bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

শপথ ও মানত (৬৬২১-৬৭০৭)

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, আবূ বাকর কক্ষনো শপথ ভঙ্গ করেননি, যতক্ষণ না আল্লাহ কসমের কাফ্ফারা সংবলিত আয়াত অবতীর্ণ করেন। তিনি বলতেন, আমি কসম করি। অতঃপর যদি এর চেয়ে উত্তমটি দেখতে পাই তবে উত্তমটিই করি এবং আমার শপথ ভাঙ্গার জন্য কাফ্‌ফারা দেই।

আবদুর রহমান ইবন সামুরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বললেনঃ হে আবদুর রহমান ইবন সামুরাহ! তুমি নেতৃত্ব চেয়ো না। কারণ, চাওয়ার পর যদি নেতৃত্ব পাও তবে এর দিকে তোমাকে সোপর্দ করে দেয়া হবে। আর যদি না চেয়ে তা পাও তবে তোমাকে এ বিষয়ে সাহায্য করা হবে। কোন কিছুর ব্যাপারে যদি শপথ কর আর তা ছাড়া অন্য কিছুর ভিতর কল্যাণ দেখতে পাও, তবে নিজ শপথের কাফ্ফারা আদায় করে তাথেকে উত্তমটি গ্রহণ কর।

আবূ বুরদাহ-এর পিতা আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার আশআরী গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে তার কাছে বাহন চাইলাম। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে বাহন দিতে পারব না। আর আমার কাছে কিছু নেই যার উপর আরোহণ করা যায়। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন, ততক্ষণ আমরা সেখানে থাকলাম। অতঃপর নবী (ﷺ)-এর কাছে অতি সুন্দর তিনটি উষ্ট্রী আনা হল। তিনি সেগুলোর উপর আমাদেরকে আরোহণ করালেন। এরপর আমরা যখন চলতে লাগলাম তখন বললাম অথবা আমাদের মাঝে কেউ বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাদেরকে বরকত দিবেন না। কারণ, আমরা যখন নবী (ﷺ)-এর কাছে বাহন চাইলে তিনি আমাদেরকে বাহন দিবেন না বলে কসম করলেন, অতঃপর আমাদেরকে আরোহণ করালেন। চল আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে যাই এবং তাকে ব্যাপারটি স্মরণ করিয়ে দেই। এরপর আমরা তার কাছে এলাম। তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে আরোহণ করাইনি বরং আল্লাহ আরোহণ করিয়েছেন। আল্লাহর কসম! আমি যখন আল্লাহর ইচ্ছায় কোন শপথ করি আর সেটি বাদে অন্যটির মাঝে কল্যাণ দেখি তখন শপথের জন্য কাফ্ফারা আদায় করে দেই। আর যেটা কল্যাণকর সেটাই করে নেই এবং স্বীয় শপথের কাফ্‌ফারা আদায় করি।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা (দুনিয়ায়) সবশেষে আগমনকারী আর কিয়ামতের দিন হব অগ্রগামী।

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহর কসম! তোমাদের মাঝে কেউ আপন পরিজন সম্পর্কে শপথ করে এবং সে এর কাফ্ফারা আদায় করার পরিবর্তে- যা আল্লাহ ফরয করেছেন- শপথে অনড় থাকে, তাহলে সে আল্লাহর নিকট গুনাহগার হবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আপন পরিবারের ব্যাপারে কসম করে এর উপর অটল থাকে সে মস্ত বড় পাপী, তার কাফ্ফারা তাকে গুনাহ থেকে মুক্ত করবে না।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার একটি বাহিনী পাঠালেন যার আমীর নিযুক্ত করলেন উসামাহ ইবন যায়দকে। কতক লোক তার নেতৃত্ব সম্পর্কে সমালোচনা করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়িয়ে বললেনঃ তোমরা তার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা কর, তবে ইতোপূর্বে তার পিতার নেতৃত্ব সম্পর্কেও তোমরা সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর কসম! সে অবশ্যই নেতৃত্বের যোগ্য ছিল। আর মানুষের মাঝে সে আমার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল। তারপরে অবশ্যই এ উসামাহ সকল মানুষ অপেক্ষা আমার কাছে প্রিয়।

ইবনে উমর থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) শপথ এ বলতেন: "না, তার কসম যিনি অন্তরকে পরিবর্তন করেন।"

জাবির ইবন সামুরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কায়সারের ধবংসের পরে আর কোন কায়সার আসবে না। কিসরার ধ্বংসের পর আর এরপর আর কোন কিসরা হবে না। যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম! অবশ্যই তাদের দু'জনের ধন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় তোমরা খরচ করবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কিসরা যখন ধ্বংস হবে অতঃপর আর কোন কিসরা হবে না। আর কায়সার যখন ধ্বংস হবে তখন আর কোন কায়সার হবে না। যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ সেই সত্তার শপথ! এ দু' এর ধন-সম্পদ অবশ্যই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করবে।

আয়িশাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ হে উম্মাতে মুহাম্মাদী আল্লাহর শপথ! আমি যা জানি যদি তা তোমরা জানতে তবে অবশ্যই তোমরা হাসতে কম আর কাঁদতে বেশি।

আবদুল্লাহ ইবন হিশাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একবার নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন উমার ইবন খাত্তাব-এর হাত ধরেছিলেন। উমার তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জান ছাড়া আপনি আমার কাছে সব কিছু চেয়ে অধিক প্রিয়। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ না, যার হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! তোমার কাছে আমি যেন তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই। তখন উমার তাকে বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। নবী (ﷺ) বললেনঃ হে উমর! এখন (তুমি সত্যিকার ঈমানদার হলে)।

আবূ হুরাইরাহ ও যায়দ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত। তারা বলেছেন, একবার দু' লোক ঝগড়া করতে করতে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলো। তাদের একজন বলল, আল্লাহর কিতাব মুতাবিক আমাদের মাঝে ফায়সালা করে দিন। দু'জনের মধ্যে (বেশি) বুদ্ধিমান অন্য লোকটি বলল, হ্যা। হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব মুতাবিক ফয়সালা করে দিন। আর আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন। তিনি বললেনঃ বল। লোকটি বলল, আমার পুত্র ও লোকটির কাছে চাকর হিসাবে ছিল। আমার পুত্র এর স্ত্রীর সঙ্গে যেনা করেছে। লোকেরা বলেছে যে, আমার পুত্রের (শাস্তি) রজম হবে। তাই আমি একশ বক্রী ও একটি বাদী নিয়ে তার ফিদইয়া দিয়েছি। এরপর আমি আলিমদের নিকট এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। তারা আমাকে জানালেন যে, আমার পুত্রের একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন হবে। আর রজম হবে এর স্ত্রীর। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ কসম ঐ সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি তোমাদের উভয়ের মধ্যে অবশ্যই আল্লাহর কিতাব মুতাবিক ফয়সালা করে দেব। তোমার বক্রী ও বাদী তোমাকেই ফিরিয়ে দেয়া হবে। তিনি তার পুত্রকে একশ বেত্রাঘাত ও এক বছরের জন্য নির্বাসিত করলেন। আর উনায়ক আসলামীকে আদেশ দেয়া হল অন্য লোকটির স্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য। সে যদি (ব্যভিচার) স্বীকার করে তবে তাকে রজম করতে। সে তা স্বীকার করল, সুতরাং তাকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হল।

