কুরআন মাজীদের তাফসীর (৪৪৭৪-৪৯৭৭)
আবূ সাঈদ ইবন মু'আল্লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা মসজিদে নাববীতে সালাত আদায় করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে ডাকেন। কিন্তু ডাকে আমি সাড়া দেইনি। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ কি বলেননি যে, ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা সাড়া দেবে আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে, যখন তিনি তোমাদেরকে ডাক দেন- (আনফাল ৮/২৪)। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই তোমাকে আমি কুরআনের এক অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিব। তারপর তিনি আমার হাত ধরেন। এরপর যখন তিনি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করেন তখন আমি তাকে বললাম, আপনি কি বলেননি যে আমাকে কুরআনের অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিবেন? তিনি বললেন, "আল-হামদু-লি-লা-লাহ রাব্বি-আল-আলামিন" সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, এটা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন যা কেবল আমাকেই দেয়া হয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যখন ইমাম বলবে "গাইর-ইল-মাগদুবি'আলাইহিম ওয়ালাদ-দালিন (তাদের পথ নয় যারা আপনার ক্রোধ অর্জন করে, না তাদের পথ যারা বিপথগামী (1.7))" তখন তোমরা বলবে, 'আমীন'। যার পড়া ফেরেস্তাদের পড়ার সময় হবে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মুমিনগণ একত্রিত হবে এবং তারা বলবে, আমরা যদি আমাদের রবের কাছে আমাদের জন্য একজন সুপারিশকারী পেতাম। এরপর তারা আদম-এর কাছে আসবে এবং তাকে বলবে, আপনি মানব জাতির পিতা। আপনাকে আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। তার মালায়িকাহ দ্বারা আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং যাবতীয় বস্ত্তর নাম আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন, যেন আমাদের কঠিন স্থান থেকে আরাম দিতে পারেন। তিনি বলবেন, আমি এ কাজের যোগ্য নই। তিনি নিজ ভুলের কথা স্মরণ করে লজ্জাবোধ করবেন। (তিনি বলবেন) তোমরা নূহ -এর কাছে যাও। তিনিই প্রথম রাসূল যাকে আল্লাহ জগৎবাসীর কাছে পাঠিয়েছেন। তখন তারা তার কাছে আসবে। তিনিও বলবেন, এ কাজ আমার দ্বারা হওয়ার নয়। তিনি তার রবের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন এমন বিষয়ে যা তার জানা ছিল না। সে কথা স্মরণ করে তিনি লজ্জাবোধ করবেন এবং বলবেন বরং তোমরা আল্লাহর খলীল (ইব্রাহীম)-এর কাছে যাও। তারা তখন তার কাছে আসবে, তখন তিনি বলবেন, এ কাজ আমার দ্বারা হওয়ার নয়। তোমরা মূসা-এর কাছে যাও। তিনি এমন বান্দা যে, তার সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাকে তাওরাত গ্রন্থ দান করেছেন। তখন তারা তার কাছে আসবে। তিনি বলবেন, তোমাদের এ কাজের জন্য আমার সাহস হচ্ছে না এবং তিনি এক কিবতীকে বিনা দোষে হত্যা করার কথা স্মরণ করে তার রবের নিকট লজ্জাবোধ করবেন। তিনি বলবেন, তোমরা ঈসা-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং আল্লাহর বাণী ও রূহ্। (তারা সেখানে যাবে) তিনি বলবেন, এ কাজ আমার দ্বারা হওয়ার নয়। তোমরা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে যাও। তিনি এমন এক বান্দা যার পূর্ব ও পরের ভুলত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তখন তারা আমার কাছে আসবে। তখন আমি আমার রবের কাছে যাব এবং অনুমতি চাব, আমাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আর আমি যখন আমার রবকে দেখব, তখন আমি সিজদায় লুটিয়ে পড়ব। আল্লাহ যতক্ষণ চান এ অবস্থায় আমাকে রাখবেন। তারপর বলা হবে, আপনার মাথা উঠান এবং চান দেয়া হবে, বলুন শোনা হবে, সুপারিশ করুন কবূল করা হবে। তখন আমি আমার মাথা উঠাব এবং আমাকে যে প্রশংসাসূচক বাক্য শিক্ষা দিবেন তা দ্বারা আমি তার প্রশংসা করব। তারপর সুপারিশ করব। আমাকে একটি সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে। (সেই সীমিত সংখ্যায়) আমি তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাব। আমি পুনরায় রবের সমীপে ফিরে আসব। যখন আমি আমার রবকে দেখব তখন আগের মত সবকিছু করব। তারপর আমি সুপারিশ করব। আর আমাকে একটি সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া হবে। তদনুসারে আমি তাদের জান্নাতে দাখিল করাব। (তারপর তৃতীয়বার) আমি আবার রবের নিকটে উপস্থিত হয়ে অনুরূপ করব। এরপর আমি চতুর্থবার ফিরে আসব এবং আরয করব এখন তারাই কেবল জাহান্নামে অবশিষ্ট রয়ে গেছে যারা কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী অনেক আছে যাদের উপর জাহান্নামে চিরবাস অবধারিত হয়ে গেছে। আবূ আবদুল্লাহ বুখারী বলেন, কুরআনের যে ঘোষণায় তারা জাহান্নামে আবদ্ধ রয়েছে তা হল মহান আল্লাহর বাণীঃ "তারা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।"
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা।
সাঈদ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ .. -আল কামাআত (ব্যাঙের ছাতা) মান্ন জাতীয়। আর তার পানি চোখের রোগের প্রতিষেধক।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, বনী ইসরাঈলকে বলা হয়েছিল যে, তোমরা সিজদা অবস্থায় নগর দ্বারে প্রবেশ কর এবং বল (ক্ষমা চাই) কিন্তু তারা প্রবেশ করল নিতম্ব হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এবং শব্দকে পরিবর্তন করে তদস্থলে বলল, গম ও যবের দানা।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শুভাগমনের খবর পেলেন। তখন তিনি (আবদুল্লাহ ইবন সালাম) বাগানে ফল সংগ্রহ করছিলেন। তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বললেন, আমি আপনাকে তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করব যা নবী (ﷺ) ব্যতীত অন্য কেউ জানেন না। তা হল কিয়ামতের প্রথম আলামাত কী? জান্নাতীদের প্রথম খাদ্য কী হবে? এবং সন্তান কখন পিতার মত হয় আর কখন মাতার মত হয়? নবী (ﷺ) বললেন, আমাকে জিব্রীল এখনই এসব ব্যাপারে জানিয়ে গেলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, জিবরীল? নবী (ﷺ) বলল, হ্যা। ইবন সালাম বললেন, সে তো মালায়িকাদের মধ্যে ইয়াহূদীদের শত্রু। তখন নবী (ﷺ) এই আয়াত পাঠ করলেন, আপনি বলে দিনঃ যে কেউ জিবরাঈলের শত্রু- এ কারণে যে, সে আল্লাহর নির্দেশে আপনার অন্তরে কুরআন অবতীর্ণ করেছে- ( আল-বাকারাহ ২/৯৭)। কিয়ামতের প্রথম আলামাত হল, এক রকম আগুন মানুষদেরকে পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত একত্রিত করবে। আর জান্নাতীরা প্রথমে যা খাবেন তা হল মাছের কলিজার টুকরা। আর যখন পুরুষের বীর্য স্ত্রীর উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন সন্তান পিতার আকৃতি পায় এবং যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের উপর প্রাধান্য লাভ করে তখন সন্তান মাতার আকৃতি পায়। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল। হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদরা চরম মিথ্যারোপকারী। যদি তারা আপনার প্রশ্ন করার পূর্বেই আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জেনে যায় তবে তারা আমার প্রতি অপবাদ আরোপ করবে। ইতোমধ্যে ইয়াহূদীরা এসে গেল। তখন নবী (ﷺ) ইয়াহূদীদের জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেমন লোক? তারা উত্তর দিল, তিনি আমাদের মধ্যে উত্তম এবং আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পুত্র। তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের নেতার ছেলে। নবী (ﷺ) বললেন, যদি আবদুল্লাহ ইবন সালাম ইসলাম গ্রহণ করেন, তাহলে তোমাদের অভিমত কী? তারা বলল, আল্লাহ তাকে এর থেকে রক্ষা করুন। তখন [আবদুল্লাহ ইবন সালাম] বের হয়ে এসে বললেন, আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। তখন তারা বলল, সে আমাদের মধ্যে মন্দ ব্যক্তি ও মন্দ ব্যক্তির ছেলে। তারপর তারা ইবন সালাম-কে দোষী সাব্যস্ত করে সমালোচনা করতে লাগল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! এটাই আমি আশঙ্কা করছিলাম।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেন, উবাই আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ক্বারী, আর আলী আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিচারক। কিন্তু আমরা উবাই-এর কিছু কথা বাদ দেই। কারণ উবাই বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে যা শুনেছি তার কিছুই ছাড়ব না। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি যে আয়াত রহিত করি অথবা ভুলিয়ে দেই ........ (আল-বাকারাহ ২/১০৬)।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আদম সন্তান আমার ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে। অথচ তার এ কাজ ঠিক নয়। আমাকে গালি দিয়েছে অথচ তার জন্য এটা ঠিক নয়। তার আমার প্রতি মিথ্যারোপ হল, সে বলে যে, আমি তাকে (মৃত্যুর) পূর্বের মত পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নই। আর আমাকে তার গালি দেয়া হল-তার এ কথা যে, আমার সন্তান আছে অথচ আমি স্ত্রী ও সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেছেন, তিনটি বিষয়ে আমার মতামত আল্লাহর ওয়াহীর অনুরূপ হয়েছে অথবা (তিনি বলেছেন) তিনটি বিষয়ে আমার মতামতের অনুকূলে আল্লাহ ওয়াহী অবতীর্ণ করেছেন। তা হল, আমি বলেছিলাম হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনি মাকামে ইব্রাহীমকে সালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করতেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন ....... তোমরা ইবরাহীমের দাড়ানোর জায়গাকে সালাতের জায়গারূপে গ্রহণ কর- (আল-বাকারাহ ২/১২৫)। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে ভাল ও মন্দ উভয় প্রকারের লোক আসে। কাজেই আপনি যদি উম্মাহাতুল মুমিনীনদেরকে পর্দা করার আদেশ করবেন। তখন আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করেন। তিনি আরো বলেন, আমি জানতে পেরেছিলাম যে, নবী (ﷺ) তার কতক স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তখন আমি তাদের কাছে উপস্থিত হই এবং বলি যে, আপনারা এর থেকে বিরত থাকুন নচেৎ আল্লাহ তাআলা তার রাসূল (ﷺ)-কে আপনাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দান করবেন। এরপর আমি তার কোন স্ত্রীর কাছে আসি, তখন তিনি বললেন, হে উমার! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারেও নাক গলাতে শুরু করেছ। তিনি (ﷺ) স্ত্রীগণকে নাসীহাত করে থাকেন আর এখন তুমি তাদের নাসীহাত করতে আরম্ভ করেছ? তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেন "যদি নবী তোমাদের সবাইকে তালাক দেন, তবে তার রব অচিরেই তোমাদের পরিবর্তে তোমাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী তাকে দিবেন, যারা হবে আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, অনুগত, তওবাকারিণী, ইবাদাতকারিণী, সিয়াম পালনকারী, অকুমারী ও কুমারী"- (আত্-তাহরীম ৬৬/৫)।
নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তোমার কি জানা নেই যে, তোমার সম্প্রদায় কুরাইশ কাবা তৈরী করেছে এবং ইবরাহীম -এর ভিত্তির থেকে ছোট নির্মাণ করেছে? [আয়িশাহ বলেন] আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি ইবরাহীম-এর ভিত্তির উপর কাবাকে আবার নির্মাণ করবেন না? তিনি বললেন, যদি তোমার গোত্রের কুফরীর যুগ নিকট অতীতে না হত। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ ইবন উমার বললেন, যদি আয়িশাহ এ কথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে শুনে থাকেন, তবে আমার মনে হয় যে এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাজরে আসওয়াদ সংলগ্ন দু' রুকনকে চুম্বন করতেন না, বর্জন করেছেন, যেহেতু বাইতুল্লাহর নির্মাণ কাজ ইবরাহীম-এর ভিতের উপর সম্পূর্ণ করা হয়নি।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আহলে কিতাব (ইয়াহূদী) ইবরানী ভাষায় তাওরাত পাঠ করে মুসলিমদের কাছে তা আরবী ভাষায় ব্যাখ্যা করত। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা আহলে কিতাবকে বিশ্বাসও কর না আর অবিশ্বাসও কর না এবং (আল্লাহর বাণী) "তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ঈমান এনেছি এবং যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে . . . ."- (আল-বাকারাহ ২/১৩৬)।
বারাআ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) মদিনা্তে ষোল অথবা সতের মাস যাবৎ বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। অথচ নবী (ﷺ) বাইতুল্লাহর দিকে তার কিবলা হওয়াকে পছন্দ করতেন। নবী (ﷺ) আসর এর সালাত (কাবার দিকে মুখ করে) আদায় করেন এবং লোকেরাও তার সঙ্গে সালাত আদায় করেন। এরপর তার সঙ্গে সালাত আদায়কারী একজন বের হন এবং তিনি একটি মসজিদের লোকেদের পার্শ্ব দিয়ে গেলেন তখন তারা রুকু অবস্থায় ছিলেন। তিনি বললেন, আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছি। এ কথা শোনার পর তারা যে অবস্থায় ছিলেন, সে অবস্থায় বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে গেলেন। আর যারা কিবলা বাইতুল্লাহর দিকে পরিবর্তনের পূর্বে বাইতুল মাকদাসের দিকে সালাত আদায় অবস্থায় মারা গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের সম্পর্কে আমরা কী বলব তা আমাদের জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন- "আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান ব্যর্থ করে দেবেন। নিশ্চই আল্লাহ মানুষের প্রতি পরম মমতাময়, পরম দয়ালু"- (আল-বাকারাহ ২/১৪৩)।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন নূহ্-কে ডাকা হবে। তখন তিনি বলবেনঃ হে আমাদের রব! আমি আপনার পবিত্র নিকটে হাযির (তখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন) তুমি কি (আল্লাহর বাণী) পৌছে দিয়েছিলে? তিনি বলবেন, হ্যা। এরপর তার উম্মতকে জিজ্ঞেস করা হবে, [নূহ কি] তোমাদের নিকট (আল্লাহর বাণী) পৌছে দিয়েছে? তারা তখন বলবে, আমাদের কাছে কোন ভয়প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন আল্লাহ তাআলা [নূহ-কে] বলবেন, তোমার পক্ষে কে সাক্ষ্য দেবে? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তার উম্মতগণ। তখন তারা সাক্ষ্য দেবে যে, নূহ তার উম্মতের নিকট আল্লাহর বাণী পৌছে দিয়েছেন এবং রাসূল (ﷺ) তোমাদের জন্য সাক্ষী হবেন। এটাই মহান আল্লাহর বাণী "আর এ ভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি মধ্যপন্থী উম্মাত করেছি যাতে তোমরা মানবজাতির সাক্ষী হতে পার আর রাসূল তোমাদের সাক্ষী হন।" (আল-বাকারাহ ২/১৪৩) 'ওয়াসাত' ন্যায়নিষ্ঠ।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। একদিন লোকেরা কূবা মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় এক আগন্তুক এসে বলল, আল্লাহ তাআলা নবী (ﷺ)-এর প্রতি কুরআনের এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন যে, তিনি যেন (সালাতে) কাবার দিকে মুখ করেন। কাজেই আপনারাও কাবার দিকে মুখ করুন। তখন লোকেরা কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যারা উভয় কিবলার (বাইতুল মাকদাস কাবা-এর) দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছেন তাদের মধ্যে আমি ব্যতীত আর কেউ বেচে নেই।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। একদা লোকেরা মসজিদে কুবায় ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় তাদের কাছে একজন লোক এসে বলল, এ রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করার জন্য তিনি নির্দেশিত হয়েছেন। অতএব আপনারা কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিন। আর তখন লোকেদের চেহারা শামের দিকে ছিল। তখন তারা তাদের চেহারা কাবার দিকে ঘুরিয়ে নিলেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকেরা কুবা মসজিদে ফজরের সালাতে ছিলেন, তখন তাদের কাছে একজন আগন্তুক এসে বললেন, নবী (ﷺ)-এর প্রতি এ রাতে কুরআন (এর আয়াত) অবতীর্ণ করা হয়েছে, আর এতে তিনি কাবার দিকে মুখ ফিরানোর জন্য নির্দেশিত হয়েছেন। কাজেই আপনারা কাবার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিন। আর তখন তাদের মুখ শামের দিকে ছিল। তখন তারা কাবার দিকে ঘুরে গেলেন।
বারাআ (ইবন আযিব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ষোল অথবা সতের মাস ব্যাপী (মদিনা্তে) বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছি। তারপর আল্লাহ তাকে কাবার পানে ফিরিয়ে দেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা কূবা মসজিদে সাহাবীগণ ফজরের সালাত সম্পাদন করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, আজ রাতে [নবী (ﷺ)-এর প্রতি] কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, তাতে কাবার দিকে মুখ ফিরানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই আপনারা সেদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিন। তখন তারা আপন আপন অবস্থায় মুখ ঘুরিয়ে নেন এবং কাবার দিকে মুখ করেন। তখন তাদের মুখ সিরিয়ার দিকে ছিল।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা কূবাতে সাহাবীগণ ফজরের সালাত সম্পাদন করছিলেন এমন সময় এক আগন্তুক এসে বলল, রাসূলুল্লাহ এর প্রতি আজ রাতে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে এবং তিনি কাবার দিকে মুখ ফিরানোর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছেন। অতএব আপনারাও সেদিকে মুখ ফিরিয়ে নিন। তাদের মুখ তখন ছিল সিরিয়ার দিকে। তখন তারা কাবার দিকে ফিরে গেলেন।
উরওয়া থেকে বর্ণিত: আমি নবীর স্ত্রী আয়েশা কে বললাম, আমি তখন একজন ছোট ছেলে ছিলাম, "তুমি আল্লাহর এই বাণীকে কিভাবে ব্যাখ্যা কর: "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া (মক্কার দুটি পর্বত) এর প্রতীকগুলির মধ্যে একটি। আল্লাহ।" সুতরাং যারা আল্লাহর ঘরের হজ্জ করে) বা উমরা করে তাদের উভয়ের মধ্যে তাওয়াফ করা ক্ষতিকর নয়। আমার মতে তাদের মধ্যে তাওয়াফ না করা গুনাহের কাজ নয়। " আয়িশা বললেন, "আপনার ব্যাখ্যাটি ভুল কারণ আপনি যেমন বলেছেন, আয়াতটি হওয়া উচিত ছিল: "সুতরাং যারা হাউসে হজ বা ওমরা করে তাদের জন্য ক্ষতিকারক নয়, তাদের মধ্যে তাওয়াফ না করা।' এই আয়াতটি আনসারদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে যারা (ইসলাম-পূর্ব যুগে) ইহরাম বেধে মানাত (একটি মূর্তি) পরিদর্শন করতেন এবং এটি কুদাইদ (মক্কার একটি স্থান) এর নিকটে অবস্থিত ছিল এবং তারা তা করতেন। ইসলাম গ্রহণের পর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে চলাফেরা করাকে পাপ মনে করে। ইসলামের আগমনের পর তারা আল্লাহর রসূল (ﷺ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেন:-"নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া (মক্কার দুটি পর্বত) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, সুতরাং যারা তা পালন করে তাদের জন্য তা ক্ষতিকর নয়। (আল্লাহর) ঘরের হজ্জ বা ওমরা করা, তাদের মধ্যে তাওয়াফ করার জন্য।" (2.158)
আসিম ইবন সুলাইমান থেকে বর্ণিত: আমি আনাস ইবন মালিককে সাফা ও মারওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। আনাস উত্তর দিলেন, "আমরা তাদেরকে (ঘুরে বেড়ানোকে) জাহেলিয়াতের প্রাক-ইসলামী যুগের রীতি মনে করতাম, তাই যখন ইসলাম এসেছিল, তখন আমরা তাদের আশেপাশে ঘোরাফেরা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর আল্লাহ নাযিল করলেন" "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া (দুটি। মক্কার পাহাড়) আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং যারা (আল্লাহর) ঘরের হজ্জ করে বা উমরা করে তাদের মধ্যে তাওয়াফ করা ক্ষতিকর নয়।" (2.158)
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একটি কথা বললেন, আর আমি একটি বললাম। নবী (ﷺ) বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তার সমকক্ষ হিসেবে আহবান করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে যাবে। আর আমি বললাম, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ হিসেবে আহবান না করা অবস্থায় মারা যায়? (তিনি বললেন) সে জান্নাতে যাবে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: কিসাসের আইন (শাস্তিতে সমতা) ইসরায়েলের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত ছিল, কিন্তু দিয়া (তাদের জন্য রক্তের অর্থ নির্ধারিত ছিল না)। তাই আল্লাহ এই জাতিকে (মুসলমানদের) বললেন: "হে ঈমানদারগণ! খুনের ক্ষেত্রে তোমাদের জন্য আল-কিসাসের (শাস্তির সমতা) আইন নির্ধারিত হয়েছে: স্বাধীনের জন্য স্বাধীন, গোলামের বদলে গোলাম, এবং নারীর জন্য নারী। কিন্তু নিহত (ব্যক্তির) আত্মীয়রা (অথবা তাদের একজন) তার ভাইকে (খুনিদের কিসাসের কিছু) ক্ষমা করে দিলে (ইচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে রক্তমানি গ্রহণ করে হত্যাকারীকে হত্যা না করা) ----অতঃপর (হত্যাকারীর) আত্মীয়রা যৌক্তিক উপায়ে রক্তের টাকা দাবি করবে এবং হত্যাকারীকে অবশ্যই কৃতজ্ঞতার সাথে পরিশোধ করতে হবে, এটি আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে একটি উপশম এবং রহমত, (যা নির্ধারিত ছিল তার তুলনায়) তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের জন্য) সুতরাং এর পর যে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করবে (রক্ত-মানি নিয়ে হত্যাকারীকে হত্যা করবে) তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।" (2.178)
আনাস তাদের কাছে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আল্লাহর কিতাবের নির্দেশ হল কিসাস।
আনাস হতে বর্ণিত। আনাসের ফুফু রুবাঈ এক বাদির সম্মুখ দাত ভেঙ্গে ফেলে। এরপর বাদির কাছে রুবাঈয়ের লোকজন ক্ষমা চাইলে বাদির লোকেরা অস্বীকার করে। তখন তাদের কাছে দিয়াত পেশ করা হল, তখন তা তারা গ্রহণ করল না। অগত্যা তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সমীপে এসে ঘটনা জানাল। কিন্তু কিসাস ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহণ করতে তারা অস্বীকার করল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিসাসের নির্দেশ দিলেন। তখন আনাস ইবন নযর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রুবাঈদের সামনের দাত ভাঙ্গা হবে? না, যে সত্তা আপনাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন তার শপথ, তার দাত ভাঙ্গা হবে না। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আনাস! আল্লাহর কিতাব তো কিসাসের নির্দেশ দেয়। এরপর বাদির লোকেরা রাযী হয়ে যায় এবং রুবাঈ'কে ক্ষমা করে দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এমন মানুষও আছে যিনি আল্লাহর নামে শপথ করলে আল্লাহ তা পূরণ করেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলী যুগের লোকেরা আশুরার সওম পালন করত। এরপর যখন রমাযানের সওমের বিধান অবতীর্ণ হল, তখন নবী (ﷺ) বললেন, যার ইচ্ছা সে আশুরার সওম পালন করবে আর যার ইচ্ছা সে তার সওম পালন করবে না।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযানের সওমের (আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার) পূর্বে আশুরার সওম পালন করা হত। এরপর যখন রমাযানের (সম্পর্কিত বিধান) অবতীর্ণ হল, তখন নবী (ﷺ) বললেন, যে ইচ্ছা করে (আশুরার) সওম পালন করবে, আর যে চায় সে সওম পালন করবে না।
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তার নিকট 'আশ'আস আসেন। এ সময় ইবন মাসঊদ পানাহার করছিলেন। তখন আশ'আস বললেন, আজ তো 'আশুরা। তিনি বললেন, রমাযানের (এর সওমের বিধান) অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে 'আশুরার সওম পালন করা হত। যখন রমাযানের (এর সওমের বিধান) অবতীর্ণ হল তখন তা পরিত্যাগ করা হয়েছে। এসো, তুমিও খাও।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে কুরাইশগণ আশুরার দিন সওম পালন করত। নবী (ﷺ)-ও সে সওম পালন করতেন। যখন তিনি মদিনায় হিজরাত করলেন তখনও তিনি সে সওম পালন করতেন এবং অন্যদের পালনের নির্দেশ দিতেন। এরপর যখন রমাযান (সম্পর্কিত আয়াত) অবতীর্ণ হলে রমাযানের সওম ফরয হল এবং আশুরার সওম বাদ গেল। এরপর যে চাইত সে উক্ত সওম পালন করত আর যে চাইত তা পালন করত না।
আতা ইবন আব্বাস-কে পড়তে শুনেছেন ...... যারা সওম পালনে সক্ষম নয়। তাদের জন্য একজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানোই ফিদ্য়া। ইবন আব্বাস বলেন, এ আয়াত রহিত হয়নি। এ হুকুম সেই অতিবৃদ্ধ পুরুষ ও স্ত্রীলোকের জন্য যারা সওম পালনে সমর্থ নয়। এরা প্রত্যেক দিনের সওমের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে পেট পুরে আহার করাবে।
নাফি বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর তিলাওয়াত করেন: "তাদের একটি পছন্দ ছিল, হয় রোজা রাখবে বা প্রতিদিন একজন গরীবকে খাওয়াবে..." এবং যোগ করল, "এই আয়াতটি বাতিল হয়ে গেছে।"
সালামা বর্ণনা করেছেন: যখন ঐশ্বরিক ওহী: "যারা রোজা রাখতে পারে, তাদের জন্য রোজা রাখা বা প্রতিদিন একজন দরিদ্রকে খাওয়ানোর বিকল্প ছিল" (2.184) নাযিল করা হয়েছিল, তখন একজনের জন্য মুক্তিপণ দেওয়া এবং উপবাস ছেড়ে দেওয়া বৈধ ছিল, যতক্ষণ না এর পরে আয়াত নাযিল হয় এবং তা রহিত হয়।
আল-বারা' বর্ণনা করেছেন: যখন রমজানের বাধ্যতামূলক রোজা রাখার আদেশ নাযিল হয়, তখন লোকেরা পুরো রমজান মাস তাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করেনি, তবে কিছু পুরুষ (সে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে) নিজেদের সাথে প্রতারণা করেছিল। তাই আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন: "আল্লাহ জানেন যে তোমরা নিজেদেরকে প্রতারণা করছিলে কিন্তু তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং তোমাদের ক্ষমা করেছেন .." (3.187)
আদী হতে বর্ণিত। তিনি (আদী) একটি সাদা ও একটি কালো সুতা সঙ্গে রাখলেন। কিন্তু রাত অতিবাহিত হলে খুলে দেখলেন কিন্তু তার কাছে সাদা কালোর কোন পার্থক্য নিরূপিত হল না। যখন সকাল হল তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার বালিশের নিচে (সাদা ও কালো রংয়ের দু'টি সুতা) রেখেছিলাম (এবং তিনি রাতের ঘটনাটি বললেন)। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমার বালিশ তো খুবই বড় দেখছি, যদি কালো ও সাদা সুতা (সুবহি কাযিব ও সুবহি সাদিক) তোমার বালিশের নিচে থেকে থাকে। (রাসূল (ﷺ) আদী (রা.)-এর বর্ণনা শুনে কৌতুক করে বলেছেন যে, গোটা পূর্বাকাশ যদি তোমার বালিশের নিচে রেখে থাক তাহলে সে বালিশ তো খুব বড়ই দেখছি)
আদী ইবনে হাতেম থেকে বর্ণিত: আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সাদা সুতার অর্থ কি কালো সুতো থেকে আলাদা? এ দুটি কি সুতো? তিনি বললেন, আপনি বুদ্ধিমান নন যদি আপনি দুটি সুতো দেখেন। তারপর তিনি যোগ করলেন, "না, এটি রাতের অন্ধকার এবং দিনের শুভ্রতা।"
সাহল ইবন সা'দ আয়াতটি বর্ণনা করেছেন, "এবং খাও এবং পান কর যতক্ষণ না তোমার কাছে সাদা সুতো স্পষ্ট দেখা যায়: কালো সুতো থেকে।" অবতীর্ণ হয়েছিল, কিন্তু: '... ভোরের' অবতীর্ণ হয়নি (এর সাথে) তাই কিছু লোক রোজা রাখার সময় তাদের পা বেধে রাখতেন, একটি সাদা সুতো দিয়ে এবং অন্যটি কালো দিয়ে। সুতো এবং খেতে থাকত যতক্ষণ না তারা একটি সুতো থেকে অন্য সুতার পার্থক্য করতে পারত, তারপর আল্লাহ '... ভোরের' অবতীর্ণ করলেন, তখন তারা বুঝতে পেরেছিল যে এর অর্থ রাত এবং দিন।
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে যখন লোকেরা ইহরাম বাধত, তারা পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করত। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন- "আর পেছনের দিক দিয়ে ঘরে প্রবেশ করাতে কোন পুণ্য নেই, বরং পুণ্য আছে কেউ তাকওয়া অবলম্বন করলে। সুতরাং তোমরা দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ কর"- ( আল-বাকারাহ ২/১৮৯)।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তার কাছে দুই ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের যুগে সৃষ্ট ফিতনার সময় আগমন করল এবং বলল, লোকেরা সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর আপনি উমার-এর পুত্র এবং নবী (ﷺ)-এর সাহাবী! কী কারণে আপনি বের হন না? তিনি উত্তর দিলেন আমাকে নিষেধ করেছে এই কথা-'নিশ্চই আল্লাহ তাআলা আমার ভাইয়ের রক্ত হারাম করেছে। তারা দু'জন বললেন, আল্লাহ কি এ কথা বলেননি যে, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর যাবৎ না ফিতনার অবসান ঘটে। তখন ইবন উমার বললেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি যাবৎ না ফিতনার অবসান ঘটেছে এবং দ্বীনও আল্লাহর জন্য হয়ে গেছে। আর তোমরা ফিতনা প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করার ইচ্ছা করছ আর যেন আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য দ্বীন হয়ে গেছে।
নাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবনে উমরের কাছে এসে বলল, "হে আবু আবদুর রহমান! কিসে তোমাকে এক বছরে হজ এবং অন্য বছরে উমরা করতে এবং আল্লাহর জন্য জিহাদ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।" কারণ আপনি জানেন যে আল্লাহ কতটা সুপারিশ করেন?" ইবনে ওমর উত্তরে বললেন, হে আমার ভাইয়ের সন্তান! ইসলাম পাচটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি বিশ্বাস, পাচটি ফরজ নামাজ, রমজান মাসের রোজা, যাকাত প্রদান এবং হজ। (আল্লাহর) ঘর।" লোকটি বলল, "হে আবু আবদুর রহমান! তুমি কি শুনবে না কেন আল্লাহ তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন: 'যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পর যুদ্ধ করে তবে তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করুন, কিন্তু যদি তাদের মধ্যে একটি সীমা অতিক্রম করে। অন্যটি, অতঃপর তোমরা সবাই সীমালঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। (49.9) এবং:-"এবং তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না আর কোন কষ্ট না হয় (আল্লাহর সাথে অন্যের উপাসনা না করা)।" ইবনে ওমর বললেন, "আমরা এটা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় করেছিলেন যখন ইসলামের মাত্র কয়েকজন অনুসারী ছিল। একজন মানুষকে তার ধর্মের কারণে বিচারের মুখোমুখি করা হবে; তাকে হয় হত্যা করা হবে অথবা নির্যাতন করা হবে। কিন্তু মুসলমানরা যখন বেড়েছে, তখন আর কোনো দুর্দশা বা অত্যাচার ছিল না।"
সে ব্যক্তি বলল, আলী উসমান সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন, উসমান-কে তো আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করেছেন অথচ তোমরা তাকে ক্ষমা করা পছন্দ কর না। আর আলী-তিনি তো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচাত ভাই এবং তার জামাতা। তিনি নিজ হাতে ইশারা করে বলেন, এই তো তার ঘর যেমন তোমরা দেখছ।
হুযাইফাহ হতে বর্ণিত যে, "আর ব্যয় কর আল্লাহর পথে এবং নিজেদের হাতে নিজেদেরকে তোমরা ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না"- ( আল-বাকারাহ ২/১৯৫)।
আবদুল্লাহ ইবন মা'কিল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন উজরা-এর নিকট এই কূফার মসজিদে বসে থাকাকালে সওমের ফিদ্য়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমার চেহারায় উকুন ছড়িয়ে পড়া অবস্থায় আমাকে নবী (ﷺ)-এর কাছে আনা হয়। তিনি তখন বললেন, আমি মনে করি যে, এতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি কি একটি বকরী সংগ্রহ করতে পার? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি তিনদিন সওম পালন কর অথবা ছয়জন দরিদ্রকে খাদ্য দান কর। প্রতিটি দরিদ্রকে অর্ধ সা' খাদ্য দান করতে হবে এবং তোমার মাথার চুল কামিয়ে ফেল। তখন আমার ব্যাপারে বিশেষভাবে আয়াত অবতীর্ণ হয়। তবে তোমাদের সকলের জন্য এই হুকুম।
ইমরান ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তুর (উমরাহ ও হাজ্জ একসঙ্গে করে লাভবাব হওয়ার) আয়াত আল্লাহর কিতাবে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে তা করেছি এবং এর নিষিদ্ধতা ঘোষণা করে কুরআনের কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়নি এবং নবী (ﷺ) ইন্তিকাল পর্যন্ত তা থেকে নিষেধও করেনি। এ ব্যাপারে এক ব্যক্তি নিজের ইচ্ছানুযায়ী মতামত ব্যক্ত করেছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উকায, মাজান্না এবং যুল-মাজায নামক স্থানে জাহিলী যুগে বাজার ছিল। মুসলিমগণ সেখানে হাজ্জ মওসুমে ব্যবসা করতে যাওয়া দূষণীয় মনে করত। তাই অবতীর্ণ হলঃ "তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় তোমাদের কোন পাপ নেই"- (আল-বাকারাহ ২/১৯৮)।
আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ কুরাইশ লোকেরা এবং যারা তাদের ধর্ম গ্রহণ করেছিল তারা মুজদালিফায় অবস্থান করত এবং নিজেদেরকে আল-হুমস বলত, আর বাকি আরবরা আরাফাতে থাকত। ইসলামের আগমনের পর, আল্লাহ তার নবীকে আরাফাতে যেতে এবং সেখানে অবস্থান করার এবং তারপর সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন, এবং এটাই আল্লাহর বাণী দ্বারা বোঝানো হয়েছে: - "অতঃপর সেই স্থান থেকে চলে যাও যেখান থেকে সমস্ত লোক চলে যায়। ......" (2.199)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তামাত্তু আদায়কারী উমরাহ আদায়ের পর যদ্দিন হালাল অবস্থায় থাকবে তদ্দিন বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবে। তারপর হাজ্জের জন্য ইহরাম বাধবে। এরপর যখন 'আরাফাতে যাবে তখন উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি যা মুহরিমের জন্য সহজলভ্য হয় তা মীনাতে কুরবানী করবে। আর যে কুরবানীর সঙ্গতি রাখে না সে হাজ্জের দিনসমূহের মধ্যে তিনদিন সওম পালন করবে। আর তা 'আরাফার দিনের আগে হতে হবে। আর তিনদিনের শেষ দিন যদি 'আরাফার দিন হয়, তবে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর 'আরাফাত ময়দানে যাবে এবং সেখানে আসরের সালাত হতে সূর্যাস্তের অন্ধকার পর্যন্ত 'ওকুফ (অবস্থান) করবে। এরপর 'আরাফা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুযদালাফায় পৌছে সেখানে পুণ্য অর্জনের কাজ করতে থাকবে আর সেখানে আল্লাহকে অধিক অথবা (রাবীর সন্দেহ) সবচেয়ে অধিক স্মরণ করবে। সেখানে ফাজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর ও তাহলীল পাঠ করবে। এরপর (মীনার দিকে) প্রত্যাবর্তন করবে যেভাবে অন্যান্য লোক প্রত্যাবর্তন করে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, "এরপর প্রত্যাবর্তন কর সেখান হতে, যেখান হতে লোকজন প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, দয়াময়।" তারপর জামরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করবে।
আনাস থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলতেন, "হে আল্লাহ! আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে যা কল্যাণকর, তা আখেরাতেও দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।" (2.201)
আয়িশাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহর নিকট অতিশয় ঘৃণিত মানুষ হচ্ছে অতিরিক্ত ঝগড়াটে ব্যক্তি।
ইবনে আবু মুলাইকা থেকে বর্ণিত: ইবনে আব্বাস তেলাওয়াত করেছেন: "(অবকাশ দেওয়া হবে) যতক্ষণ না রসূলগণ (তাদের লোকদের) আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং মনে করেছিলেন যে তারা (তাদের লোকদের দ্বারা) অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের কাছে আমাদের সাহায্য এসেছিল ..." (12.110) 'ধ' শব্দকে দ্বিগুণ না করে কুধিবু পড়া, এবং তিনি এই শ্লোকটি বুঝতে পেরেছিলেন। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করতে থাকলেন: ".. এমনকি রসূল এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তারাও বলেছিল: কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? হ্যা, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।" (2.214) অতঃপর আমি উরওয়া ইবন আয-যুবায়েরের সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমি তাকে তা উল্লেখ করলাম।
তিনি বলেন, "আয়িশা বললেন, 'আল্লাহ না করুন! আল্লাহর কসম, আল্লাহ কখনো তার রসূলকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, তবে তিনি জানতেন যে এটি তার মৃত্যুর আগে অবশ্যই ঘটবে। কিন্তু তাদের অনুসারীরা তাদের দোষারোপ করার ভয়ে রসূলদের সামনে ক্রমাগত বিচার পেশ করা হয়েছিল। মিথ্যা কথা বলা। তাই আমি আবৃত্তি করতাম:- "যতক্ষণ না তারা (আসে) মনে করে যে তাদের মিথ্যাবাদী হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল।" ডবল 'ধ' দিয়ে 'কুধ-ধিবু' পড়া।
নাফি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন উমার যখন কুরআন তিলাওয়াত করতেন তখন কুরআন তিলাওয়াত হতে অবসর না হয়ে কোন কথা বলতেন না। একদা আমি সূরাহ আল-বাকারাহ পাঠরত অবস্থায় তাকে পেলাম। পড়তে পড়তে এক স্থানে তিনি পৌছলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি জান, কী ব্যাপারে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে? আমি বললাম, না। তিনি তখন বললেন, অমুক অমুক ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর আবার পাঠে অগ্রসর হলেন।
'আবদুস সামাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেন, আমার পিতা, তিনি বলেন, আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেন আইয়ুব, তিনি নাফি থেকে আর নাফি ইবন উমার থেকে। 'অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পার'- (আল-বাকারাহ ২/২২৩)। ইবন উমার বলেন, এর অর্থ হচ্ছে কেউ তার স্ত্রীর পেছন দিক দিয়ে তার সাথে সহবাস করতে পারে।
জাবির বর্ণনা করেছেন: ইহুদীরা বলত: "যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে পেছন থেকে সহবাস করে, তবে সে একটি টেরা চোখের সন্তান প্রসব করবে।" তাই এই আয়াতটি নাযিল হলঃ- "তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য একটি ক্ষেত, সুতরাং তোমরা যখন যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যাও।" (2.223)
আল হাসান বর্ণনা করেছেন: মাকাল ইবন ইয়াসারের বোনকে তার স্বামী তালাক দিয়েছিলেন যে তার ইদ্দতের মেয়াদ (সে পুনরায় বিয়ে করার পূর্বে যে সময় অতিবাহিত হওয়া উচিত) পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছেড়ে চলে যায় এবং তারপর সে তাকে পুনরায় বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু মাকাল তা প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাই এই আয়াত নাযিল হলঃ- "তাদেরকে তাদের (সাবেক) স্বামীদের বিয়ে করতে বাধা দিও না।" (2.232)
আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উসমান ইবন 'আফ্ফান-কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে বললাম যে, এ আয়াত তো অন্য আয়াত দ্বারা মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে। অতএব উক্ত আয়াত আপনি মুসহাফে কেন লিখেছেন, (অথবা রাবী বলেন) কেন বর্জন করছেন না, তখন তিনি [উসমান] বললেন, হে ভাতিজা! আমি মুসহাফের স্থান থেকে কোন জিনিস পরিবর্তন করব না।
মুজাহি বর্ণনা করেছেন: (আয়াত সম্পর্কে):- "তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রী রেখে যায়। তারা - (তাদের স্ত্রীরা) - (তাদের বিবাহের ক্ষেত্রে) চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।" (2.234) এই আয়াত অনুসারে বিধবাকে তার স্বামীর পরিবারের সাথে অপেক্ষার এই সময়টি কাটাতে হয়েছিল, তাই আল্লাহ নাযিল করলেন: "তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং স্ত্রী রেখে যায় (বিধবা) তাদের স্ত্রীদের জন্য অসিয়ত করে, এক বছরের ভরণপোষণ এবং তাদের আবাসস্থল থেকে বের করে না দিয়ে, কিন্তু যদি তারা (তাদের বাসস্থান) ছেড়ে চলে যায়, তবে তারা নিজেদের সাথে যা করে তাতে আপনার কোন দোষ নেই যদি তা সম্মানজনক হয়।' (বৈধ বিবাহ) (২.২৪০) তাই আল্লাহ বিধবাকে সাত মাস বিশ রাতের জন্য অতিরিক্ত ভরণপোষণের ওসিয়্যাত করার অধিকারী করেছেন এবং তা হল এক বছর পূর্ণ হওয়া। সে ইচ্ছা করলে (স্বামীর বাড়িতে) থাকতে পারত। ইচ্ছা করে, এবং সে ইচ্ছা করলে তা ছেড়ে দিতে পারে, যেমন আল্লাহ বলেন: "..তাদেরকে বের করে না দিয়ে, কিন্তু যদি তারা (বাসস্থান) ছেড়ে যায় তবে আপনার কোন দোষ নেই।" তাই 'ইদ্দা (চার মাস দশটি) দিনগুলি তার জন্য ওয়াজিব।' আতা বলেন: ইবনে আব্বাস বলেছেন, "এই আয়াতটি, অর্থাত্ আল্লাহর উক্তি: "...তাদের ফিরিয়ে না দিয়ে .." তার মৃতের ইদ্দত পর্যন্ত থাকার বাধ্যবাধকতা বাতিল করে দিয়েছে। স্বামীর গৃহে, এবং সে যেখানে খুশি এই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে।" 'আতার সাহায্য: তিনি ইচ্ছা করলে তার মৃত স্বামীর বাসস্থানে অসিয়ত অনুযায়ী অবস্থান করে তার ইদ্দা পূর্ণ করতে পারতেন অথবা আল্লাহর বাণী অনুযায়ী ত্যাগ করতে পারতেন: -" তারা নিজেদের সাথে যা করে তার জন্য আপনার কোন দোষ নেই।" 'আতা' যোগ করেছেন: পরবর্তীতে উত্তরাধিকারের নিয়মকানুন এসে বাতিল হয়ে যায়। বিধবা (তার মৃত স্বামীর বাড়িতে) বাসস্থানের আদেশ মেনে নিতেন, যাতে তিনি যেখানে খুশি সেখানে ইদ্দা সম্পন্ন করতে পারেন। এবং তাকে বাসস্থান সরবরাহ করার আর প্রয়োজন ছিল না। ইবনে আব্বাস বলেন, "এই আয়াতটি তার (বিধবার) তার মৃত স্বামীর গৃহে বসবাসকে বাতিল করে দিয়েছে এবং সে যেখানে খুশি সেখানেই ইদ্দা (চার মাস দশ দিন) পূর্ণ করতে পারত, যেমন আল্লাহর বাণী: -"... তাদের বের না করে..."।
মুহাম্মাদ ইবন সীরীন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এমন একটি মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম যেখানে নেতৃস্থানীয় আনসারদের কতক ছিলেন এবং তাদের মাঝে আবদুর রহমান ইবন আবূ লাইলা-ও ছিলেন। এরপর সুরাইয়া বিনতে হারিস প্রসঙ্গে বর্ণিত আবদুল্লাহ ইবন উত্বা-এর হাদীসটি নিয়ে আলোচনা করলাম, এরপর আবদুর রহমান বললেন, 'পক্ষান্তরে তার চাচা এ রকম বলতেন না' অনন্তর আমি বললাম, কূফায় বসবাসরত ব্যক্তিটি সম্পর্কে যদি আমি মিথ্যা বলি তবে আমি হব চরম ধৃষ্ট এবং তিনি তার স্বর উচু করলেন, তিনি বললেন, তারপর আমি বের হলাম এবং মালিক ইবন 'আমির মালিক ইবন 'আওফ-এর সঙ্গে আমি বললাম, গর্ভাবস্থায় বিধবা রমণীর ব্যাপারে ইবন মাসঊদ-এর মন্তব্য কী ছিল, বললেন যে ইবন মাসঊদ বলেছেন, তোমরা কি তার উপর কঠোরতা অবলম্বন করছ আর তার জন্য সহজ বিধানটি অবলম্বন করছ না, সংক্ষিপ্ত সূরাহ নাসটি (ত্বালাক) দীর্ঘটি পরে অবতীর্ণ হয়েছে। আইয়ুব মুহাম্মাদ থেকে বর্ণনা করেছেন, আবূ আতিয়াহ মালিক ইবন 'আমির-এর সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করেছিলাম।
আলী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, আবদুর রহমান .... আলী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেন, খন্দক যুদ্ধের দিন কাফিরগণ আমাদেরকে মধ্যবর্তী সালাত থেকে বিরত রাখে এমনকি এ অবস্থায় সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাদের কবর ও তাদের ঘরকে অথবা (রাবীর সন্দেহ) পেটকে আগুন দ্বারা পূর্ণ করুক।
যায়েদ ইবন আরকাম থেকে বর্ণিত: নামাজের সময় আমরা কথা বলতাম। আমাদের মধ্যে একজন তার ভাইয়ের সাথে (নামাযের সময়) তার প্রয়োজন সম্পর্কে কথা বলত, যতক্ষণ না আয়াতটি নাযিল হয়: - "(পাচটি ফরয) নামাযকে কঠোরভাবে হেফাজত কর, বিশেষ করে মধ্যবর্তী (শ্রেষ্ঠ) (আসর) সালাত এবং দাড়ানো। আল্লাহর সামনে আনুগত্য সহকারে (এবং নামাজের সময় অন্যদের সাথে কথা না বলা)।" তখন আমাদেরকে নামাজে কথা না বলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নাফি হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন উমার-কে যখন সালাতুল খাওফ (যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর ভয় থাকা অবস্থায় সালাত) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হত তখন তিনি বলতেন, ইমাম সামনে যাবেন এবং একদল লোকও জামা'আতে শামিল হবে। তিনি তাদের সঙ্গে এক রাকাত সালাত আদায় করবেন এবং তাদের আর একদল জামা'আতে শামিল না হয়ে তাদের ও শত্রুর মাঝখানে থেকে যারা সালাত আদায় করেনি তাদের পাহারা দিবে। ইমামের সঙ্গে যারা এক রাকাত সালাত আদায় করেছে তারা পেছনে গিয়ে যারা এখনও সালাত আদায় করেনি তাদের স্থানে দাড়াবে কিন্তু সালাম ফেরাবে না। যারা সালাত আদায় করেনি তারা আগে বাড়বে এবং ইমামের সঙ্গে এক রাকাত আদায় করবে। তারপর ইমাম সালাত হতে নিষ্ক্রান্ত হবেন। কেননা তিনি দু' রাকাত সালাত আদায় করেছেন। এরপর উভয় দল দাড়িয়ে নিজে নিজে বাকি এক রাকাত ইমামের সালাত শেষে আদায় করে নেবে। তাহলে প্রত্যেক জনেরই দু' রাকাত সালাত আদায় হয়ে যাবে। ভয়-ভীতি এর চেয়েও অধিক হলে নিজে নিজে দাড়িয়ে অথবা যানবাহনে আরোহী অবস্থায় কিবলার দিকে মুখ করে বা যেদিকে সম্ভব মুখ করে সালাত আদায় করবে। ইমাম মালিক বলেন, ইমাম নাফি বলেন, আমি অবশ্য মনে করি ইবন উমার নবী (ﷺ) থেকে শুনেই এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।
ইবনে আয-যুবায়ের থেকে বর্ণিত: আমি উসমানকে বললাম, "এই আয়াতটি যা সূরা-আল-বাকারায় রয়েছে: "তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় এবং বিধবাকে রেখে যায়... তাদের বের না করে।" অন্য একটি আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে। তাহলে আপনি কেন এটি লিখছেন? (কুরআনে)?" উসমান রা. "এটা (যেখানে আছে) রেখে দাও, হে আমার ভাইয়ের ছেলে, আমি এর কোন কিছুই (কোরানকে) তার আসল অবস্থান থেকে সরিয়ে দেব না।"
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রসূল (ﷺ) বললেন, ইব্রাহীমের চেয়ে আমাদের সন্দেহ করার অধিক অধিকার আছে যখন সে বলেছিল, 'হে আমার রব! আমাকে দেখান কিভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করেন।' তিনি বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? তিনি বললেন, 'হ্যা (আমি বিশ্বাস করি) তবে ঈমানে মজবুত হতে হবে।' "(2.260)
উবাইদ ইবন উমাইর থেকে বর্ণিত: একবার 'উমর (ইবন খাত্তাব) নবী (ﷺ) এর সাহাবীদের বললেন, "এই আয়াতটি সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা:- "তোমাদের কেউ কি চায় যে তার একটি বাগান থাকুক?" তারা উত্তর দিল, "আল্লাহ জানেন। উত্তম।" উমর রাগান্বিত হয়ে বললেন, "হয় বলো যে তুমি জানো অথবা বল যে তুমি জানো না!" তখন ইবনে আব্বাস বললেন, "হে মুমিনদের প্রধান! এ সম্পর্কে আমার মনে কিছু বলার আছে।" উমর বললেন, "হে আমার ভাইয়ের ছেলে! বল, এবং নিজেকে ছোট করো না।" ইবনে আব্বাস বললেন, "এই আয়াতটি কাজের জন্য একটি উদাহরণ হিসাবে স্থাপন করা হয়েছে।" 'উমর বললেন, "কী ধরনের কাজ?" ইবনে আব্বাস বললেন, "কাজের জন্য।" 'উমর বললেন, এটি একজন ধনী ব্যক্তির জন্য একটি উদাহরণ যে আল্লাহর আনুগত্যের সাথে পণ্য করে এবং তারপর আল্লাহ তাকে শয়তান পাঠান যেখানে সে পাপ করে যতক্ষণ না তার সমস্ত নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ দরিদ্র সে নয় যার জন্য একটি খেজুর বা দু'টি টুকরো বা দু'টি খাবার যথেষ্ট, তবে দরিদ্র সেই ব্যক্তি যে লোকদের কাছে (ভিক্ষা চায় না)।) অথবা তার দারিদ্র্য প্রকাশ করুন। যদি আপনি চান, (আল্লাহর বাণী) পাঠ করুন: "তারা মানুষের কাছে ভিক্ষা করে না।" (2.273)
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সুদ সম্পর্কে সূরাহ আল-বাকারাহর শেষ আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) লোকেদের নিকট তা পাঠ করে শোনালেন। তারপর মদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দিলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরাহ আল-বাকারাহর শেষ আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘর থেকে বের হলেন এবং মসজিদে লোকেদেরকে তা পড়ে শোনালেন। এরপর মদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দিলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরাহ আল-বাকারাহর শেষ আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মসজিদে তা পাঠ করে শুনান এবং মদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরাহ আল-বাকারার শেষ দিকের আয়াতগুলো যখন অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন এবং আমাদের সামনে তা পাঠ করলেন। তারপর মদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দিলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ কৃত শেষ আয়াতটি হল সুদ সম্পর্কিত।
মারওয়ান আল আসফার নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের কোন একজন থেকে বর্ণনা করেন, আর তিনি হচ্ছেন ইবন উমার যে, "তোমাদের অন্তরের কথা প্রকাশ কর আর গোপন কর তার হিসাব আল্লাহ তোমাদের থেকে নেবেন" (2.284) আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে।
মারওয়ান আল-আসগর থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রসূল (ﷺ) -এর সাহাবীদের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তি যাকে আমি মনে করি, তিনি ছিলেন ইবন উমর বলেন, "আয়াতটি:- "তোমার মনে যা আছে তা প্রকাশ কর অথবা গোপন কর..." নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে। এটা।"
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়াতটি "তিনিই তোমার প্রতি এ কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যার কতক আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন। এগুলো কিতাবের মূল অংশ; আর অন্যগুলো রূপক; যাদের অন্তরে সত্য-লঙ্ঘন প্রবণতা রয়েছে শুধু তারাই ফিতনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশে যা রূপক তার অনুসরণ করে। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেন, আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলেঃ আমরা এতে ঈমান এনেছি, এসবই আমাদের প্রভুর তরফ থেকে এসেছে। জ্ঞানবানরা ব্যতীত কেউ নাসীহাত গ্রহণ করে না"- (আলে ইমরান ৩/৭) নবী (ﷺ) পাঠ করলেন। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘোষণা করেছেন যে, যারা মুতাশাবাহাত আয়াতের পেছনে ছুটে তাদের যখন তুমি দেখবে তখন মনে করবে যে, তাদের কথাই আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে।
সাঈদ ইবন আল-মুসাইয়াব থেকে বর্ণিত: আবূ হুরায়রা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, 'কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করে না কিন্তু তা, শয়তান যখন জন্ম নেয় তখন তাকে স্পর্শ করে, অতঃপর শয়তানের দ্বারা স্পর্শ করার কারণে সে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে, মরিয়ম ও তার পুত্র ছাড়া। আবু হুরায়রা তখন বললেন, "আপনি যদি চান তবে পাঠ করুন: "এবং আমি তার এবং তার সন্তানদের জন্য বিতাড়িত শয়তান থেকে আপনার (আল্লাহর) কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" (3.36)
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কোন মুসলিম ব্যক্তির সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশে যে ঠান্ডা মাথায় মিথ্যা শপথ করে, সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ থাকবেন। এর সত্যতা প্রমাণে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ "নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি এবং শপথের বিনিময়ে সামান্য লাভ ক্রয় করে, আখেরাতে তাদের কোন অংশ নেই..." (3.77) বর্ণনাকারী বললেন, এরপর আশ'আস ইবন কায়স সেখানে প্রবেশ করলেন এবং বললেন, আবূ আবদুর রহমান তোমাদের নিকট কোন হাদীস বর্ণনা করেছেন? আমরা বললাম, এ রকম এ রকম বলেছেন। তখন তিনি বললেন, এ আয়াত তো আমাকে উপলক্ষ করেই অবতীর্ণ হয়েছে। আমার চাচাত ভাইয়ের এলাকায় আমার একটি কূপ ছিল। (এ ঘটনা জ্ঞাত হয়ে) নবী (ﷺ) বললেন, হয়তো তুমি প্রমাণ হাজির করবে নতুবা সে শপথ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো শপথ করে বসবে। অনন্তর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশে ঠান্ডা মাথায় অবরোধ করে মিথ্যা শপথ করে, সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহই তার উপর রাগান্বিত থাকবেন।
পূর্বের হাদিসের মতই (৪৫৪৯)।
আবদুল্লাহ ইবন আবূ আউফা হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি বিক্রি করার জন্য বাজারে কিছু জিনিস আনলো এবং কসম করে বলতে শুরু করলো যে, লোকে এ জিনিসের এতো এতো মূল্য দিচ্ছে। অথচ কেউ তা দেয়নি। এ মিথ্যা বলার উদ্দেশ্য হলো, মুসলিমরা যাতে তার এ কথা বিশ্বাস করে তার নিকট থেকে জিনিসটা ক্রয় করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হলঃ "যারা আল্লাহর প্রতিকৃত প্রতিশ্রুতি ও কসম নগণ্য মূল্যে বিক্রি করে, আখিরাতে তাদের অংশে কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে কঠিন কষ্টদায়ক শাস্তি"- (আলে ইমরান ৩/৭৭)।
