আল্লাহর স্মরণার্থে মসজিদে অবসর নেওয়া (ইতিকাফ) (২০২৫-২০৪৬)
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করতেন।
নবী সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) রমাযানের শেষ দশক ই'তিকাফ করতেন। তার ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তার সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ই'তিকাফ করতেন।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রমাযানের মধ্যম দশকে ই'তিকাফ করতেন। এক বছর এরূপ ই'তিকাফ করেন, যখন একুশের রাত এল, যে রাতের সকালে তিনি তার ই'তিকাফ হতে বের হবেন, তখন তিনি বললেনঃ যারা আমার সঙ্গে ই'তিকাফ করেছে তারা যেন শেষ দশকে ই'তিকাফ করে। আমাকে স্বপ্নে এই রাত (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল, পরে আমাকে তা (সঠিক তারিখ) ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশ্য আমি স্বপ্নে দেখতে পেয়েছি যে, ঐ রাতের সকালে আমি কাদা-পানির মাঝে সিজদা করছি। তোমরা তা শেষ দশকে তালাশ কর এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তালাশ কর। পরে এই রাতে আকাশ হতে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, মসজিদের ছাদ ছিল খেজুরের পাতার ছাউনির। ফলে মসজিদে টপটপ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। একুশের রাতের সকালে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কপালে কাদা-পানির চিহ্ন আমার এ দু'চোখ দেখতে পায়।
নবী সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মসজিদে ই'তিকাফরত অবস্থায় নবী (ﷺ) আমার দিকে তার মাথা ঝুকিয়ে দিতেন আর আমি ঋতুমতী অবস্থায় তার চুল আচড়িয়ে দিতাম।
নবী সহধর্মিণী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই'তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমার ঋতুমতী অবস্থায় আমার সঙ্গে (প্রাকৃতিক) প্রয়োজনে মিশতেন।
এবং তিনি ই'তিকাফরত অবস্থায় মাসজিদ হতে তার মাথা বের করে দিতেন, আমি ঋতুমতী অবস্থায় তা ধুয়ে দিতাম।
ইবন উমার সূত্রে বর্ণিত যে, উমার নবী (ﷺ) কে জিজ্ঞেস করেন যে, আমি জাহিলিয়্যা যুগে মাসজিদুল হারামে এক রাত ই'তিকাফ করার মানৎ করেছিলাম। তিনি (উত্তরে) বললেনঃ তোমার মানৎ পুরা কর।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রমাযানের শেষ দশকে নবী (ﷺ) ই'তিকাফ করতেন। আমি তার তাবু তৈরি করে দিতাম। তিনি ফজরের সালাত আদায় করে তাতে প্রবেশ করতেন। (নবী-সহধর্মিণী) হাফসাহ্ তাবু খাটাবার জন্য আয়িশাহ-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলে হাফসাহ্ তাবু খাটালেন। (নবী-সহধর্মিনী) যায়নাব বিনতু জাহশ তা দেখে আরেকটি তাবু তৈরি করলেন। সকালে নবী (ﷺ) তাবুগুলো দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ এগুলো কী? তাকে জানানো হলে তিনি বললেনঃ তোমরা কি মনে কর এগুলো দিয়ে নেকী হাসিল হবে? এ মাসে তিনি ই'তিকাফ ত্যাগ করলেন এবং পরে শাওয়াল মাসে দশ দিন (কাযা স্বরূপ) ই'তিকাফ করেন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) ই'তিকাফ করার ইচ্ছা করলেন। এরপর যে স্থানে ই'তিকাফ করার ইচ্ছা করেছিলেন সেখানে এসে কয়েকটি তাবু দেখতে পেলেন। (তাবুগুলো হল নবী-সহধর্মিণী) আয়িশাহ, হাফসাহ্ ও যায়নাব-এর তাবু। তখন তিনি বললেনঃ তোমরা কি এগুলো দিয়ে নেকী হাসিলের ধারণা কর? এরপর তিনি চলে গেলেন আর ই'তিকাফ করলেন না। পরে শাওয়াল মাসে দশ দিনের ই'তিকাফ করলেন।