পূর্বের হাদিসের মতই (৬৬৩৩)।

আবূ বাকরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আসলাম, গিফার, মুযায়না এবং জুহাইনাহ বংশ তামীম, আমির ইবন সাসা'আ, গাতফান ও আসাদ বংশ থেকে উত্তম তোমরা কি এরূপ ধারণা কর? তারা তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সহাবাগণ বললেন, হা। তখন তিনি বললেনঃ কসম ঐ সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চই তারা এদের (শেষোক্ত গোত্রগুলোর) চেয়ে উত্তম!

আবূ হুমায়দ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ব্যক্তিকে রাজস্ব আদায়কারী নিযুক্ত করলেন। সে কাজ শেষ করে তার কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এটা আপনার জন্য আর এ জিনিসটি আমাকে হাদিয়া দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেনঃ তুমি তোমার বাপ-মার ঘরে বসে থাকলে না কেন? তা হলে দেখতে তোমার জন্য হাদিয়া পাঠানো হয় কি না? এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এশার ওয়াক্তের সালাতে দাড়িয়ে গেলেন এবং তাশাহ্হুদ পাঠ করলেন ও আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। এরপর বললেনঃ রাজস্ব আদায়কারীর অবস্থা কী হল? আমি তাকে নিযুক্ত করে পাঠালাম আর সে আমাদের কাছে এসে বলছে, এটা সরকারী রাজস্ব আর এ জিনিস আমাকে হাদিয়া দেয়া হয়েছে। সে তার বাপ-মার ঘরে বসেই থাকল না কেন? তাহলে দেখত তার জন্য হাদিয়া দেয়া হয় কি না? ঐ সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ, তোমাদের মাঝে কেউ কোন বস্তুতে খিয়ানত করলে, কিয়ামতের দিন সে ঐ বস্তুটিকে তার কাঁধে বহন করা অবস্থায় আসবে। সে বস্তুটি যদি উট হয় তা হলে উট আওয়াজ করতে থাকবে। যদি গরু হয় তবে হাম্বা হাম্বা করতে থাকবে। আর যদি বক্রী হয় তবে ভ্যা ভ্যা করতে থাকবে। আমি (বাণী) পৌছিয়ে দিলাম। রাবী আবূ হুমায়দ বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার হস্ত মুবারক এতটুকু উঠালেন যে, আমরা তার দু'বগলের শুভ্রতা দেখতে গেলাম। আবূ হুমায়দ বলেন, এ কথাগুলো যায়দ ইবন সাবিতও আমার সঙ্গে শুনেছে নবী (ﷺ) থেকে। কাজেই তোমরা তাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পার।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবুল কাসিম (ﷺ) বলেছেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ ঐ সত্তার কসম! আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে, তাহলে তোমরা অবশ্যই কাঁদতে বেশি আর হাসতে কম।

আবূ যর গিফারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি কাবা ঘরের ছায়ায় বসে বলেছিলেনঃ কাবা ঘরের রবের কসম! তারা ক্ষতিগ্রস্ত। কাবা ঘরের রবের কসম! তারা ক্ষতিগ্রস্ত। আমি বললাম, আমার অবস্থা কী? আমার মাঝে কি কিছু (ত্রুটি) দেখা গেছে? তিনি বলছিলেন, এমন অবস্থায় আমি তার কাছে বসে পড়লাম। আমি আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। আমি চিন্তায় আচ্ছন্ন রইলাম যতক্ষণের জন্য আল্লাহ চাইলেন। এরপর আমি আরয করলাম, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তিনি বললেনঃ অধিক সম্পদের অধিকারী। তবে তারা নয় যারা এভাবে এভাবে এভাবে (সাদকা করে)।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ একবার সুলায়মান বললেনঃ আমি আজ রাতে নব্বইজন স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হব, যারা প্রত্যেকেই একটি করে অশ্বারোহী জন্ম দেবে যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। তার সঙ্গী বলল, ইন্শা আল্লাহ (বলুন)। তিনি ইনশা আল্লাহ বললেন না। অতঃপর তিনি সকল স্ত্রীর সঙ্গেই মিলিত হলেন। কিন্তু একজন স্ত্রী ছাড়া কেউ গর্ভবতী হলেন না, আর সেও এক অপূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসব করল। যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ, ঐ সত্তার কসম! তিনি যদি ইনশা আল্লাহ বলতেন, তাহলে সকলেই অশ্বারোহী হয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করত।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর জন্য একবার রেশমের এক টুকরা কাপড় হাদিয়া পাঠানো হল। লোকেরা তার সৌন্দর্য ও মসৃণতা দেখে অবাক হয়ে একে একে হাতে নিয়ে দেখছিল। এরপর রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা কি এটা দেখে অবাক হচ্ছ? তারা উত্তর দিলেন, হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ যার মুঠোয় আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম!। নিশ্চই জান্নাতে সাদের রুমাল এর চেয়েও উত্তম হবে।

