যাকাত (১৩৯৫-১৫১২)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) মুআয-কে ইয়ামান দেশে (শাসক হিসেবে) প্রেরণ করেন। অতঃপর বললেন, সেখানকার অধিবাসীদেরকে এ সাক্ষ্য দানের প্রতি আহবান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর প্রতি দিনে ও রাতে পাচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করেছেন। যদি সেটাও তারা মেনে নেয় তবে তাদেরকে অবগত কর যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে সদাকাহ (যাকাত) ফরজ করেছেন। যেটা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রদের মাঝে প্রদান করা হবে।
আবূ আইয়ূব থেকে বর্ণিত যে, জনৈক সাহাবী নবী (ﷺ) -কে বললেনঃ আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তার কী হয়েছে! তার কী হয়েছে! এবং বললেনঃ তার দরকার রয়েছে তো। তুমি আল্লাহর ইবাদাত করবে, তার সঙ্গে অপর কোন কিছুকে শরীক করবে না। সালাত আদায় করবে, যাকাত আদায় করবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত যে, এক বেদুইন নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যদি আমি তা সম্পাদন করি তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসূল (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহর ইবাদাত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরয সালাত আদায় করবে, ফরয যাকাত প্রদান করবে, রমাযান মাসে সিয়াম পালন করবে। সে বলল, যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবী (ﷺ) বললেনঃ যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়।
ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ) -এর নিকটে হাযির হয়ে আরয করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা রাবীআ গোত্রের লোক, আমাদের ও আপনার (মদ্বীনার) মধ্যে মুযার গোত্রের কাফিররা বাধা হয়ে রয়েছে। আমরা আপনার কাছে কেবল নিষিদ্ধ মাস (যুদ্ধ বিরতির মাস) ব্যতীত নির্বিঘ্নে আসতে পারি না। কাজেই এমন কিছু আমলের আদেশ করুন যা আমরা আপনার কাছ থেকে শিখে (আমাদের গোত্রের) অনুপস্থিতদেরকে সেদিকে আহবান করতে পারি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তোমাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ করছি ও চারটি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। (পালনীয় বিষয়গুলো হলোঃ) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা তথা সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। (রাবী বলেন) এ কথা বলার সময় নবী (ﷺ) (একক নির্দেশক) তার হাতের অঙ্গুলি বন্ধ করেন, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা ও তোমরা গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে। আর আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি 'দুব্বা' শুষ্ক কদুর খোলস, 'হান্তাম' সবুজ রং প্রলেপযুক্ত পাত্র, 'নাকির' খেজুর কান্ড নির্মিত পাত্র, 'মুজাফফাত' তৈলজ পদার্থ প্রলেপযুক্ত মাটির পাত্র ব্যবহার করতে।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর মৃত্যুর পর আবূ বাকর-এর খিলাফতের সময় আরবের কিছু লোক মুরতাদ হয়ে যায়। তখন উমার [আবূ বাকর-কে লক্ষ্য করে] বললেন, আপনি (সে সব) লোকদের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ করবেন (যারা সম্পূর্ণ ধর্ম পরিত্যাগ করেনি বরং যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে মাত্র)? অথচ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ 'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ' নেই বলার পূর্ব পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ আমাকে দেয়া হয়েছে, যে কেউ তা বললো, সে তার সম্পদ ও জীবন আমার পক্ষ থেকে নিরাপদ করে নিলো। তবে ইসলামের বিধান লঙ্ঘন করলে (শাস্তি দেয়া যাবে), আর তার অন্তরের গভীর (হৃদয়াভ্যন্তরে কুফরী বা পাপ লুকানো থাকলে এর) হিসাব-নিকাশ আল্লাহর যিম্মায়।
আবূ বাকর বললেনঃ আল্লাহর শপথ! তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চই আমি যুদ্ধ করবো যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, কেননা যাকাত হল সম্পদের উপর আরোপিত হাক্ব। আল্লাহর কসম। যদি তারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিতেও অস্বীকৃতি জানায় যা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে তারা দিত, তাহলে যাকাত না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই যুদ্ধ করবো। উমার বলেনঃ আল্লাহর কসম, আল্লাহ আবূ বাকর-এর হৃদয় বিশেষ জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করেছেন বিধায় তার এ দৃঢ়তা, এতে আমি বুঝতে পারলাম তার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
জারীর ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -এর নিকট সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া ও সকল মুসলিমের কল্যাণ কামনা করার উপর বায়আত করি।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের উটের (উপর দরিদ্র, বঞ্চিত, মুসাফিরের) হক আদায় না করবে, কিয়ামত দিবসে সেই উট দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে এসে খুর দিয়ে আপন মালিককে পিষ্ট করবে এবং যে ব্যক্তি নিজের বকরীর হক আদায় না করবে, সে বকরী দুনিয়া অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হয়ে এসে মালিককে খুর দিয়ে পদদলিত করবে ও শিং দিয়ে আঘাত করবে। উট ও বকরীর হক হলো পানির নিকট (ঘাটে) জনসমাগম স্থলে- ওদের দোহন করা (ও দরিদ্র বঞ্চিতদের মধ্যে দুধ বণ্টন করা)। নবী (ﷺ) আরো বলেনঃ তোমাদের কেউ যেন কিয়ামত দিবসে (হাক্ব অনাদায়জনিত কারণে শাস্তি স্বরূপ) কাঁধের উপর চিৎকাররত বকরী বহন করে (আমার নিকট) না আসে এবং বলে, হে মুহাম্মদ! (আমাকে রক্ষা করুন)। তখন আমি বলবঃ তোমাকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমার কোনো ক্ষমতা নেই। আমি তো (হক অনাদায়ের পরিণতির কথা) পৌছে দিয়েছি। আর কেউ যেন চিৎকাররত উট কাঁধের উপর বহন করে এসে না বলে, হে মুহাম্মাদ! (আমাকে রক্ষা করুন)। তখন আমি বলবঃ তোমাকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমার কোন ক্ষমতা নেই। আমি তো (শেষ পরিণতির কথা) পৌছে দিয়েছি।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে টেকো (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সাপটি তার মুখের দু'পার্শ্ব কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তিলাওয়াত করেন: "আল্লাহ যাদেরকে সম্পদশালী করেছেন অথচ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে, সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর হবে। অচিরেই কিয়ামাত (কিয়ামত) দিবসে, যা নিয়ে কার্পণ্য করছে তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃক্মখলাবদ্ধ করা হবে"- (আলু ইমরানঃ ১৮০)।
খালিদ ইবন আসলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর সাথে বের হলাম। এক মরুবাসী তাকে বললো, আল্লাহ তাআলার বাণী: "যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে আর আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না"-এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। ইবন উমার বললেন, যে ব্যক্তি সম্পদ জমা করে রাখে আর এর যাকাত আদায় করে না, তার জন্য রয়েছে শাস্তি- এ তো ছিল যাকাত বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগের কথা। এরপর যখন যাকাত বিধান অবতীর্ণ হলো তখন একে আল্লাহ ধন-সম্পদের পবিত্রতা অর্জনের উপায় করে দিলেন।
আবূ সাঈদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ পাচ উকিয়ার কম সম্পদের উপর যাকাত (ফারয) নেই এবং পাচটি উটের কমের উপর যাকাত নেই। পাচ ওয়াসাক এর কম উৎপন্ন দ্রব্যের উপর যাকাত নেই।
যায়দ ইবন অহব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাবাযাহ নামক স্থান দিয়ে চলার পথে আবূ যার-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। আমি তাকে বললাম, আপনি এখানে কী কারণে আসলেন? তিনি বললেন, আমি সিরিয়ায় অবস্থানকালে নিম্নোক্ত আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে মু'আবিয়া-এর সাথে আমার মতানৈক্য হয়: "যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে এবং আল্লাহর রাস্তায় তা ব্যয় করে না..."- (আত্তাওবাঃ ৩৪)। মু'আবিয়া বলেন, এ আয়াত কেবল আহলে কিতাবদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বললাম, আমাদের ও তাদের সকলের সম্পর্কেই অবতীর্ণ হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এক সময় মু'আবিয়া উসমান-এর নিকট আমার নামে অভিযোগ করে পত্র পাঠালেন। তিনি পত্রযোগে আমাকে মাদ্বীনায় ডেকে পাঠান। মাদ্বীনায় পৌছলে আমাকে দেখতে লোকেরা এত ভিড় করলো যে, এর পূর্বে যেন তারা কখনো আমাকে দেখেনি। উসমান-এর নিকট ঘটনা বিবৃত করলে তিনি আমাকে বললেন, ইচ্ছা করলে আপনি মাদ্বীনার বাইরে নিকটে কোথাও থাকতে পারেন। এ হল আমার এ স্থানে অবস্থানের কারণ। খালীফা যদি কোন হাবশী লোককেও আমার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করেন তবুও আমি তার কথা শুনব এবং আনুগত্য করবো।
আহনাফ ইবন কায়স থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি কুরাইশ গোত্রীয় একদল লোকের সাথে বসেছিলাম, এমন সময় রুক্ষ্ম চুল, মোটা কাপড় ও খসখসে শরীর বিশিষ্ট এক ব্যক্তি তাদের নিকট এসে সালাম দিয়ে বললো, যারা সম্পদ জমা করে রাখে তাদেরকে এমন গরম পাথরের সংবাদ দাও, যা তাদেরকে শাস্তি প্রদানের জন্য জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে। তা তাদের স্তনের বোঁটার উপর স্থাপন করা হবে আর তা কাঁধের পেশী ভেদ করে বের হবে এবং কাঁধের চিকন হাড্ডির ওপর স্থাপন করা হবে, তা নড়াচড়া করে সজোরে স্তনের বোঁটা ছেদ করে বের হবে। এরপর লোকটি ফিরে গিয়ে একটি স্তম্ভের পাশে বসল। আমিও তার অনুগমন করলাম ও তার কাছে বসলাম। অথচ আমি জানতাম না সে কে। আমি তাকে বললাম, আমার মনে হয় যে, আপনার বক্তব্য লোকেরা পছন্দ করেনি। তিনি বললেন, তারা কিছুই বুঝে না।
কথাটি আমাকে আমার বন্ধু বলেছেন। রাবী বলেন, আমি বললাম, আপনার বন্ধু কে? সে বলল, তিনি হলেন নবী (ﷺ)। তিনি আমাকে বলেন, হে আবূ যার! তুমি কি উহুদ পাহাড় দেখেছ? তিনি বলেন, তখন আমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দিনের কতটুকু অংশ বাকি রয়েছে। আমার ধারণা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার কোন প্রয়োজনে আমাকে পাঠাবেন। আমি জবাবে বললাম, জী-হা। তিনি বললেনঃ আমি পছন্দ করি না যে আমার জন্য উহুদ পর্বত পরিমাণ স্বর্ণ হোক আর তা সমুদয় আমি নিজের জন্য ব্যয় করি তিনটি দ্বীনার ব্যতীত। [আবূ যার বলেন] তারা তো বুঝে না, তারা শুধু দুনিয়ার সম্পদই একত্রিত করছে। আল্লাহর কসম, না! না! আমি তাদের নিকট দুনিয়ার কোন সম্পদ চাই না এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করা পর্যন্ত দ্বীন সম্পর্কেও তাদের নিকট কিছু জিজ্ঞেস করবো না।
ইবন মাসঊদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, কেবল মাত্র দু'ধরনের ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা রাখা যেতে পারে, একজন এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং ন্যায় পথে তা ব্যয় করার মত ক্ষমতাবান করেছেন। অপরজন এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ দ্বীনের জ্ঞান দান করেছেন (আর তিনি) সে অনুযায়ী ফয়সালা দেন ও অন্যান্যকে তা শিক্ষা দেন।
আবূ হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি হালাল কামাই থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সদাকাহ করবে, (আল্লাহ তা কবূল করবেন) এবং আল্লাহ কেবল পবিত্র মাল কবূল করেন আর আল্লাহ তার ডান হাত দিয়ে তা কবূল করেন। এরপর আল্লাহ দাতার কল্যাণার্থে তা প্রতিপালন করেন যেমন তোমাদের কেউ অশ্ব শাবক প্রতিপালন করে থাকে, অবশেষে সেই সদাকাহ পাহাড় বরাবর হয়ে যায়।
হারিসাহ্ ইবন অহব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা সদাকাহ কর, কেননা তোমাদের ওপর এমন যুগ আসবে যখন মানুষ আপন সদাকাহ নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কিন্তু তা গ্রহণ করার মত কাউকে পাবে না। (যাকে দাতা দেয়ার ইচ্ছা করবে সে) লোকটি বলবে, গতকাল পর্যন্ত নিয়ে আসলে আমি গ্রহণ করতাম। আজ আমার আর কোন প্রয়োজন নেই।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে সম্পদ বৃদ্ধি পেয়ে উপচে না পড়বে, এমনকি সম্পদের মালিকগণ তার সদাকাহ কে গ্রহণ করবে তা নিয়ে চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়বে। যাকেই দান করতে চাইবে সে-ই বলবে, প্রয়োজন নেই।
আদী ইবন হাতিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -এর কাছে ছিলাম, এমন সময় দু'জন সাহাবী আসলেন, তাদের একজন দারিদ্রের অভিযোগ করছিলেন আর অপরজন রাহাজানির অভিযোগ করছিলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ রাহাজানির অবস্থা এই যে, কিছু দিন পর এমন সময় আসবে যখন কাফিলা মক্কা পর্যন্ত বিনা পাহারায় পৌছে যাবে। আর দারিদ্রের অবস্থা এই যে, তোমাদের কেউ সদাকাহ নিয়ে ঘোরাফিরা করবে, কিন্তু তা গ্রহণ করার মত কাউকে পাবে না। এমন সময় না আসা পর্যন্ত কিয়ামত কায়িম হবে না। অতঃপর (বিচার দিবসে) আল্লাহর নিকট তোমাদের কেউ এমনভাবে খাড়া হবে যে, তার ও আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল থাকবে না বা কোন ব্যাখ্যাকারী দোভাষীও থাকবে না। অতঃপর তিনি বলবেনঃ আমি কি তোমাকে সম্পদ দানকারিণী? সে অবশ্যই বলবে, হ্যা। এরপর তিনি বলবেন, আমি কি তোমার নিকট রাসূল প্রেরণ করিনি? সে অবশ্যই বলবে হা, তখন সে ব্যক্তি ডান দিকে তাকিয়ে শুধু আগুন দেখতে পাবে, তেমনিভাবে বাম দিকে তাকিয়েও আগুন দেখতে পাবে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এক টুকরা খেজুর (সদাকাহ) দিয়ে হলেও যেন আগুন হতে আত্মরক্ষা করে। যদি কেউ তা না পায় তবে যেন উত্তম কথা দিয়ে হলেও।
আবূ মূসা (আশআরী)-এর সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মানুষের উপর অবশ্যই এমন এক সময় আসবে যখন লোকেরা সদাকাহর সোনা নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কিন্তু একজন গ্রহীতাও পাবে না। পুরুষের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় এবং নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চল্লিশজন নারী একজন পুরুষের অধীনে থাকবে এবং তার আশ্রয় গ্রহণ করবে।
আবূ মাসঊদ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন সদাকাহর আয়াত নাযিল হলো তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যক্তি এসে প্রচুর মাল সদাকাহ করলো। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগলো, এ ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশে দান করেছে, আর এক ব্যক্তি এসে এক সা' পরিমাণ দান করলে তারা বললো, আল্লাহ তো এ ব্যক্তির এক সা' হতে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়ঃ "মুমিনগণের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় সদাকাহ দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই পায় না তাদেরকে যারা দোষারোপ করে....."- (আত্তওবাঃ ৭৯)।
আবূ মাসঊদ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে সদাকাহ করতে আদেশ করলেন তখন আমাদের কেউ বাজারে গিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করে মুদ পরিমাণ অর্জন করত (এবং তা হতেই সদাকাহ করত) অথচ আজ তাদের কেউ কেউ লক্ষপতি।
আদী ইবন হাতিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, তোমরা জাহান্নাম হতে আত্মরক্ষা কর এক টুকরা খেজুর সদাকাহ করে হলেও।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ভিখারিণী দু'টি শিশু কন্যা সঙ্গে করে আমার নিকট এসে কিছু চাইলো। আমার নিকট একটি খেজুর ব্যতীত অন্য কিছু ছিল না। আমি তাকে তা দিলাম। সে নিজে না খেয়ে খেজুরটি দু'ভাগ করে কন্যা দু'টিকে দিয়ে দিল। এরপর ভিখারিণী বেরিয়ে চলে গেলে নবী (ﷺ) আমাদের নিকট আসলেন। তার নিকট ঘটনা বিবৃত করলে তিনি বললেনঃ যাকে এরূপ কন্যা সন্তানের ব্যাপারে কোনরূপ পরীক্ষা করা হয় সে কন্যা সন্তান তার জন্য জাহান্নামের আগুন হতে আড় হয়ে দাড়াবে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সাহাবী আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন সদাকাহর সওয়াব বেশি পাওয়া যায়? তিনি (ﷺ) বললেনঃ সুস্থ ও কৃপণ অবস্থায় তোমার সদাকাহ করা যখন তুমি দারিদ্রের আশঙ্কা করবে ও ধনী হওয়ার আশা রাখবে। সদাকাহ করতে এ পর্যন্ত দেরী করবে না যখন প্রাণবায়ু কণ্ঠাগত হবে, আর তুমি বলতে থাকবে, অমুকের জন্য এতটুকু, অমুকের জন্য এতটুকু, অথচ তা অমুকের জন্য হয়ে গেছে।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত যে, কোন নবী সহধর্মিনী নবী (ﷺ) -কে বললেনঃ আমাদের মধ্য হতে সবার পূর্বে (মৃত্যুর পর) আপনার সাথে কে মিলিত হবে? তিনি বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যার হাত সবচেয়ে লম্বা। তারা একটি বাশের কাঠির মাধ্যমে হাত মেপে দেখতে লাগলেন। সওদার হাত সকলের হাতের চেয়ে লম্বা বলে প্রমাণিত হল। পরে [সবার আগে যায়নাব-এর মৃত্যু হলে] আমরা বুঝলাম হাতের দীর্ঘতার অর্থ দানশীলতা। তিনি [যায়নাব] আমাদের মধ্যে সবার আগে তার (ﷺ) সাথে মিলিত হন এবং তিনি দান করতে ভালবাসতেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ (পূর্ববর্তী উম্মাতের মধ্যে) এক ব্যক্তি বলল, আমি কিছু সদাকাহ করব। সদাকাহ নিয়ে বের হয়ে (ভুলে) সে এক চোরের হাতে তা দিয়ে দিলো। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, চোরকে সদাকাহ দেয়া হয়েছে। এতে সে বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই, আমি অবশ্যই সদাকাহ করবো। সদাকাহ নিয়ে বের হয়ে তা এক ব্যভিচারিণীর হাতে দিল। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, রাতে এক ব্যভিচারিণীকে সদাকাহ দেয়া হয়েছে। লোকটি বললো, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই, (আমার সদাকাহ) ব্যভিচারিণীর হাতে পৌছল! আমি অবশ্যই সদাকাহ করব। এরপর সে সদাকাহ নিয়ে বের হয়ে কোন এক ধনী ব্যক্তির হাতে দিল। সকালে লোকেরা বলতে লাগলো, ধনী ব্যক্তিকে সদাকাহ দেয়া হয়েছে। লোকটি বলল, হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনারই, (আমার সদাকাহ) চোর, ব্যভিচারিণী ও ধনী ব্যক্তির হাতে গিয়ে পড়লো! পরে স্বপ্নযোগে তাকে বলা হলো, তোমার সদাকাহ চোর পেয়েছে, সম্ভবত সে চুরি করা হতে বিরত থাকবে, তোমার সদাকাহ ব্যভিচারিণী পেয়েছে, সম্ভবত সে তার ব্যভিচার হতে পবিত্র থাকবে আর ধনী ব্যক্তি তোমার সদাকাহ পেয়েছে, সম্ভবত সে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর দেয়া সম্পদ হতে সদাকাহ করবে।
মান ইবন ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি, আমার পিতা (ইয়াযীদ) ও আমার দাদা (আখনাস) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে বায়আত করলাম। তিনি আমার বিবাহের প্রস্তাব করেন এবং আমার বিবাহ সম্পন্ন করে দেন। আমি তার কাছে (একটি বিষয়ে) বিচার প্রার্থী হই, একদা আমার পিতা ইয়াযীদ কিছু স্বর্ণমুদ্রা সদাকাহ করার নিয়্যাতে মসজিদে এক ব্যক্তির নিকট রেখে (তাকে তা বিতরণ করার সাধারণ অনুমতি দিয়ে) আসেন। আমি সে ব্যক্তির নিকট হতে তা গ্রহণ করে পিতার নিকট আসলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! তোমাকে দেয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। বিষয়টি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে পেশ করলাম। তিনি বললেনঃ হে ইয়াযীদ! তুমি যে নিয়্যাত করেছ, তা তুমি পাবে আর হে মান! তুমি যা গ্রহণ করেছ তা তোমারই।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যে দিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না সে দিন আল্লাহ তাআলা সাত প্রকার মানুষকে সে ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। (১) ন্যায়পরায়ণ শাসক। (২) যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের ভিতর গড়ে উঠেছে। (৩) যার অন্তরের সম্পর্ক সর্বদা মসজিদের সাথে থাকে। (৪) আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে দু'ব্যক্তি পরস্পর মহববত রাখে, উভয়ে একত্রিত হয় সেই মহববতের উপর আর পৃথক হয় সেই মহববতের উপর। (৫) এমন ব্যক্তি যাকে সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী (অবৈধ মিলনের জন্য) আহবান জানিয়েছে। তখন সে বলেছে, আমি আল্লাহকে ভয় করি। (৬) যে ব্যক্তি গোপনে এমনভাবে সদাকাহ করে যে, তার ডান হাত যা দান করে বাম হাত তা জানতে পারে না। (৭) যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাতে আল্লাহর ভয়ে তার চোখ হতে অশ্রু বের হয়ে পড়ে।
হারিসাহ ইবন অহব খুযা'ঈ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা সদাকাহ কর। কেননা অচিরেই তোমাদের উপর এমন সময় আসবে, যখন মানুষ সদাকাহর মাল নিয়ে ঘুরে বেড়াবে, তখন এক ব্যক্তি বলবে, গতকাল নিয়ে এলে অবশ্যই গ্রহণ করতাম কিন্তু আজ এর কোন প্রয়োজন আমার নেই।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কোন স্ত্রী যদি তার ঘর হতে বিপর্যয় সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া খাদ্যদ্রব্য সদাকাহ করে তবে এ জন্যে সে সওয়াব লাভ করবে আর উপার্জন করার কারণে স্বামীও সওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চীও অনুরূপ সওয়াব পাবে। তাদের একজনের কারণে অন্য জনের সওয়াবে কোন কমতি হবে না।
আবূ হুরাইরাহ্-এর সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ হতে সদাকাহ করা উত্তম। যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে, প্রথমে তাদেরকে দিবে।
হাকীম ইবন হিযাম-এর সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উপরের হাত (দাতার হাত) নীচের হাত (গ্রহীতার হাত) অপেক্ষা উত্তম। প্রথমে তাদেরকে দিবে যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তুমি বহন কর। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ হতে সদাকাহ করা উত্তম। যে ব্যক্তি (পাপ ও ভিক্ষা করা হতে) পবিত্র থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন এবং যে পরমুখাপেক্ষিতা হতে বেচে থাকতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন।
ওহায়ব বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে অনুরূপ বর্ণিত আছে।
ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদা মিম্বারের উপর থাকা অবস্থায় সদাকাহ করা ও ভিক্ষা করা হতে বেচে থাকা ও ভিক্ষা করা প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেনঃ উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা উত্তম। উপরের হাত দাতার, আর নীচের হাত হলো ভিক্ষুকের।
উকবাহ ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করে দ্রুত ঘরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর বিলম্ব না করে বের হয়ে আসলেন। আমি বললাম বা তাকে বলা হলো, এমনটি করার কারণ কী? তখন তিনি বললেনঃ ঘরে সদাকাহর একখন্ড সোনা রেখে এসেছিলাম কিন্তু রাত পর্যন্ত তা ঘরে থাকা আমি পছন্দ করিনি। কাজেই তা বণ্টন করে দিয়ে এলাম।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ঈদের দিন বের হলেন এবং দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন, এর আগে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। এরপর তিনি বিলাল-কে সাথে নিয়ে মহিলাদের কাছে গেলেন। তাদের উপদেশ দিলেন এবং সদাকাহ করার নির্দেশ দিলেন। তখন মহিলাগণ কানের দুল ও হাতের কংকন ছুঁড়ে মারতে লাগলেন।
আবূ মূসা (আশআরী) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট কেউ কিছু চাইলে বা প্রয়োজনীয় কিছু চাওয়া হলে তিনি বলতেনঃ তোমরা সুপারিশ কর সওয়াব প্রাপ্ত হবে, আল্লাহ তার ইচ্ছা তার নবীর মুখে চূড়ান্ত করেন।
আসমা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বললেনঃ তুমি (সম্পদ কমে যাওয়ার আশঙ্কায়) সদাকাহ দেয়া বন্ধ করবে না। অন্যথায় তোমার জন্যও আল্লাহ কর্তৃক দান বন্ধ করে দেয়া হবে। আব্দা হতে বর্ণিত যে, [পূর্বোক্ত সূত্রে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন] তুমি (সম্পদ) গণনা করে জমা রেখো না, (এরূপ করলে) আল্লাহ তোমার রিযক বন্ধ করে দিবেন।
আসমা বিনতু আবূ বাকর হতে বর্ণিত যে, তিনি এক সময় নবী (ﷺ) -এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি তাকে বললেনঃ তুমি সম্পদ জমা করে রেখো না, এরূপ করলে আল্লাহ তোমা হতে তা আটকে রাখবেন। কাজেই সাধ্যানুসারে দান করতে থাক।
হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা উমার ইবন খাত্তাব বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে ফিতনা সম্পর্কিত হাদীস মনে রেখেছ? হুযায়ফা বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যেভাবে বলেছেন, আমি ঠিক সেভাবেই তা স্মরণ রেখেছি। উমার বললেন, তুমি [আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে] বড় দুঃসাহসী ছিলে, তিনি কিভাবে বলেছেন (বলতো)? তিনি বলেন, আমি বললাম, (হাদীসটি হলোঃ) মানুষ পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশি নিয়ে ফিতনায় পতিত হবে আর সালাত, সদাকাহ ও নেক কাজ সেই ফিতনা মুছে দিবে। সুলাইমান ['আমাশ] বলেন, আবূ ওয়াইল কোন কোন সময় সালাত, সদাকাহ ও সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে বলতেন। উমার বলেন, আমি এ ধরনের ফিতনার কথা অবগত হতে চাইনি, বরং যে ফিতনা সাগরের ঢেউয়ের মত প্রবল বেগে ছুটে আসবে। হুযায়ফা বলেন, আমি বললাম, আমীরুল মুমিনীন! আপনার জীবনকালে ঐ ফিতনার কোন ভয় নেই। সেই ফিতনা ও আপনার মাঝে বদ্ধ দরজা রয়েছে। উমার প্রশ্ন করলেন, দরজা কি ভেঙ্গে দেয়া হবে না কি খুলে দেয়া হবে? হুযাইফাহ বলেন, আমি বললাম, না বরং ভেঙ্গে দেয়া হবে। উমার বললেন, দরজা ভেঙ্গে দেয়া হলে কোন দিন তা আর বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, আমি বললাম, সত্যই বলেছেন। আবূ ওয়াইল বলেন, দরজা বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে- এ কথা হুযাইফাহ-এর নিকট প্রশ্ন করে জানতে আমরা কেউ সাহসী হলাম না। তাই প্রশ্ন করতে মাসরূককে অনুরোধ করলাম। মাসরূক হুযাইফাহ-কে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিলেনঃ দরজা হলেন উমার। আমরা বললাম, আপনি দরজা বলে যাকে উদ্দেশ্য করেছেন, 'উমর কি তা অনুধাবন করতে পেরেছেন? তিনি বললেন, হা, আগামীকালের পূর্বে রাতের আগমন যেমন সুনিশ্চিত (তেমনি নিঃসন্দেহে তিনি তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন)। এর কারণ হলো, আমি তাকে এমন হাদীস বর্ণনা করেছি, যাতে কোন ভুল ছিল না।
