bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

নবী (ﷺ) ও সাহাবাদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য (৩৪৮৯-৩৬৪৮)

ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত: আয়াতটি সম্পর্কে: 'এবং (আমরা) তোমাদেরকে শু'উব ও কাবাইলে পরিণত করেছি- (49.13) যে শুউইব মানে বড় কাবাইল (জাতি) আর কাবাইল (গোত্র) মানে শাখা গোত্র।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান কে? নবী (ﷺ) বলেন, যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু, সে-ই অধিক সম্মানিত। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এ ধরনের কথা জিজ্ঞেস করিনি। নবী (ﷺ) বললেন, তাহলে আল্লাহর নবী ইউসুফ ।

কুলায়েব ইবন ওয়ায়িল বলেন, নবী (ﷺ)-এর তত্ত্বাবধানে পালিতা আবূ সালমার কন্যা যায়নাবকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বলুন, নবী (ﷺ) কি মুযার গোত্রের ছিলেন? তিনি বললেন, বনু নযর ইবন কিনানা উদ্ভুত গোত্র মুযার ব্যতীত আর কোন গোত্র হতে হবেন? এবং মুযার গোত্র নাযর ইবন কিনানা গোত্রের একটি শাখা ছিল।

কুলায়ব বলেন, নবী (ﷺ)-এর তত্ত্বাবধানে পালিতা কন্যা বলেনঃ আর আমার ধারণা তিনি হলেন যায়নাব। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কদুর বাওশ, সবুজ মাটির পাত্র মুকাইয়ার ও মুযাফ্ফাত (আলকাতরা লাগানো পাত্র বিশেষ) ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। কুলায়ব বলেন, আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বলেন তো দেখি নবী (ﷺ) কোন গোত্রের ছিলেন? তিনি কি মুযার গোত্রের অন্তর্গত ছিলেন? তিনি জবাব দিলেন, নবী (ﷺ) মুযার গোত্র ব্যতীত আর কোন গোত্রের হবেন? আর মুযার নাযর ইবন কিনানার বংশধর ছিল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা মানুষকে খণির মত পাবে। আইয়্যামে জাহিলীয়্যাতের উত্তম ব্যক্তিগণ ইসলাম গ্রহণের পরও তারা উত্তম। যখন তারা দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করে আর তোমরা শাসন ও কর্তৃত্বের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে উত্তম ঐ ব্যক্তিকে পাবে যে এই ব্যাপারে তাদের মধ্যে সবচেয়ে অধিক অনাসক্ত।

আর মানুষের মধ্যে সব থেকে নিকৃষ্ট ঐ দু'মুখী ব্যক্তি যে একদলের সঙ্গে এক ভাবে কথা বলে, অপর দলের সঙ্গে আরেকভাবে কথা বলে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, খিলাফত ও নেতৃত্বের ব্যাপারে সকলেই কুরাইশের অনুগত থাকবে। মুসলিমগণ তাদের মুসলিমদের এবং কাফিররা তাদের কাফিরদের অনুগত।

আর মানব সমাজ খণির মত। জাহিলী যুগের উত্তম ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পরও উত্তম যদি তারা দ্বীনী ইল্ম অর্জন করে। তোমরা নেতৃত্ব ও শাসনের ব্যাপারে ঐ লোককেই সবচেয়ে উত্তম পাবে যে এর প্রতি অনাসক্ত, যে পর্যন্ত না সে তা গ্রহণ করে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আপনার প্রতি আমার আত্মীয়তার জন্য আমার প্রতি সদয় হওয়া ব্যতীত-" (42.23) এ আয়াতের প্রসঙ্গে রাবী তাউস বলেন যে, সায়িদ ইবন জুবায়র বলেন, কুরবা শব্দ দ্বারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট আত্মীয়কে বুঝান হয়েছে। তখন ইবন আব্বাস বলেন, কুরাইশের এমন কোন শাখা-গোত্র নেই যাদের সঙ্গে নবী (ﷺ)-এর আত্মীয়তার বন্ধন ছিল না। আয়াতটি তখনই নাযিল হয়। তোমরা আমার ও তোমাদের মধ্যকার আত্মীয়তার প্রতি খেয়াল রাখ।

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, এই পূর্বদিক হতে ফিতনা-ফাসাদের উৎপত্তি হবে। নির্মমতা ও অন্তরের কাঠিন্য উট ও গরু নিয়ে ব্যস্ত লোকদের মধ্যে। পশ্মী তাবুর অধিবাসীরা রাবীআ ও মুযার গোত্রের যারা উট ও গরুর পিছনে চিৎকার করে (হাকায়), তাদের মধ্যেই রয়েছে নির্মমতা ও কঠোরতা।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, গর্ব-অহংকার পশমের তৈরি তাবুতে বসবাসকারী যারা (উট-গরু হাকানোর সময় চিৎকার করে) তাদের মধ্যে হয়। আর শান্তভাব রয়েছে বকরী পালকদের মধ্যে। ঈমানের দৃশ্যতা এবং হিক্মাত ইয়ামানবাসীদের মধ্যে রয়েছে। ইমাম বুখারী বলেন, ইয়ামান নাম দেয়া হয়েছে যেহেতু তা কাবা ঘরের ডানদিকে (দক্ষিণ) অবস্থিত এবং শাম (সিরিয়া) কাবা ঘরের বাম (উত্তর) দিকে অবস্থিত বিধায় তার শাম নাম দেয়া হয়েছে।

মুহাম্মাদ ইবন জুবায়ের ইবন মুত্'ঈম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মু'আবিয়া-এর নিকট কুরাইশ প্রতিনিধিদের সাথে তার উপস্থিতিতে সংবাদ পৌছলো যে, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন 'আস বর্ণনা করেন, শীঘ্রই কাহতান বংশীয় জনৈক বাদশাহর আগমন ঘটবে। এতদশ্রবণে মুআবিয়াহ ক্রুদ্ধ হয়ে খুত্বাহ দেয়ার উদ্দেশে দাড়িয়ে আল্লাহর যথাযোগ্য হামদ ও সানার পর তিনি বললেন, আমি জানতে পেরেছি, তোমাদের মধ্য থেকে কিছু লোক এমন সব কথাবার্তা বলতে শুরু করেছে যা আল্লাহর কিতাবে নেই এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) হতেও বর্ণিত হয়নি। এরাই মূর্খ, এদের হতে সাবধান থাক এবং এমন কাল্পনিক ধারণা হতে সতর্ক থাক যা ধারণাকারীকে বিপথগামী করে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, যত দিন তারা দ্বীন কায়েমে লেগে থাকবে তত দিন খিলাফত ও শাসন ক্ষমতা কুরাইশদের হাতেই থাকবে। এ বিষয়ে যে-ই তাদের সাথে শত্রুতা করবে আল্লাহ তাকে অধোঃমুখে নিক্ষেপ করবেন।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, এ বিষয় (খিলাফত ও শাসন ক্ষমতা) সর্বদাই কুরাইশদের হাতে থাকবে, যতদিন তাদের দু'জন লোকও বেচে থাকবে।

জুবায়র ইবন মুত'ঈম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং উসমান ইবন আফ্ফান আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকটে হাযির হলাম। উসমান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মুত্তালিবের সন্তানদেরকে দান করলেন এবং আমাদেরকে বাদ দিলেন। অথচ তারা ও আমরা আপনার বংশগতভাবে সম স্তরের। নবী (ﷺ) বললেন, বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিব এক ও অভিন্ন।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন জুবায়র বনূ যুহরার কতিপয় লোকের সঙ্গে আয়িশাহ-এর নিকটে হাযির হলেন। আয়িশাহ তাদের প্রতি অত্যন্ত নম্র ও দয়ার্দ্র ছিলেন। কেননা, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে তাদের আত্মীয়তা ছিল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, কুরাইশ, আনসার, জুহায়না, মুযায়না, আসলাম, আশজা' ও গিফার গোত্রগুলো আমার সাহায্যকারী। আল্লাহ ও তার রাসূল ছাড়া তাদের সাহায্যকারী আর কেউ নেই।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র নবী (ﷺ) ও আবূ বাকর-এর পর আয়িশাহ-এর নিকট সকল লোকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন এবং তিনি সকল লোকদের মধ্যে আয়িশাহ-এর প্রতি সবচেয়ে অধিক সদাচারী ছিলেন। আয়িশাহ-এর নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে রিযিক হিসেবে যা কিছু আস্ত তা জমা না রেখে সদাকাহ করে দিতেন। এতে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র বললেন, অধিক দান খয়রাত করা হতে তাকে বারণ করা উচিত। তখন আয়িশাহ বললেন, আমাকে দান করা হতে বারণ করা হবে? আমি যদি তার সঙ্গে কথা বলি, তাহলে আমাকে কাফ্ফারা দিতে হবে এবং আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র তার নিকট কুরাইশের কিছু লোক, বিশেষভাবে নবী (ﷺ)-এর মাতৃবংশের কিছু লোক দ্বারা সুপারিশ করালেন। তবুও তিনি তার সঙ্গে কথা বলা হতে বিরত থাকলেন, নবী (ﷺ)-এর মাতৃবংশ বনী যুহরার কতক বিশিষ্ট লোক যাদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবন আস্ওয়াদ এবং মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ ছিলেন তারা বললেন, আমরা যখন আয়িশাহ-এর গৃহে প্রবেশের অনুমতি চাইব তখন তুমি পর্দার ভিতরে ঢুকে পড়বে। তিনি তাই করলেন। পরে ইবন যুবায়র কাফ্ফারা আদায়ের জন্য তার নিকট দশটি ক্রীতদাস পাঠিয়ে দিলেন। আয়িশাহ তাদের সবাইকে আযাদ করে দিলেন। অতঃপর তিনি বরাবর আযাদ করতে থাকলেন। এমন কি তার সংখ্যা চল্লিশে পৌছে। আয়িশাহ বললেন, আমি যখন কোন কাজ করার কসম করি, তখন আমার এরাদা থাকে যে আমি যেন সে কাজটা করে দায়িত্ব মুক্ত হয়ে যাই এবং তিনি আরো বলেন, আমি যখন কোন কাজ করার কসম করি তা যথাযথ পূরণের ইচ্ছা রাখি।

আনাস হতে বর্ণিত। উসমান, যায়দ ইবন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন 'আস আবদুর রাহমান ইবন হারিস -কে ডেকে পাঠালেন। তারা সংরক্ষিত কুরআনকে সমবেতভাবে লিপিবদ্ধ করলেন। উসমান কুরাইশ বংশীয় তিন জনকে বললেন, যদি যায়দ ইবন সাবিত এবং তোমাদের মধ্যে কোন শব্দে মতবিরোধ দেখা দেয় তবে কুরাইশের ভাষায় তা লিপিবদ্ধ কর। যেহেতু কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতঃপর তারা তা-ই করলেন।

সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আসলাম গোত্রের কিছু লোক বাজারের নিকটে প্রতিযোগিতামূলক তীর নিক্ষেপের চর্চা করছিল। এমন সময় নবী (ﷺ) বের হলেন এবং তাদেরকে দেখে বললেন, হে ইসমাঈল-এর বংশধর। তোমরা তীর নিক্ষেপ কর। কেননা তোমাদের পিতাও তীর নিক্ষেপে অভিজ্ঞ ছিলেন এবং আমি তোমাদের অমুক দলের পক্ষে রয়েছি। তখন একটি পক্ষ তাদের হাত গুটিয়ে নিল। বর্ণনাকারী বললেন, নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের কী হল? তারা বলল, আপনি অমুক পক্ষে থাকলে আমরা কী করে তীর নিক্ষেপ করতে পারি? নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা তীর নিক্ষেপ কর। আমি তোমাদের উভয় দলের সাথে আছি।

আবূ যার হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, কোন লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাকে তার পিতা বলে দাবী করে তবে সে আল্লাহর কুফরী করল এবং যে ব্যক্তি নিজেকে এমন বংশের সঙ্গে বংশ সম্পর্কিত দাবী করল যে বংশের সঙ্গে তার কোন বংশ সম্পর্ক নেই, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।

ওয়ায়িলাহ ইবন আসকা' বলেন যে নবী (ﷺ) বলেছেন, কোন লোকের এমন লোককে পিতা বলে দাবি করা যে তার পিতা নয় এবং প্রকৃতই যা দেখেনি তা দেখার দাবি করা এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা বলেননি তা তার প্রতি মিথ্যারোপ করা নিঃসন্দেহে বড় মিথ্যা।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন আবদুল কায়স গোত্রের এক প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকটে হাজির হয়ে আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! এ গোত্রটি রাবীআহ বংশের। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রের কাফিররা বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে। আমরা সম্মানিত চার মাস ছাড়া অন্য সময় আপনার নিকট হাযির হতে পারি না। খুবই ভাল হতো যদি আপনি আমাদেরকে এমন কিছু আদেশ দিয়ে দিতেন যা আপনার নিকট হতে গ্রহণ করে আমাদের পিছনে অবস্থিত লোকদের পৌছে দিতাম। নবী (ﷺ) বললেন, আমি তোমাদেরকে চারটি কাজের আদেশ দিচ্ছি এবং চারটি কাজের নিষেধাজ্ঞা প্রদান করছি। (এক) আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, (দুই) সালাত কায়িম করা, (তিন) যাকাত আদায় করা, (চার) গনীমতের যে মাল তোমরা লাভ কর তার পঞ্চমাংশ আল্লাহর জন্য বায়তুল মালে দান করা। আর আমি তোমাদেরকে দুববা (কদু পাত্র), হান্তম (সবুজ রং এর ঘড়া), নাকীর (খেজুর বৃক্ষের মূল খোদাই করে তৈরি পাত্র), মযাফ্ফাত (আলকাতরা লাগানো মাটির পাত্র, এই চারটি পাত্রের) ব্যবহার করতে নিষেধ করছি।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুনেছি, সাবধান! ফিতনা ফাসাদের উদ্ভব ঐদিক থেকেই হবে এবং ঐদিক থেকেই শয়তানের শিং উদিত হবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন কুরাইশ, আনসার, জুহায়নাহ, মুযায়নাহ, আসলাম, গিফার এবং আশজা' গোত্রগুলো আমার আপন জন। আল্লাহ ও তার রাসূল ছাড়া অন্য কেউ তাদের আপন জন নেই।

