উমরাহ (১৭৭৩-১৮০৫)
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ এক উমরাহ'র পর আর এক উমরাহ উভয়ের মধ্যবর্তী সময়ের (গুনাহের) জন্য কাফফারা। আর জান্নাতই হলো হাজ্জে মাবরূরের প্রতিদান।
ইকরিমা ইবন খালিদ হতে বর্ণিত, তিনি ইবন উমার-কে হাজ্জের আগে উমরাহ আদায় করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বললেন, এতে কোন দোষ নেই। 'ইকরিমা বলেন, ইবন উমার বলেছেন, নবী (ﷺ) হাজ্জের আগে উমরাহ আদায় করেছেন।
মুজাহিদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং উরওয়াহ ইবন যুবাইর মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম, আবদুল্লাহ ইবন উমার আয়িশাহ -এর হুজরার পাশে বসে আছেন। ইতোমধ্যে কিছু লোক মসজিদে সালাতুয্যোহা আদায় করতে লাগল। আমরা তাকে এদের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা বিদ'আত। এরপর উরওয়াহ ইবন যুবাইর তাকে বললেন, নবী (ﷺ) কতবার উমরাহ আদায় করেছেন? তিনি বললেন, চারবার। এর মধ্যে একটি রজব মাসে। আমরা তার কথা রদ করা পছন্দ করলাম না।
আমরা আয়িশাহ-এর হুজরার ভিতর হতে তার মিসওয়াক করার আওয়াজ শুনতে পেলাম। তখন উরওয়াহ বললেন, হে আম্মাজান, হে উম্মুল মুমিনীন! আবূ আবদুর রাহমান কী বলছেন, আপনি কি শুনেননি? আয়িশাহ বললেন, তিনি কী বলছেন? উরওয়াহ বললেন, তিনি বলছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) চারবার উমরাহ আদায় করেছেন। এর মধ্যে একটি রজব মাসে। আয়িশাহ বললেন, আবূ আবদুর রাহমানের প্রতি আল্লাহ রহম করুন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এমন কোন উমরাহ আদায় করেননি যে, তিনি তার সঙ্গে ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রজব মাসে কখনো উমরাহ আদায় করেননি।
উরওয়াহ ইবন যুবাইর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-এর জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) রজব মাসে কখনো উমরাহ আদায় করেননি।
কাতাদাহ হতে বর্ণিত যে, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কতবার উমরাহ আদায় করেছেন? তিনি বললেন, চারবার। তন্মধ্যে হুদায়বিয়ার উমরাহ যুলকা'দা মাসে যখন মুশরিকরা তাকে মক্কা প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল। পরবর্তী বছরের যুল-কা'দা মাসের উমরা, যখন মুশরিকদের সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, জি'রানার উমরাহ, যেখানে নবী (ﷺ) গনীমতের মাল, সম্ভবতঃ হুনায়নের যুদ্ধে বণ্টন করেন। আমি বললাম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কতবার হাজ্জ করেছেন? তিনি বললেন, একবার।
কাতাদাহ হতে বর্ণিত যে, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) একবার উমরাহ করেছেন যখন তাকে মুশরিকরা ফিরিয়ে দিয়েছিল। তার পরবর্তী বছর ছিল হুদাইবিয়ার (চুক্তি অনুযায়ী) উমরাহ, (তৃতীয়) উমরাহ (জি'রানা) যুল-কা'দা মাসে আর হাজ্জের মাসে অপর একটি উমরাহ করেছেন।
