তাহাজ্জুদ (রাতের নামাজ) (১১২০-১১৮৭)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রাতে তাহাজ্জুদের উদ্দেশে যখন দাড়াতেন, তখন দোয়া পড়তেন- "হে আল্লাহ! আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, আপনি আসমান যমীন ও এ দু'য়ের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর নিয়ামক এবং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আসমান যমীন এবং তাদের মাঝে বিদ্যমান সব কিছুর কর্তৃত্ব আপনারই। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমান যমীনের নূর। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনি আকাশ ও যমীনের মালিক, আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা। আপনিই চির সত্য। আপনার ওয়াদা চির সত্য; আপনার সাক্ষাৎ সত্য; আপনার বাণী সত্য; জান্নাত সত্য; জাহান্নাম সত্য; নবীগণ সত্য; মুহাম্মাদ (ﷺ) সত্য, কিয়ামত সত্য। ইয়া আল্লাহ! আপনার নিকটই আমি আত্মসমর্পণ করলাম; আপনার প্রতি ঈমান আনলাম; আপনার উপরেই তাওয়াক্কুল করলাম, আপনার দিকেই রুজূ' করলাম; আপনার (সন্তুষ্টির জন্যই) শত্রুতায় লিপ্ত হলাম, আপনাকেই বিচারক মেনে নিলাম। তাই আপনি আমার পূর্বাপর ও প্রকাশ্য গোপন সব অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনিই অগ্র পশ্চাতের মালিক। আপনি ব্যতীত সত্য প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, অথবা (অপর বর্ণনায়) আপনি ব্যতীত প্রকৃত কোন সত্য মাবূদ নেই। সুফইয়ান বলেছেন, আবূ উমাইয়্যাহ তার বর্ণনায় ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তি বা ক্ষমতা নেই)। (বাক্যটি) অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। সুফইয়ান.....ইবন আব্বাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন।
সালিম তার পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর জীবিতকালে কোন ব্যক্তি স্বপ্ন দেখলে তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর খিদমতে বর্ণনা করত। এতে আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগলো যে, আমি কোন স্বপ্ন দেখলে তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নিকট বর্ণনা করব। তখন আমি যুবক ছিলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর সময়ে আমি মসজিদে ঘুমাতাম। আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন দু'জন ফিরিশতা আমাকে ধরে জাহান্নামের দিকে নিয়ে চলেছেন। তা যেন কুপের পাড় বাধানোর ন্যায় পাড় বাধানো। তাতে দু'টি খুটি রয়েছে এবং এর মধ্যে রয়েছে এমন কতক লোক, যাদের আমি চিনতে পারলাম। তখন আমি বলতে লাগলাম, আমি জাহান্নাম হতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। তিনি বলেন, তখন অন্য একজন ফেরেশ্তা আমাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি আমাকে বললেন, ভয় পেয়ো না।
আমি এ স্বপ্ন (আমার বোন উম্মুল মুমিনীন) হাফসাহ-এর নিকট বর্ণনা করলাম। অতঃপর হাফসাহ তা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নিকট বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেনঃ আবদুল্লাহ কতই ভাল লোক! যদি রাত জেগে সে সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করত! তারপর হতে আবদুল্লাহ খুব অল্প সময়ই ঘুমাতেন।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশাহ আমাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) (তাহাজ্জুদে) এগার রাকাত সালাত আদায় করতেন এবং তা ছিল তার (স্বাভাবিক) সালাত। সে সালাতে তিনি এক একটি সিজদা এত পরিমাণ করতেন যে, তোমাদের কেউ (সাজ্দাহ হতে) তার মাথা তোলার পূর্বে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারত। আর ফজরের (ফারয) সালাতের পূর্বে তিনি দু' রাকাত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর তিনি ডান কাতে শুতেন যতক্ষণ না সালাতের জন্য তার কাছে মুআয্যিন আসত।
জুনদাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (একবার) অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে এক রাত বা দু' রাত তিনি (তাহাজ্জুদের জন্য) উঠেননি।