ইবন আবূ মুলাইকাহ্ হতে বর্ণিত যে, দু'জন মহিলা একটি ঘর কিংবা একটি কক্ষে সেলাই করছিল। হাতের তালুতে সুই বিদ্ধ হয়ে তাদের একজন বেরিয়ে পড়ল এবং অপরজনের বিরুদ্ধে সুই ফুটিয়ে দেয়ার অভিযোগ করল। এই ব্যাপারটি ইবন 'আব্বস-এর নিকট পেশ করা হলে তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যদি শুধুমাত্র দাবীর উপর ভিত্তি করে মানুষের দাবী পূরণ করা হয়, তাহলে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা থাকবে না। সুতরাং তোমরা বিবাদীদের আল্লাহর নামে শপথ করাও এবং এ আয়াত তার সম্মুখে পাঠ কর। এরপর তারা তাকে শপথ করাল এবং সে নিজ দোষ স্বীকার করল। ইবন আব্বাস বললেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, শপথ বিবাদীকে করতে হবে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সুফ্ইয়ান আমাকে সামনাসামনি হাদীস শুনিয়েছেন। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আমাদের আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদকালে আমি ভ্রমণে বের হয়েছিলাম। আমি তখন সিরিয়ায় অবস্থান করছিলাম। তখন নবী (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে হিরাক্লিয়াসের নিকট একখানা পত্র পৌছান হল। দাহ্ইয়াতুল কালবী এ চিঠিটা বসরার শাসককে দিয়েছিলেন। এরপর তিনি হিরাক্লিয়াসের নিকট পৌছিয়ে দিলেন। পত্র পেয়ে হিরাক্লিয়াস বললেন, নবীর দাবীদার ব্যক্তির গোত্রের কেউ এখানে আছে কি? তারা বলল, হ্যা আছে। কয়েকজন কুরাইশীসহ আমাকে ডাকা হলে আমরা হিরাক্লিয়াসের নিকট গেলাম এবং আমাদেরকে তার সম্মুখে বসানো হল। এরপর তিনি বললেন, নবীর দাবীদার ব্যক্তির তোমাদের মধ্যে নিকটতম আত্মীয় কে? আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, উত্তরে বললাম, আমিই। তারা আমাকে তার সম্মুখে এবং আমার সাথীদেরকে আমার পেছনে বসালেন। তারপর দোভাষীকে ডাকলেন এবং বললেন, এদেরকে জানিয়ে দাও যে, আমি নবীর দাবীদার ব্যক্তিটি সম্পর্কে (আবূ সুফ্ইয়ানকে) কিছু জিজ্ঞেস করলে সে যদি আমার নিকট মিথ্যা বলে তোমরা তার মিথ্যা বলা সম্পর্কে ধরবে। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, যদি তাদের পক্ষ থেকে আমাকে মিথ্যুক প্রমাণের আশঙ্কা না থাকত তাহলে আমি অবশ্যই মিথ্যা বলতাম। এরপর দোভাষীকে বললেন, একে জিজ্ঞেস কর যে, তোমাদের মধ্যে এ ব্যক্তির বংশ মর্যাদা কেমন? আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, তিনি আমাদের মধ্যে অভিজাত বংশের অধিকারী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, তার পূর্বপুরুষদের কেউ কি রাজা-বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার বর্তমানের কথাবার্তার পূর্বে তোমরা তাকে কখনো মিথ্যাচারের অপবাদ দিয়েছ কি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা তার অনুসরণ করছে, না দুর্বলগণ? আমি বললাম, বরং দুর্বলগণ। তিনি বললেন, তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে। আমি বললাম, বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বললেন, তার ধর্মে প্রবিষ্ট হওয়ার পর তার প্রতি বিতৃষ্ণাবশতঃ কেউ কি ধর্ম ত্যাগ করে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তোমরা তার বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ করেছ কি? বললাম, জ্বী হ্যা। তিনি বললেন, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলাফল কী হয়েছে? আমি বললাম, আমাদের ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল হলঃ একবার তিনি জয়ী হন, আর একবার আমরা জয়ী হই। তিনি বললেন, তিনি প্রতিশ্রতি ভঙ্গ করেননি? বললাম, না। তবে বর্তমানে আমরা একটি সন্ধির মেয়াদে আছি। দেখি এতে তিনি কী করেন। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আল্লাহর শপথ! এটি ব্যতীত অন্য কোন কথা ঢুকিয়ে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বললেন, তার পূর্বে এমন কথা কেউ বলেছে কি? বললাম, না। তারপর তিনি তার দোভাষীকে বললেন যে, একে জানিয়ে দাও যে, আমি তোমাকে তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তির বংশমর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তারপর তুমি বলেছ যে, সে আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত। তদ্রূপ রাসূলগণ শ্রেষ্ঠ বংশেই জন্মলাভ করে থাকেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তার পূর্বপুরুষের কেউ রাজা-বাদশাহ ছিলেন কিনা? তুমি বলেছ 'না'। তাই আমি বলছি যে, যদি তার পূর্বপুরুষদের কেউ রাজা-বাদশাহ থাকতেন তাহলে বলতাম, তিনি তার পূর্বপুরুষদের রাজত্ব ফিরে পেতে চাচ্ছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, দুর্বলগণ তার অনুসারী, না সম্ভ্রান্তগণ? তুমি বলেছ, দুর্বলগণই। আমি বলেছি যে, যুগে যুগে দুর্বলগণই রাসূলদের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, এ দাবীর পূর্বে তোমরা কখনও তাকে মিথ্যাবাদিতার অপবাদ দিয়েছিলে কি? তুমি উত্তরে বলেছ যে, না। তাতে আমি বুঝেছি যে, যে ব্যক্তি প্রথমে মানুষদের সঙ্গে মিথ্যাচার ত্যাগ করেন, তারপর আল্লাহর সঙ্গে মিথ্যাচারিতা করবেন, তা হতে পারে না। আমি তোমাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তার ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তার প্রতি বিরক্ত হয়ে কেউ ধর্ম ত্যাগ করে কিনা? তুমি বলেছ, ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি বলছি, ঈমান এভাবেই পূর্ণতা লাভ করে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ কি? তুমি বলেছ যে, যুদ্ধ করেছ এবং তার ফলাফল হচ্ছে পানি তোলার বালতির মত। কখনো তোমাদের বিরুদ্ধে তারা জয়লাভ করে আবার কখনো তাদের বিরুদ্ধে তোমরা জয়লাভ কর। এমনিভাবেই রাসূলদের পরীক্ষা করা হয়, তারপর চূড়ান্ত বিজয় তাদেরই হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন কিনা? তুমি বলেছ, না। তদ্রূপ রাসূলগণ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার পূর্বে কেউ এ দাবী উত্থাপন করেছিল কিনা? তুমি বলেছ, না। আমি বলি যদি কেউ তার পূর্বে এ ধরনের দাবী করে থাকত তাহলে আমি মনে করতাম এ ব্যক্তি পূর্ববর্তী দাবীর অনুসরণ করছে। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি তোমাদের কী কাজের হুকুম দেন? আমি বললাম, সালাত কায়িম করতে, যাকাত প্রদান করতে, আত্মীয়তা রক্ষা করতে এবং পাপকাজ থেকে পবিত্র থাকার হুকুম দেন। হিরাক্লিয়াস বললেন, তার সম্পর্কে তোমার বক্তব্য যদি সঠিক হয়, তাহলে তিনি ঠিকই নবী (ﷺ), তিনি আবির্ভূত হবেন তা আমি জানতাম বটে তবে তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন তা মনে করিনি। যদি আমি তার সান্নিধ্যে পৌছার সুযোগ পেতাম তাহলে আমি তার সাক্ষাৎকে অগ্রাধিকার দিতাম। যদি আমি তার নিকট অবস্থান করতাম তাহলে আমি তার পদযুগল ধুয়ে দিতাম। আমার পায়ের নিচের জমিন পর্যন্ত তার রাজত্ব সীমা পৌছে যাবে। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, তারপর হিরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পত্রখানি আনতে বললেন। এরপর পাঠ করতে বললেন। তাতে লেখা ছিলঃ দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে, আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে রোমের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের প্রতি। হিদায়াতের অনুসারীর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এরপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ করুন, মুক্তি পাবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে থাকেন তাহলে সকল প্রজার পাপরাশিও আপনার উপর নিপতিত হবে। "হে কিতাবীগণ! এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত করব না, কোন কিছুতেই তার সঙ্গে শরীক করব না। আর আমাদের একে অন্যকে আল্লাহ ব্যতীত প্রতিপালকরূপে গ্রহণ করব না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম।" যখন তিনি পত্র পাঠ সমাপ্ত করলেন চতুর্দিকে উচ্চ রব উঠল এবং গুঞ্জন বৃদ্ধি পেল। তারপর তার নির্দেশে আমাদের বাইরে নিয়ে আসা হল। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আমরা বেরিয়ে আসার পর আমি আমার সাথীদের বললাম যে, আবূ কাবশার সন্তানের তো বিস্তার ঘটেছে। রোমের রাষ্ট্রনায়ক পর্যন্ত তাকে ভয় পায়। তখন থেকে আমার মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দ্বীন অতি সত্বর বিজয় লাভ করবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করলেন। ইমাম যুহরী বলেন, তারপর হিরাক্লিয়াস রোমের নেতৃবৃন্দকে ডেকে একটি কক্ষে একত্রিত করলেন এবং বললেন, হে রোমবাসী! তোমরা কি আজীবন সৎপথ ও সফলতার প্রত্যাশী এবং তোমরা কি চাও তোমাদের রাজত্ব অটুট থাকুক? এতে তারা বন্য-গর্দভের মত প্রাণপণে পলায়নরত হল। কিন্তু দরজাগুলো সবই বন্ধ পেল। এরপর বাদশাহ নির্দেশ দিলেন যে, তাদের সবাইকে আমার নিকট নিয়ে এসো। তিনি তাদের সবাইকে ডাকলেন এবং বললেন, তোমাদের ধর্মের উপর তোমাদের দৃঢ়তা আমি পরীক্ষা করলাম। আমি যা আশা করেছিলাম তা তোমাদের থেকে পেয়েছি। তখন সবাই তাকে সিজদা করল এবং তার উপর সন্তুষ্ট রইল।
আনাস ইবন মালিক বলেন, মদিনায় আবূ ত্বলহা-ই অধিক সংখ্যক খেজুর গাছের মালিক ছিলেন। তার নিকট সর্বাধিক প্রিয় সম্পদ ছিল "বাইরুহা" নামক বাগানটি। এটা ছিল মসজিদের সম্মুখে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে আসতেন এবং সেখানকার (কূপের) সুমিষ্ট পানি পান করতেন। যখন "তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করবে না যে পর্যন্ত না নিজেদের প্রিয়বস্তু থেকে ব্যয় করবে"- (আলে ইমরান ৩/৯২) আয়াতটি অবতীর্ণ হল, তখন আবূ ত্বলহা উঠে দাড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ বলছেন, "তোমরা কখনও পুণ্য লাভ করবে না যে পর্যন্ত না নিজেদের প্রিয়বস্তু থেকে ব্যয় করবে"- (আলে ইমরান ৩/৯২)। আমার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ বাইরুহা। এটা আল্লাহর রাস্তায় আমি দান করে দিলাম। আমি আল্লাহর নিকট পুণ্য ও তার ভান্ডার চাই। আল্লাহ আপনাকে যেভাবে নির্দেশ দেন সেভাবে তা ব্যয় করুন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, বাহ! ওটি তো অস্থায়ী সম্পদ, ওটা তো অস্থায়ী সম্পদ, তুমি যা বলেছ আমি শুনেছি। তুমি তা তোমার নিকটাত্মীয়কে দিয়ে দাও, আমি এ সিদ্ধান্ত দিচ্ছি। আবূ ত্বলহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তা করব। তারপর আবূ ত্বলহা সেটা তার চাচাত ভাই-বোন ও আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আবদুল্লাহ ইবন ইউসুফ ও ইবন উবাদাহ্-এর বর্ণনায় "ওটা তো লাভজনক সম্পত্তি" বলে উল্লেখিত হয়েছে।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এরপর আবূ ত্বলহা হাস্সান ইবন সাবিত এবং উবাই ইবন কা'বের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আমি তার নিকটাত্মীয় ছিলাম। কিন্তু আমাকে তা হতে কিছুই দেননি।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। ব্যভিচার করেছে এমন এক পুরুষ ও এক মহিলা নিয়ে ইয়াহূদীগণ নবী (ﷺ)-এর নিকটে উপস্থিত হল। নবী (ﷺ) তাদের বললেন, তোমাদের ব্যভিচারীদেরকে তোমরা কীভাবে শাস্তি দাও? তারা বলল, আমরা তাদের দু'জনের চেহারা কালিমালিপ্ত করি এবং তাদের প্রহার করি। রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা তাওরাতে কি প্রস্তর নিক্ষেপের বিধান পাও না? তারা বলল, আমরা তাতে এ ব্যাপারে কিছুই পাই না। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম তাদের বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ, তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তাওরাত আন এবং তা পাঠ কর। এরপর তাওরাত পাঠের সময় তাদের তাওরাত-শিক্ষক প্রস্তর নিক্ষেপ সম্পর্কিত আয়াতের উপর স্বীয় হস্ত রেখে তার উপর নীচের অংশ পড়তে লাগল। রজমের কথা লিখা আয়াতটি পড়ছিল না। আবদুল্লাহ ইবন সালাম তার হাতটি রজমের আয়াতের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, এটা কী? যখন তারা এ অবস্থা দেখল তখন বলল, এটি রজমের আয়াত। অনন্তর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে রজম করার নির্দেশ দিলেন এবং মসজিদের পার্শ্বে জানাযার স্থানের নিকটে উভয়কে 'রজম' করা হল। ইবন উমার বলেন, আমি সেই পুরুষটিকে দেখলাম তার সঙ্গীনীর উপরে ঝুকে পড়ে তাকে প্রস্তরাঘাত থেকে বাচানোর চেষ্টা করছে।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ আয়াত: "তোমরা (প্রকৃত মুসলমান) মানবজাতির জন্য উত্থিত জাতিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।" মানে, মানুষের জন্য সর্বোত্তম জাতি, যেমন আপনি তাদের গলায় শিকল দিয়ে নিয়ে আসবেন যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করবে।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত: আয়াত: "যখন তোমাদের মধ্য থেকে দু'টি দল মনোবল হারাতে বসেছিল, কিন্তু আল্লাহ তাদের অভিভাবক ছিলেন" (3.122) আমাদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল, এবং আমরা দুটি দল ছিলাম, বনু হারিথা এবং বনু সালামা, এবং আমরা করেছি। ইচ্ছা করতাম না (এটি নাজিল না হলে) বা আমি খুশি হতাম না (যদি এটি নাজিল না হতো), কারণ আল্লাহ বলেন: -"...আল্লাহ ছিলেন তাদের রক্ষাকর্তা।"
সেলিমের পিতা বর্ণনা করেছেন: তিনি রাসুলুল্লাহ (ﷺ) -কে ফজরের শেষ রাকাতে রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে বলতে শুনেছেন, "হে আল্লাহ, অমুক অমুককে অভিশাপ দিন, অমুককে, অমুককে। এবং-এমন ব্যক্তি," বলার পর, "আল্লাহ তার কথা শোনেন যে তার প্রশংসা করে, হে আমাদের পালনকর্তা, সমস্ত প্রশংসা আপনার জন্য।" তাই আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেনঃ- "(হে মুহাম্মদ) আপনার জন্য নয় (কিন্তু আল্লাহর জন্য) সিদ্ধান্ত, নিশ্চয়ই তারা জালেম।" (3.128)
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) যখনই কারো মন্দকে ডাকতেন বা কারো প্রতি কল্যাণের ডাক দিতেন, তিনি (নামাজে) রুকু করার পর (আল্লাহকে) ডাকতেন। কখনো কখনো বলতেন, "আল্লাহ তার কথা শোনেন, যে তার প্রশংসা করে, সমস্ত প্রশংসা। তোমার জন্য, হে আমাদের প্রভু, তিনি বলবেন, "হে আল্লাহ। আল ওয়ালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, সালামা ইবন হিশাম, এবং আয়াশ ইবন আবু রাবিয়াকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! মুদার (গোত্র) এর উপর আপনার কঠোর অত্যাচার করুন। এবং তাদেরকে ইউসুফের বছরের মতো (দুর্ভিক্ষ) দিন।" নবী (ﷺ) উচ্চস্বরে বলতেন এবং তিনি তার ফজরের নামাযেও বলতেন, "হে আল্লাহ! অমুক।" কিছু আরব গোত্রের নামকরণ করা যতক্ষণ না আল্লাহ নাযিল করেছেন: -" (হে মুহাম্মদ) আপনার জন্য নয় (কিন্তু আল্লাহর জন্য) সিদ্ধান্ত।" (3.128)
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিছু পদাতিক সৈন্যের উপর আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র-কে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। এরপর তাদের কতক পরাজিত হলে পালাতে লাগল, এটাই হল, রাসূল (ﷺ) যখন তোমাদের পেছন দিক থেকে ডাকছিলেন। মাত্র বারোজন লোক ব্যতীত আর কেউ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন না।
আবূ ত্বলহা বলেন, আমরা উহূদ যুদ্ধের দিন সারিবদ্ধ অবস্থায় ছিলাম যখন তন্দ্রা আমাদের আচ্ছাদিত করে ফেলেছিল। তিনি বলেন, আমার তরবারি আমার হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল, আমি তা উঠাচ্ছিলাম, আবার পড়ে যাচ্ছিল, আবার তা উঠাচ্ছিলাম।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কার্য সম্পাদনকারী," ইব্রাহীম বলেছিলেন যখন তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; এবং এটি মুহাম্মদ বলেছিলেন যখন তারা (মুনাফিকরা) বলেছিল, "তোমাদের বিরুদ্ধে একটি বিশাল সৈন্যদল জড়ো হচ্ছে। অতএব, তাদেরকে ভয় কর" কিন্তু এটা তাদের ঈমানকে বাড়িয়ে দিল এবং তারা বললঃ "আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই (আমাদের জন্য) সর্বোত্তম নিয়ন্ত্রক।" (3.173)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ইবরাহীম যখন আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তখন তার শেষ কথা ছিলঃ "আল্লাহই যথেষ্ট" তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দেন, তারপর সে তার যাকাত আদায় করে না- কিয়ামতের দিন তার ধন-সম্পদকে তার জন্যে লোমবিহীন কালো-চিহ্ন যুক্ত সর্পে রূপ দেয়া হবে এবং তার গলায় পরিয়ে দেয়া হবে। মুখের দু'দিক দিয়ে সে তাকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে, 'আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চয়'। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ "এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে যা তাদেরকে দিয়েছেন তাতে যারা কৃপণতা করে তাদের জন্য তা মঙ্গলজনক এটা যেন তারা কিছুতেই মনে না করে ......" আয়াতের শেষ অংশ।
উসামাহ ইবন যায়দ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি গাধার পিঠে আরোহণ করেছিলেন, একটি ফদকী চাদর তার পরনে ছিল। উসামাহ ইবন যায়দ -কে তার পেছনে বসিয়েছিলেন। তিনি বানী হারিস ইবন খাযরায গোত্রে অসুস্থ সাদ ইবন উবাদাহ-কে দেখতে যাচ্ছিলেন। এটা ছিল বদর যুদ্ধের পূর্বেকার ঘটনা। বর্ণনাকারী বলেন যে, যেতে যেতে নবী (ﷺ) এমন একটি মজলিসের কাছে পৌছলেন, যেখানে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলও ছিল-সে তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। সে মজলিসে মুসলিম, মুশরিক, প্রতিমাপূজারী এবং ইয়াহূদী সকল প্রকারের লোক ছিল এবং তথায় আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা-ও ছিলেন। জন্তুর পদধূলি যখন মজলিসকে আচ্ছন্ন করল, তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই আপন চাদরে নাক ঢেকে ফেলল। তারপর বলল, আমাদের এখানে ধূলো উড়িয়ো না। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এদেরকে সালাম করলেন। তারপর বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিলেন এবং তাদের কাছে কুরআন মাজীদ পাঠ করলেন। আবদুল্লাহ ইবন উবাই বলল, এই লোকটি! তুমি যা বলছ তা যদি সত্য হয় তাহলে এর চেয়ে উত্তম কিছুই নেই। তবে আমাদের মজলিসে আমাদেরকে জ্বালাতন করবে না। তুমি তোমার তাবুতে যাও। যে তোমার কাছে যাবে যাকে তুমি তোমার কথা বলবে। অনন্তর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের মজলিসে এগুলো আমাদের কাছে বলবেন, কারণ আমরা তা পছন্দ করি। এতে মুসলিম, মুশরিক এবং ইয়াহূদীরা পরস্পর গালাগালি শুরু করল। এমনকি তারা মারামারিতে লিপ্ত হওয়ার পর্যায়ে উপনীত হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে থামাচ্ছিলেন। অবশেষে তারা থামল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার পশুটির পিঠে চড়ে রওয়ানা দিলেন এবং সাদ ইবন উবাদাহ-এর কাছে গেলেন। নবী (ﷺ) তাকে বললেন, হে সাদ! আবূ হুবাব আবদুল্লাহ ইবন উবাই কী বলেছে, তুমি শুনেছ কি? সে এমন বলেছে। সাদ ইবন উবাদাহ্ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে ক্ষমা করে দিন। তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না। যিনি আপনার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তার শপথ করে বলছি, আল্লাহ আপনার উপর যা অবতীর্ণ করেছেন তা সত্য। এতদঞ্চলের অধিবাসীগণ চুক্তি সম্পাদন করেছিল যে, তাকে শাহী টুপী পরাবে এবং নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করবে। যখন আল্লাহ তাআলা সত্য প্রদানের মাধ্যমে এ পরিকল্পনা অস্বীকার করলেন তখন সে ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে এবং আপনার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে যা আপনি দেখেছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ক্ষমা করে দিলেন। নবী (ﷺ) এবং তার সাহাবীগণ মুশরিক এবং কিতাবীদেরকে ক্ষমা করে দিতেন এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্য ধারণ করতেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আর অবশ্যই তোমরা শুনতে পাবে পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের এবং মুশরিকদের নিকট হতে অনেক কষ্টদায়ক কথা"- (আলে ইমরান ৩/১৮৬)। আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, "কিতাবীদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পরও তাদের অনেকেই ঈর্ষা বশতঃ তোমাদের ঈমান আনার পর আবার তোমাদের কাফিররূপে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে। যতক্ষণ না আল্লাহর কোন নির্দেশ আসে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ক্ষমা কর ও উপেক্ষা কর। নিশ্চই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান"- (আল-বাকারাহ ২/১০৯)। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মোতাবেক নবী (ﷺ) ক্ষমার দিকেই ফিরে যেতেন। শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অনুমতি দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন বদরের যুদ্ধ চালিয়ে গেলেন এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কাফির কুরায়শ নেতাদেরকে হত্যা করলেন তখন ইবন উবাই ইবন সালূল তার সঙ্গী মুশরিক এবং প্রতীমা পূজারীরা বলল, এটাতো এমন একটি ব্যাপার যা বিজয় লাভ করেছে। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ইসলামের বাই'আত করে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করল।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে তিনি যখন যুদ্ধে বের হতেন তখন কিছু সংখ্যক মুনাফিক ঘরে বসে থাকত এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেরিয়ে যাওয়ার পর বসে থাকতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করত। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফিরে আসলে তার কাছে শপথ করে ওজর পেশ করত এবং যে কাজ করেনি সে কাজের জন্য প্রশংসিত হতে পছন্দ করত। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল- "তুমি কখনও মনে কর না যে, যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আনন্দিত হয় এবং নিজেরা যা করেনি তার জন্য প্রশংসিত হতে ভালবাসে, তারা আযাব থেকে পরিত্রাণ পাবে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি"- (আলে ইমরান ৩/১৮৮)।
আলক্বামাহ ইবন ওয়াক্কাস অবহিত করেছেন যে, মারওয়ান তার দারোয়ানকে বললেন, হে নাফি! তুমি ইবন আব্বাস-এর কাছে গিয়ে বল, যদি প্রাপ্ত বস্তুতে আনন্দিত এবং করেনি এমন কাজ সম্পর্কে প্রশংসিত হতে আশাবাদী প্রত্যেক ব্যক্তিরই শাস্তি প্রাপ্য হয় তাহলে সকল মানুষই শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। ইবন আব্বাস বললেন, এটা তোমাদের মাথা ঘামানোর বিষয় নয়। একদা নবী (ﷺ) ইয়াহূদীদেরকে ডেকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাতে তারা সত্য গোপন করে বিপরীত তথ্য দিয়েছিল। এতদসত্ত্বেও তারা তাদের দেয়া উত্তরের বিনিময়ে প্রশংসা অর্জনের আশা করেছিল এবং তাদের সত্য গোপনের জন্যে আনন্দিত হয়েছিল। তারপর ইবন আব্বাস পাঠ করলেন- "স্মরণ কর, যখন আল্লাহ প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন আহলে কিতাবের, তোমরা মানুষের কাছে কিতাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না। কিন্তু তারা সে প্রতিশ্রুতি নিজেদের পেছনে ফেলে রাখল এবং তার পরিবর্তে নগণ্য বিনিময় গ্রহণ করল। সুতরাং তারা যা বিনিময় গ্রহণ করল কত নিকৃষ্ট তা! তুমি কখনও মনে কর না যে, যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আনন্দিত হয় এবং নিজেরা যা করেনি তার জন্য প্রশংসিত হতে ভালবাসে, তারা আযাব থেকে পরিত্রাণ পাবে। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি"- ( আলে ইমরান ৩/১৮৭-১৮৮)।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমি আমার খালা মাইমূনাহ-এর কাছে রাত কাটিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার পরিবারবর্গের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে শুয়ে পড়লেন। তারপর রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশে তিনি উঠলেন এবং আসমানের দিকে তাকিয়ে পাঠ করলেন- "নিশ্চয়ই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।" (3.190) এরপর দাড়ালেন এবং উযূ করে মিসওয়াক করে এগার রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর বিলাল আযান দিলে তিনি দু' রাকাত সালাত আদায় করলেন। তারপর বের হলেন এবং ফজরের সালাত আদায় করলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার খালা মাইমূনাহ-এর নিকট রাত কাটিয়েছিলাম। আমি স্থির করলাম যে, অবশ্যই আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সালাত আদায় করা দেখব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্য একটি বিছানা বিছানো হল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেটার লম্বালম্বি দিকে ঘুমালেন। এরপর জাগ্রত হয়ে মুখমন্ডল থেকে ঘুমের প্রভাব মুছতে লাগলেন এবং সূরাহ আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করে শেষ করলেন। তারপর ঝুলন্ত একটি পুরাতন মশকের পানিপাত্রের নিকটে এসে তা ধরলেন এবং উযূ করে সালাতে দাড়ালেন, আমি দাড়িয়ে তিনি যা যা করছিলেন তা তা করলাম। তারপর আমি এসে তার পার্শ্বে দাড়ালাম। তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন, তারপর আমার কানে ধরে মলতে লাগলেন। তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং তারপর বিতরের সালাত আদায় করলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, তিনি মাইমূনাহ-এর নিকট রাত্রি যাপন করেন, তিনি হলেন তার খালা। ইবন আব্বাস বলেন, আমি বিছানায় আড়াআড়িভাবে শুয়েছিলাম আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তার পরিবারবর্গ লম্বালম্বির দিকে শুয়েছিলাম। অর্ধরাত্রি কিংবা এর সামান্য পূর্ব অথবা সামান্য পর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘুমালেন। তারপর তিনি জাগ্রত হলেন। এরপর দু'হাত দিয়ে মুখ থেকে ঘুমের রেশ মুছতে লাগলেন। তারপর সূরাহ আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করলেন। তারপর ঝুলন্ত একটি পুরাতন মশকের কাছে গেলেন এবং সুন্দরভাবে 'উযু করলেন। এরপর সালাতে দন্ডায়মান হলেন। তিনি যা যা করেছিলেন আমিও ঠিক তা করলাম। তারপর গিয়ে তার পার্শ্বে দাড়ালাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার ডান হাত আমার মাথায় রেখে আমার ডান কান ধরে মলতে লাগলেন। এরপর তিনি দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত, তারপর দু'রাকাত তারপর দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন এবং তারপর বিতরের সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি একটু শুয়ে পড়লেন। অবশেষে মুয়াযযিন আসল, তিনি হালকাভাবে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বের হলেন এবং ফজরের সালাত আদায় করলেন।
কুরায়ব হতে বর্ণিত। ইবন আব্বাস তাকে অবহিত করেছেন যে, তিনি নবী (ﷺ) সহধর্মিণী মাইমূনাহ-এর নিকট রাত্রি যাপন করেছিলেন। মাইমূনাহ হলেন তার খালা। তিনি বলেন, আমি বিছানায় আড়াআড়ি শুয়ে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার পরিবার লম্বা দিকে শয়ন করলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিদ্রামগ্ন হলেন। অর্ধরাত্রি কিংবা এর সামান্য আগে কিংবা সামান্য পরক্ষণে তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠলেন এবং মুখ থেকে ঘুমের ভাব মুছতে মুছতে বসলেন। তারপর সূরা আলে ইমরানের শেষ দশ আয়াত পাঠ করলেন। তারপর ঝুলন্ত একটি পুরাতন মশকের নিকট গিয়ে তাথেকে উত্তমরূপে উযূ করলেন। এরপর সালাতে দন্ডায়মান হলেন। ইবন আব্বাস বলেন, আমিও দাড়ালাম এবং তিনি যা করেছেন আমিও তা করলাম। তারপর আমি গিয়ে তার পার্শ্বে দাড়ালাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার ডান হাত আমার মাথায় রেখে আমার ডান কান মলতে শুরু করলেন। তারপর তিনি দু'রাকাত, অতঃপর দু'রাকাত, অতঃপর দু'রাকাত, অতঃপর দু'রাকাত, অতঃপর দু'রাকাত, অতঃপর দু'রাকাত, অতঃপর তিনি বিতরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর তিনি শুয়ে পড়লেন। শেষে মুয়াযযিন ফজরের আযান দিলে তিনি উঠে দাড়িয়ে সংক্ষিপ্তভাবে দু'রাকাত সালাত আদায় করলেন। তারপর বের হলেন এবং ফজরের সালাত আদায় করলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে একজন ইয়াতীম বালিকা ছিল। অতঃপর সে তাকে বিয়ে করল। সে বালিকার একটি বাগান ছিল। তার অন্তরে ঐ বালিকার প্রতি কোন আকর্ষণ না থাকা সত্ত্বেও বাগানের কারণে সে ঐ বালিকাটিকে বিবাহ করে রেখে দিতে চায়। এ সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ হয়- আর যদি আশঙ্কা কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না। আমার ধারণা যে, উরওয়াহ বলেন, ইয়াতীম বালিকাটি সে বাগান ও মালের অংশীদার ছিল।
উরওয়া ইবন আয-যুবায়ের থেকে বর্ণিত: যে তিনি আয়িশা কে আল্লাহর উক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: "যদি তুমি আশংকা কর যে তুমি এতিম মেয়েদের সাথে ন্যায়বিচার করতে পারবে না..." (4.3) তিনি বললেন, "হে আমার বোনের ছেলে! একজন এতিম মেয়ে করত। একজন অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে থাকবেন যার সাথে তিনি সম্পত্তি ভাগাভাগি করেছেন।তার অভিভাবক, তার সম্পদ এবং সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে, তাকে ন্যায়সঙ্গত মহর না দিয়েই তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করবে, অন্য কোন ব্যক্তি তাকে যে মহর দিতে পারে (যদি তিনি তাকে বিয়ে করেছিলেন) তাই এই ধরনের অভিভাবকদের এটি করতে নিষেধ করা হয়েছিল যদি না তারা তাদের মহিলা ওয়ার্ডের সাথে ন্যায়বিচার না করে এবং তাদের সহকর্মীরা পেতে পারে সর্বোচ্চ মহর দেয়। "আয়িশা যোগ করেছেন, "লোকেরা আল্লাহর রসূল (ﷺ)-কে তার নির্দেশ জিজ্ঞাসা করেছিল এই ঐশী আয়াতটি নাযিল হওয়ার পরে, যেখানে আল্লাহ নাযিল করেছিলেন: "তারা মহিলাদের সম্পর্কে আপনার নির্দেশ জিজ্ঞাসা করে" (4.127) আয়েশা আরও বলেন, "এবং আল্লাহর বক্তব্য : "এবং তবুও যাকে তোমরা বিয়ে করতে চাও।" (4.127) যেমন তোমাদের কেউ বিরত থাকে এতিম মেয়েকে বিয়ে করা থেকে (তার অভিভাবকত্বের অধীনে) যখন সে সম্পত্তি ও সৌন্দর্যের অভাব বোধ করে।'' আয়েশা আরও বলেন, "সুতরাং তাদেরকে সেই এতিম মেয়েদের বিয়ে করতে নিষেধ করা হয়েছিল যাদের ধন-সম্পদ ও সৌন্দর্যের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায়বিচার ছাড়া, এবং তা ছিল। কারণ সম্পত্তি ও সৌন্দর্যের অভাব হলে তারা তাদের বিয়ে করা থেকে বিরত থাকবে।"
আয়েশা থেকে বর্ণিত: আল্লাহর বাণী: "আর অভিভাবকদের মধ্যে যে ব্যক্তি ধনী হয়, সে যেন কোনো পারিশ্রমিক না নেয়, তবে যদি সে দরিদ্র হয়, তবে সে তার নিজের জন্য যা ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত (তার কাজ অনুযায়ী) সে যেন থাকে।" এতিমের সম্পত্তি। অভিভাবক যদি দরিদ্র হয়, তবে সে এতিমের সম্পত্তি থেকে নিতে পারে, যা তার কাজ এবং তার পরিচালনার জন্য ব্যয় করা সময় অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিসঙ্গত।
ইকরামা বর্ণনা করেছেন: ইবনে আব্বাস (আয়াতটি সম্পর্কে) বলেন, "এবং যখন আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও গরীবরা বিভক্তির সময় উপস্থিত থাকে, "এই আয়াত এবং এর আদেশ বৈধ এবং রহিত নয়।"
জাবির বর্ণনা করেছেন: নবী (ﷺ) ও আবু বকর (আমার অসুস্থতার সময়) পায়ে হেটে বনু সালামার (আবাসস্থলে) আমাকে দেখতে আসেন। নবী (ﷺ) আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পেলেন, তখন তিনি পানি চাইলেন এবং উযূ করলেন এবং তাতে কিছু পানি ছিটিয়ে দিলেন। আমি আমার জ্ঞান ফিরে পেলাম এবং বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার সম্পদের ব্যাপারে আপনি আমাকে কি আদেশ করেন? অতঃপর নাযিল করা হলঃ- "আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার) ব্যাপারে আদেশ করেন: " (4.11)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তির সম্পদ লাভ করত সন্তানরা, আর ওয়াসীয়াত ছিল পিতামাতার জন্য। অতঃপর তাথেকে আল্লাহ তাআলা স্বীয় পছন্দ অনুযায়ী কিছু রহিত করলেন এবং পুরুষদের জন্য মহিলার দ্বিগুণ নির্দিষ্ট করলেন। পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য ষষ্ঠাংশ ও তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করলেন, স্ত্রীদের জন্য অষ্টমাংশ ও চতুর্থাংশ নির্ধারণ করলেন এবং স্বামীর জন্য অর্ধাংশ ও চতুর্থাংশ নির্ধারণ করলেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: ঐশ্বরিক আয়াত সম্পর্কে: "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য নারীদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে উত্তরাধিকারী হতে নিষেধ করা হয়েছে, এবং তাদের সাথে কঠোর আচরণ করা উচিত নয় যাতে আপনি তাদের দেওয়া (মাহর) মোহরের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিতে পারেন।" (4.19) (এই প্রত্যাদেশের আগে) যদি কোন ব্যক্তি মারা যায়, তবে তার আত্মীয়দের তার স্ত্রীর উত্তরাধিকারের অধিকার ছিল, এবং তাদের মধ্যে একজন যদি তাকে বিয়ে করতে পারে, অথবা তারা ইচ্ছা করলে তাকে বিয়ে করতে পারে, বা, যদি। তারা চেয়েছিল, তারা তাকে বিয়ে করবে না, এবং তারা তার নিজের আত্মীয়দের চেয়ে তাকে নিষ্পত্তি করার বেশি অধিকারী হবে। তাই উপরোক্ত আয়াতটি এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াত সম্পর্কে: "প্রত্যেকের জন্য, আমি উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করেছি।" (4.33) 'মাওয়ালি' অর্থ উত্তরাধিকারী। এবং সম্পর্কে: --- "এবং যাদের কাছে আপনার ডান হাত অঙ্গীকার করেছে।" হিজরতকারীরা যখন মদিনায় আগমন করে, তখন একজন হিজরতকারী একজন আনসারীর উত্তরাধিকারী হতেন এবং পরবর্তীদের আত্মীয়দের বাদ দিয়ে এটি ছিল ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের কারণে যা নবী (ﷺ) তাদের মধ্যে (মুহাজিরগণ এবং মুহাজিরগণ) স্থাপন করেছিলেন। আনসার)। সুতরাং যখন আয়াত:- "আমি প্রত্যেকের জন্য উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করেছি।" প্রকাশিত হয়েছিল, (ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মাধ্যমে উত্তরাধিকার) বাতিল করা হয়েছিল। তখন ইবনে আব্বাস বললেন: "এবং যাদের কাছে তোমার ডান হাত অঙ্গীকার করেছে।" একে অপরকে সাহায্য এবং উপদেশ দেওয়ার চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই মিত্ররা আর একে অপরের উত্তরাধিকারী নয়, তবে তারা একে অপরকে তাদের কিছু সম্পত্তি উইল করে দিতে পারে।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগে একদল লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হ্যা, অবশ্যই। গ্রীষ্মের মেঘমুক্ত দুপুরের প্রখর কিরণবিশিষ্ট সূর্য দেখতে তোমরা কি পরস্পর ভিড় করে থাক? তারা বলল, না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, পূর্ণিমার রাতে মেঘমুক্ত আলো বিশিষ্ট চন্দ্র দেখতে তোমরা কি ভিড় কর? আবার তারা বলল, না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এদের কোনটিকে দেখতে যেমন পরস্পর ভিড় কর না; কিয়ামতের দিনও আল্লাহকে দেখতেও তোমরা পরস্পর ভিড় করবে না। কিয়ামত যখন আসবে তখন এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দেবে। তখন প্রত্যেকেই আপন আপন উপাস্যের অনুসরণ করবে। আল্লাহ ব্যতীত প্রতিমা ও পাথর ইত্যাদির যারা পূজা করেছে, তারা সকলে জাহান্নামে গিয়ে পড়বে, একজনও বাকী থাকবে না। পুণ্যবান হোক অথবা পাপী, এরা এবং আল্লাহর অবশিষ্ট বিশ্বাসীরা ব্যতীত যখন আর কেউ থাকবে না, তখন ইয়াহূদীদেরকে ডেকে বলা হবে, তোমরা কার ইবাদাত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযাইয়ের ইবাদাত করতাম। তাদেরকে বলা হবে যে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহ স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, পুত্রও গ্রহণ করেননি। তোমরা কী চাও? তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তৃষ্ণার্ত, আমাদেরকে পানি পান করান। এরপর তাদেরকে ইশারা করা হবে যে, তোমরা পানির ধারে যাও না কেন? এরপর তাদেরকে জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে তা যেন মরুভূমির মরীচিকা, এক এক অংশ অন্য অংশকে ভেঙ্গে ফেলছে। অতঃপর তারা সবাই জাহান্নামে পতিত হবে। তারপর নাসারাদেরকে ডাকা হবে। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা কার ইবাদাত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ইবাদাত করতাম। তাদের বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহ স্ত্রীও গ্রহণ করেননি, পুত্রও নয়। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা কী চাও? তারাও প্রথম পক্ষের মতো বলবে এবং তাদের মতো জাহান্নামে নিপতিত হবে। অবশেষে পুণ্যবান হোক কিংবা পাপী হোক আল্লাহর উপাসনাকারী ব্যতীত আর কেউ যখন বাকি থাকবে না, তখন তাদের কাছে পরিচিত রূপের নিকটতম একটি রূপ নিয়ে রাববুল আলামীন তাদের কাছে আবির্ভূত হবেন। এরপর বলা হবে, প্রত্যেক দল নিজ নিজ উপাস্যের অনুসরণ করে চলে গেছে। তোমরা কিসের অপেক্ষা করছ? তারা বলবে, দুনিয়াতে এ সকল লোকের প্রতি আমাদের অনেক প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আমরা সেখানে তাদের থেকে আলাদা থেকেছি এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখিনি। এখন আমরা আমাদের প্রতিপালকের অপেক্ষায় আছি, আমরা তার ইবাদাত করতাম। এরপর তিনি বলবেন, আমিই তোমাদের প্রতিপালক। তারা বলবে, আমরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করব না। এ কথাটি দু'বার কি তিনবার বলবে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রসূল (ﷺ) আমাকে বললেন, আমার জন্য (কুরআন) তিলাওয়াত কর, আমি বললাম, আমি কি তোমাকে তা তিলাওয়াত করব যদিও তা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে? তিনি বললেন, আমি অন্যের কাছ থেকে (কুরআন) শুনতে পছন্দ করি। অতঃপর আমি সূরা আন-নিসা পাঠ করলাম যতক্ষণ না আমি পৌছলাম: "অতঃপর কেমন হবে যখন আমরা প্রত্যেক জাতি থেকে একজন সাক্ষী আনব এবং আপনাকে (হে মুহাম্মদ) এই লোকদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে আনব?" (4.41) অতঃপর তিনি বললেনঃ থাম! এবং দেখ, তার চোখ জলে উপচে পড়ছিল।"
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে আসমা-এর একটি হার হারিয়ে গিয়েছিল। সেটা খোজার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কয়েকজন লোক পাঠিয়েছিলেন। তখন সালাতের সময় হল, তাদের কাছে পানি ছিল না। তারা উযূর অবস্থায় ছিলেন না আবার পানিও পেলেন না। এরপর বিনা অযুতে সালাত আদায় করে ফেললেন। তখন আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের নিয়মবিধি অবতীর্ণ করলেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াত: "তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের (মুসলিমদের) যারা কর্তৃত্বে আছে।" (৪.৫৯) আবদুল্লাহ ইবনে হুদাফা ইবনে কায়েস ইবনে 'আদি'-এর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল যখন নবী (ﷺ) তাকে একটি সারিয়ার (সেনা বিচ্ছিন্নতা) সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন।
উরওয়া থেকে বর্ণিত: আল-হাররাতে একটি প্রাকৃতিক পাহাড়ি স্রোতের কারণে আজ-জুবায়ের আনসারদের একজন ব্যক্তির সাথে ঝগড়া করেছিলেন। নবী (ﷺ) বললেন, "হে যুবাইর! (তোমার জমিতে সেচ দাও এবং তোমার প্রতিবেশীকে পানি প্রবাহিত কর) আনসাররা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ﷺ) (এর কারণ) তিনি (যুবায়ের) তোমার চাচাতো ভাই? নবী (সাঃ) এর মুখ (ক্রোধে) লাল হয়ে গেল এবং তিনি বললেন, "হে যুবাইর! (তোমার জমিতে) সেচ দাও, তারপর পানি আটকে রাখো যতক্ষণ না তা দেয়াল পর্যন্ত জমি পূর্ণ করে এবং তারপর তা তোমার প্রতিবেশীর দিকে প্রবাহিত হতে দাও।" তাই নবী (সা.) আনসারী রাগান্বিত হওয়ার পর আয-যুবায়েরকে তার পূর্ণ অধিকার আদায় করতে সক্ষম করেছিলেন। রাসূল (ﷺ) এর আগে একটি আদেশ দিয়েছিলেন যা তাদের উভয়ের পক্ষে ছিল আজ-জুবায়ের বললেন, "আমি মনে করি না কিন্তু আয়াতটি এই প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে: "কিন্তু না, আপনার পালনকর্তার কসম, তারা বিশ্বাস করতে পারে না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যেকার সমস্ত বিবাদে আপনাকে বিচারক না করে।" (4.65)
আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ আমি আল্লাহর রসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, "কোন নবী অসুস্থ হয় না, তবে তাকে দুনিয়া বা আখেরাত বেছে নেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়।" আয়েশা আরো বলেন, তার মারাত্মক অসুস্থতার সময় তার কন্ঠস্বর খুব রসালো হয়ে উঠেছিল এবং আমি তাকে বলতে শুনেছিলাম: "যাদের সাথে আল্লাহর রহমত, নবীদের, সিদ্দিকীনদের (নবীদের অনুসারী যারা প্রথম ও সর্বাগ্রে)। তাদের প্রতি ঈমান আনতে হবে), শহীদ ও ধার্মিকগণ।' (4.69) আর এ থেকে আমি জানতে পারলাম যে, তাকে অপশন দেওয়া হয়েছে।
উবাইদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, আমি ইবন আব্বাস-কে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন যে, আমি এবং আমার আম্মা (আয়াতে বর্ণিত) অসহায়দের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত: ইবনে আব্বাস তেলাওয়াত করেন:- "পুরুষ নারী ও শিশুদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি ব্যতীত" (4.98) এবং বলেন, "আমার মা এবং আমি তাদের মধ্যে ছিলাম যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেছিলেন।"
যায়েদ ইবন সাবিত থেকে বর্ণিত: আয়াত সম্পর্কে:- "তাহলে তোমাদের কি হল যে, তোমরা মুনাফিকদের ব্যাপারে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেলে?" (৪.৮৮) নবী (ﷺ) এর কিছু সাহাবী উহুদের যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেন (যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন) তখন মুসলমানরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে; তাদের একজন তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পক্ষে ছিল এবং অন্যটি তার পক্ষে ছিল না। অতঃপর সেখানে বাণী প্রকাশিত হলঃ "তাহলে তোমাদের কি হল যে, তোমরা মুনাফিকদের ব্যাপারে দুই দলে বিভক্ত হয়েছ?" (4.88)। তখন নবী (ﷺ) বললেন, এটি (মদীনা) তায়্য্যাবোহ (ভাল), এটি অপবিত্রতা দূর করে যেমন আগুন রূপার অপবিত্রতা দূর করে।
সাঈদ ইবন জুবায়ের থেকে বর্ণিত: উপরোক্ত আয়াতের ব্যাপারে কুফাবাসীরা দ্বিমত পোষণ করেছিল। অতঃপর আমি ইবন আব্বাস-এর কাছে গেলাম এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, এই আয়াতটি:- "এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করে, তার প্রতিফল জাহান্নাম।" সর্বোপরি অবতীর্ণ হয়েছিল (পূর্বপরিকল্পিত হত্যার বিষয়ে) এবং কিছুই এটি রহিত করেনি।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াত সম্পর্কে: "এবং যে আপনাকে (ইসলাম গ্রহণ করে) শান্তি প্রস্তাব করে তাকে বলবেন না, আপনি মুমিন নন।" তার ভেড়ার মাঝে একজন লোক ছিল। মুসলিমরা তাকে অনুসরণ করল এবং সে বলল, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। কিন্তু তারা তাকে মেরে তার মেষগুলো নিয়ে গেল। অতঃপর আল্লাহ সেই উদ্বেগের মধ্যে উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ করেন: "...এই জীবনের ধ্বংসাত্মক কল্যাণ কামনা করা।" (4.94) ঐ ভেড়াগুলো।
যায়েদ ইবন সাবিত থেকে বর্ণিত: যে নবী (ﷺ) তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: "মুমিনদের মধ্যে যারা (ঘরে) বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে এবং সমান নয়।" যায়েদ আরো বলেন, ইবনে উম মাকতুম এসেছিলেন যখন নবী (ﷺ) আমাকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ, যদি আমার (আল্লাহর পথে) যুদ্ধ করার ক্ষমতা থাকত, তবে আমি করতাম, এবং তিনি ছিলেন একজন অন্ধ। মানুষ. অতঃপর আল্লাহ তার রসূলকে প্রত্যাদেশ করলেন যখন তার ঊরু আমার উরুর উপর ছিল এবং তার উরু এত ভারী হয়ে গেল যে আমার উরু ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। অতঃপর নবী (ﷺ)-এর সেই অবস্থা চলে গেল এবং আল্লাহ নাযিল করলেনঃ- "যারা অক্ষম (আঘাতে অন্ধ বা খোড়া ইত্যাদি) ব্যতীত।
আল-বারা বর্ণনা করেছেন: যখন আয়াত: "মুমিনদের সমান নয় যারা (ঘরে) বসে থাকে" (4.95) নাযিল হয়, তখন আল্লাহর রাসূল জায়েদকে ডাকলেন যিনি এটি লিখেছেন। ইতিমধ্যে ইবনে উম মাকতুম এসে তার অন্ধত্বের অভিযোগ করলেন, তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: "যারা অক্ষম (আঘাতে অন্ধ বা খোড়া..." ইত্যাদি) (৪.৯৫) ছাড়া।
আল-বারা বর্ণনা করেছেন: যখন আয়াত: "মুমিনদের সমান নয় যারা (ঘরে বসে)" (4.95) নাযিল হয়, তখন নবী বললেন, "অমুককে ডাকো।" সেই ব্যক্তি একটি কালি-পাত্র এবং একটি কাঠের বোর্ড বা কাঁধের স্ক্যাপুলার হাড় নিয়ে তার কাছে এসেছিল। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "লেখ: যারা (ঘরে) বসে থাকে এবং যারা আল্লাহর পথে জেহাদ করে এবং তাদের মধ্যে সমান নয়। ইবন উম মাকতুম যিনি নবী (ﷺ)-এর পিছনে বসা ছিলেন তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একজন অন্ধ। তাই সেই আয়াতের জায়গায় নাজিল হল, আয়াতটি হল: -"মুমিনদের মধ্যে যারা (ঘরে) বসে থাকে তারা সমান নয় যারা অক্ষম (আঘাতে, বা অন্ধ বা খোড়া ইত্যাদি) এবং যারা আল্লাহর পথে জেহাদ ও সংগ্রাম কর।" (৪.৯৫)
ইবন আব্বাস জানিয়েছেন যে, বদরের যুদ্ধে যোগদানকারী আর বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত মুমিনগণ সমান নয়।
মুহাম্মদ ইবন আবদুর রহমান আবু আল-আসওয়াদ থেকে বর্ণিত: মদিনার জনগণকে একটি বাহিনী প্রস্তুত করতে বাধ্য করা হয়েছিল (মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন আয-জুবায়েরের খেলাফতের সময় শামের জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য), এবং আমি তাতে তালিকাভুক্ত হয়েছিলাম; অতঃপর আমি ইবনে আব্বাসের মুক্তকৃত দাস ইকরিমার সাথে সাক্ষাত করলাম এবং তাকে (এ সম্পর্কে) অবহিত করলাম এবং তিনি আমাকে তা করতে (সেই সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে) কঠোরভাবে নিষেধ করলেন এবং তারপর বললেন, ইবনে আব্বাস আমাকে জানিয়েছিলেন যে কিছু মুসলিম লোক পৌত্তলিকদের সাথে ছিল, যা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধে পৌত্তলিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করছিল।একটি তীর নিক্ষেপ করা হত যা তাদের একজনকে (মুসলিমদের সাথে থাকা মুশরিকদের) আঘাত করত এবং তাকে হত্যা করত। (তরবারি দিয়ে) আঘাত করে হত্যা করা হবে।" অতঃপর আল্লাহ অবতীর্ণ করেন:- "নিশ্চয়ই! ফেরেশতারা যাদেরকে (মৃত্যুতে) গ্রহণ করে যখন তারা নিজেদের উপর জুলুম করছে (কাফেরদের মধ্যে থেকে)" (4.97) আবু আসওয়াদ যোগ করেছেন, "পুরুষদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তিরা ব্যতীত, মহিলারা, ..." (4.98)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: "দুর্বলদের ব্যতীত" (4.98) এবং যোগ করেছেন: আমার মা ছিলেন তাদের একজন যাদের আল্লাহ ক্ষমা করেছিলেন।
আবূ হুরাইরাহ বলেন যে, নবী (ﷺ) 'ইশার সালাত আদায় করছিলেন, তিনি সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বললেন, তারপর সিজদা করার পূর্বে বললেন, হে আল্লাহ! আয়্যাশ ইবন আবূ রাবিয়াকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ! সালামাহ ইবন হিশামকে মুক্ত করুন। হে 'আল্লাহ! ওয়ালিদ ইবন ওয়ালিদকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ! অক্ষম মুমিনদেরকে মুক্ত করুন। হে আল্লাহ! মুযার গোত্রের উপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করুন। হে আল্লাহ! তাদের উপর ইউসুফ-এর যুগের দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াতটি সম্পর্কে: "বৃষ্টির অসুবিধার কারণে বা আপনি অসুস্থ হওয়ার কারণে।" (৪.১০২) (এটি অবতীর্ণ হয়েছে) আব্দুর-রহমান ইবন আউফ যিনি আহত ছিলেন।
আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ আয়াত সম্পর্কে: "তারা নারীদের সম্পর্কে আপনার নির্দেশ জিজ্ঞাসা করে। বলুন: আল্লাহ আপনাকে তাদের সম্পর্কে নির্দেশ দেন এবং আপনি কাকে বিয়ে করতে চান।" (4.127) একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে (অবতীর্ণ হয়েছে) যার একটি এতিম মেয়ে আছে এবং সে তার অভিভাবক ও উত্তরাধিকারী। মেয়েটি তার সমস্ত সম্পত্তি, এমনকি একটি খেজুর (বাগান) তার সাথে ভাগ করে নেয়, কিন্তু সে তাকে বিয়ে করতে অপছন্দ করে এবং তাকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিতে অপছন্দ করে যে তার সাথে যে সম্পত্তি ভাগ করে নেবে, এবং এর জন্য কারণ অভিভাবক সেই অনাথ মেয়েকে বিয়ে করতে বাধা দেয়। সুতরাং, এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল: (এবং আল্লাহর বক্তব্য:) "যদি কোন মহিলা তার স্বামীর পক্ষ থেকে নিষ্ঠুরতা বা পরিত্যাগের ভয় করে।" (4.128)
আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ আয়াতটি সম্পর্কে: "যদি কোনো নারী তার স্বামীর পক্ষ থেকে নিষ্ঠুরতা বা পরিত্যাগের আশঙ্কা করে।" (4.128) এটি এমন একজন ব্যক্তির সম্পর্কে যার একটি স্ত্রী (স্ত্রী) আছে এবং সে তাকে পছন্দ করে না এবং তাকে তালাক দিতে চায় কিন্তু সে তাকে বলে, "আমি তোমাকে আমার নিজের ব্যাপারে স্বাধীন করছি।" তাই এ প্রসঙ্গে এই আয়াত নাযিল হয়েছে।
আসওয়াদ বলেছেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ-এর মজলিসে ছিলাম, সেখানে হুযাইফাহ আসলেন এবং আমাদের সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে সালাম দিলেন। এরপর বললেন, তোমাদের চেয়ে উত্তম গোত্রের উপরও মুনাফিকী এসেছিল। আসওয়াদ বললেন, সুবহানাল্লাহ! অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, "মুনাফিকগণ জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে"। আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হেসে উঠলেন। হুযাইফাহ মসজিদের এক কোণে গিয়ে বসলেন, আবদুল্লাহ উঠে গেলে তার শিষ্যবর্গও চলে গেলেন। এরপর হুযাইফাহ আমার দিকে একটি পাথর টুকরো নিক্ষেপ করে আমাকে ডাকলেন। আমি তার নিকট গেলে তিনি বললেন, আমি তার হাসিতে বিস্মিত হলাম অথচ আমি যা বলেছি তা তিনি বুঝেছেন। এমন এক গোত্র যারা তোমাদের চেয়ে উত্তম তাদের মধ্যেও মুনাফিকী সৃষ্টি করা হয়েছিল। তারপর তারা তওবা করেছে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের তওবা গ্রহণ করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন যে, "আমি ইউনুস ইবন মাত্তা থেকে উত্তম" এটা বলা কারো জন্য শোভনীয় নয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি বলে "আমি ইউনুস ইবন মাত্তা থেকে উত্তম" সে মিথ্যা বলে।
আল-বারা বর্ণনা করেছেন: নাজিলকৃত সর্বশেষ সূরাটি ছিল বারাআ, এবং সর্বশেষ যে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল তা ছিল: "তারা আপনার কাছে একটি আইনগত রায় চায়, বলুন: যারা কোন বংশধর বা বংশধরকে উত্তরাধিকারী হিসাবে রাখে না তাদের সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ (এভাবে)।" (৪.১৭৬)
ত্বরিক ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। ইয়াহূদীগণ উমার ফারূক-কে বলল যে, আপনারা এমন একটি আয়াত পড়ে থাকেন তা যদি আমাদের মধ্যে নাযিল হত, তবে আমরা সেটাকে "ঈদ" হিসেবে গ্রহণ করতাম। উমার বললেন, আমি জানি এটা কখন নাযিল হয়েছে, কোথায় নাযিল হয়েছে এবং নাযিলের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোথায় ছিলেন, আয়াতটি আরাফাতের দিন নাযিল হয়েছিল। আল্লাহর শপথ আমরা সবাই 'আরাফাতে ছিলাম, সেই আয়াতটি হল- "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম।" সুফ্ইয়ান সাওরী বলেন, সে দিনটি শুক্রবার ছিল কিনা এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।
নবী-পত্নী আয়িশাহ বলেছেন যে, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে এক সফরে বের হলাম, বাইদা কিংবা যাতুল জাইশ নামক স্থানে পৌছার পর আমার গলার হার হারিয়ে গেল। তা খোজার জন্যে রাসূল (ﷺ) সেখানে অবস্থান করলেন এবং লোকেরাও তার সঙ্গে অবস্থান করল। সেখানেও কোন পানি ছিল না এবং তাদের সঙ্গেও পানি ছিল না। এরপর লোকেরা আবূ বাকর-এর কাছে আসল এবং বলল, আয়িশাহ যা করেছেন আপনি তা দেখেছেন কি? রাসূল (ﷺ) এবং সকল লোকটি আটকিয়ে রেখেছেন, অথচ সেখানেও পানি নেই আবার তাদের সঙ্গেও পানি নেই। রাসূল (ﷺ) আমার উরুতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় আবূ বাকর এলেন এবং বললেন, তুমি রাসূল (ﷺ) এবং সকল লোককে আটকে রেখেছো অথচ সেখানেও পানি নেই আবার তাদের সঙ্গেও পানি নেই। আয়িশাহ বলেন যে, আবূ বাকর আমাকে দোষারোপ করলেন এবং আল্লাহ যা চেয়েছেন তা বলেছেন এবং তার অঙ্গুলি দিয়ে আমার কোমরে ধাক্কা দিতে লাগলেন, আমার কোলে রাসূল (ﷺ)-এর অবস্থানই আমাকে নড়াচড়া করতে বাধা দিল। পানিবিহীন অবস্থায় ভোরে রাসূল (ﷺ) ঘুম থেকে উঠলেন। তখন আল্লাহ তাআলা তায়াম্মুমের আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তখন সবাই তায়াম্মুম করল। তখন উসাইদ ইবন হুযাইর বললেন, হে আবূ বাকর-এর বংশধর! এটাই আপনাদের কারণে পাওয়া প্রথম বারাকাত নয়। আয়িশাহ বললেন, যে উটের উপর আমি ছিলাম, তাকে আমরা উঠালাম তখন দেখি হারটি তার নিচে।
আয়িশাহ বলেছেন, মদিনায় প্রবেশের পথে বাইদা নামক স্থানে আমার গলার হারটি পড়ে গেল। এরপর নবী (ﷺ) সেখানে উট বসিয়ে অবস্থান করলেন। তিনি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়েছিলেন। আবূ বাকর এসে আমাকে জোরে থাপ্পড় লাগালেন এবং বললেন একটি হার হারিয়ে তুমি সকল লোককে আটকে রেখেছো। এদিকে তিনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন, অপরদিকে রাসূল (ﷺ) এ অবস্থায় আছেন, এতে আমি মৃত্যু যাতনা ভোগ করছিলাম। তারপর রাসূল (ﷺ) জাগ্রত হলেন, ফজর সালাতের সময় হল এবং পানি খোজ করে পাওয়া গেল না, তখন অবতীর্ণ হলঃ "ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা যখন সালাতের জন্য দাড়াতে চাও তখন ধৌত করে নিবে নিজেদের মুখমন্ডল এবং হাত কনুই পর্যন্ত।" (আল-মায়িদাহ ৫/৬) এরপর উসায়দ ইবন হুযায়র বললেন, হে আবূ বাকরের বংশধর! আল্লাহ তাআলা তোমাদের কারণে মানুষের জন্যে বারাকাত অবতীর্ণ করেছেন। মানুষের জন্য তোমরা হলে কল্যাণ আর কল্যাণ।
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বলেন যে, বদর যুদ্ধের দিন মিকদাদ বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইসরাঈলীরা মূসা-কে যেমন বলেছিল, "যাও তুমি ও তোমার প্রতিপালক যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে থাকব"- আমরা আপনাকে সে রকম বলব না বরং আপনি এগিয়ে যান, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি, তখন যেন রাসূল (ﷺ) থেকে সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। এই হাদীসটি ওয়াকা-সুফ্ইয়ান থেকে, তিনি মুখারিক থেকে এবং তিনি (মুখারিক) তারিক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, মিক্দাদ এটা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলেছিলেন।
আবূ কিলাবাহ হতে বর্ণিত। তিনি উমার ইবন আবদুল আযীয-এর পেছনে উপবিষ্ট ছিলেন। তারা কাসামাত দন্ড সম্পর্কিত হাদীসটি আলোচনা করলেন এবং এর অবস্থা সম্পর্কে আলাপ করলেন, তারা মৃত্যুদন্ডের পক্ষে বললেন এবং এও বললেন যে, খুলাফায়ে রাশিদ্বীন এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছেন। এরপর তিনি আবূ কিলাবার প্রতি তাকালেন, আবূ কিলাবাহ তার পেছনে ছিলেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবন যায়দ নামে কিংবা আবূ কিলাবাহ নামে ডেকে বললেন, এই ব্যাপারে তোমার মতামত কী? আমি বললাম, বিয়ের পর ব্যভিচার, কিসাস ব্যতীত খুন এবং আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কোন একটি ব্যতীত অন্য কোন কারণে কাউকে মৃত্যুদন্ড দেয়া ইসলামে বৈধ বলে আমার জানা নেই। আনবাসা বললেন, আনাস আমাদেরকে হাদীস এভাবে বর্ণনা করেছেন (হাদীসে আরনিন)। আমি (আবূ কিলাবাহ) বললাম, আমাকেও আনাস এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, একদল লোক নবী (ﷺ)-এর নিকটে এসে তার সঙ্গে আলাপ করল, তারা বলল, আমরা এ দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে পারছি না। রাসূল (ﷺ) বললেন, এগুলো আমার উট, ঘাস খাওয়ার জন্যে বের হচ্ছে, তোমরা এগুলোর সঙ্গে যাও এবং এদের দুধ ও পেশাব পান কর। তারা ওগুলোর সঙ্গে বেরিয়ে গেল এবং দুধ ও প্রস্রাব পান করে সুস্থ হয়ে উঠল, এরপর রাখালের উপর আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে পশুগুলো লুট করে নিয়ে গেল। এখন তাদেরকে হত্যা না করার পক্ষে আর কোন যুক্তিই থাকল না। তারা নরহত্যা করেছে, আল্লাহ ও তার রাসূল (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং রাসূল (ﷺ)-কে ভয় দেখিয়েছে। আনবাসা আশ্চর্য হয়ে বলল, সুবহানাল্লাহ! আমি বললাম, আমার এই হাদীস সম্পর্কে তুমি কি আমাকে মিথ্যা অপবাদ দেবে? আনবাসা বলল, আনাস আমাদেরকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন, আবূ কিলাবাহ বললেন, তখন আনবাসা বলল, হে এই দেশবাসী (সিরিয়াবাসী) এ রকম ব্যক্তিবর্গ যতদিন তোমাদের মধ্যে থাকবে ততদিন তোমরা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রুবাঈ যিনি আনাস-এ ফুফু, এক আনসার মহিলার সামনের একটি বড় দাত ভেঙ্গে ফেলেছিল। এরপর আহত মহিলার গোত্র এর কিসাস দাবী করে। তারা নবী (ﷺ)-এর নিকট এলো, নবী (ﷺ) কিসাসের নির্দেশ দিলেন, আনাস ইবন মালিকের চাচা আনাস ইবন নযর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ রুবাঈ-এর দাত ভাঙ্গা হবে না। রাসূল (ﷺ) বললেন, হে আনাস! আল্লাহর কিতাব তো "বদলা"র বিধান দেয়। পরবর্তীতে বিরোধীপক্ষ রাযী হয়ে মুক্তিপণ বা দিয়ত গ্রহণ করল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহর কতক বান্দা আছে যারা আল্লাহর নামে কসম করলে আল্লাহ তাআলা তাদের কসম সত্যে পরিণত করেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, যদি কেউ তোমাকে বলে যে, তার অবতীর্ণ বিষয়ের সামান্য কিছুও মুহাম্মাদ (ﷺ) গোপন করেছেন তা হলে অবশ্যই, সে মিথ্যা বলেছে। আল্লাহ বলেছেন, "হে রাসূল! আপনি তা পৌছে দিন যা আপনার প্রতি আপনার রবের তরফ থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে।"
