bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

কুরআনের ফযীলাতসমূহ (৪৯৭৮-৫০৬২)

আবূ সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশাহ ও ইবন আব্বাস বলেছেন, নবী (ﷺ) মক্কায় দশ বছর অবস্থান করেন। এ সময় তার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং মদিনা্তেও দশ বছর (তার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে)।

পূর্বের হাদিসের মতই (৪৯৭৮)।

আবূ উসমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে অবগত করা হয়েছে যে, একদা জিবরীল নবী (ﷺ)-এর কাছে আগমন করলেন। তখন উম্মু সালামাহ তার কাছে ছিলেন। জিব্রীল তার সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। নবী (ﷺ) উম্মু সালামাহ-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? অথবা তিনি এ রকম কোন কথা জিজ্ঞেস করলেন। উম্মু সালামাহ বললেন, ইনি দাহইয়া। তারপর জিব্রীল উঠে দাড়ালেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, নবী (ﷺ)-এর ভাষণে জিব্রীল -এর খবর না শুনা পর্যন্ত আমি তাকে সে দাহইয়া-ই মনে করেছি। অথবা তিনি (বর্ণনাকারী) সে রকম কোন কথা বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারী মুতামির বলেন, আমার পিতা (সুলাইমান) বলেছেন, আমি উসমান-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কার নিকট থেকে এ ঘটনা শুনেছেন? তিনি বললেন, উসামাহ ইবন যায়দের নিকট হতে।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে তার যুগের প্রয়োজন মুতাবিক কিছু মুজিযা দান করা হয়েছে, যা দেখে লোকেরা তার প্রতি ঈমান এনেছে। আমাকে যে মুজিযা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, ওয়াহী- যা আল্লাহ আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। কাজেই আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন তাদের অনুসারীদের অনুপাতে আমার অনুসারীদের সংখ্যা অনেক অধিক হবে।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা নবী (ﷺ)-এর প্রতি ক্রমাগত ওয়াহী অবতীর্ণ করতে থাকেন এবং তার ইন্তিকালের নিকটবর্তী সময়ে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। এরপর তার ওফাত হয়।

জুনদুব হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অসুস্থ হলেন। ফলে এক কি দু'রাত তিনি উঠতে পারেননি। এক মহিলা তার কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমার মনে হয়, তোমার শায়ত্বন তোমাকে ত্যাগ করেছে। তখন আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাতের, যখন তা হয় নিঝুম। তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তোমার প্রতি বিরূপও হননি।"

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসমান যায়দ ইবন সাবিত, সাঈদ ইবন 'আস, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র এবং আবদুর রহমান ইবন হারিস ইবন হিশাম-কে পবিত্র কুরআন গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার জন্য আদেশ দিলেন এবং তাদেরকে বললেন, আল কুরআনের কোন শব্দের আরাবী হওয়ার ব্যাপারে যায়দ ইবন সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতভেদ দেখা দিলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। অতএব তারা তা-ই করলেন।

ইয়ালা ইবন উমাইয়াহ হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, হায়! রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় যদি তাকে দেখতে পারতাম। যখন নবী (ﷺ) 'জিয়িররানা' নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং চাঁদোয়া দিয়ে তার উপর ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং তার সঙ্গে ছিলেন কতিপয় সাহাবী। এমন সময় সুগন্ধি মেখে এক ব্যক্তি এলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সম্পর্কে আপনার মত কী, যে সুগন্ধি মেখে জুববা পরে ইহরাম বেধেছে? কিছু সময়ের জন্য নবী (ﷺ) অপেক্ষা করলেন, এমনি সময় ওয়াহী এলো। উমার ইয়ালা-কে ইশারা দিয়ে ডাকলেন। ইয়ালা এলেন এবং তার মাথা ঐ চাদরের ভেতর ঢোকালেন। দেখলেন, রাসূল (ﷺ) এর মুখমন্ডল লাল রক্তিম বর্ণ এবং কিছু সময়ের জন্য বেশ জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করছেন। তারপর তার থেকে এ অবস্থা সম্পূর্ণরূপে দূর হওয়ার পর তিনি বললেন, প্রশ্নকারী কোথায় যে কিছুক্ষণ পূর্বে আমাকে উমরাহ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল? লোকটিকে খুজে নবী (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে আসা হল। নবী (ﷺ) বললেন, যে সুগন্ধি তুমি তোমার শরীরে মেখেছে, তা তিনবার ধুয়ে ফেলবে আর জুববাটি খুলে ফেলবে। তারপর তুমি তোমার উমরাহতে ঐ সমস্ত কাজ করবে, যা তুমি হাজ্জের মধ্যে করে থাক।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইয়ামামাহর যুদ্ধে বহু লোক শহীদ হবার পর আবূ বাকর সিদ্দীক আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমার -ও তার কাছে উপস্থিত ছিলেন। আবূ বাকর বললেন, উমার আমার কাছে এসে বললেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কারীদের সংখ্যা অনেক। আমি আশংকা করছি, এমনিভাবে যদি কারীগণ শাহীদ হয়ে যান, তাহলে কুরআন মাজীদের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব আমি মনে করি যে, আপনি কুরআন সংকলনের নির্দেশ দিন। উত্তরে আমি উমার-কে বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) করেননি, সে কাজ তুমি কীভাবে করবে? উমার জবাবে বললেন, আল্লাহর কসম! এটা একটি উত্তম কাজ। উমার এ কথাটি আমার কাছে বার বার বলতে থাকলে অবশেষে আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন এবং এ ব্যাপারে উমার যা ভাল মনে করলেন আমিও তাই করলাম। যায়দ বলেন, আবূ বাকর সিদ্দীক আমাকে বললেন, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ব্যাপারে আমার কোন সংশয় নেই। তদুপরি তুমি রাসূল (ﷺ)-এর ওয়াহীর লেখক ছিলে। সুতরাং তুমি কুরআন মাজীদের অংশগুলোকে তালাশ করে একত্রিত কর। আল্লাহর শপথ! তারা যদি আমাকে একটি পর্বত এক স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিত, তাহলেও তা আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হত না। আমি বললাম, যে কাজ রাসূল (ﷺ) করেননি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন? তিনি বললেন, আল্লাহরকসম! এটা একটা কল্যাণকর কাজ। এ কথাটি আবূ বাকর সিদ্দীক আমার কাছে বার বার বলতে থাকেন, অবশেষে আল্লাহ আমার বক্ষকে উন্মোচন করে দিলেন সে কাজের জন্য, যে কাজের জন্য তিনি আবূ বাকর এবং উমার -এর বক্ষকে উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। এরপর আমি কুরআন অনুসন্ধানের কাজে লেগে গেলাম এবং খেজুর পাতা, প্রস্তরখন্ড ও মানুষের বক্ষ থেকে আমি তা সংগ্রহ করতে থাকলাম। এমনকি আমি সূরাহ তওবার শেষাংশ আবূ খুযায়মাহ আনসারী থেকে সংগ্রহ করলাম। এ অংশটুকু তিনি বাদে আর কারো কাছে আমি পাইনি। আয়াতগুলো হচ্ছে এইঃ তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তার জন্য তা কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। এরপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলো, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। আমি তারই উপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি। (১২৮-১২৯) তারপর সংকলিত সহীফাসমূহ মৃত্যু পর্যন্ত আবূ বাকর-এর কাছে রক্ষিত ছিল। তার মৃত্যুর পর তা উমার -এর কাছে সংরক্ষিত ছিল, যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন। অতঃপর তা উমার-এর কন্যা হাফসাহ-এর কাছে সংরক্ষিত ছিল।

