হাজ্জযাত্ৰা (ইহরাম) অবস্থায় পথে আটকে পড়া ও শিকারের বিধান (১৮০৬-১৮২০)
নাফি হতে বর্ণিত যে, হাঙ্গামা চলাকালে আবদুল্লাহ ইবন উমার উমরাহ'র নিয়্যাত করে মক্কায় রওয়ানা হবার পর বললেন, বাইতুল্লাহর পথে বাধাগ্রস্ত হলে, তাই করব যা করেছিলাম আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে। তাই তিনি উমরাহ'র ইহরাম বাধলেন। কেননা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -ও হুদাইবিয়ার বছর উমরাহ'র ইহরাম বেধেছিলেন।
নাফি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উবায়দুল্লাহ ইবন আবদুল্লাহ ও সালিম ইবন আবদুল্লাহ উভয়ই তাকে সংবাদ দিয়েছেন, যে বছর হাজ্জাজ (ইবন ইউসুফ) বাহিনী ইবন যুবায়র-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়, সে সময়ে তারা উভয়ে কয়েকদিন পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইবন উমার-কে বুঝালেন। তারা বললেন, এ বছর হাজ্জ না করলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না। আমরা আশঙ্কা করছি, আপনার ও বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে রওয়ানা হয়েছিলাম। কিন্তু বাইতুল্লাহর পথে কাফির কুরাইশরা আমাদের বাধা হয়ে দাড়াল। তাই নবী (ﷺ) কুরবানীর পশু যবেহ করে মাথা মুড়িয়ে নিয়েছিলেন। এখন আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার নিজের জন্য উমরাহ ওয়াজিব করে নিয়েছি। আল্লাহ চাহেন তো আমি এখন রওয়ানা হয়ে যাব। যদি আমার এবং বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা না আসে তাহলে আমি তাওয়াফ করে নিব। কিন্তু যদি আমার ও বাইতুল্লাহর মাঝে বাধা সৃষ্টি করা হয় তাহলে আমি তখনই সেরূপ করব যেরূপ নবী (ﷺ) করেছিলেন আর আমিও তার সঙ্গে ছিলাম। অতঃপর তিনি যুল-হুলাইফা হতে উমরাহ্'র ইহরাম বেধে কিছুক্ষণ চললেন, এরপরে বললেন, হাজ্জ এবং উমরাহ্'র ব্যাপার তো একই। আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, নিশ্চই আমি আমার উমরাহ্'র সাথে হাজ্জও নিজের জন্য ওয়াজিব করে নিলাম। তাই তিনি হাজ্জ ও উমরাহ কোনটি হতেই হালাল হননি। অবশেষে কুরবানীর দিন কুরবানী করলেন এবং হালাল হলেন। তিনি বলতেন, আমরা হালাল হব না যতক্ষণ পর্যন্ত না মক্কায় প্রবেশ করে একটি তাওয়াফ করে নিই।
নাফি হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ-এর কোন এক ছেলে তার পিতাকে বললেন, যদি আপনি এ বছর বাড়িতে অবস্থান করতেন (তাহলে আপনার জন্য কতই না কল্যাণকর হত)!
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) (হুদাইবিয়াতে) বাধাপ্রাপ্ত হন। তাই তিনি মাথা কামিয়ে নেন। স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হন এবং প্রেরিত পশু কুরবানী করেন। অবশেষে পরবর্তী বছর উমরাহ আদায় করেন।
সালিম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবন উমার বলতেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সুন্নাতই কি তোমাদের পক্ষে যথেষ্ট নয়? তোমাদের কেউ যদি হাজ্জ আদা করতে বাধাগ্রস্ত হয় সে যেন (উমরাহ্'র জন্য) বাইতুল্লাহর ও সাফা-মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ করে সমস্ত কিছু হতে হালাল হয়ে যায়। অবশেষে পরবর্তী বৎসর হাজ্জ আদায় করে নেয়। তখন সে কুরবানী করবে আর কুরবানী দিতে যদি না পারে তবে সিয়াম পালন করবে। আবদুল্লাহ....ইবন উমার হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
মিসওয়ার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মাথা কামানোর আগেই কুরবানী করেন এবং সাহাবাদের অনুরূপ করার নির্দেশ দেন।
নাফি হতে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ এবং সালিম উভয়ই আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবন উমার বললেন, নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে উমরাহ্'র নিয়ত করে আমরা রওয়ানা হলে যখন কুরায়শের কাফিররা বাইতুল্লাহর অনতিদূরে বাধা হয়ে দাড়ায়,তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার উট কুরবানী করেন এবং মাথা কামিয়ে ফেলেন।
