দুটি উৎসব (ঈদ) (৯৪৮-৯৮৯)
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বাজারে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি রেশমী জুববা নিয়ে উমার আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এটি ক্রয় করে নিন। 'ঈদের সময় এবং প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেনঃ এটি তো তার পোষাক, যার (আখিরাতে) কল্যাণের কোন অংশ নেই। এ ঘটনার পর উমার আল্লাহর যত দিন ইচ্ছা ততদিন অতিবাহিত করলেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার নিকট একটি রেশমী জুববা পাঠালেন, উমার তা গ্রহণ করেন এবং সেটি নিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো বলেছিলেন, এটা তার পোষাক যার (আখিরাতে) কল্যাণের কোন অংশ নেই। অথচ আপনি এ জুববা আমার নিকট পাঠিয়েছেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাকে বললেনঃ তুমি এটি বিক্রি করে দাও এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তোমার প্রয়োজন পূরণ কর।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমার নিকট এলেন তখন আমার নিকট দু'টি মেয়ে বু'আস যুদ্ধ সংক্রান্ত গান গাইছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবূ বাকর এসে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানী বাদ্যযন্ত্র (দফ্) বাজান হচ্ছে নবী (ﷺ) -এর নিকট! তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তাদের ছেড়ে দাও। অতঃপর তিনি যখন অন্য দিকে ফিরলেন তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম আর তারা বেরিয়ে গেল।
আর 'ঈদের দিন সুদানীরা বর্শা ও ঢালের খেলা করত। আমি নিজে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যা, অতঃপর তিনি আমাকে তার পিছনে এমনভাবে দাড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তার গালের সাথে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করছিলে তা করতে থাক, হে বনূ আরফিদা। পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হ্যা, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও।
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -কে খুৎবাহ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেনঃ আমাদের আজকের এ দিনে আমরা যে কাজ প্রথম শুরু করব, তাহল সালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে আসব এবং কুরবানী করব। তাই যে এ রকম করে সে আমাদের রীতি সঠিকভাবে মান্য করল।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন আমার ঘরে) আবূ বকর এলেন তখন আমার কাছে আনসারী দু'টি মেয়ে বু'আস যুদ্ধের দিন আনসারীগণ পরস্পর যা বলেছিলেন সে সম্পর্কে গান গাইছিল। তিনি বলেন, তারা কোন পেশাদার গায়িকা ছিল না। আবূ বাকর বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর ঘরে শয়তানী বাদ্যযন্ত্র। আর এটি ছিল 'ঈদের দিন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ হে আবূ বাকর! প্রত্যেক জাতির জন্যই আনন্দ উৎসব রয়েছে আর এ হলো আমাদের আনন্দের দিন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) 'ঈদুল ফিত্রের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক বর্ণনায় আনাস নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বিজোড় সংখ্যায় খেতেন।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ সালাতের পূর্বে যে যবেহ্ করবে তাকে পুনরায় জবাই করতে হবে। তখন এক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, আজকের এ দিনটিতে গোশত খাবার আকাঙ্ক্ষা করা হয়। সে তার প্রতিবেশীদের অবস্থা উল্লেখ করল। তখন নবী (ﷺ) যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। সে বলল, আমার নিকট এখন ছয় মাসের এমন একটি মেষ শাবক আছে, যা আমার নিকট দু'টি হৃষ্টপুষ্ট বকরীর চাইতেও অধিক পছন্দনীয়। নবী (ﷺ) তাকে সেটা কুরবানী করার অনুমতি দিলেন। অবশ্য আমি জানি না, এ অনুমতি তাকে ছাড়া অন্যদের জন্যও কি-না?