আয়েশা থেকে বর্ণিতঃ এই আয়াত: "তোমাদের শপথের মধ্যে যা অনিচ্ছাকৃত তার জন্য আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দেবেন না।" (5.89) একজন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল (তার কথা বলার সময়), "না, আল্লাহর কসম" এবং "হ্যা, আল্লাহর কসম।"
আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, তার পিতা শপথই ভঙ্গ করতেন না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারার বিধান অবতীর্ণ করলেন। আবূ বাকর বলেছেন, শপথকৃত কাজের উল্টোটি যদি আমি উত্তম ধারণা করি তবে আমি আল্লাহ প্রদত্ত সুযোগটি গ্রহণ করি এবং উত্তম কাজটি সম্পাদন করি।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: আমরা নবী (ﷺ) কর্তৃক পরিচালিত পবিত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতাম এবং আমাদের সাথে কোন মহিলা (স্ত্রী) ছিল না। তাই আমরা (রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে) বললাম। "আমরা কি নিজেদের বর্জন করব?" কিন্তু নবী (ﷺ) আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং তারপর থেকে তিনি আমাদেরকে একজন মহিলাকে (সাময়িকভাবে) একটি পোশাক দিয়ে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি পাঠ করলেন: "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ যা ভাল জিনিসকে হারাম করবেন না। তোমার জন্য হালাল করে দিয়েছে।"
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, মদ নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান যখন নাযিল হল, তখন মদিনাতে পাচ প্রকারের মদের রেওয়াজ ছিল, আঙ্গুরের পানিগুলো এর মধ্যে গণ্য ছিল না।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, তোমরা যেটাকে ফাযীখ কাঁচা খুরমা ভিজানো পানি নাম রেখেছ সেই ফাযীখ ব্যতীত আমাদের অন্য কোন মদ ছিল না। একদিন আমি দাড়িয়ে দাড়িয়ে আবূ ত্বলহা, অমুক এবং অমুককে তা পান করাচ্ছিলাম। তখনই এক ব্যক্তি এসে বলল, আপনাদের কাছে এ সংবাদ এসেছে কি? তারা বললেন, ঐ সংবাদ কী? সে বলল, মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে, তারা বললেন, হে আনাস! এই বড় বড় মটকাগুলো থেকে মদ ঢেলে ফেলে দাও। আনাস বললেন যে, এই ব্যক্তির সংবাদের পর তারা এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেসও করেননি এবং দ্বিতীয়বার পানও করেননি।
জাবির বলেছেন যে, উহূদের যুদ্ধের দিন ভোরে কিছু লোক মদ পান করেছিলেন এবং সেদিন তারা সবাই শহীদ হয়েছেন। এই মদ্যপানের ঘটনা ছিল তা হারাম হওয়ার আগের ঘটনা।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, আমি উমার-কে নবী (ﷺ)-এর মিম্বরে বসে বলতে শুনেছি যে, এরপর হে লোক সকল! মদপানের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হয়েছে আর তা হচ্ছে পাচ প্রকার, খুরমা থেকে, আঙ্গুর থেকে, মধু থেকে, গম থেকে এবং যব থেকে আর মদ হচ্ছে যা সুস্থ বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
আনাস হতে বর্ণিত যে, ঢেলে দেয়া মদগুলো ছিল ফাযীখ। আবূ নুমান থেকে মুহাম্মাদ ইবন সাল্লাম আরও অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন, আনাস বলেছেন, আমি আবূ ত্বলহা-এর ঘরে লোকেদেরকে মদ পান করাচ্ছিলাম, তখনই মদের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একজন ঘোষককে তা প্রচারের নির্দেশ দিলেন। এরপর সে ঘোষণা দিল। আবূ ত্বল্হা বললেন, বেরিয়ে দেখ তো শব্দ কিসের? আনাস বলেন, আমি বেরুলাম এবং বললাম যে, একজন ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছে যে, জেনে রাখ মদ হারাম করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বললেন যাও, এগুলো সব ঢেলে দাও। আনাস বলেন, সেদিন মদিনা মনোওয়ারার রাস্তায় রাস্তায় মদের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিল। তিনি বলেন, সে যুগে তাদের মদ ছিল ফাযীখ, তখন একজন বললেন, যারা পেটে মদ নিয়ে শহীদ হয়েছেন তাদের কী অবস্থা হবে? তিনি বলেন, এরপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন- "যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারা যা খেয়েছে তার জন্য কোন দোষ নেই।" (5.93)
আনাস থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) এমন একটি খুতবা দিলেন যা আমি আগে কখনো শুনিনি। তিনি বললেন, আমি যা জানি তা যদি তুমি জানতে তাহলে তুমি অল্প হাসতে এবং বেশি কাঁদতে। একথা শুনে নবী (ﷺ) এর সাহাবীগণ তাদের মুখমন্ডল ঢেকে ফেললেন এবং তাদের কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। একজন লোক বলল, আমার বাবা কে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, অমুক। তাই এই আয়াতটি নাযিল হয়: "এমন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না যা, যদি তোমার কাছে স্পষ্ট করা হয়, তবে তোমাকে কষ্ট দিতে পারে।" (5.101)
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: কিছু লোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বিদ্রুপ করে প্রশ্ন করছিল। একজন লোক বলবে, আমার বাবা কে? আর একজন ব্যক্তি যার উটটি পথভ্রষ্ট হয়েছিল সে বলবে, "আমার উটটি কোথায়?" তাই আল্লাহ এই প্রসঙ্গে এই আয়াতটি নাজিল করলেন: "হে ঈমানদারগণ! এমন বিষয়ে প্রশ্ন করো না যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট করে বললে, কারণ হতে পারে। তুমি কষ্ট পাবে।" (5.101)
সাঈদ ইবন আল-মুসাইয়াব থেকে বর্ণিত: বাহীরা হল একটি উট যার দুধ মূর্তিগুলির জন্য রাখা হয় এবং কাউকে দুধ খাওয়াতে অনুমতি দেওয়া হয় না; সাইবা ছিল সেই উট যাকে তারা তাদের দেবতাদের জন্য ছেড়ে দিত এবং তাতে কিছু বহন করার অনুমতি ছিল না। আবূ হুরায়রা বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমি আমর ইবন আমির আল-খুযায়ীকে (স্বপ্নে) আগুনের মধ্যে তার অন্ত্র টেনে নিয়ে যেতে দেখেছি এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মুক্ত করার রীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রাণী (তাদের দেবতাদের জন্য)," ওয়াসিলা হল সেই উট যা প্রথম প্রসবের জন্য একটি উটকে জন্ম দেয় এবং তারপর দ্বিতীয় প্রসবের জন্য আরেকটি উট প্রসব করে। লোকেরা (ইসলাম-পূর্ব জাহেলিয়াতের যুগে) উটটিকে তাদের মূর্তির জন্য ছেড়ে দিতে দিত যদি তার মধ্যে একটি পুরুষ উট জন্ম না দিয়ে পরপর দুটি উট জন্ম দেয়। 'হাম' ছিল পুরুষ উট যা যৌন মিলনের জন্য ব্যবহৃত হত। যখন এটি এর জন্য নির্ধারিত সঙ্গমের সংখ্যা শেষ করত, তখন তারা এটিকে তাদের মূর্তির জন্য ছেড়ে দিত এবং বোঝা থেকে অজুহাত দিত যাতে এর উপর কিছুই বহন করা না হয় এবং তারা একে 'হামি' বলে। আবূ হুরায়রা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি।
আয়িশাহ বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি জাহান্নামকে দেখেছি যে, তার একাংশ অন্য অংশকে ভেঙ্গে ফেলছে বা আক্রমণ করছে, আমরকে দেখেছি সে তার নাড়িভুঁড়ি টেনে নিয়ে হাটছে, সে-ই প্রথম ব্যক্তি যে 'সায়ীবা'র রেওয়াজ চালু করেছিল।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রসূল (ﷺ) খুতবা দিলেন এবং বললেন, "হে লোক সকল! তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে খালি পায়ে, উলঙ্গ অবস্থায় এবং সুন্নত না অবস্থায় একত্র করা হবে।" অতঃপর (কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে) তিনি বললেন:- "যেমন আমরা প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, আমরা এটির পুনরাবৃত্তি করব। একটি প্রতিশ্রুতি যা আমরা নিয়েছি: সত্যই আমরা তা করব..." (21.104) তখন নবী (ﷺ) বললেন, "কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যাকে পোশাক পরানো হবে, তিনি হবেন ইব্রাহীম। দেখ, আমার উম্মতদের মধ্য থেকে কিছু লোককে আনা হবে এবং তারপর (ফেরেশতারা) তাদেরকে বাম দিকে (জাহান্নামের) দিকে নিয়ে যাবে। বলবে, হে আমার পালনকর্তা, (তারা) আমার সঙ্গী। তখন (সর্বশক্তিমানের পক্ষ থেকে) উত্তর আসবে, 'আপনি জানেন না তারা আপনার পরে কী করেছে।' আমি বলব যেমন ধার্মিক বান্দা (রাসূল (সাঃ) ঈসা) বলেছেন: এবং আমি তাদের মধ্যে সাক্ষী ছিলাম, যখন আপনি আমাকে তুলে নিয়েছিলেন।' (5.117) অতঃপর বলা হবে, তুমি যখন থেকে তাদের ছেড়ে চলেছ তখন থেকে এরা মুরতাদ হয়েই আছে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) বলেছেন, "তোমাদেরকে (কিয়ামতের দিন) একত্র করা হবে এবং কিছু লোককে (ফেরেশতাদের দ্বারা) বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে (এবং জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হবে) তখন আমি বলবো ধার্মিক বান্দা (ঈসা)।) বলেছেন:- "এবং আমি তাদের মধ্যে থাকার সময় তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম... সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞানী।" (5.117-118)
সালিম ইবন আবদুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, অদৃশ্যের চাবি পাচটি- "নিশ্চই আল্লাহরই কাছে রয়েছে কিয়ামত সম্বন্ধীয় জ্ঞান এবং তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, আর তিনিই জানেন যা কিছু আছে গর্ভাধারে। কেউ জানে না আগামীকল্য সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোথায় তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন"- (লুকমান ৩১/৩৪)।
জাবির বর্ণনা করেছেন: যখন এই আয়াত নাযিল হলঃ "বলুন, তিনি উপর থেকে তোমাদের উপর আযাব পাঠানোর ক্ষমতা রাখেন।" (৬.৬৫) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ! আর যখন আয়াত: "অথবা তোমার পায়ের নিচ থেকে আযাব পাঠাও" (নাজিল হলো), তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, "(হে আল্লাহ!) আমি তোমার মুখের (এই শাস্তি থেকে) আশ্রয় চাই।" (কিন্তু যখন নাযিল হয়েছিল): "অথবা দলীয় কোনদলে বিভ্রান্ত করবে এবং একে অপরের সহিংসতার স্বাদ গ্রহণ করবে।" (৬.৬৫) আল্লাহর রসূল (ﷺ) বললেন, এটা হালকা (বা এটা সহজ)।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: যখন:"...এবং তাদের বিশ্বাসকে ভুলের সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না।" (6.82) অবতীর্ণ হয়, নবী (সাঃ) এর সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে কোন অন্যায় হয়নি? অতঃপর নাযিল হয়ঃ- "নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে ইবাদতে শরীক হওয়া একটি চরম অন্যায়।" (31.13)
ইবন আব্বাস নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, "আমি ইউনুস ইবন মাত্তা থেকে উত্তম" এমন কথা বলা কারও জন্যে শোভনীয় নয়।
আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, "আমি ইউনুস ইবন মাত্তা থেকে উত্তম", এমন কথা বলা কারো জন্য শোভনীয় নয়।
মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন: তিনি ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলেন, "সূরা সা'দ কি কোন সিজদা আছে?" (38.24) ইবনে আব্বাস বলেন, "হ্যা" এবং তারপর পাঠ করলেন: "আমরা দিয়েছি... সুতরাং তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।" (6.85,90) তারপর তিনি বললেন, "তিনি (দাউদ) তাদের একজন (সেই নবীগণ)।" মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন: আমি ইবনে আব্বাসকে (উপরের আয়াত সম্পর্কে) জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, তোমার নবী (মুহাম্মদ) তাদের একজন ছিলেন যাদেরকে তাদের অনুসরণ করতে আদেশ করা হয়েছিল।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেছেন যে, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা ইয়াহূদীদেরকে অভিসম্পাত করেছেন, যখন তিনি তাদের উপর চর্বি নিষিদ্ধ করেছেন তখন তারা ওটাকে তরল করে জমা করেছে, তারপর বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে।
আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত। নিষিদ্ধ কার্যে মুমিনদেরকে বাধা দানকারী আল্লাহর চেয়ে অধিক কেউ নেই, এজন্যই প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করেছেন, আল্লাহর প্রশংসা প্রকাশ করার চেয়ে প্রিয় তার কাছে অন্য কিছু নেই, সেজন্যেই আল্লাহ আপন প্রশংসা নিজেই করেছেন। আমর ইবন মুররাহ্ বলেন, আমি আবূ ওয়ায়িলকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তা আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যা। আমি বললাম, এটাকে কি তিনি রাসূল (ﷺ)-এর বাণী হিসেবে বর্ণনা করেছেন? তিনি বললেন, হ্যা।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে না। লোকেরা যখন তা দেখবে, তখন পৃথিবীর সকলে ঈমান আনবে এবং সেটি হচ্ছে এমন সময় পূর্বে ঈমান আনেনি এমন ব্যক্তির ঈমান তার কাজে আসবে না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যতক্ষণ না পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয় ঘটবে ততক্ষণ কিয়ামত হবে না, যখন সেদিক থেকে সূর্য উদিত হবে এবং লোকেরা তা দেখবে তখন সবাই ঈমান গ্রহণ করবে, এটাই সময় যখন কোন ব্যক্তিকে তার ঈমান কল্যাণ সাধন করবে না। তারপর তিনি আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।
আমর ইবন মুররাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ ওয়ায়িলকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এটা আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন, হ্যা এবং তিনি এটাকে মারফু হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, অন্যায়কে ঘৃণাকারী আল্লাহর তুলনায় অন্য কেউ নেই, এজন্যেই তিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন, আবার আল্লাহর চেয়ে প্রশংসা-প্রীতি অন্য কারো নেই, তাই তিনি নিজে নিজের প্রশংসা করেছেন।
আবূ সাঈদ খুদরী বলেছেন যে, এক ইয়াহূদী নবী (ﷺ)-এর নিকটে উপস্থিত হল। তার মুখমন্ডলে চপেটাঘাত খেয়ে সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আপনার এক আনসারী সাহাবী আমার মুখমন্ডলে চপেটাঘাত করেছে। তিনি বললেন, তাকে ডেকে আন। তারা ওকে ডেকে আনল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "একে চপেটাঘাত করেছ কেন?" সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এই ইয়াহূদীর পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করছিলাম। তখন শুনলাম সে বলছে তারই শপথ যিনি মূসা-কে মানবজাতির উপর মনোনীত করেছেন, আমি বললাম মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপরও মনোনীত করেছেন কি? এরপর আমার রাগ চেপে গিয়েছিল, তাই তাকে চপেটাঘাত করেছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা আমাকে অন্যান্য নবীর থেকে উত্তম বলো না। কারণ কিয়ামত দিবসে সব মানুষই জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে, সর্বপ্রথম আমিই জ্ঞান ফিরে পাব। তিনি বলেন, তখন আমি দেখব যে, মূসা আকাশের খুটি ধরে আছেন, আমি বুঝতে পারব না যে, তিনি কি আমার পূর্বে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন নাকি তূর পর্বতের জ্ঞানশূন্যতার পুরস্কার হিসেবে তাকে পুনরায় জ্ঞানশূন্য করা হয়নি।
সাঈদ ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) বলেছেন, "আল-কামা হল মান (মিষ্টি রজন বা আঠা) এর মত (যা মানুষের যত্ন ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে) এবং এর পানি চোখের রোগের নিরাময়।
আবূ দারদা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আবূ বাকর ও উমার-এর মধ্যে বিতর্ক হল, আবূ বাকর উমার-কে রাগিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর রাগান্বিত অবস্থায় উমার সেখান থেকে চলে গেলেন, আবূ বাকর তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে তার পিছু নিলেন কিন্তু উমার ক্ষমা করলেন না, বরং তার সম্মুখের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবূ বাকর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে আসলেন। আবূ দারদা বলেন, আমরা তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম, ঘটনা শোনার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তোমাদের এই সঙ্গী আবূ বাকর আগে কল্যাণ লাভ করেছে। তিনি বলেন, এতে উমার লজ্জিত হলেন এবং সালাম করে নবী (ﷺ)-এর পাশে বসে পড়লেন ও সবকথা রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বর্ণনা করলেন। আবূ দারদা বলেন, এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসন্তুষ্ট হলেন। আবূ বাকর সিদ্দীক বারবার বলছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি অধিক দোষী ছিলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা আমার খাতিরে আমার সাথীর ত্রুটি উপেক্ষা করবে কি? তোমরা আমার খাতিরে আমার সঙ্গীর ত্রুটি উপেক্ষা করবে কি? এমন একদিন ছিল যখন আমি বলেছিলাম, "হে মানুষেরা! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসূল, তখন তোমরা বলেছিলে, "তুমি মিথ্যা বলেছ" আর আবূ বাকর বলেছিল, "আপনি সত্য বলেছেন"।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ইসরাঈলীদেরকে আদেশ করা হয়েছিল যে, "নতশিরে প্রবেশ কর এবং বল, ক্ষমা চাই, আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করব"- (আল-'আরাফ ১৫৮)। এরপর তারা তার উল্টো করল, তারা নিজেদের নিতম্বে ভর দিয়ে মাটিতে বসে বসে প্রবেশ করল এবং বলল, -যবের ভিতর বিচি চাই।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, "উয়াইনাহ ইবন হিসন ইবন হুযাইফাহ এসে তার ভাতিজা হুর ইবন কাইসের কাছে অবস্থান করলেন। উমার যাদেরকে পার্শ্বে রাখতেন হুর ছিলেন তাদের একজন। কারীগণ, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই উমার ফারূক-এর মজলিসের সদস্য এবং উপদেষ্টা ছিলেন। এরপর 'উয়াইনাহ তার ভাতিজাকে ডেকে বললেন, এই আমীরের কাছে তো তোমার একটা মর্যাদা আছে, সুতরাং তুমি আমার জন্য তার কাছে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে দাও। তিনি বললেন, হ্যা, আমি তার কাছে আপনার প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করব। ইবন আব্বাস বলেন, এরপর হুর অনুমতি প্রার্থনা করলেন উয়াইনাহর জন্যে এবং উমার অনুমতি দিলেন। উয়াইনাহ উমারের কাছে গিয়ে বললেন, হ্যা আপনি তো আমাদেরকে অধিক অধিক দানও করেন না এবং আমাদের মাঝে সুবিচারও করেন না। উমার রাগান্বিত হলেন এবং তাকে কিছু একটা করতে উদ্যত হলেন। তখন হুর বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! আল্লাহ তাআলা তো তার নবী (ﷺ)-কে বলেছেন, "ক্ষমা অবলম্বন কর, সৎকাজের আদেশ দাও এবং মূর্খদেরকে উপেক্ষা কর" আর এই ব্যক্তি তো অবশ্যই মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর কসম উমার আয়াতের নির্দেশ অমান্য করেননি। উমার আল্লাহর কিতাবের বিধানের সামনে চুপ হয়ে যেতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আযযুবাইর থেকে বর্ণিত: (আয়াত) "ক্ষমাকে আকড়ে ধর, ন্যায়ের আদেশ দাও..." আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের চরিত্রের সাথে সম্পর্কিত ছাড়া অবতীর্ণ হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তার নবী (ﷺ)-কে মানুষের আচরণের ব্যাপারে ক্ষমা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সাঈদ ইবন জুবায়ের থেকে বর্ণিত: আমি ইবনে আব্বাসকে সূরা আল-আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বলেন, এটি বদরের যুদ্ধের সাথে সাথে নাযিল হয়েছিল।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াত সম্পর্কে: "নিশ্চয়ই! আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী হল বধির ও বোবা--- যারা বোঝে না।" (৮.২২) (এখানে উল্লেখিত লোকেরা) বনী আবদ-আদ্দার গোত্রের কিছু লোক ছিল।
আবূ সাঈদ ইবন মুয়াল্লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা সালাতে রত ছিলাম, এমন সময় রাসূল (ﷺ) আমার পাশ দিয়ে গেলেন এবং আমাকে ডাকলেন। সালাত শেষ না করা পর্যন্ত আমি তার কাছে যাইনি, তারপর গেলাম। তিনি বললেন, তোমাকে আসতে বাধা দিল কিসে? আল্লাহ কি বলেননি "রাসূল তোমাদেরকে ডাকলে, আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দেবে?" তারপর তিনি বললেন, আমি মাসজিদ থেকে বের হবার পূর্বে তোমাকে একটি অতি সওয়াবযুক্ত সূরাহ শিক্ষা দেব। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আমি তার নিকট প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। মুআয বললেন,.... হাফস শুনেছেন একজন সাহাবী আবূ সাঈদ ইবন মু'আল্লাকে এই হাদীস বর্ণনা করতে, রাসূল বললেন-সেই সূরাটি হচ্ছে "'সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর।' (সূরা-আল-ফাতিহা)" সাত আয়াত বিশিষ্ট ও পুনঃ পুনঃ পঠিত।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আবূ জাহল বলেছিল, "হে আল্লাহ! এটা যদি তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয়, তবে আমাদের উপর আকাশ হতে প্রস্তর বর্ষণ কর কিংবা আমাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দাও।" তখনই অবতীর্ণ হল- "আর আল্লাহ তো এরূপ নন যে, তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথচ আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন এবং আল্লাহ এমনও নন যে, তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথচ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর তাদের এমন কী আছে যে জন্য আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না, অথচ তারা মসজিদে হারামে যেতে বাধা প্রদান করে? আর তারা সে মসজিদের তত্ত্বাবধায়কও নয়। তার তত্ত্বাবধায়ক তো মুত্তাকীরা ব্যতীত আর কেউ নয়। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না"- (আনফাল ৮/৩৩-৩৪)।
"হে আল্লাহ! যদি এ কুরআন তোমার পক্ষ থেকে সত্য হয় তাহলে আমাদের উপর আসমান থেকে প্রস্তর বর্ষণ কর অথবা দাও আমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ তো এরূপ নন যে, তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথচ আপনি তাদের মধ্যে থাকবেন এবং আল্লাহ এমনও নন যে, তিনি তাদের শাস্তি দেবেন অথচ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর তাদের এমন কী আছে যে জন্য আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না, অথচ তারা মসজিদে হারামে যেতে বাধা প্রদান করে?"(আনফাল ৮/৩২-৩৪)
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি তার কাছে এসে বলল, হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহ তার কিতাবে যা উল্লেখ করেছেন তা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন না: 'আর যদি মুমিনদের দুটি দল একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ..' (49.9) তাহলে আল্লাহ তার কিতাবে যেভাবে উল্লেখ করেছেন, যুদ্ধ করতে তোমাকে কিসে বাধা দেয়?" ইবনে ওমর বললেন, "হে আমার ভাইয়ের ছেলে! এই আয়াতের কারণে যুদ্ধ না করার জন্য আমি দোষারোপ করার চেয়ে বরং দোষী হতে চাই। অন্য একটি আয়াতের কারণে যেখানে আল্লাহ বলেছেন: 'এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করে...' (4.93) তখন সেই লোকটি বলল, "আল্লাহ বলেন:- 'এবং তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপাসনা করা) আর কোন বিপদ না হয়। দ্বীন (ইবাদত) সবই হবে আল্লাহর জন্য" (8.39) ইবনে ওমর বলেন, "আমরা এটা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় করেছিলাম যখন মুসলমানদের সংখ্যা কম ছিল এবং একজন লোককে হত্যা করা হয়েছিল। তার ধর্মের কারণে বিচার, পৌত্তলিকরা হয় তাকে হত্যা করবে বা শৃঙ্খলিত করবে; কিন্তু যখন মুসলমানরা বৃদ্ধি পেল (এবং ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল), তখন কোন অত্যাচার হয়নি।" যখন সে লোকটি দেখল যে ইবনে উমর তার প্রস্তাবে রাজি নন, তখন তিনি বললেন, "আলী ও উসমানের ব্যাপারে তোমার মতামত কি?" ইবনে ওমর বললেন, আলী ও উসমানের ব্যাপারে আমার মতামত কি? উসমানের ব্যাপারে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছেন এবং আপনি তাকে ক্ষমা করা অপছন্দ করেছেন এবং আলী হলেন আল্লাহর রসূল (ﷺ) এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। " অতঃপর তিনি হাতের ইশারা করে বললেন, "আর এটা তার মেয়ের (বাড়ি) যা তুমি দেখতে পাচ্ছো।"
সাঈদ ইবন জুবায়ের থেকে বর্ণিত: ইবন উমর আমাদের কাছে আসলেন এবং এক ব্যক্তি (তাকে) বললেন, 'কিত-আলাল-ফিতনাহ' (দুঃখের কারণে সৃষ্ট যুদ্ধ) সম্পর্কে আপনি কী মনে করেন? ইবনে উমর (তাকে) বললেন, "এবং তুমি কি বোঝো যে কষ্ট কি? মুহাম্মাদ পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন, এবং তাদের সাথে তার যুদ্ধ ছিল একটি কষ্ট, (এবং তার লড়াই) তোমার যুদ্ধের মত ছিল না যা চলছে। শাসনের স্বার্থে।"
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: যখন আয়াত: "তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন অবিচল থাকে, তবে তারা দুইশতকে অতিক্রম করবে।" (৮.৬৫) অবতীর্ণ হয়, তখন মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায় যে, একজন (মুসলিম) দশজন (অমুসলিম) থেকে পলায়ন করবে না। সুফিয়ান (উপ-বর্ণনাকারী) একবার বলেছিলেন, "দুইশ (অমুসলিম) আগে বিশজন (মুসলিম) পলায়ন করা উচিত নয়। অতঃপর নাযিল হয়: 'কিন্তু এখন আল্লাহ আপনার (কাজকে) হালকা করে দিয়েছেন।' (৮.৬৬) তাই বাধ্যতামূলক হয়ে গেল যে, একশত (মুসলিম) যেন দুইশ'র (অমুসলিম) আগে পলায়ন না করে। (একবার সুফিয়ান অতিরিক্ত বলেছিল, "আয়াত: 'মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ কর। যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন (মুসলিম) অবিচল থাকে ..' নাজিল হয়েছিল।) সুফিয়ান বলেন, "ইবনে শাবরামা বলেছেন, "আমি দেখতে পাচ্ছি যে এই আদেশটি ভালোর আদেশ এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করার বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।"
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: যখন আয়াতঃ 'তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন অবিচল থাকে, তবে তারা দুইশত (অমুসলিমকে) জয়ী করবে।' অবতীর্ণ হয়, মুসলমানদের উপর এটা কঠিন হয়ে পড়ে যখন এটা বাধ্যতামূলক হয়ে যায় যে একজন মুসলমানের দশজন (অমুসলিম) আগে (যুদ্ধে) পলায়ন করা উচিত নয়। সুতরাং (আল্লাহ) প্রকাশের মাধ্যমে আদেশটি হালকা করেছেন: '(কিন্তু) এখন আল্লাহ আপনার (কাজ) হালকা করেছেন কারণ তিনি জানেন যে আপনার মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে। সুতরাং যদি তোমাদের মধ্যে একশত অবিচল থাকে, তবে তারা (দুইশত (অমুসলিমদের) জয়ী হবে।' (8.66) সুতরাং যখন আল্লাহ মুসলমানদের প্রতিরোধ করা শত্রুদের সংখ্যা কমিয়ে দিলেন, তখন শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের ধৈর্য ও অধ্যবসায় কমে গেল। যতটা তাদের কাজ তাদের জন্য হালকা করা হয়েছিল।
আল-বারা বর্ণনা করেছেন: সর্বশেষ যে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল তা ছিল: 'তারা আপনার কাছে একটি আইনী রায় চায়: বলুন: আল্লাহ আল-কালালাহ (যারা উত্তরাধিকারী হিসাবে কোন বংশধর বা বংশধরদের রেখে যান না) সম্পর্কে (এভাবে) নির্দেশ দেন।' আর সর্বশেষ যে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে তা হল বারাতুন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর নবম হিজরীর হাজ্জে আমাকে এ আদেশ দিয়ে পাঠিয়ে দেন যে, আমি কুরবানীর দিন ঘোষণাকারীদের সঙ্গে মিনায় (সমবেত লোকদের) এ ঘোষণা করে দেই যে, এ বছরের পর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। আল্লাহর ঘর নগ্নদেহে তাওয়াফ করবে না। হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী-কে পুনরায় এ নির্দেশ দিয়ে প্রেরণ করলেন যে, তুমি সূরায়ে বারাআতের বিধানসমূহ ঘোষণা করে দাও। আবূ হুরাইরাহ বলেন, মীনায় অবস্থানকারীদের মাঝে (কুরবানীর পর) আলী আমাদের সঙ্গে ছিলেন এবং সূরায়ে বারাআতের বিধানসমূহ ঘোষণা করলেন, এ বছরের পর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। কেউ নগ্ন অবস্থায় ঘর তওয়াফ করবে না।
আবূ হুরাইরাহ বলেন, আবূ বাকর আমাকে সে কুরবানীর দিন ঘোষণাকারীদের সঙ্গে মিনায় এ (কথা) ঘোষণা করার জন্য পাঠালেন যে, এ বছরের পরে আর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না। আল্লাহর ঘর নগ্ন অবস্থায় কাউকে তওয়াফ করতে দেয়া হবে না। হুমাইদ বলেন, নবী (ﷺ) পরে পুনরায় আলী ইবন আবূ তালিবকে পাঠালেন এবং বললেনঃ সূরায়ে বারাআতের নির্দেশাবলী ঘোষণা করে দাও। আবূ হুরাইরাহ বলেন, আলী আমাদের সঙ্গেই মীনাবাসীদের মধ্যে সূরায়ে বারাআত কুরবানীর দিন ঘোষণা করলেন- এ বছরের পরে কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না এবং নগ্নদেহে আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করবে না।
ইসহাক ..... আবূ হুরাইরাহ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হাজ্জের পূর্বের বছর আবূ বাকর-কে যে হাজ্জের আমীর বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সেই হাজ্জে তিনি যেন লোকেদের মধ্যে ঘোষণা দেন, এ বছরের পর কোন মুশরিক হাজ্জ করতে পারবে না এবং নগ্নদেহে কেউ আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না। হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান বলেন, [আবূ হুরাইরাহ]'র হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, হাজ্জুল আকবারের দিন হল কুরবানীর দিন।
যায়দ ইবন ওয়াহ্ব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা হুযাইফাহ-এর কাছে ছিলাম, তখন তিনি বলেন, এ আয়াতের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু তিনজন মুসলিম এবং চারজন মুনাফিক বেচে আছে। এমন সময় একজন বেদুঈন বলেন, আপনারা সকলে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবী। আমাদের এমন লোকদের অবস্থা সম্পর্কে খবর দিন যারা আমাদের ঘরে সিঁদ কেটে ঘরের অতি মূল্যবান জিনিসগুলো চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, কেননা তাদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা জানি না। হুযাইফাহ বলেন, তারা সবাই ফাসিক। হ্যা, তাদের মধ্য হতে চার ব্যক্তি এখনও জীবিত-তাদের মধ্যে একজন এতই বৃদ্ধ যে, শীতল পানি পান করার পর তার শীতলতা অনুভব করতে পারে না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, তোমাদের মধ্যে কারো জমাকৃত সম্পদ (যার যাকাত আদায় করা হয় না) কিয়ামতের দিন বিষাক্ত সর্পের রূপ ধারণ করবে।
যায়েদ ইবন ওয়াহব থেকে বর্ণিত: আমি আর-রাবাদায় আবু যারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং তাকে বললাম, কিসে তোমাকে এই দেশে নিয়ে এসেছে? তিনি বলেন, আমরা শামে ছিলাম এবং আমি আয়াতটি পড়লাম: "যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না; তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সংবাদ দাও, " (9.34) যেখানে মুয়াবিয়া বলেন, 'এই আয়াতটি আমাদের জন্য নয়, কিতাবধারীদের জন্য।' তখন আমি বললাম, 'কিন্তু এটা আমাদের (মুসলিম) এবং তাদের উভয়ের জন্য।' "
খালিদ ইবন আসলাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর সঙ্গে বের হলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতটি যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বের। এরপর যাকাতের বিধান অবতীর্ণ হলে আল্লাহ তা সম্পদের পরিশুদ্ধকারী করেন।
আবূ বাকর কর্তৃক নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেন সেদিন যেভাবে যামানা ছিল তা আজও তেমনি আছে। বারমাসে এক বছর, তার মধ্যে চার মাস পবিত্র। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকাদ, যিলহাজ্জ ও মুহার্রম আর মুযার গোত্রের রাজব যা জামাদিউসসানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর আমার কাছে বলেছেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে (সওর) গুহায় ছিলাম। তখন আমি মুশরিকদের পদচিহ্ন দেখতে পেয়ে [নবী (ﷺ)-কে] বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি তাদের কেউ পা উঠায় তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে। তখন তিনি বললেন, এমন দু'জন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় জন হলেন আল্লাহ।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন তার ও ইবন যুবায়র-এর মধ্যে (বাইআত নিয়ে) মতভেদ ঘটল, তখন আমি বললাম, তার পিতা যুবায়র, তার মাতা আসমা ও তার খালা আয়িশাহ, তার নানা আবূ বাকর ও তার নানী সুফিয়া।
ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন ইবন আব্বাস ও ইবন যুবায়র-এর মধ্যে বাই'আত নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হল, তখন আমি ইবন আব্বাসের কাছে গিয়ে বললাম, আপনি কি আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা হালাল করে ইবন যুবায়রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান? তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে পানাহ্ চাচ্ছি, এ কাজ তো ইবন যুবায়র ও বানী উমাইয়াহর জন্যই আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। আল্লাহর কসম! কখনও তা আমি হালাল মনে করব না, (আবূ মুলাইকাহ বলেন) তখন লোকজন ইবন আব্বাস-কে বলল, আপনি ইবন যুবায়রের পক্ষে বাই'আত গ্রহণ করুন। তখন ইবন আব্বাস বললেন, তাতে ক্ষতির কী আছে? তিনি এটার জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। তার পিতা যুবায়র তো নবী (ﷺ)-এর সাহায্যকারী ছিলেন, তার নানা আবূ বাকর নবী (ﷺ)-এর সওর গুহার সঙ্গী ছিলেন। তার মা আসমা, যার উপাধি ছিল যাতুন নেতাক। তার খালা আয়িশাহ ছিলেন, তার ফুফু খাদীজাহ রাসূল (ﷺ)-এর স্ত্রী ছিলেন, আর রাসূল (ﷺ)-এর ফুফু সফীয়্যাহ ছিলেন তার দাদী। এ ব্যতীত তিনি (ইবন যুবায়র) তো ইসলামী জগতে নিষ্কলুষ ব্যক্তি ও কুরআনের ক্বারী। আল্লাহর কসম! যদি তারা (বানী উমাইয়াহ) আমার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে তবে তারা আমার নিকটাত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখল। আর যদি তারা আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করে তবে তারা সমকক্ষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরই রক্ষণাবেক্ষণ করল। ইবন যুবায়র, বানী আসাদ, বানী তুয়াইত, বানী উসামা-এসব গোত্রকে আমার চেয়ে নিকটতম করে নিয়েছেন। নিশ্চই আবিল আস্-এর পুত্র আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান অহঙ্কারী চালচলন আরম্ভ করেছে। নিশ্চই তিনি আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র তার লেজ গুটিয়ে নিয়েছেন।
ইবন আবূ মুলাইকাহ বলেন, আমরা ইবন আব্বাস-এর ঘরে প্রবেশ করলাম। তিনি বললেন, তোমরা কি ইবন যুবায়রের বিষয়ে বিস্মিত হবে না? তিনি তো তার এ কাজে (খিলাফতের কাজে) দাড়িয়েছেন। [ইবন আব্বাস বলেন] আমি বললাম, আমি অবশ্য মনে মনে তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করি, কিন্তু আবূ বাকর কিংবা উমার-এর ব্যাপারে এতটুকু চিন্তা-ভাবনা করিনি। সব দিক থেকে তার চেয়ে তারা উভয়ে উত্তম ছিলেন। আমি বললাম, তিনি নবী (ﷺ)-এর ফুফু সফীয়্যাহ -এর সন্তান, যুবায়রের ছেলে, আবূ বাকর-এর নাতি। খাদীজাহ-এর ভাতিজা, আয়িশাহ-এর বোন আসমার ছেলে। কিন্তু তিনি (নিজেকে বড় মনে করে) আমার থেকে দূরে সরে থাকেন এবং তিনি আমার সহযোগিতা কামনা করেন না। আমি বললাম, আমি নিজে থেকে এজন্য তা প্রকাশ করি না যে, হয়ত তিনি তা প্রত্যাখ্যান করবেন এবং আমি মনে করি না যে, তিনি এটা ভাল করছেন। কারণ অন্য কোন ব্যক্তি দেশের শাসক হওয়ার চেয়ে আমার চাচার ছেলে আমার আপনজন শাসক হওয়া আমার নিকট উত্তম।
আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর কাছে কিছু জিনিস প্রেরণ করা হল। এরপর তিনি সেগুলো চারজনের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আর বললেন, তাদেরকে (এর দ্বারা) আকৃষ্ট করছি। তখন এক ব্যক্তি বলল, আপনি সুবিচার করেননি। (এটা শুনে নবী (ﷺ)) বললেন, এ ব্যক্তির বংশ থেকে এমন সব লোক জন্ম নেবে যারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে।
আবূ মাস'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আমাদের সদাকাহ দানের আদেশ দেয়া হল, তখন আমরা মজুরীর বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। একদিন আবূ 'আকীল অর্ধ সা' খেজুর (দান করার উদ্দেশে) নিয়ে আসলেন এবং অন্য এক ব্যক্তি (আবদুর রহমান ইবন 'আওফ) তার চেয়ে অধিক মালামাল নিয়ে উপস্থিত হলেন। মুনাফিকরা বলতে লাগল, আল্লাহ এ ব্যক্তির সদাকাহর মুখাপেক্ষী নন। আর দ্বিতীয় ব্যক্তি [আবদুর রহমান ইবন 'আওফ] শুধু মানুষ দেখানোর জন্য অধিক মালামাল দান করেছে। এ সময় এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়- "মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদাকাহ দেয় এবং যারা নিজেদের পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ব্যতীত ব্যয় করার কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তাদের বিদ্রূপ করেন। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি"- (বারাআত ৯/৭৯)।
আবূ মাসঊদ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সদাকাহ করার নির্দেশ দিলে আমাদের মধ্য হতে কেউ কেউ অত্যন্ত পরিশ্রম করে, (গম অথবা খেজুর ইত্যাদি) এক মুদ্দ আনতে পারত কিন্তু এখন আমাদের মধ্যে কারো কারো এক লাখ পরিমাণ (দিরহাম) রয়েছে। আবূ মাসঊদ যেন (এ কথা বলে) নিজের দিকে ইশারা করলেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই মারা গেল, তখন তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকটে আসলেন এবং তার পিতাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জামাটি দিয়ে কাফন দেবার আবেদন করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জামা প্রদান করলেন, এরপর তিনি জানাযার সালাত আদায়ের জন্য নবী (ﷺ)-এর কাছে আবেদন জানালেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জানাযার সালাত পড়ানোর জন্য (বসা থেকে) উঠে দাড়ালেন, ইত্যবসরে উমার রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাপড় টেনে ধরে আবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি তার জানাযার সালাত আদায় করতে যাচ্ছেন? অথচ আপনার রব আপনাকে তার জন্য দোয়া করতে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আমাকে (দোয়া) করা বা না করার সুযোগ দিয়েছেন। আর আল্লাহ তো ইরশাদ করেছেন, "তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না কর; যদি সত্তরবারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর তবু আমি তাদের ক্ষমা করব না"। সুতরাং আমি তার জন্য সত্তরবারের চেয়েও বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করব। উমার বললেন, সে তো মুনাফিক, শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন, এরপর এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। "তাদের (মুনাফিকদের) কেউ মারা গেলে আপনি কক্ষনো তাদের জানাযার সালাত আদায় করবেন না এবং তাদের কবরের কাছেও দাড়াবেন না।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল মারা গেল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার জানাযাহর সালাত আদায়ের জন্য আহবান করা হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন (জানাযার জন্য) উঠে দাড়ালেন, আমি তার কাছে গিয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ইবন উবাই-এর জানাযার সালাত পড়াবেন? অথচ সে লোক অমুক দিন অমুক অমুক কথা বলেছে। উমার ইবন খাত্তাব বলেন, আমি তার কথাগুলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে এক একটি করে উল্লেখ করছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুচকি হাসি দিয়ে আমাকে বললেন, হে উমার! আমাকে যেতে দাও। আমি বারবার বলাতে তিনি বললেন, আল্লাহ আমাকে করা বা না করার অবকাশ দিয়েছেন। আমি তা গ্রহণ করেছি। আমি যদি জানতে পারি যে, সত্তরবারের চেয়েও বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেবেন, তবে আমি সত্তরবারের অধিক ক্ষমা প্রার্থনা করব। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জানাযার সালাত আদায় করলেন এবং (জানাযাহ) থেকে ফিরে আসার পরই সূরাহ বারাআতের এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, "তাদের কেউ মারা গেলে কখনও তার জানাযাহর সালাত আদায় করবে না। এরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অবিশ্বাস করেছে এবং ফাসিক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। (বারাআত ৯/৮৪) উমার বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে আমার এ দুঃসাহসের জন্য পরে আমি আশ্চর্য হতাম। বস্তুতঃ আল্লাহ ও তার রাসূল অধিক জ্ঞাত।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন (মুনাফিক) আবদুল্লাহ ইবন উবাই মারা গেল, তখন তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আসলেন। তিনি [নবী (ﷺ)] তার নিজ জামাটি তাকে দিয়ে দিলেন এবং এর দ্বারা তার পিতার কাফনের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ দিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জানাযার সালাত আদায়ের জন্য উঠে দাড়ালেন। তখন উমার ইবন খাত্তাব রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাপড় ধরে নিবেদন করলেন, [হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)] আপনি কি তার (আবদুল্লাহ ইবন উবাই)-এর জানাযাহর সালাত আদায় করবেন? সে তো মুনাফিক, অথচ আল্লাহ তাআলা তাদের (মুনাফিকদের) জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে আপনাকে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, (হে উমার!) আল্লাহ আমাকে করা বা না করার অবকাশ দিয়েছেন, অথবা বলেছেন, আল্লাহ আমাকে অবহিত করেছেন এবং বলেছেন, "আপনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন অথবা নাই করেন (উভয়ই সমান)। যদি আপনি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবুও আল্লাহ তাদেরকে কখনই ক্ষমা করবেন না।" (বারাআত ৯/৮০) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আমি সত্তরবারের চেয়েও অধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করব। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জানাযাহর সালাত আদায় করলেন। আমরাও তার সঙ্গে জানাযাহর সালাত আদায় করলাম। এরপর এ আয়াত অবতীর্ণ হল, "তাদের (মুনাফিকদের) কেউ মারা গেলে আপনি তার জানাযাহর সালাত কখনও আদায় করবেন না এবং তার কবরের পার্শ্বে দাড়াবেন না। তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং ফাসিক অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে"- (বারাআত ৯/৮৪)।
আবদুল্লাহ ইবন কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক-কে বলতে শুনেছি, তিনি যখন তাবূকের যুদ্ধে পিছনে রয়ে গেলেন, আল্লাহর কসম! তখন আল্লাহ আমাকে এমন এক নিয়ামত দান করেন যে মুসলিম হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এত বড় নিয়ামত পাইনি। তা হল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে সত্য কথা প্রকাশ করা। আমি তার কাছে মিথ্যা বলিনি। যদি মিথ্যা বলতাম, তবে অন্যান্য (মুনাফিক ও) মিথ্যাচারী যেভাবে ধ্বংস হয়েছে, আমিও সেভাবে ধ্বংস হয়ে যেতাম। যে সময় ওয়াহী অবতীর্ণ হল- "তারা তোমাদের সামনে কসম করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি রাজি হও। যদি তোমরা তাদের প্রতি রাজি হয়ে যাও তবুও আল্লাহ এসব ফাসিক লোকদের প্রতি রাজি হবেন না"- (বারাআত ৯/৯৬)।
সামূরাহ্ ইবন জুনদুব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের বলেছেন, রাতে দু'জন ফেরেশতা এসে আমাকে নিদ্রা থেকে জাগ্রত করলেন। এরপর আমরা এমন এক শহরে পৌছলাম, যা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ইট দ্বারা নির্মিত। সেখানে এমন কিছু সংখ্যক লোকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটল, যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুশ্রী যা তোমরা কখনও দেখনি এবং আর এক অর্ধেক এত কুৎসিত যা তোমরা কখনও দেখনি। ফেরেশতা দু'জন তাদেরকে বললেন, তোমরা ঐ নহরে গিয়ে ডুব দাও। তারা সেখানে গিয়ে ডুব দিয়ে আমাদের নিকট ফিরে আসল। তখন তাদের বিশ্রী চেহারা সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেল এবং তারা সুশ্রী চেহারা লাভ করল। ফেরেশতাদ্বয় আমাকে বললেন, এটা হল 'জান্নাতে আদন' এটাই হল আপনার আসল ঠিকানা। ফেরেশতাদ্বয় বললেন, (আপনি) যেসব লোকের দেহের অর্ধেক সুশ্রী এবং অর্ধেক বিশ্রী (দেখেছেন), তারা ঐ সকল লোক যারা দুনিয়াতে সৎকর্মের সঙ্গে অসৎকর্ম মিশিয়ে ফেলেছে। আল্লাহ তাআলা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।
সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব তার পিতা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে নবী (ﷺ) তার কাছে গেলেন। এ সময় আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবন আবূ উমাইয়াহ্ও সেখানে বসা ছিল। নবী (ﷺ) বললেন, হে চাচা! আপনি পড়ুন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আপনার মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এটা দলীল হিসেবে পেশ করব। এ কথা শুনে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়াহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করে দিবে? নবী (ﷺ) বললেন, হে চাচা! আমি আপনার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ ক্ষমা চাইতে থাকব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- "নবী ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয় যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামী।" ( বারাআত ৯/১১৩)
আবদুল্লাহ ইবনে কা'ব থেকে বর্ণিত: আমি কাব ইবন মালিককে এই আয়াত সম্পর্কে বলতে শুনেছি: 'এবং পিছনে থাকা তিনজনকে (তিনি ক্ষমাও করেছেন)।' (9.118) তার বক্তৃতার শেষ অংশে বলেছেন, "(আমি বললাম) 'আমার তওবার (চিহ্ন) অংশ হিসাবে, আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহ ও তার রসূলের পথে ত্যাগ করতে চাই,' নবী সা. (ﷺ) আমাকে বললেন, তোমার সম্পদের কিছু রেখে দাও, কারণ তা তোমার জন্য মঙ্গলজনক। (তিনজনকে (তিনি ক্ষমাও করেছিলেন) যারা পিছনে থেকেছিল যতক্ষণ না তাদের জন্য পৃথিবী, যেমন বিশাল, সংকীর্ণ ছিল..." (9.118)
আবদুর রহমান ইবন আবদুল্লাহ ইবন কা'ব ইবন মালিক তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি আমার পিতা কা'ব ইবন মালিক থেকে শুনেছি, যে তিনজনের তওবা কবূল হয়েছিল, তার মধ্যে তিনি একজন। তিনি বদরের যুদ্ধ ও তাবূকের যুদ্ধ এ দু'টি ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর থেকে পশ্চাতে থাকেননি। কা'ব ইবন মালিক বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবূক যুদ্ধ হতে সূর্যোদয়ের সময় মদিনায় ফিরে আসলে আমি (মিথ্যার পরিবর্তে) সত্য প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলাম। তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] যে কোন সফর হতে সাধারণত সূর্যোদয়ের সময় ফিরে আসতেন এবং সর্বপ্রথম মসজিদে গিয়ে দু'রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন। (তাবূকের যুদ্ধ থেকে এসে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার সঙ্গে এবং আমার সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন, অথচ আমাদের ব্যতীত অন্য যারা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত ছিল, তাদের সঙ্গে কথা বলায় কোন প্রকার বাধা প্রদান করলেন না। সুতরাং লোকেরা আমাদের সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে লাগলেন। আমার কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল যে, যদি এ অবস্থায় আমার মৃত্যু এসে যায়, আর নবী (ﷺ) আমার জানাযাহর সালাত আদায় না করেন, অথবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাত হলে আমি মানুষের কাছে এই অবস্থায় থেকে যাব তারা কেউ আমার সঙ্গে কথাও বলবে না, আর আমার জানাযার সালাতও আদায় করবে না। এরপর (পঞ্চাশ দিন পর) আল্লাহ তাআলা আমার তওবা কবূল করে তার [নবী (ﷺ)-এর] প্রতি আয়াত অবতীর্ণ করেন। তখন রাতের শেষ-তৃতীয়াংশ বাকী ছিল। সে রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উম্মু সালামাহ-এর কাছে ছিলেন, উম্মু সালামাহ আমার প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে উম্মু সালামাহ! কা'বের তওবা কবূল করা হয়েছে। উম্মু সালামাহ বললেন, তাকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য কাউকে তার কাছে পাঠাব? নবী (ﷺ) বললেন, এখন খবর পেলে সব লোক এসে জমা হয়ে যাবে। তারা তোমাদের ঘুম নষ্ট করে দিবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ফজরের সালাত আদায়ের পর আমাদের তওবা কবূল হওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারা খুশীতে এমন চমকাচ্ছিল যেন চাঁদের টুকরা। যেসব মুনাফিক মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসন্তুষ্টি থেকে] রেহাই পেয়েছিল, তাদের চেয়ে তওবা কবূলের ব্যাপারে আমরা তিনজন পিছনে পড়ে গিয়েছিলাম, এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদের তওবা কবূল করে আয়াত অবতীর্ণ করেন। (তাবূকের যুদ্ধে) অনুপস্থিতদের মধ্যে যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে মিথ্যা কথা বলেছে এবং যারা মিথ্যা অজুহাত দেখিয়েছে তাদের জঘন্যভাবে নিন্দাবাদ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "তারা তোমাদের কাছে ওযর পেশ করবে যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে আসবে। আপনি বলে দিনঃ তোমরা ওযর পেশ করো না, আমরা কখনও তোমাদের বিশ্বাস করব না; আল্লাহ তো আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন তোমাদের খবর; আর ভবিষ্যতেও আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য রাখবেন এবং তার রাসূলও"- (বারাআত ৯/৯৪)।
আবদুল্লাহ ইবন কা'ব ইবন মালিক হতে বর্ণিত। যিনি কা'ব ইবন মালিক (দৃষ্টিহীন হওয়ার পরে)-এর পথপ্রদর্শক হিসেবে ছিলেন। তিনি (আবদুল্লাহ) বলেন, আমি কা'ব ইবন মালিক-কে, তাবূক যুদ্ধে যারা পশ্চাতে থেকে গিয়েছিলেন তাদের ঘটনা বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আল্লাহর কসম! হয়ত আল্লাহ (রাসূলুল্লাহর কাছে) সত্য কথা প্রকাশের কারণে, অন্য কাউকে এত বড় সুন্দর পরীক্ষা করেননি যতটুকু আমাকে পরীক্ষা করেছেন। যখন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে তাবূক যুদ্ধে না যাওয়ার সঠিক কারণ বর্ণনা করেছি তখন থেকে আজ পর্যন্ত মিথ্যা বলার ইচ্ছাও করিনি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর এ আয়াতটি নাযিল করেন "আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি ........ এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।" (বারাআত ৯/১১৭-১১৯)
যায়েদ ইবন সাবিত আল-আনসারী থেকে বর্ণিত: যিনি ঐশী ওহী লিখতেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন: ইয়ামামার (যেখানে প্রচুর সংখ্যক কুররা নিহত হয়েছিল) যোদ্ধাদের (যুদ্ধে) (ভারী) হতাহত হওয়ার পরে আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। উমর আবু বকরের কাছে উপস্থিত ছিলেন, তিনি বললেন, উমর আমার কাছে এসে বলেছেন, ইয়ামামার যুদ্ধের দিন লোকদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আমি আশঙ্কা করছি যে কুররার মধ্যে আরও বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটবে। (যারা কোরানকে হৃদয় দিয়ে জানে) অন্যান্য যুদ্ধের ময়দানে, যেখানে কোরানের একটি বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে, যদি না আপনি এটি সংগ্রহ করেন। আর আমি এই মত পোষণ করি যে আপনার কুরআন সংগ্রহ করা উচিত।" আবু বকর যোগ করেন, "আমি উমরকে বললাম, 'আমি কীভাবে এমন কিছু করতে পারি যা আল্লাহর রসূল করেননি?' 'উমর (আমাকে) বললেন, 'আল্লাহর কসম, এটা (সত্যিই) ভালো জিনিস।' তাই উমর চাপ দিতে থাকলেন, তার প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য আমাকে রাজি করার চেষ্টা করছেন, যতক্ষণ না আল্লাহ তার জন্য আমার বক্ষ খুলে দিলেন এবং আমি উমরের মতই মত পোষণ করলাম। "আপনি একজন জ্ঞানী যুবক এবং আমরা আপনাকে (মিথ্যা বলা বা ভুলে যাওয়া সম্পর্কে) সন্দেহ করি না) এবং আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর জন্য ঐশ্বরিক প্রেরণা লিখতেন। অতএব, কুরআন সন্ধান করুন এবং এটি সংগ্রহ করুন (একটি পাণ্ডুলিপিতে)। "আল্লাহর কসম, যদি তিনি (আবু বকর) আমাকে একটি পাহাড় (তার স্থান থেকে) সরানোর নির্দেশ দিতেন তবে এটি আমার জন্য কুরআন সংগ্রহের বিষয়ে আমাকে যে আদেশ দিয়েছিলেন তার চেয়ে কঠিন ছিল না। আমি বললাম তারা উভয়ে, "আপনি এমন একটি কাজ করার সাহস কিভাবে করেন যা নবী করেননি?" আবু বকর বললেন, "আল্লাহর কসম, এটি (সত্যিই) একটি ভাল কাজ। অতঃপর আমি তার সাথে এ নিয়ে তর্ক করতে থাকলাম যতক্ষণ না আল্লাহ আমার বক্ষ খুলে দিলেন তার জন্য যা তিনি আবু বকর ও উমরের বক্ষ খুলে দিয়েছিলেন। তাই আমি কোরআনের উপাদান খুজে বের করতে শুরু করি এবং পার্চমেন্ট, স্ক্যাপুলা, খেজুরের পাতার ডালপালা এবং পুরুষদের স্মৃতি থেকে সংগ্রহ করতে শুরু করি (যারা এটি হৃদয় দিয়ে জানত)। আমি খুজাইমার সাথে সূরা-আত-তাওবার দুটি আয়াত পেয়েছি যা আমি অন্য কারো কাছে পাইনি, (এবং সেগুলো ছিল):- "নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে একজন রসূল (মুহাম্মদ) এসেছেন, এটি তাকে দুঃখ দেয়। যাতে তোমাদের কোন আঘাত বা অসুবিধা হয়, তিনি (মুহাম্মদ) তোমাদের (সঠিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য) প্রবলভাবে উদ্বিগ্ন।" (9.128) যে পাণ্ডুলিপিতে কোরান সংগৃহীত হয়েছিল, তা আবু বকরের কাছেই ছিল যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে তার কাছে নিয়ে যান এবং অতঃপর উমরের সাথে যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে তার কাছে নিয়ে যান এবং অবশেষে উমরের কন্যা হাফসার কাছেই রইল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনা্তে এলেন, তখন ইয়াহূদীগণ আশুরার দিন সওম পালন করত। তারা জানাল, এ দিন মূসা ফিরাউন-এর উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। তখন নবী (ﷺ) তার সাহাবীদের বললেন, মূসা-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে তাদের চেয়ে তোমরাই অধিক হাকদার। কাজেই তোমরা সওম পালন কর।
মুহাম্মাদ ইবন আব্বাদ ইবন জাফর হতে বর্ণিত। তিনি ইবন আব্বাস-কে এমনিভাবে পড়তে শুনেছেন, "এরা নিজেদের বুক ঘুরিয়ে নেয় যাতে তারা তার [আল্লাহর] থেকে লুকিয়ে থাকতে পারে।" মুহাম্মাদ ইবন 'আব্বাদ বলেন, আমি তাকে এর অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, কিছু লোক উন্মুক্ত আকাশের দিকে নগ্ন হওয়ার ভয়ে পেশাব-পায়খানা অথবা স্ত্রী সহবাস করতে লজ্জা করতে লাগল। তখন তাদের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হয়।
মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ইবনে জাফর থেকে বর্ণিত: ইবনে আব্বাস তিলাওয়াত করলেন। "এরা নিজেদের বুক ঘুরিয়ে নেয়.." আমি বললাম, হে আবূ আব্বাস! এরা নিজেদের বুক ঘুরিয়ে নেয়.. এর অর্থ কি? তিনি বললেন, "একজন লোক তার স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক করতে বা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে লজ্জাবোধ করত (উন্মুক্ত স্থানে) তাই এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়:- "এরা নিজেদের বুক ঘুরিয়ে নেয়.."
