bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নবীগণ (৩৩২৬-৩৪৮৮)

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ তাআলা আদম-কে সৃষ্টি করলেন। তার দেহের দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাকে (আদমকে) বললেন, যাও। ঐ ফেরেশতা দলের প্রতি সালাম কর এবং তারা তোমার সালামের জওয়াব কিভাবে দেয় তা মনোযোগ দিয়ে শোন। কারণ সেটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সালামের রীতি। অতঃপর আদম (ফেরেশতাদের) বললেন, "আস্সালামু 'আলাইকুম"। ফেরেশতামন্ডলী তার উত্তরে "আস-সালামু 'আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ" বললেন। ফেরেশতারা সালামের জওয়াবে "ওয়া রহমাতুল্লাহ" শব্দটি বাড়িয়ে বললেন। যারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন তারা আদম-এর আকৃতি বিশিষ্ট হবেন। তবে আদম সন্তানের দেহের দৈর্ঘ্য সর্বদা কমতে কমতে বর্তমান পরিমাপে এসেছে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, সর্বপ্রথম যে দল জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের মুখমন্ডল হবে পূর্ণিমার রাতের চন্দ্রের মত উজ্জ্বল। অতঃপর যে দল তাদের অনুগামী হবে তাদের মুখমন্ডল হবে আকাশের সর্বাধিক দীপ্তিমান উজ্জ্বল তারকার ন্যায়। তারা পেশাব করবে না, পায়খানা করবে না। তাদের থুথু ফেলার প্রয়োজন হবে না এবং তাদের নাক হতে শ্লেষ্মাও বের হবে না। তাদের চিরুণী হবে স্বর্ণের তৈরী। তাদের ঘাম হবে মিস্কের মত সুগন্ধযুক্ত। তাদের ধনুচি হবে সুগন্ধযুক্ত চন্দন কাষ্ঠের। বড় চোখ বিশিষ্টা হুরগণ হবেন তাদের স্ত্রী। তাদের সকলের দেহের গঠন হবে একই। তারা সবাই তাদের আদি পিতা আদম-এর আকৃতিতে হবেন। উচ্চতায় তাদের দেহের দৈর্ঘ্য হবে ষাট হাত।

উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত যে, উম্মু সুলাইম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ সত্য প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মেয়েদের স্বপ্নদোষ হলে কি তাদের উপর গোসল ফরজ হবে? তিনি বললেন, হ্যা। যখন সে বীর্য দেখতে পায়। এ কথা শুনে উম্মু সালামাহ হাসলেন এবং বললেন, মেয়েদের কি স্বপ্নদোষ হয়? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তা না হলে সন্তান তার মত কিভাবে হয়।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন সালামের নিকট রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মদিনায় আগমনের খবর পৌছল, তখন তিনি তার নিকট আসলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই যার উত্তর নবী ব্যতীত আর কেউ জানে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন কী? আর সর্বপ্রথম খাবার কী, যা জান্নাতবাসী খাবে? আর কী কারণে সন্তান তার পিতার মত হয়? আর কী কারণে (কোন কোন সময়) তার মামাদের মত হয়? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এই মাত্র জিবরাঈল আমাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। রাবী বলেন, তখন আবদুল্লাহ বললেন, সে তো ফেরেশতাগণের মধ্যে ইয়াহূদীদের শত্রু। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, কিয়ামতের প্রথম নিদর্শন হলো আগুন যা মানুষকে পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে তাড়িয়ে নিয়ে একত্রিত করবে। আর প্রথম খাবার যা জান্নাতবাসীরা খাবেন তা হলো মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ। আর সন্তান সদৃশ হবার ব্যাপার এই যে পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সঙ্গম করে তখন যদি পুরুষের বীর্য প্রথমে স্খলিত হয় তবে সন্তান তার সদৃশ হবে আর যখন স্ত্রীর বীর্য পুরুষের বীর্যের পূর্বে স্খলিত হয় তখন সন্তান তার সদৃশ হয়। তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদীরা অপবাদ ও কুৎসা রটনাকারী সম্প্রদায়। আপনি তাদেরকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করার পূর্বে তারা যদি আমার ইসলাম গ্রহণের বিষয় জেনে ফেলে, তাহলে তারা আপনার কছে আমার কুৎসা রটনা করবে। অতঃপর ইয়াহূদীরা এলো এবং আবদুল্লাহ ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক? তারা বলল, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তির পুত্র। তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির পুত্র। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, যদি আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণ করে, এতে তোমাদের অভিমত কী হবে? তারা বলল, এর থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করুক। এমন সময় আবদুল্লাহ তাদের সামনে বের হয়ে আসলেন এবং তিনি বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। তখন তারা বলতে লাগল, সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোক এবং সবচেয়ে খারাপ লোকের সন্তান এবং তারা তার গীবত ও কুৎসা রটনায় লেগে গেল।

আবূ হুরাইরাহ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে একইভাবে বর্ণিত আছে। নবী (ﷺ) বলেছেন, বনী ইসরাঈল যদি না হত তবে গোশত দুর্গন্ধময় হতো না। আর যদি হাওয়া না হতেন তাহলে কোন নারীই স্বামীর খিয়ানত করত না।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে উত্তম নাসীহাত প্রদান করবে। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশী বাকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে নাসীহাত করতে থাক।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। সত্যবাদী-সত্যনিষ্ঠ হিসাবে স্বীকৃত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান স্বীয় মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত জমা রাখা হয়। অতঃপর অনুরূপভাবে (চল্লিশ দিনে) তা আলাকারূপে পরিণত হয়। অতঃপর অনুরূপভাবে (চল্লিশ দিনে) তা গোশ্তের টুকরার রূপ লাভ করে। অতঃপর আল্লাহ তার নিকট চারটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়ে লিখে দেন। অুঃপর তার 'ধামল, তার মৃত্যু, তার রুজী এবং সে সৎ কিংবা অসৎ তা লিখা হয়। অতঃপর তার মধ্যে রূহ ফুকে দেয়া হয়। এক ব্যক্তি একজন জাহান্নামীর আমলের মত আমল করতে থাকে এমনকি তার ও জাহান্নামের মধ্যে এক হাতের তফাৎ রয়ে যায়, এমন সময় তার ভাগ্যের লিখন এগিয়ে আসে। তখন সে জান্নাতবাসীদের আমলের মত আমল করে থাকে। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। আর এক ব্যক্তি (প্রথম হতেই) জান্নাতবাসীদের আমলের মত আমল করতে থাকে। এমনকি শেষ পর্যন্ত তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাতের ব্যবধান রয়ে যায়। এমন সময় তার ভাগ্য লিখন অগ্রগামী হয়।। তখন সে জাহান্নামবাসীদের আমলের অনুরূপ আমল করে থাকে এবং ফলে সে জাহান্নামে প্রবিষ্ট হয়।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ মাতৃগর্ভে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। (সন্তান জন্মের সূচনায়) সে ফেরেশতা বলেন, হে রব! এ তো বীর্য। হে রব! এ তো আলাকা। হে রব! এ তো গোশ্তের খন্ড। অতঃপর আল্লাহ যদি তাকে সৃষ্টি করতে চান তাহলে ফেরেশতা বলেন, হে রব! সন্তানটি ছেলে হবে, না মেয়ে হবে? হে রব! সে কি পাপিষ্ঠ হবে, না নেককার হবে? তার রিযিক কী পরিমাণ হবে, তার আয়ুষ্কাল কত হবে? এভাবে তার মাতৃগর্ভে সব কিছুই লিখে দেয়া হয়।

আনাস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে শুনে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ তাআলা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে সহজ আযাব ভোগকারীকে জিজ্ঞেস করবেন, যদি পৃথিবীর ধন-সম্পদ তোমার হয়ে যায়, তবে তুমি কি আযাবের বিনিময়ে তা দিয়ে দিবে? সে উত্তর দিবে, হা। তখন আল্লাহ বলবেন, যখন তুমি আদম-এর পৃষ্ঠে ছিলে, তখন আমি তোমার নিকট এর থেকেও সহজ একটি জিনিস চেয়েছিলাম। সেটা হল, তুমি আমার সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। কিন্তু তুমি তা না মেনে শির্ক করতে লাগলে।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, কোন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে, তার এ খুনের পাপের অংশ আদম -এর প্রথম ছেলের (কাবিলের) উপর বর্তায়। কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার প্রচলন ঘটায়।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, সমস্ত রূহ সেনাবাহিনীর মত একত্রিত ছিল। সেখানে তাদের যে সমস্ত রূহের পরস্পর পরিচয় ছিল, এখানেও তাদের মধ্যে পরস্পর পরিচিতি থাকবে। আর সেখানে যাদের মধ্যে পরস্পর পরিচয় হয়নি, এখানেও তাদের মধ্যে পরস্পর মতভেদ ও মতবিরোধ থাকবে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ (ﷺ) একদা জনসমাবেশে দাড়ালেন এবং আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন, অতঃপর দাজ্জালের উল্লেখ করে বললেন, আমি তোমাদেরকে তার নিকট হতে সাবধান করছি আর প্রত্যেক নবীই নিজ নিজ সম্প্রদায়কে এ দাজ্জাল হতে সাবধান করে দিয়েছেন। নূহ-ও নিজ সম্প্রদায়কে দাজ্জাল হতে সাবধান করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তার সম্বন্ধে এমন একটা কথা বলছি, যা কোন নবী তার সম্প্রদায়কে বলেননি। তা হলো তোমরা জেনে রেখ, নিশ্চই দাজ্জাল এক চোখ বিশিষ্ট, আর আল্লাহ এক চোখ বিশিষ্ট নন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে দাজ্জাল সম্পর্কে এমন একটি কথা বলে দেব না, যা কোন নবীই তার সম্প্রদায়কে বলেননি? তা হলো, নিশ্চই সে হবে এক চোখওয়ালা, সে সঙ্গে করে হুবহু জান্নাত এবং জাহান্নাম নিয়ে আসবে। অতএব যাকে সে বলবে যে, এটি জান্নাত প্রকৃতপক্ষে সেটি হবে জাহান্নাম। আর আমি তার সম্পর্কে তোমাদের নিকট তেমনি সাবধান করছি, যেমনি নূহ তার সম্প্রদায়কে সে সম্পর্কে সাবধান করেছেন।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, (কিয়ামতের দিন) নূহ এবং তার উম্মাত (আল্লাহর নিকটে) হাযির হবেন। তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি (আমার বাণী) পৌছিয়েছ? তিনি বলবেন, হ্যা, হে আমার রব! তখন আল্লাহ তার উম্মাতকে জিজ্ঞেস করবেন, নূহ কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়েছেন। তারা বলবে, না, আমাদের নিকট কোন নবীই আসেননি। তখন আল্লাহ নূহকে বলবেন, তোমার জন্য সাক্ষ্য দিবে কে? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ (ﷺ) এবং তার উম্মাত। [রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন] তখন আমরা সাক্ষ্য দিব। নিশ্চই তিনি আল্লাহর বাণী পৌছিয়েছেন। আর এটিই হল মহান আল্লাহর বাণীঃ আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মাত করেছি, যেন তোমরা মানব জাতির উপর সাক্ষী হও- (আল-বাকারাহঃ ১৪৩)।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে এক খানার দাওয়াতে উপস্থিত ছিলাম। তার সামনে (রান্না করা) ছাগলের বাহু আনা হল, এটা তার নিকট পছন্দনীয় ছিল। তিনি সেখান হতে এক খন্ড খেলেন এবং বললেন, আমি কিয়ামতের দিন সমগ্র মানব জাতির সরদার হব। তোমরা কি জান? আল্লাহ কিভাবে (কিয়ামতের দিন) একই সমতলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করবেন? যেন একজন দর্শক তাদের সবাইকে দেখতে পায় এবং একজন আহবানকারীর আহবান সবার নিকট পৌছায়। সূর্য তাদের অতি নিকটে এসে যাবে। তখন কোন কোন মানুষ বলবে, তোমরা কি লক্ষ্য করনি, তোমরা কী অবস্থায় আছ এবং কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে খুজে বের করবে না, যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের নিকট সুপারিশ করবেন? তখন কিছু লোক বলবে, তোমাদের আদি পিতা আদম আছেন। তখন সকলে তার নিকট যাবে এবং বলবে, হে আদম! আপনি সমস্ত মানব জাতির পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পক্ষ হতে রূহ আপনার মধ্যে ফুকেছেন। তিনি ফেরেশতাদেরকে (আপনার সম্মানের) নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সকলে আপনাকে সিজদাও করেছেন এবং তিনি আপনাকে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছেন। আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? আপনি দেখেন না, আমরা কী অবস্থায় আছি এবং কী কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি। তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন এর পূর্বে এমন রাগান্বিত হননি আর পরেও এমন রাগান্বিত হবেন না। আর তিনি আমাকে বৃক্ষটি হতে নিষেধ করেছিলেন। তখন আমি ভুল করেছি। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা আমাকে ছাড়া অন্যের নিকট যাও। তোমরা নূহের নিকট চলে যাও। তখন তারা নূহ-এর নিকট আসবে এবং বলবে, হে নূহ! পৃথিবীবাসীদের নিকট আপনিই প্রথম রাসূল এবং আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞ বান্দা। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না, আমরা কী ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে আছি? আপনি দেখছেন না আমরা কতই না দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে আছি? আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়ে আছেন, যা ইতোপূর্বে হন নাই এবং এমন রাগান্বিত পরেও হবেন না। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা নবী [মুহাম্মাদ (ﷺ)]-এর নিকট চলে যাও। তখন তারা আমার নিকট আসবে আর আমি আরশের নীচে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা উঠান এবং সুপারিশ করুন। আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে আর আপনি যা চান, আপনাকে তাই দেয়া হবে।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সকল ক্বারীদের কিরাআতের মত 'ফাহাল-মিন-মুদ্দালকির' তিলাওয়াত করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ যার হাদীস বর্ণনা করতেন যে, রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) বলেছেন, (লাইলাতুল মিরাজে) আমার ঘরের ছাদ উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন আমি মক্কায় ছিলাম। অতঃপর জিব্রাঈল অবতরণ করলেন এবং আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। অতঃপর তিনি যমযমের পানি দ্বারা তা ধুলেন। এরপর হিকমত ও ঈমান (জ্ঞান ও বিশ্বাস) দ্বারা পূর্ণ একখানা সোনার তশ্তরি নিয়ে আসেন এবং তা আমার বক্ষে ঢেলে দিলেন। অতঃপর আমার বক্ষকে আগের মত মিলিয়ে দিলেন। এবার তিনি আমার হাত ধরলেন এবং আমাকে আকাশের দিকে উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর যখন দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে পৌছলেন, তখন জিবরাঈল আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? জবাব দিলেন, আমি জিবরাঈল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছেন? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মাদ (ﷺ) আছেন। দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করলেন, তাকে কি ডাকা হয়েছে? বললেন, হ্যা। অতঃপর দরজা খোলা হল। যখন আমরা আকাশের উপরে আরোহণ করলাম, হঠাৎ দেখলাম এক ব্যক্তি যার ডানে একদল লোক আর তার বামেও একদল লোক। যখন তিনি তার ডান দিকে তাকান তখন হাসতে থাকেন আর যখন তার বাম দিকে তাকান তখন কাঁদতে থাকেন। (তিনি আমাকে দেখে) বললেন, মারাহাবা! নেক নবী ও নেক সন্তান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি আদম আর তার ডানের ও বামের এ লোকগুলো হলো তার সন্তান। এদের মধ্যে ডানদিকের লোকগুলো জান্নাতী আর বামদিকের লোকগুলো জাহান্নামী। অতএব যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বামদিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে জিবরাঈল আরো উপরে উঠলেন। এমনকি দ্বিতীয় আকাশের দ্বারে এসে গেলেন। তখন তিনি এ আকাশের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন! দ্বাররক্ষী তাকে প্রথম আকাশের দ্বাররক্ষী যেরূপ বলেছিল, তেমনি বলল। অতঃপর তিনি দরজা খুলে দিলেন। আনাস বলেন, অতঃপর আবূ যার উল্লেখ করেছেন যে, নবী (ﷺ) আকাশসমূহে ইদ্রীস, মূসা, ঈসা এবং ইবরাহীম-এর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাদের কার অবস্থান কোন আকাশে তিনি আমার নিকট তা বর্ণনা করেননি। তবে তিনি এটা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি নবী (ﷺ)] দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে আদম-কে এবং ষষ্ঠ আকাশে ইবরাহীম-কে দেখতে পেয়েছেন। আনাস বলেন, জিবরাঈল যখন নবী (ﷺ) সহ] ইদ্রীস -এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, তখন তিনি [ইদ্রীস] বলেছিলেন, হে নেক নবী এবং নেক ভাই! আপনাকে মারহাবা। [নবী (ﷺ) বলেন] আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি (জিবরাঈল) জবাব দিলেন, ইনি ইদ্রীস! অতঃপর মুসা-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি [জিবরাঈল] বললেন, ইনি মূসা। অতঃপর ঈসা-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা! হে নেক নবী এবং নেক ভাই। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি [জিবরাঈল] বললেন, ইনি ঈসা। অতঃপর ইবরাহীম -এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করলাম। তিনি বললেন, মারহাবা। হে নেক নবী এবং নেক সন্তান! আমি জানতে চাইলাম, ইনি কে? তিনি [জিবরাঈল] বললেন, ইনি ইবরাহীম। ইবন শিহাব বলেন, আমাকে ইবন হাযম জানিয়েছেন যে, ইবন আব্বাস ও আবূ ইয়াহয়্যা আনসারী বলতেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, অতঃপর জিবরাঈল আমাকে ঊর্ধ্বে নিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত আমি একটি সমতল স্থানে গিয়ে পৌছলাম। সেখান হতে কলমসমূহের খসখস শব্দ শুনছিলাম। ইবন হাযম এবং আনাস ইবন মালিক বর্ণনা করেছেন। নবী (ﷺ) বলেছেন, তখন আল্লাহ আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন। অতঃপর আমি এ নির্দেশ নিয়ে ফিরে আসলাম। যখন মূসা-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার রব আপনার উম্মাত উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। তিনি বললেন, পুনরায় আপনার রবের নিকট ফিরে যান। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য রাখে না। তখন ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার জন্য আবেদন করলাম। তিনি তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে পুনরায় কমাবার আবেদন করুন এবং তিনি [নবী (ﷺ)] পূর্বের অনুরূপ কথা আবার উল্লেখ করলেন। এবার তিনি (আল্লাহ) তার অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আবার আমি মূসা-এর নিকট আসলাম এবং তিনি পূর্বের মত বললেন। আমি তা করলাম। তখন আল্লাহ তার এক অংশ মাফ করে দিলেন। আমি পুনরায় মূসা-এর নিকট আসলাম এবং তাকে জানালাম। তখন তিনি বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আরো কমাবার আরয করুন। কেননা আপনার উম্মাতের তা পালন করার সামর্থ্য থাকবে না। আমি আবার ফিরে গেলাম এবং আমার রবের নিকট তা কমাবার আবেদন করলাম। তিনি বললেন, এ পাচ ওয়াক্ত সালাত বাকী রইল। আর তা সাওয়াবের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান হবে। আমার কথার পরিবর্তন হয় না। অতঃপর আমি মূসা-এর নিকট ফিরে আসলাম। তিনি এবারও বললেন, আপনার রবের নিকট গিয়ে আবেদন করুন। আমি বললাম, এবার আমার রবের সম্মুখীন হতে আমি লজ্জাবোধ করছি। এবার জিবরাঈল চললেন এবং অবশেষে আমাকে সাথে নিয়ে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। দেখলাম তা এমন চমৎকার রঙে পরিপূর্ণ যা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবিষ্ট করানো হল। দেখলাম এর ইট মোতির তৈরী আর এর মাটি মিসক বা কস্তুরীর মত সুগন্ধময়।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমাকে ভোরের বায়ু দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে আর আদ জাতিকে দাবুর বা পশ্চিমের বায়ু দ্বারা ধ্বংস করা হয়েছে।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। আলী নবী (ﷺ)-এর নিকট কিছু স্বর্ণের টুকরো পাঠালেন। তিনি তা চার ব্যক্তির মাঝে বণ্টন করে দিলেন। (১) আল-আকরা ইবন হান্যালী যিনি মাজাশেয়ী গোত্রের ছিলেন। (২) উআইনা ইবন বাদার ফাযারী। (৩) যায়দ ত্বায়ী, যিনি পওে বনী নাবহান গোত্রের ছিলেন। (৪) 'আলকামাহ ইবন উলাসা আমেরী, যিনি বনী কিলাব গোত্রের ছিলেন। এতে কুরাইশ ও আনসারগণ অসন্তুষ্ট হলেন এবং বলতে লাগলেন, নবী (ﷺ) নাজদবাসী নেতৃবৃন্দকে দিচ্ছেন আর আমাদেরকে দিচ্ছেন না। নবী (ﷺ) বললেন, আমি তো তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এমন মনোরঞ্জন করছি। তখন এক ব্যক্তি সামনে এগিয়ে আসল, যার চোখ দু'টি কোটরাগত, গন্ডদ্বয় ঝুলে পড়া; কপাল উটু, ঘন দাড়ি এবং মাথা মোড়ানো ছিল। সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করুন। তখন তিনি বললেন, আমিই যদি নাফরমানী করি তাহলে আল্লাহর আনুগত্য করবে কে? আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর উপর আমানতদার বানিয়েছেন আর তোমরা আমাকে আমানতদার মনে করছ না। তখন এক ব্যক্তি তার নিকট তাকে হত্যা করার অনুমতি চাইল। [আবূ সাঈদ বলেন] আমি তাকে খালিদ ইবন ওয়ালীদ বলে ধারণা করছি। কিন্তু নবী (ﷺ) তাকে নিষেধ করলেন। অতঃপর অভিযোগকারী লোকটি যখন ফিরে গেল, তখন নবী (ﷺ) বললেন, এ ব্যক্তির বংশ হতে বা এ ব্যক্তির পরে এমন কিছু সংখ্যক লোক হবে তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। দ্বীন হতে তারা এমনভাবে বেরিয়ে পড়বে যেমনি ধনুক হতে তীর বেরিয়ে যায়। তারা ইসলামের অনুসারীদেরকে (মুসলিমদেরকে) হত্যা করবে আর মূর্তি পূজারীদেরকে হত্যা করা হতে বাদ দেবে। আমি যদি তাদের পেতাম তাহলে তাদেরকে আদ জাতির মত অবশ্যই হত্যা করতাম।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে (আদ জাতির ঘটনা বর্ণনায়) 'ফাহাল-মিন-মুদ্দালকির' এ আয়াতটি পড়তে শুনেছি।

