মদীনার ফযীলাত (১৮৬৭-১৮৯০)
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মদিনা এখান হতে ওখান পর্যন্ত হারাম (রূপে গণ্য)। সুতরাং তার গাছ কাটা যাবে না এবং এখানে কোন ধরনের অঘটন (বিদ'আত, অত্যাচার ইত্যাদি) ঘটানো যাবে না। যদি কেউ এখানে কোন অঘটন ঘটায় তাহলে তার প্রতি আল্লাহর এবং ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের লানত (অভিশাপ)।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মাদ্বীনায় এসে মাসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। অতঃপর বলেনঃ হে বনূ নাজ্জার! আমার নিকট হতে মূল্য নিয়ে (ভূমি) বিক্রি কর। তারা বললেন, আমরা এর মূল্য কেবল আল্লাহর নিকটই চাই। এরপর নবী (ﷺ) -এর নির্দেশে মুশরিকদের কবর খুড়ে ফেলা হল, ধ্বংসাবশেষ সমতল করা হল, খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলা হল। কেবল মসজিদের কিবলার দিকে কিছু খেজুর গাছ সারিবদ্ধভাবে রাখা হল।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মাদ্বীনার দু' পাথুরে ভূমির মধ্যবর্তী স্থান আমার ঘোষণা মোতাবেক হারাম হিসাবে নির্ধারিত করা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (ﷺ) বনূ হারিসের নিকট তাশরীফ আনেন এবং বলেনঃ হে বনূ হারিসা! আমার ধারণা ছিল যে, তোমরা হারামের বাইরে অবস্থান করছ, অতঃপর তিনি সেদিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ (না তোমরা হারামের বাইরে নও) বরং তোমরা হারামের ভিতরেই আছ।
আলী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব এবং নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, এ সহীফা ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি আরো বলেন, 'আয়ির নামক জায়গা হতে অমুক জায়গা পর্যন্ত মদিনা হল হারাম। যদি কেউ এতে অঘটন ঘটায় অথবা আশ্রয় দেয়, তাহলে তার উপর আল্লাহর, ফেরেশ্তা ও মানুষের অভিসম্পাত। সে ব্যক্তির কোন ফরয এবং নফল ইবাদাত গৃহীত হবে না। তিনি আরো বলেন, মুসলিম কর্তৃক নিরাপত্তা দানের অধিকার সকলের ক্ষেত্রে সমান। তাই যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দেয়া নিরাপত্তাকে লঙ্ঘন করবে, তার প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের। আর কবূল করা হবে না তার কোন নফল কিংবা ফরয ইবাদাত। যে ব্যক্তি তার মাওলার (চুক্তিবদ্ধ মিত্রের) অনুমতি ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তার প্রতিও আল্লাহর এবং সব ফেরেশতা ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। তার ফরয কিংবা নফল কোন ইবাদাতই কবূল করা হবে না।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেনঃ আমি এমন এক জনপদে হিজরত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যে জনপদ অন্য সকল জনপদের উপর জয়ী হবে। লোকেরা তাকে ইয়াসরিব বলে থাকে। এ হল মদিনা। তা অবাঞ্ছিত লোকদেরকে এমনভাবে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে কামারের অগ্নিচুলা লোহার মরিচা দূর করে দেয়।
আবূ হুমাইদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এর সঙ্গে আমরা তাবূক যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করে মাদ্বীনার নিকটবর্তী স্থানে পৌছলে, তিনি বললেনঃ (মদিনা্) হল ত্বাবাহ।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, আমি যদি মাদ্বীনাতে কোন হরিণকে বেড়াতে দেখি তাহলে তাকে আমি তাড়াব না। (কেননা) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ মাদ্বীনার প্রস্তরময় পাহাড়ের দুই এলাকার মধ্যবর্তী এলাকা হল হারাম বা সম্মানিত স্থান।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, তোমরা উত্তম অবস্থায় মদিনাকে রেখে যাবে। আর জীবিকা অন্বেষণে বিচরণকারী পশু-পাখি ছাড়া আর কেউ একে আচ্ছন্ন করে নিতে পারবে না। সবশেষে যাদের মদিনা্তে একত্রিত করা হবে তারা হল মুযায়না গোত্রের দু'জন রাখাল। তারা তাদের বকরীগুলোকে হাক-ডাক দিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশেই মদিনাতে আসবে। এসে দেখবে মদিনা বন্য পশুতে ছেয়ে আছে। এরপর তারা সানিয়্যাতুল-বিদা নামক স্থানে পৌছতেই মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।