হাম্মাম হতে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) চারটি উমরাহ করেছেন। তন্মধ্যে হাজ্জের মাসে যে উমরাহ করেছেন তা ছাড়া বাকী সব উমরাহই যুল-কা'দা মাসে করেছেন। হুদাইবিয়ার উমরাহ, পরবর্তী বছরের উমরাহ, জি'রানার উমরাহ, যেখানে তিনি হুনাইনের মালে গনীমত বণ্টন করেছিলেন এবং হাজ্জের মাসে আদায়কৃত উমরাহ।
আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মাসরূক, আতা এবং মুজাহিদ-কে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যুল-কা'দা মাসে হাজ্জের আগে উমরাহ করেছেন। রাবী বলেন, আমি বারা ইবন আযিব-কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হাজ্জ করার আগে দু'বার যুল-কা'দা মাসে উমরাহ করেছেন।
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এক আনসারী মহিলাকে বললেনঃ আমাদের সঙ্গে হাজ্জ করতে তোমার বাধা কিসের? ইবন আব্বাস মহিলার নাম বলেছিলেন কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছি। মহিলা বলল, আমাদের একটি পানি বহনকারী উট ছিল। কিন্তু তাতে অমুকের পিতা ও তার পুত্র (মহিলার স্বামী ও ছেলে) আরোহণ করে চলে গেছেন। আর আমাদের জন্য রেখে গেছেন পানি বহনকারী আরেকটি উট যার দ্বারা আমরা পানি বহন করে থাকি। নবী (ﷺ) বললেনঃ আচ্ছা, রমাযান এলে তখন উমরাহ করে নিও। কেননা, রমযানের একটি উমরাহ একটি হাজ্জের সমতুল্য। অথবা এরূপ কোন কথা তিনি বলেছিলেন।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে রওয়ানা হলাম যখন যুলহাজ্জ আগত প্রায়। তখন তিনি আমাদের বললেনঃ তোমাদের মধ্যে যে হাজ্জের ইহরাম বাধতে চায়, সে যেন হাজ্জের ইহরাম বেধে নেয়। আর যে উমরাহ'র ইহরাম বাধতে চায় সে যেন উমরাহ'র ইহরাম বেধে নেয়। আমি যদি কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে না আনতাম তাহলে অবশ্যই আমি উমরাহ'র ইহরাম বাধতাম। আয়িশাহ বলেন, আমাদের মধ্যে কেউ উমরাহ'র ইহরাম বাধলেন, আবার কেউ হাজ্জের। যারা উমরাহ'র ইহরাম বেধেছিলেন, আমি তাদের একজন। আরাফার দিন এল, তখন আমি ঋতুমতী ছিলাম। নবী (ﷺ) -এর নিকট তা জানালাম। তিনি বললেনঃ উমরাহ ছেড়ে দাও এবং মাথার বেণী খুলে মাথা আচড়িয়ে নাও। অতঃপর হাজ্জের ইহরাম বাধ। যখন মুহাসসাবের রাত হল, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার সঙ্গে (আমার ভাই) আবদুর রাহমানকে তান'ঈমে পাঠালেন এবং আমি ছেড়ে দেয়া উমরাহ'র স্থলে নতুনভাবে উমরাহ'র ইহরাম বাধলাম।
আবদুর রাহমান ইবন আবূ বাকর হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) তাকে তার সওয়ারীর পিঠে আয়িশাহ-এর বসিয়ে তান'ঈম হতে উমরাহ করানোর নির্দেশ দেন। রাবী সুফয়ান একদা বলেন, এ হাদীস আমি আমরের কাছে বহুবার শুনেছি।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) ও তার সাহাবীগণ হাজ্জের ইহরাম বেধেছিলেন। নবী (ﷺ) ও তালহা ব্যতীত কারো সাথে কুরবানীর পশু ছিল না। আর আলী ইয়ামান হতে এলেন এবং তার সঙ্গে কুরবানীর পশু ছিল। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যে বিষয়ে ইহরাম বেধেছেন, আমিও তার ইহরাম বাধলাম। নবী (ﷺ) এ ইহরামকে উমরায় পরিণত করতে এবং তাওয়াফ করে এরপরে মাথার চুল ছোট করে হালাল হয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। তবে যাদের সঙ্গে কুরবানীর জানোয়ার রয়েছে (তারা হালাল হবে না)। তারা বললেন, আমরা মিনার দিকে রওয়ানা হবো এমতাবস্থায় আমাদের কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাস করে এসেছে। এ সংবাদ নবী (ﷺ) -এর নিকট পৌছলে তিনি বললেনঃ যদি আমি এ ব্যাপার পূর্বে জানতাম, যা পরে জানতে পারলাম, তাহলে কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে আনতাম না। আর যদি কুরবানীর পশু আমার সাথে না থাকত অবশ্যই আমি হালাল হয়ে যেতাম। আর আয়িশাহ-এর ঋতু দেখা দিল। তিনি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হাজ্জের সব কাজই সম্পন্ন করে নিলেন। রাবী বলেন, এরপর যখন তিনি পাক হলেন এবং তাওয়াফ করলেন, তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনারা তো হাজ্জ এবং উমরাহ উভয়টি পালন করে ফিরছেন, আমি কি শুধু হাজ্জ করেই ফিরব? তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আবদুর রাহমান ইবন আবূ বাকর-কে নির্দেশ দিলেন তাকে সঙ্গে নিয়ে তান'ঈমে যেতে। অতঃপর যুলহাজ্জ মাসেই হাজ্জ আদায়ের পর আয়িশাহ উমরাহ আদায় করলেন। নবী (ﷺ) যখন জামরাতুল 'আকাবায় কঙ্কর মারছিলেন তখন সুরাকা ইবন মালিক ইবন জু'শুম-এর নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ হাজ্জের মাসে উমরাহ আদায় করা কি আপনাদের জন্য খাস? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ না, এতো চিরদিনের (সকলের) জন্য।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন যুলহাজ্জ মাস আগত প্রায়, তখন আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে রওয়ানা দিলাম। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেনঃ যে ব্যক্তি উমরাহ'র ইহরাম বাধতে চায়, সে যেন উমরাহ'র ইহরাম বেধে নেয়। আর যে ব্যক্তি হাজ্জের ইহরাম বাধতে চায় সে যেন হাজ্জের ইহরাম বেধে নেয়। আমি যদি কুরবানীর জানোয়ার সঙ্গে না আনতাম তাহলে অবশ্যই আমি উমরাহ'র ইহরাম বাধতাম। তাই তাদের কেউ উমরাহ'র ইহরাম বাধলেন আর কেউ হাজ্জের ইহরাম বাধলেন। যারা উমরাহ'র ইহরাম বেধেছিলেন, আমি তাদের মধ্যে একজন। এরপর মক্কা পৌছার আগেই আমার ঋতু দেখা দিল। আরাফার দিবস চলে এল, আর আমি ঋতুমতী অবস্থায় ছিলাম। অতঃপর আমার এ অসুবিধার কথা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট বললাম। তিনি বললেনঃ উমরাহ ছেড়ে দাও। আর বেণী খুলে মাথা আচড়িয়ে নাও। অতঃপর হাজ্জের ইহরাম বেধে নাও। আমি তাই করলাম। মুহাস্সাবের রাতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমার সাথে আবদুর রহমানকে তান'ঈম পাঠালেন। (রাবী বলেন) আবদুর রহমান তাকে সাওয়ারীতে নিজের পিছনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর আয়িশাহ আগের উমরাহ'র স্থলে নতুন উমরাহ'র ইহরাম বাধলেন। এমনিভাবেই আল্লাহ তাআলা তার হাজ্জ এবং উমরাহ উভয়টিই পুরা করালেন। বর্ণনাকারী বলেন, এর কোন ক্ষেত্রেই (দম হিসেবে) কুরবানী বা সদাকাহ দিতে কিংবা সিয়াম পালন করতে হয়নি।