আবদুল্লাহ (ইবন 'উমর) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মিম্বারে উপবিষ্ট অবস্থায় বলেন, গিফার গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে মাফ করুন, আসলাম গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে নিরাপত্তা দান করুন আর 'উসাইয়া গোত্র, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্যতা করেছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, আসলাম, গোত্র আল্লাহ তাদেরকে নিরাপত্তা দিন। গিফার গোত্র, আল্লাহ তাদেরকে মাফ করুন।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, বলত জুহায়নাহ, মুযায়নাহ, আসলাম ও গিফার গোত্র যদি আল্লাহর নিকট বানূ তামীম, বানূ আসাদ, বানূ গাতফান ও বানূ 'আমের হতে উত্তম বিবেচিত হয় তবে কেমন হবে? তখন এক সাহাবী বললেন, তবে তারা বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। নবী (ﷺ) বললেন, তারা বানূ তামীম, বানূ আসাদ, বানূ আবদুল্লাহ ইবন গাত্ফান এবং বানূ 'আমের ইবন সা'সা'আহ হতে উত্তম।

আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত যে, আকরা' ইবন হাবিস নবী (ﷺ)-এর নিকট 'আরয করলেন, আসলাম গোত্রের সুররাক হাজীজ, গিফার ও মুযায়না গোত্রদ্বয় আপনার নিকট বায়আত করেছে এবং (রাবী বলেন) আমার ধারণা জুহায়না গোত্রও। এ ব্যাপারে ইবন আবূ ইয়াকুব সন্দেহ পোষণ করেছেন। নবী (ﷺ) বলেন, তুমি কি জান, আসলাম, গিফার ও মুযায়নাহ গোত্রত্রয়, (রাবী বলেন) আমার মনে হয় তিনি জুহায়নাহ গোত্রের কথাও উল্লেখ করেছেন যে বনূ তামীম, বনূ 'আমির, আসাদ এবং গাত্ফান (গোত্রগুলো) যারা ক্ষতিগ্রস্ত ও বঞ্চিত হয়েছে, তাদের তুলনায় পূর্বোক্ত গোত্রগুলো উত্তম। রাবী বলেন, হা। নবী (ﷺ) বলেন, সে সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, পূর্বোক্তগুলো শেষোক্ত গোত্রগুলোর তুলনায় অবশ্যই অতি উত্তম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত কাহ্তান গোত্র হতে এমন এক ব্যক্তির আগমন না হবে যে মানুষ জাতিকে তার লাঠির সাহায্যে পরিচালিত করবে।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর পরিচালনায় যুদ্ধে শামিল ছিলাম। এ যুদ্ধে বহু মুহাজির সাহাবী যোগদান করেছিলেন। মুহাজিরদের মধ্যে একজন কৌতুক পুরুষ ছিলেন। তিনি কৌতুকবশতঃ একজন আনসারীকে আঘাত করলেন। তাতে আনসারী সাহাবী অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং উভয় গোত্রের সাহায্যের জন্য নিজ নিজ লোকদের আহবান জানালেন। আনসারী সাহাবী বললেন, হে আনসারীগণ! মুহাজির সাহাবী বললেন, হে মুহাজিরগণ সাহায্যে এগিয়ে আস। নবী (ﷺ) এতদশ্রবণে বের হয়ে আসলেন এবং বললেন, জাহেলী যুগের ডাকাডাকি কেন? অতঃপর বললেন, তাদের ব্যাপার কী? তাকে ঘটনা জানানো হল। মুহাজির সাহাবী আনসারী সাহাবীর কোমরে আঘাত করেছে। রাবী বলেন, নবী (ﷺ) বললেন, এ ধরনের হাকডাক ত্যাগ কর, এ অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ। আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূল বলল, তারা আমাদের বিরুদ্ধে ডাক দিয়েছে? আমরা যদি মদিনায় নিরাপদে ফিরে যাই তবে সম্মানিত ব্যক্তিগণ অবশ্যই বাহির করে দিবে অপদস্ত ব্যক্তিদেরকে। তখন উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি এই খাবীসকে হত্যা করার অনুমতি দিবেন? নবী (ﷺ) বললেন, লোকজন বলাবলি করবে, মুহাম্মাদ (ﷺ) তার সাহাবীদেরকে হত্যা করে থাকে।

আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেন, ঐ ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয় যে গালে চপেটাঘাত করে, পরনের কাপড় ছিন্নভিন্ন করে এবং জাহিলীয়াতের যুগের মত হাকডাক করে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমর ইবন লুহাই ইবন কাম'আহ ইবন খিনদাফ খুযা'আহ গোত্রের পূর্বপুরুষ ছিল।

যুহরী বলেন। আমি সাঈদ ইবন মুসাইয়্যাব-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, বাহীরাহ বলে দেবতার নামে উৎসর্গ করা উটনী যার দুধ আটকিয়ে রাখা হত এবং কোন লোক তার দুধ দোহন করত না। সা-য়িবাহ বলে ঐ পশুকে যাকে তারা ছেড়ে দিত দেবতার নামে। তাকে বোঝা বহন ইত্যাদি কোন কাজ কর্মে ব্যবহার করা হয় না। রাবী বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ বলেছেন, নবী (ﷺ) বলেন, আমি আমর ইবন 'আমির খুয'আহকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সা-য়্যিবাহ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে।

আবূ জামরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আমাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে আবূ যার এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করব? আমরা বললাম হা, অবশ্যই। তিনি বলেন, আবূ যার বলেছেন, আমি গিফার গোত্রের একজন মানুষ। আমরা জানতে পেলাম মক্কায় এক ব্যক্তি আত্মপ্রকাশ করে নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন। আমি আমার ভাইকে বললাম, তুমি মক্কায় গিয়ে ঐ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ ও আলোচনা করে বিস্তারিত খোজ-খবর নিয়ে এস। সে রওয়ানা হয়ে গেল এবং মক্কার ঐ লোকটির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা করে ফিরে আসলে আমি জিজ্ঞেস করলাম- কী খবর নিয়ে এলে? সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি একজন মহান ব্যক্তিকে দেখেছি যিনি সৎকাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ হতে নিষেধ করেন। আমি বললাম, তোমার খবরে আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। অতঃপর আমি একটি ছড়ি ও এক পাত্র খাবার নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হলাম। মক্কায় পৌছে আমার অবস্থা দাড়াল এমন- তিনি আমার পরিচিত নন, কারো নিকট জিজ্ঞেস করাও আমি সমীচীন মনে করি না। তাই আমি যমযমের পানি পান করে মসজিদে থাকতে লাগলাম। একদিন সন্ধ্যা বেলা আলী আমার নিকট দিয়ে গমনকালে আমার প্রতি ইশারা করে বললেন, মনে হয় লোকটি বিদেশী। আমি বললাম, হা। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে চল। পথেই তিনি আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করেননি। আর আমিও ইচ্ছা করে কোন কিছু বলিনি। তার বাড়িতে রাত্রি যাপন করে ভোর বেলায় আবার মসজিদে গেলাম যাতে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব। কিন্তু ওখানে এমন কোন লোক ছিল না যে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বলবে। ঐ দিনও আলী আমার নিকট দিয়ে চলার সময় বললেন, এখনো কি লোকটি তার গন্তব্যস্থল ঠিক করতে পারেনি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে চল। পথিমধ্যে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বল, তোমার বিষয় কী? কেন এ শহরে এসেছ? আমি বললাম, যদি আপনি আমার বিষয়টি গোপন রাখার আশ্বাস দেন তাহলে তা আপনাকে বলতে পারি। তিনি বললেন নিশ্চই আমি গোপন করব। আমি বললাম, আমরা জানতে পেরেছি, এখানে এমন এক লোকের আবির্ভাব হয়েছে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করেন। আমি তার সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করার জন্য আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে ফেরত গিয়ে আমাকে সন্তোষজনক কোন কিছু বলতে পারেনি। তাই নিজে দেখা করার ইচ্ছা নিয়ে এখানে আগমন করেছি। আলী বললেন, তুমি সঠিক পথপ্রদর্শক পেয়েছ। আমি এখনই তার কাছে উপস্থিত হবার জন্য রওয়ানা হয়েছি। তুমি আমাকে অনুসরণ কর এবং আমি যে গৃহে প্রবেশ করি তুমিও সে গৃহে প্রবেশ করবে। রাস্তায় যদি তোমার বিপদজনক কোন লোক দেখতে পাই তবে আমি জুতা ঠিক করার অজুহাতে দেয়ালের পার্শ্বে সরে দাড়াব, যেন আমি জুতা ঠিক করছি। তুমি কিন্তু চলতেই থাকবে। আলী পথ চলতে শুরু করলেন। আমিও তার অনুসরণ করে চলতে লাগলাম। তিনি নবী (ﷺ)-এর নিকট প্রবেশ করলে, আমিও তার সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। আমি বললাম, আমার নিকট ইসলাম পেশ করুন। তিনি পেশ করলেন। আর আমি মুসলিম হয়ে গেলাম। নবী (ﷺ) বললেন, হে আবূ যার। এখনকার মত তোমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখে তোমার দেশে চলে যাও। যখন আমাদের বিজয়ের খবর জানতে পাবে তখন এসো। আমি বললাম, যে আল্লাহ আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ! আমি কাফির মুশরিকদের সামনে উচ্চস্বরে তৌহীদের বাণী ঘোষণা করব। (ইবন আব্বাস বলেন,) এই কথা বলে তিনি মসজিদে হারামে গমন করলেন, কুরাইশের লোকজনও সেখানে হাজির ছিল। তিনি বললেন, হে কুরাইশগণ! আমি নিশ্চিতভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল। এতদশ্রবণে কুরাইশগণ বলে উঠল, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। তারা আমার দিকে এগিয়ে আসল এবং আমাকে নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল; যেন আমি মরে যাই। তখন আব্বাস আমার নিকট পৌছে আমাকে ঘিরে রাখলেন। অতঃপর তিনি কুরাইশকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমাদের বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তোমরা গিফার বংশের জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যোগী হয়েছ অথচ তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলাকে গিফার গোত্রের নিকট দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এ কথা শুনে তারা সরে পড়ল। পরদিন ভোরবেলা কাবাগৃহে উপস্থিত হয়ে গতদিনের মতই আমি আমার ইসলাম গ্রহণের পূর্ণ ঘোষণা দিলাম। কুরাইশগণ বলে উঠলো, ধর এই ধর্মত্যাগী লোকটিকে। গতদিনের মত আজও তারা নির্মমভাবে আমাকে মারধর করলো। এই দিনও আব্বাস এসে আমাকে রক্ষা করলেন এবং কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্য করে ঐ দিনের মত বক্তব্য রাখলেন। ইবন আব্বাস বলেন, এটাই ছিল আবূ যার-এর ইসলাম গ্রহণের প্রথম ঘটনা।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আসলাম, গিফার এবং মুযাইনাহ ও জুহানাহ গোত্রের কিছু অংশ অথবা জুহানাহর কিছু অংশ কিংবা মুযায়নাহর কিছু অংশ আল্লাহর নিকট অথবা বলেছেন কিয়ামতের দিন আসাদ, তামীম, হাওয়াযিন ও গাত্ফান গোত্র চেয়ে উত্তম বলে বিবেচিত হবে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুমি যদি আরবদের অজ্ঞতা সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হও, তবে সূরা আন্'আমের ১৪০ আয়াতের অংশটুকু মনোযোগের সঙ্গে পাঠ কর। "অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা যারা নিজ সন্তানদেরকে হত্যা করেছে বোকামির দরুন ও অজ্ঞতাবশতঃ এবং হারাম করে নিয়েছে তা যা আল্লাহ তাদেরকে জীবিকা হিসেবে দিয়েছিলেন, কেবল আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করার উদ্দেশে। নিশ্চই তারা বিপথগামী হয়েছে এবং তারা হিদায়াতপ্রাপ্তও ছিল না।" (আল-আনআম ১৪০)

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত "তোমার নিকট আত্মীয়গণকে সতর্ক কর" (আশ শু'আরা ২১৪) অবতীর্ণ হল, তখন নবী (ﷺ) বললেন, হে বানী ফিহর, হে বনী 'আদি! বিভিন্ন কুরাইশ শাখা গোত্রগুলিকে নাম ধরে ধরে ইসলামের পথে ডাক দিতে লাগলেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াত "তোমার নিকট আত্মীয়গণকে সতর্ক কর" (আশশু'আরাঃ ২১৪) অবতীর্ণ হল, তখন নবী (ﷺ) তাদেরকে গোত্র গোত্র ধরে ডাক দিতে লাগলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বললেন, হে আব্দে মানাফের বংশধরগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাচাও। হে আবদুল মুত্তালিবের বংশধরগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে হিফাযত কর। হে যুবায়রের মা- আল্লাহর রাসূলের ফুফু, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর কন্যা ফাতিমা! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে রক্ষা কর। তোমাদেরকে আযাব হতে বাচানোর সামান্যতম ক্ষমতাও আমার নাই আর আমার ধন-সম্পদ হতে তোমরা যা ইচ্ছা তা চেয়ে নিতে পার।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আনসারদের বললেন, তোমাদের মধ্যে অপর গোত্রের কেউ আছে কি? তারা বললেন না, অন্য কেউ নেই। তবে আমাদের এক ভাগিনা আছে। নবী (ﷺ) বললেন কোন গোত্রের ভাগ্নে সে গোত্রেরই অন্তর্ভুক্ত।

আয়িশাহ বর্ণনা করেন, মিনায় অবস্থানের দিনগুলোতে (১০, ১১, ১২ তারিখে) আবূ বাকর আমার গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন তার কাছে দু'টি বালিকা ছিল। তারা দফ বাজিয়ে নেচে নেচে গান করছিল। নবী (ﷺ) তখন চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়েছিলেন। আবূ বাকর এদেরকে ধমক দিলেন। নবী (ﷺ) তখন মুখ হতে চাদর সরিয়ে বললেন, হে আবূ বাকর! এদেরকে গাইতে দাও। কেননা, আজ ঈদের দিনও মিনার দিনগুলির অন্তর্ভুক্ত।

আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে আড়াল করে দাড়িয়ে ছিলেন আর আমি হাবশীদের খেলা দেখছিলাম। মসজিদের কাছে তারা যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে খেলা করছিল। এমন সময় উমার এসে তাদেরকে ধমক দিলেন। নবী (ﷺ) বললেন, হে উমার! তাদেরকে বানূ আরফিদাকে নিরাপদ ছেড়ে দাও।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হাসসান কবিতার ছন্দে মুশরিকদের নিন্দা করতে অনুমতি চাইলে নবী (ﷺ) বললেন, আমার বংশকে কিভাবে তুমি আলাদা করবে? হাসসান বললেন, আমি তাদের মধ্য হতে এমনভাবে আপনাকে আলাদা করে নিব যেমনভাবে আটার খামির হতে চুলকে আলাদা করে নেয়া হয়। উরওয়াহ্ বলেন, আমি হাসসান-কে আয়িশাহ-এর সম্মুখে তিরস্কার করতে উদ্যত হলে, তিনি আমাকে বললেন, তাকে গালি দিও না। সে নবী (ﷺ)-এর তরফ হতে কবিতার মাধ্যমে শত্রুর কথার আঘাত প্রতিহত করত।

