bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নামাজের সময়সমূহ (৫২১-৬০২)

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। উমার ইবন আবদুল আযীয একদা কোন এক সালাত আদায়ে বিলম্ব করলেন। তখন উরওয়াহ ইবন যুবায়র তার নিকট গেলেন এবং তার নিকট বর্ণনা করলেন যে, ইরাকে অবস্থানকালে মুগীরাহ ইবন শুবাহ একদা এক সালাত আদায়ে বিলম্ব করেছিলেন। ফলে আবূ মাসঊদ আনসারী তার নিকট গিয়ে বললেন, হে মুগীরাহ! একী? তুমি কি অবগত নও যে, জিব্রীল অবতরণ করে সালাত আদায় করলেন, আর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সালাত আদায় করলেন। আবার তিনি সালাত আদায় করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সালাত আদায় করলেন। পুনরায় তিনি সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সালাত আদায় করলেন। আবার তিনি সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সালাত আদায় করলেন। পুনরায় তিনি সালাত আদায় করলেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সালাত আদায় করলেন। অতঃপর জিব্রীল বললেন, আমি এজন্য আদিষ্ট হয়েছি। উমার (ইবন আবদুল আযীয) উরওয়াহ -কে বললেন, "তুমি যা রিওয়ায়াত করছ তা একটু ভেবে দেখ। জিব্রীলই কি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর জন্য সালাতের ওয়াক্ত নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন?" উরওয়াহ বললেন, বাশীর ইবন আবূ মাসঊদ তার পিতা হতে এমনই বর্ণনা করতেন।

উরওয়াহ বলেনঃ অবশ্য আয়িশাহ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন মুহূর্তে আসরের সালাত আদায় করতেন যে, সুর্যরশ্মি তখনও তার হুজরার মধ্যে থাকতো। তবে তা উপরের দিকে উঠে যাওয়ার পূর্বেই।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আবদুল কায়স গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকটে এসে বললো, আপনার ও আমাদের মাঝে সে 'রাবীআ' গোত্র থাকায় শাহরে হারাম (নিষিদ্ধ মাসসমূহ) ছাড়া অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আসতে পারি না। কাজেই আপনি আমাদের এমন কিছু নির্দেশ দিন যা আমরা নিজেরাও গ্রহণ করবো এবং আমাদের যারা পিছনে রয়ে গেছে তাদের প্রতিও আহবান জানাবো। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ আমি তোমাদের চারটি বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছি, আর চারটি বিষয় হতে তোমাদের নিষেধ করছি। নির্দেশিত বিষয়ের মাঝে একটি হলো ঈমান বিল্লাহ্' (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা)। অতঃপর তিনি তাদেরকে ব্যাখ্যা করে বুঝালেন যে, ঈমান বিল্লাহর' অর্থ হলো, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া যে, সত্যিকার অর্থে এক আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই আর আমি আল্লাহর রাসূল; সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, আর গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ দান করা। আর তোমাদের নিষেধ করছি কদুর পাত্র, সবুজ রঙের মাটির পাত্র, বিশেষ ধরনের তৈলাক্ত পাত্র ও গাছের গুড়ি খোদাই করে তৈরি পাত্র ব্যবহার করতে।

জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট সালাত আদায়, যাকাত প্রদান এবং প্রত্যেক মুসলিমকে নাসীহাত করার বায়আত গ্রহণ করেছি।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা উমার-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি বললেন, ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর বক্তব্য তোমাদের মধ্যে কে মনে রেখেছো? হুযাইফাহ বললেন, 'যেমনভাবে তিনি বলেছিলেন হুবহু তেমনিই আমি মনে রেখেছি।' উমার বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর বাণী মনে রাখার ব্যাপারে তুমি খুব দৃঢ়তার পরিচয় দিচ্ছো। আমি বললাম, (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন) মানুষ নিজের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, পাড়া-প্রতিবেশীদের ব্যাপারে যে ফিতনায় পতিত হয়- সালাত, সিয়াম, সদাক্বাহ, (ন্যায়ের) আদেশ ও (অন্যায়ের) নিষেধ তা দূরীভূত করে দেয়। উমার বললেন, তা আমার উদ্দেশ্য নয়। বরং আমি সেই ফিতনার কথা বলছি, যা সমুদ্র তরঙ্গের ন্যায় ভয়াল হবে। হুযাইফা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! সে ব্যাপারে আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই। কেননা, আপনার ও সে ফিতনার মাঝখানে একটি বন্ধ দরজা রয়েছে। উমার জিজ্ঞেস করলেন, সে দরজাটি ভেঙ্গে ফেলা হবে, না খুলে দেয়া হবে? হুযাইফাহ বললেন, ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমার বললেন, তাহলে তো আর কোনো দিন তা বন্ধ করা যাবে না। [হুযাইফাহ]-এর ছাত্র শাক্বীক বলেন], আমরা জিজ্ঞেস করলাম, উমার কি সে দরজাটি সম্বন্ধে জানতেন? হুযাইফাহ বললেন, হা, দিনের পূর্বে রাতের আগমন যেমন সুনিশ্চিত, তেমনি নিশ্চিতভাবে তিনি জানতেন। কেননা, আমি তার কাছে এমন একটি হাদীস বর্ণনা করেছি, যা মোটেও ক্রুটিযুক্ত নয়। (দরজাটি কী) এ বিষয়ে হুযাইফাহ-এর নিকট জানতে আমরা ভয় পাচ্ছিলাম। তাই আমরা মাসরূক-কে বললাম এবং তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, দরজাটি উমার নিজেই।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জনৈক মহিলাকে চুম্বন করে বসে। পরে সে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর নিকট এসে বিষয়টি তার গোচরীভূত করে। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেনঃ "দিনের দু'প্রান্তে-সকাল ও সন্ধ্যায় এবং রাতের প্রথম অংশে সালাত কায়েম কর। নিশ্চই ভালো কাজ পাপাচারকে মিটিয়ে দেয়"- (হূদ ১১/১১৪)। লোকটি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! এ কি শুধু আমার বেলায়? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ আমার সকল উম্মাতের জন্যই।

আবূ আমর শায়বানী হতে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ-এর বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ বাড়ির মালিক আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, 'যথা সময়ে সালাত আদায় করা। ইবন মাসঊদ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, অতঃপর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। ইবন মাসঊদ আবার জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোনটি? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, অতঃপর জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ্ (আল্লাহর পথে জিহাদ)। ইবন মাসঊদ বলেন, এগুলো তো আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাকে বলেছেনই, যদি আমি আরও অধিক জানতে চাইতাম, তাহলে তিনি আরও বলতেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছেন, "বলতো যদি তোমাদের কারো বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোন ময়লা থাকবে? তারা বললেন, তার দেহে কোনোরূপ ময়লা বাকী থাকবে না। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ এ হলো পাচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা (বান্দার) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আজকাল কোনো জিনিসই সে অবস্থায় পাই না, যেমন নবী (ﷺ) -এর যুগে ছিল। প্রশ্ন করা হলো, সালাতও কি? তিনি বললেন, সে ক্ষেত্রেও যা হক নষ্ট করার তা-কি তোমরা করনি?

যুহরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দামেশ্কে আনাস ইবন মালিক-এর নিকট উপস্থিত হলাম, তিনি তখন কাঁদছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে কোন বিষয়টি কাঁদাচ্ছে? তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর যুগে যা কিছু পেয়েছি তার মধ্যে কেবলমাত্র সালাত ছাড়া আর কিছুই বহাল নেই। কিন্তু সালাতকেও নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বাকর বলেন, আমার নিকট মুহাম্মাদ ইবন বাকর বুরসানী এবং উসমান ইবন আবূ রাওওয়াদ অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাড়ায়, তখন সে তার প্রতিপালকের সঙ্গে গোপনে কথা বলে। কাজেই, সে যেন ডানদিকে থুথু না ফেলে, তবে (প্রয়োজনে) বাম পায়ের নীচে ফেলতে পারে। তবে সাঈদ ক্বাতাদাহ হতে বর্ণনা করেছেন, সে যেন সামনের দিকে থুথু না ফেলে, কিন্তু বামদিকে অথবা পায়ের নীচে ফেলতে পারে। আর শুবাহ বলেন, সে যেন সামনের দিকে অথবা ডান দিকে থুথু না ফেলে, কিন্তু বামদিকে অথবা পায়ের তলায় ফেলতে পারে। আর হুমায়দ আনাস সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, সে যেন কিব্লার দিকে বা ডানদিকে থুথু না ফেলে, কিন্তু বামদিকে অথবা পায়ের নীচে ফেলতে পারে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা সাজদায় ই'তিদাল বজায় রাখ। তোমাদের কেউ যেন তার বাহুদ্বয় কুকুরের মতো বিছিয়ে না দেয়। আর যদি থুথু ফেলতে হয়, তাহলে সে যেন সামনে ও ডানে না ফেলে। কেননা, সে তখন তার প্রতিপালকের সঙ্গে গোপন কথায় লিপ্ত থাকে।

আবূ হুরাইরাহ্ ও আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যখন গরমের প্রচন্ডতা বৃদ্ধি পায়, তখন গরম কমলে সালাত আদায় করবে। কেননা, গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের অংশ।

পূর্বের হাদিসের মতই (৫৩৩)।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর মুআয্যিন যুহরের আযান দিলে তিনি বললেনঃ ঠান্ডা হতে দাও, ঠান্ডা হতে দাও। অথবা তিনি বললেন, অপেক্ষা কর, অপেক্ষা কর। তিনি আরও বলেন, গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের নিঃশ্বাসের ফলেই সৃষ্টি হয়। কাজেই গরম যখন বেড়ে যায় তখন গরম কমলেই সালাত আদায় করবে। এমনকি (বিলম্ব করতে করতে বেলা এতটুকু গড়িয়ে গিয়েছিল যে) আমরা টিলাগুলোর ছায়া দেখতে পেলাম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যখন গরম বেড়ে যায় তখন তোমরা তা কমে এলে (যুহরের) সালাত আদায় করো। কেননা, গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের উত্তাপের অংশ।

জাহান্নাম তার প্রতিপালকের নিকট এ বলে নালিশ করেছিলো, হে আমার প্রতিপালক! (দহনের প্রচন্ডতায়) আমার এক অংশ আর এক অংশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে দু'টি শ্বাস ফেলার অনুমতি দিলেন, একটি শীতকালে আর একটি গ্রীষ্মকালে। আর সে দু'টি হলো, তোমরা গ্রীষ্মকালে যে প্রচন্ড উত্তাপ এবং শীতকালে যে প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভব কর তাই।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যুহরের সালাত গরম কমলে আদায় কর। কেননা, গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের উত্তাপ হতে। সুফইয়ান, ইয়াহ্ইয়া এবং আবূ আওয়ানা আ'মাশ হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

আবূ যার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সফরে আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ছিলাম। এক সময় মুয়ায্যিন যুহরের আযান দিতে চেয়েছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ গরম কমতে দাও। কিছুক্ষণ পর আবার মুয়ায্যিন আযান দিতে চাইলে নবী (ﷺ) (পুনরায়) বললেনঃ গরম কমতে দাও। এভাবে তিনি (সালাত আদায়ে) এতো বিলম্ব করলেন যে, আমরা টিলাগুলো ছায়া দেখতে পেলাম। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেনঃ গরমের প্রচন্ডতা জাহান্নামের উত্তাপ হতে। কাজেই গরম প্রচন্ড হলে উত্তাপ কমার পর সালাত আদায় করো।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সূর্য ঢলে পড়লে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বেরিয়ে এলেন এবং যুহরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর মিম্বারে দাড়িয়ে কিয়ামত সম্বন্ধে আলোচনা করেন এবং বলেন যে, কিয়ামতে বহু ভয়ানক ঘটনা ঘটবে। অতঃপর তিনি বলেন, আমাকে কেউ কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে করতে পারে। আমি যতক্ষণ এ বৈঠকে আছি, এর মধ্যে তোমরা আমাকে যা কিছু জিজ্ঞেস করবে আমি তা জানিয়ে দিবো। এ শুনে লোকেরা খুব কাঁদতে শুরু করলো। আর তিনি বারবার বলতে থাকলেনঃ আমাকে প্রশ্ন কর, আমাকে প্রশ্ন কর। এ সময় আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা সাহমী দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমার পিতা কে? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমার পিতা 'হুযাফা'। অতঃপর তিনি অনেকবার বললেনঃ আমাকে প্রশ্ন কর। তখন উমার নতজানু হয়ে বসে বললেন, আমরা আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) -কে নবী হিসেবে গ্রহণ করে সন্তুষ্ট। অতঃপর নবী (ﷺ) নীরব থাকলেন। কিছুক্ষণ পর বললেনঃ এক্ষুণি এ দেওয়ালের পাশে জান্নাত ও জাহান্নাম আমার সামনে তুলে ধরা হয়েছিল; এতো উত্তম ও এতো নিকৃষ্টের মতো কিছু আমি আর দেখিনি।