আসওয়াদ হতে বর্ণিত যে, আয়িশাহ বললেন, হে আল্লাহর রসুল! সাহাবীগণ ফিরছেন দু'টি নুসূক (হাজ্জ এবং উমরাহ) পালন করে আর আমি ফিরছি একটি নুসূক (শুধু হাজ্জ) আদায় করে। তাকে বলা হল, অপেক্ষা কর। পরে যখন তুমি পবিত্র হবে তখন তান'ঈমে গিয়ে ইহরাম বাধবে এরপর অমুক স্থানে আমাদের কাছে আসবে। এ উমরাহ (এর সওয়াব) হবে তোমার খরচ বা কষ্ট অনুপাতে।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর সঙ্গে হাজ্জের ইহরাম বেধে বের হলাম, হাজ্জের মাসে এবং হাজ্জের কার্যাদি পালনের উদ্দেশ্যে। যখন সারিফ নামক স্থানে অবতরণ করলাম, তখন নবী (ﷺ) তার সাহাবাগণকে বললেনঃ যার সাথে কুরবানীর জানোয়ার নেই এবং সে এই ইহরামকে উমরায় পরিণত করতে চায়, সে যেন তা করে নেয় (উমরাহ করে হালাল হয়)। আর যার সাথে কুরবানীর জানোয়ার আছে সে এরূপ করবে না। (হালাল হতে পারবে না)। নবী (ﷺ) ও তার কয়েকজন সমর্থ সাহাবীর নিকট কুরবানীর জানোয়ার ছিল তাদের হাজ্জ উমরাহ পরিণত হল না। [আয়িশাহ বললেন] আমি কাঁদছিলাম, এমতাবস্থায় নবী (ﷺ) আমার নিকট এসে বললেনঃ তোমাকে কিসে কাঁদাচ্ছে? আমি বললাম, আপনি আপনার সাহাবীগণকে যা বলেছেন, আমি তা শুনেছি। আমি তো উমরাহ হতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে গেছি। নবী (ﷺ) বললেনঃ তোমার কী অবস্থা? আমি বললাম, আমি তো সালাত আদায় করছি না (ঋতুমতী অবস্থায়)। তিনি বললেনঃ এতে তোমার ক্ষতি হবে না। তুমি তো আদম কন্যাদেরই একজন। তাদের অদৃষ্টে যা লেখা ছিল তোমার জন্যও তা লিখিত হয়েছে। সুতরাং তুমি তোমার হাজ্জ আদায় কর। সম্ভবতঃ আল্লাহ তাআলা তোমাকে উমরাহও দান করবেন। আয়িশাহ বলেন, আমি এ অবস্থায়ই থেকে গেলাম এবং পরে মিনা হতে প্রত্যাবর্তন করে মুহাস্সাবে অবতরণ করলাম। অতঃপর নবী (ﷺ) আবদুর রহমান [আয়িশাহ-এর সহোদর ভাই]-কে ডেকে বললেনঃ তুমি তোমার বোনকে হারামের বাইরে নিয়ে যাও। সেখান হতে যেন সে উমরাহ'র ইহরাম বাধে। অতঃপর তোমরা তাওয়াফ করে নিবে। আমি তোমাদের জন্য এখানে অপেক্ষা করব। আমরা মধ্যরাতে এলাম। তিনি বললেনঃ তোমরা কি তাওয়াফ সমাধা করেছ? আমি বললাম, হা। এ সময় তিনি সাহাবীগণকে রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা দিলেন। তাই লোকজন এবং যারা ফজরের পূর্বে তাওয়াফ করেছিলেন তারা রওয়ানা হলেন। অতঃপর নবী (ﷺ) মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
ই'য়ালা ইবন উমায়্যা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জি'রানাতে ছিলেন। এ সময় জুববা পরিহিত এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -এর নিকট এসে বললেন, আপনি উমরাহতে আমাকে কী কাজ করার নির্দেশ দেন? লোকটির জুববাতে খালূক বা হল্দে রঙের দাগ ছিল। এ সময় আল্লাহ তাআলা নবী (ﷺ) -এর উপর ওয়াহী নাযিল করলেন। নবী (ﷺ) -কে কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেয়া হল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি উমার-কে বললাম, আল্লাহ তার নবীর প্রতি ওয়াহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় আমি নবী (ﷺ) -কে দেখতে চাই। উমার বললেন, এসো, আল্লাহ নবী (ﷺ) -এর প্রতি ওয়াহী নাযিল করছেন, এমতাবস্থায় তুমি কি তাকে দেখতে আগ্রহী? আমি বললাম, হা। অতঃপর উমার