ধর্মীয় জ্ঞান (আল-ইলম) (৫৯-১৩৪)
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মজলিসে জনসম্মুখে কিছু আলোচনা করছিলেন। ইতোমধ্যে তার নিকট জনৈক বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করল, 'কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার আলোচনায় রত থাকলেন। এতে কেউ কেউ বললেন, লোকটি যা বলেছে তিনি তা শুনেছেন কিন্তু তার কথা পছন্দ করেননি। আর কেউ কেউ বললেন বরং তিনি শুনতেই পাননি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আলোচনা শেষে বললেনঃ 'কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়?' সে বলল, 'এই যে আমি, হে আল্লাহর রাসূল!' তিনি বললেনঃ যখন আমানত নষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা করবে। সে বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেনঃ 'যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।'
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের পিছনে পড়ে গেলেন। পরে তিনি আমাদের নিকট পৌছলেন, এদিকে আমরা (আসরের) সালাত আদায় করতে বিলম্ব করে ফেলেছিলাম এবং আমরা উযূ করছিলাম। আমরা আমাদের পা কোনমতে পানি দ্বারা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চৈস্বঃরে বললেনঃ পায়ের গোড়ালিগুলোর (শুকনো থাকার) জন্য জাহান্নামের আযাব রয়েছে। তিনি দু'বার বা তিনবার এ কথা বললেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদা বললেনঃ গাছগাছালির মধ্যে এমন একটি গাছ আছে যার পাতা ঝরে না। আর তা মুসলিমের উদাহরণ, তোমরা আমাকে অবগত কর 'সেটি কী গাছ?' তখন লোকেরা জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির নাম ধারণা করতে লাগল। আবদুল্লাহ বলেন, 'আমার ধারণা হল, সেটা হবে খেজুর গাছ।' কিন্তু আমি (ছোট থাকার কারণে) তা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। অতঃপর সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের বলে দিন সেটি কী গাছ?' তিনি বললেনঃ 'তা হচ্ছে খেজুর গাছ।'
ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একদা বললেনঃ 'গাছ-গাছালির মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যার পাতা ঝরে পড়ে না। আর তা মুসলিমের উদাহরণ। তোমরা আমাকে বল, সেটি কী গাছ?' রাবী বলেন, তখন লোকেরা জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির নাম ধারণা করতে লাগল। আবদুল্লাহ বলেন, 'আমার ধারণা হল, সেটা হবে খেজুর গাছ।' কিন্তু আমি (ছোট থাকার কারণে) তা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। অতঃপর সাহাবীগণ বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের বলে দিন সেটি কী গাছ?' তিনি বললেনঃ 'তা হচ্ছে খেজুর গাছ।'
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমরা মসজিদে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সাথে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন জনৈক ব্যক্তি সওয়ার অবস্থায় প্রবেশ করল। মসজিদে (প্রাঙ্গণে) সে তার উটটি বসিয়ে (বেধে) দিল। অতঃপর সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলল, 'তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ (ﷺ) কোন ব্যক্তি?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন তাদের সামনেই হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। আমরা বললাম, 'এই হেলান দিয়ে উপবিষ্ট ফর্সা ব্যক্তিটিই হলেন তিনি।' অতঃপর লোকটি তাকে লক্ষ্য করে বলল, 'হে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র!' নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ 'আমি তোমার উত্তর দিচ্ছি? লোকটি বলল, 'আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করব এবং সে প্রশ্ন করার ব্যাপারে কঠোর হব, এতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হবেন না।' 'তিনি বললেন, 'তোমার যা মনে চায় জিজ্ঞেস কর।' সে বলল, 'আমি আপনাকে স্বীয় প্রতিপালক এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতিপালকের শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আল্লাহ কি আপনাকে সমগ্র মানবকুলের প্রতি রাসূলরূপে প্রেরণ করেছেন?' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষী, হ্যা।' সে বলল, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে দিনে রাতে পাচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের আদেশ দিয়েছেন?' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষী, হ্যা।' সে বলল, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে বছরের এ মাসে (রমাযান) সিয়াম পালনের আদেশ দিয়েছেন?' তিনি বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষী, হ্যা।' সে বলল, 'আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, আল্লাহই কি আপনাকে আদেশ দিয়েছেন, আমাদের ধনীদের থেকে এসব সদাক্বাহ (যাকাত) আদায় করে দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করে দিতে?' নবী (ﷺ) বললেনঃ 'আল্লাহ সাক্ষী, হ্যা।' অতঃপর লোকটি বলল, 'আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম আপনি যা (যে শরী'আত) এনেছেন তার উপর। আর আমি আমার গোত্রের রেখে আসা লোকজনের পক্ষে প্রতিনিধি, আমার নাম যিমাম ইবন সা'লাবা, বানী সা'আদ ইবন বক্র গোত্রের একজন।' মূসা ও আলী ইবন আবদুল হামীদ....আনাস নবী (ﷺ) হতে এরূপ বর্ণনা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জনৈক ব্যক্তিকে তার চিঠি দিয়ে পাঠালেন এবং তাকে বাহরাইনের গভর্নর-এর নিকট তা পৌছে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর বাহরাইনের গভর্নর তা কিসরা (পারস্য সম্রাট)-এর নিকট দিলেন। পত্রটি পড়ার পর সে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। [বর্ণনাকারী ইবন শিহাব বলেন] আমার ধারণা ইবন মুসায়্যাব বলেছেন, (এ ঘটনার খবর পেয়ে) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাদের জন্য বদদোয়া করেন যে, তাদেরকেও যেন সম্পূর্ণরূপে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একখানা পত্র লিখলেন অথবা একখানা পত্র লিখতে ইচ্ছা পোষণ করলেন। তখন তাকে বলা হল, তারা (রোমবাসী ও অনারবরা) সীলমোহর ব্যতীত কোন পত্র পাঠ করেনা। অতঃপর তিনি রূপার একটি আংটি (মোহর) তৈরি করিয়ে নিলেন যাতে খোদিত ছিল (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ)। আমি যেন তার হাতে সে আংটির শুভ্রতা দেখতে পাচ্ছি [শু'বা বলেন] আমি কাতাদাহ কে বললাম, কে বলেছে যে, তার নকশা (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) ছিল? তিনি বললেন, 'আনাস।
আবূ ওয়াকিদ আল-লায়সী হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একদা মসজিদে বসে ছিলেন; তার সাথে আরও লোকজন ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনজন লোক আসলো। তন্মধ্যে দু'জন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর দিকে এগিয়ে আসলেন এবং একজন চলে গেলেন। আবূ ওয়াকিদ বলেন, তারা দু'জন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর তাদের একজন মাজলিসের মধ্যে কিছুটা খালি জায়গা দেখে সেখানে বসে পড়লেন এবং অপরজন তাদের পেছনে বসলেন। আর তৃতীয় ব্যক্তি ফিরে গেল। যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) অবসর হলেন (সাহাবীদের লক্ষ্য করে) বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে এই তিন ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলব না? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করল, আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিলেন। অন্যজন লজ্জাবোধ করল, তাই আল্লাহও তার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করলেন। আর অপরজন (মাজলিসে হাযির হওয়া থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিলেন, তাই আল্লাহও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