আবূ বারযাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এমন সময় ফজরের সালাত আদায় করতেন, যখন আমাদের একজন তার পার্শ্ববর্তী অপরজনকে চিনতে পারতো। আর এ সালাতে তিনি ষাট হতে একশ আয়াত তিলাওয়াত করতেন এবং যুহরের সালাত আদায় করতেন যখন সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়তো। তিনি আসরের সালাত আদায় করতেন এমন সময় যে, আমাদের কেউ মদিনার শেষ প্রান্তে পৌছে আবার ফিরে আসতে পারতো, তখনও সূর্য সতেজ থাকতো। রাবী বলেন, মাগরিব সম্পর্কে তিনি [আবূ বারযা] কী বলেছিলেন, আমি তা ভুলে গেছি। আর ইশার সালাত রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত পিছিয়ে নিতে তিনি কোনোরূপ দ্বিধাবোধ করতেন না। অতঃপর রাবী বলেন, রাতের অর্ধাংশ পর্যন্ত পিছিয়ে নিতে অসুবিধা বোধ করতেন না। আর মুআয বর্ণনা করেন যে, শুবাহ বলেছেন, পরে আবু মিনহাল-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, সে সময় তিনি বলেছেন, রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিলম্ব করতে অসুবিধা বোধ করতেন না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর পিছনে গরমের সময় সালাত আদায় করতাম, তখন তাপ হতে রক্ষা পাবার জন্য কাপড়ের উপর সিজদা করতাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মদিনায় অবস্থানকালে (একবার) যুহর ও আসরের আট রাকাত এবং মাগরিব ও ইশার সাত রাকাত একত্রে মিলিত আদায় করেন। আইয়ূব বলেন, সম্ভবত এটা বৃষ্টির রাতে হয়েছিল। জাবির বললেন, সম্ভবত তাই।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন সময় আসরের সালাত আদায় করতেন যে, তখনো সূর্যরশ্মি ঘরের বাইরে যায়নি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন সময় আসরের সালাত আদায় করেছেন যে, সূর্যরশ্মি তখনো তার ঘরের মধ্যে ছিল, আর ছায়া তখনো তার ঘর হতে বেরিয়ে পড়েনি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করতেন, আর সূর্যকিরণ তখনো আমার ঘরে থাকতো। সালাত আদায় করার পরও ছায়া (ঘরে) দৃষ্টিগোচর হতো না। আবু আবদুল্লাহ [ইমাম বুখারী] বলেন, ইমাম মালিক, ইয়াহ্ইয়া ইবন সাঈদ, শুআইব ও ইবন আবূ হাফস্ উক্ত সনদে এ হাদীসটির বর্ণনায়, 'সূর্যরশ্মি আমার ঘরের ভিতরে থাকতো, ঘরের মেঝেতে ছায়া নেমে আসেনি' এমন বলেছেন।

সায়্যার ইবন সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি ও আমার পিতা আবূ বারযা আসলামী-এর নিকট গেলাম। আমার পিতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরজ সালাতসমূহ কীভাবে আদায় করতেন? তিনি বললেন, আল-হাজীর, যাকে তোমরা আল-উলা বা যুহর বলে থাকো, তা তিনি আদায় করতেন যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তো। আর আসরের সালাত এমন সময় আদায় করতেন যে, অতঃপর আমাদের কেউ মাদ্বীনার শেষ প্রান্তে তার ঘরে ফিরে যেতো আর সূর্য তখনও সতেজ থাকতো। মাগরিব সম্পর্কে তিনি কী বলেছিলেন তা আমি ভুলে গেছি। আর ইশার সালাত যাকে তোমরা 'আতামা' বলে থাকো, তা তিনি বিলম্বে আদায় করা পছন্দ করতেন। আর তিনি ইশার সালাতের পূর্বে নিদ্রা যাওয়া এবং পরে কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন। তিনি ফজরের সালাত এমন সময় সমাপ্ত করতেন যখন প্রত্যেকে তার পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিকে চিনতে পারতো। এ সালাতে তিনি ষাট হতে একশ আয়াত তিলাওয়াত করতেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সাথে আসরের সালাত আদায় করতাম। সালাতের পর লোকেরা আমর ইবন আওফ গোত্রের মহল্লায় গিয়ে তাদেরকে সালাত আদায় করা অবস্থায় পেতো।

আবূ উমামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা উমার ইবন আবদুল আযীয-এর সঙ্গে যুহরের সালাত আদায় করলাম। অতঃপর সেখান হতে বেরিয়ে আনাস ইবন মালিক-এর নিকট গেলাম। আমরা গিয়ে তাকে আসরের সালাত আদায়ে রত পেলাম। আমি তাকে বললাম চাচা! এ কোন সালাত যা আপনি আদায় করলেন? তিনি বললেন, আসরের সালাত আর এ হলো আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সালাত, যা আমরা তার সাথে আদায় করতাম।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আসরের সালাত আদায় করতেন, আর সূর্য তখনও যথেষ্ট উপরে উজ্জ্বল অবস্থায় বিরাজমান থাকতো। সালাতের পর কোনো গমনকারী 'আওয়ালী'র দিকে রওয়ানা হয়ে তাদের নিকট পৌছে যেতো, আর তখনও সূর্য উপরে থাকতো। আওয়ালীর কোন কোন অংশ ছিল মদিনা হতে চার মাইল বা তার কাছাকাছি দূরত্বে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আসরের সালাত আদায় করতাম, অতঃপর আমাদের কোনো গমনকারী কুবার দিকে যেতো এবং সূর্য যথেষ্ট উপরে থাকতেই সে তাদের নিকট পৌছে যেতো।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যদি কোন ব্যক্তির আসরের সালাত ছুটে যায়, তাহলে যেন তার পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গেল।

