bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

ওয়াহ্‌য়ীর সূচনা (১-৭)

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়্যাত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরাত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশে- তবে তার হিজরাত সে উদ্দেশেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরাত করেছে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। হারিস ইবন হিশাম আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট ওয়াহী কিরূপে আসে?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ [কোন কোন সময় তা ঘণ্টা বাজার মত আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয় এবং তা শেষ হতেই ফেরেশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই, আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আমার সাথে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই।] আয়িশাহ বলেন, আমি তীব্র শীতের সময় ওয়াহী নাযিলরত অবস্থায় তাকে দেখেছি। ওয়াহী শেষ হলেই তার ললাট হতে ঘাম ঝরে পড়ত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট সর্বপ্রথম যে ওয়াহী আসে, তা ছিল নিদ্রাবস্থায় বাস্তব স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রকাশিত হতো। অতঃপর তার নিকট নির্জনতা পছন্দনীয় হয়ে দাড়ায় এবং তিনি 'হেরা'র গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। আপন পরিবারের নিকট ফিরে এসে কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে- এভাবে সেখানে তিনি এক নাগাড়ে বেশ কয়েক দিন ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন। অতঃপর খাদীজাহ-এর নিকট ফিরে এসে আবার একই সময়ের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যেতেন। এভাবে 'হেরা' গুহায় অবস্থানকালে তার নিকট ওয়াহী আসলো। তার নিকট ফেরেশতা এসে বললো, 'পাঠ করুন'। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ "আমি বললাম, 'আমি পড়তে জানি না। তিনি (ﷺ) বলেনঃ অতঃপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো, 'পাঠ করুন'। আমি বললামঃ আমি তো পড়তে জানি না।' সে দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললোঃ 'পাঠ করুন'। আমি উত্তর দিলাম, 'আমি তো পড়তে জানি না।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, অতঃপর তৃতীয়বারে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, "পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত পিন্ড থেকে, পাঠ করুন, আর আপনার রব অতিশয় দয়ালু"- ('আলাক্ব ৯৬/১-৩)। অতঃপর এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -প্রত্যাবর্তন করলেন। তার হৃদয় তখন কাঁপছিল। তিনি খাদীজাহ বিন্তু খুওয়ায়লিদের নিকট এসে বললেন, 'আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর', 'আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর।' তারা তাকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। এমনকি তার শংকা দূর হলো। তখন তিনি খাদীজাহ -এর নিকট ঘটনাবৃত্তান্ত জানিয়ে তাকে বললেন, আমি আমার নিজেকে নিয়ে শংকা বোধ করছি। খাদীজাহ বললেন, আল্লাহর কসম, কখনই নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনও লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন। অতঃপর তাকে নিয়ে খাদীজাহ তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকাহ ইবন নাওফাল ইবন আবদুল আসাদ ইবন আবদুল 'উযযাহ'র নিকট গেলেন, যিনি অন্ধকার যুগে ঈসায়ী ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইবরানী ভাষায় লিখতে পারতেন এবং আল্লাহর তাওফীক অনুযায়ী ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল হতে ভাষান্তর করতেন। তিনি ছিলেন অতিবৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদীজাহ তাকে বললেন, 'হে চাচাতো ভাই! আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা! তুমি কী দেখ?' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা দেখেছিলেন, সবই বর্ণনা করলেন। তখন ওয়ারাকাহ তাকে বললেন, এটা সেই বার্তাবাহক যাকে আল্লাহ মূসা-এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। আফসোস! আমি যদি সেদিন থাকতাম। আফসোস! আমি যদি সেদিন জীবিত থাকতাম, যেদিন তোমার কওম তোমাকে বহিষ্কার করবে।' আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে?' তিনি বললেন, 'হ্যা, তুমি যা নিয়ে এসেছো অনুরূপ (ওয়াহী) কিছু যিনিই নিয়ে এসেছেন তার সঙ্গেই বৈরিতাপূর্ণ আচরণ করা হয়েছে। সেদিন যদি আমি থাকি, তবে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব।' এর কিছুদিন পর ওয়ারাকাহ ইন্তিকাল করেন। আর ওয়াহীর বিরতি ঘটে।