আবূ বাকরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি একদা নবী (ﷺ) -এর কথা উল্লেখ করে বলেন, (মিনায়) তিনি তার উটের উপর উপবেশন করলেন। জনৈক ব্যক্তি তার উটের লাগাম ধরে রেখেছিল। তিনি বললেনঃ 'এটা কোন দিন?' আমরা চুপ করে রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এ দিনটির আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ "এটা কি কুরবানীর দিন নয়?' আমরা বললাম, 'জি হ্যা।' তিনি জিজ্ঞেসঃ 'এটা কোন মাস?' আমরা নীরব রইলাম আর ধারণা করলাম যে, অচিরেই তিনি এর আলাদা কোন নাম দিবেন। তিনি বললেনঃ 'এটা কি যিলহাজ্জ মাস নয়?' আমরা বললাম, 'জী হ্যা।' তিনি বললেনঃ 'তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের সম্মান তোমাদের পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন আজকের তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস, তোমাদের এ শহর মর্যাদা সম্পন্ন। এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা (আমার এ বাণী) যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এসব কথা পৌছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্তে রাখতে পারবে।'
ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাদের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে নির্দিষ্ট দিনে নাসীহাত করতেন, আমরা যাতে বিরক্ত বোধ না করি।
আনাস থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা সহজ পন্থা অবলম্বন কর, কঠিন পন্থা অবলম্বন করো না, মানুষকে সুসংবাদ দাও, বিরক্তি সৃষ্টি করো না।
আবূ ওয়াইল হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইবন মাসঊদ প্রতি বৃহস্পতিবার লোকদের নাসীহাত করতেন। তাকে একজন বলল, 'হে আবূ আবদুর রহমান! আমার ইচ্ছা জাগে, যেন আপনি প্রতিদিন আমাদের নাসীহাত করেন। তিনি বললেনঃ এ কাজ থেকে আমাকে যা বাধা দেয় তা হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে ক্লান্ত করতে পছন্দ করি না। আর আমি নাসীহাত করার ব্যাপারে তোমাদের (অবস্থার) প্রতি খেয়াল রাখি, নবী (ﷺ) ক্লান্তির আশংকায় আমাদের প্রতি যেমন লক্ষ্য রাখতেন।
হুমায়দ ইবন আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি মুআবিয়াহ-কে খুৎবায় বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের 'ইল্ম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহই (জ্ঞান) দাতা। সর্বদাই এ উম্মাত কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমের উপর কায়িম থাকবে, বিরোধিতাকারীরা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
মুজাহিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সফরে মদিনা পর্যন্ত ইবন উমার-এর সাথে ছিলাম। এ সময় তাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতে একটি মাত্র হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, আমরা একদা নবী (ﷺ) -এর নিকট ছিলাম। তখন তার নিকট খেজুর গাছের (অভ্যন্তরের কোমল অংশ) মাথি আনা হল। অতঃপর তিনি বললেনঃ বৃক্ষরাজির মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ রয়েছে, যার দৃষ্টান্ত মুসলিমের ন্যায়। তখন আমি বলতে চাইলাম যে, তা হল খেজুর বৃক্ষ, কিন্তু আমি লোকদের মাঝে বয়সে সবচাইতে ছোট ছিলাম। তাই নীরব থাকলাম। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ 'সেটা হলো খেজুর বৃক্ষ।'
ক্বায়স ইবন হাযিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ কেবল দু'টি বিষয়ে ইর্ষা করা বৈধ; (১) সে ব্যক্তির উপর, যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, অতঃপর তাকে বৈধ পন্থায় অকাতরে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন; (২) সে ব্যক্তির উপর, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞা দান করেছেন, অতঃপর সে তার মাধ্যমে বিচার ফায়সালা করে ও তা অন্যকে শিক্ষা দেয়।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি এবং হুর ইবন কায়স ইবন হিসন আল-ফাযারীর মধ্যে মূসা (আ)-এর সম্পর্কে বাদানুবাদ হলো। ইবন আব্বাস বললেন, তিনি ছিলেন খিযর। ঘটনাক্রমে তখন তাদের পাশ দিয়ে উবাঈ ইব্ন কা'ব যাচ্ছিলেন। ইবন আব্বাস তাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ আমি ও আমার এ ভাই মূসা (আ)-এর সেই সহচর সম্পর্কে বাদানুবাদ করছি যার সাথে সাক্ষাত করার জন্য মূসা (আ) আল্লাহর নিকট পথের সন্ধান চেয়েছিলেন- আপনি নবী (ﷺ) -কে তার সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছেন কি? তিনি বললেন, হ্যা, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, একদা মূসা (আ) বনী ইসরাঈলের কোন এক মাজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, 'আপনি কাউকে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করেন কি?' মূসা (আ) বললেন, 'না।' তখন আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-এর নিকট ওয়াহী প্রেরণ করলেনঃ 'হ্যা, আমার বান্দা খিযর।' অতঃপর মূসা (আ) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য পথের সন্ধান চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাছকে তার জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন এবং তাকে বলা হল, যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরে যাবে। কারণ, কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি তার সাথে মিলিত হবে। তখন তিনি সমুদ্রে সে মাছের নিদর্শন অনুসরণ করতে লাগলেন। মূসা (আ)-কে তার সঙ্গী যুবক (ইউশা ইবন নূন) বললেন, (কুরআন মজীদের ভাষায়ঃ) আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আমরা যখন পাথরের নিকট বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মূসা বললেন, আমরা তো সেটিরই সন্ধান করছিলাম। অতঃপর তারা নিজেদের পদ চিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চলল। (কাহ্ফ ১৮/৬৩-৬৪) তারা খিযরকে পেলেন। তাদের ঘটনা সেটাই, যা আল্লাহ তাআলা তার কিতাবে বিবৃত করেছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) একবার আমাকে জাপটে ধরে বললেন, 'হে আল্লাহ! আপনি তাকে কিতাবের (কুরআন) জ্ঞান দান করুন।'
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি সাবালক হবার নিকটবর্তী বয়সে একদা একটি গাধীর উপর আরোহিত অবস্থায় এলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন মিনায় সালাত আদায় করছিলেন তার সামনে কোন দেয়াল না রেখেই। তখন আমি কোন এক কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলাম এবং গাধীটিকে বিচরণের জন্য ছেড়ে দিলাম। আমি কাতারের ভেতর ঢুকে পড়লাম কিন্তু এতে কেউ আমাকে নিষেধ করেননি।
মাহমূদ ইবনর-রাবী' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মনে আছে, নবী (ﷺ) একবার বালতি থেকে পানি নিয়ে আমার মুখমন্ডলের উপর কুলি করে দিয়েছিলেন, তখন আমি ছিলাম পাচ বছরের বালক।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি এবং হুর ইবন কায়স ইবন হিসন আল-ফাযারীর মধ্যে মূসা (আ)-এর সম্পর্কে বাদানুবাদ হলো। ইবন আব্বাস বললেন, তিনি ছিলেন খিযর। ঘটনাক্রমে তখন তাদের পাশ দিয়ে উবাঈ ইব্ন কা'ব যাচ্ছিলেন। ইবন আব্বাস তাকে ডাক দিয়ে বললেনঃ আমি ও আমার এ ভাই মূসা (আ)-এর সেই সহচর সম্পর্কে বাদানুবাদ করছি যার সাথে সাক্ষাত করার জন্য মূসা (আ) আল্লাহর নিকট পথের সন্ধান চেয়েছিলেন। আপনি নবী (ﷺ) -কে তার সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছেন কি? তিনি বললেন, হ্যা, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, একদা মূসা (আ) বনী ইসরাঈলের কোন এক মাজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তখন তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, 'আপনি কাউকে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করেন কি?' মূসা (আ) বললেন, 'না।' তখন আল্লাহ তাআলা মূসা (আ)-এর নিকট ওয়াহী প্রেরণ করলেনঃ 'হ্যা, আমার বান্দা খিযর।' অতঃপর মূসা (আ) তার সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য পথের সন্ধান চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাছকে তার জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন এবং তাকে বলা হল, যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরে যাবে। কারণ, কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি তার সাথে মিলিত হবে। তখন তিনি সমুদ্রে সে মাছের নিদর্শন অনুসরণ করতে লাগলেন। মূসা (আ)-কে তার সঙ্গী যুবক (ইউশা ইবন নূন) বললেন, (কুরআন মজীদের ভাষায়ঃ) আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আমরা যখন পাথরের নিকট বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম? শয়তানই তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মূসা বললেন, আমরা তো সেটিরই সন্ধান করছিলাম। অতঃপর তারা নিজেদের পদ চিহ্ন অনুসরণ করে ফিরে চলল। (কাহাফ ১৮/৬৩-৬৪) তারা খিযরকে পেলেন। এ হল তাদের দু'জনের ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা তার কিতাবে বিবৃত করেছেন।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা আমাকে যে হিদায়াত ও 'ইল্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হল যমীনের উপর পতিত প্রবল বর্ষণের ন্যায়। কোন কোন ভূমি থাকে উর্বর যা সে পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর কোন কোন ভূমি থাকে কঠিন যা পানি আটকে রাখে। পরে আল্লাহ তাআলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন; তারা নিজেরা পান করে ও (পশুপালকে) পান করায় এবং তা দ্বারা চাষাবাদ করে। আবার কোন কোন জমি রয়েছে যা একেবারে মসৃণ ও সমতল; তা না পানি আটকে রাখে, আর না কোন ঘাসপাতা উৎপাদন করে। এই হল সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ তাআলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতে সে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকে শিখায়। আর সে ব্যক্তিরও দৃষ্টান্ত- যে সে দিকে মাথা তুলে দেখে না এবং আল্লাহর যে হিদায়াত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণও করে না।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন যে, কিয়ামতের কিছু 'আলামত হলঃ 'ইল্ম হ্রাস পাবে, অজ্ঞতা প্রসারতা লাভ করবে, মদপানের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং যেনা ব্যভিচার বিস্তার লাভ করবে।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি হাদীস বর্ণনা করব যা আমার পর তোমাদের নিকট আর কেউ বর্ণনা করবে না। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের কিছু আলামাত হলঃ 'ইল্ম হ্রাস পাবে, অজ্ঞতার প্রসার ঘটবে, ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে, স্ত্রীলোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে, এমনকি প্রতি পঞ্চাশজন স্ত্রীলোকের জন্য মাত্র একজন পুরুষ হবে পরিচালক।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, একদা আমি নিদ্রাবস্থায় ছিলাম। তখন (স্বপ্নে) আমার নিকট এক পিয়ালা দুধ নিয়ে আসা হল। আমি তা পান করলাম। এমনকি আমার মনে হতে লাগল যে, সে পরিতৃপ্তি আমার নখ দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। অতঃপর অবশিষ্টাংশ আমি উমার ইবন-খাত্তাবকে দিলাম। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এ স্বপ্নের কী ব্যাখ্যা করেন? তিনি জবাবে বললেনঃ তা হল আল-'ইলম।
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বিদায় হাজ্জের দিবসে মিনায় লোকদের সম্মুখে (বাহনের উপর) দাড়ালেন। লোকেরা তাকে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করছিল। জনৈক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমি ভুলক্রমে কুরবানীর পূর্বেই মাথা কামিয়ে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ যবেহ কর, কোন ক্ষতি নেই। আর এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি ভুলক্রমে কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছি। তিনি বললেনঃ কঙ্কর ছুঁড়ো, কোন অসুবিধে নেই। আবদুল্লাহ ইবন 'আমার বলেন, 'নবী (ﷺ) সেদিন পূর্বে বা পরে করা যে কোন কাজ সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হচ্ছিলেন, তিনি এ কথাই বলেছিলেনঃ কর, কোন ক্ষতি নেই।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। হাজ্জের সময় নবী (ﷺ) জিজ্ঞাসিত হলেন। কোন একজন বললঃ আমি কঙ্কর নিক্ষেপের পূর্বেই যবেহ (কুরবানী) করে ফেলেছি। ইবন আব্বাস বলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বললেনঃ কোন অসুবিধে নেই। আর এক ব্যক্তি বললঃ আমি যবেহ করার পূর্বে মাথা মুন্ডন করে ফেলেছি। তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেনঃ কোন ক্ষতি নেই।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেনঃ (শেষ যামানায়) 'ইল্ম উঠিয়ে নেয়া হবে, অজ্ঞতা ও ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে এবং 'হার্জ' বেড়ে যাবে। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! 'হার্জ' কী? তিনি হাত দ্বারা ইঙ্গিত করে বললেনঃ 'এ রকম'। যেন তিনি এর দ্বারা 'হত্যা বুঝিয়েছিলেন।