জুবায়র ইবন মুত'ঈম হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, আমার পাচটি (প্রসিদ্ধ) নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি আল-মাহী আমার দ্বারা আল্লাহ কুফর ও শির্ককে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আমি আল-হাশির আমার চারপাশে মানব জাতিকে একত্রিত করা হবে। আমি আল-আকিব (সর্বশেষে আগমনকারী)।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, তোমরা কি আশ্চর্যান্বিত হও না? আমার উপর আরোপিত কুরাইশদের নিন্দা ও অভিশাপকে আল্লাহ তাআলা কি চমৎকারভাবে দূরীভূত করছেন? তারা আমাকে নিন্দিত ভেবে গালি দিচ্ছে, অভিশাপ করছে অথচ আমি মুহাম্মাদ চির প্রশংসিত।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন আমার ও অন্যান্য নবীগণের অবস্থা এমন, যেন কেউ একটি গৃহ নির্মাণ করলো আর একটি ইটের স্থান শূন্য রেখে নির্মাণ কাজ শেষ করে গৃহটিকে সুসজ্জিত করে নিল। জনগণ মুগ্ধ হল এবং তারা বলাবলি করতে লাগল, যদি একটি ইটের জায়গাটুকু খালি রাখা না হত।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা এমন, এক ব্যক্তি যেন একটি গৃহ নির্মাণ করল; তাকে সুশোভিত ও সুসজ্জিত করল, কিন্তু এক পাশে একটি ইটের জায়গা খালি রয়ে গেল। অতঃপর লোকজন এর চারপাশে ঘুরে আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল ঐ শূন্যস্থানের ইটটি লাগানো হল না কেন? নবী (ﷺ) বলেন, আমিই সে ইট। আর আমিই সর্বশেষ নবী।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, যখন নবী (ﷺ)-এর মৃত্যু হয় তখন তার বয়স হয়েছিল তেষট্টি বছর।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদিন বাজারে গিয়েছিলেন। তখন এক ব্যক্তি 'হে আবুল কাসিম!' বলে ডাক দিল। নবী (ﷺ) সেদিকে ফিরে তাকালেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা আমার আসল নামে নাম রাখতে পার, কিন্তু আমার উপনামে কারো নাম রেখ না।

জাবির সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমার আসল নামে অন্যের নামকরণ করতে পার, কিন্তু আমার উপনাম অন্যের জন্য রেখোনা।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূল কাসিম (নবী) (ﷺ) বলেছেন, আমার নামে নামকরণ করতে পার, কিন্তু আমার উপনামে তোমাদের নাম রেখ না।

জু'আইদ ইবন আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি 'সাইব ইবন ইয়াযীদকে চুরানববই বছর বয়সে সুস্থ-সবল ও সুঠাম দেহের অধিকারী দেখেছি। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই জ্ঞাত আছ যে, আমি এখনও নবী (ﷺ)-এর দোয়ার বরকতেই চোখ ও কান দিয়ে উপকার লাভ করছি। আমার খালা একদিন আমাকে নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগিনাটি রোগাক্রান্ত। আপনি তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তখন নবী (ﷺ) আমার জন্য দোয়া করলেন।

জু'আইদ বলেন, আমি সাইব ইবন ইয়াযীদকে বলতে শুনেছি যে, আমার খালা আমাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগিনা রোগাক্রান্ত। তখন নবী (ﷺ) আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং আমার জন্য বরকতের দোয়া করলেন। তিনি ওযু করলেন, তার ওযুর বাকী পানি আমি পান করলাম। অতঃপর আমি তার পিছন দিকে গিয়ে দাড়ালাম তার স্কন্ধের মাঝে "মোহরে নাবুওয়্যাত" দেখলাম যা কবুতরের ডিমের মত অথবা বাসর ঘরের পর্দার বুতামের মত।

উকবা ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আবূ বাকর বাদ আসর এর সালাত শেষে বের হয়ে চলতে লাগলেন। হাসান-কে ছেলেদের সঙ্গে খেলা করতে দেখলেন। তখন তিনি তাকে স্কন্ধে তুলে নিলেন এবং বললেন, আমার পিতা কুরবান হোন! এ-ত নবী (ﷺ)-এর সাদৃশ্য, আলীর সাদৃশ্য নয়। তখন আলী হাসছিলেন।

আবূ জুহাইফাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে দেখেছি। আর হাসান তারই সদৃশ।

আবূ জুহাইফাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে দেখেছি। হাসান ইবন আলী ছিলেন তারই সদৃশ। (রাবী বলেন) আমি আবূ জুহায়ফাকে বললাম, আপনি নবী (ﷺ)-এর বর্ণনা দিন। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) গৌর বর্ণের ছিলেন। কাল কেশরাজির মধ্যে সামান্য সাদা চুলও ছিল। তিনি তেরটি সবল উটনী আমাদেরকে দেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের হাতে আসার আগেই নবী (ﷺ)-এর মৃত্যু হয়।

আবূ জুহাইফাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে দেখেছি আর তার নীচ ঠোঁটের নিম্নভাগে দাড়িতে সামান্য সাদা চুল দেখেছি।

হারীয ইবন উসমান হতে বর্ণিত। তিনি নবী (ﷺ)-এর সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন বুসরকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি নবী (ﷺ)-কে দেখেছেন যে, তিনি কি বৃদ্ধ ছিলেন? তিনি বললেন, নবী (ﷺ)-এর নিম দাড়িতে কয়েকটি চুল সাদা ছিল।

রাবীআহ ইবন আবূ আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে নবী (ﷺ)-এর বর্ণনা দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন যে, নবী (ﷺ) লোকেদের মধ্যে মাঝারি গড়নের ছিলেন- বেশি লম্বাও ছিলেন না বা বেটেও ছিলে না। তার শরীরের রং গোলাপী ধরনের ছিল, ধবধবে সাদাও নয় কিংবা তামাটে বর্ণেরও নয়। মাথার চুল কোঁকড়ানোও ছিল না, আবার একেবারে সোজাও ছিল না। চল্লিশ বছর বয়সে তার উপর ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়। প্রথম দশ বছর মক্কায় অবস্থানকালে ওয়াহী যথারীতি নাযিল হতে থাকে। অতঃপর দশ বছর মদিনায় কাটান। অতঃপর তার মৃত্যুর সময়ে তার মাথা ও দাড়িতে কুড়িটি সাদা চুলও ছিল না। রাবীআ বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর একটি চুল দেখেছি তা লাল রং-এর ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলে বলা হল যে, সুগন্ধি লাগানোর জন্য তা লাল হয়েছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) অতিরিক্ত লম্বাও ছিলেন না এবং বেটেও ছিলেন না। ধবধবে সাদাও ছিলেন না, আবার তামাটে রং এরও ছিলেন না। কেশগুচ্ছ একেবারে কুঞ্চিত ছিল না, পুরোপুরি সোজাও ছিল না। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুওয়্যাত পান। তার নবুওয়্যাত সময়ের প্রথম দশ বছর মক্কায় এবং পরের দশ বছর মদিনায় কাটান। তার মৃত্যুকালে মাথা ও দাড়িতে বিশটি চুলও সাদা ছিল না।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চেহারা ছিল মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর এবং তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। তিনি বেশি লম্বাও ছিলেন না এবং বেটেও ছিলেন না।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ) চুলে খেযাব লাগাতেন কি? তিনি বললেন, না। তার কানের পাশে সামান্য কয়টা চুল সাদা হয়েছিল মাত্র।

বারাআ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মাঝারি গড়নের ছিলেন। তার উভয়ে কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্ত ছিল। তার মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আমি তাকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি। তার চেয়ে বেশি সুন্দর আমি কখনো কাউকে দেখিনি। ইউসুফ ইবন আবূ ইসহাক তার পিতা হতে হাদীস বর্ণনায় বলেন, নবী (ﷺ)-এর মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

আবূ ইসহাক তাবি-ঈ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বারাআ-কে জিজ্ঞেস করা হল, নবী (ﷺ)-এর চেহারা মুবারক কি তলোয়ারের মত ছিল? তিনি বললেন না, বরং চাঁদের ন্যায় ছিল।

হাকাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবূ জুহাইফাহ-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, একদিন নবী (ﷺ) দুপুর বেলায় বাতহার দিকে বেরোলেন। সে স্থানে উযূ করে যুহরের দু' রাকআত ও আসরের দু' রাকাত সালাত আদায় করেন। তার সামনে একটি বর্শা পোঁতা ছিল। বর্শার বাহির দিয়ে নারীরা যাতায়াত করছিল। সালাত শেষে লোকজন দাড়িয়ে গেল এবং নবী (ﷺ)-এর দু' হাত ধরে তারা নিজেদের মাথা ও মুখমন্ডলে বুলাতে লাগলেন। আমিও নবী (ﷺ)-এর হাত ধরে আমার মুখমন্ডলে বুলাতে লাগলাম। তার হাত বরফের থেকেও স্নিগ্ধ শীতল ও কস্তুরীর থেকেও বেশি সুগন্ধিময় ছিল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সর্বাপেক্ষা বেশি দানশীল ছিলেন। তার দানশীলতা বহুগুণ বর্ধিত হত রমাযানের পবিত্র দিনে যখন জিবরাঈল তার সঙ্গে দেখা করতেন। জিব্রাঈল রমাযানের প্রতি রাতে তার সঙ্গে দেখা করে কুরআনের সবক দিতেন। নবী (ﷺ) কল্যাণ বণ্টনে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল ছিলেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, একদিন নবী (ﷺ) অত্যন্ত আনন্দিত ও খুশি মনে তার নিকট প্রবেশ করলেন। খুশীর কারণে তার চেহারায় খুশীর চিহ্ন পরিস্ফুট হচ্ছিল। তিনি তখন আয়িশাহ্কে বললেন, হে আয়িশাহ্! তুমি শুননি, মুদলাজী যায়দ ও উসামাহ সম্পর্কে কী বলেছে? পিতা-পুত্রের শুধু পা দেখে বলল, এ পাগুলোর একটা অন্যটির অংশ।

আবদুল্লাহ ইবন কা'ব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার পিতা কা'ব ইবন মালিক-কে তার তাবূক যুদ্ধে না যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে সালাম করলাম, খুশী ও আনন্দে তার চেহারা ঝলমল করে উঠলো। তার চেহারা এমনিই আনন্দে টগবগ করত। মনে হত যেন চাঁদের একটি টুকরা। তার মুখমন্ডলের এ অবস্থা হতে আমরা তা বুঝতে পারতাম।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমি বনি আদমের সর্বোত্তম যুগে আবির্ভূত হয়েছি। যুগের পর যুগ অতিবাহিত হয়ে আমি সেই যুগেই এসেছি যে যুগ আমার জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার চুল পিছনে দিকে আচড়ে রাখতেন আর মুশ্রিকগণ তাদের চুল দু'ভাগ করে সিঁথি কেটে রাখত। আহলে কিতাব তাদের চুল পিছন দিকে আচড়ে রাখত। নবী (ﷺ) যে কোন বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আহলে কিতাবের অনুসরণ পছন্দ করতেন। অতঃপর নবী (ﷺ) তার চুল দু'ভাগ করে সিঁথি করে রাখতে লাগলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) অশ্লীল ভাষী ও অসদাচরণের অধিকারী ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে নৈতিকতায় সর্বোত্তম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-কে যখনই দু'টি জিনিসের একটি গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হত, তখন তিনি সহজটিই গ্রহণ করতেন যদি তা গুনাহ না হত। গুনাহ হতে তিনি অনেক দূরে অবস্থান করতেন। নবী (ﷺ) নিজের ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রতিশোধ নিতেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর হাতের তালুর চেয়ে মোলায়েম কোন নরম ও গরদকেও আমি স্পর্শ করিনি। আর নবী (ﷺ)-এর শরীরের সুঘ্রাণ অপেক্ষা অধিক সুঘ্রাণ আমি কখনো পাইনি।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) গৃহবাসিনী পর্দানশীন কুমারীদের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। মুহাম্মাদ....শুবাহ হতে একই রূপ রিওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে। যখন নবী (ﷺ) কোন কিছু অপছন্দ করতেন তা চেহারায় বুঝা যেত।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কখনো কোন খাদ্যকে মন্দ বলতেন না। রুচি হলে খেতেন না হলে বাদ দিতেন।

আবদুল্লাহ ইবন মালিক ইবন বুহায়নাহ আসাদিইয়ি হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) যখন সিজদা করতেন, তখন উভয় বাহুকে শরীর হতে এমনভাবে আলাদা করতেন যে, আমরা তার বগল দেখতে পেতাম। ইবন বুকাইর বলেন, বাকর হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন, তার বগলের শুভ্রতা দেখতে পেতাম।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইস্তিস্কায় যতটা উঠাতেন অন্য কোন দু'আয় তার বাহুদ্বয় এতটা ঊর্ধ্বে উঠাতেন না, কেননা এতে হাত এত ঊর্ধ্বে উঠাতেন যে তার বগলের শুভ্রতা দেখা যেত। আবূ মূসা হাদীস বর্ণনায় বলেন, আনাস বলেছেন নবী (ﷺ) দোয়ার মধ্যে দু' হাত উপরে উঠিয়েছেন এবং আমি তার বগলের শুভ্রতা দেখেছি।

আবূ জুহায়ফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমাকে নবী (ﷺ)-এর কাছে নেয়া হল। নবী (ﷺ) তখন আবতাহ নামক জায়গায় দুপুর বেলায় একটি তাবুতে অবস্থান করছিলেন। বিলাল তাবু হতে বেরিয়ে এসে যুহরের সালাতের আযান দিলেন এবং আবার প্রবেশ করে নবী (ﷺ)-এর উযূর অবশিষ্ট পানি নিয়ে বেরিয়ে এলেন। লোকজন তা নেয়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল। অতঃপর তিনি আবার তাবুতে ঢুকে একটি ছোট্ট বর্শা নিয়ে বেরিয়ে আসলেন। নবী (ﷺ)-ও বেরিয়ে আসলেন। আমি যেন তার পায়ের গোছার উজ্জ্বলতা, এখনো দেখতে পাচ্ছি। বর্শাটি সম্মুখে পুঁতে রাখলেন। অতঃপর যুহরের দু' রাকাত এবং পরে আসরের দু' রাকাত সালাত আদায় করলেন। বর্শার বাহির দিয়ে গাধা ও নারীরা চলাফেরা করছিল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) এমনভাবে কথা বলতেন যে, কোন গণনাকারী গুণতে চাইলে তার কথাগুলি গণনা করতে পারত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তুমি অমুকের অবস্থা দেখে কি অবাক হও না? তিনি এসে আমার হুজরার পাশে বসে আমাকে শুনিয়ে হাদীস বর্ণনা করেন। আমি তখন সালাতে ছিলাম। আমার সালাত শেষ হবার আগেই তিনি উঠে চলে যান। যদি আমি তাকে পেতাম তবে আমি অবশ্যই তাকে সতর্ক করে দিতাম যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাদের মত দ্রুততার সঙ্গে কথা বলতেন না।

আবূ সালামাহ ইবন আবদুর রাহমান হতে বর্ণিত যে, তিনি আয়িশাহ-কে জিজ্ঞেস করলেন, রমাযান মাসে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সালাত কেমন ছিল? আয়িশাহ বলেন, নবী (ﷺ) রমাযান মাসে ও অন্যান্য সব মাসের রাতে এগার রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন। এ চার রাকাত আদায়ের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর আরো চার রাকাত সালাত আদায় করতেন। এ চার রাকাতের সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। অতঃপর তিন রাকাত আদায় করতেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিত্র সালাত আদায়ের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়েন? নবী (ﷺ) বললেন, আমার চোখ ঘুমায়, আমার অন্তর ঘুমায় না।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি মসজিদে কাবা হতে রাতে অনুষ্ঠিত ইসরা-এর ঘটনা বর্ণনা করছিলেন যে, তিন ব্যক্তি তার নিকট হাযির হলেন মিরাজ সম্পর্কে ওয়াহী অবতরণের পূর্বে। তখন তিনি মাসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলেন। তাদের প্রথম জন বলল, তাদের কোন জন তিনি? মাঝের জন উত্তর দিল, তিনিই তাদের শ্রেষ্ঠ জন। আর শেষজন বলল, শ্রেষ্ঠ জনকে নিয়ে চল। এ রাতে এটুকুই হলো এবং নবী (ﷺ)ও তাদেরকে আর দেখেন নাই। অতঃপর আর এক রাতে তারা আসলেন। নবী (ﷺ)-এর অন্তর তা দেখতে পাচ্ছিল। যেহেতু নবী (ﷺ)-এর চোখ ঘুমাত কিন্তু তার অন্তর কখনও ঘুমাত না। এভাবে সকল আম্বিয়ায়ে কেরামের চোখ ঘুমাত কিন্তু অন্তর ঘুমাত না। অতঃপর জিব্রাঈল দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং নবী (ﷺ)-কে নিয়ে আকাশের দিকে চড়তে লাগলেন।

ইমরান ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত যে, এক সফরে তারা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে ছিলেন। সারা রাত পথ চলার পর যখন ভোর কাছাকাছি হল, তখন বিশ্রাম নেয়ার জন্য থেমে গেলেন এবং গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়লেন। অবশেষে সূর্য উদিত হয়ে অনেক উপরে উঠে গেল, [ইমরান বলেন] যিনি সর্বপ্রথম ঘুম হতে জাগলেন তিনি হলেন আবূ বাকর। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নিজে জাগ্রত না হলে তাকে জাগানো হত না। অতঃপর উমার জাগলেন। আবূ বাকর তার শিয়রের নিকট গিয়ে বসে উচ্চস্বরে 'আল্লাহু আকবার' বলতে লাগলেন। শেষে নবী (ﷺ) জেগে উঠলেন এবং অন্যত্র চলে গিয়ে অবতরণ করে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। তখন এক ব্যক্তি আমাদের সাথে সালাত আদায় না করে দূরে দাড়িয়ে থাকল। নবী (ﷺ) সালাত শেষ করে বললেন, হে অমুক! আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করতে কিসে বাধা দিল? লোকটি বলল, আমি অপবিত্র হয়েছি। নবী (ﷺ) তাকে পাক মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করার নির্দেশ দিলেন, অতঃপর সে সালাত আদায় করল। (ইমরান বলেন) নবী (ﷺ) আমাকে অগ্রবর্তী দলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন এবং আমরা ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লাম। এই অবস্থায় আমরা পথ চলছি। হঠাৎ উষ্ট্রে আরোহী এক মহিলা আমাদের নযরে পড়ল। সে পানি ভর্তি দু'টি মশকের মাঝখানে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, পানি কোথায়? সে বলল, (আশেপাশে) কোথায়ও পানি নেই। আমরা বললাম, তোমার ও পানির জায়গার মধ্যে দূরত্ব কতটুকু? সে বলল একদিন ও এক রাতের দূরত্ব। আমরা তাকে বললাম, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট চল। সে বলল, আল্লাহর রাসূল কী? আমরা তাকে যেতে না দিয়ে তাকে নবী (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে গেলাম। নবী (ﷺ)-এর কাছে এসেও ঐ রকম কথাই বলল যা সে আমাদের সঙ্গে বলেছিল। তবে সে তার নিকট বলল, সে কয়েকজন ইয়াতীম সন্তানের মা। নবী (ﷺ) তার মশক দু'টি নামিয়ে ফেলতে আদেশ করলেন। অতঃপর তিনি মশক দু'টির মুখে হাত বুলালেন। আমরা তৃষ্ণার্ত চল্লিশ জন মানুষ পানি পান করে পিপাসা মিটালাম। অতঃপর আমাদের সকল মশক, বাসনপত্র পানি ভর্তি করে নিলাম। তবে উটগুলোকে পানি পান করান হয়নি। এত সবের পরও মহিলার মশকগুলো এত পানি ভর্তি ছিল যে তা ফেটে যাবার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের নিকট যা কিছু আছে উপস্থিত কর। কিছু খেজুর ও রুটির টুকরা জমা করে তাকে দেয়া হল। এ নিয়ে নারীটি খুশীর সঙ্গে তার গৃহে ফিরে গেল। গৃহে গিয়ে সকলের নিকট সে বলল, আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল, এক মহা যাদুকরের সঙ্গে অথবা মানুষে যাকে নবী বলে ধারণা করে তার সঙ্গে। আল্লাহ এই মহিলার মাধ্যমে এ বস্তিবাসীকে হিদায়াত দান করলেন। স্ত্রীলোকটি নিজেও ইসলাম গ্রহণ করল এবং বস্তিবাসী সকলেই ইসলাম গ্রহণ করল।

আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর নিকট একটি পানির পাত্র আনা হল, তখন তিনি যাওরা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। নবী (ﷺ) তার হাত ঐ পাত্রে রেখে দিলেন আর তখনই পানি অঙ্গুলির ফাক দিয়ে উপচে পড়তে লাগল। ঐ পানি দিয়ে উপস্থিত সকলেই উযূ করে নিলেন। ক্বাতাদাহ বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, আমরা তিনশ' কিংবা প্রায় তিনশ' জন ছিলাম।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে দেখতে পেলাম যখন আসরের সালাতের সময় সন্নিকট। সকলেই পেরেশান হয়ে পানি খুজছেন কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন নবী (ﷺ)-এর নিকট উযূর পানি আনা হল। নবী (ﷺ) সে পাত্রে তার হাত রেখে দিলেন এবং সকলকে এ পাত্রের পানি দ্বারা উযূ করতে নির্দেশ দিলেন। আমি দেখলাম তার হাতের নীচ হতে পানি সজোরে উথ্লে পড়ছিল। তাদের শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত সকলেই এই পানি দিয়ে উযূ করলেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কোন এক সফরে বেরিয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে সহাবাগণও ছিলেন। তারা চলতে লাগলেন, তখন সালাতের সময় হয়ে গেল, কিন্তু উযূ করার জন্য কোথাও পানি পাওয়া গেল না। কাফেলার এক ব্যক্তি সামান্য পানিসহ একটি পেয়ালা নবী (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত করলেন। তিনি পেয়ালাটি হাতে নিয়ে তারই পানি দ্বারা উযূ করলেন এবং তার হাতের চারটি আঙ্গুল পেয়ালার মধ্যে সোজা করে ধরে রাখলেন। আর বললেন, উঠ তোমরা উযূ কর। সকলেই ইচ্ছামত উযূ করে নিলেন। তারা ছিলেন সত্তর বা এর কাছাকাছি।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সালাতের সময় উপস্থিত হল। যাদের বাড়ি মসজিদের নিকটে ছিল তারা উযূ করার জন্য নিজ নিজ বাড়িতে চলে গেলেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক লোক গেলেন না তখন নবী (ﷺ)-এর সামনে পাথরের তৈরী একটি পাত্র আনা হল। এতে সামান্য পানি ছিল। নবী (ﷺ) ঐ পাত্রে তার হাত রাখলেন। কিন্তু পাত্রটি ছোট্ট হওয়ার কারণে হাতের আঙ্গুলগুলো বিস্তৃত করতে পারলেন না বরং একত্রিত করে রেখে দিলেন। অতঃপর উপস্থিত লোকেরা ঐ পানি দ্বারাই উযূ করে নিল। হুমাইদ বলেন, আমি আনাস-কে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কতজন ছিলেন? বললেন, আশি জন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুদাইবিয়ায় অবস্থানের সময় একদা সহাবাগণ পিপাসায় খুব কাতর হয়ে পড়লেন। নবী (ﷺ)-এর সামনে একটি পাত্রে অল্প পানি ছিল। তিনি উযূ করলেন। তার নিকট পানি আছে ধারণা করে সকলে সেদিকে গেলেন। নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের কী হয়েছে? তারা বললেন, আপনার সামনের পাত্রের সামান্য পানি ছাড়া উযূ ও পান করার মত পানি আমাদের নিকট নাই। নবী (ﷺ) ঐ পাত্রে তার হাত রাখলেন। তখনই তার হাত উপচে ঝর্ণা ধারার মত পানি ছুটে বের হতে লাগলো। আমরা সকলেই পানি পান করলাম ও উযূ করলাম। সারিম (একজন রাবী) বলেন, আমি জাবির-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, আমরা যদি এক লক্ষও হতাম তবুও আমাদের জন্য পানি যথেষ্ট হত। আমরা ছিলাম পনেরশ'।

বারা'আ (ইবন আযিব) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে হুদাইবিয়ায় চৌদ্দশ' লোক ছিলাম। হুদাইবিয়াহ একটি কূপ, আমরা তা থেকে পানি এমনভাবে উঠিয়ে নিলাম যে তাতে এক ফোঁটা পানিও অবশিষ্ট থাকল না। নবী (ﷺ) কূপের কিনারায় বসে কিছু পানি আনার জন্য আদেশ করলেন। তিনি কুল্লি করে ঐ পানি কূপে নিক্ষেপ করলেন। অল্প সময় অপেক্ষা করলাম। তখন কূপটি পানিতে পূর্ণ হয়ে গেল। আমরা পানি পান করে তৃপ্তি লাভ করলাম, আমাদের উটগুলোও পানি পান করে পরিতৃপ্ত হল। অথবা বলেছেন আমাদের উটগুলো পানি পান করে ফিরল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বল্হা উম্মু সুলায়মকে বললেন, আমি নবী (ﷺ)-এর কন্ঠস্বর দুর্বল শুনেছি। আমি তার মধ্যে ক্ষুধা বুঝতে পেরেছি। তোমার নিকট খাবার কিছু আছে কি? তিনি বললেন, হা আছে। এই বলে তিনি কয়েকটা যবের রুটি বের করলেন। অতঃপর তার একখানা ওড়না বের করে এর কিয়দংশ দিয়ে রুটিগুলো মুড়ে আমার হাতে গোপন করে রেখে দিলেন ও ওড়নার অপর অংশ আমার শরীরে জড়িয়ে দিলেন এবং আমাকে নবী (ﷺ) এর নিকট পাঠালেন। রাবী আনাস বলেন, আমি তার নিকট গেলাম। ঐ সময় তিনি কতক লোকসহ মসজিদে ছিলেন। আমি গিয়ে তাদের সামনে দাড়ালাম। নবী (ﷺ) আমাকে দেখে বললেন, তোমাকে আবূ ত্বলহা পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি, হা। নবী (ﷺ) বললেন, খাওয়ার দাও'আত দিয়ে পাঠিয়েছে? আমি বললাম, জি-হা। তখন নবী (ﷺ) সঙ্গীদেরকে বললেন, চল, আবূ ত্বলহা আমাকে দাও'আত করেছে। আমি তাদের আগেই চলে গিয়ে আবূ ত্বলহা-কে নবী (ﷺ)-এর আগমনের কথা শুনলাম। এতদশ্রবণে আবূ ত্বলহা বলেন, হে উম্মু সুলাইম! নবী (ﷺ) তার সঙ্গী সাথীদেরকে নিয়ে আসছেন। তাদেরকে খাওয়ানোর মত কিছু আমাদের নিকট নেই। উম্মু সুলায়ম বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। আবূ ত্বলহা তাদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য বাড়ি হতে কিছুদূর এগুলেন এবং নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে দেখা করলেন এবং নবী (ﷺ) আবূ ত্বলহা-কে সঙ্গে নিয়ে তার ঘরে আসলেন, আর বললেন, হে উম্মু সুলায়ম! তোমার নিকট যা কিছু আছে নিয়ে এসো। তিনি যবের ঐ রুটিগুলি হাযির করলেন এবং তার নির্দেশে রুটিগুলো টুকরা টুকরা করা হল। উম্মু সুলায়ম ঘিয়ের পাত্র ঝেড়ে কিছু ঘি বের করে তরকারী হিসেবে উপস্থিত করলেন। অতঃপর নবী (ﷺ) পাঠ করে তাতে ফু দিলেন অতঃপর দশজনকে নিয়ে আসতে বললেন। তারা দশজন আসলেন এবং রুটি খেয়ে তৃপ্ত হয়ে চলে গেলেন। অতঃপর আরো দশজনকে আসতে বলা হল। তারা আসলেন এবং তৃপ্তি সহকারে রুটি খেয়ে চলে গেলেন। আবার আরো দশজনকে আসতে বলা হল। তারাও আসলেন এবং পেট পুরে খেয়ে নিলেন। ঐভাবে উপস্থিত সকলেই রুটি খেয়ে তৃপ্ত হলেন। সর্বমোট সত্তর বা আশিজন লোক ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নিদর্শনাবলীকে বরকতময় মনে করতাম আর তোমরা ঐসব ঘটনাকে ভীতিকর মনে কর। আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সঙ্গে কোন এক সফরে ছিলাম। আমাদের পানি কমে আসল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, অতিরিক্ত পানি খোজ কর। (খুজে) সাহাবীগণ একটি পাত্র নিয়ে আসলেন যার ভিতর সামান্য পানি ছিল। নবী (ﷺ) তার হাত ঐ পাত্রের ভিতর ঢুকিয়ে দিলেন এবং ঘোষণা করলেন, বরকতময় পানি নিতে সকলেই এসো। এ বরকত আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে দেয়া হয়েছে। তখন আমি দেখতে পেলাম আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর আঙ্গুলের ফাক দিয়ে পানি উপচে পড়ছে। কখনও আমরা খাবারের তাস্বীহ পাঠ শুনতাম আর তা খাওয়া হত।