জাবির ইবন 'আব্দুল্লাহ্ আনসারী ওয়াহী স্থগিত হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ একদা আমি হাটছি, হঠাৎ আসমান হতে একটি শব্দ শুনতে পেয়ে আমার দৃষ্টিকে উপরে তুললাম। দেখলাম, সেই ফেরেশতা, যিনি হেরা গুহায় আমার নিকট এসেছিলেন, আসমান ও যমীনের মাঝে একটি আসনে উপবিষ্ট। এতে আমি শংকিত হলাম। অবিলম্বে আমি ফিরে এসে বললাম, 'আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর, আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর।' অতঃপর আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন, "হে বস্ত্রাবৃত রাসূল! (১) উঠুন, সতর্ক করুন; আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন; এবং স্বীয় পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র রাখুন; (৫) এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন।" (সূরাহ্ঃ মুদ্দাস্সির ৭৪/১-৫) অতঃপর ওয়াহী পুরোদমে ধারাবাহিক অবতীর্ণ হতে লাগল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। মহান আল্লাহর বাণীঃ "ওয়াহী দ্রুত আয়ত্ত করার জন্য আপনি ওয়াহী নাযিল হওয়ার সময় আপনার জিহবা নাড়বেন না।" (কিয়ামাহ ৭৫/১৬)-এর ব্যাখ্যায় ইবন আব্বাস বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ওয়াহী অবতরণের সময় তা আয়ত্ত করতে বেশ কষ্ট করতেন এবং প্রায়ই তিনি তার উভয় ঠোঁট নড়াতেন।' ইবন আব্বাস বলেন, 'আমি তোমাকে দেখানোর জন্য ঠোঁট দুটি নাড়ছি যেভাবে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তা নড়াতেন।' সাঈদ (তার শিষ্যদের) বলেন, 'আমি ইবন আব্বাস-কে যেরূপে তার ঠোঁট দুটি নড়াতে দেখেছি, সেভাবেই আমার ঠোঁট দুটি নড়াচ্ছি।' এই বলে তিনি তার ঠোঁট দুটি নড়ালেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেনঃ "ওয়াহী দ্রুত আয়ত্ত করার জন্য আপনি ওয়াহী নাযিল হবার সময় আপনার জিহবা নড়াবেন না, এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমার"- (কিয়ামাহ ৭৫/১৬)। ইবন আব্বাস বলেন, "এর অর্থ হলোঃ তোমার অন্তরে তা হেফাযত করা এবং তোমার দ্বারা তা পাঠ করানো। "সুতরাং আমি যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন"- (কিয়ামাহ ৭৫/১৮)। ইবন আব্বাস বলেন, মনোযোগ সহকারে শুন এবং চুপ থাক। "তারপর এর বিশদ বর্ণনার দায়িত্ব তো আমারই"- (কিয়ামাহ ৭৫/১৯)। তুমি তা পাঠ করবে, এটাও আমার দায়িত্ব। তারপর যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট জিবরীল আসতেন, তখন তিনি মনোযোগ দিয়ে কেবল শুনতেন। জিবরীল চলে যাবার পর তিনি যেমন পাঠ করেছিলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -ও তদ্রূপ পাঠ করতেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল রমাযানে তিনি আরো অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরীল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। আর রমাযানের প্রতি রাতেই জিবরীল তার সাথে দেখা করতেন এবং তারা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বর্ণনা করেন যে, আবূ সুফইয়ান ইবন হরব তাকে বলেছেন, রাজা হিরাক্লিয়াস একদা তার নিকট লোক প্রেরণ করলেন। তিনি তখন ব্যবসা উপলক্ষে কুরাইশদের কাফেলায় সিরিয়ায় ছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সে সময় আবূ সুফইয়ান ও কুরাইশদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিতে আবদ্ধ ছিলেন। আবূ সুফইয়ান তার সাথী সহ হিরাক্লিয়াসের নিকট আসলেন এবং তখন হিরাক্লিয়াস জেরুযালেমে ছিলেন। হিরাক্লিয়াস তাদেরকে তার নিকটে ডেকে পাঠালেন। তার নিকটে তখন রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিল। অতঃপর তাদের নিকটে ডাকলেন এবং দোভাষীকে ডাকলেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, 'এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করে-তোমাদের মাঝে বংশের দিক হতে তার সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে'? আবূ সুফইয়ান বলেন, 'আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমিই তার নিকটাত্মীয়।' তিনি বললেন, 'তাকে আমার অতি নিকটে আন এবং তার সাথীদেরকেও তার পেছনে বসিয়ে দাও।' অতঃপর তার দোভাষীকে বললেন, 'তাদের বলে দাও, আমি এর নিকট সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব, যদি সে আমার নিকট মিথ্যা বলে, তখন সঙ্গে সঙ্গে তোমরা তাকে মিথ্যুক বলবে। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমার যদি এ লজ্জা না থাকত যে, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে, তবে আমি অবশ্যই তার সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।' অতঃপর তিনি তার সম্পর্কে আমাকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন করেন তা হলো, 'বংশমর্যাদার দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সে কিরূপ?' আমি বললাম, 'তিনি আমাদের মধ্যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের।' তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে এর পূর্বে আর কখনো কি কেউ এরূপ কথা বলেছে?