নাফি হতে বর্ণিত যে, (মক্কা মুকার্রামায়) গোলযোগ চলাকালে উমরাহ্'র নিয়ত করে আবদুল্লাহ ইবন উমার যখন মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন, তখন বললেন, বাইতুল্লাহ হতে যদি আমি বাধাপ্রাপ্ত হই তাহলে তাই করব যা করেছিলাম আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে। তাই তিনি উমরাহ্'র ইহরাম বাধলেন। কারণ, নবী (ﷺ) -ও হুদাইবিয়ার বছর উমরাহ্'র ইহরাম বেধেছিলেন। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন উমার নিজের ব্যাপারে ভেবে চিন্তে বললেন, উভয়টিই (হাজ্জ ও উমরা) এক রকম। এরপর তিনি তার সাথীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, উভয়টি তো একই রকম। আমি তোমাদের সাক্ষী করে বলছি, আমি আমার উপর উমরাহ্'র সাথে হাজ্জকে ওয়াজিব করে নিলাম। তিনি উভয়টির জন্য একই তাওয়াফ করলেন এবং এটাই তার পক্ষ হতে যথেষ্ট মনে করেন, আর তিনি কুরবানীর পশু সঙ্গে নিয়েছিলেন।
কা'ব ইবন 'উজরাহ হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, বোধ হয় তোমার এই পোকাগুলো (উকুন) তোমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হা, ইয়া আল্লাহর রাসূল! এরপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি মাথা মুন্ডন করে ফেল এবং তিন দিন সিয়াম পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে আহার করাও কিংবা একটা বকরী কুরবানী কর।
কা'ব ইবন 'উজরা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার নিকট দন্ডায়মান হলেন। এ সময় আমার মাথা হতে উকুন ঝরে পড়ছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার এই পোকাগুলো (উকুন) কি তোমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে? আমি বললাম, হা, তিনি বললেনঃ মাথা মুন্ডন করে ফেল অথবা বললেন, মুন্ডন করে ফেল। কা'ব ইবন 'উজরা বলেন, আমার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে এই আয়াতটিঃ "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোগাক্রান্ত হয় কিংবা মাথায় কষ্টকর কিছু হয়ে থাকে..."- (আল-বাকারাহঃ ১৯৬)। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তুমি তিনদিন সওম পালন কর কিংবা এক ফারাক (তিন সা' পরিমাণ) ছয়জন মিসকীনের মধ্যে সদাকাহ কর অথবা কুরবানী কর যা তোমার জন্য সহজসাধ্য।
আবদুল্লাহ ইবন মা'কিল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কা'ব ইবন 'উজরা-এর পাশে বসে তাকে ফিদ্য়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এ আয়াত বিশেষভাবে আমার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে। তবে এ হুকুম সাধারণভাবে তোমাদের সকলের জন্যই। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল। তখন আমার চেহারায় উকুন বেয়ে পড়ছে। তিনি বললেনঃ তোমার কষ্ট বা পীড়া যে পর্যায়ে পৌছেছে দেখতে পাচ্ছি, আমার তো আগে এ ধারণা ছিল না। তুমি কি একটি বকরীর ব্যবস্থা করতে পারবে? আমি বললাম, না। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি তিন দিন সিয়াম পালন কর অথবা ছয়জন মিসকীনকে অর্ধ সা' করে খাওয়াও।
কা'ব ইবন 'উজরা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার চেহারায় উকুন ঝরে পড়তে দেখে তাকে বললেনঃ এই কীটগুলো কি তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? তিনি বললেন, হা। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে মাথা কামিয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন। এ সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হুদায়বিয়ায় ছিলেন। এখানেই তাদের হালাল হয়ে যেতে হবে এ বিষয়টি তখনও তাদের কাছে স্পষ্ট হয়নি। তারা মক্কায় প্রবেশের আশা করছিলেন।তখন আল্লাহ তাআলা ফিদয়ার হুকুম নাযিল করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে এক ফারাক খাদ্যশস্য ছয়জন মিসকীনের মধ্যে দিতে কিংবা একটি বকরী কুরবানী করতে অথবা তিন দিন সিয়াম পালনের নির্দেশ দিলেন।
কা'ব ইবন 'উজরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে এমতাবস্থায় দেখলেন যে, তার চেহারার উপর উকুন পড়ছে। এর বাকি অংশ উপরের হাদীসের মত।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এ ঘরের হাজ্জ আদায় করল এবং স্ত্রী সহবাস করল না এবং অন্যায় আচরণ করল না, সে প্রত্যাবর্তন করবে মাতৃগর্ভ হতে সদ্য প্রসূত শিশুর মত হয়ে।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এ ঘরের (বাইতুল্লাহর) হাজ্জ আদায় করল, অশ্লীলতায় জড়িত হল না এবং আল্লাহর অবাধ্যতা করল না, সে মায়ের পেট হতে সদ্য প্রসূত শিশুর ন্যায় (হাজ্জ হতে) প্রত্যাবর্তন করল।