হাকীম ইবন হিযাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! ঈমান আনয়নের পূর্বে (সওয়াব লাভের উদ্দেশে) আমি সদাকাহ প্রদান, দাসমুক্ত করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ন্যায় যত কাজ করেছি সেগুলোতে সওয়াব হবে কি? তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তুমি যে সব ভালো কাজ করেছ তা নিয়েই ইসলাম গ্রহণ করেছ (তুমি সেসব কাজের সওয়াব পাবে)।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ স্ত্রী তার স্বামীর খাদ্য সামগ্রী হতে বিপর্যয়ের উদ্দেশ্য ব্যতীত সদাকাহ করলে সে সদাকাহ করার সওয়াব পাবে, উপার্জন করার কারণে স্বামীও এর সওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চীও অনুরূপ সওয়াব পাবে।
আবূ মূসা সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ যে বিশ্বস্ত মুসলিম খাজাঞ্চী (আপন মালিক কর্তৃক) নির্দেশিত পরিমাণ সদাকাহর সবটুকুই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সানন্দচিত্তে আদায় করে, সে খাজাঞ্চীও নির্দেশদাতার ন্যায় সদাকাহ দানকারী হিসেবে গণ্য।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন, স্ত্রী তার স্বামীর ঘর হতে কাউকে কিছু সদাকাহ করলে (স্ত্রী এর সওয়াব পাবে)।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ফাসাদের উদ্দেশ্য ব্যতীত স্ত্রী তার স্বামীর গৃহ হতে কাউকে কিছু আহার করালে স্ত্রী এর সওয়াব পাবে স্বামীও সমপরিমাণ সওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চীও সেই পরিমাণ সওয়াব পাবে। স্বামী উপার্জন করার কারণে আর স্ত্রী দান করার কারণে সওয়াব পাবে।
আয়িশাহ্ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ফাসাদের উদ্দেশ্য ব্যতীত স্ত্রী তার ঘরের খাদ্য সামগ্রী হতে সদাকাহ করলে সে এর সওয়াব পাবে। উপার্জন করার কারণে স্বামীও সওয়াব পাবে এবং খাজাঞ্চীও সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ প্রতিদিন সকালে দু'জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ কৃপণ ও সদাকাহ দানকারীর দৃষ্টান্ত এমন দু' ব্যক্তির মত যাদের পরিধানে দু'টি লোহার বর্ম রয়েছে। অপর সনদে আবুল ইয়ামান....আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছেন, কৃপণ ও সদাকাহ দানকারীর দৃষ্টান্ত এমন দু'ব্যক্তির মত, যাদের পরিধানে দু'টি লোহার বর্ম রয়েছে যা তাদের বুক হতে কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। দাতা ব্যক্তি যখন দান করে তখন বর্মটি তার সম্পূর্ণ দেহ পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে যায়। এমনকি হাতের আঙ্গুলের মাথা পর্যন্ত ঢেকে ফেলে ও (পায়ের পাতা পর্যন্ত ঝুলন্ত বর্ম) পদচিহ্ন মুছে ফেলে। আর কৃপণ ব্যক্তি যখন যৎসামান্যও দান করতে চায়, তখন যেন বর্মের প্রতিটি আংটা যথাস্থানে সেঁটে যায়, সে তা প্রশস্ত করতে চেষ্টা করলেও তা প্রশস্ত হয় না।
পূর্বের হাদিসের মতই (১৪৪৩)।
আবূ মূসা আশআরী সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ প্রতিটি মুসলিমের সদাকাহ করা উচিত। সাহাবীগণ আরয করলেন, কেউ যদি সদাকাহ দেয়ার মত কিছু না পায়? (তিনি উত্তরে) বললেনঃ সে ব্যক্তি নিজ হাতে কাজ করবে এতে নিজেও লাভবান হবে, সদাকাহও করতে পারবে। তারা বললেন, যদি এরও ক্ষমতা না থাকে? তিনি বললেনঃ কোন বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবে। তারা বললেন, যদি এতটুকুরও সামর্থ্য না থাকে? তিনি বললেনঃ এ অবস্থায় সে যেন সৎ আমল করে এবং অন্যায় কাজ হতে বিরত থাকে। এটা তার জন্য সদাকাহ বলে গণ্য হবে।
উম্মু 'আতিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নুসায়বা নাম্নী আনসারী মহিলার জন্য একটি বকরী (সদাকাহ স্বরূপ) পাঠানো হলো। তিনি বকরীর কিছু অংশ আয়িশাহ -কে (হাদিয়া স্বরূপ) পাঠিয়ে দিলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমাদের কাছে (আহার্য) কিছু আছে কি? আয়িশাহ বললেন, নুসায়বা কর্তৃক প্রেরিত সেই বকরীর গোশত ব্যতীত আর কিছুই নেই। তখন তিনি বললেনঃ তাই নিয়ে এসো, কেননা বকরীর (সদাকাহ) যথাস্থানে পৌছে গেছে (সদাকাহ গ্রহীতার নিকট)।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ পাচের কম সংখ্যক উটের উপর যাকাত নেই, পাচ উকিয়া-এর কম পরিমাণ রূপার উপর যাকাত নেই এবং পাচ ওয়াসক-এর কম পরিমাণ উৎপন্ন দ্রব্যের উপর সদাকাহ (উশর) নেই।
আনাস হতে বর্ণিত যে, আবূ বাকর আনাস-এর কাছে রাসূল (ﷺ) -কে আল্লাহ তাআলা যাকাত সম্পর্কে যে বিধান দিয়েছেন সে সম্পর্কে লিখে জানালেন, যে ব্যক্তির উপর যাকাত হিসেবে বিনতে মাখাযওয়াজিব হয়েছে কিন্তু তার কাছে তা নেই বরং বিনত্ লাবূন রয়েছে, তা হলে তা-ই (যাকাত স্বরূপ) গ্রহণ করা হবে। এ অবস্থায় যাকাত আদায়কারী যাকাত দাতাকে বিশটি দিরহাম বা দু'টি বকরী দিবে। আর যদি বিনতে মাখায না থাকে বরং ইবন লাবূন থাকে তা হলে তা-ই গ্রহণ করা হবে। এমতাবস্থায় আদায়কারীর যাকাত দাতাকে কিছু দিতে হবে না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুত্বা প্রদানের পূর্বেই (ঈদের) সালাত আদায় করেন, এরপর বুঝতে পারলেন যে, (সকলের পিছনে থাকা বিধায়) নারীদেরকে খুত্বার আওয়াজ পৌছাতে পারেননি। তাই তিনি নারীদের নিকট আসলেন, তার সাথে বিলাল ছিলেন। তিনি একখন্ড বস্ত্র প্রসারিত করে ধরলেন। নবী (ﷺ) তাদেরকে উপদেশ দিলেন ও সদাকাহ করতে আদেশ করলেন। তখন মহিলাগণ তাদের (অলংকারাদি) ছুঁড়ে মারতে লাগলেন। (রাবী) আইয়ুব তার কান ও গলার দিকে ইঙ্গিত করে (মহিলাগণের অলংকারাদি দান করার বিষয়) দেখালেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যাকাত সম্পর্কে যে বিধান দিয়েছেন তা আবূ বাকর তার নিকট লিখে পাঠান, যাকাতের (পরিমাণ কম-বেশি হওয়ার) আশংকায় বিচ্ছিন্ন (প্রাণী)-গুলোকে একত্রিত করা যাবে না এবং একত্রিতগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
আনাস হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যাকাত সম্পর্কে যে বিধান দিয়েছেন আবূ বাকর তা তাকে লিখে জানালেন, এক অংশীদার অপর অংশীদারের নিকট হতে তার প্রাপ্য আদায় করে নিবে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, জনৈক বেদুঈন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট হিজরাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ তোমার তো বড় সাহস! হিজরতের ব্যাপার কঠিন, বরং যাকাত দেয়ার মত তোমার কোন উট আছে কি? সে বলল, জী হ্যা, আছে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ সাগরের ওপারে হলেও (যেখানেই থাক) তুমি আমল করবে। তোমার ন্যূনতম আমলও আল্লাহ বিনষ্ট করবেন না।
আনাস হতে বর্ণিত যে, আবূ বাকর তার কাছে আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ) -কে যাকাত সম্পর্কে যে বিধান দিয়েছেন তা লিখে পাঠানঃ যে ব্যক্তির উপর উটের যাকাত হিসেবে জাযা'আ ফরজ হয়েছে, অথচ তার নিকট জাযা'আহ নেই বরং তার নিকট হিক্কা রয়েছে, তখন হিক্কা গ্রহণ করা হবে। এর সাথে সম্ভব হলে (পরিপূরকরূপে) দু'টি বকরী দিবে, অথবা বিশটি দিরহাম দিবে। আর যার উপর যাকাত হিসেবে হিক্কা ফরজ হয়েছে, অথচ তার কাছে হিক্কা নেই বরং জাযা'আ রয়েছে, তখন তার হতে জাযা'আ গ্রহণ করা হবে। আর যাকাত উসূলকারী (ক্ষতিপূরণ স্বরূপ) মালিককে বিশটি দিরহাম বা দু'টি বকরী দিবে। যার উপর হিক্কা ফরজ হয়েছে, অথচ তার নিকট বিনত্ লাবূন রয়েছে, তখন বিন্তে লাবূনই গ্রহণ করা হবে। তবে মালিক দু'টি বকরী বা বিশটি দিরহাম দিবে। আর যার ওপর বিন্ত লাবূন ফরজ হয়েছে, কিন্তু তার কাছে হিক্কা রয়েছে, তখন তার হতে হিক্কা গ্রহণ করা হবে এবং আদায়কারী মালিককে বিশটি দিরহাম বা দু'টি বকরী দিবে। আর যার ওপর বিন্ত লাবূন ফরজ হয়েছে কিন্তু তার নিকট তা নেই বরং বিন্তে মাখায রয়েছে, তবে তাই গ্রহণ করা হবে, অবশ্য মালিক এর সঙ্গে বিশটি দিরহাম বা দু'টি বকরী দিবে।
আনাস হতে বর্ণিত যে, আবূ বাকর তাকে বাহরাইনে প্রেরণকালে অত্র বিধানটি তার জন্য লিখে দেনঃ পরম দয়ালু করুণাময় আল্লাহর নামে। এটাই যাকাতের নিসাব-যা নির্ধারণ করেছেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মুসলিমদের প্রতি এবং যা আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলিমদের মধ্যে যার নিকট হতে নিয়মানুযায়ী চাওয়া হয়, সে যেন তা আদায় করে দেয় আর তার চেয়ে অধিক চাওয়া হলে তা যেন আদায় না করে। চবিবশ ও তার চেয়ে কম সংখ্যক উটের যাকাত বকরী দ্বারা আদায় করা হবে। প্রতিটি পাচটি উটে একটি বকরী এবং উটের সংখ্যা পঁচিশ হতে পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত হলে একটি মাদী বিনতে মাখায। ছত্রিশ হতে পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত একটি মাদী বিন্তে লাবূন। ছয়চল্লিশ হতে ষাট পর্যন্ত ষাড়ের পালযোগ্য একটি হিক্কা, একষট্টি হতে পঁচাত্তর পর্যন্ত একটি জাযা'আ, ছিয়াত্তর হতে নব্বই পর্যন্ত দু'টি বিন্তে লাবূন, একানব্বইটি হতে একশ বিশ পর্যন্ত ষাঁড়ের পালযোগ্য দু'টি হিক্কা আর একশ বিশের অধিক হলে (অতিরিক্ত) প্রতি চল্লিশটিতে একটি করে বিনতে লাবূন এবং (অতিরিক্ত) প্রতি পঞ্চাশটিতে একটি করে হিক্কা। যার চারটির বেশি উট নেই, সেগুলোর উপর কোন যাকাত নেই, তবে মালিক স্বেচ্ছায় কিছু দিতে চাইলে দিতে পারবে। কিন্তু যখন পাচে পৌছে তখন একটি বকরী ওয়াজিব। আর বকরীর যাকাত সম্পর্কেঃ গৃহপালিত বকরী চল্লিশটি হতে একশ বিশটি পর্যন্ত একটি বকরী। এর বেশি হলে দু'শটি পর্যন্ত দু'টি বকরী। দু'শর অধিক হলে তিনশ' পর্যন্ত তিনটি বকরী। তিনশ'র অধিক হলে প্রতি একশ'-তে একটি করে বকরী। কারো গৃহপালিত বকরীর সংখ্যা চল্লিশ হতে একটিও কম হলে তার উপর যাকাত নেই। তবে স্বেচ্ছায় দান করলে তা করতে পারে। রৌপ্যের যাকাত চল্লিশ ভাগের এক ভাগ। একশ নব্বই দিরহাম হলে সেক্ষেত্রে যাকাত নেই, তবে মালিক সেচ্ছায় কিছু দিলে দিতে পারে।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তার রাসূল (ﷺ) -এর প্রতি যাকাতের যে বিধান দিয়েছেন তা আবূ বাকর তার নিকট লিখে পাঠান। তাতে রয়েছেঃ অধিক বয়সে দাত পড়া বৃদ্ধ ও ত্রুটিযুক্ত বকরী এবং পাঁঠা যাকাত হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না, তবে যাকাত প্রদানকারী শেষোক্ত প্রাণী তথা পাঁঠা ইচ্ছা করলে দিতে পারেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর বলেছেন, আল্লাহর কসম! তারা যদি (যাকাতের) ঐরূপ একটি ছাগল ছানাও দিতে অস্বীকার করে যা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে দিতো, তবুও তাদের বিরুদ্ধে যাকাত না দেয়ার কারণে লড়াই করবো।
উমার বলেন, আমার নিকট স্পষ্ট যে, যুদ্ধের ব্যাপারে আল্লাহ আবূ বাকারের ক্বলব খুলে দিয়েছেন, তাই বুঝলাম তার সিদ্ধান্তই সঠিক।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মুআয (ইবন জাবাল)-কে শাসনকর্তা হিসেবে ইয়ামান দেশে পাঠান, তখন বলেছিলেনঃ তুমি আহলে কিতাব লোকদের নিকট যাচ্ছো। সেহেতু প্রথমে তাদের আল্লাহর ইবাদাতের দাওয়াত দিবে। যখন তারা আল্লাহর পরিচয় লাভ করবে, তখন তাদের তুমি বলবে যে, আল্লাহ দিন-রাতে তাদের উপর পাচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করে দিয়েছেন। যখন তারা তা আদায় করতে থাকবে, তখন তাদের জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধন-সম্পদ হতে গ্রহণ করা হবে এবং তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। যখন তারা এর অনুসরণ করবে তখন তাদের হতে তা গ্রহণ করবে এবং লোকের উত্তম মাল গ্রহণ করা হতে বিরত থাকবে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, পাচ ওসাক-এর কম পরিমাণ খেজুরের যাকাত নেই। পাচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যের যাকাত নেই এবং পাচটির কম উটের যাকাত নেই।
আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -এর কাছে গমন করলাম। তিনি বললেনঃ শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ (বা তিনি বললেন) শপথ সেই সত্তার, যিনি ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই, অথবা অন্য কোন শব্দে শপথ করলেন, উট, গরু বা বকরী থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এদের হক আদায় করেনি সেগুলো যেমন ছিল তার চেয়ে বৃহদাকার ও মোটা তাজা করে কিয়ামতের দিন হাযির করা হবে এবং তাকে পদপিষ্ট করবে এবং শিং দিয়ে গুঁতো দিবে। যখনই দলের শেষটি চলে যাবে তখন পালাক্রমে আবার প্রথমটি ফিরিয়ে আনা হবে। মানুষের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে এরূপ চলতে থাকবে। হাদীসটি বুকায়র আবূ সারিহ-এর মাধ্যমে হুরাইরাহ্ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মাদ্বীনার আনসারীগণের মধ্যে আবূ তালহা সবচাইতে বেশী খেজুর বাগানের মালিক ছিলেন। মসজিদে নাববীর নিকটবর্তী বায়রুহা নামক বাগানটি তার কাছে অধিক প্রিয় ছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার বাগানে প্রবেশ করে এর সুপেয় পানি পান করতেন। আনাস বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলোঃ "তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না"- (আলু ইমরানঃ ৯২)। তখন আবূ তালহা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ বলেছেনঃ "তোমরা যা ভালবাস তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না"- (আলু ইমরানঃ ৯২)। আর বায়রুহা বাগানটি আমার কাছে অধিক প্রিয়। এটি আল্লাহর নামে সদাকাহ করা হলো, আমি এর কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই আপনি যাকে দান করা ভাল মনে করেন তাকে দান করুন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তোমাকে ধন্যবাদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এ হচ্ছে লাভজনক সম্পদ। তুমি যা বলেছ তা শুনলাম। আমি মনে করি, তোমার আপন জনদের মধ্যে তা বণ্টন করে দাও। আবূ তালহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাই করব। অতঃপর তিনি তার আত্মীয়-স্বজন, আপন চাচার বংশধরের মধ্যে তা বণ্টন করে দিলেন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ঈদুল আযহা বা ঈদুল ফিত্রের দিনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ঈদগাহে গেলেন এবং সালাত শেষ করলেন। পরে লোকদের উপদেশ দিলেন এবং তাদের সদাকাহ দেয়ার নির্দেশ দিলেন আর বললেনঃ লোক সকল! তোমরা সদাকাহ দিবে। অতঃপর মহিলাগণের নিকট গিয়ে বললেনঃ মহিলাগণ! তোমরা সদাকাহ দাও। আমাকে জাহান্নামে তোমাদেরকে অধিক সংখ্যক দেখানো হয়েছে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এর কারণ কী? তিনি বললেনঃ তোমরা বেশি অভিশাপ দিয়ে থাক এবং স্বামীর অকৃতজ্ঞ হয়ে থাক। হে মহিলাগণ! জ্ঞান ও দ্বীনে অপরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দৃঢ়চেতা পুরুষের বুদ্ধি হরণকারিণী তোমাদের মত কাউকে দেখিনি। যখন তিনি ফিরে এসে ঘরে পৌছলেন, তখন ইবন মাসঊদ-এর স্ত্রী যায়নাব তার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! যায়নাব এসেছেন। তিনি বললেন, কোন যায়নাব? বলা হলো, ইবন মাসঊদের স্ত্রী। তিনি বললেনঃ হা, তাকে আসতে দাও। তাকে অনুমতি দেয়া হলো। তিনি বললেন, হে আল্লাহর নবী (ﷺ) আজ আপনি সদাকাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমার অলংকার আছে। আমি তা সদাকাহ করার ইচ্ছা করেছি। ইবন মাসঊদ মনে করেন, আমার এ সদাকায় তার এবং তার সন্তানদেরই হক বেশি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, ইবন মাসঊদ ঠিক বলেছে। তোমার স্বামী ও সন্তানই তোমার এ সদাকাহর অধিক হাক্দার।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিমের উপর তার ঘোড়া ও গোলামের কোন যাকাত নেই।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত।, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মুসলিমের উপর তার গোলাম ও ঘোড়ার কোন যাকাত নেই।
আবূ সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) মিম্বরে বসলেন এবং আমরা তার আশেপাশে বসলাম। তিনি বললেনঃ আমার পরে তোমাদের ব্যাপারে আমি যা আশঙ্কা করছি তা হলো এই যে দুনিয়ার চাকচিক্য ও সৌন্দর্য (ধন-সম্পদ) তোমাদের সামনে খুলে দেয়া হবে। এক সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কল্যাণ কি কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে? এতে নবী (ﷺ) নীরব হলেন। প্রশ্নকারীকে বলা হলো, তোমার কী হয়েছে? তুমি নবী (ﷺ) -এর সাথে কথা বলছ, কিন্তু তিনি তোমাকে জওয়াব দিচ্ছেন না? তখন আমরা অনুভব করলাম যে, নবী (ﷺ) -এর উপর ওয়াহী নাযিল হচ্ছে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তার ঘাম মুছলেন এবং বললেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? যেন তার প্রশ্নকে প্রশংসা করে বললেন, কল্যাণ কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে না। অবশ্য বসন্ত মৌসুম যে ঘাস উৎপন্ন করে তা (সবটুকুই সুস্বাদু ও কল্যাণকর বটে তবে) অনেক সময় হয়ত (ভোজনকারী প্রাণীর) জীবন নাশ করে অথবা তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। তবে ঐ তৃণভোজী জন্তু, যে পেট ভরে খাওয়ার পর সূর্যের তাপ গ্রহণ করে এবং মল ত্যাগ করে, প্রস্রাব করে এবং পুনরায় চলে (সেই মৃত্যু থেকে রক্ষা পায় তেমনি) এই সম্পদ হলো আকর্ষণীয় সুস্বাদু। কাজেই সে-ই ভাগ্যবান মুসলিম, যে এই সম্পদ থেকে মিসকীন, ইয়াতীম ও মুসাফিরকে দান করে অথবা নবী (ﷺ) যেরূপ বলেছেন, আর যে ব্যক্তি এই সম্পদ অন্যায়ভাবে উপার্জন করে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে খেতে থাকে এবং তার পেট ভরে না। কিয়ামত দিবসে ঐ সম্পদ তার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে।
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ)-এর স্ত্রী যায়নাব হতে বর্ণিত; [রাবী আ'মাশ বলেন,] আমি ইবরাহীম-এর সাথে এ হাদীসের আলোচনা করলে তিনি আবূ 'উবায়দাহ সূত্রে আমর ইবন হারিস-এর মাধ্যমে আবদুল্লাহ-এর স্ত্রী যায়নাব হতে হুবহু বর্ণনা করেন। তিনি [যায়নাব] বলেন, আমি মসজিদে ছিলাম। তখন নবী (ﷺ) -কে দেখলাম তিনি বলছেনঃ তোমরা সদাকাহ দাও যদিও তোমাদের অলংকার হতে হয়। যায়নাব আবদুল্লাহ ও তার পোষ্য ইয়াতীমের প্রতি খরচ করতেন। তখন তিনি আবদুল্লাহকে বললেন, তুমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট জেনে এসো যে, তোমার প্রতি এবং আমার পোষ্য ইয়াতীমদের প্রতি খরচ করলে আমার পক্ষ হতে সদাকাহ আদায় হবে কি? তিনি [ইবন মাসঊদ] বললেন, বরং তুমিই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে জেনে এসো। এরপর আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট গেলাম। তার দরজায় আরো একজন আনসারী মহিলাকে দেখলাম, তার প্রয়োজনও আমার প্রয়োজনের অনুরূপ। তখন বিলাল-কে আমাদের পাশ দিয়ে যেতে দেখে বললাম, আপনি নবী (ﷺ) -এর কাছে জিজ্ঞেস করুন, স্বামী ও আপন (পোষ্য) ইয়াতীমের প্রতি সদাকাহ করলে কি আমার পক্ষ হতে তা যথেষ্ট হবে? এবং এ কথাও বলেছিলাম যে, আমাদের কথা জানাবেন না। তিনি প্রবেশ করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তারা কে? বিলাল বললেন, যায়নাব। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, কোন যায়নাব? তিনি উত্তর দিলেন, আবদুল্লাহর স্ত্রী। নবী সল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাহু বললেনঃ তার জন্য দু'টি সওয়াব রয়েছে, আত্মীয়কে দেয়ার সওয়াব আর সদাকাহ দেয়ার সওয়াব।
উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! (আমার স্বামী) আবূ সালামার সন্তান, যারা আমারও সন্তান, তাদের প্রতি ব্যয় করলে আমার সওয়াব হবে কি? তিনি বললেনঃ তাদের প্রতি ব্যয় কর। তাদের প্রতি ব্যয় করার সওয়াব তুমি অবশ্যই পাবে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিলে বলা হলো, ইবন জামীল, খালিদ ইবন ওয়ালীদ ও আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব যাকাত প্রদানে অস্বীকার করছে। নবী (ﷺ) বললেনঃ ইবন জামীলের যাকাত না দেয়ার কারণ এ ছাড়া কিছু নয় যে, সে দরিদ্র ছিল, পরে আল্লাহর অনুগ্রহে ও তার রাসূলের বরকতে সম্পদশালী হয়েছে। আর খালিদের ব্যাপার হলো তোমরা খালিদের উপর অন্যায় করেছ, কারণ সে তার বর্ম ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর পথে আবদ্ধ রেখেছে। আর আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব তো আল্লাহর রাসূলের চাচা। তার যাকাত তার জন্য সদাকাহ এবং সমপরিমাণও তার জন্য সদাকাহ। ইবন আবুয্ যিনাদ তার পিতা হতে হাদীস বর্ণনায় শু'আইব-এর অনুসরণ করেছেন। আর ইবন ইসহাক আবুয্ যিনাদ হতে হাদীসের শেষাংশে 'সদাকাহ' শব্দের উল্লেখ করেননি। ইবন জুরাইজ বলেন, আ'রাজ হতে অনুরূপ হাদীস আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, কিছু সংখ্যক আনসারী সাহাবী আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট কিছু চাইলে তিনি তাদের দিলেন, পুনরায় তারা চাইলে তিনি তাদের দিলেন। এমনকি তার নিকট যা ছিল সবই শেষ হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেনঃ আমার নিকট যে মাল থাকে তা তোমাদের না দিয়ে আমার নিকট জমা রাখি না। তবে যে চাওয়া হতে বিরত থাকে, আল্লাহ তাকে বাচিয়ে রাখেন আর যে পরমুখাপেক্ষী না হয়, আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত রাখেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে সবর দান করেন। সবরের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোন নি'আমত কাউকে দেয়া হয়নি।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার কসম! তোমাদের মধ্যে কারো রশি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে পিঠে করে বয়ে আনা, কোন লোকের কাছে এসে চাওয়া অপেক্ষা অনেক ভাল, চাই সে দিক বা না দিক।
যুবাইর ইবন 'আওয়াম সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনা এবং তা বিক্রি করা, ফলে আল্লাহ তার চেহারাকে (যাচ্ঞা করার লাঞ্ছনা হতে) রক্ষা করেন, তা মানুষের কাছে সওয়াল করার চেয়ে উত্তম, চাই তারা দিক বা না দিক।
হাকীম ইবন হিযাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট কিছু চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন, আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন, আবার চাইলাম, তিনি আমাকে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ হে হাকীম! এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ব্যতীত) তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় করা হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মত, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। উপরের হাত নিচের হাত হতে উত্তম। হাকীম বলেন, আমি বললাম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তার কসম! হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পর মৃত্যু পর্যন্ত (সওয়াল করে) আমি কাউকে সামান্যতমও ক্ষতিগ্রস্ত করবো না। এরপর আবূ বকর হাকীম-কে অনুদান গ্রহণের জন্য ডাকতেন, কিন্তু তিনি তার কাছ হতে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন। অতঃপর 'উমর (তার যুগে) তাকে কিছু দেয়ার জন্য ডাকলেন। তিনি তার কাছ হতেও কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। উমার বললেন, মুসলিমগণ! হাকীম-এর ব্যাপারে আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি। আমি তার এই গনীমত হতে তার প্রাপ্য পেশ করেছি, কিন্তু সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। (সত্য সত্যই) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর পর হাকীম মৃত্যু অবধি কারো নিকট কিছু চেয়ে কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করেননি।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে কিছু দান করতেন, তখন আমি বলতাম, যে আমার চেয়ে বেশি অভাবগ্রস্ত, তাকে দিন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলতেনঃ তা গ্রহণ কর। যখন তোমার কাছে এসব মালের কিছু আসে অথচ তার প্রতি তোমার অন্তরের লোভ নেই এবং তার জন্য তুমি প্রার্থী নও, তখন তা তুমি গ্রহণ করবে। এরূপ না হলে তুমি তার প্রতি অন্তর ধাবিত করবে না।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সব সময় মানুষের কাছে চেয়ে থাকে, সে কিয়ামতের দিন এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, তার চেহারায় কোন গোশ্ত থাকবে না।
তিনি আরো বলেনঃ কিয়ামতের দিন সূর্য তাদের অতি কাছে আসবে, এমনকি ঘাম কানের অর্ধেক পর্যন্ত পৌছবে। যখন তারা এই অবস্থায় থাকবে, তখন তারা সাহায্য চাইবে আদম-এর কাছে, অতঃপর মূসা-এর কাছে, তারপর মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর কাছে। আবদুল্লাহ লায়স-এর মাধ্যমে ইবন আবূ জাফর হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সৃষ্টির মধ্যে ফয়সালা করার জন্য সুপারিশ করবেন। তিনি যেতে যেতে জান্নাতের ফটকের কড়া ধরবেন। সেদিন আল্লাহ তাকে মাকামে মাহমূদে পৌছে দিবেন। হাশরের ময়দানে সমবেত সকলেই তার প্রশংসা করবে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সে ব্যক্তি প্রকৃত মিসকীন নয়, যাকে এক দু' লোকমা ফিরিয়ে দেয় (যথেষ্ট হয়) বরং সে-ই প্রকৃত মিসকীন যার কোন সম্পদ নেই, অথচ সে (চাইতে) লজ্জাবোধ করে অথবা লোকদেরকে আকড়ে ধরে যাচ্ঞা করে না।
শা'বী হতে বর্ণিত যে, মুগীরা ইবন শুবাহ্-এর কাতিব (একান্ত সচিব) বলেছেন, মু'আবিয়া মুগীরা ইবন শুবাহ্-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, নবী (ﷺ) -এর কাছ হতে আপনি যা শুনেছেন তার কিছু আমাকে লিখে জানান। তিনি তার কাছে লিখলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- (১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সওয়াল করা।
সাদ ইবন আবূ ওক্কাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদল লোককে কিছু দান করলেন। আমি তাদের মধ্যে উপবিষ্ট ছিলাম। নবী (ﷺ) তাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তিকে কিছুই দিলেন না। অথচ সে ছিল আমার বিবেচনায় তাদের মধ্যে সবচাইতে উত্তম। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে গিয়ে চুপে চুপে বললাম, অমুক সম্পর্কে আপনার কী হলো? আমি তো তাকে অবশ্য মুমিন বলে মনে করি। তিনি বললেনঃ বরং মুসলিম (বল)। সা'দ বলেন, এরপর আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম। আবার তার সম্পর্কে আমার ধারণা প্রবল হয়ে উঠলে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক সম্পর্কে আপনার কী হলো? আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে মুমিন বলে মনে করি। তিনি বললেনঃ বরং মুসলিম। এবারও কিছুক্ষণ নীরব রইলাম। আবার তার সম্পর্কে আমার ধারণা প্রবল হয়ে উঠলে আমি বললাম, অমুক সম্পর্কে আপনার কী হলো? আল্লাহর কসম! আমি তো তাকে মুমিন বলে মনি করি। নবী (ﷺ) বললেনঃ অথবা মুসলিম! এভাবে তিনবার বললেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ আমি একজনকে দিয়ে থাকি অথচ অন্য ব্যক্তি আমার কাছে অধিক প্রিয় এই আশঙ্কায় যে, তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অপর সনদে ইসমাঈল ইবন মুহাম্মাদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে এভাবে বলতে শুনেছি, তিনি হাদীসটি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন, অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার কাঁধে হাত রাখলেন, এরপর বললেন, হে সাদ! অগ্রসর হও। আমি সে লোকটিকে (এখন) অবশ্যই দিব।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, প্রকৃত মিসকীন সে নয় যে মানুষের কাছে ভিক্ষার জন্য ঘুরে বেড়ায় এবং এক-দু' লুকমা অথবা এক-দু'টি খেজুর পেলে ফিরে যায় বরং প্রকৃত মিসকীন সেই ব্যক্তি, যার এতটুকু সম্পদ নেই যাতে তার প্রয়োজন মিটতে পারে এবং তার অবস্থা সেরূপ বোঝা যায় না যে, তাকে দান খয়রাত করা যাবে আর সে মানুষের কাছে যাচ্ঞা করে বেড়ায় না।
আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যদি রশি নিয়ে সকাল বেলা বের হয়, (রাবী বলেন) আমার ধারণা যে, তিনি বলেছেন, পাহাড়ের দিকে, অতঃপর লাকড়ী সংগ্রহ করে এবং তা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে এবং দানও করে, তা তার পক্ষে লোকের কাছে যাঞ্চা করার চেয়ে উত্তম।
আবূ হুমাইদ সাঈদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ) এর সাথে তাবূকের যুদ্ধে শরীক হয়েছি। যখন তিনি ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে পৌছলেন, তখন এক মহিলা তার নিজের বাগানে উপস্থিত ছিল। নবী (ﷺ) সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেনঃ তোমরা এই বাগানের ফলগুলোর পরিমাণ আন্দাজ কর। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজে দশ ওয়াসাক পরিমাণ আন্দাজ করলেন। অতঃপর মহিলাকে বললেনঃ উৎপন্ন ফলের হিসাব রেখো। আমরা তাবূক পৌছলে, তিনি বললেনঃ সাবধান! আজ রাতে প্রবল ঝড় প্রবাহিত হবে। কাজেই কেউ যেন দাড়িয়ে না থাকে এবং প্রত্যেকেই যেন তার উট বেধে রাখে। তখন আমরা নিজ নিজ উট বেধে নিলাম। প্রবল ঝড় হতে লাগল। এক ব্যক্তি দাড়িয়ে গেলে ঝড় তাকে তায় নামক পর্বতে নিক্ষেপ করল। আয়লা নগরীর শাসনকর্তা নবী (ﷺ) -এর জন্য একটি সাদা খচ্চর ও চাদর হাদিয়া দিলেন। আর নবী (ﷺ) তাকে সেখানকার শাসনকর্তারূপে বহাল থাকার লিখিত নির্দেশ দিলেন। (ফেরার পথে) ওয়াদিল কুরা পৌছে সেই মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার বাগানে কী পরিমাণ ফল হয়েছে? মহিলা বলল, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর অনুমিত পরিমাণ, দশ ওয়াসাকই হয়েছে। নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি দ্রুত মাদ্বীনায় পৌছতে ইচ্ছুক। তোমাদের কেউ আমার সাথে দ্রুত যেতে চাইলে দ্রুত কর। ইবন বাক্কার এমন একটি বাক্য বললেন, যার অর্থ, যখন তিনি মাদ্বীনা দেখতে পেলেন তখন বললেনঃ এটা ত্বাবা (মাদ্বীনার অপর নাম)। এরপর যখন তিনি উহুদ পর্বত দেখতে পেলেন তখন বললেনঃ এই পর্বত আমাদেরকে ভালবাসে এবং আমরাও তাকে ভালবাসি। আনসারদের সর্বোত্তম গোত্রটি সম্পর্কে আমি তোমাদের খবর দিব কি? তারা বললেন, হা। তিনি বললেনঃ বনূ নাজ্জার গোত্র, অতঃপর বনূ আবদুল আশহাল গোত্র, এরপর বনূ সা'য়ীদা গোত্র অথবা বনূ হারিস ইবন খাযরাজ গোত্র। আনসারদের সকল গোত্রেই কল্যাণ রয়েছে।
সাহল ইবন বাক্কার সুলায়মান ইবন বিলাল সূত্রে আমর হতে বর্ণনা করেনঃ এরপর বনূ হারিস ইবন খাযরাজ গোত্র, এরপর বনূ সা'য়িদা গোত্র এবং সুলায়মান...নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহুদ পর্বত আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও তাকে ভালবাসি।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ বৃষ্টি ও প্রবাহিত পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা সেচ ব্যতীত উর্বরতার ফলে উৎপন্ন ফসলের উপর (দশমাংশ) 'উশর ওয়াজিব হয়। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের উপর অর্ধ (বিশ ভাগের এক ভাগ) 'উশর।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ পাচ ওয়াসাক-এর কম উৎপন্ন দ্রব্যের যাকাত নেই এবং পাচটির কম উটের যাকাত নেই। এমনিভাবে পাচ উকিয়ার কম পরিমাণ রৌপ্যেরও যাকাত নেই।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খেজুর কাটার মৌসুমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর কাছে (সদাকাহর) খেজুর আনা হতো। অমুকে তার খেজুর নিয়ে আসতো, অমুকে এর খেজুর নিয়ে আসতো। এভাবে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে খেজুর স্তূপ হয়ে গেলো। হাসান ও হুসাইন সে খেজুর নিয়ে খেলতে লাগলেন, তাদের একজন একটি খেজুর নিয়ে তা মুখে দিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার দিকে তাকালেন এবং তার মুখ হতে খেজুর বের করে বললেন, তুমি কি জান না যে, মুহাম্মাদের বংশধর (বনূ হাশিম) সদাকাহ ভক্ষণ করে না।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খেজুর ব্যবহারযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন। যখন তাকে ব্যবহারযোগ্যতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি বললেনঃ ফল নষ্ট হওয়া হতে নিরাপদ হওয়া।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ফল ব্যবহারযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তা বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রং ধরার আগে ফল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, এর অর্থ লালচে হওয়া।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করতেন যে, উমার ইবন খাত্তাব আল্লাহর রাস্তায় তার একটি ঘোড়া সদাকাহ করেছিলেন। পরে তা বিক্রয় করা হচ্ছে জেনে তিনি নিজেই তা ব্যয় করার ইচ্ছায় নবী (ﷺ) -এর কাছে এসে তার মত জানতে চাইলেন। তিনি বললেনঃ তোমার সদাকাহ ফিরিয়ে নিবে না। সে নির্দেশের কারণে ইবন উমার-এর অভ্যাস ছিল নিজের দেয়া সদাকাহর বস্তু কিনে ফেললে সেটি সদাকাহ না করে ছাড়তেন না।
উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি ঘোড়া আল্লাহর পথে দান করলাম। যার কাছে ঘোড়াটি ছিল সে এর হাক আদায় করতে পারল না। তখন আমি তা ক্রয় করতে চাইলাম এবং আমার ধারণা ছিল যে, সে সেটি কম মূল্যে বিক্রি করবে। এ সম্পর্কে নবী (ﷺ) -কে আমি জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি ক্রয় করবে না এবং তোমার সদাকাহ ফিরিয়ে নিবে না, সে তা এক দিরহামের বিনিময়ে দিলেও। কেননা, যে ব্যক্তি নিজের সদাকাহ ফিরিয়ে নেয় সে যেন নিজের বমি পুনঃ ভক্ষণ করে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসান ইবন আলী সদাকাহর একটি খেজুর নিয়ে মুখে দিলেন। নবী (ﷺ) তা ফেলে দেয়ার জন্য ওয়াক ওয়াক (বমির পূর্বের আওয়াজের মত) বললেন। অতঃপর বললেনঃ তুমি কি জান না যে, আমরা সদাকাহ ভক্ষণ করি না!
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মায়মূনা কর্তৃক আযাদকৃত জনৈক দাসীকে সদাকাহ স্বরূপ প্রদত্ত একটি বকরীকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা এর চামড়া দিয়ে উপকৃত হও না কেন? তারা বললেনঃ এটা তো মৃত। তিনি বললেন, এটা কেবল ভক্ষণ হারাম করা হয়েছে।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বারীরাহ নাম্নী দাসীকে আযাদ করার উদ্দেশে কিনতে চাইলেন, তার মালিকরা বারীরাহ'র 'ওয়ালা' (অভিভাবকত্বের অধিকার)-এর শর্তারোপ করতে চাইলো। আয়িশাহ (বিষয়টি সম্পর্কে) নবী (ﷺ) -এর কাছে উল্লেখ করলেন। নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তুমি তাকে ক্রয় কর। কারণ যে (তাকে) আযাদ করবে "ওয়ালা' তারই। আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ) -এর কাছে একটু গোশত হাযির করা হলো। আমি বললামঃ এটা বারীরাকে সদাকাহ স্বরূপ দেয়া হয়েছে। নবী (ﷺ) বললেন, এটা বারীরাহ'র জন্য সদাকাহ, আর আমাদের জন্য উপহার।
উম্মু 'আতিয়্যাহ আনসারীয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আয়িশাহ-এর নিকট গিয়ে বললেনঃ তোমাদের কাছে (খাওয়ার) কিছু আছে কি? আয়িশাহ বললেনঃ না, তবে আপনি সদাকাহ স্বরূপ নুসাইবাকে বকরীর যে গোশত পাঠিয়েছিলেন, সে তার কিছু পাঠিয়ে দিয়েছিল (তাছাড়া কিছু নেই)। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ সদাকাহ তার যথাস্থানে পৌছেছে।
আনাস হতে বর্ণিত যে, বারীরাহ-কে সদাকাহকৃত গোশতের কিছু আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে দেয়া হল। তিনি বললেন, তা বারীরাহ'র জন্য সদাকাহ এবং আমাদের জন্য হাদিয়া।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয ইবন জাবাল-কে ইয়ামানের (শাসক নিয়োগ করে) পাঠানোর সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বলেছিলেনঃ তুমি আহলে কিতাবের কাছে যাচ্ছ। কাজেই তাদের কাছে যখন পৌছবে তখন তাদেরকে এ কথার দিকে দাওয়াত দিবে তারা যেন সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয় তবে তাদের বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর দিনে রাতে পাচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। যদি তারা এ কথাও মেনে নেয় তবে তাদের বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর সদাকাহ (যাকাত) ফরজ করেছেন- যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করা হবে এবং অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। তোমার এ কথা যদি তারা মেনে নেয়, তবে (কেবল) তাদের উত্তম মাল গ্রহণ হতে বিরত থাকবে এবং মযলুমের বদদোয়াকে ভয় করবে। কেননা, তার (বদদোয়া) এবং আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা থাকে না।
আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকজন যখন নবী (ﷺ) -এর নিকট নিজেদের সদাকাহ নিয়ে উপস্থিত হতো তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ! অমুকের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। একদা আমার পিতা সদাকাহ নিয়ে হাযির হলে তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ! আবূ আওফা'র বংশধরের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত যে, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট এক হাজার দ্বীনার (ঋণ) চাইলে, সে তাকে তা দিল। সে সাগরপথে যাত্রা করল কিন্তু কোন নৌযান পেল না। তখন একটি কাঠের টুকরা নিয়ে তা ছিদ্র করে এক হাজার দ্বীনার তাতে ভরে তা সাগরে নিক্ষেপ করল। ঋণদাতা সাগর তীরে পৌছে একটি কাঠ (ভেসে আসতে) দেখে তার পরিবারের জন্য লাকড়ি হিসেবে নিয়ে আসল। অতঃপর (রাবী) পুরা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। (সবশেষে রয়েছে) কাঠ চেরাই করার পর সে তার প্রাপ্য মাল পেয়ে গেল।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ চতুষ্পদ জন্তুর আঘাত দায়মুক্ত, কূপ (খননে শ্রমিকের মৃত্যুতে মালিক) দায়মুক্ত, খণি (খননে কেউ মারা গেলে মালিক) দায়মুক্ত। রিকাযে এক-পঞ্চমাংশ ওয়াজিব।
আবূ হুমাইদ সা'য়িদী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আসদ গোত্রের ইবন লুত্বিয়া নামক জনৈক ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বনূ সুলাইম গোত্রের যাকাত আদায় করার কাজে নিয়োগ করেন। তিনি ফিরে আসলে তার নিকট হতে নবী (ﷺ) হিসাব নিলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উরাইনা গোত্রের কতিপয় লোকের মদ্বীনার আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদেরকে যাকাতের উটের কাছে গিয়ে উটের দুধ ও পেশাব পান করার অনুমতি প্রদান করেন। তারা রাখালকে (নির্মমভাবে) হত্যা করে এবং উট হাকিয়ে নিয়ে (পালিয়ে) যায়। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের পশ্চাদ্ধাবনে লোক প্রেরণ করেন, তাদেরকে ধরে নিয়ে আসা হয়। এরপর তাদের হাত পা কেটে দেন এবং তাদের চোখে তপ্ত শলাকা বিদ্ধ করেন আর তাদেরকে হাররা নামক উত্তপ্ত স্থানে ফেলে রাখেন। তারা (যন্ত্রণায়) পাথর কামড়ে ধরে ছিল। আবূ কিলাবাহ, সাবিত ও হুমাইদ আনাস হতে হাদীস বর্ণনায় কাতাদাহ -এর অনুসরণ করেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আবূ তালহাকে সাথে নিয়ে আমি একদিন সকালে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট তাকে তাহ্নীক করানোর উদ্দেশে গেলাম। তখন আমি তাকে নিজ হাতে একটি কাঠি দিয়ে যাকাতের উটের গায়ে চিহ্ন লাগাতে দেখলাম।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সদাকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা' পরিমাণ আদায় করা ফারয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের সালাতের বের হবার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, মুসলিমদের প্রত্যেক আযাদ, গোলাম পুরুষ ও নারীর পক্ষ হতে সদাকাতুল ফিত্র হিসেবে খেজুর অথবা যব-এর এক সা' পরিমাণ আদায় করা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরজ করেছেন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক সা' পরিমাণ যব দ্বারা সদাকাতুল ফিত্র আদায় করতাম।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক সা' পরিমাণ খাদ্য অথবা এক সা' পরিমাণ যব অথবা এক সা' পরিমাণ খেজুর অথবা এক সা পরিমাণ পনির অথবা এক সা' পরিমাণ কিসমিস দিয়ে সদাকাতুল ফিত্র আদায় করতাম।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' পরিমাণ খেজুর বা এক সা' পরিমাণ যব দিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেন। আবদুল্লাহ বলেন, অতঃপর লোকেরা যবের সমপরিমাণ হিসেবে দু' মুদ (অর্ধ সা') গম আদায় করতে থাকে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ) -এর যুগে এক সা' খাদ্যদ্রব্য বা এক সা' খেজুর বা এক সা' যব বা এক সা' কিসমিস দিয়ে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম। মু'আবিয়া-এর যুগে যখন গম আমদানী হল তখন তিনি বললেন, এক মুদ গম (পূর্বোক্তগুলোর) দু' মুদ-এর সমপরিমাণ বলে আমার মনে হয়।
(আবদুল্লাহ) ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) লোকদেরকে ঈদের সালাতের উদ্দেশে বের হওয়ার পূর্বেই সদাকাতুল ফিত্র আদায় করার নির্দেশ দেন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ) -এর যুগে ঈদের দিন এক সা' পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করতাম। আবূ সাঈদ বলেন, আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা, আযাদ ও গোলামের পক্ষ হতে সদাকাতুল ফিতর অথবা (বলেছেন) সদাকা-ই রমাযান হিসেবে এক সা' খেজুর বা এক এক সা' যব আদায় করা ফরজ করেছেন। অতঃপর লোকেরা অর্থ সা' গমকে এক সা' খেজুরের সমমান দিতে লাগল। (রাবী নাফি বলেন) ইবন উমার খেজুর (সদাকাতুল ফিতর হিসেবে) দিতেন। এক সময় মাদ্বীনায় খেজুর দুর্লভ হলে যব দিয়ে তা আদায় করেন। ইবন উমার প্রাপ্ত বয়স্ক ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সকলের পক্ষ হতেই সদাকাতুল ফিত্র আদায় করতেন, এমনকি আমার সন্তানদের পক্ষ হতেও সদাকাহর দ্রব্য গ্রহীতাদেরকে দিয়ে দিতেন এবং ঈদের এক-দু' দিন পূর্বেই আদায় করে দিতেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) অপ্রাপ্ত বয়স্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক, আযাদ ও গোলাম প্রত্যেকের পক্ষ হতে এক সা' যব অথবা এক সা' খেজুর সদাকাতুল ফিত্র হিসেবে আদায় করা ফরজ করে দিয়েছেন।