যায়নাব বিনতে জাহাশ হতে বর্ণিত। একবার নবী (ﷺ) ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় তার নিকট আসলেন এবং বলতে লাগলেন, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আরবের লোকেদের জন্য সেই অনিষ্টের কারণে ধ্বংস অনিবার্য যা নিকটবর্তী হয়েছে। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর এ পরিমাণ খুলে গেছে। এ কথা বলার সময় তিনি তার বৃদ্ধাঙ্গুলিল অগ্রভাগকে তার সঙ্গের শাহাদাত আঙ্গুলির অগ্রভাগের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাকার করে ছিদ্রের পরিমাণ দেখান। যায়নাব বিনতে জাহাশ বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোকজন থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হা যখন পাপকাজ অতি মাত্রায় বেড়ে যাবে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, ইয়া'জূজ ও মা'জূজের প্রাচীরে আল্লাহ এ পরিমাণ ছিদ্র করে দিয়েছেন। এই বলে, তিনি তার হাতে নব্বই সংখ্যার আকৃতির মত করে দেখালেন।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবূ সাঈদ বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, নিশ্চই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ যেভাবে আমি প্রথমে সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। এটি আমার প্রতিশ্রুতি। এর বাস্তবায়ন আমি করবই- (আম্বিয়াঃ ১০৪)। আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম। আর আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী। এ সময় আল্লাহ বললেন, যখন আপনি এদের নিকট হতে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহর নেক বান্দা [ঈসা] যেমন বলেছিলেন; তেমন আমি বলব, হে আল্লাহ! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি ক্ষমতাধর হিকমতওয়ালা-(আল-মায়িদাহ ১১৭-১১৮)।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামতের দিন ইবরাহীম তার পিতা আযরের দেখা পাবেন। আযরের মুখমন্ডলে কালি এবং ধূলাবালি থাকবে। তখন ইবরাহীম তাকে বললেন, আমি কি পৃথিবীতে আপনাকে বলিনি যে, আমার অবাধ্যতা করবেন না? তখন তার পিতা বলবে, আজ আর তোমার অবাধ্যতা করব না। অতঃপর ইবরাহীম আবেদন করবেন, হে আমার রব! আপনি আমার সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন যে, হাশরের দিন আপনি আমাকে লজ্জিত করবেন না। আমার পিতা রহম হতে বঞ্চিত হবার চেয়ে বেশী অপমান আমার জন্য আর কী হতে পারে? তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। পুনরায় বলা হবে, হে ইবরাহীম! তোমার পদতলে কী? তখন তিনি নীচের দিকে তাকাবেন। হঠাৎ দেখতে পাবেন তার পিতার জায়গায় সর্বাঙ্গে রক্তমাখা একটি জানোয়ার পড়ে রয়েছে। এর চার পা বেধে জাহান্নামে ছুঁড়ে ফেলা হবে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একবার কাবা ঘরে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি ইবরাহীম ও মারইয়ামের ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, তাদের কী হল? অথচ তারা তো শুনতে পেয়েছে, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকবে, সে ঘরে ফেরেশতামন্ডলী প্রবেশ করেন না। এ যে ইবরাহীমের ছবি বানানো হয়েছে, (ভাগ্য নির্ধারক অবস্থায়) তিনি কেন ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ করবেন!

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) যখন কাবা ঘরে ছবিগুলো দেখতে পেলেন, তখন যে পর্যন্ত তার নির্দেশে তা মিটিয়ে ফেলা না হলো, সে পর্যন্ত তিনি তাতে প্রবেশ করলেন না। আর তিনি দেখতে পেলেন, ইবরাহীম এবং ইসমাঈল-এর হাতে ভাগ্য নির্ধারণের তীর। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাদের (কুরাইশদের) উপর লানত করুন। আল্লাহর কসম, এরা দু'জন কক্ষনোও ভাগ্য নির্ধারক তীর নিক্ষেপ করেননি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে অধিক মুত্তাকী। তখন তারা বলল, আমরা তো আপনাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তা হলে আল্লাহর নবী ইউসুফ, যিনি আল্লাহর নবী'র পুত্র, আল্লাহর নবী'র পৌত্র এবং আল্লাহর খলীল-এর প্রপৌত্র। তারা বলল, আমরা আপনাকে এ ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তা হলে কি তোমরা আরবের মূল্যবান গোত্রসমূহ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছ? জাহিলী যুগে তাদের মধ্যে যারা সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন, ইসলামেও তারা সর্বোত্তম ব্যক্তি যদি তারা ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানার্জন করেন।

সামূরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আজ রাতে (স্বপ্নে) আমার নিকট দু'জন লোক আসলেন। অতঃপর আমরা এক দীর্ঘদেহ বিশিষ্ট লোকের নিকট আসলাম। তার দেহ দীর্ঘ হবার দরুন আমি তার মাথা দেখতে পাচ্ছিলাম না। আসলে তিনি হলেন ইবরাহীম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, লোকজন তার সামনে দাজ্জালের কথা উল্লেখ করেছেন। তার দু' চোখের মাঝখানে কপালে লেখা থাকবে কাফির বা কাফ, ফা, রা। ইবন আব্বাস বলেন, এটা নবী (ﷺ)-এর নিকট শুনেনি। বরং তিনি বলেছেন, যদি তোমরা ইবরাহীম-কে দেখতে চাও তবে তোমাদের সাথীর দিকে তাকাও। আর মূসা হলেন কোঁকড়ানো চুল, তামাটে রং-এর দেহ বিশিষ্ট। তিনি এমন একটি লাল উটের উপর বসে আছেন, যার নাকের দড়ি খেজুর গাছের ছাল দিয়ে তৈরী। আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিতে দিতে উপত্যকায় নামছেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, নবী ইবরাহীম সূত্রধরদের অস্ত্র দিয়ে নিজের খাত্না করেছিলেন যখন তার বয়স ছিল আশি বছর।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ইবরাহীম তিনবার ব্যতীত কখনও মিথ্যা বলেননি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবরাহীম তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দু'বার ছিল আল্লাহর ব্যাপারে। তার উক্তি "আমি অসুস্থ"- (আস্সাফফাতঃ ৮৯) এবং তার অন্য এক উক্তি "বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি- (আম্বিয়াঃ ৬৩)। বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি [ইবরাহীম] এবং সারা অত্যাচারী শাসকগণের কোন এক শাসকের এলাকায় এসে পৌছলেন। তখন তাকে খবর দেয়া হল যে, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা আছে। তখন সে তার নিকট লোক পাঠাল। সে তাকে নারীটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, এ নারীটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, মহিলাটি আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীর উপর আর কোন মুমিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। অতঃপর সারাকে আনার জন্য লোক পাঠালো। তিনি যখন তার নিকট প্রবেশ করলেন এবং রাজা তার দিকে হাত বাড়ালো তখনই সে পাকড়াও হল। তখন অত্যাচারী রাজা সারাকে বলল, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া কর, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। তখন সারা আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন। ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাকে ধরতে চাইল। এবার সে পূর্বের মত বা তার চেয়ে কঠিনভাবে পাকড়াও হলে। এবারও সে বলল, আল্লাহর নিকট আমার জন্য দোয়া কর। আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। আবারও তিনি দোয়া করলেন, ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। অতঃপর রাজা তার এক দারোয়ানকে ডাকল। সে তাকে বলল, তুমি তো আমার নিকট কোন মানুষ আননি। বরং এনেছ এক শয়তান। অতঃপর রাজা সারার খিদমতের জন্য হাযেরাকে দান করল। অতঃপর তিনি (সারা) তার (ইবরাহীম) নিকট আসলেন, তিনি দাড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, কী ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাযেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে। আবূ হুরাইরাহ বলেন, হে আকাশের পানির ছেলেরা! হাযেরাই তোমাদের আদি মাতা।

উম্মু শারীক হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) গিরগিটি মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, ওটা ইবরাহীম যে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তাতে এ গিরগিটি ফু দিয়েছিল।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়ঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তারা তাদের ঈমানকে যুলুম দ্বারা কলূষিত করেনি- (আল-আন্'আম ৮২)। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে নিজের উপর জুলুম করেনি? তিনি বললেন, তোমরা যা বলছ ব্যাপারটি তা নয়। বরং তাদের ঈমানকে 'জুলুম' শির্ক দ্বারা কলূষিত করেনি। তোমরা কি লুকমানের কথা শুননি? তিনি তার পুত্রকে বলেছিলেন, "হে বৎস! আল্লাহর সঙ্গে কোন রকম শির্ক করো না। নিশ্চই শির্ক একটা বিরাট জুলুম।" (লুকমানঃ ১৩)

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী (ﷺ)-এর সামনে কিছু গোশ্ত আনা হল। তখন তিনি বললেন, নিশ্চই আল্লাহ কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একই সমতল ময়দানে সমবেত করবেন। তখন আহবানকারী তাদের সকলকে তার ডাক সমানভাবে শুনাতে পারবে এবং তাদের সকলের উপর সমানভাবে দর্শকের দৃষ্টি পড়বে আর সূর্য তাদের অতি নিকটবর্তী হবে। অতঃপর তিনি শাফা'আতের হাদীস বর্ণনা করলেন যে, সকল মানুষ ইবরাহীম-এর নিকট আসবে এবং বলবে, পৃথিবীতে আপনি আল্লাহর নবী এবং তার খলীল। অতএব আমাদের জন্য আপনি আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন। তখন তিনি ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলা কথা স্মরণ করে বলবেন, নাফসী! নাফসী! তোমরা মূসার নিকট যাও।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, ইসমাঈলের মায়ের প্রতি আল্লাহর রহম করুন। যদি তিনি তাড়াহুড়া না করতেন, তবে যমযম একটি প্রবহমান ঝরণায় পরিণত হত।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল এবং তার মাকে নিয়ে আসলেন। মা তখন তাকে দুধ পান করাতেন এবং তার সঙ্গে একটি পানির মশক ছিল।

সাঈদ ইবন জুবাইর হতে বর্ণিত। ইবন আব্বাস বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল-এর মায়ের নিকট থেকে। হাযেরা কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহীম হাযেরা এবং তার শিশু ছেলে ইসমাঈল-কে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাযেরা শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কাবার ঘর অবস্থিত, ইবরাহীম তাদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কায় না ছিল কোন মানুষ, না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এছাড়া তিনি তাদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। অতঃপর ইবরাহীম ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল-এর মা পিছু পিছু আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে কোন ব্যবস্থা। তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহীম তার দিকে তাকালেন না। তখন হাযেরা তাকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হা। হাযেরা বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম-ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাকে পৌছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে দাড়ালেন। অতঃপর তিনি দু'হাত তুলে এ দোয়া করলেন, আর বললেন, "হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের কতককে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনুর্বর উপত্যকায় ...... যাতে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- (ইবরাহীম ৩৭)। আর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তার শিশু পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা রাবী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তার অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত 'সাফা'-কে একমাত্র তার নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি তার উপর উঠে দাড়ালেন এবং ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথায়ও কাউকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন 'সাফা' পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমন কি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌছলেন, তখন তিনি তার কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মত ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে 'মারওয়া' পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন। ইবন আব্বাস বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, এজন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সায়ী করে থাকে। অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। যদি তোমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকে। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন অথবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাযেরা-এর চারপাশে নিজ হাতে বাধ দিয়ে এক হাউজের মত করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তার মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপচে উঠছিল। ইবন আব্বাস বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলেছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো। রাবী বলেন, অতঃপর হাযেরা পানি পান করলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তার পিতা দু'জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তার আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। অতঃপর হাযেরা এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কায় নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চই এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু'জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। রাবী বলেন, ইসমাঈল-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যা। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যা, বলে তাদের মত প্রকাশ করল। ইবন আব্বাস বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদেরও সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈলও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌছে তিনি তাদের নিকট অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তার সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা ইন্তিকাল করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম তার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তার স্ত্রীকে তার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধূকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইবরাহীম-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়। অতঃপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হা। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন নাসীহাত করেছেন? স্ত্রী বলল, হা। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তার সালাম পৌছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন। ইসমাঈল বললেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপন জনদের নিকট চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অন্য একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন। অতঃপর ইবরাহীম এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ যতদিন চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল-এর দেখা পেলেন না। তিনি পুত্রবধূর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাকে ইসমাঈল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তিনি আমাদের খাবারের খোজে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহীম জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কী? সে বলল, গোশ্ত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কী? সে বলল, পানি। ইবরাহীম দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! তাদের গোশ্ত ও পানিতে বরকত দিন। নবী (ﷺ) বলেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো না। যদি হতো তাহলে ইবরাহীম সে বিষয়েও তাদের জন্য দোয়া করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশ্ত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা, শুধু গোশ্ত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হতে পারে না। ইবরাহীম বললেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাকে সালাম বলবে, আর তাকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে যে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে। অতঃপর ইসমাঈল যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? সে বলল, হা। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তার প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন কিছুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বলল, হা। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল বললেন, ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ। এ কথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। অতঃপর ইবরাহীম এদের থেকে দূরে রইলেন, যদ্দিন আল্লাহ চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার আসলেন। (দেখতে পেলেন) যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে বসে ইসমাঈল তার একটি তীর মেরামত করছেন। যখন তিনি তার পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর একজন বাপ-বেটার সঙ্গে, একজন বেটা-বাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেমন করে থাকে তারা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল বললেন, আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইবরাহীম (&আ) বললেন, তুমি আমার সাহায্য করবে কি? ইসমাঈল বললেন, আমি আপনার সাহায্য করব। ইবরাহীম বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তারা উভয়ে কাবা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেয়াল উচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (মাকামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম তার উপর দাড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল তাকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে এ দোয়া করতে থাকলেন, হে আমাদে রব! আমাদের থেকে কবূল করুন। নিশ্চই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। তারা উভয়ে আবার কাবা ঘর তৈরী করতে থাকেন এবং কাবা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দোয়া করতে থাকেন। "হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবূল করে নিন। নিশ্চই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন।" (আল-বাকারাহঃ ১২৭)

