bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

সাক্ষ্যদান (২৬৩৭-২৬৮৯)

ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আয়িশাহ-এর ঘটনা সম্পর্কে উরওয়াহ, ইবন মুসায়্যাব, আলক্বামাহ, ইবন ওয়াক্কাস এবং 'উবায়দুল্লাহ বর্ণনা করেছেন, তাদের বর্ণিত হাদীসের এক অংশ অন্য অংশের সত্যতা প্রমাণ করে, যা অপবাদকারীরা আয়িশাহ সম্পর্কে রটনা করেছিল। এদিকে ওয়াহী অবতরণ বিলম্বিত হল। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আলী ও উসামাহ-কে স্বীয় স্ত্রীকে পৃথক রাখার ব্যাপারে পরামর্শের জন্য ডেকে পাঠালেন। উসামাহ তখন বললেন, আপনার স্ত্রী সম্পর্কে ভাল ব্যতীত কিছুই আমরা জানি না। আর বারীরা বললেন, তার সম্পর্কে একটি মাত্র কথাই আমি জানি, তা এই যে, অল্প বয়স্কা হবার কারণে পরিবারের লোকদের জন্য আটা খামির করার সময় তিনি ঘুমিয়ে পড়েন আর সেই ফাকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তখন বললেন, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কে আমাকে সাহায্য করবে, যার জ্বালাতন আমার পরিবার-পরিজন পর্যন্ত পৌছেছে? আল্লাহর কসম! আমার স্ত্রী সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছু জানি না। আর এমন এক ব্যক্তির কথা তারা বলে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছু জানি না।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও উবাই ইবন কা'ব আনসারী সেই খেজুর বাগানের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন, যেখানে ইবন সাইয়াদ থাকত। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন প্রবেশ করলেন, তখন তিনি সতর্কতার সঙ্গে খেজুর শাখার আড়ালে চললেন। তিনি চাচ্ছিলেন, ইবন সাইয়াদ তাকে দেখে ফেলার আগেই তিনি তার কোন কথা শুনে নিবেন। ইবন সাইয়াদ তখন চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। আর গুন গুন বা (রাবী বলেছেন) গুমগুমভাবে কিছু বলছিল। এ সময় ইবন সাইয়াদের মা নবী (ﷺ)-কে খেজুর শাখার আড়ালে আড়ালে সতর্কতার সঙ্গে আসতে দেখে ইবন সাইয়াদকে বলল, হে সাফ! এই যে মুহাম্মাদ! তখন ইবন সাইয়াদ চুপ হয়ে গেল। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, সে (তার মা) যদি তাকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিত, তাহলে প্রকাশ পেয়ে যেত।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফা'আ কুরাযীর স্ত্রী নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফা'আর স্ত্রী ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে বায়েন তালাক দিয়ে দিল। পরে আমি আবদুর রহমান ইবন যুবাইরকে বিয়ে করলাম। কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে কাপড়ের আচলের মতো নরম কিছু (তার পুরুষত্ব নাই)। তখন নবী (ﷺ) বললেন, তবে কি তুমি রিফা'আর নিকট ফিরে যেতে চাও? না, তা হয় না, যতক্ষণ না তুমি তার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে আর সে তোমার মধুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আবু বাকর তখন তার নিকট উপবিষ্ট ছিলেন। আর খালিদ ইবন সাঈদ ইবন 'আস দ্বারপ্রান্তে প্রবেশের অনুমতির অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি বললেন, হে আবূ বাকর! এই নারী নবী (ﷺ)-এর নিকটে উচ্চ আওয়াজে যা বলছে, তা কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন না?

উকবাহ ইবন হারিস হতে বর্ণিত যে, তিনি আবূ ইহাব ইবন আযীযের কন্যাকে বিবাহ করলেন। পরে এক মহিলা এসে বলল, আমি তো উকবাহ এবং যাকে সে বিয়ে করেছে দু'জনকেই দুধ পান করিয়েছি। উকবাহ তাকে বললেন, এটা তো আমার জানা নেই যে, আপনি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন আর আপনিও এ বিষয়ে আমাকে অবহিত করেননি। অতঃপর আবূ ইহাব পরিবারের নিকট লোক পাঠিয়ে তিনি তাদের নিকট জানতে চাইলেন। তারা বলল, সে আমাদের মেয়েকে দুধ পান করিয়েছে বলে তো আমাদের জানা নেই। তখন তিনি মদিনার উদ্দেশে সাওয়ার হলেন এবং নবী (ﷺ)কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, যখন এরূপ বলা হয়েছে তখন এ (বিবাহ) কিভাবে সম্ভব? তখন উকবাহ তাকে ত্যাগ করলেন। আর সে অন্য জনকে বিয়ে করল।

উমার ইবন খাত্তাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সময়ে কিছু ব্যক্তিকে ওয়াহীর ভিত্তিতে পাকড়াও করা হত। এখন যেহেতু ওয়াহী বন্ধ হয়ে গেছে, সেহেতু এখন আমাদের সামনে তোমাদের যে ধরনের আমল প্রকাশ পাবে, সেগুলোর ভিত্তিতেই তোমাদের বিচার করব। কাজেই যে ব্যক্তি আমাদের সামনে ভালো প্রকাশ করবে তাকে আমরা নিরাপত্তা দান করব এবং নিকটে আনবো, তার অন্তরের বিষয়ে আমাদের কিছু করণীয় নেই। আল্লাহই তার অন্তরের বিষয়ে হিসাব নিবেন। আর যে ব্যক্তি আমাদের সামনে মন্দ আমল প্রকাশ করবে, তার প্রতি আমরা তাদের নিরাপত্তা প্রদান করব না এবং সত্যবাদী বলে জানব না; যদিও সে বলে যে, তার অন্তর ভালো।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর সম্মুখ দিয়ে এক জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ব্যক্তিটি সম্পর্কে সবাই প্রশংসা করছিলেন। তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। পরে আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। লোকেরা তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করল কিংবা বর্ণনাকারী অন্য কোন শব্দ বলেছেন। তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। তখন বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে আবার ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। তিনি বললেন, মুমিনগণ হলেন পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষ্যদাতা যাদের সাক্ষ্য গৃহীত হয়।