আমর থেকে বর্ণিত: ইবনে আব্বাস তেলাওয়াত করেছেন:- "এরা নিজেদের বুক ঘুরিয়ে নেয় যাতে তারা তার [আল্লাহর] থেকে লুকিয়ে থাকতে পারে।" (11.5)
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহ বলেছেন, 'ব্যয় কর, আমি তোমার জন্য ব্যয় করব। তিনি আরও বলেন, "আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ, এবং (এর পূর্ণতা) ক্রমাগত রাত-দিন অতিবাহিত করার দ্বারা প্রভাবিত হয় না।" তিনি আরও বললেন, "তুমি কি দেখছ, তিনি আসমান ও পৃথিবী সৃষ্টি করার পর থেকে তিনি কী ব্যয় করেছেন? তবুও, তার হাতে যা আছে তা হ্রাস পায় না, এবং তার সিংহাসন জলের উপর ছিল; এবং তার হাতে রয়েছে ভারসাম্য (এর) ন্যায়বিচার) যার দ্বারা তিনি (মানুষকে) উত্থাপন করেন এবং নত করেন।
সফওয়ান ইবন মুহরিয হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা ইবন উমার তাওয়াফ করছিলেন। হঠাৎ এক ব্যক্তি তার সম্মুখে এসে বলল, হে আবূ আবদুর রহমান অথবা বলল, হে ইবন উমার! আপনি কি নবী (ﷺ) থেকে (কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা এবং মুমিনদের মধ্যকার) গোপন আলোচনা সম্পর্কে কিছু শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, (কিয়ামতের দিন) মুমিনকে তার নৈকট্য দান করা হবে। হিশাম বলেন, মুমিন নিকটবর্তী হবে, এমনকি আল্লাহ তাআলা তাকে স্বীয় পর্দায় ঢেকে নেবেন এবং তার নিকট হতে তার গুনাহসমূহের স্বীকারোক্তি নেবেন। (আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন) অমুক গুনাহ সম্পর্কে তুমি জান কি? বান্দা বলবে, হে আমার রব! আমি জানি, আমি জানি। এভাবে দু'বার বলবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি দুনিয়ায় তোমার পাপ গোপন রেখেছিলাম। আর আজ তোমার সে পাপ ক্ষমা করে দিচ্ছি। তারপর তার নেক আমলনামা গুটিয়ে নেয়া হবে। আর অন্যদলকে অথবা (রাবী বলেছেন) কাফিরদের সকলের সামনে ডেকে বলা হবে, এরাই সে লোক যারা আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল।
আবূ মূসা আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যালিমদের ঢিল দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন তাকে ধরেন, তখন আর ছাড়েন না। (বর্ণনাকারী বলেন) এরপর তিনি [নবী (ﷺ)] এ আয়াত পাঠ করেন- "আর এরকমই বটে আপনার রবের পাকড়াও, যখন তিনি কোন জনপদবাসীকে পাকড়াও করেন তাদের জুলুমের দরুন। নিঃসন্দেহে তার পাকড়াও বড় যন্ত্রণাদায়ক, অত্যন্ত কঠিন"- (হূদ ১১/১০২)।
ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক ব্যক্তি এক মহিলাকে চুমু দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে এ ঘটনা বললেন, তখন (এ ঘটনা উপলক্ষে) এ আয়াত নাযিল হয়। -"সালাত কায়িম করবে দিনের দু' প্রান্তে এবং রাতের প্রথমভাগে। পুণ্য অবশ্যই মুছে ফেলে বদ কাজ। যারা নাসীহাত গ্রহণ করে তাদের জন্য এটি এক নাসীহাত"- (হূদ ১১/১১৪)। তখন সে লোকটি বলল, এ নির্দেশ কি কেবল আমার জন্য? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমার উম্মাতের যেই এর আমল করবে তার জন্য।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ সম্মানিত ব্যক্তির পুত্র সম্মানিত এবং তার পিতাও সম্মানিত ব্যক্তির পুত্র সম্মানিত। তিনি হলেন ইউসুফ যার পিতা ইয়াকুব, যার পিতা ইসহাক যার পিতা ইব্রাহীম।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি বেশি সম্মানিত? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে সে-ই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত, যে তাদের মধ্যে সবচাইতে অধিক আল্লাহভীরু। লোকেরা বলল, আমরা এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হলেন আল্লাহর নবী ইউসুফ । তিনি নবীর পুত্র, (তার পিতাও) নবীর পুত্র এবং (তার পিতার পিতা) খালীলুল্লাহ্-এর পুত্র। লোকেরা বলল, আপনাকে আমরা এ ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি। তিনি বললেন, সম্ভবত তোমরা আরব বংশ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করেছ। তারা বলল, হ্যা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যারা জাহিলিয়্যাতে তোমাদের মাঝে উত্তম ছিল, ইসলামেও তারা উত্তম যদি তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানের অধিকারী হয়।
আয-যুহরি থেকে বর্ণিত: উরওয়া ইবন আয-যুবায়ের, সাঈদ ইবন আল-মুসাইয়্যাব, আল-কামা ইবন ওয়াক্কাস এবং উবায়দুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ নবীর স্ত্রী আয়েশার বর্ণনা বর্ণনা করেছেন, যখন নিন্দুকেরা তার সম্পর্কে যা বলেছিল তা বলেছিল। এবং আল্লাহ পরে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। তাদের প্রত্যেকেই বর্ণনার একটি অংশ বর্ণনা করেছেন (যেখানে) নবী (ﷺ) (আয়িশাকে) বলেছেন। "আপনি যদি নির্দোষ হন, তবে আল্লাহ আপনার নির্দোষ ঘোষণা করবেন: কিন্তু আপনি যদি কোন পাপ করে থাকেন তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং তার কাছে তওবা করুন।" আয়েশা বললেন, "আল্লাহর কসম, ইউসুফের পিতার (যখন তিনি বলেছিলেন), 'সুতরাং (আমার জন্য) ধৈর্য সবচেয়ে উপযুক্ত।' "অতঃপর আল্লাহ দশটি আয়াত নাজিল করলেন:- "নিশ্চয় যারা অপবাদ ছড়ায় তারা তোমাদের মধ্যে একটি দল" (24.11)
আয়িশাহ-এর মাতা উম্মু রূমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (অপবাদ রটনার সময়) আয়িশাহ আমাদের ঘরে জ্বরে আক্রান্ত ছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সম্ভবত এ অপবাদের কারণে জ্বর হয়েছে। আয়িশাহ বললেন, হ্যা। তিনি উঠে বসলেন এবং বললেন, আমার এবং আপনাদের দৃষ্টান্ত হল ইয়াকুব এবং তার পুত্র ইউসুফ-এর ন্যায়। [ইয়াকুব তার ছেলেদেরকে বললেন] বরং তোমরা এক মনগড়া কাহিনী সাজিয়ে নিয়ে এসেছ কাজেই "ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।"
আবু ওয়াইল থেকে বর্ণিত: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ "হাইতা লাকা (আসুন)" পাঠ করলেন এবং যোগ করলেন, "আমরা এটি পাঠ করি যেভাবে আমাদের শেখানো হয়েছিল।"
আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) থেকে বর্ণিত: যখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বুঝতে পারলেন যে কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণে বিলম্ব করেছে, তখন তিনি বললেন, "হে আল্লাহ! তাদেরকে (নবী) ইউসুফের সাত বছরের মতো সাতটি (দুর্ভিক্ষ) দিয়ে তাদের অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন।" সুতরাং তারা এমন এক বছরের দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়েছিল যা তাদের হাড় খেতে না হওয়া পর্যন্ত সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল, এবং যতক্ষণ না একজন মানুষ আকাশের দিকে তাকাবে এবং তার এবং তার মধ্যে ধোয়ার মতো কিছু দেখতে পাবে। আল্লাহ বলেন:- "অতঃপর আপনি (হে মুহাম্মদ) সেই দিনটির প্রতি লক্ষ্য রাখুন যেদিন আকাশে এক ধরনের ধোয়া দেখা যাবে।" (44.10) এবং আল্লাহ আরো বলেনঃ- "নিশ্চয়ই আমরা শাস্তি একটু প্রত্যাহার করব, নিশ্চয়ই তোমরা (কুফরের দিকে) ফিরে আসবে।" (44.15) (আল্লাহ কি কিয়ামতের দিন তাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেবেন?) ধোয়া (আযাব) কেটে গেছে এবং আল-বালতশা (বদরের যুদ্ধে পৌত্তলিকদের ধ্বংস)ও চলে গেছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা লূত-এর উপর রহম করুন। তিনি তার সম্প্রদায়ের চরম শত্রুতায় বাধ্য হয়ে, নিজের নিরাপত্তার জন্য শক্ত খুটি আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। যতদিন পর্যন্ত ইউসুফ (বন্দীখানায়) ছিলেন, আমি যদি এভাবে বন্দীখানায় থাকতাম, তবে মুক্তি পাবার ডাকে অবশ্যই সাড়া দিতাম। আমরা (সন্দেহভঞ্জন করার ব্যাপারে) ইব্রাহীম-এর চেয়েও আগে বেড়ে যেতাম যখন আল্লাহ তাকে বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? জবাবে তিনি বললেন, হা। তবে আমার মনের প্রশান্তির জন্য।
উরওয়া ইবন আয-যুবায়ের থেকে বর্ণিত: যে যখন তিনি আয়েশাকে আল্লাহর উক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন "যতক্ষণ না রাসূলগণ (তাদের লোকদের) আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।" (12.110) তিনি তাকে (এর অর্থ) বললেন, উরওয়া যোগ করলেন, "আমি বললাম, 'তারা (রাসূলগণ) কি সন্দেহ করেছিল যে তারা (আল্লাহর কাছে) বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বা (তাদের লোকদের) দ্বারা তাদের মিথ্যাবাদী হিসাবে আচরণ করা হয়েছে?' আয়েশা বললেন, '(তারা সন্দেহ করত) যে তাদের (তাদের লোকেরা) মিথ্যাবাদী বলে গণ্য করেছে,' আমি বললাম, 'কিন্তু তারা নিশ্চিত যে তাদের লোকেরা তাদের মিথ্যাবাদী হিসাবে গণ্য করেছে এবং এটি সন্দেহের বিষয় নয়।' তিনি বললেন, 'হ্যা, আমার জীবনের ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল।' আমি তাকে বললাম, 'অতএব তারা (রাসূলগণ) সন্দেহ করলেন যে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।' তিনি বললেন, আল্লাহ না করুন! প্রেরিতরা কখনই তাদের প্রভুকে এ ধরনের বিষয়ে সন্দেহ করেননি।' আমি বললাম, 'তাহলে এই আয়াতের কি হবে?' তিনি বলেন, 'এটি প্রেরিতদের অনুসারীদের সম্পর্কে যারা তাদের প্রভুতে বিশ্বাস করেছিল এবং তাদের প্রেরিতদের উপর আস্থা রেখেছিল, কিন্তু পরীক্ষার সময়কাল দীর্ঘায়িত হয়েছিল এবং বিজয় বিলম্বিত হয়েছিল যতক্ষণ না প্রেরিতরা তাদের অবিশ্বাসী লোকদের ধর্মান্তরিত করার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রেরিতরা মনে করেছিলেন যে তাদের অনুসারীরা তাদের মিথ্যাবাদী হিসাবে ব্যবহার করেছে; অতঃপর আল্লাহর সাহায্য তাদের কাছে এল।
উরওয়া থেকে বর্ণিত: "আমি তাকে (আয়িশা) বললাম: (উপরের বর্ণনা সম্পর্কে), তারা (রাসূলগণ) (আল্লাহর দ্বারা) বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছিল।" তিনি বললেনঃ আল্লাহ না করুন বা অনুরূপ বলেছেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। নিশ্চই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, 'ইল্ম গায়েব-এর চাবিকাঠি পাচটি, যা আল্লাহ ভিন্ন কেউ জানে না। তা হলোঃ আগামী দিন কী হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। মায়ের জরায়ুতে কী আছে, তা আল্লাহ ভিন্ন আর কেউ জানে না। বৃষ্টি কখন আসবে, তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। কোন ব্যক্তি জানে না তার মৃত্যু কোথায় হবে এবং কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে, তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম। তিনি বললেন, বল তো সেটা কোন বৃক্ষ, যা কোন মুসলিম ব্যক্তির মত, যার পাতা ঝরে না, এরূপ নয়, এরূপ নয় এবং এরূপও নয় যা সর্বদা খাদ্য প্রদান করে। ইবন উমার বলেন, আমার মনে হল, এটা খেজুর বৃক্ষ। কিন্তু আমি দেখলাম আবূ বাকর ও উমার কথা বলছেন না। তাই আমি এ ব্যাপারে বলা পছন্দ করিনি। শেষে যখন কেউ কিছু বললেন না, তখন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বললেন, সেটা খেজুর গাছ। পরে যখন আমরা উঠে গেলাম, তখন আমি উমার-কে বললাম, হে আব্বা! আল্লাহর কসম! আমার মনেও হয়েছিল, তা খেজুর বৃক্ষ। উমার বললেন, এ কথা বলতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? বললেন, আমি আপনাদেরকে কথা বলতে দেখলাম না, তাই আমি কথা বলতে এবং আমার মত ব্যক্ত করতে অপছন্দ করি। উমার বললেন, অবশ্য যদি তুমি বলতে, তবে তা আমার নিকট এত এত থেকে অধিক প্রিয় হত।
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। নিশ্চই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কবরে মুসলিমকে যখন প্রশ্ন করা হবে, তখন সে সাক্ষ্য দিবেঃ "লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ" আল্লাহর বাণীতে এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। বাণীটি হলো এইঃ "যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন"-(ইবরাহীম ১৪/২৭)।
আতা থেকে বর্ণিত: যখন ইবনে আব্বাস শুনলেন:- "আপনি কি তাদের দেখেননি যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরীতে পরিবর্তন করেছে?" (14.28) তিনি বললেন, এরা ছিল মক্কার কাফের পৌত্তলিক।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, "আল্লাহ যখন বেহেশতে কোন বিষয় নির্ধারণ করেন, তখন ফেরেশতারা তার বক্তব্যের আনুগত্যের জন্য তাদের ডানা দিয়ে প্রহার করে, যা একটি পাথরের উপর টেনে আনা শিকলের মত শোনায়।" (আলী এবং অন্যান্য উপ-বর্ণনাকারীরা বলেন, "আওয়াজ তাদের কাছে পৌছায়।") "যখন তাদের (ফেরেশতাদের) অন্তর থেকে ভয় দূর হয়ে যায়, তখন তারা (ফেরেশতারা) বলে, 'আপনার প্রভু কি বলেছিলেন? তারা বলে,' সত্য; এবং তিনি পরম উচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ।' (৩৪.২৩) অতঃপর যারা চুরি করে শ্রবণশক্তি লাভ করে (শয়তান) তারা আল্লাহর বাণী শুনবে:- 'যারা চুরি করে শ্রবণশক্তি লাভ করে, (এভাবে একে অপরের ওপর দাড়াও)। তার ডান হাতের আঙ্গুলগুলি এবং একটিকে অন্যটির উপর অনুভূমিকভাবে স্থাপন করে।) একটি শিখা তার নীচের লোকের কাছে খবরটি পৌছে দেওয়ার আগে কানাকানিকে ধরে ফেলতে পারে এবং পোড়াতে পারে; অথবা এটি তাকে ধরে নাও পারে যতক্ষণ না সে তার নীচের লোকটিকে এটি পৌছে দেয়, যে তার পালাক্রমে তা তার নীচের লোকের কাছে পৌছে দেয় এবং এভাবেই যতক্ষণ না তারা পৃথিবীতে খবর পৌছে দেয়। এর সাথে একশত মিথ্যার যোগ হবে। তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হবে (যতদূর স্বর্গীয় সংবাদ সম্বন্ধে) লোকেরা বলবে, 'তিনি কি আমাদের বলেননি যে অমুক-অমুক দিনে, অমুক-অমুক দিনে? এমন কিছু ঘটবে? স্বর্গ থেকে শোনা সত্য সংবাদের কারণে আমরা এটি সত্য বলে খুজে পেয়েছি।" উপরোক্ত হাদিসটি আবু হুরায়রা থেকেও বর্ণিত হয়েছে, শুরু করে: 'আল্লাহ যখন কোনো বিষয় নির্ধারণ করেছেন...') এই বর্ণনায় জাদুকর শব্দের সাথে ভবিষ্যদ্বাণীকারী শব্দটি যোগ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। নিশ্চই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরবাসীগণ সম্পর্কে সহাবায়ে কিরামদের বললেন, তোমরা ক্রন্দনরত অবস্থা ব্যতিরেকে এ জাতির এলাকায় প্রবেশ করবে না। যদি তোমাদের ক্রন্দন না আসে, তবে তোমরা তাদের এলাকায় প্রবেশই করবে না। হয়ত, তাদের ওপর যা ঘটেছিল তা তোমাদের ওপরও ঘটতে পারে।
আবূ সাঈদ ইবন মু'য়াল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার পার্শ্ব দিয়ে গেলেন, তখন আমি সালাত আদায় করছিলাম। তিনি আমাকে ডাক দিলেন। আমি সালাত শেষ না করে আসিনি। তারপর আমি আসলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, আমার কাছে আসতে তোমাকে কিসে বাধা দিয়েছিল। আমি বললাম, আমি সালাত আদায় করছিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা কি এ কথা বলেননি, "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ এবং রাসূলের ডাকে সাড়া দাও?" তারপর তিনি বললেন, আমি মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগেই কি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাটি শিখিয়ে দেব না। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মসজিদ থেকে বের হতে উদ্যত হলেন, আমি তাকে কথাটি মনে করিয়ে দিলাম। তিনি বললেন, সে সূরাটি হল, "আল্ হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।" এটি হল, বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহা কুরআন যা আমাকে দেয়া হয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, উম্মুল কুরআন (ফাতিহা) হচ্ছে বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহা কুরআন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। "যারা কুরআনকে ভাগ করে ফেলেছে।" এরা হল আহলে কিতাব (ইয়াহূদী-নাসারা)। তারা কুরআনকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলেছে। তারা কোন অংশের ওপর বিশ্বাস এনেছে এবং কোন অংশকে অস্বীকার করেছে।
সম্পর্কে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: "যেমন আমরা (কিতাব) নাযিল করেছি বিভক্তদের (ইহুদী ও খ্রিস্টানদের) উপর।" (15.90) তারা এর একটি অংশে ঈমান এনেছিল এবং অন্যটিতে অবিশ্বাস করেছিল, (এবং তারা) ইহুদী ও খ্রিস্টান।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ দোয়া করতেন (হে আল্লাহ!) আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই কৃপণতা থেকে, অলসতা থেকে, চলৎশক্তিহীন বয়স থেকে, কবরের আযাব থেকে, দাজ্জালের ফিতনা থেকে এবং জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে।
ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত: সূরা বনি ইসরাইল এবং আল কাহফ এবং মেরি আমার প্রথম পুরানো সম্পত্তি।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বাইতুল মাকদাসে ভ্রমণ করানো হয়, সে রাতে তার সামনে দু'টি পেয়ালা রাখা হয়েছিল। তার একটিতে ছিল শরাব এবং আরেকটিতে ছিল দুধ। তিনি উভয়টির দিকে তাকালেন এবং দুধ বেছে নিলেন। তখন জিবরীল বললেন, সমস্ত প্রশংসা সে আল্লাহর, যিনি আপনাকে স্বাভাবিক পথ দেখিয়েছেন। যদি আপনি শরাব বেছে নিতেন, তাহলে আপনার উম্মাত অবাধ্য হয়ে যেত।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যখন কুরায়শরা (মিরাজের ঘটনায়) আমাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে লাগল, তখন আমি হিজরে দাড়ালাম। আল্লাহ তাআলা বায়তুল মাকদাসকে আমার সামনে পেশ করে দিলেন। আমি তা দেখে তার সকল নিশানা তাদের বলে দিতে লাগলাম। ইয়াকুব ইবন ইব্রাহীম ইবন শিহাব সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। যখন কুরায়শরা আমাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে লাগল, সেই ঘটনার ব্যাপারে যখন আমাকে বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানো হয়েছিল--- পূর্বের অনুরূপ বর্ণনা করেন। এমন যা সবকিছু চুরমার করে দেয়। আমাকে বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত ভ্রমণ করানোর ঘটনাটি যখন কুরায়শরা মিথ্যা সাব্যস্ত করতে লাগল।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: প্রাক-ইসলামী যুগে কোনো গোত্র সংখ্যায় বড় হলে আমরা বলতাম, আমিরা অমুকের সন্তান। আল-হুমাইদী থেকে বর্ণিত: সুফিয়ান আমাদের কাছে কিছু বর্ণনা করেছেন এবং 'আমিরা' শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে গোশ্ত আনা হল এবং তাকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে জমায়েত হবে, যেখানে একজন আহবানকারীর আহবান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদমের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাকে বলবে, আপনি আবুল বাশার। আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিজ হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তার রূহ আপনার মধ্যে ফুকে দিয়েছেন এবং মালায়িকাহ্কে হুকুম দিলে তারা আপনাকে সিজদা করেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌছেছি। তখন আদম বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ-এর কাছে যাও। তখন সকলে নূহ্-এর কাছে এসে বলবে, হে নূহ্! নিশ্চই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রাসূল। আর আল্লাহ তাআলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগান্বিত যে, আগেও এমন রাগান্বিত হননি আর পরে কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দোয়া ছিল, যা আমি আমার কওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইব্রাহীম-এর কাছে। তখন তারা ইব্রাহীম-এর কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহীম! আপনি আল্লাহর নবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগান্বিত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবী আবূ হাইয়ান তার বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন- (এখন) নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসার কাছে। তারা মূসার কাছে এসে বলবে, হে মূসা! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবকূলের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগান্বিত আছেন, এরূপ রাগান্বিত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নফ্সী, নফসী, নফসী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও ঈসা-এর কাছে। তখন তারা ঈসা-এর কাছে এসে বলবে, হে ঈসা! আপনি আল্লাহররাসূল এবং কালিমাহ, যা তিনি মারইয়াম-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি 'রূহ'। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত যে, এর আগে এরূপ রাগান্বিত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহর কথা বলবেন না। নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্য কারও কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে। তারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ তাআলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সিজদা দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ তাআলা তার প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে। এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আপনার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যার হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বস্রার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, দাঊদ-এর ওপর (যাবূর) পড়া এত সহজ করে দেয়া হয়েছিল যে, তিনি তার সওয়ারীর উপর জিন বাধার জন্য আদেশ দিতেন; জিন বাধা শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি তার উপর যা অবতীর্ণ তা পড়ে ফেলতেন।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে: 'তারা যাদেরকে ডাকে (যেমন মরিয়ম তনয় ঈসা, ফেরেশতা ইত্যাদি) তারা তাদের রবের (আল্লাহর) কাছে যাওয়ার উপায় কামনা করে যে তাদের মধ্যে কে হওয়া উচিত? নিকটতর এবং তারা তার রহমতের আশা করে এবং তার শাস্তিকে ভয় করে।' (17.57) তারা নিজেরা (যেমন ফেরেশতা, দরবেশ, প্রেরিত, ঈসা, ইত্যাদি) আল্লাহর ইবাদত করত, যে জ্বিনরা কিছু আরবের পূজা করত তারা মুসলমান হয়ে যায় (ইসলাম গ্রহণ করে), কিন্তু সেই মানুষগুলো তাদের (পুরানো) ধর্মে অটল থাকে। আল-আমাশ আরও বলেন, 'বলুন, (হে মুহাম্মদ) : তাকে বাদ দিয়ে যাদেরকে তোমরা উপাস্য মনে কর তাদেরকে ডাকো।' (১৭.৫৬)
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: আয়াতটি সম্পর্কে: 'যাদেরকে তারা ডাকে (যেমন মরিয়ম তনয় ঈসা বা ফেরেশতা ইত্যাদি) তারা তাদের প্রভুর কাছে প্রবেশের উপায় (নিজের জন্য) কামনা করে।' (১৭.৫৭)) কিছু জিন যারা (মানুষ দ্বারা) উপাসনা করত। তারা পরে ইসলাম গ্রহণ করে (যদিও তারা তাদের উপাসনা করতে থাকে)।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: সম্পর্কে: 'এবং আমরা দর্শন (স্বর্গে আরোহন "মিরাজ") দিয়েছি যা আমরা আপনাকে দেখিয়েছি (হে মুহাম্মদ একজন প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে) কিন্তু মানবজাতির জন্য একটি পরীক্ষা হিসাবে।' (17.60) এটি একটি প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দেখানো হয়েছিল যে রাতে তাকে (আকাশের মধ্য দিয়ে) সফরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর অভিশপ্ত বৃক্ষ হল আয-যাক্কুম (জাহান্নামের তলদেশে জন্মানো তিক্ত তিক্ত গাছ)।
ইবনে আল-মুসাইয়্যাব থেকে বর্ণিত: আবু হুরায়রা বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, জামাতে আদায় করা নামায কোন এক ব্যক্তির নামাযের চেয়ে পঁচিশ গুণ বেশি সওয়াব। ফজরের (সকালের) সালাতের সময়।" আবু হুরায়রা যোগ করেছেন, "আপনি যদি চান, আপনি আবৃত্তি করতে পারেন:- 'নিশ্চয়ই! ভোরবেলা (সকালের নামায) কোরআন তেলাওয়াত সর্বদা প্রত্যক্ষ করা হয় (দিন ও রাতের ফেরেশতাদের দ্বারা উপস্থিত)।' (১৭.৭৮)
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নিশ্চই কিয়ামতের দিন লোকেরা ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। প্রত্যেক নবীর উম্মাত স্বীয় নবীর অনুসরণ করবে। তারা বলবেঃ হে অমুক (নবী)! আপনি সুপারিশ করুন। হে অমুক (নবী)! আপনি সুপারিশ করুন। (কেউ সুপারিশ করতে চাইবেন না)। শেষ পর্যন্ত সুপারিশের দায়িত্ব নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর পড়বে। আর এ দিনেই আল্লাহ তাআলা তাকে মাকামে মাহমূদ -এ পৌছাবেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নিশ্চই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আযান শোনার পর এ দোয়া পড়বে, "হে আল্লাহ! এ পরিপূর্ণ আহবানের এবং প্রতিষ্ঠিত সালাতের রব, মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে ওয়াসীলা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান কর, প্রতিষ্ঠিত কর তাকে মাকামে মাহমূদে, যার ওয়াদা তুমি করেছ" কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফা'আত অবধারিত হয়ে যাবে। এ হাদীসটি হামযা ইবন আবদুল্লাহ তার পিতা থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ হতে বর্ণিত। (মক্কা বিজয়ের দিন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন কাবা ঘরের চারপাশে তিনশ' ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন তিনি তার হাতের ছড়ি দিয়ে এগুলোকে ঠোকা দিতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন, "সত্য এসেছে আর এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই"- ( ইসরাঈল ১৭/৮১)। "সত্য এসেছে আর অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে এবং না পারে পুনরাবৃত্তি করতে।"
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদহতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে একটি ক্ষেতের মাঝে উপস্থিত ছিলাম। তিনি একটি খেজুরের লাঠিতে ভর করে দাড়িয়েছিলেন। এমন সময় কিছু সংখ্যক ইয়াহূদী যাচ্ছিল। তারা একে অন্যকে বলতে লাগল, তাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। কেউ বলল, কেন তাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছ? আবার কেউ বলল, তিনি এমন উত্তর দিবেন না, যা তোমরা অপছন্দ কর। তারপর তারা বলল যে, তাকে প্রশ্ন কর। এরপরে তাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (উত্তরদানে) বিরত থাকলেন, এ সম্পর্কে তাদের কোন উত্তর দিলেন না। (বর্ণনাকারী বলছেন) আমি বুঝতে পারলাম, তার ওপর ওয়াহী অবতীর্ণ হবে। আমি আমার জাযগায় দাড়িয়ে রইলাম। তারপর যখন ওয়াহী অবতীর্ণ হল, তখন তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] বললেন, "আর তারা আপনাকে 'রূহ' সম্পর্কে প্রশ্ন করে। আপনি বলে দিনঃ রূহ আমার রবের আদেশঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে খুব সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে"- (বনী ইসরাঈল ১৭/৮৫)।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'সালাতে স্বর উচু করবে না এবং অতিশয় নিচুও করবে না। এ আয়াতটি এমন সময় নাযিল হয়, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কায় অপ্রকাশ্যে অবস্থান করছিলেন। তিনি যখন তার সাহাবাদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন তখন তিনি উচ্চেঃস্বরে কুরআন পাঠ করতেন। মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি দিত। আর গালি দিত যিনি তা অবতীর্ণ করেছেন তাকে (আল্লাহকে) এবং যিনি তা নিয়ে এসেছেন তাকে (জিব্রীল)। এজন্য আল্লাহ তাআলা তার নবী (ﷺ)-কে বলেছিলেন, "তুমি তোমার সালাতে উচ্চস্বরে কিরাআত পড়বে না, যাতে মুশরিকরা শুনে কুরআনকে গালি দেয় এবং তা এত নিচু স্বরেও পড়বে না, যাতে তোমার সাহাবীরা শুনতে না পায়, বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন কর।"
আয়েশা থেকে বর্ণিত: (উপরের) আয়াতটি দাওয়াতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
আলী থেকে বর্ণিত: সেই এক রাতে আল্লাহর রসূল (ﷺ) তার ও ফাতিমার কাছে এসে বললেন, "তোমরা কি (তাহাজ্জুদ) নামায পড়ো না?" আলী বললেন, 'আল্লাহ যখন আমাদের উঠতে চান তখন আমরা উঠি। নবী (ﷺ) অতঃপর তিলাওয়াত করলেন: 'কিন্তু মানুষ সব কিছুর চেয়ে বেশি ঝগড়াটে' (18.54)
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাসকে বললাম, নওফ আল-বাক্কালীর ধারণা, খাযিরের সাথী মূসা, তিনি বনী ইসরাঈলের নবী মূসা ছিলেন না। ইবন আব্বাস বললেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা কথা বলেছে। [ইবন আব্বাস বলেন] উবাই ইবন কা'আব আমাকে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, মূসা একবার বনী ইসরাঈলের সম্মুখে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাকে প্রশ্ন করা হল, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমি। এতে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হলেন। কেননা এ জ্ঞানের ব্যাপারটিকে তিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেননি। আল্লাহ তার প্রতি ওয়াহী পাঠালেন, দু-সমুদ্রের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা রয়েছে, সে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা বললেন, ইয়া রব, আমি কীভাবে তার সাক্ষাৎ পেতে পারি? আল্লাহ বললেন, তোমার সঙ্গে একটি মাছ নাও এবং সেটা থলের মধ্যে রাখ, যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে সেখানেই। তারপর তিনি একটি মাছ নিলেন এবং সেটাকে থলের মধ্যে রাখলেন। অতঃপর রওনা দিলেন। আর সঙ্গে চললেন তার খাদেম 'ইউশা' ইবন নূন। তারা যখন সমুদ্রের ধারে একটি বড় পাথরের কাছে এসে হাজির হলেন, তখন তারা উভয়েই তার ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এ সময় মাছটি থলের ভিতর লাফিয়ে উঠল এবং থলে থেকে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেল। "মাছটি সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।" আর মাছটি যেখান দিয়ে চলে গিয়েছিল, আল্লাহ সেখান থেকে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিলেন এবং সেখানে একটি সুড়ঙ্গের মত হয় গেল। যখন তিনি জাগ্রত হলেন, তার সাথী তাকে মাছটির সংবাদ দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। সেদিনের বাকী সময় ও পরবর্তী রাত তারা চললেন। যখন ভোর হল, মূসা তার খাদিমকে বললেন 'আমাদের সকালের আহার আন, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহ যে স্থানের নির্দেশ করেছিলেন, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে মূসা ক্লান্ত হননি। তখন তার খাদিম তাকে বলল, "আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখন্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। শায়ত্বনই এ কথা বলতে আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি বিস্ময়করভাবে নিজের পথ করে সমুদ্রে নেমে গেল।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, মাছটি তার পথ করে সমুদ্রে নেমে গিয়েছিল এবং মূসা ও তার খাদেমকে তা আশ্চর্যান্বিত করে দিয়েছিল। মূসা বললেনঃ 'আমরা তো সে স্থানটিরই খোজ করছিলাম। তারপর তারা নিজদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চলল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তারা উভয়ে তাদের পদচিহ্ন ধরে সে শিলাখন্ডের কাছে ফিরে আসলেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় পেলেন। মূসা তাকে সালাম দিলেন। খাযির বললেন, তোমাদের এ স্থলে 'সালাম' আসলো কোথেকে? তিনি বললেন, আমি মূসা। খাযির জিজ্ঞেস করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হা, আমি আপনার কাছে এসেছি এ জন্য যে, সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন। তিনি বললেন, তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না।" হে মূসা! আল্লাহর জ্ঞান থেকে আমাকে এমন কিছু জ্ঞান দান করা হয়েছে যা তুমি জান না আর তোমাকে আল্লাহ তার জ্ঞান থেকে যে জ্ঞান দান করেছেন, তা আমি জানি না। মূসা বললেন, "ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আপনার কোন আদেশ আমি অমান্য করব না।" তখন খাযির তাকে বললেন, "আচ্ছা, তুমি যদি আমার অনুসরণ করই, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না, যতক্ষণ আমি তোমাকে সে সম্পর্কে না বলি। তারপর উভয়ে চললেন।" তারা সুমদ্রের পাড় ধরে চলতে লাগলেন, তখন একটি নৌকা যাচ্ছিল। তারা তাদের নৌকায় উঠিয়ে নেয়ার ব্যাপারে নৌকার চালকদের সঙ্গে আলাপ করলেন। তারা খাযির -কে চিনে ফেলল। তাই তাদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে নৌকায় উঠিয়ে নিল। "যখন তারা উভয়ে নৌকায় উঠলেন" খাযির কুড়াল দিয়ে নৌকার একটি তক্তা ছিদ্র করে দিলেন। মূসা তাকে বললেন, এ লোকেরা তো বিনা মজুরিতে আমাদের বহন করছে, অথচ আপনি এদের নৌকাটি নষ্ট করছেন। আপনি নৌকাটি ছিদ্র করে ফেললেন, যাতে আরোহীরা ডুবে যায়। আপনি তো এক অন্যায় কাজ করলেন, (খাযির বললেন) আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবে না। মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না ও আমার ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা করবেন না।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, মূসা-এর প্রথম এ অপরাধটি ভুল করে হয়েছিল। তিনি বললেন, এরপরে একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার পার্শ্বে বসে ঠোঁট দিয়ে সমুদ্রে এক ঠোকর মারল। খাযির মূসা-কে বললেন, এ সমুদ্র হতে চড়ুই পাখিটি যতটুকু পানি ঠোঁটে নিল, আমার ও তোমার জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় ততটুকু। তারপর তারা নৌকা থেকে নেমে সমুদ্রের পাড় ধরে চলতে লাগলেন। এমতাবস্থায় খাযির একটি বালককে অন্য বালকদের সঙ্গে খেলতে দেখলেন। খাযির হাত দিয়ে ছেলেটির মাথা ধরে তাকে হত্যা করলেন। মূসা খাযির-কে বললেন, "আপনি কি প্রাণের বদলা ব্যতিরেকেই নিষ্পাপ একটি প্রাণকে হত্যা করলেন? আপনি তো চরম এক অন্যায় কাজ করলেন। তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করে থাকতে পারবে না।" নবী (ﷺ) বললেন, এ অভিযোগটি ছিল প্রথমটির অপেক্ষাও মারাত্মক। [মূসা বললেন] এরপর যদি আমি আপনাকে কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করি তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না; আপনার কাছে আমার ওযর আপত্তি চূড়ান্তে পৌছেছে। তারপর উভয়ে চলতে লাগলেন। শেষে তারা এক বসতির কাছে পৌছে তার বাসিন্দাদের কাছে খাদ্য চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকৃতি জানাল। তারপর সেখানে তারা এক পতনোন্মুখ দেয়াল দেখতে পেলেন। বর্ণনাকারী বলেন, সেটি ঝুকে পড়েছিল। খাযির নিজ হাতে সেটি সোজা করে দিলেন। মূসা বললেন, এ লোকদের কাছে আমরা এলাম, তারা আমাদের খাদ্য দিল না এবং আমাদের আতিথেয়তাও করল না। "আপনি তো ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। তিনি বললেন, এখানেই তোমার এবং আমার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটল। .....যে বিষয়ে তুমি ধৈর্যধারণ করতে পারনি, এ তার ব্যাখ্যা।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আমার মনের বাসনা যে, যদি মূসা আর একটু ধৈর্যধারণ করতেন, তাহলে আল্লাহ তাদের আরও ঘটনা আমাদের জানাতেন।
ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণিত: ইয়ালা ইবনে মুসলিম এবং আমর ইবনে দীনার এবং অন্য কেউ সাঈদ ইবনে যুবাইরের বর্ণনা বর্ণনা করেছেন। সাঈদ থেকে বর্ণিতঃ আমরা যখন ইবন আব্বাস-এর বাড়িতে ছিলাম, তখন ইবন আব্বাস বললেন, "আমাকে (কোন প্রশ্ন) জিজ্ঞাসা করুন।" আমি বললাম, "হে আবু আব্বাস! আল্লাহ যেন আমাকে আপনার জন্য কুরবানী করেন! কুফার একজন ব্যক্তি যিনি নওফ নামে একজন গল্পকার; যিনি দাবি করেন যে তিনি (আল-খাদিরের সঙ্গী) বনী ইসরাঈলের মূসা নন।" আমর সম্পর্কে, তিনি আমাকে বললেন, "ইবনে আব্বাস বলেছেন, "(নাউফ) আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে।" কিন্তু ইয়ালা আমাকে বললেন, "ইবনে আব্বাস বলেছেন, উবাই ইবনে কাব বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, একবার মূসা লোকদের কাছে প্রচার করলেন যতক্ষণ না তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেল এবং তাদের অন্তর কোমল হয়ে গেল, তারপর তিনি খুতবা শেষ করলেন। অতঃপর এক ব্যক্তি মূসা-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! পৃথিবীতে আপনার চেয়ে বেশি জ্ঞানী কেউ আছে কি?' মূসা উত্তর দিলেন, 'না।' তাই আল্লাহ তাকে (মূসা) উপদেশ দিলেন, কারণ তিনি সমস্ত জ্ঞান আল্লাহর কাছে বর্ণনা করেননি। বলা হলো, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) 'হ্যা, (আমাদের মধ্যে এমন একজন বান্দা আছে যে আপনার চেয়ে বেশি জানে)। মূসা বললেন, হে আমার প্রতিপালক! সে কোথায়?' আল্লাহ বললেন, 'দুই সাগরের সংযোগস্থলে।' মূসা বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন একটি নিদর্শন বলুন যাতে আমি স্থানটিকে চিনতে পারি।' "আমর আমাকে বললেন, আল্লাহ বলেছেন, "সেই জায়গা হবে যেখানে মাছ তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে।" ইয়ালা আমাকে বললেন, "আল্লাহ (মূসাকে) বললেন, 'একটি মরা মাছ নাও (এবং তোমার লক্ষ্য হবে) যেখানে এটি জীবিত হয়ে উঠবে।' "অতএব মূসা একটি মাছ নিলেন এবং একটি ঝুড়িতে রাখলেন এবং তার বালক-দাসকে বললেন, "আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না, তবে এই মাছটি তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তুমি আমাকে জানাবে।" তিনি বললেন (মুসাকে) " আপনি খুব বেশি দাবি করেননি।" এবং এটি যেমন আল্লাহ উল্লেখ করেছেন: 'এবং (স্মরণ করুন) যখন মূসা তার পরিচারককে বলেছিলেন...' (18.60) ইউশা ইবন নূন। (সাঈদ তা বলেননি)। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যখন পরিচারক একটি ভেজা জায়গায় পাথরের ছায়ায় ছিল, তখন মূসা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় মাছটি (জীবিত) পিছলে গেল। তার উপস্থিত একজন (নিজেকে) বললেন, "আমি তাকে জাগাব না, কিন্তু যখন সে জেগে উঠল, সে তাকে বলতে ভুলে গেল যে মাছটি ছিটকে পড়ে সমুদ্রে প্রবেশ করল। আল্লাহ সমুদ্রের প্রবাহ বন্ধ করে দিলেন। মাছটি যেখানে ছিল, তাই এর চিহ্ন দেখে মনে হচ্ছিল যেন এটি একটি পাথরের উপর তৈরি করা হয়েছে। 'আমর তার দুই অঙ্গুষ্ঠ এবং তর্জনী দিয়ে একটি গর্ত তৈরি করে আমাকে বললেন, "এভাবে, যেমন এটির চিহ্ন একটি পাথরের উপর তৈরি করা হয়েছিল।" মূসা বললেন, "আমরা আমাদের এই যাত্রায় অনেক ক্লান্তি ছিল।" (এটি সাঈদ বর্ণনা করেননি)। তারপর তারা ফিরে এসে আল-খাদিরকে দেখতে পেল। উসমান ইবনে আবি সুলাইমান আমাকে বললেন, (তারা তাকে) সবুজ গালিচায় দেখতে পেল। সাগরের মাঝখানে।আল-খাদির তার কাপড়ে ঢাকা ছিল তার এক প্রান্ত পায়ের নিচে এবং অন্য প্রান্তটি তার মাথার নিচে।মুসা যখন সালাম দিলেন, তখন তিনি তার মুখ উন্মোচন করলেন এবং অবাক হয়ে বললেন, 'আমার দেশে কি এমন অভিবাদন আছে? তুমি কে?' মূসা বললেন, আমি মুসা। আল-খাদির বললেন, তুমি কি বনী ইসরাঈলের মূসা? মূসা বললেন, হ্যা। আল-খাদির বললেন, 'তুমি কী চাও?' মূসা বললেন, 'আমি তোমার কাছে এসেছি যাতে তুমি আমাকে সেই সত্য শিক্ষা দিতে পার যা তোমাকে শেখানো হয়েছে।' আল-খাদির বললেন, 'হে মুসা, তাওরাত তোমার হাতে থাকা এবং তোমার কাছে ঐশ্বরিক প্রেরণা আসা কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়? সত্যই, আমার কাছে এমন একটি জ্ঞান রয়েছে যা আপনার শেখা উচিত নয় এবং আপনার কাছে এমন একটি জ্ঞান রয়েছে যা আমার শেখা উচিত নয়।' এমন সময় একটি পাখি সমুদ্র থেকে তার ঠোঁট দিয়ে (কিছু পানি) নিয়ে গেল: আল-খাদির তখন বললেন, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহর জ্ঞান ব্যতীত আমার জ্ঞান এবং আপনার জ্ঞান এমনই যে এই পাখিটি তার ঠোঁট দিয়ে সমুদ্র থেকে নিয়ে গেছে।' পর্যন্ত, যখন তারা নৌকায় চড়ল (18.71)। তারা একটি ছোট নৌকা দেখতে পেল যা এই সাগর পাড় থেকে অন্য সাগর পাড়ে লোক নিয়ে যেত। দলটি আল-খাদিরকে চিনতে পেরে বলল, 'আল্লাহর ধার্মিক বান্দা।' (আমরা সাঈদকে বললাম, "ওটা কি খাদির ছিল?" তিনি বললেন, "হ্যা।") নৌকার লোকেরা বলল, 'আমরা তাকে ভাড়া দিয়ে উঠব না।' আল-খাদির নৌকাটি ছুঁড়ে ফেলে এবং তারপর একটি কাঠের টুকরো দিয়ে গর্তটি প্লাগ করে। মূসা বললেন, তুমি কি এই লোকদের নিমজ্জিত করার জন্য তা ছিঁড়ে ফেলেছ, নিশ্চয়ই তুমি একটা জঘন্য কাজ করেছ। (18.71) (মুজাহিদ বলেন, "মুসা প্রতিবাদ করে বলেছেন।") আল-খাদির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আমার সাথে তোমার ধৈর্য্য থাকবে না?' (18.72) মূসার প্রথম জিজ্ঞাসা বিস্মৃতির কারণে হয়েছিল, দ্বিতীয়টি তাকে একটি শর্তে আবদ্ধ করেছিল এবং তৃতীয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল। মূসা বললেন, 'আমি যা ভুলে গেছি তার জন্য আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না এবং (আপনার সাথে) আমার সম্পর্কের জন্য আমার প্রতি কঠোর হবেন না।' (18.73) (অতঃপর) তারা একটি ছেলেকে পেল এবং আল-খাদির তাকে হত্যা করল। ইয়ালা- বলেন: সাঈদ বলেন, 'তারা ছেলেদের খেলা দেখতে পেল এবং আল-খাদির একটি সুন্দর কাফের ছেলেকে ধরে তাকে শুইয়ে দিল এবং তারপর তাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করল। মূসা বললেন, 'তুমি কি এমন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা করেছ যে কাউকে হত্যা করেনি' (18.74) তারপর তারা এগিয়ে গিয়ে একটি প্রাচীর দেখতে পেল যা পড়ে যাওয়ার বিন্দুতে ছিল এবং আল-খাদির সেটিকে সোজা করে দাড় করিয়েছিলেন। সাঈদ এভাবে তার হাত সরিয়ে বললেন, আল-খাদির তার হাত তুললে দেয়াল সোজা হয়ে গেল। ইয়ালা বললেন, 'আমার মনে হয় সাঈদ বলেছেন, 'আল খাদির তার হাত দিয়ে দেয়াল স্পর্শ করেছিল এবং এটি সোজা হয়ে গিয়েছিল (মূসা আল-খাদিরকে বললেন), 'তুমি যদি ইচ্ছা করতে, তাহলে তুমি তার জন্য মজুরি নিতে পারতে। আর এটা।' সাঈদ বললেন, 'মজুরি যা আমরা খেতে পারতাম।' এবং তাদের সামনে (সামনে) একজন বাদশাহ ছিল" (18.79) এবং তাদের সামনে ছিল। ইবনে আব্বাস তেলাওয়াত করলেন: 'তাদের সামনে (একজন) রাজা ছিলেন।' সাঈদ ব্যতীত অন্য কারো সূত্রে বলা হয় যে বাদশাহ ছিলেন হুদাদ ইবন বুদাদ।তারা বলে যে ছেলেটির নাম ছিল হাইসুর।' একজন রাজা যিনি জোর করে প্রতিটি জাহাজ দখল করেছিলেন। তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ত্রুটির কারণে তিনি তা রেখে দিতেন এবং তারা চলে গেলে তা মেরামত করে তা থেকে উপকৃত হতেন।কিছু লোক বলেছেন যে তারা বোতল দিয়ে সেই গর্তটি বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার কেউ বলেছেন আলকাতরা দিয়ে। 'তার পিতামাতা বিশ্বাসী ছিলেন। এবং সে (ছেলেটি) ছিল একটি অবিশ্বাসী এবং আমরা (খাদির) ভয় পাচ্ছিলাম যে সে তাদের দৃঢ় বিদ্রোহ ও কুফর দ্বারা অত্যাচার করবে।' (18.80) (তার প্রতি তাদের ভালবাসা তাদের তার ধর্মে তাকে অনুসরণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করবে, তাই আমরা (খাদির) চেয়েছিলাম যে তাদের রব তাকে তাদের জন্য ধার্মিকতায় এবং রহমতের নিকটবর্তী একজনের জন্য পরিবর্তন করুন' (18:81) এটি ছিল মূসা-এর এই কথার জবাবে: তুমি কি একজন নির্দোষ প্রাণকে হত্যা করেছ।'? (18.74)। 'রহমতের কাছাকাছি' তারা তার প্রতি আগের চেয়েও বেশি করুণাময় হবেন যাকে খাদির হত্যা করেছিল। 'আইডি, বলেছেন যে তাদের একটি মেয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল।
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবু্নু আব্বাস-কে বললাম, নওফূর বাক্কালীর ধারণা, বনী ইসরাঈলের মূসা আর খাযির-এর সাথী মূসা একই ব্যক্তি নয়। এ কথা শুনে ইবন আব্বাস বললেন, আল্লাহর শত্রু মিথ্যা বলেছে। উবাই ইবন কা'ব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে আমাকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, মূসা বনী ইসরাঈলের সামনে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, আমি। আল্লাহ তার এ কথায় অসন্তুষ্ট হলেন। কেননা, তিনি এ কথাটি আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করেননি। আল্লাহ তার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ করে বললেন, (হে মূসা!) দু' সমুদ্রের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা আছে, সে তোমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী। মূসা বললেন, হে রব! আমি তার কাছে কীভাবে যেতে পারি? আল্লাহ বললেন, থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে রওয়ানা হও। যেখানে মাছটি হারিয়ে যাবে, সেখানেই তার অনুসরণ করবে। মূসা রওয়ানা হলেন এবং তার সঙ্গে ছিল তার খাদেম ইউশা ইবন নূন। তারা মাছ সঙ্গে নিলেন। তারা চলতে চলতে সমুদ্রের পাড়ে একটি বিরাট শিলাখন্ডের কাছে পৌছে গেলেন। সেখানে তারা বিশ্রামের জন্য থামলেন। বর্ণনাকারী বলেন, মূসা শিলাখন্ডের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। সুফ্ইয়ান বলেন, আমর ইবন দ্বীনার ব্যতীত সকল বর্ণনাকারী বলেছেন, শিলাখন্ডটির তলদেশে একটি ঝরণা ছিল, তাকে হায়াত বলা হত। কেননা, যে মৃতের ওপর তার পানি পতিত হয়, সে অমনি জীবিত হয়ে ওঠে। সে মাছটির ওপরও ঐ ঝরণার পানি পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে সে লাফিয়ে উঠল। তারপর মাছটি বের হয়ে সমুদ্রে ঢুকে গেল। এরপরে মূসা যখন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। মূসা তার খাদেমকে বললেন, 'আমাদের নাস্তা আন, আমরা তো আমাদের এ সফরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, যে স্থান সম্পর্কে তাকে বলা হয়েছিল সে স্থান অতিক্রম করার পর থেকেই তিনি ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। তার খাদেম ইউশা ইবন নূন তাকে বললেন, "আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখন্ডে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে আসলেন। তারা সমুদ্রে মাছটির চলে যাওয়ার জায়গায় সুড়ঙ্গের মত দেখতে পেলেন, যা মূসা-এর সাথী যুবককে বিস্মিত করে দিল। যখন তারা শিলাখন্ডের কাছে পৌছলেন, সেখানে এ ব্যক্তিকে কাপড় জড়ানো অবস্থায় দেখতে পেলেন। মূসা তাকে সালাম দিলেন। তিনি বললেন, তোমাদের এলাকায় সালাম কীভাবে এল? মূসা বললেন, আমি মূসা। তিনি [খাযির] বললেন, বনী ইসরাঈলের মূসা? মূসা উত্তর দিলেন, হ্যা। তারপর বললেন, "সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে তা থেকে আমাকে শিক্ষা দিবেন- এ শর্তে আমি আপনার অনুসরণ করব কি? খাযির বললেন, হে মূসা! তুমি আল্লাহ থেকে যে জ্ঞান পেয়েছ, তা আমি জানি, না। আর আমি আল্লাহর থেকে যে 'ইলম' প্রাপ্ত হয়েছি তাও তুমি জান না। মূসা বললেন, আমি আপনার অনুসরণ করব। খাযির বললেন, আচ্ছা তুমি যদি আমার অনুসরণ করই, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না, যতক্ষণ না আমি সে বিষয়ে তোমাকে কিছু বলি। তারপর তারা সমুদ্রের তীর দিয়ে চলতে লাগলেন। একটি নৌকা তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, নৌকার লোকেরা খাযির-কে দেখে চিনতে পারল। তারা বিনা পারিশ্রমিকে তাদের নৌকায় উঠিয়ে নিল। তারা নৌকায় উঠলেন। এ সময় একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার অগ্রভাগে বসলো। পাখিটি সমুদ্রে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। খাযির মূসা-কে বললেন, তোমার, আমার ও সৃষ্টিজগতের জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় অতখানি, যতখানি এ চড়ুই পাখি তার ঠোঁট দিয়ে সমুদ্র থেকে পানি উঠাল। বর্ণনাকারী বলেন, মূসা স্থান পরিবর্তন করেননি। খাযির অগ্রসর হতে চাইলেন। এমন সময় খাযির নৌকা ছিদ্র করে দিলেন। তখন মূসা তাকে বললেন, এরা আমাদেরকে বিনা পারিশ্রমিকে তাদের নৌকায় নিয়ে এল আর আপনি আরোহীদের ডুবানোর জন্য নৌকাটি ছিদ্র করে দিলেন। আপনি তো এক অন্যায় কাজ করেছেন। তারপর তারা আবার চলতে লাগলেন এবং দেখতে পেলেন যে, একটি বালক কতকগুলো বালকের সঙ্গে খেলা করছে। খাযির সে বালকটির শিরোশ্ছেদ করে দিলেন। মূসা তাকে বললেন, আপনি কি এক নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন জীবনের বদলা ব্যতীতই? আপনি তো এক অন্যায় কাজ করে বসলেন। তিনি বললেন, আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্যধারণ করতে পারবে না? মূসা বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করি, তবে আপনি আমাকে সঙ্গে রাখবেন না; আমার ওযরের চূড়ান্ত হয়েছে। তারপর তারা দু'জনে চলতে লাগলেন। তারা এক জনবসতির কাছে পৌছলেন এবং তাদের কাছে খাদ্য চাইলেন, তারা তাদের আতিথ্য অস্বীকার করল। তারপর সেখানে তারা পতনোদ্যত প্রাচীরটি সোজা করে দিলেন। মূসা খাযির-কে বললেন, আমরা যখন এ জনবসতিতে প্রবেশ করছিলাম, তখন তার অধিবাসীরা আমাদের আতিথেয়তা করেনি এবং আমাদের খেতে দেয়নি। এ জন্য আপনি ইচ্ছা করলে পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। খাযির বললেন, এখানেই তোমার এবং আমার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল। যে ব্যাপারে তুমি ধৈর্য ধরতে পারনি আমি তার রহস্য ব্যাখ্যা করছি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মূসা যদি আর একটু ধৈর্য ধরতেন তবে আমরা তাদের দু'জনের ঘটনা সম্পর্কে আরও জানতে পারতাম। সাঈদ বলেন, "তাদের (যাত্রাপথের) সম্মুখে ছিল এক রাজা, যে জোর করে সকল ভাল নৌকা ছিনিয়ে নিত। আর বালকটি ছিল কাফের।"
মুসআব থেকে বর্ণিত: আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আয়াতটি কি ছিল: 'বলুন: (হে মুহাম্মাদ) আমরা কি তোমাকে তাদের কর্মের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থদের বলব?' (18.103) আল-হারুরিয়া সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে?" তিনি বললেন, "না, কিন্তু ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সম্পর্কে, কারণ ইহুদিরা মুহাম্মাদকে অবিশ্বাস করেছিল এবং খ্রিস্টানরা জান্নাতকে অবিশ্বাস করেছিল এবং বলে যে সেখানে খাবার বা পানীয় নেই। আল হুররিয়া হল সেইসব লোক যারা আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে। নিশ্চিত করেছেন যে তারা তা পূরণ করবে এবং সা'দ তাদেরকে 'আল-ফাসিকীন' (আল্লাহর আনুগত্য পরিত্যাগকারী দুষ্কর্মকারী) বলতেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, কিয়ামতের দিন একজন খুব মোটা ব্যক্তি আসবে; কিন্তু সে আল্লাহর কাছে মশার পাখার চেয়ে ক্ষুদ্র হবে। তারপর তিনি বলেন, পাঠ করো, "কিয়ামত দিবসে তাদের কাজের কোন গুরুত্ব দিব না।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, কিয়ামত দিবসে মৃত্যুকে একটি ধূসর রঙের মেষের আকারে আনা হবে। তখন একজন সম্বোধনকারী ডাক দিয়ে বলবেন, হে জান্নাতবাসী! তখন তারা ঘাড়-মাথা উচু করে দেখতে থাকবে। সম্বোধনকারী বলবে, তোমরা কি একে চিন? তারা বলবেন হ্যা, এ হল মৃত্যু। কেননা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর সম্বোধনকারী আবার ডেকে বলবেন, হে জাহান্নামবাসী! জাহান্নামীরা মাথা উচু করে দেখতে থাকবে, তখন সম্বোধনকারী বলবে তোমরা কি একে চিন? তারা বলবে, হ্যা, এ তো মৃত্যু। কেননা তারা সকলেই তাকে দেখেছে। তারপর (সেটিকে) যবহ করা হবে। আর ঘোষক বলবেন, হে জান্নাতবাসী! স্থায়ীভাবে (এখানে) থাক। তোমাদের আর কোন মৃত্যু নেই। আর হে জাহান্নামবাসী! চিরদিন (এখানে) থাক। তোমাদের আর মৃত্যু নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পাঠ করলেন- "তাদের সতর্ক করে দাও পরিতাপের দিবস সম্বন্ধে, যখন সকল ফয়সালা হয়ে যাবে অথচ এখন তারা গাফিল, তারা অসতর্ক দুনিয়াবাসী-অবিশ্বাসী।"
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একবার জিবরীলকে বললেন, আপনি আমার সাথে যতবার সাক্ষাৎ করেন, তার চেয়ে অধিক সাক্ষাৎ করতে আপনাকে কিসে বাধা দেয়? তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হল, 'আমরা আপনার প্রতিপালকের আদেশ ছাড়া অবতরণ করি না, যা আমাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে আছে সবই তারই।"
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি খাববাব-কে বলতে শুনেছি, তিনি (খাববাব) বলেন, আমি আস ইবন ওয়ায়েল সাহমীর নিকট গেলাম; তার কাছে আমার কিছু পাওনা ছিল, তা আদায় করার জন্য। আস ইবন ওয়ায়িল বলল, আমি তোমার প্রাপ্য তোমাকে দিব না, যতক্ষণ তুমি মুহাম্মদের প্রতি অবিশ্বাস না কর। তখন আমি বললাম, না, এমনকি তুমি মরে গিয়ে পুনরায় জীবিত হয়ে আসলেও তা হবে না। 'আস ইবন ওয়ায়েল বলল, আমি কি মরে যাবার পরে আবার জীবিত হব? আমি বললাম, হ্যা। আস ইবন ওয়ায়েল বলল, অবশ্যই সেখানেও আমার ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি থাকবে, তা থেকে আমি তোমার ঋণ শোধ করব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ 'তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবেই।"
খাব্বাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মক্কায় অবস্থানকালে কর্মকারের কাজ করতাম। এ সময় আস্ ইবন ওয়ায়েলকে একখানা তলোয়ার বানিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর একদিন আমার সেই পাওনা আদায়ের জন্য তার নিকট আসলাম। সে বলল, মুহাম্মাদকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত তোমার পাওনা দেব না। আমি বললাম, মুহাম্মাদকে অস্বীকার করব না। এমনকি আল্লাহ তোমাকে মৃত্যু দিবার পর তোমাকে আবার জীবিত করা পর্যন্ত। সে বলল, আল্লাহ যখন আমাকে মৃত্যুর পরে আবার জীবিত করবেন, তখন আমার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিও থাকবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ 'তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে?