আনাস ইবন মালিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযাইফাহ ইবন ইয়ামান একবার উসমান-এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য যুদ্ধ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাদের মতবিরোধ হুযাইফাহ্কে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান -কে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! কিতাব সম্পর্কে ইয়াহূদী ও নাসারাদের মত মতপার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উষ্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসমান হাফসাহ -এর কাছে এক ব্যক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব। হাফসাহ তখন সেগুলো উসমান-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান যায়দ ইবন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, সাঈদ ইবন আস এবং আবদুর রহমান ইবন হারিস ইবন হিশাম-কে নির্দেশ দিলেন। তারা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় উসমান তিনজন কুরাইশী ব্যক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন ব্যাপারে যদি যায়দ ইবন সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতভেদ দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় নাযিল হয়েছে। সুতরাং তারা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রন্থ লেখা হয়ে গেল, তখন উসমান মূল লিপিগুলো হাফসাহ-এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ-সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এছাড়া আলাদা আলাদা বা একত্রিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

ইবন শিহাব খারিজাহ ইবন যায়দ ইবন সাবিতের মাধ্যমে যায়দ ইবন সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থাকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরাহ আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়; অথচ আমি তা রাসূল (ﷺ)-কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা খোজ করতে লাগলাম। শেষে আমরা তা খুযাইমাহ ইবন সাবিত আনসারী-এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এইঃ "মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি"- (আল-আহযাব ৩৩/২৩)। তারপর আমরা এ আয়াতটি সংশ্লিষ্ট সূরার সঙ্গে মাসহাফে লিপিবদ্ধ করলাম।

যায়দ ইবন সাবিত হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বাকর আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি রাসূল (ﷺ)-এর ওয়াহী লিখতে। সুতরাং তুমি কুরআনের আয়াতগুলো খোজ কর। এরপর আমি খোজ করলাম। অবশেষে সূরাহ তওবার শেষ দু'টো আয়াত আমি আবূ খুযায়মা আনসারী-এর কাছে পেলাম। তিনি ছাড়া আর কারো কাছে আমি এর সন্ধান পায়নি। আয়াত দু'টো হচ্ছে এইঃ "তোমাদের কাছে এসেছেন তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল। তার পক্ষে অতি দুঃসহ-দুর্বহ সেসব বিষয় যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে, তিনি তোমাদের অতিশয় হিতকামী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, খুবই দয়ালু। এতদসত্ত্বেও তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে আপনি বলে দিন- আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মা'বুদ নেই। তারই উপর আমি ভরসা করি এবং তিনি বিরাট আরশের অধিপতি"- (আত্-তওবা ৯/১২৮-১২৯)।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'যারা (ঘরে) বসে থাকা ঈমানদার এবং যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে তারা সমান নয়।' (৪.৯৫) আয়াতটি অবতীর্ণ হলে নবী (ﷺ) বললেন, যায়দকে আমার কাছে ডেকে আন এবং তাকে বল সে যেন কাষ্ঠখন্ড, দোয়াত এবং কাঁধের হাড় (রাবী বলেন- অথবা তিনি বলেছেন, কাঁধের হাড় এবং দোয়াত) নিয়ে আসে। এরপর তিনি বললেন, লিখ। এ সময় অন্ধ সাহাবী আমর ইবন উম্মু মাকতূম নবী (ﷺ)-এর পেছনে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, আমি তো অন্ধ, আমার ব্যাপারে আপনার কী নির্দেশ? এ কথার প্রেক্ষিতে পূর্বোক্ত আয়াতের পরিবর্তে অবতীর্ণ হলঃ "সমান নয় সেসব মুমিন যারা বিনা ওজরে ঘরে বসে থাকে এবং ঐসব মুমিন যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জানমাল দিয়ে জিহাদ করে"- (আন-নিসা ৪/৯৫)।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, জিব্রীল আমাকে একভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে অন্যভাবে পাঠ করার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম এবং বার বার অন্যভাবে পাঠ করার জন্য ক্রমাগত অনুরোধ করতে থাকলে তিনি আমার জন্য তিলাওয়াতের পদ্ধতি বাড়িয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে তিনি সাত আঞ্চলিক ভাষায় তিলাওয়াত করে সমাপ্ত করলেন।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবন হাকীম-কে রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় সূরাহ ফুরকান তিলাওয়াত করতে শুনেছি এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে আমি তার কিরাআত শুনেছি। তিনি বিভিন্নভাবে কিরাআত পাঠ করেছেন; অথচ রাসূল (ﷺ) আমাকে এভাবে শিক্ষা দেননি। এ কারণে সালাতের মাঝে আমি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু বড় কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর সে সালাম ফিরালে আমি চাদর দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম, তোমাকে এ সূরাহ যেভাবে পাঠ করতে শুনলাম, এভাবে তোমাকে কে শিক্ষা দিয়েছে? সে বলল, রাসূল (ﷺ)-ই আমাকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। কারণ, তুমি যেভাবে পাঠ করেছ, এর থেকে ভিন্ন ভাবে রাসূল (ﷺ) আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে জোর করে টেনে রাসূল (ﷺ)-এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম, আপনি আমাকে সূরাহ ফুরকান যেভাবে পাঠ করতে শিখিয়েছেন এ লোককে আমি এর থেকে ভিন্নভাবে তা পাঠ করতে শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল (ﷺ) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। হিশাম, তুমি পাঠ করে শোনাও। তারপর সে সেভাবেই পাঠ করে শোনাল, যেভাবে আমি তাকে পাঠ করতে শুনেছি। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, এভাবেই অবতীর্ণ করা হয়েছে। এরপর বললেন, হে উমার! তুমিও পড়। সুতরাং আমাকে তিনি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবেই আমি পাঠ করলাম। এবারও রাসূল (ﷺ) বললেন, এভাবেও কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। এ কুরআন সাত আঞ্চলিক ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা বেশি সহজ, সেভাবেই তোমরা পাঠ কর।