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন ইবরাহীম ও তার স্ত্রী (সারার) মাঝে যা হবার হয়ে গেল, তখন ইবরাহীম (শিশুপুত্র) ইসমাঈল এবং তার মাকে নিয়ে বের হলেন। তাদের সঙ্গে একটি থলে ছিল, যাতে পানি ছিল। ইসমাঈল-এর মা মশক হতে পানি পান করতেন। ফলে শিশুর জন্য তার স্তনে দুধ বাড়তে থাকে। অবশেষে ইবরাহীম মক্কায় পৌছে হাযেরাকে একটি বিরাট গাছের নীচে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। অতঃপর ইবরাহীম আপন পরিবারের (সারার) নিকট ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল-এর মা কিছু দূর পর্যন্ত তার অনুসরণ করলেন। অবশেষে যখন কাদা নামক স্থানে পৌছলেন, তখন তিনি পিছন হতে ডেকে বললেন, হে ইবরাহীম! আপনি আমাদেরকে কার নিকট রেখে যাচ্ছেন? ইবরাহীম বললেন, আল্লাহর কাছে। হাযেরা বললেন, আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। রাবী বলেন, অতঃপর হাযেরা ফিরে আসলেন, তিনি মশক হতে পানি পান করতেন আর শিশুর জন্য দুধ বাড়ত। অবশেষে যখন পানি শেষ হয়ে গেল। তখন ইসমাঈল-এর মা বললেন, আমি যদি গিয়ে এদিকে সেদিকে তাকাতাম! তাহলে হয়ত কোন মানুষ দেখতে পেতাম। রাবী বলেন, অতঃপর ইসমাঈল-এর মা গেলেন এবং সাফা পাহাড়ে উঠলেন আর এদিকে ওদিকে তাকালেন এবং কাউকে দেখেন কিনা এজন্য বিশেষভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলেন না। তখন দ্রুত বেগে মারওয়া পাহাড়ে এসে গেলেন এবং এভাবে তিনি কয়েক চক্কর দিলেন। পুনরায় তিনি বললেন, যদি গিয়ে দেখতাম যে, শিশুটি কী করছে। অতঃপর তিনি গেলেন এবং দেখতে পেলেন যে, সে তার অবস্থায়ই আছে। সে যেন মরণাপন্ন হয়ে গেছে। এতে তার মন স্বস্তি পাচ্ছিল না। তখন তিনি বললেন, যদি সেখানে যেতাম এবং এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখতাম। সম্ভবতঃ কাউকে দেখতে পেতাম। অতঃপর তিনি গেলেন, সাফা পাহাড়ের উপর উঠলেন এবং এদিকে সেদিক দেখলেন এবং গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। এমনকি তিনি সাতটি চক্কর পূর্ণ করলেন। তখন তিনি বললেন, যদি যেতাম তখন দেখতাম যে সে কী করছে। হঠাৎ তিনি একটি শব্দ শুনতে পেলেন। অতঃপর তিনি মনে মনে বললেন, যদি আপনার কোন সাহায্য করার থাকে তবে আমাকে সাহায্য করুন। হঠাৎ তিনি জিবরাঈল-কে দেখতে পেলেন। রাবী বলেন, তখন তিনি (জিবরাঈল) তার পায়ের গোড়ালি দ্বারা এরূপ করলেন গোড়ালি দ্বারা জমিনের উপর আঘাত করলেন। রাবী বলেন, তখনই পানি বেরিয়ে আসল। এ দেখে ইসমাঈল-এর মা অস্থির হয়ে গেলেন এবং গর্ত খুড়তে লাগলেন। রাবী বলেন, এ প্রসঙ্গে আবুল কাসিম [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)] বলেছেন, হাযেরা যদি একে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দিতেন তাহলে পানি বিস্তৃত হয়ে যেত। রাবী বলেন, তখন হাযেরা পানি পান করতে লাগলেন এবং তার সন্তানের জন্য তার দুধ বাড়তে থাকে। রাবী বলেন, অতঃপর জুরহুম গোত্রের একদল লোক উপত্যকার নীচু ভূমি দিয়ে অতিক্রম করছিল। হঠাৎ তারা দেখল কিছু পাখি উড়ছে। তারা যেন তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না আর তারা বলতে লাগল এসব পাখি তো পানি ব্যতীত কোথাও থাকতে পারে না। তখন তারা সেখানে তাদের একজন দূত পাঠাল। সে সেখানে গিয়ে দেখল, সেখানে পানি মাওজুদ আছে। তখন সে তার দলের লোকদের নিকট ফিরে আসল এবং তাদেরকে সংবাদ দিল। অতঃপর তারা হাযেরা-এর নিকট এসে বলল, হে ইসমাঈলের মা। আপনি কি আমাদেরকে আপনার নিকট থাকা অথবা (রাবী বলেছেন), আপনার নিকট বসবাস করার অনুমতি দিবেন? [হাযেরা তাদেরকে বসবাসের অনুমতি দিলেন এবং এভাবে অনেক দিন কেটে গেল]। অতঃপর তার ছেলে বয়ঃপ্রাপ্ত হল। তখন তিনি (ইসমাঈল) জুরহুম গোত্রেরই একটি মেয়েকে বিয়ে করলেন। রাবী বলেন, পুনরায় ইবরাহীম-এর মনে জাগল তখন তিনি তার স্ত্রীকে (সারাহ) বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা সম্পর্কে খবর নিতে চাই। রাবী বলেন, অতঃপর তিনি আসলেন এবং সালাম দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল-এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। ইবরাহীম বললেন, সে যখন আসবে তখন তুমি তাকে আমার এ নির্দেশের কথা বলবে, "তুমি তোমার ঘরের চৌকাঠখানা বদলিয়ে ফেলবে"। ইসমাঈল যখন আসলেন, তখন স্ত্রী তাকে খবরটি জানালেন, তখন তিনি স্ত্রীকে বললেন, তুমি সেই চৌকাঠ। অতএব তুমি তোমার পিতামাতার নিকট চলে যাও। রাবী বলেন, অতঃপর ইবরাহীম-এর আবার মনে পড়ল। তখন তিনি তার স্ত্রী (সারাহ)-কে বললেন, আমি আমার নির্বাসিত পরিবারের খবর নিতে চাই। অতঃপর তিনি সেখানে আসলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ইসমাঈল কোথায়? ইসমাঈল-এর স্ত্রী বলল, তিনি শিকারে গিয়েছেন। পুত্রবধু তাকে বললেন, আপনি কি আমাদের এখানে অবস্থান করবেন না? কিছু পানাহার করবেন না? তখন ইবরাহীম বললেন, তোমাদের খাদ্য এবং পানীয় কি? স্ত্রী বলল, আমাদের খাদ্য হল গোশ্ত আর পানীয় হল পানি। তখন ইবরাহীম দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ! তাদের খাদ্য এবং পানীয় দ্রব্যের মধ্যে বরকত দিন"। রাবী বলেন, আবুল কাসিম (ﷺ) বলেছেন, ইবরাহীম-এর দোয়ার কারণেই বরকত রয়েছে। রাবী বলেন, আবার কিছুদিন পর ইবরাহীম-এর মনে তার নির্বাসিত পরিজনের কথা জাগল। তখন তিনি তার স্ত্রী (সারাহ)-কে বললেন, আমি আমার পরিত্যক্ত পরিজনের খবর নিতে চাই। অতঃপর তিনি এলেন এবং ইসমাঈলের দেখা পেলেন, তিনি যমযম কূপের পিছনে বসে তার একটি তীর মেরামত করছেন। তখন ইবরাহীম ডেকে বললেন, হে ইসমাঈল! তোমার রব তার জন্য একখানা ঘর নির্মাণ করতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল বললেন, আপনার রবের নির্দেশ পালন করুন। ইবরাহীম বললেন, তিনি আমাকে এও নির্দেশ দিয়েছেন যে, তুমি যেন আমাকে এ বিষয়ে সহায়তা কর। ইসমাঈল বললেন, তাহলে আমি তা করব অথবা তিনি অনুরূপ কিছু বলেছিলেন। অতঃপর উভয়ে উঠে দাড়ালেন। ইবরাহীম ইমারত বানাতে লাগলেন আর ইসমাঈল তাকে পাথর এনে দিতে লাগলেন আর তারা উভয়ে এ দোয়া করছিলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজ কবূল করুন। আপনি তো সব কিছু শুনেন এবং জানেন। রাবী বলেন, এরই মধ্যে প্রাচীর উচু হয়ে গেল আর বৃদ্ধ ইবরাহীম এতটা উঠতে দুর্বল হয়ে পড়লেন। তখন তিনি (মাকামে ইবরাহীমের) পাথরের উপর দাড়ালেন। ইসমাঈল তাকে পাথর এগিয়ে দিতে লাগলেন আর উভয়ে এ দোয়া পড়তে লাগলেন, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ কাজটুকু কবূল করুন। সিঃসন্দেহে আপনি সবকিছু শুনেন ও জানেন- (আল-বাকারাহঃ ১২৭)।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, উভয় মসজিদের (তৈরীর) মাঝে কত ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর। অতঃপর তোমার যেখানেই সালাতের সময় হবে, সেখানেই সালাত আদায় করে নিবে। কেননা এর মধ্যে ফযীলত নিহিত রয়েছে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। ওহুদ পর্বত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বললেন, এ পর্বত আমাদের ভালবাসে আর আমরাও তাকে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইবরাহীম মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন আর আমি হারাম ঘোষণা করছি এর দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে (মদিনাকে)। এ হাদীসটি আবদুল্লাহ ইবন যায়দ -ও নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন।

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) [আয়িশা-কে বলেছেন, তুমি কি জান তোমার কাউম যখন কাবা ঘর নির্মাণ করেছে, তখন তারা ইবরাহীম-এর ভিত্তি হতে তা ছোট করেছে? তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি তা ইবরাহীম-এর ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করবেন না? তিনি বললেন, যদি তোমার কাওম কুফরী হতে অল্পকাল আগে আগত না হতো। আবদুল্লাহ ইবন উমার বললেন, যদি আয়িশাহ এ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে শুনে থাকেন, তবে আমি মনে করি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাতীমে কাবার সংলগ্ন দু'টি কোণকে চুমু দেয়া একমাত্র এ কারণে পরিহার করেছেন যে, কাবার ঘর ইবরাহীম-এর ভিত্তির উপর পুরাপুরি নির্মাণ করা হয়নি।

আবূ হুমাইদ সাঈদী হতে বর্ণিত। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিভাবে আপনার উপর দরূদ পাঠ করব? তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এভাবে পড়বে, "হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর, তার স্ত্রীগণের উপর এবং তার বংশধরদের উপর রহমত নাযিল করুন, যেরূপ আপনি রহমত নাযিল করেছেন ইবরাহীম -এর বংশধরদের উপর। আর আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর, তার স্ত্রীগণের উপর এবং তার বংশধরগণের উপর এমনিভাবে বরকত নাযিল করুন যেমনি আপনি বরকত নাযিল করেছেন ইবরাহীম-এর বংশধরদের উপর। নিশ্চই আপনি অতি প্রশংসিত এবং অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী।"

আবদুর রহমান ইবন আবূ লাইলা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কা'ব ইবন উজরা আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, আমি কি আপনাকে এমন একটি হাদিয়া দেব না যা আমি নবী (ﷺ) হতে শুনেছি? আমি বললাম, হা, আপনি আমাকে সে হাদিয়া দিন। তিনি বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনাদের উপর আহলে বাইতের উপর কিভাবে দরূদ পাঠ করতে হবে? কেননা, আল্লাহ তো (কেবল) আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা কিভাবে আপনার উপর সালাম করব। তিনি বললেন, তোমরা এভাবে বল, "হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম এবং তার বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধরদের উপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি আপনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীম এবং ইবরাহীম-এর বংশধরদের উপর। নিশ্চই আপনি অতি প্রশংসিত, অতি মর্যাদার অধিকারী।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) হাসান এবং হুসাইন-এর জন্য নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন আর বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম ইসমাঈল ও ইসহাক-এর জন্য দোয়া পড়ে পানাহ চাইতেন। আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ইবরাহীম তার অন্তরের প্রশান্তির জন্য মৃতকে কিভাবে জীবিত করা হবে, এ সম্পর্কে আল্লাহর নিকট জিজ্ঞেস করেছিলেন, (সন্দেহবশত নয়) যদি "সন্দেহ" বলে অভিহিত করা হয় তবে এরূপ "সন্দেহ" এর ব্যাপারে আমরা ইবরাহীম-এর চেয়ে অধিক উপযোগী। যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দেখিয়ে দিন, আপনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করেন। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? তিনি বললেন, হা। তা সত্ত্বেও যাতে আমার অন্তর প্রশান্তি লাভ করে- (আল-বাকারাহঃ ২৬০)। অতঃপর [নবী (ﷺ) লূত-এর ঘটনা উল্লেখ করে বললেন।) আল্লাহ লূত -এর প্রতি রহম করুন। তিনি একটি সুদৃঢ় খুটির আশ্রয় চেয়েছিলেন আর আমি যদি কারাগারে এত দীর্ঘ সময় থাকতাম যত দীর্ঘ সময় ইউসুফ কারাগারে ছিলেন তবে তার (বাদশাহর) ডাকে সাড়া দিতাম।

সালামাহ ইবন আকওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আসলাম গোত্রের একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তারা তীরন্দাজীর প্রতিযোগিতা করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে বনী ইসমাঈল! তোমরা তীরন্দাজী করে দাও। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষ তীরন্দাজ ছিলেন। সুতরাং তোমরাও তীরন্দাজী করে যাও আর আমি অমুক গোত্রের লোকদের সঙ্গে আছি। রাবী বলেন, তাদের এক পক্ষ হাত চালনা হতে বিরত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমাদের কী হল, তোমরা যে তীরন্দাজী করছ না? তখন তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিভাবে তীর ছুঁড়তে পারি, অথচ আপনি তো তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা তীর ছুঁড়তে থাক, আমি তোমাদের সবার সঙ্গেই আছি।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল যে, লোকদের মধ্যে অধিক সম্মানিত ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে অধিক আল্লাহ ভীরু, সে সবচেয়ে অধিক সম্মানিত। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমরা আপনাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তা হলে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হলেন আল্লাহর নবী ইউসুফ ইবন আল্লাহর নবী (ইয়াকুব) ইবন আল্লাহর নবী (ইসহাক) ইবন আল্লাহর খালীল ইবরাহীম। তারা বললেন, আমরা এ সম্পর্কেও জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তবে কি তোমরা আমাকে আরবদের উচ্চ বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? তারা বলল, হা। তখন নবী (ﷺ) বললেন, জাহিলিয়াতের যুগে তোমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি ছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরও তারাই সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি, যদি তারা ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে থাকেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আল্লাহ লূত-কে মাফ করুন। তিনি একটি মজবুত খুটির আশ্রয় চেয়েছিলেন।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) "ফাহাল মিন মুদ্দাক্কির" পড়েছেন। (54.15)