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) 'ঈদুল আযহার দিন সালাতের পর আমাদের উদ্দেশে খুৎবাহ দান করেন। খুৎবাহ্য় তিনি বলেনঃ যে আমাদের মত সালাত আদায় করল এবং আমাদের মত কুরবানী করল, সে কুরবানীর রীতিনীতি যথাযথ পালন করল। আর যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করল তা সালাতের পূর্বে হয়ে গেল, এতে তার কুরবানী হবে না। বারাআ-এর মামা আবূ বুরদাহ্ ইবন নিয়ার তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জানা মতে আজকের দিনটি পানাহারের দিন। তাই আমি পছন্দ করলাম যে, আমার ঘরে সর্বপ্রথম জবাই করা হোক আমার বকরীই। তাই আমি আমার বকরীটি জবাই করেছি এবং সালাতে আসার পূর্বে তা দিয়ে নাশ্তাও করেছি। নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার বকরীটি গোশ্তের উদ্দেশ্যে যবেহ্ করা হয়েছে। তখন তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের নিকট এমন একট ছয় মাসের মেষ শাবক আছে যা আমার নিকট দু'টি বকরীর চাইতেও পছন্দনীয়। এটি (কুরবানী করলে) কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেনঃ হ্যা, তবে তুমি ছাড়া অন্য কারো জন্য যথেষ্ট হবে না।
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) 'ঈদুল ফিত্র ও 'ঈদুল আযহার দিন 'ঈদমাঠে যেতেন এবং সেখানে তিনি প্রথম যে কাজ শুরু করতেন তা হল সালাত। আর সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাড়াতেন এবং তারা তাদের কাতারে বসে থাকতেন। তিনি তাদের নাসীহাত করতেন, উপদেশ দিতেন এবং নির্দেশ দান করতেন। যদি তিনি কোন সেনাদল পাঠাবার ইচ্ছা করতেন, তবে তাদের আলাদা করে নিতেন। অথবা যদি কোন বিষয়ে নির্দেশ জারী করার ইচ্ছা করতেন তবে তা জারি করতেন। অতঃপর তিনি ফিরে যেতেন। আবূ সাঈদ বলেন, লোকেরা বরাবর এ নিয়মই অনুসরণ করে আসছিল। অবশেষে যখন মারওয়ান মদিনার আমীর হলেন, তখন 'ঈদুল আযহা বা 'ঈদুল ফিত্রের উদ্দেশে আমি তার সঙ্গে বের হলাম। আমরা যখন 'ঈদমাঠে পৌছলাম তখন সেখানে একটি মিম্বর দেখতে পেলাম, সেটি কাসীর ইবন সাল্ত তৈরি করেছিলেন। মারওয়ান সালাত আদায়ের পূর্বেই এর উপর আরোহণ করতে উদ্যত হলেন। আমি তার কাপড় টেনে ধরলাম। কিন্তু তিনি কাপড় ছাড়িয়ে খুৎবাহ দিলেন। আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম! তোমরা (রাসূলের সুন্নাত) পরিবর্তন করে ফেলেছ। সে বলল, হে আবূ সাঈদ! তোমরা যা জানতে, তা গত হয়ে গেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি যা জানি, তা তার চেয়ে ভাল, যা আমি জানি না। সে তখন বলল, লোকজন সালাতের পর আমাদের জন্য বসে থাকে না, তাই ওটা সালাতের আগেই করেছি।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) 'ঈদুল আযহা ও 'ঈদুল ফিত্রের দিন সালাত আদায় করতেন। আর সালাতের পরে খুৎবাহ দিতেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) 'ঈদুল ফিত্রের দিন বের হন। অতঃপর খুৎবাহর পূর্বে সালাত শুরু করেন।
রাবী বলেন, আমাকে 'আতা বলেছেন যে, ইবন যুবায়র এর বায়আত গ্রহণের প্রথম দিকে ইবন আব্বাস তার কাছে এ ব'লে লোক পাঠালেন যে, 'ঈদুল ফিত্রের সালাতে আযান দেয়া হতো না এবং খুৎবাহ হল সালাতের পরে।
ইবন আব্বাস ও জাবির ইবন আবদুল্লাহ বলেন, 'ঈদুল ফিতরের সালাতে কিংবা 'ঈদুল আযহার সালাতে আযান দেয়া হত না।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে এ-ও বর্ণিত আছে যে, নবী (ﷺ) দাড়িয়ে প্রথমে সালাত আদায় করলেন এবং পরে লোকদের উদ্দেশে খুৎবাহ দিলেন। যখন নবী (ﷺ) খুৎবাহ শেষ করলেন, তিনি (মিম্বর হতে) নেমে মহিলাগণের (কাতারের) নিকট আসলেন এবং তাদের নাসীহাত করলেন। তখন তিনি বিলাল-এর হাতে ভর করেছিলেন এবং বিলাল তার কাপড় ছড়িয়ে ধরলে, নারীরা এতে সদাকাহর বস্তু ফেলতে লাগলেন। আমি 'আতা-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি এখনো যরুরী মনে করেন যে, ইমাম খুৎবাহ শেষ করে নারীদের নিকট এসে তাদের নাসীহাত করবেন? তিনি বললেন, নিশ্চই তা তাদের জন্য অবশ্যই জরুরী। তাদের কী হয়েছে যে, তারা তা করবে না?