আবূ মালীহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমরা বুরাইদা-এর সঙ্গে ছিলাম। দিনটি ছিলো মেঘলা। তাই বুরাইদাহ বলেন, শীঘ্র আসরের সালাত আদায় করে নাও। কারণ নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আসরের সালাত ছেড়ে দেয় তার আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।

জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা নবী (ﷺ) -এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি রাতে (পূর্ণিমার) চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ঐ চাঁদকে তোমরা যেমন দেখছ, ঠিক তেমনি অচিরেই তোমাদের প্রতিপালককে তোমরা দেখতে পাবে। তাকে দেখতে তোমরা কোন ভীড়ের সম্মুখীন হবে না। কাজেই সূর্য উদয়ের এবং অস্ত যাওয়ার পূর্বের সালাত (শয়তানের প্রভাবমুক্ত হয়ে) আদায় করতে পারলে তোমরা তাই করবে। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেন, "কাজেই তোমার প্রতিপালকের প্রশংসার তাসবীহ পাঠ কর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে"- (ক্বাফ ৫০/৩৯)। ইসমাঈল বলেন, এর অর্থ হল- এমনভাবে আদায় করার চেষ্টা করবে যেন কখনো ছুটে না যায়।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ ফেরেশতাগণ পালা বদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন; একদল দিনে, একদল রাতে। আসর ও ফজরের সালাতে উভয় দল একত্র হন। অতঃপর তোমাদের মাঝে রাত যাপনকারী দলটি উঠে যান। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কোন অবস্থায় রেখে আসলে? অবশ্য তিনি নিজেই তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবত। উত্তরে তারা বলেন, আমরা তাদের সালাতে রেখে এসেছি, আর আমরা যখন তাদের নিকট গিয়েছিলাম তখনও তারা সালাত আদায়রত অবস্থায় ছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যদি সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে আসরের সালাতের এক সাজদা পায়, তাহলে সে যেন সালাত পূর্ণ করে নেয়। আর যদি সূর্য উদিত হবার পূর্বে ফজরের সালাতের এক সিজদা পায়, তাহলে সে যেন সালাত পূর্ণ করে নেয়।

সালিম ইবন আবদুল্লাহ তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছেন, আগেকার উম্মাতের স্থায়িত্বের তুলনায় তোমাদের স্থায়িত্ব হলো আসর হতে নিয়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের ন্যায়। তাওরাত অনুসারীদেরকে তাওরাত দেয়া হয়েছিল। তারা তদনুযায়ী কাজ করতে লাগলো; যখন দুপুর হলো, তখন তারা অপারগ হয়ে পড়লো। তাদের এক এক 'কীরাত' করে পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়। আর ইঞ্জিল অনুসারীদেরকে ইঞ্জিল দেয়া হলো। তারা আসরের সালাত পর্যন্ত কাজ করে অপরাগ হয়ে পড়লো। তাদেরকে এক এক 'কীরাত' করে পারিশ্রমিক দেয়া হলো। অতঃপর আমাদেরকে কুরআন দেয়া হলো। আমরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করলাম। আমাদের দু' দু' 'কীরাত' করে দেয়া হলো। এতে উভয় কিতাবী সম্প্রদায় বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের দু' দু' 'কীরাত' করে দান করেছেন, আর আমাদের দিয়েছেন এক এক কীরাত করে; অথচ আমলের দিক দিয়ে আমরাই বেশি। আল্লাহ তাআলা বললেনঃ তোমাদের পারিশ্রমিকের ব্যাপারে আমি কি তোমাদের প্রতি কোনোরূপ যুলুম করেছি? তারা বললো, না। তখন আল্লাহ তাআলা বললেনঃ এ হলো, আমার অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তাকে দেই।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন; মুসলিম, ইয়াহূদী ও নাসারাদের উদাহরণ হলো এমন, এক ব্যক্তি একদল লোককে নিয়োগ করলো, তারা তার জন্য রাত পর্যন্ত কাজ করবে। কিন্তু অর্ধদিবস পর্যন্ত কাজ করার পর তারা বললো, আপনার পারিশ্রমিকের আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। সে ব্যক্তি অন্য আরেক দল লোককে কাজে নিয়োগ করলো এবং বলল, তোমরা দিনের বাকী অংশ কাজ কর, তোমরা আমার নির্ধারিত পারিশ্রমিক পাবে। তারা কাজ করতে শুরু করলো। যখন আসরের সালাতের সময় হলো, তখন তারা বললো, আমরা যা কাজ করেছি তা আপনার জন্য রেখে গেলাম। অতঃপর সে ব্যক্তি আরেক দল লোককে কাজে নিয়োগ করলো। তারা সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিনের বাকী অংশে কাজ করলো এবং সে দু' দলের পূর্ণ পারিশ্রমিক অর্জন করলো।

রাফি ইবন খাদীজ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ) এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করে এমন সময় ফিরে আসতাম যে, আমাদের কেউ (তীর নিক্ষেপ করলে) নিক্ষিপ্ত তীর পড়ার জায়গা দেখতে পেতো।

মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাসান ইবন আলী হতে বর্ণিত। মুহাম্মাদ ইবন আমার বলেন, হাজ্জাজ (ইবন ইউসুফ) (মদ্বীনায়) এলে আমরা জাবির ইবন আবদুল্লাহ-কে সালাতের ওয়াক্ত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম, (কেননা, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ বিলম্ব করে সালাত আদায় করতেন)। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) যুহরের সালাত প্রচন্ড গরমের সময় আদায় করতেন। আর আসরের সালাত সূর্য উজ্জ্বল থাকতে আদায় করতেন, মাগরিবের সালাত সূর্য অস্ত যেতেই আর ইশার সালাত বিভিন্ন সময়ে আদায় করতেন। যদি দেখতেন, সকলেই সমবেত হয়েছেন, তাহলে সকাল সকাল আদায় করতেন। আর যদি দেখতেন, লোকজন আসতে দেরী করছে, তাহলে বিলম্বে আদায় করতেন। আর ফজরের সালাত তারা কিংবা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অন্ধকার থাকতে আদায় করতেন।

সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূর্য পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আমরা নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করতাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) (মাগরিব ও ইশার) সাত রাকাত ও (যুহর ও আসরের) আট রাকাত একত্রে আদায় করেছেন।

আবদুল্লাহ মুযানী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ বেদুঈনরা মাগরিবের সালাতের নামের ব্যাপারে তোমাদের উপর যেন প্রভাব বিস্তার না করে। রাবী (আবদুল্লাহ মুযানী বলেন, বেদুঈনরা মাগরিবকে ইশা বলে থাকে।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের নিয়ে ইশার সালাত আদায় করেন, যে সালাতকে লোকেরা 'আতামা' বলে থাকে। অতঃপর তিনি ফিরে আমাদের দিকে মুখ করে বললেন, আজকের এ রাত সম্পর্কে তোমরা জান কি? এ রাত হতে নিয়ে একশ বছরের শেষ মাথায় আজ যারা ভূপৃষ্ঠে আছে তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

মুহাম্মাদ ইবন আমর ইবন হাসান ইবন আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা জাবির ইবন আবদুল্লাহ-কে নবী (ﷺ) এর সালাত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মধ্যাহ্ন গড়ালেই নবী (ﷺ) যুহরের সালাত আদায় করতেন এবং সূর্য সতেজ থাকতে "আসর আদায় করতেন। আর সূর্য পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবার সাথে সাথে মাগরিব আদায় করতেন। ইশার সালাতে লোকদের আধিক্য হলেই দ্রুত আদায় করে নিতেন আর সংখ্যায় কম হলে দেরীতে আদায় করতেন। ফজরের সালাত অন্ধকার থাকতেই আদায় করতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইশার সালাত আদায় করতে বিলম্ব করলেন। এ হলো ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রসারের পূর্বের কথা। (সালাতের জন্য) তিনি বেরিয়ে আসেননি, এমন কি উমার বললেন, মহিলা ও শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। অতঃপর তিনি বেরিয়ে এলেন এবং মসজিদের লোকদের লক্ষ্য করে বললেনঃ "তোমরা ব্যতীত যমীনের অধিবাসীদের কেউ ইশার সালাতের জন্য অপেক্ষায় নেই।"

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ও আমার সাথীরা-যারা (আবিসিনিয়া হতে) জাহাজ মারফত আমার সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন- বাকী'য়ে বুতহানের একটা মুক্ত এলাকায় বসবাসরত ছিলাম। তখন নবী (ﷺ) থাকতেন মদিনায়। বুতহানের অধিবাসীরা পালাক্রমে একদল করে প্রতি রাতে ইশার সালাতের সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর খিদমতে আসতেন। পালাক্রমে ইশার সালাতের সময় আমি ও আমার কতিপয় সঙ্গী নবী (ﷺ) -এর কাছে হাযির হলাম। তখন তিনি কোনো কাজে খুব ব্যস্ত ছিলেন, ফলে সালাত আদায়ে বিলম্ব করলেন। এমন কি রাত অর্ধেক হয়ে গেলো। অতঃপর নবী (ﷺ) বেরিয়ে এলেন এবং সবাইকে নিয়ে সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষে তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদেরকে বললেনঃ প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্থানে বসে যাও। তোমাদের সুসংবাদ দিচ্ছি যে, আল্লাহর পক্ষ হতে তোমাদের জন্য এটি এক নিয়ামত যে, তোমরা ছাড়া মানুষের মধ্যে কেউ এ মুহূর্তে সালাত আদায় করছে না। কিংবা তিনি বলেছিলেনঃ তোমরা ছাড়া কোন উম্মাত এ সময় সালাত আদায় করেনি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কোন বাক্যটি বলেছিলেন বর্ণনাকারী তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। আবূ মূসা বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর এ কথা শুনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত মনে বাড়ি ফিরলাম।

আবূ বারযাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইশার পূর্বে নিদ্রা যাওয়া এবং পরে কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইশার সালাত আদায় করতে দেরী করলেন। উমার তাকে বললেন, আস্-সালাত। নারী ও শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। অতঃপর তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেনঃ তোমরা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ এ সালাতের জন্য অপেক্ষা করছে না। (রাবী বলেন) তখন মদিনা ছাড়া অন্য কোথাও সালাত আদায় করা হতো না। (তিনি আরও বলেন যে) পশ্চিম আকাশের 'শাফাক' (পশ্চিম আকাশের লাল কিরণ) অন্তর্হিত হবার পর হতে রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে তারা ইশা সালাত আদায় করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, এক রাতে কর্মব্যস্ততার কারণে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইশার সালাত আদায়ে দেরী করলেন, এমন কি আমরা মসজিদে ঘুমিয়ে পড়লাম। অতঃপর জেগে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। অতঃপর আবার জেগে উঠলাম। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের নিকট বেরিয়ে এলেন, অতঃপর বললেনঃ তোমরা ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ এ সালাতের অপেক্ষা করছে না। ঘুম প্রবল হবার কারণে ইশার সালাত বিনষ্ট হবার আশংকা না থাকলে ইবন উমার তা আগে ভাগে বা বিলম্ব করে আদায় করতে দ্বিধা করতেন না। কখনও কখনও তিনি ইশার পূর্বে নিদ্রাও যেতেন।

ইবন জুরায়জ বলেন, এ বিষয়ে আমি আতা-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আমি ইবন আব্বাস-কে বলতে শুনেছি যে, এক রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইশার সালাত আদায় করতে দেরী করেছিলেন, এমন কি লোকজন একবার ঘুমিয়ে জেগে উঠল, আবার ঘুমিয়ে পড়ে জাগ্রত হলো। তখন উমার ইবন খাত্তাব উঠে গিয়ে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বললেন, 'আস-সালাত'। আতা বলেন যে, ইবন আব্বাস বর্ণনা করেছেন, অতঃপর আল্লাহর নবী (ﷺ) বেরিয়ে এলেন- যেন এখনো আমি তাকে দেখছি- তার মাথা হতে পানি টপ্কে পড়ছিলো এবং তার হাত মাথার উপর ছিলো। তিনি এসে বললেনঃ যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর হবে বলে মনে না করতাম, তাহলে তাদেরকে এভাবে (বিলম্ব করে) ইশার সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতাম। ইবন জুরায়জ বলেন, ইবন আব্বাস -এর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যে মাথায় হাত রেখেছিলেন তা কীভাবে রেখেছিলেন, বিষয়টি সুস্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করার জন্য আতা-কে বললাম। আতা তার আঙ্গুলগুলো সামান্য ফাক করলেন, অতঃপর সেগুলোর অগ্রভাগ সম্মুখ দিক হতে (চুলের অভ্যন্তরে) প্রবেশ করালেন। অতঃপর অঙ্গুলিগুলো একত্রিত করে মাথার উপর দিয়ে এভাবে টেনে নিলেন যে, তার বৃদ্ধাঙ্গুলি কানের সে পার্শ্বকে স্পর্শ করে গেলো যা মুখমন্ডল সংলগ্ন চোয়ালের হাড্ডির উপর শ্মশ্রুর পাশে অবস্থিত। তিনি (নবী (ﷺ)) চুলের পানি ঝরাতে কিংবা চুল চাপড়াতে এমনই করতেন। এবং তিনি বলেছিলেনঃ যদি আমার উম্মাতের জন্য কষ্টকর হবে বলে মনে না করতাম, তাহলে তাদেরকে এভাবেই (বিলম্ব করে) সালাত আদায় করার নির্দেশ দিতাম।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একরাতে নবী (ﷺ) ইশার সালাত অর্ধেক রাত পর্যন্ত বিলম্ব করলেন। অতঃপর সালাত আদায় করে তিনি বললেনঃ লোকেরা নিশ্চই সালাত আদায় করে ঘুমিয়ে পড়েছে। শোন! তোমরা যতক্ষণ সালাতের অপেক্ষায় ছিলে ততক্ষণ তোমরা সালাতেই ছিলে। ইবন আবূ মারইয়াম-এর বর্ণনায় আরও আছে, তিনি বলেন, ইয়াহ্ইয়া ইবন আইউব হুমায়দ হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (হুমায়দ) আনাস-কে বলতে শুনেছেন, সে রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর আংটির উজ্জ্বলতা আমি যেন এখনও দেখতে পাচ্ছি।

জারীর ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে নবী (ﷺ) -এর নিকট ছিলাম। হঠাৎ তিনি পূর্ণিমা রাতের চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন, শোন! এটি যেমন দেখতে পাচ্ছো- তোমাদের প্রতিপালককেও তোমরা তেমনি দেখতে পাবে। তাকে দেখতে তোমরা ভিড়ের সম্মুখীন হবে না। কাজেই তোমরা যদি সূর্য উঠার পূর্বের সালাত ও সূর্য ডুবার পূর্বের সালাত আদায়ে সমর্থ হও, তাহলে তাই কর। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ "সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করুন"-(কাফ ৫০:৩৯)। আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) বলেন, ইবন শিহাব....জারীর হতে আরো বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে খালি চোখে দেখতে পাবে।

আবূ বাকর ইবন আবূ মূসা হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুই শীতের (ফজর ও আসরের) সালাত আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইবন রজা' বলেন, হাম্মাম আবূ জামরাহ হতে বর্ণনা করেন যে, আবূ বাকর ইবন আবদুল্লাহ ইবন কায়স তার নিকট এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তারা নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে সাহারী খেয়েছেন, অতঃপর ফজরের সালাতে দাড়িয়েছেন। আনাস বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ দু'য়ের মাঝে কতটুকু সময়ের ব্যবধান ছিলো? তিনি বললেন, পঞ্চাশ বা ষাট আয়াত তিলাওয়াত করা যায়, এরূপ সময়ের ব্যবধান ছিলো।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। আল্লাহর নবী (ﷺ) ও যায়দ ইবন সাবিত একসাথে সাহারী খাচ্ছিলেন, যখন তাদের খাওয়া হয়ে গেলো- আল্লাহর নবী (ﷺ) (ফজরের) সালাতে দাড়িয়ে গেলেন এবং সালাত আদায় করলেন। কাতাদাহ্ বলেন, আমরা আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, তাদের সাহারী খাওয়া হতে অবসর হয়ে সালাত শুরু করার মধ্যে কতটুকু সময়ের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, একজন লোক পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারে এতটুকু সময়।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সাহারী খেতাম। খাওয়ার পরে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ফজরের সালাত পাওয়ার জন্য আমাকে খুব তাড়াহুড়া করতে হতো।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন; মুসলিম মহিলাগণ সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ফজরের জামা'আতে হাযির হতেন। অতঃপর সালাত আদায় করে তারা নিজ নিজ ঘরে ফিরে যেতেন। আবছা আধারে কেউ তাদের চিনতে পারতো না।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সূর্য উঠার পূর্বে ফজরের সালাতের এক রাকাত পায়, সে ফজরের সালাত পেল। আর যে ব্যক্তি সূর্য ডুবার পূর্বে আসরের সালাতের এক রাকাত পেলো সে আসরের সালাত পেল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন সালাতের এক রাকাত পায়, সে সালাত পেলো।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কয়েকজন আস্থাভাজন ব্যক্তি- যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন উমার আমাকে বলেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফজরের পর সূর্য উজ্জ্বল হয়ে না উঠা পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ তোমরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায়ের ইচ্ছা করো না।

ইবন উমার আমাকে আরও বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ যদি সূর্যের একাংশ প্রকাশ পেয়ে যায়, তাহলে পূর্ণরূপে উদিত না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায়ে দেরি করো। আর যদি তার একাংশ ডুবে যায় তাহলে সম্পূর্ণরূপে অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায়ে দেরি করো। 'আবদাহও এ রকমই বর্ণনা করেছেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু'ধরনের বেচা-কেনা করতে, দু'ভাবে পোষাক পরিধান করতে এবং দু'সময়ে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। ফজরের পর সূর্য পূর্ণরূপে উদিত না হওয়া পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। আর পুরো শরীর জড়িয়ে কাপড় পরতে এবং এক কাপড়ে (যেমন লুঙ্গি ইত্যাদি পরে) হাটু খাড়া করে এমনভাবে বসতে নিষেধ করেছেন যাতে লজ্জাস্থান উপরের দিকে খুলে যায়। আর মুনাবাযাহ ও মুলামাসাহ (এর পন্থায় বেচা-কেনা) নিষেধ করেছেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায়ের উদ্যোগ না নেয়।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি যে, ফজরের পর সূর্য উদিত হয়ে (একটু) উপরে না উঠা পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত কোন সালাত নেই।

