শান্তিস্থাপন (২৬৯০-২৭১০)
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, আমর ইবন 'আউফ গোত্রের কিছু লোকের মধ্যে সামান্য বিবাদ ছিল। তাই নবী (ﷺ) তার সাহাবীগণের একটি জামা'আত নিয়ে তাদের মধ্যে আপোস-মীমাংসা করে দেয়ার জন্য সেখানে গেলেন। এদিকে সালাতের সময় হয়ে গেল। কিন্তু নবী (ﷺ) মসজিদে নাবাবীতে এসে পৌছেননি। বিলাল আবু বাকর-এর নিকট এসে বললেন, নবী (ﷺ) কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদিকে সালাতেরও সময় হয়ে গেছে। আপনি কি সালাতে লোকদের ইমামত করবেন?' তিনি বললেন, 'হ্যা, তুমি যদি ইচ্ছা কর।' অতঃপর বিলাল সালাতের ইকামত বললেন, আর আবু বাকর এগিয়ে গেলেন। পরে নবী (ﷺ) এলেন এবং কাতারগুলো অতিক্রম করে প্রথম কাতারে এসে দাড়ালেন। (তা দেখে) লোকেরা হাততালি দিতে শুরু করল এবং তা অধিক মাত্রায় দিতে লাগল। আবূ বাকর সালাত অবস্থায় কোন দিকে তাকাতেন না, কিন্তু (হাততালির কারণে) তিনি তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে, নবী (ﷺ) তার পেছনে দাড়িয়েছেন। নবী (ﷺ) তাকে হাতের ইশারায় আগের মত সালাত আদায় করে যেতে নির্দেশ দিলেন। আবু বাকর তার দু'হাত উপরে তুলে আল্লাহর হামদ বর্ণনা করলেন। অতঃপর কিবলার দিকে মুখ রেখে পেছনে ফিরে এসে কাতারে সামিল হলেন। তখন নবী (ﷺ) আগে বেড়ে লোকদের ইমামত করলেন এবং সালাত সমাপ্ত করে লোকদের দিকে ফিরে বললেন, 'হে লোক সকল! সালাত অবস্থায় তোমাদের কিছু ঘটলে তোমরা হাত তালি দিতে শুরু কর। অথচ হাততালি দেয়া মেয়েদের কাজ। সালাত অবস্থায় কারো কিছু ঘটলে সে যেন 'সুবহানাল্লাহ্' 'সুবহানাল্লাহ্' বলে। কেননা, এটা শুনলে কেউ তার দিকে দৃষ্টিপাত না করে পারতো না।' 'হে আবূ বাকর! তোমাকে যখন ইশারা করলাম, তখন সালাত আদায় করাতে তোমার কিসের বাধা ছিল?' তিনি বললেন, 'আবূ কুহাফার পুত্রের জন্য শোভা পায় না নবী (ﷺ)-এর সামনে ইমামত করা।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে বলা হলো, আপনি যদি আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের নিকট একটু যেতেন। নবী (ﷺ) তার নিকট গাধায় চড়ে গেলেন এবং মুসলিমরা তার সঙ্গে হেটে চললো। সে পথ ছিল কংকরময়। নবী (ﷺ) তার নিকট এসে পৌছলে সে বলল, 'সরো আমার কাছ থেকে। আল্লাহর কসম, তোমার গাধার দুর্গন্ধ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।' তাদের মধ্য হতে একজন আনসারী বললোঃ আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর গাধা সুগন্ধে তোমার চেয়ে উত্তম। আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর গোত্রের জনৈক ব্যক্তি রেগে গেল এবং দু'জনে গালাগালি করল। এভাবে উভয়ের পক্ষের সঙ্গীরা রেগে উঠল এবং উভয় দলের সঙ্গে লাঠালাঠি, হাতাহাতি ও জুতা মারামারি হল। আমাদের জানান হয়েছে যে, এই ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হলোঃ মুমিনদের দু'দল বিবাদে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে।(আল-হুজরাত ৯)
উম্মু কুলসুম বিনতে উকবাহ হতে বর্ণিত যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, সে ব্যক্তি মিথ্যাচারী নয়, যে মানুষের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য ভালো কথা পৌছে দেয় কিংবা ভালো কথা বলে।
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, কুবা-এর অধিবাসীদের মধ্যে লড়াই বেধে গেল। এমনকি তারা পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু করল। এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে খবর দেয়া হলে তিনি বললেন, 'চল যাই তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেই।'