নবী-সহধর্মিণী সফীয়্যাহ বর্ণনা করেন যে, একদা তিনি রমাযানের শেষ দশকে মসজিদে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর খিদমতে উপস্থিত হন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ই'তিকাফরত ছিলেন। সাফিয়্যাহ তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলেন। অতঃপর ফিরে যাবার জন্য উঠে দাড়ান। নবী (ﷺ) তাকে পৌছে দেয়ার উদ্দেশে উঠে দাড়ালেন। যখন তিনি উম্মু সালামাহ-এর গৃহ সংলগ্ন মসজিদের দরজা পর্যন্ত পৌছলেন, তখন দু'জন আনসারী সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা উভয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে সালাম করলেন। তাদের দু'জনকে নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা দু'জন থাম। ইনি তো (আমার স্ত্রী সাফিয়্যাহ বিনতু হুয়ায়্যী। এতে তারা দু'জনে 'সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহর রাসূল' বলে উঠলেন এবং তারা বিব্রত বোধ করলেন। নবী (ﷺ) বললেনঃ শয়তান মানুষের রক্তের শিরায় চলাচল করে। আমি ভয় করলাম যে, সে তোমাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে।
আবূ সালামা ইবন আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ সাঈদ খুদরী-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে লাইলাতুল কাদর প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে শুনেছেন? তিনি বললেন, হা, আমরা রমাযানের মধ্যম দশকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ই'তিকাফ করেছিলাম। রাবী বলেন, এরপর আমরা বিশ তারিখের সকালে বের হতে চাইলাম। তিনি বিশ তারিখের সকালে আমাদেরকে সম্বোধন করে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন আমাকে (স্বপ্নযোগে) লাইলাতুল কদর (-এর নির্দিষ্ট তারিখ) দেখানো হয়েছিল। পরে আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বেজোড় তারিখে তা খোজ কর। আমি দেখেছি যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ই'তিকাফ করেছে সে যেন ফিরে আসে (বের হওয়া হতে বিরত থাকে)। লোকেরা মসজিদে ফিরে এল। আমরা তখন আকাশে এক খন্ড মেঘও দেখতে পাইনি। একটু পরে এক খন্ড মেঘ দেখা দিল ও বর্ষণ হল এবং সালাত শুরু হল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কাদা-পানির মাঝে সিজদা করলেন। এমনকি আমি তার কপালে ও নাকে কাদার চিহ্ন দেখতে পেলাম।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে তার এক মুস্তাহাযা সহধর্মিণী ই'তিকাফ করেন। তিনি লাল ও হলুদ রংয়ের স্রাব নির্গত হতে দেখতে পেতেন। অনেক সময় আমরা তার নীচে একটি গামলা রেখে দিতাম আর তিনি তার উপর সালাত আদায় করতেন।
আলী ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) সহধর্মিণী সাফিয়্যাহ বর্ণনা করেন, নবী (ই'তিকাফ অবস্থায়) মসজিদে অবস্থান করছিলেন, ঐ সময় তার নিকট তার সহধর্মিণীগণ উপস্থিত ছিলেন। তারা যাওয়ার জন্য রওয়ানা হন। তিনি (আল্লাহর রাসূল (ﷺ)) সাফিয়্যাহ বিনতে হুয়ায়্যীকে বললেনঃ তুমি তাড়াতাড়ি করো না। আমি তোমার সাথে যাব। তার [সাফিয়্যাহ]-এর ঘর ছিল উসামার বাড়িতে। এরপর নবী (ﷺ) তাকে সঙ্গে করে বের হলেন। এমতাবস্থায় দু'জন আনসার ব্যক্তির সাক্ষাৎ ঘটলে তারা নবী (ﷺ) -কে দেখতে পেয়ে (দ্রুত) আগে বেড়ে গেলেন। নবী (ﷺ) তাদের দু'জনকে বললেনঃ তোমরা এদিকে আস। এতো সাফিয়্যাহ বিন্তু হুয়ায়্যী। তারা দু'জন বলে উঠলেন, সুবহানাল্লাহ হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ শয়তান মানুষের শরীরে রক্তের মত চলাচল করে। আমি আশঙ্কা করলাম যে, সে তোমাদের মনে কিছু সন্দেহ ঢুকিয়ে দিবে।
সাফিয়্যাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) এর ই'তিকাফ অবস্থায় একদা তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি যখন ফিরে যান তখন নবী (ﷺ) তার সাথে কিছু দূর হেটে আসেন। ঐ সময়ে এক আনসার ব্যক্তি তাকে দেখতে পায়। তিনি যখন তাকে দেখতে পেলেন তখন তাকে ডাক দিলেন ও বললেনঃ এসো, এ তো সাফিয়্যাহ বিনতু হুয়ায়্যী। শয়তান মানব দেহে রক্তের মত চলাচল করে থাকে। রাবী বলেন, আমি সুফইয়ান-কে বললাম, তিনি রাতে এসেছিলেন? তিনি বললেন, রাতে ছাড়া আর কি?
আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রমাযানের মাঝের দশকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ই'তিকাফ করেছিলাম। বিশ তারিখের সকালে (ই'তিকাফ শেষ করে চলে আসার উদ্দেশে) আমরা আমাদের আসবাবপত্র সরিয়ে ফেলি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের নিকটে এসে বললেনঃ যে ব্যক্তি ই'তিকাফ করেছে সে যেন তার ই'তিকাফ স্থলে ফিরে যায়। কারণ আমি এই রাতে (লাইলাতুল কদর) দেখতে পেয়েছি এবং আমি আরো দেখেছি যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। এরপর যখন তিনি তার ই'তিকাফের স্থানে ফিরে গেলেন ও আকাশে মেঘ দেখা দিল, তখন আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হল। সেই সত্তার কসম! যিনি তাকে যথাযথই প্রেরণ করেছেন, ঐ দিনের শেষভাগে আকাশে মেঘ দেখা দিল। মাসজিদ ছিল খেজুর পাতার ছাউনির। আমি তার নাকের অগ্রভাগে পানি ও কাদার চিহ্ন দেখেছিলাম।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রতি রমাযানে ই'তিকাফ করতেন। ফজরের সালাত শেষে ই'তিকাফের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করতেন। আয়িশাহ তার কাছে ই'তিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। আয়িশাহ মসজিদে (নিজের জন্য) একটি তাবু করে নিলেন। হাফসাহ তা শুনে (নিজের জন্য) একটি তাবু তৈরি করে নিলেন এবং যায়নাব-ও তা শুনে (নিজের জন্য) আর একটি তাবু তৈরি করে নিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফজরের সালাত শেষে এসে চারটি তাবু দেখতে পেয়ে বললেনঃ একী? তাকে তাদের ব্যাপার জানানো হলে, তিনি বললেনঃ নেক আমলের প্রেরণা তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেনি। সব খুলে ফেলা হল। তিনি সেই রমাযানে আর ই'তিকাফ করলেন না। পরে শাওয়াল মাসের শেষ দশকে ই'তিকাফ করেন।
উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহিলিয়্যাতের যুগে মসজিদে হারামে এক রাত ই'তিকাফ করার মানৎ করেছিলাম। নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমার মানৎ পুরা কর। তিনি এক রাতের ই'তিকাফ করলেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার জাহিলিয়্যাতের যুগে মসজিদে হারামে ই'তিকাফ করার মানত করেছিলেন। (বর্ণনাকারী) বলেন, আমার মনে হয় তিনি এক রাতের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমার মানৎ পুরা কর।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) প্রতি রমাযানে দশ দিনের ই'তিকাফ করতেন। যে বছর তিনি ইন্তিকাল করেন সে বছর তিনি বিশ দিনের ইতিকাফ করেছিলেন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রমাযানের শেষ দশকে ই'তিকাফ করার ইচ্ছ প্রকাশ করলে আয়িশাহ তার কাছে ই'তিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। এরপর হাফসাহ্ আয়িশাহ-এর নিকট অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। তা দেখে যায়নাব বিনতু জাহশ নিজের জন্য তাবু লাগানোর নির্দেশ দিলে তা পালন করা হল। আয়িশাহ বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফজরের সালাত আদায় করে নিজের তাবুতে ফিরে এসে কয়েকটি তাবু দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেনঃ এ কী ব্যাপার? লোকেরা বলল, আয়িশাহ, হাফসাহ্ ও যায়নাব-এর তাবু। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ তারা কি নেকী পেতে চায়? আমি আর ই'তিকাফ করবো না। এরপর তিনি ফিরে আসলেন। পরে সওম শেষ করে শাওয়াল মাসের দশ দিন ই'তিকাফ করেন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি ঋতুমতী অবস্থায় নবী (ﷺ) -এর চুল আচড়িয়ে দিতেন। ঐ সময়ে তিনি মসজিদে ই'তিকাফ অবস্থায় থাকতেন আর আয়িশাহ তার হুজরায় অবস্থান করতেন। তিনি আয়িশাহ-এর দিকে তার মাথা বাড়িয়ে দিতেন।