কাপড়ের একটি কোণ উচু করে ধরলেন। আমি তার দিকে নজর করলাম। নবী (ﷺ) আওয়াজ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলছিলেন, উটের আওয়াজের মত আওয়াজ। এ অবস্থা নবী (ﷺ) হতে দূরীভূত হলে তিনি বললেনঃ উমরাহ সম্পর্কে প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি বললেনঃ তুমি তোমার হতে জুববাটি খুলে ফেল, খালূকের চিহ্ন ধুয়ে ফেল এবং হলদে রং পরিষ্কার করে নাও। আর তোমার হাজ্জে যা করেছ উমরাহতে তুমি তা-ই করবে।
উরওয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বাল্যকালে একদা নবী (ﷺ) -এর সহধর্মিণী আয়িশাহ-এর বললাম, আল্লাহর বাণীঃ "সাফা ও মারওয়াহ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে কাবা গৃহের হাজ্জ কিংবা উমরাহ সম্পন্ন করে এ দু'টির মধ্যে সা'য়ী করতে চায়, তার কোন গুনাহ নেই"- (আল-বাকারাঃ ১৫৮)। তাই সাফা-মারওয়াহর সা'য়ী না করা আমি কারো পক্ষে অপরাধ মনে করি না। আয়িশাহ বলেন, বিষয়টি এমন নয়। কেননা, তুমি যেমন বলছ, ব্যাপারটি তেমন হলে আয়াতটি অবশ্যই এমন হতঃ "সাফা ও মারওয়াহ্ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে কাবা গৃহের হাজ্জ কিংবা উমরাহ সম্পন্ন করে এ দু'টির মধ্যে সা'য়ী করে, তার কোন পাপ নেই"- (আল-বাকারাঃ ১৫৮)। এ দু'টির মাঝে তাওয়াফ করলে কোন পাপ নেই। এ আয়াত তো আনসারদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কেননা তারা মানাতের জন্য ইহরাম বাধত। আর মানাত কুদায়দের সামনে ছিল। তাই আনসাররা সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করতে দ্বিধাবোধ করত। এরপর ইসলামের আবির্ভাবের পর তারা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেনঃ 'সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে কাবা গৃহের হাজ্জ কিংবা উমরাহ করতে চায় তার জন্য এ দু'টির মধ্যে সা'য়ী করায় কোন গুনাহ নেই।' সুফয়ান ও আবূ মুআবিয়াহ হিশাম হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ সাফা-মারওয়াহর মাঝে তাওয়াফ না করলে আল্লাহ কারো হাজ্জ এবং উমরাকে পূর্ণ করেন না।
আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উমরাহ করলেন, আমরাও তার সঙ্গে উমরাহ করলাম। তিনি মক্কা প্রবেশ করে তাওয়াফ করলেন, আমরাও তার সঙ্গে তাওয়াফ করলাম। এরপর তিনি সাফা-মারওয়ায় সা'য়ী করলেন, আমরাও তার সঙ্গে সা'য়ী করলাম। আর আমরা তাকে মক্কাবাসীদের হতে লুকিয়ে রাখছিলাম যাতে কোন মুশরিক তার প্রতি কোন কিছু নিক্ষেপ করতে না পারে। বর্ণনাকারী বলেন, আমার এক সাথী তাকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কি কাবা শরীফে প্রবেশ করেছিলেন? তিনি বললেন, না।
প্রশ্নকারী তাকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খাদীজা সম্বন্ধে কী বলেছেন? তিনি বললেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ খাদীজাকে বেহেশতের মাঝে মতি দিয়ে তৈরি এমন একটি ঘরের সুসংবাদ দাও যেখানে কোন শোরগোল থাকবে না এবং কোন প্রকার কষ্ট ক্লেশও থাকবে না।