ইউসুফ ইবন মাহিক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় এক ইরাকী ব্যক্তি এসে তাকে জিজ্ঞেস করলঃ কোন ধরনের কাফন শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, আফ্সোস তোমার প্রতি! এতে তোমার কী ক্ষতি? তারপর লোকটি বলল, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে আপনি আপনার কুরআনের কপি দেখান। তিনি বললেন, কেন? লোকটি বলল, এ তারতীবে কুরআনকে বিন্যস্ত করার জন্য। কারণ লোকেরা তাকে অবিন্যস্তভাবে পাঠ করে। আয়িশাহ বললেন, তোমরা এর যে অংশই আগে পাঠ কর না কেন, এতে তোমাদের কোন ক্ষতি নেই। মুফাস্সাল সূরাহ সমূহের মাঝে প্রথমত ঐ সূরাগুলো অবতীর্ণ হয়েছে যার মধ্যে জান্নাত ও জাহান্নামের উল্লেখ রয়েছে। তারপর যখন লোকেরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে লাগল তখন হালাল-হারামের বিধান সম্বলিত সূরাগুলো অবতীর্ণ হয়েছে। যদি প্রথমেই এ আয়াত অবতীর্ণ হত যে, তোমরা মদ পান করো না, তাহলে লোকেরা বলত, আমরা কখনো মদপান ত্যাগ করব না। যদি শুরুতে অবতীর্ণ হতো তোমার ব্যভিচার করো না, তাহলে তারা বলত আমরা কখনো অবৈধ যৌনাচার ত্যাগ করব না। আমি যখন খেলাধূলার বয়সী একজন বালিকা তখন মক্কায় মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি নিম্নলিখিত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়ঃ "অধিকন্তু কিয়ামত তাদের শাস্তির নির্ধারিত কাল এবং কিয়ামত হবে কঠিনতর ও তিক্ততর।" (54.46) (বিধান সম্বলিত) সূরাহ বাকারাহ ও সূরাহ নিসা আমি রাসূল (ﷺ)-এর সঙ্গে থাকাকালীন অবস্থায় অবতীর্ণ হয়। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর আয়িশাহ তার কাছে সংরক্ষিত কুরআনের কপি বের করলেন এবং সূরাসমূহ লেখালেন।

ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি সূরাহ বনী ইসরাঈল, সূরাহ কাহ্ফ, সূরাহ মারিয়াম, সূরাহ ত্বাহা এবং সূরাহ আম্বিয়া সম্পর্কে বলতেন যে, এগুলো হচ্ছে আমার সর্বপ্রথম সম্পদ এবং এগুলো আমার পুরাতন সম্পত্তি।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) মদিনায় আসার পূর্বে আমি 'তোমার মহান প্রভুর নামের পবিত্রতা বর্ণনা কর'(আল-আ'লা) নং 87, সূরাটি শিখেছি।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সমপর্যায়ের ঐ সূরাগুলো সম্পর্কে আমি খুব অবগত আছি, যা নবী (ﷺ) প্রতি রাকাতে জোড়া জোড়া পাঠ করতেন। তারপর আবদুল্লাহ দাড়ালেন এবং আলক্বামাহ তাকে অনুসরণ করলেন। যখন আলক্বামাহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসলেন তখন আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এগুলো হচ্ছে মোট বিশটি সূরা, ইবন মাসঊদ-এর সংকলন মুতাবিক মুফাস্সাল থেকে যার শুরু এবং যার শেষ হচ্ছে 'হামীম' 'আদ্দুখান' এবং 'আম্মা ইয়াতাসা আলুন'।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) কল্যাণের কাজে ছিলেন সর্বাধিক দানশীল, বিশেষভাবে রমাযান মাসে। (তার দানশীলতার কোন সীমা ছিল না) কেননা, রমাযান মাসের শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক রাত্রে জিব্রীল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তিনি তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। যখন জিব্রীল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তখন তিনি কল্যাণের জন্য প্রবহমান বায়ুর চেয়েও বেশি দানশীল হতেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, প্রতি বছর জিব্রীল নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে একবার কুরআন মাজীদ শোনাতেন ও শুনতেন। কিন্তু যে বছর তার ওফাত হয় সে বছর তিনি রাসূল (ﷺ)-কে দু'বার শুনিয়েছেন। প্রতি বছর নবী (ﷺ) রমাযানে দশ দিন ই'তিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তার ওফাত হয় সে বছর তিনি বিশ দিন ই'তিকাফ করেন।

মাসরুক হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবন আমর আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদের কথা উল্লেখ পূর্বক বলেছেন, আমি তাকে ঐ সময় থেকে ভালবাসি, যখন নবী (ﷺ)-কে আমি বলতে শুনেছি যে, তোমরা চার ব্যক্তি থেকে কুরআন শিক্ষা কর- আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ, সালিম, মুআয এবং উবাই ইবন কা'ব।

শাকীক ইবন সালামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! সত্তরেরও কিছু অধিক সূরাহ আমি রাসূল (ﷺ)-এর মুখ থেকে হাসিল করেছি। আল্লাহর কসম! নবী (ﷺ)-এর সাহাবীরা জানেন, আমি তাদের চেয়ে আল্লাহর কিতাব সম্বন্ধে অধিক জ্ঞাত; অথচ আমি তাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। শাকীক বলেন, সাহাবীগণ তার কথা শুনে কী বলেন তা শোনার জন্য আমি মাজলিসে বসে থাকলাম, কিন্তু আমি কাউকে অন্যরকম কথা বলে আপত্তি করতে শুনিনি।

আলক্বামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা হিম্স শহরে ছিলাম। এ সময় ইবন মাসঊদ সূরাহ ইউসুফ তিলাওয়াত করলেন। তখন এক ব্যক্তি বললেন, এটা এভাবে অবতীর্ণ হয়নি। এ কথা শুনে ইবন মাসঊদ বললেন, আমি রাসূল (ﷺ)-এর সামনে এ সূরাহ তিলাওয়াত করেছি। তিনি বলেছেন, তুমি সুন্দর পড়েছ। এ সময় তিনি ঐ লোকটির মুখ থেকে মদের গন্ধ পেলেন। তাই তিনি তাকে বললেন, তুমি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে মিথ্যা বলা এবং মদ পানের অপরাধ এক সঙ্গে করছ? এরপর তিনি তার ওপর নির্ধারিত শাস্তি জারি করলেন।

মাসরূক হতে বর্ণিত। আবদুল্লাহ বলেন, আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আল্লাহর কিতাবের অবতীর্ণ প্রতিটি সূরাহ সম্পর্কেই আমি জানি যে, তা কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং প্রতিটি আয়াত সম্পর্কেই আমি জানি যে, তা কোন ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। আমি যদি জানতাম যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত এবং সেখানে উট পৌছতে পারে, তাহলে সওয়ার হয়ে সেখানে পৌছে যেতাম।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ)-এর সময় কোন কোন ব্যক্তি কুরআন সংগ্রহ করেছেন? তিনি বললেন, চারজন এবং তারা চারজনই ছিলেন আনসারী সাহাবী। তারা হলেনঃ উবাই ইবন কা'ব, মুআয ইবন জাবাল, যায়দ ইবন সাবিত এবং আবূ যায়দ।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) ইন্তিকাল করলেন। তখন চারজন ব্যতীত আর কেউ কুরআন সংগ্রহ করেননি। তারা হলেন আবুদ্ দারদা, মুআয ইবন জাবাল, যায়দ ইবন সাবিত এবং আবূ যায়দ। আনাস বলেন, আমরা আবূ যায়দ-এর উত্তরসুরী।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার বলেছেন, আলী আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম বিচারক এবং উবাই আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম কারী। এতদ্সত্ত্বেও তিনি যা তিলাওয়াত করেছেন, আমরা তার কিছু অংশ বাদ দিই, অথচ তিনি বলছেন, আমি তা আল্লাহর রাসূলের যবান থেকে শুনেছি, কোন কিছুর বিনিময়ে আমি তা ত্যাগ করব না। আল্লাহ বলেছেন, "আমি কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে তা হতে উত্তম কিংবা তার মত কোন আয়াত এনে দিই।" (2.106)