আবদুল্লাহ ইবন যাম'আহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) হতে শুনেছি এবং তিনি যে লোক [সালিহ-এর] উটনী কেটেছিলেন তার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, উটনীকে হত্যা করার জন্য এমন এক লোক (কিদার) তৈরী হয়েছিল যে তার গোত্রের ভিতর প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ছিল, যেমন ছিল আবূ যাম'আহ।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাবুকের যুদ্ধের সময় যখন হিজর নামক স্থানে অবতরণ করলেন, তখন তিনি সাহাবীগণকে নির্দেশ করলেন, তারা যেন এখানের কূপের পানি পান না করে এবং মশকেও পানি না ভরে। তখন সাহাবীগণ বললেন, আমরা তো এর পানি দ্বারা রুটির আটা গুলে ফেলেছি এবং পানিও ভরে রেখেছি। তখন নবী (ﷺ) তাদেরকে সেই গুলানো আটা ফেলে দেয়ার এবং পানি ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সাবরা ইবন মাবাদ এবং আবুশ শামূস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) খাদ্য ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আর আবূ যার নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেছেন, এর পানি দ্বারা যে আটা গুলেছে (তা ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন)।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সামূদ জাতির আবাসস্থল 'হিজর' নামক স্থানে অবতরণ করলেন আর তখন তারা এর কূপের পানি মশকে ভরে রাখলেন এবং এ পানি দ্বারা আটা গুলে নিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে হুকুম দিলেন, তারা ঐ কূপ হতে যে পানি ভরে রেখেছে, তা যেন ফেলে দেয় আর পানিতে গুলা আটা যেন উটগুলোকে খাওয়ায় আর তিনি তাদের আদেশ করলেন তারা যেন ঐ কূপ হতে মশক ভরে যেখান হতে [সালিহ]-এর উটনীটি পানি পান করত।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) যখন 'হিজ্র' নামক স্থান অতিক্রম করলেন, তখন তিনি বললেন, তোমরা এমন লোকদের আবাস স্থল প্রবেশ করো না যারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করেছে। প্রবেশ করলে, ক্রন্দনরত অবস্থায়, যেন তাদের প্রতি যে বিপদ এসেছিল তোমাদের প্রতি সে রকম বিপদ না আসে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাহনের উপর আরোহী অবস্থায় নিজ চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে নিলেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা একমাত্র ক্রন্দনরত অবস্থায়ই এমন লোকদের আবাসস্থলে প্রবেশ করবে যারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করেছে। তাদের উপর যে মুসিবত আপতিত হয়েছিল তোমাদের উপরও যেন সে মুসিবত না আসে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, সম্মানী ব্যক্তি- যিনি সম্মানী ব্যক্তির সন্তান, যিনি সম্মানী ব্যক্তির সন্তান, যিনি সম্মানী ব্যক্তির সন্তান। তিনি হলেন, ইউসুফ ইবন ইয়া'কূব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম)।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি কে? তিনি উত্তর দিলেন, তাদের মধ্যে যে আল্লাহকে সবচেয়ে অধিক ভয় করে। তারা বললেন, আমরা আপনাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তাহলে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি হলেন, আল্লাহর নবী ইউসুফ ইবন আল্লাহর নবী ইবন আল্লাহর নবী ইবন আল্লাহর খালিল। তারা বললেন, আমরা আপনাকে এ বিষয়েও জিজ্ঞেস করিনি। তখন তিনি বললেন, তাহলে তোমরা আমার নিকট আরবের খণি গোত্রগুলোর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছ? (তাহলে শুন) মানুষ খণি বিশেষ, জাহিলিয়্যাতের যুগে যারা তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিল, ইসলামেও তারা সর্বোত্তম ব্যক্তি, যদি তারা ইসলামী জ্ঞান লাভ করে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) তাকে বলেছেন, আবূ বাকর-কে বল, তিনি যেন লোকদের সালাতে ইমামতি করেন। আয়িশাহ বললেন, তিনি একজন কোমল হৃদয়ের লোক। যখন আপনার জায়গায় তিনি দাড়াবেন, তখন (ﷺ) বিগলিত অন্তর হয়ে পড়বেন। নবী (ﷺ) পুনরায় একই কথা করলেন, আয়িশাহ আবারও সেই উত্তর দিলেন, শুবাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তৃতীয় অথবা চতুর্থবার বললেন, [হে আয়িশাহ]! তোমরা ইউসুফ-এর ঘটনার নিন্দাকারী নারীদের মত। আবূ বাকরকে বল (তিনি যেন লোকদেও সালাতে ইমামতি করেন)।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন, তখন তিনি বললেন, আবূ বাকরকে বল, তিনি যেন লোকদের সালাত আদায় করিয়ে দেন। তখন আয়িশাহ বললেন, আবূ বাকর তো এ রকম লোক। অতঃপর নবী (ﷺ) অনুরূপ বললেন, তখন আয়িশাহ ও ঐরূপই বললেন, তখন নবী (ﷺ) বললেন, আবূ বাকরকে বল। হে আয়িশা! নিশ্চই তোমরা ইউসুফ-এর ঘটনার নিন্দাকারী নারীদের মত হয়ে গেছ। অতঃপর আবূ বাকর নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় ইমামত করলেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দোয়া করেছেন, হে আল্লাহ! আয়্যাশ ইবন আবূ রবীআকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! সালাম ইবন হিশামকে নাজাত দিন। হে আল্লাহ! ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদকে নাজাত দিন। হে আল্লাহ! দুর্বল মুমিনদেরকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! মুযার গোত্রকে শক্তভাবে পাকড়াও করুন। হে আল্লাহ! এ গোত্রের উপর এমন দুর্ভিক্ষ ও অনটন নাযিল করুন যেমন দুর্ভিক্ষ ইউসুফ-এর যামানায় হয়েছিল।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ লূত-এর উপর রহম করুন। তিনি একটি সুদৃঢ় খুটির আশ্রয় নিয়েছিলেন আর ইউসুফ যত দীর্ঘ সময় জেলখানায় কাটিয়েছেন, আমি যদি অত দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতাম এবং পরে রাজদূত আমার নিকট আসত তবে নিশ্চই আমি তার ডাকে সাড়া দিতাম।

মাসরূক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-এর মা উম্মু রুমানার নিকট আয়িশাহর বিষয়ে যে সব মিথ্যা অপবাদের কথা বলাবলি হচ্ছিল সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমি আয়িশার সঙ্গে একত্রে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় একজন আনসারী মহিলা এ কথা বলতে বলতে আমাদের নিকট প্রবেশ করল। আল্লাহ অমুককে শাস্তি দিক। আর শাস্তি তো দিয়েছেন। এ কথা শুনে উম্মু রুমানা বললেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম এ কথা বলার কারণ কী? সে মহিলাটি বলল, ঐ লোকটিই তো কথাটির চর্চা করছে। তখন আয়িশাহ জিজ্ঞেস করলেন, কোন কথাটির? অতঃপর সে আয়িশাহ-কে বিষয়টি জানিয়ে দিল। আয়িশাহ জিজ্ঞেস করলেন, বিষয়টি কি আবূ বাকর এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও শুনেছেন? সে বলল, হা! এতে আয়িশাহ বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন। পরে তার হুশ ফিরে আসল তবে তার শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসল। অতঃপর নবী (ﷺ) এসে জিজ্ঞেস করলেন, তার কী হল? আমি বললাম, তার সম্পর্কে যা কিছু রটেছে তাতে সে (মনে) আঘাত পেয়েছে ফলে সে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। এ সময় আয়িশাহ উঠে বসলেন, আর বলতে লাগলেন, আল্লাহর কসম, আমি যদি কসম খেয়ে বলি তবুও আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না আর যদি উযর পেশ করি তাও আপনারা আমার উযর শুনবেন না। অতএব এখন আমার ও আপনাদের উপমা হল ইয়াকুব এবং তার ছেলেদের মতো। আপনারা যা বর্ণনা করেছেন সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহর নিকটই সাহায্য চাওয়া হল। অতঃপর নবী (ﷺ) ফিরে চলে গেলেন এবং আল্লাহ যা নাযিল করার তা নাযিল করলেন। তখন নবী (ﷺ) এসে আয়িশাহ-কে এ খবর জানালেন। আয়িশাহ বললেন, আমি একমাত্র আল্লাহরই প্রশংসা করব অন্য কারো প্রশংসা নয়।

উরওয়া থেকে বর্ণিত: আমি নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়েশা-কে নিম্নোক্ত আয়াতের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম: "(অবকাশ দেওয়া হবে) 'যতক্ষণ না রসূলগণ (তাদের সম্প্রদায়ের) আশা ছেড়ে দেন এবং মনে করেন যে তারা অস্বীকার করেছে। তাদের লোকেরা) ..............." (12.110) আয়িশা উত্তর দিলেন, "সত্যিই, তাদের জাতি তাদের বিশ্বাস করেনি।" আমি বললাম, "আল্লাহর কসম! তারা নিশ্চিত ছিল যে তাদের জাতি তাদের মিথ্যাবাদী বলে গণ্য করেছে এবং সন্দেহ করার বিষয় ছিল না।" আয়েশা বললেন, হে উরাইয়া (উরওয়া) নিঃসন্দেহে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। আমি বললাম, আয়াতটি কি এমনভাবে পাঠ করা যেতে পারে যার অর্থ এই যে রাসূলগণ ভেবেছিলেন যে আল্লাহ তাদের সাহায্য করেননি? আয়েশা বললেন, আল্লাহ না করুন! (অসম্ভব) রসূলগণ তাদের রবকে এধরনের ব্যাপারে সন্দেহ করেননি। কিন্তু এই আয়াতটি রাসূলগণদের অনুসারীদের সম্পর্কে যারা তাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাদের রাসূলদের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং তাদের পরীক্ষার সময়কাল ছিল দীর্ঘ। এবং আল্লাহর সাহায্য বিলম্বিত হয়েছিল যতক্ষণ না রাসূলগণ তাদের জাতির মধ্যে কাফেরদের ধর্মান্তরিত হওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল এবং সন্দেহ করেছিল যে এমনকি তাদের অনুসারীরা তাদের বিশ্বাসে নড়বড়ে হয়েছে, তখন আল্লাহর সাহায্য তাদের কাছে এসেছিল।"

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, সম্মানিত ব্যক্তি- যিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, যিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, যিনি সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তিনি হলেন ইউসুফ ইবন ইয়াকুব ইবন ইসহাক ইবন ইবরাহীম।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, একদা আইয়ুব নগ্ন শরীরে গোসল করছিলেন। এমন সময় তার উপর স্বর্ণের এক ঝাঁক পঙ্গপাল পতিত হল। তিনি সেগুলো দু'হাতে ধরে কাপড়ে রাখতে লাগলেন। তখন তার রব তাকে ডেকে বললেন, হে আইয়ুব! তুমি যা দেখতে পাচ্ছ, তা থেকে কি আমি তোমাকে অমুখাপেক্ষী করে দেইনি? তিনি উত্তর দিলেন, হা, হে রব! কিন্তু আমি আপনার বরকত থেকে মুখাপেক্ষীহীন নই।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) খাদীজাহ-এর নিকট ফিরে আসলেন তার হৃদয় কাঁপছিল। তখন খাদীজাহ তাকে নিয়ে ওয়ারাকা ইবন নাওফলের নিকট গেলেন। তিনি খৃস্টান ধর্ম অবলম্বন করেছিলেন। তিনি আরবী ভাষায় ইঞ্জিল পাঠ করতেন। ওয়ারাকা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী দেখেছেন? নবী (ﷺ) তাকে সব ঘটনা জানালেন। তখন ওয়ারাকা বললেন, এতো সেই নামুস যাকে আল্লাহ তাআলা মূসা-এর নিকট নাযিল করেছিলেন। আপনার সে সময় যদি আমি পাই, তবে সর্বশক্তি দিয়ে আমি আপনাকে সাহায্য করব।

মালিক ইবন সা'সাআ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) মিরাজ রাত্রির ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তাদের নিকট এও বলেন, তিনি যখন পঞ্চম আকাশে এসে পৌছলেন, তখন হঠাৎ সেখানে হারূন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। জিবরাঈল বললেন, ইনি হলেন, হারূন তাকে সালাম করুন তখন আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, মারহাবা পুণ্যবান ভাই ও পুণ্যবান নবী।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যে রাতে আমার মিরাজ হয়েছিল, সে রাতে আমি মূসা-কে দেখতে পেয়েছি। তিনি হলেন, হালকা পাতলা দেহের অধিকারী ব্যক্তি তার চুল কোঁকড়ানো ছিল না। মনে হচ্ছিল তিনি যে ইয়ামান দেশীয় শানূআ গোত্রের জনৈক ব্যক্তি, আর আমি ঈসা-কে দেখতে পেয়েছি। তিনি হলেন মধ্যম দেহবিশিষ্ট, গায়ের রং ছিল লাল। যেন তিনি এক্ষুণি গোসলখানা হতে বের হলেন। আর ইব্রাহীম-এর বংশধরদের মধ্যে তার সঙ্গে আমার চেহারার মিল সবচেয়ে বেশি। অতঃপর আমার সম্মুখে দু'টি পেয়ালা আনা হল। তার একটিতে ছিল দুধ আর অপরটিতে ছিল শরাব। তখন জিব্রাঈল বললেন, এ দু'টির মধ্যে যেটি চান আপনি পান করতে পারেন। আমি দুধের পেয়ালাটি নিলাম এবং তা পান করলাম। তখন বলা হল, আপনি স্বভাব প্রকৃতিকে বেছে নিয়েছেন। দেখুন, আপনি যদি শরাব নিয়ে নিতেন, তাহলে আপনার উম্মাতগণ পথভ্রষ্ট হয়ে যেত।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কোন ব্যক্তির এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, আমি (নবী) ইউনুস ইবন মাত্তার চেয়ে উত্তম। নবী (ﷺ) এ কথা বলতে গিয়ে ইউনুস-এর পিতার নাম উল্লেখ করেছেন।

আর নবী (ﷺ) মিরাজের রাতের কথাও উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন মূসা বাদামী রং বিশিষ্ট দীর্ঘদেহী ছিলেন। যেন তিনি শানু'আহ গোত্রের লোকদের মত। তিনি আরো বলেছেন যে, ঈসা ছিলেন মধ্যমদেহী, কোঁকড়ানো চুলওয়ালা ব্যক্তি। আর তিনি (নবী (ﷺ)) জাহান্নামের দারোগা মালিক এবং দাজ্জালের কথাও উল্লেখ করেছেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি মদিনাবাসীকে এমনভাবে পেলেন যে, তারা একদিন সওম পালন করে সে দিনটি হল 'আশুরার দিন। তারা বলল, এটি একটি মহান দিবস। এ এমন দিন যে দিনে আল্লাহ মূসা-কে নাজাত দিয়েছেন এবং ফিরআউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর মূসা শুকরিয়া হিসেবে এদিন সওম পালন করেছেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তাদের তুলনায় আমি হলাম মূসা-এর অধিক নিকটবর্তী। কাজেই তিনি নিজেও এদিন সওম পালন করেছেন এবং এদিন সওম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুশ হবে। অতঃপর সর্বপ্রথম আমারই হুশ আসবে। তখন আমি মূসা-কে দেখতে পাব যে, তিনি আরশের খুটিগুলোর একটি খুটি ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, আমার আগেই কি তার হুশ আসল, না-কি তুর পাহাড়ে বেহুশ হবার প্রতিদান তাকে দেয়া হল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যদি বনী ইসরাঈল না হত, তবে গোশ্ত পচে যেত না। আর যদি (মা) হাওয়া না হতেন, তাহলে কক্ষণও কোন নারী তার স্বামীর খেয়ানত করত না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি এবং হুর ইবন কাযেস ফাযারী মূসা-এর সাথীর ব্যাপারে বিতর্ক করছিলেন। ইবন আব্বাস বলেন, তিনি হলেন, খাযির। এমনি সময় উবাই ইবন কা'ব তাদের উভয়ের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন ইবন আব্বাস তাকে ডাকলেন এবং বললেন, আমি এবং আমার এ সাথী মূসা-এর সাথী সম্পর্কে বিতর্ক করছি, যার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মূসা পথের সন্ধান চেয়েছিলেন। আপনি কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে তার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হা। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, মূসা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার নিকট জনৈক ব্যক্তি আসল এবং জিজ্ঞেস করল, আপনি কি এমন কাউকে জানেন, যিনি আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, না। তখন মূসা-এর প্রতি আল্লাহ ওয়াহী পাঠিয়ে জানিয়ে দিলেন, হা, আমার বান্দা খাযির। তখন মূসা তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পথের সন্ধান চেয়েছিলেন। তখন তার জন্য একটি মাছ নিদর্শন হিসেবে ঠিক করে দেয়া হল এবং তাকে বলে দেয়া হল, যখন তুমি মাছটি হারাবে, তখন তুমি পিছনে ফিরে আসবে, তাহলেই তুমি তার সাক্ষাৎ পাবে। আরপর মূসা নদীতে মাছের পিছে পিছে চলছিলেন, এমন সময় মূসা-কে তার খাদিম বলে উঠল, "আপনি কি লক্ষ্য করেছেন। আমরা যখন ঐ পাথরটির নিকট অবস্থান করছিলাম, তখন আমি মাছটির কথা ভুলে গিয়েছিলাম। বস্তুতঃ তার হতে একমাত্র শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল"- (কাহ্ফ ৬৩)। মূসা বললেন, আমরা তো সে স্থানেরই খোজ করছিলাম। অতএব তারা উভয়ে পিছনে ফিরে চললেন, এবং খাযিরের সাক্ষাৎ পেলেন- (কাহ্ফ ৬৪) তাদের উভয়েরই অবস্থার বর্ণনা ঠিক তাই যা আল্লাহ তার কিতাবে বর্ণনা করেছেন।

সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস-কে বললাম, নাওফল বিক্কালী ধারণা করছে যে, খাযিরের সঙ্গী মূসা বনী ইসরাঈলের নবী মূসা নন; নিশ্চই তিনি অপর কোন মূসা। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা কথা বলেছে। উবাই ইবন কা'ব নবী (ﷺ) হতে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, একবার মূসা বনী ইসরাঈলের এক সমাবেশে ভাষণ দেয়ার জন্য দাড়িয়েছিলেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি সবচেয়ে অধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন, আমি। মূসা-এর এ উত্তরে আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। কেননা তিনি জ্ঞানকে আল্লাহর দিকে সম্পর্কিত করেননি। আল্লাহ তাকে বললেন, বরং দুই নদীর সংযোগ স্থলে আমার একজন বান্দা আছে, সে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। মূসা আরয করলেন, হে আমার রব! তার নিকট পৌছতে কে আমাকে সাহায্য করবে? কখনও সুফ্ইয়ান এভাবে বর্ণনা করেছেন, হে আমার রব! আমি তার সঙ্গে কিভাবে সাক্ষাৎ করব? আল্লাহ বললেন, তুমি একটি মাছ ধর এবং তা একটি থলের মধ্যে ভরে রাখ। যেখানে গিয়ে তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তিনি অবস্থান করছেন। অতঃপর মূসা একটি মাছ ধরলেন এবং থলের মধ্যে ভরে রাখলেন। অতঃপর তিনি এবং তার সাথী ইউশা ইবন নূন চলতে লাগলেন অবশেষে তারা উভয়ে একটি পাথরের নিকট এসে পৌছে তার উপরে উভয়ে মাথা রেখে বিশ্রাম করলেন। এ সময় মূসা ঘুমিয়ে পড়লেন আর মাছটি নড়াচড়া করতে করতে থলে হতে বের হয়ে নদীতে চলে গেল। অতঃপর সে নদীতে সুড়ঙ্গ আকারে স্বীয় পথ করে নিল আর আল্লাহ মাছটির চলার পথে পানির গতি স্তব্ধ করে দিলেন। ফলে তার গমন পথটি সুড়ঙ্গের মত হয়ে গেল। এ সময় নবী (ﷺ) হাতের ইঙ্গিত করে বললেন, এভাবে সুড়ঙ্গের মত হয়েছিল। অতঃপর তারা উভয়ে অবশিষ্ট রাত এবং পুরো দিন পথ চললেন। শেষে যখন পরের দিন ভোর হল তখন মূসা তার যুবক সঙ্গীকে বললেন, আমার সকালের খাবার আন। আমি এ সফরে খুব ক্লান্তিবোধ করছি। বস্তুতঃ মূসা যে পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশিত স্থানটি অতিক্রম না করছেন সে পর্যন্ত তিনি সফরে কোন ক্লান্তিই অনুভব করেননি। তখন তার সঙ্গী তাকে বললেন, আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন সেই পাথরটির নিকট বিশ্রাম নিয়েছিলাম মাছটি চলে যাবার কথা বলতে আমি একেবারেই ভুলে গেছি। আসলে আপনার নিকট তা উল্লেখ করতে একমাত্র শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে। মাছটি নদীতে আশ্চর্যজনকভাবে নিজের রাস্তা করে নিয়েছে। (রাবী বলেন) পথটি মাছের জন্য ছিল একটি সুড়ঙ্গের মত আর তাদের জন্য ছিল একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার। মূসা তাকে বললেন, ওটাইতো সেই স্থান যা আমরা খুজে বেড়াচ্ছি। অতঃপর উভয়ে নিজ নিজ পদচিহ্ন ধরে পিছনের দিকে ফিরে চললেন, শেষ পর্যন্ত তারা দু'জনে সেই পাথরটির নিকট এসে পৌছলেন এবং দেখলেন সেখানে জনৈক ব্যক্তি বস্ত্রাবৃত হয়ে আছেন। মূসা তাকে সালাম করলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, এখানে সালাম কী করে এলো? তিনি বললেন, আমি মূসা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বনী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হা, আমি আপনার নিকট এসেছি, সরল সঠিক জ্ঞানের ঐ সব কথাগুলো শিখার জন্যে যা আপনাকে শিখানো হয়েছে। তিনি বললেন, হে মূসা! আমার আল্লাহর দেয়া কিছু জ্ঞান আছে যা আল্লাহ আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, আপনি তা জানেন। আর আপনারও আল্লাহ প্রদত্ত কিছু জ্ঞান আছে, যা আল্লাহ আপনাকে শিখিয়েছেন, আমি তা জানি না। মূসা বললেন, আমি কি আপনার সাথী হতে পারি? খাযির বললেন, আপনি আমার সঙ্গে থেকে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না আর আপনি এমন বিষয়ে ধৈর্য রাখবেন কী করে, যার রহস্য আপনার জানা নেই? মূসা বললেন, ইন্শা আল্লাহ আপনি আমাকে একজন ধৈর্যশীল হিসেবে দেখতে পাবেন। আমি আপনার কোন আদেশই অমান্য করব না। অতঃপর তারা দু'জনে রওয়ানা হয়ে নদীর তীর দিয়ে চলতে লাগলেন। এমন সময় একটি নৌকা তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদেরকেও নৌকায় উঠিয়ে নিতে অনুরোধ করলেন। তারা খাযির-কে চিনে ফেললেন এবং তারা তাকে তার সঙ্গীসহ পারিশ্রমিক ছাড়াই নৌকায় তুলে নিল। তারা দু'জন যখন নৌকায় উঠলেন, তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকাটির এক পাশে বসল এবং একবার কি দু'বার নদীর পানিতে ঠোঁট ডুবাল। খাযির বললেন, হে মূসা! আমার এবং তোমার জ্ঞানের দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান হতে ততটুকুও কমেনি যতটুকু এ পাখিটি তার ঠোঁটের দ্বারা নদীর পানি হ্রাস করেছে। অতঃপর খাযির হঠাৎ একটি কুঠার নিয়ে নৌকার একটি তক্তা খুলে ফেললেন, মূসা অকস্মাৎ দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেলেন তিনি কুঠার দিয়ে একটি তক্তা খুলে ফেলেছেন। তখন তাকে তিনি বললেন, আপনি এ কী করলেন? লোকেরা আমাদের মজুরি ছাড়া নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি তাদের নৌকার যাত্রীদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকাটি ফুটো করে দিলেন? এতো আপনি একটি গুরুতর কাজ করলেন। খাযির বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি কখনও আমার সঙ্গে ধৈর্যধারণ করতে পারবেন না? মূসা বললেন, আমি যে বিষয়টি ভুলে গেছি, তার জন্য আমাকে দোষারোপ করবেন না। আর আমার এ ব্যবহারে আমার প্রতি কঠোর হবেন না। মূসা-এর পক্ষ হতে প্রথম এই কথাটি ছিল ভুলক্রমে। অতঃপর যখন তারা উভয়ে নদী পার হয়ে আসলেন, তখন তারা একটি বালকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন সে অন্যান্য বালকদের সঙ্গে খেলছিল। খাযির তার মাথা ধরলেন এবং নিজ হাতে তার ঘাড় আলাদা করে ফেললেন। এ কথাটি বুঝানোর জন্য সুফ্ইয়ান তার হাতের আঙ্গুলগুলোর অগ্রভাগ দ্বারা এমনভাবে ইঙ্গিত করলেন যেন তিনি কোন জিনিস ছিঁড়ে নিচ্ছিলেন। এতে মূসা তাকে বললেন, আপনি একটি নিষ্পাপ বালককে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? নিশ্চই আপনি একটি অন্যায় কাজ করলেন। খাযির বললেন, আমি কি আপনাকে বলিনি যে আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরতে পারবেন না? মূসা বললেন, অতঃপর যদি আমি আপনাকে আর কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করি তাহলে আপনি আমাকে আর আপনার সাথে রাখবেন না। কেননা আপনার উযর আপত্তি চূড়ান্ত হয়েছে। অতঃপর তারা চলতে লাগলেন শেষ অবধি তারা এক জনপদে এসে পৌছলেন। তারা গ্রামবাসীদের নিকট খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা তাদের আতিথ্য করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানেই একটি দেয়াল দেখতে পেলেন যা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তা একদিকে ঝুকে গিয়েছিল। খাযির তা নিজের হাতে সোজা করে দিলেন। রাবী আপন হাতে এভাবে ইঙ্গিত করলেন। আর সুফ্ইয়ান এমনিভাবে ইঙ্গিত করলেন যেন তিনি কোন জিনিস উপরের দিকে উচু করে দিচ্ছেন। "ঝুকে পড়েছে" এ কথাটি আমি সুফ্ইয়ানকে মাত্র একবার বলতে শুনেছি। মূসা বললেন, তারা এমন মানুষ যে, আমরা তাদের নিকট আসলাম, তারা আমাদেরকে না খাবার দিল, না আমাদের আতিথ্য করল আর আপনি এদের দেয়াল সোজা করতে গেলেন। আপনি ইচ্ছা করলে এর বদলে মজুরি গ্রহণ করতে পারতেন। খাযির বললেন, এখানেই আপনার ও আমার মধ্যে বিচ্ছেদ হল। তবে এখনই আমি আপনাকে জ্ঞাত করছি ওসব কথার রহস্য, যেসব বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধরতে পারেননি। নবী (ﷺ) বলেছেন, আমাদেরতো ইচ্ছা যে, মূসা ধৈর্য ধরলে আমাদের নিকট তাদের আরো অনেক অধিক খবর বর্ণনা করা হতো। সুফ্ইয়ান বর্ণনা করেন নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ মূসা-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তিনি যদি ধৈর্য ধরতেন, তাহলে তাদের উভয়ের ব্যাপারে আমাদের নিকট আরো অনেক ঘটনা জানানো হতো। রাবী বলেন, ইবন আব্বাস এখানে পড়েছেন, তাদের সামনে একজন বাদশাহ ছিল, সে প্রতিটি নিখুত নৌকা জোর করে ছিনিয়ে নিত। আর সে ছেলেটি ছিল কাফির, তার পিতা-মাতা ছিলেন মুমিন। অতঃপর সুফ্ইয়ান আমাকে বলেছেন, আমি এ হাদীসটি তার (আমর ইবন দ্বীনার) হতে দু'বার শুনেছি এবং তার নিকট হতেই মুখস্থ করেছি। সুফ্ইয়ান -কে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কি আমর ইবন দ্বীনার হতে শুনার পূর্বেই তা মুখস্থ করেছেন না অপর কোন লোকের নিকট শুনে তা মুখস্থ করেছেন? তিনি বললেন, আমি কার নিকট হতে তা মুখস্থ করতে পারি? আমি ব্যতীত আর কেউ কি এ হাদীস আমরের নিকট হতে বর্ণনা করেছেন? আমি তার নিকট হতে শুনেছি দুইবার কি তিনবার। আর তার থেকেই তা মুখস্থ করেছি।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, খাযির-কে খাযির নামে আখ্যায়িত করার কারণ এই যে, একদা তিনি ঘাস-পাতা বিহীন শুকনো সাদা জায়গায় বসেছিলেন। সেখান হতে তার উঠে যাবার পরই হঠাৎ ঐ জায়গাটি সবুজ হয়ে গেল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, বনী ইসরাঈলকে আদেশ দেয়া হয়েছিল, "তোমরা দরজা দিয়ে অবনত মস্তকে প্রবেশ কর আর মুখে বল, 'হিত্তাতুন' (হে আল্লাহ! আমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দাও।)" (আল-বাকারাহঃ ৫৮) কিন্তু তারা এ শব্দটি পরিবর্তন করে ফেলল এবং প্রবেশ দ্বারে যেন নতজানু হতে না হয় সে জন্য তারা নিজ নিজ নিতম্বের ওপর ভর দিয়ে শহরে প্রবেশ করল আর মুখে বলল, 'হাববাতুন্ ফী শা'আরাতিন" (হে আল্লাহ! আমাদেরকে যবের দানা দাও।)

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, মূসা অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন, সব সময় শরীর ঢেকে রাখতেন। তার দেহের কোন অংশ খোলা দেখা যেত না, তা থেকে তিনি লজ্জাবোধ করতেন। বনী ইসরাঈলের কিছু লোক তাকে খুব কষ্ট দিত। তারা বলত, তিনি যে শরীরকে এত অধিক ঢেকে রাখেন, তার একমাত্র কারণ হলো, তার শরীরে কোন দোষ আছে। হয়ত শ্বেত রোগ অথবা একশিরা বা অন্য কোন রোগ আছে। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলেন মূসা সম্পর্কে তারা যে অপবাদ ছড়িয়েছে তা হতে তাকে মুক্ত করবেন। অতঃপর একদিন নিরালায় গিয়ে তিনি একাকী হলেন এবং তার পরণের কাপড় খুলে একটি পাথরের ওপর রাখলেন, অতঃপর গোসল করলেন, গোসল সেরে যেমনই তিনি কাপড় নেয়ার জন্য সেদিকে এগিয়ে গেলেন তার কাপড়সহ পাথরটি ছুটে চলল। অতঃপর মূসা তার লাঠিটি হাতে নিয়ে পাথরটির পেছনে পেছনে ছুটলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমার কাপড় হে পাথর! হে পাথর! শেষে পাথরটি বনী ইসরাঈলের একটি জন সমাবেশে গিয়ে পৌছল। তখন তারা মূসা-কে বস্ত্রহীন অবস্থায় দেখল যে তিনি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সৌন্দর্যে ভরপুর এবং তারা তাকে যে অপবাদ দিয়েছিল সে সব দোষ হতে তিনি পুরোপুরি মুক্ত। আর পাথরটি থামল, তখন মূসা তার কাপড় নিয়ে পরলেন এবং তার হাতের লাঠি দিয়ে পাথরটিকে জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলেন। আল্লাহর কসম! এতে পাথরটিতে তিন, চার, কিংবা পাচটি আঘাতের দাগ পড়ে গেল। আর এটিই হলো আল্লাহর এ বাণীর মর্মঃ "হে মুমিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা মূসা-কে কষ্ট দিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ তাকে নির্দোষ প্রমাণিত করেন তা হতে যা তারা রটিয়েছিল। আর তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকট মর্যাদার অধিকারী।" (আল-আহযাবঃ ৬৯)

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদা কিছু জিনিস বণ্টন করেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, এতো এমন ধরনের বণ্টন যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা হয়নি। অতঃপর আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট আসলাম এবং তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি খুব অসন্তুষ্ট হলেন, এমনকি তার চেহারায় আমি অসন্তুষ্টির ভাব লক্ষ্য করলাম। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ মূসা-এর প্রতি রহম করুন তাকে এর চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট দেয়া হয়েছিল, তবুও তিনি ধৈর্য অবলম্বন করেছিলেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে 'কাবাস' (পিলু) গাছের পাকা ফল বেছে বেছে নিচ্ছিলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, এর মধ্যে কালোগুলো নেয়াই তোমাদের উচিত। কেননা এগুলোই অধিক সুস্বাদু। সাহাবীগণ বললেন, আপনি কি ছাগল চরিয়েছিলেন? তিনি বললেন, প্রত্যেক নবীই তা চরিয়েছেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মালাকুলকে মূসা-এর নিকট তার জন্য পাঠান হয়েছিল। ফেরেশতা যখন তার নিকট আসলেন, তিনি তার চোখে চপেটাঘাত করলেন। তখন ফেরেশতা তার রবের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। আল্লাহ বললেন, তুমি তার নিকট ফিরে যাও এবং তাকে বল সে যেন তার একটি হাত একটি গরুর পিঠে রাখে, তার হাত যতগুলো পশম ঢাকবে তার প্রতিটি পশমের বদলে তাকে এক বছর করে জীবন দেয়া হবে। মূসা বললেন, হে রব! অতঃপর কী হবে? আল্লাহ বললেন, অতঃপর মৃত্যু। মূসা বললেন, তাহলে এখনই হোক। (রাবী) বলেন, তখন তিনি আল্লাহর নিকট আরয করলেন, তাকে যেন 'আরদে মুকাদ্দাস' হতে একটি পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে পৌছে দেয়া হয়। আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমি যদি সেখানে থাকতাম তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পথের ধারে লাল টিলার নীচে তার কবরটি দেখিয়ে দিতাম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন মুসলিম আর একজন ইয়াহূদী পরস্পরকে গালি দিল। মুসলিম ব্যক্তি বললেন, সেই সত্তার কসম! যিনি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে তামাম জগতের উপর মনোনীত করেছেন। কসম করার সময় তিনি একথাটি বলেছেন। তখন ইয়াহূদী লোকটিও বলল, ঐ সত্তার কসম! যিনি মূসা-কে তামাম জগতের উপর মনোনীত করেছেন। তখন সেই মুসলিম সাহাবী সে সময় তার হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীকে একটি চড় মারলেন। তখন সে ইয়াহূদী নবী (ﷺ)-এর নিকট গেল এবং ঘটনাটি জানালো যা তার ও মুসলিম সাহাবীর মধ্যে ঘটেছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা আমাকে মূসা-এর উপর বেশি মর্যাদা দিওনা। সকল মানুষ বেহুশ হয়ে যাবে। আর আমিই সর্বপ্রথম হুশ ফিরে পাব। তখনই আমি মূসা-কে দেখব, তিনি আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, যারা বেহুশ হয়েছিল, তিনিও কি তাদের অন্তর্ভুক্ত অতঃপর আমার আগে তার হুশ এসে গেছে? কিংবা তিনি তাদেরই একজন, যাদেরকে আল্লাহ বেহুঁশ হওয়া থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আদম ও মূসা তর্ক-বিতর্ক করছিলেন। তখন মূসা তাকে বলছিলেন, আপনি সেই আদম যে আপনার ভুল আপনাকে বেহেশত হতে বের করে দিয়েছিল। আদম তাকে বললেন, আপনি সেই মূসা যে, আপনাকে আল্লাহ তার রিসালাত দান এবং বাক্যালাপ দ্বারা সম্মানিত করেছিলেন। অতঃপরও আপনি আমাকে এমন বিষয়ে দোষী করছেন, যা আমার সৃষ্টির আগেই আমার জন্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু'বার বলেছেন, এ বিতর্কে আদম মূসা-এর ওপর বিজয়ী হন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী (ﷺ) আমাদের সামনে আসলেন এবং বললেন, আমার নিকট সকল নবীর উম্মাতকে পেশ করা হয়েছিল। তখন আমি একটি বিরাট দল দেখলাম, যা দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত আবৃত করে ফেলেছিল। তখন বলা হলো, ইনি হলেন মূসা তার কওমের মাঝে।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, পুরুষের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছেন। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম ব্যতীত আর কেউ পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। তবে আয়িশাহর মর্যাদা সব মহিলার উপর এমন, যেমন সারীদের (গোশতের সুরুয়ায় ভিজা রুটির) মর্যাদা সকল প্রকার খাদ্যের উপর।

আবদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এরূপ না বলে যে, আমি মুহাম্মদ (ﷺ) ইউনুস হতে উত্তম। মুসাদ্দাদ অতিরিক্ত বললেন, ইউনুস ইবন মাত্তা।

ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কারো জন্য এ কথা বলা উচিত নয় যে, নিশ্চই আমি (মুহাম্মদ) ইউনুস ইবন মাত্তা হতে উত্তম। আর নবী (ﷺ) তাকে (ইউনুসকে) তার পিতার দিকে সম্পর্কিত করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার এক ইয়াহূদী তার কিছু দ্রব্য সামগ্রী বিক্রির জন্য পেশ করছিল, তার বিনিময়ে তাকে এমন কিছু দেয়া হলো যা সে পছন্দ করল না। তখন সে বলল, না! সেই সত্তার কসম, যে মূসা-কে মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন। এ কথাটি একজন আনসারী শুনলেন, তিনি দাড়িয়ে গেলেন। আর তার মুখের উপর এক চড় মারলেন। আর বললেন, তুমি বলছো, সেই সত্তার কসম! যিনি মূসাকে মানব জাতির উপর মর্যাদা দান করেছেন অথচ নবী (ﷺ) আমাদের মধ্যে অবস্থান করছেন। তখন সে ইয়াহূদী লোকটি নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলো এবং বলল, হে আবুল কাসিম! নিশ্চই আমার জন্য নিরাপত্তা এবং অঙ্গীকার রয়েছে আমি একজন যিম্মী। অমুক ব্যক্তি কী কারণে আমার মুখে চড় মারলো? তখন নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন তুমি তার মুখে চড় মারলে? আনসারী লোকটি ঘটনা বর্ণনা করলো। তখন নবী (ﷺ) রাগান্বিত হলেন। এমনকি তার চেহারায় তা দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহর নবীগণের মধ্যে কাউকে কারো উপর মর্যাদা দান করো না। কেননা কিয়ামতের দিন যখন শিংগায় ফুক দেয়া হবে, তখন আল্লাহ যাকে চাইবেন সে ছাড়া আসমান ও যমীনের বাকী সবাই বেহুশ হয়ে যাবে। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাতে ফুক দেয়া হবে। তখন সর্বপ্রথম আমাকেই উঠানো হবে। তখনই আমি দেখতে পাব মূসা আরশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তূর পর্বতের ঘটনার দিন তিনি যে বেহুশ হয়েছিলেন, এটা কি তারই বিনিময়, না আমার আগেই তাকে বেহুশি থেকে উঠানো হয়েছে?

আর আমি এ কথাও বলি না যে কোন ব্যক্তি ইউনুস ইবন মাত্তার চেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী।

আবূ হুরাযরা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কোন বান্দার জন্যই এ কথা বলা সমীচীন নয় যে, আমি (মুহাম্মদ) ইউনুস ইবন মাত্তার থেকে উত্তম।

আবূ হুরাযরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, দাউদ-এর জন্য কুরআন (যাবুর) তিলাওয়াত সহজ করে দেয়া হয়েছিল। তিনি তার পশুযানে গদি বাধার আদেশ করতেন, তখন তার উপর গদি বাধা হতো। অতঃপর তার পশুযানের ওপর গদি বাধার পূর্বেই তিনি যাবুর তিলাওয়াত করে শেষ করে ফেলতেন। তিনি নিজ হাতে উপার্জন করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন 'আমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে জানান হলো যে, আমি বলছি, আল্লাহর কসম! আমি যতদিন বেচে থাকব ততদিন অবশ্যই আমি অবিরত দিনে সওম পালন করবো আর রাতে ইবাদাতে রত থাকবো। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি বলেছো, 'আল্লাহর শপথ! আমি যতদিন বাচবো, ততদিন দিনে সওম পালন করবো এবং রাতে ইবাদাতে মশগুল থাকবো। আমি আরয করলাম, আমিই তা বলেছি। তিনি বললেন, সেই শক্তি তোমার নেই। কাজেই সওমও পালন কর, ইফ্তারও কর। রাতে ইবাদাতও কর এবং ঘুমও যাও। আর প্রতি মাসে তিন দিন সওম পালন কর। কেননা প্রতিটি নেক কাজের কমপক্ষে দশগুণ সাওয়াব পাওয়া যায় আর এটা সারা বছর সওম পালন করার সমান। তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এর থেকেও অধিক সওম পালন করার ক্ষমতা রাখি। তখন তিনি বললেন, তাহলে তুমি একদিন সওম পালন কর আর দু'দিন ইফ্তার কর। তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ থেকেও অধিক পালন করার শক্তি রাখি। তখন তিনি বললেন, তাহলে একদিন সওম পালন কর আর একদিন বিরতি দাও। এটা দাউদ-এর সওম পালনের নিয়ম। আর এটাই সওম পালনের উত্তম নিয়ম। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এ থেকেও অধিক শক্তি রাখি। তিনি বললেন, এ থেকে বেশি কিছু নেই।

আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি জ্ঞাত হইনি যে, তুমি রাত ভর ইবাদাত কর এবং দিন ভর সওম পালন কর! আমি বললাম, হা। তিনি বললেন, যদি তুমি এমন কর; তবে তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং দেহ ক্লান্ত হয়ে যাবে। কাজেই প্রতি মাসে তিন দিন সওম পালন কর। তাহলে তা সারা বছরের সওমের সমতুল্য হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমি আমার মধ্যে আরো অধিক পাই। মিসআর বলেন, এখানে শক্তি বুঝানো হয়েছে। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তাহলে তুমি দাউদ-এর নিয়মে সওম পালন কর। তিনি একদিন সওম পালন করতেন আর একদিন বিরত থাকতেন। আর শত্রুর মুখোমুখী হলে তিনি কখনও পালিয়ে যেতেন না।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বলেছেন, আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় সওম হলো দাঊদ-এর নিয়মে সওম পালন করা। তিনি একদিন সওম পালন করতেন আর একদিন বিরত থাকতেন। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় সালাত হলো দাঊদ-এর নিয়মে সালাত আদায় করা। তিনি রাতের অর্ধাংশ ঘুমাতেন, রাতের এক তৃতীয়াংশ সালাতে দাড়াতেন আর বাকী ষষ্ঠাংশ আবার ঘুমাতেন।

মুজাহিদ বর্ণনা করেছেন: আমি ইবন আব্বাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, সূরা সাদ পাঠ করে কি সিজদা করা উচিত? তিনি (সুরা) পাঠ করলেন যার মধ্যে রয়েছে: 'এবং তার বংশধরদের মধ্যে দাউদ, সোলায়মান... (পর্যন্ত)... সুতরাং তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন (6.84-91) এবং তারপর তিনি বললেন, আপনার নবী সেই লোকদের মধ্যে রয়েছেন যারা তাদের (পূর্ববর্তী প্রেরিতদের) অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূরা ছোয়াদের সিজ্দা একান্ত জরুরী নয়। কিন্তু আমি নবী (ﷺ)-কে এ সূরায় সিজ্দা করতে দেখেছি।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, একটি অবাধ্য জ্বিন এক রাতে আমার সালাতে বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আমার নিকট আসল। আল্লাহ আমাকে তার উপর ক্ষমতা প্রদান করলেন। আমি তাকে ধরলাম এবং মসজিদের একটি খুটির সঙ্গে বেধে রাখার ইচ্ছে করলাম, যাতে তোমরা সবাই স্বচক্ষে তাকে দেখতে পাও। তখনই আমার ভাই সুলায়মান-এর এ দোয়াটি আমার মনে পড়লো। হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন রাজ্য দান করুন, যা আমি ছাড়া আর কারও ভাগ্যে যেন না জোটে- (সোয়াদ ৩৫)। অতঃপর আমি জ্বিনটিকে ব্যর্থ এবং লাঞ্ছিত করে ছেড়ে দিলাম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, সুলায়মান ইবন দাঊদ বলেছিলেন, আজ রাতে আমি আমার সত্তর জন স্ত্রীর নিকট যাব। প্রত্যেক স্ত্রী একজন করে অশ্বারোহী যোদ্ধা গর্ভধারণ করবে। এরা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। তখন তার সাথী বললেন, ইন্শা আল্লাহ। কিন্তু তিনি মুখে তা বললেন না। অতঃপর একজন স্ত্রী ছাড়া কেউ গর্ভধারণ করলেন না। সে যাও এক (পুত্র) সন্তান প্রসব করলেন যার এক অঙ্গ ছিল না। নবী (ﷺ) বললেন, তিনি যদি 'ইন্শা আল্লাহ' মুখে বলতেন, তাহলে আল্লাহর পথে জিহাদ করতো। শুআয়ব এবং ইবন আবূ যিনাদ এখানে নব্বই জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছেন আর এটাই সঠিক।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সর্বপ্রথম কোন মাসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, এ দু'য়ের নির্মাণের মাঝখানে কত তফাৎ? তিনি বললেন, চল্লিশ (বছরের) (অতঃপর তিনি বললেন,) যেখানেই তোমার সালাতের সময় হবে, সেখানেই তুমি সালাত আদায় করে নিবে। কারণ, পৃথিবীটাই তোমার জন্য মাসজিদ।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমার ও অন্যান্য মানুষের দৃষ্টান্ত হলো এমন যেমন কোন এক ব্যক্তি আগুন জ্বালাল এবং তাতে পতঙ্গ এবং পোকামাকড় ঝাঁকে ঝাঁকে পড়তে লাগল।

আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, দু'জন মহিলা ছিল। তাদের সাথে দু'টি সন্তানও ছিল। হঠাৎ একটি বাঘ এসে তাদের একজনের ছেলে নিয়ে গেল। সঙ্গের একজন মহিলা বললো, "তোমার ছেলেটিই বাঘে নিয়ে গেছে।" অন্য মহিলাটি বললো, "না, বাঘে তোমার ছেলেটি নিয়ে গেছে।" অতঃপর উভয় মহিলাই দাঊদ-এর নিকট এ বিরোধ মীমাংসার জন্য বিচারপ্রার্থী হলো। তখন তিনি ছেলেটির বিষয়ে বয়স্কা মহিলাটির পক্ষে রায় দিলেন। অতঃপর তারা উভয়ে বেরিয়ে দাউদ-এর পুত্র সুলায়মান-এর নিকট দিয়ে যেতে লাগল এবং তারা দু'জনে তাকে ব্যাপারটি জানালেন। তখন তিনি লোকদেরকে বললেন, তোমরা আমার নিকট একখানা ছোরা নিয়ে আস। আমি ছেলেটিকে দু' টুকরা করে তাদের দু'জনের মধ্যে ভাগ করে দেই। এ কথা শুনে অল্প বয়স্কা মহিলাটি বলে উঠলো, তা করবেন না, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন, ছেলেটি তারই। তখন তিনি ছেলেটি সম্পর্কে অল্প বয়স্কা মহিলাটির অনুকূলে রায় দিলেন।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাযিল হলঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুমের দ্বারা কলুষিত করেনি- (আল-আনআম ৮২)। তখন নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আছে যে, নিজের ঈমানকে জুলুমের দ্বারা কলুষিত করেনি? তখন এ আয়াত নাযিল হয়ঃ আল্লাহর সঙ্গে শরীক করো না। কেননা শির্ক হচ্ছে এক মহা জুলুম- (লুকমান ১৮)।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতে কারীমা নাযিল হলঃ যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে জুলুমের দ্বারা কলুষিত করেনি। তখন তা মুসলিমদের পক্ষে কঠিন হয়ে গেল। তারা আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আছে যে নিজের উপর য়ুল্ম করেনি? তখন নবী (ﷺ) বললেন, এখানে অর্থ তা নয় বরং এখানে জুলুমের অর্থ হলো শির্ক। তোমরা কি কুরআনে শুননি লুকমান তার ছেলেকে নাসীহাত দেয়ার সময় কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, "হে আমার বৎস! তুমি আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করো না। কেননা, নিশ্চই শির্ক এক মহা জুলুম।

মালিক ইবন সা'সা'আহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) সাহাবাগণের নিকট মিরাজের রাত্রির বর্ণনায় বলেছেন, তারপর তিনি আমাকে নিয়ে উপরে চললেন, এমনকি দ্বিতীয় আকাশে এসে পৌছলেন এবং দরজা খুলতে বললেন, জিজ্ঞেস করা হলো কে? বললেন, আমি জিব্রাঈল। প্রশ্ন হলো। আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (ﷺ)। জিজ্ঞেস করা হলো। তাকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? উত্তর দিলেন হা, অতঃপর আমরা যখন সেখানে পৌছলাম তখন সেখানে ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা-কে দেখলাম। তারা উভয়ে খালাত ভাই ছিলেন। জিব্রাঈল বললেন, এঁরা হলেন, ইয়াহ্ইয়া এবং ঈসা। তাদেরকে সালাম করুন। তখন আমি সালাম দিলাম। তারাও সালামের জবাব দিলেন। অতঃপর তারা বললেন, নেক ভাই এবং নেক নবীর প্রতি মারহাবা।

আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, এমন কোন আদম সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করে না। জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শের কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারইয়াম এবং তার ছেলে (ঈসা)-এর ব্যতিক্রম। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, "হে আল্লাহ! নিশ্চই আমি আপনার নিকট তার এবং তার বংশধরদের জন্য বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

আলী বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, সমগ্র নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারইয়াম হলেন সর্বোত্তম আর নারীদের সেরা হলেন খাদীজা।

আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, সকল নারীর উপর আয়িশাহর মর্যাদা এমন, যেমন সকল খাদ্যের উপর সারীদের মর্যাদা। পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করেছেন। কিন্তু নারীদের মধ্যে ইমরানের কন্যা মারইয়াম এবং ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া ছাড়া কেউ পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করতে পারেনি।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, কুরাইশ বংশীয়া নারীরা উটে আরোহণকারী সকল নারীদের তুলনায় উত্তম। এরা শিশু সন্তানের উপর অধিক স্নেহশীলা হয়ে থাকে আর স্বামীর সম্পদের প্রতি খুব যত্নবান হয়ে থাকে। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ্ বলেছেন, ইমরানের কন্যা মারইয়াম কখনও উটে আরোহণ করেননি।

উবাদাহ সূত্রে নবী (ﷺ) বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তার কোন শরীক নেই আর মুহাম্মাদ (ﷺ) তার বান্দা ও রাসূল আর নিশ্চই ঈসা আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল এবং তার সেই কালিমাহ যা তিনি মারইয়ামকে পৌছিয়েছেন এবং তার নিকট হতে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন। ওয়ালীদ....জুনাদাহ হতে বর্ণিত হাদীসে জুনাদাহ অতিরিক্ত বলেছেন যে, জান্নাতে আট দরজার যেখান দিয়েই সে চাইবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, তিনজন শিশু ছাড়া আর কেউ দোলনায় থেকে কথা বলেনি। প্রথম জন ঈসা, দ্বিতীয় জন বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি যাকে 'জুরাইজ' নামে ডাকা হতো। একদা ইবাদাতে রত থাকা অবস্থায় তার মা এসে তাকে ডাকল। সে ভাবল আমি কি তার ডাকে সাড়া দেব,না সালাত আদায় করতে থাকব। তার মা বলল, হে আল্লাহ! ব্যাভিচারিণীর মুখ না দেখা পর্যন্ত তুমি তাকে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তার ইবাদাতখানায় থাকত। একবার তার নিকট একটি নারী আসল। তার সঙ্গে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তা অস্বীকার করল। অতঃপর নারীটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাকে দিয়ে মনোবাসনা পূর্ণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো এটি কার থেকে? স্ত্রী লোকটি বলল, জুরাইজ থেকে। লোকেরা তার নিকট আসল এবং তার ইবাদাতখানা ভেঙ্গে দিল। আর তাকে নীচে নামিয়ে আনল ও তাকে গালি গালাজ করল। তখন জুরাইজ উযূ সেরে ইবাদাত করল। অতঃপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাকে জিজ্ঞেস করল হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল সেই রাখাল। তারা বলল, আমরা আপনার ইবাদাতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। সে বলল, না। তবে মাটি দিয়ে। (তৃতীয় জন) বনী ইসরাঈলের একজন নারী তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। নারীটি দোয়া করল, হে আল্লাহ! আমার ছেলেটি তার মত বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীটির দিকে মুখ ফিরালো। আর বলল, হে আল্লাহ! আমাকে তার মত কর না। অতঃপর মুখ ফিরিয়ে স্তন্য পান করতে লাগল। আবূ হুরাইরাহ্ বললেন, আমি যেন নবী (ﷺ)-কে দেখতে পাচ্ছি তিনি আঙ্গুল চুষছেন। অতঃপর সেই নারীটির পার্শ্ব দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। নারীটি বলল, হে আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মত করো না। শিশুটি তারক্ষণিক তার মায়ের স্তন্য ছেড়ে দিল। আর বলল, হে আল্লাহ! আমাকে তার মত কর। তার মা বলল, তা কেন? শিশুটি বলল, সেই আরোহীটি ছিল যালিমদের একজন। আর এ দাসীটির ব্যাপারে লোকে বলেছে তুমি চুরি করেছ, যিনা করেছ। অথচ সে কিছুই করেনি।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, মিরাজের রাতে আমি মূসা-এর দেখা পেয়েছি। আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, নবী (ﷺ) মূসা -এর আকৃতি বর্ণনা করেছেন। মূসা একজন দীর্ঘদেহধারী, মাথায় কোঁকড়ানো চুলবিশিষ্ট, যেন শানুআ গোত্রের একজন লোক। নবী (ﷺ) বলেন, আমি ঈসা -এর দেখা পেয়েছি। অতঃপর তিনি তার চেহারা বর্ণনা করে বলেছেন, তিনি হলেন মাঝারি গড়নের গৌর বর্ণবিষ্টি, যেন তিনি এই মাত্র হাম্মামখানা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। আর আমি ইব্রাহীম-কেও দেখেছি। তার সন্তানদের মধ্যে আকৃতিতে আমিই তার অধিক সদৃশ। নবী (ﷺ) বলেন, অতঃপর আমার সামনে দু'টি পেয়ালা আনা হল। একটিতে দুধ, অপরটিতে শরাব। আমাকে বলা হলো, আপনি যেটি ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। আমি দুধের বাটিটি গ্রহণ করলাম আর তা পান করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, আপনি ফিত্রাত বা স্বভাবকেই গ্রহণ করে নিয়েছেন। দেখুন! আপনি যদি শরাব গ্রহণ করতেন, তাহলে আপনার উম্মাত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আমি ঈসা, মূসা ও ইব্রাহীম-কে দেখেছি। ঈসা গৌর বর্ণ, কোঁকড়ানো চুল এবং প্রশস্ত বুকবিশিষ্ট লোক ছিলেন, মূসা বাদামী রঙের ছিলেন, তার দেহ ছিল সুঠাম এবং মাথার চুল ছিল সোজা যেন 'যুত' গোত্রের একজন মানুষ।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ ট্যারা নন। সাবধান! মাসীহ দাজ্জালের ডান চোখ ট্যারা। তার চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের মত।