আমর ইবন দ্বীনার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমরাহ'র মাঝে বাইতুল্লাহর তাওয়াফের পর সাফা-মারওয়াহর তাওয়াফ না করে যে স্ত্রীর নিকট গমন করে, এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা ইবন উমার-কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, নবী (ﷺ) (মক্কায়) এসে বায়তুল্লাহ'র সাতবার তাওয়াফ করে মাকামে ইব্রাহীমের পাশে দু'রাকাত সালাত আদায় করেছেন। এরপর সাতবার সাফা-মারওয়ার মাঝে সা'য়ী করেছেন। "আর তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ তো রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মাঝেই"- (আল-আহযাবঃ ২১)।
(রাবী) আমর ইবন দ্বীনার বলেছেন, জাবির ইবন 'আব্দুল্লাহ-কেও আমরা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেছেন, সাফা-মারওয়ার মাঝে তাওয়াফ না করা পর্যন্ত কেউ তার স্ত্রীর নিকট কিছুতেই যাবে না।
আবূ মূসা আল-আশআরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মক্কার বাতহায় অবতরণ করলে আমি তার নিকট গেলাম। তিনি বললেনঃ তুমি কি হাজ্জ করেছ? আমি বললাম, হা। তিনি বললেনঃ তুমি কিসের ইহরাম বেধেছিলে? আমি বললাম, নবী (ﷺ) -এর ইহরামের মত আমিও ইহরামের তালবিয়া পাঠ করেছি। তিনি বললেনঃ ভাল করেছ। এখন বাইতুল্লাহ এবং সাফা-মারওয়ার সা'য়ী করে হালাল হয়ে যাও। অতঃপর আমি বাইতুল্লাহ এবং সাফা-মারওয়ার সা'য়ী করে কায়স গোত্রের এক মহিলার কাছে গেলাম। সে আমার মাথার উকুন বেছে দিল। এরপর আমি হাজ্জের ইহরাম বাধলাম এবং উমার-এর খিলাফত পর্যন্ত আমি এভাবেই ফাতাওয়া দিতে থাকি। উমার বললেন, যদি আমরা আল্লাহর কিতাব গ্রহণ করি সেটা তো আমাদের পূর্ণ করার নির্দেশ দেয়। আর যদি আমরা নবী (ﷺ) -এর বাণী গ্রহণ করি তাহলে নবী (ﷺ) কুরবানীর পশু তার স্থানে পৌছার (যবহ করার) পূর্ব পর্যন্ত হালাল হননি।
আবুল আসওয়াদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর-এর কন্যা আসমা-এর আযাদকৃত গোলাম আবদুল্লাহ তার নিকট বর্ণনা করেছেন, যখনই আসমা হাজ্জূন এলাকা দিয়ে গমন করতেন তখনই তাকে বলতে শুনেছেন "সাল্লাল্লাহু আলা রাসূলিহী" 'আল্লাহ তার রাসূলের প্রতি রহমত নাযিল করুন', এ স্থানে আমরা নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে অবতরণ করেছিলাম। তখন আমাদের বোঝা ছিল খুব অল্প, যানবাহন ছিল একেবারে নগণ্য এবং সম্বল ছিল খুবই কম। আমি, আমার বোন আয়িশাহ, যুবাইর এবং অমুক অমুক উমরাহ আদায় করলাম। তারপর বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে আমরা সকলেই হালাল হয়ে গেলাম এবং সন্ধ্যাকালে হাজ্জের ইহরাম বাধলাম।
আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখনই কোন যুদ্ধ, বা হাজ্জ অথবা উমরাহ হতে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন তিনি প্রত্যেক উচু ভূমিতে তিনবার 'আল্লাহু আকবার' বলতেন এবং পরে বলতেন: "আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোন শরীক নেই। সর্বময় ক্ষমতা এবং সকল প্রশংসা কেবল তারই। তিনি সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তওবা্কারী, ইবাদাতকারী, আমাদের প্রভুর উদ্দেশে সিজদাকারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ তার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সকল শত্রুদলকে পরাজিত করেছেন।"
ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মক্কায় এলে আবদুল মুত্তালিব গোত্রীয় কয়েকজন তরুণ তাকে স্বাগত জানায়। তিনি একজনকে তার সাওয়ারীর সামনে ও অন্যজনকে পেছনে তুলে নেন।
ইবন উমার হতে বর্ণিত যে,আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মক্কার উদ্দেশে বের হয়ে 'মসজিদে শাজারাতে' সালাত আদায় করতেন। আর যখন ফিরতেন, যুল-হুলাইফার বাতনুল-ওয়াদীতে সালাত আদায় করতেন এবং এখানে সকাল পর্যন্ত রাত যাপন করতেন।
আনাস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাত্রে কখনো পরিবারের নিকট প্রবেশ করতেন না। তিনি প্রভাতে কিংবা বৈকালে ছাড়া পরিবারের নিকট প্রবেশ করতেন না।
জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাতের বেলা পরিবারের কাছে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।
হুমাইদ হতে বর্ণিত। তিনি আনাস-কে বলতে শুনেছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সফর হতে ফিরে যখন মদিনার উচু রাস্তাগুলো দেখতেন তখন তিনি তার উটনী দ্রুতগতিতে চালাতেন আর বাহন অন্য জানোয়ার হলে তিনি তাকে তাড়া দিতেন। অপর একটি বর্ণনায় হুমাইদ আনাস হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, (উচু রাস্তা)-এর পরিবর্তে (দেয়ালগুলো) শব্দ বলেছেন। হারিস ইবন উমাইর ইসমাঈল-এর অনুরূপ বর্ণনা করেন।
আবূ ইসহাক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বারা-কে বলতে শুনেছি, এ আয়াতটি আমাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছিল। হাজ্জ করে এসে আনসারগণ তাদের বাড়িতে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেন। এক আনসার ফিরে এসে তার বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে তাকে এ জন্য লজ্জা দেয়া হয়। তখনই নাযিল হয়ঃ "পশ্চাৎ দিক দিয়ে তোমাদের গৃহ-প্রবেশ করাতে কোন কল্যাণ নেই। বরং কল্যাণ আছে যে তাকওয়া অবলম্বন করে। সুতরাং তোমরা (সামনের) দরজা দিয়ে গৃহে প্রবেশ কর"- (আল-বাকারাঃ ১৮৯)।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) ইরশাদ করেন, সফর আযাবের অংশ বিশেষ। তা তোমাদের যথাসময় পানাহার ও নিদ্রায় ব্যঘাত ঘটায়। কাজেই সকলেই যেন নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে অবিলম্বে আপন পরিজনের কাছে ফিরে যায়।
আসলাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মক্কার রাস্তায় আমি আবদুল্লাহ ইবন উমার-এর সাথে ছিলাম। সাফিয়্যা বিনতু আবূ 'উবায়দ-এর মারাত্নক অসুস্থ হওয়ার খবর তার নিকট পৌছল। তখন তিনি গতি বৃদ্ধি করলেন। (পশ্চিম আকাশের) লালিমা চলে যাবার পর সাওয়ারী হতে অবতরণ করে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করেন। অতঃপর বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে দেখেছি, সফরে তাড়াতাড়ি চলার দরকার হলে তিনি মাগরিবকে দেরি করে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন।