে সালাতে রুকূর পর এক মাস ব্যাপী কুনূত পাঠ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, উহূদ যুদ্ধের দিন তিনি (যুদ্ধের জন্য) নিজেকে পেশ করার পর নবী (ﷺ) তাকে অনুমতি দেননি। তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। তবে খন্দক যুদ্ধের দিন তিনি নিজেকে পেশ করলে নবী (ﷺ) তাকে অনুমতি দিলেন। তখন তার বয়স পনের বছর।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পরিখা খননের কাজে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে অংশ নিয়েছিলাম। তারা পরিখা খুড়ছিলেন আর আমরা কাঁধে মাটি বহন করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের শান্তি ব্যতীত প্রকৃত কোন শান্তি নেই। আপনি মুহাজির এবং আনসারদেরকে ক্ষমা করে দিন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হয়ে পরিখা খননের স্থানে উপস্থিত হন। আনসার ও মুহাজিরগণ একদিন ভোরে তীব্র শীতের মধ্যে পরিখা খনন করছিলেন। তাদের কোন গোলাম বা ক্রীতদাস ছিল না যে, তারা তাদেরকে এ কাজে নিয়োগ করবেন। ঠিক এমনি সময়ে নবী (ﷺ) তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন। তাদের অনাহার ক্লিষ্টতা ও কষ্ট দেখে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের সুখ শান্তিই প্রকৃত সুখ শান্তি। তুমি আনসার ও মুহাজিরদেরকে ক্ষমা করে দাও। সাহাবীগণ এর উত্তরে বললেন- আমরা সে সব লোক, যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি জিহাদের জন্য।"

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজিরগণ মদিনার চারপাশে খাল খনন করছিলেন আর পিঠে মাটি বহন করছিলেন। আর (খুশিতে) আবৃত্তি করছিলেন- আমরা সে সব লোক, যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছি, যতদিন আমরা জীবিত থাকি জিহাদের জন্য।" বর্ণনাকারী বলেন, নবী (ﷺ) তাদের এ কথার উত্তরে বলতেন, হে আল্লাহ! আখিরাতের কল্যাণ ব্যতীত আর কোন কল্যাণ নেই, তাই আনসার ও মুহাজিরদের কাজে বারাকাত দান করুন। বর্ণনাকারী [আনাস] বর্ণনা করছেন যে, তাদেরকে এক মুষ্টি ভরে যব দেয়া হত। তা বাসি, স্বাদবিকৃত চর্বিতে মিশিয়ে খাবার রান্না করে ক্ষুধার্ত লোকগুলোর সামনে পরিবেশন করা হত। যদিও এ খাদ্য ছিল একেবারে স্বাদহীন ও ভীষণ দূর্গন্ধময়।

আইমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাবির-এর নিকট গেলে তিনি বললেন, খন্দকের দিন আমরা পরিখা খনন করছিলাম। এ সময় একখন্ড কঠিন পাথর বেরিয়ে আসলে তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, খন্দকের ভিতর একটি শক্ত পাথর বেরিয়েছে। তখন তিনি বললেন, আমি নিজে খন্দকে নামব। অতঃপর তিনি দাড়ালেন। আর তার পেটে একটি পাথর বাধা ছিল। আর আমরাও তিন দিন ধরে অনাহারী ছিলাম। কোন কিছুর স্বাদই চাখিনি। তখন নবী (ﷺ) একখানা কোদাল হাতে নিয়ে পাথরটিতে আঘাত করলেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তা চূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হল। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য অনুমতি দিন। (বাড়ি পৌছে) আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, নবী (ﷺ)-এর মধ্যে আমি এমন কিছু দেখলাম যা আমি সহ্য করতে পারছি না। তোমার নিকট কোন খাবার আছে কি? সে বলল, আমার কাছে কিছু যব ও একটি বাকরীর বাচ্চা আছে। তখন বাকরীর বাচ্চাটি আমি যবহ করলাম এবং সে যব পিষে দিল। এরপর গোশত ডেকচিতে দিয়ে আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলাম। এ সময় আটা খামির হচ্ছিল এবং ডেকচি চুলার উপর ছিল ও গোশত প্রায় রান্না হয়ে আসছিল। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার (বাড়ীতে) সামান্য কিছু খাবার আছে। আপনি একজন বা দু'জন সঙ্গে নিয়ে চলুন। তিনি বললেন, কী পরিমাণ খাবার আছে? আমি তার কাছে সব খুলে বললাম। তিনি বললেন, এ-তো অনেক বেশ ভাল। তিনি বললেন, তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বল, আমি না আসা পর্যন্ত উনান থেকে ডেকচি ও রুটি যেন না নামায়। এরপর তিনি বললেন, উঠ! মুহাজির ও আনসারগণ উঠলেন। জাবির তার স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন, তোমার সর্বনাশ হোক! নবী (ﷺ) তো মুহাজির, আনসার আর তাদের সাথীদের নিয়ে চলে এসেছেন। তিনি (জাবিরের স্ত্রী বললেন, তিনি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন? আমি বললাম, হ্যা। এরপর নবী (ﷺ) (উপস্থিত হয়ে) বললেন, তোমরা সকলেই প্রবেশ কর কিন্তু ভিড় করো না। এ ব'লে তিনি রুটি টুকরো করে এর উপর গোশত দিয়ে সাহাবীগণের মাঝে বিতরণ করতে শুরু করলেন। তিনি ডেকচি এবং উনান ঢেকে রেখেছিলেন। এমনি করে তিনি রুটি টুকরো করে হাত ভরে বিতরণ করতে লাগলেন। এতে সকলে পেট পুরে খাওয়ার পরেও কিছু বাকী রয়ে গেল। তিনি (জাবিরের স্ত্রীকে) বললেন, এ তুমি খাও এবং অন্যকে হাদিয়া দাও। কেননা লোকদেরও ক্ষুধা পেয়েছে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন পরিখা খনন করা হচ্ছিল তখন আমি নবী (ﷺ)-কে ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন আমি আমার স্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে কোন কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দারুন ক্ষুধার্ত দেখেছি। তিনি একটি চামড়ার পাত্র এনে তা থেকে এক সা' পরিমাণ যব বের করে দিলেন। আমার বাড়ীতে একটা বাকরীর বাচ্চা ছিল। আমি সেটি যবহ করলাম। আর সে (আমার স্ত্রী যব পিষে দিল। আমি আমার কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেও তার কাজ শেষ করল এবং গোশত কেটে কেটে ডেকচিতে ভরলাম। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ফিরে চললাম। তখন সে (স্ত্রী বলল, আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীদের নিকট লজ্জিত করবেন না। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে চুপে চুপে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের একটি বাকরীর বাচ্চা যবহ করেছি এবং আমাদের ঘরে এক সা যব ছিল। তা আমার স্ত্রী পিষে দিয়েছে। আপনি আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আসুন। তখন নবী (ﷺ) উচ্চস্বরে সবাইকে বললেন, হে পরিখা খননকারীরা! জাবির খানার ব্যবস্থা করেছে। এসো, তোমরা সকলেই চল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমার আসার পূর্বে তোমাদের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও তৈরি করবে না। আমি (বাড়ীতে) আসলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সহাবা-ই-কিরামসহ আসলেন। এরপর আমি আমার স্ত্রীর নিকট আসলে সে বলল, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। আমি বললাম, তুমি যা বলেছ আমি তাই করেছি। এরপর সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে আটার খামির বের করে দিলে তিনি তাতে মুখের লালা মিশিয়ে দিলেন এবং বারাকাতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর তিনি ডেকচির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাতে মুখের লালা মিশিয়ে এর জন্য বারাকাতের দোয়া করলেন। তারপর বললেন, রুটি প্রস্তুতকারিণীকে ডাক। সে আমার কাছে বসে রুটি প্রস্তুত করুক এবং ডেকচি থেকে পেয়ালা ভরে গোশত বেড়ে দিক। তবে (উনুন হতে) ডেকচি নামাবে না। তারা ছিলেন সংখ্যায় এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা সকলেই তৃপ্তি সহকারে খেয়ে বাকী খাদ্য রেখে চলে গেলেন। অথচ আমাদের ডেকচি আগের মতই টগবগ করছিল আর আমাদের আটার খামির থেকেও আগের মতই রুটি তৈরি হচ্ছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উচু অঞ্চল ও নীচু অঞ্চল হতে এবং তোমাদের চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল ...."- (আল-আহযাব ৩৩/১০)। তিনি বলেন, এ আয়াতখানা খন্দকের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খন্দক যুদ্ধের দিন মাটি বহন করেছিলেন। এমনকি মাটি তার পেট ঢেকে ফেলেছিল অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তার পেট ধূলায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তিনি বলছিলেনঃ আল্লাহর কসম! আল্লাহ হিদায়াত না করলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, দান সদাকাহ করতাম না এবং সালাতও আদায় করতাম না। সুতরাং (হে আল্লাহ!) আমাদের প্রতি রহমত অবতীর্ণ করুন এবং আমাদেরকে শত্রুর সঙ্গে মুকাবালা করার সময় দৃঢ়পদ রাখুন। নিশ্চই মক্কাবাসীরা আমাদের প্রতি বিদ্রোহ করেছে। যখনই তারা ফিতনার প্রয়াস পেয়েছে তখনই আমরা এড়িয়ে গেছি। শেষের কথাগুলো বলার সময় নবী (ﷺ) উচ্চস্বরে "এড়িয়ে গেছি", "এড়িয়ে গেছি" বলে উঠেছেন।

ইবন আব্বাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে পূবের বাতাস দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, আর আদ জাতিকে পশ্চিমা বাতাস দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পরিখা খনন করেছেন। আমি তাকে খন্দকের মাটি বহন করতে দেখেছি। এমনকি ধূলাবালি পড়ার কারণে তার পেটের চামড়া ঢেকে গিয়েছিল। তিনি অধিকতর পশম বিশিষ্ট ছিলেন। সে সময় আমি নবী (ﷺ)-কে মাটি বহন রত অবস্থায় ইবন রাওয়াহার কবিতা আবৃত্তি করে শুনেছি। তিনি বলছিলেনঃ হে আল্লাহ! আপনি যদি হিদায়াত না করতেন তাহলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, আমরা সদাকাহ করতাম না এবং আমরা সালাতও আদায় করতাম না। সুতরাং আমাদের প্রতি আপনার শান্তি অবতীর্ণ করুন, এবং দুশমনের সম্মুখীন হওয়ার সময় আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন। অবশ্য মক্কাবাসীরাই আমাদের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছে, তারা ফিতনা বিস্তার করতে চাইলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করেছি। বর্ণনাকারী (বারাআ) বলেন, শেষের কথাগুলি তিনি টেনে আবৃত্তি করছিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রথমে যে যুদ্ধে আমি অংশ নিয়েছিলাম সেটা খন্দকের যুদ্ধ ছিল।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি হাফসাহ-এর কাছে গেলাম। সে সময় তার চুলের বেণি থেকে ফোঁটা পানি ঝরছিল। আমি তাকে বললাম, আপনি দেখছেন, (নেতৃত্বের ব্যাপারে) লোকজন কী সব করছে। নেতৃত্বের কোন অংশই আমার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়নি। তখন তিনি বললেন, আপনি তাদের সঙ্গে যোগ দিন। কেননা তারা আপনার অপেক্ষা করছে। আপনি তাদের থেকে পৃথক থাকলে বিচ্ছিন্নতা ঘটতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করছি। হাফসাহ তাকে বলতেই থাকলেন। শেষে তিনি গেলেন। এরপর লোকজন ওখান থেকে চলে গেলে মুআবিয়াহ বক্তৃতা করে বললেন, ইমারতের ব্যাপারে কারো কিছু বলার ইচ্ছা হলে সে আমাদের সামনে মাথা তুলুক। এ ব্যাপারে আমরাই তার ও তার পিতার চেয়ে অধিক হাকদার। তখন হাবীব ইবন মাসলামাহ তাকে বললেন, আপনি এ কথার জবাব দেননি কেন? তখন আবদুল্লাহ (ইবন উমার) বললেন, আমি তখন আমার গায়ের চাদর ঠিক করলাম এবং এ কথা বলার ইচ্ছা করলাম যে, এ বিষয়ে ঐ ব্যক্তিই অধিক হাকদার যে ইসলামের জন্য আপনার ও আপনার পিতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তবে আমার এ কথায় ঐক্যে ফাটল ধরবে, রক্তপাত ঘটবে এবং আমার এ কথার অন্য রকম অর্থ করা হবে এ আশঙ্কা করলাম এবং আল্লাহ জান্নাতে যে নি'আমাত তৈরি করে রেখেছেন তা স্মরণ করলাম ব'লে কথা বলা থেকে বিরত থাকলাম। তখন হাবীব বললেন, আপনি (ফিতনা থেকে) রক্ষা পেয়েছেন এবং বেচে গেছেন।

সুলাইমান ইবন সুরাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধের দিন নবী (ﷺ) বলেছেন যে, এখন আমরাই তাদেরকে আক্রমণ করব, তারা আমাদের প্রতি আক্রমণ করতে পারবে না।

সুলাইমান ইবন সুরাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন কাফিরদের সম্মিলিত বাহিনী মদিনা ছেড়ে যেতে বাধ্য হলে নবী (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, এখন থেকে আমরাই তাদেরকে আক্রমণ করব। তারা আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারবে না। আর আমরা তাদের এলাকায় গিয়ে আক্রমণ চালাব।

আলী সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত যে, তিনি খন্দকের যুদ্ধের দিন বদদোয়া করে বলেছিলেন, আল্লাহ তাদের ঘরবাড়ি ও কবর আগুন দ্বারা ভরে দিন। কারণ তারা আমাদেরকে মধ্যবর্তী সালাতের সময় ব্যস্ত করে রেখেছে, এমনকি সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, খন্দকের দিন সূর্যাস্তের পর উমার ইবন খাত্তাব এসে কুরায়শ কাফিরদের গালি দিতে লাগলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সূর্যাস্তের পূর্বে আমি সালাত আদায় করতে পারিনি। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমিও আজ এ সালাত আদায় করতে পারিনি। [বর্ণনাকারী বলেন] অতঃপর আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বুতহান উপত্যকায় গেলাম। তিনি সালাতের জন্য 'উযূ করলেন। আমরাও সালাতের 'উযূ করলাম। তিনি সূর্যাস্তের পর আসরের সালাত আদায় করলেন তারপরে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কুরায়শ কাফিরদের খবর আমাদের নিকট কে এনে দিতে পারবে? যুবায়র বললেন, আমি। তিনি (ﷺ) আবার বললেন, কুরায়শদের খবর আমাদের নিকট কে এনে দিতে পারবে? তখনও যুবায়র বললেন, আমি। তিনি পুনরায় বললেন, কুরায়শদের সংবাদ আমাদের নিকট কে এনে দিতে পারবে? এবারও যুবায়র বললেন, আমি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, প্রত্যেক নবীরই হাওয়ারী (বিশেষ সাহায্যকারী) ছিল। আমার হাওয়ারী হল যুবায়র।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (খন্দকের যুদ্ধের সময়) বলতেন, এক আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার অর্থে কোন ইলাহ নেই। তিনিই তার বাহিনীকে মর্যাদাবান করেছেন, তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাভূত করেছেন। এরপর শত্রু ভয় বলতে আর কিছুই থাকল না।

আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে দোয়া করে বলেছেন, হে কিতাব অবতীর্ণকারী ও তৎপর হিসাব গ্রহণকারী আল্লাহ! আপনি সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করুন। হে আল্লাহ! তাদেরকে পরাজিত এবং তাদেরকে প্রকম্পিত করুন।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধ, হাজ্জ বা উমরাহ থেকে ফিরে আসতেন তখন প্রথমে তিনবার তাকবীর বলতেন। এরপর বলতেন, সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোন শারীক নেই। রাজত্ব এবং প্রশংসা একমাত্র তারই। সব বিষয়ে তিনিই সর্বশক্তিমান। আমরা তারই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী, তওবা্কারী, তারই ইবাদাতকারী। আমরা আমাদের প্রভুর কাছে সিজদাকারী, তারই প্রশংসাকারী। আল্লাহ তার ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন। তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাভূত করেছেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খন্দক যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে অস্ত্র রেখে গোসল করেছেন। এমনি মুহূর্তে তার কাছে জিবরীল এসে বললেন, আপনি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! আমরা তা খুলিনি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে চলুন। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যেতে হবে? তিনি বনূ কুরাইযাহর প্রতি ইশারা করে বললেন, ঐ দিকে। তখন নবী (ﷺ) তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে বেরিয়ে পড়লেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ গান্ম গোত্রের গলিতে জিবরীল বাহিনীর গমনে উত্থিত ধূলারাশি এখনো দেখতে পাচ্ছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন বানু কুরাইযার দিকে যাচ্ছিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আহযাব যুদ্ধের দিন (যুদ্ধ শেষে) বললেন, বনূ কুরাইযায় না পৌছে কেউ আসরের সালাত আদায় করবে না। তাদের একাংশের পথিমধ্যে আসরের সালাতের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে পৌছার আগে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা এখনই সালাত আদায় করব, সময় হলেও রাস্তায় সালাত আদায় করা যাবে না উদ্দেশ্য তা নয়। বিষয়টি নবী (ﷺ)-এর কাছে বলা হলে তিনি তাদের কোন দলের প্রতিই অসন্তুষ্টি ব্যক্ত করেননি।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা নবী (ﷺ)-কে খেজুর গাছ হাদিয়া দিতেন। অতঃপর যখন তিনি বানু নাযীর এবং বানু কুরাইযাহর উপর জয়লাভ করলেন তখন আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে নির্দেশ দিল, যেন আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে তাদের দেয়া সবগুলো খেজুর গাছ অথবা কিছু সংখ্যক খেজুর গাছ তার নিকট থেকে ফেরত গ্রহণের ব্যাপারে নিবেদন করি। আর নবী (ﷺ) ঐ গাছগুলো উম্মু আইমান-কে দান করেছিলেন। উম্মু আইমান আসলেন এবং আমার গলায় কাপড় লাগিয়ে বললেন, এটা কক্ষনো হতে পারে না। সেই আল্লাহর কসম! যিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। তিনি ঐ গাছগুলো তোমাকে আর দেবেন না। তিনি এগুলো আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। অথবা (রাবীর সন্দেহ) যেমন তিনি বলেছেন। এদিকে নবী (ﷺ) বলছিলেন, তুমি ঐ গাছগুলোর বদলে আমার নিকট থেকে এত এত পাবে। কিন্তু উম্মু আইমান বলছিলেন, আল্লাহর কসম! এটা কক্ষনো হতে পারে না। অবশেষে নবী (ﷺ) তাকে দিলেন। বর্ণনাকারী আনাস বলেন, আমার মনে হয় নবী (ﷺ) বললেন, এর দশগুণ অথবা যেমন তিনি বলেছেন।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ ইবন মুআয-এর বিচার মতে বানী কুরাইযাহ গোত্রের লোকেরা দূর্গ থেকে বেরিয়ে আসল। নবী (ﷺ) সাদকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। তিনি গাধায় চড়ে আসলেন। তিনি মসজিদে নাবাবীর নিকটবর্তী হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আনসার সাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তোমাদের নেতা বা সর্বোত্তম লোককে স্বাগত জানানোর জন্য দাড়িয়ে যাও। (অতঃপর) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এরা তোমার ফায়সালা মেনে নিয়ে দূর্গ থেকে নিচে নেমে এসেছে। তখন তিনি বললেন, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে এবং তাদের সন্তাদেরকে বন্দী করা হবে। নবী (ﷺ) বললেন, হে সাদ! তুমি আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে ফায়সালা দিয়েছ। কোন কোন সময় তিনি বলেছেন, তুমি সকল রাজার রাজা আল্লাহর নির্দেশ মুতাবিক ফায়সালা করেছ।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধে সাদ আহত হয়েছিলেন। কুরাইশ গোত্রের হিববান ইবন আরেকা নামক এক ব্যক্তি তার উভয় বাহুর মধ্যবর্তী রগে তীর বিদ্ধ করেছিল। নিকট থেকে তার সেবা করার জন্য নবী (ﷺ) মসজিদে নাববীতে একটি তাবু তৈরি করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যখন হাতিয়ার রেখে গোসল শেষ করলেন তখন জিব্রীল নিজ মাথার ধূলাবালি ঝাড়তে ঝাড়তে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, আপনি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এখনো তা রেখে দেইনি। চলুন তাদের দিকে। নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায়? তিনি বানী কুরাইযা গোত্রের প্রতি ইশারা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বনু কুরাইযার মহল্লায় এলেন। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ফায়সালা মান্য করে দূর্গ থেকে নিচে নেমে এল। কিন্তু তিনি ফয়সালার ভার সাদ -এর উপর ন্যস্ত করলেন। তখন সাদ বললেন, তাদের ব্যাপারে আমি এই ফায়সালা দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে, নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করা হবে। বর্ণনাকারী হিশাম বলেন, আমার পিতা আয়িশাহ থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, সাদ আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আপনি তো জানেন, আপনার সন্তুষ্টির জন্য তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার চেয়ে কোন কিছুই আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়। যে সম্প্রদায় আপনার রাসূলকে মিথ্যাচারী বলেছে এবং দেশ থেকে বের করে দিয়েছে হে আল্লাহ! আমি মনে করি (খন্দক যুদ্ধের পর) আপনি তো আমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন। যদি এখনো কুরায়শদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ বাকী থেকে থাকে তাহলে আমাকে বাচিয়ে রাখুন, যাতে আমি আপনার রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারি। আর যদি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে থাকেন তাহলে ক্ষত হতে রক্ত প্রবাহিত করুন আর তাতেই আমার মৃত্যু দিন। এরপর তার ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে তা প্রবাহিত হতে লাগল। মসজিদে বানী গিফার গোত্রের একটি তাবু ছিল। তাদের দিকে রক্ত প্রবাহিত হতে দেখে তারা বললেন, হে তাবুবাসীগণ! আপনাদের দিক থেকে এসব কী আমাদের দিকে আসছে? পরে তারা জানলেন যে, সাদ-এর ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ জখমের কারণেই তিনি মারা যান, আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট থাকুন।

আদী হতে বর্ণিত। তিনি বারাআ-কে বলতে শুনেছেন যে, নবী (ﷺ) হাসসান-কে বলেছেন, কবিতার দ্বারা তাদের (কাফিরদের) দোষত্রুটি বর্ণনা কর অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) তাদের দোষত্রুটি বর্ণনা করার জবাব দাও। জিবরীল তোমার সঙ্গে থাকবেন।

(অন্য এক সানাদে) ইবরাহীম ইবন তাহমান বারাআ ইবন আযিব থেকে অধিক বর্ণনা করে বলেছেন, নবী (ﷺ) বানু কুরাইযাহ'র সঙ্গে যুদ্ধের দিন হাস্সান ইবন সাবিত-কে বলেছিলেন (কবিতা আবৃত্তি করে) মুশরিকদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধর। এ ব্যাপারে জিবরীল তোমার সঙ্গী।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) সপ্তম যুদ্ধ তথা যাতুর রিকার যুদ্ধে তার সাহাবীগণকে নিয়ে সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন। ইবন আব্বাস বলেছেন, নবী (ﷺ) যূকারাদ -এর যুদ্ধে সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন।

জাবির হতে বর্ণিত যে, মুহারিব ও সালাবা গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় নবী (ﷺ) সাহাবীবর্গকে সঙ্গে নিয়ে সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) নাখলা নামক স্থান থেকে যাতুর রিকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গাতফান গোত্রের একটি দলের সম্মুখীন হন। কিন্তু সেখানে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। উভয় পক্ষ পরস্পর ভীতি প্রদর্শন করেছিল মাত্র। তখন নবী (ﷺ) দু'রাকাত সালাতুল খাওফ আদায় করেন। ইয়াযীদ সালামাহ থেকে বর্ণনা করে বলেছেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে যূকারাদ-এর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন যুদ্ধে আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হলাম। আমরা ছিলাম ছয়জন। আমাদের কাছে ছিল মাত্র একটি উট। পালাক্রমে আমরা এর পিঠে চড়তাম। (হেটে হেটে) আমাদের পা ফেটে যায়। আমার পা দু'খানাও ফেটে গেল, নখগুলো খসে পড়ল। এ কারণে আমরা পায়ে নেকড়া জড়িয়ে নিলাম। এ জন্য একে যাতুর রিকা যুদ্ধ বলা হয়। কেননা এ যুদ্ধে আমরা আমাদের পায়ে নেকড়া দিয়ে পট্টি বেধেছিলাম। আবূ মূসা উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি এ ঘটনা বর্ণনা করাকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, আমি এভাবে বর্ণনা করাকে ভাল মনে করি না। সম্ভবত তিনি তার কোন আমল প্রকাশ করাকে অপছন্দ করতেন।

সালিহ ইবন খাওয়াত এমন একজন সাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যিনি যাতুর রিকার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন। তিনি বলেছেন, একদল লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে কাতারে দাড়ালেন এবং অপর দলটি থাকলেন শত্রুর সম্মুখীন। এরপর তিনি তার সঙ্গে দাড়ানো দলটি নিয়ে এক রাকাত সালাত আদায় করে স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকলেন। মুক্তাদীগণ তাদের সালাত পূর্ণ করে ফিরে গেলেন এবং শত্রুর সম্মুখে সারিবদ্ধ হয়ে দাড়ালেন। এরপর দ্বিতীয় দলটি এলে তিনি তাদেরকে নিয়ে অবশিষ্ট রাকাত আদায় করে স্থির হয়ে বসে থাকলেন। এরপর মুক্তাদীগণ তাদের নিজেদের সালাত সম্পূর্ণ করলে তিনি তাদেরকে নিয়ে সালাম ফিরালেন।

জাবির হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, আমরা নাখলা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এরপর জাবির সালাতুল খাওফের কথা উল্লেখ করেন। এ হাদীসের ব্যাপারে ইমাম মালিক বলেছেন, সালাতুল খাওফ সম্পর্কে আমি যত হাদীস শুনেছি এর মধ্যে এ হাদীসটিই সবচেয়ে উত্তম। লায়স কাসিম ইবন মুহাম্মাদ থেকে নবী (ﷺ) গাযওয়ায়ে বনু আনমারে সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন।

সাহল ইবন আবূ হাসমাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (সালাতুল খাওফে) ইমাম কিবলামুখী হয়ে দাড়াবেন। একদল থাকবেন তার সঙ্গে এবং অন্যদল শত্রুদের মুখোমুখী হয়ে তাদের মুকাবালায় দাড়িয়ে থাকবেন। তখন ইমাম তার পেছনের একদল নিয়ে এক রাকাত সালাত আদায় করবেন। এরপর সালাতরত দলটি নিজ স্থানে দাড়িয়ে রুকূ ও দু' সিজদাসহ আরো এক রাকাত সালাত আদায় করে ঐ দলের স্থানে গিয়ে দাড়াবেন। এরপর তারা এলে ইমাম তাদের নিয়ে এক রাকাত সালাত আদায় করবেন। এভাবে ইমামের দু'রাকাত সালাত পূর্ণ হয়ে যাবে। আর পিছনের লোকেরা রুকূ সিজদাসহ আরো এক রাকাত সালাত আদায় করবেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে নাজ্দ এলাকায় যুদ্ধ করেছি। এ যুদ্ধে আমরা শত্রুদের মুকাবালা করেছিলাম এবং তাদের সম্মুখে কাতারে দাড়িয়েছিলাম।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদল সঙ্গে নিয়ে সালাত আদায় করেছেন। অন্যদরকে রেখেছেন শত্রুর মুকাবালায়। তারপর সালাতরত দলটি এক রাকাত আদায় করে তারা শত্রুর মুকাবালায় নিজ সাথীদের স্থানে চলে গেলেন। অতঃপর অন্য দলটি আসলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে নিয়ে এক রাকাত সালাত আদায় করে সালাম ফিরালেন। এরপর তারা তাদের বাকী আরেক রাকাত আদায় করলেন এবং শত্রুর মুকাবালায় গিয়ে দাড়ালেন। এবার আগের দলটি এসে তাদের বাকী রাকাতটি পূর্ণ করলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি নাজ্দ এলাকায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি নাজ্দ এলাকায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করলে তিনিও তার সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করলেন। পথিমধ্যে কাঁটা গাছ ভরা এক উপত্যকায় মধ্যাহ্নের সময় তাদের ভীষণ গরম অনুভূত হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এখানেই অবতরণ করলেন। লোকজন ছায়াদার বৃক্ষের খোজে কাঁটাবনের মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি বাবলা গাছের নিচে অবস্থান করে তরবারিখানা গাছে ঝুলিয়ে রাখলেন। জাবির বলেন, সবেমাত্র আমরা নিদ্রা গিয়েছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে ডাকতে লাগলেন। আমরা তার কাছে উপস্থিত হলাম। তখন তার কাছে এক বেদুঈন বসা ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি নিদ্রিত ছিলাম, এমতাবস্থায় সে আমার তরবারিখানা হস্তগত করে কোষমুক্ত অবস্থায় তা আমার উপর উচিয়ে ধরলে আমি জেগে যাই। তখন সে আমাকে বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাচাবে? আমি বললাম, আল্লাহ। দেখ না, এ-ই তো সে বসা আছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে কোন প্রকার শাস্তি দিলেন না।

(অপর এক সানাদে) আবান জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যাতুর রিকার যুদ্ধে আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা একটি ছায়াদার বৃক্ষের কাছে গিয়ে পৌছলে নবী (ﷺ)-এর জন্য আমরা তা ছেড়ে দিলাম। এমন সময় এক মুশরিক ব্যক্তি এসে গাছের সঙ্গে লটকানো নবী (ﷺ)-এর তরবারিখানা হাতে নিয়ে তা তার উপর উচিয়ে ধরে বলল, তুমি আমাকে ভয় পাও কি? তিনি বললেন, না। এরপর সে বলল, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে কে? তিনি বললেন, আল্লাহ। এরপর নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণ তাকে ধমক দিলেন। এরপর সালাত আরম্ভ হলে তিনি সাহাবীদের একটি দলকে নিয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। তারা এখান থেকে সরে গেলে অপর দলটি নিয়ে তিনি আরো দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। এভাবে নবী (ﷺ)-এর হল চার রাকাত এবং সাহাবীদের হল দু'রাকাত সালাত। (অন্য এক সূত্রে) মুসাদ্দাদ ......... আবূ বিশর হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ)-এর প্রতি যে লোকটি তলোয়ার উচু করেছিল তার নাম হল গাওরাস ইবন হারিস। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ অভিযানে খাসাফার বংশধর মুহারিব গোত্রের বিপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন।

জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, নাখল নামক স্থানে আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি এ সময় সালাতুল খাওফ আদায় করেছেন। আবূ হুরাইরাহ বলেন, নাজদের যুদ্ধে আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সালাতুল খাওফ আদায় করেছি। আবূ হুরাইরাহ খায়বার যুদ্ধের সময় নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছিলেন।

ইবন মুহাইরীয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মসজিদে প্রবেশ করে আবূ সাঈদ খুদরী-কে দেখতে পেয়ে তার কাছে গিয়ে বসলাম এবং আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। আবূ সাঈদ খুদরী বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বানূ মুসতালিকের যুদ্ধে যোগদান করেছিলাম। এ যুদ্ধে আরবের বহু বন্দী আমাদের হস্তগত হয়। মহিলাদের প্রতি আমাদের মনে আসক্তি জাগে এবং বিবাহ-শাদী ব্যতীত এবং স্ত্রীহীন অবস্থা আমাদের জন্য কষ্টকর অনুভূত হয়। তাই আমরা আযল করা পছন্দ করলাম এবং তা করতে মনস্থ করলাম। তখন আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের মাঝে আছেন। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস না করেই আমরা আযল করতে যাচ্ছি। আমরা তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ওটা না করলে তোমাদের কী ক্ষতি? কিয়ামত পর্যন্ত যতগুলো প্রাণের আগমন ঘটবার আছে, ততগুলোর আগমন ঘটবেই।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজদের যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে যোগদান করেছি। কাঁটা গাছে ভরা উপত্যকায় প্রচন্ড গরম লাগলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি গাছের নিচে অবতরণ করে তার ছায়ায় আশ্রয় নিলেন এবং তার তরবারিখানা লটকিয়ে রাখেন। সাহাবীগণ সকলেই গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য ছড়িয়ে পড়লেন। আমরা এ অবস্থায় ছিলাম, হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে ডাকলেন। আমরা তার নিকট গিয়ে দেখলাম, এক গ্রাম্য আরব তার সামনে বসে আছে। তিনি বললেন, আমি ঘুমিয়েছিলাম। এমন সময় সে আমার কাছে এসে আমার তরবারিখানা নিয়ে উচিয়ে ধরল। এতে আমি জেগে গিয়ে দেখলাম, সে খোলা তরবারি হাতে আমার মাথার কাছে দাড়িয়ে বলছে, এখন তোমাকে আমার থেকে কে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। এতে সে তরবারিখানা খাপে ঢুকিয়ে বসে পড়ে। এ-ই সেই লোক। বর্ণনাকারী জাবির বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে কোন শাস্তি দিলেন না।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে আনমার যুদ্ধে সাওয়ারীতে আরোহণ করে মাশরিকের দিকে মুখ করে নফল সালাত আদায় করতে দেখেছি।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন মুসায়্যিব, আলক্বামাহ ইবন ওয়াক্কাস ও উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ ইবন মাসঊদ সূত্রে নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, যখন অপবাদ রটনাকারীগণ তার প্রতি অপবাদ রটিয়েছিল। রাবী যুহরী বলেন, তারা প্রত্যেকেই হাদীসটির অংশবিশেষ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি স্মরণ রাখা ও সঠিকভাবে বর্ণনা করার ব্যাপারে তাদের কেউ কেউ একে অন্যের চেয়ে অধিকতর অগ্রগণ্য ও নির্ভরযোগ্য। আয়িশাহ সম্পর্কে তারা আমার কাছে যা বর্ণনা করেছেন আমি তাদের প্রত্যেকের কথাই ঠিকঠাকভাবে স্মরণ রেখেছি। তাদের একজনের বর্ণিত হাদীসের অংশ অপরের বর্ণিত হাদীসের সত্যতা প্রমাণ করে। যদিও তাদের একজন অন্যের চেয়ে অধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী। বর্ণনাকারীগণ বলেন, আয়িশাহ বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সফরে যেতে ইচ্ছে করতেন তখন তিনি তার স্ত্রীগণের (নির্বাচনের জন্য) কোরা ব্যবহার করতেন। এতে যার নাম উঠত তাকেই তিনি সঙ্গে নিয়ে সফরে যেতেন। আয়িশাহ বলেন, এমনি এক যুদ্ধে তিনি আমাদের মাঝে কোরা ব্যবহার করেন, এতে আমার নাম উঠে আসে। তাই আমিই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সফরে গেলাম। এ ঘটনাটি পর্দার হুকুম নাযিলের পর ঘটেছিল। তখন আমাকে হাওদাসহ সাওয়ারীতে উঠানো ও নামানো হত। এমনিভাবে আমরা চলতে থাকলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ যুদ্ধ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন, তখন তিনি (গৃহাভিমুখে) প্রত্যাবর্তন করলেন। ফেরার পথে আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলে তিনি একদিন রাতের বেলা রওয়ানা হওয়ার জন্য আদেশ করলেন। রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা দেয়া হলে আমি উঠলাম এবং (প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য) পায়ে হেটে সেনাছাউনী পেরিয়ে (সামনে) গেলাম। অতঃপর প্রয়োজন সেরে আমি আমার সাওয়ারীর কাছে ফিরে এসে বুকে হাত দিয়ে দেখলাম যে, (ইয়ামানের অন্তর্গত) যিফার শহরের পুতি দ্বারা তৈরি করা আমার গলার হারটি ছিঁড়ে কোথায় পড়ে গিয়েছে। তাই আমি ফিরে গিয়ে আমার হারটি খোজ করতে লাগলাম। হার খুজতে খুজতে আমার আসতে দেরী হয়ে যায়। আয়িশাহ বলেন, যে সমস্ত লোক উটের পিঠে আমাকে উঠিয়ে দিতেন তারা এসে আমার হাওদা উঠিয়ে তা আমার উটের পিঠে তুলে দিলেন, যার উপর আমি আরোহণ করতাম। তারা ভেবেছিলেন, আমি ওর মধ্যেই আছি, কারণ খাদ্যাভাবে মহিলারা তখন খুবই হালকা হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের দেহ গোশতবহুল ছিল না। তারা খুবই স্বল্প পরিমাণ খানা খেতে পেত। তাই তারা যখন হাওদা উঠিয়ে উপরে রাখেন তখন তারা হালকা হাওদাটিকে কোন প্রকার অস্বাভাবিক মনে করেননি। অধিকন্তু আমি ছিলাম একজন অল্প বয়স্কা কিশোরী। এরপর তারা উট হাকিয়ে নিয়ে চলে যায়। সৈন্যদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার হারটি খুজে পাই এবং নিজ জায়গায় ফিরে এসে দেখি তাদের (সৈন্যদের) কোন আহবানকারী এবং কোন জওয়াব দাতা সেখানে নেই। তখন আমি আগে যেখানে ছিলাম সেখানে বসে রইলাম। ভাবলাম, তারা আমাকে দেখতে না পেয়ে অবশ্যই আমার কাছে ফিরে আসবে। ঐ স্থানে বসে থাকা অবস্থায় ঘুম চেপে ধরলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। বানূ সুলামী গোত্রের যাকওয়ান শাখার সাফওয়ান ইবন মুআত্তাল [যাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফেলে যাওয়া আসবাবপত্র সংগ্রহের জন্য পশ্চাতে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন] সৈন্যদল চলে যাওয়ার পর সেখানে ছিলেন। তিনি সকালে আমার অবস্থানস্থলের কাছে এসে একজন ঘুমন্ত মানুষ দেখে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে চিনে ফেললেন। পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। তিনি আমাকে চিনতে পেরে 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাযিউন' পড়লে আমি তা শুনে জেগে উঠলাম এবং চাদর টেনে আমার চেহারা ঢেকে ফেললাম। আল্লাহর কসম! আমি কোন কথা বলিনি এবং তার থেকে ইন্না লিল্লাহ... পাঠ ব্যতীত অন্য কোন কথাই শুনতে পাইনি। এরপর তিনি সওয়ারী থেকে নামলেন এবং সওয়ারীকে বসিয়ে তার সামনের পা নিচু করে দিলে আমি গিয়ে তাতে উঠে পড়লাম। পরে তিনি আমাকে সহ সওয়ারীকে টেনে আগে আগে চললেন, অতঃপর ঠিক দুপুরে প্রচন্ড গরমের সময় আমরা গিয়ে সেনাদলের সঙ্গে মিলিত হলাম। সে সময় তারা একটি জায়গায় অবতরণ করছিলেন। আয়িশাহ বলেন, এরপর যাদের ধ্বংস হওয়ার ছিল তারা (আমার উপর অপবাদ দিয়ে) ধ্বংস হয়ে গেল। তাদের মধ্যে এ অপবাদ দেয়ার ব্যাপারে যে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল সে হচ্ছে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল। বর্ণনাকারী উরওয়াহ বলেন, আমি জানতে পেরেছি যে, তার (আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল) সামনে অপবাদের কথাগুলো প্রচার করা হত এবং আলোচনা করা হত আর অমনি সে এগুলোকে বিশ্বাস করত, খুব ভাল করে শুনত আর শোনা কথার ভিত্তিতেই ব্যাপারটিকে প্রমাণ করার চেষ্টা করত। উরওয়াহ আরো বর্ণনা করেছেন যে, অপবাদ আরোপকারী ব্যক্তিদের মধ্যে হাস্সান ইবন সাবিত, মিসতাহ ইবন উসাসা এবং হামনা বিনত জাহাশ ব্যতীত আর কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। তারা কয়েকজন লোকের একটি দল ছিল, এটুকু ব্যতীত তাদের ব্যাপারে আমার আর কিছু জানা নেই। যেমন (আল-কুরআনে) মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন। এ ব্যাপারে যে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তাকে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল বলে ডাকা হয়ে থাকে। বর্ণনাকারী উরওয়াহ বলেন, আয়িশাহ এ ব্যাপারে হাস্সান ইবন সাবিত-কে গালমন্দ করাকে পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, হাস্সান ইবন সাবিত তো সেই লোক যিনি তার এক কবিতায় বলেছেন, আমার মান সম্মান এবং আমার বাপ দাদা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মান সম্মান রক্ষায় নিবেদিত। আয়িশাহ বলেন, অতঃপর আমরা মাদ্বীনায় আসলাম। মদিনায় এসে এক মাস পর্যন্ত আমি অসুস্থ থাকলাম। এদিকে অপবাদ রটনাকারীদের কথা নিয়ে লোকেদের মধ্যে আলোচনা ও চর্চা হতে থাকল। কিন্তু এগুলোর কিছুই আমি জানি না। তবে আমি সন্দেহ করছিলাম এবং তা আরো দৃঢ় হচ্ছিল আমার এ অসুখের সময়। কেননা এর আগে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যে রকম স্নেহ-ভালবাসা পেতাম আমার এ অসুখের সময় তা আমি পাচ্ছিলাম না। তিনি আমার কাছে এসে সালাম করে কেবল "তুমি কেমন আছ" জিজ্ঞেস করে চলে যেতেন। তার এ আচরণই আমার মনে ভীষণ সন্দেহ জাগিয়ে তোলে। তবে কিছুটা সুস্থ হয়ে বাইরে বের হওয়ার আগে পর্যন্ত এ জঘন্য অপবাদের ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। উম্মু মিসতাহ (মিসতাহর মা) একদা আমার সঙ্গে পায়খানার দিকে বের হন। আর প্রকৃতির ডাকে আমাদের বের হওয়ার অবস্থা এই ছিল যে, এক রাতে বের হলে আমরা আবার পরের রাতে বের হতাম। এটা ছিল আমাদের ঘরের পার্শ্বে পায়খানা তৈরি করার আগের ঘটনা। আমাদের অবস্থা প্রাচীন আরবের লোকদের অবস্থার মতো ছিল। তাদের মতো আমরাও পায়খানা করার জন্য ঝোপঝাড়ে চলে যেতাম। এমনকি (অভ্যাস না থাকায়) বাড়ির পার্শ্বে পায়খানা তৈরি করলে আমরা খুব কষ্ট পেতাম। আয়িশাহ বলেন, একদা আমি এবং উম্মু মিসতাহ "যিনি ছিলেন আবূ রূহম ইবন মুত্তালিব ইবন 'আবদে মুনাফির কন্যা, যার মা সাখার ইবন 'আমির-এর কন্যা ও আবূ বাকর সিদ্দীকের খালা এবং মিসতাহ ইবন উসাসা ইবন আববাদ ইবন মুত্তালিব যার পুত্র" একত্রে বের হলাম। আমরা আমাদের কাজ থেকে নিস্ক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পথে উম্মু মিসতাহ তার কাপড়ে জড়িয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বললেন, মিসতাহ ধ্বংস হোক। আমি তাকে বললাম, আপনি খুব খারাপ কথা বলছেন। আপনি কি বদর যুদ্ধে যোগদানকারী ব্যক্তিকে গালি দিচ্ছেন? তিনি আমাকে বললেন, ওগো অবলা, সে তোমার সম্বন্ধে কী কথা বলে বেড়াচ্ছে তুমি তো তা শোননি। আয়িশাহ বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে আমার সম্পর্কে কী বলছে? তখন তিনি অপবাদ রটনাকারীদের কথাবার্তা সম্পর্কে আমাকে জানালেন। আয়িশাহ বর্ণনা করেন, এরপর আমার পুরানো রোগ আরো বেড়ে গেল। আমি বাড়ি ফেরার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার কাছে আসলেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন আছ? আয়িশাহ বলেন, আমি আমার পিতা-মাতার কাছে গিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক খবর জানতে চাচ্ছিলাম, তাই আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম, আপনি কি আমাকে আমার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেবেন? আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে অনুমতি দিলেন। তখন আমি আমার আম্মাকে বললাম, আম্মাজান, লোকজন কী আলোচনা করছে? তিনি বললেন, বেটী এ ব্যাপারটিকে হালকা করে ফেল। আল্লাহর কসম! সতীন আছে এমন স্বামীর সোহাগ লাভে ধন্যা সুন্দরী রমণীকে তার সতীনরা বদনাম করবে না, এমন খুব কমই হয়। আয়িশাহ বলেন, আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, সুবহানাল্লাহ। লোকজন কি এমন গুজবই রটিয়েছে। আয়িশাহ বর্ণনা করেন, সারারাত আমি কাঁদলাম। কাঁদতে কাঁদতে সকাল হয়ে গেল। এর মধ্যে আমার চোখের পানিও বন্ধ হল না এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। এরপর ভোরবেলাও আমি কাঁদছিলাম। তিনি আরো বলেন যে, এ সময় ওয়াহী নাযিল হতে দেরি হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার স্ত্রীর (আমার) বিচ্ছেদের বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ ও আলোচনা করার নিমিত্তে আলী ইবন আবূ তালিব এবং উসামাহ ইবন যায়দ-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, উসামাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীদের পবিত্রতা এবং তাদের প্রতি [নবী (ﷺ)-এর] ভালবাসার কারণে বললেন, তারা আপনার স্ত্রী, তাদের সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত আর কিছুই জানি না। আর আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার জন্য সংকীর্ণতা রাখেননি। তিনি ব্যতীত আরো বহু মহিলা আছে। অবশ্য আপনি এ ব্যাপারে দাসী [বারীরাহ]-কে জিজ্ঞেস করুন। সে আপনার কাছে সত্য কথাই বলবে। আয়িশাহ বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বারীরাহ-কে ডেকে বললেন, হে বারীরাহ! তুমি তার মধ্যে কোন সন্দেহপূর্ণ আচরণ দেখেছ কি? বারীরাহ তাকে বললেন, সে আল্লাহর শপথ যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ পাঠিয়েছেন, আমি তার মধ্যে কখনো এমন কিছু দেখিনি যার দ্বারা তাকে দোষী বলা যায়। তবে তার সম্পর্কে কেবল এটুকু বলা যায় যে, তিনি হলেন অল্প বয়স্কা কিশোরী, রুটি তৈরী করার জন্য আটা খামির করে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। আর বাকরী এসে অমনি তা খেয়ে ফেলে। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, সেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে মিম্বরে বসে আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর ক্ষতি থেকে রক্ষার আহবান জানিয়ে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অপবাদ রটিয়ে আমাকে কষ্ট দিয়েছে তার এ অপবাদ থেকে আমাকে কে মুক্ত করবে? আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভাল ব্যতীত আর কিছুই জানি না। আর তারা এক ব্যক্তির (সাফওয়ান ইবন মু'আত্তাল) নাম উল্লেখ করছে যার ব্যাপারেও আমি ভাল ব্যতীত কিছু জানি না। সে তো আমার সঙ্গেই আমার ঘরে যায়। আয়িশাহ বলেন, বানী আবদুল আশহাল গোত্রের সাদ (ইবন মুআয) উঠে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে এ অপবাদ থেকে মুক্তি দেব। সে যদি আউস গোত্রের লোক হয় তাহলে তার শিরচ্ছেদ করব। আর যদি সে আমাদের ভাই খাযরাজের লোক হয় তাহলে তার ব্যাপারে আপনি যা বলবেন তাই করব। আয়িশাহ বলেন, এ সময় হাস্সান ইবন সাবিত-এর মায়ের চাচাতো ভাই খাযরাজ গোত্রের নেতা সাঈদ ইবন উবাদা দাড়িয়ে এ কথার প্রতিবাদ করলেন। আয়িশাহ বলেনঃ এ ঘটনার আগে তিনি একজন সৎ ও নেককার লোক ছিলেন। গোত্রীয় অহঙ্কারে উত্তেজিত হয়ে তিনি সাদ ইবন মুআয-কে বললেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতাও তোমার নেই। সে তোমার গোত্রের লোক হলে তুমি তার নিহত হওয়া কখনো পছন্দ করতে না। তখন সাদ ইবন মুআয-এর চাচাতো ভাই উসাইদ ইবন হুযাইর সাদ ইবন উবাইদাহ-কে বললেন, বরং তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি হলে মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে কথাবার্তা বলছ। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, এ সময় আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্র খুব উত্তেজিত হয়ে যায়। এমনকি তারা যুদ্ধের সংকল্প করে বসে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বরে দাড়িয়ে ছিলেন। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের শান্ত করলেন এবং নিজেও চুপ হয়ে গেলেন। আয়িশাহ বলেন, আমি সেদিন সারাক্ষণ কেঁদে কাটালাম। চোখের ধারা আমার বন্ধ হয়নি এবং একটু ঘুমও হয়নি। তিনি বলেন, আমি কান্না করছিলাম আর আমার পিতা-মাতা আমার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলেন। এমনি করে একদিন দুই রাত কেঁদে কেঁদে কাটিয়ে দিলাম। এর মধ্যে আমার একটুও ঘুম হয়নি। বরং অনবরত আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। মনে হচ্ছিল যেন, কান্নার কারণে আমার কলিজা ফেটে যাবে। আমি ক্রন্দনরত ছিলাম আর আমার আববা-আম্মা আমার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় একজন আনসারী মহিলা আমার কাছে আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম। সে এসে বসল এবং আমার সঙ্গে কাঁদতে আরম্ভ করল। তিনি বলেন, আমরা কান্না করছিলাম এই মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের কাছে এসে সালাম করলেন এবং আমাদের পাশে বসে গেলেন। আয়িশাহ বলেন, অপবাদ রটানোর পর আমার পার্শ্বে এসে এভাবে তিনি আর বসেননি। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একমাস অপেক্ষা করার পরও আমার ব্যাপারে তার নিকট কোন ওয়াহী আসেনি। আয়িশাহ বলেন, বসার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কালিমা শাহাদাত পড়লেন। এরপর বললেন, আয়িশাহ তোমার ব্যাপারে আমার কাছে অনেক কথাই পৌছেছে, যদি তুমি এর থেকে পবিত্র হও তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে এ অপবাদ থেকে মুক্ত করবেন। আর যদি তুমি কোন গুনাহ করে থাক তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তওবা কর। কেননা বান্দা গুনাহ স্বীকার করে তওবা করলে আল্লাহ তাআলা তওবা কবূল করেন। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কথা শেষ করলে আমার অশ্রুধারা বন্ধ হয়ে যায়। এক ফোঁটা অশ্রুও আমি আর টের করতে পারলাম না। তখন আমি আমার আববাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা বলছেন আমার হয়ে তার জবাব দিন। আমার আববা বললেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী জবাব দিব তা জানি না। তখন আমি আমার আম্মাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা বলছেন, আপনি তার উত্তর দিন। আম্মা বললেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী উত্তর দিব তা জানি না। তখন আমি ছিলাম অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআনও বেশী পড়তে পারতাম না। তথাপিও এ অবস্থা দেখে আমি নিজেই বললাম, আমি জানি আপনারা এ অপবাদের ঘটনা শুনেছেন, আপনারা তা বিশ্বাস করেছেন এবং বিষয়টি আপনাদের মনে দৃঢ়মূল হয়ে আছে। এখন যদি আমি বলি যে, এর থেকে আমি পবিত্র তাহলে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি এ অপরাধের কথা স্বীকার করে নেই যে সম্পর্কে আল্লাহ জানেন যে, আমি এর থেকে পবিত্র, তাহলে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম! আমি ও আপনারা যে বিপাকে পড়েছি এর জন্য ইউসুফ-এর পিতার কথা ব্যতীত আমি কোন দৃষ্টান্ত খুজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেনঃ "কাজেই পূর্ণ ধৈর্য্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ এ ব্যাপারে আল্লাহই একমাত্র আমার আশ্রয়স্থল।" অতঃপর আমি মুখ ঘুরিয়ে আমার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। আল্লাহ তাআলা জানেন যে, সে মুহূর্তেও আমি পবিত্র। অবশ্যই আল্লাহ আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দেবেন তবে আল্লাহর কসম, আমি কক্ষনো ভাবিনি যে, আমার সম্পর্কে আল্লাহ ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যা পাঠ করা হবে। আমার সম্পর্কে আল্লাহ কোন কথা বলবেন আমি নিজেকে এতটা উত্তম মনে করিনি বরং আমি নিজেকে এর চেয়ে অনেক অধম বলে ভাবতাম। তবে আমি আশা করতাম যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে স্বপ্নযোগে দেখানো হবে যার ফলে আল্লাহ আমার পবিত্রতা প্রকাশ করবেন। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখনো তার বসার জায়গা ছেড়ে যাননি এবং ঘরের লোকজনও কেউ ঘর হতে বেরিয়ে যাননি। এমন সময় তার উপর ওয়াহী অবতরণ শুরু হল। ওয়াহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় তার যে বিশেষ ধরনের কষ্ট হত তখনও সে অবস্থা হল। এমনকি ভীষণ শীতের দিনেও তার শরীর হতে মোতির দানার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ল ঐ বাণীর গুরুভারে, যা তার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ অবস্থা কেটে গেলে তিনি হাসিমুখে পহেলা যে কথা উচ্চারণ করলেন সেটা হল, হে আয়িশাহ! আল্লাহ তোমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, এ কথা শুনে আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি সম্মান কর। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার দিকে উঠে যাব না। মহান আল্লাহ ব্যতীত কারো প্রশংসা করব না। আয়িশাহ বললেন, আল্লাহ (আমার পবিত্রতার ব্যাপারে) যে দশটি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, তা হল, "যারা এ অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল; এ ঘটনাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এও তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ এবং নারীগণ কেন নিজেদের বিষয়ে সৎ ধারণা করেনি এবং বলেনি যে, এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ। তারা কেন এ ব্যাপারে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করেনি? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, সেহেতু তারা আল্লাহর বিধানে মিথ্যাচারী। দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমরা যাতে লিপ্ত ছিলে তার জন্য কঠিন শাস্তি তোমাদেরকে স্পর্শ করত। যখন তোমরা মুখে মুখে এ মিথ্যা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং একে তোমরা তুচ্ছ ব্যাপারে বলে ভাবছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল খুবই গুরুতর ব্যাপার। এবং এ কথা শোনামাত্র তোমরা কেন বললে না যে, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের জন্য উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র মহান! এ তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক তাহলে কখনো অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে না; আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াতসমূহ বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকলে তোমাদের কেউই অব্যাহতি পেত না। আল্লাহ দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু- (আন-নূর ২৪/১১-২০)। আমার পবিত্রতার ব্যাপারে আল্লাহ এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করলেন। আত্মীয়তা এবং দারিদ্রের কারণে আবূ বাকর সিদ্দীক মিসতাহ ইবন উসাসাকে আর্থিক ও বৈষয়িক সাহায্য করতেন। কিন্তু আয়িশাহ সম্পর্কে তিনি যে অপবাদ রটিয়েছিলেন এ কারণে আবূ বাকর সিদ্দীক কসম করে বললেন, আমি আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক সাহায্য করব না। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন-তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদেরকে কিছুই দিবে না। তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। শোন! তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল; পরম দয়ালু- (আন-নূর ২৪/২২)। আবূ বাকর সিদ্দীক বলে উঠলেন, হ্যা, আল্লাহর কসম! অবশ্যই আমি পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন। এরপর তিনি মিসতাহ-এর জন্য যে অর্থ খরচ করতেন তা পুনঃ দিতে শুরু করলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তাকে এ অর্থ দেয়া আর কখনো বন্ধ করব না। আয়িশাহ বললেন, আমার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়নাব বিনত জাহাশ-কেও জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি যায়নাব-কে বলেছিলেন, তুমি আয়িশাহ সম্পর্কে কী জান অথবা বলেছিলেন তুমি কী দেখেছ? তখন তিনি বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার চোখ ও কানকে হিফাযত করেছি। আল্লাহর কসম! আমি তার ব্যাপারে ভাল ব্যতীত আর কিছুই জানি না। আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ)-এর স্ত্রীগণের মধ্যে তিনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আল্লাহ তার তাকওয়ার কারণে তাকে রক্ষা করেছেন। আয়িশাহ বলেন, অথচ তার বোন হামনা তার পক্ষ নিয়ে অপবাদ রটনাকারীদের মতো অপবাদ ছড়াচ্ছিল। ফলে তিনি ধ্বংসপ্রাপ্তদের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেলেন। বর্ণনাকারী ইবন শিহাব বলেন, ঐ সমস্ত লোকের ঘটনা আমার কাছে যা পৌছেছে তা হলো এইঃ উরওয়াহ বলেন, আয়িশাহ বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর কসম! যে ব্যক্তি সম্পর্কে অপবাদ দেয়া হয়েছিল, তিনি এসব কথা শুনে বলতেন, আল্লাহ মহান, ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, আমি কোন রমণীর বস্ত্র অনাবৃত করে কোনদিন দেখিনি। আয়িশাহ বলেন, পরে তিনি আল্লাহর পথে শহীদ হন।

যুহরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, ওয়ালীদ ইবন আবদুল মালিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কি এ খবর পৌছেছে যে, আয়িশাহ-এর প্রতি অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে আলী-ও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন? আমি বললাম, না, তবে আবূ সালামাহ ইবন আবদুর রহমান ও আবূ বাকর ইবন আবদুর রহমান ইবন হারিস নামক তোমার গোত্রের দু' ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছে যে, আয়িশাহ তাদের দু'জনকে বলেছেন যে, আলী তার ব্যাপারে পুরোপুরি নির্দোষ ছিলেন।

আয়িশাহ-এর মা উম্মু রুমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ও আয়িশাহ উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক আনসারী মহিলা এসে বলতে লাগল আল্লাহ অমুক অমুককে ধ্বংস করুন। এ কথা শুনে উম্মু রুমান বললেন, তুমি কী বলছ? সে বলল, যারা অপবাদ রটিয়েছে তাদের মধ্যে আমার ছেলেও আছে। উম্মু রুমান জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কী? সে বলল, এই এই রটিয়েছে। আয়িশাহ বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শুনেছেন? সে বলল, হ্যা। আয়িশাহ বললেন, আবূ বাকরও কি শুনেছেন? সে বলল, হ্যা। এ কথা শুনে আয়িশাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরে আসলে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসল। তখন আমি একটা চাদর দিয়ে তাকে ঢেকে দিলাম। এরপর নবী (ﷺ) এসে জিজ্ঞেস করলেন, তার কি অবস্থা? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হয়তো সে অপবাদের কারণে। তিনি বললেন, হ্যা। এ সময় আয়িশাহ উঠে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি কসম করি, তাহলেও আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না, আর যদি ওযর পেশ করি তবুও আমার ওযর আপনারা গ্রহণ করবেন না, আমার এবং আপনাদের দৃষ্টান্ত নবী ইয়াকূব এবং তার ছেলেদের উদাহরণের মতো। তিনি বলেছিলেন, "তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে আল্লাহই একমাত্র আমার আশ্রয়স্থল।" উম্মু রুমান বলেন, তখন নবী (ﷺ) কিছু না বলেই চলে গেলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তার পবিত্রতা ঘোষণা করে আয়াত অবতীর্ণ করলেন। আয়িশাহ বললেন, একমাত্র আল্লাহরই প্রশংসা করি অন্য কারো না, আপনারও না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি আয়াতাংশ "ইদা তালিকুনাহু দ্বি-আলসিনাতিকুম্" পড়তেন এবং বলতেন "(যেমন তুমি তোমার জিভ দিয়ে মিথ্যা বলো।)" "আল-ওয়ালাক" অর্থ "মিথ্যা বলা। ইবন আবূ মুলাইকাহ বলেছেন, এ আয়াতের ব্যাখ্যা আয়িশাহ অন্যান্যদের চেয়ে অধিক জানতেন। কারণ এ আয়াত তারই সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল।

শামের পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-এর সামনে হাসসান ইবন সাবিত-কে গালি দিতে লাগলে তিনি বললেন, তাকে গালি দিও না। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ হয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। আয়িশাহ বলেছেন, হাস্সান ইবন সাবিত কবিতার মাধ্যমে মুশরিকদের নিন্দাবাদ করার জন্য নবী (ﷺ)-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, তুমি কুরাইশদের নিন্দায় কবিতা রচনা করলে আমার বংশকে কি পৃথক করবে? তিনি বললেন, আমি আপনাকে তাদের থেকে এমনভাবে পৃথক করে রাখব যেমনিভাবে আটার খামির থেকে চুলকে পৃথক করা হয়। মুহাম্মাদ বলেছেন, উসমান ইবন ফারকাদ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আমি হিশাম-কে তার পিতা উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি হাস্সান ইবন সাবিত-কে গালি দিয়েছি। কেননা তিনি ছিলেন আয়িশাহ-এর প্রতি অপবাদ রটনাকারীদের একজন।

মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-এর নিকট গেলাম। তখন তার কাছে হাস্সান ইবন সাবিত তাকে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। তিনি আয়িশাহ-এর প্রশংসায় বলছেন, "তিনি সতী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না ও জ্ঞানবতী, তার প্রতি কোন সন্দেহই আরোপ করা যায় না। তিনি অভুক্ত থাকেন, তবুও অনুপস্থিত লোকেদের গোশত খান না (গীবত করেন না)। এ কথা শুনে আয়িশাহ বললেন, কিন্তু আপনি তো এরূপ নন। মাসরূক বলেছেন যে, আমি আয়িশাহ-কে বললাম, আপনি কেন তাকে আপনার কাছে আসার অনুমতি দেন? অথচ আল্লাহ তাআলা বলছেন, "তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্য আছে কঠিন শাস্তি। আয়িশাহ বলেন, অন্ধত্ব থেকে কঠিনতর শাস্তি আর কী হতে পারে? তিনি তাকে আরো বলেন যে, হাস্সান ইবন সাবিত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষাবলম্বন করে কাফিরদের সঙ্গে মুকাবালা করতেন অথবা কাফিরদের বিপক্ষে নিন্দাপূর্ণ কবিতা রচনা করতেন।

যায়দ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহর বছর আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হলাম। এক রাতে খুব বৃষ্টি হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। এরপরে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা জান কি তোমাদের রব কী বলেছেন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই অধিক জানেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন (বৃষ্টির কারণে) আমার কতিপয় বান্দা আমার প্রতি ঈমান এনেছে, আর কেউ কেউ আমাকে অমান্য করেছে। যারা বলেছে, আল্লাহর রহমত, আল্লাহর দয়া এবং আল্লাহর ফযলে আমাদের প্রতি বৃষ্টি হয়েছে, তারা আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী মুমিন এবং তারা নক্ষত্রের প্রভাব অস্বীকারকারী। আর যারা বলেছে যে অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে, তারা তারকার প্রতি ঈমান এনেছে এবং আমাকে অস্বীকারকারী কাফির।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চারটি উমরাহ পালন করেছেন। তিনি হাজ্জের সঙ্গে যে উমরাহটি পালন করেন সেটি ব্যতীত সবকটিই যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর উমরাহটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে। হুদাইবিয়াহর পরের বছরের উমরাহটি ছিল যুলকাদাহ্ মাসে এবং হুনাইনের প্রাপ্ত গানীমাত যে জিঈরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখানের উমরাহটিও ছিল যুলকাদাহ্ মাসে, আর তিনি হাজ্জের সঙ্গে একটি উমরাহ পালন করেন।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহর যুদ্ধের বছর আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে রওয়ানা করেছিলাম। তখন তার সাহাবীগণ ইহরাম বেধেছিলেন কিন্তু আমি ইহরাম বাধিনি।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়কে তোমরা বিজয় মনে করছ। মক্কা বিজয়ও একটি বিজয়। কিন্তু হুদাইবিয়াহর দিনের বাইআতে রিদওয়ানকে আমরা প্রকৃত বিজয় মনে করি। সে সময় আমরা চৌদ্দ'শ সাহাবী নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। হুদাইবিয়াহ একটি কূপ। আমরা তা' থেকে পানি উঠাতে উঠাতে তাতে এক বিন্দুও বাকী রাখিনি। এ সংবাদ নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছলে তিনি এসে সে কূপের পাড়ে বসলেন। তারপর এক পাত্র পানি আনিয়ে অযু করলেন এবং কুল্লি করলেন। শেষে দোয়া করে অবশিষ্ট পানি কূপের মধ্যে ফেলে দিলেন। আমরা অল্প সময় কূপের পানি উঠানো বন্ধ রাখলাম। এরপর আমরা আমাদের নিজেদের ও আরোহী পশুর জন্য ইচ্ছে মত পানি কূপ থেকে উঠালাম।

আবূ ইসহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে বারাআ ইবন আযিব সংবাদ দিয়েছেন যে, হুদাইবিয়াহর যুদ্ধের দিন তারা চৌদ্দ'শ কিংবা তার চেয়েও অধিক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তারা একটি কূপের পার্শ্বে অবতরণ করেন এবং তা থেকে পানি উত্তোলন করতে থাকেন। (পানি নিঃশেষ হয়ে গেলে) তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে তা জানালেন। তখন তিনি কূপটির নিকট এসে ওটার পাড়ে বসলেন। এরপর বললেন, আমার কাছে ওটা থেকে এক বালতি পানি নিয়ে আস। তখন তা নিয়ে আসা হলো। তিনি এতে থুথু ফেললেন এবং দোয়া করলেন। এরপর তিনি বললেন, কিছুক্ষণের জন্য তোমরা এ থেকে পানি উঠানো বন্ধ রাখ। এরপর সকলেই নিজেদের ও আরোহী জন্তুগুলোর তৃষ্ণা নিবারণ করে যাত্রা করলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহর দিন লোকেরা পিপাসার্ত হয়ে পড়লেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট একটি চামড়ার পাত্র ভর্তি পানি ছিল। তিনি তা দিয়ে ওযু করলেন। তখন লোকেরা তার দিকে এগিয়ে আসলে তিনি তাদেরকে বললেন, কী হয়েছে তোমাদের? তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার চর্মপাত্রের পানি বাদে আমাদের কাছে এমন কোন পানি নেই যা দিয়ে আমরা ওযু করতে এবং পান করতে পারি। বর্ণনাকারী জাবির বলেন, এরপর নবী (ﷺ) তার হাত ঐ চর্মপাত্রে রাখলেন। অমনি তার আঙ্গুলগুলো থেকে ঝরণার মতো পানি উথলে উঠতে লাগল। জাবির বলেন, আমরা সে পানি পান করলাম এবং ওযু করলাম। [সালিম বলেন] আমি জাবির-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা সেদিন কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, আমরা যদি একলাখও হতাম তবু এ পানিই আমাদের জন্য যথেষ্ট হত। আমরা ছিলাম পনের'শ।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবন মুসায়্যিব-কে বললাম, আমি শুনতে পেয়েছি যে, জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলতেন, তারা (হুদাইবিয়াহ্য়) চৌদ্দশ' ছিলেন। সাঈদ আমাকে বললেন, জাবির আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, হুদাইবিয়াহর দিন যারা নবী (ﷺ)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সংখ্যা ছিল পনের শত। আবূ দাউদ কুররা-এর মাধ্যমে ক্বাতাদাহ থেকে একই রকম বর্ণনা করেছেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুদাইবিয়াহর যুদ্ধের দিন আমাদেরকে বলেছেন, পৃথিবীবাসীদের মধ্যে তোমরাই সর্বোত্তম। সেদিন আমরা ছিলাম চৌদ্দশ। আজ আমি যদি দেখতাম, তাহলে আমি তোমাদেরকে সে গাছের জায়গাটি দেখিয়ে দিতাম।

আবদুল্লাহ ইবন আবূ আউফা থেকে বর্ণনা করেন যে, গাছের নীচে বাই'আত গ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল তেরশ। আসলাম গোত্রীয়রা ছিলেন মুহাজিরগণের মোট সংখ্যার এক-অষ্টমাংশ।

কায়েস হতে বর্ণিত যে, তিনি হুদাইবিয়াহর সন্ধির দিন বৃক্ষতলের সাহাবী মিরদাস আসলামীকে বলতে শুনেছেন যে, নেককার লোকদেরকে একের পর এক উঠিয়ে নেয়া হবে। এরপর বাকী থাকবে খেজুর ও যবের খোসার মতো খোসাগুলো আল্লাহ যাদের কোন তোয়াক্কা করবেন না।

মারওয়ান এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত। তারা উভয়ই বলেছেন যে, হুদাইবিয়াহর বছর নবী (ﷺ) এক সহস্রাধিক সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে বের হলেন। যুল-হুলাইফাহ্তে পৌছে তিনি কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাধলেন, পশুর কুজ কাটলেন এবং সেখান থেকে ইহরাম বাধলেন। (বর্ণনাকারী) বলেন, এ হাদীস সুফ্ইয়ান থেকে কয় দফা শুনেছি তার সংখ্যা আমি গণনা করতে পারছি না। পরিশেষে তাকে বলতে শুনেছি, যুহরী থেকে কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাধা এবং ইশআর করার কথা আমার স্মরণ নেই। রাবী আলী ইবন আবদুল্লাহ বলেন, সুফ্ইয়ান এ কথা বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা আমি জানি না। তিনি কি এ কথা বলতে চেয়েছেন যে, যুহরী থেকে ইশআর ও কিলাদা করার কথা তার স্মরণ নেই, নাকি সম্পূর্ণ হাদীসটি স্মরণ না থাকার কথা বলতে চেয়েছেন?

পূর্বের হাদিসের মতই (৪১৫৭)।

কা'ব ইবন উজরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে এমন অবস্থায় দেখলেন যে, উকুন তার মুখমন্ডলে ঝরে পড়ছে। তখন তিনি বললেন, কীটগুলো কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হ্যা। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার মাথা মুন্ডিয়ে ফেলার জন্য নির্দেশ দেন যখন তিনি হুদাইবিয়াহ্তে অবস্থান করছিলেন। তখন সাহাবীগণ মক্কা প্রবেশ করার জন্য খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। হুদাইবিয়াহ্তেই তাদেরকে হালাল হতে হবে এ কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের কাছে বর্ণনা করেননি। তাই আল্লাহ ফিদইয়ার বিধান অবতীর্ণ করলেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ছয়জন মিসকীনকে এক ফারাক (প্রায় বারো সের) খাদ্য খাওয়ানোর অথবা একটি বাকরী কুরবানী করার অথবা তিন দিন সওম পালনের নির্দেশ দিলেন।

আসলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি উমার ইবন খাত্তাব-এর সঙ্গে বাজারে বের হলাম। সেখানে একজন যুবতী মহিলা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার স্বামী ছোট ছোট বাচ্চা রেখে মারা গেছেন। আল্লাহর কসম! তাদের খাওয়ার জন্য পাকানোর মতো কোন বাকরীর খুরও নেই এবং নেই কোন ফসলের ব্যবস্থা ও দুধেল উট, বাকরী। আমার আশঙ্কা হচ্ছে পোকা তাদেরকে খেয়ে ফেলবে অথচ আমি হলাম খুফাফ ইবন আইমা গিফারীর কন্যা। আমার পিতা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে হুদাইবিয়াহ্য় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ কথা শুনে উমার তাকে অতিক্রম না করে পার্শ্বে দাড়ালেন। এরপর বললেন, তোমার গোত্রকে মোবারাকবাদ। তারা তো আমার খুব নিকটের মানুষ। এরপর তিনি ফিরে এসে আস্তাবলে বাধা উটের থেকে একটি মোটা তাজা উট এনে দুই বস্তা খাদ্য এবং এর মধ্যে কিছু নগদ অর্থ ও বস্ত্র রেখে এগুলো উটের পিঠে তুলে দিয়ে মহিলার হাতে এর লাগাম দিয়ে বললেন, তুমি এটি টেনে নিয়ে যাও। এগুলো শেষ হওয়ার আগেই হয়তো আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি তাকে খুব অধিক দিলেন। উমার বললেন, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক। আল্লাহর কসম! আমি দেখেছি এ মহিলার আববা ও ভাই দীর্ঘদিন পর্যন্ত একটি দূর্গ অবরোধ করে রেখেছিলেন এবং পরে তা জয় করেছিলেন। এরপর ঐ দূর্গ থেকে প্রাপ্ত তাদের অংশ থেকে আমরাও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের দাবী করি।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪১৬০)।

মুসাইয়্যাব (ইবন হুযন) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (যেটির নীচে বাই'আত করা হয়েছিল) আমি সে গাছটি দেখেছিলাম। কিন্তু পরে যখন ওখানে আসলাম তখন আর সেটা চিনতে পারলাম না। মাহমুদ বলেন, (মুসাইয়্যাব ইবন হুয্ণ বলেছেন) পরে ওটা আমাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

তারিক ইবন আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হাজ্জে রওয়ানা হয়েছিলাম। পথে সালাতরত এক কাওমের নিকট দিয়ে পথ অতিক্রমকালে তাদেরকে বললাম, এটা কেমন সালাতের স্থান? তারা বললেন, এটা হল সেই গাছ যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাই'আতে রিদওয়ান গ্রহণ করেছিলেন। তখন আমি সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব -এর কাছে গিয়ে এ ব্যাপারে তাকে জানালাম। তখন সাঈদ (ইবন মুসাইয়্যাব) বললেন, আমার পিতা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, গাছটির নীচে যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। মুসাইয়্যাব বলেছেন, পরের বছর আমরা যখন সেখানে গেলাম তখন আমাদেরকে ওটা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছিল যার ফলে তা নির্দিষ্ট করতে পারলাম না। সাঈদ বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ ওটা চিনতে পারলেন না আর তোমরা তা চিনে ফেললে? তাহলে তোমরাই দেখছি অধিক জান!

মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত। গাছের তলে যারা বাই'আত নিয়েছিলেন তিনি ছিলেন তাদের একজন। (তিনি বলেন) পরের বছর আমরা আবার সে গাছের কাছে গেলে আমরা গাছটিকে চিনতে পারলাম না। এ ব্যাপারে আমাদেরকে ভ্রান্তিতে নিপতিত করা হয়েছে।

তারিক হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব-এর কাছে সে গাছটির কথা উল্লেখ করা হলে তিনি হেসে বললেন, আমার পিতা আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি সেখানের বায়আতে উপস্থিত ছিলেন।

আমর ইবন মুররা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বৃক্ষতলে বাই'আতকারী সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন আবূ আউফাকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, কোন কাওম নবী (ﷺ)-এর কাছে সদাকাহর অর্থ নিয়ে আসলে তিনি তাদের জন্যে বলতেন, "হে আল্লাহ! আপনি তাদের উপর রহম করুন"। এ সময় আমার পিতা তার কাছে সদাকাহর অর্থ নিয়ে আসলে তিনি বললেন, "হে আল্লাহ! আপনি আবূ আউফার পরিবারবর্গের উপর রহম করুন"।

আব্বাদ ইবন তামীম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাররার দিন যখন লোকজন আবদুল্লাহ ইবন হানযালা-এর হাতে বাই'আত গ্রহণ করেছিলেন, তখন ইবন যায়দ জিজ্ঞেস করলেন, ইবন হানযালা কিসের উপর লোকেদের বাই'আত গ্রহণ করছেন? তখন তাকে বলা হল, মৃত্যুর উপর। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে এর উপর আমি আর কারো কাছে বাই'আত গ্রহণ করব না। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে হুদাইবিয়াহ্য় উপস্থিত ছিলেন।

ইয়াস ইবন সালামাহ ইবন আকওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা- যিনি ছিলেন বৃক্ষ-তলের বাই'আতকারীদের একজন বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে জুমুআহর সালাত আদায় করে যখন বাড়ি ফিরতাম তখনও প্রাচীরের ছায়া পড়ত না, যে ছায়ায় আশ্রয় নেয়া যেতে পারে।

ইয়াযীদ ইবন আবূ 'উবায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সালামাহ ইবন আকওয়া'-কে জিজ্ঞেস করলাম, হুদাইবিয়াহর দিন আপনারা কোন জিনিসের উপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট বাই'আত করেছিলেন। তিনি বললেন, মৃত্যুর উপর।

মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি বারাআ ইবন আযিব-এর সঙ্গে দেখা করে তাকে বললাম, আপনার খোশ খবর, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গ পেয়েছেন এবং বৃক্ষ তলে তার নিকট বাই'আত করেছেন। তখন তিনি বললেন, ভাতিজা! তুমি তো জান না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পর আমরা কী কী নতুন বিষয় উদ্ভাবন করেছি (যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ফিতনাহ ইত্যাদি)।

আবূ কিলাবাহ হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবন দাহ্হাক তাকে খবর দিয়েছেন, তিনি গাছের তলায় নবী (ﷺ)-এর নিকট বাই'আত করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। অবশ্যই আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দিয়েছি"- (ফাত্হ ৪৮/১)। তিনি বলেনঃ এ আয়াতে (সুস্পষ্ট বিজয়) দ্বারা হুদাইবিয়াহর সন্ধিকেই বোঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ বললেন, এটা খুশী ও আনন্দের কথা। কিন্তু আমাদের জন্য কী আছে? তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, যাতে তিনি মুমিন ও মুমিনাগণকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করবেন যার নীচ দিয়ে বহু নদী-নালা প্রবাহিত হচ্ছে"।

মাজযা ইবন যাহির আসলামী-এর পিতা (যিনি বৃক্ষ তলের বাইআতে অংশ নিয়েছিলেন) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ডেকচিতে গাধার গোশত রান্না করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঘোষক ঘোষণা দিলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাদেরকে গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন

(অন্য এক সানাদে) মাজযাহ উহবান ইবন আওস নামক বৃক্ষতলের বাইআতে অংশগ্রহণকারী এক সাহাবী থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তার হাটুতে আঘাত লেগেছিল। তাই তিনি সালাত আদায় কালে হাটুর নীচে বালিশ রাখতেন।

বৃক্ষতলের বাই'আতে অংশগ্রহণকারী সাহাবী সুওয়াইদ ইবন নুমান হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীদের জন্য ছাতু আনা হত। তারা তা খেয়ে নিতেন। মুআয শুবা থেকে এ হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বৃক্ষতলের বাইআতে অংশগ্রহণকারী নবী (ﷺ)-এর সাহাবী আয়িয ইবন আমর-কে আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিতর কি ভাঙ্গা যাবে? তিনি বললেন, রাতের প্রথম অংশে বিতর আদায় করলে রাতের শেষে আর আদায় করবে না।

আসলামা হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কোন এক সফরে রাত্রিকালে চলছিলেন। এ সফরে উমার ইবন খাত্তাব-ও তার সঙ্গে চলছিলেন। উমার ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি কোন উত্তর করলেন না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তিনি এবারও জবাব দিলেন না। এরপর আবার তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এবারও উত্তর দিলেন না। তখন উমার ইবন খাত্তাব মনে মনে বললেন, হে উমার! তোমাকে তোমার মা হারিয়ে ফেলুক! তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তিনবার বিরক্ত করলে। কিন্তু কোনবারই তিনি তোমাকে জবাব দেননি। উমার বললেন, এরপর আমি আমার উটকে তাড়িয়ে মুসলিমদের সম্মুখে চলে যাই। কারণ আমি আশঙ্কা করছিলাম যে, হয়তো আমার ব্যাপারে কুরআন মাজীদের কোন আয়াত অবতীর্ণ হতে পারে। অধিক দেরি হয়নি এমন সময় শুনতে পেলাম এক লোক চীৎকার করে আমাকে ডাকছে। উমার বলেন, আমি বললাম, আমার ব্যাপারে হয়তো কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ ভেবে আমি ভীত হয়ে পড়লাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে তাকে সালাম করলাম। তখন তিনি বললেন, আজ রাতে আমার প্রতি এমন একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে যা আমার কাছে যার উপর সূর্য উদিত হয় তার থেকেও অধিক প্রিয়। তারপর তিনি "সত্যিই! আমি তোমাকে (হে মুহাম্মদ) সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। (48.1)" পাঠ করলেন।

মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ ও মারওয়ান ইবন হাকাম হতে বর্ণিত। তারা একে অন্যের চেয়ে অধিক বর্ণনা করেছেন। তারা উভয়ে বলেন, হুদাইবিয়াহর বছর নবী (ﷺ) এক সহস্রাধিক সাহাবী সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। যখন তারা যুল হুলাইফাহ পৌছলেন কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদা বাধলেন, ইশ'আর করলেন। সেখান থেকে উমরাহর ইহরাম বাধলেন এবং খুযাআ গোত্রের এক লোককে গোয়েন্দা হিসেবে পাঠালেন। নবী (ﷺ) নিজেও রওয়ানা হলেন। গাদীরুল আশ্তাত নামক স্থানে পৌছলে গোয়েন্দা এসে তাকে বলল, কুরাইশরা বিরাট দল নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছে। তারা আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং বাইতুল্লাহ্য় যেতে বাধা দিবে ও বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। তখন তিনি বললেন, "হে লোক সকল! তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও, যারা আমাদেরকে বাইতুল্লাহ্য় যেতে বাধা দেয়ার ইচ্ছা করছে, আমি কি তাদের পরিবারবর্গ এবং সন্তান-সন্ততিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। তারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সংকল্প করে থাকলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন, যিনি মুশরিকদের থেকে একজন গোয়েন্দাকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছেন। আর যদি তারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে তাহলে আমরা তাদের পরিবার এবং অর্থ-সম্পদ থেকে বিরত থাকব এবং তাদেরকে তাদের পরিবার ও অর্থ সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেব।" তখন আবূ বাকর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি তো বাইতুল্লাহর উদ্দেশে বেরিয়েছেন, কাউকে হত্যা করা এবং কারো সঙ্গে লড়াই করার উদ্দেশে তো আসেননি। তাই বাইতুল্লাহর দিকে চলুন। যে আমাদেরকে তা থেকে বাধা দিবে আমরা তার সঙ্গে লড়াই করব। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তবে চল আল্লাহর নামে।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪১৭৮)।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত যে, তিনি মারওয়ান ইবন হাকাম এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ উভয়কে হুদাইবিয়াহর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উমরাহ আদায় করার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছেন। তাদের থেকে উরওয়াহ আমার (মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম ইবন শিহাব) নিকট যা বর্ণনা করছেন তা হচ্ছে এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সুহায়ল ইবন আমরকে হুদাইবিয়াহর দিন সন্ধিনামায় যা লিখিয়েছিলেন তার মধ্যে সুহায়ল ইবন আমরের শর্তগুলোর একটি শর্ত ছিল এইঃ আমাদের থেকে যদি কেউ আপনার কাছে চলে যায় তাকে আমাদের কাছে ফেরত দিতে হবে যদিও সে আপনার ধর্মের উপর থাকে এবং তার ও আমাদের মধ্যে আপনি কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন না। এ শর্ত পূর্ণ করা ছাড়া সুহায়ল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সন্ধি করতেই অস্বীকৃতি জানায়। এ শর্তটিকে মুমিনগণ অপছন্দ করলেন এবং এতে তারা ক্ষুব্ধ হলেন ও এর বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করলেন। কিন্তু যখন সুহায়ল এ শর্ত ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে চুক্তি করতে অস্বীকার করল তখন এ শর্তের উপরই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সন্ধিপত্র লেখালেন এবং আবূ জানদাল ইবন সুহায়ল-কে ঐ মুহূর্তেই তার পিতা সুহায়ল ইবন আমরের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সন্ধির মেয়াদকালে পুরুষদের মধ্যে যারাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে চলে আসতেন, মুসলিম হলেও তিনি তাদেরকে ফিরিয়ে দিতেন। এ সময় কিছু সংখ্যক মুসলিম মহিলা হিজরাত করে চলে আসেন। উম্মু কুলসুম বিনত উকবাহ ইবন আবূ মু'আইত ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হিজরাতকারিণী একজন যুবতী মহিলা। তিনি হিজরাত করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে পৌছলে তার পরিবারের লোকেরা নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে তাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানালো। এ সময় আল্লাহ তাআলা মুমিন মহিলাদের সম্পর্কে যা অবতীর্ণ করার তা অবতীর্ণ করলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪১৮০)।

বর্ণনাকারী ইবন শিহাব বলেন, আমাকে উরওয়াহ ইবন যুবায়র বলেছেন যে, নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিম্নোক্ত আয়াতের নির্দেশ মোতাবেক হিজরাতকারিণী মুমিন মহিলাদেরকে পরীক্ষা করতেন। আয়াতটি হল এইঃ হে নবী! মুমিন মহিলাগণ যখন আপনার কাছে বাই'আত করে .....শেষ পর্যন্ত- (আল-মুমতাহিনাহ ৬০/১২)। (অন্য সানাদে) ইবন শিহাব তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে এ বিবরণও পৌছেছে যে, যখন আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মুশরিক স্বামীর তরফ থেকে হিজরাতকারিণী মুমিনা স্ত্রীকে দেয়া মুহারানা মুশরিক স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর আবূ বাসীর -এর ঘটনা সম্পর্কিত হাদীসও আমাদের কাছে পৌছেছে। অতঃপর তিনি তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন।

নাফি হতে বর্ণিত যে, ফিতনার সময় (হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মক্কা আক্রমণের সময়) আবদুল্লাহ ইবন উমার উমরাহর ইহরাম বেধে রওয়ানা হয়ে বললেন, যদি আমাকে বাইতুল্লাহ্য় যেতে বাধা দেয়া হয় তাহলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে আমরা যা করেছিলাম তাই করব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যেহেতু হুদাইবিয়াহর বছর উমরাহর ইহরাম বেধে রওয়ানা করেছিলেন তাই তিনিও উমরাহর ইহরাম বেধে রওয়ানা করলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, (ফিতনার বছর) তিনি উমরাহর ইহরাম বেধে বললেন, যদি আমার আর তার (বাইতুল্লাহর) মধ্যে কোন বাধা সৃষ্টি করা হয় তাহলে কুরাইশ কাফিররা বাইতুল্লাহ্য় যেতে বাধা সৃষ্টি করলে নবী (ﷺ) যা করেছিলেন আমিও তাই করব, আর তিনি তিলাওয়াত করলেন, "তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাঝে আছে উত্তম আদর্শ"- (আহযাব ৩৩/২১)।

নাফি হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ-এর কোন ছেলে তাকে [আবদুল্লাহ-কে] বললেন, এ বছর আপনি মক্কায় যাওয়া স্থগিত রাখলে ভাল হত। কারণ আমি আশঙ্কা করছি যে, আপনি বাইতুল্লাহ্য় যেতে পারবেন না। তখন আবদুল্লাহ বললেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে রওয়ানা হয়েছিলাম। পথে কুরাইশ কাফিররা বাইতুল্লাহ্য় যেতে বাধা দিলে নবী (ﷺ) তার কুরবানীর পশুগুলো যবহ করে মাথা কামিয়ে ফেলেন। সাহাবীগণ চুল ছাঁটেন। এরপর তিনি বললেন আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমার জন্য উমরাহ করা আমি ওয়াজিব করে নিয়েছি। যদি আমার ও বাইতুল্লাহর মধ্যে বাধা সৃষ্টি করা না হয় তাহলে আমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করব। আর যদি আমার ও বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা সৃষ্টি করা হয় তাহলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা করেছেন আমি তাই করব। এরপর তিনি কিছুক্ষণ পথ চলে বললেন, আমি হাজ্জ এবং উমরাহ একই মনে করি। আমি তোমাদেরকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার হাজ্জকেও উমরাহর সঙ্গে আমার জন্য ওয়াজিব করে নিয়েছি। এরপর তিনি উভয়ের জন্য একই তওয়াফ এবং একই সা'য়ী করলেন এবং হাজ্জ ও উমরাহর ইহরাম খুলে ফেললেন।

নাফি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকেরা বলাবলি করে যে, ইবন উমার উমার-এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ব্যাপার এমন নয়। তবে (মূল ঘটনা ছিল যে,) হুদাইবিয়াহর দিন উমার (তার পুত্র) আবদুল্লাহ-কে এক আনসারী সহাবার কাছে রাখা তার ঘোড়াটি আনার জন্য পাঠিয়েছিলেন, যাতে তিনি এতে চড়ে লড়াই করতে পারেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গাছের নিকট বাই'আত গ্রহণ করছিলেন। তা উমার জানতেন না। আবদুল্লাহ তখন বাই'আত গ্রহণ করে ঘোড়াটি আনার জন্য গেলেন এবং ঘোড়াটি নিয়ে উমার-এর কাছে আসলেন। এ সময় উমার যুদ্ধের পোশাক পরিধান করছিলেন। তখন আবদুল্লাহ তাকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বৃক্ষতলে বাই'আত গ্রহণ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তখন উমার তার [আবদুল্লাহ ইবন উমার] সঙ্গে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট বাই'আত গ্রহণ করলেন। এ হল ব্যাপার যার জন্য লোকেরা এ কথা বলাবলি করছে যে, ইবন উমার উমার-এর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, হুদাইবিয়াহর দিন নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে লোকজন বিভিন্ন গাছের ছায়ায় ছড়িয়ে গিয়েছিলেন। এক সময় তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে ভিড় করেছিলেন। তখন উমার বললেন, ওহে আবদুল্লাহ! দেখতো মানুষের কী হয়েছে? তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ভিড় করেছে কেন? ইবন উমার দেখলেন যে, তারা বাই'আত গ্রহণ করছেন। তাই তিনিও বাই'আত গ্রহণ করলেন। এরপর উমার-এর কাছে ফিরে আসলেন। তখন উমার রওয়ানা করলেন এবং বাই'আত নিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন উমরাহ আদায় করেন তখন আমরাও তার সঙ্গে ছিলাম। তিনি তওয়াফ করলে আমরাও তার সঙ্গে তওয়াফ করলাম। তিনি সালাত আদায় করলে আমরাও তার সঙ্গে সালাত আদায় করলাম। তিনি সাফা-মারওয়ার মাঝে সা'য়ী করলেন। আমরা তাকে আড়াল করে রাখতাম মক্কাবাসীদের কেউ যাতে কোন কিছুর দ্বারা তাকে আঘাত করতে না পারে।

আবূ হাসীন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ওয়াইল বলেছেন যে, সাহল ইবন হুনায়ফ যখন সিফ্ফীন যুদ্ধ থেকে ফিরলেন তখন যুদ্ধের খবরাখবর জানার জন্য আমরা তার কাছে আসলে তিনি বললেন, নিজেদের মতামতকে সন্দেহযুক্ত মনে করবে। আবূ জানদাল-এর ঘটনার দিন আমি আমাকে (আল্লাহর পথে) দেখতে পেয়েছিলাম। সেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদেশ আমি উপেক্ষা করতে পারলে উপেক্ষা করতাম। কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জানেন। আর কোন দুঃসাধ্য কাজের জন্য আমরা যখন তরবারি হাতে নিয়েছি তখন তা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহজসাধ্য হয়ে গেছে। এ যুদ্ধের পূর্বে আমরা যত যুদ্ধ করেছি তার সবগুলোকে আমরা নিজেদের জন্য কল্যাণকর মনে করেছি। কিন্তু এ যুদ্ধের অবস্থা এই যে, আমরা একটি সমস্যা সামাল দিতে না দিতেই আরেকটি নতুন সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু কোন সমাধানের পথ আমাদের জানা নেই।