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তার পূর্বপুরুষের মধ্যে কেউ কি বাদশাহ ছিলেন?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'সম্ভ্রান্ত মর্যাদাবান শ্রেণীর লোকেরা তার অনুসরণ করে, নাকি দুর্বল লোকেরা?' আমি বললাম, 'দুর্বল লোকেরা।' তিনি বললেন, 'তাদের সংখ্যা কি বাড়ছে, না কমছে?' আমি বললাম, 'তারা বেড়েই চলেছে।' তিনি বললেন, 'তার ধর্মে ঢুকে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তার দাবীর পূর্বে তোমরা কি কখনো তাকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ?' আমি বললাম, 'না।' তিনি বললেন, 'তিনি কি সন্ধি ভঙ্গ করেন?' আমি বললাম, 'না। তবে আমরা তার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সন্ধিতে আবদ্ধ আছি। জানি না, এর মধ্যে তিনি কী করবেন।' আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, 'এ কথাটি ব্যতীত নিজের পক্ষ হতে আর কোন কথা যোগ করার সুযোগই আমি পাইনি।' তিনি বললেন, 'তোমরা তার সঙ্গে কখনো যুদ্ধ করেছ কি?' আমি বললাম, 'হ্যা।' তিনি বললেন, 'তার সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধের পরিণাম কি হয়েছে?' আমি বললাম, 'তার ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুপের বালতির ন্যায়।' কখনো তার পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে।' তিনি বললেন, 'তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?' আমি বললাম, 'তিনি বলেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সঙ্গে কোন কিছুর অংশীদার সাব্যস্ত করো না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা যা বলে তা ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত আদায়ের, সত্য বলার, চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেন।' অতঃপর তিনি দোভাষীকে বললেন, 'তুমি তাকে বল, আমি তোমার নিকট তার বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রাসূলগণকে তাদের কওমের উচ্চ বংশেই পাঠানো হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা? তুমি বলেছ, 'না।' তাই আমি বলছি, পূর্বে যদি কেউ এরূপ বলত, তবে আমি অবশ্যই বলতাম, ইনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তার পূর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তার পূর্বপুরুষের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি তার জবাবে বলেছ, 'না।' তাই আমি বলছি যে, তার পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি বলতাম, ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তার বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি-এর পূর্বে কখনো তোমরা তাকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ কিনা? তুমি বলেছ, 'না।' এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা পরিত্যাগ করবে আর আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, সম্ভ্রান্ত লোক তার অনুসরণ করে, না সাধারণ লোক? তুমি বলেছ, সাধারণ লোকই তার অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এই শ্রেণীর লোকেরাই হন রাসূলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তার দ্বীনে প্রবেশ করে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, 'না।' ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সঙ্গে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি সন্ধি ভঙ্গ করেন কিনা? তুমি বলেছ, 'না।' প্রকৃতপক্ষে রাসূলগণ এরূপই, সন্ধি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন? তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহর বন্দেগী করা ও তার সঙ্গে অন্য কিছুর অংশীদার স্থাপন না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন সালাত আদায় করতে, সত্য বলতে ও সচ্চরিত্র থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দু'পায়ের নীচের জায়গার অধিকারী হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তার আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হতে হবেন, এ কথা ভাবতে পারিনি। যদি জানতাম, আমি তার নিকট পৌছতে পারব, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট সহ্য করে নিতাম। আর আমি যদি তার নিকট থাকতাম তবে অবশ্যই তার দু'খানা পা ধৌত করে দিতাম। অতঃপর তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সেই পত্রখানি আনার নির্দেশ দিলেন, যা তিনি