জুনদাব ইবন 'আব্দুল্লাহ্ হতে বর্ণিত। তিন বলেন, একবার সাময়িকভাবে জিব্রীল নবী (ﷺ) -এর নিকট হাযিরা হতে বিরত থাকেন। এতে জনৈকা কুরায়শ নারী বলল, তার শয়তানটি তার নিকট আসতে দেরী করছে। তখন অবতীর্ণ হল- "শপথ পূর্বাহ্নের ও রাতের! যখন তা হয় নিঝুম। আপনার প্রতিপালক আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং আপনার প্রতি বিরূপও হননি"- (ওয়ায্যুহা ৯৩/১-৩)।
উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একরাতে ঘুম হতে জেগে বললেনঃ সুবহানাল্লাহ্! আজ রাতে কত না ফিতনা নাযিল করা হল! আজ রাতে কতই না (রহমতের) ভান্ডার নাযিল করা হল! কে জাগিয়ে দিবে বাড়ীগুলোর লোকজনকে? ওহে! শোন, দুনিয়ার অনেক পোষাক পরিহিতা আখিরাতে উলঙ্গ হয়ে যাবে।
আলী ইবন আবূ তালিব হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক রাতে তার কন্যা ফাতিমা-এর নিকট এসে বললেনঃ তোমরা কি সালাত আদায় করছ না? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের আত্মাগুলো তো আল্লাহ তাআলার হাতে রয়েছে। তিনি যখন আমাদের জাগাতে ইচ্ছা করবেন, জাগিয়ে দিবেন। আমরা যখন একথা বললাম, তখন তিনি চলে গেলেন। আমার কথার কোন জবাব দিলেন না। পরে আমি শুনতে পেলাম যে, তিনি ফিরে যেতে যেতে আপন উরুতে করাঘাত করছিলেন এবং কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন- "মানুষ অধিকাংশ ব্যাপারেই বিতর্ক প্রিয়"- (কাহ্ফ ১৮/৫৪)।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যে আমল করা পছন্দ করতেন, সে আমল কোন কোন সময় এ আশঙ্কায় ছেড়েও দিতেন যে, সে আমল লোকেরা করতে থাকবে, ফলে তাদের উপর তা ফরজ হয়ে যাবে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যুহা সালাত আদায় করেননি। আমি সে সালাত আদায় করি।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করছিলেন, কিছু লোক তার সঙ্গে সালাত আদায় করলো। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন এবং লোক আরো বেড়ে গেল। অতঃপর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতে লোকজন সমবেত হলেন, কিন্তু আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বের হলেন না। সকাল হলে তিনি বললেনঃ তোমরা যা করেছ আমি লক্ষ্য করেছি। তোমাদের নিকট বেরিয়ে আসার ব্যাপারে এ আশঙ্কাই আমাকে বাধা দিয়েছে যে, তোমাদের উপর তা ফরজ হয়ে যাবে। এটা ছিল রমাযান মাসের ঘটনা।
মুগীরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাত্রি জাগরণ করতেন অথবা রাবী বলেছেন, সালাত আদায় করতেন; এমনকি তার পদযুগল অথবা তার দু' পায়ের গোছা ফুলে যেত। তখন এ ব্যাপারে তাকে বলা হলে তিনি বলতেন, আমি কি একজন শুকরিয়া আদায়কারী বান্দাহ হব না?
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বলেছেনঃ আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় সালাত হল দাঊদ -এর সালাত। আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় সিয়াম হল দাঊদ-এর সিয়াম। তিনি [দাঊদ] অর্ধরাত পর্যন্ত ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতেন এবং রাতের এক ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। তিনি একদিন সিয়াম পালন করতেন, একদিন সওমবিহীন অবস্থায় থাকতেন।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ) -এর নিকট কোন আমলটি সর্বাধিক পছন্দনীয় ছিল? তিনি বললেন, নিয়মিত আমল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কখন তাহাজ্জুদের জন্য উঠতেন? তিনি বললেন, যখন মোরগের ডাক শুনতে পেতেন। আশ'আস তার বর্ণনায় বলেন, নবী (ﷺ) মোরগের ডাক শুনে উঠতেন এবং সালাত আদায় করতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি (নবী (ﷺ)) আমার নিকট ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়ই সাহরির সময় হতো।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) এবং যায়দ ইবন সাবিত সাহারী খেলেন। যখন তারা দু' জন সাহারী শেষ করলেন, তখন নবী (ﷺ) সালাতে দাড়িয়ে গেলেন এবং সালাত আদায় করলেন। [ক্বাতাদাহ বলেন] আমরা আনাস ইবন মালিক-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাদের সাহারী সমাপ্ত করা ও (ফজরের) সালাত শুরু করার মধ্যে কী পরিমাণ ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, কেউ পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারে এতটা সময়।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতে আমি নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে সালাত আদায় করলাম। তিনি এত দীর্ঘ সময় দাড়িয়ে থাকলেন যে, আমি একটি মন্দ কাজের ইচ্ছা করেছিলাম। (আবূ ওয়াইল বলেন) আমরা জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কী ইচ্ছে করেছিলেন? তিনি বললেন, ইচ্ছে করেছিলাম, বসে পড়ি এবং নবী (ﷺ) -এর ইক্তিদা ছেড়ে দেই।
হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাতের বেলা যখন তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য উঠতেন তখন মিস্ওয়াক দ্বারা তার মুখ পরিষ্কার করে নিতেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাতের সালাতের পদ্ধতি কী? তিনি বললেনঃ দু' দু' রাকাত করে। আর ফজর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করলে এক রাকাত মিলিয়ে বিতর করে নিবে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর সালাত ছিল তের রাকাত রাতে।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ফজরের দু' রাকাত (সুন্নাত) বাদে সাত বা নয় কিংবা এগার রাকাত।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাতের বেলা তের রাকাত সালাত আদায় করতেন, যার ভিতর আছে বিতর এবং ফজরের দু' রাকাত (সুন্নাত)।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোন কোন মাসে সিয়াম পালন করতেন না। এমন কি আমরা ধারণা করতাম যে, সে মাসে তিনি সিয়াম পালন করবেন না। আবার কোন কোন মাসে সিয়াম পালন করতে থাকতেন, এমন কি আমাদের ধারণা হত যে, সে মাসে তিনি সিয়াম ছাড়বেন না। তাকে তুমি সালাত রত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাই দেখতে পেতে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাইলে তাও দেখতে পেতে। সুলাইমান ও আবূ খালিদ আহ্মার হুমায়দ হতে হাদীস বর্ণনায় মুহাম্মাদ ইবন জা'ফার-এর অনুসরণ করেছেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঠ দেয়। প্রতি গিঠে সে এ বলে চাপড়ায়, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি শুয়ে থাক। অতঃপর সে যদি জাগ্রত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে একটি গিঠ খুলে যায়, পরে উযূ করলে আর একটি গিঠ খুলে যায়, অতঃপর সালাত আদায় করলে আর একটি গিঠ খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয়, উৎফুল্ল মনে ও অনাবিল চিত্তে। অন্যথায় সে সকালে উঠে কলূষ কালিমা ও আলস্য সহকারে।
সামুরাহ ইবন জুনদাব সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি তার স্বপ্ন বর্ণনার এক পর্যায়ে বলেছেন, যে ব্যক্তির মাথা পাথর দিয়ে বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ লোক যে কুরআন শিখে তা পরিত্যাগ করে এবং ফরজ সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে।
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর সামনে এক ব্যক্তির ব্যাপারে আলোচনা করা হল- সকাল বেলা পর্যন্ত সে ঘুমিয়েই কাটিয়েছে, সালাতের জন্য জাগ্রত হয়নি, তখন তিনি (নবী (ﷺ)) ইরশাদ করলেনঃ শয়তান তার কানে পেশাব করে দিয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ মহামহিম আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।
আসওয়াদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাতে নবী (ﷺ) এর সালাত কেমন ছিল? তিনি বলেন, তিনি প্রথমাংশে ঘুমাতেন, শেষাংশে জেগে সালাত আদায় করতেন। অতঃপর তার শয্যায় ফিরে যেতেন, মুআয্যিন আযান দিলে শীঘ্র উঠে পড়তেন, তখন তার প্রয়োজন থাকলে গোসল করতেন, নইলে উযূ করে (মসজিদের দিকে) বেরিয়ে যেতেন।
আবূ সালামাহ্ ইবন আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত। তিনি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করেন, রমাযান মাসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সালাত কেমন ছিল? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রমাযান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) এগার রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাকাত সালাত আদায় করতেন। তুমি সেই সালাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। তারপর চার রাকাত সালাত আদায় করতেন, এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করো না। অতঃপর তিনি তিন রাকাত (বিতর) সালাত আদায় করতেন। আয়িশাহ বলেন, (একদা) আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতরের পূর্বে ঘুমিয়ে থাকেন? তিনি ইরশাদ করলেনঃ আমার চোখ দু'টি ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাতের কোন সালাতে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বসে কিরা'আত পড়তে দেখিনি। অবশ্য শেষ দিকে বার্ধক্যে উপনীত হলে তিনি বসে কিরা'আত পড়তেন। যখন (পঠিত) সূরাহর ত্রিশ চল্লিশ আয়াত অবশিষ্ট থাকত, তখন দাড়িয়ে যেতেন এবং সেগুলো পড়ার পর রুকূ করতেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) একদা ফজরের সালাতের সময় বিলাল-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে বিলাল! ইসলাম গ্রহণের পর সর্বাধিক সন্তুষ্টিব্যঞ্জক যে আমল তুমি করেছ, তার কথা আমার নিকট ব্যক্ত কর। কেননা, জান্নাতে (মিরাজের রাতে) আমি আমার সামনে তোমার পাদুকার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। বিলাল বললেন, আমার নিকট এর চেয়ে (অধিক) সন্তুষ্টিব্যঞ্জক হয় এমন কিছুতো আমি করিনি। দিন রাতের যে কোন প্রহরে আমি তাহারাত ও পবিত্রতা অর্জন করেছি, তখনই সে তাহারাত দ্বারা সালাত আদায় করেছি, যে পরিমাণ সালাত আদায় করা আমার তাক্দীরে লেখা ছিল।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) (মসজিদে) প্রবেশ করে দেখতে পেলেন যে, দু'টি স্তম্ভের মাঝে একটি রশি টাঙানো রয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ রশিটি কী কাজের জন্য? লোকেরা বললো, এটি যায়নাবের রশি, তিনি (ইবাদাত করতে করতে) অবসন্ন হয়ে পড়লে এটির সাথে নিজেকে বেধে দেন। নবী (ﷺ) ইরশাদ করলেনঃ না, ওটা খুলে ফেল। তোমাদের কারো প্রাণবন্ত থাকা পর্যন্ত ইবাদাত করা উচিত। যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন যেন সে বসে পড়ে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ আসাদের এক মহিলা আমার নিকট উপস্থিত ছিলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার নিকট আসলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ মহিলাটি কে? আমি বললাম, অমুক। তিনি রাতে ঘুমান না। তখন তার সালাতের কথা উল্লেখ করা হলে তিনি (নবী (ﷺ)) বললেনঃ রাখ রাখ। সাধ্যানুযায়ী আমল করতে থাকাই তোমাদের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ তাআলা (সাওয়াব দানে) ক্লান্ত হন না, যতক্ষণ না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়।
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আ'স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বললেনঃ হে আবদুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মত হয়ো না, সে রাত জেগে ইবাদাত করত, পরে রাত জেগে ইবাদাত করা ছেড়ে দিয়েছে। আবূ সালামাহ হতেও এ রকম বর্ণিত আছে।
আবুল আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে শুনেছি, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বললেনঃ আমাকে কি জানানো হয়নি যে, তুমি রাত ভর ইবাদাতে জেগে থাক আর দিনভর সিয়াম পালন কর? আমি বললাম, হ্যা, তা আমি করে থাকি। তিনি ইরশাদ করলেনঃ একথা নিশ্চিত যে, তুমি এমন করতে থাকলে তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তোমার দেহের অধিকার রয়েছে, তোমার পরিবার পরিজনেরও অধিকার রয়েছে। কাজেই তুমি সিয়াম পালন করবে এবং বাদও দেবে। রাতে জেগে ইবাদাত করবে এবং ঘুমাবেও।
উবাদাহ ইবন সামিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রাতে জেগে ওঠে (উপরোক্ত) দোয়া পড়ে- (দোয়ার অর্থ) "এক আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই। তিনি এক তার কোন শরীক নেই। রাজ্য তারই। যাবতীয় প্রশংসা তারই। তিনিই সব কিছুর উপরে শক্তিমান। যাবতীয় হাম্দ আল্লাহরই জন্য, আল্লাহ তাআলা পবিত্র, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান, গুনাহ হতে বাচার এবং নেক কাজ করার কোন শক্তি নেই আল্লাহর তাওফীক ব্যতীত।" অতঃপর বলে, "হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন।" বা (অন্য কোন) দোয়া করে, তার দোয়া কবূল করা হয়। অতঃপর উযূ করে (সালাত আদায় করলে) তার সালাত কবূল করা হয়।