খাব্বাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জাহিলীয়াতের যুগে কর্মকার ছিলাম। সে সময় 'আস ইবন ওয়ায়েলের কাছে আমার কিছু পাওনা ছিল। আমি পাওনা আদায় করতে তার কাছে আসলে সে বলল, আমি তোমার পাওনা শোধ করব না, যতক্ষণ না তুমি মুহাম্মাদকে অস্বীকার কর। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আমি অস্বীকার করব না। এমনকি আল্লাহ তোমাকে মৃত্যু দেয়ার পর আবার তোমাকে জীবিত করার পরেও নহে। বলল, তাহলে তুমি আমাকে ছেড়ে দাও মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে ওঠা পর্যন্ত। তখন তো আমাকে ধন-সন্তান দেয়া হবে। তখন তোমাকে পরিশোধ করে দেব। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ "কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবে"-(মারইয়াম ১৯/৭৭)।
খাব্বাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একজন কর্মকার ছিলাম এবং আস ইবন ওয়ায়েলের নিকট আমার কিছু পাওনা ছিল। আমি তাকে তাগিদ দিতে তার কাছে আসলাম। সে বলল, আমি পাওনা পরিশোধ করব না, যতক্ষণ না তুমি মুহাম্মাদকে অস্বীকার করবে। তিনি (খাববাব) বললেন, আমি কখনও তাকে অস্বীকার করব না, এমনকি তোমার মৃত্যুর পরে জীবিত হওয়া পর্যন্তও না। আস্ বলল, আমি মৃত্যুর পরে আবার জবিত হব তখন অবিলম্বে আমি সম্পদ ও সন্তানের দিকে ফিরে আসব এবং তোমাকে পরিশোধ করে দেব। এ সময় আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন। "তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে, অথবা দয়াময়ের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? কখনই না; সে যা বলে অবিলম্বে আমি তা লিখে রাখব এবং তার শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকব। সে যে বিষয়ের কথা বলে তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসবে একা।"
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আদম ও মূসা-এর সাক্ষাৎ ঘটল। মূসা আদম-কে বললেন, আপনি তো সে ব্যক্তি, মানব জাতিকে কষ্টের মধ্যে ফেলেছেন এবং তাদের জান্নাত থেকে বের করিয়েছেন? আদম তাকে বললেন, আপনি তো সে ব্যক্তি, আপনাকে আল্লাহ তাআলা তার রিসালাতের জন্য নির্বাচিত করেছেন, এবং বাছাই করেছেন আপনাকে নিজের জন্য এবং আপনার ওপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন? মূসা বললেন, হ্যা। আদম বললেন, আপনি তাতে অবশ্যই পেয়েছেন যে, আমার সৃষ্টির আগেই আল্লাহ তাআলা তা আমার জন্য লিখে রেখেছেন। মূসা বললেন, হ্যা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, এভাবে আদম মূসা-এর উপর জয়ী হলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন মদিনায় এলেন, তখন ইয়াহূদীরা আশুরার দিন সওম পালন করত। তিনি তাদের (সওমের কারণ) জিজ্ঞেস করলেন। তারা বলল, এ দিনে মূসা ফিরআউনের ওপর জয়ী হয়েছিলেন। তখন নবী বললেন, আমরাই তো তাদের চেয়ে মূসা-এর নিকটবর্তী। কাজেই (মুসলিমগণ) তোমরা এ সিয়াম পালন কর।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মূসা আদম-এর সঙ্গে যুক্তি দিয়ে বললেন, আপনি তো সে ব্যক্তি, আপনার গুনাহে্র কারণে মানব জাতিকে জান্নাত থেকে বের করেছেন এবং তাদের দুঃখ-কষ্টে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আদম বললেন, হে মূসা! আপনি তো সে ব্যক্তি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে রিসালাতের জন্য এবং তার সঙ্গে কথা বলার জন্য বেছে নিয়েছেন। তবুও কি আপনি আমাকে এমন বিষয়ের জন্য নিন্দাবাদ করবেন, যা আল্লাহ আমার সৃষ্টির আগেই আমার সম্পর্কে লিখে রেখেছেন, অথবা বললেন, আমার সৃষ্টির পূর্বেই তা আমার ব্যাপারে নির্ধারণ করে রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আদম মূসা-এর উপর তর্কে বিজয়ী হলেন।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: বনী ইসরাঈলের সূরা, আল-কাহফ, মারিয়াম, ত্বহা এবং আল-আম্বিয়া সূরাগুলি খুব পুরানো সূরা যা আমি হৃদয় দিয়ে শিখেছি এবং সেগুলি আমার প্রথম সম্পত্তি।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) খুতবা দিলেন এবং বললেন, "তোমাদেরকে (কিয়ামতের দিন) খালি পায়ে, উলঙ্গ অবস্থায় এবং খতনাবিহীন অবস্থায় আল্লাহর সামনে সমবেত করা হবে। (রাসূল (ﷺ) অতঃপর তিলাওয়াত করলেনঃ- 'যেমন আমরা প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম আমরা তার পুনরাবৃত্তি করব। (এটি) একটি প্রতিশ্রুতি যা আমরা নিয়েছি এবং আমরা তা অবশ্যই করব।' এবং যোগ করেছেন, "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিকে পোশাক পরানো হবে, তিনি হবেন ইব্রাহীম। দেখ, আমার অনুসারীদের মধ্য থেকে কিছু লোককে আনা হবে এবং বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন আমি বলব, 'হে প্রভু, (এরা) আমার সঙ্গীরা!' বলা হবে, 'তুমি জানো না তোমার পরে তারা (দ্বীনের মধ্যে) কী নতুন জিনিস প্রবর্তন করেছে।' আমি তখন বলবো যেমন ধার্মিক ধার্মিক বান্দা, ঈসা বলেছেন, 'আমি তাদের মধ্যে থাকার সময় তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম...(তার বক্তব্যে)...এবং আপনিই সবকিছুর সাক্ষী।' (5.117) অতঃপর বলা হবে, '(হে মুহাম্মাদ) এই লোকেরা যখন থেকে আপনি তাদের ছেড়ে যাননি তখন থেকে মুরতাদ হতে বিরত হননি।
আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, হে আদম! আদম উত্তর দেবেন, 'আমাদের রব লাব্বাইক, এবং সা'দাইক' তখন একটি উচ্চস্বরে ডাকা হবে (বলাবে), আল্লাহ আপনাকে আদেশ করছেন যে আপনি আপনার সন্তানদের মধ্য থেকে (জাহান্নামের) আগুনের জন্য একটি মিশন গ্রহণ করুন।' আদম বলবেন, 'হে প্রভু! (জাহান্নামের) দায়ি কারা? আল্লাহ বলবেন, 'প্রতি হাজারের মধ্যে থেকে 999টি বের কর।' সে সময় প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলা তার ভার নামিয়ে ফেলবে (গর্ভপাত হবে) এবং একটি শিশুর চুল ধূসর হবে এবং আপনি মানবজাতিকে মাতাল অবস্থায় দেখতে পাবেন, অথচ মাতাল নয়, তবে আল্লাহর শাস্তি হবে কঠিন।" (২২.২) (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ কথা উল্লেখ করলেন, তখন লোকেরা এতটাই ব্যথিত (ও ভীত) হয়ে গেল যে তাদের মুখের রং পরিবর্তিত হয়ে গেল তখন নবী (ﷺ) বললেন, ইয়াজুজ ও মাজুজ থেকে নয়শত নব্বই। নয়জনকে বের করে নেওয়া হবে এবং একটি তোমাদের মধ্য থেকে।তোমরা মুসলিম (অন্যান্য সংখ্যক লোকের তুলনায়) সাদা বলদের পাশে একটি কালো চুলের মতো হবে অথবা একটি কালো বলদের পাশের একটি সাদা চুলের মতো হবে এবং আমি আশা করি আপনি জান্নাতবাসীদের এক চতুর্থাংশ হবেন।" তখন আমরা বললাম, আল্লাহু আকবার! অতঃপর তিনি বললেন, আমি আশা করি তোমরা হবে) জান্নাতীদের এক-তৃতীয়াংশ। আমরা আবার বললাম, আল্লাহু আকবার! অতঃপর তিনি বললেন, (আমি আশা করি আপনি) জান্নাতীদের অর্ধেক হবেন। তাই আমরা বললাম, আল্লাহু আকবার।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি আয়াতটি সম্পর্কে বলেন, কোন ব্যক্তি মদিনায় আগমন করতঃ যদি তার স্ত্রী পুত্র-সন্তান প্রসব করত এবং তার ঘোড়ায় বাচ্চা দিত, তখন বলত এ দ্বীন ভাল। আর যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তান না জন্মাত এবং তার ঘোড়াও বাচ্চা না দিত, তখন বলত, এটা মন্দ দ্বীন।
কায়েস ইবন উবাদ থেকে বর্ণিত: আবু যর (রা) একটি শপথ গ্রহণ করতেন যে আয়াতটি নিশ্চিত করে: 'এই দুই প্রতিপক্ষ (বিশ্বাসী ও কাফের) তাদের পালনকর্তা সম্পর্কে একে অপরের সাথে বিতর্ক করে।' (22.19) হামযা এবং তার দুই সঙ্গী এবং উতবাহ এবং তার দুই সঙ্গীর সাথে যেদিন তারা বদরের যুদ্ধ থেকে স্বস্তি লাভ করেছিল সেই দিন সম্পর্কে প্রকাশ হয়েছিল।
কায়েস ইবন উবাদ থেকে বর্ণিত: আলী বললেন, বিবাদের কারণে কেয়ামতের দিন আমিই সর্বপ্রথম করুণাময়ের সামনে নতজানু হব। কায়েস বললেন; এই আয়াতটি: 'এই দুই প্রতিপক্ষ (বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীরা একে অপরের সাথে তাদের পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্ক করে)' (22.19) বদরের যুদ্ধের জন্য যারা বেরিয়েছিল, 'আলি, হামজা, উবাইদা, শাইবা ইবন রাবী' সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। 'ক, 'উতবা ইবনে রাবিয়া এবং আল-ওয়ালিদ ইবনে 'উতবা।
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। 'উয়াইমির 'আসিম ইবন আদির নিকট আসলেন। তিনি আজ্লান গোত্রের সর্দার। 'উয়াইমির তাকে বললেন, তোমরা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কী বল, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষ দেখতে পায়। সে কি তাকে হত্যা করবে? এরপর তো তোমরা তাকেই হত্যা করবে অথবা সে কী করবে? তুমি আমার পক্ষ হতে এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস কর। তারপর আসিম নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল .....। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ধরনের প্রশ্ন অপছন্দ করলেন। তারপর 'উয়াইমির তাকে প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ধরনের প্রশ্ন না-পছন্দ করেছেন ও দূষণীয় মনে করেছেন। তখন উয়াইমির বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হব না। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য একটি পুরুষকে দেখতে পেলে সে কি তাকে হত্যা করবে? তখন তো আপনারা তাকে (কিসাস স্বরূপ) হত্যা করে ফেলবেন অথবা, সে কী করবে? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার ও তোমার স্ত্রী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বামী-স্ত্রী দু-জনকে 'লিয়ান' করার নির্দেশ দিলেন; যেভাবে আল্লাহ তাআলা তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন। তারপর 'উয়াইমির তার স্ত্রীর সঙ্গে লিয়ান করলেন। এরপরে বললেন, (এরপরও) যদি আমি তাকে রাখি, তবে তার প্রতি আমি যালিম হবো। তারপর তিনি তাকে তালাক দিয়ে দিলেন। অতএব, তাদের পরবর্তী লোকদের জন্য, যারা পরস্পর 'লিয়ান' করে- এটি সুন্নাতে পরিণত হল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, লক্ষ্য কর! যদি মহিলাটি একটি কালো ডাগর চোখ, বড় পাছা ও বড় পাওয়ালা বাচ্চা জন্ম দেয়, তবে আমি মনে করব, 'উয়াইমিরই তার সম্পর্কে সত্য বলেছে এবং যদি সে লাল গিরগিটির মত একটি লাল বর্ণের সন্তান প্রসব করে তবে আমি মনে করব, 'উয়াইমির তার সম্পর্কে মিথ্যা বলেছে। এরপর সে এমন একটি সন্তান প্রসব করল, যার গুণাবলী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) 'উয়াইমির সত্যবাদী হওয়ার পক্ষে বলেছিলেন। তারপর সন্তানটিকে মায়ের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে পরিচয় দেয়া হত।
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি আমাকে বলুন তো, এক লোক তার স্ত্রীর সঙ্গে এক লোককে দেখতে পেল। সে কী তাকে হত্যা করবে? যার ফলে আপনারা তাকে হত্যা করবেন অথবা সে আর কী করতে পারে! তারপর আল্লাহ তাআলা এ দু'জন সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ করেন, যা কুরআনে পারস্পরিক লানত করা সম্পর্কে বর্ণিত। তখন তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার ও তোমার স্ত্রী সম্পর্কে ফয়সালা হয়ে গেছে। বর্ণনাকারী বলেন, তারা উভয়ে পরস্পর 'লিয়ান' করল। তখন আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তারপর সে তার স্ত্রীকে পৃথক করে দিল। এরপর নিয়ম হয়ে গেল যে,, লিয়ানকারী উভয়কে পৃথক করে দেয়া হবে। মহিলাটি অন্তঃসত্ত্বা ছিল, তার স্বামী তার গর্ভ অস্বীকার করল। সুতরাং সন্তানটিকে তার মায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ডাকা হত। তারপর উত্তরাধিকার স্বত্বে এ নিয়ম চালু হল যে, সন্তান মায়ের 'মিরাস' পাবে। আর মাতাও সন্তানের 'মিরাস' পাবে, যা আল্লাহ তাআলা তার ব্যাপারে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। হিলাল ইবন উমাইয়াহ রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে শারীক ইবন সাহমার সঙ্গে তার স্ত্রীর ব্যভিচারের অভিযোগ করল। নবী (ﷺ) বললেন, সাক্ষী (হাযির কর) নতুবা শাস্তি তোমার পিঠে পড়বে। হিলাল বলল, হে আল্লাহর রাসূল! যখন আমাদের কেউ তার স্ত্রীর উপর অন্য কাউকে দেখে তখন সে কি সাক্ষী তালাশ করতে যাবে? তখন নবী (ﷺ) বলতে লাগলেন, সাক্ষী, নতুবা শাস্তি তোমার পিঠে। হিলাল বললেন, শপথ সে সত্তার, যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসাবে পাঠিয়েছেন, নিশ্চই আমি সত্যবাদী। অবশ্যই আল্লাহ তাআলা এমন বিধান অবতীর্ণ করবেন, যা আমার পিঠকে শাস্তি থেকে মুক্ত করে দিবে। তারপর জিবরীল এলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ করা হলঃ "যারা নিজেদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে" থেকে নবী (ﷺ) পাঠ করলেন, "যদি সে সত্যবাদী হয়ে থাকে" পর্যন্ত। তারপর নবী (ﷺ) ফিরলেন এবং তার স্ত্রীকে ডেকে আনার জন্য লোক পাঠালেন। হিলাল এসে সাক্ষ্য দিলেন। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলছিলেন, আল্লাহ তাআলা তো জানেন যে, তোমাদের দু'জনের মধ্যে অবশ্যই একজন মিথ্যাচারী। তবে কি তোমাদের মধ্যে কেউ তওবা করবে? স্ত্রীলোকটি দাড়িয়ে সাক্ষ্য দিল। সে যখন পঞ্চমবারের কাছে পৌছল, তখন লোকেরা তাকে বাধা দিল এবং বলল, নিশ্চই এটি তোমার ওপর অবশ্যম্ভাবী। ইবন আব্বাস বলেন, এ কথা শুনে সে দ্বিধাগ্রস্ত হল এবং ইতস্তত করতে লাগল। এমনকি আমরা মনে করতে লাগলাম যে, সে নিশ্চযই প্রত্যাবর্তন করবে। পরে সে বলে উঠল, আমি চিরকালের জন্য আমার বংশকে কলুষিত করব না। সে তার সাক্ষ্য পূর্ণ করল। নবী (ﷺ) বললেন, এর প্রতি দৃষ্টি রেখ, যদি সে কাল ডাগর চোখ, বড় পাছা ও মোটা নলা বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তবে ও সন্তান শারীক ইবন সাহমার। পরে সে ঐরূপ সন্তান জন্ম দিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, যদি এ বিষয়ে আল্লাহর কিতাব কার্যকর না হত, তা হলে অবশ্যই আমার ও তার মধ্যে কী ব্যাপার যে ঘটত।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে স্বীয় স্ত্রীর উপর (যিনার) অভিযোগ আনে এবং সে স্ত্রীর সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে। রাসূল উভয়কে লি'য়ান করতে আদেশ দেন। আল্লাহ তাআলা যেভাবে বলেছেন, সেভাবে তারা লিয়ান করে। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ সিদ্ধান্ত দিলেন যে, বাচ্চাটি স্ত্রীর আর তিনি লি'য়ানকারী দু'জনকে আলাদা করে দিলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "যে এ অপবাদের বড় ভূমিকা নিয়েছিল"(24.11) এর ব্যাখ্যায় বলেন, সে হল আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল।
ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে উরওয়াহ ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন মুসাইয়্যিব, আলক্বামাহ ইবন ওয়াক্কাস, উবাইদুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন 'উত্বাহ ইবন মাস'উদ নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ-এর ঘটনা সম্পর্কে বলেন, যখন অপবাদকারীরা তার প্রতি অপবাদ এনেছিল এবং আল্লাহ তাআলা তাকে তাদের অভিযোগ থেকে নির্দোষ হওয়ার বর্ণনা দেন। তাদের প্রত্যেকেই ঘটনার অংশ বিশেষ আমাকে জানান। অবশ্য তাদের পরস্পর পরস্পরের বর্ণনা সমর্থন করে, যদিও তাদের মধ্যে কেউ অন্যের তুলনায় এ ঘটনাটি অধিক সংরক্ষণ করেছে। তবে উরওয়াহ আয়িশাহ থেকে আমাকে এরূপ বলেছিলেন যে, নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কোথাও সফরে বের হতেন, তখন তিনি তার স্ত্রীগণের মধ্যে লটারী দিতেন। এতে যার নাম উঠত, তাকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বের হতেন। আয়িশাহ বলেন, অতএব, কোন এক যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমাদের মধ্যে লটারী দিলেন, তাতে আমার নাম উঠল। আমি রসূসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হলাম, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরে। আমাকে হাওদায় করে উঠানো হতো এবং তাতে করে নামানো হতো। এভাবেই আমরা চললাম। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুদ্ধ শেষ করে ফিরলেন এবং ফেরার পথে আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম। একদা রওয়ানা দেয়ার জন্য রাত থাকতেই ঘোষণা দিলেন। এ ঘোষণা হলে আমি উটে চড়ে সৈন্যদের অবস্থান থেকে কিছু দূরে চলে গেলাম। আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে যখন সওয়ারীর কাছে এলাম, তখন দেখতে পেলাম যে, জাফারের দানা খচিত আমার হারটি ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেছে। আমি তা খোজ করতে লাগলাম। খোজ করতে আমার একটু দেরী হয়ে গেল। ইতোমধ্যে এ সকল লোক যারা আমাকে সওয়ার করাতো তারা, আমি আমার হাওদার ভেতরে আছি মনে করে, আমার হাওদা উটের পিঠে রেখে দিল। কেননা এ সময় শরীরের গোশত আমাকে ভারী করেনি। আমরা খুব অল্প-খাদ্য খেতাম। আমি ছিলাম অল্পবয়স্কা এক বালিকা। সুতরাং হাওদা উঠাবার সময় তা যে খুব হালকা, তা তারা টের পায়নি এবং তারা উট হাকিয়ে রওয়ানা দিল। সেনাদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার হার পেয়ে গেলাম এবং যেখানে তারা ছিল সেখানে ফিরে এলাম। তখন সেখানে এমন কেউ ছিল না, যে ডাকবে বা ডাকে সাড়া দিবে। আমি যেখানে ছিলাম সে স্থানেই থেকে গেলাম। এ ধারণায় বসে থাকলাম যে, যখন কিছুদূর গিয়ে আমাকে দেখতে পাবে না, তখন এ স্থানে অবশ্যই খুজতে আসবে। সেখানে বসা অবস্থায় আমার চোখে ঘুম এসে গেল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আর সৈন্যবাহিনীর পিছনে সাফওয়ান ইবন মু'আত্তাল সুলামী যাওকয়ানী ছিলেন। তিনি শেষ রাতে রওয়ানা দিয়ে ভোর বেলা আমার এ স্থানে এসে পৌছলেন। তিনি একজন মানুষের আকৃতি নিদ্রিত দেখতে পেলেন। তিনি আমার কাছে এসে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। কেননা, পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হবার আগে আমাকে দেখেছিলেন। কাজেই আমাকে চেনার পর উচ্চকন্ঠে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" পড়লেন। পড়ার শব্দে আমি উঠে গেলাম এবং আমি আমার চাদর পেচিয়ে চেহারা ঢেকে নিলাম। আল্লাহর কসম, তিনি আমার সঙ্গে কোন কথাই বলেননি এবং তার মুখ হতে "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" ব্যতীত আর কোন কথা আমি শুনিনি। এরপর তিনি তার উষ্ট্রী বসালেন এবং সামনের দুই পা নিজ পায়ে দাবিয়ে রাখলেন। আর আমি তাতে উঠে গেলাম। তখন সাফওয়ান উষ্ট্রীর লাগাম ধরে চললেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সৈন্যবাহিনীর নিকট এ সময় গিয়ে পৌছলাম, যখন তারা দুপুরের প্রচন্ড উত্তাপের সময় অবতরণ করে। (এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে) যারা ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হল। আর যে ব্যক্তি এ অপবাদের নেতৃত্ব দেয়, সে ছিল (মুনাফিক সরদার) আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল। তারপর আমি মদিনায় এসে পৌছলাম এবং পৌছার পর আমি দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত অসুস্থ ছিলাম। আর অপবাদকারীদের কথা নিয়ে লোকেরা রটনা করছিল। আমি এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এতে আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে রকম স্নেহ-ভালবাসা দেখাতেন, এবারে তেমনি ভালবাসা দেখাচ্ছেন না। শুধু এতটুকুই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার কাছে আসতেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার অবস্থা কী? তারপর তিনি ফিরে যেতেন। এই আচরণই আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল; অথচ আমি এই অপপ্রচার সম্বন্ধে জানতেই পারিনি। অবশেষে একটু সুস্থ হওয়ার পর মিসতাহের মায়ের সঙ্গে মানাসের (শহরের বাইরে খোলা ময়দানের) দিকে বের হলাম। সে জায়গাটিই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার স্থান আর আমরা কেবল রাতের পর রাতেই বাইরে যেতাম। এ ছিল এ সময়ের কথা যখন আমাদের ঘরের পাশে পায়খানা নির্মিত হয়নি। আমাদের অবস্থা ছিল, অনেকটা প্রাচীন আরবদের ন্যায় নিচু ময়দানের দিকে বের হয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা। কেননা, ঘর-সংলগ্ন পায়খানা নির্মাণ আমরা কষ্টকর মনে করতাম। কাজেই আমি ও মিসতাহের মা বাইরে গেলাম। তিনি ছিলেন আবূ রুহ্ম ইবন আব্দ মানাফের কন্যা এবং মিসতাহের মায়ের মা ছিলেন সাখর ইবন আমিরের কন্যা, যিনি আবূ বাকর সিদ্দীক-এর খালা ছিলেন। আর তার পুত্র ছিলেন 'মিসতাহ্ ইবন উসাসাহ'। আমি ও উম্মু মিসতাহ্ আমাদের প্রয়োজন সেরে ঘরের দিকে ফিরলাম। তখন মিসতাহের মা তার চাদরে হোঁচট খেয়ে বললেন, 'মিসতাহ্' ধ্বংস হোক। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলছ, তুমি কি এমন এক ব্যক্তিকে মন্দ বলছ, যে বদরের যুদ্ধে হাজির ছিল? তিনি বললেন, হায়রে বেখেয়াল! তুমি কি শোননি সে কী বলেছে? আমি বললাম, সে কী বলেছে? তিনি বললেন, এমন এমন। এ বলে তিনি অপবাদকারীদের মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত খবর দিলেন। এতে আমার অসুখের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। যখন আমি ঘরে ফিরে আসলাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, তুমি কেমন আছ? তখন আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার আববা-আম্মার নিকট যেতে অনুমতি দিবেন? আয়িশাহ বললেন, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি তাদের কাছে গিয়ে তাদের থেকে আমার এ ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জেনে নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আববা-আম্মার কাছে চলে গেলাম এবং আমার আম্মাকে বললাম, ও গো আম্মা! লোকেরা কী বলাবলি করছে? তিনি বললেন, বৎস! তুমি তোমার মন হালকা রাখ। আল্লাহর কসম! এমন কমই দেখা যায় যে, কোন পুরুষের কাছে এমন সুন্দরী রূপবতী স্ত্রী আছে, যাকে সে ভালবাসে এবং তার সতীনও আছে; অথচ তার ত্রুটি বের করা হয় না। রাবী বলেন, আমি বললাম, 'সুবহান আল্লাহ'! সত্যি কি লোকেরা এ ব্যাপারে বলাবলি করছে? তিনি বলেন, আমি সে রাত কেঁদে কাটালাম, এমন কি ভোর হয়ে গেল, তথাপি আমার কান্না থামল না এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। আমি কাঁদতে কাঁদতেই ভোর করলাম। যখন ওয়াহী আসতে দেরী হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলী ইবন আবূ তালিব ও উসামাহ ইবন যায়দ -কে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদের ব্যাপারে তাদের পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি বলেন, উসামাহ ইবন যায়দ তার সহধর্মিণী (আয়িশাহ-এর পবিত্রতা এবং তার অন্তরে তাদের প্রতি তার ভালবাসা সম্পর্কে যা জানেন তার আলোকে তাকে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই পোষণ করি। আর আলী ইবন আবূ তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার উপর কোন পথ সংকীর্ণ করে দেননি এবং তিনি ব্যতীত বহু মহিলা রয়েছেন। আর আপনি যদি দাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বারীরাহ্কে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরাহ! তুমি কি তার নিকট হতে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ? বারীরাহ বললেন, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তার কসম! আমি এমন কোন কিছু তার মধ্যে দেখতে পাইনি, যা আমি গোপন করতে পারি। তবে তার মধ্যে সবচাইতে অধিক যা দেখেছি, তা হল, তিনি একজন অল্পবয়স্কা বালিকা। তিনি কখনও তার পরিবারের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। অর ছাগলের বাচ্চা এসে তা খেয়ে ফেলত। এরপরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) (মিম্বরে) দাড়ালেন। আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলের বিরুদ্ধে তিনি সমর্থন চাইলেন। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বরের উপর থেকে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, ঐ ব্যক্তির মিথ্যা অপবাদ থেকে আমাকে সাহায্য করতে পারে, যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালই জানতে পেরেছি এবং তারা এমন এক পুরুষ সম্পর্কে অভিযোগ এনেছে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছুই জানি না। সে কখনও আমাকে ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি। এ কথা শুনে সাদ ইবন মুআয আনসারী দাড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তার বিরুদ্ধে আমি আপনাকে সাহায্য করব, যদি সে আউস গোত্রের হয়, তবে আমি তার গর্দান মেরে দিব। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোক হয়, তবে আপনি নির্দেশ দিলে আমি আপনার নির্দেশ কার্যকর করব। আয়িশাহ বলেন, এরপর সাদ ইবন উবাদা দাড়ালেন; তিনি খাযরাজ গোত্রের সর্দার। তিনি পূর্বে একজন নেক্কার লোক ছিলেন। কিন্তু এ সময় স্ব-গোত্রের পক্ষপাতিত্ব তাকে উত্তেজিত করে তোলে। কাজেই তিনি সাদকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতা তুমি রাখ না। তারপর উসায়দ ইবন হুদায়র দাড়ালেন, যিনি সাদের চাচাতো ভাই। তিনি সাদ ইবন উবাদাকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি নিজেও মুনাফিক এবং মুনাফিকের পক্ষে প্রতিবাদ করছ। এতে আউস এবং খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, এমনকি তারা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বরে দাড়ানো ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের থামাতে লাগলেন। অবশেষে তারা থামল। নবী (ﷺ) ও নীরব হলেন। আয়িশাহ বলেন, আমি সেদিন এমনভাবে কাটালাম যে, আমার চোখের অশ্রুও থামেনি এবং চোখেও ঘুমও আসেনি। আয়িশাহ বলেন, সকালবেলা আমার আববা-আম্মা আমার কাছে আসলেন, আর আমি দু'রাত এবং একদিন (একাধারে) কাঁদছিলাম। এর মধ্যে না আমার ঘুম হয় এবং না আমার চোখের পানি বন্ধ হয়। তারা ধারণা করছিলেন যে, এ ক্রন্দনে আমার কলজে ফেটে যাবে। আয়িশাহ বলেন, এর পূর্বে তারা যখন আমার কাছে বসা ছিলেন এবং আমি কাঁদছিলাম, ইত্যবসরে জনৈকা আনসারী মহিলা আমার কাছে আসার জন্য অনুমতি চাইলেন। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে বসে আমার সঙ্গে কাঁদতে লাগল। আমাদের এ অবস্থার মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে বসলেন। আয়িশাহ বলেন এর পূর্বে যখন থেকে এ কথা রটনা চলেছে, তিনি আমার কাছে বসেননি। এ অবস্থায় তিনি একমাস অপেক্ষা করেছেন, আমার সম্পর্কে ওয়াহী আসেনি। আয়িশাহ বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, হে আয়িশাহ! তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার কাছে পৌছেছে, তুমি যদি নির্দোষ হয়ে থাক, তবে অচিরেই আল্লাহ তাআলা তোমার পবিত্রতা ব্যক্ত করে দিবেন। আর যদি তুমি কোন পাপে লিপ্ত হয়ে থাক, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তার কাছে তওবা কর। কেননা, বান্দা যখন তার পাপ স্বীকার করে নেয় এবং আল্লাহর কাছে তওবা করে, তখন আল্লাহ তার তওবা কবূল করেন। আয়িশাহ বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কথা শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি এমনভাবে শুকিয়ে গেল যে, এক ফোঁটা পানিও অনুভব করছিলাম না। আমি আমার পিতাকে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে (তিনি যা কিছু বলেছেন তার) জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী জবাব দিব, তা আমার বুঝে আসছে না। তারপর আমার আম্মাকে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জবাব দিন। তিনি [আয়িশাহ-এর আম্মা) বললেনঃ আমি বুঝতে পারছি না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কি জবাব দিব। আয়িশাহ বলেন, তখন আমি নিজেই জবাব দিলাম, অথচ আমি একজন অল্প বয়স্কা বালিকা, কুরআন খুব অধিক পড়িনি। আল্লাহর কসম! আমি জানি, আপনারা এ ঘটনা শুনেছেন, এমনকি তা আপনাদের অন্তরে বসে গেছে এবং সত্য বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি বলি যে, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ ভালভাবেই জানেন যে, আমি নির্দোষ; তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি আপনাদের কাছে এ বিষয় স্বীকার করে নেই, অথচ আল্লাহ জানেন, আমি তা থেকে নির্দোষ; তবে আপনারা আমার এই উক্তি বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহর কসম! এ ক্ষেত্রে আমি আপনাদের জন্য ইউসুফ-এর পিতার উক্তি ব্যতীত আর কোন দৃষ্টান্ত পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, "পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়। তিনি বলেন, এরপর আমি আমার চেহারা ঘুরিয়ে নিলাম এবং কাত হয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তিনি বলেন, এ সময় আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দিবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি তখন এ ধারণা করতে পারিনি যে, আল্লাহ আমার সম্পর্কে এমন ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যা তিলাওয়াত করা হবে। আমার দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা এর চাইতে অনেক নিচে ছিল। বরং আমি আশা করেছিলাম যে, হয়ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিদ্রায় কোন স্বপ্ন দেখবেন, যাতে আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতা জানিয়ে দেবেন। আয়িশাহ বলেন, আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়াননি এবং ঘরের কেউ বের হননি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হতে লাগল এবং তার শরীর ঘামতে লাগল। এমনকি যদিও শীতের দিন ছিল, তবুও তার উপর যে ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছিল এর বোঝার ফলে মুক্তার মত তার ঘাম ঝরছিল। যখন ওয়াহী শেষ হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসছিলেন। তখন তিনি প্রথম যে বাক্যটি বলেছিলেন, তা হলেঃ হে আয়িশাহ! আল্লাহ তোমার নির্দেষিতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না, আল্লাহ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা করব না। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন পূর্ণ দশ আয়াত পর্যন্ত। "যারা এ অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল।" যখন আল্লাহ তাআলা আমার নির্দোষিতার আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তখন আবূ বকর সিদ্দীক যিনি মিস্তাহ্ ইবন উসাসাকে নিকটবর্তী আত্মীয়তা এবং দারিদ্রের কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! মিস্তাহ্ আয়িশাহ সম্পর্কে যা বলেছে, এরপর আমি তাকে কখনই কিছুই দান করব না। তারপর আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন, "তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তার আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আবূ বকর এ সময় বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন। তারপর তিনি মিস্তাহকে সাহায্য আগের মত দিতে লাগলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ সাহায্য কখনও বন্ধ করব না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জয়নব বিন্ত জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে জয়নব! (আয়িশাহ সম্পর্কে) কী জান আর কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার কান ও চোখকে বাচিয়ে রাখতে চাই। আমি তার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে তিনি আমার প্রতিদ্বনিদ্বতা করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে পরহেযগারীর কারণে রক্ষা করেন। আর তার বোন হাম্না তার পক্ষ অবলম্বন করে দ্বন্দ্ব করে এবং অপবাদ দানকারী যারা ধ্বংস হয়েছিল তাদের মধ্যে সেও ধ্বংস হল।
আয়িশাহ-এর মা উম্মু রূমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আয়িশাহ-এর উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়া হল তখন তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়লেন।
ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্ণিত: আমি আয়েশা কে বলতে শুনেছিঃ "যখন তুমি মিথ্যা উদ্ভাবন করেছিলে (এবং তা তোমার জিহ্বায় বহন করে)।" (24.15)
ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস আয়িশাহ-এর ওফাতের পূর্বে তার কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। এ সময় তিনি [আয়িশাহ] মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি ভয় করছি, তিনি আমার কাছে এসে আমার সুখ্যাতি করবেন। তখন তার [আয়িশাহ]-এর কাছে বলা হল, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চাচাতো ভাই এবং সম্মানিত মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি বললেন, তবে তাকে অনুমতি দাও। তিনি (এসে) জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কাছে আপনার অবস্থা কেমন লাগছে? তিনি বললেন, আমি যদি নেক হই তবে ভালই আছি। ইবন আব্বাস বললেন, আল্লাহ চাহেত আপনি নেকই আছেন। আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহধর্মিণী এবং তিনি আপনাকে ব্যতীত আর কোন কুমারীকে বিবাহ করেননি এবং আপনার নির্দোষিতা আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তার পেছনে ইবন যুবায়র প্রবেশ করলেন। তখন আয়িশাহ বললেন, ইবন আব্বাস আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমার সুখ্যাতি করেছেন। কিন্তু আমি এ-ই পছন্দ করি যে, আমি যেন লোকের স্মৃতির পাতা থেকে পুরোপুরি মুছে যায়।
কাসিম হতে বর্ণিত যে, ইবন আব্বাস আয়িশাহ-এর নিকট যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। পরবর্তী অংশ উক্ত হাদীসের অনুরূপ। এতে (স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হয়ে যেতাম) অংশটি নেই।
মাসরূক আয়িশাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হাসান ইবন সাবিত এসে (তার ঘরে প্রবেশের) অনুমতি চাইলেন। আমি বললাম, এ লোককে কি আপনি অনুমতি প্রদান করবেন? তিনি (আয়িশাহ) বললেন, তার উপর কি কঠোর শাস্তি নেমে আসেনি? সুফ্ইয়ান বলেন, এর দ্বারা আয়িশাহ তার দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়ার কথা বুঝিয়েছেন। হাসান ইবন সাবিত আয়িশাহ-এর প্রশংসা করে নিম্নের ছন্দ দু'টি পাঠ করলেন, একজন পবিত্র মহিলা যার চরিত্রে কোন সন্দেহ করা হয় না। তিনি কখনই সতী অসতর্ক মহিলাদের কথা তাদের পেছনে বলেন না।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাস্সান ইবন সাবিত আয়িশাহ কাছে এসে নিচের শ্লোকটি আবৃত্তি করলেন। তিনি একজন পবিত্র মহিলা যার চরিত্রে কোন সন্দেহ করা হয় না। তিনি সতীসাধ্বী মহিলাদের গোশ্ত ভক্ষণ থেকে মুক্ত অবস্থায় ভোরে ওঠে। আয়িশাহ বললেন, 'তুমি তো এরূপ নও।' (মাসরূক বললেন) আমি বললাম, আপনি এমন এক ব্যক্তিকে কেন আপনার কাছে আসতে দিলেন, যার সম্পর্কে আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। আর যে ব্যক্তি এর বড় অংশ নিজের উপর নিয়েছে, তার জন্য তো রয়েছে কঠিন শাস্তি (২৪ঃ১১)। আয়িশাহ বললেন, 'দৃষ্টিহীনতার চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কী হতে পারে? তিনি আরও বললেন, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ হতে জবাব দিতেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আমার সম্পর্কে আলোচনা চলছিল যা রটনা হয়েছে এবং আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তখন আমার ব্যাপারে ভাষণ দিতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দাড়ালেন। তিনি প্রথমে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন। তারপর আল্লাহর প্রতি যথাযোগ্য হাম্দ ও সানা পাঠ করলেন। এরপরে বললেন, হে মুসলিমগণ! যে সকল লোক আমার স্ত্রী সম্পর্কে অপবাদ দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দাও। আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে মন্দ কিছুই জানি না। তারা এমন এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছে, আল্লাহর কসম, তার ব্যাপারেও আমি কখনও খারাপ কিছু জানি না এবং সে কখনও আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে প্রবেশ করে না এবং আমি যখন কোন সফরে গিয়েছি সেও আমার সঙ্গে সফরে গিয়েছে। সাদ ইবন উবাদা দাড়িয়ে বললেন, আমাকে তাদের শিরোচ্ছেদ করার অনুমতি দিন। এর মধ্যে বানী খাযরাজ গোত্রের এক ব্যক্তি, যে হাস্সান ইবন সাবিতের মাতার আত্মীয় ছিল, সে দাড়িয়ে বলল, তুমি মিথ্যা বলেছ, জেনে রাখ, আল্লাহর কসম! যদি সে (অপবাদকারী) ব্যক্তিরা আউস্ গোত্রের হত, তাহলে তুমি শিরোচ্ছেদ করতে পছন্দ করতে না। আউস ও খাযরাজের মধ্যে মসজিদেই একটা দুর্ঘটনা ঘটার অবস্থা দেখা দিল। আর আমি এ বিষয় কিছুই জানি না। সেদিন সন্ধ্যায় যখন আমি আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলাম, তখন উম্মু মিসতাহ্ আমার সঙ্গে ছিলেন এবং তিনি হোঁচট খেয়ে বললেন, 'মিস্তাহ্ ধ্বংস হোক'! আমি বললাম, হে উম্মু মিসতাহ! তুমি তোমার সন্তানকে গালি দিচ্ছ? তিনি নীরব থাকলেন। তারপর দ্বিতীয় হোঁচট খেয়ে বললেন, 'মিসতাহ্ ধ্বংস হোক'। আমি তাকে বললাম, 'তুমি তোমার সন্তানকে গালি দিচ্ছ?' তিনি (উম্মু মিসতাহ্) তৃতীয়বার পড়ে গিয়ে বললেন, 'মিসতাহ্ ধ্বংস হোক'। আমি এবারে তাকে ধমক দিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তাকে তোমার কারণেই গালি দিচ্ছি। আমি বললাম আমার ব্যাপারে? আয়িশাহ বলেন, তখন তিনি আমার কাছে সব ঘটনা বিস্তারিত বললেন। আমি বললাম, তাই হচ্ছে নাকি? তিনি বললেন, হা আল্লাহর কসম! এরপর আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম এবং যে প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম তা একেবারেই ভুলে গেলাম। এরপর আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম যে, আমাকে আমার পিতার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। তিনি একটি ছেলেকে আমার সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। আমি যখন ঘরে প্রবেশ করলাম, তখন উম্মু রূমানকে নিচে দেখতে পেলাম এবং আবূ বাকর ঘরের ওপরে পড়ছিলেন। আমার আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, হে বৎস! কিসে তোমাকে নিয়ে এসেছে? আমি তাকে সংবাদ দিলাম এবং তার কাছে ঘটনা বললাম। এ ঘটনা তার ওপর তেমন প্রভাব বিস্তার করেনি, যেমন আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি বললেন, হে বৎস! এটাকে তুমি হাল্কাভাবে গ্রহণ কর, কেননা, এমন সুন্দরী নারী কমই আছে, যার স্বামী তাকে ভালবাসে আর তার সতীনরা তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয় না এবং তার বিরুদ্ধে কিছু বলে না। বস্তুত তার ওপর ঘটনাটি অতখানি প্রভাব বিস্তার করেনি যতখানি আমার উপর করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমার আববা [আবূ বাকর ] কি এ ঘটনা জেনেছেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও কি? তিনি জবাব দিলেন হ্যা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও এ ঘটনা জানেন। তখন আমি অশ্রু ঝরিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আবূ বক্র আমার কান্না শুনতে পেলেন। তখন তিনি ঘরের ওপরে পড়ছিলেন। তিনি নিচে নেমে আসলেন এবং আমার আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার কী হয়েছে? তিনি বললেন, তার সম্পর্কে যা রটেছে তা তার গোচরীভূত হয়েছে। এতে আবূ বাকরের চোখের পানি ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, হে বৎস! আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে আসলেন। তিনি আমার খাদিমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আল্লাহর কসম, আমি এ ব্যতীত তার কোন দোষ জানি না যে, তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ছাগল এসে তার খামির অথবা বললেন, গোলা আটা খেয়ে যেত। তখন কয়েকজন সাহাবী তাকে ধমক দিয়ে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে সত্য কথা বল। এমনকি তারা তার নিকট ঘটনা খুলে বললেন। তখন সে বলল, সুবহান আল্লাহ, আল্লাহর কসম! আমি তার ব্যাপারে এর চেয়ে অধিক কিছু জানি না, যা একজন স্বর্ণকার তার এক টুকরা লাল খাঁটি স্বর্ণ সম্পর্কে জানে। এ ঘটনা সে ব্যক্তির কাছেও পৌছল যার সম্পর্কে এ অভিযোগ উঠেছে। তখন তিনি বললেন, সুবহান আল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি কখনও কোন মহিলার পর্দা খুলিনি। আয়িশাহ বলেন, পরবর্তী সময়ে এ (অভিযুক্ত) লোকটি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ রূপে নিহত হন। তিনি বলেন, ভোর বেলায় আমার আববা ও আম্মা আমার কাছে এলেন। তারা এতক্ষণ থাকলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করে আমার কাছে এলেন। এ সময় আমার ডানে ও বামে আমার আববা আমাকে ঘিরে বসা ছিলেন। তিনি [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] আল্লাহ তাআলার হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, হে আয়িশাহ! তুমি যদি কোন গুনাহর কাজ বা অন্যায় করে থাক তবে আল্লাহর কাছে তাওবা কর, কেননা, আল্লাহ তার বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন। তখন জনৈকা আনসারী মহিলা দরজার কাছে বসা ছিল। আমি বললাম, আপনি কি এ মহিলাকেও লজ্জা করছেন না, এসব কিছু বলতে? তবুও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে নাসীহাত করলেন। তখন আমি আমার আববার দিকে লক্ষ্য করে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জবাব দিন। তিনি বললেন, আমি কী বলব? এরপরে আমি আম্মার দিকে লক্ষ্য করে বললাম, আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জবাব দিন। তিনিও বললেন, আমি কী বলব? যখন তারা কেউই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কোন জবাব দিলেন না, তখন আমি কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে আল্লাহর যথোপযুক্ত হাম্দ ও সানা পাঠ করলাম। এরপর বললাম, আল্লাহর কসম! আমি যদি বলি যে, আমি এ কাজ করিনি এবং আমি যে সত্যবাদী এ সম্পর্কে আল্লাহই সাক্ষী, তবে তা আপনাদের নিকট আমার কোন উপকারে আসবে না। কেননা, এ ব্যাপারটি আপনারা পরস্পরে বলাবলি করেছেন এবং তা আপনাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। আর আমি যদি আপনাদের বলি, আমি তা করেছি অথচ আল্লাহ জানেন যে আমি এ কাজ করিনি, তবে আপনারা অবশ্যই বলবেন যে, সে তার নিজের দোষ নিজেই স্বীকার করেছে। আল্লাহর কসম! আমি আমার এবং আপনাদের জন্য আর কোন দৃষ্টান্ত পাচ্ছি না। তখন আমি ইয়াকূব -এর নাম স্মরণ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারিনি-তাই বললাম, যখন ইউসুফ-এর পিতার অবস্থা ব্যতীত, যখন তিনি বলেছিলেন, (তোমরা ইউসুফ সম্পর্কে যা বলছ তার প্রেক্ষিতে) পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী। ঠিক এ সময়ই রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট ওয়াহী অবতীর্ণ হল। আমরা সবাই নীরব রইলাম। ওয়াহী শেষ হলে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চেহারায় খুশীর নমুনা দেখতে পেলাম। তিনি তার কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে বলছিলেন, হে আয়িশাহ! তোমার জন্য খোশখবর! আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। আয়িশাহ বলেন, এ সময় আমি অত্যন্ত রাগান্বিত ছিলাম। আমার আববা ও আম্মা বললেন, 'তুমি উঠে তার কাছে যাও', (এবং তার শুকরিয়া আদায় কর)। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তার দিকে যাব না এবং তার শুক্রিয়া আদায় করব না। আর আপনাদেরও শুক্রিয়া আদায় করব না। কিন্তু আমি একমাত্র আল্লাহর প্রশংসা করব, যিনি আমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। আপনারা (অপবাদ রটনা) শুনছেন কিন্তু তা অস্বীকার করেননি এবং তার পাল্টা ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি। আয়িশাহ আরও বলেন, জয়নাব বিনতে জাহাশকে আল্লাহ তার দ্বীনদারীর কারণে তাকে রক্ষা করেছেন। তিনি (আমার ব্যাপারে) ভাল ব্যতীত কিছুই বলেননি। কিন্তু তার বোন হামনা ধ্বংসপ্রাপ্তদের সঙ্গে নিজেও ধ্বংস হল। যারা এই ব্যাপারে কটুক্তি করত তাদের মধ্যে ছিল মিস্তাহ্, হাস্সান ইবন সাবিত এবং মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই। সে-ই এ সংবাদ সংগ্রহ করে ছড়াত। আর পুরুষদের মধ্যে সে এবং হামনাই এ ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা পালন করত। রাবী বলেন, তখন আবূ বাকর কখনও মিসতাহ্কে কোন প্রকার উপকার করবেন না বলে কসম খেলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন, "তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী (আবূ বাকর) তারা যেন কসম না করে যে তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে মিসতাহ্কে কিছুই দেবে না। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" আবূ বাকর বললেন, হা আল্লাহর কসম! হে আমাদের রব! আমরা অবশ্যই এ চাই যে, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিবেন। তারপর আবূ বাকর আবার মিস্তাহকে আগের মত আচরণ করতে লাগলেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। আল্লাহ তাআলা প্রাথমিক যুগের মুহাজির মহিলাদের উপর রহম করুন, যখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত "তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে" অবতীর্ণ করলেন, তখন তারা নিজ চাদর ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমন্ডল ঢাকল।
সফীয়্যাহ বিনতে শাইবাহ হতে বর্ণিত। আয়িশাহ বলতেন, যখন এ আয়াত "তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন ওড়না দ্বারা আবৃত করে" অবতীর্ণ হল তখন মুহাজির মহিলারা তাদের তহবন্দের পার্শ্ব ছিঁড়ে তা দিয়ে মুখমন্ডল ঢাকতে লাগল।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর নবী! কিয়ামতের দিন কাফেরদের মুখে ভর করে চলা অবস্থায় একত্রিত করা হবে? তিনি বললেন, যিনি এ দুনিয়ায় তাকে দু'পায়ের উপর চালাতে পারছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখে ভর করে তাকে চালাতে পারবেন না? ক্বাতাদাহ বলেন, নিশ্চই, আমার রবের ইজ্জতের কসম!