দিহ্ইয়াতুল কালবী-কে দিয়ে বসরার শাসকের মাধ্যমে হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। তিনি তা পড়লেন। তাতে (লেখা) ছিলঃ বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম (পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে)। আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) -এর পক্ষ হতে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। - শান্তি (বর্ষিত হোক) তার প্রতি, যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। তারপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে সকল প্রজার পাপই আপনার উপর বর্তাবে। "হে আহলে কিতাব! এসো সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন। তা হল, আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত না করি , কোন কিছুকেই যেন তার শরীক সাব্যস্ত না করি এবং আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করে আল্লাহকে ত্যাগ করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বল, "তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা তো মুসলিম।" (ইমরান ৩/৬৪) আবূ সুফইয়ান বলেন, 'হিরাক্লিয়াস যখন তার বক্তব্য শেষ করলেন এবং পত্র পাঠও শেষ করলেন, তখন সেখানে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল, চীৎকার ও হৈ-হল্লা চরমে পৌছল এবং আমাদেরকে বের করে দেয়া হলো। আমাদেরকে বের করে দিলে আমি আমার সাথীদের বললাম, আবূ কাবশার ছেলের বিষয় তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, বনূ আসফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে! তখন থেকে আমি বিশ্বাস রাখতাম, তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করলেন। ইবন নাতূর ছিলেন জেরুযালেমের শাসনকর্তা এবং হিরাক্লিয়াসের বন্ধু ও সিরিয়ার খৃস্টানদের পাদ্রী। তিনি বলেন, 'হিরাক্লিয়াস যখন জেরুযালেম আসেন, তখন একদা তাকে অত্যন্ত মলিন দেখাচ্ছিল। তার একজন বিশিষ্ট সহচর বলল, আমরা আপনার চেহারা আজ এত মলিন দেখছি, ইবন নাতূর বলেন, হিরাক্লিয়াস ছিলেন জ্যোতির্বিদ, জ্যোতির্বিদ্যায় তার দক্ষতা ছিল। তারা জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদের বললেন, 'আজ রাতে আমি তারকারাজির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, খতনাকারীদের বাদশাহ আবির্ভূত হয়েছেন। বর্তমান যুগে কোন জাতি খাতনা করে'? তারা বলল, 'ইয়াহূদ জাতি ব্যতীত কেউ খাতনা করে না। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আপনি মোটেও চিন্তাগ্রস্থ হবেন না। আপনার রাজ্যের শহরগুলোতে লিখে পাঠান, তারা যেন সেখানকার সকল ইয়াহূদীকে কতল করে ফেলে।' তারা যখন এ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত ছিল, তখন হিরাক্লিয়াসের নিকট জনৈক ব্যক্তিকে হাযির করা হলো, যাকে গাস্সানের শাসনকর্তা পাঠিয়েছিল। সে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে খবর দিচ্ছিল। হিরাক্লিয়াস তার কাছ থেকে খবর জেনে নিয়ে বললেন, 'তোমরা একে নিয়ে গিয়ে দেখ, তার খাতনা হয়েছে কি-না।' তারা তাকে নিয়ে গিয়ে দেখে এসে সংবাদ দিল, তার খাতনা হয়েছে। হিরাক্লিয়াস তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জওয়াব দিল, 'তারা খাতনা করে।' অতঃপর হিরাক্লিয়াস তাদের বললেন, 'ইনি [আল্লাহর রাসূল (ﷺ)] এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন।' অতঃপর হিরাক্লিয়াস রোমে তার বন্ধুর নিকট লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তার সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাক্লিয়াস হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তার নিকট তার বন্ধুর চিঠি এলো, যা নবী (ﷺ) -এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী, এ ব্যাপারে হিরাক্লিয়াসের মতকে সমর্থন করছিল। তারপর হিরাক্লিয়াস তার হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সকল দরজা বন্ধ করার আদেশ দিলে দরজা বন্ধ করা হলো। অতঃপর তিনি সম্মুখে এসে বললেন, হে রোমের অধিবাসী! তোমরা কি মঙ্গল, হিদায়াত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর বায়আত গ্রহণ কর।' এ কথা শুনে তারা বন্য গাধার ন্যায় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ দেখতে পেল। হিরাক্লিয়াস যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, 'ওদের আমার নিকট ফিরিয়ে আন।' তিনি বললেন, 'আমি একটু পূর্বে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দ্বীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করছিলাম। এখন তা দেখে নিলাম।' একথা শুনে তারা তাকে সিজদা করল এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এটাই ছিল হিরাক্লিয়াসের সর্বশেষ অবস্থা।