হায়সাম ইবন আবূ সিনান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ তার ওয়ায বর্ণনাকালে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, তোমাদের এক ভাই আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা অনর্থক কথা বলেননি। "আর আমাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লাহর রাসূল, যিনি তিলাওয়াত করেন তার (আল্লাহর) কিতাব, যখন ফজরের আলো উদ্ভাসিত হয়। তিনি আমাদের গোমরাহীর পর হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন, তাই আমাদের অন্তরগুলো তার প্রতি এ বিশ্বাস রাখে যে, যা তিনি বলেছেন তা অবশ্যই সত্য। তিনি রাত যাপন করেন পার্শ্বদেশকে শয্যা হতে দূরে সরিয়ে রেখে, যখন মুশরিকরা থাকে আপন শয্যাসমূহে নিদ্রামগ্ন।"
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর সময়ে আমি (এক রাতে) স্বপ্নে দেখলাম যেন আমার হাতে একটুকরা মোটা রেশমী কাপড় রয়েছে এবং যেন আমি জান্নাতের যে কোন স্থানে যেতে ইচ্ছা করছি কাপড় (আমাকে) সেখানে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অপর একটি স্বপ্নে আমি দেখলাম, যেন দু'জন ফেরেশতা আমার নিকট এসে আমাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। তখন অন্য একজন ফেরেশতা তাদের সামনে এসে বললেন, তোমার কোন ভয় নেই। (আর ঐ দু'জনকে বললেন) তোমরা ওকে ছেড়ে দাও।
হাফসাহ আমার স্বপ্নদ্বয়ের একটি নবী (ﷺ) এর নিকট বর্ণনা করলে তিনি বললেনঃ 'আব্দুল্লাহ্ কত ভাল লোক! যদি সে রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করত। তারপর হতে আবদুল্লাহ রাতের এক অংশে সালাত আদায় করতেন।
সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নিকট (তাদের দেখা) স্বপ্নের বর্ণনা দিলেন। লাইলাতুল কদর রমাযানের শেষ দশকের সপ্তম রাতে। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ আমি মনে করি যে, (লাইলাতুল কদর শেষ দশকে হবার ব্যাপারে) তোমাদের স্বপ্নগুলোর মধ্যে পরস্পর মিল রয়েছে। কাজেই যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান করতে চায় সে যেন তা শেষ দশকে অনুসন্ধান করে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইশার সালাত আদায় করলেন, অতঃপর আট রাকাত সালাত আদায় করেন এবং দু'রাকাত আদায় করেন বসে। আর দু'রাকাত সালাত আদায় করেন আযান ও ইকামত-এর মাঝে। এ দু'রাকাত তিনি কখনো পরিত্যাগ করতেন না।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী (ﷺ) ফজরের দু'রাকাত সালাত আদায় করার পর ডান কাতে শয়ন করতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (ফজরের সুন্নাত) সালাত আদায় করার পর আমি জেগে থাকলে, তিনি আমার সাথে কথাবার্তা বলতেন, নতুবা সালাতের সময় হওয়া সম্পর্কে অবগত করানো পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের সব কাজে ইস্তিখারাহ্ শিক্ষা দিতেন। যেমন পবিত্র কুরআনের সূরাহ্ আমাদের শিখাতেন। তিনি বলেছেনঃ তোমাদের কেউ কোন কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন ফরজ নয় এমন দু'রাকাত সালাত আদায় করার পর এ দু'আ পড়েঃ "প্রভু হে! আমি তোমার জ্ঞানের ওয়াসিলাহ্তে তোমার অনুমতি কামনা করছি; তোমার কুদরতের ওয়াসিলায় শক্তি চাচ্ছি আর তোমার অপার করুণা ভিক্ষা করছি। কারণ তুমিই সর্বশক্তিমান আর আমি দুর্বল। তুমিই জ্ঞানী আর আমি অজ্ঞ এবং তুমিই সর্বজ্ঞ। প্রভু হে! তুমি যদি মনে কর যে, এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায়, ইহকালে ও পরকালে সত্বর কিংবা বিলম্বে আমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে তা হলে আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দাও এবং তার প্রাপ্তি আমার জন্য সহজতর করে দাও। অতঃপর তুমি তাতে বারাকাত দাও। আর যদি তুমি মনে কর এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায় ইহকালে ও পরকালে আমার জন্য ক্ষতিকর হবে শীঘ্র কিংবা বিলম্বে তাহলে তুমি তাকে আমা হতে দূর করে দাও এবং আমাকে তা হতে দূরে রাখো; অতঃপর তুমি আমার জন্য যা মঙ্গলজনক তা ব্যবস্থা কর- সেটা যেখান থেকেই হোক না কেন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্টচিত্ত করে তোল।" তিনি ইরশাদ করেন ব্যক্তির উচিত তার প্রয়োজনের নাম (উল্লেখ করা)।
আবূ কাতাদাহ ইবন রিব'আ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দু' রাকাত সালাত (তাহিয়্যাতুল-মাসজিদ) আদায় করার পূর্বে বসবে না।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের নিয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন, তারপর চলে গেলেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে যুহরের পূর্বে দু'রাকাত, যুহরের পরে দু'রাকাত, জুমুআর পরে দু'রাকাত, মাগরিবের পরে দু'রাকাত এবং ইশার পরে দু'রাকাত (সুন্নাত) সালাত আদায় করেছি।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার খুৎবাহ প্রদানকালে ইরশাদ করলেনঃ তোমরা কেউ এমন সময় মসজিদে উপস্থিত হলে, যখন ইমাম (জুমুআহর) খুৎবা দিচ্ছেন, কিংবা মিম্বরে আরোহণের জন্য (হুজরাহ হতে) বেরিয়ে পড়েছেন, তাহলে সে তখন যেন দু' রাকাত সালাত আদায় করে নেয়।
মুজাহিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবন উমার-এর বাড়িতে এসে তাকে খবর দিল, এইমাত্র আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কাবা শরীফে প্রবেশ করলেন। ইবন উমার বলেন, আমি অগ্রসর হলাম। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কাবা ঘর হতে বের হয়ে পড়েছেন। বিলাল দরজার নিকট দাড়িয়ে আছেন। আমি বললাম, হে বিলাল! রসুলুল্লাহ্ (ﷺ) কাবার ভিতরে সালাত আদায় করেছেন কি? তিনি বললেন, হা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন স্থানে? তিনি বললেন, দু'স্তম্ভের মাঝখানে। তারপর তিনি বেরিয়ে এসে কাবার সামনে দু' রাকাত সালাত আদায় করলেন। ইমাম বুখারী বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ বলেছেন, নবী (ﷺ) আমাকে দু'রাকাত সালাতুয্ যুহা (চাশ্ত-এর সালাত)-এর আদেশ করেছেন। ইতবান (ইবন মালিক আনসারী) বলেন, একদা অনেকটা বেলা হলে নবী (ﷺ) আবূ বাক্র এবং উমার আমার এখানে আসলেন। আমরা তার পিছনে কাতারে দাড়ালাম আর তিনি (আমাদের নিয়ে) দু'রাকাত সালাত (চাশ্ত) আদায় করলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (ফজরের) দু' রাকাত (সুন্নাত) সালাত আদায় করতেন। অতঃপর আমি জেগে থাকলে আমার সাথে কথাবার্তা বলতেন, নইলে (ডান) কাতে শয়ন করতেন। (বর্ণনাকারী আলী বলেন), আমি সুফ্ইয়ান-কে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কেউ এ হাদীসে (দু'রাকাত স্থলে) ফজরের দু' রাকাত রিওয়ায়াত করে থাকেন। (এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?) সুফ্ইয়ান বললেন, এটা তা-ই।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কোন নফল সালাতকে ফজরের দু'রাকাত সুন্নাতের চেয়ে অধিক গুরুত্ব প্রদান করতেন না।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রাতে তের রাকাত সালাত আদায় করতেন, অতঃপর সকালে আযান শোনার পর সংক্ষিপ্তভাবে দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ফজরের সালাতের পূর্বের দু'রাকাত (সুন্নাত) এত সংক্ষিপ্ত করতেন এমনকি আমি (মনে মনে) বলতাম, তিনি কি (শুধু) উম্মুল কিতাব (ফাতিহা) তিলাওয়াত করলেন?
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে যুহরের পূর্বে দু'রাকাত, যুহরের পর দু'রাকাত, মাগরিবের পর দু'রাকাত, ইশার পর দু'রাকাত এবং জুমুআহর পর দু'রাকাত সালাত আদায় করেছি। তবে মাগরিব ও ইশার পরের সালাত তিনি তার ঘরে আদায় করতেন।
ইবন উমার আরও বলেন, আমার বোন হাফসাহ আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন যে, নবী (ﷺ) ফজর হবার পর সংক্ষিপ্ত দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন। (ইবন উমার বলেন,) এটি ছিল এমন একটি সময়, যখন আমরা কেউ নবী (ﷺ) -এর খিদমতে হাযির হতাম না। ইবন আবু যিনাদ বলেছেন, মূসা ইবন 'উক্বাহ নাফি হতে ইশার পরে তার পরিজনের মধ্যে কথাটি বর্ণনা করেছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে আট রাকাত একত্রে (যুহর ও আসরের) এবং সাত রাকাত একত্রে (মাগরিব-ইশার) সালাত আদায় করেছি। (সে ক্ষেত্রে সুন্নাত আদায় করা হয়নি।) আমর বলেন, আমি বললাম, হে আবুশ্ শা'সা! আমার ধারণা, তিনি যুহর শেষ ওয়াক্তে এবং আসর প্রথম ওয়াক্তে আর ইশা প্রথম ওয়াক্তে ও মাগরিব শেষ ওয়াক্তে আদায় করেছিলেন। তিনি বলেছেন, আমিও তাই মনে করি।
মুওয়াররিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন উমার-কে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি যুহা সালাত আদায় করে থাকেন? তিনি বললেন, না। আমি প্রশ্ন করলাম, উমার তা আদায় করতেন কি? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, আবূ বাকর? তিনি বললেন, না। আমি প্রশ্ন করলাম, নবী (ﷺ)? তিনি বললেন, আমি তা মনে করি না।
আবদুর রাহমান ইবন আবূ লায়লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মু হানী ব্যতীত অন্য কেউ নবী (ﷺ) -কে চাশ্তের সালাত আদায় করতে দেখেছেন, এমন আমাদের নিকট কেউ বর্ণনা করেননি। তিনি উম্মে হানী অবশ্য বলেছেন, নবী (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন (পূর্বাহ্নে) তার ঘরে গিয়ে গোসল করেছেন। (তিনি বলেছেন) যে, আমি আর কখনো (তার) অনুরূপ সংক্ষিপ্ত সালাত দেখিনি। তবে কিরা'আত ছাড়া তিনি রুকূ ও সিজদা পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করছিলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে যুহা-এর সালাত আদায় করতে আমি দেখিনি। তবে আমি তা আদায় করে থাকি।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খলীল ও বন্ধু (নবী (ﷺ)) আমাকে তিনটি কাজের ওসিয়্যাত (বিশেষ আদেশ) করেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আমি পরিত্যাগ করব না। (তা হল) (১) প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম, (২) সালাতুয্-যুহা এবং (৩) বিতর (সালাত) আদায় করে শয়ন করা।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক স্থুল দেহ বিশিষ্ট আনসারী নবী (ﷺ) -এর নিকট আরয্ করলেন, আমি আপনার সঙ্গে (জামা'আতে) সালাত আদায় করতে পারি না। তিনি নবী (ﷺ) -এর উদ্দেশে খাবার তৈরি করে তাকে দাওয়াত করে নিজ বাড়িতে নিয়ে এলেন এবং একটি চাটাই এর এক অংশে (কোমল ও পরিচ্ছন্ন করার উদ্দেশে) পানি ছিটিয়ে (তা বিছিয়ে) দিলেন। তখন তিনি (নবী (ﷺ))-এর উপরে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। ইবন জারূদ আনাস ইবন মালিক-কে জিজ্ঞেস করলেন নবী (ﷺ) কি চাশ্ত-এর সালাত আদায় করতেন? আনাস বললেন, সেদিন বাদে অন্য সময়ে তাকে এ সালাত আদায় করতে দেখিনি।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) হতে আমি দশ রাকাত সালাত আমার স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে রেখেছি। যুহরের পূর্বে দু'রাকাত পরে দু' রাকাত, মাগরিবের পরে দু'রাকাত তার ঘরে, ইশার পরে দু'রাকাত তার ঘরে এবং দু'রাকাত সকালের (ফজরের) সালাতের পূর্বে। [ইবন উমার বলেন] আর সময়টি ছিল এমন, যখন নবী (ﷺ) -এর নিকট (সচরাচর) কোন লোককে প্রবেশ করতে দেয়া হত না।
হাফসাহ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, যখন মুআয্যিন আযান দিতেন এবং ফজর উদিত হত তখন নবী (ﷺ) দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যুহরের পূর্বে চার রাকাত এবং (ফজরের পূর্বে) দু'রাকাত সালাত ছাড়তেন না। ইবন আবূ আদী ও আমর শুবাহ হতে হাদীস বর্ণনায় ইয়াহ্ইয়া-এর অনুসরণ করেছেন।
আবদুল্লাহ মুযানী সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ তোমরা মাগরিবের (ফরযের) পূর্বে (নফল) সালাত আদায় করবে; লোকেরা এ আমলকে সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, এটা কারণে তৃতীয়বারে তিনি বললেনঃ এ তার জন্য যে ইচ্ছা করে।
মারসাদ ইবন আবদুল্লাহ ইয়াযানী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উকবাহ ইবন জুহানী-এর নিকট গিয়ে তাকে বললাম, আবূ তামীম সম্পর্কে এ কথা বলে কি আমি আপনাকে বিস্মিত করে দিব না যে, তিনি মাগরিবের (ফরয) সালাতের পূর্বে দু' রাকাত (নফল) সালাত আদায় করে থাকেন। 'উক্বাহ বললেন, (এতে বিস্ময়ের কী আছে?) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সময়ে তো আমরা তা আদায় করতাম। আমি প্রশ্ন করলাম, তা হলে এখন কিসে আপনাকে বাধা দিচ্ছে? তিনি বললেন, কাজকর্মের ব্যস্ততা।
ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মাহমূদ ইবন রাবী' আনসারী আমাকে জানিয়েছেন যে, (শিশুকালে তার দেখা) নবী (ﷺ) -এর কথা তার ভাল স্মরণ আছে এবং নবী (ﷺ) তাদের বাড়ির কুপ হতে (পানি মুখে নিয়ে বারাকাতের জন্য) তার মুখমন্ডলে যে ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন সে কথাও তার ভাল মনে আছে।
মাহমূদ বলেন যে, ইতবান ইবন মালিক আনসারী-কে (যিনি ছিলেন বদর জিহাদে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে উপস্থিত বদরী সাহাবীগণের অন্যতম) বলতে শুনেছেন যে, আমি আমার কাওম বনূ সালিমের সালাতে ইমামাত করতাম। আমার ও তাদের (কাওমের মসজিদের) মধ্যে ছিল একটি উপত্যকা। বৃষ্টি হলে উপত্যকা আমার মাসজিদ গমনে বাধা সৃষ্টি করতো এবং এ উপত্যকা অতিক্রম করে তাদের মসজিদে যাওয়া আমার জন্য কষ্টকর হতো। তাই আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করলাম, (হে আল্লাহর রাসূল!) আমি আমার দৃষ্টিশক্তির কমতি অনুভব করছি (উপরন্তু) আমার ও আমার গোত্রের মধ্যকার উপত্যকাটি বৃষ্টি হলে প্লাবিত হয়ে যায়। তখন তা পার হওয়া আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই আমার একান্ত আশা যে আপনি শুভাগমন করে আমার ঘরের কোন স্থানে সালাত আদায় করবেন; আমি সে স্থানটিকে সালাতের স্থানরূপে নির্ধারিত করে নিব। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন, শীঘ্রই তা করবো। পরের দিন সূর্যের উত্তাপ যখন বেড়ে গেল, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং আবূ বাকর আসলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) (প্রবেশের) অনুমতি চাইলে আমি তাকে স্বাগত জানালাম, তিনি উপবেশন না করেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ঘরের কোন জায়গায় আমার সালাত আদায় করা তুমি পছন্দ কর? যে স্থানে সালাত আদায় করা আমার মনঃপূত ছিল, তাকে আমি সে স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে দিলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দাড়িয়ে তাকবীর বললেন, আমরা সারিবদ্ধভাবে তার পিছনে দাড়ালাম। তিনি দু'রাকাত সালাত আদায় করে সালাম ফিরালেন। তার সালাম ফেরানোর সময় আমরাও সালাম ফিরালাম। অতঃপর তার উদ্দেশে যে খাযীরা প্রস্তুত করা হচ্ছিল তা আহারের জন্য তার প্রত্যাগমনে আমি বিলম্ব ঘটালাম। ইতিমধ্যে মহল্লার লোকেরা আমার বাড়িতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর অবস্থানের সংবাদ শুনতে পেয়ে তাদের কিছু লোক এসে গেলেন। এমন কি আমার ঘরে অনেক লোকের সমাগম ঘটলো। তাদের একজন বললেন, মালিক (ইবন দুখায়শিন) করল কী? তাকে দেখছি না যে? তাদের একজন জবাব দিলেন, সে মুনাফিক! আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসে না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেনঃ এমন কথা বলবে না। তুমি কি লক্ষ্য করছ না যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহু' উচ্চারণ করেছে। সে ব্যক্তি বলল, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক অবগত। তবে আল্লাহর কসম! আমরা মুনাফিকদের সাথেই তার ভালবাসা ও আলাপ-আলোচনা দেখতে পাই। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেনঃ আল্লাহ তাআলা সে ব্যক্তিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহু' উচ্চারণ করে। মাহমূদ বলেন, এক যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদল লোকের নিকট বর্ণনা করলাম তাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সাহাবী আবূ আইয়ুব (আনসারী) ছিলেন। তিনি সে যুদ্ধে ওফাত পেয়েছিলেন। আর ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া রোমানদের দেশে তাদের আমীর ছিলেন। আবূ আইয়ুব আমার বর্ণিত হাদীসটি অস্বীকার করে বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যে কথা বলেছ তা যে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, তা আমি বিশ্বাস করতে পারি না। ফলে তা আমার নিকট ভারী মনে হল। তখন আমি আল্লাহর নামে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, যদি এ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত তিনি আমাকে নিরাপদ রাখেন, তাহলে আমি ইত্বান ইবন মালিক-কে তার কাউমের মসজিদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করবো, যদি তাকে জীবিত অবস্থায় পেয়ে যাই। অতঃপর আমি ফিরে চললাম এবং হাজ্জ কিংবা উমরার নিয়্যাতে ইহরাম করলাম। অতঃপর সফর করতে করতে আমি মদিনায় উপনীত হয়ে বনূ সালিম গোত্রে উপস্থিত হলাম। দেখতে পেলাম 'ইত্বান যিনি তখন একজন বৃদ্ধ ও অন্ধ ব্যক্তি কাউমের সালাতে ইমামাত করছেন। তিনি সালাত সমাপ্ত করলে আমি তাকে সালাম দিলাম এবং আমার পরিচয় দিয়ে উক্ত হাদীস সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি প্রথমবারের মতই হাদীসটি আমাকে শুনালেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ তোমরা তোমাদের কিছু কিছু সালাত তোমাদের ঘরে আদায় করবে, তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানাবে না। আবদুল ওহ্হাব আইউব হতে হাদীস বর্ণনায় ওয়াহ্ব-এর অনুসরণ করেছেন।