কা'ব ইবন 'উজরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহর সময় নবী (ﷺ) আমার কাছে আসলেন। সে সময় আমার মুখমন্ডলে উকুন ঝরে পড়ছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমার মাথার উকুন তোমাকে কি কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যা। তখন তিনি বললেন, তুমি মাথা নাঁড়া করে ফেল। আর এ জন্য তিনদিন সওম পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াও অথবা একটি পশু কুরবানী কর। আইয়ুব বলেন, এগুলোর কোনটি প্রথমে বলেছিলেন তা আমি জানি না।

কা'ব ইবন উজরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহ্য় মুহরিম অবস্থায় আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। মুশরিকরা আমাদেরকে আটকে রেখেছিল। কা'ব ইবন উজরাহ বলেন, আমার কান পর্যন্ত মাথায় বাবরী চুল ছিল। (মাথার) উকুনগুলো আমার মুখমন্ডলের উপর ঝরে ঝরে পড়েছিল। এ সময় নবী (ﷺ) আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, তোমার মাথার উকুনগুলো তোমাকে কি কষ্ট দিচ্ছে? আমি বললাম, হ্যা। কা'ব ইবন উজরাহ বলেন, এরপর আয়াত অবতীর্ণ হল, "তোমাদের মধ্যে যদি কেউ পীড়িত হয় কিংবা তার মাথায় ক্লেশ থাকলে সওম কিংবা সদাকাহ অথবা কুরবানীর দ্বারা তার ফিদইয়া আদায় করবে"- (আল-বাকারা ১৯৬)।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত যে, আনাস তাদেরকে বলেছেন, উক্ল এবং উরাইনাহ গোত্রের কতিপয় লোক মদিনা্তে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর তারা নবী (ﷺ)-কে বলল, হে আল্লাহর নবী! আমরা দুগ্ধপানে বেচে থাকি, আমরা কৃষক নই। তারা মদিনার আবহাওয়া নিজেদের জন্য অনুকূল বলে মনে করল না। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে একজন রাখালসহ কতগুলো উট নিয়ে মদিনার বাইরে যেতে এবং ঐগুলোর দুধ ও প্রস্রাব পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা যাত্রা করে হার্রা-এর নিকট পৌছে ইসলাম ত্যাগ করে আবার কাফির হয়ে গেল এবং নবী (ﷺ)-এর রাখালকে হত্যা করে উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। নবী (ﷺ)-এর কাছে এ খবর পৌছলে তিনি তাদের খোজে তাদের পিছে লোক পাঠিয়ে দিলেন। (তাদের আনা হলে) তিনি তাদের প্রতি কঠিন দন্ডাদেশ প্রদান করলেন। সাহাবীগণ লৌহ শলাকা দিয়ে তাদের চোখ তুলে দিলেন এবং তাদের হাত কেটে দিলেন। এরপর হাররার এক প্রান্তে তাদেরকে ফেলে রাখা হল। শেষ পর্যন্ত তাদের এ অবস্থায়ই মৃত্যু হল। ক্বাতাদাহ বলেন, আমাদের কাছে খবর পৌছেছে যে, এ ঘটনার পর নবী (ﷺ) প্রায়ই লোকজনকে সদাকাহ প্রদান করার জন্য উৎসাহ দিতেন এবং মুসলা থেকে বিরত রাখতেন।

উমার ইবন আবদুল আযীয হতে বর্ণিত যে, একদিন তিনি লোকদের কাছে কাসামাত সম্পর্কে পরামর্শ চেয়ে বললেন, তোমরা এ কাসামা সম্পর্কে কী বল? তারা বললেন, এটা হাক। আপনার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং খলীফাগণ সকলেই কাসামাতের আদেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় আবূ কিলাবা উমার ইবন আবদুল আযীয-এর পেছনে ছিলেন। তখন আম্বাসা ইবন সাঈদ বললেন, উরাইনাহ গোত্র সম্পর্কিত আনাস-এর হাদীসটি কোথায়? তখন আবূ কিলাবাহ বললেন, আনাস ইবন মালিক আমার কাছেই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আবদুল আযীয ইবন সুহাইব আনাস ইবন মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আনাস ইবন মালিক উরাইনাহ গোত্রের কিছু লোকের কথা উল্লেখ করেছেন। আর আবূ কিলাবা আনাস ইবন মালিক থেকে উক্ল গোত্রের উল্লেখ করে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।

সালামাহ ইবন আকওয়া' থেকে বণিত, তিনি বলেন, (একদা) আমি ফজরের সালাতের আযানের আগে বাইরে বের হলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুধেল উটগুলোকে যি-কারাদ জায়গায় চরানো হতো। সালামাহ বলেন, তখন আমার সঙ্গে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ-এর গোলামের দেখা হলো। সে বলল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুধেল উটগুলো লুট করা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম, কে ওগুলো লুট করেছে? সে বলল, গাতফানের লোকেরা। তিনি বলেন, তখন আমি ইয়া সাবাহা বলে তিনবার উচ্চস্বরে চীৎকার করলাম। আর মদিনার দুই পর্বতের মাঝে অবস্থিত মানুষদের কানে আমার আওয়াজ শুনিয়ে দিলাম। তারপর দ্রুত অগ্রসর হয়ে তাদেরকে পেয়ে গেলাম। এ সময়ে তারা উটগুলোকে পানি পান করাতে শুরু করেছিল। তখন তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করলাম, আমি ছিলাম একজন দক্ষ তীরন্দাজ আর বললাম, আমি হলাম আকওয়া'-এর পুত্র, আজকের দিনটি তোমাদের সবচেয়ে খারাপ দিন। এভাবে আমি তাদের নিকট হতে উটগুলোকে কেড়ে নিলাম এবং তাদের ত্রিশখানা চাদরও কেড়ে নিলাম। তিনি বলেন, এরপর নবী (ﷺ) ও অন্যান্য লোক সেখানে আসলে আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! লোক কটি পিপাসার্ত ছিল, আমি তাদেরকে পানি পান করতেও দেইনি। আপনি এখনই এদের পিছু ধাওয়া করার জন্য সৈন্য পাঠিয়ে দিন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে ইবন আকওয়া'! তুমি (হারানো উট দখল করতে) সক্ষম হয়েছ, এখন একটু বিশ্রাম নাও। সালামাহ বলেন, এরপর আমরা ফিরে আসলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে তার উটনীর পেছনে বসিয়ে নিলেন, এভাবে মদিনায় প্রবেশ করলাম।

সুওয়াইদ ইবন নুমান হতে বর্ণিত। তিনি (সুওয়াইদ ইবন নুমান) খাইবার অভিযানের বছর নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বেরিয়েছিলেন। [তিনি বলেন] যখন আমরা খাইবারের নীচু এলাকায় 'সাহ্বা' নামক স্থানে পৌছলাম, তখন নবী (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি পাথেয় পরিবেশন করতে হুকুম দিলেন। কিন্তু ছাতু ব্যতীত আর কিছুই দেয়া গেল না। তিনি ছাতু গুলতে বললেন। ছাতু গুলা হলো। তখন তিনিও খেলেন, আমরাও খেলাম। তারপর তিনি মাগরিবের সালাতের জন্য উঠে পড়লেন এবং কুল্লি করলেন। আমরাও কুল্লি করলাম। তারপর তিনি সালাত আদায় করলেন আর সেজন্য নতুনভাবে 'উযূ করলেন না।

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে খাইবার অভিযানে বেরোলাম। আমরা রাতের বেলা চলছিলাম, তখন দলের এক ব্যক্তি 'আমির-কে বলল, হে 'আমির! তোমার সমর সঙ্গীত থেকে আমাদেরকে কিছু শোনাবে না কি? 'আমির ছিলেন একজন কবি। তখন তিনি সওয়ারী থেকে নামলেন এবং সঙ্গীতের তালে তালে কাফেলাকে এগিয়ে নিয়ে চললেন। তিনি গাইলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি না হলে আমরা হিদায়াত লাভ করতাম না, সদাকাহ দিতাম না আর সালাত আদায় করতাম না। তাই আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, যতদিন আপনার প্রতি সমর্পিত হয়ে থাকব। আমাদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন এবং শত্রুর মুকাবালায় আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন। আমাদেরকে যখন (কুফরের দিকে) ডাকা হয় আমরা তখন তা প্রত্যাখ্যান করি। আর এ কারণে তারা চীৎকার করে আমাদের বিরুদ্ধে লোক-লস্কর জমা করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ সঙ্গীতের গায়ক কে? তারা বললেন, 'আমির ইবন আকওয়া'। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন। কাফেলার একজন বললঃ হে আল্লাহর নবী! তার (শাহাদাত) নিশ্চিত হয়ে গেল। (হায়) আমাদেরকে যদি তার নিকট হতে আরো উপকার লাভের সুযোগ দিতেন! অতঃপর আমরা খাইবারে পৌছলাম এবং তাদেরকে অবরোধ করলাম। এক সময় আমরা ভীষণ ক্ষুধায় আক্রান্ত হলাম। কিন্তু পরেই মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করলেন। বিজয়ের দিন সন্ধ্যায় মুসলিমগণ (রান্নার জন্য) অনেক আগুন জ্বালালেন। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ এ সব কিসের আগুন? তোমরা কী রান্না করছ? তারা জানালেন, গোশত। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ কিসের গোশত? লোকেরা বললেন, গৃহপালিত গাধার গোশত। নবী (ﷺ) বললেন, এগুলি ঢেলে দাও এবং ডেকচিগুলো ভেঙ্গে ফেল। একজন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! গোশ্তগুলো ঢেলে দিয়ে যদি পাত্রগুলো ধুয়ে নেই? তিনি বললেন, তাও করতে পার। এরপর যখন সবাই যুদ্ধের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাড়িলে গেলেন, আর 'আমির ইবন আকওয়া'-এর তলোয়ারটা ছিল ছোট, তা দিয়ে তিনি জনৈক ইয়াহূদীর পায়ের গোছায় আঘাত করলে তরবারির তীক্ষ্ণ ভাগ ঘুরে এসে তার নিজের হাটুতে লেগে যায়। এতে তিনি মারা যান। সালামাহ ইবন আকওয়া' বলেনঃ তারপর লোকেরা খাইবার থেকে ফিরতে শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বললেন, কী খবর? আমি বললামঃ আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। লোকজন ধারণা করছে, (নিজ আঘাতে মারা যাওয়ায়) 'আমির-এর আমল নষ্ট হয়ে গেছে। নবী (ﷺ) বললেন, এ কথা যে বলেছে সে মিথ্যা বলেছে। বরং 'আমিরের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সাওয়াব, নবী (ﷺ) তার দু'টি আঙ্গুল একত্রিত করে দেখালেন। অবশ্যই সে একজন সচেষ্ট ব্যক্তি ও আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী। তার মত গুণের অধিকারী আরাব খুব কমই আছে। আমাদের নিকট হাতিম কুতাইবাহর মাধ্যমে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

আনাস হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাত্রিকালে খাইবারে পৌছলেন। আর তিনি (কোন অভিযানে) কোন গোত্রের এলাকায় রাত্রিকালে গিয়ে পৌছলে, সকাল না হওয়া পর্যন্ত তাদের উপর আক্রমণ চালাতেন না। সকাল হলে ইয়াহূদীরা তাদের কৃষি সরঞ্জাম ও টুকরি নিয়ে বাইরে আসল, আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দেখতে পেল, তখন তারা (ভয়ে) বলতে লাগল, মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে এসে পড়েছে। তখন নবী (ﷺ) বললেন, খাইবার ধ্বংস হয়েছে। আমরা যখনই কোন গোত্রের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই তখন সেই সতর্ক করা গোত্রের সকাল হয় মন্দভাবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খুব সকালে খাইবারে গিয়ে পৌছলাম। তখন সেখানকার লোকেরা কৃষির সরঞ্জাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। তারা যখন নবী (ﷺ)-কে দেখতে পেল তখন বলল, মুহাম্মাদ, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ তার দলবল নিয়ে এসে পড়েছে। নবী (ﷺ) আল্লাহু আকবার) ধ্বনি উচ্চারণ করে বললেন, খাইবার ধ্বংস হয়েছে। আমরা যখনই কোন গোত্রের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই, তখন সেই সতর্ক করা গোত্রের সকাল হয় মন্দভাবে। [আনাস বলেন] এ যুদ্ধে আমরা গাধার গোশত লাভ করেছিলাম (আর তা পাক করা হচ্ছিল)। তখন নবী (ﷺ)-এর ঘোষণাকারী ঘোষণা করলেন, আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ) তোমাদেরকে গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। কারণ তা নাপাক।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে একজন আগন্তুক এসে বলল, (গানীমাতের) গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চুপ রইলেন। এরপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসে বলল, গাধাগুলো খেয়ে ফেলা হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখনো চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার এসে বলল, গাধাগুলো খতম করে দেয়া হচ্ছে। তখন তিনি একজন ঘোষণাকারীকে হুকুম দিলেন। সে লোকজনের সামনে গিয়ে ঘোষণা দিলঃ আল্লাহ এবং তার রাসূল (ﷺ) তোমাদেরকে গৃহপালিত গাধার গোশ্ত খেতে নিষেধ করেছেন। তখন ডেকচিগুলো উল্টে দেয়া হল। অথচ ডেকচিগুলোতে গোশ্ত তখন টগবগ করে ফুটছিল।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খাইবারের নিকটে সকালে কিছু অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত আদায় করলেন। তারপর আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করে বললেন, খাইবার ধ্বংস হয়েছে। আমরা যখনই কোন গোত্রের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই তখনই সতর্ক করা গোত্রের সকালটি হয় মন্দরূপে। এ সময়ে খাইবারের অধিবাসীরা অলি-গলিতে গিয়ে আশ্রয় নিতে আরম্ভ করল। নবী (ﷺ) তাদের মধ্যকার যোদ্ধাদেরকে হত্যা করলেন। আর শিশু ও নারীদেরকে বন্দী করলেন। বন্দীদের মধ্যে ছিলেন সফিয়্যাহ। প্রথমে তিনি দাহ্ইয়াতুল কালবীর অংশে এবং পরে নবী (ﷺ)-এর অংশে বণ্টিত হন। নবী (ﷺ) তার মুক্তিদানকে (বিবাহের) মাহর হিসেবে গণ্য করেন। আবদুল আযীয ইবন সুহাইব সাবিত-কে বললেন, হে আবূ মুহাম্মাদ! আপনি কি আনাস-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, নবী (ﷺ) তার [সফিয়্যাহ-এর] মোহর কী ধার্য করেছিলেন? তখন সাবিত 'হ্যা' বুঝানোর জন্য মাথা নাড়লেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সাফিয়্যা-কে বন্দী করেছিলেন। পরে তিনি তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছিলেন। সাবিত আনাস -কে জিজ্ঞেস করলেন, নবী (ﷺ) তার মোহর কত নির্দিষ্ট করেছিলেন? আনাস বললেনঃ স্বয়ং সাফিয়্যা-কেই মোহর ধার্য করেছিলেন এবং তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন খাইবার যুদ্ধের জন্য বের হলেন কিংবা রাবী বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন খাইবারের দিকে যাত্রা করলেন, তখন সাথী লোকজন একটি উপত্যকায় পৌছে এই বলে উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে শুরু করল-আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। (আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ব্যতীত কোন প্রকৃত ইলাহ নেই)। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা নিজেদের প্রতি দয়া কর। কারণ তোমরা এমন কোন সত্তাকে ডাকছ না যিনি বধির বা অনুপস্থিত। বরং তোমরা তো ডাকছ সেই সত্তাকে যিনি শ্রবণকারী ও অতি নিকটে অবস্থানকারী, যিনি তোমাদের সঙ্গেই রয়েছেন। [আবূ মূসা আশআরী বলেন] আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাওয়ারীর পেছনে ছিলাম। তিনি আমাকে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলতে শুনে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স! আমি বললাম, আমি উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি কথা শিখিয়ে দেব কি যা জান্নাতের ভান্ডারসমূহের মধ্যে একটি ভান্ডার? আমি বললাম, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল। আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তা হল 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ'।

সাহল ইবন সাদ সাঈদী হতে বর্ণিত। (খাইবারের যুদ্ধে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুশরিকরা মুখোমুখী হলেন। পরস্পরের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (দিনের শেষে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সেনা ছাউনিতে ফিরে আসলেন আর অন্যপক্ষও তাদের ছাউনিতে ফিরে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তার তরবারি থেকে একাকী কিংবা দলবদ্ধ কোন শত্রু সৈন্যকেই রেহাই দেননি। বরং পিছু ধাওয়া করে তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করেছেন। তাদের কেউ বললেন, অমুক ব্যক্তি আজ যা করেছে আমাদের মধ্যে আর অন্য কেউ তা করতে সক্ষম হয়নি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কিন্তু সে তো জাহান্নামী। সাহাবীগণের একজন বললেন, (ব্যাপারটা দেখার জন্য) আমি তার সঙ্গী হব। সাহল ইবন সাদ সাঈদী বলেন, পরে তিনি ঐ লোকটির সঙ্গে বের হলেন, লোকটি থামলে তিনিও থামতেন, লোকটি দ্রুত চললে তিনিও দ্রুত চলতেন। বর্ণনাকারী বলেন, এক সময়ে লোকটি ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং (যন্ত্রণার চোটে) শীঘ্র মৃত্যু কামনা করল। তাই সে তার তরবারির গোড়ার অংশ মাটিতে রেখে এর ধারালো দিক বুকের মাঝে রাখল। এরপর সে তরবারির উপর নিজেকে জোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল। তখন লোকটি (অনুসরণকারী সাহাবী) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চই আপনি আল্লাহর রাসূল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ব্যাপার কী? তিনি বললেন, একটু আগে আপনি যে লোকটির কথা বলেছিলেন যে, লোকটি জাহান্নামী, তাতে লোকেরা আশ্চর্যান্বিত হয়েছিল। তখন আমি তাদেরকে বলেছিলাম, আমি লোকটির পিছু নিয়ে দেখব। কাজেই আমি ব্যাপারটির খোজে বেরিয়ে পড়ি। এক সময় লোকটি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং শীঘ্র মৃত্যু কামনা করল, তাই সে তার তরবারির হাতলের দিক মাটিতে বসিয়ে এর তীক্ষ্ণ ভাগ নিজের বুকের মাঝে রাখল। এরপর নিজেকে তার উপর জোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, অনেক সময় মানুষ জান্নাতীদের মত আমল করতে থাকে, যা দেখে অন্যরা তাকে জান্নাতীই মনে করে। অথচ সে জাহান্নামী। আবার অনেক সময় মানুষ জাহান্নামীদের মতো আমল করতে থাকে যা দেখে লোকজনও সেরূপই মনে করে থাকে, অথচ সে জান্নাতী।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাইবার যুদ্ধে গিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে মুসলিম হওয়ার দাবীদার এক ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, লোকটি জাহান্নামী। এরপর যুদ্ধ আরম্ভ হলে লোকটি ভীষণভাবে যুদ্ধ চালিয়ে গেল, এমন কি তার দেহ বিক্ষত হয়ে গেল। এতে কারো কারো [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর উপর] সন্দেহ সৃষ্টি হল। অতঃপর লোকটি আঘাতের যন্ত্রণায় অসহ্য হয়ে তূণীরের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে সেখান থেকে তীর বের করে আনল। আর তীরটি নিজের বক্ষদেশে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। তা দেখে কতিপয় মুসলিম দ্রুত ছুটে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার কথাকে সত্য প্রমাণিত করেছেন। ঐ লোকটি নিজেই নিজের বক্ষে আঘাত করে আত্মহত্যা করেছে। তখন তিনি বললেন, হে অমুক! দাড়াও এবং ঘোষণা দাও যে, মুমিন ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। অবশ্য আল্লাহ ফাসিক ব্যক্তি দ্বারাও দ্বীনের সাহায্য করে থাকেন। মা'মার যুহরী থেকে উপরোক্ত হাদীস বর্ণনায় শুআয়ব-এর অনুসরণ করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম।

ইয়াযীদ ইবন আবূ 'উবায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সালামাহ (ইবন আকওয়া)-এর পায়ের নলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবূ মুসলিম! এ আঘাতটি কিসের? তিনি বললেন, এ আঘাত আমি খাইবার যুদ্ধে পেয়েছিলাম। লোকজন বলাবলি করল, সালামাহ মারা যাবে। আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলাম। তিনি ক্ষতটিতে তিনবার ফু দিলেন। ফলে আজ পর্যন্ত এতে কোন ব্যথা অনুভব করিনি।

সাহল (ইবন সাদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং মুশরিকরা মুখোমুখী হলেন। তাদের মধ্যে তুমুল লড়াই হল। (শেষে) সকলেই আপন আপন সেনা ছাউনীতে ফিরে গেল। মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিল, যে মুশরিকদের কোন একাকী কিংবা দলবদ্ধ কোন শত্রুকেই রেহাই দেয়নি বরং তাড়িয়ে নিয়ে তরবারি দ্বারা হত্যা করেছে। তখন বলা হল! হে আল্লাহর রাসূল! অমুক লোক আজ যতটা আমল করেছে অন্য কেউ ততটা করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সে ব্যক্তি জাহান্নামী। তারা বলল, তা হলে আমাদের মধ্যে আর কে জান্নাতী হবে যদি এ ব্যক্তিই জাহান্নামী হয়? তখন কাফেলার মধ্য থেকে একজন বলল, অবশ্যই আমি তাকে অনুসরণ করে দেখব (তিনি বলেন) লোকটির দ্রুত গতিতে বা ধীর গতিতে আমি তার সঙ্গে থাকতাম। শেষে, লোকটি আঘাতপ্রাপ্ত হলে যন্ত্রণার চোটে সে দ্রুত মৃত্যু কামনা করে তার তরবারির বাট মাটিতে রাখলো এবং ধারালো দিক নিজের বুকের মাঝে রেখে এর উপর সজোরে চেপে ধরে আত্মহত্যা করল। তখন (অনুসরণকারী) সাহাবী নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চই আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি [নবী (ﷺ)] জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তিনি তখন নবী (ﷺ)-কে সব ঘটনা জানালেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, কেউ কেউ জান্নাতবাসীদের মতো আমল করতে থাকে আর লোকজন তাকে তেমনই মনে করে থাকে অথচ সে জাহান্নামী। আবার কেউ কেউ জাহান্নামীর মতো আমল করে থাকে আর লোকজনও তাকে তাই মনে করে অথচ সে জান্নাতী।

আবূ ইমরান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক জুমুআহর দিনে আনাস লোকজনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তাদের (মাথায়) তায়ালিসাহ চাদর। তখন তিনি বললেন, এ মুহূর্তে এদেরকে খাইবারের ইয়াহূদীদের মতো দেখাচ্ছে।

সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, চোখ রোগ হওয়ায় আলী নবী (ﷺ)-এর থেকে খাইবার অভিযানে পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। [নবী (ﷺ) মদিনা থেকে রওয়ানা হয়ে এসে পড়লে] আলী বলেন, আমি পেছনে বসে থাকব। সুতরাং তিনি গিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হলেন। [সালামাহ বলেন] খাইবার বিজিত হওয়ার আগের রাতে তিনি [নবী (ﷺ)] বললেন, আগামীকাল সকালে আমি এমন ব্যক্তির হাতে পতাকা তুলে দেব অথবা তিনি বলেছেন, আগামীকাল সকালে এমন এক ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করবে যাকে আল্লাহ এবং তার রাসূল ভালবাসেন। আর তার হাতেই খাইবার বিজিত হবে। কাজেই আমরা সবাই সেটি কামনা করছিলাম। তখন বলা হল, এই তো আলী। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে পতাকা প্রদান করলেন এবং তার হাতেই খাইবার বিজিত হল।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। খাইবারের যুদ্ধে একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আগামীকাল সকালে আমি এমন এক লোকের হাতে ঝান্ডা তুলে দেব যার হাতে আল্লাহ খাইবারে বিজয় দান করবেন যে আল্লাহ এবং তার রাসূলকে ভালবাসে এবং যাকে আল্লাহ এবং তার রাসূল ভালবাসেন। সাহল বলেন, মুসলিমগণ এ জল্পনায় রাত কাটালো যে, তাদের মধ্যে কাকে দেয়া হবে এ ঝান্ডা। সকালে সবাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আসলেন, আর প্রত্যেকেই তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আলী ইবন আবূ তালিব কোথায়? সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো চোখরোগে আক্রান্ত। তিনি বললেন, তার কাছে লোক পাঠাও। সে মতে তাকে আনা হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার উভয় চোখে থুথু লাগিয়ে তার জন্য দোয়া করলেন। ফলে চোখ এমন ভাল হয়ে গেল যেন কখনো চোখে কোন রোগই ছিল না। এরপর তিনি তার হাতে ঝান্ডা প্রদান করলেন। তখন আলী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা আমাদের মতো (মুসলিম) না হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি বর্তমান অবস্থায়ই তাদের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে হাজির হও, এরপর তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের প্রতি আহবান করো, আল্লাহর অধিকার প্রদানে তাদের প্রতি যে দায়িত্ব বর্তায় সে সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত কর। কারণ আল্লাহর কসম! তোমার দাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ যদি মাত্র একজন মানুষকেও হিদায়াত দেন তাহলে তা তোমার জন্য লাল রঙের (মূল্যবান) উটের মালিক হওয়ার চেয়ে উত্তম।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাইবারে এসে পৌছলাম। এরপর যখন আল্লাহ তাকে খাইবার দূর্গের বিজয় দান করলেন তখন তার কাছে (ইয়াহূদী দলপতি) হুয়াঈ ইবন আখতাবের কন্যা সফিয়্যাহ-এর সৌন্দর্যের ব্যাপারে আলোচনা করা হল। তার স্বামী (এ যুদ্ধে) নিহত হয়। সে ছিল নববধূ। নবী (ﷺ) তাকে নিজের জন্য মনোনীত করেন এবং তাকে সঙ্গে করে (খাইবার থেকে) যাত্রা করেন। এরপর আমরা যখন সাদ্দুস সাহবা নামক স্থান পর্যন্ত গিয়ে পৌছলাম তখন সফিয়্যাহ তার মাসিক ঋতুস্রাব থেকে মুক্ত হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সঙ্গে বাসর করলেন। তারপর একটি ছোট দস্তরখানে (খেজুর-ঘি ও ছাতু মিশ্রিত) হায়স নামক খানা সাজিয়ে আমাকে বললেন, তোমার আশেপাশে যারা আছে সবাইকে ডাক। আর এটিই ছিল সফিয়্যাহ-এর সঙ্গে বিয়ের ওয়ালীমা। তারপর আমরা মদিনার দিকে রওয়ানা হলাম, আমি নবী (ﷺ)-কে তার সাওয়ারীর পেছনে সফিয়্যাহ-এর জন্য একটি চাদর বিছাতে দেখেছি। এরপর তিনি তার সাওয়ারীর ওপর হাটুদ্বয় মেলে বসতেন এবং সফিয়্যাহ নবী (ﷺ)-এর হাটুর উপর পা রেখে সাওয়ারীতে উঠতেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) খাইবার থেকে ফেরার পথে সফিয়্যাহ বিন্তে হুয়াঈ-এর কাছে তিনদিন অবস্থান করে তার সঙ্গে বাসর যাপন করেছেন। আর ছিলেন তাদের একজন যাদের জন্য পর্দার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খাইবার ও মদিনার মাঝে একস্থানে তিনদিন অবস্থান করেছিলেন যাতে তিনি সফিয়্যাহ-এর সঙ্গে বাসর করেছেন। আমি মুসলিমদেরকে ওয়ালীমার জন্য দাওয়াত দিলাম। অবশ্য এ ওয়ালীমাতে গোশতও ছিল না, রুটিও ছিল না। কেবল এতটুকু ছিল যে, তিনি বিলাল-কে দস্তরখান বিছাতে বললেন। তা বিছানো হল। এরপর তাতে কিছু খেজুর, পনির ও ঘি রাখা হল। এ অবস্থা দেখে মুসলিমগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগল যে, তিনি [সফিয়্যাহ] কি উম্মাহাতুল মুমিনীনের একজন, না ক্রীতদাসীদের একজন? তারা (আরো) বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য পর্দার ব্যবস্থা করেন তাহলে তিনি উম্মাহাতুল মুমিনীনেরই একজন বোঝা যাবে। আর পর্দার ব্যবস্থা না করলে তিনি দাসীদের অন্তর্ভুক্ত। এরপর যখন তিনি [নবী (ﷺ)] রওয়ানা হলেন তখন তিনি নিজের পেছনে সফিয়্যাহ-এর জন্য বসার জায়গা করে দিয়ে পর্দা খাটিয়ে দিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাইবারের দূর্গ অবরোধ করে রাখলাম, এমন সময় এক লোক একটি থলে ছুঁড়ে ফেলল। তাতে ছিল চর্বি। আমি সেটি নেয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে গেলাম, হঠাৎ পেছনে ফিরে চেয়ে দেখি নবী (ﷺ)। এতে আমি লজ্জিত হয়ে গেলাম।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। খাইবার যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রসুন ও গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। রসুন খেতে নিষেধ করেছেন কথাটি এক্ষেত্রে নাফি থেকে বর্ণিত হয়েছে, আর গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন কথাটি সালিম [ইবন আবদুল্লাহ] হতে বর্ণিত হয়েছে।

আলী ইবন আবূ তালিব হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাইবার যুদ্ধের দিন মহিলাদের মুত'আহ করা থেকে এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাইবার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাইবারের যুদ্ধের দিন (গৃহপালিত) গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খেতে অনুমতি দিয়েছেন।

ইবন আবী আওফা হতে বর্ণিত। (তিনি বলেন) খাইবারের দিন আমরা ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলাম, আর তখন আমাদের পাতিলগুলোতে (গাধার গোশত) টগবগ করে ফুটছিল। রাবী বলেন, কোন কোন পাতিলের গোশত পাকানো হয়ে গিয়েছিল। এমন সময়ে নবী (ﷺ)-এর ঘোষণাকারী এসে ঘোষণা দিলেন, তোমরা (গৃহপালিত) গাধার গোশত থেকে একটুও খাবে না এবং তা ঢেলে দেবে। ইবন আবী আওফা বলেন, ঘোষণা শুনে আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম যে, যেহেতু গাধাগুলো থেকে খুমুস (এক-পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি এ কারণেই তিনি সেগুলো খেতে নিষেধ করেছেন। কেউ কেউ বললেন, তিনি চিরদিনের জন্যই গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। কেননা গাধা অপবিত্র জিনিস খেয়ে থাকে।

বারাআ এবং আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত যে, (খাইবার যুদ্ধে) তারা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। তারা গাধার গোশত পেলেন। তারা তা রান্না করলেন। এমন সময়ে নবী (ﷺ)-এর ঘোষণাকারী ঘোষণা করলেন, ডেকচিগুলো উল্টে ফেল।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪২২১)।

আদী ইবন সাবিত হতে বর্ণিত যে, (তিনি বলেন) আমি বারাআ এবং ইবন আবূ আওফা-কে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করতে শুনেছি যে, খাইবারের দিন তারা গাধার গোশত রান্না করার জন্য ডেকচি বসিয়েছিলেন, তখন নবী (ﷺ) বললেন, ডেকচিগুলো উল্টে ফেল।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪২২৩)।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে খাইবারে অভিযানে গিয়েছিলাম। তিনি উপরোল্লিখিত বর্ণনার অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার যুদ্ধের দিন নবী (ﷺ) আমাদেরকে কাঁচা ও রান্না করা গৃহপালিত গাধার গোশত ফেলে দিতে হুকুম করেছেন। এরপরে আর কখনো তা খাওয়ার অনুমতি দেননি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জানি না, গৃহপালিত গাধাগুলো মানুষের মালপত্র বহন করে, কাজেই তার গোশত খেলে মানুষের বোঝা বহনকারী পশু নিঃশেষ হয়ে যাবে, এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা খেতে নিষেধ করেছিলেন, না খাইবারের দিনে এর গোশত স্থায়ীভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘোড়ার জন্য দুই অংশ এবং পদাতিক সৈন্যের জন্য এক অংশ হিসেবে (গানীমাতের) মাল বণ্টন করেছেন। বর্ণনাকারী [উবাইদুল্লাহ ইবন উমার] বলেন, নাফি হাদীসটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, (যুদ্ধে) যার সঙ্গে ঘোড়া থাকে সে পাবে তিন অংশ এবং যার সঙ্গে ঘোড়া থাকে না, সে পাবে এক অংশ।

জুবায়র ইবন মুত'ঈম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং উসমান ইবন আফ্ফান নবী (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে বললাম, আপনি খাইবারের প্রাপ্ত খুমুস থেকে বানু মুত্তালিবকে অংশ দিয়েছেন, আমাদেরকে দেননি। অথচ আমরা ও তারা সম্পর্কের দিক থেকে আপনার কাছে একই পর্যায়ের। তখন নবী (ﷺ) বললেন, নিঃসন্দেহে বানী হাশিম এবং বানু মুত্তালিব সম-মর্যাদার অধিকারী। যুবায়র বলেন, নবী (ﷺ) বানু 'আবদে শাম্স ও বানু নাওফিলকে (খাইবার যুদ্ধের খুমুস থেকে) কিছুই বণ্টন করেননি।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ইয়ামানে থাকা অবস্থায় আমাদের কাছে নবী (ﷺ)-এর হিজরতের খবর পৌছল। তাই আমি ও আমার দু'ভাই আবূ বুরদা ও আবূ রুহম এবং আমাদের কাওমের আরো মোট বায়ান্ন কি তিপ্পান্ন কিংবা আরো কিছু লোকজনসহ আমরা হিজরতের উদ্দেশে বের হলাম। আমি ছিলাম আমার অপর দু'ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট। আমরা একটি জাহাজে উঠলাম। জাহাজটি আমাদেরকে আবিসিনিয়া দেশের (বাদশাহ্) নাজ্জাশীর নিকট নিয়ে গেল। সেখানে আমরা জাফর ইবন আবূ তালিবের সাক্ষাৎ পেলাম এবং তার সঙ্গেই আমরা থেকে গেলাম। অবশেষে নবী (ﷺ)-এর খাইবার বিজয়ের সময় সকলে এক যোগে (মদিনায়) এসে তার সঙ্গে মিলিত হলাম। এ সময়ে মুসলিমদের কেউ কেউ আমাদেরকে জাহাজে আগমনকারীদেরকে বলল, হিজরতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী। আমাদের সঙ্গে আগমনকারী আসমা বিন্ত উমাইস একবার নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী হাফসাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তিনিও (তার স্বামী জাফরসহ) নাজ্জাশীর দেশে হিজরাতকারীদের সঙ্গে হিজরাত করেছিলেন। আসমা হাফসাহর কাছেই ছিলেন। এ সময়ে উমার তার ঘরে প্রবেশ করলেন। উমার আসমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? হাফসাহ বললেন, তিনি আসমা বিনত উমাইস। উমার বললেন, ইনি হাবশায় হিজরাতকারিণী আসমা? ইনিই কি সমুদ্রগামিনী? আসমা বললেন, হ্যা! তখন উমার বললেন, হিজরাতের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে আগে আছি। সুতরাং তোমাদের তুলনায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি আমাদের হক অধিক। এতে আসমা রেগে গেলেন এবং বললেন, কখনো হতে পারে না। আল্লাহর কসম! আপনারা তো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতেন, আপনাদের অবুঝ লোকদেরকে নাসীহাত করতেন। আর আমরা ছিলাম এমন এক এলাকায় অথবা তিনি বলেছেন এমন এক দেশে যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বহুদূরে এবং সর্বদা শত্রু বেষ্টিত হাবশা দেশে। আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশেই ছিল আমাদের এ হিজরাত আল্লাহর কসম! আমি কোন খাবার খাবো না, পানিও পান করব না, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে না জানাব। সেখানে আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হত, ভয় দেখানো হত। শীঘ্রই আমি নবী (ﷺ)-কে এসব কথা বলব এবং তাকে জিজ্ঞেস করব। তবে আল্লাহর কসম! আমি মিথ্যা বলব না, পেচিয়ে বলব না, বাড়িয়েও কিছু বলব না।

এরপর যখন নবী (ﷺ) আসলেন, তখন আসমা বললেন, হে আল্লাহর নবী! উমার এই কথা বলেছেন, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী উত্তর দিয়েছ? আসমা বললেনঃ আমি তাকে এই এই বলেছি। নবী (ﷺ) বললেন, (এ ব্যাপারে) তোমাদের চেয়ে উমার আমার প্রতি অধিক হক রাখে না। কারণ উমার এবং তার সাথীরা একটি হিজরাত লাভ করেছে, আর তোমরা যারা জাহাজে হিজরাতকারী ছিলে তারা দু'টি হিজরাত লাভ করেছ। আসমা বলেন, এ ঘটনার পর আমি আবূ মূসা এবং জাহাজযোগে হিজরাতকারী অন্যদেরকে দেখেছি যে, তারা সদলবলে এসে আমার নিকট থেকে এ হাদীসখানা শুনতেন। আর নবী (ﷺ) তাদের সম্পর্কে যে কথাটি বলেছিলেন সে কথাটির চেয়ে তাদের কাছে দুনিয়ার অন্য কোন জিনিস অধিকতর প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আবূ বুরদাহ বলেন যে, আসমা বলেছেন, আমি আবূ মূসা [আশআরী]-কে দেখেছি, তিনি বারবার আমার নিকট হতে এ হাদীসটি শুনতে চাইতেন।

আবূ বুরদা আবূ মূসা থেকে আরো বর্ণনা করেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, আশআরী গোত্রের লোকেরা রাতের বেলায় এলেও আমি তাদেরকে তাদের কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ দিয়েই চিনতে পারি এবং রাতের বেলায় তাদের কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনেই আমি তাদের বাড়িঘর চিনতে পারি। যদিও আমি দিবাভাগে তাদেরকে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করতে দেখিনি। হাকীম ছিলেন আশআরীদের একজন। যখন তিনি কোন দল কিংবা (বর্ণনাকারী বলেছেন) কোন দুশমনের মুখোমুখী হতেন তখন তিনি তাদেরকে বলতেন, আমার সাথীরা তোমাদের বলেছেন, যেন তোমরা তাদের জন্য অপেক্ষা কর।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার বিজয়ের পরে আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে গিয়ে পৌছলাম। তিনি আমাদের জন্য গানীমাতের মাল বণ্টন করেছেন। আমাদের ব্যতীত বিজয়ে অংশ নেয়নি এমন কারোর জন্য তিনি (খাইবারের গানীমাত) বণ্টন করেননি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি কিন্তু গানীমাত হিসেবে আমরা সোনা, রুপা কিছুই পাইনি। আমরা গানীমাত হিসেবে পেয়েছিলাম গরু, উট, বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী এবং ফলের বাগান। (যুদ্ধ শেষে) আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ওয়াদিউল কুরা পর্যন্ত ফিরে এলাম। তার [নবী (ﷺ)] সঙ্গে ছিল মিদআম নামে তার একটি গোলাম। বানী যিবাব-এর এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এটি হাদিয়া দিয়েছিল। এক সময়ে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাওদা নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে অজ্ঞাত একটি তীর ছুটে এসে তার গায়ে পড়ল। তাতে গোলামটি মারা গেল। তখন লোকেরা বলতে লাগল, কী আনন্দদায়ক তার এ শাহাদাত! তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আচ্ছা? সেই মহান সত্তার কসম! তার হাতে আমার প্রাণ, বণ্টনের আগে খাইবারের গানীমাত থেকে যে চাদরখানা তুলে নিয়েছিল সেটি আগুন হয়ে অবশ্যই তাকে দগ্ধ করবে। নবী (ﷺ)-এর এ কথা শুনে আরেক লোক একটি অথবা দু'টি জুতার ফিতা নিয়ে এসে বলল, এ জিনিসটি আমি বণ্টনের আগেই নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ একটি অথবা দু'টি ফিতাও হয়ে যেত আগুনের (ফিতা)।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মনে রেখ! সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, যদি পরবর্তী বংশধরদের নিঃস্ব ও রিক্ত-হস্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না থাকত তা হলে আমি আমার সকল বিজিত এলাকা ঐভাবে বণ্টন করে দিতাম যেভাবে নবী (ﷺ) খাইবার বণ্টন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তা তাদের জন্য গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি যেন পরবর্তী বংশধরগণ তা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিতে পারে।

উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পরবর্তী মুসলিমদের উপর আমার আশঙ্কা না থাকলে আমি তাদের (মুজাহিদগণের) বিজিত এলাকাগুলো তাদের মধ্যে সেভাবে বণ্টন করে দিতাম যেভাবে নবী (ﷺ) খাইবার বণ্টন করে দিয়েছিলেন।

আমবাসা ইবন সাঈদ হতে বর্ণিত যে, আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে (খাইবার যুদ্ধের গানীমাতের) অংশ চাইলেন। তখন বনূ সাঈদ ইবন আস গোত্রের জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, না, তাকে (অংশ) দিবেন না। আবূ হুরাইরাহ বললেন, এ লোক তো ইবন কাওকালের হত্যাকারী। কথাটি শুনে সে ব্যক্তি বলল, পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফিয়ে পড়া (উড়ে এসে জুড়ে বসা) বুনো বিড়ালের কথায় আশ্চর্যবোধ করছি।

যুবাইদী-যুহরী-'আমবাসাহ ইবন সাঈদ-আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সাঈদ ইবন আস-কে সংবাদ দিচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবান [ইবন সাঈদ]-এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল মদিনা থেকে নাজদের দিকে পাঠিয়েছিলেন। আবূ হুরাইরাহ বলেন, নবী (ﷺ) খাইবার বিজয়ের পর সেখানে অবস্থানকালে আবান ও তার সঙ্গীগণ সেখানে এসে তার [নবী (ﷺ)-এর] সঙ্গে মিলিত হলেন। তাদের ঘোড়াগুলোর লাগাম ছিল খেজুরের ছালের তৈরি। আবূ হুরাইরাহ বলেনঃ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদেরকে কোন অংশ দিবেন না। তখন আবান বললেন, পাহাড়ের চূড়া থেকে লাফিয়ে পড়া বুনো বিড়াল, তোমাকেই দেয়া হবে না। নবী (ﷺ) বললেন, হে আবান! বস। নবী (ﷺ) তাদেরকে (আবান ও তার সঙ্গীদেরকে) অংশ দিলেন না।