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহ তাআলার বাণীঃ কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর অবজ্ঞা ও উপেক্ষার আশংকা করে-(আন-নিসা ১২৮)। এই আয়াতটি সম্পর্কে তিনি বলেন, আয়াতের লক্ষ্য হল, 'কেউ তার স্ত্রীর মধ্যে বার্ধক্য বা অপছন্দনীয় কিছু দেখতে পেয়ে তাকে ত্যাগ করতে মনস্থ করে আর স্ত্রী বলে যে, তুমি আমাকে তোমার নিকট রাখ এবং তোমার যেটুকু ইচ্ছা আমার অংশ নির্ধারণ কর।' আয়িশাহ বলেন, 'উভয়ে রাজী হলে এতে দোষ নেই।'
আবূ হুরাইরাহ্ ও যায়দ ইবন খালিদ জুহানী হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন যে, এক বেদুঈন এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কিতাব মুতাবেক আমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিন।' তখন তার প্রতিপক্ষ দাড়িয়ে বলল, 'সে ঠিকই বলেছে, হ্যা, আপনি আমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ্ মুতাবেক ফয়সালা করুন।' পরে বেদুঈন বলল, 'আমার ছেলে এ লোকের বাড়িতে মজুর ছিল। অতঃপর তার স্ত্রীর সঙ্গে সে যিনা করে।' লোকেরা আমাকে বললোঃ তোমার ছেলের উপর রাজম (পাথরের আঘাতে হত্যা) ওয়াজিব হয়েছে। তখন আমার আমার ছেলেকে একশ 'বকরী এবং একটি বাদীর বিনিময়ে এর নিকট হতে মুক্ত করে এনেছি। পরে আমি আলিমদের নিকট জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন, 'তোমার ছেলের উপর একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসন ওয়াজিব হয়েছে।' সব শুনে নবী (ﷺ) বললেন, 'আমি তোমাদের মাঝে কিতাবুল্লাহ্ মুতাবেকই ফয়সালা করব। বাদী এবং বকরী পাল তোমাকে ফেরত দেয়া হবে, আর তোমার ছেলেকে একশ বেত্রাঘাত সহ এক বছরের নির্বাসন দেয়া হবে।' আর অপরজনের ব্যাপারে বললেন, 'হে উনাইস! তুমি আগাীমকাল সকালে এ লোকের স্ত্রীর নিকট যাবে এবং তাকে রাজম করবে।' উনাইস তার নিকট গেলেন এবং তাকে রাজম করলেন।
পূর্বের হাদিসের মতই (২৬৯৫)।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, 'কেউ আমাদের এ শরী'আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।'
বারা ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হুদায়বিয়াতে (মক্কাবাসীদের সঙ্গে) সন্ধি করার সময় আলী উভয় পক্ষের মাঝে এক চুক্তিপত্র লিখলেন। তিনি লিখলেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। মুশরিকরা বলল, 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' লিখবে না। আপনি রাসূল হলে আপনার সঙ্গে লড়াই করতাম না?' তখন তিনি আলীকে বললেন, 'ওটা মুছে দাও'। আলী বললেন, 'আমি তা মুছব না।' তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজ হাতে তা মুছে দিলেন এবং এই শর্তে তাদের সঙ্গে সন্ধি করলেন যে, তিনি এবং তার সঙ্গী-সাথীরা তিন দিনের জন্য মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং জুলুববান "তরবারীসহ খাপ" ব্যতীত অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না।
বারা' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যিলকাদ মাসে নবী (ﷺ) উমরাহর উদ্দেশ্যে বের হলেন। কিন্তু মক্কাবাসীরা তাকে মক্কা প্রবেশের জন্য ছেড়ে দিতে অস্বীকার করল। অবশেষে এই শর্তে তাদের সঙ্গে ফয়সালা করলেন যে, তিনদিন সেখানে অবস্থান করবেন। সন্ধিপত্র লিখতে গিয়ে মুসলিমরা লিখলেন, এ সন্ধিপত্র সম্পাদন করেছেন, 'আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)।' তারা (মুশরিকরা) বলল, আমরা তার রিসালাত স্বীকার করি না। আমরা যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল তাহলে আপনাকে বাধা দিতাম না। তবে আপনি হলেন, আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।' তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল এবং আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ।' অতঃপর তিনি আলীকে বললেন, আল্লাহর রাসূল শব্দটি মুছে দাও। তিনি বললেন, 'না। আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে কখনো মুছব না।