আবূ সাঈদ ইবন মু'আল্লা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি সালাত আদায়রত ছিলাম। নবী (ﷺ) আমাকে ডাকলেন; কিন্তু আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম না। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাত আদায়রত ছিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা কি বলেননি, "হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও রাসূল যখন তোমাদেরকে আহবান করেন তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দাও।" (আল-আনফাল ৮/২৪) তারপর তিনি বললেন, তোমার মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে আমি কি তোমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরাহ শিক্ষা দেব না? তখন তিনি আমার হাত ধরলেন। যখন আমরা মাসজিদ থেকে বের হতে ইচ্ছা করলাম তখন আমি বললাম, আপনি তো বলেছেন মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে আমাকে কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরার কথা বলবেন। তিনি বললেন, সেটা হলঃ "আল হামদুলিল্লাহ রাব্বিল 'আলামীন"। এটা পুনঃ পুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত এবং কুরআন আজীম যা আমাকে দেয়া হয়েছে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা সফরে চলছিলাম। (পথিমধ্যে) অবতরণ করলাম। তখন একটি বালিকা এসে বলল, এখানকার গোত্রের সরদারকে সাপে কেটেছে। আমাদের পুরুষগণ বাড়িতে নেই। অতএব, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি ঝাড়-ফুক করতে পারেন? তখন আমাদের মধ্য থেকে একজন ঐ বালিকাটির সঙ্গে গেলেন। যদিও আমরা ভাবিনি যে সে ঝাড়-ফুক জানে। এরপর সে ঝাড়-ফুক করল এবং গোত্রের সরদার সুস্থ হয়ে উঠল। এতে সর্দার খুশী হয়ে তাকে ত্রিশটি বক্রী দান করলেন এবং আমাদের সকলকে দুধ পান করালেন। ফিরে আসার পথে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ভালভাবে ঝাড়-ফুক করতে জান (অথবা রাবীর সন্দেহ) তুমি কি ঝাড়-ফুক করতে পার? সে উত্তর করল, না, আমি তো কেবল উম্মুল কিতাব- সূরাহ ফাতিহা দিয়েই ঝাড়-ফুক করেছি। আমরা তখন বললাম, যতক্ষণ না আমরা নবী (ﷺ)-এর কাছে পৌছে তাকে জিজ্ঞেস করি ততক্ষণ কেউ কিছু বলবে না। এরপর আমরা মদিনায় পৌছে নবী (ﷺ)-এর কাছে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, সে কেমন করে জানল যে, তা (ফাতিহা) রোগ আরোগ্যের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে? তোমরা নিজেদের মধ্যে এগুলো বণ্টন করে নাও এবং আমার জন্যও একটা ভাগ রেখো। আবূ মা'মার .... আবূ সাঈদ থেকে এ রকমই বর্ণনা করেছেন।

আবূ মাসঊদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে দু'টি আয়াত তিলাওয়াত করে....।

আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, কেউ যদি রাতে সূরাহ বাকারার শেষ দু'টি আয়াত পাঠ করে, সেটাই তার জন্য যথেষ্ট।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে রমাযানে যাকাতের মাল হিফাজতের দায়িত্ব দিলেন। এক সময় এক ব্যক্তি এসে খাদ্য-সামগ্রী উঠিয়ে নেয়ার উপক্রম করল। আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর নবী (ﷺ)-এর কাছে নিয়ে যাব। এরপর পুরো হাদীস বর্ণনা করেন। তখন লোকটি বলল, যখন আপনি ঘুমাতে যাবেন, তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন। এর কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন পাহারাদার নিযুক্ত করা হবে এবং ভোর পর্যন্ত শায়ত্বন আপনার কাছে আসতে পারবে না। নবী (ﷺ) (ঘটনা শুনে) বললেন, (যে তোমার কাছে এসেছিল) সে সত্য কথা বলেছে, যদিও সে বড় মিথ্যাচারী শায়ত্বন।

বারাআ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি 'সূরাহ কাহ্ফ' তিলাওয়াত করছিলেন। তার ঘোড়াটি দু'টি রশি দিয়ে তার পাশে বাধা ছিল। তখন এক টুকরো মেঘ এসে তার উপর ছায়া দান করল। মেঘখন্ড ক্রমেই নিচের দিকে নেমে আসতে লাগল। আর তার ঘোড়াটি ভয়ে লাফালাফি শুরু করে দিল। সকাল বেলা যখন লোকটি নবী (ﷺ)-এর কাছে উক্ত ঘটনার কথা ব্যক্ত করেন, তখন তিনি বললেন, এ ছিল আস্সাকিনা (প্রশান্তি), যা কুরআন তিলাওয়াতের কারণে নাযিল হয়েছিল।

আসলাম হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোন এক সফরে রাত্রিকালে চলছিলেন এবং উমার ইবন খাত্তাব তার সঙ্গে ছিলেন। তখন উমার তার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার কোন উত্তর দিলেন না। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন; কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এবারও তিনি কোন উত্তর দিলেন না। এমন সময় উমার নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! তুমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে তিনবার প্রশ্ন করে কোন উত্তর পাওনি। উমার বললেন, এরপর আমি আমার উটকে দ্রুত হাকিয়ে লোকেদের অগ্রভাগে চলে গেলাম এবং আমি শঙ্কিত হলাম, না জানি আমার সম্পর্কে কুরআন অবতীর্ণ হয় নাকি। কিছুক্ষণ পর কেউ আমাকে ডাকছে, এ রকম আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি মনে আশংকা করলাম যে, হয়তো আমার ব্যাপারে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তখন আমি নবী (ﷺ)-এর নিকটে গেলাম এবং তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন আজ রাতে আমার উপর এমন একটি সূরাহ নাযিল হয়েছে, যা আমার কাছে সূর্যালোকিত সকল স্থান হতে উত্তম। এরপর তিনি পাঠ করলেন, "নিশ্চই আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি।" (48.1)

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে 'কুল হুআল্লাহু আহাদ' পড়তে শুনলেন। সে বার বার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে বললেন। যেন ঐ ব্যক্তি তাকে কম মনে করলেন। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন। এ সূরাহ হচ্ছে সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।

আবূ সাঈদ খুদরী বললেনঃ আমার ভাই ক্বাতাদাহ ইবন নুমান আমাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় এক ব্যক্তি শেষ রাতে সালাতে "কুল হুআল্লাহু আহাদ" ব্যতীত আর কোন সূরাই তিলাওয়াত করেননি। পরদিন সকালে লোকটি নবী (ﷺ)-এর কাছে আসলেন।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তার সাহাবীদেরকে বলেছেন, তোমাদের কেউ কি এক রাতে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করা সাধ্যাতীত মনে কর? এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। এরপর তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে যে, এটা পারবে? তখন তিনি বললেন, "কুল হুআল্লাহ আহাদ" সূরাহ ইখ্লাস কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, যখনই নবী (ﷺ) অসুস্থ হতেন তখনই তিনি 'সূরায়ে মু'আব্বিযাত' পড়ে নিজের উপর ফুক দিতেন। যখন তার রোগ কঠিন হয়ে গেল, তখন বারাকাত অর্জনের জন্য আমি এই সূরাহ পাঠ করে তার হাত দিয়ে শরীর মাসহ (মাসেহ) করিয়ে দিতাম।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত যে, প্রতি রাতে নবী (ﷺ) বিছানায় যাওয়ার প্রাক্কালে সূরাহ ইখ্লাস, সূরাহ ফালাক ও সূরাহ নাস পাঠ করে দু'হাত একত্র করে হাতে ফুক দিয়ে যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তার দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার এরূপ করতেন।