আমর ইবন ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার দাদা [সাঈদ ইবন আমর ইবন সাঈদ ইবন আস] আমাকে জানিয়েছেন যে, আবান ইবন সাঈদ নবী (ﷺ)-এর কাছে সালাম দিলেন। তখন আবূ হুরাইরাহ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ তো ইবন কাওকাল-এর হত্যাকারী! তখন আবান আবূ হুরাইরাহ-কে বললেন, দান পর্বতের চূড়া থেকে হঠাৎ নেমে আসা বুনো বিড়ালের কথায় আশ্চর্য হচ্ছি! সে এমন এক লোকের ব্যাপারে আমাকে দোষারোপ করছে যাকে আল্লাহ আমার হাত দিয়ে সম্মানিত করেছেন (শাহাদাত দান করেছেন)। আর তার হাত দিয়ে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর কন্যা ফাতেমাহ আবূ বাকর-এর নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরিত্যক্ত সম্পত্তি মদিনা্ ও ফাদাক-এ অবস্থিত ফাই (বিনা যুদ্ধে প্রাপ্ত সম্পদ) এবং খাইবারের খুমুসের (পঞ্চমাংশ) অবশিষ্ট থেকে মিরাসী স্বত্ব চেয়ে পাঠালেন। তখন আবূ বাকর উত্তরে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলে গেছেন, আমাদের (নবীদের) কোন ওয়ারিশ হয় না, আমরা যা ছেড়ে যাব তা সদাকাহ হিসেবে গণ্য হবে। অবশ্য মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরগণ এ সম্পত্তি থেকে ভরণ-পোষণ চালাতে পারবেন। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সদাকাহ তার জীবদ্দশায় যে অবস্থায় ছিল আমি সে অবস্থা থেকে এতটুকুও পরিবর্তন করব না। এ ব্যাপারে তিনি যেভাবে ব্যবহার করে গেছেন আমিও ঠিক সেভাবেই ব্যবহার করব। এ কথা বলে আবূ বাকর ফাতেমাহ-কে এ সম্পদ থেকে কিছু দিতে অস্বীকার করলেন। এতে ফাতিমা (মানবোচিত কারণে) আবূ বাকর-এর উপর নাখোশ হলেন এবং তার থেকে সম্পর্কহীন থাকলেন। তার মৃত্যু অবধি তিনি আবূ বাকর-এর সঙ্গে কথা বলেননি। নবী (ﷺ)-এর পর তিনি ছয় মাস জীবিত ছিলেন। তিনি ইন্তিকাল করলে তার স্বামী আলী রাতের বেলা তাকে দাফন করেন। আবূ বাকর-কেও এ খবর দিলেন না এবং তিনি তার জানাযার সালাত আদায় করে নেন। ফাতেমাহ-এর জীবিত অবস্থায় লোকজনের মনে আলী-এর মর্যাদা ছিল। ফাতিমা ইন্তিকাল করলে আলী লোকজনের চেহারায় অসন্তুষ্টির চিহ্ন দেখতে পেলেন। তাই তিনি আবূ বাকর-এর সঙ্গে সমঝোতা ও তার কাছে বাইআতের ইচ্ছা করলেন। এ ছয় মাসে তার পক্ষে বাই'আত গ্রহণের সুযোগ হয়নি। তাই তিনি আবূ বাকর-এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, আপনি আমার কাছে আসুন। (এটা জানতে পেরে) উমার বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি একা একা তার কাছে যাবেন না। আবূ বাকর বললেন, তারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে বলে তোমরা আশঙ্কা করছ? আল্লাহর কসম! আমি তাদের কাছে যাব। তারপর আবূ বাকর তাদের কাছে গেলেন। আলী তাশাহ্হুদ পাঠ করে বললেন, আমরা আপনার মর্যাদা এবং আল্লাহ আপনাকে যা কিছু দান করেছেন সে সম্পর্কে ওয়াকেবহাল। আর যে কল্যাণ (খিলাফাত) আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন সে ব্যাপারেও আমরা আপনার উপর হিংসা পোষণ করি না। তবে খিলাফাতের ব্যাপারে আপনি আমাদের উপর নিজস্ব মতামতের প্রাধান্য দিচ্ছেন অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটাত্মীয় হিসেবে খিলাফাতের কাজে আমাদেরও কিছু পরামর্শ দেয়ার অধিকার আছে। এ কথায় আবূ বাকর-এর চোখ থেকে অশ্রু উপচে পড়ল। এরপর তিনি যখন আলোচনা আরম্ভ করলেন তখন বললেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিকটাত্মীয় চেয়েও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আত্মীয়বর্গ অধিক প্রিয়। আর এ সম্পদগুলোতে আমার এবং আপনাদের মধ্যে যে মতবিরোধ হয়েছে সে ব্যাপারেও আমি কল্যাণকর পথ অনুসরণে পিছপা হইনি। বরং এ ক্ষেত্রেও আমি কোন কাজ পরিত্যাগ করিনি যা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে করতে দেখেছি। তারপর আলী আবূ বাকর-কে বললেনঃ যুহরের পর আপনার হাতে বাই'আত গ্রহণের ওয়াদা রইল। যুহরের সালাত আদায়ের পর আবূ বাকর মিম্বারে বসে তাশাহ্হুদ পাঠ করলেন, তারপর আলী-এর বর্তমান অবস্থা এবং বাই'আত গ্রহণে তার দেরি করার কারণ ও তার পেশকৃত আপত্তিগুলো তিনি বর্ণনা করলেন। এরপর আলী দাড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাশাহ্হুদ পাঠ করলেন এবং আবূ বাকর-এর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে বললেন, তিনি যা কিছু করেছেন তা আবূ বাকর -এর প্রতি হিংসা কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত তার মর্যাদাকে অস্বীকার করার জন্য করেননি। (তিনি বলেন) তবে আমরা ভেবেছিলাম যে, এ ব্যাপারে আমাদেরও পরামর্শ দেয়ার অধিকার থাকবে। অথচ তিনি [আবূ বাকর] আমাদের পরামর্শ ত্যাগ করে স্বাধীন মতের উপর রয়ে গেছেন। তাই আমরা মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম। মুসলিমগণ আনন্দিত হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। এরপর আলী আমর বিল মারূফ-এর পানে ফিরে আসার কারণে মুসলিমগণ আবার তার নিকটবর্তী হতে শুরু করলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪২৪০)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার বিজয়ের পর আমরা বলাবলি করলাম, এখন আমরা পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেজুর খেতে পারব।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খাইবার বিজয় করার পূর্ব পর্যন্ত আমরা তৃপ্ত হয়ে খেতে পাইনি।

আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাইবারের অধিবাসীদের জন্য এক ব্যক্তিকে প্রশাসক নিয়োগ করলেন। এক সময়ে তিনি উন্নত জাতের কিছু খেজুর নিয়ে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, খাইবারের সব খেজুরই কি এ রকম? প্রশাসক জবাব দিলেন, জ্বী না, আল্লাহর শপথ, হে আল্লাহর রাসূল! তবে আমরা এ রকম খেজুরের এক সা' সাধারণ খেজুরের দু' সা'র বদলে কিংবা এ রকম খেজুরের দু' সা' সাধারণ খেজুরের তিন সা'র বদলে গ্রহণ করে থাকি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এমন করো না। দিরহামের বদলে সব খেজুর বিক্রি করে দিবে। তারপর দিরহাম দিয়ে উত্তম খেজুর কিনে নিবে।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪২৪৪)।

সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন যে, আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরাহ তাকে বললেন, নবী (ﷺ) আনসারদের বানী আদী গোত্রের এক ব্যক্তিকে খাইবার পাঠিছিলেন এবং তাকে সেখানকার অধিবাসীদের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪২৪৬)।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খাইবারের ভূমি সেখানকার ইয়াহূদীদেরকে এ চুক্তিতে প্রদান করেছিলেন যে, তারা চাষাবাদ করবে আর উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক লাভ করবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, যখন খাইবার বিজিত হলো তখন (ইয়াহূদীদের পক্ষ থেকে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে একটি বাকরী হাদিয়া দেয়া হয়। যাতে বিষ মেশানো ছিল।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উসামাহ (ইবন যায়দ)-কে একটি বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। লোকজন তার অধিনায়ক নিযুক্তির সমালোচনা করলে তিনি [নবী (ﷺ)] বললেন, আজ তোমরা তার অধিনায়ক নিযুক্তির সমালোচনা করছ, এর পূর্বেও তোমরা তার পিতার অধিনায়ক নিযুক্তিতে সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর কসম! সে (উসামার পিতা) ছিল অধিনায়ক হওয়ার জন্য যথোপযুক্ত এবং আমার সবচেয়ে প্রিয়পাত্র। তার মৃত্যুর পর এ হচ্ছে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়পাত্র।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যিলকা'দা মাসে উমরাহ আদায়ের উদ্দেশে রওয়ানা করেন। মক্কাবাসীরা তাকে মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানাল। অবশেষে তাদের সঙ্গে চুক্তি হল যে, (আগামী বছর উমরাহ পালন হেতু) তিনি তিনদিন মক্কায় অবস্থান করবেন। মুসলিমগণ সন্ধিপত্র লেখার সময় এভাবে লিখেছিলেন, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ আমাদের সঙ্গে এ চুক্তি সম্পাদন করেছেন। ফলে তারা (মক্কার কুরাইশরা) বলল, আমরা তো এ কথা স্বীকার করিনি। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলেই জানতাম তা হলে মক্কা প্রবেশে মোটেই বাধা দিতাম না। বরং আপনি তো মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ। তখন তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল এবং মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ। তারপর তিনি আলী-কে বললেন, রাসূলুল্লাহ শব্দটি মুছে ফেল। আলী উত্তর করলেন, আল্লাহর কসম! আমি কখনো এ কথা মুছতে পারব না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন চুক্তিপত্রটি হাতে নিলেন। তিনি লিখতে জানতেন না, তবুও তিনি লিখে দিলেন যে, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ এ চুক্তিপত্র সম্পাদন করলেন যে, তিনি কোষবদ্ধ তরবারি ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন না। মক্কাবাসীদের কেউ তার সঙ্গে যেতে চাইলেও তিনি তাকে বের করে নিয়ে যাবেন না। তার সাথীদের কেউ মক্কায় থেকে যেতে চাইলে তিনি তাকে বাধা দিবেন না। (পরবর্তী বছর) যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হল তখন মুশরিকরা আলীর কাছে এসে বলল, আপনার সাথী [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)]-কে বলুন যে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। তাই তিনি যেন আমাদের নিকট থেকে চলে যান। নবী (ﷺ) সে মতে বেরিয়ে আসলেন। এ সময়ে হামযাহ-এর কন্যা চাচা চাচা বলে ডাকতে ডাকতে তার পেছনে ছুটল। আলী তার হাত ধরে তুলে নিয়ে ফাতেমাহ-কে দিয়ে বললেন, তোমার চাচার কন্যাকে নাও। ফাতেমাহ বাচ্চাটিকে উঠিয়ে নিলেন। (মদিনায় পৌছলে) বাচ্চাটি নিয়ে আলী, যায়দ (ইবন হারিসাহ) ও জা'ফার [ইবন আবূ তালিব ]-এর মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল। আলী বললেন, আমি তাকে তুলে নিয়েছি আর সে আমার চাচার মেয়ে! জাফর বললেন, সে আমার চাচার মেয়ে আর তার খালা হল আমার স্ত্রী। যায়দ [ইবন হারিসা] বললেন, সে আমার ভাইয়ের মেয়ে। তখন নবী (ﷺ) মেয়েটিকে তার খালার জন্য ফায়সালা দিয়ে বললেন খালা তো মায়ের মর্যাদার। এরপর তিনি আলীকে বললেন, তুমি আমার এবং আমি তোমার। জাফর-কে বললেন, তুমি আকৃতি-প্রকৃতিতে আমার মতো। আর যায়িদ-কে বললেন, তুমি আমাদের ভাই ও আযাদকৃত গোলাম। আলী [নবী (ﷺ)-কে] বললেন, আপনি হামযাহ'র মেয়েটিকে বিয়ে করছেন না কেন? তিনি [নবী (ﷺ)] বললেন, সে আমার দুধ ভাই-এর মেয়ে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। উমরাহ পালনের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রওয়ানা করলে কুরাইশী কাফিররা তার এবং বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা হয়ে দাড়ালো। কাজেই তিনি হুদাইবিয়াহ নামক স্থানেই কুরবানীর জন্তু যবহ করলেন এবং মাথা মুন্ডন করলেন আর তিনি তাদের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি সম্পাদন করলেন যে, আগামী বছর তিনি উমরাহ পালনের জন্য আসবেন কিন্তু তরবারি ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র সঙ্গে আনবেন না এবং মক্কাবাসীরা যে ক'দিন ইচ্ছা করবে তার অধিক তিনি সেখানে অবস্থান করবেন না। সে মতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পরবর্তী বছর উমরাহ পালন করলেন এবং সম্পাদিত চুক্তিনামা অনুসারে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তারপর তিনদিন অবস্থান করলে মক্কাবাসীরা তাকে চলে যেতে বলল। তাই তিনি চলে গেলেন।

মুজাহিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং উরওয়াহ ইবন যুবায়র মসজিদে নাববীতে প্রবেশ করেই দেখলাম আবদুল্লাহ ইবন উমার আয়িশাহ -এর হুজরার পাশেই বসে আছেন। উরওয়াহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, নবী (ﷺ) ক'টি উমরাহ আদায় করেছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, চারটি। এ সময় আমরা (ঘরের ভিতরে) আয়িশাহ-এর মিসওয়াক করার আওয়াজ শুনতে পেলাম।

উরওয়াহ বললেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আবূ আবদুর রহমান [ইবন উমার] কী বলছেন, তা আপনি শুনেছেন কি যে, নবী (ﷺ) চারটি উমরাহ করেছেন? আয়িশাহ উত্তর দিলেন যে, নবী (ﷺ) এমন কোন উমরাহ করেননি যাতে তিনি (ইবন উমার) তার সঙ্গে ছিলেন না। তবে তিনি রাজাব মাসে কখনো উমরাহ আদায় করেননি।

ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন উমরাহ‌তুল কাযা আদায় করছিলেন তখন আমরা তাকে মুশরিক ও তাদের যুবকদের থেকে আড়াল করে রেখেছিলাম যাতে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোন প্রকার কষ্ট দিতে না পারে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তার সাহাবীগণ (উমরাহতুল কাযা আদায়ের জন্য) আগমন করলে মুশরিকরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল যে, তোমাদের সামনে একদল লোক আসছে, ইয়াসরিবের জ্বর যাদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। এজন্য নবী (ﷺ) সাহাবীগণকে প্রথম চক্করে হেলে দুলে চলার জন্য এবং দু' রুকনের মধ্যবর্তী স্থানে স্বাভাবিক গতিতে চলতে নির্দেশ দেন। অবশ্য তিনি তাদেরকে সবকটি চক্করেই হেলে দুলে চলার আদেশ করতেন। কিন্তু তাদের প্রতি তার অনুভূতিই কেবল তাকে এ হুকুম দেয়া থেকে বিরত রেখেছিল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বাইতুল্লাহ এবং সাফা ও মারওয়া-এর মধ্যখানে এ জন্যই সা'য়ী করেছিলেন, যেন মুশরিকদেরকে তার শৌর্য-বীর্য দেখাতে পারেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইহরাম অবস্থায় মাইমূনাহ -কে বিয়ে করেছেন এবং (ইহরাম খোলার পরে) হালাল অবস্থায় তিনি তার সঙ্গে বাসর যাপন করেছেন। মাইমূনাহ (মক্কার নিকটেই) সারিফ নামক স্থানে ইন্তিকাল করেছেন।

[ইমাম বুখারী বলেন] অপর একটি সানাদে ইবন ইসহাক-ইবন আবূ নাজীহ ও আবান ইবন সালিহ-আতা ও মুজাহিদ-ইবন আব্বাস থেকে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ﷺ) উমরাহতুল কাযা আদায়ের সফরে মায়মূনাহ-কে বিয়ে করেছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, সেদিন (মূতার যুদ্ধের দিন) তিনি শাহাদাত প্রাপ্ত জা'ফার ইবন আবূ তালিব-এর লাশের কাছে গিয়ে দাড়িয়েছিলেন। (তিনি বলেন) আমি জাফর-এর দেহে তখন বর্শা ও তরবারীর পঞ্চাশটি আঘাতের চিহ্ন গুণেছি। তার মধ্যে কোনটাই তার পশ্চাৎ দিকে ছিল না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মূতার যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়দ ইবন হারিসাহ-কে (সেনাপতি নিযুক্ত করে) বলেছিলেন, যদি যায়দ শহীদ হয়ে যায় তাহলে জা'ফার ইবন আবূ তালিব (সেনাপতি হবে)। যদি জা'ফার-ও শহীদ হয়ে যায় তাহলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (সেনাপতি হবে)। আবদুল্লাহ [ইবন উমার] বলেন, ঐ যুদ্ধে তাদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে) আমরা জা'ফার ইবন আবূ তালিব-কে তালাশ করলে তাকে শহীদগণের মধ্যে পেলাম। তখন আমরা তার দেহে বর্শা ও তীরের নব্বইটিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি।

আনাস হতে বর্ণিত যে, মুসলিমদের নিকট খবর এসে পৌছার পূর্বেই নবী (ﷺ) তাদেরকে যায়দ, জা'ফার ও ইবন রাওয়াহা-এর (শাহাদাতের) কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যায়দ পতাকা হাতে এগিয়ে গেলে তাকে শহীদ করা হয়। অতঃপর জা'ফার পতাকা হতে এগিয়ে গেলে তাকেও শহীদ করা হয়। অতঃপর ইবন রাওয়াহা পতাকা হাতে নিলে তাকেও শহীদ করা হল। এ সময়ে তার দু'চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। (তিনি বললেন) শেষে আল্লাহর তলোয়ারদের মধ্য হতে আল্লাহর এক তলোয়ার (খালিদ ইবন ওয়ালীদ) পতাকা ধারণ করল। ফলে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যায়িদ ইবন হারিসাহ, জাফর ইবন আবূ তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা-এর শাহাদাতের সংবাদ পৌছলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বসে পড়লেন। তার চেহারায় শোক-চিহ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আয়িশাহ বলেন, আমি তখন দরজার ফাক দিয়ে উকি দিয়ে দেখলাম, এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জাফর-এর পরিবারের মেয়েরা কান্নাকাটি করছে। তখন তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] মহিলাদেরকে বারণ করার জন্য লোকটিকে আদেশ করলেন। লোকটি ফিরে গেল। তারপর আবার এসে বলল, আমি তাদেরকে নিষেধ করেছি। কিন্তু তারা তা শোনেনি। আয়িশাহ বলেন, এবারও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে পুনঃ হুকুম করলেন। লোকটি গেল কিন্তু আবার ফিরে আসল এবং বলল, আমি তাদেরকে নিষেধ করেছি কিন্তু তারা আমার কথা মানছে না। আয়িশাহ বলেন, তিনি লোকটিকে আবার যেতে বললেন, কাজেই সে গেল, অতঃপর ফিরে আসল এবং বলল, আল্লাহর শপথ! আমি তাদের কাছে পরাস্ত হয়ে গেলাম। আয়িশাহ বলেন, (তারপর) সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেন, তা হলে তাদের মুখের উপর মাটি ছুঁড়ে মার। আয়িশাহ বলেন, আমি লোকটিকে বললাম, আল্লাহ তোমার নাককে ধূলি ধূসরিত করুন। আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাকে যে কাজ করতে বলেছেন তা তুমি করতেও পারছ না অথচ তাকে কষ্ট দিতেও ছাড়ছ না।

আমির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন উমার যখনই জাফর ইবন আবূ তালিব-এর পুত্র (আবদুল্লাহ)-কে সালাম দিতেন তখনই তিনি বলতেন, তোমার প্রতি সালাম, হে দু'ডানাওয়ালার পুত্র।

কায়স ইবন আবূ হাযিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবন ওয়ালিদ-কে বলতে শুনেছি, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়টি তরবারি ভেঙ্গে গিয়েছিল। শেষে আমার হাতে একটি প্রশস্ত ইয়ামানী তলোয়ার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

ক্বায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি খালিদ ইবন ওয়ালীদ থেকে শুনেছি, তিনি বলছেন, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে নয়খানা তরবারি ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গিয়েছিল। (পরিশেষে) আমার হাতে আমার একটি প্রশস্ত ইয়ামানী তারবারিই টিকেছিল।

নুমান ইবন বাশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বেহুশ হয়ে পড়লে তার বোন আমরা [বিনত রাওয়াহা] হায়, হায় পর্বতের মতো আমার ভাই, হায়রে অমুকের মতো, তমুকের মতো ইত্যাদি গুণ-বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে কান্নাকাটি শুরু করল। এরপর জ্ঞান ফিরলে তিনি তার বোনকে বললেন, তুমি যেসব কথা বলে কান্নাকাটি করেছিলে সেসব কথা উল্লেখ করে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, তুমি কি সত্যই এরূপ?

নুমান ইবন বাশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বেহুঁশ হয়ে পড়লেন বলে তা বর্ণনা করলেন যেভাবে উপরোক্ত হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। (তারপর তিনি বলেছেন) অতঃপর তিনি [আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা] শহীদ হলে তার বোন মোটেই কান্নাকাটি করেনি।

উসামাহ ইবন যায়িদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমরা প্রত্যুষে গোত্রটির উপর আক্রমণ করি এবং তাদেরকে পরাজিত করি। এ সময়ে আনসারদের এক ব্যক্তি ও আমি তাদের (হুরকাদের) একজনের পিছু ধাওয়া করলাম। আমরা যখন তাকে ঘিরে ফেললাম তখন সে বলে উঠল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। এ বাক্য শুনে আনসারী তার অস্ত্র সামলে নিলেন। কিন্তু আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে ফেললাম। আমরা মদিনায় ফিরার পর এ সংবাদ নবী (ﷺ) পর্যন্ত পৌছলে তিনি বললেন, হে উসামাহ! 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ? আমি বললাম, সে তো জান বাচানোর জন্য কলেমা পড়েছিল। এর পরেও তিনি এ কথাটি 'হে উসামাহ! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরেও তুমি তাকে হত্যা করেছ' বারবার বলতে থাকলেন। এতে আমার মন চাচ্ছিল যে, হায়, যদি সেই দিনটির পূর্বে আমি ইসলামই গ্রহণ না করতাম!

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আর তিনি (ﷺ) যেসব অভিযান প্রেরণ করেছেন তন্মধ্যে নয়টি অভিযানে আমি অংশ নিয়েছি। এসব অভিযানে একবার আবূ বাকর আমাদের অধিনায়ক থাকতেন, আরেকবার উসামাহ আমাদের অধিনায়ক থাকতেন।

উমার ইবন হাফস ইবন গিয়াস তার পিতা হাফস্ হতে, ইয়াযীদ ইবন আবী উবাইদাহ-এর মাধ্যমে সালামাহ ইবন আকওয়া' থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আর তিনি যেসব সেনাভিযান পাঠিয়েছিলেন এর নয়টি সেনাভিযানে অংশ নিয়েছি। এ সব সেনাভিযানে একবার আবূ বাকর আমাদের অধিনায়ক থাকতেন। আরেকবার উসামাহ আমাদের অধিনায়ক থাকতেন।

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং যায়দ ইবন হারিসাহ্-এর সঙ্গেও যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। নবী (ﷺ) তাকে (যায়দকে) আমাদের সেনাধ্যক্ষ নিয়োগ করেছিলেন।

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এতে তিনি খাইবার, হুদাইবিয়াহ, হুনায়ন ও যি-কারাদের যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী ইয়াযীদ বলেন, অবশিষ্ট যুদ্ধগুলোর নাম আমি ভুলে গেছি।

আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে এবং যুবায়র ও মিকদাদ-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ কথা বলে পাঠালেন যে, তোমরা রওয়ানা হয়ে রাওযায়ে খাখ পর্যন্ত চলে যাও, সেখানে সাওয়ারীর পৃষ্ঠে হাওদায় উপবিষ্টা জনৈকা মহিলার নিকট একখানা পত্র আছে। তোমরা ঐ পত্রটি তার থেকে নিয়ে আসবে। আলী বলেন, আমরা রওয়ানা দিলাম। আর আমাদের অশ্বগুলো আমাদের নিয়ে খুব দ্রুত ছুটে চলল। শেষ পর্যন্ত আমরা রাওযায়ে খাখ-এ পৌছে গেলাম। গিয়েই আমরা হাওদায় আরোহিণী মহিলাটিকে পেয়ে গেলাম। আমরা বললাম, পত্রটি বের কর। সে বললঃ আমার কাছে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম, তুমি অবশ্যই পত্রটি বের করবে, অন্যথায় আমরা তোমার কাপড়-চোপড় খুলে তালাশ করব। রাবী বলেন, মহিলাটি তখন তার চুলের খোপা থেকে পত্রটি বের করল। আমরা পত্রটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আসলাম। দেখা গেল এটি হাতিব ইবন আবূ বালতা'আ-এর পক্ষ থেকে মক্কার কতিপয় মুশরিকের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি এতে মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু তৎপরতার সংবাদ দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে হাতিব! এ কী কাজ করেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! (দয়া করে) আমার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। আমি কুরাইশদের সঙ্গে স্বগোত্রীয় কেউ ছিলাম না বরং তাদের বন্ধু তাদের মিত্র গোত্রের একজন ছিলাম। আপনার সঙ্গে যেসব মুহাজির আছেন কুরায়শ গোত্রে তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। যারা এদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদের হিফাযাত করছে। আর কুরাইশ গোত্রে যেহেতু আমার বংশগত কোন সম্পর্ক নেই, তাই আমি ভাবলাম, যদি আমি তাদের কোন উপকার করে দেই তাহলে তারা আমার পরিবার-পরিজনের হিফাযাতে এগিয়ে আসবে। কখনো আমি আমার দ্বীন পরিত্যাগ করা কিংবা ইসলাম গ্রহণের পর কুফরকে গ্রহণ করার জন্য এ কাজ করিনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বললেন, সে (হাতিব) তোমাদের কাছে সত্য কথাই বলেছে। উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, দেখ সে বদর যুদ্ধে যোগদান করেছে। তুমি তো জান না, হয়তো আল্লাহ তাআলা বদরে যোগদানকারীদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে বলে দিয়েছেন, তোমরা যা খুশী করতে থাক, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন আল্লাহ তাআলা এ সূরাহ অবতীর্ণ করেনঃ "ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা তোমাদের কাছে যে সত্য এসেছে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা রাসূলকে এবং তোমাদেরকে মক্কা থেকে নির্বাসিত করেছে এ কারণে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখ। যদি তোমরা বের হয়ে থাক আমার পথে জিহাদ করার উদ্দেশে এবং আমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, তবে কেন গোপনে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাও? আর তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর তা আমি ভাল জানি। তোমাদের যে কেউ এরূপ করে, সে তো সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়"- ( আল-মুমতাহিনাহ ৬০/১)।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি জানিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রমাযান মাসে মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ করেছেন। বর্ণনাকারী যুহরী বলেন, আমি সাঈদ ইবন মুসায়্যাব-কেও একই রকম বর্ণনা করতে শুনেছি। আরেকটি সূত্র দিয়ে তিনি উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ-এর মাধ্যমে ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বলেছেন, (মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সওম পালন করছিলেন। অবশেষে তিনি যখন কুদাইদ এবং উস্ফান নামক স্থানদ্বয়ের মাঝে কাদীদ নামক জায়গার ঝরণার কাছে পৌছেন তখন তিনি ইফতার করেন। এরপর রমাযান মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি আর সওম পালন করেননি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) রমাযান মাসে মদিনা থেকে (মক্কা অভিযানে) রওয়ানা হন। তার সঙ্গে ছিল দশ হাজার সাহাবী। তখন হিজরাত করে চলে আসার সাড়ে আট বছর পার হয়ে গিয়েছিল। তিনি ও তার সঙ্গী মুসলিমগণ সওম অবস্থায়ই মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। অবশেষে তিনি যখন উস্ফান ও কুদাইদ স্থানদ্বয়ের মধ্যবর্তী কাদীদ নামক জায়গার ঝরণার নিকট পৌছলেন তখন তিনি ও সঙ্গী মুসলিমগণ ইফতার করলেন। যুহরী বলেছেনঃ উম্মতের জীবনযাত্রায় গ্রহণ করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাজকর্মের শেষোক্ত আমলটিকেই চূড়ান্ত দলীল হিসাবে গণ্য করা হয়।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রমাযান মাসে হুনাইনের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন। সঙ্গী মুসলিমদের অবস্থা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ ছিলেন সওমরত। কেউ ছিলেন সওমহীন। তাই তিনি যখন সওয়ারীর উপর বসলেন তখন তিনি একপাত্র দুধ কিংবা পানি আনতে বললেন। তারপর তিনি পাত্রটি হাতের উপর কিংবা সওয়ারীর উপর রেখে লোকজনের দিকে তাকালেন। এ অবস্থা দেখে সওমবিহীন লোকেরা সওমরত লোকেদেরকে ডেকে বললেনঃ তোমরা সওম ভেঙ্গে ফেল।

আবদুর রাযযাক, মা'মার, আইয়ুব, 'ইকরিমা সূত্রে ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের বছর নবী (ﷺ) এ অভিযানে বের হয়েছিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রমাযান মাসে সওমরত অবস্থায় (মক্কা অভিমুখে) সফর করেছেন। অবশেষে তিনি উস্ফান নামক স্থানে পৌছলে একপাত্র পানি দিতে বললেন। তারপর দিনের বেলাতেই তিনি সে পানি পান করলেন যেন তিনি লোকজনকে তার সওমবিহীন অবস্থা দেখাতে পারেন। এরপর মক্কা পৌছা পর্যন্ত তিনি আর সওম পালন করেননি। বর্ণনাকারী বলেছেন, পরবর্তীকালে ইবন আব্বাস বলতেন সফরে কোন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সওম পালন করতেন আবার কোন সময় তিনি সওমবিহীন অবস্থায়ও ছিলেন। তাই সফরে যার ইচ্ছা সওম পালন করবে যার ইচ্ছা সওমবিহীন অবস্থায় থাকবে। (সফর শেষে বাসস্থানে তা আদায় করে নিতে হবে)।

হিশামের পিতা [উরওয়াহ ইবন যুবায়র] হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর নবী (ﷺ) (মক্কা অভিমুখে) রওয়ানা করেছেন। এ সংবাদ কুরাইশদের কাছে পৌছলে আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হার্ব, হাকীম ইবন হিযাম এবং বুদাইল ইবন ওয়ারকা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সংবাদ জানার জন্য। রাতের বেলা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে (মক্কার অদূরে) মাররুয জাহরান নামক স্থান পর্যন্ত এসে পৌছলে তারা আরাফার ময়দানে প্রজ্জ্বলিত আলোর মতো অসংখ্য আগুন দেখতে পেল। আবূ সুফ্ইয়ান বলে উঠল, ঠিক আরাফাহর ময়দানে প্রজ্জ্বলিত আলোর মতো এ সব কিসের আলো? বুদাইল ইবন ওয়ারকা উত্তর করল, এগুলো আমর গোত্রের (চুলার) আলো। আবূ সুফ্ইয়ান বলল, আমর গোত্রের লোক সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কয়েকজন প্রহরী তাদেরকে দেখে ফেলল এবং কাছে গিয়ে তাদেরকে পাকড়াও করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে নিয়ে এল। এ সময় আবূ সুফ্ইয়ান ইসলাম গ্রহণ করল। এরপর তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] যখন (সেনাবাহিনী সহ) রওয়ানা হলেন তখন আব্বাস-কে বললেন, আবূ সুফ্ইয়ানকে পথের একটি সংকীর্ণ জায়গায় দাড় করাবে, যেন সে মুসলিমদের পুরো সেনাদলটি দেখতে পায়। তাই আব্বাস তাকে যথাস্থানে থামিয়ে রাখলেন। আর নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে আগমনকারী বিভিন্ন গোত্রের লোকজন আলাদা আলাদাভাবে খন্ড দলে আবূ সুফ্ইয়ানের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করতে লাগল। (প্রথমে) একটি দল অতিক্রম করে গেল। আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, হে আব্বাস, এরা কারা? আব্বাস বললেন, এরা গিফার গোত্রের লোক। আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আমার এবং গিফার গোত্রের মধ্যে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল না। এরপর জুহাইনা গোত্রের লোকেরা অতিক্রম করে গেলেন, আবূ সুফ্ইয়ান অনুরূপ বললেন। তারপর সাদ ইবন হুযাইম গোত্র অতিক্রম করল, তখনো আবূ সুফ্ইয়ান অনুরূপ বললেন। তারপর সুলাইম গোত্র অতিক্রম করলেও আবূ সুফ্ইয়ান অনুরূপ বললেন। অবশেষে একটি বিরাট বাহিনী তার সামনে এল যে, এত বিরাট বাহিনী এ সময় তিনি আর দেখেননি। তাই জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? আব্বাস উত্তর দিলেন, এরাই আনসারবৃন্দ। সাদ ইবন উবাদাহ তাদের দলপতি। তার হাতেই রয়েছে তাদের পতাকা। সাদ ইবন উবাদাহ বললেন, হে আবূ সুফ্ইয়ান! আজকের দিন রক্তপাতের দিন, আজকের দিন কাবার অভ্যন্তরে রক্তপাত হালাল হওয়ার দিন। আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, হে আব্বাস! আজ হারাম ও তার অধিবাসীদের প্রতি তোমাদের করুণা প্রদর্শনেরও কত উত্তম দিন। তারপর আরেকটি দল আসল। এটি ছিল সবচেয়ে ছোট দল। আর এদের মধ্যেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার সাহাবীগণ। যুবায়র ইবন আওয়াম-এর হাতে ছিল নবী (ﷺ)-এর পতাকা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আবূ সুফ্ইয়ানের সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, সাদ ইবন উবাদাহ কী বলছে আপনি তা কি জানেন? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সে কী বলেছে? আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, সে এ রকম এ রকম বলেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সাদ ঠিক বলেনি বরং আজ এমন একটি দিন যে দিন আল্লাহ কাবাকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আজকের দিনে কাবাকে গিলাফে আচ্ছাদিত করা হবে। বর্ণনাকারী বলেন, (মক্কায়) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাজুন নামক স্থানে তার পতাকা স্থাপনের নির্দেশ দেন। বর্ণনাকারী উরওয়া নাফি ইবন যুবায়র ইবন মুত্ঈম আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি যুবায়র ইবন আওয়াম-কে (মক্কা বিজয়ের পর একদা) বললেন, হে আবূ আবদুল্লাহ! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপনাকে এ জায়গায়ই পতাকা স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। উরওয়াহ আরো বলেন, সে দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খালিদ ইবন ওয়ালীদকে মক্কার উচু এলাকা কাদার দিক থেকে প্রবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর নবী (ﷺ) কুদার দিক দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। সেদিন খালিদ ইবন ওয়ালীদের অশ্বারোহী সৈন্যদের মধ্য থেকে হুবায়শ ইবন আশআর এবং কুরয ইবন জাবির ফিহরী-এ দু'জন শহীদ হয়েছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার উটনীর উপর দেখেছি, তিনি 'তারজী' পূর্ণ তাজভীদ সহকারে সূরাহ আল-ফাত্হ তিলাওয়াত করছেন। বর্ণনাকারী মুআবিয়াহ ইবন কুররাহ বলেন, যদি আমার চারপাশে লোকজন জমায়েত হওয়ার আশঙ্কা না থাকত, তা হলে উবাইদুল্লাহ ইবন মুগাফ্ফাল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর তিলাওয়াত বর্ণনা করতে যেভাবে তারজী করেছিলেন আমিও ঠিক সে রকমে তারজী করে তিলাওয়াত করতাম।

উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি মক্কা বিজয়ের কালে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আগামীকাল আপনি কোথায় অবস্থান করবেন? নবী (ﷺ) বললেন, আকীল কি আমাদের জন্য কোন বাড়ি অবশিষ্ট রেখে গেছে?

এরপর তিনি বললেন, মুমিন ব্যক্তি কাফিরের ওয়ারিশ হয় না, আর কাফিরও মুমিন ব্যক্তির ওয়ারিশ হয় না। (পরবর্তীকালে) যুহরী-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আবূ তালিবের ওয়ারিশ কে হয়েছিল? তিনি বলেছেন, আকীল এবং তালিব তার ওয়ারিশ হয়েছিল। মা'মার যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আপনি আগামীকাল কোথায় অবস্থান করবেন কথাটি (উসামাহ ইবন যায়িদ) রাসূল (ﷺ)-কে তার হাজ্জের সফরে জিজ্ঞেস করেছিলেন। কিন্তু ইউনুস তার হাদীসে মক্কা বিজয়ের সময় বা হাজ্জের সফর কোনটিরই উল্লেখ করেননি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ আমাদেরকে বিজয় দান করলে ইনশাআল্লাহ 'খাইফ' হবে আমাদের অবস্থানস্থল, যেখানে কাফিররা কুফরীর উপর পরস্পরে শপথ গ্রহণ করেছিল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হুনাইনের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে বললেন, বানী কিনানার খায়ফ নামক স্থানই হবে আমাদের আগামীকালের অবস্থানস্থল, যেখানে কাফিররা কুফরের উপর পরস্পর শপথ গ্রহণ করেছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন নবী (ﷺ) মাথায় লোহার টুপি পরিহিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেছেন। তিনি সবেমাত্র টুপি খুলেছেন এ সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, ইবন খাতাল কাবার গিলাফ ধরে দাড়িয়ে আছে। নবী (ﷺ) বললেন, তাকে হত্যা কর। ইমাম মালিক বলেছেন, আমাদের ধারণামতে সেদিন নবী (ﷺ) ইহরাম অবস্থায় ছিলেন না। তবে আল্লাহ আমাদের চেয়ে ভাল জানেন।

আবদুল্লাহ [ইবন মাসঊদ] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন নবী (ﷺ) মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন বাইতুল্লাহর চারপাশ ঘিরে তিনশত ষাটটি প্রতিমা স্থাপিত ছিল। তিনি হাতে একটি লাঠি নিয়ে প্রতিমাগুলোকে আঘাত করতে থাকলেন আর বলতে থাকলেন, হাক এসেছে, বাতিল অপসৃত হয়েছে। হাক এসেছে, বাতিলের উদ্ভব বা পুনরুত্থান আর ঘটবে না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় আগমন করার পর তৎক্ষণাৎ বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রইলেন, কেননা সে সময় বাইতুল্লাহর ভিতরে অনেক প্রতিমা স্থাপিত ছিল। প্রতিমাগুলো বের করে ফেলা হল। তখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল-এর মূর্তিও বেরিয়ে আসল। তাদের উভয়ের হাতে ছিল মুশরিকদের ভাগ্য নির্ণয়ের কয়েকটি তীর। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। তারা অবশ্যই জানত যে, ইব্রাহীম ও ইসমাঈল কক্ষনো তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করেননি। এরপর তিনি বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করলেন। আর প্রত্যেক কোণায় কোণায় গিয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিলেন এবং বেরিয়ে আসলেন। আর সেখানে সালাত আদায় করেননি।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সওয়ারীতে আরোহণ করে উসামাহ ইবন যায়িদকে নিজের পেছনে বসিয়ে মক্কা নগরীর উচু এলাকার দিক দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেছেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিলাল এবং বাইতুল্লাহর চাবি রক্ষক উসমান ইবন ত্বলহা। অবশেষে তিনি [নবী (ﷺ)] মসজিদে হারামের সামনে সওয়ারী থামালেন এবং উসমান ইবন ত্বলহাকে চাবি এনে (দরজা খোলার) আদেশ করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (কাবায়) প্রবেশ করলেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন উসামাহ ইবন যায়দ, বিলাল এবং উসমান ইবন ত্বলহা। সেখানে তিনি দিনের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবস্থান করে (সালাত আদায়, তাকবীর ও অন্যান্য দোয়া করার পর) বের হয়ে এলেন। তখন অন্যান্য লোক দ্রুত ছুটে এল। তন্মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন উমার প্রথমেই প্রবেশ করলেন এবং বিলাল-কে দরজার পাশে দাড়ানো পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন- রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন জায়গায় সালাত আদায় করেছেন? তখন বিলাল তাকে তার সালাতের জায়গাটি ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কত রাকাত আদায় করেছিলেন বিলাল-কে আমি এ কথাটি জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের বছর নবী (ﷺ) মক্কার উচু এলাকা 'কাদা'-এর দিক দিয়ে প্রবেশ করেছেন। আবূ উসামাহ এবং ওহাইব 'কাদা'-এর দিক দিয়ে প্রবেশ করার বর্ণনায় হাফস্ ইবন মাইসারাহ-এর অনুসরণ করেছেন।

হিশামের পিতা হতে বর্ণিত যে, মক্কা জয়ের বছর নবী (ﷺ) মক্কার উচু এলাকা 'কাদা' নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন।

ইবন আবী লাইলা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে চাশতের সালাত আদায় করতে দেখেছে-এ কথাটি একমাত্র উম্মু হানী ব্যতীত অন্য কেউ আমাদের কাছে বর্ণনা করেননি। তিনি বলেছেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন নবী (ﷺ) তার বাড়িতে গোসল করেছিলেন, এরপর তিনি আট রাকাত সালাত আদায় করেছেন। উম্মু হানী বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে এ সালাত অপেক্ষা হালকাভাবে অন্য কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি। তবে তিনি রুকূ, সিজদা পুরোপুরিই আদায় করেছিলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তার সালাতের রুকূ ও সিজদায় পড়তেন, সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রাববানা ওয়া বিহামদিকাল্লাহুম্মা গফির লী অতি পবিত্র। হে আল্লাহ! হে আমাদের প্রভু! আমি তোমারই প্রশংসা করছি। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দাও।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার তার (পরামর্শ মজলিসে) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বর্ষীয়ান সহাবাদের সঙ্গে আমাকেও শামিল করতেন। তাই তাদের কেউ কেউ বললেন, আপনি এ তরুণকে কেন আমাদের সঙ্গে মজলিসে শামিল করেন। তার মতো সন্তান তো আমাদেরও আছে। তখন উমার বললেন, ইবন আব্বাস ঐ সব মানুষের একজন যাদের (মর্যাদা) সম্পর্কে আপনারা অবহিত আছেন। ইবন আব্বাস বলেন, একদিন তিনি (উমার) তাদেরকে পরামর্শ মজলিসে আহবান করলেন এবং তাদের সঙ্গে তিনি আমাকেও ডাকলেন। তিনি (ইবন আব্বাস) বলেন, আমার মনে হয় সেদিন তিনি তাদেরকে আমার ইল্ম দেখানোর জন্যই ডেকেছিলেন। উমার বলেন, "যখন আল্লাহর সাহায্য আসে এবং (মক্কার) বিজয় আসে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে (ইসলামে) প্রবেশ করতে দেখেন। 'অতএব আপনার পালনকর্তার প্রশংসা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, নিশ্চয়ই তিনিই একজন। যিনি তওবা কবুল করেন এবং ক্ষমা করেন।" (110.1-3) এভাবে সূরাটি শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ সূরাহ সম্পর্কে আপনাদের কী বক্তব্য? তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, এখানে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যে, যখন আমাদেরকে সাহায্য করা হবে এবং বিজয় দান করা হবে তখন যেন আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর কেউ কেউ বললেন, আমরা অবগত নই। আবার কেউ কেউ কোন কথাই বলেননি। এ সময় উমার আমাকে বললেন, ওহে ইবন আব্বাস! তুমি কি এ রকমই মনে কর? আমি বললাম, জ্বী, না। তিনি বললেন, তা হলে তুমি কী বলতে চাও? আমি বললাম, এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের সংবাদ। আল্লাহ তাকে তা জানিয়ে দিয়েছেন। "যখন আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয় আসবে" মক্কা বিজয়। সেটাই হবে আপনার ওফাতের নিদর্শন। সুতরাং এ সময়ে আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করবেন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। অবশ্যই তিনি তাওবা কবুলকারী। এ কথা শুনে উমার বললেন, এ সূরাহ থেকে তুমি যা বুঝেছ আমি তা ব্যতীত আর অন্য কিছুই বুঝিনি।

আবূ শুরাইহিল আদাবী হতে বর্ণিত যে, (মদিনার শাসনকর্তা) আমর ইবন সাঈদ যে সময় মক্কা অভিমুখে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তখন আবূ শুরায়হিল আদাবী তাকে বলেছিলেন, হে আমাদের আমীর! আপনি আমাকে একটু অনুমতি দিন, আমি আপনাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি বাণী শোনাবো, যেটি তিনি মক্কা বিজয়ের পরের দিন বলেছিলেন। সেই বাণীটি আমার দু'কান শুনেছে। আমার হৃদয় তা হিফাযাত করে রেখেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সে কথাটি বলছিলেন তখন আমার দু'চোখ তাকে অবলোকন করেছে। প্রথমে তিনি [নবী (ﷺ)] আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং সানা পাঠ করেন। এরপর তিনি বলেন, আল্লাহ নিজে মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। কোন মানুষ এ ঘোষণা দেয়নি। কাজেই যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং কিয়ামত দিবসের উপর ঈমান এনেছে তার পক্ষে সেখানে রক্তপাত করা কিংবা এখানকার গাছপালা কর্তন করা কিছুতেই হালাল নয়। আর আল্লাহর রাসূলের সে স্থানে লড়াইয়ের কথা বলে যদি কেউ নিজের জন্যও সুযোগ করে নিতে চায় তবে তোমরা তাকে বলে দিও, আল্লাহ তার রাসূলের ক্ষেত্রে (বিশেষভাবে) অনুমতি দিয়েছিলেন, তোমাদের জন্য কোন অনুমতি দেননি। আর আমার ক্ষেত্রেও তা একদিনের কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্যই কেবল অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এরপর সেদিনই তা পুনরায় সেরূপ হারাম হয়ে গেছে যেরূপে তা একদিন পূর্বে হারাম ছিল। উপস্থিত লোকজন (এ কথাটি) অনুপস্থিত লোকদের কাছে পৌছিয়ে দেবে। (বর্ণনাকারী বলেন) পরবর্তী সময়ে আবূ শুরায়হ-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আমর ইবন সাঈদ আপনাকে কী উত্তর করেছিলেন? তিনি বললেন, আমর আমাকে বললেন, হে আবূ শুরায়হ্! হাদীসটির বিষয় আমি তোমার চেয়ে অধিক অবগত আছি। হারামে মক্কা কোন অপরাধী বা খুনী পলাতককে কিংবা কোন বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে ফেরারীকে প্রশ্রয় দেয় না। আর আবদুল্লাহ বলেন, 'আল খারবাহ' অর্থ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। মক্কা বিজয়ের বছর তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মক্কায় এ কথা বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল মদের ক্রয়-বিক্রয় হারাম করে দিয়েছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে (মক্কায়) দশদিন অবস্থান করেছিলাম। সে সময় আমরা সালাত কসর করতাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের সময়ে) নবী (ﷺ) ঊনিশ দিন মক্কায় অবস্থান করেছিলেন, তিনি সে সময় দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সফরে আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ঊনিশ দিন (মক্কা বিজয়কালে) অবস্থান করেছিলাম। এ সময়ে আমরা সালাতে কসর করতাম। ইবন আব্বাস বলেছেন, আমরা সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত কসর করতাম। এর চেয়ে অধিক দিন থাকলে আমরা পূর্ণ সালাত আদায় করতাম।

লায়স [ইবন সাদ] বলেছেন, ইউনুস আমার কাছে ইবন শিহাব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাবাহ ইবন সু'আয়র আমার নিকট বর্ণনা করেছেন, আর মক্কা বিজয়ের বছর নবী (ﷺ) তার মুখমন্ডল মাসহ(মাসেহ) করেছিলেন।

যুহরী হতে বর্ণিত। তিনি সুনায়ন আবূ জামীলাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। যুহরী বলেন, আমরা (সাঈদ) ইবন মুসায়্যাব-এর সঙ্গে ছিলাম। এ সময় আবূ জামীলাহ দাবী করেন যে, তিনি নবী (ﷺ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তিনি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মক্কা বিজয়ের বছর (যুদ্ধের জন্য) বেরিয়েছিলেন।