আয়িশাহ সিদ্দীকা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিন্দা বিন্ত 'উত্বাহ ইব্ন রাবীআ' বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এমন এক সময় ছিল যখন ভূ-পৃষ্ঠে যারা তাবুতে বাস করছে তাদের মাঝে আপনার অনুসারী যারা তারা অপমানিত হোক এটা আমি খুবই পছন্দ করতাম। কিন্তু আজ আমার কাছে এর চেয়ে বেশি প্রিয় কিছুই নেই যে, তাবুতে বাসকারীদের মাঝে আপনার অনুসারীরা সম্মানিত হোক। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ কসম ঐ সত্তার! এ সম্মান আরও বাড়ুক। হিন্দা বললো, আবূ সুফ্ইয়ান একজন কৃপণ লোক। তার মাল থেকে তার পরিবারবর্গকে) কিছু খাওয়ালে এতে কি আমার কোন দোষ হবে? তিনি বললেনঃ না। তবে তা ন্যায়সঙ্গতভাবে হতে হবে।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক সময় ইয়ামানী চামড়ার কোন এক তাবুতে তার পিঠ হেলান দিয়েছিলেন। তখন তিনি তার সাহাবীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমরা জান্নাতীদের এক-চতুর্থাংশ হবে, এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট আছ? তারা বললেন, হ্যা। তিনি বললেনঃ তোমরা জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ হবে, এতে কি তোমরা সন্তুষ্ট নও! তারা বললেন, হ্যা। তিনি বললেনঃ যার হাতে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রাণ শপথ ঐ সত্তার! নিশ্চই আমি কামনা করি তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তিকে "তিনিই আল্লাহ, এক (112)" বারংবার পাঠ করতে শুনলেন। সকাল হলে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলেন এবং ব্যাপারটি তার কাছে উল্লেখ করলেন। আর ঐ ব্যক্তি যেন উক্ত সূরার পাঠকে কম গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ, যার হাতে আমার প্রাণ কসম ঐ সত্তার! নিশ্চই এ সূরা কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, তোমরা রুকূ ও সিজদা পূর্ণভাবে কর। যার হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! তোমরা যখন রুকূ এবং সিজদা কর তখন আমি তোমাদেরকে আমার পিছন থেকে অবশ্যই দেখতে পাই।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, আনসার গোত্রের এক মহিলা নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির হল; সঙ্গে ছিল তার সন্তান-সন্ততি। নবী (ﷺ) বললেনঃ যার হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! মানুষের মধ্যে তোমরা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয়। কথাটি তিনি তিনবার বললেন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উমার ইবন খাত্তাব-কে বাহনে চলা অবস্থায় পেলেন যখন তিনি তার পিতার নামে কসম করছিলেন। তিনি বললেনঃ সাবধান! আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ কসম করতে চাইলে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নইলে যেন চুপ থাকে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বলেছেনঃ নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের বাপ-দাদার নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। উমার বলেন, আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, তখন থেকে আমি তাদের নামে কসম করিনি মনে থাকা অবস্থাতেও না, অন্যের কথা উদ্ধৃত করেও না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাদের নামে শপথ করো না।

যাহদাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের গোত্র জারাম এবং আশআরী গোত্রের মাঝে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব ছিল। আমরা (একবার) আবূ মূসা আশআরীর সাথে ছিলাম। তার কাছে খাবার উপস্থিত করা হল, যাতে ছিল মুরগীর গোশত। তাইমিল্লাহ্ গোত্রের এক লাল রঙের ব্যক্তি তার কাছে ছিল। সে দেখতে গোলামদের মত। তিনি তাকে খাবার খেতে ডাকলেন। তখন সে লোকটি বলল, আমি মুরগীকে এমন জিনিস খেতে দেখেছি যার জন্য আমি তাকে ঘৃণা করি। তাই আমি কসম করেছি যে, মুরগী খাব না। তিনি বললেন, ওঠ, আমি এ সম্পর্কে অবশ্যই তোমাকে একখানা হাদীস বলব। একবার আমি কতক আশআরীর সাথে বাহন সংগ্রহের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এলাম। তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে বাহন দিতে পারব না। তোমাদের বাহন দেয়ার জন্য কিছুই আমার কাছে নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে গনীমতের কিছু উট এল। তিনি আমাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেনঃ আশআরী দলটি কোথায়? এরপর আমাদের জন্য পাচটি উত্তম সুন্দর উট দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমরা যখন চলে গেলাম, তখন চিন্তা করলাম আমরা এ কী করলাম? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তো শপথ করেছিলেন আমাদেরকে বাহন দেবেন না। আর তার কাছে কোন বাহন তো ছিলও না। কিন্তু এরপর তিনি তো আমাদেরকে আরোহণের বাহন দিলেন। আমরা রাসূলুল্লাহকে (ﷺ)- তার কসমের ব্যাপারে অন্যমনস্ক রেখেছিলাম। আল্লাহর কসম! এ বাহন আমাদের কোন উপকারে আসবে না। কাজেই আমরা তার কাছে ফিরে গেলাম এবং তাকে বললাম যে, আমাদেরকে আপনি আরোহণ করাবেন এ উদ্দেশে আমরা তো আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি কসম করেছিলেন যে, আপনি আমাদেরকে কোন বাহন দিবেন না। আর আপনার কাছে এমন কোন কিছু ছিলও না, যাতে আমাদেরকে আরোহণ করাতে পারেন। তখন তিনি বলেছিলেনঃ আমি তোমাদেরকে আরোহণ করাইনি বরং আল্লাহ আরোহণ করিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি যখন শপথ করি আর তার অন্যটির মাঝে যদি অধিক কল্যাণ দেখতে পাই, তা হলে যা কল্যাণকর তাই বাস্তবায়িত করি এবং আমি শপথ ভঙ্গ করি।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি শপথ করে এবং বলে, 'লাত ও উয্যার শপথ', তখন সে যেন "আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই।" বলে আর যে ব্যক্তি তার সঙ্গীকে বলে 'এসো জুয়া খেলি' তাহলে সে যেন সদাকাহ দেয়।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি স্বর্ণের আংটি তৈরি করালেন এবং তিনি সেটা ব্যবহার করতেন। ব্যবহারকালে তার পাথরটি হাতের ভিতরের দিকে রাখতেন। তখন লোকেরাও এরূপ করল। এরপর তিনি মিম্বরের উপর বসে তা খুলে ফেললেন এবং বললেনঃ আমি এ আংটি পরেছিলাম এবং তার পাথর হাতের ভিতরের দিকে রেখেছিলাম। অতঃপর তিনি তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। আর বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি এ আংটি আর কোনদিন ব্যবহার করব না! তখন লোকেরাও তাদের নিজেদের আংটিগুলো খুলে ফেলল।

সাবিত ইবন যহ্‌হাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের কসম করলে সেটা ঐ রকমই হবে, যেমন সে বলল। তিনি (আরও বলেছেন) কেউ কোন জিনিসের দ্বারা আত্মহত্যা করলে, জাহান্নামের আগুনে তাকে ঐ জিনিস দিয়েই শাস্তি দেয়া হবে। কোন মুমিনকে লানত করা তাকে হত্যা করা তুল্য। আর কোন মুমিনকে কুফরীর অপবাদ দেয়াও তাকে হত্যা করার তুল্য।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন যে, বনী ইসরাঈল গোত্রের তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ পরীক্ষা করতে চাইলেন। অতঃপর একজন ফেরেশ্তা পাঠালেন। ফেরেশ্তা কুষ্ঠরোগীর কাছে এল। সে বলল, আমার সমস্ত উপায়-উপকরণ ছিন্ন হয়ে গেছে। কাজেই আমার জন্য আল্লাহ ব্যতীত, অতঃপর তুমি ব্যতীত কোন উপায় নেই।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাদেরকে কসম পূর্ণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

উসামাহ হতে বর্ণিত। একবার উসামাহ ইবন যায়দ, সাদ ও উবাই নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এমন সময় নবী (ﷺ)-এর এক কন্যা তার কাছে খবর পাঠালেন যে, আমার পুত্র মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। কাজেই তিনি যেন আমাদের নিকট আসেন। তিনি সালামের সঙ্গে এ কথা বলে পাঠালেন যে, আল্লাহ যা দান করেন আর যা নিয়ে নেন সব কিছুই আল্লাহর জন্য। আর সব কিছুই আল্লাহর নিকট নির্ধারিত আছে। অতএব তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সাওয়াবের আশা কর। এরপর তার কন্যা কসম দিয়ে আবার খবর পাঠালেন। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যাওয়ার জন্য দাড়ালেন। আমরাও তার সঙ্গে দাড়ালাম। (সেখানে গিয়ে) তিনি যখন বসলেন, শিশুটিকে তার সামনে আনা হল। তিনি তাকে নিজের কোলে নিয়ে বসালেন, আর শিশুটির শ্বাস নিঃশেষ হয়ে আসছিল। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু'চোখ অশ্রু প্রবাহিত করল। তখন সাদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কী ব্যাপার? তিনি বললেনঃ এ হল রহমত, যা আল্লাহ তার বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তার মনের ভিতরে দিয়ে থাকেন। আর আল্লাহ কেবলমাত্র তার দয়ালু বান্দাদের ওপরই দয়া করে থাকেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে মুসলিমের তিনটি সন্তান মারা গেছে (সে যদি ধৈর্য ধরে) তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। তবে কসম পূর্ণ করার জন্য (তাকে পুলসিরাতের উপর দিয়ে নেয়া হবে)।

হারিসাহ ইবন ওয়াহ্ব হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের সম্পর্কে জানাব না? তারা হবে (দুনিয়াতে) দুর্বল, মাযলুম। তারা যদি আল্লাহর ওপর কসম করে, তবে আল্লাহ তা পূর্ণ করে দেন। আর জাহান্নামের অধিবাসী হবে অবাধ্য, ঝগড়াটে ও অহংকারীরা।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হল, কোন মানুষ সর্বোত্তম? তিনি বললেনঃ আমার সময়ের মানুষ। এরপর তাদের পরবর্তী লোকেরা, এরপর তাদের পরবর্তী লোকেরা। এরপরে এমন লোক আসবে যে তাদের সাক্ষ্য কসমের উপর অগ্রগামী হবে, আর কসম সাক্ষ্যের উপর অগ্রগামী হবে। রাবী ইবরাহীম বলেন যে, আমরা যখন বালক ছিলাম তখন আমাদের সঙ্গীরা সাক্ষ্য এবং অঙ্গীকারের সঙ্গে কসম করতে নিষেধ করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কোন মুসলিমের মাল আত্মসাৎ করার জন্য অথবা বলেছেনঃ তার ভাইয়ের মাল আত্মসাৎ করার জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা কসম করবে, আল্লাহর সাথে তার সাক্ষাত ঘটবে এমন অবস্থায় যে আল্লাহ তার উপর রাগান্বিত থাকবেন। এ কথারই সত্যতায় আল্লাহ তাআলা-অবতীর্ণ করেনঃ নিশ্চই যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখিরাতের নিয়ামাতের কোন অংশই পাবে না।

রাবী সুলায়মান তার বর্ণিত হাদীসে বলেন, আশ'আস ইবন কায়স্ যখন পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন জিজ্ঞেস করেন, আবদুল্লাহ তোমাদের কাছে কী বর্ণনা করেছেন? জবাবে লোকেরা তাকে কিছু বলল। তখন আশ'আস বললেন, এ আয়াত আমার আর আমার এক সাথী সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আমাদের দু' জনের মাঝে একটি কূপ নিয়ে বিবাদ ছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ জাহান্নাম সর্বদাই বলতে থাকবে- আরও কি আছে? এমন কি রাববুল ইয্যত তাতে তার পা রাখবেন। 'বাস, বাস' জাহান্নাম বলবে, তোমার ইয্যতের কসম! সেদিন তার একাংশ অন্য অংশের সঙ্গে মিলিত হয়ে যাবে।

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ-এর অপবাদ বিষয়ক হাদীস বর্ণনা করেন। অপবাদ রটনাকারীরা যখন তার সম্পর্কে যা ইচ্ছে তাই অপবাদ রটালো, তখন আল্লাহ তাকে পূত-পবিত্র বলে প্রকাশ করে দিলেন। রাবী বলেন, উপর্যুক্ত বর্ণনাকারীগণ প্রত্যেকেই হাদীসের এক একটি অংশ আমার কাছে বর্ণনা করলেন। নবী (ﷺ) দাড়ালেন এবং আবদুল্লাহ ইবন উবাই এর মিথ্যা রটনা থেকে নিরাপত্তা চাইলেন। এরপর উসায়দ ইবন হুযায়র দাড়ালেন এবং সাদ ইবন উবাদাহ সম্পর্কে বললেন, আল্লাহর কসম, অবশ্য অবশ্যই আমরা তাকে হত্যা করব।

আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ আয়াত: 'তোমাদের অনিচ্ছাকৃত শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে ডাকবেন না...' (2.225) এই আয়াতটি শপথের সূত্র সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে যেমন: 'না, আল্লাহর কসম!' এবং 'হ্যা, আল্লাহর কসম!' ভুলে যাওয়ার কারণে তার শপথের বিরুদ্ধে কিছু তার কি কাফফারা দিতে হবে?) এবং আল্লাহর বাণী: 'এবং যদি আপনি এতে ভুল করে থাকেন তবে এতে আপনার কোন দোষ নেই।' (33.5) এবং আল্লাহ বলেছেন:- '(মূসা খাদিরকে বললেন: আমি যা ভুলে গেছি তার জন্য আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না।' (18.73)

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। আর আবূ হুরাইরাহ অন্যত্র হাদীস মারফূ' হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি (নবী (ﷺ)) বলেনঃ নিশ্চই আল্লাহ আমার উম্মাতের ঐ সকল ওয়াস্ওয়াসা ক্ষমা করে দিয়েছেন যা তাদের মনে উদিত হয় বা যে সব কথা মনে মনে বলে থাকে; যতক্ষণ না তা বাস্তবে করে বা সে সম্পর্কে কথা বলে।