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন চুক্তিপত্রটি নিলেন এবং লিখলেন, 'এ সন্ধিপত্র মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ সম্পন্ন করেন- খাপবদ্ধ অস্ত্র ব্যতীত আর কিছু নিয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করবেন না। মক্কাবাসীদের কেউ তার সঙ্গে যেতে চাইলে তিনি বের করে নিবেন না। আর তার সঙ্গীদের কেউ মক্কায় থাকতে চাইলে তাকে বাধা দিবেন না।' তিনি যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেল, তখন তারা এসে আলীকে বলল, 'তোমার সঙ্গীকে আমাদের এখান হতে বের হতে বল। কেননা নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।' নবী (ﷺ) রওয়ানা হলেন। তখন হামযাহর কন্যা হে চাচা, হে চাচা, বলে তাদের পেছনে পেছনে চলল। আলী তাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন এবং ফাতিমাকে বললেন, 'এই নাও, তোমার চাচার মেয়েকে। আমি ওকে তুলে এনেছি।' আলী, যায়দ ও জাফর তাকে নেয়ার ব্যাপারে বিতর্কে প্রবৃত্ত হলেন। আলী বললেন, 'আমি তার অধিক হক্দার। কারণ সে আমার চাচার মেয়ে। জাফর বললেন, সে আমার চাচার মেয়ে এবং তার খালা আমার স্ত্রী।' যায়দ বললেন, 'সে আমার ভাইয়ের মেয়ে।' অতঃপর নবী (ﷺ) খালার পক্ষে ফয়সালা দিলেন এবং বললেন, 'খালা মায়ের স্থান অধিকারিণী।' আর আলীকে বললেন, 'আমি তোমার এবং তুমি আমার।' জাফরকে বললেন, 'তুমি আকৃতি ও প্রকৃতিতে আমার সদৃশ। আর যায়দকে বললেন, 'তুমি তো আমাদের ভাই ও আযাদকৃত গোলাম।'
বারা ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) হুদায়বিয়ার দিন মুশরিকদের সঙ্গে তিনটি বিষয়ে সন্ধি করেছিলেন। তা হলো- মুশরিকরা কেউ (মুসলিম হয়ে) তার নিকট এলে তিনি তাকে তাদের নিকট ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমদের কেউ (মুরতাদ হয়ে) তাদের নিকট গেলে তারা তাকে ফিরিয়ে দিবে না। আর তিনি আগামী বছর মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান করবেন। কোষবদ্ধ তরবারি, ধনুক ও এ রকম কিছু ব্যতীত অন্য কিছু নিয়ে প্রবেশ করবেন না। ইতোমধ্যে আবূ জান্দাল শিকল পরা অবস্থায় লাফিয়ে লাফিয়ে তার নিকট এল। তাকে তিনি তাদের নিকট ফিরিয়ে দিলেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উমরার উদ্দেশে বহির্গত হলেন। কিন্তু কুরাইশ কাফিররা তার ও বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা হয়ে দাড়াল। তখন তিনি হুদায়বিয়াতে তার হাদী কুরবানী করলেন, তার মাথা মুড়ালেন এবং তাদের সঙ্গে সন্ধি করলেন যে, আগামী বছর তিনি উমরাহ করবেন আর তরবারি ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র বহন করবেন না। আর তারা যতদিন চাইবে তার বেশি সেখানে থাকবেন না। পরের বছর তিনি উমরাহ করলেন এবং তাদের সঙ্গে সন্ধি মুতাবেক প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে তিন দিন অবস্থান করলেন। তারা তাকে বেরিয়ে যেতে বললে, তিনি বেরিয়ে গেলেন।
সাহল ইবন আবূ হাসমা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খায়বার সন্ধিবদ্ধ থাকাকালে আবদুল্লাহ ইবন সাহল ও মুহাইয়াসা ইবন মাসঊদ ইবন যায়দ খায়বার গিয়েছিলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুবাইয়্যি বিনতে নাযর এক কিশোরীর সামনের দাত ভেঙ্গে ফেলেছিল। তারা ক্ষতিপূরণ চাইল আর অপরপক্ষ ক্ষমা চাইল। তারা অস্বীকার করল এবং নবী (ﷺ)-এর নিকট এল। তিনি কিসাসের আদেশ দিলেন। আনাস ইবন নাযর তখন বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! রুবাইয়্যি-এর দাত ভাঙ্গা হবে? না, যিনি আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন তার কসম তার দাত ভাঙ্গা হবে না।' তিনি বললেন, 'হে আনাস, আল্লাহর বিধান হল কিসাস।' অতঃপর বাদীপক্ষ রাযী হয় এবং ক্ষমা করে দেয়। তখন নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন বান্দাও রয়েছেন যে, আল্লাহর নামে কোন কসম করলে তা পূরণ করেন। ফাযারী হুমায়দ সূত্রে আনাস হতে রিওয়ায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, তখন লোকেরা রাযী হল এবং ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করল।
হাসান (বাসরী) বলেন, আল্লাহর কসম, হাসান ইবন আলী পর্বত প্রমাণ সেনাদল নিয়ে মুআবিয়াহ-এর মুখোমুখী হলেন। আমর ইবন 'আস বললেন, আমি এমন সেনাদল দেখতে পাচ্ছি যারা প্রতিপক্ষকে হত্যা না করে ফিরে যাবে না। মুআবিয়াহর তখন বললেন, আল্লাহর কসম! আর (মুআবিয়াহ ও আমর ইবন 'আস) উভয়ের মধ্যে মুআবিয়াহ ছিলেন উত্তম ব্যক্তি- 'হে আমর! এরা ওদের এবং ওরা এদের হত্যা করলে, আমি কাকে দিয়ে লোকের সমস্যার সমাধান করব? তাদের নারীদেও কে তত্ত্বাবধান করবে? তাদের দুর্বল ও শিশুদের কে রক্ষণাবেক্ষণ করবে? অতঃপর তিনি কুরায়শের বানূ আবদে শাম্স্ শাখার দু' ব্যক্তি আবদুর রহমান ইবন সামুরাহ ও আবদুল্লাহ ইবন আমর-কে হাসান-এর নিকট পাঠালেন। তিনি তাদের বললেন, 'তোমরা উভয়ে এ ব্যক্তিটির নিকট যাও এবং তার নিকট (সন্ধির) প্রস্তাব পেশ করো, তার সঙ্গে আলোচনা কর ও তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা কর।' তারা তার নিকট রয়ে গেলেন এবং তার সঙ্গে কথা বললেন, আলাপ-আলোচনা করলেন এবং তার বক্তব্য জানলেন। হাসান ইবন আলী তাদের বললেন, আমরা আবদুল মুত্তালিবের সন্তান, এই সম্পদ (বায়তুল মালের) আমরা পেয়েছি। আর এরা রক্তপাতে লিপ্ত হয়েছে।' তারা উভয়ে বললেন, [মুআবিয়াহ] আপনার নিকট এরূপ বক্তব্য পেশ করেছেন। আর আপনার বক্তব্যও জানতে চেয়েছেন ও সন্ধি কামনা করেছেন। তিনি বললেন, 'এ দায়িত্ব কে নিবে?' তারা (তার জওয়াবে) বললেন, আমরা এ দায়িত্ব নিচ্ছি।' অতঃপর তিনি তার সঙ্গে সন্ধি করলেন। হাসান (বসরী) বলেন, আমি আবূ বাকরাহ-কে বলতে শুনেছিঃ 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমি মিম্বরের উপর দেখেছি, হাসান ইবন আলী তার পাশে ছিলেন। তিনি একবার লোকদের দিকে আরেকবার তার দিকে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমার এ সন্তান একজন নেতা। সম্ভবত তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের দু'টি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করাবেন।' আবূ আবদুল্লাহ বলেন, আলী ইবন আবদুল্লাহ আমাকে বলেছেন যে, এ হাদীসের মাধ্যমেই আবূ বাকরাহ হতে হাসানের শোনা কথা আমাদের নিকট প্রমাণিত হয়েছে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একবার দরজায় ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পেলেন; দু'জন তাদের আওয়াজ উচ্চ করেছিল। তাদের একজন আরেকজনের নিকট ঋণের কিছু মাফ করে দেয়ার এবং সহানুভূতি দেখানোর অনুরোধ করেছিল। আর অপর ব্যক্তি বলছিল, 'না, আল্লাহর কসম! আমি তা করব না।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের দু'জনের কাছে এলেন এবং বললেন, সৎ কাজ করবে না বলে যে আল্লাহর নামে কসম করেছে, সে ব্যক্তিটি কোথায়? সে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি। সে যা পছন্দ করবে তার জন্য তা-ই হবে।'
কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবন আবূ হাদরাদ আল-আসলামীর কাছে তার কিছু মাল পাওনা ছিল। রাবী বলেন, একবার তার সাক্ষাৎও পেলেন এবং তাকে ধরলেন, এমনকি তাদের আওয়াজ চড়ে গেল। নবী (ﷺ) তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, ওহে কা'ব, অতঃপর হাতের ইশারায় তিনি যেন জানালেন, অর্ধেক। তারপর তিনি তার পাওনা নিলেন আর অর্ধেক ছেড়ে দিলেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, 'মানুষের প্রতিটি হাতের জোড়ার জন্য তার উপর সদাকাহ রয়েছে। সূর্য উঠে এমন প্রত্যেক দিন মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সদাকাহ।'
যুবাইর হতে বর্ণিত যে, তিনি এক আনসারীর সঙ্গে বিবাদ করেছিলেন, যিনি বাদারে শরীক ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে প্রস্তরময় যমীনের একটি নালা সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তারা উভয়ে সে নালা হতে পানি সেচ করতেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যুবাইরকে বললেন, 'হে যুবাইর! তুমি প্রথমে পানি সেচবে। অতঃপর তোমার প্রতিবেশির দিকে পানি ছেড়ে দিবে।' আনসারী তখন রেগে গেল এবং বললো, 'হে আল্লাহর রাসূল! সে আপনার ফুফুর ছেলে হওয়ার কারণে?' এতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চেহারার রঙ বদলে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, 'তুমি সেচ কর, অতঃপর পানি আটকে রাখ, বাধ বরাবর পৌছা পর্যন্ত।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যুবাইর -কে তার পূর্ণ হক দিলেন। এর আগে যুবাইর-কে তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন যা আনসারীর জন্য সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু আনসারী আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে রাগান্বিত করলে সুস্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে যুবাইর-কে তিনি তার পূর্ণ হক দান করলেন। উরওয়াহ বলেন, যুবাইর বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমার নিশ্চিত ধারণা যে (আল্লাহর বাণী)ঃ কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ তারা তাদের নিজেদের বিবাদে আপনাকে বিচারক হিসাবে মান্য না করে-(আন-নিসা ৬৫) আয়াতটি সে ব্যাপারেই নাযিল হয়েছিল।'
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা মারা গেলেন, আর তার কিছু ঋণ ছিল। আমি তার ঋণের বিনিময়ে পাওনাদারদের খেজুর নেয়ার কথা বললাম। তাতে ঋণ পরিশোধ হবে না বলে তারা তা নিতে অস্বীকার করল। আমি তখন নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে এ বিষয়ে তার নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, খেজুর পেড়ে মাচায় রেখে আল্লাহর রাসূলকে খবর দিও। (অতঃপর) তিনি এলেন এবং তার সঙ্গে আবু বাকর ও উমার-ও ছিলেন। তিনি তার উপর বসলেন এবং বরকতের দোয়া করলেন। পরে বললেন, তোমার পাওনাদারদের ডাক এবং তাদের প্রাপ্য পরিশোধ করে দাও। অতঃপর আমার পিতার পাওনাদারদের কেউ এমন ছিল না যার ঋণ পরিশোধ করিনি। অতঃপরও (আমার কাছে) তের ওয়াসাক খেজুর উদ্ধৃত্ত রয়ে গেল। সাত ওয়াসক আজওয়া খেজুর আর ছয় ওয়াসক নিম্নমানের খেজুর কিংবা ছয় ওয়াসক আজওয়া ও সাত ওয়াসক নিম্নমানের খেজুর। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম এবং তাকে ব্যাপারটা বললাম। তিনি হাসলেন এবং বললেন, আবূ বাকর ও উমারের কাছে যাও এবং দু'জনের কাছে খবরটা দাও।' তারা বললেন, আমরা আগেই জানতাম যে, যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা করার তা যেহেতু করেছেন, তখন অবশ্য এ রকমই হবে।' হিশাম ওয়াহাব-এর মাধ্যমে জাবির হতে (বর্ণনায়) আসরের সালাতের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি আবূ বাকর-এর কথা এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর হাসার কথা উল্লেখ করেননি। তিনি বর্ণনা করেছেন, [জাবির বলেছেন] আমার পিতা নিজের উপর ত্রিশ ওয়াসক ঋণ রেখে মারা গিয়েছেন। ইবন ইসহাক ওয়াহাব-এর মাধ্যমে জাবির হতে যুহরের সালাতের কথা বলেছেন।
কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যমানায় একবার তিনি ইবন আবূ হাদরাদের কাছে মসজিদে পাওনার তাগাদা করলেন। এতে উভয়ের গলার আওয়াজ চড়ে গেল। এমনকি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার ঘরে থেকেই আওয়াজ শুনতে পেলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হুজরার পর্দা সরিয়ে তাদের নিকট বেরিয়ে এলেন আর কা'ব ইবন মালিক-কে ডাকলেন এবং বললেন, ওহে কা'ব! কা'ব বললেন, আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল! রাবী বলেন, তিনি হাতে ইশারা করলেন, অর্ধেক কমিয়ে দাও। কা'ব বললেন, তাই করলাম। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) (ইবনে আবূ হাদরাদকে) বললেন, 'যাও, তার ঋণ পরিশোধ করে দাও।'