লায়স উসাইদ ইবন হুযায়র হতে বর্ণিত যে, একদা রাত্রে তিনি সুরা বাকারা পাঠ করছিলেন। তখন তার ঘোড়াটি তারই পাশে বাধা ছিল। হঠাৎ ঘোড়াটি ভীত হয়ে লাফ দিয়ে উঠল এবং ছুটাছুটি শুরু করল। যখন পাঠ বন্ধ করলেন তখনই ঘোড়াটি শান্ত হল। আবার পাঠ শুরু করলেন। ঘোড়াটি আগের মত করল। যখন পাঠ বন্ধ করলেন ঘোড়াটি শান্ত হল। আবার পাঠ আরম্ভ করলে ঘোড়াটি আগের মত করতে লাগল। এ সময় তার পুত্র ইয়াহইয়া ঘোড়াটির নিকটে ছিল। তার ভয় হচ্ছিল যে, ঘোড়াটি তার পুত্রকে পদদলিত করবে। তখন তিনি পুত্রকে টেনে আনলেন এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখতে পেলেন। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উক্ত ঘটনা বললেন। ঘটনা শুনে নবী (ﷺ) বললেনঃ হে ইবন হুদায়র! তুমি যদি পাঠ করতে, হে ইবন হুদায়র! তুমি যদি পাঠ করতে। ইবন হুযায়র আরয করলেন, আমার ছেলেটি ঘোড়ার নিকট থাকায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম হয়ত বা ঘোড়াটি তাকে পদদলিত করবে, সুতরাং আমি আমার মাথা উপরে উঠাতেই মেঘের মত কিছু দেখলাম, যা আলোর মত ছিল। আমি যখন বাইরে এলাম তখন আর কিছু দেখ্লাম না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তুমি কি জান, ওটা কী ছিল? বললেন, না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তারা ছিল মালায়িকাহ। তোমার তিলাওয়াত শুনে তোমার কাছে এসেছিল। তুমি যদি সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে তারাও ততক্ষণ পর্যন্ত এখানে অবস্থান করত এবং লোকেরা তাদেরকে দেখতে পেত। এরপর হাদীসের অন্য একটি সনদ বর্ণিত হয়েছে।

আবদুল আযীয ইবন রুফাই' হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং শাদ্দাদ ইবন মা'কিল ইবন আব্বাস-এর নিকট উপস্থিত হলাম। শাদ্দাদ ইবন মা'কিল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, নবী (ﷺ) কুরআন বাদে অন্য কিছু রেখে যাননি? ইবন আব্বাস উত্তর দিলেন, নবী (ﷺ) দুই মলাটের মাঝে যা কিছু আছে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু রেখে যাননি। আবদুল আযীয বললেন, আমরা মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়ার নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনিই বললেন যে, দুই মলাটের মাঝে (যা আছে তা) ব্যতীত আর কিছু রেখে যাননি।

আবূ মূসা আশআরী সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এ লেবুর মত যা সুস্বাদু এবং সুগন্ধযুক্ত। আর যে ব্যক্তি (মুমিন) কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন খেজুরের মত, যা সুগন্ধহীন, কিন্তু খেতে সুস্বাদু। আর ফাসিক-ফাজির ব্যক্তি যে কুরআন পাঠ করে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে রায়হান জাতীয় লতার মত, যার সুগন্ধ আছে, কিন্তু খেতে বিস্বাদ। আর ঐ ফাসিক যে কুরআন একেবারেই পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মাকাল ফলের মত, যা খেতেও বিস্বাদ এবং যার কোন সুগন্ধও নেই।

ইবন উমার সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, অতীতের জাতিসমূহের সঙ্গে তোমাদের জীবনকালের তুলনা হচ্ছে আসর ও মাগরিবের সালাতের মধ্যবর্তী সময়কালের মত। তোমাদের এবং ইয়াহূদী-নাসারাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করে তাদেরকে বলল, "তোমাদের মধ্যে কে এক কীরাতের বিনিময়ে দ্বি-প্রহর পর্যন্ত কাজ করবে?" ইয়াহূদীরা কাজ করল। তারপর সেই ব্যক্তি আবার বলল, তোমাদের মধ্যে কে এক কীরাতের বিনিময়ে দুপুর থেকে আসর পর্যন্ত কাজ করবে? নাসারারা কাজ করল। এরপর তোমরা (মুসলিমরা) আসরের সালাতের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত প্রত্যেকে দু' কীরাতের বিনিময় কাজ করেছ। তারা বলল, আমরা কম মজুরী নিয়েছি এবং অধিক কাজ করেছি। তিনি (আল্লাহ) বললেন, আমি কি তোমাদের অধিকারের ব্যাপারে জুলুম করেছি? তারা উত্তরে বলবে, না। এরপর আল্লাহ বলবেন, এটা আমার দয়া, আমি যাকে ইচ্ছে দিয়ে থাকি।

ত্বলহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী (ﷺ) কি কোন ওয়াসিয়্যাত করে গেছেন? তিনি বললেন, না। তখন আমি বললাম, যখন নবী (ﷺ) নিজে কোন ওয়াসিয়্যাত করে যাননি, তখন কী করে মানুষের জন্য ওয়াসিয়্যাত করাকে (কুরআন মাজীদে) বাধ্যতামূলক করা হল এবং তাদেরকে এজন্য নির্দেশ দেয়া হল। জবাবে তিনি বললেন, তিনি [নবী (ﷺ)] আল্লাহর কিতাব (অনুসরণ)-এর ওয়াসিয়্যাত করে গেছেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কোন বিষয়ের প্রতি ঐরূপ কান লাগিয়ে শুনেন না যেরূপ তিনি নবীর সুমধুর তিলাওয়াত শুনেন। রাবী বলেন, এর অর্থ সুস্পষ্ট করে আওয়াজের সঙ্গে কুরআন পাঠ করা।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) বলেন, আল্লাহ তাআলা কোন বিষয়ের প্রতি এরূপ কান লাগিয়ে শুনেন না যেরূপ তিনি নবীর সুমধুর তিলাওয়াত শুনেন। সুফ্ইয়ান বলেন, কুরআনই তার জন্য যথেষ্ট।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, দু'টি বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। প্রথমত, যাকে আল্লাহ তাআলা কিতাবের জ্ঞান দান করেছেন এবং তিনি তা থেকে গভীর রাতে তিলাওয়াত করেন। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন এবং তিনি সেই সম্পদ দিন-রাত দান করতে থাকেন।

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, দু'ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও সাথে ঈর্ষা করা যায় না। এক ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং সে তা দিন-রাত তিলাওয়াত করে। আর তা শুনে তার প্রতিবেশীরা তাকে বলে, হায়! আমাদেরকে যদি এমন জ্ঞান দেয়া হত, যেমন অমুককে দেয়া হয়েছে, তাহলে আমিও তার মত আমল করতাম। অন্য আর এক ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন এবং সে সম্পদ সত্য ও ন্যায়ের পথে খরচ করে। এ অবস্থা দেখে অন্য এক ব্যক্তি বলেঃ হায়! আমাকে যদি অমুক ব্যক্তির মত সম্পদ দেয়া হত, তাহলে সে যেমন ব্যয় করছে, আমিও তেমন ব্যয় করতাম।

উসমান সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়।

উসমান ইবন আফফান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম তারা, যারা নিজেরা কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক মহিলা নবী (ﷺ)-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বলল, সে নিজেকে আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য নিবেদন করার ইচ্ছা করেছে। এ কথা শুনে নবী (ﷺ) বললেন, আমার কোন মহিলার নিষ্প্রোয়োজন। জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, একে আমার সঙ্গে বিবাহ করিয়ে দিন। নবী (ﷺ) তাকে বললেন, তাকে একখানা কাপড় দাও। ঐ ব্যক্তি তার অপারগতার কথা জানাল, তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেন, তাকে একখানা লোহার আংটি হলেও দাও। এবারেও লোকটি আগের মত অপারগতা জানাল। তারপর নবী (ﷺ) তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার কি কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ আছে? লোকটি উত্তর করল, হা। আমার অমুক অমুক সূরাহ মুখস্থ আছে। তখন নবী (ﷺ) বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে, তার বিনিময়ে তোমার নিকট এ মহিলাটিকে বিবাহ দিলাম।

সাহল ইবন সাদ হতে বর্ণিত যে, একদা একা মহিলা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসুল! আমি আমার জীবনকে আপনার জন্য দান করতে এসেছি। এরপর নবী (ﷺ) তার দিকে তাকিয়ে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করে মাথা নিচু করলেন। মহিলাটি যখন দেখল যে নবী (ﷺ) কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না তখন সে বসে পড়ল। এমন সময় রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীদের একজন বলল, যদি আপনার কোন প্রয়োজন না থাকে, তবে এ মহিলাটির সঙ্গে আমার শাদী দিয়ে দিন। তিনি বললেন, তোমার কাছে কি কিছু আছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম কিছুই নেই। তিনি বললেন, তুমি তোমার পরিজনদের কাছে ফিরে যাও এবং দেখ কিছু পাও কি-না! এরপর লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কিছুই পেলাম না। নবী (ﷺ) বললেন, দেখ একটি লোহার আংটি হলেও! তারপর সে চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম, একটি লোহার আংটিও পেলাম না; কিন্তু এই যে আমার তহবন্দ আছে। সাহল বলেন, তার কোন চাদর ছিল না। অথচ লোকটি বলল, আমার তহবন্দের অর্ধেক দিতে পারি। এ কথা শুনে রাসূল (ﷺ) বললেন, এ তহবন্দ দিয়ে কী হবে? যদি তুমি পরিধান কর, তাহলে মহিলাটির কোন আবরণ থাকবে না। আর যদি সে পরিধান করে, তোমার কোন আবরণ থাকবে না। লোকটি বসে পড়লো, অনেকক্ষণ সে বসে থাকল। এরপর উঠে দাড়াল। রাসূল (ﷺ) তাকে ফিরে যেতে দেখে তাকে ডেকে আনলেন। যখন সে ফিরে আসল, নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কুরআনের কতটুকু মুখস্থ আছে? সে উত্তরে বলল, অমুক অমুক সূরাহ মুখস্থ আছে। সে এমনিভাবে একে একে উল্লেখ করতে থাকল। তখন নবী (ﷺ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ সকল সূরাহ মুখস্থ তিলাওয়াত করতে পার? সে উত্তর করল, হা! তখন নবী (ﷺ) বললেন, যাও তুমি যে পরিমাণ কুরআন মুখস্থ রেখেছ, তার বিনিময়ে এ মহিলাটির তোমার সঙ্গে বিবাহ দিলাম।

ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্তরে কুরআন গেঁথে (মুখস্থ) রাখে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মালিকের ন্যায়, যে উট বেধে রাখে। যদি সে উট বেধে রাখে, তবে সে উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু যদি সে বাধন খুলে দেয়, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, এটা খুবই খারাপ কথা যে, তোমাদের মধ্যে কেউ বলবে, আমি কুরআনের অমুক অমুক আয়াত ভুলে গেছি; বরং তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং, তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করতে থাক কেননা, তা মানুষের অন্তর থেকে উটের চেয়েও দ্রুত গতিতে চলে যায়।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমরা কুরআনের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। আল্লাহর কসম! যার হাতে আমার জীবন! কুরআন বাধন ছাড়া উটের চেয়েও দ্রুত গতিতে দৌড়ে (ভুলে) যায়।

আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন আমি রাসূল (ﷺ)-কে (উটের পিঠে) আরোহন অবস্থায় 'সূরাহ আল্ ফাত্হ' তিলাওয়াত করতে দেখেছি।

সাঈদ ইবন যুবায়র বলেন, যে সকল সূরাকে তোমরা মুফাসসাল বলো, তা হচ্ছে মুহ্কাম। রাবী বলেন, ইবন আব্বাস বলেছেন, যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইন্তিকাল করেন, তখন আমার বয়স দশ বছর এবং আমি ঐ বয়সেই মুহ্কাম আয়াতসমূহ শিখে নিয়েছিলাম।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি 'মুহকাম সূরাসমূহ আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় মুখস্থ করেছিলাম। রাবী সাঈদ বলেন, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, 'মুহকাম' অর্থ কী? তিনি বললেন, মুফাস্সাল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) এক ব্যক্তিকে মসজিদে নাববীতে কুরআন পড়তে শুনলেন। তিনি বললেন, তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, সে আমাকে অমুক সূরার অমুক আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছে। হিশাম হতে বর্ণিত পূর্বের হাদীসের অতিরিক্ত রয়েছে, "যা ভুলে গেছি অমুক অমুক সূরাহ থেকে।" আলী এবং 'আবদাহ হিশাম থেকে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) এক ব্যক্তিকে রাতে কুরআন পড়তে শুনে বললেন, আল্লাহ তাকে রহমত করুন। কেননা, সে আমাকে অমুক অমুক সূরার অমুক অমুক আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছে, যা আমি ভুলতে বসেছিলাম।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, কোন লোক এ কথা কেন বলে যে, আমি অমুক অমুক আয়াত ভুলে গেছি; বরং (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাকে ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