আসমা হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-র নিকট আসলাম, তিনি তখন সালাত রত ছিলেন। আমি বললাম, 'মানুষের কী হয়েছে?' তিনি আকাশের দিকে ইঙ্গিত করলেন (সূর্য গ্রহণ লেগেছে)। তখন সকল লোক (সালাতুল কুসূফ এর জন্য) দাড়িয়ে রয়েছে। আয়িশাহ বললেন, সুবহানাল্লাহ! আমি বললাম, এটা কি কোন নিদর্শন? তিনি মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করলেন, 'হ্যা।' অতঃপর আমি (সালাতে) দাড়িয়ে গেলাম। এমনকি (দীর্ঘতার কারণে) আমার জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম হল। তাই আমি মাথায় পানি ঢালতে আরম্ভ করলাম। পরে নবী (ﷺ) আল্লাহর হাম্দ ও সানা পাঠ করলেন। অতঃপর বললেনঃ যা কিছু আমাকে ইতোপূর্বে দেখানো হয়নি, তা আমি আমার এ স্থানেই দেখতে পেয়েছি। এমনকি জান্নাত ও জাহান্নামও। অতঃপর আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওয়াহী প্রেরণ করলেন, 'দাজ্জালের ন্যায় (কঠিন) পরীক্ষা অথবা তার কাছাকাছি বিপদ দিয়ে তোমাদেরকে কবরে পরীক্ষায় ফেলা হবে।' (কবরের মধ্যে) বলা হবে, 'এ ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কী জান?' তখন মুমিন ব্যক্তি বা মুকিন (বিশ্বাসী) ব্যক্তি [ফাতিমা বলেন] আসমা এর কোন শব্দটি বলেছিলেন আমি জানিনা], বলবে, 'তিনি মুহাম্মাদ (ﷺ) , তিনি আল্লাহর রাসূল। আমাদের নিকট মুজিযা ও হিদায়াত নিয়ে এসেছিলেন। আমরা তা গ্রহণ করেছিলাম এবং তার ইততিবা' করেছিলাম। তিনি মুহাম্মাদ।' তিনবার এরূপ বলবে। তখন তাকে বলা হবে, আরামে ঘুমিয়ে থাক, আমরা জানতে পারলাম যে, তুমি (দুনিয়ায়) তার উপর বিশ্বাসী ছিলে। আর মুনাফিক অথবা মুরতাব (সন্দেহ পোষণকারী) ফাতিমা বলেন, আসমা কোনটি বলেছিলেন, আমি ঠিক মনে করতে পারছি না- বলবে, আমি কিছুই জানি না। মানুষকে (তার সম্পর্কে) যা বলতে শুনেছি, আমিও তাই বলেছি।
আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস ও লোকদের মধ্যে ভাষান্তরের কাজ করতাম। একদা ইবন আব্বাস বললেন, আবদুল কায়স গোত্রের প্রতিনিধি দল নবী (ﷺ) এর নিকট আসলে তিনি বললেনঃ তোমরা কোন প্রতিনিধি দল? অথবা বললেনঃ তোমরা কোন গোত্রের? তারা বলল, রাবীআহ গোত্রের। তিনি বললেনঃ 'স্বাগতম। এ গোত্রের প্রতি অথবা এ প্রতিনিধি দলের প্রতি, এরা কোনরূপ অপদস্থ ও লাঞ্ছিত না হয়েই এসেছে। তারা বলল, আমরা বহু দূর হতে আপনার নিকট এসেছি। আর আমাদের ও আপনার মধ্যে রয়েছে কাফিরদের এই 'মুযার' গোত্রের বাস। আমরা নিষিদ্ধ মাস ব্যতীত আপনার নিকট আসতে সক্ষম নই। সুতরাং আমাদের এমন কিছু নির্দেশ দিন, যা আমাদের পশ্চাতে যারা রয়েছে তাদের নিকট পৌছাতে এবং তার ওয়াসীলায় আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি।' তখন তিনি তাদের চারটি কাজের নির্দেশ দিলেন এবং চারটি কাজ থেকে নিষেধ করলেন। তাদের এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের আদেশ করলেন। তিনি বললেনঃ এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন কীরূপে হয় জান? তারা বললঃ 'আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন।' তিনি বললেনঃ 'তা হল এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা এবং রমাযান-এর সিয়াম পালন করা আর তোমরা গনীমাতের মাল থেকে এক-পঞ্চমাংশ দান করবে।' আর তাদের নিষেধ করলেন শুকনো কদুর খোল, সবুজ কলস এবং আলকাতরা দ্বারা রঙ করা পাত্র ব্যবহার করতে। রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তোমরা এগুলো মনোযোগ সহকারে স্মরণ রাখ এবং তোমাদের পশ্চাতে যারা রয়েছে তাদের নিকট পৌছে দাও।
উকবাহ ইবন হারিস বর্ণনা করেন, তিনি আবূ ইহাব ইবন আযীয-এর কন্যাকে বিয়ে করলে তার নিকট জনৈকা স্ত্রীলোক এসে বলল, আমি উকবাহ-কে এবং সে যাকে বিয়ে করেছে তাকে (আবূ ইহাবের কন্যাকে) দুধ পান করিয়েছি। উকবাহ তাকে বললেন আমি জানি না তুমি আমাকে দুধ পান করিয়েছ, আর (ইতোপূর্বে) তুমি আমাকে একথা জানাও নি। অতঃপর তিনি মদিনায় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট গেলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ এ কথার পর তুমি কীভাবে তার সঙ্গে সংসার করবে? অতঃপর উকবাহ তার স্ত্রীকে আলাদা করে দিলেন এবং সে মহিলা অন্য স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল।
উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী বনি উমাইয়াহ ইবন যায়দের মহল্লায় বাস করতাম। এ মহল্লাটি ছিল মদিনার উচু এলাকায় অবস্থিত। আমরা দু'জনে পালাক্রমে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট উপস্থিত হতাম। তিনি একদিন আসতেন আর আমি একদিন আসতাম। আমি যেদিন আসতাম, সেদিনের ওয়াহী প্রভৃতির খবর নিয়ে তাকে পৌছে দিতাম। আর তিনি যেদিন আসতেন সেদিন তিনিও তাই করতেন। অতঃপর একদা আমার আনসারী সাথী তার পালার দিন আসলেন এবং (সেখান থেকে ফিরে) আমার দরজায় খুব জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলেন। (আমার নাম নিয়ে) বলতে লাগলেন, তিনি কি এখানে আছেন? আমি ঘাবড়ে গিয়ে তার দিকে গেলাম। তিনি বললেন, এক বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে [আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার স্ত্রীগণকে তালাক দিয়েছেন]। আমি তখনি (আমার কন্যা) হাফসাহ-এর নিকট গেলাম। তিনি তখন কাঁদছিলেন। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কি তোমাদের তালাক দিয়ে দিয়েছেন? তিনি বললেন, 'আমি জানি না।' অতঃপর আমি নবী (ﷺ) -এর নিকট গেলাম এবং দাড়িয়ে থেকেই বললামঃ আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন? জবাবে তিনি বললেনঃ 'না।' আমি তখন বললাম 'আল্লাহ আকবার'।
আবূ মাসঊদ আনসারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাতে (জামা'আতে) শামিল হতে পারি না। কারণ অমুক ব্যক্তি আমাদের নিয়ে খুব দীর্ঘ সালাত আদায় করেন। [আবূ মাসঊদ বলেন,] আমি নবী (ﷺ) -কে কোন নাসীহাতের মাজলিসে সেদিনের তুলনায় অধিক রাগান্বিত হতে দেখিনি। (রাগত স্বরে) তিনি বললেনঃ হে লোক সকল! তোমরা মানুষের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি কর। অতএব যে লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করবে সে যেন সংক্ষেপ করে। কারণ তাদের মধ্যে রোগী, দুর্বল ও কর্মব্যস্ত লোকও থাকে।
যায়দ ইবন খালিদ আল-জুহানী হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী (ﷺ) -কে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ তার বাধনের রশি অথবা বললেন, থলে-ঝুলি ভাল করে চিনে রাখ। অতঃপর এক বছর পর্যন্ত তার ঘোষণা দিতে থাক। তারপর (মালিক পাওয়া না গেলে) তুমি তা ব্যবহার কর। অতঃপর যদি এর প্রাপক আসে তবে তাকে তা দিয়ে দেবে। সে বলল, 'হারানো উটের ব্যাপারে কী করতে হবে?' এ কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন রাগ করলেন যে, তার গাল দু'টো লাল হয়ে গেল। অথবা বর্ণণাকারী বলেন, তার মুখমন্ডল লাল হয়ে গেল। তিনি বললেনঃ 'উট নিয়ে তোমার কী হয়েছে? তার তো আছে পানির মশক ও শক্ত পা। পানির নিকট যেতে পারে এবং গাছ খেতে পারে। কাজেই তাকে ছেড়ে দাও এমন সময়ের মধ্যে তার মালিক তাকে পেয়ে যাবে।' সে বলল, 'হারানো ছাগল পাওয়া গেলে?' তিনি বললেন, 'সেটি তোমার হবে, নাহলে তোমার ভাইয়ের, না হলে বাঘের।'
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ﷺ) -কে কয়েকটি অপছন্দনীয় বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। প্রশ্নের সংখ্যা অধিক হয়ে যাওয়ায় তখন তিনি রেগে গিয়ে লোকদেরকে বললেনঃ 'তোমরা আমার নিকট যা ইচ্ছা প্রশ্ন কর।' জনৈক ব্যক্তি বলল, 'আমার পিতা কে?' তিনি বললেনঃ 'তোমার পিতা হুযাফাহ।' আর এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কে?' তিনি বললেনঃ 'তোমার পিতা হল শায়বার দাস সালিম।' তখন উমার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর চেহারার অবস্থা দেখে বললেনঃ 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা মহিমান্বিত আল্লাহর নিকট তওবা করছি।'
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বের হলেন। তখন আবদুল্লাহ ইবন হুযাফাহ দাড়িয়ে বললেন, 'আমার পিতা কে?' তিনি বললেনঃ 'তোমার পিতা হুযাফাহ।' অতঃপর তিনি বারবার বলতে লাগলেন, 'তোমরা আমাকে প্রশ্ন কর।' উমার তখন জানু পেতে বসে বললেনঃ আমরা আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) -কে নবী হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে নিয়েছি।' তিনি এ কথা তিনবার বললেন। এতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নীরব হলেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন সালাম দিতেন, তিনবার সালাম দিতেন। আর যখন কোন কথা বলতেন তখন তা তিনবার বলতেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন কোন কথা বলতেন তখন তা বুঝে নেয়ার জন্য তিনবার বলতেন। আর যখন তিনি কোন গোত্রের নিকট এসে সালাম দিতেন, তাদের প্রতি তিনবার সালাম দিতেন।
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের পিছনে পড়ে গেলেন। পরে তিনি আমাদের নিকট পৌছলেন, এদিকে আমরা (আসরের) সালাত আদায় করতে বিলম্ব করে ফেলেছিলাম এবং আমরা উযূ করছিলাম। আমরা আমাদের পা কোনমতে পানি দ্বারা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চস্বরে বললেনঃ পায়ের গোড়ালিগুলোর (শুকনো থাকার) জন্য জাহান্নামের আযাব রয়েছে। তিনি দু'বার বা তিনবার এ কথা বললেন।
আবূ বুরদাহ, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ তিন ধরনের লোকের জন্য দুটি পুণ্য রয়েছেঃ (১) আহলে কিতাব- যে ব্যক্তি তার নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর উপরও ঈমান এনেছে। (২) যে ক্রীতদাস আল্লাহর হাক আদায় করে এবং তার মালিকের হাকও (আদায় করে)। (৩) যার বাদী ছিল, যার সাথে সে মিলিত হত। তারপর তাকে সে সুন্দরভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে এবং ভালভাবে দ্বীনি ইল্ম শিক্ষা দিয়েছে, অতঃপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে; তার জন্য দু'টি পুণ্য রয়েছে। অতঃপর বর্ণনাকারী আমির (তার ছাত্রকে) বলেন, তোমাকে কোন কিছুর বিনিময় ব্যতীতই হাদীসটি শিক্ষা দিলাম, অথচ পূর্বে এর চেয়ে ছোট হাদীসের জন্যও লোকেরা (দূর-দূরান্ত থেকে) সওয়ার হয়ে মদিনায় আসত।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) কে সাক্ষী রেখে বলছি, কিংবা পরবর্তী বর্ণনাকারী আতা বলেন, আমি ইবন আব্বাসকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, নবী (ﷺ) (ঈদের দিন পুরুষের কাতার থেকে) বের হলেন আর তার সঙ্গে ছিলেন বিলাল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ধারণা করলেন যে, দূরে থাকার জন্য তার নাসীহাত মহিলাদের নিকট পৌছেনি। ফলে তিনি তাদের নাসীহাত করলেন এবং দান-খায়রাত করার উপদেশ দিলেন। তখন মহিলারা কানের দুল ও হাতের আংটি দান করতে লাগলেন। আর বিলাল সেগুলো তার কাপড়ের প্রান্তে গ্রহণ করতে লাগলেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে প্রশ্ন করা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা'আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে।
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তার বান্দাদের অন্তর থেকে "ইল্ম উঠিয়ে নেন না, কিন্তু দ্বীনের আলিমদের উঠিয়ে নেয়ার ভয় করি। যখন কোন আলিম অবশিষ্ট থাকবে না তখন লোকেরা মূর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তাদের জিজ্ঞেস করা হলে না জানলেও ফাতাওয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে, এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে।
আবূ সাঈদ খুদরী (রযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নারীরা একদা নবী (ﷺ) -কে বলল, পুরুষেরা আপনার নিকট আমাদের চেয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। তাই আপনি নিজে আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারিত করে দিন। তিনি তাদের বিশেষ একটি দিনের অঙ্গীকার করলেন; সে দিন তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদের নাসীহাত করলেন ও নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদের যা যা বলেছিলেন, তার মধ্যে একথাও ছিল যে, তোমাদের মধ্যে যে স্ত্রীলোক তিনটি সন্তান পূর্বেই পাঠাবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াবে। তখন জনৈক স্ত্রীলোক বলল, আর দু'টি পাঠালে? তিনি বললেনঃ দু'টি পাঠালেও।
আবূ সাঈদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। আবদুর রহমান আল-আসবাহানী.... আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এমন তিনজন, যারা সাবালকত্বে পৌছেনি।
ইবন আবূ মুলাইকাহ বলেন, নবী (ﷺ) -এর স্ত্রী আয়িশাহ কোন কথা শুনে না বুঝলে বার বার প্রশ্ন করতেন। একদা নবী (ﷺ) বললেন, "(কিয়ামতের দিন) যার কাছ থেকে হিসেব নেয়া হবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।" আয়িশাহ বলেনঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তাআলা কি ইরশাদ করেননি, তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে- (ইনশিক্বাক ৮৪/৮)। তখন তিনি বললেনঃ তা কেবল হিসেব প্রকাশ করা। কিন্তু যার হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে নেয়া হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
আবূ শুরায়হ্ হতে বর্ণিত যে, তিনি আমর ইবন সাঈদ (মদিনার গভর্নর)-কে বললেন, যখন তিনি মক্কায় সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন- 'হে আমাদের নেতা! আমাকে অনুমতি দিলে আপনাকে এমন একটি হাদীস শুনাতে পারি যেটা মক্কা বিজয়ের পরের দিন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন। আমার দু' কান তা শ্রবণ করেছে, আমার হৃদয় তা আয়ত্ত রেখেছে, আর আমার চোখ দু'টো তা দেখেছে। তিনি আল্লাহর হাম্দ ও সানা বর্ণনা করে বললেনঃ মক্কাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, কোন মানুষ তাকে হারাম করেনি। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার জন্য সেখানে রক্তপাত করা, সেখানকার গাছ কাটা বৈধ নয়। কেউ যদি আল্লাহর রাসূলের (সেখানকার) লড়াইকে দলীল হিসেবে পেশ করে তবে তোমরা বলে দাও, আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে এর অনুমতি দিয়েছিলেন; কিন্তু তোমাদেরকে তা দেননি। আমাকেও সে দিনের কিছু সময়ের জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন। অতঃপর পূর্বের মতই আজ আবার একে তার নিষিদ্ধ হবার মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। উপস্থিতগণ যেন অনুপস্থিতদের নিকট (এ বাণী) পৌছে দেয়।' অতঃপর আবূ শুরায়হ্-কে প্রশ্ন করা হল, 'আপনার এ হাদীস শুনে আমর কী বললেন?' [আবূ শুরায়হ্ উত্তর দিলেন] তিনি বললেনঃ 'হে আবূ শুরায়হ্! (এ বিষয়ে) আমি তোমার চেয়ে অধিক জানি। মক্কা কোন বিদ্রোহীকে, কোন খুনের পলাতক আসামীকে এবং কোন চোরকে আশ্রয় দেয় না।'
আবূ বাকরাহ নবী (ﷺ) -এর কথা উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি বলেছেনঃ তোমাদের জান তোমাদের মাল বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বলেন, 'আমার মনে হয়, তিনি বলেছিলেনঃ এবং তোমাদের মান-সম্মান (অন্য মুসলিমের জন্য) এ শহরে এ দিনের মতই মর্যাদা সম্পন্ন। শোন, (আমার এ বাণী যেন) তোমাদের মধ্যে উপস্থিত ব্যক্তি অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট পৌছে দেয়। বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সত্য বলেছেন, তা-ই হয়েছে। তারপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু' দু'বার করে বললেন, হে লোক সকল! 'আমি কি পৌছে দিয়েছি?'