আমর ইবন সালামাহ হতে বর্ণিত। আইয়ুব বলেছেন, আবূ কিলাবাহ আমাকে বললেন, তুমি আমর ইবন সালামাহ'র সঙ্গে সাক্ষাৎ করে (তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে) জিজ্ঞেস কর না কেন? আবূ কিলাবাহ বলেন, অতঃপর আমি আমর ইবন সালামাহর সঙ্গে দেখা করে তাকে (তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সম্পর্কে) জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমরা লোকজনের চলার পথের পাশে একটি ঝরণার কাছে বাস করতাম। আমাদের পাশ দিয়ে অনেক কাফেলা চলাচল করত। তখন আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করতাম, (মক্কার) লোকজনের অবস্থা কী? মক্কার লোকজনের অবস্থা কী? আর ঐ লোকটির কী অবস্থা? তারা বলত, ঐ ব্যক্তি দাবী করে যে, আল্লাহ তাকে রাসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, তার প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ করেছেন। (কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করে বলত) তার কাছে আল্লাহ এ রকম ওয়াহী অবতীর্ণ করেছেন। (আমর ইবন সালামা'হ বলেন) তখন আমি সে বাণীগুলো মুখস্থ করে নিতাম যেন তা আমার হৃদয়ে গেঁথে থাকত। সমগ্র আরব ইসলাম গ্রহণের জন্য নবী (ﷺ)-এর বিজয়ের অপেক্ষা করছিল। তারা বলত, তাকে তার নিজ গোত্রের লোকেদের সঙ্গে (আগে) বোঝাপড়া করতে দাও। অতঃপর তিনি যদি তাদের উপর বিজয়ী হন তবে তিনি সত্য নবী। এরপর মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটল। এবার সব গোত্রই তাড়াহুড়া করে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। আমাদের কাওমের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আমার পিতা বেশ তাড়াহুড়া করলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি সত্য নবীর নিকট থেকে তোমাদের কাছে এসেছি। তিনি বলে দিয়েছেন যে, অমুক সময়ে তোমরা অমুক সালাত এবং অমুক সময় অমুক সালাত আদায় করবে। এভাবে সালাতের সময় হলে তোমাদের একজন আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যে কুরআন অধিক জানে সে সালাতের ইমামাত করবে। সবাই এ রকম একজন লোক খুজলেন। কিন্তু আমার চেয়ে অধিক কুরআন জানা একজনকেও পাওয়া গেল না। কেননা আমি কাফেলার লোকদের থেকে কুরআন শিখেছিলাম। কাজেই সকলে আমাকেই তাদের সামনে এগিয়ে দিল। অথচ তখনো আমি ছয় কিংবা সাত বছরের বালক। আমার একটি চাদর ছিল, যখন আমি সিজদায় যেতাম তখন চাদরটি আমার গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে উপরের দিকে উঠে যেত। তখন গোত্রের জনৈকা মহিলা বলল, তোমরা আমাদের দৃষ্টি থেকে তোমাদের ক্বারীর নিতম্ব আবৃত করে দাও না কেন? তারা কাপড় খরিদ করে আমাকে একটি জামা তৈরি করে দিল। এ জামা পেয়ে আমি এত খুশি হয়েছিলাম যে, আর কিছুতে এত খুশি হইনি।

আয়িশাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'উত্বাহ ইবন আবূ ওয়াক্কাস তার ভাই সাদ [ইবন আবূ ওয়াক্কাস]-কে ওয়াসিয়াত করে গিয়েছিল যে, সে যেন যাম'আহর বাদীর সন্তানটি তার নিজের কাছে নিয়ে নেয়। 'উত্বাহ বলেছিল, পুত্রটি আমার ঔরসজাত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কা বিজয়কালে সেখানে আগমন করলেন তখন সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস যাম'আহর বাদীর সন্তানটি রাসূল (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত করলেন। তার সঙ্গে আবদ্ ইবন যাম'আহ (যামআর পুত্র)-ও আসলেন। সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস বললেন, সন্তানটি তো আমার ভাতিজা। আমার ভাই আমাকে বলে গিয়েছেন যে, এ সন্তান তার ঔরসজাত কিন্তু আবদ্ ইবন যাম'আহ তার দাবী পেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ আমার ভাই, এ যাম'আহর সন্তান, তার বিছানায় এর জন্ম হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন যাম'আহর ক্রীতদাসীর সন্তানের প্রতি নযর দিয়ে দেখলেন যে, সন্তানটি আকৃতিতে 'উত্বাহ ইবন আবূ ওয়াক্কাসের সঙ্গেই অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আব্দ ইবন যাম'আহ! একে নিয়ে যাও। সে তোমার ভাই। কেননা সে তার (তোমার পিতা যাম'আহর) বিছানায় জন্মগ্রহণ করেছে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ সন্তানটির আকৃতি 'উত্বাহ ইবন আবী ওয়াক্কাসের আকৃতির মত হওয়ার কারণে (তার স্ত্রী সাওদা বিনতে যাম'আহ-কে বললেন, হে সাওদা! তুমি তার থেকে পর্দা করবে। ইবন শিহাব যুহরী বলেন, আয়িশাহ বলেছেন যে, এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, শয্যা যার, ছেলে তার। আর ব্যভিচারীর জন্য আছে পাথর। ইবন শিহাব যুহরী বলেছেন, আবূ হুরাইরাহ এ কথাটি উচ্চস্বরে বলতেন।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যামানায় মক্কা বিজয় অভিযানের সময়ে এক স্ত্রীলোক চুরি করেছিল। তাই তার গোত্রের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে উসামাহ ইবন যায়দ-এর কাছে এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট সুপারিশ করার জন্য অনুরোধ জানালো। উরওয়াহ বলেন, উসামাহ- এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে কথা বলা মাত্র তার চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। তিনি উসামাহ-কে বললেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তিগুলোর একটি শাস্তির ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ করছ? উসামাহ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এরপর সন্ধ্যা হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুতবা দিতে দাড়ালেন। যথাযথভাবে আল্লাহর হাম্দ-সানা করে বললেন, "আম্মা বা'দ" তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা এ জন্য ধ্বংস হয়েছিল যে, তারা তাদের মধ্যকার উচ্চ শ্রেণীর কোন লোক চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত। পক্ষান্তরে কোন দুর্বল লোক চুরি করলে তার উপর নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করত। যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ, যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত তা হলে আমি তার হাত কেটে দিতাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই মহিলাটির ব্যাপারে আদেশ দিলেন। ফলে তার হাত কেটে দেয়া হল। পরবর্তীকালে সে উত্তম তাওবার অধিকারিণী হয়েছিল এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। আয়িশাহ বলেন, এর পর সে আমার কাছে প্রায়ই আসত। আমি তার প্রয়োজনাদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে তুলে ধরতাম।

মুজাশি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আমি আমার ভাই (মুজালিদ)-কে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি যেন আপনি তার নিকট হতে হিজরাত করার ব্যাপারে বাই'আত গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (মক্কা বিজয়ের পূর্বে মক্কা থেকে মদিনায়) হিজরাতকারীরা হিজরতের সমুদয় বারাকাত নিয়ে গেছে। আমি বললাম, তা হলে কোন বিষয়ের উপর আপনি তার নিকট হতে বাই'আত গ্রহণ করবেন? তিনি বললেন, আমি তার নিকট হতে বাই'আত গ্রহণ করব ইসলাম, ঈমান ও জিহাদের উপর। [বর্ণনাকারী আবূ উসমান বলেছেন] পরে আমি আবূ মাবাদ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি ছিলেন তাদের দু'ভাইয়ের মধ্যে বড়। আমি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মুজাশি সত্যই বলেছেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩০৫)।

মুজাশি ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ মাবাদ (মুজালিদ)-কে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে গেলাম, যেন তিনি তার নিকট হতে হিজরাতের জন্য বাই'আত গ্রহণ করেন। তখন তিনি [নবী (ﷺ)] বললেন, হিজরাতকারীদের জন্য হিজরাত অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আমি তার নিকট হতে ইসলাম ও জিহাদের জন্য বাই'আত গ্রহণ করব। [বর্ণনাকারী আবূ উসমান নাহদী বলেন] এরপরে আমি আবূ মাবাদ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মুজাশি সত্যই বলেছেন। অন্য সনদে খালিদ আবূ উসমান-এর মাধ্যমে মুজাশি হতে বর্ণিত যে, তিনি তার ভাই মুজালিদ-কে নিয়ে এসেছিলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩০৭)।

মুজাহিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন উমার-কে বললাম, আমি সিরিয়া দেশে হিজরাত করার ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেন, এখন হিজরাত নয়, এখন জিহাদ। সুতরাং যাও, নিজ অন্তরের সঙ্গে বুঝে দেখ, জিহাদের সাহস খুজে পাও কিনা, তা না হলে হিজরাতের ইচ্ছা থেকে ফিরে আস।

অন্য সানাদে নাযর [ইবন শুমায়ল] মুজাহিদ হতে বর্ণিত। (তিনি বলেছেন) আমি ইবন উমার-কে বললে তিনি উত্তরে বললেন, বর্তমানে হিজরাতের কোন প্রয়োজন নেই, অথবা তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পর কোন হিজরাত নেই। অতঃপর তিনি উপরোল্লিখিত হাদীসের মত বর্ণনা করেন।

মুজাহিদ ইবন জাবর আল-মাক্কী হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন উমার বলতেনঃ মক্কা বিজয়ের পর আর কোন হিজরাত নেই।

আত্বা ইবন আবূ রাবাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি 'উবায়দ ইবন উমায়র সহ আয়িশাহ-এর সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। সে সময় 'উবায়দ তাকে হিজরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বর্তমানে কোন হিজরাত নেই। আগে মুমিন ব্যক্তি তার দ্বীনকে ফিতনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলের দিকে (মদিনায়) পালিয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে আল্লাহ ইসলামকে বিজয় দান করেছেন। তাই এখন মুমিন যেখানে চায় আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে। তবে বর্তমানে জিহাদ এবং নিয়্যাত করা যাবে।

মুজাহিদ হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খুতবার জন্য দাড়িয়ে বললেন, যেদিন আল্লাহ সমুদয় আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, সেই দিন থেকেই তিনি মক্কা নগরীকে সম্মান দান করেছেন। তাই আল্লাহ কর্তৃক এ সম্মান প্রদানের কারণে এটি কিয়ামত দিবস পর্যন্ত সম্মানিত থাকবে। আমার পূর্বে কারো জন্য তা হালাল করা হয়নি, আমার পরে কারো জন্যও তা হালাল করা হবে না। আর আমার জন্যও মাত্র একদিনের সামান্য অংশের জন্যই তা হালাল করা হয়েছিল। তার শিকারযোগ্য প্রাণীকে বিতাড়িত করা যাবে না। ঘাস সংগৃহীত হবে না। বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য ব্যতীত রাস্তায় পতিত বস্তু উত্তোলিত হবে না। তখন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয্খির ঘাস ব্যতীত। কেননা ইয্খির ঘাস আমাদের কর্মকার ও বাড়ির (ছাউনির) কাজে লাগে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চুপ থাকলেন। এর কিছুক্ষণ পরে বললেন, ইয্খির ব্যতীত। ইয্খির ঘাস কাটা অনুমোদিত।

ইসমাঈল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আবূ আউফা-এর হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছি। তিনি বলেছেন, হুনাইনের দিন নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে থাকা অবস্থায় আমাকে এ আঘাত করা হয়েছিল। আমি বললাম, আপনি কি হুনাইন যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন? তিনি বললেন, এর পূর্বেও (সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে) অংশ নিয়েছি।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি বারাআ ইবন আযিব-কে বলতে শুনেছি যে, এক ব্যক্তি এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, হে আবূ উমারাহ! হুনাইনের দিন কি আপনি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিলেন? তখন তিনি বলেন যে, আমি তো নিজেই নবী (ﷺ) সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেননি। তবে মুজাহিদদের অগ্রবর্তী যোদ্ধাগণ (গানীমাত সংগ্রহের জন্য) তাড়াহুড়া করলে হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় আবূ সুফ্ইয়ান ইবন হারিস রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাদা খচ্চরটির মাথা ধরে দাড়িয়েছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন বলছিলেন- আমি আল্লাহর নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। আমি শুনলাম যে, বারাআ ইবন আযিব-কে জিজ্ঞেস করা হল, হুনাইন যুদ্ধের দিন আপনারা কি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিলেন? তিনি বললেন, কিন্তু নবী (ﷺ) পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেননি। তবে তারা (হাওয়াযিনের লোকেরা) ছিল দক্ষ তীরন্দাজ, তাদের তীর বর্ষণে মুসলিমরা পিছনে হটলেও নবী (ﷺ) (অটলভাবে দাড়িয়ে) বলছিলেন- আমি আল্লাহর নবী, এটা মিথ্যা নয়। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি বারআ-কে বলতে শুনেছেন যে, তাকে কায়স গোত্রের এক লোক জিজ্ঞেস করেছিল যে, হুনাইনের দিন আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হতে পালিয়েছিলেন? তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিন্তু পালিয়ে যাননি। হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা ছিল সুদক্ষ তীরন্দাজ। আমরা যখন তাদের উপর আক্রমণ চালালাম তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আমরা গানীমাত তুলতে শুরু করলাম তখন আমরা তাদের তীরন্দাজ বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়লাম। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার সাদা রংয়ের খচ্চরটির পিঠে আরোহিত অবস্থায় দেখলাম। আর আবূ সুফ্ইয়ান তার খচ্চরটির লাগাম ধরেছিলেন। তিনি বলছিলেন- আমি আল্লাহর নবী, এটা মিথ্যা নয়। বর্ণনাকারী ইসরাঈল এবং যুহায়র বলেছেন যে, তখন নবী (ﷺ) তার খচ্চর থেকে অবতরণ করেছিলেন।

মারওয়ান এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত যে, হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিগণ যখন মুসলিম হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে এলো এবং তাদের (যুদ্ধে ফেলে যাওয়া) সম্পদ ও বন্দীদেরকে ফেরত দেয়ার প্রার্থনা জানালো তখন তিনি দাড়ালেন এবং তাদের বললেন, আমার সঙ্গে যারা আছে তোমরা দেখতে পাচ্ছ। সত্য কথাই আমার কাছে অধিক প্রিয়। কাজেই তোমরা যুদ্ধবন্দী অথবা সম্পদ- এ দু'টির যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে পার। আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বস্তুতঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তায়েফ থেকে ফিরে আসার পথে দশ রাতেরও অধিক সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। (বর্ণনাকারী বলেন) হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদের কাছে যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে এ দু'টির মধ্যে একটির অধিক ফেরত দিতে সম্মত নন, তখন তারা বললেন, আমরা আমাদের বন্দীদেরকে গ্রহণ করতে চাই। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিমদের সম্মুখে গিয়ে দাড়ালেন এবং আল্লাহর যথাযোগ্য হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, আম্মা বা'দু, তোমাদের (মুসলিম) ভাইয়েরা তওবা করে আমাদের কাছে এসেছে, আমি তাদের বন্দীদেরকে তাদের নিকট ফেরত দেয়ার সিদ্ধান্ত করেছি। অতএব তোমাদের মধ্যে যে আমার এ সিদ্ধান্তকে খুশি মনে গ্রহণ করবে সে (বন্দী) ফেরত দিক। আর তোমাদের মধ্যে যে তার অংশের অধিকারকে অবশিষ্ট রেখে তা এভাবে ফেরত দিতে চাইবে যে, ফাইয়ের সম্পদ থেকে (আগামীতে) আল্লাহ আমাকে সর্বপ্রথম যা দান করবেন তা দিয়ে আমি তার এ বন্দীর মূল্য পরিশোধ করব, তবে সে তাই করুক। তখন সকল লোক উত্তর করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার প্রথম সিদ্ধান্ত খুশিমনে গ্রহণ করলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমাদের মধ্যে এ ব্যাপারে কে খুশিমনে অনুমতি দিয়েছে আর কে খুশিমনে অনুমতি দেয়নি আমি তা বুঝতে পারিনি। তাই তোমরা ফিরে যাও এবং তোমাদের মধ্যকার বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ কর। তারা আমার কাছে বিষয়টি পেশ করবে। সবাই ফিরে গেল। পরে তাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ তাদের সঙ্গে আলাপ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ফিরে এসে জানাল যে, সবাই তার (প্রথম) সিদ্ধান্তকেই খুশি মনে মেনে নিয়েছে এবং (যুদ্ধবন্দী ফেরত দেয়ার) অনুমতি দিয়েছে। [ইমাম ইবন শিহাব যুহরী বলেন] হাওয়াযিন গোত্রের বন্দীদের বিষয়ে এ হাদীসটিই আমার কাছে পৌছেছে।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩১৮)।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা হুনায়নের যুদ্ধ থেকে ফেরার কালে উমার নবী (ﷺ)-কে জাহিলিয়্যাতের যুগে মানৎ করা তার একটি ই'তিকাফ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। নবী (ﷺ) তাকে সেটি পূরণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইনের বছর আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা যখন শত্রুর মুখোমুখী হলাম তখন মুসলিমদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। এ সময় আমি মুশরিকদের এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে মুসলিমদের এক ব্যক্তিকে পরাভূত করে ফেলেছে। তাই আমি কাফির লোকটির পশ্চাৎ দিকে গিয়ে তরবারি দিয়ে তার কাঁধ ও ঘাড়ের মাঝে শক্ত শিরার উপর আঘাত হানলাম এবং লোকটির গায়ের লৌহ বর্মটি কেটে ফেললাম। এ সময় সে আমার উপর আক্রমণ করে বসল এবং আমাকে এত জোরে চাপ দিয়ে জড়িয়ে ধরল যে, আমি আমার মৃত্যুর বাতাস অনুভব করলাম। এরপর মৃত্যু লোকটিকে পেয়ে বসল আর আমাকে ছেড়ে দিল। এরপর আমি উমার [ইবন খাত্তাব]-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মুসলিমদের হলটা কী? তিনি বললেন, মহান শক্তিধর আল্লাহর ইচ্ছা। এরপর সবাই (আবার) ফিরে এল (এবং মুশরিকদের উপর হামলা চালিয়ে যুদ্ধে জয়ী হল)। যুদ্ধের পর নবী (ﷺ) বসলেন এবং ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি কোন মুশরিক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে এবং তার কাছে এর প্রমাণ রয়েছে তাকে তার (নিহত ব্যক্তির) পরিত্যক্ত সকল সম্পদ দেয়া হবে। এ ঘোষণা শুনে আমি দাড়িয়ে বললাম, আমার পক্ষে কেউ সাক্ষ্য দিবে কি? আমি বসে পড়লাম। নবী (ﷺ)-ও অনুরূপ ঘোষণা দিলে আমি দাড়ালাম। তিনি (ﷺ) বললেন, আবূ ক্বাতাদাহ তোমার কী হয়েছে? আমি তাকে ব্যাপারটি জানালাম। এ সময়ে এক ব্যক্তি বলল, আবূ ক্বাতাদাহ ঠিকই বলেছেন, নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত বস্ত্রগুলো আমার কাছে আছে। সুতরাং সেগুলো আমার প্রাপ্তির ব্যাপারে আপনি তাকে সম্মত করুন। তখন আবূ বাকর বললেন, না, আল্লাহ শপথ! তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তার যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি তোমাকে দিয়ে দেয়ার ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) করতে পারেন না। নবী (ﷺ) বললেন, আবূ বাকর ঠিকই বলছে। সুতরাং এসব দ্রব্য তুমি তাকে (আবূ ক্বাতাদাহ) দিয়ে দাও। [আবূ ক্বাতাদাহ] বলেন] তখন সে আমাকে দ্রব্যগুলো দিয়ে দিল। এ দ্রব্যগুলোর বিনিময়ে আমি বানী সালামাহর এলাকায় একটি বাগান কিনলাম। আর ইসলাম গ্রহণের পর এটিই হল প্রথম সম্পদ যেটা ছিল আমার আর্থিক বুনিয়াদ।

আবূ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইন যুদ্ধের দিন আমি দেখলাম যে, এক মুসলিম এক মুশরিকের সঙ্গে লড়াই করছে। আরেক মুশরিক মুসলিম ব্যক্তিটির পেছন থেকে তাকে হত্যা করার জন্য আক্রমণ করছে। তখন আমি তার হাতের উপর আঘাত করে তা কেটে ফেললাম। সে আমাকে ধরে ভীষণ চাপে চাপ দিল। এমনকি আমি শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। এরপর সে আমাকে ছেড়ে দিল ও দুর্বল হয়ে পড়ল। আমি তাকে আক্রমণ করে হত্যা করলাম। মুসলিমগণ পালাতে লাগলে আমিও তাদের সঙ্গে পালালাম। হঠাৎ লোকের মাঝে উমার ইবন খাত্তাব-কে দেখতে পেলাম। তাকে বললাম, লোকজনের অবস্থা কী? তিনি বললেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা। এরপর লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ফিরে এলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "যে (মুসলিম) ব্যক্তি কাউকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণ পেশ করতে পারবে নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদ সে-ই পাবে। আমি যাকে হত্যা করেছি তার সম্পর্কে সাক্ষী খোজার জন্য আমি দাড়ালাম। কিন্তু আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে এমন কাউকে পেলাম না। তখন বসে পড়লাম। এরপর আমার সুযোগমত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জানালাম। তখন তার পাশে উপবিষ্ট একজন বললেন- উল্লিখিত নিহত ব্যক্তির হাতিয়ার আমার কাছে আছে, সেগুলো আমাকে দিয়ে দেয়ার জন্য আপনি তাকে সম্মত করুন। তখন আবূ বাকর বললেন, না, তা হতে পারে না। আল্লাহর সিংহদের এক সিংহ যে আল্লাহ এবং তার রাসূলের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছে তাকে না দিয়ে এ কুরাইশী দুর্বল ব্যক্তিকে তিনি [নবী (ﷺ)] দিতে পারেন না। রাবী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন এবং আমাকে তা দিয়ে দিলেন। আমি এর দ্বারা একটি বাগান কিনলাম। আর ইসলাম গ্রহণের পর এটিই ছিল প্রথম সম্পদ, যদ্দবারা আমি আমার আর্থিক বুনিয়াদ করেছি।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়ন যুদ্ধ অতিক্রান্ত হওয়ার পর নবী (ﷺ) আবূ আমির-কে একটি সৈন্যবাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করে আওতাস গোত্রের বিরুদ্ধে পাঠালেন। যুদ্ধে তিনি দুরাইদ ইবন সিম্মার সঙ্গে মুকাবালা করলে দুরাইদ নিহত হয় এবং আল্লাহ তার সঙ্গীদেরকেও পরাস্ত করেন। আবূ মূসা বলেন, নবী (ﷺ) আবূ আমির-এর সঙ্গে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। এ যুদ্ধে আবূ আমির-এর হাটুতে একটি তীর নিক্ষিপ্ত হয়। জুশাম গোত্রের এক লোক তীরটি নিক্ষেপ করে তার হাটুর মধ্যে বসিয়ে দিয়েছিল। তখন আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, চাচাজান! কে আপনার উপর তীর ছুঁড়েছে? তখন তিনি আবূ মূসা-কে ইশারার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ঐ যে, ঐ ব্যক্তি আমাকে তীর মেরেছে। আমাকে হত্যা করেছে। আমি লোকটিকে লক্ষ্য করে তার কাছে গিয়ে পৌছলাম আর সে আমাকে দেখামাত্র ভাগতে শুরু করল। আমি এ কথা বলতে বলতে তার পিছু নিলাম- তোমার লজ্জা করে না, তুমি দাড়াও। লোকটি থেমে গেল। এবার আমরা দু'জনে তরবারি দিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলাম এবং আমি ওকে হত্যা করে ফেললাম। তারপর আমি আবূ আমির-কে বললাম, আল্লাহ আপনার আঘাতকারীকে হত্যা করেছেন। তিনি বললেন, এখন এ তীরটি বের করে দাও। আমি তীরটি বের করে দিলাম। তখন ক্ষতস্থান থেকে কিছু পানি বের হল। তিনি আমাকে বললেন, হে ভাতিজা! তুমি নবী (ﷺ)-কে আমার সালাম জানাবে এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবে। আবূ আমির তার স্থলে আমাকে সেনাদলের অধিনায়ক নিয়োগ করলেন। এরপর তিনি কিছুক্ষণ বেচেছিলেন, তারপর ইন্তিকাল করলেন। (যুদ্ধ শেষে) আমি ফিরে এসে নবী (ﷺ)-এর গৃহে প্রবেশ করলাম। তিনি তখন পাকানো দড়ির তৈরি একটি খাটিয়ায় শায়িত ছিলেন। খাটিয়ার উপর (যৎসামান্য) একটি বিছানা ছিল। কাজেই তার পৃষ্ঠে এবং দুইপার্শ্বে পাকানো দড়ির দাগ পড়ে গিয়েছিল। আমি তাকে আমাদের এবং আবূ 'আমির-এর সংবাদ জানালাম। তাকে এ কথাও বললাম যে, (মৃত্যুর পূর্বে বলে গিয়েছেন) তাকে [নবী (ﷺ)-কে] আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবে। এ কথা শুনে নবী (ﷺ) পানি আনতে বললেন এবং 'উযু করলেন। তারপর তার দু'হাত উপরে তুলে তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তোমার প্রিয় বান্দা আবূ আমিরকে ক্ষমা করো। (হস্তদ্বয় উত্তোলনের কারণে) আমি তার বগলদ্বয়ের শুভ্রাংশ দেখতে পেয়েছি। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! কিয়ামত দিবসে তুমি তাকে তোমার অনেক মাখলুকের উপর, অনেক মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান কর। আমি বললামঃ আমার জন্যও (দোয়া করুন)। তিনি দোয়া করলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! আবদুল্লাহ ইবন কায়সের গুনাহ ক্ষমা করে দাও এবং কিয়ামত দিবসে তুমি তাকে সম্মানিত স্থানে প্রবেশ করাও। বর্ণনাকারী আবূ বুরদা বলেন, দু'টি দোয়ার একটি ছিল আবূ আমির-এর জন্য আর অপরটি ছিল আবূ মূসা (আশআরী) -এর জন্য।

উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত যে, আমার কাছে এক হিজড়া ব্যক্তি বসা ছিল, এমন সময়ে নবী (ﷺ) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি শুনলাম যে, সে (হিজড়া ব্যক্তি) আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়া-কে বলছে, হে আবদুল্লাহ! কী বল, আগামীকাল যদি আল্লাহ তোমাদেরকে তায়েফের উপর বিজয় দান করেন তা হলে গাইলানের কন্যাকে নিয়ে নিও। কেননা সে (এতই কোমলদেহী), সামনের দিকে আসার সময়ে তার পিঠে চারটি ভাঁজ পড়ে আবার পিঠ ফিরালে সেখানে আটটি ভাঁজ পড়ে। [উম্মু সালামাহ বলেন] তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ এদেরকে তোমাদের কাছে ঢুকতে দিও না। ইবন উয়াইনাহ বর্ণনা করেন যে, ইবন জুরাইজ বলেছেন, হিজড়ার নাম ছিল হীত। হিশাম থেকে পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তবে তিনি এ হাদীসে এতটুকু বৃদ্ধি করেছেন যে, সেদিন তিনি [নবী (ﷺ)] তায়িফ অবরোধ করা অবস্থায় ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তায়িফ অবরোধ করলেন। কিন্তু তাদের নিকট হতে কিছুই হাসিল করতে পারেননি। তাই তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ আমরা (অবরোধ উঠিয়ে মদিনার দিকে) ফিরে যাব। কথাটি সাহাবীদের মনে ভারী লাগল। তারা বললেন, আমরা চলে যাব, তায়িফ বিজয় করব না? বর্ণনাকারী একবার কাফিলুন শব্দের স্থলে নাকফুলো (আমরা 'যুদ্ধবিহীন ফিরে যাব') বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাহলে সকালে গিয়ে লড়াই কর। তারা (পরদিন) সকালে লড়াই করতে গেলেন, এতে তাদের অনেকেই আহত হলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ইনশাআল্লাহ আমরা আগামীকাল ফিরে চলে যাব। তখন সহাবাদের কাছে কথাটি মনঃপূত হল। এতে নবী (ﷺ) হাসলেন। বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান একবার বর্ণনা করেছেন যে, তিনি মুচকি হাসি হেসেছেন। হুমাইদী বলেন, সুফ্ইয়ান আমাদেরকে এ হাদীসের পূর্ণ সূত্রটিতে 'খবর' শব্দটি ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন।

আবূ উসমান [নাহদী] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হাদীসটি শুনেছি সাদ থেকে, যিনি আল্লাহর পথে গিয়ে সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন এবং আবূ বাকর থেকেও শুনেছি যিনি (তায়িফ অবরোধকালে) সেখানকার স্থানীয় কয়েকজনসহ তায়িফের পাচিলের উপর চড়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছিলেন। তারা দু'জনই বলেছেন, আমরা নবী (ﷺ) থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি জেনে শুনে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবী করে, তার জন্য জান্নাত হারাম। হিশাম বলেন, মা'মার আমাদের কাছে 'আসিম-আবুল 'আলিয়া অথবা আবূ উসমান নাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি সাদ এবং আবূ বাকর-এর মাধ্যমে নবী (ﷺ) থেকে হাদীসটি শুনেছি। আসিম বলেন, আমি (আবুল 'আলিয়া অথবা আবূ উসমান)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নিশ্চই আপনাকে হাদীসটি এমন দু'জন রাবী বর্ণনা করেছেন যাদেরকে আপনি আপনার নিশ্চইতার জন্য যথেষ্ট মনে করেন। তিনি বললেন, নিশ্চই, কেননা তাদের একজন হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর রাস্তায় সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। আর অপরজন হলেন তায়েফ থেকে (প্রাচীর টপকে) এসে নবী (ﷺ)-এর সাক্ষাৎকারী তেইশ জনের একজন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩২৬)।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী জিরানা নামক স্থানে অবস্থান করছিলাম। তখন বিলাল তার কাছে ছিলেন। এমন সময়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এক বেদুঈন এসে বলল, আপনি আমাকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা পূরণ করবেন না? তিনি তাকে বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর। সে বলল, সুসংবাদ গ্রহণ কর কথাটি তো আপনি আমাকে অনেকবারই বলেছেন। তখন তিনি ক্রোধ ভরে আবূ মূসা ও বিলাল-এর দিকে ফিরে বললেন, লোকটি সুসংবাদ ফিরিয়ে দিয়েছে। তোমরা দু'জন তা গ্রহণ কর। তারা উভয়ে বললেন, আমরা তা গ্রহণ করলাম। এরপর তিনি পানির একটি পাত্র আনতে বললেন। তিনি এর মধ্যে নিজের উভয় হাত ও মুখমন্ডল ধুয়ে­­­­­­­­ কুল্লি করলেন। তারপর বললেন, তোমরা উভয়ে এ থেকে পান করো এবং নিজেদের মুখমন্ডল ও বুকে ছিটিয়ে দাও। আর সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা উভয়ে পাত্রটি তুলে নিয়ে নির্দেশ মত কাজ করলেন। এমন সময় উম্মু সালামাহ পর্দার আড়াল থেকে ডেকে বললেন, তোমাদের মায়ের জন্যও অতিরিক্ত কিছু রাখ। কাজেই তারা এ থেকে অতিরিক্ত কিছু তার [উম্মু সালামাহ-এর] জন্য রাখলেন।

সাফওয়ান ইবন ইয়া'লা ইবন উমাইয়া হতে বর্ণিত যে, ইয়া'লা বলতেন যে, আহা! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হওয়ার মুহূর্তে যদি তাকে দেখতে পেতাম। ইয়া'লা বলেন, ইতোমধ্যে নবী (ﷺ) জি'রানা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তার উপর একটি কাপড় টানিয়ে ছায়া করে দেয়া হয়েছিল। আর সেখানে তার সঙ্গে তার কতিপয় সাহাবীও ছিলেন। এমন সময় তার কাছে এক বেদুঈন আসল। তার গায়ে ছিল একটি খুশবু মাখানো জোববা। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার অভিমত কী যে গায়ে খুশবু মাখানো জোববা পরিধান করে উমরাহ আদায়ের জন্য ইহরাম বেধেছে? (এমন সময়) উমার হাত দিয়ে ইশারা করে ইয়া'লা-কে আসতে বললেন। ইয়া'লা এলে উমার তার মাথাটি (কাপড়ের ছায়ায়) ঢুকিয়ে দিলেন। [তখন তিনি ইয়া'লা দেখতে পেলেন যে] নবী (ﷺ)-এর চেহারা লাল বর্ণ হয়ে রয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাস জোরে চলছে। এ অবস্থা কিছুক্ষণ পর্যন্ত ছিল, তারপর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল। তখন তিনি (নবী (ﷺ)) বললেন, সে লোকটি কোথায়, কিছুক্ষণ আগে যে আমাকে উমরাহর বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিল। লোকটিকে খুজে আনা হলে তিনি বললেনঃ তোমার গায়ে যে খুশবু রয়েছে তা তুমি তিনবার ধুয়ে ফেল এবং জোববাটি খুলে ফেল। তারপর হাজ্জ পালনে যা কর, উমরাহতেও সেগুলোই কর।

আবদুল্লাহ ইবন যায়দ ইবন 'আসিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইনের দিবসে আল্লাহ যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে গানীমাতের সম্পদ দান করলেন তখন তিনি ঐগুলো সেসব মানুষের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন যাদের হৃদয়কে ঈমানের উপর সুদৃঢ় করার প্রয়োজন তিনি অনুভব করেছিলেন। আর আনসারগণকে কিছুই দিলেন না। ফলে তারা যেন নাখোশ হয়ে গেলেন। কেননা অন্যেরা যা পেয়েছে তারা তা পাননি। অথবা তিনি বলেছেনঃ তারা যেন দুঃখিত হয়ে গেলেন। কেননা অন্যোরা যা পেয়েছে তারা তা পাননি। কাজেই নবী (ﷺ) তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে আনসারগণ! আমি কি তোমাদেরকে পথভ্রষ্ট পাইনি, অতঃপর আল্লাহ আমার দ্বারা তোমাদের হিদায়াত দান করেছেন? তোমরা ছিলে পরস্পর বিচ্ছিন্ন, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে পরস্পরকে জুড়ে দিয়েছেন। তোমরা ছিলে দরিদ্র, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন। এভাবে যখনই তিনি কোন কথা বলেছেন তখন আনসারগণ জবাবে বলেছেন, আল্লাহ এবং তার রাসূলই আমাদের উপর অধিক ইহ্সানকারী। তিনি বললেনঃ আল্লাহর রাসূলের জবাব দিতে তোমাদেরকে বাধা দিচ্ছে কিসে? তারা তখনও তিনি যা কিছু বলছেন তার উত্তরে বলে যাচ্ছেন, আল্লাহ এবং তার রাসূলই আমাদের উপর অধিক ইহ্সানকারী। তিনি বললেন, তোমরা ইচ্ছা করলে বলতে পার যে, আপনি আমাদের কাছে এমন এমন (সংকটময়) সময়ে এসেছিলেন কিন্তু তোমরা কি এ কথায় সন্তুষ্ট নও যে, অন্যান্য লোক বকরী ও উট নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের বাড়ি ফিরে যাবে আল্লাহর নবীকে সঙ্গে নিয়ে। যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে হিজরাত করানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত না থাকত তা হলে আমি আনসারদের মধ্যকারই একজন থাকতাম। যদি লোকজন কোন উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়ে চলে তা হলে আমি আনসারদের উপত্যকা ও গিরিপথ দিয়েই চলব। আনসারগণ হল (নাববী) ভিতরের পোশাক আর অন্যান্য লোক হল উপরের পোশাক। আমার বিদায়ের পর অচিরেই তোমরা দেখতে পাবে অন্যদের অগ্রাধিকার। তখন ধৈর্য ধারণ করবে (দ্বীনের উপর টিকে থাকবে) যে পর্যন্ত না তোমরা হাউজে কাউসারে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ)-কে হাওয়াযিন গোত্রের সম্পদ থেকে গানীমাত হিসেবে যতটুকু দান করতে চেয়েছেন দান করলেন, তখন নবী (ﷺ) কতিপয় লোককে একশ করে উট দান করলেন। (এ অবস্থা দেখে) আনসারদের কিছুসংখ্যক লোক বলে ফেললেন, আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ক্ষমা করুন, তিনি কুরায়শদেরকে দিচ্ছেন আর আমাদেরকে বাদ দিচ্ছেন। অথচ আমাদের তলোয়ার থেকে এখনো তাদের রক্ত টপটপ করে পড়ছে। আনাস বলেন, তাদের একটি চামড়ার তৈরি তাবুতে জমায়েত করলেন এবং তারা ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে অনুমতি দিলেন না। এরপর তারা সবাই জমায়েত হলে নবী (ﷺ) দাড়িয়ে বললেন, তোমাদের নিকট হতে কী কথা আমার নিকট পৌছল? আনসারদের জ্ঞানীগুণী লোকেরা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নেতৃস্থানীয় কেউ তো কিছু বলেনি, তবে আমাদের কতিপয় কমবয়সী লোকেরা বলেছে য, আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে ক্ষমা করুন, তিনি আমাদেরকে বাদ দিয়ে কুরাইশদেরকে (গানীমাতের মাল) দিচ্ছেন। অথচ আমাদের তরবারিগুলো থেকে এখনো তাদের রক্ত টপটপ করে পড়ছে। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আমি অবশ্য এমন কিছু লোককে দিচ্ছি যারা সবেমাত্র কুফর ত্যাগ করে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আর তা এ জন্যে যেন তাদের মনকে আমি ঈমানের উপর সুদৃঢ় করতে পারি। তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, অন্যান্য লোক ফিরে যাবে ধন-সম্পদ নিয়ে আর তোমরা বাড়ি ফিরে যাবে (আল্লাহর) নবীকে সঙ্গে নিয়ে? আল্লাহর কসম! তোমরা যে জিনিস নিয়ে ফিরে যাবে তা অনেক উত্তম ঐ ধন-সম্পদ অপেক্ষা, যা নিয়ে তারা ফিরে যাবে। আনসারগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। নবী (ﷺ) তাদের বললেন, অচিরেই তোমরা (নিজেদের উপর) অন্যদের প্রবল অগ্রাধিকার দেখতে পাবে। অতএব, (আমার মৃত্যুর পর) আল্লাহ এবং তার রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত তোমরা ধৈর্য ধারণ করবে। আমি হাউজে কাউসারের নিকট থাকব। আনাস বলেন, কিন্তু তারা (আনসাররা) ধৈর্যধারণ করেননি।

আনাস (ইবন মালিক) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশদের মধ্যে গানীমাতের মাল বণ্টন করে দিলেন। এতে আনসারগণ নাখোশ হয়ে গেলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোকজন পার্থিব সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ফিরবে? তারা উত্তর দিলেন, অবশ্যই (আমার সন্তুষ্ট)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যদি লোকজন কোন উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে চলে তা হলে আমি আনসারদের উপত্যকা বা গিরিপথ দিয়ে চলব।

আনাস (ইবন মালিক) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনায়ন-এর দিন নবী (ﷺ) হাওয়াযিন গোত্রের মুখোমুখী হলেন। তার সঙ্গে ছিল দশ হাজার (মুহাজির ও আনসার সৈনিক) এবং (মক্কার) নও-মুসলিম। যুদ্ধে এরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করল। এ মুহূর্তে তিনি [নবী (ﷺ)] বললেন, ওহে আনসার সকল! তারা জওয়াব দিলেন, আমরা হাযির, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাহায্য করতে আমরা প্রস্তুত এবং আপনার সামনেই আমরা উপস্থিত। নবী (ﷺ) তার সাওয়ারী থেকে নেমে পড়লেন। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসূল। মুশরিকরা পরাজিত হল। তিনি নও-মুসলিম এবং মুহাজিরদেরকে (গানীমাতে) বণ্টন করে দিলেন। আর আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। (এতে তারা নিজেদের মধ্যে সে কথা বলাবলি করছিল।) তখন তিনি তাদেরকে ডেকে এনে একটি তাবুর ভিতর জমায়েত করলেন এবং বললেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট থাকবে না যে, লোকজন বাকরী ও উট নিয়ে যাবে আর তোমরা যাবে আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে। এরপর নবী (ﷺ) আরো বললেন, যদি লোকজন উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসাররা গিরিপথ দিয়ে চলে তা হলে আমি আনসারদের গিরিপথকেই বেছে নেব।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আনসারদের লোকজনকে জমায়েত করে বললেন, কুরাইশরা সবেমাত্র জাহিলীয়্যাত ছেড়েছে আর তারা দুর্দশাগ্রস্ত। তাই আমি তাদেরকে অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করার ইচ্ছা করেছি। তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা পার্থিব সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা তোমাদের ঘরে ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে। তারা বললেন, অবশ্যই আমরা সন্তুষ্ট। তিনি আরো বললেন, যদি লোকজন উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসাররা গিরিপথ দিয়ে চলে, তা হলে আনসারদের গিরিপথ অথবা তিনি বলেছেন, আনসারদের উপত্যকা দিয়েই চলব।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ) হুনাইনের গানীমাত বণ্টন করলেন, তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে ফেলল যে, এই বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেননি। কথাটি শুনে আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলাম এবং তাকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তার চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ, মূসা-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তাতে তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইনের দিন নবী (ﷺ) কোন কোন লোককে (গানীমাতের মাল) প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেন। যেমন আকরা'কে একশ উট দিয়েছিলেন। 'উয়াইনাহ্কে ততই দিয়েছিলেন। অন্যদেরও দিয়েছিলেন। এতে এক ব্যক্তি বলে উঠল, এ বণ্টনে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়নি। (রাবী বলেন) তখন আমি বললাম, অবশ্যই আমি নবী (ﷺ)-কে এ কথা জানিয়ে দিব। [এ কথা জানানো হলে নবী (ﷺ)] বললেন, আল্লাহ মূসা-এর উপর রহম করুন। তাকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তাতে তিনি ধৈর্য ধারণ করেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুনাইনের দিন হাওয়াযিন, গাতফান ও অন্যান্য গোত্রগুলো নিজেদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিসহ যুদ্ধক্ষেত্রে এল। আর নবী (ﷺ)- এর সঙ্গে ছিল দশ হাজার (ও কিছু সংখ্যক) তুলাকা সৈনিক। যুদ্ধে তারা সবাই তার পাশ থেকে পিছনে সরে গেল। ফলে তিনি একাকী রয়ে গেলেন। সেই সময়ে তিনি আলাদা আলাদাভাবে দু'টি ডাক দিয়েছিলেন, তিনি ডান দিক ফিরে বলেছিলেন, ওহে আনসারগণ! তারা সবাই উত্তর করলেন, আমরা উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সুসংবাদ নিন, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। এরপর তিনি বাম দিকে ফিরে বলেছিলেন, ওহে আনসারগণ! তারা সবাই উত্তরে বললেন, আমরা উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সুসংবাদ নিন। আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। নবী (ﷺ) তার সাদা রঙের খচ্চরটির পিঠে ছিলেন। তিনি নিচে নেমে পড়লেন এবং বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তার রাসূল। (শেষে) মুশরিকরাই পরাজিত হল। সে যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গানীমাত হস্তগত হল। তিনি সেসব সম্পদ মুহাজির এবং নও-মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আর আনসারদেরকে কিছুই দেননি। তখন আনসারদের (কেউ কেউ) বললেন, কঠিন মুহূর্ত আসলে ডাকা হয় আমাদেরকে আর গানীমাত দেয়া হয় অন্যদেরকে। কথাটি নবী (ﷺ) পর্যন্ত পৌছে গেল। তাই তিনি তাদেরকে একটি তাবুতে জমায়েত করে বললেন, ওহে আনসারগণ! একী কথা আমার কাছে পৌছল? তারা চুপ করে থাকলেন। তিনি বললেন, হে আনসারগণ! তোমরা কি খুশি থাকবে না যে, লোকজন দুনিয়ার ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা (বাড়ি ফিরে যাবে আল্লাহর রাসূলকে সঙ্গে নিয়ে? তারা বললেনঃ অবশ্যই। তখন নবী (ﷺ) বললেন, যদি লোকজন একটি উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনসারগণ একটি গিরিপথ দিয়ে চলে তাহলে আমি আনসারদের গিরিপথকেই গ্রহণ করে নেব। বর্ণনাকারী হিশাম বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আবূ হামযাহ (আনাস ইবন মালিক) আপনি কি এ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি তার নিকট হতে কখন বা অনুপস্থিত থাকতাম?

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজদের দিকে একটি সৈন্যদল প্রেরিত হয়েছিল, তাতে আমিও ছিলাম। আমাদের সবার ভাগে (গানীমাতের) বারোটি করে উট পৌছল। আর একটি একটি করে উট অধিকও দেয়া হল। নবী (ﷺ) আমাদেরকে পাঠিয়েছিলেন আর আমরা তেরোটি করে উট নিয়ে ফিরে আসলাম।

সালিমের পিতা [আবদুল্লাহ ইবন উমার] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এক অভিযানে খালিদ ইবন ওয়ালীদ-কে বানী জাযিমার বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। (সেখানে পৌছে) খালিদ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু আমরা ইসলাম কবূল করলাম', এ কথাটি তারা ভালভাবে বুঝিয়ে বলতে পারছিল না। তাই তারা বলতে লাগল, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করলাম, আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করলাম। খালিদ তাদেরকে হত্যা ও বন্দী করতে থাকলেন এবং আমাদের প্রত্যেকের কাছে বন্দীদেরকে সোপর্দ করতে থাকলেন। অবশেষে একদিন তিনি আদেশ দিলেন আমাদের সবাই যেন নিজ নিজ বন্দীকে হত্যা করে ফেলি। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আমার বন্দীকে হত্যা করব না। আর আমার সঙ্গীদের কেউই তার বন্দীকে হত্যা করবে না। অবশেষে আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ফিরে আসলাম। আমরা তার কাছে এ ব্যাপারটি উল্লেখ করলাম। নবী (ﷺ) তখন দু'হাত তুলে বললেন, হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তার দায় থেকে মুক্ত হওয়ার কথা তোমার নিকট জ্ঞাপন করছি। এ কথাটি তিনি দু'বার বললেন।

আলী (ইবন আবূ তালিব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আনসারদের এক ব্যক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তার (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। (কোন কারণে) আমীর রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তারা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনো। তারা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তারা ওতে আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে প্রবেশ কর। তারা আগুনে প্রবেশ করতে সংকল্প করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন অন্যদের বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়ে গিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ইতস্তত করতে করতে আগুন নিভে গেল এবং তার ক্রোধও ঠান্ডা হল। এরপর এ সংবাদ নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য (করতে হবে) কেবল সৎ কাজের।

আবূ বুরদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) আবূ মূসা এবং মুআয ইবন জাবাল-কে ইয়ামানে পাঠালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তৎকালে ইয়ামানে দু'টি প্রদেশ ছিল। তিনি তাদের প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে বলে দিলেন, তোমরা কোমল হবে, কঠোর হবে না। অনীহা সৃষ্টি হতে দেবে না। এরপর তারা দু'জনে নিজ নিজ কর্ম এলাকায় চলে গেলেন। আবূ বুরদা বললেন, তাদের প্রত্যেকেই যখন নিজ নিজ এলাকায় সফর করতেন এবং অন্যজনের কাছাকাছি স্থানে পৌছে যেতেন তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সালাম বিনিময় করতেন। এভাবে মুআয একবার তার এলাকায় এমন স্থানে সফর করছিলেন, যে স্থানটি তার সাথী আবূ মূসা-এর এলাকার নিকটবর্তী ছিল। সুযোগ পেয়ে তিনি খচ্চরের পিঠে চড়ে (আবূ মূসার এলাকায়) পৌছে গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, আবূ মূসা বসে আছেন আর তার চারপাশে অনেক লোক জমায়েত হয়ে আছে। আরো দেখলেন, পাশে এক লোককে তার গলার সঙ্গে উভয় হাত বেধে রাখা হয়েছে। মুআয তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স (আবূ মূসা)। এ লোকটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, এ লোকটি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে। মুআয বললেন, তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি সাওয়ারী থেকে নামব না। আবূ মূসা বললেন, এ উদ্দেশেই তাকে আনা হয়েছে, কাজেই আপনি নামুন। তিনি বললেন, না তাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি নামব না। ফলে আবূ মূসা হুকুম করলেন এবং লোকটিকে হত্যা করা হল। এরপর মুআয নামলেন। মুআয বললেন, ওহে আবদুল্লাহ! আপনি কীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি বললেন, আমি (দিবা-রাত্রি) কিছুক্ষণ পরপর কিছু অংশ করে তিলাওয়াত করে থাকি। তিনি বললেন, আর আপনি কীভাবে তিলাওয়াত করেন, হে মুআয? উত্তরে তিনি বললেন, আমি রাতের প্রথমাংশে শুয়ে পড়ি এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘুমিয়ে আমি উঠে পড়ি। এরপর আল্লাহ আমাকে যতটুকু তাওফীক দান করেন তিলাওয়াত করতে থাকি। এতে আমি আমার নিদ্রার অংশকেও (সওয়াবের বিষয় বলে) মনে করি, আমি আমার দাড়িয়ে তিলাওয়াতকে যেমনি (সাওয়াবের বিষয় বলে) মনে করি।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩৪১)।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তাকে (আবূ মূসাকে গভর্নর নিযুক্ত করে) ইয়ামানে পাঠিয়েছেন। তখন তিনি ইয়ামানে তৈরি করা হয় এমন কতিপয় শরাব সম্পর্কে নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি (ﷺ) বললেন, ঐগুলো কী কী? আবূ মূসা বললেন, তা হল বিত্উ ও মিয্র শরাব। বর্ণনাকারী সাঈদ বলেন, আমি আবূ বুরদাহকে জিজ্ঞেস করলাম বিত্উ কী? তিনি বললেন, বিত্উ হল মধু থেকে গ্যাজানো রস আর মিয্র হল যবের গ্যাজানো রস। (সাঈদ বলেন) তখন নবী (ﷺ) বললেন, সকল নেশা উৎপাদক বস্তুই হারাম।

আবূ বুরদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তার দাদা আবূ মূসা ও মুআয-কে নবী (ﷺ) (শাসক হিসেবে) ইয়ামানে পাঠালেন। এ সময় তিনি বললেন, তোমরা লোকজনের সঙ্গে সহজ আচরণ করবে। কখনো কঠিন আচরণ করবে না। মানুষের মনে সুসংবাদের মাধ্যমে উৎসাহ সৃষ্টি করবে। কখনো তাদের মনে অনীহা সৃষ্টি করবে না এবং একে অপরকে মেনে চলবে। আবূ মূসা বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমাদের এলাকায় মিয্র নামের এক প্রকার শরাব যব থেকে তৈরি করা হয় আর বিত্উ নামের এক প্রকার শরাব মধু থেকে তৈরি করা হয় (এগুলো সম্পর্কে হুকুম দিন)। নবী (ﷺ) বললেন, নেশা সৃষ্টিকারী সকল বস্তুই হারাম। এরপর দু'জনেই চলে গেলেন। মুআয আবূ মূসাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কীভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? তিনি উত্তর দিলেন, দাড়িয়ে, বসে, সাওয়ারীর পিঠে সাওয়ার অবস্থায় এবং কিছুক্ষণ পরপরই তিলাওয়াত করি। তিনি বললেন, আর আমি রাতের প্রথমদিকে ঘুমিয়ে পড়ি তারপর (শেষ ভাগে তিলাওয়াতের জন্য সালাতে) দাড়িয়ে যাই। এভাবে আমি আমার নিদ্রার সময়কেও আমার সালাতে দাড়ানোর মতই সওয়াবের বিষয় মনে করে থাকি। এরপর (উভয়েই নিজ শাসন এলাকায়) তাবু খাটালেন এবং পরস্পরের সাক্ষাৎ বজায় রেখে চললেন। (এক সময়) মুআয আবূ মূসা-এর সাক্ষাতে এসে দেখলেন, সেখানে এক ব্যক্তি হাত-পা বাধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ লোকটি কে? আবূ মূসা বললেন, লোকটি ইয়াহূদী ছিল, ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে। মুআয বললেন, আমি ওর গর্দান উড়িয়ে দেবো।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩৪৪)।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে আমার গোত্রের এলাকায় (শাসক করে) পাঠালেন। (বিদায় হাজ্জের বছর) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবতাহ নামক স্থানে অবস্থান করার সময় আমি তার সাক্ষাতে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স! তুমি ইহরাম বেধেছ কি? আমি বললাম, জী হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, (তালবিয়া) কীভাবে বলেছিলে? আমি উত্তর দিলাম, আমি এরূপ বলেছি যে, হে আল্লাহ! আমি হাযির হয়েছি এবং আপনার [নবী (ﷺ)-এর] ইহরামের মতো ইহরাম বাধলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বাইতুল্লাহ তাওয়াফ কর এবং সাফা ও মারওয়ার সায়ী আদায় কর, তারপর হালাল হয়ে যাও। আমি সে রকমই করলাম। এমনকি বানী কাইসের জনৈকা মহিলা আমার চুল পর্যন্ত আচড়িয়ে দিয়েছিল। আর আমরা উমার-এর খিলাফত কাল পর্যন্ত এভাবেই আমল করতে থাকলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুআয ইবন জাবালকে ইয়ামানে পাঠানোর সময় তাকে বললেন, অচিরেই তুমি আহলে কিতাবদের এক গোত্রের কাছে যাচ্ছ। যখন তুমি তাদের কাছে গিয়ে পৌছবে তখন তাদেরকে এ দাওয়াত দেবে তারা যেন সাক্ষ্য দেয় যে 'আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল', এরপর তারা যদি তোমার এ কথা মেনে নেয়, তখন তাদেরকে এ কথা জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তোমাদের উপর দিনে ও রাতে পাচবার সালাত ফরয করে দিয়েছেন। তারা তোমার এ কথা মেনে নিলে তুমি তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তোমাদের উপর যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের বিত্তশালীদের নিকট হতে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের অভাবগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয়, তা হলে (যাকাত গ্রহণ কালে) তাদের মালের উৎকৃষ্টতম অংশ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকবে। মাযলুমদের বদদোয়াকে ভয় করবে, কেননা মাযলুমের বদদোয়া এবং আল্লাহর মাঝখানে কোন আড়াল থাকে না।

আমর ইবন মাইমূন হতে বর্ণিত যে, মুআয (ইবন জাবাল) ইয়ামানে পৌছার পর লোকজনকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। 'আল্লাহ ইব্রাহিমকে খলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।' (আন্-নিসা ৪/১২৫) আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন। লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি বলল, ইব্রাহীমের মা কত খুশি! (অন্য বর্ণনায়) 'আমর বলেন, "রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুআযকে ইয়েমেনে পাঠালেন এবং তিনি (লোকদেরকে) ফজরের নামাযের ইমামতি করলেন এবং পাঠ করলেন: 'আল্লাহ ইবরাহীমকে খলিল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তার পিছনে একজন লোক বলল, (কিভাবে) ইব্রাহিমের মা খুশি!"

আহমাদ ইবন উসমান বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে খালিদ ইবন ওয়ালীদ-এর সঙ্গে ইয়ামানে পাঠালেন। বারাআ বলেন, তিনি খালিদ-এর স্থলে আলী-কে পাঠিয়ে বলে দিলেন যে, খালিদ-এর সাথীদেরকে বলবে, তাদের মধ্যে যে তোমার সঙ্গে (ইয়ামানের দিকে) যেতে ইচ্ছা করে সে যেন তোমার সাথে চলে যায়, আর যে (মদিনায়) ফিরে যেতে চায় সে যেন ফিরে যায়। (রাবী বলেন) তখন আমি আলী-এর অনুগামীদের মধ্যে থাকলাম। ফলে আমি গানীমাত হিসেবে অনেক পরিমাণ উকিয়া লাভ করলাম।

বুরাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আলী-কে খুমুস (গানীমাতের এক-পঞ্চমাংশ) নিয়ে আসার জন্য খালিদ-এর কাছে পাঠালেন। (রাবী বুরাইদাহ বলেন,) আমি আলী-এর প্রতি অসন্তুষ্ট, আর তিনি গোসলও করেছেন। (রাবী বলেন) তাই আমি খালিদ-কে বললাম, আপনি কি তার দিকে দেখছেন না? এরপর আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ফিরে আসলে আমি তার কাছে বিষয়টি জানালাম। তখন তিনি বললেন, হে বুরাইদাহ! তুমি কি আলীর প্রতি অসন্তুষ্ট? আমি বললাম, জ্বী, হ্যা। তিনি বললেন, তার উপর অসন্তুষ্ট থেক না। কারণ খুমুসে তার প্রাপ্য এর চেয়েও অধিক আছে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী ইবন আবূ তালিব ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এক প্রকার (রঙিণ) চামড়ার থলে করে সামান্য কিছু স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। তখনও এগুলো থেকে সংযুক্ত মাটি পরিষ্কার করা হয়নি। আবূ সাঈদ খুদরী বলেন, রাসূল (ﷺ) চার জনের মাঝে স্বর্ণখন্ডটি বণ্টন করে দিলেন। তারা হলেন, 'উয়াইনাহ ইবন বাদর, আকরা ইবন হাবিস, যায়দ আল-খায়ল এবং চতুর্থ জন আলক্বামাহ কিংবা 'আমির ইবন তুফায়ল। তখন সাহাবীগণের মধ্য থেকে একজন বললেন, এটা পাওয়ার ব্যাপারে তাদের অপেক্ষা আমরাই অধিক হাকদার ছিলাম। (রাবী) বলেন, কথাটি নবী (ﷺ) পর্যন্ত গিয়ে পৌছল। তাই নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা কি আমার উপর আস্থা রাখ না অথচ আমি আসমানের অধিবাসীদের আস্থাভাজন, সকাল-বিকাল আমার কাছে আসমানের সংবাদ আসছে। রাবী বলেন, এমন সময়ে এক ব্যক্তি উঠে দাড়াল। লোকটির চোখ দু'টি ছিল কোটরাগত, চোয়ালের হাড় যেন বেরিয়ে পড়ছে, উচু কপাল বিশিষ্ট, দাড়ি অতি ঘন, মাথাটি ন্যাড়া, পরনের লুঙ্গী উপরে উত্থিত। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহকে ভয় করুন। নবী (ﷺ) বললেন, তোমার জন্য আফসোস! আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে আমি কি অধিক হাকদার নই? রাবী আবূ সাঈদ খুদরী বলেন, লোকটি চলে গেলে খালিদ ইবন ওয়ালীদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি লোকটির গর্দান উড়িয়ে দেব না? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ না, হতে পারে সে সালাত আদায় করে। খালিদ বললেন, অনেক সালাত আদায়কারী এমন আছে যারা মুখে এমন এমন কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমাকে মানুষের দিল ছিদ্র করে, পেট ফেড়ে দেখার জন্য বলা হয়নি। তারপর তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তখন লোকটি পিঠ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি বললেন, এ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা শ্রুতিমধুর কণ্ঠে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে অথচ আল্লাহর বাণী তাদের গলদেশের নিচে নামবে না। তারা দ্বীন থেকে এভাবে বেরিয়ে যাবে যেভাবে লক্ষ্যবস্তুর দেহ ভেদ করে তীর বেরিয়ে যায়। (বর্ণনাকারী বলেন) আমার মনে হয় তিনি এ কথাও বলেছেন, যদি আমি তাদেরকে পাই তাহলে অবশ্যই আমি তাদেরকে সামূদ জাতির মতো হত্যা করে দেব।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আলী-কে তার কৃত ইহরামের উপর স্থির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন বাকর ইবন জুরায়জ-আতা -জাবির সূত্রে আরও বর্ণনা করেন যে, জাবির বলেছেনঃ আলী ইবন আবূ তালিব তার আদায়কৃত কর খুমুস নিয়ে (মক্কায়) আসলেন। তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেন, হে আলী! তুমি কিসের ইহরাম বেধেছ? তিনি বললেন, নবী (ﷺ) যেটির ইহরাম বেধেছেন। নবী (ﷺ) বললেন, তা হলে তুমি কুরবানীর পশু পাঠিয়ে দাও এবং ইহরাম বাধা এ অবস্থায় অবস্থান করতে থাক। বর্ণনাকারী [জাবির] বলেন, সে সময় আলী নবী (ﷺ)-এর জন্য কুরবানীর পশু পাঠিয়েছিলেন।

বাকর হতে বর্ণিত যে, ইবন উমার-এর কাছে এ কথা উল্লেখ করা হল, 'আনাস লোকেদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ﷺ) হাজ্জ ও উমরাহর জন্য ইহরাম বেধেছিলেন। তখন ইবন উমার বললেন, নবী (ﷺ) হাজ্জের জন্য ইহরাম বেধেছেন, তার সঙ্গে আমরাও হাজ্জের জন্য ইহরাম বাধি। যখন আমরা মক্কায় পৌছলাম তিনি বললেন, তোমাদের যার সঙ্গে কুরবানীর পশু নেই সে যেন তার হাজ্জের ইহরাম উমরাহর ইহরামে পরিণত করে। অবশ্য নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। অতঃপর আলী ইবন আবূ তালিব হাজ্জের উদ্দেশে ইয়ামান থেকে আসলেন। নবী (ﷺ) (তাকে) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিসের ইহরাম বেধেছ? কারণ আমাদের সঙ্গে তোমার স্ত্রী পরিবার আছে। তিনি উত্তর দিলেন, নবী (ﷺ) যেটির ইহরাম বেধেছেন আমি সেটিরই ইহরাম বেধেছি। নবী (ﷺ) বললেন, তাহলে (এ অবস্থায়ই) থাক, কেননা আমাদের সঙ্গে কুরবানীর পশু আছে।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৩৫৩)।

জারীর (ইবন আবদুল্লাহ্ বাজালী) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলিয়্যাতের যুগে একটি ঘর ছিল যাকে 'যুল খালাসা', ইয়ামানী কাবা এবং সিরীয় কাবা বলা হত। নবী (ﷺ) আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি যুল-খালাসা থেকে আমাকে স্বস্তি দেবে না? এ কথা শুনে আমি একশ পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী নিয়ে ছুটে চললাম। আর এ ঘরটি ভেঙ্গে টুকরা করে দিলাম এবং সেখানে যাদেরকে পেলাম তাদের হত্যা করে ফেললাম। তারপর নবী (ﷺ)-এর কাছে ফিরে এসে তাকে এ সংবাদ জানালাম। তিনি আমাদের জন্য এবং (আমাদের গোত্র) আহমাসের জন্য দোয়া করলেন।

ক্বায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জারীর থেকে আমাকে বলেছেন যে, নবী (ﷺ) তাকে বললেন, তুমি কি আমাকে যুল খালাসা থেকে স্বস্তি দেবে না? যুল খালাসা ছিল খাসআম গোত্রের একটি ঘর, যার নাম দেয়া হয়েছিল ইয়ামানী কাবা। এ কথা শুনে আমি আহ্মাস গোত্র থেকে একশ পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে চললাম। তাদের সকলেই অশ্ব পরিচালনায় পারদর্শী ছিল। আর আমি তখন ঘোড়ার পিঠে স্থিরভাবে বসতে পারছিলাম না। কাজেই নবী (ﷺ) আমার বুকের উপর হাত দিয়ে আঘাত করলেন। এমন কি আমি আমার বুকের উপর তার আঙ্গুলগুলোর ছাপ পর্যন্ত দেখতে পেলাম। তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! একে স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়াত দানকারী ও হিদায়াত লাভকারী বানিয়ে দিন। এরপর জারীর সেখানে গেলেন এবং ঘরটি ভেঙ্গে দিলেন আর তা জ্বালিয়ে দিলেন। এরপর তিনি [জারীর] রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে দূত পাঠালেন। তখন জারীরের দূত [রাসূল (ﷺ)-কে] বলল, সেই মহান সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্য বাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন, আমি ঘরটিকে চর্মরোগে আক্রান্ত কাল উটের মতো রেখে আপনার কাছে এসেছি। রাবী বলেন, তখন নবী (ﷺ) আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর জন্য পাচবার বারাকাতের দোয়া করলেন।

জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি কি আমাকে যুল খালাসা থেকে স্বস্তি দেবে না? আমি বললামঃ অবশ্যই। এরপর আমি (আমাদের) আহমাস গোত্র থেকে একশ পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে চললাম। তাদের সবাই ছিল অভিজ্ঞ অশ্বচালক। কিন্তু আমি ঘোড়ার উপর স্থির হয়ে বসতে পারতাম না। এ সম্পর্কে নবী (ﷺ)-কে জানালাম। তিনি তার হাত দিয়ে আমার বুকের উপর আঘাত করলেন। এমনকি আমি আমার বুকে তার হাতের চিহ্ন পর্যন্ত দেখতে পেলাম। তিনি দোয়া করলেনঃ হে আল্লাহ! একে স্থির রাখুন এবং তাকে হিদায়াতদানকারী ও হিদায়াত লাভকারী বানিয়ে দিন। জারীর বলেনঃ এরপরে আর কখনো আমি আমার ঘোড়া থেকে পড়ে যাইনি। তিনি আরো বলেছেন যে, যুল খালাসা ছিল ইয়ামানের অন্তর্গত খাসআম ও বাজীলা গোত্রের একটি ঘর। সেখানে কতগুলো মূর্তি ছিল যেগুলোর পূজা করা হত এবং এ ঘরটিকে বলা হত কাবা। রাবী (কায়স) বলেন, এরপর তিনি সেখানে গেলেন এবং ঘরটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন আর একে ভেঙ্গে চুরে ফেললেন। রাবী আরো বলেন, আর যখন জারীর ইয়ামানে গিয়ে উঠলেন তখন সেখানে এক লোক থাকত, সে তীরের সাহায্যে ভাগ্য নির্ণয় করত। লোকটিকে বলা হল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতিনিধি এখানে আছেন, তিনি যদি তোমাকে পাকড়াও করেন তাহলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেবেন। রাবী বলেন, এরপর যখন সে ভাগ্য নির্ণয়ের কাজে লিপ্ত ছিল, সেই অবস্থায় জারীর সেখানে পৌছে গেলেন। তিনি বললেন, তীরগুলো ভেঙ্গে ফেল এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই-এ কথার সাক্ষ্য দাও, অন্যথায় তোমার গর্দান উড়িয়ে দেব। লোকটি তখন তীরগুলো ভেঙ্গে ফেলল এবং কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করল। এরপর জারীর আবূ আরতাত ডাক নাম বিশিষ্ট আহমাস গোত্রের এক ব্যক্তিকে নবী (ﷺ)-এর নিকট পাঠালেন এ সংবাদ শোনানোর জন্য। লোকটি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সে সত্তার কসম করে বলেছি, যিনি আপনাকে সত্য বাণী সহকারে পাঠিয়েছেন, ঘরটিকে চর্মরোগে আক্রান্ত উটের মতো কালো করে রেখে আমি এসেছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন নবী (ﷺ) আহমাস গোত্রের অশ্বারোহী এবং পদাতিক সৈনিকদের বারকাতের জন্য পাচবার দোয়া করলেন।

আবূ উসমান হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমর ইবন আস-কে (সেনাপতি হিসেবে) যাতুস্ সালাসিল বাহিনীর বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। আমর ইবন আস বলেনঃ (যুদ্ধ শেষে) আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কাছে কোন লোকটি অধিকতর প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, আয়িশাহ, আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তার (আয়িশাহ'র) পিতা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বললেন, উমার। এভাবে তিনি পর পর আরো কয়েকজনের নাম বললেন। আমি চুপ হয়ে গেলাম এ ভয়ে যে, আমাকে না তিনি সকলের শেষে গণ্য করে বসেন।

জারীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইয়ামানে ছিলাম। এ সময়ে একদা যুকালা ও যুআমর নামে ইয়ামানের দু'ব্যক্তির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হল। আমি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীস শোনাতে লাগলাম। (বর্ণনাকারী বলেন) এমন সময়ে যুআমর জারীর-কে বললেন, তুমি যা বর্ণনা করছ তা যদি তোমার সাথীরই [নবী (ﷺ)-এর] কথা হয়ে থাকে তা হলে জেনে নাও যে, তিনদিন আগে তিনি ইন্তিকাল করে গেছেন। (জারীর বলেন, এ কথা শুনে আমি মদিনার দিকে ছুটলাম) তারা দু'জনেও আমার সঙ্গে সম্মুখের দিকে চললেন। অতঃপর আমরা একটি রাস্তার ধারে পৌছলে মদিনার দিক থেকে আসা একদল সওয়ারীর সাক্ষাৎ পেলাম। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাত হয়ে গেছে। মুসলিমদের পরামর্শত্রুমে আবূ বাকর খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর তারা দু'জন (আমাকে) বলল, (মদিনায়) তোমার সাথী [আবূ বাকর]-কে বলবে যে, আমরা কিছুদূর পর্যন্ত এসেছিলাম। সম্ভবত আবার আসব ইনশাআল্লাহ, এ কথা বলে তারা দু'জনে ইয়ামানের দিকে ফিরে গেল। এরপর আমি আবূ বাকর-কে তাদের কথা জানালাম। তিনি বললেন, তাদেরকে তুমি নিয়ে আসলে না কেন? পরে আরেক সময় যুআমর আমাকে বললেন, হে জারীর! তুমি আমার চেয়ে অধিক সম্মানী। তবুও আমি তোমাকে একটি কথা জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা আরব জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একজন আমীর মারা গেলে অপরজনকে (পরামর্শের ভিত্তিতে) আমীর বানিয়ে নেবে। আর তা যদি তরবারির জোরে ফায়সালা হয় তা হলে তোমাদের আমীরগণ রাজা বাদশাহর মতোই হয়ে যাবে। তারা রাজাদের রাগ করার মতই রাগ করবে। রাজাদের খুশি হওয়ার মতই খুশি হবে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সমুদ্র তীরের দিকে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ্-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করে দিলেন। তারা সংখ্যায় ছিলেন তিনশ'। (রাবী বলেন) আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমরা এক রাস্তায় ছিলাম, তখন আমাদের রসদপত্র শেষ হয়ে গেল, তাই আবূ উবাইদাহ আদেশ দিলেন সমগ্র সেনাদলের অবশিষ্ট পাথেয় একত্রিত করতে। অতএব সব একত্রিত করা হল। মাত্র দু'থলে খেজুর হল। এরপর তিনি প্রত্যহ অল্প অল্প করে আমাদের মধ্যে খাদ্য সরবরাহ করতে লাগলেন। যখন তাও শেষ হয়ে গেল। তখন কেবল একটি একটি করে খেজুর আমরা পেতাম। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি জাবির -কে বললাম, একটি করে খেজুর খেয়ে আপনাদের কতটুকু ক্ষুধা মিটত? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! একটি খেজুর পাওয়াও বন্ধ হয়ে গেলে আমরা একটির কদরও বুঝতে পারলাম। এরপর আমরা সমুদ্র পর্যন্ত পৌছে গেলাম। তখন আমরা পর্বতের মতো বড় একটি মাছ পেয়ে গেলাম। বাহিনীর সকলে আঠানো দিন পর্যন্ত তা খেল। তারপর আবূ উবাইদা মাছটির পাঁজরের দু'টি হাড় আনতে হুকুম দিলেন। (দু'টি হাড় আনা হলে) সেগুলো দাড় করানো হল। এরপর তিনি একটি সওয়ারী প্রস্তুত করতে বললেন। সাওয়ারী প্রস্তুত হল এবং হাড় দু'টির নিচ দিয়ে সওয়ারীটি অতিক্রম করল। কিন্তু হাড় দু'টিতে কোনই স্পর্শ লাগল না।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের তিনশ' সাওয়ারীর একটি সৈন্যবাহিনীকে কুরাইশদের একটি কাফেলার উপর সুযোগ মতো আক্রমণ চালানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ্ ছিলেন আমাদের সেনাপতি। আমরা অর্ধমাস সমুদ্র তীরে অবস্থান করলাম। ভয়ানক ক্ষুধা আমাদেরকে পেয়ে বসল। ক্ষুধার জ্বালায় গাছের পাতা খেতে থাকলাম। এ জন্যই এ সৈন্যবাহিনীর নাম রাখা হয়েছে জায়শুল খাবাত পাতাওয়ালা সেনাদল। এরপর সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামক একটি প্রাণী নিক্ষেপ করল। আমরা অর্ধমাস ধরে তা থেকে খেলাম। এর চর্বি শরীরে লাগালাম। ফলে আমাদের শরীর পূর্বের মত হৃষ্টপুষ্ট হয়ে গেল। এরপর আবূ উবাইদাহ আম্বরটির শরীর থেকে একটি পাঁজর ধরে খাড়া করালেন। এরপর তার সাথীদের মধ্যকার সবচেয়ে লম্বা লোকটিকে আসতে বললেন। সুফ্ইয়ান আরেক বর্ণনায় বলেছেন, আবূ উবাইদাহ আম্বরটির পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্য থেকে একটি হাড় ধরে খাড়া করালেন এবং (ঐ) লোকটিকে উটের পিঠে বসিয়ে এর নিচে দিয়ে অতিক্রম করালেন। জাবির বলেন, সেনাদলের এক ব্যক্তি (খাদ্যের অভাব দেখে) প্রথমে তিনটি উট যবহ করেছিলেন, তারপর আরো তিনটি উট যবেহ করেছিলেন, তারপর আরো তিনটি উট যবহ করেছিলেন। এরপর আবূ উবাইদাহ তাকে (উট যবহ করতে) নিষেধ করলেন। আমর ইবন দ্বীনার বলতেন, আবূ সালিহ আমাদের জানিয়েছেন যে, কায়স ইবন সাদ (অভিযান থেকে ফিরে এসে) তার পিতার কাছে বর্ণনা করেছিলেন যে, সেনাদলে আমিও ছিলাম, সেনাদল ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ল, (কথাটা শোনামাত্র কায়সের পিতা) সাদ বললেন, এমতাবস্থায় তুমি উট যবহ করে দিতে। কায়স বললেন, (হ্যা) আমি উট যবেহ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হয়ে গেল। এবারো তার পিতা বললেন, তুমি যবহ করতে। তিনি বললেন, (হ্যা) যবহ করেছি। তিনি বললেন, তারপর আবার সবাই ক্ষুধার্ত হল। সাদ বললেন, এবারো উট যবহ করতে। তিনি বললেন, (হ্যা) যবহ করেছি। তিনি বললেন, এরপরও আবার সবাই ক্ষুধার্ত হল। সাদ বললেন, উট যবহ করতে। যখন কায়স ইবন সাদ বললেন, তখন আমাকে (যবহ করতে) নিষেধ করা হল।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাইশুল খাবাত-এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, আর আবূ উবাইদাহ-কে আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়েছিল। পথে আমরা ভীষণ ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ি। তখন সমুদ্র আমাদের জন্য একটি মরা মাছ তীরে নিক্ষেপ করে দিল। এত বড় মাছ আমরা আর কখনো দেখিনি, একে আমবার বলা হয়। এরপর মাছটি থেকে আমরা অর্ধমাস আহার করলাম। একবার আবূ উবাইদাহ মাছটির হাড়গুলোর একটি হাড় তুলে ধরলেন আর সওয়ারীর পিঠে চড়ে একজন হাড়টির নিচ দিয়ে অতিক্রম করল। (ইবন জুরায়জ বলেন) আবূ যুবায়র আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি জাবির থেকে শুনেছেন, জাবির বলেনঃ ঐ সময় আবূ উবাইদাহ বললেনঃ তোমরা মাছটি আহার কর। এরপর আমরা মদিনা ফিরে আসলে নবী (ﷺ)-কে বিষয়টি অবগত করলাম। তিনি বললেন, খাও। এটি তোমাদের জন্য রিযিক, আল্লাহ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর তোমাদের কাছে কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাদেরকেও খাওয়াও। মাছটিরও কিছু অংশ নবী (ﷺ)-কে এনে দেয়া হল। তিনি তা খেলেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, বিদায় হাজ্জের পূর্ববর্তী হাজ্জে নবী (ﷺ) আবূ বাকর সিদ্দীক-কে আমীরুল হাজ্জ নিযুক্ত করেছিলেন। সে সময় দশ তারিখে আবূ বাকর তাকে [আবূ হুরাইরাহ-কে] একটি ছোট দলসহ লোকজনের মধ্যে এ ঘোষণা দেয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন যে, আগামী বছর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। আর উলঙ্গ অবস্থায়ও কেউ বাইতুল্লাহর তওয়াফ করতে পারবে না।

বারাআ (ইবন আযিব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সর্বশেষে যে সূরাটি পূর্ণরূপে অবতীর্ণ হয়েছিল তা ছিল সূরাহ বারাআত। আর সর্বশেষ যে সূরার আয়াতটি সমাপ্তিরূপে অবতীর্ণ হয়েছিল সেটি ছিল সূরাহ আন-নিসার এ আয়াতঃ "লোকেরা আপনার কাছে সমাধান জানতে চায়, বলুন পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহ সমাধান জানাচ্ছেন" (আন-নিসা ৪/১৭৬)।

ইমরান ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানু তামীমের একটি প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ)-এর নিকটে আসলে তিনি তাদেরকে বললেনঃ হে বানু তামীম! সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সুসংবাদ দিয়ে থাকেন, এবার আমাদেরকে কিছু (অর্থ-সম্পদ) দিন। কথাটি শুনে তার চেহারায় অসন্তোষের ভাব প্রকাশ পেল। এরপর ইয়ামানের একটি প্রতিনিধি দল আসলে তিনি তাদেরকে বললেন, বানু তামীম যখন সুসংবাদ গ্রহণ করলোই না তখন তোমরা সেটি গ্রহণ কর। তারা বললেন, আমরা তা গ্রহণ করলাম হে আল্লাহর রাসূল!

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট থেকে তিনটি কথা শুনার পর থেকে আমি বানী তামীমকে ভালবাসতে থাকি। (তিনি বলেছেন) তারা আমার উম্মাতের মধ্যে দাজ্জালের বিরোধিতায় সবচেয়ে অধিক কঠোর হবে। তাদের গোত্রের একটি বাদী আয়িশাহ-এর কাছে ছিল। রাসূল (ﷺ) বললেন, একে আযাদ করে দাও, কারণ সে ইসমাঈল-এর বংশধর। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে তাদের সদাকাহর অর্থ-সম্পদ আসলে তিনি বললেন, এটি একটি কাওমের সদাকাহ বা তিনি বললেন, এটি আমার কাওমের সদাকাহ।

আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত যে, বানী তামীম গোত্র থেকে একটি অশ্বারোহী দল নবী (ﷺ)-এর নিকটে আসল। আবূ বাকর প্রস্তাব দিলেন, কা'কা ইবন মাবাদ ইবন যারারা-কে এদের আমীর নিযুক্ত করে দিন। উমার বললেন, বরং আকরা ইবন হাবিস-কে আমীর বানিয়ে দিন। আবূ বাকর বললেন, আমার বিরোধিতা করাই তোমার উদ্দেশ্য। উমার বললেন, আপনার বিরোধিতা করার ইচ্ছা আমি কখনো করি না। এর উপর দু'জনের বাক-বিতন্ডা চলতে চলতে শেষ পর্যায়ে উভয়ের আওয়াজ উচু হয়ে গেল। ফলে এ সম্পর্কে এ আয়াত অবতীর্ণ হল, "হে মুমিনগণ! আল্লাহ এবং তার রাসূলের সামনে তোমরা কোন ব্যাপারে অগ্রবর্তী হয়ো না। বরং আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সঙ্গে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না। কারণ এতে তোমাদের আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে"- (আল-হুজুরাত ৪৯/১-২)।

আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। (তিনি বলেন) আমি ইবন আব্বাস-কে বললামঃ আমার একটি কলসী আছে। তাতে আমার জন্য (খেজুর ভিজিয়ে) নবীয তৈরী করা হয় এবং পানি মিঠা হলে আমি তা আরেকটি পাত্রে ঢেলে পানি করি। কিন্তু কখনো যদি ঐ পানি অধিক পরিমাণ পান করে লোকজনের সঙ্গে বসে যাই এবং দীর্ঘ সময় মসজিদে বসে থাকি তখন আমার ভয় হয় যে, (নেশার কারণে) আমি অপমানিত হব। তখন ইবন আব্বাস বললেন, আবদুল কায়স গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে আসলে তিনি বললেন, কাওমের জন্য খোশ-আমদেদ যাদের আগমন না ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় হয়েছে, না অপমানিত অবস্থায়। তারা আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ও আপনার মধ্যে মুদার গোত্রের মুশরিকরা প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। এ জন্য আমরা আপনার কাছে নিষিদ্ধ মাসসমূহ ব্যতীত অন্য সময়ে আসতে পারি না। কাজেই আমাদেরকে সংক্ষিপ্ত কয়েকটি কথা বলে দিন, যেগুলোর উপর আমল করলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। আর যারা আমাদের পেছনে (বাড়িতে) রয়ে গেছে তাদেরকে এর দাওয়াত দেব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি তোমাদেরকে চারটি জিনিস পালন করার নির্দেশ দিচ্ছি। আর চারটি জিনিস থেকে বিরত থাকতে বলছি। আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দিচ্ছি। তোমরা কি জান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা কাকে বলে? তা হলঃ 'আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই'- এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, আর সালাত আদায় করা, যাকাত দেয়া, রমাযানের সওম পালন করা এবং গানীমাতের মালের এক-পঞ্চমাংশ জমা দেয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। আর চারটি জিনিস-লাউয়ের পাত্র, কাঠের তৈরী নাকীর নামক পাত্র, সবুজ কলসী এবং মুযাফ্ফাত নামক তৈল মাখানো পাত্রে নবীয তৈরী করা থেকে নিষেধ করছি।

আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ইবন আব্বাস থেকে শুনেছি, তিনি বলেছেন-আবদুল কায়স গোত্রে একটি প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ)-এর নিকটে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এই ছোট্ট দল রাবীআহ'র গোত্র। আমাদের এবং আপনার মাঝখানে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে মুদার গোত্রের মুশরিকরা। কাজেই আমরা নিষিদ্ধ মাসগুলো ব্যতীত অন্য সময়ে আপনার কাছে আসতে পারি না। এ জন্য আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বিষয়ের নির্দেশ দিয়ে দিন যেগুলোর উপর আমরা আমল করতে থাকব এবং যারা আমাদের পেছনে রয়েছে তাদেরকেও সেই দিকে আহবান জানাব। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে চারটি বিষয়ের হুকুম দিচ্ছি এবং চারটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। (বিষয়গুলো হল) আল্লাহর উপর ঈমান আনা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই এ কথার সাক্ষ্য দেয়া। (কথাটি বলে) তিনি আঙ্গুলের সাহায্যে এক গুণলেন। আর সালাত আদায় করা, যাকাত দেয়া এবং তোমরা যে গানীমাত লাভ করবে তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য জমা দেয়া। আর আমি তোমাদেরকে লাউয়ের পাত্র, নাকীর নামক খোদাইকৃত কাঠের পাত্র, সবুজ কলসী এবং মুযাফ্ফাত নামক তৈল মাখানো পাত্র ব্যবহার থেকে নিষেধ করছি।

বুকায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস-এর আযাদকৃত গোলাম কুরাইব তাকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবন আব্বাস, আবদুর রহমান ইবন আযহার এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামা (এ তিনজনে) আমাকে আয়িশাহ-এর কাছে পাঠিয়ে বললেন, তাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে সালাম জানাবে এবং তাকে আসরের পরের দু'রাকাত সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। কারণ আমরা অবহিত হয়েছি যে, আপনি নাকি এই দু'রাকাত সালাত আদায় করেন অথচ নবী (ﷺ) এ দু'রাকাত সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন-এ হাদীসও আমাদের কাছে পৌছেছে। ইবন আব্বাস বলেন, আমি উমার-এর উপস্থিতিতে এ দু'রাকাত সালাত আদায়কারী লোকদেরকে প্রহার করতাম। কুরায়ব বলেন, আমি তার [আয়িশাহ] কাছে গেলাম এবং তারা আমাকে যে ব্যাপারে পাঠিয়েছেন তা জানালাম। তিনি বললেন, বিষয়টি উম্মু সালামাহ-এর কাছে জিজ্ঞেস কর। এরপর আমি তাদেরকে জানালে তারা আবার আমাকে উম্মু সালামাহ-এর কাছে পাঠালেন যেভাবে তারা আমাকে আয়িশাহ-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন। তখন উম্মু সালামাহ বললেন, আমি নবী (ﷺ) থেকে শুনেছি, তিনি দু'রাকাত সালাত আদায় করা থেকে নিষেধ করেছেন। কিন্তু একদিন তিনি আসরের সালাত আদায় করে আমার ঘরে প্রবেশ করলেন। এ সময় আমার কাছে ছিল আনসারদের বানী হারাম গোত্রের কতিপয় মহিলা। তখন নবী (ﷺ) দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। আমি তখন পরিচারিকাকে পাঠিয়ে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পাশে গিয়ে দাড়াবে এবং বলবে, " উম্মু সালামাহ আপনাকে এ কথা বলছেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনাকে এ দু'রাকাত আদায় করা থেকে নিষেধ করতে শুনিনি অথচ দেখতে পাচ্ছি আপনি সে দু'রাকাত আদায় করছেন?" এরপর যদি তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করেন তাহলে পিছনে সরে যাবে। পরিচারিকা গিয়ে সেভাবেই বলল। তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন। পরিচারিকা পেছনের দিকে সরে গেল। সালাত সম্পাদন করে তিনি বললেন, হে আবূ উমাইয়াহর কন্যা! (উম্মু সালামাহ) তুমি আমাকে আসরের পরের দু'রাকাত সালাতের কথা জিজ্ঞেস করছ। আসলে আজ আবদুল কায়স গোত্র থেকে তাদের কতিপয় লোক আমার কাছে ইসলাম গ্রহণ করতে এসেছিল। তারা আমাকে ব্যস্ত রাখার কারণে যুহরের পরের দু'রাকাত সালাত আদায় করতে পারিনি। সেই দু'রাকাত হল এ দু'রাকাত সালাত।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মসজিদে জুমুআহর সালাত জারী করার পরে সর্বপ্রথম যে মসজিদে জুমুআহর সালাত জারী করা হয়েছিল তা হল বাহরাইনের জুয়াসা এলাকায় অবস্থিত আবদুল ক্বায়স গোত্রের মাসজিদ।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদল অশ্বারোহী সৈন্য নজদের দিকে পাঠিয়েছিলেন। তারা সুমামাহ ইবন উসাল নামক বনু হানীফার এক লোককে ধরে আনলেন এবং মসজিদে নাববীর একটি খুটির সঙ্গে তাকে বেধে রাখলেন। তখন নবী (ﷺ) তার কাছে গিয়ে বললেন, ওহে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে উত্তর দিল, হে মুহাম্মাদ! আমার কাছে তো ভালই মনে হচ্ছে। যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি অর্থ সম্পদ পেতে চান তাহলে যতটা ইচ্ছা দাবী করুন। নবী (ﷺ) তাকে সেই অবস্থার উপর রেখে দিলেন। এভাবে পরের দিন আসল। নবী (ﷺ) আবার তাকে বললেন, ওহে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছে সেটিই মনে হচ্ছে যা আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, যদি আপনি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করবেন। তিনি তাকে সেই অবস্থায় রেখে দিলেন। এভাবে এর পরের দিনও আসল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছে তা-ই মনে হচ্ছে যা আমি পূর্বেই বলেছি। নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা সুমামাহর বন্ধন ছেড়ে দাও। এবার সুমামাহ মসজিদে নাববীতে প্রবেশ করে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। (তিনি বললেন) হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! ইতোপূর্বে আমার কাছে যমীনের উপর আপনার চেহারার চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় আর কোন চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আমার কাছে আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত অন্য কোন দ্বীন ছিল না। এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে সকল দ্বীনের চেয়ে প্রিয়তম। আল্লাহর কসম! আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে অধিক খারাপ শহর অন্য কোনটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার কাছে সকল শহর চেয়ে অধিক প্রিয়। আপনার অশ্বারোহী সৈনিকগণ আমাকে ধরে এনেছে, সে সময় আমি উমরাহর উদ্দেশে বেরিয়ে ছিলাম। এখন আপনি আমাকে কী হুকুম করেন? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে সু-সংবাদ প্রদান করলেন এবং উমরাহ আদায়ের নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি যখন মক্কায় আসলেন তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, বেদ্বীন হয়ে গেছ? তিনি উত্তর করলেন, না, বরং আমি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর আল্লাহর কসম! নবী (ﷺ)-এর অনুমতি ব্যতীত তোমাদের কাছে ইয়ামামাহ থেকে গমের একটি দানাও আসবে না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগে একবার মিথ্যুক মুসাইলামাহ (মদিনায়) এসেছিল। সে বলত লাগল, মুহাম্মাদ যদি আমাকে তার পরে তার স্থলাভিষিক্ত করে যায় তাহলে আমি তার অনুগত হয়ে যাব। সে তার গোত্রের বহু লোকজনসহ এসেছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাবিত ইবন কায়স ইবন সাম্মাসকে সঙ্গে নিয়ে তার দিকে অগ্রসর হলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। মুসাইলামাহ তার সঙ্গী-সাথীদের মাঝে ছিল, এই অবস্থায় তিনি তার কাছে পৌছলেন। তিনি বললেন, যদি তুমি আমার কাছে এ ডালটিও চাও তবে তাও আমি তোমাকে দেব না। তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ কক্ষনো লঙ্ঘিত হবে না। যদি তুমি আমার আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করে দিবেন। আমি তোমাকে ঠিক তেমনই দেখতে পাচ্ছি যেমনটি আমাকে (স্বপ্নে) দেখানো হয়েছে। এই সাবিত আমার পক্ষ থেকে তোমাকে জবাব দেবে। এরপর তিনি তার নিকট হতে চলে আসলেন।

ইবন আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উক্তি "আমি তোমাকে তেমনই দেখতে পাচ্ছি যেমন আমাকে দেখানো হয়েছিল" সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আবূ হুরাইরাহ আমাকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, একদিন আমি ঘুমাচ্ছিলাম তখন স্বপ্নে দেখলাম, আমার দু'হাতে স্বর্ণের দু'টি কঙ্কন। কঙ্কন দু'টি আমাকে চিন্তিত করল। তখন ঘুমের মধ্যেই আমার প্রতি ওয়াহী করা হল, কাঁকন দু'টিতে ফু দাও। আমি সে দু'টিতে ফু দিলে তা উড়ে গেল। আমি এর ব্যাখ্যা করেছি দু'জন মিথ্যাচারী (নবী) যারা আমার পরে বের হবে। তাদের একজন 'আনসী, অন্যজন মুসাইলামাহ।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি ঘুমাচ্ছিলাম এমতাবস্থায় (স্বপ্নে) আমাকে পৃথিবীর সকল দেয়া হল এবং আমার হাতে দু'টি স্বর্ণ কঙ্কন রাখা হল। এ দু'টি আমার কাছে গুরুতর মনে হল। তখন ওয়াহী যোগে আমাকে জানানো হল যে, ও দু'টিতে ফু দাও। আমি ফু দিলাম, তখনও দু'টি উধাও হয়ে গেল। আমি এ দু'টির ব্যাখ্যা করলাম যে, এরা সেই দু' মিথ্যাচারী (নবী) যাদের মাঝখানে আমি অবস্থান করছি। সান'আর অধিবাসী (আসওয়াদ আনসী) এবং ইয়ামামার অধিবাসী (মুসাইলামাতুল কায্যাব)।

আবূ রাজা উতারিদী বলেন যে, (ইসলাম পূর্ব যুগে) আমরা একটি পাথরের পূজা করতাম। যখন এ অপেক্ষা উত্তম কোন পাথর পেতাম তখন এটিকে নিক্ষেপ করে দিয়ে অপরটির পূজা আরম্ভ করতাম। কোন পাথর না পেলে কিছু মাটি একত্রিত করে স্তুপ বানিয়ে নিতাম। তারপর একটি বাকরী এনে সেই স্তুপের উপর দোহন করতাম তারপর এর চারপাশে তাওয়াফ করতাম। আর রজব মাস এলে আমরা বলতাম, এটা তীর থেকে ফলা বিচ্ছিন্ন করার মাস। কাজেই আমরা রজব মাসে সব ক'টি তীর ও বর্শা থেকে এর তীক্ষ্ণাংশ খুলে রেখে দিতাম। রজব মাসব্যাপী আমরা এগুলো খুলে নিক্ষেপ করতাম।

রাবী মাহদী বলেন, আমি আবূ রাজা-কে বলতে শুনেছি যে, নবী (ﷺ)-এর নবুয়ত লাভের সময় আমি ছিলাম অল্প বয়স্ক বালক। আমি আমাদের উট চরাতাম। যখন আমরা তার অভিযানের কথা শুনলাম তখন আমরা পালিয়ে এলাম জাহান্নামের দিকে মিথ্যাচারী (নবী) মুসাইলামাহর দিকে।

উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ বলেন, আমাদের কাছে এ খবর পৌছে যে, [রাসূল (ﷺ)-এর যামানায়] মিথ্যাচারী মুসাইলামাহ একবার মদিনায় এসে হারিসের কন্যার ঘরে অবস্থান করেছিল। হারিস ইবন কুরাইযের কন্যা তথা আবদুল্লাহ ইবন 'আমিরের মা ছিল তার (মুসাইলামাহর) স্ত্রী। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কাছে আসলেন। তখন তার সঙ্গে ছিলেন সাবিত ইবন কায়স ইবন শাম্মাস আর তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খতীব বলা হত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাতে ছিল একটি খেজুরের ডাল। তিনি তার কাছে গিয়ে তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। মুসাইলামাহ তাকে [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে] বলল, আপনি ইচ্ছা করলে আমার এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের মাঝে বাধা এভাবে তুলে দিতে পারেন যে, আপনার পরে তা আমার জন্য নির্দিষ্ট করে দিবেন। নবী (ﷺ) তাকে বললেন, তুমি যদি এ ডালটিও আমার কাছে চাও, তাও আমি তোমাকে দেব না। আমি তোমাকে ঠিক তেমনই দেখছি যেমনটি আমাকে (স্বপ্নযোগে) দেখানো হয়েছে। এই সাবিত ইবন কায়স আমার পক্ষ থেকে তোমার জবাব দেবে। এ কথা বলে নবী (ﷺ) চলে গেলেন।

উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস-কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উল্লেখিত স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি ইবন আব্বাস বললেন, [আবূ হুরাইরাহ কর্তৃক] আমাকে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি ঘুমাচ্ছিলাম এমতাবস্থায় আমাকে দেখানো হল যে, আমার দু'হাতে দু'টি সোনার কাঁকন রাখা হয়েছে। ও দু'টি আমার কাছে বীভৎস ঠেকল এবং তা অপছন্দ করলাম। আমাকে (ফু দিতে) বলা হলে আমি ও দু'টিতে ফু দিলাম। সে দু'টি উড়ে গেল। আমি এ দু'টির ব্যাখ্যা করলাম যে, দু'টি মিথ্যাচারী (নবী) আবির্ভূত হবে। উবাইদুল্লাহ বলেন, এ দু'জনের একজন হল আসওয়াদ আল'আনসী, যাকে ফাইরুয নামক এক ব্যক্তি ইয়ামানে হত্যা করে আর অপরজন হল মুসাইলামাহ।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজরান এলাকার দু'জন সরদার আকিব এবং সাইয়িদ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে তার সঙ্গে মুবাহালা করতে চেয়েছিল। বর্ণনাকারী হুযাইফাহ বলেন, তখন তাদের একজন তার সঙ্গীকে বলল, এরূপ করো না। কারণ আল্লাহর কসম! তিনি যদি নবী হয়ে থাকেন আর আমরা তার সঙ্গে মুবাহালা করি তাহলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী সন্তান-সন্ততি (কেউ) রক্ষা পাবে না। তারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলল, আপনি আমাদের নিকট হতে যা চাবেন আপনাকে আমরা তা-ই দেব। তবে এর জন্য আপনি আমাদের সঙ্গে একজন আমানতদার ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দিন। আমানতদার ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তিকে আমাদের সঙ্গে পাঠাবেন না। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে অবশ্যই এমন একজন আমানতদার পাঠাবো যে প্রকৃতই আমানতদার এবং পাক্কা আমানতদার। এ পদে ভূষিত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীগণ আগ্রহান্বিত হলেন। তখন তিনি বললেন, হে আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ্! তুমি উঠে দাড়াও। তিনি যখন দাড়ালেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এ হচ্ছে এই উম্মতের সত্যিকার আমানতদার।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাজরান অধিবাসীরা নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমাদের জন্য একজন আমানতদার ব্যক্তি পাঠিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ তোমাদের কাছে আমি একজন আমানতদার ব্যক্তিকেই পাঠাব যিনি সত্যিই আমানতদার। লোকের এ সম্মান অর্জনের জন্য আগ্রহান্বিত হল। নবী (ﷺ) তখন আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ্-কে পাঠালেন।

আনাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ প্রত্যেক উম্মতের জন্য একজন আমানতদার রয়েছে। আর এ উম্মাতের আমানতদার হল আবূ উবাইদাহ ইবন জাররাহ্।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, বাহরাইনের অর্থ-সম্পদ (জিযিয়া) আসলে তোমাকে এত দেব, এত দেব এত দেব। তিনবার বললেন। এরপর বাহরাইন থেকে আর কোন অর্থ-সম্পদ আসেনি। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাত হয়ে গেল। এরপর আবূ বাকরের যুগে যখন সেই অর্থ সম্পদ আসল তখন তিনি একজন ঘোষণাকারীকে নির্দেশ দিলেন। সে ঘোষণা করলঃ নবী (ﷺ)-এর কাছে যার প্রাপ্য ঋণ আছে কিংবা কোন ওয়াদা অপূর্ণ আছে সে যেন আমার কাছে আসে। জাবির বলেনঃ আমি আবূ বাকর-এর কাছে এসে তাকে জানালাম যে, নবী (ﷺ) আমাকে বলেছিলেন, যদি বাহরাইন থেকে অর্থ-সম্পদ আসে তা হলে তোমাকে আমি এত দেব, এত দেব, এত দেব। তিনবার বললেন। জাবির বলেনঃ তখন আবূ বাকর আমাকে অর্থ-সম্পদ দিলেন। জাবির বলেন, এরপর (আবার) আমি আবূ বাকর-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার কাছে মাল চাইলাম। কিন্তু তিনি আমাকে কিছুই দিলেন না। এরপর আমি তার কাছে দ্বিতীয়বার আসি, তিনি আমাকে কিছুই দেননি। এরপর আমি তার কাছে তৃতীয়বার এলাম। তখনো তিনি আমাকে কিছুই দিলেন না। কাজেই আমি তাকে বললামঃ আমি আপনার কাছে এসেছিলাম কিন্তু আপনি আমাকে দেননি। তারপর (আবার) এসেছিলাম তখনো দেননি। এরপরেও এসেছিলাম তখনো আমাকে আপনি দেননি। কাজেই এখন হয় আপনি আমাকে সম্পদ দিবেন নয়তো আমি মনে করবঃ আপনি আমার ব্যাপারে কৃপণতা করছেন। তখন তিনি বললেনঃ এ কী বলছ 'আমার ব্যাপারে কৃপণতা করছেন।' কৃপণতা থেকে মারাত্মক ব্যাধি আর কী হতে পারে। কথাটি তিনি তিনবার বললেন। (এরপর তিনি বললেন) যতবারই আমি তোমাকে সম্পদ দেয়া থেকে বিরত রয়েছি ততবারই আমার ইচ্ছা ছিল যে, তোমাকে দেব। আমর [ইবন দ্বীনার] মুহাম্মাদ ইবন আলী-এর কাছে আসলে তিনি আমাকে বললেন, এ (আশরাফী)গুলো গুণো, আমি এগুলো গুণে দেখলাম এখানে পাচশ' (আশরাফী) রয়েছে। তিনি বললেন, এ পরিমাণ আরো দু'বার উঠিয়ে নাও।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি এবং আমার ভাই ইয়ামান থেকে এসে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেছি। এ সময়ে ইবন মাসঊদ ও তার মায়ের অধিক আসা-যাওয়া ও নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে আমরা তাদেরকে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত মনে করেছিলাম।

যাহদাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ মূসা এ এলাকায় এসে জারম গোত্রের লোকদেরকে সম্মানিত করেছেন। একদা আমরা তার কাছে বসা ছিলাম। এ সময়ে তিনি মুরগীর গোশ্ত দিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। লোকদের মধ্যে এক ব্যক্তি বসা ছিল। তিনি তাকে খানা খেতে ডাকলেন। সে বলল, আমি মুরগীটিকে এমন জিনিস খেতে দেখেছি যার জন্য খেতে আমার অরুচি লাগছে। তিনি বললেন, এসো। কেননা আমি নবী (ﷺ)-কে মুরগী খেতে দেখেছি। সে বলল, আমি শপথ করে ফেলছি যে, এটি খাব না। তিনি বললেন, এসে পড়। তোমার শপথ সম্বন্ধে আমি তোমাকে জানাচ্ছি যে, আমরা আশআরীদের একটি দল নবী (ﷺ)-এর নিকটে এসে তার কাছে সাওয়ারী চেয়েছিলাম। তিনি আমাদেরকে সওয়ারী দিতে অস্বীকার করলেন। এরপর আমরা (আবার) তার কাছে সাওয়ারী চাইলাম। তিনি তখন শপথ করে বললেন যে, আমাদেরকে তিনি সওয়ারী দেবেন না। কিছুক্ষণ পরেই নবী (ﷺ)-এর কাছে গানীমাতের কিছু উট আনা হল। তিনি আমাদেরকে পাচটি করে উট দেয়ার আদেশ দিলেন। উটগুলো হাতে নেয়ার পর আমরা পরস্পর বললাম, আমরা নবী (ﷺ)-কে তার শপথ থেকে অমনোযোগী করে ফেলছি এমন অবস্থায় আর কখনো আমরা কামিয়াব হতে পারব না। কাজেই আমি তার কাছে এসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শপথ করেছিলেন যে, আমাদের সাওয়ারী দেবেন না। এখন তো আপনি আমাদের সাওয়ারী দিলেন। তিনি বললেন, নিশ্চই। তবে আমার নিয়ম হল, আমি যদি কোন ব্যাপারে শপথ করি আর এর বিপরীত কোনটিকে এ অপেক্ষা উত্তম মনে করি তাহলে উত্তমটিকেই গ্রহণ করে নেই।

ইমরান ইবন হুসায়ন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী তামীমের লোকজন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আসলে তিনি তাদেরকে বললেন, হে বানী তামীম! সুসংবাদ গ্রহণ কর। তারা বলল, আপনি সুসংবাদ তো দিলেন, কিন্তু আমাদেরকে (কিছু অর্থ-সম্পদ) দান করুন। কথাটি শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। এমন সময়ে ইয়ামানী কিছু লোক আসল। নবী (ﷺ) বললেন, বানী তামীম যখন সুসংবাদ গ্রহণ করল না, তাহলে তোমরাই তা গ্রহণ কর। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তা গ্রহণ করলাম।

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) ইয়ামানের দিকে তার হাত দিয়ে ইশারা করে বলেছেন, ঈমান হল ওখানে। আর কঠোরতা ও হৃদয়হীনতা হল রাবীআহ ও মুযার গোত্রদ্বয়ের সেসব মানুষের মধ্যে যারা উটের লেজের কাছে দাড়িয়ে চীৎকার দেয়, যেখান থেকে শয়তানের দু' শিং উদিত হয়।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামানবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তারা অন্তরের দিক থেকে অত্যন্ত কোমল ও দরদী। ঈমান হল ইয়ামানীদের, হিকমাত হল ইয়ামানীদের, গরিমা ও অহঙ্কার রয়েছে উট-ওয়ালাদের মধ্যে, বাকরী পালকদের মধ্যে আছে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ঈমান হল ইয়ামানীদের। আর ফিতনা হল ওখানে, যেখানে উদিত হল শয়তানের শিং।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামানবাসীরা তোমাদের কাছে এসেছে। তারা অন্তরের দিক থেকে অত্যন্ত কোমল। আর মনের দিক থেকে অত্যন্ত দয়ার্দ্র। ফিকহ্ হল ইয়ামানীদের আর হিকমাত হল ইয়ামানীদের।

আলক্বামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ইবন মাসঊদ-এর কাছে বসা ছিলাম। তখন সেখানে আব্বাস এসে বললেন, হে আবূ আবদুর রহমান (আবদুর রহমানের পিতা আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ)! এসব তরুণ কি আপনার তিলাওয়াতের মতো তিলাওয়াত করতে পারে? তিনি বললেনঃ আপনি যদি চান তাহলে একজনকে হুকুম দেই যে, সে আপনাকে তিলাওয়াত করে শুনাবে। তিনি বললেন, অবশ্যই। ইবন মাসঊদ বললেন, ওহে 'আলকামাহ, পড়। তখন যিয়াদ ইবন হুদাইরের ভাই যায়দ ইবন হুদাইর বলল, আপনি আলকামাহ্কে পড়তে হুকুম করেছেন, অথচ সে তো আমাদের মধ্যে ভাল তিলাওয়াতকারী নয়। ইবন মাসঊদ বললেন, যদি তুমি চাও তাহলে আমি তোমার গোত্র ও তার গোত্র সম্পর্কে নবী (ﷺ) কী বলেছেন তা জানিয়ে দিতে পারি। (আলকামাহ বলেন) এরপর আমি সূরায়ে মারইয়াম থেকে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করলাম। আবদুল্লাহ বললেন, আপনার কেমন মনে হয়? তিনি বললেন, বেশ ভালই পড়েছে। আবদুল্লাহ বললেন, আমি যা কিছু পড়ি তার সবই সে পড়ে। এরপর তিনি খাববাবের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, তার হাতে একটি সোনার আংটি। তিনি বললেন, এখনো কি এ আংটি খুলে ফেলার সময় হয়নি? খাববাব বললেন, আজকের পর আর এটি আমার হাতে দেখতে পাবেন না। অতঃপর তিনি আংটিটি ফেলে দিলেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুফায়ল ইবন আমর নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, দাওস গোত্র হালাক হয়ে গেছে। তারা নাফরমানী করেছে এবং (দ্বীনের দাওয়াত) গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সুতরাং আপনি তাদের প্রতি বদদোয়া করুন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন এবং দ্বীনের পথে নিয়ে আসুন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসার জন্য রওয়ানা হয়ে রাস্তার মধ্যে বলেছিলাম- হে সুদীর্ঘ ও চরম পরিশ্রমের রাত! এ রাত আমাকে দারুল কুফর থেকে মুক্তি দিয়েছে। আমার একটি গোলাম ছিল। পথে সে পালিয়ে গেল। এরপর আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বাই'আত করলাম। অতঃপর একদিন আমি তার নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় গোলামটি এসে হাযির। নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, হে আবূ হুরাইরাহ! এই যে তোমার গোলাম। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে সে আযাদ-এ কথা বলে আমি তাকে আযাদ করে দিলাম।

আদী ইবন হাতিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একটি প্রতিনিধি দলসহ উমার-এর নিকটে আসলাম। তিনি প্রত্যেকের নাম নিয়ে একজন একজন করে ডাকতে শুরু করলেন। তাই আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি কি আমাকে চিনেন? তিনি বললেন, হা চিনি। লোকজন যখন ইসলামকে অস্বীকার করেছিল তখন তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছ। লোকজন যখন পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন তুমি সম্মুখে অগ্রসর হয়েছ। লোকেরা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তুমি তখন ইসলাম পালনের ওয়াদা পূরণ করেছ। লোকেরা যখন দ্বীনকে অস্বীকার করেছে তুমি তখন দ্বীনকে চিনে নিয়ে গ্রহণ করেছ। এ সব কথা শুনে আদী বললেন, তাহলে আমার আর কোন চিন্তা নেই।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জে রওয়ানা হই। তখন আমরা উমরাহর (নিয়তে) ইহরাম বাধি। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘোষণা দিলেন, যাদের সঙ্গে কুরবানীর পশু রয়েছে, তারা যেন হাজ্জ ও উমরাহ উভয়ের একসঙ্গে ইহরামের নিয়ত করে এবং হাজ্জ ও উমরাহর উভয়টি সমাধা করার পূর্বে হালাল না হয়। এভাবে তার সঙ্গে আমি মক্কায় পৌছি এবং ঋতুমতী হয়ে পড়ি। এ কারণে আমি বাইতুল্লাহর তওয়াফ এবং সাফা ও মারওয়ার সায়ী করতে পারলাম না। এ দুঃখ আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে অবহিত করলাম। তখন তিনি বললেন, তুমি তোমার মাথার চুল ছেড়ে দাও এবং মাথা (চিরুনী দ্বারা) আচড়াও আর কেবল হাজ্জের ইহরাম বাধ ও উমরাহ ছেড়ে দাও। আমি তাই করলাম। এরপর আমরা যখন হাজ্জের কাজসমূহ সম্পন্ন করলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে আবূ বাকর সিদ্দীক-এর পুত্র আবদুর রহমান-এর সঙ্গে তানঈম-এ পাঠিয়ে দিলেন। (সেখান থেকে ইহরাম বেধে) উমরাহ আদায় করলাম। তখন তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] বললেন, এই উমরাহ তোমার পূর্বের কাযা উমরাহ পূর্ণ করল। আয়িশাহ বলেন, যারা উমরাহর ইহরাম বেধেছিলেন তারা বাইতুল্লাহ্ তওয়াফ করে এবং সাফা ও মারওয়া সায়ী করার পর হালাল হয়ে যান এবং পরে মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর আর এক তওয়াফ আদায় করেন। আর যারা হাজ্জ ও উমরাহর ইহরাম এক সঙ্গে বাধেন, তারা কেবল এক তওয়াফ আদায় করেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। মুহরিম ব্যক্তি যখন বাইতুল্লাহ তওয়াফ করল তখন সে তার ইহরাম থেকে হালাল হয়ে গেল। আমি (ইবন জুরায়জ) জিজ্ঞেস করলাম যে, ইবন আব্বাস এ কথা কী করে বলতে পারেন? রাবী আতা উত্তরে বলেন, আল্লাহ তাআলার এই কালামের দলীল থেকে যে, এরপর তার হালাল হওয়ার স্থল হচ্ছে বাইতুল্লাহ এবং নবী (ﷺ) কর্তৃক তার সাহাবীদের বিদায় হাজ্জের (এ কাজের পরে) হালাল হয়ে যাওয়ার হুকুম দেয়ার ঘটনা থেকে। আমি বললামঃ এ হুকুম তো 'আরাফাহ-এ উকূফ করার পর প্রযোজ্য। তখন আতা বললেন, ইবন আব্বাস-এর মতে উকূফে 'আরাফাহর পূর্বাপর উভয় অবস্থার জন্য এ হুকুম।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (বিদায় হাজ্জে) মক্কার বাত্হা নামক স্থানে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মিলিত হলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি হাজ্জের ইহরাম বেধেছ? আমি বললাম, হা। তখন তিনি আমাকে (পুনরায়) জিজ্ঞেস করলেন। কোন প্রকারে হাজ্জের ইহরামের নিয়ত করেছ? আমি বললাম, 'আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইহরামের মতো ইহরামের নিয়ত করে তালবিয়াহ পড়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, বাইতুল্লাহ তওয়াফ কর এবং সফা ও মারওয়াহ্ সায়ী কর। এরপর (ইহরাম খুলে) হালাল হয়ে যাও। তখন আমি বাইতুল্লাহ্ তওয়াফ করলাম ও সফা এবং মারওয়াহ্ সায়ী করলাম। এরপর আমি ক্বায়স গোত্রের এক মহিলার কাছে গেলাম, সে আমার চুল আচড়ে দিল (তাতে আমি ইহরাম থেকে মুক্ত হয়ে গেলাম)।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহধর্মিণী হাফসাহ ইবন উমার-কে জানিয়েছেন যে, বিদায় হাজ্জের বছর নবী (ﷺ) তার স্ত্রীদের হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দেন। তখন হাফসাহ জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী কারণে হালাল হচ্ছেন না? তদুত্তরে তিনি বললেন, আমি আঠা জাতীয় বস্তু দ্বারা আমার মাথার চুল জমাট করে ফেলেছি এবং কুরবানীর পশুর গলায় কিলাদাহ বেধে দিয়েছি। কাজেই, আমি আমার কুরবানীর পশু যবহ করার পূর্বে হালাল হতে পারব না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, আশ'আম গোত্রের এ মহিলা বিদায় হাজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করে। এ সময় ফদল ইবন আব্বাস (সওয়ারীতে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। মহিলাটি আবেদন করল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি হাজ্জ ফারয্ করেছেন। আমার পিতার উপর তা এমন অবস্থায় ফরয হল যে, তিনি অতীব বয়োবৃদ্ধ, যে কারণে সওয়ারীর উপর ঠিক হয়ে বসতেও সমর্থ নন। এমতাবস্থায় আমি তার পক্ষ থেকে হাজ্জ আদায় করলে তা আদায় হবে কি? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হা।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ফতেহ মক্কার বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এগিয়ে চললেন। তিনি (তার) কসওয়া নামক উটনীর উপর উসামাহ-কে পিছনে বসালেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিলাল ও উসমান ইবন ত্বলহা। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (তার বাহনকে) বাইতুল্লাহর নিকট বসালেন। তারপর উসমান (ইবন ত্বলহা)-কে বললেন, আমার কাছে চাবি নিয়ে এসো। তিনি তাকে চাবি এনে দিলেন। এরপর কাবা শরীফের দরজা তার জন্য খোলা হল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ), উসামাহ, বিলাল এবং উসমান কাবা ঘরে প্রবেশ করলেন। তারপর দরজা বন্ধ করে দেয়া হল। এরপর তিনি দিবা ভাগের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং পরে বের হয়ে আসেন। তখন লোকেরা কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য তাড়াহুড়া করতে থাকে। আর আমি তাদের অগ্রণী হই এবং বিলাল-কে কাবার দরজার পিছনে দাড়ানো অবস্থায় পাই। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন স্থানে সালাত আদায় করেছেন? তিনি বললেন, ঐ সামনের দু' স্তম্ভের মাঝখানে। এ সময় বাইতুল্লাহর দুই সারিতে ছয়টি স্তম্ভ ছিল। নবী (ﷺ) সামনের সারির দু' খামের মাঝখানে সালাত আদায় করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাইতুল্লাহর দরজা তার পিছনে রেখেছিলেন এবং তার চেহারা ছিল বাইতুল্লাহ্য় প্রবেশকালে সামনে যে দেয়াল পড়ে সেদিকে। ইবন উমার বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কয় রাকাত সালাত আদায় করেছেন তা জিজ্ঞেস করতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আর যে স্থানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাত আদায় করেছিলেন সেখানে লাল বর্ণের মর্মর পাথর ছিল।

নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী হুয়াই-এর কন্যা সাফিয়া বিদায় হাজ্জের সময় ঋতুমতী হয়ে পড়েন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সে কি আমাদের (মদিনা প্রত্যাবর্তনে) বাধা হয়ে দাড়াল? তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তো তওয়াফে যিয়ারাহ্ করে নিয়েছেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তাহলে সেও রওয়ানা করুক।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকাবস্থায় আমরা বিদায় হাজ্জ সম্পর্কে আলোচনা করতাম। আর আমরা বিদায় হাজ্জ কাকে বলে তা জানতাম না। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা বর্ণনা করেন। তারপর তিনি মাসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেন এবং বলেন, আল্লাহ এমন কোন নবী প্রেরণ করেননি যিনি তার উম্মতকে (দাজ্জাল সম্পর্কে) সতর্ক করেননি। নূহ এবং তার পরবর্তী নবীগণও তাদের উম্মতগণকে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সে তোমাদের মধ্যে প্রকাশিত হবে। তার অবস্থা তোমাদের নিকট অপ্রকাশিত থাকবে না। তোমাদের কাছে এও অস্পষ্ট নয় যে, তোমাদের রব কানা নন। আর দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে। যেন তার চোখ একটি ফোলা আঙ্গুর।

তোমরা সতর্ক থাক। আজকের এ দিনের মত, এ শহরের মত এবং এ মাসের মতো আল্লাহ তাআলা তোমাদের রক্তকে ও তোমাদের সম্পদকে তোমাদের উপর হারাম করেছেন। বল তো, আমি কি আল্লাহর পয়গাম পৌছে দিয়েছি। সমবেত সকলে বললেন, হ্যা। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। এ কথা তিনবার বললেন, (তারপর বললেন), তোমাদের জন্য পরিতাপ অথবা তিনি বললেন, তোমাদের জন্য আফসোস, সতর্ক থেকো, আমার পরে তোমরা কুফরের দিকে ফিরে যেয়ো না যে, একে অন্যের গর্দান মারবে।

যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) ঊনিশটি যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। আর হিজরাতের পর তিনি হাজ্জ আদায় করেন মাত্র একটি হাজ্জে। এরপর তিনি আর কোন হাজ্জ আদায় করেননি এবং তা হল বিদায় হাজ্জ। আবূ ইসহাক বলেন, মক্কায় অবস্থানকালে তিনি আরেকটি হাজ্জ করেছিলেন।

জাবির হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) জারীর-কে বিদায় হাজ্জে বললেন, লোকজনকে চুপ থাকতে বল। তারপর বললেন, আমার ইন্তিকালের পর তোমরা কুফরীর দিকে ফিরে যেয়ো না যে, একে অন্যের গর্দান উড়াবে।

আবূ বাকরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সময় ও কাল আবর্তিত হয় নিজ চক্রে। যেদিন থেকে আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এক বছর হয় বার মাসে। এর মধ্যে চার মাস সম্মানিত। তিনমাস ক্রমান্বয়ে আসে-যেমন যিলকদ, যিলহাজ্জ ও মুহার্রম এবং রজব মুদার বা জমাদিউল আখির ও শাবান মাসের মাঝে হয়ে থাকে। (এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন) এটি কোন মাস? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-ই অধিক জানেন। এরপর তিনি চুপ থাকলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, হয়তো তিনি এ মাসের অন্য কোন নাম রাখবেন। (তারপর) তিনি বললেন, এ কি যিলহাজ্জ মাস নয়? আমরা বললামঃ হ্যা। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটি কোন শহর? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-ই অধিক জানেন। তারপর তিনি চুপ থাকলেন। আমরা ধারণা করলাম যে, হয়তো তিনি এ শহরের অন্য কোন নাম রাখবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি (মক্কা) শহর নয়? আমরা বললাম, হ্যা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এটি কোন দিন? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূল-ই ভাল জানেন। তারপর তিনি চুপ থাকলেন। এতে আমরা মনে করলাম যে, তিনি এ দিনটির অন্য কোন নামকরণ করবেন। তারপর তিনি বললেন, এটি কি কুরবানীর দিন নয়? আমরা বললাম, হ্যা। এরপর তিনি বললেন, তোমাদের রক্ত তোমাদের সম্পদ। রাবী মুহাম্মাদ বলেন, আমার ধারণা যে, তিনি আরও বলেছিলেন, তোমাদের মান-ইজ্জত- তোমাদের উপর পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিন, তোমাদের এই শহর ও তোমাদের এই মাস। তোমরা শীঘ্রই তোমাদের রবের সঙ্গে মিলিত হবে। তখন তিনি তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। খবরদার! তোমরা আমার ইন্তিকালের পরে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ো না যে, একে অন্যের গর্দান উড়াবে। শোন, তোমাদের উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তিকে আমার পয়গাম পৌছে দেবে। অনেক সময় যে প্রত্যক্ষভাবে শ্রবণ করেছে তার থেকেও তার মাধ্যমে খবর-পাওয়া ব্যক্তি অধিকতর সংরক্ষণকারী হয়ে থাকে। রাবী মুহাম্মাদ [ইবন সীরীন] যখনই এ হাদীস বর্ণনা করতেন তখন তিনি বলতেন-মুহাম্মাদ (ﷺ) সত্যই বলেছেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা শোন, আমি কি (আল্লাহর পায়গাম) পৌছিয়ে দিয়েছি? এভাবে দু'বার বললেন।

ত্বরিক ইবন শিহাব হতে বর্ণিত যে, একদল ইয়াহূদী বলল, যদি এ আয়াত আমাদের প্রতি অবতীর্ণ হত, তাহলে আমরা উক্ত অবতরণের দিনকে 'ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করতাম। তখন উমার তাদের জিজ্ঞেস করলেন, কোন আয়াত? তারা বলল, এই আয়াতঃ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন (জীবন-বিধান)-কে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামাত পরিপূর্ণ করলাম"- (আল-মায়িদাহ ৫/৩)। তখন উমার বললেন, কোন স্থানে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমি জানি। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরাফাহ্য় দন্ডায়মান অবস্থায় ছিলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (মদিনা মুনাওয়ারা থেকে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ উমরাহর ইহরাম বেধেছিলেন আর কেউ কেউ হাজ্জের ইহরাম, আবার কেউ কেউ হজ্জ ও উমরাহ উভয়ের ইহরাম বেধেছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাজ্জের ইহরাম বেধেছিলেন। যারা শুধু হাজ্জের ইহরাম বেধেছিলেন অথবা হাজ্জ ও উমরাহর ইহরাম একসঙ্গে বেধেছিলেন, তারা কুরবানীর দিনের পূর্বে হালাল হতে পারেননি। মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি উপরোক্ত হাদীসটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জকালীন সময়ে।

সাদ (ইবন আবূ ওয়াক্কাস) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বিদায় হাজ্জের সময় আমি বেদনার কারণে মরণ রোগে আক্রান্ত হলে নবী (ﷺ) আমাকে দেখতে এলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার রোগ যে মারাত্মক হয়ে গেছে তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন সম্পদশালী লোক কিন্তু আমার একমাত্র কন্যা ব্যতীত অন্য কোন উত্তরাধিকারী নেই। কাজেই আমি কি আমার সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ সদাকাহ করে দেব? তিনি বললেন, 'না'। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তবে কি আমি সম্পদের অর্ধেক সদাকাহ করে দেব? তিনি বললেন, 'না'। আমি বললাম, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ, তখন তিনি বললেন, এক-তৃতীয়াংশই ঢের। তুমি যদি তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় ছেড়ে যাও তবে তা তাদেরকে অভাবী অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম-যাতে তারা মানুষের কাছে হাত পেতে বেড়াবে। আর তুমি যা-ই আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্ত খরচ কর, তার বিনিময়ে তোমাকে প্রতিদান দেয়া হবে। এমনকি যে লোকমা তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে ধর তারও। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আমার সাথীদের পিছনে পড়ে থাকব? তিনি বললেন, তোমাকে কক্ষনো পেছনে ছেড়ে যাওয়া হবে না, আর (তুমি পিছনে পড়ে গেলেও) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে আমল করবে তা দ্বারা তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে ও সমুন্নত হবে। সম্ভবত তুমি আরো জীবিত থাকবে। ফলে তোমার দ্বারা এক সম্প্রদায় উপকৃত হবে। অন্য সম্প্রদায় (মুসলিমরা) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবীদের হিজরাত আপনি জারী রাখুন এবং তাদের পিছনের দিকে ফিরিয়ে দিবেন না। কিন্তু আফসোস সাদ ইবন খাওলা-এর জন্য, (রাবী বলেন) মক্কায় তার মৃত্যু হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মনে কষ্ট পেয়েছিলেন।

নাফি হতে বর্ণিত। ইবন উমার তাদেরকে অবহিত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হাজ্জে তার মাথা মুন্ডন করেছিলেন।

নাফি হতে বর্ণিত। ইবন উমার তাকে অবহিত করেন যে, বিদায় হাজ্জে নবী (ﷺ) এবং তার সাহাবীদের অনেকেই মাথা মুন্ডন করেন আর তাদের কেউ কেউ মাথার চুল ছেঁটে ফেলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি গাধায় চড়ে রওয়ানা হন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হাজ্জকালে মিনায় দাড়িয়ে লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তখন গাধাটি সালাতের একটি কাতারের সামনে এসে পড়ে। এরপর তিনি গাধার পিঠ থেকে নেমে পড়েন এবং তিনি লোকেদের সঙ্গে সালাতের কাতারে সামিল হন।

হিশামের পিতা [উরওয়াহ] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার উপস্থিতিতে উসামাহ নবী (ﷺ)-এর বিদায় হাজ্জের সওয়ারী চালনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে বললেন, মধ্যম গতিতে চলেছেন আবার প্রশস্ত পথ পেলে দ্রুতগতিতে চলেছেন।

আবূ আইয়ূব হতে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে বিদায় হাজ্জে (মুযদালিফায়) মাগরিব ও ঈশার সালাত এক সঙ্গে আদায় করেছেন।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার সাথীরা আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পাঠালেন তাদের জন্য পশুবাহন চাওয়ার জন্য। কারণ তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে কষ্টের যুদ্ধ তাবূকের যুদ্ধে যাচ্ছিলেন। অনন্তর আমি এসে বললাম, হে আল্লাহর নবী! আমার সাথীরা আমাকে আপনার কাছে এজন্য পাঠিয়েছেন যে, আপনি যেন তাদের জন্য পশুবাহনের ব্যবস্থা করেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য কোন সওয়ারীর ব্যবস্থা করতে পারব না। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি রাগান্বিত। (কিন্তু কী কারণে তিনি রাগান্বিত) তা বুঝলাম না। আর আমি নবী (ﷺ)-এর পশুবাহন না দেয়ার কারণে দুঃখিত মনে ফিরে আসি। আবার এ ভয়ও ছিল যে, নবী (ﷺ) না আমার উপরই অসন্তুষ্ট হন। তাই আমি সাথীদের কাছে ফিরে যাই এবং নবী (ﷺ) যা বলেছেন তা আমি তাদের জানাই। অল্পক্ষণ পরেই শুনতে পেলাম যে, বিলাল ডাকছেনঃ আবদুল্লাহ ইবন কায়স কোথায়? তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তখন তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপনাকে ডাকছেন, আপনি হাজির হোন। আমি যখন তার কাছে হাজির হলাম তখন তিনি বললেন, এই জোড়া এবং ঐ জোড়া এমনি ছয়টি উটনী যা সাদ থেকে ক্রয় করা হয়েছে, তা গ্রহণ কর এবং সেগুলো তোমার সাথীদের কাছে নিয়ে যাও এবং বল যে, আল্লাহ তাআলা (রাবীর সন্দেহ) অথবা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এগুলো তোমাদের যানবাহনের জন্য ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা এগুলোর উপর আরোহণ কর। যাতে তোমরা এমন ধারণা না কর যে, নবী (ﷺ) যা বলেননি আমি তা তোমাদের বর্ণনা করেছি। তখন তারা আমাকে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি আমাদের কাছে সত্যবাদী বলে পরিচিত। তবুও আপনি যা চান, আমরা অবশ্য করব। অনন্তর আবূ মূসা তাদের মধ্যকার একদল লোককে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হন এবং যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক অপারগতা প্রকাশ এবং পরে তাদেরকে দেয়ার কথা শুনেছিলেন, তাদের কাছে আসেন। তখন তারা সেরূপ কথাই বর্ণনা করলেন যেমন আবূ মূসা বর্ণনা করেছিলেন।

মুস'আব ইবন সাদ তার পিতা (আবূ ওয়াক্কাস) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবূক যুদ্ধাভিযানে রওয়ানা হন। আর আলী-কে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করেন। আলী বলেন, আপনি কি আমাকে শিশু ও মহিলাদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন। নবী (ﷺ) বললেন, তুমি কি এ কথায় রাযী নও যে, তুমি আমার কাছে সে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হারূন যে মর্যাদায় মূসার কাছে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, [হারূন নবী ছিলেন আর] আমার পরে কোন নবী নেই।

সফওয়ান-এর পিতা ইয়ালা ইবন উমাইয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কষ্টের (তাবূকের) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ইয়া'লা বলতেন যে, উক্ত যুদ্ধ আমার কাছে নির্ভরযোগ্য আমলের অন্যতম বলে বিবেচিত হত। আতা বলেন যে, সাফওয়ান বলেছেন, ইয়া'লা বর্ণনা করেন, আমার একজন দিনমজুর চাকর ছিল, সে একবার এক ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হল এবং এক পর্যায়ে একজন অন্যজনের হাত দাত দ্বারা কেটে ফেলল। আতা বলেন, আমাকে সাফওয়ান জানান যে, উভয়ের মধ্যে কে কার হাত দাত দ্বারা কেটে ছিল তার নাম আমি ভুলে গেছি। রাবী বলেন, আহত ব্যক্তি আহতকারীর মুখ থেকে নিজ হাত বের করার পর দেখা গেল, তার সম্মুখের একটি দাত উপড়ে গেছে। তারপর দু'জন নবী (ﷺ)-এর সমীপে আসল। তখন নবী (ﷺ) তার দাতের ক্ষতিপূরণের দাবি নাকোচ করে দিলেন। আতা বলেন যে, আমার ধারণা যে, বর্ণনাকারী এ কথাও বলেছেন যে, নবী (ﷺ) বলেন, তবে কি সে তার হাত তোমার মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দিবে? যেমন উটের মুখে চিবানোর জন্য ছেড়ে দেয়া হয়?

আবদুল্লাহ ইবন কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। কা'ব অন্ধ হয়ে গেলে তার সন্তানের মধ্য থেকে যিনি তার সাহায্যকারী ও পথপ্রদর্শনকারী ছিলেন, তিনি (আবদুল্লাহ্) বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক-কে বলতে শুনেছি, যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে তিনি পশ্চাতে থেকে যান তখনকার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যতগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তার মধ্যে তাবূক যুদ্ধ ব্যতীত আমি আর কোন যুদ্ধ থেকে পেছনে থাকিনি। তবে আমি বদর যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করিনি। কিন্তু উক্ত যুদ্ধ থেকে যারা পেছনে পড়ে গেছেন, তাদের কাউকে ভৎর্সনা করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেবল কুরাইশ দলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের এবং তাদের শত্রু বাহিনীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ সংঘটিত করেন। আর আকাবার রাতে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের থেকে ইসলামের উপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন, আমি তখন তার সঙ্গে ছিলাম। ফলে বদর প্রান্তরে উপস্থিত হওয়াকে আমি প্রিয়তর ও শ্রেষ্ঠতর বলে বিবেচনা করিনি। যদিও আকাবার ঘটনা অপেক্ষা লোকেদের মধ্যে বদরের ঘটনা বেশী মাশহুর ছিল। আর আমার অবস্থার বিবরণ এই-তাবূক যুদ্ধ থেকে আমি যখন পেছনে থাকি তখন আমি এত অধিক সুস্থ, শক্তিশালী ও সচ্ছল ছিলাম যে আল্লাহর কসম! আমার কাছে কখনো ইতোপূর্বে কোন যুদ্ধে একই সঙ্গে দু'টো যানবাহন জোগাড় করা সম্ভব হয়নি, যা আমি এ যুদ্ধের সময় জোগাড় করেছিলাম। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে অভিযান পরিচালনার সংকল্প গ্রহণ করতেন, বাহ্যত তার বিপরীত দেখাতেন। এ যুদ্ধ ছিল ভীষণ উত্তাপের সময়, অতি দূরের যাত্রা, বিশাল মরুভূমি এবং বহু শত্রুসেনার মোকাবালা করার। কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ অভিযানের অবস্থা এবং কোন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করতে যাবেন তাও মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করে দেন যাতে তারা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামান জোগাড় করতে পারে। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে মুসলিমের সংখ্যা অনেক ছিল এবং তাদের সংখ্যা কোন নথিপত্রেও হিসেব করে রাখা হতো না। কা'ব বলেন, যার ফলে যে কোন লোক যুদ্ধাভিযান থেকে বিরত থাকতে ইচ্ছা করলে তা সহজেই করতে পারত এবং ওয়াহী মারফত এ খবর না জানানো পর্যন্ত তা সংগোপন থাকবে বলে সে ধারণা করত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এমন সময় যখন ফল-মূল পাকার ও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়ার সময় ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বয়ং এবং তার সঙ্গী মুসলিম বাহিনী অভিযানে যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেলেন। আমিও প্রতি সকালে তাদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে পৌছতে পারিনি। মনে মনে ধারণা করতে থাকি, আমি তো যখন ইচ্ছা পারব। এই দোটানায় আমার সময় কেটে যেতে লাগল। এদিকে অন্য লোকেরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল। ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তার সাথী মুসলিমগণ রওয়ানা করলেন অথচ আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমি মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, এক দু'দিনের মধ্যে আমি প্রস্তুত হয়ে পরে তাদের সঙ্গে গিয়ে মিলব। এভাবে আমি প্রতিদিন বাড়ি হতে প্রস্তুতি নেয়ার উদ্দেশে বের হই, কিন্তু কিছু না করেই ফিরে আসি। আবার বের হই, আবার কিছু না করে ঘরে ফিরে আসি। ইত্যবসরে বাহিনী অগ্রসর হয়ে অনেক দূর চলে গেল। আর আমি রওয়ানা করে তাদের সঙ্গে রাস্তায় মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতে লাগলাম। আফসোস যদি আমি তাই করতাম! কিন্তু তা আমার ভাগ্যে জোটেনি। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রওয়ানা হওয়ার পর আমি লোকেদের মধ্যে বের হয়ে তাদের মাঝে বিচরণ করতাম। এ কথা আমার মনকে পীড়া দিত যে, আমি তখন (মদিনায়) মুনাফিক এবং দুর্বল ও অক্ষম লোক ব্যতীত অন্য কাউকে দেখতে পেতাম না। এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবূক পৌছার আগে পর্যন্ত আমার ব্যাপারে আলোচনা করেননি। অনন্তর তাবূকে এ কথা তিনি লোকেদের মাঝে বসে জিজ্ঞেস করে বসলেন, কা'ব কী করল? বানু সালামাহ গোত্রের এক লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তার ধন-সম্পদ ও অহঙ্কার তাকে আসতে দেয়নি। এ কথা শুনে মুআয ইবন জাবাল বললেন, তুমি যা বললে তা ঠিক নয়। হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহর কসম, আমরা তাকে উত্তম ব্যক্তি বলে জানি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নীরব রইলেন। কা'ব ইবন মালিক বলেন, আমি যখন জানতে পারলাম যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসছেন, তখন আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম এবং মিথ্যা ওজুহাত খুজতে থাকলাম। মনে স্থির করলাম, আগামীকাল এমন কথা বলব যাতে করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ক্রোধকে ঠান্ডা করতে পারি। আর এ সম্পর্কে আমার পরিবারস্থ জ্ঞানীগুণীদের থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে থাকি। এরপর যখন প্রচারিত হল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় এসে পৌছে যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর থেকে মিথ্যা দূর হয়ে গেল। আর মনে দৃঢ় প্রত্যয় হল যে, এমন কোন উপায়ে আমি তাকে কখনো ক্রোধমুক্ত করতে সক্ষম হব না, যাতে মিথ্যার লেশ থাকে। অতএব আমি মনে মনে স্থির করলাম যে, আমি সত্য কথাই বলব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সকাল বেলায় মদিনায় প্রবেশ করলেন। তিনি সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করে প্রথমে মসজিদে গিয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন, তারপর লোকদের সামনে বসতেন। যখন নবী (ﷺ) এরূপ করলেন, তখন যারা পশ্চাদপদ ছিলেন তারা তার কাছে এসে শপথ করে করে অপারগতা ও আপত্তি পেশ করতে লাগল। এরা সংখ্যায় আশির অধিক ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাহ্যত তাদের ওযর-আপত্তি গ্রহণ করলেন, তাদের বাই'আত করলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু তাদের অন্তরের অবস্থা আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলেন। [কা'ব বলেন] আমিও এরপর নবী (ﷺ)-এর সামনে হাজির হলাম। আমি যখন তাকে সালাম দিলাম তখন তিনি রাগান্বিত চেহারায় মুচকি হাসি হাসলেন। তারপর বললেন, এসো। আমি সে মতে এগিয়ে গিয়ে একেবারে তার সম্মুখে বসে গেলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে তুমি অংশগ্রহণ করলে না? তুমি কি যানবাহন ক্রয় করনি? তখন আমি বললাম, হ্যা, করেছি। আল্লাহর কসম! এ কথা সুনিশ্চিত যে, আমি যদি আপনি ব্যতীত দুনিয়ার অন্য কোন ব্যক্তির সামনে বসতাম তাহলে আমি তার অসন্তুষ্টিকে ওযর-আপত্তি পেশের মাধ্যমে ঠান্ডা করার চেষ্টা করতাম। আর আমি তর্কে পটু। কিন্তু আল্লাহর কসম আমি পরিজ্ঞাত যে, আজ যদি আমি আপনার কাছে মিথ্যা কথা বলে আমার প্রতি আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি তাহলে শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করে দিতে পারেন। আর যদি আপনার কাছে সত্য প্রকাশ করি যাতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবুও আমি এতে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার অবশ্যই আশা করি। না, আল্লাহর কসম, আমার কোন ওযর ছিল না। আল্লাহর কসম! সেই যুদ্ধে আপনার সঙ্গে না যাওয়ার সময় আমি সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সে সত্য কথাই বলেছে। তুমি এখন চলে যাও, যতদিনে না তোমার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ফায়সালা করে দেন। তাই আমি উঠে চলে গেলাম। তখন বানী সালিমার কতিপয় লোক আমার অনুসরণ করল। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! তুমি ইতোপূর্বে কোন পাপ করেছ বলে আমাদের জানা নেই; তুমি (তাবূক যুদ্ধে) অংশগ্রহণ হতে বিরত অন্যান্যদের মতো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে একটি ওযর পেশ করে দিতে পারতে না? আর তোমার এ অপরাধের কারণে তোমার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ক্ষমা প্রার্থনাই তো যথেষ্ট ছিল। আল্লাহর কসম! তারা আমাকে বারবার কঠিনভাবে ভৎর্সনা করতে থাকে। ফলে আমি পূর্ব স্বীকারোক্তি থেকে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলার বিষয়ে মনে মনে চিন্তা করতে থাকি। এরপর আমি তাদের বললাম, আমার মতো এ কাজ আর কেউ করেছে কি? তারা জওয়াব দিল, হ্যা, আরও দু'জন তোমার মতো বলেছে এবং তাদের ব্যাপারেও তোমার মতো একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, তারা কে কে? তারা বলল, একজন মুরারা ইবন রবী আমরী এবং অপরজন হলেন, হিলাল ইবন উমাইয়াহ ওয়াকিফী। এরপর তারা আমাকে জানালো যে, তারা উভয়ে উত্তম মানুষ এবং তারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সেজন্য দু'জনেই আদর্শস্থানীয়। যখন তারা তাদের নাম উল্লেখ করল, তখন আমি পূর্ব মতের উপর অটল রইলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের মধ্যকার যে তিনজন তাবূকে অংশগ্রহণ হতে বিরত ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলতে মুসলিমদের নিষেধ করে দিলেন। তদনুসারে মুসলিমরা আমাদের এড়িয়ে চলল। আমাদের প্রতি তাদের আচরণ বদলে ফেলল। এমনকি এ দেশ যেন আমাদের কাছে অপরিচিত হয়ে গেল। এ অবস্থায় আমরা পঞ্চাশ রাত অতিবাহিত করলাম। আমার অপর দু'জন সাথী তো সংকটে ও শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হলেন। তারা নিজেদের ঘরে বসে বসে কাঁদতে থাকেন। আর আমি যেহেতু অধিকতর যুবক ও শক্তিশালী ছিলাম তাই বাইরে বের হতাম, মুসলিমদের জামা'আতে সালাত আদায় করতাম, বাজারে চলাফেরা করতাম কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে হাযির হয়ে তাকে সালাম দিতাম। যখন তিনি সালাত শেষে মজলিসে বসতেন তখন আমি মনে মনে বলতাম ও লক্ষ্য করতাম, তিনি আমার সালামের জবাবে তার ঠোঁটদ্বয় নেড়েছেন কি না। তারপর আমি তার কাছাকাছি জায়গায় সালাত আদায় করতাম এবং গোপন দৃষ্টিতে তার দিকে দেখতাম যে, আমি যখন সালাতে মগ্ন হতাম তখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি দিতেন, আর যখন আমি তার দিকে তাকাতাম তখন তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে আমার প্রতি মানুষদের কঠোরতা ও এড়িয়ে চলা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। একদা আমি আমার চাচাত ভাই ও প্রিয় বন্ধু আবূ ক্বাতাদাহ-এর বাগানের প্রাচীর টপকে ঢুকে পড়ে তাকে সালাম দেই। কিন্তু আল্লাহর কসম তিনি আমার সালামের জওয়াব দিলেন না। আমি তখন বললাম, হে আবূ ক্বাতাদাহ! আপনাকে আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আপনি কি জানেন যে, আমি আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-কে ভালবাসি? তখন তিনি নীরবতা পালন করলেন। আমি পুনরায় তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি এবারও কোন জবাব দিলেন না। আমি আবারো তাকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-ই ভাল জানেন। তখন আমার চোখদ্বয় থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। আমি আবার প্রাচীর টপকে ফিরে এলাম। কা'ব বলেন, একদা আমি মদিনার বাজারে হাটছিলাম। তখন সিরিয়ার এক বণিক যে মদিনার বাজারে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করার উদ্দেশে এসেছিল, সে বলছে, আমাকে কা'ব ইবন মালিককে কেউ পরিচয় করে দিতে পারে কি? তখন লোকেরা তাকে আমার প্রতি ইশারা করে দেখিয়ে দিল। তখন সে এসে গাস্সানি বাদশার একটি পত্র আমার কাছে হস্তান্তর করল। তাতে লেখা ছিল, পর সমাচার এই, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার সাথী আপনার প্রতি জুলুম করেছে। আর আল্লাহ আপনাকে মর্যাদাহীন ও নিরাশ্রয় সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের দেশে চলে আসুন, আমরা আপনার সাহায্য-সহানুভূতি করব। আমি যখন এ পত্র পড়লাম তখন আমি বললাম, এটাও আর একটি পরীক্ষা। তখন আমি চুলা খুজে তার মধ্যে পত্রটি নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম। এ সময় পঞ্চাশ দিনের চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে এক সংবাদবাহক আমার কাছে এসে বলল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি আপনার স্ত্রী হতে পৃথক থাকবেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি তাকে তালাক দিয়ে দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি উত্তর দিলেন, তালাক দিতে হবে না বরং তার থেকে পৃথক থাকুন এবং তার নিকটবর্তী হবেন না। আমার অপর দু'জন সঙ্গীর প্রতি একই আদেশ পৌছালেন। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি তোমার পিত্রালয়ে চলে যাও। আমার সম্পর্কে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত তুমি সেখানে থাক। কা'ব বলেন, আমার সঙ্গী হিলাল ইবন উমাইয়্যার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! হিলাল ইবন উমাইয়্যা অতি বৃদ্ধ, এমন বৃদ্ধ যে, তার কোন খাদিম নেই। আমি তার খেদমত করি, এটা কি আপনি অপছন্দ করেন? নবী (ﷺ) বললেন, না, তবে সে তোমার বিছানায় আসতে পারবে না। সে বলল, আল্লাহর কসম! এ সম্পর্কে তার কোন অনুভূতিই নেই। আল্লাহর কসম! তিনি এ নির্দেশ পাওয়ার পর থেকে সর্বদা কান্নাকাটি করছেন। [কা'ব বলেন] আমার পরিবারের কেউ আমাকে পরামর্শ দিল যে, আপনিও যদি আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে অনুমতি চাইতেন যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিলাল ইবন উমায়্যার স্ত্রীকে তার (স্বামীর) খিদমাত করার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি কখনো তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে অনুমতি চাইব না। আমি যদি তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অনুমতি চাই তবে তিনি কী বলেন, তা আমার জানা নেই। আমি তো নিজেই আমার খিদমতে সক্ষম। এরপর আরও দশরাত কাটালাম। এভাবে নবী (ﷺ) যখন থেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেন তখন থেকে পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হল। এরপর আমি পঞ্চাশতম রাত শেষে ফজরের সালাত আদায় করলাম এবং আমাদের এক ঘরের ছাদে এমন অবস্থায় বসে ছিলাম যে অবস্থার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা (কুরআনে) বর্ণনা করেছেন। আমার জান-প্রাণ দুর্বিষহ এবং গোটা জগৎটা যেন আমার জন্য প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বে সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় শুনতে পেলাম এক চীৎকারকারীর চীৎকার। সে সালা পর্বতের উপর চড়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করছে, হে কা'ব ইবন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ করুন কা'ব বলেন, এ শব্দ আমার কানে পৌছামাত্র আমি সিজদায় পড়ে গেলাম। আর আমি বুঝলাম যে, আমার সুদিন ও খুশীর খবর এসেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফজরের সালাত আদায়ের পর আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আমাদের তওবা কবূল হওয়ার সুসংবাদ প্রকাশ করেন। তখন লোকেরা আমার এবং আমার সঙ্গীদ্বয়ের কাছে সুসংবাদ দিতে থাকে এবং তড়িঘড়ি একজন অশ্বারোহী আমার কাছে আসে এবং আসলাম গোত্রের অপর এক ব্যক্তি দ্রুত আগমন করে পর্বতের উপর আরোহণ করতঃ চীৎকার দিতে থাকে। তার চীৎকারের শব্দ ঘোড়া অপেক্ষাও দ্রুত পৌছল। যার শব্দ আমি শুনেছিলাম সে যখন আমার কাছে সুসংবাদ প্রদান করতে আসল, তখন আমাকে সুসংবাদ প্রদান করার শুকরিয়া স্বরূপ আমার নিজের পরনের কাপড় দু'টো খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ সে সময় ঐ দু'টো কাপড় ব্যতীত আমার কাছে আর কোন কাপড় ছিল না। ফলে আমি দু'টো কাপড় ধার করে পরিধান করলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে রওয়ানা হলাম। লোকেরা দলে দলে আমাকে ধন্যবাদ জানাতে আসলে লাগল। তারা তওবা কবূলের মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। তারা বলছিল, তোমাকে মুবারাকবাদ যে আল্লাহ তাআলা তোমার তওবা কবূল করেছেন। কা'ব বলেন, অবশেষে আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে বসা ছিলেন এবং তার চতষ্পার্শ্বে জনতার সমাবেশ ছিল। ত্বলহা ইবন উবাইদুল্লাহ দ্রুত উঠে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন ও মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর কসম! তিনি ব্যতীত আর কোন মুহাজির আমার জন্য দাড়াননি। আমি ত্বলহার ব্যবহার ভুলতে পারব না। কা'ব বলেন, এরপর আমি যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সালাম জানালাম, তখন তার চেহারা আনন্দের আতিশয্যে ঝকঝক করছিল। তিনি আমাকে বললেন, তোমার মাতা তোমাকে জন্মদানের দিন হতে যতদিন তোমার উপর অতিবাহিত হয়েছে তার মধ্যে উৎকৃষ্ট ও উত্তম দিনের সুসংবাদ গ্রহণ কর। কা'ব বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এটা কি আপনার পক্ষ থেকে না আল্লাহর পক্ষ থেকে? তিনি বললেন, আমার পক্ষ থেকে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন খুশী হতেন তখন তার চেহারা এত উজ্জ্বল ও ঝলমলে হত যেন পূর্ণিমার চাঁদের ফালি। এতে আমরা তার সন্তুষ্টি বুঝতে পারতাম। আমি যখন তার সম্মুখে বসলাম তখন আমি নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার তওবা কবূলের শুকরিয়া স্বরূপ আমার ধন-সম্পদ আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর পথে দান করতে চাই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার কিছু মাল তোমার কাছে রেখে দাও। তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, খাইবারে অবস্থিত আমার অংশটি আমার জন্য রাখলাম। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আল্লাহ তাআলা সত্য বলার কারণে আমাকে রক্ষা করেছেন, তাই আমার তওবা কবূলের নিদর্শন ঠিক রাখতে আমার বাকী জীবনে সত্যই বলব। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি এ সত্য বলার কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে জানিয়েছি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার জানা মতে কোন মুসলিমকে সত্য কথার বিনিময়ে এরূপ নিয়ামত আল্লাহ দান করেননি যে নিয়ামত আমাকে দান করেছেন। [কা'ব বলেন] যেদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মুখে সত্য কথা বলেছি সেদিন হতে আজ পর্যন্ত অন্তরে মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। আমি আশা পোষণ করি যে, বাকী জীবনও আল্লাহ তাআলা আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর এই আয়াত অবতীর্ণ করেন আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবী (ﷺ)-এর প্রতি এবং মুহাজিরদের প্রতি এবং তোমরা সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও- (আত্তওবাহ ৯/১১৭-১১৭)। [কা'ব বলেন] আল্লাহর শপথ! ইসলাম গ্রহণের পর থেকে কখনো আমার উপর এত উৎকৃষ্ট নিয়ামত আল্লাহ প্রদান করেননি যা আমার কাছে শ্রেষ্ঠতর, তা হল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আমার সত্য বলা ও তার সঙ্গে মিথ্যা না বলা, যদি মিথ্যা বলতাম তবে মিথ্যাচারীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম। সেই মিথ্যাচারীদের সম্পর্কে যখন ওয়াহী অবতীর্ণ হয়েছে তখন জঘন্য অন্তরের সেই লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ তোমরা তাদের নিকট ফিরে আসলে তারা আল্লাহর শপথ করবে ... আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়ের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না- (আত-তাওবাহ ৯/৯৫-৯৬)। কা'ব বলেন, আমাদের তিনজনের তওবা কবূল করতে বিলম্ব করা হয়েছে-যাদের তওবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কবূল করেছেন যখন তারা তার কাছে শপথ করেছে, তিনি তাদের বাই'আত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। আমাদের বিষয়টি আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্থগিত রেখেছেন। এর প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন- সেই তিনজনের প্রতিও যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল- (আত্তওবাহ ৯/১১৮)। কুরআনের এই আয়াতে তাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়নি যারা তাবূক যুদ্ধ থেকে পিছনে ছিল ও মিথ্যা কসম করে ওযর-আপত্তি জানিয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও তা গ্রহণ করেছিলেন। বরং এই আয়াতে তাদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে আমরা যারা পেছনে ছিলাম এবং যাদের প্রতি সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ) (সামূদ গোত্রের) হিজর বস্তি অতিক্রম করেন, তখন তিনি বললেন, যারা নিজ আত্মার উপর অত্যাচার করেছিল তাদের আবাসস্থলে কান্নাকাটি ব্যতীত প্রবেশ কর না যাতে তোমাদের প্রতি শাস্তি নিপতিত না হয় যা তাদের প্রতি নিপতিত হয়েছিল। তারপর তিনি তার মস্তক আবৃত করলেন এবং অতি দ্রুতবেগে চলে উক্ত উপত্যকা অতিক্রম করলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজ্র নামক স্থান দিয়ে অতিক্রমকালে তার সঙ্গীদের বললেন, তোমরা ঐ শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে কান্নাকাটি ছাড়া প্রবেশ কর না-যাতে তোমাদের উপরও সেরূপ বিপদ আপতিত না হয় যা তাদের উপর আপতিত হয়েছিল।

মুগীরাহ ইবন শুবাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) কোন প্রয়োজনে বাহিরে গেলেন। (ফিরে এলে) আমি দাড়িয়ে তার পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। স্থানটি আমার স্মরণ নেই। তবে তা ছিল তাবূক যুদ্ধের সময়কার। এরপর তিনি তার চেহারা ধৌত করলেন এবং তার বাহুদ্বয় ধৌত করতে গেলে দেখা গেল যে, তার জামার আস্তিন আটসাঁট। তখন তিনি দুই বাহুকে জামার ভিতর থেকে বের করে আনলেন এবং তা ধৌত করলেন। তারপর তিনি তার দুই মোজার উপর মাসাহ করলেন।

আবূ হুমায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে তাবূক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে মদিনার নিকটবর্তী হলে তিনি বললেন, এই ত্বাবা (পবিত্র) এবং এই উহূদ পর্বত আমাদের ভালবাসে আর আমরাও তাকে ভালবাসি।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবূক যুদ্ধ থেকে ফিরে মদিনার নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি বললেন, মদিনাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে যে তোমরা এমন কোন দূরপথ ভ্রমণ করনি এবং এমন কোন উপত্যকা অতিক্রম করনি যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। সহাবায়ে কিরাম (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তারা তো মদিনাতে ছিল। তখন তিনি বললেন, তারা মদিনাতেই ছিল তবে যথার্থ ওযর তাদের আটকে রেখেছিল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন হুযাফাহ সাহমী-কে তার পত্রসহ কিসরার নিকট পাঠান। নবী (ﷺ) তাকে এ নির্দেশ দেন যে, সে যেন পত্রখানা প্রথমে বাহরাইনের শাসকের কাছে দেয় এবং পরে বাহরাইনের শাসক যেন কিসরার হাতে পত্রটি পৌছিয়ে দেয়। কিসরা যখন পত্রখানা পড়ল, তখন তা ছিঁড়ে টুকরা করে ফেলল। (রাবী বলেন) আমার যতদূর মনে পড়ে ইবন মুসাইয়াব বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের প্রতি এ বলে বদদোয়া করেন, আল্লাহ তাদেরকেও সম্পূর্ণরূপে টুকরো টুকরো করে দিন।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শ্রুত একটি বাণীর দ্বারা আল্লাহ জঙ্গে জামালের (উষ্ট্রের যুদ্ধ) দিন আমার মহা উপকার করেছেন, যে সময় আমি সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে মিলিত হয়ে জামাল যুদ্ধে শারীক হতে প্রায় প্রস্তুত হয়েছিলাম। আবূ বাকরাহ বলেন, সে বাণীটি হল, যখন নবী (ﷺ)-এর কাছে এ খবর পৌছল যে, পারস্যবাসী কিসরা কন্যাকে তাদের বাদশাহ মনোনীত করেছেন, তখন তিনি বললেন, সে জাতি কক্ষনো সফল হবে না স্ত্রীলোক যাদের প্রশাসক হয়।

সায়েব ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার এখনও মনে পড়ছে আমি মদিনার ছেলেদের সঙ্গে সানিয়্যাতুল বিদায়ে নবী (ﷺ)-কে স্বাগত জানাতে গিয়েছিলাম।

সায়েব (ইবন ইয়াযীদ) হতে বর্ণিত, আমার মনে পড়ে যে, সানিয়্যাতুল বিদায়ে নবী (ﷺ)-কে স্বাগত জানাতে মদিনার ছেলেদের সঙ্গে গিয়েছিলাম, যখন নবী (ﷺ) তাবূক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন।

ইউনুস ... যুহরী ও উরওয়াহ সূত্রে বলেন, আয়িশাহ বলেছেন, নবী (ﷺ) যে রোগে ইন্তিকাল করেন সে সময় তিনি বলতেন, হে আয়িশাহ! আমি খাইবারে (বিষযুক্ত) যে খাবার খেয়েছিলাম আমি সর্বদা তার যন্ত্রণা অনুভব করছি। আর এখন মনে হচ্ছে সে বিষক্রিয়ার ফলে আমার শিরাগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে।

উম আল-ফাদল বিনতে আল-হারিস থেকে বর্ণিত: আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে মাগরিবের নামাযে সূরা-আল-মুরসালাত উরফান (৭৭) পাঠ করতে শুনেছি এবং সেই সালাতের পর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কোন সালাতে ইমামতি করেননি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব ইবন আব্বাস-কে তার কাছে বসাতেন। এতে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ তাকে বললেন, আমাদেরও তো ইবন আব্বাস-এর বয়সী ছেলেপুলে আছে! তখন উমার বললেন, সে কেমন মর্যাদার লোক তা তো আপনারাও জানেন। এরপর উমার ইবন আব্বাস-কে "কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে এবং মক্কা বিজয়..." (110.1) এই আয়াতের মর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি বললেন, এটা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তিকালের খবর। তখন উমার বললেন, এ থেকে তুমি যা (অর্থ) বুঝেছ আমিও তাই বুঝেছি।

সাঈদ ইবন জুবাইর থেকে বণিত, তিনি বলেন, ইবন আব্বাস বললেন, বৃহস্পতিবার! বৃহস্পতিবারের ঘটনা কী? নবী (ﷺ)-এর রোগ-জ্বালা প্রবল হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার কাছে এসো, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দিয়ে যাই যাতে তোমরা এরপর কখনও বিভ্রান্ত না হও। তখন তারা পরস্পর মতভেদ করতে থাকে। অথচ নবী (ﷺ)-এর সান্নিধ্যে মতভেদ করা শোভনীয় নয়। এরপর কিছু সংখ্যক লোক বললেন, নবী (ﷺ)-এর অবস্থা কেমন? তিনি কি বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন? তোমরা তার কাছে থেকে বিষয়টি জেনে নাও। এতে তারা নবী (ﷺ)-এর কাছে ব্যাপারটি আবার উত্থাপন করল। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দাও, তোমরা যে কাজের দিকে আমাকে ডাকছ তার চেয়ে আমি ভাল অবস্থায় অবস্থান আছি। আর নবী (ﷺ) তাদের তিনটি ওয়াসীয়াত করলেন- (১) আরব উপদ্বীপ থেকে মুশরিকদের বহিষ্কার করে দিবে, (২) দূতদের সেরূপ সমাদর করবে যেমন আমি করতাম এবং তৃতীয়টি বলা থেকে তিনি চুপ থাকলেন অথবা বর্ণনাকারী বলেন, তৃতীয়টি আমি ভুলে গেছি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাতের সময় যখন ঘনিয়ে এলো এবং ঘরে ছিল লোকের সমাবেশ, তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা এসো, আমি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দেই, যেন তোমরা পরবর্তীতে পথভ্রষ্ট না হয়ে যাও। তখন তাদের মধ্যকার কিছুলোক বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রোগ-যন্ত্রণা কঠিন হয়ে গেছে, আর তোমাদের কাছে তো কুরআন মওজুদ আছে। আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এ ব্যাপারে নবী (ﷺ)-এর পরিবারের লোকজনের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয় এবং তারা পরস্পর বাক-বিতন্ডা করতে থাকেন। তাদের কেউ বললেন, তোমরা তার নিকট যাও, তিনি তোমাদের জন্য কিছু লিখে দিবেন। যাতে তোমরা তার পরে কোন বিভ্রান্তিতে না পড়। আবার কেউ বললেন অন্য কথা। বাক-বিতন্ডা ও মতভেদ যখন চরমে পৌছল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা উঠে চলে যাও। উবাইদুল্লাহ বলেন, ইবন আব্বাস বলতেন, এ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীগণের জন্য কিছু লিখে দেয়ার ব্যাপারে তাদের মতবিরোধ ও চেঁচামেচিই মূলত প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মৃত্যু-রোগকালে ফাতিমা-কে ডেকে আনলেন এবং চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন ফাতেমাহ কেঁদে ফেললেন; এরপর নবী (ﷺ) পুনরায় তাকে ডেকে চুপে চুপে কিছু বললেন, তখন হাসলেন। আমরা এ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, নবী (ﷺ) যে রোগে আক্রান্ত আছেন এ রোগেই তার ইন্তিকাল হবে এ কথাই তিনি গোপনে আমাকে বলেছেন। তখন আমি কাঁদলাম। আবার তিনি আমাকে চুপে চুপে বললেন, তার পরিজনের মধ্যে সর্বপ্রথম আমিই তার সঙ্গে মিলিত হব, তখন আমি হাসলাম।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৩৩)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এ কথা শুনেছিলাম যে, কোন নবী মারা যান না যতক্ষণ না তাকে বলা হয় দুনিয়া বা আখিরাতের একটি বেছে নিতে। যে রোগে নবী (ﷺ) ইন্তিকাল করেন সে রোগে আমি নবী (ﷺ)-কে যন্ত্রণায় কাতর অবস্থায় বলতে শুনেছি, তাদের সঙ্গে যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা নিয়ামাত প্রদান করেছেন- [তারা হলেন- নবী-গণ, সিদ্দীকগণ এবং শাহীদগণ] (আন-নিসা ৪/৬৯)। তখন আমি ধারণা করলাম যে, তাকেও একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখন তার মারাত্মক অসুস্থতায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বলতে লাগলেন, "সর্বোচ্চ সঙ্গীর সাথে।"

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সুস্থাবস্থায় বলতেন, জান্নাতে তার স্থান দেখানো ব্যতীত কোন নবী-এর প্রাণ কখনো কবজ করা হয়নি। তারপর তাকে জীবন বা মৃত্যু একটি গ্রহণ করতে বলা হয়। এরপর যখন নবী (ﷺ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তার মাথা আয়িশাহ-এর উরুতে রাখাবস্থায় তার জান কবজের সময় উপস্থিত হল তখন তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে গেলেন। এরপর যখন তিনি সংজ্ঞা ফিরে পেলেন তখন তিনি ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আল্লাহ! উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই)। অনন্তর আমি বললাম, তিনি আর আমাদের মাঝে থাকতে চাচ্ছেন না। এরপর আমি উপলব্ধি করলাম যে, এটা হচ্ছে ঐ কথা যা তিনি আমাদের কাছে সুস্থাবস্থায় বর্ণনা করতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর নবী (ﷺ)-এর কাছে এলেন। তখন আমি নবী (ﷺ)-কে আমার বুকে হেলান দেয়া অবস্থায় রেখেছিলাম এবং আবদুর রহমানের হাতে তাজা মিসওয়াকের ডাল ছিল যা দিয়ে সে দাত পরিষ্কার করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। আমি মিসওয়াকটি নিলাম এবং তা চিবিয়ে নরম করলাম। তারপর তা নবী (ﷺ)-কে দিলাম। তখন নবী (ﷺ) তা দিয়ে দাত মর্দন করলেন। আমি তাকে এর পূর্বে এত সুন্দরভাবে মিসওয়াক করতে আর কখনও দেখিনি। এ থেকে অবসর হয়েই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার উভয় হাত অথবা আঙ্গুল উপরে উঠিয়ে তিনবার বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই) তারপর তিনি ইন্তিকাল করলেন। আয়িশাহ বলতেন, নবী (ﷺ) আমার বুক ও থুতনির মাঝে ইন্তিকাল করেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসুস্থ হয়ে পড়তেন তখন তিনি আশ্রয় প্রার্থনার দুই সূরাহ (ফালাক ও নাস) পাঠ করে নিজ দেহে ফুক দিতেন এবং স্বীয় হাত দ্বারা শরীর মাসাহ করতেন। এরপর যখন মৃত্যু-রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন আমি আশ্রয় প্রার্থনার সূরাহ দু'টি দিয়ে তার শরীরে ফু দিতাম, যা দিয়ে তিনি ফু দিতেন। আর আমি তার হাত দ্বারা তার শরীর মাসাহ করিয়ে দিতাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পূর্বে যখন তার পিঠ আমার উপর হেলান দেয়া অবস্থায় ছিল, তখন আমি কান ঝুকিয়ে দিয়ে নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার উপর রহম করুন এবং মহান বন্ধুর সঙ্গে আমাকে মিলিত করুন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তার সেই রোগাবস্থায় যাথেকে তিনি আর সেরে উঠেননি- বলেন, ইয়াহূদীদের প্রতি আল্লাহ লানত করেছেন। তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরগুলোকে সিজদার জায়গা করে নিয়েছে। আয়িশাহ মন্তব্য করেন, তা না হলে তবে তার কবরকেও সিজদার জায়গা বানানোর আশঙ্কা ছিল।

নবী সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রোগ প্রবল হল ও ব্যথা বেড়ে গেল, তখন তিনি আমার ঘরে সেবা-শুশ্রূষা পাওয়ার ব্যাপারে তার স্ত্রীগণের নিকট অনুমতি চাইলেন। তারা অনুমতি দিলেন। তারপর তিনি (ﷺ) ঘর থেকে বের হয়ে ইবন আব্বাস ও অপর একজন সাহাবীর মাঝে যমীনের উপর পা হিঁচড়ে চলতে লাগলেন। উবাইদুল্লাহ বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস-কে আয়িশাহ কথিত ব্যক্তি সম্পর্কে জানালাম, তখন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আমাকে বললেন, তুমি কি সেই অন্য ব্যক্তিকে জান যার নাম আয়িশাহ উল্লেখ করেননি? আমি বললাম, না। ইবন আব্বাস বললেন, তিনি হলেন আলী। নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ বর্ণনা করতেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তার ব্যথা বেড়ে গেল, তখন তিনি বললেন, তোমরা এমন সাত মশক যার মুখ এখনও খোলা হয়নি, তা থেকে আমার শরীরে পানি ঢেলে দাও। যেন আমি (সুস্থ হয়ে) লোকদের নাসীহাত দিতে পারি। এরপর আমরা তাকে নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী হাফসাহ-এর একটি বড় গামলায় বসালাম। তারপর আমরা উক্ত মশক হতে তার উপর ততক্ষণ পর্যন্ত পানি ঢালতে লাগলাম যতক্ষণ না তিনি তার হাত দ্বারা আমাদের ইশারা করে জানালেন যে, তোমরা তোমাদের কাজ পুরা করেছ। আয়িশাহ বলেন, তারপর নবী (ﷺ) লোকদের কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে জামা'আতে সালাত আদায় করলেন এবং তাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন।

উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন উতবাহ আমাকে জানালেন যে, আয়িশাহ ও আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস উভয়ে বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রোগ-যাতনায় অস্থির হতেন তখন তিনি তার কালো চাদর দিয়ে নিজ মুখমন্ডল ঢেকে রাখতেন। আবার যখন জ্বরের উষ্ণতা কমত তখন মুখমন্ডল থেকে চাদর সরিয়ে ফেলতেন। রাবী বলেন, এরূপ অবস্থায়ও তিনি বলতেন, ইয়াহূদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর লানত, তারা তাদের নবীদের (নবীদের) কবরকে মাসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। তাদের কৃতকর্ম থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৪৩)।

উবাইদুল্লাহ বলেন যে, আয়িশাহ বলেন, আমি আবূ বাকর-এর ইমামতের ব্যাপারে নবী (ﷺ)-এর নিকট বারবার আপত্তি করেছি। আর আমার তার কাছে বারবার আপত্তি করার কারণ ছিল এই, আমার অন্তরে এ কথা আসেনি যে, নবী (ﷺ)-এর পরে তার স্থলে কেউ দাড়ালে লোকেরা তাকে পছন্দ করবে। বরং আমি মনে করতাম যে, কেউ তার স্থলে দাড়ালে লোকেরা তার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করবে, তাই আমি ইচ্ছা করলাম যে, নবী (ﷺ) এ দায়িত্ব আবূ বাকর-এর পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রদান করুন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইন্তিকাল করার সময় আমার বুক ও থুতনির মাঝে ছিলেন। আর নবী (ﷺ)-এর (মৃত্যু-যন্ত্রণার) পর আমি আর কারো জন্য মৃত্যু-যন্ত্রণাকে খারাপ মনে করি না।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, আলী ইবন আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ হতে বের হয়ে আসেন যখন তিনি মৃত্যুরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তখন সাহাবীগণ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবুল হাসান! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আজ কেমন আছেন? তিনি বললেন, আল্-হাম্দুলিল্লাহ, তিনি কিছুটা সুস্থ। তখন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব তার হাত ধরে তাকে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি তিন দিন পরে হবে লাঠির দাস। আল্লাহর শপথ! আমি মনে করি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই রোগে অচিরেই ইনতিকাল করবেন। কারণ, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশের অনেকের মৃত্যুকালীন অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছি। চল যাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এবং তাকে জিজ্ঞেস করি যে, তিনি (নেতৃত্বের) দায়িত্ব কার উপর ন্যস্ত করে যাচ্ছেন। যদি আমাদের মধ্যে থাকে তো তা আমরা জানব। আর যদি আমাদের ব্যতীত অন্যদের উপর ন্যস্ত করে যান, তাহলে তাও আমরা জানতে পারব এবং তিনি অসীয়াত করে যাবেন। তখন আলী বললেন, আল্লাহর কসম! যদি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমরা জিজ্ঞেস করি আর তিনি আমাদের নিষেধ করে দেন, তবে তারপরে লোকেরা আর আমাদের তা প্রদান করবে না। আল্লাহর কসম! আমি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করব না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। সোমবারে সাহাবীগণ ফজরের সালাতে ছিলেন। আর আবূ বাকর তাদের সালাতের ইমামত করছিলেন। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়িশাহ-এর হুজরার পর্দা উঠিয়ে তাদের দিকে দেখলেন। সাহাবীগণ কাতারবন্দী অবস্থায় সালাতে ছিলেন। তখন নবী (ﷺ) মুচকি হাসি দিলেন। আবূ বাকর মুক্তাদীর সারিতে পিছিয়ে আসতে মনস্থ করলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে সালাত আদায়ের জন্য বের হওয়ার ইচ্ছা করছেন। আনাস বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর (আগমনের) আনন্দে সাহাবীগণের সালাত ভঙ্গের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাতের ইশারায় তাদের সালাত পূর্ণ করতে বললেন। তারপর তিনি হুজরায় প্রবেশ করলেন ও পর্দা টেনে দিলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি প্রায়ই বলতেন, আমার প্রতি আল্লাহর এটা নিয়ামাত যে, আমার ঘরে, আমার পালার দিনে এবং আমার গন্ড ও সিনার মাঝে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তিকাল হয় এবং আল্লাহ তাআলা তার ইন্তিকালের সময় আমার থুথু তার থুথুর সঙ্গে মিশ্রিত করে দেন। এ সময় আবদুর রহমান আমার নিকট প্রবেশ করে এবং তার হাতে মিসওয়াক ছিল। আর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে (আমার বুকে) হেলান অবস্থায় রেখেছিলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, তিনি আবদুর রহমানের দিকে তাকাচ্ছেন। আমি বুঝলাম যে, নবী (ﷺ) মিসওয়াক চাচ্ছেন। আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি আপনার জন্য মিসওয়াক নিব? তিনি মাথা নাড়িয়ে জানালেন যে, হ্যা। তখন আমি মিসওয়াকটি নিলাম। কিন্তু মিসওয়াক ছিল তার জন্য শক্ত, তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি এটি আপনার জন্য নরম করে দিব? তখন তিনি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললেন। তখন আমি তা চিবিয়ে নরম করে দিলাম। এরপর তিনি ভালভাবে মিসওয়াক করলেন। তার সম্মুখে পাত্র অথবা পেয়ালা ছিল (রাবী উমারের সন্দেহ) তাতে পানি ছিল। নবী (ﷺ) স্বীয় হস্তদ্বয় পানির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে তার দ্বারা তার চেহারা মুছতে লাগলেন। তিনি বলছিলেন.. -আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, সত্যিই মৃত্যু-যন্ত্রণা কঠিন। তারপর দু' হাত উপরের দিকে উঠিয়ে বলছিলেন, আমি উচ্চে সমাসীন। বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই)। এ অবস্থায় তার ইন্তিকাল হল আর হাত শিথিল হয়ে গেল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। মৃত্যু রোগকালীন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করতেন, আমি আগামীকাল কার ঘরে থাকব। আগামীকাল কার ঘরে? এর দ্বারা তিনি আয়িশাহ -এর ঘরের পালার ইচ্ছা পোষণ করতেন। সহধর্মিণীগণ নবী (ﷺ)-কে যার ঘরে ইচ্ছা অবস্থান করার অনুমতি দিলেন। তখন নবী (ﷺ)আয়িশাহ-এর ঘরে ছিলেন। এমনকি তার ঘরেই তিনি ইন্তিকাল করেন। আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ) আমার জন্য নির্ধারিত পালার দিন আমার ঘরে ইন্তিকাল করেন এবং আল্লাহ তার রূহ কবজ করেন এ অবস্থায় যে, তার মাথা আমার গন্ড ও সীনার মধ্যে ছিল এবং আমার থুথু (তার থুথুর সঙ্গে) মিশ্রিত হয়ে যায়। তারপর তিনি বলেন, আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর তার ঘরে প্রবেশ করল আর তার হাতে একটি মিসওয়াক ছিল যা দিয়ে সে তার দাত মাজছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার দিকে তাকালেন। আমি তখন তাকে বললাম, হে আবদুর রহমান! এই মিসওয়াকটি আমাকে দাও; তখন সে আমাকে তা দিয়ে দিল। আমি সেটি চিবিয়ে নরম করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দিলাম। তিনি (ﷺ) তা দিয়ে দাত পরিষ্কার করলেন, তিনি তখন আমার বুকে হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমার ঘরে আমার পালার দিনে এবং আমার গন্ড ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। নবী (ﷺ) অসুস্থ হলে আমাদের মধ্যকার কেউ দোয়া পড়ে তাকে ঝাড়ফুক করতেন। আমি নবী (ﷺ)-কে ঝাড়ফুক করার জন্য তার কাছে গেলাম। তখন তিনি তার মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই), উচ্চে সমাসীন মহান বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হতে চাই)। এ সময় আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর আগমন করলেন। তার হাতে মিসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। নবী (ﷺ) তখন সেদিকে তাকালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, তার [নবী (ﷺ)]-এর মিসওয়াকের প্রয়োজন। তখন আমি সেটি নিয়ে চিবালাম, ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করলাম এবং নবী (ﷺ)-কে তা দিলাম। তখন তিনি এর দ্বারা এত সুন্দরভাবে দাত পরিষ্কার করলেন যে, এর আগে কখনও এরূপ করেননি। তারপর তা আমাকে দিলেন। এরপর তার হাত ঢলে পড়ল অথবা রাবী বলেন, তার হাত থেকে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তাআলা আমার থুথুকে নবী (ﷺ)-এর থুথুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তার এ দুনিয়ার শেষ দিনে এবং আখিরাতের প্রথম দিনে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে তার সুনহের বাড়ি থেকে আগমন করেন। ঘোড়া থেকে অবতরণ করে তিনি মসজিদে নাববীতে প্রবেশ করেন কিন্তু কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে আয়িশাহ-এর কাছে উপস্থিত হন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইয়ামানী চাদর দ্বারা আবৃত ছিলেন। তখন তিনি চেহারা হতে কাপড় হটিয়ে তার উপর ঝুকে পড়লেন এবং তাকে চুমু দিলেন ও কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, আমার মাতাপিতা আপনার প্রতি কুরবান হোক! আল্লাহর কসম! আল্লাহ তো আপনাকে দু'বার মৃত্যু দিবেন না, যে মৃত্যু ছিল আপনার জন্য নির্ধারিত সে মৃত্যু আপনি গ্রহণ করে নিলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৫২)।

ইমাম যুহরী বলেন, আমাকে আবূ সালামাহ আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, আবূ বাকর বের হয়ে আসেন তখন উমার লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আবূ বাকর তাকে বললেন, হে উমার বসে পড়। উমার বসতে অস্বীকার করলেন। তখন সাহাবীগণ উমার-কে ছেড়ে আবূ বাকর-এর দিকে গেলেন। তখন আবূ বাকর বললেন- "অতঃপর আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ইবাদাত করতেন, তিনি তো ইন্তিকাল করেছেন। আর যারা আপনাদের মধ্যে আল্লাহর ইবাদাত করতেন (জেনে রাখুন) আল্লাহর চিরঞ্জীব, কখনো মরবেন না। আল্লাহ বলেন.. -মুহাম্মাদ (ﷺ) একজন রাসূল মাত্র, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছেন। ..... কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন- (আলে ইমরান ৩/১৪৪)। ইবন আব্বাস বলেন, আল্লাহর কসম! আবূ বাকর-এর পাঠ করার পূর্বে লোকেরা যেন জানত না যে, আল্লাহ তাআলা এরূপ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। এরপর সমস্ত সাহাবী তার থেকে উক্ত আয়াত শিখে নিলেন। তখন সবাইকে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমাকে সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব জানিয়েছেন, উমার বলেছেন, আল্লাহর কসম! আমি যখন আবূ বাকর-কে উক্ত আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম, তখন ভীত হয়ে পড়লাম এবং আমার পা দু'টি যেন আমার ভার নিত পারছিল না, এমনকি আমি মাটিতে পড়ে গেলাম যখন শুনতে পেলাম যে, তিনি তিলাওয়াত করছেন যে নবী (ﷺ) ইন্তিকাল করেছেন।

আয়িশাহ ও ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আবূ বাকর নবী (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পর তাকে চুমু দেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৫৫)।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৫৫)।

আয়িশাহ বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর রোগাক্রান্ত অবস্থায় তার মুখে ঔষধ ঢেলে দিলাম। তিনি ইশারায় আমাদেরকে তার মুখে ঔষধ ঢালতে নিষেধ করলেন। আমরা বললাম, এটা ঔষধের প্রতি রোগীদের স্বাভাবিক বিরক্তিবোধ। যখন তিনি সুস্থবোধ করলেন তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের ওষুধ সেবন করাতে নিষেধ করিনি? আমরা বললাম, আমরা মনে করেছিলাম এটা ঔষধের প্রতি রোগীর সাধারণ বিরক্তিভাব। তখন তিনি বললেন, আব্বাস ব্যতীত বাড়ির প্রত্যেকের মুখে ঔষধ ঢাল তা আমি দেখি। কেননা সে তোমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। এ হাদীস ইবন আবূ যিনাদ ....... আয়িশাহ থেকে এবং তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন।

আসওয়াদ (ইবন ইয়াযীদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশাহ-এর কাছে উল্লেখ করা হল যে, নবী (ﷺ) আলী-কে ওসীয়াত করে গেছেন। তখন তিনি বললেন, এ কথা কে বলেছে? আমার বুকের সঙ্গে হেলান দেয়া অবস্থায় আমি নবী (ﷺ)-কে দেখেছি। তিনি একটি চিলিমচি চাইলেন, তাতে থুথু ফেললেন এবং ইন্তিকাল করলেন। অতএব আমার বোধগম্য নয় তিনি কীভাবে আলী-কে ওসীয়াত করলেন।

ত্বলহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা-কে জিজ্ঞেস করলাম নবী (ﷺ) কি ওসীয়াত করে গেছেন? তিনি বললেন, না। তখন আমি বললাম, তাহলে কেমন করে মানুষের জন্য ওসীয়াত লিপিবদ্ধ করা হল অথবা কীভাবে এর নির্দেশ দেয়া হল? তিনি বললেন, নবী (ﷺ) কুরআন সম্পর্কে ওসীয়াত করে গেছেন।

আমর ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন দ্বীনার, দিরহাম, গোলাম ও বাদি রেখে যাননি। কেবলমাত্র একটি সাদা খচ্চর যার উপর তিনি আরোহণ করতেন এবং তার যুদ্ধাস্ত্র আর একখন্ড যমীন যা মুসাফিরদের জন্য ওয়াক্ফ করে গেছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী (ﷺ)-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতেমাহ বললেন, উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন ফাতেমাহ বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তার বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরীল-কে তার ইনতিকালের খবর শুনাই। যখন নবী (ﷺ)-কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমা বললেন, হে আনাস! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে!

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সুস্থ থাকাকালীন বলতেন, কোন নবীর ওফাত হয়নি যতক্ষণ না তাকে জান্নাতে তার ঠিকানা দেখানো হয়। তারপর তাকে দুনিয়া বা আখিরাত একটি বেছে নিতে বলা হয়। যখন নবী (ﷺ)-এর রোগ বৃদ্ধি পেল তখন তার মাথা আমার উরুর উপর ছিল এ সময় তিনি মূর্ছা যান। তারপর তার হুশ ফিরে এলে, ছাদের দিকে তিনি দৃষ্টি তোলেন। তারপর বলেন, হে আল্লাহ! আমাকে উচ্চে সমাসীন বন্ধুর (সঙ্গে মিলিত করুন)। তখন আমি বললাম, তিনি আর আমাদের মাঝে থাকতে চাচ্ছেন না। আমি বুঝতে পারলাম যে, এটা হল ঐ কথা যা তিনি সুস্থাবস্থায় আমাদের কাছে বর্ণনা করতেন। আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ)-এর শেষ কথা যা তিনি বলেছিলেন তা হল ........ -হে আল্লাহ! উচ্চে সমাসীন বন্ধুর (সঙ্গে মিলিত করুন)।

আয়িশাহ ও ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) নুযুলে কুরআনের দশ বছর মক্কায় কাটান আর মদিনা্তেও দশ বছর কাটান।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৪৬৪)।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। ওফাতকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বয়স ছিল তেষট্টি বছর।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইন্তিকাল করেন এমন অবস্থায় যে, তার বর্ম ত্রিশ সা' যবের বিনিময়ে ইয়াহূদীর কাছে বন্ধক রাখা ছিল।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) উসামাহ ইবন যায়দ-কে (একটি অভিযানে আমীর) নিযুক্ত করেন। এটা নিয়ে সাহাবীগণ বলাবলি করেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আমি খবর পেয়েছি, তোমরা উসামাহর আমীর নিযুক্তি নিয়ে বলাবলি করছ, অথচ সে হচ্ছে আমার নিকট সবার চেয়ে প্রিয়।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি সেনাদল প্রেরণ করেন এবং উসামাহ ইবন যায়দ-কে তাদের আমীর নিয়োগ করেন। তখন সাহাবীগণ তার নেতৃত্বের সমালোচনা করতে থাকেন। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন এবং বললেন, তোমরা আজ তার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, এভাবে তোমরা তার পিতা (যায়দ)-এর নেতৃত্বেরও সমালোচনা করতে। আল্লাহর কসম! সে (যায়দ) ছিল নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তি এবং আর সে আমার কাছে লোকেদের মধ্যে প্রিয়তম ব্যক্তি। তার এ (উসামাহ) লোকেদের মধ্যে আমার কাছে প্রিয়তম ব্যক্তি।

সুনাবিহী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, আপনি কখন হিজরাত করেছিলেন? তিনি বলেন, আমরা ইয়ামান থেকে হিজরাতের নিয়্যাতে বের হয়ে জুহফাতে পৌছি। তখন একজন অশ্বারোহী পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, খবর কী খবর কী? তিনি বললেন, পাচদিন পূর্বে আমরা নবী (ﷺ)-কে সমাহিত করেছি। তখন আমি তাকে বললাম, তুমি কি কাদারের রাত সম্পর্কে কিছু শুনেছ? তিনি বললেন, হ্যা, নবী (ﷺ)-এর মুয়ায্যিন বিলাল আমাকে জানিয়েছেন যে, তা হল রমাযানের শেষ দশকের সপ্তম দিনে।

আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যায়দ ইবন আরকাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে কয়টি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বলেন, সতেরটি। আমি বললাম, নবী (ﷺ) কয়টি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বললেন,ঊনিশটি।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে পনেরটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি।

রাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ষোলটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।