মুআবিয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা এমন এক সালাত আদায় করে থাক-রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সাহচর্য লাভ করা সত্ত্বেও আমরা তাকে কখনও তা আদায় করতে দেখিনি। বরং তিনি তা হতে নিষেধ করেছেন। আসরের পর দু'রাকাত।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দু' সময়ে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। ফজরের পর সূর্য উঠা পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্য ডুবা পর্যন্ত।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার সাথীদের যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছি সেভাবেই আমি সালাত আদায় করি। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়ে সালাতের ইচ্ছা করা ভিন্ন রাতে বা দিনে যে কোনো সময়ে কেউ সালাত আদায় করতে চাইলে আমি নিষেধ করি না।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সে মহান সত্তার শপথ, যিনি তাকে (নবী (ﷺ) -কে) উঠিয়ে নিয়েছেন, আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দু'রাকাত সালাত কখনই ছাড়েননি। আর সালাতে দাড়ানো যখন তার পক্ষে সম্ভব হয়নি, তখনই তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। তিনি তার এ সালাত অধিকাংশ সময় বসে বসেই আদায় করতেন। আয়িশাহ এ সালাত দ্বারা আসরের পরবর্তী দু'রাকাতের কথা বুঝিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন, তবে উম্মাতের উপর বোঝা হয়ে পড়ার আশংকায় তা মসজিদে আদায় করতেন না। কেননা, উম্মাতের জন্য যা সহজ হয় তাই তার কাম্য ছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে ভাগ্নে! নবী (ﷺ) আমার নিকট উপস্থিত থাকার কালে আসরের পরবর্তী দু'রাকাত কখনও ছাড়েননি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু'রাকাত সালাত আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রকাশ্যে বা গোপনে কোন অবস্থাতেই ছাড়তেন না। তাহলো ফজরের সালাতের পূর্বের দু'রাকাত ও আসরের পরের দু'রাকাত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যে দিনই আসরের পর আমার নিকট আসতেন সে দিনই দু'রাকাত সালাত আদায় করতেন।

আবূ মালীহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মেঘলা দিনে আমরা বুরাইদা-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি বললেন, শীঘ্র সালাত আদায় করে নাও। কেননা, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আসরের সালাত ছেড়ে দেয় তার সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যায়।

আবূ কাতাদাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে ছিলাম। যাত্রী দলের কেউ কেউ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাতের এ শেষ প্রহরে আমাদের নিয়ে যদি একটু বিশ্রাম নিতেন। রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) বললেনঃ আমার ভয় হচ্ছে সালাতের সময়ও তোমরা ঘুমিয়ে থাকবে। বিলাল বললেন, আমি আপনাদের জাগিয়ে দিব। কাজেই সবাই শুয়ে পড়লেন। এ দিকে বিলাল তার হাওদার গায়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। এতে তার দু'চোখ মুদে আসলো। ফলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সূর্য কেবল উঠতে শুরু করেছে, এমন সময় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জাগ্রত হলেন এবং বিলাল-কে ডেকে বললেন, হে বিলাল! তোমার কথা গেলো কোথায়? বিলাল বললেন, আমার এতো অধিক ঘুম আর কখনও পায়নি। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ আল্লাহ তাআলা যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তোমাদের রূহ্ কবয করে নিয়েছেন; আবার যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তা তোমাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। হে বিলাল! উঠ, লোকদের জন্য সালাতের আযান দাও। অতঃপর তিনি উযূ করলেন এবং সূর্য যখন উপরে উঠল এবং উজ্জ্বল হলো তখন তিনি দাড়ালেন এবং সালাত আদায় করলেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, খন্দকের দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর উমার ইবন খাত্তাব এসে কুরাইশ গোত্রীয় কাফিরদের ভৎর্সনা করতে লাগলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এখনও আসরের সালাত আদায় করতে পারিনি, এমন কি সূর্য অস্ত যায় যায়। নবী (ﷺ) বললেন আল্লাহর শপথ! আমিও তা আদায় করিনি। অতঃপর আমরা উঠে বুতহানের দিকে গেলাম। সেখানে তিনি সালাতের জন্য উযূ করলেন এবং আমরাও উযূ করলাম; অতঃপর সূর্য ডুবে গেলে আসরের সালাত আদায় করেন, অতঃপর মাগরিবের সালাত আদায় করেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ যদি কেউ কোনো সালাতের কথা ভুলে যায়, তাহলে যখনই স্মরণ হবে, তখন তাকে তা আদায় করতে হবে। এ ব্যতীত সে সালাতের অন্য কোনো কাফ্ফারা নেই। (কেননা, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন) "আমাকে স্মরণের উদ্দেশে সালাত কায়িম কর"- (ত্বা-হা ২০/১৪)। মূসা বলেন, হাম্মাম বলেছেন যে, আমি তাকে [কাতাদাহ] পরে বলতে শুনেছি, "আমাকে স্মরণের উদ্দেশে সালাত কায়িম কর।"

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধকালে এক সময় উমার কুরাইশ কাফিরদের তিরস্কার করতে লাগলেন এবং বললেন, সূর্যাস্তের পূর্বে আমি আসরের সালাত আদায় করতে পারিনি, [জাবির বলেন] অতঃপর আমরা বুতহান উপত্যকায় উপস্থিত হলাম। সেখানে তিনি সূর্যাস্তের পর সে সালাত আদায় করলেন, তার পরে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন।

আবূ মিনহাল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পিতার সঙ্গে আবূ বারযা আসলামী-এর নিকট গেলাম। আমার পিতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরজ সালাতসমূহ কোন সময় আদায় করতেন? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুহরের সালাত যাকে তোমরা প্রথম সালাত বলে থাকো, সূর্য ঢলে পড়লে আদায় করতেন। আর তিনি আসরের সালাত এমন সময় আদায় করতেন যে, আমাদের কেউ সূর্য সজীব থাকতেই মদিনার শেষ প্রান্তে নিজ পরিজনের নিকট ফিরে আসতে পারতো। মাগরিব সম্পর্কে তিনি কী বলেছিলেন, তা আমি ভুলে গেছি। অতঃপর আবূ বারযা বলেন, ইশার সালাত একটু বিলম্বে আদায় করাকে তিনি পছন্দ করতেন। আর ইশার পূর্বে ঘুমানো এবং পরে কথাবার্তা বলা তিনি অপছন্দ করতেন। আর এমন মুহূর্তে তিনি ফজরের সালাত শেষ করতেন যে, আমাদের যে কেউ তার পার্শ্ববর্তী ব্যক্তিকে চিনতে পারত। এ সালাতে তিনি ষাট হতে একশত আয়াত তিলাওয়াত করতেন।

কুররাহ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা হাসান বসরী-এর অপেক্ষায় ছিলাম। তিনি এতো বিলম্বে আসলেন যে, নিয়মিত সালাত শেষে চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসলো। এরপর তিনি এসে বললেন, আমাদের এ প্রতিবেশীগণ আমাদের ডেকেছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আনাস ইবন মালিক বর্ণনা করেছেন, এক রাতে আমরা নবী (ﷺ) -এর অপেক্ষায় ছিলাম। এমন কি প্রায় অর্ধেক রাত হয়ে গেলো, তখন এসে তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমাদের সম্বোধন করে তিনি বললেনঃ জেনে রাখ! লোকেরা সালাত আদায় করে ঘুমিয়ে পড়েছে, তবে তোমরা যতক্ষণ সালাতের অপেক্ষায় ছিলে ততক্ষণ সালাতেই রত ছিলে। হাসান (বসরী বলেন, মানুষ যতক্ষণ কল্যাণের অপেক্ষায় থাকে, ততক্ষণ তারা কল্যাণেই রত থাকে। কুর্রা বলেন, এ উক্তি আনাস কর্তৃক বর্ণিত আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর হাদীসেরই অংশ।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) একবার তার শেষ জীবনে ইশার সালাত আদায় করে সালাম ফিরবার পর বললেনঃ আজকের এ রাত সম্পর্কে তোমাদের অভিমত কী? আজ হতে নিয়ে একশ বছরের মাথায় আজ যারা ভূ-পৃষ্ঠে আছে তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। কিন্তু সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর 'একশ বছরের' এ উক্তি সম্পর্কে নানা রকম জল্পনা-কল্পনা করতে থাকলেন। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ আজকে যারা জীবিত আছে তাদের কেউ ভূ-পৃষ্ঠে থাকবে না। এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, এ শতাব্দী ঐ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটাবে।

আবদুর রহমান ইবন আবূ বাকর হতে বর্ণিত যে, আসহাবে সুফ্ফা ছিলেন খুবই দরিদ্র। (একদা) নবী (ﷺ) বললেনঃ যার নিকট দু'জনের আহার আছে সে যেন (তাদের হতে) তৃতীয় জনকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। আর যার নিকট চারজনের আহারের সংস্থান আছে, সে যেন পঞ্চম বা ষষ্ঠজনকে সঙ্গে নিয়ে যায়। আবূ বাকর তিনজন সাথে নিয়ে আসেন এবং আল্লাহর রাসূল দশজন নিয়ে আসেন। আবদুর রহমান বলেন, আমাদের ঘরে এবং আবূ বাকরের ঘরে আমি, আমার পিতা ও মাতা (এই তিন জন সদস্য) ছিলাম। রাবী বলেন, আমি জানি না, তিনি আমার স্ত্রী এবং খাদিম একথা বলেছিলেন কি-না? আবূ বাকর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর ঘরেই রাতের আহার করেন, এবং ইশার সালাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। ইশা সালাতের পর তিনি আবার (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর ঘরে) ফিরে আসেন এবং নবী (ﷺ) -এর রাতের আহার শেষ করা পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় রাতের কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর বাড়ি ফিরলে তার স্ত্রী তাকে বললেন, মেহমানদের নিকট আসতে কিসে আপনাকে ব্যস্ত রেখেছিল? কিংবা তিনি বলেছিলেন, (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) মেহমান হতে। আবু বাকর বললেন, এখনও তাদের খাবার দাওনি? তিনি বললেন, আপনি না আসা পর্যন্ত তারা খেতে অস্বীকার করেন। তাদের সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল, তবে তারা খেতে সম্মত হননি। আবদুর রহমান বলেন, (পিতার তিরস্কারের ভয়ে) আমি সরে গিয়ে আত্মগোপন করলাম। তিনি (রাগান্বিত হয়ে) বললেন, ওরে বোকা এবং ভৎর্সনা করলেন। আর (মেহমানদের) বললেন, খেয়ে নিন। আপনারা অস্বস্তিতে ছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এ কখনই খাব না। আবদুর রহমান বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা লোক্মা উঠিয়ে নিতেই নীচ হতে তা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছিল। তিনি বলেন, সকলেই পেট ভরে খেলেন। অথচ পূর্বের চেয়ে অধিক খাবার রয়ে গেলো। আবূ বাকর খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন তা পূর্বের সমপরিমাণ কিংবা তার চাইতেও বেশি। তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, হে বানূ ফিরাসের বোন। একি? তিনি বললেন, আমার চোখের প্রশান্তির কসম! এতো এখন পূর্বের চেয়ে তিনগুণ বেশি! আবূ বাকর-ও তা হতে আহার করলেন এবং বললেন, আমার সে শপথ শয়তানের পক্ষ হতেই হয়েছিল। অতঃপর তিনি আরও লুক্মা মুখে দিলেন এবং অবশিষ্ট খাবার নবী (ﷺ) -এর নিকটে নিয়ে গেলেন। ভোর পর্যন্ত সে খাদ্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর কাছেই ছিল। এদিকে আমাদের ও অন্য একটি গোত্রের মাঝে যে সন্ধি ছিলো তার সময়সীমা পূর্ণ হয়ে যায়। (এবং তারা মদিনায় আসে) আমরা তাদের বারজনের নেতৃত্বে ভাগ করে দেই। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই কিছু কিছু লোক ছিলো। তবে প্রত্যেকের সঙ্গে কতজন ছিল তা আল্লাহই জানেন। তারা সকলেই সেই খাদ্য হতে আহার করেন। (রাবী বলেন) কিংবা আবদুর রহমান যেভাবে বর্ণনা করেছেন।