আবুল আসওয়াদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমি মদিনায় আসলাম। সেখানে তখন মহামারী দেখা দিয়েছিল। এতে ব্যাপক হারে লোক মারা যাচ্ছিল। আমি উমার-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা অতিক্রম করল এবং তার সম্পর্কে ভালো ধরনের মন্তব্য করা হল। তা শুনে উমার বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। অতঃপর আরেকটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কেও ভালো মন্তব্য করা হল। তা শুনে তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। অতঃপর তৃতীয় জানাযা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং তার সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করা হল। এবারও তিনি বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ওয়াজিব হয়ে গেছে, হে আমীরুল মুমিনীন? তিনি বললেন, নবী (ﷺ) যেমন বলেছিলেন, আমিও তেমন বললাম। কোন মুসলিম সম্পর্কে চারজন ব্যক্তি ভালো সাক্ষ্য দিলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, আর তিনজন সাক্ষ্য দিলে? তিনি বললেন, তিনজন সাক্ষ্য দিলেও। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, দু'জন সাক্ষ্য দিলে? তিনি বললেন, দু'জন সাক্ষ্য দিলেও। অতঃপর আমরা একজনের সাক্ষ্য সম্পর্কে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আফলাহ্ আমার সাক্ষাতের অনুমতি চাইলেন। আমি অনুমতি না দেয়ায় তিনি বললেন, আমি তোমার চাচা, অথচ তুমি আমার সঙ্গে পর্দা করছ? আমি বললাম, তা কিভাবে? তিনি বললেন, আমার ভাইয়ের স্ত্রী, আমার ভাইয়ের মিলনজাত দুধ তোমাকে পান করিয়েছে। আয়িশাহ বলেন, এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আফলাহ্ ঠিক কথাই বলেছে। তাকে অনুমতি দিও।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) হামযাহর মেয়ে সম্পর্কে বলেছেন, সে আমার জন্য হালাল নয়। কেননা বংশ কারণে যা হারাম হয়, দুধ পানের সম্পর্কের কারণেও তা হারাম হয়, আর সে আমার দুধ ভাইয়ের মেয়ে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তার নিকট অবস্থান করছিলেন। এমন সময় তিনি জনৈক ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন। সে হাফসাহ- এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করছে। আয়িশাহ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই একজন ব্যক্তি আপনার ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করছে। তিনি বলেন, তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, তাকে হাফসাহর অমুক দুধ চাচা বলে মনে হচ্ছে। তখন আয়িশাহ বললেন, আচ্ছা আমার অমুক দুধ চাচা যদি জীবিত থাকত তাহলে সে কি আমার ঘরে প্রবেশ করতে পারত? আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, হ্যা, পারত। কেননা, জন্মসূত্রে যা হারাম, দুধপানও তাকে হারাম করে।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) আমার নিকট আসলেন, তখন আমার নিকট জনৈক ব্যক্তি ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আয়িশাহ! এ কে? আমি বললাম, আমার দুধ ভাই। তিনি বললেন, হে আয়িশাহ! কে তোমার সত্যিকার দুধ ভাই তা যাচাই করে দেখে নিও। কেননা, ক্ষুধার কারণে দুধ পানের ফলেই শুধু দুধ সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

উরওয়াহ ইবন যুবায়র হতে বর্ণিত যে, মক্কা বিজয়ের সময় এক মহিলা চুরি করলে তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট হাযির করা হল, অতঃপর তিনি তার সম্পর্কে নির্দেশ জারি করলে তার হাত কাটা হল। আয়িশাহ বলেন, অতঃপর খাঁটি তাওবা করল এবং বিয়ে করল। অতঃপর সে আসলে আমি তার প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সমীপে উপস্থাপন করতাম।

যায়দ ইবন খালিদ হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অবিবাহিত ব্যভিচারী সম্পর্কে একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের নির্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন।

নুমান ইবন বাশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার মাতা আমার পিতাকে তার মালের কিছু আমাকে দান করতে বললেন। পরে তা' দেয়া ভালো মনে করলে আমাকে তা দান করেন। তিনি (আমার মাতা) তখন বললেন, নবী (ﷺ)-কে সাক্ষী মানা ব্যতীত আমি রাজী নই। অতঃপর তিনি (আমার পিতা) আমার হাত ধরে আমাকে নবী (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে গেলেন, আমি তখন বালক মাত্র। তিনি বললেন, এর মা বিনতে রাওয়াহা একে কিছু দান করার জন্য আমার নিকট আবেদন জানিয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সে ব্যতীত তোমার আর কোন ছেলে আছে? তিনি বললেন, হ্যা, আছে। নুমান বলেন, আমার মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন, আমাকে অন্যায় কাজে সাক্ষী করবেন না। আর আবূ হারীয ইমাম শা'বী সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আমি অন্যায় কাজে সাক্ষী হতে পারি না।

ইমরান ইবন হুসাইন হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আমার যুগের লোকেরাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা, অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা। ইমরান বলেন, আমি বলতে পারছি না, নবী (ﷺ) (তার যুগের) পরে দুই যুগের কথা বলেছিলেন, বা তিন যুগের কথা। নবী (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের পর এমন লোকেরা আসবে, যারা খিয়ানত করবে, আমানত রক্ষা করবে না। সাক্ষ্য দিতে না ডাকলেও তারা সাক্ষ্য দিবে। তারা মান্নত করবে কিন্তু তা পূর্ণ করবে না। তাদের মধ্যে মেদওয়ালাদের প্রকাশ ঘটবে।

আবদুল্লাহ (ইবন মাসঊদ) সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী এরপরে এমন সব ব্যক্তি আসবে যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দিবে, আবার সাক্ষ্য দেয়ার আগে কসম করে বসবে। ইবরাহীম (নাখ্ঈ) বলেন, আমাদেরকে সাক্ষ্য দিলে ও অঙ্গীকার করলে মারতেন।

আনাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-কে কাবীরাহ গুনাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।

আবূ বাকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) একদা তিনবার বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহগুলো সম্পর্কে অবহিত করব না? সকলে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া। তিনি হেলান দিয়ে বসেছিলেন; এবার সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, শুনে রাখ! মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, এ কথাটি তিনি বার বার বলতে থাকলেন। এমনকি আমরা বলতে লাগলাম, আর যদি তিনি না বলতেন।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) জনৈক ব্যক্তিকে মসজিদে (কুরআন) পড়তে শুনলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। সে আমাকে অমুক অমুক আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, যা আমি অমুক অমুক সূরা হতে ভুলে গিয়েছিলাম। 'আববাদ ইবন আবদুল্লাহ আয়িশাহ হতে এতটুকু অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ﷺ) আমার ঘরে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করলেন। সে সময় তিনি মসজিদে সালাত রত 'আববাদের আওয়াজ শুনতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আয়িশাহ! এটা কি 'আববাদের কণ্ঠস্বর? আমি বললাম, হ্যা। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ 'আববাদের প্রতি রহম করুন।

আবদুল্লাহ ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, বিলাল রাত থাকতেই আযান দিয়ে থাকে। সুতরাং ইবন উম্মে মাকতূম আযান দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করতে পার। অথবা তিনি বলেন, ইবন উম্মে মাকতূমের আযান শোনা পর্যন্ত। ইবন মাকতূম অন্ধ ছিলেন, 'সকাল হয়েছে' লোকেরা এ কথা তাকে না বলা পর্যন্ত তিনি আযান দিতেন না।

মিসওয়ার ইবন মাখরামাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর নিকট 'কাবা' (পোশাক) আসল। আমার পিতা মাখরামাহ তা শুনে আমাকে বললেন, আমাকে তার নিকট নিয়ে চল। সেখান থেকে তিনি আমাদের কিছু দিতেও পারেন। আমার পিতা দরজার সামনে দাড়িয়ে কথা বললেন, নবী (ﷺ) তার আওয়াজ চিনতে পারলেন। নবী (ﷺ) তখন একটি 'কাবা' সঙ্গে করে বেরিয়ে এলেন, তিনি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করছিলেন এবং বলছিলেন, আমি এটা তোমার জন্য যত্ন করে রেখেছিলাম। আমি এটা তোমার জন্য যত্ন করে রেখেছিলাম।

আবূ সাঈদ খুদরী সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নারীদের সাক্ষ্য কি পুরুষদের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? উপস্থিতরা বলল, অবশ্যই অর্ধেক। তিনি বলেন, এটা নারীদের জ্ঞানের ত্রুটির কারণেই।

উকবাহ্ ইবন হারিস হতে বর্ণিত যে, তিনি উম্মু ইয়াহ্ইয়া বিনতে আবূ ইহাবকে বিবাহ করলেন। তিনি বলেন, তখন কালো বর্ণের এক দাসী এসে বলল, আমি তো তোমাদের দু'জনকে দুধপান করিয়েছি। সে কথা আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি আমার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি সরে গেলাম। বিষয়টি আবার তার নিকট উত্থাপন করলাম। তিনি তখন বললেন, এ বিয়ে হয় কী করে? সে তো দাবি করছে যে, তোমাদের দু'জনকেই সে দুধ পান করিয়েছে। অতঃপর তিনি তাকে (উকবাহকে) তার (উম্মু ইহাবের) সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে বললেন।

উকবাহ ইবন হারিস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক নারীকে আমি বিয়ে করলাম। কিন্তু আরেক নারী এসে বলল, আমি তো তোমাদের দু'জনকে দুগ্ধপান করিয়েছি, তখন আমি নবী (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, এমন কথা বলা হয়েছে তখন বিয়ে কিভাবে সম্ভব? তাকে তুমি ত্যাগ কর। অথবা তিনি সে রকম কিছু বললেন।

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ হতে বর্ণিত। মিথ্যা অপবাদকারীরা যখন তার সম্পর্কে অপবাদ রটনা করল এবং আল্লাহ তা হতে তার পবিত্রতা ঘোষণা করলেন। রাবীগণ বলেন, আয়িশাহ বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরে বের হবার ইচ্ছা করলে স্বীয় স্ত্রীদের মধ্যে কুর'আ ঢালার মাধ্যমে সফর সঙ্গিণী নির্বাচন করতেন। তাদের মধ্যে যার নাম বেরিয়ে আসত তাকেই তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় তিনি আমাদের মধ্যে কুর'আ ঢাললেন, তাতে আমার নাম বেরিয়ে এলো। তাই আমি তার সঙ্গে (সফরে) বের হলাম। এটা পর্দার নির্দেশ নাযিল হবার পরের ঘটনা। আমাকে হাওদার ভিতরে সাওয়ারীতে উঠানো হত, আবার হাওদায় থাকা অবস্থায় নামানো হত। এভাবেই আমরা সফর করতে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ যুদ্ধ শেষ করে যখন প্রত্যাবর্তন করলেন এবং আমরা মদ্বীনার নিকট পৌছে গেলাম তখন এক রাতে তিনি মনযিল ত্যাগ করার ঘোষণা দিলেন। উক্ত ঘোষণা দেয়ার সময় আমি উঠে সেনাদলকে অতিক্রম করে গেলাম এবং নিজের প্রয়োজন সেরে হাওদায় ফিরে এলাম। তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি আযফার দেশীয় সাদা কালো পাথরের তৈরী আমার একটা মালা ছিঁড়ে পড়ে গেছে। তখন আমি আমার মালার সন্ধানে ফিরে গেলাম এবং সন্ধান কার্য আমাকে বিলম্বিত করে দিল। ওদিকে যারা আমার হাওদা উঠিয়ে দিত তারা তা উঠিয়ে যে উটে আমি সওয়ার হতাম, তার পিঠে রেখে দিল। তাদের ধারণা ছিল যে, আমি হাওদাতেই আছি। তখনকার মেয়েরা দুবলা পাতলা হত, মোটা সোটা হত না। কেননা খুব সামান্য খাবার তারা খেতে পেত। তাই হাওদা উঠাতে গিয়ে তার ভার তাদের নিকট অস্বাভাবিক বলে মনে হল না। তদুপরি সে সময় আমি অল্প বয়স্কা কিশোরী ছিলাম এবং তখন তারা হাওদা উঠিয়ে উট হাকিয়ে রওনা হয়ে গেল। এদিকে সেনাদল চলে যাবার পর আমি আমার মালা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাদের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। তখন আমি আমার জায়গায় এসে বসে থাকাই স্থির করলাম। আমার ধারণা ছিল যে, আমাকে না পেয়ে আবার এখানে তারা ফিরে আসবে। বসে থাকা অবস্থায় আমার দু' চোখে ঘুম এলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবন মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী এবং পরে যাকওয়ানী হিসাবে পরিচিত ছিলেন, সেনা দলের পিছনে (পরিদর্শক হিসাবে) রয়ে গিয়েছিলেন। সকালের দিকে আমার অবস্থান স্থলের কাছাকাছি এসে পৌছলেন এবং একজন ঘুমন্ত মানুষের শরীর দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। পর্দার বিধান নাযিলের আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। যে সময় তিনি উট বসাচ্ছিলেন সে সময় তার 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' শব্দে আমি জেগে গেলাম। তিনি উটের সামনে পা চেপে ধরলে আমি তাতে সওয়ার হলাম। আর তিনি আমাকে নিয়ে সাওয়ারী হাকিয়ে চললেন। সেনাদল ঠিক দুপুরে যখন বিশ্রাম করছিল, তখন আমরা সেনাদলে পৌছলাম। সে সময় যারা ধ্বংস হবার, তারা ধ্বংস হল। অপবাদ রটনায় যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সে হলো আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল। আমরা মদিনায় উপস্থিত হলাম এবং আমি এসেই একমাস অসুস্থতায় ভুগলাম। এদিকে কতিপয় ব্যক্তি অপবাদ রটনাকারীদের রটনা নিয়ে চর্চা করতে থাকল। আমার অসুস্থতার সময় এ বিষয়টি আমাকে সন্দিহান করে তুলল যে, নবী (ﷺ)-এর পক্ষ হতে সেই স্নেহ আমি অনুভব করছিলাম না, যা আমার অসুস্থতার সময় সচরাচর আমি অনুভব করতাম। তিনি শুধু ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে বলতেন কেমন আছ? আমি সে বিষয়ের কিছুই জানতাম না। শেষ পর্যন্ত খুব দুর্বল হয়ে পড়লাম। (একরাতে) আমি ও উম্মু মিসতাহ প্রয়োজন সারার উদ্দেশে ময়দানে বের হলাম। আমরা রাতেই শুধু সেদিকে যেতাম। এ আমাদের ঘরগুলোর নিকটবর্তী স্থানে পায়খানা বানানোর আগের নিয়ম। জঙ্গলে কিংবা দূরবর্তী স্থানে প্রয়োজন সারার ব্যাপারে আমাদের অবস্থাটা প্রথম যুগের আরবদের মতোই ছিল। যাই হোক, আমি এবং উম্মু মিসতাহ বিনতে আবূ রূহম হেটে চলছিলাম। ইত্যবসরে সে তার চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল এবং বলল, মিসতাহ এর জন্য দুর্ভোগ। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলেছ। বাদার যুদ্ধে শরীক হয়েছে, এমন এক ব্যক্তিকে তুমি অভিশাপ দিচ্ছ! সে বলল, হে সরলমনা! যে সব কথা তারা উঠিয়েছে, তা কি তুমি শুনোনি? অতঃপর অপবাদ রটনাকারীদের সব রটনা সম্পর্কে সে আমাকে অবহিত করল। তখন আমার রোগের উপর তীব্রতা বৃদ্ধি পেল। আমি ঘরে ফিরে আসার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ? আমি বললাম, আমাকে আমার পিতা-মাতার নিকট যাবার অনুমতি দিন। তিনি [আয়িশাহ] বলেন, আমি তখন তাদের (পিতা-মাতার) নিকট হতে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার পিতা-মাতার নিকট গেলাম। অতঃপর আমি মাকে বললাম, লোকেরা কী বলাবলি করে? তিনি বললেন, বেটি! ব্যাপারটাকে নিজের জন্য হালকাভাবেই গ্রহণ কর। আল্লাহর শপথ! এমন সুন্দরী রমণী খুব কমই আছে যাকে তার স্বামী ভালোবাসে আর তার একাধিক সতীনও আছে; অথচ ওরা তাকে উত্যক্ত করে না। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা সত্যি তবে এসব কথা রটিয়েছে? তিনি (আয়িশাহ) বলেন, ভোর পর্যন্ত সে রাত আমার এমনভাবে কেটে গেল যে, চোখের পানি আমার বন্ধ হল না এবং ঘুমের একটু পরশও পেলাম না। এভাবে ভোর হল। পরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ওয়াহীর বিলম্ব দেখে আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগের ব্যাপারে ইবন আবূ তালিব ও উসামাহ ইবন যায়দকে ডেকে পাঠালেন। যাই হোক, উসামাহ পরিবারের জন্য তার [নবী (ﷺ)-এর] ভালোবাসার প্রতি লক্ষ্য করে পরামর্শ দিতে দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম (তার সম্পর্কে) ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমরা জানি না, আর আলী ইবন আবূ তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিছুতেই আল্লাহ আপনার পথ সংকীর্ণ করেননি। তাকে ব্যতীত আরো অনেক নারী আছে। আপনি না হয় বাদীকে জিজ্ঞেস করুন সে আপনাকে সত্য কথা বলবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন (বাদী) বারীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হে বারীরা! তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেয়েছ? বারীরা বলল, আপনাকে যিনি সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তার কসম করে বলছি, না, তেমন কিছু দেখিনি, এই একটি অবস্থায়ই দেখেছি যে, তিনি অল্পবয়স্কা কিশোরী। আর তাই আটা খামির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। সে দিনই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ভাষণ দিতে দাড়িয়ে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুলের ষড়যন্ত্র হতে বাচার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে? আল্লাহর কসম, আমি তো আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। আর এমন ব্যক্তিকে জড়িয়ে তারা কথা তুলেছে, যার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না আর সে তো আমার সঙ্গে ব্যতীত আমার ঘরে কখনও প্রবেশ করত না। তখন সাদ [ইবন মু'আয] দাড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতিকার করব। যদি সে আউস গোত্রের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব; আর যদি সে আমাদের খায্রাজ গোত্রীয় ভাইদের কেউ হয়, তাহলে আপনি তার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ দিবেন, আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। খায্রাজ গোত্রপতি সাদ ইবন উবাদাহ তখন দাড়িয়ে গেলেন। এর পূর্বে তিনি উত্তম ব্যক্তিই ছিলেন। আসলে গোত্রপ্রীতি তাকে পেয়ে বসেছিল। তিনি বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না, সে শক্তি তোমার নেই। তখনি উসায়িদ ইবন হুযাইর দাড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করে ছাড়ব। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছ। অতঃপর আউস ও খায্রাজ উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মিম্বারে থাকা অবস্থায়ই তারা (লড়াইয়ে) উদ্যত হল। তখন তিনি নেমে তাদের চুপ করালেন। সবাই শান্ত হল আর তিনিও নীরবতা অবলম্বন করলেন। আয়িশাহ বলেন, সেদিন সারাক্ষণ আমি কাঁদলাম, চোখের পানি আমার শুকাল না এবং ঘুমের সামান্য পরশও পেলাম না। আমার পিতা-মাতা আমার পাশে পাশেই থাকলেন। পুরো রাত দিন আমি কেঁদেই কাটালাম। আমার মনে হল, কান্না বুঝি আমার কলিজা বিদীর্ণ করে দিবে। তিনি (আয়িশাহ) বলেন, তারা (পিতা-মাতা) উভয়ে আমার কাছেই উপবিষ্ট ছিলেন, আর আমি কাঁদছিলাম। ইতিমধ্যে এক আনসারী মহিলা ভিতরে আসার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার সঙ্গে বসে কাঁদতে শুরু করল। আমরা এ অবস্থায় থাকতেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রবেশ করে বসলেন, অথচ যেদিন হতে আমার সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে সেদিন হতে তিনি আমার নিকট বসেননি। এর মধ্যে এক মাস কেটে গিয়েছিল। অথচ আমার সম্পর্কে তার নিকট কোন ওয়াহী নাযিল হল না। তিনি (আয়িশাহ) বলেন, অতঃপর হাম্দ ও সানা পাঠ করে তিনি বললেন, হে আয়িশাহ! তোমার সম্পর্কে এ ধরনের কথা আমার নিকট পৌছেছে। তুমি নির্দোষ হলে আল্লাহ অবশ্যই তোমার নির্দোষিতা ঘোষণা করবেন। আর যদি তুমি কোন গুনাহে জড়িয়ে গিয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইসতিগফার কর। কেননা, বান্দা নিজের পাপ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তাওবা কবূল করেন। তিনি যখন তার বক্তব্য শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রু বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এক বিন্দু অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। আমার পিতাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে আমার পক্ষ হতে জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝে উঠতে পারি না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী বলব? অতঃপর আমার (মা-কে) বললাম, আমার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কথার জবাব দিন। তিনিও বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝি উঠতে পারি না, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কী বলব? আমি তখন অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআনও খুব অধিক পড়িনি। তবুও আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমার জানতে বাকী নেই যে, লোকেরা যা রটাচ্ছে, তা আপনারা শুনতে পেয়েছেন এবং আপনাদের মনে তা বসে গেছে, ফলে আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি আপনাদের বলি যে, আমি নিষ্পাপ আর আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ, তবু আপনারা আমার সে কথা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদের নিকট কোন বিষয় আমি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ জানেন আমি নিষ্পাপ তাহলে অবশ্যই আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহর কসম! ইউসুফ (আ)-এর পিতার ঘটনা ব্যতীত আমি আপনাদের জন্য কোন দৃষ্টান্ত খুজে পাচ্ছি না। যখন তিনি বলেছিলেন, পূর্ণ ধৈর্যধারণই আমার জন্য শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী। অতঃপর আমি আমার বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করে নিলাম। এটা আমি অবশ্যই আশা করছিলাম যে, আল্লাহ আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! এ আমি ভাবিনি যে, আমার ব্যাপারে কোন ওয়াহী নাযিল হবে। কুরআনে আমার ব্যাপারে কোন কথা বলা হবে, এ বিষয়ে আমি নিজেকে উপযুক্ত মনে করি না। তবে আমি আশা করছিলাম যে, নিদ্রায় আল্লাহর রাসূল এমন কোন স্বপ্ন দেখবেন, যা আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবে। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি তার আসন ছেড়ে তখনও উঠে যাননি এবং ঘরের কেউ বেরিয়েও যায়নি, এরই মধ্যে তার উপর ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়ে গেল এবং (ওয়াহী নাযিলের সময়) তিনি যে রকম কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, সে রকম অবস্থার সম্মুখীন হন। এমনকি সে মুহূর্তে শীতের দিনেও তার শরীর হতে মুক্তার মত ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ত। যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে ওয়াহীর সে অবস্থা কেটে গেল, তখন তিনি হাসছিলেন। আর প্রথম যে বাক্যটি তিনি উচ্চারণ করলেন তা ছিল এই যে, আমাকে বললেন, হে আয়িশাহ! আল্লাহর প্রশংসা কর। কেননা, তিনি তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। আমার মাতা তখন আমাকে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট যাও। (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর) আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! আমি তার নিকট যাব না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো প্রশংসাও করব না। আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করেন, "যারা এ অপবাদ উত্থাপন করেছে তারা তোমাদেরই একটি দল, এটাকে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে কর না, বরং তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর.." (২৪:১১)। যখন আমার সাফাই সম্পর্কে নাযিল হল তখন আবূ বাকর সিদ্দীক বললেন, আল্লাহর কসম! নিকটাত্মীয়তার কারণে মিসতাহ্ ইবন উসাসার জন্য তিনি যা খরচ করতেন, আয়িশাহ সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলার পর মিসতার জন্য আমি আর কখনও খরচ করব না। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাযিল করলেন। "যারা সতী-সাধ্বী, সহজ-সরল ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত আর তাদের জন্য আছে গুরুতর শাস্তি।" (২৪:২২) "তোমাদের মধ্যে যারা নিয়ামতপ্রাপ্ত ও সচ্ছল, তারা যেন দান না করার কসম না করে ..... আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।" তখন আবূ বাকর বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি মিসতাহ-কে যা দিতেন, তা পুনরায় দিতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যায়নাব বিনতে জাহাশকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি বললেন, হে যায়নাব! তুমি কী জান? তুমি কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার কান, আমি আমার চোখের হিফাজত করতে চাই। আল্লাহ কসম! তার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমি জানি না। আয়িশাহ বলেন, অথচ তিনিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। কিন্তু পরহেযগারীর কারণে আল্লাহ তার হিফাযত করেছেন।

আবূ বাকর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর সামনে এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করল। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, তোমার জন্য আফসোস! তুমি তো তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে, তুমি তো তোমার সাথীর গর্দান কেটে ফেললে। তিনি এ কথা কয়েকবার বললেন, অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ যদি তার ভাইয়ের প্রশংসা করতেই চায় তাহলে তার বলা উচিত, অমুককে আমি এরূপ মনে করি, তবে আল্লাহই তার সম্পর্কে অধিক জানেন। আর আল্লাহর প্রতি সোপর্দ না করে আমি কারো সাফাই পেশ করি না। তার সম্পর্কে ভালো কিছু জানা থাকলে বলবে, আমি তাকে এরূপ এরূপ মনে করি।

আবূ মূসা হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) এক ব্যক্তিকে অপর এক ব্যক্তির প্রশংসা করতে শুনে বললেন, তোমরা তাকে ধ্বংস করে দিলে কিংবা (রাবীর সন্দেহ) বলেছেন, তোমরা লোকটির মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেললে।

ইবন উমার হতে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট তাকে (ইবন উমরকে) পেশ করলেন, তখন তিনি চৌদ্দ বছরের বালক। (ইবন উমার বলেন) তখন তিনি আমাকে (যুদ্ধে গমনের) অনুমতি দেননি। পরে খন্দকের যুদ্ধে তিনি আমাকে পেশ করলেন এবং অনুমতি দিলেন। তখন আমি পনের বছরের যুবক। নাফি বলেন, আমি খলীফা উমার ইবন আবদুল আযীযের নিকট গিয়ে এ হাদীস শুনালাম। তিনি বললেন, এটাই হচ্ছে প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের সীমারেখা। অতঃপর তিনি তার গভর্নরদেরকে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যে, (সেনাবাহিনীতে) যাদের বয়স পনের হয়েছে তাদের জন্য যেন ভাতা নির্দিষ্ট করেন।

আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের উপর জুমুআ দিবসের গোসল কর্তব্য।

আবদুল্লাহ (ইবন মাস'উদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশে মিথ্যা শপথ করবে, (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তার উপর অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হবেন। রাবী বলেন, তখন আশআস ইবন কায়স বলেন, আল্লাহর কসম! এ বর্ণনা আমার ব্যাপারেই। একখন্ড জমি নিয়ে (এক) ইয়াহূদীর সঙ্গে আমার বিবাদ ছিল। সে আমাকে অস্বীকার করলে আমি তাকে নবী (ﷺ)-এর নিকট হাযির করলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, তোমার কি কোন প্রমাণ আছে? আশ'আস বলেন, আমি বললাম, না (কোন প্রমাণ নেই।) তখন তিনি (ইয়াহূদীকে) বললেন, তুমি কসম কর। আশ'আস বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তবে তো সে (মিথ্যা) কসম করে আমার সম্পদ আত্মসাৎ করে ফেলবে। আশ'আস বলেন, তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেনঃ যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা এবং নিজের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে .... (আলু ইমরানঃ ৭৭)।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৬৬৬)।

ইবন আবূ মুলায়কা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস আমাকে লিখে জানিয়েছেন, নবী (ﷺ) ফায়সালা দিয়েছেন যে, বিবাদীকে কসম করতে হবে।

আবদুল্লাহ (ইবন মাস'উদ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে এমন (মিথ্যা) কসম করে, যা দ্বারা মাল প্রাপ্ত হয়। সে (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট, অতঃপর আল্লাহ তাআলা উক্ত বর্ণনার সমর্থনে আয়াত নাযিল করেনঃ যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে ..... তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব-(আলু ইমরানঃ ৭৭)। অতঃপর আশ'আস ইবন কায়স আমাদের নিকট বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আবূ আবদুর রহমান তোমাদের কী হাদীস শুনিয়েছেন? আমরা তার বর্ণিত হাদীসটি তাকে শুনালাম। তিনি বললেন, তিনি (ইবন মাস'উদ) ঠিকই বলেছেন। আমার ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে। কিছু একটা নিয়ে আমার সঙ্গে এক ইয়াহূদী ব্যক্তির বিবাদ ছিল। আমরা উভয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট আমাদের বিবাদ উত্থাপন করলাম। তখন তিনি বললেন, তোমাকে দু'জন সাক্ষী পেশ করতে হবে অথবা তাকে কসম করতে হবে। তখন আমি বললাম, তবে তো সে মিথ্যা কসম করতে কোন দ্বিধা করবে না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, কেউ যদি এমন কসম করে, যার দ্বারা মাল প্রাপ্ত হয় এবং সে যদি উক্ত ব্যাপারে মিথ্যাচারী হয়, তা হলে (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তার উপরে অসন্তুষ্ট থাকবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা এ বর্ণনার সমর্থনে আয়াত নাযিল করেন। এ কথা বলে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৬৬৯)।

ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। হিলাল ইবন উমাইয়া নবী (ﷺ)-এর নিকট তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে শারীক ইবন সাহমা এর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হবার অভিযোগ করলে নবী (ﷺ) বললেন, হয় তুমি প্রমাণ পেশ করবে, নয় তোমার পিঠে দন্ড আপতিত হবে। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ কি আপন স্ত্রীর উপর অপর কোন পুরুষকে দেখে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ছুটে যাবে? কিন্তু নবী (ﷺ) একই কথা বলতে থাকলেন, হয় প্রমাণ পেশ করবে, নয় তোমার পিঠে বেত্রাঘাতের দন্ড আপতিত হবে। তারপর তিনি লি'আন ...... সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কথা বলবেন না এবং (করুণার দৃষ্টিতে) তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদের পাপ মোচন করবেন না আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। প্রথম শ্রেণীর সে, যার নিকট অতিরিক্ত পানি রয়েছে রাস্তার পাশে, আর সে পানি হতে মুসাফিরকে বঞ্চিত রাখে। আর এক ব্যক্তি সে, যে কারো আনুগত্যের বায়আত করে এবং একমাত্র দুনিয়ার গরযেই সে তা করে। ফলে চাহিদা মাফিক তাকে দিলে সে অনুগত থাকে, আর না দিলে অনুগত থাকে না। আর এক শ্রেণীর সে, যে আসরের পর কারো সঙ্গে পণ্য নিয়ে দাম দর করে এবং আল্লাহর নামে মিথ্যা হলফ করে বলে যে, সে ক্রয় করতে এত মূল্য দিয়েছে আর তা শুনে ক্রেতা তা কিনে নেয়।

ইবন মাস'উদ সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশে (মিথ্যা) কসম করবে (কিয়ামতের দিন) সে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত থাকবেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। একদল লোককে নবী (ﷺ) হলফ করতে বললেন। তখন (কে আগে হলফ করবে এ নিয়ে) হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। তখন তিনি কে (আগে) হলফ করবে, তা নির্ধারণের জন্য তাদের নামে লটারী করার নির্দেশ দিলেন।

আবদুল্লাহ ইবন আবূ আওফা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি তার মালপত্র বাজারে আনল এবং হলফ করে বলল যে, এগুলোর (খরিদ মূল্য) সে এত দিয়েছে, অথচ সে তত দেয়নি। তখন আয়াত নাযিল হলঃ যারা নগণ্য মূল্যের বিনিময়ে আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা এবং নিজের শপথ বিক্রি করে ......। ইবন আবূ আওফা বলেন, (দাম বৃদ্ধির মতলবে) যে ধোকা দেয়, সে মূলতঃ সুদখোর ও খিয়ানতকারী।

আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কারো অথবা তার ভাইয়ের অর্থ আত্মসাতের মতলবে মিথ্যা হলফ করবে, সে (কিয়ামতে) মহান আল্লাহর দেখা পাবে এমন অবস্থায় যে, তিনি তার উপর অত্যন্ত রাগান্বিত থাকবেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা উক্ত হাদীসের সমর্থনে কুরআনে এই আয়াত নাযিল করলেনঃ যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা এবং নিজেদের শপথ তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করে, আখিরাতে তাদের কোন অংশ নেই। আর আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না এবং তাদের প্রতি (করুণা ভরে) তাকাবেন না এবং তাদেরকে বিশুদ্ধও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব- (আলু ইমরানঃ ৭৭)। পরে আশ'আস আমার সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করলেন, আবদুল্লাহ আজ তোমাদের কী হাদীস শুনিয়েছেন? আমি বললাম, এই এই (হাদীস)। তিনি বললেন, আমার ব্যাপারেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে।

পূর্বের হাদিসের মতই (২৬৭৬)।

ত্বলহা ইবন উবায়দুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একলোক রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে তাকে ইসলাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, দিনে-রাতে পাচ ওয়াক্ত সালাত। সে বলল, আমার উপর আরও কিছু ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই। তবে নফল হিসাবে পড়তে পার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আর রমাযান মাসের সিয়াম। সে জিজ্ঞেস করল, আমার উপর এ ছাড়া আরও কিছু ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই। তবে নফল হিসাবে পালন করতে পার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে যাকাতের কথা বললেন; সে জানতে চাইল, আমার উপর এছাড়া আরও কিছু ওয়াজিব আছে? তিনি বললেন, না, নেই। তবে নফল হিসাবে করতে পার। অতঃপর সে ব্যক্তিটি এই বলে প্রস্থান করল, আল্লাহর কসম! এতে আমি কোন কম-বেশী করব না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, সত্য বলে থাকলে সে সফল হয়ে গেল।

আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, কারও হলফ করতে হলে সে যেন আল্লাহর নামেই হলফ করে, নতুবা চুপ করে থাকে।

উম্মু সালামাহ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমরা আমার নিকট মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে আস। আর তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত প্রতিপক্ষের তুলনায় প্রমাণ সাক্ষী পেশ করার ব্যাপারে অধিক বাকপটু। তবে জেনে রেখ, বাকপটুতার কারণে যার পক্ষে আমি তার ভাইয়ের প্রাপ্য হক ফায়সালা করে দেই, তার জন্য আসলে আমি জাহান্নামের অংশ নির্ধারণ করে দেই। কাজেই, সে যেন তা গ্রহণ না করে।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সুফইয়ান আমাকে খবর দিয়েছেন যে, হিরাক্লিয়াস তাকে বলেছিলেন, তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি [নবী (ﷺ)] তোমাদের কী কী আদেশ করেন? তুমি বললে যে, তিনি তোমাদেরকে সালাতের, সত্যবাদিতার, পবিত্রতার, ওয়াদা পূরণের ও আমানত আদায়ের আদেশ দেন। হিরাক্লিয়াস বললেন, এটাই নবীগণের সিফাত।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মুনাফিকের আলামত তিনটি- বলতে গেলে মিথ্যা বলে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে, আর ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ)-এর ওফাতের পর আবূ বাকর-এর নিকট [রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিযুক্ত বাহরাইনের শাসক] 'আলা ইবন হাযরামীর পক্ষ হতে মালপত্র এসে পৌছল। তখন আবূ বাকর ঘোষণা করলেন, নবী (ﷺ)-এর নিকট কারো কোন ঋণ থাকলে কিংবা তার পক্ষ হতে কোন ওয়াদা থাকলে সে যেন আমাদের নিকট এসে তা নিয়ে যায়। জাবির বলেন, আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে এমন এমন এবং এমন দান করার ওয়াদা করেছিলেন। জাবির তার দু'হাত তিনবার ছড়িয়ে দেখালেন। জাবির বলেন, তখন তিনি [আবূ বাকর] আমার দু'হাতে গুণে গুণে পাচশ' দিলেন, আবার পাচশ' দিলেন, আবার পাচশ' দিলেন।

সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ইয়াহূদী আমাকে প্রশ্ন করল, দুই মুদ্দতের কোনটি মূসা (আ) পূর্ণ করেছিলেন? আমি বললাম, আরবের কোন জ্ঞানীর নিকট গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস না করে আমি বলতে পারব না। পরে ইবন আব্বাসের নিকট এসে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মূসা (আ) অধিকতর ও উত্তম সময় সীমাই পূর্ণ করেছিলেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা বলেন, তা করেন।

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে মুসলিম সমাজ! কী করে তোমরা আহলে কিতাবদের নিকট জিজ্ঞেস কর? অথচ আল্লাহ তার নবীর উপর যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, তা আল্লাহর সম্পর্কিত নবতর তথ্য সম্বলিত, যা তোমরা তিলাওয়াত করছ এবং যার মধ্যে মিথ্যার কোন সংমিশ্রণ নেই। তদুপরি আল্লাহ তোমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, আহলে কিতাবরা আল্লাহ যা লিখে দিয়েছিলেন, তা পরিবর্তন করে ফেলেছে এবং নিজ হাতে সেই কিতাবের বিকৃতি সাধন করে তা দিয়ে তুচ্ছ মূল্যের উদ্দেশে প্রচার করেছে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ। তোমাদেরকে প্রদত্ত মহাজ্ঞান কি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করা থেকে তোমাদের বাধা দিয়ে রাখতে পারে না? আল্লাহর কসম! তাদের একজনকেও আমি কখনো তোমাদের উপর যা নাযিল হয়েছে সে বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করতে দেখিনি।

নুমান ইবন বশীর হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখার ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শনকারী এবং তা লঙ্ঘনকারীর উপমা হল সেই যাত্রীদল, যারা কুর'আর মাধ্যমে এক নৌযানে নিজেদের স্থান নির্ধারণ করে নিল। ফলে কারো স্থান হল এর নীচতলায় আর কারও হল উপর তলায়। যারা নীচতলায় ছিল তারা পানি নিয়ে উপর তলার লোকদের নিকট দিয়ে আসত। এতে তারা বিরক্তি প্রকাশ করল। তখন এক লোক কুড়াল নিয়ে নৌযানের নীচের অংশ ফুটো করতে লেগে গেল। এ দেখে উপর তলার লোকজন তাকে এসে জিজ্ঞেস করল তোমার হয়েছে কী? সে বলল, আমাদের কারণে তোমরা কষ্ট পেয়েছ। অথচ আমারও পানির প্রয়োজন আছে। এ মুহূর্তে তারা যদি এর দু'হাত চেপে ধরে তাহলে তাকে যেমন রক্ষা করা হল তেমনি নিজেদেরও রক্ষা হল। আর যদি তাকে ছেড়ে দেয় তবে তাকে ধ্বংস করা হল এবং নিজেদেরও ধ্বংস করা হল।

উম্মুল 'আলা নাম্নী একজন আনসারী মহিলা যিনি নবী (ﷺ)-এর কাছে বায়আত হয়েছিলেন, তিনি বলেন, মুহাজিরদের বাসস্থান দানের জন্য আনসারগণ যখন কুর'আ নিক্ষেপ করলেন, তখন তাদের ভাগে উসমান ইবন মাযউনের জন্য বাসস্থান দান নির্ধারিত হল। উম্মুল 'আলা বলেন, সেই হতে উসমান ইবন মাযউন আমাদের এখানে বসবাস করতে থাকেন। অতঃপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা তার সেবা-শুশ্রুষা করলাম। পরে তিনি যখন মারা গেলেন এবং আমরা তাকে কাফন পরালাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের এখানে আসলেন। আমি (উসমান ইবন মাযউনকে লক্ষ্য করে) বললাম, হে আবূ সায়িব! তোমার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তোমার সম্পর্কে আমার সাক্ষ্য এই যে, আল্লাহ তোমাকে অবশ্যই মর্যাদা দান করেছেন। নবী (ﷺ) তাকে বললেন, তোমাকে কে জানাল যে, আল্লাহ তাকে মর্যাদা দান করেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি জানি না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আল্লাহর কসম! উসমানের নিকট তো মৃত্যু এসে গেছে, আমি তো তার জন্য কল্যাণের আশা করি। আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না তার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে। তিনি (উম্মুল 'আলা) বলেন, আল্লাহর কসম! এ কথার পরে কখনো আমি কাউকে পূত-পবিত্র বর্ণনা করি না। সে কথা আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল। তিনি বলেন, পরে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, উসমান-এর জন্য একটা ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এসে সে খবর জানালাম। তিনি বলেন, সেটা হচ্ছে তার নেক আমল।

আয়িশাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরের ইচ্ছা পোষণ করলে তার স্ত্রীদের মাঝে কুর'আ নিক্ষেপ করতেন। যার নাম বের হত তাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি সফরে বের হতেন। আর তিনি স্ত্রীদের প্রত্যেকের জন্যই দিন রাত বণ্টন করতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম'আহ তার অংশের দিন রাত নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী আয়িশাহ-কে দান করে দিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তা করেছিলেন।

আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আযান ও প্রথম কাতারের মর্যাদা মানুষ যদি জানত আর কুর'আ নিক্ষেপ ব্যতীত সে সুযোগ তারা না পেত, তাহলে কুর'আ নিক্ষেপ করত, তেমনি আগে ভাগে জামা'আতে শরীক হবার মর্যাদা যদি তারা জানত তাহলে তারা সেদিকে ছুটে যেত। তেমনি ঈশা ও ফজরের জামা'আতে হাযির হবার মর্যাদা যদি তারা জানত তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা তাতে হাযির হত।