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে।
আবদুল্লাহ ইবন'য্-যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আমার পিতা যুবায়রকে বললামঃ আমি তো আপনাকে অমুক অমুকের মত আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর হাদীস বর্ণনা করতে শুনি না। তিনি বললেনঃ 'জেনে রাখ, আমি তার থেকে দূরে থাকিনি, কিন্তু আমি তাকে বলতে শুনেছি, যে আমার উপর মিথ্যারোপ করবে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নিবে (এজন্য হাদীস বর্ণনা করি না)।'
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এ কথাটি তোমাদের নিকট বহু হাদীস বর্ণনা করতে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়ায় যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।
সালামাহ ইবন আক্ওয়া' হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি নবী (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, 'যে ব্যক্তি আমার উপর এমন কথা আরোপ করে যা আমি বলিনি, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।'
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ 'আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমার উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখ না। আর যে আমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।'
আবূ জুহাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আলী-কে বললাম, আপনাদের নিকট কি কিছু লিপিবদ্ধ আছে? তিনি বললেনঃ 'না, শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব রয়েছে, আর একজন মুসলিমকে যে জ্ঞান দান করা হয় সেই বুদ্ধি ও বিবেক। এছাড়া কিছু এ সহীফাতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।' তিনি [আবূ জুহাইফাহ ] বলেন, আমি বললাম, এ সহীফাটিতে কী আছে? তিনি বললেন, 'ক্ষতিপূরণ ও বন্দী মুক্তির বিধান, আর এ বিধানটিও যে, 'মুসলিমকে কাফির হত্যার বিনিময়ে হত্যা করা যাবে না।'
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়কালে খুযা'আহ গোত্র লায়স গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করল। এ হত্যা ছিল তাদের এক নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ, যাকে ইতোপূর্বে লায়স গোত্রের লোক হত্যা করেছিল। তারপর এ খবর নবী (ﷺ) -এর নিকট পৌছল। তিনি তার উটের উপর আরোহণ করে ভাষণ দিলেন, তিনি বলেনঃ আল্লাহ তাআলা মক্কা হতে 'হত্যা'-কে কিংবা 'হাতী'-কে রোধ করেছেন। ইমাম বুখারী বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) 'হত্যা' বলেছেন না 'হাতী' বলেছেন এ ব্যাপারে বর্ণনাকারী আবূ নুআম সন্দেহ পোষণ করেন। অন্যরা শুধু 'হাতী' শব্দ উল্লেখ করেছেন। অবশ্য মক্কাবাসীদের উপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং মুমিনগণকে (যুদ্ধের মাধ্যমে) বিজয়ী করা হয়েছে। জেনে রাখ, আমার পূর্বে কারো জন্য মক্কাকে হালাল করা হয়নি এবং আমার পরেও হালাল হবে না। জেনে রাখ, তাও আমার জন্য দিনের কিছু সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। আরো জেনে রাখ যে, আমার এই কথা বলার মুহূর্তে আবার তা অবৈধ হয়ে গেছে। সেখানকার কোন কাঁটা কিংবা গাছ কাটা যাবে না এবং সেখানে পড়ে থাকা কোন বস্তু কুড়িয়ে নেয়া যাবে না। তবে ঘোষণা দেয়ার জন্য তা নিতে পারবে। আর কেউ নিহত হলে তার আপনজনদের জন্য দু'টি ব্যবস্থার যে কোন একটি গ্রহণের এখতিয়ার আছে। হয় তার 'রক্তপণ নিবে নয় 'কিসাসের ফায়সালা' গ্রহণ করবে। অতঃপর ইয়ামানবাসী জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! (এ কথাগুলো) আমাকে লিখে দিন। তিনি (সাহাবীদের) বললেনঃ তোমরা অমুকের পিতাকে লিখে দাও। তারপর জনৈক কুরায়শ [আব্বাস] বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! গাছপালা কাটার নিষেধাজ্ঞা হতে ইযখির (এক প্রকার লম্বা ঘাষ) বাদ দিন। কারণ তা আমরা আমাদের গৃহে ও কবরে কাজে লাগাই।' নবী (ﷺ) বললেন, 'ইযখির ব্যতীত, ইযখির ব্যতীত।'
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ) -এর সাহাবীগণের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আমর ব্যতীত আর কারো নিকট আমার চেয়ে অধিক হাদীস নেই। কারণ তিনি লিখতেন, আর আমি লিখতাম না। মা'মার হাম্মাম সূত্রে আবূ হুরাইরাহ হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর অসুখ যখন বৃদ্ধি পেল তখন তিনি বললেনঃ 'আমার নিকট লেখার জিনিস নিয়ে এস, আমি তোমাদের এমন কিছু লিখে দিব যাতে পরে তোমরা আর পথভ্রষ্ট হবে না।' উমার বললেন, 'নবী (ﷺ) -এর রোগ-যন্ত্রণা প্রবল হয়ে গেছে (এমতাবস্থায় কিছু বলতে বা লিখতে তার কষ্ট হবে)। আর আমাদের নিকট তো আল্লাহর কিতাব আছে, যা আমাদের জন্য যথেষ্ট।' এতে সাহাবীগণের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিল এবং শোরগোল বেড়ে গেল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাও। আমার নিকট ঝগড়া-বিবাদ করা অনুচিত।' এ পর্যন্ত বর্ণনা করে ইবন আব্বাস (যেখানে বসে হাদীস বর্ণনা করছিলেন সেখান থেকে) এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এলেন যে, 'হায় বিপদ, সাংঘাতিক বিপদ! আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এবং তার লেখনীর মধ্যে যা বাধ সেধেছে।'
উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক রাতে নবী (ﷺ) নিদ্রা হতে জেগে বলেনঃ সুবহানাল্লাহ্! এ রাতে কতই না বিপদাপদ নেমে আসছে এবং কতই না ভান্ডার উন্মুক্ত করা হচ্ছে! অন্য সব ঘরের নারীদেরকেও জানিয়ে দাও, 'বহু মহিলা যারা দুনিয়ায় পোশাক পরিহিতা, তারা অখিরাতে হবে বিবস্ত্র।'
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী (ﷺ) তার জীবনের শেষের দিকে আমাদের নিয়ে ইশার সালাত আদায় করলেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি দাড়িয়ে বললেনঃ তোমরা কি এ রাতের সম্পর্কে জান? বর্তমানে যারা পৃথিবীতে রয়েছে, একশ বছরের মাথায় তাদের কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার খালা নবী (ﷺ) -এর স্ত্রী মায়মূনা বিন্ত হারিস-এর ঘরে এক রাতে ছিলাম। নবী (ﷺ) সে (পালার) রাতে সেখানে ছিলেন। নবী (ﷺ) ইশার সালাত আদায় করে তার ঘরে চলে আসলেন এবং চার রাকাত সালাত আদায় করে শুয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর উঠে বললেনঃ বালকটি কি ঘুমিয়ে পড়েছে? বা এরূপ কোন কথা বললেন। অতঃপর (সালাতে) দাড়িয়ে গেলেন, আমিও তার বা দিকে গিয়ে দাড়ালাম। তিনি আমাকে তার ডান দিকে সরিয়ে এনে পাচ রাকাত সালাত আদায় করলেন। পরে আরো দু' রাকাত আদায় করলেন। অতঃপর শুয়ে পড়লেন। এমনকি আমি তার নাক ডাকার আওয়াজ শুনতে পেলাম। অতঃপর উঠে তিনি (ফজরের) সালাতের জন্য বের হলেন।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ লোকে বলে, আবূ হুরাইরাহ অধিক হাদীস বর্ণনা করে। (জেনে রাখ,) কিতাবে দু'টি আয়াত যদি না থাকত, তবে আমি একটি হাদীসও পেশ করতাম না। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেনঃ "আমি সেসব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথ-নির্দেশ অবতীর্ণ করেছি মানুষের জন্য কিতাবে তা বিস্তারিত বর্ণনার পরও যারা তা গোপন রাখে আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং অভিশাপকারীগণও তাদেরকে অভিশাপ দেয় কিন্তু যারা তওবা করে এবং আত্মসংশোধন করে এবং প্রকাশ করে দেয় যে, আমি তাদের (ক্ষমার) জন্য ফিরে আসি, আর আমি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (বাক্বারাহ ২/১৫৯-১৬০)। (প্রকৃত ঘটনা এই যে,) আমার মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে কেনাবেচায় এবং আমার আনসার ভাইয়েরা জমা-জমির কাজে মশগুল থাকত। আর আবূ হুরাইরাহ (অভুক্ত থেকে) তুষ্ট থেকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে লেগে থাকত। তাই তারা যখন উপস্থিত থাকত না, তখন সে উপস্থিত থাকত এবং তারা যা আয়ত্ত করত না সে তা আয়ত্ত রাখত।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললামঃ 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার নিকট হতে অনেক হাদীস শুনি কিন্তু ভুলে যাই।' তিনি বললেনঃ তোমার চাদর মেলে ধর। আমি তা মেলে ধরলাম। তিনি দু'হাত খাবল করে তাতে কিছু ঢেলে দেয়ার মত করে বললেনঃ এটা তোমার বুকের সাথে লাগাও। আমি তা বুকের সাথে লাগালাম। অতঃপর আমি আর কিছুই ভুলে যাইনি।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে দু'পাত্র 'ইলম আয়ত্ত করে রেখেছিলাম। তার একটি পাত্র আমি বিতরণ করে দিয়েছি। আর অপরটি এমন যে, প্রকাশ করলে আমার কণ্ঠনালী কেটে দেয়া হবে।
জারীর থেকে বর্ণিত যে, বিদায় হাজ্জের সময় নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তুমি লোকদেরকে চুপ করিয়ে দাও, তারপর তিনি বললেনঃ 'আমার পরে তোমরা একে অপরের গর্দান কাটাকাটি করে কাফির (এর মত) হয়ে যেও না।'
সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ইবন আব্বাস-কে বললাম, নাওফ আল-বাকালী দাবী করে যে, মূসা (আ) [যিনি খাযির (আ)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন তিনি] বনী ইসরাঈলের মূসা নন বরং তিনি অন্য এক মূসা। (একথা শুনে) তিনি বললেনঃ আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলেছে। উবাঈ ইবন কা'ব নবী (ﷺ) হতে আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ মূসা (আ) একদা বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বক্তৃতা দিতে দাড়ালেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে জ্ঞানী কে? তিনি বললেন, 'আমি সবচেয়ে জ্ঞানী।' মহান আল্লাহ তাকে সতর্ক করে দিলেন। কেননা তিনি 'ইল্মকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ করেন নি। অতঃপর আল্লাহ তার নিকট এ ওয়াহী প্রেরণ করলেনঃ দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে আমার বান্দাদের মধ্যে এক বান্দা রয়েছে, যে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। তিনি বলেন, 'হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে তার সাক্ষাৎ পাব?' তখন তাকে বলা হল, থলের মধ্যে একটি মাছ নিয়ে নাও। অতঃপর যেখানে সেটি হারিয়ে ফেলবে সেখানেই তাকে পাবে। অতঃপর তিনি ইউশা 'ইবন নূনকে সাথে নিয়ে যাত্রা করলেন। তারা থলের মধ্যে একটি মাছ নিলেন। পথিমধ্যে তারা একটি বড় পাথরের নিকট এসে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। তারপর মাছটি থলে হতে বেরিয়ে গেল এবং সুড়ঙ্গের মত পথ করে সমুদ্রে চলে গেল। এ ব্যাপারটি মূসা (আ) ও তার খাদিম-এর জন্য ছিল আশ্চর্যের বিষয়। অতঃপর তারা তাদের বাকী দিন ও রাতভর চলতে থাকলেন। পরে ভোরবেলা মূসা (আ) তার খাদিমকে বললেন, 'আমাদের নাশতা নিয়ে এস, আমরা আমাদের এ সফরে খুবই ক্লান্ত, আর মূসা (আ)-কে যে স্থানের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সে স্থান অতিক্রম করার পূর্বে তিনি ক্লান্তি অনুভব করেন নি। তারপর তার সাথী তাকে বলল, 'আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন পাথরের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম?' মূসা (আ) বললেন, আমরা তো সেই স্থানটিরই খোজ করছিলাম।' অতঃপর তারা তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললেন। তারা সেই পাথরের নিকট পৌছে দেখতে গেলেন, এক ব্যক্তি (বর্ণনাকারী বলেন,) কাপড় মুড়ি দিয়ে আছেন। মূসা (আ) তাকে সালাম দিলেন। তখন খাযির বললেন, এ দেশে সালাম কোথা হতে আসল! তিনি বললেন, 'আমি মূসা।' খাযির প্রশ্ন করলেন, 'বনী ইসরাঈলের মূসা (আ)?' তিনি বললেন, 'হ্যা। তিনি আরো বললেন, "সত্য পথের যে জ্ঞান আপনাকে দান করা হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্য আমি কি আপনাকে অনুসরণ করতে পারি?' খাযির বললেন, "তুমি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না। হে মূসা (আ)! আল্লাহর 'ইল্মের মধ্যে আমি এমন এক 'ইল্ম নিয়ে আছি যা তিনি কেবল আমাকেই শিখিয়েছেন, যা তুমি জান না। আর তুমি এমন 'ইল্মের অধিকারী, যা আল্লাহ তোমাকেই শিখিয়েছেন, তা আমি জানি না।" 'মূসা (আ) বললেন, "আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার আদেশ অমান্য করব না। অতঃপর তারা দু'জন সমুদ্র তীর দিয়ে চলতে লাগলেন, তাদের কোন নৌকা ছিল না। ইতোমধ্যে তাদের নিকট দিয়ে একটি নৌকা যাচ্ছিল। তারা নৌকাওয়ালাদের সাথে তাদের তুলে নেয়ার কথা বললেন। তারা খাযিরকে চিনতে পারল এবং ভাড়া ব্যতিরেকে তাদের নৌকায় তুলে নিল। তখন একটি চড়ুই পাখি এসে নৌকার এক প্রান্তে বসে একবার কি দু'বার সমুদ্রে তার ঠোঁট ডুবাল। খাযির বললেন, 'হে মূসা (আ)! আমার এবং তোমার জ্ঞান (সব মিলেও) আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় চড়ুই পাখির ঠোঁটে যতটুকু পানি এসেছে তার চেয়েও কম।' অতঃপর খাযির নৌকার তক্তাগুলোর মধ্য থেকে একটি খুলে ফেললেন। মূসা (আ) বললেন, এরা আমাদের বিনা ভাড়ায় আরোহণ করিয়েছে, আর আপনি আরোহীদের ডুবিয়ে দেয়ার জন্য নৌকাটি ছিদ্র করে দিলেন?' খাযির বললেন, "আমি কি বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কিছুতেই ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না?" মূসা (আ) বললেন, 'আমার ত্রুটির জন্য আমাকে অপরাধী করবেন না এবং আমার ব্যাপারে অধিক কঠোর হবেন না।' বর্ণনাকারী বলেন, এটা মূসা (আ)-এর প্রথমবারের ভুল। অতঃপর তারা দু'জন (নৌকা থেকে নেমে) চলতে লাগলেন। (পথে) একটি বালক অন্যান্য বালকের সাথে খেলা করছিল। খাযির তার মাথার উপর দিক দিয়ে ধরলেন এবং হাত দিয়ে তার মাথা ছিন্ন করে ফেললেন। মূসা (আ) বললেন, 'আপনি হত্যার অপরাধ ছাড়াই একটি নিষ্পাপ জীবন নাশ করলেন?' খাযির বললেন "আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সঙ্গে কখনো ধৈর্য ধরতে পারবে না?" ইব্ন 'উয়ায়নাহ বলেন, এটা ছিল পূর্বের চেয়ে অধিক জোরালো। "তারপর আবারো চলতে লাগলেন; চলতে চলতে তারা এক গ্রামের অধিবাসীদের নিকট পৌছে তাদের নিকট খাদ্য চাইলেন কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। অতঃপর সেখানে তারা ধ্বসে যাওয়ার উপক্রম এমন একটি প্রাচীর দেখতে পেলেন। খাযির তার হাত দিয়ে সেটি দাড় করে দিলেন। মূসা (আ) বললেন, "আপনি ইচ্ছে করলে এর জন্য মজুরী নিতে পারতেন। তিনি বললেন, 'এখানেই তোমার আর আমার মধ্যে সম্পর্কের অবসান।"(কাহ্ফঃ ৭৭-৭৮) নবী (ﷺ) বলেনঃ আল্লাহ তাআলা মূসার উপর রহম করুন। আমাদের কতই না মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হতো যদি তিনি সবর করতেন, তাহলে আমাদের নিকট তাদের আরো ঘটনাবলী বর্ণনা করা হতো।
আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে যুদ্ধ কোনটি, কেননা আমাদের কেউ লড়াই করে রাগের বশবর্তী হয়ে, আবার কেউ লড়াই করে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। তিনি তার দিকে মাথা তুলে তাকালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তার মাথা তোলার কারণ ছিল যে, সে ছিল দাড়ানো। অতঃপর তিনি বললেনঃ 'আল্লাহর বাণী বিজয়ী করার জন্য যে যুদ্ধ করে তার লড়াই আল্লাহর পথে হয়।'
আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি নবী (ﷺ) -কে দেখলাম, জামরাহর নিকট তাকে মাসআলা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কংকর মারার পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছি।' তিনি বললেনঃ 'কঙ্কর মার, তাতে কোন ক্ষতি নেই।' অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কুরবানী করার পূর্বেই মাথা কামিয়ে ফেলেছি।' তিনি বললেনঃ 'কুরবানী করে নাও, কোন ক্ষতি নেই।' বস্তুত আগ পিছ করার যে কোন প্রশ্নই তাকে করা হচ্ছিল, তিনি বলছিলেনঃ 'কর, কোন ক্ষতি নেই।'
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি নবী (ﷺ) -এর সাথে মাদ্বীনার বসতিহীন এলাকা দিয়ে চলছিলাম। তিনি একখানি খেজুরের ডালে ভর দিয়ে একদল ইয়াহুদীর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা একজন অন্যজনকে বলতে লাগল, 'তাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর।' আর একজন বলল, 'তাকে কোন প্রশ্ন করো না, হয়ত এমন কোন জবাব দিবেন যা তোমরা পছন্দ করোনা।' আবার কেউ কেউ বলল, 'তাকে আমরা প্রশ্ন করবই।' অতঃপর তাদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, 'হে আবুল কাসিম! রূহ কী?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) চুপ করে রইলেন, আমি মনে মনে বললাম, তার প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছে। তাই আমি দাড়িয়ে রইলাম। অতঃপর যখন সে অবস্থা কেটে গেল তখন তিনি বললেনঃ "তারা তোমাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ ঘটিত। এবং তাদেরকে সামান্যই জ্ঞান দেয়া হয়েছে।" (ইসরা ১৭/৮৫)
আসওয়াদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইবন যুবায়র আমাকে বললেন, আয়িশাহ তোমাকে অনেক হাদীস গোপনে বলতেন। বল তো কাবা সম্পর্কে তোমাকে কী বলেছেন? আমি বললাম, তিনি আমাকে বলেছেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আয়িশাহ! তোমাদের কওম যদি (ইসলাম গ্রহণে) নতুন না হত, ইব্ন যুবায়র বলেনঃ কুফর থেকে; তবে আমি কাবা ভেঙ্গে ফেলে তার দু'টি দরজা বানাতাম। এক দরজা দিয়ে লোক প্রবেশ করত আর এক দরজা দিয়ে বের হত। (পরবর্তীকালে মক্কার আধিপত্য পেলে) তিনি এরূপ করেছিলেন।
আবু আত-তুফাইল থেকে বর্ণিত:
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, একদা মুআয নবী (ﷺ) -এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলেন, তখন তিনি তাকে ডাকলেন, হে মুআয ইবন জাবাল! মুআয বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল আমি আপনার সার্বিক সহযোগিতা ও খিদমাতে হাযির আছি। তিনি ডাকলেন, মুআয! মুআয উত্তর দিলেন, আমি হাযির হে আল্লাহর রাসূল এবং প্রস্তুত।' তিনি আবার ডাকলেন, মুআয। তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি হাযির এবং প্রস্তুত'। এরূপ তিনবার করলেন। অতঃপর বললেনঃ যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, 'আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল'-তার জন্য আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। মুআয বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?' তিনি বললেন, 'তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে।' মুআয (জীবন ভর এ হাদীসটি বর্ণনা করেননি) মৃত্যুর সময় এ হাদীসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে ('ইল্ম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, নবী (ﷺ) মুআয-কে বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোনরূপ শির্ক না করে তার সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। মুআয বললেন, 'আমি কি লোকদের সুসংবাদ দেব না?' তিনি বললেন, 'না, আমার আশংকা হচ্ছে যে, তারা এর উপরই ভরসা করে বসে থাকবে।'
উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট উম্মু সুলায়ম এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ হক কথা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। মহিলাদের স্বপ্নদোষ হলে কি গোসল করতে হবে? নবী (ﷺ) বললেনঃ 'হ্যা, যখন সে বীর্য দেখতে পাবে।' তখন উম্মু সালামাহ (লজ্জায়) তার মুখ ঢেকে নিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! মহিলাদেরও স্বপ্নদোষ হয় কি?' তিনি বললেন, 'হ্যা, তোমার ডান হাতে মাটি পড়ুক! (তা না হলে) তাদের সন্তান তাদের আকৃতি পায় কীভাবে?
ইবন্উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ গাছের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যার পাতা ঝরে পড়ে না এবং তা হল মুসলিমের দৃষ্টান্ত। তোমরা আমাকে বল তো সেটা কোন গাছ? তখন লোকজনের খেয়াল জঙ্গলের গাছপালার প্রতি গেল। আর আমার মনে হতে লাগল যে, সেটি খেজুর গাছ। আবদুল্লাহ বলেন, 'কিন্তু আমি লজ্জাবোধ করলাম।' সহাবায়ে কিরাম বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনিই আমাদের তা বলে দিন।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ 'তা হল খেজুর গাছ।' আবদুল্লাহ বলেন, 'তারপর আমি আমার পিতাকে আমার মনে যা এসেছিল তা বললাম।' তিনি বললেন, 'তুমি তখন তা বলে দিলে তা আমার নিকট এরূপ এরূপ জিনিস লাভ করার চেয়ে অধিক প্রিয় হতো।'
আলী ইবন আবূ তালিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার অধিক পরিমাণে 'মযী' বের হত। তাই এ ব্যাপারে নবী (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করার জন্য মিকদাদকে বললাম। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ 'এতে কেবল উযূ করতে হয়।'
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি মসজিদে দাড়িয়ে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের কোন স্থান হতে ইহরাম বাধার নির্দেশ দেন?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ মদিনা্বাসী ইহরাম বাধবে 'যু'ল-হুলাইফাহ' হতে, সিরিয়াবাসী ইহরাম বাধবে 'জুহফা' হতে এবং নাজদবাসী ইহরাম বাধবে 'কর্ন' হতে। ইবন উমার বলেন, সাহাবীগণ বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এও বলেছেনঃ 'এবং ইয়ামানবাসী ইহরাম বাধবে 'ইয়ালামলাম' হতে।' ইবন উমার বলেছেন, 'এ কথাটি আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বুঝে নেইনি।'
ইবন উমার নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল, 'মুহরিম কী কাপড় পরিধান করবে?' তিনি বললেনঃ 'জামা, পাগড়ী, পাজামা, টুপি এবং কুসুম বা যাফরান রঙ্গে রঞ্জিত কোন কাপড় পরিধান করবে না। জুতা না পেলে চামড়ার মোজা পরতে পারে, তবে এমনভাবে কেটে ফেলতে হবে যাতে মোজা দু'টি পায়ের গিরার নিচে থাকে।