সুফইয়ান ইবন আবূ যুহায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ ইয়ামান বিজিত হবে, তখন একদল লোক নিজেদের সওয়ারী তাড়িয়ে এসে স্বীয় পরিবার-পরিজন এবং অনুগত লোকদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। অথচ মদিনা তাদের জন্য উত্তম ছিল, যদি তারা বুঝত। সিরিয়া বিজিত হবে, তখন একদল লোক নিজেদের সওয়ারী তাড়িয়ে এসে স্বীয় পরিবার-পরিজন এবং অনুগত লোকদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে; অথচ মাদ্বীনাই ছিল তাদের জন্য মঙ্গলজনক, যদি তারা জানত। এরপর ইরাক বিজিত হবে তখন একদল লোক নিজেদের সওয়ারী তাড়িয়ে এসে স্বজন এবং অনুগতদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে; অথচ মাদ্বীনাই তাদের জন্য ছিল মঙ্গলজনক, যদি তারা জানত।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ ঈমান মদিনাতে ফিরে আসবে যেমন সাপ তার গর্তে ফিরে আসে।
সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ) -কে বলতে শুনেছিঃ যে কেউ মাদ্বীনাবাসীর সাথে ষড়যন্ত্র বা প্রতারণা করবে, সে লবণ যেভাবে পানিতে গলে যায়, সেভাবে গলে যাবে।
উসামা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) মদিনার কোন একটি পাথর নির্মিত গৃহের উপর আরোহণ করে বললেনঃ আমি যা দেখি তোমরা কি তা দেখতে পাচ্ছ? (তিনি বললেন) বৃষ্টি বিন্দু পতিত হওয়ার স্থানসমূহের মত আমি তোমাদের গৃহসমূহের মাঝে ফিতনার স্থানসমূহ দেখতে পাচ্ছি। মা'মার এবং সুলাইমান ইবন কাসীর উক্ত হাদীস যুহরী থেকে বর্ণনার ক্ষেত্রে সুফইয়ানকে অনুসরণ করেছেন।
আবূ বাকরাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, মদিনাতে দাজ্জালের ত্রাস ও ভীতি প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ সময় মদিনার সাতটি প্রবেশ পথ থাকবে। প্রত্যেক পথে দু'জন করে ফেরেশতা (মোতায়েন) থাকবে।
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেনঃ মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফেরেশ্তা পাহারায় নিয়োজিত আছে। তাই প্লেগ রোগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।
আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ মক্কা ও মদিনা ব্যতীত এমন কোন শহর নেই যেখানে দাজ্জাল পদচারণ করবে না। মক্কা এবং মদিনার প্রত্যেকটি প্রবেশ পথেই ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে পাহারায় নিয়োজিত থাকবে। এরপর মদিনা তার অধিবাসীদেরকে নিয়ে তিনবার কেঁপে উঠবে এবং আল্লাহ তাআলা সমস্ত কাফির এবং মুনাফিকদেরকে বের করে দিবেন।
আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের সামনে দাজ্জাল সম্পর্কে এক দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন। বর্ণিত কথাসমূহের মাঝে তিনি এ কথাও বলেছিলেন যে, মদিনার প্রবেশ পথে অনুপ্রবেশ করা দাজ্জালের জন্য হারাম করে দেয়া হয়েছে। তাই সে মাদ্বীনার উদ্দেশে যাত্রা করে মদিনার নিকটবর্তী কোন একটি বালুকাময় জমিতে অবতরণ করবে। তখন তার নিকট এক ব্যক্তি যাবে যে উত্তম ব্যক্তি হবে বা উত্তম মানুষের একজন হবে এবং সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমিই হলে সে দাজ্জাল যার সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদেরকে অবহিত করেছেন। দাজ্জাল বলবে, আমি যদি একে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করতে পারি তাহলেও কি তোমরা আমার ব্যাপারে সন্দেহ করবে? তারা বলবে, না। এরপর দাজ্জাল লোকটিকে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবে। জীবিত হয়েই লোকটি বলবে, আল্লাহর শপথ! আজকের চেয়ে অধিক প্রত্যয় আমার আর কখনো ছিল না। অতঃপর দাজ্জাল বলবে, আমি তাকে হত্যা করে ফেলব। কিন্তু সে লোকটিকে হত্যা করতে আর সক্ষম হবে না।