আমি এক রাতে স্বপ্নে নিজেকে কাবার নিকট দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার থেকেও অধিক সুন্দর ছিলেন তিনি। তার মাথার সোজা চুল, তার দু'স্কন্ধ পর্যন্ত ঝুলছিল। তার মাথা হতে পানি ফোঁটা ফোঁটা পড়ছিল। তিনি দু'জন লোকের স্কন্ধে হাত রেখে কাবা তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তারা জবাব দিলেন, ইনি হলেন, মসীহ ইবন মারইয়াম। অতঃপর তার পেছনে অন্য একজন লোককে দেখলাম। তার মাথায় চুল ছিল বেশ কোঁকড়ানো, ডান চোখ ট্যারা, আকৃতিতে সে আমার দেখা মত ইবন কাতানের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু'স্কন্ধে ভর দিয়ে কাবার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? তারা বললেন, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।

সালিম এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! নবী (ﷺ) এ কথা বলেননি যে ঈসা লাল বর্ণের ছিলেন। বরং বলেছেন, একদা আমি স্বপ্নে কাবা ঘর তাওয়াফ করছিলাম। হঠাৎ সোজা চুল ও বাদামী রঙের জনৈক ব্যক্তিকে দেখলাম। তিনি দু'জন লোকের মাঝখানে চলছেন। তার মাথার পানি ঝরছে অথবা বলেছেন, তার মাথা হতে পানি বেয়ে পড়ছে। আমি বললাম, ইনি কে? তারা বললেন, ইনি মারিয়ামের পুত্র। তখন আমি এদিক ওদিক তাকালাম। হঠাৎ দেখলাম, এক লোক তার গায়ের রং লালবর্ণ, খুব মোটা, মাথার চুল কোঁকড়ানো এবং তার ডান চোখ ট্যারা। তার চোখ যেন ফোলা আঙ্গুরের মত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? তারা বললেন, এ হলো দাজ্জাল। মানুষের মধ্যে ইবন কাতানের সঙ্গে তার বেশি সাদৃশ্য রয়েছে। যুহরী তার বর্ণনায় বলেন, ইবন কাতান খুযাআ গোত্রের জনৈক ব্যক্তি , সে জাহিলীয়াতের যুগেই মারা গেছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার অধিক ঘনিষ্ঠ। আর নবীগণ পরস্পর বৈমাত্রিয় ভাই। আমার ও তার মাঝখানে কোন নবী নেই।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমি দুনিয়া ও আখিরাতে ঈসা ইবন মারিয়ামের ঘনিষ্ঠতম। নবীগণ একে অন্যের বৈমাত্রিয় ভাই। তাদের মা ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু দ্বীন হল এক।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, ঈসা এক লোককে চুরি করতে দেখলেন, তখন তিনি বললেন, তুমি কি চুরি করেছ? সে বলল, কক্ষণও নয়। সেই সত্তার কসম! যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তখন ঈসা বললেন, আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি আর আমি আমার দু'চোখ অবিশ্বাস করলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি উমার-কে মিম্বারের ওপর দাড়িয়ে বলতে শুনেছেন যে, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন ঈসা মারইয়াম সম্পর্কে খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করেছিল। আমি তার বান্দা, তাই তোমরা বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল।

আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন যদি কোন লোক তার দাসীকে শিষ্টাচার শিখায় এবং তা উত্তমভাবে শিখায় এবং তাকে দ্বীন শিখায় আর তা উত্তমভাবে শিখায় অতঃপর তাকে মুক্ত করে দেয় অতঃপর তাকে বিয়ে করে তবে সে দু'টি করে সওয়াব পাবে। আর যদি কেউ ঈসা-এর উপর ঈমান আনে অতঃপর আমার প্রতিও ঈমান আনে, তার জন্যও দু'টি করে সওয়াব রয়েছে। আর গোলাম যদি তার রবকে ভয় করে এবং তার মনিবদের মান্য করে তার জন্যও দু'টি করে সওয়াব রয়েছে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা হাশরের ময়দানে নগ্নপদে, নগ্নদেহে খাতনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত হবে। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করবো। এটা আমার অঙ্গীকার। আমি তা অবশ্যই পূর্ণ করব- (আল-আম্বিয়া ১০৪)। অতঃপর সর্বপ্রথম যাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করা হবে, তিনি হলেন ইব্রাহীম। অতঃপর আমার সাহাবীদের কিছু সংখ্যককে ডান দিকে (জান্নাতে) এবং কিছু সংখ্যককে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী। তখন বলা হবে আপনি তাদের হতে বিদায় নেয়ার পর তারা মুরতাদ হয়ে গেছে। তখন আমি এমন কথা বলব, যা বলেছিল, নেককার বান্দা ঈসা ইবন মারইয়াম। তার উক্তিটি হলো এ আয়াতঃ আর আমি যতদিন তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর আপনি যখন আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনিই তাদের সংরক্ষণকারী ছিলেন। আর আপনি তো সব কিছুর উপরই সাক্ষী। যদি আপনি তাদেরকে আযাব দেন, তবে এরা তো আপনারই বান্দা। আর যদি আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন তবে আপনি নিশ্চই ক্ষমতাধর ও প্রজ্ঞাময়- (আল-মায়িদাহঃ ১১৭)। কাবীসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এরা হলো ঐ সব মুরতাদ যারা আবূ বাকর-এর খিলাফতকালে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। তখন আবূ বাকর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, শীঘ্রই তোমাদের মধ্যে মারিয়ামের পুত্র ঈসা শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে আগমন করবেন। তিনি 'ক্রুশ' ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন এবং তিনি যুদ্ধের সমাপ্তি টানবেন। তখন সম্পদের ঢেউ বয়ে চলবে। এমনকি কেউ তা গ্রহণ করতে চাইবে না। তখন আল্লাহকে একটি সিজ্দা করা তামাম দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত সম্পদ হতে অধিক মূল্যবান বলে গণ্য হবে। অতঃপর আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে এর সমর্থনে এ আয়াতটি পড়তে পারঃ "কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার (ঈসা-এর) মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবেন।" (আন-নিসাঃ ১৫৯)

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের অবস্থা কেমন হবে যখন তোমাদের মধ্যে মারইয়াম পুত্র ঈসা অবতরণ করবেন আর তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য থেকেই হবে।

উকবাহ ইবন আমর হুযাইফাহ-কে বললেন, আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে যা শুনেছেন, তা কি আমাদের নিকট বর্ণনা করবেন না? তিনি জবাব দিলেন, আমি তাকে বলতে শুনেছি, যখন দাজ্জাল বের হবে তখন তার সঙ্গে পানি ও আগুন থাকবে। অতঃপর মানুষ যাকে আগুনের মত দেখবে তা হবে মূলতঃ ঠান্ডা পানি। আর যাকে মানুষ ঠান্ডা পানির মত দেখবে, তা হবে আসলে দহনকারী অগ্নি। তখন তোমাদের মধ্যে যে তার দেখা পাবে, সে যেন অবশ্যই তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যাকে সে আগুনের মত দেখতে পাবে। কেননা, আসলে তা সুস্বাদু শীতল পানি।

হুযায়ফাহ বলেন, আমি বলতে শুনেছি, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মাঝে জনৈক ব্যক্তি ছিল। তার নিকট ফেরেশতা তার জান কবয করার জন্য এসেছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো। তুমি কি কোন ভাল কাজ করেছ? সে জবাব দিল, আমার জানা নেই। তাকে বলা হলো, একটু চিন্তা করে দেখ। সে বলল, এ জিনিসটি ব্যতীত আমার আর কিছুই জানা নেই যে, দুনিয়াতে আমি মানুষের সঙ্গে ব্যবসা করতাম। ঋণ দিতাম। আর তা আদায়ের জন্য তাদেরকে তাগাদা করতাম। আদায় না করতে পারলে আমি সচ্ছল লোককে সময় দিতাম আর অভাবী লোককে ক্ষমা করে দিতাম। তখন আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।

হুযায়ফাহ বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে এটাও বলতে শুনেছি যে, কোন এক ব্যক্তির মৃত্যুর সময় হাযির হল। যখন সে জীবন হতে নিরাশ হয়ে গেল। তখন সে তার পরিজনকে ওসীয়াত করল, আমি যখন মরে যাব তখন আমার জন্য অনেকগুলো কাষ্ঠ একত্র করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিও। আগুন যখন আমার গোশত খেয়ে ফেলবে এবং আমার হাড় পর্যন্ত পৌছে যাবে আর আমার হাড়গুলো বেরিয়ে আসবে, তখন তোমরা তা পিষে ফেলবে। অতঃপর যেদিন দেখবে খুব হাওয়া বইছে, তখন সেই ছাইগুলোকে উড়িয়ে দেবে। তার স্বজনেরা তাই করল। অতঃপর আল্লাহ সে সব একত্র করলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কাজ তুমি কেন করলে? সে জবাব দিল, আপনার ভয়ে। তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। উক্বাহ ইবন আমর বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে ঐ ব্যক্তি ছিল কাফন চোর।

আয়িশাহ ও ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু 'আনহুম) হতে বর্ণিত। তারা উভয়ে বলেন, যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হল তখন তিনি স্বীয় মুখমন্ডলের উপর তার একখানা চাদর দিয়ে রাখলেন। অতঃপর যখন খারাপ লাগল, তখন তার চেহারা হতে তা সরিয়ে দিলেন এবং তিনি এ অবস্থায়ই বললেন, ইয়াহূদী ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। তারা তাদের নবীগণের কবরগুলোকে মাসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। তারা যা করেছে তা হতে নবী (ﷺ) মুসলিমদেরকে সতর্ক করছেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (৩৪৫৩)।

আবূ হাযিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি পাচ বছর যাবৎ আবূ হুরাইরাহ্-এর সাহচর্যে ছিলাম। তখন আমি তাকে নবী (ﷺ) হতে হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাদের উম্মাতকে শাসন করতেন। যখন কোন একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তার স্থলাভিসিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোন নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। সহাবগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদেরকে কী নির্দেশ করছেন? তিনি বললেন, তোমরা একের পর এক করে তাদের বায়আতের হক আদায় করবে। তোমাদের উপর তাদের যে হক রয়েছে তা আদায় করবে। আর নিশ্চই আল্লাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন ঐ সকল বিষয়ে যে সবের দায়িত্ব তাদের উপর অর্পণ করা হয়েছিল।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা পুরোপুরি অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি গো সাপের গর্তেও ঢুকে তবে তোমরাও তাতে ঢুকবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি ইয়াহূদী ও নাসারার কথা বলছেন? নবী (ﷺ) বললেন, তবে আর কার কথা?

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তারা আগুন জ্বালানো এবং ঘণ্টা বাজানোর কথা উল্লেখ করলেন। তখনই তারা ইয়াহূদী ও নাসারার কথা উল্লেখ করলেন। অতঃপর বিলাল-কে আযানের শব্দগুলো দু' দু' বার করে এবং ইকামাতের শব্দগুলো বেজোড় করে বলতে নির্দেশ দেয়া হল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, কেউ প্রার্থনা করার সময় তার কোমরে হাত রাখাকে তিনি অপছন্দ করতেন। আর বলতেন, ইয়াহূদীরা এমন করে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমাদেও পূর্বের যেসব উম্মাত অতীত হয়ে গেছে তাদের অনুপাতে তোমাদের অবস্থান হলো আসরের সালাত এবং সূর্য অস্ত যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়টুকুর সমান। আর তোমাদের ও ইয়াহূদী নাসারাদের দৃষ্টান্ত হলো ঐ ব্যক্তির মতো, যে কয়েকজন লোককে তার কাজে লাগালো এবং জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মধ্যে কে আছে যে, আমার জন্য দুপুর পর্যন্ত এক কিরাতের [১] বিনিময়ে কাজ করবে? তখন ইয়াহূদীরা এক এক কিরাতের বিনিময়ে দুপুর পর্যন্ত কাজ করল। অতঃপর সে ব্যক্তি আবার বলল, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, সে দুপুর হতে আসর সালাত পর্যন্ত এক এক কিরাতের বিনিময়ে আমার কাজটুকু করে দেবে? তখন নাসারারা এক কিরাতের বিনিময়ে দুপুর হতে আসর সালাত পর্যন্ত কাজ করল। সে ব্যক্তি আবার বলল, কে এমন আছ, যে দু' দু' কিরাতের বদলায় আসর সালাত হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমার কাজ করে দেবে? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, দেখ, তোমরাই হলে সে সব লোক যারা আসর সালাত হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দু' দু' কিরাতের বিনিময়ে কাজ করলে। দেখ, তোমাদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ। এতে ইয়াহূদী ও নাসারারা অসন্তুষ্ট হয়ে গেল এবং বলল, আমরা কাজ করলাম অধিক আর মজুরি পেলাম কম। আল্লাহ বলেন, আমি কি তোমার পাওনা হতে কিছু জুলুম বা কম করেছি? তারা উত্তরে বলল, না। তখন আল্লাহ বললেন, এটা হলো আমার অনুগ্রহ, আমি যাকে ইচ্ছা, তা দান করে থাকি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেন, আল্লাহ অমুক লোককে ধ্বংস করুক! সে কি জানে না যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ ইয়াহূদীদের ওপর লানত করুন। তাদের জন্য চর্বি হারাম করা হয়েছিল। তখন তারা তা গলিয়ে বিক্রি করতে লাগল।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, আমার কথা পৌছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোন দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ইয়াহূদী ও নাসারারা (দাড়ি-চুলে) রং লাগায় না। অতএব তোমরা তাদের বিপরীত কাজ কর।

হাসান (বসরী) বলেন, জুনদুব ইবন আবদুল্লাহ বসরার এক মসজিদে আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেন। সে দিন হতে আমরা না হাদীস ভুলেছি না আশংকা করেছি যে, জুনদুব নবী (ﷺ)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের পূর্ব যুগে জনৈক ব্যক্তি আঘাত পেয়েছিল, তাতে কাতর হয়ে পড়েছিল। অতঃপর সে একটি ছুরি হাতে নিল এবং তা দিয়ে সে তার হাতটি কেটে ফেলল। ফলে রক্ত আর বন্ধ হল না। শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। মহান আল্লাহ বললেন, আমার বান্দাটি নিজেই প্রাণ দেয়ার ব্যাপারে আমার হতে অগ্রগামী হল। কাজেই, আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, বানী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, 'উট' অথবা সে বলল, 'গরু'। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে শ্বেতরোগী না টাকওয়ালা দু'জনের একজন বলেছিল 'উট' আর অপরজন বলেছিল 'গরু'। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফিরশতা বললেন, "এতে তোমার জন্য বরকত হোক।" বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, 'গরু'। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দোয়া করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক। অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নবী (ﷺ) বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল 'ছাগল'। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। অতঃপর ঐ ফেরেশতা তার পূর্ববর্তী আকৃতি প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌছার আল্লাহ ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ তাআলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তার সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেত রোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী। তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে তেমন অবস্থায় করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তার আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌছার ব্যাপারে আল্লাহ ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম। আল্লাহ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম। আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের আগের যুগের লোকদের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। তারা পথ চলছিল। হঠাৎ তাদের বৃষ্টি পেয়ে গেল। তখন তারা এক গুহায় আশ্রয় নিল। অমনি তাদের গুহার মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তাদের একজন অন্যদেরকে বললেন, বন্ধুগণ আল্লাহর কসম! এখন সত্য ব্যতীত কিছুই তোমাদেরকে রেহাই করতে পারবে না। কাজেই, এখন তোমাদের প্রত্যেকের সেই জিনিসের উসিলায় দু'আ করা দরকার, যে সম্পর্কে জানা রয়েছে যে, এ কাজটিতে সে সত্যতা আছে। তখন তাদের একজন দু'আ করলেন- হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমার একজন মজদুর ছিল। সে এক ফারাক১ চাউলের বিনিময়ে আমার কাজ করে দিয়েছিল। পরে সে মজুরী না নিয়েই চলে গিয়েছিল। আমি তার এ মজুরী দিয়ে কিছু একটা করার ইচ্ছা করলাম এবং কৃষি কাজে লাগালাম। এতে যা উৎপাদন হল, তার বিনিময়ে আমি একটি গাভী কিনলাম। সেই মজদুর আমার নিকট এসে তার মজুরী দাবী করল। আমি তাকে বললাম, এ গাভীটির দিকে তাকাও এবং তা হাকিয়ে নিয়ে যাও। সে জবাব দিল, আমার আপনার নিকট মাত্র এক 'ফারাক' চালই পাওনা। আমি তাকে বললাম গাভিটি নিয়ে যাও। কেননা সেই এক 'ফারাক' দ্বারা যা উৎপাদিত হয়েছে, তারই বিনিময়ে এটি কেনা হয়েছে। তখন সে গাভীটি হাকিয়ে নিয়ে গেল। আপনি জানেন যে, তা আমি একমাত্র আপনার ভয়েই করেছি। তাহলে আমাদের হতে সরিয়ে দিন। তখন তাদের নিকট হতে পাথরটি কিছুটা সরে গেল। তাদের আরেকজন দু'আ করল, হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমার মা-বাপ খুব বৃদ্ধ ছিলেন। আমি প্রতি রাতে তাদের জন্য আমার বকরীর দুধ নিয়ে তাদের নিকট যেতাম। এক রাতে তাদের নিকট যেতে আমি দেরী করে ফেললাম। অতঃপর এমন সময় গেলাম, যখন তারা দু'জনে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এদিকে আমার পরিবার পরিজন ক্ষুধার কারণে চিৎকার করছিল। আমার মাতা-পিতাকে দুধ পান না করান পর্যন্ত ক্ষুধায় কাতর আমার সন্তানদেরকে দুধ পান করাইনি। কেননা, তাদেরকে ঘুম হতে জাগানটি আমি পছন্দ করিনি। অপরদিকে তাদেরকে বাদ দিতেও ভাল লাগেনি। কারণ, এ দুধটুকু পান না করলে তারা উভয়েই দুর্বল হয়ে যাবেন। তাই আমি ভোর হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। আপনি জানেন যে, এ কাজ আমি করেছি, একমাত্র আপনার ভয়ে, তাই আমাদের হতে সরিয়ে দিন। অতঃপর পাথরটি তাদের হতে আরেকটু সরে গেল। এমনকি তারা আসমান দেখতে পেল। অপর ব্যক্তি দু'আ করল, হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমার একটি চাচাত বোন ছিল। সবেচেয়ে সে আমার নিকট অধিক প্রিয় ছিল। আমি তার সঙ্গে বাসনা করছিলাম। কিন্তু সে একশ দ্বীনার প্রদান ছাড়া ঐ কাজে রাযী হতে চাইল না। আমি স্বর্ণ মুদ্রা অর্জনের চেষ্টা আরম্ভ করলাম এবং তা অর্জনে সমর্থও হলাম। অতঃপর কথিত মুদ্রাসহ তার নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে তা অর্পণ করলাম। সেও তার দেহ আমার জন্য অর্পণ করলো। আমি যখন তার দুই পায়ের মাঝে বসে পড়লাম তখন সে বলল, আল্লাহকে ভয় কর, অন্যায় ও অবৈধভাবে পবিত্র ও রক্ষিত আবরুকে বিনষ্ট করো না। আমি তৎক্ষণাৎ সরে পড়লাম ও স্বর্ণমুদ্রা ছেড়ে আসলাম। হে আল্লাহ! আপনি জানেন যে, আমি প্রকৃতই আপনার ভয়ে তা করেছিলাম। তাই আমাদের রাস্তা প্রশস্ত করে দিন। আল্লাহ সংকট দূরীভূত করলেন। তারা বের হয়ে আসল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, একদা একজন মহিলা তার কোলের শিশুকে স্তন্য পান করাচ্ছিল। এমন সময় একজন ঘোড়সওয়ার তাদের নিকট দিয়ে গমন করে। মহিলাটি বলল, হে আল্লাহ! আমার পুত্রকে এই ঘোড়সওয়ারের মত না বানিয়ে মৃত্যু দান করো না। তখন কোলের শিশুটি বলে উঠলো- হে আল্লাহ! আমাকে ঐ ঘোড়সওয়ারের মত করো না, এই বলে পুনরায় সে স্তন্য পানে লেগে গেল। অতঃপর একজন মহিলাকে কতিপয় লোক অপমানজনকভাবে বিদ্রুপ করতে করতে টেনে নিয়ে চলছিল। ঐ মহিলাকে দেখে বাচ্চার মা বলে উঠল- হে আল্লাহ! আমার পুত্রকে ঐ মহিলার মত করো না। বাচ্চাটি বলে উঠল, হে আল্লাহ! আমাকে ঐ মহিলার মত কর। নবী (ﷺ) বলেন, ঐ ঘোড়সওয়ার কাফির ছিল। আর ঐ মহিলাকে লক্ষ্য করে লোকজন বলছিল, তুই ব্যাভিচারিণী, সে বলছিল হাস্বি আল্লাহ- আল্লাহ-ই আমার জন্য যথেষ্ট। তারা বলছিল তুই চোর আর সে বলছিল আল্লাহ-ই আমার জন্য যথেষ্ট।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন যে, একবার একটি কুকুর এক কূপের চতুর্দিকে ঘুরছিল এবং অত্যন্ত পিপাসার কারণে সে মৃত্যুর কাছে পৌছেছিল। তখন বনী ইসরাঈলের ব্যাভিচারিণীদের একজন কুকুরটির অবস্থা লক্ষ্য করল, এবং তার পায়ের মোজা দিয়ে পানি সংগ্রহ করে কুকুরটিকে পান করাল। এ কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

হুমায়েদ ইবন আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত। তিনি মু'আবিয়া ইবন আবূ সুফ্ইয়ান-কে বলতে শুনেছেন যে, তার হাজ্জ পালনের বছর মিম্বরে নববীতে উপবিষ্ট অবস্থায় তার দেহরক্ষীদের কাছ থেকে মহিলাদের একগুচ্ছ চুল নিজ হাতে নিয়ে তিনি বলেন যে, হে মীনাবাসী! কোথায় তোমাদের আলিম সমাজ? আমি নবী (ﷺ)-কে এ রকম পরচুলা ব্যবহার হতে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, বনী ইসরাঈল তখনই ধ্বংস হয়, যখন তাদের মহিলাগণ এ ধরনের পরচুলা ব্যবহার করতে শুরু করে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের পূর্বের উম্মাতগণের মধ্যে ইল্হাম প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। আমার উম্মাতের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে, তবে সে নিশ্চই উমার ইবন খাত্তাব হবেন।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, বনী ইসরাঈলের মাঝে এমন এক ব্যক্তি ছিল যে, নিরানব্বইটি মানুষ হত্যা করেছিল। অতঃপর বের হয়ে একজন পাদরীকে জিজ্ঞেস করল, আমার তওবা কবুল হবার আশা আছে কি? পাদরী বলল, না। তখন সে পাদরীকেও হত্যা করল। অতঃপর পুনরায় সে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল। তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, তুমি অমুক স্থানে চলে যাও। সে রওয়ানা হল এবং পথিমধ্যে তার মৃত্যু এসে গেল। সে তার বক্ষদেশ দ্বারা সে স্থানটির দিকে ঘুরে গেল। মৃত্যুর পর রহমত ও আযাবের ফেরেশতামন্ডলী তার রূহকে নিয়ে বাদানুবাদে লিপ্ত হলেন। আল্লাহ সামনের ভূমিকে আদেশ করলেন, তুমি মৃত ব্যক্তির নিকটবর্তী হয়ে যাও। এবং পশ্চাতে ফেলে আসা স্থানকে (যেখানে হত্যাকান্ড ঘটেছিল) আদেশ দিলেন, তুমি দূরে সরে যাও। অতঃপর ফেরেশতাদের উভয় দলকে নির্দেশ দিলেন তোমরা এখান থেকে উভয় দিকের দূরত্ব পরিমাপ কর। পরিমাপ করা হল, দেখা গেল যে, মৃত লোকটি সামনের দিকে এক বিঘত বেশি এগিয়ে আছে। কাজেই তাকে ক্ষমা করা হল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) ফজরের সালাত শেষে লোকজনের দিকে ঘুরে বসলেন এবং বললেন, একদা এক লোক একটি গরু হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ সে এটির পিঠে চড়ে বসলো এবং ওকে প্রহার করতে লাগল। তখন গরুটি বলল, আমাদেরকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি, আমাদেরকে চাষাবাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এতদশ্রবণে লোকজন বলে উঠল, সুবহানাল্লাহ্! গরুও কথা বলে? নবী (ﷺ) বললেন, আমি এবং আবূ বাকর ও উমার তা বিশ্বাস করি। অথচ তখন তারা উভয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। আর এক রাখাল একদিন তার ছাগল পালের মাঝে অবস্থান করছিল, এমন সময় একটি চিতা বাঘ পালে ঢুকে একটি ছাগল নিয়ে গেল। রাখাল বাঘের পিছনে ধাওয়া করে ছাগলটি উদ্ধার করে নিল। তখন বাঘটি বলল, তুমি ছাগলটি আমার থেকে কেড়ে নিলে বটে তবে ঐদিন কে ছাগলকে রক্ষা করবে যেদিন হিংস্র জন্তু ওদের আক্রমণ করবে এবং আমি ব্যতীত তাদের অন্য কোন রাখাল থাকবে না। লোকেরা বলল, সুবহানাল্লাহ! চিতা বাঘ কথা বলে! নবী (ﷺ) বললেন, আমি এবং আবূ বাকর ও উমার তা বিশ্বাস করি অথচ তারা উভয়েই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, এক লোক অপর লোক হতে একখন্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরিদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণ ভর্তি ঘড়া পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে অনুরোধ করে বলল, কারণ আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি। বিক্রেতা বলল, আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই বেচে দিয়েছি। অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। তিনি বললেন, তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে? একজন বলল, আমার একটি ছেলে আছে। অন্য লোকটি বলল, আমার একটি মেয়ে আছে। মীমাংসাকারী বললেন, তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিবাহ দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিবাহে ব্যয় কর এবং বাকী অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও।

সা'দ ইবন আবূ ওয়াক্কাস উসামাহ্ ইবন যায়দ-কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে প্লেগ সম্বন্ধে কী শুনেছেন? উসামাহ্ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, প্লেগ একটি আযাব। যা বনী ইসরাঈলের এক সম্প্রদায়ের উপর পতিত হয়েছিল অথবা তোমাদের পূর্বে যারা ছিল। তোমরা যখন কোন স্থানে প্লেগের ছড়াছড়ি শুনতে পাও, তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন প্লেগ এমন জায়গায় দেখা দেয়, যেখানে তুমি অবস্থান করছো, তখন সে স্থান হতে পালানোর লক্ষ্যে বের হয়ো না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বললেন, তা একটি আযাব। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের মধ্যে যাদের প্রতি ইচ্ছা করেন তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। আর আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দাগণের উপর তা রহমত করে দিয়েছেন। কোন ব্যক্তি যখন প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সাওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে তাহলে সে একজন শহীদের সমান সওয়াব পাবে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। মাখযূম গোত্রের এক চোর নারীর ঘটনা কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুললো। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তারা বলল, একমাত্র রাসূল (ﷺ)-এর প্রিয়তম উসামা ইবন যায়িদ এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে কথা বললেন। নবী (ﷺ) বললেন, তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত সীমাঙ্ঘনকারিণীর সাজা মাওকুফের সুপারিশ করছ? অতঃপর নবী (ﷺ) দাড়িয়ে খুত্বায় বললেন, তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোন বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত। অন্যদিকে যখন কোন অসহায় গরীব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার উপর হদ্ জারি করত। আল্লাহর কসম, যদি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা চুরি করত তাহলে আমি তার অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক লোককে কুরআনের একটি আয়াত পড়তে শুনলাম যা নবী (ﷺ) হতে আমার শোনা তিলাওয়াতের বিপরীত। আমি তাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকটে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি বললাম, তখন তার চেহারায় অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করলাম। তিনি বললেন, তোমরা দু'জনেই ভাল ও সুন্দর পড়েছ। তবে তোমরা মতবিরোধ করো না। তোমাদের আগের লোকেরা মতবিরোধের কারণেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি যেন এখনো নবী (ﷺ)-কে দেখছি যখন তিনি একজন নবী-এর অবস্থা বর্ণনা করছিলেন যে, তার স্বজাতিরা তাকে প্রহার করে রক্তারক্তি করে দিয়েছে আর তিনি তার চেহারা হতে রক্ত মুছে ফেলছেন এবং বলছেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করে দাও, যেহেতু তারা জানে না।

আবূ সাঈদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন যে, তোমাদের আগের এক লোক, আল্লাহ তাআলা তাকে প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেছিলেন। যখন তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল তখন সে তার ছেলেদেরকে জড় করে জিজ্ঞেস করল আমি তোমাদের কেমন পিতা ছিলাম? তারা বলল আপনি আমাদের উত্তম পিতা ছিলেন। সে বলল, আমি জীবনে কখনও কোন নেক আমল করতে পারিনি। আমি যখন মারা যাব তখন তোমরা আমার লাশকে জ্বালিয়ে ছাই করে দিও এবং প্রচন্ড ঝড়ের দিন ঐ ছাই বাতাসে উড়িয়ে দিও। সে মারা গেল। ছেলেরা ওসিয়াত অনুযায়ী কাজ করল। আল্লাহ তাআলা তার ছাই জড় করে জিজ্ঞেস করলেন, এমন ওসিয়াত করতে কে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে আল্লাহ! তোমার শাস্তির ভয়। ফলে আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে নিল।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, এক লোকের যখন মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল এবং সে জীবন হতে নিরাশ হয়ে গেল। তখন সে তার পরিবার পরিজনকে ওসিয়াত করল, যখন আমি মরে যাব তখন তোমরা আমার জন্য অনেক লাকড়ি জমা করে আগুন জ্বালিয়ে দিও। আগুন যখন আমার গোশত জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হাড় পর্যন্ত পৌছে যাবে তখন হাড়গুলি পিষে ছাই করে নিও। অতঃপর সে ছাই গরমের দিন কিংবা প্রচন্ড বাতাসের দিনে সাগরে ভাসিয়ে দিও। আল্লাহ তাআলা তার ছাই জড় করে জিজ্ঞেস করলেন, এমন কেন করলে? সে বলল, আপনার ভয়ে। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, পূর্বযুগে কোন এক লোক ছিল, যে মানুষকে ঋণ প্রদান করত। সে তার কর্মচারীকে বলে দিত, তুমি যখন কোন গরীবের নিকট টাকা আদায় করতে যাও, তখন তাকে মাফ করে দিও। হয়ত আল্লাহ তাআলা এ কারণে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। নবী (ﷺ) বলেন, যখন সে আল্লাহ তাআলার সাক্ষাৎ লাভ করল, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পূর্বযুগে এক লোক তার নিজের উপর অনেক জুলুম করেছিল। যখন তার মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এলো, সে তার পুত্রদেরকে বলল, মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড় গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে নিও এবং প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিও। আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দিবেন যা অন্য কাউকেও দেননি। যখন তার মওত হল, তার সঙ্গে সে ভাবেই করা হল। অতঃপর আল্লাহ যমীনকে আদেশ করলেন, তোমার মাঝে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও। যমীন তা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাড়িয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে, প্রতিপালক তোমার ভয়। অতঃপর তাকে ক্ষমা করা হলো।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, এক নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আযাব দেয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেধে রেখেছিল। সে অবস্থায় বিড়ালটি মরে যায়। মহিলাটি ঐ কারণে জাহান্নামে গেল। কেননা সে বিড়ালটিকে খানা-পিনা কিছুই করাইনি এবং ছেড়েও দেয়নি যাতে সে যমীনের পোকা-মাকড় খেয়ে বেচে থাকত।

আবূ মাসঊদ উকবাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আম্বিয়া-এ-কিরামের উক্তিসমূহ যা মানব জাতি লাভ করেছে, তার মধ্যে একটি হল, "যদি তোমার লজ্জা না থাকে তাহলে তুমি যা ইচ্ছে তাই কর।"

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, প্রথম যুগের আম্বিয়া-এ-কিরামের উক্তিসমূহ যা মানব জাতি লাভ করেছে, তন্মধ্যে একটি হল, "যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তাহলে তুমি যা ইচ্ছে তাই কর।"

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, এক ব্যক্তি গর্ব ও অহংকারের সাথে লুঙ্গি টাখ্নুর নীচে ঝুলিয়ে পথ চলছিল। এই অবস্থায় তাকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেয়া হল এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে এমনি অবস্থায় নীচের দিকেই যেতে থাকবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, পৃথিবীতে আমাদের আগমন সবশেষে হলেও কিয়ামত দিবসে আমরা অগ্রগামী। কিন্তু, অন্যান্য উম্মাতগণকে কিতাব দেয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে, আর আমাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের পরে। অতঃপর এ সম্পর্কে তারা মতবিরোধ করেছে। তা ইয়াহূদীদের মনোনীত শনিবার, খ্রিস্টানদের মনোনীত রবিবার।

প্রত্যেক মুসলিমের জন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন গোসল করা কর্তব্য।

সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, যখন মু'আবিয়া ইবন আবূ সুফ্ইয়ান মদিনায় সর্বশেষ আগমন করেন, তখন তিনি আমাদেরকে লক্ষ্য করে খুত্বা প্রদানকালে একগুচ্ছ পরচুলা বের করে বলেন, ইয়াহূদীরা ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যবহার করে বলে আমার ধারণা ছিল না। নবী (ﷺ) এ কাজকে মিথ্যা প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছেন। পরচুলা।