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) কুরবানীর দিন খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি উঠে দাড়িয়ে নিবেদন করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করলাম যে, অমুক অমুক রুকনের পূর্বে অমুক অমুক রুকন হবে। এরপর আরেক জন উঠে দাড়াল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক অমুক আমলের পূর্বে অমুক আমল হবে, (তারা জবাই, হলক্ ও তাওয়াফ) এ তিনটি কাজ সম্পর্কে জানতে চাইল। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ করতে পার, কোন দোষ নেই। ঐ দিন যে সম্পর্কে তিনি জিজ্ঞেসিত হলেন, বললেনঃ করতে পার, কোন দোষ নেই।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর কাছে বলল যে, আমি পাথর নিক্ষেপের আগে যিয়ারাত করেছি। তিনি বললেনঃ কোন দোষ নেই। আরেক ব্যক্তি বলল, আমি তো যব্হ্ করার আগে মাথা মুন্ডন করেছি। তিনি বললেনঃ কোন দোষ নেই। আরেক জন বলল, আমি পাথর নিক্ষেপের আগে যব্হ্ করেছি। তিনি বললেনঃ কোন দোষ নেই।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করছিল। আর নবী (ﷺ) তখন মসজিদের এক কোণে অবস্থান করছিলেন। লোকটি এসে তাকে সালাম করল। তিনি বললেনঃ ফিরে যাও এবং সালাত আদায় কর। কেননা, তুমি সালাত আদায় করনি। তখন সে ফিরে গেল এবং সালাত আদায় করল। আবার এসে তাকে সালাম করল। তিনি বললেনঃ তোমার উপরও সালাম। তুমি ফিরে যাও এবং সালাত আদায় কর। কারণ, তুমি সালাত আদায় করনি। তৃতীয়বারে লোকটি বলল, আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেনঃ যখন তুমি সালাতে দন্ডায়মান হবে তখন খুব ভালভাবে উযূ করবে। এরপর কিবলামুখী হবে। তারপর তাকবীর বলবে। এরপর কুরআন থেকে যা তোমার জন্য সহজ তা তিলাওয়াত করবে। এরপর ধীরস্থিরভাবে রুকূ করবে। এরপর মাথা উঠাবে। এমনকি সঠিকভাবে দাড়িয়ে যাবে। এরপর সিজদা করবে ধীরস্থিরভাবে। এরপর মাথা তুলে সোজা হবে এবং ধীরস্থিরভাবে বসে যাবে। এরপর আবার ধীরস্থিরভাবে সিজদা করবে। তারপর সি্জদা থেকে মাথা উঠিয়ে স্থির হয়ে বসবে। তারপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে যাবে। এরপর তোমার পুরো সালাতেই এরূপ করবে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের যুদ্ধে মুশরিকরা প্রকাশ্যতঃ পরাজিত হলে ইব্লিস চিৎকার করে বলল, হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পিছনের দিকে ফির। এতে সামনের লোকগুলো পিছনের দিকে ফিরল। তারপর পিছনের লোকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান হঠাৎ তার পিতাকে দেখে (মুসলিমদের প্রতি লক্ষ্য করে) বললেন, এ তো আমার পিতা, আমার পিতা। আল্লাহর কসম! তারা ফিরল না। শেষে তারা তাকে হত্যা করল। হুযাইফাহ বললেন, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। উরওয়াহ বলেন যে, আল্লাহর কসম! মৃত্যু পর্যন্ত হুযাইফাহ-এর মাঝে এ ব্যাপারটি বিদ্যমান ছিল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে সায়িম ভুলে কিছু খায় সে যেন তার সওম পূর্ণ করে। কেননা, আল্লাহ তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন।

আবদুল্লাহ ইবন বুহাইনাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। প্রথম দু'রাকআতে বসার পূর্বেই তিনি দাড়িয়ে গেলেন। এভাবেই সালাত আদায় করতে থাকলেন। সালাত শেষ করলে লোকেরা তার সালামের অপেক্ষা করছিল। তিনি আল্লাহু আকবর বলে সালামের পূর্বে সিজদা করলেন। এরপর তিনি তার মাথা উঠালেন। আবার আল্লাহু আকবর বলে সিজদা করলেন। এরপর আবার মাথা উঠালেন এবং সালাম ফিরালেন।

ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একবার তাদের নিয়ে যুহরের সালাত আদায় করলেন। তিনি সালাতে কিছু বেশি করলেন বা কিছু কম করলেন। মানসূর বলেন, এই কম-অধিকের ব্যাপারে সন্দেহ ইব্রাহীমের না আলক্বামাহর তা আমার জানা নেই। রাবী বলেন, জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! (ﷺ) সালাতের মাঝে কি কিছু কমিয়ে দেয়া হয়েছে, না আপনি ভুলে গেছেন? তিনি বললেনঃ কী হয়েছে? সহাবাগণ বললেন, আপনি এভাবে এভাবে সালাত আদায় করেছেন। রাবী বলেন, তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে দু'টি সিজদা করেন। এরপর বললেন, এ দু'টি সিজদা ঐ ব্যক্তির জন্য যার স্মরণ নেই যে, সালাতে সে কি অধিক কিছু করেছে, না কম করেছে। এমন অবস্থায় সে চিন্তা করে (নির্ভুলটি স্থির করার চেষ্টা করবে)। আর যা বাকি থাকবে তা পুরা করে নেবে। এরপর দু'টি সিজদা করবে।

উবাই ইবন কা'ব হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে আল্লাহর বাণীঃ (মূসা বলল, 'আমার ভুলের জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না, আর আমার ব্যাপারে আপনি অধিক কড়াকড়ি করবেন না) সম্পর্কে শুনেছেন। তিনি বলেছেনঃ মূসা-এর প্রথমটি ভুলবশত হয়েছিল।

শা'বী থেকে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন যে, বারাআ ইবন আযিব-এর নিকট কয়েকজন মেহমান ছিল। তিনি তার পরিবার-পরিজনকে তাদের জন্য সালাত থেকে ফেরার আগেই কিছু যব্হ্ করতে হুকুম করলেন, যেন ফিরে এসে তারা আহার করতে পারেন। তখন পরিবারের লোকেরা সালাত থেকে ফেরার আগেই (কুরবানীর পশু) জবাই করলেন। নবী (ﷺ)-এর কাছে লোকেরা এ সম্পর্কে বর্ণনা করল। তিনি পুনরায় যব্হ্ করার জন্য হুকুম করলেন। বারাআ ইবন আযিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে এমন একটি বক্রীর বাচ্চা আছে যা দু'টি বড় বকরির গোশতের চেয়েও উত্তম। ইবন 'আওন শাবীর মাধ্যমে বর্ণনা করতে গিয়ে এ জায়গায় থেমে যেতেন। তিনি মুহাম্মাদ ইবন সীরীন থেকে এরকমই বর্ণনা করতেন এবং এ স্থানে থেমে যেতেন। আর বলতেন, আমার জানা নেই তিনি ব্যতীত অন্য কারও জন্য এরূপ অনুমতি আছে কিনা?