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, অথবা অন্য কেউ জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? তিনি বললেন, কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করা, অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোনটি? তিনি জবাব দিলেন, তোমার সন্তানকে এ আশংকায় হত্যা করা যে, তারা তোমার খাদ্যে ভাগ বসাবে। আমি বললাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন,এরপর হচ্ছে তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচার করা। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এ কথার সমর্থনে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়- "এবং তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে আহবান করে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না।"
কাসিম ইবন আবূ বাযযা হতে বর্ণিত। তিনি সাঈদ ইবন যুবায়র-কে জিজ্ঞেস করলেন, যদি কেউ কোন মুমিন ব্যক্তিকে ইচ্ছাবশতঃ হত্যা করে, তবে কি তার জন্য তাওবা আছে? আমি তাকে এ আয়াত পাঠ করে শোনালাম "আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না।" সাঈদ বললেন, তুমি যে আয়াত আমার সামনে পড়লে, আমিও এমনিভাবে ইবন আব্বাস-এর সামনে এ আয়াত পড়েছিলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতটি মাক্কী। সূরাহ নিসার মধ্যে মাদানী আয়াতটি একে রহিত করে দিয়েছে।
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুমিনের হত্যার ব্যাপারে কূফাবাসী মতভেদে লিপ্ত হল। আমি (এ ব্যাপারে) ইবন আব্বাস-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, (মুমিনের হত্যা সম্পর্কিত) এ আয়াত সর্বশেষে অবতীর্ণ হয়েছে। একে অন্য কিছু রহিত করেনি।
সাঈদ ইবন জুবায়ের থেকে বর্ণিত: আমি ইবনে আব্বাসকে আল্লাহর বাণী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম:- '.. এই পুরস্কার জাহান্নামের আগুন।' (৪.৯৩) তিনি বললেন, তার (মুমিনের হত্যাকারী) কোনো তওবা কবুল করা হবে না। আমি তাকে আল্লাহর বাণী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলামঃ 'যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না।' ..(25.68) তিনি বলেন, "এই আয়াতটি প্রাক-ইসলামী যুগের পৌত্তলিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল।"
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আবযা বলেন, ইবন আব্বাসকে জিজ্ঞেস করা হল, আল্লাহ তাআলার বাণীঃ "কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম" এবং আল্লাহর এ বাণীঃ "এবং আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত, তারা তাকে হত্যা করে না" এবং "কিন্তু যারা তওবা করে" পর্যন্ত সম্পর্কে। আমিও তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি উত্তরে বললেন, যখন এ আয়াত নাযিল হল তখন মক্কাবাসী বলল, আমরা আল্লাহর সাথে শারীক করেছি, আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করেছি এবং আমরা অশ্লীল কার্যে লিপ্ত হয়েছি। তারপর আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, "যারা তওবাহ করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে।' (25.70)
সাঈদ ইবন জুবায়ের থেকে বর্ণিত: আবদুর-রহমান ইবন আবজা আমাকে ইবন আব্বাসকে দুইটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার নির্দেশ দেন (যার প্রথমটি ছিল): "এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুমিনকে হত্যা করে।" (4.93) অতঃপর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি বললেন, কোন কিছুই এ আয়াত রহিত করেনি। (অন্য আয়াত) সম্পর্কে: 'আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন উপাস্যকে ডাকে না।' তিনি বললেন, এটা পৌত্তলিকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পাচটি ঘটনা ঘটে গেছে ধূম্রাচ্ছন্ন, চন্দ্র খন্ডিত হওয়া, রোমানদের পরাজিত হওয়া, প্রবলভাবে পাকড়াও এবং ধ্বংস হওয়া। (25.77)
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামত দিবসে ইব্রাহীম তার পিতাকে ধূলি-মলিন অবস্থায় দেখতে পাবেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, (হাশরের ময়দানে ইব্রাহীম তার পিতার সাক্ষাৎ পেয়ে বলবেন, ইয়া রব! আপনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করেছেন যে, কিয়ামতের দিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আল্লাহ তা'আলা বলবেন, আমি কাফিরদের উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন "এবং আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন" এ আয়াত অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাফা (পর্বতে) আরোহণ করলেন এবং আহবান জানালেন, হে বানী ফিহর! হে বানী আদী! কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে। অবশেষে তারা জমায়েত হল। যে নিজে আসতে পারল না, সে তার প্রতিনিধি পাঠাল, যাতে দেখতে পায়, ব্যাপার কী? সেখানে আবূ লাহাব ও কুরাইশগণও আসল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুসৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল, হা আমরা আপনাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি। তখন তিনি বললেন, "আমি তোমাদেরকে কঠিন শাস্তির ভয় প্রদর্শন করছি।" আবূ লাহাব [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে] বলল, সারাদিন তোমার উপর ধ্বংস নামুক! এজন্যই কি তুমি আমাদের জমায়েত করেছ? তখন অবতীর্ণ হল, "ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের হস্ত দু'টি এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার অর্জন তার কোন উপকারে লাগেনি।" (111.1-5)
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন "তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক কর" এ আয়াত অবতীর্ণ হল, তখন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) দাড়ালেন এবং বললেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়! অথবা অনুরূপ বাক্য, নিজেদের কিনে নাও। আমি আল্লাহর নিকট তোমাদের কোন উপকারে আসব না। হে বানী আব্দে মানাফ! আল্লাহর নিকট আমি তোমাদের কোন উপকারে আসব না। হে আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব! আমি আল্লাহর নিকট তোমার কোনই উপকারে আসব না। হে আল্লাহর রাসূলের ফুফু সফীয়্যাহ! আমি তোমার কোনই উপকার করতে পারব না। হে মুহাম্মদ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা! আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছে চাও, কিন্তু আল্লাহর নিকট আমি তোমার কোনই উপকারে আসব না।
মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আবূ তালিবের মৃত্যু নিকটবর্তী হল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কাছে আসলেন। তিনি সেখানে আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবন আবূ উমাইয়াহ ইবন মুগীরাহ্কে পেলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে চাচা! আপনি বলুন "লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ।" এ 'কালেমা' দ্বারা আমি আপনার জন্য কিয়ামতে আল্লাহর কাছে ওযর পেশ করতে পারব। আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবন আবূ উমাইয়াহ বলল, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বারবার তার কাছে এ 'কালিমা' পেশ করতেই থাকলেন। আর তারা তাদের কথা বারবার বলেই চলল। অবশেষে আবূ তালিব তাদের সঙ্গে সর্বশেষ এ কথা বললেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপর আছি, এবং কালিমা "লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ" পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে নিষেধ না করা অবধি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতেই থাকব। তারপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, নবী ও মুমিনদের জন্য এটা শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর আল্লাহ তাআলা আবূ তালিব সম্পর্কে অবতীর্ণ করেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সম্বোধন করে আল্লাহ তাআলা বললেন, "তুমি যাকে ভালবাস তাকেই সৎপথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন।"
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: কোরান 28.85'...তোমাকে বাড়িতে নিয়ে আসবে' মানে মক্কায়।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি কিন্দাবাসীদের সামনে বলছিল, কিয়ামতের দিন ধোয়া আসবে এবং মুনাফিকদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দেবে। আর মুমিনের কাছে মনে হবে সর্দি লেগে থাকা অবস্থার ন্যায়। এ কথা শুনে আমরা ভীত হয়ে গেলাম। এরপর আমি ইবন মাস'উদ-এর নিকট গেলাম। তখন তিনি তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। এ সব কথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, যার জানা আছে সেও যেন তা বলে, আর যে না জানে সে যেন বলে, আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। জ্ঞানের মধ্যে এটাও একটা জ্ঞান যে, যার যে বিষয় জানা নেই সে বলবে "আমি এ বিষয়ে জানি না।" আল্লাহ তাআলা নবীকে বলেছেন, হে নবী! আপনি বলুন, "আমি আল্লাহর দ্বীনের দিকে ডাকার জন্য তোমাদের নিকট কোন পারিশ্রমিক চাই না এবং যারা মিথ্যা দাবী করে আমি তাদের মধ্যে নই। কুরায়শগণ ইসলাম গ্রহণে দেরী করতে লাগল, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের জন্য এই বলে বদদোয়া করলেন। "হে আল্লাহ! আপনি তাদের উপর ইউসুফ-এর মত সাত বছর (দুর্ভিক্ষ) দিয়ে আমাকে সাহায্য করুন।" তারপর তারা এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে পতিত হলো যে, তারা তাতে ধ্বংস হয়ে গেল এবং মরা জন্তু ও তার হাড় খেতে বাধ্য হলো। তারা (দুর্ভিক্ষের কারণে) আকাশও পৃথিবীর মধ্যস্থলে ধোয়ার মত দেখতে পেল। তারপর আবূ সুফ্ইয়ান তার কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! তুমি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ দিচ্ছ, অথচ তোমার গোত্রের লোকেরা এখন ধ্বংস হয়ে গেল। সুতরাং আমাদের (এ দুর্ভিক্ষ থেকে) বাচার জন্য দোয়া কর। তখন তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন "অতএব, তুমি অপেক্ষা কর সেদিনের, যেদিন স্পষ্ট ধূম্রাচ্ছন্ন হবে আকাশ..... তোমরা তো তোমাদের পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে।" অবশেষে দুর্ভিক্ষের অবসান ঘটল কিন্তু তারা কুফরীর দিকে ফিরে গেল। তখন আল্লাহ তাআলা এদের ব্যাপারেই অবতীর্ণ করলেন, যেদিন আমি তোমাদের শক্তভাবে পাকড়াও করব। আল্লাহ তাআলার বাণীঃ আলিফ, লাম, মীম। রোমানরা পরাজিত হয়েছে। ..... এবং পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হবে। রোমানদের ঘটনা অতিক্রান্ত হয়েছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সকল মানব শিশুরই ফিতরাত (ইসলাম)-এর ওপর জন্ম হয়। তারপর তার পিতা ও মাতা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে ফেলে। যেমন জানোয়ার পূর্ণ বাচ্চার জন্ম দেয়। তোমরা কি তার মধ্যে কোন ত্রুটি পাও? পরে তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন। (আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর) যে প্রকৃতি মুতাবিক তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন নেই। এ-ই সরল দ্বীন।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হল (আল্লাহর বাণী) : যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি। এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাহাবীদের উপর খুবই কঠিন মনে হল। তখন তারা বললেন, আমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, তারা তাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করেনি? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ আয়াত দ্বারা এ অর্থ বুঝানো হয়নি। তোমরা কি লুকমানের কথা শুননি যা তিনি তার পুত্রকে বলেছিলেন? "নিশ্চই শির্ক হচ্ছে বড় জুলুম।" (31.13)
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ঈমান কী? তিনি বললেন, "আল্লাহতে ঈমান আনবে এবং তার মালায়িকাহ, তার নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর দর্শন ও পুনরুত্থানের ওপর ঈমান আনবে।" লোকটি জিজ্ঞেস করল, ইসলাম কী? তিনি বললেন, ইসলাম (হল) আল্লাহর ইবাদাত করবে ও তার সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করবে না এবং সালাত কায়িম করবে, ফারয্ যাকাত দিবে ও রমাযানের সিয়াম পালন করবে। লোকটি জিজ্ঞেস করল, ইহ্সান কী? তিনি বললেন, ইহ্সান হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত এমন নিষ্ঠার সঙ্গে করবে, যেন তুমি তাকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও, তবে (জানবে) আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। লোকটি আরও জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কখন কিয়ামত ঘটবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ ব্যাপারে প্রশ্নকারীর চেয়ে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, সে অধিক জানে না। তবে আমি তোমার কাছে এর কতগুলো নিদর্শন বলছি। তা হল, যখন দাসী তার মনিবকে জন্ম দিবে, এটা তার একটি নিদর্শন। আর যখন দেখবে, নগ্নপদ ও নগ্নদেহ বিশিষ্ট লোকেরা মানুষের নেতা হবে, এও তার একটি নিদর্শন। এটি ঐ পাচটি বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানেন নাঃ (১) কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকটই রয়েছে। (২) তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, (৩) তিনিই জানেন, মাতৃগর্ভে কী আছে। এরপরে সে লোকটি চলে গেল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে আন। সাহাবীগণ তাকে ফিরিয়ে আনতে গেলেন, কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তিনি হলেন জিব্রীল, লোকেদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্য এসেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, গায়বের চাবি পাচটি। এরপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ কিয়ামত সম্পর্কিত জ্ঞান কেবল আল্লাহ তাআলারই আছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তু বানিয়ে রেখেছি, যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন অন্তঃকরণ চিন্তা করেনি। আবূ হুরাইরাহ বলেছেন, তোমরা চাইলে এ আয়াত তিলাওয়াত করঃ "কেউ জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কোন বিষয় লুকিয়ে রাখা হয়েছে"- (আস্-সিজদা ৩২/১৭)।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তুরাজি তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন ব্যক্তির মন কল্পনা করেনি। এসব ছাড়া যা কিছুই তোমরা দেখছ, তার কোন মূল্যই নেই। তারপর এ আয়াত পাঠ করলেন, "কেউ জানে না তাদের জন্য নয়ন তৃপ্তিকর কী লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কৃতকর্মের পারিতোষিক হিসেবে।" (32.17)
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, দুনিয়া ও আখিরাতে সকল মানুষের চেয়ে মুমিনের জন্য আমিই ঘনিষ্ঠতম। তোমরা ইচ্ছা করলে এ আয়াত পাঠ করতে পার- "নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের চেয়ে অধিক ঘনিষ্ঠ।" সুতরাং কোন মুমিন কোন ধন-সম্পদ রেখে গেলে তার নিকটআত্মীয় সে যে-ই হোক, তার উত্তরাধিকারী হবে, আর যদি ঋণ অথবা অসহায় সন্তানাদি রেখে যায় সে যেন আমার কাছে আসে, আমি তার অভিভাবক।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আযাদকৃত গোলাম যায়দ ইবন হারিসাহ্কে আমরা "যায়দ ইবন মুহাম্মদ-ই" ডাকতাম, যে পর্যন্ত না এ আয়াত নাযিল হয়। তোমরা তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে এটিই অধিক ন্যায়সঙ্গত। (33.5)
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, এ আয়াত আনাস ইবন নায্র সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ "মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে।"
যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন সহীফা থেকে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত পেলাম না, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তিলাওয়াত করতে শুনেছি। শেষে সেটি খুযায়মা আনসারী ছাড়া অন্য কারও কাছে পেলাম না; যার সাক্ষ্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দু'জন পুরুষ সাক্ষীর সমান গণ্য করেছেন। আয়াতটি হল: 'মুমিনদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে তাদের অঙ্গীকারে সত্যবাদী।' (৩৩ঃ২৩)
নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কাছে এলেন, যখন আল্লাহ তাআলা তার সহধর্মিণীগণকে দু'টি পন্থার মধ্যে একটি পন্থা বেছে নেয়ার নির্দেশ দিলেন,তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সর্বপ্রথম আমা হতে শুরু করলেন এবং বললেন, আমি তোমার কাছে একটি কথা উল্লেখ করছি। তাড়াহুড়ো না করে তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে পরামর্শ করে উত্তর দেবে। তিনি এ কথা ভালভাবেই জানতেন যে, আমার আববা-আম্মা তার থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরামর্শ কখনও দিবেন না। আয়িশাহ বলেন, তিনি [রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)] বললেন, আল্লাহ বলছেন, "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার ভূষণ কামনা কর.....। তখন আমি তাকে বললাম, এ ব্যাপারে আমার আববা-আম্মা থেকে পরামর্শ নেবার কী আছে? আমি তো আল্লাহ তার রাসূল এবং আখিরাতের জীবনই কামনা করি।
লায়স.....নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তার সহধর্মিণীদের ব্যাপারে দু'টি পন্থার একটি পন্থা বেছে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হল, তখন তিনি প্রথমে আমাকে বললেন, তোমাকে একটি বিষয় সম্পর্কে বলব। তাড়াহুড়ো না করে তুমি তোমার আব্বা ও আম্মার সঙ্গে পরামর্শ করে নিবে। আয়িশাহ বলেন, তিনি অবশ্যই জানতেন, আমার আব্বা-আম্মা তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলবেন না। আয়িশাহ বলেন, এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার ভূষণ কামনা কর.....মহা প্রতিদান পর্যন্ত। (33.28-29) আয়িশাহ বলেন, এ ব্যাপারে আমার আব্বা-আম্মার সঙ্গে পরামর্শের কী আছে? আমি তো আল্লাহ, তার রাসূল এবং আখিরাতের জীবন কামনা করি। আয়িশাহ বলেনঃ নবী (ﷺ)-এর অন্যান্য সহধর্মিণী আমার মতই জবাব দিলেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ আয়াতটি, "(তুমি তোমার অন্তরে যা গোপন করছ, আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিচ্ছেন।)" যায়নাব বিনতে জাহ্শ এবং যায়দ ইবন হারিসাহ্ সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যেসব মহিলা নিজেকে রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ)-এর কাছে হেবাস্বরূপ ন্যস্ত করে দেন, তাদের আমি ঘৃণা করতাম। আমি (মনে মনে) বলতাম, মহিলারা কি নিজেকে ন্যস্ত করতে পারে? এরপর যখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ "আপনি তাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট হতে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন। আর আপনি যাকে দূরে রেখেছেন, তাকে কামনা করলে আপনার কোন অপরাধ নেই।" তখন আমি বললাম, আমি দেখছি যে, আপনি যা ইচ্ছা করেন আপনার রব, তা-ই শীঘ্র পূর্ণ করে দেন।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্ত্রীদের সঙ্গে অবস্থানের পালার ব্যাপারে আমাদের থেকে অনুমতি চাইতেন এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরও, আপনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট হতে দূরে রাখতে পারেন এবং যাকে ইচ্ছা আপনার নিকট স্থান দিতে পারেন এবং আপনি যাকে দূরে রেখেছেন তাকে কামনা করলে আপনার কোন অপরাধ নেই। এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর মুআয বলেন, আমি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এর উত্তরে কী বলতেন? তিনি বললেন, আমি তাকে বলতাম, এ বিষয়ের অধিকার যদি আমার থেকে থাকে তাহলে হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার ব্যাপারে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দিতে চাই না।
উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, আপনার কাছে ভাল ও মন্দ লোক আসে। আপনি যদি উম্মাহাতুল মুমিনীদের ব্যাপারে পর্দার নির্দেশ দিতেন। তারপর আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করলেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যয়নাব বিন্ত জাহশ্কে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিয়ে করেন, তখন তিনি লোকদের দাওয়াত করলেন। লোকেরা আহারের পর বসে কথাবার্তা বলতে লাগল। তিনি উঠে যেতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু লোকেরা উঠছিল না। এ অবস্থা দেখে তিনি উঠে দাড়ালেন। তিনি উঠে যাওয়ার পর যারা উঠবার তারা উঠল। কিন্তু তিন ব্যক্তি বসেই থাকল। নবী (ﷺ) ঘরে প্রবেশের জন্য ফিরে এসে দেখেন, তারা তখনও বসে রয়েছে। অতঃপর তারাও উঠে গেল। আমি গিয়ে নবী (ﷺ)-কে তাদের চলে যাওয়ার সংবাদ দিলাম। তারপর তিনি এসে প্রবেশ করলেন। এরপরও আমি প্রবেশ করতে চাইলে তিনি আমার ও তার মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেনঃ "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর গৃহে প্রবেশ করো না.....শেষ পর্যন্ত।" (33.53)
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি পর্দার আয়াত সম্বন্ধে লোকদের চেয়ে অধিক জানি। যখন নবী (ﷺ)-এর নিকট যাইনাবকে বাসর যাপনের জন্য পাঠানো হয় এবং তিনি তার ঘরে তার সঙ্গে অবস্থান করেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খাবার তৈরি করে লোকদের দাওয়াত করলেন। তারা (খাওযার পর) বসে কথাবার্তা বলতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাইরে গিয়ে আবার ঘরে ফিরে এলেন, তখনও তারা বসে কথাবার্তা বলছিল। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেন, "হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা আহার্য প্রস্তুতির জন্য অপেক্ষা না করে আহারের জন্য নবী (ﷺ) গৃহে প্রবেশ করবে না।".....পর্দার আড়াল থেকে' পর্যন্ত। এরপর পর্দার বিধান কার্যকর হল এবং লোকেরা নিস্ক্রান্ত হল।
আনাস হতে বর্ণিত। যায়নাব বিনতে জাহ্শের সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাসর যাপন উপলক্ষে কিছু গোশত ও রুটির ব্যবস্থা করা হল। তারপর খানা খাওয়ানোর জন্য আমাকে লোকদের ডেকে আনতে পাঠালেন। একদল লোক এসে খেয়ে চলে গেল। তারপর আর একদল এসে খেয়ে চলে গেল। এরপর আবার আমি ডাকতে গেলাম, কিন্তু কাউকে আর ডেকে পেলাম না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আর কাউকে ডেকে পাচ্ছি না। তিনি বললেন, খানা উঠিয়ে নাও। তখন তিন ব্যক্তি ঘরে রয়ে গেল, তারা কথাবার্তা বলছিল। তখন নবী (ﷺ) বের হয়ে আয়িশাহ-এর ঘরের দিকে গেলেন এবং বললেন, আস্সালামু 'আলায়কুম ইয়া আহলাল বায়ত ওয়া রহমাতুল্লাহ্! আয়িশাহ বললেন, ওয়া আলায়কাস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ্। আল্লাহ আপনাকে বারাকাত দিন, আপনার স্ত্রীকে কেমন পেলেন? এভাবে তিনি পর্যায়ক্রমে সব স্ত্রীর ঘরে গেলেন এবং আয়িশাহ্কে যেমন বলেছিলেন তাদেরও তেমনি বললেন। আর তারা তাকে সে জবাবই দিয়েছিলেন, যেমন আয়িশাহ দিয়েছিলেন। তারপর নবী (ﷺ) ফিরে এসে সে তিন ব্যক্তিকেই ঘরে কথাবার্তা বলতে দেখতে পেলেন। নবী (ﷺ) খুব লাজুক ছিলেন। (লজ্জা পেয়ে) আবার আয়িশাহ-এর ঘরের দিকে গেলেন। তখন, আমি স্মরণ করতে পারছি না, অন্য কেউ না আমি তাকে লোকদের বের হয়ে যাওয়ার খবর দিলাম। তিনি ফিরে এসে দরজার চৌকাঠের ভিতরে এক পা ও বাইরে এক পা রেখে আমার ও তার মধ্যে পর্দা ঝুলিয়ে দিলেন এবং আল্লাহ তাআলা পর্দার আয়াত অবতীর্ণ করলেন।
আনাস্ হতে বর্ণিত যে, যয়নাব বিন্ত জাহ্শের সঙ্গে বাসর উৎযাপনের সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওয়ালীমা করলেন। লোকদের তিনি গোশ্ত-রুটি তৃপ্তি সহকারে খাওয়ালেন। তারপর তিনি উম্মুল মুমিনীনদের কক্ষে যাওয়ার জন্য বের হলেন। যেমন বাসর রাত্রির ভোরে তার অভ্যাস ছিল যে, তিনি তাদের সালাম দিতেন ও তাদের জন্য দোয়া করতেন এবং তারাও তাকে সালাম করতেন, তার জন্য দোয়া করতেন। তারপর ঘরে ফিরে এসে দু'ব্যক্তিকে কথাবার্তায় রত দেখতে পেলেন। তাদের দেখে তিনি ঘর থেকে ফিরে চলে গেলেন। সে দু'জন নবী (ﷺ)-কে ঘর থেকে ফিরে যেতে দেখে জলদি বের হয়ে গেল। এরপরে, আমার মনে নেই যে আমি তাকে তাদের বের হয়ে যাওয়ার খবর দিলাম, না অন্য কেউ দিল। তখন তিনি ফিরে এসে ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আমার ও তার মধ্যে পর্দা লটকিয়ে দিলেন এবং পর্দার আয়াত নাযিল হল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পর সাওদাহ প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলেন। সাওদাহ এমন স্থূল শরীরের অধিকারিণী ছিলেন যে, পরিচিত লোকদের থেকে তিনি নিজেকে গোপন রাখতে পারতেন না। উমার ইবন খাত্তাব তাকে দেখে বললেন, হে সাওদাহ! জেনে রাখ, আল্লাহর কসম! আমাদের নযর থেকে গোপন থাকতে পারবে না। এখন দেখ তো, কীভাবে বাইরে যাবে? আয়িশাহ বলেন, সাওদাহ ফিরে আসলেন। আর এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে রাতের খানা খাচ্ছিলেন। তার হাতে ছিল টুকরা হাড়। সাওদাহ ঘরে প্রবেশ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। তখন উমার আমাকে এমন এমন কথা বলেছে। আয়িশাহ বলেন, এ সময় আল্লাহ তাআলা তার নিকট ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। ওয়াহী অবতীর্ণ হওয়া শেষ হল, হাড় টুকরা তখনও তার হাতেই ছিল, তিনি তা রেখে দেননি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, অবশ্য দরকার হলে তোমাদেরকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর, আবুল কু'আয়স এর ভাই-আফলাহ আমার কাছে প্রবেশ করার অনুমতি চায়। আমি বললাম, এ ব্যাপারে যতক্ষণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অনুমতি না দিবেন, ততক্ষণ আমি অনুমতি দিতে পারি না। কেননা তার ভাই আবূ কু'আয়স নিজে আমাকে দুধ পান করাননি। কিন্তু আবুল কু'আয়সের স্ত্রী আমাকে দুধ পান করিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের কাছে আসলেন। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আবুল কু'আয়সের ভাই-আফরাহ্ আমার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চাইছিল। আমি এ বলে অস্বীকার করেছি যে, যতক্ষণ আপনি এ ব্যাপারে অনুমতি না দিবেন, ততক্ষণ আমি অনুমতি দিব না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমার চাচাকে (দেখা করার) অনুমতি দিতে কিসে বাধা দিয়েছে? আমি বললাম, সে ব্যক্তি তো আমাকে দুধ পান করাননি; কিন্তু আবুল কু'আয়াসের স্ত্রী আমাকে দুধ পান করিয়েছে। এরপর তিনি [রাসূল (ﷺ)] বললেন, তোমার হাত ধুলায় ধূসরিত হোক, তাকে অনুমতি দাও, কেননা, সে তোমার চাচা। উরওয়াহ বলেন, এ কারণে আয়িশাহ বলতেন বংশ সম্বন্ধের কারণে যাকে তোমরা হারাম জান, দুগ্ধ-পানের কারণেও তাকে হারাম জানবে।
কা'ব ইবন উজরাহ হতে বর্ণিত। বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর সালাম (সম্পর্কে) আমরা অবগত হয়েছি; কিন্তু সালাত কীভাবে? তিনি বললেন, তোমরা বলবে, "হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের উপর রহমত নাযিল কর, যেমনিভাবে ইব্রাহীম-এর পরিবারবর্গের উপর তুমি রহমত নাযিল করেছ। নিশ্চই তুমি প্রশংসিত, মর্যাদাবান। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ-এর উপর এবং মুহাম্মাদ-এর পরিবারবর্গের প্রতি বারাকাত নাযিল কর। যেমনিভাবে তুমি বারাকাত নাযিল করেছ ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের প্রতি। নিশ্চই তুমি প্রশংসিত, মর্যাদাবান।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, এ তো হল সালাম পাঠ; কিন্তু কেমন করে আমরা আপনার প্রতি দরূদ পড়ব? তিনি বললেন, তোমরা বলবে, "হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও আপনার রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি রহমত নাযিল করুন, যেভাবে রহমত নাযিল করেছেন ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের প্রতি এবং মুহাম্মদ (ﷺ) এর প্রতি ও মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের প্রতি বারকাত নাযিল করুন, যেভাবে বারকাত অবতীর্ণ করেছেন ইব্রাহীম-এর প্রতি। তবে বর্ণনাকারী আবূ সালিহ লায়স থেকে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ও তার পরিবারবর্গের প্রতি বারাকাত নাযিল করুন যেমন আপনি বারকাত নাযিল করেছেন ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের প্রতি। ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি (এমনিভাবে) বলেন, যেমনভাবে ইব্রাহীম-এর উপর রহমত অবতীর্ণ করেছেন। আর বারাকাত অবতীর্ণ করুন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি এবং মুহাম্মাদের পরিবারবর্গের প্রতি, যেভাবে বারাকাত নাযিল করেছেন ইব্রাহীম-এর প্রতি এবং ইব্রাহীমের পরিবারের প্রতি।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মূসা ছিলেন খুব লজ্জাশীল। আর এ প্রেক্ষিতে আল্লাহর এ বাণী, হে মুমিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা মূসা-কে কষ্ট দিয়েছে। তারপর আল্লাহ তাআলা তাকে ওদের অভিযোগ থেকে পবিত্র করেছেন। আর তিনি ছিলেন আল্লাহর কাছে অতি সম্মানিত। (33.69)
'ইকরিমাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা যখন আকাশে কোন ফায়সালা করেন তখন মালায়িকাহ আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অতি নম্রভাবে তাদের ডানা ঝাড়তে থাকে; যেন মসৃণ পাথরের উপর শিকলের আওয়াজ। যখন তাদের মনের ভয়-ভীতি দূর হয় তারা (একে অপরকে) জিজ্ঞেস করে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা বলেন, তিনি যা বলেছেন, সত্যই বলেছেন। তিনি মহান উচ্চ। যে সময়ে লুকোচুরিকারী (শায়ত্বন) তা শোনে, আর লুকোচুরিকারী এরূপ একের ওপর এক। সুফ্ইয়ান তার হাত উপরে উঠিয়ে আঙ্গুলগুলো ফাক করে দেখান। তারপর শায়ত্বন কথাগুলো শুনে নেয় এবং প্রথমজন তার নিচের জনকে এবং সে তার নিচের জনকে জানিয়ে দেয়। এমনিভাবে এ খবর দুনিয়ার জাদুকর ও জ্যোতিষের কাছে পৌছে দেয়। কোন কোন সময় কথা পৌছানোর আগে তার উপর অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হয় আবার অগ্নিশিখা নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে সে কথা পৌছিয়ে দেয় এবং এর সাথে শত মিথ্যা মিশিয়ে বলে। এরপর লোকেরা বলাবলি করে সে কি অমুক দিন অমুক অমুক কথা আমাদের বলেনি? এবং সেই কথা যা আসমান থেকে শুনে এসেছে তার জন্য সব কথা সত্য বলে মনে করে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে 'ইয়া সাবাহাহ' বলে সবাইকে ডাক দিলেন। কুরাইশগণ তার কাছে জমায়েত হয়ে বলল, তোমার ব্যাপার কী? তিনি বললেন, তোমরা বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুবাহিনী সকাল বা সন্ধ্যায় তোমাদের উপর আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তবে কি তোমরা আমার এ কথা বিশ্বাস করবে? তারা বলল, নিশ্চই। তিনি বললেন, আমি তোমাদের জন্য এক আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি। এ কথা শুনে আবূ লাহাব বলল, তোমার ধ্বংস হোক। এই জন্যই কি আমাদেরকে জমায়েত করেছিলে? তখন আল্লাহ নাযিল করেনঃ "আবূ লাহাবের হাত দু'টো ধ্বংস হোক।" (111.1)
আবু যার থেকে বর্ণিত: একবার আমি সূর্যাস্তের সময় মসজিদে নববী (সাঃ)-এর সাথে ছিলাম। নবী (ﷺ) বললেন, হে আবু যার! তুমি কি জানো সূর্য কোথায় অস্ত যায়? আমি উত্তরে বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, "এটি যায় এবং (আল্লাহর) আরশের নীচে সেজদা করে; এবং এটি আল্লাহর বাণী:- 'আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গতিপথে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলে।..' (36.38)
আবূ যার গিফারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) কে আল্লাহর বাণীঃ 'আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গতিপথে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলে।..'(36.38) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেছেন, সূর্যের গন্তব্যস্থল আরশের নিচে।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ (ইউনুস) ইবন মাত্তার চেয়ে উত্তম বলে মনে করা কারো জন্য শোভনীয় নয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে বলল, আমি ইউনুস ইবন মাত্তার চেয়ে উত্তম, সে মিথ্যা বলল।
আও্ওয়াম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুজাহিদকে সূরাহ সাদ-এর সাজদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, (এ বিষয়ে) ইবন আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি পাঠ করলেন, 'তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেছেন, সুতরাং তাদের পথের অনুসরণ কর।'(6.90) ইবন আব্বাস এতে সিজদা করতেন।'
আল-আওয়াম থেকে বর্ণিত: আমি মুজাহিদকে সূরা সাদ এর সেজদা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস-কে জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোন প্রমাণ আপনি সিজদা করেছেন?' তিনি বললেন, "তুমি কি পাঠ কর না: -'আর তার বংশধরদের মধ্যে দাউদ ও সোলায়মান...(6.84)। এরাই তারা যাদেরকে আল্লাহ হেদায়েত করেছিলেন। সুতরাং তাদের নির্দেশনা অনুসরণ কর।' (6.90) সুতরাং দাউদ ছিলেন সেইসব নবীদের মধ্যে একজন যাদের অনুসরণ করার জন্য নবী (মুহাম্মদ) আদেশ করেছিলেন। দাউদ সিজদা করলেন, তাই আল্লাহর রসূল (ﷺ) ও সেজদা করলেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, গতরাতে অবাধ্য জিনের একটি দৈত্য আমার কাছে এসেছিল অথবা এ ধরনের কিছু কথা তিনি বললেন, আমার সালাত নষ্ট করার উদ্দেশে। তখন আল্লাহ আমাকে তার উপর আধিপত্য দিলেন। আমি ইচ্ছা করলাম, মসজিদের খুটিগুলোর একটির সঙ্গে ওকে বেধে রাখতে, যাতে ভোরে তোমরা সকলে ওটা দেখতে পাও। তখন আমার ভাই সুলায়মান-এর দোয়া স্মরণ হল, "হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যার অধিকারী আমি ব্যতীত আর কেউ না হয়।"(38.35) রাবী রাওহ্ বলেন, এরপর নবী (ﷺ) তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ-এর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, হে লোকসকল! যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে অবগত সে তা বর্ণনা করবে। আর যে না জানে, তার বলা উচিত, আল্লাহই ভাল জানেন। কেননা অজানা বিষয় সম্বন্ধে আল্লাহই ভাল জানেন, এ কথা বলাও জ্ঞানের নিদর্শন। আল্লাহ তার নবী (ﷺ)-কে বলেছেন, 'বল, এর (কুরআন বা তাওহীদ প্রচারের) জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং আমি বানোয়াটকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।" (কুরআনে উল্লেখিত) ধূম্র সম্পর্কে শীঘ্র আমি তোমাদের বলব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুরাইশদেরকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিলে তারা (সাড়া দিতে) বিলম্ব করল। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! ইউসুফ-এর জীনবকালের দুর্ভিক্ষের সাত বছরের মত দুর্ভিক্ষ দ্বারা তুমি আমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য কর। এরপর দুর্ভিক্ষ তাদেরকে ঘিরে ফেলল। শেষ হয়ে গেল সমস্ত কিছু। অবশেষে তারা মৃত জন্তু ও চামড়া খেতে লাগল। তখন তাদের কেউ আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার জ্বালায় চোখে আকাশ ও তার মধ্যে ধূম্র দেখত। আল্লাহ বললেন, "অতএব তুমি সেদিনের অপেক্ষা কর, যেদিন ধূম্র হবে আকাশে, এবং তা ঘিরে ফেলবে সকল মানুষ। এ তো মর্মন্তুদ শাস্তি।" রাবী বলেন, তারপর তারা দোয়া করল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ আযাব থেকে নাজাত দাও, আমরা ঈমান আনব। তারা কীভাবে নাসীহাত মানবে? তাদের কাছে তো এসেছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাদাতা এক রাসূল। তারপর তারা মুখ ঘুরিয়ে নিল তার থেকে এবং বলল, সে তো শিখানো কথা বলে, সে তো এক উন্মাদ। আমি তোমাদের শাস্তি কিছুকালের জন্য রহিত করছি। তোমরা তো অবশ্য তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। (ইবন মাসউদ বলেন), কিয়ামতের দিনও কি তাদের থেকে আযাব রহিত করা হবে? তিনি (ইবন মাসউদ) বলেন, আযাব সরানো হলে তারা পুনরায় কুফরীর দিকে ফিরে গেল। তারপর আল্লাহ তাআলা বদর যুদ্ধের দিন তাদের পাকড়াও করলেন। আল্লাহ বলেন, যেদিন আমি তোমাদের কঠিনভাবে ধরব, সেদিন আমি তোমাদের শাস্তি দেবই। (44.16)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুশরিকদের কিছু লোক বহু হত্যা করে এবং বেশি বেশি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। তারপর তারা মুহাম্মদ (ﷺ)-এর কাছে এল এবং বলল, আপনি যা বলেন এবং আপনি যেদিকে আহবান করেন, তা অতি উত্তম। আমাদের যদি অবগত করতেন, আমরা যা করেছি, তার কাফ্ফারা কী? এর প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয় 'এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন, তাকে না-হক হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। আরো অবতীর্ণ হলঃ "হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না।" (39.53)
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়াহূদী আলিমদের থেকে এক আলিম রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে দেখতে) পাই যে, আল্লাহ তাআলা আকাশসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন, যমীনকে এক আঙ্গুলের উপর, বৃক্ষসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি ও কাঁদামাটি এক আঙ্গুলের উপর এবং অন্যান্য সৃষ্টি জগত এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। তারপর বলবেন, আমিই বাদশাহ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা সমর্থনে হেসে ফেললেন; এমনকি তার সামনের দাত প্রকাশ হয়ে পড়ে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পাঠ করলেন, তারা আল্লাহকে যথোচিত মর্যাদা দান করে না।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা যমীনকে নিজ মুষ্ঠিতে নিবেন এবং আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করে তার ডান হাতে নিবেন, তারপর বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার বাদশারা কোথায়?
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, শেষবার শিঙ্গায় ফুক দেয়ার পর যে সবার আগে মাথা উঠাবে, সে আমি। তখন আমি মূসা-কে দেখব আরশের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। আমি জানি না, তিনি আগে থেকেই এভাবে ছিলেন, না শিঙ্গায় ফুক দেয়ার পর।
আবূ হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, দু'বার ফুৎকারের মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবূ হুরাইরাহ! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। তারপর তারা জিজ্ঞেস করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। এরপর তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি চল্লিশ মাস। তিনি বললেন, আমার জানা নেই এবং বললেন, শিরদাড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই সৃষ্টি জগত আবার সৃষ্টি করা হবে।
উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আ'স-কে বললাম, মুশরিকরা রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে কঠোরতম কী আচরণ করেছে, সে সম্পর্কে আপনি আমাকে বলুন। তিনি বললেন, একদা রাসূল (ﷺ) কাবার আঙ্গিণায় সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় উকবাহ ইবন আবূ মু'আইত আসল এবং সে রাসূল (ﷺ)-এর ঘাড় ধরল এবং তার কাপড় দিয়ে তার গলায় পেচিয়ে খুব শক্ত করে চিপা দিল। এ সময় আবূ বক্র হাজির হয়ে তার ঘাড় ধরে রাসূল (ﷺ) থেকে তাকে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, তোমরা কি এ ব্যক্তিকে এ জন্য হত্যা করবে যে সে বলে 'আমার রব আল্লাহ'; অথচ তিনি তোমাদের রবের নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে তোমাদের কাছে এসেছেন। (40.28)
ইবন মাসঊদ থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহর বাণীঃ "তোমাদের কান তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে- এ থেকে তোমরা কখনো নিজেদের লুকাতে পারবে না।" আয়াত সম্পর্কে বলেন, কুরাইশ গোত্রের দু' ব্যক্তি ছিল, যাদের জামাতা ছিল বানী সাকীফ গোত্রের অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) দু' ব্যক্তি ছিল বানী সাকীফ গোত্রের আর তাদের জামাতা ছিল কুরাইশ গোত্রের। তারা সকলেই একটি ঘরে ছিল। তারা পরস্পর বলল, তোমার কী ধারণা, আল্লাহ কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন? একজন বলল, তিনি আমাদের কিছু কথা শুনছেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, তিনি যদি আমাদের কিছু কথা শুনতে পান, তাহলে সব কথাও শুনতে পাবেন। তখন নাযিল হলঃ "তোমাদের কান ও তোমাদের চোখ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, এ থেকে তোমরা কখনো নিজেদের লুকাতে পারবে না।.....আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (41.22)
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কাবার কাছে দু'জন কুরাইশী এবং একজন সাকাফী অথবা দু'জন সাকাফী ও একজন কুরাইশী একত্রিত হয়। তাদের পেটের মেদ ছিল অধিক; কিন্তু অন্তরে বুদ্ধি ছিল কম। তাদের একজন বলল, তোমাদের কী ধারণা, আমরা যা বলছি তা কি আল্লাহ শুনছেন? উত্তরে অপর এক ব্যক্তি বলল, আমরা যদি জোরে বলি, তাহলে তিনি শুনতে পান। আর যদি চুপে চুপে বলি, তাহলে তিনি শুনতে পান না। তৃতীয় ব্যক্তি বলল, আমরা জোরে বললে যদি তিনি শুনতে পান, তাহলে চুপে চুপে বললেও তিনি শুনতে পাবেন। তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, 'তোমাদের চোখ, কান এবং তোমাদের চামড়া তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে, এ থেকে তোমরা কখনো নিজেদের লুকাতে পারবে না..... (আয়াতের শেষ পর্যন্ত)। (41.22-23)
ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা তাকে "আপনার সাথে আমার আত্মীয়তার জন্য আমার প্রতি সদয় হওয়া ব্যতীত।" (42.23) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর (কাছে উপস্থিত) সাঈদ ইবন যুবায়র বললেন, এর অর্থ নবী পরিবারের আত্মীয়তার বন্ধন। (এ কথা শুনে) ইবন আব্বাস বললেন, তুমি তাড়াহুড়া করে ফেললে। কেননা কুরাইশের এমন কোন শাখা ছিল না যেখানে নবী (ﷺ)-এর আত্মীয়তা ছিল না। রাসূল (ﷺ) তাদের বলেছেন, আমার এবং তোমাদের মাঝে যে আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে তার ভিত্তিতে তোমরা আমার সঙ্গে আত্মীয়সুলভ আচরণ কর। এই আমি তোমাদের থেকে কামনা করি।
ইয়ালা থেকে বর্ণিত: আমি নবী (ﷺ)-কে মিম্বরে পাঠ করতে শুনেছি: 'তারা কাঁদবে, হে মালিক (জাহান্নামের রক্ষক) আপনার প্রভু আমাদের শেষ করে দিন।' (43.77)
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পাচটি নিদর্শনই বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। ধোয়া (দুর্ভিক্ষ), রোম (পরাজয়), চন্দ্র (দ্বিখন্ডিত হওয়া), পাকড়াও (বদর যুদ্ধে) এবং ধ্বংস।
মাসরূক হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ বলেছেন, এ অবস্থা এ জন্য যে, কুরাইশরা যখন রাসূল (ﷺ)-এর নাফরমানী করল, তখন তিনি তাদের বিরুদ্ধে এমন দুর্ভিক্ষের দোয়া করলেন, যেমন দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ইউসুফ-এর সময়ে। তারপর তাদের উপর দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার কষ্ট এমনভাবে আপতিত হল যে, তারা হাড্ডি খেতে আরম্ভ করল। তখন মানুষ আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার তাড়নায় তারা আকাশ ও তাদের মাঝে শুধু ধোয়ার মত দেখতে পেত। এ সম্পর্কেই আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, "অতএব তুমি অপেক্ষা কর সেদিনের, যেদিন স্পষ্ট ধূম্রাচ্ছন্ন হবে আকাশ এবং তা ছেয়ে ফেলবে মানব জাতিকে। এ হবে মর্মন্তুদ শাস্তি।" (44.10-11) বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট (কাফিরদের পক্ষ থেকে) এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মুদার গোত্রের জন্য বৃষ্টির দোয়া করুন। তারা তো ধ্বংস হয়ে গেল। তিনি [রাসূল (ﷺ)] বললেন, মুদার গোত্রের জন্য দোয়া করতে বলছ। তুমি তো খুব সাহসী। তারপর তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়া করলেন এবং বৃষ্টি হল। তখন অবতীর্ণ হল, তোমরা তো তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। যখন তাদের সচ্ছলতা ফিরে এলো, তখন আবার নিজেদের আগের অবস্থায় ফিরে গেল। তারপর আল্লাহ নাযিল করলেন, "যেদিন আমি তোমাদের প্রবলভাবে পাকড়াও করব, সেদিন আমি তোমাদের প্রতিশোধ নেই।" (44.16) বর্ণনাকারী বলেন, বদর যুদ্ধের দিন।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, সে সম্পর্কে 'আল্লাহই ভাল জানেন' একথা বলাও জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। নিশ্চই আল্লাহ তার নবী (ﷺ)-কে বলেছেন, বল, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং আমি বানোয়াটকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই। কুরাইশরা যখন নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বাড়াবাড়ি করল এবং বিরোধিতা করল, তখন তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! ইউসুফ-এর সময়কার সাত বছরের দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষের দ্বারা তুমি আমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য কর। তারপর দুর্ভিক্ষ তাদেরকে পাকড়াও করল। ক্ষুধার জ্বালায় তারা হাড্ডি এবং মরা খেতে আরম্ভ করল। এমনকি তাদের কোন ব্যক্তি আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার জ্বালায় তার ও আকাশের মাঝে শুধু ধোয়ার মতই দেখতে পেত। তখন তারা বলল, "হে আমাদের রব! আমাদের থেকে এ শাস্তি সরিয়ে নাও, নিশ্চই আমরা ঈমান আনব।" (44.12) তাকে বলা হল, যদি তাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে দেই, তাহলে তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তারপর তিনি তার রবের নিকট দোয়া করলেন। আল্লাহ তাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে দিলেন; কিন্তু তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে এল। তাই আল্লাহ বদর যুদ্ধের দিন তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলেন। (44.10)
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহর কাছে গেলাম। তারপর তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন কুরাইশদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং তারা তাকে মিথ্যাচারী বলল ও তার নাফরমানী করল, তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহ! ইউসুফ-এর সময়কার সাত বছরের দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষের দ্বারা তুমি আমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য কর। ফলে দুর্ভিক্ষ তাদের এমনভাবে গ্রাস করল যে, নির্মূল হয়ে গেল সমস্ত কিছু; অবশেষে তারা মৃতদেহ খেতে আরম্ভ করল। তাদের কেউ দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুধার জ্বালায় সে তার ও আকাশের মাঝে ধোয়ার মতই দেখতে পেত। এরপর তিনি পাঠ করলেন, "অতএব তুমি অপেক্ষা কর সে দিনের, যেদিন স্পষ্ট ধূম্রাচ্ছন্ন হবে আকাশ এবং তা ছেয়ে ফেলবে মানব জাতিকে। এ হবে মর্মন্তুদ শাস্তি। আমি তোমাদের শাস্তি কিছুকালের জন্য সরিয়ে দিচ্ছি, তোমরা তো তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।" পর্যন্ত আবদুল্লাহ বলেন, কিয়ামতের দিনও কি তাদের থেকে শাস্তি সরিয়ে ফেলা হবে? তিনি বলেন, "যেদিন আমি তোমাদের প্রবলভাবে পাকড়াও করব" দ্বারা বদরের দিনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে পাঠিয়ে বলেছেন, "বল, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং যারা মিথ্যা দাবী করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।" রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন দেখলেন যে, কুরাইশরা তার নাফরমানী করছে, তখন তিনি ললেন, ইউসুফ-এর সময়কার সাত বছরের দুর্ভিক্ষের মত দুর্ভিক্ষের দ্বারা তুমি আমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য কর। ফলে দুর্ভিক্ষ তাদের পেয়ে বসল। নিঃশেষ করে দিল তাদের সমস্ত কিছু, এমনকি তারা হাড় এবং চামড়া খেতে আরম্ভ করল। আর একজন রাবী বলেছেন, তারা চামড়া ও মরা খেতে লাগল। তখন যামীন থেকে ধোয়ার মত বের হতে লাগল। এ সময় আবূ সুফ্ইয়ান নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! তোমার কওম তো ধ্বংস হয়ে গেল। আল্লাহর কাছে দোয়া কর, যেন তিনি তাদের থেকে এ অবস্থা দূর করে দেন। তখন তিনি দোয়া করলেন, এবং বললেন, এরপর তারা আবার নিজেদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মানসুর হতে বর্ণিত হাদীসে আছে, তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন, "অতএব, তুমি অপেক্ষা কর সে দিনের, যে দিন স্পষ্ট ধূম্রাচ্ছন্ন হবে আকাশ, তোমরা তো আগের অবস্থায় ফিরে যাবেই.....পর্যন্ত। (তিনি বলেন) আখিরাতের শাস্তিও কি দূর হয়ে যাবে? ধোয়া, প্রবল পাকড়াও এবং ধ্বংস তো অতিক্রান্ত হয়েছে। এক রাবী চন্দ্র এবং অন্য রাবী রোমের পরাজয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পাচটি বিষয় ঘটে গেছেঃ ধ্বংস, রূম, পাকড়াও, চন্দ্র ও ধোয়া।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, আদম সন্তানরা আমাকে কষ্ট দেয়। তারা যামানাকে গালি দেয়; অথচ আমিই যামানা। আমার হাতেই সকল ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি।
ইউসুফ ইবন মাহাক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মারওয়ান ছিলেন হিজাযের গভর্নর। তাকে নিয়োগ করেছিলেন মুআবিয়াহ। তিনি একদা খুতবা দিলেন এবং তাতে ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার কথা বারবার বলতে লাগলেন, যেন তার পিতার মৃত্যুর পর তার বায়আত গ্রহণ করা হয়। এ সময় তাকে আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর কিছু কথা বললেন। মারওয়ান বললেন, তাকে পাকড়াও কর। তৎক্ষণাৎ তিনি আয়িশাহ-এর ঘরে চলে গেলেন। তারা তাকে ধরতে পারল না। তারপর মারওয়ান বললেন, এ তো সেই লোক যার সম্বন্ধে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন, "আর এমন লোক আছে যে, মাতাপিতাকে বলে, তোমাদের জন্য আফসোস! তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব যদিও আমার পূর্বে বহু পুরুষ গত হয়েছে, তখন তার মাতাপিতা আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করে বলে, দুর্ভোগ তোমার জন্য। বিশ্বাস স্থাপন কর, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য। কিন্তু সে বলে এ তো অতীতকালের উপকথা ব্যতীত কিছুই নয়।"
নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এভাবে কখনো হাসতে দেখিনি, যাতে তার কন্ঠনালীর আলাজিভ দেখা যায়। তিনি মুচকি হাসতেন।
তিনি [আয়িশাহ] বলেন, যখনই তিনি মেঘ অথবা ঝড়ো হাওয়া দেখতেন, তখনই তার চেহারায় তা পরিলক্ষিত হত। তিনি বললেন, মানুষ যখন মেঘ দেখে তখন বৃষ্টির আশায় আনন্দিত হয়। কিন্তু আপনি যখন মেঘ দেখেন, তখন আমি আপনার চেহারায় আতংকের ছাপ পাই। তিনি বললেন, হে আয়িশাহ! এতে আযাব না থাকার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। বাতাস দিয়েই তো এক কওমকে আযাব দেয়া হয়েছে। সে কওম আযাব দেখে বলেছিল, এ তো মেঘ, আমাদেরকে বৃষ্টি দিবে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেন। এ থেকে তিনি নিস্ক্রান্ত হলে 'রাহিম' (রক্ত সম্পর্কে) দাড়িয়ে পরম করুণাময়ের আচল টেনে ধরল। তিনি তাকে বললেন, থামো। সে বলল, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী লোক থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্যই আমি এখানে দাড়িয়েছি। আল্লাহ বললেন, যে তোমাকে সম্পর্কযুক্ত রাখে, আমিও তাকে সম্পর্কযুক্ত রাখব; আর যে তোমার হতে থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব এতে কি তুমি খুশী নও? সে বলল, নিশ্চই, হে আমার প্রভু। তিনি বললেন, যাও তোমার জন্য তাই করা হল। আবূ হুরাইরাহ বলেন, ইচ্ছে হলে তোমরা পড়, "ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বাধন ছিন্ন করবে।" (47.22)
আবূ হুরাইরাহ থেকে এরকমই বর্ণনা করেছেন। (এরপর তিনি বলেন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ইচ্ছে হলে তোমরা পড় (ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বাধন ছিন্ন করবে।) (47.22)
মুআবিয়াহ ইবন মুযার্রাদ থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। (আবূ হুরাইরাহ বলেন) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ইচ্ছে হলে তোমরা পড়, (ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে)। (47.22)
আসলাম হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) রাতের বেলা কোন এক সফরে ছিলেন। তার সঙ্গে উমার ইবন খাত্তাব-ও চলছিলেন। উমার ইবন খাত্তাব তাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে কোন উত্তর দিলেন না। তিনি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তারপর তিনি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এবারও তিনি কোন উত্তর দিলেন না। তখন উমার (নিজেকে) বললেন, উমরের মা হারিয়ে যাক। তুমি তিনবার রাসূল (ﷺ)-কে প্রশ্ন করলে, কিন্তু একবারও তিনি তোমার জবাব দিলেন না। উমার বলেন, তারপর আমি আমার উটটি দ্রুতবেগে চালিয়ে লোকদের আগে চলে গেলাম এবং আমার ব্যাপারে কুরআন নাযিলের আশংকা করলাম। অধিকক্ষণ হয়নি, তখন শুনলাম এক আহবানকারী আমাকে ডাকছে। আমি (মনে মনে) বললাম, আমি তো আশংকা করছিলাম যে, আমার ব্যাপারে কোন আয়াত অবতীর্ণ হতে পারে। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন, আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সূরাহ নাযিল হয়েছে, যা আমার কাছে, এই পৃথিবী, যার ওপর সূর্য উদিত হয়,তা থেকেও অধিক প্রিয়। তারপর তিনি পাঠ করলেন, নিশ্চই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়।
আনাস থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, "নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে (হে মুহাম্মদ) প্রকাশ্য বিজয় দিয়েছি।' এর দ্বারা হুদাইবিয়াহর সন্ধি বোঝানো হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন সূরাহ ফাতহ্ সমধুর কণ্ঠে পাঠ করেন। মুআবিয়াহ্ বলেন, আমি ইচ্ছে করলে নবী (ﷺ)-এর কিরাআত তোমাদের নকল করে শোনাতে পারি।
মুগীরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এত অধিক সালাত আদায় করতেন যে, তার পদযুগল ফুলে যেতো। তাকে বলা হলো, আল্লাহ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দিয়েছেন। তিনি বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী (ﷺ) রাতে এত অধিক সালাত আদায় করতেন যে, তার পদযুগল ফেটে যেতো। আয়িশাহ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তো আপনার আগের ও পরের ত্রুটিসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? তবু আপনি কেন তা করছেন? তিনি বললেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া পছন্দ করব না? তার মেদ বর্ধিত হলে তিনি বসে সালাত আদায় করতেন। যখন রুকু করার ইচ্ছে করতেন, তখন তিনি দাড়িয়ে কিরাআত পড়তেন, তারপর রুকূ করতেন।
আমর ইবন আস হতে বর্ণিত যে, কুরআনের এ আয়াত, "আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে" তাওরাতে আল্লাহ এভাবে বলেছেন, হে নবী, আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা ও উম্মী লোকদের মুক্তি দাতারূপে। তুমি আমার বান্দা ও রাসূল। আমি তোমার নাম রেখেছি নির্ভরকারী যে রূঢ় ও কঠোরচিত্ত নয়, বাজারে শোরগোলকারী নয় এবং মন্দ মন্দ দ্বারা প্রতিহতকারীও নয়; বরং তিনি ক্ষমা করবেন এবং উপেক্ষা করবেন। বক্র জাতিকে সোজা না করা পর্যন্ত আল্লাহ তার জান কবয করবেন না। তা এভাবে যে, তারা বলবে, আল্লাহ ব্যতীত ইলাহ নেই। ফলে খুলে যাবে অন্ধ চোখ, বধির কান এবং পর্দায় ঢাকা অন্তরসমূহ।
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর জনৈক সাহাবী কিরাআত করছিলেন। তার একটি ঘোড়া ঘরে বাধা ছিল। হঠাৎ তা পালাতে লাগলো। সে ব্যক্তি বেরিয়ে এসে দৃষ্টিপাত করলেন; কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না। ঘোড়াটি পালিয়েই যাচ্ছিল। যখন ভোর হলো তখন তিনি ঘটনাটি নবী (ﷺ)-এর কাছে ব্যক্ত করলে তিনি বললেন, এ হলো সেই প্রশান্তি, যা কুরআন তিলাওয়াত করার সময় অবতীর্ণ হয়ে থাকে।
জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়াহর (সন্ধির) দিন আমরা এক হাজার চারশ' লোক ছিলাম।
আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল মুযানী (যিনি সন্ধির সময় উপস্থিত ছিলেন) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) দুই আঙ্গুলের মাঝে কাঁকর নিয়ে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন আল-মুগাফ্ফাল আল-মুজানি আরও বলেন: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গোসল করার স্থানে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন।
সাবিত ইবন দাহহাক হতে বর্ণিত। তিনিও বৃক্ষতলে বায়আতকারী সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
হাবীব ইবন আবূ সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ ওয়ায়িল-এর কাছে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য এলে, তিনি বললেন, আমরা সিফ্ফীনের ময়দানে ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি বললেন, তোমরা কি সে লোকদেরকে দেখতে পাচ্ছ না, যাদের আল্লাহর কিতাবের দিকে আহবান করা হচ্ছে? আলী বললেন, হা। তখন সাহল ইবন হুনায়ফ বললেন, প্রথমে তোমরা নিজেদের খবর নাও। হুদায়বিয়াহর দিন নবী (ﷺ) এবং মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যে সন্ধি হয়েছিল, আমরা সেটা দেখেছি। যদি আমরা একে যুদ্ধ মনে করতাম, তাহলে অবশ্যই আমরা যুদ্ধ করতাম। সেদিন উমার রাসূল (ﷺ)-এর কাছে) এসে বলেছিলেন, আমরা কি হাকের উপর নই, আর তারা কি বাতিলের উপর নয়? আমাদের নিহত ব্যক্তিরা জান্নাতে, আর তাদের নিহত ব্যক্তিরা কি জাহান্নামে যাবে না? তিনি বললেন, হা। তখন উমার বললেন, তাহলে কেন আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অপমানজনক শর্তারোপ করা হবে এবং আমরা ফিরে যাব? অথচ আল্লাহ আমাদেরকে এ সন্ধির ব্যাপারে হুকুম করেননি। তখন নবী (ﷺ) বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না। উমার রাগে মনে দুঃখ নিয়ে ফিরে গেলেন। তিনি ধৈর্য ধরতে পারলেন না। তারপর তিনি আবূ বাকর সিদ্দীক-এর কাছে গেলেন এবং বললেন, হে আবূ বাকর! আমরা কি হাকের উপর নই এবং তারা কি বাতিলের উপর নয়? তিনি বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! নিশ্চই তিনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ কক্ষনো তাকে ধ্বংস করবেন না। এ সময় সূরাহ ফাতহ্ অবতীর্ণ হয়।
ইবন আবূ মুলায়কাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উত্তম দু' ব্যক্তি- আবূ বাকর ও উমার নবী (ﷺ)-এর কাছে কণ্ঠস্বর উচু করে ধ্বংস হওয়ার দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছিলেন। যখন বানী তামীম গোত্রের একদল লোক নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেছিল। তাদের একজন বানী মাজাশে গোত্রের আকরা ইবন হাবিসকে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তাব করল এবং অপরজন অন্য জনের নাম প্রস্তাব করল। নাফি বলেন, এ লোকটির নাম আমার মনে নেই। তখন আবূ বাকর সিদ্দীক উমার-কে বললেন, আপনার ইচ্ছে হলো কেবল আমার বিরোধিতা করা। তিনি বললেন, না, আপনার বিরোধিতা করার ইচ্ছে আমার নেই। এ ব্যাপারটি নিয়ে তাদের আওয়াজ উচু হয়ে গেল। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর গলার আওয়াজের উপর নিজেদের গলার আওয়াজ উচু করবে না".....শেষ পর্যন্ত। (49.2) ইবন যুবায়র বলেন, এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর উমার এ তো আস্তে কথা বলতেন যে, দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তা শুনতে পেতেন না। তিনি আবূ বাকর সম্পর্কে এমন কথা বর্ণনা করেননি।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) সাবিত ইবন কায়স-কে খুজে পেলেন না। একজন সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছে তার সংবাদ নিয়ে আসছি। তারপর লোকটি তার কাছে গিয়ে দেখলেন যে, তিনি তার ঘরে মাথা নীচু করে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কী অবস্থা? তিনি বললেন, খারাপ। কারণ এই (অধম) তার আওয়াজ নবী (ﷺ)-এর আওয়াজের চেয়ে উচু করে কথা বলত। ফলে, তার আমল বরবাদ হয়ে গেছে এবং সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তারপর লোকটি নবী (ﷺ)-এর কাছে ফিরে এসে খবর দিলেন যে, তিনি এমন এমন কথা বলছেন। মূসা বলেন, এরপর লোকটি এক মহাসুসংবাদ নিয়ে তার কাছে ফিরে গেলেন (এবং বললেন) নবী (ﷺ) আমাকে বলেছেন, তুমি যাও এবং তাকে বল, তুমি জাহান্নামী নও, বরং তুমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত।
ইবন আবূ মুলাইকাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র তাদেরকে জানিয়েছেন যে, একবার বানী তামীম গোত্রের একদল লোক সাওয়ার হয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলেন। আবূ বাকর সিদ্দীক বললেন, কা'কা ইবন মাবাদ-কে আমীর বানানো হোক এবং উমার বললেন, আকরা ইবন হাবিস -কে আমীর নিয়োগ করা হোক। তখন আবূ বাকর সিদ্দীক বললেন, আপনার ইচ্ছে হলো কেবল আমার বিরোধিতা করা। উত্তরে উমার বললেন, আমি আপনার বিরোধিতা করার ইচ্ছে করিনি। এ নিয়ে তারা পরস্পর তর্ক-বিতর্ক করতে লাগলেন, এক পর্যায়ে তাদের আওয়াজ উচু হয়ে গেল। এ উপলক্ষে আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, "হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তার রাসূলের সমক্ষে তোমরা কোন বিষয়ে অগ্রণী হয়ো না.....আয়াত শেষ। (49.1)
আনাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হলে জাহান্নাম বলবে, আরো আছে কি? শেষে আল্লাহ তার পা সেখানে রাখবেন, তখন সে বলবে, আর না, আর না।
আবূ হুরাইরাহ থেকে মারফূ হাদীস হিসেবে বর্ণিত। তবে আবূ সুফ্ইয়ান এ হাদীসটিকে অধিকাংশ সময় মওকূফ হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জাহান্নামকে বলা হবে, তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? জাহান্নাম বলবে, আরো আছে কি? তখন আল্লাহ রববুল 'আলামীন নিজ পা তাতে রাখবেন। তখন জাহান্নাম বলবে, আর নয়, আর নয়।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম পরস্পর বিতর্ক করে। জাহান্নাম বলে দাম্ভিক ও পরাক্রমশালীদের দ্বারা আমাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। জান্নাত বলে, আমার কী হলো? আমাতে কেবল মাত্র দুর্বল এবং নিরীহ ব্যক্তিরাই প্রবেশ করছে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা জান্নাতকে বলবেন, তুমি আমার রহমত। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে আমি অনুগ্রহ করব। আর তিনি জাহান্নামকে বলবেন, তুমি হলে আযাব। তোমার দ্বারা আমার বান্দাদের যাকে ইচ্ছে শাস্তি দেব। জান্নাত ও জাহান্নাম প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে পূর্ণতা। তবে জাহান্নাম পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না তিনি তার পা তাতে রাখবেন। তখন সে বলবে, বাস, বাস, বাস। তখন জাহান্নাম পূর্ণ হয়ে যাবে এবং এর এক অংশ অপর অংশের সঙ্গে মুড়িয়ে দেয়া হবে। আল্লাহ তার সৃষ্টির কারো প্রতি জুলুম করবেন না। অবশ্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতের জন্য অন্য মাখলূক সৃষ্টি করবেন।
জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একরাতে আমরা নবী (ﷺ)এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি চৌদ্দ তারিখের রাতের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা যেমন এ চাঁদটি দেখতে পাচ্ছ, তেমনিভাবে তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে এবং তাকে দেখার ব্যাপারে বাধা বিঘ্ন হবে না। তাই তোমাদের সামর্থ্য থাকলে সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের আগের সালাতের ব্যাপারে প্রভাবিত হবে না। তারপর তিনি পাঠ করলেন, "আপনার রবের প্রশংসা, পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের পূর্বে"- (ক্বাফ ৫০/৩৯)।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা নবী (ﷺ)-কে প্রত্যেক সালাতের পর তার পবিত্রতা ঘোষণার আদেশ করেছেন। আল্লাহর বাণীঃ 'নামাজের পর।' (৫০.৪০) এর দ্বারা তিনি এ অর্থ করেছেন।
উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-এর কাছে নিবেদন করলাম যে, আমি অসুস্থ। তিনি বললেন, তুমি সওয়ার হয়ে লোকদের পেছনে তাওয়াফ করে নাও। তখন আমি তাওয়াফ করলাম। এ সময় রাসূল (ﷺ) কাবার এক পার্শ্বে দাড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন এবং "শপথ তূর [পর্বত] এর। শপথ কিতাবের যা লিখিত।" তিলাওয়াত করছিলেন।
যুবায়র ইবন মুত'ইম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে মাগরিবে সূরাহ তূর পাঠ করতে শুনেছি। যখন তিনি এ আয়াত পর্যন্ত পৌছেন- তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? আসমান-যমীন কি তারাই সৃষ্টি করেছে? আসলে তারা অবিশ্বাসী। আমার প্রতিপালকের ধনভান্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, না তারাই এ সমূদয়ের নিয়ন্তা- তখন আমার অন্তর প্রায় উড়ে যাবার অবস্থা হয়েছিল। সুফ্ইয়ান বলেন, আমি যুহরীকে মুহাম্মদ ইবন জুবায়ির ইবন মুত'ইমকে তার পিতার বর্ণনা করতে শুনেছি তার পিতা যুবায়র বলেছেন যে, যা আমি নবী (ﷺ)-কে মাগরিবে সূরাহ তূর পাঠ করতে শুনেছি। কিন্তু এর অতিরিক্ত আমি শুনিনি যা তারা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন।
মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা! মুহাম্মদ (ﷺ) কি তার রবকে দেখেছিলেন তিনি বললেন, তোমার কথায় আমার গায়ের পশম কাঁটা দিয়ে খাড়া হয়ে গেছে। তিনটি কথা সম্পর্কে তুমি কি জান না যে তোমাকে এ তিনটি কথা বলবে সে মিথ্যা বলবে। যদি কেউ তোমাকে বলে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তার প্রতিপালককে দেখেছেন, তাহলে সে মিথ্যাচারী। তারপর তিনি পাঠ করলেন, তিনি দৃষ্টিশক্তির অধিগম্য নহেন কিন্তু দৃষ্টিশক্তি তার অধিগত; এবং তিনিই সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক পরিজ্ঞাত" "মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন, ওয়াহীর মাধ্যম ব্যতীত অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া"। আর যে ব্যক্তি তোমাকে বলবে যে, আগামীকাল কী হবে সে তা জানে, তাহলে সে মিথ্যাচারী। তারপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, "কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে।" এবং তোমাকে যে বলবে, মুহাম্মাদ (ﷺ) কোন কথা গোপন রেখেছেন, তাহলেও সে মিথ্যাচারী। এরপর তিনি পাঠ করলেন, "হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা প্রচার কর। হ্যা, তবে রাসূল জিব্রীল-কে তার নিজস্ব আকৃতিতে দু'বার দেখেছেন।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। "এবং দুই ধনুকের দৈর্ঘ্য বা (এমনকি) কাছাকাছি দূরত্বে ছিল; তাই (আল্লাহ) তার বান্দা (জিব্রাইল) কে অনুপ্রেরণা পৌছে দিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি জিব্রাইল এটি মুহাম্মদের কাছে...পৌছেছিলেন।" (53.9-10) আয়াত দু'টোর ব্যাখ্যা সম্পর্কে ইবন মাস'উদ বলেন, রাসূল (ﷺ) জিবরীল-কে দেখেছেন। তার ছয়শ ডানা ছিল।
শাইবানী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যির্র-কে আল্লাহর বাণীঃ "এবং দুই ধনুকের দৈর্ঘ্য বা (এমনকি) কাছাকাছি দূরত্বে ছিল; তাই (আল্লাহ) তার বান্দা (জিব্রাইল) কে অনুপ্রেরণা পৌছে দিয়েছিলেন এবং তারপর তিনি জিব্রাইল এটি মুহাম্মদের কাছে...পৌছেছিলেন।" (53.9-10) এর ব্যাখ্যার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমাকে আবদুল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) জিব্রীল-কে দেখেছেন। এ সময় তার ডানা ছিল ছ'শ।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। "তিনি তিনি (মুহাম্মদ) তার পালনকর্তার নিদর্শনাবলী দেখেছেন; সর্বশ্রেষ্ঠ!" (53.18) আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, রাসূল (ﷺ) সবুজ একটি 'রফরফ' দেখেছিলেন যা পুরো আকাশ জুড়ে রেখেছিল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর বাণী 'লাত ও উজ্জা' এর ব্যাখ্যায় বলেন, এখানে 'লাত' বলে এ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যে হাজীদের জন্য ছাতু গুলত।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কসম করে বলে যে, লাত ও উয্যার কসম, সে যেন 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে। আর যে ব্যক্তি তার সাথীকে বলে, এসো আমি তোমার সঙ্গে জুয়া খেলব, তার সদাকাহ দেয়া কর্তব্য।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মুশাল্লাল নামক স্থানে অবস্থিত মানাত দেবীর নামে যারা ইহরাম বাধতো, তারা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করতো না। তারপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, "সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম।" এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুসলিমগণ তাওয়াফ করলেন। সুফয়ান বলেন, 'মানাত' কুদায়দ-এর মুশাল্লাল-এ অবস্থিত ছিল। অপর এক বর্ণনায় আবদুর রহমান ইবন খালিদ ..... আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এ আয়াতটি আনসারদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের আগে আনসার ও গাস্সান গোত্রের লোকেরা মানাতের নামে ইহরাম বাধতো। হাদীসের বাকী অংশ সুফ্য়ানের বর্ণনার মতই। অপর এক সূত্রে মা'মার ..... আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারদের কতক লোক মানাতের নামে ইহরাম বাধতো, মানাত মক্কা ও মদিনার মাঝে রাখা একটি দেবমূর্তি। তারা বললেন, হে আল্লাহর নবী! মানাতের সম্মানার্থে আমরা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করতাম না।
বনু আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সূরাহ নাজমের মধ্যে সিজদা করলেন এবং তার সঙ্গে মুসলিম, মুশরিক, জিন ও মানব সবাই সিজদা করল।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সিজদার আয়াত সম্বলিত অবতীর্ণ হওয়া সর্বপ্রথম সূরাহ হলো আন-নাজম। এ সূরার মধ্যে রাসূল (ﷺ) সিজদা করলেন এবং সিজদা করল তার পেছনের সকল লোক। তবে এক ব্যক্তিকে আমি দেখলাম, এক মুঠ মাটি হাতে তুলে তাতে সিজদা করছে। এরপর আমি তাকে কাফের অবস্থায় নিহত হতে দেখেছি। সে হল উমাইয়াহ ইবন খাল্ফ।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ)-এর সময় চাঁদ খন্ডিত হয়েছে। এর এক খন্ড পর্বতের উপর এবং অপর খন্ড পর্বতের নিচে পড়েছিল। তখন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা সাক্ষী থাক।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, চন্দ্র বিদীর্ণ হল। এ সময় আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তা দু'টুকরো হয়ে গেল। তখন তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক, তোমরা সাক্ষী থাক।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর কালে চাঁদ খন্ডিত হয়েছিল।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কাবাসীরা নবী (ﷺ)-কে একটি নিদর্শন দেখাতে বলল। তখন তিনি তাদেরকে চাঁদ খন্ডিত করে দেখালেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, চন্দ্র দু' খন্ডে খন্ডিত হয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত: নবী (ﷺ) তিলাওয়াত করতেনঃ ফাহাল-মিন-মাদ্দাকীর (তাহলে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?)
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: নবী (ﷺ) তিলাওয়াত করতেনঃ স্মরণকারী কেউ আছে কি? এবং প্রচণ্ড বাতাস (মানুষকে উপড়ে ফেলা) যেন তারা খেজুর গাছের ডালপালা উপড়ে ফেলেছে, তখন আমার শাস্তি ও সতর্কবাণী কতই না ভয়াবহ ছিল!' (54.20-21)
আবু ইস-হক থেকে বর্ণিত: একজন ব্যক্তি আল-আসওয়াদকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি 'ফাহল মিন-মুদ্দাকির' নাকি '..মুদ্দাকির'? আল আসওয়াদ উত্তর দিল, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে 'ফাহল-মিন মুদ্দাকির' পড়তে শুনেছি; আমিও শুনেছি। নবী (ﷺ) 'দ' দিয়ে 'ফাহাল-মিন-মুদ্দাকির' পাঠ করছেন।
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: নবী (ﷺ) পাঠ করলেন: 'ফাহাল-মিন-মুদ্দাকির' "এবং সত্যই একটি স্থায়ী আযাব তাদের ভোরবেলা পাকড়াও করেছিল, অতএব, তোমরা আমার আযাব এবং আমার সতর্কবাণী আস্বাদন কর" (54.38-39)
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: নবী (ﷺ) পাঠ করলেন: 'ফাহাল-মিন মুদ্দাকির: 'এবং অবশ্যই, আমরা তোমাদের মত জাতিকে ধ্বংস করেছি; তাহলে উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?' (54.51)
আবদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সামনে 'ফাহাল-মিন-মুদ্দাকীর' পাঠ করলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এটা ফাহাল-মিন মুদ্দাকির।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, রাসূল (ﷺ) বদর যুদ্ধের দিন একটি ছোট্ট তাবুতে অবস্থান করে এ দোয়া করেছিলেন- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কামনা করছি! হে আল্লাহ! তুমি যদি চাও, আজকের দিনের পর তোমার ইবাদাত না কর হোক....ঠিক এ সময়ই আবূ বাকর সিদ্দীক তার হস্ত ধারণ পূর্বক বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যথেষ্ট হয়েছে। আপনি আপনার প্রতিপালকের নিকট অনুনয়-বিনয়ের সঙ্গে বহু দোয়া করেছেন। এ সময় রাসূল (ﷺ) বর্ম পরিহিত অবস্থায় উঠে দাড়ালেন। তাই তিনি আয়াত দু'টো পড়তে পড়তে তাবু থেকে বেরিয়ে এলেন, "এ দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ পৃদর্শন করবে"- (আল-কামার ৫৪ঃ৪৫-৪৬)।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, "না, কেয়ামত হল তাদের নির্ধারিত সময় (তাদের পূর্ণ প্রতিদানের জন্য); এবং কেয়ামত হবে আরও আগের এবং সবচেয়ে তিক্ত।" (54.46) আয়াতটি মুহাম্মদ (ﷺ)-এর প্রতি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। আমি তখন কিশোরী ছিলাম, খেলাধূলা করতাম।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন নবী (ﷺ) ছোট্ট একটি তাবুতে অবস্থান করে এ দোয়া করছিলেন, আয় আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার ওয়াদা ও অঙ্গীকার পূরণ কামনা করছি। হে আল্লাহ! যদি তুমি চাও, আজকের পর আর কখনো তোমার ইবাদাত না করা হোক.....। ঠিক এ সময় আবূ বাকর রাসূল (ﷺ)-এর হাত ধরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যথেষ্ট হয়েছে। আপনি আপনার প্রতিপালকের কাছে অনুনয়-বিনয়ের সঙ্গে বহু দোয়া করেছেন। এ সময় তিনি লৌহবর্ম পরে ছিলেন। এরপর তিনি এ আয়াত পড়তে পড়তে তাবু থেকে বের হয়ে এলেনঃ একদল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। অধিকন্তু কিয়ামত তাদের শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্ততর"। (আল-কামার ৫৪/৪৫-৪৬)
আবদুল্লাহ ইবন কায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, (জান্নাতের মধ্যে) দু'টি বাগান থাকবে। এ দু'টির সকল পাত্র এবং এর ভিতরে সকল বস্তু রৌপ্য নির্মিত হবে এবং (জান্নাতে) আরো দু'টি উদ্যান থাকবে। এ দু'টির সকল পাত্র এবং ভিতরের সকল বস্তু সোনার তৈরী হবে। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতী লোকেরা তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভ করবে। এ জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের এ দর্শনের মাঝে আল্লাহর সত্তার ওপর জড়ানো তার বিরাটত্বের চাদর ছাড়া আর কোন জিনিস থাকবে না।
আবদুল্লাহ ইবন কায়স হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, জান্নাতের মধ্যে ফাঁপা মোতির একটি তাবু থাকবে। এর প্রশস্ততা হবে ষাট মাইল। এর প্রতি কোণে থাকবে হুর-বালা। এদের এক কোণের জন অপর কোণের জনকে দেখতে পাবে না। ঈমানদার লোকেরা তাদের কাছে যাবে। এতে থাকবে দু'টি বাগান, যার সকল পাত্র এবং ভেতরের সকল বস্তু হবে রূপার তৈরী।
তেমনি আরো দু'টি বাগান থাকবে, যার পাত্র এবং ভিতরের সমস্ত জিনিস হবে স্বর্ণের নির্মিত। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতবাসী এবং তাদের প্রতিপালকের দর্শন লাভের মাঝখানে আল্লাহর বিরাটত্বের জ্যোতির্ময় আভা ভিন্ন আর কিছু থাকবে না।
আবূ হুরাইরাহ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, জান্নাতের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে, যার ছায়ায় একজন সওয়ারী একশত বছর চলতে থাকবে, তবুও সে এ ছায়া অতিক্রম করতে পারবে না। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি (সম্প্রসারিত ছায়া) পাঠ কর।
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস-কে সূরাহ তওবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এ তো লাঞ্ছনাকারী সূরা। তাদের একদল এই করেছে, আরেক দল ওই করেছে, এ বলে একাধারে এ সূরাহ অবতীর্ণ হতে থাকলে লোকেরা ধারণা করতে লাগলো যে, এ সূরায় উল্লেখ করা হবে না, এমন কেউ আর তাদের মধ্যে বাকী থাকবে না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে সূরাহ আনফাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এ সূরাটি বদর যুদ্ধের সময় অবতীর্ণ হয়েছে। আমি তাকে সূরাহ হাশর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি বানু নযীর সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।
সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস-কে 'সূরাহ হাশর' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এ সুরাকে 'সূরাহ বানী নাযীর' বল।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বানী নযীর গোত্রের খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এবং কেটে ফেলেছিলেন। এ গাছগুলো ছিল 'বুয়াইরা' নামক জায়গায়। এরপর অবতীর্ণ করেছেন আল্লাহ তাআলাঃ তোমরা যে খর্জুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছ বা যেগুলোকে কান্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে; এ এজন্য যে, আল্লাহ পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন। (59.5)
উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনু নযীরের বিষয়-সম্পত্তি ঐ সমস্ত বস্তুর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আল্লাহ তার রাসূলকে 'ফাই' হিসেবে দিয়েছেন এ জন্য যে মুসলিমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে অরোহণ করে যুদ্ধ করেনি। সুতরাং এটা খাস ছিল রাসূল (ﷺ)-এর জন্য। এর থেকে তিনি তার পরিবারের জন্য এক বছরের খরচ দান করতেন। এরপর বাকিটা তিনি অস্ত্রশস্ত্র এবং ঘোড়া সংগ্রহের পিছনে ব্যয় করতেন আল্লাহর পথে জিহাদের প্রস্তুতি হিসেবে।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ লানাত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকণ করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকণ করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভূরু-চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাতের মাঝে ফাক সৃষ্টি করে। সে সব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে। এরপর বানী আসাদ গোত্রের উম্মু ইয়াকূব নামের এক মহিলার কাছে এ সংবাদ পৌছলে সে এসে বলল, আমি জানতে পারলাম, আপনি এ ধরনের মহিলাদের প্রতি লানত করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যার প্রতি লানত করেছেন, আল্লাহর কিতাবে যার প্রতি লানত করা হয়েছে, আমি তার প্রতি লানত করব না কেন? তখন মহিলা বলল, আমি দুই ফলকের মাঝে যা আছে তা (পূর্ণ কুরআন) পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলেছেন, তা তো এতে পাইনি। আবদুল্লাহ বললেন, যদি তুমি কুরআন পড়তে তাহলে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি রাসূল (ﷺ) তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক। মহিলাটি বলল, হা নিশ্চই পড়েছি। আবদুল্লাহ বললেন, রাসূল (ﷺ) এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তখন মহিলা বলল, আমার মনে হয় আপনার পরিবারও এ কাজ করে তিনি বললেন, তুমি যাও এবং ভালমত দেখে এসো। এরপর মহিলা গেল এবং ভালভাবে দেখে এলো। কিন্তু তার দেখার কিছুই দেখতে পেলো না। তখন আবদুল্লাহ বললেন, যদি আমার স্ত্রী এমন করত, তবে সে আমার সঙ্গে একত্র থাকতে পারত না।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে নারী নকল চুল লাগায়, তার প্রতি রাসূল (ﷺ) লানত করেছেন।
আমর ইবন মায়মূন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেছেন, আমি আমার পরবর্তী খালীফাকে ওসীয়াত করেছি, প্রথম যুগের মুহাজিরদের হাক আদায় করার জন্য এবং আমি পরবর্তী খালীফাকে আনসারদের ব্যাপারে ওসীয়াত করছি, যারা নবী (ﷺ)এর হিজরাতের পূর্বে এ নগরীতে বসবাস করতেন এবং ঈমান এনেছিলেন যেন তিনি তাদের পুণ্যবানদের সৎকর্মকে গ্রহণ করেন এবং দোষ-ত্রুটিকে ক্ষমা করে দেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, আমি খুব ক্ষুধার্ত। তখন তিনি তার সহধর্মিণীদের নিকট পাঠালেন; কিন্তু তিনি তাদের কাছে কিছুই পেলেন না। এরপর রাসূল (ﷺ) বললেন, এমন কেউ আছে কি, যে আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমানদারী করতে পারে? আল্লাহ তার প্রতি রহমত করবেন। তখন আনসারদের এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বললেন, আমি আছি, হে আল্লাহর রাসূল! এরপর তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গেলেন এবং নিজ স্ত্রীকে বললেন, ইনি রাসূল (ﷺ)-এর মেহমান। কোন জিনিস জমা করে রাখবে না। মহিলা বলল, আল্লাহর কসম! আমার কাছে ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বললেন, ছেলেমেয়েরা রাতের খাবার চাইলে তুমি তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিও, (খাবার নিয়ে) আমার কাছে আসিও, অতঃপর বাতিটি নিভিয়ে দিও। আজ রাতে আমরা ভুখা থাকব। সুতরাং মহিলা তা-ই করল। পরদিন সকালে আনসারী সাহাবী রাসূল (ﷺ)-এর খিদমাতে আসলেন। তিনি বললেন, অমুক ব্যক্তি ও তার স্ত্রীর প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন অথবা অমুক অমুকের কাজে আল্লাহ হেসেছেন। এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেনঃ "এবং তারা তাদের নিজেদের উপর অন্যদের প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও।" (59.9)
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) যুবায়র, মিকদাদ ও আমাকে পাঠালেন এবং বললেন, তোমরা 'রওযা খাখ' নামক স্থানে যাও। সেখানে এক উষ্ট্রারোহিণী মহিলা পাবে। তার সঙ্গে একখানা পত্র আছে, তোমরা তার থেকে সে পত্রখানা নিয়ে নিবে। এরপর আমরা রওয়ানা হলাম। আমাদের ঘোড়া আমাদেরকে নিয়ে ছুটে চলল। যেতে যেতে আমরা রওযায় গিয়ে পৌছলাম। সেখানে পৌছেই আমরা উষ্ট্রারোহিণীকে পেয়ে গেলাম। আমরা বললাম, পত্রখানা বের কর সে বলল, আমার সঙ্গে কোন পত্র নেই। আমরা বললাম, অবশ্যই তুমি পত্রখানা বের করবে, অন্যথায় তোমাকে বিবস্ত্র করে ফেলা হবে। এরপর সে তার চুলের বেনী থেকে পত্রখানা বের করল। আমরা পত্রখানা নিয়ে নবী (ﷺ)-এর কাছে এলাম। দেখা গেল, পত্রখানা হাতিব ইবন আবূ বালতাআহ্-এর পক্ষ হতে মক্কার কতিপয় মুশরিকের কাছে লেখা যাতে তিনি নবী (ﷺ)-এর বিষয় তাদের কাছে ব্যক্ত করে দিয়েছেন। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, হাতিব কী ব্যাপার? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যাপারে ত্বড়িৎ কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমি কুরাইশ বংশীয় লোকদের সঙ্গে বসবাসকারী এক ব্যক্তি; কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার কোন বংশগত সম্পর্ক নেই। আপনার সঙ্গে যত মুহাজির আছেন, তাদের সবারই সেখানে আত্মীয়-স্বজন আছে। এসব আত্মীয়-স্বজনের কারণে মক্কায় তাদের পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদ রক্ষা পাচ্ছে। আমি চেয়েছিলাম, যেহেতু তাদের সঙ্গে আমার বংশীয় কোন সম্পর্ক নেই,তাই এবার যদি আমি তাদের প্রতি অনুগ্রহ করি, তাহলে হয়তো তারাও আমার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াবে। কুফর ও স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করার মনোভাব নিয়ে আমি এ কাজ করিনি। তখন নবী (ﷺ) বললেন, সে তোমাদের কাছে সত্য কথাই বলেছে। তখন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন এক্ষুণি আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই। নবী (ﷺ) বললেন, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জান না, আল্লাহ অবশ্যই বদরে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি লক্ষ্য করে বলেছেনঃ "তোমরা যা চাও কর, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।" আমর বলেন, এ ঘটনার প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছেঃ "হে ঈমানদারগণ! আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।" সুফ্ইয়ান বলেন, আয়াতটি হাদীসের অংশ না আমর-এর কথা, তা আমি জানি না। আলী হতে বর্ণিত যে, সুফ্ইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ-কে "হে মুমিনগণ! আমার শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করিও না" আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে সুফ্ইয়ান বলেন, মানুষের বর্ণনার মাঝে তো এ রকমই পাওয়া যায়। আমি এ হাদীসটি আমর ইবন দ্বীনার থেকে মুখস্থ করেছি। এর থেকে একটি অক্ষরও আমি বাদ দেইনি। আমার ধারণা, আমর ইবন দ্বীনার থেকে আমি ছাড়া আর কেউ এ হাদীস মুখস্থ করেনি।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ তাকে বলেছেন, কোন মুমিন মহিলা রাসূল (ﷺ)-এর কাছে হিজরাত করে এলে, তিনি তাকে আল্লাহর এই আয়াতের ভিত্তিতে পরীক্ষা করতেন- অর্থঃ "হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার কাছে এ মর্মে বায়আত করতে আসে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না, এবং সৎকার্যে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়আত গ্রহণ করবে এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।) আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"- (আল-মুমতাহিনাহ ৬০/১২)। উরওয়াহ বলেন, আয়িশাহ বলেছেন, যে মুমিন মহিলা এসব শর্ত মেনে নিত, রাসূল (ﷺ) তাকে বলতেন, আমি কথার মাধ্যমে তোমাকে বায়আত করে নিলাম। আল্লাহর কসম! বায়আত কালে কোন নারীর হাত নবী (ﷺ)-এর হাতকে স্পর্শ করেনি। নারীদেরকে তিনি শুধু এ কথার দ্বারাই বায়আত করতেন আমি তোমাকে এ কথার ওপর বায়আত করলাম।
উম্মু 'আতিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূল (ﷺ)-এর কাছে বায়আত গ্রহণ করেছি। এরপর তিনি আমাদের সামনে পাঠ করলেন, "তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক স্থির করবে না।" এরপর তিনি আমাদেরকে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে কাঁদতে নিষেধ করলেন। এ সময় এক মহিলা তার হাত টেনে নিয়ে বলল, অমুক মহিলা আমাকে বিলাপে সহযোগিতা করেছে, আমি তাকে এর বিনিময় দিতে ইচ্ছা করেছি। নবী (ﷺ) তাকে কিছুই বলেননি। এরপর মহিলাটি উঠে চলে গেল এবং আবার ফিরে আসলো, তখন রাসূল (ﷺ) তাকে বায়আত করলেন।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আল্লাহর বাণী সম্পর্কে: 'এবং তারা কোনো ন্যায়বিচারে তোমার অবাধ্য হবে না।' (60.12) এটা এমন একটি শর্ত ছিল যা আল্লাহ ঈমানদার নারীদের উপর আরোপ করেছিলেন (যারা নবীর আনুগত্যের শপথ নিতে এসেছিল)।
উবাদাহ ইবন সামিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে ছিলাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি এসব শর্তে আমার কাছে বায়আত গ্রহণ করবে যে, তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কিছুকে শরীক করবে না, যিনা করবে না এবং চুরি করবে না। এরপর তিনি নারীদের শর্ত সম্পর্কিত আয়াত পাঠ করলেন। বর্ণনাকারী সুফ্ইয়ান প্রায়ই বলতেন, রাসূল (ﷺ) আয়াতটি পাঠ করেছেন। এরপর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমাদের যে ব্যক্তি এসব শর্ত পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রতিফল দেবেন। আর যে ব্যক্তি এ সবের কোন একটি করে ফেলবে এবং তাকে শাস্তিও দেয়া হবে। এ শাস্তি তার জন্য কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এ সবের কোন একটি করে ফেলল এবং আল্লাহ তা লুকিয়ে রাখলেন, তাহলে এ বিষয়টি আল্লাহর কাছে থাকল। তিনি চাইলে তাকে শাস্তি দেবেন, আর তিনি যদি চান তাহলে তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের সালাতে রাসূল (ﷺ) সঙ্গে সঙ্গে হাজির ছিলাম এবং আবূ বাকর, উমার এবং উসমান-ও সঙ্গে ছিলেন। তারা সকলেই খুত্বার আগে সালাত আদায় করেছেন। সালাত আদায়ের পর তিনি খুতবা দিয়েছেন। এরপর আল্লাহর নবী মিম্বর থেকে নেমেছেন। তখন তিনি যে লোকজনকে হাতের ইশারায় বসাচ্ছিলেন, এ দৃশ্য আমি এখনো যেন দেখতে পাচ্ছি। এরপর তিনি লোকদের দু'ভাগ করে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং মহিলাদের কাছে গিয়ে দাড়ালেন। তার সঙ্গে বিলাল-ও ছিলেন। এরপর তিনি পাঠ করলেন, "হে নবী! মুমিন নারীগণ যখন তোমার কাছে এসে বায়আত করে এ মর্মে যে, তারা আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক স্থির করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানকে হত্যা করবে না এবং তারা সজ্ঞানে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না।" তিনি পূর্ণ আয়াত তিলাওয়াত করে সমাপ্ত করলেন। এরপর তিনি আয়াত শেষ করে বললেন, এ শর্ত পূরণে তোমরা রাজি আছ কি? একজন মহিলা বলল, হা, হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যতীত আর কোন মহিলা কোন উত্তর দেয়নি। এ মহিলাটি কে ছিল, হাসান তা জানতেন না। রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমরা দান করো। বিলাল তার কাপড় বিছিয়ে দিলেন। তখন মহিলারা তাদের রিং ও আংটি বিলাল-এর কাপড়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলেন।
যুবায়র ইবন মুত'ইম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ এবং আমি মাহী। আমার দ্বারা আল্লাহ তাআলা সমস্ত কুফরী দূর করবেন। আমি হাশির, আমার পেছনে সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে এবং আমি 'আকিব, সকলের শেষে আগমনকারী।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে বসেছিলাম। এমন সময় তার উপর অবতীর্ণ হলো সূরাহ জুমুআহ, যার একটি আয়াত হলোঃ "এবং তাদের অন্যান্যের জন্যও যারা এখনও তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি।" (62.3) তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, তারা কারা? তিনবার এ কথা জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও তিনি কোন উত্তর দিলেন না। আমাদের মাঝে সালমান ফারসী-ও উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালমান-এর উপর হাতে রেখে বললেন, ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রের নিকট থাকলেও আমাদের কতক লোক অথবা তাদের এক ব্যক্তি তা অবশ্যই পেয়ে যাবে।
আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত যে, আমাদের লোক অথবা তাদের কতক লোক অবশ্যই তা পেয়ে যাবে।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার জুমুআহর দিন একটি বাণিজ্য দল আসল, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। বারজন লোক ছাড়া সকলেই সেদিকে ছুটে গেল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ অবতীর্ণ করলেনঃ "এবং যখন তারা দেখল ব্যবসা ও কৌতুক, তখন তারা (তোমাকে দাড়ান অবস্থায় রেখে) তার দিকে ছুটে গেল-" (আল-জুমুআহ ৬২/১১)।
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমি শারীক হয়েছিলাম। তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে বলতে শুনলাম, আল্লাহর রাসূলের সঙ্গীদের জন্য তোমরা ব্যয় করবে না, যতক্ষণ না তারা তার থেকে সরে পড়ে এবং সে এও বলল, আমরা মদিনায় ফিরলে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদেরকে অবশ্যই বের করে দিবে। এ কথা আমি আমার চাচা কিংবা উমার-এর কাছে বলে দিলাম। তিনি তা নবী (ﷺ)-এর কাছে জানালেন। ফলে তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তাকে বিস্তারিত এ সব কথা বলে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার সাথী-সঙ্গীদের কাছে খবর পাঠালেন, তারা সকলেই কসম করে বলল, এমন কথা তারা বলেননি। ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার কথাকে মিথ্যা ও তার কথাকে সত্য বলে মেনে নিলেন। এতে আমি এমন মনে কষ্ট পেলাম, যেরূপ কষ্ট আর কখনও পাইনি। আমি (মনের দুঃখে) ঘরে বসে গেলাম। আমার চাচা আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাকে মিথ্যাচারী মনে করেছেন এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে তুমি কী করে মনে করলে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, "যখন মুনাফিকগণ তোমার কাছে আসে।" নবী (ﷺ) আমার কাছে লোক পাঠালেন এবং এ সূরাহ পাঠ করলেন। এরপর বললেন, হে যায়দ! আল্লাহ তাআলা তোমাকে সত্যবাদী বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার চাচার সঙ্গে ছিলাম। এ সময় আমি আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলকে বলতে শুনেছি যে, তোমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গীদের জন্য ব্যয় করবে না, যতক্ষণ না তারা তার থেকে সরে পড়ে এবং সে এও বলল যে, আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদেরকে অবশ্যই বের করে দিবে। এ কথা আমি আমার চাচার কাছে বলে দিলাম। আমার চাচা তা (রাসূল) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে বললেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবদুল্লাহ ইবন উবাই এবং তার সাথী-সঙ্গীদেরকে ডেকে পাঠালেন। তারা সকলেই কসম করে বলল, তারা এ কথা বলেনি। ফলে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের কথাকে সত্য এবং আমার কথাকে মিথ্যা মনে করলেন। এতে আমার এমন দুঃখ হল যেমন দুঃখ আর কখনও হয়নি। এমনকি আমি ঘরে বসে গেলাম। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেনঃ "যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসে।" থেকে "তারা বলে আল্লাহর রাসূলের সহচরদের জন্য তোমরা ব্যয় করবে না, যতক্ষণ না তারা সরে পড়ে" এবং "তথা থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদেরকে বহিষ্কৃত করবেই।" এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং আমার সামনে তা তিনি পাঠ করলেন। তারপর বললেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে সত্যবাদী বলে ঘোষণা করেছেন।
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই যখন বলল, "আল্লাহর রাসূলের সহচরদের জন্য তোমরা ব্যয় করবে না" এবং এ-ও বলল যে, "যদি আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করি.....।" তখন এ খবর আমি নবী (ﷺ)-কে জানিয়ে দিলাম। এ কারণে আনসারগণ আমাকে ভৎর্সনা করলেন এবং আবদুল্লাহ ইবন উবাই কসম করে বলল, এমন কথা সে বলেনি। এরপর আমি আমার অবস্থানে ফিরে আসলাম এবং ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তার কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তোমাকে সত্য বলে ঘোষণা করেছেন এবং অবতীর্ণ করেছেন- "তারা বলে তোমরা ব্যয় করবে না....শেষ পর্যন্ত। (63.7)
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কোন এক সফরে নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে বের হলাম। সফরে এক কঠিন অবস্থা লোকদেরকে গ্রাস করে নিল। তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই তার সাথী-সঙ্গীদেরকে বলল, "আল্লাহর রাসূলের সহচরদের জন্য তোমরা ব্যয় করবে না যতক্ষণ তারা সরে পড়ে যারা তার আশে পাশে আছে।" সে এও বলল, 'আমরা মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলে তথা হতে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদের বহিষ্কৃত করবেই।" (এ কথা শুনে) আমি নবী (ﷺ)-এর কাছে এলাম এবং তাকে এ সম্পর্কে জানালাম। তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে ডেকে পাঠালেন। সে অতি জোর দিয়ে কসম খেয়ে বলল, এ কথা সে বলেনি। তখন লোকেরা বলল, যায়দ রাসূল (ﷺ)-এর কাছে মিথ্যা কথা বলেছে। তাদের এ কথায় আমার খুব দুঃখ হল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা আমার সত্যতার পক্ষে আয়াত অবতীর্ণ করলেনঃ "যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসে।" এরপর নবী (ﷺ) তাদেরকে ডাকলেন, যাতে তিনি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, "কিন্তু তারা তাদের মাথা ফিরিয়ে নিল।" আল্লাহর বাণীঃ "দেয়ালে ঠেস লাগানো কাঠ সদৃশ"- (মুনাফিকূন ৬৩/৪)। রাবী বলেন, লোকগুলো দেখতে খুব সুন্দর ছিল।