আবূ মাসঊদ আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যদি কোন ব্যক্তি সূরাহ বাক্বারার শেষ দু'টি আয়াত পাঠ করে, তবে এটাই তার জন্য যথেষ্ট।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবন হাকীম ইবন হিযামকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় 'সূরাহ ফুরকান' তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমি লক্ষ্য করলাম যে, সে বিভিন্ন কিরাআতে তা পাঠ করছে, যা আল্লাহর রাসূল আমাকে শিখাননি। যার ফলে তাকে সালাতের মধ্যেই ধরতে উদ্যত হলাম। অবশ্য আমি তার সালাত শেষে সালাম ফিরানো পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সালাত শেষ হতেই তার গলায় রুমাল পেঁচিয়ে ধরলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এইমাত্র আমি তোমাকে যা পাঠ করতে শুনলাম, তা তোমাকে কে শিখিয়েছে? সে উত্তর করল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে এরূপ শিখিয়েছেন। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছো! আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে ভিন্ন ভাবে তিলাওয়াত করা শিখিয়েছেন, যা তোমাকে তিলাওয়াত করতে শুনেছি। এরপর আমি তাকে টেনে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে উপস্থিত হলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এই ব্যক্তিকে ভিন্ন ভাবে 'সূরাহ ফুরকান' পাঠ করতে শুনেছি, যে পদ্ধতি আপনি আমাকে তিলাওয়াত করতে শিখাননি। অথচ আপনি আমাকে সূরাহ ফুরকান তিলাওয়াত শিখিয়েছেন। এরপর তিনি বললেন, হে হিশাম! পাঠ করো! সুতরাং আমি যেভাবে পাঠ করতে শুনেছি, সে সেই ভাবেই পাঠ করল। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, এভাবে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, হে উমার। তুমি পাঠ করো, সুতরাং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে যেভাবে শিখিয়েছিলেন, সেভাবে আমি পাঠ করলাম। এরপর তিনি বললেন, কুরআন এভাবেই অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বললেন, সাত কিরাআত বা পদ্ধতিতে পাঠ করার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এর মধ্যে যে পদ্ধতি তোমার জন্য সহজ, সে পদ্ধতিতে পড়।

আয়িশাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক কারীকে রাতে মসজিদে কুরআন মাজীদ পড়তে শুনলেন। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ তার প্রতি করুণা করুন। সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত মনে করিয়ে দিয়েছে, যা অমুক অমুক সূরাহ থেকে ভুলতে বসেছিলাম।

আবূ ওয়ায়িল সূত্রে আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। আবূ ওয়ায়িল বলেন, আমরা একদিন সকালে আবদুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। একজন লোক বলল, গতকাল রাতে আমি মুফাস্সাল সূরাসমূহ পাঠ করেছি। এ কথা শুনে আবদুল্লাহ বললেন, এত শীঘ্র পাঠ করা যেন কবিতা পাঠের মতো; অথচ আমরা নবী (ﷺ)-এর পাঠ শুনেছি এবং তা আমার ভালভাবে মনে আছে। নবী (ﷺ) থেকে যে সমস্ত সূরাহ পাঠ করতে আমি শুনেছি, তার সংখ্যা মুফাস্সাল হতে আঠারটি এবং 'আলিফ-লাম হামিম' হতে দু'টি।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। আল্লাহর বাণীঃ "হে নবী! আপনার জিহবাকে তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার জন্য নাড়াবেন না।" আল্লাহর এই কালাম সম্পর্কে তিনি বলেন, যখনই জিব্রীল ওয়াহী নিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট আসতেন, তখন নবী (ﷺ) খুব তাড়াতাড়ি জিহবা এবং ঠোঁট নাড়াতেন এবং এটা তার জন্য খুব কঠিন হত। আর এ অবস্থা সহজেই অন্যজনে আচ করতে পারত। এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা সূরাহ কিয়ামাহ এর এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ "হে নবী! তাড়াতাড়ি ওয়াহী মুখস্থ করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা নাড়াবেন না। এ মুখস্থ করিয়ে দেয়া ও পাঠ করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমারই। যখন আমি তা পাঠ করতে থাকি, তখন আপনি সে পাঠকে মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকুন। পরে এর অর্থ বুঝিয়ে দেয়াও আমার দায়িত্ব।" সুতরাং যখন জিব্রীল পাঠ করেন আপনি তার অনুসরণ করুন। এরপর থেকে যখন জিবরীল বলে যেতেন তখন নবী (ﷺ) চুপ থাকতেন। যখন তিনি চলে যেতেন, আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী তিনি তা পাঠ করতেন।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবন মালিক-কে নবী (ﷺ) এর 'কিরাআত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, নবী (ﷺ) (কোন কোন ক্ষেত্রে শব্দকে) দীর্ঘায়িত করে পাঠ করতেন।

ক্বাতাদাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস-কে নবী (ﷺ)-এর 'কিরাআত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী (ﷺ)-এর 'কিরাআত' কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বললেন, কোন কোন ক্ষেত্রে নবী (ﷺ) দীর্ঘ করতেন। এরপর তিনি 'বিস্মিল্লা-হির রহমা-নির রহীম' তিলাওয়াত করে শোনালেন এবং তিনি বললেন, নবী (ﷺ) 'বিস্মিল্লাহ" 'আর রহমান', 'আর রহীম' পড়ার সময় দীর্ঘায়িত করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল বলেন, নবী (ﷺ) উষ্ট্রির পিঠে অথবা উটের পিঠে আরোহিত অবস্থায় যখন উষ্ট্রটি চলছিল, তখন আমি তিলাওয়াত করতে দেখেছি। তিনি 'সূরাহ ফাত্হ' বা 'সূরাহ ফাত্হ'র অংশ বিশেষ অত্যন্ত নরম এবং মধুর ছন্দোময় সুরে পাঠ করছিলেন।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আবূ মূসা! তোমাকে দাঊদ-এর সুমধুর কন্ঠ দান করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, "আমার কাছে কুরআন পাঠ কর।" আবদুল্লাহ বললেন, আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করব; অথচ আপনার ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, আমি অন্যের নিকট থেকে তা শুনতে ভালবাসি।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমি কুরআন পাঠ কর। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করব? অথচ তা তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, হ্যা। এরপর আমি 'সূরাহ নিসা' পাঠ করলাম। যখন আমি এই আয়াত পর্যন্ত আসলাম 'চিন্তা করো আমি যখন প্রত্যেক উম্মাতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং সকলের ওপরে তোমাকে সাক্ষী হিসাবে হাযির করব তখন তারা কী করবে।' নবী (ﷺ) বললেন, আপাততঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি তার চেহারার দিকে তাকালাম, দেখলাম, তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।

সুফ্ইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ বলেন, আমাকে ইবন সুবরুমা বললেন, আমি দেখতে চাইলাম, সালাতে কী পরিমাণ আয়াত পাঠ করা যথেষ্ট এবং আমি তিন আয়াত বিশিষ্ট সূরার চেয়ে ছোট কোন সূরাহ পেলাম না। সুতরাং আমি বললাম, কারো জন্য তিন আয়াতের কম সালাতে পড়া উচিত নয়। আবূ মাসঊদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করলাম, তখন তিনি বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করছিলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, যদি কেউ সুরা বাকারার শেষ দু' আয়াত রাতে পাঠ করে, তাহলে তা তার জন্য যথেষ্ট।

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় মহিলার সঙ্গে শাদী দেন এবং প্রায়ই তিনি আমার সম্পর্কে আমার স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। আমার স্ত্রী বলত, সে কতইনা ভাল মানুষ যে, সে কখনও আমার বিছানায় আসেনি এবং শাদীর পর থেকে আমার সম্পর্কে খোজ খবরও নেয়নি। এ অবস্থা যখন দীর্ঘদিন পর্যন্ত চলতে থাকল তখন আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমার সম্পর্কে জানালেন। তখন নবী (ﷺ) আমার পিতাকে বললেন, তাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করুন। এরপর আমি নবী (ﷺ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন সওম পালন কর? আমি উত্তর দিলাম, প্রতিদিন সওম পালন করি। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এ অবস্থায় পূর্ণ কুরআন মাজীদ খতম করতে তোমার কত সময় লাগে? আমি উত্তর দিলাম, প্রত্যেক রাতেই এক খতম করি। তিনি বললেন, প্রত্যেক মাসে তিনদিন সওম পালন করবে এবং কুরআন এক মাসে এক খতম দেবে।" আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অধিক করার সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তাহলে প্রতি সপ্তাহে তিনদিন সওম পালন করবে। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অধিক করার শক্তি রাখি। তিনি বললেন, দু'দিন পর একদিন সওম পালন কর। আমি বললাম, আমি এর চেয়ে অধিক সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তাহলে সব চেয়ে উত্তম পদ্ধতির সওম পালন কর। তা হল, দাঊদ-এর সওম। তিনি এক দিন অন্তর একদিন সওম পালন করতেন এবং প্রতি সাত দিনে একবার আল্লাহর কিতাব খতম করতেন। হায়! আমি যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দেয়া সুবিধা গ্রহণ করতাম! এখন আমি দুর্বল বৃদ্ধ হয়ে গেছি। আবদুল্লাহ প্রত্যেক দিন তার পরিবারের একজন সদস্যের সামনে কুরআনের সপ্তমাংশ পাঠ করে শোনাতেন। দিবা ভাগে পাঠ করে দেখতেন, তার স্মরণশক্তি সঠিক আছে কিনা? যা তিনি রাতে পাঠ করবেন তা যেন সহজ হয় এবং যখনই তিনি শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির ইচ্ছা করতেন তখন কয়েক দিন সওম পালন বন্ধ রাখতেন এবং পরবর্তীতে ঐ ক'দিনের হিসাব করে সওম পালন করতেন। কেননা, তিনি রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় যে নিয়ম পালন করতেন পরে সে নিয়ম ত্যাগ করা অপছন্দ মনে করতেন। আবূ আবদুল্লাহ বলেন কেউ তিন দিনে, কেউ পাচ দিনে এবং অধিকাংশ লোক সাত দিনে কুরআন খতম করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন আমর বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কত দিনে তুমি কুরআন খতম কর?

আবদুল্লাহ ইবন আমর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, "এক মাসে কুরআন পাঠ সমাপ্ত কর।" আমি বললাম, "আমি এর চেয়ে অধিক করার শক্তি রাখি।" তখন নবী (ﷺ) বললেন, "তাহলে সাত দিনে তার পাঠ শেষ করো এবং এর চেয়ে কম সময়ে পাঠ শেষ করো না।"

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, তুমি আমার কাছে কুরআন পাঠ করো। আমি উত্তরে বললাম, আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করবো,অথচ আপনারই ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, আমি অন্যের নিকট হতে কুরআন পাঠ শোনা পছন্দ করি। আমি তখন সূরাহ নিসা পাঠ করলাম যখন আমি এ আয়াত পর্যন্ত পৌছলামঃ "তারপর চিন্তা করো, আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যে একজন করে সাক্ষী হাযির করব এবং এ সকলের ওপরে তোমাকে সাক্ষী হিসেবে হাযির করব তখন তারা কী করবে।" তখন তিনি আমাকে বললেন, "থাম!" আমি লক্ষ্য করলাম, তার [নবী (ﷺ)-এর] দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ বর্ণনা করেন। নবী (ﷺ) আমাকে বললেন, আমার কাছে কুরআন পাঠ করো। আমি বললাম, আমি আপনার নিকট কুরআন পাঠ করব, অথচ আপনারই ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, আমি অন্যের তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি।

আলী বলেনঃ আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, শেষ যামানায় এমন একদল মানুষের আবির্ভাব হবে, যারা হবে কমবয়স্ক এবং যাদের বুদ্ধি হবে স্বল্প। ভাল ভাল কথা বলবে, কিন্তু তারা ইসলাম থেকে এমনভাবে বের হয়ে যাবে যেমন তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। তাদের ঈমান গলার নীচে পৌছবে না। সুতরাং তোমরা তাদেরকে যেখানে পাও, হত্যা কর। এদের হত্যাকারীর জন্য কিয়ামতে পুরস্কার রয়েছে।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছিঃ ভবিষ্যতে এমন সব লোকের আগমন ঘটবে, যাদের সালাতের তুলনায় তোমাদের সালাতকে, তাদের সওমের তুলনায় তোমাদের সওমকে এবং তাদের আমলের তুলনায় তোমাদের আমলকে তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালীর নিচে (অন্তরে) প্রবেশ করবে না। এরা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে নিক্ষিপ্ত তীর ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়। আর শিকারী সেই তীরের আগা পরীক্ষা করে দেখতে পায়, তাতে কোন চিহ্ন নেই। সে তীরের ফলার পার্শ্বদেশে নযর করে; অথচ সেখানে কিছু দেখতে পায় না। শেষে ঐ ব্যক্তি কোন কিছু পাওয়ার জন্য তীরের নিম্নভাগে সন্দেহ পোষণ করে।

আবূ মূসা সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঐ মুমিন যে কুরআন পাঠ করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে, তার দৃষ্টান্ত ঐ লেবুর মত যা খেতে সুস্বাদু এবং গন্ধে চমৎকার। আর ঐ মুমিন যে কুরআন পাঠ করে না; কিন্তু এর অনুসারে আমল করে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ খেজুরের মত যা খেতে সুস্বাদু কিন্তু সুগন্ধ নেই। আর মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে; তার উদাহরণ হচ্ছে, ঐ রায়হানের মত, যার মন মাতানো খুশবু আছে, অথচ খেতে একেবারে বিস্বাদ। আর ঐ মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মাকাল ফলের মত, যা খেতে বিস্বাদ এবং গন্ধে দুর্গন্ধময়।

জুনদুব ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইবাদাত মনের চাহিদার অনুকূল হয় তিলাওয়াত করতে থাক এবং (তাতে) মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটলে পড়া ত্যাগ কর।

জুনদুব হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইবাদাত মনের চাহিদার অনুকূল হয় তিলাওয়াত করতে থাক এবং তাতে মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটলে পড়া ত্যাগ কর।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি এক ব্যক্তিকে আয়াত পড়তে শুনলেন। নবী (ﷺ)-কে যেভাবে পড়তে শুনতেন, তার থেকে সে অন্য রকম করে পড়ছিল। তখন ঐ ব্যক্তিকে তিনি নবী (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তোমরা উভয়ই সঠিকভাবে পাঠ করেছ। সুতরাং এভাবে কুরআন পাঠ করতে থাক। নবী (ﷺ) আরও বললেন, তোমাদের পূর্বেকার জাতিগুলো তাদের পারস্পরিক বিভেদের জন্যই ধ্বংস হয়ে গেছে।