জাবির হতে বর্ণিত। তার পিতা (আবদুল্লাহ উহুদ যুদ্ধে) ঋণ রেখে শাহাদাত লাভ করেন। তখন আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, আমার পিতা অনেক ঋণ রেখে গেছেন। আমার কাছে বাগানের কিছু খেজুর ছাড়া অন্য কোন মাল নেই। কয়েক বছরের খেজুর একত্র করলেও তার ঋণ শোধ হবে না। আপনি দয়া করে আমার সঙ্গে চলুন, যাতে পাওনাদারগণ আমার প্রতি কঠোর মনোভাব গ্রহণ না করে। নবী (ﷺ) তার সঙ্গে গেলেন এবং খেজুরের একটি স্তূপের চারপাশে ঘুরে দু'আ করলেন। অতঃপর অন্য স্তুপের নিকটে গেলেন এবং এর উপরে বসলেন এবং জাবির-কে বললেন, খেজুর বের করে দিতে থাক। সকল পাওনাদারের প্রাপ্য শোধ হয়ে গেল আর তাদের যত দিলেন তত থেকে গেল।

আবদুর রাহমান ইবন আবূ বাকর বর্ণনা করেন, আসহাবে সুফ্ফায় কতক অসহায় গরীব লোক ছিলেন। নবী (ﷺ) একবার বললেন, যার ঘরে দু'জনের খাবার আছে সে যেন এদের মধ্য হতে তৃতীয় একজন নিয়ে যায়। আর যার ঘরে চার জনের খাবার রয়েছে সে এদের মধ্য হতে পঞ্চম একজন বা ষষ্ঠ একজনকে নিয়ে যায় অথবা নবী (ﷺ) যা বলেছেন। আবূ বাকর তিনজন নিলেন। আর নবী (ﷺ) নিয়ে গেলেন দশজন এবং আবূ বাকর তিনজন। আবদুর রহমান বলেন, আমি, আমার আববা ও আম্মা। আবূ উসমান রাবী বলেন, আমার মনে নাই আবদুর রাহমান কি এও বলেছিলেন যে, আমার স্ত্রী ও আমাদের পিতা-পুত্রের একজন গৃহভৃত্যও ছিল। আবূ বাকর ঐ রাতে নবীজীর বাড়িতেই খেয়ে নিলেন এবং ইশার সালাত পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। ইশার সালাতের পর পুনরায় তিনি নবী (ﷺ)-এর গৃহে গমন করলেন। নবী (ﷺ)-এর রাতের খাবার খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন। অনেক রাতের পর বাড়ী ফিরলেন। তখন তার স্ত্রী তাকে বললেন, মেহমান পাঠিয়ে দিয়ে আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, তাদের কি এখনো রাতের খাবার দাওনি। স্ত্রী বললেন, আপনার না আসা পর্যন্ত তারা খাবার খেতে রাযী হননি। তাদেরকে ঘরের লোকজন খাবার দিয়েছিল। কিন্তু তাদের অসম্মতির নিকট আমাদের লোকজন হার মেনেছে। আবদুর রাহমান বলেন, আমি তাড়াতাড়ি সরে পড়লাম। আবূ বাকর বললেন, ওরে বেওকুফ! আহম্মক! আরো কিছু কড়া কথা বলে ফেললেন। অতঃপর মেহমান পক্ষকে সম্বোধন করে বললেন, আপনারা খেয়ে নিন। আমি কিছুতেই খাব না। আবদুর রহমান বলেন, আল্লাহর কসম, আমরা যখন গ্রাস তুলে নেই তখন দেখি পাত্রের খাবার অনেক বেড়ে যায়। খাওয়ার শেষে আবূ বাকর দেখলেন তৃপ্ত হয়ে আহারের পরও পাত্রে খাবার আগের চেয়ে বেশি রয়ে গেছে। তখন স্ত্রীকে বললেন, হে বনী ফিরাস গোত্রের বোন! ব্যাপার কী? তিনি বললেন, হে আমার নয়নমণি! খাদ্যের পরিমাণ এখন তিনগুণের চেয়েও অধিক রয়েছে। আবূ বাকর তা হতে কয়েক লোকমা খেলেন এবং বললেন, আমার কসম শয়তানের প্ররোচনায় ছিল। অতঃপর অবশিষ্ট খাদ্য নবী (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন এবং ভোর পর্যন্ত ঐ খাদ্য নবী (ﷺ)-এর হিফাযতে রইল। রাবী বলেন, আমাদের ও অন্য একটি গোত্রের মধ্যে সন্ধি ছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াতে তাদের মোকাবেলা করার জন্য আমাদের বার জনকে নেতা বানানো হল। প্রত্যেক নেতার অধীনে আবার কয়েকজন করে লোক ছিল। আল্লাহই ভাল জানেন তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কতজন করে দেয়া হয়েছিল! আবদুর রহমান বলেন, এদের সকলেই এ খাবার হতে খেয়ে নিলেন। অথবা তিনি যেমন বলেছেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর যুগে একবার মদিনা্বাসী অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষে নিপতিত হল। এ সময় কোন এক জুমুআর দিনে নবী (ﷺ) খুত্বা দিয়েছিলেন, তখন এক লোক উঠে দাড়াল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঘোড়াগুলো নষ্ট হয়ে গেল, বকরীগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আল্লাহর নিকটে বৃষ্টির জন্য দু'আ করুন। নবী (ﷺ) তৎক্ষণাৎ দু'হাত উঠিয়ে দু'আ করলেন। আনাস বলেন, তখন আকাশ কাঁচের মত নির্মল ছিল। হঠাৎ মেঘ সৃষ্টিকারী বাতাস শুরু হল এবং মেঘ ঘনীভূত হয়ে গেল। অতঃপর শুরু হল প্রবল বৃষ্টিপাত যেন আকাশ তার দরজা খুলে দিল। আমরা পানি ভেঙ্গে বাড়ী পৌছলাম। পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত অনবরত বৃষ্টিপাত হল। ঐ শুক্রবারে জুমুআর সময় ঐ ব্যক্তি বা অন্য কেউ দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! গৃহগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। বৃষ্টি বন্ধের জন্য আল্লাহর নিকটে দু'আ করুন। তখন নবী (ﷺ) মুচকি হাসলেন এবং বললেন, আমাদের আশে পাশে বৃষ্টি হোক। আমাদের উপর নয়। [আনাস বলেন,] তখন আমি দেখলাম, মদিনা্ আকাশ হতে মেঘরাশি চারিদিকে সরে গেছে আর মদিনা্কে মুকুটের মত মনে হচ্ছে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী (ﷺ) খেজুরের একটি কান্ডের সঙ্গে খুত্বা প্রদান করতেন। যখন মিম্বার তৈরি করে দেয়া হল। তখন তিনি মিম্বরে উঠে খুত্বা দিতে লাগলেন। কান্ডটি তখন কাঁদতে শুরু করল। নবী (ﷺ) কান্ডটির নিকটে গিয়ে হাত বুলাতে লাগলেন।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) একটি বৃক্ষের উপর কিংবা একটি খেজুর বৃক্ষের কান্ডের উপর শুক্রবারে খুত্বা দেয়ার জন্য দাড়াতেন। এমতাবস্থায় একজন আনসারী মহিলা অথবা একজন পুরুষ বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য একটি মিম্বার বানিয়ে দিব? নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের ইচ্ছে হলে দিতে পার। অতঃপর তারা একটি কাঠের মিম্বার বানিয়ে দিলেন। যখন শুক্রবার এল নবী (ﷺ) মিম্বরে বসলেন, তখন কান্ডটি শিশুর মত চীৎকার করে কাঁদতে লাগল। নবী (ﷺ) মিম্বার হতে নেমে এসে ওটাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু কান্ডটি শিশুর মত আরো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল। রাবী বলেন, কান্ডটি এজন্য কাঁদছিল যেহেতু সে খুত্বাকালে যিক্র শুন্তে পেত।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, প্রথম দিকে খেজুরের কয়েকটি কান্ডের উপর মসজিদে নববীর ছাদ করা হয়েছিল। নবী (ﷺ) যখনই খুত্বা দানের ইচ্ছা করতেন, তখন একটি কান্ডে হেলান দিয়ে দাড়াতেন। অতঃপর তার জন্য মিম্বার তৈরি করে দেয়া হলে তিনি সেই মিম্বারে উঠে দাড়াতেন। ঐ সময় আমরা কান্ডটি হতে দশ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীর স্বরের মত কান্নার আওয়াজ শুনলাম। শেষে নবী (ﷺ) তার কাছে এসে তাকে হাত বুলিয়ে সোহাগ করলেন। অতঃপর কান্ডটি শান্ত হল।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে কে নবী (ﷺ)-এর ফিতনা সম্বন্ধীয় হাদীস স্মরণ রেখেছ যেমনভাবে তিনি বর্ণনা করেছেন। হুযাইফাহ বললেন, আমিই সর্বাধিক মনে রেখেছি। উমার বললেন, বর্ণনা কর, তুমি তো অত্যন্ত সাহসী ব্যক্তি। হুযাইফাহ বললেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, মানুষের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ এবং প্রতিবেশি দ্বারা সৃষ্ট ফিতনা-ফাসাদের ক্ষতিপূরণ হয়ে যাবে সালাত, সাদ্কা এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার দ্বারা। উমার বললেন, আমি এ ধরনের ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি বরং উদ্বেলিত সমুদ্রের ঢেউয়ের মত ভীষণ আঘাত হানে ঐ ধরনের ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। হুযাইফাহ বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ ধরনের ফিতনা সম্পর্কে আপনার শঙ্কিত হবার কোন কারণ নেই। আপনার এবং এ জাতীয় ফিতনার মধ্যে এশটি সুদৃঢ় কপাট বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। উমার জিজ্ঞেস করলেন, এ কপাটটি কি খোলা হবে, না ভেঙ্গে ফেলা হবে? হুযাইফাহ বলেন, ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমার বললেন, তা হলে এ কপাটটি আর সহজে বন্ধ করা যাবে না। আমরা হুযাইফাহ্কে জিজ্ঞেস করলাম, উমার কি জানতেন, ঐ কপাট দ্বারা কাকে বুঝানো হয়েছে? তিনি বললেন, অবশ্যই; যেমন নিশ্চিতভাবে জানতেন আগামী দিনের পূর্বে আজ রাতের আগমন অনিবার্য। আমি তাকে এমন একটি হাদীস শুনিয়েছি, যাতে ভুল-চুকের সুযোগ নেই। আমরা হুযাইফাহ্কে ভয়ে জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি, তাই মাসরূককে বললাম, মাসরূক জিজ্ঞেস করলেন, এ বন্ধ কপাট কে? হুযাইফাহ বললেন, উমার স্বয়ং।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে এমন এক জাতির সঙ্গে যাদের পায়ের জুতা হবে পশমের এবং যতক্ষণ না তোমাদের যুদ্ধ হবে তুর্কিদের সাথে যাদের চোখ ছোট, নাক চ্যাপ্টা, চেহারা লাল বর্ণ যেন তাদের চেহারা পেটানো ঢাল।

তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হবে যারা নেতৃত্বে ও শাসন ক্ষমতায় জড়িয়ে না যাওয়া পর্যন্ত একে অত্যন্ত অপছন্দ করবে। মানুষ খণির মত। যারা জাহিলীয়্যাতের যুগে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম, ইসলাম গ্রহণের পরও তারা শ্রেষ্ঠ ও উত্তম।

তোমাদের নিকট এমন যুগ আসবে যখন তোমাদের পরিবার-পরিজনরা ধন-সম্পদের অধিকারী হবার চাইতেও আমার সাক্ষাৎ পাওয়া তার নিকট অত্যন্ত প্রিয় বলে গণ্য হবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবেনা যে পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ না হবে খুয ও কিরমান নামক স্থানে (বসবাসরত) অনারব জাতিগুলোর সঙ্গে, যাদের চেহারা লালবর্ণ, চেহারা যেন পিটানো ঢাল, নাক চ্যাপ্টা, চোখ ছোট এবং জুতা পশমের।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সাথে তিন বছর কাটিয়েছি। আমার জীবনে হাদীস মুখস্থ করার আগ্রহ এ তিন বছরের চেয়ে বেশি আর কখনো ছিল না। আমি নবী (ﷺ)-কে হাত দ্বারা এভাবে ইশারা করে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের পূর্বে তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে যাদের জুতা হবে পশমের। এরা হবে পারস্যবাসী অথবা পাহাড়বাসী অনারব এবং একবার সুফ্ইয়ান বলেছেন, তারা পারস্যবাসী বা পাহাড়বাসী অনারব।

আমর ইবন তাগলিব বর্ণনা করেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা কিয়ামতের আগে এমন এক জাতির সঙ্গে যুদ্ধ করবে যারা পশমের জুতা ব্যবহার করে এবং তোমরা এমন এক জাতির সঙ্গে লড়াই করবে যাদের মুখমন্ডল হবে পিটানো ঢালের মত।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ইয়াহূদীরা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তখন জয়লাভ করবে তোমরাই। স্বয়ং পাথরই বলবে, হে মুসলিম, এইতো ইয়াহূদী আমার পিছনে, একে হত্যা কর।

আবূ সাঈদ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, (ভবিষ্যতে) মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে যে, তারা জিহাদ করবে। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কোন লোক আছেন কি যিনি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গ লাভ করেছেন? তখন তারা বলবে, হা। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে। অতঃপরও তারা আরো জিহাদ করবে। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি যিনি সহাবাদের সঙ্গ লাভ করেছেন? তখন তারা বল্বে, হা। তখন তাদেরকে জয়ী করা হবে।

আদি ইবন হাতিম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করল। অতঃপর আর এক ব্যক্তি এসে ডাকাতের উপদ্রবের কথা বলে অনুযোগ করল। নবী (ﷺ) বললেন, হে আদী! তুমি কি হীরা নামক স্থানটি দেখেছ! আমি বললাম, দেখি নাই, তবে স্থানটি আমার জানা আছে। তিনি বললেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও তবে দেখবে একজন উষ্ট্রারোহী হাওদানশীল মহিলা হীরা হতে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে তাওয়াফ করে যাবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না। আমি মনে মনে বলতে লাগলাম তাঈ গোত্রের ডাকাতগুলো কোথায় থাকবে যারা ফিতনা ফাসাদের আগুন জ্বালিয়ে দেশকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তিনি বললেন, তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও, তবে নিশ্চই দেখতে পাবে যে তোমরা কিসরার ধনভান্ডার দখল করেছ। আমি বললাম, কিসরা ইবন হুরমুযের? নবী (ﷺ) বললেন, হা, কিসরা ইবন হুরমুযের। তোমার আয়ু যদি দীর্ঘ হয় তবে অবশ্যই তুমি দেখতে পাবে, লোকজন মুঠভরা যাকাতের স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে বের হবে এবং এমন ব্যক্তির খোজ করে বেড়াবে যে তাদের এ মাল গ্রহণ করে। কিন্তু গ্রহণকারী একটি লোকও পাবে না। তোমাদের প্রত্যেকটি মানুষ কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করবে। তখন তার ও আল্লাহর মাঝে অন্য কোন দোভাষী থাকবে না যিনি ভাষান্তর করে বলবেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমার নিকট আমার বাণী পৌছানোর জন্য রাসূল প্রেরণ করিনি? সে বলবে হা, প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাকে ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি দান করিনি এবং দয়া মেহেরবাণী করিনি? তখন সে বলবে, হা দিয়েছেন। অতঃপর সে ডান দিকে নযর করবে, জাহান্নাম ছাড়া আর কিছূই দেখতে পাবে না। আবার সে বাম দিকে নযর করবে, তখনো সে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই দেখবে না। আদী বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আধখানা খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন হতে নিজেকে রক্ষা কর আর যদি তাও করার তৌফিক না হয় তবে মানুষের জন্য ভাল কথা বলে নিজেকে আগুন থেকে রক্ষা কর। আদী বলেন, আমি নিজে দেখেছি, এক উষ্ট্রারোহী মহিলা হীরা হতে একাকী রওয়ানা হয়ে কাবাহ্ শরীফ তাওয়াফ করেছে। সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করে না। আর পারস্য সম্রাট কিসরা ইবন হুরমুযের ধনভান্ডার যারা দখল করেছিল, তাদের মধ্যে আমি একজন ছিলাম। তোমরা যদি আরও কিছুদিন বেচে থাক তাহলে দেখতে পাবে যেমন (ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে) আবুল কাসিম (ﷺ) যা বলেছেন, এক ব্যক্তি এক মুষ্টি ভর্তি সোনা-রূপা নিয়ে বের হবে কিন্তু কেউ নিতে চাইবে না।

উকবাহ ইবন 'অমির হতে বর্ণিত। একদা নবী (ﷺ) বের হয়ে মৃত ব্যক্তির সালাতে জানাযার মত উহুদ যুদ্ধে শহীদ সহাবাগণের কবরের পার্শ্বে দাড়িয়ে সালাত আদায় করলেন। অতঃপর ফিরে এসে মিম্বারে উঠে বললেন, আমি তোমাদের জন্য অগ্রগামী ব্যক্তি, আমি তোমাদের হয়ে আল্লাহর নিকটে সাক্ষ্য দিব। আল্লাহর কসম, আমি এখানে বসে থেকেই আমার হাউযে কাওসার দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীর ধন-ভান্ডারের চাবি আমার হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার মৃত্যুর পর তোমরা মুশ্রিক হয়ে যাবে এ আশঙ্কা আমি করি না। তবে আমি তোমাদের ব্যাপারে এ আশঙ্কা করি যে, দুনিয়ার ধন-সম্পদের মোহে তোমরা আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে পড়বে।

উসামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদা মদিনায় একটি উটু টিলায় উঠলেন, অতঃপর বললেন, আমি যা দেখছি, তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ? আমি দেখছি পানির স্রোতের মত ফাসাদ ঢুকে পড়ছে তোমাদের ঘরে ঘরে।

যায়নাব বিনতু জাহশ হতে বর্ণিত। একদা নবী (ﷺ) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়তে পড়তে তার গৃহে প্রবেশ করলেন এবং বলতে লাগলেন, শীঘ্রই একটি দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হবে। এতে আরবের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। ইয়াজুজ ও মাজুজের দেয়ালে এতটুকু পরিমাণ ছিদ্র হয়ে গিয়েছে, এ কথা বলে দু'টি আঙ্গুল গোলাকার করে দেখালেন। যায়নাব বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি ধ্বংস হয়ে যাব, অথচ আমাদের মধ্যে বহু নেক ব্যক্তি আছেন? নবী (ﷺ) বললেন, হা, যখন অশ্লীলতা বেড়ে যাবে।

উম্মু সালামাহ বলেন, নবী (ﷺ) জেগে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন, সুবাহানাল্লাহ, আজ কী অফুরন্ত ধনভান্ডার অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তারই সঙ্গে অগণিত ফিতনা-ফাসাদ নাযিল করা হয়েছে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি আবূ সা'সা'আহকে বললেন, তোমাকে দেখছি তুমি বকরীকে অত্যন্ত ভালবেসে এদেরকে সর্বদা লালন-পালন কর, তাই, তুমি এদের যত্ন কর এবং রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা কর। আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, এমন এক সময় আসবে, যখন বকরীই হবে মুসলিমের উত্তম সম্পদ। তাকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় বৃষ্টি বর্ষণের স্থানে চলে যাবে এবং তাদের দ্বীনকে ফিতনা থেকে রক্ষা করবে।

আবূ হুরাইরাহ্ বর্ণনা করেন। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, শীঘ্রই ফিতনা রাশি আসতে থাকবে। ঐ সময় উপবিষ্ট ব্যক্তি দাড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম (নিরাপদ), দাড়ানো ব্যক্তি ভ্রাম্যমান ব্যক্তি হতে অধিক রক্ষিত আর ভ্রাম্যমান ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চেয়ে অধিক বিপদমুক্ত। যে ব্যক্তি ফিতনার দিকে চোখ তুলে তাকাবে ফিতনা তাকে গ্রাস করবে। তখন যদি কোন ব্যক্তি তার দ্বীন রক্ষার জন্য কোন ঠিকানা অথবা নিরাপদ আশ্রয় পায়, তবে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করাই উচিত হবে।

ইবন শিহাব যুহরী....নাওফাল ইবন মু'আবিয়া হতে আবূ হুরাইরাহ্-এর হাদীসের মতই বর্ণনা করেছেন। তবে অতিরিক্ত আর একটি কথাও বর্ণনা করেছেন যে এমন একটি সালাত রয়েছে যে ব্যক্তির ঐ সালাত ফওত হয়ে গেল, তার পরিবার-পরিজন ধন-সম্পদ সবই যেন ধ্বংস হয়ে গেল।

ইবন মাসঊদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, শীঘ্রই স্বজনপ্রীতির বিস্তৃতি ঘটবে এবং এমন ব্যাপার ঘটবে যা তোমরা পছন্দ করতে পারবে না। সহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ অবস্থায় আমাদের কী করতে বলেন? নবী (ﷺ) বললেন, তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে আর তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহর কাছে চাইবে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কুরাইশ গোত্রের এ লোকগুলি (যুবকগণ) মানুষের ধ্বংস ডেকে আনবে। সহাবাগণ বললেন, তখন আমাদেরকে আপনি কী করতে বলেন? তিনি বললেন, মানুষেরা যদি এদের সংসর্গ ত্যাগ করত তবে ভালই হত।

আহমদ ইবন মুহাম্মাদ মাক্কী.....সাঈদ উমাবী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবূ হুরাইরাহ্ এবং মারওয়ান-এর নিকট ছিলাম। আবূ হুরাইরাহ্ বলতে লাগলেন, আমি সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মাতের ধ্বংস কুরাইশের কতকগুলি অল্প বয়স্ক যুবকের হাতে এবং মারওয়ান বললেন, অল্প বয়স্ক ছেলেদের হাতে। আবূ হুরাইরাহ্ বলেন, তুমি শুনতে চাইলে তাদের নামও বলতে পারি, অমুকের ছেলে অমুক, অমুকের ছেলে অমুক।

হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, লোকজন নবী (ﷺ)-কে কল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন আর আমি তাকে অকল্যাণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম; এই ভয়ে যেন আমি ঐ সবের মধ্যে পড়ে না যাই। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা জাহিলীয়্যাতে অকল্যাণকর অবস্থায় জীবন যাপন করতাম অতঃপর আল্লাহ আমাদের এ কল্যাণ দান করেছেন। এ কল্যাণকর অবস্থার পর আবার কোন অকল্যাণের আশঙ্কা আছে কি? তিনি বললেন, হা, আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঐ অকল্যাণের পর কোন কল্যাণ আছে কি? তিনি বললেন, হা, আছে। তবে তা মন্দ মেশানো। আমি বললাম, মন্দ মেশানো কী? তিনি বললেন, এমন একদল লোক যারা আমার সুন্নাত ত্যাগ করে অন্যপথে পরিচালিত হবে। তাদের কাজে ভাল-মন্দ সবই থাকবে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কি আরো অকল্যাণ আছে? তিনি বললেন হা, তখন জাহান্নামের দিকে আহবানকারীদের উদ্ভব ঘটবে। যারা তাদের ডাকে সাড়া দিবে তাকেই তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এদের পরিচয় বর্ণনা করুন। তিনি বললেন, তারা আমাদেরই সম্প্রদায়ভুক্ত এবং কথা বলবে আমাদেরই ভাষায়। আমি বললাম, আমি যদি এ অবস্থায় পড়ে যাই তাহলে আপনি আমাকে কী করতে আদেশ দেন? তিনি বললেন, মুসলিমদের দল ও তাদের ইমামকে আকড়ে ধরবে। আমি বললাম, যদি মুসলিমদের এহেন দল ও ইমাম না থাকে? তিনি বলেন, তখন তুমি তাদের সকল দল উপদলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করবে এবং মৃত্যু না আসা পর্যন্ত বৃক্ষমূল দাতে আকড়ে ধরে হলেও তোমার দ্বীনের উপর থাকবে।

হুযাইফাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার সঙ্গীরা কল্যাণ বিষয়ে জানতে চেয়েছেন আর আমি জানতে চেয়েছি অকল্যাণ সম্পর্কে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, কিয়ামত হবে না যে পর্যন্ত এমন দু'টি দলের মধ্যে যুদ্ধ না হবে যাদের দাবী হবে এক।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যে পর্যন্ত দু'টি দলের মধ্যে যুদ্ধ না হবে। তাদের মধ্যে হবে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। তাদের দাবী হবে এক। আর কিয়ামত কায়িম হবে না যে পর্যন্ত প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাচারী দাজ্জালের আবির্ভাব না হবে। এরা সবাই নিজেকে আল্লাহর রাসূল বলে দাবী করবে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি কিছু গনীমতের মাল বণ্টন করছিলেন। তখন বানু তামীম গোত্রের জুলখোয়াইসিরাহ্ নামে এক ব্যক্তি এসে হাযির হল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি ইনসাফ করুন। তিনি বললেন তোমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি ইন্সাফ না করি, তবে ইন্সাফ করবে কে? আমি তো নিষ্ফল ও ক্ষতিগ্রস্ত হব যদি আমি ইন্সাফ না করি। উমার বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি এর গর্দান উড়িয়ে দিই। তিনি বললেন, একে ছেড়ে দাও। তার এমন কিছু সঙ্গী সাথী রয়েছে তোমাদের কেউ তাদের সালাতের তুলনায় নিজের সালাত এবং সিয়াম নগণ্য বলে মনে করবে। এরা কুরআন পাঠ করে, কিন্তু কুরআন তাদের কন্ঠনালীর নীচে প্রবেশ করে না। তারা দ্বীন হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমন তীর ধনুক হতে বেরিয়ে যায়। তীরের অগ্রভাগের লোহা দেখা যাবে কিন্তু কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না। কাঠের অংশ দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। মাঝের অংশ দেখলে তাতেও কিছু পাওয়া যাবে না। তার পালক দেখলে তাতেও কোন চিহ্ন পাওয়া যায় না। অথচ তীরটি শিকারী জন্তুর নাড়িভুঁড়ি ভেদ করে রক্তগোশত পার হয়ে বেরিয়ে গেছে। এদের নিদর্শন হল এমন একটি কালো মানুষ যার একটি বাহু নারীর স্তনের মত অথবা গোশত খন্ডের মত নড়াচড়া করবে। তারা লোকদের মধ্যে বিরোধ কালে আত্ম প্রকাশ করবে। আবূ সাঈদ বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট হতে এ কথা শুনেছি। আমি এ-ও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী ইবন আবূ তালিব এদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। আমিও তার সঙ্গে ছিলাম। তখন আলী ঐ লোককে খুজে বের করতে আদেশ দিলেন। খোজ করে যখন আনা হল আমি মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে তার মধ্যে ঐ সব চিহ্নগুলি দেখতে পেলাম, যা নবী (ﷺ) বলেছিলেন।

সুয়াইদ ইবন গাফালা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী বলেছেন, আমি যখন তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কোন হাদীস বর্ণনা করি, তখন আমার এমন অবস্থা হয় যে, তার উপর মিথ্যারোপ করার চেয়ে আকাশ হতে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় এবং আমরা নিজেরা যখন আলোচনা করি তখন কথা হল এই যে, যুদ্ধ ছল-চাতুরী মাত্র। আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, শেষ যুগে একদল যুবকের আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন। তারা মুখে খুব ভাল কথা বলবে। তারা ইসলাম হতে বেরিয়ে যাবে যেভাবে তীর ধনুক হতে বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান গলদেশ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে না। যেখানেই এদের সঙ্গে তোমাদের দেখা মিলবে, এদেরকে তোমরা হত্যা করে ফেলবে। যারা তাদের হত্যা করবে তাদের এই হত্যার পুরস্কার আছে কিয়ামতের দিন।

খাববাব ইবন আরত্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী (ﷺ)-এর খেদমতে অভিযোগ করলাম। তখন তিনি তার চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরীফের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। আমরা তাকে বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করবেন না? আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করবেন না? তিনি বললেন, তোমাদের আগের লোকদের অবস্থা ছিল এই, তাদের জন্য মাটিতে গর্ত খুড়া হত এবং ঐ গর্তে তাকে পুঁতে রেখে করাত দিয়ে তার মাথা দ্বিখন্ডিত করা হত। এটা তাদেরকে দ্বীন হতে টলাতে পারত না। লোহার চিরুনী দিয়ে শরীরের হাড় গোশত ও শিরা-উপশিরা সব কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিত। এটা তাদেরকে দ্বীন হতে সরাতে পারেনি। আল্লাহর কসম, আল্লাহ এ দ্বীনকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন। তখন একজন উষ্ট্রারোহী সান'আ হতে হাযারামাউত পর্যন্ত সফর করবে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করবে না। অথবা তার মেষপালের জন্য নেকড়ে বাঘের ভয়ও করবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছ।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) সাবিত ইবন কায়েস-কে তার মাজলিসে অনুপস্থিত পেলেন। তখন এক সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তার সম্পর্কে জানি। তিনি গিয়ে দেখেন সাবিত তার ঘরে অবনত মস্তকে বসে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে সাবিত! কী অবস্থা তোমার? তিনি বললেন, অত্যন্ত খারাপ। তার গলার স্বর নবী (ﷺ)-এর গলার স্বর হতে উচ্চ হয়েছিল। কাজেই তার সব নেক আমল নষ্ট হয়ে গেছে। সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। ঐ ব্যক্তি ফিরে এসে নবী (ﷺ)-কে জানালেন সাবিত এসব কথা বলেছে। মূসা ইবন আনাস বলেন, ঐ সাহাবী এক মহা সুসংবাদ নিয়ে হাযির হলেন যে নবী (ﷺ) বলেছেন, তুমি যাও সাবিতকে বল, নিশ্চই তুমি জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত নও বরং তুমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত।

বার'আ ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক সাহাবী সূরা কাহ্ফ তিলাওয়াত করছিলেন। তার বাড়িতে একটি ঘোড়া বাধা ছিল। ঘোড়াটি তখন লাফালাফি করতে লাগল। তখন ঐ সাহাবী শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর নিকটে দু'আ করলেন। তখন তিনি দেখলেন, একখন্ড মেঘ এসে তাকে ঢেকে দিয়েছে। তিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। তখন তিনি বললেন, হে অমুক! তুমি এভাবে তিলাওয়াত করবে। এটা তো প্রশান্তি ছিল, যা কুরআন তিলাওয়াতের কারণে নাযিল হয়েছিল।

বারা ইবন আযিব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আবূ বাকর আমার পিতার কাছে আমাদের বাড়িতে আসলেন। তিনি আমার পিতার কাছ হতে একটি হাওদা কিনলেন এবং আমার পিতাকে বললেন, তোমার ছেলে বারাকে আমার সঙ্গে হাওদাটি বয়ে নিয়ে যেতে বল। আমি হাওদাটি বয়ে তার সঙ্গে চললাম। আমার পিতাও ওটার মূল্য নেয়ার জন্য আমাদের সঙ্গী হলেন। আমার পিতা তাকে বললেন, হে আবূ বাকর! দয়া করে আপনি আমাদেরকে বলুন, আপনারা কী করেছিলেন যে রাতে আপনি নবী (ﷺ)-এর সাথী ছিলেন? তিনি বললেন, হা। অবশ্যই আমরা সারা রাত পথ চলে পরদিন দিন দুপুর অবধি চললাম। যখন রাস্তাঘাট লোকশূন্য হয়ে পড়ল, রাস্তায় কোন মানুষের আনাগোনা ছিল না। হঠাৎ একটি লম্বা ও চওড়া পাথর আমাদের নযরে পড়লো, যার ছায়ায় সূর্যের তাপ প্রবেশ করছিল না। আমরা সেখানে গিয়ে নামলাম। আমি নবী (ﷺ)-এর জন্য নিজ হাতে একটি জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিলাম, যাতে সেখানে তিনি ঘুমাতে পারেন। আমি ওখানে একটি চামড়ার বিছানা পেতে দিলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শুয়ে পড়ুন। আমি আপনার নিরাপত্তার জন্য পাহারায় থাকলাম। তিনি শুয়ে পড়লেন। আর আমি চারপাশের অবস্থা দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, একজন মেষ রাখাল তার মেষপাল নিয়ে পাথরের দিকে ছুটে আসছে। সেও আমাদের মত পাথরের ছায়ায় আশ্রয় নিতে চায়। আমি বললাম, হে যুবক! তুমি কার রাখাল? সে মদিনার কি মক্কার এক লোকের নাম বলল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার মেষপালে কি দুধেল মেষ আছে? সে বলল, হা আছে। আমি বললাম, তুমি কি দুহে দিবে? সে বলল, হা। অতঃপর সে একটি বক্রী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, এর স্তন ধূলা-বালি, পশম ও ময়লা হতে পরিষ্কার করে নাও। রাবী আবূ ইসহাক বলেন, আমি বারাআ-কে দেখলাম এক হাত অন্য হাতের উপর রেখে ঝাড়ছেন। অতঃপর ঐ যুবক একটি কাঠের বাটিতে কিছু দুধ দোহন করল। আমার সঙ্গেও একটি চামড়ার পাত্র ছিল। আমি নবী (ﷺ)-এর উযূর পানি ও পান করার পানি রাখার জন্য নিয়েছিলাম। আমি দুধ নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট আসলাম। তাকে জাগানো ভাল মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পর তিনি জেগে উঠলেন। আমি দুধ নিয়ে হাযির হলাম। আমি দুধের মধ্যে কিছু পানি ঢেলেছিলাম তাতে দুধের নীচ পর্যন্ত ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দুধ পান করুন। তিনি পান করলেন, আমি তাতে সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম। অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, এখন কি আমাদের যাত্রা শুরুর সময় হয়নি? আমি বললাম, হ্যা হয়েছে। পুনরায় শুরু হল আমাদের সফর। ততক্ষণে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। সুরাকা ইবন মালিক আমাদের পিছন নিয়েছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের অনুসরণে কে যেন আসছে। তিনি বললেন, চিন্তা করোনা, নিশ্চই মহান আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। তখন নবী (ﷺ) তার বিরুদ্ধে দু'আ করলেন। তৎক্ষণাৎ আরোহীসহ ঘোড়া তার পেট পর্যন্ত মাটিতে দেবে গেল, শক্ত মাটিতে। রাবী যুহায়র এই শব্দটি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন আমার ধারণা এ রকম শব্দ বলেছিলেন। সুরাকা বলল, আমার বিশ্বাস আপনারা আমার বিরুদ্ধে দোয়া করেছেন। আমার জন্য আপনারা দোয়া করে দিন। আল্লাহর কসম আপনাদের খোজকারীদেরকে আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। নবী (ﷺ) তার জন্য দোয়া করলেন। সে বেচে গেল। ফিরে যাবার পথে যার সঙ্গে তার দেখা হত, সে বলত আমি সব দেখে এসেছি। যাকেই পেয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছে। আবূ বাকর বলেন, সে আমাদের সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)একদিন অসুস্থ একজন বেদুঈনকে দেখতে গেলেন। রাবী বলেন, নবী (ﷺ)-এর অভ্যাস ছিল যে, পীড়িত ব্যক্তিকে দেখতে গেলে বলতেন, কোন দুশ্চিন্তার কারণ নেই, ইশাআল্লাহ গোনাহ হতে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে। ঐ বেদুঈনকেও তিনি বললেন। চিন্তা করো না গুনাহ হতে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। বেদুঈন বলল, আপনি বলেছেন গোনাহ হতে তুমি পবিত্র হয়ে যাবে। তা নয়। বরং এতো এমন এক জ্বর যা বয়োঃবৃদ্ধের উপর প্রভাব ফেলছে। তাকে কবরের সাক্ষাৎ করাবে। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তাই হোক।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক খ্রিস্টান ব্যক্তি মুসলিম হল এবং সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান শিখে নিল। নবী (ﷺ)-এর জন্য সে ওহী লিখত। অতঃপর সে আবার খ্রিস্টান হয়ে গেল। সে বলতে লাগল, আমি মুহাম্মাদ -কে যা লিখে দিতাম তার চেয়ে বেশি কিছু তিনি জানেন না। (নাউজুবিল্লাহ) কিছুদিন পর আল্লাহ তাকে মৃত্যু দিলেন। খ্রিস্টানরা তাকে দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে বাইরে নিক্ষেপ করে দিয়েছে। এটা দেখে খ্রিস্টানরা বলতে লাগল- এটা মুহাম্মাদ এবং তার সাহাবীদেরই কাজ। যেহেতু আমাদের এ সাথী তাদের হতে পালিয়ে এসেছিল। এ জন্যই তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। তাই যতদূর পারা যায় গভীর করে কবর খুড়ে তাকে আবার দাফন করল। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা গেল, কবরের মাটি তাকে আবার বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবারও তারা বলল, এটা মুহাম্মাদ ও তার সাহাবীদের কান্ড। তাদের নিকট হতে পালিয়ে আসার কারণে তারা আমাদের সাথীকে কবর হতে উঠিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে। এবার আরো গভীর করে কবর খনন করে দাফন করল। পরদিন ভোরে দেখা গেল কবরের মাটি এবারও তাকে বাইরে নিক্ষেপ করেছে। তখন তারাও বুঝল, এটা মানুষের কাজ নয়। কাজেই তারা লাশটি ফেলে রাখল।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যখন কিসরা ধ্বংস হবে, অতঃপর অন্য কোন কিসরা হবে না। যখন কায়সার ধ্বংস হবে তখন আর কোন কায়সার হবে না। ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ নিশ্চই ঐ দু'এর ধন-ভান্ডার তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।

জাবির ইবন সামূরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, কিসরা ধ্বংস হয়ে যাবার পর আর কোন কিসরা হবে না এবং কায়সার ধ্বংস হয়ে যাবার পর আর কোন কায়সার হবে না। তিনি আরো বলেছেন, নিশ্চই তাদের ধন-ভান্ডার তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যামানায় মুসায়লামাতুল কায্যাব আসল এবং বলতে লাগল, মুহাম্মাদ (ﷺ) যদি তার পর আমাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন, তাহলে আমি তার অনুসরণ করব। তার জাতির অনেক লোক নিয়ে সে এসেছিল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার নিকট আসলেন। আর তার সাথী ছিলেন সাবিত ইবন কায়েস ইবন শাম্মাস। আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর হাতে খেজুরের একটি ডাল ছিল। তিনি সঙ্গী-সাথী পরিবেষ্টিত মুসায়লামার সামনে গিয়ে দাড়ালেন এবং বললেন, তুমি যদি আমার নিকট খেজুরের এই ডালটিও চাও, তবুও আমি তা তোমাকে দিব না। তোমার ব্যাপারে আল্লাহর যা ফায়সালা তা তুমি লঙ্ঘন করতে পারবে না। যদি তুমি কিছু দিন বেচেও থাক তবুও আল্লাহ তোমাকে অবশ্যই ধ্বংস করে দিবেন। অবশ্যই তুমি ঐ লোক যার সম্বন্ধে স্বপ্নে আমাকে সব কিছু দেখানো হয়েছে।

ইবন আব্বাস বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ আমাকে জানিয়েছেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখতে পেলাম আমার দু'হাতে সোনার দু'টি বালা। বালা দু'টি আমাকে চিন্তায় ফেলল। স্বপ্নেই আমার নিকট অহী এল, আপনি ফু দিন। আমি তাই করলাম। বালা দু'টি উড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি স্বপ্নের ব্যাখ্যা এভাবে করলাম, আমার পর দু'জন কায্যাব বের হবে। এদের একজন আনসী, অপরজন ইয়ামামাহবাসী মুসায়লামাতুল কায্যাব।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম, আমি মক্কা হতে হিজরাত করে এমন জায়গায় যাচ্ছি যেখানে বহু খেজুর গাছ রয়েছে। তখন আমার ধারণা হল, এ স্থানটি ইয়ামামা অথবা হাযর হবে। স্থানটি মদিনা্ ছিল। যার পূর্বনাম ইয়াস্রিব। স্বপ্নে আমি আরো দেখতে পেলাম যে আমি একটি তলোয়ার হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। হঠাৎ তার অগ্রাংশ ভেঙ্গে গেল। উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের যে বিপদ ঘটেছিল এটা তা-ই। অতঃপর দ্বিতীয় বার তলোয়ারটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম তখন সেটি আগের চেয়েও আরো উত্তম হয়ে গেল। এটা হল যে, আল্লাহ মুসলিমগণকে বিজয়ী ও একত্রিত করে দিবেন। আমি স্বপ্নে আরো দেখতে পেলাম, একটি গরু (যবহ হচ্ছে) এবং শুনতে পেলাম আল্লাহ যা করেন সবই ভাল। এটাই হল উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের শাহাদাত বরণ। আর খায়ের হল- আল্লাহর পক্ষ হতে ঐ সকল কল্যাণই কল্যাণ এবং সত্যবাদিতার পুরস্কার যা আল্লাহ আমাদেরকে বাদার দিবসের পর দান করেছেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর চলার ভঙ্গিতে চলতে চলতে ফাতিমা আমাদের নিকট আগমন করলেন। তাকে দেখে নবী (ﷺ) বললেন, আমার স্নেহের কন্যাকে মোবারকবাদ। অতঃপর তাকে তার ডানপাশে অথবা বামপাশে বসালেন এবং তার সঙ্গে চুপিচুপি কথা বললেন। তখন ফাতিমা কেঁদে দিলেন। আমি [আয়িশাহ তাকে বললাম] কাঁদছেন কেন? নবী (ﷺ) পুনরায় চুপিচুপি তার সঙ্গে কথা বললেন। ফাতিমা এবার হেসে উঠলেন। আমি [আয়িশাহ] বললাম, আজকের মত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ ও খুশী আমি আর কখনো দেখিনি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি (ﷺ) কী বলেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর গোপন কথাকে প্রকাশ করব না। শেষে নবী (ﷺ)-এর ইন্তিকাল হয়ে যাবার পর আমি তাকে (আবার) জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কী বলেছিলেন?

তিনি বললেন, তিনি (ﷺ) প্রথম বার আমাকে বলেছিলেন, জিবরীল প্রতি বছর একবার আমার সঙ্গে কুরআন পাঠ করতেন, এ বছর দু'বার পড়ে শুনিয়েছেন। আমার মনে হয় আমার বিদায় বেলা উপস্থিত এবং অতঃপর আমার পরিবারের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সঙ্গে মিলিত হবে। তা শুনে আমি কেঁদে দিলাম। অতঃপর বলেছিলেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, জান্নাতবাসী নারীদের অথবা মুমিন নারীদের তুমি সরদার হবে। এ কথা শুনে আমি হেসেছিলাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) অন্তিম পীড়িতাবস্থায় তার কন্যা ফাতিমা-কে ডেকে পাঠালেন। অতঃপর চুপিচুপি কী যেন বললেন। ফাতিমা তা শুনে কেঁদে ফেললেন। অতঃপর আবার ডেকে তাকে চুপিচুপি আরো কী যেন বললেন। এতে ফাতিমা হেসে উঠলেন। আয়িশাহ বলেন, আমি হাসি-কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি বললেন, নবী (ﷺ) আমাকে চুপে চুপে বলেছিলেন, যে রোগে তিনি রোগাক্রান্ত হয়েছেন এ রোগেই তার মৃত্যু হবে; তাই আমি কেঁদে দিয়েছিলাম। অতঃপর তিনি চুপিচুপি আমাকে বলেছিলেন, তার পরিবার-পরিজনের মধ্যে সর্বপ্রথম আমিই তার সঙ্গে মিলিত হব, এতে আমি হাসলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবন খাত্তাব ইবন আব্বাস-কে বিশেষ মর্যাদা দান করতেন। একদা আবদুর রাহমান ইবন আউফ তাকে বললেন, তার মত ছেলে আমাদেরও আছে। এতে তিনি বললেন, এর কারণ তো আপনি নিজেও জানেন। তখন উমার ইবন আব্বাস-কে ডেকে 'যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য এবং (মক্কা) বিজয়' (110.1) আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন। ইবন আব্বাস উত্তর দিলেন, এ আয়াতে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে তার মৃত্যু সন্নিকট বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। উমার বললেন, এ আয়াতের অর্থ তুমি যা জান তা ছাড়া ভিন্ন কিছু আমি জানি না।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) শেষ রোগে আক্রান্ত হবার পর একটি চাদর পরে মাথায় একটি কাল কাপড় দিয়ে পট্টি বেধে ঘর হতে বের হয়ে মিম্বরের উপর গিয়ে বসলেন। আল্লাহ তাআলার হাম্দ ও সানা পাঠ করার পর বললেন, আম্মা বাদ। লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, আর আনসারদের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকবে। অবশেষে তাদের অবস্থা লোকের মাঝে যেমন খাদ্যের মধ্যে লবণের মত হবে। তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির মানুষের উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা থাকবে সে যেন আনসারদের ভাল কাজ গ্রহণ করে এবং তাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে। এটাই ছিল নবী (ﷺ)-এর সর্বশেষ মজলিস যা তিনি করেছিলেন।

আবূ বাকরা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদা হাসান-কে নিয়ে বেরিয়ে এলেন এবং তাকে সহ মিম্বারে আরোহণ করলেন। অতঃপর বললেন, আমার এ ছেলেটি সরদার। নিশ্চই আল্লাহ তাআলা এর মাধ্যমে বিবদমান দু'দল মুসলিমের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দিবেন।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) জাফর এবং যায়দ [ইবন হারিস] এর শাহাদাত অর্জনের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের উভয়ের শাহাদাত অর্জনের সংবাদ আসার পূর্বেই। তখন তার দু'চোখ হতে অশ্রু ঝরছিল।

জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট আনমাত (গালিচার কার্পেট) আছে কি? আমি বললাম আমরা তা পাব কোথায়? তিনি বললেন, শীঘ্রই তোমরা আনমাত লাভ করবে। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বলি, আমার বিছানা হতে এটা সরিয়ে দাও। তখন সে বলল, নবী (ﷺ) কি বলেননি যে, শীঘ্রই তোমরা আনমাত পেয়ে যাবে? তখন আমি তা রাখতে দেই।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাদ ইবন মুআয উমরাহ আদায় করার জন্য গেলেন এবং সাফ্ওয়ানের পিতা উমাইয়াহ ইবন খালাফ এর বাড়িতে তিনি অতিথি হলেন। উমাইয়াহ্ও সিরিয়ায় গমনকালে (মদিনায়) সাদ-এর বাড়িতে অবস্থান করত। উমাইয়াহ সাদ-কে বলল, অপেক্ষা করুন, যখন দুপুর হবে এবং যখন চলাফেরা কমে যাবে, তখন আপনি গিয়ে তাওয়াফ করে নিবেন। সাদ তাওয়াফ করছিলেন। এমতাবস্থায় আবূ জাহাল এসে হাযির হল। সাদ-কে দেখে জিজ্ঞেস করল, এ ব্যক্তি কে যে কাবার তাওয়াফ করছে সাদ বললেন, আমি সাদ। আবূ জাহাল বলল, তুমি নির্বিঘ্নে কাবার তাওয়াফ করছ? অথচ তোমরাই মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তার সাথীদেরকে আশ্রয় দিয়েছ? সাদ বললেন, হা। এভাবে দু'জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হল। তখন উমাইয়া সাদ-কে বলল, আবুল হাকামের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বল না, কারণ সে মক্কাবাসীদের নেতা। অতঃপর সাদ বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি যদি আমাকে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে বাধা প্রদান কর, তবে আমিও তোমার সিরিয়ার সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের রাস্তা বন্ধ করে দিব। উমাইয়া সাদ-কে তখন বলতে লাগল, তোমার স্বর উচু করো না এবং সে তাকে বিরত করতে চেষ্টা করতে লাগল। তখন সাদ ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তারা তোমাকে হত্যা করবে। উমাইয়া বলল, আমাকেই? তিনি বললেন হা। উমাইয়া বলল, আল্লাহর কসম মুহাম্মাদ (ﷺ) কখনও মিথ্যা কথা বলেন না। অতঃপর উমাইয়া তার স্ত্রীর নিকট ফিরে এসে বলল, তুমি কি জান, আমার ইয়াসরিবী ভাই আমাকে কী বলেছে? স্ত্রী জিজ্ঞেস করল কী বলেছে? উমাইয়া বলল, সে মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে। তার স্ত্রী বলল, আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ (ﷺ) মিথ্যা বলেন না। যখন মক্কার মুশরিকরা বাদারের উদ্দেশে রওয়ানা হল এবং আহবানকারী আহবান জানাল। তখন উমাইয়ার স্ত্রী তাকে স্মরণ করিয়ে দিল, তোমার ইয়াসরিবী ভাই তোমাকে যে কথা বলছিল সে কথা তোমার মনে নেই? তখন উমাইয়া না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিল। আবূ জেহেল তাকে বলল, তুমি এ অঞ্চলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। আমাদের সঙ্গে দুইএকদিনের পথ চল। উমাইয়াহ তাদের সঙ্গে চলল। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় সে নিহত হল।

আবদুল্লাহ (ইবন উমার) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, একদা (স্বপ্নে) লোকজনকে একটি মাঠে সমবেত দেখতে পেলাম। তখন আবূ বাকর উঠে দাড়ালেন এবং এক অথবা দুই বালতি পানি উঠালেন। পানি উঠাতে তিনি দুর্বলতা বোধ করছিলেন। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর উমর বালতিটি হাতে নিলেন। বালতিটি তখন বড় আকার ধারণ করল। আমি মানুষের মধ্যে পানি উঠাতে উমারের মত সুদক্ষ ও শক্তিশালী ব্যক্তি আর দেখিনি। শেষে উপস্থিত লোকো তাদের উটগুলিকে পানি পান করিয়ে উটশালে নিয়ে গেল। হাম্মাম বলেন, আমি আবূ হুরাইরাহ্-কে নবী (ﷺ) হতে বর্ণনা করতে শুনেছি আবূ বাকর দু'বালতি পানি উঠালেন।

আবূ উসমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে জানানো হল যে, একবার জিবরাঈল নবী (ﷺ)-এর নিকট আসলেন। তখন উম্মু সালামাহ তার নিকট ছিলেন। তিনি এসে তার সঙ্গে আলোচনা করলেন। অতঃপর উঠে গেলেন। নবী (ﷺ) উম্মু সালামাহ-কে জিজ্ঞেস করলেন, লোকটিকে চিনতে পেরেছ কি? তিনি বললেন, এতো দেহ্ইয়া। উম্মু সালামাহ বলেন, আল্লাহর কসম। আমি দেহ্ইয়া বলেই বিশ্বাস করছিলাম কিন্তু নবী (ﷺ)-কে তার খুত্বায় জিব্রাঈল-এর আগমনের কথা বলতে শুনলাম। [সুলায়মান (রাবী) বলেন] আমি আবূ উসমানকে জিজ্ঞেস করলাম এ হাদীসিট আপনি কার নিকট শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামাহ ইবন যায়দ-এর নিকট শুনেছি।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। ইয়াহূদীরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর খিদমতে এসে বলল, তাদের একজন পুরুষ ও একজন মহিলা ব্যভিচার করেছে। নবী (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করা সম্পর্কে তাওরাতে কী বিধান পেয়েছ? তারা বলল, আমরা এদেরকে অপমানিত করব এবং তাদের বেত্রাঘাত করা হবে। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, তোমরা মিথ্যা বলছ। তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার বিধান রয়েছে। তারা তাওরাত নিয়ে এসে বাহির করল এবং প্রস্তর হত্যা করা সম্পর্কীয় আয়াতের উপর হাত রেখে তার আগের ও পরের আয়াতগুলি পাঠ করল। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, তোমার হাত সরাও। সে হাত সরাল। তখন দেখা গেল প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করার আয়াত আছে। তখন ইয়াহূদীরা বলল, হে মুহাম্মাদ! তিনি সত্যই বলছেন। তাওরাতে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার আয়াতই আছে। তখন নবী (ﷺ) প্রস্তর নিক্ষেপে দু'জনকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। আবদুল্লাহ বলেন, আমি ঐ পুরুষটিকে মেয়েটির দিকে ঝুকে পড়তে দেখেছি। সে মেয়েটিকে বাচানোর চেষ্টা করছিল।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর যুগে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক।

আনাস (ইবন মালিক) হতে বর্ণিত যে, মক্কাবাসী কাফিররা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট নিদর্শন দেখানোর জন্য বললে তিনি তাদেরকে চাঁদ দু'ভাগ করে দেখালেন।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ)-এর যুগে চাঁদ দু'খন্ড হয়েছিল।

আনাস হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ)-এর দু'জন সাহাবী অন্ধকার রাতে নবী (ﷺ)-এর নিকট হতে বের হলেন, তখন তাদের সঙ্গে দু'টি বাতির মত কিছু তাদের সম্মুখ ভাগ আলোকিত করে চলল। যখন তারা আলাদা হয়ে গেলেন তখন প্রত্যেকের সঙ্গে এক একটি বাতি চলতে লাগল। তারা নিজ নিজ বাড়িতে পৌছা পর্যন্ত।

মুগীরাহ ইবন শুবাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে। এমনকি যখন কিয়ামত আসবে তখনও তারা বিজয়ী থাকবে।

মুআবিয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা আল্লাহর দ্বীনের উপর অটল থাকবে। তাদেরকে যারা অপমান করতে চাইবে অথবা তাদের বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। এমনকি কিয়ামত আসা পর্যন্ত তারা এই অবস্থার উপর থাকবে।

উরওয়াহ বারিকী হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) একটি বকরী কিনে দেয়ার জন্য তাকে একটি দিনার দিলেন। তিনি ঐ দ্বীনার দিয়ে দু'টি বকরী কিনলেন। অতঃপর এক দ্বীনার মূল্যে একটি বকরী বিক্রি করে দিলেন এবং নবী (ﷺ)-এর খেদমতে একটি বকরী ও একটি দ্বীনার নিয়ে উপস্থিত হলেন। তা দেখে তিনি তার ব্যবসা বাণিজ্যে বরকত হবার জন্য দু'আ করে দিলেন। অতঃপর তার অবস্থা এমন হল যে, ব্যবসার জন্য যদি মাটিও তিনি কিনতেন তাতেও তিনি লাভবান হতেন।

উরওয়াহ বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ঘোড়ার কপালের কেশদামে বরকত ও কল্যাণ আছে কিয়ামত অবধি। রাবী বলেন, আমি তার গৃহে সত্তরটি ঘোড়া দেখেছি। সুফ্ইয়ান বলেন, নবী (ﷺ)-এর জন্য যে বকরীটি কেনা হয়েছিল তা ছিল কুরবানীর জন্য।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেন, ঘোড়ার কপালের কেশদামে কিয়ামত অবধি কল্যাণ ও বরকত আছে।

আনাস ইবনে মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, ঘোড়ার কপালে কল্যাণ ও বরকত আছে।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, ঘোড়া তিন প্রকার। একজনের জন্য পুণ্য, আর একজনের জন্য আবরণ ও অন্য আর একজনের জন্য পাপের কারণ। সে ব্যক্তির জন্য পুণ্য, যে আল্লাহর রাস্তায় ঘোড়াকে সর্বদা প্রস্তুত রাখে এবং সে ব্যক্তি যখন লম্বা রশি দিয়ে ঘোড়াটি কোন চারণভূমি বা বাগানে বেধে রাখে তখন ঐ লম্বা দড়ির মধ্যে চারণভূমি অথবা বাগানের যে অংশ পড়বে তত পরিমাণ সাওয়াব সে পাবে। যদি ঘোড়াটি দড়ি ছিঁড়ে ফেলে এবং দুই একটি টিলা পার হয়ে কোথাও চলে যায় তার পরে তার লাদাগুলিও নেকী বলে গণ্য হবে। যদি কোন নদী-নালায় গিয়ে পানি পান করে, মালিক যদিও পানি পান করানোর ইচ্ছা করেনি তাও তার নেক আমলে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি নিজের অস্বচ্ছলতা দারিদ্রের গ্লানি ও পরমুখাপেক্ষিতা হতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ঘোড়া পালন করে এবং তার গর্দান ও পিঠে আল্লাহর যে হক রয়েছে তা ভুলে না যায়। তবে এই ঘোড়া তার জন্য আযাব হতে আবরণ হবে। অপর এক ব্যক্তি যে অহংকার, লোক দেখানো এবং আহলে ইসলামের সঙ্গে শত্রুতার কারণে ঘোড়া লালন-পালন করে এ ঘোড়া তার জন্য পাপের বোঝা হবে। নবী (ﷺ)-কে গাধা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বললেন, এ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন আয়াত আমার নিকট অবতীর্ণ হয়নি। তবে ব্যাপক অর্থবোধক অনন্য আয়াতটি আমার নিকট নাযিল হয়েছেঃ যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ নেক আমল করবে সে তার প্রতিফল অবশ্যই দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সেও তার প্রতিফল দেখতে পাবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) খুব সকালে খায়বারে পৌছলেন। তখন খায়বারবাসী কোদাল নিয়ে ঘর হতে বের হচ্ছিল। তাকে (ﷺ)-কে দেখে তারা বলতে লাগল, মুহাম্মাদ (ﷺ) পুরা সেনা বাহিনী নিয়ে এসে পড়েছে। (এ বলে) তারা দৌড়াদৌড়ি করে তাদের সুরক্ষিত কিল্লায় ঢুকে পড়ল। নবী (ﷺ) দু'হাত উপরে উঠিয়ে বললেন, "আল্লাহু আকবার" খায়বার ধ্বংস হোক, আমরা যখন কোন জাতির, আঙ্গিণায় অবতরণ করি তখন এসব সাবধানকৃত লোকদের প্রভাতটি অত্যন্ত অশুভ হয়।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হতে অনেক হাদীস আমি শুনেছি, তবে তা আমি ভুলে যাই। তিনি (ﷺ) বললেন, তোমার চাদরটি বিছাও। আমি চাদর বিছালাম। তিনি তার হাত দিয়ে চাদরের মধ্যে কী যেন রাখলেন এবং বললেন, চাদরটি চেপে ধর। আমি চেপে ধরলাম, অতঃপর আমি আর কোন হাদীস ভুলিনি।