জুন্দুব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি ঈদের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর খুত্বাহ প্রদান করলেন। এরপর বললেনঃ যে ব্যক্তি (সালাতের আগেই) যব্হ্ করেছে সে যেন তার স্থলে আরেকটি যব্হ করে। আর যে এখনও জবাই করেনি সে যেন আল্লাহর নাম নিয়ে যবেহ্ করে।

আবদুল্লাহ ইবন আমর নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের (অন্যতম) হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতামাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম করা।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি যদি কোন মুসলিমের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে মিথ্যা শপথ করে তবে আল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাত হবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। আল্লাহ এ কথার সত্যতা প্রমাণে আয়াত "সত্যিই! যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ও নিজেদের শপথের বিনিময়ে সামান্য লাভ ক্রয় করে। (3.77)" অবতীর্ণ করেন।

এরপর আশ'আস ইবন কায়স প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলেন যে, আবূ আবদুর রাহমান তোমাদের কাছে কী বর্ণনা করেছেন। লোকেরা বলল, এমন এমন। তখন তিনি বললেন, এ আয়াত আমার ব্যাপারে অবতীর্ণ করা হয়েছে। আমার চাচাতো ভাই-এর জমিতে আমার একটি কূপ ছিল। আমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির হলাম। তিনি বললেনঃ তুমি প্রমাণ হাযির কর অথবা সে শপথ করুক! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ কথার উপরে সে তো শপথ করেই ফেলবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়ার মানসে কসম করে, অথচ সে তাতে মিথ্যাচারী, তাহলে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে এমতাবস্থায় যে আল্লাহ তার উপর রাগান্বিত থাকবেন।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে আমার সাথী নবী (ﷺ)-এর কাছে পাঠাল তার কাছে বাহন চাওয়ার জন্য। তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে কোন কিছুই আরোহণের জন্য দিতে পারব না। তখন আমি তাকে ক্ষুব্ধ অবস্থায় পেলাম। এরপর যখন আমি তার কাছে এলাম, তিনি বললেনঃ তুমি তোমার সাথীদের কাছে চলে যাও এবং বল যে, নিশ্চই আল্লাহ অথবা আল্লাহর রাসূল তোমাদের আরোহণের জন্য বাহনের ব্যবস্থা করবেন।

নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ এর ব্যাপারে অপবাদ রটনাকারীরা যা বলেছিল তা শুনতে পেলাম। আল্লাহ এ মর্মে তার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দিয়েছেন। উপরোক্ত বর্ণনাকারীগণ প্রত্যেকেই আমার নিকট উল্লিখিত ঘটনার অংশ বিশেষ বর্ণনা করেছেন। আয়িশাহ বলেন, আল্লাহ তাআলা দশখানা আয়াত আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করার জন্য অবতীর্ণ করেছেন, "সত্যিই! যারা অপবাদ ছড়ায়.. (24.11-21)"। আবূ বাকর সিদ্দীক আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে মিসতাহ্ ইবন সালামাহর ভরণ-পোষণ করতেন। অপবাদ দেয়ার কারণে আবূ বাকর সিদ্দীক বললেন, আল্লাহর কসম! মিসতাহ্ যখন আয়িশাহর ব্যাপারে অপবাদ রটিয়েছে; এরপর আমি আর তার জন্য কখনো কিছু খরচ করব না। তখন আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেন, "এবং তোমাদের মধ্যে যারা ভালো এবং ধনী তারা যেন তাদের আত্মীয়দের (কোন প্রকার সাহায্য) না করার শপথ না করে...' (24.22)"। আবূ বাকর বলেন, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন এটা আমি নিশ্চই পছন্দ করি। তিনি পুনরায় মিসতাহের ভরণ-পোষণের জন্য ঐ খরচ দেয়া শুরু করলেন, যা তিনি পূর্বে তাকে দিতেন এবং তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তার খরচ দেয়া কখনো বন্ধ করব না।

আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কতক আশআরী লোকের সাথে (বাহন চাওয়ার জন্য) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। যখন হাজির হলাম, তখন তাকে ক্ষুব্ধ অবস্থায় পেলাম। আমরা তার কাছে বাহন চাইলাম। তিনি কসম করে বললেন যে, আমাদেরকে বাহন দিবেন না। এরপর বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি কোন কিছুর ওপর আল্লাহর ইচ্ছা মুতাবিক যখন কসম করি আর তার অন্যটির মাঝে কল্যাণ দেখতে পাই; তাহলে যেটা কল্যাণকর সেটাই করি আর কসমকে ভঙ্গ করি।

সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের যখন মৃত্যু হাযির হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কাছে এলেন এবং বললেনঃ আপনি "আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই" কলেমাটি বলুন। আমি আল্লাহর নিকট এর দ্বারা আপনার ব্যাপারে সুপারিশ করব।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ দু'টি কলেমা যা জবানে অতি হাল্কা, মীযানে ভারী, আর রাহমানের নিকট খুব পছন্দনীয়; তা হচ্ছে 'সুবহানাল্লাহ্ ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম'।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি কলেমা বললেন। আর আমি অন্যটি বললাম। তখন তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে মারা যাবে তাকে জাহান্নামে দাখিল করা হবে। আমি অন্যটি বললাম, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক না করে মারা যাবে তাকে জান্নাতে দাখিল করা হবে।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তার স্ত্রীদের ব্যাপারে কসম করলেন। আর তখন তার এক পা মচকে গিয়েছিল। তিনি তখন ঊনত্রিশ দিন কুঠরীতে অবস্থান করলেন। এরপর তিনি নেমে এলেন (স্ত্রীগণের কাছে ফিরে এলেন)। লোকেরা তখন জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো এক মাসের কসম করেছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ মাস তো কখনও ঊনত্রিশ দিনেও হয়।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবী আবূ উসায়দ বিবাহ করলেন। তার (ওলীমায়) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে দাওয়াত করলেন। আর তখন তার নব বিবাহিতা স্ত্রী তাদের খেদমত করছিলেন। সাহল তার গোত্রের লোকদেরকে বললেন, তোমরা কি জান সে মহিলা নবী (ﷺ)-কে কী পান করিয়েছিল? সে রাত্রিবেলা একটি পাত্রে তার জন্য খেজুর ভিজিয়ে রেখেছিল সকাল পর্যন্ত। আর সেগুলিই সে তাকে পান করাল।

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী সাওদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমাদের একটি বকরী মরে গেল। আমরা এর চামড়া দাবাগাত (পাকা) করে নিলাম। এরপর থেকে তাতে সর্বদাই আমরা নবীয (খুরমা-খেজুর ভিজানো শরবত) প্রস্তুত করতাম। শেষ পর্যন্ত ওটা পুরাতন হয়ে গেল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পরিবার তরকারী দিয়ে গমের রুটি এক নাগাড়ে তিনদিন পর্যন্ত খেয়ে তৃপ্ত হননি। এভাবে তিনি আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আবূ ত্বলহা উম্মু সুলায়ম-কে বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুর্বল আওয়াজ শুনতে পেলাম, যার ফলে আমি বুঝলাম তিনি ক্ষুধার্ত। তোমার কাছে কি কিছু আছে? উম্মু সুলায়ম বললেন, হ্যা। তখন তিনি কয়েকটি যবের রুটি বের করলেন। এরপর তার ওড়নাটি নিলেন এবং এর একাংশে রুটিগুলি পেঁচিয়ে নিলেন। আনাস বলেন, এরপর তিনি আমাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। আমি গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে মসজিদে পেলাম। এবং কতকগুলো লোক তার সঙ্গে ছিল। আমি তাদের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমাকে কি আবূ ত্বলহা পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি হ্যা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সঙ্গীদেরকে বললেন, উঠ, (আবূ ত্বলহার কাছে যাও)। তখন তারা আবূ ত্বলহার নিকট গেলেন। আমি তাদের আগে আগে যেতে লাগলাম। শেষে আবূ ত্বলহার কাছে এসে উপস্থিত হলাম এবং তাকে এ ব্যাপারে জানালাম। তখন আবূ ত্বলহা বলল, হে উম্মু সুলায়ম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তো আমাদের কাছে এসেছেন কিন্তু আমাদের কাছে তো এমন কোন খাবার নেই যা তাদের খেতে দিতে পারি। উম্মু সুলায়ম বলল, আল্লাহ ও তার রাসূলই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জানেন। আবূ ত্বলহা বেরিয়ে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ ত্বলহা উভয়েই সামনাসামনি হলেন এবং দু'জনেই একসঙ্গে ঘরে প্রবেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হে উম্মু সুলায়ম! তোমার কাছে যা আছে তাই নিয়ে এসো। তখন উম্মু সুলায়ম ঐ রুটিগুলি তার সামনে পেশ করলেন। রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ রুটিগুলি ছিঁড়ার জন্য নির্দেশ করলেন। তখন রুটিগুলো টুকরা টুকরা করা হল। উম্মু সুলায়ম তার ঘি-এর পাত্র থেকে ঘি বের করলেন এবং তাতে মেশালেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার উপর আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী পাঠ করলেন এবং বললেন: দশজন লোককে অনুমতি দাও। তিনি তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তখন তারা সবাই আহার করলেন, এমন কি সবাই তৃপ্ত হয়ে সেখান থেকে বের হলেন। এরপর তিনি আবার বললেনঃ (আরও) দশজনকে অনুমতি দাও। তখন তাদেরকে অনুমতি দেয়া হলো। এভাবে তারা সবাই আহার করলেন, এমনকি সবাই তৃপ্ত হয়ে সেখান থেকে বের হলেন। এরপর আবারো তিনি বললেন: আরো দশজনকে আসতে দাও। দলের লোকসংখ্যা ছিল সত্তর বা আশি জন।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, নিশ্চই প্রতিটি আমলের গ্রহণযোগ্যতা তার নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল। কোন ব্যক্তি তা-ই লাভ করবে যা সে নিয়্যাত করে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য হিজরাত করবে তার হিজরাত আল্লাহ ও তার রাসূলের সন্তুষ্টির জন্যই হবে। আর যার হিজরাত দুনিয়া লাভের জন্য হবে অথবা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্য হবে তার হিজরাত সে উদ্দেশেই হবে যে জন্য সে হিজরাত করেছে।

আবদুল্লাহ ইবন কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। কা'ব যখন অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, তখন তার এক পুত্র তাকে ধরে নিয়ে চলতেন। আবদুর রাহমান বলেন, আমি (আল্লাহর বাণী) : 'যে তিনজন তাবূকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত হয়েছে' সংক্রান্ত ঘটনা বর্ণনা করতে কা'ব ইবন মালিককে শুনেছি। তিনি তার বর্ণনার শেষভাগে বলেন, আমার তওবা এটাই যে আমার সমস্ত মাল আল্লাহ ও তার রাসূলের কাছে দান করে দিয়ে আমি মুক্ত হব। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ মালের কিছুটা তোমার নিজের জন্য রাখ, এটাই তোমার জন্য কল্যাণকর।

আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ নবী (ﷺ) জয়নাব বিনতে জাহশ (রাসূলের স্ত্রীদের একজন) এর ঘরে (কিছু সময়) থাকতেন এবং তিনি তার ঘরে মধু পান করতেন। আয়িশাহ বলেন, আমি এবং হাফসাহ পরস্পরে পরামর্শ করলাম যে, নবী (ﷺ) আমাদের দু'জনের মধ্যে যার কাছেই আগে আসবেন আমরা তাকে বলব, আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? এরপর তিনি কোন একজনের ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি তাকে ঐ কথাটা বললেন। তখন নবী (ﷺ) জবাব দিলেন, না, আমি তো যাইনাব বিন্ত জাহাশের কাছে মধু পান করেছি। এরপরে আর কক্ষনো এটা করব না। অতঃপর নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়ঃ হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করেছেন তা আপনি কেন নিষিদ্ধ করছেন? ..(পর্যন্ত) "তোমরা উভয়ে যদি আল্লাহর কাছে তওবা কর।" (66.1-4) দু'জন হলেন আয়েশা ও হাফসা। এবং আল্লাহর বাণী: 'আর (মনে রাখবেন) যখন নবী তার একজন স্ত্রীর কাছে আত্মবিশ্বাসের সাথে একটি বিষয় প্রকাশ করেছিলেন!' (66.3) তার এই উক্তি, "কিন্তু আমি মধু পান করেছি।" হিশাম বললেন: এর অর্থ তার এই কথাটিও ছিল, "আমি আর পান করব না, এবং আমি শপথ নিয়েছি, তাই কাউকে জানাবেন না।"

সাঈদ ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি ইবন উমার-কে বলতে শুনেছেন, তোমাদেরকে কি মানত করতে নিষেধ করা হয়নি? নবী (ﷺ) তো বলেছেনঃ মানত কোন কিছুকে বিন্দুমাত্র এগিয়ে নিতেও পারে না এবং পিছাতেও পারে না। মানতের মাধ্যমে কৃপণের নিকট হতে (কিছু ধন মাল) বের করে নেয়া হয়।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মানত করতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেনঃ তা কিছুই রদ করতে পারে না, কিন্তু কৃপণ থেকে (কিছু মালধন) বের করা হয়।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মানত আদম সন্তানকে এমন কিছু এনে দিতে পারে না, যা আমি (আল্লাহ) তার তাক্দীরে নির্দিষ্ট করিনি। বরং মানতটি তাক্দীরের মাঝেই ঢেলে দেয়া হয় যা তার জন্য বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ কৃপণের নিকট হতে (সম্পদ) বের করে নিয়ে আসেন। অতঃপর তাকে এমন কিছু দেন যা তাকে পূর্বে দেয়া হয়নি।

ইমরান ইবন হুসায়ন হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে আমার যুগ সর্বোত্তম, এরপর তাদের পরবর্তী যুগ অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগ। ইমরান বলেন, নবী (ﷺ) তার যুগ বলার পর দু'বার বলেছেন না কি তিনবার তা আমার জানা নেই। এরপর এমন লোকেরা আসবে যারা মানত করবে কিন্তু তা পূরা করবে না। তারা খিয়ানাত করবে, আমানতদার হবে না। তারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদের সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। আর তাদের মাঝে আরাম বিলাসিতা প্রকাশ পাবে।

আয়িশাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি এরূপ মানত করে যে, সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে। আর যে মানত করে, সে আল্লাহর না-ফরমানী করবে, সে যেন তার না-ফরমানী না করে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, উমার একবার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়্যাতের যুগে মানত করেছিলাম যে, মসজিদে হারামে এক রাত ইতি'কাফ করব। তিনি বললেনঃ তুমি তোমার মানত পূর্ণ কর।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ-কে ইবন আব্বাস জানিয়েছেন যে, সাদ ইবন উবাদাহ আনসারী নবী (ﷺ)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন তার মায়ের কোন এক মানতের ব্যাপারে, যা আদায় করার আগেই তিনি ইনতিকাল করেন। তখন নবী (ﷺ) তাকে তার মায়ের পক্ষ থেকে মানত পূর্ণ করার আদেশ দিলেন। পরবর্তীতে এটাই সুন্নাত হয়ে গেল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর কাছে এক লোক এসে বলল যে, আমার বোন হাজ্জের মানত করেছিল। কিন্তু সে মারা গেছে। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তার ওপর কোন ঋণ থাকলে তবে কি তুমি তা আদায় করতে না? লোকটি বলল, হা। তিনি বললেনঃ কাজেই আল্লাহর হককে আদায় করে দাও। কেননা, আল্লাহর হক আদায় করা আরো বড় কর্তব্য।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে লোক আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করে সে যেন তার আনুগত্য করে। আর যে লোক আল্লাহর অবাধ্যতা করার মানত করে সে যেন তার অবাধ্যতা না করে।

আনাস সুত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ এ লোক যে নিজের জানকে কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে এতে আল্লাহর আদৌ প্রয়োজন নেই। আর তিনি লোকটিকে দেখলেন যে, সে তার দু' ছেলের উপর ভর করে হাটছে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এক লোককে দেখতে পেলেন। লোকটি একটি দড়ি অথবা অন্য কিছুর সাহায্যে কাবা তাওয়াফ করছে। তিনি দড়িটি কেটে দিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) কাবাহর তাওয়াফ কালে এক লোকের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি অন্য আরেক লোককে নাকে দড়ি লাগিয়ে টানছিল (আর সে তাওয়াফ করছিল)। তখন নবী (ﷺ) নিজ হতে তার দড়িটি কেটে ফেললেন এবং তাকে হাত দ্বারা টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সময় নবী (ﷺ) খুত্বা দিচ্ছিলেন। এক লোককে দাড়ানো অবস্থায় দেখে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল আবূ ইসরাঈল। সে মানত করেছে যে, সে দাড়িয়ে থাকবে, বসবে না, ছায়া গ্রহণ করবে না, কারো সাথে কথা বলবে না এবং সওম পালন করবে। নবী (ﷺ) বললেনঃ লোকটিকে বল- সে যেন কথা বলে, ছায়ায় যায়, বসে এবং তার সওম পূর্ণ করে।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন উমরকে এক লোক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল যে লোক মানত করেছিল যে, সে সওম পালন থেকে কোন দিনই বিরত থাকবে না। আর তার ভিতর কুরবানী বা ঈদুল ফিত্রের দিন এসে গেল। তিনি বললেন, নিশ্চই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাঝে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে। তিনি ঈদুল ফিত্রের এবং কুরবানীর দিন সওম পালন করতেন না। আর তিনি ঐ দিনগুলোতে সওম পালন করা জায়েযও মনে করতেন না।

যিয়াদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সময় ইবন উমার-এর সাথে ছিলাম। এক লোক তাকে জিজ্ঞেস করল, আমি মানত করেছিলাম যে, যতদিন বাচব প্রতি মঙ্গলবার এবং বুধবার সওম পালন করব। কিন্তু এর ভিতর কুরবানীর দিন পড়ে গেল। তিনি বললেন, আল্লাহ মানত পুরা করার হুকুম করেছেন; আর কুরবানীর দিন সওম পালন করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। লোকটি আবার সেই প্রশ্ন করল। তিনি এরকমই উত্তর দিলেন, অধিক কিছু বললেন না।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে খায়বারের যুদ্ধের দিন বের হলাম। আমরা মাল, আসবাবপত্র ও কাপড়-চোপড় ছাড়া সোনা বা রুপা গণীমত হিসাবে পাইনি। যুবায়র গোত্রের রিফাআ ইবন যায়দ নামক এক লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে একটি গোলাম হাদিয়া দিলেন, যার নাম ছিল মিদ'আম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওয়াদি উল কুরার দিকে রওয়ানা হলেন। তিনি যখন ওয়াদিউল কুরায় পৌছলেন, তখন মিদ'আম রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সওয়ারীর হাওদা থেকে মালপত্র নামাচ্ছিলেন। তখন হঠাৎ একটি তীর এসে তার গায়ে বিঁধল এবং তাতে সে মারা গেল। লোকেরা বলল, সে জান্নাত লাভ করুক। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন কক্ষনো না, কসম ঐ সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! খায়বারের যুদ্ধের দিন গনীমতের মাল থেকে বণ্টনের পূর্বে যে চাদরটি সে নিয়ে গিয়েছিল তার গায়ে তা আগুনের শিখা হয়ে জ্বলবে। যখন লোকেরা এটা শুনল, তখন এক লোক একটি বা দু'টি ফিতা নিয়ে নবী (ﷺ) এর কাছে এসে হাযির হল। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে জাহান্নামের একটি ফিতা বা জাহান্নামের দু'টি ফিতা।