জাবির হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন বেদুঈন নবী (ﷺ) -এর নিকট এসে ইসলামের উপর তার কাছে বায়আত গ্রহণ করলো। পরদিন সে জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় নবী (ﷺ) -এর কাছে এসে বললো, আমার (বায়আত) ফিরিয়ে নিন। নবী (ﷺ) তা প্রত্যাখ্যান করলেন। এভাবে তিনবার হল। অতঃপর বললেনঃ মদিনা কামারের হাপরের মত, যা তার আবর্জনা ও মরিচাকে দূরীভূত করে এবং খাঁটি ও নির্ভেজালকে পরিচ্ছন্ন করে।
যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) -এর সঙ্গে উহুদ যুদ্ধে যাত্রা করে তার কতিপয় সাথী ফিরে আসলে একদল লোক বলতে লাগল, আমরা তাদেরকে হত্যা করব, আর অন্য দলটি বলতে লাগলো, না, আমরা তাদেরকে হত্যা করব না। এ সময়ই (তোমাদের হল কী, তোমরা মুনাফিকদের ব্যাপারে দু'দল হয়ে গেলে?) (আন-নিসাঃ ৮৮) আয়াতটি নাযিল হয়। এরপর নবী (ﷺ) বললেনঃ মদিনা (বিশেষ কিছু) লোকদেরকে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে আগুন লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেনঃ হে আল্লাহ! মক্কাতে তুমি যে বরকত দান করেছ, মদিনাতে এর দ্বিগুণ বরকত দাও। উসমান ইবন উমার উক্ত হাদীস ইউনুস থেকে বর্ণনার ক্ষেত্রে জারীরের অনুসরণ করেছেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) সফর হতে ফিরে আসার পথে যখন মদিনার প্রাচীরগুলোর দিকে তাকাতেন, তখন তিনি মদিনার প্রতি ভালবাসার কারণে তার উটকে দ্রুত চালাতেন আর তিনি অন্য কোন জন্তুর উপর থাকলে তাকেও দ্রুত চালিত করতেন।
আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ সালামাহ্ গোত্রের লোকেরা মসজিদে নববীর নিকটে চলে যাওয়ার সংকল্প করলেন। নবী (ﷺ) মাদ্বীনাকে জনশূন্য করা অপছন্দ করলেন, তাই তিনি বললেনঃ হে বনূ সালামাহ্! মসজিদে নববীর দিকে তোমাদের হাটার সওয়াব কি তোমরা হিসাব কর না? এরপর তারা সেখানেই রয়ে গেলেন।
আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি হল জান্নাতের বাগানের একটি বাগান, আর আমার মিম্বরটি হল আমার হাউয (কাউসার)-এর উপর অবস্থিত।
আয়িশাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) মাদ্বীনায় শুভাগমন করলে আবূ বাকার ও বিলাল জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আবূ বাকার জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লে তিনি এ কবিতাংশটি আবৃত্তি করতেন: "প্রত্যেকেই স্বীয় পরিবারের মাঝে দিনাতিপাত করছে, অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতা অপেক্ষা সন্নিকটবর্তী।" আর বিলাল জ্বর থেকে সেরে উঠলে উচ্চস্বরে এ কবিতাংশ আবৃত্তি করতেন? "হায়, আমি যদি কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে মক্কার প্রান্তরে একটি রাত কাটাতে পারতাম আর আমার চারদিকে থাকত ইযখির এবং জালীল ঘাস। মাজান্না ঝর্ণার পানি পানের সুযোগ কখনো হবে কি? আমার জন্য শামা এবং ত্বফীল পাহাড় প্রকাশিত হবে কি?" আল্লাহর রাসূল (ﷺ)) বলেনঃ হে আল্লাহ! তুমি শায়বা ইবন রাবীআ, 'উতবা ইবন রাবীআ এবং উমায়্যাহ ইবন খালফের প্রতি লানত বর্ষণ কর; যেমনিভাবে তারা আমাদেরকে আমাদের মাতৃভূমি হতে বের করে মহামারীর দেশে ঠেলে দিয়েছে। এরপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) দোয়া করলেনঃ হে আল্লাহ! মদিনাকে আমাদের নিকট মক্কার মত বা তার চেয়েও বেশি প্রিয় করে দাও। হে আল্লাহ! আমাদের সা' ও মুদে বরকত দান কর এবং মাদ্বীনাকে আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও। এর জ্বরের প্রকোপকে বা মহামারীকে জুহফায় স্থানান্তরিত করে দাও। আয়িশাহ বলেন, আমরা যখন মদিনা এসেছিলাম তখন তা ছিল আল্লাহর যমীনে সর্বাপেক্ষা অধিক মহামারীর স্থান। তিনি আরো বলেন, সে সময় মাদ্বীনায় বুতহান নামক স্থানে একটি ঝর্ণা ছিল যেখান হতে বর্ণ ও বিকৃত স্বাদের পানি প্রবাহিত হত।
যায়েদ ইবন আসলাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন: উমর বললেন, হে আল্লাহ! আপনার পথে আমাকে শাহাদাত দান করুন এবং আমার মৃত্যু আপনার রসূলের শহরে হোক।"