যায়দ ইবন আরকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার চাচার সঙ্গে ছিলাম। এ সময় শুনলাম, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল বলছে, "আল্লাহর রাসূলের সঙ্গীদের জন্য তোমরা ব্যয় করবে না যতক্ষণ না তারা সরে পড়ে" এবং 'আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদেরকে অবশ্যই বের করে দিবে"। এ কথা আমি আমার চাচার কাছে জানালাম। আমার চাচা তা নবী (ﷺ)-এর কাছে জানালেন, নবী (ﷺ) আমাকে ডাকলেন। আমি বিস্তারিতভাবে এ কথা তার কাছে বললাম। তখন তিনি আবদুল্লাহ ইবন উবাই ও তার সাথী-সঙ্গীদেরকে ডেকে পাঠালেন। তারা সকলেই কসম করে বলল, এ কথা তারা বলেনি। ফলে নবী (ﷺ) আমাকে মিথ্যাচারী ও তাদেরকে সত্যবাদী মনে করলেন। এতে আমি এমন দুঃখ পেলাম যে, এমন দুঃখ আর কখনও পাইনি। এরপর আমি ঘরে বসে গেলাম। তখন আমার চাচা আমাকে বললেন, এমন কাজের কেন ইচ্ছে করলে, যার ফলে নবী (ﷺ) তোমাকে মিথ্যাচারী স্থির করলেন এবং তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন? এ সময় আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেনঃ "যখন মুনাফিকরা তোমার কাছে আসে তারা বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চই আল্লাহর রাসূল" তখন নবী (ﷺ) আমার কাছে লোক পাঠালেন এবং সূরাটি আমার সামনে তিলাওয়াত করলেন ও বললেন, আল্লাহ তোমাকে সত্যবাদী বলে ঘোষণা করেছেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমরা উপস্থিত ছিলাম। এ সময় জনৈক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করলেন। তখন আনসারী হে আনসারী ভাইগণ! বলে সাহায্য প্রার্থনা করলেন এবং মুহাজির সাহাবী, ওহে মুহাজির ভাইগণ! বলে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। রাসূল (ﷺ) তা শুনে বললেন, কী খবর, জাহিলী যুগের মত ডাকাডাকি করছ কেন? তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, এক মুহাজির এক আনসারীর নিতম্বে আঘাত করেছে। তিনি বললেন, এমন ডাকাডাকি পরিত্যাগ কর। এটা অত্যন্ত গন্ধময় কথা। এরপর ঘটনাটি আবদুল্লাহ ইবন উবায়র কানে পৌছল, সে বলল, আচ্ছা, মুহাজিররা এমন কাজ করেছে? "আল্লাহর কসম! আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান থেকে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকেদেরকে অবশ্যই বের করে দিবে।' এ কথা নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছল। তখন উমার উঠে দাড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি এক্ষুণি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিচ্ছি। নবী (ﷺ) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ কথা বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তার সঙ্গী-সাথীদেরকে হত্যা করেন। জাবির বলেন, মুহাজিররা যখন মদিনায় হিজরাত করে আসেন, তখন মুহাজিরদের তুলনায় আনসাররা সংখ্যায় বেশি ছিলেন। অবশ্য পরে মুহাজিররা সংখ্যায় বেশি হয়ে যান।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হার্রায় যাদেরকে শহীদ করা হয়েছিল তাদের খবর শুনে শোকে মুহ্যমান হয়েছিলাম। আমার এ শোকের সংবাদ যায়দ ইবন আরকাম-এর কাছে পৌছলে তিনি আমার কাছে পত্র লিখেন। পত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি রাসূলকে বলতে শুনেছেন, হে আল্লাহ! আনসার ও আনসারদের সন্তানদেরকে তুমি ক্ষমা করে দাও। এ দোয়ায় রাসূল (ﷺ) আনসারদের সন্তানদের সন্তানদের জন্য দোয়া করেছেন কিনা এ ব্যাপারে ইবন ফায্ল সন্দেহ করেছেন। এ ব্যাপারে আনাস তার কাছে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যায়দ ইবন আরকাম ঐ ব্যক্তি যার শ্রবণকে আল্লাহ তাআলা সত্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমরা যোগদান করেছিলাম। জনৈক মুহাজির আনসারদের এক ব্যক্তির নিতম্বে আঘাত করলেন। তখন আনসারী সাহাবী "আনসারী ভাইগণ!" বলে এবং মুহাজির সাহাবী "হে মুহাজির ভাইগণ!" বলে ডাক দিলেন। আল্লাহ তার রাসূলের কানে এ কথা পৌছিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, এটা কেমন ডাকাডাকি? উপস্থিত লোকেরা বললেন, জনৈক মুহাজির ব্যক্তি এক আনসারী ব্যক্তির নিতম্বে আঘাত করেছে। আনসারী ব্যক্তি "হে আনসারী ভাইগণ!" বলে এবং মুহাজির ব্যক্তি "হে মুহাজির ভাইগণ!" বলে নিজ নিজ গোত্রকে ডাক দিলেন। এ কথা শুনে নবী (ﷺ) বললেন, এ রকম ডাকাডাকি ত্যাগ কর। এগুলো অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত কথা। জাবির বলেন, নবী (ﷺ) যখন মদিনায় হিজরাত করে আসেন তখন আনসার সাহাবীগণ ছিলেন সংখ্যায় বেশি। পরে মুহাজিরগণ সংখ্যায় বেশি হয়ে যান। এ সব কথা শুনার পর আবদুল্লাহ ইবন উবাই বলল, সত্যিই তারা কি এমন করেছে? আল্লাহর কসম! আমরা মদিনায় ফিরলে সেখান হতে প্রবল লোকেরা দুর্বল লোকদেরকে বের করে দিবেই। তখন ইবন খাত্তাব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেই। নবী (ﷺ) বললেন, উমার! তাকে ছেড়ে দাও, যাতে লোকেরা এমন কথা বলতে না পারে যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তার সাথীদের হত্যা করছেন।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি তার ঋতুমতী স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর উমার তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উল্লেখ করলেন। এতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অত্যন্ত নাখোশ হলেন। এরপর তিনি বললেন, সে যেন তাকে ফিরিয়ে নেয়। এরপর পবিত্রাবস্থা না আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রেখে দিক। এরপর ঋতু এসে আবার পবিত্র হলে তখন যদি তালাক দিতে চায় তাহলে পবিত্রাবস্থায় স্পর্শ করার পূর্বে সে যেন তাকে তালাক দেয়। এটি সেই ইদ্দত যেটি পালনের নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন।
আবূ সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ ইবন আব্বাস-এর কাছে ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি ইবন আব্বাস-এর কাছে এলেন এবং বললেন, এক মহিলা তার স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেছে। সে এখন কীভাবে ইদ্দত পালন করবে, এ বিষয়ে আমাকে ফতোয়া দিন। ইবন আব্বাস বললেন, ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম্ দু'টির যেটি দীর্ঘ, তাকে সেটি পালন করতে হবে। আবূ সালামাহ বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর হুকুম তো হলঃ গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আবূ হুরাইরাহ বলেন, আমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র আবূ সালামাহর সঙ্গে আছি। তখন ইবন আব্বাস তার ক্রীতদাস কুরায়বকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য উম্মু সালামাহ-এর কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন, সুবায়আ আসলামিয়া-এর স্বামীকে হত্যা করা হল, তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপরই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। যারা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবুস্ সানাবিল তাদের মধ্যে একজন।
(অন্য এক সানাদে) সুলায়মান ইবন হারব ও আবুন নুমান, হাম্মাদ ইবন যায়দ ও আইয়ুবের মাধ্যমে মুহাম্মাদ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি ঐ মজলিসে ছিলাম, যেখানে আবদুর রহমান ইবন আবূ লায়লা-ও হাজির ছিলেন। তার সঙ্গীরা তাকে খুব সম্মান করতেন। তিনি ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম দু'টি থেকে দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ হুকুমটির কথা উল্লেখ করলে আমি আবদুল্লাহ ইবন উতবাহর বরাত দিয়ে সুবায়আ বিন্ত হারিছ আসলামিয়া সম্পর্কিত হাদীসটি বর্ণনা করলাম। মুহাম্মাদ ইবন সিরীন বলেন, এতে তার কতক সঙ্গী আমাকে থামিয়ে দিল। তিনি বলেন, আমি বুঝলাম, তারা আমার হাদীসটি অস্বীকার করছে। তাই আমি বললাম, আবদুল্লাহ ইবন 'উত্বাহ কূফাতে এখনও জীবিত আছেন, এমতাবস্থায় যদি আমি তার নাম নিয়ে মিথ্যা কথা বলি, তাহলে এতে আমার চরম দুঃসাহসিকতা দেখানো হবে। এ কথা শুনে আবদুর রহমান ইবন আবূ লায়লা লজ্জিত হলেন এবং বললেন, কিন্তু তার চাচা তো এ হাদীস বর্ণনা করেননি। তখন আমি আবূ আতিয়া মালিক ইবন 'আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি সুবায়আ-এর হাদীসটি বর্ণনা করে আমাকে শোনাতে লাগলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, (এ বিষয়ে) আপনি আবদুল্লাহ থেকে কোন কথা শুনছেন কি? তিনি বললেন, আমরা আবদুল্লাহ-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি এ সকল মহিলাদের ব্যাপারে সহজ পন্থা ছেড়ে কঠোর পন্থা গ্রহণ করতে চাও? সূরাহ নিসা আল্কুসরা এরপরে অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেন, গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত।
সাঈদ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। ইবন আব্বাস বলেছেন, এরূপ হারাম করে নেয়া হলে কাফ্ফারা দিতে হবে। ইবন আব্বাস এ-ও বলেছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাঝে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।"
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যয়নব বিনত জাহশ-এর কাছে মধু পান করতেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন। তাই আমি এবং হাফ্সাহ স্থির করলাম যে, আমাদের যার ঘরেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসবেন, সে তাকে বলবে, আপনি কি মাগাফীর খেয়েছেন? আপনার মুখ থেকে মাগাফীরের গন্ধ পাচ্ছি। তিনি বললেন, না, বরং আমি যয়নব বিন্ত জাহশ-এর নিকট মধু পান করেছি। আমি কসম করলাম, আর কখনও মধু পান করব না। তুমি এ ব্যাপারে অন্য কাউকে জানাবে না।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব-কে এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য আমি এক বছর অপেক্ষা করেছি। কিন্তু তার বাক্তিত্বের প্রভাবের ভয়ে আমি তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। অবশেষে তিনি হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হলে, আমিও তার সঙ্গে গেলাম। ফেরার পথে আমরা যখন কোন একটি রাস্তা অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি পিলু গাছের আড়ালে গেলেন। ইবন আব্বাস বলেন, তিনি প্রয়োজন সেরে না আসা পর্যন্ত আমি সেখানে দাড়িয়ে অপেক্ষা করলাম। এরপর তার সঙ্গে পথ চলতে চলতে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! নবী (ﷺ)-এর স্ত্রীদের কোন দু'জন তার বিপক্ষে একমত হয়ে পরস্পর একে অন্যকে সহযোগিতা করেছিলেন? তিনি বললেন, তারা দু'জন হল হাফসাহ ও আয়িশাহ। ইবন আব্বাস বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করার জন্য এক বছর যাবৎ ইচ্ছে করেছিলাম। কিন্তু আপনার ভয়ে আমার পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তখন উমার বললেন, এ রকম করবে না। যে বিষয়ে তুমি মনে করবে যে, আমি তা জানি, তা আমাকে জিজ্ঞেস করবে। এ বিষয়ে আমার জানা থাকলে আমি তোমাকে জানিয়ে দেব। তিনি বলেন, এরপর উমার বললেন, আল্লাহর শপথ! জাহিলী যুগে মহিলাদের কোন অধিকার আছে বলে আমরা মনে করতাম না। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে যে বিধান অবতীর্ণ করার ছিল তা অবতীর্ণ করলেন এবং তাদের হক হিসাবে যা নির্দিষ্ট করার ছিল তা নির্দিষ্ট করলেন। তিনি বলেন, একদিন আমি কোন এক ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করছিলাম, এমন সময় আমার স্ত্রী আমাকে বললেন, কাজটি যদি তুমি এভাবে এভাবে করতে। আমি বললাম, তোমার কী প্রয়োজন? এবং আমার কাজে তোমার এ অনধিকার চর্চা কেন। সে আমাকে বলল, হে খাত্তাবের বেটা! কি আশ্চর্য, তুমি চাও না যে, আমি তোমার কথার উত্তর দান করি অথচ তোমার কন্যা হাফ্সাহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথার পৃষ্ঠে কথা বলে থাকে। এমনকি একদিন তো সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে রাগান্বিত করে ফেলে। এ কথা শুনে উমার দাড়িয়ে গেলেন এবং চাদরখানা নিয়ে তার বাড়িতে চলে গেলেন। তিনি তাকে বললেন, বেটী! তুমি নাকি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথার প্রতি-উত্তর করে থাক। ফলে তিনি দিনভর দুঃখিত থাকেন। হাফসাহ বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তো অবশ্যই তার কথার জবাব দিয়ে থাকি। উমার বলেন, আমি বললাম, জেনে রাখ! আমি তোমাকে আল্লাহর শাস্তি এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অসন্তুষ্টি সম্পর্কে সতর্ক করছি। রূপ-সৌন্দর্যের কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ভালবাসা যাকে গর্বিতা করে রেখেছে, সে যেন তোমাকে প্রতারিত না করতে পারে। এ কথা বলে উমার আয়িশাহ-কে বোঝাচ্ছিলেন। উমার বলেন, এরপর আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসলাম এবং উম্মু সালামাহ-এর ঘরে প্রবেশ করলাম ও এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করলাম। কারণ, তার সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তখন উম্মু সালামাহ বললেন, হে খাত্তাবের বেটা! কি আশ্চর্য, তুমি প্রত্যেক ব্যাপারেই নাক গলাচ্ছ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তার স্ত্রীদের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছ। আল্লাহর কসম! তিনি আমাকে এমন শক্তভাবে ধরলেন যে, আমার রাগ খতম হয়ে গেল। এরপর আমি তার নিকট হতে চলে আসলাম। আমার একজন আনসার বন্ধু ছিল। যদি আমি কোন মাজলিসে অনুপস্থিত থাকতাম তাহলে সে এসে মাজলিসের খবর আমাকে জানাত। আর সে যদি অনুপস্থিত থাকত তাহলে আমি এসে তাকে মাজলিসের খবর জানাতাম। সে সময় আমরা গাসসানী বাদশাহর আক্রমণের আশংকা করছিলাম। আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে, সে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য রওয়ানা হয়েছে। তাই আমাদের হৃদয়-মন এ ভয়ে শংকিত ছিল। এমন সময় আমার আনসার বন্ধু এসে দরজায় আঘাত করে বললেন, দরজা খুলুন, দরজা খুলুন। আমি বললাম, গাস্সানীরা চলে এসেছে নাকি? তিনি বললেন, বরং এর চেয়েও কঠিন ব্যাপার ঘটে গেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার সহধর্মিণীদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছেন। তখন আমি বললাম, হাফসাহ ও আয়িশাহর নাক ধূলায় ধূসরিত হোক। এরপর আমি কাপড় নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একটি উচু কক্ষে অবস্থান করছেন। সিড়ি বেয়ে সেখানে পৌছতে হয়। সিড়ির মুখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একজন কালো গোলাম বসা ছিল। আমি বললাম, বলুন, উমার ইবন খাত্তাব এসেছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে অনুমতি দিলেন, আমি তাকে সব কথা বললাম, আমি যখন উম্মু সালামাহর কপোপকথন পর্যন্ত পৌছলাম তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুচকি হাসলেন। এ সময় তিনি একটা চাটাইয়ের উপর শুয়ে ছিলেন। চাটাই এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাঝে আর কিছুই ছিল না। তার মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ এবং পায়ের কাছে ছিল সল্ম বৃক্ষের পাতার একটি স্তূপ ও মাথার উপর লটকানো ছিল চামড়ার একটি মশক। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর এক পার্শ্বে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললে তিনি বললেন, তুমি কেন কাঁদছ? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগ-বিলাসের মধ্যে ডুবে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তুমি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক, আর আমরা আখিরাত লাভ করি।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমার-কে জিজ্ঞেস করতে চাইলাম। আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণীদের কোন দু'জন তার ব্যাপারে একমত হয়ে পরস্পর একে অন্যকে সহযোগিতা করেছিলেন? আমি আমার কথা শেষ করার আগেই তিনি বললেন, আয়িশাহ এবং হাফসাহ।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে দু'জন মহিলা নবী (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে পরস্পর একে অন্যকে সাহায্য করেছিল, তাদের সম্পর্কে উমার-কে আমি জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে করছিলাম। কিন্তু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না পেয়ে আমি এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। শেষে একবার হজ্জ করার জন্য তার সঙ্গে আমি যাত্রা করলাম। আমরা 'যাহরান' নামক স্থানে পৌছলে উমার প্রাকৃতিক প্রয়োজনে গেলেন। এরপর আমাকে বললেন, আমার জন্য ওযুর পানির ব্যবস্থা কর। আমি পাত্র ভরে পানি নিয়ে আসলাম এবং ঢেলে দিতে লাগলাম। সুযোগ মনে করে আমি তাকে বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! ঐ দু'জন মহিলা কে কে, যারা একে অন্যকে সাহায্য করেছিল? ইবন আব্বাস বলেন, আমি আমার কথা শেষ করার আগেই তিনি বললেন, আয়িশাহও হাফ্সাহ।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেছেন, নবী (ﷺ)-কে সতর্কতা দানের জন্য তার সহধর্মিণীগণ একত্রিত হয়েছিলেন। আমি তাদেরকে বললাম, যদি নবী (ﷺ) তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন তবে তার প্রতিপালক সম্ভবত তাকে দেবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। তখন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। (66.5)
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি "কঠোর স্বভাব, তার উপরে আবার কুখ্যাত" আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এ লোকটি হলো কুরাইশ গোত্রের এমন এক লোক, যার স্কন্ধে ছাগলের চিহ্নের মত একটি বিশেষ চিহ্ন ছিল।
হারিস ইবন ওয়াহাব খুযাঈ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা দুর্বল এবং অসহায়; কিন্তু তারা যদি কোন ব্যাপারে আল্লাহর নামে কসম করে বসেন, তাহলে তা পূরণ করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের পরিচয় বলব না? তারা রূঢ় স্বভাব, অধিক মোটা এবং অহংকারী তারাই জাহান্নামী।
আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমাদের প্রতিপালক যখন তার পায়ের গোড়ালির জ্যোতি বিকীর্ণ করবেন, তখন ঈমানদার নারী ও পুরুষ সবাই তাকে সাজ্দাহ করবে। কিন্তু যারা দুনিয়াতে লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য সাজ্দাহ করত, তারা কেবল বাকী থাকবে। তারা সিজদা করতে ইচ্ছে করলে তাদের পিঠ একখন্ড কাঠের ন্যায় শক্ত হয়ে যাবে।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে প্রতিমার পূজা নূহ্-এর কওমের মাঝে চালু ছিল, পরবর্তী সময়ে আরবদের মাঝেও তার পূজা প্রচলিত হয়েছিল। ওয়াদ "দুমাতুল জান্দাল" নামক জায়গার কাল্ব গোত্রের একটি দেবমূর্তি, সূওয়া'আ, হল, হুযায়ল গোত্রের একটি দেবমূর্তি এবং ইয়াগুছ ছিল মুরাদ গোত্রের, অবশ্য পরবর্তীতে তা গাতীফ গোত্রের হয়ে যায়। এর আস্তানা ছিল কওমে সাবার নিকটবর্তী 'জাওফ' নামক স্থান। ইয়া'উক ছিল হামাদান গোত্রের দেবমূর্তি, নাসর ছিল যুলকালা' গোত্রের হিময়ার শাখার মূর্তি। নূহ-এর সম্প্রদায়ের কতিপয় নেক লোকের নাম নাসর ছিল। তারা মারা গেলে, শায়ত্বন তাদের কওমের লোকদের অন্তরে এ কথা ঢেলে দিল যে, তারা যেখানে বসে মাজলিস করত, সেখানে তোমরা কতিপয় মূর্তি স্থাপন কর এবং ঐ সমস্ত পুণ্যবান লোকের নামেই এগুলোর নামকরণ কর। কাজেই তারা তাই করল, কিন্তু তখনও ঐ সব মূর্তির পূজা করা হত না। তবে মূর্তি স্থাপনকারী লোকগুলো মারা গেলে এবং মূর্তিগুলোর ব্যাপারে সত্যিকারের জ্ঞান বিলুপ্ত হলে লোকজন তাদের পূজা আরম্ভ করে দেয়।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) একদল সাহাবীকে নিয়ে উকায বাজারের দিকে রওয়ানা হলেন। এ সময়ই জিনদের আসমানী খবরাদি শোনার ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে এবং ছুঁড়ে মারা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে লেলিহান অগ্নিশিখা। ফলে জিন শায়ত্বনরা ফিরে আসলে অন্য জিনরা তাদেরকে বলল, তোমাদের কী হয়েছে? তারা বলল, আসমানী খবরাদি সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে আমাদের উপর বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমাদের প্রতি লেলিহান অগ্নিশিখা ছুঁড়ে মারা হয়েছে। তখন শায়ত্বন বলল, আসমানী খবরাদি সংগ্রহের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি যে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, অবশ্যই তা কোন নতুন ঘটনা ঘটার কারণেই হয়েছে। সুতরাং তোমরা পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত সফর কর এবং দেখ ব্যাপারটা কী ঘটেছে? তাই আসমানী খবরাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে, এর কারণ খুজে বের করার জন্য তারা সকলেই পৃথিবীর পূর্ব এবং পশ্চিমে অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বলেন, যারা তিহামার উদ্দেশে বেরিয়েছিল, তারা 'নাখলা' নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে উপস্থিত হল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এখান থেকে উকায বাজারের দিকে যাওয়ার মনস্থ করেছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সাহাবীদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। জিনদের ঐ দলটি কুরআন মাজীদ শুনতে পেয়ে আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে তা শুনতে লাগল এবং বলল, আসমানী খবর আর তোমাদের মাঝে এটাই সত্যিকারে বাধা সৃষ্টি করেছে। এরপর তারা তাদের কওমের কাছে ফিরে এসে বলল, হে আমাদের কওম! আমরা এক আশ্চর্যজনক কুরআন শ্রবণ করেছি, যা সঠিক পথ নির্দেশ করে। এতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনও আমাদের প্রতিপালকের কোন শরীক স্থির করব না। এরপর আল্লাহ তার নবীর প্রতি অবতীর্ণ করলেনঃ বল, আমার প্রতি ওয়াহী প্রেরিত হয়েছে যে জিনদের একটি দল মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। (72.1) জিনদের উপরোক্ত কথা নবী (ﷺ)-কে ওয়াহীর মারফত জানিয়ে দেয়া হয়েছিল।
ইয়াহ্ইয়াহ ইবন কাসীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ সালামাহ ইবন আবদুর রহমান-কে কুরআন মাজীদের কোন আয়াতটি সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, "ওহে বস্ত্র আবৃত [ব্যক্তি]!" (74:1) প্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। আমি বললাম, লোকেরা তো বলে "পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।" (96:1) প্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। তখন আবূ সালামাহ বললেন, আমি এ বিষয়ে জাবির ইবন আবদুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম এবং তুমি যা বললে আমিও তাকে হুবহু তাই বলেছিলাম। জবাবে জাবির বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে যা বলেছিলেন, আমিও হুবহু তাই বলব। তিনি বলেছেন, আমি হেরা গুহায় ই'তিকাফ করতে লাগলাম। আমার ই'তিকাফ শেষ হলে আমি সেখান থেকে নামলাম। তখন আমাকে আওয়াজ দেয়া হল। আমি ডানে তাকালাম; কিন্তু কিছু দেখতে পেলাম না, বামে তাকালাম, কিন্তু এদিকেও কিছু দেখলাম না। এরপর সামনে তাকালাম, এদিকেও কিছু দেখলাম না। এরপর পেছনে তাকালাম, কিন্তু এদিওক আমি কিছু দেখলাম না। শেষে আমি উপরের দিকে তাকালাম, এবার একটা বস্তু দেখতে পেলাম। এরপর আমি খাদীজা-এর কাছে এলাম এবং তাকে বললাম, আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত কর এবং আমার শরীরে ঠান্ডা পানি ঢাল। তিনি বলেন, তারপর তারা আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করে এবং ঠান্ডা পানি ঢালে। নবী (ﷺ) বলেন, এরপর অবতীর্ণ হলঃ 'হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি হেরা গুহায় ইতিকাফ করেছিলাম।
ইয়াহইয়া বর্ণনা করেছেন: আমি আবা সালামাকে জিজ্ঞাসা করলাম, "কোরআনের কোন সূরা সর্বপ্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল?" তিনি উত্তর দিলেন, "হে তুমি, মোড়ানো '(আল-মুদ্দাছসির)।" আমি বললাম, আমাকে জানানো হয়েছে যে, 'পড়ুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন ..(আল-আলাক)।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) থেকে শুনেছি। তিনি ওয়াহী বন্ধ থাকার সময়কাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তিনি তার আলোচনার মাঝে বললেন, একদা আমি চলছিলাম, এমন সময় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। মাথা উঠাতেই আমি দেখলাম, যে ফেরেশতা হেরা গুহায় আমার কাছে এসেছিল সে আসমান-যমীনের মাঝে একটি কুসরীতে বসা আছে। আমি তার ভয়ে ভীত হয়ে পড়লাম। এরপর আমি বাড়িতে ফিরে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর; আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা আমাকে বস্ত্রাবৃত করল। তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, "হে বস্ত্রাবৃত! উঠ.....অপবিত্রতা হতে দূরে থাক।" এ আয়াতগুলো সালাত ফরয হওয়ার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। রুজ মানে মূর্তি।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি রাসূল(ﷺ)-কে ওয়াহী বন্ধ হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, একদা আমি পথ চলছিলাম, এমন সময় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। এরপর আমি আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখলাম, যে ফেরেশতা হেরা গুহায় আমার কাছে আসত, সে আসমান-যমীনের মাঝে একটি কুরসীতে উপবিষ্ট আছে। তাকে দেখে আমি ভীষণ ভয় পেলাম। এমনকি যমীনে পড়ে গেলাম। তারপর আমি আমার স্ত্রীর কাছে গেলাম এবং বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা আমাকে বস্ত্রাবৃত করল। এরপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেনঃ "হে বস্ত্রাবৃত!.....অপবিত্রতা হতে দূরে থাক।" আবূ সালামাহ বলেন, রুজ মানে মূর্তিসমূহ। এরপর অধিক হারে ওয়াহী অবতীর্ণ হতে লাগল এবং লাগাতার ওয়াহী আসতে থাকল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর প্রতি যখন ওয়াহী অবতীর্ণ করা হত, তখন তিনি দ্রুত তার জিহ্বা নাড়তেন। রাবী সুফ্ইয়ান বলেন, এভাবে করার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল ওয়াহী মুখস্থ করা। তারপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেনঃ তাড়াতাড়ি ওয়াহী আয়ত্ত করার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা সঞ্চালন করবে না।
মূসা ইবন আবূ আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি "আপনার জিহ্বা নাড়াচাড়া করবেন না" আল্লাহর এই বাণী সম্পর্কে সাঈদ ইবন যুবায়র-কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন, ইবন আব্বাস বলেছেন, নবী (ﷺ)-এর প্রতি যখন ওয়াহী অবতীর্ণ করা হত, তখন তিনি তার ঠোঁট দু'টো দ্রুত নাড়তেন। তখন তাকে বলা হল, তাড়াতাড়ি ওয়াহী আয়ত্ত করার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা নাড়বে না। নবী (ﷺ) ওয়াহী ভুলে যাবার আশংকায় এমন করতেন। নিশ্চই এ কুরআন সংরক্ষণ ও পাঠ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমারই। আমি নিজেই তাকে তোমার স্মৃতিতে সংরক্ষণ করব। তাই আমি যখন তা পাঠ করব যখন তোমার প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হতে থাকবে, তখন তুমি তার অনুসরণ করবে। এরপর তা বর্ণনা করার দাযিত্ব আমারই এ কুরআনকে তোমার মুখ দিয়ে বর্ণনা করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমার।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: (সম্পর্কে) আল্লাহর বাণী: "(কুরআনের) ব্যাপারে তোমার জিহ্বাকে তাড়াহুড়ো করার জন্য নাড়াও না।" (75.16) যখন জিব্রাইল আল্লাহর রসূল (ﷺ) এর মধ্যে ঐশ্বরিক ওহী নাযিল করলেন, তখন তিনি (আল্লাহর রসূল (ﷺ)) তার জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়ালেন, এবং সেই অবস্থা তার জন্য খুবই কঠিন ছিল এবং সেই আন্দোলন ইঙ্গিত করত যে ওহী সংঘটিত হচ্ছে। . তাই আল্লাহ তায়ালা সূরা আল কিয়ামাতে নাযিল করেন যার শুরু: 'আমি কিয়ামতের দিনের শপথ করছি...' (75) আয়াত:- 'তাড়াতাড়ি করার জন্য (কোরআন) সম্পর্কে আপনার জিহ্বাকে নড়বেন না। এটি (কোরআন) আপনার মনের মধ্যে সংগ্রহ করা এবং আপনাকে এটি হৃদয় দিয়ে তেলাওয়াত করার ক্ষমতা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। (75.16-17) ইবনে আব্বাস যোগ করেছেন: এটা (কোরআন) (আপনার মনে) সংগ্রহ করা এবং আপনাকে এটি হৃদয় দিয়ে তেলাওয়াত করার ক্ষমতা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব, "যখন আমরা এটি প্রকাশ করি, তখন শুনুন। এটা ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্য," মানে, 'আপনার জিহ্বার মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করা আমাদের জন্য।' তাই যখনই জিবরাঈল আল্লাহর রসূল (ﷺ)-এর কাছে আসতেন তিনি চুপ থাকতেন (এবং শুনতেন) এবং ফেরেশতা চলে গেলে রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সেই অহী পাঠ করতেন, যেমনটি আল্লাহর ওয়াদা ছিল।
আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় তার প্রতি অবতীর্ণ হল সূরাহ মুরসালাত। আমরা তার মুখে শুনে সেটি শিখছিলাম। তখন একটি সাপ বেরিয়ে এল। আমরা ওদিকে দৌড়ে গেলাম, কিন্তু সাপটি আমাদের থেকে দ্রুত চলে গিয়ে গর্তে ঢুকে পড়ল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ওটাও তোমাদের অনিষ্ট হতে বেচে গেল, তোমরা যেন ওটার অনিষ্ট হতে রক্ষা পেলে।
আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত যে, এক গুহার মধ্যে আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় তার প্রতি অবতীর্ণ হল সূরাহ ওয়াল মুরসালাত। আমরা তার মুখ থেকে সেটা গ্রহণ করছিলাম। এ সুরার তিলাওয়াতে তখনও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখ সিক্ত ছিঁল, হঠাৎ একটি সাপ বেরিয়ে এল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, "তোমরা ওটাকে মেরে ফেল।" আবদুল্লাহ বলেন, আমরা সেদিকে দৌড়ে গেলাম, কিন্তু সাপটি আমাদের আগে চলে গেল। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ওটা তোমাদের অনিষ্ট হতে বেচে গেল যেমনি তোমরা এর অনিষ্ট হতে বেচে গেলে।
আবদুর রহমান ইবন আবিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঐ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস-কে বলতে শুনেছি যে, আমরা তিন গজ বা এর চেয়ে ছোট কাঠের খন্ড জোগাড় করে শীতকালের জন্য উঠিয়ে রাখতাম। এটাকেই আমরা বলতাম কসর।
আবদুর রহমান ইবন আবিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এ আয়াত সম্পর্কে ইবন আব্বাস-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমরা তিন গজ বা তার চেয়ে অধিক লম্বা কাষ্ঠ জড়ো করে শীতকালের জন্য উঠিয়ে রাখতাম। এটাকেই আমরা বলতাম জাহাজের রশি, যা জমা করে রাখা হত। এমনকি তা মাঝারি গড়নের মানুষের সমান উচু হয়ে যেত।
আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক গুহায় আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। এমন সময় তার প্রতি অবতীর্ণ হল 'সূরাহ ওয়াল মুরসালাত'। তিনি তা তিলাওয়াত করছিলেন, আর আমি তার মুখ থেকে তা শিখছিলাম। তিলাওয়াতে তখনো তার মুখ সিক্ত ছিল। হঠাৎ আমাদের সামনে একটি সাপ বেরিয়ে এলো। নবী (ﷺ) বললেন, ওটাকে মেরে ফেল। আমরা ওদিকে দৌড়িয়ে গেলাম। কিন্তু সাপটি চলে গেল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, ওটা তোমাদের অনিষ্ট থেকে বেচে গেল তোমরা যেমন তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেলে। উমার ইবন হাফস্ বলেন, এ হাদীসটি আমি আমার পিতার নিকট হতে শুনে মুখস্থ করেছি। গুহাটি মিনায় অবস্থিত বলে উল্লেখ আছে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, প্রথম ও দ্বিতীয়বার শিঙ্গায় ফুৎকারের মধ্যে চল্লিশের ব্যবধান হবে। [আবূ হুরাইরাহ]-এর জনৈক ছাত্র বললেন, চল্লিশ বলে-চল্লিশ দিন বোঝানো হয়েছে কি? তিনি বলেন, আমি অস্বীকার করলাম। তারপর পুনরায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, চল্লিশ বলে চল্লিশ মাস বোঝানো হয়েছে কি? তিনি বলেন, এবারও অস্বীকার করলাম। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, চল্লিশ বছর বোঝানো হয়েছে কি? তিনি বলেন, এবারও আমি অস্বীকার করলাম। এরপর আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করবেন। এতে মৃতরা জীবিত হয়ে উঠবে, যেমন বৃষ্টির পানিতে উদ্ভিদরাজি উৎপন্ন হয়ে থাকে। তখন শিরদাড়ার হাড় ছাড়া মানুষের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পচে গলে শেষ হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন ঐ হাড়খন্ড থেকেই আবার মানুষকে সৃষ্টি করা হবে।
সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দেখেছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার মধ্যমা ও বুড়ো আঙ্গুলের নিকটবর্তী অঙ্গুলিদ্বয় এভাবে একত্র করে বললেন, কিয়ামাত (কিয়ামত) ও আমাকে এমনিভাবে পাঠানো হয়েছে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন, কুরআনের হাফিয পাঠক লিপিকর সম্মানিত ফেরেশতাের মত। খুব কষ্টদায়ক হওয়া সত্ত্বেও যে বারবার কুরআন মাজীদ পাঠ করে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) "যেদিন সব মানুষ জগতসমূহের প্রতিপালকের সামনে দাড়াবে" (মুতাফ্ফিফীন ৮৩/৬)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির কানের লতা পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তিরই হিসাব নেয়া হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন। আল্লাহ কি বলেননি, "যার আমলনামা তার ডান হস্তে দেয়া হবে, তার হিসাব নিকাশ সহজেই নেয়া হবে।" (84.7-8) এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এ আয়াতে আমলনামা কীভাবে দেয়া হবে সে ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুবা যার খুটিনাটি হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: (আয়াতের ব্যাপারে): -'আপনি অবশ্যই পর্যায় থেকে পর্যায় ভ্রমণ করবেন (ইহজীবন ও পরকালে)।' (এর অর্থ) এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। এটি আপনার নবীর সাথে সম্পর্কিত।
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের মধ্যে সর্ব প্রথম হিজরাত করে আমাদের কাছে এসেছিলেন, তারা হলেন মুস'আব ইবন উমায়র ও ইবন উম্মু মাকতূম। তারা দু'জন এসেই আমাদেরকে কুরআন পড়াতে শুরু করেন। এরপর এলেন, আম্মার, বিলাল ও সাদ। অতঃপর আসলেন বিশজন সাহাবীসহ উমার ইবন খাত্তাব। অতঃপর এলেন নবী (ﷺ)। বারাআ বলেন, নবী (ﷺ)-এর আগমনে মদিনা্বাসীকে এত অধিক খুশী হতে দেখেছি যে, অন্য কোন বিষয়ে তাদেরকে ততটা খুশী হতে আর কখনো দেখিনি। এমনকি আমি দেখেছি, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত বলছিল যে, ইনিই তো আল্লাহর সেই রাসূল, যিনি আগমন করেছেন। বারাআ ইবন আযিব বলেন, নবী (ﷺ) মদিনায় আসার আগেই আমি "তোমার মহান প্রতিপালকের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর" (87:1) এবং ও রকম আরো কিছু সূরাহ শিখে নিয়েছিলাম।
আবদুল্লাহ ইবন যাম'আহ হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-কে খুতবাহ দিতে শুনেছেন, খুতবায় তিনি কওমে সামূদের প্রতি প্রেরিত উষ্ট্রী ও তার পা কাটার কথা উল্লেখ করলেন। তারপর রাসূল "যখন তাদের সবচেয়ে হতভাগা লোকটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল" (91.12.)-এর ব্যাখ্যায় বললেন, ঐ উষ্ট্রীটিকে হত্যা করার জন্য এক হতভাগ্য শক্তিশালী ব্যক্তি তৎপর হয়ে উঠ যে সে সমাজের মধ্যে আবূ যাম'আর মত প্রভাবশালী ও অত্যন্ত শক্তিধর ছিল। এ খুতবায় তিনি মেয়েদের সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যে তার স্ত্রককে ক্রীতদাসের মত মারপিট করে; কিন্তু ঐ দিনের শেষেই সে আবার তার সঙ্গে এক বিছানায় মিলিত হয়। তারপর তিনি বায়ু নিঃসরণের পর হাসি দেয়া সম্পর্কে বললেন, তোমাদের কেউ কেউ হাসে সে কাজটির জন্য যে কাজটি সে নিজেও করে।
আলক্বামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ-এর একদল সাথীর সঙ্গে সিরিয়া গেলাম। আবূদ্ দারদা আমাদের কাছে এসে বললেন, কুরআন পাঠ করতে পারেন, এমন কেউ আছেন কি? আমরা বললাম, হা, আছে। এরপর তিনি বললেন, তাহলে আপনাদের মাঝে উত্তম কারী কে? লোকেরা ইশারা করে আমাকে দেখিয়ে দিলে তিনি আমাকে বললেন, পড়ুন, আমি পড়লাম "শপথ রাতের যখন তা [আলোকে] ঢেকে দেয়। শপথ দিনের যখন তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আর শপথ তার যিনি সৃষ্টি করেছেন পুরুষ ও নারী।" (92.1-3) তিলাওয়াত শুনে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এ সূরাহ আপনার উস্তাদ আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের মুখে শুনেছেন? আমি বললাম, হ্যা। তখন তিনি বললেন, আমি এ সূরাটি নবী (ﷺ)-এর মুখে শুনেছি। কিন্তু তারা (সিরিয়াবাসী) তা অস্বীকার করছে।
ইব্রাহিম থেকে বর্ণিত: আবদুল্লাহ (ইবনে মাসউদ) এর সাহাবীরা আবু দারদা'র কাছে এসেছিলেন, (এবং তারা তার বাড়িতে পৌছানোর আগে) তিনি তাদের খুজলেন এবং তাদের খুজে পেলেন। অতঃপর তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে (কোরআন) আবৃত্তি করতে পারে যেভাবে আবদুল্লাহ পাঠ করেন?" তারা উত্তর দিল, "আমরা সবাই।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমাদের মধ্যে কে তা হৃদয় দিয়ে জানে?" তারা ইশারা করল ' আলকামা। তারপর তিনি আলকামাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি কীভাবে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে সূরা আল-লাইল (রাত্রি) পড়তে শুনেছেন?" আলকামা পাঠ করলেন: 'পুরুষ ও মহিলার কসম।' আবু আদ-দারদা বলেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমি আমাকে নবীকে একইভাবে পাঠ করতে শুনেছি, কিন্তু এই লোকেরা চায় যে আমি এটি পাঠ করি: - 'এবং তার কসম যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন।' কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি তাদের অনুসরণ করব না।
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাকীউল গারকাদ নামক স্থানে এক জানাযায় আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলাম। সে সময় তিনি বলেছিলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার স্থান জান্নাত বা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়নি। এ কথা শুনে সকলেই বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে কি আমরা ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকব? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা আমল করতে থাক। কারণ, যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে আমল সহজ করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি পাঠ কররেন, সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে, আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ এবং কেউ কার্পণ্য করলেও নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, যার যা উত্তম তা ত্যাগ করলে, তার জন্য আমি সহজ করে দেব কঠোর পরিণামের পথ।
আলী হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি কোন একটি জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর তিনি একটি কাঠি হাতে নিয়ে এর দ্বারা মাটি খোচাতে খোচাতে বললেন, তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, যার স্থান জান্নাতে বা জাহান্নামে নির্দিষ্ট হয়নি। এ কথা শুনে সকলেই বললেন, তাহলে কি আমরা ভাগ্যের উপর ভরসা করে বসে থাকব? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা আমল করতে থাক। কারণ, যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে আমলকে সহজ করে দেয়া হবে। এরপর তিনি পাঠ করলেন, সুতরাং কেউ দান করলে, মুতআকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে, আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজপথ। আর কেউ কার্পণ্য কররে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে ও যার যা উত্তম তা ত্যাগ করলে তার জন্য আমি সুগম করে দেব কঠোর পরিণামের পথ। (92.5-10)
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম। এ সময় তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার স্থান জান্নাতে বা জাহান্নামে নির্দিষ্ট হয়নি। এ কথা শুনে আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে কি আমরা ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকব? তিনি বললেন, না তোমরা আমল করতে থাক। কারণ, যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তার জন্য সে আমলকে সহজ করে দেয়া হবে। এরপর তিনি পাঠ করলেন, কাজেই কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ এবং কেউ কার্পণ্য করলে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, আর যা উত্তম তা ত্যাগ করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দেব কঠোর পরিণামের পথ। (92.5-10)
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বাকীউল গারকাদ নামক স্থানে একটি জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের কাছে এসে বসলেন। আমরাও তার চারপাশে গিয়ে বসলাম। এ সয় তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। তিনি তার মাতাখানা নামিয়ে, এর দ্বারা মাটি খুড়তে শুরু করলেন। এরপর বললেন, তোমাদের কেউ এমন নেই অথবা বললেন, কোন সৃষ্টি এমন নেই) জান্নাতে বা জাহান্নামে যার স্থান নির্দিষ্ট হয়নি। কিংবা তাকে ভাগ্যবান বা হতভাগা লেখা হয়নি। এ কথা শুনে এক সাহাবী বললেন, আমরা তাহলে আমল ত্যাগ করে আমাদের লিখিত ভাগ্যের উপর কি নির্ভয় করে বসব? আমাদের মধ্যে যে সৌভাগ্যবান, সে তো সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের মাঝেই শামিল হয়ে যাবে, আর আমাদের মাঝে যে হতভাগ্য, সে তো হতভাগা লোকদের আমলের দিকেই এগিয়ে যাবে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সৌভাগ্যের অধিকারী লোকদের জন্য সৌভাগ্য লাভ করার মত আমল সহজ করে দেয়া হবে। আর দুর্ভাগ্যের অধিকারী লোকদের জন্য দুর্ভাগ্য লাভ করার মত আমল সহজ করে দেয়া হবে। এরপর তিনি পাঠ করলেন, "সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে।" (92.5-10)
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক জানাযাহ্য় নবী (ﷺ) উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি কিছু একটা হাতে নিয়ে তা দিয়ে মাটি খুড়তে খুড়তে বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার স্থান হয় জান্নাতে বা জাহান্নামে নির্দিষ্ট করে রাখা হয়নি। এ কথা শুনে সবাই বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তাহলে আমল বাদ দিয়ে আমাদের লিখিত ভাগ্যের উপর কি ভরসা করব? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা আমল করতে থাক, কারণ, যাকে যে আমলের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে আমলকে সহজ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি সৌভাগ্যের অধিকারী হবে, তার জন্য সৌভাগ্যের অধিকারী লোকদের আমলকে সহজ করে দেয়া হবে। আর যে দুর্ভাগ্যের অধিকারী হবে, তার জন্য দুর্ভাগা লোকদের আমলকে সহজ করে দেয়া হবে। এরপর তিনি পাঠ করলেন, সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ করলে, আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ। এবং কেউ কার্পণ্য করলে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে, আর যা উত্তম তা ত্যাগ করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দেব কঠোর পরিণামের পথ)।
জুনদুব ইবন সুফ্ইয়ান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অসুস্থতার কারণে রাসূল (ﷺ) দুই বা তিন রাত তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারেননি। এ সময় এক মহিলা এসে বলল, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! আমার মনে হয়, তোমার শায়ত্বন তোমাকে ত্যাগ করেছে। দুই কিংবা তিনদিন যাবৎ তাকে আমি তোমার কাছে আসতে দেখতে পাচ্ছি না। তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, শপথ পূর্বাহ্নের, "শপথ রাতের যখন তা হয় নিঝুম, তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি"- (ওয়াদ্ দুহা ৯৩/৩)।
জুনদুব বাজালী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা এসে বলল, আমি দেখছি, আপনার সঙ্গী আপনার কাছে ওয়াহী নিয়ে আসতে দেরী করে ফেলছে। তখনই অবতীর্ণ হলঃ তোমার প্রতিপালক তোমাকে ত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি মনোক্ষুণ্ণও হননি। (93.1-3)
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সফরে থাকাকালীন 'ইশার সালাতের দুই রাকআতের কোন এক রাকআতে 'সূরাহ তীন' পাঠ করেছেন।
নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঘুমের অবস্থায় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে নবী (ﷺ)-এর প্রতি ওয়াহী শুরু করা হয়েছিল। ঐ সময় তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন, তা সকালের আলোর মতই সুস্পষ্ট হত। এরপর নির্জনতা তার কাছে প্রিয় হয়ে উঠল। তিনি হেরা গুহায় চলে যেতেন এবং পরিবার-পরিজনের কাছে আসার পূর্বে সেখানে লাগাতার কয়েকদিন পর্যন্ত তাহানন্নুছ করতেন। তাহান্নুছ মানে বিশেষ পদ্ধতিতে ইবাদাত করা। এ জন্য তিনি কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। এরপর তিনি খাদীজাহ-এর কাছে ফিরে এসে আবার ওরকম কিছু কিছু খাবার নিয়ে যেতেন। শেষে হেরা গুহায় থাকা অবস্থায় হঠাৎ তার কাছে সত্যবাণী এসে পৌছল। ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, পড়ুন। রাসূল (ﷺ) বললেন, আমি পড়তে পারি না। রাসূল (ﷺ) বলেন, এরপর তিনি আমাকে ধরে খুব জোরে আলিঙ্গণ করলেন। এতে আমি প্রাণান্তকর কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি তো পড়তে পারি না। রাসূল (ﷺ) বলেন, এরপর তিনি আমাকে ধরে দ্বিতীয়বার খুব জোরে আলিঙ্গণ করলেন। এতেও আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি পড়তে পারি না। এরপর তিনি আমাকে ধরে তৃতীয়বার খুব জোরে আলিঙ্গণ করলেন। এবারও আমি খুব কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পাঠ কর তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক হতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে যা সে জানত না। এরপর রাসূল (ﷺ) এ আয়াতগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। এ সময় তার কাঁধের গোশত ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। খাদীজার কাছে পৌছেই তিনি বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তখন সকলেই তাকে বস্ত্রাবৃত করে দিল। অবশেষে তার ভীতিভাব দূর হলে তিনি খাদীজাকে বললেন, খাদীজা আমার কী হল? আমি আমার নিজের সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। এরপর তিনি তাকে সব কথা খুলে বললেন। এ কথা শুনে খাদীজাহ বললেন, কখনো নয়। আপনি সুসংবাদ নিন। আল্লাহর শপথ, আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়দের খোজ-খবর নেন, সত্য কথা বলেন, সহায়হীন লোকদের বোঝা লাঘব করে দেন, নিঃস্ব লোকদেরকে উপার্জন করে দেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং হকের পথে আসা বিপদাপদে পতিত লোকদেরকে সাহায্য করে থাকে। তারপর খাদীজাহ তাকে নিয়ে তার চাচাত ভাআরাকা ইবন নাওফালের কাছে গেলেন। তিনি জাহিলী যুগে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরবী ভাষায় কিতাব লিখতেন। আর তিনি আল্লাহর ইচ্ছা মাফিক আরবী ভাষায় ইঞ্জিল কিতাব অনুবাদ করে লিখতেন। তিনি খুব বৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজাহ তাকে বললেন, হে আমার চাচাত ভাই। আপনার ভাতিজা কী বলেন একটু শুনুন। তখন ওয়ারাকা বললেন, ভাতিজা, কী হয়েছে তোমার? নবী (ﷺ) যা দেখেছিলেন, সব কিছুর ব্যাপারে তাকে জানালেন। সব কথা শুনে ওয়ারাকা বললেন, ইনিই সেই ফেরেশতা, যাকে মূসার কাছে পাঠানো হয়েছিল। আহ! সে সময় আমি যদি যুবক হতাম। আহ্! সে সময় আমি যদি জীবিত থাকতাম। তারপর তিনি একটি গুরুতর বিষয় উল্লেখ করলে রাসূল (ﷺ) বললেন, সত্যিই তারা কি আমাকে বের করে দেবে? ওয়ারাকা বললেন, হ্যা, তারা তোমাকে বের করে দেবে। তুমি যে দাওয়াত নিয়ে এসেছ, এ দাওয়াত যে-ই নিয়ে এসেছে তাকেই কষ্ট দেয়া হয়েছে। তোমার নবুয়তকালে আমি জীবিত থাকলে অবশ্যই আমি তোমাকে প্রবল ও সর্বতোভাবে সাহায্য করতাম। এরপর ওয়ারাকা অধিক দিন বাচেননি; বরং অল্পদিনের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। দীর্ঘ সময়ের জন্য ওয়াহী বন্ধ হয়ে গেল। এতে রাসূল (ﷺ) খুবই চিন্তাযুক্ত হয়ে পড়লেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (ﷺ) ওয়াহী বন্ধ হওয়া প্রসঙ্গে বলেছেন, এক সময় আমি পথ চলছিলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলাম। আমি মাথা তুলে তাকালাম। দেখলাম, যে ফেরেশতা আমার কাছে হেরা গুহায় আসতেন, তিনিই আসমান ও যমীনের মাঝে বিদ্যমান কুরসীতে বসে আছেন। এতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাই বাড়িতে ফিরে বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। সুতরাং সকলেই আমাকে বস্ত্রাবৃত করল। তখন আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন, "হে বস্ত্রাবৃত রাসূল! উঠুন, সতর্ক করুন, আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন, এবং স্বীয় পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র রাখুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন"- ( আল-মুদ্দাস্সির ৭৪/১-৫)। আবূ সালামাহ বলেন, আরবরা জাহিলী যুগে যে সব মূর্তির পূজা করত বলে ঐ সব মূর্তিকেই বোঝানো হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর থেকে ওয়াহীর ধারা চলতে থাকে।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রথমত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ওয়াহী আরম্ভ হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। এরপর তার কাছে ফেরেশতা এসে বললেন, পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিন্ড থেকে। পাঠ করুন, আর আপনার রব অতিশয় দয়ালু"- (আলাক ৯৬/১-৫)।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে ওয়াহীর শুরু হয়। এরপর তার কাছে ফেরেশতা এসে বললেন, "পাঠ কর, তোমার প্রতিপালকের নামে , যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক হতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালকমহা মহিমান্বিত"- (আলাক ৯৬/১-৫)।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এরপর রাসূল (ﷺ) খাদীজা-এর কাছে ফিরে এসে বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। এরপর রাবী সম্পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করলেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ জাহ্ল বলেছিল, আমি যদি মুহাম্মাদকে কাবার পাশে সালাত আদায় করতে দেখি তাহলে অবশ্যই আমি তার ঘাড় পদদলিত করব। এ খবর নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছার পর তিনি বললেন, সে যদি তা করে তাহলে অবশ্যই ফেরেশতা তাকে পাকড়াও করবে।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) উবাই ইবন কা'ব বলেছিলেন, তোমাকে "কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফির ছিল তারা আর মুশরিকরা [তাদের ভ্রান্ত মত ও পথ হতে] সরে আসত না যতক্ষণ না তাদের কাছে আসত সুস্পষ্ট প্রমাণ" (আল-বায়্যিনাহ) পড়ে শোনানোর জন্য আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন। উবাই ইবন কা'ব বললেন, আল্লাহ তাআলা কি আমার নাম উল্লেখ করে বলেছেন? তিনি বললেন, হ্যা; এ কথা শুনে উবাই ইবন কা'ব কাঁদতে লাগলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) উবাই ইবন কা'ব-কে বলেছিলেন, তোমাকে কুরআন পড়ে শোনানোর জন্য আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন। উবাই ইবন কা'ব বললেন, আল্লাহ তাআলা কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যা, আল্লাহ তাআলা তোমার নাম উল্লেখ করেছেন। এ কথা শুনে উবাই ইবন কা'ব কাঁদতে বললেন, হ্যা, আল্লাহ তাআলা তোমার নাম উল্লেখ করেছেন। এ কথা শুনে উবাই ইবন কা'ব কাঁদতে শুরু করলেন। ক্বাতাদাহ বলেন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, নবী (ﷺ) তাকে "কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফির ছিল তারা আর মুশরিকরা" (92) পাঠ করে শুনিয়েছিলেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) উবাই ইবন কা'ব-কে বলেছিলেন, তোমাকে কুরআন পাঠ করে শোনানোর জন্য আল্লাহ তাআলা আমাকে আদেশ করেছেন। এ কথা শুনে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন? তিনি বললেন,হ্যা। তখন উবাই ইবন কা'ব বিস্মিত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন, বিশ্বজাহাজেন প্রতিপালকের কাছে কি আমার ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে? উত্তরে নবী (ﷺ) বললেন, হ্যা। এ কথা শুনে তা দু'চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তিন শ্রেণীর মানুষের ঘোড়া থাকে। এক শ্রেণীর মানুষের জন্য তা সওয়াব ও পুরস্কারের কারণ হয়, এক শ্রেণীর মানুষের জন্য তা (গুনাহ থেকে) আবরণস্বরূপ এবং এক শ্রেণীর মানুষের প্রতি তা হয় গুনাহর কারণ। যার জন্য তা সওয়াবের কারণ হয়, তারা সেসব লোক, যারা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য তা প্রস্তুত করে রাখে এবং কোন চারণ ক্ষেত্রে বা বাগানে লম্বা দড়ি দিয়ে তাকে বেধে রাখে। দড়ির আওতায় চারণ ক্ষেত্রে বা বাগানে সে যা কিছু খায় তা ঐ ব্যক্তির জন্য নেকী হিসাবে গণ্য হয়। যদি ঘোড়াটি দড়ি ছিঁড়ে ফেলে এবং নিজ স্থান পার হয়ে এক/দু' উচু স্থানে চলে যায়, তাহলে তার পদচিহ্ন ও গোবরের বিনিময়েও ঐ ব্যক্তি সওয়াব লাভ করবে। আর ঘোড়াটি যদি কোন নহরের কিনারায় গিয়ে নিজে নিজেই পানি পান করে নেয়-মালিকের সেখান থেকে পানি পান করানোর ইচ্ছা না থাকলেও সে ব্যক্তি এর বিনিময়ে সওয়াবের অধিকারী হবে। এ ঘোড়া এ ব্যক্তির জন্য হল সওয়াবের কারণ; আরেক শ্রেণীর লোক যাদের জন্য এ ঘোড়া (গুনাহ হতে) আড়াল, তারা ঐ ব্যক্তি যারা মানুষের থেকে মুখাপেক্ষী না থাকার জন্য এবং মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে বেচে থাকার জন্য তা পালন করে থাকে। কিন্তু তাতে আল্লাহর যে হক রয়েছেতা দিয়ে ভুলে যায় না। এ শ্রেণীর মানুষের জন্য এ ঘোড়া হচ্ছে পর্দা। আরেক শ্রেণীর ঘোড়ার মালিক যারা গর্ব দেখানোর মনোভাব ও দুশমনির উদ্দেশে ঘোড়া রাখে। এ ঘোড়া হচ্ছে গুনাহর কারণ। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, একক ও ব্যাপক অর্থবোধক এ একটি মাত্র আয়াত ব্যতীত এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি আর কোন আয়াত অবতীর্ণ করেননি। আয়াতটি এইঃ "কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে এবং অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তাও দেখবে"- (যিলযাল ৯৯/৭-৮)।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, এ বিষয়ে একক ও ব্যাপক অর্থবোধক এই আয়াতটি ছাড়া আমার প্রতি আর কোন আয়াতই অবতীর্ণ করা হয়নি। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ "কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তাও দেখবে"- (যিলযাল ৯৯/৭-৮)।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আকাশের দিকে নবী (ﷺ)-এর মিরাজ হলে তিনি বলেন, আমি একটি নহরের ধারে পৌছলাম, যার উভয় তীরে ফাঁপা মোতির তৈরি গম্বুজসমূহ রয়েছে। আমি বললাম, হে জিব্রীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই (হাওযে) কাউছার।
আবূ উবাইদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-কে আল্লাহ তাআলার বাণী "আমি তোমাকে [মুহাম্মদ] কাওসার দান করেছি" (108) -এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, কাউছার একটি নহর যা তোমার নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে প্রদান করা হয়েছে। এর দু'টো পাড় রয়েছে। উভয় পাড়ে বিছানো আছে ফাঁপা মোতি। এর পাত্রের সংখ্যা তারকারাজির মত।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি কাউসার সম্পর্কে বলেছেন যে, এটা এমন একটি কল্যাণ যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন। বর্ণনাকারী আবূ বিশর বলেন, আমি সাঈদ ইবন যুবায়র-কে বললাম, লোকেরা ধারণা করে যে, কাউসার হল জান্নাতের একটি নহর। এ কথা শুনে সাঈদ বললেন, জান্নাতের নহরটি নবী (ﷺ)-কে দেয়া কল্যাণের একটি।
আয়েশা থেকে বর্ণিত: "যখন "সূরা-আন-নাসর", 'আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসে', তখন নবী (ﷺ)-এর প্রতি অবতীর্ণ হলে তিনি সেখানে বলেন, "সুবহাঙ্কা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা; আল্লাহুম্মা ইগফিরলি (আমি আমাদের প্রভুর অনন্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি, এবং সমস্ত প্রশংসা তার জন্য: হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন!)
আয়েশা থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রসূল (ﷺ) প্রায়ই রুকু ও সিজদায় (নামাযের সময়) বলতেন, সুবহাঙ্কা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা; আল্লাহুম্মা ইগফিরলি," কোরআনের আদেশ অনুসারে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: 'উমর আল্লাহর বাণী সম্পর্কে লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন: 'কখন আল্লাহর সাহায্য (আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে হে মুহাম্মদ) এবং মক্কা বিজয় আসবে।' (110.1) তারা উত্তর দিল, "এটি (মুসলিমদের) ভবিষ্যত শহর ও প্রাসাদ জয়ের ইঙ্গিত দেয়।" উমর বললেন, হে ইবন আব্বাস, এ বিষয়ে তুমি কি বল? আমি উত্তর দিলাম, "(এই সূরাটি) মুহাম্মাদের জীবনের অবসানের ইঙ্গিত দেয়। এর মাধ্যমে তিনি তার মৃত্যুর সন্নিকট সম্পর্কে অবহিত হন।"
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বদর যুদ্ধে যোগদানকারী প্রবীণ সাহাবীদের সঙ্গে আমাকেও শামিল করতেন। এ কারণে কারো কারো মনে প্রশ্ন দেখা দিল। একজন বললেন, আপনি তাকে আমাদের সঙ্গে কেন শামিল করছেন। আমাদের তো তার মত সন্তানই রয়েছে। উমার বললেন, এর কারণ তো আপনারাও অবগত আছেন। সুতরাং একদিন তিনি তাকে ডাকলেন এবং তাদের সঙ্গে বসালেন। ইবন আব্বাস বলেন, আমি বুঝতে পারলাম, আজকে তিনি আমাকে ডেকেছেন এজন্য যে, তিনি আমার প্রজ্ঞা তাদেরকে দেখাবেন। তিনি তাদেরকে বললেনঃ- আল্লাহর বাণীঃ "যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও [ইসলামের চূড়ান্ত] বিজয়" (110) এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে আপনারা কী বলেন, তখন তাদের কেউ বললেন, আমরা সাহায্য প্রাপ্ত হলে এবং আমরা বিজয় লাভ করলে এ আয়াতে আমাদেরকে আল্লাহর প্রশংসা এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য আদেশ করা হয়েছে। আবার কেউ কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, হে ইবন আব্বাস! তুমিও কি তাই বল? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কী চলতে চাও? উত্তরে আমি বললাম, এ আয়াতে আল্লাহ রাববুল আলামীন রাসূল (ﷺ)-কে তার ইন্তিকালের সংবাদ জানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসলে' এটিই হবে তোমার মৃত্যুর নিদর্শন। "তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি তো তওবা কবূলকারী।" এ কথা শুনে উমার বললেন, তুমি যা বলছ, এ আয়াতের ব্যাখ্যা আমিও তা-ই জানি।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: যখন আয়াত: 'এবং তোমাদের নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক কর।' (26.214) প্রকাশিত হয়েছিল। আল্লাহর রসূল (ﷺ) বের হয়ে গেলেন এবং যখন তিনি সাফা পাহাড়ে উঠলেন, তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, হে সাবাহ! লোকেরা বলল, সে কে? "অতঃপর তারা তার চারপাশে জড়ো হল, তখন তিনি বললেন, "তুমি কি দেখছ? আমি যদি তোমাকে জানাই যে, অশ্বারোহীরা এই পাহাড়ের দিক দিয়ে এগিয়ে আসছে, তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?" তারা বলল, "আমরা তোমাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি।" তারপর তিনি বললেন, "আমি তোমার আগমন সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্ককারী। কঠিন শাস্তি।" আবু লাহাব বলল, "তুমি ধ্বংস হও! আপনি কি শুধু এই জন্য আমাদের একত্রিত? "অতঃপর আবু লাহাব চলে গেল। সুতরাং "সূরা:-উল-লাহাব" 'আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক!' (111.1) প্রকাশিত হয়েছিল।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) বাত্হা প্রান্তরের দিকে চলে গেলেন এবং পর্বতে উঠে "ও সাবাহ!" বলে উচ্চস্বরে ডাকলেন। কুরাইশরা তার কাছে জমায়েত হল। তিনি বললেন, আমি যদি তোমাদেরকে বলি, শত্রু সৈন্যরা সকালে বা সন্ধ্যায় তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেবে? তারা সকলেই বলল, হা, আমরা বিশ্বাস করব। তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সাবধান করছি। এ কথা শুনে আবূ লাহাব বলল, তুমি কি এজন্যই আমাদেরকে একত্রিত করেছ? তোমার ধ্বংস হোক। তখন আল্লাহ তাআলা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সূরাহ লাহাব অবতীর্ণ করলেন, ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দুই হস্ত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ এবং উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি। অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলায় পাকান দড়ি।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আবু লাহাব বলল, "তুমি ধ্বংস হও! তুমি কি এ জন্যই আমাদেরকে একত্র করেছ?" তাই সেখানে অবতীর্ণ হলঃ- 'আবূ লাহাবের হাত দু'টো ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সে নিজে'।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, "বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। বানী আদম আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার জন্য উচিত হয়নি। আমার প্রতি মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ আমাকে যে রকম প্রথমবার সৃষ্টিকরেছেন, তেমনি তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন না। অথচ তাকে আবার জীবিত করা অপেক্ষা প্রথমবার সৃষ্টি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমাকে তার গালি দেয়ার অর্থ হল, সে বলে, আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং কেউ আমার সমকক্ষ নয়।"
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেছেন, আদম সন্তান আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। সে আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার পক্ষে উচিত হয়নি। আমার প্রতি তার মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে, সে বলে, আমি আবার জীবিত করতে সক্ষম নই যেমনিভাবে আমি তাকে প্রথমে সৃষ্টি করেছি। আমাকে তার গালি দেয়া হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ তাআলা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি এমন এক সত্তা যে, আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও কেউ জন্ম দেয়নি এবং আমার সমতুল্য কেউ নেই।
যির ইবন হুবাইশ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবন কা'বকে "মুওয়াইদাত (আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেওয়ার সূরা)" সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন, এ বিষয়ে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, আমাকে বলা হয়েছে, তাই আমি বলছি। উবাই ইবন কা'ব বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে রকম বলেছেন, আমরাও ঠিক সে রকম বলছি।
যির ইবন হুবাইশ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবন কা'ব-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবুল মুনযির! আপনার ভাই ইবন মাস'উদ তো এ রকম কথা বলে থাকেন। তখন উবাই বললেন, আমি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি আমাকে বললেন, আমাকে বলা হয়েছে তাই আমি বলেছি। উবাই ইবন কা'ব বলেন, কাজেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা বলেছেন আমরাও তাই বলি।