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আবূ বাকর, উমার এবং উসমান-এর সঙ্গে সালাতে হাযির ছিলাম। সকলেই খুৎবাহর আগে সালাত আদায় করতেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আবূ বাকর এবং উমার উভয় 'ঈদের সালাত খুৎবার আগে আদায় করতেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) 'ঈদুল ফিত্রে দু' রাকাত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। অতঃপর বিলাল -কে সঙ্গে নিয়ে নারীদের নিকট এলেন এবং সদাকাহ প্রদানের জন্য তাদের নির্দেশ দিলেন। তখন তারা দিতে লাগলেন। নারীদের কেউ দিলেন আংটি, আবার কেউ দিলেন গলার হার।
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আজকের এ দিনে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে সালাত আদায় করা। অতঃপর আমরা ফিরে আসব এবং কুরবানী করব। কাজেই যে ব্যক্তি তা করল, সে আমাদের নিয়ম পালন করল। যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করল, তা শুধু গোশ্ত বলেই গণ্য হবে, যা সে পরিবারবর্গের জন্য পূর্বেই করে ফেলেছে। এতে কুরবানীর কিছুই নেই। তখন আবূ বুরদাহ ইবন নিয়ার নামক এক আনসারী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো জবাই করে ফেলেছি। এখন আমার নিকট এমন একটি মেষ শাবক আছে যা এক বছর বয়সের মেষের চেয়ে উৎকৃষ্ট। তিনি বললেন, সেটির স্থলে এটাকে জবাই করে দাও। তবে তোমার পর অন্য কারো জন্য তা যথেষ্ট হবে না।
সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবন উমার-এর সংগে ছিলাম যখন বর্শার অগ্রভাগ তার পায়ের তলদেশে বিদ্ধ হয়েছিল। ফলে তার পা রেকাবের সঙ্গে আটকে গিয়েছিল। আমি তখন নেমে সেটি টেনে বের করে ফেললাম। এটা ঘটেছিল মিনায়। এ সংবাদ হাজ্জাজের নিকট পৌছলে তিনি তাকে দেখতে আসেন। হাজ্জাজ বললো, যদি আমি জানতে পারতাম কে আপনাকে আঘাত করেছে, (তবে তাকে শাস্তি দিতাম)। তখন ইবন উমার বললেন, তুমিই আমাকে আঘাত করেছ। সে বলল, তা কিভাবে? ইবন উমার বললেন, তুমিই সেদিন (ঈদের দিন) অস্ত্র ধারণ করেছ, যে দিন অস্ত্র বহন করা হতো না। তুমিই অস্ত্রকে হারামের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছ অথচ হারামের মধ্যে কখনো অস্ত্র প্রবেশ করা হয় না।
সাঈদ ইবন আস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন উমার-এর নিকট হাজ্জাজ এলো। আমি তখন তার নিকট ছিলাম। হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, তিনি কেমন আছেন? ইবন উমার বললেন, ভাল। হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করলো, আপনাকে কে আঘাত করেছে? তিনি বললেন, আমাকে সে ব্যক্তি আঘাত করেছে যে, সে দিন অস্ত্র বহনের আদেশ দিয়েছে যে দিন তা বহন করা বৈধ নয়। হাজ্জাজ।
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কুরবানীর দিন আমাদের উদ্দেশে খুৎবা দেন। তিনি বলেন, আজকের দিনে আমাদের প্রথম কাজ হল সালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে এসে কুরবানী করা। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে আমাদের রীতি পালন করল। যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বেই যবেহ্ করবে, তা শুধু গোশ্তের জন্যই হবে, যা সে পরিবারের জন্য তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে। কুরবানী সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তখন আমার মামা আবূ বুরদাহ ইবন নিয়ার দাড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো সালাতের পূর্বেই যবেহ্ করে ফেলেছি। তবে এখন আমার নিকট এমন একটি মেষশাবক আছে যা 'মুসিন্না' মেষের চাইতেও উত্তম। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ তার স্থলে এটিই (কুরবানী) করে নাও। অথবা তিনি বললেনঃ এটিই জবাই কর। তবে তুমি ব্যতীত আর কারো জন্যই মেষ শাবক যথেষ্ট হবে না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের আমলই উত্তম নয়। তারা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী (ﷺ) বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।
মুহাম্মাদ ইবন আবূ বাকর সাক্বাফী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা সকাল বেলা মিনা হতে যখন আরাফাতের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আনাস ইবন মালিক -এর নিকট তালবিয়াহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে কিরূপ করতেন? তিনি বললেন, তালবিয়া পাঠকারী তালবিয়াহ পড়ত, তাকে নিষেধ করা হতো না। তাকবীর পাঠকারী তাকবীর পাঠ করত, তাকেও নিষেধ করা হতো না।
উম্মু 'আতিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'ঈদের দিন আমাদের বের হবার আদেশ দেয়া হত। এমন কি আমরা কুমারী মেয়েদেরকেও অন্দর মহল হতে বের করতাম এবং ঋতুমতী মেয়েদেরকেও। তারা পুরুষদের পিছনে থাকতো এবং তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর বলতো এবং তাদের দোয়ার সাথে দোয়া করত- সে দিনের বরকত এবং পবিত্রতা তারা আশা করত।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। 'ঈদুল ফিতর ও কুরবানীর দিন নবী (ﷺ) এর সামনে যুদ্ধের হাতিয়ার রেখে দেয়া হত। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করতেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। 'ঈদুল ফিতর ও কুরবানীর দিন নবী (ﷺ) এর সামনে বর্শা পুঁতে দেয়া হত। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করতেন।
উম্মু 'আতিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন ('ঈদের সালাতের উদ্দেশে) যুবতী ও পর্দানশীন মেয়েদের নিয়ে যাবার জন্য আমাদের নির্দেশ দেয়া হতো। আইয়ূব হতে হাফসাহ সূত্রে অনুরূপ বর্ণিত আছে এবং হাফসাহ হতে বর্ণিত রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত বর্ণনা আছে, 'ঈদগাহে ঋতুমতী নারীরা আলাদা থাকতেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর সঙ্গে 'ঈদুল ফিতর বা আযহার দিন বের হলাম। তিনি সালাত আদায় করলেন। অতঃপর খুৎবাহ দিলেন। অতঃপর নারীদের নিকট গিয়ে তাদের নাসীহাত করলেন এবং তাদেরকে সদাক্বাহ করার নির্দেশ দিলেন।
বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী (ﷺ) 'ঈদুল আযহার দিন বাকী'তে (নামক কবরস্থানে) যান। অতঃপর তিনি দু' রাকাত সালাত আদায় করে আমাদের দিকে মুখ করে দাড়ালেন এবং তিনি বললেন, আজকের দিনের প্রথম ইবাদাত হল সালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে গিয়ে কুরবানী করা। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে আমাদের নীতি অনুযায়ী কাজ করবে। আর যে এর পূর্বেই জবাই করবে তা হলে তার যবেহ্ হবে এমন একটি কাজ, যা সে নিজের পরিবারবর্গের জন্যই তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে, এর সাথে কুরবানীর কোন সম্পর্ক নেই। তখন এক ব্যক্তি (আবূ বুরদাহ ইবন নিয়ার দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি (পূর্বেই) জবাই করে ফেলেছি। এখন আমার নিকট এমন একটি মেষশাবক আছে যা পূর্ণবয়স্ক মেষের চেয়ে উত্তম। (এটা কুরবানী করব কি?) তিনি বললেন, এটাই যবেহ্ কর। তবে তোমার পর আর কারো জন্য তা যথেষ্ট হবে না।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি কি নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে কখনো 'ঈদে উপস্থিত হয়েছেন? তিনি বললেন হা। যদি তার নিকট আমার মর্যাদা না থাকত তা হলে কম বয়সী হবার কারণে আমি 'ঈদে উপস্থিত হতে পারতাম না। তিনি বের হয়ে কাসীর ইবন সালাতের গৃহের নিকট স্থাপিত নিশানার নিকট এলেন এবং সালাত আদায় করলেন। অতঃপর খুৎবাহ দিলেন। অতঃপর তিনি মহিলাগণের নিকট উপস্থিত হলেন। তখন তার সঙ্গে বিলাল ছিলেন। তিনি নারীদের উপদেশ দিলেন, নাসীহাত করলেন এবং দান সদাকাহ করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি তখন নারীদেরকে হাত বাড়িয়ে বিলাল-এর কাপড়ে দান সামগ্রী ফেলতে দেখলাম। অতঃপর তিনি এবং বিলাল নিজ বাড়ির দিকে চলে গেলেন।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) 'ঈদুল ফিত্রের দিন দাড়িয়ে সালাত আদায় করলেন, পরে খুৎবাহ দিলেন। খুৎবাহ শেষে নেমে নারীদের নিকট আসলেন এবং তাদের নাসীহাত করলেন। তখন তিনি বিলাল-এর হাতের উপর ভর দিয়ে ছিলেন এবং বিলাল তার কাপড় প্রসারিত করে ধরলেন। এতে নারীগণ দান সামগ্রী ফেলতে লাগলেন আমি (ইবন জুরায়জ) আত্বা-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ কি 'ঈদুল ফিত্রের সদাকাহ? তিনি বললেন না, বরং এ সাধারণ সদাকাহ যা তারা ঐ সময় দিচ্ছিলেন। কোন মহিলা তার আংটি দান করলে অন্যান্য নারীরাও তাদের আংটি দান করতে লাগলেন। আমি আতা-কে (আবার), জিজ্ঞেস করলাম, মহিলাগণকে উপদেশ দেয়া কি ইমামের জন্য জরুরী? তিনি বললেন, অবশ্যই, তাদের উপর তা জরুরী। তাদের (ইমামগণের) কী হয়েছে যে, তারা তা করবেন না?
ইবন জুরায়জ বলেছেন, হাসান ইবন মুসলিম তাঊস এর মাধ্যমে ইবন আব্বাস হতে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, নবী (ﷺ) আবূ বাকর, উমার ও উসমান-এর সঙ্গে 'ঈদুল ফিত্রে আমি উপস্থিত ছিলাম। তারা খুৎবার পূর্বে সালাত আদায় করতেন, পরে খুৎবা দিতেন। নবী (ﷺ) বের হলেন, আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তিনি হাতের ইঙ্গিতে (লোকদের) বসিয়ে দিচ্ছেন। তখন নবী (ﷺ) কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেনঃ "হে নবী! যখন ঈমানদার মহিলাগণ আপনার নিকট এ শর্তে বায়আত করতে আসেন..... (মুমতাহিনাহ ৬০/১২)। এ আয়াত শেষ করে নবী (ﷺ) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এ বায়আতের উপর আছ? তাদের মধ্যে একজন মহিলা বলল, হা, সে ছাড়া আর কেউ এর জবাব দিল না। হাসান জানেন না, সে মহিলা কে? অতঃপর নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমরা সদাক্বাহ কর। সে সময় বিলাল তার কাপড় প্রসারিত করে বললেন, আমার মা-বাপ আপনাদের জন্য কুরবান হোক, আসুন, আপনারা দান করুন। তখন নারীগণ তাদের ছোট-বড় আংটিগুলো বিলাল-এর কাপড়ের মধ্যে ফেলতে লাগলেন। আবদুর রাযযাক বলেন, 'ফাতাখ' হলো বড় আংটি যা জাহিলী যুগে ব্যবহৃত হতো।
হাফসাহ বিনত সীরীন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা 'ঈদের দিন আমাদের যুবতীদের বের হতে নিষেধ করতাম। একদা জনৈকা মহিলা এলেন এবং বনু খালাফের প্রাসাদে অবস্থান করলেন। আমি তার নিকট গেলে তিনি বললেন, তার ভগ্নিপতি নবী (ﷺ) -এর সাথে বারোটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, এর মধ্যে ছয়টি যুদ্ধে স্বয়ং তার বোনও স্বামীর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন, (মহিলা বলেন) আমার বোন বলেছেন, আমরা রুগ্নদের সেবা করতাম, আহতদের শুশ্রুষা করতাম। একবার তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমাদের কারো ওড়না না থাকে, তখন কি সে বের হবে না? নবী (ﷺ) বললেনঃ এ অবস্থায় তার বান্ধবী যেন তাকে নিজ ওড়না পরিধান করতে দেয় এবং এভাবে মহিলাগণ যেন কল্যাণকর কাজে ও মুমিনদের দোয়ায় অংশগ্রহণ করেন। হাফ্সাহ বলেন, যখন উম্মে আতিয়্যাহ এলেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি কি এসব ব্যাপারে কিছু শুনেছেন? তিনি বললেন, হা, হাফসাহ বলেন, আমরা পিতা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর জন্য উৎসর্গিত হোক এবং তিনি যখনই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নাম উল্লেখ করতেন, তখনই একথা বলতেন। তাবুতে অবস্থানকারিণী যুবতীরা এবং ঋতুমতী নারীরা যেন বের হন। তবে ঋতুমতী নারীরা যেন সালাতের স্থান হতে সরে থাকেন। তারা সকলেই যেন কল্যাণকর কাজে ও মুমিনদের দোয়ায় অংশগ্রহণ করেন। হাফ্সা বলেন, আমি তাকে বললাম, ঋতুমতী নারীরাও? তিনি বললেন, হা, ঋতুমতী নারী কি আরাফাত এবং অন্যান্য স্থানে উপস্থিত হয় না?
উম্মু আতিয়্যাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (ঈদের দিন) আমাদেরকে বের হবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তাই আমরা ঋতুমতী, যুবতী এবং তাবুতে অবস্থানকারিণী নারীদেরকে নিয়ে বের হতাম। ইবন 'আওন-এর এক বর্ণনায় রয়েছে, অথবা তাবুতে অবস্থানকারিণী যুবতী নারীদেরকে নিয়ে বের হতাম। অতঃপর ঋতুমতী মহিলাগণ মুসলিমদের জামা'আত এবং তাদের দোয়ায় অংশগ্রহণ করতেন। তবে 'ঈদমাঠে পৃথকভাবে অবস্থান করতেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) 'ঈদমাঠে নাহর করতেন কিংবা যবেহ্ করতেন।
বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুরবানীর দিন সালাতের পর রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) আমাদের সামনে খুৎবা দিলেন। খুৎবাহ্য় তিনি বললেন, যে আমাদের মতো সালাত আদায় করবে এবং আমাদের কুরবানীর মত কুরবানী করবে, তার কুরবানী যথার্থ বলে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করবে তার সে কুরবানী গোশ্ত খাওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না। তখন আবূ বুরদাহ্ ইবন নিয়ার তখন দাড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! আমি তো সালাতে বের হবার পূর্বেই কুরবানী করে ফেলেছি। আমি ভেবেছি যে, আজকের দিনটি তো পানাহারের দিন। তাই আমি তাড়াতাড়ি করে ফেলেছি। আমি নিজে খেয়েছি এবং আমার পরিবারবর্গ ও প্রতিবেশীদেরকেও আহার করিয়েছি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ ওটা গোশ্ত খাবার বকরী ছাড়া আর কিছু হয়নি। আবূ বুরদাহ বলেন, তবে আমার নিকট এমন একটি মেষ শাবক আছে যা দু'টো (গোশ্ত খাওয়ার) বকরীর চেয়ে ভাল। এটা কি আমার পক্ষে কুরবানীর জন্য যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, হ্যা, তবে তোমার পরে অন্য কারো জন্য যথেষ্ট হবে না।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কুরবানীর দিন সালাত আদায় করেন, অতঃপর খুৎবাহ দিলেন। অতঃপর নির্দেশ দিলেন, যে ব্যক্তি সালাতের পূর্বে কুরবানী করেছে সে যেন পুনরায় কুরবানী করে। তখন আনসারদের মধ্য হতে জনৈক ব্যক্তি দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার প্রতিবেশীরা ছিল উপবাসী অথবা বলেছেন দরিদ্র। তাই আমি সালাতের পূর্বেই জবাই করে ফেলেছি। তবে আমার নিকট মেষশাবক আছে যা দু'টি হৃষ্টপুষ্ট বকরির চাইতেও আমার নিকট অধিক পছন্দসই। নবী (ﷺ) তাকে সেটা কুরবানী করার অনুমতি দেন।
জুনদাব ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কুরবানীর দিন সালাত আদায় করেন, অতঃপর খুৎবাহ দেন। অতঃপর জবাই করেন এবং তিনি বলেনঃ সালাতের পূর্বে যে ব্যক্তি যবেহ্ করবে তাকে তার স্থলে আর একটি জবাই করতে হবে এবং যে যবেহ্ করেনি, আল্লাহর নামে তার যবেহ্ করা উচিত।
জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) 'ঈদের দিন (বাড়ী ফেরার পথে) ভিন্ন পথে আসতেন। ইউনুস ইবন মুহাম্মাদ আবূ হুরাইরাহ্ হতে হাদীস বর্ণনায় আবূ তুমাইলা ইয়াহ্ইয়া এর অনুসরণ করেছেন। তবে জাবির হতে হাদীসটি অধিকতর বিশুদ্ধ।
আয়িশাহ হতে বর্ণিত। আবূ বাকর তার নিকট এলেন। এ সময় মিনার দিবসগুলোর এক দিবসে তার নিকট দু'টি মেয়ে দফ বাজাচ্ছিল, নবী (ﷺ) তার চাদর আবৃত অবস্থায় ছিলেন। তখন আবূ বাকর মেয়ে দু'টিকে ধমক দিলেন। অতঃপর নবী (ﷺ) মুখমন্ডল হতে কাপড় সরিয়ে নিয়ে বললেন, হে আবূ বাকর! ওদের বাধা দিও না। কেননা, এসব 'ঈদের দিন। আর সে দিনগুলো ছিল মিনার দিন।
আয়িশাহ আরো বলেছেন, হাবশীরা যখন মসজিদে (এর প্রাঙ্গণে) খেলাধূলা করছিল, তখন আমি তাদের দেখছিলাম এবং আমি দেখেছি, নবী (ﷺ) আমাকে আড়াল করে রেখেছেন। উমার হাবশীদের ধমক দিলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, ওদের ধমক দিও না। হে বনূ আরফিদা! তোমরা যা করছিলে তা কর।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বিলাল-কে সঙ্গে নিয়ে 'ঈদুল ফিত্রের দিন বের হয়ে দু' রাকাত সালাত আদায় করেন। তিনি এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি।