bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ) এর জীবন

আর রাহীকুল মাখতূম (মোহরাঙ্কিত জান্নাতি সুধা) [লেখক: সফিউর রহমান মুবারকপুরী]

আরবের ভৌগোলিক অবস্থান এবং গোত্রসমূহ

অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। (সূরা আহযাব: আয়াত-২১)

আখেরি ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী 'মুহাম্মদ (ﷺ) এর জীবনী' বলতে বুঝায় আল্লাহ প্রদত্ত সে বার্তার বাস্তবায়ন যা নবী মুহাম্মদ (ﷺ) মানবজাতির সম্মুখে উপস্থাপন করেছেন এবং যার দ্বারা মানুষকে ভুল পথ থেকে উদ্ধার করে আল্লাহর দেখানো সঠিক পথের ওপরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তাদেরকে শয়তানের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর অনুগত করেছেন।

নবী (ﷺ) এর জীবনী পুরোপুরিভাবে বোঝা সম্ভব নয় যতক্ষণ না পর্যন্ত ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বের ও পরের অবস্থার বিষয়ে জানা যায়। তাই আরবের ভৌগোলিক সীমারেখা, আরবভূমিতে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অবস্থা ও অবস্থান এবং তাদের ক্রমোন্নতির ধারা, যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর আবির্ভাব ঘটেছিলো তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হল।

আরবের ভৌগোলিক অবস্থান

'আরব' শব্দটি আরবি আরাবাত শব্দ থেকে গৃহীত। শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'বালুকাময় প্রান্তর', 'ধূসর মরুভূমি' বা 'লতাগুলা তৃণ শস্যবিহীন অঞ্চল'। প্রাচীন হতেই বিশেষ এই বৈশিষ্ট্যগত অর্থে আরব উপদ্বীপ এবং সেখানে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের জন্য এ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আরবের পশ্চিমে লোহিত সাগর সামায়ে সীনা উপদ্বীপ, পূর্বে আরব উপসাগর, দক্ষিণে ইরাকের এক বড়ো অংশ এবং আরব সাগর-যা ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত অংশ, উত্তরে শাম রাজ্য এবং উত্তর ইরাকের কিছু অংশ। উল্লিখিত সীমান্তসমূহের ব্যাপারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা মতবিরোধ রয়েছে। সমগ্র ভূ-ভাগের আয়তন ১০ লক্ষ থেকে ১৩ লক্ষ বর্গমাইল পর্যন্ত ধরা হয়।

অভ্যন্তরীণ ভৌগোলিক এবং ভূপ্রাকৃতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই আরব উপদ্বীপ অত্যন্ত গুরুত্ব এবং তাৎপর্য বহন করে। উপদ্বীপের চারদিক মরুভূমি বা দিগন্তবিস্তৃত বালুকাময় প্রান্তর দ্বারা পরিবেষ্টিত। যে কারণে এ উপদ্বীপ এমন এক সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছে, যে কোনো বিদেশী শক্তি বা বহিঃশত্রুর পক্ষে এর ওপর আক্রমণ করা, অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কিংবা প্রভাব বিস্তার করা অত্যন্ত কঠিন। উক্ত কারণেই আরব উপদ্বীপের মধ্যভাগের অধিবাসীগণ সে সুপ্রাচীনকাল থেকেই সম্পুর্ণ স্বাধীন থেকে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যগত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলতে সক্ষম হয়েছে। অথচ অবস্থানের দিক দিয়ে এ উপদ্বীপটি এমন দু'পরাশক্তির প্রতিবেশী যে, ভূ-প্রকৃতিগত প্রতিবন্ধকতা না থাকলে এ পরাশক্তিদ্বয়ের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা আরববাসীদের পক্ষে কখনই সম্ভবপর হতো না।

বহির্বিশ্বের দিক থেকে আরব উপদ্বীপের অবস্থানের দিকে দৃষ্টি দিলেও প্রতীয়মান হবে যে, দেশটি পুরাতন যুগের মহাদেশসমূহের একেবারে মধ্যস্থল বা কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এবং জল ও স্থল উভয় সীমান্ত হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশে গমনের প্রবেশ পথ। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত হচ্ছে ইউরোপ মহাদেশে প্রবেশের তোরণদ্বার এবং পূর্ব সীমান্ত হচ্ছে ইরান ও মধ্য এশিয়া হয়ে চীন-ভারতসহ দূর প্রাতীচ্যের অন্যান্য দেশে গমনাগমনের দরজা। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশ থেকে সাগর ও মহাসাগর হয়ে আগত জলপথ বিশ্বের সাথে আরব উপদ্বীপের চমৎকার যোগসূত্র রচনা করেছে। বিভিন্ন দেশে জাহাজগুলো সরাসরি আরবের বন্দরে গিয়ে ভিড়ে। এমন ভৌগোলিক অবস্থা ও সীমারেখার প্রেক্ষিতে আরব উপদ্বীপের উত্তর ও দক্ষিণ সীমান্ত ছিলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও মতবিনিময়ের লক্ষস্থল বা কেন্দ্রবিন্দু।

আরবের জাতিসমূহ ও গোত্রগত অবস্থান

জন্মসূত্রের ভিত্তিতে ইতিহাসবিদগণ আরব সম্প্রদায়সমূহকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা-
১. আরবে বায়েদা
২. আরবে আরেবা
৩. আরবে মোস্তারেবা।

১. আরবে বায়েদা: তারা হচ্ছে সেসব ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন গোত্র এবং সম্প্রদায় যারা ধরাপৃষ্ঠ থেকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের সম্পর্কে সঠিকভাবে জানার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণাদিও সন্ধান লাভ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ সম্প্রদায়গুলো হচ্ছে যথাক্রমে আদ, সামুদ, তাসম জাদীস, ইমলাক, উমাইম, জুরহাম, হায়ুব, ওয়াবার, জাসিম, হাযরামাউত ইত্যাদি। বিস্মৃতির অতল তলে তারা এমনভাবে হারিয়ে গিয়েছিলো যে, তাদের পতনের পর উত্থানের আর কোনো সম্ভাবনাই নেই।

২. আরবে আরেবা: তারা হচ্ছে সেসব গোত্র যারা ইয়ারুর বিন ইয়াশজুর বিন কাহতানের বংশোদ্ভূত। তাদেরকে 'কাহতানী আরব' বলা হয়।

৩. আরবে মোস্তারেবা: তারা হচ্ছে সে আরব সম্প্রদায়- যারা ইসমাঈল (আ) এর বংশধারা থেকে আগত। তাদেরকে 'আদনানী আরব' বলা হয়।

'আরবে আরেবা' অর্থাৎ কাহতানী আরবদের প্রকৃত আবাসস্থল ছিলো ইয়েমেন রাজ্য। এখানেই তাদের বংশধারা এবং গোত্রসমূহ বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে পরবর্তীকালে দুটো গোত্র অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। সেগুলো হচ্ছে-

ক. হিমইয়ার: এর প্রসিদ্ধ শাখাগুলো হচ্ছে যাইদুল জামহুল কোযায়াহ এবং সাদাসেক।

খ. কাহলান: এর প্রসিদ্ধ শাখা-প্রশাখাগুলো হচ্ছে হামদান, আনমার, তাই মাযহিজ, কিন্দাহ লাখম, জুযাম, আযদ, আউস, খাজরায এবং জাফরান বংশধরগণ। তারা পরে শাশ রাজ্যের আশেপাশে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং 'আলে গাসসান' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পরবর্তীকালে অধিকাংশ কাহলানী গোত্র ইয়েমেন রাজ্য ত্যাগ করে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণভাবে তাদের দেশত্যাগের ঘটনা ঘটে 'সাইরে আরেম' এর কিছু পূর্বে। এটা হলো সে সময়ের ঘটনা, যখন রোমীয়গণ মিশর ও শাম দেশে অনুপ্রবেশ করে ইয়েমেনের অধিবাসীদের বাণিজ্যিক কাফেলা চলাচলের রাস্তার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে এবং স্থলপথের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও চিরতরে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে কাহলানীদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়।

'হিমইয়ারী' ও 'কাহলানী' গোত্রদ্বয়ের বংশধরগণের মধ্যে বিরাজমান আত্মকলহ ও দ্বন্দ্ব যে তাদের বাস্তভিটা ত্যাগের অন্যতম প্রধান কারণ ছিলো তার ঈঙ্গিত বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়। এ সকল সূত্র থেকে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় আত্মকলহের কারণে জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাবিধ জটিল সমস্যার উদ্ভব হওয়ায় কাহলানী গোত্রসমূহ স্বদেশভূমির মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু হিমইয়ারী গোত্রসমূহ স্বদেশভূমিতে স্থায়ীভাবে বহাল থাকে।

নিশ্চয় সাবা সম্প্রদায়ের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল একটি নিদর্শন: দু'টি উদ্যান, একটি ডানে ও অপরটি বামে, (তাদেরকে বলা হয়েছিল) 'তোমরা তোমাদের রবের রিযক থেকে খাও আর তাঁর শোকর কর। এটি উত্তম শহর এবং (তোমাদের রব) ক্ষমাশীল রব'। তারপরও তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। ফলে আমি তাদের উপর বাঁধভাঙ্গা বন্যা প্রবাহিত করলাম। আর আমি তাদের উদ্যান দু'টিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দু'টি উদ্যানে যাতে উৎপন্ন হয় তিক্ত ফলের গাছ, ঝাউগাছ এবং সামান্য কিছু কুল গাছ। সে আযাব আমি তাদেরকে দিয়েছিলাম তাদের কুফরীর কারণে। আর আমি অকৃতজ্ঞ ছাড়া অন্য কাউকে এমন আযাব দেই না। আর তাদের ও যে সব জনপদের মধ্যে আমি বরকত দিয়েছিলাম সেগুলোর মধ্যবর্তীস্থানে আমি অনেক দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং তাতে ভ্রমণ করার ব্যবস্থা নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম। (তাদেরকে বলা হয়েছিল) 'তোমরা এসব জনপদে রাত-দিন (যখন ইচ্ছা) নিরাপদে ভ্রমণ কর'। কিন্তু তারা বলল, 'হে আমাদের রব, আমাদের সফরের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন'। আর তারা নিজদের প্রতি যুলম করল। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনী বানালাম, তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরা সাবা: আয়াত ১৫-১৯)

যে সকল কাহলানী গোত্র স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করে তাদের চারটি শাখায় বিভক্ত হওয়ার কথা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়। সেগুলো হচ্ছে-

১. আযদ
২. লাখার ও জাযাম গোত্র
৩. বনু তাই গোত্র
৪. কিন্দা গোত্র।

১. আযদ: তারা নিজ নেতা ইমরান বিন আমর মুযাইকিয়ার পরামর্শে দেশ ত্যাগ করেন। যাত্রার প্রাককালে প্রথম দিকে তারা ইয়েমেনের একস্থানে অবস্থান করেন। নিরাপত্তার ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্য তারা অগ্রভাগে অনুসন্ধানী বাহিনী প্রেরণ করতো। এভাবে পথ অতিক্রম করতে করতে তারা অবশেষে উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ার একপর্যায়ে বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে; এবং ইতস্ততঃ ভ্রমণ করতে করতে বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে নেয়। তাদের এ দেশান্তর বসতি স্থাপন সংক্রান্ত বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ-

ক. সালাবা বিন আমর: তিনি প্রথমত হেজায অভিমুখে অগ্রসর হয়ে 'সালাবিয়া' এবং 'যীকার' নামক দুটি স্থানের মধ্যস্থলে বাসস্থান নির্মাণ করে বসবাস করতে থাকেন। যখন তার সন্তান-সন্ততি বয়োপ্রাপ্ত হয় এবং বংশধরগণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে তখন মদিনা অভিমুখে অগ্রসর হয়ে মদিনাকেই বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান মনে করে সেখানে বসতি স্থাপন করে। এই সালাবার বংশধর থেকেই উদ্ভব হয়েছিলো 'আউস' এবং 'খাযরাজ' গোত্রের তথা মদিনার আনসারদের।

খ. হারিসা বিন আমর: অর্থাৎ কুযায়মা এবং তার সন্তানাদি। তারা হেজায ভূমিতে চক্রাকারে ইতস্তত: পরিভ্রমণ করতে করতে 'মাররুয যাহরান' নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে বসবাস করতে থাকেন। অতঃপর হারাম শরিফের ওপর প্রবল আক্রমণ করে বনু জুরহুমকে সেখান থেকে বহিষ্কার করে এবং নিজেরা মক্কানগরীতে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে বসবাস করতে থাকে।

গ. ইমরান বিন আমর: সে এবং তার সন্তানাদি 'আম্মান'-এ বসতি স্থাপন করেছিলো। তাই তাদেরকে 'আযদে আম্মান' বলা হতো।

ঘ. নসর বিন আযদ: তার সাথে সম্পর্কিত লোকগুলো তেহামায় বসতি স্থাপন করেছিলো তাদেরকে 'আযদে শানুআহ' বলা হতো।

ঙ. জাফনা বিন আমর: সে শাম রাজ্যে গমন করে সেখানে বসতি স্থাপন করে এবং সন্তানাদিসহ বসবাস করতে থাকে। সে হচ্ছে গাসসানী শাসকগণের প্রখ্যাত পূর্বপুরুষ। শাম রাজ্যে গমনের পূর্বে হেজাযে 'গাসসান' নামক ঝরনার নিকট তারা কিছুদিন বসবাস করেছিলো। তাই তাদের বংশধরকে 'গাসসানী বংশ' বলা হতো।

২. লাখম ও জুযাম গোত্র: এই লাখমীদের মধ্যে 'নাসর বিন রাবীয়া' নামক এক ব্যক্তি ছিলো যে 'হীবার মুনযির' বংশের শাসকগণের অত্যন্ত প্রভাবশালী পূর্বপুরুষ ছিলো।

৩. বনু তাই গোত্র: এ গোত্র বনু আযদ গোত্রের দেশত্যাগের পর উত্তরদিকে অগ্রসর হয়ে 'আজা' এবং 'সালমা' নামক দু'পাহাড়ের পাদদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। এ গোত্রের নামানুসারেই পাহাড় দুটো 'তাই গোত্রের পাহাড়' নামে পরিচিতি লাভ করে।

৪. কিন্দা গোত্র: এ গোত্র প্রথমে 'বাহরাইন' বর্তমান 'আল আহসা'য় শিবির স্থাপন করে। কিন্তু সেখানে আশানুরূপ পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে 'হাযরা মাউত' অভিমুখে যাত্রা করে। কিন্তু সেখানেও তেমন কোনো অনুকূল পরিবেশ না পাওয়ায় অবশেষে 'নযদ' অঞ্চলে গিয়ে বসতি গড়ে তোলে। সেখানে তারা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক বিশাল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। কিন্তু সে রাষ্ট্র বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। অল্পকালের মধ্যেই তার অস্তিত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। কাহলান ছাড়া হিময়ারেরও অনুরূপ একটি কোযায়া গোত্র রয়েছে। অবশ্য যারা ইয়েমেন থেকে বাস্তুভিটা ত্যাগ করে ইরাক সীমান্তে বসতি স্থাপন করে তাদের 'হিময়ারী' হওয়ার ব্যাপারেও কিছুটা মতভেদ রয়েছে।

আরবে মোস্তারিবা ও ইবরাহিম (আ)

তাদের প্রধান পূর্বপুরুষ ইবরাহিম (আ)। তিনি মূলত ইরাকের উরা নামক এক শহরের বাসিন্দা ছিলেন। এ শহরটি ফোরাত বা ইউফ্রেটিস নদীর তীরে কুফার সন্নিকটে অবস্থিত। প্রত্নতাত্ত্বিকগণ কর্তৃক সে শহরটির ভূগর্ভ খননের সময় যে সকল শিলালিপি, পুঁথি-পুস্তক ও দলিল-দস্তাবেজ হস্তগত হয়েছে তার মাধ্যমে উক্ত শহর সম্পর্কে বহুবিধ মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। সাইয়্যেদেনা ইবরাহিম (আ) ও তাঁর ঊর্ধ্বতন বংশধর এবং সেখানকার অধিবাসীদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এবং অবস্থা সম্পর্কে বহু নতুন নতুন তথ্য উদ্ঘাটিত এবং নবদিগন্ত উন্মোচন হয়েছে।

এর প্রসঙ্গে আমরা আরো অবগত রয়েছি যে, ইবরাহিম (আ) উক্ত স্থান থেকে 'হাররান' নামক শহরে আগমন করেছিলেন। অতঃপর সেখান থেকে তিনি আবার ফিলিস্তিনে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন এবং সে দেশকেই তার পয়গম্বরী বা আল্লাহ আহ্বানিত কর্মকাণ্ড কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেন। আল্লাহ সুবহানাহু তাকে পরম সম্মানিত 'খলিলুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করে তার কাঁধে রিসালাতের যে সুমহান দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পণ করেছিলেন সেখান থেকেই দেশের অভ্যন্তরভাগে এবং বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রচার এবং প্রসারের জন্য তিনি সর্বত্যোকভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

ইবরাহিম (আ) একবার মিসর ভূমিতে গিয়ে বসবাস করেন। মিসরের তৎকালীন বাদশাহ 'ফির'আউন' তার মন্ত্রীর মুখে সারার অপরিসীম রূপ- গুণের কথা শুনে তার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং অসদুদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে নিজের যৌনকামনা চরিতার্থ করার মানসে তার দিকে হাত বাড়ায়। এদিকে একরাশি ঘৃণা ও ক্ষোভানলে বিদগ্ধ পতিপ্রাণা সারা সতীত্ব রক্ষার্থে আবেগাকুল চিত্তে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানালে তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তা কবুল করেন এবং এর অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি হিসেবে ফির'আউন বিকারগ্রস্ত হয়ে হাত-পা ছুড়াছুড়ি করতে থাকে। অদৃশ্য শক্তির হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত ফির'আউন একদম নাজেহাল, দুর্বল হয়ে পড়ে।

তার এ ঘৃণ্য ও জঘন্য অসদুদ্দেশ্যের ভয়াবহ পরিণতিতে সে একেবারে হতচকিত, বিস্মায়াভিভূত হয়ে পড়ে। এভাবে অত্যন্ত মর্মান্তিক অবস্থার মধ্য দিয়ে সে অনুধাবন করতে পারে যে, 'সারা' কোনো সাধারণ মহিলা নয়; রবং তিনি হচ্ছেন আল্লাহর প্রিয় এক মহিয়সী নারী।

ইবরাহিম (আ) ও হাজেরার বিয়ে

সারার এ ব্যক্তি বৈশিষ্ট্য দেখে ফির'আউন এতই মুগ্ধ এবং অবিভূত হয়ে পড়ে যে, নিজের কন্যা হাজেরাকে সারার খেদমতে নিয়োজিত করেন। সারা হাজেরার সেবা-যত্ন ও গুণ-গরিমায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি তার স্বামী ইবরাহিম খলিলুল্লাহ (আ) এর সাথে হাজেরার বিয়ে দিয়ে দেন।

ইবরাহিম (আ) সারা এবং হাজেরাকে সাথে নিয়ে ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর আল্লাহ হাজেবার গর্ভে ইবরাহিম (আ) কে পরম ভাগ্যবান সন্তান দান করেন তাঁর এই সন্তানই হচ্ছেন 'যাবীহুল্লাহ' খেতাবে ভূষিত বিশ্বনন্দিত মহামানব ও নবী ইসমাঈল (আ)।

সারা ছিলেন সন্তানহীনা। হাজেরার গর্ভে ইবরাহিম (আ) এর ঔরসজাত সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ায় তিনি কিছুটা লজ্জিত এবং ঈর্ষাবোধ করতে থাকলেন। সে কারণে তিনি নবজাতকসহ হাজেরাকে নির্বাসনে পাঠানোর জন্য স্বামীর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন।

অবস্থার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে ইবরাহিম (আ) সারার দাবি মেনে নিলেন। তিনি হাজেরা ও নবজাতক পুত্র ইসমাঈল (আ) কে সাথে নিয়ে হিজায ভূমিতে এসে উপস্থিত হলেন। অতঃপর বায়তুল্লার সন্নিকটে তাদের নির্বাসন দিয়ে গেলেন। সে সময় বর্তমান আকারে বায়তুল্লার কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। বর্তমানে যে স্থানে বায়তুল্লাহ অবস্থিত সে সময় সে স্থানটির আকার-আকৃতি ছিলো যে প্লাবনের ধারা বয়ে চলে যেত। সে সময় যমযম কূপের পাশে মসজিদে হারামের উপরিভাগে বিরাট আকারের একটি বৃক্ষ ছিলো ইবরাহিম (আ) স্ত্রী হাজেরা এবং শিশুপুত্র ইসমাইল (আ) কে সে বৃক্ষের নিচে রেখে গেলেন।

সে সময় উক্ত স্থানে না ছিলো কোনো জলাশয় বা পানির কানো উৎস ছিলো না কোনো লোকালয় বা মানবসতি। একটি পাত্রে কিছু খেজুর এবং ছোট্ট মশকে কিছুটা পানি রেখে ইবরাহিম (আ) আবার পাড়ি জমালেন সে ফিলিস্তিনে। কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যেই ফুরিয়ে গেলো খেজুর, ফুরিয়ে গেলো পানিও। কঠিন সংকটেরও সমাধান হয়ে গেলো আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আলৌকিক পন্থায়। সৃষ্টি হলো 'আবে হায়াত' যমযম কূপের। সে একইভাবে সংগৃহীত হলো দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পণ্যসামগ্রী।

কিছুদিন পর ইয়েমেন থেকে একটি গোত্রের লোকেরা সেখানে আগমন করে। ইসলামের ইতিহাসে এ গোত্রকে 'জুরহামে সানী' বা 'দ্বিতীয় জুরহাম' বলা হয়ে থাকে। এ গোত্র ইসমাইল (আ) এর মাতার নিকট অনুমতি নিয়ে মক্কাভূমিতে অবস্থান করতে থাকেন। কথিত আছে যে, প্রথমাবস্থায় এ গোত্র মক্কার আশপাশের পর্বতময় উন্মুক্ত প্রান্তরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সহিহ বুখারিতে সম্পষ্টভাবে এতটুকু উল্লেখ আছে যে, মক্কাভূমিতে বসবাসের উদ্দেশ্যে তারা আগমন করেছিলেন। ইসমাঈল (আ) এর আগমনের পর, কিন্তু তার যৌবনে পদার্পনের পূর্বে। অবশ্য তারা অনেক আগে থেকেই সে পর্বত পরিবেষ্টিত প্রান্তর দিয়ে যাতায়াত করতো।

পরিত্যক্ত স্ত্রী-পুত্রের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ইবরাহিম (আ) মাঝে মাঝে মক্কায় আগমন করতেন। কিন্তু তিনি কতবার ঐভাবে মক্কা আগমন করেছিলেন তার সঠিক কোনো বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ঐতিহাসিকদের মত হচ্ছে, তিনি চারবার মক্কায় আগমন করেছিলেন। তার এই চার দফা আগমনের বিবরণ যথাক্রমে নিম্নে প্রদত্ত হলো-

১. মহাগ্রন্থ: আল কুরআনে বর্ণিত আছে, আল্লাহ স্বপ্নযোগে ইবরাহিম (আ) কে দেখালেন যে, তিনি আপন পুত্র ইসমাইল (আ) কে কুরবানী করেছেন। পক্ষান্তরে এ স্বপ্ন ছিলো আল্লাহর একটি নির্দেশ। তাই পিতা-পুত্র উভয়েই একাগ্রচিত্তে সে নির্দেশ পালনের জন্য মনে-প্রাণে প্রস্তুত হয়ে গেলেন।

পিতা যখন পুত্রকে কুরবানি করার উদ্দেশ্যে মাটিতে শুইয়ে দিলেন তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত হলো- 'হে ইবরাহিম তোমার স্বপ্নকে তুমি সর্বত্তোম ভাবে সত্যে পরিণত করেছো। অবশ্যই আমি সৎকর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চিতরূপে এ ঘটনা ছিলো আল্লাহর তরফ থেকে এক মহা অগ্নিপরীক্ষা এবং আল্লাহ এর বিনিময়ে তাদেরকে একটি বড়ো ধরনের পশু দান করেছিলেন।

'মাজুমা' বাইবেলের জন্মের পূর্বে উল্লেখ আছে, ইসমাইল (আ) এর চেয়ে ১৩ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠা ছিলেন এবং কুরআনের হিসাব অনুযায়ী ঐ ঘটনা ইসহাক (আ) এর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিলো। কারণ ইসমাঈল (আ) এর জন্ম- ইতিহাস বিস্তারিত বর্ণনার পর ইসহাক (আ) এর জন্ম প্রসঙ্গে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।

উক্ত ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ইসমাঈল (আ) যৌবনে উপনীত হওয়ার আগে কমপক্ষে একবার ইবরাহীম (আ) মক্কায় আগমন করেছিলেন। অবশিষ্ট তিন সফরের বিবরণ সহিহ বুখারির এক দীর্ঘ বর্ণনার মধ্যে পাওয়া যায়- যা ইবনে আব্বাস (রা) থেকে সরাসরি বর্ণিত হয়েছে। সে বর্ণনার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে নিম্নরূপ-

প্রথমবার ইসমাইল (আ) যখন যৌবনে পদার্পণ করলেন তখন জুরহাম গোত্রের লোকজনের নিকট থেকে আরবি উত্তমরূপে আয়ত্ব করেন এবং সবদিক দিয়েই সংশ্লিষ্ট সকলের মন জয় করতে সক্ষম হন। এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই উক্ত গোত্রের এক মহিলার সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান। এমনি এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যখন সময় অতিবাহিত হচ্ছিল তখন ইসমাইল (আ) কে শোকসাগরে ভাসিয়ে হাজেরা জান্নাতবাসিনী হয়ে যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

এদিকে পরিত্যক্ত পরিবারের কথা স্মৃতিপটে উদিত হলে ইবরাহিম (আ) পুনরায় মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। সহধর্মিনী হাজেরা তখন জান্নাতবাসিনী। তিনি প্রথমে গিয়ে উপস্থিত হলেন ইসমাঈল (আ) এর গৃহে। কিন্তু তার অনুপস্থিতির কারণে পিতা-পুত্রের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হলো না। দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবর্তা হলো পুত্রবধূর সাথে। শ্বশুর-পুত্রবধূর মধ্যে আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে পুত্রবধূ সাংসারিক অভাব-অনটন বিষয়ে অভিযোগ-অনুযোগ পেশ করলে তিনি এ বলে উপদেশ প্রদান করেন যে, ইসমাইলের আগমনের পরই যেন সে এ দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে নেয়। স্ত্রীর মুখে পিতার উপদেশের কথা শুনতে পেরে এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে ইসমাইল (আ) তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দ্বিতীয় এক মহিলার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ মহিলা ছিলেন জুরহাম গোত্রের 'ময়ায বিন আমর-'এর কন্যা।

দ্বিতীয়বার: ইসমাইল (আ) এর দ্বিতীয় বিয়ের পর ইবরাহিম (আ) পুনরায় মক্কায় আগমন করেন। কিন্তু এবারও পুত্রের সাথে তার সাক্ষাৎ লাভ সম্ভব হয়নি। ইবরাহিম (আ) পুত্রবধূর নিকট কুশলাদি জানতে চাইলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে ইবরাহিম (আ) দরজার চৌকাঠ স্থায়ী রাখার পরামর্শ দেন এবং পুনরায় ফিলিস্তিনে চলে যান।

তৃতীয়বার: এরপর ইবরাহিম (আ) তৃতীয় দফায় মক্কায় আগমন করেন। সে সময় ইসমাইল (আ) যমযম কূপের নিকট বৃক্ষের নিচে তীর বানাচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ পিতাকে দেখতে পেয়ে তিনি আবেগ ও আনন্দের আতিশয্যে একেবারে লাফ দিয়ে উঠলেন এবং পিতা ও পুত্র উভয়ে উভয়কে কোলাকুলি ও আলিঙ্গনাবস্থায় বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করলেন।

এ দেখা-সাক্ষাৎ এত দীর্ঘসময় পর সংঘটিত হয়েছিলো যে, সন্তানবৎসল, কোমল হৃদয় ও কল্যাণকামী পিতা এবং পিতৃবৎস ও বাধ্যানুগত পুত্রের নিকট তা ছিলো অত্যন্ত আবেগময় ও মর্মস্পর্শী। সে সময় পিতা-পুত্র উভয়ে মিলিতভাবে কা'বাঘর নির্মাণ করেছিলেন। এ কা'বা ঘরের নির্মাণ কাজ পরিসমাপ্তির পর সেখানে পবিত্র হজ্জব্রত পালনের জন্য ইবরাহিম (আ) মুসলিম জাতিকে উদাত্ত্ব আহ্বান জানালেন।

আল্লাহ ময়াযের কন্যার গর্ভে ইসমাইল (আ) কে ১২টি সু-সন্তান দান করেন। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে-
১. নাবিত বা নাবায়ুত,
২. কায়দার,
৩. আদবাঈল,
৪. মোবশাম,
৫. মেশমা,
৬. দোমা,
৭. মিশা,
৮. হাদদ,
৯. তাইমা,
১০. ইয়াতুর,
১১. নাফিস,
১২. কাইদমান।

ইসমাইল (আ) এর ১২টি সন্তান থেকে ১২টি গোত্রের সূত্রপাত হয় এবং সকলেই মক্কানগরীতে বসতি স্থাপন করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের জীবনযাত্রা ছিলো ইয়েমেন, মিসর, সিরিয়া প্রভৃতি দেশের সাথে ব্যবসা- বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এ গোত্রগুলো ধীরে ধীরে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি আরবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় এবং মনোনীত এক মহাপুরুষের রক্তধারা থেকে এ সকল গোত্রের সৃষ্টি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কিন্তু রক্তধারা কালচক্রের আবর্তনে সৃষ্ট যবনিকার অন্তরালেই অজ্ঞাত-অখ্যাত অবস্থায় থেকে যায়। শুধুমাত্র নাবিত এবং কায়দারের বংশধরই কালচক্রের আবর্তনে সৃষ্ট গাঢ় তিমিরজাল থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে সক্ষম হন। কালক্রমে উত্তর হেজাযে নবিতীদের সাহিত্য ও শিল্প-সংস্কৃতির যথেষ্ট উৎকর্য সাধিত হয়। শুধু তাই নয়, তারা একক শক্তিশালী জাতি এবং বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, আশপাশের জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের অধীনস্থ করে নিয়ে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত কর আদায় করতে থাকে। এ গোত্র বা জাতির রাজধানী ছিল 'বাতরা'। তাদের সাথে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সাহস কিংবা শক্তি আশপাশের কারো ছিলো না।

রোমানদের উত্থান

অতঃপর কালের আবর্তনে রোমানদের অভ্যুদয় ঘটে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা এতই উন্নতি সাধন এবং এত বেশি শক্তি সঞ্চয় করে যে, তখন নাবিতীদের শক্তি-সামর্থ্য এবং শৌর্যবীর্যের কথা রূপকথার মতো কল্পকাহিনিতে পরিণত হয়ে যায়।

মাওলানা সাইয়্যেদ সোলাইমান নদভী নিজ গবেষণা, আলোচনা ও গভীর অনুসন্ধানের পর একথা প্রমাণ করেছেন যে, গাসসান বংশধর এবং মদিনার আনসার তথা আউস ও খাজরায় গোত্রের কেউই কাহতানী আরবের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না; বরং ঐ অঞ্চলের মধ্যে নাবিত বিন ইসমাইল (আ) এর বংশধরগণের যাঁরা অবশিষ্ট ছিলেন কেবল তাদেরই অবস্থান আরবভূমিতে ছিলো।

মক্কানগরীর পুণ্যভূমিতেই কায়দার বিন ইসমাইল (আ) এর বংশ বৃদ্ধি হয় এবং কালক্রমে তারা সেখানে প্রগতির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করে। অতঃপর কালের আবর্তনে এক সময় তারা অজ্ঞাত অখ্যাত হয়ে পড়ে। অতঃপর সে স্থলে আদনান এবং তার সন্তানাদির অভ্যুদয় ঘটে। আরবের আদনানীগণের বংশপরম্পরা সূত্র বিশুদ্ধভাবে এ পর্যন্তই জানা যায়।

'আদনান' হচ্ছে রাসূল (ﷺ) এর বংশ তালিকায় ২১তম ঊর্ধ্বতন পুরুষ। কোনো কোনো বর্ণনায় বিবৃত হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) যখন নিজ বংশ তালিকা বর্ণনা করতেন তখন 'আদনান' পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ স্তদ্ধ হয়ে যেতেন, আর একটুও অগ্রসর হতেন না। তিনি বলতেন, বংশবলি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা ভুল বলেছেন।

কিন্তু আলিমদের মধ্যে একদলের অভিমত হচ্ছে, আদনান হতে আরো উপরে বংশপরস্পরা সূত্র বর্ণনা করা যেতে পারে। রাসূল (ﷺ)- উক্ত বর্ণনাকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন। আলিমগণের অনুসন্ধান অনুযায়ী আদনান এবং ইবরাহিম (আ) এর মধ্যবর্তী স্থানে দীর্ঘ ৪০টি সিঁড়ির ব্যবধান বিদ্যমান রয়েছে।

যা-ই হোক, 'মায়াদ এর সন্তান 'নাযার' সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ছাড়া মায়াদের অন্য কোনো সন্তান ছিলো না। কিন্তু এ নাযার থেকেই আবার কয়েকটি গোত্র অস্তিত্ব লাভ করেছে। প্রকৃতপক্ষে নাযারের ছিলো চারটি সন্তান এবং প্রত্যেক সন্তান থেকেই এক একটি গোত্রের গোড়াপত্তন হয়েছিলো। নাযারের এ চার সন্তানের নাম ছিলো যথাক্রমে:-
১. ইয়াদ,
২. আনমার,
৩. রাবিয়া
৪. মুযার।

তাদের মধ্যে 'রাবিয়া' এবং 'মুযার' গোত্রের শাখা-প্রশাখা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। অতএব রাবিয়া হতে আসাদ বিন রাবিয়া, আনযা, আব্দুল কাইস, ওয়ায়েল, বাকর, তাগলিব এবং বনু হানিফা অস্তিত্ব লাভ করে। মুযারের সন্তানগণ দুটি বড়ো বড়ো গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সে গোত্র দুটো হচ্ছে:-
১. কাইস আইলাম বিন মুযার ও
২. ইলিয়াস বিন মুযার।

কাইস আইলাম হতে বনু সুলাইমান, বনু হাওয়াযেন, বনু গাতফান। বনু গাতফান হতে আবস, যুবইয়ান, আশজা এবং গনি বিন আসুর গোত্রসমূহের সূত্রপাত হয়।

ইলিয়াস বিন মুযার হতে তামীম বিন মুররাহ, হুযাইল বিন মুদরেকা, বনু আসাদ বিন খুযাইমা এবং কেনানা বিন খুযাইমা গোত্রসমূহের উদ্ভব হয়। অতঃপর কেনানা হতে কুরাইশ গোত্রের উদ্ভব হয়। এ গোত্রটি ফেহর বিন মালেক বিন নামার বিন কেনানা এর সন্তানাদি।

এরপর কুরাইশ গোত্র বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ শাখাগুলোর নাম হচ্ছে জুহম, সাহম আদীম মাখযুম, তাইম, যুহরা এবং কুসাই বিন কেলাব এর বংশধর। অর্থাৎ আব্দুদ্দার, আসাদ বিন আব্দুল উযযা এবং আবদে মানাফ-এ গোত্রই ছিলো কুসাইয়ের সন্তান। তাদের মধ্যে আবদে মানাফের ছিলো চার পুত্র এবং চার পুত্র থেকে সৃষ্টি হয় চারটি গোত্রের, অর্থাৎ আবদে শামস, নওফাল, মুত্তালেব এবং হাশেম। উক্ত হাশেম গোত্র থেকেই আল্লাহ আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে নবী ও রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- 'আল্লাহ ইবরাহিম (আ) এর সন্তানাদির মধ্য থেকে ইসমাইল (আ) কে এবং ইসমাইল (আ) এর সন্তানাদির মধ্য থেকে বনু হাশেমকে এবং বনু হাশেম থেকে আমাকে মনোনীত করেন।

ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন- 'আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন এবং আমাকে সর্বোত্তম দলভুক্ত করেন। অতঃপর গোত্রসমূহ নির্বাচন করা হয় এবং এক্ষেত্রে আমাকে সর্বোত্তম গোত্রের মধ্যে শামিল করা হয়। অবশেষে পারিবারিক মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয় এবং এক্ষেত্রে আমাকে অত্যন্ত মর্যাদাশীল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতএব আমি আমার ব্যক্তি সত্তায় যেমন উত্তম বংশ মর্যাদার ব্যাপারেও তেমনি উৎকৃষ্ট।

যা-ই হোক, আদনানের বংশ যখন অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন তারা জীবিকার অন্বেষণে আরব ভূ-খণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রেক্ষিতে আব্দুল কাইস গোত্র, বকর বিন ওয়ায়েলের কয়েকটি শাখা এবং বনু তামীমের বংশধর বাহরাইন অভিমুখে যাত্রা করে এবং সেখানে বসতি স্থাপন করে।

বনু হানিফা বিন সড়াব বিন আলী বিন বকর গোত্র ইয়ামামা অভিমুখে গমন করে এবং তার কেন্দ্রস্থল 'হিজর' নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে। বকর বিন ওয়ায়েল গোত্রের অবশিষ্ট শাখাগুলো ইয়ামামা থেকে বাহরাইন, সাহেলে কাযেমা, খালীজ, সওয়াদে ইরাক, উবুল্লাহ এবং হিত অবধি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।

'বনু তাগালব' গোত্র ফোরাত উপদ্বীপ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অবশ্য তাদের কোনো কোনো শাখা বনু বকরের সাথেও বসবাস করতে থাকে। এদিকে বনু তামীম গোত্র বসরার প্রত্যন্ত অঞ্চলকে বসবাসের জন্য উপযুক্ত ভূমি হিসেবে মনোনীত করে।

'বনু সোলাইম' গোত্র মদিনার নিকটবর্তী স্থানে বসতি স্থাপন করে। তাদের আবাস ছিলো ওয়াদিউল কোরা হতে আরম্ভ করে খায়বার এবং মদিনার পূর্বদিক দিয়ে অগ্রসর হয়ে হাররায়ে বনু সোলাইমের সাথে মিলিত দু' পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত।

'বনু সাকিফ' তায়েফে বসতি স্থাপন করে এবং 'বনু হাওয়াযেন' মক্কার পূর্বদিকে অবস্থিত 'ওয়াদিয়ে আউতাস' নামক স্থানের আশপাশে বসবাস করতে থাকে। তাদের আবাসস্থল ছিলো মক্কা-বসরা মহাসড়কের পাশে।

'বনু আসাদ' তার বসতি স্থাপন করে তাইমার পূর্বে ও কুফার পশ্চিমে। তাদের ও তাইমার মধ্যভাগে 'বনু তাই' গোত্রের এক বোহতার পরিবারের আবাদ ছিলো। বনু আসাদের দখলি ভূমি এবং কুফার মধ্যকার পথের দূরত্ব ছিলো পাঁচদিনের দূরত্বের সমান।

'বনু যুবইয়ান' গোত্র বসতি স্থাপন ও আবাদ করত তাইমার নিকটে হাওয়ানের আশপাশে।

'বনু কেনানা' গোত্রের লোকজন থেকে যায় তেহামায়। তাদের মধ্য থেকে কুরাইশগণ বসতি স্থাপন করে মক্কা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে। এসব লোক ছিলো বিচ্ছিন্ন ধ্যান-ধারণার অধিকারী। তাদের মধ্য কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা ছিলো না। এভাবেই তাদের জীবনধারা চলে আসছিলো। অতঃপর 'কুসাই বিন কেলাব' নামক এক ব্যক্তি তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সঠিকভাবে পরিচালনার মাধ্যমে তাদেরকে প্রচলিত অর্থে মর্যাদা ও সম্মানের আসনে উন্নীত করে এবং ঐশ্বর্যশালী ও অন্যদের ওপর বিজয়ী গোত্রে পরিণত করে।

সমসাময়িককালে আরবের বিভিন্ন রাজ্য ও প্রশাসনিক অবস্থা

ইসলাম প্রচারের প্রারম্ভিককালে আরবের বিভিন্ন রাজ্য ও রাজনৈতিক অবস্থা, নেতৃত্ব, সম্প্রদায়, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করার বিশেষ প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে উক্ত বিষয়াদি সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা সন্নিবেশিত হলো। এর মাধ্যমে প্রাক-ইসলাম ও ইসলাম পরবর্তী আরবের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে সহজেই ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে।

আরব উপদ্বীপে যে সময় ইসলাম নামক সূর্যের দীপ্তিময় শিক্ষার বিকাশ ক্রমে ক্রমে সূচিত হয়ে উঠতে লাগলো, তখন দু' ধরনের রাজ্য ও শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। এর মধ্যে এক ধরনের ছিলো মুকুটধারী সম্রাট-যিনি প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ স্বাধীন বা মুক্ত ছিলেন না। অন্য প্রকার ছিলো গোত্রীয় প্রধানগণ। মুকুটধারী সম্রাটগণের যে মর্যাদা ছিলো অন্যান্য খ্যাতিসম্পন্ন গোত্রীয় প্রধানগণেরও সে মর্যাদা ছিলো। তবে সম্রাটগণের থেকে তাদের যে বৈশিষ্ট্য ছিলো তাহলো তারা ছিলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাধীন। যেসব সাম্রাজ্যে মুকুটধারী সম্রাটগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো সেগুলো হচ্ছে শাহানে ইয়েমেন শাহানে আলে গাসসান (শামরাজ্য) এবং শাসনে হীরা (ইরাক)। অবশিষ্ট অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই ছিলো গোত্রীয় প্রধানের শাসন। এঁরা ছিলেন মুকুটহীন রাজা।

ইয়েমেন সাম্রাজ্য: 'আরবে আরেবার' অন্তর্ভুক্ত যে সকল সম্প্রদায় প্রাচীনতম ইয়েমেনি সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত ছিলো তারাই ছিলো 'সাবা' সম্প্রদায়ভুক্ত। প্রাচীন 'উর' (ইরাক)– ভূ-খণ্ডের অনেক পুরাতন ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের ধ্বংসস্তূপ থেকে যেসব তথ্য-প্রামাণাদি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তাতে খ্রিস্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর পূর্বের সম্প্রদায়ের কথা উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতকে তাদের অভ্যূদয় সূচিত হয়েছিলো বলে তথ্য- প্রমাণাদিসূত্রে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা ছিলো মূলত অনুমাননির্ভর। গবেষণালব্ধ তথ্যাদির ভিত্তিতে তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে সে ধারণা লাভ করা গেছে তা হচ্ছে নিম্নরূপ-

মোকাররব সাবা: খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ অব্দ হতে তাদের যুগ শুরু হয়। সে সময়কালে শাহানে সাবার মর্যাদাসূচক উপাধি ছিলো 'মুকাররবে সাবা'। তার রাজধানী ছিলো 'সারওয়াহ' নামক নগরীতে যার ধ্বংসাপ্রাপ্ত অট্টালিকার চিহ্ন আজও মায়ারেবের পশ্চিমে এক দিনের পথের দূরত্বে দেখতে পাওয়া যায় এবং তা 'খাবিবা' নামে প্রসিদ্ধ রয়েছে। সে যুগে মায়ারেবের সে বিখ্যাত বাঁধের ভিত্তি স্থাপন করা হয়- যা ইয়েমেনের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে, সে যুগে 'সাবা' সাম্রাজ্যের এত বেশি বিস্তৃতি ঘটেছিলো যে, তারা আরবের অভ্যন্তরে এবং বাইরেও বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন আবাস, শহর ও নগর গড়ে তুলেছিলো।

সাবা-রাজা: খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০ অব্দ থেকে ১১৫ অব্দ পর্যন্ত সময়কালে 'সাবা' সম্রাটগণ মোকাররব' উপাধি পরিত্যাগ করে 'রাজা' (বাদশাহ) সম্মানসূচক উপাধি গ্রহণ করে এবং 'সাওয়ার' এর পরিবর্তে মায়াররেবকে সাম্রাজ্যের রাজধানী ঘোষণা দেয়। সে শহরের ধ্বংসস্তূপ আজও 'সানয়া' নামক স্থানের ৬০ মাইল পূর্বে দেখতে পাওয়া যায়।

সাবা'র পতন যুগ: খ্রিস্টপূর্ব ১১৫ থেকে ৩০০ অব্দ পর্যন্ত সময়ে 'সাবা রাষ্ট্রের ওপর হিময়ার' গোত্র প্রাধান্য লাভ করে। মায়ারেবের পরিবর্তে 'রায়দান'কে রাজধানী করে। পরে রাজধানীর নাম 'রায়দান' পরিবর্তন করে 'জিফার' রাখা হয়। এ শহরের ধ্বংসাবশেষ আজও 'ইয়ারিম' শহরের নিকটে এক গোলাকার পর্বতের মধ্যে দেখা যায়।

এ সময় থেকেই 'সাবা' সম্প্রদায়ের পতন শুরু হয়ে যায়। নাবয়তীগণ প্রথমে হেজাযের উত্তর প্রদেশে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সাবা সম্প্রদায়ের বসতি স্থাপনকারীদের সেখান থেকে বহিষ্কার করে। উপরন্তু রুমীগণ, মিসর, শাম এবং হেজাজের উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়ার ফলে সমুদ্রপথে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে পর্যায়ক্রমে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হতে হতে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে কাহতানী' গোত্রসমূহ নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং কলহে লিপ্ত হয়ে পড়ার ফলে নিজ নিজ আবাসস্থল পরিত্যাগ করে তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার বিলুপ্তি: ৩০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ইসলামের আবির্ভাব পর্যন্ত সময়কালে ইয়েমেনের মধ্যে অব্যাহতভাবে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা ঘটতে থাকে। একের পর এক বহু বিপর্যয়-প্রতিবিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয়ে থাকে। এর ফলে বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের অবাঞ্ছিত সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যায়। এমনকি একসময়ে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয়, যার ফলশ্রুতিতে ইয়েমেনের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে সে যুগেই রুমীগণ 'আদন দ্বীপ'-এ সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে ইয়েমেনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। অতঃপর হিময়ার ও হামদানের পারস্পরিক আত্মকলহের সুযোগ নিয়ে হাবশীগণ রুমী গোত্রের সহায়তায় তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। হাবশীগণের এ দখলদারিত্ব ৩৪০ থেকে ৪৭৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এ সময়ের পর ইয়েমেনের স্বাধীনতা এক ধরনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। কিন্তু মায়ারেবের মশহুর বাঁধে শুরু হলো ফাটল। সে ফাটল ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেতে পেতে অবশেষে ৪৫০ অথবা ৪৫১ ঈসায়ী সালে বাঁধটি পুরোপুরি ভেঙ্গে যায়। এ বাঁধের ভাঙনের ফলে ভয়াবহ প্লাবনের সৃষ্টির উল্লেখ কুরআন মাজিদের সূরা সাবায় সায়লে আরেম' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ভয়াবহ প্লাবনের ফলে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যায় এবং বহু গোত্র বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে।

ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ: পরবর্তীকালে ৫২৩ ঈসায়ী সালে পুনরায় ভিন্ন ধাঁচের এক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। ইয়েমেনের ইহুদি সম্রাট 'যু নওয়াস' নাজরানের খ্রিস্টানদের ওপর এক ন্যাক্কারজনক আক্রমণ পরিচালনা করে খ্রিস্ট ধর্ম পরিত্যাগ করে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করার জন্য তাদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কিন্তু খ্রিস্টানগণ কোনোক্রমেই এতে রাজি না হওয়ায় 'যু নওয়াস' কতগুলো বিরাট বিরাট গর্ত খনন করিয়ে তাতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে। ঐ অগ্নিকুণ্ডে খ্রিস্টানদের নিক্ষেপ করে। কুরআন মাজীদেও সূরা বুরুজের 'কুতিলা আসহাবুল উখদুদ' আয়াত দ্বারা উক্ত লোমহর্ষক ঘটনার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

রোমানদের আক্রমণ: উক্ত ঘটনার ফল এ দাঁড়ায় যে, রুমীয় সম্রাটগণের নেতৃত্বে খ্রিস্টানগণ আরব উপদ্বীপের শহর ও নগরের ওপর বার বার আক্রমণ চালিয়ে বিজয়ী হতে থাকে। এতে উৎসাহিত হয়ে ইহুদিদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা সংকল্পবদ্ধ হয়ে যায় এবং এ পাল্টা আক্রমণে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা দানের জন্য হাবশীগণকে উৎসাহিত করতে থাকে। এমনকি এতদুদ্দেশ্যে হাবশীগণকে নৌবহরও সরবরাহ করা হয়। রুমীগণের সহযোগিতা লাভের ফলে হাবশীগণ বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ৫২৫ ঈসায়ী সালে ইরয়াতের নেতৃত্বে ৭০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয় এবং পুনরায় ইয়েমেনের ওপর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

ইয়েমেন দখলের প্রাথমিক পর্যায়ে হাবশার সম্রাটের গভর্নর হিসেবে ইয়যাত ইয়েমেনের শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। কিন্তু 'আবরাহা' নামে তার অধীনস্থ এক সৈনিক তাকে হত্যা করে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে হাবশার সম্রাটের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলতে সক্ষম হয়। সে ছিলো 'আবরাহা' যে কা'বাঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিশাল হস্তীবাহিনীসহ কা'বার অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষিবাহিনী কর্তৃক স্ব-মূলে ধ্বংস হয়। আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন এ ঘটনা 'আসহাবে ফীল' (হস্তীবাহিনী) নামে বর্ণিত হয়েছে।

হাবশীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: আসহাবে ফীলের ঘটনায় হাবশীগণ অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ইয়েমেনবাসীগণ এ সুযোগে পারস্য রাজ্যের সাহায্যপুষ্ট হয়ে হাবশীগণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইয়েমেনবাসীগণ 'সাইফে যী ইয়াযান হিময়ারী'র সন্তান 'মাদী কারব' এর নেতৃত্বে হাবশীগণকে সেদেশ থেকে বহিষ্কার করে এবং মুক্ত স্বাধীন সম্প্রদায় হিসেবে মাদী-কারবকেই সম্রাট মনোনীত করে। এ ছিলো ৫৭৫ ঈসায়ী সালের ঘটনা।

স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের পর 'মাদীকারব' কিছুসংখ্যক হাবশীকে নিজের খেদমত এবং রাজদরবারের জাঁকজমক বৃদ্ধির কার্যে নিয়োজিত করেছিলো। কিন্তু তার এ অবিমৃষ্যকারিতা ভ্রান্ত ধারণাই 'দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা' প্রবাদবাক্যটি এক মর্মান্তিক সত্যে পরিণত হয়ে যায়। প্ররোচিত হয়ে ঐ হাবশীগণই একদিন মাদী কারবকে হত্যা করার মাধ্যমে 'যী ইয়াযান' পরিবারের শাসন ক্ষমতাকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়।

পারস্য সাম্রাজ্যের প্রদেশ: এ নাজুক অবস্থাকে একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করে পারস্যবাসী 'কিসরা' সান'আ প্রদেশের পারস্য বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তিকে গভর্নর নিযুক্ত করে এবং তার মাধ্যমে দেশটিকে পারস্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত করে। এরপর থেকে পারস্য বংশোদ্ভূত কয়েকজন গভর্নর একাদিক্রমে ইয়েমেন প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। সর্বশেষে পারসি গভর্নর 'বাযান' ৬২৮ ঈসায়ী সালে ইসলামী গ্রহণ করলে ইয়েমেনে পারস্য শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে ইসলাম জীবনধারা ও শাসনের ছায়াতলে আশ্রয় লাভ করে।

হীরার সাম্রাজ্য: পারস্য শাসনাধীন ইরাক এবং তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলে কোরোশ কাবির খোরাশ অথবা সায়রাস জুল কারনাইন (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৭-৫২৫ অব্দে) এর সময় থেকেই পারস্যে শাসনব্যবস্থা চলে আসছিলো। এ সময়ের মধ্যে তাদের সাথে প্রতিযোগিতা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তি কিংবা সাহস কারোই ছিলো না। অতঃপর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫ অব্দে সেকান্দার মাকদুনী পারস্যরাজা প্রথম দারাকে পরাজিত করে পারস্যশক্তিকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে ফেলে। এর ফলে পারস্য সাম্রাজ্য ভেঙ্গে টুকরো টুকরো এবং সর্বত্র বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায়। এ বিশৃঙ্খল অবস্থা চলতে থাকে ২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

সে সময় কাহতানী গোত্রসমূহ দেশত্যাগ করে ইরাকের এক শস্য-শ্যামল সীমান্ত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এদিকে আবার দেশত্যাগী আদনানীগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যায়। অতঃপর যুদ্ধে জয়লাভ করে তারা ফোরাত নদীর উপকূলভাগের এক অংশে বসতি স্থাপন করে।

অন্যদিকে ২২৬ ঈসায়ী সালে 'আরদশীর' যখন সাসানী সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করে তখন ধীরে ধীরে পারস্য সাম্রাজ্যের গৌরব ও ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হতে থাকে। 'আরদশীর' সাসানীয়দেরকে সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করে এবং দেশের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাসানীয়দেরকে সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করে এবং দেশের সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী আরবদের অধীনস্থ করে। এমনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোযায়া গোত্র শামরাজ্যের দিকে গমন করে। পক্ষান্তরে হীরা আনবারের আরব বাসিন্দাগণ বশ্যতা স্বীকারের ব্যাপারে নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করে।

আরদশীর সময়কালে হীরা, বাগিয়াতুল ইরাক এবং উপদ্বীপবাসীগণের রাবীয়ী এবং মুযারী গোত্রসমূহের ওপর জাযীমাতুল ওয়াযযাহদের আধিপত্য ছিলো। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আরববাসীদের ওপর আরদশীর' সরাসরি আধিপত্য বিস্তার করতে চায়নি। সে এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলো যে, আরবীয়দের ওপর সরাসরি আধিপত্য বিস্তার কিংবা সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের লুটতরাজ বন্ধ করা খুব সহজে সম্ভব হবে না। সে প্রেক্ষিতে একটি বিকল্প ব্যবস্থার কথা সে চিন্তা করেছিলো এবং তা ছিলো এই যে, যদি তাদের গোত্র থেকে একজন শাসক নিযুক্ত করা হয় তাহলে তার স্বগোত্রীয় লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজনদের পক্ষ থেকে সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

এর ফলে আরো যে একটি বিশেষ সুবিধা লাভের সম্ভাবনা ছিলো তা হচ্ছে, প্রয়োজনে রুমীয়দের বিরুদ্ধে তাদের নিকট থেকে সাহায্য গ্রহণের সুযোগ থাকবে। উপরন্তু সাম্রাজ্যের রোম অভিমুখী আরব অধিপতিদের বিরুদ্ধে ঐ সকল আরব অধিপতিদের দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতিকে কিছুটা অনুকূলে রাখা সম্ভব হতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, হীরার সম্রাটের নিকট পারস্য সৈন্যদের একটি করে ইউনিট সবসময়ের জন্য মজুদ রাখা হতো যার দ্বারা মরুভূমিতে বসবাসকারী বিদ্রোহীদের দমন করা সহজসাধ্য হতো।

লাখমীদের শাসন

২৬৮ ঈসায়ী সালের সময়সীমার মধ্যে 'জাযীমা' মৃত্যু মুখে পতিত হয় এবং আমর বিন আদী বিন নাসর লাখমী তার স্থালাভিষিক্ত হয়। সে ছিলো লাখম গোত্রের প্রথম শাসনকর্তা এবং শাপুর আরদর্শীর সমসাময়িক। এরপর কোথায বিন ফিরোজের যুগ পর্যন্ত হীরার ওপর লাখমীদেরই শাসন কায়েম ছিলো। কোবাযের সময় মুজদাকের আবির্ভাব ঘটে। সে ছিলো স্বাধীনচেতা নরপতি। কোথায এবং তার বহু প্রজা মুযদাকের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। কোরায় আবার হীরার সম্রাট মুনযের বিন মাউস সামায়ের নিকট এ মর্মে সংবাদ প্রেরণ করে যে, সে যেন ধর্ম গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু মুনযের ছিলো কিছুটা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি। প্রেরিত সংবাদে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফল এ দাঁড়ায়, কোথায তাকে তার পদ থেকে অপসারণ করে তার স্থানে মুযদাকেরের এক শিষ্য হারিস বিন আমর বিন হাজর ফিন্দী'র হাতে হীরার শাসনভার অর্পণ করেন।

কিসরা নওশেরওয়ার শাসন

কোবাযের পর পারস্য রাজ্যের শাসনভার এসে পড়ে কিসরা নওশেরওয়ার হাতে। ঐ ধর্মের প্রতি তার মনে ছিলো প্রবল ঘৃণা। সে মুযদাক এবং তার অনুসারীদের এক বড়ো দলকে হত্যা করিয়েছিলো। অতঃপর পুনরায় মুনযেরের প্রতি হীরার শাসনভার অর্পিত হয় এবং হারিস বিন আমরকে তার দরবারে আগমনের জন্য আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সে বনু কালব গোত্রের দিকে পলায়ন করে এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকে।

মুনযের বিন মাউস সামা পরে নোমান বিন মুনযের কাল পর্যন্ত হীরার রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব তারই বংশধরের ওপর অর্পিত হয়। আবার যায়েদ বিন আদী উবাদী কিসরার নিকট নোমান বিন মুনযের সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ করলে কিসরা রাগান্বিত হয়ে নোমানকে নিজ দরবারে তলব করে। নোমান গোপনে বনু শায়বান গোত্রের দলপতি হানী বিন মাসউদের নিকট গিয়ে নিজ পরিবারে সদস্যবৃন্দ এবং সহায়-সম্পদ তার হেফাযতে রেখে কিসরার নিকট যায়। কিসরা তাকে জেলখানায় বন্দি করে রাখে এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

আরবের ইয়াস বাহিনীর বিজয়

এদিকে কিসরা নোমানকে কারাগারে বন্দি করার পর তার স্থানে ইয়াস বিন কাবিসা তায়ীকে হীরার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে এবং হানী বিন মাসউদের নিকট থেকে নোমানের রক্ষিত আমানত তলব করার জন্য নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন লোক হানী তলবী আমানত প্রদান করতে শুধু যে অস্বীকারই করলো তাই নয়; বরং যুদ্ধও ঘোষণা করে বসলো। অতঃপর যা হওয়ার তাই হলো। ইয়াস নিজের সুসজ্জিত বাহিনী, কিসরার বাহিনী এবং মুরবানের পুরো বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলো মোকাবিলা করার জন্য। 'যীকার' নামক ময়দানে উভয় দলের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে বনু শায়বান বিজয়ী হয় এবং পারস্যবাসীগণ অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। ইতিহাসে এ যুদ্ধ অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, আরবদের বিরূদ্ধে আরবদের এটাই ছিলো প্রথম বিজয়। এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্মের অল্প কিছুকাল পর। হীরার ওপর ইয়াসের আধিপত্য লাভের অষ্টম মাসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দুনিয়াতে তাশরীফ আনেন।

ইয়াস এর পর কিসরা এক পার্সীকে হীরার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে। কিন্তু ৬৩২ ঈসায়ী সালে লাখমীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুনযের বিন মা'রুর নামক উক্ত গোত্রের এক ব্যক্তি শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্বভাব গ্রহণ করে। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের সময়ানুক্রমে যখন অষ্টম মাস অতিক্রান্ত হয়েছিলো এমতাবস্থায় খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ইসলামের অগ্রদূত হিসেবে হীরায় প্রবেশ করেন।

শাম রাজ্যের শাসন

আরব গোত্রে সে যুগের বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। কোযায়া গোত্রের কয়েকটি শাখা শাম রাজ্যেও সীমানা অতিক্রম করে সেখানে বসতি স্থাপন করেন। বনু সোলাইম বিন হুলওয়ানদের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিলো। বনু যাজআম বিন সোলাইম' নামক যে গোত্রটি 'যাজাযেমাহ' নামে পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো তা ছিলো তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কোযায়ার সে শাখাকে রুমীগণ আরব মরুভূমিতে যাযাবর কর্তৃক পরিচালিত লুটতরাজের কবল থেকে নিষ্কৃতি লাভ ও লুটতরাজ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এবং পার্সীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য নিজেদের পৃষ্ঠপোষক বানিয়েছিলো। এতদুদ্দেশ্যে তাদের এক ব্যক্তির মাথায় রাজ্য শাসনের মুকুট পরিধান করিয়েছিলো।

এরপর থেকে বেশ কিছুকাল যাবৎ তারই পরিচালনাধীন রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালিত হতে থাকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ শাসক ছিলো সম্রাট 'যিয়াদ বিন হাযুল্লাহ'। ধারণা করা হয় যে, 'যাজায়েমাহ' গোত্র কর্তৃক পরিচালিত রাজ্য শাসনব্যবস্থা দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের পুরোটা জুড়েই বিদ্যমান ছিলো। অতঃপর সে অঞ্চলে 'গাসসানী' গোত্রের বংশধরদের আগমনের আলোচনা চলতে থাকে। এ প্রসঙ্গে এটা বলাই বাহুল্য যে, ইতোমধ্যে গাসসানীগণ বনু যাজেমাকে পরাজিত করে তাদের ক্ষমতা ও সহায়-সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলো। এমন পরিস্থিতিতে রুমীগণ গাসসানী বংশের শাসককে শাম অঞ্চলের জন্য আরবীয়দের সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। গাসসানীদের রাজধানী ছিলো 'দুমাতুল জান্দাল'। রুমীয় কর্মকান্ডের পরিচালক হিসেবে শাম অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে সে পর্যন্ত তাদেরই রাজত্ব চলতে থাকে যে পর্যন্ত ফারুকী খোলাফতকালের মধ্যে ১৩ হিজরিতে ইয়ারমুক যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং গাসসানী বংশের শেষ শাসক 'জাবলা বিন আইয়াম' ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। যদিও তার অহংকারবোধ ইসলামি সাম্যকে বেশিদিন পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে সে স্ব-ধর্মত্যাগী হয়ে যায়।

হেজাযের নেতৃত্ব

এটা সর্বজনবিদিত যে, মক্কায় জনবসতির সূত্রপাত হয় ইসমাইল (আ)- এর মক্কায় আগমন থেকে। ১৩৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। এবং আজীবন মক্কাবাশির সর্দার ও বায়তুল্লাহর খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার ওফাতের পর নাবিত ও কায়দার দুই সন্তানই পর্যায়ক্রমে মক্কার খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তার নানা 'মু'আয বিন আমর জুরহুমী রাজ্যের শাসনভার নিজ হস্তে গ্রহণ করেন। এভাবে মক্কার নেতৃত্ব বনু জুরহাম গোত্রের হাতে চলে যায় এবং এক যুগ পর্যন্ত তাদের হাতের মুঠোর মধ্যেই থাকে।

যেহেতু ইসমাইল (আ) পিতার সাথে হাত মিলিয়ে বাইতুল্লাহ নির্মাণ কাজ করেছিলেন সেহেতু তার সন্তানাদি বিশেষ এক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত থাকেন। যদিও নেতৃত্বে কিংবা অধিকার লাভে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব ছিলো না। ইবনে হিশাম ইসমাইল (আ) এর বংশধর থেকে কেবলমাত্র নাবিতকে নেতৃত্বদানের কথা উল্লেখ করেছেন।

অতঃপর দিনের পর দিন এবং বছরের পর বছর অতিবাহিত হতে লাগলো। কিন্তু ইসমাইল (আ) এর সন্তানগণ যেন মাতৃগর্ভেই রয়ে গেলেন। জনসমাজে তারা অজ্ঞাত-অখ্যাতই থেকে গেলেন। পক্ষান্তরে 'বখতে নসর' এর খ্যাতি প্রকাশিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তে বনু জুরহাম গোত্রের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মক্কার আকাশে আদনানীদের রাজনৈতিক নক্ষত্রের জ্যোতি চমকাতে আরম্ভ করে। এর প্রমাণ হচ্ছে, বখতে নসর 'জাতে ইরাক' নামক স্থানে আরবদের সাথে যে ভীষণ লড়াই করেছিলো তার মধ্যে আরব সৈন্যদের সেনাপতি জুরুহুমী ছিলেন না।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৭ অব্দে 'বখতে নসর' আবার যখন মক্কা আক্রমণ করে তখন আদনানীগণ পলায়ন করে ইয়েমেনে চলে যায়। সে সময় বনি ইসারাঈলদের নবী ছিলেন 'ইয়ারমিয়াহ' (আ)। তিনি আদনানের সন্তান মায়াদকে তার সাথে নিয়ে শামদেশে চলে যান এবং বখতে নসরের প্রভাব বিলুপ্ত হয়ে গেলে মায়াদ পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর জুরহাম গোত্রের মাত্র একজনের সাথেই তার সাক্ষাৎ হয়। সে ছিলো, 'জুরহুম বিন জালাহামাহ'। মায়াদ তার কন্যা মায়ানাহকে বিয়ে করে। তার গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করে নেয়ার।

এরপর থেকে মক্কায় জুরহুম গোত্রের অবস্থা খুব খারাপ হতে থাকে। তারা প্রকট অসচ্ছলতার মধ্যে নিপতিত হতে থাকে। ফলে তারা বায়তুল্লায় আগত হজ্জ-তীর্থযাত্রীদের ওপর নানা ধরনের অন্যায়-উৎপীড়ন শুরু করে দেয়। খানায়ে কা'বার অর্থ আত্মসাৎ করতেও তারা কোনো দ্বিধাবোধ করে না।

এদিকে 'বনু আদনান গোত্র তাদের এ জাতীয় কার্যকলাপের ওপর গোপনে গোপনে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে থাকে এবং তাদের ওপর ভয়ানক ক্ষুব্ধ ও ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠে। তাই যখন 'বুন খুযায়মা' গোত্র মারুরয যাহরানে শিবির স্থাপন করে এবং লক্ষ করে যে, বনু আদনান গোত্র বনু জুরহামকে ঘৃণার চোখে দেখছে তখন এ সুযোগ গ্রহণ করে এক আদনানী গোত্র (বনু বকর বিন আবদে মানাথ বিন কেনানা)- কে সাথে নিয়ে বনু জুরহুম গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয় এবং মক্কা থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। এই ঘটনাটি ঘটে দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে।

বনু জুরুহুম গোত্র মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় যমযম কূপের মধ্যে নানা ধরনের জিনিসপত্র নিক্ষেপ করে তা প্রায় ভরাট করে ফেলে। যেসব জিনিসপত্র তারা যমযম কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করে তার মধ্যে ছিলো কিছু সংখ্যক ঐতিহাসিক নিদর্শন। মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বিবরণ মতে, আমর বিন হারিস বিন মু'আয জুরহুমী।

খানায়ে কা'বার দুটো হরিণ

মাসউদী লিখেছেন যে, অতীতে পারস্যবাসী খানায়ে কাবার জন্য প্রচুর সম্পদ ও মোতি পাঠাতেন। সাসান বিন বাবুক সোনার তৈরি দুটো হরিণ, মুক্তা, তরবারী এবং অনেক সোনা প্রেরণ করে। আমর সে সবকে যমযম কূপে নিক্ষেপ করে দিয়েছিলেন।

কর্নারে অবস্থিত পাথরটি (হাজরে আসওয়াদ বা কালোপাথর) বের করে নিয়ে তা কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করে। অতঃপর নিজ গোত্র বনু জুরুহুমকে সাথে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে চলে যায়। কিন্তু মক্কার রাজত্ব শেষ হওয়ার কারণে তাদের দুঃখের অন্ত ছিলো না।

এ কারণেই আমর নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করে:-
মনে হচ্ছে যে হাজুন হতে সাফা পর্যন্ত কোনো পরিচিত লোক ছিলো না এবং রাত্রকালীন গল্পের আসরে কোনো গল্প উপস্থাপন করছি। কেনইবা ছিলোনা' নিশ্চয় আমরা তার বাসিন্দা ছিলাম। কিন্তু যুগের পরিবর্তন এবং ভাগ্যের পরিহাস আমাদের নির্বাক করে দিয়েছে।

ইসমাইল (আ) এর যুগ ছিলো যীশু খ্রিস্টের জন্মের আনুমানিক দু' হাজার বছর পূর্বে। সে হিসেবে মক্কায় জুরহুম গোত্রের অস্তিত্ব ছিলো দু' হাজার একশত বছর পর্যন্ত এবং তাদের রাজত্বকাল ছিলো দুই হাজার বছর পর্যন্ত।

বনু খোযায়াহ গোত্রের শাসন

মক্কার ওপর আধিপত্য বিস্তারের পর বনু বকরকে প্রশাসনিক দায়-দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত না করেই বনু খুযায়মা এককভাবে প্রশাসন পরিচালনা করে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং মর্যাদাসম্পন্ন তিনটি পদের অংশীদারিত্ব বনু মুযার গোত্র লাভ করেছিলো। পদগুলো হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ-

১. হাজীদের সঞ্চালন: হাজীদের আরাফাহ থেকে মুজদালিফায় নিয়ে যাওয়া এবং ইয়াওমুন নাফার অর্থাৎ ১৩ যিলহজ্জের শেষ দিন মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার জন্য হাজীদের লিখিত আদেশ প্রদান। এ সম্মানের অধিকারী ছিলো ইলিয়াস বিন মুযার বংশধরের মধ্যে বনু গাউস বিন মুররাহ-যাদের বলা হতো 'সুফা'। উক্ত মর্যাদার ব্যাখ্যা হচ্ছে, ১৩ যিলহজ্ব হজ্জযাত্রীগণ যখন কংকর নিক্ষেপকার্য সম্পন্ন করতেন এবং মিনা হতে রওয়ানা হওয়ার ইচ্ছা করতেন তখন সুফার লোকেরা একমাত্র পথ আকাবার দু'পাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে যেতো এবং যতক্ষণ না তাদের সকলের যাওয়া শেষ হতো ততক্ষণ সে পথে কাউকেই যেতে দেয়া হতো না। তাদের চলে যাওয়ার পর অন্যান্য লোকদের জন্য রাস্তা ছেড়ে দেয়া হতো। যখন সুফা বিদায় নিলো তখন এ সম্মান বনু তামীমের এক পরিবার বনু সায়াদ বিন যায়েদের অনুকূলে চলে গেলো।

২. এফাজ: ১০ যিলহজ্জ তারিখ সকালে মুজদালিফা থেকে মিনার দিকে যাত্রা করার ব্যাপারটি ছিলো বনু আদওয়ানের ইখতিয়ারভুক্ত এক মহাসম্মানের প্রতীক।

৩. হারাম 'মাস' নির্ধারণ: হারাম মাসগুলোকে এগিয়ে নিয়ে আসা কিংবা পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যাপারটি ছিলো উচ্চসম্মানের প্রতীক। এ সম্মানেরর ব্যাপারটি ছিলো বনু কেনানা গোত্রের অন্যতম শাখা বনু তামীম বিন আদীর ইখতিয়ারভুক্ত।

মক্কার ওপর বনু খুযায়মা গোত্রের কর্তৃত্ব প্রায় তিনশত বছর যাবৎ প্রতিষ্ঠিত ছিলো। উক্ত সময়ের মধ্যে আদনানী গোত্রসমূহ মক্কা এবং হেজায সীমান্ত অতিক্রম করে নাদ, ইরাক, বাহরাইন ইত্যাদি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার আশপাশে কেবলমাত্র কুরাইশদের কয়েকটি শাখা অবশিষ্ট ছিলো। অবশ্য তাদের ভিন্ন ভিন্ন পাড়ায় বসবাস করতো। বন্ধু কোনানা গোত্রের মধ্যেও বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘর-বাড়ি ছিলো। কিন্তু মক্কার প্রশাসন কিংবা বায়তুল্লাহর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে তাদের কোনো অংশ ছিলো না। এমনি এক সময়ে কুসাই বিন কেলাব গোত্র আত্মপ্রকাশ করে।

কুসাইয়ের শাসন

'কুসাই' সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি যখন মায়ের কোলে ছিলেন তখন তার পিতার মৃত্যু হয়। এরপর তার মা বনু উযরা গোত্রের 'রাবিয়া বিন হারাম' নামক এক ব্যক্তির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ গোত্র শাম রাজ্যের কোনো এক অঞ্চলে বসবাস করতো। সুতরাং কুসাইয়ের মা কুসাইকে সাথে নিয়ে সেখানে চলে যায়। বয়োপ্রাপ্তির পর কুসাই মক্কার অভিভাবক। কুসাই হোলাইলের কন্যা হোবাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলে সে তা মঞ্জুর করে এবং উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান।

এর কিছুদিন পর হোলাইল মৃত্যুমুখে পতিত হলে মক্কা এবং বায়তুল্লাহর ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুযায়মা এবং কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধোত্তর মক্কায় কুসাই-ই সবার মধ্যমণি হয়ে ওঠে। মক্কা এবং বায়তুল্লার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত হয় তারই হাতে।

খুযায়মা এবং কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে নিম্নরূপ-

প্রথম বিবরণ হচ্ছে: যখন কুসাইয়ের সন্তানাদি খুব উন্নতি লাভ করলো তাদের হাতে সম্পদের প্রাচুর্য পরিলক্ষিত হলো এবং মান-সম্মানও বৃদ্ধি পেতে লাগলো। অন্যদিকে হোলাইল যখন মৃত্যুবরণ করলো তখন কুসাই উপলব্ধি করলো যে, মক্কার প্রশাসন এবং কা'বার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বনু খুযায়মাও বনু বকরের তুলনায় তার দাবিই অগ্রাধিকারযোগ্য। সে এ ধারণাও পোষণ করতে থাকলো যে, কুরাইশগণ হচ্ছে ইসমাইলের বংশোদ্ভূত খাঁটি আরব এবং ইসমাইলীয় বংশের অন্যান্যাদের সরদার। সুতরাং নেতৃত্বের অধিকার রয়েছে কেবলমাত্র তাদেরই।

উক্ত পেক্ষিতে সে কুরাইশ এবং বনু খুযায়মার কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সাথে এ মর্মে আলাপ-আলোচনা করে যে, কেন বনু বকর এবং বনু খুযায়মাকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করা হবে না। আলোচনায় অংশ গ্রহণকারীগণ এ ব্যাপারে তার মতের সাথে অভিন্ন মত পোষণ করে।

দ্বিতীয় বিবরণ হচ্ছে: বনু খুযায়মার কথা অনুযায়ী হোলাইল নিজেই কুসাইকে অসীয়ত করে যে, সে-ই মক্কার শাসনভার গ্রহণ করবে এবং কা'বার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।

তৃতীয় বিবরণ হচ্ছে: হোলাইল তার কন্যা হোবার হাতে বায়তুল্লাহর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন এবং আবু গিরমান খুযায়ীকে তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে। হোবার প্রতিনিধি হিসেবে আবু গিরমান খুযায়মাই হয়ে যায় কা'বার দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এদিকে হোলাইল যখন মৃত্যুবরণ করে তখন কুসাই এক মশক মদের বিনিময়ে আবু গিরমানের নিকট থেকে কা'বার ব্যবস্থাপনার অধিকার ক্রয় করে নেয়। কিন্তু খুযায়মা সম্প্রদায় এ জাতীয় ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারটি অনুমোদন না করে বায়তুল্লাহর ব্যাপারে কুসাইকে বাধা প্রদান করতে থাকে কুসাইও কিন্তু ছাড়বার পাত্র নয়। বনু খুযায়মাকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করার মানসে কুরাইশ এবং বনু কেনানাকে একত্রিত করে তাদের সহায়তা লাভের জন্য আবেদন জানাল। কুসাইয়ের আহবানে সাড়া দিয়ে তারাও একাত্বতা ঘোষণা করলো।

কারণ যেটাই হোক, ঘটনার রূপটি ঠিক এরকম যে, হোলাইল যখন মৃত্যুবরণ করলো সুফা তখন তাই করতে চাইল- যা সে সর্বদা করে আসছিলো। কুসাই তখন কুরাইশ এবং কেনানা'র লোকজনদের সাথে নিয়ে আকাবার যে স্থানে তারা সম্মিলিত হয়েছিলো সেখানে উপস্থিত হয়ে বললো- 'খানায়ে কা'বার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনের জন্য তোমাদের তুলনায় আমরা অধিকতর যোগ্য এবং আমাদের দাবি অগ্রগণ্য।

কিন্তু কুসাইয়ের কথায় কর্ণপাত না করে তারা যুদ্ধ ঘোষণা করে বসলো। এ যুদ্ধে কুসাই তাদের পরাজিত করে তার মান-মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে কুসাই এবং সুফার মধ্যকার বিরোধের সুযোগ নিয়ে বনু খুযায়মা ও বনু বকর অসহযোগিতার পথ অবলম্বন করল। কুসাই তাদের ভয় প্রদর্শন করে সাবধান হওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এ দু' গোত্রের লোকজন কুসাইয়ের কথার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। এভাবে উভয়পক্ষই এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এ যুদ্ধে দু' পক্ষেরই বহু লোকজন হতাহত হয়।

জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে আপোস-নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত উভয়পক্ষের মধ্যেই আগ্রহ জাগে এবং উভয় পক্ষই একটি চুক্তি সম্পাদনে সম্মত হয়। সে লক্ষ্যে বনু বকর গোত্রের 'ইয়ামার বিন আউফ' নামক এক ব্যক্তিকে মধ্যস্থতাকারী মনোনীত করা হয়। সমস্যার সকল দিক পর্যালোচনা করে সে রায় দেয় যে, মক্কার শাসনভার এবং বায়তুল্লাহর ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে খুযায়মার তুলনায় কুসাই-ই অধিকতর যোগ্যতার অধিকারী। সে সাথে সে আরো রায় প্রদান করে যে, এ যুদ্ধে কুসাই যত রক্তপাত ঘটিয়েছে তা সব-ই অর্থহীন এবং পদদলিত বলে ঘোঘণা করছিলো। তাছাড়া এ সিদ্ধান্তও ঘোষিত হয় যে, খুযায়মা ও বনু বকর যে সকল লোকজনকে হত্যা করেছে তাদের জন্য রক্তপণ প্রদান এবং বায়তুল্লাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অকুণ্ঠচিত্তে কুসাইয়ের হাতে সমর্পণ করতে হবে। উক্ত বিচার-সালিশের কারণে ইয়ামারের উপাধি হয়েছিলো 'শাদ্দাখ'। শাদ্দাখ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে 'পদদলিতকারী ব্যক্তি'।

উক্ত আপোস-নিস্পত্তি এবং চুক্তির ফলে মক্কার ওপর কুসাই ও কুরাইশদের পূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ সম্ভব হয় এবং বায়তুল্লাহর ধর্মীয় নেতার মহা- সম্মানিত পদটিও কুসাই লাভ করে। এর ফলে খানায়ে কা'বা পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লোকজনের সাথে তার সম্পর্ক হতে থাকে। মক্কার ওপর কুসাইয়ের আধিপত্যের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের মধ্যভাগে, অর্থাৎ ৪৪০ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়।

মক্কার শাসন-ক্ষমতা লাভের পর কুসাই শাসনব্যবস্থায় কিছুটা সংস্কারমুখী কাজ-কর্মের দিকে মনোনিবেশ করে। মক্কার আশপাশে বসবাসরত কুরাইশগণকে মক্কায় নিয়ে এসে সে পুরো শহরটাকে তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়ার মাধ্যমে প্রত্যেক বংশের লোকজনদের বসবাসের জন্য যথাযথ স্থান নির্ধারণ করে দেয়। তবে যারা হারাম মাসকে আগে পিছে করতো তাদের এমনকি আলে সাফওয়ান, বনু আদওয়ান এবং বনু মুররা বিন আউফ প্রভৃতি গোত্রসমূহের লোকজনকে তাদের স্ব স্ব পদে বহাল রাখে। কারণ কুসাই মনে করতো যে, এ সকল কাজ-কর্ম ও ধর্ম-কর্মের অন্তর্ভুক্ত এবং এসব ব্যাপারে রদবদল করা ঠিক নয়।

কুসাইয়ের সংস্কারমূলক কাজ

কুসাইয়ের সংস্কারমুখী কার্যকলাপের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিলো, সে কা'বা ঘরের উত্তরে 'দারুন নাদওয়া' প্রতিষ্ঠা করে। এর দরজা ছিলো মসজিদের দিকে। 'দারুন নাদওয়া ছিলো প্রকৃত অর্থেই কুরাইশদের 'জাতীয় সংসদ'। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য বিষয়াদিও বিচার-বিশ্লেষণ করা হতো। কুরাইশদের জন্য এটি ছিলো একটি অত্যন্ত কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান। কারণ এই 'দারুন নাদওয়াই' ছিলো তাদের ঐক্যের প্রতীক এবং এখানেই তাদের বিক্ষিপ্ত ও বিতর্কিত সমস্যাবলি ন্যায়সঙ্গত উপায়ে মীমাংসা করা হতো।

কুসাইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ও মক্কাবাসীদের নেতৃত্বের প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ পালনের অধিকার সে লাভ করে-

১. সে 'দারুন নাদওয়া'র অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারতো। এ সকল অধিবেশনে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে পরামর্শ করার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। সেখানে সমাজের লোকজনের কন্যাদের বিয়ে-শাদীর আয়োজনও করা হতো।

2. লেওয়া: অর্থাৎ যুদ্ধের পতাকা কুসাইয়ের হাতেই বেঁধে রাখা হতো।

৩. হেজাবাত: এর অর্থ হচ্ছে কা'বা ঘর রক্ষণাবেক্ষণ। কুসাই নিজেই কা'বা ঘরের দরজা খুলতো এবং আনুসঙ্গিক যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সে নিজেই পালন করতো।

৪. সেকায়া: এর অর্থ হচ্ছে পানি পান করানো। হজ্জযাত্রীদের পানি পান করানোর একটি সুন্দর রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো। এতদুদ্দেশ্যে জলাধার এবং চৌবাচ্চার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতো। সে পানিতে পরিমাণ মতো খেজুর ও কিসমিস দিয়ে বেশ সুস্বাদু পানীয় বা শরবত তৈরি করা হতো। হজ্জযাত্রীগণ মক্কায় আগমন করলে সে তাদের পানীয় পান করাতো।

৫. রেফাদাহ: অর্থাৎ হজ্বযাত্রীদের মেহমানদারিত্ব। হজ্বযাত্রীদের আপ্যায়ন ও সুবিধার জন্য খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে খাওয়ানোর একটা রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো। এতদুদ্দেশ্যে কুসাই কুরাইশদের ওপর একটা নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা নির্ধারণ করে তা আদায় করতো। আদায়কৃত অর্থের সাহায্যে খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে আর্থিক দিক দিয়ে অসচ্ছল কিংবা যাঁদের নিকট খাদ্যবস্তু থাকতো না-এমন সব হজ্বযাত্রীদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হতো।

উল্লিখিত কর্মকাণ্ডের প্রত্যেকটি ছিলো উচ্চমানের সম্মানের প্রতীক এবং কুসাই ছিলো এসবের প্রতিভু। কুসাইয়ের প্রথম পুত্রের নাম ছিলো 'আব্দুদ্দার'। কিন্তু এতদসত্ত্বেও কুসাইয়ের জীবদ্দশাতেই তার দ্বিতীয় পুত্র আবদে মানাফ' সম্মান নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে যায়।

উক্ত কারণে কুসাই তার পুত্র আব্দুদ্দারকে বলছিলেন- 'যদিও কেউ কেউ সম্মান ও নেতৃত্বের ওসিয়ত করেছিলো। অর্থাৎ 'দারুন নাদওয়ার' অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার অধিকার, কা'বা ঘর রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার, যুদ্ধের পতাকা বহনের অধিকার, হজ্বযাত্রীদেরকে পানি পান করানো, ও হজ্বযাত্রীদের মোহমানদার দায়িত্ব ইত্যাদি সবকিছুরই অধিকার আব্দুদ্দারকে ওসিয়ত করলো।

কুসাই ছিলো খুবই উন্নত মর্যাদার ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নেতা। সুতরাং কেউ কখনো তার বিরোধিতা করতো না এবং তার কোনো প্রস্তাব কিংবা সিদ্ধান্ত কেউ কখনো প্রত্যখ্যানও করতো না। সেহেতু কুসাইয়ের প্রচলন করা নিয়ম- নীতিগুলোকে মেনে চলাটা তার মৃত্যুর পরও ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করণীয় কর্তব্য বলে মনে করা হতো। অন্যদিকে কুসাইয়ের পুত্রগণ একই কারণে তার মৃত্যুর পরেও দ্বিধাহীন চিত্তে ওসিয়তগুলো মেনে চলেছিলো।

কিন্তু আবদে মানাফ যখন ইন্তেকাল করলো তখন তার পুত্রগণ উল্লিখিত পদসমূহের ব্যাপারে আব্দুদ্দারের সন্তানদের সাথে রেষারেষি আরম্ভ করলো। যার ফলে কুরাইশগণ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লো এবং দু দলের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলো। কিন্তু ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে উভয় পক্ষই সংযম প্রদর্শন করে একটি সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এ চুক্তির ফলে নেতৃত্ব ও মান-মর্যাদার বিষয়গুলো উভয় পক্ষের মধ্যে বন্টিত হয়ে গেলো। 'কোয়া' ও রেফাদাহ' এ পদ দুটো দেয়া হলো বনু আবদে মানাফকে। দারুন নাদওয়ার সভাপতিত্ব, লেওয়া ও হেজাবাতের দায়িত্ব বনু আব্দুদ্দারের হাতেই রয়ে গেল।

বনু আবদে মানাফ আবার তাদের প্রাপ্ত পদগুলোর জন্য নিজেদের মধ্যে লটারী করলো। লটারীতে নাম উঠলো হাশেম বিন আবদের মানাফের। তখন থেকে হাশেম-ই সেকায়া ও রেফাদাহ এ দুটো বিষয়ে নেতৃত্ব দান করতে থাকে এবং তার মৃত্যু পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।

হাশেমের মৃত্যু হলে তার সহোদরা 'মুত্তালিব' তার স্থলাভিষিক্ত হয়। কিন্তু মুত্তালিবের পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র আব্দুল মুত্তালিব' (যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ এর দাদা) এ পদের অধিকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এমনকি যখন ইসলামের যুগ আরম্ভ হলো তখন আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব' উক্ত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

এছাড়া আরো কিছু সংখ্যক পদ ছিলো যা কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিয়েছিলো। সে সকল পদের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুরাইশগণ একটি ছোট রাষ্ট্র বরং বলা যায় যে, একটি রাষ্ট্রমুখী সমাজ কাঠামো প্রবর্তন করে নিয়েছিলো। বর্তমানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় যে গণতান্ত্রিক ধারা অনুসৃত হয়ে থাকে অনেকটা সে বাঁট ও ছাঁচের প্রশাসনিক অবকাঠামো ও সমাজব্যবস্থা তৎকালীন মক্কায় গড়ে তোলা হয়েছিলো। যে পদগুলোর কথা ইতঃপূর্বে বলা হলো, সে পদগুলো হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ-

১. ঈসার: এতে ভবিষ্যৎ জানা এবং ভাগ্য নির্ণয়ের জন্য মূর্তির পাশে রক্ষিত তীরের মালিকানার ব্যবস্থা ছিলো। এ পদের অধিকর্তা ছিলো 'বনু জুমাহ'।

২. ধন-সম্পদের ব্যবস্থাপনা: মূর্তির নৈকট্য লাভের জন্য যে কুরবানি এবং মানত বা মানসী উৎসর্গ করা হতো এ হচ্ছে তারই ব্যবস্থাপনা। বিবাদ- বিসম্বাদ এবং মামলা-মোকাদ্দমা মীমাংসার ব্যাপারটিও ছিলো এর সাথে সংশ্লিষ্ট। এ সংক্রান্ত দায়িত্ব অর্পিত ছিলো 'বন্ধু সহম' গোত্রের ওপর।

৩. শূরা: এ সম্মানের সাথে সংশ্লিষ্ট গোত্র ছিলো 'বনু আসাদ'।

৪. আশনাক: এ অধিদপ্তরের কাজ ছিলো রক্তপাতের খেসারত এবং জরিমানার ব্যবস্থা। এর দায়িত্ব অর্পিত ছিলো 'বনু তায়েম' গোত্রের ওপর।

৫. উকাব: এর কাজ ছিলো জাতীয় পতাকা ধারণ করা। এ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলো 'বনু উমাইয়া' গোত্র।

৬. কুব্বাহ: এ পদটি ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অধিদপ্তরের দায়িত্ব- কর্তব্য ছিলো সৈন্যদের জন্য শিবির স্থাপন এবং সৈন্য পরিচালনা করা। এ দায়িত্ব অর্পিত ছিলো 'বনু মাখযম' গোত্রের ওপর।

৭. সাফারাত: এ অধিদপ্তরের কর্তব্য ছিলো ধৌতকার্য সম্পাদন করা। এর দায়িত্ব ছিলো বনু আদী গোত্রের ওপর।

আরব গোত্রপতিদের নেতৃত্ব সম্পর্কিত আরো কিছু কথা

ইতোপূর্বে কাহতানী ও আদনানীদের স্ব স্ব বাসস্থান ত্যাগ করে যাওয়া সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনা করা হয়েছে যে, সবগুলো আরব রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এ সকল গোত্রের সমন্বয়ে। উপরন্তু তাদের নেতৃত্বে এবং গোত্রপতিদের স্বরূপ এমন ছিলো যে, যেসব গোত্র হীরার আশপাশে বসবাসরত ছিলো তাদেরকে হীরা বা ইরাক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়েছে এবং যেসব গোত্র বাদিয়াতুস শাসে বসতি স্থাপন করেছিলো তাদেরকে গাসসানী শাসকদের অন্তর্ভূক্ত ধরা হয়েছে। এ সম্পর্কে যেভাবে যতটুকুই বলা হোক না কেন, তা হবে শুধু কথার কথা। এ সকল গোত্র, উপগোত্র, তাদের বসবাস, দেশত্যাগ এবং শেষে পুনরাগমন সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক সূত্র কিংবা আলোচনাকেই চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

উপরোল্লিখিত গোত্রসমূহ ছাড়া আর যেসব গোত্র দেশের অভ্যন্তরে বসবাস করতো তাদের সম্পর্কেও কিছুটা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সকল দিক দিয়েই এসব গোত্র স্বাধীন ছিলো। এদের মধ্যে গোত্রপতি-ব্যবস্থা চালু ছিলো। গোত্রের জনসাধারণ নিজেরাই তাদের প্রধান নির্বাচিত করতো। তারা নিজ গোত্রকে একটি ছোট রাষ্ট্র এবং গোত্রপতিকে রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা প্রদান করতো। গোত্রীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্থিতিশীলতা ও অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব, গোত্রীয় জনগণের নিরাপত্তা, বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা ইত্যাদি সকল ব্যাপারেই গোত্রীয় জনগণ সম্মিলিতভাবে কাজ করতো।

গোত্রপতিদের নিয়ম-নীতি

যেকোনো গোত্র সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যুদ্ধ ঘোষণা, যুদ্ধ পরিচালোনা কিংবা সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করতে পারতো। যুদ্ধ কিংবা শান্তি যেকোনো অবস্থাতেই গোত্রের লোকজনকে গোত্রপতির নির্দেশ মেনে চলতে হতো। কোনো অবস্থাতেই তার বিরুদ্ধাচরণ করা যেতো না। এমনকি কোনো কোনো গোত্রপতির অবস্থা এমনও হতো যে, যদি সে রাগান্বিত হতো তাহলে তৎক্ষণাৎ সহস্রাধিক তলোয়ার কোষমুক্ত হয়ে যেতে। সেক্ষেত্রে জিজ্ঞাসার কোনো অবকাশই থাকতো না যে, গোত্রপতির রাগান্বিত হওয়ার কারণটি কী!

কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার নেতৃত্বের প্রশ্নে গোত্রপতির চাচাতো ভাইদের সাথে রেষারেষি এবং দ্বন্দ্বও শুরু হয়ে যেতো। এ কারণে গোত্রপতিকে কতগুলো বিধি-বিধান মেনে চলতে হতো। সেগুলো নিম্নরূপ-

১. স্বগোত্রীয় লোকদের সাথে কথাবার্তা এবং আলোচনার ক্ষেত্রে গোত্রপতিকে সংগ্রমের পরিচয় দিতে হবে এবং উদার মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে।

২. রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে তাকে মিতব্যয়ী হতে হবে। কোনোক্রমেই সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারবে না।

৩. মেহমানদারী করার ব্যাপারে তাকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

৪. কাজ-কর্মের ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই দক্ষতা ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

৫. গোত্রীয় বীরত্বের প্রতিভু হিসেবে তাকে বীরত্বের বাস্তব নমুনা প্রদর্শন করতে হবে।

৬. যে কাজ করলে লজ্জিত হতে হবে এমনসব কাজ-কর্ম করা থেকে তাকে বিরত থাকতে হবে।

৭. সাধারণ লোকদের দৃষ্টিতে একটি কল্যাণমুখী সমাজ এবং বিশেষভাবে কবিগণের দৃষ্টিতে একটি সুন্দর ও চরমোৎকর্ষের পথে অগ্রসরমান উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে, সে যুগে কবিগণকে সমাজের জ্ঞানী-গুণী ও পথপ্রদর্শক মনে করা হতো। এভাবে গোত্রপতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উচ্চাসন বা উচ্চমর্যাদা লাভের জন্য বিধিবদ্ধ আচরণবিধির অনুসরণে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ন্যায়ভিত্তিক জীবন যাপন করতে হতো।

গোত্রপতিদের অধিকার

গোত্রপতিদের নিকট থেকে সমাজ যেমন অনেক কিছুই আশা করতো, অন্যদিকে তেমনি আবার সমাজ গোত্রপতিদের জন্য কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতো। সে সম্পর্কে জনৈক কবি তার কাব্যিক ছন্দের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন-

"আমাদের নিকটে তোমার জন্য গণীমতের সম্পদের এক চতুর্থাংশ এবং যা তুমি পছন্দ করবে এবং সে মাল যার তুমি মীমাংশা করবে এবং বিনা পরিশ্রমে অর্জিত সম্পদ এবং বিলি-বণ্টন থেকে যা অবশিষ্ট রয়ে যাবে।"

মেরবা: মালে গণীমতের এক-চতুর্থাংশ।

সফি: সে সম্পদ -যা বণ্টনে পূর্বেই গোত্রপতি নিজের জন্য নির্ধারিত করে রাখে।

নাশিতা: সে সম্পদ -যা মৌলিক স্তর অর্থাৎ সাধারণ লোকজনের নিকট পৌঁছার পূর্বেই পথিমধ্যে গোত্রপতি গ্রহণ করে।

ফুযুল: সে সম্পদ-বা গাজীদের সংখ্যানুপাতে বন্টন করা সম্ভব না হওয়ার কারণে অবশিষ্ট থেকে যায়। বন্টনের পর অবশিষ্ট উট, ঘোড়া ইত্যাদি সম্পদ গোত্রপতির প্রাপ্য হয়ে থাকে। আরব উপদ্বীপের গোত্রসমূহ এবং গোত্রপতিদের সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এখন সমসাময়িক রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

সমকালীন আরবের রাজনৈতিক পরিস্থিতি

আরব উপদ্বীপের তিন দিকের সীমান্তবর্তী দেশসমূহের রাজনৈতিক অবস্থা ছিলো খুবই অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল এবং পতনোন্মুখ। সমাজের মানবগোষ্ঠী হয় মানব, নয়তো দাস, কিংবা হয় রাজা, নয়তো প্রজা-এ দু শ্রেণিতে বিভক্ত ছিলো। মনিব, রাজা, গোত্রপতি, নরপতি যে উপাধিতেই ভূষিত থাকুক না কেন, সমাজ- জীবনের যাবতীয় কল্যাণ বা সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত থাকতো তাদেরই জন্য, বিশেষ করে বহিরাগত নেতাদের জন্য। অন্যদিকে গোত্রপতি বা নরপতিদের যাবতীয় আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির আয়োজন ও উপকরণাদির জন্য প্রাণপণ পরিশ্রম করতে হতো জনসাধারণ এবং দাস-দাসীদেরকে। আরো সহজ এবং সুস্পষ্টভাবে বললে বলা যেতো যে, প্রজারা ছিলো যেন শস্যক্ষেত্র স্বরূপ- যেখান থেকে সংস্থান হতো রাষ্ট্রের যাবতীয় আয়-উপার্জনের। রাষ্ট্রনায়কগণ এসব উপার্জন তাদের ভোগ-বিলাস, কাম-প্রবৃত্তি চরিতার্থ এবং অন্যান্য নানাবিধ দুষ্কর্মে ব্যবহার করতো। সাধারণ মানুষের ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছার কোনোই মূল্য থাকতো না। অত্যাচার-অনাচারে জর্জরিত মানুষ তাদের অভাব-অভিযোগ কিংবা দুঃখ-কষ্টের কথা মুখে আনলেই আরো শতধারায় বর্ষিত হতো অত্যাচার- উৎপীড়নের অগ্নিধারা। এক কথায় 'স্বৈরাচারী শাসন বলতে যা বোঝায় তা চরমে পৌঁছেছিলো সেসব অঞ্চলে। সুতরাং অসহায় মানুষের নিরবে সহ্য করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলো না।

উক্ত অঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোকেও মাঝে মাঝে এসব আচার-উৎপীড়নের শিকার হতে হতো। স্বৈরাচারী গোত্রপতিদের ভোগলিপ্সা, স্বার্থান্ধতা এবং অর্থহীন অহংকারবোধের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে তাদেরকে ছুটে বেড়াতে হতো বিভিন্নদিকে। এ গোত্রপতিগণ তাদের হীন স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে আরো একটু অগ্রসর হয়ে কখনো ইরাকীদের হাতকে শক্তিশালী করতো, কখনো বা তাল মিলিয়ে চলতো শামবাসীদের সাথে।

যেসব গোত্র আরব ভূ-খণ্ডের অভ্যন্তর ভাগে বসবাস করতো তাদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেও নানাবিধ সমস্যা এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করতো। গোত্রে গোত্রে বিবাদ-বিসম্বাদ বংশপরম্পরায় শত্রুতা, ধর্মীয় মতবিরোধ, গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে পরিবেশ থাকতো উত্তপ্ত। যেকোনো মূল্যেই হোক, প্রত্যেক গোত্রের লোকজন নিজ নিজ গোত্রের পক্ষে কাজ করতো। সেটা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হোক কিংবা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত হোক তা যাচাই-বাছাইয়ের কোনো প্রশ্নই থাকতো না। যেমনটি তাদের মুখপত্রে বলা হয়েছে-

"আমিও তো গাথিয়া গোত্রের একজন। যদি সে গোত্র ভ্রান্ত পথে চলে তবে আমিও ভ্রান্ত পথে চলবো এবং যদি সে সঠিক পথে চলে তবে আমিও সঠিক পথে পরিচালিত হবো।"

আরবের অভ্যন্তরে এমন কোনো নেতা ছিলেন না যিনি তাদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করবে। এমন কোনো আশ্রয়স্থল ছিলো না বিপদ-আপদ কিংবা সংকটের মুহূর্তে যেখানে তারা আশ্রিত হতে পারবে এবং প্রয়োজনে যার ওপর তারা নির্ভরশীল হতে পারবে।

তবে হ্যাঁ, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, উপদ্বীপ রাষ্ট্রে হেজাযকে কারো কারো মতে সম্মানের আসনে সমাসীন বলে মনে করা হতো এবং ধর্মকেন্দ্র ও মীয় আচার-আচরণের পরিচালক ও রক্ষক হিসেবে ধারণা করা হতো। পকৃতপক্ষে এ রাষ্ট্র ছিলো পার্থিব পরিচালনা ও ধর্মীয় পুরোহিত -তত্ত্ববিদদের এক প্রকার মিশ্রিত রূপ। এর দ্বারা আরববাসীদের ওপর ধর্মীয় শাসনের নামে তাদের মর্যাদার উচ্চাসন অর্জিত হতো। সে সাথে হারাম শরিফ ও হারাম শরীফের আশপাশের শাসনকার্যও নিয়মিত পরিচালিত হতো। তারাই বায়তুল্লাহর পরিদর্শকদের প্রয়োজন পরিপূরণের ব্যবস্থাপনা এবং ইবরাহিমি শরিয়তের হুকুম আহকাম চালু রাখার ব্যবস্থা করতো। কিন্তু এ রাষ্ট্র এতই দুর্বল ছিলো যে, আরবের যাবতীয় আভ্যন্তরীণ দায়দায়িত্বের গুরুভার বহনের ক্ষমতা তার ছিলো না। এ সত্যটি হাবশিদের আক্রমণের সময় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়।

আরবের ধর্মীয় মতবাদ প্রসঙ্গ একত্ববাদী ধর্ম বিশ্বাস

আরবে বসবাসকারী সাধারণ লোকজন ইসমাইল (আ) এর দাওয়াত ও প্রচারের ফলে ইবরাহিম (আ) প্রচারিত দ্বীনের অনুসারী ছিলো। এ কারণেই তারা ছিলো আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং একমাত্র আল্লাহর-ই উপাসনা করতো। কিন্তু কালের আবর্তে ক্রমশ তারা আল্লাহর একত্ববাদ একনিষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষার কোনো কোনো অংশ ভুলে যেতে থাকে কিংবা সে সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আল্লাহর একত্ববাদ এবং দ্বীনে ইবরাহিম (আ) এর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট থেকে যায় যে পর্যন্ত না বনু খুযায়মা গোত্রের সর্দার আমর বিন লুওয়াই জনসমক্ষে এসে উপস্থিত না হয়। ধর্মীয় মতাদর্শের লালন ও পরিপোষণ, দান খয়রাত এবং ধর্মীয় বিষয়াদির প্রতি তার গভীর অনুরাগের কারণে লোকজন তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতে থাকে। সে সাথে বড়ো বড়ো আলিম এবং সম্মানিত ওলীদের দলভুক্ত ধরে নিয়ে তার অনুসরণ করতে থাকে।

মূর্তি পূজার প্রচলন

এমন অবস্থার এক পর্যায়ে সে শামদেশ ভ্রমণে যায় এবং সেখানে গিয়ে মূর্তিকে পূজা-অর্চনার জাঁকালো চর্চা প্রত্যক্ষ করে। শামদেশ অনেক পয়গাম্বরের জন্মভূমি এবং ঐশী বাণী নাযিলের ক্ষেত্র হওয়ায় সেসব মূর্তিপূজাকে সে অধিকতর ভালো এবং সত্য বলে ধারণা করে। তাই দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় সে 'হোবল' নামক মূর্তি সাথে নিয়ে আসে এবং কা'বা ঘরের মধ্যে সেটা স্থাপনের মাধ্যমে পূজা-অৰ্চনা শুরু করে। সাড়া দিয়ে মূর্তি হোবলের পূজা করতে থাকে। কালবিলম্ব না কর হেজাযরাশির মক্কাবাশির পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকে। কারণ তারাও এককালে বায়তুল্লাহর ব্যবস্থাপক এবং হারামের বাসিন্দা ছিলো।

এভাবে একত্ববাদী আরববাসী অবলীলায় মূর্তিপূজার মতো এক অতি জঘন্য এবং ঘৃণিত পাপাচার ও দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে আরব ভূমিতে মূর্তিপূজার গোড়াপত্তন হয়।

'হোবল' ছাড়া আরবের প্রাচীনতম মূর্তিগুলোর মধ্যে ছিলো 'মানাত' মূর্তি। লোহিত সাগরের তীরে 'কোদাইদ' নামক ভূ-খণ্ডের সন্নিকটস্থ 'মূসাল্লাল' নামক স্থানে তা প্রতিষ্ঠিত ছিলো।

এরপর তায়েফে 'লাত' নামক মূর্তির প্রতিষ্ঠা এবং পূজা শুরু হয়ে যায়। অন্যদিকে আবার 'নাখলা' নামক উপত্যকায় 'উয্যা' নামক মূর্তির পূজা চলতে থাকে। এ তিনটি ছিলো আরবের সবচেয়ে বড়ো এবং বিখ্যাত মূর্তি। এরপর হেজাযের বিভিন্ন অংশে শিরক ও মূর্তিপূজার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটতে থাকে।

কথিত আছে যে, এক জ্বীন 'আমর বিন লোহাই' এর অনুগত ছিলো। সে বলেছে যে, নূহ সম্প্রদায়ের মূর্তি "ওয়াদ্দ সেওয়া" "ইয়াগুস, 'ইয়াউক' এবং 'নাসর' জেদ্দার ভূমিতে প্রোথিত রয়েছে। এ মূর্তির খোঁজ পেয়ে আমর বিন লোহাই জেদ্দায় যায় এবং মাটি খনন করে মূর্তিগুলোকে বের করে। অতঃপর সেগুলোকে তেহামায় নিয়ে যায় এবং পরবর্তী হজ্জ মৌসুমে মূর্তিগুলো বিভিন্ন গোত্রের হাতে তুলে দেয়। এভাবে একেকটি মূর্তি একেক গোত্রের অধিকারে এসে পড়ে। পরবর্তী পর্যায়ে বিভিন্ন গোত্রের লোকদের ঘরে ঘরে মূর্তি স্থান পেয়ে যায়।

অতঃপর মক্কার মুশরিকরা একের পর এক মূর্তি দিয়ে মসজিদে হারামকেও পরিপূর্ণ করে তোলে। বর্ণিত আছে যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে মসজিদুল হারামের ৩৬০টি মূর্তি ছিলো। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর মুবারক হাত দিয়ে মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করেছিলেন। একের পর এক তিনি স্মৃতিগুলোকে মসজিদে হারামের বাইরে নিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।

উদ্দেশ্যে ছিলো, মূর্তিপূজা ও অংশীবাদিতা দ্বীনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অনাচার এবং পাপাচার হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন আরববাসিরা অসার অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণা ছিলো যে, তারা দ্বীনে ইবরাহিম আলাইহিস সালামে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে' -এই ধারণাকে একদম ধূলিসাৎ করে দেয়া।

অন্যদিকে আবার জাহেলি যুগের লোকদের মূর্তিপূজার বিশেষ বিশেষ রীতি-পদ্ধতিও প্রচলিত ছিলো। এসবের অধিকাংশই আমর বিন লোহাইয়ের প্রবর্তিত মনগড়া রীতি ছিলো। ইবনে লোহাই প্রবর্তিত মূর্তিপূজকের দল মনে করতো দ্বীনের ক্ষেত্রে সে যে রীতি-পদ্ধতির কথা বলেছে তা ইব্ররাহিম (আ) প্রবর্তিত দ্বীনের পরিবর্তন কিংবা বিলোপসাধন নয়; বরং সেটা হচ্ছে ভালোর জন্য কিছু কিছু নতুন সংযোজনের মাধ্যমে সর্বযুগের সকল মানুষের উপযোগী একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান প্রবর্তন করা। জাহেলি যুগের লোকেরা তাদের মনগড়া দ্বীনের ক্ষেত্রে যে সব রীতি-পদ্ধতির প্রচলন করে নিয়েছিলেন তা হলো নিম্নরূপ-

১. মূর্তির কাছে প্রার্থনা: মূর্তিপূজকগণ দরগার খাদেমের মতো মূর্তির পাশে বসে তাদের নিকট আশ্রয় অনুসন্ধান করতো এবং উচ্চ কণ্ঠে তাদের আহ্বান জানাতো। অভাব মোচন ও বিপদাপদ হতে উদ্ধারের জন্য অনুনয়-বিনয় সহকারে তাদের নিকট প্রার্থনা জানাতো। প্রার্থনাকারী মনে করতো, মূর্তিরূপী এসব দেব-দেবী তাদের প্রার্থনা কবুল করার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ পেশ করবে যা তাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

২. মূর্তিকে প্রদক্ষিণ ও সিজদা করা: তারা মূর্তির উদ্দেশ্যে হজ্জ সম্পন্ন করতো, মূর্তিকে তাওয়াফ এবং সিজাদাহ করতো এবং তাদের সামনে অত্যন্ত ভক্তি ও বিনয়াবনত আচরণ করতো।

৩. মূর্তির উদ্দেশ্যে বলি দেয়া: মূর্তির জন্য বিভিন্ন ধরনের মানত এবং কুরবানি উৎসর্গ করা হতো। উৎসর্গকৃত জীব-জানোয়ারগুলোকে মূর্তির বেদীমূলে তার নাম নিয়ে যবেহ করা হতো। ঘটনাক্রমে অন্য কোথাও যবেহ করা হলেও মূর্তির নাম নিয়েই তা করা হতো। তাদের উক্ত উৎসর্গকৃত পশু যবেহ করা প্রসঙ্গে দুটো রীতির কথা আল্লাহ কুরআন মাজিদে উল্লেখ করেছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে:-

ঐ সমস্ত পশুও হারাম যেগুলো মূর্তির বেদীমূলে যবেহ করা হয়েছে। (আল মায়িদা: আয়াত ৩)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:-

ঐ পশুর গোস্ত খেও না যাকে আল্লাহর নাম না নিয়ে যবেহ করা হয়েছে। অর্থাৎ গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা হয়েছে। (আল আনআম: আয়াত ১২১)

৪. মূর্তির জন্য উৎসর্গ: মূর্তিপূজক পূজার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের কিছু অংশ, উৎপাদিত শস্যাদি এবং পালিত পশুদলের কয়েকটি পশু মূর্তির জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতো। এক্ষেত্রে আরো একটি আকর্ষণীয় ও প্রণিধানযোগ্য ব্যাপার ছিলো, উৎপাদিত শস্যাদি এবং পালিত পশুদলের কিছু অংশ আল্লাহর নামের নির্দিষ্ট করে রাখা দ্রব্যাদি মূর্তির জন্য রেখে দেয়া দ্রব্যাদির সাথে মিশিয়ে তা মূর্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দেয়া হতো। কিন্তু মূর্তির জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা দ্রবাদির সাথে মিশিয়ে কখনোই তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো না। কুরআন মাজিদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:-

আর আল্লাহ যেসব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন তারা (মুশরিকরা) তার কিছু অংশ আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখে এবং নিজেদের ধারণা মতে বলে, এসব আল্লাহর, আর এসব আমাদের দেবতাদের। অন্তত যে অংশ তাদের দেবতাদের হয়তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না। আর যে অংশ আল্লাহর (নামে) হয় তা তাদের দেবতার দিকে পৌঁছিয়ে দেয়, আর তারা কতই না মন্দ ব্যবস্থা গ্রহণ করে রেখেছে। (আল আনআম: আয়াত ১৩৬)

৫. মূর্তির জন্য মানত: মূর্তির নৈকট্য লাভের আরো একটি রীতি এমন ছিলো যে, মুশরিকরা শস্যাদি এবং চতুষ্পদ জন্তুর ব্যাপারে বিভিন্ন রকম মানত করতো। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:-

আর মুশরিকরা (ধারণা করে) বলতো যে, এ চতুষ্পদ জন্তু এবং শস্যক্ষেত্র এটা কারো জন্য বৈধ নয়, কিন্তু আমরা যাকে ইচ্ছ করি, সে ছাড়া অন্য কেউ তা ভক্ষণ করতে পারবে না। আর কতকগুলো পশু যাদের ওপর আরোহণ করা কিংবা বোঝা চাপানো হারাম করা হয়েছে। আরো কতকগুলো পশুকে যবেহ করার সময় এরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে না। এসমস্তই আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যারোপ করা। (আল আনআম: আয়াত ১৩৮)

৬. মূর্তির জন্য পশু ছেড়ে দেয়া: সে চতুষ্পদ জন্তুগুলোর মধ্যে 'বাহীরা, 'সায়েবা, 'ওয়াসীলা' এবং 'হামী' নামে পশু ছিলো। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক বলেছেন: 'বাহীরা' সায়েবারই কন্যা সন্তানকে বলা হয় এবং সে উষ্ট্রীকে 'সায়েবা' বলা হয় যার গর্ভ থেকে দশবার মাদি ভূমিষ্ট হয়েছে, এর মধ্যে কোনো মর্দা ভূমিষ্ট হয়নি। এমনি অবস্থা বা প্রকৃতির উষ্ট্রীকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো। তার পৃষ্ঠদেশে কেউ আরোহণ করতো না, তার লোম কর্তন করতো না। এবং মেহমান ব্যতীত অন্য কেউই তার দুগ্ধ পান করতে পারতো না।

এরপর সে উষ্ট্রী যখন মাদী প্রসব করতো তখন তার কান চিড়ে দেয়া হতো এবং তাকেও তার মায়ের সাথে মুক্তভাবে চলাফেরার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো। এর পৃষ্ঠদেশে কেউ সওয়ার হতো না, তার লোম কাটা হতো না এবং মেহমান ব্যতীত অন্য কেউই তার দুগ্ধ ও পান করতো না। একে বলা হতো 'বাহীরা' এবং তার মাকে বলা হতো 'সায়েবা'।

'ওয়াসীলা' বলা হতো সে ছাগীকে যে ছাগী একাদিক্রমে দুটো দুটো করে পাঁচ দফায় দশটি মাদি প্রসব করে এবং এর মধ্যে কোনো মর্দা প্রসব করে না। সে ছাগীকে এ কারণে 'ওয়াসীলা' বলা হয় যে, সে তার সবগুলো মাদি একে অন্যের সাথে জড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সে ছাগী যে বাচ্চা প্রসব করবে তাকে শুধু পুরুষ লোকেরাই খেতে পারবে, নারীরা খেতে পারবে না। তবে যদি কোনো মৃত বাচ্চা প্রসব করে তাহলে পুরুষ এবং নারী সকলেই তাকে খেতে পারবে।

সে উষ্ট্রীকে 'হামী' বলা হয় যার প্রজননের মাধ্যমে পর পর একাদিক্রমে দশটি মাদি জন্মলাভ করেছে এবং এসবের মধ্য কোনো মর্দা জন্মায়নি। এ জাতীয় উষ্ট্রীয় পৃষ্ঠদেশ সংরক্ষিত থাকতো। অর্থাৎ এর পৃষ্টদেশে আরোহণ নিষিদ্ধ ছিলো এর লোমও কর্তন করা নিষিদ্ধ ছিলো। শুধুমাত্র প্রজননের উদ্দেশ্যে উটের পালের মধ্যে সেটাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো, অন্য কোনো কাজে সেটাকে ব্যবহার করা হতো না। জাহেলী যুগের মূর্তিপূজার সেসব রীতি-পদ্ধতির প্রতিবাদ করে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:-

বাহীরা, সায়েবা, ওয়াসীলা ও হামের প্রচলন আল্লাহ করেন নি। কিন্তু যারা কাফির তারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেয়, আর অধিকাংশ কাফিরই (ধর্ম) জ্ঞান উপলব্ধি করে না। (আল মায়িদা: আয়াত ১০৩)

আরো ইরশাদ হয়েছে-

আর তারা বলে, এ পশুগুলোর গর্ভে যা কিছু রয়েছে তা শুধু আমাদের পুরুষদের জন্য (বৈধ) এবং আমাদের নারীদের জন্য হারাম। আর যদি তা মৃত হয় তাতে সকলে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। (আল আনআম: আয়াত ১৩৯)

যে ভাবে উল্লিখিত পশুগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যেমন বাহীরা, সায়েবা ইত্যাদি এবং এছাড়া আরো যা বর্ণনা করা হয়েছে তা ইবনে ইসহাকের উল্লিখিত ব্যাখ্যার কিছুটা বিপরীত এবং কিছুটা ভিন্ন ধরনের বলে মনে হয়। সাঈদ বিন মূসাইয়ে (রা) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন এ পশুগুলো মুশরিকদের তাগুত মূর্তিসমূহের জন্য ছিলো।

আমর বিন লোহাই ছিলো প্রথম ব্যক্তি যে মূর্তির নামে চতুষ্পদ প্রাণি উৎসর্গ করার ব্যবস্থা করেছিলো।

আরববাসী মূর্তিকে কেন্দ্র করে এসব করতো এ বিশ্বাসে যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভে এরা তাদেরকে সাহায্য করবে। যেমনটি কুরআন কারীমে বলা হয়েছে যে, মুশরিকরা বলতো-

আমরা তাদের উপাসনা শুধু এজন্য করছি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর ঘনিষ্ঠ করে দিবে। (সূরা যুমার: আয়াত -৩)

আরো ইরশাদ হয়েছে-

আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছু ইবাদত করে যারা তাদের অপকার কিংবা উপকার কোনো কিছুই করতে পারে না। আর তারা বলে যে, এরা হচ্ছে আল্লাহ র নিকট আমাদের সুপারিশকারী। (সূরা ইউনুস: আয়াত-১৮)

গণক ও তীরে বিশ্বাস: আরবের মুশরিকরা 'আযলাম' অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কর্ম সম্পর্কে ফলাফল নির্ণয়ের জন্য তীর ব্যবহার করতো (আয়লাম' হচ্ছে 'যালামুন' এর বহুচন এবং 'যালাম' সে তীরকে বলা হয়, যার ওপর পালক লাগানো থাকতো)। ভবিষ্যৎ কর্ম সম্পর্কিত ফলাফল নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত তীরগুলো ছিলো তিন প্রকারের।

১. প্রথম শ্রেণিভুক্ত তীরগুলোর গায়ে 'হ্যাঁ' কিংবা 'না' লেখা, থাকতো। এই শ্রেণিভুক্ত তীরগুলো সাধারণত: ভ্রমণ, বিয়ে-শাদী এবং অনুরূপ অন্য কোনো কার্য উপলক্ষে ব্যবহৃত হতো। বিশেষ একটি পদ্ধতিতে তীর বাছাই পর্ব সম্পাদিত হতো। কর্মপন্থা নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে বাছাইকৃত তীরপাত্রে 'হ্যাঁ' লেখা থাকলে পরিকল্পিত কার্য আরম্ভ করা হতো। কিন্তু বাছাই করতে গিয়ে 'না' লিখিত তীর বের হলে পরিকল্পিত কার্যটি এক বছরের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হতো এবং আগামীতে আবার উক্ত কার্যের জন্য শুভসময় বের করা হতো।

২. দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত তীরগুলোর কোনোটির গায়ে লেখা থাকতো 'পানি', কোনোটির গায়ে লেখা থাকতো 'দিয়াত' এবং অন্যান্যগুলোর গায়ে লেখা থাকতো অন্য কোনো কিছু।

৩. তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত তীরগুলোর মধ্যে কোনোটির গায়ে লেখা থাকতো 'তোমাদের অন্তর্ভুক্ত', কোনোটির গায়ে লেখা থাকতো তোমাদের ছাড়া, হয়তোবা কোনোটির গায়ে লেখা থাকতো 'মুলহাব' (যার অর্থ হচ্ছে মিলিত)। উল্লিখিত তীরগুলোর ব্যবহার ছিলো নিম্নরূপ।

তীরগুলোর ব্যবহার

কারো বংশ-পরিচয়ের ব্যাপারে যখন সন্দেহের সৃষ্টি হতো তখন তাকে একশত উটসহ 'হোবল' নামক মূর্তির নিকট নিয়ে যাওয়া হতো। উটগুলো তীরধারী সেবায়েতের (ঋষি) এর নিকট সমর্পণ করা হতো।

সেবায়েত সবগুলো তীর একত্রিত করে ঝাঁকুনী দিতে দিতে ঘোরাতে থাকতো। অতঃপর তার মধ্য থেকে একটি তীর বের করে আনা হতো। তীরের গায়ে 'তোমাদের অন্তর্ভুক্ত' লিখিত তীরটি যদি বের হতো তবে তাকে তাদের গোত্রের একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে স্থান দেয়া হতো। অন্যদিকে যদি 'তোমাদের বাইরের' লিখিত তীরটি বের হতো তখন তাকে 'হালীপ' হিসেবে স্থান দেয়া হতো। কিন্তু যদি 'মুলহাক' লিখিত তীরটি বের হতো তাহলে তাকে তার নিজস্ব স্থানেই রাখা হতো। তাকে গোত্রীয় ব্যক্তি কিংবা 'হালীফ' হিসেবে স্থান দেয়া হতো না।

জুয়া বা ভাগ্য নির্ণয়ের জন্য তীর

অনুরূপ আরো একটি প্রথা মুশরিকদের মধ্যে প্রচলিত থাকার কথা জানা যায়, সেটি হলো জুয়া খেলা। জুয়া খেলার ক্ষেত্রে ভাগ্য নির্ণয় কিংবা অনুরূপ কোনো কিছুর জন্য তারা পূর্বোক্ত নিয়মে তীর ব্যবহার করতো। তাদের মার্কা চিহ্নিত তীর বের হওয়ার ফলে প্রাপ্ত উট যবেহ করে গোস্ত বিলি-বন্টন করে দেয়া হতো।

জুয়া খোলোয়াড়গণ একটি উট যবেহ করে তাকে দশ কিংবা আঠাশ ভাগে ভাগ করতো। অতঃপর কতগুলো বিজয় চিহ্ন বিহীন তীরের সাহায্যে লটারী করা হতো। চিহ্নিত তীরগুলো যাঁদের ভাগ্যে উঠতো তাঁদেরকে বিজয়ী মনে করে বিনামূল্যে উটের গোস্তের ন্যায্য অংশ দেয়া হতো। কিন্তু চিহ্নবিহীন তীর যাঁরা পেতেন তাঁদের দাম দিয়ে গোস্ত নিতে হতো।

যাদুতে বিশ্বাস

আরবের মুশরিকরা তথাকথিত ভবিষ্যদ্বক্তা যাদুকর এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদণের ভবিষদ্বাণী, কলাকৌশল এবং কথাবার্তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতো। যে আগামীতে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলির ভবিষ্যদ্বাণী করতো গোপন তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত বিষয়াদি অবগত আছে বলে দাবি করতো তাকে বলা হতো 'গণক'। কোনো কোনো কাহেন (গণক) এমন দাবিও করতো যে, একটি জ্বীন তার অনুগত রয়েছে এবং সে তাকে সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশ করে থাকে। কোনো কোনো গণক আবার এমন দাবিও করতো যে, অদৃশ্যের খবরাখবর নেয়ার মতো যথেষ্ট বিদ্যাবুদ্ধি তার রয়েছে এবং সে তা নিয়েও থাকে।

ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস

তৎকালীন সমাজে আরো এক ধরনের লোক ছিলো যারা মানুষের কথা ও কর্মের ওপর অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতো। তারা 'আরোফ' নামে পরিচিত ছিলো। তাদের দাবি ছিলো যে, কোনো লোক যখন কোনো কিছুর ব্যাপারে অবগত হওয়ার জন্য তার নিকট আগমন করে তখন তার অবস্থা, কিছু কিছু পূর্বলক্ষণ এবং আনুসঙ্গিক কথাবার্তার মাধ্যমে ঘটনার স্থান বা ঠিকানা এবং ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগোষ্ঠীর খোঁজ-খবর সে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অপহৃত সম্পদ, অপহরণের স্থান ও সময়, হারানো পশু কিংবা অন্যকোনো কিছু সম্পর্কিত খোঁজ-খবর।

জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস

আকাশমন্ডলে তারকারাজির গতিবিধি, উদয়াস্ত, আগমন-প্রত্যাগমন ইত্যাদি লক্ষ করে ভবিষ্যতের আবহাওয়া কিংবা ঘটতে পারে এমন কোনো ঘটনা, কিংবা দুর্ঘটনা সম্পর্কে আভাষ প্রদান হচ্ছে জ্যেতিষীদের কাজ। জ্যোতিষীদের চিন্তা-চেতনা এবং গণনার প্রভাব আজও যেমন জনসমাজে লক্ষ করা যায়, সেকালেও তেমনটি ছিলো। কিন্তু বিশেষ পার্থক্য ছিলো যে, তারকারাজির অবস্থা ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে বৃষ্টি-বাদলের পূর্বাভাষ দেয়া হলে তারা বিশ্বাস করতো যে, এ তারকাই তাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করছে। তাদের মঙ্গলের মূলে রয়েছে এ তারকারাজি। এভাবে তারা জঘন্য শিরক করে বসতো।

ভালো-মন্দ ফলের জন্য তিয়ারা প্রথার বিশ্বাস

আরবের মুশরিকরা কোনো কাজ-কর্ম আরম্ভ করার পূর্বে কাজের ফল ভালো হবে না মন্দ হবে তা যাচাই করে নেয়ার জন্য কতগুলো মনগড়া রেওয়াজের প্রচলন করে নিয়েছিলো। ভালো-মন্দ যাচাইয়ের এ প্রথাকে বলা হতো তিয়ারা'। এতে তাদের নিজস্ব ধারণা প্রসূত যেসব কাজ-কর্ম করা হতো তা হচ্ছে-

যখন তারা কোনো কাজ করার ইচ্ছা করতো তখন তা শুরু করার পূর্বে কোনো পাখিকে উড়িয়ে দেয়া হতো অথবা হরিণকে তাড়া করা হতো। পাখি কিংবা হরিণ যদি তাদের ডান দিক দিয়ে পলায়ন করতো তাহলে এটাকে শুভ লক্ষণ মনে করে তারা তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করে দিত। কিন্তু বাম দিক দিয়ে পলায়ন করলে সেটাকে অশুভ লক্ষণ মনে করে কাজ করা থেকে বিরত থাকতো। অনুরূপভাবে কোনো পশু কিংবা পাখিকে যদি রাস্তায় আঁচড় আটতে দেখা যেতো তাহলে সেটাকে অমঙ্গলের পূর্ব লক্ষণ বলে মনে করা হতো। কোনো কোনো শিরক কিংবা বিদআতপন্থী লোকদের মধ্যে এ যুগেও এ জাতীয় কুসংস্কার পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

শুভ-অশুভ ধারণায় বিশ্বাস

অনুরুপভাবে বসা, চলা, কিংবা দাঁড়ানোর বিশেষ কোনো ভঙ্গিকেও অশুভ মনে করা হতো। অশুভ কোনো কিছুর প্রভাব কাটানোর জন্য খরগোশের পায়ের গোড়ালির ওপরের হাড় ঝুলিয়ে রাখা হতো। সপ্তাহের মহিলার দর্শন অশুভ, দিন- রাতের কোন কোন সময় অশুভ, কোন কোন বাড়ি-ঘর অশুভ ইত্যাদি নানা কুসংস্কার তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো। কলেরা বসন্ত ইত্যাদি মহামারীকে কোনো অশুভ শক্তির প্রভাব বলে বিশ্বাস করা হতো। সে সাথে মানবাত্মাকে পেঁচিয়ে ধরার বিষয়টিও তারা বিশ্বাস করতো। তাদের এ বিশ্বাস ছিলো যে, কেউ কোনো লোককে হত্যা করলে যতক্ষণ না তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় ততক্ষণ সে আত্মা শান্তি পায় না। সে আত্মা পেঁচায় পরিণত হয়ে জনশূন্য প্রান্তরে ঘোরাফেরা করতে থাকে। পিপাসা, 'পিপাসা' অথবা 'আমাকে পান করাও আমাকে পান করাও বলে চিৎকার করতে থাকে। যখন সে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয় তখন সে শান্ত হয়।

দ্বীনে ইবরাহিমের মধ্যে কুরাইশদের বিদ'আত সংযোজন

দ্বীনে ইবরাহিমের মধ্যে কুরাইশদের সংযোজিত ও অনুসৃত বিদ'আতসমূহই ছিলো জাহেলি যুগের আরববাসীদের ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীর আচার-অনুষ্ঠানের মূল অংশ। ইবরাহিম (আ) প্রবর্তিত সত্য ধর্মের কোনো কোনো আচার-অনুষ্ঠানে কিছু কিছু অংশ তখনো প্রচলিত ছিলো। অর্থাৎ ইবরাহিম (আ) প্রবর্তিত দ্বীনকে তারা সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেয়নি। ফলে বায়তুল্লাহর প্রতি তারা যথারীতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাওয়াফ করতো, উমরা এবং হজ্জ পালন করতো, আরাফাও মুযদালিফায় অবস্থান করতো, (হাদীর) পশু কুরবানি করতো।

সনাতন ইসলামের কিছু রীতি এবং আচার-অনুষ্ঠানাদি পালন করলেও প্রকৃতপক্ষে ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা এত বেশি শিরক-বিদ'আতের সমাবেশ ঘটিয়েছিলো যে, সত্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছিলো। আরববাসী আরো যেসব বিদ'আতের প্রচলন করে নিয়েছিলো তা হচ্ছে নিম্নরূপ-

১. আলাদা মর্যাদার দাবিদার: কুরাইশরা দাবি করতো যে, তারা হচ্ছে ইবরাহিম (আ) এর বংশধর এবং তারাই হচ্ছে হারাম শরীফের সংরক্ষক ও ব্যবস্থাপক এবং মক্কার প্রকৃত অধিবাসী। কোনো ব্যক্তিই তাদের সমকক্ষ নয় এবং কারো অধিকার তাদের অধিকারের সমান নয়। এসব কারণে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে 'হুসম' (বীর এবং শক্তিশালী) আখ্যায় আখ্যায়িত করেছিলো। সুতরাং তারা এটা মনে করতো যে, হারাম সীমানার বাইরে অগ্রসর হওয়া তাদের উচিত নয়। তাই হজ্জ মৌসুমে তারা আরাফায় যেতো না এবং সেখান থেকে তারা নিয়ম অনুযায়ী ফিরেও আসতেন না। তারা মুযদালিফায় অবস্থান করতো এবং সেখান থেকেই প্রত্যাবর্তন করতো। তাদের সে বিদ'আত সংশোধনের জন্য আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,

"তোমরাও সে জায়াগা থেকে প্রত্যাবর্তন করো যেখান থেকে অন্যান্য সবাই প্রত্যাবর্তন করেছে।"

২. কুরাইশদের জন্য বিশেষ নিয়ম: মুশরিকদের আরো একটি বিদ'আতের ব্যাপার ছিলো, তারা বলতো, হুমুস (কুরাইশ)-দের জন্য ইহরাম অবস্থায় পণির এবং ঘি তৈরি করা ঠিক নয় এবং ঠিক নয় যে, ছায়ায় অবস্থানের প্রয়োজন হলে চামড়ার তৈরি শিবির ছাড়া অন্য কোথাও বা অন্য কোনো কিছুর ছায়ায় আশ্রয় নিবে।

৩. হাজীদের খাওয়া বিষয়: এদের আরো একটি বিদ'আতের ব্যাপার ছিলো যে তারা বলতো, হারামের বাইরে থেকে আগত হজ্জ ও উমরাহকারীগণ মক্কার বাইরে থেকে খাদ্যদ্রব্য কিংবা অনুরূপ কোনো কিছু নিয়ে আসলে তা তাদের জন্য খাওয়া ঠিক নয়।

৪. উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ: আরো একটি বিদ'আতের কথা জানা যায় এবং তা হচ্ছে, তারা হারামের বাইরের বাসিন্দাদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন যে, হারামের মধ্যে প্রবেশ করার পর হুমুস থেকে সংগৃহীত বস্ত্র পরিধান করে তাদের প্রথম তাওয়াফ করতে হবে। এ প্রেক্ষিতে হুমুসের বস্ত্র সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে পুরুষেরা উলঙ্গ অবস্থাতেই তাওয়াফ করতো এবং মহিলারা পরিধানের কাপড় চোপড় খুলে ফেলে দিয়ে একটি ছোট আকারের খোলা জামা পরিধান করে তাওয়াফ করতো। তাওয়াফকালে তারা কবিতার এ চরণ আবৃত্তি করতো-

"অদ্য কিছু অথবা সম্পূর্ণ লজ্জাস্থান উলঙ্গ হয়ে যাবে, কিন্তু যা খুলে যায়, আমি তা দেখা বৈধ বলে সাব্যস্ত করি না।"

এসব অশ্লীলতা থেকে পরহেজ বা সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

হে বনী আদম! প্রত্যেকবার নামায পড়ার সময় নিজেদের পোশাক পরিধান করে নাও। (আরাফ: আয়াত-৩১)

৫. পোশাকে বিধি নিষেধ: অন্যদিকে যদি কোনো মহিলা কিংবা পুরুষ নিজেকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন মনে করে হারামের বাহির থেকে আনীত পোশাকে তাওয়াফ করে নিতো তাহলে তাওয়াফের পর উক্ত পোশাক তাকে ফেলে দিতে হতো। এর ফলে তারা না নিজে উপকৃত হতো, না অন্য কেউ।

৬. ইহরাম অবস্থায় দরজা দিয়ে বের না হওয়া: বিদ'আতের আরো একটি ব্যাপার ছিলো হারাম অবস্থায় তারা দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করত না। ঘরে প্রবেশ করার জন্য তারা ঘরের পেছন দিকে একটি বড়ো ছিদ্র বানিয়ে সে ছিদ্রপথে আসা-যাওয়া করতো। অবোধ ও আহম্মকের মতোই এ কাজকে তারা পুণ্যময় কাজ বলে মনে করতো। এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন-

আর তোমরা যে ঘরের পশ্চাৎ দিকে প্রবেশ করো তাতে কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য আছে কেউ তাকওয়া অর্জন করলে। সুতরাং তোমরা (সদর) দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। (সূরা আল-বাক্বারা: আয়াত-১৮৯)

অশ্লীলতা ও অন্যান্য কুসংস্কারের আবরণে চাপা পড়ে গিয়েছিলো ইবরাহিম (আ) এর প্রবর্তিত সত্য ও সনাতন ধর্ম ইসলাম।

কেমন ছিলো বড়ো বড়ো ধর্মগুলোর অবস্থা

আরবীয় উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল ইহুদিবাদ, খ্রিস্টবাদ, প্রাচীনতম পারসিক যাজকতাবাদ এবং সাবাঈ ধর্ম স্থান দখল করে নিয়েছিলো। তাই সেসবেরও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক পটভূমি সম্পর্কে আলোচনা করা নিতান্তই প্রয়োজন।

আরবে ইয়াহুদি মতবাদ: আরব উপদ্বীপে ইহুদিদের ন্যূনতম দুটো যুগ অতিবাহিত হয়েছিলো। প্রথম যুগটি সে সময়ের সাথে সম্পর্কিত ছিলো যখন ফিলিস্তিনে বাবেল এবং আত্তরের রাষ্ট্র বিজয়ের কারণে ইহুদিদেরকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিলো।

দখলদার বাহিনী কর্তৃক ব্যাপকভাবে ইহুদিদের ধরপাকড়, বুখতে নসরের হস্তে ইহুদি বসতি ধ্বংস ও উজাড়, তাদের মুখাকৃতির ক্ষতিসাধন এবং বাবেল থেকে ব্যাপকহারে দেশান্তরের ফলে একদল ইহুদি ফিলিস্তিন ত্যাগ করে হেজাযের উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।

দ্বিতীয় পর্যায় আরম্ভ হয় যখন টাইপাস রুমির নেতৃত্বে রুমিগণ ৭০ ঈসায়ী সালে জোরপূর্বক ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। সে সময় রুমিদের অনেক ইহুদিবসতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের মুখাকৃতির ক্ষতি সাধিত হয়। এর ফলে বহু ইহুদি গোত্র হেজায থেকে পলায়ন করে ইয়াসরিব, খায়বর এবং তাইমায়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। সেসব স্থানে তারা স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। আর্থিক সমৃদ্ধি ও সঙ্গতি লাভের পর দুর্গ ও মোর্চা নির্মাণ করে।

উল্লিখিত দেশত্যাগী ইহুদিদের মাধ্যমে আরববাসীদের মধ্যে এক ধরনের ইহুদি রসম-রেওয়াজ চালু হয়ে যায়। এ আরব-ইহুদি সংমিশ্রণের সূত্রপাত হয় ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক অবস্থা ও ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষাপটে তা বিশেষ শুরুত্ব লাভ করে। ইসলামের আবির্ভাবকালে উল্লেখযোগ্য ইহুদি গোত্রগুলো ছিলো যথাক্রমে খায়বর, নাযীর, মুস্তালাক, কোরাইযা ও কায়নুকা। বিখ্যাত সামহুদী 'ওয়াফাউল ওয়াফা' গ্রন্থে ১১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, তৎকালে ইহুদি গোত্রগুলোর সংখ্যা বিশেরও কিছু বেশি ছিলো।

ইয়েমেনে ইহুদি মতবাদ বেশ বিস্তার লাভ করে। এখানে বিস্তার লাভের মূল হোতা ছিলো 'তাব্বান আসয়াদ'। এ ব্যক্তি যুদ্ধ করতে করতে ইয়াসরিবে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে সে ইহুদি মতবাদ গ্রহণ করে বনু কুরাইযার দুজন ইহুদি পন্ডিতকে সাথে নিয়ে ইয়েমেন যায়। এভাবে ইয়েমেনে ইহুদি মতবাদ বিস্তার লাভ করে।

আবু বকরের পর তার পুত্র 'ইউসুফ যু নাওয়াস' ইয়েমেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়। শাসনভার গ্রহণ করার পর সে নাজরানবাসী খ্রিস্টানদের ওপর ইহুদি মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের ইহুদি মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য করে। কিন্তু প্রবল চাপ সত্ত্বে ও খ্রিস্টানগণ ইহুদি মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে যার ফলশ্রুতিতে যু নাওয়াস গর্ত খনন করিয়ে সে গর্তে অগ্নিকুন্ড তৈরি করে এবং যুবক, বৃদ্ধ, পুরুষ- মহিলা নির্বিশেষে অনেককে সে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে হত্যা করে। বলা হয়ে থাকে যে, বিশ থেকে চল্লিশ হাজার লোক উক্ত নিষ্ঠুর ঘটনার শিকার হয়েছিলো। এই নিষ্ঠুর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ৫২৩ ঈসায়ি সালের অক্টোবর মাসে। কুরআন মাজিদের সূরা আল-বুরুজে উক্ত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

"ধ্বংস হয়েছে গর্ত ওয়ালারা- (যে গর্তে) দাউ দাউ করে জ্বলা ইন্ধনের আগুন ছিলো, যখন তারা গর্তের কিনারায় বসেছিলো- আর তারা মু'মিনদের সঙ্গে যা করছিলো তা প্রত্যক্ষ করেছিলো।" (আল বুরুজ আয়াত: ৪-৭)

আরবে খ্রিস্টবাদ

খ্রিস্টীয় মতবাদ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তাহলো, আরবের শহরগুলোতে তাদের আগমনের ব্যাপারটি ঘটেছিলো হাবশি এবং রুমিদের জবরদখলের পর বিজয়ীদের মাধ্যমে। ইতোপূর্বে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের ওপর হাবশীদের প্রথম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ৩৪০ ঈসায়ী সাল থেকে ৩৭৮ ঈসায়ী পর্যন্ত তা স্থায়ী থাকে। উক্ত মধ্যবর্তী সময়ে খ্রিস্টান মিশনারীগণ ব্যাপক প্রচারকার্য চালাতে থাকে। প্রায় সে সময়েই এমন এক বুজর্গ ব্যক্তি নাজরানে আগমন করেন-যার প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হতো বলে কথিত আছে; সে ছিলো অত্যন্ত সম্মানিত ও কারামতওয়ালা পুরুষ। তার নাম ছিলো 'ফাইমিউন'। অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সে নাজরানে খ্রিস্টীয় মতবাদের প্রচারকার্য চালিয়ে যেতে থাকে। নাজরানবাশিরা তার কাছে এমন কতগুলো কারামত দেখতে পায়-যা তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকে অধিকতর দৃঢ় করে তোলে। এরপর তারা ধর্মান্তরিত হয়ে সকলেই খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে।

অতঃপর দ্বিতীয়বার হাবশীগণ ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে যূ-নাওয়াস কর্তৃক খ্রিস্টানদের গর্তের মধ্যে পুড়িয়ে মারার মতো পৈশাচিক কর্মকান্ডের প্রতিশোধ স্বরূপ হাবশিগণ পুনরায় ইয়েমেন দখল করে নেয়, এবং 'আবারাহা' নামক এক ব্যক্তি রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সমাসীন হওয়ার পর নতুন উদ্যমে খ্রিস্টীয় মতবাদের প্রচার ও প্রসারকার্যে আত্মনিয়াগ করে। তার উক্ত প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিই হচ্ছে ইয়েমেনে অন্য একটি কা'বা ঘর নির্মাণ এবং তার নির্মিত কা'বা ঘরকে কেন্দ্র করে হজ্ব পালনের জন্য আরবাসীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

শাসক আবরাহা শুধু আলাদা একটি কা'বাঘর নির্মাণ এবং হজ্জ পালনের আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। সে খানায়ে কা'বাকে সমূলে ধ্বংস করে ফেলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সে খানায়ে কা'বাকে ধ্বংস করাতো দূরের কথা, আল্লাহর গজবে পড়ে বিশাল এক হস্তীবাহিনীসহ সে নিজেই সমূলে ধ্বংস হয়ে যায়। যেমনটি কুরআনে কারীমের সূরা ফীল'-এ বলা হয়েছে। সূরা ফীলের এই ঘটনা সর্বযুগের সকল মানুষের শিক্ষালাভের জন্য একটি জ্বলস্ত দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে রুমীয় অঞ্চলসমূহের সন্নিকটস্থ হওয়ার কারণে আল গাসসান, বনু তাগলিব, বনু তাই এবং অন্যান্য আরব গোত্রসমূহের মধ্যে খ্রিস্টীয় মতবাদ বিস্তৃত হতে থাকে। হীরার আরব সম্রাটাগণও খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলো বলে জানা যায়।

মাজুসী মতবাদ বা অগ্নিপূজারী

'মাজুসী' মতবাদ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা হচ্ছে, পারস্যের সন্নিকটস্থ আরব ভূমিতে এ মতবাদ বেশ প্রাধান্য পায় এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যেমন আরবের ইরাকে, বাহরাইনে (আল আকসা), হিজ্বর এবং আরব উপসাগরীয় সীমান্ত অঞ্চলে। তাছাড়া ইয়েমেনে পারস্য শাসনামলেও বিচ্ছিন্নভাবে দুই একজন লোক মাজুসী মতবাদ গ্রহণ করেছিলো।

সাবী বা তারকা পূজারী

এরপর অবশিষ্ট থাকে 'সাবী' মতবাদের কথা। ইরাক এবং অন্যান্য দেশের প্রাচীন শহর- নগরের ধ্বংসস্তূপ খনন করে যেসব দলিল-দস্তাবেজ উদ্ধার করা হয়েছে তা থেকে জানা যায় যে, 'সাবী' মতবাদ হলো ইবরাহিম (আ) এর 'কালদানী' সম্প্রদায়ের মতবাদ। প্রাচীন শাম এবং ইয়েমেনের বহু অধিবাসী এ মতবাদের অনুসারী ছিলো। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন ইহুদি মতবাদ এবং পরে খ্রিস্টীয় মতবাদ বিস্তার লাভ করে তখন উক্ত 'সাবী' মতবাদের ভিত্তি শিথিল হয়ে পড়ে এবং প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ ক্রমে ক্রমে নিভে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাজুসীদের সাথে একত্রে কিংবা পাশাপাশি বসবাসের ফলে আরব ভূ-খণ্ডের ইরাকে এবং আরব উপসাগরীয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উক্ত মতবাদের কিছু সংখ্যক অনুসারী থেকে যায়।

ধর্মবিশ্বাসের সার্বিক অবস্থা

পৌত্তলিকতা, অশ্লীলতা, শিরক, বিদ'আত ও বহুত্ববাদের ঘোর অন্ধকার ভেদ করে চিরভাস্বর ও চিরজ্যোতিষ্মান 'ইসলাম' এর 'সূর্য' যখন নবায়িত আলোচনার বন্যায় উদ্ভাসিত হয়ে আত্মপ্রকাশ করলো তখন প্রচলিত সকল বিশ্বাস এবং মতবাদের অনুসারীগণ একদম হতচকিত হয়ে পড়ল। সর্বশেষ আসমানি কিতাব মহাগ্রস্থ আল-কুরআনের সুললিত শাশ্বত বাণী এবং মহানবী (ﷺ) এর উদাত্ত কণ্ঠের তা সব মুশরিক ও মূর্তিপূজক শিরক ও পৌত্তলিকতার পাপ পঙ্কে নিমজ্জিত থেকে ও দাবি ঘোষণা সকল ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিমূলকে করে তুললো প্রকম্পিত। যে সব দাবি করতো যে তারা দ্বীন-ই ইবরাহিম (আ) এর ওপর প্রতিষ্ঠিত তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে প্রলয় ঘটে।

ইবরাহিম (আ) এর ধর্মের বিকৃতি

ইবরাহিম (আ) প্রবর্তিত সত্য ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে দ্বীন-ই ইবরাহিমের কোনো বৈশিষ্ট্যই তাদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যন- ধারণা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিলো না। কালক্রমে তারা মূর্তিপূজা এবং নানা ধরনের অশ্লীলতা ও পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহর অবতীর্ণ ঐশী বাণীর আলোকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রবর্তিত দ্বীনের সাথে এর অভিন্ন সম্পর্কের প্রসঙ্গটি যখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন তখন তাদের দ্বীন সম্পর্কিত দাবির অসাড়তা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো।

ইহুদি ধর্ম

ইহুদিবাদের অবস্থাও ছিলো ঠিক একই রূপ। অসার বাহ্যিক স্বেচ্ছাচার ছাড়া তেমন আর কিছুই ছিলো না ইহুদিদের মধ্যে। ইহুদি পুরোহিতগণ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে নিজেরাই চেয়েছিলো প্রভুর আসনে সমাসীন হতো। ধর্মের আবরণে তারা চেয়েছিলেন পার্থিব প্রতিষ্ঠা। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা চাইতো সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নিজ মতামত সম্পর্কিত প্রভাব বিস্তার করতে। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্যে ছিলো সম্পদ সংগ্রহ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা। সম্পদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তার ধর্ম-কর্ম যদি চুলোয় যায় তা যাক, অবিশ্বাস কিংবা অধর্ম যদি বিস্তার লাভ করে তা করুক, তাতে কোনো সমস্যা নেই। এই ছিলো ইহুদিবাদের প্রকৃত রূপ।

খ্রিস্টান ধর্ম

খ্রিস্টান ধর্মও সত্যবিবর্জিত শিরক এবং পৌত্তলিকতায় ভরপুর ছিলো। নাহর একত্ববাদের পরিবর্তে ত্রিত্ববাদের ধারণা তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে হয়েছিল এবং এ ভ্রান্ত ধারণাই আল্লাহ এবং মানবকে এক আজব সংমিশ্রণের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলো। উপরন্ত যে আরববাসী এ ধর্ম গ্রহণ করেছিলো প্রকৃতপক্ষে তাদের ওপর উক্ত ধর্মের কোনো প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। কারণ এর আদর্শের সাথে তাদের প্রচলিত জীবন যাত্রা-প্রণালীর কোন মিল ছিলোনা। আর তারা ও তাদের প্রচলিত জীবন পদ্ধতি পরিত্যাগ করতে পারছিলোনা।

অবশিষ্ট আরবদের ধর্মীয় অবস্থা মুশরিকদের মতোই ছিলো। কারণ তাদের অন্তঃকরণ একই ছিলো, বিশ্বাসসমূহে পরস্পর সাদৃশ্য ছিলো এবং রীতি-নীতিতেও সামঞ্জস্য বিদ্যমান ছিলো।

জাহেলিয়াত সমাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্র বা জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অবস্থার বিবরণ তুলে ধরার পর এ পর্যায়ে সেখানকার মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবস্থার-সংক্ষিপ্ত চিত্র উপস্থাপন করা হলো।

সামাজিক অবস্থা

তৎকালীন আরব সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির লোকজন বসবাস করতো। অবস্থা এবং অবস্থানের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শ্রেণি বা গোত্রের মধ্যে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। অভিজাত শ্রেণির পরিবারে পুরুষ এবং মহিলাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিলো মর্যাদা এবং ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অনেক ব্যাপারেই মহিলাদের স্বাধীনতা দেয়া হতো, তাদের যুক্তিসঙ্গত মতামতের যথেষ্ট গুরুত্ব এবং তাদের ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যকে মর্যাদা দেয়া হতো। অভিজাত পরিবারের মহিলাদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মান-সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা হতো। মহিলাদের মান-মর্যাদা হানি করে এমন কোনো ব্যাপার বা অবমাননাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সাথে সাথে তলোয়ার কোষমুক্ত হয়ে রক্তারক্তি শুরু হয়ে যেতো।

তৎকালীন আরবে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি নিজের উদারতা কিংবা বীরত্বের প্রশংসাসূচক কোনো কিছু বলতে চাইলে মহিলাদের সম্বোধন করেই তা বলা হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহিলারা ইচ্ছে করলে বিবাদমান গোত্রগুলোকে একত্রিত করে সন্ধিচুক্তি সম্পাদনে সাহায্য করতে পারতো। অন্যদিকে পুরুষদের উত্তেজিত ও উদ্বেলিত করে সহজেই দু'পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে দিতে পারতো।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে পুরুষ প্রধান সমাজকাঠামোই আরবে প্রচলিত ছিলো। পরিবার প্রধান বা পরিবারের পরিচালক হিসেবে পুরুষদেরই প্রাধান্য ছিলো এবং তাদের সিন্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে স্বীকৃত এবং গৃহীত হতো। পারিবারিক জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে পুরুষ এবং স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক বিয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতো। বর-কনে উভয় পক্ষের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে এবং কনের অভিভাবকদের তত্বাবধানে বিয়ে পর্ব অনুষ্ঠিত হতো। অভিভাবকদের আগোচরে ইচ্ছেমাফিক বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার মহিলাদের ছিলো না।

অশ্লীল জীবনাচার

একদিকে যখন সম্ভ্রান্ত এবং অভিজাত পরিবারসমূহের জন্য প্রচলিত ছিলো এ ব্যবস্থা অন্যদিকে তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং মেলামেশার ক্ষেত্রে এমন সব ঘৃণ্য ব্যবস্থা এবং জঘন্য প্রথা প্রচলিত ছিলো-যাকে অশ্লীলতা, পাশবিকতা এবং ব্যভিচার ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত সূত্রে জানা যায়, অন্ধকার যুগে আরব সমাজে বিয়ের চারটি প্রথা প্রচলিত ছিলো।

ক. নিয়মিত বিবাহ: সমাজে সভ্যতাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক প্রথাকেন্দ্রীক এক ধরনের বিবাহ প্রচলিত ছিলো। এ ধরনের বিবাহকে নেকাহে রুসম' তথা প্রথাগত বিবাহও বলা হতো। এর মধ্যে একটি তো হচ্ছে সে প্রথা- যা বর্তমান যুগেও জনসমাজে প্রচলিত আছে। এ প্রথা অনুসারে বিভিন্ন দিক বিবেচনার পর একজন অভিভাবক তার অধীনস্থদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা হওয়ার পর বর-কনের কার্যকৃত মোহর প্রদান করে বিয়ে করতো।

খ. নিকাহে ইসতিব্যা: নারী-পুরুষের বিবাহের দ্বিতীয় প্রথাকে বলা হতো "নিকাহে ইস্তিব্যা'। নারী ও পুরুষের মিলনের মুখ্য উদ্দেশ্যে থাকতো জ্ঞানী, গুণী ও শক্তিধর কোনো সুপুরুষের সাথে সঙ্গ ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট শ্রেণির সন্তান লাভ করা। এ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে যখন কোনো মহিলা ঋতুজনিত অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হতো তখন তার স্বামী তাকে পছন্দমতো কোনো সুপুরুষের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে বলতো। এই অবস্থায় স্বামী তার নিকট থেকে পৃথক হয়ে থাকতো, কোনোক্রমেই তার সাথে সঙ্গ ক্রিয়ায় লিপ্ত হতো না। এদিকে স্ত্রীর দেয়া প্রস্তাব স্বীকৃতি লাভ করলে গর্ভধারণের সুষ্পষ্ট আলামত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তার সাথে সঙ্গমক্রিয়ায় লিপ্ত হতে থাকতো। অতঃপর গর্ভধারণের আলামত সুস্পষ্ট হলে সে তার স্বামীর সাথে মিলিত হতো। ভারতীয় পরিভাষায় এ বিয়েকে 'নিয়োগ' বলা হয়।

গ. দলগত বিবাহ: তথাকথিত 'বিয়ে' নামক নারী-পুরুষের মিলনের তৃতীয় প্রথা অন্যরূপের একটি জঘন্য ব্যাপার। এতে দশের চেয়ে কমসংখ্যক পুরুষের সমন্বয়ে একটি দল একত্রিত হতো এবং সকলে পর্যায়ক্রমে একই মহিলার সাথে সঙ্গমক্রিয়ায় লিপ্ত হতো। এর ফলে উক্ত মহিলা গর্ভধারণের পর যথা সময়ে সন্তান প্রসব করতো। সন্তান প্রসবের কয়েক দিন পর সে মহিলা তার সাথে যারা সঙ্গমক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছিলো তাদের সকলকে ডেকে একত্রিত করতো। প্রচলিত নিয়মে বাধ্যগতভাবেই সংশ্লিষ্ট সকলকে সেখানে উপস্থিত হতে হতো। কারণ সেখানে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে অমত করার কোনো উপায় থাকতো না মেয়েটি বলতো- 'আপনাদের সাথে সঙ্গম ক্রিয়ার ফলেই যে আমার এ সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে এ ব্যাপারটি আপনারা সকলেই অবগত আছেন। অতঃপর সমবেত সকল লোকজনদের মধ্য থেকে একজনকে লক্ষ করে বলতো- 'হে অমুক! আমার গর্ভজাত এ সন্তান হচ্ছে আপনারই সন্তান।' মহিলার ঘোষণা মতে সন্তানটি হতো তারই সন্তান এবং সংশ্লিষ্ট সকলেই তার স্বীকৃতি প্রদান করতে বাধ্য থাকতো।

পতিতাবৃত্তি: নারী-পুরুষের 'বিয়ে ও মিলন' নাম দিয়ে আরো একটি জঘন্য ধরনের অশ্লীল প্রথা জাহেলি যুগের আরব সমাজে প্রচলিত ছিলো। এতে কোনো মহিলাকে কেন্দ্র করে অনেক লোক একত্রিত হতো এবং পর্যায়ক্রমে তার সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতো। এরা হচ্ছে পতিতাবৃত্তির পেশা অবলম্বনকারী মহিলা। সুতরাং দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে কোনো লোক তাদের নিকট আসলে তারা আপত্তি করতো না। এদের বাড়ির প্রবেশদ্ধারে পতিতাবৃত্তির প্রতীক হিসেবে একধরনের নিশান দিয়ে রাখা হতো-যাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নির্দ্বিধায় সেখানে আসা-যাওয়া করতে পারে।

দৈহিক মিলনের ফলে গর্ভধারণের পর যখন কোনো মহিলা সন্তান প্রসব করতো তখন তার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকারী সকল পুরুষকে একত্রিত করা হতো। অতঃপর যে ব্যক্তি মানুষের অবয়ব প্রত্যক্ষ করে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। সে ব্যক্তি উপস্থিত সকলের অবয়ব নিরীক্ষণ করে তার বিবেচনামতো একজনের সাথে সন্তানটির যোগসূত্র বা সম্পর্ক স্থাপন করে দিতো। সে বলতো- 'এই সন্তান আপনার।

যাকে লক্ষ করে এক বার রায় দেয়া হতো, সে তা মেনে নিতে বাধ্য থাকতো। এভাবে নবজাতকটি একজন পুরুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে যেত। সে-ও শিশুটিকে তার ঔরসজাত সন্তান বলেই মনে করতো।

যখন আল্লাহ মুহাম্মদ (ﷺ) কে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করলেন তখন জাহেলি যুগের সকল ধরনের অশ্লীল বৈবাহিক প্রথার অবসান ঘটলো। বর্তমানে ইসলামি সমাজে যে বিয়ে প্রথা প্রচলিত রয়েছে আল্লাহর নির্দেশে রাসূলে করীম (ﷺ) আরব সমাজে সে ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করেন।

বিজিত নারীদের সম্ভোগ

কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরবের নারী-পুরুষদের অন্যরকম সম্পর্কের কথা জানা যায়। তৎকালে অর্থাৎ জাহেলি যুগে নারী-পুরুষের সম্পর্ক গড়ার ব্যাপারটি এমন প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো-যা তলোয়ারের ধার এবং বল্লমের ফলার সাহায্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতো। এতে গোত্রীয় যুদ্ধবিগ্রহের ক্ষেত্রে বিজয়ী গোত্র বিজিত গোত্রের নারীদের আটক রেখে যৌনসম্ভোগে তাদের ব্যবহার করতো। এ সকল মহিলার গর্ভে যেসব সন্তান জন্মলাভ করতো তাদেরকে কোনো সামাজিক মর্যাদা দেয়া হতো না। সামাজিকভাবে সারাজীবন তাদেরকে ছোট হয়েই থাকতে হতো।

বহু বিবাহ

জাহেলী যুগে একই সাথে একাধিক বা অনির্দিষ্ট সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণের প্রথা প্রচলিত ছিলো। একই সাথে আপন দু'বোনকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে সংসার করাটা কোনো দোষের ব্যাপার ছিলো না। পিতার মৃত্যুর পর এবং পিতা কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা সত্ত্বাকে বিয়ে করার মতো জঘন্য প্রথাও তখন প্রচলিত ছিলো। স্ত্রীকে পুরুষদের তালাক দেয়ার অধিকার ছিলো, কিন্তু এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ছিলো না।

অবাধ ব্যভিচার

সে আমলে ব্যভিচারের মতো একটি অতি ঘৃণ্য ও জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত হতে প্রায় সকল শ্রেণির মানুষকেই দেখা যেতো। কোনো গোষ্ঠী কিংবা গোত্রের খুব অল্পসংখ্যক লোকই এ নৈতিকতা বিরোধী দুষ্কর্ম থেকে মুক্ত থাকতো। অবশ্য এমন কিছু সংখ্যক নারী-পুরুষও চোখে পড়তো যাঁদের আভিজাত্যানুভূতি ও সভ্রান্তবোধ পাপাচারের এ পঙ্কিলতা থেকে তাদেরকে বিরত রাখতো। অত্যন্ত দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে নারীদের জীবনযাপন করতে হতো। অবশ্য দাসীদের তুলনায় স্বাধীন নারীদের অবস্থা কিছুটা ভালো ছিলো।

দাস-সাসীদের জীবনাচার

সমাজে দাসীদেরকে অত্যন্ত দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হতো। তৎকালীন সমাজে এমন মনিবের সংখ্যা খুব কমই ছিলো- যে দাসীদের নানা অনাচার, যথেচ্ছাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হতো না। এসব অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো লজ্জাবোধ কিংবা অপরাধবোধ সৃষ্টি হতো না। যেমন 'সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে, একদা এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে লক্ষ করে বললো- 'হে আল্লাহর রাসূল! অমুক ব্যক্তি আমার পুত্র। জাহেলী যুগে আমি তার মায়ের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিলাম।

প্রত্যুত্তরে রাসূল বললেন- ইসলামে এমন দাবির কোনো সুযোগ কিংবা মূল্য নেই। অন্ধকার যুগের যাবতীয় প্রথা পদদলিত ও বিলুপ্ত হয়েছে। এখন পুত্র তারই গণ্য হবে যার স্ত্রী অথবা দাসী আছে। আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে পাথর।

সা'আদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা) এবং আবদ ইবনে যাময়ার মধ্যে যাময়ার দাসীপুত্র আব্দুল রহমান বিন মায়ার ব্যাপারে সে বিবাদ সংঘটিত হয়েছিলো সেটি একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা। এ ব্যাপারটি অবশ্যই অনেকেরই জানা কথা।

জাহেলি পিতা-পুত্র সম্পর্ক যুগে পিতা-পুত্রের সম্পর্কও বিভিন্ন ধরনের ছিলো। সে ব্যাপারে ইতোপূর্বে কিছু কিছু বিষয় আলোচিত হয়েছে। তথাপিও এমনটি বলা উচিৎ হবে না যে, সন্তান বাৎসল্যের ব্যাপারে তাদের কিছুটা ঘাটতি ছিলো। নিম্নোক্ত কবিতার চরণটি প্রণি ধানযোগ্য-

আমাদের, সন্তান আমাদের কলিজার টুকরো, যারা জমিনের ওপর চলাফেরা করছে।

কন্যাদের সাথে ব্যবহার

অন্যদিকে কন্যা' সন্তানদের ব্যাপারে নরকীয় দুষ্কর্ম করতে তারা একটুও দ্বিধাবোধ করতো না। সমাজের লোকলজ্জা ও নিন্দা এবং তাদের জন্য ব্যয় নির্বাহের ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত অবস্থায় মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হতো। এমনকি অভাব-অনটন, অনাহার এবং দুর্ভিক্ষের কারণে পুত্র সন্তানদের হত্যা করতে তারা কুণ্ঠাবোধ করতো না।

কিন্তু পুত্র সন্তান হত্যার ব্যাপারে যে জনশ্রুতি রয়েছে তার যথার্থতা নির্ণয় বা প্রত্যয়ন করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ গোত্রীয় বিরোধ এবং যুদ্ধবিগ্রহের সময় স্বপক্ষকে শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার ব্যাপারে অন্যদের তুলনায় নিজ নিজ সন্তানেরাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য বলে প্রমাণিত হতো। সেক্ষেত্রে পুত্র সন্তানের সংখ্যাধিক্যই আরবাসীদের কাম্য হওয়া স্বাভাবিক।

অবশ্য জনশ্রুতিটি যে কোনো ঐতিহাসিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়- এমনটি বলাও বোধ হয় সমীচীন হবে না। কারণ ক্ষমতালিপ্সু গোত্রপতিগণের জন্য পুত্রসন্তানের সংখ্যাধিক্য কাম্য হতে পারে। কিন্তু অনাহারী, অর্ধাহারী, নিরীহ গোবেচারা গরিব-দুঃখীদের জন্য পুত্রসন্তানের আধিক্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এমন ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষ কিংবা দুঃসময়ে পুত্রসন্তান হত্যার ব্যাপারটিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ভাই-ভাই সম্পর্ক

যতটুকু জানা যায়, তৎকালীন আরব সমাজে সহোদর ভাই চাচাতো ভাই এবং গোষ্ঠী ও গোত্রের লোকজনদের পারস্পারিক সম্পর্কের ব্যাপারটি ছিলো অত্যন্ত শক্ত ও মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর কারণ হলো বহু গোত্রে বিভক্ত এবং গোত্রে গোত্রের রেষারেষিতে লিপ্ত আরব সমাজে গোত্রীয় ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধনের ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে হতো। আরববাসীগণ গোত্রের মান-মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে জীবন উৎসর্গ করতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না। গোত্রসমূহের অভ্যন্তরে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিকতার মূলতত্ত্ব গোত্রীয় চেতনা এবং আবেগ-অনুভূতিকে সজীব ও সক্রিয় রাখার ব্যাপারে সহায়ক হতো। সাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মীয়তাই ছিলো গোত্রীয় নিয়ম- শৃংখলার উৎস। তারা সে উদাহরণকে শাব্দিক অর্থে বাস্তবে রূপদান করতো, যেমন- "নিজ ভাইকে সাহায্য করো সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত হোক।"

ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে উৎকট এই গোত্রপ্রীতি প্রচলিত ছিলো। ইসলাম সেসব ধারণার মূলোৎপাটন করেছে। অত্যাচারীকে সাহায্য করার অর্থ হচ্ছে তাকে অন্যায় ও অনাচার থেকে বিরত রাখা।

অবশ্য মর্যাদা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের ব্যাপারে একে অন্যের আগে অগ্রসর হওয়ার যে আকুতি ও আকাঙ্ক্ষা মানব মনে বিদ্যমান থাকে একই ব্যক্তি কর্তৃক তা বহুবার বাস্তবে পরিণত করতে চাওয়ার কারণেই গোত্রসমূহের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের দামামা বেজে উঠতো। আউস ও খাযরাজ, আবস ও যুবইয়ান, বকর ও তাগলিব এবং অন্যান্য গোত্রের সংঘটিত ঘটনাবলির ক্ষেত্রে এমনটি লক্ষ করা যায়।

গোত্রে গোত্রে সম্পর্ক

অন্যদিকে যতদূর জানা যায়, বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটি ছিলো অপেক্ষাকৃত শিথিল বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন গোত্রের সকল ক্ষমতাই ব্যবহার হতো একে অপরের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে। তবে দ্বীনি ব্যবস্থা এবং অশ্লীল আচারের সংমিশ্রণে গঠিত কতগুলো রীতি-নীতি ও অভ্যাসের মাধ্যমে কোনো কোনো সময় যুদ্ধের তীব্রতা ও প্রচন্ডতা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারস্পরিক লেন-দেন, সহযোগিতামূলক কাজ-কর্ম সংক্রান্ত চুক্তি, প্রতিজ্ঞাপত্র আনুগত্যের বিধি-বিধান সমন্বিত ব্যবস্থাধীনে গোত্রগুলো পরস্পর একত্রিত হতেন ও সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। সর্বোপরি হারাম মাসগুলো তাদের জীবন অর্জন ও জবীন নির্বাহের ব্যাপারে বিশেষভাবে সহায়ক ছিলো।

সারকথা

জাহেলি যুগের আরব সমাজের সামাজিক অবস্থার সারকথা বলতে গেলে শুধু এটুকুই বলতে হয় যে, স্থিরতা এবং কূপমণ্ডূকতাই সমাজ জীবনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। অজ্ঞতা, অশ্লীলতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিলো সমাজ। অসত্য ও অন্যায়ের নিকট সত্য ও ন্যায় হয়ে পড়েছিলো সম্পূর্ণরূপে পরাজিত। সাধারণ মানুষকে জীবনযাপন করতে হতো পশুর মতো। বাজারের পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হতো মহিলাদের এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের সাথে ব্যবহার করা হতো মাটি ও পাথরের মতো। গোত্র কিংবা রাষ্ট্র যা-ই বলা হোক না কেন, প্রশাসনের মূল ভিত্তি ছিলো "জোর যার মুল্লক তার" ভিত্তির ওপর। প্রশাসন পরিচালিত হতো শক্তিধরদের স্বার্থে। দুর্বলতর শ্রেণি বা সাধারণ লোকজনের কল্যাণের কথা কস্মিনকালেও চিন্তা করা হতো না। প্রজাদের নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থ-সম্পদে কোষাগার ভরে তোলা হতো এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সৈন্যদলের মহড়া এবং যুদ্ধবিগ্রহের উদ্দেশ্যেই তা সংরক্ষিত হতো।

সমকালীন আরবের অর্থনৈতিক অবস্থার খণ্ডচিত্র ব্যবসা-বাণিজ্য

জাহেলি যুগের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ও ব্যবস্থাপনাকে কোনোভাবেই সামাজিক অবস্থার চেয়ে উন্নত বলা যেতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তেজারত বা ব্যবসা-বাণিজ্যই ছিলো আরব অধিবাসীগণের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু দেশ থেকে দেশান্তরে গমনাগমন, মালপত্র পরিবহন, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ-পর্যটনের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো এতই সমস্যা সংকুল ছিলো যে, নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা ছিলো এক দুষ্কর ব্যাপার। তৎকালে মরুপথে গমনাগমন এবং মালপত্র পরিবহনের জন্য একমাত্র মাধ্যম ছিলো উট। উটের পিঠে চড়ে যাতায়াত এবং মালপত্র পরিবহনের ব্যবস্থাটি ছিলো অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়া পথও ছিলো অত্যন্ত দুর্গম এবং বিপদ-সংকুল। সবদিক দিয়ে সুসজ্জিত বড়ো বড়ো কাফেলা ছাড়া পথ চলার কথা চিন্তাই করা যেতো না। কিন্তু তারপরও যে কোনো সময় দস্যুদল কর্তৃক আক্রান্ত এবং সর্বস্ব লুণ্ঠিত হওয়ার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হতো কাফেলার সকলকে। অবশ্য হারাম মাসগুলোতে তারা কিছুটা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ-কর্ম চালিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তা ছিলো সময়ের একটি সীমিত পরিসরে সীমাবদ্ধ। সুতরাং বাণিজ্য নির্ভর হলেও নানাবিধ কারণে তারা তেমন সুবিধা করতে পারতো না। তবে হারাম মাসগুলোতে 'ওকায্য, যিলমাজায, বাণিজ্য করে পুষিয়ে নিতো। এক্ষেত্রে মাজিন্নাত এবং আরোও কতগুলো প্রসিদ্ধ মেলায় কেনা-বেচা করে তারা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতো।

শিল্প-কারখানা

আরব ভূ-খন্ডে শিল্পের প্রচলন তেমন একটা ছিলো না। শিল্প-কারখানার ব্যাপারে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় আরব দেশ আজও পিছিয়ে রয়েছে। তুলনামূলকভাবে সেকালে আরো অনেক বেশি পিছনে পড়ে ছিলো। শিল্পের মধ্যে বস্ত্রশিল্প, চর্মশিল্প, ধাতবশিল্প ইত্যাদি শিল্পের প্রচলন চোখে পড়তো। অবশ্য এ শিল্পগুলো ইয়েমেন, হীরা এবং শামরাজ্যের সন্নিকটস্থ অঞ্চলগুলোতেই প্রসার লাভ করেছিলো। কিন্তু সুতো কাটার কাজে সকল অঞ্চলের মহিলাদেরই জড়িত থাকতে দেখা যেতো।

কৃষি

আরব ভু-খণ্ডের অভ্যন্তর ভাগের লোকেরা প্রায় সকলেই পশু পালন কার্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। মরুপ্রান্তরের আনাচে-কানাচে যেসব স্থানে চাষের উপযোগী ভূমি পাওয়া যেতো সেসব স্থানে কৃষির ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি সবচেয়ে জটিল ছিলো তা হচ্ছে, মানুষের দরিদ্রতা দূরীকরণের মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন, মহামারী ও রোগব্যাধি দূরীকরণ কিংবা অন্য কোনো কল্যাণমূলক কাজে অর্থ-সম্পদের খুব সামান্য অংশই ব্যয় হতো। সম্পদের সিংহভাগই ব্যয় হতো যুদ্ধ বিগ্রহের কাজে। সুতরাং জনজীবনে সুখ-শান্তি বা স্বাচ্ছন্দ্য বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। সমাজে এমন এক শ্রেণির লোক ছিলো-যাদের জীবনধারণের জন্য দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন এবং লজ্জা নিবারণের জন্য নূন্যতম প্রয়োনীয় বস্ত্র যোগানও সম্ভব হতো না।

জাহেলি যুগে আরব সমাজের নীতি-নৈতিকতা

আরববাসীদের নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্রের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি ধারার বিকাশ লক্ষ করা যায়। একদিকে লক্ষ করা যায় জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, হত্যা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা ইত্যাদি। অন্যদিকে লক্ষ করা যায় দয়া-দাক্ষিণ্য, উদারতা, অতিথিপরায়ণতা, ওয়াদা রক্ষায় আন্তরিকতা এবং আরো অনেক উন্নত মানবিক গুণাবলির সমাবেশ। তাদের অমানবিক ক্রিয়াকলাপ এবং আচারণ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্যায়ে তাদের চরিত্রের বিভিন্ন মানবিক দিক এবং সৎ গুণাবলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

দয়া-দাক্ষিণ্য ও উদারতা: জাহেলি যুগের আরববাসীদের দয়া-দাক্ষিণ্য সম্পর্কিত জনশ্রুতি ছিলো সর্বযুগের মানুষের গর্ব করার মতো একটি বিষয়। নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে ভ্রষ্টতার নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেও দয়া-দাক্ষিণ্য কিংবা বদান্যতার ব্যাপারে বিশ্বমানবগোষ্ঠীর মধ্যে তারা ছিলো সকলের শীর্ষস্থানে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে তাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলতো এবং এ ব্যাপারে তারা কথা বলে গর্ব করতো- 'আরবের অর্থভাগ তার জন্য উপহার হয়ে গিয়েছে।'

উক্ত গুণকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ নিজের প্রশংসা নিজেই করেছে। তাদের বদান্যতা বাস্তবিকপক্ষে এতই উঁচুমানের ছিলো যে, তা মানুষকে বিস্ময়ে অভিভূত করে ফেলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনটিও দেখা গিয়েছে, কঠিন শীত কিংবা ক্ষুধার সময়ও কারো বাড়িতে যদি মেহমান আসতো এবং তার জীবন ও জীবিকার জন্য অপরিহার্যরূপে প্রয়োজন একটি মাত্র উট ছাড়া আর কোনো সম্বলই নেই, তথাপি এমন এক সংকটময় মুহূর্তেও তার উদারতা এবং অতিথিপরায়ণতা তাকে এতটাই প্রভাবিত করে ফেলতো যে, অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা না করে তৎক্ষণাৎ সে উটটি যবেহ করে মেহমানদের আপ্যায়ন করানো হতো। উপরন্তু তাদের দয়া-দাক্ষিণ্য এবং উদারতার অনন্য চেতনা বড়ো বড়ো সমস্যার মূল বিষয়টি কিংবা সে সংক্রান্ত আর্থিক দায়-দায়িত্ব অবলীলাক্রমে আপন কাঁধে তুলে নিয়ে এমনভাবে মানুষকে ধ্বংস ও রক্ত পাতের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করতো-যা অন্যান্য নেতা কিংবা গোত্রপতিদের তুলনায় অনেক বেশি গর্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতো।

এ প্রসঙ্গে একটি মজার ব্যাপার ছিলো এই যে, দয়া-দাক্ষিণ্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে তারা যেমন গর্ববোধ করতো তেমনি মদ্যপান করেও গর্ববোধ করতো। 'মদ্যপান' একটি 'ভালো কাজ সে অর্থে মদ্যপান করে তারা গর্ববোধ করতো না; বরং এজন্য গর্ববোধ করতো যে, মদ্যপান উদারতা উদ্বোধক হিসেবে তাদের ওপর বিশেষভাবে প্রাধান্য বিস্তার করতো যার ফলশ্রুতিতে কোনো ত্যাগ স্বীকারকেই তারা বড়ো মনে করতো না। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে, নেশাগস্ত অবস্থায় মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পিছপা হয় না। এজন্য তারা আঙ্গুর ফলের বৃক্ষকে 'কারাম' এবং আঙ্গুর-রসে তৈরি মদকে 'বিনতুল কারাম' (কারামের কন্যা) বলতো।

জাহেলি যুগের কবিগণের কাব্যে এ জাতীয় প্রশংসা এবং গৌরবসূচক রচনা একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। আনতারা বিন সাদ্দাদ আবসী' তার নিজ মুয়াল্লাকায় বলেছে-

নিদাঘের উত্তাপ স্তিমিত হওয়ার পর বামদিকে রক্ষিত ফুটন্ত এবং মোহরকৃত মদপূর্ণ হলুদ বর্ণের এক নকশাদার কাঁচপাত্র হতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মদ্য আমি পান করলাম এবং যখন আমি তা পান করি তখন নিজের মাল লুটিয়ে দিই কিন্তু আমার মান-ইজ্জত পূর্ণমাত্রায় থাকে। এর ওপর কোনো হোচট কিংবা আঘাত আসে না। অতঃপর যখন আমি সজ্ঞানে থাকি কিংবা যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখনো আমি দান করতে কুণ্ঠিত হই না এবং আমার দয়া-দক্ষিণ্য এবং চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে তোমরা অবহিত রয়েছ।

তারা জুয়া খেলতো এবং মনে করতো যে, এটাও হচ্ছে তাদের দয়া- দক্ষিণ্যের একটি পথ। কারণ এর মাধ্যমে তারা যে পরিমাণ উপকৃত হতো তার কিছু অংশ কিংবা উপকৃত ব্যক্তিদের অংশ থেকে যা অবশিষ্ট থেকে যেতো তা অসহায় এবং মিসকীনদের মধ্যে দান করে দিতো। এ কারণেই কুরআন মাজিদেও মদ এবং জুয়ার উপকারকে অস্বীকার করা হয়নি; বরং এ সম্পর্কে বলা হয়েছে-

ঐ দুটোর উপকারের চেয়ে পাপ অধিকতর বড়ো জঘন্য। (বাকারাহ: আয়াত-২১৯)

প্রতিজ্ঞাপরায়ণতা: জাহেলি যুগে আরবদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিলো ওয়াদা রক্ষা তথা প্রতিজ্ঞাপরায়ণতা। ওয়াদা পালন বা অঙ্গীকার রক্ষা করাতে তারা ধর্মীয় কর্তব্য মনে করতো। সমাজ-সামাজিকতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কিংবা অন্য কোনোভাবে তারা যার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকতো তাদের জন্য স্বীয় সন্তানের রক্ত প্রবাহিত করা কিংবা নিজ বাস্তুভিটা পরিত্যাগ করার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকেও সামান্য কাজ বলে মনে করতো। এর যথার্থতা উপলব্ধির জন্য হানি বিন মাসউদ শাইবানী, সামওয়াল বিন আদিয়া এবং হাজির বিন যুরারাহ এর ঘটনাবলীই যথেষ্ট।

ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ: জাহেলি যুগে আরবদের অন্যতম ব্যক্তিবৈশিষ্ট্য ছিলো পার্থিব সবকিছুর ওপর নিজের মান-ইজ্জতকে প্রাধান্য দেয়া এবং কোনো প্রকার অন্যায়-অত্যাচার সহ্য না করা। এর ফল এ দাঁড়িয়েছিলো যে, তাদের অহংকারবোধ এবং মর্যাদাবোধ সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিলো। বিশেষ কোনো কারণে তাদের এ অহংকার ও মর্যাদাবোধের ওপর সামান্যতম আঘাত আসলে কিংবা অপমান হলেও তারা উত্তেজিত হয়ে পড়তো এবং তরবারি, বর্শা, ফলা ইত্যাদি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়তো। এ সংঘর্ষে লিপ্ত হতে গিয়ে তাদের প্রাণহানির ব্যাপারে কোনোই উৎকণ্ঠা থাকতো না। প্রাণের তুলনায় মান-মর্যাদাকেই তারা অধিকতর মূল্যবান মনে করতো।

সংকল্প বাস্তবায়ন: ইসলামপূর্ব যুগে আরবদের আরো একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো, কোনো কাজ-কর্মকে মান-সম্মান ও পৌরুষের প্রতীক মনে করে যখন তারা সে কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে সংকল্পবদ্ধ হতো তখন তারা প্রাণবাজি রেখে সেই কর্ম সম্পাদনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তো। পার্থিব কোনো শক্তিই তাদেরকে এ সংকল্প থেকে বিরত রাখতে পারতো না।

ভদ্রতা, ধৈর্য ও গাম্ভীর্য: ভদ্রতা, শিষ্টতা ও ধৈর্য-গাম্ভীর্য আরববাসীদের নিকট খুবই প্রিয় ও প্রশংসনীয় বিষয় ছিলো। এসব মানবিক গুণাবলিকে কোনো সময়ই তারা ছোট করে দেখতো না। কিন্তু তাদের উগ্র স্বভাব, উৎকট অহংকারবোধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার কারণে খুব কম ক্ষেত্রেই এর যথার্থতা রক্ষা করতে সক্ষম হতো।

সরলতা ও অনাড়ম্বরতা: ইসলামপূর্ব যুগে আরবাসীদের সংস্কৃতিধারা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, তাদের জীবনযাত্রা ছিলো অত্যন্ত সহজ, সরল এবং অনাড়ম্বর। তাদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে ঘোর প্যাচ কিংবা জটিলতার লেশমাত্র থাকতো না। উদার, উন্মুক্ত মরুপ্রকৃতির মতোই তাদের মন ছিলো উন্মুক্ত। কিন্তু মেজাজ ছিলো তীক্ষ্ণ। এ কারণে প্রকৃতিগতভাবেই তারা ছিলো সৎ এবং সততাপ্রিয়। ধোকাবাজি এবং বিশ্বাসভঙ্গের মতো কোনো ব্যাপার ছিলো তাদের সম্পূর্ণ অজানা। গচ্ছিত ধন বা আমানত রক্ষা করা তারা পবিত্র দায়িত্ব হিসেবেই গণ্য করতো।

আমরা সর্বন্তঃকরণে বিশ্বাস করি যে, ধরাপৃষ্ঠের কেন্দ্রস্থলে আরবভূমির অবস্থান, আরবভূমির ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগত বিশেষ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, আরবাসীদের উদার-উন্মুক্ত মানবিক চেতনা, অতিথি পরায়ণতা, সহজ-সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা এবং আমানত গচ্ছিত রাখার অতুলনীয় উদাহরণের প্রেক্ষাপটে আরবভূমিকে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু, আরবজাতিকে আল্লাহর পবিত্রতম আমানত ইসলামকে হেফাজত করার উপযুক্ত মানবগোষ্ঠী, আরবি ভাষাকে আল্লাহর বাণী ধারণ ও বাহনের উপযুক্ত ভাষা এবং আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে সকল দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিটিকে নবুয়ত ও রিসালতের উপযুক্ত বিবেচনাসাপেক্ষে ইসলামের আয়োজন ও বাস্তবায়ন ধারা সূচিত হয়েছিলো।

পৃথিবীর বুকে শুভাগমন করলেন বিশ্বনবী রহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মদ (ﷺ)

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন- "আল্লাহ মাখলুক সৃষ্টি করেন এবং আমাকে সর্বোত্তম দলভুক্ত করেন। তারপর গোত্রসমূহ নির্বাচন করা হয় এবং এক্ষেত্রেও আমাকে সর্বোত্তম গোত্রের মধ্যে শামিল করা হয়। এরপর পরিবারিক মর্যাদার ওপর দৃষ্টি দেয়া হয় এবং এক্ষেত্রেও আমাকে অন্ত্যন্ত মর্যাদাশীল পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অতএব আমি আমার ব্যক্তিসত্তায় যেমন উত্তম, বংশ মর্যাদার ব্যাপারেও তেমনি সকলের চেয়ে উত্তম।" (তিরমিযি)

পবিত্র হারাম শরীফের পাশে অবস্থিত গ্রন্থাগার ভবন মহানবী (ﷺ) এখানেই জন্মগ্রহণ করেন বলে ধারণা করা হয়।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বংশাবলি, শুভাগমন ও তাঁর নবুয়তকাল

পরস্পরাগত সূত্রে রাসূল (ﷺ) এর বংশাবলিকে তিন পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে আদনান পর্যন্ত-যার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ এবং বংশাবলি বিশেষজ্ঞ অভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ এবং বংশাবলি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারটিকে কেউ কেউ এড়িয়ে গেছেন, কেউ কেউ আবার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছেন।

তৃতীয় পর্যায়ের সমকাল হচ্ছে ইবরাহিম (আ) থেকে আদম (আ) পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে এই পর্যায়ের আলোচনা এবং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কিছুটা ভুলভ্রান্তি রয়েছে।

প্রথম পর্যায়: মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব (শায়বা) বিন হাশেম (আমর) বিন আবদে মানাফ (মুগীরাহ) বিন কুসাই (যায়েদ) বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কা'ব বিন লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তার উপাধি ছিলো 'কুরাইশ' এবং উক্ত সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালেক বিন নামব (কায়েস) বিন কেনানা বিন খুযায়মা বিন মুদরেকা আমের বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নাযর বিন ময়াদ্দ বিন আদনান।

দ্বিতীয় পর্যায়: আদনান থেকে ওপরের দিকে অর্থাৎ আদনান বিন আদ বিন হামিসায়া বিন সালামান বিন আউস বিন বুয বিন কাওয়াল বিন উবাই বিন আওয়াম বিন নাশিদ বিন হেযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন তারিখ বিন জাহিম বিন নাহিস বিন মাখী বিন আইস বিন আবকার বিন উবাইদ বিন আদদোয়া বিন হামদাদ সুনবর বিন ইয়াসরীরী বিন ইয়াহয়ুন বিন ইয়ালহান বিন আরআওয়া বিন আইয বিন যীশন বিন আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুকশির বিন নাহিস যারেহ বিন সুমাই বিন মুখী বিন আওয়াহ বিন এরাম বিন কাইদার বিন ইসমাঈল বিন ইবরাহিম (আ)।

তৃতীয় পর্যায়: ইবরাহিম (আ) হতে ওপরে ইবরাহিম বিন তারিহ (আযর) বিন নাহুর বিন সারুহ্ (অথবা সারুগ) বিন রাউ বিন ফালেখ বিন আবের বিন শালেখ বিন আরফাখশাদ বিন শাম বিন নূহ (আ) বিন লামেক বিন মাতুশলখ বিন আখনুখ [কথিত আছে যে, এ নাম ছিলো ইদরিস (আ) এর] বিন ইয়াদ বিন মহালায়েল বিন কায়নান বিন আনুশ বিন শীশ বিন আদম (আ)।

পরিবার পরম্পরা

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পরিবার ওপরের দিকে তার প্রপিতামহ হাশেম বিন আবদে মানাফ থেকে পারিবারিক পরিচয় প্রদানের মূল সুত্র ধরার কারণে তা হাশেমি পরিবার নামে প্রসিদ্ধ ছিলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য তার পিতামহ, প্রপিতামহ, অর্থাৎ পূর্বতন কয়েক প্রজন্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের জীবনী সম্পর্কে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। উক্ত প্রেক্ষিতেই পরবর্তী আলোচনা।

হাশেম

আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, যখন বনু আবদে মানাফ এবং বনু আবদুরের মধ্যে হারামের সাথে সংশ্লিষ্ট পদসমূহ বন্টনের ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো তখন আবদে মানাফের সন্তাদের মধ্যে হাশেমকেই 'সেকায়া' এবং 'রেফাদাহ' অর্থাৎ হজ্বযাত্রীগণকে পানি পান করানো এবং তাদের মেহমানদারী করার মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। হাশেম ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও সভ্রান্ত ব্যক্তি। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি 'শোরবা' বা ঝোলের সাথে রুটি মিশ্রিত করে মক্কায় হাজীদেরকে খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করেন। তাঁর আসল নাম ছিলো 'আমর'। কিন্তু শোরবা বা ঝোলের সাথে রুটি কেটে মিশ্রিত করার কারণে 'হাশেম' নামে তাকে ডাকা হতে থাকে। কারণ 'হাশেম' অর্থ হচ্ছে যিনি কোনো কিছু ভেঙ্গে ফেলেন। আবার এ হাশেমই হচ্ছেন। প্রথম ব্যক্তি-যিনি কুরাইশদের জন্য গ্রীষ্ম ও শীতকালে ব্যবসা সংক্রান্ত দুটি ভ্রমণ বা পর্যটনের গোড়াপত্তন করেন। তাঁর সম্পর্কে জনৈক কবি বলেছেন-

এ আমর-ই দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্বল স্বজাতির জন্য মক্কায় 'শোরবা' বা ঝোলের মধ্যে রুটির টুকরো ভিজিয়ে খাইয়েছিলেন এবং শীত ও গ্রীষ্মের দিনে ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং পরবর্তী ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো। সেটি হলো, ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে শামরাজ্যের যাওয়ার পথে যখন তিনি মদীনায় পৌঁছলেন তখন সেখানে বনু নাজ্জার গোত্রের 'সালমা বিনতে আমর' নামে এক মহিলাকে বিয়ে করেন। এবং কিছুকাল সেখানে অবস্থান করেন। অতঃপর নিজ স্ত্রীকে গর্ভবতী অবস্থায় তার পিত্রালয়ে রেখে তিনি শামরাজ্যে চলে যান এবং সেখানে গিয়ে ফিলিস্তিনের গাযা শহরে পরলোক গমন করেন।

এদিকে সালমার গর্ভজাত সন্তান যথাসময়ে ভূমিষ্ট হয়। বর্ষপঞ্জীর হিসেবে সে বছরটি ছিলো ৪৯৭ খ্রিস্টাব্দ। নবজাত শিশুর মাথার চুল ছিলো সাদা, তাই সালমা তার নাম রাখেন শায়বা।

সালমা নিজ পিত্রালয়ে থেকে আপন সন্তানকে সযত্নে লালন-পালন করতে থাকেন। সেদিনের এ শিশুটিই ছিলেন পরবর্তীকালে আখেরি নবী মুহাম্মদ (ﷺ) -এর পিতামহ এবং অভিভাবক 'আব্দুল মুত্তালিব'। শিশু আব্দুল মুত্তালিব দিনে দিনে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে উঠলেও দীর্ঘসময় যাবৎ হাশেম পরিবারে কেউই তাঁর জন্মের কথা জানতে পারেননি। হাশেম ছিলেন ৯ জন সন্তানের জনক। ৯ জনের মধ্যে ৪ জন ছেলে ও ৫ জন মেয়ে। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে আসাদ, আবু সাইফী, নাযলাহ, আব্দুল মুত্তালিব এবং শিফা, খালিদাহ, মায়িফাহ, রুকাইয়া ও জান্নাহ।" বিভিন্ন বর্ণনা মোতাবেক নামের পার্থক্য পাওয়া যায়।

আব্দুল মুত্তালিব

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা নিশ্চিতরূপে অবগত হয়েছি যে, 'সেকায়া' এবং 'রেফাদাহ' সম্পর্কিত পদের দায়িত্ব অর্পিত ছিলো হাশেমের ওপর। হাশেমের ইন্তেকালের পর সে দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ভাই মুত্তালিবের ওপর। তিনিও গোত্রের মধ্যে বিভিন্ন সগুণাবলি এবং মান-মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর কথা অমান্য করা কিংবা নড়চড় করার ক্ষমতা গোত্রের অন্য কারোর ছিলো না। বদান্যতার জন্যেও তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। বদান্যতার কারণেই কুরাইশগণ তাঁর নাম রাখেন 'ফাইয়ায়'। যখন শায়বা কে দেখতে পান তাঁর চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে থাকে। অতঃপর তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে উষ্ট্রপৃষ্টে আরোহণ করিয়ে নেন এবং মক্কা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।

কিন্তু শায়বা তাঁর মাতার অনুমতি ছাড়া মক্কায় যেতে অস্বীকার করায় তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুত্তালিব তাঁর মাতার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু শায়বার মাতা তাঁকে অনুমতি দিতে অস্বীকার করলে মুত্তালিব তাঁকে এ কথা বুঝিয়ে বলেন যে, এ ছেলে তাঁর পিতার রাজত্বে এবং আল্লাহর হারাম শরীফের দিকে যাচ্ছে। নিশ্চিতরূপে এ হচ্ছে তার চরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। এ কথা শ্রবণের পর শায়বাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর মাতা অনুমতি প্রদান করে। অনুমতি লাভের পর মুত্তালিব তাঁকে নিজের উষ্টের পিঠে বসিয়ে মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকেন।

মক্কায় পৌঁছার পর শায়বাকে মুত্তালিবের সাথে দেখে মক্কাবাসী বলে, এই বালক হচ্ছে 'আব্দুল মুত্তালিব' অর্থাৎ 'মুত্তালিবের দাস'। তার উত্তরে মুত্তালিব বলেন, না না, এ হচ্ছে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র আমার ভাই হাশেমের ছেলে। এরপর থেকে তিনি মুত্তালিবের নিকট লালিত-পালিত হতে থাকেন।

শায়বা যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন কোনো এক সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের ইয়েমেনে মুত্তালিব পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর আব্দুল মুত্তালিব পরিত্যক্ত পদসমূহের অধিকার লাভ করেন। যে তাঁর পিতা কিংবা পিতামহ কেউ- এত মান-সম্মানের অধিকারী হতে সক্ষম হননি। একজন গুণী ব্যক্তি হিসেবে জাতির লোকেরা সকলেই তাঁকে খুবই আন্তরিকতার সাথে ভালোবাসতো এবং সমীহ করে চলতো।

মুত্তালিব যখন পরলোক গমন করেন তখন 'নাওফাল' বলপূর্বক আব্দুল মুত্তালিবের চত্বর দখল করে নেয়। আব্দুল মুত্তালিবের একার পক্ষে তাঁর চাচার সাথে মোকাবিলা করা সম্ভব না হওয়ার কারণে কুরাইশ গোত্রের কোনো কোনো লোকের নিকট তিনি সাহায্যপ্রার্থী হন। কিন্তু তারা এ বলে আপত্তি করে যে, নিজের চাচার সাথে তাঁর বিরোধের ব্যাপারে কোনো কিছু করা তাদের পক্ষ সম্ভব নয়। নিরুপায় হয়ে আব্দুল মুত্তালিব তাঁর মামার গোত্র বনু নাজ্জারের নিকট কিছু কবিতা লিখে পাঠান-যার মধ্যে লিখিত ছিলো সাহায্যের করুণ আবেদন।

এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর, মামা 'আবু সা'দ বিন আদী' আশি জন অশ্বারোহী নিয়ে মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং 'আবতাহ' নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান করেন। আব্দুল মুত্তালিব সেখানে গিয়ে তাঁর মামার সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে নিজ গৃহে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু নাওফালের সাথে একটা বোঝাপড়া না হওয়া পর্যন্ত আবু সা'দ তাঁর গৃহে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। অতঃপর সে অগ্রসর হয়ে নাওফালের অবস্থান স্থলে গিয়ে দাঁড়ায়।

নাওফাল তখন' হাতীম' নামক স্থানে কয়েকজন কুরাইশের সাথে উপবিষ্ট ছিলো। আবু সা'দ তলোয়ার কোষমুক্ত করে বললো- এ পবিত্র ঘরের প্রভুর শপথ! তুমি যদি আমার ভাগ্নেকে তার অধিকার ফিরিয়ে না দাও, তাহলে এ তলোয়ার অবশ্যই তোমার বক্ষদেশ বিদীর্ণ করবে। ইতস্ততঃ না করে নাওফাল বললো- 'ঠিক আছে, আমি তাঁর অধিকার ফিরিয়ে দিলাম।

এ কথা শ্রবণের পর আবু সা'দ কুরাইশদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে সাক্ষী থাকা এবং প্রয়োজনবোধে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য অনুরোধ জানায়। তারা এ ব্যাপারে সম্মতিজ্ঞাপন করলে সে আবব্দুল মুত্তালিবের গৃহে গমন করে এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান ও উমরা পালনের পর মদিনায় ফিরে আসে। উক্ত ঘটনার পর 'নাওফাল' বনু হাশেমের বিরুদ্ধে বনু আবদে শামস এর সাথে পরস্পর সাহায্য ও সহযোগিতামূলক এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।

অন্যদিকে 'বনু খুযায়মা' গোত্র যখন দেখতে পেলো বনু নাজ্জার গোত্র আব্দুল মুত্তালিবকে সাহায্য করছে তখন তারা বললো, আব্দুল মুত্তালিব যেমন তোমাদের সন্তান তেমনি আমাদের সন্তান। সুতরাং তাকে সাহায্য করা সর্বাগ্রে আমাদেরই কর্তব্য।

এর কারণ ছিলো, আবদে মানাফের মায়ের সম্পর্ক ছিলো খুযায়মা গোত্রের সাথে এ কারণে বনু খুযায়মা গোত্র 'দারুন নদওয়ায়' গিয়ে বনু আবদে শামস এবং বনু নাওফালের বিরুদ্ধে বনু হাশেমের সাথে সাহায্য ও সহযোগিতার এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। উক্ত চুক্তিতে এমন সব অঙ্গীকার করা হয়েছিলো-যা পরবর্তী পর্যায়ের ইসলামি যুগে মক্কা বিজয়ের জন্য খুবই সহায়ক হয়েছিলো। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে প্রদান করা হবে।

বায়তুল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় আব্দুল মুত্তালিবের সাথে দুটি বিশেষ ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে 'যমযম' কূপের খননকার্য সম্পর্কিত এবং অন্যটি হচ্ছে 'হস্তিবাহিনী' সম্পর্কিত ঘটনা। উক্ত দুটি ঘটনা সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

যমযম কূপ খনন

এ ঘটনার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, আব্দুল মুত্তালিব স্বপ্নযোগে অবগত হন যে, তাঁকে যমযম কূপ খননের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং স্বপ্নে তার স্থানও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অতঃপর ঘুম থেকে জেগে তিনি নির্দিষ্ট স্থানে খননকার্য আরম্ভ করে দেন। খননকার্য চলাকালে কূপ থেকে সেসব জিনিস পত্র উত্তোলন করা হয় যা বনু জুরহাম গোত্র মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিলো। সংক্ষিপ্ত জিনিসের মধ্যে ছিলো কতকগুলো তলোয়ার ও লৌহবর্ম এবং দুটি সোনার হরিণ।

আব্দুল মুত্তালিব তলোয়ারগুলো দ্বারা কা'বা ঘরের দরজা ঢালাই করেন, সোনার হরিণ দুটো দরজার সাথে সন্নিবেশিত করে রাখেন এবং হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্থা করেন।

যমযম কূপ খননকালে আরো একটি ঘটনার উদ্ভব হয়, যখন কূপটি প্রকাশিত হয় তখন কুরাইশগণ আব্দুল মুত্তালিবের সাথে বিবাদ আরম্ভ করে এবং দাবি করে যে, খননকার্যে তাদেরকেও অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে। আব্দুল মুত্তালিব বললেন, যেহেতু এ কূপ খননের জন্য তিনি স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হয়েছেন সেহেতু এ কাজ অন্যকে অংশগ্রহণ করতে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।

কিন্তু কুরাইশগণও তাদের দাবি ছাড়তে রাজি নয়। এ ব্যাপারে মতামত গ্রহণের জন্য তারা বনু সা'দ গোত্রের এক মহিলা-যে ছিলো ভবিষ্যদ্বক্তা-তার নিকট যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এতদুদ্দেশ্যে মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে তারা এমন কতগুলো নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে যাতে তাদের নিকট এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ যমযম কূপের খননকার্য আব্দুল মুত্তালিবের জন্যই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই তারা আর অগ্রসর না হয়ে মক্কায় ফিরে আসলো।

উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতেই আব্দুল মুত্তালিব মানত করেছিলেন, আল্লাহ যদি অনুগ্রহ করে তাকে দশটি পুত্রসন্তান দান করেন এবং সকলেই প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তিনি তার একটি সন্তানকে বায়তুল্লাহর জন্য উৎসর্গ করে দিবেন।

হস্তিবাহিনীর ঘটনা

দ্বিতীয় ঘটনার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে, আবরাহা সাবাহ হাবশি সে সম্রাট নাজ্জাশি হাবশের পক্ষ হতে ইয়েমেনের গভর্নর ছিলো যখন দেখলো যে, আরববাসী কা'বা ঘরের হজ্জ পালন করছে এবং একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে লোকজন সেখানে আগমন করছে। তখন সানআয় সে একটি বিরাট গির্জা নির্মাণ করলো এবং সে গির্জাকে কেন্দ্র করে হজ্জ পালন করার জন্য আরববাসীকে আহ্বান জানালো।

কিন্তু বনু কেনানা গোত্রের লোকজন যখন এই সংবাদ অবগত হলো তখন তারা এক রাতে গোপনে গির্জায় প্রবেশ করে তার সামনের দিকে মল এর প্রলেপন দিয়ে একদম নোংরা করে ফেললো।

উক্ত ঘটনায় আবরাহা ভয়ানক ক্রোধান্বিত হয় এবং প্রতিশোধ গ্রহণার্থে কা'বাঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রায় ষাট হাজার অস্ত্রসজ্জিত সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হয়। সে নিজে একটি শক্তিশালী হাতির পিঠে আরোহণ করে। সৈন্যদের কাছে মোট নয়টি মতান্তরে তেরটি হাতি ছিলো।

আবরাহা ইয়েমেন হতে অগ্রসর হয়ে 'আল মাগাম্মাস' নামক স্থানে পৌঁছে এবং সেখানে তার সৈন্যবাহিনীকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করে মক্কায় প্রবেশের উদ্দেশ্যে সামনে অগ্রসর হলো। অতঃপর যখন মুজদালিফা এবং মিনার মধ্যবর্তী স্থান ওয়াদিয়ে মুহাসসারে পৌঁছলো তখন আবরাহার হাতিটি মাটিতে বসে পড়লো। কা'বা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য কোনোভাবেই তাকে উঠানো সম্ভব হলো না। অথচ উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্বমুখে যাওয়ার জন্য তাকে উঠানোর চেষ্টা করলে সে তৎক্ষণাৎ উঠে দৌড়াতে শুরু করলো। এমন সময়ে আল্লাহ এক ঝাঁক ছোট পাখি প্রেরণ করলেন। কুরআন মাজিদে সে পাখিগুলোকে 'আবাবীল' বা ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে পাখিগুলো পাথরের ছোট ছোট টুকরো বয়ে এনে সৈন্যদের ওপর নিক্ষেপ করতে লাগলো। প্রত্যেকটি পাখি তিনটি করে পাথরের টুকরো বা কঙ্কর নিয়ে আসতো- একটি ঠোঁটে এবং দুটি দু'পায়ে। কঙ্করগুলো আকারে ছিলো বুটের সমান। কিন্তু কঙ্করগুলো শরীরের যেখানে লাগতো সে অঙ্গ ফেটে সেখান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে হতে সে মরে যেতো।

উক্ত কঙ্কর দ্বারা সকলেই যে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলো এমনটি নয়। কিন্তু এ অলৌকিক ঘটনায় সকলেই ভীষণভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং প্রাণভয়ে সে স্থান ছেড়ে পালানোর উদ্দেশ্যে যখন বেপরোয়াভাবে ছুটোছুটি শুরু করে পদতলে পিষ্ঠ হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। কঙ্করের আঘাতে ছিন্নভিন্ন এবং পদতলে পিষ্ঠ হয়ে দুভাবেই পলকে পলকে বীরপুরুষগণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে থাকে।

অন্যদিকে আবরাহার ওপর আল্লাহ এমন এক কঠিন মসিবত প্রেরণ করলেন যে তার আঙ্গুলসমূহের জোড়া খুলে গেলো এবং 'সানা' নামক স্থানে যেতে না যেতেই সে পাখির বাচ্চার মতো হয়ে পড়ে। অতঃপর তার বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে আসে এবং সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

মক্কা অভিমুখে আবরাহার অভিযানের সংবাদ অবগত হয়ে মক্কাবাসী প্রাণভয়ে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পলায়ন করে পাহাড়ের কিংবা পর্বত চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। অতঃপর যখন তারা অবগত হলো যে, আবরাহা এবং তার বাহিনী সমূলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের অভিমত হচ্ছে, উক্ত ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্মগ্রহণের মাত্র ৫০ কিংবা ৫৫ দিন পূর্বে মুহাররম মাসে। এ প্রেক্ষিতে এটা ধরে নেয়া যায় যে, ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিলো ৫৭১ ঈসায়ী সালে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ ভাগে কিংবা মার্চ মাসের প্রথম ভাগে।

হস্তিবাহিনীর এ ঘটনা ভবিষ্যতের নবী, ও রাসূল এবং কা'বার জন্য ইলাহী সিদ্ধান্ত ও সাহায্যের এক সুস্পষ্ট নিদর্শন। এর পেছনে আরো যে একটি কারণ ছিলো তা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর আমলেই দেখলেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস ছিলো মুসলমানদের 'কিবলা' এবং সেখানকার অধিবাসীগণও ছিলো 'মুসলমান'। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তার ওপর আল্লাহর শত্রুদের অর্থাৎ মুশরিকদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। এর সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে বুখতে নসরের আক্রমণ (৫৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে) এবং রোমানগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা (৭০ ঈসায়ী সালে)। পক্ষান্তরে কা'বার ওপর খ্রিস্টানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যদিও তারা তখন মুসলমান ছিলো এবং কা'বার অধিবাসীগণ ছিলো মুশরিক।

উপরন্তু এ ঘটনা এমনি এক সময়ে সংঘটিত হয়েছিলো যে, এ সংক্রান্ত খবরা-খবর তৎকালীন সভ্যজগতের অধিকাংশ অঞ্চলে অর্থাৎ: রোমান সাম্রাজ্য, পারস্য সাম্রাজ্য ইত্যাদি অঞ্চলে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যদিকে পারস্যবাসীদের দৃষ্টি রোমীয়গণের ওপর সমভাবে বিদ্যমান ছিলো এবং শেষ পর্যন্ত অবস্থা এ দাঁড়ায় যে, পারস্যবাসী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ইয়েমেন দখল করে বসে।

যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তখন রোমান এবং পারস্য এ দুটি রাষ্ট্রই তৎকালীন পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করতো এবং যেহেতু হস্তিবাহিনী ঘটনাটি এ দু'রাষ্ট্রের সকলের নিকটেই সুবিদিত ছিলো। সেহেতু বলা যায় যে, সমগ্র পৃথিবীর দৃষ্টি কাবাঘরের অলৌকিকত্বের প্রতি নিবদ্ধ হয়ে গেলো। বায়তুল্লাহ উচ্চ সম্মান ও সুমহান মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ প্রদত্ত সুস্পষ্ট নিদর্শন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার পর একথা তাদের মনে দৃঢ়ভাবে স্থান লাভ করলো যে, এ গৃহকে সংরক্ষণ ও পবিত্রকরণ এবং এর সুমহান মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার ব্যাপারেই আল্লাহ উক্ত অলৌকিক ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন। অতএব ভবিষ্যতে এখানকার অধিবাসীদের মধ্য থেকে কেউ যদি নবুয়ত দাবি করেন তবে সে ঘটনার প্রেক্ষাপটে তা হবে ন্যায়সঙ্গত এবং বাঞ্ছনীয় ব্যাপার এবং তা হবে পার্থিব ব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বে। আল্লাহর রাজত্বের ভিত্তি-যা ঈমানদারদের সাহায্যার্থে নাযিল হয়েছিলো গায়েবী উৎস থেকে। আব্দুল মুত্তালিবের ছিলো সর্বমোট দশটি সন্তান। তাঁদের নাম ছিলো যথাক্রমে-

১. হারিস.
২. জোবায়ের,
৩. আবু তালিব,
৪. আব্দুল্লাহ,
৫. হামজাহ,
৬. আবু লাহাব,
৭ গায়দাক,
৮. মুকাওআম,
৯. সিফার,
১০. আব্বাস।

কেউ কেউ বলেছেন, তাঁর ছিলো ১১টি সন্তান, একজনের নাম ছিলো 'কাযম'। অন্য একদল বলেছেন, ১৩টি সন্তান। অন্য দু'জনের নাম হলো কা'বা এবং 'হাযাল'। কিন্তু দশ জনের কথা যারা বলেছেন তারা বলেন, মুকাওআমেরই' অন্য নাম ছিলো 'আব্দুল কা'বা এবং 'গায়দাকের' আরেক নাম ছিলো 'হাযাল'। তাদের মত 'কাযম' নামে আব্দুল মুত্তালিবের কোনো পুত্রসন্তান ছিলো না। আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা ছিলো ৬ জন। তাদের নামগুলো হচ্ছে যথাক্রমে-

১. উম্মুল হাকীম (তার নাম বায়যা),
২. বাররাহ,
৩. আতিকাহ,
৪. সাফিয়্যাহ,
৫. আরোয়া,
৬. উমাইয়া।

মহা সৌভগ্যবান পুরুষ আব্দুল্লাহ

আব্দুল্লাহ ছিলেন নবী (ﷺ) এর সম্মানিত পিতা। আবদুল্লাহর মাতার নাম ছিলো ফাতিমা। তিনি ছিলেন আমর বিন আয়েয বিন ইমরান মাখযুম বিন ইয়ামাহ বিন মুররাহর কন্যা। আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণের মধ্যে "আব্দুল্লাহ' ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন পিতার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তাঁর উপাধি ছিলো 'যবীহ'। যে কারণে তাকে 'যবীহ' বলা হতো। তা হচ্ছে, আব্দুল মুত্তালিবের প্রার্থিত পুত্রসংখ্যা যখন ১০ জন হলো এবং তারা সকলেই আত্মরক্ষা করার যোগ্যতা অর্জন করলেন তখন আব্দুল মুত্তালিব তাদেরকে নিজ মান্নত সম্পর্কে অবহিত করেন। (তাদের পক্ষ থেকে একজনকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার ব্যাপারে)। তারা সকলেই উক্ত প্রস্তাবে স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।

এরপর আবদুল মুত্তালিব ভাগ্য নির্ণায়ক তীরের ওপর তাদের সকলের নাম লেখেন এবং হোবল মূর্তির সেবায়েত বা তদারককারীগণের নিকট তা সমর্পণ করেন। সেবায়েতগণ তীরগুলোকে তাদের নির্ধারিত পন্থায় চক্রাকারে ফেরানোর পর নির্বাচনী গুটিকা বা লটারির গুটি বের করেন। লটারিতে আব্দুল্লাহ'র নাম উঠে যায়। আব্দুল মুত্তালিব আব্দুল্লাহর হাত ধরে তাঁকে নিয়ে যায় কা'বাঘরের নিকট। তাঁর হাতে ছিলো যবেহকার্যের অভিজ্ঞ নানাগোষ্ঠীর লোকজন এবং আব্দুল্লাহর ভাই আবু তালিব এ ব্যাপারে তাঁকে বাধা প্রদান করেন। নিজের মানত পূরণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আব্দুল মুত্তালিব বললেন, তাহলে মানতের ব্যাপারে তার করণীয় কার্য কি হতে পারে? এ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারিণী বা তত্ত্ব বিশারদ কোনো মহিলার নিকট থেকে উক্ত ব্যাপারে পরামর্শ গ্রহণের জন্যে তারা তাঁকে উপদেশ প্রদান করেন।

আব্দুল মুত্তালিব জনৈকা তত্ত্ববিশারদের নিকট গিয়ে এ ব্যাপারে তার পরামর্শ চাইলে সঠিক সিন্ধান্ত গ্রহণের জন্য আব্দুল্লাহ এবং দশটি উটের মধ্যে লটারি বা নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। নির্বাচনী গুটিকায় যদি আব্দুল্লাহর নাম উঠে যায় তাহলে দশটি উটের সাথে আরো দশটি উট যোগ করে নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করতে হবে। এরপরও যদি আব্দুল্লাহর নাম উঠে যায় তাহলে পূর্বোক্ত বিশটি উটের সাথে আরো দশটি উট যোগ করে নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করতে হবে এবং যে পর্যন্ত না আব্দুল্লাহ'র নামের স্থানে 'উট' কথাটি প্রকাশিত হয় সে পর্যন্ত একই ধারায় নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করে যেতে হবে যতক্ষণ না আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর উটের যে সংখ্যা নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করা হবে সে সংখ্যক উট আল্লাহর নামে উৎসর্গ করতে হবে।

সেখান থেকে ফিরে আসার পর আব্দুল মুত্তালিব আব্দুল্লাহ' এবং দশটি 'উট' এর মধ্যে নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করেন। কিন্তু এতে আব্দুল্লাহর নাম-ই প্রকাশিত হয়। তত্ত্ববিশারদের নির্দেশ মোতাবেক দ্বিতীয় দফায় উটের সংখ্যা আরো দশ বৃদ্ধি করে তিনি নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করেন। কিন্তু এতেও আব্দুল্লাহর নাম-ই উঠে যায়। সুতরাং পরবর্তী পত্যেক দফায় দশটি করে উটের সংখ্যা বৃদ্ধি করে তিনি নির্বাচনী গুটিকা ব্যবহার করে যেতে থাকেন। এভাবে চলতে চলতে যখন একশত উট এবং আব্দুল্লাহর নাম নির্বাচনী গুটিকায় ব্যবহার করা হয় তখন 'উট' কথাটি প্রকাশিত হয়। এ প্রেক্ষিতে আব্দুল মুত্তালিব আব্দুল্লাহ'র পরিবর্তে একশটি উট আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গীকৃত পশুর গোশত কোনো মানুষ কিংবা জীবজন্তুর খাওয়ার ব্যাপারে কোনো বিধি-নিষেধ ছিলো না।

উল্লিখিত ঘটনার পূর্বে আরব এবং কুরাইশদের মধ্যে রক্তপাতের খেসারত বা মূল্য ছিলো দশটি উট। কিন্তু এ ঘটনার পর এর বর্ধিত সংখ্যা নির্ধারিত হয় একশটি উট। ইসলামও উক্ত সংখ্যাকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাসূল হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন- 'আমি দু যবীহর সন্তান- একজন ইসমাঈল (আ) এবং অন্যজন হচ্ছেন আমার পিতা আব্দুল্লাহ।

আব্দুল মুত্তালিব নিজ সন্তান আব্দুল্লাহর বিয়ের জন্য আমিনাকে মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন ওয়াহাব বিন আবদে মানাফ বিন যোহরা বিন কিলাবের কন্যা। বংশপরম্পরা এবং মর্যাদার দিক দিয়ে তাঁকে কুরাইশ গোত্রের মধ্যে উন্নতমানের মহিলা হিসেবে গণ্য করা হতো। তাঁর পিতা ছিলেন বিখ্যাত বনু যোহরা গোত্রপতি। বিয়ের পর আমিনা মক্কায় স্বামীগৃহে আগমন করেন এবং স্বামীর সাথে বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু অল্পদিন পরেই আব্দুল মুত্তালিব ব্যবসা উপলক্ষে খেজুর আনার উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহকে মদিনা প্রেরণ করেন। তিনি সেখানেই ইন্তেকাল করেন।

কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেন, ব্যবসার উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ শামদেশে গমন করেছিলেন। এক কুরাইশ কাফেলার সাথে মক্কায় ফিরে আসার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন ও মদিনায় অবস্থান গ্রহণ করেন। সে অসুস্থতার কারণেই মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। 'নাবেগা জা'দী'র বাড়িতে তাঁর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো মাত্র ২৫ বছর। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের অভিমত হচ্ছে, পিতার মৃত্যুর আগে রাসূলুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেননি। আর অল্পসংখ্যক ঐতিহাসিকের অভিমত হচ্ছে, পিতার মৃত্যুর দু'মাস পূর্বেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

আব্দুল্লাহর মৃত্যুসংবাদ যখন মক্কায় পৌঁছলো তখন আমিনা মর্মস্পর্শী ভাষায় একটি শোকগাথা আবৃত্তি করেছিলেন। শোকগাথাটি হচ্ছে- বতহার জমিন হাশেমের পুত্রকে হারালো, সে চিৎকার ও গোলমালের মাঝে সমাধিতে সুখস্বপ্নে পরিতৃপ্ত হয়ে গেলো। মৃত্যু তাকে এমন ডাক দিলো যে, মৃত্যু মানুষের মধ্যে ইবনে হাশেমের মতো কোনো ব্যক্তিকেই ছাড়েনি। কতই দুঃখজনক ছিলো যখন সে সন্ধ্যায় লোকেরা তাঁকে মৃতের খাটিয়ায় উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। যদিও একটি মৃত্যু যন্ত্রণা তাঁর অস্তিত্বকে শেষ করেছে, তবুও তার উন্নততর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে মুছে ফেলতে পারবে না। তিনি ছিলেন বড়োই দয়াবান এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারী।

মৃত্যুকালে তিনি যেসব সহায়-সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন তা ছিলো যথাক্রমে ৫টি উট, এক পাল ছাগল এবং একটি হাবশি দাসী-যার নাম ছিলো 'বরকতা ও উপনাম 'উম্মে আইমান'। এ উম্মে আয়মান-ই শিশুকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দুধ পান করিয়েছিলেন।

সৌভাগ্যময় জন্ম এবং নবুয়াত পূর্ব জীবনের চল্লিশ বছর

সৌভাগ্যময় জন্ম: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কার বিখ্যাত বনু হাশেম বংশে ৯ রবিউল আওয়াল (ফিলের বছর) সোমবার দিন রাতের মহাসন্ধিক্ষণে সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। ইংরেজি পঞ্জিকামতে তারিখটি ছিলো ৫৭১ ঈসায়ি সালের ২০ অথবা ২২ এপ্রিল। এ বছরটি ছিলো বাদশাহ নওশেরওয়ার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার চল্লিশতম বছর।

ইবনে সা'দ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যখন আমার জন্ম হয়েছিলো তখন আমার শরীর হতে এক জ্যোতি বের হয়েছিলো- যাতে শামদেশের অট্টালিকাসমূহ আলোকিত হয়েছিলো।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্মের সময় কতকগুলো ঘটনা নবুয়তের পূর্বাভাস হিসেবে প্রকাশিত হয়। যেমন কিসরার প্রাসাদের সৌধচূড়াগুলো ভেঙ্গে পড়ে, প্রাচীন পারসিক যাজকমন্ডলির উপাসনাগারগুলোতে যুগ যুগ ধরে প্রজ্জ্বলিত হয়ে আসা অগ্নিকুন্ডগুলো নির্বাপিত হয়ে যায়, বোহায়রা পাদ্রীগণের সরগরম গির্জাগুলো নিস্তেজ ও নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে এবং তাদের সুখ- সাচ্ছন্দ্য বিনষ্ট হয়ে যায় কা'বাঘরের ৩৬০ টি মূর্তি লুণ্ঠিত হয়ে পড়ে।

সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার পরই আমিনা আব্দুল মুত্তালিবের নিকট তাঁর পুত্রের জন্নগ্রহণের শুভ সংবাদটি প্রেরণ করেন। এ শুভ সংবাদ শোনা মাত্রই তিনি আনন্দ-উদ্বেল চিত্তে সূতিকাগারে প্রবেশ করে নবজাতককে কোলে তুলে নিয়ে কা'বাগৃহে উপস্থিত হন। অতঃপর অপূর্ব সুষমামন্ডিত এ শিশুর মুখমন্ডলে আনন্দ অশ্রুসজল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে থাকেন এবং তাঁর সার্বিক কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন। একান্ত আনন্দ-মধুর এ মুহূর্তেই তিনি এটাও স্থির করে ফেলেন যে, এ নবজাতকের নাম রাখা হবে 'মুহাম্মদ' (ﷺ)। আরববাশির নামের তালিকায় এটি ছিলো 'অভিনব' একটি নাম। অতঃপর আরবের প্রচলিত প্রথানুযায়ী সপ্তম দিনে তাঁর খাতনা করা হয়।

তাঁর মাতার পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে সর্বপ্রথম দুধ পান করিয়েছিলেন আবু লাহাবের দাসী 'সুওয়ায়বা'। সেই সময় সুওয়ায়বার কোলে যে সন্তান ছিলো তার নাম ছিলো 'মাসরুহ'। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পূর্বে সুওয়ায়বা হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিবকে এবং পরে আবু সালমা বিন আব্দুল আসাদ মাখযুমীকেও দুধ পান করিয়েছিলেন।

দুধ মা হালিমা (রা) এর তত্ত্বাবধানে শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর লালন-পালন

দুগ্ধপোষ্য শিশুদের লালন-পালনের ব্যাপারে তৎকালীন নগরবাসী আরবগণের মধ্যে একটি বিশেষ প্রথা প্রচলিত ছিলো, শহর-নগরের জনাকীর্ণ পরিবেশজনিত রোগ ব্যাধির কু-প্রভাব থেকে দূরে উন্নত গ্রামীণ পরিবেশে শিশুদের লালন-পালন করার মাধ্যমে যাতে বলিষ্ঠ দেহ এবং মজবুত গোশত পেশীর অধিকারী হয় এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখতে সক্ষম হয় সে উদ্দেশ্যে দুধপানের জন্য বেদুঈন পরিবারের ধাত্রীগণের নিকট শিশুদের সমর্পণ করা হতো। শহরের দূষিত পরিবেশ থেকে শিশুদের মুক্ত রাখার জন্যই আরব দেশে ধাত্রী প্রথা চালু ছিলো। আরবদের থেকেই হয়ত ধাত্রী প্রথা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গ্রহণ করেছিলো।

উক্ত প্রথানুযায়ী আব্দুল মুত্তালিব পরিবারের শিশু মুহাম্মদকে (ﷺ) দুধ পান করানোর উদ্দেশ্যে ধাত্রী অনুসন্ধান করেন এবং শেষ পর্যন্ত হালিমা বিনতে আবু যুবায়েবের নিকট তাঁকে সমর্পণ করেন। এ মহিলা বণু সা'দ বিন বকর গোত্রের একজন 'খাতুন' ছিলেন। তাঁর স্বামীর নাম 'হারিস' বিন আব্দুল উযযা এবং ডাক নাম ছিলো 'আবু কাবশাহ'। তিনিও বনু সা'দ গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন।

হালিমা ও হারিস দম্পতির কয়েকটি সন্তান ছিলো। তাঁরা রাসূল (ﷺ) এর দুধ সম্পর্কিত ভাই ও বোনের সম্মান লাভ করে। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে আব্দুল্লাহ, আনিসাহ, হোযাফা অথবা জোয়ামা। হোযাফা 'শায়মা' নামেই অধিকতর পরিচিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন। কথিত আছে, এই শায়মা-ই রাসূল (ﷺ) কে লালন-পালনের ব্যাপারে মাতা হালিমাকে সাহায্য করতেন। উপরন্তু তাঁর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবও হালিমার সূত্র ধরে দুধ-সম্পর্কিত ভাই ছিলেন।

রাসূল (ﷺ) এর চাচা হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিবকেও বনু সা'দ গোত্রের এক মহিলা দুধ পান করিয়েছিলেন। হালিমার গৃহে থাকা অবস্থায় উক্ত মহিলাও একদিন রাসূল কে দুধ পান করিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষিতে রাসূল এবং হামযা (রা) দু'জনে 'দুধভাই' সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যান- প্রথম সূত্রে সুওয়ায়বার সম্পর্কের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয় সূত্রে বনু সা'দ গোত্রের সে মহিলার মাধ্যমে।

দুধপানকালে হালিমা রাসূল (ﷺ) এর অলৌকিক ও বরকতময় গুণের অনেক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে আশ্চর্য ও হতবাক হয়ে যান। হালিমার বর্ণনা সূত্রে ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক বলেছেন-হালিমা এবং তাঁর স্বামী তাঁদের একটি দুগ্ধপোষ্য সন্তানসহ বনু সা'দ গোত্রের একদল মহিলার সাথে অর্থের বিনিময়ে দুধপান করাবে এমন শিশুর সন্ধানে মক্কায় যান। সে সময় আরবভূমিতে দুর্ভিক্ষজনিত কারণে প্রচুর খাদ্য ও অর্থ সংকট বিরাজমান ছিলো।

হালিমা বলেন: 'আমি আমার একটি সাদা মাদী গাধার পিঠে সওয়ার হয়ে পথ চলছিলাম। আমার সাথে উষ্ট্রীও ছিলো। কিন্তু আল্লাহর কি মহিমা যে, উষ্ট্রীর ওলান থেকে একবিন্দুও দুধ বের হচ্ছিল না। আমার বুকেও শিশুটির জন্য একবিন্দু দুধ ছিলো না। এদিকে ক্ষুধার তাড়নায় শিশুটি এতই ছটফট করছিলো যে, সারাটি রাত আমরা ঘুমাতে পারিনি। এমতাবস্থায় আমরা বৃষ্টি ও সচ্ছলতার আশা-ভরসা গুণছিলাম। কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি না হওয়ায় অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে পুনরায় আমরা পথ চলা শুরু করলাম। আমি আমার মাদি গাধাটির ওপর সওয়ার হয়ে পথ চলতে থাকলাম। গাধাটি ছিলো খুবই দুর্বল। তার দুর্বলতা এবং শক্তিহীনতার কারণে সে এতই ধীরে ধীরে চলতে থাকলো যে, এতে কাফেলার অন্যেরা অত্যন্ত বিরক্ত এবং বিব্রতবোধ করতে থাকলো। যা-ই হোক, এমনই এ অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা মক্কায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। অতঃপর আমাদের দলে এমন কোনো মহিলা ছিলো না-যার নিকট শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে দুধ পান করানোর প্রস্তাব দেয়া হয়নি। কিন্তু যখনই তারা জানতে পারলো যে, শিশুটি পিতৃহীন এতিম তখনই তারা তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। কারণ, দুধপানের জন্য দুগ্ধপোষ্যের পিতার নিকট থেকে আশানুরূপ মূল্য লাভের প্রত্যাশা সকলেরই ছিলো। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোনো সম্ভাবনাই নেই। মা বিধবা, দাদা বৃদ্ধ, এ শিশুকে লালন- পালন করে তার বিনিময়ে কীইবা পাওয়ার আশা করা যেতে পারে! সুতরাং এসব সাত-পাঁচ ভেবেচিন্তে দলের কেউই তাঁকে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো না।

হালিমা আরও বলেন: 'এদিকে দলের অন্যান্য মহিলা যারা আমার সাথে গিয়েছিলো তারা সকলেই একটি করে শিশু সংগ্রহ করে নিলো। অবশিষ্ট রইলাম শুধু আমি। আমার পক্ষে কোনো শিশু সংগ্রহ করা সম্ভব হলো না। ফিরে আসার সময় যতই ঘনিয়ে আসতে লাগলো আমার মনটা ততই যেন ভারাক্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে উঠতে লাগলো। অবশেষে আমি আমার স্বামীকে বললাম, আমার সাথি বা সকলেই দুধপানের জন্য শিশু নিয়ে ফিরছে আর আমাকে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে বরং আমি সে এতিম ছেলেটিকে নিয়ে যাই, এতে যা করেন আল্লাহ।

স্বামী বললেন: 'আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো অসুবিধা নেই তুমি গিয়ে তাকেই নিয়ে এসো। এমনটিও হতে পারে যে, আল্লাহ এর মধ্যেই আমাদের জন্য কোনো বরকত নিহিত রেখেছেন।' হালিমা বলেন: 'এমনি এক অবস্থা এবং এমন- মানসিকতার প্রেক্ষাপটে শিশু মুহাম্মদ (ﷺ) কে দুধপানের জন্য আমি গ্রহণ করলাম।'

অতঃপর হালিমা আরো বলেন: 'যখন আমি শিশু মুহাম্মদ (ﷺ) কে নিয়ে মক্কায় আমাদের অস্থায়ী বাসগৃহে ফিরে এলাম এবং তাঁকে আমার কোলে নিলাম তখন তিনি তাঁর দু'সিনা আমার বুকের সাথে মিলিত করে পূর্ণ পরিতৃপ্তি নিয়ে দুধ পান করলেন। তাঁর দুধভাই অর্থাৎ আমার গর্ভজাত সন্তানটিও পূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধ পান করলো। এরপর দু'জনেই ঘুমিয়ে পড়লো। অন্যদিকে আমার স্বামী উষ্ট্রী দোহন করতে গিয়ে দেখেন, তার ওলান দুধে পরিপূর্ণ রয়েছে। তিনি এতো বেশি পরিমাণে দুধ দোহন করলেন যে, আমরা উভয়েই তৃপ্তির সাথে পেট পুরে তা পান করলাম এবং শান্তিতে রাত্রীযাপন করলাম। পূর্ণ পরিতৃপ্তির সাথে। রাত্রীযাপন শেষে যখন সকাল হলো তখন আমার স্বামী বললেন, হালিমা, আল্লাহর শপথ! তুমি এক সৌভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছো। উত্তরে বললাম, ভাব-সাব এবং অবস্থাদৃষ্টে আমারও যেন তাই মনে হচ্ছে।

হালিমা বলেন: এরপর আমাদের দল মক্কা থেকে নিজ নিজ গৃহে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। শিশু মুহাম্মদ (ﷺ) কে বুকে নিয়ে আমার সে দুর্বল এবং নিস্তেজ মাদি গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আমিও তাদের সাথে যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমার সেই দুর্বল গাধাই সকলকে পেছনে ফেলে দ্রুতবেগে সকলের অগ্রভাগে এগিয়ে যেতে থাকলো। অন্য কোনো গাধা-ই তার সাথে তাল মিলিয়ে পথ চলতে পারলো না। এমনকি অন্যান্য সঙ্গিনীরা বলতে লাগলো, ও আবু যুয়ারের কন্যা ব্যাপারটি কি হলো বলো তো! আমাদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করো। এটা কি সে গাধাটা নয়-যার ওপর সওয়ার হয়ে তুমি এসেছিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এটা সে গাধাই যেটার ওপর সওয়ার হয়ে মক্কায় এসেছিলাম।

তারা বললো, নিশ্চয় এর মধ্যে বিশেষ রহস্যজনক কোনো ঘটনা ঘটেছে। এমনি এক রহস্যাবৃত অবস্থার মধ্য দিয়ে অবশেষে আমরা বনু সা'দ গোত্র নিজ বাসস্থানে এসে উপস্থিত হলাম। ইতোপূর্বে এ ব্যাপারটি আমার জানা ছিলো না যে, আল্লাহর এ জমিনে আমাদের অঞ্চলের মানুষের চেয়ে অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ অধিকতর অভাবগ্রস্ত থাকতে পারে। কিন্তু আনুষঙ্গিক বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমার সে ভুলটি ভেঙ্গে গেলো।

মক্কা থেকে আমাদের ফিরে আসার পরবর্তী সময়ে আমাদের বকরিগুলো চারণভূমি থেকে ঘাস খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে বাড়িতে ফিরে আসতো। দুগ্ধবতী বকরিগুলো দোহন করে আমরা পরিতৃপ্তি সহকারে দুধ পান করতাম। অথচ অন্য লোকেরা এক ফোঁটা দুধও পেতো না। তাদের পশুগুলোর ওলানে কোনো দুধই থাকতো না। এমনি অবস্থার প্রেক্ষিতে অন্য পশুপালের মালিকেরা তাদের রাখালদের বলতেন 'হতভাগারা! যুওয়ায়েবের কন্যার রাখাল পশুপাল নিয়ে যেখানে যায় তোমরা কি তোমাদের পশুপাল নিয়ে সে চারণভূমিতে যেতে পারো না?'

ফলে আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেতো অন্যান্য রাখালরাও সে ভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেতো। কিন্তু এত সত্ত্বেও তাদের পশুগুলো ঘাসের অভাবে ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত অবস্তায় গৃহে ফিরে আসতো। সেসব পশুর ওলানে দুধও থাকতো না। অথচ আমাদের বকরিগুলো ঘাস খেয়ে পরিতৃপ্ত এবং ওলানে পূর্ণমাত্রায় দুধ সহকারে গৃহে প্রত্যাবর্তন করতো। আমরা প্রত্যেকটি কাজ-কর্মে আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভ করতে থাকলাম।

এভাবে সে ছেলের পুরো দুটো বছর অতিবাহিত হয়ে গেলো এবং আমি তার স্তন পান বন্ধ করে দিলাম। অন্যান্য শিশুদের তুলনায় এ শিশুটি এমন সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে থাকলো যে, দু' বছর পুরো হতে না হতেই তার দেহ বেশ শক্ত ও সুঠাম হয়ে গড়ে উঠলো। বিধান মোতাবেক তাঁর লালন-পালনের মেয়াদ দু' বছর পূর্ণ হওয়ায় আমরা তাঁকে তাঁর মায়ের নিকট ফেরত দিতে নিয়ে গেলাম। কিন্তু তাঁকে নিয়ে আসার পর থেকে আমাদের সংসার জীবনে সচ্ছলতা ও বরকতের যে সুফল আমরা ভোগ করে আসছিলাম তাতে আমরা মনের কোনে গোপন একটি আশা পেষাণ করে আসছিলাম যে, তিনি যেন আরো কিছু কাল আমাদের নিকট থাকেন।

তাঁর মাতার নিকট আমাদের গোপন ইচ্ছা ব্যক্ত করে বললাম যে, তাঁকে আরো কিছু সময় আমাদের সাথে থাকতে দিন-যাতে সে সুস্বাস্থ্য ও সুঠাম দেহের অধিকারী হয়ে ওঠে। উপরন্ত মক্কায় মহামারীর প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে আমরা কিছুটা ভয় করছি। আমাদের বারংবার অনুরোধ ও আন্তরিকতায় আশ্বস্ত হয়ে তিনি শিশু মুহাম্মদ (ﷺ) কে পুনরায় আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দান করলেন।

বক্ষবিদারণ

এভাবে দুধপানের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) বনু সা'দ গোত্রে অবস্থান করতে থাকলেন। দ্বিতীয় দফায় বনু সা'দ গোত্রে অবস্থানকালে জন্মের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বছরে তাঁর বক্ষবিদারণ বা সিনাচাকের ঘটনাটি ঘটে। আনাস (রা) হতে সহিহ মুসলিমে ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। ব্যাপারটি হচ্ছে, একদা শিশু নবী শু যখন সঙ্গী সাথিদের সাথে খেলাধুলা করছিলেন এমন সময় জিবরাঈল (আ) সেখানে এসে উপস্থিত হন। অতঃপর তাঁকে একটু দূরে নিয়ে চিৎ-করে শুইয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে হৃৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। অতঃপর তার মধ্য থেকে কিছুটা জমাটবাঁধা রক্ত বের করে নিয়ে বললেন- শয়তানের অংশ যা তোমার মধ্যে ছিলো তা হচ্ছে এই।

তারপর হৃৎপিন্ডটিকে সোনার পাত্রে রেখে যমযমের পানি দ্বারা তা ধৌত করলেন এবং পুনরায় তা যথাস্থানে সন্নিবেশিত করে কাটা অংশে জোড়া লাগিয়ে দিলেন। এ সময় তাঁর খেলার সঙ্গী দৌড়ে গিয়ে ধাত্রীমাতা হালিমাকে বললো, মুহাম্মদ (ﷺ) নিহত হয়েছে।

হালিমা এবং তাঁর স্বামী এ কথা শুনে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও অস্থির হয়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়ে মুহাম্মদ (ﷺ) এর মুখমন্ডলে মালিন্য এবং পেরেশানীর ভাব লক্ষ করলেন। এ অবস্থার মধ্যে তাঁরা তাঁকে গৃহে এনে তাঁর সেবা-যত্ন করতে লাগলেন।

ফিরে এলেন শিশু নবী স্নেহময়ী মায়ের কোলে

শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর বক্ষবিদারণের ঘটনায় ধাত্রীমাতা হালিমা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাঁকে তাঁর মায়ের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছয় বছর বয়স পর্যন্ত ধাত্রীগৃহে লালিত-পালিত হন।

ধাত্রীগৃহ থেকে প্রাণের টুকরো নয়নমণি সন্তানকে ফেরত পাওয়ার পর আমিনা, ইয়াসরিব (মদিনার পূর্ব নাম) গিয়ে তাঁর স্বামীর কবর যিয়ারত করার মনস্থ করেন। অতঃপর শ্বশুর আব্দুল মুত্তালিবের ব্যবস্থাপনায় শিশুপুত্র মুহাম্মদ (ﷺ) এবং পরিচালিকা উম্মে আইমানকে সাথে নিয়ে মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী পাঁচশত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মদিনায় পৌছেন। সেখানে এক মাস অবস্থানের পর মক্কায় ফিরে আসার উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে যাত্রা শুরু করেন। সামনে মক্কা অনেক দূরের পথ, পেছনে মদিনা স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত। পথচলার এমনি একপর্যায়ে আমিনা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ধীরে ধীরে তাঁর রোগ বৃদ্ধি পেতে লাগালো। অবশেষে তিনি এতিম ও শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এবং আত্মীয়-স্বজনকে রেখে 'আবওয়া' নামক স্থানে মারা যান।

বৃদ্ধ পিতামহের স্নেহের আশ্রয়ে বিশ্বনবী

শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর পিতার ইন্তেকালের পর রইলেন স্নেহময়ী মাতা, মাতার ইন্তেকালের পর রইলেন বৃদ্ধ পিতামহ। মাতার মৃত্যুর পর শোকাভিভূত পিতামহ নিয়ে এলেন পিতৃমাতৃহীন পৌত্রকে নবুয়ত ও রিসালতের লীলাভূমি পবিত্র মক্কানগরীতে। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহর মৃত্যুতে আব্দুল মুত্তালিব যতটা ব্যাথা অনুভব করলেন তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথা অনুভব করলেন পুত্রবধূ আমিনার মৃত্যুতে। কারণ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর শিশু মুহাম্মদ (ﷺ) এর অবলম্বন ছিলেন মাতা আমিনা। কিন্তু মাতার মৃত্যুর পর তাঁর যে আর কোনো সহায়-ই রইলো না। সেহেতু দুঃখ তাঁর শতগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলো। অন্যদিকে এতিম শিশুটির জন্য তাঁর স্নেহ ভালোবাসাও শতধারায় বর্ষিত হতে লাগলো। মনে হতো যেন ঔরসজাত সন্তানের চেয়েও অধিক মাত্রায় তিনি তাঁকে স্নেহ করতে লাগলেন।

অবশ্য এটাও সত্যি যে, পুত্রবধূ আমিনার মৃত্যুর পূর্বেও তিনি এ শিশুটিকে প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, এ শিশুটিকে তিনি সম্মানের দৃষ্টিতেও দেখতেন ইবনে হিশামের বর্ণনা মতে, কা'বাঘরের ছায়ায় আব্দুল মুত্তালিবের জন্য বিশেষ একটি আসন বিছানো থাকতো। আব্দুল মুত্তালিব উক্ত আসনে বসতেন এবং তাঁর সন্তানগণ বসতেন সে আসনের পার্শ্ববর্তী স্থানে। পিতার সম্মানার্থে তাঁর কোনো সন্তান উক্ত আসনে বসতেন না। কিন্তু শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) সেখানে আগমন করলে সে আসনেই বসতেন।

উক্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর চাচাগণ তাঁর হাত ধরে সে আসন থেকে নামিয়ে দিতেন। কিন্তু আব্দুল মুত্তালিবের উপস্থিতিতে শিশু নবী কে সে আসন থেকে কেউ নামাতে চাইলে তিনি বলতেন- 'একে তোমরা এ আসন থেকে নামানোর চেষ্টা করো না, ওকে ছেড়ে দাও। কারণ এ শিশুকে সাধারণ শিশু বলে মনে হয় না। এ হচ্ছে বিশিষ্ট এক শিশু, এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ এক ব্যক্তিত্বময় সত্তা। অদ্ভুত রকম বেশি রয়েছে এর সব কিছুতে। অতঃপর তাঁকে নিজের কাছেই বসিয়ে নিতেন সে আসনে, তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর-সোহাগ করতেন এবং তার হাবভাব ও কাজ-কর্ম দেখে আনন্দ প্রকাশ করতেন।

মুহাম্মদ (ﷺ) এর বয়স যখন আট বছর দুই মাস দশ দিন তখন পিতামহ আব্দুল মুত্তালিবও ইন্তেকাল করলেন। এভাবে মৃত্যু পিতামহের স্নেহ সুশীতল বক্ষ থেকে শিশু নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে দূরে সরিয়ে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে। বালক নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এখন ভাবতে শিখেছেন মৃত পিতার কথা, ভাবতে শিখেছেন স্নেহ-মমতার মূর্ত প্রতীক মৃত মাতার কথা। অবর্ণনীয় শোক-তাপ ও দুঃখ-বেদনার সাথে আবারও তাঁকে ভাবতে হলো মৃত পিতামহের কথা।

নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এ দুঃখ-শোকের মুহূর্তে দুঃখ-বেদনার বোঝা লাঘব করতে এগিয়ে এলেন চাচা আবু তালিব। তিনি হৃষ্টচিত্তে আপন কাঁধে তুলে নিলেন বালক মুহাম্মদ (ﷺ) এর লালন-পালন ও পরিচালনের সকল দায়-দায়িত্ব। বৃদ্ধ আব্দুল মুত্তালিব মৃত্যুর পূর্বক্ষণে আবু তালিবকে সে উপদেশই দিয়ে গিয়েছিলেন।

স্নেহশীল চাচার তত্ত্বাবধানে বালক নবী মুহাম্মদ (ﷺ)

পিতার অন্তিম উপদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আবু তালিব অত্যন্ত যত্ম সহকারে ভ্রাতুষ্পুত্র ও ভবিষ্যতের নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে লালন-পালন করতে থাকেন। আবু তালিব তাঁকে যে আপন সন্তানাদির অন্যতম হিসেবে লালন-পালন করতেন তাই নয়; রবং সন্তানাধিক স্নেহ-মমতা দিয়েই তাঁকে প্রতিপালন করতে থাকেন। উপরন্ত পিতা আব্দুল মুত্তালিবের মতোই তিনি ও তাঁকে নানাভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে থাকেন। অনাগত যামানার নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এবং বিশ্ববাসীর মুক্তির দিশারী এভাবে আত্মীয়-পরিজনদের কাছে থেকে শৈশব, বাল্য কিংবা কৈশোরেই যে মান-সম্মান লাভ করতে থাকবেন সে ব্যাপারে সন্দেহর কোনো অবকাশই নেই তা সহজেই ধরে নেয়া যায়। রাসূল (ﷺ) এর ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত এভাবে তিনি চাচার অধীনে পরিচালিত হতে থাকেন। পিতৃব্যের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ঘটনাবলি প্রসঙ্গক্রমে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা হবে।

চেহারা মুবারক হতে রহমতের ধারা বর্ষণ

'জালহামা বিন আরাফাহ' থেকে ইবনে আসাকির বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি একবার মক্কায় আগমন করলাম। দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ তখন অত্যন্ত নাজেহাল এবং আরবের লোকজন দুর্ভিক্ষ জনিত চরম আকালের সম্মুখীন হয়েছে। চলুন সকলে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর দরবারে দু'আ করি।

এ কথা শ্রবণের পর আবু তালিব বালক নবী মুহাম্মদ (ﷺ) কে সাথে নিয়ে বের হলেন। ওই বালককে আকাশে মেঘাচ্ছন্ন এমন এক সূর্য বলে মনে হচ্ছিলো যা থেকে ঘন মেঘমালা যেন এক্ষুণি আলাদা হয়ে গেল। সেই বালকের আশপাশে আরো অন্যান্য বালকও ছিলো, কিন্তু এ বালকটির মুখমন্ডল থেকে নূর যেন ছিটকে পড়ছিলো।

আবু তালিব সে বালককে হাত ধরে কা'বা ঘরের নিকট নিয়ে গেলেন এবং কা'বার দেয়ালের সাথে তাঁর পিঠ লাগিয়ে তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বালক চাচার হাতের আঙ্গুল ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সে সময় আকাশে এক টুকরো মেঘও ছিলো না। অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে গিয়ে আঁধার ঘনিয়ে এলো এবং মুষলধারায় বৃষ্টিপাত শুরু হলো। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এত বেশি হলো যে, উপত্যকায় প্লাবনের সৃষ্টি হয়ে গেলো এবং এর ফলে শহর ও মরু অঞ্চল পুনরায় সতেজ-সজীব হয়ে উঠলো।

উক্ত ঘটনার ফলে আবু তালিব মুহাম্মদ (ﷺ) এর যে প্রশংসা গীতি গেয়েছিলেন তা হচ্ছে এরূপ- 'তিনি অত্যন্ত নিষ্কলুষ। তাঁর চেহারা মুবারকের দোহাই দিয়ে। তিনি এতিমদের আশ্রয়স্থল এবং স্বামী হারাদের রক্ষক।'

চোখ এড়ায়নি খ্রিস্টান পাদ্রী বুহায়রা রাহেবের

কথিত আছে যে, (যার বর্ণনা সূত্র কিছুটা সন্দেহযুক্ত) মুহাম্মদ (ﷺ) এর বয়স যখন ১২ বছর অন্য এক বর্ণনায় ১২ বছর ২ মাস ১০ দিন, সে সময়ে ব্যবসা উপলক্ষে চাচা আবু তালিবের সাথে তিনি শামদেশে (সিরিয়ায়) গমন করেন এবং সফরের এক পর্যায়ে বসরায় গিয়ে উপস্থিত হন। বসরা ছিলো শামরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি স্থান এবং হুরানের কেন্দ্রীয় শহর। সে সময় তা আরব উপদ্বীপের রোমীয়গণের আয়ত্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী ছিলো।

উক্ত শহরে 'জাজিস' নামক একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজক (রাহেব) বসবাস করতেন। তার উপাধি ছিলো 'বুহায়রা' এবং এ উপাধিতেই সকলের নিকট পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ ছিলেন। মক্কার ব্যবসায়ী দল যখন বসরায় শিবির স্থাপন করেন তখন রাহেব গির্জা থেকে বেরিয়ে তাদের নিকট আগমন করেন এবং তাদেরকে আপ্যায়ন করান।

অথচ এর পূর্বে কখনো তিনি এভাবে গির্জা থেকে বেরিয়ে কোনো বাণিজ্য কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ করেননি। তিনি কিশোর নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর চেহারা-সুরত, আচার-আচরণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে বুঝতে পারেন যে, ইনিই হচ্ছেন বিশ্বামানবের মুক্তির দিশারী শেষ নবী মুহাম্মদ (ﷺ)। অতঃপর কিশোর নবী (ﷺ) এর হাত ধরে তিনি বললেন- 'ইনি হচ্ছেন বিশ্বজগতের তামাম জাহানের সরদার। আল্লাহ তাঁকে বিশ্বজগতের রহমতরূপী সর্বশেষ রাসূল মনোনীত করবেন।'

বুহায়রা বললেন- গিরিপথে ঐ প্রান্ত থেকে তোমাদের আগমন যখন ধীরে ধীরে দৃষ্টিগোচর হয়ে আসছিলো আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে, সেখানে এমন কোনো বৃক্ষ কিংবা পাথর ছিলো না- যা তাকে সিজদা করে নি। এসব জিনিস নবী-রাসূল ছাড়া সৃষ্টিকুলের মধ্যে অন্য কাউকে কখনোই সিজদা করে না। উপরন্তু মোহরে নবুয়ত দেখেও আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি। তাঁর কাঁধের নিচের হাড়ের পাশে 'সেব' ফলের আকৃতিবিশিষ্ট একটি দাগ রয়েছে। সেটাই হচ্ছে মোহরে নবুয়ত। আমাদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেল সূত্রে আমি অবগত হতে পেরেছি।

এরপর বুহায়রা আবু তালিবকে বললেন: 'এঁকে সাথে নিয়ে আর বিদেশ ভ্রমণ করবেন না। শীঘ্রই এঁকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যান। কারণ এঁর পরিচয় জানতে পারলে ইহুদিরা এঁকে হত্যা করে ফেলতে পারে।' এ কথা শুনার পর আবু তালিব যথাশীঘ্র তাঁকে মক্কা ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

ফুজ্জার যুদ্ধে কেঁদে ওঠল কিশোর নবী (ﷺ) এর হৃদয়

মুহাম্মদ (ﷺ) এর বয়স যখন ১৫ বছর তখন 'ফুজ্জার যুদ্ধ' সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের একপক্ষে ছিলো কুরাইশগণ এবং তাদের মিত্র বনু কেনানা। বিপক্ষে ছিলো কায়েস আয়ালান। কুরাইশ কেনানা মিত্রপক্ষের সেনাপতি ছিলো 'হারব বিন উমাইয়া' কারণ নিজ প্রতিভা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তির ফলে সে কুরাইশ ও কেনানা গোত্রের মধ্যে নিজেকে মান-মর্যাদার উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো। এ যুদ্ধকালে প্রথম দিকে কেনানাদের ওপর কায়েসদের সমর্থন ছিলো বেশি, কিন্তু পরবর্তীতে কেনানাদেরই সমর্থন হয়ে যায় বেশি। এ যুদ্ধকে 'ফুজ্জার যুদ্ধ' এজন্যই বলা হয় যে, এতে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ এবং পবিত্র মাসের পবিত্রতা উভয়ই লঙ্ঘন করা হয়। কিশোর বয়সে রাসূল (ﷺ) এ যুদ্ধের পরিস্থিতি চাচা আবু তালিবের সাথে থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এ যুদ্ধে তিনি তীরের আঘাত থেকে তাঁর চাচাদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

'হিলফ উল ফুজুল' গঠন বা ন্যায়নিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ

ফুজ্জার যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও সদিচ্ছাপরায়ণ আরবাসীগণকে দারুণভাবে বিচলিত করে তোলে। এ যুদ্ধে যে প্রাণহানি ঘটে, কত শিশু এতিম হয়, কত নারী বিধবা হয়, কত মা সন্তানহারা হয় এবং কত সম্পদ ধ্বংস হয় তার পরিমাপ করা মুশকিল। ভবিষ্যতে আরববাসীকে যাতে এমন অর্থহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয় তার জন্য আরবের বিশিষ্ট গোত্রপতিগণ আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ান তাইমী'র গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর নামে একটি 'অঙ্গীকারনামা' সম্পাদন করে।

আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ান ছিলো তৎকালীন মক্কার একজন অত্যন্ত ধনাট্য ব্যক্তি। উপরন্তু সততা, দানশীলতা এবং অথিতিপরায়ণতার জন্য সমস্ত আরব ভূ-খণ্ডে তার প্রচার প্রসিদ্ধি থাকার কারণে আরববাসীগণের ওপর তার যথেষ্ট প্রভাবও ছিলো। উক্ত প্রেক্ষিতেই তার বাসভবনে অঙ্গীকার গ্রহণ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়।

যেসব গোত্র আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে তার মধ্যে প্রধান গোত্রগুলো হচ্ছে যথাক্রমে বনু হাশেম, বনু মুত্তালিব, বনু আসাদ বিন আব্দুল উযযা, বনু যোহরা বিন কিলাব এবং বনু তামীম বিন মুররাহ। বৈঠকে একত্রিত হয়ে সকলে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার এবং অর্থহীন যুদ্ধবিগ্রহের প্রতিকার সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করে।

এর পূর্বে নিয়ম ছিলো গোত্রীয় কিংবা বংশীয় কোনো ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য করতেই হবে তা সে যত বড়ো বা কঠিন অন্যায় করুক না কেনো। আলোচ্য পরামর্শ সভায় এটা স্থিরীকৃত হয় যে, এ জাতীয় নীতি হচ্ছে ভয়ঙ্কর অন্যায়, অমানবিক ও অবমাননাকর। সুতরাং এ ধরনের জঘন্য নীতি আর কিছুতেই চলতে দেয়া যেতে পারে না। তারা সবাই এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করলেন-

ক. দেশের অশান্তি দূর করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।
খ. বিদেশি লোকদের ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান রক্ষা করার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।
গ. দরিদ্র, দুর্বল ও অসহায় লোকদের সহায়তাদানে আমরা কখনোই কুণ্ঠাবোধ করবো না।
ঘ. অত্যাচারী ও অনাচারীর অন্যায়-অত্যাচার থেকে দুর্বল দেশবাসীদের রক্ষা করতে প্রাণপণ চেষ্টা করবো।

রাসূল এবং তাঁর চাচা যুবায়ের বিন আব্দুল মুত্তালিব উক্ত আলোচনা সভায় যোগদান করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে যুবক নবী-ই ছিলেন সে কল্যণমুখী চিন্তা-ভাবনার উদ্ভাবক এবং চাচা যুবায়ের ছিলেন প্রথম সমর্থক। তাঁদের উভয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই ধীরে ধীরে সমর্থনকারী লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ানের বিভিন্ন গোত্রপতিদের উপস্থিতি ও সম্মতিসাপেক্ষে 'অঙ্গীকারনামা' সম্পাদিত হয় এবং তার ভিত্তিতে একটি 'সেবাসংঘ' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিলো অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারনামা। এজন্য এ সেবাসংঘের নাম দেয়া হয়েছিলো 'কল্যাণের শপথ' বা 'হিলফ উল ফুজুল'।

উক্ত অঙ্গীকারনামার ফলশ্রুতিতে আরববাসীদের চিন্তা-চেতনার মধ্যে একটি ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে এবং প্রথমাবস্থায় খুব ভালোভাবে কর্মতৎপরতা চলতে থাকে। কিন্তু রাসূল নবুয়ত লাভের পর কুরাইশদের মধ্যে কিছুটা বিরূপ ভাব সৃষ্টি হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত এর কার্যকারিতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। অবশ্য রাসূল (ﷺ) নিজে এ অঙ্গীকারনামার কথা কখনোই বিস্মৃত হননি। বদরযুদ্ধে বন্দীগণের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের সময় তিনি এ প্রতিজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছিলেন। একদা এ প্রসঙ্গে কথা উল্লেখকালে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন -আজও যদি কোনো উৎপীড়িত ব্যক্তি বলে, হে 'হিলফ উল ফুজুল' অঙ্গীকারনামার ব্যক্তিবৃন্দ! আমি নিশ্চয় তার সে আহ্বানে সাড়া দিবো। কারণ ইসলাম তো এসেছে ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে, উৎপীড়িত ও অত্যাচারিতকে সাহায্য করতে।

উপরন্তু এ ব্যাপারে অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন- 'আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ানের বাসভবনে আমি এমন এক অঙ্গীকারনামায় শরীক ছিলাম- যার বিনিময়ে আমি আসন্ন প্রসবা উষ্ট্রীও পছন্দ করি না এবং যদি ইসলামের যুগে এরূপ অঙ্গীকারের জন্য আমাকে আহ্বান জানানো হয় তাহলেও আমি উপস্থিত আছি বলতাম।

'হিলফ উল ফুজুল' প্রতিষ্ঠান অন্য একটি প্রাসঙ্গিক প্রত্যক্ষ পটভূমিকার কথাও জানা যায়, সেটি যোবায়ের নামক একজন লোক বাইরে থেকে মালপত্র ক্রয় করে, কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ না করে তা আটকে রাখে। এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য সে লোক আব্দুদ্দারদ, মাখযুম, জামহ, সাহাম এবং আদী এই সকল গোত্রের নিকট আবেদন জানান। কিন্তু তার আবেদনের প্রতি কেউই গুরুত্ব না দেয়ায় তিনি জাবালে আবু কুবাইস পর্বতের চূড়ায় উঠে উচ্চকণ্ঠে কতকগুলো কবিতা আবৃত্তি করেন- যার মধ্যে তার নিজের যুলুমের শিকার হওয়ার বিষয়টিও বর্ণিত ছিলো। কবিতা আবৃত্তি শুনতে পেয়ে যুবায়ের বিন আব্দুল মুত্তালিব দৌড়ে গিয়ে বলেন, 'এ লোকটি অসহায় এবং সহায় সম্বলহীন কেনো?' তারই অর্থাৎ যুবায়েরের প্রচেষ্টায় উপরোল্লাখিত গোত্রগুলো একত্রিত হয়ে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে এবং পরে আস বিন ওয়ায়েলের নিকট থেকে যুবায়েরের পাওনা আদায় করে দেয়া হয়।

দুঃখময় জীবন যাপন

আখেরী নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর বাল্য, কৈশোর এবং প্রথম যৌবনে পেশাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ-কর্মের কথা পাওয়া যায় না। তবে নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, তিনি সা'দ গোত্রে ধাত্রীগৃহে থাকাকালে অন্যান্য বালকদের সাথে ছাগল চরানোর উদ্দেশ্যে মাঠে গমন করতেন। মক্কাতেও কয়েক কীরাত অর্থের বিনিময়ে তিনি ছাগল চরাতেন।

উপরন্তু কৈশোরে চাচা আবু তালিবের সাথে বাণিজ্য উপলক্ষে তিনি সিরিয়া গমন করেছিলেন। অতঃপর যখন তিনি ২৫ বছর বয়সে পদার্পণ করেন তখন খাদিজা (রা) এর বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামদেশে গমন করেন। ইবনে ইসহাক এর বর্ণনা মতে, খাদিজা (রা) বিনতে খুয়ালিদ এক সভ্রান্ত সম্পদশালী ও ব্যবসায়ী মহিলা ছিলেন। ব্যবসায়ের অংশীদারিত্ব এবং প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে তিনি ব্যবসায়ীগণের নিকট অর্থলগ্নী করতেন। পুরো কুরাইশ গোত্রই জীবন-জীবিকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকতেন।

মুহাম্মদ (ﷺ) এর সত্যবাদিতা, উত্তম চরিত্র, সদাচার এবং আমানতদারী সম্পর্কে জানতে পেরে খাদিজা (রা) তাঁর নিকট এক প্রস্তাব পেশ করলেন যে, তিনি তাঁর অর্থ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তাঁর দাস মায়সারার সাথে শামদেশে গমন করতে পারেন। তিনি আরো নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, অন্যান্য ব্যবসায়ীগণকে যে হারে লভ্যাংশ বা মুনাফা প্রদান করা হয় তাঁকে তার চেয়ে অধিক হারে মুনাফা প্রদান করা হবে। মুহাম্মদ (ﷺ) এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং তাঁর অর্থ-সম্পদ নিয়ে দাস মায়সারার সাথে শামদেশে গমন করলেন।

খাদিজা (রা) এর সাথে বিয়ে

সিরিয়া থেকে যুবক নবী মক্কায় ফিরে আসার পর ব্যবসায় লাভ- লোকসানের হিসাব করা হলো। হিসাব-নিকাশ করে খাদিজা (রা) মূলধনসহ এত বেশি পরিমাণ অর্থ পেলেন যে, এর আগে তিনি কোনোদিনই তা পাননি। এতে খাদিজা (রা) এর অন্তর খুশিতে ভরে ওঠে। উপরন্তু তাঁর দাস মায়সারার কথাবার্তা থেকে মুহাম্মদ (ﷺ) এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, উন্নত মন-মানসিকতা, আমানতরক্ষায় আন্তরিকতা ইত্যাদি বিষয় অবগত হওয়ার পর তাঁর প্রতি খাদিজা (রা) এর শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকে এবং তাঁকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার একটি গোপন বাসনা মনের কোণে দানা বেঁধে উঠতে থাকে। এর পূর্বে বড়ো বড়ো সরদার, নেতা ও গোত্র প্রধানগণ অনেকেই তাঁর নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু তিনি কোনোটিই মঞ্জুর করেননি। অথচ মুহাম্মদ (ﷺ)কে স্বামীরূপে পাওয়ার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি নিজ অন্তরের গোপন ইচ্ছা তাঁর বান্ধবী 'নাফীসা বিনতে মুনব্বিহ'র নিকট বললেন এবং বিষয়টি নিয়ে মুহাম্মদ (ﷺ) এর সাথে আলোচনা করার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানালেন। অনুরোধ রক্ষার্থে নাফীসা খাদিজা (রা) এর প্রস্তাব সম্পর্কে মুহাম্মদ (ﷺ) কে অবহিত করলেন।

মুহাম্মদ (ﷺ) উক্ত প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করে বিষয়টি নিয়ে চাচা আবু তালিবের সাথে আলোচনা করলেন। আবু তালিব এ ব্যাপারে খাদিজা (রা) এর অভিভাবক চাচার সাথে আলোচনার পর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং এক শুভক্ষণে বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত দুটি প্রাণ বিশ্বমানবের জন্য অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য পবিত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান। বিয়ের অনুষ্ঠানে বনু হাশেম ও মুযারের গোত্র প্রধানগণ উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে জৌলুশ বৃদ্ধি করেন।

মুহাম্মদ (ﷺ) আর এর সাথে বিবাহের সময় খাদিজা (রা) এর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। বংশ-মর্যাদা, সহায়-সম্পদ বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমাজের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। তিনি ছিলেন উত্তম চরিত্রের এক অনুপমা মহিলা এবং রাসূল (ﷺ) এর প্রথম সহধর্মিনী। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর কোনো বিয়ে করেননি।

রাসূল (ﷺ) এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহিম (রা) ব্যতীত অন্যান্য সকলেই ছিলেন খাদিজা (রা) এর গর্ভজাত সন্তান। নবী দম্পতির প্রথম সন্তান ছিলেন কাসেম, তাই মুহাম্মদ (ﷺ) এর উপনাম হয় 'আবুল কাসেম, অর্থাৎ কাসেমের পিতা'। অতঃপর যথাক্রমে জন্মগ্রহণ করেন যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহর উপাধি ছিলো। 'তাইয়ের' এবং তাহের'।

রাসূল (ﷺ) এর সকল পুত্র সন্তান বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে কন্যাদের মধ্যে সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছেন, মুসলমান হয়েছেন এবং মুহাজিরের মর্যাদাও লাভ করেছেন। কিন্তু ফাতিমা (রা) ব্যতীত কন্যাগণ সকলেই পিতার জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন। ফাতিমা (রা) এর মৃত্যু হয়েছিলো রাসূল প্রকার এর মৃত্যুর ৬ মাস পর।

কা'বাঘর পুনঃনির্মাণ এবং হাজরে আসওয়াদ নিয়ে সৃষ্ট বিবাদের মীমাংসা মুহাম্মদ (ﷺ) যখন ৩৫ বছর বয়সে পদার্পণ করেন তখন কুরাইশগণ কা'বাঘর পুণঃনির্মাণ কাজ শুরু করে। কারণ, কাবাঘরের স্থানটি চারদিকে দেয়াল দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলো মাত্র। দেয়ালের ওপর কোনো ছাদ ছিলো না। এ অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে কিছুসংখ্যক চোর কা'বা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে রক্ষিত অনেক মূল্যবান সম্পদ এবং অলঙ্কারাদি চুরি করে নিয়ে যায়। ইসমাঈল (আ) এর আমল হতেই এ ঘরের উচ্চতা ছিলো সাড়ে তের ফিট।

কা'বাঘরটি অনেক আগে নির্মিত হওয়ার কারণে দেয়ালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যে কোনো সময় তা ধসে পড়ার মত উপক্রম হয়েছিলো। তাছাড়া সে বছরেই মক্কানগরী বন্যার কারণে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কা'বামুখী জলধারা প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়ে কা'বাঘরের দেয়ালের চরম অবনতি ঘটে এবং যেকোনো সময় তা ধসে পড়ার আশংকা তৈরি হয়। এমনি এক নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কুরাইশগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো কা'বাঘরের স্থান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তা পুনঃর্নির্মাণ করবে।

কা'বাঘর নির্মাণের উদ্দেশ্যে সকল গোত্রের কুরাইশগণ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে কতগুলো নীতি নির্ধারণ করে নিলো। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে কাবাঘর পুনঃনিমার্ণ করতে গিয়ে শুধুমাত্র বৈধ অর্থ-সম্পদ (হালাল) ব্যবহার করা হবে। এতে বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ, সুদের অর্থ এবং অন্যের হক নষ্ট করে সংগৃহীত হয়েছে-এমন কোনো অর্থ নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যাবে না। এ সকল নীতির সাথে সকলে একমত হয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলো।

নতুন ইমারত তৈরির জন্য পুরাতন ইমারত ভেঙ্গে ফেলা প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহর ঘর ভেঙ্গে ফেলার কাজে হাত দিতে কারো সাহস হচ্ছিলো না। অবশেষে 'ওয়ালীদ বিন মুগীরাহ মাখযুমী' সর্বপ্রথম ভাঙ্গার কাজে হাত দিলো এবং অন্যেরা ভীত-সন্ত্রস্ত মনে তা প্রত্যক্ষ করতে থাকলো। কিন্তু অংশ ভেঙ্গে ফেলার পরও যখন তারা দেখলো যে, তার ওপর কোনো বিপদ-আপদ আসছে না তখন সকলেই ভাঙ্গার কাজে অংশগ্রহণ করলো। যখন ইবরাহিম (আ) এর ভিত্তি পর্যন্ত ভেঙ্গে ফেলা হলো তখন নির্মাণ কাজ শুরু হলো। প্রত্যেক গোত্র যাতে নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করতে পারে সেজন্য কোনো গোত্র আলাদা আলাদাভাবে পাথর সংগ্রহ করে রেখেছিলো।

নির্মাণ কাজ শুরু হলো। 'বাকুম' নামক একজন রোমীয় মিস্ত্রির তত্ত্বাবধানে নির্মাণ কাজ এগিয়ে চললো। যখন কৃষ্ণপাথরের স্থান পর্যন্ত গিয়ে পৌছলো তখন নতুনভাবে এক সমস্যার সৃষ্টি হলো। সমস্যটি হলো হাজরে আসওয়াদ বা কৃষ্ণপাথরের স্থানে কে বা কোন গোত্র সেটি পুনঃস্থাপন করার মহাগৌরব অর্জন করবে তা নিয়ে।

সকলেই দাবি তুললো, সে নিজে বা তার গোত্রের লোকেরা কৃষ্ণপাথরটি যথাস্থানে স্থাপন করবে। তাদের এ দাবির পক্ষে সকলেই অনড় হয়ে রইলো। এই কাজটি তারাই করবে। সকলেই অনড় হয়ে রইলো। কেউ-ই সামান্য ছাড় দিতে রাজি নয়। সকলের একই কথা, একই জেদ। জেদ আস্তে আস্তে রূপান্তরিত হলো রেষারেষিতে। রেষারেষির পরবর্তী পর্যায় হচ্ছে রক্তারক্তি। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে রক্তারক্তি করতেও তারা পিছপা হবে না। শুরু হয়েছে অস্ত্রের মহড়া। একটু নরমপন্থিরা আতঙ্কিত কখন যে যুদ্ধ বেঁধে যায় তা কে জানে।

এমন বিভীষিকাময় এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বর্ষীয়ান নেতা 'আবু উমাইয়া মাখযুমী' অনেক ভেবে-চিন্তে এ সমস্যা সমাধানের একটি উপায় খুঁজে বের করলো। সে সকলকে উদ্দেশ্য করে প্রস্তাব করলো যে, আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করবেন তাঁর ওপরেই এ বিবাদ মীমাংসার দায়িত্ব অর্পণ করা হোক।

উপস্থিত সকলেই এই প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করলো। আল্লাহর কী অপার মহিমা! দেখা গেলো সকল আরববাশির প্রিয়পাত্র ও শদ্ধেয় আল-আমিনই সর্বপ্রথম মসজিদে হারামে প্রবেশ করেছেন। মুহাম্মদ (ﷺ) কে এভাবে আসতে দেখে সকলেই চিৎকার করে বলে উঠলো- এ তো আমাদের আল-আমিন-আমাদের বিশ্বস্ত লোক। আমরা সকলেই তাঁর ওপর আস্থাশীল। তিনিই হলেন মুহাম্মদ (ﷺ)।

অতঃপর মুহাম্মদ (ﷺ) যখন তাদের নিকটবর্তী হলেন তখন ব্যাপারটি সবিস্তারে তাঁর নিকট তুলে ধরা হলো। তখন তিনি একখানা চাদর চাইলেন। তাঁকে চাদর দেয়া হলে তিনি মেঝের ওপর তা বিছিয়ে দিয়ে স্বস্তে কৃষ্ণপাথরটি চাদরের ওপর তুলে রাখলেন। তারপর তিনি বিবাদমান গোত্রপতিগণদের ডেকে বললেন, আপনারা সকলে মিলে একসাথে চাদরটি চারকোনায় ধরুন এবং কৃষ্ণপাথরটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চলুন। অতঃপর স্বহস্তে তিনি কৃষ্ণপাথরটি উঠিয়ে যথাস্থানে তা রেখে দিলেন। এ মীমাংসা সকলেই সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিলো। অত্যন্ত সহজ, সুশৃঙ্খল এবং ন্যায়সঙ্গত পন্থায় জ্বলন্ত একটি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়ে গেলো।

এদিকে কা'বাঘর পুনঃনির্মাণ করতে গিয়ে কুরাইশদের নিকট বৈধ অর্থের ঘাটতি দেখা দিলো। এজন্যই উত্তর দিক হতে কাবাঘরের দৈর্ঘ্য আনুমানিক নয় ফিট পর্যন্ত কমিয়ে দেয়া হলো। এ অংশটুকুই 'হিজর' বা 'হাতীম' নামে প্রসিদ্ধ। এবার কুরাইশগণ কা'বার দরজা ভূমি হতে বিশেষভাবে উঁচু করে দিলেন যেন এর মধ্য দিয়ে সে ব্যক্তিই প্রবেশ করতে পারে-যাকে তারা অনুমতি দিবে। যখন দেয়ালগুলো সাড়ে বাইশ ফিট উঁচু হলো তখন ঘরের অভ্যন্তরে ছয়টি পিলার বা স্তম্ভ নির্মাণ করা হলো এবং তার উপর ছাদ দেয়া হলো।

কা'বা ঘরের উচ্চতা হচ্ছে পনেরো ফিট। কৃষ্ণপাথরবিশিষ্ট দেয়াল এবং তার সামনের দেয়াল অর্থাৎ দক্ষিণ ও উত্তর দিকের দেয়াল হচ্ছে ত্রিশ ফিট। কৃষ্ণপাথর মাতাফের জায়গা হতে সাড়ে চার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত দরজাবিশিষ্ট দেয়াল এবং এর সাথে সামনের দেয়াল অর্থাৎ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকের দেয়াল ছত্রিশ ফিট করে। দরজা রয়েছে মেঝে থেকে ছয় ফিট উঁচুতে। দেয়ালের পার্শ্বস্থ চতুর্দিকের নিচু জায়গা একটি প্রসারিত চেয়ার সমতুল্য অংশ দ্বারা পরিবেষ্টিত আছে-যার উচ্চতা পঁচিশ সেন্টিমিটার এবং গড় প্রস্থ ত্রিশ সেন্টিমিটার। একে 'শাজে রাওয়া' (চলন্ত দুর্লভ) বলা হয়। এটাও হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে বায়তুল্লাহর অংশ। কিন্তু কুরাইশগণ এটাও ছেড়ে দিয়েছিলো।

নবুয়ত লাভের পূর্বেকার সংক্ষিপ্ত চরিত্র

সকল মানুষের জীবনেই বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্নভাবে যেসব সদগুণাবলির বিকাশ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে তার সবগুলোরই চরম উৎকর্ষ সাধন হয়েছিলো মুহাম্মদ (ﷺ) এর অস্তিত্বের সবটুকু জুড়ে। তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনার যথার্থতা, পারদর্শিতা এবং ন্যায়পরায়ণতার এক জ্বলন্ত প্রতীক।

মুহাম্মদ (ﷺ) কে প্রদান করা হয়েছিলো সুষমমন্ডিত দেহসৌষ্ঠব, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, যাবতীয় জ্ঞানের পরিপূর্ণতা এবং উদ্দেশ্যে সাধনে সাফল্যের নিশ্চয়তা। তিনি দীর্ঘ সময় যাবৎ নীরবতা অবলম্বনের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন ধ্যান ও অনুসন্ধান কাজে রত থাকতেন। এবং বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী চিন্তা- ভাবনার মাধ্যমে তিনি ন্যায় ও সত্য উদঘাটন করতে সক্ষম হতেন।

তিনি তাঁর সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি-বিবেচনা এবং নির্ভুল নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ- ক্ষমতার দ্বারা মানবসমাজের প্রকৃত অবস্থা, দল বা গোত্রসমূহের গতিবিধি ও মন-মানসিকতা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো অনুধাবনের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতেন। যার ফলে শত অন্যায়, অশ্লীলতা এবং অনাচারে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজে বসবাস করেও তিনি ছিলেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সবকিছু থেকে মুক্ত ও পবিত্র। শরাবপায়ীদের সাথে একত্রে বসবাস করেও কোনোদিন তিনি শরাব স্পর্শ করেননি, দেব-দেবীর আস্তানায় যবেহকৃত পশুর গোশত তিনি কখনোই খাননি এবং মূর্তির নামে অনুষ্ঠিত কোনো ধরনের খেলা-ধুলায়ও অংশগ্রহণ করেননি। তিনি সমাজের সকল ধরনের সদাচার এবং সৎকর্মে অংশগ্রহণ করতেন, অন্যথায় নীরব নির্জনতায় সময় অতিবাহিত করতেন।

মুহাম্মদ (ﷺ) ছোটকাল থেকেই তৎকালীন সমাজে প্রচলিত যাবতীয় মিথ্যা উপাস্যকে ঘৃণা করতেন এবং সে ঘৃণার পরিমাণ এতই ব্যাপক ছিলো যে, তাঁর দৃষ্টিতে অন্য কোনো বিষয়ই এতে নিন্দীয় ও অপছন্দনীয় ছিলো না। এমনকি লাত ও উযযার নামে শপথ করার ব্যাপারটি শুনতে পেলে সেটা যেন তাঁর কানে অগ্নিবর্ষণ করতো।

রাসূল যে আল্লাহর খাস রহমত, হেফাজত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে লালিত-পালিত ও পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন সে ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই। অতএব যখনই পার্থিব কোনো লাভ কিংবা অনুসরণীয় রীতি অনুসরণের প্রতি প্রবৃত্তি আকৃষ্ট হয়েছে তখনই আল্লাহর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ সেখানে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সে কাজ থেকে বিরত রেখেছে। ইবনে আসীরের একটি বর্ণনায় এসেছে যে, রাসূল বলেছেন-

জাহেলি যুগের লোকেরা যেসব কাজ করেছে দু'বার ছাড়া আর কখনোই তা আমার স্মরণ হয়নি। কিন্তু আল্লাহ আমার এবং সে কাজের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আর কখনোই সে ব্যাপার সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা জন্মে নি যে পর্যন্ত না আল্লাহ আমাকে পয়গম্বরীর মর্যাদা প্রদান করেছেন। উক্ত ঘটনা হলো, যে বালকের সাথে আমি মক্কার উপকণ্ঠে ছাগল চরাতাম এক রাতে তাকে বললাম, তুমি আমার ছাগলগুলো একটু দেখাশোনা করো, আমি মক্কায় যাই এবং সেখানে অন্যান্য যুবকের মতো যৌবন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে যোগদান করি। সে বললো, ঠিক আছে। এরপর আমি বের হলাম এবং তখনো মক্কার প্রথম ঘরের নিকটেই ছিলাম - এমন সময় কিছু বাদ্যযন্ত্রের শব্দ কানে এসে লাগলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথা থেকে বাদ্যযন্ত্রের এ শব্দ ভেসে আসছে? লোকেরা বললো, অমুকের বিয়ে হচ্ছে, তারই বাজনা বাজছে।

আমি সে যন্ত্রসঙ্গীত শ্রবণের জন্য সেখানে বসে পড়লাম। অমনি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ আমার শ্রবণশক্তির ওপর আরোপিত হলো। তিনি আমার কানে শোনার ক্ষমতা বন্ধ করে দিলেন এবং আমি সেখানে শুয়ে পড়লাম। অতঃপর সূর্যের তাপে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তারপর আমি আমার সে বন্ধুর নিকট চলে গেলাম এবং তার জিজ্ঞাসার জবাবে ঘটনাটি তার নিকট বিস্তারিত বর্ণনা করলাম। এরপর আবার একরাতে আমার বন্ধুর নিকট বসা ছিলাম এবং মক্কায় পৌঁছে তেমনি ঘটনার সম্মুখীন হলাম। এ দুটি ঘটনা ছাড়া আর কখনো আমি অনুরূপ ভ্রান্তপথে পা বাড়াইনি।

সহিহ বুখারিতে জাবির বিন আব্দুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। যখন কা'বাঘরের নির্মাণ কাজ চলছিলো তখন রাসূল আব্বাস (রা) এর সাথে পাথর বহন করে আনছিলেন। আব্বাস (রা) রাসূল কে বললেন, পরনের কাপড় খুলে কাঁধে দিয়ে তার ওপর ইট রেখে বহন করে নিয়ে যাও। তাহলে কাঁধে ব্যাথা কম পাবে। কিন্তু রাসূল তাতে রাজি না হওয়ায় জোর করে তাঁর পরনের কাপড় খুলে নেয়া হলো। তৎক্ষণাৎ তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি আকাশের দিকে উঠে গেলো এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।

জ্ঞান ফিরে পাওয়ার সাথে সাথে তিনি চিৎকার করতে লাগলেন- 'আমার কাপড়, আমার কাপড়! সাথে সাথে তাঁকে কাপড় পরিয়ে দেয়া হলো। অন্য বর্ণনায় জানা যায় যে, এ ঘটনার পর তাঁর লজ্জস্থান আর কোনো দিনই দেখা যায়নি।

রাসূল (ﷺ) এর কাজ-কর্ম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়, চরিত্র ছিলো সর্বোত্তম এবং মহানুভবতা ছিলো সর্বযুগের সকলের জন্য অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য। তিনি ছিলেন সর্বাধিক শিষ্টাচারী, নম্র-ভদ্র, সদালাপী ও সদাচারী। তিনি ছিলেন সবচেয়ে দয়াদ্রচিত্ত, দূরদর্শী ও সত্যবাদী। মিথ্যা কখনোই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁকে সকলেই 'আল-আমীন' বলে সম্বোধন করতো।

রাসূল ছিলেন আরবদের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আমানতদার। খাদিজা সাক্ষ্য দিতেন যে, তিনি অভাবগ্রস্তদের বোঝা বহন ‌করতেন, নিঃস্ব ও অসহায়দের সাহায্য করতেন। ন্যায্য দাবিদারদের অধিকার আদায়ে তিনি সহায়তা করতেন এবং মেহমানদারির জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন।

নবুয়তের মহাজীবনের সূত্রপাত

তুমি পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিণ্ড হতে। পাঠ কর, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন-তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না। (সূরা আলাক: আয়াত ১-৫)

দাওয়াতের কার্যকাল ও পর্যায়: পাঠকদের অনুধাবনের সুবিধার্থে রাসূল আল এর নবুয়তী জীবনকালকে আমরা দুটি অংশে ভাগ করে নিয়ে আলোচনা করতে পারি। কাজ-কর্মের প্রক্রিয়া এবং সাফল্য-ব্যর্থতার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে এর এক অংশ অন্য অংশ থেকে ছিলো ভিন্নধর্মী এবং ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যতম। অংশ দুটো হচ্ছে যথাক্রমে।-

১. মক্কায় অবস্থানকাল প্রায় তের বছর।
২. মদিনায় অবস্থানকাল দশ বছর।

অতঃপর মক্কী ও মাদানী উভয় জীবনকাল, বৈশিষ্ট্য ও কর্মপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে ছিলো স্তরক্রমিক এবং ভিন্নধর্মী। তাঁর নবুয়তী জীবনে উভয় অংশের বিভিন্ন ও বিচিত্র অবস্থা এবং ঘটনাপ্রবাহকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনা এবং নিরীক্ষণ করলে অনুক্রমিক স্তরগুলো নির্ণয় করে দেখা অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে।

রাসূল (ﷺ) এর মক্কায় অবস্থানকাল এবং কর্মপ্রক্রিয়াকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করে আলোচনা করা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে-

১. সর্বসাধারণের দৃষ্টির অন্তরালে গোপন দাওয়াতী কার্যস্তর (তিন বছর)।
২. মক্কাবাশির নিকট প্রকাশ্য দাওয়াত ও তাবলিগী কার্যস্তর (চতুর্থ বছর থেকে দশম বছরের শেষ নাগাদ)।
৩. মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত প্রদান ও বিস্তৃতির স্তর (নবুয়তের দশম বর্ষের শেষ ভাগ পর্যন্ত)

আলোর পাহাড় হেরা গুহায় নবুয়ত সূচনা

রাসূল যখন চল্লিশ বছরে পদার্পণ করলেন তখন তাঁর দীর্ঘদিনের বিচার-বিবেচনা, বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তা-ভাবনা যা জনগণ এবং তার মধ্যে ব্যবধানের এক প্রাচীর সৃষ্টি করে চলেছিলো তা উম্মুক্ত হয়ে গেলো এবং আস্তে আস্তে তিনি নির্জনতাপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন। খাবার এবং পানি সাথে নিয়ে মক্কানগরী হতে দু'মাইল দূরত্বে অবস্থিত হেরা পর্বতের এক নির্জন গুহায় গিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতে লাগলেন। এটি হচ্ছে ক্ষুদ্র আকার-আয়তন বিশিষ্ট একটি গুহা। এর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১২ ফুট এবং প্রস্থ ৭ ফুট। এর নিচের দিকটা তেমন গভীর ছিলো না।

একটি সংকীর্ণ রাস্তার প্রান্তভাগে অবস্থিত পর্বতের উপরি অংশের একত্রে মিলে মিশে ঠিক এমন একটি আকার-আকৃতি ধারণ করেছিলো যা শোভাযাত্রার পুরোভাগে অবস্থিত আরোহীশূন্য সুসজ্জিত ঘোড়ার মতো দেখায়।

তিনি যখন সেখানে গমন করতেন তখন খাদিজা (রা) ও তাঁর সাথে যেতেন এবং নিকটবর্তী কোনো জায়গায় অবস্থান করতেন। পুরো রমযান মাস তিনি হেরাগুহায় অবস্থান করতেন। রাসূল - দুঃস্থ ও অসহায় মুসাফিরদের খাবার খাওয়াতেন এবং অবশিষ্ট সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকতেন। বিশ্বের দৃশ্যমান সব বস্তুর অন্তরাল থেকে যে মহাশক্তি প্রতিটি মুহূর্তে সবকিছুকে জীবন-জীবিকা ও শক্তি যুগিয়ে চলেছেন, সমগ্র বিশ্বময় সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের এক শাশ্বত ব্যবস্থা বজায় রেখে চলেছেন সে মহীয়ান ও গরীয়ান সত্তার ধ্যানে মশগুল থাকতেন। স্বগোত্রীয় লোকদের অর্থহীন বহুত্ববাদী বিশ্বাস ও পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণা তাঁর অন্তরে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতো। কিন্তু তাঁর সামনে এমন কোনো পথ খোলা ছিলো না যেপথ ধরে তিনি শান্তি ও স্বস্তির সাথে পদচারণা করতে সক্ষম হতেন। রাসূল (ﷺ) এর নির্জনপ্রিয়তা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ব্যবস্থাপনার একটি অংশ।

এভাবেই আল্লাহ ভবিষ্যতের এক মহতী কর্মসূচির জন্য তাঁকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন। যে আত্মার নসীবে নবুয়তরূপী এক মহান আসমানি নি'আমত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে এবং যিনি পথভ্রষ্ট ও অধঃপতিত মানুষকে সঠিক পথনির্দেশনা দিয়ে করবেন ধন্য তাঁর জন্য যথার্থই প্রয়োজন সমাজ জীবনের যাবতীয় ব্যস্ততা, জীবনযাত্রা নির্বাহের যাবতীয় ঝামেলা এবং সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে নির্জনতা অবলম্বনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আল্লাহ তা আলা যখন মুহাম্মদ (ﷺ) কে বিশ্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে মর্যাদাশীল ও দায়িত্বশীল আমানতদার মনোনীত করে তাঁর কাঁধে দায়িত্বভার অর্পণের মাধ্যমে বিশ্বমানবের জীবন বিধানের রূপরেখা পরিবর্তন এবং অর্থহীন আদর্শের জঞ্জাল সরিয়ে শাশ্বত আদর্শের আঙ্গিকে ইতিহাসের পরিমার্জিত ধারা প্রবর্তন করতে চাইলেন তখনই নবুয়ত প্রদানের প্রাক্কালে তাঁর জন্য এক মাসব্যাপী নির্জনতা অবলম্বন অপরিহার্য করে দিলেন যাতে তিনি গভীর ধ্যানমগ্নতার মাধ্যমে দিব্যজ্ঞান লাভের পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হন। নির্জন হেরাগুহার সে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি বিশ্বের আধ্যাত্মিক জগতে পরিভ্রমণ করতেন এবং সকল অস্তিত্বের অন্তরালে লুক্কায়িত অদৃশ্য রহস্য সম্পর্কে চিন্ত- ভাবনা ও গবেষণা করতেন যাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ আসামাত্রই সেটা তিনি বাস্তবায়নের ব্যাপারে ব্রতী হতে পারেন।

আল্লাহর মহান বাণী নিয়ে জিবরাঈল (আ) এর আগমন

রাসূল (ﷺ) এর বয়স ৪০ বছর যখন পূর্ণ হলো, এটাই হচ্ছে মানুষের পূর্ণতা প্রাপ্তির বয়স এবং বলা হয়েছে যে, এ বয়সই হচ্ছে নবী- রাসূলগণের নবুয়ত প্রাপ্তির উপযুক্ত বয়স তখন নবুয়তের কিছু স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পেতে লাগালো। সে লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছিলো। তিনি যখনই কোনো স্বপ্ন দেখতেন তা সত্যি হিসেবে প্রতীয়মান হতোভোরের আলোর মতো। এমনি এক অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হলো ছয়টি মাস-যা ছিলো নবুয়তের সময়সীমার ছিচল্লিশতম অংশ এবং নবুয়তের সময়সীমা ছিলো তেইশ বছর। এরপর তিনি যখন হেরাগুহায় নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন এবং এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং বছর অতিবাহিত হতে হতে তৃতীয় বর্ষ অতিবাহিত হতে লাগলো তখন আল্লাহ পৃথিবীর মানুষের ওপর নিজ রহমত বর্ষণের ইচ্ছা করলেন। অতঃপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জিবরাঈল (আ) এর মাধ্যমে তাঁর কুরআনুল কারীমের কয়েকটি আয়াতে কারীমা নাযিল করে মুহাম্মদ (ﷺ) কে নবুয়তের মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন।

বিভিন্ন ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রমাণাদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই জিবরাইল (আ) এর আগমনের প্রকৃত দিন-তারিখ ও সময় অবগত হওয়া সম্ভব হবে। আমাদের বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো রমযান মাসের ২১ তারিখ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে। খ্রিস্টীয় হিসাব অনুযায়ী দিনটি ছিলো ৬১০ ঈসায়ি সালের ১০ আগস্ট। চন্দ্রমাসের হিসাব অনুযায়ী রাসূল (ﷺ) এর বয়স ছিলো চল্লিশ বছর ছয় মাস বার দিন এবং সৌর হিসাব অনুযায়ী ছিলো ৩৯ বছর ৩ মাস ২২ দিন।

ওহী নাযিল হওয়ার তারিখ

রাসূল ওহী প্রাপ্তি এবং নবুয়ত লাভের মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়ার মাস ও দিন-তারিখ সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অধিক সংখ্যক ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে অভিন্ন মত পোষণ করে থাকেন যে, মাসটি ছিলো রবিউল আউয়াল। কিন্তু অন্য একদল বলেন, মাসটি ছিলো রমযানুল মুবারক। কেউ কেউ আবার এ কথাও বলেন যে, মাসটি ছিলো রজব।

দ্বিতীয় দলের মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে আমাদের মনে হয়, অর্থাৎ যারা বলেছেন যে, তা রমযান মাসে নাযিল হয়েছিলো তাদের মত। কারণ আল্লাহ কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেছেন: রমযান মাসেই কুরআনুল করীম নাযিল করা হয়েছে। (সূরা আল- বাক্বারা: আয়াত-১৮৫)

কুরআনুল করীমে আরো ইরশাদ হয়েছে- আমি পবিত্র কদরের রাতে কুরআন নাযিল করেছি। (সূরা ক্বাদর: আয়াত-১)

আমরা সকলেই এটা জানি যে, রমযান মাসেই কদর রাতের প্রসঙ্গটি আসে। কুরআনুল কারীমে আরো ইরশাদ হয়েছে- আমি কুরআনকে এক বরকতময় রাতে নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি মানুষকে বিপদ হতে সর্তকারী। (সূরা দুখান: আয়াত-৩)

দ্বিতীয় মতটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার আরো একটি কারণ হচ্ছে এই যে নবী করীম (ﷺ) ও রমযান মাসেই বেশিরভাগ সময় হেরা গুহায় অবস্থান করতেন, যেহেতু অন্যান্য আসমানী কিতাবগুলোও রমযান মাসেই নাযিল হয়েছিলো এবং এটাও জানা কথা যে জিবরাঈল (আ) সেখানে আগমন করতেন অধিকন্তু যাঁরা রমযান মাসে ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন কোন তারিখে তা অবতীর্ণ হয়েছিলো সে ব্যাপারেও বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। কেহ কেহ বলেছেন রমযান মাসের ৭ তারিখে, কেউ বলেছেন ১৭ তারিখে, কেউবা আবার বলেছেন ১৮ তারিখে তা অবতীর্ণ হয়েছিলো।

আমার মতে ২১ শে রমযান এ জন্য গ্রহণযোগ্য যে, যদিও এর স্বপক্ষে কেউ নাই- তবুও অধিক সংখ্যক চরিত্রকার এই ব্যাপারে এক মত হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) এর নবুয়ত প্রাপ্তির দিনটি ছিলো সোমবার। এর সমর্থন পাওয়া আবু কাতাদার সে বর্ণনা থেকে যখন রাসূল (ﷺ) এর নিকট সোমবারের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে, এ হচ্ছে সেদিন যেদিন আমি ভূমিষ্ট হয়েছিলাম এবং আমার নিকট ওহী নাযিল করে আমাকে নবুয়ত প্রদান করা হয়েছিলো। সে রমযান মাসে সোমবার হয়েছিলো ৭, ১৪, ২১, ও ২৮ তারিখগুলোতে। এদিকে সহিহ হাদিস সূত্রে এটা প্রমাণিত ও স্বীকৃত হয়েছে যে, পবিত্র কদর রাত্রি রমযান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে বিজোড় রাত্রিগুলোকেই ধরা হয়ে থাকে।

এখন আমরা এক দিকে কুরআন করীম থেকে অবগত হচ্ছি যে, আল্লাহ বলেছেন "আমি কদরের রাত্রিতে কুরআনুল মাজীদ অবতীর্ণ করেছি। তাছাড়া, আবু কাতাদার (রা) বর্ণিত হাদীস সূত্রে জানা যায় যে, রাসূল সোমবার দিবস নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তৃতীয় সূত্রে পঞ্জিকার হিসাবে জানা যায় ঐ বছর রমযান মাসে কোনো কোনো তারিখ সোমবার ছিলো। অতএব নির্দিষ্টভাবে জানা যায় যে নবী করীম (ﷺ) নবুয়ত প্রাপ্ত হয়েছিলেন ২১ শে রমযানের রাত্রিতে। সুতরাং ঐটিই ছিলো ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রথম তারিখ।

এখন আমরা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) এর বর্ণনা থেকে বিস্তারিত বিবরণ জেনে নিই। এটা নৈসর্গিক নূর বা আসমানী দীপ্তির মর্মে এমনি এক আলোকরশ্মি-যা প্রকাশের সাথে সাথে অবিশ্বাস ও ভ্রষ্টতার অন্ধাকার বিদূরিত হতে থাকে, জীবনের গতিধারা পরিবর্তিত হতে থাকে এবং ইতিহাসের পট পরিবর্তিত হয়ে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হতে থাকে। আয়েশা (রা) বলেছেন: রাসূল (ﷺ) এর নিকট ওহী নাযিল হওয়া শুরু হয়েছিলো ঘুমের অবস্থায় স্বপ্নযোগে। তিনি যখন সে স্বপ্নই দেখতেন তা প্রভাতরশ্মির মতো প্রকাশিত হতো। অতঃপর আস্তে আস্তে তিনি নির্জনতা পছন্দ করতে লাগলেন। আলোক রহিত নিরবিচ্ছিন্ন নির্জনতায় ধ্যানমগ্ন থাকার সুবিধার্থে তিনি হেরাগুহায় অবস্থান করতেন কোনো কোনো সময় ঘরে না এসে রাতের পর রাত তিনি ইবাদত- বন্দেগী এবং গভীর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। এজন্য খাদ্য এবং পানীয় সাথে নিয়ে যেতেন। সেগুলো ফুরিয়ে গেলে পুনরায় তিনি ঘরে ফিরে আসতেন।

কিন্তু ঘরে তিনি স্থির থাকতে পারতেন না। যেহেতু হেরাগুহার নির্জনতার জন্য তাঁর মন অস্থির হয়ে উঠতো। তাই আগের মতো খাদ্য এবং পানীয় সাথে নিয়ে পুনরায় তিনি হেরাগুহায় গিয়ে ধ্যানমগ্ন হতেন। ওহী নাযিলের মাধ্যমে তাঁর নিকট সত্য প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই তিনি হেরাগুহায় নির্জনতায় অবস্থান করতে থাকেন।

এমনিভাবে একদিন তিনি যখন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন তখন আল্লাহর দূত জিবরাঈল (আ) তাঁর নিকট আগমন করে বললেন: 'পড়ুন।' তিনি বললেন- 'আমি পড়তে জানি না।'

জিবরাঈল (আ) তাঁকে অত্যন্ত শক্তভাবে ধরে আলিঙ্গন করলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেন- 'পড়ুন। রাসূল - জবাব দিলেন- 'আমি পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই।' জিবরাঈল (আ) অতঃপর তৃতীয় দফায় তাঁকে আলিঙ্গনবদ্ধ করার পর ছেড়ে দিয়ে বললেন: 'পড়ুন,

পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড থেকে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না। (সূরা আলাক: আয়াত-১-৫)

অতঃপর ওহির আয়াতগুলো হৃদয়ে ধারণ করে রাসূল কিছুটা অস্থির ও কম্পিত মনে খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের নিকট প্রত্যাবর্তন করলেন এবং বললেন- 'আমাকে বস্ত্রাবৃত করো, আমাকে বস্ত্রাবৃত করো।'

খাদিজা (রা) তাঁকে শায়িত অবস্থায় বস্ত্রাবৃত করলেন। এভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর তাঁর অস্থিরতা ও হৃদকম্পন প্রশমিত হলে তিনি তার সহধর্মিনীকে হেরাগুহার ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করলেন। তাঁর অস্থিরতা ও চিত্তচাঞ্চল্যের ভাব লক্ষ করে খাদিজা (রা) তাকে আশ্বস্ত করে বললেন- 'কোনো ভয় করবেন না, আপনি ধৈর্য করুন। আল্লাহ কখনোই আপনাকে অপমান করবেন না। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আপনি সু-সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। অভাবগ্রস্তদের অভাব মোচনের চেষ্টা করেন। অসহায়দের আশ্রয় প্রদান করেন। মেহমানদের আদর- আপ্যায়ন করেন এবং ঋণগ্রস্থদের ঋণের দায়মোচনে সাহায্য করেন। নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না।'

এরপর খাদিজা (রা) তাঁকে নিজের চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফল বিন আসাদ বিন আব্দুল উযযার নিকট নিয়ে গেলেন। জাহেলী যুগে ওয়ারাকা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং ইরানী ভাষা পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। এক সময় তিনি ইরানী ভাষায় কিতাবও লিখতেন। কিন্তু যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময় তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদিজা (রা) তাঁকে বললেন: 'ভাইজান, আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। তিনি কি যেন সব কথাবার্তা বলছেন এবং অস্থির হয়ে পড়েছেন।

ওয়ারাকা বললেন: 'ভাতিজা, বলোতো তুমি কি দেখেছো? কী হয়েছে তোমার? রাসূল যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং হেরাগুহায় যেভাবে যা ঘটেছিলো সবকিছু সবিস্তারে বর্ণনা করলেন ওরাকার নিকট। সবকিছু শ্রবণের পর বিস্ময়-বিহ্বল কন্ঠে ওয়ারাকা বলে উঠলেন: 'ইনিই তো সে, যিনি মূসার নিকটেও আগমন করেছিলেন।

অতঃপর বলতে থাকলেন, 'হায়! হায়! যেদিন আপনার স্বজাতি এবং স্বগোত্রীয় লোকেরা আপনার প্রতি নানাভাবে যুলুম-অত্যাচার করবে এবং আপনাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবে সেদিন যদি আমি শক্তিমান এবং জীবিত থাকতাম। ওয়ারাকার মুখ থেকে একথা শোনার পর রাসূল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-কী বলছেন! ওরা কি আমায় দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবে?

ওয়ারাকা বললেন: হ্যাঁ, তারা অবশ্যই আপনাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে। তিনি আরো বললেন: শুধু আপনার ক্ষেত্রেই নয়, অতীতেও এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। যখনই জনসমাজে সত্যের বার্তাবাহক কোনো নবী- রাসূলের আগমন ঘটেছে তখনই তাঁর স্বগোত্রীয় লোকেরা নানাভাবে তার ওপর যুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে এবং তাঁকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে।

ওয়ারাকা আরও বললেন: 'আপনি মনে রাখবেন, আমি যদি সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে আপনাকে সকল ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করবো। কিন্তু এর অল্পকাল পরেই ওয়ারাকা মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে ওহী আসাও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

তাবারী এবং ইবনে হিশামের বর্ণনায় জানা যায় যে, আকস্মিকভাবে ওহী নাযিল হওয়ার পরপরই রাসূল হেরা পর্বতের গুহা হতে বেরিয়ে আসেন। পরে পুনরায় সেখানে গিয়ে আরো কিছু সময় অবস্থান করেন। তারপর মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। হেরাগুহা থেকে রাসূল (ﷺ) এর বেরিয়ে আসার কারণ সম্পর্কে তাবারীর বর্ণনায় যে বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে নিম্নে তা তুলে ধরা হলো।

ওহী এবং পাগলের প্রতি ঘৃণার এমন কারণে তাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করাও আমি সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু আমার ওপর যখন ওহী নাযিল হলো তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, এ অকর্মণ্য (অর্থাৎ নিজেই) কি কবি অথবা পাগল হয়ে গেলাম। যদিও কুরাইশগণ কখনোই আমার সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করার সাহস পাবে না, তা সত্ত্বেও ব্যাপারটি আমাকে খুবই অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিলো। আমি মনস্থ করলাম পর্বতচূড়ায় আরোহণ করে সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে শেষ করে ফেলবো। তাহলে এ ভাবাবেগজনিত অতৃপ্তি ও অস্বস্তির হাত থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি পেয়ে যাবো। এ চিন্তা করে আমি পর্বতশীর্ষে আরোহণের জন্য ওপরে উঠতে থাকলাম। যখন মধ্যভাগে গিয়ে পৌঁছলাম তখন আকাশ থেকে একটি কন্ঠ আমি শুনতে পেলাম- ও হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর রাসূল আমি জিবরঈল ফেরেশতা।

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মানুষের আকৃতি ধারণ করে আকাশপ্রান্তে ডানা মেলে জিবরাঈল (আ) দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং বলছেন: হে মুহাম্মদ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং আমি জিবরাঈল ফেরেশতা।

সে সময় আমি এমন এক অবস্থার মুখোমুখি হলাম যে, যেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি সেদিকেই জিবরাঈল ফেরেশতা দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। তখন আমি আকাশের সকল প্রান্তে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার জন্য এত বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম যে, পর্বতশীর্ষ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে শেষ করার চিন্তা-ভাবনা চেতনার অন্তরালে হারিয়ে গেলো এবং আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আচ্ছন্ন অবস্থায় দঁড়িয়ে রইলাম; না পারলাম সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে, না পারলাম পশ্চাতে ফিরে যেতে।

এদিকে দীর্ঘসময় যাবৎ ঘরে প্রত্যাবর্তন না করার কারণে খাদিজা (রা) আমার খোঁজে লোক পাঠালেন। সে লোক মক্কায় আমাকে খোঁজ করে। কিন্তু কোনো সন্ধান না পেয়ে ঘরে ফিরে যায়। আমিও কিন্তু একই অবস্থায় সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি। অতঃপর জিবরাঈল (আ) দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেলে পরিবার- পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য আমি বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করি।

বাড়ি ফিরে আমি খাদিজা (রা) এর উরুর ওপর ভর দিয়ে বসে পড়ি। খাদিজা বললো: 'আবুল কাসেম আপনি কোথায় ছিলেন? হায় আল্লাহ! আমি আপনার খোঁজে লোক পাঠিয়েছিলাম। সে আপনার সন্ধান না পেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। আমি খাদিজা (রা) এর প্রশ্নের উত্তরে আমার প্রত্যক্ষ ঘটনাবলির সবকিছুই সবিস্তারে তাঁর নিকট বর্ণনা করলাম।

তিনি বললেন: 'হে প্রাণপ্রিয় স্বামী! আপনি আনন্দবোধ করুন এবং নিশ্চিন্তে থাকুন। যে মহামহিম সত্তার হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ, উক্ত ঘনাবলির প্রেক্ষিতে আমি আশা করছি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখছি যে, আপনাকে নবুয়তদানের মহান উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে এসব অলৌকিক ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে।

এরপর তিনি ওয়ারাকা বিন নওফলের নিকট গেলেন। তিনি তাঁর নিকট বিস্তারিতভাবে ঘটনাবলি খুলে বললেন। ওয়ারাকা বিন নওফল সব শুনে বললেন: 'কুদ্দুস! ওই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তাঁর নিকট ওই নামুসে আকবর' এসেছিলেন- যিনি মূসা (আ) এর নিকট আসতেন। তিনি এ উম্মতের নবী হবেন। তাঁকে বলো, ধৈর্যধারণ করতে।

অতঃপর খাদিজা (রা) ফিরে এসে ওয়ারাকার কথাগুলো শোনালেন। পুনরায় রাসূল - হেরাগুহায় অবস্থান পূর্ণ করে যখন মক্কায় ফেরত আসলেন তখন ওয়ারকা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। ওয়ারাকা রাসূল (ﷺ) এর কাছে মৌখিক বিবরণ শুনে বললেন: সে সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আপনি হচ্ছেন এ জাতির নবী। আপনার নিকট সেই 'নামুসে আকবার' এসেছে-যিনি মূসা (আ) এর নিকট আসতেন।' এবং ওয়ারাকার সাথে সাক্ষাৎ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর সেদিনই ঘটেছিলো। অবশিষ্ট হেরাগুহায় অবস্থান তিনি মক্কা হতে ফিরে গিয়ে পূর্ণ করেছিলন।

সাময়িকভাবে ওহী নাজিল স্থগিত হওয়া

ইতোপূর্বে ওহী বন্ধ থাকার কথা প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কত দিন যাবৎ ওহী বন্ধ ছিলো সে ব্যাপারে ইবনে সা'দ ইবনে আব্বাস (রা) হতে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। এতে বলা হয়েছে, মাত্র কয়েকদিনের জন্য ওহী বন্ধ ছিলো।

বিষয়টি বিভিন্ন দিক নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলে উক্ত কথাটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। কোনো কোনো সূত্রে এ কথটা প্রচারিত হয়ে আসছে যে, আড়াই কিংবা তিন বছর যাবৎ ওহী নাযীল বন্ধ ছিলো। কিন্তু এই ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ না থাকায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। একটু চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণা করলে যে সহজ সত্যটা প্রকাশিত হয়ে ওঠে তা হচ্ছে, অপ্রস্তুত রাসূল শ প্রথম অবস্থায় যখন ওহী লাভ করলেন সে সময় তিনি যেন কিছুটা বিহবল হয়ে পড়লেন। এমন এক অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল যাতে তার উদ্দেশ্যেই সাময়িকভাবে অল্প কয়েক দিনের জন্য ওহী বন্ধ থাকাই হচ্ছে প্রকৃত যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু আড়াই কিংবা তিন বছর যাবৎ ওহী বন্ধ থাকার কথা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। সেটি সত্য হলে ইসলামের ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত ও পঠিত হতো। যেহেতু এক্ষেত্রে প্রমাণাদি নির্ভর আলোচনার অবকাশ খুবই কম যেহেতু তা যুক্তিনির্ভর হওয়া প্রয়োজন।

যে সময় ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ ছিলো সে সময় রাসূল অত্যন্ত চিন্তিত এবং বিচলিত বোধ করতেন। ওহী বন্ধ হয়ে গেলে রাসূল এতই বিচলিত ও বিব্রতবোধ করতেন এবং তাঁর দুশ্চিন্তা ও অশ্বস্তিবোধ এতই বৃদ্ধি পেতো যে, পর্বতশিখর হতে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করার জন্য তিনি মনস্থির করে ফেলতেন। কিন্তু এ উদ্দেশ্যে যখনই তিনি পর্বতশীর্ষে আরোহণ করেছেন তখনই জিবরাঈল (আ) এর 'আপনি আল্লাহর সত্য নবী।' এ কথা শুনে তাঁর মনের অস্বস্তিভাব স্তিমিত হয়ে আসতো, মনে লাভ করতেন অনাবিল শান্তি। অতঃপর ফিরে আসতেন আপন ঘরে। পুনরায় কোনো সময় কিছুদিনের জন্য ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ থাকলে একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি হতো।

ওহী নিয়ে জিবরাঈল (আ) এর পুনরাগমন

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি (রহ) বলেছেন: রাসূল (ﷺ) এর ওপর প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার সময় তিনি কিছুটা ভয়-ভীতির সাথে বিস্ময়াবিভূত হয়ে পড়েন। তাঁর মানসিকতার ক্ষেত্রে কিছুটা বিহবলতার ভাবও পরিলিক্ষত হতে থাকে। উক্ত প্রেক্ষিতেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কিছুদিন ওহী নাযিল বন্ধ রাখেন। যাতে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

হলোও ঠিক তাই, রাসূল (ﷺ) প্রথম ওহী নাযিলের সময় যে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা থেকে মুক্ত হয়ে যখন মন-মানসিকতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন তখন তাঁর মনে এ ধারণা বন্ধমূল হয়ে গেলো যে, তিনি আল্লাহর "রাসূল" মনোনীত হয়েছেন এবং তাঁর নিকট যিনি ওহী নিয়ে আগমন করেছিলেন তিনি হচ্ছেন আসমানী 'দূত বা ওহী বাহক'। এভাবে রহস্যাবৃত ব্যাপারটি যখন তাঁর নিকট পরিষ্কার হয়ে গেলো তখনই তিনি পরবর্তী ওহী গ্রহণের জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষমান ছিলেন। ওহী গ্রহণের জন্য মানসিকভাবে যখন প্রস্তুত হয়ে গেলেন তখন জিবরাঈল (আ) পুনরায় ওহী নিয়ে আগমন করলেন।

সহিহ বুখারির মধ্যে জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূল থেকে ওহী নিয়ে আগমন বন্ধের ঘটনা শ্রবণ করেছেন। তিনি বলেছেন: ঘটনার বর্ণনা প্রসঙ্গে রাসূল বলেছেন, আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম এমন সময় হঠাৎ আকাশ থেকে একটি আওয়াজ আমার কানে প্রবেশ করলো। আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আমি সেই ফেরেশতাকে দেখতে পেলাম যিনি আমার নিকট হেরাগুহায় আগমন করেছিলেন। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে কুরসিতে উপবিষ্ট ছিলেন। ভয়ে বিস্ময়ে আমার দৃষ্টি অবনত হয়ে গোলো। অতঃপর আমার সহধর্মিনীর নিকট গিয়ে বললাম, আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। তিনি আমাকে চাদর দ্বারা ঢেকে দিলেন। অতঃপর আল্লাহ "ইয়া আইয়্যুহাল মুদ্দাস্সির" সপ্তম আয়াত পর্যন্ত ওহী নাযিল করেন এবং এরপর থেকে অবিরামভাবে ওহী নাযিল হতে থাকে।

মানুষের নিকট আল্লাহর হুকুম প্রচারের নির্দেশ এবং এর অন্তর্নিহিত বিষয়

সূরায়ে মুদ্দাছছিরের প্রথম আয়াত হতে সপ্তম আয়াত পর্যন্ত আয়াতের মধ্যে রাসূল (ﷺ) কে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তা আপাতঃদৃষ্টিতে বাহ্যিকভাবে খুবই সংক্ষেপ এবং সরল মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে অনন্ত, অসীম ও চিরঞ্জীব স্রষ্টা, প্রতিপালক প্রভুর শাশ্বত উদ্দেশ্যেময় এক কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক নির্দেশনা। এ নির্দেশনার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে যথাক্রমে:

১. উল্লিখিত আয়াতগুলোর মাধ্যমে ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মোক্ষম উদ্দেশ্যে হলো এ পার্থিব জীবনে আল্লার ইচ্ছা বা আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধানের প্রতিকূলে যারাই চলতে থাকবে তাদেরকে এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সজাগ করে তোলা। তারা আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তির ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাদের মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে যাতে আলোড়ন সৃষ্টি এবং ওলট-পালট শুরু হয়ে যায় সেটাও ছিলো অন্যতম উদ্দেশ্যে।

২. প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব মহিমান্বিত মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা দেয়ার উদ্দেশ্যে হচ্ছে, পৃথিবীর মাঝে যেন আল্লাহর ছাড়া অন্য কারোরই বড়ত্ব কিংবা শ্রেষ্ঠত্ব স্থান না পায়; বরং অন্যান্য সকলের অর্থহীন অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে চুরমার করে দিয়ে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দেয়া।

৩. পরিচ্ছদের পবিত্রতা অর্জনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা। 'বাহ্যিক পবিত্রতা' বলতে বোঝায় দৈহিক, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সবকিছুর পবিত্রতা। 'অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা' বলতে বোঝায় আত্মিক পবিত্রতা। যাবতীয় অন্যায়-অনাচার, অশ্লীলতা এবং কলুষতা থেকে মন-মস্তিষ্ক ও অন্তরকে পরিষ্কার করে নিয়ে আত্মার পূর্ণ পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। উপরন্তু সার্বিক পরিচ্ছন্নতা হাসিলের মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীর জন্য এমন এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা যাতে স্বচ্ছ সরল অন্তঃকরণের লোকেরা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সঠিক সত্যের সন্ধান লাভ করে এবং বক্র অন্তঃকরণের লোকদের অন্তর ভয়ে ভীত এবং কম্পিত হতে থাকে। এভাবে গোটা বিশ্বের মানুষ পক্ষে ও বিপক্ষে সকলেই আপনার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে।

৪. উপকার করে তার বিনিময় গ্রহণ না করার প্রকৃত তাৎপর্য হচ্ছে, আপন পরিশ্রম-প্রচেষ্টা বা কাজ-কর্মের দ্বারা অন্যের উপকার করার মধ্য দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা কিংবা প্রাধান্য বিস্তার করার প্রতি যেন কোনোভাবেই গুরুত্ব দেয়া না হয়; বরং পরোপকারের মাধ্যমে নিজেকে বৃহত্তর ত্যাগের জন্য প্রস্তুত করে নেয়া, পরোপকারকে করণীয় কর্তব্য হিসেবে স্বীকার করে অবিরামভাবে একের পর এক কাজ করে যাওয়ার এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই হবে প্রধান উদ্দেশ্যে।

৫. সূরার শেষ আয়াতটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত এবং তাবলীগের কাজ আরম্ভ করার পর আপনার ও আপনার সঙ্গী-সাথীদের ওপর শত্রুদের পক্ষ হতে বিরোধিতা, বিদ্রূপ ঠাট্টা-মশকরা ও নানা ধরনের যুলুম- নির্যাতন অব্যাহত ভাবে আসতে থাকবে। এমনকি আপনি এবং একত্ববাদে বিশ্বাসী আপনার সঙ্গী-সাথিগণকে হত্যা করে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হবে। সে সব বিপদাপদের মুখে আপনাকে শিলাখন্ডের মতো অনড়-অটল থাকতে হবে এবং চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিজের কৃতিত্বের-প্রসঙ্গটি কোনোভাবেই মনে ঠাঁই দিবে না। পার্থিব কোনো লাভের প্রত্যাশাও সেখানে থাকবে না; রবং শুধু প্রভু প্রতিপালকের সন্তুষ্টি বিধান এবং তাঁর দ্বীনের উচ্চমর্যাদা লাভের উদ্দেশ্যেই তা করতে হবে।

আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ কতই না মহান! এ সকল বিধি-বিধান বাহ্যিক দৃষ্টিতে কতই না সহজ, সরল ও সংক্ষিপ্ত। এর শব্দসমূহের গাঁথুনি ও ব্যঞ্জনা কতই না শান্তিপ্রদ ও আকর্ষণীয়। এর অন্তর্নিহিত ভাব-সম্পদ ও ভাষাবৈচিত্র্য কতই না চিত্তোদ্দীপক! এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে এবং কর্মপ্রক্রিয়ার দিক দিয়ে এ সকল বিধি-বিধান কতই না শ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত। কিন্তু এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কতই না কঠিন, এর ফলাফল কতই না বিচিত্র বহুমুখী। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে গোটা পৃথিবীর আনাচে কানাচে নানা সংঘাত ও সমস্যায় বাতিলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অবস্থা হয়ে উঠবে শোচনীয়। শেষ পর্যন্ত বাতিল হবে পরাস্ত ও পর্যদুস্ত। সত্যের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে চারিদিক।

সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহে দাওয়াত তাবলীগের বিষয়াদিও উল্লিখিত হয়েছে। 'ইনযার' (ভয় প্রদর্শন করা) শব্দের অর্থ হচ্ছে, আদম সন্তানদের কিছু কিছু কাজ-কর্ম আছে- যার পরিণতি খারাপ এবং সকলেই এটা অবগত আছে যে, এ পৃথিবীতে মানুষকে তাদের সকল কৃতকর্মের প্রতিফল দেয়া হয় না। এজন্য 'ইনযার' শব্দের ভিন্নতর অর্থ ও আহ্বান হচ্ছে, পৃথিবীর দিনগুলো ছাড়া এমন এক ভিন্নধর্মী কর্মফল দিবসের ব্যবস্থা রয়েছে যেদিন প্রতিটি কর্মের বিনিময় যথার্থভাবে দেয়া হবে। সে দিবসটিই হচ্ছে প্রলয় দিবস, প্রতিদান দিবস, কর্মফল দিবস।

উক্ত বিচার দিবসে কর্মফল দেয়ার অপরিহার্য দাবি এবং তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, আমরা পৃথিবীতে যে ধরনের জীবনযাপন করে থাকি বিচার দিবস থাকার কারণে জীবনযাপনের ধারা ভিন্নতর হওয়া প্রয়োজন।

অবশিষ্ট আয়াতসমূহে বান্দাদের নিকট থেকে এ দাবি ও প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়েছে যে, তারা নির্ভেজাল একত্ববাদের ওপর দৃঢ়ভাবে দন্ডায়মান থাকবে এবং জীবনযাপনের সকল ক্ষেত্রে ও সকল ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে নিজকে সমর্পণ করে দিবে এবং নিজ প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত না হয়ে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী প্রবৃত্তিসমূহকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করবে।

আলোচ্য বিষয়টির সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে যথাক্রমে-
ক. আল্লাহর একত্ববাদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা।
খ. শেষ বিচার দিবস সম্পর্কে অবিচল বিশ্বাস স্থাপন করা।
গ. আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা অর্থাৎ মন্দ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমনসব অপবিত্র ও অশ্লীল কাজ-কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং উত্তম চরিত্র ও পূর্ণ মনুষ্যত্ব অর্জনের কাজ-কর্ম করার ব্যাপারে সর্বদাই সচেষ্ট থাকা।
ঘ. যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা।
ঙ. অতঃপর এ পদ্ধতির সর্বশেষ এবং বিশেষ বিধান হচ্ছে রাসূল - এর রিসালাত ও নবুয়তের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে তাঁর প্রাজ্ঞ পরিচয় লাভ, পথপ্রদর্শনও নির্দেশাবলির আলোকে জীবনের যাবতীয় কাজ-কর্ম সম্পাদন করা।

উল্লিখিত আয়াতসমূহের প্রারম্ভিক সুরে মহান আল্লাহর এক উদাত্ত আহ্বান সুস্পষ্ট, যে আহ্বানে রাসূল কে নবুয়তের মহামর্যাদাপূর্ণ কাজের জন্য ঘুম থেকে জাগ্রত হতে এবং ঘুমের আচ্ছাদন ও গরম বিছানা পরিত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদের বাণী প্রচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হে বস্ত্রাচ্ছাদিত (রাসূল)! আপনি জাগ্রত হোন এবং ভয় প্রদর্শন করুন।

যে নিজের জন্যই বাঁচতে চায় সে আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়ে চলতে পারে। কিন্তু আপনাকে এক বিরাট ও মহান দায়িত্বে আত্মনিয়োগ করতে হচ্ছে তখন ঘুমের সাথে আপনার কী সম্পর্ক? আরাম-আয়েশের সাথে আপনার কী সম্পর্ক? আপনার নরম বিছানার কী প্রয়োজন? কি প্রয়োজন আপনার সুখময় জীবন যাপনের? আপনি উঠে পড়ুন এবং ঐ মহান কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ুন-যা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, যা আপনার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আপনার ঘুম এবং আরাম-আয়েশের সময় এখন অতিক্রান্ত। এখন আপনাকে অবিরাম পরিশ্রম করে যেতে হবে এবং দীর্ঘ ও কষ্টদায়ক সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

আল্লাহর পথে আহ্বান এবং কালেমার দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ হচ্ছে অতীব উঁচু মর্যাদার কাজ। কিন্তু এ পথে চলার ব্যাপারটি হচ্ছে অত্যন্ত ভয়- ভীতিজনক এবং বিপদসংকুল। এ কাজ রাসূল কে শান্তির নীড়, সুখময় পারিবারিক পরিবেশ, আরাম-আয়েশপূর্ণ কোমল শয্যা থেকে টেনে বের করে এনে দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা এবং দুঃখ-কষ্টের অথৈ সাগরে নিক্ষেপ করে দিলো। দাঁড় করিয়ে দিলো মানুষের বাহ্যিক আচরণ এবং শতদাপূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রকৃতগত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দারুণ টানাপোড়েনের মাঝখানে।

তারপর রাসূল - তাঁর অবস্থা, অবস্থান এবং দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে গেলেন এবং বিশ বছরেরও অধিককাল যাবৎ সে জাগ্রত অবস্থার মধ্য দিয়েই অতিবাহিত করলেন। এ দীর্ঘকাল যাবৎ সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ বলতে তাঁর আর কিছুই ছিলো না। সবকিছুকেই তিনি বিসর্জন দিলেন। তাঁর জীবন নিজের কিংবা পরিবার-পরিজনদের জন্য আর রইলো না।

তাঁর জীবন উৎসর্গিত হয়ে গেলো আল্লাহর কাজ বাস্তবায়নের জন্য। তাঁর কাজ ছিলো আল্লাহর প্রতি বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানানো। বিশ্বের বুক থেকে সর্বপ্রকার অসত্য, অন্যায় ও মিথ্যার মূলোৎপাটন করে ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে পথপ্রদর্শন করা।

আল্লাহর পথে আহ্বান'ও সত্যের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কথাগুলো আপাত দৃষ্টিতে ততটা কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর চেয়ে কঠিন এবং কষ্টসাধ্য কাজ পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না।

রিসালাতের আমানত হচ্ছে বিশ্বের বুকে সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ এবং দুর্বহ আমানত। এ আমানত হচ্ছে একপক্ষে বিশ্বময় মানবের চরম উৎকর্ষ ও বিকাশের আমানত এবং অন্যপক্ষে যাবতীয় বাতিল এবং গায়রুল্লাহর প্রভাব প্রতিহত করে তাকে ধ্বংস করার আমানত। সুতরাং তাঁর কাঁধে যে বোঝা চাপানো হয়েছিলো তা ছিলো সমগ্র মানবতার বোঝা, সমপ্ত মতবাদের বোঝা এবং ময়দানে ময়দানে জিহাদ ও তা প্রতিহত করার বোঝা। বিশ বছরেরও অধিককাল যাবৎ অবিরামভাবে তিনি ব্যাপক ও বহুমুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। সে দীর্ঘকাল যাবৎ অর্থাৎ যখন তিনি আসমানী আহ্বান শ্রবণের মাধ্যমে অত্যন্ত কঠিন ও কন্টকময় দায়িত্ব লাভ করলেন। তখন থেকেই তাঁকে কোনো একটি অবস্থায় অন্য কোনো অবস্থা সম্পর্কে বিন্দুমাত্রও গাফিল কিংবা উদাসীন রাখতে পারেনি। আল্লাহ তাঁকে আমাদের এ সমগ্র মানবতার পক্ষ হতে উত্তম বিনিময় দান করুন।

রাসূল (ﷺ) এর প্রতি ওহীর প্রকারভেদ

এখানে আমরা আলোচনার মূল বিষয় থেকে সাময়িকভাবে একটু সরে গিয়ে অর্থাৎ রেসালাত ও নবুয়তের বরকতময় বিষয়াদির বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ওহীর প্রকৃতিও প্রকারভেদ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করার প্রয়োজনবোধ করছি। কারণ এটাই হচ্ছে নবুয়ত বা রিসালাতের উৎস এবং প্রচারের উপায়। ওহীর প্রকৃতি এবং প্রকারভেদ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাইয়িম রাহমাতুল্লাহ আল্লাইহি যে আলোচনা করেছেন তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১. সত্য স্বপ্ন: স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূল (ﷺ) এর ওপর ওহী নাযিল হয়।

২. জিবরাঈল ফেরেশতা দেখা না দিয়ে অর্থাৎ দৃষ্টির আড়াল থেকেই রাসূল অন্তরে ওহী প্রবেশ করিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল (ﷺ) যেমনটি ইরশাদ করেন: জিবরাঈল ফেরেশতা আমার অন্তরে এ কথা প্রবিষ্ট করিয়ে দিলেন যে, কোনো আত্মা সে পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না, যে পর্যন্ত তার ভাগ্যে যতটুকু খাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে পুরোপুরিভাবে তা পেয়ে না যাবে। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং রুযি অন্বেষণের জন্য সৎপথ অবলম্বন করো। রুযিপ্রাপ্তিতে বিলম্ব হওয়ায় তোমরা আল্লাহর অসন্তোষের পথ অন্বেষণে যেন উদ্ধুদ্ধ না হও। কারণ আল্লাহর নিকট যা কিছু রয়েছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া পাওয়া যায় না।

৩. জিবরাঈল ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে রাসূল (ﷺ) কে সম্বোধন করতেন। অতঃপর তিনি যা কিছু বলতেন রাসূল (ﷺ) তা মুখস্থ করে নিতেন। এই অবস্থায় সাহাবিগণও জিবরাঈল ফেরেশতাকে দেখতে পেতেন।

৪. ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূল (ﷺ) এর নিকট ঘন্টা বাজার শব্দের মতো ঢং ঢং শব্দ শোনা যেতো। ওহী নাযিলের এটাই ছিলো সবচেয়ে কঠিন অবস্থা। ঢং ঢং ধ্বনির সংকেত প্রকাশ করতে করতে জিবরাঈল ফেরেশতা ওহী নিয়ে আগমন করতেন এবং রাসূল সাই এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। ওহী নাযিলের সময় কঠিন শীতের দিনেও রাসূল (ﷺ) এর কপাল থেকে ঘাম ঝরতে থাকতো। তিনি উষ্ট্রের ওপর আরোহণরত অবস্থায় থাকলে ওহীর ভারে অথবা চাপে উট মাটিতে বসে পড়তো। এক দফা এভাবে ওহী নাযিল হওয়ার সময় রাসূল (ﷺ) এর মাথা যায়েদ বিন সাবিত (রা) এর উরুর ওপর ছিলো। তখন তাঁর উরুতে এতই ভার অনুভূত হয়েছিলো যে, মনে হয়েছিলো যেন উরু অবশ হয়ে যাবে।

৫. রাসূল - জিবরাঈল ফেরেশতাকে কোনো কোনো সময় নিজের স্বাভাবিক আকৃতিতে দেখতে পেতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সে অবস্থাতেই তিনি তাঁর নিকট ওহী নিয়ে আগমন করতেন। রাসূল (ﷺ) এর নবুয়তী জীবনে এমন অবস্থা দু'বার সংঘটিত হয়েছিলো- যা আল্লাহ সূরা 'নাজম'-এ উল্লেখ করেছেন।

৬. পবিত্র মিরাজের রাতে রাসূল আকাশে অবস্থান করছিলেন সেই সময় আল্লাহ সালাত এবং অন্যন্য বিষয় সম্পর্কে সরাসরি হুকুমের মাধ্যমে ওহী নাযিলের ব্যবস্থা করেছিলেন।

৭. আল্লাহর সাথে রাসূল (ﷺ) এর সরাসরি কথোপকথন। যেমনটি হয়েছিল মূসা (আ) এর সাথে। মূসা (আ) এর সাথে যে আল্লাহর সরাসরি কথোপকথন হয়েছিলো কুরআনে তা অকাট্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর সাথে রাসূল (ﷺ) এর কথোপকথনের ব্যাপারটি কুরআন মাজিদে নয়, হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

কোনো কোনো লোক পর্দা বা আবরণ ব্যতিরেকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) সামনাসামনি কথোপকথনের মাধ্যমে ওহী নাযিলের অষ্টম রীতির কথা বলেছেন। কিন্তু ইসলামের আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সর্বদা এ পদ্ধতিতে ওহী নাযিলের ব্যাপারে মতভেদ চলে আসছে।

সূচনা করলেন ইসলামের প্রচার কাজ, ইসলাম প্রচার গোপন দাওয়াতের তিন বছর

১। ওহে আবৃত (ব্যক্তি)! ২। ওঠ সতর্ক করো। ৩। আর তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। ৪। তোমার পোশাক পরিচ্ছেদ পরিত্র রাখো। ৫। (যাবতীয়) অপবিত্রতা থেকে দূরে থাক। ৬। (কারো প্রতি) অনুগ্রহ করো না অধিক পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ৭। তোমার প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) জন্য ধৈর্য ধর। (আল-মুদ্দাসির-১-৭)

এটা সকলেরই জানা বিষয় যে, মক্কা ছিলো আরববাশির ধর্মীয় চেতনার কেন্দ্রস্থল। এ মক্কাতেই একদিকে যেমন ছিলো একত্ববাদে বিশ্বাস কা'বার তত্ত্বাবধায়ক ও খাদেমগণ, অন্যদিকে তেমনি ছিলো শিরকে লিপ্ত মূর্তিপূজারী প্রতিমার তত্ত্বাবধায়কগণও যাদেরকে পুরো আরববাসী দেখতো শ্রদ্ধা, সম্মান ও পবিত্রতার দৃষ্টিতে। এজন্যই দূরবর্তী স্থানের তুলনায় মক্কায় সংস্কারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ব্যাপারটি ছিলো অনেক বেশি কঠিন ও কষ্টকর।

সেহেতু এখানে এ কাজের জন্য এমনই এক সবল ও শক্তিশালী সংকল্পের প্রয়োজন ছিলো যাতে কোনো বিপদাপদ কিংবা সমস্যা তার সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে কর্মতৎপরতা বন্ধ করে দিতে না পারে।

উক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতেও প্রাথমিক পর্যায়ে মক্কায় ইসলাম প্রচার ও তাবলীগের কাজ-কর্ম সন্তর্পণে ও সঙ্গোপনে করার প্রয়োজন ছিলো, যাতে মক্কাবাসী সামনে আকস্মিকভাবে দ্বৈপক্ষবিক কিংবা উত্তেজনামূলক কোনো অবস্থার সৃষ্টি হয়ে না যায় এবং প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার সাথে অনুরূপ কৌশলেই প্রচারকার্য পরিচালনা করা হয়েছিলো।

সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী দল: এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কথা যে, যাঁরা রাসূল (ﷺ) এর সবচেয়ে কাছের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছিলেন সর্বপ্রথম তিনি তাদেরই নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছিলেন। এ দলের মধ্যে ছিলেন পরিবারের লোকজন, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব।

উপরন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি সেসব লোককে সত্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন - যাঁদের মুখমন্ডলে কর্মশীলতা এবং সত্যপ্রীতির আভাস ছিলো সুস্পষ্ট। তাছাড়া যাঁরা রাসূল (ﷺ) এর সততা, সত্যবাদিতা ও পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সুবিদিত ছিলেন এবং উক্ত কারণে তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন তাঁরা ছিলেন এই দলভুক্ত। রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাঁরা এত বেশি অনুরক্ত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, প্রথম আহ্বানেই সাড়া দিয়ে তাঁরা ইসলাম কবুল করেন এবং প্রথম মুসলমান হওয়ার এক দুর্লভ গৌরব অর্জন করেন। এ দলের মধ্যে প্রথম নম্বরে ছিলেন নবীপত্নী উম্মুল মুমিনীন খাদিজাতুল কুবরা (রা) বিনতে খুওয়াইলিদ। তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস যায়েদ বিন সাবিত বিন শুরাহবীল কালবী।

ইনি যুদ্ধে বন্দী হয়ে দাসে পরিণত হন। পরে খাদীজা (রা) তাঁর মালিক হন। তাঁকে রাসূল (ﷺ) এর নিকট দেন। এরপর তাঁর পিতা এবং চাচা তাঁকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আগমণ করেন। কিন্তু তিনি বাড়ি না গিয়ে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে থাকাকেই বেশি পছন্দ করেন। অতঃপর প্রচলিত প্রথানুযায়ী রাসূল (ﷺ) তাঁকে পালিত পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এজন্য তাঁকে যায়িদ বিন মুহাম্মদ বলে ডাকা হতো। ইসলাম পরে এ প্রথার বিলোপ সাধনের ঘোষণা করেন।

তাঁর চাচাতো ভাই আলী বিন আবু তালিব যিনি তখনো তাঁর লালন-পালনাধীন কিশোর ছিলেন এবং তাঁর গারে সাওরের সফরসঙ্গী আবু বকর সিদ্দীক (রা)। উপরিউক্ত ব্যক্তিবর্গ রাসূল (ﷺ) এর নিকট থেকে দ্বীনে হকের দাওয়াত পাওয়ার সাথে সাথেই তা কবুল করে মুসলমান হয়েছিলেন।

অতঃপর আবু বকর (রা) ইসলাম প্রচারকার্যে তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, কোমল স্বভাব, পছন্দনীয় অভ্যাসের অধিকারী, সচ্চরিত্র এবং উদার মনের ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দানশীলতা, দূরদর্শিতা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সৎসাহচর্যের কারণে তাঁর নিকট লোকজনের আসা-যাওয়া প্রায় সবসময় লেগেই থাকতো। পক্ষান্তরে তিনি তাঁর নিকট আগমনকারী এবং আশপাশে বসবাসকারীদের মধ্যে যাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করতেন তার নিকটেই ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উসমান (রা), জুবায়ের (রা), আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা), সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা) ও তালহা বিন উবায়দুল্লাহ (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। এই মহাসম্মানিত ব্যক্তিগণই হচ্ছেন প্রথম মুসলিম জনগোষ্ঠী।

প্রাথমিক অবস্থায় যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন বেলাল হাবশী (রা) ও ছিলেন সেই দলের অন্তর্ভুক্ত। এরপর ইসলাম কবুল করেন আবু উবায়দা, (রা) আমের বিন জাররাহ (রা), আবু সালমা বিন আব্দুল আসাদ (রা), আরকাম বিন আবিল আরকাম (রা), উসমান বিন মাযউন (রা) এবং তাঁর দুই ভাই যথাক্রমে কোদামা (রা) এবং আব্দুল্লাহ (রা) উবায়দা বিন হারিস বিন মুত্তলিব বিন আবদে মানাফ (রা), সাঈদ বিন যায়েদ (রা), এবং তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ ওমর (রা) এর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব (রা), খাব্বাব বিন আরাত (রা), আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এছাড়া আরো কয়েকজন ব্যক্তি ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়েছিলেন।

মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের কুরাইশ গোত্রের সকল শাখা-প্রশাখার সাথেই আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো। ইবনে হিশাম তাঁদের সংখ্যা বলেছেন চল্লিশ জনেরও বেশি। কিন্তু তাঁদের কিছুসংখ্যক সাহাবিকে প্রথম দলে গণ্য করার ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, এরপর পুরুষ এবং মহিলাগণ দলে দলে ইসলাম কবুল করতে থাকেন। এমনকি মক্কায় ক্রমে ক্রমে ইসলাম নিয়ে আলোচনা বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং জনসাধারণের মধ্যেও এর চর্চা শুরু হয়ে যায়।

তাঁরা সকলেই গোপনে মুসলমান হয়েছিলেন এবং রাসূল গোপনীয়তার মধ্যেই তাঁদের ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার জন্য একত্রিত করে নির্দেশনা প্রদান করতেন। কারণ তখনো ইসলামের প্রচারকার্য ব্যক্তিপর্যায়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও সঙ্গোপনে হয়ে আসছিলো। এদিকে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম দিকের আয়াতসূমহ নাযিল হচ্ছিল। সেসব আয়াতের শেষাংশ একই ধরনের আকর্ষণীয় শব্দমালার সমন্বয়ে গঠিত এবং ঝংকার ও শ্রুতিমাধুর্যের দিক দিয়ে ছিলো বড়োই তৃপ্তিদায়ক। ভাবধারার দিক দিয়ে আয়াতগুলো ছিলো নীরব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের সাথে সঙ্গতিশীল।

উপরন্তু আয়াতগুলোতে আত্মশুদ্ধির জন্য প্রশংসা এবং অশ্লীলতায় নিমজ্জিতদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে। এতে জান্নাত ও জাহান্নামের চিত্র এতো নিপুণভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যেন তা চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ভেসে উঠেছে। এ আয়াতসমূহ ঈমানদারদের তৎকালীন মানবসমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং ভিন্নতর এক পরিবেশে পরিভ্রমণ করতে থাকে।

সালাত বা আনুষ্ঠানিক প্ৰাৰ্থনা

প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব আয়াত নাযিল হয় তাতে সালাতের নির্দেশনা বিদ্যমান ছিলো। মুকাতিল বিন সোলায়মান বলেছেন, আল্লাহ ইসলামের প্রাথমিক অবস্থান ফজরের দু' রাকাত এবং মাগরিবের দু' রাকাত সালাত ফরয করেছিলেন কারণ আল্লাহর ইরশাদ করেছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় স্বীয় প্রতিপালকের প্রশংসা দ্বারা তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।

ইবনে হাজার আসকালানি (রা) বলেছেন: রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবিগণ (রা) মিরাজের ঘটনার পূর্বে সেভাবেই সালাত আদায় করতেন (অর্থাৎ দু'ওয়াক্ত)। তবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বে তা ফরয ছিলো কি ছিলো না সে ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে একবার করে সালাত ফরয ছিলো। হারিসা ইবনে উসামা ইবনে লাহিয়ার মাধ্যমে বর্ণনাকারীদের মিলিত পরম্পরা সূত্রের বরাতে যায়েদ ইবনে হারিছা বর্ণনা করেছেন:

রাসূল (ﷺ) এর নিকট যখন প্রথম ওহী নাযিল হলো তখন জিবরাঈল (আ) আগমন করলেন এবং তাঁকে অযুর পদ্ধতি শিক্ষা দিলেন। যখন অযু শেখা হলো তখন এক চোলি (প্রায় ২৫০ গ্রাম) পানি নিয়ে লজ্জাস্থানে ছিটিয়ে দিলেন। ইবনে মাজাহও এ মর্মে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

বারা ইবনে আযির এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতেও ঐ ধরনের হাদিছ বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হাদিছে একথাও উল্লেখ্য যে, 'সালাত' প্রাথমিক অবস্থায় ফরযকৃত কর্তব্যসমূহের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

ইবনে হিশামের বর্ণনায় একথা রয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবি (রা) সালাতের সময় গোপন ঘাঁটিতে চলে যেতেন এবং গোত্রীয় লোকজনদের দৃষ্টির অন্তরালে সালাত আদায় করতেন। আবু তালিব একবার রাসূল এবং আলী (রা) কে সালাত আদায় করতে দেখেন এবং জিজ্ঞাসা করে প্রকৃত বিষয়টি অবগত হলে এর ওপর অটল থাকার পরামর্শ দান করেন।

কুরাইশদের নিকট দাওয়াতী কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

আনুষাঙ্গিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, সে সময় যদিও ইসলাম প্রচারের কাজ-কর্ম ব্যক্তিগত পর্যায়ে অত্যন্ত গোপনীভাবে চলছিলো, কিন্তু তা সত্ত্বেও কুরাইশদের নিকট তা সম্পূর্ণ অজানা ছিলো না।

মুহাম্মদ গাযযালীর লিখিত বিবরণে জানা যায় যে, যদিও ইসলাম প্রচারের কাজ সঙ্গোপনে চলছিলো তবু এর খবরাদি কুরাইশদের নিকট পৌঁছে গিয়েছিলো। কিন্তু কুরাইশরা এসব ঘটনার ওপর ততটা গুরুত্ব আরোপ করেনি। খুব সম্ভব তারা মুহাম্মদ (ﷺ) কে সে ধরনের একজন গতানুগতিক ধার্মিক ব্যক্তি বলে মনে করেছিলো যিনি দেব এবং দেবত্বের প্রাপ্য সম্পর্কে কথোপকথন করেন। যেমনটি উমাইয়া ইবনে আবিস সালত কুস ইবনে সায়িদা এবং আমর ইবনে নুফাইল ও অন্যান্যরা করেছিলো। অবশ্য রাসূল (ﷺ) এর দাওয়াতী কাজ এবং এর প্রভাব ক্রমশঃ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় কুরাইশরা পূর্বের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলো এবং সমবায়ের গতিবেগের সাথে সাথে রাসূল (ﷺ) এর প্রচারকার্যে ফলাফলের প্রতি তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়ে আসছিলো।

তিন বছর পর্যন্ত প্রচারকার্য ব্যক্তি পর্যায়ে অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিলো। সে অন্তবর্তী সময়ের মধ্যেই ঈমানদার ব্যক্তিদের এমন একটি ছোট-খাটো দল তৈরি হয়ে গিয়েছিলো—যাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং আল্লাহর রাসূল কে যথার্থ মর্যাদা প্রদানের জন্য জীবন্ত জীবের হৃৎপিন্ডের মতো তারা সারাক্ষণ সচেষ্ট থাকতেন। এরপর স্বজাতীয় ও স্বগোত্রীয় লোকজনদের নিকট প্রকাশ্যভাবে ইসলাম প্রচারের জন্য রাসূল (ﷺ) এর নিকট ওহী নাযিল হলো এবং তাদের প্রতিমা পূজার অসারতা এবং প্রতিমার স্বরূপ উদ্ঘাটন করে দিতে বলা হলো।

প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ

প্রথম: এক পর্যায়ে গোপনে প্রায় তিন বছর ইসলাম প্রচার বা দাওয়াতী কার্যক্রম চালানোর পর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে মানুষের এর নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য রাসূল (ﷺ) এর প্রতি আদেশ দেয়া হয়। এই বিষয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে যে নির্দেশ প্রদান করা হয় তাহলো: (সর্বপ্রথম) আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন। (সূরা আশ-শুআরা: আয়াত-২১৪)

এ সূরার মধ্যে প্রথমে মুসা (আ) এর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এতে মুসা (আ) এর নবুয়তের প্রারম্ভিককাল কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিলো, বনি ইসরাঈলদেরকে সাথে নিয়ে কিভাবে তিনি হিজরত করে ফিরাউনের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভ করেছিলেন এবং পরিশেষে কিভাবে সদলবলে ফিরাউনকে নীলনদে নিমজ্জিত করা হয়েছিলো সেসব কথা বলা হয়েছে।

অন্য কথায়, ফিরাউন এবং তার কওমকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করতে গিয়ে মুসা (আ) কে যেসব পর্যায়, অতিক্রম করতে হয়েছিলো-এ ছিলো কার্যক্রমের একটি সমন্বিত আলোচনা।

এ ব্যাপারে আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে, রাসূল কে যখন তাঁর আত্মীয়- স্বজন এবং স্বগোত্রীয় লোকদের নিকট প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করার নির্দেশ দেয়া হলো সেই প্রসঙ্গে মুসা (আ) এর ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণসমূহ এই কারণেই তুলে ধরা হলো- যাতে প্রকাশ্যে দাওয়াতের পর কিভাবে মিথ্যা এবং বাতিলের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়ে যায় এবং হকপন্থিদের কিভাবে অন্যায়- অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয় তার একটি চিত্র রাসূল এবং সাহাবায়ে কিরামদের সম্মুখে বিদ্যমান থাকে।

দ্বিতীয়: এ সূরার মধ্যে নবী-রাসূলদের মিথ্যা প্রতিপন্নকারী জাতিসমূহ, যথা: ফিরাউন ও তার দল ব্যতীত নূহ (আ) এর সম্প্রদায়, আদ, সামুদ, ইবরাহীম (আ) এর সম্প্রদায়, লুত (আ) এর সম্প্রদায় এবং আসহাবুল আইকার পরিণতির কথাও উল্লিখিত হয়েছে।

সম্ভবত এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে, যে সকল কাওম নবী-রাসূলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন, তাদের ওপর যুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে কিংবা কোনো কোনো নবীকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের হঠকারিতার পরিণতি, কী কৌশলে আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিতে পারেন, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এবং ঈমানদারগণ কঠিন বিপদাপদ পরিবেষ্টিত থেকেও আল্লাহর রহমতে কিভাবে পরিত্রাণ লাভ করে থাকেন তা তুলে ধরাই হচ্ছে এর প্রধান উদ্দেশ্যে।

আত্মীয়-স্বজনদেরকে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ

প্রথম সমাবেশ: যাই হোক, উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূল 'বনু হাশেম' গোত্রকে নিয়ে এক সমাবেশের আয়োজন করেন। সে সমাবেশে বনু মুত্তালিব বিন আবদে মানাফেরও একদল লোক উপস্থিত ছিলো। সমাবেশে উপস্থিত লোকদের সংখ্যা ছিলো পঁয়তাল্লিশ জন। সমাবেশের শুরুতেই রাসূল শুভ এর চাচা আবু লাহাব হঠাৎ বলে উঠলো 'দেখো ভাতিজা, এরা সকলেই তোমার নিকট আত্মীয় চাচা, চাচাতো ভাই ইত্যাদি। বাচালতা বাদ দিয়ে এদের সাথে ভালোভাবে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করো। তোমার জানা উচিত যে, তোমার জন্য সকল আরববাসীদের সাথে শত্রুতা করার শক্তি আমাদের নেই। তোমার আত্মীয় স্বজনদের পক্ষে তোমাকে ধরে কারারুদ্ধ করে রাখাই কর্তব্য। সুতরাং তোমার জন্য তোমার পিতৃপরিবারই যথেষ্ট। তুমি যদি তোমার ধ্যান-ধারণা এবং কথাবার্তায় অটল থাকো তবে এটা অনেক সহজ এবং স্বাভাবিক যে, সমগ্র কুরাইশ গোত্র তোমার বিরুদ্ধে 'অস্ত্রধারণ' করবে এবং অন্যান্য আরব গোত্র এ ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। অতঃপর এটা আমার জানার বিষয় নয় যে, স্বীয় পিতৃপরিবারের আর অন্য কেউ তোমার চেয়ে বড়ো সর্বনাশা হতে পারে।'

আবু লাহাবের এ জাতীয় অর্থহীন আস্ফালনের প্রেক্ষাপটে রাসূল সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করলেন এবং ঐ নীরবতার মধ্য দিয়েই সমাবেশ শেষ হয়ে গেলো।

দ্বিতীয় সমাবেশ: এরপর রাসূল (ﷺ) স্বগোত্রীয় লোকজনদের একত্রিত করে দ্বিতীয় ব্যবস্থা করেন। সমাবেশে উপস্থিত লোকদেরকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বললেন- 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমি তাঁর প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করছি, তাঁর ওপরেই নির্ভর করছি এবং সাক্ষ্য প্রদান করছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই উপাসনার যোগ্য নয়। তিনি একক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো অংশীদার নেই।

অতঃপর তিনি বলেন: 'কল্যাণকামী পথপ্রদর্শক আপন আত্মীয়-স্বজনের নিকট কখনোই মিথ্যা বলতে পারেন না। সেই আল্লাহর শপথ-যিনি ব্যতীত অন্য কোনোই উপায় নেই। বিশেষভাবে তোমাদের জন্য এবং সাধারণভাবে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য আমি 'আল্লাহর রাসূল' হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। আল্লাহ জানেন তোমরা সকলেই সেভাবে মৃত্যুর সম্মুখীন হবে যেমনটি বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ো এবং সেভাবেই পুনরায় উত্থিত হবে যেমনটি তোমরা ঘুমন্ত অবস্থা থেকে জাগ্রত হও। পুনরুত্থান দিবসে তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে হিসাব গ্রহণ করা হবে এবং পুণ্যের ফলশ্রুতি হিসেবে চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির আবাসস্থল জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।

রাসূল (ﷺ) এর কথা শুনে তাঁর চাচা আবু তালিব বললেন- 'আমরা কতটুকু তোমায় সাহায্য করতে পারবো, তোমার উপদেশ আমাদের জন্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে এবং তোমার কথাবার্তা কতটুকু সত্য বলে আমরা জানবো! এখানে সমবেত লোকজন তোমার পিতৃপরিবারের সদস্য এবং আমিও অনুরূপ একজন সদস্য। পার্থক্য শুধু এতুটুকুই যে, তোমার সহযোগিতার জন্য তাদের তুলনায় আমি অগ্রগামী আছি। অতএব তোমার নিকট যে নির্দেশনাবলি নাযিল হয়েছে সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকো। আল্লাহ ভরসা! আমি অবিরামভাবে তোমার কাজ-কর্মে সাহায্য-সহযোগিতা করবো এবং তোমার প্রতি আমার সদয় সহানুভূতি সবসময় থাকবে। তবে আব্দুল মুত্তালিবের দ্বীন ত্যাগ করতে আমি প্রস্তুত নই।

আবু লাহাব বললো- আল্লাহর শপথ! এ হচ্ছে অন্যায় এবং দুষ্টমি-ফাযলামি। একে অন্যদের আগে তোমরাই থামিয়ে দাও। আবু লাহাবের মুখ থেকে উক্ত কথা শোনার পর আবু তালিব বললেন: আল্লাহর শপথ করে বলছি! যতক্ষণ আমার দেহে প্রাণ থাকবে আমি মুহাম্মদের হেফাযত বা রক্ষণাবেক্ষণ করতে থাকবো।

সাফা পর্বতের ওপর

যখন রাসূল (ﷺ) খুব ভালোভাবে নিশ্চিত হলেন, যে, আল্লাহর দ্বীন প্রচারের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আবু তালিব তাকে সাহায্য করবেন তখন একদিন তিনি সাফা পর্বত শিখরে আরোহণ করে জনসাধারণকে উচ্চৈস্বরে আহ্বান জানালেন- 'হায় শুভ সকাল বলে, রাসূল (ﷺ) এর কণ্ঠে উক্ত আহ্বান শুনে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা সেখানে যখন সমবেত হলো তখন তিনি সকলকে উদ্দেশ্যে করে আল্লাহর একত্ববাদ, নিজের নবুয়তপ্রাপ্তি এবং পরকালীন জীবনের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় সকলকে আহ্বান জানালেন। এ ঘটনার এক অংশ সহিহ বুখারিতে ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক এভাবে বর্ণিত হয়েছে।

যখন "ওয়ানজির আশিরণতাকাল কারাবিন" আয়াতটি নাযিল হলো তখন রাসূল সাফা পর্বতশিখরে আরোহণ করে কুরাইশ গোত্রের সকলকে লক্ষ করে বিশেষ কতগুলো শব্দ উচ্চারণ করে চিৎকার করতে থাকলেন- 'ওহে বনু ফির! ওহে বনু আদী! আবদে মানাফ ইত্যাদি!'

উক্ত আহ্বান শুনতে পেয়ে সকলেই সেখানে সমবেত হলো। এমনকি কোনো ব্যক্তির পক্ষে সেখানে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলেও ব্যাপারটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য সে প্রতিনিধি প্রেরণ করলো। মোটকথা, কুরাইশ গোত্রের সকলেই। তৎকালে আরবের নিয়ম ছিলো। ভয়ষ্কর কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে কিংবা কেউ দেশবাশির নিকট কোনো গুরুতর বিষয়ে বিচার কিংবা প্রতিকার প্রার্থী হলে পর্বত শীর্ষে আরোহণপূর্বক (ইয়া সাবাহাহ), হায় প্রাতকাল, বলে চিৎকার করতে থাকতো। এতে লোকজন সেখানে সমবেত হতো।

সেখানে আবু লাহাব ও উপস্থিত ছিলো। অতঃপর রাসূল বললেন: 'হে কুরাইশগণ! তোমরা বলো, আজ (এ পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে) যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, পর্বতের আড়ালে এক প্রবল শত্রু সৈন্যবাহিনী তোমাদের সবকিছু লুণ্ঠন করে নেয়ার জন্য লুকিয়ে আছে, তাহলে তোমরা আমার এ কথা বিশ্বাস করবে কি?'

সকলে সমস্বরে উত্তর করলো, হ্যাঁ নিশ্চয়, বিশ্বাস না করার কোনোই কারণ নেই। আমরা কখনোই আপনাকে মিথ্যা বলতে শুনি নি।'

তখন রাসূল গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন: 'যদি তা-ই হয়, বেশ শোনো, আমি তোমাদেরকে পাপ ও আল্লাহদ্রোহিতার ভীষণ পরিণাম এবং তার জন্য অবশ্যম্ভাবী কঠোর দণ্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য প্রেরিত হয়েছি।

তাঁর উক্ত সাবধান বাণী শুনে আবু লাহাব অত্যন্ত ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলো- 'তোর সর্বনাশ হোক! এ জন্যই কি তুই এখানে আমাদেরকে সমবেত করেছিস?

আবু লাহাবের উক্ত আচরণের ফলশ্রুতিতে আয়াতে কারীমা- (আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং সে নিজে ধ্বংস হোক) নাজিল হয়।

উক্ত ঘটনার আরেক অংশ ইমাম মুসলিম সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেছে। তিনি বলেন: যখন আয়াত নাযিল হয় তখন রাসূল আর চিৎকার করে সকলের প্রতি আহ্বান জানালেন। এ আহ্বান ছিলো বিশেষ এবং 'সাধারণ' উভয় ভাবধারার। তিনি চিৎকার করে বললেন: 'হে কুরাইশগণ! জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে বনু কাব গোত্রের লোকেরা! জাহান্নাম থেকে নিজেদের রক্ষা করো। হে মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা! আমি আল্লাহর পাকড়াও এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবো না। তবে তোমাদের সাথে বংশীয়, আত্মীয়তার সূত্রে যতটুকু উপকার করা সম্ভব ততটুকু করবো।

সত্যের প্রকাশ্য ঘোষণা এবং মুশরিকদের প্রতিক্রিয়া

উপরোল্লেখিত আহ্বান তখনো মক্কার আশপাশে শোনা যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় ওহী নাযিল হলো, "কাজেই তোমাকে যে বিষয়ের হুকুম দেয়া হয়েছে তা জোরে শোরে প্রকাশ্যে প্রচার কর, আর মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।" (সূরা আল হিজর আয়াত-৯৪)

এরপর রাসূল বহুত্ববাদের বিশ্বাস এবং মিথ্যার পর্দা উম্মোচন করে প্রতিমান প্রকৃতি, মর্যাদা এবং মূল্যের অসারতা সম্পর্কে প্রকাশ্যভাবে কথা বলা শুরু করলেন। এ প্রতিমাগুলোর জড়ত্ব, অসমর্থ্যতা ও অকর্মণ্যতা সম্পর্কে যুক্তি- প্রমাণ তিনি জোরালো কন্ঠে তুলে ধরলেন এবং যাঁরা এদেরকে আল্লাহ এবং নিজের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে তারা যে কত ভ্রষ্টতার মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে তাও বলতে লাগলেন।

রাসূল (ﷺ) এর এ প্রচারাভিযান ছিলো অত্যন্ত প্রবল এবং প্রজ্ঞানিষ্ঠ। তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নিকট জোরালো কন্ঠে ঘোষণা করলেন যে, এখন থেকে নবুয়তের বিশ্বাসের ওপরেই নির্ভর করবে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের ব্যাপারটি। যুগ যুগ ধরে গোত্রীয় বা বংশীয় সম্পর্কের যে বন্ধন টি আরবে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে আল্লাহ কর্তৃক ভীতি প্রদর্শনের প্রচন্ডতাপে বিগলিত হয়ে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।

মূর্তিপূজক ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে সত্যের এ আপোষহীন ঘোষণা যখন যুগ-যুগান্তরের বহুত্ববাদী বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে ধস সৃষ্টি করলো তখন প্রচণ্ড ক্রোধ ও ক্ষোভে পৌত্তলিক ও উৎকট অহংবাদী মক্কাবাসী এমনভাবে ফেটে পড়লো যেমনটি ঝঞ্চবিক্ষুব্ধ মেঘমালার বক্ষনিসৃত বজ্রের ভয়ঙ্কর গর্জন শান্ত পৃথিবীর ঊর্ধ্বদেশে আকাশমণ্ডল ফেটে পড়তে চায়। কুরাইশগণ উঠে-পড়ে লাগলো সদ্য অঙ্কুরিত এ একত্ববাদের মূলোৎপাটন করে ফেলার জন্য। কারণ একত্ববাদের এ ধারণাই যে শেষ পর্যন্ত উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত তাদের ঐতিহ্য ও আকীদাকে একদম নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে সে রকম একটি আশঙ্কা তাদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিলো।

রাসূল (ﷺ) এর একত্ববাদের ঘোষণায় কুরাইশগণ একদম ক্ষেপে উঠলো: কারণ এটা তারা জানতো যে, একত্ববাদ, নবুয়ত ও পরকালীন জীবনের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার অর্থই হবে নিঃশর্তভাবে রাসূল নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং কোনো আপত্তি ছাড়াই তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। অন্যান্য বিষয়ের কথা তো দূরেই থাক, এমনকি নিজের প্রাণ এবং ধন-সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইচ্ছানুযায়ী তা করা চলবে না। এর অর্থ এ দাঁড়াবে যে, ধর্মীয় ব্যাপারে আরববাসীদের ওপর মক্কাবাসী পৌরহিত্য ও নেতৃত্বের যে মর্যাদা লাভ করে আসছিলো তা সমূলে উৎপটিত হয়ে যাবে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর সন্তুষ্টির বাইরে নিজ খেয়াল-খুশিমতো কোনো কাজ করার অধিকার তাদের থাকবে না। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, দুর্বল শ্রেণির লোকজনদের প্রতি তারা যে অন্যায়-অত্যাচার করে এসেছে এবং সকাল-সন্ধ্যা যেসব অপকর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকেছে সেসব করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। কুরাইশগণ এসব ব্যাপারে ভালোভাবেই অবগত ছিলো এবং এজন্যই তাদের দৃষ্টিতে এ অপমানজনক অবস্থাকে মেনে নিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের এ মানসিকতার পেছনে মঙ্গলজনক কিংবা সম্মানজনক বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। আল্লাহ বলেন- "বরং কোনো কোনো মানুষ এমনটি চায় যে, নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনেও পাপকার্যে লিপ্ত থাকে।" (সূরা আল-কিয়ামাহ: আয়াত-৫)

আল্লাহর একত্ববাদ এবং দ্বীন সম্পর্কে রাসূল যে সমস্ত কথা বললেন, কুরাইশগণ তার সত্যতা এবং যথার্থতা উপলব্ধি করলেও মাত্র একটি কারণে তা মেনে নিতে পারল না। সে কারণটি হচ্ছে তাদের কায়েমি স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়া অর্থাৎ তাদের শক্তিমত্তা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চলে যাওয়ার ভয়। অথচ আল্লাহর রাসূল কে অস্বীকার করা কিংবা এড়িয়ে চলার ক্ষমতাও তাদের ছিলো না। কারণ সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, পরোপকারিতা, উদারতা, বুদ্ধিমত্তা, চরিত্রমাধুর্য, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি সকল মানবিক গুণাবলির সমন্বয়ে সর্বকালের সকল মানুষের জন্য আদর্শ এবং মহিমান্বিত এমন এক ব্যক্তিত্ব তিনি ছিলেন যেমনটি তারা কোনোকালেও শোনেন নি কিংবা দেখেনও নি। এহেন পরিস্থিতিতে তারা কতকটা যেন দিশেহারার মতো হয়ে পড়লো এবং আসলেই তাদের দিশেহারা হওয়ারই কথা ছিলো। তাদের বংশানুক্রমিক ইতিহাসে রাসূল (ﷺ) ছিলেন নজিরবিহীন এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব।

অবশেষে কুরাইশগণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর তাদের ধারণায় তারা একটি পথ খুঁজে পেলো এবং সেটি হলো এ যে, তারা তাঁর চাচা আবু তালিবের নিকট যাবে এবং তার নিকট দাবি করবে যে, তিনি যেন তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে এমন কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখেন।

কুরাইশরা তাদের উপাস্য প্রতিমাদের প্রসঙ্গটি উত্থাপনেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। মুহাম্মদ (ﷺ) তাদের প্রতিমাদের সম্পর্কে নানা ধরনের কটুবাক্য ও অবমাননাকর উক্তি করে তাদের উপাসনা না করার কথা বলেছে, এটা কিছুতেই বরদাস্ত করা যেতে পারে না। পূর্বপুরুষের আমল থেকে বংশপরম্পরায় তারা যে সকল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি প্রচলন করে এসেছে আজ মুহাম্মদের এক কথায় সবই বাদ দিতে হবে; এটা কেনো এবং কিভাবে তা সম্ভব? তাদের পূর্বপুরুষগণ তাহলে কি মূর্খ ছিলেন? সাত-পাঁচ এ জাতীয় নানা কথা, নানা প্রশ্ন এবং নানা যুক্তিতর্কের পসরা নিয়ে তারা আবু তালিবের নিকট যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো।

নিজেদের দাবি নিয়ে আবু তালিবের সমীপে কুরাইশ প্রতিনিধিদল

ইবনে ইসহাক বলেছেন, কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি একত্রিত হয়ে আবু তালিবের নিকট গিয়ে বললো: 'হে আবু তালিব! আপনার ভাতিজা আমাদের দেব দেবীকে গালিগালাজ করছেন, আমাদের ধর্মের নিন্দা করছেন, আমাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিচার বিবেকহীন মূর্খ বলছেন এবং আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে ধর্মভ্রষ্ট বলছেন। অতএব হয় আপনি তাকে এ জাতীয় কাজ-কর্ম থেকে বিরত রাখুন নতুবা আমাদের এবং তার মধ্য থেকে আপনি দূরে সরে যান। কারণ আপনিও আমাদের মতোই; তার বক্তব্য অনুযায়ী ভিন্নদিকের অনুসারী তার ব্যাপারে আমরাই আপনার ভাতিজার জন্য যথেষ্ট হবো।

কুরাইশ প্রতিনিধিদলের উক্ত দাবি-দাওয়ার বিষয়ে আবু তালিব অত্যন্ত ঠাণ্ডা মেজাজে বিভিন্ন কথাবার্তা বলে তাদের বুঝিয়ে বিদায় করলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে তারা ফের চলে গেলো। এদিকে রাসূল - পূর্ণোদ্যমে তাঁর প্রচারকার্য চালিয়ে যেতে থাকলেন।

হজ্জযাত্রীদেরকে দূরে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে কুরাইশদের বৈঠক

তখন কুরাইশগণের সামনে আরো একটি সমস্যা দেখা দিলো। রাসূল প্রকাশ্য প্রচারভিযানের কয়েক মাস অতিবাহিত হতে না হতেই হজ্জের মৌসুম এসে উপস্থিত হলো।

যেহেতু উক্ত মৌসুমে আরব ভূমির দূর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিদলের আগমন আরম্ভ হয়ে যাবে এবং যেহেতু মুহাম্মদ (ﷺ) কে নিয়ে কুরাইশরা এমন এক কথা বলার পরিকল্পনা আঁটলো- যাতে মুহাম্মদ (ﷺ) এর ওপর তাদের আস্থা-বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায় এবং তাঁর কথাবার্তায় তাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয়।

উক্ত পরিকল্পনার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা ও সলা-পরামর্শের জন্য তারা অলীদ বিন মুগীরার গৃহে সমবেত হলো। অলীদ বললোঃ 'এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত ঠিক করো: যাতে এ নিয়ে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধ কিংবা মতপার্থক্যের সৃষ্টি না হয় এবং তোমাদের একজনের কথাকে অন্য জন যেন মিথ্যা প্রতিপন্ন না করে বসে।

অন্যেরা বললো: 'আপনিই একটা উপযুক্ত মন্তব্য ঠিক করে দিন, তাহলেই তা আমাদের সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।

অলীদ বললো: 'না, তা হবে না; বরং তোমরা বলবে এবং আমি তা শুনবো।

অলীদের এ কথার পর কয়েকজন সমস্বরে বলে উঠলো; ঠিক আছে, আমরা মন্তব্য করবো যে, তিনি একজন গণক।

অলীদ বললো: 'না, আল্লাহর শপথ! তিনি কাহেন (গণক) নন। আমরা অনেক গণক দেখেছি। তিনি তো কাহেনদের মতো গুণগুণ করে গান না। ছন্দাকারে কবিতা আবৃত্তি করেন না কিংবা কবিতা রচনাও করেন না।'

অন্যেরা বললো: 'তা হলে আমরা তাকে একজন পাগল বলবো।'

অলীদ বললো: 'না তিনি তো পাগল নন, আমরা পাগল দেখেছি এবং তার ধরন সম্পর্কেও জানি। এ লোকের মধ্যে পাগলদের মতো ঝিম মেরে থাকা, অস্বাভাবিক কোনো কাজ-কর্ম করা, আবোল তাবোল কথাবার্তা বলা কিংবা অনুরূপ কোনো কিছুই তো দেখি না।'

অন্যেরা বললো: 'তাহলে আমরা বলবো যে, তিনি একজন কবি।

অলীদ বললো: তার মধ্যে কবির কোনো বৈশিষ্ট্য নেই যে, তাকে কবি বলা হবে। আমাদের যুদ্ধাকৃত ছন্দ নযম, হাজয, কারিম, মাকবুয, মাবসূত ইত্যাদি সকল ধরনের কাব্যরীতি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। যা হোক, তার কথাবার্তাকে কিছুতেই কাব্য বলা যেতে পারে না।

অন্যেরা বললো- 'তাহলে আমরা তাকে যাদুকর বলবো।'

অলীদ বললো: 'এ ব্যক্তিকে যাদুকরও বলা যাবে না। আমরা যাদুকর এবং যাদু সংক্রান্ত নানা ফন্দি-ফিকির দেখেছি, তারা সত্য-মিথ্যা কত কথা বলে, কত অঙ্গভঙ্গি করে, কত যে ঝাড়-ফুঁক করে এবং গিরা দেয় তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু মুহাম্মদ তো যাদুকরদের মতো সত্য-মিথ্যা কথা বলা, ঝাড়-ফুঁক কিংবা গিরে দেয়া কোনো কিছুই করে না।'

অন্যেরা তখন বললো: 'আমরা তাহলে আর কি বলবো?

অলীদ বললো: আল্লাহর শপথ! তার কথাবার্তা খুবই মিষ্টি মধুর, তার ভিত বা শিকড় বড়োই শক্ত এবং শাখা-প্রশাখা বড়োই মনোমুগ্ধকর। তোমরা তার সম্পর্কে যা-ই বলোনা কেন, যারা তার সংস্পর্শে কিছুক্ষণ থাকবে তারা তোমাদের কথাবার্তাকে অবশ্যই মিথ্যা মনে করবে।

অতঃপর কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে পুনরায় অলীদ বললো 'তার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেই হয় তাহলে বড়োজোর যাদুকর বলতে পারো। তার জন্য এটাই কিছুটা হলেও উপযোগী বলে মনে হবে। তিনি এমন সব কথা উত্থাপন করেছেন যা যাদু বলেই মনে হয়। তিনি পিতা-পুত্রের মধ্যে, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে, গোত্রে গোত্রে এবং আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত তারা তাকে 'যাদুকর' বলার সিদ্ধান্তে একমত হয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলো।

কোনো কোনো বর্ণনায় একথাও বলা হয়েছে যে, অলীদ যখন তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিলো তখন তারা বললো: আপনি তাহলে আপনার গ্রহণযোগ্য অভিমত ব্যক্ত করুন। প্রত্যুত্তরে অলীদ বলেছিলো- 'আমাকে কিছু চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ দিন।' এরপর সে অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে এবং উল্লিখিত অভিমত ব্যক্ত করে।

এ ব্যাপারে অলীদ সম্পর্কে সূরা মুদ্দাসসিরের ১৮-২৬ নম্বরের ১৬টি আয়াত নাযিল হয়েছে। যার মধ্যে কয়েকটি আয়াতে তার চিন্তার ধরন সম্পর্কিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- "সে চিন্তা করলো এবং একটি মন্তব্য স্থির করলো। সুতরাং সে ধ্বংস হোক, কেমন মন্তব্য স্থির করলো? অতঃপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, অতঃপর মুখ বিকৃতি করলো। আরো অধিক বিকৃত করলো। তারপর মুখ ফিরালো এবং গর্ব করলো, অবশেষে বললো, এ তো কিছুই নয়, শুধু যাদু এ তো পূর্ব হতে চলে আসছে। এ তো একটি মানবীয় কালাম ছাড়া আর কিছু নয়।"

যা-ই হোক, তারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো তা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে লাগলো। কিছু সংখ্যক কাফির মক্কায় আগমনকারী হজ্জযাত্রীদের আসার পথে কিংবা মক্কার অলি-গলির মোড়ে মোড়ে জটলা করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রচার এবং তাবলীগের ব্যাপারে যাচ্ছে তাই বলে হজ্জযাত্রীদেরকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করলো। রাসূল সম্পর্কে এসব ব্যাপারে আবু লাহাব' অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

হজ্জের মৌসুমে যজ্জযাত্রীদের তাঁবুতে গিয়ে এবং উকায় মাজিন্নাহ ও যুলমাজায বাজারে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন আল্লাহর একত্ব এবং দ্বীনের তাবলিগ করতেন তখন 'আবু লাহাব' তাঁর পিছনে পিছনে গিয়ে বলতো- 'তোমরা কেউ এর কথায় কান দিও না। সে মিথ্যুক এবং বে-দ্বীন হয়ে গিয়েছে।

এভাবে দৌড়-ঝাঁপের ফল হলো এ যে, হজ্জ পালনের পর হাজীগণ যখন নিজ নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন করলো তখন তারা রাসূল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হয়ে গেলো। এছাড়া তারা এ বিষয়টিও অবগত হয়ে গেলো যে, মুহাম্মদ ও নুবওয়তপ্রাপ্তির দাবি করেছেন। এমনিভাবে হজ্জযাত্রীদের মাধ্যমেই রাসূল (ﷺ) এর নবুয়ত এবং ইসলামের প্রাথমিক কথাবার্তা সমগ্র আরব জাহানে ছড়িয়ে পড়লো।

কুরাইশদের বিরোধিতার বিভিন্ন কৌশল

কুরাইশগণ যখন দেখলো যে, মুহাম্মদ (ﷺ) কে তাঁর দ্বীনের দাওয়াত এবং তাবলীগ থেকে বিরত রাখার কোনো কৌশলই কার্যকর হচ্ছে না। তখন তারা পুনরায় চিন্তা-ভাবনা করে তাঁর তাবলীগী কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য নানামুখী পন্থা-প্রক্রিয়া অবলম্বন শুরু করলো। যেসব পস্থা তারা অবলম্বন করেছিলো তা নিয়ে তুলে ধরা হলো-

১. বিরোধিতার ঠাট্টা-বিদ্রূপ: অকারণে হাসাহাসি, ঠাট্টা-তামাশা, ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা, মিথ্যাবাদী বলা, অবমাননাকর উক্তি করা ইত্যদির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে তারা জর্জরিত, অতিষ্ঠ করে তুলতে চাইলো। এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে ছিলো নওমুসলিমদেরকে সন্দেহ পরায়ণ, বিপন্ন ও ব্যস্ত করে তাদের উদ্যম ও কার্যস্পৃহা নষ্ট করে দেয়া। এতদুদ্দেশ্যে মুশরিকরা রাসূল কে কখনো কখনো' পাগল' বলেও আখ্যায়িত করতো। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

"তারা বলে, হে অমুক ব্যক্তি যাঁর প্রতি কুরআন নাযিল হয়েছে, তুমি তো পাগল।" (সূরা আল-হিজর: আয়াত-৬)

কখনো কখনো রাসূল কে 'যাদুকর' বলতো এবং 'মিথ্যাবাদী; বলে অপবাদও দিতো। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

আর ঐ (কুরাইশি) কাফিররা এ কথায় বিস্মিত হলো যে, তাদের মধ্য থেকেই একজন ভয়প্রদর্শকরূপে আগমন করেছেন, এবং তারা বলতে লাগলো, এ ব্যক্তি যাদুকর, মিথ্যাবাদী। (সূরা সাদ: আয়াত-৪)

এ কাফিরগণ রাসূল (ﷺ) এর অগ্রভাগে ও পিছনে ক্রোধান্বিত এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও মন-মানসিকতা নিয়ে ঘোরাফেরা করতো। প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে-

আর কাফিররা যখন কুরআন শ্রবণ করে তখন (তারা আপনাকে এমন কটু দৃষ্টিতে দেখে) মনে হয় যেন তারা তাদের (তীক্ষ্ণ) দৃষ্টি দ্বারা আপনাকে আছড়িয়ে ফেলবে এবং বলে যে, এ ব্যক্তি পাগল। (সূরা আল-ক্বালাম: ৫১)

উপরন্তু: রাসূল যখন কোথাও গমন করতেন এবং তাঁর দুর্বল ও ময়লুম সাহাবিগণ তাঁর নিকট উপস্থিত থাকতেন তখন তাঁদের লক্ষ করে মুশরিকরা উপহাস করে বলতো,

"আর এরাই নাকি সে ব্যক্তি যাদের ওপর আল্লাহ করুণা করেছেন আমাদের মধ্য হতে।" (সূরা আল-আন'আম: আয়াত-৫৩)

প্রত্যুত্তরে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-

আল্লাহ কি কৃতজ্ঞ বান্দাদের সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত নন? (সূরা আল-আন'আম: আয়াত-৫৩)

সাধারণত মুশরিকদের অবস্থা তাই ছিলো যার চিত্র নিম্নোক্ত আয়াতসমূহে তুলে ধরা হয়েছে-

আর যারা অপরাধী ছিলো তারা (দুনিয়ায়) মুমিনদের প্রতি (বিদ্রূপ ও তাচ্ছিলের সহকারে) হাসি-ঠাট্টা করতো। আর যখন তারা (ঈমানদারগণ) তাদের সম্মুখ দিয়ে যাতায়াত করতো তখন তারা (কাফিররা) পরস্পর চোখ টেপাটিপি করতো। আর যখন তারা নিজেদের গৃহে ফিরে যেতো তখন (মুমিনদের সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে) আনন্দ উপভোগ করতো। আর যখন তাদেরকে দেখতো তখন এমন বলাবলি করতো যে, নিশ্চয় এরা বিভ্রান্তিতে আছে। (সূরা আল-মুতাফফিফীন: ২৯-৩৩)

২. বিরোধিতায় জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি: রাসূল (ﷺ) শিক্ষাদীক্ষার বিষয়াদিকে বিকৃত করে দেখানো। রাসূল (ﷺ) শিক্ষা-দীক্ষা সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি করা এবং মিথ্যা ও অপপ্রচার করা, ঢুকাতে হবে তাঁর, শিক্ষা-দীক্ষা, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুকে অর্থহীন ও আজেবাজে প্রশ্নের সম্মুখীন করা, এ সবগুলোই অনবরত এত ব্যাপকভাবে করা যাতে জনসাধারণ তাঁর দ্বীন প্রচারের দিকে ধীর-স্থিরভাবে মনযোগ দেয়া কিংবা চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ না পায়। মুশরিকরা যেমন কুরআন সম্পর্কে বলেছে-

এটা মিথ্যা ছাড়া অন্যকিছুই নয়-যা সে রচনা করে নিয়েছে। এ জন্য তাকে অন্যকিছু লোকজন সাহায্য করেছে। (সূরা আল-ফুরকান: আয়াত -৪)

আর তারা বলে থাকে যে, এ তো পূর্বকালের কাহিনি-যা এই ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে লিখে নিয়ে এসেছে, আর সেটাই সকাল-সন্ধায় তার নিকটে পাঠ করা হয়। (সূরা আল-ফুরকান: আয়াত- ৫)

তাছাড়া মুশরিকরা আরো বলেছে-

নিশ্চয় মুহাম্মদকে এটা (কুরআন) কোনো একজন মানুষ শিক্ষা দেয়। (আন-নাহল: ১০৩)

তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি তাদের প্রশ্ন ছিলো এই-

এ ব্যক্তি কেমন রাসূল, আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? (সূরা আল-ফুরক্বান: আয়াত -৭)

কুরআনে কারীমে অনেক জায়গায় মুশরিকদের কথার প্রতিবাদও করা হয়েছে। কোথাও প্রশ্নের উল্লেখ রয়েছে, কোথাও উল্লেখ ছাড়া তা করা হয়েছে।

৩. বিরোধিতার ধূম্রজাল তৈরি: অতীতকালের ঘটনাবলি এবং উপাখ্যানসমূহ এবং কুরআনে করীমে বর্ণিত বিষয়দির মধ্যে অর্থহীন ঝগড়া বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধুম্রজাল সৃষ্টি করে জনমনে বাঁধার সৃষ্টি করা এবং মুক্ত চিন্তা- ভাবনার সুযোগ না দেয়া। প্রসঙ্গক্রমে এখানে নাযর বিন হারিসের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। একদিন সে কুরাইশদেরকে আহ্বান জানিয়ে বললো: "হে কুরাইশ ভাইগণ! আল্লাহর শপথ! তোমাদের সম্মুখে এক মহাদুর্যোগপূর্ণ সময় উপস্থিত হয়েছে, অথচ তোমরা আজ পর্যন্ত এর কোনো প্রতিকার কিংবা এর থেকে বাঁচার চেষ্টা কোনোটাই করতে পারোনি। মুহাম্মদ (ﷺ) যখন তোমাদের মধ্যে যুবক ছিলেন তখন তিনি সকলের প্রিয়পাত্র ছিলেন। সবার চেয়ে সত্যবাদী ও বিশ্বাসী ছিলেন। এখন যখন তাঁর কান ও মাথার মধ্যকার চুল সাদা হতে চললো (অর্থাৎ বয়স বৃদ্ধি পেয়ে মধ্য বয়সে পৌচেছে) এবং তোমাদের নিকট কিছু বাণী ও বক্তব্য উপস্থাপন করলেন তখন তোমরা বলছো যে, তিনি একজন 'যাদুকর'।

না, আল্লাহর শপথ! তিনি 'যাদুকর' নন। আমরা যাদুকর দেখেছি, তাদের ঝাড়-ফুঁফ ও গিরাবন্দিও দেখেছি। কিন্তু তাঁর মধ্যে সেরকম কোনো কিছুই দেখছি না।

তোমরা বলছো যে, তিনি একজন 'গণক'।

কিন্তু তাঁকে তো কাহেন বলেও মনে হয় না। আমরা কাহেন দেখেছি, তাদের অসাড় বাগাড়ম্বরতা, উল্টাপাল্টা কাজ-কর্ম এবং বাকচাতুর্য। কিন্তু তাঁর মধ্যে তেমন কিছুই দেখি না।

তোমরা বলছো, সে 'কবি'। কিন্তু তাঁকে কবি বলেও তো মনে হয় না। আমরা কবি দেখেছি এবং কাব্যধারা হাজয, বাজ্য ইত্যাদিও শুনেছি। কিন্তু মুহাম্মদ (ﷺ) এর কাছে যা শুনেছি, কোনোদিন কারো কাছেই শুনিনি। তাঁর কাছে যা শুনেছি সে তো অদ্ভুত জিনিস।

তোমরা তাঁকে বলছো 'পাগল'। কিন্তু তাকে পাগল বলার কোনো হেতুই তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা তো অনেক পাগলের পাগলামী দেখেছি, দেখেছি তাদের উল্টোপাল্টা কাজ-কর্ম, শুনেছি তাদের অসংলগ্ন ও অশ্লীল কথাবার্তা এবং আরো কত কি। কিন্তু মুহাম্মদ (ﷺ) এর মধ্যে তেমন কোনো বিষয়-ই কোনোদিন দেখিনি। ওহে কুরাইশগণ! আল্লাহর শপথ! তোমরা খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়েছো। খুব ভালোভাবে চিন্তা-ভাবনা করো, পরিত্রাণের পথ খোঁজ করো।

এরপর নাযর বিন হারিস হীরা চলে গেলো। সেখানে রাজা-বাদশাহদের ঘটনাবলি, ইরানের বিখ্যাত বীর রুস্তম ও প্রাচীন গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডারের কাহিনি শিখলো। এসব শেখার পর সে মক্কায় ফিরে আসলো। ঘটনাক্রমে রাসূল যখন কোনো জায়গায় আল্লাহর নির্দেশনাবলি নিয়ে আলোচনা করতেন এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করলে জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব সম্পর্কে ভয়প্রদর্শন করতেন তখন সে ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে বলতো- 'আমার কথার চেয়ে মুহাম্মদের কথা উত্তম নয়।'

এরপর সে পারস্য সম্রাটদের রুস্তম এবং সেকান্দার বাদশাহর (আলেকজান্ডারের) কাহিনি শোনাতে আরম্ভ করতো এবং বলতো- 'বলো কোনদিক দিয়ে মুহাম্মদ (ﷺ) এর কথা আমার কথার চেয়ে উত্তম!

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর বর্ণনাসূত্রে এটাও জানা যায় যে, ইসলাম বৈরীতার চরম পর্যায়ের ব্যবস্থা হিসেবে 'নাযর' একাধিক ক্রীতদাসী রেখেছিলো। যখনই সে জানতে পারতো যে, কোনো লোক রাসূল (ﷺ) এর দ্বীনি তাবলীগের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন তখন সে লোকের জন্য এক ক্রীতদাসীকে নিয়োজিত করে দিতো। ক্রীতদাসী তাকে খাওয়া-দাওয়া করাতো এবং তার মনোরঞ্জনের জন্য গীতবাদ্য এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা করতো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি সে ব্যক্তির আকর্ষণ হ্রাস না পাওয়া পর্যন্ত সে একই ধরনের কাজ চালাতো।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

লোকদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে-যারা খেলতামাশার কথাবার্তার মাধ্যমে (মানুষকে) আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে থাকে। (সূরা লোকমান: আয়াত-৬)

৪. বিরোধিতার আপোস-রফার কৌশল: এ পন্থার মূল কথাটির কিছু কিছু গ্রহণ ও কিছু কিছু বর্জনের মাধ্যমে মুসলমান ও মুশরিকদের মধ্যে একটি আপোস রফার ব্যবস্থা। এর প্রকৃত অর্থ হলো, রাসূল (ﷺ) এবং মুসলমানগণ যদি মুশরিকদের উপাসনা পদ্ধতির কিছু কিছু অংশ মেনে নেন তাহলে তারাও মুহাম্মদ (ﷺ) এর প্রচারিত ইসলামি বিধি-বিধানের কিছু কিছু অংশ মেনে নিবেন। কুরআনুল কারীমে যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

তারা চায় যে আপনি যদি কিছুটা নমনীয় বা শিথিল হয়ে যান। তাহলে তারাও শিথিল ও নমনীয় হয়ে যাবে। (সূরা আল-ক্বালাম: আয়াত-৯)

যেমনটি ইবনে জারীর এবং তাবারানীর এক বর্ণনায় রয়েছে: মুশরিকরা রাসূল (ﷺ) এর নিকট প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন যে, যদি তিনি এক বছর যাবৎ তাদের মাবুদের (প্রভুর) পূজা-অর্চনা করেন তাহলে তারাও রাসূল (ﷺ) এর প্রভু ও প্রতিপালকের ইবাদত (উপাসনা) করবে। আবদ বিন হোমায়েদ হতে একটি বর্ণনা এসেছে- মুশরিকরা প্রস্তাব করলো যে, যদি আপনি আমাদের মা'বুদকে গ্রহণ করেন তবে আমরাও আপনার রবের ইবাদত করবো।

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন: একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কা'বাঘর তাওয়াফ করছিলেন— এমন সময় আসওয়াদ বিন মুত্তালিব বিন আসাদ বিন আব্দুল উযযা, অলীদ বিন মুগীরা, উমাইয়া বিন খালফ এবং আস বিন ওয়ায়েল সাহমী তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হলো। তারা সকলেই ছিলো নিজ নিজ গোত্রের প্রধান। তারা বললো- 'হে মুহাম্মদ। এসো তুমি যে মা'বুদের উপাসনা করো আমরাও সে মা'বুদের উপাসনা করি এবং আমরা যে মা'বুদের উপাসনা করি তোমরাও সে মা'বুদের উপসনা করো। এরপর দেখা যাবে, যদি তোমাদের মা'বুদ কোনো অংশে আমাদের মা'বুদের চেয়ে উন্নত হয়, তাহলে আমরা সে মাবুদের ইবাদতে অংশ গ্রহণ করবো, আর যদি আমাদের মা'বুদ কোনো অংশে তোমার মা'বুদের উন্নত হয়, তাহলে তুমি সে মাবুদের ইবাদতে অংশ গ্রহণ করবে।

এ কারণে আল্লাহ 'সূরা কাফিরুন' সম্পূর্ণ নাযিল করেন। যার মধ্যে জলদগম্ভীর সুরে ঘোষণা করা হয়েছে- তোমরা যার উপাসনা করো আমরা তার উপাসনা করতে পারি না। এই অকাট্য সিদ্ধান্তসূচক উত্তরে তাদের হাস্যকর কথাবার্তা এবং কাজ-কর্মের চূড়ান্ত অবসান ঘটলো।

মুসলমানদের প্রতি কাফির-মুশরিকদের অন্যায়-অত্যাচার

নবুয়তের চতুর্থ বছরের যখন প্রথমবার সর্বসাধারণের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হলো তখন মুশরিকরা তা প্রতিহত করার কৌশল হিসেবে ঐ পদক্ষেপ গ্রহণ করে- যা ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। এ কৌশল কার্যকর করার ব্যাপারে তারা 'ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে থাকে এবং এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের অন্যায়-অত্যাচার শুরু করেনি। কিন্তু তারা যখন এটা বুঝতে পারলো যে, তাদের সে কৌশল ও কর্মকান্ড ইসলামি আন্দোলন প্রসার লাভের পথে তেমন কার্যকর হচ্ছে না তখন তারা সকলে পুনরায় এক আলোচনা সভায় মিলিত হয় এবং পঁচিশ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। সাধারণত গোত্রীয় প্রধানদের নিয়েই এ কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির অধিনায়ক ছিলো মুহাম্মদ (ﷺ) এর চাচা আবু লাহাব। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটির সদস্যগণ পরস্পর আলাপ- আলোচনা ও যুক্তি-পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, মুহাম্মদ (ﷺ) কে ইসলাম প্রচার থেকে নিবৃত্ত করা এবং মুসলমানদেরকে ইসলামের গন্ডি থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে আন্যায়-অত্যাচার ও নির্যাতনের কঠোর ব্যবস্থা অলম্বনে তারা কোনো ধরনের দ্বিধা-সংকোচ করবে না।

উক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুশরিকরা সংকল্পবদ্ধ হয়। মুসলমান এবং বিশেষ করে দুর্বল শ্রেণির মুসলমানদের নিয়ে মুশরিকদের তেমন কোনো সমস্যাই ছিলো না। তাদের প্রকৃত সমস্যা ছিলো রাসূল কে নিয়ে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। বংশমর্যাদার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন উন্নত ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শত্রু-মিত্রপক্ষের কেউ তাঁর নিকট আগমন করলে তাকে মান-মর্যাদার ভূষণে ভূষিত করেই সেখানে আগমন করতে হতো। কোনো দুষ্টদুরাচার কিংবা অনাচারীর পক্ষে তাঁর সম্মুখে কোনো অশ্লীল বা জঘন্য কাজ করার মতো ধৃষ্টতা প্রদর্শন কখনোই সম্ভব হতো না।

রাসূল (ﷺ) এর উপরিউক্ত গুণাবলি এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যপ্রসূত প্রভাব- প্রতিপত্তির সাথে সংযুক্ত হলো চাচা আবু তালিবের সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন। ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত উভয় ক্ষেত্রেই আবু তালিব মর্যাদাসম্পন্ন এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী ছিলেন যে, তাঁর কথা অমান্য করা কিংবা তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্তের ওপর হস্তক্ষেপ করার মতো দুঃসাহস কারোরই ছিলো না। এমনি এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে অন্যান্য কুরাইশদেরকে কঠিন দুশ্চিন্তা, হতবুদ্ধিতা এবং টানাপোড়নের মধ্যে নিপাতিত হতে হলো, কিন্তু তাদের সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে কঠিন ছিলো তা হচ্ছে প্রতিমা ও পুরোহিতগণের মানমর্যাদা এবং তাদের নিজেদের সামাজিক মান-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের এসব যে সম্পূর্ণরূপে ভূলণ্ঠিত ও ধ্বংস হয়ে যাবে সে ব্যাপারে তারা ছিলো সম্পূর্ণ সচেতন। সুতরাং উপায়ান্তর না দেখে তারা একদম মরিয়া হয়ে উঠলো এবং আবু লাহাবের পরিচালনায় ও নেতৃত্বে মুসলমান এবং রাসূল (ﷺ) এর ওপর নির্যাতন শুরু করে দিলো।

মূলত শুরু থেকেই রাসূল (ﷺ) এর প্রতি আবু লাহাবের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো অত্যন্ত কঠোর ও কঠিন। এমনকি অন্যান্য কুরাইশগণ যখন ঘূর্ণাক্ষরেও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওপর কোনো ধরনের যুলুম-নির্যাতন চালানোর চিন্তা-ভাবনা করেনি তখনো আবু লাহাবের আচরণ ছিলো অত্যন্ত মারমুখী ও কঠোর। বনু হাশিমের বৈঠকে এবং সাফা পর্বতের নিকট আবু লাহাব যা কিছু করেছিলো তা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, সাফা পর্বতের ওপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে মারার জন্য সে একখন্ড পাথর হাতে উঠিয়েছিলো।

রাসূল (ﷺ) এর ওপর আবু লাহাব যে কত পৈশাশিকতা ও নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করেছিলো সে ব্যাপারে আরো বিভিন্ন প্রমাণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আবু লাহাবের ছেলে ও রাসূল (ﷺ) এর মেয়ের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা।

নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দু'মেয়ের সাথে আবু লাহাব তার দু'ছেলের বিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু নবুয়ত প্রাপ্তির পর অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের মাধ্যমে সে তার দু' ছেলেরই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়।

তার পাশবিকতার আরো একটি ঘটনা হচ্ছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পুত্র আব্দুল্লাহ যখন মারা যান তখন সে (আবু লাহাব) উল্লাসে ফেটে পড়ে, টগবগিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তার বন্ধু-বান্ধুবদের নিকট এ দুঃসংবাদকে শুভ সংবাদ হিসেবে প্রচার করে যে, মুহাম্মদ লেজকাটা (পুত্রহীন) হয়েছে।

ইতোপূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, হজ্জের মৌসুমে আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বাজার ও গণজমায়েতে তাঁর পেছনে লেগে থাকতো এবং মানুষের মাঝে অপপ্রচার চালাতো।

তারিক বিন আব্দুল্লাহ মুহারেবীর বর্ণনায় জানা যায়, এ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে শুধুমাত্র মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং কোনো কোনো সময় সে রাসূল কে লক্ষ করে প্রস্তর নিক্ষেপ করতো-যার ফলে তাঁর পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত রক্তাক্ত হয়ে যেতো।

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল (প্রকৃত নাম 'আরওয়া) ছিলো হারব বিন উমাইয়ার কন্যা এবং আবু সুফিয়ানের বোন। রাসূল (ﷺ) এর প্রতি অত্যাচার ও যুলম-নির্যাতনে এ মহিলা ছিলো স্বামীর যোগ্য সহযোগী। সে ছিলো অত্যন্ত বিদ্বেষপরায়ণ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ মহিলা। এসব দুষ্কর্মে সে স্বামী থেকে পশ্চাদপদ ছিলো না। সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চলার পথে এবং দরজায় কাঁটা, কটুক্তি করা, মিথ্যা অপবাদ দেয়া ইত্যদি নানাবিধ জঘন্য কাজ-কর্মে সে লিপ্ত থাকতো। তাছাড়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানাবিধ ফিৎনা-ফ্যাসাদের আগুন উস্কানী দিয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের বিভীষিকা সৃষ্টি করা তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এজন্যই কুরআন তাকে (লাকড়ির বোঝা বহনকারিণী) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। উম্মে জামিল যখন অবগত হলো যে, তার এবং তার স্বামীর ব্যাপারে নিন্দাসূচক আয়াত নাযিল হয়েছে তখন সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর খোঁজ করতে লাগলো।

রাসূল (ﷺ) সে সময় মসজিদুল হারামে কা'বাঘরের পাশে অবস্থান করছিলেন। আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও তখন তাঁর সাথে অবস্থান করছিলেন।

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল যখন এক পাথর নিয়ে বায়তুল হারামে (পবিত্র গৃহে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সম্মুখভাগে এসে দন্ডায়মান হলো তখন আল্লাহ মহিলার দৃষ্টিশক্তি বন্ধ করে দেয়ার কারণে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে দেখতে পেলো না। অথচ আবু বকর (রা) কে সে দেখতে পাচ্ছিলো। তাঁর সামনে গিয়ে সে প্রশ্ন করলো: 'তোমার সাথি কোথায়? আমি জানতে পারলাম যে, সে নাকি আমাদের কুৎসা রটনা করে বেড়াচ্ছে? হায়! আমি যদি এখন তাকে পেতাম তাহলে তার মুখের ওপর এ পাথর ছুড়ে মারতাম। আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি একজন মহিলা কবি।

অতঃপর সে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনালো-

আমরা মন্দের অবজ্ঞা করেছি। তাঁর নির্দেশ অমান্য করেছি এবং তার দ্বীন (ধর্ম)কে ঘৃণা করেছি। তার নির্দেশ অমান্য করেছি এবং তার দ্বীন (ধর্ম)কে ঘৃণা করেছি।

এরপর উম্মে জামিল সেখান হতে চলে গেলো।

আবু বকর (রা) বললেন- 'হে আল্লাহর রাসূল! সেকি আপনাকে দেখে নি? আল্লাহর রাসূল বললেন- না, সে আমাকে দেখতে পায়নি। আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তিকে আমার থেকে রহিত করে দিয়েছিলেন।'

বাযযারও উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং এর সাথে আরো কিছু কথা সংযোজন করেছেন। তিনি বলেছেন-

আবু লাহাবের স্ত্রী 'উম্মে জামিল' আবু বকর (রা) এর সামনে উপস্থিত হয়ে বললো- 'তোমার সাথি আমাকে অপবাদ দিয়েছে।'

আবু বকর (রা) বললেন: না, এ ঘরের প্রভুর শপথ! তিনি কোনো কবিতা রচনা কিংবা আবৃত্তি করেন না। আর না সে সব তিনি মুখে আনেন। উম্মে জামিল বললো: তুমি সত্যি বলছো।

এসব সত্ত্বেও আবু লাহাব সেসব লোমহর্ষক ঘটনাবলি ঘটিয়ে চলছিলো- যদিও সে ছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর আপন চাচা এবং প্রতিবেশী। উভয়ের ঘর ছিলো পাশাপাশি এবং একসাথে। এভাবেই রাসূল (ﷺ) এর অন্যান্য প্রতিবেশীগণও তাঁর ওপর নির্যাতন চালাতো।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় এসেছে, যেসব লোক রাসূল কে তাঁর বাড়িতে জ্বালা-যন্ত্রণা দিতো তাদের নেতৃত্ব দিতো আবু লাহাব, হাকাম বিন আবুল আস বিন উমাইয়া, উকবা বিন আবু মুয়াইত, আদি বিন হামরা সাকাফী, ইবনে আসাদ হুযাইলী। এরা সকলেই ছিলো তাঁর প্রতিবেশী। এদের মধ্যে হাকাম বিন আবুল আস ছাড়া অন্য কেউ-ই পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেনি।

রাসূল (ﷺ) এর ওপর তাদের যুলুম-নির্যাতনের ধরনটা ছিলো এমন, তিনি যখন সালাত আদায় করতেন তখন তাঁকে লক্ষ করে উটের নাড়ি-ভুঁড়ি ও মলমূত্র নিক্ষেপ করা হতো। আর তা গিয়ে পড়ত তার উনুনের ওপর, হাঁড়ি- পাতিল চাপিয়ে রান্নাবান্না করার সময় চুলার ওপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করা হতো। এ অবস্থায় তাদের হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে রাসূল যেন নিবিষ্ট চিত্তে সালাত আদায় করতে পারেন সে উদ্দেশ্যে তিনি একটি পৃথক মাটির ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন।

রাসূল (ﷺ) এর ওপর যখন এসব ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করা হতো তখন তিনি সেগুলো নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের ডাক দিয়ে বলতেন- "ওহে আবদে মানাফ! প্রতিবেশীর সাথে প্রতিবেশীর এ কেমন আচরণ। অতঃপর রাসূল (ﷺ) বাইরে সেগুলো ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়ে আসতেন।

উকবা বিন আবু মুয়াইত আরো খারাপ প্রকৃতির এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ লোক ছিলো। সহিহ বুখারিতে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে-একদা রাসূল বায়তুল্লাহর পাশে সালাত আদায় করছিলেন, এমতাবস্থায় আবু জেহেল এবং তার বন্ধুবর্গ সেখানে উপস্থিত হলো। তাদের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি অন্যদের লক্ষ করে বললো- কে এমন আছো, যে অমুকের বাড়ি থেকে উটের ভুঁড়ি আনবে এবং মুহাম্মদ যখন সালাতরত অবস্থায় সিজদায় যাবে তখন তার পিঠের ওপর ভুঁড়িটি চাপিয়ে দিবে।

সে সময় আরববাসীদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি উকবা বিন আবু মুয়িত। দাঁড়ালো এবং কথিত ভূড়িটি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। রাসূল যখন সিজদায় গেলেন তখন সে ভুঁড়িটি নিয়ে গিয়ে পিঠের ওপর চাপিয়ে দিলো। আমি (বর্ণনাকারী) সব কিছুই দেখছিলাম, কিন্তু কোনো কিছু করার ক্ষমতা আমার ছিলো না। হায়! যদি আমার মধ্যে তাকে বাঁচানোর কোনো ক্ষমতা থাকতো।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) আরও বর্ণনা করেন- 'এরপর তারা আনন্দ ও উত্তেজনায় পরস্পর পরস্পরের গায়ে ঢলাঢলি, জড়াজড়ি করে মাতামাতি শুরু করে দিলো। মনে হলো তাদের জন্য এর চেয়ে বড়ো আমোদ ফূর্তির আর কিছুই হতে পারে না। হায় আফসোস! ঐদিন তারা একটু বুঝতো যদি, কী সর্বনাশের পথ তারা বেছে নিয়েছে।'

একদিকে তারা যখন আনন্দ ও নারকীয় কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলো তখন বিশ্বনবী মুহাম্মদ সিজাদারত অবস্থায় জান্নাতী আবেহায়াত পানে বিভোর ছিলেন। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য।

রাসূল (ﷺ) এর কন্যা ফাতিমা (রা) এ দুঃসংবাদ শুনতে পেয়ে দ্রুত সেখানে আগমন করেন এবং ভূরি সরিয়ে পিতাকে তার নিচ থেকে উদ্ধার করেন। অতঃপর রাসূল শির উত্তোলন করে তিনবার বললেন, "হে আল্লাহ! এ কুরাইশদেরকে আটক করুন।" যখন তিনি আল্লাহর নিকট এই ফরিয়াদ করলেন তখন তাদের মধ্যে কিছুটা ভীতিরভাব সৃষ্টি হলো এবং তারা বিচলিত হয়ে পড়লো। কারণ তাদের এই বিশ্বাসও ছিলো যে, এ শহরের মধ্যে প্রার্থনা কবুল হয়ে থাকে।

অতঃপর রাসূল নাম ধরে তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও আবেদন পেশ করলেন: 'হে আল্লাহ! আবু জেহেল, উতবা বিন রাবিয়া, শায়বা বিন রাবিয়া, অলীদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালফ এবং উকবা বিন আবু মুয়াইত এদেরকে আটক করুন।

রাসূল তাদের ছাড়া আরেকজনের নাম বলেছিলেন, কিন্তু বর্ণনাকারীর সেই ব্যক্তির নাম স্মরণ নেই।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন- 'সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন! উক্ত অবস্থায় রাসূল যাদের নামে নারাজি পেশ করেছিলেন আমি তাদের সকলকেই বদর যুদ্ধে নিহত হয়ে কুয়োর মধ্যে পতিত অবস্থায় দেখেছি।'

উমাইয়া বিন খালফের এমন এক স্বভাব হয়ে গিয়েছিলো যে, যখনই সে রাসূল কে দেখতে পেতো তখনই তাঁকে ভর্ৎসনা করতো এবং অভিশাপ দিতো।

এ প্রেক্ষিতেই নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমা নাযিল হয়-

প্রত্যেক অভিশাপকারী, ভর্ৎসনাকারী এবং অন্যায়কারীর জন্যই রয়েছে ধ্বংস। (আল-হুমাঝাহ:আয়াত ১)

ইবনে হিশাম বলেছেন: 'হুমাযা' ঐ ব্যক্তি যে অগোচরে লোকের নিন্দা বা বদনাম করে ও তাদের কষ্ট দেয়।

উমাইয়ার ভাই উবাই ইবনে খালফ উকবা বিন আবু মুয়িতের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলো। একবার উকবা রাসূল (ﷺ) এর নিকট বসে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে কিছু কথাবার্তা শুনলো।

উবাই উক্ত খবর জানতে পেরে তাকে খুব ধমক দিলো এবং ভর্ৎসনা করলো। তার নিকট অত্যন্ত কঠোরতার সাথে কৈফিয়ত তলব করলো এবং বললো-'তুমি গিয়ে মুহাম্মদ এর মুখে থুথু নিক্ষেপ করে এসো। শেষ পর্যন্ত উকবা তা-ই করে। উবাই বিন খালফ নিজেও একবার মরা-পচা হাড় নিয়ে তা চূর্ণ করে এবং জোরে ফুঁ দিয়ে তা রাসূল (ﷺ) এর দিকে উড়িয়ে দেয়।

রাসূল কে নির্যাতনকারীদের মধ্যে যারা ছিলো তাদের অন্যতম হচ্ছে আখনাস বিন শুরাইক সাকাফী। কুরআন মাজীদের মধ্যে তার ৯টি বৈশিষ্ট্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তার মন-মানসিকতা ও কাজ-কাম সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে-

আর আপনি এমন ব্যক্তির কথা অনুকরণ করবেন না, যে অধিক শপথকারী ও হীনপ্রকৃতির। যে অধিক নিন্দুক ও চোগলখুরী করে, সৎকর্মে বাধা দেয়, ভীষণ অত্যাচারী, পাপী, রুক্ষ স্বভাবসম্পন্ন, তদুপরি অবৈধ জাত। (সূরা আল-কালাম: আয়াত-১০-১৩)

আবু জাহেল কোনো কোনো সময় রাসূল (ﷺ) এর নিকট গিয়ে কুরাআন শ্রবণ করতো। কিন্তু তার সে শ্রবণ ছিলো নেহাত-ই একটি মামুলী ব্যাপার। তার এই শ্রবণের মূলে আন্তরিকতা, বিশ্বাস, আদব কিংবা আনুগত্যের কোনো প্রশ্নই ছিলো না। সেটাকে কতকটা যেন তার উদ্ভট খেয়াল বলা যেতে পারে। সে রাসূল (ﷺ) কে অশ্লীল কিংবা কর্কশ কথাবার্তার মাধ্যমে কষ্ট দিতো এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করতো। উপরন্তু অন্যায়-অত্যাচারের ক্ষেত্রে কৃতকার্য হওয়াটাকে গর্বের ব্যাপার মনে করে সে আনন্দ চিত্তে পথ চলতো। মনে হতো যে, সে যেন গুরুত্বপূর্ণ কোনো মহান কার্য সম্পাদন করেছে। কুরআন মাজিদের নিম্নোক্ত আয়াত তার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছিলো।

সে তো দান-খয়রাত করে নি এবং সালাতও আদায় করে নি। (আল-কিয়ামা: আয়াত-৩১)

উপরন্তু অবিশ্বাস করেছিলো এবং পরাঙ্মুখ হয়েছিলো। অতঃপর সে স্বর্গে পরিবারের কাছে ফিরে যেতো। এটা তার জন্য উপযোগী।

আবু জাহেল রাসূল (ﷺ) কে প্রথম যেদিন সালাত আদায় করতে দেখলো তখন থেকেই সালাত হতে নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালাতে থাকে। একদা রাসূল মাকামে ইবরাহিমের নিকট সালাত আদায় করছিলেন এমন সময় আবু জাহেল সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখেই সে বললো- 'মুহাম্মদ! আমি কি তোমাকে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকতে বলিনি? সে সাথে রাসূল কে সে ধমকও দিলো।

রাসূল ও আবু জেহেলকে পাল্টা ধমকের সুরে তার এই কথার কঠোর প্রতিবাদ করলেন। প্রত্যুত্তরে সে বললো- 'হে মুহাম্মদ! আমাকে কেনো ধমকাচ্ছো? আল্লাহর শপথ! দেখো এ উপত্যকায় (মক্কায়) আমার বৈঠকখানা সবচেয়ে বড়ো।

তার এ কথার প্রেক্ষিতে আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করেন।

আবার বেশ ভালো! সে তার সহচরদের ডাকুক, আমিও আমার জাহান্নামের প্রহরী ফেরেশতাকে ডাকবো। (সূরা-আলাক্ব: আয়াত ১৭-১৮)

অন্য এক বর্ণনা মতে, রাসূল আবু জেহেলের জামার বুকের অংশ ধরে জোরে হেঁচকা এক টান দিলেন এ আয়াতে কারীমা পাঠ করলেন-

'দুর্ভোগ তোমার জন্য এবং দুর্ভোগ! তারপরও দুর্ভোগ তোমার জন্য এবং দুর্ভোগ! (সূরা আল-ক্বিয়ামা: আয়াত-৩৪)

এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর সে শত্রু বলতে লাগলো- 'হে মুহাম্মদ। তুমি আমাকে ধমক দিচ্ছো? আল্লাহর শপথ! তুমি এবং তোমার প্রতিপালক আমার কিছুই করতে পারবে না। আমি মক্কার পর্বতের মাঝে বিচরণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি।

তার এ অসাড় এবং উৎকট অহমিকা প্রকাশের পরও আবু জাহেল সেসব থেকে নিবৃত্ত হলো না; বরং তার অনাচার ও অন্যায় আচরণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চললো। যেমনটি সহিহ মুসলিমের আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে-

একদা আবু জেহেল কুরাইশ প্রধানদেরকে বললো, 'আপনাদের সম্মুখে মুহাম্মদ কি নিজ মুখ মণ্ডলকে ধূলিস্যাৎ করছে না? প্রত্যুত্তরে তারা বললো- 'হ্যাঁ।'

এরপর সে আস্ফালন করে বললো: 'লাত ও উযযার কসম! যদি আমি তাকে পুনরায় সে অবস্থানে (সালাত রত) দেখি তাহলে তার ঘাড় পদতলে পিষ্ঠ করে ফেলবো এবং মুখমন্ডল মাটির সাথে আচ্ছা করে ঘর্ষণ দিয়ে মজা দেখিয়ে দিবো।

কিছুদিন পর ঘটনাক্রমে একদিন সে রাসূল কে সালাত আদায় করতে দেখে ফেলে এবং কুরাইশ প্রধানদের নিকট স্বঘোষিত সংকল্প কার্যকর করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু আকস্মিকভাবে পরিলক্ষিত হলো যে, অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে সে পশ্চাদপসরণ শুরু করেছে এবং আত্মরক্ষার জন্য অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শূন্যে দু'হাত নড়াচড়া করে কি যেন এড়ানোর প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উপস্থিত লোকজন জিজ্ঞেস করলো: ওহে আবুল হাকাম! তোমার কী এমন হলো যে, তুমি অমনভাবে হাত ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়ে পড়লে?'

সে উত্তর করলো- 'আমার এবং তার মধ্যে আগুনের এক গর্ত রয়েছে, ভয়াবহ বিভীষিকাময় ও ভীতিপ্রদ শিকল রয়েছে।

রাসূল ইরশাদ করেছেন- সে যদি আমার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতো তবে ফেরেশতাগণ তার একটা অঙ্গ ছেদ করে নিয়ে যেতেন।

মুশরিকরা রাসূল (ﷺ) এর ওপর এমনিভাবে অবর্ণনীয় অন্যায়-অত্যাচার ও উৎপীড়ন চালিয়ে আসছিলো। সাধারণ এবং বিশেষ সকল শ্রেণির মানুষের নিকট ব্যক্তিগতভাবে মান-মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন থাকা সত্ত্বেও এবং মক্কার সবচেয়ে প্রাজ্ঞ, প্রভাবশালী এবং মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব আবু তালিবের ছত্রছায়ায় আশ্রিত থাকা সত্ত্বেও যেখানে তাঁকে নিজেরই এমন যুলুম নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছিল সেক্ষেত্রে গরিব শ্রেণির সাধারণ মুসলমানদের কথা তো বলাই বাহুল্য। গরিব শ্রেণির নব দীক্ষিত মুসলমানদের ওপর এত নিষ্ঠুরতার সাথে নির্যতন চালানো হতো যে, ভাষার মাধ্যমে তার সঠিক চিত্র তুলে ধরা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

প্রত্যেক গোত্রই নিজ নিজ গোত্রের নওমুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালাতো। কিন্তু যেসব মুসলমান কোনো গোত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকতো না তাদের ওপর এত অধিকমাত্রায় নির্যাতন চালানো হতো যে, পাষাণ হৃদয় ব্যক্তিটিও তা প্রত্যক্ষ করে অস্থির কিংবা বিচলিত না হয়ে পারতো না।

আবু জেহেল যখন কোনো সম্ভ্রান্ত বা শক্তিধর ব্যক্তির মুসলমান হওয়ার কথা শুনতো তখন সে তাকে যাচ্ছে তাই বলে গালি-গালাজ করতো, অপমান- অপদস্থ করতো এবং ধন-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করবে বলে ভয় দেখাতো। জাতি- গোষ্ঠীর কোনো দুর্বল লোক যদি মুসলমান হতো তাহলে তাকে সে অত্যন্ত নির্দয় ভাবে মারধর করতো এবং অন্যদেরকেও মারধর করার জন্য প্ররোচিত করতো।

ওসমান বিন আফফান (রা) এর চাচা তাঁকে খেজুর পাতার চাটাইয়ের মধ্যে জড়িয়ে রেখে নিচে থেকে আগুন লাগিয়ে ধোঁয়া দিতো।

মুসয়াব বিন উমায়ের (রা) এর মা যখন তাঁর ইসলাম গ্রহণের খবর জানতে পেলো তখন সে তাঁর খানা-পানি (আহারাদি) বন্ধ করে দিলো এবং তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো। প্রথম জীবনে তিনি আরাম-আয়েশ ও সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যে বড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এতই কঠিন কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন যে সাপের গা থেকে খুলে পড়া খোলসের মতো তাঁর গায়ের চামড়া খুলে খুলে পড়তো।

হযরত বেলাল উমাইয়া বিন খালফ জুমাহীর ক্রীতদাস ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় উমাইয়া তাঁর গলায় রশি বেঁধে দুষ্ট ছেলেদের হাতে ধরিয়ে দিতো। তারা সে রশি ধরে তাঁকে পথে-প্রান্তরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াতো। এমনকি টানাটানির ফলে তাঁর গলায় রশির দাগ বসে যেতো। উমাইয়া স্বয়ং হাত-পা বেঁধে তাঁকে প্রহার করতো এবং প্রখর রোদে বসিয়ে রাখতো। তাঁকে খানা-পানি না দিয়ে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত রাখতো। এসবের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও কষ্টকর হতো তখন যখন দুপুর বেলায় পথর রৌদ্রে বালি আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠতো এবং তাকে সেই উত্তপ্ত বালির ওপর শুইয়ে দিয়ে তাঁর বুকে পাথর চাপা দেয়া হতো। অতঃপর বলতো- 'আল্লাহর শপথ! তুই এভাবেই শুয়ে থাকবি। অতঃপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বি। অথবা মুহাম্মদ এর সাথে কুফরী করবি।'

একদিন হযরত বেলাল এমনিতর এক দুঃসহ অবস্থার মধ্যে নিপতিত ছিলেন তখন আবু বকর সিদ্দীক (রা) সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বেলাল (রা) কে এক কালো দাস এবং দু'শত দিরহাম (৭৩৫ গ্রাম রূপা) অথবা দু'শত আশি দিরহাম (১ কেজিরও বেশি রৌপ্য) এর বিনিময়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।

আম্মার বিন ইয়াসির' বনু মাখযুমের ক্রীতদাস' ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ইয়াসির এবং মাতার নাম সুমাইয়া। তিনি এবং তাঁর পিতা-মাতা সকলে একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁদের ওপর কিয়ামতের আযাব নেমে আসে। ইয়াসির (রা) এর দু'পায়ে দুটি রশি বেঁধে দেয়া হয় এবং রশির দু'মাথা দুটি উটের পায়ে বেঁধে দিয়ে উট দুটিকে খুব জোর কদমে বিপরীতমুখে তাড়ানো হয়। এর ফলে তার দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে যায় এবং তৎক্ষণাৎ তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন।

পাষণ্ড আবু জেহেল সুমাইয়া (রা) এর গোপনাঙ্গে বর্শা বিদ্ধ করে তাঁকে হত্যা করে। মুসলিম মহিলাদের মধ্যে সুমাইয়া (রা) ছিলেন প্রথম শহীদ।

দুপুর বেলা প্রখর রৌদ্রতাপে মরুভূমির বালুকণা এবং কঙ্কররাশি যখন আগুনের মতো উত্তপ্ত থাকতো তখন আবু জাহেলের নেতৃত্বে মুশরিকরা আম্মার (রা) কে নিয়ে সেই উত্তপ্ত বালি এবং কঙ্করের ওপর শুইয়ে দিয়ে শাস্তি দিতো। একদিন তাঁকে যখন সেভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল এমন সময় রাসূল সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আম্মার (রা) কে লক্ষ করে তিনি বললেন: হে ইয়াসরিবের বংশধর! ধৈর্যধারণ করো, তোমাদের স্থান জান্নাতে।

আম্মার (রা) এর ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। কখনো তাঁকে প্রখর রোদে শুইয়ে দিয়ে তাঁর বুকে পাথরচাপা দেয়া হতো, কখনো বা পানিতে ডুবিয়ে শাস্তি দেয়া হতো। মুশরিকরা তাঁকে বলতো- 'যতক্ষণ তুমি মুহাম্মদ কে গালমন্দ না করবে এবং আমাদের উপাস্য লাত ও উযযা সম্পর্কে উত্তম কথা না বলবে ততক্ষণ তোমাকে মুক্তি দেয়া হবে না। অত্যন্ত নিরুপায় হয়ে আম্মার (রা) তাদের কথা মেনে নিলেন।

অতঃপর আম্মার (রা) রাসূল (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে কান্নাবিজড়িত কন্ঠে সবিস্তারে ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। এ কারণে এ আয়াতে কারীমা নাযিল হলো-

আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপনের পর যে কুফরী করে তার জন্য ক্রোধ ও কঠিন শাস্তি রয়েছে। কিন্তু যাকে বাধ্য করা হয় অথচ যার অন্তর বিশ্বাসে অটল থাকে তার জন্য চিন্তার কিছুই নেই। (সূরা নাহল: আয়াত -১০৬)

ফুকাইহা (রা) বনু আব্দুদ্দার গোত্রের দাস ছিলেন। তার আরেক নাম ছিলো 'আফলাহ'। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে তাঁর মালিক পায়ে বেড়ি পরিয়ে তাঁকে কঙ্করময় পথ-প্রান্তরে টেনে নিয়ে বেড়াতো।

খাব্বাব বিন আরাত (রা) খুযায়মাহ গোত্রের 'উম্মে আনমার' নামে এক মহিলার দাস ছিলেন। মুশরিকরা তাঁর ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালাতো। কখনো বা খুব শক্ত হাতে তার চুল টানাটানি করে নির্যাতন চালাতো। কখনো বা আবার খুব শক্ত হাতে তাঁর ঘাড় ধরে মোচড়িয়ে দিতো। একসময় তাঁকে কাঠের জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর শুইয়ে দিয়ে তাঁর বুকের ওপর পাথরচাপা দেয়া হয়েছিলো—যাতে তিনি উঠতে না পারেন। এতে তাঁর পৃষ্ঠাদেশ পুড়ে গিয়ে ধবল কুষ্ঠ রোগের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিলো।

যিন্নীরাহ নাহদিয়া এবং তাঁর কন্যা উম্মে উবাইস সকলেই দাসী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁরা সকলেই মুশরিকদের হাতে নানাভাবে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হওয়ার ফলে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও জ্বালা-যন্ত্রণার সম্মুখীন হন। তাঁদের সম্পর্কে ইতোপূর্বে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

বনু আদী গোত্রের এক পরিবার বনু মুয়াম্মেলের এক দাসী মুসলমান হয়ে যাওয়ার সংবাদ শুনে ওমর বিন খাত্তাব (তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) তাঁকে এতই প্রহার করেছিলেন যে, তিনি নিজেই ক্লান্ত হয়ে গিয়ে এ বলে ক্ষান্ত হয়েছিলেন- 'মানবিক কোনো কারণে নয়; বরং খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি বলে শাস্তি দেয়া থেকে আপাততঃ তোমাকে রেহাই দিলাম।

অবশেষে আবুবকর (রা) বেলাল এবং আমের বিন ফুহায়রার মতো উক্ত দাসগুলোকেও ক্রয় করে মুক্ত করে দেন।

কাফির-মুশরিকরা মুসলমানদেরকে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে আরো যেসব পন্থা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলো তা হচ্ছে, কোনো কোনো সাহাবিকে উট কিংবা দুম্বার কাঁচা চামড়ায় জড়িয়ে রোদ্রতাপের মধ্যে ফেলে রাখতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার লোহার বর্ম পরিয়ে উত্তপ্ত পাথরের ওপর শুইয়ে রাখতো।

পৃথকভাবেই আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী অত্যাচারিত ও উৎপীড়িত ব্যক্তিগণের নামের তালিকা ছিলো যথেষ্ট লম্বা এবং অত্যাচার ও উৎপীড়নের দৃশ্য বড়ই করুণ, লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক। প্রকৃত অবস্থা ছিলো, মুশরিকরা যখন কারো মুসলমান হওয়ার সংবাদ পেতো তখনই তাঁদের কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে তারা খুবই আগ্রহী বদ্ধপরিকর হয়ে যেতো।

ইসলাম প্রচারের গোপন কেন্দ্র আরকামের বাড়ি

মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও উৎপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ ব্যক্তিগণের বিকল্প দাবি ছিলো যে, রাসূল (ﷺ) মুসলমানদের কথা এবং কাজ উভয় দিক দিয়েই প্রকাশ্যে কিছু করা থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ প্রদান করবেন এবং তাঁদের সাথে গোপনে একত্রিত হবেন। কারণ তিনি যদি প্রকাশ্যে তাঁদের সাথে একত্রিত হন তাহলে মুশরিকরা তাঁর আত্মশুদ্ধি এবং কিতাব ও হিকমত শেখার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে মুসলিম ও মুশরিক উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ঠিক এ রকম এক সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিলো নবুয়তের চতুর্থ বছরে। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ-

সাহাবায়ে কিরাম তাঁদের নির্দিষ্ট ঘাঁটিগুলোতে একত্রিত হয়ে সালাত আদায় করতেন। ঘটনাক্রমে একদিন কিছু সংখ্যক কাফির কুরাইশ তাঁদের এভাবে সালাত আদায় করতে দেখে ফেলার পর অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করতে থাকে এবং আক্রমণ করে বসে। মুসলমানগণও সে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসেন। প্রতিহত করতে গিয়ে সা'দ বিন ওয়াক্কাস (রা) এক ব্যক্তিকে এমনভাবে প্রহার করেছিলেন যে, তার শরীরের আঘাতপ্রাপ্ত জায়গা থেকে রক্তধারা প্রবাহিত হতে থাকে। উম্মতের মুহাম্মদীর মুসলমানদের পক্ষ হতে কোনো কাফিরের দেহ থেকে এটাই ছিলো সর্বপ্রথম রক্ত ঝরানোর ঘটনা।

এটা সর্বজনবিদিত বিষয় যে, ঐভাবে বারংবার মুসলিম ও মুশরিকদের মধ্যে যদি সংঘর্ষ চলতে থাকে তাহলে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান অতি অল্প সময়ের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যেতো। অতএব ইসলামের সকল কাজ-কর্ম অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করার দাবি ছিলো খুবই যুক্তিসঙ্গত ও বিজ্ঞোচিত।

এ কারণে সাধারণ সাহাবিগণ তালীম, তাবলীগ, ইবাদত-বন্দেগী, সম্মেলন ও পারস্পরিক মতবিনিময় ইত্যাদি যাবতীয় কাজ-কর্ম মুশরিকদের সামনে প্রকাশ্যেই করতে থাকেন। তাঁকে কোনো কিছুতেই মুশরিকরা বাধা দেয়ার সাহস পেতো না। তবু মুসলমানদের কল্যাণের কথা চিন্তা ভাবনা করে গোপনেই তিনি তাঁদের সাথে একত্রিত হতেন।

অন্যদিকে যেহেতু আরকাম বিন আবুল আরকাম মাখযুমীর বাড়িটি সাফা পর্বতের ওপর কাফির-মুশরিকদের দৃষ্টির আড়ালে এবং তাদের সম্মেলনের স্থান হতে দূরে অবস্থিত ছিলো সেহেতু নবুয়তের পঞ্চমবর্ষ থেকে সে বাড়িটিকেই ইসলামের গোপন প্রচারকেন্দ্র এবং মুসলমানদের মিলিত হওয়ার গোপন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে।

মুসলমানদের প্রথম আবিসিনিয়া হিজরত

মক্কার কাফির-মুশরিকদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের ওপর অন্যায়-অত্যাচারের উল্লিখিত বিভীষিকাময় ধারা-প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম সূচিত হয় নবুয়তের চতুর্থ বর্ষের মধ্যভাগে কিংবা শেষের দিক থেকে। যুলুম-নির্যাতনের শুরুতে এর মাত্রা ছিলো সামান্য। কিন্তু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সময় যতই অতিবাহিত হতে লাগলো যুলুম-নির্যাতনের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে পেতে পঞ্চমবর্ষের মধ্যভাগে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছলো এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হলো যে, মক্কায় মুসলমানদের টিকে থাকাই একেবারে অসম্ভব হয়ে উঠলো। তাই এ বিভীষিকার কবল থেকে পরিত্রাণ লাভের উদ্দেশ্যে তাঁরা বাধ্য হলেন পথের সন্ধান করতে।

উক্ত অনিশ্চয়তা এবং দুঃখ-দুর্দশার ঘোর অন্ধকারচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হলো সূরায়ে 'কাহাফ'। প্রকৃতপক্ষে এই সূরা নাযিল হয়েছিলো মুশরিকদের উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর হিসেবে। কিন্তু এর মধ্যে যে তিনটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, সেগুলা ছিলো মু'মিন বান্দাদের জন্য তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইঙ্গিতস্বরূপ। যেমন- 'আসহাবে কাহাফ এর ঘটনা থেকে এ শিক্ষা বা ইংগিত পাওয়া যায় যে, যখন দ্বীন ও ঈমান মারাত্বক হুমকির সম্মুখীন হয় তখন 'কুফর' এবং অন্যায়-অত্যাচারের কেন্দ্রস্থল থেকে আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর ভরসা রেখে অন্যত্র হিজরত করে যাওয়া কর্তব্য। ইরশাদ হয়েছে-

আর যখন তোমরা তাদের হতে এবং আল্লাহ ব্যতীত তারা যাদের ইবাদত করছে তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেলে তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো, তবেই তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য নিজ রহমত প্রসারিত করবেন এবং তোমাদের কাজকে অনুকূল করে দিবেন। (সূরা আল-কাহফ: আয়াত -১৬)

মূসা (রা) এবং খিযির (আ) এর ঘটনাবলি হতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কোনো কিছুর ফলাফল সকল ক্ষেত্রেই প্রকাশ্য অবস্থান অনুযায়ী হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীতও হয়ে থাকে। অতএব উক্ত ঘটনায় সে কথার প্রতি সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে অন্যায়-অত্যাচার করা হচ্ছে তার ফল লাভ বৈপরীত্যের মধ্যেই সম্ভব হবে এবং এ অবাধ্য মুশরিকরা যদি ইসলাম গ্রহণ না করে, তবে ভবিষ্যতে তারা নির্যাতিত ও উৎপীড়িত মুসলমানদের নিকট পরাজিত হবে এবং নমনীয় হয়ে তাদের সাথে আপোস-মীমাংসা করতে বাধ্য হবে।

প্রসঙ্গত এখানে 'যুলকারনাইন' এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যুলকারনাইনের ঘটনায় কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে-

১. এ যে পৃথিবী, এর প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন তাঁকে উত্তরাধিকার দান করেন।

২. মানুষের যে সফলতা বা কৃতকার্যতা, এ প্রসঙ্গটির মূলসূত্র সংশ্লিষ্ট রয়েছে ঈমান সাথে, কুফরির সাথে নয়।

৩. আল্লাহ নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে এমন কতক ব্যক্তিকে ঈমান, আমল ও হিকমত দিয়ে থাকেন-যাঁরা নিপীড়িত-নিগৃহীত ও নিষ্পেষিত মানুষকে জমানার ইয়াজুজ মাজুজের কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়ে থাকেন।

৪. আল্লাহর সৎ এবং সদাচারী বান্দাই পৃথিবীর উত্তরাধিকার লাভের জন্য সর্বাধিক উপযুক্ত। অনন্তর সূরায়ে কাহাফের পর সূরায়ে যুমার নাযিল হয়। এতে তাদের জন্য ইংগিত প্রদান করে বলা হয়-

যারা এ পৃথিবীতে সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে উত্তম বিনিময়। আল্লাহর যমিন প্রশস্ত, ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে বেহিসাব পুরস্কার। (সূরা যুমার: আয়াত-১০)

মুসলমানদের ওপর কাফির-মুশরিকদের অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা যখন ধৈর্য ও সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেলো, বিশেষ করে কুরআন মাজিদ পড়তে এবং সালাত আদায় করতে না দেয়ার মানসিক যন্ত্রণা যখন চরমে পৌঁছলো রাসূল তখন তাঁর উম্মতগণের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন এবং হিজরত বা দেশান্তরের কথা চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করলেন। তিনি অনেক আগে থেকেই আবিসিনিয়ার সম্রাট 'আসহামা নাজ্জাশী'র উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। উপরন্ত সেখানে কারো প্রতি যে কোনো অন্যায় অত্যাচার করা হয় না সে কথাও তিনি জানতেন। মুসলমানরা সেখানে গমন করলে নিরাপদে থাকা এবং নির্বিঘ্নে ধর্ম-কর্ম করার সুযোগ লাভ করবে। এ সবকিছু বিচার- বিবেচনা করে তাদের জীবন এবং ঈমানের নিরাপত্তা বিধান এবং নির্বিঘ্নে ধর্ম- কর্ম করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করে আবিসিনিয়ায় গমনের জন্য রাসূল সাহাবিগণকে নির্দেশ প্রদান করেন।

আলোচ্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় সলা-পরামর্শের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক নবুয়তের পঞ্চমবর্ষের রজব মাসে সাহাবায়ে কিরামদের প্রথম দলটি মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন।

উক্ত দলে ১২ জন পুরুষ এবং ৪ জন মহিলা ছিলেন। উসমান বিন আফফান (রা) ছিলেন তাঁদের দলপতি। তাঁর সাথে ছিলেন রাসূল (ﷺ) এর কন্যা রোকাইয়া (রা)। রাসূল তাঁদের সম্পর্কে বলেছে: 'ইবরাহিম এবং লূত (আ) এর পর এঁরাই হচ্ছে প্রথম পরিবার যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করলো।

ইসলামের এ প্রথম মুহাজির দল রাতের অন্ধকারে সবার অলক্ষ্যে অত্যন্ত সঙ্গোপনে নিজ নিজ আবাসস্থল পরিত্যাগ করে রওয়ানা হয়ে গেলেন নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কুরাইশ কাফিরগণ যাতে এই হিজরত সম্পর্কে কোনো কিছু জানতে না পারে সে জন্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়।

উক্ত মুহাজির দলের যাত্রা ছিলো লোহিত সাগরের বন্দর 'ওয়াইবাহ' অভিমুখে। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে দু'টো ব্যবসায়ী নৌকা উপস্থিত ছিলো- যে নৌকায় তাঁরা নিরাপদে সমুদ্র অতিক্রম করে হাবশায় গিয়ে পৌঁছলেন।

কুরাইশরা কিছুটা বিলম্বে এ হিজরত সম্পর্কে অবগত হয়ে লোহিত সাগর পর্যন্ত মুহাজির দলের পিছু ধাওয়া করে। কিন্তু মুহাজিরগণ তখন তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সুতরাং তারা ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। অন্য দিকে যাচাইর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শান্তিতে আবিসিনিয়ায় বসবাস করতে লাগলেন।

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, এ দলটি রজব মাসে মক্কা থেকে হিজরত করেন। কিন্তু সেই বছরই রমযান মাসে কা'বায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়ে যায়।

মুসলিমদের সাথে কাফিরদের সিজদা ও মুহাজিরদের প্রত্যাবর্তন

উক্ত রমযান মাসে রাসূল (ﷺ) একদা হারাম শরীফে গমন করেন। কুরাইশদের একটি বিরাট দল সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলো। রাসূল সেখানে উপস্থিত হয়ে আকস্মিকভাবে সূরা 'নাজম' পাঠ করতে শুরু করেন। উপস্থিত সে দলের কাফির-মুশরিকরা এর আগে কুরআন শুনতো না এবং কোথাও কুরাআন পাঠ করা হলে তারা শোরগোল করে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করতো যাতে তা শোনা না যায়। কারণ তাদের একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যে, কুরআন শ্রবণ করলে তারা প্রভাবিত হয়ে পড়বে। কুরআনের ভাষায় ব্যাপারটি ছিলো এ রকম-

তোমরা এ কুরআন শ্রবণ করো না এবং এর আবৃত্তিকালে গোলমাল সৃষ্টি করো তাহলেই জয়ী হবে। (সূরা ফুস্সিলাত: আয়াত- ২৬)

কিন্তু রাসূল (ﷺ) যখন উক্ত সূরাটি পাঠ শুরু করলেন, তখন এর শ্রুতিমধুর বাণী, অবর্ণনীয় মধুরতা ও অপরূপ মিষ্টতা যখন তাদের কানে প্রবেশ করলো তখন তারা মুগ্ধ এবং হতচকিত হয়ে পড়লো। ইতোপূর্বে কুরআন পাঠের সময় তারা যেভাবে গন্ডগোল করতো সেরকম গন্ডগোল করা তো দূরের কথা; বরং আরো গভীর মনোযোগ সহকারে কান পেতে তারা তা শুনতে লাগলো। তাদের অন্তরে বিরূপ কোনো ভাবেরই উদ্রেক হলো না।

অতঃপর রাসূল (ﷺ) যখন উক্ত সূরার শেষের আয়াতসমূহ পাঠ করতে থাকলেন তখন তাদের অন্তরে কম্পন সৃষ্টি হতে লাগলো যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশসম্বলিত শেষের আয়াতটি পাঠ করলেন-

আল্লাহর জন্য তোমরা সিজদা করো এবং তাঁরই ইবাদত করো। (আন নাজম: আয়াত-৬২)

সে সাথে তিনি সিজদায় গেলেন তখন আত্মসম্মোহিতের মতো সকলেই সিদজায় লুটিয়ে পড়লো। প্রকৃতপক্ষে সেই সময় কুরআন মাজিদের আলৌকিক মোহনীয়তা, মহিমাময় মাধুর্য এবং স্বর্গীয় নির্দেশনা অহংকারী, আত্মাভিমানী ও উচ্ছৃংখল কুরাইশগণের চৈতন্যকে এমনিভাবে প্রভাবিত এবং বশীভূত করে ফেলেছিলো যে, তাদের বিরোধিতা কিংবা অস্বীকার করার কোনো শক্তিই ছিলো না। এবং তারই ফলশ্রুতিতে ইচ্ছা-অনিচ্ছার নিরক্ষীয় অবস্থান থেকেই তারা সিজদারত হয়েছিলো।

কিন্তু পরক্ষণেই যখন আত্মসম্মোহিত অবস্থা থেকে তারা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসল তখন উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো যে, আল্লাহর কালামের অলৌকিকত্ব তাদের স্বকীয়তা বিনষ্ট করে দিয়েছে- যার ফলে তারা আল্লহর উদ্দেশ্যে সিজদা করতেও বাধ্য হয়েছে। অথচ যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করে তাদের সমূলে ধ্বংস করার জন্য তারা বদ্ধপরিকর। এমনি এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে তারা আত্মগ্লানির অনলে দগ্ধীভূত হতে থাকে।

কাফির-মুশরিকদের উক্ত শোচনীয় মানসিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে থাকে যখন অনুপস্থিত অন্যান্য মুশরিকরা বিষয়টি জ্ঞাত হয়ে এ আচরণের জন্য তাদের লজ্জা দিতে ও নিন্দা জ্ঞাপন করতে থাকে।

উক্ত ত্রিশংকুল অবস্থা থেকে আত্মরক্ষা এবং তাদের সমালোচনা মুখর মুশরিকদের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে তারা রাসূল (ﷺ) এর নামে অপবাদ দিয়ে একটি অপপ্রচার শুরু করলো। তারা একটি নির্জলা মিথ্যাকে নানা রূপ ও রং দিয়ে রাসূল (ﷺ) এর নামে প্রচার শুরু করলো যে, তিনি তাদের প্রতিমাসমূহের ইজ্জত ও সম্মানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন—

এগুলো উচ্চ সম্মানিত দেব-দেবীর মূর্তি এবং এদের সুপারিশ কামনা করা হয়েছে।

অথচ তা ছিলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাসূল (ﷺ) এর সাথে সিজদা করে তাদের ধারণায় তারা যে ভুলটি করেছিলো তার গ্লানি থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যেই তাদের এ অপপ্রচার।

রাসূল (ﷺ) এর সম্পর্কে সর্বদাই যাঁরা মিথ্যা কুৎসা রটনা এবং নানা অপপ্রচারে লিপ্ত থাকতো এক্ষেত্রেও যে তারা তা করবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই; বরং এটাই স্বাভাবিক যে, কোনো সূত্রে যেকোনো মুহূর্তে রাসূল (ﷺ) এর নির্মল চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করতে তারা কখনই কুণ্ঠাবোধ করবে না।

যা-ই হোক, কুরাইশ মুশরিকদের সিজদা করার খবর আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানদের নিকটও গিয়ে পৌঁছলো। কিন্তু সে সংবাদের ধরন ছিলো ভিন্ন। মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত কথার সাথে স্বাভাবিকভাবেই যেমন সংযোজন ও সংমিশ্রণ ঘটে যায় এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো। আবিসিনিয়ায় অবস্থানকারী মুহাজিরগণ খবর পেলেন যে, মক্কার কুরাইশগণ মুসলমান হয়ে গিয়েছেন।

উক্ত কথা শোনামাত্রই স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য অনেকেরই মনে ব্যগ্রতা পরিলক্ষিত হলো এবং পরবর্তী শাওয়াল মাসেই তাদের একটি দল মক্কা অভিমুখে যাত্রা করলেন। কিন্তু মক্কা থেকে যখন তারা এক দিনের পথের দূরত্বে অবস্থান করছিলেন তখন প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়ে তারা বুঝতে পারলেন যে, ব্যাপারটি যেভাবে তাদের নিকট পৌঁছানো হয়েছে প্রকৃত ঘটনাটি তা নয়। তাই দলের কিছুসংখ্যক লোক আবিসিনিয়া অভিমুখে পুনরায় যাত্রা করলেন এবং কিছুসংখ্যক লোক অত্যন্ত গোপনে কিংবা কুরাইশগণের আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন।

আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরত

অতঃপর মক্কায় প্রত্যাগত মুহাজিরগণের ওপর বিশেষভাবে এবং অন্যান্য মুসলমানদের ওপর সাধারণভাবে কুরাইশদের অন্যায়-অত্যাচার ও উৎপীড়নের মাত্রা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পেলো। শুধু মুহাজিরগণই নয়, তাঁদের পরিবার- পরিজনও এ নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পোলো না। এর কারণ হচ্ছে, ইতোপূর্বে কুরাইশরা যখন অবগত হয়েছিলো যে আবিসিনিয়ার মুহাজিরদের সাথে নাজ্জাশী অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করছেন এবং তাঁদের প্রতি নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে চলেছেন তখন মনে মনে কুরাইশরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। মুহাজিরগণ যখন মক্কায় ফিরে আসলো তখন কুরাইশরা আপনা থেকেই সেই সুযোগ পেয়ে গেলো।

মুসলমানদের প্রতি হিংসাপরায়ণ কুরাইশদের যুলুম-নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে রাসূল পরামর্শ দিলেন পুনরায় আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে। কিন্তু প্রথম তুলনায় দ্বিতীয় ব্যাপারটি ছিলো অনেক বেশি সমস্যা সংকুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রথমবার সময় কুরাইশরা বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন ছিলো না। কিন্তু এবার প্রহরীর মতো তারা সচেতন এবং যেকোনো মূল্যে এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিলো।

কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধনে সাফল্য লাভের ব্যাপারে কুরাইশদের তুলনায় মুসলমানদের সচেতনতা ও ঐকান্তিকতার মাত্রা ছিলো অনেক গুণে বেশি। উপরন্তু নিরীহ- নির্দোষ এবং ন্যায়নিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি ছিলো আল্লাহর বিশেষ রহমত। যার ফলে কুরাইশদের তরফ থেকে কোনো অনিষ্ট কিংবা প্রতিবন্ধকতা আসার আগেই তারা সহিহ সালামতে গিয়ে পৌছালেন হাবশার সম্রাটের দরবারে।

দ্বিতীয় দফায় সর্বমোট ৮২ কিংবা ৮৩ জন পুরুষ হিজরত করেছিলেন (এর মধ্যে আম্মার (রা) এর হিজরত সম্পর্কে মতপার্থক্য রয়েছে) এবং ১৮ কিংবা ১৯ জন মহিলাও সে দলে ছিলেন। আল্লামা সুলাইমান মহিলা মুহাজিরগণের সংখ্যা ১৮ জনের কথা উল্লেখ করেছেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুহাজিরদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র

নিজেদের জান-মাল ও ঈমান রক্ষার্থে মুসলমানরা দেশত্যাগ করে আবিসিনিয়ায় গিয়ে সেখানে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করায় কুরাইশদের দারুন গাত্রদাহ সৃষ্টি হয়ে যায়। ফলে আমর বিন আস এবং গভীর জ্ঞানগরিমান অধিকারী আব্দুল্লাহ বিন রাবিয়াহকে (যে তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি) নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করার জন্য দূত মনোনীত করা হয়।

অতঃপর সম্রাট নাজ্জাশী এবং খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজকদের জন্য বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহ দুজন দূতকে দৌত্যকর্ম সম্পাদনের উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়ায় প্রেরণ করা হয়।

আবিসিনিয়ায় পৌঁছে তারা সর্বপ্রথম বেতরীক পুরোহিতদের দরবারে উপস্থিত হয়ে উপঢৌকন প্রদান করে। অতঃপর তাদের নিকট সে সব বিবরণ ও প্রমাণাদি তুলে ধরে- যার ভিত্তিতে মুসলমানদেরকে হাবশা হতে বের করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। যদিও সেসব বিবরণ ও প্রমাণাদি তেমন কোনো ভিত্তিই ছিলো না, তবু কুরাইশদের পক্ষ থেকে উপঢৌকন পেয়ে পাদ্রীগণ এ ব্যাপারে একমত হলো যে, মুসলমানদেরকে হাবশা হতে বহিষ্কার করার ব্যাপারে সম্রাট নাজ্জাশীকে তারা সুপারিশ করবে। পাদ্রীগণদের নিকট থেকে সহযোগিতা লাভের আশ্বাস পেয়ে কুরাইশ দূতেরা সম্রাট নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে উপঢৌকন প্রদান করে। তাদের পেশ করা আরজির বিবরণ নিম্নরূপ-

'হে মহামান্য সম্রাট! আমাদের দেশের কিছুসংখ্যক অবোধ ও অর্বাচীন লোক আমাদের দেশ থেকে পলায়ন করে আপনার দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের নিকট থেকে বংশপরম্পরা সূত্রে চলে আসা ধর্ম পরিত্যাগ করেছে। আপনার দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে আপনার ধর্মমতও গ্রহণ করেনি। এ হচ্ছে তাদের চরম ধৃষ্টতার পরিচায়ক। শুধু তাই নয়, তারা নাকি একটা নুতন ধর্মমতও আবিষ্কার করেছে। এর চেয়ে আজগুবী ব্যাপার আর কী হতে পারে বলুন। আমাদের গোত্রীয় প্রধান এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ, এসব অর্বাচীনের পিতা-মাতা, মুরব্বি ও আত্মীয়-স্বজনরা তাদেরকে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে আমাদের দুই জনকে দূত হিসেবে আপনার দরবারে প্রেরণ করেছেন। আপনি অনুগ্রহ করে আমাদের সাথে ওদের ফেরত পাঠানের ব্যবস্থা করুন। আমাদের প্রধানগণ ওদের সম্পর্কে বেশ উঁচু ধারণা পোষণ করেন এবং তাদের অসন্তোষের কারণ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল রয়েছেন।'

কুরাইশ দূতেরা সম্রাটের নিকট যখন এ আরজি পেশ করলো তখন পুরোহিতরা বললো: 'আলোচ্য বিষয়টির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সুসম্পষ্ট ধারণা লাভের পূর্বে কোনো কিছু মন্তব্য প্রকাশ করা কিংবা সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন মনে করি না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আমার জানা প্রয়োজন।'

তাই তিনি তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য মুসলমানদের আহ্বান জানালেন। মুসলমানরাও আল্লাহর কথা স্মরণ করে বিষয়ের খুঁটিনাটিসহ সকল কথা সম্রাটের সমীপে পেশ করার জন্য উত্তম মানসিক প্রস্তুতি সহকারে শাহী দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

সম্রাট নাজ্জাশি তাঁর দরবারে উপস্থিত মুসলমানদের লক্ষ করে বললেন: যে ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে যুগ যুগ ধরে পূর্বপুরুষদের সূত্রে চলে আসা ধর্ম তোমরা পরিত্যাগ করেছো এবং আমাদের দেশে আশ্রিত হয়েও তোমরা আমাদের ধর্মের সম্পূর্ণ উদাসীন রয়েছো সে ধর্মটি কোন ধর্ম?

প্রত্যুত্তরে মুসলমানদের মনোনীত মুখপাত্র হিসেবে 'জাফর বিন আবু তালিব' রাদিয়াল্লাহু আনহু নির্ভীক কণ্ঠে বললেন: হে সম্রাট! আমরা ছিলাম অজ্ঞতা, অশ্লীলতা ও অনাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত দুষ্কর্মশীল এক জাতি। আমরা প্রতিমা পূজা করতাম, মৃত জীব-জানোয়ারের গোশত ভক্ষণ করতাম, নির্বিচারে ব্যভিচার ও অশ্লীলতায় লিপ্ত থাকতাম, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে অন্যায় আচরণ করতাম, আমানতের খিয়ানত ও মানুষের হক নষ্ট করতাম এবং দুর্বলদের সহায়-সম্পদ গ্রাস করতাম। এমনি এক অন্ধাকারাচ্ছন্ন সমাজ জীবনে আমরা যখন মানবেতর জীবনযাপন করে আসছিলাম তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুগ্রহ করে আমাদের মাঝে এক রাসূল প্রেরণ করলেন। তাঁর বংশমর্যাদা, সততা, সহনশীলতা, সংযমশীলতা, ন্যায়নিষ্ঠা, পরোপকারিতা ইত্যাদি গুণাবলি এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পূর্ব থেকেই আমরা অবহিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, সমগ্র বিশ্বজাগতের স্রষ্টা প্রতিপালক এক আল্লাহ ছাড়া আমরা আর কারো উপাসনা করবো না। বংশপরম্পরা সূত্রে এযাবৎ আমরা যেসব প্রস্তরমূর্তি বা প্রতিমা পূজা করে এসেছি সেসব বর্জন করতে হবে। মিথ্যা উপাস্য বর্জন করে সর্বদা সত্য কথা বলা, আমানতের হিফাজত করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে সদ্ব্যবহার করা, অশ্লীল-অবৈধ কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকা এবং রক্তপাত পরিহার করে চলা, মহিলাদের অহেতুক অপবাদ দেয়া থেকেও বিরত থাকার জন্য তিনি নির্দেশ দেন। উপরন্তু সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা এবং যাকাত প্রদান করার জন্যেও তিনি আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন। এভাবে জাফর (রা) অত্যন্ত চিত্তোদ্দীপক এবং মর্মস্পর্শী ভাষায় ইসলামের মূলনীতি ও তার বিধি বিধানগুলো বর্ণনা করলেন। অতঃপর আবারও বললেন: এ পয়গম্বরকে বিশ্বজাহানের স্রষ্টা প্রতিপালক আল্লাহর পয়গম্বর বলে আমরা দুঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছি এবং তাঁর আনীত দ্বীনে ইলাহীর অনুসরণে দৃঢ়প্রত্যয় ও আত্মাবিশ্বাসের সাথে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূল কে অনুসরণ করে চলছি। সুতরাং আমরা এক এবং অদ্বিতীয় প্রভু আল্লাহর ইবাদত ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি না এবং বিশ্বজগতের কোথাও তাঁর কোনো শরীক আছে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। পয়গম্বর যেসব কথা, কাজ ও খাদ্য আমাদের জন্য হারাম বলেছেন, আমরা সেগুলোকে পরিত্যাগ করেছি। এ কারণে আরব সমাজের বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায় আমাদের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। তারা এ সত্য, সুন্দর, শাশ্বত ও সুনির্মল জীবনবিধান থেকে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে অশ্লীলতা ও অনাচারের পথে চালানোর জন্য নরকীয় নির্যাতন চালিয়েছে।

এক আল্লাহর ইবাদত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে প্রতিমাপূজায় লিপ্ত করানোর জন্য আমাদের ওপর আঘাতের পর আঘাত হেনেছে, জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর শুইয়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে, পায়ে দড়ি বেঁধে পথে-প্রান্তরে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছে। এমনকি এভাবে যখন তারা আমাদের ওপর অবিরামভাবে অন্যায়-অত্যাচার চালাতে থাকলো, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে আল্লহর জমিনকে আমাদের জন্য সংকীর্ণ করে ফেলেছে এবং এমনকি আমাদের ও আমাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে ও প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকলো তখন আপনার মহানুভবতা, উদারতা ও ন্যায়নিষ্ঠার কথা অবগত হয়ে আল্লাহর রাসূল তা আমাদের নির্দেশ প্রদান করলেন দেশত্যাগ করে আপনার দেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে। হে সম্রাট! আমরা আপনার সহৃদয়তা, উদারতা ও মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়েছি। আমরা চাই আপনার আশ্রয়ের সুশীতল ছায়াতলে অবস্থান করতে। দয়া করে এ সব পাষন্ড যালিমদের হাতে আমাদেরকে তুলে দিবেন না।

জাফর (রা) বললেন: 'জী হ্যাঁ অবশ্যই। নাজ্জাশী বললেন: 'তাহলে আমার সামনে কিছু উপস্থাপন করুন।

জাফর (রা) বাদশার সমীপে নিবেদিত এবং আত্মসম্মোহিত অবস্থায় সূরায়ে মরিয়মের প্রথম কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শোনালেন। নাজ্জাশী আল্লাহর বাণীর আসমানী ইলহাম এবং সুরধারায় এতই মুগ্ধ হলেন যে, তাঁর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রুধারা প্রবাহিত হয়ে দাড়ি ভিজে গেলো।

জাফর (রা) এর তিলাওয়াত শুনে নাজ্জাশীর ধর্মীয় উপদেষ্টাগণের চোখেও অশ্রুর বন্যা প্রবাহিত হলো এবং এ ক্রন্দন এমনভাবে করেছিলেন যে, তাঁদের সহীফাগুলো ভিজে গিয়েছিলো।

নাজ্জাশী তখন বলেছিলেন: এ কালাম (বাণী) সেই কালাম যা ঈসা (আ) এর নিকট নাযিল হয়েছিলো তা একই উৎস হতে নাযিল হয়েছে।

এরপর নাজ্জাশী আমর বিন আস এবং আব্দুল্লাহ বিন রাবিয়াকে সম্বোধন করে বললেন: 'তোমরা যে দুরভিসন্ধি নিয়ে আমার দরবারে আগমন করেছো তা তোমাদের সাথে নিয়েই দেশে ফিরে যাও। তোমাদের হাতে এদের সমর্পণ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। উপরন্তু এই ব্যাপারে এখানে কোনো কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে না।

সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট থেকে এ নির্দেশ লাভের পর তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তাঁর দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে।

আদম সন্তানদের গোমরাহ করার ব্যাপারে আযাযীল শয়তান যেমন একের পর এক কৌশল প্রয়োগ করতে থাকে এরাও তেমনি একটি কৌশল ব্যর্থ হওয়ায় অন্য কৌশল প্রয়োগের ফন্দি-ফিকির করতে থাকে।

এক পর্যায়ে 'আমর বিন আস' আব্দুল্লাহ বিন রাবিয়াকে বললো-'আল্লাহর কসম! আগামীকাল এদের সম্পর্কে এমন একটি প্রসঙ্গ নাজ্জাশীর কানে তুলবো- যা এদের জীবিত থাকার মূল কর্তন করে ফেলবে। আর না হয়, এদের ব্যাপারে এমন যন্ত্রের অবতারণা করবো: যাতে এদের মূল কর্তিত হয় এবং সজীবতা ও সতেজতা বিনষ্ট হয়ে যায়।

আমর বিন আসের কথা শুনে আব্দুল্লাহ বিন রাবিয়া বললো: 'না না, এমনটি করা সমীচীন হবে না। কারণ এরা যদিও আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে তবু এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তারা আমাদেরই স্বজাতি এবং স্বগোত্রীয় লোক এবং আত্মীয়-স্বজনও বটে।

কিন্তু আমর বিন আস আব্দুল্লাহ বিন রাবিয়ার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে নিজের কুমতলবের ওপর অটল রইলো।

পরের দিন পুনরায় নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে আমর বিন আস বললো 'হে সম্রাট! এরা ঈসা বিন মরিয়ম সম্পর্কে এমন একটি কথা বলে-যা কেউই কোনোদিন বলেনি। আপনি ওদের কাছ থেকেই তা জেনে নিয়ে তার প্রতিকার করুন।

একথা শোনার পর সম্রাট নাজ্জাশী পুনরায় মুসলমানরদের ডেকে পাঠালেন।

তাঁরা দরবারে এসে উপস্থিত হলে ঈসা (আ) সম্পর্কে মুসলমানরা কি ধারণা পোষণ করেন তা তিনি জানতে চাইলেন।

সম্রাটের মুখ থেকে একথা শুনে মুসলমানরা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলো। কারণ মুসলমানরা মনে করে-ঈসা (আ) হচ্ছেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

তত্ত্বগত এই পার্থক্য হেতু মুসলমানদের সংশয় এ কারণে যে, একথা বললে সম্রাট নাজ্জাশী যদি বা বিরুপভাব পোষণ করেন, তাহলে মুসলমানদের জন্য তা খুবই উদ্বেগের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেটা ছিলো নিতান্তই ক্ষণিকের ব্যাপার। আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর আস্থাশীল দৃঢ়চিত্ত মুসলমানগণ পরক্ষণেই মনস্থির করে ফেললেন যে, আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ থেকে যে শিক্ষা তারা পেয়েছেন সেটাই হবে তাদের মূলমন্ত্র এবং সেটাই হবে তাদের বক্তব্য, তাতে ভাগ্যে যা ঘটবে ঘটুক।

নাজ্জাশীর প্রশ্নের উত্তরে জাফর (রা) বললেন: আল্লাহর ও আল্লাহর রাসূল পক্ষ থেকে আমরা যে শিক্ষা লাভ করেছি তাতে আমরা জেনেছি যে, ঈসা (আ) হচ্ছেন আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল। তাঁর মাতা মরিয়ম ছিলেন সতী-সাধ্বী এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে উচ্চ মর্যাদার একজন নারী। আল্লাহর হুকুম এবং বিশেষ ব্যবস্থাধীনে কুমারী মরিয়মের গর্ভে ঈসা (আ) এর জন্ম হয়।

উক্ত কথা শোনার পর নাজ্জাশী এক টুকরো খড় উঁচু করে ধরে বললেন 'আল্লাহর কসম! নাজ্জাশীর অভিব্যক্তি এবং অভিমত শুনে দরবারে উপস্থিত পুরোহিতগণও তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে 'হু' 'হ্যাঁ বলে সমর্থন জ্ঞাপন করলো। নাজ্জাশী বললেন -হ্যাঁ এখন তো তোমরা হ্যাঁ হ্যাঁ বলে সমর্থন জ্ঞাপন করবেই।

অতঃপর নাজ্জাশী মুসলমানদের লক্ষ করে বললেন: 'তোমরা নির্ভয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে আমার রাজ্যে বসবাস করো। যে কেউ তোমাদের ওপর অন্যায়-অত্যাচারের বিনিময়ে আমার হাতে কেউ সোনার পাহাড় এনে দিলেও আমি তা সহ্য করবো না।

এরপর তিনি তার পার্শ্বচরদের লক্ষ করে বললেন: 'এই কুরাইশ দূতদের আনীত উপঢৌকন তাদের ফিরিয়ে দাও। উপঢৌকন আমার কোনোই প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কসম! আল্লাহও যখন আমাকে আমার রাজ্য ফিরিয়ে দেন তখন আমার নিকট থেকে তিনি কোনো উপঢৌকন কিংবা উৎকোচ গ্রহণ করেননি সেহেতু তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কাজ করতে গিয়ে কিভাবে আমি উৎকোচ গ্রহণ করতে পারি। যেহেতু আল্লাহ আমার ব্যাপারে কোনো লোকের কোনো কথা গ্রহণ করেননি সেহেতু আল্লাহর ব্যাপারে আমি কোনো লোকের কোনো কথা গ্রহণ করতে পারি না।

উক্ত ঘটনার বর্ণনাকারিণী উম্মে সালমা (রা) বলেছেন: এরপর প্রত্যাখ্যাত উপঢৌকনসহ কুরাইশ দূতগণ চরম বেইজ্জতির সাথে নাজ্জাশীর দরবার থেকে বেরিয়ে গেল এবং আমরা তাঁর আশ্রয়ে সম্মানের সাথে তাঁর রাজ্যে অবস্থান করতে থাকলাম।

যা-ই হোক, মুশরিকদের চাতুর্য শেষ পর্যন্ত অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হলো এবং তারা এটাও উপলব্ধি করলো যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের শত্রুতা কিংবা তাদের শায়েস্তা করার ব্যাপারে স্বদেশভূমির বাইরে সাফল্য লাভের কোনোই সম্ভাবনা নেই। সুতরাং তাদের প্রচার সংক্রান্ত কাজ-কর্ম বন্ধ করতে হলে কিংবা শায়েস্তা করতে হলে স্বদেশের সীমানার মধ্যেই তা করতে হবে।

উপরন্তু মুসলমানদের ব্যাপারে কাফির-মুশরিকদের মন-মানসিকতা অনেক বেশি মারমুখী হয়ে উঠলো। তারা এইও উপলব্ধি করলো যে, মুসলমানদের দলটি খুব ছোট হলেও কোনোভাবেই তাদের অবহেলা কিংবা উপেক্ষা করা চলবে না। তাছাড়া স্ট্রাটেজী বা কর্মকৌশল হিসেবে তারা এটাও ঠিক করলো যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করতে হলে হয় বলপূর্বক মুহাম্মদ (ﷺ) এর প্রচারাভিযান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিতে হবে, আর না হয় তার অস্তিত্বকে ধরাপৃষ্ট থেকে একদম নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে।

কিন্তু দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি ছিলো অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মুহাম্মদ (ﷺ) এর অভিভাবক ছিলেন আবু তালিব-যিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং মুশরিকদের মধ্যে বিরাজমান ছিলেন লৌহ প্রাচীরস্বরূপ। সুতরাং চূড়ান্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা অবলম্বনের চেয়ে আবু তালিবের সাথে কিছু কড়া কথাবার্তা বলার সিদ্ধান্তকেই তারা প্রাধান্য দিলো।

আবু তালিবের প্রতি কুরাইশদের পক্ষ থেকে হুমকি

আবু তালিবের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর কুরাইশ প্রধানগণ আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হয়ে বললো:

হে আবু তালিব! আপনি আমাদের মাঝে মান-মর্যাদার অধিকারী একজন বয়স্ক ব্যক্তি। আমরা ইতোপূর্বে আপনার নিকট আবেদন করেছিলাম যে, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমাদের ধর্ম সম্পর্কে নিন্দাবাদ করা থেকে বিরত রাখুন। কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনি মনে রাখবেন, আমরা এটা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছি না যে, আমাদের পিতা, পিতামহ এবং পূর্বপুরুষদের গাল-মন্দ করা হবে, আমাদের বিবেককে নির্বুদ্ধিতা বলে আখ্যায়িত করা হবে এবং আমাদের দেব-দেবীর নিন্দা করা হবে। আমরা আবারও আপনাকে অনুরোধ করছি, হয় আপনি তাকে সেসব থেকে নিবৃত্ত রাখুন, নচেৎ আমাদের দু'দলের মধ্যে এক দল ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিগ্রহ চলতেই থাকবে।

কুরাইশ প্রধানদের এমনিভাবে কঠোর হুমকি প্রদান এবং আস্ফালনে আবু তালিব অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি সেই মুহূর্তে তাঁর কর্তব্য স্থির করতে না পেরে রাসূল কে ডেকে পাঠালেন। চাচার আহ্বানে রাসূল সেখানে উপস্থিত হলে, আবু তালিব তাঁর নিকট কুরাইশ প্রধানদের আলোচনা এবং আচরণ সম্পর্কে সবিস্তারে বর্ণনা করার পর তাঁকে বললেন-'বাবা! একটু বিচার-বিবেচনা করে কাজ করো। যে ভার বহন করার শক্তি আমার নেই সে ভার আমার ওপর চাপিয়ে দিও না।'

রাসূল মনে মনে চিন্তা করলেন, মানবকুলের মধ্যে তাঁর একমাত্র আশ্রয়দাতা ও সহায় পিতৃব্যও বোধ হয় আজ থেকে তাঁর সঙ্গ পরিত্যাগ করলেন এবং তাঁকে সাহায্য দানের ব্যাপারে তিনিও বোধ হয় দুর্বল হয়ে পড়লেন। তিনি এটাও সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলেন যে, আজ থেকে তিনি এক নিদারুণ সংকটে নিপতিত হতে চললেন। তবুও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রেখে তিনি বললেন- 'চাচাজান, আল্লাহর কসম! যদি এরা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দেয় তবুও শাশ্বত এ মহাসত্য প্রচারে আমার কর্তব্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও আমি বিচ্যুত হবো না। এই মহান কাজে হয় আল্লাহ আমাকে জয়যুক্ত করবেন, না হয় আমি ধ্বংস হয়ে যাবো। কিন্তু চাচাজান! আপনি অবশ্যই জানবেন যে, মুহাম্মদ (ﷺ) কখনোই এই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হবে না।'

স্বজাতীয় এবং স্বগোত্রীয় লোকজনদের নির্বুদ্ধিতা, হঠকারিতা এবং পাপাচারে ব্যথিত হৃদয় রাসূল (ﷺ) নয়নযুগলকে আচ্ছন্ন করে তুললো। তিনি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলেন, ভবিষ্যতের দিনগুলো তাঁর জন্য আরো কঠিন হবে এবং আরও ভয়াবহতা এবং কঠোরতার সাথে তাঁকে মোকাবিলা করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে হবে।

তাঁর নয়ন অশ্রু কিন্তু অন্তরে অন্তরে সাহস। এমনি এক মানসিক অবস্থার প্রেক্ষিতে তিনি পিতৃব্য আবু তালিবের সম্মুখ থেকে বেরিয়ে এলেন। আবু তালিবের প্রাণাধিক প্রিয় ভাতিজাকে এ অসহায়ত্ব ও মানসিক অশান্তিতে দেখে তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠলো। পরক্ষণেই তিনি রাসূল কে পুনরায় ডেকে পাঠালেন।

রাসূল যখন আবু তালিবের সম্মুখে উপস্থিত হলেন তখন তিনি তাঁকে সম্বোধন করে বললেন: 'প্রিয়তম ভাতিজা! নির্দ্বিধায় নিজ কর্তব্য পালন করে যাও। আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কোনো অবস্থাতেই তোমাকে পরিত্যাগ করবো না।

অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতার চরণগুলো আবৃত্তি করলেন-

আল্লাহর কসম! আমি সমাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা কখনোই তাদের দলবল নিয়ে তোমার কাছে পৌঁছতে পারবে না। তুমি তোমার দ্বীনি প্রচারকার্য যথাসাধ্য চালিয়ে যাও, তাতে কোনো প্রকার বাধা-বিপত্তি আসবে না। তুমি খুশি থাকো এবং তোমার চক্ষু পরিতৃপ্ত হোক।

আবু তালিব সমীপে পুনরায় কুরাইশদের আগমন

কুরাইশদের পক্ষ থেকে বিগত দিনের কড়া কড়া এবং হুমকি দেয়া সত্ত্বেও তারা যখন দেখলো যে, মুহাম্মদ (ﷺ) বিরত থাকা তো দূরের কথা, আরও জোরেশোরে প্রচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছে তখন এটা তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো, আবু তালিব মুহাম্মদ (ﷺ) কে পরিত্যাগ করবে না। এ ব্যাপারে তিনি কুরাইশদের হতে পৃথক হয়ে যেতে এমনকি তাদের শত্রুতা ক্রয় করতেও প্রস্তুত রয়েছেন, কিন্তু তবুও ভাতিজাকে ছাড়তে প্রস্তুত নয়।

কড়া-কড়া কথাবার্তা এবং যুদ্ধের হুমকি দিয়েও যখন তেমন কিছুই হলো না তখন একদিন যুক্তি-পরামর্শ করে অলীদ বিন মুগীরার সন্তান উমারাকে সাথে নিয়ে আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হয়ে বললো: হে আবু তালিব! এ হচ্ছে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ধীমান যুবক। আপনি একে পুত্ররূপে গ্রহণ করুন। এর রক্তপাতের খেসারত এবং সাহায্যেও আপনি অধিকারী হবেন। আপনি একে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিন। এ যুবক আজ হতে আপনার সন্তান বলে গণ্য হবে। এর পরিবর্তে আপনার ভাতিজাকে আমাদের হাতে সমর্পণ করে দিন।

সে আপনার ও আমাদের পিতা, পিতামহদের বিরোধিতা করছে, আমাদেরকে নির্বুদ্ধিতার আবরণে আচ্ছাদিত করছে। তাকে হত্যা করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই। এক ব্যক্তির বিনিময়ে এক ব্যক্তিই যথেষ্ট।

কুরাইশদের প্রস্তাবের উত্তরে আবু তালিব বললেন: 'তোমরা যে কথা বললে এর চেয়ে জঘন্য এবং অর্থহীন কথা আর কিছু হতে পারে কি? তোমরা তোমাদের সন্তান আমাকে এ উদ্দেশ্যে দিচ্ছ যে, আমি তাকে খাইয়ে-পরিয়ে লালন-পালন করবো, আর আমার সন্তানকে তোমাদের হাতে তুলে দিবো এই উদ্দেশ্যে যে, তোমরা তাকে হত্যা করবে। আল্লাহর কসম! কখনোই এমনটি হতে পারবে না।

ফলে নওফাল বিন আবদে মানাফের পৌত্র মুতয়িম বিন আদী বললো: 'আল্লাহর কসম হে আবু তালিব! তোমার জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লোকজন তোমার সাথে বিচার-বিবেচনাসুলভ কথাবার্তা বলছে, কাজ-কর্মেও যে ধারা-পদ্ধতি তোমার জন্য বিপজ্জনক তা থেকে তোমাকে রক্ষার প্রচেষ্টাই করা হয়েছে। কিন্তু আমি যা দেখছি তাতে আমার মনে হচ্ছে যে, তুমি তাদের কোনো কথাই কর্ণপাত করো না।

এর জবাবে আবু তালিব বললেন- 'আল্লাহর কসম! তোমরা আমার সাথে বিচার-বিবেচনাপ্রসূত কোনো কথাবার্তাই বলোনি; বরং তোমরা আমার সঙ্গ পরিত্যাগ করে আমার বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছো এবং বিরুদ্ধবাদীদের সাহায্যার্থে কোমর বেঁধে লেগেছো। ঠিক আছে, তোমাদের যেটা করণীয় মনে করবে তাই তো কর।

আলোচ্য জীবন চরিতের মূল উৎসের ভিতরে বক্ষমান বিষয় দুটো আলোচনার নির্দিষ্ট সময় পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণাদি সূত্রে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এ দুটো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো নবুয়তের ৬ষ্ঠ বর্ষের মধ্যভাগে এবং উভয় আলোচনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিলো অতি অল্প।

রাসূল (ﷺ) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র

রাসূল (ﷺ) এর চাচা আবু তালিবের সাথে পূর্বোক্ত দু'দফা আলোচনায় কুরাইশরা আপোস রফায় আসতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে তাদের অন্যায়-অত্যাচার ও উত্তেজনার মাত্রা-ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগলো এবং অত্যাচারের ধরন ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোরতর হতে থাকলো। সে সময়ই চরম উগ্রপন্থি কুরাইশদের কিছুসংখ্যক লোকের মনে এটা চরম এবং নরকীয় চিন্তা-ভাবনার উদয় হলো। সেটা হলো, তারা রাসূল কে ধরাপৃষ্ঠ থেকেই সরিয়ে দিবে তাঁর প্রচারিত তাওহিদী ধ্যান-ধারণার মূলোৎপাটনের জন্য।

কিন্তু এমনি এক নাজুক এবং বিপজ্জনক সময়ে আল্লাহর খাস রহমত হিসেবে 'হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব' এবং 'ওমর বিন খাত্তাব' ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মুসলমানদের শক্তিবৃদ্ধি পেলো অন্যদিকে তেমনি আবার মুশরিকদের শক্তিও কিছুটা খর্ব হয়ে গেলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের অত্যাচারের তীব্রতা প্রশমিত হলো না। অত্যাচারে অত্যাচারে কিভাবে তারা মুসলমানদের জর্জরিত এবং অতীষ্ট করে তুলেছিলো তার অগণিত প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে দু-একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো-

একদিন আবু লাহাবের পুত্র 'উতবা' রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো- 'আমি এই আয়াত দুটোকে অস্বীকার করছি। এরপর সে রাসূল কে কষ্ট দেয়ার জন্য আদাজল খেয়ে লেগে গেলো। সে রাসূল (ﷺ) এর জামা ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেললো এবং তাঁর মুখে থুথু নিক্ষেপ করলো। আল্লাহর রহমতে থুথু সে পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেনি। সেই অবস্থায় রাসূল আল্লাহর দরবারে দু'আ করলেন- 'হে আল্লাহ! তোমার কুকুরগুলোর মধ্য থেকে এর জন্য একটি কুকুর নিযুক্ত করে দাও।'

রাসূল (ﷺ) এর দু'আ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে গেলো।

একদা কিছু সংখ্যক কুরাইশ ব্যবসায়ীর সাথে উতবা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশ গেলো। যখন তারা শামরাজ্যের 'জারকা' নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করলো তখন রাতের বেলায় একটি বাঘ এসে তাঁবুর চারপাশে ঘোরাফেরা করতে লাগলো।

বাঘ দেখেই উতবা ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলে উঠলো- 'হায় হায়, আমার ধ্বংস! আল্লাহর কসম, সে আমাকে খেয়ে ফেলবে- এ মর্মেই মুহাম্মদ আমার ধ্বংসের জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করেছিলো। দেখো, আমি শাম রাজ্যে অবস্থান করছি অথচ সে মক্কা থেকেই আমাকে হত্যা করছে।

উতবার এ কথা শোনার পর তার সঙ্গী-সাথিরা সাবধানতা অবলম্বনের জন্য তাকে তাদের মধ্যস্থলে শুইয়ে দিলো- যাতে বাঘ এসে সহজে তার নিকট পৌঁছতে না পারে।

কিন্তু গভীর রাতে সেখানে বাঘ এসে সকলকে পাশ কাটিয়ে সোজা উতবার নিকটে যায় এবং তার মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যায়।

একদা 'উকবা বিন আবি মুয়াইত' রাসূল যখন সিজদারত ছিলেন তখন তাঁর ঘাড় এত জোরে পদতলে পিষ্ঠ করলো যে, মনে হলো তার চোখ দুটো তখনই চোখের কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে।

ইবনে ইসহাকের এক দীর্ঘ বর্ণনায় দুরাচার চরমপন্থী কুরাইশদের এমন দুরভিসন্ধির আভাস পাওয়া যায় যে, তারা রাসূল কে হত্যা করে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো।

উক্ত বর্ণনা সূত্রে বলা হয়েছে: কুরাইশদেরকে উদ্দেশ্যে করে একদিন আবু জাহেল বললো- হে কুরাইশ ভ্রাতৃবৃন্দ। আপনারা সম্যকরূপে অবগত আছেন যে, মুহাম্মদ আমাদের ধর্মের কলঙ্ক রটাচ্ছে, আমাদের পূর্বপুরুষদের নিন্দা করছে, আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধিকে খাটো বলে রটনা করছে এবং আমাদের দেব-দেবীদের অবমাননা করছে। এসব কারণে আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি একখন্ড ভারি এবং সহজে উঠানো সম্ভব এমন পাথর নিয়ে কাবা চত্বরে বসে থাকবো এবং মুহাম্মদ যখন সিজাদায় যাবে তখন সে পাথর মেরে তার মাথা চূর্ণ করে ফেলবো। এখন এই পরিস্থিতিতে হয় তোমরা আমাকে একা অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দাও, আর না হয় সাহায্য করো। বনু আবদে মানাফ এরপর যা ইচ্ছে তাই করুক।

উপস্থিত কুরাইশরা বললো- 'আল্লাহর কসম! আমরা তোমাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারি না। তুমি যা করার ইচ্ছা করেছো তা করে ফেলো। সকাল হলে আবু জেহেল তার ঘোষণা অনুযায়ী একখন্ড পাথর নিয়ে রাসূল (ﷺ) এর অপেক্ষায় কাবা চত্বরে বসে থাকলো।

রাসূল (ﷺ) যথানিয়মে কাবা চত্বরে আগমন করলেন এবং সালাত আদায় করতে লাগলেন। কুরাইশগণও সেখানে উপস্থিত হয়ে আবু জেহেলের কথিত কান্ড দেখার জন্য অপেক্ষমান রইলো।

যখন রাসূল সিজদায় গেলেন তখন আবু জাহেল পাথর উঠিয়ে তার দিকে অগ্রসর হলো। কিন্তু নিকটে পৌঁছেই পরাস্ত সৈনিকের মতো সবেগে পিছু হটে এলো। এ সময় তাকে অত্যন্ত বিবর্ণ এবং ভীত-সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল। তার দুই হাত পাথরের সাথে শক্তভাবে চিমটিয়ে লেগে গিয়েছিলো। পাথরের গা থেকে হাত ছাড়াতে তাকে যথেষ্ট কষ্ট করতে এবং বেগ পেতে হয়েছিলো।

পরিস্থিতি অবলোকন করে কুরাইশদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক লোক দ্রুত তার নিকট এগিয়ে আসে এবং বলতে থাকে- 'আবুল হাকাম। ব্যাপারটা হলো কি? কিছুই তো বুঝে উঠতে পারছি না।

আবু জাহেল বললো- আমি রাতের বেলা যা বলেছিলাম তা করার জন্যই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন তার নিকটে গিয়ে পৌঁছলাম তখন একটি উট আমার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ালো। হায় আল্লাহ! কখনো তো আমি এমন মন্ত্রক, এমন ঘাড় এবং দাঁতবিশিষ্ট উট দেখিনি। মনে হলো সে যেন আমাকে খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে।

ইবনে ইসহাক বলেছেন, আমাকে বলা হয়েছে যে, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন: উষ্ট্রের রূপ ধারণ করে সেখানে জিবরাঈল (আ) এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। আবু জাহেল যদি আমার নিকট যেতো তাহলে তার ওপর মহাবিপদ নেমে আসতো।

এরপর আবু জাহেল এমন একটি গণ্ডগোল পাকিয়ে তুললো, যা হামযার ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ালো। সে ঘটনার বিবরণ যথাস্থানে তুলে ধরা হবে।

অন্যান্য কুরাইশ দুর্বৃত্তদের সম্পর্কেও সত্যিকারভাবে বলা যায় যে, রাসূল (ﷺ)কে হত্যার মাধ্যমে ধরাপৃষ্ঠ থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলার এক গভীর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র তাদের অন্তরে ক্রমেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে। যেমনটি আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস হতে ইবনে ইসহাক তাঁর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেছেন: একদিন কুরাইশ মুশরিকরা কা'বার 'হাতীমে' সম্মিলিতভাবে অবস্থান করছিলো। সেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। মুশরিকরা রাসূল সম্পর্কে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলো। আলোচনার এক পর্যায়ে তারা বললো- এই ব্যক্তির ব্যাপারে আমরা যে ধৈর্যধারণ করেছি তার কোনো তুলনা নেই। প্রকৃতই এর ব্যাপারে আমরা বড়োই ধৈর্যধারণ করেছি।

এমন বিষয়বস্তু নিয়ে যখন তাদের কথোপোকথন চলছিলো তখন কিছুটা যেন অপ্রত্যাশিত ভাবেই রাসূল সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানে আগমনের পর সর্বপ্রথম তিনি 'হাজরে আসওয়াদ পাথরে চুম্বন করলেন এবং কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করলেন। এসব করতে গিয়ে তাঁকে মুশরিকদের নিকট দিয়ে যাতায়াত করতে হলো। এ অবস্থায় কিছু বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা বলে তারা তাঁর প্রতি কটাক্ষ করায় রাসূল রং এর মনে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো সেটার বহিঃপ্রকাশ তাঁর চেহারা মুবারকে আমি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করলাম।

এরপর দ্বিতীয় দফায় তিনি যখন সেখানে গেলেন তখনো মুশরিকরা অনুরূপভাবে তাঁকে বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা বলে ভর্ৎসনা করলো। আমি শুনলাম এবারও তারা আগের মতো বিদ্রূপাত্মক কথাবার্তা বললো।

এবার রাসূল সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন: 'হে কুরাইশগণ! শুনেছো? সে সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন! আমি তোমাদের নিকট কুরবানির পশু নিয়ে এসেছি।

তাদের প্রতি রাসূল (ﷺ) এর এ সম্বোধন এবং কথাবার্তা তাদেরকে এতোই প্রভাবিত করে ফেললো যে, তাদের সবার মূর্ছে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে পড়লো এবং এমনি এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়ে গেলো যে, তাদের মনে হতে লাগলো যেন প্রত্যেকের মাথার ওপর চড়ুইপাখি বসে রয়েছে। এমনকি সেই দলের মধ্যে যে ব্যক্তি রাসূল (ﷺ) এর ওপর সবচেয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিলো সেও যেন খুব ভালো মানুষটি হয়ে গেলো এবং পঞ্চমুখে তাঁর প্রশংসা শুরু করলো। অত্যন্ত বিনীতভাবে সে বলতে লাগলো- আবুল কাসেম! প্রত্যাবর্তন করুন। আল্লাহর কসম! আপনি কখনোই জ্ঞানহীন ছিলেন না।

দ্বিতীয় দিনেও মুশরিকরা সেখানে একত্রিত হয়ে রাসূল সম্পর্কে আলাপ-আলোচনায় রত ছিলো: এমন সময় তিনি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রাসূল (ﷺ) কে এভাবে দেখে তারা সকলে সম্মিলিতভাবে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে চুতর্দিক থেকে ঘিরে ধরলো।

আমি লক্ষ করলাম, তাদের মধ্য থেকে একজন তাঁর গলার চাদর ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করে দিলো। সেসময় আবুবকর (রা) ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মুশরিকদের হাত থেকে রাসূল কে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। সে সাথে তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন-

তোমরা লোকটিকে কি এ জন্য হত্যা করছো যে, তিনি বলছেন: 'আল্লাহ আমার প্রভু' এরপর তারা রাসূল কে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের জায়গায় ফিরে গেলো।

আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস বলেছেন: 'এটাই ছিলো সবচেয়ে কঠিন অত্যাচার ও উৎপীড়ন যা আমি কুরাইশদেরকে করতে দেখেছি। সহিহ বুখারিতে উরওয়া বিন যুবায়ির (রা) হতে বর্ণিত এক বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি বলেছেন: আমি আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আসকে মুশরিকরা রাসূল (ﷺ) এর ওপর সবচেয়ে কঠিন যে নিপীড়ন চালিয়েছিলো তা আমার সামনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করলাম।

তিনি বললেন' একদিন রাসূল কা'বা ঘরের 'হাতীমে' সালাত আদায় করছিলেন: এমন সময় উকবা বিন আবি মুয়িত সেখানে আগমন করলো। সে সেখানে উপস্থিত হয়েই নিজ কাপড় দ্বারা রাসূল (ﷺ) এর গলা ধরে অত্যন্ত জোরে চপেটাঘাত করলো এবং গলা টিপে ধরলো। এমন সময় আবু বকর (রা) সেখানে উপস্থিত হলেন এবং উকবার দুই কাঁধ ধরে জোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললেন:

তোমরা কি লোকটিকে এ জন্যই হত্যা করছো যে, তিনি বলছেন- 'আমার প্রভু আল্লাহ।'

আসমা (রা) এর সূত্রে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবু বকর (রা)- এর নিকট যখনএ আওয়াজ পৌঁছলো- যে আপন বন্ধুকে বাঁচাও-তিনি তখন অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে আমাদের মধ্য থেকে বের হলেন। তাঁর মাথায় চুলের চারটি ঝুঁটি ছিলো। যাওয়ার সময় তিনি বলতে লাগলেন যে-

তোমরা লোকটিকে শুধু এ কারণে হত্যা করছো যে, তিনি বলেছেন: "আমার প্রভু আল্লাহ।" এরপর মুশরিকরা রাসূল কে ছেড়ে দিয়ে আবু বকর এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি যখন ফেরত আসলেন তখন তাঁর অবস্থা ছিলো এমন যে, আমরা তাঁর চুলের মধ্য থেকে যে ঝুটিটাই ধরছিলাম সেটাই আমাদের টানের সাথে সাথে উঠে আসছিলো।

বড়ো বড়ো সাহাবাদের ইসলাম গ্রহণ

হামযা (রা) এর ইসলাম গ্রহণ

জাহেলি যুগে মক্কার বিস্তৃত অঞ্চল অন্যায় ও অত্যাচারের ঘনকৃষ্ণ মেঘমালা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিলো। সে মেঘমালার মধ্য থেকে হঠাৎ এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকিত হওয়ায় নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পথ আলোকিত হলো এবং সে আলোয় আলোকিত হয়ে এক পর্যায়ে হামযা মুসলমান হয়ে গেলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সংঘটিত হয় রাসূল (ﷺ) এর নবুয়ত প্রাপ্তির ৬ষ্ঠ বর্ষের শেষভাগে। সম্ভবতঃ তিনি যিলহজ্জ মাসে মুসলমান হয়েছিলেন।

আল্লাহ যাঁর ওপর রহম করেন তাঁর পক্ষেই ইসলামের অমিয় ধারা থেকে এক আজলা পান করা সম্ভব হয়। যদিও হামযার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটিও আল্লাহর বিশেষ রহমতেরই ফলশ্রুতি, তবু তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে একটি বিশেষ কথা উল্লেখ না করে পারা যায় না। ঘটনাটি নিম্নরূপ:

একদিন আবু জাহেল সাফা পর্বতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। রাসূল কে দেখে অনেক কটুবাক্য করলো এবং অপমানসূচক কথাবার্তা বললো।

রাসূল (ﷺ)- আবু জাহেলের কথাবার্তার কোনো উত্তর না দিয়ে সম্পূর্ণ নীরব হয়ে রইলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবু জাহেল একটি পাথর তুলে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাথায় আঘাত করলো। এর ফলে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান হতে রক্তধারা প্রবাহিত হতে লাগলো। অতঃপর আবু জাহেল কা'বা ঘরের নিকটে কুরাইশদের বৈঠকে গিয়ে মিলিত হলো।

আব্দুল্লাহ বিন জুদয়ানের একজন দাসী নিজ গৃহ থেকে তীর-ধনুক হাতে ফিরে আসামাত্রই তাঁকে আবু জাহেলের অন্যায়-অত্যাচার এবং রাসূল (ﷺ) এর ধৈর্যধারণের ব্যাপারটি বর্ণনা করে শোনালো।

ঘটনাটি শোনামাত্রই হামযা (রা) ক্রোধে ফেটে পড়লেন। কুরাইশদের মধ্যে তিনি ছিলেন মহাবীর এবং মহাশক্তিশালী এক যুবক। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তিনি এ প্রতিজ্ঞা নিয়ে ছুটে চললেন যে, যেখানেই আবু জাহেলের দেখা পাবেন সেখানেই তিনি তাকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বেন। হামযা (রা) আবু জাহেলের খোঁজ করতে করতে গিয়ে তাকে পেলেন মসজিদুল হারামে। সেখানে তিনি তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন: 'ও হে গুহ্যদ্বার দিয়ে বায়ু নিঃসরণকারী! আমার ভাতিজা মুহাম্মদ কে তুমি গালি দিয়েছ এবং পাথর দিয়ে আঘাত করেছ? অথচ আমি তার দ্বীনেই আছি।'

এরপর তিনি নিজের হাতে থাকা ধনুক দ্বারা তার মাথায় প্রচন্ডভাবে আঘাত করলেন: যাতে সে আহত হয়ে গেলো। এর ফলে আবু জাহেলের বনু মাখযুম ও হামযা (রা) এর বনু হাশেম গোত্রদ্বয় একে অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো।

কিন্তু আবু জাহেল এ বলে সকলকে নিরস্ত্র করলো যে, আবু উমারাকে যেতে দাও। আমি সত্যিই তার ভাতিজাকে গালমন্দ করেছি এবং আঘাত দিয়েছি।

প্রাথমিক পর্যায়ে হামযা (রা) এর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি ছিলো কিছুটা যেন ভাতিজার প্রতি আবেগের উৎস থেকে উৎসারিত। মুশরিকরা ভাতিজাকে কষ্ট দিতো এটা বরদাস্ত করা তাঁর পক্ষে খুবই কঠিন ছিলো। সুতরাং তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে হয়তো তার দুঃখ-কষ্টের কিছুটা লাঘব হতে পারে এ ধারণার বশবর্তী হয়েই তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।

পরে আল্লাহ তাঁর অন্তরে ইসলামপ্রীতি জোরদার করে দেয়ায় তিনি দ্বীনের রশি মজবুত করে ধরলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ফলে মুসলমানদের শক্তি এবং সম্মান দুই-ই বৃদ্ধি পেলো।

ওমরের ইসলাম গ্রহণ

কাফির-মুশরিকদের অন্যায়-অত্যাচারের বিস্তৃত পরিমন্ডলে ঘনকৃষ্ণ মেঘমালার বুক চিরে আরও একটি জ্যোতিষ্মান বিদ্যুতের চমকে আরবগণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আরব জাহানের অন্যতম তেজস্বী পুরুষ ওমর বিন খাত্তাব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সংঘটিত হয় নবুয়তের ৬ষ্ঠ বর্ষে হামযা (রা) এর ইসলাম গ্রহণের মাত্র ৩ দিন পর।

রাসূল ওমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রর্থনা করেছিলেন। ইমাম তিরমিযি আব্দুল্লাহ বিন ওমর হতে এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন এবং একে বিশুদ্ধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। অনুরূপভাবে তাবরানী ইবনে মাসউদ (রা) এবং আনাস (রা) এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল এ বলে দু'আ করেছেন-

হে আল্লাহ! ওমর বিন খাত্তাব অথবা আবু জাহেল বিন হিশাম-এই দু'জনের মধ্য হতে যে তোমার নিকট অধিক প্রিয় তার দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী করে দাও।

রাসূল (ﷺ) এর এ প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করলেন এবং এ দু'জনের মধ্যে আল্লাহর নিকট ওমর (রা) অধিক প্রিয় ছিলেন। আর ওমর মুসলমান হয়ে গেলেন।

ওমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত সকল বর্ণনা একত্রিত করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর অন্তরে ইসলাম ধীরে ধীরে স্থান লাভ করতে থাকে। ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত বিষয়াদির সার-সংক্ষেপ তুলে ধরার পূর্বে তাঁর মন-মানসিকতা এবং আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

ওমর (রা) তাঁর উগ্রমেজাজ, রূঢ় প্রকৃতি এবং বীরত্বের জন্য আরব সমাজে বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। মুসলমানগণকে বেশ কিছুকাল যাবৎ তাঁর হাতে উৎপীড়িত ও নিগৃহীত হতে হয়েছিলো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের আভাস যেন প্রথম থেকেই তাঁর মধ্যে পরিলক্ষিত হতো। তাঁর হাবভাব দেখে মনে হতো যে, ভাবাবেগের দু বিপরীতমুখী শক্তি যেন তাঁর অন্তরাজ্যে পরস্পর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। একদিকে তিনি তার পূর্বপুরুষগণের অনুসৃত রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং মদ্যপান ও আমোদ-প্রমোদের প্রতি তার যথেষ্ট আসক্তি ছিলো। অন্যদিকে মুসলমানদের ঈমান ও আকিদা এবং বিপদ-আপদে তাদের ধৈর্যধারণের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে তিনি হতবাক হয়ে যেতেন এবং সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাদের দিকে চেয়ে থাকতেন৷

উপরন্তু কোনো কোনো সময় জ্ঞানী ব্যক্তিগণের মতো তাঁর মনে তত্ত্ব- চিন্তার উদ্রেকও হতো। তিনি আপন খেয়ালে চিন্তা করতে থাকতেন নানা বিষয়, নানা কথা। কোনো কোনো সময় এটাও তাঁর মনে হতো যে, ইসলাম যে পথের সন্ধান দিচ্ছে, যে পথে চলার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে সম্ভবত; সেটাই উত্তম ও পবিত্রতম পথ। এজন্য প্রায়ই তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতেন, কোনো কোনো সময় বিচলিত বোধ করতেন, কখনো বা নিরুৎসাহিত হতেন।

ওমরকে একদিন বাড়ির বাইরে অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাতযাপন করতে হয়। তিনি বায়তুল্লাহ চত্বরে আগমন করেন এবং কাবাঘরের পর্দার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। রাসূল সে সময় সালাত আদায় করছিলেন। সালাতে তিনি সূরা 'আল-হাক্কা' তিলাওয়াত করছিলেন। ওমর (রা) নীরবে গভীর মনোযোগের সাথে তিলাওয়াত শ্রবণ করলেন এবং এর ঝংকার, বাক্যবিন্যাস ও সূরা মাধুর্যে মুগ্ধ, চমৎকৃত ও হতবাক হয়ে গেলেন।

ওমরের বর্ণনাসূত্রে এটা বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, 'আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম! কুরাইশরা যেমনটি বলে থাকে তিনি হচ্ছেন একজন কবি। কিন্তু এ সময় রাসূল এই আয়াত পাঠ করেন- "এই কুরআন হচ্ছে একজন দূত কর্তৃক আনীত বাণী এবং ইহা কোনো কবির কল্পনা নয়, কিন্তু এতে তোমরা খুব কমই বিশ্বাস স্থাপন করো।"

ওমর (রা) বললেন: 'আমি মনে মনে বললাম, আরে এ তো হচ্ছে আমারই মনের কথা, সে কী করে তা জানলো! নিশ্চয় মুহাম্মদ হচ্ছেন একজন মন্ত্রতন্ত্রধারী গণক।'

আমার মনে উক্ত ভাবের উদয় হওয়ার পরপরই মুহাম্মদ তিলাওয়াত করলেন-

এটা কোনো গণকের উক্তিও নয়, তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকো। এটা আল্লাহর রাব্বুল আলামীন কর্তৃক নাযিলকৃত বাণী।

রাসূল তার সালাতে সূরার শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন এবং ওমর (রা) তা শ্রবণ করলেন। উক্ত প্রসঙ্গে ওমর (রা) বলেছেন: 'সে সময় ইসলাম আমার অন্তররাজ্যে স্থান অধিকার করে বসলো।'

প্রকৃতপক্ষে ওমর (রা) এর অন্তরে এটাই ছিলো ইসলামের বীজ বপনের প্রথম সময়। কিন্তু তখনো তাঁর চেতনায় অজ্ঞতাপ্রসূত, আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রতি প্রবল অন্ধত্ব এবং পূর্বপুরুষগণের ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের ঐতিহ্যগত প্রভাব জগদ্দল পাথরের মতো তাঁর মন-মস্তিষ্কে এতই প্রভাবিত করে রেখেছিলো যে, ইসলামের প্রাথমিক অনুভূতির কার্যকারিতা তেমন একটা ছিলো না বললেই চলে। সুতরাং বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে থাকার ব্যাপারেই তাঁর আগ্রহ ছিলো ঐকান্তিক।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির লোক। তাঁর স্বভাবগত কঠোরতার কারণেই তিনি ছিলেন রাসূল এবং মুসলমানদের অন্যতম বিপজ্জনক শত্রু। তিনি এতই বিপজ্জনক ছিলেন যে, রাসূল কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে একদিন তিনি খোলা তরবারি হাতে বের হন। রুক্ষ মেজাজে তাঁর পথচলার একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে নঈম বিন আব্দুল্লাহ নাহহাম আদভী নামে কোনো এক ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁর ক্রোধ কুক্ষিত অবস্থায় দেখে সে ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো- হে ওমর! কি উদ্দেশ্যে কোথায় চলেছো? তিনি বললেন: মুহাম্মদ কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে চলেছি।'

লোকটি বললো- 'মুহাম্মদ কে হত্যা করে বনু হাশেম ও বনু যোহরা থেকে কিভাবে রক্ষা পাবে? ওমর বললেন: 'মনে হচ্ছে তোমরাও পূর্বপুরুষগণের ধর্ম পরিত্যাগ করে বেদ্বীন হয়ে গেছো। লোকটি বললো: 'ওমর! একটি আজব কথা তোমাকে শুনাবো নাকি? তোমার বোন এবং ভগ্নিপতিও তোমাদের ধর্ম পরিত্যাগ করে বেদ্বীন হয়ে গেছে।

এ কথা শুনে উমর আগুনে ঘি ঢালার মতো দপ করে জ্বলে উঠলেন এবং সোজা ভগ্নিপতির গৃহাভিমুখে যাত্রা করলেন। সেখানে খাব্বাব বিন আরাত 'সূরায়ে ত্বাহা'র অংশবিশেষ স্বামী-স্ত্রীকে তালীম দিচ্ছিলেন। খাব্বাব তাঁদের তালীম দেয়ার জন্য নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতেন।

খাব্বাব (রা) যখন ওমর (রা) এর সেখানে আগমনের শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি ঘরের মধ্যে আত্মগোপন করলেন এবং ওমরের বোন ফাতিমা সে অংশটি লুকিয়ে রাখলেন। কিন্তু ওমর বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে খাব্বাবের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন-'কার কণ্ঠে মৃদু মৃদু আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম?

তাঁর বোন উত্তর করলেন: 'না, তোমন কিছুই না। আমরাই পরস্পর কথাবার্তা বলছিলাম। ওমর (রা) বললেন: 'সম্ভবত তোমরা উভয়েই। বেদ্বীন হয়ে গেছো?'

ভগ্নিপতি সাঈদ বললেন: 'আচ্ছা ওমর! বলোতো, তোমাদের ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে যদি সত্য থাকে তবে সেক্ষেত্রে করণীয় কি হবে?

একথা শোনামাত্র ওমর অত্যন্ত রাগান্নিত হয়ে ভগ্নিপতিকে নির্মমভাবে প্রহার করতে শুরু করলেন। নিরুপায় হয়ে ছোট বোন জোর করে ভাইয়ের হাত থেকে স্বামীকে ছাড়িয়ে একটু দূরে সরিয়ে দিলেন। এতে আরো ক্রুদ্ধ হয়ে ওমর তাঁর বোনের গালে জোরে চড় মারলেন যে, সাথে সাথে তাঁর মুখমন্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেলো।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, তিনি মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। বোন ফাতিমা ক্রোধ ও আবেগজড়িত কণ্ঠে বললেন: 'ওমর! তোমার ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্ম যদি সত্য হয়- 'এ বলে তিনি কালেমা শাহাদাত পাঠ করলেন: "আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনোই উপাস্য নাই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।"

শাহাদতের এ বাণী শোনামাত্র ওমর (রা) এর হৃদয়জগতে ভাবান্তর শুরু হয়ে গেলো। তিনি তাঁর ছোট বোনের রক্তাক্ত মুখমন্ডল দেখে লজ্জিত এবং অনুতপ্ত হলেন। অতঃপর তিনি বোনকে সম্বোধন করে কোমল কণ্ঠে বললেন: তোমাদের নিকট যে আয়াতখানা আছে তা আমাকে একবার পড়তে দিবে?

বোন বললেন: "তুমি অপবিত্র রয়েছো। অপবিত্র লোকেরা তা স্পর্শ করতে পারে না। শুধুমাত্র পবিত্র লোকেরাই তা স্পর্শ করতে পারবে।"

ওমর গোসল করে পাক-সাফ হলেন তারপর কুরআনের আয়াত গুলো হাতে নিলেন এবং 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' পড়লেন এবং মন্তব্য করলেন-'এ তো বড়োই পবিত্র নাম। অতঃপর সূরায়ে তহা হতে: "নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোন [সত্য] ইলাহ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।" (সূরা তাহা: আয়াত-১-১৪) পর্যন্ত পাঠ করলেন এবং পাঠ শেষে বললেন-'এ তো বড়োই উত্তম এবং বড়োই সম্মানিত কথা। আমাকে মুহাম্মদ এর সন্ধান বলো।

ওমর (রা) এর এই কথা শুনে খাব্বাব (রা) লুকানো জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে বললেন: 'ওমর! সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমার ধারণা যে রাসূল বিগত বৃহস্পতিবার রাতে তোমার সম্পর্কে যে প্রার্থনা করেছিলেন হে আল্লাহ! ওমর বিন খাত্তাব অথবা আবু জাহেল বিন হিশামের দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী করে দিন। আমার মনে হয় তা কবুল হয়েছে।

সেসময় রাসূল সাফা পর্বতের নিকটস্থ নিজ আবাসস্থলে অবস্থান করছিলেন। খাব্বাব (রা) এর মুখ থেকে উক্ত কথা শোনার পর ওমর (রা) তাঁর তরবারিখানা কোষবদ্ধ করে রাসূল (ﷺ) এর আবাসস্থলের পথ ধরে চলতে লাগলেন। অতঃপর তিনি বাড়ির বাহিরাঙ্গনে উপস্থিত হয়ে দরজায় করাঘাত করলেন।

দরজার ফাঁক দিয়ে এক ব্যক্তি উকি দিয়ে দেখতে পেলেন যে, কোষবদ্ধ তলোয়ারসহ ওমর দণ্ডায়মান রয়েছেন। ঝটপট রাসূল কে তা অবগত করানো হলো। উপস্থিত লোকজন যাঁরা সেখানে তখন ছিলেন সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সাথে সাথে কাছাকাছি এসে ওমরকে মোকাবেলা করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে গেলেন।

সকলের মধ্যে সন্ত্রস্ত ভাব লক্ষ করে হামযা (রা) জিজ্ঞেস করলেন- 'কি ব্যাপার, কি এমন হয়েছে? হামযা (রা) বললেন-ঠিক আছে। ওমর এসেছে, দরজা খুলে দাও। যদি সে সদিচ্ছা নিয়ে আগমন করে থাকে তাহলে আমাদের তরফ থেকেও ইনশাআল্লাহ সদিচ্ছার কোনোই অভাব হবে না। আর যদি সে কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে নিয়ে আগমন করে থাকে তাহলে আমরা তাকে তার তলোয়ার দ্বারাই খতম করবো।

এদিকে রাসূল গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর ওপর ওহী নাযিল হচ্ছিল। ওহী নাযিল সমাপ্ত হলে তিনি ওমরের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বৈঠকখানায় আগমন করলেন। তিনি ওমরের কাপড় এবং তরবারির কোষ ধরে শক্তভাবে টান দিয়ে বললেন: 'ওমর! যেমনটি ওয়ালীদ বিন মুগীরার ওপর গজব নাযিল হয়েছিলো তেমনি আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ না তোমার ওপর লাঞ্ছনা, অবমাননা এবং শিক্ষামূলক শাস্তি নাযিল না হচ্ছে ততক্ষণ কি তুমি পাপাচার থেকে বিরত হবে না?

অতঃপর রাসূল (ﷺ) আল্লাহর দরবারে দু'আ করলেন: হে সর্বশক্তিশান প্রভু! তোমার ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছাই হচ্ছে চূড়ান্ত। এ ওমর বিন খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি এবং সম্মান বৃদ্ধি করুন।

রাসূল (ﷺ) এর এ প্রার্থনা শোনার পর ওমর (রা) এর অন্তরে এমনি এক স্পন্দনের সৃষ্টি হতে লাগলো যে, তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন এবং পাঠ করলেন: "আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনোই উপাস্য নেই এবং সত্যই আপনি আল্লাহর রাসূল।"

ওমর (রা) এর মুখ থেকে তাওহীদের এ বাণী শোনামাত্র সেখানে উপস্থিত লোকজনেরা এতো জোরে 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনি উচ্চারণ করলেন যে, মসজিদুল হারামে অবস্থানকারী লোকেরাও তা স্পষ্টভাবে শুনতে পেলেন।

আরবমুলকে এটা সর্বজন বিদিত বিষয় ছিলো যে, ওমর বিন খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী এবং প্রভাবশালী। তিনি এতই প্রতাপশালী ছিলেন যে, তাঁর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সাহস সেই সমাজে কোনো ব্যক্তিরই ছিলো না।

উক্ত কারণে তাঁর মুসলমান হয়ে যাওয়ার কথা প্রকাশ হওয়া মাত্র মুশরিকদের মধ্যে ক্রন্দন এবং বিলাপ সৃষ্টি হয়ে গেলো এবং তারা নিজেরা বড়োই লাঞ্ছিত ও অপমানিত বোধ করতে লাগলো।

পক্ষান্তরে ওমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণ করার ফলে মুসলমানদের শক্তি সাহস ও মান-মর্যাদা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়ে গেলো এবং তাদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার প্রবাহিত হতে লাগলো। ইবনে ইসহাক সনদ সূত্রে বরাতে ওমর (রা) এর বর্ণনায় উদ্ধৃত করেছেন:

যখন আমি মুসলমান হয়ে গেলাম তখন চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলাম যে, মক্কার কোন কোন ব্যক্তি রাসূল (ﷺ) এর সবচেয়ে প্রভাবশালী শত্রু। তৎক্ষণাৎ তার গৃহে গমন করে দরজায় করাঘাত করলাম।

আবু জাহেল বের হয়ে এসে খোশ আমদেদ! খোশ আমদেদ! বলে আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে স্বাগত জানালো এবং বললো- 'কিভাবে এ অভাগার কথাটা আজ মনে পড়ে গেলো?

প্রত্যুত্তরে কোনো ভূমিকা না করেই আমি সরাসরি বললাম- 'তোমাকে আমি একথা বলতে এলাম যে, আল্লাহ, তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ) এবং দ্বীন ইসলামের প্রতি আমি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যা কিছু আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর ওপর নাযিল হয়েছে তার ওপরও বিশ্বাস স্থাপন করেছি।

আমার কথা শোনামাত্র সে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললো- "আল্লাহ তোমার মন্দ করুন এবং যা কিছু আমার নিকট নিয়ে এসেছো সে সবেরও মন্দ করুন।"

ইমাম ইবনে জাওযি ওমর (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেছেন: যখনই কোনো ব্যক্তি মুসলমান হয়ে যেত তখনই লোক তার পিছু ধাওয়া করতো এবং তাকে মারধর করতো।

আমিও তাদের মারধর করতাম। এ কারণে যখন আমি মুসলমান হয়ে গেলাম, তখন আমার মামা আসী বিন হাশিমের নিকটে গেলাম এবং তাকে আমার মুসলমান হয়ে যাওয়ার খবর জানালাম। আমার কথা শোনামাত্রই সে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো। অতঃপর কুরাইশের একজন বড়ো প্রধানের বাড়িতে গেলাম (সম্ভবত আবু জাহেলের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে) এবং তাকেও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করলাম। কিন্তু সে-ও ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো।

ইবনে হিশাম এবং ইবনে জাওযি বর্ণনা করেছেন যে, যখন ওমর (রা) মুসলমান হলেন তখন তিনি জামীল বিন মা'মার জুমাহী'র নিকট গেলেন। মানুষের নিকট কোনো কথা বা তথ্য প্রচার করা কিংবা ঢোল-শোহরত করার ব্যাপারে সে কুরাইশদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলো। ওমর তাকে বললেন, তিনি মুসলমান হয়ে গিয়েছেন। একথা শোনামাত্র সে ঘর থেকে বের হয়ে পড়লো এবং অত্যন্ত উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করতে লাগলো যে, খাত্তাবের পুত্র ওমর বেদ্বীন হয়ে গিয়েছে।

ওমর (রা) তার পিছনেই ছিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি এ বলে উত্তর দিলেন: "এ লোক মিথ্যা বলছে। আমি বেদ্বীন হইনি বরং মুসলমান হয়েছি।" যা হোক, লোকজনেরা তার ওপর চড়াও হলো এবং মারপিট শুরু হয়ে গেলো। একপক্ষে অনেক জনতা এবং অন্যপক্ষে ওমর। মারপিট চলতে লাগালো। এত সময় ধরে মারপিট চললো যে, সে অবস্থায় সূর্য প্রায় মাথার ওপর এসে পড়লো। ওমর ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন। লোকজন তাঁকে ঘিরেই দাঁড়িয়ে ছিলো।

ওমর (রা) বললেন: 'যা খুশি করো।' আল্লাহর শপথ! আমরা যদি সংখ্যায় তিনশত হতাম এই বলে তারা আরও রাগান্বিত হলো এবং সংঘব্ধ হয়ে উঠলো এবং ওমর (রা) এর বাড়ি আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করার এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো- যেমনটি সহিহ বুখারির মধ্যে ইবনে ওমর হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন:

মুশরিকদের আক্রমণের আশংকায় ওমর (রা) ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ঘরের মধ্যেই অবস্থান করছিলেন: এমন সময় 'আবু আমর আস বিন ওয়ায়েল সাহমি সেখানে আগমন করলো। সে ইয়েমেন দেশের তৈরি নকশাদার জরিদার চাদর এবং রেশম দ্বারা সুসজ্জিত চমকদার জামা পরিহিত অবস্থায় ছিলো। তার সম্পর্ক ছিলো সাহম গোত্রের সাথে এবং জাহেলি যুগে এ গোত্র বিপদ-আপদে ওমর (রা) এর গোত্রকে সাহায্য করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো।

সে জিজ্ঞেস করলো: কী ব্যাপার?

ওমর (রা) বললেন: আমি মুসলমান হওয়ার কারণে আপনার জাতি আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছে।

আস বললো: তা সম্ভব নয়।

আসের কথা শুনে ওমর (রা) মনে কিছুটা শান্তি পেলেন, কিছুটা তৃপ্তি অনুভব করলেন।

অতঃপর আস সেখান থেকে ফিরে লোকজনদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার উদ্যোগ গ্রহণ করলো। তখন জনতার ভিড়ে সমগ্র উপত্যকা গিজ গিজ করছিলো। সাধারণ জনতার অগ্রভাগে থাকা লোকজনকে জিজ্ঞেস করলো: তোমরা কোথায় চলেছো।

উত্তরে তারা বললো: 'আমরা চলেছি খাত্তাবের ছেলের একটা কিছু ব্যবস্থা করতে। আস বললো: কারণ সে বেদ্বীন বিধর্মী না। সেদিকে যাওয়ার কোনো পথ নেই। একথা শোনামাত্রই জনতা আর অগ্রসর না হয়ে তাদের পূর্বের অবস্থানস্থলে ফিরে গেলো।

ইবনে ইসহাকের এক বর্ণনায় আছে-'আল্লাহর শপথ! তাদের দেখে মনে হচ্ছিলো যেন তারা সমস্ত লোকজন একখানা কাপড় ছিলো-যাকে ওপর হতে নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ওমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণের কারণে মুশরিকদের এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো-যা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে অনুমান কিংবা কিছুটা ধারণা লাভ করা সম্ভব হবে, এর পাশাপাশি আলোচিত পরের ঘটনাটি থেকে।

মুজাহিদ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে: আমি ওমর বিন খাত্তাবকে জিজ্ঞেস করলাম যে, কি কারণে আপনার উপাধি 'ফারুক' হয়েছে?

তখন তিনি আমাকে বললেন, আমার তিনদিন পূর্বে হামযা (রা) মুসলমান হয়েছিলেন।

অতঃপর তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করে শেষে বললেন: "আমি যখন মুসলমান হলাম তখন আমি বললাম: "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নই, যদি জীবিত থাকি কিংবা মরে যাই?"

রাসূল - ইরশাদ করলেন: 'অবশ্যই! সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন, তোমরা যদি জীবিত থাকো কিংবা মৃত্যুমুখে পতিত হও, সত্যের ওপরেই তোমরা প্রতিষ্ঠিত রয়েছো।'

ওমর (রা) বললেন: তখন আমি সকলকে লক্ষ করে বললাম, গোপনীয়তার আর কী প্রয়োজন? সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন! আমরা অবশ্যই গোপনীয়তা পরিহার করে বাইরে যাবো।

অতঃপর আমরা দু'টি সারি বেঁধে রাসূলকে দুই সারির মধ্যে নিয়ে বাইরে এলাম। এক সারির অগ্রভাগে ছিলেন হামযা (রা), আর অন্য সারির অগ্রভাগে ছিলাম আমি।

আমাদের চলার কারণে রাস্তা থেকে হালকা ধূলিকণা উঠে যাচ্ছিল। এভাবে যেতে যেতে আমরা মসজিদুল হারামে গিয়ে প্রবেশ করলাম।

ওমর (রা) বলেছেন, কুরাইশরা যখন আমাকে এবং হামযাকে মুসলমানদের সাথে দেখলো তখন মনে মনে তারা এত দুঃখ পেলো এবং বেদনাহত হলো যে, এমনটি ইতোপূর্বে আর কখনোই হয়নি। সে দিন-ই রাসূল আমার উপাধি দিয়েছিলেন "ফারুক"।

ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন, যতদিন পর্যন্ত ওমর (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি ততদিন পর্যন্ত আমরা কা'বাঘরে গিয়ে সালাত আদায় করতে সাহস করিনি।

সুহাইব বিন সেনান রুমী বর্ণনা করেছেন: ওমর (রা) যেদিন ইসলাম গ্রহণ করলেন সেদিন থেকে ইসলাম গোপন প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো বাইরের জগতে। সে দিন থেকে প্রকাশ্যে প্রচার এবং মানুষকে প্রকাশ্যে দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানানো সম্ভব হলো।

পূর্বের সূত্র ধরেই বলা হয়েছে-'আমরা গোলাকার হয়ে আল্লাহর ঘরের পাশে বৈঠক করলাম এবং আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণ করলাম। যারা আমাদের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করেছে, আমরা তার প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম এবং তাদের কোনো কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করলাম।

ইবনে মাসউদের বর্ণনা

যেদিন থেকে ওমর (রা) মুসলমান হয়েছিলেন সেদিন থেকে আমরা মুশরিকদের মতো সমানভাবে শক্তিশালী হয়েছিলাম এবং মান-সম্মানের সাথে বসবাস করতে পেরেছিলাম।

রাসূল (ﷺ) এর নিকট কুরাইশ প্রতিনিধি

দুই সম্মানিত এবং প্রতাপশালী বীর অর্থাৎ হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব এবং ওমর বিন খাত্তাব (রা) এর মুসলমান হওয়ার পর থেকে মুশরিকদের অন্যায়-অত্যাচার ও উৎপীড়নের মাত্রা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে এবং মুসলমানদের সাথে আচরণের ব্যাপারে পাশাবিকতা ও মাতলামীর স্থলে বিচার- বুদ্ধির প্রয়োগ দৃষ্টিগোচর হতে থাকে।

উক্ত প্রেক্ষিতে রাসূল কে তাঁর দাওয়াত এবং তাবলীগের কাজ থেকে নিবৃত্ত করার জন্য কঠোরতা এবং নিষ্ঠুরতা অবলম্বনের পরিবর্তে তাঁর সাথে সদাচার করা অর্থ, ক্ষমতা, নেতৃত্ব, সুন্দরী নারী ইত্যাদি যোগান দেয়ার লোভ দেখিয়ে তাঁকে প্রচারকার্য থেকে নিবৃত্ত করার এক নব, কৌশল প্রয়োগের পরিকল্পনা আঁটে।

কিন্তু সেসব হতভাগাদের জানা ছিলো না যে, রাসূল (ﷺ) এর দাওয়াত ও তাবলীগের তুলনায় তাদের দেয়া প্রস্তাব খড়কুটারও মর্যাদা বহন করে না। এ কারণে এ পরিকল্পনায়ও তাদের অকৃতকার্য ও বিফল হতে হয়।

ইবনে ইসহাক ইয়াযিদ বিন যিয়াদের মাধ্যমে মুহাম্মদ বিন কা'ব কুরাযীর এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন, একদিন রাসূল (ﷺ) মসজিদুল হারামের এক জায়গায় একাকী অবস্থান করছিলেন। সে সময় উতবা বিন রাবিয়াহ-যে গোত্রীয় প্রধান ছিলো-কুরাইশদের এক বৈঠকে তাদের সম্বোধন জানিয়ে বললো- 'হে কুরাইশগণ! আমি মুহাম্মদ এর নিকট গিয়ে কেনইবা কথোপোকথন করবো না এবং তাঁর সামনে কিছু উপস্থাপন করবো না! হতে পারে যে সে আমাদের কোনো কিছু গ্রহণ করে নিবে। তবে যা কিছু সে গ্রহণ করবে তাকে তা প্রদান করে আমরা তাকে তার প্রচারভিযান থেকে নিবৃত্ত করবো।

এটি হচ্ছে ওই সময়ের কথা যখন হামযা মুসলমান হয়ে গিয়েছেন এবং মুশরিকরা দেখছে যে, মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মুশরিকরা বললো: 'আবুল ওয়ালীদ! আপনি যান এবং তার সাথে কথাবার্তা বলুন। এরপর উতবা সেখান থেকে গিয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকট বসলো এবং বললো 'ভাতিজা' আমাদের গোত্রে তোমার মর্যাদা ও স্থান যা আছে এবং বংশীয় যে সম্মান আছে তা তোমার জানা আছে। এখন তুমি নিজ গোত্রের নিকট এক বড়ো ধরনের ব্যাপার নিয়ে এসেছো যার ফলে গোত্রভুক্ত বিভিন্ন লোকজনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়ে গেছে। তাদের বিবেক-বুদ্ধিকে নির্বুদ্ধিতার সম্মুখীন করে ফেলেছো। তাদের উপাস্য প্রতিমাদের এবং তাদের ধর্মের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে মৃত পূর্বপুরুষদের 'কাফির' সাব্যস্ত করছো। এসব নানা সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি তোমার নিকট কয়েকটি কথা পেশ করছি, তার প্রতি মনোযোগী হও। এমনটি হয়তবা হতেও পারে যে, কোনো কথা তোমার ভালো লাগবে এবং তুমি তা গ্রহণ করবে।

রাসূলকে বললেন: 'ভাতিজা, এই ব্যাপারে তুমি যা নিয়ে আগমন করেছো এবং মানুষকে যেসব কথা বলে বেড়াচ্ছো তার উদ্দেশ্যে যদি এ হয় যে, এর মাধ্যমে তুমি কিছু ধন-সম্পদ অর্জন করতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এত বেশি ধন-সম্পদ একত্রিত করে দিবো যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধন-সম্পদের মালিক হয়ে যাবে। কিংবা যদি তুমি এটা চাও যে, মান- মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি তোমার কাম্য তাহলে আমাদের নেতৃত্ব তোমার হাতে সমর্পণ করে দিবো এবং তোমাকে ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান কিংবা সীমাংসা আমরা করবো না। যদি এমনও হয় যে, তুমি রাজা-বাদশাহ হতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সম্রাটের পদে অধিষ্ঠিত করে দিচ্ছি। তাছাড়া তোমার নিকট যে আগমন করে সে যদি জ্বিন কিংবা ভূত-প্রেত হয় যাকে তুমি দেখছো অথচ নিজে নিজে তার কুপ্রভাব প্রতিহত করতে পারছো না, তাহলে আমরা তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি এবং তোমার পূর্ণ সুস্থতা লাভ না হওয়া পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা প্রয়োজন আমরা তা করতে প্রস্তুত আছি। কেননা, কখনো কখনো এমনও হয় যে, জ্বিন-ভূতেরা মানুষের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলে এবং এজন্য চিকিৎসার প্রয়োজনও হয়ে দাঁড়ায়।

উতবা একনাগাড়ে এসব কথা বলতে লাগলো এবং রাসূল (ﷺ) গভীর মনোযোগের সাথে তা শুনতে থাকলেন। যখন সে তার কথা শেষ করলো তখন রাসূল (ﷺ) বললেন: 'আবুল ওয়ালীদ, তোমার বলা কি শেষ হয়েছে? সে বললো: 'হ্যাঁ।' রাসূল বললেন: 'বেশ ভালো, এখন আমার কথা শোনো।' সে বললো-'ঠিক আছে, শুনবো।' রাসূল বললেন-

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। হা-মীম। [এ গ্রন্থ] পরম করুণাময় অসীম দয়ালুর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। এমন এক কিতাব, যার আয়াতগুলো জ্ঞানী কওমের জন্য বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, কুরআনরূপে আরবী ভাষায়। সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। অতঃপর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, অতএব তারা শুনবে না। আর তারা বলে, ‘তুমি আমাদেরকে যার প্রতি আহবান করছ সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর তোমার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়। অতএব তুমি [তোমার] কাজ কর, নিশ্চয় আমরা [আমাদের] কাজ করব। (সূরা ফুস্সিলাত: আয়াত- ১-৫)

রাসূল (ﷺ) পাঠ করতে থাকেন এবং উতবা নিজ দুই হাত পশ্চাতে মাটির ওপর রাখা অবস্থায় তাতে ভর দিয়ে শ্রবণ করতে থাকে। যখন রাসূল সিজদার আয়াতের নিকট পৌঁছে গেলেন তখন সিজদা করলেন এবং বললেন: আবুল ওয়ালীদ, তোমাকে যা শোনানোর প্রয়োজন ছিলো তা শুনেছো, এখন তুমি জানো এবং তোমার কর্ম জানে।

উতবা সেখান থেকে ওঠে সোজা তার বন্ধুদের নিকট চলে গেলো। তাকে আসতে দেখে মুশরিকরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, "আল্লাহর শপথ! আবুল ওয়ালীদ তোমাদের নিকট সে মুখ নিয়ে আসছে না যে মুখ নিয়ে সে গিয়েছিলো।'

অতঃপর আবুল ওয়ালীদ যখন তাদের নিকট এসে বসলো তখন তারা জিজ্ঞেস করলো: 'আবুল ওয়ালীদ পিছনের খবর কি?

সে বললো: 'পিছনের খবর হচ্ছে এ যে, আমি এমন এক কথা শুনেছি-যা কোনোদিনই শুনিনি। আল্লাহর শপথ, সে কথা কবিতা নয়, যাদুও নয়। হে কুরাইশগণ! আমার কথা মেনে নিয়ে ব্যাপারটি আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমার মত এ যে, ঐ ব্যক্তিকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দাও। সে পৃথক হয়ে থাক। আল্লাহর কসম! আমি তার মুখ থেকে যে বাণী শুনে এলাম তার দ্বারা অতিশয় কোনো গুরুতর ব্যাপার সংঘটিত হয়ে যাবে। আর যদি তাকে কোনো আরব হত্যা করে ফেলে তবে তো তোমাদের কর্মটা অন্যের দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে যাবে। কিন্তু এ ব্যক্তি যদি আরবদের ওপর বিজয়ী হয়ে প্রাধান্য বিস্তারে সক্ষম হয়, তাহলে তাঁর রাজত্ব পরিচালনা প্রকৃতপক্ষে তোমাদেরই রাজত্ব হিসেবে গণ্য হবে। তার অস্তিত্ব বা টিকে থাকা সবচেয়ে বেশি তোমাদের জন্যই মঙ্গলজনক হবে।

লোকেরা বললো: 'আবুল ওয়ালীদ! আল্লাহর কসম, তোমার ওপরও তার যাদুর প্রভাব কাজ করেছে। উতবা বললো: তোমরা যা-ই মনে করো না কেন, তার সম্পর্কে আমার যা অভিমত আমি তোমাদের জানিয়ে দিলাম। এখন তোমরা যা ভালো মনে করবে, তাই করবে।

অন্য এক বর্ণনা মতে, রাসূল যখন তিলাওয়াত আরম্ভ করেছিলেন তখন উতবা নীরবে শুনতে থাকে। অতঃপর রাসূল যখন এই আয়তটি পাঠ করেন:

অতঃপর তারা যদি বিমুখ হয়ে যায়, তুমি বলে দাও যে, আমি তোমাদের আদ ও সামূদ সম্প্রদায়ের মতোই ধ্বংসাত্মক শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি।

এ কথা শোনামাত্রই উতবা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়ালো এবং তার হাত রাসূল (ﷺ) এর মুখের ওপর রেখে বললো: 'আমি আল্লাহর মাধ্যম দিয়ে এবং আত্মীয়তার প্রসঙ্গটি স্মরণ করিয়ে বলছি যে, এমনটি যেন না করা হয়।

সে এ ভয়ে ভীত হয়েছিলো যে, রাসূল (ﷺ) এর প্রদর্শিত ভয় যদি সত্যিই এসে যায়। এরপর সে সমবেত মুশরিকদের নিকট চলে যায় এবং তাদের সাথে উল্লিখিত আলাপ-আলোচনা করে।

বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবকে একত্রিতকরণে আবু তালিবের উদ্যোগ গ্রহণ

অবস্থার গতিধারায় কিছুটা পরিবর্তন সূচিত হয়েছিলো। পার্শ্ববর্তী পরিবেশ ও পরিবর্তনের আভাস ক্রমেই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো। কিন্তু আবু তালিবের ভয়-ভীতি তখনো ছিলো প্রকট। মুশরিকদের পক্ষ থেকে নিজের ভাতিজা সম্পর্কে বিপদের সম্ভাবনায় তিনি তখনো বিচলিতবোধ করছিলেন। কারণ মুশরিকরা ইতোপূর্বে এই ব্যাপারে তার সাথে মুখোমুখি বাদানুবাদ করার পর চরম ব্যবস্থা অবলম্বনের হুমকি দিয়েছিলো। উপরন্তু উমারা বিন ওয়ালীদকে আবু তালিবের হাতে দিয়ে বিনিময়ে তার ভাতিজাকে নিয়ে তাঁকে হত্যা করার এক প্রস্তাবও তারা দিয়েছিলো। এছাড়া আবু জাহেল একটি বেশ বড়ো আকারের পাথরের আঘাতে তার ভাতিজার মাথা চূর্ণ করে দিতে উদ্যত হয়েছিলো। উকবা বিন আবু মুয়ায়ের তাঁর গলায় চাদর জড়িয়ে গলা টিপে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিলো। খাত্তাবের ছেলে কোষমুক্ত তরবারি হাতে তাঁকে হত্যা করতে গিয়েছিলো।

আবু তালিব যখন উল্লিখিত ঘটনাবলি সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করতেন তখন তাঁর হৃদকম্পন শুরু হয়ে যেতো। এ সকল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয়ে গিয়েছিলো যে, মুশরিকরা তাঁর অঙ্গীকার বিনষ্ট করার এবং তাঁর ভাতিজাকে হত্যা করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। ঐ অবস্থায় আল্লাহ না করুন যদি কোনো মুশরিক আকস্মিকভাবে রাসূল কে আক্রমণ করে বসে, তাহলে হামযা, ওমর কিংবা অন্য যেকোনো ব্যক্তিই হোক না কেন, তারা কী কাজে আসবে?

মুশরিকরা রাসূল কে হত্যার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়ার কারণে আবু তালিব কখনোই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিতে পারেননি। উপরন্তু একটি আয়াতে বিষয়টির প্রতি ইংগিত থাকায় তিনি তার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে থাকেন। আয়াতটি হচ্ছে-

আচ্ছা তারা কি কোনো ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছে, তবে আমিও এক ব্যবস্থা ঠিক করে রেখেছি (সূরা যুখরূপ: আয়াত-৭৯)

এখন প্রশ্ন হলো এ উপরিউক্ত ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আবু তালিবের করণীয় কী ছিলো?

আবু তালিব যখন দেখতে পেলেন যে, কুরাইশরা সার্বিকভাবে সকল ক্ষেত্রে তার ভাতিজার বিরোধিতায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে তখন তিনি আপন প্রপিতামহ আবদে মানাফের দু'পুত্র হাশেম এবং মুত্তালিব বংশধারার পরিবারবর্গকে একত্রিত করেন। অতঃপর এ বলে তাদের আহ্বান জানান যে, এতদিন পর্যন্ত তিনি এককভাবেই তার ভাতিজাকে দেখাশোনা এবং সাহায্য- সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে যেহেতু তার পক্ষে এককভাবে আর সে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়, সেহেতু সম্মিলিতভাবে সে দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি সকলের প্রতি অনুরোধ জানান।

আবু তালিবের এ অনুরোধ আরব সমাজের গোত্রপ্রেমের প্রেক্ষিতে সে দুই পরিবারের সকলেই তা মেনে নিলেন। কিন্তু আবু তালিবের ভাই আবু লাহাব তা গ্রহণ না করে কুরাইশ মুশরিকদের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ-কর্ম করা এবং তাদের সাহায্য করার কথা ঘোষণা করলো।

পূর্ণাঙ্গ বয়কট

রাসূল ও তাঁর গোত্রকে পূর্ণাঙ্গ বয়কট

মাত্র চার সপ্তাহ কিংবা তার চেয়েও কম সময়ের মধ্যে মুশরিকদেরকে চার দফা প্রবল ঝাঁকুনি এবং ঘটনাপ্রবাহে অপ্রত্যাশিত মোড় পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। প্রথম দফায় হামযা (রা) এর ইসলাম গ্রহণ, দ্বিতীয় দফায় ওমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণ, তৃতীয় দফায় রাসূল কর্তৃক ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উভয় পক্ষে আংশিক গ্রহণ-বর্জনণীতি সংক্রান্ত প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান, চতুর্থ দফায় বনু হাশেম ও বনু মুত্তলিবের মুসলমান ও কাফির সকলের সম্মিলিতভাবে রাসূল কে সাহায্য করার অঙ্গীকার। এসব কারণে মুশরিকরা প্রায় হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো এবং তাদের জন্য সেটাই ছিলো স্বাভাবিক। কারণ তাদের কাছে তখন এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, যদি তারা মুহাম্মদ কে হত্যা করার জন্য অগ্রসর হয়, তবে তার হেফাযতের জন্য মক্কা উপত্যকা মুশরিকদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে। এমনকি তারা সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়েও যেতে পারে। এ কারণে তারা হত্যার পরিকল্পনা বর্জন করে অত্যাচারের এমন এক কৌশল অবলম্বন করলো- যা ছিলো এ পর্যন্ত পরিচালিত নির্যাতনের মধ্য সবচেয়ে লোমহর্ষক।

মুসলমানদেরকে অত্যাচার-উৎপীড়নের জন্য মুশরিকদের অঙ্গীকার

উল্লিখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মুশরিকরা 'মুহাসসাব' নাক উপত্যকায় খাইফে বনী কেনানার ভিতরে একত্রিত হয়ে সর্বসম্মতভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো যে, বনু হাশেম এবং বনু মুত্তালিবের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, সামাজিক কার্যকলাপ, অর্থনৈতিক আদান-প্রদান, কুশলবিনিময় ইত্যাদি সবকিছুই বন্ধ রাখা হবে। কেউ তাদের কন্যা গ্রহণ করতে কিংবা তাদের কন্যা দান করতে পারবে না। তাদের সাথে উঠাবসা, চলাফেরা, কথাবর্তা, মেলামেশা, বাড়িতে যাতায়াত ইত্যাদি কোনো কিছুই করা চলবে না। হত্যা করার জন্য রাসূল (ﷺ)কে যতদিন তাদের হাতে তুলে দেয়া না হবে ততদিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

মুশরিকরা উক্ত বয়কটের দলিল স্বরূপ একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করে, যাতে অঙ্গীকার করা হয়েছিলো তারা কখনোই বনু হাশিমের পক্ষ হতে কোনো সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব গ্রহণ করবে না এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের ভদ্রতা বা শিষ্টাচার প্রদর্শন করবে না। যে পর্যন্ত তারা রাসূল কে হত্যার জন্য মুশরিকদের হাতে তুলে না দিবে সে পর্যন্ত এ অঙ্গীকারনামা বহাল থাকবে।

ইবনে কাইয়ুমের বর্ণনা সূত্রে বলা হয়েছে, উক্ত অঙ্গীকারনামা লিখেছিলো 'মানসুর বিন ইকরামা বিন আমের বিন হাশেম'। কেউ কেউ উল্লেখ করেছে যে, উক্ত অঙ্গীকারনামা লিখেছিলো 'নাযর বিন হারিস'। কিন্তু সঠিক কথা হচ্ছে এ যে, উক্ত অঙ্গীকারনামা সঠিক লেখক ছিলো 'বুগায়েয বিন আমের বিন হাশেম'। রাসূল তার প্রতি বদদোয়া করেছিলেন যার ফলে তার হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলো।

যা হোক, এ অঙ্গীকারনামা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলে, বনু হাশেম এবং বনু মুত্তালিবের লোকেরা কি কাফির, কি মুসলিম সকলেই আতঙ্কিত হয়ে 'শিয়াবে আবু তালিব' গিরিপর্বতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো নবুয়তের সপ্তমবর্ষে ও মুহাররম মাসের শুরুতে চাঁদ রাতে।

শিয়াবে আবু তালিবের অন্তরীণ অবস্থা

কাফির-মুশরিকদের উক্ত বয়কটের ফলে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের লোকজনদের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন ও সঙ্গহীন হয়ে পড়লো। খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী আমদানি ও পানীয় সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলো। কারণ খাদ্যশস্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রবস্যসামগ্রী যা মক্কায় আসতো, মুশীরকরা তা তাড়াহুড়া করে ক্রয় করে নিতো। এ কারণে গিরিপর্বতে অবরুদ্ধদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ হয়ে পড়লো। খাদ্যাভাবে তারা গাছের পাতা, চামড়া ইত্যাদি খেতে বাধ্য হলো। কোনো কোনো সময় তাদের উপবাসেও থাকতে হতো। উপবাসের অবস্থা এমন ছিলো যে, ক্ষুধার তাড়নায় নিষ্পাপ শিশু সন্তানগুলো এবং মহিলারা অস্থির হয়ে যখন করুণ কণ্ঠে ক্রন্দন করতে থাকতো তখন গিরিপর্বতের বাহির থেকেও সেই ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পাওয়া যেত।

গিরিপর্বতে তাদের নিকট জিনিসপত্র পৌঁছা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো, যা পৌঁছতো তা-ও অতি গোপনে। হারাম মাসগুলো ছাড়া অন্য কোনো সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারতেন না। কিন্তু মক্কার ব্যবসায়ীগণ এবং লোকজনেরা সে সব জিনিসের দাম এতই বৃদ্ধি করে দিতো যে, তা গিরিপর্বতবাসীগণের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরেই থেকে যেতো।

খাদিজা (রা) এর ভাতিজা হাকীম বিন হিযাম কখনো কখনো তাঁর ফুফুর জন্য গম পাঠিয়ে দিতেন। একদিন আবু জাহেলের সাথে দেখা হয়ে গেলো। সে খাদ্যশস্য নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বাধা দিতে উদ্যত হলো, কিন্তু আবুল বোখতারী এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করলো এবং কেবলমাত্র তাঁর ফুফুর নিকট খাদ্য প্রেরণে সাহায্য করলো।

এদিকে আবু তালিব রাসূল (ﷺ) এর ব্যাপারে সর্বক্ষণ চিন্তিত থাকতেন। তাঁর নিরাপত্তা বিধানের জন্য লোকেরা যখন নিজ নিজ শয্যায় শয়ন করতো তখন তিনি রাসূল কে নিজের শয্যায়-ই শয়ন করার জন্য পরামর্শ দিতেন উদ্দেশ্যে ছিলো যে, কেউ যদি তাঁকে হত্যা করতে ইচ্ছুক থাকে তাহলে সে দেখে নিক যে, তিনি কোথায় শয়ন করেন। অতঃপর যখন লোকজনেরা ঘুমিয়ে পড়তো তখন তিনি তাঁর শয্যাস্থল পরিবর্তন করে দিতেন।

মুশরিকদের অঙ্গিকারনামা বিনষ্ট

উক্ত অবর্ণনীয় সংকটময় অবস্থায় দীর্ঘ তিন বছর অতিক্রান্ত হলো। এরপর নবুয়তের ১০ম বর্ষের মুহাররম মাসে লিখিত অঙ্গীকারনামাটি ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং অত্যাচার-উৎপীড়নের পরিসমাপ্তি ঘটানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। এর কারণ ছিলো এই যে, প্রথম থেকেই কিছু সংখ্যক কুরাইশ ছিলো উক্ত অঙ্গীকারনামার সমর্থক এবং কিছু সংখ্যক ছিলো এর বিপক্ষে। যারা বিপক্ষে ছিলো তারা সব সময় সুযোগের সন্ধানে থাকতো একে বাতিল কিংবা বিনষ্ট করার জন্য। অনেক ত্যাগ ও তিতীক্ষার মধ্য দিয়ে বছর দুই অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহর রহমতে হঠাৎ সেই অঙ্গীকারনামা বিনষ্ট করার মোক্ষম এক সুযোগ এসে যায়।

এর প্রকৃত উদ্দ্যোক্তা ছিলো বনু আমের বিন লুয়াঈ গোত্রের 'হিশাম বিন আমর' নামক এক ব্যক্তি। রাতের অন্ধকারে এই ব্যক্তি গোপনে গোপনে শিয়াবে আবু তালিব গিরি পর্বতের ভিতরে খাদ্যশস্যাদি প্রেরণ করে বনু হাশেমের লোকজনদের সাহায্য-সহযোগিতা করে সহানুভূতি দেখাতো। এই ব্যক্তি একদিন যুহায়ের বিন আবু উমাইয়া মাখযুমীর নিকট গিয়ে পৌছালো। যুহায়েরের মাতা আতেকা হলেন আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা এবং আবু তালিবের ভগ্নি। তিনি যুহায়েরকে উদ্দেশ্যে করে বললেন: যুহায়ের, তুমি এটা কিভাবে বরদাস্ত করছো যে, আমরা উদরপূর্ণ করে তৃপ্তি সহকারে আহার করছি, উত্তম বস্ত্রাদি পরিধান করছি আর বনু হাশেম খাদ্যাভাবে, বস্ত্রাভাবে, অর্থাভাবে জীবন্ত অবস্থায় দিনযাপন করছে। বর্তমানে তোমার মাতুল বংশের যে অবস্থা চলছে তা তুমি ভালোভাবেই জানো।

আবেগ মাখা দুঃখ ভরা কথাগুলো শুনে ব্যাথা-বিজড়িত কণ্ঠে যুহায়ের বললো- সব কথাই তো ঠিক, কিন্তু এই ব্যাপারে একা আমি কি করতে পারি? তবে হ্যাঁ, আমার সাথে যদি কেউ থাকতো তাহলে অবশ্যই আমি উক্ত অঙ্গীকারনামা ছিঁড়ে ফেলার ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টা করতাম।

যুহায়ের বললো: বেশ, তাহলে একজন তৃতীয় ব্যক্তির সন্ধান করো।

উক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে হিশাম 'মুতয়িম বিন আদীর' নিকটে গেল। মুতয়িম বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের সম্পর্কসূত্রে আবদে মানাফের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

হিশাম তাদের বংশীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ভর্ৎসনা করার পর বনু হাশেমও বনু মুত্তালিবের দারুণ দুঃখ-দুর্দশার কথা উল্লেখ করে বললো: আপন বংশীয় লোকদের এত দুঃখ-কষ্টের কথা জানার পরও তুমি কিভাবে কুরাইশদের সমর্থন করতে পার?

মুতয়িম বললো: 'সবই তো ঠিক আছে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমি একা কি করতে পারি?
হিশাম বললো: 'আরও একজন রয়েছে।
মুতয়িম জিজ্ঞাসা করলো: 'কে সে?
হিশাম বললো: 'আমিই, আমিই সে ব্যক্তি।
মুতয়িম বললো: 'তাহলে তৃতীয় ব্যক্তির সন্ধান করো।
হিশাম বললো: এটাও আমি করেছি।
মুতয়িম বললো: কে সে?
উত্তরে হিশাম বললো: 'যুহায়ের বিন আবু উমাইয়া।
মুতয়িম বললো: আচ্ছা তবে এখন চতুর্থ ব্যক্তির সন্ধান করো।
উক্ত প্রেক্ষিতে হিশাম বিন আমর 'আবুল বোখতারী বিন হিশাম' এর নিকট গেল এবং মুতয়িমের সাথে যেভাবে কথাবার্তা হয়েছিলো তার সাথেও ঠিক একইভাবে কথাবার্তা হলো।
আবু বোখতারী বললো: 'আচ্ছা এর সমর্থক কেউ আছে কি?
হিশাম বললো: হ্যাঁ।
আবু বোখতারী জিজ্ঞাসা করলো- কে?
হিশাম বললো: 'যুহায়ের বিন আবু উমাইয়া, মুতয়িম বিন আদী এবং আমি।
সে বললো: 'আচ্ছা, ঠিক আছে তবে এখন ৫ম ব্যক্তির খোঁজ করো।

এভাবে হিশাম 'যাময়া বিন আসওয়াদ বিন মুত্তালিব বিন আসাদের' নিকট গেলো এবং তার সাথে কথাবার্তা বলতে বনু হাশেমের আত্মীয়তা এবং তাদের প্রাপ্যসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। সে বললো: 'আচ্ছা, যে কাজের জন্য আমাকে ডাক দিচ্ছো সেই ব্যাপারে আরও কি কারো সমর্থন আছে?

হিশাম 'হ্যাঁ' সূচক উত্তর করে সকলের নাম বললো। অতঃপর তারা সকলে হাজুনের নিকট একত্রিত হয়ে এই মর্মে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো যে, কুরাইশদের অঙ্গীকারপত্র অবশ্যই ছিড়ে ফেলতে হবে। যুহায়ের বললো: এই ব্যাপারে আমিই সর্বপ্রথম মুখ খুলবো।

পূর্বের কথামতো পরদিন প্রাতে সকলে মজলিসে উপস্থিত হলো। যুহায়ের শরীরে একজোড়া কাপড় ভালোভাবে বেঁধে উপস্থিত হলো। প্রথমে সে সাতবার বায়তুল্লাহ প্রদক্ষিণ করে নিলো। অতঃপর সমবেত জনগণকে সম্বোধন করে বললো: ওহে মক্কাবাসী। আমরা তৃপ্তি সহকারে উদরপূর্ণ করে খাওয়া-দাওয়া করবো, উত্তম পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করবো আর বনু হাশেম ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় এবং লেন-দেন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি ততক্ষণ পর্যন্ত বসে থাকতে পারি না, যতক্ষণ ওই অন্যায় ও উৎপীড়নমূলক অঙ্গীকারপত্র ছিঁড়া না হচ্ছে।

আবু জাহেল মসজিদে হারামের এক প্রান্তে উপবিষ্ট ছিলো। সে বলে ওঠলো: তুমি ভুল বলছো। আল্লাহর কসম! ঐ অঙ্গীকারপত্র কখনোই নষ্ট করা যাবে না। প্রত্যুত্তরে যামরা বিন আসওয়াদ বলে ওঠলো, আল্লাহর কসম! তুমি অধিক ভুল বলছো। কিসের অঙ্গীকারপত্র! ওটা লেখার ব্যাপারে আমাদের কোনো সম্মতি ছিলো না। আমরা ওতে সন্তুষ্টও ছিলাম না। অন্যদিক দিয়ে আবুল বোখতারী সহযোগী হয়ে বলে ওঠলো: যাময়া ঠিকই বলেছে। ঐ অঙ্গীকারপত্রে যা লেখা হয়েছিলো তাতে আমাদের সম্মতি ছিলো না এবং এখনো তা মান্য করতে আমরা বাধ্য নই।

এদের এই সকল কথাবার্তা শুনে আবু জাহেল বললো: বুঝেছি, বুঝেছি, এসব কথা আলাপ আলোচনা করে বিগত রাতে স্থির করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত পরামর্শ এই স্থান বাদ দিয়ে আরো কোথাও করা হয়েছে।

ঐ সময় আবু তালিবও পবিত্র হারামের এক প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন। তার আগমনের কারণ ছিলো, আল্লাহ রাসূল কে উক্ত অঙ্গীকারপত্র সম্পর্কে এই সংবাদ দিয়েছিলেন যে, তার জন্য আল্লাহ এক ধরনের কীট প্রেরণ করেছেন- যা অন্যায় ও উৎপীড়নমূলক এবং আত্মীয়তা বিনষ্টকারী অঙ্গীকার পত্রটির সব কথা বিনষ্ট করে দিয়েছে এবং তাতে শুধুমাত্র আল্লাহর নাম অবশিষ্ট রয়েছে।

রাসূল তার চাচা আবু তালিবকে এই কথা বলেছিলেন এবং তিনিও কুরাইশদেরকে এই কথা বলার জন্য মসজিদে হারামে আগমন করেছিলেন।

আবু তালিব কুরাইশদেরকে লক্ষ করে বললেন: আল্লাহর তরফ থেকে আমার ভাতিজার নিকট সংবাদ এসেছে যে, তোমাদের অঙ্গীকার নামাটির সমস্ত লেখা আল্লাহ প্রেরিত কীটেরা নষ্ট করে ফেলেছে। ওতে শুধু আল্লাহর নামটি আছে। এই সংবাদটি আপনাদের নিকট পৌঁছানোর জন্য আমার ভাতিজা আমাকে প্রেরণ করেছেন। যদি তার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে তার ও তোমাদের মধ্য থেকে আমি সরে দাঁড়াবো। তখন তোমাদের যা ইচ্ছে হয় করবে। কিন্তু তার কথা যদি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে বয়কটের মাধ্যমে তোমরা আমাদের প্রতি যে অন্যায়-অত্যাচার করে আসছো তা থেকে বিরত হতে হবে।

আবু তালিবের কথা শুনে কুরাইশরা বললো: 'আপনি ইনসাফের কথাই বলছেন। এদিকে আবু জাহেল এবং লোকজনদের মধ্যে বাকযুদ্ধ শেষ হলে মুতয়িম বিন আদী অঙ্গীকার নামা খানা ছিঁড়ে ফেলার জন্য দাঁড়ালো। অতঃপর সেটা হাতে নিয়ে সত্যি সত্যিই দেখা গেলো যে, এক ধরনের কীট লেখাগুলোকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দিয়েছে। তাতে শুধুমাত্র 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' কথাটি অবশিষ্ট রয়েছে এবং যেখানে যেখানে আল্লাহর নাম লেখা ছিলো শুধু সেই লেখাগুলোই অবশিষ্ট রয়েছে। কীটে সেগুলো খায়নি।

অতঃপর অঙ্গীকারপত্রটি ছিড়ে ফেলা হলো এবং এর ফলে বয়কটেরও অবসান ঘটলো। রাসূলূল্লাহ এবং অন্যান্য সকলে শিয়াবে আবু তালিব থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নবুয়তের এক বিশেষ নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে চমৎকৃত হলো, কিন্তু এতদসত্ত্বে তাদের আচরণের ক্ষেত্রে কোনোই পরিবর্তন হলো না। যার উল্লেখ এই আয়াতে রয়েছে-

আর যদি তারা মুজেযা (অলৌকিক নিদর্শন) দেখে তবে টালবাহানা করে আর বলে এটা তো ছলনার যাদু। (সূরা ক্বামার: আয়াত-২)

তাই মুশরিকরা বিমুখ হয়ে গেল এবং নিজেদের কুফরী কাজে তারা আরও কয়েক ধাপ অগ্রসর হয়ে গেলো।

আবু তালিব সমীপে সর্বশেষ কুরাইশ প্রতিনিধিদল

গিরিপর্বত থেকে বেরিয়ে আসার পর পূর্বের মতো আবারও রাসূল দাওয়াত এবং তাবলীগের কাজ শুরু করে দিলেন।

অন্যদিকে মুশরিকরা যদিও বয়কট পরিহার করে দিয়েছিলো, কিন্তু তবুও পূর্বের মতোই মুসলমানদের ওপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে লাগলো।

আবু তালিব পূর্বের মতোই জীবনবাজি রেখে ভাতিজাকে সাহায্য করতে থাকলেন এবং তার নিরাপত্তাবিধানের ব্যাপারে যথাসাধ্য সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে লাগলেন। কিন্তু এখন তিনি অনেক বৃদ্ধ। বিগত কয়েক বছর যাবৎ নানা বিপদ আপদের মধ্য দিয়ে দিন যাপন করার ফলে এবং বিশেষ করে গিরি পর্বতে তিন বছর যাবৎ অবর্ণনীয় অভাব-অনটনের মধ্যে বন্দী জীবনযাপন করার ফলে তার শক্তি-সামর্থ্য প্রায় নিঃশেষিত হয়ে পড়েছিলো এবং কোমর বেঁকে গিয়েছিলো। গিরিপর্বতে বন্দী জীবন থেকে বেরিয়ে আসার পর এসব নানা কারণে তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

সেই সময় মুশরিকরা চিন্তা-ভাবনা করলো যে, যদি আবু তালিবের মৃত্যু হয় এবং তারা তার ভাতিজার ওপর আবার অন্যায়-অত্যাচার করে তবে এতে তাদের খুব বড়ো রকমের বদনাম হয়ে যাবে। এ কারণে আবু তালিবের বেঁচে থাকা অবস্থায়ই মুহাম্মদ সম্পর্কে কোনো একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়া উচিত। এই ব্যাপারে তিনি কিছুটা সুযোগ-সুবিধাও দিতে পারেন: আগে কোনোদিনই যা দিতে তিনি রাজি ছিলেন না।

উক্ত চিন্তা-ভাবনার প্রেক্ষিতে একটি কুরাইশ প্রতিনিধিদল আবু তালিবের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলো এবং এটিই ছিলো তার নিকট এই ধরনের সর্বশেষ প্রতিনিধি দল।

ইবনে ইসহাক এবং অন্যান্যদের বর্ণনাসূত্রে জানা যায়, যখন অসুস্থ আবু তালিব শয্যাগত হয়ে পড়লেন এবং দিনে দিনে তাঁর অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে লাগলো তখন কুরাইশরা এই মর্মে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো যে, হামযা ও ওমর মুসলমান হয়ে গিয়েছে এবং মুহাম্মদ (ﷺ) এর ধর্ম বিভিন্ন কুরাইশ গোত্রে বিস্তার লাভ করেছে। সুতরাং চলো আমরা আবু তালিবের নিকট গিয়ে তাকে তার ভাতিজার ধর্ম প্রচার করা থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে একটি অঙ্গীকার আদায়ের কথা বলি এবং আমাদের পক্ষ থেকেও কোনো অনিষ্ট না করার ব্যাপারে তার অনুকূলে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদনা করে নেই। কারণ এই ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত ভীত এবং আতঙ্কিত যে, এভাবে মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর প্রচারকার্য অব্যাহত রাখলে লোকজনেরা তার ধর্মমত গ্রহণ করে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাবে।

অন্য এক বর্ণনায় কুরাইশদের বক্তব্য এই মর্মে তুলে ধরা হয়েছে যে, আমাদের ভয় হচ্ছে যে, বৃদ্ধ আবু তালিব মৃত্যুবরণ করলে এবং তারপর মুহাম্মদ (ﷺ) এর সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়ে গেলে আরবের লোকেরা আমাদের নিন্দা করবে এবং বলবে যে, তারা মুহাম্মদ কে ছেড়ে দিয়েছিলো (অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে কোনো কিছুই করতে পারেনি)। কিন্তু যখন তার চাচা মৃত্যুমুখে পতিত হলেন তখন তারা তার ওপর আক্রমণ করে বসলো।

যাইহোক, এই কুরাইশ প্রতিনিধিদল আবু তালিবের নিকট গিয়ে পৌঁছলো এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময় করলো। কুরাইশদের মধ্য থেকে বিশিষ্ট এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে এই প্রতিনিধিদল গঠিত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্যে ছিলো উতবা বিন রাবিয়াহ, শায়বা বিন রাবিয়া, আবু জাহেল বনি হিশাম, উমাইয়া বিন খালফ এবং আবু সুফিয়ান বিন হারব। এই প্রতিনিধিদলে ছিলো মোট পঁচিশ জন সদস্য।

উক্ত প্রতিনিধিদল বৃদ্ধ আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে উদ্দেশ্যে করে বললো, হে আবু তালিব! আমাদের মধ্যে মান-মর্যাদার যে আসনে আপনি অধিষ্ঠিত রয়েছেন তা সম্যক অবহিত রয়েছেন এবং বর্তমানে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করছেন তাও আপনার নিকট সুস্পষ্ট। আমাদের ভয় হচ্ছে যেমন আপনি আপনার জীবনের অন্তিম পর্যায় অতিবাহিত করছেন। এদিকে আপনার ভাতিজা এবং আমাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও মতবিরোধ চলে আসছে তাও আপনার অজানা নেই। আমরা চাচ্ছি যে, আপনি তাকে ডেকে এনে তার সম্পর্কে আমাদের নিকট থেকে এবং আমাদের সম্পর্কে তার নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করবেন। এই অঙ্গীকারের উদ্দেশ্যে হবে আমরা তার থেকে এবং সেই আমাদের থেকে পৃথক থাকবে। অর্থাৎ আমাদের ধর্মমতের ওপর সে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না এবং আমরাও তার ধর্মমতের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবো না।

কুরাইশ প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে আবু তালিব রাসূলূল্লাহ কে ডেকে আনলেন এবং বললেন: 'প্রিয় ভাতিজা! তুমি নিশ্চয় অবগত রয়েছো যে, এরা হচ্ছে তোমার স্ব-জাতীয় সম্মানিত ব্যক্তি। তোমার জন্যই এরা এখানে সমবেত হয়েছে। এরা চাচ্ছে যে, তোমাকে কিছু অঙ্গীকার প্রদান করবে এবং তোমাকেও তাদের কিছু অঙ্গীকার প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ ধর্মমতের ব্যাপারে তারা তোমার প্রতি কোনো কটাক্ষ করবে না এবং তুমিও তাদের প্রতি কোনো ধরনের কটাক্ষ করবে না।

প্রত্যুত্তরে রাসূল (ﷺ) স্বপ্রতিনিধিদলকে সম্বোধন করে বললেন- 'আমি যদি এমন একটি প্রস্তাব পেশ করি যা মেনে নিলে গোটা আরবের সম্রাট হওয়া যাবে। এবং অনারব অধীনস্থ হয়ে যাবে, তাহলে এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি হতে পারে তা বলুন,

কোনো কোনো বর্ণনায় এমনটি বলা হয়েছে, রাসূল তাঁর চাচা আবু তালিবকে সম্বোধন করে বলেছেন, 'চাচাজান! আমি তাদের নিকট থেকে এমন এক প্রস্তাবের প্রতি স্বীকৃতি ও সমর্থন চাই- যা মেনে নিলে সমগ্র আরব জাহান তাদের অধীনস্থ হয়ে যাবে এবং তাদেরকে কর (ট্যাক্স) প্রদান করে বসবাস করতে বাধ্য হবে।'

অন্য এক বর্ণনায় এ কথাও উল্লেখ রয়েছে, রাসূল বলেছেন: চাচাজান! আপনি তাদেরকে এমন কথার প্রতি আহ্বান জানান না কেন- যা প্রকৃতপক্ষেই তাদের জন্য মঙ্গলজনক।'

ইবনে ইসহাকের এই বর্ণনাসূত্রে জানা যায়, রাসূল তাদের বললেন- আপনারা শুধুমাত্র একটি কথা মেনে নিন-যার বদৌলতে আপনারা হয়ে যাবেন আরবের সম্রাট এবং অনারব হয়ে যাবে আপনাদের অধীনস্থ।

রাসূল (ﷺ) এর মুখ থেকে যখন তারা এ কথা শুনলো তখন তারা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে গেলো এবং মনে হলো যেন তাদের হতবুদ্ধিতায় পেয়ে বসেছে। মুহাম্মদের শুধু একটি কথা মেনে নিলে তারা এত বেশি লাভবান হতে পারবে এই চিন্তা তাদের মন-মগজকে একদম আচ্ছন্ন করে ফেললো। তারা মনে মনে ভাবতে লাগলো যে, একটি মাত্র কথাতে যদি এতবড় লাভ হয় তাহলে তা ছেড়ে দেয়া যায় কি করে?

আবু জাহেল বললো: 'আচ্ছা তুমি বলো তো ঠিক সে কথাটি কি? তোমার পিতার কসম! কথাটা যদি সত্যি হয় তাহলে একটি কেন, দশটি বললেও আমরা তা মান্য করতে প্রস্তুত আছি।'

রাসূল বললেন: 'আপনারা বলুন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করেন তা পরিহার করুন।'

রাসূল (ﷺ) এর উক্ত কথার পরিপ্রেক্ষিতে তারা হাতে মারতে মারতে এবং তালি দিতে দিতে বললো: 'মুহাম্মদ তুমি এটাই চাচ্ছো যে, সকল আল্লাহর স্থলে মাত্র এক আল্লাহকে আমরা মেনে নি। বাস্তবিক তোমার ভাব-ভঙ্গি বড়োই আশ্চর্যজনক।' অতঃপর তারা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে বললো, আল্লাহর কসম! এই ব্যক্তি তোমাদের একটি কথাও মান্য করার জন্য প্রস্তুত নয়। অতএব চলো এবং পূর্বপুরুষগণের নিকট থেকে বংশপরম্পরা সূত্রে প্রাপ্ত দ্বীনের ওপরেই অটল থাকো যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের এবং তার মধ্যে একটা মীমাংসা করে না দেন। এরপর তারা নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলো।

উক্ত ঘটনার পর সেইসব লোকজনকে উদ্দেশ্যে করে কুরআন মাজীদের এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়- (সোয়াদ - ৩৮)

১. সাদ, কুরআনের শপথ যা উপদেশে পরিপূর্ণ।
২. বরং কাফিররা অহংকারে ও বিরোধিতায় লিপ্ত।
৩. তাদের পূর্বে আমি বহু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছি; যখন তারা আর্তনাদ করেছিলো, কিন্তু তখন মুক্তি লাভের কোনো সময় ছিলো না।
৪. তারা এতে আশ্চর্য হলো যে, তাদের কাছে এসেছে তাদেরই মধ্য থেকে এক সতর্ককারী। আর কাফিররা বলতে লাগলো: এই ব্যক্তি তো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী।
৫. সে কি বহু উপাস্যের স্থানে একজন মাত্র উপাস্য সাব্যস্ত করে দিয়েছে? বস্তুতঃ এটা এক আশ্চর্য ব্যাপার।
৬. আর তাদের নেতারা এ কথা বলে চলে যায় যে, তোমরা চলে যাও এবং নিজেদের উপাস্যদের ব্যপারে ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয় এতো এক উদ্দেশ্যেমূলক ব্যাপার।
৭. এরূপ কথা তো আমরা পূর্ববর্তী ধর্মে শুনিনি। এটা তো মনগড়া উক্তি ছাড়া আর কিছু নয়।

শোকের বছর

আবু তালিবের মৃত্যু

বার্ধক্য, দুশ্চিন্তা, অনিয়ম ইত্যাদি নানাবিধ কারণে আবু তালিবের অসুস্থতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তিনি এক সময় মৃত্যু মুখে পতিত হন। তার মৃত্যু হয় নবুয়তের ১০ম বর্ষের রজব মাসে।

জীবন চরিত বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোন মাসে আবু তালিবের মৃত্যু হয়েছে তা নিয়ে মতভেদ আছে। আমি রজব মাসকে এজন্য অগ্রাধিকার দিলাম যে, অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত যে তাঁর মৃত্যু গিরিগুহা হতে মুক্তি লাভের ছয় মাস পরে হয়েছে। অবরোধ আরম্ভ হয়েছিলো ৭ম নববী সনের মুহাররম মাসের প্রথম তারিখে। এ হিসেবে মৃত্যু ১০ম নববী সনের রজবেই হয়।

এই ব্যাপারে ভিন্ন একটি মত হচ্ছে, তিনি খাদিজা (রা) এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর নিকট আগমন করেন। সেখানে আবু জাহেলও উপস্থিত ছিলো। রাসূল বললেন- 'চাচাজান! আপনি শুধু একবার লা-ইলাহা ইল্লাহল্লাহু কালেমাটি পাঠ করুন- যাতে আমি বিচার দিবসে প্রমাণ হিসেবে তা আল্লাহর দরবারে পেশ করতে পারি।'

আবু জাহেল এবং আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়া বললো, আবু তালিব, আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে কি তাহলে শেষ পর্যন্ত বিমুখ হয়েই যাবেন?

অতঃপর তারা উভয়েই অবিরাম তাঁর সাথে কথা বলতে থাকে। সবশেষে আবু তালিব যে কথাটি বলেছিলেন তা হচ্ছে- 'আব্দুল মুত্তালিবের ধর্মের ওপর।'

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: 'আমি যতক্ষণ বাধাপ্রাপ্ত না হবো ততক্ষণ আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবো।'

উক্ত প্রেক্ষিতে এই আয়াতে কারীমা নাযিল হয়: "আত্মীয় স্বজন হলেও মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা নবী এবং মু'মিনদের জন্য সংগত নয়। যখন এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, নিশ্চিতই তারা জাহান্নামী।" (তওবা: আয়াত-১১৩)

উপরন্তু এই আয়াতও নাযিল হয়- আপনার পছন্দমতো ব্যক্তিকে হেদায়েত করার ক্ষমতা আপনার নেই। (কাসাস: আয়াত-৫৬)

এখানে একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, আবু তালিব রাসূল কে কি পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা এবং কাফির-মুশরিকদের অন্যায়-অত্যাচার থেকে সর্বশক্তি নিয়োগ করে রক্ষা করেছিলেন। মক্কার অত্যাচারী মুশরিকদের আক্রমণ থেকে ইসলামি আন্দোলনের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন দুর্গস্বরূপ। কিন্তু আল্লাহর রাসূল এবং ইসলামের জন্য এতো করেও যেহেতু তিনি বংশপরস্পরা সূত্রে প্রাপ্ত শিরকের প্রভাব কাটিয়ে আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারলেন না সেহেতু দোরগোড়ায় আগত কামিয়াবি থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেলেন। সহিহ বুখারিতে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব হতে বর্ণিত আছে। তিনি রাসূলুল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি তোমার চাচার কি উপকারে আসবে?

কারণ রাসূল (ﷺ) এর হেফাজত এবং নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে তাঁর শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন।

রাসূল (ﷺ) এর চাচা আবু তালিব তিনি এখন জাহান্নামের অগভীর স্থানে অবস্থান করছেন। যদি আমি তাঁর সাথে সম্পর্কিত না হতাম তাহলে তিনি জাহান্নামের অতল গহবরে ডুবে যেতেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেছেন: একদা রাসূল (ﷺ) এর নিকট তাঁর চাচা আবু তালিব সম্পর্কে আলোচনা উপস্থাপিত হয়। আলোচনা সূত্রে তিনি বলেন- 'সম্ভবত হাশরের দিন আমার সুপারিশ তাঁর উপকারে আসবে এবং তাঁকে জাহান্নামের এক অগভীর স্থানে রাখা হবে- যা শুধু তাঁর দুই পায়ের গিট পর্যন্ত পৌঁছবে।

খাদিজা (রা) এর মৃত্যু

আবু তালিবের মৃত্যুর দুই মাস পর (মতান্তরে মাত্র তিন দিন পর) উম্মুল মুমিনীন খাদিজাতুল কুবরা (রা) ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু নবুয়তের দশমবর্ষের রমযান মাসে হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৫ বছর। রাসূল আমার তখন অতিবাহিত করছিলেন তাঁর জীবনের ৫০তম বছর।

রাসূল (ﷺ) এর জীবনে খাদিজা (রা) ছিলেন আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামতস্বরূপ। দীর্ঘ পঁচিশ বছর যাবৎ আল্লাহর রাসূল কে সাহচর্য দিয়ে, সেবাযত্ন দিয়ে, বিপদ-আপদে সাহস ও শক্তি যুগিয়ে, অভাব-অনটনে অর্থ- সম্পদ দিয়ে, ধ্যান ও জ্ঞানের প্রয়োজনে প্রেরণা ও পরামর্শ দিয়ে ইসলামের বীজের অঙ্কুরোদগম এবং নতুন ইসলামের লালন-পালনের ক্ষেত্রে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখেছেন ইসলামের ইতিহাসে তার কোনো তুলনা পাওয়া যায় না।

খাদিজা (রা) সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যে সময় লোকেরা আমার সাথে কুফরী করলো সেই সময় তিনি আমার প্রতি অটল বিশ্বাস স্থাপন করলেন, যে সময় লোকেরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো সে সময় তিনি আমার সত্যবাদিতার স্বীকৃতি প্রদান করলেন, যে সময় মানুষ আমাকে বঞ্চিত করলো সে সময় তিনি আমাকে তার সম্পদে অংশীদার করলেন। আল্লাহ আমাকে তার গর্ভে সন্তানাদি প্রদান করলেন, অন্য কোনো স্ত্রীর গর্ভে সন্তান দেননি।

সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে। জিবরাঈল (আ) রাসূল (ﷺ) এর নিকট আগমন করে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল। ইনি খাদিজা (রা) আগমন করছেন। তাঁর নিকট একটি পাত্র আছে। যার মধ্যে তরকারি, খাদ্যবস্তু অথবা পানীয় আছে। যখন তিনি আপনার নিকট এসে পৌঁছবে তখন আপনি তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সালাম বলবেন এবং জান্নাতের মতির তৈরি একটি মহলের শুভসংবাদ প্রদান করবেন। যার মধ্যে কোনো প্রকার হট্টগোল বা হৈ চৈ হবে না, কোনো ধরনের ক্লান্তি ও শ্রান্তি আসবে না।

দুঃখের ওপর দুঃখ

প্রাণপ্রিয় চাচা আবু তালিবের মৃত্যু এবং প্রাণাধিক প্রিয়া ও সহধর্মিনী উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা) এর মৃত্যু-এই দুটি মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেলো অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে। এই দুটি মৃত্যুর সুদূরপ্রসারী ফল প্রতিফলিত হতে লাগলো রাসূল (ﷺ) এর জীবনে। একদিকে যেমন তাঁর জীবনে বিস্তার লাভ করলো নিদারুন শোকের ছায়া, অন্যদিকে তিনি বঞ্চিত হলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী অভিভাবকের অভিভাবত্ব এবং সহধর্মিনীর অনবিল প্রেম-ভালোবাসা ও সাহচর্য থেকে।

চাচার মৃত্যুর ফলে মুশরিকদের সাহস বৃদ্ধি পেয়ে গেলো বহুগুণে। রাসূলল্লাহ এবং মুসলমানদের ওপর নবোদ্যমে শুরু করল নানামুখী নির্যাতন। একে তো প্রিয় পরিজনদের বিয়োগব্যাথা, দুঃখ-যন্ত্রণা, অন্যদিকে কাফির-মুশরিকদের নির্যাতন-নিপীড়ন পর্বতসম ধৈর্যের অধিকারী হয়েও রাসূল এর জীবন হয়ে ওঠে বিষাদময় ও বিপর্যস্ত ও নৈরাশ্যে ভরপুর।

নৈরাশ্যের মাঝে কিছুটা আশায় বুক বেঁধে অগ্রসর হন তিনি তায়েফের পথে- যদি সেখানকার লোকজন দাওয়াত গ্রহণ করে কিংবা দাওয়াত ও তাবলীগের ব্যাপারে তাঁকে কিছুটা সাহায্য করে কিংবা তাঁকে একটু আশ্রয় প্রদান করে তাঁর জাতির বিরুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতা করে। কিন্তু সেখানে দাওয়াত কবুল, আশ্রয় কিংবা সাহায্য প্রদান তো দূরের কথা; বরং তাঁর সাথে এতই নির্মম আচরণ করা হলো এবং এমন দৈহিক নির্যাতন চালানো হলো যে তা অতীত নির্যাতনের সকল দৃষ্টান্ত অতিক্রম করে গেল। উক্ত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হবে।

এদিকে মক্কায় মুশরিকরা রাসূলল্লাহ এবং তাঁর অনুগামী ও অনুসারীগণের ওপর ইতোপূর্বে যেভাবে যুলুম-নির্যাতন ও অত্যাচার-উৎপীড়ন করে আসছিলো এখনো অব্যাহতভাবে তা চালিয়ে যেতে লাগলো। শুধু তাই নয়, বরং নির্যাতনের মাত্রা এত বেশি বৃদ্ধি করতে লাগলো যে, আবুবকর (রা) এর মতো অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং কষ্টসহিষ্ণু ব্যক্তিও অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে ওঠলেন এবং উপায়ান্তর না দেখে মক্কা ছেড়ে হাবশার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কিন্তু পথিমধ্যে 'বারকে গামাদ' নামক স্থানে পৌঁছলে ইবনে দাগানার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে নিরাপত্তা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে নিজ আশ্রয়ে মক্কায় ফেরত নিয়ে আসে।

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন। যখন আবু তালিব মৃত্যুমুখে পতিত হন তখন কুরাইশরা রাসূল কে এত কষ্ট দেয়-যা আবু তালিবের জীবদ্দশায় কল্পনাই করতে পারেননি। নিম্নে একটি ঘটনার উল্লেখ করা হলো।

একদিন এক নির্বোধ ও গোঁয়ার প্রকৃতির কুরাইশি কাফির রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সামনে এগিয়ে এসে মাথার ওপর মাটি নিক্ষেপ করে দেয়। সেই অবস্থাতেই তিনি প্রত্যাবর্তন করেন। গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর এক কন্যা সেই মাটি ধুইয়ে পরিষ্কার করে দেন। ধুয়ে দেয়ার সময় তিনি ক্রন্দন করছিলেন। রাসূল তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বললেন: 'মা, তুমি ক্রন্দন করো না। আল্লাহই তোমার পিতার হেফাজতকারী।'

সে সময় তিনি এ কথাও বলেছেন- 'যতদিন আমার চাচা আবু তালিব জীবিত ছিলেন কুরাইশরা আমার সাথে এত খারাপ ব্যবহার করেনি- যা আমার সহ্যের বাইরে ছিলো।'

এমনিভাবে অবিরাম একের পর এক বিপদ আপদের সম্মুখীন হওয়ার কারণে রাসূল সেই বছরটির নাম রাখেন 'আমুল হুযন' অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের বছর। ইতিহাসে সে বছরটি এই নামেই প্রসিদ্ধ।

রাসূল (ﷺ) এর সাথে সাওদা (রা) এর বিয়ে নবুয়তের ১০ম বর্ষের শাওয়াল মাসে রাসূল সাওদা বিনতে যামযাহ (রা) কে বিয়ে করেন। এই মহিলা নবুয়তের প্রথম অবস্থাতেই মুসলমান হয়েছিলেন। হাবশার (আবিসিনিয়া) দ্বিতীয় সময় হিজরতও করেছিলেন। তাঁর পূর্ববর্তী স্বামীর নাম ছিলো 'সাকারান বিন আমর'। তিনিও প্রথম পর্যায়ের মুসলমান ছিলেন এবং সাওদা (রা) তাঁর সাথে হাবশায় হিজরত করেছিলেন। সাওদা (রা) এর প্রথম স্বামী হারশায় ইন্তেকাল করেন। তবে কারো কারো মতে, মক্কায় ফিরে আসার পর তিনি ইন্তেকাল করেছেন।

পরে তার ইদ্দত পালন শেষ হলে রাসূল তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। অতঃপর তাঁরা উভয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

এই মহিলা ছিলেন রাসূল (ﷺ) এর দ্বিতীয় স্ত্রী। কয়েক বছর পর ইনি নিজের পালা আয়েশা (রা) কে দিয়েছিলেন।

মুসলিমগণের ধৈর্য ও দৃঢ়তা

প্রথম কয়েক বছরের মধ্যে যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাদের যে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা, নির্যাতন ও নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো এবং যেভাবে তারা অসাধারণ ধৈর্য ও সহিষ্ণুজ্ঞতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহস ও দৃঢ়তা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা এবং অধ্যবসায়ের সাথে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবন দিয়ে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণকে বিপন্ন করে নব ইসলামকে লালন করে তার বিকাশধারা অব্যাহত রেখেছিলেন তা গভীরভাবে অনুধাবন করে বিশ্বের বড়ো বড়ো পণ্ডিত এবং জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিগণ একদিকে যেমন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান অন্যদিকে তেমনি সত্যের প্রতি তাদের অবিচল নিষ্ঠা, কর্তব্যবোধ, কর্মে দৃঢ়তা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করে তারা চমৎকৃত এবং মুগ্ধ হয়ে থাকেন। একই সাথে তাদের মনে এই প্রশ্নেরও উদয় হতে থাকে যে, কি কারণে, কোন যাদুমন্ত্রবলে এই অসাধ্য সাধন তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিলো। অসংখ্য অগণিত মানুষের এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর কি হতে পারে তার প্রতি কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করেই নিম্নোক্ত আলোচনা পেশ করছি-

১. আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস: উপরিউক্ত প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য উত্তরমালার মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস এবং তাঁর অস্তিত্ব, হিকমত এবং কুদরত সম্পর্কে সঠিক এবং সুস্পষ্ট ধারণা। কারণ তাওহীদের সুস্পষ্ট ধারণা এবং তাওহিদী নূরে যখন মুমিনের অন্তর আলোকিত, উদ্বেলিত ও পুলকিত হয়ে ওঠে পর্বত সমান প্রতিবন্ধকতাও তাঁর সামনে শুষ্ক তৃণখণ্ডের মতো তুচ্ছ মনে হয়। যে মুমিন পরিপক্ক ও সুদৃঢ় ঈমান এবং মজবুত ইয়াকীনের অধিকারী হওয়ার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করে তার সম্মুখে পৃথিবীর যত বড়ো সমস্যাই আসুক না কেন, তা যতই ভয়ঙ্কর এবং ভীতিপ্রদই হোক না কেন তা কিছুই মনে করেন না। এ কারণেই ঈমানদারের প্রাণের সজীবতা এবং উদার উন্মুক্ত চিত্তের আনন্দানুভূতি মূর্খ ও নিকৃষ্ট শ্রেণির মানবসৃষ্ট দুঃখ-কষ্ট কিংবা যন্ত্রণাকে কখনোই পরোয়া করে না। কুরআন মাজীদে যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

(ফেনা বা গাদ তো আবর্জনাতে পরিণত হয়) যা আবর্জনা তা ফেলে দেয়া হয় এবং যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিতে থেকে যায়। (সূরা আর-রাদ: আয়াত ১৭)

অতঃপর এই এক কারণের সূত্র ধরেই অস্তিত্ব লাভ করে অজস্র কারণ যা সেই ধৈর্য-সহিঞ্চুতা ও দৃঢ়তাকে আরও মজবুত করে তোলে।

২. মহানবী (ﷺ) এর দুরদর্শী নেতৃত্ব: এটা সর্বজনবিদিত এবং সর্বসম্মত সত্য যে, রাসূল ছিলেন বিশেষভাবে মুসলিম উম্মাহ এবং সাধারণভাবে বিশ্বমানবের জন্য মহিমান্বিত পরিচালক ও প্রাজ্ঞ পথপ্রদর্শক। দেহে, মন- মানসিকতায়, নেতৃত্ব, সৌজন্য, সদাচারে তিনি ছিলেন সকল যুগের সকল মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ। অপরূপ দৈহিক সুষমা, আধ্যাত্মিক সহত্তম চরিত্র, বিনম্র স্বভাব, উদার- উন্মুক্ত আবরণ, ন্যায়নিষ্ঠ কার্যকলাপ, অসাধারণ পাণ্ডিত, বৃদ্ধিমত্তা ও বাগ্মিতা সবকিছুর সমন্বয়ে তিনি ছিলেন এমন এক ব্যাক্তিত্ব-যার সান্নিধ্য কিংবা সাহচর্যে মানুষ একবার এলে বারবার ফিরে আসার জন্য আপনা থেকেই প্রভাবিত হতো এবং তাঁর খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠতো।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বিনয়-বিনম্র আচরণ, সত্যবাদিতা, সহনশীলতা সহমর্মিতা, আমানতদারী, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সদগুণাবলির জন্য বন্ধু-বান্ধব দূরের কথা, শত্রু'রাও তাঁর কোনো উক্তি কিংবা অঙ্গীকারকে যে অবিশ্বাস্য বলে মনে করতে পারতেন না তার বহু প্রমাণ রয়েছে। এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো।

একদা কুরাইশদের এমন তিন ব্যক্তি একত্রিত হলো- যারা পৃথক পৃথকভাবে একজন অন্যজনের অগোচরে কুরআন পাঠ শ্রবণ করেছিলো। কিন্তু পরে তাদের প্রত্যেকের এই গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। সেই তিন জনের মধ্যে একজন ছিলো আবু জাহেল।

পরে তিন জন যখন একত্রিত হলো তখন একজন আবু জাহেলকে বললো- 'তুমি মুহাম্মদ এর নিকট যা শ্রবণ করেছ সে সম্পর্কে তোমার মতামত কি তো বলো।'

আবু জাহেল বললো: 'আমি কি আর শুনেছি। প্রকৃত কথা হচ্ছে এই যে, আমরা এবং বনু আবদে মানাফ মান-মর্যাদার ব্যাপারে একে অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছি। তারা যেমন গরিব-মিসকীনদের খানা খাওয়ায়, আমরা তেমনি তাদের খানা খাওয়াই। তারা দান-খয়রাত করে আমরাও তা করি। এখন আমরা এবং তারা উভয় পক্ষই সর্বক্ষেত্রে একে অন্যের সমকক্ষ হিসেবে প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করে চলেছি এবং প্রতিযোগিতামূলক ঘোড়দৌড়ের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতারত দুটো ঘোড়ার মতো ঊর্ধ্বশ্বাসে অবিরাম ছুটে চলেছি। এখন তারা নতুনভাবে বলতে শুরু করেছে যে, তাদের মাঝে একজন নবী আছে যার নিকট আকাশ থেকে ঐশিবাণী নাযিল হয়। আচ্ছা বলো তো আমরা তাহলে কিভাবে তাদের নাগাল পেতে পারি? আল্লাহর কসম! আমরা ঐ ব্যক্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবো না এবং তাকে কখনোই সত্যবাদী বলবো না।

যেমন আমরা তাকে মিথ্যুক বলছি না কিন্তু সে যা নিয়ে এসেছে তা মিথ্যা মনে করছি।

কিন্তু তারা তোমাকে তো মিথ্যাবাদী বলে না; বরং যালিমেরা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে। (সূরা আনয়াম: আয়াত-৩৩)

উক্ত ঘটনা পূর্বে সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একদিন কাফিররা রাসূল কে তিনবার অভিশাপ দেয়। তৃতীয় দফায় রাসূল এ ইরশাদ করলেন- হে কুরাইশগণ! আমি কুরবানির পশু নিয়ে তোমাদের নিকট আগমন করেছি।

সেই কথা তখন তাদের ওপর এমনভাবে প্রভাব সৃষ্টি করলো যে, যে ব্যক্তি শত্রুতায় সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলো সে-ই সর্বোৎকৃষ্ট কথাবার্তা দ্বারা রাসূল কে সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট হলো।

অনুরূপভাবে একটি ঘটনারও বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি ছিলো, সিজদারত অবস্থান যখন রাসূল (ﷺ) এর ওপর নাড়িভুড়ি নিক্ষেপ করা হয়েছিলো অতঃপর মাথা উত্তোলন করে যখন তিনি নিক্ষেপকারীর বিরুদ্ধে বদ দু'আ করতে থাকেন তখন তারা একদম অস্থির হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে ভয়-ভীতি ও দুশ্চিন্তার ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে। তারা আর বাঁচতে পারবে না বলে তাদের মনে স্থির বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়ে যায়।

অন্য একটি বর্ণনা মতে, রাসূল যখন আবু লাহাবের পুত্র উতায়বার বিরুদ্ধে বদদোয়া করলেন তখন তার স্থির বিশ্বাস হয়ে গেলো যে, সে রাসূল (ﷺ) এর বদ দু'আ থেকে কিছুতেই মুক্তি পাবে না। যেমনটি শামরাজ্য সফর অবস্থায় বাঘ দেখেই বলেছিলো- 'আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ মক্কা থেকেই আমাকে হত্যা করলো।

অন্য আরেকটি ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছে, উবাই বিন খালফ রাসূলকে হত্যা করার জন্য বার বার হুমকি দিচ্ছিলো। একদা রাসূল উত্তরে বললেন; "(তোমরা নয়) বরং আল্লাহ চান তো আমিই তোমাদেরকে হত্যা করবো, ইনশাআল্লাহ!' এরপর উহুদের যুদ্ধে রাসূল যখন উবাইয়ের গলদেশে বর্শার দ্বারা আঘাত করলেন তখন যদিও সে আঘাত খুবই সামান্য ছিলো তথাপি উবাই বার বার এই কথাই বলছিলো- 'মুহাম্মদ আমাকে মক্কায় বলেছিলো, আমি তোমাকে হত্যা করবো। সুতরাং সে যদি আমার গায়ে থুথুও দিত তাতেও আমার মৃত্যু ঘটে যেত।

এমনিভাবে একদা সাদ বিন মু'আয মক্কায় উমাইয়া বিন খালফকে বলেছিলো: 'আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি, মুসলমানগণ তোমাদের হত্যা করবে-তখন থেকে উমাইয়া ভীষণভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ভয়-ভীতি তার অন্তরে সর্বক্ষণ বিরাজমান থাকে। তাই সে মনে মনে স্থির করেছিলো যে সে কখনোই মক্কার বাইরে যাবে না। কিন্তু বদর যুদ্ধের সময় আবু জাহেলের পীড়াপীড়ি এবং চাপের মুখে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মক্কার বাইরে যেতে বাধ্য হয়েছিলো। তবে প্রয়োজনবোধে যাতে দ্রুত পশ্চাদাপসারণ সম্ভব হয় সে উদ্দেশ্যে সে মক্কার সবচেয়ে দ্রুতগামী উটটি ক্রয় করে নিয়ে তার ওপর সওয়ার হয়ে যুদ্ধে যায়।

এদিকে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রত্যক্ষ করে তার স্ত্রীও তাকে এই বলে বাধা দেয়- 'আবু সাফওয়ান, আপনার ইয়াসরেবী ভাই যা বলেছিলেন আপনি কি তা ভুলে গেছেন?

সে উত্তর দিলো- 'না' ভুলিনি, তবে আল্লাহর শপথ! তাদের সাথে আমি অল্প দূরেই যাব।

এই তো ছিলো রাসূল (ﷺ) এর শত্রুদের অবস্থা। অন্যদিকে তাঁর সাহাবায়ে কিরামগণ, সঙ্গী-সাথি ও বন্ধু-বান্ধবগণের নিকট তিনি ছিলেন প্রাণের চেয়েও প্রিয়। তিনি ছিলেন সকলের চিন্তা-চেতনা ও অন্তরের চিকিৎসক। তাঁদের অন্তুর থেকে উৎসারিত ভক্তি ও ভালোবাসার ধারা, ঠিক সেভাবে রাসূল (ﷺ) এর দিকে প্রবাহিত হলো যেমনটি জলের ধারা উচ্চ থেকে নিম্নভূমির দিক প্রবলবেগে প্রবাহিত হতে থাকে এবং তাঁদের সকলের প্রাণ ঠিক সেভাবে রাসূল (ﷺ) এর প্রাণের দিকে আকর্ষিত হতে থাকতো যেমনটি সাধারণ লৌহখন্ড আকর্ষিত হতে থাকে চুম্বকের আকর্ষণে। যেমনটি বলা হয়েছে-

রাসূল (ﷺ) এর আকৃতি প্রতিটি মানবদেহের জন্য মূল অস্তিত্ব স্বরূপ ছিলো এবং প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের জন্য চুম্বকের মতো ছিলো।

রাসূল (ﷺ) এর জন্য সাহাবায়ে কিরামগণের অন্তরে প্রেম-প্রীতি, শ্রদ্ধা- ভক্তি ও ভালোবাসার যে জান্নাতী ধারা সর্বক্ষণ বাহিত হতো অখণ্ড মানবজাতির ইতিহাসে কোথাও তাঁর কোনো তুলনা মেলে না। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য কখনো কোনো ত্যাগ স্বীকারকেই বড়ো বলে মনে করতেন না। এমনকি এটাও পছন্দ করতেন না যে, রাসূল (ﷺ) এর গায়ে সামান্যতম নখের আঁচড় লাগুক অথবা তাঁর পায়ে কাঁটার আঁচড় লাগুক। তাঁর জন্য তাঁদের নিজেদের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে তাঁরা সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন।

একদিন আবুবকর সিদ্দীক (রা) অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে প্রহৃত হলেন। উতবা বিন রাবিয়াহ তাঁর নিকটে এসে তালিযুক্ত জুতো দ্বারা প্রহার করতে লাগলো। বিশেষভাবে চেহারা লক্ষ করে মারতে মারতে তাঁর পিঠের ওপর চড়ে বসলো। অবস্থা এমনই হয়ে যায় যে, তার নাক ও চেহারার পার্থক্য করা দুষ্কর হয়ে পড়েছিলো এবং তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন এই অবস্থায় তাঁর গোত্র বনু তাইমের লোকজন তাঁকে কাপড়ে জড়িয়ে বাড়ি আনে। তাদের বিশ্বাস ছিলো যে তিনি আর বাঁচবেন না। কিন্তু দিনের শেষভাগে তাঁর মুখ থেকে কথা বের হলো। সেসময় তিনি অন্য সবকিছুর আগে প্রশ্ন করলেন রাসূল (ﷺ) এর অবস্থা কী?

তাঁর কথা শুনে বনু তাইমের লোকেরা বললো তাঁকে যেন কিছু পানাহার করানো হয়। তাঁর মা একেবারে একাকী অবস্থায় তাঁকে অনুরোধ করলেন কিছু পানাহার করার জন্য।

কিন্তু তিনি পূর্বের কথাই বলতে থাকলেন- রাসূল কী অবস্থায় আছেন? পরিশেষে উম্মুল খায়ের বললেন: 'আমি তোমার সাথির সংবাদ জানি না।'

আবুবকর বললেন: উম্মে জামিল বিন খাত্তাবের নিকট যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো।

তিনি উম্মে জামিলের নিকট গিয়ে বললেন: 'আবুবকর জানতে চেয়েছে, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহর অবস্থা কী?'

উম্মে জামিল বললেন: 'আমি না মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহকে চিনি, না তোমার পুত্রকে চিনি। তবে তুমি যদি চাও তাহলে তোমার সাথে তোমার পুত্রের নিকট যেতে পারি।'

উম্মুল খায়ের বললেন: খুব ভালো।

এরপর উম্মে জামিল তার সাথে এসে দেখলেন আবু বকর (রা) চরমভাবে আহত এবং বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। অতঃপর তাঁর নিকটবর্তী হয়ে চিৎকার করে বললেন: যারা আপনাকে এই দুরবস্থার মধ্যে নিপতিত করেছে তারা অবশ্যই জঘন্য প্রকৃতির লোক এবং অমানুষ কাফির। আমি আশা করি যে, আল্লাহ এই অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।

আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন: 'রাসূল (ﷺ) এর কী হয়েছে? তিনি বললেন, সহিহ সালামতে আছেন।

কোথায় আছেন তিনি?

ইবনে আরকামের বাড়িতে।

আবু বকর (রা) বললেন: যতক্ষণ আমি রাসূল (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত না হবো ততক্ষণ আমি খাদ্য কিংবা পানীয় কোনো কিছুই গ্রহণ করবো না। এটাই হচ্ছে আল্লাহর জন্য আমার অঙ্গীকার।

অতঃপর উম্মুল খায়ের এবং উম্মে জামিল সেখানেই অবস্থান করলেন। লোকজনের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যখন নিস্তব্ধতা নেমে এলো তখন উম্মুল খায়ের এবং উম্মে জামিল দুজনে আবু বকর (রা) কে সাথে নিয়ে বের হলেন। তিনি তাঁদের কাঁধে ভর দিয়ে চলতে লাগলেন এবং এভাবে তাঁরা তাঁকে রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে পৌছিয়ে দিলেন।

রাসূলল্লাহ (ﷺ) এর জন্য শ্রদ্ধা, মুহব্বত উৎসর্গীকরণ ও ত্যাগ-তিতীক্ষার বিরল ঘটনাবলি এই গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন প্রসঙ্গে বর্ণিত হবে। বিশেষ করে উহুদ যুদ্ধের ঘটনাবলি এবং খোবায়েবের প্রসঙ্গে সেগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হবে।

৩. দায়িত্ববোধের অনুভূতি: সাহাবায়ে কিরামগণ এটা সুস্পষ্টভাবে অবগত ছিলেন যে, এই একমুষ্টি মাটি যাকে 'মানুষ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ও আল্লাহর তরফ থেকে তার ওপর যে বিশাল এবং দুর্বহ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে কোনো অবস্থাতেই তা থেকে বিমুখ হওয়া কিংবা তাকে এড়িয়ে গেলে তার ফল যা হবে তা কাফির-মুশরিকদের অন্যায়-অত্যাচার এবং নির্যাতন-নিপীড়নের হলে কিংবা কর্তব্য এড়িয়ে গেলে নিজের এবং সমগ্র মানবতার যে ক্ষতি হবে এবং এমন সব সমস্যার উদ্ভব হবে যার তুলনায় এসব দুঃখ-কষ্ট ক্ষয়ক্ষতি তেমন কিছুই নয়।

৪. পরকালীন জীবনে বিশ্বাস: আল্লাহর জমিনে দ্বীন কায়েম করার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে মানুষের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে সে সম্পর্কে দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী এবং কর্মমুখী করার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে পরকালীন জীবনে বিশ্বাস। সাহাবায়ে কিরাম এই কথার ওপর অটল বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন যে, পরকালীন জীবনে হাশরের দিনে তাদেরকে দুনিয়ার সকল কার্যকলাপের ব্যাপারে অবশ্যই রাব্বুল আলামীনের দরবারে সকল কিছুর নিপুণ হিসাব দিতে হবে। পুণ্যবানগণ অনন্ত সুখ-শান্তির চিরস্থায়ী আবাস জান্নাতে চিরকাল মহাসুখে বসবাস করতে থাকবে। পক্ষান্তরে পাপীগণ দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণার আবাসস্থল জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়ে অবর্ণনীয় দুঃখ যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে।

সাহাবায়ে কিরাম একদিকে যেমন পুণ্য অর্জনের নেশায় বিভোর হয়ে সর্বক্ষণ কল্যাণমুখী কাজ-কর্মে লিপ্ত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা জান্নাত লাভের আশায় উন্মুখ হয়ে থাকতেন অন্যদিকে তেমনি মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও জাহান্নামের আযাবের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকতেন। যেমনটি নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমায় বর্ণিত হয়েছে-

তারা যা কিছু সম্পাদন করে তা অন্তরে ভয়-ভীতির সাথে করে এই জন্য যে, তাদেরকে আপন প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা আল-মুমিনুন -৬০)

এ বিষয়েও তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ, বিত্তবৈভর ও ভোগবিলাস, পরকালীন জীবনের সেসবের তুলনায় মশার একটি পাখার সমতুল্যও নয়। তাদের এই বিশ্বাস এতই দৃঢ় ছিলো যে, এর সামনে পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট, যুলুম-নির্যাতন সব ছিলো অত্যন্ত তুচ্ছ ব্যাপার। সুতরাং যুলুম- নির্যাতনের মাত্রা যতই বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের বিশ্বাস এবং সহনশীলতাও ততোধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে-যা কাফির-মুশরিক বা বিরোধীপক্ষকে হতভম্ব ও হতবাক করে দিয়েছে।

৫. কুরআন মাজীদের দুর্নিবার আকর্ষণ: কাফির-মুশরিকদের সৃষ্ট ভয়ঙ্কর বিপদ-আপদ ও ঘোর সামাজিক অনাচার এবং অবক্ষয়জনিত অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় এমন সব সূরা ও আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিলো- যার মধ্যে নিবিড় অথচ আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে ইসলামের মৌলিক নিয়ম-নীতির ওপর প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। সেই সময় উল্লিখিত নিয়ম-নীতির পাশাপাশি দাওয়াত এবং তাবলীগের কাজও পূর্ণোদ্যমে চলছিলো। উক্ত আয়াতসমূহে ইসলামের অনুসারীগণকে এমন সব মৌলিক কাজ-কর্ম করতে বলা হচ্ছিল-যার ওপর ভিত্তি করে আল্লাহ মানবগোষ্ঠীকে সবচেয়ে উন্নত সমাজ অর্থাৎ ইসলামি সামাজের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ইঙ্গিত দিয়েছিলো। উল্লিখিত আয়াতসমূহের মাধ্যমে মুসলমানদের আবেগ ও অনুভূতিতে স্থায়িত্ব ও দৃঢ়তা দানকল্পে উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছিলো। যেমন নিম্নের আয়াতে কারীমায় বর্ণনা হয়েছে-

নাকি তোমরা ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মত কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথি মুমিনগণ বলছিল, ‘কখন আল্লাহর সাহায্য [আসবে]’? জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী। (সূরা বাক্বারা: আয়াত -২১৪)

কুরআনে কারীমে আরো বলা হয়েছে-

আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। (সূরা আনকাবূত: আয়াত-১ - ৩)

আর তাদেরই পাশে এমনও আয়াতসমূহ নাযিল হচ্ছিল-যার মধ্যে কাফির ও বিরোধিতাকারীদের প্রশ্নের দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়া হয়েছে। তাদের জন্য কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধার অবকাশই দেয়া হয়নি।

উপরন্তু তাদেরকে অত্যন্ত সহজ এবং সুস্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে যে, যদি কেউ ভ্রষ্টতা ও অবাধ্যতায় একগুঁয়েমী ভাব পোষণ করে থাকে, তাহলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। এর প্রমাণ স্বরূপ বিগত জাতিগুলোর এমনসব ঘটনা এবং ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হয়েছে যার দ্বারা এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, নিজের বন্ধু এবং শত্রুদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রীতিনীতি এবং ব্যবস্থাদি কি রয়েছে। অতঃপর ভয় প্রদর্শনের পাশাপাশি করুণা এবং অনুগ্রহের কথাও বলা হয়েছে। তাছাড়া উপদেশ প্রদান ও গ্রহণ এবং আদেশ ও পথপ্রদর্শনের দাবিও আদায় করা হয়েছে, যেন প্রকাশ্য ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ব্যক্তিগণ বিরত হতে চাইলে বিরত হতে পারে।

সত্যিই কুরআন মাজীদ মুসলমানদেরকে ভিন্ন এক জগতে পরিভ্রমণে রত রেখেছিলো এবং তাদেরকে সৃষ্টির বিভিন্ন দৃশ্যপন্ট, প্রভুত্বের পরিপাট্য, লিল্লাহিয়াতের চরমোৎকর্ষ এবং অনুকম্পা- অনুগ্রহ, দয়াদাক্ষিণ্য, সন্তষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কিত এমন সব দীপ্তিময় দৃশ্য প্রদর্শন করা হচ্ছিল যে, সেগুলোর আকর্ষণ ও রেজামন্দি (অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি) এবং চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির আবাসস্থল জান্নাতের শুভসংবাদ নিহিত ছিলো। অন্যদিকে মুসলমানদের শত্রু অনাচারী ও অবাধ্য কাফির মুশরিকদের সেসব অবস্থার চিত্র অংকন করা হচ্ছিলো-যা শেষ বিচারের দিন প্রভু পরওয়ারদিগার সমীপে পেশ করা হবে। তাদের সৎ এবং মঙ্গলজনক কাজ-কর্ম বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তাদেরকে মুখের ওপর ভর দিয়ে টেনে- হেঁচড়ে নিয়ে গিয়ে এই বলে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে- এখন থেকে জাহান্নামের স্বাদ গ্রহণ করো।

৬. সফলতার শুভসংবাদ সমূহ: উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও মুসলমানগণ নিপীড়িত-নির্যাতিত হওয়ার পূর্ব থেকেই অবহিত ছিলেন যে, ইসলাম গ্রহণ করার অর্থ স্থায়ী বিবাদে জড়িয়ে পড়া কিংবা বিবাদ-বিসম্বাদের কারণে ক্ষয়-ক্ষতির শিকারে পরিণত হওয়া নয়; বরং এর প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্যে হচ্ছে ইসলামি দাওয়াত পেশ করার প্রথম দিন থেকেই অজ্ঞদের অজ্ঞতা এবং তাদের অনুসৃত যাবতীয় ভ্রান্ত পথ ও পদ্ধতির অবসানকল্পে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নির্দেশিত পথে অটল ও অবিচল থাকা।

উক্ত দাওয়াতের আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ হচ্ছে, পৃথিবীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামি ভাবধারা ও ইসলামি বিধি-বিধানের প্রচার ও প্রসার লাভ। এতদুদ্দেশ্যে বিশ্বরাজনীতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করা যাতে বিশেষও জাতিসমূহকে আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠিত করা।

কুরআন মাজীদে এই শুভসংবাদ কখনো আকার-ইঙ্গিতে, কখনোবা সুস্পষ্ট ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। অথচ গোটা পৃথিবীর ওপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আভাস-ইঙ্গিত সত্ত্বেও মনে হচ্ছিলো মুসলমানদের জন্য পৃথিবী খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মুসলমানরা যখন এমনতর এক অবস্থায় নৈরাশ্যে অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন অন্যদিকে আবার এমন সব আয়াত নাযিল হচ্ছিলো- যার মধ্যে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ঘটনাবলি এবং তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের বিস্তারিত বিবরণের উল্লেখ ছিলো। সেসব আয়াতে যে চিত্র অংকন করা হচ্ছিলো তার সাথে মক্কার মুসলমান ও কাফিরদের অবস্থার হুবহু সাদৃশ্য ছিলো। এসব ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে এই ইঙ্গিতও প্রদান করা হচ্ছিলো যে, তখন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যায়- অত্যাচারীগণ কিভাবে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছিলো এবং আল্লাহর সৎ বান্দাগণ কিভাবে পৃথিবীর উত্তরধিকারপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

এভাবে সেসব আয়াতে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, আগামীতে মক্কায় বসবাসকারী মুশরিকদের সম্পূর্ণরূপে বিফল হয়ে যাবে এবং মুসলমানগণ ও তাঁদের ইসলামি দাওয়াত পুরোপুরি সফলকাম হয়ে আরব ও আযমে উত্তরাধিকার লাভ করবে। বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে এমন আয়াতও নাযিল হয়েছিলো যার মধ্যে মুসলমানগণের বিজয়ী হওয়ার শুভসংবাদ বিদ্যমান ছিলো। যেমনটি কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে:

আমার রাসূল ও বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ কথা আগেই নির্ধারিত হয়েছে যে, অবশ্যই তারা হবে সাহায্যপ্রাপ্ত এবং অবশ্যই আমার বাহিনী জয়ী হবে। অতএব আপনি কিছু কালের জন্য তাদেরকে উপেক্ষা করুন এবং তাদের প্রতি লক্ষ রাখুন, তারাও শীঘ্রই দেখতে পাবে। তারা কি তবে আমার 'আযাব দ্রুত চায়? যখন তাদের আঙ্গিনায় 'আযাব এসে পড়বে, তখন আরও ইরশাদ হয়েছে-

অচিরেই এই দল পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। (আল-ক্বামার: আয়াত-৪৫)

সর্বযুগের কাফেরদের বহু বাহিনীর মধ্যে এটাও মক্কার কাফেরদের বাহিনী, যা ওখানেই (মক্কাতেই) পরাজিত হবে। (সূরা সোয়াদ: আয়াত-১১)

আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-

যারা অত্যাচারিত হবার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস দিব এবং আখিরাতের পুরস্কার তার চাইতেও শ্রেষ্ঠ। হায়, তারা যদি তা জানত। (সূরা নাহল: আয়াত-৪১)

এভাবে কাফিররা রাসূল (ﷺ) এর নিকট ইউসুফ (আ) এর ঘটনা জিজ্ঞেস করলো, তার উত্তরে আনুষাঙ্গিক আয়াতে কারীমা নাযিল হলো-

ইউসুফ এবং তার ভ্রাতাদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৭)

অর্থাৎ মক্কাবাসী মুশরিকরা অদ্য ইউসুফ (আ) এর যে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে এরা নিজেরাও অনুরূপভাবে অকৃতকার্য হবে-যেমন ইউসুফ (আ) এর ভাইয়েরা অকৃতকার্য হয়েছিলো এবং তাদেরও রক্ষণাবেক্ষণের অবস্থা তা-ই হবে-যা তাদের ভাইদের হয়েছিলো। তাদেরকে ইউসুফ (আ) এবং তাঁর ভাইদের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা একান্ত উচিত। আর এটা জানা দরকার যে, অত্যাচারীদের পরাজয় কিভাবে হয়।

পয়গম্বরের কথা উল্লেখ করে কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-

আর যারা কুফরী করেছে, তারা তাদের রাসূলদের বলল, ‘আমরা তোমাদেরকে আমাদের ভূ-খন্ড থেকে অবশ্যই বের করে দেব, অথবা তোমরা অবশ্যই আমাদের মিল্লাতে ফিরে আসবে’। অতঃপর তাদের রব তাদের নিকট ওহী পাঠালেন, ‘আমি অবশ্যই যালিমদের ধ্বংস করে দেব’। ‘আর নিশ্চয় আমি তাদের পর তোমাদেরকে যমীনে বাস করতে দেব। এটা তার জন্য, যে আমার অবস্থানকে ভয় করে এবং ভয় করে আমার ধমকের’। (সূরা ইবরাহীম: আয়াত ১৩-১৪)

অনুরূপভাবে যে সময় পারস্য এবং রোমে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতে ছিলো এবং কাফির-মুশারিকরা চেয়েছিলো যে, পারস্যবাসীগণ বিজয়ী হোক, কারণ পারস্যবাশিরা ছিলো মুশরিক। কিন্তু মুসলমানরা চেয়েছিলেন যে, রোমীয়গণ জয়ী হোক, কারণ রোমীয়গণ আল্লাহর ফেরেশতা, পয়গম্বর, ওহী, আসমানী কিতাবসমূহ এবং বিচারদিনের প্রতি বিশ্বাস করার দাবিদার ছিলো। কিন্তু পারস্যবাশিরা যখন জয়লাভের পথে অনেকটা অগ্রসর হলো তখন আল্লাহ এই শুভসংবাদ দিলেন যে, কয়েক বছর পরই রোমীয়গণ বিজয়ী হবে। কিন্তু সেই শুভসংবাদকে যথেষ্ট মনে না করে তার পাশাপাশি এই শুভসংবাদটিও প্রদান করেন যে, রোমীয়গণের বিজয়ী হওয়ার প্রাক্কালে আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিশেষ সাহায্য প্রদান করবেন-যাতে তাঁরা সন্তোষ লাভ করবে।

যেমন ইরশাদ হয়েছে—

সেই দিন ঈমানদারগণও আল্লাহর বিশেষ সাহায্যে সন্তোষ লাভ করবে। (সূরা রূম: আয়াত ৪-৫)

পরবর্তী পর্যায়ে আল্লাহর এই সাহায্যই বদর যুদ্ধে অর্জিত মহাসাফল্য এবং বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাস্তবরূপ লাভ করে। উপরন্ত রাসূল নিজেও অনুরূপ শুভসংবাদ পরিবেশন করে মুসলমানদের উৎসাহিত করতেন। যেমন হজ্জের সময় রাসূল (ﷺ) 'মাজিন্নাহ' এবং 'যুলমাজায়' বাজারে জনগণের মধ্যে প্রচারের জন্য গমন করতেন। তখন শুধুমাত্র জান্নাতেরই শুভসংবাদ দিতেন না; বরং পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণাও করতেন -

হে মানুষেরা! কালেমা 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করো, তাহলে সফলকাম হবে, এর ফলে আরবের সম্রাট হতে পারবে ও আযম তোমাদের অধীনস্থ হয়ে যাবে। আবার তোমরা মৃত্যুর পরে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

এই ঘটনা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। ব্যাপারটি হচ্ছে, যখন উতবা বিন রাবিয়া রাসূল (ﷺ) এর নিকট পার্থিব জগতের পণ্যদ্রব্যের প্রস্তাব দিয়ে বিনিময় বা লেন-দেন করতে চাইলো এবং তার উত্তরে রাসূল সূরা হা-মীম সিজদার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনালেন তখন উতবার এ বিশ্বাস হয়ে গেলো যে, শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ (ﷺ) জয়ী হবেন।

অনুরূপভাবে আবু তালিবের নিকট আগমনকারী কুরাইশদের শেষ প্রতিনিধিদের সাথে রাসূল (ﷺ) এর যে কথোপকথন হয়েছিলো তারও বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে দেয়া হয়েছে। সে সময়ও রাসূল মুশরিকদেরকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, তারা যদি তাঁর শুধু একটি কথা মেনে নেয় তাহলে গোটা আরব জাহানে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে এবং অনারব তাদের অধীনস্থ হয়ে যাবে।

খাব্বাব বিন আরাত বলেছেন: একদা আমি রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে হাজির ছিলাম। তিনি কাবা ঘরের ছায়ায় একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে ছিলেন। সে সময় আমরা মুশরিকদের হাতে দারুণভাবে নির্যাতিত হচ্ছিলাম। আমি বললাম, আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন না কেন? একথা শোনার পর রাসূল (ﷺ) এর মুখমন্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করল। তিনি সাথে সাথে বললেন, যাঁরা তোমাদের পূর্বে গত হয়ে গিয়েছেন তাঁদের শরীরের হাড় গোশত পর্যন্ত ছিলো না। যাদের শরীরে গোশত ছিলো তাঁদের গোশত পেশীতে লোহার চিরুনী দ্বারা আঁচড়ানো হতো। কিন্তু এত নির্যতিত এবং পিনীড়িত হয়েও তাঁরা কোনোদিন ধৈর্যচ্যুত হন নি।

অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ এই বিষয়কে অর্থাৎ দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ। এমনকি সানা হতে হাজরা মাউত পর্যন্ত একজন আরোহীর যাতায়াতকালে আল্লাহ ছাড়া কারোই ভয় থাকবে না। তবে ছাগলের জন্য বাঘের ভয় থাকবে।

অন্য এক বর্ণনায় এটাও আছে যে, কিন্তু তোমরা তাড়াতাড়ি করছো। তবে বলা যায় যে, এ শুভসংবাদের কোনো কিছুই গোপন ছিলো না। মুসলমানদের মতো কাফিররাও এসব ব্যাপারে অবহিত ছিলো।

তাদের এ সবকিছু অবগতির কারণে যখন আসওয়াদ বিন মুত্তালিব এবং তার বন্ধুগণ সাহাবায়ে কিরামকে দেখতে পেতো তখন বিদ্রূপ করে একজন অন্যজনকে বলতো- দেখ দেখ ঐ যে, পৃথিবীর সম্রাট এসে গেছে। এরা শীঘ্রই কায়সার ও কিসরা বাদশাহকে পরাজিত করবে। এসব কথা বলে তারা করতালি দিতো এবং মুখে বিদ্রূপাত্মক শীস দিতো।

সেই সময় সাহাবায়ে কিরামের ওপরে অন্যায়-অত্যাচার, উৎপীড়ন-নিপীড়ন, লাঞ্ছনা সবকিছুর ব্যাপ্তি এবং মাত্রা উভয় দিক দিয়েই চরমে পৌঁছেছিলো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও জান্নাত লাভের নিশ্চিত আশা-ভরসা এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভসংবাদ ঝড়ে হাওয়ার ঝাপটায় নিক্ষিপ্ত ও বিতাড়িত মেঘমালার মতো মুসলমানদের মানসপট থেকে সবকিছুকে বিতাড়িত ও বিদূরিত করে দিতো।

এছাড়া রাসূল মুসলমানদের ঈমানী তালীমের মাধ্যমে অবিরামভাবে আধ্যাত্মিক খোরাক যোগাতেন, কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দিয়ে আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করতেন এবং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সময়োচিত উপদেশ ও নির্দেশনা প্রদান করতেন। তাছাড়া আত্মসম্মানবোধ, দৈহিক ও মানসিক পরিছন্নতা, চরিত্রমাধুর্য ও চারিত্রিক পবিত্রতা, সহিষ্ণুতা, সংযম, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অসত্য, ও অবিচারের প্রতি ঘৃণা ও আপোসহীন সংগ্রাম ইত্যাদি গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে সাহাবায়ে কিরামকে এমনভাবে তৈরি করে নিয়েছিলেন যে, তারা প্রয়োজনের মুহূর্তে এক একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠতে পারেন।

সর্বোপরি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে হিদায়েতের আলোকোজ্জ্বল প্রান্তরে এনে যখন তাঁদের দাঁড় করিয়ে দিলেন তখন তাঁদের পূর্বের জীবন ও নতুন জীবনের মধ্যে রাতের অন্ধকার ও দিনের আলোর মতোই পার্থক্য সূচিত হয়ে গেলো। তাঁদের অন্তর্দৃষ্টির সামনে প্রতিভাত হয়ে ওঠলো স্রষ্টার অনন্ত মহিমা ও সৃষ্টিদর্শন, সীমাহীন বিশ্বের অন্তহীন বিস্তার ও বৈচিত্র্য, মানবজীবনের অনন্ত সম্ভাবনার পথ ও পাথেয় এবং পারলৌকিক জীবনের সাফল্য সম্পর্কিত মহাসত্যের উপলব্ধি।

উপরিউক্ত বিষয়াদির আলোকে প্রত্যেক সাহাবীর মধ্যে এমন একটি সমন্বিত চেতনার সৃষ্টি হলো- যার মাধ্যমে বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণের অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, প্রবণতার মোড় পরিবর্তন, আত্মশক্তির উৎকর্ষসাধন, নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভকে জীবনের একমাত্র পাথেয় হিসেবে গ্রহণ তাঁরা এমন এক জীবন গঠনে নিবেদিত হয়ে গেলেন যে, কোথাও তার কোনো তুলনা মেলে না।

মক্কানগরীর বাইরে ইসলামের দাওয়াত

মক্কানগরীর বাইরে ইসলামের দাওয়াত প্রদান রাসূল (ﷺ) এর তায়েফ গমন নবুয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে ৬১৯ ঈসায়ী সালে মে মাসের শেষের দিকে কিংবা জুন মাসের প্রথম দিকে রাসূল তায়েফ গমন করেছিলেন। তায়েফ মক্কা থেকে আনুমানিক ষাট মাইল দূরত্বে অবস্থিত। যাতায়াতের এই দূরত্ব তিনি অতিক্রম করেছিলেন পায়ে হেঁটে। সাথে ছিলেন। তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস যায়েদ বিন হারিস। পথ চলাকালে পথিমধ্যে যে কবিলা বা গোত্রের নিকট তিনি উপস্থিত হতেন তাদের নিকটই ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। কিন্তু তাঁর এই আহ্বানে কোনো কবিলার পক্ষ থেকে কেউ সাড়া দেয়নি।

তায়েফ গমন করে সাকীফ গোত্রের তিন নেতা- যারা সকলেই সহোদর ছিলো তাদের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন। তাদের নাম ছিলো যথাক্রমে আবদে ইয়ালাইল, মাসউদ ও হাবীব। তিন সহোদরের পিতার নাম ছিলো যথাক্রমে আবদে ইয়ালাইল, সাহায্য করার জন্য তাদের নিকট দাওয়াত পেশ করেন। তার উত্তরে একজন বললো-

তুমি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাকো, তাহলে কাবার পর্দা (আবরণ) ফেঁড়ে দেখাও।

একটি উর্দূ পরিভাষার সঙ্গে এই উক্তির মিল রয়েছে তুমি যদি নবী হও তবে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করুন। এই উক্তির তাৎপর্য হচ্ছে দৃঢ়তার সঙ্গে একথা প্রকাশ করা যে তোমার নবী হওয়া কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়, কা'বার পর্দা ফাড়ার জন্য হাত বাড়ানো।

দ্বিতীয়জন বললো- নবী পাঠানোর জন্য আল্লাহ কি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে পান নি?

তৃতীয়জন বললো- 'তোমরা যা করলে এবং বললে তা গোপনেই রেখো।

রাসূল এ তায়েফে দশ দিন অবস্থান করেন। এই সময়ের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করে তিনি ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। কিন্তু সকলের উত্তর একই- 'তুমি আমাদের শহর থেকে চলে যাও।'

ফলে ভগ্নহৃদয়ে তিনি সেখান থেকে ফিরে আসার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। ফিরে আসার পথে যখন তিনি পা বাড়ালেন তখন তাকে উত্যক্ত, অপমানিত ও কষ্ট প্রদানের জন্য শিশু-কিশোর ও যুবকদেরকে তার পিছনে লেলিয়ে দেয়া হলো। ইত্যবসরে পথের দুপাশে দুষ্টলোকের ভিড় জমে গেলো। তারা হাত তালি, অশ্লীল কথাবার্তা বলে তাঁকে গাল-মন্দ করতে ও পাথর ছুঁড়ে আঘাত করতে লাগলো। আঘাতের ফলে রাসূল (ﷺ) এর পায়ের গোড়ালীতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে পাদুটো রক্তাক্ত হয়ে গেলো।

তায়েফের হতভাগ্য কিশোর ও যুবকেরা যখন রাসূল (ﷺ) এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করেছিলো তখন যায়েদ বিন হারিসই তাঁকে রক্ষার জন্য ঢালের মতো কাজ করছিলেন। ফলে তাঁর মাথার কয়েকটি স্থানে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। এভাবে অমানবিক যুলুম-নির্যাতনের মধ্য দিয়ে রাসূল - পথ চলতে থাকেন এবং দুরাচার তায়েফবাশিরা তাদের এই অত্যাচার অব্যাহত রাখে।

আঘাতে আঘাতে জর্জরিত এবং সারাদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় পথ চলতে গিয়ে রাসূল (ﷺ) খুবই ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত এক আঙ্গুরের বাগানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন। বাগানটি ছিলো রাবিয়ার পুত্র উতবা ও শায়বার। রাসূল বাগানে প্রবেশ করলে দূরাচার তায়েফবাশিরা গৃহাভিমুখে ফিরে যায়।

উক্ত আঙ্গুর বাগানটি ছিলো তায়েফ থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। বাগানের মধ্যে প্রবেশ করে রাসূল আঙ্গুরগাছের ছায়ায় এক দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার ফলে কিছুটা সুস্থতা লাভের পর রাসূল আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করলেন। তাঁর এই দোয়া দুর্বলদের দোয়া নামে সুপ্রসিদ্ধ। তাঁর দোয়ার এক একটি কথা থেকে বুঝতে পারা যায় যে, তায়েফবাসীদের দুর্ব্যবহারে তিনি কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন এবং তারা ঈমান না আনার কারণে তিনি কতটা ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি দোয়া করেছিলেন:

হে প্রভু! আমি তোমারই নিকট আমার দুর্বলতা, অপারগতা এবং মানুষের নিকট আমার কদর না হওয়ার অভিযোগ করছি। হে দয়াময়। তুমি দুর্বলের প্রভু ও আমারও প্রভু। তুমি আমাকে কাদের নিকট সোপর্দ করেছো? এমন কোনো আত্মীয়ের নিকট কি যারা রূঢ় আচরণ করে কিংবা শত্রুর নিকট যাকে আমার মাথামুণ্ডের মালিক বানিয়েছো? যদি তুমি আমার ওপর রাগান্বিত না হও তবে কোনো পরোয়া নেই। তাছাড়া তোমার ক্ষমাই আমার জন্য প্রশস্ত। আমি তোমার মুখমণ্ডলের ঐ জ্যোতির ওসিলার প্রার্থনা করছি-যার দ্বারা অন্ধকার আলোকিত হয়েছে এবং পার্থিব ও পারলৌকিক কার্যাবলি সফল হয়েছে। যাতে তোমার ক্রোধ আমার উপরে আপতিত না হয়। তোমারই সন্তুষ্টি কামনা করব যতক্ষণ পর্যন্ত সকল ক্ষমতা ও শক্তি একমাত্র তোমারই এখতিয়ারভুক্ত। তোমার শক্তি ছাড়া কারোরই কোনো শক্তি নেই।

এদিকে রাবিয়ার পুত্রগণও সেই বাগানে গিয়ে উপস্থিত হয়ে রাসূল (ﷺ) কে যখন এমনিতর এক দুরবস্থার মধ্যে নিপতিত অবস্থায় দেখতে পেলো তখন তাদের মধ্যে গোত্রীয় চেতনা জাগ্রত হয়ে ওঠলো। 'আদাস' নামক তাদের এক খ্রিস্টান ক্রীতদাসের হাতে একগোছা আঙ্গুর তারা রাসূল (ﷺ) এর নিকট পাঠিয়ে দিলো।

সেই ক্রীতদাসটি যখন আঙ্গুরের গোছাটি রাসূল (ﷺ) এর হাতে তুলে দিতে চাইলো তিনি তখন 'বিসমিল্লাহ' বলে হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করলেন এবং খেতে শুরু করলেন।

সে সময় আদ্দাস রাসূল (ﷺ) এর উদ্দেশ্যে বললো- এমন কথা তো এ অঞ্চলের লোকদেরমুখে কখনো শুনিনি?

রাসূল বললেন: তুমি কোথায় থাকো? তোমার ধর্ম কি?

সে বললো- আমি খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী এবং নিনোয়ার বাসিন্দা।

নবিজীর কথা শুনে আদ্দাস রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দিকে ঝুঁকে পড়লো এবং তাঁর মাথা ও হাত-পায়ে চুমু দিলো। উক্ত ব্যাপারটি রাবিয়ার পুত্রদ্বয় অদূরে দাঁড়িয়ে অবলোকন করে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো- দেখো দেখো, ঐ ব্যক্তি দেখছি শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্রীতদাসকেও বিগড়িয়ে দিল।

এরপর আদ্দাস যখন তাদের নিকট ফিরে গেলো তখন ভ্রাতৃদ্বয় তাকে বললো- বলো তো দেখি ব্যাপারটা কী? ঐ লোক দেখছি তোমাকেও বিগড়িয়ে দিলো।

সে বললো-'হে আমার মনিব! এই ধরাধামে তার চেয়ে উত্তম মানুষ আর কেউই নেই। তিনি আমাকে এমন এক কথা বলেছেন- যা নবী-রাসূল ছাড়া অন্য কেউই জানে না।'

তারা দুজন বললো- দেখো আদ্দাস, ঐ ব্যক্তি যেন তোমাকে তোমার ধর্ম থেকে ফিরিয়ে না নেয়। কারণ তোমার ধর্ম তার ধর্ম থেকে উত্তম।

কিছুক্ষণ অবস্থানের পর রাসূল বাগান থেকে বের হয়ে মক্কার পথে যাত্রা করলেন। তাঁর মিশনের বিফলতাজনিত চিন্তা ও দৈহিক যন্ত্রণার কারণে হৃদয়-মন ছিলো অত্যন্ত ভারাক্রান্ত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত। এমনিতর অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি যখন কার্নে সায়ালের নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশে জিরবাঈল (আ) সেখানে আগমন করেন। তাঁর সাথে ছিলেন পর্বতনিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতামণ্ডলী। আল্লাহর তরফ থেকে তাঁরা এই অভিপ্রায় নিয়ে এসেছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যদি ইচ্ছা করেন তাহলে দুই পাহাড়কে একত্রিত করে দুরাচার তায়েফবাসীকে পিষে মারবেন।

এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বুখারিতে আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেছেন:

রাসূল কে তিনি একদা জিজ্ঞেস করলেন- আপনার জীবনে কি এমন কোনোদিন এসেছে যা উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন ছিলো?

তিনি উত্তরে বললেন-'হ্যাঁ।' তোমার সম্প্রদায়ের নিকট থেকে আমাকে যে যে দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিলো সেই দিনটি যেদিন তায়েফে গিয়ে আমি নিজেকে আমর বিন উমাইর সাকাফীর পুত্রদের নিকট পেশ করেছিলাম। কিন্তু তারা আমার কথায় কর্ণপাত না করায় দুঃখ-বেদনায় ভারাক্রান্ত এবং দুষ্টলোকদের হাতে নির্যাতিত হয়ে অত্যন্ত ক্লান্ত-শ্রান্ত অবস্থায় আমি নিজ গন্তব্যে রওয়ানা করি। এভাবে চলতে চলতে 'কার্নে সায়ালের'-এ যখন এসে পৌঁছি তখন আমার চেতনা ফিরে আসে।

এ সময় আমার মনে কিছুটা সাচ্ছন্দবোধ হয়। সেখানে আমি আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই দেখি, একখণ্ড মেঘ আমাকে ছায়া দান করছে। ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে নিরীক্ষণ করলে বুঝতে পারি যে, এতে জিবরাইল (আ) রয়েছেন। তিনি আমাকে আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনার সম্প্রদায় আপনাকে যা বলেছে এবং আপনার প্রতি যে আচরণ করেছে আল্লাহ সবকিছুই শুনেছেন এবং দেখেছেন। এখন তিনি পর্বতনিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতাগণকে আপনার খেদমতে প্রেরণ করেছেন। আপনি তাদেরকে যা ইচ্ছা নির্দেশ প্রদান করুন। এরপর পর্বতের ফেরেশতা আমাকে সালাম জানিয়ে বললেন, হে মুহাম্মদ! কথা একটাই, আপনি যদি চান এদেরকে আমি দুই পাহাড় একত্রিত করে পিষে মারি, তাহলে তা-ই হবে।

এ স্থলে সহিহ বুখারিতে 'আখশাবাইন' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা হচ্ছে মক্কার দুটি প্রসিদ্ধ পাহাড়কে আবু কুরাইশ বা কাযাইকায়ান। এ পাহাড় দুটি যথাক্রমে কা'বার দক্ষিণ ও উত্তর পাশে মুখোমুখি অবস্থিত। সে সময় মক্কার সাধারণ আবাসিক এলাকা ঐ দুই পাহাড়ের মধ্যেই অবস্থিত ছিলো।

তখন আমি বললাম, না, বরং আমার আশা মহান আল্লাহ এদের পৃষ্ঠদেশ হতে এমন বংশধর সৃষ্টি করবেন যারা একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে এবং অন্য কাউকেও তাঁর অংশীদার ভাববে না।

রাসূল (ﷺ) এর উক্ত উত্তরে তাঁর অসাধারণ মানবিক গুণাবলি, মানবপ্রেমের সমুজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব এবং ক্ষমাশীল অনুপম চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। সাত আসমানের ওপর হতে আগত এই গায়েবি মদদের প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফেরেশতাগণ যখন তাঁর খেদমতে উপস্থিত হন তখন তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র যেন আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে। নিজের দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়ে তিনি স্বস্তির চিত্তে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে থাকেন। এভাবে তাঁর মনের আকাশ থেকে চিন্তা-ভাবনার মেঘ দূরীভূত হয়ে যায়।

অতঃপর তিনি মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পথে 'ওয়াদীয়ে নাখলায়' অবস্থান করেন।

এখানে দুটো জায়গা বসবাসের উপযোগী ছিলো। তার মধ্যে একটি হচ্ছে "আসসাইলুল কবীর এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে 'যায়মা। কেননা সেখানে পানি ছিলো কিছুটা সহজলভ্য এবং জায়গা দুটো ছিলো শস্য-শ্যামল। কিন্তু তিনি এই দুটো জায়গার মধ্যে কোথায় অবস্থান করেছিলেন সে ব্যাপারে কোনো সূত্র থেকেই জানা যায় নি।

ওয়ার্দীয়ে নাখলায়, তিনি যখন কয়েকদিনের জন্য অবস্থান করেছিলেন সে সময় আল্লাহ তাঁর নিকট জীনদের একটি দলকে প্রেরণ করেন-যার উল্লেখ কুরআন মাজীদের দুটো জায়গায় এসেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সূরা আল-আহকাফ এবং অন্যটি সূরা জ্বীন। সূরা আহকাফের আয়াতগুলো হচ্ছে-

আর স্মরণ কর, যখন আমি জিনদের একটি দলকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তখন তারা বলল, ‘চুপ করে শোন। তারপর যখন পাঠ শেষ হল তখন তারা তাদের কওমের কাছে সতর্ককারী হিসেবে ফিরে গেল। তারা বলল, ‘হে আমাদের কওম, আমরা তো এক কিতাবের বাণী শুনেছি, যা মূসার পরে নাযিল করা হয়েছে। যা পূর্ববর্তী কিতাবকে সত্যায়ন করে আর সত্য ও সরল পথের প্রতি হিদায়াত করে’। ‘হে আমাদের কওম, আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার প্রতি ঈমান আন, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবেন’। (আল-আহকাফ: আয়াত ২৯-৩১)

বল, ‘আমার প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, নিশ্চয় জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শুনেছে। অতঃপর বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সত্যের দিকে হিদায়াত করে; অতঃপর আমরা তাতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করব না’। (সূরা জ্বিন; আয়াত ১-২)

উক্ত ঘটনা প্রসঙ্গে নাযিলকৃত এই আয়াতসমূহের প্রাসঙ্গিক আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে রাসূল জ্বীনদের আগমনের কথা জানতেন না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উক্ত আয়াতের মাধ্যমে তাঁকে জ্বীনদের আগমনের কথা অবহিত করেন এবং তখন তিনি তা জানতে পারেন। এ থেকে এটাও বুঝা যায় যে, রাসূল (ﷺ) এর নিকট এটাই ছিলো জিনদের প্রথম আগমন। বিভিন্ন হাদিসসূত্রে জানা যায়, এরপর থেকে রাসূল (ﷺ) এর দরবারে তাদের গমনাগমন চলতে থাকে।

জ্বীনদের আগমন ও ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি ছিলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর তরফ থেকে দ্বিতীয় সাহায্যমূলক ঘটনা। যে সাহায্য তিনি করেছিলেন তাঁর অদৃশ্য ভান্ডার থেকে অদৃশ্য বাহিনী দ্বারা। এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই অবগত ছিলো না। এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তাতে রাসূল (ﷺ) এর দাওয়াতের কামিয়াবীর সুসংবাদ রয়েছে। উপরন্তু এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, বিশ্বের কোনো শক্তি তার দাওয়াতের কার্যকারিতার পথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে না। অতএব ইরশাদ হয়েছে-

আর যে আল্লাহর দিকে আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেবে না সে যমীনে তাকে অপারগকারী নয়। আর আল্লাহ ছাড়া তার কোন অভিভাবক নেই। এরাই স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। (আল-আহকাফ: আয়াত ৩২)

আর আমাদের একান্ত বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহকে কোনোক্রমে পরাভূত করতে পারবো না এবং পলায়ন করেও তাঁকে ব্যর্থ করতে পারব না। (আল-জিন: আয়াত- ১২)

এই সাহায্য ও সুসংবাদের মাধ্যমে তাঁকে তার যত ধরনের চিন্তা-ভাবনা, দুঃখ-কষ্ট এবং নৈরাশ্য তায়েফবাসীদের গালি-গালাজ, পটাঘাত ও পাথর নিক্ষেপের মতো ব্যাথা-বেদনার কালো মেঘ সবকিছুই মন থেকে মুছে গেলো। তিনি সংকল্পবদ্ধ হলেন তাঁকে মক্কায় ফিরে যেতেই হবে এবং নতুনভাবে ইসলামের দাওয়াত ও নবুয়তের তাবলীগ পূর্ণোদ্যমে শুরু করতে হবে।

এটা ছিলো সেই সময়ের কথা যখন যায়েদ বিন হারিসা (রা) তাঁকে বলেছিলেন: 'মক্কাবাসী অর্থাৎ কুরাইশরা যে অবস্থায় আপনাকে মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছে সে অবস্থায় কিভাবে আপনি মক্কায় ফিরে যাবেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন- 'হে যায়েদ! তুমি যে অবস্থা দেখছো তার একটা সমাধান অবশ্যই হবে এবং আল্লাহ অবশ্যই এ থেকে পরিত্রাণের একটি পথ বের করে দিবেন। তার মনোনীত দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তিনি অবশ্যই যাহায্য করবেন এবং তাঁর রাসূলকে জয়ী করবেন।

রাসূল শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে যাত্রা করলেন এবং মক্কার নিকটবর্তী হেরা পর্বতের পাদদেশে অবস্থান করলেন। অতঃপর খুযায়মা গোত্রের একজন লোক মারফত আখনাস বিন শুরাইকের নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন যে, তিনি যেন রাসূলূল্লাহ কে আশ্রয় প্রদান করেন।

কিন্তু আখনাস এই বলে আপত্তি করলেন যে, কুরাইশরা হচ্ছে তার মিত্র। সুতরাং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুহাম্মাদ (ﷺ) কে আশ্রয় দান করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

এরপর তিনি সুহায়েল বিন আমার এর নিকট একই অনুরোধবার্তা প্রেরণ করলেন। কিন্তু সে-ও এই বলে আপত্তি জানালো যে, বনু আমেরের কাউকে আশ্রয় দেয়া বনু কা'বের জন্য সঙ্গত হয় না।

অতঃপর তিনি মুতয়িম বিন আদীর নিকট অনুরোধ বার্তা প্রেরণ করেন। মুতয়িম এতে সম্মত হয়ে নিজ সন্তানাদি এবং সম্প্রদায়ের লোকজনদের অস্ত্রসজ্জে সজ্জিত হয়ে কা'বার সন্নিকটে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন এবং বললেন: যেহেতু আমি মুহাম্মদ (ﷺ) কে আশ্রয় প্রদানে সম্মত হয়েছি সেহেতু যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য অবশ্যই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

উক্ত প্রস্তুতি গ্রহণের পর মুতয়িম রাসূল (ﷺ) এর নিকট খবর পাঠালেন মক্কায় আগমনের জন্য। তিনি খবর পেয়ে যায়েদ বিন হারিসাকে সাথে নিয়ে মক্কায় আগমন করে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন- 'হে কুরাইশগণ! আমি মুহাম্মদ (ﷺ) কে আশ্রয় প্রদান করেছি, তাঁকে আর কেউ যেন হয়রানি না করে।'

এদিকে রাসূল সোজা হাজরে আসওয়াদের নিকট গিয়ে তা চুম্বন করেন। তারপর দুই রাকাত সালাত আদায় করেন এবং অস্ত্রসজ্জিত মুতয়িম বিন আদী ও তার লোকজন দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।

কথিত আছে, এ সময় আবু জাহেল মুতয়িম কে জিজ্ঞাসা করেছিল- 'তুমি মুহাম্মদ কে আশ্রয় দিয়েছো, না মুসলমানদের অনুসারী হয়ে গিয়েছো? উত্তরে মুতয়িম বলেছিলেন- 'আমি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছি।'

এর উত্তরে আবু জাহেল বলেছিলো- 'তুমি যাকে আশ্রয় দিয়েছো, আমিও তাকে আশ্রয় দিলাম।

বিভিন্ন ব্যক্তি এবং গোত্রের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রদান

নবুয়তের দশম বর্ষের যিলক্বদ মাসে (ইসায়ী ৬১৯ সালের জুনের শেষ কিংবা জুলাইয়ের প্রথম ভাগে) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে আসেন এবং পুনরায় নতুনভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিদের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন। যেহেতু তখন সময়টা ছিলো হজ্জ মৌসুমের কাছাকাছি সেহেতু নিকটবর্তী এবং দূরবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজনেরা পায়ে হেঁটে ও যানবাহনে চড়ে হজ্জ পালনের জন্য মক্কা নগরীতে আসতে শুরু করেছিলেন। রাসূল শহর এই সময়টাকে দাওয়াত দানের জন্য বেশ উপযুক্ত মনে করে এক এক গোত্রের নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন যা তিনি নবুয়তের ৪র্থ বছর থেকে করে আসছিলেন।

যে সকল গোত্রের নিকট ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো

ইমাম যুহরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, রাসূল যে যে গোত্রের নিকট গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন তাদের মধ্যে নিম্নের গোত্রগুলোর কথা আমাকে বলা হয়েছে। গোত্রগুলো হচ্ছে যথাক্রমে-

বনু আমের বিন সা' সায়াহ, মহারের বিন খাসফাহ, ফাযারাহ, গাসসান, মুররাহ, হানিফাহ, সালীম, আবস, বনু নাসর, মহারের বিন খাসফাহ, ফাযারাহ, গাসসান, মুররাহ, হানিফাহ, সালীম, আবস, বন্ধু নাসর, বানুল বকরা, কালব, হারিস বিন কা'ব, আযরাহ ও হাযারিমা। কিন্তু এদের কেউই ইসলাম গ্রহণ করেনি।

প্রকাশ থাকে যে, ইমাম যুহরী যেসব গোত্রের কথা উল্লেখ করেছেন তাদের সকলের নিকট একই বছর খুতবা একই হজ্জের মৌসুমে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়নি বরং নবুয়তের ৪র্থ বছর থেকে আরম্ভ করে হিজরত করার পূর্বে শেষ হজ্জ মৌসুম পর্যন্ত দশ বছর সময়ের মধ্যে এ দাওয়াত পেশ করেছিলেন।

ইবনে ইসহাক কোনো কোনো গোত্রের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করা এবং তাদের উত্তরের অবস্থা, ধরন ইত্যদি সম্পর্কে যে বর্ণনা প্রদান করেছেন নিম্নে তার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো-

বনু কালব: রাসূল বনু কালব এর একটি শাখা আব্দুল্লাহর নিকটে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে নিজেকে তাদের সম্মুখে পেশ করেন। আলাপ আলোচনাকালে তিনি তাদের বলেন- হে বন্ধু আব্দুল্লাহ, আল্লাহ তোমাদের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট অনুগ্রহ করেছেন এবং মযার্দা দিয়েছেন। তোমাদের উচিত আল্লাহর এই অহ্বানে সাড়া দেয়া। কিন্তু এই গোত্র রাসূল (ﷺ) এর দাওয়াত গ্রহণ করেনি।

বনু হানীফা: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের তাঁবুতে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহর আহ্বান জানিয়ে নিজেকে তাদের সামনে পেশ করেন। কিন্তু তারা এমন অশ্লীল ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করে- যা আরবে অন্য কেউই করে নি।

আমের বিন সা'সাআহ: রাসূল - এ গোত্রের লোকজনদেরও আল্লাহর পথে আহ্বান জানিয়ে নিজেকে তাদের সামনে পেশ করেন। উত্তরে উক্ত গোত্রের 'বুহায়রাহ বিন ফাসার' নামক এক লোক বললো- 'আল্লাহর কসম! আমি যদি কুরাইশদের এই যুবককে গ্রহণ করি তবে তার দ্বারা সমগ্র আরবকে খেয়ে ফেলবো।'

রাসূল কে আবার জিজ্ঞাসা করলো; আচ্ছা বলুন তো, যদি আমরা আপনার নিকট আপনার এই দ্বীনের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করি এবং আল্লাহ আপনাকে বিরোধীদের ওপর বিজয়ী করেন তবে আপনার পরে নেতৃত্বের দায়িত্ব কি আমাদের ওপর অর্পিত হবে?

উত্তরে রাসূল বললেন: 'নেতৃত্বের চাবি-কাঠি তো আল্লাহর হাতে। যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি নেতৃত্ব দান করেন।'

লোকটি বললো: ভালো কথা, আপনার রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের বক্ষ আপনার প্রতিপক্ষ আরবদের তীর-বল্লমের নিশানায় থাকবে। কিন্তু আল্লাহ যখন আপনাকে বিজয়ী করবেন তখন কর্তৃত্বের চাবি-কাঠি অন্য কারো হাতে থাকবে- এটা কখনোই হতে পারে না। সুতরাং আপনার দ্বীনের আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।

মোটকথা, তারা রাসূল (ﷺ) এর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করলো।

এরপর যখন বনু আমের গোত্রের লোকেরা নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে এক বৃদ্ধকে- যিনি বার্ধক্যের কারণে হজ্জে যেতে সক্ষম হননি-সমস্ত ঘটনা শোনালো এবং বললো: 'আমাদের নিকট কুরাইশ খানদানের বনু আব্দুল মুত্তালিবের এক যুবক এসেছিলো। তার ধারণা যে, সে আল্লাহর নবী। সে দাওয়াত দিলো যে, আমরা ইসলাম গ্রহণ করে যেন তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং আমাদের অঞ্চলে তাকে নিয়ে আসি।

এসব কথা শুনে বৃদ্ধ লোকটি দু'হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো এবং বললো: 'হে বন্ধু আমের! এখন কি এই ভুল সংশোধনের কোনো পথ আছে? আর যা হস্তচ্যুত হয়ে গিয়েছে তা কি ফিরিয়ে আনা যেতে পারে? সেই সত্তার শপথ যার হাতে ওমুকের প্রাণ আছে! ইসমাঈলের গোত্রের কারো পক্ষে নবুয়তের মিথ্যা দাবি করা সম্ভব নয়। তিনি অবশ্যই সত্য নবী। তোমাদের বুদ্ধি- শুদ্ধি কি লোপ পেয়েছিলো?

ঈমানের শিখা প্রজ্জ্বলিত হলো মক্কার বাইরে

যেভাবে রাসূল (ﷺ) গোত্র ও দলসমুহকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন তেমনিভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকেও ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। এর মধ্যে কোনো ব্যক্তির নিকট থেক অনুকূল সাড়া পাওয়া যায়। উপরন্তু হজ্জের এ মৌসুমের কিছুদিন পর কয়েক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। নিচে তাঁদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

১. সুয়াইদ বিন সামিত: তিনি একজন কবি, গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং মদিনার অধিবাসী ছিলেন। তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিও পরিপক্বতা, অভিজ্ঞতা, কাব্যচর্চা, সামাজিক মর্যাদা এবং বংশমর্যাদার কারণে জাতি তাঁকে 'কামিল' উপাধিতে ভূষিত করে। হজ্জ এবং উমরাহ করার উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় আগমন করে। রাসূল কে বললো, 'আমার নিকট যে জিনিস রয়েছে সম্ভবতঃ আপনার নিকটও সে জিনিস রয়েছে।

উত্তরে রাসূল বললেন: 'আপনার নিকট কি কি জিনিস রয়েছে?
সুয়াইদ বললেন: 'হিকমতে লোকমান।'
রাসূল বললেন-'তা নিয়ে আসো।'
তিনি তা নিয়ে এলেন।
রাসূল বললেন: 'অবশ্যই এ কথা ভালো। কিন্তু আমার কাছে যা আছে তা এর থেকেও উত্তম এবং তা হচ্ছে আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন যা আল্লাহ আমার ওপর নাযিল করেছেন। তা হেদায়েত ও জ্যোতি।

এরপর রাসূল তাঁকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন এবং পুনরায় ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং বললেন: 'এ তো খুব ভালো কথা।'

অতঃপর কবি সুয়াইদ মদিনায় ফিরে আসার পরপরই খাযরায ও আউস গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং সে যুদ্ধে তিনি নিহত হন।

২. ইয়াস বিন মু'আয: তিনিও মদিনার অধিবাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন নব্য যুবক। নবুয়তের একাদশবর্ষে বুআসের যুদ্ধের কিছু পূর্বে আউস গোত্রের একটি দল খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে কুরাইশদের মিত্রতা ও সহায়তা লাভের প্রত্যাশায় মক্কায় আগমন করে। ইয়াস বিন মু'আযও সেই দলের সাথে এসেছিলেন। সে সময় ইয়াসরীবে আউস ও খাযরাজ এই উভয় গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। যুদ্ধে আউসদের তুলনায় খাযরাজের সংখ্যাধিক্য ছিলো।

আউসদের মক্কায় আগমনের কথা জানতে পেরে রাসূল তাদের নিকট গেলেন এবং যুদ্ধের বিভীষিকা ও ক্ষয়ক্ষতির কথা চিন্তা করে তাদেরকে তিনি বললেন: 'তোমরা যে উদ্দেশ্যে আগমন করেছো তার চেয়েও কি উত্তম বস্তু গ্রহণ করবে?

তারা বললো: 'সেটা কি জিনিস?'

উত্তরে তিনি বললেন: 'আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে নিজ বান্দাদের নিকট এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যে, আমি যেন তাদের এ কথার দাওয়াত দিই- তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকেও শরীক করবে না। আল্লাহ আমার ওপর কিতাবও নাযিল করেছেন।'

ইসলাম সম্পর্কে তিনি আরও কিছু আলাপ-আলোচনা করলেন এবং কুরআন মাজীদের কিছু অংশ পাঠ করে শোনালেন।

ইয়াস বিন মু'আয বললেন: হে আমার গোত্রীয় ভাইয়েরা, আল্লাহর শপথ! তোমরা যে উদ্দেশ্যে আগমন করেছো এ হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।

কিন্তু দলের একজন সদস্য 'আবুল হায়সার আনাস বিন রাফে' এক মুষ্টি কঙ্কর উঠিয়ে ইয়াসের মুখে নিক্ষেপ করলো এবং বললো: এ কথা ছাড়ো। আমার বয়সের শপথ! আমরা এ স্থলে অন্য উদ্দেশ্যে আগমন করেছি।

এ কথা শোনার পর ইয়াস নীরবতা অবলম্বন করলো। রাসূল ও সেখান থেকে উঠে চলে গেলেন।

দলটি কুরাইশদের সাথে মিত্রতা ও সহায়তা চুক্তি সম্পাদন করতে সক্ষম হয়নি। অতঃপর একরাশ নৈরাশ্য নিয়ে তারা মদিনায় ফেরত যায়।

মদিনায় ফেরত যাওয়ার কয়েকদিন পরেই ইয়াস মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু), তাকবীর (আল্লাহু আকবর), হামদ ও তাসবীহ জপতে ছিলেন। এ কারণে অনেকের দৃঢ়বিশ্বাস যে, তাঁর মৃত্যু ইমানের ওপর হয়েছিলো।

৩. আবু যর গিফারী (রা): তিনি ইয়াসরিবে বসবাস করতেন। যখন সুয়াইদ বিন সামিত ও ইয়াস বিন মু'আয মারুফ রাসূল (ﷺ) এর আবির্ভাবের কথা জানতে পারলেন তখন তাদের হৃদয়ে প্রচণ্ড একটি কম্পনের মতো অবস্থা আনুভব করলেন এবং সেটাই তাদের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। তাদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা) এর বর্ণনা মতে, আবু যর গিফারী (রা) বলেছেন:

আমি ছিলাম, গিফার গোত্রের একজন লোক। আমি জানতে পারলাম যে, মক্কায় এমন একজন লোকের আবির্ভাব হয়েছে-যিনি নিজেকে 'নবী বলে দাবি করছেন। আমি আমার ভাইকে বললাম, তুমি লোকটির নিকট গিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলো এবং খবর নিয়ে আসো।

সে সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলার পর ফিরে এলো।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কি খবর এনেছো?
সে বললো, আল্লাহর শপথ! আমি এমন মানুষ দেখেছি-যিনি ভালোর জন্য আদেশ এবং মন্দের জন্য নিষেধ করেছেন।
আমি বললাম, তুমি সন্তোষজনক উত্তর দিলে না।

শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই কাঁধে খাদ্যের ঝুলি এবং হাতে লাঠি নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করলাম। সেখানে পৌঁছে তো গেলাম, কিন্তু রাসূল কে চিনতাম না এবং তার সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেস করবো তাও সাহস পাচ্ছিলাম না। ফলে আমি পানি পান করতাম এবং মসজিদে হারামে পড়ে থাকতাম।

শেষ পর্যন্ত আমার নিকট দিয়ে আলী (রা) কোথাও যাচ্ছিলেন।
তিনি আমাকে দেখে বললেন, আপনাকে বিদেশী মনে হচ্ছে!
আমি বললাম, জ্বি হ্যাঁ।
তিনি বললেন, জ্বি হ্যাঁ।
আমি তার সাথে চললাম।
পথ চলতে চলতে তাঁর সাথে নেহাতই মামুলী গোছের কিছু কথাবার্তা হলো।

তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। যে উদ্দেশ্যে আমার আগমন সে সম্পর্কে আমিও তাঁকে তেমন কিছু বললাম না। এভাবে রাত অতিবাহিত হলো।

সকাল হতে না হতেই আমি এই উদ্দেশ্যে মসজিদুল হারামে গেলাম যে, সেখানে কোনো লোককে পেলে তার নিকট রাসূল সম্পর্কে জানতে চাইবো। কিন্তু সেখানে এমন কেউ ছিলো না, যে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলবে। শেষ পর্যন্ত দেখলাম আবারও আলী (রা) সেখান দিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। আমাকে দেখে তিনি কতকথা যেন নিজে নিজেই বললেন, এই লোক তো দেখছি এখনো তার ঠিকানা খুঁজে পায়নি!

আমি বললাম, আপনি ঠিক-ই বলেছেন।
তিনি বললেন, ভালো, আপনি আমার সাথে চলুন।
এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, আচ্ছা বলুন তো আপনার ব্যাপারটা কী? কি উদ্দেশ্যে আপনি এ শহরে এসেছেন!
আমি বললাম, আমার আগমনের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে আমি যা বলবো আপনি যদি তা গোপন রাখেন, তাহলে আপনাকে আমি বলতে পারি।
তিনি বললেন, ঠিক আছে, আমি তাই করবো।

উক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে আমি বললাম, আমি জানতে পেরেছি যে, এখানে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে, যিনি নিজেকে 'আল্লাহর নবী' বলে দাবি করছেন। আমি আমার ভাইকে পাঠিয়েছিলাম এই ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলার জন্য। কিন্তু সে ফিরে গিয়ে আমাকে সন্তোষজনক কোনো কিছুই জানাতে পারেনি। সেহেতু আমি ভাবলাম যে, নিজে গিয়েই সাক্ষাৎ করে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলে আসি।

আলী (রা) বললেন, ভাই! আপনি সঠিক জায়গাতেই পৌঁছেছেন। শুনুন, আমার যাত্রা তাঁর দিকেই। আমি যেখানে প্রবেশ করবো আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন। আর যদি এমন কোনো লোক দেখি, যে আপনার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, তাহলে আমি তখন কোনো প্রাচীরের গায়ে লাগিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যাবো- যা দেখে মনে হবে যেন আমি আমার জুতো ঠিক করছি। আপনি কিন্তু তখন হাঁটতেই থাকবেন।

এরপর আলী (রা) যাত্রা শুরু করলেন। আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম।

তিনি রাসূল (ﷺ) এর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। আমি তাঁর সাথে সেখানে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম- ইয়া রাসূল! আমার নিকট ইসলাম পেশ করুন।

হৃদয়স্পর্শী ভাব ও ভাষার মাধ্যমে তিনি আমার নিকট ইসলামের মূল বক্তব্য পেশ করলেন। বিষয় ও বক্তব্যে অভিভূত হয়ে আমি তখনই ইসলাম গ্রহণ করলাম।

অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: হে আবু যর! এই ব্যাপারটি গোপন রাখো এবং নিজ এলাকায় চলে যাও। আমার বিজয়ের সংবাদ অবগত হলে তখন আমার নিকট চলে আসবে।

আমি বললাম: 'সেই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যের বাণীবাহক হিসেবে প্রেরণ করেছেন! আমি তাদের মধ্যে উচ্চকণ্ঠে এই সত্যের বাণী প্রচার করবো।

এরপর আমি মসজিদুল হারামে গেলাম। কুরাইশ গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক সেখানে উপস্থিত ছিলো। আমি তাদের লক্ষ করে বললাম-

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

আমার মুখ থেকে তাওহীদের বাণী শুনামাত্র কুরাইশ কাফির-মুশরিকরা এমনভাবে আমাকে মারপিট শুরু করলো যেন আমি মরে যাই। এমনি এক বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত অবস্থা থেকে তিনি সেখানে এসে জনতার ভিড়ের মধ্যেখানে উকি দিয়ে আমাকে দেখতে পেলেন এবং কুরাইশদের লক্ষ করে বললেন: তোমরা ধ্বংস হও। তোমরা গিফার গোত্রের একজন লোককে মারপিট করছো অথচ তোমাদের সফর ও ব্যবসার জন্য যাতায়াতের পথই হচ্ছে গিফার গোত্রের মধ্য দিয়ে।

একথা শোনার পর তাদের টনক নড়লো এবং তারা আমাকে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে সরে পড়লো। দ্বিতীয় দিন সকাল হলে আমি আবারও সেখানে গেলাম এবং আগের দিন যা বলেছিলাম সেদিনও তা বললাম। অর্থাৎ, উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করলাম তাওহীদের বাণী-আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু।

আমার উচ্চারিত কালিমা শাহাদত শ্রবণের পর আগের মতোই তারা আমাকে মারপিট শুরু করলো। সেদিনও আব্বাস (রা) কুরাইশদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করলেন। তিনি আমার প্রতি ঝুঁকে পড়ে কুরাইশদের লক্ষ করে আবারো সেই কথাগুলো বললেন: যা বলেছিলেন আগের দিন।

৪. তোফাইল বিন আমর দাওসী (রা): তিনি দাওস গোত্রের নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন কবি এবং একজন সম্মানিত ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তাঁর গোত্রের কোনো কোনো সদস্য ইয়ামানের কোনো কোনো অঞ্চলে রাজত্ব করতো। তিনি নবুয়তের একাদশবর্ষে মক্কায় আগমন করেন।

সেখানে আসার পর মক্কাবাসী কাফিরগণ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং সম্মান প্রদর্শন করে। শহরে আপনার আগমনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু একটি লোকের কারণে আমাদের সব আনন্দ নিরানন্দে পর্যবসিত হচ্ছে। সে নানা ধরনের নতুন নতুন কথাবার্তা বলে আমাদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে, আমাদের একতা বিনষ্ট করেছে এবং শৃংখলা ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। তার কথাবার্তা অনেকের ওপর যাদুমন্ত্রের মতো প্রভাব বিস্তার করছে। সে পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও ভাঙন দিয়ে দিচ্ছে। আমাদের ভয় হচ্ছে আমরা যে বিপদে পড়েছি আপনি এবং আপনার সম্প্রদায় যেন অনুরূপ বিপদে না পড়েন। অতএব আপনি অবশ্যই তার সাথে কোনো কথাবার্তা বলবেন না কিংবা তার কোনো কথাও শুনবেন না।

তোফায়েল যেভাবে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন তা হচ্ছে নিম্নরূপ:

তারা আমাকে বার বার বোঝাতে লাগলো এবং উক্ত প্রেক্ষিতে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, আমি তাঁর কোনো কথা শোনবো না। তাঁর সাথে কোনোরূপ কথাবার্তা বলবো না। এমনকি আমি যখন মসজিদে হারামে গেলাম তখন কানের মধ্যে খানিকটা করে তুলো ঢুকিয়ে নিলাম- যাতে তাঁর কোনো কথা আমাদের কর্ণগোচর না হয়।

কিন্তু যথাসম্ভব আল্লাহর ইচ্ছা হয়তো তা ছিলো না। হয়তো এটাই আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো যে, তাঁর কথা আমাকে শুনতে হবে। ফলে খুব ভালোভাবেই আমি তাঁর কথাবার্তা শুনতে পেলাম।

অতঃপর আমি মনে করলাম, হায়! আমার সর্বনাশ হোক! আমি তো আল্লাহর কৃপায় একজন বুদ্ধিমান মানুষ এবং কবি। আমার একটি ভালো-মন্দ গোপন থাকবে না, তবে কেনো আমি সে ব্যক্তির কথা শুনবো না? যদি তাঁর কথাবার্তা ভালো হয় তা গ্রহণ করে নিবো, যদি মন্দ হয় প্রত্যাখান করবো। এসব বিষয় চিন্তা-ভাবনা করে আমি নেমে গেলাম এবং যখন তিনি বাড়ি ফেরার জন্য পথ ধরলেন তখন আমিও তাঁর পিছন পিছন চললাম।

পথ চলতে চলতে একসময় তিনি গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তাঁকে অনুসরণ করে আমিও প্রবেশ করলাম এবং আমার আগমনের উদ্দেশ্যে, কুরাইশদের আমাকে ভয় দেখানো, তাঁর মনের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে তাঁর নিকট বর্ণনা করলাম। অতঃপর বললাম: 'আপনার বক্তব্য এখন পেশ করুন।'

তিনি আমার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন এবং আল-কুরআন থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনালেন।

আল্লাহ সাক্ষী আছেন, এর চেয়ে উত্তম কথা এবং ইনসাফের বাণী ইতোপূর্বে আমি আর কখনো শুনতে পাইনি। আল কুরআনের বাণী এবং তাঁর বক্তব্যের স্নিগ্ধতায় মুগ্ধ হয়ে আমি তখন ইসলাম গ্রহণ করলাম এবং কালেমা শাহাদত উচ্চারণ করে সত্যের সাক্ষ প্রদান করলাম। অতঃপর এই বলে তার নিকট নিবেদন করলাম- 'আমার সম্প্রদায় আমার কথা মান্য করে। আমি তাদের নিকট ফিরে গিয়ে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করবো। অতএব আপনি আল্লাহর দরবারে দু'আ করুন যেন তিনি অনুগ্রহ করে আমাকে কোনো নিদর্শন প্রদান করেন।

আমার কথা শোনার পর রাসূল আল্লহর দরবারে দু'আ করলেন। রাসূল (ﷺ) এর দোয়ার বরকতে তোফায়েল (রা) কে যে নিদর্শন দেয়া হয়েছিলো তা ছিলো নিম্নরূপ:

তোফায়েল (রা) যখন তার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হলেন তখন তার মুখমণ্ডল ছিলো প্রদীপের আলোর মতো আলোকোজ্জ্বল। কিন্তু তাঁর মানসিক কিংবা আলাদা কোনো অসুবিধার কারণে তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন- 'হে আল্লাহ! মুখন্ডলের পরিবর্তে অন্য কোনো স্থানে এই নিদর্শন প্রকাশিত হোক। আমার ভয় হয় মানুষ আমাকে বিকৃত বলবে।

তোফায়েল (রা) এর প্রার্থনার ফলে উক্ত জ্যোতি তাঁর লাঠিতে স্থানান্তরিত হয়েছিলো।

এরপর তিনি তাঁর পিতা এবং স্ত্রীকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন এবং উভয়েই তা গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যান। কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের অন্যান্য লোকেরা ইসলাম গ্রহণে যথেষ্ট বিলম্ব করে। অবশ্য এই ব্যাপারে তিনি অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর ফলে দেখা যায় যে, খন্দকের যুদ্ধের পর তিনি যখন নিজ জন্মভূমি পরিত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করেন তখন তাঁর সাথে তাঁর সম্প্রদায়ের ৭০ থেকে ৮০ টি গোত্রের লোক ছিলো।

তোফায়েল (রা) ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি সমাধা করে ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন।

৫. যিমান আযদী (রা): 'তিনি ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী এবং আযদে শানওয়াহ গোত্রের এক ব্যক্তি। তার কাজ ছিলো মানুষের রোগ-ব্যাধি সারানোর জন্য ঝাড়-ফুঁক করা এবং জিন-ভূতে ধরা মানুষের জ্বীন-ভূত ছাড়ানো।'

মক্কায় আগমনের পর ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে যিমান আযদী অবগত হলেন যে, মুহাম্মদ (ﷺ) একজন পাগল। কুরাইশরাও জানতে পারলো যে, যিমান আযদী জ্বীন-ভূত তাড়ানো একজন ওঝা।

কুরাইশরা যিমান আযদীকে মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলো। কিন্তু তিনি এই চিন্তা-ভাবনা করে তার নিকট যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আল্লাহ যদি চান তাহলে তিনি তার হাতে সুস্থ হতেও পারেন। যেহেতু তিনি রাসূল (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন: 'আমি জ্বীন-ভুত তাড়ানোর জন্য ঝাড়-ফুঁক করে থাকি। আপনার কি তেমন কোনো প্রয়োজন আছে?' উত্তরে তিনি বললেন-

নিশ্চয় সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করছি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। যাকে আল্লাহ সৎপথ দেখান তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে তিনি বিপথে চালিত করেন তাকে কেউই সৎপথে পরিচালিত করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং বান্দা।

অতঃপর যিমান বললেন: 'আপনার কথাগুলো পুনরায় বলুন, আমি শুনি।'

রাসূল পুনরায় একাধিক্রমে তিনবার অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় তার বক্তব্য পেশ করলেন। সব শুনে যিমান বললেন: "আমি জ্যোতিষ, যাদুকর এবং কবিদের কথাবার্তা শুনেছি, কিন্তু আপনার কথার মতো চিত্তোদীপক ও হৃদয়স্পর্শী কথাবার্তা কখনোই শুনি নি। গভীরতম সমুদ্রের তলদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহাপ্রবাহের মতো এ কথাগুলো আমার অন্তরকে ভাব ও আবেগে আন্দোলিত এবং উচ্ছাসিত করে তুলেছে।

অতঃপর তিনি রাসূল (ﷺ) এর দিকে অত্যন্ত ভক্তিভরে হাত বাড়িয়ে কম্পিত কণ্ঠে বললেন:

ইয়া রাসূল! আপনি এই হাত গ্রহণ করে ইসলামের প্রতি আমার আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করুন। যিমান আযদী (রা) এভাবে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।

ইয়াসরিবের ছয়টি পুণ্যবান মানবআত্মা

নবুয়তের একাদশ বর্ষে (জুলাই ৬২০ ইসায়ি সালে) হজ্জের মৌসুম ফিরে এলো। রাসূল (ﷺ) এর হস্তগত হলো ইসলামি দাওয়াতের কয়েকটি কার্যকরী বীজ- যা দেখতে দেখতে বিরাট বৃক্ষে পরিণত হলো। এর ঘন শাখা-প্রশাখা ও পত্রপল্লবের সুশীতল ছায়ার বসে মুসলমানেরা অনেক বছরের অন্যায়-অত্যাচার ও উৎপীড়নের উত্তাপ থেকে কিছুটা আরাম ও শান্তি পেলেন।

মক্কাবাসী মুশরিকরা রাসূল কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা এবং লোকজনকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে রাখার জন্য প্রতিবন্ধকতার যে দেয়াল সৃষ্টি করে রেখেছিলো তা এড়িয়ে চলার জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর কর্মকৌশল পরিবর্তন করে নিলেন। মুশরিকরা যাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে সে উদ্দেশ্যে দিনের বেলার পরিবর্তে তিনি রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন গোত্রের নিকট যাতায়াতের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে লাগলেন।

উক্ত কর্মকৌশল বা পদ্ধতির অনুসরণে একরাতে রাসূল আবু বকর ও আলী (রা) কে সাথে নিয়ে বের হলেন। বনু যোহাল ও বনু শায়বান বিন সা'লাবাদের বাসস্থানের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় ইসলাম সম্পর্কে তাদের সাথে কিছু কথাবার্তা বললেন। আলাপ-আলোচনার সময় তাদের সাড়া খুব অনুকূল বলে মনে হলেও ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্তমূলক কোনো কিছুই তাদের কাছ থেকে পাওয়া গেলো না। এ সময় আবু বকর (রা) ও বনু যোহালের এক ব্যক্তির সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কে খুব হৃদ্যতাপূর্ণ কথাবার্তা হলো। উভয়েই বংশধারা সম্পর্কে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন।

এরপর রাসূল সঙ্গীদের নিয়ে মীনার চৌকি দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। এমন সময় অদূরে কিছুসংখ্যক লোকের আলাপচারিতা তার শ্রুতিগোচর হলো।

সেহেতু তাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তিনি সেদিকে অগ্রসর হতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। এ দলে ছিলো ইয়াসরীবের খাযরাজ গোত্রের ছয়জন যুবক। তাদের নাম হলো যথাক্রমে-

১. আসয়াদ বিন যুরারাহ। (বনু নাজ্জার গোত্রের)
২. আউফ বিন হারিস বিন রিফাআহ (ইবনে আফরা)। (বনু নাজ্জার গোত্রের)
৩. রাফে বিন মালিক বিন আজলান। (বনু যুরাইক্ব গোত্রের)
৪. কুতবা বিন আমের বিন হাদীদাহ। (বনু সালামাহ গোত্রের)
৫. উকবা বিন আমির বিন নাবী। (বনু হারাম বিন কা'ব গোত্রের)
৬. হাবির বিন আব্দুল্লাহ বিন রিআব। (বনু উবাইদ বিন গান্‌ম গোত্রের)

তাঁদের গোত্রের নাম ছিলো যথাক্রমে বনু নাজ্জার, বনু যুরাইক, বনু সালমা, হারাম বিন কা'ব ও বনু উবাইদ গানাম। এটা ইয়াসরাববাসীদের সৌভাগ্য যে, তারা তাদের মিত্র ইহুদীদের নিকট থেকে অবগত হয়েছিলো যে, এযুগে একজন নবী প্রেরিত হবেন এবং শীঘ্রই তা প্রকাশ পেয়ে যাবে। ইহুদীরা বলতো যে, আমরা তাঁর অনুসারী হয়ে তাঁর সাথে তোমাদেরকে ইরানের আদ জাতির মতো হত্যা করবো।

রাসূলুল্লা চলতে চলতে তাদের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা বললো- 'আমরা খাযরাজ গোত্রের সাথে সম্পর্কিত।' তিনি বললেন- 'অর্থাৎ ইহুদীদের মিত্র।' তারা বললো-জি'হ্যা।' তিনি বললেন- 'আপনারা বসুন না, কিছু কথাবার্তা হোক।

রাসূল (ﷺ) এর কথা শোনার পর তারা বসে পড়লো। তিনি তাদের সম্মুখে ইসলামের হাকীকত বর্ণনা করার পর কুরআন মাজীদ থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করে শোনালেন এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত পেশ করলেন।

রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ থেকে দাওয়াত পাওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন- 'ইনি তো সেই নবীই বলে মনে হচ্ছে যাঁর উল্লেখ করে ইহুদীরা আমাদেরকে হুমকি দিচ্ছে। সুতরাং ইহুদীরা যেন আমাদেরকে পেছনে ফেলতে না পারে।'

উক্ত কথা বলেই তারা তৎক্ষণাৎ ইসলামের দাওয়াত কবুল করে মুসলমান হয়ে গেলেন। তাঁরা ইয়াসরিবের জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। সাম্প্রতিককালে ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়ে গেলেন।

তাঁরা ইয়াসরিবের জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। সাম্প্রতিককালে ইয়াসরিবে যে যুদ্ধ হয়ে গেলো এবং যার ধোঁয়া এখনো ইয়াসরিবের আকাশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে, সে ইসলামের এই দাওয়াতই এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানোর একটা উপলক্ষ হতে পারে। এজন্য তাঁরা বললেন: 'আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে এমন এক অবস্থায় রেখে এসেছি যে, তাদের পরস্পরের মধ্যে এমন শত্রুতা ও দুশমনীর সৃষ্টি হয়েছে- যার কোনো নজির নেই। আশা করি আপনার দাওয়াতই তাদেরকে একত্রিত করে দিবে। আমরা সেখানে ফিরে গিয়ে লোকদেরকে আপনার দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাবো এবং আপনার দাওয়াতের কারণে আল্লাহ যদি তাদের একত্রিত করে দেন, তবে আপনার চেয়ে অধিক কেউই সম্মানিত হবে না।'

আয়েশা (রা) এর সাথে বিবাহ

রাসূল (ﷺ) এর সাথে আয়েশা (রা) এর বিয়ে এ বছরই অর্থাৎ নবুয়তের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে রাসূল আয়েশা (রা) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সে সময় আয়েশা (রা) এর বয়স ছিলো মাত্র ছয় বছর। শাওয়াল মাসে মদিনাতে নয় বছর বয়সে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা) স্বামীগৃহে পদার্পণ করেন। সাহাবি আবু বকর (রা) এর ইচ্ছা ছিলো আল্লাহর রাসূল - এর সাথে রক্তের সম্পর্ক গড়ে তোলা। উক্ত প্রেক্ষিতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিলো অলৌকিক অসম বিয়ের।

রাসূল (ﷺ) এর মিরাজ বা ঊর্ধ্বগমন

রাসূল (ﷺ) এর তাবলীগ ও দাওয়াতের কৃতকার্যতা এবং অন্যায় ও উৎপীড়নের মধ্যপর্যায় অতিক্রম করে চলেছে। সুদূর আকাশের প্রান্তে আশার ক্ষীণ আলো এবং ধূলিযুক্ত ঝলক দৃষ্টিগোচর হতে আরম্ভ করেছে। ঠিক এমনি সময়ে নৈশ ভ্রমণ ও ঊর্ধ্বগমনের ঘটনাটি সংঘটিত হয়।

একে আরবী ভাষায় বলা হয় 'মিরাজ'- এবং এই নামেই ঘটনাটি সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মিরাজের এ বিশ্বপরিশ্রুত অলৌকিক ঘটনটি কোন সময় সংঘটিত হয়েছিলো সে ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যে মতভেদ লক্ষ করা যায় তা নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১. রাসূল কে যে বছর নবুয়ত দান করা হয়েছিলো সেই বছরই মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো -এটা তাবারীর কথা।
২. নবুয়তের পাঁচ বছর পর মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো- ইমাম নববী এবং ইমাম কুরতুবী এই মত অধিক গ্রহণযোগ্য বলে স্থির করেছেন।
৩. নবুয়তের দশম বর্ষের ২৭ রজব তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো- আল্লামা মানসুরপুরী এই মত গ্রহণ করেছেন।
৪. ষোল মাস পূর্বে অর্থাৎ নবুয়তের দ্বাদশ বর্ষের রমযান মাসে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো।
৫. এক বছর দুই মাস পূর্বে অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের মুহাররম মাসে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো।
৬. এক বছর পূর্বে অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিলো।

এর মধ্যে প্রথম তিনটি মত এজন্য সহিহ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না যে, উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা) এর মৃত্যু হয়েছিলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হওয়ার পূর্বে। উপরন্তু এই ব্যাপারে সকলেই একমত যে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয হয়েছে মিরাজের পরে। তাছাড়া এটাও সর্বজনবিদিত ব্যাপার যে, তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিলো নবুয়তের দশম বর্ষের রমযান মাসে। এ প্রেক্ষিতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তাঁর ইন্তেকালের পরে, পূর্বে নয়।

অবশিষ্ট থাকে শেষের তিনটি মত। এই তিনটির কোনোটাকেই কোনেটির ওপর অগ্রাধিকার দেয়ার পক্ষে প্রমাণ পাওয়ার যায় না। তবে সূরা ইসরা'র বর্ণনাভঙ্গি থেকে অনুমান করা যায় যে, এই ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো রাসূল এর মক্কী জীবনের শেষ সময়ে।

হাদীসবিশারদগণ এ ঘটনায় যে বিস্তারিত রিওয়ায়েত প্রদান করেছেন পরবর্তী লাইনলোতে তার সার-সংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

ইবনে কাইয়্যম লিখেছেন, প্রাপ্ত তথ্যাদি মোতাবেক প্রকৃত ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে, রাসূল কে সশরীরে বুরাকের ওপর আরোহণ করিয়ে জিবরাঈল (আ) মসজিদে হারাম থেকে বায়তুল আকসা বা 'বায়তুল মুকাদ্দাস' পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন। বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণের পর সেখানে সমাগত নবী আলাইহিমস সালামগণের জামায়াতে ইমামতি সহকারে সালাত আদায় করেন। সালাত আদায়ের সময় বুরাককে মসজিদের দরজার কড়ার সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিলো।

সালাত আদায়ের পর পুনরায় তাঁকে বোরাকে আরোহণ করিয়ে পৃথিবীর নিকটতম আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম আসমানের দরজা খোলা হলে সেখানে মানুষের আদি পিতা আদম (আ) এর সাথে রাসূল (ﷺ) এর সাক্ষাৎ হয়। জিবরাঈল (আ) তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: 'ইনি হচ্ছেন আপনার আদি পিতা আদম (আ) তাঁকে সালাম করুন।

একথা শোনার পর রাসূল তাঁকে শ্রদ্ধাভরে সালাম জানান। আদম (আ) আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে সালামের জবাব দিয়ে বললেন 'স্বাগতম হে আমার বংশের মধ্যমণি! স্বাগতম! হে আমার বংশের গৌরব!

অতঃপর আদম (আ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নবুয়তের স্বীকারোক্তি করলেন এবং ডানদিকে আল্লাহর নেককার বান্দাদের এবং বামদিকে বদকার বান্দাদের আত্মাসমূহ তাঁকে দর্শন করালেন।

এরপর রাসূলকে দ্বিতীয় আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। দরজা খোলা হলে সেখানে ইয়াহাইয়া বিন যাকারিয়া এবং ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরিচয় পর্বের পর তিনি তাঁকে শ্রদ্ধাভাবে সালাম জানান। উভয়েই সালামের জবাব দিয়ে তাঁকে মুবারকবাদ উষ্ণ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করে নবুয়তের স্বীকাররোক্তি প্রদান করেন।

তৃতীয় পর্যায়ে রাসূল কে চতুর্থ আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি ইদরিস (আ) কে দেখেন এবং সশ্রদ্ধ সালাম জানান। ইদরিস (আ) সালামের জবাব দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে মুবারকবাদ জানান এবং তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি করেন।

অতঃপর রাসূলকে ৬ষ্ঠ আসমানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মূসা বিন ইমরান (আ) এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাসূল তাঁকে শ্রদ্ধাভরে সালাম জানিয়ে কুশালাদি বিনিময় করেন। মূসা ও সম্ভ্রমের সাথে সালামের জবাব দিয়ে রাসূল কে মুবারকবাদ জানান এবং তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি জ্ঞাপন করেন।

এরপর রাসূল যখন সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন তখন তিনি ক্রন্দন করতে থাকেন। তাঁকে ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন - আমার পূর্বে এমন এক যুবককে নবী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে- যাঁর উম্মতগণ আমার উম্মতদের তুলনায় অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন।

অগ্রযাত্রার পরবর্তী পর্যায়ে রাসূল কে নিয়ে যাওয়া হয় সপ্তম আসমানে। সপ্তম আসমানে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ হয় ইবরাহীম খলিলুল্লাহ (আ) এর সাথে। রাসূল তাঁকে শ্রদ্ধাভরে সালাম ও মুবারকবাদ জ্ঞাপন করেন। ইবরাহীম (আ) ও সম্ভ্রমের স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।

ইবরাহীম (আ) এর সাথে সাক্ষাতের পর রাসূল (ﷺ) এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে এবং তিনি গিয়ে উপস্থিত হন সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে। এখানে জিবরাঈল (আ) যাত্রাবিরতি করলেন। অগ্রযাত্রা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হলো না। সেহেতু বোরাকের পৃষ্ঠে উপবিষ্ট রাসূল একাই চলতে থাকলেন সম্মুখপানে। চলার শেষ পর্যায়ে তিনি গিয়ে উপস্থিত হলেন বায়তুল মা'মুরের নিকট। এখানে রাসূল (ﷺ) এর বাহন বোরাক তার যাত্রা স্থগিত করলো।

অতঃপর মহাগৌরব, চির আকাঙ্ক্ষিত মানব নবী, দোজাহানের মহাসম্মানিত সম্রাট, তাজদারে মদিনা, নবীকুল শিরোমণি, রাহমাতুল্লিল আলামীন, খাতামুননবিয়ীন উপনীত হলেন অনাদি অনন্ত, অসীম শক্তি-সামর্থ্য ও হিকমতের মালিক আল্লাহর সান্নিধ্যে। পর্দার একপাশে বিশ্বজগতের চির উপাস্য, অদ্বিতীয় স্রষ্টা প্রতিপালক প্রভু, অন্যপাশে তাঁর একান্ত অনুগ্রহভাজন সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (ﷺ) মধ্যখানে রয়েছে দুই ধনুকের জ্যার সমপরিমাণ ব্যবধান কিংবা তার চেয়েও কম। অনুষ্ঠিত হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির অভূতপূর্ব সাক্ষাৎকার, সম্মেলন। অনন্ত প্রতাপান্বিত স্রষ্টা প্রভু এবং মনোনীত প্রিয়তম সৃষ্টির মধ্যে হলো ঐশী বাণী বিনিময়। তোহফা স্বরূপ বরাদ্দ করা হলো পঞ্চাশ ওয়াক্ত ফরয সালাত। এরপর শুরু হলো রাসূল (ﷺ) এর মর্তলোকে প্রত্যাবর্তনের পালা। এক পর্যায়ে সাক্ষাৎ হলো মূসা (আ) এর সাথে, তিনি বললেন- 'আপনার উম্মতের পক্ষে সম্ভব হবে না পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। আপনি ফিরে গিয়ে আপনার উম্মতের ওপর আরোপিত এই গুরুদায়িত্ব হালকা করে নেয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে আবেদন করুন। একথা শোনার পর জিবরাঈল (আ) এর পরামর্শ গ্রহণের জন্য রাসূল তাঁর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। জিবরাঈল (আ) ইংগিতে বোঝালেন যে, তিনি যদি ইচ্ছা করেন তাহলে তা করতে পারেন।

এরপর জিবরাঈল (আ) রাসূল কে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর দরবারে নিয়ে গেলেন। তিনি নিজ স্থানেই ছিলেন। কোনো কোনো বর্ণনায় সহিহ বুখারিতে এই রকম কথা আছে যে, পরম করুণাময় আল্লাহ দশ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দিলেন এবং রাসূল কে নিচে আনা হলো।

রাসূল যখন মূসা (আ) এর নিকট আগমন করে দশ ওয়াক্ত সালাত কমানোর কথা বললেন তখন তিনি পুনরায় পরামর্শ দিলেন আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে এই গুরুভার আরও কমিয়ে আনার জন্য। এ ভাবে পাঁচ ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত মূসা (আ) রাসূল কে পরামর্শ দিলেন পুনরায় আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে আরও কিছুটা হালকা করে নেয়ার জন্য।

প্রত্যুত্তরে রাসূল বললেন এ ব্যাপারটি নিয়ে আল্লাহর দরবারে পুনরায় যেতে আমি খুবই লজ্জাবোধ করছি। অত্যন্ত সন্তুষ্টির সাথে আমি দিন ও রাতের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের সিদ্ধান্ত মেনে নিলাম। দু'মঞ্জিলের মধ্যে রাসূল, মূসা (আ) এবং আল্লাহর মধ্যে সালাতের বিষয়টি প্রসঙ্গে বেশ কয়েকবার আলোচনার পর পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সিদ্ধান্ত হয়েছিলো।

উক্ত কথা বলে তিনি সম্মুখের দিকে এগিয়ে চললেন। যখন তিনি বেশ কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করলেন তখন একথাগুলো তাঁর শ্রুতিগোচর হলো- 'আমি আমার বান্দাদের জন্য আপন ফরয জারী করে দিলাম এবং বান্দাদের দায়িত্বভার কিছুটা হালকা করে দিলাম।'

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আপন প্রভুকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখেছেন কি না সে ব্যাপারে ইবনে কাইয়্যুম বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত বর্ণনা করেছেন। এরপর ইবনে তাইমিয়ার এ সূক্ষ্ম বর্ণনার আলোচনা করেছেন- যার মূল বক্তব্য হচ্ছে- 'আল্লাহকে চাক্ষুস দেখার কোনো প্রমাণ নেই। কোনো সাহাবীও এরকম কোনো কথা বলেননি। আর ইবনে আব্বাস থেকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখার এবং অন্তর্দৃষ্টি সহকারে দেখার যে দুটো মত বর্ণিত হয়েছে তার মধ্যে প্রথমটি দ্বিতীয়টির বিপরীত নয়।

এরপর ইবনে কাইয়্যুম লিখেছেন, সূরা আন-নাজমে আল্লাহ যে ইরশাদ করেছেন- 'তারপর সে নিকটে আসলো এবং আরও নিকটে আসলো- এটা সেই নৈকট্য থেকে ভিন্ন যেটি মিরাজের ঘটনায় ঘটেছিলো। কেননা, সূরা নাজমে যে নৈকট্যের উল্লেখ রয়েছে তাতে জিবরাঈল (আ) এর নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে। যেমনটি আয়েশা সিদ্দীকা (রা) এবং ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন এবং বর্ণনা ভঙ্গিতেও এটাই নির্দেশিত হয়েছে। এর বিপরীত মিরাজের হাদীসে যে নৈকট্য লাভের কথা বলা হয়েছে তাতে সর্বশক্তিমান প্রভু আল্লাহর নৈকট্য লাভের কথা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে- যে কথার উল্লেখ সূরা নাজমের মধ্যে নেই; বরং তাতে বলা হয়েছে যে, রাসূল তাঁকে দ্বিতীয়বার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট এবং তিনি ছিলেন জিবরাঈল (আ)।

রাসূল দু'বার তাঁকে তাঁর আসল রূপে দেখেছিলেন। একবার পৃথিবীতে এবং অন্যবার সিদরাতুল মুনতাহার নিকট।

এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য কি সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। মিরাজের সময় পুনরায় রাসূল (ﷺ) এর বক্ষবিদারণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো এবং এই সফরকালে তাঁকে কয়েকটি জিনিসও দেখানো হয়েছিলো। তাঁর সামনে পানের জন্য 'দুধ' ও 'মদ' পেশ করা হয়েছিলো। তিনি দুধ পছন্দ করেছিলেন। এ ব্যাপারে রাসূল কে বলা হয়েছিলো যে, আপনাকে ফিতরাতের (ইসলামের) পথ দেখানো হয়েছে অথবা আপনি ফিতরাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। আপনি যদি মদ গ্রহণ করতেন তাহলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেতো।

রাসূল - জান্নাতে চারটি নদী দেখেছিলেন। এরমধ্যে দুটো প্রকাশ্য এবং দুটো গোপনে। প্রকাশ্য দুটো হচ্ছে নীল ও ফোরাত। সম্ভবত এর তাৎপর্য এই ছিলো যে, তাঁর রিসালাত নীল ও ফোরাত নদের শস্য-শ্যামল উপত্যকায় আপন ঘর নির্মাণ করবে অর্থাৎ এই সকল অঞ্চল পর্যন্ত ইসলামের বিস্তৃতি ঘটবে এবং এখানকার মানুষ বংশ পরস্পরা সূত্রে মুসলমান হবে। ব্যাপারটি এ নয় যে, এ দুই পানির উৎস জান্নাত থেকে উৎসারিত হয়েছে। অবশ্য আল্লাহই সবকিছু ভালো জানেন।

রাসূল তিনি জাহান্নামের রক্ষী মালিককে দেখেছেন। তারা হাসছিলেন না এবং তাদের মুখমণ্ডলে আনন্দ এবং প্রফুল্লতাও ছিলো না। রাসূল - জান্নাত এবং জাহান্নামও দেখেছিলেন।

রাসূল তাদেরকেও দেখেছিলেন- যারা অন্যায়ভাবে এতিমের মাল আত্মসাৎ করে চলেছে। তাদের ঠোঁটের আকার-আকৃতি উটের ঠোটের মতো। তারা পাথরের মতো আগুনের ফুলকী মুখের মধ্যে পুরছিলো এবং সেগুলো গুহ্যদ্বার দিয়ে নির্গত হয়ে আসছিলো।

রাসূল সুদখোরদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাদের পেটগুলো এতই প্রকান্ড আকারের ছিলো যে, পেটের ভার বহন করা ছিলো তাদের জন্য খুবই কষ্টের ব্যাপার এবং পেটের ভারে এদিক ওদিক নড়াচড়া তাদের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব হচ্ছিলো না। উপরন্ত ফিরাউনের বংশধরদেরকে যখন অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের জন্য পেশ করা হচ্ছিলো তখন তারা এদেরকে পদদলিত করে পথ অতিক্রম করছিলো।

এক পর্যায়ে রাসূল ব্যভিচারীদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাদের সম্মুখে টাটকা ও মোটা গোশত ছিলো এবং তার পাশে দুঃসহ দুর্গন্ধযুক্ত পচা গোশত ছিলো। এরা টাটকা ও মোটা গোশত বাদ দিয়ে পচা গোশত খাচ্ছিলো।

রাসূল সে সকল স্ত্রীলোকদেরকেও দেখেছিলেন, যারা তাদের স্বামীদের সন্তান প্রদান করেছিল, যা অন্য পুরুষদের দ্বারা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা ছিলো ব্যভিচারিণী। ব্যভিচারের কারণে তারা পরপুরুষের বীর্যে গর্ভধারণ করতো, কিন্তু স্বামীর অজান্তে সে সন্তান স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতো। রাসূল দেখলেন তাদের বক্ষস্থল বড়ো বড়ো বড়োশী দ্বারা বিদ্ধ করে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যস্থলে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মিরাজ অবস্থায় যাতায়াতের সময় রাসূল আরববাসীদের এক বণিকদলকেও দেখেছিলেন এবং তাদের এক পলাতক উট দেখেছিলেন। সেই সময় রাসূল বণিকদের পান করার জন্য সাথে থাকা পানিও পান করেছিলেন।

ঐ পানি একটি পাত্রে ঢাকা ছিলো। এ সময়ে বণিকেরা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলো। পানি পান করার পর পুনরায় তিনি পাত্রটিকে ঢেকে রেখেছিলেন। মিরাজের রাত্রশেষে সকালবেলা এই ঘটনাটি রাসূল (ﷺ) এর ঊর্ধ্বগমন বা মিরাজের দাবির সত্যতা প্রমাণার্থে দলিল হিসেবে প্রতিপন্ন হয়।

ইবনে কাইয়্যুম (রা) বলেছেন-যখন রাসূল সকাল বেলায় স্বগোত্রীয় লোকজনদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদর্শিত নিদর্শনসমূহের কথা বর্ণনা করলেন তখন তারা এ সবকিছুকে মিথ্যা এবং গাঁজাখুরী গল্প বলে উড়িয়ে দিলো এবং তাঁর প্রতি যুলুম-নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো। শুধু তাই নয়, তারা তাঁকে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকে এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।

কাফির-মুশরিকরা বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে তাঁকে নানা প্রশ্ন করতে থাকে এবং উত্তরের জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। এমনিতর অবস্থায় আল্লাহ রাসূল (ﷺ) এর দৃষ্টির সম্মুখে বায়তুল মুকাদ্দাসের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি সেই চিত্র প্রত্যক্ষ করে কাফির-মুশরিকরদের প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন। এর ফলে নির্দ্বিধায় তাদের সকল প্রশ্নের জবাব দেয়া রাসূল (ﷺ) এর পক্ষে সম্ভব হয়। কাফির-মুশরিকরা তাঁর কোনো কথার প্রতিবাদ করতে সক্ষম হয়নি।

উপরন্তু যাতায়াতের সময় যে বণিকদের কাফেলা তিনি দেখেছিলেন তার আগমনের সময় এবং বিবরণও তিনি বর্ণনা করে শোনালেন। এমনকি কাফেলার অগ্রগামী উটের চিহ্নও তিনি বলে দিলেন। তিনি কাফেলার বেপারে যা কিছু বলেছিলেন সবকিছুই তারা সত্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করলো।

পক্ষান্তরে আবু বকর (রা) লোকমুখে রাসূল (ﷺ) এর এসব কথা শোনামাত্রই একে 'সত্য' বলে মেনে নেন এবং এর সত্যতার ঘোষণা দিতে থাকেন।

উক্ত সময়েই আবু বকর (রা) কে সিদ্দীক (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কারণ সকলে যখন এই ঘটনাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলো তখন তিনি একে সর্বান্তকরণে সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন।

নবী আলাইহিমুল সালামদের ব্যাপারে আল্লাহর এটাই নীতি। সূরা আনয়ামে বলেছেন- "আর এভাবেই আমি ইবরাহীমকে আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব দেখাই এবং যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।" (সূরা আনয়াম: আয়াত -৭৫)

আর মুসা (আ) কে বলেছিলেন- "সে যেন দৃঢ় বিশ্বাসকারীদের মধ্যকার একজন হয় এর মাধ্যমে ব্যাপারটি পরিষ্কার করা হয়েছে।"

ফলে যখন আম্বিয়ায়ে কিরামদের জ্ঞান এভাবে প্রত্যক্ষদর্শিতার সনদপ্রাপ্ত হয়ে যায় তখন তাঁদের আয়নূল ইয়াকীনের (স্বচক্ষে দর্শনের) পর্যায় হাসিল হয়ে যায়, যার সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব নয়। যেমন- কানে শোনা কি চোখে দেখার মতো হয়? আর এই কারণেই নবী আলাইহিমুস সালামগণ আল্লাহর পথে এমন সব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারেন যা অন্য কেউ পারে না।

প্রকৃতপক্ষে তাঁদের দৃষ্টিতে পার্থিব সকল শক্তি একত্রিত হয়েও সামান্য মাছির একটি পাখার সমানও হতে পারে না। এ কারণে ঐ শক্তির পক্ষ থেকে আসা কোনো প্রকার কঠোরতা কিংবা দুঃখ-কষ্টকে তারা দুঃখ-কষ্ট বলে মনেই করতেন না।

এ মিরাজ সংঘটনের পর্দার অন্তরালে যেসব অতি বিজ্ঞানময় এবং রহস্যজনক ব্যাপার রয়েছে, তার আলোচনার স্থান হচ্ছে শরীয়ত দর্শনের পুস্তকাবলি। কিন্তু এমন কতগুলো স্থির তত্ত্ব রয়েছে-যার ধারা রাসূলের অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। উক্ত কারণে সেসব সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

আল্লাহ সূরা বনী ইসরাঈলে রাতের ভ্রমণের ঘটনা দ্বারা সেই দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, ইহুদীগণকে মানুষের নেতৃত্ব দেয়া থেকে বরখাস্ত করা হবে। কারণ তারা এমন সব অন্যায় করেছে যে, ঐসব কর্ম করার পর তাদেরকে ঐ পদে আর অধিষ্ঠিত রাখা সঙ্গত নয়। সুতরাং উক্ত পদ রাসূল কে প্রদান করা হবে এবং ইসরাঈলী দাওয়াতের দুটো কেন্দ্রকেই তাঁর নেতৃত্বাধীনে স্থাপন করা হবে। অন্য কথায় বলা যায় যে, এমন এক অবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল, যার ফলে আত্মিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গটি এক সম্প্রদায়ের নিকট হতে অন্য সম্প্রদায়ের নিকট হস্তান্তর করা দরকার।

অর্থাৎ এমন এক সম্প্রদায়- যাদের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতা, খিয়ানত, অসাধুতা, অন্যায়-অত্যাচার ও অপকর্মে ভরপুর তাদের হাত থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে অন্য এক সম্প্রদায়কে দায়িত্বভার দেয়া দরকার যাদের নবী সর্বাধিক হেদায়েতপ্রাপ্ত, সঠিক পথপ্রদর্শক ও কুরআনের ঐশী বাণী দ্বারা লাভবান হবেন।

কিন্তু যখন এ উম্মতের রাসূল মরুময় মক্কার পাহাড়-পর্বতে মানুষের মাঝে ঠোক্কর খেয়ে বেড়াচ্ছেন তখন এ প্রত্যাবর্তন কিভাবে সম্ভব হতে পারে? এটা সে সময়ের একটা প্রশ্নমাত্র, যে সময় এক অন্য রহস্যের আবরণ উন্মেচিত হচ্ছিল। আর সেই রহস্যটি ছিলো এই যে, ইসলামি দাওয়াতের একটি পর্যায় শেষ হয়ে তা পূর্ণতায় পৌঁছেছে, আর এমন অন্য একটি পর্যায় আরম্ভ হতে যাচ্ছে, যার ধারা পূর্বের ধারা থেকে কিছুটা ভিন্ন। এজন্য আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কোনো কোনো আয়াতে অংশীদারদেরকে খোলাখুলি সতর্ক করে ধমক দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে।

আমি যখন কোনো জনপদ ধ্বংস করতে চাই তখন তার সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিদেরকে সৎকর্ম করতে আদেশ করি, কিন্তু তারা সেথায় অসৎকর্ম করে; অতএব তার প্রতি দণ্ডাজ্ঞা ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় সুতরাং আমি সেটা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। নূহের পর আমি কতই না মানবগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি! তোমার প্রতিপালকই তাঁর বান্দাদের পাপাচরণের সংবাদ রাখা ও পর্যবেক্ষণের জন্য যথেষ্ট। (বনী ইসরাঈল: আয়াত- ১৬-১৭)

পক্ষান্তরে এই সকল আয়াতের পাশে এমন সব আয়াতও রয়েছে- যার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে তাহযীব-তামাদ্দুনের এমন সব নিয়ম-কানুন এবং প্রতিরক্ষার সাধারণ নিয়মাবলি শিক্ষা দেয়া হয়েছে - যার ওপর ভিত্তি করে নবাগত ইসলামি জিন্দেগীর ভিত্তি নির্মিত, নিয়ন্ত্রিত ও সুদৃঢ় হতে পারে। মনে হয় মুসলমানগণ এখন এমন এক সবুজ জমিনের ওপর নিজ ঠিকানা বানিয়েছে যে, সেখানে সকল দিক দিয়ে নিজেদের সমস্যাবলি আপন হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছে এবং সমাজ ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে তারা এমন এক ঐক্যমত গঠনে সক্ষম হয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে সমাজ চলছে।

উপরক্ত আয়াতে আরও ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাসূল অচিরেই এমন এক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করবেন, যা সম্পূর্ণ দিবাগত হবে এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

এ রাতের ভ্রমণ ও মিরাজ ঘটনার তলদেশে হিকমত ও সাহস সমূহের মধ্যে এমন একটি হিকমত- যা আমাদের বিষয়বস্তুর সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এজন্য বর্ণনা উপযোগী মনে করে আমি এখানে তা লিপিবদ্ধ করলাম। এরকম দুটো বিরাট হিকমতের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের পর আমরা এ ব্যাপারে জ্ঞানস্থির করেছি যে, এই রাতের ভ্রমণের ঘটনা আকাবার প্রথম বাইয়াতের ঘটনার কিছু পূর্বেকার অথবা দুই বাইয়াতের মধ্যবর্তী সময়ের ঘটনা হতে পারে। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

আকাবার প্রথম বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ

পূর্বে আমরা বলেছি যে, নবুয়তের একাদশ বর্ষে হজ্জের মৌসুমে ইয়াসরিবের ছয়জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূল (ﷺ) এর নিকট অঙ্গীকার করেছিলেন- আমরা নিজ জাতির নিকট গিয়ে আপনার নবুয়তের কথা প্রচার করবো।

ফলে পরবর্তী বছর যখন হজ্জের মৌসুম এলো (অর্থাৎ নবুয়তের দ্বাদশ বর্ষের যিলহজ্জ মোতাবেক ৬২১ ঈসায়ী সালে জুলাই মাস) তখন বারো জন লোক রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁদের মধ্যে জাবির বিন আব্দুল্লাহ বিন রিআব ছাড়া অবশিষ্ট পাঁচজন তাঁরাই ছিলেন- যাঁরা আগের বছর এসেছিলেন। এছাড়া অন্য সাত জন ছিলেন নতুন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে-

১. মায়ায় বিন হারিস ইবনে আফরা। - বনী নাজ্জার (খাযরাজ)।
২. যাকওয়ান বিন আবদুল কায়েস। - বনী যরাইক (খাজরাজ)।
৩. উবাদা বিন সামিত। - বনী গানাম (খাযরাজ)।
৪. ইয়াযিদ বিন সালাবা। - বনী গানামের মিত্র (খাযরাজ)।
৫. আব্বাস বিন উবাদাহ বিন নায়লা। - বনী সালিশ (খাযরাজ)।
৬. আবুল হায়শাম বিন তায়্যিহান। - বনী আবদুল আশহাল (আউস)।
৭. ওয়াইম বিন সায়িদা। - বনী আমর বিন (আউস)।

এর মধ্যে কেবল শেষের দুজন আউস গোত্রের। তাছাড়া বাকি সকলেই ছিলেন খাযরাজ গোত্রের।

এই লোকগুলো মিনার আকাবার নিকটে রাসূল (ﷺ) এর সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর প্রচারিত দ্বীনের ব্যাপারে কয়েকটি কথার ওপর অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। সেই কথাগুলো সবই পরবর্তীকালে সম্পাদিত হুদাইবিয়ার সন্ধিপত্র এবং মক্কা বিজয়ের সময় মহিলাদের নিকট থেকে গৃহীত অঙ্গীকারনামার অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

আকাবার এই অঙ্গীকারনামার ঘটনা সহিহ বুখারিতে উবাদা বিন সামিত (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেছেন:

রাসূল বলেছেন: 'এসো আমার নিকট এ কথার ওপর অঙ্গীকার গ্রহণ করো যে,

১. আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকেই অংশীদার করবে না, ২. চুরি করবে না, ৩. যিনা করবে না ৪. নিজ সন্তানকে হত্যা করবে না, ৫. হাত-পায়ের মাঝে মনগড়া কোনো অপবাদ আনবে না এবং ৬. কোনো ভালো কথায় আমাকে অমান্য করবে না।

যারা এসব কথা মান্য এবং পূর্ণ করবে আল্লাহর নিকট তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে। কিন্তু যারা এগুলোর মধ্যে কোনো একটি করে বসে এবং তার শাস্তি এখানেই প্রদান করা হয় তবে সেটা তার মুক্তি লাভের কারণ হয়ে যাবে। আর যদি কেউ এসবের মধ্যে কোনো কিছু করে বসে এবং আল্লাহ তা গোপন রেখে দেন, তবে তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়া হবে, চাইলে তিনি শাস্তি দিবেন, নচেৎ ক্ষমা করে দিবেন।

উবাদাহ (রা) বলেছেন, এসব কথার ওপরে আমরা রাসূল (ﷺ) এর নিকট অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।

মদিনায় ইসলাম প্রচারকের দল

অঙ্গীকার সম্পাদিত এবং হজ্জপালন সম্পন্ন হলে রাসূলূল্লাহ এই লোকদের সাথে ইয়াসরিবে প্রথম ধর্মপ্রচারক দল প্রেরণ করলেন। বিবিধ উদ্দেশ্যে এই প্রচারকদল প্রেরণ করা হয়। প্রথম উদ্দেশ্যে ছিলো নবদীক্ষিত মুসলমানদেরকে ইসলামে আহকাম এবং ধর্মের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেয়া। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যেটি ছিলো যারা এখনও শিরকের ওপরেই রয়ে গেছে তাদের নিকট ইসলাম প্রচার করা। রাসূল এই কাজের জন্য প্রথম অগ্রগামীদের মধ্যে স্বনামধন্য এক যুবককে নির্বাচন করেন- যাঁর নাম হলো মুসআব বিন উমায়ের আবদারী (রা)।

গৌরবময় সফলতা

মুসয়াব বিন উমায়ের (রা) মদিনায় গিয়ে আসয়াদ বিন যুরারা (রা) এর বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং উভয় মিলে ইয়াসরিববাসীদের নিকট প্রবল উদ্দম ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামের প্রচারকার্য শুরু করলেন। তাঁর প্রচারকার্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি 'মুকরিউন' উপাধিতে ভূষিত হন। 'মুকরিউন' অর্থ 'পাঠদানকারী'। সেই যুগে শিক্ষক বা উস্তাদকে 'মুকরিউন' বলা হতো। প্রচারকার্যের মধ্যে সবচেয়ে সফল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটির কথা এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে-

একদিন আসয়াদ বিন যুরারা মুসয়াব বিন উমায়ের (রা) কে সাথে নিয়ে বনী আব্দুল আশহাল ও বনী যাফরের মহল্লায় গমন করলেন এবং সেখানে বনী যাফরের একটি বাগানের মধ্যে 'মরক' নামক এক কূপের ওপর বসে পড়লেন। সেই সময় তাঁদের নিকট কিছু সংখ্যক মুসলমান এসে একত্রিত হলেন। তখন পর্যন্ত বনী আব্দুল আশহালের দুই নেতা সা'দ বিন মু'আয ও উসাইদ বিন হুযায়ের শিরকের ওপরেই ছিলেন অর্থাৎ মুসলমান হননি।

তারা যখন তাঁদের আগমনের খবর জানতে পারলেন তখন সা'দ উসাইদকে বললেন: 'আপনি একটু তাদের নিকট যান এবং তাদের উভয়কে বলে দিন যারা আমাদের দুর্বল চিত্তের, মানুষগুলোকে বোকা বানাতে এসেছেন তাদেরকে সাবধান করে বলে দিন যে, তারা যেন আমাদের মহল্লায় না আসেন।

আসয়াদ বিন যুরারা আমার খালাতো ভাই, সেহেতু আপনাকে পাঠাচ্ছি। অন্যথায় এ কাজ আমি নিজেই সম্পন্ন করতাম।

উসাইদ (রা) নিজ বর্শা উত্তোলনপূর্বক তাঁদের দু'জনের নিকট পৌঁছলেন। আসয়াদ (রা) তাদের আসতে দেখে মুসআবকে বললেন, 'ইনি নিজ জাতির সরদার, আপনার কাছে আসছেন। এর জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন।

মুসআব বললেন: এখানে এসে তিনি যদি বসেন তাহলে কথা বলবো।

উসাইদ তাঁদের নিকট পৌঁছানোর পর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কঠোর ভাষার কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন: তোমরা দু'জন আমাদের এখানে কেনো এসেছো? আমাদের দুর্বল চিত্তের মানুষকে বোকা বানাচ্ছো? যদি তোমাদের প্রাণ বাঁচাবার ইচ্ছা থাকে তাহলে আমাদের নিকট হতে দূরে চলে যাও।'

মুসআব বললেন: 'আপনি' কিছুক্ষণের জন্য বসুন এবং কিছু কথাবার্তা শুনুন। যদি কোনো কথা পছন্দ হয় তাহলে তা গ্রহণ করুন। পছন্দ না হলে বর্জন করুন।'

উসাইদ বললেন: কথা তো ন্যায়সঙ্গতই বলেছেন।'

তারপর তিনি নিজ বর্শা মাটিতে পুঁতে রেখে বসে পড়লেন। এ সময় মুসআব ইসলামের কথা বলতে লাগলেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করলেন। তাঁর নিজের বর্ণনায় রয়েছে, উসাইদকে আল্লাহ কথা বলার সাথে সাথে আমরা লক্ষ করলাম যে, তার মুখমণ্ডলে একটা চমকের ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এতে আমাদের ধারণা হলো যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। এরপর তিনি মুখ খুললেন এবং বললেন- 'আপনারা যেসব কথা বললেন তার চেয়ে উত্তম কথা তো আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আপনারা যখন কাউকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতে চান তখন কি করেন?

উত্তরে তারা বললেন- 'আপনি গোসল করে পাক-সাফ পোশাক পরিধান করুন এবং সত্যের সাক্ষ্য প্রদানপূর্বক দুই রাক'আত সালাত আদায় করুন।

তিনি গোসল করে নিয়ে পাক-সাফ পোশাক পরিধান করলেন, কালেমা শাহাদত পাঠ করে সত্যের সাক্ষ্য প্রদানপূর্বক দুই রাক'আত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর বললেন: 'আমার পিছনে আরও একজন আছেন। যদি তিনি অনুসারী হয়ে যান তাহলে তার সম্প্রদায়ে কেউ পিছনে পড়ে থাকবে না। আমি এখনই তাকে আপনাদের খেদমতে প্রেরণ করছি। তাঁর ইঙ্গিত সা'দ বিন মুয়াযের প্রতি ছিলো।

এরপর উসাইদ (রা) নিজ বর্শা উত্তোলনপূর্বক সাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি তখন তার স্বজাতীয় লোকজনের সাথে আলাপ-আলোচনারত ছিলেন। উসাইদকে আসতে দেখে তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, এই ব্যক্তি তোমাদের নিকট যে বললেন: আপনি কি করে এলেন?

তিনি বললেন: 'আমি তাঁদের দু'জনের সাথে কথা বলেছি, কিন্তু আল্লাহর কসম! কোনো ধরনের অন্যায় কিংবা অসুবিধা তো আমার নজরে পড়লো না। তবে তাঁদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। তারাও বলেছেন, ঠিক আছে আপনারা যা চান তাই করা হবে। উপরন্তু আমি জানতে পারলাম যে, বনী হারিসার লোকজন আসয়াদ বিন যুররাহকে হত্যা করতে গিয়েছে। কারণ হলো, তারা জানে যে আসয়াদ আপনার খালাতো ভাই। সুতরাং তারা চাচ্ছে আপনার সাথে যে চুক্তি রয়েছে তা ভঙ্গ করে ফেলবে।'

এ কথা শুনে সা'দ রাগাম্বিত ও উত্তেজিত হয়ে ওঠলেন এবং নিজ বর্শা উত্তোলন করে সোজা ঐ দু'জনের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন যে, তাঁরা নিশ্চিন্তে বসে রয়েছেন। এতে তিনি এ কথা বুঝে গেলেন, উসাইদের ইচ্ছা ছিলো যে, তিনি যেন তাঁদের কথা শোনেন।

কিন্তু তাঁদের নিকট গিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি কঠোর ভাষায় আসয়াদ বিন যুররাহকে বললেন: 'আল্লাহর শপথ! হে আবু উমাম, আমার ও আপনার মধ্যে যদি আত্মীয়তার বন্ধন না থাকতো তবে আপনার কোনোদিনই সাহস হতো না যে, আপনি আমার এলাকায় এসে আমার অপছন্দনীয় কথাবার্তা বলাবলী করবেন।'

এদিকে আসয়াদ পূর্বেই একথা বলেছিলেন যে, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার নিকট এমন এক নেতা আসছেন- যার পিছনে তার জাতি রয়েছে। যদি তিনি আপনাদের কথা মেনে নেন তাহলে কেউই তার পিছে থাকবে না। এজন্য মুসয়াব (রা) সাদকে বলেলেন: 'আপনি কেনো আগমন করবেন না? আর কেনইবা আমাদের কথা শুনবেন না? যদি কোনো কথা পছন্দ হয় তবে গ্রহণ করবেন, আর যদি অপছন্দ হয় তাহলে আমরা আপনার অপছন্দনীয় কথা থেকে আপনাকে দূরেই রাখবো।'

সা'দ বললেন: 'ন্যায়সঙ্গত কথাই তো বলছেন।'

এরপর তিনি তার বর্শা মাটিতে পুঁতে রেখে বসে পড়লেন। মুসয়াব (রা) তার নিকট ইসলাম পেশ করলেন এবং কুরআন পাঠ করলেন।

মুসয়াব (রা) এর বর্ণনায় রয়েছে, সা'দের স্বীকারোক্তির পূর্বেই তাঁর মুখমণ্ডলে জৌলুস দেখে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরেছিলাম।

এরপর তিনি মুখ খুললেন এবং বললেন- 'আপনারা মানুষকে কিভাবে ইসলামে দীক্ষিত করেন? তাঁরা বললেন: 'আপনি গোসল করুন, পাক-সাফ পোশাক পরিধান করুন এবং সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করে দুই রাক'আত সালাত আদায় করুন। সা'দ তাই করলেন। এরপর তিনি তা উত্তোলন করে স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকজনের সভায় গমন করলেন। তাঁকে দেখামাত্রই লোকেরা বললেন: 'আল্লাহর শপথ! সা'দ যে মুখমণ্ডল নিয়ে গিয়েছিলেন তার স্থলে ভিন্ন একটি মুখমন্ডল নিয়ে ফিরে এসেছেন।'

সা'দ (রা) তখন সভায় উপস্থিত লোকজনদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন- হে বনী আব্দুল আশহাদ! তোমরা আমাকে তোমাদের মধ্যে কেমন লোক মনে করো?

তারা বললেন: আপনি আমাদের নেতা, অগাধ জ্ঞান-গরিমান অধিকারী এবং বরকতময় কাণ্ডারি।

তিনি বলনে: বেশ ভালো, তবে এখন একটা কথা শোনো। সেটি হলো এখন থেকে তোমাদের নারী-পুরুষ সকলের সাথে আমার কথা হারাম; যে পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর ওপর ঈমান আনছো।

তার এ বক্তব্য এমন প্রতিক্রিয়া করলো যে, সন্ধ্যা হতে না হতেই সেই গোত্রের এমন একটি পুরুষ কিংবা মহিলা বাকি ছিলো না যে ইসলাম গ্রহণ করেনি। কেবলমাত্র একজন লোক সেই সময়ই ইসলাম গ্রহণ করেনি যার নাম ছিলো উসাইরিম। তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উহুদের যুদ্ধকাল পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছিলো। উহুদ যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং যুদ্ধরত অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেছিলেন। কালেমায়ে শাহাদত পাঠ করে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার অল্প সময় পরেই শহীদ হয়ে যান। আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করার সুযোগ তাঁর হয়নি। উক্ত কারণেই রাসূল তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: 'তিনি অল্প পরিশ্রম করে অধিক পুরস্কার লাভ করলেন।'

মুস'আব (রা) আসয়াদ বিন যুহারার বাড়িতে থেকেই ইসলামের প্রচারকার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। কেবলমাত্র বনী উমাইয়া বিন যায়েদ, খাতমা ও ওয়ায়েলের বাড়ি ছাড়া আনসারদের এমন কোনো বাড়ি ছিলো না- যার পুরুষ ও মহিলাদের কিছুসংখ্যক মুসলমান হয়নি। বিখ্যাত কবি কায়েস বিন আসলাত তাঁদেরই লোক ছিলেন। তাঁরা তাঁরই কথা মান্য করতো। এ কবিই তাঁদেরকে খন্দকের যুদ্ধ (৫ম হিজরি) পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখেন।

যাই হোক, পরবর্তী হজ্জ মৌসুম পর্যন্ত অর্থাৎ নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষের হজ্জ মৌসুম আগমনের পূর্বেই মুস'আব বিন উমায়ের (রা) তাঁর সাফল্যের সুসংবাদ মক্কায় রাসূল (ﷺ) এর দরবারে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে ইয়াসরিবের গোত্রগুলোর অবস্থা তাঁদের রণকৌশল ও প্রতিরক্ষামূলক দক্ষতার উৎকর্ষতা সম্পর্কে অবগত করেন।

আকাবার দ্বিতীয় শপথ, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে হজ্জের মৌসুমের (জুন,৬২২ ইসায়ী সালে) ইয়াসরিবের সত্তর জনেরও অধিক মুসলমান ফরয হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করেন। তাঁরা নিজ সম্প্রদায়ের মুশরিক হজ্জযাত্রীগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

ইয়াসরিবের মধ্যে কিংবা মক্কার পথে ছিলেন এবং এমন একপর্যায়ে মুসলিম হাজীগণ পরস্পর পরস্পরের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন- 'আমরা আর কতদিন রাসূল কে এভাবে মক্কায় পাহাড়সমূহের মধ্যে চক্কর ও ঠোক্কর খেতে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় ফেলে রাখবো?

এ মুসলমানগণ যখন মক্কায় পৌঁছলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে যোগাযোগ শুরু করলেন এবং শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত হলো যে, আইয়্যামে তাশরীকের মধ্য দিবসে (১২ যিলহজ্জ তারিখে) উভয় দল মিনায় জামরায়ে উলা, অর্থাৎ জামরায়ে আকাবার নিকটে যে সুড়ঙ্গ রয়েছে সেখানে একত্রিত হবেন এবং সেই সমাবেশ গোপনে রাতের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত হবে।

উক্ত ঐতিহাসিক সমাবেশ কিভাবে ইসলাম ও মূর্তিপূজার মধ্যে চলমান সংঘর্ষের মোড় ঘুরিয়ে দেয় তা একজন আনসার সাহাবীর নিকট থেকে প্রাপ্ত বিবরণসূত্রে জানা যায়। কা'ব বিন মালিক আনসারি (রা) বলেছেন,

যিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে আইয়াম তাশরীফ বলা হয়। আমরা হজ্জের জন্য বের হলাম। আইয়ামে তাশরীকের মধ্যবর্তী দিবাগত রাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো এবং শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলো। আমাদের সাথে আমাদের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা উপস্থিত ছিলেন- যিনি কখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। মুশরিকদের মধ্যে একমাত্র তাকেই আমরা সাথে নিয়েছিলাম। আমাদের সাথে আগত অন্যান্য মুশরিকের নিকট থেকে আমাদের কাজ-কর্ম ও কথাবার্তা গোপন রাখছিলাম। কিন্তু আব্দুল্লাহ বিন হারামের সাথে আমাদের কথোপকথন ঠিকভাবেই চলছিলো। আমরা তাকে বললাম- 'হে আবু জাবির! আপনি আমাদের একজন প্রভাবশালী এবং উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন নেতা। আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সূত্রে আমরা আপনাকে বর্তমান অবস্থা থেকে বের করে আনতে চাচ্ছি- যাতে করে আপনি জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডের ইন্ধন হয়ে না যান।

এরপর তাকে আমরা ইসলামের দাওয়াত দিলাম এবং বললাম- 'আজ আকাবায় রাসূল (ﷺ) এর সাথে আমাদের সাক্ষাতের কথা রয়েছে। তিনি আমাদের কথা শুনে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আমাদের সাথে আকাবায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে আমাদের সাক্ষাতের নেতা নির্বাচিত হলেন।

কাব (রা) ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন। আমরা এ রাতেও যথারীতি নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু যখন রাতের তৃতীয় অংশ অতিবাহিত হলো তখন আমরা নিজ নিজ তাঁবু থেকে বের হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমরা এমনভাবে সংগোপনে তাঁবু থেকে বের হলাম।

শেষ পর্যন্ত আমরা সকলে গিয়ে আকাবায় একত্রিত হলাম। আমরা সংখ্যায় ছিলাম মোট পঁচাত্তর জন। তিয়াত্তর জন পুরুষ এবং দুই জন মহিলা। মহিলা দুইজনের একজন ছিলেন 'উম্মে আম্মারা নাসীরা বিনতে কাব'। তিনি কবিলা বনু মাযেন বিন নাজ্জারের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। দ্বিতীয়জন ছিলেন উম্মে মানী আসমা বিনতে আমর। তিনি বনু সালমা গোত্রের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।

আমরা সকালে সুড়ঙ্গের মধ্যে একত্রিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত সে আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি এসে পড়লো এবং তিনি তাশরীফ আনয়ন করলেন। সাথে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব, যদিও তিনি তখনও নিজ সম্প্রদায়ের ধর্মের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তবুও তিনি চাচ্ছিলেন যে, স্বীয় ভাতিজার সমস্যায় উপস্থিত থাকবেন যাতে তাঁর পূর্ণ দৃঢ় বিশ্বাস হয়। তিনিই সর্বপ্রথম কথা বলা শুরু করেন।

আলোচনার বিষয়বলি এবং আব্বাস কর্তৃক সমস্যার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করা

সভার প্রাথমিক কাজ-কর্ম সম্পন্ন হলে ধর্মীয় ও সামরিক সাহায্যকল্পে সন্ধি ও চুক্তি সম্পাদনের জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্যে আলোচনা শুরু হলো। আব্বাস সর্বপ্রথম মুখ খুললেন। তাঁর উদ্দেশ্যে ছিলো উভয়পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ফলে তাদের কাঁধে যে গুরু দায়িত্ব অর্পিত হবে এবং এর পরিণামে যে নাজুক অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে তা সববিস্তারে ব্যাখ্যা করা। সুতরাং তিনি বললেন-

হে খাযরাজের লোকজন! (আরাশির নিকট আনসারদের মধ্যে দুই গোত্রই খাযরাজ এবং আউস নামেই পরিচিত ছিলো) আমাদের মধ্যে মুহাম্মদ (ﷺ) এর মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে তোমরা সকলেই অবগত। ধর্মের ব্যাপারে আমরা যে মনোভাব পোষণ করি আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনও একই মনোভাব পোষণ করে। আমরা তাঁকে তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের অনিষ্ট থেকে হিফাজত করে রেখেছি। তিনি এখন নিজ আবাসস্থলে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে মান-সম্মান, শক্তি-সামর্থ্য এবং হিফাজতের সাথেই রয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি তোমাদের সেখানে গিয়ে তোমাদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ। এই অবস্থায় যদি এমনটি হয় যে, তোমরা তাঁর রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট থাকবে তাহলে সব ঠিক আছে, আপত্তির কোনো কিছু নেই। তোমরা যে মহান দায়িত্ব যে গুরুভার গ্রহণ করতে যাচ্ছ আশা করি তার গুরুত্ব সম্পর্কে তোমাদের সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। কিন্তু এমনটি যদি হয় যে, তোমরা তাঁকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাবে কিংবা প্রয়োজনে তোমরা তাঁর কোনো উপকারে আসবে না, তাহলে তাঁকে এখনি ছেড়ে দাও। কারণ তিনি নিজ জন্মভূমিতে সম্প্রদায়ের মধ্যে মান-সম্মান ও হিফাজতের সাথেই রয়েছেন।

কা'ব (রা) বলেছেন: আমরা আব্বাসকে বললাম, আমরা আপনার কথা শুনেছি। অতঃপর রাসূল কে উদ্দেশ্যে করে বললাম 'আপনি আপনার কথা শুরু করুন, নিজের জন্যে ও নিজ প্রভুর জন্য যে সন্ধি ও চুক্তি করতে পছন্দ করেন তা করুন।

কা'ব (রা) এর উত্তর থেকে এটা সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, এ বিরাট জিম্মাদারী বহন করা এবং এর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পরিণতির ব্যাপারে আনসারগণের মনে দৃঢ়সংকল্প, বাহাদুরী, ঈমান, উদ্যম ও খুলুসিয়াত কোন পর্যায়ের ছিলো।

এরপর রাসূল কথাবার্তা বললেনঃ তিনি প্রথমে কুরআন মাজীদ থেকে কিছু অংশ তিলাওয়াত করলেন, আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত পেশ করলেন এবং ইসলামের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করলেন। এরপর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করলেন। যা ইমাম আহমদ (রা) জাবির (রা) হতে বাইয়াতের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। জাবির (রা) বলেছেন, 'আমরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর কাছে নিবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার নিকট থেকে কোন কথা গ্রহণ করব? তিনি বললেন, 'তোমরা যে কথাগুলোর ওপর শপথ গ্রহণ করবে, তা গ্রহণ করবে আর সেগুলো হলো:

১. সুখে-দুঃখে সর্ব অবস্থায় কথা শুনবে ও মেনে চলবে।
২. অভাব ও স্বচ্ছলতায় একই ধারায় খরচ করবে।
৩. ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে।
৪. আল্লাহর পথে দন্ডায়মান থাকবে এবং আল্লাহর ব্যাপারে কোনো ভর্ৎসনাকারীর পরওয়া করবে না।
৫. যখন আমি তোমাদের কাছে হিজরত করে যাব তখন যেমনভাবে স্বীয় জান-মাল ও সন্তানদের হেফাজত কর সেভাবেই আমার হেফাজত করবে। এগুলো পালন করলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।

কা'ব (রা) এর বর্ণনা সূত্রে ইবনে ইসহাক যে আলোচনা করেছেন তাতে শেষ ধারায় কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রাসূল কুরআন তিলাওয়াত করলেন, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি দাওদয়াত এবং ইসলাম গ্রহণের প্রতি অনুপ্রেরণা দানের পর বললেন, 'আমি তোমাদের নিকট থেকে এ কথার শপথ গ্রহণ করছি, তোমরা আমাকে ঐ সকল জিনিস থেকে হেফাজত করবে যে সকল জিনিস থেকে তোমরা নিজ ছেলেমেয়ে ও আত্মীয় স্বজনদের হেফাজত করে থাক।' একথা বলার পরই বারা বিন মারুর (রা) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হাত ধরে বললেন, 'ঐ সকল অনিষ্ট থেকে হেফাজত করবো, যে সকল অনিষ্ট থেকে আমাদের ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনদের হেফাজত করে থাকি।' একথা বলার পরেই বারা বিন মারুর (রা) রাসূল (ﷺ) এর হাত ধরে বললেন, "ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন। অবশ্যই আমরা আপনাকে ঐ সকল অনিষ্ট থেকে হেফাজত করবো, যে সকল অনষ্ট থেকে আমাদের ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনদের হেফাজত করি। অতএব, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করুন। আল্লাহর শপথ! আমরা যুদ্ধের সন্তান এবং অস্ত্র আমাদের খেলনা। আমাদের এ পদ্ধতি বাপ দাদার কাল থেকে চলে আসছে।"

কা'ব (রা) বলেন, বারা যখন রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন, তখন আবুল হায়সাম বিন তায়হান তার মধ্যখানে বললেন "হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ও কিছু মানুষের অর্থাৎ ইহুদীদের মধ্যে চুক্তি ও সন্ধির বন্ধন রয়েছে। আমরা এখন সে বন্ধন ছিন্ন করছি। সে ক্ষেত্রে এমন হবে না তো, যে আপনি আমাদেরকে ছেড়ে দিয়ে নিজ জাতির দিকে ফিরে যাবেন।

এ কথা শুনে রাসূল মৃদু হেসে বললেন, 'না; বরং তোমাদের রক্ত আমার রক্ত এবং তোমাদের ধ্বংস আমার ধ্বংস। আমি তোমাদেরই এবং তোমরাও আমারই। তোমরা যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। তোমরা যাদের সঙ্গে সন্ধি করবে আমিও তাদের সঙ্গে সন্ধি করব।'

বাই'আতের বিপজ্জনক দিকগুলোর পুনঃ স্মরণ: অঙ্গীকারের শর্তাদি সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা প্রায় শেষের দিকে এবং লোকজনেরা অঙ্গীকার নেয়া বর্ষে হজ্জের মৌসুমে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা মানুষের সামনে তাদের দায়িত্বের নাজুকতা ও ভয়াবহতা সম্ভাব্য বিপদাপদের ব্যাপারটি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেন যাতে সমস্যার সকল দিক ভালোভাবে অবহিত হওয়ার পর তারা শপথ গ্রহণ করে। এর পিছনে আরও যে একটি উদ্দেশ্যে ছিলো তা হচ্ছে, এই সকল লোকজন কতটুকু আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত রয়েছে তা অনুধাবন করা।

ইবনে ইসহাক বলেছেন, যখন লোকজন অঙ্গীকার গ্রহণের জন্য একত্রিত হলেন তখন আব্বাস বিন উবাদাহ বিন নাযলাহ বললেন, "তোমরা কি জানো যে, তাঁর সাথে (রাসূলুল্লাহর প্রতি ইঙ্গিত করে) কোন কথার ওপর অঙ্গীকার গ্রহণ করতে যাচ্ছ? তাঁরা সমবেত কন্ঠে উত্তর দিলেন, জী হ্যাঁ।"

আব্বাস (রা) বললেন, 'লাল ও কালো মানুষের বিরুদ্ধে জান্নাতের বিনিময়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে তোমরা তাঁর কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। যদি এই রকম ধারণা থাকে, যখন তোমাদের দলের সম্ভ্রান্ত লোকজনকে হত্যা করা হবে তখন তোমরা তাঁর সঙ্গ ছেড়ে যাবে তাহলে এখনই ছেড়ে যাও। কেননা, তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর যদি তোমরা তাঁকে ছেড়ে দাও তাহলে ইহলৌকিক ও পরকালের জন্য তা হবে চরম লজ্জাজনক ব্যাপার। আর যদি তোমাদের ইচ্ছা থাকে, তোমাদের ধন-সম্পদ ধ্বংস এবং মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের হত্যা সত্ত্বেও এ চুক্তি সম্পন্ন করবে যার প্রতি তোমরা তাকে আহ্বান করছো তবে অবশ্যই তা গ্রহণ করবে। কেননা, আল্লাহর শপথ, এতেই ইহলৌকিক এবং পরলৌকিক জীবনের জন্য মঙ্গল রয়েছে।

এ কথা শোনার পর সকলেই সমবেত কণ্ঠে বললেন, "ধন-সম্পদের ক্ষয়- ক্ষতি এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের হত্যার মতো অত্যন্ত বিপদ সংকুল পরিস্থিতির বিনিময়ে এটা আমরা গ্রহণ করছি। তবে তা একটি প্রাসঙ্গিক কথা। হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যদি যথাযথভাবে এ অঙ্গীকার পূরণ করি তবে প্রতিদানে আমাদের জন্য কী পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে? তিনি বললেন, 'জান্নাত।" লোকেরা বললেন, "আপনার হাত মোবারক বাড়িয়ে দিন।" তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে লোকেরা তাঁর হাত ধরে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন।

জাবির (রা) এর বর্ণনা মতে, অঙ্গীকার গ্রহণের জন্য যে সময় আমরা দাঁড়ালাম সে সময় সত্তর জনের মধ্যে সর্ব-কনিষ্ঠ সদস্য আসয়াদ বিন যুরারাহ বললেন, হে ইয়াসরিববাশিরা! একটু থেমে যাও। আমরা উটের কলিজা নষ্ট করে (অর্থাৎ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে) এই বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে তার খেদমতে উপস্থিত হয়েছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল! আজ তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ সমস্ত আরববাশির সঙ্গে শত্রুতা, তলোয়ারের আঘাতে তোমাদের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের হত্যা এবং ধন-সম্পদের অসামান্য ক্ষয়-ক্ষতি। অতত্রব, যদি এসব সহ্য করতে পার তবে তাকে নিয়ে চলো। এসবের বিনিময়ে আল্লাহর দরবারে তোমাদের জন্য যে, মহা পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে, তা হচ্ছে 'জান্নাত'।

যদি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর চাইতে এসব কিছুই তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তবে এখনই তাঁকে ছেড়ে দাও। এটাই হবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ওজর বা আপত্তি।

বাই'আতের পূর্ণতা লাভ

বাই'আতের শর্ত বা দফাসমূহ আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ভয়াবহ দিকগুলো সম্পর্কে একবার ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছিলো। যখন এই অতিরিক্ত সতর্কতার কথা বলা হলো তখন সকলে সমস্বরে বলে ওঠলেন, 'আসয়াদ বিন যুরারাহ! নিজ হাত হটাও। আল্লাহর কসম! আমরা এ অঙ্গীকার ছাড়তে কিংবা ভঙ্গ করতে পারি না।'

উপস্থিত জনতার এই উত্তরে আসয়াদ বিন যুরারাহ ভালোভাবে ওয়াকিফহাল হওয়ার সুযোগ লাভ করলেন যে, লোকেরা আল্লাহর রাসূলের জন্য কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে আসয়াদ বিন যুরারাহ মুস'আব বিন উমায়েরের সাথে একযোগে মদিনায় ইসলাম প্রচার কাজে লিপ্ত ছিলেন এবং সবচেয়ে বড়ো মুবাল্লেগ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া যায়, তিনি অঙ্গীকার গ্রহণ কারীদের নেতাও ছিলেন। ফলে তিনিই সর্বপ্রথম অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এজন্য ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে, বনু নাজ্জার বলেছেন, আবু উমামা আসয়াদ বিন যুরারাহ সর্বপ্রথম মানুষ, যিনি রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।

আমার ধারণায় সম্ভবত আবুল হাইছাম ও বারায়ার সাথে বাই'আতের পূর্বে যে কথাবার্তা হয়েছিলো সেটাকেই মানুষ অঙ্গীকার বলে ধরে নিয়েছে। অন্যথায় এসময় সর্বপ্রথম আগে যাওয়ার অধিকতর অধিকার আসয়াদ যুবাইরই রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।

এরপর সাধারণ অঙ্গীকার অনুষ্ঠিত হয়। জাবির (রা) এর বর্ণনায় রয়েছে, আমরা একে একে দাঁড়ালাম আর নবী করীম (ﷺ) আমাদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। আর এর বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করলেন।

অবশিষ্ট রইলেন দু'জন মহিলা, যাঁরা সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের শপথ হলো মৌখিক। রাসূল কখনও কোনো পরস্ত্রীর সঙ্গে হাত মেলাননি।

বারজন নকীব

অঙ্গীকারপর্ব সম্পন্ন হলে রাসূল অঙ্গীকারাবদ্ধ লোকদের মধ্যে থেকে বারোজন নেতা নির্বাচন করলেন। নির্বাচিত ব্যক্তি নিজ নিজ সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন এবং আপন আপন সম্প্রদায়ের মধ্যে অঙ্গীকারের ধারাসমূহ বাস্তবায়নের ব্যাপারে জিম্মাদারী ও দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এরূপ ইঙ্গিত ছিলো যে, নিজেদের মধ্য থেকে তাঁরা এমন সব নেতা নির্বাচন করবেন, যাঁরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সমস্যাবলি সমাধানের ব্যাপারে যথার্থ ভূমিকা পালন করবেন। তাঁর ইঙ্গিতে দ্রুত নেতা নির্বাচনপর্ব সমাপ্ত হলো। নয়জন খাযরাজ এবং তিনজন আউস গোত্র থেকে মোট বারোজন নেতা নির্বাচিত হলো।

খাযরাজ গোত্রের নেতাগণের নাম হচ্ছে-

১. আস'আদ বিন যুরারাহ বিন 'আদাস
২. সা'দ বিন রাবী বিন আমার
৩. আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাহ বিন সা'লাবাহ
৪. রাফি বিন মালিক বিন 'আজলান
৫. বারা বিন মা'রূর বিন সাখার
৬. আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন হারাম
৭. 'উবাদা বিন সামিত বিন ক্বায়স
৮. সা'দ বিন উবাদাহ বিন দুলাইম
৯. মুনযির বিন আমর বিন খুনাইস।

আউস গোত্রের নেতারা হচ্ছেন-

১. উসাইদ হুযাইর বিন সামাক
২. সায়াদ বিন খায়সামা বিন হারেস
৩. রেফায়া বিন আব্দুল মুনযের বিন যুবাইর।

কেউ কেউ যুবাইর এর পরিবর্তে যুনাইর বলেছেন। কোনো কোনো চরিত্রকার রিফয়ার বদলে আবুল হাইশাম বিন তায়েহানের নাম লিখেছেন।

যখন এসব নেতার নির্বাচন পর্ব সমাপ্ত হলো, তখন নবী করীম (ﷺ) তাঁদের কাছ থেকে পুনরায় অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন। তিনি বললেন, ঈসা (আ)- এর পক্ষ থেকে যেভাবে হাওয়ারীয়দের ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো, তেমনিভাবে আজ থেকে আপনাদের ওপর আপন আপন সম্প্রদায়ের দায়িত্ব অর্পিত হলো। আর আমার ওপর দায়িত্বভার রইল পুরো মুসলিম জাতির। তাঁরা সকলে এক বাক্যে বলে ওঠলেন জী হ্যাঁ।

যখন অঙ্গীকার সংক্রান্ত কাজকর্ম সম্পূর্ণ হয়ে গেল এবং লোকজনেরা নিজ নিজ গন্তব্যস্থান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাবেন এমন সময় এক শয়তান ব্যাপারটি জেনে ফেলে। যেহেতু সে ব্যাপারটি জানতে পারে শেষ সময়ে এবং সে মুহূর্তে তার হাতে একটুকু সময় ছিলো না যে সে কুরাইশ মুশরিকদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে দেয় এবং তারা আকস্মিকভাবে এই সুড়ঙ্গের মধ্যেই আক্রমণ চালিয়ে এদের সকলকে নিঃশেষ করে দিবে। তাই সে (শয়তান) তাড়াতাড়ি পাহাড়ে একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে এমন উচ্চকণ্ঠে (যা কদাচিৎ কেউ শুনে থাকবে) ডাক দিল, হে তাঁবুওয়ালা! মুহাম্মদকে দেখ, বেদীনেরা এখন তার সঙ্গে রয়েছে। তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য তারা এখানে একত্রিত হয়েছে।

কুরাইশদের ওপর আক্রমণের জন্য আনসারদের প্রস্তুতি

শয়তানের কণ্ঠে নিঃসৃত শব্দ শুনে আব্বাস বিন উবাদাহ বিন নায়লা বললেন, ঐ সত্তার শপথ যিনি ন্যায়ের সঙ্গে আপনাকে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি চান তাহলে আমরা কালই তরবারি নিয়ে মীনাবাশির ওপর আক্রমণ চালাই। রাসূল বললেন: "আমাকে এ নির্দেশ দেয়া হয় নি।" তাই আপনারা নিজনিজ আস্তানায় চলে যান। কাজেই লোকেরা নিজ নিজ আস্তানায় গেলেন। এভাবেই সকাল হয়ে গেলো।

ইয়াসরিব নেতৃবৃন্দের সামনে কুরাইশদের বিক্ষোভ

এ সংবাদ কুরাইশদের কানে পৌঁছামাত্র তাদের মাঝে অসহনীয় দুঃখ- বেদনা শুরু হয়ে গেলো। কেননা, মুসলমানদের এ ধরনের অঙ্গীকার ও চুক্তির সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে তাদের জীবন ও সম্পদের ওপরে হবে সেটা তাদের ভালোভাবেই জানা ছিলো। সুতরাং সকাল হওয়ামাত্র তাদের নেতা ও সন্তানদের ভারী দল ঐ চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখানোর উদ্দেশ্যে মদিনাবাসীদের তাবুর দিকে যাত্রা করলো এবং এইভাবে আবেদন জানালো-

হে খাযরাজের লোকেরা! জানতে পারলাম, আপনারা এই মানুষটিকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তাঁর সঙ্গে অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছেন। অথচ আরব গোত্রসমূহের মধ্যে শুধুমাত্র আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা আমাদের অপছন্দের কাজ।

কিন্তু যেহেতু এই বাই'আত অত্যন্ত সঙ্গোপনে রাতের অন্ধকারে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সেহেতু খাযরাজ-মুশরিকগণ এ সম্পর্কে মোটেই টের পায়নি। সেজন্য তারা বারবার আল্লাহর শপথ করে এ বিশ্বাস জন্মানোর চেষ্টা করলো যে, এ ধরনের কোনো কাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। আমরা এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র অবগত নই। পরিশেষে বিক্ষোভে শামিল এই দল আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সুলুনের নিকট পৌঁছলো। এ বিষয়ে তাঁর নিকটে জানতে চাইলে প্রত্যত্তরে সে বললো, 'নিশ্চয়ই এটা বাজে কথা। এমনটি কিছুতেই হতে পারে না যে, আমার সম্প্রদায় আমাকে এড়িয়ে আমার অগোচরে এই রকম কোনো কাজ করতে পারে। আমি যদি ইয়াসরিবেও থাকতাম, তাহলেও আমার পরামর্শ ছাড়া আমার সম্প্রদায় এরূপ করতো না।'

অবশিষ্ট রইলেন মুসলমান। তাঁরা আড় চোখে পরস্পর পরস্পরকে দেখলেন এবং চুপচাপ রইলেন। এমনকি হ্যাঁ কিংবা না বলেও কেউ মুখ খুললেন না। শেষ পর্যন্ত কুরাইশ নেতাদের ধারণা হলো, মুশরিকদের কথা সত্য এবং তাই তারা নিরাশ হয়ে ফিরে গেলো।

সংবাদের সত্যতা ও শপথকারীদের পশ্চাদ্ধাধাবন: মক্কায় কুরাইশ নেতাগণ সম্ভবত; দৃঢ়তার সঙ্গে ধরেই নিয়েছিলো যে, এ সংবাদ মিথ্যা। কিন্তু এর অনুসন্ধানে সর্বদা নিয়োজিত থাকলো এবং শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হলো, অঙ্গীকার গ্রহণের ঘটনা সত্য। এই ঘটনা অবগত হওয়ার পর তারা অঙ্গীকার গ্রহণকারীদের প্রতি মারমুখী হয়ে উঠে। কিন্তু যখন তারা এই সংবাদ অবগত হলো, তখন অঙ্গীকারাবদ্ধ হাজীগণ দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে অনেকটা পথ অতিক্রম করেছেন। মক্কাবাসীগণ দ্রুত অগ্রসর হয়েও তাঁদের নাগাল পেলো না। অবশ্য তারা সায়াদ বিন উবাদাহ এবং মুনযির বিন আমরকে দেখে ফেলে। অতঃপর তাদেরকে তাড়া করতে থাকে। কিন্তু মুনযির অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের নাগালের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু সায়াদ বিন উবাদাহ তাদের হাতে ধরা পড়ে যান। তারা তাঁর হাত দুটো তাঁরই পাকানো দড়ি দ্বারা গর্দানের পিছনে বেঁধে দেয়। কষ্ট দিতে দিতে মক্কা পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে মুতয়িম বিন আদী এবং হারেস বিন উমাইয়া এসে তাঁকে ছাড়িয়ে দেন। কারণ, তাদের দু'জনের যে, বাণিজ্য কাফেলা মদিনার পথ দিয়ে যাতায়াত করতো তা সায়াদের আশ্রয়েই চলাচল করতো। এদিকে তাঁকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়াতে আনসারগণ খুবই বিব্রতবোধ করতে থাকেন এবং তাঁকে মুক্ত করার ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সলা-পরামর্শ করতে থাকেন। ইতোমধ্যে দেখা গেলো যে, বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে সায়াদ সঙ্গী-সাথিদের নিকট প্রত্যাবর্তন করেছেন। এরপর সকলেই নিরাপদে মদিনা প্রত্যাবর্তন করলেন।

এটাই হচ্ছে আকাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকার, যাকে আকাবার বড়ো শপথ বলে অভিহিত করা হয়। এই অঙ্গীকার এমন এক খোলা জায়গায় সম্পাদিত হয়েছিলো যা ভালোবাসা ওয়াদা পালন, সততা বিচ্ছিন্ন ঈমানদারদের মধ্যে সাহায্য, সহযেগিতা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা, আস্থা ও বিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও বীরত্বের উদ্দীপনায় ভরপুর ছিলো। ফলে ঈমানদার ইয়াসরিববাসীদের অন্তর মক্কায় দুর্বল ভাইদের প্রতি দয়ামায়ায় ভরপুর ছিলো। মক্কায় অধিবাসী ভাইদের সাহায্য করার জন্য তাঁদের অন্তরে উৎসাহ-উদ্দীপনার কমতি ছিলো না। অধিকন্তু তাঁদের প্রতি অত্যাচারকারীদের বিরুদ্ধে দারুণ দুশ্চিন্তা ও ক্রোধ ছিলো। তাঁদের অন্তর এই ভাইদের ভালোবাসায় ভরপুর ছিলো, যাদের না দেখে আল্লাহর ওয়াস্তে ভাই নির্ধারণ করেছিলো।

আর এই উৎসাহ-উদ্দীপনা ও অনুধাবন শুধু একটি কল্পিত আকর্ষণের ফলই ছিলো না, যা সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে; বরং এমন উৎস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান। যা অন্যায়-অত্যাচারের বড়ো থেকে বড়ো শক্তির কাছেও মাথা নত করে না। সে ঈমানের বদৌলতে সাহাবারা এমন সব যুগান্তরকারী কর্ম ও কীর্তিমালা স্থাপন করেছেন এবং মানব জাতির ইতিহাসে এমন সব অধ্যায় রচনা করেছেন, যার তুলনা অতীত কিংবা বর্তমান কোনো কালেই মিলে না। সম্ভবতঃ ভবিষ্যতেও মিলবে না।

হিজরতের সর্বপ্রথম দল

আকাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকার যখন সুসংগঠিত রূপ ধারণ করল তখন নাস্তিকতা ও মূর্খতার তৃণ শস্যবিহীন মরুভূমিতে ইসলাম মহীরূহের ভিত্তিমূল বহুলাংশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠলো। ইসলামি দাওয়াতের জন্ম হতে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে যতটা সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছিলো তার মধ্যে এটিই ছিলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখযেগ্য সফলতা। এর পরই রাসূল (ﷺ) মুসলমানদেরকে এই নতুন দেশে হিজরত করার (দেশত্যাগ করার) অনুমতি দেন।

হিজরতের অর্থ ছিলো সকল প্রকার সুখ-সুবিধা ও আরাম আয়েশ ত্যাগ করে এবং ধন-দৌলত ও সহায় সম্পদ সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে কেবলমাত্র প্রাণ রক্ষা করা। আর এটা মনে রাখতে হবে যে, মুশরিক বেষ্টিত মুসলমানদের জীবন যে কোনো মুহূর্তে বিপদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিলো অধিক। অধিকন্তু পথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেকোনো স্থানে বিপদ ঘনিয়ে আসার সম্ভাবনা ছিলো। আর ভ্রমণ ছিলো এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক। জানা ছিলো না আগামীতে কোন ধরনের বিপদাপদ ও দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন তাঁদের হতে হবে।

মুসলমানেরা এসব জেনে শুনেই হিজরত আরম্ভ করে দিলেন। এদিকে মুশরিকরা তাদের যাত্রাপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে শুরু করে দিলো। কারণ তারা বুঝতে পারছিলো, এর মধ্যে কোনো বিপদ লুকায়িত রয়েছে। হিজরতের কয়েকটি নমুনা পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।

১. সর্বপ্রথম মুহাজির ছিলেন আবু সালামা (রা)। ইবনে ইসহাকের মতে তিনি আকাবার বড়ো শপথের পূর্বেই হিজরত করেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা। যখন তিনি মক্কা থেকে যাত্রা করতে চাইলেন তখন তাঁর শ্বশুর পক্ষ বললো আপনার নিজ প্রাণের ব্যাপারে তো আপনি আমাদের ওপর জয়ী হলেন। কিন্তু আমাদের কন্যাকে আপনার সঙ্গে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতে দিতে পারি না।

এ কথা বলার পর তাঁরা তাঁর স্ত্রীকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন। এতে আবু সালামা (রা) এর আত্মীয়-স্বজন অত্যন্ত রাগাম্বিত হলেন এবং বললেন, "তোমরা যখন এই মহিলাকে আমাদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছ তখন আমরাও আমাদের সন্তানটিকে কিছুতেই থাকতে দিতে পারি না।"

অতঃপর সন্তানটিকে নিয়ে উভয় পক্ষ টানটানি শুরু করে দিলো। টানাটানির ফলে শিশুটির একটি হাত ছিড়ে গেলো। এমনি এক অবস্থার মধ্যে আবু সালামার আত্মীয়-স্বজনেরা শিশুটিকে নিজেদের অধিকারে নিয়ে যান। সে কারণে আবু সালামাকে একাকী মদিনা গমন করতে হয়।

এরপর থেকে উম্মে সালামা (রা) এর অবস্থা এমন হলো যে, প্রত্যেক সকালে তিনি প্রায় সেখানে আসতেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত কান্নাকাটি করতে থাকতেন। এই অবস্থায় একটি বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। তাঁর এই অবস্থা দেখে আত্মীয় স্বজনেরা গভীর মর্মবেদনা অনুভব করতে থাকেন। অবশেষে তারা তার পিতৃপক্ষকে লক্ষ করে বললেন, তোমরা কেনো এই মহিলাকে তার স্বামীর নিকট যেতে দিচ্ছ না? অনর্থক কেনো তাকে তার স্বামী ও সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছো?

এই কথাবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে তার আত্মীয়রা তাকে বললো, তুমি যদি ইচ্ছা করো তাহলে স্বামীর নিকট যেতে পারো। তখন তিনি তাঁর সন্তানকে তার দাদার বাড়ি হতে ফেরত নিয়ে মদিনা চলে গেলেন। আল্লাহু আকবার! পাঁচশত কিলোমিটার পথ। আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই তাঁর সঙ্গে ছিলো না। সন্তানসহ যখন তিনি মদিনা গিয়ে পৌঁছলেন তখন উসমান বিন আবি তালহার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। অবস্থা জেনে তিনি সহযাত্রী রূপে তাকে মদিনা নিয়ে গেলেন। যখন জনবসতি দৃষ্টিগোচর হলো, তখন তিনি বললেন, "এই গ্রামে তোমার স্বামী আছেন, সেখানে চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন।" এরপর তিনি মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হলেন।

২. সোহাইব (রা) যখন হিজরতের ইচ্ছা করলেন, তখন কুরাইশ গোত্রের কাফিররা বললো, তুমি যখন আমাদের নিকট এসেছিলে, তখন নিকৃষ্ট ভিক্ষুক ছিলে। কিন্তু এখানে আসার পর তোমার অনেক ধন-সম্পদ হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। এখন তুমি ভাবছো, তোমার ধন-সম্পদ নিয়ে এখানে থেকে চলে যাবে। আল্লাহর কসম! এ কিছুতেই হতে পারে না। সোহাইব (রা) বললেন, ঠিক আছে, যদি আমি আমার ধন সম্পদ ছেড়ে যাই তবে কি তোমরা আমার পথ ছেড়ে দেবে?

তারা বললো, হ্যাঁ। সোহাইব বললেন, ঠিক আছে। চল আমার ধন-সম্পদ যা কিছু আছে, তোমাদেরকে দিয়ে দিই। অতঃপর তিনি আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের মহব্বতে তার সমস্ত সম্পদ কাফিরদের হাতে তুলে দিলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এ খবর জানতে পারলেন তখন আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলে ওঠলেন, সোহাইব লাভবান হয়েছেন, সোহাইব লাভবান হয়েছেন।

৩. ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) আইয়াশ বিন আবু রাবীয়াহ (আ) হিশাম আস বিন ওয়ায়িল (রা) নিজেদের মধ্যে স্থির করলেন, সাকিফ এর তানায়ুর জায়গায় খুব সকালে একত্রিত হয়ে সেখান থেকে মদিনা হিজরত করা হবে। ওমর (রা) ও আইয়াশ যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হলেন, কিন্তু হিশাম বন্দি হয়ে গেলেন, ওমর (রা) ও আইয়াশ যখন মদিনায় গিয়ে "কুবাতে" অবতরণ করলেন তখন আবু জাহেল ও তার ভাই হারেস আইয়াশের নিকট উপস্থিত হলো। তারা তিনজন ছিলো একই মায়ের সন্তান। তারা দুজন আইয়াশ (রা) কে বললো, তোমার এবং আমাদের মাতা মানত করেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে দেখতে না পারে ততক্ষণ পর্যন্ত চুল আঁচড়াবে না এবং রোদ ছেড়ে ছায়াতে আশ্রয় নেবে না। এই অবস্থা দেখে আইয়াশ (রা) স্বীয় মায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত দয়ার্দ্র হয়ে পড়লেন। শুনে ওমর (রা) আইয়াশ (রা) কে বললেন, 'দেখ আইয়াশ! আল্লাহর কসম! তোমার মাতাকে যদি উকুনে কষ্ট দেয় তবে সে অবশ্যই চিরুনী ব্যবহার করবে। আর যদি তাকে মক্কার রোদে কষ্ট দেয় তবে সে অবশ্যই ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। কাজেই তাদের সম্পর্কে সতর্ক থেকো। কিন্তু আইয়াশ সে কথায় কর্ণপাত না করে মাতার কসম পূর্ণ করার জন্য ঐ দুজনের সঙ্গে বেরিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন।

ওমর (রা) তাঁকে লক্ষ করে বললেন, তোমার মাতার ইচ্ছা পূরণের ব্যাপারে তুমি যখন দৃঢ় সংকল্প তখন তোমার যাতায়াতের সুবিধার্থে আমার উটনীটি নিয়ে যাও। এ হচ্ছে খুবই দ্রুতগামী এবং শান্ত স্বভাবের। একে যদি তুমি নিয়ে যাও তোমার হাতের বাইরে ছেড়ে দেবে না। তাছাড়া মক্কার মুশরিকদের পক্ষ হতে কোন ধরনের অনিষ্ট কিংবা অসদাচরণের আশঙ্কা করলে পালিয়ে আসবে।

আইয়াশ (রা) উটনীর ওপর আরোহণ করে তাদের সঙ্গে যাত্রা করলেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর এক জায়গায় আবু জাহেল বললো, 'ভাই আমার এই উট নিয়ে তো খুব অসুবিধায় পড়তে হলো। তুমি কি আমাকে তোমার পেছনে ঐ উটনীর পিঠে বসিয়ে নেবে? আইয়াশ বললেন, 'ঠিক আছে।' অতঃপর তিনি উটনীকে বসিয়ে দিলেন।

তারা দুজনে নিজ নিজ উটকে বসিয়ে দিলো যাতে আবু জাহেল তার উটের পিঠ থেকে নেমে গিয়ে আইয়াশ (রা) এর উটনীর পিঠে গিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তিনজনেই যখন মাটিতে নেমে পড়লো, তখন হঠাৎ তারা দুজনে একত্রে আইয়াশের ওপর আক্রমণ চালালো এবং দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে ফেললো। তারপরে তাঁকে এই বাঁধা অবস্থাতেই দিনের বেলায় মক্কায় নিয়ে এসে মক্কাবাসীকে লক্ষ করে বললো, "হে মক্কাবাসী! আপনারা আপনাদের অবুঝদের সঙ্গে এরূপ করবেন যেমন আমরা আমাদের অবুঝের সঙ্গে করেছি।"

হিশাম ও আইয়াশ (রা) কাফিরদের বন্দিখানায় পড়ে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরত করে যাওয়ার পর একদিন বললেন। "কে এমন আছেন যিনি হিশাম ও আইয়াশকে আমার জন্য ছাড়িয়ে আনবে।" ওয়ালীদ বললেন, 'আমি তাদেরকে আপনার জন্য ছড়িয়ে আনার দায়িত্ব নিলাম।' তারপরে ওয়ালীদ গোপনে মক্কা গমন করলেন। একজন স্ত্রীলোকের (যে তাদের দুজনের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছিল) পিছনে গিয়ে তাদের ঠিকানা বের করলেন। এরা দুজনে একটি ছাদবিহীন গৃহে বন্দি ছিলেন। রাত হলে ওয়ালীদ দেওয়াল ডিঙিয়ে তাঁদের নিকট হাজির হলেন এবং বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে তাঁদেরকে নিয়ে মদিনায় পালিয়ে এলেন।

হিজরতের দৃঢ় ইচ্ছা পোষণকারীদের সম্পর্কে জানতে পেরে মক্কার মুশরিকরা তাঁদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করতো তার তিনটি নমুনা এখানে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও হিজরতের ধারা অব্যাহত থাকল, যার ফলে আকাবার বড়ো অঙ্গীকারের পর মাত্র দুই মাসাধিক কাল অতিক্রান্ত হতে না হতেই রাসূল - আবু বকর (রা) ও আলী (রা) ছাড়া আর কোনো মুসলমানই মক্কায় অবশিষ্ট ছিলেন না। রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশে তাঁরা দুজন মক্কাতেই অবস্থান করছিলেন। অবশ্য আরও এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান মক্কায় ছিলেন। যাদেরকে মুশরিকগণ জোর করে আটকে রেখেছিলো। রাসূল তার মাল-সামানা গোছগাছ করে রেখে যাত্রার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি সহকারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা করছিলেন। আবু বকর (রা) কে ও হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। এটা হচ্ছে লাওয়ার দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি খেজুর বাগানের এলাকা। এরপর মুসলমানেরা মদিনার দিকে হিজরত করলেন। হাবশার সাধারণ মুহাজিররাও মদিনায় হিজরত করলেন। আবুবকরও মদিনায় হিজরতের জন্য জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেললেন। কিন্তু রাসূল তাঁকে বললেন, "ধৈর্যধারণ কর। কেননা, আমি আশা করছি আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া হবে।" আবুবকর (রা) বললেন, 'আপনার জন্য আমার মাতাপিতা উৎসর্গ হোক। আপনার জন্যেও কি হিজরতের অনুমতি আশা করতে পারি?

তিনি বললেন, "হ্যাঁ"। এরপর আবু বকর (রা) থেকে গেলেন যেন রাসূল (ﷺ) এর সাথে সফর করতে পারেন। তাঁর কাছে দুটো উটনী ছিলো। তিনি তাদের চার মাস ধরে ভালোভাবে বাবলা গাছের পাতা খাইয়ে হৃষ্টপুষ্ট করে তুললেন, যাতে তারা অত্যন্ত দ্রুত পথ চলতে পারে।

দারুন নাদওয়াতে কুরাইশদের অধিবেশন

যখন মুসলমানগণ নিজ নিজ ধনসম্পদ ও স্ত্রী পুত্র কন্যাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আউস ও খাযরাজ গোত্রের আবাসিক এলাকায় আশ্রয় নিলেন তখন মুশরিকদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেলো। চরম দুশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণায় তারা এতই অস্থির হয়ে পড়লো যে, ইতোপূর্বে কোনো কারণেই তাদের মধ্যে এত অধিক অস্থিরতা দেখা যায়নি। হিজরতের ব্যাপারটি ছিলো তাদের মূর্তি পূজা, সামাজিক ঐক্যবোধ, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

মুশরিকরা এটা ভালোভাবেই অবগত ছিলো, মুহাম্মদ (ﷺ) এর মধ্যে পূর্ণ নেতৃত্ব দান ও পথ নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে কিরূপ আকর্ষণীয় শক্তি মজুদ রয়েছে। তাছাড়া আউস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে কিরূপ শক্তি সামর্থ্য এবং যুদ্ধ করার যোগ্যতা রয়েছে এবং ওই গোত্র দুটির জ্ঞানীদের মধ্যে সন্ধি ও পরিচ্ছন্নতার কিরূপ উৎসাহ উদ্দীপনা রয়েছে ও কয়েক বছর ধরে পরিচালিত গৃহযুদ্ধের তিক্ততা আস্বাদনের পর এখন কিভাবে নিজেদের মধ্যকার দুঃখ-কষ্ট ও শত্রুতা দূর করতে তারা আগ্রহী।

তারা এটাও অনুধাবন করে ছিলো যে, ইয়েমেন হতে সিরিয়া পর্যন্ত লোহিত সাগরের উপকূল দিয়ে তাদের ব্যবসায় যে জাতীয় সড়ক (রাজপথ) অতিক্রম করছে, তাতে মদিনার সৈনিকদের অবস্থান কতবেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমনি এক স্পর্শকাতর অবস্থায় সম্মুখীন তারা হলো। সে সময় সিরিয়ার সঙ্গে মক্কাবাসীদের ব্যবসা বাণিজ্য ছিলো প্রায় আড়াই লক্ষ দীনার সমতুল্য। এছাড়া ছিলো তায়েফবাসীদের ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যাপার। আর এসব ব্যবসা বাণিজ্য নির্ভর করছিলো বাণিজ্য কাফেলাগুলোর নিরাপত্তা বিধানের ওপর।

এই বর্ণনামতে এটা অনুমান করা মোটেই কঠিন ছিলো না যে, হিজরতকারী মুসলমানদের মদিনায় আগমনের ফলে ইসলামি দাওয়াতের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হলে এবং মদিনাবাসীদেরকে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নেয়ায় সক্ষম হলে, তা হবে মক্কাবাসীদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার। মুশরিকেরা উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলো। কাজেই তারা এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠল। এটা তাদের জানা কথা যে, এই বিপদের মূলসূত্র হচ্ছে ইসলামের দাওয়াত এর পতাকাবাহী হচ্ছেন মুহাম্মদ।

দিবসের প্রথম

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে বলা হয়েছে যে, জিবরাঈল (আ) নবী (ﷺ) এর নিকট এ সভার সংবাদ এনেছিলেন এবং তাঁকে হিজরতের অনুমতির সংবাদ দিলেন। আয়শা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী ঠিক দুপুরে আবু বকর (রা)- কে বললেন; আমাকে হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। পূর্ণ বিবরণ পরে আসছে। আগে মক্কার সংসদ ভবন দারুন নদওয়াতে কুরাইশ-মুশরিকরা গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে বসে। এতে সকল কুরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করে।

এতে আলোচ্য বিষয় ছিলো এমন এক অকাট্য পরিকল্পনা তৈরি করা, যাতে যত শীঘ্র সম্ভব ইসলামি দাওয়াতের পতাকাবাহী নবী কে হত্যার মাধ্যমে ইসলামের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হয়।

এই ভয়াবহ মারমুখী অধিবেশনে যে সকল গোত্রের কুরাইশ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যথাক্রমে-

১. আবু জাহেল বিন হিশাম। - বনী মাখযুম থেকে
২. যুবায়ের বিন মুতঈম, তুয়াইমা বিন আদী, হাশেম বিন আমের। - বনী আবদে শামস বিন আবদে মানাফ থেকে।
৩. শাইবাহ বিন রাবীয়াহ উৎবা বিন রাবীয়াহ, আবু সুফিয়ান বিন হারব। - বনী আব্দুদার থেকে।
৪. নযর বিন হারেস। - বনী আসাদ বিন আব্দুল উযযা থেকে।
৫. আবুল বুখতারী বিন হিশাম, যাযমা বিন আসওয়াদও হাকীম বিন হেযাম। - বনী আসাদ বিন আবদুল উযযা থেকে।
৬. বিন হাজ্জাজ ও মুনাব্বাহ বিন হাজ্জাজ। - বনী সহম থেকে।
৭. উমাইয়া বিন খালফ। - বনী জুমাহ থেকে।

নির্ধারিত সময়ে যখন এই নেতারা দারুন নদওয়ায় পৌঁছলো তখন ইবলীসও সম্ভ্রান্ত পণ্ডিতের রূপ ধরে অত্যন্ত অভিজাত পোশাক পরিহিত অবস্থায় দরজায় দণ্ডায়মান হলো। তাকে দেখে সকলে আপোসে বলাবলি করতে লাগল ইনি কোথাকার শাইখ (পণ্ডিত)?

ইবলিস বলল, "আমি নাজদের শাইখ।" আপনাদের অনুষ্ঠান শুনে উপস্থিত হয়েছি, কথাবার্তা শুনতে চাই এবং সম্ভব হলে প্রয়োজন মাফিক পরামর্শ দিতে চাই। লোকেরা বলল, "বেশ ভালো, আপনি ভিতরে আসুন। এই সুযোগে ইবলীস তাদের সঙ্গে ভিতরে গেলো।

সর্ব-সম্মতিক্রমে নবীকে অন্যায় ভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ

গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আগমনে সভাকক্ষ পরিপূর্ণ হওয়ার পর বিতর্ক সূচনা হলো। অতঃপর প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত আকারে বিতর্ক চলতে থাকল। প্রথমে আবুল আসওয়াদ এ প্রস্তাব পেশ করলো আমরা ঐ লোকটিকে আমাদের ভিতর থেকে বের করে দিই এবং এই শহর থেকে বিতাড়িত করি। সে কোথায় যাবে কিংবা কোথায় থাকবে সে ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে আমাদের আর কোনোই সম্পর্ক থাকবে না। এতে আমাদের আর কোনো সমস্যা থাকবে না এবং পূর্বের অবস্থা আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু শাইখ নাজদী বলল, আল্লাহর কসম এটি সঠিক প্রস্তাব হলো না। তোমরা কি দেখতে পাও না ঐ ব্যক্তির কথা কত চমৎকার এবং বলার ধারা কতটা মধুর। তোমরা দেখ না। কিভাবে সে মানুষের মন জয় করে চলেছে? আল্লাহর শপথ! তোমরা যদি এটা কর তবে সে কোনো আরব গোত্রে গিয়ে আশ্রয় নেবে এবং তাদেরকে নিজ অনুসারী করে নেবে। অতঃপর তাদের সঙ্গে সখ্যতা করে তোমাদের শহরে আক্রমণ চালিয়ে তোমাদের কোনঠাসা করে ফেলবে এবং কঠোর ব্যবহার করবে। তোমরা যে সমাধানের কথা বলছ, তা বাদ দিয়ে অন্য সমাধানের পথ চিন্তা করো।

আবুল বুখতারী বললো, তাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখ। বন্দী অবস্থায় তাঁকে ঘরে আবদ্ধ রেখে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দাও এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতির জন্য (মৃত্যু) অপেক্ষা করতে থাকো। যেমনটি ইতোপূর্বে কবিদের (যুহাইর, নাবেগা ও অন্য) বেলায় হয়েছিলো।

শাইখ নাজদী বললো, না, আল্লাহর কসম! এই প্রস্তাবও তেমন ভালো বলে মনে হচ্ছে না। আল্লাহর শপথ! যদি তোমরা তাকে বন্দী করো যেমনটি তোমরা বলছো, তাহলে তাঁর খবর বন্ধ দরজা দিয়েই বের হয়ে তাঁর সঙ্গীদের নিকট পৌঁছে যাবে। আর তখন তাদের পক্ষে হয়তো এটা অসম্ভব হবে না যে তারা তোমাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে। এরপর তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে তোমাদের একদম কোনঠাসা করে ফেলবে। অতএব এ প্রস্তাবও সমর্থনযোগ্য নয়। ভিন্ন কোনো সমাধানের কথা চিন্তা করা প্রয়োজন।

পর পর দুটো প্রস্তাবই যখন নাকচ হয়ে গেলো তখন শেষে করা হলো ভিন্ন একটি প্রস্তাব। এই প্রস্তাবটি পেশ করল মক্কার সব চাইতে কুখ্যাত ব্যক্তি আবু জাহেল। সে বললো, এ ব্যক্তি মুহাম্মদ (ﷺ) এর সম্পর্কে আমার একটি অভিমত রয়েছে। আমি দেখছি এ যাবৎ তোমরা কেউই সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারনি। লোকেরা বলল, আবুল হাকাম! সেটা কী? আবু জাহেল বললো, 'আমার প্রস্তাব হলো: প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে সুঠামদেহী ও শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করা হোক এবং প্রত্যেককে একটি করে ধারালো তরবারী দেয়া হোক। অতঃপর সকলেই তার দিকে অগ্রসর হোক এবং সকলেই এক সঙ্গে তলোয়ার মেরে তাকে হত্যা করুক। তাহলেই আমরা তার হাত থেকে নিস্তার পেয়ে যাবো। আর এভাবে হত্যা করার ফল হবে যে, রক্তপাতের দায়িত্বটা সকল গোত্রের ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এর একটি বিশেষ সুবিধা হবে বনু আবদে মানাফ সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে সক্ষম হবে না। ফলে তারা দিয়ত (একটি খুনের বদলে একশ শত উট প্রদান) গ্রহণে রাজী হয়ে যাবে এবং আমরা তা আদায় করে দেবো।

শাইখ নাজদী বললো, এই যুবক যে কথা বললো, সেটাই কার্যকর থাকল। যদি আর কোনো প্রস্তাব ও সমর্থনের প্রশ্ন আসে সেক্ষেত্রেও এটাই বহাল থাকবে, অন্যগুলোর তেমন কোনো গুরুত্বই থাকবে না।

দারুন নদওয়ার অধিবেশনে এমনিভাবে এক কাপুরুষোচিত, ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে সে দিনের মতো মুলতবি হয়ে গেলো। আর সদস্যরা এ সিদ্ধান্ত ত্বড়িৎ বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করলো।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হিজরত

আল্লাহ সুবহানল্লাহুর ইচ্ছে ও কুরাইশদের প্রচেষ্টা

তারা তাদের লক্ষ-উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের জন্য এমন জঘন্য পরামর্শ সভা অত্যন্ত গোপনে করে, যাতে কার্যসিদ্ধির আগ পর্যন্ত কেউ জানতে না পারে। তারা তাদের এতদিন যাবৎ প্রতিরোধের ধরনে পরিবর্তন নিয়ে আসে যা পূর্বের সব সিদ্ধান্তের চেয়ে নিতান্ত ভয়াবহও লোমহর্ষক। এটা ছিলো কুরাইশদের চক্রান্ত। যখন রাসূলকে হত্যার পাপময়, ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেলো তখন জিবরাঈল (আ)-মহান ও বরকতময় প্রভুর তরফ থেকে ঐশী বাণী নিয়ে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে কুরাইশ-মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, "আপনার প্রভু মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেছেন। আপনি এ যাবৎ যে শয্যায় শয়ন করে এসেছেন আজ রাত্রে সে শয্যায় শয়ন করবেন না। এ কথার মাধ্যমে হিজরত করার সময় নির্ধারণ করে দেয়া হলো।

হিজরত সংক্রান্ত ঐশী বাণী প্রাপ্ত হওয়ার পর নবী করীম (ﷺ) আবু বকর (রা) এর গৃহে গমন করলেন। উদ্দেশ্যে ছিলো হিজরতের সময় ও বিভিন্ন পন্থা নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, বাড়িতে ঠিক দুপুরে বসেছিলাম। তখন জনৈক ব্যক্তি এসে খবর দিলো নবী (ﷺ) মাথা ঢেকে আগমন করেছেন। এটা দিবাভাগের সময় ছিলো যে সময় রাসূল সাধারণত কোথাও যেতেন না। আবু বকর (রা) বললেন, "আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক, আপনি এ সময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার জন্য আগমন করেছেন?

আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল ভিতরে আসার অনুমতি চাইলেন, তাঁকে ভিতরে আসার অনুমতি দেয়া হলে তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর আবু বকর (রা) কে বললেন, "আপনার কাছে যে সকল লোক রয়েছে তাদের সরিয়ে দিন"।

আবু বকর (রা) বললেন, "যথেষ্ট, আপনার গৃহিণী ছাড়া এখানে আর কেউই নেই। আপনার প্রতি আমার মাতা পিতা কুরবান হোক, হে আল্লাহর বাসূল!

তিনি বললেন, "ভালো। হিজরত করার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আমাকে অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। আবুবকর (রা) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতামাতা উৎসর্গ হোক। রাসূল বললেন: "হ্যা"।

অতঃপর হিজরতের সময় সূচি নির্ধারণ করে রাসূল প্রত্যাবর্তন করলেন এবং রাতের আগমনের প্রতীক্ষায় রইলেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বাড়ি ঘেরাও: রাসূল যখন একদিকে হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকলেন, অন্যদিকে মক্কার পাপিষ্ঠরা দারুন নদওয়া গৃহীত সিদ্ধান্তকে তড়িৎ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাটা দিন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকলো। উদ্দেশ্যে সাধনের জন্য এগারজন পাপীষ্ঠকে নির্বাচন করা হলো। তাদের নাম হচ্ছে-

১. আবু জাহেল বিন হিশাম।
২. হাকাম বিন আস।
৩. উকবা বিন আবু মুয়িত।
৪. ইযার বিন হারেস।
৫. উমাইয়া বিন খালফ।
৬. যাময়াহ বিন আসওয়াদ
৭. তোয়াইমা বিন আদী
৮. আবু লাহাব।
৯. উবাই বিন খালফ।
১০. হুবাইহ বিন হাজ্জাজ এবং তার ভাই।
১১. মুনাব্বহ বিন হাজ্জাজ।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে, দিন শেষে সন্ধ্যার লগ্ন অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন গাঢ় অন্ধকারে চতুর্দিক ছেয়ে গেলো তখন তারা ওঁৎ পেতে নবী (ﷺ) এর বাড়ির দরজায় বসে পড়লো। তাদের উদ্দেশ্যে ছিলো মুহাম্মদ শুয়ে পড়লেই তারা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

তাদের এই ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার ব্যাপারে তাদের আস্থা এতই দৃঢ় ছিলো যে, তাদের ধারণা ছিলো কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা তাকে মেরে ফেলবে। আবু জাহেল চরম অহংকারী। উপহাস ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নবী (ﷺ) এর গৃহ ঘেরাওকারী স্বীয় সঙ্গীদের বললো, "মুহাম্মদ বলেছে, যদি তোমরা তার ধর্মে প্রবেশ করে তার অনুসরণ কর তাহলে অনারবদের ওপর আরবদের শাসন-ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। মৃত্যুর পরে আবার যখন তোমাদের ওঠানো হবে তখন উরুদুনের বাগানসমূহের ন্যায় বাগান দেয়া হবে। আর যদি তোমরা তার নির্দেশ বর্জন করো তাহলে নাকি অনন্ত কাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।"

যাহোক জঘন্যতম এই পাপাচার অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত সময় ছিলো রাতদুপুরের পরক্ষণ। এজন্য তারা রাত জেগে সময় কাটাচ্ছিল এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য প্রতিক্ষারত ছিলো। কিন্তু আল্লাহর ব্যবস্থাই হচ্ছে চূড়ান্ত এবং তাঁর বিজয়ই হচ্ছে প্রকৃত বিজয়। তাঁরই একক এখতিয়ার রয়েছে আসমান ও জমীনের একচ্ছত্র আধিপত্য। তিনি যা চান, তা-ই করেন। তিনি যাঁকে বাঁচাতে চান, কেউই তাঁর কেশগুচ্ছও স্পর্শ করতে পারে না। আবার তিনি যাকে পাকড়াও করতে চান পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে রক্ষা করতে পারে না। উক্ত প্রসঙ্গে নিম্নের আয়াতে রাসূলূল্লাহ কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে-

ঐ সময়কে স্মরণ করো, যখন কাফেরগণ তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলো এ জন্য যে, তোমাকে বন্দী করবে, অথবা হত্যা করবে অথবা বিতাড়িত করবে। আর নিজেদের তদবির করছিলো এবং আল্লাহ স্বীয় তদবির করছিলেন আর আল্লাহ হচ্ছেন সর্বাধিক উত্তম তদবিরকারক। (সূরা আনফাল: আয়াত-৩০)

হিজরতের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) এর গৃহত্যাগ

কুরাইশ-মুশরিকরা তাদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েও চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গেলো। রাসূল্লাহ আলী (রা) কে বললেন, তুমি আমার এই সবুজ চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় ঘুমিয়ে থাক। তারা তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। আলী (রা) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চাদর গায়ে দিয়েই শুয়ে থাকলেন।

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) গৃহের বাইরে গমন করলেন এবং মুশরিকদের কাতার ফাঁক করে এক মুষ্টি কংকরযুক্ত মাটি নিয়ে তাদের মাথার ওপর ছিটিয়ে দিলেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের দৃষ্টি ধরে রাখলেন, যার ফলে তারা রাসূলুল্লাহকে আর দেখতে পেলো না। এ সময় তিনি এই আয়াত পাঠ করছিলেন-

আমি তাদের সম্মুখে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করালাম এবং তাদের পিছনে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করালাম। অতঃপর আমি তাদের আচ্ছন্ন করে ফেললাম এবং তারা দেখতে পেল না।

এ সময় এমন কোনো মুশরিক বাকি ছিলো না, যার মাথায় তিনি মাটি নিক্ষেপ করেন নি। এর পর তিনি আবু বকরের গৃহে গমন করলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে সঙ্গে নিয়ে ইয়েমেন অভিমুখে যাত্রা করলেন। অতঃপর রাতের অন্ধকার থাকতেই তাঁরা মক্কা থেকে কয়েক মাইল দূরের "সওর" নামক পবর্ত গুহায় গিয়ে পৌঁছলেন।

এদিকে ঘেরাওকারীরা হত্যাকান্ডের উন্মুখতায় উম্মত্ত হয়ে সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষায় প্রহর গুণতে থাকল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই তাদের ব্যর্থতার কথা অবগত হয়ে তারা একদম হতচকিত হয়ে পড়ল। ব্যাপারটি ছিলো এক লোক এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলো না। সে তাদেরকে রাসূল (ﷺ) এর গৃহের চারদিকে অপেক্ষমান দেখে বললো, তোমরা কি জন্য এখানে অপেক্ষা করছ?

তারা বলল, আমরা মহম্মদকে শুধু খতম করার অপেক্ষায় রয়েছি। সে বললো, "উদ্দেশ্যে সাধনে তোমরা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছো। আল্লাহর কসম! কিছুক্ষণ পূর্বে মুহাম্মদ তোমাদের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। যাবার পূর্বে তিনি তোমাদের মাথার ওপর এক মুষ্টি মাটি ছিটিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।"

তারা বললো, "আল্লাহর কসম! আমরাতো তাকে দেখিনি। এই বলে তারা মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে দাঁড়িয়ে গেলো। এর পর দারুণ হতাশা ও ক্রোধের সঙ্গে তারা দরজার ফাঁক-ফোক দিয়ে গৃহের মধ্যে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে থাকল। চাদর জড়ানো অবস্থায় শায়িত আলী (রা) এর প্রতি দৃষ্টি গেলে তারা বলতে লাগল "খোদার কসম! এই তো মুহাম্মদ শুয়ে আছে"। তিনি শুয়ে আছেন এই ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়েই তারা সেখানে সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। এদিকে যখন সকাল হলো এবং আলী (রা) বিছানা ছেড়ে ওঠলেন তখন তারা বুঝতে পারল, সত্যি সত্যিই মুহাম্মদ নেই। তারা অত্যন্ত রাগান্বিত এবং বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে আলীকে জিজ্ঞেস করল- "মুহাম্মদ নেই "কোথায়?" আলী বললেন, 'আমি জানি না"।

গৃহ থেকে গুহা পর্যন্ত

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সফরের এই সময়টা চতুর্দশ নবুয়ত বর্ষের সময় হবে যখন বছর আরম্ভ হবে মুহাররম মাসে। আর যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে মাসে নবুয়াত প্রাপ্ত হয়েছিলেন সে মাস থেকে বছর গণনা করা হয়ে থাকে তাহলে তা ছিলো নবুয়ত প্রাপ্তির ক্রয়োদশ বর্ষের সফর মাসে। সাধারণ ইতিহাসবিদগণ প্রথম হিসাবটি গ্রহণ করেছেন। আর যাঁরা দ্বিতীয়টি গ্রহণ করেছেন, তাঁরা ঘটনার তারিখে ভুল করেছেন। আমি মুহররম থেকে বছরের শুরু ধরেছি।

মধ্যরাতের সামান্য কিছু সময় পর নিজ ঘর থেকে বের হয়ে জান-মালের ব্যাপারে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী আবু বকর (রা) এর ঘরে যান এবং সেখান থেকে পিছনের একটি জানালা দিয়ে বের হয়ে দুজনেই পথ বেয়ে অগ্রসর হতে থাকেন, যাতে রাতের অন্ধকার থাকতেই তারা মক্কা নগরীর বাইরে চলে যেতে সক্ষম হন। কারণ, রাসূল জানতেন যে কুরাইশগণ তাঁকে দেখতে না পেয়ে তারা সর্বশক্তি দিয়ে তার সন্ধানে লেগে পড়বে এবং সর্বপ্রথম যে রাস্তায় দৃষ্টি দেবে তা হচ্ছে মদিনার কর্মব্যস্ত রাস্তা যা উত্তর দিকে গেছে। এ জন্য তাঁরা সেই পথে যেতে থাকলেন- যে পথটি ছিলো সে পথের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। অর্থাৎ ইয়েমেন যাওয়ার পথ, যা মক্কার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ছিলো। সে পথ ধরে পাঁচ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে তারা সুপ্রসিদ্ধ 'সত্তর' পর্বতের পাদদেশে গিয়ে পৌঁছলেন। এই পর্বতটি ছিলো খুব উঁচু, পর্বত-শীর্ষে আরোহণের পথ ছিলো আকাঁ-বাকা ও প্যাঁচানো। আরোহণের ব্যাপারটিও ছিলো অত্যন্ত কষ্ট-সাধ্য। এই পর্বত গাত্রের এখানে সেখানে ছিলো প্রচুর ধারালো পাথর যা রাসূল (ﷺ) এর পা দুখানিকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছিলো। বর্ণিত আছে তিনি পদচিহ্ন গোপন করার জন্য আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে চলছিলেন। এজন্য তাঁর পা জখম হয়ে গিয়েছিলো। যাহোক, আবু বকর (রা) এর সহায়তায় তিনি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত গুহার পাশে গিয়ে পৌঁছলেন। এই গুহাটিই ইতিহাসে 'গারে সত্তর' বা 'সত্তর গুহা' নামে পরিচিত।

গুহায় প্রবেশ

গুহার কাছে উপস্থিত হয়ে আবু বকর (রা) বললেন, "আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি এখন গুহায় প্রবেশ করবেন না। প্রথমে আমি প্রবেশ করে দেখে নিই, এখানে অসুবিধাজনক কোনো কিছু আছে কি না। যদি তেমন কিছু থাকে তাহলে প্রথমে তা আমার সম্মুখীন হবে এবং এর ফলে আপনাকে প্রাথমিক অসুবিধার সম্মুধীন হতে হবে না। একথা বলার পর আবু বকর (রা) গুহার ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং প্রথমে গর্তটি পরিষ্কার করে নিলেন। গর্তের এক পাশে কতগুলো ছিদ্র ছিলো। নিজের কাপড় টুকরো টুকরো করে তিনি ছিদ্রপথের মুখগুলো বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু কাপড়ের টুকরোর ঘাটতির কারণে দুটো ছিদ্রের মুখ বন্ধ করা সম্ভব হলো না। আবু বকর (রা) ছিদ্র দুটোর মুখে নিজ দুই পা রেখে ভেতরে আসার জন্য রাসূলূল্লাহ এর নিকট নিবেদন করলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করে আবু বকরের উরুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।

এদিকে আবু বকরের পায়ের নিচে গর্তে থাকা সাপ কিংবা বিচ্ছু কোনো কিছুতে দংশন করল। তিনি বিষে কাতর হয়ে ওঠলেন অথচ নড়াচড়া করলেন না এই ভয়ে যে এর ফলে রাসূল (ﷺ) এর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে। এদিকে বিষের তীব্রতায় তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে থাকল এবং সেই অশ্রু বিন্দু ঝরে পড়ল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সারা মুখমণ্ডলের ওপর। এর ফলে তাঁর ঘুম ভেঙে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর। তোমার কী হয়েছে"

তিনি নিবেদন করলেন, আমার মাতা-পিতা আপনার জন্য কুরবান হউক, গর্তের ছিদ্র পথে কোনো কিছু আমার পায়ে কামড় দিয়েছে। এ কথা শুনে রাসূল নিজের মুখ থেকে কিছুটা লালা নিয়ে সেই ক্ষতস্থানে লগিয়ে দিলেন। ফলে আবু বকর (রা) এর দংশন জনিত বিষব্যথা দূরীভূত হলো।

এ পর্বত গুহায় তাঁরা উভয়ে একাধিক্রমে তিন রাত্রি (শুক্র, শনি ও রবিবার রাত্রি) অবস্থান করলেন।

আবু বকর (রা) এর পুত্র আব্দুল্লাহও ঐ সময় একই সঙ্গে সেখানে রাত্রি যাপন করতেন। আয়েশা (রা) এর বর্ণনা মতে, আব্দুলল্লাহ ছিলেন একজন কর্মঠ, বুদ্ধিমান ও ধীশক্তি সম্পন্ন যুবক। সকলের অগোচরে রাত গভীর হলে তিনি সেখানে যেতেন এবং সাহরী সময়ের পূর্বেই মক্কায় ফিরে এসে মক্কাবাসীগণের সঙ্গে মিলিত হতেন। এতে মনে হতো যেন তিনি মক্কাতেই রাত্রি যাপন করেছেন। গুহায় আত্মগোপনকারীদের বিরুদ্ধে মুশরিকরা যে সকল ষড়যন্ত্র করত তা অত্যন্ত সঙ্গোপনে তিনি তাঁদের নিকট পৌঁছে দিতেন।

এদিকে আবু বকর (রা) এর গোলাম আমের বিন ফুহাইরা পর্বত ময়দানে ছাগল চরাত এবং যখন রাত্রির এক অংশ অতিবাহিত হয়ে যেত তখন সে ছাগল নিয়ে গারে সত্তরের কাছে চলে যেত এবং আত্মগোপনকারী নবী এবং তাঁর সাহাবী কে দুগ্ধ পান করাত। আবার সকাল হওয়ার আগেই প্রভাতকালে সে ছাগলের পাল নিয়ে দূরে চলে যেত। পর পর তিন রাতই সে এরূপ করল।

অধিকন্তু, আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের গমনাগমন পথে তাঁর পদচিহ্নগুলো যাতে মিশে যায়। তার জন্য আমের বিন ফুহাইরা সেই পথে ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে যেতো।

কুরাইশদের প্রচেষ্টা

এ দিকে কুরাইশদের অবস্থা এ ছিলো যে, রাসূলুল্লাহকে হত্যার উম্মাদনায় উম্মত্ত অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করার পর প্রভাতে যখন তারা নিশ্চিতভাবে জানতে পারল যে, তিনি তাদের কবজার বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন, তখন তারা একদম দিশেহারা হয়ে পড়লো এবং ক্রোধের অতিশয্যে ফেটে পড়লো। তাদের প্রথম শিকার হলেন আলী (রা)। তাঁকে টেনে হিচড়ে কাবা ঘর পর্যন্ত নিয়ে গেল এবং প্রায় এক ঘন্টা কাল যাবৎ তাঁর ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাল, যাতে তার কাছ থেকে তাঁদের দু'জন সম্পর্কে কিছুটা খোঁজ খবর-সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কোনো সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় আবু বকর (রা) এর ঘরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল এবং সেখানে গিয়ে দরজায় করাঘাত করল। দরজার করাঘাত শুনে আসমা বিনতে আবু বকর (রা) বের হলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার পিতা কোথায় আছেন?" তিনি বললেন, "আল্লাহই ভালো জানেন। আমি জানি না, আব্বা কোথায় আছেন? এতে কমবখত আবু জাহেল তাঁর গালে এমন জোরে চড় মারলো যে, সে ব্যথার চোটে চিৎকার করে ওঠল এবং তার কানের দুল খুলে পড়ে গেলো।

এরপর কুরাইশরা তড়িঘড়ি একটি সভা করে সর্ব-সম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিল যে, তাঁদের ধরার জন্য অনতিবিলম্বে সম্ভাব্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন করা হোক। ফলে মক্কা থেকে বেরিয়ে যে দিকে যত পথ গিয়েছে সর্ব পথেই অত্যন্ত কড়া সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে দেয়া হলো। অধিকন্তু সর্বত্র এই ঘোষণা প্রচার করে দেয়া হলো যে, যদি কেউ মুহাম্মদ এবং আবু বকর (রা) কে অথবা দুজনের যে কোনো একজনকে জীবন্ত কিংবা মৃত অবস্থায় হাজির করবে তাহলে তাকে একশত উটের সমান মূল্যবান একটি পুরস্কার প্রদান করা হবে।

এ প্রচারণার ফলে বিভিন্ন ভ্রমণকারী, পদাতিক ও পদচিহ্ন বিশারদরা অত্যন্ত জোরে শোরে অনুসন্ধান কার্য শুরু করে দিল। প্রান্তর, পর্বতমালা, শস্যভূমি, বিরান অঞ্চল সর্বত্রই তারা অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকল, কিন্তু ফল হলো না কিছুই।

রাসূল ও আবু বকর যে পর্বত গুহায় আত্মগোপন করে ছিলেন অনুসন্ধান কারীরা সেই গুহার প্রবেশ পথের পার্শ্বদেশে পৌছে গেলো। কিন্তু আল্লাহ আপন কাজে জয়ী হলেন। সহিহ বুখারি শরীফে আনাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, "আবু বকর রাসূলুল্লাহকে বলেছেন, "আমি ভয় পেলাম।"

আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী তাদের মধ্যে কেউ যদি শুধু নিজ দৃষ্টি নিচের দিকে নামায় তাহলেই আমাদেরকে দেখে ফেলবে।

তিনি বললেন, "আবুবকর। চুপচাপ থাক। আমরা দুজন, আর তৃতীয় জন হলেন আল্লাহ।" অন্য একটি বর্ণনার ভাষা এরূপ আছে, "হে আবু বকর! এরূপ দুজন লোক সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ।"

প্রকৃত কথা হচ্ছে এই যে, এটি ছিলো একটি মোজেযা (অলৌকিক ঘটনা), যা আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রদান করেছিলেন। কাজেই অনুসন্ধানকারীরা সে সময় ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হলো যেখানে রাসূল ও তাদের মধ্যে ব্যবধান ছিলো কয়েক ফুটেরও কম।

মদিনার পথে

তিনদিন যাবৎ নিস্ফল দৌড়ঝাঁপ এবং খোঁজা-খুঁজির পর যখন কুরাইশদের আকস্মিক প্রজ্জ্বলিত ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় অনুসন্ধান কার্যের মাত্রা হালকা হয়ে গেল, এবং তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ল তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এবং আবু বকর (রা) মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হলেন। আব্দুল্লাহ বিন আরীকাত লাইসী যিনি জনমানব শূন্য পথ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন, মদিনায় পৌঁছে দেয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে চুক্তি ও মজুরি নির্ধারিত হয়েছিলো এবং তার নিকট দুটি বাহনও রাখা হয়েছিলো। যে তখনো কুরাইশ মূর্তিপূজকদের দলভুক্ত থাকলেও পথ প্রদর্শক হিসেবে তাঁর ওপর নির্ভর করার ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিলো না। তাঁর সঙ্গে এ মর্মে কথাবার্তা ছিলো, তিন রাত্রি অতিবাহিত হওয়ার পর চতুর্থ রাত্রিতে বাহন দুটো নিয়ে তাকে গারে সত্তরে পৌঁছতে হবে। কথামত সোমবার দিবাগত রাতে তিনি বাহন দুটো নিয়ে উপস্থিত হলেন। সেটি ছিলো ১ম হিজরি সনের রবিউল আওয়াল মাসের চাঁদনী রাত (১৬ ই সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ) যখন তিনি বাহন দুটো নিয়ে উপস্থিত হলেন তখন আবু বকর (রা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাহন দুটোর মধ্যে একটি আপনি গ্রহণ করুন। রাসূল বললেন, মূল্যের বিনিময়ে।

এদিকে আসমা বিনতে আবু বকর (রা) সফরের সামগ্রী নিয়ে এলেন। এরপর রাসূল ও আবু বকর উটে আরোহণ করলেন। আমর বিন ফুহায়রাও সঙ্গে ছিলেন। পথ প্রদর্শক আব্দুল্লাহ বিন আরীকাত মদিনা যাত্রার সাধারণ পথে না গিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলের পথ ধরলেন। সর্বপ্রথম সত্তর গুহা হতে যাত্রা শুরু করে তিনি (পথ-প্রদর্শক) ইয়েমেনের পথে যাত্রা করলেন এবং দক্ষিণ দিকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তারপরে পশ্চিম দিকে ঘুরে সমুদ্র উপকূলের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপরে এমন এক পথে নিয়ে গেলেন, যে পথের সন্ধান সাধারণ লোকেরা জানত না। এরপর উত্তর দিকে মোড় নিলেন, যে পথ লোহিত সাগরের খুব কাছাকাছি ছিলো। এ পথে খুব অল্প মানুষ চলাচল করত।

এরপর রাসূল এই পথে যে সকল স্থান দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন ইবনে ইসহাক তার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন পথপ্রদর্শক যখন তাদের দুজনকে নিয়ে বের হলেন তখন মক্কার নিম্নভূমি অঞ্চল দিয়ে নিয়ে গেলেন এরপর উপকূল দিয়ে চলতে চলতে আসফানের নিম্ন অঞ্চল দিয়ে গেলেন। এরপর আমাদের নিম্নভূমি হয়ে এগিয়ে চললেন এবং কুদাইদ পার হলেন।

তারপর সান্নয়াতুল মুররাহ দিয়ে তারপরে লিফ দিয়ে তারপরে লিক্বফের বিস্তৃত ভূমি অতিক্রম করেন। অতঃপর হেজাজের বিস্তীর্ণ ভূমিতে পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে মুজাহের মোড় দিয়ে অতিক্রম করেন অতঃপর যুলগযওয়াইনের মোড়ের শস্য শ্যামল ভূমিতে যান। তারপরে কেশরার মাঠে প্রবেশ করে জ্বদাজাদের দিকে যান এবং সেখান থেকে আজাদে পৌঁছেন। এরপর তা'হানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাশ দিয়ে যু'সালাম অতিক্রম করেন। সেখান থেকে আবীদ তারপরে ফাজা অভিমুখে যাত্রা করেন। তারপরে রকুবার ডানপার্শ্ব দিয়ে সানিয়াতুল আয়েরে গেলেন এবং রিম উপত্যকায় অবতরণ করেন। এরপরই কুবায় গিয়ে পৌঁছলেন।

পথে ঘটিত কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা

১. সহিহ বুখারি শরীফে আবু বকর সিদ্দীক (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, "আমরা (গারে সত্তর থেকে বেরিয়ে) একটানা সারা রাত এবং পরের দিন দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকলাম। রোদের প্রখরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে পথচারীর সংখ্যা কমতে থাকল এবং পাথরের ছায়ায় তখনো রোদ আসেনি। আমরা সেখানে অবতরণ করলাম। আমি নিজ হাতে রাসূল (ﷺ) এর শয়নের জন্য একটি জায়গা সমতল করে দিলাম এবং সেখানে একটি চাঁদর পেতে দিয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এখানে শয়ন করুন আর আমি সামনে ও পেছনের খোঁজ-খবর নিতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ লক্ষ করলাম একজন রাখাল তার ছাগলের পাল নিয়ে পাথরের দিকে চলে আসছে। সেই পাথর থেকে সেও ঐ জিনিসই চাচ্ছে, যা আমরা চেয়েছিলাম ছায়া। আমি তাকে বললাম, "হে যুবক তুমি কার লোক?

সে মক্কা অথবা মদিনার কোনো লোকের কথা বলল। আমি তাকে বললাম তোমার ছাগীর ওলানে কি কিছু দুধ আছে"? সে বললো, হ্যাঁ"। আমি পুনরায় বললাম, "সেটি কি দোহন করতে পারি? " সে বলল, "হ্যাঁ"। অতঃপর সে একটি ছাগী ধরে নিয়ে এল। আমি বললাম, "মাটি, খড়কুটো এবং লোম থেকে ওলানটা পরিষ্কার করে নাও। পরিষ্কার করে নেয়ার পর একটি পেয়ালার অল্প কিছু দুধ দোহন করল। আর দুধটুকু আমি একটি চামড়ার পাত্রে ঢেলে নিলাম। রাসূল (ﷺ) এর পানি এবং ওযুর জন্য ঐ পাত্রটি আমি সঙ্গে নিয়েছিলাম। দুধ-পাত্র হস্তে রাসূল (ﷺ) এর নিকট আমি এসে দেখি তখনো তিনি ঘুমিয়ে আছেন।

কাজেই, তাকে ঘুম থেকে জাগানোর সাহস হলো না। অতঃপর যখন তিনি জাগ্রত হলেন, তখন আমি দুধের মধ্যে কিছুটা পানি ঢেলে দিলাম যাতে দুধের তলাদেশ হয়ে যায় এবং বললাম "হে আল্লাহর রাসূল! এই দুধটুকু পান করুন।" তিনি পান করলেন। তাকে পান করানোর সুযোগ প্রদানের জন্য আনন্দ-চিত্তে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলাম।

দুধ পানের পর রাসূল বললেন, "এখনো কি যাত্রার সময় হয়নি?" আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! কেন হবে না, যাত্রার উপযুক্ত সময় হয়েছে।" অতঃপর আমরা পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম।

২. আবু বকর (রা) সাধারণত সফরে রাসূল্লাহর (ﷺ) এর পিছনে বসতেন। তিনি পিছনে বসতেন এই কারণে যে তার মধ্যে বার্ধক্যের চিহ্ন প্রকাশ পেয়েছিলো এবং মানুষের দৃষ্টি প্রথমেই তার ওপরেই পড়তো। রাসূল (ﷺ) এর মধ্যে তখনো যৌবনের চিহ্ন পরিস্ফুট ছিলো। এজন্য তাঁর প্রতি মানুষের দৃষ্টি অপেক্ষাকৃত কম যেতো। এর ফল ছিলো এই যে, কোনো লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে সে আবু বকর (রা) কে জিজ্ঞেস করত, আপনার সম্মুখের লোকটি কে? আবু বকর (রা)-তাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উত্তর প্রদান করতেন। বলতেন, এই লোকটি আমাকে পথ বলে দিচ্ছেন। এতে লোকেরা সহজভাবে পথের কথাই বুঝতেন। কিন্তু এই কথার মাধ্যমে তিনি কল্যাণের পথকেই বোঝাতে চেয়েছেন।

৩. মদিনা সফরকালে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খোযায়া গোত্রের উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। ইনি একজন নামকরা স্বাস্থ্যবান মহিলা ছিলেন। হাতে পট ধারণ করে তাঁবুতে বসে থাকতেন ও মুসাফিরদেরকে পানাহার করাতেন। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নিকট কিছু আছে কি? তিনি বললেন, আমার নিকট যদি কিছু থাকতো, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে, আপনাদের মেহমানদারীতে কোনো প্রকার ত্রুটি হতো না। ঘরে তেমন কিছুই নেই, বকরিগুলোও রয়েছে দূর-দুরান্তে। সময়টা ছিলো দুর্ভিক্ষ-কবলিত। রাসূল দেখলেন তাঁবুর এক কোণে একটি বকরি রয়েছে। তিনি বললেন, "হে উম্মে মা'বাদ, এটা কেমন বকরি? মহিলা বললেন, দুর্বলতার কারণে ওকে দলের বাইরে রাখা হয়েছে। নবী বললেন ওর ওলানে কি কিছু দুধ আছে? তিনি বললেন, দুধ দেয়ার মতো তার কোনো শক্তিই নেই। নবীজী বললেন, "অনুমতি দিলে আমি তাকে দোহন করি"।

মহিলা বললেন, হ্যাঁ, আমার মাতা পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। যদি আপনি ওলানে দুধ দেখতে পান তবে অবশ্যই দোহন করবেন। এই কথাবার্তার পর রাসূল বকরিটির ওলানের ওপর হাত ফিরালেন আল্লাহর নাম নিলেন এবং দু'আ করলেন। অতঃপর তার ওলান দুধে ভরপুর হয়ে ওঠলো।

রাসূল উম্মে মা'বাদের বেশ বড়ো আকারের একটি পাত্র নিলেন এবং এত পরিমাণ দুধ দোহন করলেন যে, দুধের ফেনা পাত্রের ওপরে উঠে গেলো। দুধ দোহনের পর তিনি উম্মে মা'বাদকে পান করালেন। তিনি দুগ্ধপানে পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হলেন। অতঃপর সঙ্গী-সাথিদের পান করালেন। পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে সকলকে পান করানোর পর তিনি নিজে পান করলেন। দ্বিতীয়বারেও তিনি এত পরিমাণ দুধ দোহন করলেন যে পাত্র ভরে গেল। সে দুধ উম্মে মাবাদের নিকট রেখে দিয়ে তিনি সঙ্গীদেরসহ মদিনার পথে অগ্রসর হলেন।

কিছুক্ষণ পর তাঁর স্বামী আবু মা'বাদ সেখানে এসে পৌঁছলেন। পাত্রে দুধ দেখে তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁর সহধর্মিণীকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তুমি কোথায় পেলে? দুগ্ধবতী বকরিগুলো দূর চারণভূমিতে ছিলো এবং বাড়িতে কোনো দুগ্ধবতী বকরিই ছিলো না। সেক্ষেত্রে পাত্রে এত দুধ এল কোত্থেকে?

স্ত্রী উম্মে মা'বাদ তাঁর স্বামীকে সেই বরকতময় মেহমানের কথা জানালেন। যিনি পথ চলার সময় তাঁর গৃহে আগমন করেন এবং যা ঘটেছিলো তা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। সে কথা শুনে আবু মা'বাদ বলল, "এতো ঠিক সেই লোক বলে মনে হচ্ছে, যাঁকে কুরাইশরা খুঁজে বেড়াচ্ছে।" আবু মা'বাদ পুনরায় তাঁর স্ত্রীকে বললেন, "আচ্ছা তাঁর আকৃতি প্রকৃতি বর্ণনা করো দেখি।

উম্মে মা'বাদ অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তার গুণাবলি ও যোগ্যতার এমন একটি নকশা অংকন করলেন, তাতে মনে হলো শ্রোতা যেন তাঁকে চোখের সম্মুখেই দেখছেন। তিনি বললেন আমার ইচ্ছা তাঁর বন্ধত্ব গ্রহণ করি এবং যদি কোনো পথ পাই তাহলে অবশ্যই তা করব।

এদিকে মক্কায় একটি বাক্য ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মানুষ শুনতে পাচ্ছে কিন্তু বক্তাকে দেখতে পাচ্ছে না। কথাগুলো ছিলো এরূপ-

আরশের প্রভু আল্লাহ ঐ দুই বন্ধুকে উত্তম পুরস্কার দেন, যারা উম্মে মা'বাদের তাবুতে অবতরণ করেছিলেন। তারা দুজনে কল্যাণের সঙ্গে অবতরণ করেছেন এবং কল্যাণের সঙ্গে গমন করেছেন। যিনি মুহাম্মদ (ﷺ) এর বন্ধু হয়েছেন তিনি সফলকাম হয়েছেন। হায় কুসাই! আল্লাহ তোমদের থেকে কত নজিরবিহীন কার্যকলাপ ও নেতৃত্ব গুটিয়ে নিয়ে তাদেরকে অর্থাৎ বনু কা'বদেরকে দিয়েছেন। ওদের মহিলাদের অবস্থানস্থল এবং ঘর-বাড়ি মুমিনদের সেনাচৌকী হওয়াতে বনু কা'ব বরকতময় হোক। তোমরা নিজ ভগ্নিকে তাঁর পাত্র এবং বকরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো। তুমি যদি স্বয়ং বকরিদেরকেও জিজ্ঞেস কর, তবে সেগুলো ও সাক্ষ্য দেবে।

আসমা (রা) বলেছেন, "তারা দেখতে পেল না যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আর কোন মানুষ তার পিছনে পিছনে চলছিলো। আর কথা শুনছিলো, কিন্তু তাকে কেউই দেখতে পাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে মক্কার উচ্চ ভূমি থেকে বের হয়ে গেল।

তিনি বলেন, "আমরা যখন তাঁর কথা শুনলাম, তখন বুঝতে পারলাম রাসূল কোন দিকে গমন করেছেন। অর্থাৎ তিনি গমন করেছেন মদিনার দিকে।

৪. সূরাকা বিন মালেক পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহর পিছু ধাওয়া করে। এই ঘটনা সূরাকা নিজেই বর্ণনা করেছে। তিনি বলছেন, "আমি নিজ সম্প্রদায় বনী মুদলেজের এক সভায় বসা ছিলাম। ইতোমধ্যে একজন লোক আমার পাশে এসে দাঁড়াল। সে বলল, "হে সূরাকা! আমি কিছুক্ষণ পূর্বে উপস্থলে কিছু সংখ্যক লোককে দেখলাম। আমার ধারণা তাঁরাই হবেন মুহাম্মদ ও তার সঙ্গীগণ"।

"এরপর সভাস্থলে সামান্য সময় অপেক্ষা করে অন্দরমহলে চলে গেলাম এবং দাসীকে নির্দেশ দিলাম আস্তাবল থেকে আমার ঘোড়াটি বের করে পেছনে আমার জন্য অপেক্ষা করতে। আর আমি তীর নিয়ে বাড়ির পেছন দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এ সময় আমার হাতের লাঠিটির এক মাথা মাটির সঙ্গে ঘষা খাচ্ছিল এবং অন্য মাথা নিচু করে রাখা ছিলো। এই অবস্থায় আমি ঘোড়ার ওপর আরোহণ করালাম। অতঃপর লোকটির কথিক দিক লক্ষ করে ঘোড়া হাকিয়ে চললাম।" বনু খেয়ার আবাদী আবাসস্থানের প্রতি দৃষ্টি রেখে এ কথাই অধিক গ্রহণযোগ্য যে, এই ঘটনাটি গারে সত্তর থেকে যাত্রার ২য় দিনে সংঘটিত হয়েছিলো।

আমি দেখলাম ঘোড়াটি আমাকে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে ছুটছে। এক পর্যায়ে আমি তাদের নিকটবর্তী হয়ে গেলাম, কিন্তু আকস্মিকভাবে আমার ঘোড়ার পা পিছলে যাওয়ায় আমি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলাম। আমি উঠে তাদের দিকে হাত বাড়ালাম এবং পাশার তীর বের করে জানতে চাইলাম, তাঁকে ফেলতে পারবো কিনা। কিন্তু যে তীরটি বেরিয়ে আসল, সেটা আমার অপছন্দনীয়। আমি তীরের সাংকেতিক অভিব্যক্তি এড়িয়ে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করলাম। ঘোড়াটি আমাকে নিয়ে ছুটতে লাগল এবং এক পর্যায়ে নবী - এর কন্ঠ-নিঃসৃত কুরআন পাঠ আমার কানে আসল। তিনি এক মুহূর্তের জন্য পিছন ফিরে তাকাননি। কিন্তু আবু বকর (রা) বার বার পিছন ফিরে তাকাচ্ছিলেন।

আর সামান্য পথ অতিক্রম করলেই তাঁদের পথরোধ করতে পারি, এমন এক অবস্থায় আকস্মিকভাবে আমার ঘোড়ার পা হাঁটু পর্যন্ত বালুতে ডেবে গেল। এতে আমি তার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম। আমি অবস্থাটা সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য ঘোড়াটিকে ধমকা-ধমকি শুরু করলাম। আমার ধমক খেয়ে সে ওঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু সহজে তা পারল না। অবশেষে অনেক কষ্টে সে পা টেনে বের করল। যখন দাঁড়াল তখন তার পদচিহ্ন থেকে আসমানের দিকে ধোঁয়ার মতো ধূলি সৃষ্টি হলো।

আমি আবার পাশার তীর থেকে আমার ভাগ্যান্বেষণের ইঙ্গিত সম্পর্কে জানতে চাইলাম। কিন্তু আবার ঐ তীরটিই বের হলো, যা আমার অপছন্দনীয় ছিলো। এরপর আমি তাঁদের নিরাপত্তার অবকাশ দিলে তাঁরা থেমে গেলেন। আমি ঘোড়া থামিয়ে তাঁদের নিকট পৌঁছলাম। যখন আমি তাঁদেরকে থামিয়ে ছিলাম তখনই আমার মনে এ কথাটা গেঁথে গিয়েছিলো যে, মুহাম্মদ-ই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন। এজন্য আমি তাকে বললাম যে, "আপনার সম্প্রদায় আপনার প্রাণের বিনিময়ে পুরস্কার ঘোষণা করেছে" এবং ঐ কথার সূত্রেই আমি তাঁকে মানুষের মনোভাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিলাম। অধিকন্তু, কিছু খাদ্য-সামগ্রী এবং আসবাবপত্রেরও ব্যবস্থা করে দিতে চাইলাম। কিন্তু আমার কাছ থেকে কোনো কিছুই গ্রহণ করলেন না এবং আমাকে কোনো প্রশ্নও জিজ্ঞেস করলেন না। শুধু এই টুকুই বললেন, "আমাদের ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করবেন।" আমি নিবেদন করলাম, "আমাকে নিরাপত্তার ব্যাপারে লিখে দিন"।

তিনি আমের বিন ফুহাইরাকে তা লিখে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলে তিনি এক টুকরো চামড়ার ওপর তা লিখে আমার হাতে দিলেন। অতঃপর নবী এর দল সম্মুখ পানে অগ্রসর হলো।

বনী মুদলিজদের বাড়ির নিকটবর্তী ছিলো সূরাকা সেই সময় নবীজী এর অনুসন্ধানে রত হয়েছিলেন। যখন তিনি কুদাইদ থেকে ওপরে যাচ্ছিলেন।

এ ঘটনা সম্পর্কে স্বয়ং আবু বকর (রা) এর এক রেওয়ায়েতে এর বর্ণনা রয়েছে, "আমাদের যাত্রার পর আমাদের স্বগোত্রীয় লোকজন অনুসন্ধানে তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু সূরাকা বিন মালেক বিন জু'শুম ছাড়া যারা নিজ ঘোড়ায় উঠে ছিলো, তারা কেউই আমাদের নাগাল পায়নি। আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল পশ্চাদানুসারীগণ আমাদের পেয়ে যাবে।"

রাসূল বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই, আল্লাহ আমাদের সঙ্গেই আছেন।

যা হোক সূরাকা প্রত্যাবর্তন করে দেখে লোকজন সব হন্যে হয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। সে তাদের বলল, "এ দিকের খোঁজ খবর আমি নিয়েছি। এদিকে তোমাদের যা কাজ ছিলো, তা যথারীতি করা হয়েছে। এভাবে সে লোকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেল। দিনের প্রথম ভাগে যে ছিলো আক্রমণকারী শত্রু, দিনের শেষ ভাগে সেই হলো জীবন রক্ষাকারী বন্ধু।

৫. পথে রাসূল (ﷺ) এর ছোট কাফেলার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় বুরাইদা আসলামীর। সে ছিলো নিজ সম্প্রদায়ের নেতা এবং শক্তিমান পুরুষ। কুরাইশ নেতাগণ কর্তৃক ঘোষিত বিরাট অংকের পুরস্কারের লোভে সে বেরিয়েছে রাসূল এবং আবু বকর এর খোঁজে। কিন্তু রাসূল (ﷺ) এর সম্মুখীন হওয়ার পর তার সঙ্গে যখন কিছু কথাবার্তা হলো, সরাসরি। সে তার অন্তর দিয়ে দিলেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের সত্তরজন লোকসহ সেখানেই মুসলমান হয়ে গেল। আর স্বীয় পাগড়ি খুলে তা তীরের সঙ্গে বেঁধে নিল, যা সাদা কালো বাতাসে দোল খাচ্ছিল। সে উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করছিলো, শান্তি ও নিরাপত্তার বাদশাহ, সন্ধির সাহায্যকারী, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ দ্বারা পৃথিবীকে ভরপুরকরণে ওয়ালা আগমন করেছেন।

৬. পথচলার পরবর্তী পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে যোবায়ের বিন আওয়ামের সাক্ষাৎ হয় মুসলমানদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সঙ্গে। তিনি সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন। যোবায়ের রাসূল ও আবু বকর কে সাদা কাপড় প্রদান করেন। কুবাতে আগমন ৮ রবিউল আওয়াল, ১৪ নববী সনে, অর্থ্যাৎ ১ম হিজরি সন মোতাবেক ২৩ সেপ্টম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূল (ﷺ) কুবাতে আগমন করেন।

এ সময় নবীর বয়স ৫৩ বছর হয়েছিলো। আর যারা তার নবুয়াত কাল ৯ই রবিউল আওয়াল ৪১ ফীল বর্ষ মানছেন তাঁদের কথা মোতাবেক নবুয়াতের ঠিক ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছিলো। অবশ্য যারা তাঁর নবুয়াতের সময়কাল রমযান ১৪ ফীল বর্ষ মানেন তাঁদের কথা মোতাবেক ১২ বছর ৫ মাস ২২ দিন হয়েছিলো।

ওরুয়া বিন যোবায়েরের বর্ণনায় মদিনাবাসী মুসলমানগণ মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং তাঁর সঙ্গীদের দেখতে পায়। সাদা কাপড়ে আবৃত অবস্থায় তাঁরা যখন আসছিলেন তখন তাঁরা তাঁর সঙ্গীদের দেখতে পায়। সাদা কাপড়ে আবৃত অবস্থায় তাঁরা যখন আসছিলেন তখন তাঁদের পোশাক হতে যেন চাঁদের কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। এই অবস্থা দেখে সে আত্মহারা হয়ে উচ্চকণ্ঠে বললো, ওহে আরবের লোকরা! তোমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়েছে, তোমাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত অতিথি এসে গেছেন।" এ কথা শোনা মাত্রই মুসলমানগন অস্ত্রাগারে দৌড় দিলেন।

এবং অস্ত্র শস্ত্রে শজ্জিত হয়ে আল্লাহর রাসূলকে স্বাগত জানানোর জন্য সমবেত হলেন।

ইবনে কাইয়্যুম বলেছেন, ইতো মধ্যেই বণী আমর বিন আউফ গোত্রে (কুবার বসিন্দা) লোকজনদের শোরগোল উঁচু হয়ে ওঠল এবং তাকবীর ধ্বনি শোনা গেল। মুসলমানগণ নবীর আগমনে তাঁকে খোশ আমদেদ জানানোর উদ্দেশ্যে হর্ষোৎফুল্ল কণ্ঠে তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে সমবেত হতে থাকল। তিনি তাঁদের মাঝে এসে উপস্থিত হলে সকলে সম্মিলিতভাবে তাঁকে মুবারকবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং চারদিক থেকে বেষ্টন করে দাঁড়ালেন। এই সময় রাসূল (ﷺ) শান্তির আবরণে আচ্ছাদিত ছিলেন এবং ঐশী বাণী অবতীর্ণ হচ্ছিল-

আল্লাহ ও জিবরাঈল এবং পুণ্যবান মুসলমানগণ রাসূল (ﷺ) এর সহায় আছে, এমনকি ফেরেশতাগণও সাহায্যকারী আছেন। (আত্-তাহরীম: আয়াত-৪)

ওরুয়া বিন যুবায়ের (রা) এর বর্ণনা মতে, লোকজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর রাসূল তাদের সঙ্গে নিয়ে ডান দিকে ফিরলেন এবং আমর বিন আওফ গোত্রে গমন করলেন।

এই দিনটি ছিলো সোমবার এবং মাস ছিলো রবিউল আওয়াল। সেখানে রাসূল চুপচাপ বসে ছিলেন। কিন্তু আগত লোকজনকে অভিনন্দন জানাবার উদ্দেশ্যে আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে ছিলেন। সমাগত আনসারগণ রাসূল কে লক্ষ করে সালাম জানাচ্ছিলেন। এরপর রাসূল (ﷺ) এর ওপর যখন রৌদ্র এসে গেল তখন আবু বকর (রা) চাদর টাঙ্গিয়ে ছায়া করলেন। তাতে সমাগত লোকজন বুঝতে পারলেন, ইনিই হচ্ছেন রাসূল।

রাসূল (ﷺ) এর মদিনা আগমন উপলক্ষে তাঁকে স্বাগত জানাতে এবং তাকে দেখার জন্য মদিনাবাসীর ঢল নেমে এসেছিলো। এই দিনটি ছিলো মদিনাবাসীর জন্য তুলনাবিহীন এমন এক ঐতিহাসিক দিবস, যা তারা কখনও দেখেনি। সেদিন ইহুদীগণও হারুন নবী মারফত যে নবীর আগমনের সুসংবাদ পেয়েছিলো, তার দর্শন লাভ করেছিল। সে সংবাদটি এই "আল্লাহ দক্ষিণ দিক থেকে নবীর আগমন ঘটাবেন এবং যিনি পবিত্র তিনি ফারান পর্বত থেকে আগমন করবেন।"

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুলসুম বিন হাদাম এবং মতান্তরে, সায়াদ বিন খায়সামার বাড়িতে অবস্থান করেছিলেন। এর মধ্যে প্রথম মতটি অধিক শক্তিশালী।

এদিকে আলী (রা) মক্কায় রাসূল (ﷺ) এর নিকট লোকদের গচ্ছিত আমানত আদায় করার পর মদিনা অভিমুখে যাত্রা করলেন। অতঃপর মদিনায় পৌঁছে তিনি কুবায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং কুলসুম বিন হাদামের বাড়িতেই অবস্থান করলেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কুবাতে চার দিন (সোমবার মঙ্গলবার, বুধ ও বৃহস্পতিবার) অথবা দশ দিন থেকে বেশি অথবা পৌঁছা ও যাত্রার দিন ছাড়া চব্বিশ দিন অবস্থান করেন। আর এ সময়ের মধ্যেই তিনি মসজিদে কুবার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং তাতে নামাযও আদায় করেন। তাঁর নবুয়াত প্রাপ্তির পর এটা হচ্ছে সর্বপ্রথম মসজিদ, তার বুনিয়াদ তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। পঞ্চম দিনে (অথবা দ্বাদশ দিনে অথবা চব্বিশতম দিনে) শুক্রবারে তিনি আল্লাহর নির্দেশে উটে আরোহণ করলেন। আবু বকর (রা) তাঁর রাদীফ (পিছনে আরোহণকারী) ছিলেন। তিনি বনু নজ্জার (যাঁরা তাঁর মামাগোষ্ঠির ছিলেন) তাঁদের নিয়ে মদিনার দিকে যাত্রা করলেন। অতঃপর বানু সালেম আউফের আবাসস্থলে পৌঁছলে জুমার নামাযের সময় হয়ে যায়। তিনি উক্ত স্থানে বাতনে ওয়াদীতে জুমা পড়লেন। সেখানে এখনো মসজিদ রয়েছে। সে সময় তাঁরা মোট একশত লোক ছিলেন।

মদিনায় প্রবেশ

জুমআর নামাযান্তে নবী মদিনায় প্রবেশ করলেন। ঐ দিন থেকেই এই শহরের নাম ইয়াসরিবের পরিবর্তে মদিনাতুর রাসূল বা রাসূলের শহর হয়ে যায়। সংক্ষেপে একে মদিনা বলা হয়ে থাকে। এটি গুরুত্বপূর্ণ এক ঐতিহাসিক দিবস। মদিনার অলিতে গলিতে সর্বত্র সেদিন তাকদীর ও তাহমীদের (পবিত্রতা ও প্রশংসার) গুঞ্জনধ্বনি হচ্ছিল। আনসারদের ছেলেমেয়েরা আনন্দ কণ্ঠে নিম্নের কবিতার চরণ গুলো সুর ও ঝংকার সহকারে গেয়ে বেড়াচ্ছিল।

"সানিয়্যাতুল ওয়াদা" নামক পাহাড় হতে পূর্ণিমার চন্দ্র আমাদের ওপর উদিত হয়েছে।" "যতকাল কোনও আহবানকারী আল্লাহর পথে আহ্বান করবে ততোকাল আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের প্রতি ওয়াজিব।" "হে আমাদের মাঝে প্রেরিত পুরুষ! আপনি তো অনুসরণীয় বিষয় (দ্বীন) নিয়ে এসেছেন (তাই, আপনার নির্দেশ অনুসরণ করা ফরয)।" হে আমাদের মাঝে প্রেরিত পুরুষ! অনুসরণীয় বিষয় দ্বীন নিয়ে এসেছেন। (তাই আমার-নির্দেশ অনুসরণ করা ফরয)।

আনসারগণ যদিও ধনী ছিলেন না, তবুও সকলের আশা ছিলো, রাসূল (ﷺ) তার বাড়িতেই অবস্থান করুক। ফলে তার উটনী আনসারদের যে বাড়ি কিংবা মহল্লার পাশ দিয়ে অতিক্রম করত সেখানকার লোকজন উটনীর লাগাম ধরে অনুরোধ করতেন আসবাবপত্র, অস্ত্রশস্ত্র ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে আগমন করুন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলতেন "উটনীর পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত।" ফলে উটনী একটানা চলতে থাকলো এবং ঐ স্থানে এসে বসে পড়ল, যেখানে মসজিদে নববী রয়েছে।

কিন্তু তিনি নিচে অবতরণ করলেন না। অতঃপর উটনী পুনরায় উঠে কিছু দূর গিয়ে ফিরে দেখার পর পূর্বের জাগাতেই এসে বসে পড়ল। এরপর রাসূল নিচে অবতরণ করলেন। এটি ছিলো তাঁর নানীর, অর্থাৎ বনু নাজ্জার গোত্রের মহল্লাহ। আর উটনীর জন্য ছিলো এটা আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশনা। লোকজনেরা রাসূলুল্লাহকে নিজ নিজ গৃহে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর নিকট আবেদন শুরু করে দিলেন। কিন্তু আবু আইয়ুব আনসারী (রা) উটনীর পালান উঠিয়ে নিলেন এবং বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এতে রাসূল বলতে লাগলেন, মানুষ তার পালানের সাথে রয়েছে। এদিকে আসয়াদ বিন যুরারাহ (রা) এসে উটনীর লাগাম ধরে নিলেন, ফলে উটনী তার নিকটেই রয়ে গেল।

কিছুদিন পর নবীপত্নী উম্মুল মুমিনীন সওদা (রা) নবী কন্যা ফাতেমা (রা) ও উম্মে কুলসুম (রা) উসামা বিন যায়েদ (রা) ও উম্মে আয়মান (রা) মদিনায় গিয়ে পৌঁছলেন। এদের সকলে আব্দুল্লাহ বিন আবু বকরের আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে ‍গিয়েছিলেন; যাদের মধ্যে আয়েশাও ছিলেন। অবশ্য নবী কন্যা যয়নব (রা) আবুল আসের নিকট থেকে গিয়েছিলেন। তিনি তাকে আসতে দেননি। তিনি বদরের যুদ্ধের পরে এসেছিলেন।

আয়েশা (রা) এর বর্ণনা মতে, রাসূল (ﷺ) এর মদিনায় পৌঁছার পর আবু বকর (রা) ও বেলাল (রা) জ্বরে আক্রান্ত হন। আমি তাদের খেদমতে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আব্বাজান! আপনি কেমন আছেন? তারপরে বেলালকে লক্ষ করে বললাম, আপনি কেমন আছেন? তিনি অর্থাৎ, আয়েশা (রা) বলেছেন, যখন আবু বকরের শরীরে জ্বর আসত, তখন তিনিই কবিতা পাঠ করতেন-

প্রতিটি মানুষকে তার আত্মীয়ের মাঝে সুপ্রভাত বলা হয়ে থাকে অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও নিকটবর্তী।

বেলালের শরীর যখন একটু সুস্থ থাকতো তখন তিনি নিজের বেদনাভরা কন্ঠে উঁচু করে বলতেন-

"হায় যদি আমি জানতাম, আমার কোনো একরাত্রি যাপন হবে কি-না এমন এক প্রান্তরে (মক্কায়) এমন অবস্থায় যেখানে আমার পাশে ইযখির ও জালীল (ঘাষ) থাকবে এবং কোনো দিন কি মাজিন্ন ঝর্ণাতে অবতরণ করতে পারব এবং আমি সামা ও তোফায়েল পাহাড় দেখতে পারব?

আয়েশা (রা) বলেছেন, আমি রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের এ প্রলাপের সংবাদ দিলাম। তখন তিনি বললেন,

"হে আল্লাহ! আমাদের নিকট মদিনাকে এমন প্রিয় করে দাও, যেমন মক্কা প্রিয় ছিলো; বরং তার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয় করে দাও মদিনার মাঠ-ঘাট ও আবাহাওয়া স্বাস্থ্যের উপযোগী করে দাও। এর 'সা' ও মুদ্দে (শস্য মাপার পাত্র বিশেষ) বরকত দাও এবং তার অসুখ প্রত্যাবর্তন করে জোহফায় পৌছিয়ে দাও। আল্লাহ তাঁর দু'আ কবুল করলেন এবং অবস্থার পরিবর্তন ঘটল।

এ পর্যন্ত পবিত্র জীবনের এক ধরনের এবং ও ইসলামি দাওয়াতের এক যুগ তথা মক্কী জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল। আমরা এখন তাঁর মাদানী জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব। আল্লাহ তাওফীক দাতা।

পবিত্র মহাজীবনের মদিনা অধ্যায়

আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দিবে এবং সৎ কাজের আদেশ করবে অসৎকাজ হতে নিষেধ করবে; সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। (সূরা আল-হাজ্জ: আয়াত ৪১)

প্রথম পর্যায়: পথম হিজরি থেকে ষষ্ঠ হিজরি: ৬ বছর।
*যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

দ্বিতীয় পর্যায়: ষষ্ঠ হিজরি থেকে অষ্টম হিজরি: ২ বছর।
*সন্ধি।
*মক্কা বিজয়।
*রাজা-বাদশাদের কাছে দাওয়াতী পত্র।

তৃতীয় পর্যায়: অষ্টম হিজরি থেকে একাদশ হিজরি।
*দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ।
*মহানবী (ﷺ) এর ইন্তিকাল।

মদিনার জীবনকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে।

১. প্রথম পর্যায়: যাতে ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। শহরে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বাহির থেকে শত্রুরা আক্রমণ চালিয়েছে, যাতে মদিনায় ইসলামের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে ৬ষ্ঠ হিজরি সনে যিলকদ মাসে হুদায়বিয়ার সন্ধিতে।

২. দ্বিতীয় পর্যায়: এ পর্যায়ে মূর্তিপূজারী নেতাদের সঙ্গে সন্ধি হয়। এর সমাপ্তি ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দ্বারা ঘটে। এই পর্যায়কে বিশ্বের রাজন্য বর্গের নিকট ইসলামের দাওয়াত প্রেরণের পর্যায়ও বলা যেতে পারে।

৩. তৃতীয় পর্যায়: এ পর্যায়ের বিস্তৃতি ঘটেছিলো একাদশ হিজরির রবিউল আওয়ালে। এর ব্যাপ্তী রাসূল (ﷺ) এর পবিত্র জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এ সময়ে বিভিন্ন দেশ ও গোত্রের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। এ পর্যায় বিভিন্ন জাতি ও গোত্রসমূহের মুখপাত্রদের মদিনায় আগমনের পর্যায়।

হিজরতের সময় মদিনার অবস্থা

অশান্তি এবং উপহাসের লক্ষ বস্তু থেকে মুক্তি লাভই হিজরতের মুখ্য উদ্দেশ্যে ছিলো না বরং; এতে এ উদ্দেশ্যে নিহিত ছিলো যে, এক শান্তিপূর্ণ এলাকায় ইসলামি আন্দোলনের জন্য শান্তির বার্তাবরণ সৃষ্টি করা। এ কারণে সকল সক্ষম মুসলমানের জন্য এটা ফরয করে দেয়া হয়েছিলো, এ নতুন দেশ ও নতুন রাষ্ট্রের নির্মাণ কাজে তারা সাধ্যমত অংশগ্রহণ করবেন এবং একে রক্ষণাবেক্ষণ ও মর্যাদার উচ্চশিখরে সমাসীন করার ব্যাপারে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। আর এ কথাতো সন্দেহাতীতভাবে সকলেই অবগত যে, এই মহতী জীবন ধারার রূপকার এবং এ মহান জাতির ইমাম, নেতা ও পথ প্রদর্শক ছিলেন স্বয়ং বিশ্বের সেরা মানব মুহাম্মাদ (ﷺ)।

মদিনাতে রাসূল কে এমন তিনটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়েছিলো, যাদের একগোষ্ঠী থেকে অন্যান্য গোষ্ঠীর অবস্থা ছিলো ভিন্ন এবং পরস্পরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো যাতে ভিন্নতার প্রাধান্যই ছিলো বেশি। গোষ্ঠী তিনটির পরিচিতি হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ:

১. আল্লাহর মনোনীত রাসূল (ﷺ) এর নিকট হতে উত্তম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ও প্রাণ উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত সাহাবায়ে কেরাম (রা) এর গোষ্ঠী।
২. মদিনার আদিবাসী, যারা পৌত্তলিক তথা মুশরিক যারা তখনো ঈমান আনেনি।
৩. ইহুদীগণ।

মদিনায় রাসূল ও সাহাবাদের অবস্থা ছিলো সম্পূর্ণ মক্কার অবস্থার বিপরীত। যদিও তাঁদের দ্বীন সম্পর্কিত ধ্যান ধারণা দ্বীনী কাজ কর্মের লক্ষ ও উদ্দেশ্যে ছিলো অভিন্ন কিন্তু মক্কী জীবনে তারা বসবাস করতেন বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায়। আর তাঁরা ছিলেন নিরুপায়, অপমানিত ও দুর্বলতর। তারা আত্মিক ও নৈতিকবলে চরম বলীয়ান হলেও মৌখিক শক্তি সামর্থ্য কিংবা ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। সকল প্রকার শক্তি ও সম্পদ পুঞ্জিভূত ছিলো ধর্মের চির দুশমনদের হাতে।

কাজেই আমরা দেখতে পাই মক্কী সূরাগুলোতে কেবলমাত্র ইসলামের প্রারম্ভিক বিষয়গুলোরই বর্ণনা রয়েছে এবং ঐ সকল বিষয়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, যা ব্যক্তিগতভাবে করা সম্ভব। অধিকন্তু এই পর্যায়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পূত পবিত্র জীবন যাপনের মাধ্যমে আত্মিক উন্নতি ও উত্তম চরিত্র গঠনের উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং অনৈতিক ও অসামাজিক ক্রিয়াকর্ম থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে মদিনা জীবনের প্রথম থেকেই নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের ঢাগঢোল ছিলো মুসলমানদেরই হাতে। মুসলমান ছাড়া মদিনা কিংবা তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে সকল সম্প্রদায় ছিলো, তাদের নেতৃত্ব ছিলো নিষ্প্রভ। কাজেই তখন এমন এক সময় ও সুযোগ এসেছিলো যাতে মুসলমানগণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, রাষ্ট্র পরিচালনা, যুদ্ধ-সন্ধি ইত্যাদি সকল ব্যাপারেই ইসলামের বিধি-বিধান ও অনুশাসন অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এর ফলে হালাল, হারাম, ইবাদত, আখলাক ইত্যাদি জীবনের সব ব্যাপারেই পুরোপুরি মীমাংসার কাজ সম্ভব হয়।

সময় ও সুযোগ এসেছিলো মুসলমানদের জন্য এমন এক জীবন-ধারা প্রবর্তনের যা ছিলো জাহেলিয়াত যুগের জীবন-ধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এমনকি পৃথিবীর কোথাও এমন কোনো জীবন ধারা ছিলো না, যার সঙ্গে এর তুলনা করা যেতে পারে। বিগত দশ বছর যাবৎ মুসলমারা অবর্ণনীয় ভূমিকা রেখেছেন, কোথাও যার তুলনা মিলবে না।

এই প্রসঙ্গে যে ব্যাপারটি বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য তা হচ্ছে এই জাতীয় কোনো জীবনধারার রূপ এক দিনের, এক মাসের কিংবা এক বছরের কাজ হতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘ সময়ের, যাতে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে এর বিধি-বিধান ও নির্দেশনাবলি প্রয়োগ করা এবং নীতি নির্ধারণী কাজের অভ্যাস ও চর্চা এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ণতা দান করা সম্ভব হতে পারে। ইসলাম যে পর্যন্ত বিধি-বিধান প্রদান, সংগ্রহ, সংরক্ষণের পর্যায়ে ছিলো তার জিম্মাদার ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ। পক্ষান্তরে, এ সবের বাস্তবায়ন, মুসলমানদের চর্চা ও অভ্যস্তকরণ এবং পথ-প্রদর্শনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন রাসূল। এ মর্মে ইরশাদ হয়েছে-

তিনি হচ্ছেন এমন সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, এবং কিতাব (কোরান) ও হিকমত (হাদিস) শিক্ষা দিচ্ছেন, আর এরা পূর্বে অবশ্যই প্রকাশ্য ভ্রষ্টতার মধ্যে নিপতিত ছিলো। (সূরা আল-জুমুয়াহ: আয়াত-২)।

এদিকে সাহাবাগণের এমন অবস্থা ছিলো, তাঁরা সর্বক্ষণ নবী (ﷺ) এর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে চলতেন। যে কোনো আহকাম নির্ধারিত হওয়ামাত্র তা গ্রহণ করে নিতেন এবং তা পালন করে আনন্দ লাভ করতেন।

এমর্মে ইরশাদ হয়েছে, "যখন তাদের নিকট আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।" (সূরা আল-আনফাল: আয়াত-২)।

এ সকল বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা করা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। কাজেই এই বিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশটুকু আলোচনা করব।

যাহোক এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো, মুসলমানদের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে যার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এটা কোনো ক্ষণস্থায়ী বিষয় ছিলো না; বরং স্বয়ং সম্পূর্ণ ও স্থায়ী ব্যাপার ছিলো। অবশ্য এছাড়া এমন কিছু বিষয়ও ছিলো, যা সমাধানের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক মনোযোগের প্রয়োজন ছিলো। যার সংক্ষিপ্ত অবস্থা নিম্নরূপ:

মুসলমানদের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক ছিলেন, প্রথম শ্রেণীভুক্ত হচ্ছেন, তারা নিজস্ব জমিজমা, ঘরবাড়ি এবং ধন-সম্পত্তির মধ্যে বসবাস করতেন। এ সম্পর্কে তাদের অন্য কোনো অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন ছিলো না। এরা হচ্ছেন আনসার গোত্রীয় লোক। এদের মধ্যে বংশানুক্রমে একে অন্যের সঙ্গে প্রবল শত্রুতা ও মত বিরোধ চলে আসছিলো। তাঁদের পাশাপাশি অন্য যে দলটি ছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন মুহাজির গোত্র। ঐ সকল সুবিধা হতে সম্পূর্ণরূপে এরা বঞ্চিত ছিলেন। লুণ্ঠিত হয়ে ও মার খেয়ে নিঃস্ব এবং রিক্ত অবস্থায় ভাগ্যের প্রতি ভরসা করে কোনোরূপে মদিনায় পৌঁছেছিলেন।

মদিনায় মুহাজেরদের বাসস্থান আহার ও পোশাকের জন্য কোনো কর্ম সংস্থান ছিলো না। অথবা কোনো প্রকার ধন-সম্পদও ছিলো না যার দ্বারা তাঁরা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। অথচ এই আশ্রয়প্রার্থী মুহাজিরদের সংখ্যা কম ছিলো না। তদুপরি দিনের পর দিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েই চলেছিলো। কারণ সুস্পষ্ট ঘোষণা করায় মদিনায় চলে আসেন। অথচ এটা জানার কথা যে, মদিনাতে সম্পদ বলতে উল্লেখযোগ্য কোনো কিছুই ছিলো না। এমনকি ব্যবসা বাণিজ্যের সুযোগ সুবিধাও ছিলো অত্যন্ত সীমিত। এর ফলে মদিনার অর্থনৈতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়ল। ইসলাম বিরোধী চক্র এই বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিক বয়কট আরম্ভ করে দেয়। কাজেই আমদানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু মুসলমানদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ বিরোধিতা কিংবা শত্রু মনোভাব ছিলো না।

দ্বিতীয় সম্প্রদায়: মদিনার কুল পৌত্তলিক (মুশরিক) অধিবাসী এই সম্প্রদায়ভুক্ত। মুসলমানদের ওপর এদের কোনো নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব ছিলো না। কিছু সংখ্যক মুশরিক সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েছিলো এবং পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগে সন্দিহান ও অনিচ্ছুক ছিলো। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ-বিরোধিতা কিংবা শত্রুতা ছিলো না। এ শ্রেণির মানুষ স্বল্পকালের মধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করে এবং নিষ্ঠাবান মুসলমানদের দলভুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে এমন কিছু সংখ্যক মুশরিক ছিলো, যারা অন্তরে অন্তরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করতো কিন্তু তাঁদের সঙ্গে মোকাবেলা করার ক্ষমতা তাদের ছিলো না। অন্তরে তাদের যে ভাবই থাক না কেন, প্রকাশ্যে তারা বন্ধুতের ভাব প্রকাশে বাধ্য হতো। এদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলূল। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলো সেই ব্যক্তি, যে বুআসেন যুদ্ধের পর আউস ও খাযরাজ গোত্র থেকে নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিলো। অথচ এর পূর্বে এই দূই গোত্র মিলিতভাবে কোনো লোককে নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে একমত হতে পারে নি। নেতা নির্বাচনের পর তার জন্য মণিমুক্তা খচিত মুকুট তৈরি করা হচ্ছিল। এ মুকুট পরিয়ে দেয়ার পর তাকে মদিনার রাজা হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠানের কথা ছিলো। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে মদিনায় রাসূল (ﷺ) এর আগমনের ফলে তা পাল্টে যায়। ফলে সে রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধে যাবার পর যখন দেখল অবস্থা মোটেই তার অনুকূল নয় এবং শিরকের ওপর অটল থাকার কারণে তাকে পার্থিব ফায়দা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, তখন সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে বসল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে কাফেরই ছিলো।

এ কারণে রাসূল ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার সামান্যতম সুযোগ পেলেও তার সদ্ব্যবহার করতে সে পিছপা হতো না। তার সঙ্গে সাধারণত ঐ সকল নেতার সম্পর্ক ছিলো যারা তার রাজত্বে বড়ো বড়ো পদ পাওয়ার আশায় আশান্বিত ছিলো। কিন্তু মুসলমানদের প্রাধান্যের ফলে এদরেকে তাদের আকাঙ্ক্ষিত পদ ও প্রতিপত্তি থেকে বঞ্চিত হতে হলো। এজন্য তাদের আক্ষেপও কম ছিলো না। এই হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে তারা কোনো কোনো সময় সরলপ্রাণ মুসলমান যুবকদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইত।

তৃতীয় সম্প্রদায়: মদিনার ইহুদিরা হচ্ছে এই শ্রেণিভুক্ত। এরা রোমীয়দের অন্যায় অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে হেজাজে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরা ছিলো প্রকৃতপক্ষে ইবরাণী (হিব্রু ভাষি)। কিন্তু হেজাজে বসবাসের পর তাদের চালচলন, ভাষা ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে আরবি রঙে রঞ্জিত হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি তাদের গোত্রীয় এবং আরবদের মধ্যে বিয়ে শাদির সম্পর্কও স্থাপিত হয়েছিলো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাদের বংশধারা এবং বংশপরিচয় ঠিকই ছিলো। আরবদের সঙ্গে তারা সম্পূর্ণভাবে মিশে যায়নি; বরং নিজেদেরকে ইহুদি বা ইসরাঈলী জাতীয়তাবাদের অনুসারী বলে গর্ববোধ করতো এবং আরবদের অত্যন্ত নিকৃষ্ট শ্রেণির বলে মনে করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরকে অশিক্ষিত বর্বর হিংস্র নিচু ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করতো। তাদের ধারণা ছিলো, আরবদের সম্পদ তাদের জন্য বৈধ বা হালাল।

ইরশাদ হয়েছে- "তারা বলতো, অশিক্ষিতদের ব্যাপারে আমাদের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। অর্থাৎ মূর্খদের সম্পদ হরণ করলে আমাদেরকে পাকড়াও করা হবে না।" (আল ইমরান: আয়াত-৭৫)

ধর্ম প্রচারের ব্যাপারে ইহুদিদের মধ্যে কোনো প্রকার সংগ্রামী চেতনা কিংবা উৎসাহ-উদ্দীপনা চোখে পড়ত না। ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য তাদের মধ্যে যা লক্ষ করা যেত তা হলো, ভালো-মন্দ লক্ষণ নির্ধারণ করা, ঐ যাদুর টোনা, ঝাড়ফুক এবং আরও নানা প্রকার টুকটাক করা। এ সকল কাজের জন্যই তারা নিজেদেরকে জ্ঞানী গুণী এবং আধ্যাত্মিক ইমাম ও নেতা মনে করতো। অর্থোপার্জনের নানা পন্থা প্রক্রিয়া ও কৌশলাদির ব্যাপারে ইহুদীরা ছিলো অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত। বিখ্যাত শস্যাদি, খেজুর, মদ এবং বস্ত্র ব্যবসায়ে তারা ছিলো সে জামানায় শীর্ষে। তারা খাদ্যশস্য, বস্ত্র, মদ ইত্যদি আমদানি এবং খেজুর রফতানি করতো। এছাড়া অন্যান্যা বিভিন্ন কাজেও তারা নিয়োজিত থাকত। ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে তারা আরবদের নিকট থেকে অত্যন্ত উচ্চহারে মুনাফা আদায় করতো। শুধু তাই নয়, তারা চড়া সুদে সুদী কারবারও করতো।

এই সকল সুদখোর ইহুদিরা আরবের বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী নেতাদের সুদি ঋণ প্রদান করত। এই সকল ঘাতক ব্যবসায়ী ও নেতাগণ ঋণদাতা ইহুদিগণের প্রশংসা কীর্তনের জন্য এবং প্রসংশাসূচক কাব্য রচনার জন্য কবিদের অর্থ যোগান দিত। ঋণদানের সময় ইহুদিগণ ঋণ পরিশোধের গ্যারান্টিস্বরূপ আরবদের জমি-জমা ও বাগ-বাগিচা দায়বদ্ধ করে রাখতো। পরবর্তীকালে চড়া সুদের ফলে সুদে-আসলে ঋণলব্ধ অংকের অর্থ যখন অতিমাত্রায় ফুলে ফেঁপে ওঠত, তখন ঋণ গ্রহীতাদের পক্ষে সেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠত না। ফলে তাদের দায়বদ্ধ সম্পত্তি ইহুদিদের অধিকারে চলে যেতো।

এরা কুচক্র, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ ও শত্রুতার অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করতে পারদর্শী ছিলো। তারা এত সূক্ষ্ম ছিলো এ ব্যাপারে যে কেউ কোনো আঁচই পেতো না। তাদের কুচক্রীপণার ফলশ্রুতিতে গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকতো। ঘটনাচক্রে যুদ্ধে তীব্রতা কিছুটা কমে আসলে তারা পুনরায় কুট-কৌশল প্রয়োগ করে তার তীব্রতা বাড়িয়ে দিত। এক্ষেত্রে সবচাইতে মজার ব্যাপার ছিলো এই যে, গোত্রে গোত্রে যখন ধ্বংসযজ্ঞ চলত তখন আরবদের এই ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে তারা কৌতুক অনুভব করত। যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম কিংবা অর্থাভাবে যাতে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য যুদ্ধরত পক্ষদ্বয়কে বিশাল বিশাল অংকের ঋণ স্বল্প সুদে প্রদান করতো এবং বিনিময়ে তাদের সহায়-সম্পত্তি দায়বদ্ধ করে রাখতো। এভাবে কায়দা-কৌশল করে দুইমুখী অস্ত্রের মতো তারা দ্বিমুখী মুনাফা লুটত। অধিকন্তু একদিকে তারা ইহুদি ঐক্য সংরক্ষিত করার ব্যাপারে যেমন সর্বক্ষণ সচেষ্ট থাকত। অন্যদিকে তেমনি সুদের বাজার গরম রাখার জন্য সর্বক্ষণ সক্রিয় থাকত।

ইয়াসরিবের ইহুদি গোত্রগুলোর তিনটি গোত্র ছিলো সমধিক প্রসিদ্ধ। এ গোত্র তিনটি হচ্ছে -
১.বানু কাইনুকা: এরা ছিলো খাযরাজদের মিত্র এবং তাদের আবাসস্থল মদিনার মধ্যেই ছিলো।
২. বনু নাযীর:
৩. বানু কুরাইযাহ: এই শেষ গোত্র দুটো ছিলো আউসদের মিত্র। এদের বাসস্থান ছিলো মদিনার উপকণ্ঠে।

প্রায় এক যুগ যাবৎ এই গোত্রত্রয় আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যুদ্ধাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে রেখেছিলো এবং বুআসের যুদ্ধে নিজ নিজ মিত্র গোত্রের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো।

ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদিদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে সংক্ষেপে এটুকুই বলা যায় যে, তারা কখনই মুসলমানদের সুনজরে দেখত না। তারা সর্বদাই মুসলমানদের ব্যাপারে প্রতিহিংসাপরায়ণ ও শত্রুভাবাপন্ন থাকতো। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সঙ্গে তাদের গোত্রীয় কিংবা বংশজাত কোনো সম্পর্কই ছিলো না। প্রসঙ্গক্রমে এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাদের বংশীয় টান তাদের মন-মেজাজের অংশ হিসেবে স্থান লাভ করতো এবং এতে তারা প্রচুর আনন্দও পেত।

ইসলাম সম্পর্কে তাদের বিরূপ ভাবাপন্ন হওয়ার ভিন্ন একটি কারণ ছিলো যে, এর দাওয়াত ছিলো একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের দাওয়াত যা ভাঙা অন্তরকে জোড়া দিয়ে চলছিলো। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার আগুনকে নির্বাপিত করছিলো, সকল লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতার পথ অবলম্বন এবং হালাল উপার্জন ও হালাল ভক্ষণের জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছিলো। এর ফলে ইয়াসরিবের গোত্রসমূহের মধ্যকার শিথিল সম্পর্ক ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী ও মজবুত হয়ে ওঠতে থাকল, যা ইহুদিদের মনে দারুণ প্রতিক্রিয়া ও আতঙ্ক সৃষ্টি করল। এই ব্যাপারে তাদের আশঙ্কা ছিলো, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের রমরমা সুদী কারবার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া, সুদী কারবার সূত্রে কুট-কৌশলের মাধ্যমে মদিনাবাসীর যে সকল সম্পদ তারা কুক্ষিগত করে রেখেছিলো, সে সব কিছুই তাদেরকে ফেরৎ দিতে বাধ্য করা হবে।

যখন ইহুদিরা বুঝতে পারল যে, ইসলামী দাওয়াত ইয়াসরিবের মাটিতে নিজের জন্য স্থান করে নিয়ে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে; তখন থেকেই তারা এটিকে তাদের জন্য একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে নিল। এ কারণেই রাসূল (ﷺ) এর ইয়াসরিবে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানদের সঙ্গে তারা শত্রুতা আরম্ভ করে দিলো। অবশ্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের এই শত্রুতা গোপনে গোপনেই চলছিলো। তারপর প্রকাশ্যে শত্রুতা করার সাহস তারা অর্জন করে। ইবনে ইসহাক বর্ণিত একটি ঘটনা সূত্রে এই ব্যাপার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লাভ করা যায়।

তাঁর বর্ণনা মতে, আমি উম্মুল মুমিনীন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই বিন আখতাব (রা) থেকে এই বর্ণনা প্রাপ্ত হয়েছি। তিনি বলেন, "আমি আমার আব্বা ও চাচাজান আবু ইয়াসেরের কাছে তাদের সন্তানদের মধ্যে সব চাইতে অধিক প্রিয় ছিলাম। তাঁদের অন্যান্য সন্তানদের সঙ্গে থেকে আমি যখনই তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম, তাঁরা সকলের চেয়ে আমাকেই অধিক ভালোবাসতেন এবং সকলের আগে আমাকেই কোলে তুলে নিতেন। রাসূল যখন মদিনায় আগমন করলেন এবং কুবায় বনু আমর বিন আউফের বাসস্থানে অবতরণ করলেন,তখন আমার পিতা হুয়াই ইবনে আখতার ও আমার চাচা আবু ইয়াসার অতি প্রত্যুষে তাঁর দারবারে উপস্থিত হতেন। ক্লান্ত ও অবসন্ন অবস্থায় সূর্যাস্তের সময় টাল খেতে খেতে তারা ফিরছিলেন, আমি উঁকি মেরে তাদের দেখার পর পূর্বের নিয়ম মাফিক দৌড় দিয়ে তাঁদের কাছে গেলাম, কিন্তু আল্লাহর শপথ তাঁরা এত বেশি চিন্তিত ছিলেন যে, আমার প্রতি তারা ফিরেও তাকালেন না।"

আমি আমার চাচাকে বলতে শুনলাম, তিনি আব্বাকে বলছিলেন, "ইনিই কি তিনি?"
আব্বা বললেন, "হ্যাঁ" আল্লাহর শপথ।
চাচা পুনরায় বললেন, "আপনি তাকে ঠিক ঠিক চিনতে পারছেন তো"?
পিতা বললেন, "হ্যাঁ"।
অতঃপর চাচা বললেন, "তার ব্যাপারে আপনি এখন মনে মনে কী ধারণা পোষণ করছেন?
পিতা বললেন, "শত্রুতা, আল্লাহর শপথ! যতদিন জীবিত থাকব"।

এরই সাক্ষ্য সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, যাতে আব্দুল্লাহ বিন সালামের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন উঁচু পর্যায়ের আলেম ছিলেন।

তিনি যখন জানলেন, নবী করীম (ﷺ) বনী নাজ্জার গোত্রে আগমন করেছেন, তখন তিনি খুব তাড়াতাড়ি তাঁর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তাকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, যার উত্তর একমাত্র নবীগণ ছাড়া অন্য কেউই দিতে পারেন না। তিনি যখন রাসূল (ﷺ) এর নিকট থেকে প্রশ্নসমূহের উত্তর পেয়ে গেলেন, তখন তিনি সেখানেই মুসলমান হয়ে গেলেন এবং তাঁকে বললেন যে, ইহুদিরা হচ্ছে মিথ্যা অপবাদকারী এক ঘৃণিত সম্প্রদায়। আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি জানার পর যদি তাদেরকে আমার সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তাতে তাঁরা আমার সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ দিতে থাকবে।

একথা শোনার পর রাসূল ইহুদিদের ডেকে পাঠালেন। তারা আহ্বানে তাঁর দরবারে এসে উপস্থিত হলো, রাসূল আব্দুল্লাহ বিন সালাম কেমন লোক তা জানতে চাইলেন। প্রত্যুত্তরে তারা বলল, "তিনি হচ্ছেন, আমাদের মধ্যে সব চাইতে বড়ো আলেম এবং সব চাইতে বড়ো আলেমের পুত্র, তিনি হচ্ছেন, আমাদের মধ্যে সব চাইতে ভালো মানুষ এবং সব চাইতে ভালো মানুষের পুত্র"।

অন্য এক বর্ণনাসূত্রে জানা যায় তারা বলল, তিনি আমাদের সর্দার এবং ছেলে। আরও এক বর্ণনা মতে তারা বলল, "তিনি হচ্ছেন আমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি এবং সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তির সন্তান।"

রাসূল বললেন, "আচ্ছা বলতো আব্দুল্লাহ যদি মুসলমান হয়ে যায়, তবে? ইহুদিগণ দুই কিংবা তিন বার বলল, "আল্লাহ যেন তাঁকে এ থেকে রক্ষা করেন"। এ কথা শোনার পর আব্দুল্লাহ বিন সালাম ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল"।

একথা শোনা মাত্রই ইহুদিগণ বলে বসল, "এ হচ্ছে আমাদের মধ্যে সব চাইতে খারাপ লোক এবং সব চাইতে খারাপ লোকের সন্তান।" এরপর তারা তার কুৎসা বর্ণনা করতে শুরু করে দিল। অপর এক বর্ণনায় আছে -আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রা) এ সময় বললেন, "হে ইহুদিদের দল! আল্লাহকে ভয় করো। সেই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কোনোই উপাস্য নেই। তোমরা আরও জান যে, তিনি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সত্যসহ আগমন করেছেন।" কিন্তু ইহুদিরা বলল, "তুমি মিথ্যা বলছো।"

এটা ছিলো ইহুদি সম্প্রদায় সম্পর্কিত রাসূল (ﷺ) এর প্রথম অভিজ্ঞতা। আর তা মদিনায় প্রবেশের প্রথম দিনেই হাসিল হয়েছিলো।

এ পর্যন্ত যে সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো, তা ছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদিনায় প্রবেশেকালীন অবস্থা ও ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। মদিনার বাইরে মুসলমানদের সব চাইতে শক্তিশালী শত্রু ছিলো কুরাইশ মুশরিকগণ। মুসলমানদেরকে দশ বছর যাবৎ তাদের প্রবল চাপ, ভীতি প্রদর্শন, অত্যাচার উৎপীড়ন এবং যুলুম নির্যাতনের মধ্যে বসবাস করতে হয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস, ঈমান-আমল সংক্রান্ত সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ, ত্যাগ-তীতিক্ষা এবং সহিঞ্চুতা ইত্যাদির মাধ্যমে মুসলমানদের আত্মিক উৎকর্ষতা চরমে পৌঁছেছিলো। যার ফলে শত অসুবিধার মধ্যে থেকে তাঁদের মনোবল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েই চলেছিলো।

মুসলমানগণ যখন মদিনায় হিজরত করলেন, কুরাইশ মুশরিক তখন তাঁদের বাড়ি-ঘর এবং ধন-সম্পত্তি নিজেদের অধিকারভুক্ত করে নিয়েছিলো। শুধু সে সব নিয়েই তারা ক্ষান্ত হলো না, মুসলমানদের সঙ্গে এঁদের আত্মীয়-স্বজনদের যোগাযোগ রক্ষা করে চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলল। অধিকন্তু, তারা যাকে পেল তাকেই বন্দী করে রাখল এবং তাদের ওপর অমানুষিক যুলুম-নির্যাতন চালাতে থাকল। কিন্তু এত করেও তারা ক্ষান্ত হলো না, আরও চরম ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে হত্যা এবং তাঁর দাওয়াতকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকল। তারা পাঁচশত কিলোমিটার দূরত্বে মদিনায় গিয়ে উপদ্বীপের মুশরিক অধিবাসীদেরকে মদিনার বিরুদ্ধে উস্কানি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে বয়কট করে ফেলল। যার ফলে মদিনায় জিনিসপত্র আমদানি ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকল। অথচ মুহাজিরদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতেই থাকল। প্রকৃতপক্ষে মক্কার বিরুদ্ধবাদীদের সঙ্গে মদিনার মুসলমানদের নবতর অবস্থায় প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়ে গেল। যারা সমস্যার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে এই যুদ্ধের দোষ এবং দায়-দায়িত্ব মুসলমানদের ঘাড়ে চাপাবে তাদের সম্পর্কে বুঝতে হবে, হয় তারা বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে একথা বলছে, নতুবা এ ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাই নেই।

মুসলমানদের জন্য এ পর্যায়ে ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্য এটাই ছিলো, যেভাবে তাদের সম্পদ হরণ করা হয়েছে তেমনিভাবে তাঁরাও দুষ্কৃতকারীদের সম্পদ হরণ করবেন। যেভাবে তাঁদের প্রতি অত্যাচার উৎপীড়ন চালানো হয়েছে, সেভাবে তাঁরাও অত্যাচারীদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। যেভাবে মুসলমানদের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনিভাবে তাঁরাও তাদের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন। মোটকথা, দুস্কৃতকারীদের সঙ্গে "যেমন কর্ম তেমনি ফল" নীতি অবলম্বন করে চলবেন, যাতে মুসলমানদের প্রতি তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণতা এবং ইসলামের মূলোৎপাটনে ধারণা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

বর্ণিত ঘটনা প্রবাহ ও সমস্যাসমূহ যেগুলো রাসূল নেতা হিসেবে মদিনা আগমনের পর প্রত্যক্ষ করেন, তিনি সে সকল সমস্যার সমাধান করেছিলেন নবী এবং নেতাসূলভ ভূমিকার মাধ্যমে। যে সম্প্রদায় দয়া পাবার যোগ্য তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং যারা কঠোরতা পাবার যোগ্য তাদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি এ সকল সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কঠোরতার চাইতে দয়াই তাঁর অধিক কাম্য এবং প্রিয় ছিলো। যার ফলে স্বল্প কালেরমধ্যেই মদিনার চাবি কাঠি মুসলমানদের হাতে এসে যায়।

প্রথম পর্যায়

নতুন সমাজ ব্যবস্থার রূপায়ণ

ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল মদিনায় আগমন করে প্রথম হিজরি রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ জুমুআর দিন মোতাবেক ২৭ শে সেপ্টেম্বর ৬২ খ্রিস্টাব্দে বনী নাজ্জার গোত্রের আবু আইউব আনসারীর বাড়ির সামনে অবতরণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন "ইন-শা আল্লাহ এটাই হবে অবস্থান স্থল"। অতঃপর তিনি আবু আইউব আনসারীর বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে যান।

মসজিদে নববীর নির্মাণ

এরপর রাসূল (ﷺ) এর প্রথম কাজ হলো মসজিদে নববীর নির্মাণ। আর এজন্য ঐ স্থানটিই নির্ধারিত হলো যেখানে সর্বপ্রথম তাঁর উটনীটি বসে পড়েছিলো। এই স্থানটির মালিক ছিলো দুই অনাথ বালক। তিনি ওই স্থানটি ন্যায্য মূল্যে ক্রয় করলেন এবং মসজিদের নির্মাণকার্যে অংশগ্রহণ করলেন। তিনি ইট ও পাথর বহন করছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বলছিলেন:

"হে আল্লাহ জীবনতো কেবল পরকালেরই জীবন। অতএব আনসার ও মুহাজিরদেরকে ক্ষমা করুন।"

অধিকন্তু একথাও বলছিলেন-

"হে আমাদের প্রভু! এটা খাযরাবের বোঝা নয়, এটাতো অধিক পুণ্যময় ও পবিত্র।"

রাসূল (ﷺ) এর কর্মধারা সাহাবা (রা) এদের উৎসাহিত, উদ্দীপিত ও উজ্জীবিত করেছিলো। তাই তারাও বলছিলেন-

"যদি আমরা বসে থাকি এবং নবী কাজ করেন তবে এ কাজ হবে আমাদের বাতিল কাজ।"

এ জমিতে মুশরিকদের কিছু সংখ্যক কবর ছিলো। কিছু অংশ পতিত ছিলো। তাছাড়া খেজুর ও গারকাদের কয়েকটি গাছ ছিলো। রাসূল মুশরিকদের কবরগুলো পরিষ্কার করে নিলেন, পতিত জায়গাটা সমতল করালেন এবং খেজুর ও অন্য গাছগুলো কেটে কেবলার দিকে খাড়া করে দিলেন। সে সময় কেবলা ছিলো বায়তুল মুকাদ্দাস (আল-আকসা)। দরজার দুই বাহুর স্তম্ভগুলি পাথর দ্বারা এবং দেয়াল নির্মিত হলো কাঁচা ইট দিয়ে। ছাদের ওপর খেজুরের ডালপালা চাপিয়ে আবরণ তৈরি করা হলো আর খেজুর গাছের গুড়ি দিয়ে খুঁটি তৈরি করা হলো। মেঝেতে বিছানো হলো বালি ও ছোট ছোট কাঁকর। তিনটি দরজা লাগানো হয়েছিলো। কেবলার দেওয়াল হতে পিছনের দেওয়াল পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ছিলো একশত হাত আর প্রশস্তও ছিলো ঐ পরিমাণ অথবা কিছুটা কম। ভিতের গভীরতা ছিলো তিন হাত।

মসজিদে নববী শুধুমাত্র নামায আদায়ের কেন্দ্রবিন্দুই ছিলো না; বরং তা ছিলো তৎকালীন মুসলিম রাষ্ট্রের বিভিন্নমুখী কর্মকান্ডের উৎসস্থল। এ মসজিদেই ছিলো মুসলিম সমাজের আদি-শিক্ষা কেন্দ্র, যেখানে বসে মুসলমানগণ ইসলামের যাবতীয় শিক্ষা-দীক্ষা এবং হেদায়েতের জীবনের দীর্ঘকালের বিবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের অবসান ঘটিয়ে আরব গোত্রগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলা হয়েছিলো। মসজিদেই বসত রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম পরিচালনের পরামর্শসভা। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ, সৈন্য পরিচালনা, সন্ধি স্থাপন, চুক্তি সম্পাদন ইত্যাদি যাবতীয় কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই মসজিদে নববী। অধিকন্তু, এ মসজিদেই ছিলো অনেক নিবেদিত সাহাবি (রা) এর আবাসস্থল, যাঁদের বাড়ি-ঘর ধন-সম্পদ এবং আত্মীয়-স্বজন বলতে কিছুই ছিলো না।

এই মসজিদ এক দিকে ছিলো যেমন মুসলমানদের শান্তি, স্বস্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান এর প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি আবার এই সমজিদেই ছিলো কাফির মুশরিকদের জন্য ভয়-ভীতির উৎস। হিজরতের প্রথম দিকেই আযান প্রথা চালু হয়। এটি এমন এক সুরেলা স্বর্গীয় সঙ্গীত এবং নামায কায়েমের উদ্দেশ্যে মসজিদে আগমনের জন্য এমন মনোজ্ঞ আহ্বান যা প্রত্যেক দিন পাঁচ বার প্রচার করা হয় সমজিদের মিনার থেকে। মসজিদে নববীতে যখন আযান দেয়া হতো এবং আযানের গুরুগম্ভীর আওয়াজ যখন দিকে দিকে ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হতে থাকতো, তখন একদিকে আল্লাহ-প্রেমিক মুসলমানদের অন্তর আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠতো, অন্যদিকে কাফের-মুশরিকদের অন্তর ভয়-ভীতিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠতো।

মসজিদে নববীর নির্মাণকার্যে রাসূল এবং মুসলমানগণ পারস্পরিক বোঝাপড়া, সাহায্য সহযোগিতা এবং উৎসাহ-উদ্দীপনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

তেমনিভাবে মুসলমানদের মধ্যে এমন অপূর্ব এক ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। যার তুলনা মানব জাতির ইতিহাসে কোথাও মিলবে না। মুসলমানদের এ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে "মুহাজির ও আনসারগণের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন" নামে অভিহিত করা হয়েছে। ইবনে কাইয়্যুম (রহ) লিখেছেন, রাসূল আনাস বিন মালেকের গৃহে মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। উক্ত সভায় সর্বশেষ নব্বইজন উপস্থিত ছিলেন, অর্ধেক সংখ্যক ছিলেন মুহাজির এবং অর্ধেক-সংখ্যক আনসার। "মুহাজির-আনসার ভ্রাতৃত্বের" মূলনীতিগুলো ছিলো "একে অন্যের ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী হবেন। ওয়ারাসাত বা উত্তরাধিকারের এই ব্যবস্থা বদর যুদ্ধ পর্যন্ত চালু ছিলো। অতঃপর যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো-

"রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় একে অপরের অধিক হকদার।" (সূরা আনফাল: আয়াত ৭৫)।

তখন আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যকার পারস্পরিক উত্তরাধিকারের ব্যবস্থা কুরআনের বিধান অনুসারে হয়ে গেল। কিন্তু ভ্রাতৃত্ব বন্ধন বজায় থাকল।

কথিত আছে, রাসূল কেবলমাত্র মুহাজিরীনদের মধ্যে আরও এক ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু প্রথম মতটিই অধিক প্রামাণ্য ও গ্রহযোগ্য। কেননা, মুহাজিরীনরা এমনিতেই পরস্পর ইসলামী ভ্রাতৃত্বে, দেশীয় ও গোত্রীয় ভ্রাতৃত্বের এবং আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলো। তাঁদের মধ্যে নতুন করে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিলো না, কিন্তু আনসারদের ব্যাপারটি ছিলো ভিন্ন।

এ ভ্রাতৃত্বের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে মুহাম্মাদ গাযালী লিখেছেন, "এ ছিলো জাহেলী যুগের বংশীয় সম্পর্ক ছিন্নকারী। আত্মীয়তা বা অনাত্মীয়তার সম্পর্ক মুছে যাবে। উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণীর মানবতার মাপকাঠি হবে কেবলমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতে, অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে নয়।

রাসূল এ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে শুধুমাত্র ফাঁকা বুলিতেই রেখে দেননি; বরং এ ছিলো এমন এক কার্যকর অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি, যা রক্ত ও ধন-সম্পদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলো। এটা সালাম ও মুবারকবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। বরং এই ভ্রাতৃত্বের মধ্যে ছিলো সমবেদনা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। আর এই কারণেই তাঁর পরিকল্পিত ও প্রতিষ্ঠিত এই নবতর জীবনধারা মানব জাতির ইতিহাসে এমন এক অধ্যায় রচনা করেছিলো, কোনো কালেই যার কোনো তুলনা মিলবে না।

সহিহ বুখারীতে বর্ণিত আছে, মুহাজিররা যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন রাসূল (ﷺ) আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) এবং যায়েদ বিন রাবী'র মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে দিয়েছিলেন। এরপর যায়েদ (রা) আব্দুর রহমানকে (রা) বললেন, "আনসারদের মধ্যে আমি সর্বাপেক্ষা ধনী ব্যক্তি। আপনি আমার সম্পদ দুইভাগে ভাগ করে অর্ধেক গ্রহণ করুন। তাছাড়া, আমার দুজন স্ত্রী রয়েছে। দুজনের মধ্যে যাকে আপনার পছন্দ হয়, আমাকে বলুন, আমি তাকে তালাক দেব। ইদ্দত পালনের পর তাকে বিয়ে করবেন।"

আব্দুর রহমান (রা) বললেন, "আল্লাহ আপনার ধন-সম্পদ, স্বীয়-সন্তানদের মাঝে বরকত দিন। আপনাদের বাজার কোথায়? তাঁকে বনু কাইনুকার বাজার দেখিয়ে দেয়া হলো। তিনি যখন বাজার থেকে ফিরে এলেন তখন তাঁর নিকট কিছু পনির ও ঘি ছিলো। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত বাজারে যেতেন। যখন একদিন তিনি বাজার থেকে ফিরে এলেন তখন তাঁর শরীরের হলুদ রঙের চিহ্ন ছিলো। রাসূল (ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কী?" তিনি বললেন, "আমি বিয়ে করেছি।" রাসূল বললেন, "স্ত্রীকে মোহর দিয়েছ তো?" তিনি বললেন," একটি খেজুরের আটি পরিমাণ স্বর্ণ (অর্থাৎ সোয়া ভরি) দিয়েছি।"

আবু হুরায়রা এর এক বর্ণনা মতে, আনসারগণ রাসূল (ﷺ) এর নিকট এ বলে আবেদন পেশ করলেন, "আপনি আমাদের এবং মুহাজির ভাইদের মধ্যে আমাদের খেজুর বাগানগুলো ভাগ বণ্টন করে দিন"। তিনি বললেন, "না"।

আনসারগণ বললেন, "তবে আপনারা আমাদের কাজ করে দেবেন। তার বিনিময়ে আমরা শস্যের অংশ দিব। তারা বললেন, "ঠিক আছে।"

এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায় আনসারগণ কিভাবে আন্তরিকতা ও আগ্রহের সঙ্গে সামনে এগিয়ে মুহাজির ভাইদের জন্য সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছিলেন এবং কতটুকু মুহব্বত, আন্তরিকতা ও আত্মত্যাগের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। অধিকন্তু, মুহাজিররাও তাঁদের আনসার ভাইদের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাশীল, সহমর্মী ছিলেন তা এই ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয়। আনসারগণের আত্মত্যাগের সুযোগ তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু এই সুযোগের অপব্যবহার কখনই করেননি। তাঁদের ভেঙে যাওয়া জীবনধারাকে ন্যূনতম প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে সচল করে তোলার জন্য যতটুকু গ্রহণ করার প্রয়োজন ছিলো, তাঁরা ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করেছিলেন।

এই সম্পর্কে সত্য কথা বলতে গেলে এ কথা অবশ্যই বলতে হয় যে, এই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের ভিত্তিও ছিলো অভাবিত ও অপূর্ব এক ঐশী দর্শন।

পরস্পর ধর্মীয় সাহায্যের অঙ্গীকার

উপরিউল্লিখিত ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনের মতোই রাসূল মুসলমানদের মধ্যে আরও একটি অঙ্গীকারপত্র সম্পাদন করেছিলেন, যা দ্বারা জাহেলিয়াত যুগের সকল গোত্রীয় কলহের অবসান এবং যাবতীয় কুসংস্কার ও কসম-রেওয়াজের বিলোপ ঘটে। উক্ত অঙ্গীকারনামার দফাগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে লিপিবদ্ধ করা হলো। এ চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর পক্ষ থেকে কুরাইশ, ইয়াসরেবী এবং তাঁদের অনুসারী ও তাঁদের সঙ্গে মিলিত হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণকারী মুসলমানগণের জন্য।

১. তারা নিজেদের ছাড়া অন্য সকল মানব থেকে ভিন্ন একটি গোষ্ঠী।

২. কুরাইশ-মুহাজিররা নিজেদের পূর্বেকার অবস্থা মোতাবেক নিজেদের মধ্যে দিয়ত (হত্যার বিনিময়) দেবেন এবং মু'মিনদের মঙ্গে বন্দীদের মুক্তিপণ প্রদান করবেন এবং তাঁদের সকল দল ইমানদারদের মধ্যে ন্যায়-সঙ্গত পন্থায় আপন বন্দীদের জন্য মুক্তিপণ প্রদান করবেন।

৩. ঈমানদারগণ কোনো সহায় সম্পদহীনকে (অনাথ) মুক্তিপণ ও দিয়ত প্রদানের ব্যাপারে উত্তম পন্থা অবলম্বন, সম্মান করা থেকে বিমুখ করবেন না।

৪. সকল ধর্মপ্রাণ মু'মিন ঐ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ করবেন, যারা ঈমানদারদের বিরুদ্ধে অন্যায়, অত্যাচার, পাপ ও গন্ডগোলের পথ বেছে নেবে।

৫. মু'মিনগণ তাদের বিরুদ্ধে কাজ করবেন, যদিও তাদের মধ্যে কেউ আপন পুত্রও হয়।

৬. কোনো কাফিরের বদলে কোনো মু'মিনকে হত্যা করবেন না।

৭. কোনো মু'মিন কোনো মু'মিন এর বিরুদ্ধে কোনো কাফিরকে সাহায্য করবেন না।

৮. আল্লাহর যিম্মা (অঙ্গীকার) একই হবে। একজন সাধারণ মানুষের প্রদানকৃত যিম্মা সকল মুসলমানের জন্য সমানভাবে পালনযোগ্য।

৯. যে সকল ইহুদি মুসলমানদের অনুগামী হবে, তাদেরকে প্রয়োজনে সাহায্য করতে হবে এবং তারা অন্য মুসলমানদের মতো হয়ে যাবে। তাদের প্রতি কোনো অন্যায় করা যাবে না। কিংবা তাদের বিরুদ্ধে অন্যকে সাহায্যও করা যাবে না।

১০. মুসলমানদের সম্পাদিত সন্ধি হবে একই। কোনো মুসলমান কোনো মুসলমানকে বাদ দিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধের ব্যাপারে কোনো সন্ধি করবেন না; বরং সকলে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতেই তা করবেন।

১১. মুসলমানরা ঐ রক্তপাতের ব্যাপারে সমান অধিকার রক্ষা করবেন, যা আল্লাহর পথে প্রবাহিত হবে।

১২. কোনো কুরাইশ মুশরিককে আশ্রয় দেবে না, তাদের ধন-সম্পদ রক্ষণা বেক্ষণের ব্যাপারে সাহায্য করবে না, আর কোনো মুমিনের হেফাজতের ব্যাপারে মুশরিকদেরকে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড় করাবে না।

১৩. যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে হত্যা করে এবং তা যদি প্রমাণিত হয় তাহলে তার নিকট থেকে হত্যার বদলা গ্রহণ করা হবে, যদি নিহতের অভিভাবক রাজী থাকেন।

১৪. কোনো মু'মিনের জন্য এটি সঙ্গ হবে না যে, যারা গণ্ডগোল সৃষ্টি করে (বিদয়াতী) তাদের কার্যকলাপে সাহায্য করে অথবা তাকে আশ্রয় দেয় কিংবা যে তাকে সাহায্য করে তাকে আশ্রয় দেয়। যে এরূপ করবে কিয়ামতের দিন সে অভিশাপ এবং গযবে নিপতিত হবে এবং ফরয ও নফল কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।

১৫. তোমাদের মধ্যে যখনই কোনো মতভেদ পরিলক্ষিত হবে, তখনই তা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের বিধি-বিধান মত ফয়সালার ব্যবস্থা করবে।

জীবনধারায় বৈপ্লবিক ধ্যান-ধারণার প্রবর্তন

ইসলামী রাষ্ট্র ও মহান বিজ্ঞানময় মুসলিম সমাজের এ ক্রান্তিলগ্নে রাসূল এক নতুন জীবনধারার ভিত্তি স্থাপন করেন। এ জীবন ধারার বাহ্যিকতা প্রকৃতপক্ষে ঐ অভ্যন্তরীণ পরিপূর্ণতারই রশ্মি ছিলো, যাকে নবীর সঙ্গ ও সাহচর্যের বদৌলতে অভাবিতপূর্ব এক সম্মানের আসনে সমাসীন করা সম্ভব হয়েছিলো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর শিষ্যদের দীক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও উত্তম চরিত্র গঠনে উৎসাহিত করতেন এবং অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন।

তিনি তাঁর শিষ্যগণকে সদা-সর্বদা ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা আনুগত্য ও আদব-কায়দার তালীম দিতেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তা মেনে চলার জন্য পরামর্শ দিতেন।

একজন সাহাবা রাসূল কে জিজ্ঞেস করলেন "কোন ইসলাম উত্তম? অর্থাৎ ইসলামের কোন আচার-আচরণটি উৎকৃষ্ট"? তিনি বললেন, তুমি খাদ্য খাওয়াও এবং চেনা-অচেনা (সকলকে) সালাম দাও।"

আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রা) এর মতে, "রাসূল (ﷺ) যখন মদিনায় আগমন করলেন, তখন আমি তাঁর দরবারে হাযির হয়ে তাঁর পবিত্র মুখমন্ডল প্রত্যক্ষ করেই স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলাম, এ কমনীয়, রমনীয়, সুষমাসিগ্ধ ও উজ্জ্বলতামন্ডিত মুখমন্ডলটি কোনো মিথ্যুক মানুষের হতেই পারে না এবং তার মুখ-নিঃসৃত যে প্রথম বানীটি শ্রবণ করেছিলাম তা ছিলো, "হে লোকসকল! তোমরা পরস্পর পরস্পরকে সালাম দেয়ার রেওয়াজ চালু করো, খাদ্য খাওয়াও, আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করো এবং রাত্রিবেলা মানুষ যখন নিদ্ৰাসুখে মগ্ন থাকবে তখন আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাক। (তবে) নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

রাসূল বলতেন, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার প্রতিবেশী তার অন্যায়-অত্যাচার থেকে নিরাপদে না থাকে।

তিনি আরও বলেছেন," (প্রকৃত) মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যার হাত ও জিহবা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদে থাকে"।

তিনি আরও বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে কেউ (প্রকৃত) মুসলমান হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে অপর ভাইয়ের জন্য ঐ সকল জিনিস পছন্দ করবে যা নিজের জন্য পছন্দ করে"।

তিনি আরও বলেছেন, "সকল মুমিন একটি মানব দেহের মতো, যদি তার চোখে ব্যথা হয়, তাহলে সমগ্র দেহেই ব্যথা অনুভূত হবে, আর যদি মাথার ব্যথা হয়, তাহলে তার সমগ্র শরীরেই সে ব্যথা অনুভূত হবে"।

তিনি আরও বলেছেন, "মুমিন মুমিনের জন্য একটি দালান ঘরের ন্যায়, একাংশ অপর অংশকে শক্তি দান করে।"

তিনি আরও বলেছেন, "নিজেদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ রাখবে না, রাগ করবে না, একে অপর থেকে মুখ ফিরাবে না, আল্লাহর বান্দা ও আপসের মধ্যে ভাই ভাই হয়ে থাকবে। কোনো মুসলমানের জন্য হালাল নয় যে, সে তিনদিনের বেশি তার ভাইয়ের সাথে ক্রোধবশত: কথাবার্তা বলবে না।

তিনি আরও বলেছেন, "মুসলমান মুসলমান ভাই, না তার প্রতি অন্যায় করবে আর তাকে শত্রুর হাতে অর্পণ করবে। আর যে ব্যক্তি স্বীয় (মুসলমান) ভাইয়ের প্রয়োজন মেটাতে সচেষ্ট হবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন মিটাতে থাকবেন। কোনো মুসলমান যদি তার মুসলমান ভাইয়ের দুঃখ কষ্ট দূরীভূত করে, তবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। আর কোনো মুসলমান যদি তার মুসলমান ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন করে তবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।

আরও বলেছেন, "তোমরা পৃথিবীবাশির প্রতি সদয় হও, আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি সদয় হবেন।

তিনি আরও বলেছেন, ঐ ব্যক্তি মুসলমান নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই প্রতিবেশী অনাহারে থাকে"।

তিনি আরও বলেছেন, "মুসলমানদের গালি দেয়া ফাসিক (পাপ), তাদের হত্যা করা কুফরী কাজ (অবিশ্বাসের কর্ম)"।

এভাবে তিনি রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূরীভূত করাকে সদকা বলে গণ্য করতেন এবং এটাকে ঈমানের শাখাসমূহের মধ্যে একটি শাখা বলে গণ্য করতেন।

রাসূল দান খয়রাতের ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন এবং এ সবের এমন এমন ফযীলত বর্ণনা করতেন, যেদিকে মন এমনিতেই আকৃষ্ট হতো। তিনি বলতেন, সদকা এবং দান খয়রাত পাপকে এমনভাবে মুছে ফেলে যেমনি পানি আগুনকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে।

তিনি আরো বলেছেন, "কোনো মুসলমান যদি কোনো নগ্ন মুসলমানকে কাপড় পরিয়ে দেয়, তা হলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরিয়ে দিবেন এবং কোনো মুসলমান যদি ক্ষুধার্ত মুসলমানকে খাদ্য খাওয়ায়, তাহলে আল্লাহ তাকে জান্নাতে ফল খাওয়াবেন এবং কোনো মুসলমান যদি কোনো তৃষ্ণার্ত মুসলমানকে পানি পান করায়, তাহলে আল্লাহ-তাকে জান্নাতে মোহরকৃত পবিত্র শরাব পান করাবেন।"

তিনি বলেছেন, "আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করো, যদিও খেজুরের অর্ধাংশ দিয়েও হয়। তাও যদি না পাও তাহলে কমপক্ষে ভালো কথা দ্বারা ভিখারীকে তুষ্ট করো।"

অথচ ভিক্ষা করা থেকে চরমভাবে নিষেধ করেছেন, ধৈর্যধারণ এবং অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়ার ফযীলত শুনাতেন, ভিক্ষুকদের ভিক্ষাবৃত্তিকে তাদের মুখমন্ডলে আঁচড়, পাচড়া ও ক্ষত আখ্যায়িত করেছেন।

অবশ্য সীমাতিরিক্ত নিরুপায় হয়ে যারা ভিক্ষা করে তাদেরকে এর বাইরে রেখেছেন।

কোন ইবাদতের কী ফযীলত এবং আল্লাহর নিকট তার কী সওয়াব ও পুরস্কার রয়েছে সে সবও তিনি আলোচনা করতেন। উপরন্তু, তাঁর নিকট যে সকল আয়াত অবতীর্ণ হতো মুসলমানদেরকে তার সঙ্গে শক্তভাবে জড়িয়ে রাখতেন। সেই সকল আয়াত তিনি মুসলমানদেরকে পড়ে শোনাতেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাঁদের তা পড়ে শোনাতে বলতেন। উদ্দেশ্যে ছিলো এ কাজের মাধ্যমে তাঁদের মনের মধ্যে চিন্তা-ভাবনার উদ্রেক এবং দাওয়াতের যোগ্যতা, পয়গম্বরত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করা।

এভাবে রাসূল মুসলমানদের সুপ্ত সম্ভাবনাসূহের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মানবত্বের সর্বোচ্চ স্তরে তাঁদের উন্নীত করেন এবং জাগতিক ও পারলৌকিক ভাবধারার সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটিয়ে ঐশী চেতনা ও ন্যায়-নীতির প্রতি নিবেদিত ও সমর্পিত এমন এক মানবগোষ্ঠির গোড়াপত্তন করেছিলেন, ইতিহাসে যার কোনো নজির নেই। এই মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যদের বলা হতো সাহাবি (রা)। মান-মর্যাদা এবং মানবতার উৎকর্ষতার ক্ষেত্রে সাহাবিগণের স্থান ছিলো নবী-রাসূলগণের পরেই। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, "যার অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে। সে অতীত মানবগোষ্ঠীর অনুসরণ করুক। কেননা, জীবিতদের ব্যাপারে ফিৎনার ভয় রয়েছে"।

"অতীত মানবগোষ্ঠী" বলতে তিনি সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেছেন, "তাঁরা নবীর সঙ্গী ছিলেন। নবীর এই উম্মত ছিলো সর্বোৎকৃষ্ট মানব, সব চাইতে পুণ্যবান, সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সব চাইতে নিবেদিত। আল্লাহ তাঁদেরকে নিজ নবীর বন্ধুত্ব এবং ঐশী দ্বীন প্রতিষ্ঠার মহান-ব্রতে শরীক হওয়ার দুর্লভ সুযোগ দানে ধন্য ও সম্মানিত করেছেন। তাঁদের পদাংক অনুসরণপূর্বক তাঁদের চরিত্রে চরিত্রবান হওয়া প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। কারণ তাঁরা ছিলেন হেদায়েতপ্রাপ্তির উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত।

আধ্যাত্মিক অলৌকিক চেতনায় উজ্জীবিত প্রেরণাবোধ এবং ঐকান্তিক পচেষ্টার ফলে নবী করীম (ﷺ) মদিনার সমাজ জীবনে এমন এক জীবনধারা বর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, অখন্ড মানব জাতির ইতিহাসে যা ছিলো সর্বোচ্চ মানের এবং সর্বাধিক পূর্ণত্বপ্রাপ্ত। এই জীবনধারায় তিনি এমন সব নিয়মনীতি এবং আচার-আচরণ প্রবর্তন করলেন, যা যুগ-যুগান্তর ধরে অব্যাহত থাকা শোষণ, শাসন ও নিস্পেষণের যাঁতাকালে নিস্পেষিত মানব জীবনকে শান্তি, স্বস্তি ও মুক্তির আস্বাদে ভরপুর করে তোলে। এই জীবনধারার উপাদানগুলোকে এমন উঁচু মানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পূর্ণতা দান করা হয়েছিলো যে, যুদ্ধ এবং শান্তি সকল অবস্থায় মোকাবেলা করে যে কোনো পরিস্থিতির মোড় নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার মতো যোগ্যতা মুসলমানরা অর্জন করেছিলেন। মুসলমানদের এমন পরিবর্তিত জীবনধারা যেন আকস্মিকভাবেই ইহিহাসের মোড় পরিবর্তন করে দেয়।

ইহুদিদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন

হিজরতের পর মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে গঠিত মদিনার মুসলিম সমাজকে পারস্পারিক আস্থা বিশ্বাস, সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এবং পরিচ্ছন্ন নিয়ম- শৃংখলার ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে নবী করীম- যখন সক্ষম হলেন, তখন মদিনার অমুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও সমঝোতা গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন। তাঁর এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে ছিলো জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সুখী, সমৃদ্ধ ও বরকতময় জীবনের প্রশস্ততা, মদিনাবাসী ও পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্যবোধ সৃষ্টি ও একতার বন্ধন সুদৃঢ়করণ। উক্ত লক্ষ্যে উদার উম্মুক্ত মন-মানসিকতা নিয়ে এমন সব নিয়ম-নীতি ও কার্যক্রম তিনি অবলম্বন করলেন যে, ধর্মান্ধতা ও স্বার্থান্ধতা-ক্লিষ্ট সমসাময়িক সমাজে যা ছিলো একটি কল্পনাতীত ব্যাপার।

মদিনার মুসলমানদের নিকটতম প্রতিবেশী ছিলো ইহুদিরা। মদিনায় মহানবীর হিজরতের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের সুশৃংখল সমাজ গঠন, ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন এবং ক্রমবর্ধমান শক্তি সামর্থ্যের ব্যাপারে তারা সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু লক্ষ করে যাচ্ছিল। সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের সকল ক্ষেত্রেই মুসলমানদের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেও প্রকাশ্য কলহ কিংবা ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়ার হাবভাবও প্রকাশ করেনি। কাজেই রাসূল তাদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজন অনুভব করে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই চুক্তিতে তাদেরকে জানমালের সাধারণ নিরাপত্তা এবং ধর্ম-কর্মের স্বাধীনতার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। তাতে দেশত্যাগ, মালক্রোক এবং বাগড়া-ফাসাদের ব্যাপারে কোনো নীতি নির্ধারণ করা হয়নি।

এ চুক্তি ঐ চুক্তির সঙ্গেই হয়েছিলো, যা মুসলমানদের পরস্পরের সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিলো, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্নে তার উল্লেখযোগ্য ধারাসমূহ আলোচনা করা হলো।

১. বনু আওফের ইহুদিরা মুসলমানদের সঙ্গে মিলে মিশে একই উম্মতের ন্যায় থাকবে, কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ে লোকেরাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। এটা তাদের নিজেদের অধিকার হিসেবে যেমন গণ্য হবে, ঠিক তেমনিভাবে তাদের সঙ্গে যারা সম্পর্কিত তাদের এবং তাদের দাস-দাসীদের বেলায়ও গণ্য হবে। বনু আউফ ছাড়া অন্যান্য ইহুদিদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে।

২. মুসলমান এবং ইহুদি উভয় সম্প্রদায়ের লোকই নিজ-নিজ আয়-উপার্জনের যিম্মাদার থাকবে।

৩. এ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের সাথে অন্য কোনো শক্তি যুদ্ধে লিপ্ত হলে চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলো সম্মিলিতভাবে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

৪. এই চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের লোকেরা নিজেদের মধ্যে সহানুভূতি, সদিচ্ছা ও পারস্পরিক উপকারের ভিত্তিতে কাজ করে যাবে, কোনো অন্যায় অনাচার কিংবা পাপাচারের ভিত্তিতে নয়।

৫. মিত্রপক্ষে অন্যায়-অনাচারের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

৬. কেউ কারো ওপর যুলুম করলে মযলুমকে সাহায্য করা হবে।

৭. চুক্তিবদ্ধ কোনো পক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে যতদিন চলতে থাকবে ততদিন ইহুদিদেরকেও মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধের খরচ বহন করতে হবে।

৮. এ চুক্তিভুক্ত সকলের জন্যই মদিনায় কোনো প্রকার হাঙ্গামা সৃষ্টি করা কিংবা রক্তপাত ঘটানো হারাম হবে।

৯. চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলো কোনো নতুন সমস্যা কিংবা ঝগড়া ফাসাদে জড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে এর মীমাংসা করবেন আল্লাহও তাঁর রাসূল।

১০. মক্কার কুরাইশ ও তাদের সহায়তাকারীদের আশ্রয় দেয়া চলবে না।

১১. ইয়াসরিবের ওপর কেউ হামলা চালালে সম্মিলিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে এবং নিজ নিজ অঞ্চল থেকে তা প্রতিহত করতে হবে।

১২. কোনো অন্যায়কারী কিংবা পাপীর জন্য এ চুক্তি সহায়ক হবে না।

এ চুক্তি সম্পাদনের ফলে মদিনা এবং সংলগ্ন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ এক শান্তি-স্বস্তিময় সাম্রাজ্যে রূপ লাভ করে, যার রাজধানী ছিলো মদিনা এবং এর সর্বময় নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)। এই সাম্রাজ্য পরিচালনার ভিত্তি ছিলো ইসলামী বিধি-বিধান এবং পরিচালনা ভাগের অধিকাংশ কর্মকর্তা ছিলেন মুসলমান। প্রকৃতপক্ষে এভাবে মদিনা ইসলামী হুকুমতের রাজধানীতে পরিণত হয়ে যায়।

সুশৃংখল এবং শান্তি স্বস্তিময় অঞ্চলের সীমারেখা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে নবী করীম (ﷺ) পরবর্তী পর্যায়ে অন্যান্য গোত্রের সঙ্গে অবস্থার প্রেক্ষাপটে অনুরূপ চুক্তি সম্পাদন করেন। সে সব চুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা হবে।

অস্ত্রের ঝনঝনানি

হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সংঘাতময় কর্মসূচি এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সঙ্গে পত্রালাপ, মক্কার কুরাইশ মুশরিকরা মুসলমানদের ওপর কিরূপ অন্যায় অত্যাচার ও নিপীড়ন-নির্যাতন করেছিলো এবং যখন তারা মদিনায় হিজরত শুরু করেন, তখন কারা তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের বিদ্বেষমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলো তা ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। যার ফলে তাদের ধনমাল ছিনিয়ে নেয়া এবং সাধারণভাবে তাদেরকে হত্যার নির্দেশ প্রদানের যোগ্য হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এরপরও তাদের অন্যায় আচরণ, হঠকারিতামূলক কার্য-কলাপ বন্ধ হলো না। পক্ষান্তরে, মুসলমানেরা তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়ে মদিনায় একটা নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেছে এবং ধীরে ধীরে সুসংগঠিত ও শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে এটা প্রত্যক্ষ করে তাদের ক্রোধাগ্নি অতিমাত্রায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। তাই তারা অনারাবদের নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে প্রকাশ্য হুমকি সহকারে একটি পত্র লিখল, যদিও তিনি তখন পর্যন্ত খোলাখুলিভাবে মুশরিকই ছিলেন এবং মদিনাবাসী তার নেতৃত্বের ব্যাপারে সকলেই অভিন্ন মত পোষণ করছিলো। তখন মদিনাবাসীর মধ্যে এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো যে, মদিনায় রাসূল আগমনের সুসংবাদ না হলে তারা তাকেই মুকুট পরিয়ে তাদের বাদশাহ নির্বাচিত করতো। মুশরিকদের উক্ত পত্রের সার-সংক্ষেপ ছিলো নিম্নরূপ।

"তোমরা আমাদের কিছু বিপথগামী লোককে আশ্রয় দিয়েছো। এজন্য আমরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, হয় তোমরা তোমাদের দেশ থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করে দেবে অন্যথায় সব দলবলে তোমাদের ওপর ভীষণভাবে আক্রমণ চালিয়ে তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা এবং মহিলাদের মানহানি করবো।"

এই পত্র পাওয়ামাত্রই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার ঐ মক্কাবাসী মুশরিক ভাইদের নির্দেশ পালনার্থে ওঠে পড়ে লেগে গেল। যেহেতু তার অন্তরে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো যে, মদিনায় রাসূল আগমনের কারণেই তাকে মদিনার বাদশাহী থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে, সেহেতু পূর্ব থেকেই সে রাসূলুল্লাহর প্রতি হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছিলো। অতএব কারণে কালবিলম্ব না করে রাসূল তাদের নিকট আগমণ করলেন এবং তাদের সম্বোধন করে বললেন, "আমি দেখছি যে কুরাইশদের হুমকি তোমাদের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। কিন্তু এটা তোমাদের অনুধাবন করা উচিত, তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে যে পরিমাণ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে যাচ্ছ কুরাইশরা কোনোক্রমেই তোমাদের সেই পরিমাণ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। "তোমরা কি তোমাদের পুত্র ও ভ্রাতাদের সঙ্গে নিজেরাই যুদ্ধ করতে চাও?"

নবীজীর কথা শুনে তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। কাজেই, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে তার প্রতিহিংসাজনিত যুদ্ধের সংকল্প থেকে তখনকার মতো বিরত থাকতে হয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথায় তার সঙ্গী-সাথিদের যুদ্ধ স্পৃহা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু এতদসত্ত্বেও কুরাইশদের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ চলতে থাকে। কারণ, মুসলমান ও কফিরদের মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করার ইচ্ছা তার আদৌ ছিলো না। তাছাড়া, ইহুদিদের সঙ্গেও সে যোগাযোগ রাখতে থাকে, যাতে প্রয়োজন হলে তাদের কাছ থেকেও যাহায্য লাভ সম্ভব হয়। কিন্তু রাসূল এ সময়োচিত ব্যবস্থপনার ফলে ঝগড়া বিবাদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা ক্রমে ক্রমে প্রশমিত হতে থাকে।

মসজিদুল হারামের দরজা বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা

এরপর সাদ ইবনে মুআয (রা) উমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন এবং উমাইয়া ইবনে খালফের অতিথি হন। তিনি উমাইয়াকে সম্বোধন করে বলেন, "আমার জন্য এমন এক সময়ের ব্যবস্থা করে দাও যখন আমি নির্জনে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারি। কথামত উমাইয়া উত্তপ্ত দুপুরে তাকে নিয়ে বের হলে পথে আবু জাহেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। সে উমাইয়াকে সম্বোধন করে বলে, "হে আবু সাফওয়ান! তোমার সঙ্গে এ লোকটি কে?'

উত্তরে উমাইয়া বললো, এ হচ্ছে সা'দ।

আবু জাহেল তখন সা'দ (রা) কে লক্ষ করে বললো, "আমি দেখছি যে তুমি বড়ো নিরাপদে তাওয়াফ করতে এসেছো, অথচ তোমরা বেদ্বীনদেরকে আশ্রয় দিয়েছো এবং তাদেরকে সাহায্য করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছো। আল্লাহর কসম! যদি তুমি আবু সাফওয়ানের সঙ্গে না থাকতে তবে নিরাপদে ফিরে যেতে পারতে না।

তার একথা শুনে সা'দ (রা) উচ্চকণ্ঠে বললেন, "দেখো আল্লাহর কসম! যদি তুমি আমার এ কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করো, তবে তোমার এমন কাজে আমি প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াব যা তোমাদের জন্য হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তা হচ্ছে মদিনার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বাণিজ্য পথটি।

কুরাইশ কর্তৃক মুহাজিরদেরকে ধমক

কুরাইশ-মুশরিকরা মদিনার মুহাজিরদেরকে ধমকের সুরে বলে পাঠাল, মক্কা হতে তোমরা নিরাপদে ইয়াসরিবে পালিয়ে যেতে পেরেছো বলে অহংকারে ফেটে পড়ো না যেন। এটুকু জেনে রেখো, ইয়াসরিবে চড়াও হয়েই তোমাদের ধ্বংস করে ফেলার ক্ষমতা আমাদের রয়েছে।

তাদের এই ধমক শুধু যে কথাবার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো তা নয়; বরং এই ব্যাপারে তারা গোপনে গোপনে তৎপরও ছিলো। রাসূল তাদের এ ষড়যন্ত্রের কথা এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র থেকে জেনেছিলেন যে, তিনি সতর্কতা অবলম্বন না করে পারেন নি। নিরাপত্তার খাতিরে হয় জাগ্রত অবস্থায় তিনি রাত্রি যাপন করতেন, নতুবা সাহাবিদের প্রহরারত অবস্থায় ঘুমাতেন। যেমনটি সহিহ বুখারী এবং সহিহ মুসলিম শরীফে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, মদিনায় আগমনের পর একদা রাত্রি বেলায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন এবং আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন, আজ রাতে যদি তাঁর সাহাবিদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তি এখানে এসে পাহারা দিতেন (তাহলে কতই না ভালো হতো)।

আমরা ঐ অবস্থাতেই ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ অস্ত্রের ঝনঝনানি আমাদের কানে এল। রাসূল (ﷺ) প্রশ্ন করলেন "কে? উত্তরে জানানো হলো। "আমি সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস" রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, এই গভীর রাত্রে তোমার এখানে আগমনের কারণ কী? জবাবে তিনি বললেন, "আপনার সম্পর্কে আমার মনে বিপদের আশংকা উদ্রেক হওয়ায় আপনাকে পাহারা দেয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি।" তার একথা শুনে তিনি তার জন্য দু'আ করলেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন।

এটা স্মরণ রাখার বিষয়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পাহারা দেয়ার ব্যাপারটি শুধু কয়েকটি রাতের জন্য নির্দিষ্ট ছিলো না; বরং এটা ছিলো পর্যায়ক্রমিক এবং স্থায়ী ব্যবস্থা। আয়েশা (রা) হতে যেমনটি বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন যে, রাতে রাসূল কে পাহারা দেয়া হতো।

আবার মুশরিকদের শত্রুতাজনিত এ বিপদ শুধুমাত্র রাসূল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো না; বরং তা মুসলিম সমাজের সকল সদস্য পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। যেমনটি উবাই ইবনে কা'ব (রা) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, যখন রাসূল ও তাঁর সাহাবাগণ মদিনায় আগমন করেন এবং আনসারগণ তাদের আশ্রয় দান করেন তখন আরব মুশরিকগণ তাঁদেরকে একই কামান দ্বারা আক্রমণ করে। তাই তাঁরা অস্ত্র ছাড়া রাত্রি যাপন করতেন না, অস্ত্র ছাড়া সকাল বেলা নিদ্রা থেকে জাগ্রত হতেন না।

যুদ্ধের অনুমতি

মদিনায় ভয় ভীতি ও বিপজ্জনক অবস্থা, যা মুসলমানদের অস্তিত্বের জন্য একটি মারাত্মক চালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এবং যা দ্বারা এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো যে, কুরাইশরা কোনোক্রমেই তাদের বিদ্বেষ ও একগুঁয়েমী পরিহার করতে প্রস্তুত নয়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ মুসলমানদেরকে যুদ্ধের অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত মুসলমানদের ওপর যুদ্ধ ফরয হয়নি। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ যে আয়াত নাযিল করলেন, তা হচ্ছে নিম্নরূপ-

যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। (হাজ্জ: আয়াত-৩৯।)

অতঃপর এ ধরনের আরো বহু আয়াত অবতীর্ণ হয়, যেগুলোতে বলে দেয়া হয় যে, যুদ্ধের এ অনুমতি যুদ্ধ হিসেবে নয়; বরং এর উদ্দেশ্যে হচ্ছে বাতিলের বিলোপ সাধন এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিতকরণ। যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

পৃথিবীতে যদি আমি এদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করি তাহলে তারা নামায প্রতিষ্ঠিত করবে, যাকাত দিবে এবং ভালো কাজের জন্য আদেশ করবে ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (হাজ্জ: আয়াত-৪১।)

সঠিক কথা, যা না মেনে উপায় নেই তা হচ্ছে এই, এ অনুমতি সম্পর্কিত আয়াত হিজরতের পর মদিনায় অবতীর্ণ হয়, মক্কায় অবতীর্ণ হয়নি। তবে অবতীর্ণ হওয়ার সময় নিশ্চিতরূপে নির্দিষ্ট করা নিঃসন্দেহে মুশকিল।

যুদ্ধের অনুমতি তো নাযিল হলো, কিন্তু যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে নাযিল হলো, সেটি যেহেতু শুধু কুরাইশদের শক্তিমত্তা ও একগুয়েমীর ফল ছিলো সেহেতু এটাই ছিলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও বিজ্ঞোচিত কাজ যে, মুসলমানেরা নিজেদের দখল সীমা কুরাইশদের ঐ বাণিজ্য পথ পর্যন্ত বিস্তৃত করে নেবে, যা মক্কা হতে সিরিয়া পর্যন্ত চালু ছিলো। উক্ত কারণেই দখলসীমা বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দুটো পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন। পরিকল্পনা দুটো হচ্ছে যথাক্রমে-

১. যে সকল গোত্র রাজপথের আশ-পাশে কিংবা এই রাজপথ হতে মদিনা পর্যন্ত বিস্তৃত জায়গার মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাসরত ছিলো তাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন এবং যুদ্ধ না করার চুক্তি সম্পাদন।

২. এ রাজপথের ওপর টহলদারী দল প্রেরণ।

প্রথম পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো ঐ ঘটনাটি, যা পূর্বে ইহুদিদের সঙ্গে সংঘটিত হয়েছিলো এবং যে চুক্তিটির বিস্তারিত বিবরণ ইতোপূর্বে প্রদত্ত হয়েছে। সামরিক তৎপরতা শুরু করার পূর্বে রাসূল এভাবে জুহাইনা গোত্রের সঙ্গেও বন্ধুত্ব, মিত্রতা ও পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত না হওয়ার একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিলো।

মদিনা থেকে তিন মনজিলের অধিক, অর্থ: ৪০ থেকে ৫০ মাইলের ব্যবধানে তাদের আবাসস্থল অবস্থিত ছিলো। টহলদারী সৈন্যদের পরিভ্রমণ কালে লোকজনদের সঙ্গে কয়েকটি চুক্তিও সম্পাদন করেছিলেন, যার আলোচনা পরে আসছে। দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি ছিলো যুদ্ধ বিগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

বদরযুদ্ধের পূর্বেকার: সারিয়্যাহ ও গাযওয়াহসমূহ

যুদ্ধের অনুমতি সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হওয়ায় এ দুটো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে মুসলমানদের সামরিক তৎপরতার কাজ শুরু হয়ে যায়। পরিভ্রমণকারী প্রহরীরূপে মুসলিম সোনাবহিনী মদিনা এবং তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে টহল দিতে শুরু করেন। যেমনটি ইতোপূর্বে আভাস প্রদান করা হয়েছে। তাঁদের এই টহলদারীর মুখ্য উদ্দেশ্যে ছিলো মদিনার আশ-পাশে বিশেষভাবে মক্কা থেকে আগত পথগুলোর ওপর বিশেষভাবে লক্ষ রাখা। এভাবে বিভিন্ন পথের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লক্ষ করে যাওয়া এবং একই সঙ্গে এ সকল পথের আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলোর সঙ্গে মিত্রতা ও বন্ধুত্বের চুক্তি সম্পদন করা। অধিকন্তু, এ সুসংগঠিত টহলদারীর অন্য যে একটি উদ্দেশ্যে ছিলো তা হচ্ছে, ইয়াসরিবের ইহুদি, মুশরিক এবং বেদুঈনদের অন্তরে এই ধারণাটি বদ্ধমূল করে দেয়া যে, মুসলমানেরা এখন যথেষ্ট শক্তিশালী এবং পূর্বের নাজুক অবস্থাকে পেছনে ফেলে তারা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছেন। তাছাড়া কুরাইশ মুশরিকগণকে তাদের অর্থহীন ক্রোধ ও ইন্দ্রিয়াবেগের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া, যাতে এখনো তারা তাদের নির্বুদ্ধিতার অন্ধকূপে যে পতিত অবস্থায় রয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং জ্ঞান বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনার আলোকোজ্জ্বল পথচারণা শুরু করে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে নিজেদের আয় উপার্জন ও জীবন- জীবিকার পথে বিপদের সমূহ সম্ভাবনা এড়ানোর উদ্দেশ্যে সন্ধির কথাটা সক্রিয়ভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে সাথে সাথে মুসলমানদের আবাসস্থলের ওপর চড়াও হয়ে তাদের ধ্বংস করে ফেলার যে চরম হঠকারী সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর দ্বীনের পথে অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে সে সব থেকে বিরত থাকে।

সর্বোপরি, মুসলমানেরা যাতে আরব উপদ্বীপে আল্লাহর পয়গাম পৌছানোর ব্যাপারে নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে কর্মপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন, সেটাও ছিলো অন্যতম উদ্দেশ্যে।

সারিয়্যাহ ও গাযওয়াহসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

মদিনায় হিজরতের পর মুসলমানদের যে সকল সারিয়্যাহ ও গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করতে হয়েছিলো, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১. সমুদ্রোপকূলে প্রেরিত বাহিনী: হিজরি ১ম বর্ষের রমযান মাস মোতাবিক মার্চ ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে রাসূল (ﷺ) হামযা বিন আবুল মুত্তালিবকে এ অভিযানে সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং তাঁর অধীনে ৩০ জন মুহাজির সৈন্য নিয়ে তাদেরকে সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকারী কুরাইশ কাফেলার গতিবিধি লক্ষ করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনশত সদস্য বিশিষ্ট এ কুরাইশ কাফেলার অন্যতম সদস্য ছিলো আবু জাহেল। মুসলিম বাহিনী 'ইস' নামক জায়গায় পার্শ্ববর্তী সমুদ্রোপকূলের নিকট পৌছলে ঐ কাফেলার সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটে। উভয় দলই পরস্পরের মুখোমুখি হলে এক পর্যায়ে উভয় দলই যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু জুহাইনা গোত্রের নেতা মাজদী ইবনে আমর যিনি উভয় দলেরই মিত্র ছিলেন। অনেক চেষ্টা করে- তিনি উভয় দলকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখেন।

২. সারিয়্যাতু রাবেগ বা রাবেগ অভিযান: এই অভিযান পরিচালিত হয় হিজরি ১ম বর্ষের শাওয়াল মাস মোতাবিক এপ্রিল ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে। রাসূল উবাইদাহ ইবনে হারিস ইবনে মুত্তালিবকে ৬০ জন মুহাজিরের সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। অভিযানে তাঁরা রাবেগ উপত্যকায় আবু সুফিয়ানের সম্মুখীন হয়ে পরস্পর পরস্পরের ওপর কিছু তীর নিক্ষেপ করা ছাড়া তেমন কিছুই করেনি, যার ফলে বড়ো আকারের কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি।

এ অভিযানে মক্কা বাহিনী থেকে দুইজন এসে যোগদান করেন মুসলিম বাহিনীতে। তাঁদের একজন হচ্ছেন মিকদাদ বিন আমরুল বাহরানী এবং অন্য জন হচ্ছেন উতবা বিন গাযওয়ান মাযেনী (রা) উভয়েই মুসলমান ছিলেন, তাঁরা কাফিরদের সঙ্গে এই উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলোন যে, সামনে গিয়ে মুসলমানদের সঙ্গে মিশে যাবেন। আবু ওবায়দার (রা) পতাকা ছিলো সাদা এবং তার বহনকারী ছিলেন মিসতাহ বিন আসাসাহ বিন মুত্তালিব বিন আবদে মানাফ।

৩. সারীয়্যায়ে খাররার: এ অভিযান হিজরি ১ম বর্ষের যিলকাদ মাস মোতাবিক মে ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয়। রাসূল (ﷺ) সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসকে এ সারিয়্যাহর সেনাপতি নিযুক্ত করেন এবং বিশ জন যোদ্ধার সমন্বয়ে এক বাহিনী গঠন করে একটি কুরাইশ কাফেলার গতিবিধি লক্ষ করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তাদেরকে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বললেন যে, তারা যেন খাররার হতে সামনের দিকে আর অগ্রসর না হন। এ বাহিনী পায়ে হেটে পথ চলতেন। তারা দিনে নিজেদের গোপন করে রাখতেন এবং রাতের বেলা পথ চলতেন। পঞ্চম দিন সকালে তারা খাররার গিয়ে পৌঁছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যে, একদিন পূর্বেই সেই কাফেলা সে স্থান অতিক্রম করে গিয়েছে। এ সারিয়্যাহর পতাকা ছিলো সাদা রঙের এবং পতাকাবাহী ছিলেন মিকদাদ ইবনে আমর (রা)।

৪. গাযওয়ায়ে আবওয়া অথবা ওয়াদ্দান: এই গাযওয়ার সময় ছিলো হিজরি ২য় বর্ষের সফর মাস মোতাবিক আগস্ট, ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ। ৭০ জন মুহাজির যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল স্বয়ং এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এ গাযওয়ায় যাত্রার প্রাক্কালে সা'দ ইবনে উবাদাহ (রা) কে মদিনায় তার স্থলাভিষিক্ত রূপে নিযুক্ত করা হয়। তাঁদের এ যাত্রার উদ্দেশ্যে ছিলো একটি কুরাইশ কাফেলার পথরোধ করা। তাদের অগ্রযাত্রার এক পর্যায় তিনি ওয়াদ্দান গিয়ে পৌঁছেন।

কিন্তু এতে সংঘাতমূলক কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি। এ গাযওয়া অভিযানে রাসূল বনু যামরাহ গোত্রের তৎকালীন সরদার আমর ইবনে মুখশী যমরীর সঙ্গে একটি মিত্রতামূলক চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তির কথাগুলো ছিলো নিম্নরূপ-

"এটা হচ্ছে বনু যামরাহর জন্য মুহাম্মাদুর রাসূল (ﷺ) এর দলিল। এ গোত্রের লোকজনেরা লাভ করবে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা। তারা আক্রান্ত হলে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করা হবে যদি তারা আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়। পক্ষান্তরে, যখনই রাসূল (ﷺ) সাহায্যের জন্য তাদেরকে আহবান জানাবেন তখনই তাঁর সাহায্যার্থে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে।"

এটা ছিলো প্রথম সৈন্য পরিচালনা, যাতে রাসূল নিজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ অভিযানে ১৫ দিন যাবৎ মদিনার বাইরে থাকার পর তিনি মদিনায় ফিরে আসেন। এ অভিযানের পতাকার রঙ ছিলো সাদা এবং পতাকাবাহী ছিলেন হামযাহ (রা)।

৫. গাযওয়ায়ে বুওয়াত বা বুওয়াতের অভিযান: ২ হিজরির রবিউল আওয়াল মাসে (সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দ) সংঘটিত হয়। এসময় মুহাম্মাদ ২০০ সদস্যের একটি বাহিনী নিয়ে একটি কুরাইশ কাফেলার পথরোধের জন্য অভিযানের নেতৃত্ব দেন। মুসলিমরা বুওয়াত নামক স্থান পর্যন্ত পৌছায় তবে উভয় পক্ষ পরস্পর মুখোমুখি হতে পারেনি। অভিযানকালে সাদ ইবনে মুয়াজকে মদিনার আমির নিযুক্ত করা হয়। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বাহিনীর সাদা পতাকা বহন করেছিলেন।

৬. গাযওয়ায়ে সাফওয়ান: এ গাযওয়া সংঘটিত হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের রবিউল আওয়াল মাস মোতাবিক সেপ্টেম্বর ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। এ গাযওয়ার কারণ ছিলো, কুর্জ‌ ইবনে জাবির আল-ফিহরির নেতৃত্বে একটি দল মদিনার চারণভূমিতে আক্রমণ চালিয়ে মুসলিমদের গবাদিপশু লুট করে নেয়।

রাসূল সত্তর জন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং বদর প্রান্তরের পার্শ্ববর্তী সাফওয়ান উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেন। কিন্তু কুর্জ‌ এবং তার সঙ্গীরা অত্যন্ত দ্রুতবেগে তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়। রাসূল তাঁর বাহিনীসহ মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন। এই গাযওয়ায় শত্রু পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার কোনো সুযোগই সৃষ্টি হয়নি। কেউ কেউ এ গাযওয়াকে গাযওয়ায়ে বদরে উলা বা বদরের প্রথম যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন।

এ গাযওয়ায় যাওয়ার সময় রাসূল যায়েদ ইবনে হারিসাকে (রা:) মদিনার আমীর নিযুক্ত করেন। এ গাযওয়ায় পতাকার রঙ ছিলো সাদা এবং পতাকাবাহী ছিলেন আলী (রা)।

৭. গাযওয়ায়ে যিল উশাইরাহ: এ গাযওয়া সংঘটিত হয় হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের জমাদিউল উলা ও জমাদিউল উখরা মোতাবিক নভেম্বর ও ডিসেম্বর ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। এ অভিযানে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন একশত পঞ্চাশ কিংবা দুইশ মুহাজির সাহাবি। অবশ্য এ অভিযানে অংশ গ্রহণ করতে কাউকেই তিনি বাধ্য করেননি। সওয়ারীর জন্য উট ছিলো মাত্র ত্রিশটি। এ কারণে তারা পালাক্রমে সওয়ার হতেন। এ অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিলো সিরিয়া অভিমুখী এক কুরাইশ কাফেলার পথরোধ করা। জানা যায়, কাফেলা মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করেছে। এ কাফেলার সঙ্গে কুরাইশদের বহু সন্দর সুন্দর মূল্যবান মালপত্র ছিলো। এ কাফেলার সন্ধানে রাসূল তার বাহিনীসহ যুল উশাইরাহ পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু তারা সেখানে পৌঁছার কয়েক দিন পূর্বেই কুরাইশ কাফেলা সে স্থান ত্যাগ করেছিলো। এটা ছিলো ঐ যাত্রীদল, সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে রাসূল যাদেরকে গ্রেফতার করতে চেয়েছিলেন। ঐ যাত্রীদল তার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ফিরে গিয়েছিলো বটে, কিন্তু এর ফলে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিলো বদর যুদ্ধের।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, এ অভিযানে রাসূল বের হয়েছিলেন জমাদিউল উলার শেষ ভাগে এবং মদিনায় ফিরে এসেছিলেন জমাদিউল উখরায়। এ গাযওয়ায় রাসূল বনু মুদলিজ এবং তাদের মিত্র বানু যামরাহর সঙ্গে যুদ্ধ না করার চুক্তি সম্পাদন করেন।

উক্ত অভিযানের দিনগুলোতে আবু সালমা ইবনে আব্দুল আসাদ মাখযুমী (রা) মদিনার শাসন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। এবারের পতাকাও ছিলো সাদা রঙের এবং পতাকাবাহী ছিলেন হামযা (রা)।

৮. সারিয়্যাতু নাখলা: এ অভিযানের সময় ছিলো হিজরি দ্বিতীয় বর্ষের রজব মাস মোতাবিক জানুয়ারি ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে। এ অভিযানে রাসূল আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের (রা) নেতৃত্বে বারোজন মুহাজির সাহাবির একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনীর বাহন ছিলো প্রতি দুজনের জন্য একটি করে উট। একই উটের ওপর তারা পালাক্রমে আরোহণ করতেন। বাহিনীপ্রধানের হস্তে রাসূল একটি পত্র দিয়ে নির্দেশ প্রদান করেন, দুই দু'দিন পথ অতিক্রম করার পর যেন এই পত্র পাঠ করা হয়। সুতরাং দু'দিন পথ চলার পর আবদুল্লাহ (রা) পত্রটি পাঠ করেন। পত্রে লিখিত ছিলো "আমার এ পত্র পাঠ করার পর তোমরা সামনের দিকে এগিয়ে চলবে এবং মক্কাও তায়েফের মধ্যস্থানে অবস্থিত নাখলায় অবতরণ করবে। এক কুরাইশ কাফেলার আগমনের প্রতীক্ষায় তোমরা সেখানে ওৎ পেতে থাকবে এবং তাদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে আমাদের অবহিত করবে।" রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশ পালনের জন্য আবদুল্লাহ দ্বিধাহীন চিত্তে মানসিক প্রস্তুতি নেয়ার পর তাঁর সঙ্গীদের নিকট পত্রের বিষয়টি প্রকাশ করে বললেন, "আমি কারো ওপর জোর জবরদস্তি করতে চাই না। তোমদের মধ্যে যার শাহাদাত পছন্দনীয় নয়, সে প্রত্যাবর্তন করবে। শাহাদাতই আমার কাম্য"।

তাঁর একথা শোনার পর সঙ্গীরা সকলেই সম্মুখপানে অগ্রসর হতে থাকলেন। কিন্তু পথ অতিক্রম করার পর সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) এবং উতবা ইবনে গাযওয়ানের উটটি হারিয়ে যায়। এ উটটিই তাঁদের উভয়ের বাহন। উট হারিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁরা পিছনে থেকে যেতে বাধ্য হন।

আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা) এবং তার সঙ্গীগণ দীর্ঘপথ অতিক্রম করার পর নাখলায় অবতরণ করেন। সে সময় একটি কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলা সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের বাণিজ্য সামগ্রী ছিলো কিশমিশ, চামড়াসহ আরও অনেক সামগ্রী। ঐ কাফেলায় ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে মুগীরার দুই পুত্র ওসমান ও নওফর এবং মুগীরার মুক্ত দাস আমর ইবনে হাযরামী ও হাকীম ইবনে কায়সান। শত্রুপক্ষ নাগালের মধ্যে, অথচ দিনটি ছিলো হারাম মাস রজবের শেষ দিন। এ নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মনে কিছুটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ার পরিপেক্ষিতে তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করতে থাকলেন। যদি তারা এ দিনে যুদ্ধে লিপ্ত হন, তাহলে হারাম মাসের অসম্মান করা হবে। পক্ষান্তরে রাত্রি পর্যন্ত যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকলে ঐ কাফেলা আরও অগ্রসর হয়ে হারাম সীমার মধ্যে প্রবেশ করবে। উভয় সংকটজনিত দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে মুসলিম বাহিনী অবশেষে ঐ কুরাইশ কাফেলাকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।

আক্রমণের সূচনাতে মুসলিম বাহিনী আমর ইবনে হাযরামীকে লক্ষ করে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীর বিদ্ধ হাযরামী ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে।

তারপর তারা ওসমান এবং হাকীমকে বন্দী করে ফেললেন। কিন্তু নওফল পালিয়ে নাগালের বাইরে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হলো। বন্দী দু'জন এবং মালপত্রসহ মুসলিম বাহিনী নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করলেন। তারা গণীমতের মাল হতে পঞ্চমাংশ বের করেও নিয়েছিলেন।

সারিয়্যাতু নাখলার ঘটনার ফলে মুশরিকেরা এ ঘটনা রটানোর সুযোগ পায়, মুসলমানেরা আল্লাহর হারামকৃত মাসে যুদ্ধ এবং নরহত্যা করে হারাম বিধান লঙ্ঘন করেছে এবং তার অমর্যাদা করেছে। এর ফলে দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়। শেষ পযর্ন্ত আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করে এ সমস্যার সমাধান করে দেন। ওহীর মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন, মুশরিকরা যে সকল কাজকর্ম করছে তা মুসলমানদের এ কাজের তুলনায় বহুগুণে অপরাধজনক। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে-

"হারাম বা পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করে। তুমি বলো, তাতে যুদ্ধ করা খুবই অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে বাধা দেয়া এবং তার বাসিন্দাদের সেখান থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহর নিকট তদপেক্ষা অধিক অন্যায়। (আল্লাহর দৃষ্টিতে) হত্যা অপেক্ষা ফিতনা (শিরক ও কুফর) অনেক বেশি গুরুতর। (সূরা বাক্বারা: আয়াত ২১৭)

উক্ত ওহী নাযিল হওয়ার ফলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, মুসলিম মুহাজিরদের সম্পর্কে মুশরিকেরা যে অপবাদ রটাচ্ছে তা হচ্ছে সম্পূর্ণ অমূলক এবং ভিত্তিহীন। কেননা, কুরাইশ মুশরিক ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায় অনাচার ও যুলুম নির্যাতন করার ব্যাপারে বিন্দুমাত্রও ইতস্তত করেনি। কিংবা নিয়ম নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেনি যখন হিজরতকারী মুসলমানদের ধনমাল তারা ছিনিয়ে নেয়ার কাজে ব্যাপৃত থাকত এমনকি রাসূলুল্লাহকে হত্যার জন্য তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো। তখন হারাম মাস কিংবা হারাম সীমার (মক্কার) প্রতি তারা কোনো ভ্রুক্ষেপই করেনি। অথচ কী কারণে হঠাৎ করে তারা এ পবিত্র মাসগুলোর পবিত্রতার ব্যাপারে এত সচেতন হয়ে ওঠল এবং এগুলোর পবিত্রতা নষ্ট করা দোষণীয় বলে এত সোচ্চার হয়ে ওঠল? অবশ্যই মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকেরা যে গুজব রটিয়েছে এবং হৈ চৈ শুরু করেছে তা প্রকাশ্য বিদ্বেষ ও সুস্পষ্ট নির্লজ্জতার ওপরই প্রতিষ্ঠিত।

এরপর রাসূল বন্দী দুজনকে মুক্ত করে দেন এবং নিহত ব্যক্তির অভিভাবককে রক্তপণ দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন।

এই গাযওয়া এবং সারিয়্যাহ সম্পর্কে যেখান থেকে তথ্যাদি গৃহীত হয়েছে তার ধারাবাহিকতা এগুলো হচ্ছে বদর যুদ্ধের পূর্বেকার সারিয়্যাহ ও গাযওয়া। এগুলোর কোনোটাতেই সুস্পষ্ট ও হত্যার তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যে পর্যন্ত না কুরম ইবনে জাবির ফাহরীর নেতৃত্বে বুঝা গেল, এর সূচনাও মুশরিকদের পক্ষ থেকেই হয়েছিলো। ইতোপূর্বে তারা যেমন বিভিন্ন প্রকার অত্যাচার ও উৎপীড়ন চালিয়ে এসেছিলো, গবাদি পশু লুটপাটের ঘটনাটাও ছিলো অনুরূপ একটি ঘটনা।

আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের সারিয়্যার পর কুরাইশ মুশরিকদের মধ্যে কিছুটা ভয়-ভীতির ভাব পরিলক্ষিত হলো এবং তারা সুষ্পষ্টভাবে এটা উপলব্ধি করলো, তাদের সামনে এক ভয়াবহ বিপদের সম্ভাবনা ক্রমেই দানা বেঁধে ওঠেছে যে ফাঁদে পড়ার আশংকা তারা এতদিন করে আসছিলো, শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদেই তাদের পতিত হতে হলো। এ বিষয়টিও তাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মদিনার মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত সজাগ ও তৎপর এবং কুরাইশদের প্রত্যেকটি বাণিজ্য কাফেলার গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে চলেছে। তারা এটাও বুঝল, মুসলমানেরা এখন ইচ্ছা করলে তিন'শ মাইল পথ অতিক্রম করে আক্রমণ চালাতে, লোকজনদের বন্দী করে নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। এটাও তাদের নিকট সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, সিরিয়ামুখী ব্যবসা-বাণিজ্য এখন কঠিন বিপদের সম্মুখীন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা নিজেদের মূর্খতা এবং উদ্ধত আচরণ থেকে বিরত থাকল না। তারা জুহাইনা এবং বনু যামরাহ গোত্রদ্বয়ের ন্যায় সন্ধির পথ অবলম্বনের পরিবর্তে ক্রোধ, হিংসা ও দুশমনির মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। তারা ভাবলো তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মুসলমানদের আবাসস্থলে আক্রমণ চালিয়ে তারা তাদের একদম নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। উক্ত লক্ষ্যে এক সুসজ্জিত যোদ্ধা বাহিনীসহ তারা বদর প্রান্তর অভিমুখে অগ্রসর হলো। এবং এতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। তাই আমি আল্লামা ইবনে কাইয়িম এবং আল্লামা মানসুরপুরী গৃহীত তথ্যের ওপর নির্ভর করেছি।

এখন মুসলমানদের সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, আব্দুল্লাহ ইবনু জাহশের সারিয়্যার পর দ্বিতীয় হিজরি সনের শাবান মাসে আল্লাহ তাদের ওপর যুদ্ধ ফরয করে এবং এ সম্পর্কীয় কয়েকটি সুস্পষ্ট আয়াত অবতীর্ণ করেন-

আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করেছিল। আর ফিতনা হত্যার চেয়ে কঠিনতর এবং তোমরা মাসজিদুল হারামের নিকট তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো না, যতক্ষণ না তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সেখানে লড়াই করে। অতঃপর তারা যদি তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তবে তাদেরকে হত্যা কর। এটাই কাফিরদের প্রতিদান। তবে যদি তারা বিরত হয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর যে পর্যন্ত না ফিতনা খতম হয়ে যায় এবং দীন আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। সুতরাং তারা যদি বিরত হয়, তাহলে যালিমরা ছাড়া [কারো উপর] কোন কঠোরতা নেই। (সূরা বাক্বারা, আয়াত: ১৯০-১৯৩)

এরপর এমন কতিপয় আয়াত অবতীর্ণ হলো। যাতে যুদ্ধের নিয়ম-কানুন বর্ণিত হলো। ইরশাদ হলো-

অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা রেখে দেয়। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। অচিরেই তিনি তাদেরকে হিদায়াত দিবেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দিবেন। আর তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পরিচয় তিনি তাদেরকে দিয়েছেন। হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা সুদৃঢ় করে দেবেন। (সূরা মুহাম্মদ: আয়াত ৪-৭)

এরপর আল্লাহ ঐ সকল লোকদের নিন্দা করেছেন, যুদ্ধের হুকুম শ্রবণ করে যাদের হৃদকম্পন শুরু হয়েছে। ইরশাদ হলো-

অতঃপর যখন দ্ব্যর্থহীন কোন সুস্পষ্ট সূরা নাযিল করা হয় এবং তাতে যুদ্ধের উল্লেখ থাকে, তখন তুমি দেখবে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা তোমার দিকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছিত ব্যক্তির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। (সূরা মুহাম্মাদ: আয়াত -২০)

বস্তুত যুদ্ধ ফরয করা, তার প্রতি উৎসাহর দান করা এবং তার প্রস্তুতির নির্দেশ প্রদান ছিলো পরিস্থিতির প্রয়োজন। এমনকি পরিস্থিতির প্রতি সতর্ক ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করার কোনো সেনাধিনায়ক থাকলে তিনি ও তাঁর সেনাবাহিনীকে সর্বপ্রকারের সংঘাতময় পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ প্রদান করতেন। তাহলে মহান আল্লাহ যিনি প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল, তিনি কেনো এরূপ নির্দেশ প্রদান করবে না? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই, প্রয়োজন ও পরিস্থিতির একান্ত প্রয়োজন ছিলো হক ও বাতিলের মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের, বিশেষ করে আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশের অভিযান পরবর্তী পরিস্থিতির যা মুশরিকদের মর্যাদা ও আমিত্বের ওপর ছিলো কঠিন আঘাতস্বরূপ এবং যা তাদেরকে যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছিলো।

নির্দেশ সম্পর্কিত আয়াতগুলো দ্বারা অনুমতি হচ্ছিল যে, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সময় আসন্ন প্রায় এবং এতে মুসলমানদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, মুশরিক বন্দীদেরকে বেঁধে ফেলার এবং বিরোধীদেরকে পিষ্ঠ করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছে যা একটি বিজয় কাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত। এর মাধ্যমে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে, মুসলমানদের বিজয় সুনিশ্চিত।

কিন্তু এটা গোপনীয়তার সঙ্গে এবং আভাস ইঙ্গিতেই বলা হয়েছে। যাতে যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য যতটা আগ্রহী ও উন্মুখ থাকে কার্যত তা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়।

অতঃপর ঐ সময়েই অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাস মোতাবিক ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে আল্লাহ বায়তুল মুকাদ্দাসের পরিবর্তে কা'বা গৃহকে কিবলা বলে ঘোষণা করলেন এবং নামাযে ঐ দিকে মুখ ফিরানোর নির্দেশ প্রদান করলেন। এর ফলে যে ক্ষেত্রে মুসলমানেরা বিশেষভাবে উপকৃত হলেন তা হচ্ছে এই, যে সকল মুনাফিক ইহুদি মুসলমানদের মধ্যে শুধু ফাটল ধরানো ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মুসলমানদের সারিতে এসে দাঁড়াত তাদের মুখোশ খুলে গেল। তারা এখন মুসলমানদের মধ্য থেকে পৃথক হয়ে গিয়ে নিজেদের আসল অবস্থানে ফিরে গেল। আর এভাবে মুসলমানদের সারিগুলো বিশ্বাসঘাতক কপটতার দূষণ থেকে পবিত্র হয়ে গেল।

এ সময় কিবলা পরিবর্তন মধ্যে যে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত নিহিত ছিলো তা হচ্ছে, এখন থেকে এমন একটি নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে, যা এ কিবলার ওপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কেনন, এটা বড়োই বিস্ময়কর এবং অবমাননাকর ব্যাপার হবে যে কোনো সম্প্রদায়ের কিবলা তাঁদের শত্রুদের অধিকার থেকে মুক্ত করে সেখানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ নির্দেশাবলি ও ইঙ্গিতসমূহ প্রকাশের পর মুসলমানদের আনন্দানুভূতি ও আবেগ আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলো এবং আল্লাহর পথে তাঁদের যুদ্ধ করার উদ্দীপনা এবং শত্রুদের সঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বহুগুণে বেড়ে গেল।

গাযওয়ায়ে বদরে কুবরা ইসলামের প্রথম ফয়সালাকারী যুদ্ধ

যুদ্ধের কারণ: গাযওয়ায়ে উশায়রার আলোচনায় উল্লেখ আছে, একটি কুরাইশ কাফেলা মক্কা হতে সিরিয়া যাওয়ার পথে রাসূল (ﷺ) এর পাকড়াও হতে বেঁচে গিয়েছিলো। উক্ত কাফেলাটিই যখন সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে যাচ্ছিল, তখন নবী করীম (ﷺ) তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা) এবং সাইদ ইবনু যায়েদ (রা) কে তাদের অবস্থা ও অবস্থানের প্রতি লক্ষ রাখার জন্য উত্তর দিকে প্রেরণ করেন। এই সাহাবিদ্বয় (রা) "হাওরা" নামক স্থান পর্যন্ত গমন করেন এবং সেখানে অপেক্ষায় থাকেন। আবু সুফিয়ান (রা) যখন কাফেলাটি নিয়ে ঐ স্থানটি অতিক্রম করছিলেন, তখন সাহাবিদ্বয় অত্যন্ত দ্রুত গতিতে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং রাসূলুল্লাহকে বিষয়টি অবহিত করেন।

এ কাফেলায় মক্কাবাসীদের প্রচুর ধন-সম্পদ ছিলো। এক হাজার উট ছিলো এবং উটগুলো কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা মূল্যের মালপত্র বহন করছিলো। শুধুমাত্র এগুলো রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য কাফেলার সঙ্গে চল্লিশ জন কর্মী ছিলো।

মদিনাবাসীদের ধনদৌলত লাভের জন্য এটা ছিলো অপূর্ব এক সুযোগ। পক্ষান্তরে এ বিশাল পরিমাণ ধন-সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারটি ছিলো মক্কাবাসীদের জন্য সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক বিরাট ক্ষতি। এ জন্যই রাসূল মুসলমানদের মধ্যে ঘোষণা করে দিলেন, সিরিয়া থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তনকারী এক কুরাইশ কাফেলার সঙ্গে প্রচুর ধন-সম্পদ রয়েছে। সুতরাং তোমরা এ কাফেলাকে প্রতিরোধ করার জন্য বেরিয়ে পড়। হয়তো আল্লাহ গণীমত হিসেবে এ সকল মালপত্র তোমাদের হাতে দিয়ে দেবেন।

কিন্তু রাসূল - এতদুদ্দেশ্যে গমন করার জন্য জরুরি বলে উল্লেখ করেননি; বরং এটাকে তিনি জনগণের ইচ্ছা এবং আগ্রহের ওপর ছেড়ে দেন। কেননা, এ ঘোষণার সময় এটা মোটেই ধারণা করা হয়নি যে, উক্ত কাফেলার সঙ্গে লড়াইয়ের পরিবর্তে শক্তিশালী কুরাইশ সেনবাহিনীর সঙ্গে বদর প্রান্তরে ভয়াবহ এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মোকাবিলা করতে হবে। তাদের অনেকেরই ধারণা ছিলো, এ কারণেই বহু সাহাবি মদিনাতেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকেরই ধারণা ছিলো, রাসূল এ অভিযান এ পূর্ববর্তী অভিযানগুলোর মতোই সাধারণ একটা কিছু হবে। আর এ কারণেই যারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও উত্থাপিত হয়নি।

মুসলিম সৈন্য সংখ্যা ও তাঁদের নেতৃত্বের বিন্যাস

রাসূল - বদর অভিযানে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তাঁর সঙ্গী হলেন তিন শতাধিক সাহাবি (রা)। তিন শতাধিক বলতে সে সংখ্যাটি হতে পারে ৩১৩,৩১৪ কিংবা ৩১৭ যাদের মধ্যে ৮২, ৮৩ কিংবা ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির এবং অন্যেরা ছিলেন আনসার।

আনসারদের মধ্যে আবার ৬১ জন ছিলেন আউস গোত্রের এবং ১৭০ জন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের লোক। যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীর যে প্রস্তুতি গ্রহণের প্রয়োজন, এরকম কোনো প্রস্তুতিই রাসূল (ﷺ) এর বাহিনীর ছিলো না। এমন কি যুদ্ধ প্রস্তুতির কোনো ব্যবস্থাও ছিলো না। তিন শতাধিক লোক বিশিষ্ট এ বাহিনীর জন্য মাত্র দুটো উট ছিলো। যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা) এর ছিলো একটি এবং মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ কিনদীন (রা) ছিলো একটি; এক এক উটের ওপর পালাক্রমে আরোহণ করতেন দুই কিংবা তিন জন লোক। রাসূল আলী (রা) এবং মারছাদ ইবনে আবু মারছাদ গানাভী (রা) এর জন্য বরাদ্দ ছিলো একটি উট। তাঁরা তিনজন পালাক্রমে আরোহণ করতেন সেই উটটির ওপর। মদিনার ব্যবস্থাপনা ও নামাযে ইমামতি করার দায়িত্ব প্রথমে অর্পণ করা হয়েছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমের (রা) ওপর। কিন্তু "রাওহা" নাম স্থানে পৌঁছার পর নবী করীম (ﷺ) আবু লুবাবাহ ইবনে আব্দুল মুনযির (রা) কে মদিনার ব্যবস্থাপক নিযুক্ত করে পাঠিয়ে দেন।

এরপর আসে যুদ্ধ পূর্বাবস্থার কথা। রাসূল (ﷺ) মুসলিম বাহিনীকে দুটি দলে বিভক্ত করেন। এর মধ্যে এক দল হচ্ছে মুহাজিরদের সমন্বয়ে গঠিত এবং অন্যদল আনসারদের সমন্বয়ে গঠিত। মুহাজির দলের পতাকা দেয়া হয় আলী ইবনে আবু তালেব (রা) কে এবং আনসার দলের পতাকা দেয়া হয় সা'দ ইবনে মু'আয (রা) কে সার্বিক নেতৃত্বের পতাকা প্রদান করা হয় মুসআব ইবনে উমায়ের (রা) কে। এ পতাকার রঙ ছিলো সাদা। সেনাবাহিনীর ডান দিকের দলপতি নিযুক্ত করা হয় যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা) কে এবং বাম দিকের দলপতি নিযুক্ত করা হয় মিকদাদ ইবনে আমর (রা) কে। কারণ সমগ্র সেনাবাহিনীর মধ্যে মাত্র এ দুজনই ছিলেন অশ্বারোহী। সেনাবাহিনীর পশ্চাদ্ভাগের দলপতি নিযুক্ত হন কায়েস ইবনে আবু সা'সা'আ (রা) আর প্রধান সেনাপতি হিসেবে সমগ্র বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)।

বদর অভিমুখে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা

রাসূল (ﷺ) উত্তম প্রস্তুতি ছাড়াই সেনাবাহিনী নিয়েই যাত্রা শুরু করেন। তাঁর বহিনী মদিনার মুখ হতে বের হয়ে মক্কাগামী সাধারণ রাজপথ ধরে চলতে থাকেন এবং "বিরে রাওহা" গিয়ে পৌঁছেন। অতঃপর সেখানে থেকে অগ্রসর হয়ে বাম দিকে মক্কাগামী রাজপথে ছেড়ে দেন এবং ডান দিকের পথ ধরে চলতে থাকেন। চলার এক পর্যায়ে নাযিয়ার এক প্রান্ত দিয়ে অগ্রসর হয়ে রাহকান উপত্যকা অতিক্রম করেন। এটা হচ্ছে, নাযিয়াহ্ ও দাররায়ে সাফরার মধ্যস্থলে অবস্থিত একটি উপত্যকা। এ উপত্যকার পর দাররায়ে সাফরা দিয়ে গমন করেন। তারপর 'দাররাহ, থেকে নেমে সাফরার নিকট গিয়ে পৌঁছেন। সেখান হতে 'জুহাইনা' গোত্রের দুজন লোককে যথা বাসীস ইবনে উমার ও আদী ইবনে আবু যাগবাকে কুরাইশ কাফেলার অবস্থা ও অবস্থান লক্ষ করার উদ্দেশ্যে বদর অভিমুখে প্রেরণ করা হয়।

মক্কায় সতর্কের ঘোষণা

পক্ষান্তরে কুরাইশ কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ান ছিলেন সুচতুর, সতর্ক এবং অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তি। সে কারণে তিনি অব্যাহতভাবে পথের খবরা-খবর নিতেই থাকতেন। পথে যে কাফেলার সঙ্গেই সাক্ষাৎ হতো তাদের সকলকেই তিনি পথের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। সুতরাং বিভিন্ন সূত্রে তিনি অবগত হতে সক্ষম হন, মুহাম্মদ (ﷺ) তাঁর সাহাবিদেরকে কাফেলার ওপর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই তৎক্ষনাৎ তিনি যমযম ইবনে আমর গিফারীকে কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় পাঠিয়ে দেন এবং তার মাধ্যমে এ মর্মে সংবাদ প্রেরণ করেন যে, "কাফেলা ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন, হিফাযতের জন্য সাহায্যের আশু প্রয়োজন।" যমযম অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মক্কায় আসে এবং আরব সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী নিজের উটের নাক চাপড়ালো, হাওদা উল্টালো, জামা ছিড়ে ফেললো এবং মক্কা উপত্যকায় উটের ওপর দাঁড়িয়ে উচ্চৈস্বরে বলতে থাকলো, "হে কুরাইশগণ! কাফেলা (আক্রান্ত)। কাফেলা (আক্রান্ত)। আবু সুফিয়ানের সঙ্গে তোমাদের ধনমাল রয়েছে, তার ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য মুহাম্মদ (ﷺ) এবং তার সাহাবিরা উদ্যত হয়েছেন। সুতরাং আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, তোমরা তা ফেরত পাবে। অতএব সাহায্যের জন্য এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো।"

মক্কাবাসীর যুদ্ধ প্রস্তুতি চূড়ান্ত

কাফেলা আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ শুনে সমগ্র মক্কা উপত্যকায় একদম হৈ চৈ শুরু হয়ে গেলো। চতুর্দিক থেকে সকলে দৌড়ে এসে বলতে থাকল, "মুহাম্মদ তার এবং তার সঙ্গী-সাথিরা কি মনে করেছে, এ কাফেলাও ইবনে হাযরামীর কাফেলার মতই? না, না কখনই না। আল্লাহর শপথ! এ কখনই সেরূপ নয়। শীঘ্রই তারা জানতে পারবে, আমাদের ব্যাপারটা ভিন্ন রকম।"

সমগ্র মক্কা শহর তখন দুই শ্রেণির লোক চোখে পড়ছিলো। এক শ্রেণির লোক যুদ্ধ প্রস্তুতি সহকারে যুদ্ধে গমন করছিলো এবং অন্যদল নিজের পরিবর্তে অন্যকে যুদ্ধে প্রেরণ করছিলো। আর এভাবে প্রায় সবাই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলো। বিশেষ করে মক্কার সম্মানিত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কেউই পিছনে ছিলো না। শুধু আবু লাহাব নিজে না এসে তার একজন ঋণী ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলো। আশে-পাশে অন্যান্য আরব গোত্রগুলোকেও তারা নিজেদের দলভুক্ত করে নিল। কুরাইশ গোত্রসমূহের মধ্যে একমাত্র বনু আদী ছাড়া আর কোনো গোত্রই পিছনে রইল না। বনু আদী গোত্রে কোন লোকই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল না।

মক্কী সেনাবাহিনীর সংখ্যা

প্রথমাবস্থায় মক্কী বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিলো তেরোশো। তাদের কাছে ছিলো একশ ঘোড়া এবং ছয়শ লৌহ বর্ম। উটের সংখ্যা এত বেশি ছিলো যে, তার কোনো হিসাব ছিলো না। সেনাবাহিনীর সর্বধিনায়ক ছিলো আবু জাহেল ইবনে হিশাম। এ বাহিনীর রসদপত্রের দায়িত্বে ছিলো নয়জন সম্ভ্রান্ত কুরাইশ। কোনো দিন নয়টি এবং কোনো দিন দশটি, এভাবে প্রতিদিন উট জবেহ করা হতো।

বনু বকর গোত্রের সমস্যা সর্বাত্মক প্রস্তুতি সহকারে মক্কী সেনাবাহিনী যখন অগ্রগমনে উদ্যত এমতাবস্থায় কুরাইশদের মনে পড়ে গেল বনু বকর গোত্রের কথা। বনু বকর গোত্রের সঙ্গে তখন তারা ছিলো যুদ্ধরত। এ কারণে তাদের আশঙ্কা হলো, হয়তো বনু বকর পিছন থেকে তাদের আক্রমণ করবে এবং ফলে দুই জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডের মধ্যে তাদের নিপতিত হতে হবে। এ ধারণা তাদেরকে যুদ্ধের সংকল্প থেকে বিরত রাখার মতো মানসিক পরিবেশ সৃষ্টি করল। কিন্তু এমনি সময়ে অভিশপ্ত ইবলিস শয়তান বনু কিনানা গোত্রের নেতা সূরাকা ইবনে মালিক ইবনে জুশুম মুদলিজীর রূপ ধরে এসে বলল, আমিও তোমাদের বন্ধু এবং আমি তোমাদের নিকট এ বিষয়ের জামিন হচ্ছি, বনু কিনানা তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ করবে না কিংবা কোনো অশোভনীয় কাজও করবে না।

মক্কা সেনাবাহিনীর যুদ্ধযাত্রা

সূরাকা ইবনে মালিকরূপী অভিশপ্ত ইবলীস শয়তান বনু কিনানার ব্যাপারে জামিন হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় কুরাইশগণ আশঙ্কামুক্ত হয়ে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ল। আল্লাহ যেমনটি বলেন, "আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের ঘর থেকে অহঙ্কার ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বের হয়েছে এবং আল্লাহর রাস্তায় বাধা প্রদান করে।" (সূরা আনফাল: ৪৭)। আর রাসূল যেমনটি বলেছেন, "অপমানিত হয়ে প্রতিশোধ নেয়ার ও অহমিকার নেশায় উন্মত্ত হয়ে এ বলে যুদ্ধে বেরিয়েছে, রাসূল ও তাঁর সাথীগণ মক্কাবাসী ব্যবসায়ী দলের ওপর চক্ষুত্তোলনের হিম্মত পেল কোত্থেকে?"

মক্কী বাহিনী খুব দ্রুতগতিতে উত্তর বদর প্রান্তরের অগ্রসর হচ্ছিল। অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে তারা উসফান ও কুদায়েদ উপত্যকা অতিক্রম করে যখন জুহফা নামক স্থানে উপস্থিত হলো তখন আবু সুফিয়ানের লোক এসে সংবাদ দিল, "কাফেলা নিরাপদে চলে এসেছে সুতরাং সামনে আর অগ্রসর না হয়ে এখন ফিরে যাওয়ার পালা।"

কাফেলার নিরাপদ অগ্রযাত্রা

আবু সুফিয়ানের কাফেলা নিরাপদ অগ্রযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে এই, কাফেলা সিরিয়া হতে রাজপথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিল বটে; কিন্তু আবু সুফিয়ান অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে চলছিলেন। পথ চলার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ক্রমাগত খবরা-খবর নিতেই থাকছিলেন। বদর প্রান্তরের নিকটবর্তী হয়ে তিনি কাফেলাকে থামালেন এবং নিজেই সম্মুখে অগ্রসর হয়ে মাজদী ইবনে আমরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে মদিনার সেনাবাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।

মাজদী বললো, "এ রকম কোনো সেনাবাহিনী তো আমি দেখিনি, তবে দুজন উষ্ট্রারোহীকে দেখেছি যারা টিলার পাশে তাদের উটকে বসিয়ে নিজেদের মশকে পানি ভর্তি করে নিয়ে চলে গেছে।"

একথা শুনেই আবু সফিয়ান অত্যন্ত দ্রুতবেগে অগ্রসর হয়ে সেই স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন এবং তাদের উটের গোবর ভেঙে দেখলেন। তখন ঐ গোবরের মধ্য থেকে খেজুরের আঁটি বেরিয়ে পড়ল। এ দেখে সে বলে উঠলো আল্লাহর কসম! এটা হচ্ছে ইয়াসরিবেরই (মদিনার) খেজুরের আঁটি। অতঃপর তিনি দ্রগতিতে কাফেলার কাছে ফিরে গেলেন এবং তাদেরকে পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। বদর অভিমুখী পথ বাম দিকে ছেড়ে দিয়ে কাফেলাকে উপকূল অভিমুখে অগ্রসর হতে বললেন। এভাবে কাফেলাকে তিনি মদিনা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করলেন। একই সঙ্গে মক্কী বাহিনীর নিকট কাফেলার নিরাপদ থাকার সংবাদ পাঠিয়ে বাহিনীকে মক্কায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। জুহফায় অবস্থানকালে মক্কী বাহিনী এ সংবাদ পেয়েছিলো।

মক্কায় প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে মক্কী বাহিনীর মধ্যে মতভেদ

আবু সুফিয়ানকে পেয়ে মক্কী বাহিনীর প্রায় সকল সদস্যই মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলো। কিন্তু কুরাইশ নেতা ও মক্কী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু জাহেল অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলল, "আল্লাহর কসম! আমরা এখান থেকে ফিরে যাব না; বরং আমরা বদরে যাব, সেখানে তিন দিন অবস্থান করব এবং এ তিন দিন যাবৎ উট যবেহ করব, পান ভোজন ও আনন্দ উল্লাস করব। এর ফলে সমগ্র আরব জাতি আমাদের শক্তি সামর্থ্যের কথা অবগত হবে, আর এভাবে চিরদিনের জন্য তাদের ওপর আমাদের প্রভাব প্রতিফলিত হবে।

আবু জাহেলের এ কথার পরেও আখনাস ইবনে শুরায়েক ফিরে যাবারই পরামর্শ দিল। কিন্তু অধিকাংশ লোকই তার কথায় কান দিল না। তাই, সে বনু যুহরার লোকজনদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় ফিরে গেল। কেননা, সে ছিলো বনু যুহরা গোত্রের মিত্র এবং বাহিনীতে সে ছিলো তাদের নেতা। তাদের কোনো লোকই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে বনু যুহরা গোত্রের লোকেরা আখনাস ইবনে শুরায়েকের এ সিদ্ধান্তের কারণে খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিলো এবং তাদের অন্তরে তার প্রতি শ্রদ্ধা চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। তাদের সংখ্যা ছিলো তিন শত জন।

বনু যুহরার ন্যায় বনু হাশিমও মক্কায় ফিরে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু আবু জাহেল অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করায় তাদের পক্ষে মক্কায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হলো না। সে কঠোর কণ্ঠে বললো, আমরা ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এ দলটি আমাদের থেকে পৃথক হতে পারবে না।

মোট কথা, ঐ বাহিনী তাদের সফরসূচি বহাল রাখল। বনু যুহরা গোত্রের লোকজনদের মক্কায় প্রত্যাবর্তনের ফলে তাদের সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজারে এবং তারা ছিলো বদর অভিমুখী।

বদরের নিকটবর্তী হয়ে তারা একটি টিলার পিছনে শিবির স্থাপন করে। এ টিলাটি বদর উপত্যকার সীমান্তের ওপর দক্ষিণমুখে অবস্থিত।

মুসলিম বাহিনীর স্পর্শকাতর অবস্থা

রাসূল পথিমধ্যে আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা এবং মক্কী সেনাবাহিনী সম্পর্কে অবগত হন। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আসন্ন প্রায় সমস্যাদির খুঁটিনাটি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনার পর তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এখন একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সুতরাং এখন এমনভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন, যা দুর্দমনীয় সাহস, বীরত্ব এবং নির্ভীকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কারণ এটা নিশ্চিত সত্য, মক্কী বাহিনীকে যদি এলাকায় যথেচ্ছ চলতে ফিরতে দেয়া হয়, তাহলে তাদের সামরিক মর্যাদা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়ে যাবে এবং রাজনৈতিক প্রাধান্য বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে এর ফলে মুসলমানদের শক্তি হ্রাস পাবে এবং আঞ্চলিক সুযোগ-সুবিধাও সীমিত হয়ে পড়বে। এর ফলশ্রুতিতে ইসলামী দাওয়াতকে একটি নিষ্প্রাণ আদর্শ মনে করে যাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা রয়েছে এরূপ প্রত্যেক লোক ইসলামের ক্ষতি সাধনে ওঠে পড়ে লেগে যাবে। এ ছাড়াও মক্কী বাহিনী মদিনার দিকে অগ্রসর হয়ে এ যুদ্ধকে মদিনার চার প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে মুসলমানদেরকে তাদের আবাসস্থলেই ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সাহস ও চেষ্টা করবে না, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। মুসলিম সোনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যদি সামান্য পরিমাণও অবহেলা, আলস্য কিংবা কাপুরুষতা প্রদর্শিত হতো তাহলে এসবের যথেষ্ট সম্ভাবনা ও আশঙ্কা ছিলো। আর যদি এরূপ না-ও হতো তাহলেও মুসলমানদের সামরিক প্রভাব প্রতিপত্তি এবং সুখ্যাতির ওপর একটি মন্দ ও প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া প্রতিফলিত হতো, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

পরামর্শ সভার বৈঠক

অবস্থার এ আকস্মিক ভয়াবহ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাসূল (ﷺ) উচ্চ পর্যায়ের এক সামরিক পরামর্শ সভার আয়োজন করলেন। উক্ত সভায় তিনি বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নেতৃস্থানীয় ও সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে মত বিনিময় করলেন। অবস্থার এরূপ আকস্মিক মোড় পরিবর্তনের ফলে আসন্ন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা অবগত হয়ে একটি দলের হৃদকম্পন উপস্থিত হলো। এ দলটি সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করলেন-

[এটা এমন] যেভাবে তোমার রব তোমাকে নিজ ঘর থেকে বের করেছেন যথাযথভাবে এবং নিশ্চয় মুমিনদের একটি দল তা অপছন্দ করছিল। তারা তোমার সাথে সত্য সম্পর্কে বিতর্ক করছে তা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর। যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নেয়া হচ্ছে, আর তারা তা দেখছে। (সূরা আনফাল: ৫-৬)

কিন্তু সামরিক বাহিনীর নেতৃস্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে আবু বকর (রা) দাঁড়ালেন এবং অতি চমৎকার কথা বললেন। অতঃপর ওমর (রা) ওঠলেন এবং তিনিও অতি উত্তম কথা বললেন। তারপর মিকদাদ ইবনে আমের (রা) দাঁড়িয়ে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, সে পথে আপনি চলতে থাকুন। আমরা সর্বাবস্থায় আপনার সঙ্গে রয়েছি। আল্লাহর কসম! আমরা আপনাকে ঐ কথা বলব না, যে কথা বণী ইসরাঈল মূসাকে (রা) বলেছিলো আর তা হলো-

তুমি ও তোমার প্রতিপালক গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে থাকব। (সূরা মায়িদা: ২৪)

কিন্তু আমাদের ব্যাপার ভিন্ন। আমরা বরং বলব, "আপনি আমাদেরকে 'বারকে গিমাদ' পর্যন্ত নিয়ে যান, তবুও আমরা পথরোধকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আপনার সঙ্গে সেখানেও গমন করব।

রাসূল -তাঁদের সম্পর্কে উত্তম কথা বললেন এবং তাদের জন্য দু'আ করলেন। এ তিনজন নেতাই ছিলেন মুহাজির। সেনাবাহিনীতে আনসারদের তুলনায় মুহাজির সৈন্যের সংখ্যা ছিলো অনেক কম। রাসূল আনসারদের মতামত জানার প্রয়োজন বোধ করলেন। কেননা, সেনাবাহিনীতে সংখ্যায় তাঁরাই ছিলেন অধিক এবং যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের চাপও ছিলো প্রকৃতপক্ষে তাঁদের ওপরেই বেশি। অবশ্য, আকাবা'র বাইয়াতের স্বীকৃতি মোতাবিক মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করা তাদের জন্য অপরিহার্য ছিলো না। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি উপরিউক্ত তিন মহান নেতার বক্তব্য শোনার পর পুনরায় বললেন, "উপস্থিত ভ্রাতৃবৃন্দ! বর্তমান অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় সম্পর্কে তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।"

আনসারদের উদ্দেশ্যেই তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন। আনসার অধিনায়ক ও পতাকাবাহক সা'দ ইবনে মু'আয (রা) রাসূল এ কথার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনপূর্বক নিবেদন করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! মনে হয় আপনি আমাদের মতামতই জানতে চাচ্ছেন।"

প্রত্যুত্তরে রাসূল বললেন, "হ্যাঁ।"

তখন তিনি বললেন, "আমরা তো আপনার ওপর ঈমান এনেছি, আপনার সত্যতা স্বীকার করেছি এবং এ সাক্ষ্য দিয়েছি, আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন সবই সত্য এবং ওগুলো শোনা ও মান্য করার পর আমরা আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যা ইচ্ছা করেছেন তা পূরণার্থে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যান। যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ! আপনি আদেশ করলে আমরা উত্তাল সাগরেও ঝাঁপ দিতে পারি। জগতের দুর্গমতম স্থানকেও পদদলিত করতে পারি, ইনশাআল্লাহ! আমাদের একজন লোকও পিছনে থাকবে না। যুদ্ধ-বিগ্রহে আপনি আমাদের প্রত্যক্ষ করবেন সাহসী ও নির্ভীক বীর পুরুষের ভূমিকায়। সম্ভবত আল্লাহ আপনাকে আমাদের মাঝে এমন নৈপুণ্য প্রদর্শন করাবেন যা প্রত্যক্ষ করে আপনার চক্ষুদ্বয় শীতল হয়ে যাবে। সুতরাং যেখানে ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে নিয়ে চলুন। আল্লাহ আমাদের কাজে-কার্মে বরকত দান করুন।"

অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, সা'দ ইবনে মু'আয (রা) বলেন, আপনি হয়তো আশঙ্কা করছেন, আনসারগণ তাঁদের শহরে থেকেই শুধু আপনাকে সাহায্য করা কর্তব্য মনে করছেন। এ কারণে আমি তাদের পক্ষ থেকে বলছি এবং তাঁদের পক্ষ থেকেই উত্তর দিচ্ছি, আমাদের ধন-সম্পদ হতে যে পরিমাণ ইচ্ছা গ্রহণ করুন এবং যা ইচ্ছা ছেড়ে দিন। তবে যেটুকু আপনি গ্রহণ করবেন তা আমাদের নিকট, যেটুকু ছেড়ে দেবেন তার চাইতে অধিক পছন্দনীয় হবে। আর এ ব্যাপারে আপনি যে ফয়সালাই করবেন, আমাদের ফায়সালা তারই অনুসারী হবে। আল্লাহর কসম! আপনি যে ফয়সালাই করবেন, আমাদের নিয়ে ঐ সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান তবে আমরাও এতে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

তাদের একথা শুনে রাসূল (ﷺ) এর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো। তিনি বললেন, "চলো এবং আনন্দ চিত্তে চলো। আল্লাহ আমার সঙ্গে দুটো দলের মধ্যে হতে একটির ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেন এ সময় সে (কাফির) সম্প্রদায়ের বধ্যভূমি দেখতে পাচ্ছি।"

মুসলিম বাহিনীর পরবর্তী অগ্রযাত্রা

এরপর রাসূল যাফরান হতে সামনে অগ্রসর হন এবং কতকগুলো পাহাড়ী মোড় অতিক্রম করেন, যেগুলোকে আসাফির বলা হয়। সেখান থেকে আরও অগ্রসর হয়ে 'দাব্বাহ' নামক এক জনপদে অবতরণ করেন। অতঃপর 'হিনান' নামক পাহাড়কে ডান দিকে ছেয়ে দিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন, পরবর্তী পর্যায়ে বদরের নিকটবর্তী স্থানে অবতরণ করেন।

তথ্যানুসন্ধানের চেষ্টা

এখানে পৌঁছেই রাসূল আর তাঁর গুহার সঙ্গী ও সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর (রা) কে সঙ্গে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সন্ধান নেয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। দূর হতে তাঁরা মক্কী বাহিনীর শিবির এবং অবস্থান সম্পর্কে সমীক্ষারত ছিলেন। এমন সময় একজন বৃদ্ধ আরবকে তাঁরা পেয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ বৃদ্ধকে কুরাইশ বাহিনী এবং মুহাম্মদ ও তার সাহাবিদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দুই বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে ছিলো, যাতে সে তাঁকে চিনতে না পারে। বৃদ্ধ বললেন, "আপনারা কোন কওমের সঙ্গে যুক্ত তা না জানালে আমি কিছুই বলব না।"

রাসূল্লাহ বললেন, ঠিক আছে, "আপনি বলে দিলে আমরাও বলে দিব।" সে বলল, "এটা ওটার বিনিময়ে তো?"

তিনি উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ"

সে তখন বলল, "আজি জানতে পেরেছি যে, মুহাম্মদ এবং তাঁর সঙ্গীরা অমুক দিন মদিনা থেকে বের হয়েছেন। সংবাদদাতা, আমাকে সঠিক বলে থাকলে আজ তারা অমুক জায়গায় রয়েছেন।

সে ঠিক ঐ জায়গাটিরই নাম ঠিকানা বলে দিল, যেখানে ঐ সময় মুসলিম বাহিনী অবস্থান করছিলেন।

অতঃপর সে বলল, আমি এটাও জেনেছি, কুরাইশ বাহিনী অমুক দিন মক্কা থেকে বের হয়েছে সংবাদ দাতা আমাকে সঠিক সংবাদ বলে থাকলে, তারা আজ অমুক জায়গায় অবস্থান করছে।" সে ঠিক ঐ জায়গারই নাম বলল যেখানে ঐ সময় কুরাইশ বাহিনী অবস্থান করছিলো।

বৃদ্ধ নিজের কথা শেষ করে বলল, "আচ্ছা তবে এখন বলুন, আপনারা কোন সম্প্রদায়ভুক্ত।

উত্তরে রাসূল (ﷺ) বললেন, "আমরা এক পানি হতেই (উদ্ভূত)"

এ কথা বলেই তিনি ফিরে চললেন। আর বৃদ্ধ বক বক করতেই থাকল, কোন পানি হতে? ইরাকের পানি হতে কি?

মক্কী বাহিনী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লাভ

ঐ দিনই সন্ধ্যায় রাসূল (ﷺ) শত্রুদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য নতুনভাবে এক গোয়েন্দা বাহিনী গঠন করেন। এ বাহিনীর ব্যবস্থাপনার জন্য আলী ইবনে আবু তালিব (রা), যুবায়ের ইবনু আওয়াম (রা) এবং সা'দ ইবনে ওয়াক্কাস (রা) কে প্রেরণ করেন। এ গোয়েন্দা বাহিনী সরাসরি বদরের প্রস্রবণে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে দুজন গোলাম মক্কী বাহিনীর জন্য পানির পাত্র পূর্ণ করছিলো। মুসলিম গোয়েন্দা বাহিনী এই দুজন পানি বাহককে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর নিকট হাযির করেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নামাযরত ছিলেন। উপস্থিত সাহাবিগণ ঐ গোলামদ্বয়কে বিভিন্ন ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকলেন। উত্তরে তারা বলল যে, "আমরা কুরাইশদের পানি বাহক। পাত্রে পানি ভর্তি করে আনার জন্য তারা আমাদের পাঠিয়েছে।" তাদের এই জবাবে সাহাবিগণ সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাদের আশা ছিলো যে, এরা দুজন হবে সুফিয়ানের লোক। কেননা, তাদের অন্তরে তখনো এ ক্ষীণ আশা বিরাজমান ছিলো যে, তারা আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার ওপর জয়যুক্ত হবেন। সুতরাং তারা ঐ গোলামদ্বয়কে কিছু কঠোর চাপ প্রয়োগ করেন। তারা তখন বাধ্য হয়ে বললো যে, তারা আবু সুফিয়ানের কাফেলার লোক। একথা বলার পর তাদের ওপর মারপিট করা হয়।

ততক্ষণে রাসূল (ﷺ) নামায শেষ করেছেন। সাহাবিগণের এমন আচরণে বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, "গোলামদ্বয় যখন সত্য কথা বলল তখন তোমরা তাদের মারপিট করলে, অথচ যখন মিথ্যা কথা বলল তখন তাদের ছেড়ে দিলে। আল্লাহর কসম! তারা দুজন সঠিক কথাই বলেছিলো যে, তারা কুরাইশের লোক।"

এরপর রাসূল (ﷺ) ঐ গোলামদ্বয়কে বললেন, আচ্ছা এখন আমাকে কুরাইশদের সম্পর্কে খবর দাও।

তারা বলল, ঐ যে টিলাটি, যা উপত্যকার শেষ প্রান্তে দেখা যাচ্ছে কুরাইশরা তারই পেছনে অবস্থান করছে।

তিনি প্রশ্ন করলেন, "তারা কতজন আছে"? উত্তরে তারা বলল, "অনেক।" তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তাদের সংখ্যা কত? তারা বলল, "আমাদের তা জানা নেই?" তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন। প্রত্যহ কটি উট যবেহ করা হয়?

তারা জবাব দিল। "একদিন নয়টি এবং একদিন দশটি"। তখন রাসূল (ﷺ) মন্তব্য করলেন, "তাহলে তো তাদের সংখ্যা নয়শ ও এক হাজারের মাঝমাঝি হবে"।

তারপর তিনি তাদেরকে পুনরায় প্রশ্ন করলেন, "তাদের সঙ্গে সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের কে কে আছে"? উত্তরে তারা বলল, "রাবীয়ার দুই পুত্র উতবা ও শায়বা আবুল বাখতারী ইবনে হিশা, হাকীম, ইবনে হিযাম, নওফর ইবনে খুওয়াইলিদ, হারিস ইবনে আমির, তোআইমাহ ইবনে আদী, নাযর ইবনে হারিস, যামআহ ইবনে আসওয়াদ, আবু জাহল ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং আরও অনেকে।" রাসূল্লাহ বললেন, "মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলোকে তোমাদের পাশে এনে নিক্ষেপ করেছে।"

রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ

মহা মহিমান্বিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তখন বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। মক্কী বাহিনীর ওপর বর্ষিত হলো সেই বৃষ্টির ধারা মুষল ধারে। প্রবল বৃষ্টির কারণে মক্কী বাহিনীর অগ্রগমনে কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হলো। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর ওপর তা বর্ষিত হলো আল্লাহর বিশেষ এক রহমত রূপে। আল্লাহর রহমতের এই বৃষ্টি শয়তানের সৃষ্ট অপবিত্রতা থেকে মুসলমানদের পবিত্র করে এবং ভূমিকে সমতল ও মসৃণ করে। এর ফলে বালির স্তর কিছুটা শক্ত হয়ে ওঠে যা মুসলিম বাহিনীর চলাচলের ক্ষেত্রে বেশ অনুকূল অবস্থান সৃষ্টি করে। পদচারণার ক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থা সৃষ্টির কারণে তাদের অন্তরেও দৃঢ়তার ভাব সৃষ্টি হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্রস্থলের দিকে মুসলিম বাহিনীর অগ্রগমন

এরপর রাসূল (ﷺ) স্বীয় সেনাবাহিনীকে দ্রুত চলার নির্দেশ দেন যাতে তাঁরা মুশরিকবাহিনীর পূর্বেই বদরের পানির ধারার নিকট পৌঁছে যান এবং পানির ধারার ওপরে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। মুশরিকবাহিনী যাতে কোনোভাবেই পানির ধারার ওপর অধিকার লাভ করতে না পারে সেটাই ছিলো তাঁর লক্ষ। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি এবং তাঁর বাহিনী এশার সময় বদরের নিকট অবতরণ করেন।

এ সময় হাব্বাব ইবনে মুনযির (রা) একজন অভিজ্ঞ সামরিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রশ্ন করলেন। "হে আল্লাহর রাসূল। এ স্থানে আপনি আল্লাহর নির্দেশক্রমে অবতরণ করেছেন, না শুধু যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই আপনি এই ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন। কেননা, এর এর আগে কিংবা পেছনে যাওয়ার আমাদের কোনো সুযোগ নেই।"

প্রত্যুত্তরে রাসূল বললেন, "শুধু যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই আমি এ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছি।" এ কথা শুনে হাব্বাব (রা) বললেন, "এটা উপযুক্ত স্থান নয়। আরও সামনের দিকে এগিয়ে চলুন এবং কুরাইশ বাহিনীর সব চাইতে নিকটে যে পানির ধারা রয়েছে সেখানে শিবির স্থাপন করুন। অতঃপর অন্যান্য সব পানির ধারা বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের পানির ধারার ওপর চৌবাচ্চা তৈরি করে তাতে পানি ভর্তি করে নেন। এরপর কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হলে আমরা পানি পাব কিন্তু তারা তা পাবে না।"

তাঁর এ কথা শুনে রাসূল বললেন, "তুমি উত্তম পরামর্শ দিয়েছ।" এরপর রাসূল তাঁর বাহিনীকে অগ্রগমনের নির্দেশ প্রদান করলেন এবং অর্ধেক রাত যেতে না যেতেই কুরাইশ বাহিনীর সব চাইতে নিকটবর্তী পানির ধারার নিকট পৌঁছে শিবির স্থাপন করলেন। অতঃপর সেখানে একটি চৌবাচ্চা তৈরি করে অবশিষ্ট সমস্ত পানির ধারা বন্ধ করে দিলেন।

নেতৃত্বের কেন্দ্র

পানির ধারার নিকট মুসলিম বাহিনীর যখন শিবির স্থাপন কার্যসম্পন্ন হলো তখন সা'দ ইবনে মু'আয (রা) প্রস্তাব করলেন যে, রাসূলকে সৈন্য পরিচালনা বা নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্রস্থল রূপে একটি ছাউনী নির্মাণ করে দেয়া হোক যেখানে তিনি অবস্থান করবেন। আল্লাহ না করুন বিজয়ের পরিবর্তে আমাদেরকে যদি পরাজিত হতে হয় কিংবা ভিন্ন কোনো অসুবিধাজনক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়, তাহলে পূর্ব থেকেই তাঁর নিরাপত্তার জন্য আমরা যেন প্রস্তুত থাকতে পারি। তাঁর এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থিত হলে তখন তাঁরা নিবেদন করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার জন্য একটি বস্ত্রের ছাউনী নির্মাণ করার মনস্থির করেছি। আপনি ওর মধ্যে অবস্থান করবেন এবং আপনার সওয়ারীগুলো পাশেই তৈরি অবস্থায় থাকবে।" তারপর আমরা শত্রুদের সঙ্গে মোকাবিলা করব। যদি আল্লাহ আমাদের মান মর্যাদা রক্ষাপূর্বক শত্রুদের ওপর বিজয় দান করেন তবে সেটাতো হবে আমাদের একান্ত আকাঙ্ক্ষিত ও পছন্দনীয়। আর আল্লাহ না করুন যদি আমরা অন্য অবস্থার সম্মুখীন হই, তবে আপনি সওয়ারীর ওপর আরোহণ করে আমাদের কওমের ঐ সকল লোকের নিকট চলে যাবেন যারা পিছনে রয়ে গেছেন। হে আল্লাহর নবী! প্রকৃতপক্ষে আপনার পিছনে এরূপ লোকেরা রয়েছেন যাদের আপনার প্রতি ভালোবাসা অসীম। যদি তারা অনুমান করতে পারতেন যে, আপনি যুদ্ধের সম্মুখীন হয়ে পড়বেন তবে কখনই তারা পিছনে থাকতেন না। তারা আপনার সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করতেন। তাঁদের একথায় রাসূল খুশি হলেন ও তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাঁদের কল্যাণের জন্যে দু'আ করলেন।

সাহাবিগণ যুদ্ধ ক্ষেত্রের উত্তর পূর্বে একটি উঁচু টিলার ওপর রাসূল (ﷺ) এর তাবু নির্মাণ করলেন যেখান থেকে পূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি দৃষ্টি গোচর হতো। অতঃপর তাঁর এ তাবুর রক্ষণা বেক্ষণের জন্যে সা'দ ইবনে মু'আয (রা) এর নেতৃত্বে আনসারী যুবকদের একটি বাহিনী নির্বাচন করা হলো।

সেনা বিন্যাস ও রাত্রি যাপন

এরপর রাসূল (ﷺ) সৈন্যদেরকে বিন্যস্ত করেন। একপর্যায় যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি স্বীয় পবিত্র হস্ত দ্বারা ইশারা করে যাচ্ছিলেন, "ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এটা হবে অমুকের বধ্যভূমি এবং এটা হবে আগামীকাল অমুকের বধ্যভূমি।" এরপর রাসূল এ সেখানে একটি গাছের মূলের পাশে রাত্রি যাপন করেন এবং মুসলমানরাও শান্তিতে রাত্রি অতিবাহিত করেন। তাঁদের অন্তর আল্লাহর ওপর ভরসায় পরিপূর্ণ ছিলো। তাঁদের এ আশা ছিলো যে, প্রত্যকেই তাঁরা স্বচক্ষে প্রতিপালকের শুভসংবাদের বাণী দেখতে পারেন।

আল্লাহ বলেন: "স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্থির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন এবং আকাশ হতে তোমাদের উপর ভারি বর্ষণ করেন। ওটা করা হয়েছে তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্যে, তোমাদের হতে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণের জন্যে, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করার জন্যে এবং তোমাদের পা স্থির রাখার জন্যে।" (আনফাল: ১১)

এ রাতটি ছিলো হিজরি ২য় সনের ১৭ ই রমযানের জুমাআর রাত। ঐ মাসেরই ৮ অথবা ১২ তারিখে রাসূল (ﷺ) মদিনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।

যুদ্ধ ক্ষেত্রে মক্কী সৈন্যদের আগমন তাদের পারস্পরিক মতানৈক্য

অপরপক্ষে কুরাইশরা উপত্যকার বাইরের দিকে তাদের শিবিরে রাত্রি যাপন করে। আর প্রত্যুষে পুরো বাহিনীসহ টিলা হতে অবতরণ করে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। একটি দল রাসূল (ﷺ) এর চৌবাচ্চার দিকে অগ্রসর হয়। রাসূল বলেন, তাদেরকে ছেড়ে দাও। তাদের মধ্যে যেই পানি পান করেছিলো সেই এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। শুধু হাকীম ইবনে হিযাম প্রাণে বেঁচেছিলো। সে পরে খাঁটি মুসলমান হয়েছিলো। তার নিয়ম ছিলো যে, যখন সে দৃঢ় শপথ করতো তখন বলতো এ সত্তার শপথ! যিনি আমাকে বদরের দিন হতে পরিত্রাণ দিয়েছেন।

ওদিকে কুরাইশ সৈন্যদলে মহা কোলাহল শুরু হয়েছে। কেউ অহংকারে চিৎকার করছে এবং কেউ ক্রোধভরে মাটিতে পদাঘাত করছে। এ সময় কুরাইশ দলপতিদের আদেশক্রমে উমায়ের ইবনে আহারর জুমাহি নামক এক ব্যক্তি মুসলমানদের সংখ্যা নির্ণয় করার জন্যে অশ্বারোহণে তাদের চারদিক প্রদক্ষিণ করে চলে যায়। স্বদলে ফিরে এসে উমায়ের বলতে শুরু করে, "মুসলমানদের সংখ্যা তিনশর অধিক হবে না এবং তাদের পশ্চাতে সাহায্য করারও কেউ নেই। তরবারী ছাড়া আত্মরক্ষার জন্য কোনো উপকরণ তাদের সাথে নেই, এটাও আমি উত্তমরূপে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তারা এমন সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে যে, আমরা আমাদের একটি প্রাণের বিনিময় ছাড়া তাদের একটি প্রাণ নাশ করতে পারবো না। কাজেই এ যুদ্ধে আমাদের পক্ষের অন্তত তিন শত প্রাণ উৎসর্গ না করে আমরা কোনো ক্রমেই বিজয় লাভে সক্ষম হবো না। যদি তারা আমাদের বিশেষ লোকদেরকে হত্যা করে ফেলে তবে এর পরে বেঁচে থাকার সাধ আর কি থাকতে পারে? অতএব, আমাদের কিছু চিন্তা ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।"

উমায়েরের এ কথা শুনে হাকীম ইবনে হিযাম নামক কুরাইশ দলপতির চৈতন্য হলে তিনি দাড়িয়ে এক নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন এবং সকলকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন যে, এ অন্যায় সমরে প্রবৃত্ত হওয়ার কোনোই কারণ নেই। তিনশ প্রাণ বলি দিয়ে এই যুদ্ধে বিজয় লাভের সার্থকতাও কিছুই নেই। হাকীম বক্তৃতা দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না। তিনি উৎবাহ ইবনে রাবীআহ নামক কুরাইশ দলপতির নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের মনোভাব তার কাছে ব্যক্ত করলেন। উবাহ হাকীমের কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারল না। হাকীম তখন আশান্বিত হয়ে বললেন, "দেখুন, আপনি ধনে-মানে কুরাইশদের একজন বরেণ্য ব্যক্তি। সুতরাং আপনি একটু দৃঢ়তা অবলম্বন করে এ অন্যায় যুদ্ধ হতে স্বজাতিকে বিরত রাখুন, তাহলে আরবের ইতিহাসে আপনার নাম চির স্বরণীয় হয়ে থাকবে।" উৎবাহ উত্তরে বলল, "আমি তো প্রস্তুত আছি। এক আমর বিন হাযরামীর (যে সারিয়্যায়ে নাখলাতে মারা গিয়েছিলো) রক্তপণ, সেটাও আমি নিজে পরিশোধ করে দিতে পারি। কিন্তু হানযালিয়ার পুত্রকে (আবু জাহল) কোনো যুক্তির দ্বারাই বিরত রাখা সম্ভব নয়। যা হোক, তুমি তার কাছে গিয়ে চেষ্টা করে দেখো, তোমার প্রস্তাবে আমার সম্মতি রয়েছে।"

অতঃপর উৎবাহ দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে লাগল। বলল, "হে কুরাইশগণ! তোমরা মুহাম্মদ তাঁর সঙ্গীদের সাথে যুদ্ধ করে কোনো বাহাদুরী প্রদর্শন করবেনা আল্লাহর শপথ যদি তোমরা তাদের হত্যা করে ফেলো তাহলে এমন চেহারাসমূহ দেখতে পাওয়া যাবে সেগুলোকে দেখা পছন্দনীয় হবে না। কেননা, এ যুদ্ধে হয় চাচাতো ভাই নিহত হবে নতুবা খালাতো ভাই কিংবা নিজের গোত্রেরই লোক নিহত হবে। সুতরাং ফিরে চল এবং মুহাম্মদ ও গোটা আরব দুনিয়াকে ছেড়ে দাও। যদি আরবের অন্য লোকেরা মুহাম্মদ কে হত্যা করে ফেলে তাহলে তো সেটা তোমাদের কাঙ্ক্ষিত কাজই হবে। অন্যথা মুহাম্মদ তোমাদেরকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবেন যে তোমরা তাঁর প্রতি তোমাদের করণীয় কাজটি করোনি।

এদিকে হাকীম আবু জাহলের নিকট হাযির হয়ে নিজের ও উৎবাহর মতামত ব্যক্ত করলেন। হাকীমের কথা শুনে আবু জাহেলের আপাদমস্তক জ্বলে উঠল। সে ক্রোধান্বিত স্বরে বলতে লাগলো, "মুহাম্মদ এর যাদু উৎবাহর ওপর বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছে। ভীরু, কাপুরুষ, কুরাইশের কলংক আজ যুদ্ধের নামে ভীত হয়ে প্রাণরক্ষার বাহানা খুঁজছে। না, না এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি, উৎবাহ পুত্র মুহাম্মদ এর দলভুক্ত (উৎবাহর পুত্র আবু হাইফা (রা) প্রথম পর্যায়ের মুসলমান ছিলেন এবং হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন)। সে যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত। তার নিহত হওয়ার আশঙ্কায় নরাধম এমন বিচলিত হয়ে পড়েছে। ধিক শত ধিক তাকে।"

হাকীম তখন আবু জাহেলকে সেখানে রেখে উৎবাহর নিকট গমন করে সমস্ত বৃত্তান্ত প্রকাশ করলেন। ক্রোধ, অভিমান ও অহংকারে উৎবাহ একেবারে অস্থির হয়ে পড়লো। সে বলে তাহলে আরববাসী দেখুক, জগদ্বাসী দেখুক যে, কে বীরপুরুষ, আমি ততক্ষণ ফিরব না যতক্ষণ না মুহাম্মদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া হয়। এই বলে সে সদল বলে সমরাঙ্গনে এগিয়ে চলল। আর ওদিকে আবু জাহেল ছুটে গিয়ে আমের ইবনে হাযরামীকে বললো, "দেখছ কি, তোমার ভ্রাতার প্রতিশোধ গ্রহণ আর সম্ভবপর হবে না। কাপুরুষ উৎবাহ, সদল বলে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে যাচ্ছে। শীঘ্র উঠে আর্তনাদ করতে শুরু কর।"

আবু জাহলের কথা শেষ হতে না হতেই আমের তার সকল অঙ্গে ধুলো বালি মাখতে মাখতে এবং গায়ের কাপড় ছিড়তে ছিড়তে নিহত ভ্রাতার নাম নিয়ে আর্তনাদ করে বেড়াতে লাগল। আর মুহূর্তের মধ্যে হাকীমের সমস্ত পরিশ্রম পন্ড হয়ে গেল। ক্ষণিকের মধ্যেই রণ পিপাসু মুশরিক বাহিনীর বীভৎস দিগ্বিদিক ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত এবং রণাঙ্গন প্রকম্পিত হয়ে ওঠল।

মুশরিক ও মুসলিম বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি

যখন মুসলিম ও মুশরিক উভয় বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি হলো তখন রাসূল বললেন, "হে আল্লাহ! এ মুশরিক কুরাইশগণ ভীষণ গর্বভরে তোমার বিরুদ্ধাচরণ করতে করতে এবং তোমার রাসূল কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে করতে এগিয়ে আসছে। হে আল্লাহ! আমরা তোমার সাহায্যপ্রার্থী। হে আল্লাহ! তোমার এ দ্বীনের দাসদের প্রতি তোমার যে ওয়াদা রয়েছে তা আজ পূর্ণ করে দেখিয়ে দাও।"

রাসূল (ﷺ) উৎবাহ ইবনে রাবীয়াহকে একটি উটের ওপর দেখে বললেন, "কওমের মধ্যে কারো কাছে কল্যাণ থাকলে লাল উটের মালিকের কাছে রয়েছে। জনগণ তার কথা মেনে নিলে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে।"

এ স্থলে রাসূল মুসলমানদের সারিগুলো ঠিক করলেন। সারি ঠিক করা অবস্থায় একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেলো। রাসূল (ﷺ) এর হাতে একটি তীর ছিলো যা দ্বারা তিনি সারি ঠিক করছিলেন। ঐ সময় সাওয়াদ ইবনে গাযিয়্যাহ সারি হতে কিছু আগে বেড়েছিলেন। তার পেটের ওপর তিনি তীরের ছোয়া দিয়ে বললেন। "হে সাওয়াদ! সমান হয়ে যাও। তখন সাওয়াদ বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে আপনি কষ্ট দিয়েছেন। সুতরাং প্রতিশোধ প্রদান করুন।" তার একথা শুনে রাসূল তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং পেটে চুম্বন দিলেন। রাসূল তখন তাকে বললেন "হে সাওয়াদ তোমার এরূপ করার কারণ কি?" সাওয়াদ উত্তরে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! যা কিছু সামনে আছে তাতো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। আমি চেয়েছি যে, এ স্থলে আপনার সাথে আমার শেষ আদান প্রদান যেন এটাই হয়- 'আমার দেহের চামড়া আপনার দেহের চামড়াকে স্পর্শ করে।' তাঁর এ কথা শুনে রাসূল তাঁর জন্যে কল্যাণের দু'আ করলেন। সারিসমুহ ঠিক ঠাক হয়ে গেলে রাসূল (ﷺ) সৈন্যদেরকে উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন, তিনি তাদেরকে শেষ নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যেন তারা যুদ্ধ শুরু না করেন। তারপর তিনি যুদ্ধনীতির ব্যাপারে বিশেষ একটি উপদেশ দিতে গিয়ে বললেন, "মুশরিকরা যখন সংখ্যা বহুলরূপে তোমাদের নিকট এসে পড়বে তখন তাদের প্রতি তীর চালাবে এবং নিজেদের তীর বাঁচাবার চেষ্টা করবে।"

(অর্থাৎ প্রথম থেকেই অযথা তীরন্দাজী করে তীর নষ্ট করবে না।) আর যতক্ষণ তারা তোমাদের ওপর ছেয়ে না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তরবারী উত্তোলন করবে না।

এরপর রাসূল এবং আবু বকর (রা) ছাউনির দিকে ফিরে গেলেন এবং সাদ ইবনে মু'আয (রা) তার রক্ষকবাহিনীকে নিয়ে ছাউনির দরজার ওপর নিযুক্ত হয়ে গেলেন।

অপর পক্ষে মুশরিকদের অবস্থা এ ছিলো যে, আবু জাহেল আল্লাহর নিকট ফায়সালার দু'আ করল। সে বলল, "হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দলটি আত্মীয়তার বন্ধন বেশি ছিন্নকারী ও ভুল পন্থা অবলম্বনকারী ঐ দলকে তুমি আজ ছিন্ন ভিন্ন করে দাও। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল তোমার নিকট বেশি প্রিয় ও পছন্দনীয় আজ তুমি ঐ দলকে সাহায্য কর।" পরবর্তীতে এ কথারই দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ নিম্নের আয়াতটি অবতীর্ণ করেন।

"তোমরা যদি মীমাংসা চেয়ে থাকো তবে, তা তো তোমাদের নিকট এসেই গেছে, যদি তোমরা বিরত হও তবে ওটা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, আর যদি তোমরা পুনরায় কর তবে আমিও পুনরায় শাস্তি দিব এবং তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোনো কাজে আসবে না এবং আল্লাহ মু'মিনদের সাথে রয়েছেন। (সূরা আনফাল-১৯)

চূড়ান্ত লগ্ন ও যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন

এ যুদ্ধে প্রথম ইন্ধন ছিলো আসওয়াদ ইবনে আবুল আসাদ মাখযুমী। এ লোকটি ছিলো বড়ই হঠকারী ও দুশ্চরিত্র। সে একথা বলতে বলতে যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে আসলো "আমি এদের হাউযের পানি পান করবো অথবা একে ভেঙে ফেলব নতুবা এজন্য জীবন দিয়ে দিবো।"

একথা বলে যখন সে ওদিক থেকে বেরিয়ে আসলো তখন এদিক থেকে হামযাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এগিয়ে আসলেন। হাউয়ের পাড়েই দুজনের দেখা হলো। হামযাহ তাকে এমন ভাবে তরবারী দ্বারা আঘাত করলেন যে, তার পা অর্ধ পদনালী হতে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো এবং সে পৃষ্ঠভরে পড়ে গেল। তার পা হতে রক্তের ফোয়ারা ছুটছিলো যার গতি তার সঙ্গীদের দিকে ছিলো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে হাঁটুর ভরে ছেচড়িয়ে চলে হাউয়ের দিকে অগ্রসর হলো এবং তাতে প্রবেশ করতে চাচ্ছিল যাতে তার কসম পুরো হয়ে যায়। ইতোমধ্যে হামযাহ দ্বিতীয়বার তার ওপর তরবারী চালালেন এবং সে হাউযের মধ্যেই মৃত্যুমুখে পতিত হলো।

যুদ্ধের সূত্রপাতের মূল চিত্র

এটা ছিলো এ যুদ্ধের প্রথম হত্যা। এর ফলে যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠলো। তখন নিয়ম ছিলো যে, যুদ্ধের পূর্বে প্রত্যেক পক্ষের বিখ্যাত বীর পুরুষরা রনাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়ে অন্যপক্ষকে সমরে আহ্বান করতো। তখন ঐ পক্ষের নির্বাচিত কয়েকজন খ্যাতনামা বীর এ আহ্বানের উত্তর প্রদানের জন্যে বীরদর্পে অগ্রসর হতো। এ ক্ষেত্রেও তাই হলো। অভিযান ক্ষুব্ধ উৎবাহ ও তার সহোদর শায়বাহ ও পুত্র ওয়ালিদসহ চীৎকার করতে লাগলো। "কে আসবি আয়, আমাদের তরবারীর খেলা দেখে যা।" তার এ আহ্বান শুনে তিনজন আনসার বীর খোলা তরবারী হস্তে সেদিকে ধাবিত হলেন। তারা হলেন আউফ, মুয়াব্বিয় এরা দুজন হারিসের পুত্র ছিলেন এবং তাদের মাতার নাম ছিলো আফরা। তৃতীয় জন হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। কুরাইশরা তাদের জিজ্ঞেস করল, তোমরা কে? তাঁরা বলল, "আমরা আনসার।"

তখন তারা বলল, "আপনাদের আমরা চাচ্ছি না। আমরা আমাদের চাচাতো ভাইদের চাচ্ছি এবং একজন চীৎকার করে বলতে লাগলো, "হে মুহাম্মদ! মদিনার এ চাষাগুলোর সাথে যুদ্ধ করা আমাদের পক্ষে অসম্মানজনক। আমাদের যোগ্য যোদ্ধা পাঠাও। তার একথা শুনে রাসূল এ তিনজন আনসার বীরকে তাদের স্ব-স্ব স্থানে ফিরে যেতে বললেন। অতঃপর তিনি নিজের পরমাত্মীয়দের মধ্যে হতে হামযাহ, উবাইদাহ বিন হারিস ও আলি কে সম্বোধন করে বললেন, "তোমরা তাদের মোকাবিলায় অগ্রসর হও।" এরা অগ্রসর হলে কুরাইশগণ বললো, "তোমরা কে"? তাঁরা তাদের পরিচয় দান করলেন।

কাফিররা তাদেরকে আক্রমণ করলো। ওয়ালীদের সাথে আলী এর, শায়বার সাথে হামযা এর এবং উতবাহর সাথে উবাইদাহ এর যুদ্ধ বেঁধে গেলো। মুহূর্তের মধ্যে শায়বাহ ও ওয়ালীদের মস্তক ভুলণ্ঠিত হয়ে পড়লো। উবাইদাহ ছিলেন তখন সবার চেয়ে বৃদ্ধ। তিনি ও উতবাহ পরস্পরে তরবারীর আঘাতে গুরুতর রূপে আহত হয়ে পড়ল। ইতোমধ্যে আলী ও হামযাহ নিজ নিজ প্রতিদ্বন্দ্বীকে খতম করে এসে উতবাহর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে শেষ করেন ও উবাইদাহকে তুলে আনলেন। উবাইদাহর মুখের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো এবং ক্রমাগতভাবে বন্ধই থাকলো। শেষ পর্যন্ত ৪র্থ বা ৫ম দিন যখন মুসলমানরা মদিনা প্রত্যাবর্তনের পথে সাফা উপত্যকা অতিক্রম করছিলেন ঐ সময় উবাইদাহ (রা) ইন্তিকাল করেন।

আলী (রা) আল্লাহর নামে শপথ করে বলতেন, "এ আয়াতটি আমাদেরই ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়-

"এ দুটি ঝগড়াকারী দল, যারা তাদের প্রতিপালকের ব্যাপারে ঝগড়া করেছে।" (সূরা আল-হাজ্ব: আয়াত-১৯)

সাধারণ আক্রমণ

এ মল্ল যুদ্ধের পরিণাম মুশরিকদের জন্যে খুবই মন্দসূচনা ছিলো। তারা একটি মাত্র মুহূর্তে তাদের তিনজন বিখ্যাত অশ্বারোহী নেতাকে হারিয়ে বসেছিলো। এ জন্যে তাঁরা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে একত্রিতভাবে মুসলমানদের আক্রমণ করল। মুসলমানরা তাঁদের প্রতিপালকের নিকট অত্যন্ত আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করার পর স্ব স্ব স্থানে অটল থাকলেন এবং প্রতিহত করার ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন। তাঁরা মুশরিকদের একাধিক্রমে আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকলেন, তাঁদের বিশেষ ক্ষতিসাধন করে চললেন। তাদের মুখে আহাদ আহাদ শব্দ উচ্চারিত হচ্ছিল।

রাসূল (ﷺ) এর আকুল প্রার্থনা

এদিকে রাসূল - সৈন্যদের শ্রেণিবিন্যাস কার্য শেষ করে ফিরে এসেই স্বীয় মহান প্রতিপালকের নিকট সাহায্যের ওয়াদা পূরণের প্রার্থনা করতে লাগলেন। তাঁর প্রার্থনা ছিলো-

"হে আল্লাহ! আমার সাথে যে ওয়াদা করেছো তা পূর্ণ করো। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূর্ণকরণের প্রার্থনা করছি।"

অতঃপর যখন উভয়পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন তিনি এ প্রার্থনা করলেন-

"হে আল্লাহ! এ দলটিকে যদি আজ তুমি ধ্বংস করে দাও তাহলে তোমার আর উপাসনা করা হবে না। হে আল্লাহ তুমি যদি এটাই চাও তবে আজকের পরে তোমার আর কখনো ইবাদত করা হবে না।"

রাসূল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করলেন এবং তিনি এমন আত্মভোলা হয়ে পড়লেন যে, তাঁর চাদরখানা তাঁর স্কন্ধদেশ হতে খুলে গেল। তখনও তিনি পূর্বের ন্যায় প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকলেন। এদৃশ্য দেখে আবু বকর (রা) অধীর ভাবে ছুটে আসলেন এবং চাদরখানা দ্বারা তার দেহ আচ্ছাদিত করত; তাকে আলিঙ্গনপূর্বক বলতে লাগলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! যথেষ্ট হয়েছে। বড়ই কাতর কণ্ঠে আপনি প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করেছেন। এ প্রার্থনা ব্যর্থ হবে না। শীঘ্রই তিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করবেন।"

এদিকে আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে ওহী করলেন-

স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে অনড় রাখ’। অচিরেই আমি ভীতি ঢেলে দেব তাদের হৃদয়ে যারা কুফরী করেছে। অতএব তোমরা আঘাত কর ঘাড়ের উপরে এবং আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙুলের অগ্রভাগে। (সূরা আনফাল: আয়াত-১২)

আর রাসূল (ﷺ) এর নিকট আল্লাহ ওহী পাঠালেন-

"আমি তোমাদের সাহায্য করবো এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে।" (সূরা আনফাল: আয়াত-৯)

সাহায্যের জন্য ফেরেশতাদের অবতরণ

এরপর রাসূল (ﷺ) এর একটু তন্দ্রা আসলো। অতঃপর তিনি স্বীয় মস্তক মুবারক উঠিয়ে বললেন, "আবু বকর খুশি হও। ইনি জিবারঈল, (আ) তার দেহ ধুলো বালিতে ভরপুর।"

ইসহাকের বর্ণনা মতে, রাসূল বলেন, "আবু বকর আনন্দিত হও, তোমাদের কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। ইনি জিবরাঈল (আ), তিনি স্বীয় ঘোড়ার লাগাম ধরে ওর আগে আগে চলে আসছেন। তার দেহ ধুলো বালিতে পরিপূর্ণ।"

এরপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছাউনির দরজা হতে বাহিরে আসলেন। তিনি লৌহ বর্ম পরিহিত ছিলেন। পূর্ণ উত্তেজনার সাথে তিনি সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং মূখে উচ্চারণ করছিলেন:

"তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে তখন প্রকৃতপক্ষে তুমি নিক্ষেপ করনি; বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছিলেন। (সূরা আল-আনফাল: আয়াত-১৭)

পাল্টা আক্রমণ

এরপর রাসূল (ﷺ) পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দেন এবং যুদ্ধের প্রতি উৎসাহ প্রদান করতে গিয়ে বলেন, "তোমরা আক্রমণ চালাও। যার হাতে মুহাম্মদ এর প্রাণ রয়েছে সেই সত্তার শপথ! এদের মধ্যে যে ব্যক্তিই যুদ্ধে অটল থেকে যুদ্ধ করাকে পুণ্য মনে করে সম্মুখে অগ্রসর হবে, পিছনে না হটে লড়াই করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।"

রাসূল (ﷺ) যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে গিয়ে আরো বলেন, তোমরা ঐ জান্নাতের দিকে উঠে যাও যার প্রস্থ আসমান ও যমীনের সমান। একথা শুনে উমায়ের ইবনে হাম্মাম (রা) বললেন, "খুব ভালো! খুব ভালো!" রাসূল (ﷺ) তখন তাঁকে প্রশ্ন করলেন, "তুমি এ কথা কেন বললে?" উত্তরে তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল আমি আশা রাখি যে, আমিও ঐ জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবো, এ ছাড়া অন্য কোনো কথা নয়।" রাসূল বললেন, হ্যাঁ তুমিও ঐ জান্নাতবাসীদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। অতঃপর হাম্মাম তার খাদ্য থলে হতে কিছু খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। তারপর তিনি বললেন, যদি আমি যে খেজুরগুলো খেয়ে শেষ করা পর্যন্ত জীবিত থাকি তবে এটাও তো দীর্ঘ জীবন হয়ে যাবে। সুতরাং তিনি তাঁর কাছে যে খেজুরগুলো ছিলো সেগুলো ফেলে দিলেন। তারপর মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেলেন।

এভাবেই খ্যাতনামা মহিলা আফরা (রা) পুত্র আউফ ইবনে হাবিশ (রা) জিজ্ঞেস করলেন হে আল্লাহর রাসূল - আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কোন কাজে খুশি হয়ে হেসে থাকেন? উত্তরে রাসূল বললেন, "তিনি বান্দার ঐ কাজে খুশি হয়ে হেসে থাকেন যে, সে অনাবৃত দেহে (যুদ্ধ দেহরক্ষক পোশাক পরিধান না করেই) স্বীয় হস্ত শত্রুদের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়। এটা শুনে আউফ (রা) দেহ হতে লৌহবর্ম খুলে নিয়ে নিক্ষেপ করলেন এবং তরবারী নিয়ে শত্রুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অতঃপর যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।

যে সময় রাসূল (ﷺ) পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তাতে শত্রুদের আক্রণের প্রচণ্ডতা হ্রাস পেয়েছিলো এবং তাদের উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে পড়েছিলো। কেননা, সাহাবায়ে কিরাম যখন আক্রমণ করার নির্দেশ পেলেন তখন ছিলো তাঁদের জিহাদের উত্তেজনার যৌবনকাল। তাই তাঁরা এ দুর্দমণীয় ও ফায়সালাকারী আক্রমণ পরিচালনা করলেন। তাঁরা শত্রুদের সারিগুলোকে তছনছ ও এলামেলো করে নিয়ে তাদের গলা কেটে কেটে সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। স্বয়ং রাসূল (ﷺ) বর্ম পরিহিত অবস্থায় আসতে দেখে এবং 'শীঘ্রই তারা পরাজিত হবে ও পৃষ্ঠ প্রদর্শনপূর্বক পলায়ন করবে' একথা স্বষ্টভাবে বলতে শুনে তাঁদের উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পেলো। এজন্যেই মুসলমানরা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করলেন এবং ফেরেশতারাও তাঁদেরকে সাহায্য করলেন। যেমন ইবনে সাদের বর্ণনায় ইকরামা (রা) হতে বর্ণিত। ঐ দিন মানুষের মস্তক কেটে পড়তো অথচ কে কেটেছে তা জানা যেতো না এবং মানুষের হাত কর্তিত হয়ে পড়ে যেতো, অথচ কে কর্তন করেছে তা জানা যেতো না।

ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, একজন মুসলমান একজন মুশরিককে তাড়া করছিলেন। হঠাৎ ঐ মুশরিকের ওপর চাবুকের আঘাতের শব্দ শোনা গেল এবং একজন অশ্বারোহীর শব্দ শোনা গেল, যিনি বলছিলেন "সম্মুখে অগ্রসর হও।" মুসলমান মুশরিকটিকে তাঁর সামনে দেখলেন যে, তার নাকের ওপর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং অবয়ব ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে যেন চাবুক দ্বারা আঘাত করা হয়েছে। ঐ আনসারী মুসলমান রাসূল (ﷺ) এর নিকট এসে ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। তখন তিনি বললেন "তুমি সত্য কথা বলছ। এটা ছিলো তৃতীয় আসমানের সাহায্য।"

আবু দাউদ মায়েনী বলেন, "আমি একজন মুশরিককে মারার জন্যে তাড়া করছিলাম। অকম্মাৎ তার মস্তকটি, আমার তরবারী তার ওপর পৌঁছার পূর্বে কেটে পড়ে যায়। আমি তখন বুঝতে পারলাম যে, তাকে আমি নই, বরং অন্য কেউ হত্যা করেছে।"

একজন আনসারি আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে বন্দী করে নিয়ে আসেন। তখন আব্বাস (রা) বলেন "আল্লাহর শপথ। আমাকে এ ব্যক্তি বন্দী করেনি। আমাকে তো একজন চুলবিহীন মাথা ওয়ালা লোক যিনি দেখতে অত্যন্ত সুন্দর এবং একটি বিচিত্র বর্ণের ঘোড়ার ওপর সরওয়ার ছিলেন তিনি আমাকে বন্দী করেছিলেন। তাকে এখন আমি লোকজনদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না।" আনসারী বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল তাকে আমি বন্দী করেছি।" রাসূল বললেন, "চুপ করো, আল্লাহ এক সম্মানিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাকে সাহায্য করেছেন।"

ময়দান হতে ইবলিসের পলায়ন

যেমনটি আমরা বলে এসেছি, অভিশপ্ত ইবলিস সোরাকা ইবনে মালেক ইবনে জুশুম মুদলিজীর সুরতে এসেছিলো এবং এতক্ষণ পর্যন্তও সে মুশরিকগণ হতে পৃথক হয়নি। কিন্তু যখন সে মুশরিকদের বিরুদ্ধে ফেরেশতাগণের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করল তখন সে পিছনে ফিরে পলায়ন করতে থাকল। কিন্তু ফেরেশতা তার বুকে এত জোরে ঘুষি মারল যে, সে মাটিতে পড়ে গেল। এরপর ইবলিস সেখান থেকে পলায়ন করল। মুশরিকদেরকে বলতে লাগল, "আমি যা দেখছি, তোমরা তা দেখছ না। আল্লাহকে আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে। তিনি কঠিন শাস্তির মালিক।" এরপর পলায়ন করে সে সমুদ্রের ভেতরে যেতে থাকল।

সাংঘাতিক পরাজয়

অল্পক্ষণের মধ্যেই মুশরিকগণের সৈন্য বাহিনীতে অকৃতকার্য ও দুর্ভাবনার বিভিন্ন লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠল। মুসলমানদের কঠিন এবং অবিরাম আক্রমণের ফলে মুশরিক বাহিনীর সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল এবং যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের নিকটবর্তী হয়ে আসতে থাকল। অতঃপর চরম বিশৃংখলার মধ্যে দিয়ে মুশরিক বাহিনী পিছু হটতে থাকল। এমন কি মুসলমানরা দৌড় দিয়ে পিছু পিছু ধাওয়া করে চলল। এমন কি দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সম্পূর্ণরূপে পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হলো।

আবু জাহেলের হঠকারিতা

কিন্তু বড়ো তাগুত আবু জাহেল যখন নিজ সারির সৈন্যদলের মধ্যে বিশৃংখলা প্রত্যক্ষ করল তখনও সে নিজ অবস্থানে সূদৃঢ় থাকার মনস্থ করল। কাজেই সে নিজ দলের সৈন্যগণকে উচ্চ কন্ঠে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে বলতে লাগলো, "যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সোরাকার সরে পড়ার কারণে তোমরা মনোবল হারিয়ো না যেন। কারণ সে পূর্ব হতেই মুহাম্মদ (ﷺ) এর সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। উৎবাহ, শায়বা এবং ওয়ালীদের হত্যার কারণেও তোমাদের ভীত হওয়ার কোনোই কারণ নেই। তাড়াহুড়োর মধ্যে কাজ করতে গিয়েই তাদের এ অবস্থা হয়েছে। লাত ও উযযার শপথ! তাদেরকে রশি দ্বারা শক্ত করে বেঁধে না ফেলা পর্যন্ত আমরা প্রত্যাবর্তন করব না। দেখ, তোমাদের কোনো ব্যক্তি তাদের কাউকেও যেন হত্যা না করে। আমরা যেন তাদেরকে অন্যায়ের শাস্তি দিতে পারি এতদুদ্দেশ্যে তাদেরকে বন্দী কর।"

কিন্তু তার এ অসাড় অহমিকার প্রতিফল শীঘ্রই তাকে অনুধাবন করতে হলো। কারণ মূহূর্তের মধ্যেই মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেললো। কিন্তু আবু জাহেল তার চতুস্পার্শ্বেও একদল জনতাকে বেশ সংঘবদ্ধ অবস্থতাতেই রেখে ছিলো। উক্ত জনতা তার চতুর্দিকে তরবারীর ও বর্শার দেয়াল সৃষ্টি করে রেখেছিলো। কিন্তু ইসলামি জনতার প্রলয়ংকারী তুফান তার তরবারীর ও বর্শার দেয়ালকে একদম তছনছ করে ফেলল। অতঃপর এ বড়ো তাগুত মর্দে মুমিনদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে এসে গেল। মুসলিম সৈন্যরা দেখতে পেলেন যে, সে এক ঘোড়ার পিঠে চড়ে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। এদিকে দুজন আনসারী যুবকের হাত তার মৃত্যু রক্ত চুষে নেয়ার অপেক্ষায় ছিলো।

আবু জাহেলের হত্যা

আব্দুর রহমান ইবনে আওফ হতে বর্ণিত যে, "বদরের যুদ্ধের দিন আমি সৈন্যদের সারিতে ছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ ডানে এবং বামে অল্প বয়স্ক দুজন যুবককে দেখতে পেলাম। তাদের উপস্থিতিতে আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারলাম না। এমনি ওদের একজন তার সঙ্গীকে এড়িয়ে আমার কাছে এসে বলল। "চাচাজান, আবু জাহেল কোনটি আমাকে দেখিয়ে দিন।"

আমি বললাম, "ভাতিজা, তাকে তোমার কি প্রয়োজন?" সে বলল, "আমরা জানতে পেরেছি সে রাসূল কে অনেকবার কষ্ট দিয়েছে। সেই সত্তার কসম! যার হতে রয়েছে আমার জীবন, "যদি আমি তাকে দেখতে পাই তাহলে যতক্ষণ আমাদের মধ্যে যার মৃত্যু পূর্বে অবধারিত হয়েছে সে মৃত্যুবরণ না করবে ততক্ষণ আমার অস্তিত্ব তার অন্তিম থেকে পৃথক হবে না।"

তিনি বলেছেন যে, "আমি তার এ কথায় একদম অভিভূত হয়ে পড়লাম।"

তিনি আরও বলেছেন যে, "দ্বিতীয় জনও এসে ইঙ্গিতে আমাকে ঐ একই কথা বলল। অতঃপর আমি প্রত্যক্ষ করলাম যে আবু জাহেল লোকজনদের মাঝে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বললাম, আরে দেখছ না, ঐ যে তোমাদের শিকার যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলে।"

তিনি বর্ণনা করেছেন যে, "এ কথা শোনা মাত্র তারা উভয়ে তরবারি নিয়ে লাফ দিয়ে এগিয়ে চলল এবং সেই কুখ্যাত নরাধমকে হত্যা করে রাসূল (ﷺ) এর নিকট প্রত্যাবর্তন করল।"

রাসূল (ﷺ) বললেন, "তোমাদের উভয়ের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছ?"

তারা উভয়েই বলল, "আমি হত্যা করেছি"।

রাসূল (ﷺ) পুনরায় বললেন, "তোমরা কি নিজ নিজ তরবারী মুছে ফেলেছ?" তারা বলল "না।"

অতঃপর রাসূল (ﷺ) উভয়ের তরবারী দেখলেন এবং বললেন, "তোমরা উভয়েই তাকে হত্যা করেছ"।

অবশ্য আবু জাহেলের জিনিসপত্রগুলো তিনি মুআয ইবনে আমর ইবনে জামুহকে প্রদান করেন। আবু জাহেলের এ দুই হত্যাকারীর নাম হলো- ১. মু'আয ইবনে আমর ইবনে জামুহ এবং ২. মুআয ইবনে আফরা।

আর ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, মুআয ইবনে আমর ইবনে জামুহ বলেছেন, "আমি মুশরিকদেরকে আবু জাহেল সম্পর্কে বলতে শুনলাম যে, সে ঘন বৃক্ষসমূহের ন্যায় বর্শা ও তরবারীর ভিড়ের মধ্যে ছিলো। তারা একথাও বলছিলো যে, আবুল হাকাম পর্যন্ত কেউ পৌঁছতে পারবে না।" অর্থাৎ তাকে হত্যা করতে পারবে না।

মু'আয ইবনে আমর আরও বলেছেন যে, "যখন আমি একথা শুনলাম তখন আমাকে আমার লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে নিলাম এবং তার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে রাখলাম। অতঃপর যখন সুযোগ পেয়ে গেলাম তখনই আক্রমণ করে বসলাম এবং এমনভাবে আঘাত করলাম যে, তার পা দ্বিখন্ডিত হয়ে খুলে পড়ে গেল।

তিনি আরও বর্ণনা করেছেন যে, এদিকে আমি যখন আবু জাহেলকে আঘাত করলাম অন্য হাত কেটে গেলো এবং যুদ্ধের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াল। আমি তাকে পিছনে টেনে নিয়ে সাধারণভাবে যুদ্ধ করতে থাকলাম।

এরপর আবু জাহেলের নিকট পৌঁছে যান মুআয ইবনে আফরা। তিনি তাকে এত জোরে আঘাত করেন যে, সে সেখানেই স্তূপে পরিণত হয়ে যায়। সেই সময় শুধু তার শ্বাস-প্রশ্বাসটুকু অবশিষ্ট ছিলো। এরপর মুআয ইবনে আফরা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান।

যখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল তখন রাসূল বললেন, "কে আছ এমন যে দেখে আসো আবু জাহেলের অবস্থা কি হলো।" এ কথা শুনে সাহাবায়ে কিরাম তার খোঁজে বিক্ষিপ্তভাবে দিগ্বিদিকে চলে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) তাকে এমন অবস্থায় পেলেন যে তখনো তার শ্বাস-প্রশ্বাস যাওয়া আসা করছিলো। তিনি তার গলার ওপর পা রেখে মাথা কেটে নেয়ার জন্য দাড়ি ধরলেন এবং বললেন, "ওহে আল্লাহর শত্রু! শেষে আল্লাহ তোমাকে এভাবে অপমানিত করলেন?" সে বলল, "আমাকে কি প্রকারের লাঞ্ছিত করলেন? "যে ব্যক্তিকে তোমরা হত্যা করছো তার চেয়ে উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন লোক কেউ আছে কি? অথবা যে লোকটিকে তোমরা হত্যা করছো তার চেয়ে উঁচু সম্মানের কোনো লোক আছে কি? তারপর সে বলল, "যদি আমাকে কৃষকরা ছাড়া অন্য কেউ হত্যা করতো তবে কতই না ভালো হতো" অতঃপর সে বললো, "আচ্ছা, আমাকে বলতো আজ বিজয় লাভ কার হয়েছে?" আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) কে বললো, যিনি তার গলার ওপর পা রেখে ছিলেন, হে বকরীর রাখাল! তুমি বড়ই উঁচু ও কঠিন জায়গায় চড়ে গিয়েছো। প্রকাশ থাকে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) মক্কায় বকরি চরাতেন।

এ কথোপকথনের পর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) তার মস্তক কেটে নিলেন এবং রাসূল (রা) এর খিদমতে হাযির করে দিলেন এবং আরয করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল এটা আল্লাহর শত্রু আবু জাহেলের মস্তক।" রাসূল তিনবার বললেন, "সত্যিই, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই।"

তারপর বললেন- "আল্লাহই সবচেয়ে মহান। ঐ আল্লাহরই সমুদয় প্রশংসা যিনি তার ওয়াদাকে সত্যে প্রমাণিত করেছেন। স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সমস্ত দলকে পরাজিত করেছেন।"

এরপর রাসূল বললেন, "চলো আমাকে তার মৃত দেহ দেখাও"। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) বলেন, "আমি তাকে নিয়ে গিয়ে তার মৃতদেহ দেখালাম। তিনি বললেন, "ঐ ব্যক্তিই এ উম্মতের ফিরাউন।"

ঈমানের উজ্জ্বলতায় গৌরবোজ্জ্বল

উমায়ের ইবনে হাম্মাম (রা) এবং আউফ ইবনে হারিস ইবনে আফরা'র (রা) ঈমান-দীপ্ত চরিত্র কথার বিষয়াবলি ইতোপূর্বে বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে যুদ্ধে পদে পদে এমন সব দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে যেগুলোতে ঈমানী শক্তি ও মৌলিক নীতিমালার পরিপক্কতা সুস্পষ্ট ও সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেছে। এ যুদ্ধে পিতা ও পূত্র এবং ভাই ও ভাইয়ের মধ্যে দল বিভাগ বা শ্রেণিবিন্যাস হয়েছে, আর মূল নীতির ব্যাপারে মতানৈক্যের তরবারী কোষমুক্ত হয়েছে। এভাবে অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীর ওপর আঘাত হেনে ক্রোধগ্নি প্রশমিত করেছে। পরবর্তী আলোচনা থেকে এর যথার্থতা প্রমাণিত হবে।

১. ইবনে ইসহাক ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) সাহাবায়ে কিরামকে বললেন, "আমি জানি যে, বনু হাশেম এবং আরও কোনো গোত্রের কতগুলো লোককে জোর পূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে আনয়ন করা হয়েছে। আমাদের যুদ্ধের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং বনু হাশিমের কোনো লোক কারো তরবারীর সামনে এসে পড়লে তাকে যেন সে হত্যা না করে। আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব কারো সামনে পড়ে গেলে তাকেও যেন হত্যা করা না হয়। কেননা, তাকে জোর করে এ যুদ্ধে নিয়ে আসা হয়েছে।"

একথা শুনে উৎবাহর পুত্র আবু হুযাইফা (রা) বললেন, "আমরা কি আমাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করবো, আর আব্বাস কে ছেড়ে দিবো? আল্লাহর কসম! যদি তিনি আমার সামনে পড়ে যান তবে আমি তাকে তরবারীর লাগাম পরিয়ে দিবো। রাসূল (ﷺ) এর নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) কে বলেন "রাসূল (ﷺ) এর চাচার চেহারার ওপর কি তরবারীর আঘাত করা হবে?" উত্তরে ওমর (রা) বলেন, "আমাকে ছেড়ে দিন, আমি তরবারী দ্বারা এ ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দিই। কেননা, এ ব্যক্তি মুনাফিক হয়ে গেছে।"

পরবর্তীকালে আবু হুযাইফা (রা) বলতেন, ঐ দিন আমি যে কথা বলে ফেলেছিলাম তার কারণে আমি কোনো সময় মনে শান্তি পাই না। এ ব্যাপারে বরাবরই আমার মনে ভয় থেকে যায়। এটা হতে মুক্ত হওয়ার একটি মাত্র উপায় হলো আমার শাহাদাতের মাধ্যমে এর কাফফারা হয়ে যাওয়া। অবশেষে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হয়েই যান।

২. আবুল বাখতারীকে হত্যা করতে নিষেধ করার কারণ ছিলো এই যে, এ ব্যক্তি মক্কায় রাসূল কে কষ্ট দেয়া হতে সবচেয়ে বেশি বিরত ছিলো। সে রাসূল কে কোনো প্রকারের কষ্ট দিত না এবং তার পক্ষ হতে তিনি কখনো কোনো অপছন্দনীয় কথা শোনেন নি। আর এ ব্যক্তি ঐ লোকদের একজন ছিলো যারা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বয়কট এর পত্রটি ছিড়ে ফেলেছিলো।

কিন্তু এতদসত্বেও আবুল বাখতারী শেষে নিহতই হয়েছিলো ঘটনাটি হলো, মুযাযযার ইবনে যিয়াদ বালাভী (রা) এর সাথে তার লড়াই হয়। তার সাথে তার অন্য এক সঙ্গীও ছিলো। দুজন এক সাথে যুদ্ধ করছিলো। মুযাযযার (রা) তাকে বলেন, "হে আবুল বাখতারী! আপনাকে হত্যা করতে রাসূল আমাদেরকে নিষেধ করেছেন।" সে বলে "আমার সাথিকেও কি? মুযাযযার (রা) উত্তরে বলেন, "না আল্লাহর কসম! আপনার সাথিকে আমরা ছেড়ে দিতে পারি না।" সে তখন বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি এবং সে দুজনই মরবো। এরপর দুজনই যুদ্ধ শুরু করে দেয়। মুযাযযার (রা) বাধ্য হয়ে তাকেও হত্যা করেন।

৩. মক্কায় জাহেলিয়াত যুগে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ও উমাইয়া ইবনে খালফের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্ব ছিলো। বদর যুদ্ধের দিন উমাইয়া ইবনে খালফ তার ছেলে আলীর হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলো। এমন সময় আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা) সেখান দিয়ে গমন করেন। তিনি শত্রুর নিকট হতে কিছু লৌহ বর্ম ছিনিয়ে নিয়ে তা উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। উমাইয়া তাঁকে দেখে বললো, "তুমি আমার কোনো প্রয়োজন বোধ কর কি? আমি তোমার এই লৌহ বর্মগুলো হতে উত্তম। আজকের মত দৃশ্য আমি কোনো দিন দেখিনি। তোমার দুধের কি প্রয়োজন নেই।" সে একথা দ্বারা বুঝাতে চেয়েছিলো যে আমাকে বন্দী করবে তাকে আমি মুক্তিপণ হিসেবে বহু দুগ্ধবতী উট্টি প্রদান করবো।"

তার এ কথা শুনে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা) লৌহবর্মগুলো ফেলে দিয়ে পিতা-পুত্র দুজনকে গ্রেফতার করে সামনে অগ্রসর হলেন।

আব্দুর রহমান বললেন, "আমি উমাইয়া এবং তার পুত্রের মাঝে চলছিলাম এমতাবস্থায় উমাইয়া আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "তোমাদের মধ্যে এ ব্যক্তি কে ছিলো যে তার বক্ষে উটপাখির পালক লাগিয়ে রেখেছিলো।" আমি উত্তরে বললাম, উনি ছিলেন হামযাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা)। সে তখন বললো এ সেই ব্যক্তি যে আমাদের মধ্যে ধ্বংস রচনা করে রেখেছিলো।"

আব্দুর রহমান বলেন, আল্লাহর শপথ। আমি এদুজনকে নিয়ে চলছিলাম অকস্মাৎ বিলাল উমাইয়াকে আমার সাথে চলতে দেখে। এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে, এ উমাইয়া মক্কায় বিলাল এর ওপর অমানুষিক উৎপীড়ন করেছিলো। বিলাল বললেন, এ হচ্ছে কাফিরদের নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ। হয় আমি বাঁচাবো না হয় সে বাঁচবে। আমি বললাম, হে বিলাল! এটা হচ্ছে আমার বন্দী। তিনি আবার বললেন, এখন দুনিয়াতে হয় আমি থাকবো, না হয় সে থাকবে। তারপর তিনি অত্যন্ত উচ্চৈস্বরে ডাক দিয়ে বললেন, "হে আল্লাহর আনসারগণ! এ হচ্ছে কুফরের নেতা উমাইয়া ইবনে খালফ। এখন হয় আমি থাকবো অথবা সে থাকবে।" আব্দুর রহমান বলেন ইতোমধ্যে জনগণ আমাদেরকে ঘিরে ফেললো। আমি তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু একটি লোক তার পুত্রের পায়ে তরবারীর আঘাত হেনে দিলো। আর সাথে সাথে সে পড়ে গেল। ও দিকে উমাইয়া এত জোরে চীৎকার করলো যে, এরূপ চীৎকার আমি কখনই শুনিনি। আমি বললাম, পালিয়ে যাও। কিন্তু আজ পালাবার কোনো উপায় নেই। আল্লাহর কসম! আজ আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারবো না। আব্দুর রহমান বর্ণনা করেন যে, জনগণ তরবারী দ্বারা তাদের দুজনকে কেটে শেষ করে দেয়। এর পর আব্দুর রহমান বললেন, "আল্লাহ বিলালের ওপর রহম করুণ। আমার লৌহবর্মও গেল এবং আমার বন্দীর ব্যাপারে আমাকে ব্যাকুলও হতে হলো।"

৪. ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) তার মামা আস ইবনে হিশাম ইবনে মুগীরাহকে হত্যা করেন। সেদিন তিনি আত্মীয় সম্পর্কের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেন নি।

৫. আবু বকর সিদ্দীক (রা) স্বীয় পুত্র আব্দুর রহমানকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন যখন সে মুশরিকদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলো" ওরে দুরাচার। আমার মাল কোথায়"? আব্দুর রহমান উত্তরে বলেছিলো- অস্ত্র, সস্ত্র, দ্রুতগামী অশ্ব এবং ঐ তরবারী ছাড়া কিছুই বাকী নেই যা বার্ধক্যের ভ্রষ্টতার সমাপ্তি ঘটিয়ে থাকে।

৬. যখন মুসলমানরা মুশরিকদেরকে গ্রেফতার করতে শুরু করেন তখন রাসূল (ﷺ) ছাউনীর মধ্যে অবস্থান করছিলেন এবং সা'দ ইবনে মু'আয (রা) তরবারী হস্তে দরজার ওপর পাহারা দিচ্ছিলেন। রাসূল (ﷺ) লক্ষ করলেন যে সা'দ (রা) এর চেহারায় মুসলমানদের এ কার্যকলাপ অপছন্দনীয় হওয়ার লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে। তাই, তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে সা'দ (রা) আল্লাহর কসম! বুঝা যাচ্ছে যে, মুসলমানদের এ কার্যকলাপ তোমার পছন্দ হচ্ছে না, তাই নয় কি?" সা'দ (রা) উত্তরে বললেন, জ্বী হ্যাঁ। হে আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর কসম! মুশরিকদের সাথে এটাই প্রথম যুদ্ধ যার সুযোগ আল্লাহ আমাদের দান করেছেন। সুতরাং মুশরিকদের ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে অধিক সংখ্যায় হত্যা করে ফেলাই আমার নিকট বেশি পছন্দনীয়।"

৭. এ যুদ্ধে উকাশাহ ইবনে মুহসিন আসাদীর (রা) তরবারী ভেঙ্গে যায়। তিনি রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাযির হলে রাসূল তাঁকে কাঠের একটা ভাঙা থাম্মা প্রদান করেন এবং বলেন "উকাশাহ (রা) তুমি এটা দ্বারাই যুদ্ধ কর" উকাশাহ ওটা রাসূল (ﷺ) এর নিকট হতে নিয়ে নড়ানো মাত্রই একটা লম্বা, শক্ত সাদা চকচকে তরবারীতে পরিবর্তিত হয়। অতঃপর তিনি ওটা দ্বারাই যুদ্ধ করেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেন। ঐ তরবারী খানা স্থায়ীভাবে উকাশাহ (রা) এর কাছেই থাকে এবং তিনি ওটাকেই বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার করেন। অবশেষে আবু বকর (রা) এর খিলাফতকালে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। ঐ সময়েও ঐ তরবারীটি তার কাছেই ছিলো।

৮. যুদ্ধ শেষে মুসআব গমন করেন। আবু উমায়ের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল এবং ঐ সময় একজন আনসারী সাহাবি তাঁর হাত বাঁধছিলেন। মুসাব ঐ আনসারীকে বললেন, এ ব্যক্তির মাধ্যমে আপনি আপনার হাতকে দৃঢ় করুন। এ খুবই ধনবতী মহিলা। অবশ্যই সে আপনাকে উত্তম মুক্তিপণ দিবে।" একথা শুনে আবু আযীয তার ভাই মুসআব কে বললো, "আমার ব্যাপারে উত্তম মুক্তিপণ দিবে।" একথা শুনে আবু উমায়ের তাঁর ভাই মুসাব কে বললো, "আমার ব্যাপারে তোমার উপদেশ এটাই?" মুসাব উত্তরে বললেন, "হ্যাঁ তোমার পরিবর্তে এ আনসারীই আমার ভাই।"

৯. মুশরিকদের মৃতদেহগুলোকে যখন কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হলো এবং উতবাহ ইবনে রাবীআহকে কূপের দিকে ছেঁচড়িয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো তখন রাসূল তার পুত্র আবু হুযাইফা (রা) এর চেহারার প্রতি দৃষ্টি দিলেন। তখন দেখলেন যে, তিনি দুঃখিত হয়েছেন এবং তার চেহারা পরিবর্তিত হয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আবু হুযাইফা! নিশ্চয় তোমার পিতার এ অবস্থা দেখে তোমার অন্তরে কিছু অনুভূতি জেগেছে তাই না?" উত্তরে তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমার পিতার ব্যাপার এবং তার হত্যার ব্যাপারে আমার অন্তরে একটুও শিহরণ ওঠেনি। তবে অবশ্যই আমার পিতা সম্পর্কে আমি জানতাম যে, তার মধ্যে বিবেক বুদ্ধি, দূরদর্শিতা ও ভদ্রতা রয়েছে। এজন্য আমি আশা করতাম যে, এ গুণাবলি তাকে ইসলাম পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিবে। কিন্তু এখন তার পরিণাম দেখে এবং আমার আশার বিপরীত কুফরের ওপর তার জীবনের সমাপ্তি দেখে আমি দুঃখিত হয়েছি। তাঁর একথা শুনে রাসূল (ﷺ) তার মঙ্গলের জন্যে দু'আ করলেন এবং তার সাথে উত্তমরূপে বাক্যালাপ করলেন।

উভয় দলের নিহত ব্যক্তিবর্গ

এ যুদ্ধ মুশরিকদের প্রকাশ্য পরাজয় এবং মুসলমানদের সুস্পষ্ট বিজয়ের ওপর সমাপ্তি হয়। এতে চৌদ্দজন মুসলমান শহীদ হন, ছয়জন মুহাজির এবং আটজন আনসার। কিন্তু মুশরিকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের সত্তরজন নিহত এবং সত্তর জন বন্দী হয়। এদের অধিকাংশই ছিলো নেতৃস্থানীয় লোক।

যুদ্ধ শেষে রাসূল (ﷺ) মুশরিকদের নিহতদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, "তোমরা তোমাদের নবীর কতই না নিকৃষ্ট গোষ্ঠী ও গোত্র ছিলে। তোমরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছ। তোমরা আমাকে বন্ধুহীনও সহায়কহীনরূপে ছেড়ে দিয়েছো যখন অন্যেরা আমার পৃষ্টপোষকতা করেছে। তোমরা আমাকে বের করে দিয়েছো যখন অন্যেরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে।" এরপর তাঁর নির্দেশক্রমে তাদেরকে টেনে হিচড়ে বদরের একটি কূপে নিক্ষেপ করা হয়।

আবু তালহা (রা) হতে বর্ণিত যে, নবী করীম (ﷺ) এর আদেশক্রমে বদরের দিন কুরাইশদের চব্বিশ জন বড়ো বড়ো নেতার মৃতদেহ বদরের একটি নোভরা কূপে নিক্ষেপ করা হয়।

তাঁর নিয়ম ছিলো যে, যখন তিনি কোনো কওমের ওপর বিজয় লাভ করতেন। তখন তিন দিন পর্যন্ত যুদ্ধ ক্ষেত্রেই অবস্থান করতেন। সুতরাং যখন বদরের তৃতীয় দিন সূচিত হলো তখন তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তার সওয়ারীর ওপর হাওদা উঠিয়ে দেয়া হলো। অতঃপর তিনি পদব্রজে চলতে থাকেন এবং তাঁর পিছনে পিছনে তাঁর সাহাবিগণও চললেন। অবশেষে তিনি কূপের ধারে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাদেরকে তাদের নাম ধরে ও তাদের পিতাদের নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন। 'হে অমুকের পুত্র অমুক! হে অমুকের পুত্র অমুক! যদি তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর আনুগত্য করতে এটা কি তোমাদের জন্যে খুশির বিষয় হতো না? কেননা, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আমরা তো তা সত্য পেয়েছি।' ওমর (রা) তখন নিবেদন করেন, "হে আল্লাহর রাসূল আপনি এমন দেহসমূহের সঙ্গে কথা বলছেন যেগুলোর আত্মা নেই ব্যাপার কি?" নবী উত্তরে বললেন, "যে সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! আমি যা কিছু বলছি তা এদের চেয়ে বেশি তোমরা শুনতে পাও না।" অন্য বর্ণনা মতে, নবী করীম (ﷺ) বলেন, "তোমরা এদের চেয়ে বেশি শুনতে পাও না। কিন্তু এরা উত্তর দিতে পারে না।"

মক্কায় পরাজয়ের খবর ও শোকের মাতম

মুশরিকরা বদর প্রান্তর হতে বিশৃংখল, ছত্রভঙ্গ ও ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় মক্কামুখী হয়। চরম লজ্জা ও সংকোচের কারণে তাদের ধারণায় আসছিলো না যে কিভাবে তারা মক্কায় প্রবেশ করবে।

ইবনে ইসহাক বলেন, যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কুরাইশদের পরাজয়ের সংবাদ বহন করে মক্কায় পৌছে ছিলো সে হলো হাইসামান ইবনে আব্দুল্লাহ খুযায়ী। জনগণ তাকে জিজ্ঞেস করল "যুদ্ধের খবর কি?" সে উত্তরে বললো, "উত্তাহ ইবনে রাবীআহ, শায়বাহ ইবনে রাবীআহ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং আরো কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির নাম উল্লেখপূর্বক এরা সবাই নিহত হয়েছে। সে যখন নিহতদের তালিকায় সম্ভ্রান্ত কুরাইশদের নাম উল্লেখ করতে শুরু করলো। তখন হাতীমের ওপর উপবিষ্ট সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বললো, আল্লাহর কসম! যদি তার স্বাভাবিক জ্ঞান থেকে থাকে তবে তাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর?" সে উত্তরে বললো, "ঐ দেখো, সে হাতীমে উপবিষ্ট রয়েছে। আল্লাহর কসম! তার পিতা ও ভ্রাতাকে স্বয়ং আমিই নিহত দেখেছি।

রাসূল কর্তৃক আযাদকৃত দাস আবু রাফে (রা) বর্ণনা করেন। 'আমি ঐ সময় আব্বাস (রা) এর গোলাম ছিলাম আমাদের বাড়িতে ইসলাম প্রবেশ করেছিলো। আব্বাস (রা) মুসলমান হয়েছিলেন, উম্মুল ফযল (রা) মুসলমান হয়েছিলেন এবং আমি মুসলমান হয়েছিলাম। তবে অবশ্যই আব্বাস (রা) তার ইসলাম গোপন রেখেছিলেন। এদিকে আবু লাহাব বদর যুদ্ধে হাজির হয়নি যখন কুরাইশদের পরাজয়ের খবর তার কানে পৌঁছলো তখন লজ্জায় ও অপমানে তার মুখ কালো হয়ে গেল। পক্ষান্তরে আমরা নিজেদের মধ্যে শক্তি ও সম্মান অনুভব করলাম। আমি দুর্বল মানুষ ছিলাম, তীর বানাতাম এবং যমযম কক্ষে বসে তীরের হাতল ছিলতাম। আল্লাহর কসম! ঐ সময় আমি কক্ষে বসে তীর ছিলছিলাম। উম্মল ফযল (রা) আমার পাশেই বসেছিলেন এবং যে খবর এসেছিলো তাতে আমরা খুশি ও আনন্দিত ছিলাম। ইতোমধ্যে আবু লাহাব জঘন্যভাবে তার পদদ্বয় টেনে টেনে আমাদের কাছে এসে কক্ষপ্রান্তে বসে পড়লো। তার পৃষ্ঠ আমার পৃষ্ঠের দিকে ছিলো। হঠাৎ গোলমাল শোনা গেল" এ যে, আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এসে গেছে।" আবু লাহাব তাকে বললো, "হে আমার প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র আমার কাছে এসো। আমার জীবনের শপথ! তোমার নিকট হতে খবর কি?" তিনি উত্তরে বললেন, "কিছুই নয়, এটুকুই বলা যথেষ্ট যে, মুসলমানদের সাথে আমাদের মুকাবিলা হয়েছে এবং আমরা আমাদের কাধগুলো তাদেরকে সোপর্দ করেছি। তারা আমাদেরকে ইচ্ছামত হত্যা করেছে এবং বন্দী করেছে। এতদসত্ত্বেও আমি আমাদের লোকদেরকে তিরষ্কার করতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মোকাবিলা এমন কতকগুলো লোকের সঙ্গে হয়েছিলো যারা আসমান ও যমীনের মধ্যস্থলে সাদাকালো মিশ্রিত ঘোড়ার ওপর সওয়ার ছিলো। আল্লাহর শপথ! না তারা কোনো কিছু ছেড়ে দিচ্ছিল, না কোনো জিনিস তাদের মোকাবিলায় টিকতে পারছিলো।"

আবু রাফে (রা) বললেন, আমি স্বীয় হাত দ্বারা তাবুর প্রান্ত উঠালাম। অতঃপর বললাম, "আল্লাহর শপথ! তারা ছিলেন ফেরেশতা।" আমার এ কথা শুনে আবু লাহাব তার হাত উঠিয়ে ভীষণ জোরে আমার গালে এক চড় লাগিয়ে দিল। আমি তখন তার সাথে লড়াই করলাম। কিন্তু সে আমাকে উঠিয়ে মাটিতে ফেলে দিলো। অতঃপর আমার ওপর হাঁটুর ভরে বসে আমাকে প্রহার করতে লাগলো। আমি দুর্বল প্রমাণিত হলাম। কিন্তু ইতোমধ্যে উম্মুল ফয়ল উঠে তাবুর একটি খুঁটি নিয়ে তাকে এমনভাবে মারলেন যে, তার মাথায় ভীষণভাবে আঘাত লাগলো। আর সাথে সাথে উম্মুল ফযল (রা) বলে উঠলেন, 'তার মনিব নেই বলে তাকে দুর্বল মনে করেছো।' আবু লাহাব তখন লজ্জিত হয়ে চলে গেল। এরপর আল্লাহর কসম। মাত্র সাত দিন অতিবাহিত হয়েছে এরই মধ্যে আল্লাহর হুকুমে সে 'আদাসাহ' নামক কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হলো এবং এতেই তার জীবন লীলা শেষ হয়ে যায়, ফোড়াকে আরবরা বড়ই কুলক্ষণ মনে করতো। তাই, তার মৃত্যুর পর পুত্ররা তার গোর-কাফন না করে তিন দিন পর্যন্ত তাকে খাটির ওপরেই রেখে দেয়। কেউই তার নিকটে দুর্গন্ধের কারণে যায়নি, দাফন-কাফনের ব্যবস্থাও করেনি। অবশেষে যখন তার পুত্ররা এ আশংকা করলো যে, তাকে এভাবে রেখে দিলে জনগণ তাদের তিরষ্কার করবে তখন তারা একটা গর্ত খনন করে ওরই মধ্যে তার মৃত দেহকে কাঠ দ্বারা ঠেলে ফেলে দিলো এবং দূর থেকেই ওর মধ্যে পাথর নিক্ষেপ করে তাকে ঢেকে ফেলল।

মোটকথা, এভাবে মক্কাবাসী তাদের লোকদের সুস্পষ্ট পরাজয়ের খবর পেলো এবং তাদের স্বভাবের ওপর এর অত্যন্ত খারাপ প্রতিক্রিয়া হলো। এমনকি তারা নিহতদের ওপর বিলাপ করতে নিষেধ করে দিলো যাতে মুসলমানরা তাদের দুঃখে আনন্দিত হওয়ার সুযোগ না পায়।

এ ব্যাপারে একটি চিত্তকর্ষক ঘটনা রয়েছে যে, বদরের যুদ্ধে আসওয়াদ ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের তিনটি পুত্র মারা যায়। তাদের জন্য সে কাঁদতে চাচ্ছিল। সে ছিলো অন্ধ লোক। একদা রাত্রে সে এক বিলাপকারিণী মহিলার বিলাপের শব্দ শুনতে পেলো। তৎক্ষণাৎ সে তার গোলামকে বললো, তুমি গিয়ে দেখো তো, বিলাপ করার কি অনুমতি পাওয়া গেছে? কুরাইশরা কি নিহতদের জন্যে ক্রন্দন করছে? তাহলে আমিও আমার পুত্র আবু হাকিমার জন্য ক্রন্দন করবো। কেননা, আমার বুক জ্বলে যাচ্ছে। গোলাম ক্রন্দন করছে। এ কথা শুনে আসওয়াদ নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। আবেগে সে নিম্নের বিলাপ পূর্ণ কবিতাটি বলে ফেললো-

তার উট হারিয়ে গেছে এজন্যই কি সে কাঁদছে? আর ওর জন্যে অনিদ্রাই কি তার নিদ্রাকে হারাম করে দিয়েছে? হে মহিলা তুমি উটের জন্য কেঁদো না। হ্যাঁ হ্যাঁ, বরং বদরের জন্যে ক্রন্দন করো যেখানে বনু হাসীস, বানু মাখযুম, আবুল ওয়ালীদ প্রভৃতি গোত্রের নেতৃবৃন্দের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছে। যদি ক্রন্দন করতেই হয় তবে আকিলের জন্যে ক্রন্দন কর এবং সবার নাম নিও না।

মদিনায় বিজয়ের শুভ সংবাদ

এদিকে মুসলমানদের বিজয় পূর্ণতায় পৌঁছে গেলে রাসূল মদিনাবাসীকে অতি শীঘ্রই শুভ সংবাদ দেয়ার জন্যে দু'জন দূতকে প্রেরণ করেন। একজন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহ (রা) যাকে মদিনার উচ্চ ভূমি অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট প্রেরণ করা হয় এবং অপরজন যায়েদ ইবনে হারিসা (রা) যাকে মদিনার নিম্নভূমি অঞ্চলের অধিবাসীদের নিকট পাঠানো হয়।

ঐ সময় ইহুদি ও মুনাফিকরা এগুজব রটিয়ে দিয়েছিলো যে, মুসলমানরা পরাজিত হয়েছে। এমন কি এ গুজবও তারা রটিয়েছিলো যে, রাসূল কে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং একজন মুনাফিক যখন যায়েদ ইবনে হারিসা (রা) কে রাসূল (ﷺ) এর উষ্ট্রী কাসওয়ার ওপর সওয়ার হয়ে আসতে দেখলো তখন বলে উঠলো, "সত্যিই মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন। দেখ, এটা তো তাঁরই উষ্ট্রী আমরা এটাকে চিনি। আর এ ব্যক্তি হলো যায়েদ ইবনে হারিসাহ (রা) পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসেছে এবং সে এত ভীত সন্ত্রস্ত হয়েছে যে, কি বলতো তা বুঝতে পারছে না।" মোটকথা, যখন দুজন দূত মদিনায় পৌঁছলেন তখন মুসলমানরা তাদেরকে ঘিরে ধরেন এবং তাদের মুখে বিস্তারিত খবর শুনতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাদের দৃঢ়বিশ্বাস হয় যে, মুসলমানরা বিজয় লাভ করেছেন। এরপর চতুর্দিকে আনন্দের টেউ উতলে ওঠে এবং মদিনার আকাশ-বাতাস তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হতে থাকে। যে সব মর্যাদা সম্পন্ন নেতৃস্থানীয় সাহাবি মদিনাতেই রয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা রাসূল কে প্রকাশ্যে বিজয়ের মুবারকবাদ জানাবার জন্যে বদরের রাস্তার ওপর বেরিয়ে পড়েন।

উসামাহ ইবনে যায়েদ (রা) বর্ণনা করেছেন, "আমাদের নিকট এ সুসংবাদ ঐ সময় পৌছে যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এর কন্যা ও উসমান (রা) এর সহধর্মিনী রুকাইয়া (রা) কে দাফন করে মাটি দেয়া হয়ে গিয়েছিলো। তাঁর শুশ্রূষার জন্যে রাসূল আমাকে উসমান (রা) এর সাথে মদিনায় রেখে গিয়েছিলেন।

গণীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের সমাধান

রাসূল যুদ্ধ শেষে তিনদিন বদরে অবস্থান করেন এবং তখনও তিনি যুদ্ধক্ষেত্র হতে যাত্রা শুরু করেননি এর মধ্যেই গণীমতের মালের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দেন যে, যার কাছে যা আছে তা যেন সে তাঁর কাছে জমা দেয়। সাহাবায়ে কিরাম তাঁর এ নির্দেশ পালন করেন এবং এরপর আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করে দেন।

উবাদাহ ইবনে সামিত (রা) বর্ণনা করেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথে মদিনা হতে যাত্রা শুরু করে বদর প্রান্তরে উপনীত হলাম। লোকদের (মুশরিকদের) সাথে আমাদের যুদ্ধ হলো এবং আল্লাহ শত্রুদেরকে পরাজিত করলেন। অতঃপর আমাদের মধ্যে একটি দল তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলো এবং তাদেরকে ধরতে ও হত্যা করতে লাগলো। আর একটি দল গণীমতের মাল লুট করতে ও জমা করতে থাকলো। অন্য একটি দল রাসূলকে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে রাখলেন যাতে শত্রুরা প্রতারণা করে তাকে কোনো ভাবে কষ্ট দিতে না পারে। যখন রাত্রি হলো এবং প্রতিটি দল একে অপরের সাথে মিলিত হলো তখন গণীমত একত্রিতকারীরা বললো, "আমরাই এগুলো জমা করেছি। সুতরাং এতে অন্য কারো কোনো অংশ নেই।" শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনকারীরা বললো, "তোমরা আমাদের চেয়ে বেশি এর হকদার নও। কেননা, আমরা এ মাল হতে শত্রুদেরকে তাড়ানো ও দূর করানোর কাজ করেছি।" আর যারা রাসূল (ﷺ) এর হিফাযতের কাজ করেছিলো তারা বললো, "আমরা এ আশংকা করেছিলাম যে, আমাদের অবহেলার কারণে শত্রুরা রাসূল তারা এর কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারে। এ জন্যে আমরা তার হিফাযতের কাজে নিয়োজিত থেকেছি। সুতরাং আমরাই এর বেশি হকদার।" তখন আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করলেন-

লোকেরা আপনাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করছে, আপনি বলুন যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ আল্লাহ এবং রাসূল (ﷺ) এর। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর আর যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাকো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য করো। (আনফাল আয়াত- ১)। এরপর রাসূল এ গণীমতের মাল মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দেন।

মুসলিম সেনাবাহিনী মদিনার পথে

রাসূল তিনদিন বদরে অবস্থানের পর মদিনার পথে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সাথে মুশরিক বন্দীরাও ছিলো এবং মুশরিকদের নিকট হতে প্রাপ্ত গণীমতের মালও ছিলো। তিনি তাদের পাহারার দায়িত্ব আব্দুল্লাহ ইবনে কা'ব (রা) এর ওপর অর্পণ করেন। যখন তিনি সাফরা উপত্যকার গিরিপথ হতে বের হয়ে একটি টিলার ওপর বিশ্রাম গ্রহণ করেন তখন তিনি সেখানে গণীমতের এক-পঞ্চমাংশ আলাদা করে বাকি মাল মুসলমানদের মধ্যে সমভাবে বন্টন করে দেন। আর সাফরা উপত্যকাতেই তিনি নাযর ইবনে হারিসের হত্যার নির্দেশ দেন। এ ব্যক্তি বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের পতাকা ধরে রেখেছিলো এবং সে কুরাইশের বড়ো বড়ো অপরাধীদের একজন ছিলো। ইসলামের শত্রুতায় রাসূল কে কষ্ট প্রদানে সে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিল। রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশক্রমে আলী (রা) তাকে হত্যা করেন। এরপর রাসূল ইরকু যাবয়্যাহ নামক স্থানে পৌঁছে উকবাহ ইবনে আবু মুয়িতকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ লোকটি যেভাবে রাসূল কে কষ্ট দিয়েছিলো তার কিছু আলোচনা ইতোপূর্বে করা হয়েছে। এ সেই ব্যক্তি যে রাসূল কে নামাযরত অবস্থায় তাঁর পিঠের ওপর উটের নারি-ভুড়ি দিয়েছিলো এবং সেই তার গলায় চাদর জড়িয়ে দিয়ে তাঁকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলো এবং আবু বকর (রা) সেখানে সময়মত এসে না পড়লে সে তো তাকে গলা টিপে মেরেই ফেলতো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন তখন সে বলে ওঠে, "হে মুহাম্মদ আমার ও আমার সন্তানদের জন্যে কি আছে?" তিনি উত্তরে বললেন, "আগুন।" অতঃপর আসিম ইবনে সাবিত (রা) এবং মতান্তরে আলী (রা) তার গর্দান উড়িয়ে দেন।

সামরিক নীতি অনুযায়ী এ দুরাচার ব্যক্তিদ্বয়ের হত্যা অপরিহার্য ছিলো। কেননা, তারা শুধু যুদ্ধ বন্দীই ছিলো না; বরং আধুনিক পরিভাষার দিক থেকে যুদ্ধ অপরাধীও ছিলো।

অভ্যর্থনাকারী প্রতিনিধিদল এরপর যখন মুসলিম সোনাবাহিনী 'রাওহা' নাম স্থানে পৌঁছেন তখন ঐ মুসলিম প্রতিনিধি দলের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয় যারা দূতদ্বয় মারফত বিজয়ের শুভ সংবাদ শুনে রাসূল (ﷺ) এর অভ্যর্থনার জন্যে এবং তাকে বিজয়ের মুবারকবাদ জানাবার জন্যে মদিনা হতে বের হয়ে এসেছিলেন। যখন তারা মুবারকবাদ পেশ করলেন তখন সালামাহ ইবনে সালামাহ (রা) বললেন, মুকাবিলা তো টেকো মাথা বিশিষ্ট বুড়োদের সাথে হয়েছিলো, যারা ছিলো উটের মতো।" তার এ কথা শুনে রাসূল মুচকি হেসে বললেন, ভ্রাতুষ্পুত্র এরাই ছিলো কওমের নেতা।

অতঃপর উসায়েদ ইবনে হুযায়ের (রা) নিবেদন করলেন- "হে আল্লাহ রাসূল! আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা, তিনি আপনাকে সফলতা দান করেছেন এবং আপনার চক্ষুদ্বয় শীতল করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি একথা মনে করে বদরে গমন হতে পিছনে থাকিনি যে, আপনার মুকাবিলা শত্রুদের সাথে হবে। আমি তো ধারণা করেছিলাম যে, এটা শুধু কাফেলার ব্যাপার। আমি যদি বুঝতাম যে, শত্রুদের মুখোমুখী হতে হবে তবে আমি কখনই পিছনে থাকতাম না।" রাসূল মদিনা মুনাওয়ারায় বিজয়ী বেশে এমনভাবে প্রবেশ করলেন যে, মদিনা শহর এবং তাঁর আশপাশের শত্রুদের ওপর তাঁর চরম প্রভাব প্রতিফলিত হলো। এ বিজয়ের ফলে মদিনার বহু লোক দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করলেন। এ সময়েই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সঙ্গীরা শুধু লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণ করে।

রাসূল মদিনায় আগমনের একদিন পর বন্দীদের আগমন ঘটে। রাসূল তাদেরকে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করেন। এ পরামর্শের কারণে সাহাবায়ে কেরাম (রা) নিজেরা খেজুর খেতেন এবং বন্দীদেরকে রুটি খাওয়াতেন। কেননা, মদিনায় খেজুর ছিলো সাধারণ খাদ্য এবং রুটি ছিলো বিশেষ মূল্যবান খাদ্য।

যুদ্ধবন্দীদের সম্বন্ধে পরামর্শ

মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে রাসূল (ﷺ) সাহাবিদের সঙ্গে যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে পরামর্শ করেন। আবু বকর (রা) নিবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! এরা সবাই আমাদের চাচাত ভাই, বংশীয় লোক এবং আত্মীয়। আমার মতে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু কিছু অর্থ নিয়ে এদেরকে মুক্তি দেয়া উচিত। এতে আমাদের সাধারণ তহবিলে যথেষ্ট অর্থ সঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে অল্প দিনের মধ্যে এদের সবার পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করাও সম্ভব হবে। তখন তাদেরকে আমাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারব।

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) খাত্তাবের পুত্র ওমরকে সম্বোধন করে বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র। তোমার অভিমত কি? উত্তরে ওমর (রা) বললেন, আল্লাহর কসম এ ব্যাপারে আমি আবু বকরের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। আমার মত হচ্ছে যে, অমুককে যিনি ওমরের আত্মীয় ছিলেন, আমার হাওয়ালা করে দেন, আমি তাকে হত্যা করি। আকিল ইবনে আবু তালেবকে আলীর হাতে হাওয়ালা করে দিন। তিনি তাকে হত্যা করবেন এবং অমুককে যিনি হামযার ভাই ছিলেন হামযার হাতে অর্পণ করে দিন, তিনি তাকে হত্যা করবেন। যাতে করে আল্লাহ এটা বুঝেন যে, আমাদের অন্তরে মুশরিকদের সম্পর্কে কোনো প্রকার দুর্বলতা নেই। আর এরা ছিলো মুশরিকদের সার্বক্ষণিক অগ্রণী নেতা। এরা ইসলামের চির শত্রু এবং মুসলমানদের প্রাণের বৈরী। আমাদেরকে নির্যাতিত করতো, আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করতো এবং আল্লাহ সত্য ধর্মকে জগতের পৃষ্ঠ হতে মুছে ফেলতে এরা সাধ্যপক্ষে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করে নি।

এরা অন্যায়, অধর্ম ও অত্যাচারের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি। এদেরকে অবিলম্বে হত্যা করে ফেলা হোক। প্রত্যেক মুসলমান তরবারী হস্তে দণ্ডায়মান হোক এবং নিজ হস্তে নিজের আত্মীয়বর্গের মুন্ডুপাত করুক, আমার এটাই মত।

ওমর (রা) বলেন, "রাসূল আবু বকর (রা) এর মতকেই পছন্দ করলেন, আমার মতকে পছন্দ করলেন না। সুতরাং বন্দীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ নেয়ারই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।" পরের দিন আমি সকাল সকাল রাসূল এবং আবু বকর (রা) এর খিদমতে হাযির হলাম। দেখি যে, তাঁরা দুজনই কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! বলুন, আপনারা কেন কাঁদছেন? ঐদিন কাঁদার কোনো কারণ থাকে তাহলে আমিও কাঁদব। রাসূল উত্তরে বললেন, "মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে তোমার সঙ্গীদের ওপর যে জিনিস পেশ করা হয়েছে সেই কারণেই কাঁদছি। আর তিনি নিকটবর্তী একটি গাছের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, "আমার সামনে তাদের শাস্তিকে এ গাছের চেয়েও বেশি নিকটবর্তীরূপে পেশ করা হয়েছে।" অতঃপর আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াত নাযিল করেন-

"দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোনো নবীর জন্যে সংগত নয়, তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চান পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছো তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি পতিত হতো। (সূরা আল-আনফাল: ৬৭-৬৮)

আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ব বিধান ছিলো নিম্নরূপ-

তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়। - (সূরা মুহাম্মদ: আয়াত-৪)

যেহেতু এ বিধানে বন্দীদের নিকট হতে মুক্তিপণ নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে সেহেতু মুক্তিপণ গ্রহণ করার কারণে সাহাবায়ে কিরাম (রা) কে শাস্তি দেয়া হয়নি; বরং তাদেরকে শুধু তিরস্কার ও নিন্দা করা হয়েছে যে, ভালোভাবে কাফেরদেরকে শাস্তি দেয়ার আগেই বন্দী করে নিয়েছিলেন এবং এজন্যেও যে, তাঁরা এমন যুদ্ধ অপরাধীদের নিকট থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করেছিলেন যারা বড়ো অপরাধী ছিলো। যাদের ওপর নতুন আইন ও মুকদ্দমা না চালিয়ে ছাড়ত না। এদের মুকদ্দমার ফয়সালাও সাধারণত মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতো।

যাহোক আবু বকর (রা) এর অভিমত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো বলে মুশরিকদের নিকট হতে মুক্তিপণ গৃহীত হয়। মুক্তিপণের পরিমাণ চার হাজার দিরহাম পর্যন্ত ছিলো। যুদ্ধবন্দীদের কেউ কেউ লেখা পড়াও জানতো। এ জন্যে এ সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিলো যে, যে মুক্তিপণ দিতে অসমর্থ হবে সে মদিনার দশজন ছেলেকে লেখাপড়া শিখাবে। যখন এ ছেলেগুলো উত্তমরূপে লেখা পড়া শিখে নিবে তখন এটাই তার মুক্তিপণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

রাসূল (ﷺ) কয়েকজন বন্দীর ওপর অনুগ্রহও করেছেন এবং তাদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছেন। এ তালিকায় মুত্তালিব ইবনে হানতার, সাইফী ইবনে আবু রিফাআহ এবং আবু ইযযাহ জুমাহীর নাম পাওয়া যায়। শেষের দুজনকে উহুদের যুদ্ধে বন্দী ও হত্যা করা হয়। (বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে)

রাসূল স্বীয় জামাতা আবুল আসকের বিনা মুক্তিপণে এই শর্তে ছেড়ে দেন যে, সে তাঁর কন্যা যয়নব (রা) এর পথ রোধ করবে না। এর কারণ ছিলো এই যে, যয়নব (রা) আবুল আসের মুক্তিপণ হিসেবে কিছু মাল পাঠিয়েছিলেন যার মধ্যে একটি হারও ছিলো। এ হারটি প্রকৃতপক্ষে খাদিজা (রা) এর ছিলো। যয়নব (রা) কে আবুল আসের নিকট বিদায় দেয়ার সময় তিনি তাকে উক্ত হারটি প্রদান করেছিলেন। হারটি দেখে রাসূল (ﷺ) এর মধ্যে ভাবাবেগ সৃষ্টি হয়। তাই তিনি সাহাবিদের নিকট অনুমতি চান যে, আবুল আসকে মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্ত করে দেয়া হোক। সাহাবিগণ সন্তুষ্টচিত্তে এটা মেনে নেন। তখন রাসূল আবুল আসকে এ শর্তে ছেড়ে দেন যে, সে যয়নব (রা) এর পথ রোধ করতে পারবে না। এ শর্তানুসারে আবুল আস তাঁর পথ ছেড়ে দেয় এবং যয়নব (রা) মদিনায় হিজরত করেন। রাসূল - যায়েদ ইবনে হারিসাহ (রা) এবং একজন আনসারি সাহাবি (রা) কে এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর সাথি হয়ে যাবেন। রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা দুজন যয়নব (রা) কে সাথে নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন। যয়নব (রা) এর হিজরতের ঘটনাটি খুবই দীর্ঘ ও হৃদয়বিদারক।

বন্দীদের মধ্যে সুহায়েল ইবনে আমরও ছিলো। সে ছিলো বড়ো বাকপটু ও ভালো বক্তা। ওমর (রা) নিবেদন করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! সুহায়েল ইবনে আমরের সামনের দাঁত দুটি ভেঙে দেয়া হোক, যাতে সে কোনো জায়গায় বক্তা হয়ে আপনার বিরুদ্ধে বক্তৃতা করতে না পারে। কিন্তু রাসূল তাঁর এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন। কেননা, এটা মুসলাহ (নাক কান কর্তিত)- এর অন্তর্ভুক্ত। যার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ পক্ষ হতে পাকড়াও এর আশংকা থাকবে।

সা'দ ইবনে নুমান (রা) উমরা করার জন্যে বের হলে আবু সুফিয়ান তাকে বন্দী করে ফেলেন। আবু সুফিয়ানের পুত্র আমরও বদরযুদ্ধে বন্দীদের একজন ছিলো। আমরকে আবু সফিয়ানের নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি সা'দ (রা) কে ছেড়ে দেন।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনের পর্যালোচনা

এ যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আনফাল অবতীর্ণ হয় প্রকৃতপক্ষে এ সূরাটি এ যুদ্ধের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশদ বর্ণনা। আর আল্লাহর এ বর্ণনা বাদশাহ ও কমান্ডারদের বিজয় বর্ণনা হতে সম্পূর্ণ পৃথক। এ বিশদ বর্ণনার কতকগুলো কথা হচ্ছে সংক্ষেপে নিম্নরূপ -

আল্লাহ সর্বপ্রথম মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঐ অসতর্কতা ও চারিত্রিক দুর্বলতার প্রতি যা মোটের ওপর তাদের মধ্যে বাকি রয়ে গিয়েছিলো। আর যেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু এ যুদ্ধে প্রকাশও পেয়ে গিয়েছিলো। তাদের এ মনোযোগ আকর্ষণের উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে, তারা নিজেদেরকে এসব দুর্বলতা হতে পবিত্র করে পরিপূর্ণতা লাভ করবে।

এরপর মহান আল্লাহ এ বিজয়ে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও গায়েবী সাহায্যের অন্তর্ভুক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্যে ছিলো, মুসলমানরা নিজেদের সাহস ও বীরত্বের প্রতারণায় যেন না পড়ে। কেননা এর ফলে স্বভাব ও প্রকৃতির মধ্যে গর্ব ও অহংকার সৃষ্টি হয়; বরং তারা যেন আল্লাহর ওপরই নির্ভরশীল হয়। এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য স্বীকার করে।

তারপর ঐ সব মহৎ উদ্দেশ্যের আলোচনা করা হয়েছে যার জন্যে রাসূল এ ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পা রেখেছিলেন এবং এর মধ্যে ঐ চরিত্র ও গুণাবলি চিহ্নিত করা হয়েছে যা যুদ্ধসমূহে বিজয়ের কারণ হয়ে থাকে।

অতঃপর মুশরিক, মুনাফিক, ইহুদি এবং যুদ্ধবন্দীদেরকে এমন মর্মস্পশী উপদেশ দেয়া হয় যাতে তারা সত্যের সামনে ঝুঁকে পড়ে এবং এর অনুসারী হয়ে যায়। এরপর মুসলমানদেরকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ব্যাপারে সম্বোধনপূর্বক এ বিষয়ের সমুদয় বুনিয়াদী নিয়ম-কানুন ও নীতিমালা বলে দেয়া হয়।

অতঃপর এ স্থলে ইসলামি দাওয়াতের জন্যে যুদ্ধ ও সন্ধির যে নীতিমালার প্রয়োজন ছিলো এ গুলোর বিশ্লেষণ ও বিবরণ দেয়া হয়েছে। যাতে মুসলমানদের যুদ্ধ এবং জাহেলিয়াত যুগের যুদ্ধের মধ্যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চরিত্র ও কর্মের ক্ষেত্রে মুসলমানদের উৎকৃষ্টতা লাভ হয়। আর দুনিয়ার মানুষ উত্তমরূপে জেনে নেয় যে, ইসলাম শুধুমাত্র একটা মতবাদ নয়; বরং যে নীতিমালাও রীতিনীতির প্রতি আহ্বানকারী, স্বীয় অনুসারীদেরকে সে অনুযায়ী আমল করার শিক্ষাও দিয়ে থাকে।

তারপর ইসলামি হুকুমতের কয়েকটি দফা বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলো দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী হুকুমতের গণ্ডির মধ্যে বসবাসকারী মুসলমান ও এর বাইরে বসবাসকারী মুসলমানদের মধ্যে কতই না পার্থক্য রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিধান জারি: হিজরি ২য় সনে রমযানের রোযা এবং সদকায়ে ফিতর ফরয করা হয়, আর যাকাতের বিভিন্ন নিসাব ও ধনের পরিমাণ যা থাকলে যাকাত ফরয হয়, তা নির্দিষ্ট করা হয়। সদকায়ে ফিতর ফরয এ যাকাতের নিসাব নির্দিষ্ট করণের ফলে বোঝা ও কষ্ট অনেকাংশে হালকা হয়ে গেলো যা বহু সংখ্যক দরিদ্র মুহাজির বহন করে আসছিলেন। কেননা, তাঁরা জীবিকার সন্ধানে ভূপৃষ্ঠে ঘুরেও জীবিকার ব্যবস্থা করতে অপারগ হচ্ছিলেন।

অতঃপর অত্যন্ত সুন্দর সুযোগ ও মোক্ষম ব্যবস্থা এ ছিলো যে, মুসলমানরা তাদের জীবনে যে প্রথম ঈদ উদযাপন করেছিলেন তা ছিলো ২য় হিজরির শাওয়াল মাসের ঈদ, যা বদর যুদ্ধের প্রকাশ্য বিজয়ের পর হাযির হয়েছিলো। কতই না সুন্দর ছিলো এ সৌভাগ্যের ঈদ, যে সৌভাগ্য আল্লাহ মুসলমানদের মস্তিস্কে বিজয় ও সম্মানের মুকুট পরানোর পর দান করেছিলেন। আর কতই না ঈমানের ছিলো এ ঈদের নামাযের দৃশ্য যা মুসলমানরা নিজেদের ঘর হতে বের হয়ে তাকবীর তাওহীদ ধ্বনিতে গগণ পবন মুখরিত মাঠে গিয়ে আদায় করে থাকেন। ঐ সময় অবস্থা ছিলো এই যে, মুসলমানদের অন্তরে ছিলো আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতরাশি ও তাঁর দেয়া সাহায্যের কারণে তাঁর করুণা ও সন্তুষ্টি লাভের আগ্রহে উচ্ছসিত এবং বিজয়োম্মাদনার উল্লাসে পরিপূর্ণ। তাদের মাথাগুলো তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্যে ঝুঁকে পড়ছিলো। আল্লাহ এ নিয়ামতের বর্ণনা নিম্নের আয়াতে দিয়েছেন-

আর স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে অল্প, তোমাদেরকে দুর্বল মনে করা হত যমীনে। তোমরা আশঙ্কা করতে যে, লোকেরা তোমাদেরকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন, নিজ সাহায্য দ্বারা তোমাদেরকে শক্তিশালী করেছেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র রিয্ক দান করেছেন। যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর। (সূরা আল আনফাল: আয়াত - ২৬)

বদর-পরবর্তী সময়ের তৎপরতা

বদরের যুদ্ধ ছিলো মশরিকদের মধ্যে সর্বপ্রথম অস্ত্রের লড়াই এবং মীমাংসা সূচক সংঘর্ষ। এ সংঘর্ষে মুসলমানগণ প্রকাশ্য বিজয় লাভ করেন এবং সমগ্র আরব তা প্রত্যক্ষ করে। এ যুদ্ধের ফলে যারা সরাসরি চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো তারাই মর্মাহত হয়েছিলো সব চাইতে বেশি অর্থাৎ মক্কার মুশরিকেরা। তাছাড়া ঐ সকল লোকও যারা মুসলমানদের বিজয় ও সফলতাকে নিজেদের ধর্মীয় ও অর্থ নৈতিক অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেছিলো, অর্থাৎ ইহুদিরা। সুতরাং মুসলমানগণ যখন বদর যুদ্ধে কল্পনাতীতভাবে বিজয় লাভ করলেন তখন এ দুটো দল মুসলমানদের প্রতি ক্রোধ, ক্ষোভ ও মন পীড়ায় জ্বলে পুড়ে মরতে লাগল। কুরআনুল কারীমে যেমনটি ইরশাদ হয়েছে-

মু'মিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইহুদি এবং মুশরিকদেরকেই আপনি সর্বাধিক উগ্র দেখবেন। (সূরা আল মায়েদা: আয়াত-৮২)

মদিনায় কিছু লোক এ দুটো দলের সঙ্গী ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলো। তারা যখন দেখল যে, তাদের মান মর্যাদা সমুন্নত রাখার এখন আর কোনো পথ রইল না তখন তারা বাহ্যিকভাবে ইসলামে প্রবেশ করল।

এটা ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার বন্ধু-বান্ধবের দল। ইহুদি এবং মুশরিকদের তুলনায় মুসলমানদের প্রতি এরাও কম ক্ষোভ, হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করত না।

এদের ছাড়া চতুর্থ একটি দলও ছিলো। অর্থাৎ ঐ সব বেদুঈন যারা মদিনার চতুস্পার্শে বসবাস করত। কুফর কিংবা ঈমান কোনো কিছুর প্রতিই তাদের কোনো আকর্ষণ কিংবা আবেগের প্রশ্ন জড়িত ছিলো না। তারা ছিলো লুণ্ঠনকারী দস্যু। এ কারণে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাফল্যে তারাও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলো। তাদের আশংকা ছিলো যে, মদিনায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে তাদের অন্তরেও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা দানা বেঁধে ওঠে। যার ফলে তারাও মুসলমানদের শত্রুদের দলভুক্ত হয়ে পড়ে।

মুসলমানগণ এভাবে চতুর্দিক থেকে বিপদের সম্মুখীন হন। কিন্তু মুসলমানদের ব্যাপারে প্রত্যেক দলের কর্ম-পদ্ধতি ছিলো অন্যান্য দলের কর্ম পদ্ধতি হতে পৃথক। প্রত্যেক দল নিজেদের অবস্থার পেক্ষাপটে এমন সব পস্থা অবলম্বন করেছিলো যা তাদের ধারণায় তাদের উদ্দেশ্যে সাধনে ছিলো সহায়ক। সুতরাং মদিনাবাসী মুনাফিক বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণপূর্বক গোপনে গোপনে ষড়যন্ত্র করে পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়ার পথ অবলম্বন করল। ইহুদিদের একটি দল খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতা প্রকাশ করল। আর মক্কাবাসী তো দাঁত ভাঙা জবাব দেবার হুমকি দিতে শুরু করল এবং প্রতিশোধ গ্রহণের প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে থাকল। তাদের সামরিক তৎপরতা এবং প্রস্তুতিও ছিলো খোলাখুলি তারা যেন তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে মুসলমানদের নিম্নরূপ পয়গাম দিচ্ছিল-

এমন এক উজ্জ্বল ও আলোকময় দিন অবশ্যই আসবে, যার পরে দীর্ঘকাল ধরে বিলাপকারিণীদের বিলাপ শুনতে থাকবো।

আর বছরকাল পরে তারা কার্যত যুদ্ধ করার জন্যে মদিনার ওপর চড়াও হলো, যা ইতিহাসে উহুদের যুদ্ধ নামে পরিচিত। মুসলমানদের খ্যাতি মর্যাদার ওপর এর যথেষ্ট মন্দ প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিলো।

এ বিপদের মোকাবিলা করার জন্যে মুসলমানেরা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এর দ্বারা রাসূল (ﷺ) এর যোগ্য নেতৃত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রকাশ থাকে যে, মদিনার নেতা রাসূল চার পাশের এ সব বিপদের ব্যাপারে সদা সচেতন ও সতর্ক ছিলেন এবং এগুলো মোকাবিলা করার জন্য যে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন এখানে তারই একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. কুদর নামক স্থানে গাযওয়ায়ে বনী সুলাইমের যুদ্ধ: বদর যুদ্ধের পর সর্বপ্রথম যে খবর মুসলিম গোয়েন্দা বাহিনী সরবরাহ করেন তা ছিলো, গাতফান গোত্রের শাখা বনু সুলাইমের লোকেরা মদিনার ওপর চড়াও হওয়ার জন্য সৈন্য সমাবেশ করছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নবী করীম (ﷺ) দুশোজন উষ্ট্রারোহীকে সঙ্গে নিয়ে আকস্মিকভাবে তাদের নিজেদের এলাকায় ধাওয়া করেন এবং 'কুদর' নামক স্থানে তাদের মনযিল পর্যন্ত পৌঁছেন। বনু সুলাইম গোত্র এ আকস্মিক আক্রমণে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এবং উপায়ান্তর না দেখে উপত্যকার মধ্যে পাঁচশটি উট ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এগুলোর ওপর মদিনার মুসলিম সেনাবাহিনী দখলদার হয়ে যান। রাসূল এগুলোর এক পঞ্চমাংশ বের করে নিয়ে অবশিষ্ট মাল গণীমত হিসেবে মুজাহিদদের মধ্যে বন্টন করে দেন। প্রত্যেকের অংশে দুটি করে উট পড়ে। এ গাযওয়ায় ইয়াসার নামক একটি গোলাম হাতে আসে যাকে রাসূল আযাদ করে দেন। এরপর রাসূল বনু সুলাইমের বাসভূমিতে তিন দিন অবস্থান করার পর মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

এ গাযওয়া হিজরি ২য় সনের শাওয়াল মাসে বদর হতে প্রত্যাবর্তনের মাত্র সাত দিন পরে সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধকালীন সময়ে সাবা ইবনে আরাফাত (রা) কে এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মি মাকতুম (রা) কে মদিনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো।

২. নবী করীম (ﷺ) কে হত্যার ষড়যন্ত্র: বদর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুশরিকরা ক্ষোভে ও ক্রোধে অগ্নি শর্মা হয়ে ওঠে। রাসূল কে হত্যা করে বদরের গ্লানি ও অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভীষণ ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে দুই যুবক নিজ বুদ্ধিবলে এ সকল মতভেদ ও এখতেলাফের বুনিয়াদ ও বদর যুদ্ধের অবমাননাকর পরিস্থিতির মূলোৎপাটন করবে অর্থাৎ নবী (ﷺ) কে হত্যা করবে। ফলে বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা হলো এই যে, ওহাব ইবনু উমায়ের জুমাহী সাহাবাদেরকে যন্ত্রণা দেয়ার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করত, তার পুত্র ওহাব ইবনে উমায়ের বদর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছিলো। এ উমায়ের এক দিন হাতীমে বসে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সঙ্গে বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে আলোচনা করছিলো। এতে সাফওয়ান বলে ওঠলো "আল্লাহর শপথ! এরপর আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো আকর্ষণ থাকতে পারে না।" উত্তরে উমায়ের বলল, "আল্লাহর কসম! তুমি সত্যই বলেছ। দেখ আমার যদি ঋণ না থাকত যা পরিশোধ করার মত অবস্থা বর্তমানে আমার নেই এবং আমার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে যদি না থাকত যা আমার অভাবে বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এখনই আমি বাহনে আরোহণ করে মুহাম্মদ এর কাছে যেতাম এবং তাকে হত্যা করে ফেলতাম। কেননা, তাঁর কাছে যাওয়ার কারণ আমার মজুদ রয়েছে। আমার পুত্র, তার নিকট বন্দী রয়েছে। সাফওয়ান তার এ কথার উত্তরে বলল, বেশ তোমার সমস্ত ঋণের আমি যিম্মাদার হচ্ছি এবং তোমার পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। তোমার সন্তানেরা হবে আমার সন্তান।

উমায়ের বলল, 'সাবধান! ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।' সিদ্ধান্ত হলো, সে তার বন্দী সন্তানকে মুক্ত করার অজুহাত নিয়ে মদিনায় গমন করবে এবং সুযোগ মতো অতর্কিত রাসূলের ওপর তরবারী চালাবে। ক্ষিপ্ততার সঙ্গে এ কাজ করতে গিয়ে একবারের বেশি আঘাত করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে এবং এর ফলে নবী আহত হয়েও বেঁচে যেতে পারেন। এসব ভেবে-চিন্তে উমায়রের তরবারী খানা তীব্র বিষে সিক্ত করা হলো। যাতে মুহাম্মদকে কোনো রকমে আঘাত করতে পারলেই তাঁর প্রাণ রক্ষার ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে অসম্ভব হয়ে পড়বে।

রাসূল মসজিদে বসেছিলেন। ওমর (রা) এবং আরও কায়েকজন সাহাবি (রা) বাইরে বসে বদর যুদ্ধ সম্বন্ধে কথোপকথন করছেন, এমন সময় গলায় তরবারী ঝুলিয়ে উমায়ের মসজিদের দ্বারদেশে উপস্থিত হলো। তখন ওমর (রা) তাকে কুরাইশদের অন্যতম শয়তান বলে উল্লেখ করলেন। তার কুটিল চাহনি ও সন্দেহজনক হাবভাব দেখে ওমর (রা) এর মনে খটকা লাগলো। তিনি সকলকে সতর্ক হতে ইঙ্গিত করলেন এবং কয়েকজন আনসারকে রাসূলের চারদিকে উপবেশন করার আদেশ দিলেন। তারপর তিনি তার তরবারী ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে মসজিদের মধ্যে উপস্থিত হলেন। এ দেখে রাসূল তাকে ছেড়ে দিতে আদেশ করলেন এবং বললেন "আল্লাহ আমাদেরকে এর চাইতে অনেক ভালো অভিবাদন দান করেছেন।" (অর্থাৎ সালাম যা হচ্ছে জান্নাতীদের অভিবাদন।)

তারপর তিনি উমায়েরকে তাঁর কাছে আসতে বললেন, অতঃপর জিজ্ঞাসা করলেন, "উমায়ের কি মনে করে এসেছো? সে উত্তরে বললো, "রাসূল এ বন্দীদের জন্যে আপনি দয়া করেন। তিনি বললেন, "এ তো খুব ভালো কথা। কিন্তু এ তরবারী এনেছো কেন?"

রাসূল তাকে পুনঃপুন সত্য কথা বলতে নির্দেশ দিলেন, কিন্তু সে নানা প্রকার টাল বাহানা করে এ কথাই বলতে থাকলো। তখন রাসূল হেসে মক্কার গুপ্ত ষড়যন্ত্র এবং সাফওয়ানের সাথে প্রতিজ্ঞা প্রতিশ্রুতি সম্বন্ধে সব কথা ব্যক্ত করতে লাগলেন। এমন গোপনীয় পরামর্শ, গুপ্ত ষড়যন্ত্র! তিনি এসব ব্যাপার কিরূপে অবগত হলেন? উমায়ের তখন চমকিত চিত্তে রাসূলের এ মুজিযার কথা চিন্তা করতে লাগল। তার বিবেক আর সত্য গোপন করতে পারলো না। সে ভয়-ভক্তি বিজড়িত কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো 'মুহাম্মদ, পূর্বে আপনার কথায় বিশ্বাস করিনি, এখন সে জন্য অনুতপ্ত হচ্ছি। বস্তুত আপনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর জন্যেই সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আমাকে সত্যের জ্যোতি দর্শনের সৌভাগ্য প্রদান করেছেন।'

এরূপে প্রাণের বৈরী দু'দিনে রাসূল (ﷺ) এর সেবকে পরিণত হলেন। রাসূল (ﷺ) সাহাবিদেরকে সম্বোধন করে বললেন, "তোমাদের এ ধর্ম ভ্রাতাকে উত্তমরূপে ধর্ম ও কুরআন শিক্ষা দাও এবং তার প্রার্থিত বন্দীদের মুক্তি দাও। কিছুকাল পরে উমায়ের (রা) রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাযির হয়ে নিবেদন করলেন, 'আমি আল্লাহর জ্যোতিকে নির্বাপিত এবং সত্যের সেবকদেরকে নির্যাতিত করতে চেষ্টায় ত্রুটি করিনি। এরূপে যে মহাপাপ আমি সজ্ঞানে করেছি, এখন তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। তিনি মক্কায় প্রত্যাবর্তন করলেন। এদিকে সাফওয়ান মক্কার লোকদেরকে ইঙ্গিত বলে রেখেছিলো, দেখে নিয়ো, আমি শীঘ্রই এমন এক শুভ সংবাদ দিতে পারবো যার ফলে তোমরা বদর যুদ্ধের সমস্ত শোক ভুলে যাবে।" কিন্তু উমায়েরকে দেখে সে অবাক। একি! এমন দুর্ধর্ষ উমায়ের, তার ওপরও মুহাম্মদ (ﷺ) এর যাদু খেটে গেল, যাই হোক, উমায়ের আর কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের কর্তব্য পালন করে যেতে লাগলেন। তার আদর্শ ও প্রচার মাহাত্মে মক্কার বহু সংখ্যক নর-নারী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন।

৩. গাযওয়ায়ে বনি কাইনুকা বা কাইনুকা অভিযান: রাসূল (ﷺ) মদিনায় আগমনের পর ইহুদিদের সঙ্গে তিনি যে চুক্তি করেছিলেন তার দফাগুলো ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। রাসূলের পূর্ণ চেষ্টা ও ইচ্ছা ছিলো যে, এ চুক্তি পত্রে যেসব শর্ত আরোপিত হয়েছে সেগুলো যেন পুরোপুরিভাবে পালিত হয়। সুতরাং মুসলমানরা এমন এক চুল পরিমাণও অগ্রসর হননি যা এ চুক্তিনামার কোনো একটি অক্ষরেরও বিপরীত হয়। কিন্তু ইহুদিদের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতা, হঠকারিতা এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে পরিপূর্ণ। তারা অতি তাড়াতাড়ি তাদের পূর্ব স্বভাবের দিকে ফিরে গেল। তারা মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহ বাধানোর চেষ্টায় লেগে পড়লো। এর একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে।

ইহুদিদের প্রতারণার একটা নমুনা- ইবনে ইসহাক এর বর্ণনা মতে, শাস ইবনে কায়েস নামক একজন বৃদ্ধ ইহুদি ছিলো। তার পা যেন কবরে লটকানো ছিলো (অতি বৃদ্ধ ছিলো)। সে মুসলমানদের প্রতি চরম শত্রুতা ও হিংসা পোষণ করতো। সে একদা সাহাবায়ে কিরামের একটি মজলিসের পাশ দিয়ে গমন করছিলো, যে মজলিসে আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রেরই লোকেরা পরস্পর কথোপকথন করছিলেন। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তার অন্তর হিংসায় জ্বলে ওঠল এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকরার পথ সে অন্বেষণ করতে লাগল। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘকালব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে আসছিলো। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের ফলে তাদের শত্রুতা প্রেম প্রীতিতে পরিণত হয়েছিলো এবং এভাবে তাদের দীর্ঘকালের দুঃখ-দুর্দশার অবসান হয়েছিলো। সমবেত জনতাকে দেখে সে বলতে লাগল, এখানে বনু কাইলার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ একত্রিত হয়েছে। আল্লাহর কসম। এ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের নিকট দিয়ে আমার গমন সঙ্গত হবে না। তাই সে তার এক যুবক সঙ্গীকে নির্দেশ দিল যে, সে যেন তাদের মজলিসে যায় এবং তাদের সঙ্গে বসে বুআস যুদ্ধ এবং তার পূর্ববর্তী অবস্থা আলোচনা করে এবং ঐ সময়ে উভয়ের পক্ষ হতে যে সকল কবিতা পাঠ করা হয়েছিলো কিছু কিছু পাঠ করে শুনিয়ে দেয়। ঐ যুবক ইহুদিকে যা যা বলা হয়েছিলো ঠিক সে ঐ রূপই করল।

ঐ কবিতাগুলো শোনা মাত্রই উভয় গোত্রের লোকদের মধ্যে পুরোনো হিংসা-বিদ্বেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠল এবং উভয় পক্ষের মধ্যে অনেক বাক বিতণ্ডা হয়ে গেল। এমন কি যুদ্ধের স্থান এবং সময় পর্যন্ত নির্ধারিত হয়ে গেল। যুদ্ধের উম্মাদনা নিয়ে উভয় পক্ষের যোদ্ধাগণ 'হাররাহ' নামক স্থানে সমবেত হলেন।

এ দুঃসংবাদ পাওয়া মাত্রই রাসূল মুহাজির সাহাবাগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মাঝে আগমন করে বললেন, "হে মুসলিম সম্প্রদায়! আল্লাহ ক্ষমা করুন, এ কি হচ্ছে? আল্লাহ আমার জীবদ্দশাতেই জাহেলিয়াতের মূলোৎপাটন করে তোমাদেরকে মুসলমান করেছেন, ইসলামের দ্বারা জাহেলিয়াতের মূলোৎপাটন করে তোমদেরকে কুফর হতে মুক্ত করে তোমদের পরস্পরের হৃদয়কে একে অপরের সাথে বেঁধে দিয়েছেন।

রাসূল (ﷺ) এর কথা শুনে নিজেরা নিজেদেরকে সামলিয়ে নিলেন এবং অনুধাবন করলেন যে, এটা শয়তানের প্ররোচনা ছাড়া আর কিছুই না। অতঃপর তাঁরা পরস্পর গলায়-গলায় মিলে ক্রন্দন এবং তাওবা করলেন। এভাবে শাস ইবনে কায়েসের প্রতি হিংসার আগুন নির্বাপিত হলো।

এটা হচ্ছে কুচক্রীপনা ও কলহের একটা নমুনা যা ইহুদীরা মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে থাকতো। এ কাজের জন্যে তারা বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতো এবং মিথ্যা রটনা রটাতে থাকতো। তারা সকালে মুসলমান হয়ে সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যেতো এবং এভাবে সরল প্রাণ মুসলমানদের অন্তরে সন্দেহের বীজ বপন করার চেষ্টায় লেগে থাকত। আর তারা কোন মুসলমানদের কাছে ঋণী থাকলে সে ঋণ পরিশোধ করতো না; বরং অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতো এবং বলতো ঋণ তো ঐ সময় ছিলো যখন তোমরা তোমাদের পূর্ব পরুষদের ধর্মের ওপর ছিলে। কিন্তু এখন তোমরা ঐ ধর্ম পরিবর্তন করেছ। এখন আমাদের নিকট হতে ঋণ আদায়ের তোমাদের কোনো পথ নেই।

প্রকাশ থাকে যে, ইহুদিরা এসব কার্যকলাপ বদর যুদ্ধের পূর্বেই শুরু করেছিলো এবং তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করার সূচনা করে ফেলেছিলো। কিন্তু রাসূল ও সাহাবিদের অবস্থা এইরূপ ছিলো যে, তারা ইহুদিদের হিদায়াত প্রাপ্তির আশা করে তাদের এসব কার্যকলাপের ওপর ধৈর্যধারণ করে চলছিলেন। এ ছাড়া এটাও উদ্দেশ্যে ছিলো যে, যেন ঐ অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

বনু কাইনুকার অঙ্গীকার ভঙ্গ- ইহুদিরা যখন দেখল যে, আল্লাহ বদর প্রান্তরে মুসলমানদেরকে চরমভাবে সাহায্য করে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করলেন এবং দূরবর্তী ও নিকটবর্তী প্রতিটি স্থানের বাসিন্দাদের অন্তরে তাদের প্রভাব প্রতিফলিত হলো, তখন তাদের প্রতি শত্রুতা ও হিংসায় তারা ফেটে পড়ল। প্রকাশ্যভাবে তারা শত্রুতার ভাব প্রদর্শন করতে লাগল এবং খোলাখুলিভাবে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল ও দুঃখ-কষ্ট দেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হিংসুটে ও প্রতিহিংসা পরায়ণ ছিলো কার বিন আশরাফ, যার আলোচনা সামনে আসছে। অনুরূপভাবে ইহুদিদের তিনটি গোত্রের মধ্যে সর্বাধিক হিংসুটে ছিলো বনু কাইনুকা গোত্রটি। এরা সকলেই মদিনার মধ্যে অবস্থান করত এবং তাদের মহল্লাটি তাদের নামেই কথিত ছিলো। পেশার দিক দিয়ে তারা ছিলো স্বর্ণকার, ও পাত্র নির্মাতা। এ কারণে ওদের প্রত্যেকের নিকটে বহুল পরিমাণে সমরাস্ত্র মওজুদ ছিলো। তাদের যোদ্ধার সংখ্যা ছিলো সাতশত। তারা ছিলো মদিনার সবচেয়ে বাহাদুর ইহুদি গোষ্ঠী। তাদের সর্বপ্রথম অঙ্গীকার ভঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে নিম্নরূপঃ

আল্লাহ যখন বদর প্রান্তরে মুসলমানদের বিজয় দান করেন, অন্যায়আচরণ এবং ঝগড়া বাঁধানোর কার্যকলাপের সীমা তারা আরো বাড়িয়ে দিল। সুতরাং যে মুসলমানই তাদের বাজারে যেতেন তাঁকেই তারা ঠাট্টা তামাশা এবং বিদ্রূপাত্মক আচরণ শুরু করে দিত এবং নানাভাবে কষ্ট দিত। এমন কি মুসলিম মহিলাদের নিয়েও তারা উপহাস ও ঠাট্টা বিদ্রূপ করতে দ্বিধা করত না।

এভাবে পরিস্থিতি যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছল এবং তাদের ঔদ্ধত্যপনা বেড়েই চলল তখন রাসূল স্বয়ং বনু কাইনুকার বাজারে উপস্থিত হলেন, ইমাম আবু দাউদ এবং অন্যান্যরা ইবনে আব্বাস (রা) কে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল এ বদর প্রান্তরে কুরাইশদিগকে পরাজিত করে যখন মদিনায় আগমন করলেন তখন বানু কাইনুকার বাজারে ইহুদিদের একত্রিত করে বললেন, হে ইহুদি সমাজ! তোমরা আনুগত্য স্বীকার কর, অন্যথায় কুরাইশদের ন্যায় তোমাদেরকেও বিপন্ন হতে হবে।

কিন্তু তারা তাঁর উপদেশ গ্রহণ করল না। চরম ধৃষ্টতা সহকারে তারা বলতে লাগল। হে মুহাম্মদ! কতকগুলো আনাড়ি কুরাইশকে হত্যা করেছো বলে গর্বিত হয়ো না। যুদ্ধ সম্বন্ধে তারা একেবারে অনভিজ্ঞ ছিলো। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যখন যুদ্ধ হবে তখন বুঝবে যে ব্যাপারটা কত কঠিন।

তাদের এসব কথায় জবাবে আল্লাহ বলেন: যারা কুফরী করে তাদেরকে বলো তোমরা শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং তোমাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে। আর সেটা হচ্ছে কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল। দুটি দলের মধ্যে পরস্পর সম্মুখীন হওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। এক দল আল্লাহর পথে সংগ্রাম করছিলো, অন্যদল ছিলো কাফির তারা চাক্ষুষভাবে তাদেরকে দ্বিগুণ দেখছিলো। অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর সাহায্য দ্বারা শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় এতে অন্তরদৃষ্টি (প্রজ্ঞা বা সূক্ষ্মদর্শন) সম্পন্ন লোকদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। (সূরা আল ইমরান: আয়াত ১২-১৩)

মোটকথা, বানু কাইনুকা যে জবাব দিয়েছিলো তাতে পরিষ্কারভাবে যুদ্ধের ঘোষণাই ছিলো। কিন্তু রাসূল ক্রোধ সংবরণপূর্বক ধৈর্যধারণ করেন। অন্যান্য মুসলমানেরাও ধৈর্য ধারণপূর্বক পরবর্তী অবস্থার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

এদিকে ঐ হিতোপদেশের পর বানু কাইনুকার ইহুদিগণের ঐদ্ধত্য আরও বেড়ে যায় এবং অল্প দিনের মধ্যেই তারা মদিনাতে হাঙ্গামা শুরু করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে তারা নিজের কবর নিজের হাতেই খনন করে এবং নিজেদের জীবন বিপন্ন করে তোলে।

এসময়ে জনৈকা মুসলিম মহিলা বনু কাইনুকার বাজারে দুধ বিক্রী করে বিশেষ কোনো প্রয়োজনে এবং ইহুদি স্বর্ণকারের কাছে গিয়ে বসে পড়েন। কয়েকজন দুর্বল ইহুদি তাঁর মুখের পর্দা খোলাবার অপচেষ্টা করে, তাতে মহিলাটি অস্বীকার করেন। উক্ত স্বর্ণকার গোপনে মহিলাটির পরিহিত বস্ত্রের এক প্রান্ত তার পিঠের ওপরে গিরা দিয়ে দিয়েছিলো কিন্তু তিনি তা টের পাননি। তিনি উঠতে গিয়ে বিবস্ত্র হয়ে পড়লেন। এ ভদ্র মহিলাকে বিবস্ত্র অবস্থায় প্রত্যক্ষ করে নর পিশাচের দল হো হো করে হাত তালি দিতে থাকল। মহিলাটি ক্ষোভে ও লজ্জায় আর্তনাদ করতে লাগলেন। তা শুনে জনৈক মুসলমান ঐ স্বর্ণকারকে আক্রমণ করে হত্যা করেন। এরপর ইহুদিগণ মুসলমানটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যা করে।

এরপর নিহত মুসলমানটির পরিবারবর্গ চিৎকার করে ইহুদিদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের নিকট ফরিয়াদ করলেন। এর ফলে মুসলমান ও বানু কাইনুকার ইহুদিদের মধ্যে সংঘাত বেঁধে গেল।

অবরোধ, আত্মসমর্পণ ও নির্বাসন- এ ঘটনার পর রাসূলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি মদিনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লুবাবাহ ইবনে আব্দুল মুনযির (রা) এর ওপর অর্পণ করে হামযাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা) এর হাতে মুসলমানদের পতাকা প্রদান পূর্বক আল্লাহর সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বনু কাইনুকার দিকে ধাবিত হলেন। ইহুদিরা তাদেরকে দেখামাত্র দুর্গের মধ্যে আশ্রয়গ্রহণ করে দুর্গের দ্বারগুলো উত্তমরূপে বন্ধ করে দিল। রাসূল (ﷺ) কঠিনভাবে তাদের দুর্গ অবরোধ করলেন। এ দিনটি ছিলো শুক্রবার, হিজরি ২য় সনের শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ। ১৫ দিন পর্যন্ত অর্থাৎ যুলকাদার নতুন চাঁদ উদয় হওয়া অবধি অবরোধ জারী থাকলো। অতঃপর আল্লাহ ইহুদিদের অন্তরে ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর নীতি এটাই যে, যখন তিনি কোনো সম্প্রদায়কে পরাজিত ও লাঞ্ছিত করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে থাকেন। অবশেষে বনু কাইনুকা আত্মসমর্পণ করল এবং বললো যে, রাসূল তাদের জান মাল, সন্তান-সন্ততি এবং নারীদের ব্যাপারে যা ফয়সালা করবেন তারা তা মেনে নিবে। অতঃপর রাসূল এ নির্দেশক্রমে তাদের সকলকে বেঁধে নেয়া হয়। কিন্তু এ স্থলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তার কপট চাল চালবার সুযোগ গ্রহণ করল। সে রাসূল কে তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করতে থাকল। রাসূল (ﷺ) তার হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু শেষে সে নবী এর জামার বুকের অংশ বিশেষ ধরে ফেলল। রাসূল বিশেষ বিরক্তি ও ক্রোধ সহকারে পুনঃপুনঃ তাকে ছেড়ে দিতে বললেন, কিন্তু এতদসত্বেও সে পুনঃপুনঃ উত্তর করতে লাগলো আমি কোনো মতেই ছাড়বো না, যে পর্যন্ত আপনি তাদের ওপর দয়া পরবশ হন। চারশজন খোলা দেহের যুবক এবং তিনজন বর্মপরিহিত যুবককে আপনি একই দিনের সকালে কেটে ফেলবেন, অথচ তারা আমাকে কঠিন বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিলো। আল্লাহর কসম! আমি কালচক্রের বিপদের আশংকা করছি।

অবশেষে রাসূল এ মুনাফিকের প্রতি দয়া প্রদর্শন করলেন যে, মাত্র এক মাস পূর্বে যে বাহ্যিক ভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার খাতিরে তিনি তাদের প্রত্যেকেরই প্রাণদণ্ড রহিত করেন। তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে মদিনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন। সুতরাং তারা সকলেই সিরিয়ার দিকে চলে গেল এবং অল্পদিনের মধ্যে তাদের অধিকাংশই তথায় মৃত্যুবরণ করলো।

রাসূল (ﷺ) তাদের ধন মাল হস্তগত করলেন যেগুলোর মধ্যে তিনটি কামান, দুটি বর্ম, তিনটি তরবারী এবং তিনটি বর্শা নিজের জন্যে বেছে নেন। এবং গনীমতের মালের এক পঞ্চমাংশ আলাদা করেন। মুহাম্মদ মাসলামা (রা) গণীমত একত্রিত করার কাজ সম্পাদন করেন।

৪. গাযওয়ায়ে সাভীক বা ছাতুর যুদ্ধ: একদিকে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ইহুদি এবং মুনাফিকরা নিজ নিজ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, অপরদিকে আবু সফিয়ানও এমন ব্যবস্থাপনা কার্যকরী করার সুযোগে ছিলেন যাতে কষ্ট কম হয় আর ফল ভালো হয়। তিনি এ ব্যবস্থাপনার তাড়াতাড়ি কার্যকরী করে স্বীয় কওমের মর্যাদা রক্ষা এবং তাদের শক্তি প্রকাশ করার ইচ্ছে করছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, অপবিত্রতার কারণে তাঁর মস্তক পানি স্পর্শ করবে না যে পর্যন্ত না তিনি মুহাম্মদ (ﷺ) এর সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। সুতরাং তিনি তাঁর এ প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার জন্যে দশ জন অশ্বারোহী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন এবং কানাত উপত্যকার শেষে অবস্থিত নীব নামক এক পর্বত প্রান্তে তাবু স্থাপন করেন। মদিনা হতে এ জায়গাটির দূরত্ব প্রায় বারো মাইল। মদিনার ওপর খোলাখুলিভাবে আক্রমণ করার সাহস তাঁর ছিলো না বলে তিনি এমন এক ব্যবস্থা কার্যকরী করলেন যেটাকে ডাকাতি বলা যেতে পারে। এর বিস্তারিত বিবরণ এই যে, তিনি রাত্রির অন্ধকারে মদিনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রবেশ করেন। এবং হোয়াই ইবনে আখতারের নিকট গিয়ে তার দরজা খুলতে বলেন। কিন্তু হোয়াই পরিণাম চিন্তা করে তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। আবু সুফিয়ান তখন সেখান হতে ফিরে বনু নাযীরের সালাম ইবনে মুশকিম নামক আর এক সর্দারের নিকট উপস্থিত হন। সে বনু নাযীর গোত্রের কোষাধ্যক্ষ ছিলো। আবু সুফিয়ান তার বাড়ির ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলে সে অনুমতি প্রদান করে। সে তার অতিথি সেবাও করে। রাত্রির শেষভাগে আবু সুফিয়ান সেখান হতে বের হয়ে নিজের সঙ্গীদের একটি জায়গার ওপর হামলা করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেন। ঐ দলটি তথাকার কিছু খেজুরের গাছ কর্তন করে এবং জ্বালিয়ে দেয়, আর একজন আনসারী ও তার মিত্রকে তাদের জমিতে পেয়ে হত্যা করে এবং দ্রুত বেগে পলায়ন করে মক্কার পথে ফিরে যায়। রাসূল এ সংবাদ পাওয়া মাত্রই দ্রুতগতিতে আবু সুফিয়ান এবং তার সঙ্গীদের পশ্চাদ্ধাবন করেন, কিন্তু তারা আরো দ্রুত গতিতে পলায়ন করে। সুতরাং তাদেরকে ধরা সম্ভবপর হয়নি। কিন্তু তারা বোঝা হালকা করার জন্যে ছাতু, পাথেয় এবং বহু আসবাবপত্র ফেলে দেয় যা মুসলমানদের হাতে আসে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কারকুরাতুল কুদর পর্যন্ত পশ্চাদ্ধাবন করে ফিরে আসেন। ফিরার পথে তাঁরা ছাতু ইত্যাদি বোঝাই করে নিয়ে আসেন। এ অভিযানের নাম গাযওয়ায়ে সাভীক রাখা হয়। কারণ আরবি ভাষায় ছাতুকে সাভীক বলা হয়। এ যুদ্ধ বদর যুদ্ধের মাত্র দুমাস পর হিজরি ২য় সনের যিলহজ্জ মাসে সংঘটিত হয়।

এ যুদ্ধকালীন সময়ে মদিনায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবু লুবাবাহা ইবনে আব্দুল মুনযির (রা) এর ওপর অর্পণ করা হয়।

৫. গাযওয়ায়ে যী আমর: বদর ও উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূল (ﷺ) এর নেতৃত্বাধীনে এটাই সবচেয়ে বড়ো সামরিক অভিযান। এটা তৃতীয় হিজরির মুহাররম মাসে সংঘটিত হয়।

এ অভিযানের কারণ: মদিনার গোয়েন্দা বাহিনী রাসূল কে খবর দেন যে, বনু সালামাহ ও মুহারির গোত্রের এক বিরাট বাহিনী মদিনার ওপর আক্রমণ করার জন্য একত্রিত হচ্ছে। এ খবর শোনা মাত্রই রাসূল মুসলমানদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন এবং আরোহী ও পদাতিক মিলে মোট চার'শ সৈন্যের বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। উসমান ইবনে আফফান (রা) কে মদিনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন।

পথে সাহাবিগণ বনু সালামাহ গোত্রের জাবর নামক এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করে রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাযির করেন। রাসূল (ﷺ) তাকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং সে ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি তাকে বিলাল (রা) এর বন্ধুত্বে দিয়ে দেন এবং সে পথ প্রদর্শক রূপে মুসলমানদের শত্রুদের অবস্থানস্থল পর্যন্ত রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যায়।

এদিকে শত্রুরা মদিনার সৈন্য বাহিনীর আগমনের খবর পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং আশে পাশের পাহাড়গুলোতে লুকিয়ে যায়। কিন্তু রাসূল অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন এবং সেনাবাহিনীসহ ঐ জায়গা পর্যন্ত গমন করেন যেটাকে শত্রুরা নিজেদের দলের একত্রিত হওয়ার স্থান নির্বাচিত করেছিলো। এটা ছিলো আসলে একটি প্রস্রবণ যা আমর নামে পরিচিত ছিলো। বেদুঈনদের ওপর প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত এবং মুসলমানদের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে তাদের অবহিত করানোর জন্য তৃতীয় হিজরির পূর্ণ সফর মাসটি তিনি সেখানে অতিবাহিত করেন। অতঃপর মদিনায় ফিরে আসেন।

৬. কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যা: এ ছিলো ইহুদিদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি যে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি অত্যন্ত শত্রুতা ও হিংসা পোষণ করত। সে নবী (ﷺ) কে কষ্ট দিতো এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যভাবে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে বেড়াত। 'তাই' গোত্রের শাখা বন্ধু নারহানের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো। আর তার মাতা বনু নাযীর গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সে ছিলো বড়ো ধনী ও পুঁজিপতি আরবে তার খ্যাতি ছিলো। সে একজন খ্যাতনামা কবিও ছিলো। তার দুর্গটি মদিনার দক্ষিণে বনু নযীর গোত্রের আবাদী ভূমির পিছনে অবস্থিত ছিলো।

বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় লাভ এবং নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের নিহত হওয়ার প্রথম খবর শুনে সে অকস্মাৎ বলে ওঠে 'সত্যিই কি ঘটনা এটাই? এরা ছিলো আরবের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এবং জনগণের বাদশাহ। যদি মুহাম্মদ তাদেরকে হত্যা করে থাকে তবে পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ ও উপরিভাগ হতে উত্তম হবে অর্থাৎ আমাদের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই উত্তম হবে।

অতঃপর যখন সে নিশ্চিতরূপে জানতে পারল যে, এটা সত্য খবর তখন আল্লাহর শত্রু রাসূল এবং মুসলমানদের নিন্দা এবং ইসলামের শত্রুদের প্রশংসা করতে শুরু করল এবং তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে লাগল। কিন্তু এতেও তার বিদ্বেষ প্রশমিত না হওয়ায় সে অশ্বে আরোহণ পূর্বক কুরাইশদের নিকট গমন করল এবং মুত্তালিব ইবনে আবু আদাআ সাহমীরার অতিথি হলো। অতঃপর সে কুরাইয়েশদেরকে মর্যাদাবোধে উত্তেজিত করে, তাদের প্রতিশোধাগ্নি প্রজ্বলিত করে এবং তাদেরকে নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে উৎসাহিত করতে কবিতা বলে বলে ঐ কুরায়েশ নেতাদের জন্য বিলাপ করতে লাগল যাদেরকে বদর প্রান্তরে হত্যা করার পর কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। মক্কায় তার অবস্থানকালে আবু সুফিয়ান ও মুশরিকরা তাকে জিজ্ঞেস করল তোমার নিকট আমাদের দ্বীন বেশি পছন্দনীয় না মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের দ্বীন? আর উভয় দলের মধ্যে কোন দলটি বেশি হিদায়াত প্রাপ্ত? উত্তরে কা'ব ইবনে আশরাফ বলল তোমরাই তাদের চেয়ে বেশি হিদায়াত প্রাপ্ত এবং উত্তম। এ ব্যাপারেই আল্লাহ নিম্নের আয়াত নাযিল করেন।

তুমি কি তাদেরকে দেখনি, আপনি তাদের ব্যাপারটি জানেন না? যাদেরকে কিতাবের একটি অংশ দেয়া হয়েছিলো, যারা জিবত ও তাগুতে বিশ্বাস করে আর কাফিরদের সম্বন্ধে বলে, তারা মু'মিনগণের তুলনায় অধিক সঠিক পথে রয়েছে। (আন-নিসা ৪: ৫১)

ইবনে আশরাফ এসব কিছু করে মদিনায় ফিরে এসে সাহাবায়ে কিরামের ব্যাপারে বাজে কবিতা বলতে শুরু করে এবং কটুক্তির মাধ্যমে তাঁদেরকে ভীষণ কষ্ট দিতে থাকে।

তার এ দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল বললেন 'কে এমন আছে যে, কা'ব ইবনে আশরাফকে হত্যা করতে পারে? কেননা, সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কে কষ্ট দিয়েছে এবং দিচ্ছে।'

রাসূল (ﷺ) এর প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা), আব্বাদ ইবনে বিশর (রা) আবু নায়েলা (রা) যিনি ছিলেন কা'বের দুধ ভাই, সারাস বিন আউ (রা) এবং আবু আবস ইবনু জাবর (রা) খিদমতের জন্যে এগিয়ে আসেন। এ সংক্ষিপ্ত বাহিনীর নেতা ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা)।

কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যার ব্যাপারে যেসব বর্ণনা রয়েছে এই গুলোর সারমর্ম হচ্ছে এই যে, রাসূল যখন বললেন "কা'ব ইবনে আশরাফকে কে হত্যা করতে পারবে? সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল কে কষ্ট দিয়েছে এবং দিচ্ছে।"

ইবনে মাসলামা (রা) আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি প্রস্তুত আছি। আমি তাকে হত্যা করবো এটা কি আপনি চান? রাসূল (ﷺ) জবাবে বললেন, হ্যাঁ। তিনি তখন বললেন, তাহলে আপনি আমাকে অস্বাভাবিক কিছু বলার অনুমতি দিচ্ছেন কি? রাসূল উত্তরে বলেন, হ্যাঁ তুমি বলতে পার।

এরপর মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) কা'ব ইবনে আশরাফের নিকট গমন করলেন এবং তাকে বললেন, "এ ব্যক্তি মুহাম্মদ (ﷺ) আমাদের কাছে সাদকা চাচ্ছে এবং বাস্তবে, সে আমাদেরকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।"

একথা শুনে কা'ব বললো, "আল্লাহর কসম! তোমাদের আরো বহু দুর্ভোগ পোহাতে হবে। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) বললেন, "আমরা যখন তার অনুসারী হয়েই গেছি তখন হঠাৎ করে এখনই তার সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত মনে করছি না। পরিণামে কি হয় দেখাই যাক। আচ্ছা, আমি আপনার কাছে এক অসাক বা দু'অসাক খাদ্য শষ্যের আবেদন করছি। তিনি বললেন আমার কাছে কিছু বন্ধক রাখো।

মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) বললেন, 'আপনি কি জিনিস বন্ধক রাখা পছন্দ করেন? কাব উত্তর দিলো, তোমাদের নারীদেরকে আমার নিকট বন্ধক রাখো।' মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) বললেন, 'আপনি আরবের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুদর্শন পুরুষ সুতরাং আমরা আমাদের নারীদেরকে কিরূপে আপনার নিকট বন্ধক রাখতে পারি?'

সে বলল 'তাহলে তোমাদের পুত্রদেরকে বন্ধক রাখো।'

মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) বললেন, 'আমরা আমাদের পুত্রদেরকে কি করে বন্ধক রাখতে পারি? এরূপ করলে তাদেরকে গালি দেয়া হবে যে, এক অসাক বা দু'অসাক খাদ্যের বিনিময়ে তাদেরকে বন্ধক রাখা হয়েছিলো। এটা আমাদের জন্যে খুবই লজ্জার কথা হবে।' আমরা অবশ্য আপনার কাছে অস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। এরপর দুজনের মধ্যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রা) অস্ত্র নিয়ে তার কাছে আসবেন। এদিকে আবু নায়েলা অগ্রসর হলেন অর্থাৎ কা'ব ইবনে আশরাফের কাছে আসলেন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন দিকের কবিতা শোনা ও শোনানোর কাজ চললো। অতঃপর আবু নায়েলা বললেন, ভাই ইবনে আশরাফ। আমি এক প্রয়োজনে এসেছি। এটা আপনাকে আমি বলতে চাচ্ছি এ শর্তে যে, আপনি কারো কাছে এটা প্রকাশ করবেন না। কা'ব বলল, ঠিক আছে আমি তাই করবো।

আবু নায়েলা (রা) বললেন, এ ব্যক্তির 'মুহাম্মদ' এর আগমন তো আমাদের জন্যে পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোটা আরব আমাদের শত্রু হয়ে গেছে। আমাদের পথ ঘাট বন্ধ হয়ে গেছে, পরিবার পরিজন ধ্বংস হতে চলেছে। সন্তান-সন্ততির কষ্টে আমরা চৌচির হচ্ছি। এরপর তিনি ঐ ধরনেরই কিছু আলাপ আলোচনা করলেন যেন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা করেছিলেন। কথোপকথনের সময় আবু নায়েলা এ কথাও বলেছিলেন। 'আমার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব রয়েছে যাদের চিন্তাধারা ঠিক আমারই মতো। আমি তাদেরকেও আপনার কাছে নিয়ে আসতে চাচ্ছি। আপনি তাদের হাতেও কিছু বিক্রি করেন এবং তাদের ওপর অনুগ্রহ করেন। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং আবু নায়েলা নিজ নিজ কথোপকথনের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্যে সাধনে সফলকাম হন। কেননা, এ কথোপকথনের পরে অস্ত্রসস্ত্র বন্ধু বান্দবসহ এ দুজনের আগমনের কারণে কা'ব ইবনে আশরাফের সতর্ক হয়ে যাওয়ার কথা নয়। অতঃপর হিজরি ৩য় সনের রবিউল আওয়াল মাসের ১৪ তারিখে চাঁদনী রাতে এ ক্ষুদ্র বাহিনী রাসূল (ﷺ) এর নিকট একত্রিত হন। রাসূল 'বাকীয়ে গারকাদ' পর্যন্ত তাঁদের অনুসরণ করেন। তারপর বলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে যাও, বিসমিল্লাহ। হে আল্লাহ! এদেরকে সাহায্য করুন। অতঃপর তিনি নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। তারপর বাড়িতে তিনি নামায ও মুনাজাতে লিপ্ত হয়ে পড়েন।

এদিকে এ বাহিনী কা'ব ইবনে আশরাফের দুর্গের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পর আবু নায়েলা উচ্চৈস্বরে ডাক দেন। ডাক শুনে কা'ব তাদের নিকট আসার জন্যে উঠল। তার স্ত্রী, যে ছিলো নববধূ তাকে বললো, এ সময় কোথায় যাচ্ছেন? আমি এমন শব্দ শুনতে পাচ্ছি যে, যেন তা হতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ছে।

স্ত্রীর এ কথা শুনে কা'ব এটাতো আমার ভাই মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং দুধ ভাই আবু নায়েলা। সম্ভ্রান্ত লোককে যদি তরবারী যুদ্ধের দিকে আহ্বান করা হয় তবে সে ডাকেও সে সাড়া দিবে। এরপর সে বাহিরে আসল। তার দেহ থেকে সুগন্ধি ছুটছিলো এবং তার মাথায় খোসবুর ঢেউ খেলছিলো।

আবু নায়েলা তাঁর সঙ্গীদেরকে বলে রেখেছিলেন। যখন সে আসবে তখন আমি তার চুল ধরে শুঁকবো। যখন তোমরা দেখবে যে, আমি তার মাথা ধরে তাকে ক্ষমতার মধ্যে পেয়ে গেছি তখন ঐ সুযোগে তোমরা তাকে হত্যা করবে।

সুতরাং যখন কাব আসলো, তখন দীর্ঘক্ষণ ধরে আলাপ-আলোচনা ও গল্পগুজব চললো। তারপর আবু নায়েলা বললেন, ইবনে আশরাফ! আজুয় ঘাঁটি পর্যন্ত চলুন। সেখানে আজ রাতে কথাবার্তা বলাবলি হবে। সে বলল, তোমাদের ইচ্ছা হলে চলো। অতঃপর তাদের সাথে সে চলল।

পথিমধ্যে আবু নায়েলা তাকে বললেন, আজকের মতো এমন উত্তম সুগন্ধির সাথে আমার পরিচয় নেই। একথা শুনে কা'বের বক্ষ গর্বে ফুলে ওঠলো। সে বললো, আমার পাশে আরবের সর্বাপেক্ষা অধিক সুগন্ধি ব্যবহারকারিনী মহিলা রয়েছে। আবু নায়েলা বললেন, আপনার মাথাটি একটু শুঁকবো এ অনুমতি আছে কি? সে উত্তরে বললো হ্যাঁ, হ্যাঁ, আবু নায়েলা তখন কাবের মাথায় হাত রাখলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর আবু নায়েলা বললেন, ভাই আর একবার শুঁকতে পারি কি? কাব উত্তর দিলে 'হ্যাঁ হ্যাঁ। কোনো আপত্তি নেই।' আবু নায়েলা আবার শুঁকলেন। সুতরাং সে নিশ্চিন্ত হয়ে গেল।

আরো কিছু দূর চলার পর আবু নায়েলা পুনরায় বলেন, 'ভাই আর একবার শুঁকবো কি? এবারও কা'ব উত্তর দিলো হাঁ, শুঁকতে পারো।

এবার আবু নায়েলা তার মাথায় আঘাত করল। ইতিমধ্যেই তার ওপর কয়েকটি তরবারী পতিত হলো, কিন্তু কাজ হলো না দেখে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা নিজের কোদাল ব্যবহার করে তাকে হত্যা করল। আক্রমণের সময় সে এতো জোরে চীৎকার করেছিলো যে, চুতর্দিকে তার চীৎকারের শব্দ পৌঁছে গিয়েছিলো, এমন কোনো দুর্গ বাকি ছিলো না যেখানে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয়নি। কিন্তু ওটা মুসলমানদের ক্ষতির কোনো কারণ হয়নি।

কাবকে আক্রমণ করার সময় হারিস ইবনে আউসের গায়ে তাঁর কোনো এক সাথীর তরবারীর কোণার আঘাত লেগেছিলো। ফলে তিনি আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর দেহ হতে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। কা'বকে হত্যা করে ফিরার সময় যখন এ ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী হরবায়ে আরীয় নামক স্থানে পৌঁছেন তখন দেখেন যে, হারিস অনুপস্থিত রয়েছে। সুতরাং তারা সেখানে থেকে যান। অল্পক্ষণ পরে হারিস সঙ্গীদের পদচিহ্ন ধরে তথায় পৌঁছে যান। সেখান হতে তাঁরা তাঁকে উঠিয়ে নেন এবং বাকীয়ে গারকাদে পৌঁছে এমন জোরে তাকবীর ধ্বনি দেন যে, রাসূল ও তা শুনতে পান। তিনি বুঝে নেন যে, কাব নিহত হয়েছে। সুতরাং তিনিও আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারণ করেন। অতঃপর যখন এ মুসলিম বাহিনী তাঁর খিদমতে উপস্থিত হন তখন তিনি বলেন, এ চেহারাগুলো সফল থাকুক।

তখন তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল - আপনার চেহারাও সফলতা লাভ করুক। আর সাথে সাথেই তাঁরা কাব এর কর্তিত মস্তক তাঁর সামনে রেখে দেন। তিনি তখন আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং হারিস এর ক্ষত স্থানে স্বীয় পবিত্র মুখের লালা লাগিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরোগ্য লাভ করেন এবং পরে আর কষ্ট অনুভব করেননি।

এদিকে ইহুদিরা যখন কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যার খবর জানতে পারল তখন তাদের শঠতাপূর্ণ অন্তরে ভীতি ও ত্রাসের ঢেউ খেলে গেল। তারা তখন বুঝতে পারলো যে, রাসূল যখন অনুধাবন করবেন যে, শান্তি ভঙ্গকারী, কলহ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এবং প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার ভঙ্গকারীদেরকে উপদেশ দিয়ে কোনো ফল হচ্ছে না তখন তিনি তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধাবোধ করবেন না। এ জন্যেই তারা কাব এর হত্যার প্রতিবাদে কোনো কিছু করার সাহস করলো না; বরং একেবারে সোজা হয়ে গেল। তারা অঙ্গীকার পূরণের স্বীকৃতি দান করল এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণের সাহস সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলল।

এভাবে রাসূল মদিনার বিরুদ্ধে বহিরাক্রমণের মোকাবিলা করার অপূর্ব সূযোগ লাভ করলেন এবং মুসলমানরা অভ্যন্তরীণ গোলযোগ হতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে গেলেন, যে গোলযোগে তাঁরা আশংকা করছিলেন এবং যার গন্ধ তাঁরা মাঝে মাঝে পাচ্ছিলেন।

৭. গাযওয়ায়ে বাহরান: এটা ছিলো একটা বড়ো সামরিক অভিযান যার সৈন্যসংখ্যা ছিলো তিনশ জন। এ সেনাদল নিয়ে রাসূল তৃতীয় হিজরির রবিউল আখের মাসে বাহরান নামক একটি অঞ্চলের দিকে গমন করেছিলেন। এটা হিজাযের মধ্যে ফারা সীমান্তে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জায়গা। রাসূল সেনাবাহিনীর রবিউল আখের ও জুমাদিউল উলা এ দুমাস তথায় অবস্থানের পর মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ অভিযানে তাঁদেরকে কোনো প্রকার যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়নি।

এই গাযওয়ার কারণের ব্যাপারে মতনৈক্য রয়েছে। কথিত আছে: মদিনায় এ খবর পৌছে যে, বনু সুলাইম গোত্র মদিনা ও এর আশে-পাশে আক্রমণ চালাবার জন্যে যথেষ্ট রকমের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এটাও কথিত আছে যে, রাসূল (ﷺ) কুরাইশের কোনো এক যাত্রাদলের সন্ধানে বের হয়েছিলেন। ইবনে হিশাম এ কারণটাই বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে কাইয়্যুম ও এটাই গ্রহণ করেছেন। তাই, তিনি প্রথম কারণটি উল্লেখই করেননি। এটাই সত্য বলে মনে হচ্ছে। কেননা, বনু সুলায়েম গোত্র ফারা এলাকায় বসবাসই করেনি; বরং তারা নজদের বাসিন্দা ছিলো, যা ফারা হতে বহু দূরে।

৮. সারিয়্যাতু যায়েদ ইবনে হারিসাহ: এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো ৩য় হিজরির জুমাদিউস সানি মাসে। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে মুসলমানদের জন্যে এটা ছিলো সর্বশেষ এবং সফলজনক অভিযান। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, কুরাইশরা বদর যুদ্ধের পর হতে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে নিমজ্জিত তো ছিলোই, তদুপরি যখন গ্রীষ্মকাল আসলো এবং শাম হতে দেশে বাণিজ্যের সফরের সময় এসে পড়লো। এখন তারা আরও এক দুশ্চিন্তায় নিপতিত হলো। আর তা হলো সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, যাকে ঐ বছর শামদেশে গমনকারী কাফেলার আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিলো, কুরাইশকে বললো "মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্য পথ কঠিন করে ফেলেছে। তার সঙ্গীদের সাথে আমরা কিভাবে মোকাবিলা করবো তা আমি বুঝতে পারছি না। তারা সমুদ্র উপকূল ছাড়তেই চাচ্ছে না। আর উপকূলের বাসিন্দারা তাদের সাথে সন্ধি করে নিয়েছে। সাধারণ লোকেরাও তাদের সাথি হয়ে গেছে। তাই, এখন আমি কোন রাস্তা অবলম্বন করবো তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আর যদি আমরা বাড়িতেই বসে থাকি তবে মূলধনও খেয়ে ফেলবো, কিছুই বাকি থাকবে না। কেননা, গ্রীষ্মকালে সিরিয়ার সাথে এবং শীতকালে আবিসিনিয়ায় ব্যবসা করার ওপরে আমাদের জীবিকা নির্ভর করছে।"

সাফওয়ানে এ উক্তির পর বিষয়টি নিয়ে আরো চিন্তা ভাবনা হয়ে গেল। অবশেষে আসওয়াদ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সাফওয়ানকে বললো, তুমি উপকূলের রাস্তা ছেড়ে দিয়ে ইরাকের রাস্তায় সফর কর। প্রকাশ থাকে যে, এটা খুবই দীর্ঘ রাস্তা। এটা নাজদ হয়ে সিরিয়া চলে গেছে এবং মদিনার পূর্ব দিকে কিছুদূর দিয়ে গিয়েছে। কুরাইশদের নিকট এটা ছিলো সম্পূর্ণ অজানা পথ।

এজন্য আসওয়াদ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সাফওয়ানকে পরামর্শ দিলো যে, সে যেন বকর ইবনে ওয়াইলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ফুরাত ইবনে হাইয়ানকে পথ প্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে নেয়।

এ ব্যবস্থাপনার পর কুরাইশের বাণিজ্য কাফেলা সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার নেতৃত্বে নতুন পথ ধরে যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু এ যাত্রাদলের এ পথে যাত্রার খবর ইতোমধ্যেই মদিনায় পৌঁছে গিয়েছিলো। ঘটনা এ যে, সালীত ইবনু নুমান যিনি মুসলমান হয়েছিলেন, নাঈম ইবনু মাসউদের সাথে বসেছিলেন। এটা মদ্যপান নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বের ঘটনা। যখন নাঈমের উপর নেশা চেপে বসল তখন সে কুরায়েশ কাফেলার সফর এবং তাদের অভিপ্রায়ের কথা পূর্ণভাবে বর্ণনা করলেন।

রাসূল তৎক্ষণাৎ আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং এক শজন অশ্বারোহীর একটি বাহিনীকে যায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে প্রেরণ করলেন। যায়েদ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আক্রমণ চালিয়ে পুরো কাফেলার ওপর অধিকার লাভ করলেন। সাফওয়ান ইবনু উমাইয়া এবং কাফেলার অন্যান্য ব্যক্তিদের পলায়ন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না।

মুসলমানরা কাফেলার পথ প্রদর্শক ফুরাত ইবনে হাইয়ানকে এবং আরো দু'জনকে গ্রেফতার করে নেন। কাফেলার নিকট প্রচুর পরিমাণ রৌপ্য ছিলো যার মূল্য আনুমনিক এক লক্ষ দিরহাম হবে সবগুলিই মুসলমানরা গণীমতরূপে লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একপঞ্চমাংশ বের করে নিয়ে বাকিগুলো মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দেন। ফুরাত ইবনে হাইয়ান নবী করীম (ﷺ) এর পবিত্র হাতে ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করেন।

বদর যুদ্ধের পরে এটাই ছিলো কুরাইশদের জন্য সর্বাপেক্ষা বেদনাদায়ক ঘটনা যার ফলে তাদের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বহুগুণে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। এখন তাদের সামনে দুটি মাত্র পথ ছিলো, হয় তারা গর্ব ও অহংকার ত্যাগ করে মুসলমানদের সাথে সন্ধি করবে, না হয় ভীষণ যুদ্ধ করে নিজেদের অতীত গৌরব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনবে এবং মুসলমানদের শক্তি এমনভাবে চূর্ণ করে দিবে যাতে তারা দ্বিতীয়বার মাথা জাগাতে পারে। মক্কাবাসী দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিল। সুতরাং এ ঘটনার পর কুরাইশদের প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তেজনা আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলো। তারা মুসলমানদের সাথে মুকাবিলা করার জন্যে এবং তাদের ঘরে ঢুকে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবার জন্য পূর্ণ মাত্রায় প্রস্তুতি শুরু করে দিলো। এভাবে পূর্ববর্তী ঘটনাবলি ছাড়া এ ঘটনাটিও উহুদ যুদ্ধের বড়ো একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

উহুদ যুদ্ধ:

প্রতিশোধমূলক যুদ্ধের জন্যে কুরাইশদের প্রস্তুতি

বদরের যুদ্ধে মক্কাবাশিরা পরাজয় ও অপমানের যে গ্লানি এবং তাদের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় লোকদের হত্যার যে দুঃখভার বহন করতে হয়েছিলো তারই কারণে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রোধ ও প্রতিহিংসার অনলে দগ্ধিভূত হচ্ছিল। এমনকি তারা তাদের নিহতদের জন্যে শোক প্রকাশ করতেও নিষেধ করে দিয়েছিলো এবং বন্দীদের মুক্তিপণ আদায়ের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করতেও নিষেধ করেছিলো, যাতে মুসলমানরা তাদের দুঃখ যাতনার কাঠিন্যের সম্পর্কে ধারণা করতে না পারে। অধিকন্তু তারা বদর যুদ্ধের পর এ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেছিলো যে, মুসলমানদের সঙ্গে এক ভীষণ যুদ্ধ করে নিজেদের কলিজা ঠাণ্ডা করবে এবং নিজেদের ক্রোধ ও প্রতিহিংসার ক্ষোভ প্রশমিত করবে। উক্ত প্রেক্ষিতে কালবিলম্ব না করে তারা সব ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দেয়। এ কাজে কুরাইশ নেতৃবর্গের মধ্যে ইকরামা ইবনে আবু জাহেল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সফিয়ান ইবনে হারব এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাবীয়াহ খুব বেশি উদ্যোগী ও অগ্রগামী ছিলো।

ঐ লোকেরা এ ব্যাপারে প্রথম যে কাজটি করে, তা হচ্ছে আবু সুফিয়ানের যে কাফেলা বদর যুদ্ধের কারণ হয়েছিলো এবং যেটাকে আবু সুফিয়ান বাঁচিয়ে নিয়ে বের করে নিয়ে যেতে সফলকাম হয়েছিলো, তার সমস্ত জানমাল সামরিক খাতে ব্যয় করার জন্যে আটক করে রাখা। ঐ মালের মালিকদেরকে সম্বোধন করে তারা বলেছিলেন, "হে কুরাইশের লোকেরা! মুহাম্মদ তোমাদের ভীষণ ক্ষতি সাধন করেছে এবং তোমাদের বিশিষ্ট নেতাদের হত্যা করেছে সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে এ মালের মাধ্যমে সাহায্য কর। সম্ভবত আমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবো। কুরাইশরা তাঁর এ কথা সমর্থন করে। সুতরাং সমস্ত মাল, যার পরিমাণ ছিলো এক হাজার উট এবং পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে ব্যায় করা হয় হয়। এ ব্যাপারেই আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেন-

'নিশ্চয় কাফিররা আল্লাহর পথ হতে লোককে নিবৃত্ত করার জন্যে তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, অতএব, তারা ধন-সম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে, অতঃপর ওটা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে, এরপর তারা পরাজিত হবে। (সূরা আল আনফাল: আয়াত ৩৬)

অতঃপর তারা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য এ ঘোষণা দিল যে, যে কোনো সৈনিক, কেননা এবং তেহমাহর অধিবাশিদের মধ্যে হতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে চায়। সে যেন কুরাইশদের পতাকা তলে সমবেত হয়।

এছাড়া আরবের বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন বংশ ও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদেরকে উত্তেজিত করে তুলতে লাগলো। এজন্যে তারা মক্কায় দু'জন কবিকে বিশেষভাবে নিয়োজিত করল। তাদের মধ্যে প্রথম ও প্রধান ছিলো আবু উয। এ নরাধম বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়েছিলো। অতঃপর সে রাসূল (ﷺ) এর দয়ায় বিনা মুক্তিপণে মুক্তি পেয়েছিলো। সে রাসূল এর নিকট প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলো যে, আর কখনো মুশলমানদের বিরুদ্ধে যাবে না। কিন্তু পরবর্তীতে, 'মুসাফে' ইবনু আবদের মানাফ জুমাহির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিভিন্ন গোত্রের আরবদের নিকট উপস্থিত হয়ে নিজেদের দুষ্ট প্রতিভা ও শয়তানী শক্তির প্রভাবে হেজাযের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রচারণার আগুন জ্বালিয়ে দিল। এ কাজে উৎসাহিত করার জন্য সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া আৰু উযযাহকে প্রতিশ্রুতি দিল যে, সে যদি নিরাপদে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয় তাহলে ধন-সম্পদ দিয়ে তাকে ধনবান করে দেবে। অন্যথায় তার কন্যাদের লালন পালনের জামিন হয়ে যাবে।

অধিকন্তু ধর্মের অপমান, ধর্ম মন্দিরের অপমান, ঠাকুর-দেবতার অপমান ইত্যাদি বিষয়ে মুখরোচিত অপ-প্রচারণা চালিয়ে সর্বত্র তারা এমনই উত্তেজনা সৃষ্টি করে দিল যে, অল্পকালের মধ্যেই নানা স্থান হতে বহু দুর্ধর্ষ আরব যোদ্ধা এসে মক্কায় সমবেত হলো এবং দেখতে দেখতে প্রায় তিন সহস্র সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মদিনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো।

এদিকে আবু সুফিয়ান গাযওয়ায়ে সাভীক থেকে অকৃতকার্য হয়ে সমস্ত ধন-সম্পদ ফেলে দিয়ে পলায়ন করে এসেছিলো। সেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করল।

এ ছাড়াও সারিয়্যায়ে যায়েদ বিন হারার ঘটনটিও কুরাইশদের যে আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছিলো এবং তাদের যে দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়েছিলো এ ঘটনাও যেন জ্বলন্ত আগুনে তেল ঢালার শামিল হলো এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক ফায়সালাকারী যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলো।

কুরাইশ সেনা বাহিনীর যুদ্ধের সরাঞ্জাম এবং কামান

বছর পূর্ণ হতে না হতেই কুরাইশদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেল। তিন সহস্র সৈন্যের এক বাহিনীর সঙ্গে ১৫ জন মহিলা গেল। কুরাইশ নেতৃবর্গের ধারণায় মেয়েদেরকে সঙ্গে রাখলে তাদের মান-সম্মান রক্ষা হেতু বেশি করে বীরত্ব ও আমরণ লড়ে যাওয়ার প্রেরণা লাভ করা যাবে। সওয়ারির জন্য তাদের সঙ্গে ছিলো তিন হাজার উট এবং যুদ্ধের জন্য ছিলো দুশটি ঘোড়া।

ঘোড়াগুলোকে সুস্থ রাখার জন্য ওগুলোর পিঠে আরোহণ করা হয়নি। প্রতিরক্ষা মূলক অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে সাতশটি লৌহবর্ম ছিলো। পুরো বাহিনীর জন্য আবু সুফিয়ানকে সেনাপতি নির্বাচন করা হয় এবং খালিদ ইবনে ওয়ালীদকে অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়, আর ইকরামা ইবনে আবু জাহেলকে তার সহকারী বানানো হয়। প্রথা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পতাকা বনু আবদিদ্দার গোত্রের হস্তে সমর্পণ করা হয়।

মক্কী বাহিনীর যুদ্ধ যাত্রা

এ পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির পর মক্কী বাহিনী এমন অবস্থায় মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করল যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রোধ, প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তেজনা তাদের অন্তরে অগ্নিশিখার ন্যায় প্রজ্জ্বলিত ছিলো, যা অচিরেই এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ইঙ্গিত বহন করছিলো।

মদিনায় সংবাদ

আব্বাস (রা) কুরাইশের এ যুদ্ধ প্রস্তুতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং এতে তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিলেন। সুতরাং তিনি এর বিস্তারিত সংবাদ সম্বলিত একটি পত্রসহ জনৈক বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে মদিনায় প্রেরণ করেন। আব্বাস (রা) এর দূত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মদিনার পথে এগিয়ে চললেন। মক্কা হতে মদিনা পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার পথ মাত্র তিন দিনে অতিক্রম করে তিনি ঐ পত্রখানা রাসূল (ﷺ) এর হাতে অর্পণ করেন। ঐ সময় তিনি মসজিদের কুবাতে অবস্থান করছিলেন। উবাই ইবনে কাব পত্রটি রাসূল (ﷺ) কে পাঠ করে শুনালেন। তিনি এগুলোর গোপনীয়তা রক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন এবং তড়িৎ গতিতে মদিনায় আগমনপূর্বক আনসার ও মুহাজিরদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে সলাপরামর্শ করেন।

আকস্মিক যুদ্ধাবস্থা মুকাবিলার প্রস্তুতি

এরপর মদিনায় সাধারণ সামরিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল। যে কোনো আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে জনগণ সদাসর্বদা রণসাজে সজ্জিত হতে লাগলেন। এমনকি নামাযের সময়েও তাঁরা অস্ত্রশস্ত্র সরিয়ে রাখতেন না।

এদিকে আনসারদের এক ক্ষুদ্র বাহিনী, যাদের মধ্যে সা'দ ইবনে মু'আয, উসায়েদ ইবনে হুযায়েল এবং সা'দ ইবনে উবাদাহ, রাসূল (ﷺ) কে পাহারা দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকতেন।

আরো কিছু সংখ্যক বাহিনী মদিনার বিভিন্ন প্রবেশ পথে নিয়োজিত হয়ে যান। এ আশংকায় যে, না জানি অসতর্ক অবস্থায় আকস্মিক কোনো আক্রমণের শিকার হতে হয়।

অন্য কিছু সংখ্যক বাহিনী শত্রুদের গতি বিধি লক্ষ করার জন্য গোয়েন্দাগিরির কাজ শুরু করে দেন।

মদিনার প্রান্তদেশে মক্কী সেনাবাহিনী

এদিকে মক্কী সেনাবাহিনী সুপ্রসিদ্ধ রাজপথ দিয়ে চলতে থাকে। যখন তারা 'আবওয়া' নামক স্থানে পৌঁছে তখন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা উত্তাহ এ প্রস্তাব দেয় যে, রাসূল (ﷺ) এর মাতার সমাধি উৎপাটন করা হোক। কিন্তু এর দরজা খুলে দেয়ার কঠিন পরিণামের কথা চিন্তা করে সেনাবাহিনী তার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

এরপর এ সেনাবাহিনী তাদের সফর অব্যাহত রাখে এবং শেষ পর্যন্ত মদিনার নিকটবর্তী হয়ে প্রথম 'আকীক' নামক উপত্যকা অতিক্রম করে। তারপর কিছুটা ডান দিয়ে বাঁকিয়ে উহুদের নিকটবর্তী আয়নাইন, নামকস্থানে শিবির স্থাপন করে, যা মদিনার উত্তরে 'কানাত' উপত্যকার কাছে অবস্থিত। এটা ছিলো তৃতীয় হিজরির ৬ই শাওয়াল, শুক্রবারের ঘটনা।

মদিনার প্রতিরক্ষার পরামর্শ সভার বৈঠক

মদিনার গোয়েন্দা বাহিনী মক্কী সেনাবাহিনীর এক একটি করে খবর মদিনায় পৌঁছিয়ে দিচ্ছিলেন। এমনকি তাদের শিবির স্থাপন সম্পর্কীয় শেষ সংবাদটাও তাঁরা পৌঁছিয়ে দেন। ঐ সময় রাসূল একটি পরামর্শ সভা আহ্বান করেন, যেখানে তিনি কৌশলপূর্ণ কর্মসূটি গ্রহণের জন্য পরামর্শ করার ইচ্ছা করেছিলেন। ঐ সভায় তিনি নিজের দেখা একটি স্বপ্নের কথাও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ আমি একটি ভালো জিনিস দেখেছি। আমি দেখি যে, কতকগুলো গাভী যবাহ করা হচ্ছে। আরো দেখি যে, আমার তরবারীর মাথায় কিছু ভঙ্গুরতা রয়েছে। আর এও দেখি যে, আমি আমার হাতখানা একটি সুরক্ষিত বর্মের মধ্যে ঢুকিয়েছি।' তারপর তিনি গভীর ব্যাখ্যা করেন যে, কিছু সাহাবা নিহত হবে। আর তরবারীর ভঙ্গুরতার ব্যাখ্যা করেন যে, তার বাড়ির কিছু লোক শহীদ হবেন এবং সুরক্ষিত বর্মের ব্যাখ্যা করেন যে, এর দ্বারা মদিনা শহরকে বুঝানো হয়েছে। অতঃপর রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরাম এর সামনে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি সম্পর্কে এ মত পেশ করেন যে, এবার নগরের বাইরে গমন করা কোনো মতেই সঙ্গত হবে না; বরং নগরের অভ্যন্তরে থেকে যুদ্ধ করাই সঙ্গত হবে। কেননা, মদিনা একটি সুরক্ষিত শহর। সুতরাং শত্রু-সৈন্য নগরের নিকটবর্তী হলে মুসলমানরা সহজেই তাদের ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হবে। আর মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদেরকে ইট পাটকেল ছুড়বে। এটাই ছিলো সঠিক মত। আর মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইও এ মত সমর্থন করে। সে এ পরামর্শ সভায় খাযরাজ গোত্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলো। সে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ মত সমর্থন করে নি; বরং যুদ্ধ থেকে দূরে থাকাই ছিলো তার মূল উদ্দেশ্যে। কারণ এর ফলে সে যুদ্ধকে এড়িয়ে যেতেও পারছে, আবার কেউ এর টেরও পাচ্ছেনা। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিলো ভিন্ন। তিনি চেয়েছিলেন যে, এ লোকটি তার সঙ্গী-সাথি সহ সর্ব সম্মুখে অপমানিত হোক এবং তার কপটতার ওপর যে পর্দা পড়ে ছিলো তা অপসারিত হোক। আর মুসলমানরা চরম বিপদের সময় যেন এটা জানতে পারে যে, তাদের জামার মধ্যে কতো সাপ চলাফেরা করছে।

কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবাদের একটি দল এ প্রস্তাবে অমত প্রকাশ করলেন। তারা নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আমরা এ প্রস্তাব সমর্থন করতে পারছি না। আমাদের মতে এ প্রকারে নগর অবরুদ্ধ হয়ে থাকলে শত্রুপক্ষের স্পর্ধা বেড়ে যাবে। তারা মনে করবে যে, আমরা তাদের বলবিক্রম দর্শনে ভিতু হয়ে পড়েছি। আমরা শত্রুপক্ষকে দেখাতে চাই যে, আমরা দুর্বল নই কিংবা কাপুরুষও নই। আজ যদি আমরা অগ্রসর হয়ে আক্রমণ করতে পারি তবে ভবিষ্যতে মক্কাবাসী আমাদেরকে আক্রমণ করতে এতো সহজে সাহসী হতে পারবে না।

আবার কেউ তো বলে ওঠলেন, ইয়া রাসূল আমরা তো এ দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা আল্লাহর কাছে এ মুহূর্তের জন্যই দু'আ করেছিলাম তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এটাই ময়দানে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। রাসূল পিতৃব্য বীরকুল কেশরী হামযা (রা) এতক্ষণ চুপ করে এসব আলোচনা শুনে যাচ্ছিলেন। এতক্ষণে তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, এ তো কথার মত কথা। আমরা সত্যের সেবক মুসলমান। সত্যের সেবায় আত্মোৎসর্গ করাই আমাদের পার্থিব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সফলতা। জয় পরাজয় আল্লাহর হাতে এবং জীবন মরণ তাঁরই অধিকারে। এ ভাবনা ভাববার কোনো দরকার আমাদের নেই। হে আল্লাহর সত্য নবী যিনি আপনার ওপর কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তাঁর শপথ। মদিনার বাইরে গিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ না করে আমি খাবার স্পর্শ করবো না।

রাসূল অধিকাংশের এ মতের সামনে নিজের মত পরিত্যাগ করলেন এবং মদিনার বাইরে গিয়েই শত্রু বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।

ইসলামী সেনাবাহিনীর বিন্যাস এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যাত্রা

এরপর রাসূল জুমার নামাযে ইমামতি করেন। খুতবা দানকালে তিনি জনগণকে উপদেশ দেন, সংগ্রামের প্রতি উৎসাহিত করেন এবং বলেন, ধৈর্য ও স্থিরতার মাধ্যমেই বিজয় লাভ সম্ভব হতে পারে। এর সঙ্গে তিনি তাদেরকে এ নির্দেশও দান করেন যে, তারা যেন মুকাবিলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে যায়। তাঁর এ নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে জনগণের মধ্যে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়।

অতঃপর আসরের নামাযান্তে রাসূল প্রত্যক্ষ করেন যে, লোকেরা জমায়েত হয়েছেন এবং আওয়ালীর অধিবাসীগণও এসে পড়েছেন। অতঃপর তিনি ভিতরে প্রবেশ করলেন, তাঁর সাথে আবু বকর এবং ওমর ও ছিলেন। তাঁরা তাঁর মাথায় পাগড়ী বেঁধে দিলেন ও দেহে পোশাক পরিয়ে দিলেন। তিনি ওপরে ও নিচে দুটি লৌহ বর্ম পরিধান করলেন, তরবারী ধারণ করলেন এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জনগণের সামনে আগমন করলেন।

জনগণ তাঁর আগমনের অপেক্ষায় তো ছিলেনই, কিন্তু তাঁর আগমনের পূর্বে সা'দ ইবনে মু'আয এবং উসায়েদ ইবনে হুযায়েল জনগণকে বলেন, 'আপনারা রাসূল কে জোরপূর্বক ময়দানে বের হতে উত্তেজিত করেছেন। সুতরাং এখন ব্যাপারটা তাঁর ওপরই ন্যস্ত করুন। এ কথা শুনে জনগণ লজ্জিত হলেন এবং যখন রাসূল অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বের হয়ে আসলেন তখন তাঁরা তার নিকট আরয করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার বিরোধিতা করা আমাদের মোটেই উচিত ছিলো না। সুতরাং আপনি যা পছন্দ করেন তাই করুন। যদি মদিনার অভ্যন্তরে অবস্থান করাই আপনি পছন্দ করেন তবে সেখানেই অবস্থান করুন, আমরা কোনো আপত্তি করবো না। তাঁদের এ কথার জবাবে রাসূল বললেন, 'কোনো নবী যখন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যান তখন তাঁর জন্যে অস্ত্রশস্ত্র খুলে ফেলা সমীচীন নয়, যে পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর ও শত্রুদের মধ্যে ফায়সালা করে না দেন।'

সেনাবাহিনীকে তিনভাগে বিভক্তকরণ

১. মুহাজিরদের বাহিনী- এর পতাকা মুস'আব ইবনে উমায়ের আবদারী (রা) কে প্রদান করা হয়।

২.আউস (আনসার) গোত্রের বাহিনী। এর পতাকা উবাই ইবনে যুবায়ের (রা) কে প্রদান করা হয়।

৩. খাযরাজ (আনসার) গোত্রের বাহিনী এর পতাকা হাব্বাব ইবনে মুনযির (রা) কে প্রদান করা হয়।

মোট সৈন্য সংখ্যা ছিলো এক হাজার, যাদের মধ্যে একশজন ছিলেন বর্ম পরিহিত এবং পঞ্চাশ জন ছিলেন অশ্বারোহী। আবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, অশ্বারাহী একজনও ছিলেন না। ইবনে উম্মি মাখতূম (রা) কে এ কাজে নিযুক্ত করেন যে, তিনি ঐ লোকদেরকে নামায পড়াবেন যারা মদিনাতেই রয়ে গেছেন। এরপর তিনি সেনাবাহিনীকে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দেন এবং মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে চলতে শুরু করে। সা'দ ইবনে মা'আয (রা) ও সা'দ ইবনে উবাদাহ (রা) বর্ম পরিহিত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর আগে আগে চলছিলেন।

এ কথাটি ইবনু কাইয়্যম বর্ণনা করেছেন। ইবনু হাজার বলেন, এটা ভুল কথা। মুসা ইবনু উকবা জোর দিয়ে বলেন যে, উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে ঘোড়াই ছিলো না। ওয়াকেদী বলেন যে, শুধু দু'টি ঘোড়া ছিলো। একটি ছিলো রাসূল (ﷺ) এর নিকট এবং আরেকটি ছিলো আবু বরদাহ (রা) এর নিকট। 'সানিয়াতুল বিদা' হতে সম্মুখে অগ্রসর হলে তাঁরা এমন বাহিনী দেখতে পান, যারা অত্যন্ত উত্তম অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিলো এবং পুরো সেনাবাহিনী হতে পৃথক ছিলো। তাদের সম্পর্কে রাসূল জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারেন যে, তারা খাযরাজের মিত্র ইহুদি, যারা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চায়। রাসূল তখন জিজ্ঞেস করেন, "এরা মুসলমান হয়েছে কি? জনগণ উত্তরে বলেন, 'না'। তখন তিনি মুশরিকদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য নিতে অস্বীকৃতি জানালেন।

সৈন্য পর্যবেক্ষণ

অতঃপর রাসূল শায়খান নামক স্থানে পৌছে সৈন্যবাহিনী পরিদর্শন করেন। যারা ছোট ও যুদ্ধের উপযুক্ত নয় বলে প্রতীয়মান হলো তাদেরকে তিনি ফিরিয়ে দিলেন। তাদের নাম হচ্ছে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর, যায়েদ ইবনে আরকাম, আরবাহ ইবনে আউস, আমর ইবনে হাযম, আবু সাঈদ খুদরী, যায়েদ ইবনে হারিসাহ আনসারী, এবং সাআদ ইবনে হিব্বাহ (রা)।

এ তালিকাতেই বারা ইবনে আযিবের নামও উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সহিহ বুখারিতে যে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তার দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, তিনি উহুদের যুদ্ধে শরীক ছিলেন। অবশ্যই অল্প বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও রাফে ইবনে খাদীজ এবং সামুরাহ ইবনে জুনদুব যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি লাভ করেন। এর কারণ ছিলো এই যে রাফে ইবনে খাদীজ বড়ই সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলো। যখন তাঁকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেয়া হলো তখন সামুরাহ ইবনে জুনদুর বললেন, 'আমি রাফে অপেক্ষা বেশি শক্তিশালী। আমি তাঁকে কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারি। রাসূল কে এ সংবাদ দেয়া হলে তিনি তাদের দুজনকে কুস্তিতে লাগিয়ে দেন এবং সত্যি সত্যিই সামুরাহ রাফেকে পরাস্ত করে দেন। সুতরাং তিনিও যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি পেয়ে যান।

উহুদ ও মদিনার মধ্যস্থলে রাত্রি যাপন

এখানেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিলো। সুতরাং রাসূল এখানে মাগরিব ও এশার নামায পড়েন এবং এখানেই রাত্রি যাপনের ফায়সালা করেন। পাহারার জন্যে পঞ্চাশ জন সাহাবি কে নির্বাচন করেন, যারা শিবিরের চার পাশে টহল দিবে। তাদের পরিচালক ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা আনসারী (রা)। ইনি ঐ বুযুর্গ ব্যক্তি যিনি কা'ব ইবনে আশরাফের হত্যাকারী দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সাফওয়ান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস (রা) নির্দিষ্টভাবে রাসূল এর পাশে পাহারা দিচ্ছিলেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার সঙ্গীদের শঠকারিতা

ফজর হওয়ার কিছু পূর্বে রাসূল (ﷺ) পুনরায় চলতে শুরু করলেন এবং 'শাওত' নামক স্থানে পৌঁছে ফজরের নামায আদায় করলেন। এখন তিনি শত্রুদের একেবারে নিকটেই ছিলেন এবং উভয় সোনাবাহিনী একে অপরকে দেখতে ছিলো। এখানে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সে এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য অর্থাৎ তিন'শ জন সৈন্য নিয়ে একথা বলতে বলতে ফিরে গেল যে, অযথা কেন জীবন দিতে যাবে? সে এ বিতর্কও উত্থাপন করল যে, রাসূল তাঁর কথা না মেনে অন্যদের কথা মেনে নিয়েছেন।

রাসূল তাঁর কথা মেনে নেন নি এটা তার মুসলিম বাহিনী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণ অবশ্যই ছিলো না। কেননা, এ অবস্থায় নবীর সেনাবাহিনীর সাথে এতদূর পর্যন্ত তার আসার কোনো প্রশ্নই ওঠতো না। বরং সেনাবাহিনীর যাত্রা শুরু হওয়ার পূর্বেই তার পৃথক হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো। সুতরাং প্রকৃত ব্যাপার তা নয় যা সে প্রকাশ করেছিলো; বরং প্রকৃত ব্যাপার ছিলো এই যে, ঐ সংকটময় মুহূর্তে পৃথক হয়ে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই ছিলো তার মুখ্য উদ্দেশ্যে। যাতে একদিকে সাধারণ সৈন্যরা রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গত্যাগ করে এবং যারা বাকি থাকবে তাদেরও উদ্যম ও মনোবল ভেঙ্গে পড়ে। পক্ষান্তরে এ দৃশ্য দেখে শত্রুদের সাহস বেড়ে যায়। সুতরাং তার এ কাজে মূলত ঐ মুনাফিকদের এই আশা ছিলো যে, শেষ পর্যন্ত তার ও তার বন্ধুদের নেতৃত্বের জন্য ময়দান সাফ হয়ে যাবে।

এ মুনাফিকদের কোনো কোনো উদ্দেশ্যে সফল হবারও উপক্রম হয়েছিলো। কেননা, আরো দুটি দলের মধ্যে বনু হাসিসাহ এবং খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বনু সালমারও পদস্খলন ঘটতে যাচ্ছিল এবং তারা ফিরে যাবার চিন্তা ভাবনা করছিলো। কিন্তু আল্লাহ তাদের সহায়তা করেন। ফলে তাঁদের চিত্তচাঞ্চল্য দূর হয়ে যায় এবং তারা ফিরে যাবার সংকল্প ত্যাগ করে। তাদের সম্পর্কেই আল্লাহ ইরশাদ করেন:

'যখন তোমাদের মধ্যে দুটি দলের সাহস হারাবার উপক্রম হয়েছিলো অথচ আল্লাহ উভয়ের সহায়ক ছিলেন, আল্লাহর প্রতিই যেন মুমিনরা নির্ভর করে।' (আল ইমরান: আয়াত-১২২)

যাহোক, মুনাফিকরা ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে ঐ সংকটময় সময়ে জাবির (রা) এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা) তাদেরকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার ইচ্ছা করেন। সুতরাং তিনি তাদেরকে ধমকের সুরে (যুদ্ধের জন্যে) ফিরে আসার উৎসাহ প্রদানপূর্বক তাদের পিছনে পিছনে চলতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন, "এসো, আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর।" কিন্তু তারা উত্তরে বলল, "যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম" এ উত্তর শুনে আবদুল্লাহ ইবনে হারাম (রা) নিম্নরূপ কথা বলতে বলতে ফিরে আসলেন, "ওরে আল্লাহর শত্রুরা! তোদের ওপর আল্লাহর গজব পড়ুক। মনে রাখিস যে, আল্লাহ স্বীয় নবী কে তাদের থেকে অমুখাপেক্ষী করবেন।" এসব মুনাফিকের সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন:

আর যাতে তিনি জেনে নেন মুনাফিকদেরকে। আর তাদেরকে বলা হয়েছিল, ‘এসো, আল্লাহর পথে লড়াই কর অথবা প্রতিরোধ কর’। তারা বলেছিল, ‘যদি আমরা লড়াই হবে জানতাম তবে অবশ্যই তোমাদেরকে অনুসরণ করতাম’। সেদিন তারা কুফরীর বেশি কাছাকাছি ছিল তাদের ঈমানের তুলনায়। তারা তাদের মুখে বলে, যা তাদের অন্তরসমূহে নেই। আর তারা যা গোপন করে সে সম্পর্কে আল্লাহ অধিক অবগত। (আল ইমরান: আয়াত ১৬৭)

উহুদ প্রান্তে অবশিষ্ট ইসলামি সোনাবাহিনী

মুনাফিকদের হঠকারিতা ও প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল অবশিষ্ট সাত'শ জন সৈন্য নিয়ে শত্রুবাহিনীর দিকে ধাবিত হলেন। শত্রুদের শিবির তাঁর মাঝে ও উহুদের মাঝে কয়েক দিক থেকে বাধা সৃষ্টি করছিলো। তাই, তিনি প্রশ্ন করলেন, শত্রুদের পার্শ্ব দিয়ে গমন ছাড়াই ভিন্ন কোনো পথ দিয়ে আমাদেরকে নিয়ে যেতে পারে এমন কেউ আছে কি? এ প্রশ্নের জবাবে আবু খাইসামা (রা) নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল। এ খিদমতের জন্য আমি হাযির আছি। অতঃপর তিনি এক সংক্ষিপ্ত পথ অবলম্বন করলেন, যা মুশরিকদের সেনাবাহিনীকে পশ্চিম দিকে ছেড়ে দিয়ে বনু হারিসা গোত্রের শস্য ক্ষেতের মধ্য দিয়ে চলে গিয়েছিলো।

এ পথ ধরে যাবার কালে তাদেরকে মিরবা ইবনে কাইযীর বাগানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ লোকটি মুনাফিক ছিলো এবং অন্ধও ছিলো। সে সেনাবাহিনীর আগমন অনুধাবন করে মুসলমানদের মুখমণ্ডলে ধুলো নিক্ষেপ করল এবং বলতে লাগল, আপনি যদি আল্লাহর রাসূল হন তবে জেনে রাখুন যে, আমার বাগানে আপনার প্রবেশের অনুমতি নেই।

তার একথা শোনা মাত্র মুসলমানেরা তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো। কিন্তু রাসূল তাদেরকে বললেন, "তাকে হত্যা করোনা, সে অন্তর ও চোখের অন্ধ।"

তারপর নবী করীম (ﷺ) সম্মুখে অগ্রসর হয়ে উপত্যকার শেষ মাথায় অবস্থিত উহুদ পাহাড়ের ঘাটিতে অবতরণ করেন এবং সেখানে মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপন করেন। সামনে ছিলো মদিনা এবং পেছনে হলো সুউচ্চ উহুদ পর্বত। এভাবে শত্রুদের বাহিনী মুসলমান ও মদিনার মাঝে পৃথককারী সীমানা হয়ে গেল।

সেনা বাহিনী শ্রেণি বিন্যাস ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা

এখানে পৌঁছে রাসূল সেনাবাহিনীর শ্রেণি-বিন্যাস করেন এবং সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি সারিতে বিভক্ত করে নেন। সুনিপুণ তীরন্দাযদের একটি দলও নির্বাচন করা হয়। তাঁরা ছিলেন সংখ্যায় পঞ্চাশ জন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের ইবনে নু'মান আনসারী দাওসী বাদরী (রা) এ দলের অধিনায়ক পদে নিয়োজিত হন। তাঁর দলকে কানাত উপত্যকার দক্ষিণে ইসলামী সৈন্যদের ক্যাম্প থেকে পূর্ব-দক্ষিণে এক শত পঞ্চাশ মিটার দূরত্বে একটি ছোট পাহাড়ের ধারে অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। ঐ পাহাড়টি এখন জাবালে 'রুমাত' নামে প্রসিদ্ধ। ঐ পর্বতমালার মধ্যে একটি গিরিপথ ছিলো। শত্রু সৈন্যরা যাতে পশ্চাৎ দিক থেকে আক্রমণ করতে না পারে এজন্য এ পঞ্চাশ জন তীরন্দাযকে ঐ গিরিপথ রক্ষা করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তাদেরকে বলা হয় অশ্বারোহীদেরকে তীর মেরে আমাদের থেকে দূরে রাখবে। তারা যেন পেছন থেকে কোনো ক্রমেই আমাদেরকে আক্রমণ করতে না পারে। সাবধান, আমাদের জয় পরাজয় যাই হোক না কেনো, তোমাদের দিক থেকে যেন আক্রমণ না হয়।

তারপর রাসূল পুনরায় অধিনায়ককে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা আমাদের পিছন দিক রক্ষা করবে। যদি তোমরা দেখ যে, আমরা মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছি তবুও তোমরা আমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসবে না। আর যদি দেখতে পাও যে, আমরা গণীমতের মাল একত্রিত করছি তবে তখনও তোমরা আমাদের সাথে শরীক হবে না।

আর সহিহ বুখারির শব্দ অনুযায়ী রাসূল বলেছিলেন, তোমরা যদি দেখ যে, পক্ষীকুল আমাদেরকে ছোঁ মারছে, তথাপিও তোমরা নিজেদের জায়গা ছাড়বে না, যে পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে ডেকে না পাঠাই।

এ কঠিনতম সামরিক নির্দেশাবলি দিয়ে এ বাহিনীকে তিনি ঐ পাহাড়ের গিরিপথে মোতায়েন করে দেন, যে পথ দিয়ে মুশরিকবাহিনীর পিছন দিক থেকে মুসলমানদের আক্রমণ করার খুবই আশংকা ছিলো।

রাসূল (ﷺ) অবশিষ্ট সৈন্যের শ্রেনিবিন্যাস এভাবে করেন যে, দক্ষিণ দিকে মুনযির ইবনে আমরকে নিযুক্ত করেন এবং বাম দিকে নিযুক্ত করেন যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে নিযুক্ত করেন এবং তার উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় যে, তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদের অশ্বারোহী বাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন। এ শ্রেণিবিন্যাস ছাড়াও সারির সম্মুখভাবে এমন বাছাইকৃত মুসলিম বীর মুজাহিদদেরকে নিযুক্ত করা হয় যাদের বীরত্বের খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং যাদের প্রত্যেককে হাজারের সমান মনে করা হতো। রাসূলের এ শ্রেণীবিন্যাস ছিলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কৌশলপূর্ণ এবং এর দ্বারা তাঁর সামরিক দক্ষতা প্রমাণিত হয়। কোনো কমাণ্ডার, সে যতই দক্ষ ও যোগ্য হোক না কেন, রাসূল অপেক্ষা অধিক সূক্ষ্ম ও নিপুণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে না। কেননা, দেখা যায় যে, তিনি যদিও শত্রুবাহিনীর পরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছেন, তথাপি তিনি স্বীয় সেনাবাহিনীর জন্যে এমন স্থান নির্বাচন করেছেন যা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে উত্তম স্থান ছিলো। অর্থাৎ তিনি পাহাড়কে আড়াল করে নিয়ে পিছন ও দক্ষিণ দিক রক্ষিত করে নেন এবং যে গিরিপথ দিয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণের আশংকা ছিলো ওটা নির্বাচন করেন। কারণ, যদি আল্লাহ না করুন পরাজয় বরণ করতে হয় তবে যেন পলায়নের পরিবর্তে শিবিরের মধ্যেই আশ্রয় নিতে পারা যায়। যদি শত্রুরা শিবির দখল করার জন্যে এগিয়ে আসে তবে যেন তাদেরকে ভীষণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। অপরপক্ষে তিনি শত্রু বাহিনীকে তাদের শিবির স্থাপনের জন্যে এমন নিচু জায়গা গ্রহণ করতে বাধ্য করেন যে, তারা জয়লাভ করলেও যেন তেমন কোনো সুবিধা লাভ করতে না পারে। আর মুসলমানরা বাছাই করা বীর পুরুষদের একটি দল গঠন করে সামরিক সংখ্যার স্বল্পতা পূরণ করে দেন। এ ছিলো নবী করীম (ﷺ) এর সেনাবাহিনীর শ্রেণিবিন্যাস যা তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসের ৭ তারিখ শনিবারে কার্যকর হয়েছিলো।

রাসূল (ﷺ) সেনাবাহিনীর মধ্যে বীরত্বের প্রেরণাদান করেন

রাসূল (ﷺ) ঘোষণা করেন যে, তিনি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ যেন যুদ্ধ শুরু না করে। তিনি নিচে ও ওপরে দু'টি লৌহ বর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরাম (রা) কে যুদ্ধের প্রতি উৎসাহ প্রদানপূর্বক জোর দিয়ে বলেন যে, তারা যেন শত্রুদের সাথে মুকাবিলার সময় অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে বীরত্বের প্রেরণা দিয়ে তিনি একখানা অত্যন্ত ধারলো তরবারী হাতে নিয়ে বলেন, কে এটা গ্রহণ করবে? কে এর মর্যাদা রক্ষা করবে? বলাবাহুল্য যে ঐ তরবারী খানা গ্রহণের জন্য চারদিক থেকে শত শত বাহু ঊর্ধ্বে উত্থিত হয়েছিলো, যার মধ্যে আলী ইবনে আবু তালিব, জোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং ওমর ইবনে খাত্তাবও ছিলেন। উপস্থিত ভক্তগণের মধ্যে অনেকেই ওটা গ্রহণ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করতে লাগলেন। কিন্তু তা গ্রহণের জন্য আবু দুজানাহ সিমাক ইবনে খারাশাহ (রা) সবার আগে অগ্রসর হলেন এবং বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এ তরবারীর হক কী!" রাসূল! বললেন, এর দ্বারা তুমি শত্রুদের মুখমণ্ডলে এমন আঘাত হানবে যেন তা বেঁকে যায়। তখন তিনি বললেন; আমি এর হক আদায় করব। তখন তলোয়ারটি তাঁর হাতে দেয়া হলো।

তলোয়ারটি হাতে পেয়ে আবু দুজানাহর গর্ব দেখে কে? তিনি মাথায় লাল রুমালের খুব সুন্দর পাগড়ি বেঁধে নিয়ে হেলতে দুলতে ও নাচতে নাচতে গিয়ে কুরাইশ বাহিনীর ওপর চড়াও হলেন। এ দৃশ্য অবলোকন করে নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'এরূপ চাল চলন আল্লাহ পছন্দ করেন না বটে, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে নয়।"

মুশরিক বাহিনীর বিন্যাস

মুশরিকগণও কাতারবন্দী নীতির অনুসরণে নিজেদের সেনাবাহিনীর বিন্যাস সাধন করেছিলো। তাদের সেনাপতি ছিলেন আবু সুফিয়ান। তিনি নিজের কেন্দ্র তৈরি করেছিলেন সেনাবাহিনীর মধ্যস্থলে। দক্ষিণ দিকে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালীদ, যিনি তখনও মুশরিক ছিলেন। বাম দিকে ছিলেন ইকরামা ইবনে আবু জাহল। পদাতিক সৈন্যের সেনাপতি ছিলেন সফওয়ান ইবনে উমাইয়া আর তীরন্দাযদের নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে রাবীয়াহ।

তাদের পতাকা ছিলো বনু আবদিদ্দারের ছোট একটি দলের হাতে। এ পদ তারা ঐ সময় লাভ করেছিলো, যখন বনু আবদি মানাফ কুসাই হতে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পদসমূহকে পরস্পর বন্টন করে নিয়েছিলো। তারপর পূর্বপুরুষ হতে যে প্রথা চলে আসছিলো ওটাকে সামনে রেখে কেউ এ পদের ব্যাপারে তাদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে পারত না। কিন্তু সেনাপতি আবু সুফিয়ান তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বদরের যুদ্ধে তাদের পতাকা বাহক নযর ইবনে হারিস বন্দী হলে কুরাইশকে বড়ই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিলো। এটা স্মরণ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথেই তাদের ক্রোধ বৃদ্ধি করার জন্যে বললেন, "হে বনী আবদিদ্দার গোত্র! বদরের যুদ্ধের দিন আমাদের পতাকা তোমরা নিয়ে রেখেছিলে। ঐ দিন আমাদেরকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিলো তা তোমরা অবগত আছ। প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীর ওপর পতাকার দিক থেকেই বিপদ নেমে আসে। যখন পতাকা পতিত হয়, তখন তাদের পা আলগা হয়ে যায়। সুতরাং এবার তোমরা আমাদের পতাকা সঠিকভাবে ধারণ করে থাকবে অথবা আমাদের পতাকা আমাদেরকেই দিয়ে দিবে। আমরা নিজেরাই এর ব্যবস্থা করবো।" এ কথোপকথনে আবু সুফিয়ানের যে উদ্দেশ্যে ছিলো তাতে তিনি সফল হন। কেননা, একথা শুনে বনু আবদিদ্দার ভীষণ চটে যায় এবং ক্রোধে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। তারা বলে ওঠে, "আমরা আমাদের পতাকা তোমাদেরকে দেবো? কাল মুকাবিলা হলে আমরা কি করি তা দেখতে পাবে।" আর বাস্তবিকই যখন যুদ্ধ শুরু হলো তখন তারা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত এক এক করে সবাই মৃত্যুর কবলে পতিত হলো।

কুরাইশের রাজনৈতিক চাল

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু পূর্বে কুরাইশরা মুসলমানদের সারিতে বিচ্ছিন্নতা ও বিবাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। এ উদ্দেশ্যে আবু সফিয়ান আনসারদের নিকট পয়গাম পাঠান, তোমরা আমাদের স্বগোত্রস্থ লোকগুলোকে পরিত্যাগ করে সরে দাড়াও, আমরা তোমাদেরকে কিছুই বলবো না, তোমাদের নগর আক্রমণ করবো না এবং এখান হতেই ফিরে যাবো।' আবু সুফিয়ানের এ জঘন্য প্রস্তাব শ্রবণ করা মাত্রই আনসারগণ ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠলেন এবং তাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। উভয় সেনাবাহিনী একে অপরের নিকটবর্তী হলে কুরাইশরা তাদের পূর্বোক্ত উদ্দেশ্যে সফল করার লক্ষ্যে অন্য এক চেষ্টা করলো এবং সেটি হলো, মদিনার আউস বংশে আবু আমির ইবনে সায়ফী। ইসলামের পূর্বে সে 'রাহিব' (বনবাসী) আখ্যায় আখ্যায়িত ছিলো। কিন্তু, ইসলামের আবির্ভাব ঘটলে রাসূল তার নাম রেখেছিলেন 'ফাসিক' (লম্পট) অজ্ঞতার যুগে সে আউস গোত্রের সর্দার ছিলো। কিন্তু, ইসলামের আবির্ভাব ঘটলে ওটা তার গলার ফাঁস হয়ে যায় এবং প্রকাশ্যভাবে সে রাসূল (ﷺ) এর শত্রুতায় লেগে পড়ে।

আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা দলে দলে মুসলমান হয়ে যাচ্ছে দেখে সে কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় পালিয়ে যায় এবং সেখানে কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। মদিনার এ প্রবীণ পুরোহিত কতিপয় দুর্ধর্ষ সৈন্য কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়ে সর্বপ্রথমে ময়দানে উপস্থিত হলো এবং আনসারদেরকে সম্বোধনপূর্বক উচ্চ কন্ঠে বলতে লাগলো, হে মদিনার অধিবাশিরা! আমাকে চিনতে পারছ কি? আমি তোমাদের পুরোহিত আবু আমির। তোমরা মুহাম্মদ কে ত্যাগ করে আমার সাথে যোগদান কর, তোমাদের কল্যাণ হবে।' কিন্তু আনসারগণ এখন পুরোহিতদের প্রবঞ্চনার অতীত, তারা সমবেত কন্ঠে উত্তর দিলেন, দূর হও প্রবঞ্চক তোর পৌরহিত্যের কোনো ধার আমরা ধারি না, তোর অভিসন্ধি সিদ্ধ হবে না।' আবু আমির কুরাইশদেরকে আশা দিয়ে বলেছিলো, 'আমি মদিনার পুরোহিত, যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে আমি একবার আহ্বান করলে মদিনাবাসী সবাই আমার দলে যোগদান করবে।'

কিন্তু আনসারদের উত্তর শুনে সে বলতে লাগল, দেখছি, আমার অবর্তমানে হতভাগারা একেবারে বিগড়ে গেছে। অতঃপর তার পৌরহিত্যের ক্ষুব্ধ অভিমান পুরাতন প্রতিহিংসার সাথে যোগ দিয়ে প্রচণ্ড হয়ে ওঠলো এবং এ হতভাগ্যই সর্বপ্রথমে সদলবলে পাথর ও তীর বর্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধের সুত্রপাত করে দিল এবং শেষে আক্রমণের উপযুক্ত প্রত্যুত্তর পেয়ে সরে দাঁড়াল। এভাবে কুরাইশের পক্ষ হতে মুসলমানদের কাতারে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে গেল। সংখ্যার আধিক্য ও সাজ-সরঞ্জামের প্রাচুর্য সত্ত্বেও মুশরিকগণ মুসলমানদের ভয়ে কিরূপ ভীত হয়েছিলো ওপরের ঘটনা দ্বারা তা সহজেই অনুমান করা যায়।

যুদ্ধোন্মাদনা ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্যে কুরাইশ মহিলাদের কর্ম তৎপরতা

এদিকে কুরাইশ মহিলারাও যুদ্ধে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্যে তৎপর হয়ে ওঠল। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ইবনে উত্তাহ। এ মহিলারা সারিসমূহে ঘুরে ঘুরে ও দফ বাজিয়ে বাজিয়ে লোকদেরকে উত্তেজিত করল। কখনো কখনো তারা পতাকা বাহকদেরকে সম্বোধন করে বলতো- 'দেখো, হে বানু আবদিদ্দার। দেখো, হে পিছনের রক্ষকবৃন্দ। তরবারী দ্বারা খুব আঘাত কর।'

উত্তেজিত করতে গিয়ে কখনো কখনো তারা বলত- 'যদি তোমরা অগ্রসর হও তবে আমরা তোমাদেরকে আলিঙ্গন করব ও তোমাদের জন্যে শয্যা রচনা করব। আর যদি তোমরা পশ্চাদপদ হও তবে আমরা (তোমাদের হতে) চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব।'

যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন

এরপর উভয় দল সম্পূর্ণ মুখোমুখী হয়ে যায় এবং একে অপরের নিকটবর্তী হয় ও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুশরিকদের পতাকাবাহী তালহা ইবনে আবু তালহা আবদারী যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন হয়। এ লোকটি ছিলো কুরাইশের বড়ো বীর পুরুষ এবং অশ্বারোহী। মুসলমানরা তাকে কাবশুল কুতায়বা (সৈন্যদের ভেড়া) বলতেন। সে উষ্ট্রের ওপর আরোহণ করে বেরিয়ে পড়ল এবং মুকাবিলার জন্যে আহ্বান করল। তার অত্যধিক বীরত্বের কারণে সাধারণ সাহাবিগণ তার সাথে মুকাবিলা করার সাহস করলেন না। কিন্তু যুবায়ের (রা) অগ্রসর হন এবং এক মুহূর্তের অবকাশ না দিয়ে সিংহের মতো লাফ দিয়ে উটের ওপর চড়ে বসেন এবং তাকে নিজের আয়ত্বের মধ্যে নিয়ে নেন। অতঃপর ভূমিতে লাফিয়ে পড়ে তাকে তরবারী দ্বারা দু'টুকরো করে দেন।

নবী করীম (ﷺ) এ আশাব্যঞ্জক দৃশ্য দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং উচ্চৈস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবিগণও তাকবীর পাঠ করেন। অতঃপর রাসূল যুবায়ের এর প্রশংসা করে বলেন, 'প্রত্যেক নবীরই একজন সহচর থাকেন আর আমার সহচর হলেন যুবায়ের।'

যুদ্ধের কেন্দ্রস্থল এবং পতাবাহকদের প্রাণনাশ

এরপর চুতর্দিক হতে যুদ্ধের অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে এবং সারাটা ময়দানে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুশরিকদের পতাকা প্রতিষ্ঠিত ছিলো যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রস্থলে। বনু আবদিদ্দার নিজেদের কমান্ডার তালহা ইবনে আবু তালহার হত্যার পর একের পর এক পতাকাধারণ করে থাকে। কিন্তু তারা সবাই নিহত হয়। সর্বপ্রথম তালহার ভাই উসমান ইবনে আবু তালহা পতাকা উঠিয়ে নেয় এবং নিম্নের ছন্দ পাঠ করতে করতে সম্মুখে অগ্রসর হয়।

"পতাকাধারীদের অবশ্য কর্তব্য এ যে, তাদের পাতাকা রক্তে রঞ্জিত হবে অথবা ছিড়ে যাবে।" উভয়ে একে অপরের ওপর তরবারীর আঘাত করে। কিন্তু আলী (রা) এর তরবারীর আঘাতে আবু সা'দ নিহত হয়। এরপর মুসাফে ইবনে সাবিত ইবনে আবু আফলাহ (রা) তাঁকে তীর মেরে হত্যা করেন। তারপর তার ভাই কিলাব ইবনে তালহা ইবনে আবু তালহা পাতাকা তুলে ধরেন। কিন্তু যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা) তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তার প্রাণনাশ করেন। অতঃপর ঐ দুজনের ভাই জিলাস ইবনে তালহা ইবনে আবু তানহা পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ (রা) তীর মেরে তাঁকে শেষ করে দেন। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, আ'সিম ইবনে সাবিত ইবনে আবু আফলাহ (রা) তীর মেরে তাকে খতম করে দেন।

এরা একই পরিবারের ছয় ব্যক্তি ছিলো। অর্থাৎ সবাই আবু তালহা আবদিল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে আবদিদ্দারের পুত্র অথবা পৌত্র ছিলো, যারা মুশরিকদের পাতাকা রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়। এরপর বনু আবদিদ্দার গোত্রের আরতাত ইবনে শূরাহবীল নামক আর একটি লোক পতাকা উঠিয়ে নেয়। কিন্তু আলী ইবনে আবু তালিব এবং মতান্তরে হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাকে হত্যা করেন। অতঃপর শুরাহ ইবনে কায়েয পতাকা তুলে ধরে। কিন্তু কুযমান তাকে হত্যা করে। কুযমান মুনাফিক ছিলো এবং ইসলামের পরিবর্তে গোত্রীয় মর্যাদা রক্ষার উত্তেজনায় যুদ্ধ করতে এসেছিলো।

শুরাইহর পর আবু যায়েদ আমর ইবনে আবদি মানাফ আবদারী পতাকা উঠিয়ে নেয়। কিন্তু কুযমানের হাতে সেও মারা পড়ে। বনু আবদিদ্দার গোত্রের এ দশ ব্যক্তি, যারা মুশরিকদের পতাকা উঠিয়েছিল, সবাই নিহত হলো। এরপর গোত্রের কোনো লোকই জীবিত থাকলো না, যে পতাকা উঠাতে পারে। কিন্তু ঐ সময় 'সুওয়াব' নামক তাদের এক হাবশী গোলাম লাফিয়ে গিয়ে পতাকা উঠিয়ে নেয় এবং তার পূর্ববর্তী পতাকাবাহী মনিবদের চেয়েও বেশি বল বিক্রমে যুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত এক এক করে তার হাত কাটা পড়ে। কিন্তু এর পরেও সে পতাকা পড়তে দেয়নি; বরং নিজের হাঁটুর ভরে বসে বক্ষ ও কাঁধের সাহায্যে পতাকা খাড়া করে রাখে। অবশেষে সে কুযমানের হাতে নিহত হয়। ঐ সময়েও সে বলছিলো, 'হে আল্লাহ! এখন তো আমি কোনো ওযর রাখিনি।' ঐ গোলাম অর্থাৎ সুওয়াব নিহত হওয়ার পর পতাকা ভূমির ওপর পড়ে যায় এবং ওটা উঠাতে পারে এমন কেউই বেঁচে রইল না। এ কারণে ওটা পড়েই রইল।

অবশিষ্ট অন্যান্য অংশসমূহে যুদ্ধের অবস্থা

একদিকে মুশরিকদের পতাকা, যুদ্ধের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত ছিলো, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের অন্যান্য অংশসমূহে কঠিন যুদ্ধ চলছিলো। মুসলমানদের সারিসমূহের ওপর ঈমানের রূহ ছেয়ে ছিলো। এ কারণে তারা মুশরিক ও কাফির সৈন্যদের ওপর ঐ জলপ্লাবনের মতো ভেঙ্গে পড়ছিলেন যার সামনে কোনো বাঁধ টিকে থাকে না। এ সময় মুসলমানরা 'আমিত' 'আমিত' মেরে ফেল, মেরে ফেল, বলছিলেন।

আবু দুজানাহ (রা) মুশরিকদের সারি গুলি উলট পালট করে দেন

এদিকে আবু দুজানাহ (রা) তার লাল পাগড়ী বেঁধে রাসূল (ﷺ) এর তরবারী উঠিয়ে নেন এবং এর হক আদায় করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন ও যুদ্ধ করতে করতে বহু দূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। যে মুশরিকের সাথেই তাঁর মুকাবিলা হতো তাঁকেই তিনি হত্যা করে ফেলতেন।

যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা) বর্ণনা করেছেন, 'যখন আমি রাসূলের নিকট তরবারী চাই এবং তিনি আমাকে তা দেননি, তখন আমার অন্তরে চোট লাগে। আমি মনে মনে চিন্তা করি যে, আমি রাসূল এর ফুফু সফিয়ার পুত্র এবং একজন কুরাইশ। আমি তাঁর নিকট গিয়ে আবু দুজানার পূর্বেই তরবারী চেয়ে বসি।

কিন্তু তিনি আমাকে তা না দিয়ে আবু দুজানাকেই দিয়ে দেন। এজন্যে আমি আল্লাহর নামে শপথ করি যে, আবু দুজানাহ তরবারী দ্বারা কি করেন তা আমি অবশই দেখবো। সুতরাং আমি তাঁর পিছনে পিছনে থাকতে লাগলাম। দেখি যে, তিনি তার লাল পাগড়ীটি বের করে মাথায় বেঁধে নিলেন। তাঁর একাজ দেখে আনসারগণ মন্তব্য করলেন, 'আবু দুজানাহ (রা) মৃত্যুর পাগড়ী বেঁধেছেন।' অতঃপর তিনি নিম্নের কবিতা বলতে বলতে যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হলেন:

'আমরা যখন খেজুর বাগান প্রান্তে ছিলাম তখন আমি আমার বন্ধু রাসূলের নিকট এ অঙ্গীকার করেছি যে, কখনই আমি যুদ্ধে সারির পিছনে থাকবো না, (বরং সামনে অগ্রসর হয়ে) আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের তরবারী চালনা করবো।"

এরপর তিনি যাকেই সামনে পেতেন তাকে হত্যা করে ফেলতেন। এ দিকে মুশরিকদের মধ্যেও একজন লোক ছিলো, যে আমাদের কোনো আহতকে পেলেই তাকে শেষ করে ফেলতো। এ দুজনে ক্রমে ক্রমে নিকটবর্তী হতে যাচ্ছিল। আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলাম যে, যেন তাদের দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। ঘটনাক্রমে তাই হলো। উভয়ে একে অপরের ওপর আঘাত হানল। প্রথমে মুশরিকটি আবু দুজানাহ এর ওপর তরবারীর আঘাত করল। কিন্তু আবু দুজানাহ (রা) এ আক্রমণ ঢাল দ্বারা প্রতিরোধ করলেন এবং মুশরিকের তরবারী ঢালে আটকে গেল। এরপর তিনি ঐ মুশরিকের ওপর তরবারীর আক্রমণ চালালেন এবং সেখানেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।

এরপর আবু দুজানাহ মুশরিকের সারিগুলি ছিন্ন ভিন্ন করতে করতে সামনে এগিয়ে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত কুরাইশী নারীদের নেত্রী পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। কিন্তু সে যে নারী এটা তাঁর জানা ছিলো না। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেছেন, 'আমি একটি লোককে দেখলাম যে, সে খুব জোরে শোরে মুশরিক সেনাবাহিনীকে উত্তেজিত করছে। সুতরাং আমি তাকে আমার নিশানার মধ্যে নিয়ে ফেললাম। কিন্তু যখন আমি তাঁকে তরবারী দ্বারা আক্রমণ করার ইচ্ছা করলাম তখন সে হায়! হায়! করে চীৎকার করে উঠল। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, সে একজন মহিলা। আমি রাসূল (ﷺ) এর তরবারী দ্বারা একজন মহিলাকে হত্যা করে তা কলংকিত করলাম না।

এ মহিলাটি ছিলো হিন্দা বিনতে উত্তাহ। আমি আবু দুজানাহ কে দেখলাম যে, তিনি হিন্দা বিনতে উৎবার মাথার মধ্যভাগে তরবারী উঁচু করে ধরলেন এবং পরক্ষণেই সরিয়ে নিলেন। আমি বললাম আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।

আল্লাহর সিংহ হামযার শাহাদাত

এদিকে হামযা (রা) ও সিংহের ন্যায় বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন এবং মধ্যভাগের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়ছিলো। তাঁর সামনে মুশরিকদের বড়ো বড়ো বীর বাহাদুরেরা টিকতে পারছিলো না। কিন্তু বড়োই আফসোসের কথা তিনিও শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু তাঁকে সামনা সামনি বীর পুরুষের মত শহীদ করা হয়নি, বরং কাপুরুষের মতো গুপ্তভাবে শহীদ করা হয়েছিলো।

হামযা (রা) এর ঘাতকের নাম ছিলো 'অহশী ইবনে হারব'। আমরা তাঁর শাহাদতের ঘটনা অহশীর নিজের ভাষাতেই বর্ণনা করছি। সে বর্ণনা করেছে, 'আমি জুবাইর ইবনে মুতইমের গোলাম ছিলাম। তার চাচা তুআইমাহ ইবনে আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। যখন কুরাইশরা উহুদের যুদ্ধে বের হয় তখন জুবাইর ইবনে মুতইম আমাকে বলে, 'তুমি যদি মুহাম্মদ (ﷺ) এর চাচা হামযা (রা) কে আমার চাচার বিনিময়ে হত্যা কর তবে তোমাকে আযাদ করে দেয়া হবে।' তার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমিও লোকদের সাথে রওয়ানা হয়ে যাই। আমি ছিলাম একজন হাবশী লোক এবং হাবশীদের মত বর্শা নিক্ষেপের কাজে আমি খুব পারদর্শী ছিলাম। আমার লক্ষভ্রষ্ট হতো খুবই কম। লোকদের মধ্যে যুদ্ধ যখন চরমে পৌঁছে তখন আমি বের হয়ে হামযা (রা) কে খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে আমি তাঁকে লোকদের মাঝে দেখতে পাই। তিনি লোকদেরকে ছত্রভঙ্গ করে চলছিলেন।

আল্লাহর শপথ, আমি তাঁকে হত্যা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলাম এবং একটি বৃক্ষ অথবা একটি পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থেকে আমার নিকটে তাঁর আসার প্রতীক্ষা করছিলাম, ইতোমধ্যে সিবা ইবনে অবদুল উযযা আমার হতে আগে বেগে গিয়ে তাঁর নিকট পৌঁছে যায়। তিনি তাকে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে বলেন, 'ওরে লজ্জাস্থানের চামড়া কর্তনকারীর পুত্র! মজা দেখ।' এ কথা বলেই তিনি এতো জোরে তাকে তরবারীর আঘাত করেন যে, তার মাথা দেহচ্যুত হয়ে যায়।

এর সাথে সাথেই আমি বর্শা উঠিয়ে নিই এবং যখন তিনি আমার আওতার মধ্যে এসে পড়েন তখন আমি তাঁর দিকে ওটা ছুঁড়ে দিই এবং ওটা তাঁর নাভীর নিচে লেগে যায় এবং পদদ্বয়ের মধ্যভাগ দিয়ে পার হয়ে যায়। তিনি আমার দিকে ধাওয়া করার ইচ্ছা করেন, কিন্তু অসমর্থ হন। আমি তাঁকে ঐ অবস্থায় ছেড়ে দিই। শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। এরপর আমি তাঁর মৃত দেহের নিকট গিয়ে বর্শা বের করে নেই এবং সৈন্যদের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ি। (আমার কাজ সমাপ্ত হয়েছিলো) তিনি ছাড়া আর কারো সাথে আমার কোনো সম্বন্ধ ছিলো না। আমি শুধু আযাদ হওয়ার জন্যেই শেরে খুদা ও শেরে রাসূল হামযাকে হত্যা করি। হামযার শাহাদাতের ফলে মুসলমানদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়, কিন্তু এতদসত্বেও যুদ্ধে মুসলমানদেরই পাল্লা ভারী থাকে। আবু বকর (রা) ওমর আবদুল্লাহ ইবনে জাহুশ (রা) সা'দ ইবনে মু'আয (রা), সা'দ ইবনে উবাদাহ (রা), সা'দ ইবনু রাবী' (রা) নযর ইবনে আনাস (রা), প্রভৃতি মহান ব্যক্তিবর্গ এমন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন যে, মুশরিকরা হতোদ্যম ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে এবং তাদের দেহের শক্তি হ্রাস পায়।

পত্নীর বক্ষ ছেড়ে তরবারির ধারের ওপর

এ দিকে আর এক দৃশ্য চোখে পড়ে। উপরিউক্ত আত্মত্যাগীদের মধ্যে আর একজন হচ্ছেন হানযালাতুল গাসীর (রা)। যিনি এক অদ্ভুত মাহাত্ম্য নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি ঐ আবু আমির বাহিরের পুত্র, যে পরবর্তীকালে ফাসিক নামে প্রসিদ্ধ হয়। যার বর্ণনা ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। হানযালা নব বিবাহিতা ছিলেন। যখন যুদ্ধে গমনের জন্যে ঘোষণা দেয়া হয়, তখন তিনি নববধূকে আলিঙ্গন করছিলেন। যুদ্ধের ঘোষণা শোনা মাত্রই তিনি নববধূর বক্ষ ছেড়ে দিয়ে জিহাদের জন্যে বেরিয়ে পড়েন। যখন উহুদ প্রান্তরে ভীষণ যুদ্ধ চলছে তখন তিনি মুশরিকদের সারিগুলো ফেড়ে ফেড়ে তাদের সেনাপতি বানু সুফিয়ান পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন এবং তাকে প্রায় ধরাশায়ী করতেই যাচ্ছিলেন। কিন্তু প্রবাহমান আল্লাহ তাঁর ভাগ্যেই শাহাদত লিখে রেখেছিলেন। তাই যেমনই তিনি আবু সুফিয়ানকে লক্ষ করে তরবারী উঁচু করে ধরেছেন, তেমনই শাদ্দাদ ইবনে আউস তাঁকে দেখে ফেলে এবং তৎক্ষণাৎ তাঁকে আক্রমণ করে। ফলে তিনি নিজেই শহীদ হয়ে গেলেন।

তীরন্দাযদের কার্যকলাপ

জাবালে রুমাতের ওপর যে তীরন্দাযদেরকে রাসূল মোতায়েন করেছিলেন তাঁরাও যুদ্ধের গতি মুসলমানদের অনুকূলে আনার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মক্কী অশ্বারোহীরা খালিদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে এবং আবু আমির ফাসিকের সহায়তায় মুসলিম সৈনিকদের বাম দিকের দল ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে তিন বার ভীষণ আক্রমণ চালায়। কিন্তু মুসলিম তীরন্দাযগণ তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাদেরকে এমনভাবে ঘায়েল করে দেন যে, তাদের তিনটি আক্রমণই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

মুশরিকদের পরাজয়

কিছুক্ষণ ধরে এরূপ ভীষণ যুদ্ধ চলতে থাকে এবং মুসলিমের ক্ষুদ্র বাহিনী যুদ্ধে পূর্ণভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। অবশেষে মুশরিকদের মনোবল ভেঙে পড়ে। মনে হচ্ছিল যেন তিন হাজার মুশরিককে সাতশ নয়; বরং ত্রিশ হাজার মুসলমানদের সাথে মুকাবিলা করতে হচ্ছে। আর এদিকে মুসলমানরা, ঈমান, বিশ্বাস এবং বীরত্বের অত্যন্ত উঁচুমানের মনোবল নিয়ে তরবারী চালনা করছিলেন।

কুরাইশরা যখন মুসলমানদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও অক্ষমতা অনুভব করল এবং তাদের মনোবল এমনভাবে ভেঙে পড়ল যে, যুওয়াবের হত্যার পর কারো সাহস হলো না যে, যুদ্ধ চালু রাখার জন্যে তাদের ভূপতিত পতাকার নিকটবর্তী হয়ে ওটাকে উঁচু করে, তখন তারা পালিয়ে যাবার পস্থা অবলম্বন করল এবং মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গেল।

ইবনে ইসহাক বলেন যে, আল্লাহ মুসলমানদের ওপর স্বয়ং সাহায্য নাযিল করেন তাঁদের সাথে কৃত ওয়াদা পুরো করেন। মুসলমানরা মুশরিকদেরকে তরবারী দ্বারা এমনভাবে কর্তন করতে লাগলেন যে, তারা শিবির থেকেও পালিয়ে গেল এবং নিঃসন্দেহে তাদের পরাজয় ঘটে গেল।

আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা) বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ আমি দেখি যে, হিন্দা বিনতে উত্তাহ্ এবং তার সঙ্গিনীদের পা দেখা যাচ্ছে। তারা কাপড় ওপরে উঠিয়ে নিয়ে পলায়ন করছে। তাদের গ্রেফতারিতে কম বেশি কোনোই প্রতিবন্ধকতা ছিলো না।

সহিহ বুখারিতে বারা ইবনে আ'যির (রা) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'মুশরিকদের সাথে আমাদের মুকাবিলা হলে তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়, এমন কি আমি নারীদেরকে দেখি যে, তারা পায়ের গোছা হতে কাপড় উঠিয়ে নিয়ে দ্রুত বেগে পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পায়ের অলংকার দেখা যাচ্ছিল।'

আর এ সুযোগে মুসলমানরা মুশরিকদের ওপর তরবারী চালাতে চালাতে ও তাদের পরিত্যক্ত মাল জমা করতে করতে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করছিলেন।

তীরন্দাযদের ভয়ানক ভুল

তীরন্দায বাহিনী এতক্ষণ পর্বতমূলে অবস্থানগ্রহণপূর্বক নিজেদের কর্তব্য পালন করে আসছিলেন। কিন্তু এ আশাতীত জয়ের উল্লাসে এখন তাঁরা আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়লেন। রাসূল যে তাঁদেরকে যে কোনো অবস্থায় তাঁদের স্থান ত্যাগ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন তা তাঁরা বেমালুম ভুলে গিয়ে গণীমত সংগ্রহের জন্য সমরক্ষেত্রের দিকে ছুটে যেতে লাগলেন। সে জন্য যুদ্ধের চেহারা বদলে গেল। মুসলমানগণ ভীষণভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হলেন, স্বয়ং নবী শহীদ হতে হতে বেঁচে গেলেন। আর এ কারণেই মুসলিম ভীতি যেটা বদর যুদ্ধের পরিণামে মুশরিকদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিলো সেটা অনেকটা দূরীভূত হতে লাগল। তার মূল কারণ দুনিয়া প্রীতি, গণীমতের মালের লোভ। সুতরাং সে সময় তারা একে অপরকে বলছিলো, গণীমত, গণীমত ...

তোমাদের সঙ্গীগণ জিতে গেছেন.. আর অপেক্ষা কিসের? তাঁদের অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা) তাঁদেরকে থামার জন্যে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাঁর অধীনস্থ সৈনিকগণ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলতে লাগলেন, 'এখন আমাদের সম্পূর্ণ জয় হয়েছে। সুতরাং এখন আর এখানে বসে থাকব কিসের জন্যে?'

তাঁদের অধিকাংশ সৈনিকই স্থান ত্যাগ করে ময়দানের দিকে ছুটে গেলেন। আবদুল্লাহ (রা) মাত্র নয়জন লোককে নিয়ে ঐ স্থানে বসে রইলেন। যারা নিজদায়িত্ব পালনে অটল থাকলেন যে, হয় তাঁদের প্রস্থানের অনুমতি দেয়া হবে অন্যথা তাঁরা আমৃত্যু সেখানে অবস্থান করবেন।

মুসলিম সেনাবাহিনী মুশরিকদের বেষ্টনীতে

এরূপে রাসূল (ﷺ) এর কঠোর আদেশ এবং সেনাপতির নিষেধ অমান্য করার ফলও হাতে হাতে ফলতে শুরু হলো। আরবের বিখ্যাত বীর এবং রণকৌশলী সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ অশ্বারোহী সেনাদল নিয়ে চারদিকে ঘুরে সুযোগের সন্ধান করে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি যখন দেখলেন যে, মুসলমানরা গিরিপথ পরিত্যাগ করে চলে গেছেন, তখন আর কালবিলম্ব না করে তিনি সেই অরক্ষিত পথের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন এবং দেখতে দেখতে পশ্চাদদিক দিয়ে মুসলমানদের মাথার ওপর এসে উপস্থিত হলেন। বীর আব্দুল্লাহ তাঁর সহচর কয়জনকে নিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসূল (ﷺ) এর আদেশ পালন করে চললেন। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে তাঁরা সবাই শাহাদত বরণ করলেন। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা নির্ভাবনায় গণীমতের মাল সংগ্রহ করতে ব্যাপৃত আছেন। এমন সময় প্রথমে খালিদের অশ্বারোহী সেনাদল এবং অপর দল সুওয়াব ও পদাতিক সেনাদল অতর্কিত অবস্থায় তাদেরকে ভীষণভাবে আক্রমণ করল এবং সতর্ক হবার পূর্বেই বহু মুসলমানকে কুরাইশদের হাতে শহীদ হতে হলো। কুরাইশদের পতাকা এতক্ষণ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। খালিদের এ আক্রমণ এবং মুসলমানদের উপস্থিত সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে আমরাহ বিনতে আলকামা নামী জনৈক কুরাইশ বীরঙ্গনা আবার তা তুলে ধরল। সম্পূর্ণ পরাজয়ের পর ভুলুণ্ঠিত পতাকাকে পুনরায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে উড্ডীয়মান হতে দেখে বিক্ষিপ্ত ও পলায়নপর কুরাইশ সৈন্যগণ আবার সেই পতাকার দিকে ছুটে আসলো এবং তারা আবার দলবদ্ধভাবে মুসলমানদেরকে আক্রমণ করল। এবার মুসলমানরা অগ্রপশ্চাৎ দুই দিক হতে আক্রান্ত হয়ে যাঁতার মধ্যস্থলে পড়লে যে অবস্থা হয় তাই হলো।

রাসূলুল্লাহর বিপদসংকুল ফায়সালা এবং বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপ

এ সময় রাসূল মাত্র নয় জন সাহাবিসহ পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন এমন সময় হঠাৎ খালিদ ইবনে ওয়ালীদের অশ্বারোহী সৈন্যগণ তার দৃষ্টিগোচর হয়। এর পর রাসূল (ﷺ) এর সামনে দুটো পথ ছিলো। আর তা হচ্ছে এই যে, হয় তিনি তাঁর নয় জন সহচরসহ দ্রুত গতিতে পলায়ন করে কোনো এক সুরক্ষিত স্থানে চলে যেতেন এবং স্বয়ং সেনাবাহিনীকে যারা শত্রুর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন, তাদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতেন, নয়তো নিজের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে স্বীয় সাহাবিদেরকে ডাক দিতেন এবং এক নির্ভরযোগ্য সংখ্যক সাহাবীকে নিজের কাছে একত্রিত করে তাদের মাধ্যমে অবরোধ ভেঙ্গে দিয়ে নিজের সেনাবাহিনীর জন্যে উহুদ পাহাড়ের উপরিভাগের দিকে চলে যাওয়ার পথ করে দিতেন। এ চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসূল (ﷺ) এর তুলনাবিহীন বীরত্ব প্রকাশিত হয়েছে। কেননা, তিনি নিজের জীবন রক্ষা করে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নিজের জীবনকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করে সাহাবায়ে কিরামের জীবন রক্ষা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তাই তো তিনি খালিদ ইবনু ওয়ালীদের অশ্বারোহী সৈন্যদেরকে দেখা মাত্র উচ্চৈস্বরে স্বীয় সাহাবিদেরকে ডাক দেন, ও আল্লাহর বান্দারা এদিকে। অথচ তিনি জানতেন যে, তার ঐ শব্দ মুসলমানদের পূর্বে মুশরিকদেরই অবগত করলো যে, এ মুহূর্তে তাঁর অবস্থান কোথায় রয়েছে। যার ফলে তাদের একটি বাহিনী মুসলমনদের পূর্বেই তাঁর নিকটে এসে পড়ে এবং বাকি অশ্বারোহীরা দ্রুততার সাথে মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। এখন ভিড়ের বিস্তারিত বিবরণ পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করছি।

মুসলমানদের মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ততা

যখন মুসলমানরা ভিড়ের মধ্যে এসে পড়েন তখন একটি দল তো জ্ঞানই হারিয়ে ফেলে। তাদের শুধু নিজেদের জীবনের চিন্তা ছিলো। সুতরাং তারা যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে দিয়ে পলায়নের পথ ধরলো। পিছনে কি ঘটছে তার কোনো খবরই তাদের ছিলো না। আর একটি দল পিছনে ফিরলে তারা মুশরিকদের সাথে মিশ্রিত হয়ে যায়। একে অপরকে চিনতে অসমর্থ হয়। এর ফলে মুসলমানদেরই হাতে কোনো কোনো মুসলমান নিহত হয়। যেমন- সহিহ বুখারিতে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত আছেন যে, উহুদ যুদ্ধের দিন (প্রথম) মুশরিকরা পরাজিত হয়। এরপর ইবলীস (সাধারণভাবে) ডাক দিয়ে বলে- 'ওরে আল্লাহর বান্দারা পিছনে' (অর্থাৎ পিছন দিক হতে আক্রমণ কর) তার এ কথায় সামনে সারির সৈন্যেরা পিছন দিকে ফিরে আসে এবং পিছনের সারির সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। হুযাইফা দেখেন যে, তাঁর পিতা ইয়ামানের ওপর আক্রমণ করা হচ্ছে তিনি তখন বলে ওঠেন- হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইনি যে বিরত হলেন না শেষ পর্যন্ত আমার পিতা নিহতই হয়ে গেলেন। হুযাইফা বলেন 'আল্লাহর কসম! হুযাইফা এর মধ্যে সদা-সর্বদা কল্যাণ বিরাজমান ছিলো। শেষ পর্যন্ত তিনি আল্লাহর সাথে মিলিত হন।

মোট কথা, এ দলের সারিতে কঠিন বিক্ষিপ্ততা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়েছিলো। বহু লোক চিন্তান্বিত ও পেরেশান ছিলেন। তাঁরা কোন দিকে যাবেন তা বুঝতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় কোনো ঘোষণাকারীর ঘোষণা শোনা গেল যে, মুহাম্মদ (ﷺ) নিহত হয়েছেন। এ ঘোষণা শুনে তারা জ্ঞান হারা হয়ে গেলেন। অধিকাংশ লোকেরই সাহস ও উদ্যম নষ্ট হয়ে গেল। কেউ কেউ যুদ্ধ বন্ধ করে দিল এবং দুঃখিত হয়ে অস্ত্র শস্ত্র ফেলে দিল, কেউ কেউ এ চিন্তাও করল যে, মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই এর সাথে মিলিত হয়ে তাকে বলা হবে যে, সে যেন আবু সুফিয়ানের নিকট তাদের জন্যে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে।

কিছুক্ষণ পরও ঐ লোকদের পাশ দিয়ে আনাস ইবনে নাযর (রা) গমন করেন। তিনি দেখেন যে, তারা হাতের ওপর হাত ধরে পড়ে আছে। তাদেরকে তিনি প্রশ্ন করলেন কিসের অপেক্ষা করছো? তারা উত্তরে বলল, রাসূল নিহত হয়েছেন। তাদের একথা শুনে আনাস ইবনে নযর তাদেরকে বললেন, 'তাহলে রাসূল (ﷺ) এর ইন্তিকালের পর তোমরা জীবিত থেকে কি করবে? উঠো, যার ওপর রাসূল জীবন দিয়েছেন তার ওপর তোমরাও জীবন দিয়ে দাও।' এরপর তিনি বলেন, "হে আল্লাহ, ঐ মুসলমানরা যা কিছু করেছে সে জন্যে আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আর মুশরিকরা যা কিছু করেছে তার সাথে আমার সম্পর্কচ্ছেদ করছি।" এ কথা বলে তিনি সম্মুখে অগ্রসর হলেন। সা'দ ইবনে মু'আযের সাথে দেখা হলে তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, হে আবু ওমর কোথায় যাচ্ছেন? আনাস উত্তরে বলেন, "জান্নাতের সুগন্ধি সম্পর্কে আর কি বলবো! হে সা'দ! আমি ওর সুগন্ধি অনুভব করছি।" এরপর তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধ শেষে তাঁকে চেনা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁর ভগ্নী শুধু তার অঙ্গুলীগুলোর পোর দেখে তাঁকে চিনতে পারেন। তার গায়ে বর্শা, তরবারী এবং তীরের আশিটিরও বেশি আঘাত লেগেছিলো।

অনুরূপভাবে সাবিত ইবনে দাহদাহ (রা) স্বীয় কওমকে ডাক দিয়ে বলেন, যদি মুহাম্মদ (ﷺ) নিহত হয়ে থাকেন তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহ জীবিত রয়েছেন। তিনি মরতে পারেন না। তোমরা তোমাদের দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করে যাও আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য ও বিজয় দান করবেন। তার একথা শুনে আনসারের একটি দল উঠে পড়েন এবং সাবিত তাদের সহায়তায় খালিদের অশ্বারোহীবাহিনীর ওপর হামলা করেন। যুদ্ধ করতে করতে খালিদ এর বর্শার আঘাতে শহীদ হয়ে যান। তার মতো সঙ্গীরাও যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত লাভ করেন।

একজন মুহাজির সাহাবি একজন আনসারী সাহাবির পাশ দিয়ে গমন করেন। যিনি রক্তে রঞ্জিত ছিলেন। মুহাজির তাঁকে বলেন, হে ভাই! আপনি তো জানেন যে, "মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন।" তখন ঐ আনসারী বললেন "যদি মুহাম্মদ (ﷺ) নিহত হয়ে থাকেন তবে জেনে রাখুন যে, তিনি আল্লাহর দ্বীন পৌছিয়ে দিয়েছেন। এখন আপনাদের কর্তব্য হচ্ছে ঐ দ্বীনের হিফাযতের জন্যে যুদ্ধ করা।"

এরূপ সাহস ও উদ্যম বৃদ্ধিকারী কথায় মুসলিম সৈন্যদের উদ্যম বহাল হয়ে যায় এবং তাদের জ্ঞান ও চৈতন্য ফিরে আসে, নিরাপত্তা প্রার্থনা চিন্তার পরিবর্তে অস্ত্রশস্ত্র উঠিয়ে নেন এবং মুশরিকদের সাথে মুকাবিলা করে তাঁদের অবরোধ ভেঙ্গে দেয়া ও তাঁদের কেন্দ্রস্থল পর্যন্ত রাস্তা বানিয়ে নেয়ার চেষ্টায় রত হয়ে যান।

এ সময়েই তাঁরা এটাও জানতে সক্ষম হন যে, রাসূল (ﷺ) এর নিহত হওয়ার সংবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এর ফলে তাঁদের শক্তি আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং তাঁদের উদ্যম ও উদ্দীপনায় নবীনতা এসে যায়। সুতরাং তারা এক কঠিন ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অবরোধ ভেঙ্গে দিয়ে ভিড় হতে বের হন এবং এক মজবুত কেন্দ্রের চতুর্দিকে একত্রিত হওয়াতে সফল হন।

মুসলিম সেনাবাহিনীর তৃতীয় একটি দলের লোক ছিলেন যারা শুধু রাসূলের সম্পর্কেই চিন্তা করছিলেন। এরা এ ব্যবস্থাপনার কথা অবহিত হওয়া মাত্রই শুধু রাসূলের দিকে ফিরে আসেন। এদের মধ্যে অগ্রভাগে ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও প্রভৃতি মহান ব্যক্তিবর্গ। এরা যোদ্ধাদের প্রথম সারিতেও সকলের অগ্রে ছিলেন। কিন্তু যখন নবীর মহান ব্যক্তিত্বের জন্যে বিপদের আশংকা দেখা দিল তখন তাঁর হিফাযত ও প্রতিরোধকারীদের মধ্যেও তাঁরা সকলের অগ্রে এসে গেলেন।

রাসূল (ﷺ) এর আশে পাশে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম

মুসলিম সেনাবাহিনী যখন ভিড়ের মধ্যে মুশরিকদের দুটি পক্ষের মাঝে পড়ে যান এবং তাঁদেরকে পোষণ করা হচ্ছিল, ঠিক সেই সময় শুধু রাসূল (ﷺ) এর আশেপাশেও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলতে থাকে। এ কথা পূর্বেই বলা হয়েছে, মুশরিকরা মুসলমানদেরকে যখন ঘিরে ফেলতে শুরু করে, তখন শুধু রাসূল এর নিকট মাত্র নয়জন সাহাবি ছিলেন এবং যখন তিনি মুসলমানদেরকে 'আমার দিকে এসো, আমি আল্লাহর রাসূল' এ কথা বলে ডাক দেন, তখন তাঁর এ ডাক মুশরিকেরা শুনে ফেলে এবং তাঁকে চিনে নেয় কেননা, ঐ সময় তারা মুসলমানদের চেয়ে বেশি তাঁর নিকটবর্তী ছিলো। সুতরাং তাঁরা দ্রুতবেগে ধাবিত হয়ে তাকে আক্রমণ করে বসে এবং কোনো মুসলমানদের আগমনের পূর্বেই নিজেদের কাজ সম্পূর্ণ করে ফেলে। এ আকস্মিক আক্রমণের ফলে ঐ মুশরিকদের ও সেখানে বিদ্যামান নয়জন সাহাবির মধ্যে ভীষণ লড়াই শুরু হয়ে যায়। এতে নবীপ্রেম, বীরত্বপনা, প্রাণ উৎসর্গের অসাধারণ ঘটনাবলি সংঘটিত হয়।

সহিহ মুসলিমে আনাস (রা) হতে বর্ণিত। উহুদ যুদ্ধের দিন শুধু রাসূল (ﷺ) সাতজন আনসার ও দুই জন কুরাইশসহ পৃথক রয়ে গিয়েছিলেন। যখন আক্রমণকারীরা তাঁর একেবারে নিকটে পৌঁছে যায় তখন তিনি বলেন, 'এমন কেউ আছে কি, যে এদেরকে আমার হতে দূর করে নিতে পারে? তাঁর জন্যে রয়েছে জান্নাত।' তাঁর কথা শুনে একজন আনসারী সাহাবি অগ্রসর হন এবং যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যান। এরপর পুনরায় মুশরিকরা তাঁর একেবারে নিকটে এসে পড়ে এবং এবারও তিনি একই কথা বলেন। এভাবে পালাক্রমে সাতজন আনসারী সাহাবি শহীদ হয়ে যান। এ দেখে শুধু রাসূল স্বীয় অবশিষ্ট দু'জন সাহাবিকে বলেন, 'আমরা আমাদের সঙ্গীদের সাথে ন্যায় বিচার করলাম না।'

এ সাতজনের মধ্যে শেষের জন ছিলেন আম্মারাহ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে সাকান (রা)। তিনি লড়তেই থাকেন। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে মাটিতে পড়ে যান।

আম্মারাহ (রা) পতিত হওয়ার পর রাসূল (ﷺ) এর সাথে মাত্র দু'জন কুরাইশী সাহাবি ছিলেন। যেমন সহিহ বুখারি মুসলিমের আবু উসমান (রা) হতে বর্ণিত যে, যে যুগে শুধু রাসূল যুদ্ধ করেছেন ঐ যুদ্ধগুলোর কোনো একটিতে তাঁর সাথে তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ (রা) এবং সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) ছাড়া আর কেউই ছিলো না।

আর এ মুহূর্তটি রাসূল (ﷺ) এর জন্যে অত্যন্ত ভয়ংকর ছিলো এবং মুশরিকদের জন্যে ছিলো সুবর্ণ সুযোগের মুহূর্ত। বাস্তবতা হলো, মুশরিকরা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেনি। তারা একাধিক্রমে শুধু রাসূলের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলো এবং তাঁকে পাথর মেরেছিলো, যার ফলে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর ডানদিকের রুবাঈ দাঁত ভেঙ্গে গিয়েছিলো। আর তাঁর নিচের ঠোঁটটি আহত হয়েছিলো। আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী অগ্রসর হয়ে তাঁর কপাল জখম করে। আবদুল্লাহ ইবনে কামআহ নামক আর একজন দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী লাফিয়ে গিয়ে তাঁর কাঁধে এত জোরে তরবারীর আঘাত করে যে, তিনি এক মাসেরও বেশি সময় পর্যন্ত ওর ব্যথা ও কষ্ট অনুভব করেন। তবে তাঁর লৌহবর্ম কাটতে পারেনি। এরপর সে আরেকবার তাঁকে তরবারীর আঘাত করে, যা তাঁর চোখের নিচের হাড়ে লাগে এবং এর কারণে শিরস্ত্রানের দুটি কড়া চেহারার মধ্যে ঢুকে যায়।

রাসূল (ﷺ) এর রুবাঈ দাঁত ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং মাথা আহত করা হয় ঐ সময় তিনি মুখমণ্ডল হতে রক্ত মুছে ফেলছিলেন এবং মুখে বলেছিলেন, "ঐ কওম কিরূপে কৃতকার্য হতে পারে, যারা তাদের নবীর মুখমণ্ডল আহত করেছে এবং তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে, অথচ তিনি তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছিলেন?" ঐ সময় আল্লাহ নিম্নের আয়াত অবতীর্ণ করেন-

তিনি (আল্লাহ) তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন, এ ব্যাপারে তোমার করণীয় কিছুই নেই, কারণ তাঁরা যালিম।" (আল-ইমরান: ১২৮)

তাবরানীর বর্ণনায় রয়েছে, ঐ দিন রাসূল বলেছিলেন, ঐ কওমের ওপর আল্লাহর কঠিন শাস্তি হোক, যারা তাদের নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন-

হে আমার প্রতিপালক! আমার কওমকে ক্ষমা করে দিন, তারা জানে না। সহিহ মুসলিমের রেওয়ায়েতেও এটাই আছে যে, তিনি বার বার বলছিলেন-

হে আমার প্রতিপালক! আমার কওমকে ক্ষমা করে দিন, তারা জানে না।

হে আল্লাহ! আমার কওমকে হিদায়াত দান করুন, নিশ্চয় তারা জানে না।

এতে কোনো সন্দেই নেই যে, মুশরিকরা রাসূল কে দুনিয়া হতে বিদায় করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু দু'জন কুরাইশী সাহাবি অর্থাৎ সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা) ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা) অসাধারণ বীরত্ব ও অতুলনীয় বাহাদুরীর সাথে কাজ করে শুধু দুজনেই মুশরিকদের সফলতাকে অসম্ভব করে দেন। এ দু'ব্যক্তি আরবের সুদক্ষ তীরন্দায ছিলেন। তাঁরা তীর মেরে মেরে আক্রমণকারী মুশরিকদেরকে রাসূল হতে দূরে সরিয়ে রাখেন।

রাসূল (ﷺ) সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস এর জন্যে নিজ হাতে সমস্ত তীর বের করে ছড়িয়ে দেন এবং তাঁকে বলেন, 'তীর ছুড়তে থাকো, তোমার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গিত হোন।'

সা'দ এর সৌজন্য ও কর্মদক্ষতা এর দ্বারাই অনুমান করা যেতে পারে যে, তিনি ছাড়া আর কারো জন্যে রাসূল তাঁর পিতামাতা উৎসর্গিত হওয়ার কথা বলেননি।

তালহা (রা) এর কর্মদক্ষতার অনুমান করা যেতে পারে সুনানে নাসায়ীর একটি বর্ণনার মাধ্যমে, যাতে জাবির রাসূলের ওপর মুশরিকদের ঐ সময়ের আক্রমণের উল্লেখ করেছেন, যখন তিনি মুষ্টিমেয় আনসারের সাথে রয়ে গিয়েছিলেন।

জাবির (রা) বলেন, মুশরিকরা রাসূলের নিকটবর্তী হয়ে গেলে তিনি বলেন, 'এদের মুকাবিলা করে এমন কেউ আছে কি? উত্তরে তালহা (রা) বলেন, 'আমি আছি'। এর পর জাবির আনসারদের অগ্রসর হওয়া এবং এক এক করে শহীদ হওয়ার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন, যা সহিহ মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। জাবির বলেন, যখন তারা শহীদ হয়ে যান তখন তালহা সম্মুখে অগ্রসর হন এবং এগারো জন লোকের সাথে একাই যুদ্ধ করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে তরবারীর এমন এক আঘাত লাগে যার ফলে তার হাতের আঙ্গুলগুলো কেটে যায়। ঐ সময় তার মুখ দিয়ে 'হিস' শব্দ বের হয়। তখন রাসূল তা দেখতে পায়। জাবির বলেন, অতঃপর আল্লাহ মুশরিকদেরকে ফিরিয়ে দেন। ইকলীলে হাকিমের বর্ণনা রয়েছে যে, উহুদের দিন তাঁর ৩৯ টি বা ৩৫ টি আঘাত লেগেছিলো এবং তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা অঙ্গুলিদ্বয় অকেজো হয়ে গিয়েছিলো।

ইমাম বুখারি (রা) কায়েস ইবনে আবু হাযম (রা) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি তালহার (রা) হাত দেখেছি ওটা নিস্ক্রিয় ছিলো। ঐ হাত দ্বারাই তিনি উহুদ যুদ্ধের দিন নবী কে রক্ষা করেছিলেন।

ইমাম তিরমিযির বর্ণনায় রয়েছে, রাসূল ঐ দিন তালহা (রা) এর ব্যাপারে বলেছিলেন, 'কেউ যদি ভূ-পৃষ্ঠে কোনো শহীদকে চলতে ফিরতে দেখতে চায়, তবে সে যেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহকে দেখে নেয়।'

আবু দাউদ তায়ালেসী (রা) আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেছেন। আবু বকর (রা) যখন উহুদ যুদ্ধের আলোচনা করতেন তখন বলতেন, এ যুদ্ধ সম্পূর্ণটাই তালহার জন্যে ছিলো। রাসূল কে হিফাযত করার আসল কাজ তিনিই আনজাম দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা) তাঁর ব্যাপারে নিম্নের কথাও বলেন-

হে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা) তোমার জন্যে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে এবং তোমার জন্য জান্নাতে হুরদের মাঝে ঠিকানা বানানো হয়েছে।

এ সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ অদৃশ্য হতে স্বীয় সাহায্য নাযিল করেন। যেমন সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে সাআ'দ (রা) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি উহুদের যুদ্ধের দিন রাসূলকে দেখেছি, তার সাথে দুজন লোক ছিলেন। তাঁরা ছিলেন সাদা কাপড় পরিহিত। তাঁরা তাঁর পক্ষ হতে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। আমি এর পূর্বে এবং পরে এর এ দু'জন লোককে আর কখনো দেখিনি। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, তারা দুজন ছিলেন জিবরাঈল (আ) ও মীকাঈল (আ)।

রাসূল (ﷺ) এর নিকট সাহাবায়ে কিরামের একত্রিত হওয়ার সূচনা

এসব ঘটনা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একেবারে অকস্মাৎ এবং অত্যন্ত তড়িৎ গতিতে সংঘটিত হয়ে যায়। অন্যথায় রাসূল (ﷺ) এর বাছাইকৃত সাহাবায়ে কেরাম, যারা যুদ্ধ চলাকালে প্রথম সারিতে ছিলেন, যুদ্ধের পট পরিবর্তন হওয়ামাত্রই রাসূল (ﷺ) এর নিকট দ্রুতগতিতে আসেন, যাতে তাঁর কোনো অঘটন ঘটে না যায়। কিন্তু তাঁরা প্রথম সারিতে থাকার কারণে এসব খবর জানতে পারেননি। অতঃপর যখন তাঁদের কানে এ খবর পৌঁছল তখন তাঁরা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে রাসূল (ﷺ) এর নিকট দৌড়ে আসলেন। কিন্তু যখন তাঁরা তাঁর নিকট পৌছলেন তখন তিনি আহত হয়েই গেছেন। ৬ জন আনসারী শহীদ হয়েছেন এবং সপ্তম জন আহত হয়ে পড়ে আছেন। আর সা'দ ও তালহা (রা) প্রাণপণে যুদ্ধ করে শত্রুদেরকে প্রতিহত করছেন। তাঁরা পৌঁছামাত্রই নিজেদের দেহ ও অস্ত্র দ্বারা নবীর চতুর্দিকে বেড়া তৈরি করে দেন এবং শত্রুদের ভীষণ আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ শুরু করে দেন। যুদ্ধের সারি হতে রাসূল (ﷺ) এর নিকট যাঁরা ফিরে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম ছিলেন তাঁর গুহার বন্ধু আবু বকর সিদ্দীক (রা)।

ইবনে হিব্বান স্বীয় সহিহ গ্রন্থে আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন। আবু বকর বলেছেন, 'উহুদ যুদ্ধের দিন সমস্ত লোক নবী করীম (ﷺ) এর নিকট হতে দূরে চলে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ রক্ষকগণ ছাড়া সমস্ত সাহাবি কাফিরদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ার পর আমিই সর্বপ্রথম তাঁর নিকট ফিরে আসি। এসে দেখি, তাঁর সামনে একজন মাত্র লোক রয়েছেন, যিনি তাঁর পক্ষ হতে যুদ্ধ করছেন এবং তাঁকে রক্ষা করছেন। আমি (মনে মনে) বললাম, তুমি তালহাই হবে। তোমার ওপর আমার পিতামাতা উৎসর্গিত হোক! ইতোমধ্যে আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ আমার নিকট এসে পড়েন। তিনি এমনভাবে দৌড়াচ্ছিলেন, যেন পাখি উড়ছে। শেষ পর্যন্ত তিনি আমার সাথে মিলিত হয়ে যান। তারপর আমরা দুজন নবীর দিকে দৌড় দেই। এসে দেখি, তাঁর সামনে তালহা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে রয়েছেন। রাসূল আমাদেরকে বলেছেন, "তোমাদের ভাই তালহা এর শুশ্রূষা কর। সে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।" আবু বকর সিদ্দীক বলেন, আমরা দেখি, রাসূল (ﷺ) এর চেহারা মুবারক আহত হয়েছে এবং শিরস্ত্রানের দু'টি কড়া চোখের নিচে গণ্ড দেশে ঢুকে আছে। আমি কড়া দু'টি বের করতে চাইলে আবু উবাইদাহ (রা) বললেন, 'আমি আল্লাহর নাম নিয়ে বলছি, এ দু'টি আমাকেই বের করতে দিন।' এ কথা বলে তিনি দাঁত দিয়ে একটি কড়া ধরলেন এবং ধীরে ধীরে বের করতে শুরু করলেন, যেন তিনি কষ্ট না পান। শেষ পর্যন্ত তিনি কড়াটি টেনে বের করলেন বটে, কিন্তু তাঁর নিচের একটি দাঁত ভেঙ্গে পড়ে গেল। এখন দ্বিতীয় কড়াটি আমি বের করতে চাইলাম। কিন্তু এবারেও তিনি বললেন- 'আবু বকর! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আপনাকে আমি বলছি যে, এটাও আমাকেই টেনে বের করতে দিন।' এরপর দ্বিতীয়টিও তিনি আস্তে আস্তে টেনে বের করলেন। কিন্তু তাঁর নিচের আর একটি দাঁত ভেঙ্গে গেল। অতঃপর রাসূল্লাহ (ﷺ) বললেন; তোমাদের ভাই তালহার শুশ্রূষা কর, সে জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে। আবু বকর বললেন, এরপর আমরা তালহার দিকে মনোযোগ দিলাম এবং তাকে সামনে নিলাম। তাঁর দেহে দশটিরও বেশি যখম হয়েছিলো। তালহা ঐ দিন প্রতিরোধ এ যুদ্ধে কত বীরত্বের সাথে কাজ করেছিলেন। এর দ্বারা তা সহজেই অনুমান করা যায়।

আর ঐ সংকটময় মুহূর্তেই সাহাবীদের একটি দলও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চর্তুদিকে এসে পড়েন। তাঁরা হলেন- আবু দুজানাহ, মুসআব ইবনে উমায়ের, আলী ইবনে আবু তালিব, সাহল ইবনে হুনায়েফ, মালিক ইবনে সিনান, আবু সাঈদ খুদরী, এর উম্মি আম্মার রাহনুসাইবাহ বিনতে কাব মাযিনিয়্যাহ, কাতাদাহ্ ইবনে নু'মান, ওমর ইবনে খাত্তাব, হাতিব ইবনে আবু বালতাআহ (রা)।

মুশরিকদের চাপ বৃদ্ধি

এদিকে মুশরিকদের সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর ফলে তাদের আক্রমণও কঠিন হতে কঠিনতম আকার ধারণ করছিলো। যার ফলে শক্তি এবং চাপ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এমনকি রাসূল (ﷺ) কতগুলো গর্তের মধ্যে একটি গর্তে পড়ে যান, যেগুলো আবু আমির ফাসিক এ ধরনের বিপদের জন্যেই খনন করে রেখেছিলো। এর ফলে রাসূল (ﷺ) এর হাঁটু মচকে যায়। আলী তাঁর হাত ধরে নেন এবং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ্ যিনি নিজেও চরমভাবে আহত হয়েছিলেন, তাঁকে স্বীয় বক্ষে নিয়ে নেন। এরপর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হন।

রাফে ইবনে জুবায়ের (রা) বলেন, তিনি একজন মুহাজির সাহাবিকে বলতে শুনেছেন, আমি উহুদের যুদ্ধে হাযির ছিলাম। আমি দেখি, চুতুর্দিক হতে রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তীর বর্ষিত হচ্ছে, আর তিনি তীরগুলোর মাঝেই রয়েছেন কিন্তু সমস্ত তীরই ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে (অর্থাৎ তাঁকে বেষ্টনকারী সাহাবিগণ সেগুলো রুখে দিচ্ছেন)। আমি আরো দেখতে পেলাম, আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব যুহরী বলছিলো, 'মুহাম্মদ কোথায় আছে তা আমাকে বলে দাও, এখন হয় আমি থাকবো না হয় সে থাকবে। অথচ রাসূল তার কাছেই ছিলেন; এ দেখে সাফওয়ান তাকে ভর্ৎসনা করে। জবাবে সে বলে, আল্লাহর কসম! আমি তাঁকে দেখতেই পাইনি। আল্লাহর শপথ! আমার হতে তাঁকে রক্ষা করা হয়েছে।' এরপর আমরা চারজন লোক তাঁকে হত্যা করার প্রতিজ্ঞা করে উপস্থিত হই। কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছতে পারিনি।

অসাধারণ বীরত্ব ও প্রাণপণ লড়াই

যাহোক এ সময় মুসলমানরা এমনভাবে বীরত্বের সাথে ও জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছেন এবং আত্মত্যাগ প্রদর্শন করেছেন যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে মেলে না। যেমন আবু তালহা (রা) নিজেকে রাসূল (ﷺ) এর সামনে ঢাল বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি স্বীয় বক্ষ ওপরে উঠিয়ে নিতেন, যাতে রাসূলকে শত্রুদের তীর হতে রক্ষা করতে পারেন। আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন, উহুদের দিন সাধারণ মুসলমানরা পরাজয় বরণ করে রাসূল (ﷺ) এর নিকট আসার পরিবর্তে এদিক-ওদিক পালিয়ে যায়, আর তালহা একটি ঢাল নিয়ে রাসূল (ﷺ) এর সামনে দাঁড়িয়ে যান। তিনি একজন সুদক্ষ তীরন্দাজ ছিলেন। তিনি খুব টেনে তীর চালাতেন। ঐ দিন তিনি দু'টি কিংবা তিনটি ধনুক ভেঙ্গে ছিলেন।

রাসূল (ﷺ) এর নিকট দিয়ে কোনো লোক তুণ নিয়ে গমন করলে তিনি বলতেন, 'তোমার তুণের তীরগুলো আবু তালহা (রা) এর জন্য ছড়িয়ে দাও। আর তিনি যখন এক একবার মাথা উঠিয়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি দেখতেন, তখন আবু তালহা (রা) চমকিত হয়ে বলতেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রাণের বিনিময়ে উৎসর্গিত হোক। আমার দেহ আপনার দেহের ঢাল হোক। মাথা বের করবেন না।

এ সময় আবু তালহা (রা) রাসূল (ﷺ) এর প্রতি নিক্ষিপ্ত তীরগুলো নিজে গ্রহণ করছিলেন।

আনাস (রা) থেকে এটাও বর্ণিত আছে। আবু তালহা নবী করীম (ﷺ) একই ঢালের মধ্যে আত্মরক্ষা করছিলেন। আবু তালহা ছিলেন খুব দক্ষ তীরন্দাজ। যখন তিনি তীর নিক্ষেপ করতেন তখন নবী করীম (ﷺ) গর্দান উঠিয়ে দেখতেন, তীরটি কোথায় নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।

আবু দুজানাহ (রা) এর বীরত্বের কথা পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে। এ বিপদের মুহূর্তে তিনি রাসূল (ﷺ) এর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং নিজের পিঠকে করলেন ঢাল। তার ওপর তীর নিক্ষিপ্ত হতো অথচ তিনি ছিলেন অনড়।

হাতিব ইবনে আবু বালতাআহ (রা) উতবা ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পেছনে ধাওয়া করেন, সে নবী করীম (ﷺ) এর দন্ত মুবারক শহীদ করেছিলো। তাকে তিনি ভীষণ জোরে তরবারীর আঘাত করেন। এর ফলে তার মস্তক দেহচ্যুত হয়ে যায়। তারপর তিনি তার ঘোড়া ও তরবারী অধিকার করে নেন। সা'দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রা) তাঁর নিজের ভাই উতবাকে নিজ হাতে হত্যা করার জন্য খুবই আকাঙ্ক্ষী ছিলেন। কিন্তু এতে তিনি সফলকাম হননি; রবং এ সৌভাগ্য হাতিব (রা)-ই লাভ করেন।

সাহল ইবনে হুনায়েফ (রা) ও একজন সুদক্ষ তীরন্দায় ছিলেন। তিনি রাসূলের নিকট মৃত্যুর দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে মুশরিকদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেন।

রাসূল নিজেও তীর চালাচ্ছিলেন। যেমন কাতাদাহ ইবনে নু'মান বর্ণনা করেছেন, রাসূল স্বীয় ধনুক দ্বারা এতো তীর চালিয়েছিলেন যে, ওর প্রান্ত ভেঙ্গে গিয়েছিলো। অতঃপর ঐ ধনুকটি কাতাদাহ ইবনে নু'মান (রা) নিয়ে নেন এবং ওটা তার কাছেই থাকে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ যুদ্ধ করতে করতে মুখে আঘাতপ্রাপ্ত হন। ফলে তার সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর দেহে বিশটি কিংবা তার চেয়েও বেশি যখম হয়। তাঁর পা ও যখম হয়, ফলে তিনি খোঁড়া হয়ে যান।

এ যুদ্ধে উম্মে আম্মারাহ নুসাইবাহ বিনতে কাআব (রা) নামে এক মহিলা অসীম বীরত্ব ও আত্নেসাৎসর্গের পরিচয় প্রদান করেন। তিনি আয়েশা (রা) ও অন্যান্য মুসলিম মহিলাদের সঙ্গে শুশ্রুষাকারিণীরূপে সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে আহত সৈনিকদের পানি সরবরাহ এবং তাদের অন্যান্য প্রকার সেবা-শুশ্রুষা করছিলেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, মুসলমানরা পরাজিত হয়েছে এবং কুরাইশ সৈন্যরা রাসূলকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। এ সংবাদ শোনামাত্র উম্মে আম্মারাহ কাঁধের মশক ও হাতের পানির পাত্র ছুড়ে ফেললেন এবং তীর ধনুক ও তরবারী নিয়ে রাসূলের নিকট ছুটে গেলেন। ঐ সময় মুষ্টিমেয় সাহাবারা রাসূলকে রক্ষা করছিলেন। উম্মে আম্মারাহ সেখানে উপস্থিত হলেন এবং বিশেষ ক্ষিপ্রতা ও নৈপুণ্য সহকারে তীর বর্ষণ করে কুরাইশদেরকে ধ্বংস করতে লাগলেন। এক সময় তিনি ইবনে কামআহর সামনে পড়ে গেলেন। ইবনে কামআহ তার কাঁধের ওপর এত জোরে তরবারীর আঘাত করলো যে, এর ফলে তার কাঁধ গভীরভাবে যখম হলো। তিনিও তার তরবারী দ্বারা ইবনে কামআহকে কয়েকবারে আঘাত করলেন। কিন্তু সে দুটি লৌহবর্ম পরিহিত ছিলো বলে বেঁচে গেল। শত্রুদের বর্শা ও তরবারীর আঘাতে তার সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত ও জর্জরিত হয়ে পড়ল। কিন্তু এ বীরাঙ্গনা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নিজের কর্তব্য পালন করে যেতে লাগলেন। উহুদ যুদ্ধের বর্ণনাকালে স্বয়ং রাসূল বলেছেন, ঐ বিপদের সময় আমি দক্ষিণে, বামে যে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, সে দিকেই দেখি, উম্মে আম্মারাহ (রা) আমাকে রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করছেন।

উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের পতাকা মুসআব ইবনে উমায়ের (রা) এর হাতে অর্পিত হয়েছিলো। এ পতাকার মর্যাদা রক্ষার জন্যে মুসআবকে প্রথম থেকেই যুদ্ধ করে আসতে হয়েছিলো। আলোচ্য বিপদের সময় দুর্ধর্ষ ইবনে কামআহ অগ্রসর হয়ে তাঁর ডান হাতে তরবারির আঘাত করলো। হাতটি কেটে যাওয়ার সাথে সাথে মুসআব বাম হাতে পতাকা ধারণ করেন। কিন্তু অবিলম্বে ইবনে কামআহর তরবারির দ্বিতীয় আঘাতে তাঁর বাম হাতটি কেটে ফেলে। তারপর শত্রুপক্ষের একটি তীর এসে তার বক্ষ ভেদ করে চলে যায় এবং তিনি শহীদ হন। ইবনে কামআহ মনে করেছিলো, তিনি মুহাম্মদ। কেননা, তাঁর আকৃতির সাথে মুসআবের আকৃতির সাদৃশ্য ছিলো। সুতরাং ইবনে কামআহ মুসআবকে শহীদ করে মুশরিকদের দিকে ফিরে গেল এবং চিৎকার করে ঘোষণা করলো, মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন।

নবী (ﷺ) শহীদ হওয়ার খবর এবং যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

তার এ ঘোষণায় নবী (ﷺ) এর শাহাদতের খবর মুসলমান ও মুশরিক উভয় দলের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ল। এ দুঃখজনক সংবাদ রটনার পর অধিকাংশ মুসলমানই ক্ষণিকের জন্যে কিংবর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। একদল মুসলমান ইতিমধ্যে শাহাদত প্রাপ্ত হয়েছেন, জীবিতদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হয়ে পড়েছেন। আর রাসূল (ﷺ) নিহত হয়েছেন শুনে একদল অস্ত্র ত্যাগ করে যুদ্ধ ক্ষেত্র পরিত্যাগ এমনকি কেউ কেউ মদিনায় পলায়ন পর্যন্ত করলেন। কিন্ত রাসূলের শাহাদতের এ খবরই আরেক দিক দিয়ে কল্যাণকর প্রতীয়মান হয়। কারণ, এরপর মুশরিকদের উত্তেজনাপূর্ণ আক্রমণ কিছুটা শিথিল হয়ে যায়। কেননা তারা অনুভব করছিলো, তাদের শেষ উদ্দেশ্যে পূর্ণ হয়েছে।

সুতরাং এখন বহু মুশরিক আক্রমণ বন্ধ করে মুসলমান শহীদদের মৃত দেহের মুসলা (নাক কান ইত্যাদি কেটে নেয়ার কাজ) করতে শুরু করে দেয়।

তারপরের যুদ্ধ ও পরিস্থিতির উপর আধিপত্য লাভ

মুস'আব ইবনে উমায়ের (রা) এর শাহাদাতের পর রাসূল (ﷺ) আলী (রা) কে পতাকা প্রদান করেন। তিনি প্রাণপণে যুদ্ধ করে যান। সেখানে উপস্থিত অবশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামও অতুলনীয় বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ ও আক্রমণ করেন। এর দ্বারা অবশেষে এ সম্ভাবনা দেখা দেয়, রাসূল মুশরিকদের সারিগুলো ফেড়ে ভিড়ের মধ্যে আগত সাহাবায়ে কিরামের দিকে পথ তৈরি করতে পারবেন। তিনি সামনে পা বাড়ালেন এবং সাহাবায়ে কেরামের দিকে আসলেন। সর্বপ্রথম তাঁকে চিনতে পারেন কাব ইবনে মালিক (রা)। তিনি খুশিতে চিৎকার করে ওঠেন, হে মুসলিমবৃন্দ! তোমরা আনন্দিত হও, এ যে রাসূল! তিনি তাঁকে ইঙ্গিতে বলেন, 'চুপ থাকো, যাতে মুশরিকরা আমার অস্তিত্ব ও অবস্থানস্থলের টের না পায়।' কিন্তু কাব (রা) আওয়ায মুসলমানদের কাছে পৌঁছেই গিয়েছিলো। সুতরাং তারা রাসূল (ﷺ) এর কাছে চলে আসতে শুরু করেন এবং ক্রমে ক্রমে প্রায় ত্রিশজন সাহাবি একত্রিত হয়ে যান।

যখন এত সংখ্যক সাহাবি সমবেত হয়ে যান, তখন রাসূল পাহাড়ের ঘাঁটি অর্থাৎ শিবিরের দিকে যেতে শুরু করেন। কিন্তু সরে যাওয়ার অর্থ যেহেতু এই ছিলো যে, মুশরিকরা মুসলমানদেরকে তাদের আয়ত্বের মধ্যে নিয়ে ফেলার যে ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছিলো, তা নিষ্ফল হয়ে যাবে তাই তারা মুসলমানদের এ প্রত্যাবর্তনকে ব্যর্থ করার মানসে ভীষণ আক্রমণ শুরু করে দেয়। কিন্তু এতদসত্বেও রাসূল ঐ আক্রমণকারীদের ভীড় ঠেলে রাস্তা তৈরি করে ফেলেন এবং ইসলামের সিংহদের বীরত্বের সামনে তাদের কোনো ক্ষমতাই টিকলো না। এরই মধ্যে উসমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুগীরা নামক মুশরিকদের একজন অশ্বারোহী রাসূল (ﷺ) এর দিকে অগ্রসর হলো এবং বললো হয় আমি থাকবো, না হয় সে থাকবে।' এদিকে রাসূল (ﷺ) ও তার সাথে মুকাবিলা করার জন্যে থেকে গেলেন। কিন্তু মুকাবিলা করার সুযোগ হলো না। কেননা, তার ঘোড়াটি একটি গর্তে পড়ে গেল। আর ইতোমধ্যে হারিস ইবনে সম্মাহ (রা) তাঁর নিকট পৌঁছে তার পায়ের ওপর এমন জোরে তরবারির আঘাত করলেন যে, সে ওখানেই বসে পড়লো। অতঃপর তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি তার হাতিয়ার নিয়ে নিলেন এবং রাসূল (ﷺ) এর নিকট হাজির হয়ে গেলেন। কিন্তু এরই মধ্যে আবার আবদুল্লাহ ইবনে জাবির নামক আর একজন মক্কী অশ্বারোহী প্রতিক্ষেপ করে হারিস ইবনে সম্মাহ (রা) কে আক্রমণ করল এবং তাঁর কাঁধের ওপর তরবারির আঘাত করে যখম করে দিল। কিন্তু মুসলমানরা লাফিয়ে গিয়ে তাঁকে উঠিয়ে নিলেন। আর এদিকে মৃত্যুর সঙ্গে খেলাকারী আবু দুজানা (রা), যিনি আজ লাল পাগড়ী বেঁধে রেখেছিলেন, আবদুল্লাহ ইবনে জাবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাঁকে এমন জোরে তরবারির আঘাত করেন যে, তার মাথা উড়ে যায়।

এ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলাকালেই মুসলামনরা তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়ছিলেন। যেমন কুরআন কারীমে বলা হয়েছে, 'এটা ছিলো আল্লাহ তাআ'লার পক্ষ হতে বিশ্রাম ও প্রশান্তি।' আবু তালহা (রা) বলেন, উহুদের যুদ্ধের দিন যারা তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়েছিলেন আমিও ছিলাম তাদের মধ্যে একজন। এমনকি, আমার হাত হতে কয়েকবার তরবারি পড়ে যায়। অবস্থা এ ছিলো, ওটা পড়ে যাচ্ছিল এবং আমি ধরে নিচ্ছিলাম। আবার পড়ে যাচ্ছিল এবং আবারও আমি ধরে নিচ্ছিলাম।

সারকথা এই যে, এভাবে মরণপণ যুদ্ধ করে এ বাহিনী সুশৃংখলভাবে পেছনে সরতে সরতে পাহাড়ের ঘাঁটিতে অবস্থিত শিবির পর্যন্ত পৌঁছে যান এবং বাকী সৈন্যদের জন্যেও এ সুরক্ষিত স্থানে পৌছার পথ পরিষ্কার করে দেন। সুতরাং অবশিষ্ট সৈন্যরাও তখন রাসূল (ﷺ) এর নিকট পৌঁছে গেলেন এবং খালিদের বাহিনী রাসূল (ﷺ) এর বাহিনীর সামনে অকৃতকার্য হয়ে গেল।

উবাই ইবনে খালফের হত্যা

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, রাসূল (ﷺ) যখন ঘাঁটিতে পৌঁছে যান, তখন উবাই ইবনে খালফ এগিয়ে গিয়ে বলে, 'মুহাম্মদ কোথায়? হয় আমি থাকবো, না হয় সে থাকবে।' তার একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্য হতে কেউ তাঁর ওপর আক্রমণ করবে কী! উত্তরে রাসূল বলেন, 'তাকে আসতে দাও।' সে নিকটবর্তী হলে রাসূল (ﷺ) হারিস ইবনে সম্মাহ (রা) এর নিকট হতে একটি ক্ষুদ্র বর্শা চেয়ে নিয়ে নাড়া দেন। তিনি ওটা নাড়া দিলে মাছিগুলো উড়ে যায়। এরপর তিনি তাঁর মুখোমুখী হন এবং শিরস্ত্রাণ ও বর্মের মধ্যস্থলে গলার পার্শ্বে সামান্য জায়গা খোলা দেখে ওটাকেই লক্ষ করে এমনভাবে বর্শার আঘাত করেন যে, সে ঘোড়া হতে গড়িয়ে পড়ে যায়। তার ঘাড়ে খুব বড়ো আচড় ছিলো না, রক্ত বন্ধ ছিলো, এমতাবস্থায় সে কুরাইশদের নিকট পৌছে বলে মুহাম্মদ আমাকে হত্যা করে ফেলেছে। জনগণ তাকে বলে, 'আল্লাহর কসম! তোমার মন দমে গেছে, নচেৎ তোমার আঘাত তো তেমন লাগেনি, তারপরও তুমি এতো ছটফট করছো কেনো?' উত্তরে সে বললো, সে মক্কায় আমাকে বলেছিলো, আমি তোমাকে হত্যা করব।

ঘটনা এই যে, মক্কায় যখন রাসূল (ﷺ) এর সাথে উবাই এর সাক্ষাৎ হতো তখন সে তাঁকে বলত, মুহাম্মদ আমার নিকট 'আউদ' নামক একটি ঘোড়া রয়েছে। আমি দৈনিক তাঁকে তিন সা (সাড়ে সাত কিলোগ্রাম) দানা ভক্ষণ করিয়ে থাকি। ওরই ওপর আরোহণ করে আমি তোমাকে হত্যা করব। উত্তরে রাসূল তাকে বলতেন- ইনশাআল্লাহ আমিই তোমাকে হত্যা করব।

এজন্যে আল্লাহর কসম! যদি সে আমাকে থু থু দিতো, তাহলেও আমার জীবন শেষ হয়ে যেতো। অবশেষে সে মক্কা ফিরার পথে 'সারফ' নামক স্থানে পৌঁছে মৃত্যবরণ করে।

আবুল আসওয়াদ (রা) উরওয়া হতে বর্ণনা করেছেন, সে বলদের মতো আওয়াজ বের করতো এবং বলতো, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! যে কষ্ট আমি পাচ্ছি, যদি যুল মাজাযের সমস্ত অধিবাসী ঐ কষ্ট পেতো তবে তারা, সবাই মরে যেতো।

তালহা (রা) নবী (ﷺ) কে উঠিয়ে নেন

পাহাড়ের দিকে নবী (ﷺ) এর প্রত্যাবর্তনের পথে একটি টিলা পড়ে যায়। তিনি তার ওপর আরোহণের চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু সক্ষম হলেন না। কেননা, একে তো তাঁর দেহ ভারী হয়ে গিয়েছিলো, দ্বিতীয়ত তিনি দুটো বর্ম পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। তাছাড়া তিনি কঠিনভাবে আঘাতপ্রাপ্তও হয়েছিলেন। সুতরাং তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা) নিচে বসে পড়েন এবং তাঁকে ঘরে উঠিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। এভাবে তিনি টিলার ওপর পৌঁছে বলেন, তালহা (রা) জান্নাত ওয়াজিব করে নিয়েছে।

মুশরিকদের শেষ আক্রমণ

রাসূল (ﷺ) যখন ঘাঁটির মধ্যে স্বীয় অবস্থানস্থলে পৌঁছে যান, তখন মুশরিকরা মুসলমানদেরকে ঘায়েল করার শেষ চেষ্টা করে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় রয়েছে, যে সময় রাসূল (ﷺ) ঘাঁটি মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন, ঐ সময় আবু সুফিয়ান ও খালিদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে মুশরিকদের একটি দল পাহাড়ের ওপর উঠে। রাসূল ঐ সময় দু'আ করেন, 'হে আল্লাহ! এরা যেন আমাদের হতে ওপরে যেতে না পারে। অতঃপর ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) এবং মুহাজিরদের একটি দল যুদ্ধ করে তাদেরকে পাহাড়ের ওপর হতে নিচে নামিয়ে দেন।'

মাগাযী উমভীর বর্ণনা মতে, মুশরিকরা পাহাড়ের ওপর চড়ে বসলে রাসূল (ﷺ) সা'দ (রা) কে বললেন: তাদের উদ্যম নষ্ট করে দাও অর্থাৎ তাদেরকে পেছনে সরিয়ে দাও। তিনি উত্তরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একাই কিভাবে তাদের উদ্যম নষ্ট করব? রাসূল (ﷺ) তিনবার এ কথারই পুনরাবৃত্তি করেন। অবশেষে সা'দ (রা) স্বীয় তূণ হতে একটি তীর বের করেন এবং একটি লোকের ওপর নিক্ষেপ করেন। লোকটি সেখানেই মৃত্যুবরণ করে। সা'দ (রা) বলেন, পুনরায় আমি আমার তীর গ্রহণ করি। আমি ওটা চিনতাম। ওটা দ্বারা দ্বিতীয় এক ব্যক্তিকে মারলাম। সেও মারা গেল। তারপর আমি আবার ঐ তীর গ্রহণ করলাম এবং ওটা আমি চিনতাম। ওটা তৃতীয় এক ব্যক্তির প্রতি নিক্ষেপ করলাম এবং তাঁরও প্রাণ নির্গত হয়ে গেল। অতঃপর মুশরিকরা নিচে নেমে গেল। আমি বললাম, এটা বরকতপূর্ণ তীর। তারপর আমি ঐ তীর আমার তূণের মধ্যে রেখে দিলাম।" এ তীর সারা জীবন সা'দ (রা) এর কাছেই থাকে এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের নিকট সংরক্ষিত থাকে।

শহীদগণের মুসলা (অর্থাৎ নাক, কান ইত্যাদি কর্তন)

এটা ছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বিরুদ্ধে শেষ আক্রমণ। যেহেতু মুশরিকরা রাসূলের অবস্থান সম্পর্কে সঠিক অবহিত ছিলো না; বরং তার শাহাদত সম্পর্কে তাদের প্রায় দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো, সেহেতু তারা তাদের শিবিরের দিকে ফিরে গিয়ে মক্কায় যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে।

মুশরিকরদের কিছু সংখ্যক নারী-পুরুষ মুসলমান শহীদদের মুসলায় (নাক, কান, ইত্যাদি কর্তনে) লিপ্ত হয়ে পড়ে। হিন্দা বিনতে উতবা হামযাহ (রা) এর কলিজা ফেঁড়ে দেয় এবং তা মুখে নিয়ে চিবাতে থাকে। সে ওটা গিলে নেয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু গিলতে না পেরে থুথু করে ফেলে দেয়। সে কর্তিত কান ও নাকের তোড়া ও হার বানিয়ে নেয়।

অতঃপর শেষ সময়ে এমন দুটি ঘটনা সংঘটিত হয়, যার দ্বারা এটা অনুমান করা মোটেই কঠিন নয় যে, ইসলামের এ বীর মুজাহিদের শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্যে কেমন প্রস্তুত ছিলেন এবং আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার জন্যে কতটা আগ্রহী ছিলেন।

কা'ব ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেছেন, আমি ঐ মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। যাঁরা ঘাঁটি হতে বাহিরে এসেছিলেন। আমি দেখতে পেলাম, মুশরিকদের হাতে মুসলমান শহীদদের নাক, কান ইত্যাদি কর্তিত হচ্ছে। এ দেখে আমি থমকে দাঁড়ালাম। তারপর সামনে এগিয়ে দেখি, একজন মুশরিক, যে ভারী বর্ম পরিহিত ছিলো, শহীদদের মাঝে হতে গমন করছে এবং বলতে বলতে যাচ্ছে, 'কর্তিত বকরীদের নরম হাড়ের মত ঢেরী লেগে গেছে।' আরো দেখতে পেলাম একজন মুসলমান তার পথে ওঁৎ পেতে রয়েছেন। তিনিও বর্ম পরিহিত ছিলেন। আমি আরো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তাঁর পেছনে রয়ে গেলাম। তারপর দাঁড়িয়ে গিয়ে মুসলমান ও কাফিরটিকে চোখের দৃষ্টিতে ওজন করতে লাগলাম।

এমনিভাবে যতটুকু প্রত্যক্ষ করলাম তাতে ধারণা হলো যে, মুশরিকটি দেহের বাঁধন ও সারসরঞ্জাম উভয় দিক দিয়েই মুসলমানটির ওপরে রয়েছে। এ পর্যায়ে আমি দুজনের পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে অপেক্ষা করতে লাগলাম। অবশেষে উভয়ের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেল এবং মুসলমানটি মুশরিকটিকে তরবারি দিয়ে এমন আঘাত করলেন যে, ওটা তার পা পর্যন্ত কেটে চলে গেল। মুশরিক দু'টুকরা হয়ে গেল। তারপর মুসলমানটি নিজের চেহারা খুলে দিলেন এবং বললেন, ভাই কা'ব, কেমন হলো? আমি আবু দুজানাহ।

যুদ্ধশেষে কিছু মুসলিম মহিলা জিহাদের ময়দানে পৌঁছেন। আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন, আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা) এবং উম্মে সুলায়েম (রা) কে দেখলাম। তাঁরা পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত কাপড় উঠিয়ে নিয়ে পিঠের ওপর পানির মশক বহন করেছেন, উহুদের দিন উম্মে সালীত (রা) আমাদের জন্যে মশক ভরে ভরে পানি আনছিলেন।

এ মহিলাদের মধ্যে একজন উম্মে আয়মানও (রা) ছিলেন। তিনি পরাজিত মুসলমানদেরকে যখন দেখলেন যে, তাঁরা মদিনায় ঢুকে পড়তে চাচ্ছেন, তখন তিনি তাদের চেহারায় মাটি নিক্ষেপ করতে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন তোমরা এ সূতা কাটার ফিরকী গ্রহণ কর এবং আমাদেরকে তরবারি দিয়ে দাও।

এরপর তিনি দ্রুতগতিতে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছেন এবং আহতদেরকে পানি পান করাতে শুরু করেন। তাঁর ওপর হিব্বান ইবনে অরাকা তীর চালিয়ে দেয়। তিনি পড়ে যান এবং তার পর্দা সরে যায়। এ দেখে আল্লাহর শত্রু হো হো করে হেসে ওঠে। রাসূল (ﷺ) এর কাছে এটা খুব কঠিন ঠেকে এবং তিনি সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) কে একটি পালকবিহীন তীর দিয়ে বলেন, এটা চালাও। সা'দ (রা) ওটা চালিয়ে দিলে ওটা হিব্বানের গলায় লেগে যায় এবং সে চিৎ হয়ে পড়ে যায় ও তার পোশাক খুলে যায়। এ দেখে রাসূল এমনভাবে হাসেন যে, তাঁর দাঁত দেখা যায় এবং তিনি বলেন, সা'দ উম্মে আয়মানের বদলা নিয়ে ফেলেছে। আল্লাহ তাঁর দু'আ কবুল করুন।

ঘাঁটিতে স্থিতিশীলতার পর

যখন রাসূল (ﷺ) ঘাঁটির মধ্যে স্বীয় অবস্থানস্থলে কিছুটা স্থিতিশীল হন, তখন আলী ইবনে আবু তালিব (রা) মিহরাস হতে নিজের ঢালে করে পানি ভরে আনেন। কথিত আছে যে, মিহরাস পাথরের তৈরি ঐ গর্তকে বলা হয় যার মধ্যে বেশি পানি আসতে পারে। আবার এও বলা হয়ে থাকে, 'মিহরাস' উহুদের একটি ঝর্ণার নাম। যাই হোক আলী (রা) ঐ পানি নবী (ﷺ) এর খেদমতে পান করার জন্য পেশ করেন। নবী করীম (ﷺ) কিছুটা অপছন্দনীয় গন্ধ অনুভব করেন। সুতরাং তিনি ঐ পানি পান করলেন না বটে, তবে তা দ্বারা চেহারার রক্ত ধুয়ে ফেলেন এবং মাথায়ও দেন। ঐ সময় তিনি বলছিলেন- ঐ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর কঠিন গযব পতিত হোক, যে তার নবী এর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছেন।

সাহল (রা) বলেন, রাসূল (ﷺ) এর যখম কে ধুয়েছেন, পানি ঢেলে দিয়েছেন এবং প্রতিষেধকরূপে কোনো জিনিস প্রয়োগ করা হয়েছে; তা আমার বেশ জানা আছে। তাঁর কলিজার টুকরা ফাতিমা (রা) তাঁর যখম ধুচ্ছিলেন, আলী (রা) ঢাল হতে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন এবং ফাতিমা (রা) যখন দেখেন, পানির কারণে রক্ত বন্ধ হচ্ছে না, তখন তিনি চাটাই এর একটি অংশ নিয়ে জ্বালিয়ে দেন এবং তার ছাই নিয়ে ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দেন। এর ফলে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) মিষ্ট ও সুস্বাদু পানি আনেন। ঐ পানি নবী পান করেন এবং কল্যাণের দু'আ করেন।

যখমের ব্যাথার কারণে রাসূল (ﷺ) জোহরের নামায বসে বসে আদায় করেন এবং সাহাবায়ে কেরামও তাঁর পেছনে বসে বসে নামায পড়েন।

আবু সুফিয়ানের আনন্দ এবং ওমর (রা) এর সাথে কথোপকথন

মুশরিকরা প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেললে আবু সুফিয়ানকে উহুদ পাহাড়ের ওপর দেখা গেল। তিনি উচ্চৈস্বরে বললেন, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ আছে কি? মুসলমানরা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি আবার বললেন, তোমাদের মধ্যে আবু কুহাফার পুত্র আবু বকর (রা) আছে কি? তাঁরা এবার কোনো জবাব দিলেন না। তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেন, তোমাদের মধ্যে ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) আছে কি? সাহাবিগণ এবারও উত্তর দিলেন না। কেননা, তার কওমের এটা খুব ভালোই জানা ছিলো, ইসলাম এ তিনজনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মোটকথা, যখন কোনো উত্তর পাওয়া গেল না, তখন তিনি বললেন, চলো যাই, এ তিনজন হতে অবকাশ লাভ করা গেছে। এ কথা শুনে ওমর (রা) আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। তিনি বলে উঠলেন ওরে আল্লাহর শত্রু। যাদের তুই নাম নিয়েছিস তাঁরা সবাই জীবিত রয়েছেন এবং এখনো আল্লাহ তোকে লাঞ্চিত করার উৎস বাকি রেখেছেন। এরপর আবু সফিয়ান বলেন, তোমাদের নিহতদের মুসলা করা হয়েছে অর্থাৎ নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এরূপ করতে আমি হুকুমও করিনি এবং এটাকে খারাপও মনে করিনি। অতঃপর তিনি চিৎকার করে বলেন হুবল (ঠাকুর) সুউচ্চ হোক।

নবী করীম (ﷺ) তখন সাহাবিদেরকে বললেন, তোমরা জবাব দিচ্ছো না কেন? তারা বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী জবাব দেবো? তিনি বললেন, তোমরা বল, 'আল্লাহ সুউচ্চ ও অতি সম্মানিত।'

আবার আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বললেন, আমাদের জন্যে উযযা (প্রতিমা) রয়েছে, তোমাদের জন্যে উযযা নেই।

নবী পুনরায় সাহাবিদেরকে বললেন, তোমরা উত্তর দিচ্ছ না কেন? তারা বললেন, কী উত্তর দেবো?' তিনি বললেন, তোমরা বল- "আল্লাহ আমাদের মাওলা এবং তোমাদের কোনো মাওলা নেই।"

অতঃপর আবু সুফিয়ান বললেন, 'কতই না ভালো কাজ হলো। আজকের দিনটি বদর যুদ্ধের দিনের প্রতিশোধ। আর যুদ্ধ হচ্ছে বালতির ন্যায়।'

ওমর এ কথার উত্তরে বলেন, "সমান নয়। কেননা, আমাদের নিহতরা জান্নাতে আছেন, আর তোমাদের নিহতরা জাহান্নামে আছে।"

এরপর আবু সুফিয়ান বলেন, ওমর আমার নিকটে এসো। রাসূল তাঁকে বললেন, যাও, দেখা যাক কী বলে? ওমর এর নিকটে আসলে আবু সফিয়ান তাঁকে বলেন, তোমাকে আল্লাহর মাধ্যম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, আমরা মুহাম্মদ (ﷺ) কে হত্যা করেছি কি? জবাবে ওমর বলেন, আল্লাহর কসম! না। বরং এখন তিনি তোমাদের কথা শুনছেন। আবু সুফিয়ান তখন বললেন, তুমি আমার নিকট ইবনে কামআহ হতে অধিক সত্যবাদী।

বদরে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন। আবু সুফিয়ান এবং তাঁর সঙ্গীরা ফিরে যেতে শুরু করলে আবু সুফিয়ান মুসলমানদেরকে বললেন, "আগামী বছর বদরে আবার যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা থাকল।" রাসূল (ﷺ) তখন একজন সাহাবিকে বললেন, "তুমি তাঁকে বলে দাও, ঠিক আছে। এখন আমাদের ও তোমাদের মাঝে এটার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল।"

মুশরিকদের প্রত্যাগমনের সত্যাসত্য যাচাই

এরপর রাসূল আলী ইবনে আবু তালিবের (রা) রওয়ানা করিয়ে দিয়ে বললেন, (মুশরিক) কওমের পিছু পিছু যাও। অতঃপর তারা কী করে এবং তাদের উদ্দেশ্যে কী তা পর্যবেক্ষণ করো। যদি দেখো, তারা ঘোড়াকে পার্শ্বে রেখে উটের ওপর সওয়ার হয়ে চলছে, তবে জানবে যে, ফিরে যাওয়াই তাদের উদ্দেশ্যে। আর যদি দেখো, তাঁরা ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে উটকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তবে জানবে, যে মদিনা (আক্রমণ করাই) তাঁদের উদ্দেশ্যে"। তারপর তিনি বলেন, 'যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তাঁর শপথ! যদি মদিনা (আক্রমণ করাই) তাদের উদ্দেশ্যে হয়, তবে মদিনা গিয়ে আমি তাদের মুকাবিলা করবো। আলী (রা) বলেন, অতঃপর আমি তাদের পেছনে বের হয়ে দেখি তারা ঘোড়াকে পাশে রেখে উটের ওপর সওয়ার হয়ে আছে এবং মক্কামুখী রয়েছে।

শহীদ ও আহতদের অনুসন্ধান

কুরাইশদের প্রত্যাবর্তনের পর মুসলমানরা তাঁদের শহীদ ও আহতদের খোঁজ খবর নেয়ার সুযোগ লাভ করেন। যায়েদ ইবনে সাবিত (রা) বর্ণনা করেছেন। উহুদের দিন রাসূল আমাকে প্রেরণ করেন, আমি যেন সা'দ ইবনে রাবী (রা) এর মৃতদেহ অনুসন্ধান করি এবং সেই সাথে তিনি বলেন, "যদি তাঁকে জীবিত দেখতে পাও, তবে তাঁকে আমার সালাম জানাবে এবং আমার কথা বলবে, সে কেমন অনুভব করছে তা রাসূল জানতে চান।" আমি তখন নিহতদের মধ্যে চক্কর দিতে দিতে তাঁর কাছে পৌঁছে দেখি, তাঁর নিঃশ্বাস আসা-যাওয়া করছে। তিনি বর্শা, তরবারি ও তীরের সত্তরের বেশি আঘাত পেয়েছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, হে সাদ! রাসূল আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং আপনি কেমন অনুভব করছেন তা জানতে চেয়েছেন। তিনি উত্তরে বললেন, রাসূলকে আমার সালাম জানাবেন এবং তাঁকে বলবেন, আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি। আর আপনি আমার কওম আনসারদেরকে বলবেন যে, যদি তাদের একটি চক্ষুও নড়তে থাকে এবং এমতাবস্থায় শত্রু রাসূল পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তবে আল্লাহর নিকট তাদের কোনো ওযর চলবে না। আর ঐ মুহূর্তে তাঁর প্রাণ নির্গত হয়ে গেল।

মুসলমানরা আহতদের মধ্যে উসাইরিমকেও দেখতে পান, যাঁর নাম ছিলো আমর ইবনে সাবিত। তাঁর প্রাণ ছিলো তখন ওষ্ঠাগত। ইতোপূর্বে তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হতো, কিন্তু তিনি কবুল করতেন না। এ জন্যে মুসলমানরা (বিস্মিতভাবে) পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করেন, এ উসাইরিম! কিভাবে এখানে আসলে? আমরা তো তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে এসেছিলাম যে, সে দ্বীনের বিরোধী ছিলো। তাই, তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে উসাইরিম! কোন জিনিস তোমাকে এখানে এনেছেন? সম্প্রদায়কে সাহায্য করার উত্তেজনা, না ইসলামের আকর্ষণ? তিনি উত্তরে বললেন, ইসলামের আকর্ষণ, আসলে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর প্রতি ঈমান এনেছি এবং এরপর রাসূলকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে শরীক এর পরই তিনি চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হয়ে যান। মুসলমানরা রাসূল এর সামনে এ ঘটনার উল্লেখ করলে তিনি বলেন, সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হলো।" আবু হুরায়রা বলেন, অথচ তিনি আল্লাহর জন্যে এক ওয়াক্ত নামাযও আদায় করেননি। কেননা, ইসলাম গ্রহণের পর কোনো নামাযের সময় হওয়ার পূর্বেই তিনি শহীদ হয়ে যান।

এ আহতদের মধ্যে কুযমানকেও পাওয়া গেল, সে যুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্ব দেখিয়েছিলো এবং একাই সাতজন বা আটজন মুশরিককে হত্যা করেছিলো। তাকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল। মুসলমানরা তাকে উঠিয়ে বনু যাফারের মহল্লায় নিয়ে গেলেন এবং তাকে সুসংবাদ শুনালেন। সে বলল, আল্লাহর কসম! আমার যুদ্ধ তো শুধু আমার কওমের মর্যাদা রক্ষার জন্যেই ছিলো। এটা না থাকলে আমি যুদ্ধই করতাম না।" এরপর যখন তার যখমের করনে সে অত্যধিক যন্ত্রণা অনুভব করল তখন সে নিজেকে জবাই করে আত্মহত্যা করল। এরপর যখনই রাসূল (ﷺ) এর সামনে তার আলোচনা করা হতো তখনই তিনি বলতেন যে, সে জাহান্নামী।

আল্লাহর কালেমাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে ছাড়া অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে যুদ্ধকারীদের পরিণাম এরূপই হয়ে থাকে, যদিও সে ইসলামের পতাকার নিচে রাসূল, সাহাবিদের সাথে শরীক হয়ে যুদ্ধ করে।

পক্ষান্তরে, নিহতদের মধ্যে বনু সা'লাবার একজন ইহুদিকে পাওয়া যায়। যখন তুমুল যুদ্ধ চলছিলো তখন সে তার কওমকে বলেছিলো, হে ইহুদিদের দল! আল্লাহর কসম! তোমরা জান, মুহাম্মদ তখন বলেছিলো, তোমাদের জন্যে কোনো শনিবার নেই।" অতঃপর সে নিজের তরবারী এবং সাজ-সরাঞ্জাম উঠিয়ে নেয় এবং বলে আমি যদি নিহত হই, তবে আমার মাল মুহাম্মদ (ﷺ) এর অধিকারে চলে যাবে। তিনি তা নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করবেন। এরপর ঐ ব্যক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যায় এবং যুদ্ধ করতে করতে নিহত হয়। রাসূল (ﷺ) মন্তব্য করেন- মুখাইরীক একজন উত্তম ইহুদি ছিলো।

এ সময় রাসূল (ﷺ) নিজেও শহীদদেরকে পরিদর্শন করেন এবং বলেন, আমি এ লোকদের ব্যাপারে সাক্ষী থাকবো। প্রকৃত ব্যাপার এই যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহত হয়, আল্লাহ তাঁকে কিয়ামতের দিন এ অবস্থায় উঠাবেন, তাঁর ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত বইতে থাকবে। রং তো রক্তেরই হবে, কিন্তু সুগন্ধি হবে মিশকের মতো।

কয়েকজন সাহাবা (রা) তাদের শহীদদেরকে মদিনায় স্থানান্তরিত করেছিলেন। রাসূল তাদেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁরা যেন শহীদদেরকে ফিরিয়ে এনে তাঁদের শাহাদাতের স্থানেই দাফন করেন এবং আরো নির্দেশ দেন, তাঁদের অস্ত্র-শস্ত্র এবং চর্ম নির্মিত (যুদ্ধের) পোশাক যেন খুলে নেয়া না হয়, আর গোসল দেয়া ছাড়াই যে অবস্থায় তাঁরা রয়েছেন সেই অবস্থাতেই যেন তাঁদেরকে দাফন করে দেয়া হয়। তিনি দু' দুজনকে একই কাপড় জড়াতেন এবং দুই কিংবা তিন জন শহীদকে একই কবরে দাফন করতেন এবং প্রশ্ন করতেন, এদের মধ্যে কুরআন কার বেশি মুখস্থ ছিলো? সাহাবিরা যার দিকে ইশারা করতেন, তাকেই তিনি কবরে আগে রাখতেন এবং বলতেন: "কিয়ামতের দিন আমি এ লোকদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দান করব।" আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম এবং আমর ইবনে জমূহ কে একই কবরে দাফন করা হয়। কেননা, তাঁদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিলো।

হানযালা (রা) এর মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছিল না। অনুসন্ধানের পর এক জায়গায় এমন অবস্থায় দেখা গেল, যমীন হতে ওপরে রয়েছে এবং ওটা হতে টপ টপ করে পানি পড়ছে। এ দেখে রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, ফেরেশতারা একে গোসল দিচ্ছেন। তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন, তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা কর, প্রকৃত ব্যাপারটি কী ছিলো? তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তার প্রকৃত ঘটনাটি বলেন। এখান থেকেই হানযালা (রা) এর নাম গাসীলুল মালাইকাহ (অর্থাৎ ফেরেশতাগণ কর্তৃক গোসল) হয়ে যায়।

রাসূল তাঁর চাচা হামযা (রা) এর অবস্থা দেখে অত্যন্ত মর্মাহত হন। তাঁর ফুফু সফিয়া (রা) আগমন করেন এবং তিনিও তাঁর ভ্রাতা হামযা (রা) কে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু রাসূল তাঁর পুত্র যুবায়ের (রা) কে বলেন যে, তিনি যেন তাঁর মাতাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং তাঁর ভাইকে দেখতে না দেন।

এ কথা শুনে সফিয়া (রা) বলেন, "এটা কেনো? আমি জানতে পেরেছি যে, আমার ভাইয়ের নাক, কান ইত্যাদি কেটে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার ভাই আল্লাহর পথে রয়েছে। সুতরাং তার ওপর যা কিছু করা হয়েছে, তাতে আমি পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট আছি। আমি পুণ্য মনে করে ইনশাআল্লাহ ধৈর্যধারণ করব। অতঃপর তিনি হামযা (রা) এর নিকট আসেন, তাঁকে দেখেন, তাঁর জন্যে ইন্নালিল্লাহ পড়েন এবং দু'আ করেন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। তারপর রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশ অনুযায়ী হামযা (রা) কে আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ (রা) এর সাথে দাফন করা হয়। তিনি হামযার ভাগিনা এবং দুধ ভাইও ছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) এর জন্যে যেভাবে কেঁদেছেন, তার চেয়ে বেশি কাঁদতে আমরা তাঁকে কখনো দেখিনি। তিনি তাঁকে কেবলামূখী করে রাখেন। অতঃপর তাঁর জানাযায় দাঁড়িয়ে তিনি এমন ভাবে ক্রন্দন করেন যে, শব্দ উঁচু হয়ে যায়।

প্রকৃতপক্ষে শহীদদের দৃশ্য ছিলো অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। খাব্বাব ইবনে আরাত বর্ণনা করেছেন, হামযা (রা) এর জন্যে কালো প্রান্ত বিশিষ্ট একটি চাদর ছাড়া কোনো কাফনের কাপড় পাওয়া যায়নি। ঐ চাদর দ্বারা মাথা আবৃত করলে পা খোলা থেকে যেতো এবং পা আবৃত করলে মাথা খোলা থেকে যেতো। অবশেষে মাথা ঢেকে দেয়া হয় এবং পায়ের ওপর ইযখির ঘাস চাপিয়ে দেয়া হয়।

রাসূল মহামহিমান্বিত আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন এবং তার নিকট দু'আ করেন।

ইমাম আহমদের বর্ণনায় রয়েছে, উহুদের দিন যখন মুশরিকরা মক্কার পথে ফিরে যায়, তখন রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, 'তোমরা সমানভাবে দাঁড়িয়ে যাও, "আমি কিছুক্ষণ আমার মহিমান্বিত প্রতিপালকের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করব।" এ আদেশ অনুযায়ী সাহাবায়ে কেরাম তাঁর পেছনে কাতারবন্দী হয়ে যান। তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। হে আল্লাহ! যে জিনিসকে আপনি প্রশস্ত করেন সেটিকে কেউ সংকীর্ণ করতে পারে না, আর যে জিনিসকে আপনি সংকীর্ণ করে দেন সেটিকে কেউ প্রশস্ত করতে পারে না। যাকে আপনি পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ প্রদর্শন করতে পারে না। যেটা আপনি আটকে রাখেন, সেটিকে কেউ প্রদান করতে পারে না, আর যেটি আপনি প্রদান করেন ওটা কেউ আটকাতে পারে না, যেটাকে আপনি দূর করে দেন সেটিকে কেউ নিকটবর্তী করতে পারে না। হে আল্লাহ! আমার ওপর বরকত, রহমত অনুগ্রহ এবং রিযিক প্রশস্ত করে দিন। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন নিয়ামতের জন্যে প্রার্থনা করছি, যা স্থায়ী থাকে এবং শেষ হয় না। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন নিয়ামতের জন্যে প্রার্থনা করছি, যা স্থায়ী থাকে এবং শেষ হয় না। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট দরিদ্রের দিনে সাহায্যের, ভয়ের দিনে নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! আপনি আমদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তার অকল্যাণ হতে এবং যা কিছু দেননি তারও অকল্যাণ হতে আশ্রয় চাচ্ছি। হে আল্লাহ! আমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিন এবং আমাদের সৌন্দর্যমণ্ডিত হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকদের অর্ন্তভুক্ত করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদেরকে মুসলমান থাকাবস্থায় মৃত্যু দান করুন এবং মুসলমান থাকাবস্থায় জীবিত রাখুন। আর আমরা লাঞ্ছিত ও ফিতনায় পড়ার পূর্বেই আমাদেরকে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি ঐ কাফিরদেরকে ধ্বংস করুন যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে, হে সত্য মা'বুদ।

মদিনায় প্রত্যাবর্তন এবং প্রেম-প্রীতি আত্মোৎসর্গ প্রদর্শনের অসাধারণ ঘটনাবলি

শহিদের দাফন কাফন এবং মহামহিমান্বিত আল্লহর গুণকীর্তন ও তাঁর নিকট প্রার্থনার কাজ শেষ করে রাসূল (ﷺ) মদিনার পথে যাত্রা শুরু করেন। যুদ্ধকালে যেমন সাহাবায়ে কেরাম (রা) হতে প্রেম ও আত্মোৎসর্গের অসাধারণ ঘটনাবলি প্রকাশিত হয়েছিলো, ঠিক তেমনি পথ চলাকালে মুসলিম মহিলাগণ হতেও সত্যবাদিতা ও আত্মোৎসর্গের বিস্ময়কর ঘটনাবলি প্রকাশ পেয়েছিলো। পথে রাসূল (ﷺ) এর সাথে হামনা বিনতে জাহাশ (রা) এর সাক্ষাৎ হলে তাকে তার ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ এর শাহাদাতের সংবাদ দেয়া হয়। তিনি ইন্নলিল্লাহ পাঠ করেন ও তাঁর মাগফিরাতের জন্য দোআ করেন। তাঁর মামা হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) এর শাহাদতের খবর দেয়া হয়। তিনি আবার ইন্নলিল্লাহ পড়েন ও তাঁর মাগফিরাতের জন্য দু'আ করেন। এরপর তাঁকে তাঁর স্বামী মুসআব ইবনে উমায়ের (রা) এর শাহাদতের সংবাদ দেয়া হয়। এ খবর শুনে তিনি অস্থিরভাবে চিৎকার করে উঠেন এবং হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। এ দেখে রাসূল বলেন, 'এ মহিলার কাছে তাঁর স্বামীর বিশেষ এক মর্যাদা ছিলো।'

অনুরূপভাবে রাসূল বানু দীনার গোত্রের এক মহিলার পাশ দিয়ে গমন করেন, যার স্বামী, ভাই এবং পিতা তিনজনই শহীদ হয়েছেন। তাঁকে এদের শাহাদতের সংবাদ দেয়া হলে তিনি বলে ওঠেন, 'রাসূল ভালো আছেন এবং আল-হামদুলিল্লাহ, তুমি যেমন চাচ্ছ তিনি তেমনই আছেন (অর্থাৎ তিনি বেঁচে আছেন)। মহিলাটি বললেন, তাঁকে একটু আমাকে দেখিয়ে দিন, আমি তার দেহ মুবারক একটু দেখতে চাই।'

সাহাবিগণ ইঙ্গিতে রাসূল (ﷺ) এর দিকে দেখিয়ে দিলেন। রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়া মাত্রই তিনি বলে উঠলেন- 'আপনাকে পেলে সব বিপদই নগণ্য।'

পথে চলাকালেই সা'দ ইবনে মু'আয (রা) এর মা রাসূল (ﷺ) এর নিকট দৌড়াতে দৌড়াতে আসেন। ঐ সময় সা'দ ইবনে মু'আয রাসূল (ﷺ) এর ঘোড়ার লাগাম ধরেছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইনি আমার মাতা। রাসূল তখন 'মারহাবা' বলেন। অতঃপর তাঁর অভ্যর্থনার জন্যে থেমে যান। তারপর রাসূল (ﷺ) উহুদের শহীদদের জন্যে দু'আ করেন এবং বলেন, হে উম্মি সা'দ! তুমি খুশি হয়ে যাও এবং শহীদদের পরিবারের লোকদেরকে সুসংবাদ শুনিয়ে দাও, তাঁদের সবারই শাফাআত কবুল করা হবে।

সা'দের (রা) মাতা তখন বললেন, হে আল্লাহ রাসূল! তাদের উত্তরাধিকারীদের জন্যেও দু'আ করুন। তিনি বললেন- হে আল্লাহ! তাঁদের অন্তরের দুঃখ দূর করে দিন, তাঁদের বিপদের বিনিময় প্রদান করুন এবং জীবিত ওয়ারিসদেরকে উত্তমরূপে দেখা শোনা করুন।

রাসূল মদিনায় পৌঁছেন

সেদিন হিজরি তৃতীয় সনের ৭ই শাওয়াল শনিবারে সন্ধ্যার পূর্বেই রাসূল মদিনায় পৌঁছেন। বাড়িতে পৌঁছে তিনি স্বীয় তরবারিখানা ফাতিমা (রা) কে দিয়ে বলেন, মা! এর রক্ত ধুয়ে দাও। আল্লাহর কসম! এটা আজ আমার নিকট খুবই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।" তারপর আলী (রা) তাঁর তরবারিখানা ফাতিমা (রা) এর দিকে বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, এটার রক্তও ধুয়ে ফেলো। আল্লাহর শপথ! এটাও আজ অত্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।" তাঁর একথা শুনে রাসূল তাঁকে বললেন, তুমি যদি নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করে থাক, তবে তোমার সাথে সুহায়েল ইবনে হোনায়েফ (রা) এর আবু দুজানাও (রা) নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধ করেছে।

অধিকাংশ বর্ণনাকারী একমত হয়েছেন মুসলমান শহীদদের সংখ্যা ছিলো সত্তর জন, যাদের মধ্যে অধিক সংখ্যকই ছিলেন আনসার, অর্থাৎ তাঁদেরই পয়ষট্টি জন লোক শহীদ হয়েছিলো। খাযরাজ গোত্রের একচল্লিশ জন এবং আউস গোত্রের চব্বিশ জন। একজন ইহুদি নিহত হয়েছিলো এবং মুহাজির শহীদদের সংখ্যা ছিলো মাত্র চারজন।

এখন বাকী থাকল কুরাইশের নিহাদের সংখ্যা। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, তাদের সংখ্যা ছিলো বাইশ জন। কিন্তু আসহাবে মাগাযী এবং আহলু সিরিয়ার এ যুদ্ধের যে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এবং যাতে যুদ্ধের বিভিন্ন স্থানে নিহত মুশরিকদের যে আলোচনা এসেছে, তাতে গভীরভাবে চিন্তা করে হিসাব করলে এ সংখ্যা বাইশ নয়, বরং সাইত্রিশ হয়। এসব ব্যাপারে আল্লাহ সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী।

মদিনায় উদ্বেগপূর্ণ অবস্থা

মুসলমানরা উহুদ যুদ্ধ হতে ফিরে এসে (তৃতীয় হিজরি সনের ৮ শাওয়াল শনিবার ও রবিবারের মধ্যবর্তী) রাত্রে উদ্বেগপূর্ণ অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করেন। যুদ্ধ তাঁদেরকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছিলো। এতদসত্বেও তাঁরা মদিনার পথে ও গমনাগমন স্থলে সারা রাত পাহারা দিতে থাকেন এবং তাঁদের সেনাপতি রাসূল (ﷺ) এর হিফাযতের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কেননা, যে কোনো দিক থেকেই তাঁর আক্রান্ত হওয়ার আশংকা ছিলো।

হামরাউল-আসাদ অভিযান

এদিকে রাসূল যুদ্ধের ব্যাপারে গভীর চিন্তা করে সারারাত কাটিয়ে দেন। তাঁর আশংকা ছিলো, যদি মুশরিকরা এ চিন্তা করে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে তাদের পাল্লা ভারী থাকা সত্ত্বেও তারা কোনো উপকার লাভ করতে পারেনি, তাহলে তারা অবশ্যই লজ্জিত হবে এবং রাস্তা হতে ফিরে এসে মদিনার ওপর দ্বিতীয়বার আক্রমণ চালাবে। এ জন্যে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, যে প্রকারেই হোক তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে হবে।

আহলে সিয়াবের মতে, রাসূল যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ (তৃতীয় হিজরির ৮ শাওয়াল রবিবারে) সকালে ঘোষণা করেন যে, শত্রুদের মুকাবিলার জন্যে বের হতে হবে। সাথে সাথে তিনি এ ঘোষণাও দেন যে, যারা উহুদ যুদ্ধে শরীক ছিলো শুধু তারাই যাবে। এর পরেও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তাদের সাথে যাবার অনুমতি চাইলে রাসূল তাকে অনুমতি দিলেন না। এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মদিনার মুসলিম পল্লীটি নব জীবনে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠলেন।

আহত মুসলিম বীরেরা আল্লাহু আকবর বলে লাফিয়ে উঠলেন। সব শোক, সব সন্তাপ, সব জ্বালা, সব যন্ত্রণা বিস্মৃত হয়ে তাঁরা গতকালের রক্ত রঞ্জিত অস্ত্রগুলো তুলে নিলেন হাতে এবং উৎসাহের সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে সমবেত হতে লাগলেন। দেখতে দেখতে মুসলিম বাহিনী মদিনা ত্যাগ করলেন।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) যিনি উহুদ যুদ্ধে শরীক হওয়ার সুযোগ পাননি। এ যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে আরজ পেশ করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি চাচ্ছি আপনি যে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন আমিও যেন সেই সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ লাভ করি। কিন্তু যেহেতু এ যুদ্ধে (উহুদ) আমার পিতা তার সন্তানদের দেখাশোনার জন্য আমাকে বাড়িতে রেখে দেন, সেহেতু আমি তাতে শরীক হতে পরিনি অতএব, আমাকে অভিযানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দান করা হোক। রাসূল তাঁকে অনুমতি প্রদান করলেন।

রাসূল পূর্বের ন্যায় রণসাজে সজ্জিত হয়ে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক অগ্রভাগে থেকে চলতে থাকলেন। আর সকলেই চলছিলেন পদব্রজে। কর্মসূচি অনুযায়ী মদিনা হতে আট মাইল দূরে 'হামরাউল আসাদ' নামক স্থানে পৌঁছে তারা শিবির স্থাপন করলেন।

এ স্থানে অবস্থানকালে মা'বাদ ইবনে আবু মা'বাদ খুযায়ী রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। কথিত আছে, সে শিরকের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কিন্তু সে রাসূললের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলো। যাই হোক, সে বলল, হে মুহাম্মদ (ﷺ) আপনার ও আপনার সহচরদের ক্ষয়ক্ষতিতে আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছি। আমি কামনা করছিলাম, আল্লাহ আপনাদেরকে নিরাপদে রাখবেন। তার এ সহানুভূতি প্রকাশে খুশি হয়ে রাসূল তাকে বললেন, 'তুমি আবু সুফিয়ানের নিকট যাও এবং তাকে হতোদ্যম করে দাও।'

এদিকে রাসূল যে আশঙ্কা করছিলেন, মুশরিকরা মদিনার দিকে প্রত্যাবর্তনের কথা চিন্তা ভাবনা করবে, তা ছিলো সম্পূর্ণ সত্য।

মুশরিকেরা মদিনা হতে ছত্রিশ মাইল দূরে 'রওহা' নামক স্থানে পৌঁছে যখন শিবির স্থাপন করল, তখন তারা পরস্পর পরস্পরকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করতে লাগল। তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, আমরা কোনো কাজই করতে পারলাম না এবং আমাদের উদ্দেশ্যেও সফল হলো না। আবু সুফিয়ান, ইকরামা প্রমুখ দলপতিরা বলতে লাগল, মুহাম্মদ আহত এবং তাঁর অধিকাংশ ভক্তই আঘাতে জর্জরিত, এ অবস্থায় মদিনা আক্রমণ না করে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে কোনোক্রমেই যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে না।

মুসলমানদেরকে সমূলে উৎপাটিত ও সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করার জন্য আমরা এত উদ্যোগ আয়োজন করলাম এবং যথাসর্বস্ব খরচ করে ফেললাম। এখন তার সুযোগ উপস্থিত হয়েছে, অথচ আমরা ফিরে যাচ্ছি, দু'দিন পরেই তারা আবারও সামলে উঠবে, তখন আমাদের উদ্দেশ্যে পূরণ সহজসাধ্য হবে না, কেননা, তাদের শান-শওকত ও শক্তি কিছুটা খর্ব হলেও তাদের মধ্যে এখনো কিছু সংখ্যক লোক থেকে গেছে, যারা আবার তোমাদের মাথাব্যথার কারণ হবে। অতএব, তোমাদের উচিত, মদিনায় ফিরে গিয়ে তাদের মূলোৎপাটন করে ফেলা।

আবু সফিয়ান বিভিন্ন গোত্রের যে সমস্ত লোকদেরকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে নিজেদের দলে এনেছিলেন, তারা বলতে লাগল, কী করতে এসেছিলাম আর কী করে যাচ্ছি। মদিনা আক্রমণ করে ধর্মের শত্রুদেরকে বিধ্বস্ত করে ফেলব, মদিনার সমস্ত ধন-সম্পদ লুটে নেব, তাদের যুবতী ও কুমারীদের সতীত্ব নষ্ট করব এবং যা খুশি তাই করব। কিন্তু এখন দেখছি এ সব কিছুই হলো না। আমাদেরকে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিল, মদিনা আক্রমণ করতেই হবে। উমাইয়ার পুত্র সাফওয়ান এর প্রতিবাদ করল বটে, কিন্তু কেউই তার কথা গ্রাহ্য করল না।

কিন্তু অনুমান করা যায় যে, এটা ছিলো মুশরিক কুরাইশদের সাধারণ লোকজনের অভিমত যারা উভয় পক্ষের শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখত না। কিন্তু সাফওয়ান বিন উমাইয়া যিনি একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি এ মতের বিরোধিতা করেন এবং বলেন, হে লোক সকল! তোমরা এরূপ কাজ করো না। আমার ভয় হয় যে, মদিনায় যারা উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি, তারাও তোমাদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে। তোমরা এ অবস্থায় ফিরে চল। এখন পর্যন্ত বিজয় রয়েছে তোমাদেরই। অন্যথায় আমার ভয় হয়, যদি মদিনা আক্রমণ কর তাহলে বিপদে পড়ে যাবে। কিন্তু অধিক সংখ্যক লোকই এ মত গ্রহণ করল না এবং সিদ্ধান্ত হলো যে মদিনা আক্রমণ করতে হবে।

তখনো তারা শিবির ছেড়ে বের হয়নি এমন সময় মা'বাদ ইবনে আবু মা'বাদ খোযায়ী সেখানে গিয়ে হাজির হলো। মা'বাদের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আবু সুফিয়ান কিছুই জানতো না। তাই তাকে দেখেই আবু সুফিয়ান সাগ্রহে বলে উঠলেন, "এই যে মা'বাদ!" সংবাদ কী? মা'বাদ উত্তর দিলো, সংবাদ আর কী, এখনই সরে পড়। আর সুফিয়ান প্রশ্ন করলেন, ব্যাপার কী, মুহাম্মদ সম্বন্ধে কোনো সংবাদ আছে না কি? মা'বাদ জবাবে বলল, 'আছে তবে কী? মুহাম্মদ বিপুল আয়োজনে অগ্রসর হচ্ছেন। এবার মদিনার প্রত্যেক মুসলমানই যোগদান করেছে। একথা শুনে আবু সুফিয়ান বললেন, আরে সর্বনাশ। তুমি বলছো কী? তাদের অবশিষ্ট শক্তিটুকু বিনষ্ট করতে, তাদেরকে সমূলে উৎপাটিত করতে কৃতসংকল্প হয়ে আমরা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে যাচ্ছি, আর মুহাম্মদ দৃঢ় প্রত্যয়ে আবার যুদ্ধ যাত্রা করেছে? এটাও কি সম্ভব, তুমি বলছ কী? বেশি দেরী নয়, শীঘ্র সরে পড়ো।

আবু সুফিয়ান তখন সকলকে মক্কার পথে যাত্রা করার আদেশ প্রদান করলেন। কুরাইশ বাহিনী আর কালবিলম্ব না করে স্বদেশাভিমুখে ধাবিত হলো। তবে আবু সুফিয়ান একটি কাজ করেন, মুহাম্মদ (ﷺ) যেন মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন না করেন এ জন্যে তাদের পাশ দিয়ে গমনকারী আবুল কায়েস গোত্রের এক কাফেলার লোকদেরকে বলেন, আপনারা মুহাম্মদ কে আমাদের একটি পয়গাম পৌছিয়ে দিবেন কি? আমি ওয়াদা করছি, আপনারা যখন মক্কায় আসবেন, তখন আমি এর বিনিময়ে আপনাদের উষ্ট্রী যতটা বহন করতে পারে ততো কিসমিস প্রদান করব।

ঐ লোকগুলো বলল, জ্বী হ্যাঁ পারবো। আবু সুফিয়ান তখন তাদেরকে বললেন, মুহাম্মদকে এ খবর পৌঁছিয়ে দেবেন, আমরা তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদেরকে খতম করে দেয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

এরপর এ কাফেলা যখন হামরাউল আসাদে রাসূল এবং সাহাবায়ে কিরামের পাশ দিয়ে গমন করে তখন তাদেরকে আবু সুফিয়ানের এ পয়গাম শুনিয়ে দেয় এবং বলে, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক (মুশরিকরা) জমায়েত হয়েছে। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় কর, কিন্তু এটা তাঁদের বিশ্বাস দৃঢ়তর করেছিলো এবং তাঁরা বলেছিলেন, 'আল্লাহই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক!

তারপর তাঁরা আল্লাহ অবদানে ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিলেন। কোনো অনিষ্ট তাঁদেরকে স্পর্শ করেনি এবং আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট, তাঁরা তারই অনুসরণ করেছিলেন এবং আল্লাহ বড়ো অনুগ্রহশীল।

রাসূল তো রবিবারে হামরাউল আসাদে পৌঁছে সোমবার, মঙ্গলবার মদিনায় ফিরে এসেছিলেন। ফিরবার পূর্বে আবু উযযা জুমহী রাসূল (ﷺ) এর হাতে বন্দী হয়। এ ছিলো ঐ ব্যক্তি, যে বদরের যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর দারিদ্র্য ও কন্যার আধিক্যের কারণে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি পেয়েছিলো। শর্ত ছিলো, সে ভবিষ্যতে কখনও রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধে কাউকেও সাহায্য করবে না। কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে কবিতার মাধ্যমে নবী ও সাহাবায়ে কিরামের বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করতে থাকে। অতঃপর উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে সে নিজেও আগমন করে, তাকে গ্রেফতার করে যখন রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাযির করা হয়, তখন সে বলতে শুরু করলো, সন্তানদের খাতিরে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি অঙ্গীকার করছি এরূপ অপরাধমূলক কাজ আর কখনও করব না। নবী উত্তরে বলেন, এখন এটা হতে পারে না যে, মক্কায় ফিরে গিয়ে নিজের কপালে আহ মেরে বলবে, আমি মুহাম্মদকে দু'দুবার প্রতারিত করেছি। মু'মিনকে এক ছিদ্র হতে দু'বার দংশন করা হয় না। এরপর তিনি যুবায়ের (রা) কে অথবা আসিম ইবনে সাবিত (রা) কে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। তাঁরা তাকে হত্যা করেন।

অনুরূপভাবে মক্কার একজন গুপ্তচরও মারা যায়। তার নাম ছিলো মুয়াবিয়া ইবনে মুগিরা ইবনে আবুল আস। সে ছিলো আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের নানা। উহুদের মুশরিকরা যখন মক্কার দিকে ফিরে যায়, তখন সে চাচাতো ভাই উসমান ইবনে আফফান (রা) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। উসমান (রা) রাসূল (ﷺ) এর নিকট তার জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। রাসূল (ﷺ) তাকে এক শর্তে নিরাপত্তা পদান করেন যে, সে যদি মদিনায় তিনদিনের বেশি অবস্থান করে তবে তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু মদিনা যখন মুসলিম সৈন্য শূন্য হয়ে গেল তখন এ লোকটি কুরাইশের গোয়েন্দাগিরি করার জন্যে মদিনায় তিন দিনের বেশি থেকে যায়।

অতঃপর যখন মুসলিম সেনাবাহিনী মদিনায় ফিরে আসেন, তখন সে পালাবার চেষ্টা করে। রাসূল (ﷺ) যায়েদ ইবনে হারিসাহ (রা) ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রা) কে নির্দেশ দেন, তারা যেন ঐ ব্যক্তি পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করেন।

হামরাউল-আসাদ অভিযানে বর্ণনা পৃথক নামে দেয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা উহুদ যুদ্ধেরই একটি অংশ ও পরিশিষ্ট।

উহুদ যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের পর্যালোচনা

ঐতিহাসিকগণ বলেন, উহুদ যুদ্ধে মুসলমানগণ ভীষণভাবে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। মুসলমানরা যে নিজেদের ভুলে এ যুদ্ধে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কুরাইশরা যে মুসলমানদের তুলনায় অল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো এরও কোনো প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে এ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় হয়েছিলো বলে ঐতিহাসিকগণ যে অভিমত প্রকাশ করেছেন, সেটাও সমর্থন করা যায় না। কারণ মুসলমানরা পরাজিত হয়ে থাকলে বিজয়ী কুরাইশ সৈন্যরা পরাজিত মুসলমানদেরকে ধ্বংস না করে রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করে গেল কেন? দেখা যায়, এ যুদ্ধে কুরাইশরা একজন মুসলমানকেও বন্দী করতে পারেনি, এমনকি কোনো আহত মুসলমান সৈনিকও তাদের হাতে বন্দী হননি।

যুদ্ধে কুরাইশ পক্ষের বিজয় হয়ে থাকলে এরূপ হওয়া কোনো মতেই সম্ভবপর হতো না। ঐতিহাসিকগণ বলছেন কুরাইশ পক্ষের মাত্র ২৩ জন সৈন্য নিহত হয়েছিলো। কিন্তু তাদের এ বর্ণনার পর মোটেই আস্থা রাখা যায় না। কেননা, তাঁরা নিজ মুখে বলেছেন যে, একা হামযা (রা) এর হাতে ৩১ জন কুরাইশ সৈন্য নিহত হয়েছিলো। মুসলমান পক্ষে প্রায় ৭০ জন বীর প্রাণপণে যুদ্ধ করার পর শাহাদাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

মুসলমানদের হাতে যে কত লোক নিহত হওয়া সম্ভব, তাও সহজে অনুমান করা যেতে পারে। যুদ্ধের প্রথম অবস্থায় মুসলিম বীরদের প্রচন্ড আক্রমণ তিন হাজার কুরাইশ সৈন্য পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলো। তখন শত্রু বিনাশে মুসলিম সৈন্যরা একটুও ত্রুটি করেননি। সুতরাং এ সময়ও যে বহু সংখ্যক শত্রু সৈন্য হতাহত হয়েছিলো তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ থাকতে পারে না।

এরূপ অবস্থায় আমরা এ যুদ্ধকে এক দলের বিজয় ও অন্য দলের পরাজয় না বলে অমিমাংসিত যুদ্ধ বলতে পারি, যাতে উভয় দল নিজ নিজ সফলতা ও ক্ষয়-ক্ষতির অংশ লাভ করেছে। এদিকেই আল্লাহ ইঙ্গিত করে বলেছেন-

শত্রু সম্প্রদায়ের সন্ধানে তোমরা হতোদ্যম হয়ো না। যদি তোমরা যন্ত্রণা পাও, তবে তারাও তো তোমাদের মতই যন্ত্রণা পায় এবং আল্লাহর নিকট তোমরা যা আশা কর, তারা তা আশা করে না। (সূরা নিসা: আয়াত - ১০৪)

এ আয়াতে আল্লাহ ক্ষতি সাধনে ও ক্ষতি অনুভব করণে এক সেনাবাহিনীকে অন্য সেনা বাহিনীর সাথে উপমা দিয়েছেন। যার মর্মার্থ হলো, দু'ই পক্ষেরই অবস্থান সমপর্যায়ের ছিলো।

উভয় পক্ষই এমন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে যে, কেউ কারো উপর জয়ী হতে পারেনি।

এ যুদ্ধের ব্যাপারে কুরআনের ব্যখ্যা

পরবর্তীতে কুরআন নাযিল হলে তাতে এ যুদ্ধের এক একটি মনযিলের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে এবং বিশদ ব্যাখ্যা করত ঐ কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর ফলে মুসলমানদেরকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। আর এ ধরনের ফায়সালাকৃত সময়ে ঈমানদার এবং এ উম্মতকে যে সব উঁচু ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে লাভের জন্যে অস্তিত্বে আনা হয়েছে, সেগুলোর দিক দিয়ে এখনও তাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে কী কী দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো বলে দেয়া হয়েছে।

অনুরূপভাবে কুরআন মাজিদে মুনাফিকদের বর্ণনা দিয়ে তাদের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করে দেয়া হয়েছে। তাদের অন্তরে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল - এর বিরুদ্ধে যে শত্রুতা লুক্কায়িত ছিলো তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আর সরলমনা মুসলমানদের অন্তরে এ মুনাফিক এবং তাদের ভাই ইহুদিরা যে কুমন্ত্রণা ছড়িয়ে রেখেছিলো, তা দূরীভূত করা হয়েছে। কুরআনে এ প্রশংসনীয় হিকমত এবং উদ্দেশ্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা এ যুদ্ধের ফল ছিলো।

এ যুদ্ধ সম্পর্কে সূরা আল ইমরানের ৬০ টি আয়াত নাযিল হয়েছে।

'স্মরণ কর, যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের নিকট হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্যে মু'মিনদেরকে ঘাঁটিতে বিন্যস্ত করছিলে। (সূরা আল ইমরান: আয়াত- ১২১)

আর আল্লাহ তোমাদিগকে অদৃশ্যের তথ্য জানাবেন, তা হতে পারে না। কিন্তু তিনি নিজ পয়গম্বরদের মধ্যে যাকে চান নির্বাচিত করেন। কাজেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। যদি তোমরা ঈমান এনে পরহেযগারী অবলম্বন করো, তাহলে তোমাদের জন্য মহা প্রতিদান আছে। (সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৭৯)

এ যুদ্ধে আল্লাহর সক্রিয় উদ্দেশ্যে ও রহস্য

হাফেয ইবনে হাজার (রহ) বলেছেন, আলেমগণ বলেছেন যে, গাযওয়ায়ে উহুদ ও তার মধ্যে মুসলমানদের পরাজয়ে মহান আল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে ও রহস্য নিহিত ছিলো। যেমন অবাধ্যতার প্রায়শ্চিত্ত বাধা না মানার দুর্বিপাক সম্পর্কে মুসলিম জাতিকে সতর্ক করা। কারণ তীরন্দাযগণকে নিজ স্থানে জয় ও পরাজয় উভয় অবস্থাতেই স্থির থাকার জন্য রাসূল (ﷺ) যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁরা তা অমান্য করে কেন্দ্র পরিত্যাগ করেছিলো, যার পরিণতি হিসেবে এ পরাজয়। এটির উদ্দেশ্য পয়গম্বরগণের সুন্নতের প্রকাশ করা, যদি তাঁদেরকে বরাবর বিজয়ী করা হয়, তাহলে মুসলিম সমাজে এমন সব লোকের অনুপ্রবেশ ঘটবে, যারা মু'মিন নয়। তখন সৎ ও অসৎ এর মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে না। আর যদি বরাবর পরাজয়ের পর পরাজয়ের সম্মুখীন হন, তাহলে নবী প্রেরণের উদ্দেশ্যেই সফল হবে না। কাজেই আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণের জন্য জয় পরাজয় দুটিরই প্রয়োজন আছে। যাতে সৎ ও অসৎ এর মধ্যে পার্থক্য হয়ে যায়। কারণ, মুনাফিকগণ কথা ও কাজে তা প্রকাশ করে দিল। আর মুসলমানেরা জানতে পারল, তাঁদের মধ্যে নিজেদের শত্রু বর্তমান। কাজেই মুসলমানরা তাদের মুকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ও সতর্ক হলেন।

একটি উদ্দেশ্যে বা রহস্য এটাও ছিলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাহায্য আসতে বিলম্ব ঘটলে নমনীয়তার সৃষ্টি হয় ও আত্ম-অহংকার নিঃশেষ হয়ে যায়। কাজেই পরীক্ষায় পড়ে যখন মুসলমানগণ বিপন্ন হয়ে পড়লেন তখন তাঁরা ধৈর্য অবলম্বন করলেন আর মুনাফিকরা হা-হুতাশ আরম্ভ করে দিল।

একটা উদ্দেশ্যে এ-ও ছিলো যে, আল্লাহ বিশ্বাসীগণের জন্য পুরস্কারের ক্ষেত্রে (জান্নাতে) এমন অনেক মর্যাদা তৈরি করেছেন, যেখানে তাঁদের আমল দ্বারা পৌঁছা সম্ভব নয়। কাজেই বিপদ ও পরীক্ষার মধ্যে এমন উপাদান নিহিত রেখেছেন, যদ্বারা তাঁরা সেই সব মর্যাদায় পৌঁছতে পারেন।

আর একটা হিকমত বা রহস্য এও ছিলো যে, শাহাদাত লাভ সাহাবাদের সর্বপেক্ষা বড়ো পদমর্যাদা। কাজেই এ পদমর্যাদা তাঁদের জন্য সরবরাহ করে দেয়া হয়েছিলো।

অপর একটি রহস্য এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ নিজ শত্রুদেরকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। অত্যাচার ও আল্লাহর ওলীদেরকে কষ্ট দেওয়াতে সীমাতিরিক্ত অবাধ্যতার কারণে বিধর্মী কাফিরগণকে ধ্বংস ও নিঃশেষ করলেন।

উহুদ ও আহযাব যুদ্ধের মধ্যবর্তী সারিয়্যাহ ও অভিযান সমূহ

উহুদের অপ্রতাশিত ও দুঃখজনক পরিস্থিতি মুসলমানদের সুখ্যাতি ও শক্তি সামর্থ্যের ওপর দারুণ প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। এতে তাঁদের মনোবলে কিছুটা ভাটার সৃষ্টি হয়ে যায় এবং এর ফলে বিরুদ্ধবাদীদের অন্তর থেকে ক্রমান্বয়ে মুসলিম-ভীতি হ্রাস পেতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে মুসলনাদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে যায়। ইহুদি, মুনাফিক এবং বেদুঈনরা প্রকাশ্য শত্রুতায় লিপ্ত হয় এবং মুসলমানদেরকে অপমান করার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। তাদের এ চক্রান্ত ও শত্রুতার উদ্দেশ্যে ছিলো এমনভাবে ইসলামের মূলোৎপাটন করে ফেলা, যাতে কোনোদিন মুসলমনেরা আর মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠতে না পারে। উহুদের পর দুই মাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই উক্ত লক্ষ্যে বনু আসাদ মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে।

অন্যদিকে চতুর্থ হিজরির সফর মাসে আযল এবং কারাহ গোত্র এমন এক চক্রান্তমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যার ফলে ১০ জন সাহাবাকে শহীদ হতে হয়। অধিকন্তু, উক্ত সফর মাসেই বনু আমের প্রধান হীন চক্রান্ত ও শঠতার মাধমে ৭০ জন সাহাবা (রা) কে শহীদ করে। এ ঘটনাকে 'বীরে মাউনার ঘটনা' বলা হয়। ঐ সময়ে বনু নাজিরও প্রকাশ্যে শত্রুতা আরম্ভ করে দেয়। এমন কি ৪র্থ হিজরির রবিউল আওয়াল মাসে তারা নবী করীম (ﷺ) কে হত্যার জন্য চেষ্টা করে। এদিকে বনু গাতফানের সাহস এতই বেড়ে যায় যে চতুর্থ হিজরির জুমাদাল উলা মাসে মদিনা আক্রমণের তারিখ ঠিক করে বসে।

মূল কথা হচ্ছে, উহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের যে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলো, তারই প্রেক্ষাপটে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের একের পর এক নানা বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু নবী করীম (ﷺ) তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞাপ্রসূত পরিচালনার মাধ্যমে সকল প্রকার চক্রান্ত, শঠতা ও বৈরিতা অতিক্রম করে পুনরায় গৌরব ও মর্যাদার সুউচ্চ আসনে মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত করতে পুরোপুরি সক্ষম হন। এ ব্যাপারে নবী সর্বপ্রথম পদক্ষেপ ছিলো হামরাউল আসাদ পর্যন্ত মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করা। এ পদক্ষেপের ফলে নবী সৈন্যদলের মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কারণ, এ পদক্ষেপ এতই গুরুত্ব ও বীরত্বপূর্ণ ছিলো যে, এর ফলে প্রতিপক্ষরা, অর্থাৎ মুশরিক, মুনাফিক ও ইহুদিরা একদম স্তম্বিত ও হতবাক হয়ে যায়। অতঃপর রাসূল আরও এমন সব সামরিক পদক্ষেপ অবলম্বন করেছিলেন, যা শুধু মুসলমানদের হৃতগৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠাতেই সাহায্য করেনি; বরং তার বৃদ্ধিপ্রাপ্তিতেও প্রভূত সাহায্য করেছিলো। নিচে উক্ত বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১. আবু সালমার অভিযান: উহুদ যুদ্ধের পর সর্বপ্রথম মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করে বনু আসাদ বিন খোযায়মা। মদিনায় তারা এ মর্মে খবর পৌঁছায় যে, খোয়াইলিদের দুই ছেলে তালহা এবং সালমা নিজদলের লোকজন এবং অনুসারীদের নিয়ে রাসূল (ﷺ) এর ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য বনু আসাদকে আহ্বান জানাচ্ছে। এ সংবাদ অবগত হয়ে নবী করীম (ﷺ) অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে দেড়শত সৈন্যের এক বাহিনী গঠন করেন এবং আবু সালমার হাতে পাতাকা প্রদানপূর্বক তাঁর নেতৃত্বে সেই বাহিনী প্রেরণ করেন। বনু আসাদের প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই আবু সালমা (রা) অতর্কিত তাদের আক্রমণ করেন, যার ফলে তারা হতচকিত হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী তাদের পরিত্যক্ত উট ও বকরীর পাল এবং প্রাপ্ত গণীমতের মালামালসহ নিরাপদে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ অভিযানে সংঘটিত হয়েছিলো চতুর্থ হিজরি মুহাররম মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর। অত্র অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবু সালমা (রা) এর উহুদ যুদ্ধে আহত হওয়ার কারণে প্রাপ্ত ব্যথা পুনরায় বেড়ে যায় এবং অল্পকালের মধ্যেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন।

২. আবদুল্লাহ বিন উনাইস এর অভিযান: চতুর্থ হিজরির মুহাররম মাসের ৫ তারিখে এ মর্মে একটি সংবাদ পাওয়া যায়, খালিদ বিন সুফিয়ান হুযালী মুসলমানদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে সৈন্য সংগ্রহ করছে। শত্রুপক্ষের এ দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার লক্ষ্যে রাসূল আবদুল্লাহ ইবনে উনাইস (রা) কে প্রেরণ করেন।

আবদুল্লাহ বিন উনাইস মদিনার বাইরে ১৮ দিন অবস্থানের পর মুহাররমের ২৩ তারিখে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি খালিদকে হত্যা করে তার মস্তক সঙ্গে নিয়ে আসেন। নবীর দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি যখন মস্তকটি তাঁর সম্মুখে উপস্থাপন করেন, তখন তিনি তাঁর হাতে একটি 'আসা' (লাঠি) দিয়ে বলেন 'এটি কিয়ামতের দিন আমার ও তোমার মাঝে একটি নিদর্শন হয়ে থাকবে। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় নিকটবর্তী হলো, উক্ত প্রেক্ষিত তিনি সেই আসাটিকে তাঁর লাশের সঙ্গে কবরে দেয়ার জন্য ওসিয়ত করলেন।

৩. রাযীর ঘটনা: চতুর্থ হিজরির সফর মাসে 'আযল এবং কারা' গোত্রের কয়েক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু ইসলামের চর্চা রয়েছে। কাজেই কুরআন ও দ্বীন শিক্ষাদানের জন্য তাদের সঙ্গে কায়েকজন সাহাবি (রা) কে পাঠালে ভালো হয়। সেই মোতাবেক রাসূল (ﷺ) ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে ছয়জন এবং সহিহ বুখারির বর্ণনা মতে, দশজন সাহাবাকে তাদের সঙ্গে প্রেরণ করেন। ইবনে ইসহাকের মতে, মুরশেদ ইবনে আবু মুরশেদ গানাভীকে এবং সহিহ বুখারির বর্ণনা মতে, আসেম বিন ওমর বিন খাত্তাবের নানা আসেম বিন সাবেতকে এ দলের নেতৃত্ব প্রদান করা হয়। এরা যখন রাবেগ এবং জেদ্দাহর মধ্যবর্তী স্থানে হোয়াইল গোত্রের 'রাযী' নামক ঝর্ণার নিকটে পৌছান তখন আয়ল এবং কারার উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ হোয়াইল গোত্রের শাখা বানু লেহয়ানকে তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য লেলিয়ে দেয়।

উক্ত গোত্রের একশত তীরন্দাজ তাদের অনুসন্ধান করতে থাকে। পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে গিয়ে তাদের নাগালের মধ্যে পেয়ে যায়। সাহাবাগণ একটি পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় বনু লেহয়ান তাদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলার পর বলতে থাকে, তোমাদের সঙ্গে এ মর্মে আমরা ওয়াদাবদ্ধ হলাম তোমরা যদি নিচে নেমে আস তাহলে আমরা কাউকে হত্যা করব না। আসেম তাদের প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। কিন্তু শত্রুপক্ষের অবিরাম তীর বর্ষণের ফলে ৭ জন শাহাদত বরণ করেন। জীবিত রইলেন ৩ জন। তারা হচ্ছেন খোবাইব (রা), যায়েদ বিন দসেনাহ (রা) এবং আরও একজন। বনু লেহয়ান আবারও তাদের ওয়াদা পুনর্ব্যক্ত করলে তাঁরা নিচে নেমে আসেন।

কিন্তু নাগালের মধ্যে পেয়েই তারা ওয়াদা ভঙ্গ করে ধনুকের ছিলো দিয়ে তাঁদের বেঁধে ফেলে। অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তৃতীয় সাহাবী তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করেন। তারা তাঁকে জোর করে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু না পেরে শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করে। এদিকে খোবাইব (রা) এবং যায়েদ বিন হারেসা (রা) কে মক্কায় নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করে দেয়। এ দু'জন সাহাবি বদরের যুদ্ধে মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করেছিলেন।

খোবাইব (রা) কিছু দিন যাবৎ বন্দী অবস্থায় মক্কাবাসীদের নিকট থাকেন। অতঃপর মক্কাবাসীগণ তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হারাম শরিফের বাইরে তানঈমে নিয়ে যায়। তাঁকে শূলে চড়ানোর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেন, দুই রাক'আত নামায পড়ার জন্য সময় ও সুযোগ আমাকে দেয়া হোক। তাঁকে সময় দেয়া হলে তিনি দুই রাক'আত নামায আদায় করেন। নামাযান্তে সালাম ফেরানোর পর তিনি বলেন, যদি তোমাদের এ কথা বলার ভয় না থাকত যে, আমি যা কিছু করছি তা ভয় পাওয়ার কারণে করছি তাহলে আরও দীর্ঘ সময় যাবৎ এ নামায আদায় করতাম।

এরপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে গণনা করে নাও। অতঃপর তাদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে মৃত্যু দাও এবং কাউকেও অবশিষ্ট রেখো না। একথা বলার পর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন-

আমার শত্রুরা তাদের দলবল আমার চারদিকে একত্রিত করেছে এবং তাদের সকলেই এক স্থানে একত্রিত হয়েছে। তারা আমার হত্যার দৃশ্য অবলোকন করবার জন্য তাদের সন্তান-সন্ততি এবং নারীদেরকেও একত্রিত করেছে। আর আমাকে হত্যা করার জন্য প্রকান্ড ও সুদৃঢ় এক খেজুর গাছের নিকটবর্তী করা হয়েছে। আল্লাহর নিকটে আমি আমার নিঃসঙ্গতার অভিযোগ করছি: অতঃপর আমার বিপদের অভিযোগও করছি; আর আমার মৃত্যু শয্যার নিকটে শত্রুরা যা জমায়েত করেছে তার অভিযোগও করছি।

হে আরশের মালিক! আমাকে হত্যার ব্যাপারে আমার সঙ্গে তারা যা করতে চায়, তুমি আমাকে তাতে ধৈর্যধারণের শক্তি দান কর। কারণ অল্প সময়ের মধ্যেই তারা আমার গোশতগুলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে এবং আমার সকল আশা আকাঙ্ক্ষার নিরসন ঘটবে।

আমাকে হত্যার পূর্বে কুফরী গ্রহণ করা কিংবা মৃত্যুবরণ করা এ দুয়ের মধ্যে যেকোনো একটি গ্রহণ করার সুযোগ তারা দিয়েছে, কিন্তু কুফরী গ্রহণ না করে ধর্মের পথে মৃত্যুকেই আমি বেছে নিয়েছি। তখন আমার নয়নযুগল বিনা অশ্রুপাতে অশ্রু প্রবাহিত করেছে, অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়ে আমি অশ্রুপাত করিনি; বরং তাদের অন্যায় আচরণ ও নির্বুদ্ধিতার কারণে ক্ষোভে- দুঃখে আমার অন্তর ব্যথিত হয়েছে।

আমি যখন মুসলমান হিসেবে আল্লাহর পথে কাফিরদের হাতে নিহত হচ্ছি, তখন আমার মৃত্যু যে কোনো অবস্থায়ই হোক না কেন, আমি কোনো কিছুকে ভয় করি না।' আমি জানি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই আমার মৃত্যু হচ্ছে। মহান আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমার শরীরের বিখণ্ডকৃত প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গেই বরকত দান করতে পারেন।

এরপর আবু সুফিয়ান খোবাইবকে বলল, তোমার নিকট এটা কি পছন্দনীয় যে, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদকে আমাদের এখানে পেয়ে তাঁর গলা কর্তন করা হবে, আর তুমি নিজ আত্মীয় স্বজনসহ জীবিত থাকবে? তিনি বললেন, না আল্লাহর শপথ! আমার নিকট এটাইতো সহনীয় নয় যে, আমি আপন আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বেঁচে থাকি এবং তার পরিবর্তে মুহাম্মদ (ﷺ) কে যেখানে তিনি অবস্থান করছেন একটি কাটার আঘাত লেগে যায় এবং সে আঘাতে তিনি ব্যথিত হন।

এরপর মুশরিকরা তাঁকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করে তাঁর লাশ দেখাশোনার জন্য লোক নিযুক্ত করে দেয়। কিন্তু আমের বিন উমাইয়া যামরী (রা) সেখানে আগমন করলেন এবং রাত্রিবেলা অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে লাশ উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে দাফন কাফন করলেন। খোবাইব (রা) কে হত্যা করেছিলো উকবাহ বিন হারেস। খোবাইব তার পিতা হারেসকে বদর যুদ্ধে হত্যা করেছিলেন।

সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, খোবাইব (রা) সর্বপ্রথম সম্মানিত ব্যক্তি যিনি হত্যার মুহূর্তে দুই রাকআত নামায পড়ার প্রথা চালু করেছিলেন। বন্দী অবস্থায় তাঁকে আঙ্গুর ফল খেতে দেখা গিয়েছিলো, অথচ সেই সময় মক্কায় খেজুরও পাওয়া যাচ্ছিল না।

দ্বিতীয় সাহাবি যাকে উক্ত ঘটনায় ধরা হয়েছিলো, তিনি ছিলেন যায়েদ বিন হারেসা। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া তাকে ক্রয় করে নিয়ে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করে।

কুরাইশরা আসেম (রা) এর দেহের অংশ বিশেষ আনার জন্য লোক প্রেরণ করে। উদ্দেশ্যে ছিলো তাঁকে সনাক্ত করা। কারণ বদর যুদ্ধে তিনি বিশিষ্ট কোনো কুরাইশ প্রধানকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাদের ওপর এমন এক ভীমরুলের ঝাঁক প্রেরণ করলেন, যারা কুরাইশ লোকজনদের দুরভিসন্ধি থেকে উক্ত লাশ হেফাজত করল। কুরাইশদের পক্ষে লাশের কোনো অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হলো না। আসেম আল্লাহর দরবারে প্রকৃতই এ প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁকে যেন কোনো মুশরিক স্পর্শ করতে না পারে এবং তিনিও যেন কোনো মুশরিককে স্পর্শ না করেন। ওমর (রা) যখন এ ঘটনা অবগত হলেন তখন বলেন, 'আল্লাহ মু'মিন বান্দাকে তাঁর মৃত্যুর পরেও হেফাযত করেন, যেমনটি করেন জীবিত অবস্থায়।

৪. বির মাউনা এর মর্মান্তিক ঘটনা: যে মাসে 'রাযীর ঘটনা' সংঘটিত হয়, ঠিক সেই মাসেই বিরে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনাও সংঘটিত হয়। এ ঘটনা ছিলো রাযীর ঘটনার চাইতেও কঠিন ও বেদনাদায়ক।

উক্ত ঘটনার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে, আবু বারায়া আমের বিন মালেক যিনি মুলায়েবুল আসিন্নাহ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন (বর্শা নিয়ে যিনি খেলা করেন) এক দফা মদিনায় নবীর খেদমতে উপস্থিত হলেন। নবী করীম (ﷺ) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন না কিংবা তা থেকে সরেও গেলেন না। তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য সাহাবাদেরকে নাজদবাশির নিকট প্রেরণ করেন, তাহলে তারা আপনার দাওয়াত গ্রহণ করবে বলে আমি আশা করি।"

রাসূল বললেন, নাজদবাসীদের থেকে নিজ সাহাবাদের সম্পর্কে আমার ভয় আছে।

আবু বারা বললেন, 'তাঁরা আমার আশ্রয়ে থাকবেন।

উক্ত কারণে ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে ৪০ জন এবং সহিহ বুখারির তথ্য মুতাবেক ৭০ জন সাহাবাকে রাসূল তাঁর সঙ্গে প্রেরণ করেন।

৭০ জনের সংখ্যটিই সঠিক বলে প্রমাণিত। মুনযির বিন আমিরকে (বনু সায়েদা গোত্রের সঙ্গে যার সম্পর্ক ছিলো) দলের নেতা নিযুক্ত করেন। এ সাহাবারা (রা) ছিলেন বিজ্ঞ ক্বারী এবং শীর্ষস্থানীয়। এঁরা দিনে জঙ্গল থেকে জ্বালনি সংগ্রহ করে তাঁর বিনিময়ে আহলে সুফফাদের থেকে খাদ্য ক্রয় করতেন। কুরআন শিক্ষা করতেন ও শিক্ষা দিতেন এবং রাত্রি বেলা আল্লাহর দরবারে মুনাজাতে ও নামাযের জন্য দন্ডায়মান থাকতেন। এ ধারা অবলম্বনের মাধ্যমে তাঁর মাউনার কূপের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। এ কূপটি বনু আমের এবং হাররাহ সোলাইমে মধ্যস্থলে অবিস্থত ছিলো।

সেই স্থানে শিবির স্থাপনের পর উক্ত সাহাবা (রা) উম্মে সোলাইমের ভ্রাতা হারাম বিন মিলহানকে রাসূল (ﷺ) এর পত্রসহ আল্লাহর শত্রু আমের বিন তোফাইলের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু পত্রখানা পাঠ করাতো দূরে থাক, তার ইঙ্গিত এক ব্যক্তি হারামকে পেছন দিক থেকে এসে জোরে বর্শা দ্বারা আঘাত করল, যে, তা দেহের অপর দিকে ফেড়ে বেরিয়ে গেল। বর্শা-বিদ্ধ রক্তাক্ত হারাম বলে উঠলেন, 'আল্লাহ মহান! কাবার প্রভুর কসম, আমি কৃতকার্য হয়েছি।'

এর পরপরই আল্লাহর শত্রু আমির অবশিষ্ট সাহাবাদের (রা) আক্রমণ করার জন্য তার গোত্র বনু আমিরকে আহ্বান জানাল। কিন্তু যেহেতু তাঁরা আবু বারার আশ্রয়ে ছিলেন, সেহেতু তারা সেই আহ্বানে সাড়া দিল না। এদিক থেকে সাড়া না পেয়ে সে বনু সোলাইমকে আহ্বান জানাল। বনু সোলাইমের তিনটি গোত্র উসাইয়া, রাইল এবং যাকওয়ান এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ সাহাবাদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল। প্রত্যুত্তরে সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং একজন বাদে সকলেই শাহাদত বরণ করলেন। কেবলমাত্র কা'ব বিন যায়েদ (রা) জীবিত ছিলেন।

তাছাড়া আরও দুজন সাহাবি আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) এবং মুনযির বিন উকবা বিন আমির (রা) উট চরাচ্ছিলেন। ঘটনাস্থলে তাঁরা পাখি উড়তে দেখে সেখানে গিয়ে পৌঁছেন। অতঃপর মুনাযির তাঁর বন্ধুগণের সঙ্গে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন। আমর বিন উমাইয়া যামরীকে বন্দী করা হয়। কিন্তু যখন তারা অবগত হয় যে, মুযার গোত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে, তখন আমির তার কপালের চুল কেটে দিয়ে তার মায়ের পক্ষ হতে (যার ওপর একটি সাদকে স্বাধীন করার মানত ছিলো) তাঁকে মুক্ত করে দেয়।

আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) উক্ত বেদনাদায়ক ঘটনার খবর নিয়ে মদিনায় পৌঁছলেন। ৭০ জন বিজ্ঞ মুসলমানের এ হৃদয়বিদারক শাহাদত উহুদ যুদ্ধের ক্ষতকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু উহুদের তুলনায় এ ঘটনা আরও মর্মান্তিক ছিলো এ কারণে যে, উক্ত যুদ্ধে মুসলমানগণ শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে মুসলমানগণ চরম এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) প্রত্যাবর্তনকালে কানাত উপত্যকার প্রান্তভাগে অবস্থিত কারকারা নামক স্থানে পৌঁছে একটি বৃক্ষের ছায়ায় অবতরণ করেন। বনু কেলাব গোত্রের দুই ব্যক্তিও সেখানে অবস্থান গ্রহণ করে। তারা উভয়েই যখন ঘুমে নিমগ্ন হয়ে পড়ে, তখন আমর বিন উমাইয়া (রা) তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেন। তাঁর ধারণা ছিলো, এদের হত্যা করে তার সঙ্গীদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন। অথচ তাদের দুজনের নিকট রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ থেকে অঙ্গীকার ছিলো, কিন্তু আমর বিন উমাইয়া (রা) তা জানতেন না। কাজেই, মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর যখন তিনি রাসূলকে ব্যাপারটি জানালেন তখন তিনি বললেন, তুমি এমন দুজনকে হত্যা করেছ, যাদের রক্ত ঝরানোর খেসারত অবশ্যই আমাকে করতে হবে। এরপর রাসূল মুসলমান এবং তাঁদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ইহুদিদের নিকট থেকে রক্তপণ একত্রিত করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটাই পরিণামে বনু নযীর যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এর বিবরণ পরবর্তীতে আসেছে।

মাউনা এবং রাযীর উল্লিখিত বেদনাদায়ক ঘটনাবলিতে যা মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সংঘটিত হয়েছিলো রাসূল এতোই ব্যথিত হয়েছিলেন এবং এ পরিমাণ চিন্তিত ও মর্মাহত হন যে, যে সকল গোত্র ও সম্প্রদায় বিশ্বাসঘাতকতা করে সাহাবায়ে কেরাম (রা) কে হত্যা করে, নবী করীম (ﷺ) একমাস যাবৎ তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে বদদোয়া করতে থাকেন। তিনি ফজরের নামাযে রেল, যাকওয়ান, লেহইয়ান এবং উসাইয়া গোত্রের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেন। আল্লাহ সে সম্পর্কে স্বীয় নবীর ওপর আয়াত অবতীর্ণ করেন যা পরবর্তীকালে বাদ হয়ে যায়। সেগুলো এইরূপ: "আমার সম্প্রদায়কে এ কথা বলে দাও যে, আমরা আপন প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হয়েছি। তিনি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, আমরাও তার ওপর সন্তুষ্ট হয়েছি।" এরপর থেকে রাসূল বদদোয়া করা ছেড়ে দেন।

সব কিছু অবগত হওয়া সত্বেও নবী করীম, অত্যন্ত ধৈর্য্য ও সহনশীলতার সঙ্গে চলতে থাকেন। কিন্তু রাযী এবং মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনাবলির মাধ্যমে তারা সীমিত ঐদ্ধত্য বাড়াবাড়ি প্রদর্শনপূর্বক নবী করীম (ﷺ) কে খতম করার এমন এক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

কয়েকজন সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল্লাহ ইহুদীদের কাছে গিয়ে বনু কেলাব গোত্রের সেই দুই ব্যক্তি রক্তপণ সম্পর্কে কথা বলছিলেন, আমর বিন উমাইয়া যামরী ভুলক্রমে যাদের হত্যা করেছিলেন। তাদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কারণে এ ব্যাপারে সহায়তা করা ছিলো আশু কর্তব্য।

রাসূল্লাহ যখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন তারা বলল, হে আবুল কাসেম! আমরা আপনার কথামতই কাজ করব। আপনি এখানে অবস্থান করুন, আমরা আপনার প্রয়োজন পূরণ করছি। রাসূল তাদের এক বাড়ির দেয়ালের সঙ্গে গা লাগিয়ে বসে পড়লেন এবং তাদের ওয়াদা পূবণের অপেক্ষায় রইলেন। নবীর সঙ্গে ছিলেন আবু বকর, ওমর, আলী (রা) এবং আরও কয়েকজন সাহাবার একটি দল।

এদিকে ইহুদিগণ গোপনে একত্রিত হলে শয়তান তাদের পেয়ে বসল এবং তাদের ললাট লিখনে যে দুর্ভাগ্যের প্রসঙ্গটি লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো, সে হত্যাকে আরও সুশোভন করে উপস্থাপন করল। উক্ত প্রেক্ষিতে তারা নবী করীম (ﷺ) কে হত্যার এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পরস্পর বলাবলি করল, কে এমন আছে যে, এই চাকুটা নিয়ে দেয়ালের ওপরে উঠে যাবে অতঃপর মুহাম্মদের মাথার ওপর তা নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করবে?

জাহহাশ বলল, তাদের মধ্য থেকে সালাম বিন মুশকিম বলল, তোমরা এমন করো না। কারণ আল্লাহর কসম! তোমরা যা করতে চাচ্ছ, সে সম্পর্কে তাকে অবগত করিয়ে দেয়া হবে। অধিকন্তু আমাদের এবং তাঁদের মধ্যে যে অঙ্গীকারনামা রয়েছে, এ কাজ হবে তারও বিপরীত।

কিন্তু তারা তার কথায় কর্ণপাত না করে চক্রান্তমূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়নের ব্যাপারে অটল রইল। এদিকে মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে জিবরাঈল (আ) আগমন করে নবী করীম (ﷺ) কে ইহুদিদের চক্রান্তের ব্যাপারটি অবগত করিয়ে দিলেন। তিনি সেখান থেকে দ্রুত প্রস্থানপূর্বক মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। পরে সাহাবাগণ এসে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল - আপনি সেখান থেকে চলে এলেন, অথচ আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। রাসূল বললেন, 'ইহুদিগণ এক ভয়ংকর চক্রান্ত করেছিলো, যা আল্লাহ আমাকে অবগত করিয়েছেন।'

মদিনা প্রত্যবর্তনের পরপরই রাসূল তাৎক্ষণিকভাবে মুহাম্মদ বিন মাসলমাকে বনু নযীরের নিকট এ নির্দেশসহ পেরণ করেন যে, তারা যেন অবিলম্বে মদিনা থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। মুসলমানদের সঙ্গে তারা আর মদিনায় বসবাস করতে পারবে না। মদিনা পরিত্যাগ করে যাওয়ার জন্য তাদের দশ দিন সময় দেয়া হলো। এ নির্ধারিত সময়ের পরে তাদের মধ্য থেকে যাকে মদিনায় পাওয়া যাবে তার গলা কাটা হবে। উক্ত নির্দেশ প্রাপ্তির পর মদিনা পরিত্যাগ করে যাওয়া ছাড়া ইহুদিদের আর কোনো গন্তব্য রইল না।

নবী করীম (ﷺ) এর পক্ষ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর মদিনা পরিত্যাগের জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু উল্লোখত সময়ের মধ্যেই মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই মদিনা ত্যাগ না করে, নিজ নিজ স্থানে দৃঢ়তার সঙ্গে অবস্থান করতে থাকার জন্য তাদের পরামর্শ দেয়। সে বললো, তার নিকট দুই হাজার সাহসী সৈন্য রয়েছে, যদি তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া হয় তাহলে তাদের সঙ্গে তারাও দেশত্যাগ করবে। যদি তাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়, তাহলে তারা তাদের সাহায্য করবে এবং তাদের কোনো ব্যাপারেই তারা কারো নিকট মাথা নত করবে না। তাছাড়া বনু কুরাইযা এবং বনু গাতফান, যারা তোমাদের সহযোগী তারাও তাদের সাহায্য করবে।

আবদুল্লাহ বিন উবাইর পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব পাওয়ার পর ইহুদিদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে মদিনা পরিত্যাগ না করে বরং মুসলমানদের মোকাবিলা করবে।

তাদের নেতা হুওয়াই বিন আখতাবের বিশ্বাস ছিলো, মুনাফিক নেতা যা বলেছে, তা সে পূরণ করবে। এ কারণে প্রত্যুত্তরে সে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে বলে পাঠাল যে, তারা কিছুতেই তাদের ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করে যাবে না। তিনি যা করতে চান, তা করতে পারেন।

এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, মুসলমানদের জন্য এ পরিস্থিতি ছিলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, ইহিহাসের সংকটপূর্ণ অধ্যায়ে শত্রুদের সঙ্গে মোকাবিলা করার ব্যাপরাটি তেমন ইতিবাচক কিংবা উৎসাহ ব্যঞ্জক ছিলো না। এর পরিণতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো, তা অস্বীকার করা যায় না। তখন সমগ্র আরব জাহান ছিলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের দুটি প্রচারক দলকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিলো। তাছাড়া, বনু নাযীরের ইহুদিগণ এতই শক্তিশালী ছিলো যে, তাদের হাত হতে অস্ত্রশস্ত্র নামানো মোটেই সহজসাধ্য ছিলো না। অধিকন্তু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার ব্যাপারটিও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আশঙ্কামুক্ত ছিলো না, বিরে মাউনার বেদনাদায়ক ঘটনার পূর্বে ও পরে পরিস্থিতি যেভাবে মোড় নিয়েছিলো, যার ফলশ্রুতি ছিলো অঙ্গীকার ভঙ্গ ও মুসলমানদের নির্মমভাবে হত্যা এবং যা মুসলমানদের মনে এ সকল অপরাধ সম্পর্কে অভূতপূর্ব এক সচেতনতা ও চৈতন্যের উন্মেষ ঘটিয়েছিলো। এর ফলে মুসলমাদের মনে প্রতিশোধ গ্রহণের অনুভূতি এবং ইচ্ছাও হয়েছিলো তীব্র।

উক্ত কারণে তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, যেহেতু বনু নাযীর নবী করীম (ﷺ) এর হত্যার এক ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিলো, সেহেতু যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাতে ফলাফল যা-ই হোক না কেন।

এমনি এক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নবী (ﷺ) যখন হুয়াই বিন আখতাবের নিকট থেকে তার নির্দেশনামার প্রত্যুত্তর পাপ্ত হলেন, তখন তিনি এবং তাঁর উপস্থিত সাহাবা (রা) আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে ফেটে পড়লেন। তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ প্রস্তুতি। আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুমের ওপর মদিনার প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণের পর বনু নাযীর অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন মুসলিম বাহিনী। পতাকা ছিলো আলী বিন আবু তালিবের হাতে। বনু নাযীর পৌঁছে মুসলিম বাহিনী তাদের দুর্গ অবরোধ করেন।

এদিকে বনু নাযীর দুর্গ অভ্যন্তরে অবস্থান গ্রহণ করে দুর্গ প্রাচীর থেকে তীর এবং প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকে। যেহেতু খেজুর বাগানগুলো তাদের ঢাল বা যুদ্ধাবরণ হিসেবে বিদ্যমান ছিলো সেহেতু সেগুলোকে কেটে ফেলা কিংবা পুড়িয়ে ফেলার জন্য নবী করীম (ﷺ) নির্দেশ প্রদান করেন। পরে এর প্রতি ইঙ্গিত করে হাসসান (রা) বলেছেন-

বনু লুওয়াইদের নেতাদের জন্য এটা অতি সাধারণ কথা ছিলো যে, বুওয়াইরাতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড হবে; বনু নযীরের খেজুরের বাগানের নাম ছিলো বুওয়াইরা।

তোমরা যে খেজুরবৃক্ষগুলো কর্তন করেছিলে কিংবা যেগুলোকে তার শাখার অবস্থানরত রেখে দিয়েছ, সবই আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়েছে এবং এ জন্য এমনটি করা হয়েছিলো যাতে ফাসেকগণ অপমানিত হয়। (সূরা হাশর: ৫)

যাহোক যখন তাদের অবরোধ করা হলো, তখন বনু কুরাইযা তাদের থেকে পৃথক রইল। আবদুল্লাহ বিন উবাইও প্রতিশ্রুতি পালন করল না। তাছাড়া, তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ গাতফান গোত্রও সাহায্যার্থে এগিয়ে এলো না। মোট কথা, তাদের এ সংকটকালে কেউই তাদের কোনোভাবেই সাহায্য করল না। এ কারণেরই আল্লাহ তাদের এ ঘটনার দৃষ্টান্ত উল্লেখপূর্বক আয়াত নাযিল করেন-

যেমন শয়তান মানুষেকে বলে, কুফরী কর। অতঃপর যখন সে কুফরী করে, তখন শয়তান বলে তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। (সূরা হাশর: ১৬)

অবরোধ বেশি দীর্ঘায়িত হয়নি। অবরোধ অব্যাহত ছিলো নয় রাত্রি মতান্তরে পনেরো রাত্রি। এর মধ্যেই আল্লাহ শত্রুদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে দেন। রাসূল (ﷺ) এর নিকট তারা প্রস্তাব করে, মদিনা পরিত্যাগ করে তারা অন্যত্র চলে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। রাসূল তাদের প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপনপূর্বক এ নিদের্শ প্রদান করেন, অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া অন্যান্য যেসব দ্রব্য তারা উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে যাবে। পরিবার-পরিজন ও তাদের সঙ্গে যেতে পারবে।

উক্ত স্বীকৃতির পর বনু নযীর অস্ত্র সমর্পণ করে। অতঃপর গৃহাদির জানালা দরজাগুলো যাতে উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারে এতদুদ্দেশ্যে নিজ হাতে নিজ নিজ ঘরবাড়িগুলো ধ্বংস করে ফেলে এদের কোনো কোনো লোককে ছাদের কড়া এবং দেয়ালের খুঁটি নিয়ে যেতেও দেখা যায়। অতঃপর শিশু ও মহিলাদের উষ্ট্র পৃষ্ঠে সওয়ার করিয়ে ছয়শত উটের ওপর সব কিছু বোঝাই করে নিয়ে রওয়ানা হয়ে যায়। অধিক সংখ্যক ইহুদি এবং তাদের প্রধানগণ যেমন হুয়াই বিন আখতার এবং সালাম বিন আবুল হুকাইক খায়বর অভিমুখে যায়। এক দল যায় সিরিয়া অভিমুখে। শুধু ইয়ামিন বিন আমর এবং আবু সাঈদ বিন ওয়াহাব ইসলাম গ্রহণ করে। কাজেই, তাদের মালের ওপর হাত দেয়া হয়নি।

আরোপিত শর্তাদির পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল বনু নাযীরের অস্ত্রশস্ত্র জমিজমা ও বাড়িঘর নিজ অধিকারভুক্ত করে নেন। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিলো ৫০টি শিরস্ত্রাণ এবং ৩৪০টি তরবারী। বনু নাযীরের ঘরবাড়ি জমিজমা ও বাগ-বাগিচার ওপর একমাত্র নবী করীম (ﷺ) পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিলো। এদসংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তাঁর এতটুকু স্বাধীনতা ছিলো, ইচ্ছা করলে তিনি সব নিজ অধিকারে রেখে দিতে পারেন কিংবা যাকে ইচ্ছা দিয়েও দিতে পারেন। ফলে তিনি যুদ্ধলব্ধ অর্থ সম্পদের ন্যায় এ সবের এক-পঞ্চমাংশ বের করেননি। কারণ আল্লাহ রাসূল কে ফাই সম্পদের ন্যায় সে সব সম্পদ দান করেছিলেন। উষ্ট্র, অশ্ব কিংবা তরবারী ব্যবহার করে তা জয় করা হয়নি। কাজেই রাসূল এ উক্ত বিশেষ অধিকার বলে পূর্বে হিজরতকারীদের মধ্যে সেই সম্পদ বন্টন করে দেন। তবে অভাবগ্রস্ত থাকার কারণে আনসারী সাহাবি আবু দুজানাহ (রা) ও সাহল বিন হুকাইককে (রা) কিছু অংশ প্রদান করেন। অধিকন্তু, একটি ছোট অংশ নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন, যদ্বারা নিজ স্ত্রীগণের পূর্ণ বছরের ব্যয় করতেন। অবশিষ্টাংশ যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং অস্ত্র সংগ্রহের কাজে ব্যয় করেন।

বনু নযীর যুদ্ধ ৪র্থ হিজরির রবিউল আউয়াল মোতাবেরক ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের আগষ্ট মাসে সংঘটিত হয়েছিলো। উক্ত প্রসঙ্গেই আল্লাহ পুরো সূরা হাশর অবতীর্ণ করেন। এতে ইহুদিদের দেশান্তর পর্বটি উল্লেখ করে মুহাজিরদের ও আনসারদের প্রশংসা করা হয়েছে। সাথে সাথে এ মতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যুদ্ধের প্রয়োজনে শত্রুদের গাছ কাটা কিংবা তাতে অগ্নি সংযোগ করে তা জ্বালিয়ে দেয়া যেতে পারে। এরূপ করাকে ভূ-পৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করা বলা চলে না। অতঃপর ঈমানদারদের জন্য তাকওয়ার অপরিহার্যতা এবং পরকালের প্রস্তুতির জন্য বিশেষভাবে তাগিদ দেয়া হয়েছে। উল্লেখিত বিষয়াদি বর্ণনার পর আল্লাহ স্বীয় হামদ ও সানা বর্ণনার পর নিজ নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে সূরাটি সমাপ্ত করেন। ইবনে আব্বাস (রা) সূরা হাশর সম্পর্কে বলতেন, এ সূরাটিকে সূরায়ে বনী নযীর বলে।

৬. নাজদ যুদ্ধ: কোনো প্রকার ত্যাগ স্বীকার ছাড়াই বনু নযীর যুদ্ধে মুসলমানদের এক চমৎকার সাফল্য লাভ সম্ভব হয়। এর ফলে মদিনায় বসবাসকারী মুসলমানদের অবস্থা বেশ মজবুত হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে ইসলাম বিরোধীরা বহুলাংশে হীনবল হয়ে পড়ে। এরপর থেকে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলে। এবার রাসূল সকল বেদুঈনের খবরাখবর নেয়ার উদ্যেগী হন, যারা উহুদ যুদ্ধের পর মুসলমানদের এক কঠিন বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিলো এবং অত্যন্ত অন্যায়ভাবে ইসলাম প্রচারকদের ওপর হামলা চালিয়ে তাঁদের হত্যা করেছিলো। এমনিভাবে এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে তাদের সাহস এতই বেড়ে গিয়েছিলো যে, তারা মদিনা আক্রমনের চিন্তা ভাবনা করছিলো।

বনু নযীর সন্ধি হতে মুক্ত হয়ে রাসূল যখন সেই ওয়াদাভঙ্গকারী বেদুইনদের শায়েস্তা করার কথা চিন্ত-ভাবনা করছিলেন, এমন সময় হঠাৎ সংবাদ পান, বনু গাতফানের দুটি গোত্র বনু মোহরের এবং বনু সালাবাহ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বেদুঈন ও পল্লীবাসীদের মধ্যে থেকে সৈন্য সংগ্রহ করছে। এ সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নবী করীম (ﷺ) নাজদ আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং এতদুদ্দেশ্যে নাজদে সাহাবা প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্যে ছিলো সেই সকল পাষাণ হৃদয় বেদুঈনদের মনে এমনভাবে ভীতির সঞ্চার করা, যাতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পূর্বের ন্যায় কোনো কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি করতে তারা সাহস না পায়। এদিকে উদ্ধৃত বেদুঈনদের মধ্য থেকে যারা লুণ্ঠনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো মুসলমানদের আকস্মিক আক্রমণে তারা ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় পালিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। মুসলমানগণ এ সকল লুন্ঠনকারী গোত্রসমূহের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর নিরাপদে মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন।

ঐতিহাসিকগণ এ সময়ে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন যা ৪র্থ হিজরির রবিউস সানি কিংবা জুমাদিউল উলা মাসে নাজদে সংঘটিত হয়েছিলো। তাঁরা এ যুদ্ধকেই যাতুর রিকা বলে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য এ সময় নাজদ ভূমিতে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কারণ তখন মদিনার পরিস্থিতি ঠিক সেই রকমই ছিলো। উহুদ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের সময় মদিনা প্রান্তরে যুদ্ধের জন্য আবু সুফিয়ান আহ্বান জানিয়েছিলো এবং মুসলমানরা মঞ্জুর করে নিয়েছিলেন, সেই সময়টা ক্রমেই নিকটবর্তী হয়ে আসছিলো। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা কোনোক্রমেই সমীচীন ছিলো না যে, বেদুঈন ও গ্রামবাসীদেরকে তাদের ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত রেখে বদরের ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য মদিনাকে মুজাহিদশূন্য অবস্থায় রাখা হবে; বরং এটাই অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার ছিলো যে, বদর প্রান্তরে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পূর্বের এই সকল বেদুঈনের ওপর এমনভাবে আঘাত হানা, যাতে তারা কোনো অবস্থাতেই মদিনা মুখী হওয়ার সাহস না পায়।

প্রসঙ্গক্রমে এটা বিশেষভাবে উল্লেখ্য ৪র্থ হিজরির রবিউল আখের কিংবা জুমাদিউল উলা মাসে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তাকে 'যাতুর রিকা' যুদ্ধ বলে যে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে, আমার অনুসন্ধান মোতাবেক তাকে যাতুর রিকা যুদ্ধে আবু হুরায়রা (রা) এবং আবূ মুসা আশআরী (রা) উপস্থিত ছিলেন অথচ আবু হুরায়রা (রা) খায়বার যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিন পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অনুরূপভাবে আবু মূসা আশয়ারী (রা) ইসলাম গ্রহণের পর খায়বারেই নবীর খিদমতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ফলে গাযওয়ায়ে যাতুর রিকা যে খায়বার যুদ্ধের পর সংঘটিত হয়েছিলো, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

৪র্থ হিজরির বেশ কিছুকাল পর যে যাতুর রিকা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো, তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে, এই যুদ্ধে রাসূল খাওফের নামায আদায় করেছিলেন। খাওফের নামায সর্বপ্রথম আদায় করা হয় গাযওয়ায়ে আসফানে। আর গাযওয়ায়ে আসফান যে খন্দক যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিলো এতে কোনোই সন্দেহ নেই। খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো ৫ম হিজরির শেষ ভাগে। প্রকৃতপক্ষে গাযওয়ার আসফান ছিলো হুদায়বিয়া সফরের একটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা। আর হুদায়বিয়া সফর ছিলো ৬ষ্ঠ হিজরির শেষ ভাগের ঘটনা। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল খায়বার অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলেন। এ থেকেও প্রমাণিত হচ্ছে, যাতুর রিকা খায়বার যুদ্ধের পরেই সংঘটিত হয়েছিলো।

৭. দ্বিতীয় বদর যুদ্ধ: মুরুচারী আরবদের প্রভাব প্রতিপত্তির মূল উৎপাটন করা এবং বেদুঈনদের অনিষ্ট থেকে স্বস্থিলাভের পর মুসলমানগণ তাদের প্রবল পরাক্রান্ত শত্রু কুরাইশদের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দেন। কারণ বছর দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল এবং উহুদ যুদ্ধ শেষে এক পক্ষে ঘোষিত এবং অন্য পক্ষের সমর্থিত সময় ক্রমেই ঘনিয়ে আসছিলো।

রাসূল (ﷺ) এবং সাহাবা কেরাম (রা) এর জন্য এটা অবশ্য কর্তব্য ছিলো যে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে আবু সুফিয়ান এবং কওমের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন এবং এমন হিজরত ও কৌশলের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন, যাতে যে দল বেশি হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং স্থায়িত্ব লাভের উপযুক্ত, যুদ্ধের মোড় সঙ্গতভাবে তাদের দিকেই ফিরে যাবে।

সুতরাং ৪র্থ হিজরির শাবান মুতাবিক ৬২৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে রাসূল মদিনার ব্যবস্থপনার দায়িত্ব আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহ (রা) এর ওপর ন্যস্ত করে বিঘোষিত বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তার সঙ্গে ছিলো দেড় হাজার সাহাবি এবং ঘোড়া ছিলো দশটি। তিনি পতাকা প্রদান করেন আলী (রা) এর হাতে। অতঃপর বদরে পৌঁছে মুশরিকদের অপেক্ষায় শিবির সন্নিবেশ করেন। অপর দিকে আবু সুফিয়ান পঞ্চাশজন অশ্বারোহীসহ দুই হাজার মুশরিক সৈন্য নিয়ে রওয়ানা হয়। অতঃপর মক্কা হতে এক মারহালা দূরত্বে মারুরুষ যাহরান নামক স্থানে পৌঁছে মাজিন্নাহ নামক প্রসিদ্ধ ঝর্ণার নিকট শিবির স্থাপন করেন। কিন্তু মক্কা হতে রওয়ানা হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধের ব্যাপারে সে নিরুৎসাহিত বোধ করতে থাকে। মুসলমানদের সঙ্গে বারংবার যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কথা চিন্তা করে তার অন্তর ভয়ে প্রকম্পিত হতে থাকে। মারুরুয যাহরানে পৌঁছে সে সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারিয়ে ফেলে এবং মক্কা প্রত্যাবর্তনের অজুহাত খুঁজতে থাকে। অবশেষে সে নিজ সঙ্গী-সাথিদের বলল, হে কুরাইশরা, এ সময়টি যুদ্ধের উপযুক্ত সময় নয়। ঐ সময় হচ্ছে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত, যখন তুমি সজীব থাকবে, জীব-জানোয়ার ঘাস খেতে পারবে এবং তোমরাও দুধ পান করতে পারবে। এখন শুষ্ক অবস্থা বিরাজমান রয়েছে। অতএব আমি প্রত্যাবর্তন করার মনস্থ করেছি, তোমরাও আমার সঙ্গে প্রত্যাবর্তন কর।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল যে, সৈন্যদের সকলেই যেন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলো। কারণ, কোনো প্রকার বিরোধিতা ছাড়াই সকলেই ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করল। সফর অব্যাহত রাখা কিংবা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যাপারে কেউই মত দেয়নি।

এদিকে মুসলমানরা আট দিন পর্যন্ত বদর প্রান্তরে শত্রুদের প্রতীক্ষায় থাকেন এবং এরই মধ্যে ব্যবসায়ের পণ্যাদি বিক্রয় করে এক দিরহামকে দুই দিরহামে পরিণত করতে থাকেন। এরপর অত্যন্ত শান শওকতের সঙ্গে তাঁরা মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন। এ যুদ্ধকে গাযওয়ায়ে বদরে মাওউদ (ওয়াদাকৃত বদরে যুদ্ধ) বদরে সানিয়াহ (দ্বিতীয় বদর যুদ্ধ), বদরে আখির (শেষ বদর যুদ্ধ) এবং বদর সুগরা (ছোট বদর যুদ্ধ) নামে পরিচিত।

৮. গাযওয়ায়ে দুমাতুল জানদাল: বদর হতে রাসূল (ﷺ) এর প্রত্যাবর্তনের পর চতুর্দিকে শান্তি ও নিরাপত্তার এক সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায় এবং সমগ্র ইসলামি হুকুমতের মধ্যে শান্তি ও স্বস্তির হাওয়া প্রবাহিত হতে থাকে। এ সময় রাসূল (ﷺ) আরবের শেষ সীমা পর্যন্ত মনোযোগ দানে উপযোগী মানসিক প্রশান্তি ও অবকাশ লাভ করেন। পরিস্থিতির ওপর মুসলমানগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং শত্রু-মিত্র সকলেরই তা উপলব্ধি এবং স্বীকৃতি প্রদানের জন্য এর বিশেষ প্রয়োজনও ছিলো। কাজেই দ্বিতীয় বদর যুদ্ধের পর কয়েক মাস পর্যন্ত পরিপূর্ণ প্রশান্তির মধ্যে রাসূল মদিনায় অবস্থান করেন। অতঃপর তিনি জানতে পারেন সিরিয়ার নিকটবর্তী দুমাতুল জানদাল নামক স্থানের আশপাশে বসবাসরত গোত্রগুলো ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে চলাচলকারী লোকজনের ওপর চড়াও হয়ে তাদের মালপত্র ছিনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে। অধিকন্তু তিনি এ সংবাদও অবগত হন যে, মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে তারা এক বিরাট সৈন্যবাহিনী সংগ্রহ করেছে।

উক্ত প্রেক্ষিতে সেবা বিন আরফাতা গেফারী (রা) কে মদিনায় তাঁর স্থলভিষিক্ত নিযুক্ত করে এক হাজার মুসলিম সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনীসহ নবী করীম (ﷺ) সে উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান। এটি ছিলো ৫ম হিজরি ২৫ শে রবিউল আওয়ালের ঘটনা। পথপ্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে নেয়া হয়েছিলো বনু আযরাক গোত্রের মাযকুর নামক এক ব্যক্তিকে।

উক্ত অভিযানে রাসূল (ﷺ) রাত্রি বেলায় পথ চলতেন এবং দিবাভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। উদ্দেশ্যে ছিলো শত্রুপক্ষের ওপর আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করা। তাঁরা যখন লক্ষস্থলের নিকটবর্তী হলেন, তখন জানতে পারলেন যে তারা বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। কাজেই, তাদের গবাদি পাল ও রাখালদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে কিছু সংখ্যক গবাদি পশু হস্তগত করা হয়। অন্যগুলো নিয়ে রাখালেরা পালিয়ে যায়।

যতদূর পর্যন্ত দুমাতুল জানদালের অধিবাসীদের সংবাদ জানা গেছে, যে যেদিকে সুযোগ পেয়েছে সে সেদিকে পালায়ন করল। দুমাতুল জানদালে উপস্থিত হয়ে মুসলমানেরা কাউকেও পেলেন না। রাসূল আর সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করে এদিক সেদিক একাধিক ছোট ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করেন। কিন্তু শত্রুপক্ষের কেউই তাদের নাগালের মধ্যে পড়েনি। অবশেষে রাসূল (ﷺ) মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন। উক্ত অভিযানকালে উয়াইনা বিন হাসানের সাথে সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হয়। দুমাতুল জানদাল হচ্ছে সিরিয়া সীমান্তে অবস্থিত একটি শহর। এখান থেকে দামেস্কের দূরত্ব পাঁচ রাত্রির পথ মদিনার দূরত্ব পনেরো রাত্রির পথ।

এ আকস্মিক ও মীমাংসাসূচক অভিযান এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে রাসূল (ﷺ) শান্তি মুসলমানদের অনুকূলে পরিবর্তিত হয় এবং আভ্যন্তরীণ ও বহিরস্থ বিপদাপদের কাঠিন্য, যা তাঁদের চতুর্দিক পরিবেষ্টন করে রেখেছিলো তা হ্রাস পায়। মুনাফিকেরা নীরব এবং নিরাশ হয়ে পড়ে। ইহুদিদের একটি গোত্রকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। অন্যান্য গোত্রগুলো মুসলমানদের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলা এবং অঙ্গীকার পালনের স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। বেদুঈন এবং কুরাইশরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব কিছুর প্রেক্ষাপটে মুসলমানেরা ইসলাম প্রচার, রাব্বুল আলামীনের পয়গাম দেশ-দেশান্তরে পৌছিয়ে দেয়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগ লাভ করেন।

গাযওয়ায়ে আহযাব (খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ)

এক বছরের অধিক কাল যাবৎ উপর্যুপরি সামরিক অভিযান এবং কর্মকান্ডের প্রেক্ষাপটে আরব উপদ্বীপে শান্তি ও স্বস্তির বার্তাবরণ সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সর্বত্র সুষম-শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ বিরাজমান ছিলো। কিন্তু যে সকল ইহুদিকে নিজেদের দুস্কর্ম ও চক্রান্তের কারণে নানা প্রকার অপমান ও লাঞ্ছনার আস্বাদন গ্রহণ করতে হয়েছিলো, তখনো তাদের চৈতন্যোদয় হয়নি। বিশ্বাসঘাতকতা, অঙ্গীকার ভঙ্গ, ধোঁকাবাজি, আমানতের খেয়ানত ইত্যাদি নানাবিধ অপকর্মের অশুভ ফলাফল থেকে কোনো শিক্ষাই তাদের হয়নি। কাজেই, মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে খায়বার যাওয়ার পর মুসলমান ও মূর্তিপূজকদের মধ্যে যে সামরিক টানাপড়েন চলছিলো, তার ফলাফল কী দাঁড়ায়, তা প্রত্যক্ষ করার জন্য তারা অপেক্ষমান থাকে। কিন্তু যখন তারা প্রত্যক্ষ করল যে, পরিস্থিতি ক্রমেই মুসলমানদের অনুকূলে চলে যাচ্ছে এবং তাঁদের শাসন ক্ষমতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করছে তখন তারা হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে থাকল এবং নানা প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। শেষবারের মতো মুসলমাদের এমন এক চরম আঘাত হানার জন্য তারা প্রস্তুতি শুরু করে দিল, যাতে তাঁদের জীবন প্রদীপ চিরতরে নির্বাপিত হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু মুসলমানদের সঙ্গে সরাসরি মোকাবেলা করার সাহস তাদের ছিলো না সেহেতু তারা এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পন্থা অবলম্বন করল, যা নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো।

বনু নাযীর গোত্রের ২০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মক্কার কুরাইশদের নিকট উপস্থিত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। উহুদ যুদ্ধের দিন কুরাইশরা পুনরায় মুসলমানদের সঙ্গে বদরে মোকাবেলা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পালন করতে ব্যর্থ হয় এবং এর ফলে যোদ্ধা হিসেবে তাদের যে সুখ্যাতি ছিলো তা অনেকটাই বিনষ্ট হয়েছে, তাই তা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যেই বনু নযীরের প্রস্তাব তাদের উৎসাহিত করে এবং তারা তা মেনে নেয়।

এরপর ইহুদিদের এ দলটি বনু গাতফান গোত্রের নিকট যায় এবং কুরাইশদের মতো তাদেরকেও যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। এতে তারাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। অধিকন্তু, উক্ত প্রতিনিধি দলটি আরবের অবশিষ্ট গোত্রগুলোর নিকটে ঘোরাফিরা করে তাদেরকেও যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ এবং উৎসাহিত করতে থাকে। যার ফলে তারা অনেকেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এভাবে কুচক্রী ইহুদিরা অত্যন্ত কার্যকরভাবে নবী করীম (ﷺ) ইসলামের দাওয়াত এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফির মুশরিকদের বড়ো বড়ো গোত্র এবং দলগুলোকে উত্তেজিত ও উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধের জন্য তৈরি করে নেয়।

অতঃপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী দক্ষিণ দিক হতে কুরাইশ কেনানাহ এবং তোহামায় বসবাসরত দ্বিতীয় হালিফ (চুক্তিবদ্ধ) গোত্রসমূহ মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যায়। এদের সংখ্যা ছিলো চার হাজার এবং সার্বিক নেতৃত্বে ছিলো আবু সুফিয়ান। এ বাহিনী মাররুয যাহরান গিয়ে পৌঁছলে বন্ধু সোলাইম এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ঐ সময় পূর্বদিক হতে গাতফানী গোত্রসমূহ ফাযারা, মুররাহ এবং আশজা রওয়ানা হয়। ফায়ারার নেতৃত্বে ছিলো উমাইয়া বিন হিসন, বনু মুররাহর নেতৃত্বে ছিলো হারেস বিন আউফ এবং আশজা গোত্রের নেতৃত্বে ছিলো মিসআর বিন রুহাই। তাদের নেতৃত্বে বনু আসাদ এবং অন্যান্য গোত্রের অনেক লোকজনও এসেছিলো।

উল্লেখিত গোত্রগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় এবং নির্ধারিত কর্মসূচি মোতাবেক মদিনা অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। সে প্রেক্ষিতে কয়েক দিনের মধ্যেই মদিনার আশপাশে দশ হাজার সৈন্যের এক দুর্ধর্ষ বাহিনী সমবেত হলো। তাদের দুরভিসন্ধিমূলক যুদ্ধ প্রস্তুতি পর্বে তারা এত বেশি সংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করেছিলো যে, মদিনার মহিলা, শিশু বৃদ্ধ ও যুবকের সমষ্টিগত সংখ্যার চাইতেও তাদেও সৈন্য সংখ্যা ছিলো বেশি। যদি শত্রুপক্ষের সৈন্য সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ আকস্মিকভাবে মদিনার দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যেত, তাহলে মুসলমানদের জন্য তা হতো অত্যন্ত বিপজ্জনক। তখন এতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছুই থাকত না যে, মুসলমানদের মূলোৎপাটন করে তাঁদের সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হতো।

তখনই মদিনার সংবাদ সরবরাহকারীরা রাসূল এর নিকট দ্রুত সংবাদ পরিবেশন করলেন।

সংবাদ পাওয়ামাত্রই রাসূল নেতৃস্থানীয় সাহাবাদের পরামর্শ বৈঠক আহ্বান করেন এবং প্রতিরোধ সংক্রান্ত পরিকল্পনার ব্যাপারে পরামর্শ করেন। শুরার প্রতিনিধিরা অনেক চিন্তা ভাবনার পর সর্বসম্মতিক্রমে সালমান ফারসী (রা) এর একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। সালমান ফারসী এর প্রস্তাবটির ভাষা ছিলো নিম্নরূপ:

হে আল্লাহর রাসূল। পারস্যে যখন আমাদেরকে অবরোধ করা হতো, তখন আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী স্থানে পরিখা খনন করে নিতাম।

প্রতিরোধ সংক্রান্ত এ প্রস্তাবটি ছিলো অত্যন্ত হেকমাতপূর্ণ ও সম্ভাবনাময়। আরববাশিরা এ প্রস্তাবের হেকমত সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাসূল তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেন। এতে প্রতি দশজনের ওপর ৪০ হাত পরিখা খননের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। দায়িত্ব প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পরিখা খননে আত্মনিয়োগ করেন। নবী করীম (ﷺ) উক্ত কার্যে সকলকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করতে থাকেন এবং নিজেও পুরোপুরিভাবে তাতে অংশগ্রহণ করেন।

সাহল বিন সা'দ হতে বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে-তিনি বলেছেন, রাসূলের সঙ্গে আমরা খন্দকে ছিলাম। লোকজনেরা খনন করছিলেন এবং আমরা কাঁধে করে মাটি বহন করছিলাম। এ সময় রাসূলপাঠ করলেন-

'হে আল্লাহ! পরকালীন জীবন ছাড়া দুনিয়ার জীবন তো প্রকৃত জীবন নয়। অতএব মুহাজির এবং আনসারদেরকে ক্ষমা করে দাও।'

আনাস হতে এর বর্ণনা, রাসূল (ﷺ) যখন পরিখার দিকে আগমন করছেন, তখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, এক শীতের সকালে আনসাররা ও মুহাজিরবা খনন করছেন। তাদের নিকট কোনো দাস নেই, যারা তাদের পরিবর্তে এ কাজ করে দেয়। তাদের কষ্ট এবং ক্ষুধার ভাব দেখে রাসূল বললেন,

'হে আল্লাহ! অবশই, পরকালীন জীবনটাই প্রকৃত জীবন অতএব, আনসার এবং মুহাজেরীনদেরকে ক্ষমা করে দিন।'

আনসার এবং মুহাজিররা প্রত্যুত্তরে বললেন- 'আমরাইতো মুহাম্মদ (ﷺ) এর হাতে যতকাল বেঁচে থাকবো জিহাদের বাইআত করেছি।'

সহিহ বুখারিতে বারা বিন আযিব হতে বর্ণিত আমি রাসূলকে পরিখার মাটি বহনরত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। এ মাটি বহন করার কারণে তাঁর দেহ মুবারক ধূলি ধূসরিত হয়ে উঠেছিলো। ঐ অবস্থায় তাঁকে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার কবিতার নিম্নোক্ত চরণগুলো আবৃত্তি করতে শুনেছিলাম-

হে আল্লাহ! যদি তোমার অনুগ্রহ না হতো তাহলে আমরা হেদায়েতপ্রাপ্ত হতাম না, আমরা দান খয়রাত করতাম না এবং নামাযও পড়তাম না। অতএব আমাদের শান্তি বর্ষণ কর এবং কাফিরদের সঙ্গে যদি আমাদের মোকাবিলা হয়, তাহলে আমাদের পাকে দৃঢ় রেখো (আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত রেখো)। নিশ্চয় তারা আমাদের বিরুদ্ধে লোকদেরকে প্ররোচিত করেছে (ক্ষেপিয়ে তুলেছে) যদি তারা ফেৎনা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে আমরা তা মানব না।

বারা বিন আযেব বলেছেন, শেষের শব্দগুলো রাসূল অধিক টান দিয়ে উচ্চারণ করছিলেন, অন্য একটি বর্ণনায় কবিতাটির শেষাংশ ছিলো নিম্নরূপ-

নিশ্চয় তারা আমাদের ওপর অত্যাচার করেছে এবং তারা যদি আমাদেরকে ফেৎনায় নিক্ষেপ করতে চায়, তাহলে আমরা তা মানব না।

মুসলমানগণ একদিকে এতই আবেগের সঙ্গে কাজ করছিলেন, অপরদিকে তাঁদের ক্ষুধার তাড়না এত অধিক ছিলো যে, তা চিন্তা করতে গেলে অন্তর ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আনাস (রা) বর্ণনা করেন, পরিখা খননরত মুসলমানদের জন্য যে সামান্য পরিমাণ খাদ্য দ্রব্য আনা হয়েছিলো, তা ছিলো অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত। এ দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্যই তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন।

আবু তালহা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (ﷺ) এর নিকট আমরা ক্ষুধার অভিযোগ করলাম এবং নিজ নিজ পেটের আবরণ উন্মোচন করে পেটের সঙ্গে বেঁধে রাখা পাথর দেখালাম। রাসূল (ﷺ) স্বীয় পেটের আবরণ উন্মেচন করে দেখালেন যে, তাঁর পেট দুটি পাথর বাঁধা।

পরিখা খননকালে নবুয়াতের কতিপয় নিদর্শনও প্রকাশিত হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনায় আছে যে, নবী করীম (ﷺ) এর তীব্র ক্ষুধার ব্যাপারটি অবগত হয়ে জাবের বিন আবদুল্লাহ একটি বকরীর বাচ্চা যবেহ করলেন এবং তাঁর স্ত্রী (আনুমনিক আড়াই কেজি) যব পিশে আটা তৈরি করলেন। অতঃপর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবিসহ একান্তে তাঁর বাসায় দাওয়াতে আসার জন্য নবী করীম (ﷺ) কে অনুরোধ পেশ করলেন। কিন্তু নবী করীম (ﷺ) পরিখা খননরত সকল সাহাবিকে যাদের সংখ্যা ছিলো এক হাজার, সঙ্গে নিয়ে তাঁর গৃহে গমন করলেন।

আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ এই স্বল্প খাদ্যে সাহাবিগণের সকলেই পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেলেন অথচ গোশতের পাত্রে গোশত অবশিষ্ট রইল এবং আটার পাত্রেও আগের মতোই আটা অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় ক্রমাগতভাবেই রুটি তৈরি হতে থাকল।

নোমান ইবনে বাশীরের বোন তাঁর পিতা এবং মামাকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে অল্প খেজুরসহ পরিখার নিকট আগমন করলে রাসূল তা চেয়ে নিয়ে একটি কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দেন। অতঃপর খননরত সাহাবিদের দাওয়াত দিয়ে তা খেতে বললেন। সাহাবিগণ খেতে থাকলে খেজুরের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকল। পূর্ণ পরিতৃপ্তি সহকারে সকল সাহাবির খাওয়ার পরেও এ পরিমাণ খেজুর অবশিষ্ট রইল যে, তার কিছু পরিমাণ কাপড়ের বাইরেও পড়েছিলো।

খন্দক খননকালে উপরিউক্ত ঘটনাবলির চাইতেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইমাম বোখারী (রা) বর্ণনা করেছেন। জাবির (রা) বলেন, আমরা পরিখা খননকার্যে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় একটি অত্যন্ত শক্ত পাথর আমাদের কাছে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল। কয়েকজন সাহাবি নবী করীম (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! একটি অত্যন্ত শক্ত পাথর আমাদের খনন কাজে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে।

নবী করীম (ﷺ) বললেন, আমি অবতরণ করছি। অতঃপর তিনি যখন অবতরণ করলেন তখনো তাঁর পেটের ওপর একটি পাথর বাঁধা ছিলো। আমরাও তিন দিন যাবৎ কোনো প্রকার খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করেনি। অতঃপর রাসূল যখন উক্ত প্রস্তর খন্ডের ওপর আঘাত করলেন। তখন তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে স্তূপে পরিণত হয়ে গেল।

বারা (রা) বর্ণনা করেছেন, খন্দক খনন কালে এক স্থানে একটি অত্যন্ত শক্ত পাথর দৃষ্টিগোচর হলো। এ পাথরটিকে কোঁদাল দ্বারা আঘাত করলে সে আঘাতে পাথরটির কিছুই হলো না, বরং কোঁদাল প্রত্যাঘাত খেয়ে ফিরে আসতে থাকল। উপায়ান্তর না দেখে নবী করীম (ﷺ) এর ব্যাপারটি অবহিত করা হলো। বিষয়টি অবগত হয়ে রাসূল সেখানে আগমন করলেন এবং কোদাল হাতে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলার পর পাথরটিকে আঘাত করলেন। উক্ত আঘাতের ফলে পাথরের একটি অংশ ভেঙে পড়ল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহু আকবর। আমার হাতে সিরিয়া দেশের চাবি কাঠি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী আছে, সেখানকার লাল দালানগুলো আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।

অতঃপর যখন তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন, তখন অন্য একটি অংশ ভেঙে পড়ল। তিনি বললেন 'আল্লাহু আকবর। আমাকে পারস্য সাম্রাজ্য দেয়া হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী এ সময় আমি মাদায়েনের সাদা দালানগুলো প্রত্যক্ষ করছি। অতঃপর বিসমিল্লাহ সহকারে তিনি তৃতীয়বার আঘাত করলেন। তখন পাথরটির অবশিষ্টাংশ ভেঙ্গে পড়ল। এবার তিনি বললেন, আল্লাহু আকবর! আমাকে ইয়েমেন রাজ্যের চাবিগুলো প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ সাক্ষী, এখন আমি সানআর সিংহ দ্বার প্রত্যক্ষ করছি।

যেহেতু উত্তর দিক ছাড়া অন্যান্য সব দিক থেকেই মদিনা নগরী পাহাড়, পর্বত এবং খেজুর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলো সেহেতু একজন বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ সৈনিক হিসেবে যথার্থই তিনি ধারণা করেছিলেন যে, মদিনার ওপর এত বিশাল এক বাহিনীর আক্রমণ একমাত্র উত্তর দিক থেকেই সম্ভব হতে পারে এবং সেই দিকেই তিনি পরিখা খনন করিয়েছিলেন।

মুসলমান পরিখা খননকার্য একটানা অব্যাহত রাখেন। দিবাভাগে তাঁরা খননকার্য চালিয়ে যেতেন এবং সন্ধ্যবেলা ঘরে যেতেন। এভাবে মদিনার পাশ্ববর্তী এলাকায় পর্যন্ত কাফিরদের সুসজ্জিত সৈন্যদল পৌছার পূর্বেই নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী পরিখা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।

এদিকে চার হাজার সৈন্য সমন্বয়ে গঠিত কুরাইশ বাহিনী মদিনার নিকটবর্তী রূমাহ, জারফ এবং জাগবার মধ্যবর্তী মাজমাউল আসয়াল নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। অন্যদিকে গাতফান এবং তাদের নাজদী সঙ্গীরা ছয় হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে উহুদের পূর্ব পাশে যানবে নাকমী নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। এমন পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন-

আর মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের যে ওয়াদা দিয়েছেন এটি তো তাই। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন’। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল। (সূরা আল-আহযাব: আয়াত-২২)

এবং মুনাফিক ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিলো, তারা বলল আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা আল-আহযাব: আয়াত-১২)

যাহোক, শত্রুপক্ষের সঙ্গে মোকাবিলার উদ্দেশ্যে রাসূল তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনীসহ অগ্রসর হলেন এবং সালয়া পর্বতকে পেছনে রেখে শিরিব স্থাপন করলেন। সম্মুখভাগে ছিলো পরিখা, যা মুসলমান এবং কাফিরদের মধ্যে একটি প্রতিবন্ধক প্রাচীর হিসেবে বিদ্যমান ছিলো।

এ সময় মদিনার দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় ইবনে উম্মে মাতুমের ওপর। মদিনার মহিলা এবং শিশুদেরকে নগরের দুর্গ ও গর্তসমূহে সুরক্ষিত রাখা হয়।

আক্রমণের উদ্দেশ্যে মুশরিকরা যখন মদিনার দিকে অগ্রসর হলো তখন দেখল যে, একটি প্রশস্ত পরিখা তাদের এবং মুসলমানদের মধ্যে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। উপায়হীন হয়ে তাদেরকে অবরোধ সৃষ্টির কথা ভাবতে হলো। অথচ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময় এ রকম কোনো চিন্তা ভাবনা কিংবা প্রস্তুতি তাদের ছিলো না। কারণ প্রতিরোধে এ পরিকল্পনা; তাদের নিজেদের কথা অনুযায়ী এমন এটি চাতুর্যপূর্ণ কৌশল যা সম্পর্কে আরবদের কোনো ধারণা ছিলো না। কাজেই, এ ধরনের রণ কৌশল সম্পর্কে তাদের চিন্তাই ছিলো না। পরিখায় উপস্থিত হয়ে মুশরিকরা তাদের ধারণাতীত এ রণকৌশল দেখে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে উঠল এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চক্কর দিতে থাকল। এ অবস্থায় তারা এমন কোনো দুর্বল স্থানের অনুসন্ধান করছিলো যেখান দিয়ে অবতরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। এদিকে মুসলমানরা তাদের গতিবিধির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলেন এবং তারা যাতে পরিখার নিকটবর্তী হতে সাহসী না হয়, এজন্য মাঝে মাঝে তীর নিক্ষেপ করছিলেন, যাতে তারা পরিখার মধ্যে লাফ দিয়ে পড়তে কিংবা অংশবিশেষ ভরাট করে ফেলে পথ তৈরি করে নিতে না পারে।

এদিকে কুরাইশ অশ্বারোহীরা এটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলো না যে, তারা পরিখার পাশে অবরোধ সৃষ্টি করে ফলাফলের আশায় অনর্থক অনির্দিষ্টকাল যাবৎ বসে থাকবে। এ ব্যবস্থা ছিলো তাদের অভ্যাস ও শানের সম্পূর্ণ বিপরীত। কাজেই, তাদের একটি দল; যার মধ্যে ছিলো আমর বিন আবদে উদ্দ, ইকরামা বিন আবু জাহেল এবং যারার বিন খাত্তাব একটি সংকীর্ণ স্থান দিয়ে পরিখা পার হয়ে গেল এবং তাদের ঘোড়াগুলো পরিখা ও সালআর মধ্যবর্তী স্থানে চক্করও দিতে থাকল। পক্ষান্তরে আলী এবং কয়েকজন সাহাবি (রা) পরিখার যে অংশ দিয়ে তারা প্রবেশ করেছিলো, সেখানে অবস্থান নিয়ে তাদের পথ বন্ধ করে দিলেন। এর প্রেক্ষিতে আমর বিন আবদে উদ্দ সামনাসামনি মোকাবিলার জন্য উচ্চকণ্ঠে আহ্বান জানাল। আলী (রা) তার সঙ্গে মুকাবিলার জন্যে মুখোমুখী হয়ে এমন এক বাক্য উচ্চারণ করেন, যার ফলে অত্যন্ত ক্রোধান্বিত অবস্থায় সে ঘোড়া হতে লাফ দিয়ে অবতরণ করে এবং ঘোড়ার দুই পা কেটে ফেলে এবং চেহারা বিকৃত করে, সে কুরাইশদের অন্যতম বীর ও সাহসী মুশরিক ছিলো।

অতঃপর উভয়ের মধ্যে শুরু হলো মোকাবিলা, চলল উভয়ের মধ্যে আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের পালা। অবশেষে প্রবল আঘাত হেনে আলী (রা) তাকে হত্যা করেন। এ অবস্থা দেখে অন্য মুশরিকরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পরিখা থেকে পলায়ন করে। অন্যরা এতই ভীত হয়ে ছিলো যে, পলায়নের সময় ইকরামা তার বর্শা ফেলে দিয়ে যায়।

মুশরিকরা কোনো কোনো সময় পরিখা অতিক্রম করে যাওয়ার কিংবা এর প্রশস্ততা কমিয়ে পথ তৈরি করে নেয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু মুসলমানরাও পরিখা থেকে তাদের দূরে রাখার লক্ষ্যে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবস্থা অবলম্বন করে যেতে থাকেন। তারা অদম্য সাহস এবং দক্ষতার সঙ্গে তীর নিক্ষেপ করে এবং প্রতিপক্ষের তীরন্দাযির মোকাবিলা করে তাদের সকল প্রকার প্রচেষ্টাকে বিফল করে দেন।

শত্রুপক্ষের সঙ্গে অব্যাহত মুকাবিলা করার কারণে রাসূল এবং সাহাবা কেরামদের পক্ষে নামায আদায় করা সম্ভব হয়নি। যেমনটি সহিহাইনের মধ্যে জাবির (রা) হতে বর্ণিত আছে, পরিখার দিন ওমর বিন খাত্তাব আগমন করেন এবং কাফিরদের সম্পর্কে কিছু ভালোমন্দ কথা বলার পর নিবেদন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! অদ্য সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় খুব কষ্টে নামায আদায় করতে সক্ষম হয়েছি।

রাসূল বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি এখনো নামায আদায় করতে পারিনি।

এরপর আমরা নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে বুতহা নামক স্থানে অবতরণ করি। রাসূল সেখানে অযু করেন এবং আমরাও অযু করি। অতঃপর তিনি আসরের নামায আদায় করেন। এটি ছিলো সূর্য অস্তমিত হয়ে যাওয়ার পরের কথা। এর পর মাগরিবের নামায আদায় করেন।

নির্দিষ্ট সময়ে উক্ত নামায আদায় করতে না পারার কারণে রাসূল এতই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, মুশরিকদের বিরুদ্ধে তিনি বদদোয়া করেছিলেন। বুখারিতে আলী (রা) এর এক বর্ণনা মতে পরিখার দিন রাসূল বললেন, হে আল্লাহ! ঐ সকল মুশরিকের বাড়িঘর ও কবর এমনভাবে আগুণে পরিপূর্ণ করে দাও, যেভাবে তারা আমাদেরকে সালাতে উস্তা আদায় করা থেকে বিরত রেখেছে এবং এভাবে সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে।

মুসনাদে আহমদ এবং মুসনাদে শাফেয়িতে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা নবী করীম (ﷺ) কে জোহর, আসর, মাগরিব ও এশার নামায আদায় করা থেকে বিরত রাখে। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি একত্রে এ সকল নামায আদায় করেন। ইমাম নববী বলেন, উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের ব্যাপারে সমাধান হবে এই, পরিখা যুদ্ধের কয়েকদিন পর্যন্ত এ সমস্যা চালু ছিলো। কাজেই, কোনো দিন এ রকম অন্য দিন ভিন্ন রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো।

এখান থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয়, মুশরিকদের পক্ষ থেকে পরিখা অতিক্রম করার প্রচেষ্টা এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে অব্যাহত প্রতিরোধ কয়েক দিন পর্যন্ত চালু ছিলো। কিন্তু যেহেতু দুই দলের মধ্যে সাক্ষাৎ সমরে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে পরিখা ছিলো একটি বিরাট প্রতিবন্ধক। এ জন্য সামনা-সামনি সংগ্রামের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। যুদ্ধের গতিধারা তীর নিক্ষেপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো।

অবশ্য, তীর নিক্ষেপের ফলে উভয় পক্ষেরই কয়েক ব্যক্তিকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। মুসলমান শহীদদের সংখ্যা ছিলো ছয়জন এবং মুশরিদের পক্ষে দশজন। এর মধ্যে এক কিংবা দুই জন তরবারির আঘাতে নিহত হয়েছিলো। এ দুই পক্ষ দলের পরস্পর পরস্পরের প্রতি তীর নিক্ষেপের এক পর্যায়ে সা'দ বিন মু'আয তীরবিদ্ধ হন। তীরের আঘাতে তাঁর হাতের মূল শিরা কেটে যায়। হিব্বান বিন আরিকা নামক এক কুরাইশীর তীরের আঘাতে তিনি আহত হন। এপরপ তিনি প্রার্থনা করেন, হে আল্লাহ! তুমি জানো, যে সম্প্রদায় তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং তাকে দেশ হতে বের করে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ব্যাপারটি আমার নিকট যত প্রিয়, অন্য কোনো সম্প্রদায়ের নিকট ততটা প্রিয় নয়। হে আল্লাহ! আমি মনে করি, এখন তুমি তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধকে শেষ পর্যায় পৌঁছে দিয়েছো। কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপারে এখনো যদি কোনো কিছু অবশিষ্ট থাকে, তাহলে আমাকে তাদের জন্য অবশিষ্ট রেখে দাও, যেন আমি তাদের সঙ্গে জিহাদে লিপ্ত হতে পারি। আর যদি তুমি যুদ্ধ শেষ করে থাক তাহলে এ আঘাতকে বাকি রেখে, এ আমার মৃত্যুর কারণ করে দাও।

তাঁর দোয়ার শেষের অংশটুকু ছিলো, (কিন্তু) সেই পর্যন্ত আমার মৃত্যু দিও না, যে পর্যন্ত না বনু কুরাইযার ব্যাপারে আমার চক্ষু পরিতৃপ্ত করে নিই।

যে প্রকারেই হোক একদিকে মুসলমানরা শত্রুদের সামনাসামনি হয়ে সমস্যাবলি সমাধানে তৎপর রয়েছেন, অন্যদিকে ষড়যন্ত্রকারী এবং কপটদের প্রতারণা নিজের গর্তের মধ্যে কুন্ডলী পাকাচ্ছে এবং প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, যাতে তারা মুসলমানদের দেহে বিষ ঢেলে দিতে পারে। যেমন বনু নযীরের বড়ো অপরাধী হুওয়াই বিন আখতার বনু কুরাইযার আবাসস্থলে এসে তাদের নেতা কা'ব বিন আসাদ করযীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এ কা'ব বিন আসাদ হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে বনু কুরাইযার পক্ষ থেকে অঙ্গীকার পালনের অধিকার রাখত এবং যে রাসূলের সঙ্গে এ চুক্তি করেছিলো যে, যুদ্ধের সময় সে তাঁকে সাহায্য করবে। তখন সে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু হুওয়াই তার সঙ্গে এমন এমন সব কথাবার্তা বলতে থাকে যে, শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য সে দরজা খুলে দেয়। হুওয়াই বলল, হে কা'ব! আমি তোমার নিকট যুগের ইজ্জত এবং জোয়ারের সাগর নিয়ে এসেছি। আমি নেতা ও পরিচালকসহ কুরাইশদের নিয়ে এসে রুমার মাজমাউল আসয়ালে অবতরণ করিয়েছি। তাছাড়া, বনু গাতফানকে তাদের পরিচালক ও নেতৃবৃন্দসহ উহুদের নিকট যানবে নাকমীতে শিবির স্থাপন করিয়েছি। তারা আমার সঙ্গে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছে, 'মুহাম্মদ (ﷺ) এবং তার সঙ্গী-সাথিদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত তারা এখান থেকে ফিরে যাবে না।

কা'ব বলল, 'আল্লাহর কসম! তুমি আমার নিকট যুগের অপমান এবং বর্ষণ-মুখর মেঘমালা নিয়ে এসেছ যা শুধু বিজলীর চমক দিচ্ছে। কিন্তু ওর মধ্যে ফলোৎপাদক কিছুই নেই। হুওয়াই বললো আমি দুঃখিত, আমাকে আমার আপন অবস্থার ওপর থাকতে দাও। আমি মুহাম্মদ (ﷺ) এর মধ্যে সততা ও বিশ্বাস রক্ষা ছাড়া অন্য কিছুই দেখিনি।

কিন্তু হুওয়াই অনবরত তার চুলের খোপা এবং কাঁধের মধ্যে মোচড় দিয়ে ফুসলাতে থাকল। এভাবেই তাকে বশীভূত করে ফেললো অবশ্য এ ব্যাপারে হুওয়াইকে কা'বের সঙ্গে একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ হতে হয়। অঙ্গীকারটি ছিলো কুরাইশরা যদি মুহাম্মদ (ﷺ) শেষ না করে প্রত্যাবর্তনের পথ ধরে তাহলে সেও তাদের সঙ্গে তাদের দুর্গে প্রবেশ করবে। অতঃপর তাদের অবস্থা যা হবে, তারও তা-ই হবে। উভয়ের এ অঙ্গীকারের ফলে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে কাবের সম্পদিত চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায় এবং এর ফলে মুসলমানদের সহযোগী হয়ে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তারা শত্রুদের পক্ষাবলম্বন করে।

এরপর বনু কুরাইযার ইহুদিরা প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজ কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা সূত্রে জানা যায়, সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব হাসসান বিন সাবেত (রা) এর 'ফারো' নামক দুর্গে অবস্থান করছিলেন। মহিলা এবং শিশুদের সঙ্গে হাসসান (রা) ও সেখানে ছিলেন। সাফিয়া (রা) বলেন, আমাদের নিকটবর্তী স্থান দিয়ে একজন ইহুদি গমন করল এবং দুর্গের চারদিকে ঘোরাফেরা করতে থাকল। এটি হচ্ছে সেই সময়ের ঘটনা, যখন বনু কুরাইযা রাসূলের সঙ্গে সম্পাদিত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চুক্তির শর্তাবলি থেকে নিজেদের মুক্ত করে নিয়েছিলো। আর আমাদের এবং তাঁদের মধ্যে এমন কেউই ছিলো না, যে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। রাসূল মুসলমানদের সাথে নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলায় ব্যাস্ত ছিলেন। আমাদের নিকট আসতে পারতেন না। এজন্য আমি বললাম, হে হাসসান! আমি দেখতে পাচ্ছি, এ ইহুদি আমাদের দুর্গের চতুর্দিকে ঘোরাফিরা করছে। আল্লাহর কসম! আমি আশঙ্কা করছি, এ ব্যক্তি অন্যান্য ইহুদীকে আমাদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন করে দেবে। এদিকে রাসূল ও সাহাবায়ে কেরাম (রা) শত্রুর মোকাবেলায় এতই ব্যস্ত রয়েছেন, যে তাঁরা আমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসতে পারবেন না। সুতরাং আপনি গিয়ে তাকে হত্যা করে আসুন।

উত্তরে হাসসান (রা) বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি জানেন আমি এ কাজের লোক নই। সাফিয়া বললেন, 'আমি এখন নিজেই কোমর বাঁধলাম। তারপর স্তম্ভের একটি একটি কাঠ নিলাম এবং দুর্গ হতে বের হয়ে ঐ ইহুদির কাছে গেলাম। অতঃপর ঐ কাঠ দ্বারা আঘাত করে করে তাকে মেরে ফেললাম এবং দুর্গে ফিরে এসে হাসসান (রা) কে বললাম যান, এখন তার অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্রগুলো নিয়ে আসুন। সে পুরুষ লোক আমি তার অস্ত্র খুলিনি। আমার এ কথা শুনে হাসসান (রা) বললেন, তার অস্ত্র এবং আসবাবপত্রের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে এই যে, মুসলমান শিশু এবং মহিলাগণের হেফাযতের ওপর রাসূল (ﷺ) এর ফুফুর ঐ ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের অত্যন্ত গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। উক্ত পদক্ষেপের ফলে সাধারণ ইহুদিদের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিলো যে, উক্ত দুর্গবাসীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সৈন্য মোতায়েন রয়েছে এবং এ কারণেই তারা দুর্গের ওপর চড়াও হওয়ার সাহস করেনি। অথচ দুর্গে তখন কোনো সৈন্যই ছিলো না।

তবে মূর্তিপূজক আক্রমণকারীদের সঙ্গে তাদের একান্ততার প্রমাণস্বরূপ তারা তাদের জন্য রসদ সরবরাহ করতে থাকে। ঐ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী তাদের রসদবাহী বিশটি উট আটক করেছিলেন। যা হোক, রাসূল যখন ইহুদিগণের অঙ্গীকার ভঙ্গের সংবাদ অবগত হলেন, তখন তিনি এতদস্পর্কিত তথ্যানুসন্ধানের জন্য তৎক্ষণাৎ মনোনিবেশ করলেন। উদ্দেশ্যে ছিলো, বনু কুরাইযার মনোভাব অবহিত হওয়ার পর প্রয়োজন বোধে সেই আলোকে সামরিক কৌশল পুনর্বিন্যাস করে দেয়া।

কাজেই, উক্ত ব্যাপারে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য রাসূল (ﷺ) সা'দ বিন মু'আয, সা'দ বিন উবাদাহ, আবদুল্লাহ বিন রওয়াহা এবং খাওয়াত বিন জোবায়ের (রা) কে প্রেরণ করেন। বনু কুরাইযা সম্পর্কে যে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে তা সঠিক না মিথ্যা সে ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানোর জন্য তিনি তাদের পরামর্শ দেন। যদি সঠিক হয় তাহলে আভাস ইঙ্গিতে শুধু তাঁর কাছেই বিষয়টি ব্যক্ত করার জন্য পরামর্শ দেন। সৈন্যদের মনোবল অটুট রাখার জন্যই এ ব্যবস্থা। পক্ষান্তরে, যদি তারা অঙ্গীকার মান্য করে চলে তাহলে তা সর্বসমক্ষে প্রকাশ ও আলোচনা করার জন্য পরামর্শ দান করেন।

যখন তারা বনু কুরাইযার নিকট গিয়ে পৌঁছলেন তখন তাদের চরম বিশৃংখলা ও উত্তেজিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তারা প্রকাশ্যে গালিগালাজ করল, শত্রুতামূলক কথাবার্তা বলল এবং রাসূল প্রতি অবমাননা সূচক উক্তি করল। তারা এমন সব কথাবার্তাও বলল, আল্লাহর রাসূল কে? আমাদের এবং মুহাম্মদের মধ্যে কোনো অঙ্গীকার নেই।

বনু কুরাইযার এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করার পর নবী করীম (ﷺ) এর নিকট ফিরে এসে তাঁরা ইঙ্গিতে বললেন, আযল ও কারাহ। এর অর্থ হলো আযল ও কারাহ গোত্র যেমন সংশ্লিষ্ট সাহাবাদের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছিলো, বনু কুরাইযার ইহুদিরাও অনুরূপভাবে অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে।

উক্ত ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সাহাবাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা সত্ত্বেও প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সকলেই ওয়াকেফহাল হয়ে গেলেন এবং এর ফলে আসন্ন এক বিপদের আভাস ক্রমেই তাদের সামনে প্রকাশ পেতে থাকল। প্রকৃতই মুসলমানগণ সে সময় এক অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। পেছনে ছিলো বনু কুরাইযার যাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থাই মুসলমানদের ছিলো না। সম্মুখভাগে ছিলো অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত মুশরিক বাহিনী, যাদের সম্মুখ থেকে সরে আসা কোনো ক্রমেই সম্ভব ছিলো না। অধিকন্তু, মুসলমান শিশু ও মহিলারা বিশেষ কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই বিশ্বাসঘাতক ইহুদিদের সন্নিকটে অবস্থান করছিলেন। বিভিন্ন কারণে মুসলমানরা দারুণ দুর্ভাবনার মধ্যে নিপতিত হন, যার সম্পর্কে এ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে-

যখন তারা তোমাদের কাছে এসেছিল তোমাদের উপরের দিক থেকে এবং তোমাদের নিচের দিক থেকে আর যখন চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ কন্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম ধারণা পোষণ করছিলে। তখন মুমিনদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল। আর তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল। (সূরা আল-আহযাব: আয়াত ১০-১১)

এমনি জটিল এক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কিছু মুনাফিকও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। তারা বলতে লাগল, মুহাম্মদ আমাদের সঙ্গে ওয়াদা করতেন যেমন, আমরা কায়সার ও কিসরার ধন-ভান্ডার ভোগ করব। অথচ এখানে এখন অবস্থা এ যে, প্রস্রাব এবং পায়খানার জন্য বের হলেও জীবনের ভয় রয়েছে। কোনো কোনো মুনাফিক তাদের সম্প্রদায়ের নিকট এমন কথাও বলল আমাদের ঘরবাড়িগুলো শত্রুদের সামনে খোলা পড়ে রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে আমাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হোক। সেই সময় পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াল যে, বনু সালমার লোকজনদের উদ্যম ভেঙে গেল এবং তাঁরা ফিরে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করতে থাকল। এ সব লোকের ব্যাপারেই আল্লাহ ইরশাদ করলেন-

আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, ‘আল্লাহ ও তার রাসূল আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়’। আর যখন তাদের একদল বলেছিল, ‘হে ইয়াসরিববাসী, এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই, তাই তোমরা ফিরে যাও’। আর তাদের একদল নবীর কাছে অনুমতি চেয়ে বলছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত, অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। (সূরা আহযাব: আয়াত ১২-১৩)

একদিকে সৈন্যদের অবস্থা যখন ছিলো এরূপ, অন্যদিকে তখন রাসূল (ﷺ) বনু কুরাইযার অঙ্গীকার ভঙ্গের সংবাদ অবগত হওয়ার পর কাপড় দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত অবস্থায় দীর্ঘ সময় চিৎ হয়ে শুয়ে রইলেন। নবী করীম (ﷺ) এর উক্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে লোকজনদের দুর্ভাবনা আরও বেড়ে গেল। কিন্তু কিছু সময় পরই রাসূল (ﷺ) এর মুখমন্ডল আশার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আল্লাহ আকবার বলে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, হে মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্য এবং তোমাদের বিজয়ের শুভ সংবাদ শুনে নাও।

অতঃপর উদ্ভূত পরিস্থিতি মুকাবিলার লক্ষ্যে নবী করীম (ﷺ) এক কর্মসূচি প্রণয়ন করেন এবং তারই ব্যবস্থা হিসেবে মদিনার নিরাপত্তা বিধানের জন্য সেনাবাহিনীর একটি অংশকে সেখানে প্রেরণ করেন। এর উদ্দেশ্যে ছিলো শিশু ও মহিলাদের অরক্ষিত অবস্থায় সুযোগ নিয়ে কুচক্রী ইহুদিরা যাতে তাদের আক্রমণ করতে না পারে, তা সুনিশ্চিত করা।

কিন্তু সে সময় এমন এক কুটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিলো, যার মাধ্যমে শত্রুদের বিভিন্ন দলের ঐক্যের মধ্যে ফাটল সৃষ্টির মাধ্যমে এক এক দলকে অন্য দল থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব হয়। উক্ত প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) বনু গাতফানের দুই নেতা উয়াইনা বিন হিসন এবং হারিস বিন আওফের সঙ্গে মদিনার উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ দেয়ার শর্তে এমন একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের মনস্থ করলেন যার ফলে এ দুই নেতা নিজ নিজ গোত্রের লোকজনদের নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে এবং এ অবস্থায় মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কুরাইশ বাহিনীর ওপর প্রবল পরাক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন।

উক্ত কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সলা-পরামর্শের এক পর্যায়ে রাসূল যখন সা'দ বিন মু'আয এবং সা'দ উবাদাহর সঙ্গে আলোচনা করেন তখন তারা উভয়ে এক বাক্যে আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আল্লাহর তরফ থেকে এ নির্দেশ না লাভ করেন তাহলে আমাদের এর কোনো প্রয়োজন নেই। যখন এ সকল লোকজন এবং আমরা সকলেই মূর্তিপূজক ছিলাম, তখন তো এরা অতিথি সেবা এবং ক্রয় বিক্রয় ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে একটি শস্য কণাও লাভ করতে পারেনি। আর এখনতো আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের নূর দ্বারা ধন্য করেছেন এবং আপনার মাধ্যমে ইজ্জত দান করেছেন। এখন কেন আমরা তাদেরকে সম্পদ দান করব? আল্লাহর শপথ! আমরা তো তাদেরকে শুধু তলোয়ারের আঘাত করব। তাদেরকে অন্য কিছু প্রদান করার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। নবী করীম (ﷺ) তাদের মতামতকে সঠিক সাব্যস্ত করলেন এবং বললেন, 'সমগ্র আরব তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে বলে শুধু তোমাদের খাতিরেই আমি এরূপ করতে চেয়েছিলাম।'

কিন্তু আল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে এমন এক ব্যবস্থা অবলম্বন করলেন, যাতে শত্রুদের নিজেদের মধ্যেই বিভেদ ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি হয়ে গেল। এর ফলে তাদের সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ল এবং প্রখরতা স্তিমিত হয়ে পড়ল। ঘটনাটি হলো, এই বনু, গাতফানের নুয়াইম ইবনে মাসউদ ইবনে আমের আশজাঈ রাসূলের খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুসলমান হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানতে পারেনি। সুতরাং আপনি আমাকে কোনো আদেশ করুন।

রাসূল বললেন, ব্যক্তি হিসেবে যেহেতু তুমি নিত্যান্তই একক সেহেতু কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তাদের ঐক্যে ফাটল ধরানো এবং তাদের মনোবল নষ্ট করার মতো কোনো কৌশল তুমি অবলম্বন করতে পার। কারণ, শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার ব্যাপারে এসব কূটকৌশল অত্যন্ত মূল্যবান। যুদ্ধ অর্থ হচ্ছে কূট কৌশলের খেলা, প্রেক্ষিতে নুয়াইম তৎক্ষণাৎ বনু কুরাইযার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

জাহেলি যুগে বনু কুরাইযার সঙ্গে নুয়াইমের সুসম্পর্ক ছিলো। তিনি সেখানে গিয়ে বললেন, আপনাদের এবং আমার মধ্যে যে পারস্পরিক সুসম্পর্কে বিদ্যমান রয়েছে, অবশ্যই তার স্বীকৃতি প্রদান করবেন। তারা বলল, 'জী হ্যাঁ'।

নুয়াইম বললেন, তাহলে আপনারা একথাটাও অবশ্যই স্বীকার করবেন যে, আপনাদের এখানে পরিবার-পরিজন ও সম্পদ সব কিছুই রয়েছে। এ সব কিছু পরিত্যাগ করে অন্য কোথাও যাওয়া আপনাদের পক্ষে অসম্ভব। আর আপনারা হাত মিলিয়েছেন যুদ্ধপিপাসু এমন দুই গোত্রের সঙ্গে, এখানে যাদের ঘরবাড়ি সহায় সম্পদ কিংবা পরিবার পরিজন বলতে কিছুই নেই। এ কারণে, কোনো সুযোগ-সুবিধা সম্ভাবনা থাকলে তারা পদক্ষেপ নেবে, নতুবা তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিদায় হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে, এখানেই আপনাদের থাকতে হবে এবং মুহাম্মদ থাকবে। আপনারা যদি তাঁর শত্রুপক্ষের সঙ্গে মিলে তাদের সাহায্য করেন, তাহলে যেভাবেই হোক তিনি অবশ্যই এর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। অতএব বনু কুরাইশ তাদের কিছু সংখ্যক লোক বন্ধক হিসেবে আপনাদের জিম্মায় না রাখলে, আপনারা তাদের সহযোগী হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না।

এরপর নুয়াইম সোজা কুরাইশদের নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। অতঃপর বললেন, আপনাদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা এবং সদিচ্ছা রয়েছে, তা অবশ্যই আপনাদের বোধগম্য রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। তারা বলল, জী হ্যাঁ।

নুয়াইম বললেন, বেশ তাহলে শুনুন। ইহুদিরা মুহাম্মদ (ﷺ) এবং তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে তাদের স্বীকৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে এবং এ কারণে তারা লজ্জিতও হয়েছে। বর্তমানে তারা এ শর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে যে, বন্ধক হিসেবে তারা আপনাদের নিকট থেকে কিছু সংখ্যক লোক গ্রহণ করার পর মুহাম্মদের নিকট সমর্পণ করবে এবং এর মাধ্যমে অঙ্গীকার ভঙ্গের ঘাটতি পূরণ করে নেবে। কাজেই ইহুদিরা বন্দি হিসেবে কুরাইশদের নিকট থেকে কিছু সংখ্যক লোক চাইলে কিছুতেই তা দেয়া যাবে না। এরপর নুয়াইম গাতফান গোত্রে গিয়ে কুরাইশদের নিকট যা বলেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করলেন। এতে তারাও সজাগ হয়ে উঠল।

এরপর শত্রুবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী রাত্রিকে কুরাইশরা ইহুদিদের নিকট এ পয়গাম প্রেরণ করে যে, তাদের অবস্থা কোনো সুবিধাজনক স্থানে নেই। ঘোড়া এবং উটগুলো মরে যাচ্ছে। অতএব, ওদিক থেকে আপনারা এবং এদিক থেকে আমরা উভয় দল এক সঙ্গে মুহাম্মদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করি। এর উত্তরে ইহুদীরা বলল, আজ শনিবার এবং আপনারা অবগত আছেন যে, আমাদের পূর্ব পূরুষগণের মধ্যে যারা এ দিবসে শরীয়াতের আদেশ অমান্য করেছিলো কিভাবে তাদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ হয়েছিলো। অধিকন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত আপনারা আপনাদের কিছু সংখ্যক লোককে বন্ধক হিসেবে আমাদের নিকট না রাখবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব না।

সংবাদ বাহক যখন ইহুদিদের নিকট থেকে এ উত্তর নিয়ে ফেরৎ এল তখন কুরাইশ এবং গাতফানরা বলল, আল্লাহর কসম! নুয়াইমতো সত্যই বলেছিলো। কাজেই তারা ইহুদিদেরকে এ কথা বলে পাঠাল। আল্লাহর কসম! আপনাদের হাতে কোনো লোককে বন্ধক রাখব না। আসুন আপনারা আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ুন এবং আমরা উভয় পক্ষ একযোগে দুদিক থেকে মুহাম্মদের বাহিনীকে আক্রমণ করি। একথা শুনে বনু কুরাইযার লোকেরা পরস্পর পরস্পরকে বলল, আল্লাহর কসম! নুয়াইম তোমাদেরকে সত্যই বলেছিলো। এভাবে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা এবং নির্ভরশীলতার পথ রুদ্ধ হয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাঙন সৃষ্টি হয়ে গেল। যার ফলশ্রুতিতে তাদের সাহস এবং মনোবল ভেঙ্গে পড়ল।

এ সময় মুসলমানগণ আল্লাহর দরবারে নিম্ন লিখিত দু'আ করছিলেন- হে আল্লাহ! আপনি আমাদের দোষত্রুটি ঢেকে রাখুন এবং আমাদেরকে ভয়ভীতি এবং বিপদাপদ থেকে নিরাপদ রাখুন।

রাসূল নিম্নের দু'আ করেছিলেন- হে আল্লাহ! হে কিতাব অবতীর্ণকারী! দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী! এ সেনাবাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ! তাদেরকে পরাভূত করুন এবং প্রকম্পিত করুন।

অবশেষে আল্লাহ আপন রাসূল এবং মুসলমানদের দু'আ কবুল করে মুশরিকদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করেন এবং মনোবল ভেঙ্গে দেন। অতঃপর তাদের ওপর উত্তপ্ত বায়ু ও তুফান প্রেরণ করেন। যা তাদের তাবু উপড়িয়ে ফেলে, মূল পাত্র সমূহ উল্টিয়ে দেয়, তাঁবুর খুঁটি উৎপাটন এবং সব কিছু তছনছ করে ফেলে। এর সঙ্গে প্রেরণ করেন ফেরেশতাবাহিনী যাঁরা তাদের অবস্থানকে নাজুক করে দেন, অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেন।

সেই তীব্র শীতের রাত্রিতে রাসূল হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) কে প্রেরণ করেন মুশরিদের সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তিনি যখন তাদের সামাবেশ স্থলের সন্নিকটে গিয়ে পৌঁছেন তখন প্রত্যক্ষ করেন যে, প্রত্যাবর্তনের জন্য তাঁদের প্রস্তুতি পর্ব প্রায় সম্পন্ন। হুযায়ফা নবী করীম (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাদের ফিরে যাওয়া সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রভাতে রাসূল প্রত্যক্ষ করেন যে, তাদের প্রত্যাবর্তনের ফলে ময়দান একদম পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। কোনো প্রকার সাফল্য লাভ ছাড়াই গভীর অসন্তোষ এবং ক্রোধসহ শত্রুদের ফিরিয়ে দেয়া এবং তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ একাই যথেষ্ট হয়েছেন। মোটকথা, এভাবে আল্লাহ আপন ওয়াদা পূরণ করেছেন এবং নিজ সৈন্যদের ইজ্জত প্রদান করেছেন। উক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে রাসূল মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন।

বিশুদ্ধমতে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো ৫ম হিজরির শাওয়াল মাসে এবং মুশরিকরা আনুমানিক এক মাস যাবৎ রাসূল এবং মুসলানদের অবরোধ সূচিত হয়েছিলো। এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিলো যিলকদ মাসে। ইতিহাসবিদ ইবনে সায়াদের মতে।

রাসূল যে দিন খন্দক থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, সে দিনটি ছিলো বুধবার এবং যুল কা'দ মাস শেষ হতে অবশিষ্ট ছিলো সাত দিন।

আহযাব যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ক্ষয়-ক্ষতির যুদ্ধ ছিলো না; বরং সেটা প্রকৃতপক্ষে স্নায়ু যুদ্ধ ছিলো। এতে কোনো প্রকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়নি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধে ছিলো একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এ যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে মুশরিকদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে এবং সুস্পষ্ট হয়ে যায়, আরবের কোনো শক্তির পক্ষেই মদিনার মুসলমানদের ক্রমবিকাশমান শক্তিকে নিঃশেষ করা সম্ভব নয়। কারণ, আহযাব যুদ্ধের জন্য বিশাল বাহিনী সংগৃহীত হয়েছিলো। এর চাইতে অধিক শক্তিশালী বাহিনী সংগ্রহ করা আরবদের পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। এজন্য আহযাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল বলেন-

এখন থেকে আমরাই তাদের ওপর আক্রমণ করব, তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করবে না। এখন আমরা এবং আমাদের সৈন্যরা তাদের দিকে যাবো।

বনু কুরাইযার যুদ্ধ

খন্দকের যুদ্ধ প্রান্তর থেকে যেদিন রাসূল (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করলেন, সেই দিনই যোহরের সময় যখন তিনি উম্মে সালামা (রা) এর গৃহে গোসল করছিলেন, তখন জিবরাঈল (আ) আগমন করলেন এবং বললেন, আপনি কি অস্ত্রশস্ত্র খুলে রেখে দিয়েছেন? ফেরেশতাগণ কিন্তু এখনো অস্ত্রশস্ত্র খোলেননি। আমিও শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবনপূর্বক সরাসরি এখানেই চলে এসেছি। উঠুন এবং স্বীয় সঙ্গী সাথিদের নিয়ে বনু কুরাইযা অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকুন। আমি অগ্রভাগে গিয়ে তাদের দুর্গসমূহে কম্পন সৃষ্টিপূর্বক তাদের অন্তরে ভয় ভীতির সঞ্চার করে দিব।

রাসূল কে এ সকল কথা বলার পর জিবরাঈল (আ) ফেরেশতাগণের দলভুক্ত হয়ে যাত্রা করলেন।

এদিকে রাসূল একজন সাহাবির মাধ্যমে ঘোষণা করে দিলেন যাঁরা যাঁরা শ্রবণ ও আনুগত্যের ওপর দন্ডায়মান আছেন তাঁরা আসরের নামায পড়বেন বনু কুরাইযায় গিয়ে। এরপর তিনি ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) এর উপর মদিনার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করলেন এবং আলী (রা) এর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিয়ে বনু কোরাইযা অভিমুখে প্রেরণ করলেন। যখন তিনি বনু কুরাইযার দুর্গসমূহের নিকট গিয়ে পৌঁছিলেন, তারা তখন রাসূল ওপর গালি গালাজের বৃষ্টি বর্ষণ করছিলো।

অতঃপর রাসূল মুহাজির ও আনসারদের একটি সুসংগঠিত দল নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং বনু কুরাইযার 'আন্না' নামক এক কূপের পাশে গিয়ে শিবির স্থাপন করলেন। অন্যান্য সাধারণ মুসলমানরাও যুদ্ধের ঘোষণা শুনে দ্রুতগতিতে বনু কুরাইযা অভিমুখে যাত্রা করলেন। পথে আসর নামাযের সময় হয়ে গেল। তখন কেউ কেউ বললেন, আমাদের যেভাবে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, আমরা সেইভাবেই কাজ করব। আমরা বনু কোরাইয়ার গিয়ে আসর নামায আদায় করব। উক্ত কারণে কেউ কেউ এশার পর আসর নামায আদায় করেন।

কিন্তু কোনো কোনো সাহাবা এ কথাও বলেন, রাসূলের উদ্দেশ্যে এটা ছিলো না যে নামাযের ব্যাপারে আমরা এ মত কিংবা পথ অবলম্বন করি; বরং তিনি এটাই চেয়েছিলেন যে মুহূর্ত মাত্রও বিলম্ব না করে আমরা যেন বনু কুরাইযার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। যাঁরা এ ধারণা পোষণ করেছিলেন তাঁরা পথেই সময়মত আসর নামায আদায় করে নিয়েছিলেন। তবে ব্যাপারটি যখন রাসূলের নিকট পেশ করা হয় তখন তিনি এ প্রসঙ্গে কোনো পক্ষকেই ভালো-মন্দ কিছুই বলেননি।

যে প্রকারেই হোক বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মুসলিম সৈন্যদল বনু কুরাইযার ভূমিতে গিয়ে পৌঁছলেন এবং নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে মিলিত হলেন। অতঃপর বনু কুরাইযার দুর্গসমূহকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেললেন। মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিলো তিন হাজার এবং অশ্বের সংখ্যা ছিলো ত্রিশটি। বনু কুরাইযার ইহুদিরা যখন অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে নিপতিত হলো, তখন ইহুদি নেতা কা'ব বিন আসাদ তাদের সামনে তিনটি পরিবর্তনশীল প্রস্তাব উপস্থাপন করল। সেগুলো হচ্ছে যথাক্রমে-

১. হয় ইসলাম গ্রহণপূর্বক মুহাম্মদের দ্বীনে প্রবেশ করে স্বীয় জানমাল এবং সন্তান সন্ততিদের ধ্বংসপ্রাপ্তি থেকে রক্ষা করবে। উক্ত প্রস্তাব উপস্থাপন কালে কা'ব আসাদ একথাও বলেছিলো যে আল্লাহর শপথ! তোমাদের নিকট এটা সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, তিনি হচ্ছেন প্রকৃতই একজন নবী এবং রাসূল। অধিকন্তু তিনি হচ্ছেন, সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা স্বীয় ঐশী কিতাবে অবগত হয়েছো।

২. অথবা স্বীয় সন্তান-সন্ততিগণকে স্বহস্তে হত্যা করবে। অতঃপর তলোয়ার উত্তোলন করে মুহাম্মদের দিকে অগ্রসর হবে এবং সর্বশক্তি প্রয়োগ করে যুদ্ধ করবে। পরিণামে হয় আমরা বিজয়ী হব, নতুবা সমুলে নিঃশেষ হয়ে যাব।

৩. অথবা মুহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের ধোকা দিয়ে শনিবারে তাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করবে। কারণ এ ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চিন্ত থাকবে যে, উক্ত দিনে কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ অনুষ্ঠিত হবে না।

কিন্তু ইহুদিরা উক্ত তিনটি প্রস্তাবের একটিও মঞ্জুর করল না। তার ফলে কা'ব বিন আসাদ রাগান্বিত হয়ে বলল, মায়ের কোলে জন্মগ্রহণ করার পর তোমরা কেউ একটি রাতও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অতিবাহিত করনি।

উক্ত প্রস্তাব তিনটি প্রত্যাখ্যানের পর বনু কুরাইযার সামনে শুধুমাত্র যে পথটি অবশিষ্ট রইল তা হলো এই যে, তারা রাসূলের নিকট অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপ করে আত্মসমর্পণ করবে এবং আপন ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারটি রাসূলের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিবে। কিন্তু তারা আরও ভেবে চিন্তে স্থির করল যে, অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে অর্থাৎ অস্ত্র সমর্পণের পূর্বে তাদের সঙ্গে সাহায্য চুক্তিতে আবদ্ধ মুসলমানদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করবে। সম্ভবত এর মাধ্যমে অস্ত্র ত্যাগের ফলাফল সম্পর্কে তারা কিছুটা ধারণা লাভ করতে সক্ষম হবে।

উক্ত প্রেক্ষিতে তারা রাসূল (ﷺ) এর নিকট এ মর্মে প্রস্তাব পাঠাল যে, 'আবু লুবাবাকে তাদের নিকট প্রেরণ করা হোক। যেহেতু আবু লুবাবার সঙ্গে তারা মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ ছিলো, সেহেতু তার সঙ্গে তাদের পরামর্শ করা প্রয়োজন। অধিকন্তু আবু লুবাবার বাগ-বাগিচা, সন্তান-সন্ততি এবং গোত্রীয় লোকেরা ছিলো সেই অঞ্চলের বাসিন্দা।

যখন আবু লুবাবা সেখানে উপস্থিত হলো তখন পুরুষরা তাকে দেখে দৌড়ে তার নিকট এল এবং শিশু ও মহিলারা করুণ কণ্ঠে কাঁদতে শুরু করল। উক্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবু লুবাবার অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হলো। ইহুদিরা বলল, আবু লুবাবা! আপনি কি যুক্তিযুক্ত মনে করছেন যে, বিরোধ নিস্পত্তির জন্য আমরা মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করি?

আবু লুবাবা বলল হ্যাঁ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাত দ্বারা কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করল, যার অর্থ ছিলো হত্যা। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সে উপলব্ধি করল যে, ব্যাপারটি হচ্ছে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর সুস্পষ্ট খিয়ানত। উক্ত কারণে সে রাসূল (ﷺ) এর নিকট প্রত্যাবর্তন না করে সরাসরি মসজিদে নববীতে গিয়ে উপস্থিত হলো এবং নিজেই নিজেকে সমজিদের একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলে শপথ করল যে, রাসূল স্বহস্তে তাকে না খোলা পর্যন্ত সে এ অবস্থাতেই থাকবে এবং আগামীতে কোনো দিন বনু কুরাইযার ভূমিতে প্রবেশ করবে না। এদিকে তার প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত হওয়ার ব্যাপারটি রাসূল গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন। অতঃপর প্রকৃত ব্যাপারটি অবগত হয়ে বললেন, যদি সে আমার নিকট আসত, তাহলে আমি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতাম। কিন্তু যেহেতু সে নিজের মতকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেই এ কাজ করে বসেছে, সেহেতু আল্লাহ যতক্ষণ তার তওবা কবুল না করছেন, ততক্ষণ আমি তাকে বন্ধন-মুক্ত করতে পারব না।

এদিকে আবু লুবাবার কুটকৌশলজনিত গোপন ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও কুরাইযা রাসূলের নিকট অস্ত্র সমর্পণ করারই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল এবং তিনি যা উপযুক্ত বিবেচনা করবেন তা তারা নির্বিবাদে মেনে নেবে বলে স্থির করল। অথচ দীর্ঘকাল যাবৎ এ অবরোধের ধকল সহ্য করার মতো সামর্থ্য ও সহনশীলতা তাদের ছিলো। কারণ একদিকে যেমন তাদের নিকট প্রচুর খাদ্য ও পানীয় মজুদ ছিলো, পানির ঝর্ণা এবং কূপ ছিলো, অন্যদিকে তেমনি মজবুত ও সুসংরক্ষিত দুর্গও ছিলো। গিয়ে পৌঁছল যখন আলী ইবনে আবু তালিব এবং জোবায়ের বিন আওয়াম তাদের দুর্গ তোরণের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আলী বজ্র কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, আল্লাহর সেনাগণ! আল্লাহর শপথ! আমি হয় সেই অমৃতের পেয়ালা থেকে পান করব, যা হামযা পান করেছে, আর না হয় এটা সুনিশ্চিত যে এ দুর্গ জয় করব।

আলীর এ প্রাণপণ সংকল্পের কথা অবগত হয়ে বনু কুরাইযা তড়িঘড়ি করে রাসূল সমীপে নিজেদের সমর্পণ করে দিল, সাথে তিনি তাদের জন্য যা সঙ্গত বলে বিবেচনা করবেন এরূপ একটি পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূল (ﷺ) পুরুষদের বন্দী করার নির্দেশ প্রদান করায় মুহাম্মদ বিন মাসলামা আনসারীর তত্ত্বাবধানে বনু কুরাইযার সকল পুরুষ লোককে বন্দী করা হলো এবং মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদের সযত্নে পৃথকভাবে রাখা হলো। আওস গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এ বলে রাসূল (ﷺ) এর নিকট আবেদন পেশ করল যেন বনু কায়নুকার সঙ্গে আপনি যে আচরণ করেছেন, তা আপনিই উত্তমরূপে অবগত আছেন। আপনার স্মরণ থাকতে পারে বনু কায়কা আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের হালীফ ছিলো এবং এ সকল লোকজন আমাদের হালীফ। অতএব অনুগ্রহ পূর্বক তাদের ওপর ইহসান করুন।

নবী বললেন, আপনারা কি এ ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন যে, আপনাদেরই এক ব্যক্তি তাদের সম্পর্কে মীমাংসা করে দেবেন? তারা জবাব দিল, এমনটি হলে আমাদের সন্তুষ্ট না হওয়ার কোনোই কারণ নেই। "রাসূল বললেন, ভালো কথা, এ ব্যাপারটি সা'দ বিন মু'আয এর দায়িত্বে রইল।" আওস গোত্রের লোকজন বলল, 'আমরা এর ওপর সন্তুষ্ট আছি।'

অতঃপর সা'দ বিন মু'আযকে ডেকে পাঠানো হলো। তিনি তখন মদিনায় অবস্থান করছিলেন। সৈন্যদের সঙ্গে বনু কুরাইযায় আগমন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ, খন্দকের যুদ্ধে তাঁর হাতের শিরা কেটে যাওয়ায় তিনি আহত হয়েছিলেন। তাঁকে একটি গাধার পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়ে রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাযির করা হয়। যখন তিনি সেখানে গিয়ে পৌঁছালেন, তখন গোত্রীয় লোকজন চতুর্দিক থেকে তাঁকে ঘিরে বলতে থাকলেন, হে সাদ! স্বীয় হালীফের সাথে উত্তম ও কল্যাণকর মীমাংসা করবেন। রাসূল আপনাকে এ জন্যই বিচারক নির্বাচিত করেছেন যে, আপনি তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবেন। কিন্তু তিনি তাদের কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ রইলেন। লোকজন এ ব্যাপারে তাঁকে বারবার অনুরোধ জানাতে থাকলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি বললেন, এখন এমন এক সময় সমাগত যখন সা'দ আল্লাহ সম্পর্কে কোনো নিন্দার চিন্তা কিংবা ভয় করেন না। একথা শোনার পর কিছু লোক মদিনায় আসে এবং বন্দীদের মৃত্যু অনিবার্য বলে ঘোষণা করে।

এরপর সা'দ (রা) যখন নবী করীম (ﷺ) এর নিকট পৌঁছলেন তখন তিনি ইরশাদ করলেন, স্বীয় নেতাকে এগিয়ে নিয়ে এসো যখন তাঁকে অবতরণ করিয়ে আনা হলো, তখন রাসূল তাঁকে বললেন, 'হে সা'দ। এ সব লোকজন আপনার মীমাংসার ওপর আস্থাশীল হয়ে আত্মসমর্পণ করেছে।'

সা'দ বললেন, আমার মিমাংসা কি এদের ওপর প্রযোজ্য হবে? লোকেরা বলল, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, মুসলমানদের ওপরেও কি? জবাবে লোকেরা বলল, জী হ্যাঁ।

তিনি আবারও বললেন, এখানে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন তাদের ওপরেও কি তা প্রযোজ্য হবে? তার ঈঙ্গিত ছিলো রাসূল (ﷺ) এর অবতরণ স্থানের দিকে। কিন্তু সম্মান ও ইজ্জতের কারণে মুখমন্ডল ছিলো অন্যদিকে ফেরানো।

প্রত্যুত্তরে রাসূল বললেন, জী হ্যাঁ। আমার ওপরেও হবে। সাদ বললেন, তাহলে তাদের সম্পর্কে আমার বিচারের রায় হচ্ছে, পুরুষদের হত্যা করা হবে, মহিলা ও শিশুদের বন্দী করে রাখা হোক এবং সম্পদসমূহ বণ্টন করে দেয়া হোক।

রাসূল বললেন, আপনি তাদের ব্যাপারে ঠিক সেই বিচারই করেছেন, যেমনটি করেছেন আল্লাহ সাত আসমানের ওপর।

সা'দের এ বিচার ছিলো অত্যন্ত ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক। কারণ, বনু কুরাইযার মুসলমানদের জীবন মরণের জন্য অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে যা করতে চেয়েছিলো তা ছিলো অত্যন্ত ভয়াবহও বিভীষিকাময়। অঙ্গীকার ভঙ্গের একটি জঘন্য অপরাধও তারা করেছিলো। অধিকন্তু, মুসলমানদেরকে নিঃশেষ করে ফেলার জন্য তারা দেড় হাজার তরবারী, দুই হাজার বর্শা, যুদ্ধে ব্যবহারে উপযোগী তিনশত লৌহবর্ম এবং পাঁচ শত প্রতিরক্ষা ঢাল সংগ্রহ করে রেখেছিলো। পরবর্তীকালে সেগুলো মুসলমানদের অধিকারে আসে।

উক্ত সিদ্ধান্তের পর রাসূলের নির্দেশে বনু কুরাইযা গোত্রের লোকজনকে মদিনায় আনা হয় এবং বনু নাজ্জার গোত্রের হারেসের কন্যার বাড়িতে তাদের আবদ্ধ করে রাখা হয়। অতঃপর মদিনার বাজারে একটি পরিখা খনন করা হয় এবং বন্দীদের এক একটি দলকে সেখানে নিয়ে গিয়ে তাদের শিরচ্ছেদ করা হয়। এহেন অবস্থায় নিপতিত অবশিষ্ট বন্দীগণ যখন স্বীয় নেতা কাব বিন আসাদের নিকট জানতে চাইল, যাদের এখানে থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের সঙ্গে কিরূপ আচরণ করা হচ্ছে?

সে বলল, এটুকু উপলব্ধি করার মতো সাধারণ বোধও কি তোমাদের নেই? তোমরা কি লক্ষ করছ না যে, যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তারা আর ফিরে আসছে না এখানে অনুরোধকারীর অনুরোধ রক্ষা করা হচ্ছে না। আল্লাহর কসম! হত্যা ব্যতিরেকে আর কিছুই হচ্ছে না।

এভাবে বন্দীদের সকলের (যাদের সংখ্যা ছয় এবং সাত শতের মধ্যবর্তী ছিলো) শিরচ্ছেদ করা হয়। উল্লেখিত ব্যবস্থাপনার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বনু কুরাইযার ও বিদ্রোহের সম্পূর্ণরূপে মূলোৎপাটন করে ফেলা হয়। মুসলমানদের নিঃশেষ করে ফেলার উদ্দেশ্যে তাঁদের দুঃখ দুর্দশা ও দারুণ দুঃসময়ে শত্রুদের সাহায্য দান করে তারা যে জঘন্য যুদ্ধাপরাধ করেছিলো তাতে তারা যথার্থই প্রাণদন্ড পাওয়ার যোগ্য হয়ে গিয়েছিলো।

বনু কুরাইযার ন্যায় বানু নাযীর গোত্রের নিকৃষ্ট শয়তান ও আহযাব যুদ্ধের বড়ো অপরাধী হুয়াই বিন আখতার ও তার নানা অন্যায় অনাচারের কারণে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হয়ে পড়েছিলো। এ ব্যক্তি উম্মুল মুমেনীন সাফিয়া (রা) এর পিতা ছিলো। কুরাইশ এবং গাতফানদের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর যখন বনু কুরাইযাকে অবরোধ করা হয় এবং তারা দুর্গের মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকে। কারণ, আহযার যুদ্ধের সময় এ ব্যক্তি যখন কা'ব বিন আসাদকে বিশ্বাসঘাতকতা ও গাদ্দারী করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এসেছিলো তখন সে অঙ্গীকার করেছিলো, এখানে চলছিলো সে অঙ্গীকারেরই বাস্তবায়ন।

তাকে যখন নবীর খিদমতে নিয়ে আসা হলো, তখন সে এক জোড়া পরিধেয় বস্ত্র দ্বারা নিজেকে আবৃত করে রেখেছিলো। এ পোশাককে সে নিজেই প্রত্যেক দিক থেকে এক এক আঙ্গুল করে চিরে রেখেছিলো যাতে তাকে লুণ্ঠিত মালামালের মধ্যে গণ্য করা না হয়। তার হাত দুটো গলার পেছন দিকে দড়ি দ্বারা একত্রে বাঁধা অবস্থায় ছিলো। সে রাসূলে করীম কে লক্ষ করে বলল, আমি আপনার শত্রুতার জন্য নিজে নিজেকে নিন্দা করিনি। কিন্তু যে আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করে, সে পরাজিত হয়।

অতঃপর লোকজনকে সম্বোধন করে বলল, ওহে লোকেরা! আল্লাহর ফায়সালায় কোনো অসুবিধা নেই। এতো ভাগ্যের লিখিত ব্যাপার। এটি হচ্ছে এক বড়ো হত্যাকান্ড, যা বনি ইসরাঈলের ওপর আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন। এরপর সে বসে পড়ল এবং তার গলা কেটে দেয়া হলো।

উক্ত ঘটনায় বনু কুরাইযার এক মহিলাকেও হত্যা করা হয়। সে খাল্লাদ বিন সোওয়ায়েদ (রা) এর ওপর যাঁতার একটি অংশ নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করেছিলো। তার এ হত্যাকান্ডের শাস্তি হিসেবেই তাকে হত্যা করা হয়।

উক্ত ঘটনা প্রসঙ্গে রাসূল নির্দেশ প্রদান করেন, যাদের নাভির নিম্নদেশে লোম গজিয়েছে তাদের হত্যা করা হোক। আতিয়া কুরাযীর তখনো সে লোম গজায়নি, যার ফলে তাকে জীবিত ছেড়ে দেয়া হয়। পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম প্রহণপূর্বক সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

সাবেত বিন কায়েস, যোবায়ের বিন বাতা এবং তার পরিবারবর্গকে তাঁকে দান করে দেয়ায় জন্য আবেদন পেশ করেন। এর কারণ ছিলো, যোবায়ের সাবেতের ওপর কিছু ইহসান করেছিলো। তার আবেদন মঞ্জুর করে যোবায়ের এবং তার পরিবারবর্গকে তাকে দিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর সাবেত বিন কায়েস যোবাইরকে বললেন, রাসূল তোমাকে এবং তোমার পরিবারবর্গকে আমার অনুরোধে আমাকে দিয়ে দিয়েছেন।

এখন আমি সকলকে তোমার হাওয়ালা বা জিম্মায় প্রদান করছি। (অর্থাৎ তুমি তোমার পরিবার পরিজনসহ মুক্ত) কিন্তু যোবায়ের বিন বাতা যখন জানতে পারল, তার গোত্রীয় সকলকেই হত্যা করা হয়েছে তখন সে বলল, আমার গোত্রীয় ভাইদের ভাগ্যে যা ঘটেছে আমার ভাগ্যেও তাই ঘটতে দাও। উক্ত প্রেক্ষিতে তার শিরশ্ছেদ করে তাকেও তার গোত্রীয় ইহুদি ভাইদের দলভুক্ত করে দেয়া হয়। তবে যোবায়ের বিন বাতার সন্তান আব্দুল রহমানকে হত্যার হাত থেকে রক্ষা দেয়া হয়। পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করে তিনি সাহাবির মর্যাদা লাভ করেন।

অনুরূপভাবে বনু নাজ্জারের একজন মহিলা উম্মুল মুনযির সালমা বিনতে কায়েস নিবেদন পেশ করল যে, সামওয়াল কুরাযীর সন্তান রেফায়াকে তাঁর জন্য দান করে দেয়া হোক। তাঁর আরজী গ্রহণ করে রেফায়াকে তাঁর নিকট সমর্পণ করা হয়। এভাবে রেফায়াকে তিনি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। পরে রেফায়া ইসলাম গ্রহণকরে সাহাবির মর্যাদা লাভ করেন।

বনু কুরাইযার আরও কিছু সংখ্যক লোক অস্ত্রশস্ত্র নিক্ষেপণ ও আত্মসমর্পণের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই, তাদের জীবন, ধনসম্পদ ও সন্তানাদি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে। উক্ত, রাত্রিতেই আমর নামক এক ব্যক্তি যে বনু কুরাইযার অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে অংশগ্রহণ না করে দুর্গ থেকে বের হয়ে আসে। প্রহরীদের কমান্ডার মুহাম্মদ বিন আসলাম তাকে দেখে চিনতে পারেন এবং ছেড়ে দেন। পরে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই।

রাসূল বনু কুরাইযার ধন-সম্পদের এক-পঞ্চামাংশ বের করে নিয়ে বন্টন করে দেন। অশ্বারোহীদের তিন অংশ প্রদান করেন। এক অংশ আরোহীদের জন্য এবং দুই অংশ অশ্বগুলোর জন্য। যাঁরা পদব্রজে গমন করেছিলেন, তাঁদের এক অংশ প্রদান করেন। কয়েদী এবং শিশুদেরকে সা'দ বিন যায়েদ আনসারীর তত্ত্বাবধানে প্রেরণ করে তাদের বিনিময়ে ঘোড়া এবং অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করে নেয়া হয়।

রাসূলে করীম বনু কুরাইযার মহিলাদের মধ্যে থেকে রায়হানা বিনতে আমর বিন খানাফাকে নিজের জন্য দাসী মনোনীত করেন। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে নবী করীম (ﷺ) এর ওফাত পর্যন্ত রায়হানা তাঁর মালিকানাতেই ছিলেন।

কিন্তু কালবীর বর্ণনা মতে, নবী করীম (ﷺ) ৬ষ্ঠ হিজরিতে তাঁকে মুক্তি দিয়ে দেন। তখন তিনি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এর কিছুদিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। রাসূল (ﷺ) তাকে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে কবরস্থ করেন।

বনু কুরাইযার গোত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যাবলির যখন চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গেল তখন সৎ বান্দা সা'দ বিন মুআযের সেই প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে, তা প্রকাশের সময় এসে গেল। যার উল্লেখ আহযাব যুদ্ধের আলোচনায় এসেছে। তাই তার ক্ষত বিদীর্ণ হয়ে গেল। ঐ সময় তিনি মসজিদে নববীতে অবস্থান করছিলেন। নবী করীম (ﷺ) তাঁর জন্য মসজিদেই শিবির স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যাতে নিকটে থেকেই তাঁর সেবা শুশ্রুষা করা যায়। আয়েশা (রা) এর বিবরণ সূত্রে জানা যায়, তাঁর বিদীর্ণ ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়। মসজিদে বনু গিফার গোত্রের লোকজনের কয়েকটি শিবিরও ছিলো। যেহেতু তাদের দিকে রক্ত বয়ে যাচ্ছিল, তারা দেখে বলল, ওহে শিবিরওয়ালা! এগুলো কি যা তোমাদের দিক থেকে আমাদের দিক বয়ে আসছে? তাঁরা লক্ষ করলেন, সা'দের ক্ষতস্থান হতে রক্তস্রোত প্রবাহিত হচ্ছিল। অতঃপর তিনি উক্ত আহত অবস্থায় ইনতিকাল করেন।

বুখারি এবং সহিহ মুসলিমে জাবের (রা) হতে বর্ণিত রাসূল করীম ইরশাদ করেন, সা'দ বিন মু'আযের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠল। ইমাম তিরমিযি আনাস হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং যা বিশুদ্ধ বলে সাব্যস্ত করেছেন যখন, সা'দ বিন মু'আয (রা) এর জানাযা উঠানো হলো, তখন মুনাফিকরা বলল, এ লাশ কতই না হালকা। রাসূল করীম (ﷺ) বললেন, 'আল্লাহর ফেরেশতাগণ তার লাশ উত্তোলন করেছিলেন।

বনু কুরাইযার অবরোধকালে একজন মুসলমান শহীদ হন। তাঁর নাম ছিলো খাল্লাদ বিন সোয়াইদ। তিনি ছিলেন সেই সাহাবি যাঁর ওপর বনু কুরাইযার এক মহিলা যাঁতার অংশবিশেষ নিক্ষেপ করেছিলো। তাছাড়া, উকাশার ভাই আবু সেনান বিন মুহসিন উক্ত অবরোধকালে মৃত্যুবরণ করেন।

যতদূর জানা যায়, আবু লুবাবা ছয় রাত্রি পর্যন্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় অতিবাহিত করেন। প্রত্যেকবার নামাযের সময় তাঁর স্ত্রী এসে বাঁধন খুলে দিত। নামায শেষে পুনরায় তিনি খুঁটির সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলতেন। অতঃপর প্রত্যুষে তাঁর তওবা কবুল সম্পর্কে রাসূলের ওপর ওহী নাযিল হয়। সেই সময় নবী করীম (ﷺ) উম্মে সালমা (রা) এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। আবু লুবাবা বর্ণনা করেন, উম্মে সালামা নিজ গৃহের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, হে আবু লুবাবা! শুভ সংবাদ, সন্তুষ্ট হয়ে যাও আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন। একথা শুনে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম (রা) তাঁর বাঁধন খুলে দেয়ার জন্য দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু রাসূল ছাড়া অন্য কারো হাতে বাঁধন খুলে নিতে তিনি অস্বীকার করলেন। তাই ফযরের নামাযরত জন্য বের হয়ে নবী করীম (ﷺ) যখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর বাঁধন খুলে দেন।

এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় যিলকা'দ মাসে। পঁচিশ দিন পর্যন্ত বনু কুরাইযা অবরোধ স্থায়ী থাকে। সূরায়ে আহযাবে খন্দকের যুদ্ধ এবং বনু কুরাইযার যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক মুমিন ও মুনাফিকদের বিভিন্ন অবস্থায় বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। শত্রুদের বিভিন্ন দলের ভাঙন ও উদ্যমহীনতা এবং আহলে কিতাবের অঙ্গীকারভঙ্গের ফলাফল সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হয়।

আহযাব ও কুরাইযা যুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাবলি

১. সালাম বিন আবুল হোকাইকের হত্যা: সালাম বিন আবিল হোকাইকের উপনাম ছিলো আবু রাফে। ইসলাম বিদ্বেষী ও ইসলামের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ইহুদি প্রধানদের মধ্যে সে ছিলো অন্যতম। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের প্ররোচিত ও প্রলোভিত করার ব্যাপারে সে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো এবং ধন সম্পদ ও রসদ সরবরাহ করে তাদের সাহায্য করতো।

তাছাড়া রাসূলকে কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে সর্বক্ষণ সে ওঁৎ পেতে থাকত। এ কারণে মুসলমানগণ যখন বনু কুরাইযার সমস্যাবলি থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন তখন খাযরাজ গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করার জন্য নবী করীম (ﷺ) এর অনুমতি প্রার্থী হলেন। যেহেতু ইতোপূর্বে আউস গোত্রের কয়েকেজন সাহাবা কা'ব বিন আশরাফকে হত্যা করেছিলেন, সেহেতু খাযরাজ গোত্রও অনুরূপ একটি দুঃসাহসিক কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তাই তাঁর অনুমতি গ্রহণের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করতে চাইলেন।

রাসূলে করীম (ﷺ) তাঁদের অনুমতি প্রদান করলেন। কিন্তু বিশেষভাবে নির্দেশ প্রদান করলেন, মহিলা এবং শিশুদের যেন হত্যা করা না হয়। রাসূল (ﷺ) এর অনুমতি লাভের পর পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি দল অভীষ্ট গন্তব্য অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। এরা সকলেই ছিলেন খাযরায গোত্রের শাখা বনু সালামার সঙ্গে সম্পর্কিত। এঁদের দলনেতা ছিলেন আবদুল্লাহ বিন আতীক।

উক্ত দলটি সোজা খায়বর অভিমুখে গেলেন। কারণ আবু রাফের দুর্গটি তথায় ছিলো। যখন তাঁর দুর্গের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন সূর্য তখন অস্তমিত হয়েছিলো। লোকজন তখন গবাদি পশুর পাল নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলো। আবদুল্লাহ বিন আতীক তাঁর সঙ্গীদের বললেন, তোমরা এখানে অপেক্ষা করতে থাক। আমি দরজার প্রহরীর সঙ্গে কথাবর্তা বলতে গিয়ে এমন এক সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করব, যার মাধমে হয়তো দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশ লাভ সম্ভব হতে পারে। এরপর তিনি দরজার নিকট গেলেন এবং মাথার ঘোমটা টেনে এমনভাবে অবস্থান গ্রহণ করলেন, যাতে দেখলে মনে হয়, কেউ যেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বসেছে। প্রহরী সেই সময় চিৎকার করে ডাক দিয়ে বলল, ওহে আল্লাহর বান্দা! যদি ভেতরে আসার প্রয়োজন থাকে তবে এক্ষুণি চলে এসো, নচেৎ আমি দরজা বন্ধ করে দেব।

আবদুল্লাহ বিন আতীক বললেন, আমি সেই সুযোগে দুর্গাভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম এবং নিজেকে গোপন করে রাখলাম। যখন লোকজন সব ভেতরে এসে গেল, প্রহরী তখন দরজা বন্ধ করে দিয়ে চাবির গোছাটি একটি খুঁটির ওপর ঝুলিয়ে রাখল। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর যখন লক্ষ করলাম, সমগ্র পরিবেশ নিশ্চুপ ও নিস্তব্ধ, তখন আমি চাবির গোছাটি হাতে নিয়ে দরজা খুলে দিলাম। আবু রাফে, ওপর তলায় অবস্থান করছিলো। সেখানেই তার পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো বৈঠক শেষে বৈঠককারীরা যখন নিজ নিজ স্থানে চলে গেল, তখন আমি ওপর তলায় উঠে গেলাম। আমি যে দরজা খুলতাম ভেতর থেকে তা বন্ধ করে দিতাম। আমি এটা স্থির করে নিলাম, যদি লোকজনেরা আমার অনুপ্রবেশ সম্পর্কে অবহিত হয়েও যায় তবুও আমার নিকট তাদের পৌঁছার পূর্বেই যেন আবু রাফেকে হত্যা করতে পারি। এভাবে আমি তার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে পরিবার-পরিজন এবং সন্তানাদি পরিবেষ্টিত অবস্থায় এক অন্ধকার কক্ষে অবস্থান করছিলো। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলাম না যে, সে কক্ষের ঠিক কোন স্থানে অবস্থান করছে। এ কারণে আমি তার নাম ধরে ডাক দিলাম, আবু রাফে। সে উত্তরে বলল, কে ডাকে?

তৎক্ষণাৎ আমি তার কণ্ঠস্বরকে অনুসরণ করে দ্রুত অগ্রসর হলাম এবং তরবারী দ্বারা জোরে আঘাত করেও কোন ফল হলো না বলে মনে হলো। এদিকে সে জোরে চিৎকার করে উঠল। কাজেই, আমি দ্রুতবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম এবং অল্প দূরে এসে থেমে গেলাম। অতঃপর কন্ঠস্বর পরিবর্তন করে আবার ডাক দিলাম আবু রাফে। এ কন্ঠস্বর কেমন?

সে বলল, তোমার মা ধ্বংস হোক। অল্পক্ষণ পূর্বে এ ঘরেই কে যেন আমাকে তরবারী দ্বারা আঘাত করেছে।

আবদুল্লাহ বিন আতীক বললেন, আমি আবার প্রচণ্ড শক্তিতে তরবারী দ্বারা তাকে আঘাত করলাম। তার ক্ষতস্থান থেকে রক্তের ফোয়ারা ছুটতে থাকল। কিন্তু এতেও তাকে হত্যা করা সম্ভব হলো না। এতক্ষণে আমি তরবারীর অগ্রভাগ সজোরে তার পেটের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিলাম। তরবারীর অগ্রভাগ তার পৃষ্ঠদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এখন আমি নিশ্চিত হলাম যে, সে নিহত হয়েছে। তাই আমি একের পর এক দরজা খুলতে খুলতে নিচে নামতে থাকলাম। অতঃপর সিঁড়ির মুখে শেষ ধাপে গিয়ে পৌঁছতেই আমি নিচে পড়ে গেলাম।

চাঁদের আলোয় আলোকিত ছিলো চারদিক। নিচে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গোড়ালী স্থানচ্যূত হয়ে গেল। মাথার পাগড়ী খুলে পায়ের গোড়ালী শক্ত করে বেঁধে ফেললাম। অতঃপর দরজা হতে দূরে গিয়ে বসে পড়লাম এবং মনে মনে স্থির করলাম, যতক্ষণ না ঘোষণাকারীর মুখ থেকে তার মৃত্যুর ঘোষণা শুনতে পাচ্ছি, ততক্ষণ আমি এ স্থান পরিত্যাগ করব না।

মোরগের ডাক শুনে বুঝতে পারলাম, রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় দুর্গ শীর্ষ থেকে ঘোষণাকারী ঘোষণা করল, আমি হেজাযের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু রাফে'র মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করছি। একথা শোনার পর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম এবং সঙ্গীদের নিকট গিয়ে বললাম, আল্লাহ আবু রাফেকে তার মন্দ কথাবার্তা ও মন্দ কাজের চূড়ান্ত বিনিময় প্রদান করেছেন। আবু রাফে নিহত হয়েছে। চলো আমরা এখন এখান থেকে পলায়ন করি।

মদিনা প্রত্যাবর্তনের পর নবী করীম (ﷺ) এর খেদমতে হাযির এবং ঘটনাটি বর্ণনা করলাম। ঘটনাটি আদ্যপান্ত অবগত হওয়ার পর তিনি বললেন, তোমার পা প্রসারিত কর। আমরা পা প্রসারিত করলে তিনি স্থানচ্যুত গোড়ালীটি ওপর তাঁর হস্ত মুবারক বুলিয়ে দিলেন। তাঁর হস্ত পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গেই অনুভূত হলো, সেখানে ব্যথা-বেদনা বলতে আর কিছুই নেই। শুধু তাই নয়, ঐ স্থানে যে ব্যথা-বেদনা, ছিলো সেই অনুভূতিও যেন তখন ছিলো না।

এ হচ্ছে সহিহ বুখারির বর্ণনা। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, আবু রাফের ঘরে পাঁচজন সাহাবায়ে কেরামই (রা) প্রবেশ করেছিলেন এবং তার হত্যার ব্যাপারে সকলেই সক্রিয় ছিলেন। তবে যে সাহাবি তরবারীর আঘাতে তাকে হত্যা করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন আবদুল্লাহ বিন উনায়েস।

উক্ত বর্ণনায় একথাও বলা হয়েছে যে, তাঁরা যখন রাতে আবু রাফেকে হত্যা করেন এবং আবদুল্লাহ বিন আতীকের পায়ের গোড়ালী স্থানচ্যুত হয়ে যায়, তখন তাঁকে উঠিয়ে এনে দুর্গের দেয়ালের আড়ালে যেখানে ঝর্ণার নহর ছিলো সেখানে তাঁরা আত্মগোপন করে থাকেন।

এদিকে ইহুদিরা অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে চতুর্দিকে দৌড়াদৌড়ি করে অনুসন্ধান চালাতে থাকেন। অনেক অনুসন্ধানের পরও যখন তারা কোনো খোঁজ পেল না, তখন নিরাশ হয়ে ব্যক্তির নিকট প্রত্যাবর্তন করল। এ সুযোগে সাহাবায়ে কেরাম আবদুল্লাহ বিন আতীককে কাঁধে উঠিয়ে রাসূলে করীম এর খেদমতে হাযির হলেন।

প্রেরিত এ ক্ষুদ্র বাহিনীটির সফল অভিযান অনুষ্ঠিত হয়েছে ৫ম হিজরির যিলকদ অথবা যিলহজ্জ মাসে।

রাসূলে করীম যখন আহযাব এবং বনু কুরাইযা যুদ্ধ হতে নিস্কৃতি লাভ করলেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য সমাধা করলেন তখন শান্তি-শৃংখলার পথে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী লোকসমূহ এবং বেদুঈনদের বিরুদ্ধে সংশোধনী আক্রমণ পরিচালনা শুরু করলেন। এ পর্যায়ে তিনি যে সকল অভিযান পরিচালনা এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ আলোচিত হলো।

২. মুহাম্মদ বিন মাসলামার অভিযান: আহযাব ও বনু কুরাইযা সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার পর এটাই ছিলো প্রথম অভিযান। ত্রিশজন মুমিনের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিলো এ অভিযাত্রী দলটি। এ অভিযান পরিচালনার্থে অভিযাত্রী দলটি প্রেরিত হয়েছিলেন নাজদের অত্যন্তরভাগে বাকারাত অঞ্চলে যারিয়ার পার্শ্ববর্তী কারতা নামক স্থানে। যারিয়া এবং মদিনার অবস্থান' ছিলো সাত রাত্রি দূরত্বের ব্যবধানে। এ অভিযানে গমনকারীদের যাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ৬ষ্ঠ হিজরির ১০ই মুহাররম। তাদের লক্ষস্থল ছিলো বনু বকর বিন কিলাবের একটি শাখা।

মুসলমানরা অতর্কিতভাবে শত্রুদের আক্রমণ করলে তারা হতচকিত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পালিয়ে যায়। তাদের পরিত্যক্ত ধন সম্পদ এবং গবাদি পশু মুসলমানদের হস্তগত হয়। সেই সকল ধন সম্পদ এবং গবাদির পাল নিয়ে তাঁরা মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁরা যখন মদিনায় প্রত্যাগমন করেন তখন মুহাররম মাসের মাত্র একদিন অবশিষ্ট ছিলো। প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁরা বনু হানিফার সরদার সোমামা বিন আসাল হানাফীকেও বন্দী করে নিয়ে আসেন। সে মোসায়লামা কাজ্জাবের নির্দেশে নবী করীম (ﷺ) কে হত্যা করার জন্য ছদ্মবেশে বাহির হয়েছিলো।

কিন্তু অভিযানকারী সাহাবিগণ তাকে বন্দী করে নিয়ে আসেন এবং মসজিদে নববীর খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন।

এমতাবস্থায় নবী করীম (ﷺ) সেখানে এসে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে সোমামা! তোমার নিকট কী আছে?

প্রত্যুত্তরে সে বলল, হে মুহাম্মদ আমার নিকট কল্যাণ (ধন-সম্পদ) রয়েছে। যদি তুমি আমাকে হত্যা কর, তবে প্রকৃতই একজন খুনী আসামীকে হত্যা করবে। আর যদি অনুগ্রহ কর তবে প্রকৃতই একজন গুণগ্রাহী ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করবে। পক্ষান্তরে যদি ধন-সম্পদ চাও, তাহলে যা চাইবে তাই পাবে। তার মুখ থেকে এসব কথা শোনার পর রাসূল (ﷺ) তাকে ঐ অবস্থায় রেখে চলে গেলেন।

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) যখন দ্বিতীয়বার সেখানে এসে উপস্থিত হলেন, তখন পূর্বোক্ত প্রশ্নগুলোই তাকে জিজ্ঞেস করলেন। সে উত্তরও দিল ঠিক পূর্বের মতোই। এবারও রাসূল তাকে একই অবস্থায় রেখে চলে গেলেন। এরপর যখন তিনি তৃতীয়বার আগমন করলেন, তখনো ঐ একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। সোমামা এবারও একই উত্তর প্রদান করলেন। তৃতীয়বার তার মুখ থেকে উত্তর শোনার পর রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে নিদের্শ প্রদান করলেন তাকে মুক্ত করে দেয়ার জন্য।

তাঁরা তাকে মুক্ত করে দিলে সে মসজিদে নববীর নিকট একটি খেজুর বাগানে গেল। সেখানে গোসল করে পাক সাফ হওয়ার পর রাসূল (ﷺ) এর নিকট প্রত্যাবর্তন করে ইসলাম গ্রহণ করল। অতঃপর বলল, আল্লাহর শপথ! পৃথিবীর বুকে কোনো মুখমন্ডল আপনার মুখমন্ডলের চাইতে অধিক ঘৃণিত ছিলো না। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার নিকট আপনার মুখমন্ডলের চাইতে অধিক প্রিয় মুখমণ্ডল আর পৃথিবীতে নেই। সে আরও বলল, আল্লাহর শপথ! ইতোপূর্বে পৃথিবীর বুকে আপনার প্রচারিত দ্বীন ছিলো আমার নিকট সব চাইতে ঘৃণিত, কিন্তু এ মুহূর্তে আপনার দ্বীন আমার নিকট সব চাইতে প্রিয় এবং পবিত্র বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অত্র অভিযানে প্রেরিত অভিযাত্রীগণ আমাকে এমন সময় গ্রেফতার করেছিলো, যখন আমি উমরাহ পালনের জন্য মনস্থির করছিলাম।

রাসূলে করীম তাকে উমরাহ পালনের নির্দেশ এবং শুভ সংবাদ প্রদান করলেন। উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যখন সে কুরাইশদের অঞ্চলে পৌঁছল তখন তারা তাকে বলল, হে সোমামা তুমিও বেদ্বীন হয়ে গিয়েছো?

সোমামা বলল, না; বরং আমি মুহাম্মদ (ﷺ) এর হাতে বাইআত হয়ে মুসলমান হয়েছি। তিনি আরও বললেন, জেনে রাখ, আল্লাহর কসম! ইয়ামামা হতে তোমাদের নিকট গমের একটি দানাও আসবে না, যে পর্যন্ত রাসূল এ ব্যাপারে অনুমতি প্রদান না করবেন। ইয়ামামা মক্কা বাসীগণের শস্য ভূমির মর্যাদা রাখত।

সোমামা দেশে ফিরে মক্কা অভিমুখী খাদ্যদ্রব্যের চালান বন্ধ করে দিলেন। এর ফলে মক্কাবাশিরা খাদ্য সংকটজনিত অসুবিধার মধ্যে নিপতিত হলে। উক্ত পেক্ষিতে আত্মীয়তার সূত্র উল্লেখপূর্বক তারা রাসূলের নিকট এ মর্মে পত্র লিখল, যাতে তিনি সোমামাকে খাদ্যদ্রব্য চালান বন্ধ করা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূল সোমামাহকে খাদ্যদ্রব্যের চালান বন্ধ করা থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন।

৩. বনু লাহইয়ান যুদ্ধ: বনু লাহইয়ানের লোকজনেরা প্রতারণার মাধ্যমে রাজী নামক স্থানে ১০ জন সাহাবা (রা) কে আটক করার পর আটজনকে হত্যা করে এবং অবশিষ্ট দুইজনকে মক্কার মুশরিকদের নিকট বিক্রয় করে। তাঁদেরকেও নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। অঞ্চলটি হেজাযের অন্তঃভাগে মক্কার সীমানার নিকটবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিলো এবং যেহেতু উক্ত সময়ে মুসলমানদের সঙ্গে কুরাইশ ও বেদুঈনদের সম্পর্কের একটা কঠিন টানাপড়েনের অবস্থা বিরাজমান ছিলো, সেহেতু রাসূল (ﷺ) হেজাযের গভীর অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করে বড়ো শত্রুদের নিকট যাওয়াকে সমীচীন মনে করেননি।

কিন্তু কাফের মুশরিকরা যখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল এবং দলে ভাঙন ধরার ফলে তাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়ে পড়ল, তখন রাসূল এটা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে, রাজী নামক স্থানে লাহইয়ান গোত্রের লোকেরা সাহাবাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো, তার প্রতিশোধ গ্রহণের উপযুক্ত সময় সমাগত। কাজেই ৬ষ্ঠ হিজরির রবিউল আউয়াল, মতান্তরে জুমাদিউল উলা মাসে দুইশত সাহাবা নিয়ে রাসূল রাযী অভিমুখে যাত্রা করেন। যাত্রার প্রাক্কালে মদিনার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করেন ইবনে উম্মে মাকতুমের ওপর এবং ঘোষণা করেন যে, তিনি শাম রাজ্য অভিমুখে যাত্রা করেছেন।

অগ্রাভিযানের এক পর্যায়ে অভিযাত্রী দলসহ তিনি আমাজ এবং উসফানের মধ্যস্থলে অবস্থিত বাতনে গাররান নামক উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। এখানেই লাহইয়ান গোত্রের লোকেরা সাহাবাদেরকে হত্যা করেছিলো। সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি শহীদ সাহাবা (রা) দের জন্য আল্লাহর দরবারে রহমতের প্রার্থনা করলেন। এদিকে লাহইয়ান গোত্রের লোকেরা মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের সংবাদ শুনে পর্বতশীর্ষ অতিক্রম করে পালিয়ে গেল, যার ফলে তাদের কাউকেও গ্রেফতার করা সম্ভব হলো না।

রাসূলে করীম তাঁর বাহিনীসহ লাহইয়ান গোত্রের আবাসস্থলে দু'দিন অবস্থান করলেন, কিন্তু উক্ত গোত্রের কোনো লোকজনের খোঁজ-খবর তিনি পাননি। দ্বিতীয় দিনের পর তিনি দশজন অশ্বারোহীকে কুরাউল গামীমের দিকে প্রেরণ করেন। যাতে কুরাইশরাও নবীর অভিযান সম্পর্কে অবগত হন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। এভাবে মোট চৌদ্দ দিন মদিনার বাইরে কাটানোর পর তিনি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

বনু লাহইয়ান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি একের পর এক অভিযানের পর অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। পরিচালিত সেই সকল অভিযানের সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিম্নে প্রদত্ত হলো-

৪. গামীরের অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির রবিউল আওয়াল, মতান্তরে রবিউস সানি মাসে মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা) এর নতৃত্বে চল্লিশজন সাহাবির (রা) সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনী গামীর অভিমুখে গমন করেন। গামীর হচ্ছে বনু আসাদের একটি ঝর্ণার নাম। মুসলমান বাহিনীর অগ্রাভিযানের সংবাদ শুনে আসাদ গোত্রের লোকজনেরা তাদের গবাদির পাল পেছনে রেখে প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী তাদের পরিত্যক্ত দুইশত উট নিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন।

৫. ফুলকেসরার প্রথম অভিযান: উল্লিখিত ৬ষ্ঠ হিজরির রবিউল আউয়াল কিংবা রবিউস সানি মাসে মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা) নেতৃত্বে দশ সদস্যবিশিষ্ট এক সৈন্যদল জুলকেসরা অভিমুখে প্রেরণ করা হয়। বনু সালাবা নামক অঞ্চলে অবস্থিত শত্রুদলের সৈন্যসংখ্যা ছিলো একশত। শত্রুদল একটি গুপ্তস্থানে আত্মগোপন করে। কিছুটা অসতর্ক অবস্থায় মুসলিম বাহিনী যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, এমন সময় শত্রুবাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে তাঁদের সকলকে হত্যা করে। শুধুমাত্র মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা) মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে কোনোভাবে জীবনে রক্ষা পান।

৬. ফুলকেসবার দ্বিতীয় অভিযান: বনু সা'লাবা অভিযানে শাহাদতপ্রাপ্ত সাহাবিদের এ শোকাবহ ঘটনার প্রতিশোধ গ্রহণ এবং বনু সা'লাবাকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে রবিউস সানি মাসেই রাসূল আবু উবায়দাহ (রা) এর নেতৃত্বে যুলকেসরা অভিমুখে চল্লিশ সদস্যের আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। রাতের অন্ধকারে পায়ে হেটে এ বাহিনী বনু সা'লাবার সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে অতর্কিত আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু বনু সা'লাবার লোকজনেরা দ্রুত গতিতে পর্বতশীর্ষ অতিক্রম করে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী তাদের নাগাল পায়নি। তাঁরা শুধু এক ব্যক্তিকে গেপ্তার করতে সক্ষম হন, যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানদের দলভুক্ত হয়ে যান। কাজেই, বনু সা'লাবা গোত্রের পরিত্যক্ত গবাদি পশুর পাল নিয়ে মুসলিম বাহিনী মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন।

৭. জুমুম অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির রবিউস সানি মাসে যায়েদ বিন হারেসার নেতৃত্বে জুমুম অভিমুখে এ বাহিনীকে প্রেরণ করা হয়। জুমুখ হচ্ছে মাররায যাহরানে (বর্তমান ফাতেমা উপত্যকা) সোলাইম গোত্রের একটি ঝর্ণার নাম। যায়েদ (রা) তাঁর বাহিনীসহ সেখানে পৌছার পরপরই মুযাইনা গোত্রের হালিমা নামের এক মহিলা তাঁদের হাতে বন্দি হয়। উক্ত মহিলার কাছ থেকে বনু সোলাইম গোত্রের নির্দিষ্ট এবং বিভিন্ন তথ্য তাঁরা অবগত হন। বন্ধু সোলাইমের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাঁরা বহু লোককে বন্দী করেন এবং অনেক গবাদি পশু তাঁদের হস্তগত হয়। যায়েদ এবং তাঁর বাহিনী এ সকল বন্দী ও গবাদি পশুসহ মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন। রাসূল উক্ত মুয়াইনী গোত্রীয় বন্দি মহিলাকে মুক্ত করার পর তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করেন।

৮. ঈস অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির জুমাদিউল উলা মাসে যায়েদ বিন হারেসার নেতৃত্বে ঈস অভিমুখে এক বাহিনী প্রেরণ করা হয়। এ বাহিনীতে ছিলো একশত সত্তরজন অশ্বারোহী। এ অভিযানকালে এক কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলার কিছু সম্পদ মুজাহিদ বাহিনীর হস্তগত হয়। এ কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলাটি রাসূলের জামাতা আবুল আসের নেতৃত্বাধীনে সফর করছিলো। আবুল আস তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি।

কাফেলার সম্পদ মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হওয়ার পর গ্রেফতার এড়ানো এবং মালপত্র ফেরৎ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মদিনা অভিমুখে পলায়ন করেন এবং নবী কন্যা যয়নাবের আশ্রয় গ্রহণপূর্বক কাফেলার সকল সম্পদ যাতে ফেরৎ দেয়া হয়, সে ব্যাপারে তার পিতাকে অনুরোধ করার জন্য বলেন। যয়নার পিতার নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করলে কোনো প্রকার শর্ত ব্যতিরেকেই সকল সম্পদ ফেরত দানের জন্য সাহাবায়ে কেরামকে নবী করীম (ﷺ) নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশ মোতাবেক সাহাবায়ে কেরাম কাফেলার সকল সম্পদ ফেরৎ দেন। সমস্ত ধন সম্পদসহ আবুল আস মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং মালিকদের নিকট সমস্ত মালামাল ফেরত দেয়ার পর ইসলাম গ্রহণ পূর্বক মদিনায় হিজরত করেন। পূর্বের বিয়ের ভিত্তিতেই রাসূল (ﷺ) তার মেয়ে যয়নবকে তার হাতে সমর্পণ করেন। সহিহ হাদীসের মাধ্যমে এ তথ্য প্রমাণিত হয়েছে।

রাসূল পূর্বের বিয়ের ভিত্তিতে এ জন্য তাঁর মেয়ে যয়নাবকে সমর্পণ করেছিলেন, কারণ ঐ সময় পর্যন্ত মুসলমান মহিলাদের ওপর কাফের স্বামীর সঙ্গে বসবাস করা হারাম হওয়ার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ হয়নি।

৯. তরফ অথবা তরিক বা সারিয়ায়ে যায়েদ: এ অভিযানটিও সংঘটিত হয়েছিলো জুমাদিউস সানি মাসে। যায়েদ বিন হারেসার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এ বাহিনীটি প্রেরণ করা হয় তরফ অভিমুখে। এ স্থানটি বনু সা'লাবার অঞ্চলে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রার সংবাদ অবগত হওয়া মাত্রই বেদুঈনেরা সে স্থান থেকে পালিয়ে গেল। পলায়নরত বেদুঈনদের চারটি উট মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয়েছিলো। সেখানে চারদিন অবস্থানের পর তাঁরা মদিনায় প্রতাবর্তন করেন। বেদুঈনদের ভয় ছিলো যে, সেখানে রাসূল (ﷺ) নিজেই আগমন করছেন।

১০. ওয়াদিল কুরা বা সারিয়ায়ে যায়েদ ২য়: যায়েদ বিন হারেসার নেতৃত্বে এ অভিযানটি পরিচালিত হয়। ১২ জন সাহাবির সমন্বয়ে সংঘটিত হয়েছিলো এ অভিযাত্রী দল। ৬ষ্ঠ হিজরির রজব মাসে অনুষ্ঠিত হয় ওয়াদিল কুরা অভিযান। এ অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিলো শত্রুদের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া। কিন্তু ওয়াদির কুরার অধিবসীরা আকস্মিকভাবে মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করে ৯ জন সাহাবিকে হত্যা করে। শুধুমাত্র ৩ জন সাহাবি এ হত্যাকান্ড থেকে রক্ষা পান। এ তিনজনের অন্যতম ছিলেন যায়েদ।

১১. খারত অভিযান: এ অভিযানের সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি ছিলো ৮ম হিজরির রজব মাস। কিন্তু হিসাব করে দেখা যায় যে, এ অভিযান ছিলো হুদায়বিয়ার পূর্বের ঘটনা। জাবির (রা) এর বর্ণনা মতে,

এ অভিযানে নবী করীম (ﷺ) তিনশত অশ্বারোহীর এক বাহিনী প্রেরণ করেন। এ অভিযানের নেতৃত্ব অর্পণ করা হয় আবু ওবায়দা বিন জাররা (রা) এর ওপর। এ অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিলো একটি কুরাইশ কাফেলার গতিবিধি লক্ষ করা ও খোঁজ-খবর সংগ্রহ করা। কথিত আছে যে, উক্ত বাহিনী পরিচালনাকালে অভিযাত্রীরা চরম অনাহারে ও ক্ষুধার মধ্যে নিপতিত হন। খাদ্যসামগ্রীর সংস্থান করতে সক্ষম না হওয়ায় এক পর্যায়ে এ বাহিনীর সদস্যদেরকে ক্ষুধা নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে গাছের পাতা ভক্ষণ করতে হয়। এ কারণে এ অভিযানের নামকরণ হয়েছিলো খারত অভিযান (ঝরানো পাতাসমূহকে খারত বলা হয়)। অবশেষে এক ব্যক্তি তিনটি উট যবেহ করে, পরবর্তী পর্যায়ে পুনরায় তিনটি উট যবেহ করেন। কিন্তু আরও উট জবেহ করার ব্যাপারে আবু ওবায়দা তাঁকে বাধা প্রদান করেন।

এরপরেই সমুদ্রবক্ষ হতে 'আম্বর' নামক একটি বিশালাকার মাছ নিক্ষিপ্ত হয়। অভিযাত্রী দল অর্ধমাস যাবৎ এ মাছ ভক্ষণ এবং এর দেহ নিঃসৃত তেল ব্যবহার করতে থাকেন। এ মাছ ভক্ষণের ফলে তাদের ঝিমিয়ে পড়া মাংসপেশী ও স্নায়ুতন্ত্রগুলো পুনরায় সুস্থ ও সতেজ হয়ে ওঠে। আবু ওবায়দা উক্ত মাছের একটি কাটা নেন সৈন্যদলের মধ্যে সব চাইতে লম্বা ব্যক্তিটিকে সবচেয়ে উঁচু উটে আরোহণ করে সেই কাটার মধ্য দিয়ে যেতে বলেন এবং অনায়াসেই তিনি তা করেন। মৎস্যটির বিশালাকারত্ব প্রমাণের জন্যেই তিনি এ ব্যবস্থা করেন।

সেই মাছের প্রয়োজনাতিরিক্ত অংশবিশেষ সংরক্ষণ করে তা মদিনা গমনের সময় সঙ্গে নেয়া হয়। রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে সেই মাছ পেশ করা হলে তিনি বলেন, এ হচ্ছে তোমাদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক প্রকারের আহার্য। এর গোস্ত তোমাদের নিকট যদি আরও কিছু থাকে, তাহলে আমাদেরকেও খেতে দাও। কিছুটা গোস্ত আমরা তার খিদমতে পাঠাবার ব্যাবস্থা করি।

খারত অভিযানের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে। কারণ, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির পর মুসলমানরা কোনো কুরাইশ কাফেলার চলার পথে কোনো প্রকার অন্তরায় সৃষ্টি করেনি।

বনু মুসতালিক যুদ্ধ বা গাযওয়ায়ে মোরাইসি (৫ম অথবা ৬ষ্ঠ হিজরি)

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে এ যুদ্ধের উল্লেখযোগ্যতা বলতে তেমন কিছুই ছিলো না। কিন্তু ইসলামের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাসঙ্গিক ঘটনা প্রবাহের কারণে এ যুদ্ধ ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধের ফলে ইসলামি সমাজে দারুণ চাঞ্চল্য এবং বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়, মুনাফিকদের যবনিকা উত্তোলিত হয় এবং অন্যদিকে এমনই শাস্তিমূলক বিধান সম্বলিত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়, যা ইসলামি সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি ও মুসলমানদের আত্মশুদ্ধির বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। প্রথমে আমরা যুদ্ধের প্রসঙ্গ আলোচনা করব এবং পরে আনুষঙ্গিক ঘটনাবলি উপস্থাপন করব। যুদ্ধ বিবরণদাতার মতে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো ৫ম কিংবা ৬ষ্ঠ হিজরির শা'বান মাসে।

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, রাসূল অবগত হন যে, বনু মুসতালিকের এক সর্দার হারেস বিন আবু জারার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য স্বগোত্রীয় এবং অন্য আরবীয় লোকজনদের সঙ্গে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন রাসূল বোরায়দা বিন হোসাইব আসলামী (রা) কে তথ্যানুসন্ধান ও পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য প্রেরণ করেন। তিনি উক্ত গোত্রে গিয়ে হারেস বিন আবু জারার সঙ্গে সাক্ষাৎ কথোপকথন করেন। অতঃপর প্রত্যাবর্তন করে নবী করীম (ﷺ) কে অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন।

যখন নবী (ﷺ) সংবাদের সত্যতা সম্বদ্ধে সুনিশ্চিত হন, তখন তিনি যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য সাহাবায়ে কেরাম (রা) কে নির্দেশ দেন এবং অনতিবিলম্বে বাহিনী প্রেরিত হয়ে যায়। এ বাহিনী প্রেরণের দিনটি ছিলো ২ শাবান। উক্ত যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পক্ষে একটি মুনাফিক দলও যুদ্ধে গিয়েছিলো। মুসলিম বাহিনীর পক্ষ হয়ে মুনাফিকদের দল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। মদিনার তত্বাবধানের জন্য নবী করীম (ﷺ) যায়েদ বিন হারেসা (রা) এর ওপর, কেউ কেউ বলেন আবু যর (রা) এর ওপর, অন্য এক দল বলেন নামীলাহ বিন আবদুল্লাহ লায়সীর (রা) ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। হারেস বিন আবু জাররার মুসলিম বাহিনীর খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য একজন গোয়েন্দা প্রেরণ করেছিলো। কিন্তু মুসলমানরা তাকে বন্দী করার পর হত্যা করেন।

হারেস বিন আবু জারার এবং তার বন্ধু ও সহচরণগ যখন জানতে পারল, মুসলমানরা তাদের প্রেরিত গোয়েন্দাকে হত্যা করেছে এবং রাসূল তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেছেন, তখন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

যে সকল বেদুঈন তাদের সঙ্গে ছিলো, তারাও সকলে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল। রাসূল মুরাইসী নামক ঝর্ণা পর্যন্ত যখন অগ্রসর হলেন, তখন বনু মোসতালেক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।

রাসূল (ﷺ) যুদ্ধ প্রস্তুতি হিসেবে তাঁর সাহাবাদেরকে সারিবদ্ধ করে নিলেন। পুরো বাহিনীর পতাকা বহন করছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা) এবং আনসারদের বিশেষ পতাকাটি ছিলো সা'দ বিন উবাদাহ (রা) এর হাতে। কিছুক্ষণ উভয় দলের মধ্যে কিছু তীর বিনিময় হয়। এরপর রাসূল (ﷺ) এর মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষের উপর আক্রমণ পরিচালনা পূর্বক সহজে বিজয় অর্জন করেন। মুশরিকগণ পরাজিত হয় এবং কিছু মুশরিক নিহত হলো। মহিলা ও শিশুদের বন্দী করা হলো। ছাগল এবং অন্য চতুস্পদ জন্তুগুলো মুসলমানদের অধিকারে এলো। মুসলমানদের পক্ষে মাত্র একজন সাহাবি শাহাদত বরণ করেন। একজন আনসারী সাহাবি ভুলক্রমে তাঁকে শত্রুভেবে আঘাত করেছিলেন।

উক্ত যুদ্ধ সম্পর্কে চরিতকারদের বর্ণনা এ রকমই। কিন্তু আল্লামা ইবনে কাইয়্যুম লিখেছেন, উক্ত ধারণা ভ্রান্ত। কারণ, বনু মুসতালিকের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি; বরং মুসলিম বাহিনী ঝর্ণার ধারে বনু মুসতালিকের উপর আকিস্মক আক্রমণ পরিচালনা করে ও শিশুদের আটক করেন এবং সম্পদ ও চতুস্পদ জন্তুগুলোকে নিজেদের অধিকারে নেয়। তখনও বনু মুসতালিক অসতর্ক অবস্থায় ছিলো।

বন্দী শত্রুদের মধ্যে জুওয়াইরিয়া (রা) ছিলেন। তিনি ছিলেন মুসতালিক গোত্রের নেতা হারেস বিন আবু জারারের কন্যা। বন্টনের সময় তিনি সাবেত বিন কাইসের অংশে পড়েন। সাবেত তাঁকে মুকাতিব হিসেবে চুক্তিতে শর্তারোপ করেন। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) তাঁর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাকে বিয়ে করেন। উক্ত বিয়ের ফলশ্রুতিতে মুসলমানগণ বনু মুসতালিক গোত্রের একশত পরিবারের লোকজনদের মুক্ত করে দেন। এঁরা সকলেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এর পরে প্রচার হয়ে গেল, এঁরা সকলেই রাসূল এর শ্বশুর বংশের লোক।

এটি ছিলো বনু মুসতালিক যুদ্ধের বিবরণ। অবশিষ্ট থাকে আরও কিছু ঘটনাবলি যা সংঘটিত হয়েছিলো উক্ত যুদ্ধে। তবে যেহেতু সে সবের মূল হোতা ছিলো মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই এবং তার বন্ধুরা, সেহেতু প্রথমে ইসলামি সমাজের মধ্যে তাদের কার্যকলাপের কিছু কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ এবং পরে সে সবের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলে তা অর্থহীন কিংবা অপ্রয়োজনীর বলে বিবেচিত হবে না।

বনু মুসতালিক যুদ্ধের পূর্বে মুনাফিকদের রীতিনীতি

ইতোপূর্বে একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে, মদিনায় সাধারণভাবে মুসলমানদের এবং বিশেষ করে রাসূলের আগমনের ব্যাপারটি আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের যথেষ্ট মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কেননা, আউস এবং খাযরাজ এই দুই গোত্রের নেতৃত্বের পদে তাঁকে বরণ করে নেয়ার জন্য যখন মুকুট তৈরি হচ্ছিল, এমন এক ক্রান্তিলগ্নে মদিনায় ইসলামের আলো পৌঁছায় এতে জনগণের মনোযোগ আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের পরিবর্তে রাসূল (ﷺ) এর দিকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এ কারণে এ ধারণাটি তার মনে বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, রাসূল (ﷺ) ই তাকে তার এ মান-সম্মান থেকে বঞ্চিত করেছেন।

রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তার এ বিদ্বেষমূলক মনোভাব এবং মনোকষ্ট হিজরতের প্রথম অবস্থাতেই সূচিত হয় এবং বেশ কিছুকাল যাবৎ তা অব্যাহত থাকে। কারণ, তখনো সে ইসলাম গ্রহণ করেনি। তার ইসলাম গ্রহণের পূর্বেকার একটি ঘটনা থেকে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। সা'দ বিন উবাদার অসুস্থতার খবর পেয়ে তাঁকে দেখার জন্য একদা রাসূল গাধার পিঠে আরোহিত অবস্থায় পথ চলছিলেন সে সময় আবদুল্লাহ বিন উবাইসহ কতগুলো লোক পথের ধারে আলাপ আলোচনায় রত ছিলো। রাসূল (ﷺ) কে পথ চলতে দেখে সে তার নাকে কাপড় চাপা দিয়ে বলল, আমাদের ওপর ধূলোবালি উড়িও না। অতঃপর রাসূল যখন উপস্থিত লোকজনদের নিকট কুরআন থেকে তিলাওয়াত করলেন, তখন সে বলল, আপনি আপন ঘরে বসেই এসব করুন। এসবের মধ্যে আমাদের জড়াবেন না।

কিন্তু বদর যুদ্ধে মুসলমানদের অসামান্য সাফল্য প্রত্যক্ষ করার পর যখন ব্যাপারটি তার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করা খুবই বিপদজনক হবে, তখন সে ইসলাম গ্রহণ করল। কিন্তু এতদসত্বেও সে আল্লাহর রাসূল এবং মুসলমানদের শত্রুই রয়ে গেল। ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি ছিলো তার একটি বাহ্যিক প্রকাশ মাত্র। গোপনে গোপনে সে ইসলামি সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি এবং ইসলামের দাওয়াতী ব্যবস্থাকে দুর্বল করার জন্য অব্যাহতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। শুধু তাই নয়, ইসলামের শত্রুদের সঙ্গেও সে ঘনিষ্ট সহযোগিতা ও আতাত গড়ে তুলতে থাকে। এক্ষেত্রে বনু কায়নুকার ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বনু কায়নুকার ব্যাপারে সে অত্যন্ত বিবেকহীনতার পরিচয় দিয়েছিলো (ইতোপূর্বে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে)। একইভাবে সে উহুদের যুদ্ধেও শঠতা অঙ্গীকার ভঙ্গ, মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে অশান্তি, বিশৃংখলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলো। (এ বিষয়টিও পূর্বে আলোচিত হয়েছে।)

এ মুনাফিক (কপট) ব্যক্তিটি নানা ছল-চাতুরী প্রতারণা ও ধূর্ততার মাধ্যমে রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধাচরণ করতেই থাকত। প্রত্যেক জুমু'আর দিনে খুৎবা দানের উদ্দেশ্যে রাসূল যখন আগমন করতেন তখন সে অযাচিতভাবে দাঁড়িয়ে গিয়ে জনতাকে লক্ষ করে বলত, হে লোক সকল! তোমাদের মাঝে ইনি হচ্ছেন আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে মান-সম্মান এবং ইজ্জত দান করেছেন। অতএব, তোমরা তাঁর সঙ্গে সহযোগিতা করবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। তোমরা তাঁর হাতকে শক্তিশালী করবে এবং তাঁর কথা মেনে চলবে। এ সকল অযাচিত ও অর্থহীন কথাবার্তার পর সে বসে পড়ত। এর পর রাসূল (ﷺ) দাঁড়িয়ে খুৎবা দান করতেন।

এভাবে তার ঐদ্ধত্যপূর্ণ অন্যায়াচরণ এবং নির্লজ্জতা চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছল, ওহুদ যুদ্ধের পর যখন প্রথম জুমু'আর দিন উপস্থিত হলো। কেননা, উক্ত যুদ্ধের সময় অত্যন্ত শঠতা, কপটতা এবং প্রতারণামূক ভূমিকা পালনের পরেও খুৎবার পূর্বে সে দাঁড়িয়ে সে সব কথার পুনরাবৃত্তি করতে থাকল, যা ইতোপূর্বে সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছিলো। কিন্তু এবার উপস্থিত মুসলিম জনতা নির্বিবাদে তার এসব কথা মেনে নিতে পারল না। চতুর্দিক থেকে তারা তার কাপড় টেনে ধরে বলল, হে আল্লাহর শত্রু! বসে পড়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুমি যে ভূমিকা পালন করেছ, তারপর তুমি এর যোগ্য নও। বিক্ষুব্ধ লোকজনদের প্রতিবাদে সে বকবক করতে করতে মসজিদ পরিত্যাগ করল। মসজিদ ত্যাগকালে তার কণ্ঠ-নিঃসৃত এ প্রলাপ বাক্যগুলো সকলের শ্রুতিগোচর হলো, আমি যেন এখানে কোনো অপরাধী এসেছি। আমিতো তাঁরই সমর্থনে বলার জন্যই দাঁড়িয়েছিলাম।

ভাগ্যক্রমে দরজায় একজন আনসারীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, তোমার ধ্বংস হোক। ফিরে চল। রাসূল তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে দিবেন। সে বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমি চাই না যে, তিনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

এছাড়াও, ইবনে উবাই বনু নযীর গোত্রের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছিলো। অনুরূপভাবে খন্দকের যুদ্ধেও সে মুসলমানদের মধ্যে বিশৃংখলা, চাঞ্চল্য ও ভীতি সঞ্চারের জন্য নানা কূট কৌশল প্রয়োগ করেছিলো। আল্লাহ তা'আর সূরা আহযাবে নিম্ন বর্ণিত আয়াতসমূহে সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন-

১২. সে সময়ের কথা স্মরণ করো, যখন মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে রোগ ছিলো, তারা বলেছিলো: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

১৩. তাদের মধ্য থেকে এক দল বলেছিলো: হে ইয়াসরিববাসী! (মদিনাবাসী) এখানে তোমাদের টিকবার স্থান নেই, অতএব তোমরা ফিরে যাও আর তাদের মধ্য থেকে এক দল নবীর কাছে অব্যাহতি চেয়ে বলেছিলো: আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত। প্রকৃতপক্ষে তা অরক্ষিত ছিলো না। আসলে পলায়ন করাই তাদের উদ্দেশ্যে।

১৪. আর যদি শত্রুরা নগরীর চারদিক থেকে প্রবেশ করে বিদ্রোহের জন্য তাদেরকে প্ররোচিত করত, তবে তারা তৎক্ষণাৎ তাই করতো; এবং তারা সেথায় খুব অল্পই অবস্থান করত।

১৫. অথচ এরাই পূর্বে আল্লাহর সাথে শপথ করেছিলো যে, তারা পিছু হটে ফিরে যাবে না আর আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।

১৬. আপনি বলে দিন, তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর, তবে পলায়ন তোমাদের কোন উপকারে আসবে না এবং তখন তোমাদেরকে অল্পই ভোগ করতে দেয়া হবে।

১৭. বলুন; সে কে, যে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করতে পারে, যদি তিনি ইচ্ছা করেন তোমাদের কোন ক্ষতি করতে? অথবা সে কে, যে রোধ করতে পারে তাঁর অনুগ্রহকে। যদি তিনি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের জন্য কোনো বন্ধু ও কোন সাহায্যকারী পাবে না।

১৮. আল্লাহ খুব ভালো করে জানেন তোমাদের মধ্যে কারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, "আমাদের কাছে এসো" তারা খুব কমই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে,

১৯. (যুদ্ধে সহযোগিতা করতে) তোমাদের প্রতি কৃপণতা বশত আর যখন কোন ভয়ের কারণ সামনে আসে, তখন আপনি তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির নাম চোখ উল্টিয়ে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। অতঃপর যখন সে ভয়ে চলে যায়, তখন তারা ধন-সম্পদের লোভে তীব্র ভাষায় তোমাদের আক্রমণ করে। তারা ঈমান আনেনি। অবএব, আল্লাহ তাদের কার্যসমূহ ব্যর্থ করে দিয়েছেন। এরূপ করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।

২০. তারা ধারণা করে যে, এখনও সম্মিলিত শত্রুবাহিনী চলে যায়নি। আর যদি সে বাহিনী পুনরায় এসে পড়ে, তবে তারা কামনা করবে, কত ভালো হত যদি তারা মরুবাসীদের মধ্য থেকে তোমাদের সংবাদ জেনে নিত! তারা যদি তোমাদের সাথে থেকেও যেত, তবুও তারা খুব সামান্যই যুদ্ধ করতো (সূরা আল আহযাব: আয়াত ১২-২০)

উল্লিখিত আয়াতসমূহে অবস্থা বিশেষে মুনাফিকদের চিন্তা ও ভাবধারা, কার্যকলাপ, অহংকার ও আত্মম্ভরিতা এবং সুযোগ সন্ধান ও সুবিধাবাদিতা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র অংকন করা হয়েছে।

এতসব কিছু বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইহুদি মুনাফিক, মুশরিকগণ এক কথায় ইসলামের শত্রুরা এটা ভালোভাবেই ওয়াকেফহাল ছিলো যে, মুসলমানদের বিজয়ের কারণ প্রাকৃতিক প্রাধান্য অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী কিংবা বাহিনীর লোকজনদের সংখ্যাধিক্যে নয়; রবং এর প্রকৃত কারণ ছিলো আল্লাহর দাসত্বকরণ এবং একনিষ্ঠ চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন, যার দ্বারা পূর্ণ ইসলামি সমাজ সংগঠন সম্ভব হয়েছিলো এবং এর ফলে দ্বীন ইসলামের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি ব্যক্তি ছিলেন পরিতৃপ্ত ও নিবেদিত। তাঁরা নিজেদের ভাগ্যবানও মনে করতেন একমাত্র দ্বীনের কারণে। ইসলামের শত্রুরা এটাও ভালোভাবেই জানত যে, মুসলমানদের উদারতার মূল উৎস ছিলো, রাসূল (ﷺ) এর সত্ত্বা মুবারক যা মুসলমানদের চরিত্র, সম্পদ ও চরিত্র মাধুর্যের অলৌকিকত্বের চূড়ান্ত পর্যায় পৌছার ব্যাপারে ছিলেন সবচাইতে বড়ো আদর্শ।

অধিকন্তু, ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা চার পাঁচ বছর যাবৎ শত্রুতা, হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে সাধ্যমত সব কিছু করেও যখন তারা এটা উপলব্ধি করল যে, এ দ্বীন এবং এর অনুসারীদেরকে অস্ত্রের দ্বারা নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়, তখন তারা বিপন্ন পন্থা অবলম্বনের চিন্তা-ভাবনা করতে থাকল। তাদের এ বিকল্প কৌশল হিসেবে তারা মুসলমানদের শক্তি এবং শৌর্য-বীর্যের প্রধান উৎস-চরিত্র সম্পদের ওপর আঘাত হানার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। তাদের হীন চক্রান্তের প্রথম লক্ষস্থল নির্বাচন করল আল্লাহর নবীকে। কারণ, মুনাফিক মুসলমানদের শ্রেণিতে ছিলো পঞ্চম বাহিনী। মদিনায় বসবাস করার ফলে মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশার যথেষ্ট সুযোগ তাদের ছিলো। এ কারণে কুটকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে সহজভাবে প্রলুব্ধ করার সুযোগও তাদের ছিলো। তাদের এ জঘন্য উদ্দেশ্যে চরিতার্থ করার লক্ষ্যে তারা শুরু করল ব্যাপক অপপ্রচার। মুনাফিকরা তাদের এ প্রচারিভাযানের দায়িত্ব তারা নিজেরাই নিয়োছিলো আর এর নেতৃত্বের ভার স্বয়ং আবদুল্লাহ বিন উবাই বহন করছিলো।

যখন যায়দ ইবনু হারিসা (রা) যয়নবকে তালাক প্রদান করেন এবং নবী করীম (ﷺ) তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তখন মুনাফিকরা রাসূল (ﷺ) এর চরিত্র সম্পর্কে কটাক্ষ করা ও অপপ্রচারের একটি মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। কারণ তৎকালীন আরবের প্রচলিত প্রথায় পোষ্য পুত্রকে প্রকৃত সন্তানের মর্যদা ও স্থান দেয়া হতো এবং পোষ্য পুত্রের স্ত্রীকে প্রকৃত পুত্রের স্ত্রীর ন্যায় অবৈধ গণ্য করা হতো। এ কারণে, নবী করীম (ﷺ) যখন যয়নবকে বিবাহ করলেন তখন তারা নবী (ﷺ) এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে দিল।

এ বিয়েকে কেন্দ্র করে তারা নানা অলীক ও ভিত্তিহীন কাহিনী রচনা করে এবং জোর গুজব ছড়াতে থাকে। লোকে এমনটিও বলতে থাকে যে, মুহাম্মদ যয়নবকে দেখা মাত্র তাঁর সৌন্দর্যে এমনভাবে আকৃষ্ট হলো যে, সঙ্গে সঙ্গে উভয়ের মন দেয়া নেয়া হয়ে গেল। তাদের প্রশ্ন, যয়নব হচ্ছে ছেলের (পোষ্য পুত্রের) স্ত্রী। তৎকালীন আরবের প্রচলিত প্রথানুযায়ী এ বিয়ে ছিলো অবৈধ এবং কঠিন পাপের কাজ।

মুনাফিকরা এত জোরালোভাবে উক্ত ঘৃণ্য কল্পকাহিনী প্রচার করতে থাকল যে, এর জের হাদীস এবং তফসিরের কিতাবাদিতে এখন পর্যন্ত চলে আসে। ঐ সময় এ সমস্ত অপ-প্রচার দুর্বল চিত্ত অন্তরকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিলো যে, অবশেষে আল্লাহ এ প্রসঙ্গে সূরা আহযাবের আয়াত নাযিল করেন। যার মধ্যে সন্দেহ ব্যাধিতে আক্রান্ত অস্তরসমূহের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা ছিলো। প্রাসঙ্গিক আয়াতে কারীমা থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, উক্ত অপপ্রচারের ব্যাপকতা কতটা বিস্তৃতি লাভ করেছিলো।

আর তিনি তোমাদের পোষ্যদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা। আর আল্লাহই সত্য কথা বলেন। আর তিনিই সঠিক পথ দেখান। তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক; আল্লাহর কাছে এটাই অধিক ইনসাফপূর্ণ। অতঃপর যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তাহলে তারা তোমাদের দীনি ভাই এবং তোমাদের বন্ধু। (সূরা আহযাব: আয়াত ৪-৫)

এ আয়াতে কারীমা ছিলো মুনাফিকদের কার্যকলাপ ও কর্মকান্ডের প্রতি একটি সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত এবং তাদের চক্রান্তের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র। নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্বভাবজাত উদারতা এবং ধৈর্যের সঙ্গে মুনাফিকদের এ সকল অন্যায় আচরণ সহ্য করে আসছিলেন। সাধারণ মুসলামনগণও তাদের প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে নিজেদের রক্ষা করার ব্যাপারে ধৈর্য্যধারণ করে চলছিলেন। কারণ, তাঁদের নিকট বহুবার এটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিলো যে, মুনাফিকরা আল্লাহর তরফ থেকেই মাঝে মাঝে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে আসছে। যেমনটি আল্লাহ কুরআন মজীদে ইরশাদ করেছেন-

তারা কি দেখছে না যে, তাদেরকে প্রত্যেক বৎসর একবার দুবার বিপদে নিক্ষেপ করা হয়ে থাকে। এরপরও তারা না তওবা করছে, আর না উপদেশ গ্রহণ করছে। (আত তাওবা: আয়াত-১২৬)

গাযওয়ায়ে বনু মুসতালিকে মুনাফিকদের কার্যকলাপ

যখন বনু মুসতালিক যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুনাফিকরাও এতে অংশ গ্রহণ করে তখন তারা ঠিক সেটাই করেছিলো নিম্নোক্ত আয়াতে আল্লাহ যা বলেছেন-

যদি তারা তোমাদের সঙ্গে বের হতো তবে তোমাদের বিপদ (মানুসিক অশান্তি) আরো অধিক বাড়িয়ে দিত এবং তোমাদের মধ্যে ফেতনা সৃষ্টি করে বেড়াতো। (তাওবা: আয়াত-৪৭)

অতএব উক্ত যুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার দুটো সুযোগ তাদের হাতে আসে। তার ফলশ্রুতিতে তারা মুসলমানদের মধ্যে চাঞ্চল্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং রাসূল বিরুদ্ধে নিকৃষ্টতম অপ-প্রচার চালাতে থাকে। তাদের প্রাপ্ত সুযোগ দুটোর বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ-

মদিনা হতে নিকৃষ্ট লোকদের বহিষ্কার প্রসঙ্গ

বনু মুসতালিক গাযওয়ার পর রাসূল (ﷺ) তখনো মুরাইসী' ঝর্ণার নিকট অবস্থান করছিলেন, এমন সময় কিছু লোক পানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সেখানে আগমন করে। আগমনকারীদের মধ্যে ওমর (রা) এর একজন শ্রমিকও ছিলো। তাঁর নাম ছিলো জাহজাহ গেফারী। ঝর্ণার নিকট আরও একজন ছিলো, যার নাম ছিলো সেনাম বিন অবার জোহানী। কোনো কারণে এ দুজনের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হতে শেষ পর্যায়ে ধস্তাধস্তি ও মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে জোহানী চিৎকার শুরু করে দেয়, হে আনসারদের দল! (আনসারী লোকজন) সাহায্যের জন্য দ্রুত এগিয়ে আস। অপরপক্ষে জাহজাহ আহ্বান করতে থাকে, ওগো মুহাজির দল! (মুহাজিরগণ) আমাকে সাহায্য করার জন্য তোমরা শীঘ্রই এগিয়ে আস।

রাসূল এ সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাৎ তথায় গেলেন এবং বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে বর্তমান আছি, অথচ তোমরা অজ্ঞতার যুগের মতো আচরণ করছ। তোমরা এসব পরিহার করে চল, এসব হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত।

আবদুল্লাহ বিন উবাই উক্ত ঘটনা অবগত হয়ে ক্রোধে একদম ফেটে পড়ল এবং বলল, এর মধ্যেই এরা এ রকম কার্যকলাপ শুরু করেছে? আমাদের অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে তারা আমাদের সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করেছে এবং আমাদের সমকক্ষ হতে চাচ্ছে? আল্লাহর কসম! আমাদের ওপর সেই উদাহরণ প্রযোজ্য যেমনটি পূর্ব যুগের লোকেরা বলেছেন যে, নিজের কুকুরকে লালন পালন করে হৃষ্টপুষ্ট কর যেন সে তোমাকে ফাঁড়িয়া খেতে পারে। শোন, আল্লাহর কসম! যদি আমি ফিরে যেতে পারি তাহলে দেখবে যে, আমাদের সম্মানিত ব্যক্তিরাই নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছে।

অতঃপর উপস্থিত লোকজনদের লক্ষ করে সে বলল, 'এ বিপদ তোমরা নিজেরাই ক্রয় করেছ। তোমরা তাকে নিজ শহরে অবতরণ করিয়েছ এবং নিজ নিজ সম্পদ ভাগ করে দিয়েছ। দেখ। তোমাদের হাতে যা কিছু আছে তা দেয়া যদি বন্ধ করে দাও তবে সে তোমাদের শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে।'

ঐ সময় উক্ত বৈঠকে যায়েদ বিন আরকাম নামক এক যুবক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। তিনি মদিনায় ফিরে এসে তাঁর চাচাকে ঐ সমস্ত কথা বলে দেন। তাঁর চাচা তখন রাসূল কে সব কিছু অবহিত করেন। ঐ সময় সেখানে ওমর (রা) ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, 'রাসূল! আব্বাদ বিন বিশরকে নির্দেশ দিন, সেও তাকে হত্যা করুক।

রাসূল বললেন, 'ওমর! এটা কী করে সম্ভব? লোক বলবে যে, মুহাম্মদ (ﷺ) নিজের সঙ্গী সাথীদের হত্যা করছে। না, তা হতে পারে না। তবে তোমরা যাত্রার কথা ঘোষণা করে দাও।'

সময় ও অবস্থাটা তখন এমন যে, যে সময় রাসূল স্বস্থান পরিত্যাগ করতেন না। লোকজনেরা যাত্রা শুরু করেছে এমনি সময়ে ওসাইদ বিন হোয়াইল (রা) রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁকে সালাম জানানোর পর আরজ করলেন, 'আজ এমন অসময়ে যাত্রা আরম্ভ করা হলো?

নবী করীম (ﷺ) বললেন, তোমাদের সাথি (অর্থাৎ ইবনে উবাই) যা বলেছে, তার সংবাদ কি তুমি পাওনি? জিজ্ঞেস করলেন, সে কী বলেছে? নবী (ﷺ) বললেন, 'তার ধারণা হচ্ছে যে, সে যদি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে, তাহলে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ নিকৃষ্ট ব্যক্তিবর্গকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করে দেবে। তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাসূল। আপনি যদি চান, তাহলে তাকে মদিনা থেকে বের করে দিই। আল্লাহর শপথ! সে নিকৃষ্ট এবং আপনি পরম সম্মানিত।

অতঃপর সে বলল, হে আল্লার রাসূল! তার সঙ্গে সহনশীল ব্যবহার করুন। কারণ আল্লাহই ভালো জানেন। আপনি আমাদের মাঝে এমন সময়ে এসেছেন, যখন তার গোত্রীয় লোকেরা তাকে মুকুট পরানোর জন্য মনিমুক্তার মুকুট তৈরি করছিলো। এ কারণে এখন সে মনে করছে যে, আপনি তার নিকট থেকে তার রাজত্ব কেড়ে নিয়েছেন।

অতঃপর তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত পূর্ণ দিবস এবং সকাল পর্যন্ত পূর্ণ রাত্রি পথ চলতে থাকেন এবং এমনকি পরবর্তী দিবস পূর্বাহ্নে এ সময় পর্যন্ত ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন, যখন রৌদ্রের প্রখরতা বেশ কষ্টদায়ক অনুভূত হচ্ছিল। এরপর এক জায়গায় অবতরণ করে শিবির স্থাপন করা হয়।

রাসূল (ﷺ) এর সফর সঙ্গীগণ এতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, ভূমিতে দেহ রাখতে না রাখতেই সকলে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়লেন। এক-টানা দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যাপারে রাসূল উদ্দেশ্যে ছিলো, লোকজনেরা যেন আরামে বসে গল্প-গুজব করার সুযোগ না পায়।

এদিকে আবদুল্লাহ বিন উবাই যখন জানতে পারল যে, যায়েদ বিন আরকাম তার সমস্ত কথাবার্তা প্রকাশ করে দিয়েছে, তখন সে রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হলো বলল, আল্লাহর শপথ! যায়েদ আপনাকে যে সকল কথা বলেছে, আমি তা কখনই বলিনি এমনকি মুখেও আনিনি।

ঐ সময় আনসার গোত্রের যারা সেখানে উপস্তিত ছিলেন, তারাও বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখনও সে নাবালক ছেলেই আছে এবং হয়তো তারই ভুল হয়েছে। সে ব্যক্তি, যা বলেছিলো হয়তো সে ঠিক ঠিকভাবে তা স্মরণ রাখতে পারেনি।

এ কারণে রাসূল ইবনে উবাইর কথা সত্য বলে মেনে নিলেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যায়েদ (রা) বলেছেন, 'এরপর এ ব্যাপারে আমি এতই দুঃখিত হয়ে পড়েছিলাম যে, ইতোপূর্বে আর কখনই কোনো ব্যাপারে আমি এতটা দুঃখিত হইনি। সেই চিন্তাজনিত দুঃখে আমি বাড়িতেই বসে রইলাম।'

শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সূরা মুনাফিকুন নামে একটি সূরা অবতীর্ণ করলেন, যার মধ্যে উভয় প্রসঙ্গেরই উল্লেখ রয়েছে-

তারাই বলে, যারা আল্লাহর রাসূলের কাছে আছে তোমরা তাদের জন্য খরচ করো না, যতক্ষণ না তারা সরে যায়। আর আসমানসমূহ ও যমীনের ধন-ভান্ডার তো আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বুঝে না। তারা বলে, যদি আমরা মদীনায় ফিরে যাই তাহলে অবশ্যই সেখান থেকে প্রবল দুর্বলকে বহিষ্কার করবে। কিন্তু সকল মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও মুমিনদের। কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না। (আল-মুনাফিকূন: ৭-৮)

যায়েদ বলেছেন, এরপর রাসূল আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং সেই আয়াতগুলো পাঠ করে শোনালেন। অতঃপর বললেন, 'আল্লাহ তোমার কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।'

উল্লিখিত মুনাফিকের সন্তানের নামও ছিলো আবদুল্লাহ। সন্তান ছিলেন পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত, অত্যন্ত সৎ স্বভাবের মানুষ এবং উত্তম সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি পিতার নিকট থেকে পৃথক হয়ে গিয়ে উম্মুক্ত তরবারী হস্তে দণ্ডায়মান হলেন মদিনার দরজায়। যখন তার পিতা সেখানে গিয়ে পৌঁছল, তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনি এখান থেকে আর অগ্রসর হতে পারবেন না, যতক্ষণ রাসূল (ﷺ) অনুমতি না দিবেন। কারণ রাসূল (ﷺ) প্রিয়, পবিত্র ও সম্মানিত এবং আপনি নিকৃষ্ট। এরপর নবী করীম (ﷺ) যখন সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে মদিনায় প্রবেশের অনুমতি প্রদান করলেন তখন পুত্র পিতার পথ ছেড়ে দিলেন। আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের ঐ ছেলেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এ বলে আরজ করলেন, আপনি তাকে হত্যা করার ইচ্ছা পোষণ করলে আমাকে নির্দেশ প্রদান করুন। আল্লাহর কসম! আমি তার মস্তক দ্বিখন্ডিত করে আপনার খিদমতে হাজির করব।

মিথ্যা অপবাদের ঘটনা

উল্লেখিত যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো মিথ্যা অপবাদের ব্যাপারটি। উক্ত ঘটনার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে রাসূল (ﷺ) এর নিয়ম ছিলো সফরে যওয়ার প্রাক্কালে তিনি তাঁর পত্নীগণের মধ্যে লটারী করে নিতেন। লটারীতে যাঁর নাম উঠত, তাকে তিনি সফরে নিয়ে যেতেন। উক্ত অভিযানকালে লটারীতে আয়েশা (রা) এর নাম ওঠে। সেহেতু রাসূল তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সফরে যান। অভিযান শেষে মদিনা প্রত্যাবনের পথে এক জায়গায় শিবির স্থাপন করা হয়। শিবিরে থাকা অবস্থায় আয়েশা (রা) নিজ প্রয়োজনে শিরিবের বাহিরে গমন করেন। সফরের উদ্দেশ্যে যে স্বর্ণের হারটি তাঁর বোনের নিকট থেকে নিয়ে এসেছিলেন, এ সময় তা হারিয়ে যায়। হারানোর সময় হারের কথাটি তাঁর স্মরণেই ছিলো না। বাহির থেকে শিবিরে ফিরে আসার পর হারানো হারের কথাটি তাঁর স্মরণে আসা মাত্রই তার খোঁজে তিনি পুনরায় পূর্বস্থানে গমন করেন। এ সময়ের মধ্যেই যাঁদের ওপর নবী পত্নী (রা) এর হাওদা উস্ত্রী-পৃষ্ঠে উঠিয়ে দেয়ার দায়িত্ব অর্পিত ছিলো, তাঁরা হাওদা উঠিয়ে দিলেন। তাদের ধারণা ছিলো, উম্মুল মুমিনীন হাওদার মধ্যেই রয়েছেন। যেহেতু তাঁর শরীর খুব হালকা ছিলো, তাই হাওদা হালকা থাকার ব্যাপারটি তাদের মনে কোনো প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করেনি। তাছাড়া হাওদাটি দুজনে উঠালে হয়তো তাদের পক্ষে অনুমান করা সহজ হতো এবং সহজেই ভুল ধরা পড়ত। কিন্তু যেহেতু কয়েকজন মিলে মিশে ধরাধরি করে হাওদাটি উঠিয়ে ছিলেন, তাই ব্যাপারটি আঁচ করার ব্যাপারে তাঁরা তেমন ভ্রুক্ষেপই করেননি।

যাহোক, হারানো হারটি প্রাপ্তির পর আয়েশা আশ্রয়স্থলে ফিরে এসে দেখলেন যে, পুরো বাহিনী ইতোমধ্যে সে স্থান পরিত্যাগ করে এগিয়ে গিয়েছে। প্রান্তরটি ছিলো সম্পূর্ণ জনশূন্য। সেখানে না ছিলো কোনো আহ্বানকারী, না ছিলো কোনো উত্তরদাতা। তিনি এ ধারণায় সেখানে বসে পড়লেন যে, লোকেরা তাঁকে যখন দেখতে পাবে না, তখন তাঁর খোঁজ করতে করতে এখানেই এসে যাবেন। কিন্তু সর্বজ্ঞ ও সর্বত্র বিরাজিত প্রজ্ঞাময় প্রভু আল্লাহ স্বীয় কার্যে সদা তৎপর ও প্রতাবশালী। তিনি যেভাবে যা পরিচালনা করার ইচ্ছা করেন, সেভাবেই তা বাস্তবায়িত হয়। অতএব, আল্লাহ আয়েশার চক্ষুদ্বয়কে ঘুম পাড়িয়ে দিলে তিনি সেখানে ঘুমিয়ে পড়লেন। অতঃপর সফওয়ান বিন মোয়াত্তাল এর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি জাগ্রত হলেন। তিনি বলছিলেন, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন' রাসূল (ﷺ) এর স্ত্রী?

সফওয়ান (রা) সেনাদলের শেষ অংশে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তাঁর অভ্যাস ছিলো একটু বেশি ঘুমানো। আয়েশাকে এ অবস্থায় দেখামাত্রই তিনি চিনতে পারলেন। কারণ, পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে তিনি তাঁকে দেখেছিলেন। অতঃপর 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠরত অবস্থায় তিনি স্বীয় সওয়ারীকে নবী পত্নী (রা) এর নিকট বসিয়ে দিলেন। আয়েশা সওয়ারীর ওপর আরোহণ করলে, তিনি তার লাগাম ধরে টানতে টানতে হাঁটতে থাকলেন এবং সর্বদা মুখে উচ্চারণ করতে থাকলেন ইন্না লিল্লাহি ...।

সফওয়ান ইন্নালিল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বাক্য উচ্চারণ করেননি। সাফওয়ান (রা) আয়েশা (রা) কে সঙ্গে নিয়ে যখন সৈন্যদলে মিলিত হলেন, তখন সময় ছিলো ঠিক খরতপ্ত দুপুর। সৈন্যদল শিবির স্থাপনপূর্বক বিশ্রামরত ছিলেন। আয়েশাকে এ অবস্থায় আসতে দেখে লোকেরা নিজ নিজ প্রকৃতির নিরীখে ব্যাপারটি আলোচনা পর্যালোচনা করতে থাকলেন। সৎ প্রকৃতির লোকেরা এটাকে সহজভাবেই গ্রহণ করল। কিন্তু অসৎ প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির লোকেরা এটাকে ঘুরিয়ে পৌচিয়ে নানাভাবে চিন্তা করতে থাকল। বিশেষ করে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর দুশমন আবদুল্লাহ বিন উবাই এটিকে পেয়ে বসল তার অপ-প্রচারের একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে। সে তার অন্তরে কপটতা, হিংসা ও বিদ্বেষের যে অগ্নিশিখা ছিলো এ ঘটনা তা প্রজ্জ্বলিত করে তুলল। সে এ সামান্য ঘটনাটিকে তার কল্পিত নানা আকার ও রঞ্জিত করে ব্যাপকভাবে অপ-প্রচার শুরু করে দিল।

পুণ্যের তুলনায় পাপের প্রভাবে মানুষ যে সহজেই প্রভাবিত হয়ে পড়ে, এ সত্যটি আবারও অত্যন্ত সহজভাবেই প্রমাণিত হয়ে গেল। আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের এ অপ-প্রচারে অনেকেই প্রভাবিত হয়ে পড়ল এবং তারাও অপ-প্রচার শুরু করল। এমনিতর দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভারাক্রান্ত মানসিকতাসম্পনা বাহিনীসহ রাসূল মদিনা প্রত্যাবর্তন করলেন। মুনাফিকরা মদিনা প্রত্যবর্তনের পর আরও জোটবদ্ধ হয়ে অপ-প্রচার শুরু করে দিল।

এ অপবাদ ও অপ-প্রচারের মুখোমুখী হয়ে রাসূলে (ﷺ) ওহীর মাধমে এর সমাধানের আশায় নীরবতা অবলম্বন করলেন।

কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা সত্ত্বেও ওহী নাযিল না হওয়ায় আয়েশা (রা) হতে পৃথক থাকার ব্যাপারে তিনি তাঁর সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শের ব্যবস্থা করলেন। আলী (রা) আভাস ইঙ্গিতে তাঁকে পরামর্শ দিলেন তাঁর থেকে পৃথক হয়ে গিয়ে অন্য কোনো মহিলাকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু উসামা ও অন্যান্য সাহাবারা (রা) শত্রুদের কথায় কান না দিয়ে আয়েশা (রা) কে তাঁর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত রাখার পরামর্শ দিলেন।

এরপর আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কপটতাজনিত কষ্ট হতে অব্যাহতি লাভের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) মিম্বরে উঠে এক ভাষণের মাধ্যমে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। উক্ত প্রেক্ষিতে সা'দ ইবনে মো'আয তাকে হত্যা করার অভিমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু সা'দ ইবনে উবাদা (যিনি আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের খাযরা গোত্রের নেতা ছিলেন) গোত্রীয় প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে খুব শক্তভাবে এর বিরোধিতা করায় উভয়ের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যার ফলে উভয় গোত্রের লোকেরাই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। রাসূল অনেক চেষ্টা করে উভয় গোত্রের লোকজনদের উত্তেজনা প্রশমিত করেন এবং নিজেও নীরবতা অবলম্বন করেন।

এদিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আয়েশা (রা) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এক নাগাড়ে এক মাস যাবৎ অসুস্থতায় ভুগতে থাকেন। উক্ত অপবাদ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু তাঁর অসুস্থ অবস্থায় রাসূল (ﷺ) এর কাছ থেকে যে আদর যত্ন ও সেবা শুশ্রূষা পাওয়ার কথা, তা না পাওয়ায় তাঁর মনে কিছুটা অস্বস্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।

বেশ কিছু দিন যাবৎ রোগ ভোগের পর ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। সুস্থতা লাভের পর প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে এক রাত্রিতে তিনি উম্মে মেসতার সঙ্গে সন্নিকটস্থ মাঠে গমন করেন। হাঁটতে গিয়ে এক সময় উম্মে মেসতাহ্ তার চাদরের সঙ্গে জড়িয়ে পা পিছলে মাটিতে পড়ে যায়। এ অবস্থায় সে তাঁর ছেলেকে গালমন্দ দিতে থাকে। আয়েশা (রা) তাঁর ছেলেকে গালমন্দ দেয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলায় তিনি বলেন, আমার ছেলেও সেই অপবাদ সম্পর্কিত অপ-প্রচারে জড়িত আছে। আয়েশা (রা) সেই অপবাদ ও অপ-প্রচার সম্পর্কে জানতে চাইলে উম্মে মেসতাহ তাঁকে সকল কথা খুলে বলেন। এভাবে তিনি অপবাদের কথা জানতে পারেন। উক্ত খবরের সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর পিতামাতার নিকট যাওয়ার জন্য রাসূল (ﷺ) এর নিকট অনুমতি চাইলেন। রাসূল তাঁকে অনুমতি প্রদান করলে তিনি পিতামাতার নিকট গমন করলেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিতরূপে অবগত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। নিরবচ্ছিন্ন কান্নার মধ্যে তাঁর দুই রাতও একদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। ঐ সময়ের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য তাঁর অশ্রুর ধারা বন্ধ হয়নি কিংবা ঘুমও আসেনি। তাঁর এ রকম একটা উপলব্ধি হচ্ছিল যে, কান্নার চোটে তাঁর কলিজা এক্ষুণি ফেটে যাবে। ঐ অবস্থাতে রাসূল সেখানে তশরীফ আনয়ন করলেন এবং কলেমা শাহাদত সমন্বয়ে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ প্রদান করলেন। অতঃপর ইরশাদ করলেন, হে আয়েশা! তোমার সম্পর্কে কিছু জঘন্য কথাবার্তা আমার কানে এসেছে। যদি তুমি উক্ত কাজ থেকে পবিত্র থাক তাহলে আল্লাহর অনুগ্রহ করে এর সত্যতা প্রকাশ করে দেবেন। আর আল্লাহর না করুন, তোমার দ্বারা যদি কোনো পাপকার্য হয়ে থাকে তাহলে তুমি আল্লাহ দরবারে ক্ষমাপ্রার্থী হও এবং তওবা কর। কারণ, পাপকার্যের পর কোনো বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে খালেস অন্তরে আল্লাহর দরবারে তওবা করে তিনি তা কবুল করেন।

রাসূল (ﷺ) এর বক্তব্য শোনার পর আয়েশা (রা) এর অশ্রুধারা সম্পর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর চোখে তখন এক ফোঁটা পানিও যেন অবশিষ্ট ছিলো না। তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে বললেন, তাঁদেরকেই রাসূলের এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। কিন্তু জবাব দেয়ার মতো কোনো ভাষাই যেন তাঁরা খুঁজে পেলেন না। পিতামাতাকে অত্যন্ত অসহায় এবং নির্বাক দেখে আয়েশা (রা) নিজেই বললেন, আল্লাহর কসম! আপনারা যে কথা শুনেছেন, তা আপনাদের অন্তরকে প্রভাবিত করেছে এবং আপনারা তাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। এ কারণে, আমি যদি বলি যে, আমি সম্পূর্ণ পবিত্র আছি এবং আল্লাহ অবশ্যই অবগত আছেন যে আমি পবিত্র আছি, তবুও আপনারা আমার কথাকে সত্য বলে মেনে নেবেন না। এমতাবস্থায় আল্লাহর কসম! আমার ও আপনাদের জন্য ঐ উদাহরণটিই প্রযোজ্য হবে, যা ইউসুফ (রা) এর পিতা বলেছিলেন।

ধৈর্যধারণই উত্তম পথ এবং তোমরা যা বলছ, তার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করছি।' (সূরা ইউসূফ: আয়াত-১৮)

এরপর আয়েশা (রা) অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং ঐ সময়ই রাসূলের ওপর ওহী নাযিল আরম্ভ হয়ে গেল। অতঃপর যখন রাসূল (ﷺ) এর ওপর ওহী নাযিলের কঠিন অবস্থা অতিক্রান্ত হলো, তখন তিনি মৃদু মৃদু হাসছিলেন। এ সময় তিনি প্রথম যে কথাটি বলেছিলেন তা হচ্ছে, হে আয়েশা! আল্লাহ তোমাকে অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

এতে সন্তুষ্ট হয়ে তার আম্মা বললেন, (আয়েশা) উঠে দাঁড়াও এবং রাসূলের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো। আয়েশা (রা) স্বীয় সতীত্ব ও রাসূলের ভালোবাসার ওপর ভরসা করে গর্বের সঙ্গে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি তো তাঁর সামনে দাঁড়াবো না, শুধুমাত্র আল্লাহর প্রশংসা করব। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কিত যে আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়, তা ছিলো সূরা নূরের দশটি আয়াত।

নিশ্চয়ই যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। ..... (সূরা নূর: আয়াত ১১-২০)

এরপর মিথ্যা অপবাদের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের অপরাধের দায়ে মিসতাহ ইবনে আসাসা, হাসসান ইবনে সাবেত এবং হামনা বিনতে জাহাশকে আশি দোররা কার্যকর করা হলো।

তবে খবিস আবদুল্লাহ বিন উবাই উক্ত শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেল। অথচ অপবাদ রটানোর অগ্রগামী ভূমিকা ছিলো তারই। তাকে নবী শাস্তি না দেয়ার কারণ হয়তো এটাই ছিলো যে, আল্লাহ পরকালে তাকে শাস্তি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাকে এখন শাস্তি প্রদান করা হলে তার পরকালের শাস্তি হালকা হয়ে যাবে এ ধারণায় শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। কিন্তু অন্যান্য যাদের জন্য শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা করা হয় তাদের পরকালীন পাপ হালকা এবং পাপসমূহের কাফফারা হিসেবেই তা করা হয়।

এভাবে এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর সন্দেহ, আশঙ্কা, অশান্তি থেকে মদিনার পরিবেশ পরিষ্কার হয়ে উঠল। এর ফলশ্রুতিতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এতই অপমানিত ও লাঞ্ছিত হলো যে, সে আর দ্বিতীয়বার মস্তক উত্তোলন করতে সক্ষম হলো না। ইবনে ইসহাক বলেছেন, এরপর যখনই সে কোনো গন্ডগোল পাকাতে উদ্যত হতো, তখনই তার দলের লোকজনেরা তাকে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করতে থাকত এবং বলপ্রয়োগ করে বসিয়ে দিত। উক্ত অবস্থা প্রত্যক্ষ করে রাসূল ওমর (রা) কে বললেন, হে ওমর! এ ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? দেখ আল্লাহর শথপ! যেদিন তুমি আমার নিকট অনুমতি চেয়েছিলে, সে দিন যদি আমি অনুমতি দিতাম আর যদি তুমি তাকে হত্যা করতে তাহলে এজন্য অনেকেই বিরূপ মনোভাব পোষণ করত। কিন্তু আজকে যদি সেই সব লোকদের আদেশ দেয়া হয় তাহলে তারাই তাকে হত্যা করবে।

ওমর (রা) বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমি ভালোভাবেই হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছি, রাসূল- এ ব্যাপার আমার তুলনায় অনেক বেশি বরকতপূর্ণ।

গাযওয়ায়ে মুরাইসীর পরবর্তী সামরিক অভিযানসমূহ

১. দিয়ারে বনু কালব অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির শা'বান মাসে আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) এর নেতৃত্বে এ অভিযান প্রেরিত হয়। রাসূলে দলনেতাকে সামনে বসিয়ে স্বীয় হাত দ্বারা তার পাগড়ি বেঁধে দিয়ে অভিযানে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্য পরামর্শ দান করেন। তিনি এ বলে তাঁকে উপদেশ প্রদান করেন যে, যদি তারা তোমাদের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়, তাহলে তুমি তাদের সম্রাটের মেয়েকে বিয়ে করে নেবে। আব্দুর রহমান বিন আওফ গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পর একাদিক্রমে তিন দিন যাবৎ ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। ঐশী কিতাব আল কুরআন, ইসলামি জীবনধারার অলৌকিক বৈশিষ্ট্যাদি এবং মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর আব্দুর রহমান বিন আওফ তামাজির বিনতে আসবাগকে বিয়ে করেন। তিনিই ছিলেন আব্দুল রহমানের পুত্র আবু সালমার মাতা। উক্ত মহিলার পিতা স্বজাতির নেতা এবং বাদশাহ ছিলেন।

২. ফাদাক অঞ্চলে দিয়ারে বনু সা'দ অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির শা'বান মাসে আলী (রা) এর নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানের কারণ ছিলো এই যে, রাসূল বিশেষ সূত্রে অবগত হয়েছিলেন যে, বনু সাদের একটি দল ইহুদিদের সাহায্য করার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। এর প্রতিকারার্থে রাসূল আলীর নেতৃত্বে দুই শত মুজাহিদের এক বাহিনী প্রেরণ করেন। তাঁরা রাত্রিতে ভ্রমণ করতেন এবং দিবাভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। অবশেষে শত্রুপক্ষের একজন গোয়েন্দা তাঁদের হাতে ধরা পড়ে। সে স্বীকার করল যে, খায়বারের খেজুরের বিনিময়ে তারা সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে এ সংবাদও সংগৃহীত হলো যে, বনু সা'দ গোত্রের লোকরা কোন জায়গায় অবস্থান করছে। প্রাপ্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে মুসলিম বাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে পাঁচশত উট ও দুই হাজার ছাগল হস্তগত করেন। তবে শিশু ও মহিলাসহ সাদের গোত্রের লোকেরা পালিয়ে তাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাদের নেতা ছিলো অবার বিন উলাইম।

৩. ওয়াদিল কুরা অভিযান: এ অভিযান প্রেরণ করা হয় ৬ষ্ঠ হিজরির রমযান মাসে আবু বকর সিদ্দীক (রা) কিংবা যায়েদ বিন হারেসা (রা) এর নেতৃত্বে। রাসূল তাকে হত্যার জন্য বনু ফায়ারার একটি শাখা শঠতা ও চক্রান্তমুলক এক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাদের এ জঘন্য ষড়যন্ত্রের কথা অবগত হয়ে রাসূল এক মুজাহিদ বাহিনীসহ আবু বকর সিদ্দীক (রা) কে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন।

সালমান বিন আকওয়ার বিবরণ সূত্রে জানা যায় তিনি বলেছেন, উক্ত অভিযানে আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। ফজরের নামায আদায় করার পর তাঁর নির্দেশক্রমে আমরা শত্রুপক্ষের ওপর আকস্মিকভাবে আক্রমন পরিচালনা করে ঝর্ণার ওপর আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলাম।

অধিকার প্রতিষ্ঠার পর শত্রুপক্ষের কিছু লোককে হত্যা করা হলো। এদের অন্য একটি দলের প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। এদের সঙ্গে মহিলা এবং শিশুও ছিলো। আমার ভয় হচ্ছিল যে, লোকজন আসার পূর্বে এরা পর্বতের ওপর পৌঁছে না যায়। এজন্য দ্রুতবেগে অগ্রসর হয়ে তাদের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছলাম এবং তাদের ও দলের মধ্যে ছিলো উম্মে কুরফা নাম্নী এক মহিলা, যিনি পুরাতন চামড়া তৈরি পোশাক পরিহিতা ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলো তার এক কন্যা। এ কন্যাটি আরবের সুন্দরী মহিলাদের দলভক্ত ছিলো। আমি তাদের আবু বকর এর নিকট নিয়ে এলাম। অতঃপর উক্ত কন্যাটিকে আমার নিকট সমর্পণ করা হলো। কিন্তু সে যে পোশাকে ছিলো সে পোশাকেই রইল। এরমধ্যে তার পোশাক পরিবর্তন করা হয়নি।

পরে রাসূলে এ মহিলাকে সালমা বিন আকওয়ার নিকট থেকে চেয়ে মক্কায় প্রেরণ করেন এবং বিনিময়ে কিছু মুসলিম বন্দীকে মুক্ত করিয়ে নেন।

উম্মে কুরফা ছিলো একজন দুষ্ট প্রকৃতির মহিলা। নবী করীম (ﷺ) কে হত্যার জন্য সে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো এবং এতদুদ্দেশ্যে স্বীয় পরিবার থেকে ত্রিশটি সওয়ারীর ব্যবস্থা করেছিলো। তার এ ষড়যন্ত্রের ও দুষ্কর্মের প্রতিফলস্বরূপ ত্রিশজন সওয়ারীকেই হত্যা করা হয়েছিলো।

৪. উরায়ানিয়ীন অভিযান: ৬ষ্ঠ হিজরির শাওয়াল সামে: কুরয বিন জাবির ফহরী (রা) নেতৃত্বে অত্র অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানের পটভূমি হচ্ছে এই, উকাল এবং উরায়ানিয়ার কতগুলো লোক মদিনায় আগমন করে ইসলাম গ্রহণ করে সেখানে বসবাস করতে থাকে। কিন্তু মদিনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল না হওয়ার রাসূল - কতগুলো উটসহ তাদের চারণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেন এবং স্বাস্থোদ্ধারের উদ্দেশ্যে উটের দুধ ও পেশাব পান করার পরামর্শ দেন। অতঃপর লোকগুলো যখন সুস্থ হয়ে উঠল তখন একদিন তারা রাখালকে হত্যা করে উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করল। এভাবে ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় তারা কুফরী অবলম্বন করল। উল্লিখিত কারণে রাসূল (ﷺ) তাদের খোঁজ করার জন্য কুরয বিন যাবের পাহড়ীকে বিশজন সাহাবাসহ প্রেরণ করেন। এ বাহিনী প্রেরণের সময় নবী করীম (ﷺ) দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! উরায়ানিয়ীনদের অন্ধকার করে দাও এবং কঙ্কন চাইতেও বেশি খাটো করে দাও। প্রিয় নবীর প্রার্থনা মঞ্জুরপূর্বক আল্লাহ তাদের পথ অন্ধকার করে দেন। এর ফলশ্রুতিতে তারা অভিযাত্রী দলের হাতে ধরা পড়ে যায়। মুসলমান রাখালদের সঙ্গে তারা যে প্রতারণা করেছিলো তার প্রতিফল ও প্রতিশোধস্বরূপ তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হলো, চোখে দাগ দেয়া হলো এবং হাররাহ নামক স্থানের এক প্রান্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হলো। সেখানে তারা মাটি অনুসন্ধান করতে করতে স্বীয় মন্দ কার্যের শাস্তি পর্যন্ত পৌছে গেল। তাদের এ ঘটনা সহিহ বুখারী এবং অন্যান্য কিতাবে আনাস (রা) হতে বর্ণিত আছে।

চরিতকারগণ এরপর আরও একটি অভিযানের কথা উল্লেখ করেছেন। এ অভিযান প্রেরিত হয়েছিলো ৬ষ্ঠ হিজরির শাওয়াল মাসে আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) এবং সালমা বিন আবি সালাম (রা) এ, দুইজনের সমন্বয়ে। এ অভিযান সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যায় তাতে বলা হয়েছে যে, আবু সুফিয়ানকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমর ইবনে উমাইয়া মক্কায় গমন করেছিলেন। এর কারণ হচ্ছে যে, রাসূল কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ান একজন বেদুঈনকে মদিনায় পাঠিয়েছিলো। তবে এ উভয় পক্ষের কেউই অভীষ্ট লক্ষ অর্জনে সক্ষম হয়নি।

এগুলোই হচ্ছে ঐ সকল অভিযান যা বনু কুরাইযা যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিলো। ঐ সকল অভিযানে বড়ো আকারের তেমন কোনো ঘটনা সংঘটিত হয়নি, এ সবের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সাধারণ ছোটখাটো ঘটনা সংঘটিত হয়েছিলো। এসব অভিযানের উদ্দেশ্যে ছিলো মূর্খ বেদুঈন এবং শত্রুদের অন্তরে ভয় ভীতির সঞ্চার করা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আহযাব যুদ্ধের পর অবস্থা ক্রমেই মুসলমানদের অনুকূলে আসতে থাকে। এর ফলে শত্রুদের মনোবল ও উদ্যম ভেঙ্গে পড়তে থাকে। ইসলামি দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দেয়া কিংবা এর মর্যাদাকে ভুলণ্ঠিত করে দেয়ার যে দুঃস্বপ্ন তারা দেখত, তার ছিটে ফোঁটাও তাদের মনে অবশিষ্ট রইল না। পরিস্থিতি যে ক্রমেই মুসলমানদের অনুকূলে যাচ্ছিল, তা অধিকতর সুস্পষ্ট হয়ে উঠল হুদায়বিয়ার চুক্তির মাধ্যমে। এ চুক্তির সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো আরব মুশরিকগণ কর্তৃক ইসলামি শক্তিকে স্বীকৃতি প্রদান এবং একটি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের ব্যাপারে আরব মুশরিক কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার অবসান।

হুদায়বিয়ার সন্ধি (৬ষ্ঠ হিজরির যিলকা'দ মাস)

হুদায়বিয়ার উমরার কারণ: আরব উপদ্বীপের অবস্থা যখন বহুলাংশে মুসলমানদের অনুকূলে এসে গেল, তখন ইসলামি দাওয়াতের কার্যকারিতার ও বৃহত্তম বিজয়ের বিভিন্ন নিদর্শন ধীরে ধীরে প্রকাশ লাভ করতে থাকল। মুশরিকরা ছয় বছর যাবৎ মসজিদুল হারামের দরজা মুসলমানদের জন্য বন্ধ রেখেছিলো। কিন্তু এ সন্ধির পর মসজিদুল হারামে মুসলমানদের ইবাদত-বন্দেগীর ইতিবাচক দাবির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল।

মদিনায় রাসূলকে স্বপ্নযোগে দেখানো হলো, তিনি এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম মসজিদুল হারামে প্রবেশ করেছেন। তিনি কা'বা গৃহের চাবি গ্রহণ পূর্বক সাহাবায়ে কেরামসহ আল্লাহর ঘর তাওয়াফ এবং উমরা পালন করেছেন। অতঃপর কিছু সংখ্যক লোক মাথা মুন্ডন করেছেন এবং কিছুসংখ্যক লোক চুল কর্তন করাকেই যথেষ্ট মনে করছেন। রাসূল সাহাবায়ে কেরামকে উক্ত স্বপ্ন সম্পর্কে অবহিত করলে তাঁরা বড়োই আনন্দিত হন। এর ফলে তাঁরা এটাও ধারণা করতে থাকেন যে, আল্লাহর রহমতে শীঘ্রই তাঁরা মক্কায় প্রবেশাধিকার লাভ করবেন। রাসূল সাহাবাদেরকে একথাও বললেন যে, তিনি উমরাহ পালনের মনস্থ করেছেন। উক্ত অবস্থার প্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কেরাম সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকলেন।

মুসলমানদের মধ্যে মক্কা গমনের ঘোষণা

তাঁর সঙ্গে মক্কা গমনের জন্য রাসূল মদিনা এবং পার্শ্ববর্তী জনবহুল বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোষণা দিলেন। কিন্তু অধিকাংশ আরবী যাত্রী শুরু করার ব্যাপারে কিছুটা বিলম্ব করে ফেললেন। এদিকে রাসূলে করীম স্বীয় পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার করে নিলেন। অতঃপর মদিনায় ইবনে উম্মে মাকতুম কিংবা নামীলা লাইসীকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করলেন এবং কাসওয়া নামক নিজ উষ্ট্রীর ওপর আরোহণ করে ৬ষ্ঠ হিজরির ১ম যিলকাদ মক্কাভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা)। সঙ্গে নিলেন চৌদ্দশত (মতান্তরে পনের শত) সাহাবা কেরাম। সফররত অবস্থায় তারা অস্ত্র গ্রহণের নিয়মে কোষাবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া পৃথক কোনো খোলা অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নেননি।

মক্কা অভিমুখে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা

রাসূল এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) মক্কা অভিমুখে ছিলেন। যখন তাঁরা যুল হুলায়ফায় গিয়ে পৌঁছলেন তখন কুরবানীর পশুকে হার পরিয়ে দিলেন।

উটের পিঠের উঁচু জায়গা কেটে চিহ্নিত করলেন এবং ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধলেন। এর প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে, লোকজন যেন নিশ্চিন্ত থাকে যে, তারা যুদ্ধ করবেন না। কুরাইশদের খবরাখবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে খোযায়া সম্প্রদায়ের এক গোয়েন্দাকে প্রেরণ করা হলো অগ্রভাগে। রাসূল দলবলসহ উসফান নামক স্থানে যখন পৌঁছলেন, তখন উক্ত গোয়েন্দা ফিরে এসে তাঁকে অবহিত করলেন যে, মুসলমানদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করার জন্য কা'ব বিন লুওয়াই সাহায্যকারী আহাবীশ (মিত্র) গ্রোত্রকে সংঘবদ্ধ করছে এবং আরও সৈন্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। সে আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করা এবং আল্লাহর ঘর থেকে আপনাকে বিরত রাখার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রয়েছে।

উক্ত সংবাদ অবগত হওয়ার পর রাসূল তাঁর সাহাবায়ে কেরামদের সঙ্গে এক পরামর্শ বৈঠকে মিলিত হলেন এবং ইরশাদ করলেন আপনাদের অভিমত কি এই যে, যে সকল লোক আমাদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আমরা তাদের পরিবাবর্গের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সেসব দখল করে নিই। এরপর যদি তারা চুপচাপ বসে পড়ে, তাহলে সেটা হবে মঙ্গলজনক। এতে আমরা ধারণা করব যে, যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি, চিন্তাভাবনা এবং দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেই তারা বসে পড়েছে। আর যদি তারা পলায়ন করে তাতেও তাদের এমন এক অবস্থার মধ্যে দেখবে যে, আল্লাহ তাদের এক গর্দান কেটে দিয়েছেন। অথবা আপনারা এ অভিমত পোষণ করছেন যে, আমরা কা'বা গৃহ অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকি। আমাদের যাত্রাপথে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আমরা তার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হব।

রাসূল এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে আবু বকর সিদ্দীক (রা) আরয করলেন যে, "কি করতে হবে তা আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই ভালো জানেন, তবে আমরা এসেছি ওমরাহ পালন করতে যুদ্ধ করতে নয়। অবশ্য কেউ যদি আমাদের এবং আল্লাহর ঘরের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হব।" রাসূল বলেছেন, ভালো কথা, চল। তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাক। কাজেই সকলে যাত্রা শুরু করলেন।

আল্লাহর ঘর হতে মুসলমানদের বিরত রাখার প্রচেষ্টা

এদিকে কুরাইশরা যখন মুসলমানদের আগমন সম্পর্কে অবহিত হলো, তখন তারা একটি পরামর্শ বৈঠকে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল, যে কোনো প্রকারেই হোক আল্লাহর ঘর হতে মুসলমানদের নিবৃত্ত করতেই হবে। এমননিভাবে অধ্যূষিত জনপদের পার্শ্ববর্তী পথ দিয়ে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলেন। এ সময় বন্ধু কবের এক লোক এসে রাসূল কে অবহিত করল যে, কুরাইশগণ যী'তাওয়া নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছে এবং খালিদ বিন ওলীদ দুই শত অশ্বারোহী সৈন্য দল নিয়ে কুরাউল গামীমে প্রস্তুত রয়েছে। (কুরাউল গামীম মক্কা যাওয়ার পথে মধ্যস্থলে এবং যাতায়াতের মহাসড়কের ওপর অবস্থিত)

খালিদ মুসলমানদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করল, খালিদ এমন এক স্থানে অশ্বারোহীদের মোতায়েন করল, যেখান থেকে উভয় দলই পরস্পর পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছিল। যোহর নামাযের সময় খালিদ প্রত্যক্ষ করল যে, মুসলমানগণ নামাযের মধ্যে রুকু-সেজদা করছে। এতে তার ধারণা হলো যে, নামাযের মধ্যে যখন তারা বহির্জগত সম্পর্কে গাফেল অবস্থায় থাকে, তখন আক্রমণ চালালে সহজেই তাদের পরাজিত করা সম্ভব হতে পারে। তার উক্ত ধারণার প্রেক্ষিতে সে স্থির করল যে, আসর নামাযের সময় তার বাহিনী নিয়ে সে আকস্মিকভাবে তাদের ওপর আক্রমণ চালাবে। কিন্তু আল্লাহ ঠিক সেই সময়েই সালাতে খাত্তাফের বিধান নাযিল করলেন। ফলে খালিদের আক্রমনের সুযোগ লাভ সম্ভব হলো না।

রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানোর প্রচেষ্টায় পথ পরিবর্তন

রাসূল কুরাউল গামীমের প্রধান পথ পরিহার করে আঁকা বাঁকা অন্য এক পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকলেন। এ পথটি ছিলো একটি পাহাড়ী পথ। প্রধান সড়কটি বাম পাশে রেখে ডান দিকে ঘুরে হিমসের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে তিনি এমন পথ ধরলেন, যে পথ সানিয়াতুল মারারের ওপর দিয়ে চলে গেছে। সানিয়াতুল মারার হতে হুদায়বিয়াতে নেমেছে। হুদায়বিয়া মক্কার নিম্ন অঞ্চলে অবস্থিত। পরিবর্তিত পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার সুবিধার হলো এই যে, কুরাউল গামীমের সেই প্রধান সড়ক, যা তানইম হতে হারাম শরীফ গিয়েছে এবং যেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদের সৈন্যবাহিনী মোতায়েন ছিলো তাকে বাম দিকে রেখে এগিয়ে যাওয়ার ফলে সংঘর্ষের ঝুঁকিটা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলো। মুসলমানদের পথ চলার ফলে বাতাসে যে ধূলোবালির আভাস প্রকাশ পাচ্ছিল তা প্রত্যক্ষ করে খালিদ অনুধাবন করতে সক্ষম হলো, তারা পথ পরিবর্তন করেছে। তখন সে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে কুরাইশদেরকে অবহিত করার জন্য তার ঘোড়াকে যতটুকু সম্ভব উত্তেজিত করল এবং অত্যন্ত ক্ষিপ্ত গতিতে মক্কা অভিমুখে ছুটে চলল৷

এদিকে রাসূল যথারীতি সফর অব্যাহত রাখলেন এবং যখন সানিয়াতুল মারারে এসে পৌঁছলেন তখন উট বসে পড়ল। লোকজনেরা বললেন, বসলে কেন? চল। কিন্তু সে বসেই রইল। লোকেরা বললেন, কাসওয়া বেঁকে বসেছে।

রাসূল বললেন, "কাসওয়া থামেনি এবং এটা তার স্বভাব কিংবা অভ্যাসও নয়। কিন্তু একে সেই সত্তাই বিরত রেখেছেন, যে সত্তা হাতীকে বাধা দিয়ে রেখেছিলেন।"

অতঃপর রাসূল ইরশাদ করেন ঐ সত্তার কসম যাঁর হাতে রয়েছে আমার প্রাণ, এমন কোনো বিষয়ের দাবি করবে না, যার মধ্যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বস্তুর সম্মান প্রদর্শিত হয় এবং আমি অবশ্যই তা স্বীকার করে নিব।

এরপর রাসূল তার উষ্ট্রীকে ধমক দিলেন। তখন সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রাসূলে করীম পথের সামান্য পরিবর্তন করে অগ্রসর হলেন এবং হুদায়বিয়ার শেষ প্রান্তে একটি ঝর্ণার কাছে অবতরণ করলেন। সেখানে সামান্য পরিমাণ পানি ছিলো এবং লোকেরা অল্প অল্প করে তা নিচ্ছিলেন। কাজেই, কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি শেষ হয়ে গেল।

পিপাসার্ত লোকজন যখন রাসূলে করীম (ﷺ) এর খেদমতে পানির জন্য নিবেদন করলেন তখন তিনি তুনীয় থেকে একটি তীর বের করে নিয়ে তা তাদের হাতে দিলেন এবং সেটিকে ঝর্ণায় নিক্ষেপ করার পরামর্শ দান করলে সঙ্গে সঙ্গে ঝর্ণার পানি ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঝর্ণায় এত বেশি পরিমাণে পানি প্রবাহিত হলো যে সকলেই পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করে প্রত্যাবর্তন করেছেন।

বুদাইল বিন ওয়ারাকার মধ্যস্থতা

রাসূল যখন একটু স্বস্তিবোধ করলেন, তখন বুদাইল বিন ওয়ারাকা (রা) খোযায়ী গোত্রের কয়েকজন লোকসহ তাঁর খেদমতে উপস্থিত হলেন। তোহামার অধিবাসীগণের মধ্যে এই গোত্রই (খোয়ায়া) রাসূল (ﷺ) এর মঙ্গলকামী ছিলো। বুদাইল বলল, 'আমি কা'ব বিন লুওয়াইকে দেখে আসছি যে, সে হুদায়বিয়া পর্যাপ্ত পানির আশ্রয়ের ওপর শিবির স্থাপন করেছে। তাদের সঙ্গে শিশু এবং মহিলাও রয়েছে। আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করা এবং আল্লাহর ঘর হতে আপনাদের নিবৃত্ত রাখার ব্যাপারে তারা বদ্ধ পরিকর।

রাসূল বললেন, কারো সঙ্গে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে আসিনি। অতীতের যুদ্ধসমূহ কুরাইশগণকে সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্তু ও তছনছ করে ফেলেছে। এতে তাদের ক্ষতিও হয়েছে অনেক তাই যদি তারা চায়, তাহলে আমি তাদের সঙ্গে একটি সময় নির্ধারণ করব, সে সময় তারা আমার ও বিপক্ষীয় লোকজনের পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। এতে বড়ো আকারের ক্ষয়-ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। অন্যাথায় যদি তারা যুদ্ধ চায় তাহলে ঔদ্ধত্যজনিত কৃতকার্যের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।

আর যুদ্ধই যদি তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে থাকে, তবে সে সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন, আমি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ঐ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শরীরে আত্মা থাকে কিংবা যতক্ষণ আল্লাহ স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফয়সালা করে না দেন।

বুদাইল বলল, আপনি যা বললেন, আমি তা কুরাইশদের অবহিত করব। অতঃপর সে কুরাইশদের নিকট গিয়ে বলল, 'আমি মদিনায় মুহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছি। আমি তাঁর নিকট একটা কথা শুনেছি যদি তোমরা চাও তাহলে আমি তোমাদের নিকট তা উপস্থাপন করব। এ কথা শুনে নির্বোধ, স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা বলল, আমাদের এমন কোনো প্রয়োজন নেই যে, তুমি তাঁর কোনো কথা আমাদের নিকট বর্ণনা কর। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন ছিলো তারা বলল, তুমি তাঁর কাছ থেকে কী শুনেছ তা আমাদের শোনাও।

বুদাইলের নিকট রাসূল যে সকল কথা বলেছিলেন, সে তাদের নিকট তা বর্ণনা করল। উক্ত প্রেক্ষিতে কুরাইশরা মুকরেয বিন হাফসকে তাঁর নিকট প্রেরণ করল। তাকে দেখে রাসূল বললেন, এ ব্যক্তি অঙ্গীকার ভঙ্গকারী।

কিন্তু যখন সে রাসূল (ﷺ) এর নিকট অগ্রসর হয়ে আলাপ-আলোচনা করল, তখন তিনি তাকে সে সব কথাই বললেন, যা বুদাইল এবং তাঁর সঙ্গী-সাথিদের নিকট বলেছিলেন। অতঃপর সে মক্কা প্রত্যাবর্তন করে কুরাইশদেরকে তার আলাপ-আলোচনার বিষয়াদি অবহিত করল।

কুরাইশদের দূত

আলাপ-আলোচনার বিষয়াদি অবহিত হয়ে বনু কেনানা হালিস বিন আলকামা বলল, 'আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও।" লোকজনেরা বলল, বেশ তবে যাও।"

যখন সে রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন নবী (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ করে বললেন, এই ব্যক্তি এমন এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, যারা হাদীর পশুকে অনেক সম্মান করে। অতএব পশুগুলোকে দাঁড় করিয়ে দাও।

সাহাবা (রা) পশুগুলোকে দাঁড় করিয়ে দিলেন এবং নিজেরাও লাব্বায়েক বলে তাকে খোশ আমদেদ জানালেন। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে সেই ব্যক্তি আনন্দে বিভোর হয়ে বলে উঠল, সুবাহানাল্লাহ! এ সকল লোককে আল্লাহর ঘর হতে বিরত রাখা কোনো মতেই সমীচীন হবে না। বলেই সে তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল।

ফিরে গিয়ে সে কুরাইশদেরকে বলল, আমি হাদীর পশু দেখে এলাম, যাদের গলায় হার দেয়া আছে এবং পৃষ্ঠদেশ চিরে দেয়া হয়েছে। এজন্য আল্লাহর ঘর থেকে তাদের নিবৃত্ত রাখা আমি সমীচীন মনে করছি না। তার এ সব কথা শুনে কুরাইশ লোকজন ও তার মধ্যে এমন কিছু বাক্য বিনিময় হয়ে গেল, যার ফলে সে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ল।

এমন সময় উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফী হস্তক্ষেপ করল এবং বলল, ঐ ব্যক্তি মুহাম্মদ (ﷺ) তোমাদের নিকট একটি ভালো প্রস্তাব দিয়েছে। তোমরা তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করে নাও এবং আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও।

লোকজনেরা তাকে যাওয়ার অনুতি দিলে সে রাসূল (ﷺ) এর কাছে উপস্থিত হয়ে কথোপকথন আরম্ভ করল। আলোচনায় নবী করীম (ﷺ) তাকে সে সব কথাই বললেন, যা তিনি বুদাইলকে বলেছিলেন। প্রত্যুত্তর উরওয়া বলল, হে মুহাম্মদ, যদি আপনি নিজ জাতিকে নিশ্চিহ্নও করে দেন তবে কি আপনার পূর্বের কোনো আরব সম্পর্কে শুনেছেন যে, সে নিজ জাতিকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে? আর যদি দ্বিতীয় অবস্থা ঘটে যায়, তবে আল্লাহর কসম! আমি এমন কতগুলো মূর্খ ও লম্পট দেখছি, যারা আপনাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে।"

একথা শুনে আবু কবর (রা) বললেন, লাতের লজ্জাস্থানের ঝুলন্ত চর্ম চুষতে থাক, আমরা রাসূলকে ছেড়ে পালিয়ে যাব?

উরওয়া বলল, এ লোকটি কে? লোকজনেরা বলল, তিনি আবু বকর।

সে আবু বুকরকে সম্বোধন করে বলল, দেখ, সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন, যদি এমন ব্যাপার না হতো যে, তুমি আমার একটি উপকার করেছিলে এবং আমি তার প্রতিদান দিতে পারিনি, তবে অবশ্যই এর জবাব আমি দিয়ে দিতাম।

এরপর উরওয়া পুনরায় নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে কথোপকথন শুরু করল। সে যখন আলাপ আলোচনা করছিলো তখন বার বার রাসূল (ﷺ) এর দাড়ি মুবারকে হাত দিচ্ছিল। মুগীরা বিন শো'বা নবীর মাথার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর হাতে ছিলো একটি তরবারী। আলোচনার সময় উরওয়া যখন নবী করীমের দাড়ি মুবারকের দিকে হাত বাড়াত, তখন তিনি তরবারীর হাতল দ্বারা তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন, রাসূল (ﷺ) এর দাড়ি মুবারক হতে হাত দূরে রাখ।

অবশেষে উরওয়া মাথা উঠিয়ে বলল, এ লোকটি কে? লোকেরা বলল তিনি হচ্ছেন মুগীরা বিন শো'বা।

অতঃপর সে বলল, অঙ্গীকার ভঙ্গকারী। আমি কি তোমার অঙ্গীকার ভঙ্গের ব্যাপারে দৌড় ঝাঁপ করছি না? প্রকৃত ঘটনাটি ছিলো এই যে, জাহেলিয়াত যুগে মুগীরা কিছু সংখ্যক লোকের সঙ্গে ছিলেন।

কোনো এক অবস্থায় তিনি সঙ্গী-সাথিদের হত্যা করেন এবং তাদের ধন সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যান। অতঃপর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) বলেছিলেন, 'তুমি তো ইসলাম গ্রহণ করেছ কিন্তু তোমার ধন সম্পদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না।' উক্ত ব্যাপারে উরওয়ার দৌড় ঝাঁপ করার কারণ ছিলো এই যে, মুগীরা ছিলেন তার ভ্রাতুষ্পুত্র।

এরপর উরওয়া নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে সাহাবাদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে থাকল। অতঃপর সে স্বগোত্রীয় লোকজনদের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, হে গোত্রীয় ভ্রাতৃবর্গ! আল্লাহর কসম! আমি কায়সার ও কেসরা এবং নাজ্জাসীদের মতো সম্রাটের দরবারে গিয়েছি, কিন্তু আমি কোনো সম্রাটকে দেখিনি, যাকে তাঁর সঙ্গী-সাথিরা এতটুকু সম্মান করেছে, মুহাম্মদকে তাঁর সঙ্গী-সাথিরা যত বেশি সম্মান করছে। আল্লাহর কসম। তিনি যখন থু থু ফেলছেন তখন কেউ না কেউ তা হাতে নিয়ে আপন মুখমগুলে কিংবা শরীরে মেখে নিচ্ছেন। যখন তিনি কোনো নির্দেশ প্রদান করছেন, তখন তা বাস্তবায়নের জন্য সকলের মধ্যেই তৎপরতা শুরু হয়ে যাচ্ছে। যখন তিনি অযু করছেন তখন মনে হচ্ছে যেন তাঁর ব্যবহৃত পানির জন্য লোকেরা যুদ্ধ শুরু করে দেবে। যখন তিনি কোনো কথা বলছেন, তখন সকলের কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে যাচ্ছে। তাঁর সম্মানের খাতিরে সাহাবারা কখনই তাঁর প্রতিপূর্ণভাবে দৃষ্টিপাত করেন না। নিশ্চয় তাঁর মধ্যেই এমন গুণাবলির সমাবেশ ঘটেছে, যার ফলে সাহাবারা তাঁকে এতটা শ্রদ্ধা করছেন। তিনি তোমাদের জন্য একটি উত্তম প্রস্তাব দিয়েছেন। তোমাদের উচিত তা গ্রহণ করে নেয়া।

যখন কুরাইশগণ দেখল যে, তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাই সন্ধিচুক্তির পক্ষে, তখন তারা এর বিপক্ষে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, রাত্রির অন্ধাকারে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে তারা মুসলমানদের শিবিরে প্রবেশ করবে এবং এমনভাবে গন্ডগোল পাকিয়ে তুলবে যাতে আপনা থেকেই যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে।

অতঃপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্য সম্পাদনের লক্ষ্যে রাতের আঁধারে সত্তর কিংবা আশি জন যুবক তানঈম পর্বতে অবতরণ করে মুসলমানদের শিবিরে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু সুমলিম শিবির প্রহরীদের পরিচালক মুহাম্মদ বিন মাসলামা তাদের সকলকে বন্দী করেন। কিন্তু সন্ধিচুক্তির খাতিরে নবী করীম (ﷺ) সকলকে ক্ষমা প্রদর্শনপূর্বক মুক্ত করে দেন সেই সম্পর্কেই আল্লাহর তরফ থেকে তখন আয়াত নাযিল হয়-

আর তিনিই মক্কা উপত্যকায় তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করার পর তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে ফিরায়ে রেখেছেন। আর তোমরা যা আমল কর, আল্লাহ হলেন তার সম্যক দ্রষ্টা। (আল ফাতাহ: ২৪)

কুরাইশদের কাছে দূত হিসেবে ওসমান কে প্রেরণ

রাসূল চিন্তা করলেন যে, এ সময় কুরাইশদের নিকট এমন একজন দূত প্রেরণ করা প্রয়োজন যিনি বর্তমান ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এবং লক্ষ সম্পর্কে জোরালোভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে। রাসূল প্রথম ওমরকে এ কাজের জন্য আহ্বান জানালে তিনি এ বলে ক্ষমাপ্রার্থী হলেন যে, হে আল্লার রাসূল। সেখানে যদি আমাকে কষ্ট দেয়া হয় তাহলে মক্কায় বনু কা'ব গোত্রের বিন আফফানকে এতদুদ্দেশ্যে প্রেরণ করুন। তাঁর আত্মীয় এবং গোত্রীয় লোকজনদের অনেকেই এখনো মক্কায় রয়েছেন। তিনি আপনার বার্তা খুব ভালোভাবেই কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবেন।

অতঃপর রাসূল ওসমানকে কুরাইশদের নিকট গমনের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, তুমি গিয়ে তাদেরকে বলে দাও যে, যুদ্ধ করার জন্য আমরা আসিনি। আমরা এসেছি উমরাহ পালনের জন্য। তাছাড়া তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ কর।

অধিকন্তু, তিনি ওসমানকে এ নির্দেশও দিলেন, তুমি মক্কায় ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের নিকট গিয়ে অদূর ভবিষ্যতে মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের শুভ সংবাদ শুনিয়ে দেবে এবং একথাও বলে দেবে যে, আল্লাহ স্বীয় দ্বীনকে শীঘ্রই মক্কায় প্রকাশিত ও প্রতিষ্ঠিত করবেন। কাজেই, আল্লাহর দ্বীনে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য কাউকেও আত্মগোপনে থাকার প্রয়োজন হবে না।

ওসমান (রা) নবী করীম (ﷺ) এর বার্তা নিয়ে মক্কা গমন করলেন, বালদাহ নামক স্থানে কুরাইশদের নিকট দিয়ে যখন তিনি পথ চলছিলেন, তখন তারা জিজ্ঞেস করল, কী উদ্দেশ্যে কোথায় এই যাত্রা? তিনি বললেন, একটি বার্তাসহ আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (ﷺ) আমাকে এ স্থানে প্রেরণ করেছেন।

তারা বলল, আমরা মুহাম্মদের কথা শুনেছি, আপনি নিজ কাজে চলে যান। অন্যদিকে সাঈদ বিন আস উঠে এসে মারহাবা বলে তাঁকে খোশ আমদেদও জানালেন। অতঃপর নিজ ঘোড়ার ওপর বিজ চাপিয়ে তাতে আরোহণ করলেন এবং ওসমানকে সঙ্গে বসিয়ে নিয়ে মক্কায় নিজ বাসস্থানে নিয়ে গেলেন। সেখানে গিয়ে ওসমান (রা) নেতৃস্থানীয় কুরাইশগণের নিকট রাসূল এর বার্তা শোনালেন। বার্তা পৌছানোর মাধ্যমে যখন তিনি আরোপিত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করছেন, তখন কুরাইশরা প্রস্তাব করল তিনি যেন আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করেন। কিন্তু রাসূলের তাওয়াফের পূর্বে তাওয়াফ করা সমীচীন মনে না করায় তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

ওসমান (রা) এর শাহাদাতের গুজব এবং বাইয়াতে রিযওয়ান

ওসমান (রা) তাঁর ওপর আরোপিত দায়িত্ব সূচারু রূপে সম্পন্ন করলেন। কিন্তু কুরাইশরা তাঁকে আটকে রাখলেন। সম্ভবত উদ্ভূত পরিস্থিতির ব্যাপারে সঠিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারার কারণেই এবং কিছুটা বিলম্বে হলেও তাঁর মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যেই তারা ওসমানকে আটক রেখেছিলো। যেহেতু ব্যাপারটি ছিলো তাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এবং এ ব্যাপারে তাদের আরও সলা-পরামর্শের প্রয়োজন ছিলো, সেহেতু তারা ওসমানের প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত করতে চেয়েছিলো।

কিন্তু ওসমান (রা) এর প্রত্যাবর্তনের অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়ার কারণে মুসলমানদের মধ্যে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, ওসমানকে হত্যা করা হয়েছে। রাসূল যখন এ সংবাদ অবগত হলেন, তখন ঘোষণা দিলেন যে, যুদ্ধের মাধ্যমে যতক্ষণ এর একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা এ জায়গা পরিত্যাগ করব না। অতঃপর নবী সাহাবাদেরকে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেন। সাহাবায়ে কেরামের একটি দলকে কিছুটা ভেঙে পড়ার মতো মনে হলো। অবশ্য, তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন যে, তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবেন না। অন্য এক দল মৃত্যুবরণ করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন।

অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করতে হলেও তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে যাবেন না। সর্বপ্রথম অঙ্গীকার করলেন আবু সেনান আসাদী। সালমা বিন আকওয়া তিন দফা অঙ্গীকার করলেন। প্রথম, মধ্যে ও শেষে। রাসূলে করীম (ﷺ) স্বয়ং নিজ হাত ধরে বললেন, এ হচ্ছে ওসমানের হাত। ইতোমধ্যে যখন অঙ্গীকার গ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হয়ে গেল, তখন ওসমান (রা) প্রত্যাবর্তন করলেন এবং তিনিও অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। উক্ত অঙ্গীকার গ্রহণ পর্বে মাত্র একজন অংশগ্রহণ করেনি। সে ছিলো মুনাফিক। তার নাম ছিলো জুদ বিন কায়েস।

রাসূল (ﷺ) এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন একটি গাছের নিচে। ওমর (রা) পবিত্র হাতকে উত্তোলিত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং মাকাল বিন ইয়াসা (রা) এর গাছের কতগুলো ডাল ধরে রাসুলে করীম (ﷺ) এর ওপর থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। উক্ত অঙ্গীকারের নাম হচ্ছে বাইয়াতে রিযওয়ান। উক্ত বাইয়াত সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেন-

আল্লাহ মুমিনদের ওপর তখনই সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন, যখন তাঁরা বৃক্ষের নিচে আপনার হাতে হাত রেখে অঙ্গীকারবদ্ধ হচ্ছিলেন। (সূরা ফাতাহ: আয়াত-১৮)

সন্ধিচুক্তি এবং চুক্তির দফাসমূহ

যাহোক, কুরাইশরা পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করল এবং অনতিবিলম্বে সোহাইল বিন আমরকে সন্ধিচুক্তির ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) এর কাছে করল। তাকে প্রেরণের সময় এ পরামর্শ দিল যে, সন্ধিচুক্তিতে অবশ্যই এ চুক্তিটি উল্লিখিত হবে যে, মুহাম্মদ এ বছর ওমরাহ পালন না করেই তাঁর সঙ্গী সাথিদের নিয়ে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করবেন। মক্কার লোকেরা এমনটি ভাববার যেন অবকাশ না পায় যে, মুহাম্মদ জোর জবরদস্তি করে আমাদের শহরে প্রবেশ করেছেন। সোহাইন বিন আমর যখন কুরাইশদের নিকট থেকে ফিরে এলো তাকে আসতে দেখে নবী (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ করে দেয়া হয়েছে। এ ব্যক্তিকে পাঠানোর উদ্দেশ্যে হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চাচ্ছে। সোহাইল রাসূল (ﷺ) এর নিকট আগমনের পর বহুক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা করল এবং অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তির দফাসমূহ স্থিরকৃত হলো চুক্তির দফাগুলো হচ্ছে নিম্নরূপ-

১. রাসূল এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই সঙ্গী-সাথিগণসহ মদিনায় ফিরে যাবেন। মুসলমানগণ আগামী বছর মক্কায় আগমন করবেন এবং সেখানে তিন দিন অবস্থান করবেন। তাঁদের সঙ্গে সফরের প্রয়োজনীয় অস্ত্র থাকবে এবং তরবারী কোষাবদ্ধ থাকবে। তাঁদের আগমন কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না।

২. দশ বছর পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। এ সময় লোকজন নিরাপদ থাকবে, কেউ কারো ওপর হাত উঠাবে না।

৩. যে সকল গোত্র কিংবা জনগোষ্ঠি মুহাম্মদের অঙ্গীকারে প্রবেশ করতে চাইবে, প্রবেশ করতে পারবে। যে গোত্রে যে দলে অংশগ্রহণ করবে, তাকে উক্ত দলের অংশ গণ্য করা হবে। এরূপ ক্ষেত্রে কোনো গোত্রের ওপর অন্যায় অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের ওপর অন্যায় করা হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে।

৪. কুরাইশদের কোনো লোক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ পালিয়ে মুহাম্মদের দলে যোগদান করলে তাকে ফেরৎ পাঠাতে হবে। কিন্তু মুহাম্মদের দলভুক্ত কোনো লোক আশ্রয় লাভের উদ্দেশ্যে পালিয়ে কুরাইশদের নিকট গেলে কুরাইশরা তাকে ফেরৎ দেবে না।

এর পর নবী করীম (ﷺ) আলীকে সন্ধির দফাগুলো লিপিবদ্ধ করার জন্য নির্দেশ দিলেন।

তিনি বলেন, লিখ, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

এর প্রেক্ষিতে সোহাইল বলল, 'রহমান' বলতে যে কী বুঝায়, আমরা তা জানি না। আপনি এভাবে লিখুন, "বিসমিকা আল্লাহুম্মা' (হে আল্লাহ তোমার নামে)। রাসূল আলীকে সে ভাবেই লিখতে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি সেভাবেই তা লিখলেন।

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশে আলী লিখলেন, 'এগুলো হচ্ছে সেসব কথা, যার ওপর ভিত্তি করে আল্লাহর রাসূল সন্ধি করলেন।

একথার প্রেক্ষিতে সোহাইল বলল, আমরা যদি জানতাম যে আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আপনাকে আল্লাহর ঘর হতে বিরত রাখতাম না এবং আপনার সঙ্গে যুদ্ধও করতাম না, কাজেই আপনি লিখুন 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ।'

নবী করীম (ﷺ) বললেন, তোমরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করলেও এ এক মহাসত্য যে, আমি আল্লাহর রাসূল। অতঃপর 'রাসূলুল্লাহ', কথাটি মুছে ফেলে তার পরিবর্তে 'মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ' লিখার জন্য তিনি আলীকে (রা) নির্দেশ দিলেন।

কিন্তু আলী রাসূল এ কথাটি মুছে ফেলার ব্যাপারটিকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। আলীর মানসিক অবস্থা অনুধাবন করে রাসূলে করীম স্বীয় মুবারক হাতেই কথাটি মুছে ফেললেন। তারপর পুরো চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হয়ে গেল।

যখন সন্ধি চুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেল তখন বনু খোযায়া রাসূলে করীম - এর অঙ্গীকারে প্রবেশ করল। এরা প্রকৃতপক্ষে আব্দুল মুত্তালিবের সময় হতেই বনু হাশিমের হালীফ ছিলো। যেমনটি পুস্তকের প্রারম্ভে উল্লিখিত হয়েছে।

রাসূল অঙ্গীকারে বনু খোযায়ার প্রবেশের ব্যাপারটি ছিলো পূর্বত প্রতিজ্ঞারই ফলশ্রুতি বা পরিপক্ক অবস্থা। অন্যদিকে কুরাইশদের অঙ্গীকারে প্রবেশ করল বনু বকর গোত্র।

আবু জান্দালের প্রত্যাবর্তন

সন্ধিপত্র লেখার কাজ তখন চলছিলো, এমন সময় সোহাইলের পুত্র আবু জান্দাল শিকল পরিহিত অবস্থায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এসে সেখানে উপস্থিত হলো। সে মক্কার নিম্নাঞ্চল হতে বের হয়ে এসেছিলো। সে এখানে পৌঁছেই নিজে নিজেই মুসলমানদের দলের মধ্যে শামিল হলো। তার এ অবস্থা দেখে সোহাইল বলল, এ আবু জান্দালই হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি, যার সম্পর্কে আপনার সঙ্গে মত বিনিময় করেছি যে, আপনি তাকে ফেরৎ দেবেন। রাসূল বললেন, 'এখনো তো আমাদের সন্ধিপত্র সম্পন্নই হয়নি।

সে বলল, 'তাহলে আমি সন্ধির ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আর কোনো আলাপ-আলোচনা করতে রাজি না।' নবী করীম (ﷺ) বললেন, আচ্ছা তাহলে আমার খাতিরে তুমি তাকে ছেড়ে দাও।'

সে বলল, আমি আপনার খাতিরেও তাকে ছাড়ব না। বললেন, 'না না, অন্ততঃপক্ষে এতটুকু তোমাকে করতেই হবে।'

সে বলল, 'না আমি তা করতে পারি না।"

অতঃপর সোহাইল আবু জান্দালের মুখে চপেটাঘাত করল এবং মুশরিকদের নিকট প্রত্যাবর্তনের জন্য তার গাত্রবস্ত্র ধরে হেঁচড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল।

আবু জান্দাল তখন জোরে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগল, হে মুসলমান ভ্রাতৃবৃন্দ! আমি কি মুশরিকগণের নিকট ফিরে যাব এবং তারা আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে ফেতনায় নিক্ষেপ করবে?

রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আবু জান্দাল! ধৈর্যধারণ করো এবং একে সওয়াব লাভের উপায় মনে করে নাও। আল্লাহ তোমার এবং তোমার মতো দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য প্রশস্ত আশ্রয় স্থান তৈরি করে রেখেছেন। আমরা কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধি করেছি এবং আমরা পরস্পরের নিকট অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছি। এ কারণে আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারব না।'

এরপর ওমর (রা) বের হয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে আবু জান্দালের নিকট গিয়ে পৌঁছিলেন। তিনি তাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলছিলেন, 'আবু জান্দাল ধৈর্যধারণ করো। এরা মুশরিক এদের রক্ত তো কুকুরের রক্ত।' সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারের হাতলও তিনি তাঁর সামনে তুলে ধরলেন। ওমরের বর্ণনা রয়েছে যে, আমার আশা ছিলো যে, আবু জান্দাল তলোয়ার হাতে নিয়ে তাঁর পিতাকে নিঃশেষ করে ফেলবেন। কিন্তু তিনি তাঁর পিতার ব্যাপারে কৃপণতা অবলম্বন করলেন এবং সন্ধিচুক্তি কার্যকর হয়ে গেল।

ওমরাহ হতে হালাল হওয়ার জন্য কুরবানি এবং মাথার চুল কর্তন

সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিষ্কৃতি লাভের পর রাসূল নিজ নিজ পশু কুরবানি করার জন্য সাহাবাদেরকে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! কেউই আপন স্থান ত্যাগ করলেন না। মনে হলো যেন এ কথা তাঁদের কানেই যায়নি।

রাসূল (ﷺ) তিন বার তাঁর উক্তির পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু কেউই স্থান ত্যাগ করলেন না। তখন তিনি উম্মে সালামা (রা) এর নিকট গেলেন এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলেন। উম্মুল মুমিনীন (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি চান যে সকলে নিজ নিজ পশু কুরবানি করে মস্তক মুন্ডন করুক, তাহলে আর কাউকেও কিছু না বলে নিজে পশু যবেহ করুন এবং হাজ্জামকে (নাপিত) ডেকে নিয়ে নিজ মস্তক মুন্ডন করে নিন।

রাসূল (ﷺ) উম্মুল মুমিনীনের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলেন, অর্থাৎ নিজ হাদীর পশু জবেহ করলেন, হাজ্জামকে ডাকিয়ে নিজ মস্তক মুন্ডন করে নিলেন।

রাসূল কে কুরবানি ও মস্তক মুন্ডন করতে দেখে অন্যরা সকলেই নিজ নিজ পশু জবেহ করলেন এবং একে অন্যের সাহায্য নিয়ে মস্তক মুন্ডন করিয়ে নিলেন। সমগ্র পরিবেশটা তখন গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং সকলেই এতই চিন্তাযুক্ত ছিলেন যে, মনে হচ্ছিল অত্যধিক চিন্তিত থাকার কারণে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করে ফেলবে। সেই সময় সাত জনের জন্য একটি গরু এবং একটি উট যবেহ করা হয়।

রাসূল আবু জাহলের একটি উট যবেহ করেন, যার নাকে রূপার তৈরি একটি নোলক বালি বৃত্ত ছিলো। এর উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে, এর ফলে কুরাইশ মুশরিকরা যেন মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। অতঃপর রাসূল করীম মস্তক মুণ্ডনকারীদের জন্য তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং কাঁচি দ্বারা কেশ কর্তনকারীদের জন্য তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা ও একবার দু'আ করেন। উক্ত সফরে আল্লাহ কা'ব ইবনে উজরাহ সম্পর্কে এ হুকুমে নাযিল করেন, যে ব্যক্তি কষ্টের কারণে নিজ মস্তক মুণ্ডন করবে (ইহরামের অবস্থায়) সে যেন রোযা পালন করে, অথবা সদকা করে কিংবা কোনো পশু যবেহ করে তা উৎসর্গ করে।

হিজরতকারিণী মহিলাদের ফেরৎ প্রদানে অস্বীকৃতি

এরপর কিছু সংখ্যক মহিলা মুহাজির আগমন করলেন। তাদের অভিভাবকরা দাবি করল যে, হুদায়বিয়ায় যে সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এদের ফেরৎ দেয়া হোক। কিন্তু তাদের এ দাবি রাসূল (ﷺ) প্রত্যাখ্যান করে দিলেন।

আল্লাহ উক্ত মহিলাদের সম্পর্কেই আয়াতে নাযিল করেন-

হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কাছে মু’মিন মহিলারা হিজরত করে আসলে তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখ। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে অধিক অবগত। অতঃপর যদি তোমরা জানতে পার যে, তারা মুমিন মহিলা, তাহলে তাদেরকে আর কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠিও না। তারা কাফিরদের জন্য বৈধ নয় এবং কাফিররাও তাদের জন্য হালাল নয়। তারা যা ব্যয় করেছে, তা তাদেরকে ফিরিয়ে দাও। তোমরা তাদেরকে বিয়ে করলে তোমাদের কোন অপরাধ হবে না, যদি তোমরা তাদেরকে তাদের মোহর প্রদান কর। আর তোমরা কাফির নারীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রেখ না, তোমরা যা ব্যয় করেছ, তা তোমরা ফেরত চাও, আর তারা যা ব্যয় করেছে, তা যেন তারা চেয়ে নেয়। এটা আল্লাহর বিধান। তিনি তোমাদের মাঝে ফয়সালা করেন। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সূরা মুমতাহিনা: আয়াত-১০)

উল্লিখিত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর যখনই কোনো মহিলা হিজরত করে আসতেন তখন রাসূলে করীম আল্লাহর নিম্নোক্ত নির্দেশের আলোকে তাঁর পরীক্ষা গ্রহণ করতেন-

হে নবী, যখন মুমিন নারীরা তোমার কাছে এসে এই মর্মে বাইআত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তারা জেনে শুনে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তারা তোমার অবাধ্য হবে না। তখন তুমি তাদের বাইআত গ্রহণ কর এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা মুমতাহিনা: আয়াত-১২)

মহিলারা উক্ত আয়াতে বর্ণিত শর্তাবলি অনুসরণ করবে বলে যখন অঙ্গীকার করত, রাসূল তখন তাদের অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন। অতঃপর তাদেরকে আর ফেরৎ দেয়া হতো না।

উক্ত নির্দেশাবলি পালনার্থে মুসলমানগণ নিজ নিজ কাফের স্ত্রীদেরকে তালাক প্রদান করেন। ঐ সময় ওমরের দাম্পত্যে দুই অংশীবাদী মহিলা ছিলো। - তিনি তাদের দুজনকেই তালাক প্রদান করেন। এদের একজনকে বিয়ে করেন মুওয়াবিয়া এবং অন্যজনকে বিয়ে করেন সাফওয়ান বিন উমাইয়া।

উক্ত সন্ধির দফাসমূহের সার-সংক্ষেপ

ইসলামের ইতিহাসে মোড় পরিবর্তনকারী এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধি হচ্ছে হুদায়বিয়ার সন্ধি। যে ব্যক্তি এ সন্ধির দফাগুলো এবং পরবর্তী দৃশ্যপট সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করবেন, এটা তাঁর নিকট স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, এ সন্ধি ছিলো মুসলমানদের জন্য একটা বিরাট বিজয়স্বরূপ। কারণ এর পূর্ব পর্যন্ত কুরাইশরা ইসলামি সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্বই স্বীকার করত না। এমনকি একে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এরা ছিলো বদ্ধপরিকর। তারা এ অপেক্ষায় ছিলো যে, একদিন না একদিন এদের শক্তি বিনষ্ট হয়ে যাবে। অধিকন্তু, কুরাইশরা আরব উপদ্বীপে ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং পার্থিব প্রধানের দায়িত্বে সমাসীন থাকার কারণে ইসলামি দাওয়াত এবং সাধারণ মানুষের মাঝে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক ছিলো।

এর পরবর্তী দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করলে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এ সন্ধিতে আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের কিছুটা নতি স্বীকার করার কথা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এতে ছিলো মুসলমানদের শক্তির স্বীকারোক্তি এবং এ সত্যের স্বীকৃতি যে, ইসলামি শক্তিকে পিষ্ট কিংবা নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা কুরাইশদের নেই।

তৃতীয় দফার ক্ষেত্রে এটা প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, কুরাইশদের নিকট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের অতীতের অবস্থা এবং অবস্থান সম্পর্কে তেমন কোনো সচেতনতাই যেন ছিলো না।

ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের ভূমিকা যে ছিলো শীর্ষস্থানে, এ কথাটি তারা প্রায় ভুলতেই বসেছিলে। আরব উপদ্বীপের সকল সাধারণ মানুষ যদি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে, তাতেও যেন তাদের মাথা ব্যথার আর তেমন কিছুই ছিলো না এবং এ ব্যাপারে তারা আর কোনো প্রতিবন্ধকও হবে না। কুরাইশদের লক্ষ উদ্দেশ্যে এবং সংকল্পের প্রেক্ষাপটে এটা কি তাদের জন্য প্রকশ্য পরাজয় ছিলো না? পক্ষান্তরে, মুসলমানদের লক্ষ ও উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটে এটা কি তাদের জন্য সুস্পষ্ট বিজয় ছিলো না?

অবশেষে মুসলমান ও ইসলামের শত্রুদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছিলো, এর লক্ষ ও উদ্দেশ্যে এছাড়া আর কী ছিলো যে, বিশ্বাস বা দ্বীনের ব্যাপারে জনসাধারণ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং ক্ষমতার অধিকারী হবে? অর্থাৎ স্বাধীন ইচ্ছানুযায়ী যে ব্যক্তি যা ইচ্ছা করবে, তাই অবলম্বন করতে পারবে? মুসলমান হতে চাইলে মুসলমান হবে, আর কাফের থাকতে চাইলে কাফের থাকবে। তাদের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। মুসলমানদের এ ইচ্ছা তো কখনই ছিলো না যে, শত্রুদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক, তাদেরকে হত্যা করা হোক এবং জোরজরবদস্তি করে মুসলমান করা হোক। অর্থাৎ মুসলমানদের উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র এটা ছিলো যা আল্লামা ইকবাল তাঁর ভাষায় এভাবে বর্ণনা করেছেন-

মুমিনদের ইচ্ছা শাহাদাতপ্রাপ্তি; গনিমত বা রাজত্ব না।

একজন মুমিন মুসলমান বান্দার লক্ষ ও উদ্দেশ্যেই ছিলো শাহাদত বরণ করা। গণীমত লাভ অথবা বাদশাহ বা কোনো অঞ্চলের মালিক হওয়ার ইচ্ছা ছিলো না।

উক্ত সন্ধির মাধ্যমে মুসলমানরা যা অর্জন করতে পেরেছিলো, অধিকাংশ সময় যুদ্ধে প্রকাশ্য বিজয় লাভ করেও তা সম্ভব হয়নি। সন্ধির মাধ্যমে প্রচারকার্যের ঝুঁকি এবং বিপদাপদের সম্ভাবনা থেকে মুক্তি পাওয়ায় ইসলামের দাওয়াত ও প্রচারের ময়দানেও মুসলমানগণ অভূতপূর্ব কৃতকার্যতা অর্জন করতে থাকেন। সন্ধির পূর্বে যে ক্ষেত্রে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা কখনই তিন হাজারের বেশি হয়নি। সেক্ষেত্রে সন্ধির পর মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে তা দশ হাজার পৌঁছে গেল।

দ্বিতীয় দফাও প্রকৃতপক্ষে উক্ত প্রকাশ্য বিজয়েরই অংশ ছিলো। কারণ, সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে মুশরিকগণই যুদ্ধ আরম্ভ করেছিলো। এ প্রসঙ্গে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

প্রথমে ওরাই তোমাদেরকে আক্রমন করেছে। (সূরা আত তাওবাহ: আয়াত ১৩)

যে অঞ্চল পর্যন্ত মুসলিম প্রহরী টহলদারী সৈন্য দলের কার্যক্রম বিস্তৃত ছিলো মুসলমানদের এটা উদ্দেশ্যে এবং আশা ছিলো যে, কুরাইশরা তাদের নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত অহমিকা ও অহংকার পরিহারপূর্বক আল্লাহর দ্বীনের পথে বাধা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকবে এবং সাম্য ও মৈত্রীর ভিত্তিতে কার্যাদি সম্পন্ন করবে। অর্থাৎ প্রত্যেক পক্ষই আপন আপন লক্ষ্যে কার্যাদি নিস্পন্ন করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে। এখন চিন্তা করে দেখলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, দশ বছরের জন্য যুদ্ধ বিরতির সন্ধি ছিলো তাদের অর্থহীন অহংকার এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকারই অঙ্গীকার। অধিকন্তু এটা এ কথাই প্রমাণ করে যে, যারা যুদ্ধ আরম্ভ করেছিলেন তারা দুর্বল এবং পর্যদুস্ত হওয়ার ফলে স্বীয় উদ্দেশ্যে হাসিল করতে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ অকৃতকার্য হয়ে গেল।

প্রথম দফার প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করলেও এটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। যে, আপাতঃদৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য অবমাননাকর মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিলো তাঁদের সাফল্যেরই প্রতীক। কারণ, এ শর্তেরই মাধ্যমে মুসলমানেরা ও কুরাইশরা ইতোপূর্বে নিষেধাজ্ঞা জারী করেছিলো। তবে উক্ত শর্তের মধ্যে কুরাইশদের পরিতৃপ্ত হওয়ার যে বিষয়টি ছিলো তা হচ্ছে, তারা ঐ বছরের জন্য মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে সফল হয়েছিলো। কিন্তু তা ছিলো নিত্যান্ত গুরুত্বহীন একটি সাময়িক ব্যাপার।

উক্ত সন্ধির ব্যাপারে বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনার আরও একটি বিষয় হচ্ছে, কুরাইশরা মুসলমানদেরকে তিনটি বিষয়ে সুযোগদানের বিনিময়ে তারা মাত্র একটি সুযোগ গ্রহণ করেছিলো, যা ৪র্থ দফায় উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু এ সুযোগ ছিলো খুবই সাধারণ এবং গুরুত্বহীন। এতে মুসলমানদের কোনোই ক্ষতি হয়নি। কারণ, এটি একটি বিদিত বিষয় ছিলো যে, যতক্ষণ কোনো মুসলমান ইসলামের বন্ধনের মধ্যে থাকবে, সে ততক্ষণ আল্লাহও আল্লাহর রাসূল - এবং মদিনাতুল ইসলাম হতে পালিয়ে যেতে পারবে না। মাত্র একটি কারণেই সে পালিয়ে যেতে পারে এবং তা হচ্ছে স্বধর্ম ত্যাগ। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক কোনো মুসলমান যখন স্বধর্ম ত্যাগ করবে, তখন তো মুসলিম সমাজে তার কোনোই প্রয়োজন থাকবে না; রবং মুসলিম সমাজে তার উপস্থিতি থেকে তার পৃথক হয়ে যাওয়াই হবে বহু গুণে উত্তম। এ মোক্ষম ব্যাপারটির প্রতি ঈঙ্গিতপূর্বক রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেছেন-

যে আমাদের দল ছেড়ে মুশরিকদের নিকট পালিয়ে গেল, আল্লাহ তাকে দূর করে দিলেন বা ধ্বংস করে দিলেন।

এরপর অবশিষ্ট থাকে মক্কার সেসব অধিবাশির কথা, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলো কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ছিলো। অবশ্য এ চুক্তির ফলে যদিও তাদের জন্য মদিনায় আশ্রয় গ্রহণের কোনোই সম্ভাবনা ছিলো না, কিন্তু তবুও তাদের জন্য একটি শান্ত নব বিষয় এই ছিলো যে, আল্লাহর জমিন প্রশস্ত।' ইসলামের প্রথম পর্যায়ে মক্কার মুসলমানদের অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে কি হাবশী মুসলমানদের জন্য তার বাহুবন্ধন উন্মুক্ত করে দেয়নি? যখন মদিনার অধিবাশিরা ইসলামের নাম পর্যন্ত শোনেনি তখনকার কথা। অনুরূপভাবে আজও পৃথিবীর যে কোনো অংশ মুসলমানদের জন্য স্বীয় বাহু বন্ধন উন্মুক্ত করতে পারে। এ বিষয়টির প্রতিই ইঙ্গিত করে রাসূল ইরশাদ করেছেন-

তাদের মধ্য হতে কোনো ব্যক্তি আমাদের কাছে আসলে আল্লাহ তার জন্য যে কোনো সূরাহা এবং প্রশস্ততা বের করে দেবেন। (মুসলিম)

অতঃপর এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদিও বাহ্যিকভাবে কুরাইশদের সাময়িক মান-মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিলো। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্য তা ছিলো ব্যক্তিগত ব্যাকুলতা, চিন্তা-ভাবনা, গোত্রীয় চাপ এবং বিপর্যয়ের নিদর্শন। অধিকন্তু এ থেকে এমনটিও বোধগম্য হচ্ছিল যে, তারা তাদের মূর্তিপূজক সমাজ সম্পর্কে খুবই ভীত ছিলো। তাছাড়া তারা এটাও উপলব্ধি করছিলো যে, শিশুদের খেলাঘরের ন্যায় ঠুনকো ও অর্থহীন সমাজ ব্যবস্থা এমন এক ফাঁকা অন্তঃসারশূন্য এবং অভ্যন্তর ভাগ হতে খননকৃত পরিখার পাশে অবস্থিত, যা যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এর হেফাজতের জন্য ঐ জাতীয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলো।

অন্যপক্ষে রাসূল উদার অন্তঃকরণের সঙ্গে এ শর্তগুলোর স্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলেন যে, কুরাইশদের আশ্রিত কোনো মুসলমানকে ফেরৎ চাইবেন না, তা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত করে যে সুসংগঠিত ইসলামি সমাজের ওপর রাসূল (ﷺ) এর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ পুরোমাত্রায় কার্যকর ছিলো। এ প্রকার শর্তে সম্মতি জ্ঞাপনের ব্যাপারে তাঁর মনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিংবা আশংকার কোনোই কারণ ছিলো না।

মুসলমানদের বিষণ্ণতা এবং ওমর (রা) এর বিতর্ক

হুদায়বিয়া সন্ধি-চুক্তির শর্তাদি এবং তার সমীক্ষাসূচক আলোচনা ইতোপূর্বে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু উক্ত শর্তসমূহের মধ্যে দুটি শর্ত স্পষ্টই এ প্রকারের ছিলো, যা মুসলমানদের মনে দারুণ দুঃখ-বেদনা, হতাশা ও বিষণ্ণতার ভাব সৃষ্টি করেছিলো। সেগুলো হচ্ছে-

১. বিষয়টি ছিলো এই যে, রাসূল (ﷺ) বলেছিলেন, তিনি আল্লাহ ঘরের নিকট গমন করবেন এবং তাওয়াফ করবেন, কিন্তু পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাওয়াফ না করেই মদিনা ফিরে যাওয়ার শর্তে তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করেন।

২. দুঃখ-বেদনার দ্বিতীয় বিষয়টি ছিলো এই যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর দ্বীনকে তিনি এ সন্ধির অবমাননাকর শর্তে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন তা কিছুতেই মুসলমানদের বোধগম্য হচ্ছিল না। এ দুটো বিষয় মুসলমানদের মনে দারুণ সংশয় সন্দেহ, শঙ্কার সৃষ্টি করেছিলো। এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনুভূতি এতই আঘাতপ্রাপ্ত ও আহত হয়েছিলো যে, বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করার মতো মানসিক ধৈর্য তাঁদের ছিলো না। ভাবানুভূতির ক্ষেত্রে তাঁরা সকলেই প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন সম্ভবত ওমরই আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন সব চাইতে বেশি।

তিনি রাসূল (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি সত্যের ওপর দন্ডায়মান নই এবং কাফিররা বাতিলের ওপর? রাসূল (ﷺ) উত্তর দিলেন, 'অবশ্যই'।

তিনি পুনরায় নিবেদন করলেন, 'আমাদের নিহতগণ জান্নাতি এবং তাদের নিহতগণ কি জাহান্নামী নয়?' তিনি বললেন, 'কেন নয়?'

ওমর বললেন 'তবে কেন আমরা আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে মুশরিকদের চাপে পড়ব এবং এমন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন কবর যে, এখনও আল্লাহ আমাদের ও তাদের মধ্যে কোনোই ফয়সালা করেনি?'

রাসূল বললেন ওহে খাত্তাবের সন্তান! আমি আল্লাহর রাসূল এবং কখনই তাঁর অবাধ্য হতে পারব না। আমি বিশ্বাস করি যে সকল প্রয়োজনে তিনিই সাহায্য করবেন, কখনই আমাকে ধ্বংস হতে দিবেন না।

ওমর (রা) বললেন, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, আপনি আল্লাহর ঘরের নিকট গমন করবেন এবং তাওয়াফ করবেন?

নবী বললেন, অবশ্যই। কিন্তু আমি কি এ কথা বলেছিলাম যে, আমরা এ বছরই আসব? তিনি উত্তর করলেন, না।

নবী বললেন, যাহোক ইন-শাআল্লাহ তোমরা আল্লাহর ঘরের নিকট আসবে এবং তাওয়াফ করবে।

এরপর ওমর ক্রোধে ও অভিমানে অগ্নিশর্মা হয়ে আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তাকেও সেসব কথা বললেন, যা রাসূলকে বলেছিলেন সত্যুত্তরে আবু বকরও সেই সব কথাই বললেন, যা রাসূল বলেছিলেন এবং পরিশেষে এটুকুও বললেন যে, ধৈর্য সহকারে পথের ওপর দন্ডায়মান থাক, যতক্ষণ পর্যন্ত সত্য সমাগত না হয়। কেননা, আল্লাহর শপথ তিনি সত্যের ওপরেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

এরপর আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়, যার মধ্যে উক্ত সন্ধিকে সুষ্পষ্ট বিজয় বললেন এবং আয়াতটি পড়ে শোনালেন। তিনি তখন বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি একে বিজয় বলতে পারি?"

নবী করীম (ﷺ) বললেন, হ্যাঁ।

এতে তিনি সান্তনা লাভ করলেন এবং সেখান থেকে চলে গেলেন। পরে ওমর (রা) যখন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন তখন অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। এ ব্যপারে তাঁর নিজের বর্ণনা হচ্ছে, আমি সে দিন যে ভুল করেছিলাম এবং যে কথা বলেছিলাম, তাতে ভীত হয়ে আমি অনেক আমল করেছি, প্রচুর দান-খয়রাত করেছি, রোযা রেখে আসছি এবং দাস মুক্ত করে আসছি। এত কিছু করার পর এখন আমার মঙ্গলের আশা করছি।

দুর্বল মুসলমানদের সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গ

মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল (ﷺ) কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই অন্য এক সমস্যা সৃষ্টি হয়ে গেল। একজন মুসলমান মক্কায় যায় তখন তার ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছিল কোনোভাবে মুক্ত হয়ে মদিনায় এসে উপস্থিত হলো। তিনি সাকীফ গোত্রের সঙ্গে মদিনায় এসে উপস্থিত হলো। তাঁর নাম ছিলো আবু বাশির। তিনি সাকীফ গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কুরাইশদের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁকে ফেরৎ নেয়ার জন্য কুরাইশরা দুই ব্যক্তিকে মদিনায় প্রেরণ করে। তাঁরা রাসূল (ﷺ) কে বলল, আমাদের ও আপনাদের মধ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। তা কার্যকর করে আবু বাশিরকে ফেরৎ দিন।

তাদের এ কথার প্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) আবু বাশিরকে তাদের হাতে সমর্পণ করে দিলেন। তারা দুজন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা অভিমুখে যাত্রা করল। পথ চলার এক পর্যায়ে তারা যুল হুলাইফা নামক স্থানে অবতরণ করে খেজুর খেতে লাগল। খাওয়া দাওয়া চলাকালীন অন্তরঙ্গ পরিবেশে আবু বাশির একজনকে বলল, ওগো ভাই! আল্লাহর শপথ! তোমার তরবারীটা আমার নিকট খুবই উৎকৃষ্ট মনে হচ্ছে। সে ব্যক্তি কোষ থেকে তরবারী বের করে নিয়ে বলল, হ্যাঁ' হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! এ হচ্ছে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একে বারংবার পরীক্ষা করে দেখেছি।

আবু বাশির বলল, 'তরবারীটা আমার হাতে দাও ভাই, আমিও দেখে নিই।' সে তার কথামত তরবারীখানা তার হাতে দিল। এদিকে তরবারী হাতে পাওয়ামাত্রই আবু বাশির তাকে আক্রমণ করে স্তূপে পরিণত করে দিল।

দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রাণভয়ে পলায়ন করে মদিনায় এসে উপস্থিত হলো এবং দৌড় দিয়ে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করল। রাসূল তাকে দেখে বললেন, 'কি হয়েছে, একে এত ভীত দেখাচ্ছে কেন?

লোকটি নবী (ﷺ) এর নিকট অগ্রসর হয়ে বলল, 'আল্লাহর শপথ! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে এবং আমাকেও হত্যা করা হবে।' এ সময় আবু বাশির সেখানে এসে উপস্থিত হলো এবং বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার অঙ্গীকার পূরণ করে দিয়েছেন। আপনি আমাকে তাদের হাতে সমর্পণ করে দিয়েছেন। অতঃপর আল্লাহ আমাকে তাঁদের নির্যাতন থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন।'

রাসূল বললেন, তার মাতা ধ্বংস হোক, এ ব্যক্তি কোনো সঙ্গী পেলে যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করবে।

নবী করীম (ﷺ) এর এ কথা শুনে আবু বাশির বুঝে নিলেন যে, পুনরায় তাকে কাফিরদের হাতেই সমর্পণ করা হবে। কাজেই, কালবিলম্ব না করে তিনি মদিনা থেকে বের হয়ে সমুদ্রোপকূল অভিমুখে অগ্রসর হলেন।

এদিকে আবু জান্দাল বিন সোহাইলও কোনোভাবে মুক্ত হয়ে মক্কা হতে পলায়ন করেন এবং আবু বাশিরের সঙ্গে মিলিত হন। এরপর থেকে কুরাইশদের কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কা থেকে পালিয়ে আবু বাশিরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হতেন। এভাবে একত্রিত হতে হতে তারা একটি সুসংগঠিত দলে পরিণত হয়ে যান।

এরপর থেকে শাম দেশে গমনাগমনকারী কোনো কুরাইশ বাণিজ্য কাফেলার খোঁজখবর পেলেই তাঁরা তাদের ওপর চড়াও হয়ে লোকজনদের মারধর করতেন এবং ধনমাল যা পেতেন তা লুটপাট করে নিয়ে যেতেন। বার বার লুণ্ঠিত হওয়ার ফলে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অবশেষে কুরাইশরা নবীর নিকট এসে আল্লাহ এবং আত্মীয়তার মধ্যস্থতার বরাত দিয়ে এ সাহায্য প্রস্তাব পেশ করেন যে, তিনি যেন তাদেরকে তার নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে আসেন।

উক্ত প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) তাঁদেরকে মদিনায় আগমনের জন্য আহ্বান জানালে তাঁরা মদিনায় চলে আসেন। কুরাইশরা আরও প্রস্তাব করে, যে সকল মুসলমানরা মক্কা থেকে মদীনা চলে যাবে তাদের আর ফেরৎ চাওয়া হবে না।

কুরাইশ ভ্রাতৃবৃন্দের ইসলাম গ্রহণ

হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তির পর সপ্তম হিজরি সালের প্রথম ভাগে আমর বিন আস, খালিদ বিন অলীদ এবং ওসমান বিন তালহা (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরা যখন মসজিদে নববীতে উপস্থিত হলেন, তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন, মক্কা তার কলিজার টুকরোদের (প্রিয়জনদেরকে) আমাদের নিকট সমর্পন করে দিয়েছে।

নবতর পরিবর্তন ধারা

ইসলাম এবং মুসলমানদের জীবনে হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রকৃতই এক নবতর পরিবর্তন ধারার সূচনা করে। কারণ, ইসলামের শত্রুতা ও বিরোধিতায় কুরাইশরা সর্বাধিক দঢ়, একগুঁয়ে এবং দাঙ্গাবাজ সম্প্রদায় হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলো। কিন্তু যখন তারা যুদ্ধের ময়দানে পশ্চাদাপসরণ পূর্বক সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে নিরাপত্তা বিধানের প্রতি ঝুঁকে পড়ল তখন যুদ্ধবাজ তিনটি দলের মধ্যে (কুরাইশ, গাতফান ও ইহুদি) সব চাইতে শক্তিশালী দলটি (কুরাইশ) নমনীয়তা অবলম্বন করায় তাদের ঐক্যজোটের সূদৃঢ় বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ল। অধিকন্তু সমগ্র আরব উপদ্বীপে মূর্তিপূজার চাবিকাঠি এবং মূর্তিপূজকদের নেতৃত্ব ছিলো কুরাইশদের হাতে। অথচ তারা যখন যুদ্ধের ময়দান হতে পিছু হটে গেল, তখন মূর্তিপূজকদের যুদ্ধোন্মাদনা ও উদ্দীপনায় ভাটা পড়ে গেল এবং মুসলমানদের প্রতি উৎকট বৈরীভাব কমে গেল।

এটাও লক্ষণীয় যে উক্ত সন্ধির পর গাতফান গোত্রের দিক হতে বড়ো রকমের শত্রুতামূলক ক্রিয়াকলাপ কিংবা গোলমাল সৃষ্টির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়নি। এসব ব্যাপারে তারা যদি কিছু করেও থাকে তা তাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনার ফলশ্রুতি ছিলো না; বরং তা ছিলো ইহুদিদের প্ররোচনার কারণে।

ইহুদিগণের ব্যাপার ছিলো এই যে, ইয়াসরিব হতে বিতাড়িত হওয়া পর খায়বরকে সর্বরকম যোগশাজস ও ষড়যন্ত্রের আখড়া বা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলো। সেখানে শয়তান তাদের সব রকম ইন্ধনের যোগান দিচ্ছিল এবং তারা ফেৎনা ফাসাদের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করার কাজে লিপ্ত ছিলো। তারা মদিনার পাশ্ববর্তী আবাদীর বেদুইনদের উত্তেজিত করা এবং নবী করীম (ﷺ) ও মুসলমানদের নিঃশেষ করা কিংবা তাঁদের ওপর খুব বড়ো রকমের আঘাত হানার ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত ছিলো। এ জন্যই হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী করীম (ﷺ) সর্বপ্রথম ইহুদিদের প্ররোরচনা মূলক ক্রিয়াকলাপ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

যাহোক, হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তা ও শান্তি-স্বস্তির যে বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিলো ইসলামি প্রচারাভিযান ও দাওয়াতের বিস্তৃতির ব্যাপারে মুসলমানদের জন্য তা একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। এ সুযোগের ফলে তাদের উদ্যম যেমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকল, তেমনি কর্মক্ষেত্রের পরিধিও প্রসারিত হতে থাকল। যুদ্ধ মহোদ্যমের তুলনায় শান্তিকালীন প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হলো। বিষয়ের উপস্থাপনা ও আলোচনার সুবিধার্থে সন্ধি পরবর্তী কার্যক্রমে দ্বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশন করা হলো। যথা-

১. প্রচারাভিযান এবং সম্রাট ও সমাজপতিদের নামে পত্র পেরণ।

২. এবং যুদ্ধাভিযান।

অবশ্য এটা বলা অন্যায় কিংবা অমূলক হবে না যে, এ স্তরের যুদ্ধাভিযান সম্পর্কে বলার আগে সম্রাট এবং সমাজপতিদের নামে পত্র পেরণ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা প্রয়োজন। কারণ, ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে প্রচার এবং প্রকাশের কথাই আগে আসে এবং এ কারণেই মুসলমানগণকে নানান নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট-ফ্যাসাদ ও দুর্ভাবনার শিকার হতে হয়েছিলো।

বাদশাহ সমাজপতিদের কাছে পত্র প্রেরণ

৬ষ্ঠ হিজরির শেষের দিকে হুদায়বিয়া হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহের বাদশাহ ও সমাজপতিদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাদের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। নবীর পত্রসমূহ লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাঁর নিকট এই বলে আরজ করা হলো যে, বাদশাগণ সেই পত্র গ্রহণ করবেন যখন তার ওপর সিলমোহর অংকিত থাকবে। উক্ত প্রেক্ষিতে রাসূল একটি রূপার আংটি তৈরি করিয়ে নেন, যার ওপর মুদ্রিত ছিলো 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'। এ মুদ্রণ ছিলো তিন লাইন বিশিষ্ট, এক লাইনে 'মুহাম্মাদুর' অন্য লাইনে 'রাসূলুল্লাহ' এবং তৃতীয় লাইনে 'আল্লাহ' শব্দটি মুদ্রিত ছিলো।

অতঃপর বিচক্ষণ, সুশিক্ষিত ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাহাবাদেরকে রাসূল (ﷺ) বার্তাবাহক মনোনীত করে তাঁদের মাধ্যমে বাদশাহ ও সমাজপতিদের নিকট পত্র প্রেরণ করলেন। আল্লামা মানসুরপুরী দৃঢ়তার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন, রাসূল তাঁর খায়বার যাত্রার কয়েক দিন পূর্বে ১লা মুহাররম ৭ম হিজরিতে এ বার্তা বাহকদের প্রেরণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে ঐ সকল পত্র ও তার পরিপ্রেক্ষিত এবং কার্যকর প্রভাবসমূহ সম্পর্কে উপস্থাপন করা হলো।

হাবশার সম্রাট নাজ্জাশীর নামে পত্র

উল্লিখিত নাজ্জাশীর নাম ছিলো আসহামা বিন আবযার। নবী করীম (ﷺ) তাঁর নামে যে পত্রখানা লিখিয়েছিলেন, তা আমর বিন উমাইয়া যামরীর হাতে ৬ষ্ঠ হিজরির শেষ কিংবা ৭ম হিজরির প্রথমভাগে প্রেরণ করেছিলেন। পত্রখানার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লার রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে হাবশার সম্মানিত সম্রাট নাজ্জাশীর নামে। সেই ব্যক্তির উপর সালাম যে হেদায়েতের অনুসরণ করবে। অতঃপর আমি আপনার প্রতি ঐ আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। যিনি ব্যতীত আর কোনোই উপাস্য নেই। যিনি পবিত্র শান্তি বিধানকারী, নিরাপত্তা প্রদানকারী- সংরক্ষক এবং তত্ত্বাবধায়ক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা (আ) বিন মরিয়ম আল্লাহ প্রদত্ত আত্মা এবং তাঁর কালেমা। আল্লাহ তাঁকে পবিত্র করে সৃষ্টি করেছেন এবং সতী-সাধ্বী মরিয়মের প্রতি নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাঁর প্রদত্ত আত্মা ফুৎকারের মাধ্যমে মরিয়ম ঈসা (আ) কে গর্ভধারণ করেছিলেন, যেমনভাবে আদমকে স্বীয় কুদরতের হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছিলেন। আমি এক আল্লাহর প্রতি যাঁর কোনোই অংশীদার নেই এবং তাঁর আনুগত্যের ওপর পরস্পর পরস্পরের প্রতি সাহায্য সহানুভূতির উদ্দেশ্যে আহ্বান জানাচ্ছি এবং সেই কথার প্রতি ডাক দিচ্ছি যে, আপনি আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করবেন এবং আমার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন। কারণ, আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। আমি আপনাদেরকে এবং আপনাদের সৈন্যদেরকে আল্লাহর প্রতি যিনি মহা- সম্মানিত ও মহান মহীয়ান আহ্বান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমার ওপর যে দায়িত্ব কর্তব্য অর্পণ করেছেন, তা আপনাদের পৌছিয়ে দিয়ে তা গ্রহণ করার জন্য উপদেশ প্রদান করলাম। অতএব আমার উপদেশ গ্রহণ করুন। সেই ব্যক্তির জন্য সালাম, যিনি হেদায়েত গ্রহণ ও অনুসরণ করবেন।

যখন আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) নবী করীম (ﷺ) এর পত্রখানা নাজ্জাশীর নিকট সমর্পণ করলেন তখন নাজ্জাশী তা নিয়ে চোখের সামনে রাখলেন এবং সিংহাসন থেকে অবতরণ করে জা'ফর বিন আবী তালিবের নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) এর নিকট পত্র লিখেন, যার। বিষয়বস্তু ছিলো নিম্নরূপ।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহ রাসূল! আল্লাহর তরফ হতে আপনার ওপর সালাম, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। আল্লাহ এমন সত্তা, যিনি ব্যতীত অন্য কেউই উপাসনার উপযুক্ত নয়। অতঃপর হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অতীব মূল্যবান পত্র খানা আমার হস্তগত হয়েছে যার মধ্যে আপনি নবী ঈসা (আ) এর ব্যাপার উল্লেখ করেছেন। আকাশ ও পৃথিবীর মালিক আল্লাহর কসম! এর ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, ঈসা (আ) তা হতে এক কণাও অতিরিক্ত ছিলেন না। তিনি ঠিক তেমনটি ছিলেন যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন। অতঃপর আপনি যা কিছু আমাদের নিকট প্রেরণ করেছেন, আমরা তা অবগত হলাম এবং আপনার চাচাত ভাই ও সাহাবাবৃন্দকে আপ্যায়ন করলাম। সুতরাং আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল। আমি আপনার পত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি অঙ্গীকার গ্রহণ করলাম এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের হাতে হাত রেখে আল্লাহ বাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলাম।

নবী করীম (ﷺ) নাজ্জাশীকে একথাও বলেছিলেন যে, তিনি যেন জাফর এবং অন্যান্য হাবশী মুহাজিরদের পাঠিয়ে দেন। উক্ত কারণে তিনি আমর বিন উমাইয়া যামরীর (রা) সঙ্গে দুটো নৌকা করে তাদের প্রেরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। একটি নৌকায় আরোহীদের মধ্যে ছিলেন জাফর, আবু মুসা আশআরী এবং অন্যান্য সাহাবারা (রা)। তাঁরা সরাসরি খায়বারে পৌঁছে খিদমতে নববীতে উপস্থিত হলেন। দ্বিতীয় নৌকার আরোহীদের মধ্যে ছিলো বেশির ভাগই বিভিন্ন পরিবারের লোকজন। তারা সোজাসুজি মদিনায় গিয়ে পৌঁছল।

উক্ত নাজ্জাশী সম্রাট তাবুক যুদ্ধের পর ৯ম হিজরির রজব মাসে মৃত্যু মুখে পতিত হন। তাঁর মৃত্যুর দিনই নবী করীম (ﷺ) সাহাবাদেরকে তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেন এবং তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অন্য একজন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে সিংহাসনে সমাসীন হন। নবী করীম (ﷺ) তাঁর নিকটেও একটি পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কি না সে ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।

মিশরের সম্রাট মোকাওকিসের নামে পত্র

নবী করীম (ﷺ) মিশর ও ইসকান্দারিয়ার সম্রাট জোরাইজ বিন মাতার নামে একটি মূল্যবান পত্র পেরণ করেন। তাঁর উপাধি ছিলো মোকওকিস। প্রত্রখানার বিষয়বস্তু ছিলো নিম্নরূপ-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মোকাওকিসের প্রতি- সালাম তার ওপর, যে হেদায়েত অনুসরণ করবে। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ আপনাদেরকে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করবেন। কিন্তু আপনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে কিবতীগণের পাপ বর্তাবে আপনারই ওপর। হে কিবতীরা! এমন একটি কথার প্রতি তোমরা এগিয়ে আস, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমান। এ বিষয়টি হলো এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করব না এবং কাউকেও তাঁর অংশীদার করব না। অধিকন্তু আমাদের মধ্যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও রব না প্রভু বানাবো না। অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও যে 'সাক্ষী থাক, আমরা মুসলমান।'

উক্ত পত্রখানা পৌঁছানোর জন্য হাতেব বিন আবু বালতাকে মনোনীত করা হয়। তিনি মোকাওকিসের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, এ পৃথিবীর ওপর তোমার পূর্বে এক ব্যক্তি গত হয়ে গিয়েছেন, যিনি নিজেই নিজেকে বড়ো প্রভু মনে করতেন। আল্লাহ তাঁকে শেষ করে দিয়েছেন এবং তাকে মানুষের জন্য শিক্ষণীয় করেছেন। প্রথমত তাঁর দ্বারাই মানুষ হতে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। অতঃপর তাঁকেই প্রতিশোধের লক্ষ স্থলে পরিণত করেছেন। অতএব, অন্যদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং এমনটি যেন না হয় যে, অন্যেরা আপনার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।

মোকাওসিক বলল, আমাদের একটিই ধর্ম এবং যতক্ষণ এর চাইতে উত্তম কিছু না পাব, ততক্ষণ আমরা তা পরিত্যাগ করতে পারব না। হাতেব বিন আবু বাল তায়াহ (রা) আল্লাহ অন্য সকল ধর্মের পরিপূরক হিসেবে ইসলাম ধর্ম মনোনীত করেছেন। দেখুন, উক্ত নবীর মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। কুরাইশরা এ ব্যাপারে সব চাইতে শক্তভাবে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং ইহুদিরা সব চাইতে বেশি শত্রুতা করেছে। কিন্তু খ্রিস্টনরা সব চাইতে নিকটে থেকেছে। আমার জীবনের শপথ! মূসা (আ) যেভাবে ঈসা (আ) সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিয়েছিলেন, তেমনিভাবেই ঈসা (আ) নবী মুহাম্মদ (ﷺ) সম্পর্কে শুভ সংবাদ দিয়েছিলেন। আমরা কুরআন মজীদের প্রতি আপনাদের ঐভাবে দাওয়াত দিচ্ছি, যেমনটি আপনারা তাওরাতের অনুসারীদের ইঞ্জিলের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন। যখন যে সম্প্রদায়ের মাঝে যে নবীর আবির্ভাব হয় তখন সেই খ্রিষ্টানদের লোকজনদের সেই নবীর উম্মত হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই নবীর আনুগত্য করা তখন সেই সম্প্রদায়ের লোকজনদের অবশ্য করণীয় কর্তব্য হয়ে পড়ে। আপনারা উক্ত নবীর অনুসরণ করেছেন। আমরা কিন্তু আপনাদেরকে সহিহ্-দ্বীন হতে বিরত থাকতে বলছি না; বরং তারই দ্বীনের পরিপূরক ব্যবস্থার অনুসরণের জন্য দাওয়াত দিচ্ছি।

মোকাওকিস বললেন, উক্ত নবীর ব্যাপারে আমি চিন্তা-ভাবনা করলাম। এতে আমি এটুকু পেলাম যে, তিনি কোনো অপছন্দনীয় কথা কিংবা কাজের নির্দেশ প্রদান করেননি এবং কোনো পছন্দনীয় কথা কিংবা কাজ হতে নিষেধও করেননি। তাকে যাদুকর কিংবা মিথ্যুক বলেও মনে হয় না; বরং আমি তাঁর নিকট নবুয়তের এ সকল নিদর্শন পাচ্ছি যে, তিনি গোপনকে প্রকাশ করেন এবং পরামর্শের সংবাদ দিচ্ছেন। আমি এ ব্যাপারে আরো অধিক চিন্তা-ভাবনা করব। মোকাওকিস নবী করীম (ﷺ) এর পত্রখানা হাতে নিয়ে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে হাতির দাঁতের তৈরি একটি বাক্সে রাখলেন এবং তাতে সীলমোহর লাগিয়ে তা যত্নসহকারে রেখে দেয়ার জন্য একজন দাসীর হাতে দিলেন। অতঃপর আরবি ভাষা লিখতে সক্ষম একজন কাতেবকে ডাকিয়ে নিয়ে রাসূলে করীম (ﷺ) এর খিদমতে নিম্নবর্ণিত পত্রখানা লিখলেন।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর প্রতি মহান মোকাওকিস কিবতের পক্ষ হতে:
আপনি আমার সালাম গ্রহণ করুন। অতঃপর আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। পত্রে উল্লিখিত আপনার কথাবার্তা ও দাওয়াত আমি উপলব্ধি করেছি। এখন যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে, সে বিষয়ে আমার ধারণা রয়েছে। আমার ধারণা ছিলো যে, তিনি শাম রাজ্য থেকে আবির্ভূত হবেন।
আমি আপনার প্রেরিত সংবাদ বাহকের নিদর্শনস্বরূপ আপনার খিদমে দুটো দাসী প্রেরণ করলাম, কিবতীদের মাঝে যারা বড়ো মর্যাদার অধিকারিণী। অধিকন্তু, আপনার পরিধানের জন্য কিছু পরিচ্ছেদ এবং বাহন হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি খচ্চর পাঠালাম সামান্য উপটৌকন হিসেবে। অতঃপর আপনার খিদমতে পুনরায় সালাম পেশ করলাম।

মোকওকিস এর অতিরিক্ত আর কিছুই লিখেননি। রাসূল (ﷺ) এর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেও তিনি কিন্তু ইসলামে প্রবেশ করেননি। তাঁর প্রেরিত দাসী দুটোর নাম ছিলো মারিয়া এবং শিরীন। খচ্চরের নাম ছিলো দুলদুল। খচ্চরটি মুয়াবিয়ার সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলো। নবী করীম (ﷺ) মারিয়াকে বিয়ে করেন। তাঁর গর্ভে নবী পুত্র ইবরাহীম জন্ম লাভ করেন। শিরীনকে হাসান বিন সাবেত আনসারীর হাতে দেয়া হয়।

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পত্র।

নবী করীম (ﷺ) পারস্য সম্রাট কিসরার (খসরু) নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। উক্ত পত্রের বিষয়বস্তু ছিলো নিম্নরূপ:

বিসমিলরাহির রহমানির রহীম
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি। সেই ব্যক্তির ওপর সালাম, যে হেদায়েতের অনুসরণ করবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউই উপাসনার যোগ্য নেই। আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোনোই অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আপনাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করছি। কারণ, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানব জাতির জন্য প্রেরিত, যাতে পাপাচারের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে জীবিতদের সতর্ক করে দেয়া যায় এবং কাফিরদের নিকট সত্য প্রকাশিত হয়। অতঃপর যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে নিরাপদে থাকবে। আর যদি তা অস্বীকার করো, তাহলে তোমার ওপর অগ্নিপূজকদের পাপও বর্তাবে।

উক্ত পত্র বহনের দূত হিসেবে নবী করীম (ﷺ) আবদুল্লাহ বিন হুযাইফা সাহমীকে মনোনীত করেন। তিনি এ পত্র খানা বাহরাইনের প্রধানের নিকট সমর্পণ করেন। কিন্তু এ কথাটা জানা যায় না যে, বাহরাইনের প্রধান নিজেই কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে পত্রটি কিসরার নিকট পাঠিয়েছিলেন না আবদুল্লাহ বিন হুযাইফা সাহমীকেই প্রেরণ করেছিলেন। যাহোক, যখন এ পত্রখানা কিসরাকে পড়ে শোনানো হলো, তখন সে তা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলল, আমার প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত একজন নিকৃষ্ট দাস তার নিজ নাম আমার নামের পূর্বে লিখেছে।

রাসূল যখন কিসরার ঐ ঔদ্ধত্যের কথা অবগত হলেন। তখন বললেন, "আল্লাহ যেন তার সাম্রাজ্যকে ছিন্ন ভিন্ন করে বিনষ্ট করে ফেলেন।" এবং যা তিনি বললেন, বাস্তবক্ষেত্রে তাই কার্যকর হয়ে গেল।

অতঃপর কিসরা তার ইয়েমেনের গভর্নর বাজানকে এ বলে লিখল যে, 'দুজন কর্মঠ এবং শক্তিশালী লোক পাঠিয়ে হেজাযের সেই লোককে আমার দরবারে হাজির কর।' কিসরার নির্দেশানুযায়ী বাজান দুই ব্যক্তিকে মনোনীত করল এবং তাদের হাতে একটি পত্র রাসূলের নিকট প্রেরণ করল। পত্রে রাসূলকে কিসরা প্রাসাদে উপস্থিত হওয়ার কথা বলা হয়েছিলো।

যখন তারা মদিনায় গিয়ে রাসূল (ﷺ) এর সামনে উপস্থিত হলো, তখন তাদের একজন বলল, সম্রাট কিসরা ইয়েমেনের গভর্নর বাজানের নিকট একটি পত্রের মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করেছেন, লোক পাঠিয়ে আপনাকে কিসরা প্রাসাদে হাজির করার জন্য। বাজান প্রধান সেই নির্দেশ পালনার্থে আপনার নিকট আমাদের প্রেরণ করেছেন। অতএব, আপনি আমাদের কিসরা প্রাসাদে চলুন। সঙ্গে সঙ্গে উভয়ে ধমকের সুরে কথাবার্তাও বলল। রাসূল বললেন, 'আগামীকাল সাক্ষাৎ কর।'

এদিকে মদিনায় যখন এ চিত্তাকর্ষক ঘটনা সংঘটিত হচ্ছিল, তখন কিসরা প্রাসাদে খসরু পারভেজের পরিবারে তার বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহের অগ্নিশিখা প্রচন্ডবেগে প্রজ্জ্বলিত হচ্ছিল। এর ফলশ্রুতিতে কায়সারের সৈন্যদলের হাতে পারস্য সৈন্যদলের লাগাতার পরাজয়ের পর খসরুর ছেলে শিরওয়াই পিতাকে হত্যা করে সিংহাসনে আরোহণ করে। এ ঘটনা সংঘটিত হয় ৭ম হিজরির ১০ জুমাদিউল উলা মঙ্গলবার রাত্রে। ওহীর মাধ্যমে রাসূল উক্ত ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হন।

পরবর্তী প্রভাতে যখন পারস্য প্রতিনিধিদ্বয় রাসূলের দরবারে উপস্তিত হলো। তখন তিনি তাদেরকে উক্ত ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন। তারা বলল, বুদ্ধি-শুদ্ধি কিছু আছে কি? এ আপনি কী বলছেন? এ থেকে অনেক কিছু সাধারণ কথাও আমরা আপনার অপরাধগুলোর অন্তর্ভুক্ত গণনা করেছি। তবে কি আপনার এ কথা বাদশাহর নিকট লিখে পাঠাব?

নবী বললেন, 'হ্যাঁ, তাকে আমার এ সংবাদ জানিয়ে দাও এবং কথাও বলে দাও যে, আমার দ্বীন ও আমার শাসন ঐ পর্যন্ত পৌঁছবে, যেখানে কিসরা পৌছেছে; বরং তার চাইতেও অগ্রসর হয়ে ঐ জায়গায় গিয়ে থামবে, যার আগে উট এবং ঘোড়ার পা যাবে না। তোমরা উভয়ে এ কথাও তাকে বলে দিবে যে, যদি সে মুসলিম হয়ে যায়, তাহলে তাঁর আয়ত্বাধীনে যা কিছু আছে, তা সমস্তই তাকে দিয়ে দেয়া হবে এবং তাকে তোমাদের জাতির জন্য বাদশাহ করে দেয়া হবে।'

এরপর তারা দুজন মদিনা থেকে যাত্রা করে বাজানের নিকট গিয়ে পৌঁছল এবং তাকে বিস্তারিতভাবে সব কিছুই অবহিত করল। অল্পক্ষণ পরেই এ মর্মে একটি পত্র এল যে, শিরওয়া আপন পিতা কিসরাকে হত্যা করেছে। শিরওয়া তার পত্র মাধ্যমে এ উপদেশও প্রদান করল যে, যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমার পিতা তোমাদের পত্র লিখেছিলো, পুনরায় নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাঁকে উত্তেজিত করবে না।"

উক্ত ঘটনার ফলে বাজান এবং তার পারসীয়ান বন্ধুগণ (যারা ইয়েমেনে অবস্থান করছিলো) মুসলমান হয়ে গেল।

রোমের সম্রাট কায়সারের নামে পত্র

সহীহ বুখারীর একটি দীর্ঘ হাদীসে উক্ত পত্রখানার বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে। নবী করীম (ﷺ) উক্ত পত্রখানা রোম সম্রাট হেরাকলের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। উক্ত পত্রখানার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ এর পক্ষ হতে রোম সম্রাট হিরাকলের প্রতি- সেই ব্যক্তির ওপর সালাম যে, হেদায়তে অনুসরণ করে চলবে। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন নিরাপদে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করুন আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দান করবেন। কিন্তু যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে আপনার ওপর প্রচারকবৃন্দের পাপ বর্তাবে। হে ঐশী গ্রন্থপ্রাপ্ত সম্প্রদায়! এমন এক কথার প্রতি আসুন, যা আমাদের ও আপনাদের মাঝে সমান, যে আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করব না, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করব না এবং আমরা কেউই আল্লাহর স্থলে অন্যকে রব গ্রহণ করব না। এতদসত্বেও যদি লোকজন মুখ ফিরিয়ে নেয়। তবে বলে দাও যে, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলমান।

উক্ত পত্র প্রেরণের জন্য নবী দূত মনোনীত করলেন দাহইয়াহ বিন কালবীকে। নবী তাঁকে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, তিনি যেন এ পত্রখানা বসরার প্রধানের নিকট সমর্পণ করেন। অতঃপর তিনি সেটা পৌঁছে দেবেন কায়সারের নিকট। এরপর এ প্রসঙ্গে যা কিছু সংঘটিত হয়েছিলো। তাঁর বিবরণ সহিহ বুখারিতে ইবনে আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে। তিনি বর্ণনা করেন যে, আবু সুফিয়ান বিন হারব তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, হিরাকল তাঁকে একটি কুরাইশ দলের সঙ্গে ডেকে পাঠান। এ দলটি হুদায়বিয়া সন্ধিচুক্তির আওতায় নিরাপত্তা লাভ হেতু শামদেশে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলো। এঁরা ঈলিয়া (বায়তুল মোকাদ্দস) নামক স্থানে তাঁর নিকট উপস্থিত হলেন।

হিরাকল তাঁদেরকে তাঁর দরবারে আহ্বান করলেন। এ সময় তাঁর পাশে রোমের প্রধান ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর দোভাষীদের মাধ্যমে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে করে বললেন, 'যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করছেন, তাঁর সঙ্গে আপনাদের মধ্যে কে সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ? আবু সুফিয়ানের বর্ণনা, যে 'আমি বললাম আমি সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ।'

হিরাকল বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো এবং তার সঙ্গী-সাথিদেরকেও তার পেছনে বসাও। এরপর হিরাকল নিজ দোভাষীকে বললেন, "আমি এ ব্যক্তিকে উক্ত নবী সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করব। এ যদি মিথ্যা বলে তবে তোমরা তা মিথ্যা বলে প্রমাণ করবে।

আবু সুফিয়ান বলল, "আল্লাহর কসম! মিথ্যা বলার কারণে আমাকে মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করার ভয় না থাকত, তবে আমি অবশ্যই নবী সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম।"

আবু সুফিয়ান বলেছেন, 'এরপর নবী সম্পর্কে হিরাকল আমাকে প্রথম যে প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করেছিলেন, তা হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশ মর্যাদা কেমন?
আমি বললাম, তিনি উচ্চ বংশের।
হিরাকল বললেন, তবে এ কথা তাঁর পূর্বে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ কি বলেছিলো? আমি বললাম, "না"।
হিরাকল পুনরায় বললেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি রাজা ছিলো? আমি বললাম, 'না।
হিরাকল বললেন, 'আচ্ছা তবে সম্মানিত লোকজন তাঁর অনুসরণ করেছে, না দুর্বল লোকজন? আমি বললাম, বরং দুর্বল লোকজন।
হিরাকল জিজ্ঞেস করলেন, এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না কমছে?
আমি বললাম, কমছে না; বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হিরাকল বললেন, 'এ দ্বীন গ্রহণের পর কোনো বৃদ্ধ কি বিদ্রোহী হয়ে ধর্মত্যাগ করেছে?
আমি বললাম, না।
হিরাকল বললেন, তিনি যখন থেকে এসব কথা বলছেন, তার পূর্বে কি তাঁকে তোমরা কোনো মিথ্যার সঙ্গে জড়িত দেখেছ?
আমি বললাম, না।
হিরাকল বললেন, তিনি কি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন?
আমি বললাম, না। তবে এখন আমরা তাঁর সঙ্গে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ রয়েছি। এর মধ্যে বেশ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। জানি না, এ ব্যাপারে এরপর তিনি কী করবেন।"
প্রসঙ্গে আবু সুফিয়ান বলেছেন, যেন এ বাক্যটি ছাড়া অন্য কোথাও তাঁর বিপক্ষে কিছু বলার সুযোগ আমি পাইনি।
হিরাকল বললেন, কোনো সময় তাঁর সঙ্গে কি তোমরা যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হয়েছো?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
হিরাকল বললেন, তোমাদের এবং তাঁর যুদ্ধের অবস্থা কিরূপ ছিলো?
আবু সুফিয়ান বললেন, আমাদের ও তাঁর মাঝে যে যুদ্ধ হয়েছিলো তা ছিলো বালতির ন্যায় অর্থাৎ তিনি আমাদের পরাজিত করেছেন এবং আমরা তাঁকে পরাজিত করেছি।
হিরাকল বললেন, তিনি তোমাদেরকে কি ধরনের কথাবার্তা এবং কাজকর্মের নির্দেশ করেন?
আমি বললাম, তিনি আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতে, তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক না করতে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা যা বলতেন, তা ছেড়ে দিতে, নামায কায়েম করতে, সত্যাবাদিতা ও পুণ্যশীল আচরণ করতে এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

এরপর হিরাকল তাঁর দোভাষীকে বললেন, 'তুমি ঐ ব্যক্তিকে (আবু সুফিয়ানকে) বল যে, আমি যখন তোমাকে উক্ত নবীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম তখন তুমি বললে যে, তিনি হচ্ছেন উচ্চবংশোদ্ভূত ব্যক্তি। আর নবীগণ উচ্চ বংশেরই হয়ে থাকেন। একথা তাঁর পূর্বেও কি তোমাদের মধ্যে কেউ বলেছিলো? তুমি উত্তর দিয়েছ 'না'। আমি বলছি যে এর পূর্বে অন্য কেউ যদি একথা বলে থাকত, তাহলে আমি বলতাম যে এ ব্যক্তি এমন এক কথার অনুকরণ করছে, যা এর পূর্বে বলা হয়েছিলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, তাঁর পিতা কিংবা পিতৃব্যের মধ্যে কেউ কি বাদশাহী করেছেন! এর উত্তরে তুমি বলেছ, 'না'। এ প্রসঙ্গে আমি বলছি যে, যদি পিতা কিংবা পিতৃব্যগণের মধ্য হতে কেউ বাদশাহী করেছেন বলে প্রমাণিত হতো, তাহলে বলতাম যে, এ ব্যক্তি তাঁর পিতা কিংবা পিতৃব্যের রাজত্বের দাবিদার হওয়ার প্রেক্ষাপটেই এ কথা বলছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইতোপূর্বে তাকে কি মিথ্যুক বলে দোষারোপ করা হয়েছে? তুমি বললে, না আমি ভালোভাবেই জানি যে, যে লোক মানুষের সঙ্গে মিথ্যাচার করে না সে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, এঁর অনুকরণকারীগণ বিত্তশালী ও প্রভাবশালী লোক না নিম্নবিত্ত ও দুর্বলতর শ্রেণির লোক। তদুত্তরে তুমি বললে, দরিদ্র এবং দুর্বলতর শ্রেণির লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এ শ্রেণির লোকেরাই পয়গম্বরদের অনুসারী হয়ে থাকেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম যেন এ দ্বীনে প্রবেশ করার পর কি কেউ বিরক্ত হয়ে ধর্ম ত্যাগ করে? উত্তরে তুমি বলছো 'না'। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে, দ্বীনে প্রবেশকারী ব্যক্তি ঈমানের আস্বাদ পেয়ে গেলে এরূপই হয়ে থাকে।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন? উত্তরে তুমি বলেছ, 'না'। পয়গম্বরের ব্যাপার এ রকমেই হয়ে থাকে। তিনি কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না।

আমি এ প্রশ্নও করেছিলাম, তিনি কী ধরনের কথা এবং কাজের নির্দেশ প্রদান করেছেন? উত্তরে তুমি বললে, তিনি একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেও শরীক না করার জন্য বলছেন। অধিকন্তু, মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকতে, নামায কায়েম করতে এবং সত্যবাদিতা ও পুণ্যশীলতা অবলম্বন করতে বলছেন।

এ প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে, তাঁর সম্পর্কে তুমি যা কিছু বলেছ তা যদি সঠিক ও সত্য হয়, তাহলে এ ব্যক্তি খুব শীঘ্রই আমার দুই পদতলের জায়গার অধিকার লাভ করবেন। আমার জানা ছিলো, এ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমার ধারণা ছিলো না, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন। যদি নিশ্চিত হতাম যে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে সক্ষম হব, তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কষ্ট স্বীকার করতাম। আর যদি তাঁর নিকটবর্তী হতাম তাহলে তাঁর পদদ্বয় ধৌত করে দিতাম।

এরপর হিরাকল রাসূলের প্রেরিত পত্রখানা চেয়ে নিয়ে পাঠ করলেন। পত্রখানা পাঠ করে যখন শেষ করলেন, তখন সেখানে কিছু কণ্ঠের আওয়াজ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকল এবং শেষ পর্যন্ত খুব শোরগোল সৃষ্টি হয়ে গেল। হিরাকলের নির্দেশে আমাদের তখন সেখান থেকে বের করে দেয়া হলো। আমাদের যখন বাইরে নিয়ে আসা হলো তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, আবু কাবশার। রাসূলের ব্যাপারটি বড়ো শক্তিশালী হয়ে গেল। তার সম্পর্কে তো বানু আসফার (রোমীয়দের) সম্রাট ভয় করছেন। আমার মনে হচ্ছে যে এরপর রাসূল (ﷺ) এর দ্বীন জয়যুক্ত হয়ে যাবে, এমনকি আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলামের স্থান করে দিলেন।

এ কায়সারের ওপর নবীর পত্রের যে প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিলো, তা আবু সুফিয়ান নিজেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। উক্ত পত্র যে কায়সারকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলো তার দ্বিতীয় প্রমাণ হচ্ছে যে, এর প্রভাবে তিনি রাসূল (ﷺ) এর দূত দাহইয়া কালবী (রা) কে অর্থ সম্পদ এবং মূল্যবান পোষাক দ্বারা পুরস্কৃত করেছিলেন। কিন্তু দাহইয়া কালবী (রা) যখন এ সকল উপঢৌকনসহ প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন হুসমা নামক স্থানে জোযাম গোত্রের কিছু লোক তাঁর কাছ থেকে সব কিছু লুট পাট করে নিয়ে যায়। দাহইয়া মদিনা প্রত্যাবর্তনের পর নিজ গৃহে না গিয়ে নবীর কাছে যান এবং নবীকে সব কিছু অবহিত করেন।

ঘটনা সবিস্তারে অবগত হয়ে রাসূল যায়েদ বিন হারেসা (রা) এর নেতৃত্বাধীনে পাঁচ শত সাহাবার একটি দলকে হুসমা অভিমুখে প্রেরণ করেন। যায়েদ (রা) রাত্রিবেলা অতর্কিত জোযাম গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের কিছু লোককে হত্যা করেন এবং বেশ কিছু গবাদি পশু ও মহিলাকে আটক করে নিয়ে আসেন। গবাদি পশুর মধ্যে ছিলো এক হাজার উট ও পাঁচ হাজার ছাগল। আটককৃতদের মধ্যে ছিলো এক শত মহিলা এবং শিশু।

যেহেতু নবী করীম (ﷺ) এবং জুযাম গোত্রের মধ্যে পূর্ব হতেই সন্ধিচুক্তি বলবৎ ছিলো, সেহেতু উক্ত গোত্রের অন্যতম নেতা যায়েদ বিন রেফায়া জোযামী কালবিলম্ব না করে নবী সমীপে উপস্থিত হয়ে বাদানুবাদ ও বিতর্কে লিপ্ত হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ করলেন। উক্ত গোত্রের কিছু লোকজনসহ যায়েদ বিন রেফায়া পূর্বেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে দাহইয়া কালবী যখন ডাকাত দলের কবলে পতিত হন, তখন তিনি তাকে সাহায্যও করেছিলেন। এ কারণেই রাসূল তাঁর প্রতিবাদ গ্রহণপূর্বক গণীমতের সম্পদাদি এবং আটকৃতদের ফেরৎ দেন।

মুনযির বিন সাভীর নামে পত্র

মুনযির বিন সাভী ছিলেন বাহরাইনের গভর্নর। ইসলামের দাওয়াত প্রদানপূর্বক নবী করীম (ﷺ) তাঁর নিকট একটি পত্র পেরণ করেন। পত্রখানা বহন করেন আলা ইবনে হাযরামী (রা)।

পত্র পাওয়ার পর মুনযির রাসূল (ﷺ) এ মর্মে উত্তর প্রদান করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পত্রখানা আমি বাহরাইনবাসীকে পাঠ করে শুনিয়ে দিলাম। কিছু লোক ইসলামের ভালোবাসা এবং পবিত্রতার মনোভাব ব্যক্ত করে তার সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করল। কিছু কিছু লোক বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমার অধীনে ইহুদি এবং অগ্নিউপাসকও আছে। অতএব এ ব্যাপারে আপনি আপনার নিজস্ব কর্ম প্রক্রিয়া অবলম্বন করুন।

প্রত্যুত্তরে রাসূলে করীম তাঁকে এ পত্র লিখলেন,

বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম।"
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে মুনযির বিন সাভীর নিকট পত্র- আপনার প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। সর্বপ্রথমে আমি ঐ আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করছি, যিনি ব্যতীত অন্য কেউ প্রশংসা কিংবা উপাসনার উপযুক্ত নয়। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা এবং প্রেরিত রাসূল।
অতঃপর আমি তোমাদেরক আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। এটা অবশ্যই স্মরণ থাকা প্রয়োজন যে, যে ব্যক্তি সৌজন্য প্রদর্শন করবে এবং পূণ্য অর্জন করবে, সে নিজের উপকারার্থেই তা করবে এবং যে ব্যক্তি আমার প্রতিনিধির অনুকরণ ও তাঁর নির্দেশাবলির আনুগত্য করবে সে যেন আমারই আনুগত্য করবে। যে তাঁর সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করবে সে যেন আমারই সঙ্গে তা করল। আমার প্রতিনিধিরা আপনার প্রশংসা করেছে এবং আপনার জাতি সম্পর্কে আমি আপনার সুপারিশ গ্রহণ করেছি। অতএব, মুসলমানরা যে অবস্থার মধ্যে ঈমান এনেছে তাদেরকে সেই অবস্থার মধ্যে ছেড়ে দিন। আমি অপরাধীদের অপরাধ মাফ করে দিয়েছি। অতএব, তাদেরকে গ্রহণ করে নিন এবং যতক্ষণ আপনি সংশোধনের পথ অবলম্বন করে থাকবেন, আমরা আপনাদের কার্য হতে অপসারিত করব না। তবে যারা ইহুদি ধর্ম অথবা অগ্নিপূজার ওপর বিদ্যমান থাকবে। তাদের ওপর (জিজিয়া) কর প্রয়োজ্য হবে।

ইয়ামামা প্রধান হাওযা বিন আলীর নিকট পত্র

নবী করীম (ﷺ) ইয়ামামার গর্ভনর হাওযা বিন আলীর নিকট যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন তা নিয়ে লিপিবন্ধ করা হলো।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে হাওযা বিন আলীর প্রতি- সেই ব্যক্তির ওপর শান্তি বর্ষিত হোক যে হেদায়েতের অনুসরণ করে। আপনাদের জানা উচিত যে, আমার দ্বীন উট এবং ঘোড়াগুলোর উপস্থিতির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করবে। অতএব, ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। আপনার অধীনস্ত যা কিছু আছে, তা আপনার জন্য স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখব।"

উক্ত পত্রখানা বহনের জন্য দূত হিসেবে সালীত বিন আমর আমেরী (রা) কে মনোনীত করা হয়। সালীত (রা) উক্ত মোহরাঙ্কিত পত্রখানা নিয়ে হাওযার নিকট গমন করেন। হাওযা তাঁকে যথেষ্ট আদর আপ্যয়ন ও আতিথ্য করেন। সালীত (রা) তাঁকে পত্রখানা পাঠ করে শুনান।

অতঃপর হাওযা রাসূলের প্রতি লিখলেন, "আপনি যে বিষয়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, তার উৎকর্ষতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসার কিছুই নাই, এই ব্যাপারে আমার অন্তরে যথেষ্ট ভয়-ভীতির সঞ্চার হয়েছে এবং আমি কিছু খিদমত প্রদানের মনস্থ করেছি। অতএব আমার ওপর কিছু কাজ-কর্মের দায়িত্ব অর্পণ করা হলে আমি আপনার আনুগত্য করার জন্য প্রস্তুত আছি। তিনি সালীতকে অনেক উপটোকনও প্রদান করেন। তাঁকে হিজরের তৈরি কাপড় চোপড়ও প্রদান করেন। সালীত উপঢৌকনসহ মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে নবীর কাছে উপস্থিত হন এবং সব কিছু সম্পর্কে অবহিত করেন।

নবী করীম (ﷺ) কে পত্রখানা পাঠ করে শোনানো হলে তিনি বললেন, "যদি সে জমিনের একটি অংশও আমার নিকট থেকে চায়, তবুও আমি তাকে তা দেব না। সে নিজে ধ্বংস হবে এবং তার হাতে যা কিছু আছে সবাই ধ্বংস হবে।" অতঃপর যখন রাসূল মক্কা বিজয়ের পর প্রত্যাবর্তন করেন তখন জিবরাঈল (আ) এই সংবাদ প্রদান করেন যে, হাওযার মৃত্যু হয়েছে।

নবী করীম (ﷺ) বললেন, "শোন! ইয়ামামায় একজন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে, যাকে আমার পর হত্যা করা হবে।"

একজন বলে উঠলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! তাকে কে হত্যা করবে? রাসূল বললেন, "তুমিও তোমার সাথি।" বাস্তবিকপক্ষে তাই হয়েছিলো।

দামেসকের গভর্নর হারেস বিন আবি শামির গাসসানীর নামে পত্র

নবী করীম (ﷺ) তাঁর নিকট যে পত্র লিখেছিলেন, তার বিষয়বস্তু নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
"আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ হতে হারেস বিন আবু শামির গাসসানীর প্রতি। সেই ব্যক্তির ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, যে ঈমান এনেছে, বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং হেদায়েতের অনুসরণ করে। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, সেই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন, যিনি একক এবং অদ্বিতীয়। যার কোনোই অংশীদার নেই এবং যিনিই একমাত্র উপাসনার উপযুক্ত। ইসলামের দাওয়াত কবুল করুন, আপনাদের জন্য আপনাদের রাজত্ব স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।"

এই পত্র পেরণ করা হয় আসাদ বিন খোযায়মা গোত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাহাবি শোজা বিন অহাব (রা) এর হাতে। যখন তিনি এই পত্রখানা হারেসের হাতে সমর্পণ করেন। তখন সে বলল, "আমার রাজত্ব কে ছিনিয়ে নিতে পারে? আমি তার ওপর আক্রমণ পরিচালনা করব।" সে ইসলাম গ্রহণ করেনি।

আম্মানের সম্রাটের নামে পত্র

রাসূল (ﷺ) আম্মানের সম্রাট জাইফার এবং তাঁর ভাই আবদের নামে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তাদের পিতার নাম ছিলো ফুলান্দাহ। পত্রের বিষয়বস্তু ছিলো নিম্নরূপ-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ পক্ষ হতে ফুলান্দাহর দুই পুত্র জাইফার এবং আবদের নামে। শান্তি বর্ষিত হোক সেই ব্যক্তির ওপর, যিনি হেদায়েতের অনুসরণ করে চলেন। অতঃপর আমি আপনাদের দুইজনকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বমানবের নিকট প্রেরিত হয়েছি, যাতে জীবিত ব্যক্তিদের শেষ পরিণতির বিভীষিকা হতে সতর্ক করে দিই এবং কাফিরদের ওপর আল্লাহর কথা সত্য প্রমাণিত হয়। যদি আপনারা দুজন ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেন, তবে আপনাদেরকেই শাসক এবং গভর্নর নিযুক্ত করে দেব। কিন্তু আপনারা যদি ইসলামের দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে আপনাদের রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। আপনাদের রাজত্বে অশ্বারোহী সৈন্যদের আক্রমণ পরিচালিত হবে এবং আপনাদের রাজত্বের ওপর আমার নবুয়ত জয়যুক্ত হবে।

উক্ত পত্র বহনের জন্য প্রতিনিধি হিসেবে আমর বিন আসকে মনোনীত করা হয়। তিনি বর্ণনা করেছেন, "মদিনা থেকে যাত্রা করে আমি আম্মানে গিয়ে পৌঁছি এবং আবদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনিই অধিক দূরদর্শী এবং কোমল স্বভাবের ছিলেন। আমি বললাম, আমি আপনার এবং আপনার ভাইয়ের নিকট রাসূলের প্রতিনিধি হিসেবে আগমন করেছি।" তিনি বললেন, বংশ এবং রাজত্ব উভয় দিক দিয়েই আমার ভাই আমার চাইতে বড়ো এবং আমার ঊর্ধ্বতন। এ কারণে আমি আপনাকে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিচ্ছি যেন তিনি আপনার পত্রখানা পাঠ করেন।

অতঃপর তিনি বললেন, "বেশ! আপনি কোন কথার দাওয়াত দিচ্ছেন?"

আমি বললাম, "আমরা এক আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যিনি একক এবং অদ্বিতীয়, যাঁর কোনোই অংশীদার নেই, যিনি ব্যতীত আর কেউই উপাসনার উপযুক্ত নয়। আমরা বলছি যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের উপাসনা করা হচ্ছে তাদের পরিত্যাগ করুন এবং সাক্ষ্য প্রদান করুন, 'মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও প্রেরিত পুরুষ।"

আবদ বললেন, 'হে আমর! আপনি নিজ সম্প্রদায়ের নেতার পুত্র। বলুন আপনার পিতা কী কী করেছেন? কারণ, তাঁরা তো মুহাম্মদ এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন ছাড়াই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। কিন্তু আমার দুঃখ এই যে, যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন এবং রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতেন, তাহলে কতই না ভালো হতো। আমিও পূর্বে তাঁর মতোই ছিলাম।

কিন্তু আল্লাহ আমার প্রতি ইসলামের হেদায়েত প্রদান করেছেন।"
আবদ বললেন, "আপনি কখন তার আনুগত্য স্বীকার করেছেন?
আমি বললাম, অল্প কিছু দিন হলো।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন?
আমি বললাম, নাজ্জাশীর নিকট। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আবদ জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর সম্প্রদায় ও সাম্রাজ্যের লোকেরা কী করল?
আমি বললাম, তাঁকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত রেখে তাঁর আনুগত্য করে। তিনি বললেন, মন্ত্রী পরিষদ, রাহেবগণও কি আনুগত্য করেছে?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ।
আবদ বললেন, হে আমর! এ কী বললেন! কারণ, মানুষের কোনো অভ্যাস মিথ্যার চাইতে অপমানজনক আর কিছুই নেই।
আমি বললাম, আমি মিথ্যা বলছি না, আমরা মিথ্যা বলা বৈধ মনে করি না।
আবদ বললেন, "আমি মনে করছি, হিরাকল নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণের খবর জানেন না।"
আমি বললাম, কেন নয়?"
আবদ বললেন, আপনি একথা কীভাবে জানলেন?"
আমি বললাম, "নাজ্জাশী হিরাকলকে কর দিতেন। কিন্তু যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেন তখন বললেন, 'আল্লাহর কসম! এখন যদি তিনি আমার নিকট একটি টাকাও চান, তবুও আমি তা দেব না।"

হিরাকল যখন এই সংবাদ অবগত হলেন, তখন তাঁর ভাই ইয়ানাকে বললেন, ‘আপনার দাস যদি আপনাকে টাকা না দেয় তাহলে কি আপনি তাকে ছেড়ে দেবেন? তাছাড়া, সে যদি আপনার পরিবর্তে অন্য এক জনের দ্বীন অবলম্বন করে? হিরাক্বল বললেন, ‘এ ব্যক্তি যিনি এক নতুন দ্বীন পছন্দ করেছেন এবং নিজের জন্য তা অবলম্বন করেছেন। এখন আমি তার কী করতে পারি? আল্লাহর কসম! যদি আমার নিজের রাজত্বের লোভ না থাকত তাহলে তিনি যা করেছেন আমিও তাই করতাম।’

আবদ বললেন, "আমর দেখুন! আপনি কী বলছেন?"

আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে সত্যই বলছি। আবদ বললেন, ভালো, তাহলে আমাকে বলুন, "তিনি কোন কথা কিংবা কাজের নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং কোন কথা কিংবা কাজ থেকে নিষেধ করছেন?"

আমি বললাম, 'মহিমান্বিত আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছেন এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করছেন, সৎ ব্যবহার এবং আত্মীয়তা সম্পর্ক স্থাপনের নির্দেশ প্রদান করছেন। অন্যায়, অনাচার, ব্যভিচার, মদ্যপান, প্রস্তরমূর্তি এবং ক্রুশের আরাধনা বা উপাসনা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিচ্ছেন।'

আবদ বললেন, "যে সব কথার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন তা কতই না উত্তম! যদি আমার ভাইও এই কথার উপর অনুসরণ করত তাহলে যানবাহনে চড়ে যাত্রা করতাম। এমন কি মুহাম্মদ (ﷺ) এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতাম এবং সত্যায়ন করতাম। কিন্তু আমার ভাইয়ের রাজত্বের মোহ এতই বেশি যে, কিছুতেই কারো অধীনতা স্বীকার করতে তিনি রাজী নন।"

আমি বললাম, 'যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে তবে রাসূলে করীম তাঁর সম্প্রদায়ের ওপর তাঁর রাজত্ব স্থায়ী করে দেবেন এবং তাদের যারা সম্পদশালী তাদের নিকট থেকে সদকা গ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে তা বন্টন করে দেবেন।'

আবদ বললেন, 'এ তো বড়ো ভালো কথা। আচ্ছা বল তো সদকা কী?" প্রত্যুত্তরে আমি সম্পদশালীদের বিভিন্ন সম্পদের মধ্য থেকে আল্লাহর রাসূল কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণ বের করে নিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের ব্যাপারটিকে যে সদকা বলা হয়, সে প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। যখন উটের প্রসঙ্গ এল তখন তিনি বললেন, হে আমর! আমাদের সেই চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে থেকেও কি সদকা দিতে হবে, যা নিজেই বিচরণ করতে থাকে? আমি বললাম, "হ্যাঁ"।

আবদ বললেন, "আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় না, আমার সম্প্রদায় স্বীয় রাজত্বের প্রশস্ততা এবং সংখ্যাধিক্যতা সত্ত্বেও এটা মেনে নেবেন।"

আমর বিন আসের বর্ণনায় আছে যে, "আমি তাঁর বারান্দায় কয়েক দিন অবস্থান করলাম তিনি তাঁর ভাইয়ের নিকট গিয়ে আমার সকল কথা ব্যক্ত করলেন। অতঃপর একদিন তিনি আমাকে তাঁর নিকট ডেকে পাঠালেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলে প্রহরীগণ আমার বাহু ধরে বসল। তিনি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। আমাকে ছেড়ে দেয়া হলো। আমি বসতে চাইলাম, কিন্তু প্রহরীরা আমাকে বসতে দিল না। আমি সম্রাটের দিকে তাকালে তিনি বললেন, "আপনার কথা বলুন" আমি তখন মোহরকৃত পত্রখানা তাঁর হস্তে সমর্পণ করলাম।

তিনি সীলমোহর খুলে পত্রখানা পাঠ করলেন। পাঠ শেষ হলে পত্রখানা তিনি তার ভাইয়ের হাতে দিলেন। তাঁর ভাইও তা পাঠ করলেন। এই প্রসঙ্গে আমি লক্ষ করলাম, সম্রাটের তুলনায় তাঁর ভাই ছিলেন অধিক মাত্রায় কোমল স্বভাবের।

সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, "আমাকে বল কুরাইশরা কিরূপ আচরণ অবলম্বন করেছে?

আমি বললাম, সকলেই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছে, কেউ কেউ আল্লাহর দ্বীনের প্রতি উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত হয়ে এবং অন্যেরা তরবারীর দ্বারা পরাভূত হয়ে।"

সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর সঙ্গে কেমন লোকেরা আছে?

আমি বললাম, "ঐ সকল লোকেরা আছেন, যাঁরা পূর্ণ সন্তুষ্টির সঙ্গে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং সব কিছুর ওপর একে প্রাধান্য দিয়েছেন। আমি জানি না, এতদঞ্চলে এখন আপনি ছাড়া আর অন্য কেউ দ্বীনের বাইরে অবশিষ্ট আছে কি না। আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ পূর্বক মুহাম্মদ (ﷺ) এর আনুগত্য না করেন তাহলে অশ্বারোহী বাহিনী আপনাকে পদদলিত করবে এবং আপনাদের সজীবতাকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। ইসলাম গ্রহণ করুন নিরাপদে থাকবেন এবং রাসূল আপনাকেই আপনার কওমের শাসক নিযুক্ত করবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে কোনো অশ্বারোহী কিংবা পদাতিক সৈন্য আপনার এলাকায় প্রবেশ করবে না।"

সম্রাট বললেন, "আমাকে একটু চিন্তা ভাবনা করার সময় দাও। আগামীকাল আবার এসো।" অতঃপর আমি তাঁর ভাইয়ের নিকট আবার ফিরে গেলাম।

তিনি বললেন, "আমর! আমার আশা হচ্ছে, যদি রাজত্বের লোভ জয়ী না হয় তাহলে সে ইসলাম গ্রহণ করে নেবে।"

আমর বিন আস (রা) বলছেন, "দ্বিতীয় দিনে পুনরায় সম্রাটের নিকট গেলাম। কিন্তু তিনি অনুমতি প্রদানে অস্বীকার করলেন। এ কারণে আমি তাঁর ভাইয়ের নিকট ফিরে গিয়ে বললাম যে, সম্রাটের সাক্ষাৎ লাভ আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। উক্ত প্রেক্ষিতে তাঁর ভাই আমাকে তাঁর নিকট পৌঁছিয়ে দিলেন।"

তিনি বললেন, "তোমার দাওয়াতের ব্যাপারে আমি চিন্তা-ভাবনা করেছি। যদি আমার রাজত্ব এমন এক ব্যক্তির নিকট সমর্পণ করে দিই, যার নিপুণ অশ্বারোহী এখানে পৌঁছেনি, তখন আমি আরবের মধ্যে সব চাইতে দুর্বল ব্যক্তিত্বে পরিণত হব। পক্ষান্তরে, যদি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী এখানে পৌঁছে যায় এমন এক সংগ্রাম আরম্ভ হয়ে যাবে যেমনটি ইতিপূর্বে তাঁদের সঙ্গে আর কখনোই হয়নি।"

আমি বললাম, "আচ্ছা তাহলে আগামীকাল আমি ফেরৎ চলে যাচ্ছি।" যখন আমার ফেরৎ যাওয়ার ব্যাপারটি তাঁদের মনে একটি স্থির বিশ্বাসের সৃষ্টি করল, তখন তিনি তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করলেন এবং বললেন, "এই পয়গম্বর যাঁদের ওপর বিজয়ী হয়েছেন, তাঁদের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে আমাদের তেমন কোনো স্থানই নেই। অধিকন্তু তিনি যাঁদের নিকট দাওয়াত প্রেরণ করেছেন তাঁরা সকলেই সে দাওয়াত গ্রহণও করে নিয়েছেন।"

অতএব, পরবর্তী দিন সকালে তাঁরা পুনরায় আমাকে আহ্বান জানালেন। আমি সেখানে উপস্থিত হলে সম্রাট এবং তাঁর ভাই উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং নবী করীম (ﷺ) এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন। সদকা গ্রহণ করা এবং লোকজনের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য আমাকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিলেন এবং আমার বিরুদ্ধচারীদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারী ভূমিকা অবলম্বন করলেন।

উপরি-উল্লিখিত পত্রসমূহের মাধ্যমে নবী করীম (ﷺ) পৃথিবীর অধিকাংশ রাজা বাদশাহদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন, কেউ কেউ অস্বীকারও করেছিলেন। কিন্তু এর ফলে এই সুবিধাটুকু হলো যে, যারা দ্বীন অস্বীকার করল, তারাও এই ব্যাপারে মনোযোগী হলো এবং রাসূল (ﷺ) এর নাম ও রাসূলের প্রচারিত দ্বীন তাদের নিকট বেশ পরিচিত হয়ে উঠল।

হুদায়বিয়ার পরে যুদ্ধ প্রস্তুতি

গা-বা যুদ্ধ অথবা যী কারাদ যুদ্ধ

প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ ছিলো বনু ফাযারার একটি দলের বিরুদ্ধে। এরা রাসূলে করীম এর গৃহপালিত পশু লুটপাট করে নিয়ে যাওয়ার কারণে এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিলো। হুদায়বিয়ার পরে এবং খায়বারের পূর্বে এটিই ছিলো একমাত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। ইমাম বুখারি (রা) এই পর্বটি নির্ধারণ করে বলেন যে, খায়বারের মাত্র তিনিদিন পূর্বে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো।

উক্ত যুদ্ধের সেরা বীর সালমা বিন আকওয়া (রা) হতে যে সকল বর্ণনা পাওয়া যায়, তাঁর সারাংশ হচ্ছে, নবী করীম (ﷺ) তাঁর সওয়ারীর উট চারণের উদ্দেশ্যে স্বীয় দাস রোবাহর তত্ত্বাবধানে চারণভূমিতে পাঠিয়েছেন। আবু তালহা ও আমি ঘোড়াসহ তাঁর সঙ্গে ছিলাম। সকাল নাগাদ আকস্মিকভাবে আঃ রহমান ফাযারী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে রাখালকে হত্যা করার পর পশুপাল নিয়ে পলায়ন করে। আমি বললাম, 'রোবাহর এই ঘোড়া নাও, তুমি একে তালহার নিকট পৌঁছে দেবে এবং রাসূলকে এই দুর্ঘটনার সংবাদ দেবে।' অতঃপর আমি একটি ছোট পাহাড়ের ওপর গিয়ে দাঁড়াই এবং মদিনামুখী হয়ে তিন বার চিৎকার করি, হায় প্রাতঃকালীন আক্রমণ! এরপর আক্রমণকারীদের পিছনে পিছনে আমি অগ্রসর হতে থাকি। এই পর্যায়ে তাঁদের ওপর তীর নিক্ষেপ করতে করতে এই চরণটি আবৃত্তি করতে থাকি-

অদ্য জানা যাবে, কে নিজ মায়ের দুধ পান করেছে।

সালমা বিন আকওয়া বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি অবিরাম তীর নিক্ষেপের দ্বারা তাদের ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকি। যখন কোনো অশ্বারোহী আমাকে লক্ষ করে ফিরে আসত তখন আমি কোনো গাছের আড়ালে বসে গা ঢাকা দিতাম। যতক্ষণ তারা পর্বতের সংকীর্ণ রাস্তায় প্রবেশ না করল ততক্ষণ আমি একই ধারায় কাজ করে গেলাম। কিন্তু যখন তারা পর্বতের সংকীর্ণ রাস্তায় প্রবেশ করল, তখন আমি পর্বতের ওপর উঠে গেলাম এবং পাথর ছুড়ে ছুড়ে তাঁদের অগ্রগতি সম্পর্কে আঁচ করতে থাকলাম। যে পর্যন্ত না রাসূলের উটগুলো তারা তাদের পিছনে ছেড়ে না দিল, সে পর্যন্ত আমি একই ধারায় কাজ করে চললাম। তারা রাসূল (ﷺ) এর উটগুলো ছেড়ে দিলেও আমি তাদের পিছু ধাওয়া অব্যাহত রেখে তীর চুড়তে থাকলাম। তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাকল। তাদের গতির মাত্রা ঠিক রাখার প্রয়োজনে বোঝা হালকা করতে ত্রিশেরও অধিক চাদার এবং বর্শা তারা ফেলে দেয়। যে সকল জিনিস তারা ফেলে যাচ্ছিল চিহ্নস্বরূপ সে সবের ওপর আমি পাথর চাপা দিয়ে রাখছিলাম। উদ্দেশ্যে ছিলো রাসূলে করীম এবং তাঁর সঙ্গীগণ যেন চিনতে পারেন যে এগুলো হচ্ছে শত্রুদের নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়া সম্পদ।

এরপর মাটির একটি সংকীর্ণ মোড়ে বসে তারা দুপুরের খাবার খেতে লাগল। আমি একটি চূড়ার ওপরে গিয়ে বসলাম। আমাকে এই অবস্থায় দেখে তাদের মধ্যে থেকে চার জন লোক পর্বতের ওপর উঠে আমার দিকে আসতে থাকল। যখন তারা একটুকু নিকটে এসে গেল, যাতে আমার কথা শুনতে পারে তখন আমি বললাম, "তোমরা কি আমাকে চেন? আমার নাম সালামা বিন আকওয়া। তোমাদের মধ্য হতে যার পিছনে আমি ধাওয়া করব তাকে খুব সহজেই নাগালের মধ্যে পেয়ে যাব। কিন্তু তোমাদের মধ্য থেকে কেউ আমার পিছু ধাওয়া করলে কখনই আমার নাগাল পাবে না।

আমার এ কথা শোনার পর তারা চার জনই ফিরে গেল। আমি কিন্তু আমার জায়গাতেই রয়ে গেলাম। আমি সেখানেই অপেক্ষমান থাকলাম যে পর্যন্ত না রাসূলের অশ্বারোহীদের বৃক্ষসারির মধ্যে অগ্রসরমান অবস্থায় দেখতে পেলাম। সকলের অগ্রভাগে ছিলেন আখরাম, তাঁর পিছনে ছিলেন আবু কাতাদা এবং তাঁর পিছনে ছিলেন মিকদাদ বিন আওয়াদ। ঘটনাস্থলে পৌঁছেই আব্দুর রহমান ও আখরামের টক্কর লাগে। আখরাম আব্দুল রহমানের ঘোড়াকে আঘাত করলে তা আহত হয়। কিন্তু আব্দুর রহমান বর্শা নিক্ষেপ করে আখরামকে শহীদ করে দেয় এবং তাঁর ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে। ঠিক এমনি সময়ে আবু কাতাদা বর্শা দ্বারা আব্দুর রহমানকে আঘাত করেন। এই আঘাতের ফলে সে আহত হয়। অন্যেরা পশ্চাদপসরণ করে পালিয়ে যায়। আমরা তাদের অনুসরণ করে অগ্রসর হতে থাকি। আমি আমার পায়ের ভরে লাফ দিয়ে দিয়ে চলছিলাম। সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে তারা একটি ঘাঁটি অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে যেখানে ছিলো যীকারাদ নামে একটি ঝর্ণা। তাঁরা পিপাসার্ত থাকার কারণে সেখানে পানি পান করার ইচ্ছা করেছিলো। কিন্তু আমি তাদেরকে ঝর্ণা থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করার ফলে তাঁরা এক ফোঁটাও পানি পান করতে সক্ষম হয়নি। রাসূলে করীম এবং অশ্বারোহী সাহাবায়ে কেরাম (রা) আমার নিকট পৌঁছেন সূর্যাস্তের পর।

আমি আবেদন করলাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! তারা পিপাসার্ত। যদি আপনাকে আমার সঙ্গে এক শত লোক দেন তাহলে আমি পালানসহ তাদের ঘোড়াগুলো ছিনিয়ে আনতে পারি এবং তাদের গলা ধারণপূর্বক আপনার দরবারে তাদের হাজির করে দিতে পারি।

রাসূল (ﷺ) বললেন, "আকওয়ার পুত্র! তুমি অনেক করেছ। এখন একটু ক্ষান্ত হও। এ সময় বনু গাতফানে তাদের আপ্যায়িত করা হচ্ছে।"

রাসূল উক্ত যুদ্ধের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে বললেন, "আজকে আমাদের সব চাইতে উত্তম, অশ্বারোহী আবু কাতাদা এবং উত্তম পদাতিক সৈন্য সালমা বিন আকওয়া"

সালমা বলেন, "যুদ্ধলব্ধ অর্থ হতে রাসূল আমাকে দুই অংশ প্রদান করেন। এক অংশ পদাতিক হিসেবে এবং অন্য অংশ অশ্বারোহী হিসেবে। অধিকন্তু, মদিনা প্রত্যাবর্তনের পথে আমাকে (সম্মানের নিদর্শনস্বরূপ) তাঁর আযবা নামক উটের ওপর নিজের পিছনে আরোহণ করিয়ে নেন।"

উক্ত ঘটনার সময় রাসূল মদিনার পরিচালনা ভার ইবনে উম্মে মাকতুমের ওপর অর্পণ করেছিলেন এবং পতাকা বহনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন মেকদাদ বিন আমরের ওপর।

খায়বার ও ওয়াদিল কোরা যুদ্ধ (মুহাররম, ৭ম হিজরি)

খায়বার ছিলো মদিনার উত্তরে আশি কিংবা ষাট মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি বড়ো শহর। যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন সেখানে একটি দুর্গ ছিলো এবং চাষাবাদেরও ব্যবস্থা ছিলো বর্তমানে সেটি একটি জনবসতি এলাকায় পরিণত হয়েছে। এখানকার আবহাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য তেমন উপযোগী নয়।

হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে রাসূল (ﷺ) যখন আহযাব যুদ্ধের তিনটি শক্তির মধ্যে সব চাইতে শক্তিশালী দল কুরাইশদের শত্রুতা থেকে মুসলমানদের নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে করলেন, তখন তিনি অন্য দুটি শক্তি ইহুদি ও নাজদসহ অন্য গোত্রসমূহের সঙ্গেও একটি সমঝোতায় আসার চিন্তা-ভাবনা করতে থাকলেন। উদ্দেশ্যে ছিলো এই সকল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে শত্রুতা ও বৈরীভাব পরিহারের মাধ্যমে মুসলমানদের শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন যাপন এবং ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কার্যে অধিক পরিমাণে আত্মনিয়োগ।

যেহেতু খায়বার ছিলো বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকারী ও কোন্দলকারীদের আড্ডা সৈনিক মহাড়ার কেন্দ্র এবং প্ররোচনা, প্রবঞ্চনা ও যুদ্ধের দাবানল সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। সেহেতু এ স্থানটিই সর্বাগ্রে মুসলমানদের মনোযোগ দানের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিলো। এ প্রসঙ্গে এখন একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, খায়বার সম্পর্কে মুসলমানদের যে ধারণা তা যথার্থ ছিলো কি না। এই ব্যাপারে মুসলমানদের ধারণা যে যথার্থ ছিলো, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কারণ এই খায়বারবাসীই খন্দক যুদ্ধে মুশরিক শক্তিগুলোকে সংগঠিত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে সাহায্য এবং উৎসাহিত করেছিলো। তাছাড়া, মুসলামানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য এরাই বনু কুরাইযাকে সর্বতোভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। অধিকন্তু, এরাই তো ইসলামি সমাজের পঞ্চম শ্রেণিভুক্ত মুনাফিকদের সঙ্গে, আহযাব যুদ্ধের তৃতীয় শক্তি বনু গাতফান এবং বেদুঈনদের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রেখে চলছিলো এবং নিজেরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো। তারা তাদের এই সমস্ত কার্যকলাপের মাধ্যমে মুসলমানদের একটা চরম অস্বস্তিকর অবস্থা ও অগ্নি পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত করেছিলো। এমনকি নবী করীম (ﷺ) কেও হত্যার ষড়যন্ত্র তারা করেছিলো। এই সমস্ত অস্বস্তিকর অবস্থার প্রেক্ষাপটে অনন্যোপায় হয়ে মুসলমানেরা বার বার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ সকল যুদ্ধের মাধ্যমে কোন্দল সৃষ্টিকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা ও পরিচালক সালাম বিন আবিল হুকাইক এবং আসিম বিন যারেমকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ল। অথচ শত্রু মনোভাবাপন্ন ইহুদিদের শায়েস্তা করার ব্যাপারটি মুসলমানদের জন্য ততোধিক প্রয়োজনীয় ছিলো।

কিন্তু এই ব্যাপারে যথাযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ মুসলমানরা যে কারণে বিলম্ব করেছিলেন তা হচ্ছে এই যে, কুরাইশ মুশরিকরা ইহুদিদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, যুদ্ধাভিজ্ঞ ও উদ্ধত ছিলো এবং শক্তি সামর্থে মুসলমানদের সমকক্ষ ছিলো। কাজেই কুরাইশদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পূর্বে ইহুদিদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে শক্তি ও সম্পদ ক্ষয় করা নবী করীম সঙ্গত মনে করেননি। কিন্তু কুরাইশদের সঙ্গে যখন একটা সমঝোতায় আসা সম্ভব হলো, তখন ইহুদিদের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়ার অবকাশ তিনি লাভ করলেন এবং তাদের হিসাব নেয়ার জন্য ময়দান পরিষ্কার হয়ে গেল।

খায়বার অভিমুখে যাত্রা

ইবনে ইসহাক সূত্রে জানা যায়, হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলে করীম পুরো যিলহাজ্জ মাস এবং মুহাররম মাসের কয়েক দিন মদীনায় অবস্থান করেন। অতঃপর মুহাররম মাসেই শেষভাগে কোনো এক সময়ে খায়বার অভিমুখে যাত্রা করেন। মুফাসসিরদের বর্ণনা মতে খায়বারের ব্যাপারে আল্লাহর যে ওয়াদা ছিলো তা কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে যে,

"আল্লাহ তোমাদেরকে গণীমত হিসেবে অনেক সম্পদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যা তোমরা অর্জন করবে, তাই তোমাদের জন্য তিনি এটা ত্বরান্বিত করলেন।" (সূরা ফাতহ: আয়াত ২০)

এর অর্থ ছিলো হুদায়বিয়ার সন্ধি এবং অনেক গণীমতের সম্পদ এর অর্থ ছিলো খায়বার প্রসঙ্গ।

মুসলিম সৈন্যের সংখ্যা

যেহেতু মুনাফিকগণ এবং দুর্বল প্রকৃতির মুসলমানগণ হুদায়বিয়ার সফর হতে বিরত থেকে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গ লাভের পরিবর্তে নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করেছিলো, সেজন্য আল্লাহ নবীকে (আ) তাদের সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করে বললেন-

তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহে উদ্যোগী হবে তখন পিছনে যারা পড়েছিল অচিরেই তারা বলবে, ‘আমাদেরকে তোমাদের অনুসরণ করতে দাও।’ তারা আল্লাহর বাণী পরিবর্তন করতে চায়। বল, ‘তোমরা কখনো আমাদের অনুসরণ করবে না; আল্লাহ আগেই এমনটি বলেছেন।’ অতঃপর অচিরেই তারা বলবে, ‘বরং তোমরা হিংসা করছ।’ বরং তারা খুব কমই বুঝে। (সূরা ফাতহ: আয়াত ১৫)

কাজেই রাসূলে করীম যখন খায়বার অভিযানের কথা ঘোষণা করলেন তখন ইরশাদ করলেন যে, এই অভিযান শুধু সে সকল ব্যক্তিই অংশগ্রহণ করতে পারবেন, যাঁরা প্রকৃতই জিহাদের জন্য আগ্রহী। উক্ত ঘোষণার ফলে তাঁর সঙ্গে শুধু সেই সকল লোকই যাওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন যাঁরা হুদায়বিয়ার বৃক্ষের নিচে বাইয়াতে রিযওয়ানের শরীক হয়েছিলেন। তাঁরা সংখ্যায় ছিলেন মাত্র চৌদ্দশত (১৪০০) জন।

উক্ত যুদ্ধ চলাকালে মদিনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় সেবা বিন আরফাতা গিফারীর ওপর।

ঐ সময়ে আবু হুরায়রা (রা) ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় আগমন করেছিলেন। সে সময় সেবা বিন আরফাতা ফজরের জামায়াতে ইমামতি করছিলেন। নামায সমাপ্ত হলে আবু হুরায়রা (রা) তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁর সাথে খায়বার অভিমুখে যাত্রা করলেন। তিনি যখন নববীতে উপস্থিত হলেন তখন খায়বার বিজয়পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। রাসূলে করীম সাহাবায়ে কিরামের (রা) সঙ্গে আলোচনা করে আবু হুরায়রা এবং তাঁর বন্ধুদের কেও গণীমতের অংশ প্রদান করেন।

ইহুদিদের জন্য মুনাফিকদের ব্যস্ততা

রাসূলের খায়বার অভিযানের প্রাক্কালে মুনাফিকরা ইহুদিদের সাহায্যার্থে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাই খায়বারের ইহুদিদের নিকট এই মর্মে সংবাদ প্রেরণ করে যে, "এখন মুহাম্মদ (ﷺ) তোমাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন। অতএব তোমরা হুঁশিয়ার হয়ে যাও এবং উত্তম প্রস্তুতি নাও। দেখ, তোমরা ভুল করো না যেন। উত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাক, ভয়ের কিছুই নেই। কারণ, একদিকে তোমরা যেমন সামান্য, অন্যদিকে তেমনি তিনি প্রায় রিক্তহস্ত। তাঁর অস্ত্রশস্ত্র খুব সামান্যই আছে।"

খায়বারবাসী যখন এই সংবাদ অবগত হলো তখন বনু গাতফানের সাহায্য লাভের জন্য তারা কেনান বিন আবুল হুকাইক এবং হাওয়া বিন কাইসকে সেখানে পাঠালো। কারণ, বনু গাতফান ছিলো খায়বারবাসীদের মিত্র এবং মুলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্যকারী। বনু গাতফানের নিকটে তারা এই প্রস্তাবও পাঠাল যে, যদি তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়লাভে সক্ষম হয়, তাহলে খায়বারে উৎপন্ন সবকিছুর অর্ধেক তাদের দেয়া হবে।

খায়বারের পথ

খায়বার যাওয়ার পথে রাসূলে করীম পর্বত অতিক্রম করেন। অতঃপর সাহাবা নামক উপত্যকায় গমন করেন। এরপর রাজী নামক উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেন।

রাজী হতে মাত্র একদিন ও একরাত্রির ব্যবধানে বনু গাতফানের জনবসতি অবস্থিত ছিলো। যুদ্ধ প্রস্তুতি সহকারে বনু গাতফান খায়বারবাসীদের সাহায্যার্থে খায়বার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিলো। কিন্তু পথিমধ্যে তাদের পিছন দিয়ে কিছু শোরগোল শুনতে পেয়ে তারা ধারণা করল যে, তাদের শিশু সন্তানাদি ও পশুপালের ওপর মুসলমানেরা আক্রমণ চালিয়েছে, এ কারণে তারা খায়বারকে মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে পিছনে ফিরে চলল।

রাসূলে করীম এ যাত্রায় যে দুজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি সৈন্যদের পথ প্রদর্শনে নিয়োজিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজনের নাম ছিলো হুসাইল। রাসূলে করীম তাঁদের নিকট থেকে এমন এক পথের সন্ধান জানতে চাইলেন যে পথ ধরে মদিনার পরিবর্তে তার উত্তরদিক দিয়ে সিরিয়ান পথ ধরে খায়বারে প্রবেশ করা যায়। নবী করীম (ﷺ) এর উক্ত কৌশল অবলম্বনের উদ্দেশ্যে ছিলো শাম রাজ্যের দিকে ইহুদিদের পালানোর পথ রোধ করা এবং বনু গাতফান থেকে ইহুদিদের সাহায্য প্রাপ্তির পথ বন্ধ করে দেয়া।

হুসাইল বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল "আমি আপনাকে সেই পথ দিয়েই নিয়ে যাব।" অতঃপর আগে আগে চলতে থাকলেন। চলার এক পর্যায়ে তাঁরা এমন এক জায়গায় পৌঁছলেন, যেখান থেকে একাধিক পথ বের হয়েছে। তিনি নিবেদন করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এই সকল পথ ধরে আপনি গন্তব্য স্থানে পৌঁছে যেতে পারবেন।"

তিনি বললেন, এটির নাম 'হায়ন' (কঠিন এবং কর্কশ)। রাসূল এ পথ ধরে যাওয়া পছন্দ করলেন না। দ্বিতীয় পথটির নাম বললেন, "শাশ" (বিযুক্তকরণ এবং সঞ্চাল্যক্য)। রাসূল - এটাও গ্রহণ করলেন না। তিনি তৃতীয়টির নাম বললেন, 'হাতের' (কাষ্ঠ সংগ্রহকারী) তিনি এই পথ ধরে চলতেও অস্বীকার করলেন।

হুসাইল বললেন, এখন অবশিষ্ট থাকে আর একটি মাত্র পথ। ওমর (রা) বললেন, এই পথটির নাম কী?" হুসাইল বললেন, এই পথের নাম 'মারহাব'। নবী করীম (ﷺ) এই পথ ধরে চলা পছন্দ করলেন।

পথিমধ্যস্থ ঘটনাবলি

সালমা বিন আকওয়া (রা) বলেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে একত্রে খায়বার অভিমুখে পথ চলতে থাকলাম। রাতের বেলা আমরা চলছিলাম। এক ব্যক্তি আমেরকে বললেন, হে আমের! তোমার অসাধারণ কোনো কাহিনী আমাদের শোনাচ্ছো না কেন? আমের ছিলেন একজন কবি। একথা শুনে তিনি বাহন থেকে অবতরণ করলেন এবং কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। কবিতার চরণগুলো ছিলো নিম্নরূপ-

অর্থাৎ হে আল্লাহ! "যদি তুমি অনুগ্রহ না করতে তাহলে আমরা হোদায়াত পেতাম না, সদকা করতাম না, নামায পড়তাম না। আমরা তোমার নিকট উৎসর্গ হলাম, তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও, যতক্ষণ আমরা তাকওয়া অবলম্বন করি এবং যদি যুদ্ধ করি তাহলে আমাদের কদম মযবুত করে দাও, এবং আমাদের কদম মযবুত করে রেখো এবং আমাদের ওপর শান্তি বর্ষণ করো। আমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করা হলে, আমরা তার পরোয়া করি না এবং যুদ্ধের অবস্থায় আমাদের প্রতি লোকেরা নির্ভর করেছেন।"

রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, "এই কবিতা আবৃত্তিকারী কে?"
লোকেরা বললেন, "আমের বিন আকওয়া।"
রাসূল বললেন, "আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।"

সম্প্রদায়ের একজন বললেন, এখন তো তাঁর শাহাদাত কার্যকর হয়ে গেল। আপনি তাঁর অস্তিত্বের মাধ্যমে আমাদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ কেন দিলেন না।

সাহাবায়ে কেরাম (রা) জানতেন যে, যুদ্ধের সময় রাসূলে করীম কারো জন্য বিশেষভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তার অর্থই ছিলো তাঁর শহীদ হওয়ার ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়া।

খায়বার যুদ্ধে আমেরের ব্যাপারে এই সত্যটিই প্রমাণিত হয়েছিলো। এই জন্যই সাহাবিরা আল্লাহর নবীর দরবারে নিবেদন করলেন যে, কেন তাঁর দীর্ঘায়ুর জন্য প্রার্থনা করা হলো না, যাতে আমরা তাঁর অস্তিত্বের দ্বারা ভবিষ্যতে আরও উপকৃত হতে পারতাম।

খায়বারের সন্নিকটে 'সাহাব' নামক উপত্যকায় রাসূল আসরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর জিনিস পত্র চাইলেন। কিন্তু শুধু ছাতু আনা হলো এবং রাসূলের নির্দেশে তা মাখানো হলো রাসূল এবং সাহাবাগণ সে খাবার খেলেন। এরপর নবী করীম (ﷺ) মাগরির নামাযের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। অবশ্য নামাযের প্রস্তুতি হিসেবে শুধু কুলি করলেন। সাহাবায়ে কেরামও কুলি করলেন। অতঃপর নতুনভাবে অযু না করেই নামায আদায় করলেন।

পূর্বের অজুকেই যথেষ্ট মনে করেন। অতঃপর এশার নামায ও আদায় করলেন।

খায়বার অঞ্চলে মুসলিম সৈন্যদল

যে প্রভাতে খায়বার যুদ্ধ আরম্ভ হয় মুসলমান সৈন্যদল তার পূর্ব রাত্রি খায়বারের কাছেই অতিবাহিত করে। কিন্তু ইহুদিরা এই ব্যাপারে কোনো খবরই পায়নি। রাসূল (ﷺ) এর নিয়ম ছিলো এই যে, কোনো সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করতে চাইলে সেখানে গিয়ে রাত্রি যাপন করতেন এবং সকাল না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ পরিচালনা করতেন না। উক্ত প্রেক্ষিতে রাত যখন শেষ হওয়ার উপক্রম হলো, তখন অন্ধকার থাকা অবস্থায় তিনি ফজরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্যরা খায়বার অভিমুখে অগ্রসর হলেন। এদিকে খায়বারবাশিরা তাদের প্রাত্যহিক কাজের ন্যায় সেদিনও চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরাঞ্জামাদি নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ অগ্রসরমান মুসলিম সৈন্যদের দেখতে পেয়ে তারা শহরের দিকে দৌড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে বলতে থাকল, "আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ স্বসৈন্যে এসে গেছেন। নবী করীম (ﷺ) এই দৃশ্য অবলোকন করে বললেন, "আল্লাহু আকবর, খায়বার ধ্বংস হলো, আল্লাহু আকবর, খায়বার ধ্বংস হলো। যখন কোনো সম্প্রদায়ের ময়াদানে অবতরণ করি যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয় তাদের সকল মন্দ হয়ে যায়।"

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) সৈন্যদের শিবির স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচন করলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে হোবাব বিন মুনযির (রা) নিবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে এই স্থানে শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন, না যুদ্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে আপনি এটা করছেন? এটা কি আপনার ব্যক্তিগত অভিমত?"

নবী করীম (ﷺ) বললেন, "না এটা হচ্ছে নিতান্তই একটি অভিমতের ব্যাপার। যুদ্ধের জন্য সুবিধাজনক মনে করেই করা হচ্ছে।"

হোবাব বিন মুনযির (রা) বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! এই স্থানটি 'নযাত' দুর্গের সন্নিকটে অবস্থিত এবং খায়বারের যুদ্ধাভিজানে সৈনিকরা এই দুর্গে অবস্থান করছে। সেখান থেকে তারা আমাদের সকল অবস্থা ও অবস্থানের খবর রাখতে পারবে, কিন্তু আমাদের পক্ষে তাদের কোনো অবস্থার খবরই সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। অধিকন্তু আমরা তাদের রাতের আক্রমণ থেকেও নিরাপদ থাকব না। তাদের তীর আমাদের নিকট পৌঁছবে, কিন্তু আমাদের তীর তাদের নিকট পৌঁছবে না। তাছাড়া, এই স্থানটি খেজুর বাগানের মধ্যে নিচু ভূমিতে অবস্থিত। এই স্থানে রোগ/ব্যাধি সংক্রমণেরও আশঙ্কা থাকবে। এ সকল অসুবিধার প্রেক্ষাপটে আপনি এমন কোনো স্থানে শিবির স্থাপনের ব্যবস্থা করুন, যাতে আমরা এ সকল ক্ষতিকর অবস্থা থেকে মুক্ত থাকতে পারি। রাসূলে করীম বললেন, "তুমি যে পরামর্শ দিলে তা যথার্থ।" অতঃপর তিনি স্থান পরিবর্তন করে শিবির স্থাপনের নিদের্শ প্রদান করলেন।

অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী খায়বারের এত নিকটে উপস্থিত হলেন যে, সেখান থেকে শহর পরিষ্কারভাবে দেখতে পাওয়া গেল। তখন রাসূল মুসলিম বাহিনীকে থেমে যাওয়ার নির্দেশ দেয়ায় তাঁরা থেমে গেলেন। অতঃপর তিনি এই প্রার্থনা করলেন-

হে আল্লাহ! সপ্তম আকাশ এবং যার ওপর এর ছায়া রয়েছে তাদের এভু এবং জমিন ও এর ওপর যা কিছু রয়েছে তাদের প্রভু এবং শয়তানসমূহ এবং যাদেরকে তারা ভ্রষ্ট করেছে তাদের প্রতিপালক! আমরা আপনার নিকট এই বসতির মঙ্গল, এর বাসিন্দাদের মঙ্গল এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে, তার মঙ্গল প্রার্থনা করছি। এই বসতির অনিষ্টতা, এখানে বসবাসকারীদের অনিষ্টতা এবং এখানে যা কিছু আছে তার অনিষ্টতা হতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (এরপর বললেন) চল, আল্লাহর নামে সামনে অগ্রসর হও।

যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং খায়বারের দুর্গসমূহ

যে রাত্রিতে নবী করীম (ﷺ) খায়বার সীমানায় প্রবেশ করলেন তখন তিনি বললেন, "আগামী কাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা প্রদান করব যিনি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা রাখেন এবং যাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন। রাত্রি শেষে যখন সকাল হলো তখন সাহাবায়ে কেরাম (রা) রাসূলের খিদমতে উপস্থিত হলেন। প্রত্যেকরই আশা পতাকা তাঁর হাতেই আসবে। রাসূলে করীম (ﷺ) বললেন, আলী ইবনে আবু তালেব কোথায়?

সাহাবায়ে কেরাম (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! তাঁর চোখের পীড়া হয়েছে।" সেই অসুখের কারণে তিনি পিছনে পড়েছিলেন, অতঃপর গিয়ে সৈন্যদের সঙ্গে মিলিত হলেন।"

রাসূল বললেন, "তাঁকে ডেকে নিয়ে এস।" তাঁকে ডেকে আনা হলো। রাসূল নিজ মুখ থেকে লালা নিয়ে তা তাঁর চোখের লাগিয়ে দিয়ে দু'আ করলে, তিনি এমনভাবে আরোগ্য লাভ করলেন, যেন তাঁর পীড়াজনিত কোনো যন্ত্রণাই ছিলো না। অতঃপর তাঁর হাতে পাতাকা প্রদান করা হলো। তিনি বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি তাদের সঙ্গে ঐ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করব যে, তারা আমাদের মতো হয়ে যাবে।"

রাসূল বললেন, "শান্তির সঙ্গে চল এবং তাদের ময়দানে অবতরণ কর। অতঃপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দাও এবং ইসলামের মধ্যে আল্লাহর যে সমস্ত প্রাপ্য রয়েছে যা তাদের কর্তব্য সে সম্পর্ক তাদেরকে অবহিত কর। আল্লাহ তোমাদের মাধ্যমে যদি একজনকেও হেদায়েত দেন তাহলে তোমাদের জন্য তা লাল উটের চাইতে উত্তম হবে।"

খায়বারের জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিলো। একটি অঞ্চলে পাঁচটি দুর্গ ছিলো- ১. নায়েম দুর্গ, ২. সাব বিন মোয়ায দুর্গ, ৩, যুবাইরের দুর্গ ৪. উবাই দুর্গ ও ৫. নেযা দুর্গ। এসবের প্রথম তিনটি দুর্গের সঙ্গে অবশিষ্ট অঞ্চলকে নাতাত বলা হতো। অবশিষ্ট দুটি দুর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল শিক নামে প্রসিদ্ধ ছিলো।

খায়বারের জনবসতির দ্বিতীয় অঞ্চলকে কাতিবাহ বলা হতো। এর মধ্যে মাত্র তিনটি দুর্গ ছিলো- ১. কসুম দুর্গ (এটা বনু নযীর গোত্রের আবুল হুকাইকের দুর্গ ছিলো)। ২. ওয়াতীহ দুর্গ। ৩. সালালিম দুর্গ।

উপরিউল্লিখিত ৮টি দুর্গ ছাড়াও খায়বাওে ছোট বড়ো আরও কিছু সংখ্যাক দুর্গ এবং ঘাঁটি ছিলো। কিন্তু শক্তি সামর্থ্য ও নিরাপত্তার ব্যাপারে এই সকল দুর্গ পুর্বোক্তগুলোর সমপর্যায়ের ছিলো না। তুলনামুলকভাবে এই দুর্গগুলো ক্ষুদ্রাকারের ছিলো।

খায়বার যুদ্ধ প্রথম অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিলো। দ্বিতীয় অঞ্চলের দুর্গ তিনটিতে যোদ্ধাদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ ছাড়াই দূর্গের অধিবাশিরা মুসলমানদের হাতে আত্মসমর্পণ করেছিলো।

যুদ্ধারম্ভ এবং নায়েম দুর্গ বিজয়

উল্লিখিত আটটি দুর্গের মধ্যে সর্বপ্রথম নায়েম দুর্গের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। কারণ, অবস্থানগত দিক এবং যুদ্ধ কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে এই দুর্গটিই ছিলো প্রথম শ্রেণির এবং সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকন্তু, এটিই ছিলো মারহাব নামের সেই পরাক্রান্ত ও পরিশ্রমী ইহুদির দুর্গ এবং যাকে এক হাজার পুরুষের সমকক্ষ মনে করা হতো।

আলী বিন আবু তালিব (রা) মুসলমান সৈন্যদের নিয়ে উক্ত দুর্গের সামনে গিয়ে পৌঁছলেন এবং ইহুদিদের ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তারা এই দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করল এবং তাদের সম্রাট মারহাবের পরিচালনাধীনে মুসলমানদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য অবস্থান গ্রহণ করল। প্রথমেই মারহাব প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মুসলমানদের আহ্বান জানাল।

যার অবস্থা সম্পর্কে সালমা আকওয়া বর্ণনা করছেন যে, "যখন আমরা খায়বারে পৌঁছলাম, তখন ইহুদি সম্রাট মারহাব স্বীয় তরবারী হাতে নিয়ে দাম্ভিকতা প্রকাশপূর্বক গর্বকরে বলল, "খায়বার অবহিত আছে যে, আমার নাম মারহাব। যুদ্ধের আগুন যখন জ্বলে উঠে তখন আমি অস্ত্রে সজ্জিত বীর এবং অভিজ্ঞ।"

উক্ত প্রেক্ষিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আমের এগিয়ে এসে বললেন, "খায়বার জানে যে, আমার নাম আমের, অস্ত্র সজ্জিত, বীর এবং যোদ্ধা!"

অতঃপর উভয়ে উভয়ের প্রতি আঘাত হানে। মারহাবের তরবারী আমার চাচার ঢালে গিয়ে বিদ্ধ হয়। তিনি তাকে মারার চেষ্টা করেন কিন্তু তাঁর তরবারী ছোট থাকার কারণে তিনি ইহুদির পায়ের গোছার ওপর আঘাত হানেন। কিন্তু সে আঘাত মারহাবের পায়ে না লেগে তাঁর নিজের হাঁটুতেই এসে লাগে। আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই অবশেষে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। নবী করীম (ﷺ) নিজের দুইটি আঙ্গুল একত্রিত করে দেখিয়ে তাঁর সম্পর্কে বলেন যে, "তিনি দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হলেন। তিনি বড়ো পরিশ্রমী যোদ্ধা ছিলেন। তার মতো যোদ্ধা আরব জমিনের ওপর থাকবে।

যাহোক, আমের (রা) এর পর মারহাবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আলী (রা) গমন করেন।

সালমা বিন আকওয়া বর্ণনা করেন, "ঐ সময় আলী (রা) একটি কবিতার এই চরণ আবৃত্তি করছিলেন-

আমি সেই ব্যক্তি আমার মাতা যার নাম রেখেছিলেন হায়দা (বাঘ)। বনের বাঘের মত ভয়ংকর আমি তাদেরকে একসা এর বদলে এক সান্দারাহ দিয়ে তাদের মাপ পূর্ণ করে দেব অর্থাৎ সামান্য আঘাতের বদলে প্রচন্ড আঘাত দিয়ে প্রতিশোধ দিব।

অতঃপর তিনি মারহাবের মাথার ওপর তরবারী দ্বারা এমনভাবে আঘাত করলেন যে, সে সেখানেই স্তূপ হয়ে গেল। এভাবে আলী (রা) এর হাতেই বিজয় অর্জিত হলো।

যুদ্ধের মাঝে আলী (রা) ইহুদিদের দুর্গের নিকট পৌঁছলেন। তখন একজন ইহুদি দুর্গের উঁচু স্থান থেকে উঁকি দিয়ে দেখার পর জিজ্ঞেস করল, "তুমি কে? আলী (রা) বললেন, "আমি আলী ইবনে আবু তালেব।"

ইহুদি বলল, "সেই গ্রন্থের শপথ! যা মুসার (আ) ওপর অবতীর্ণ হয়েছিলো, তোমরা সুউচ্চে রয়েছো।"

এরপর মারহাবের ভাই ইয়াসের এই বলে বের হলো, "কে এমন আছে যে আমার সামনে আসবে?" তার এই আহ্বানে যুবাইর (রা) ময়দানে অবতরণ করেন। তাঁকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে দেখে তাঁর মা সাফিয়া (আ) বললেন, "হে আল্লার রাসূল! আমার পুত্র কি শহীদ হয়ে যাবে?"

নবী করীম (ﷺ) বললেন, "না বরং তোমার ছেলে তাকে হত্যা করবে।" কিছুক্ষণের মধ্যেই আল্লাহর রাসূলের উক্তি সত্যে পরিনত হলো, যুবাইর (রা) ইয়াসেরকে হত্যা করলেন।

এরপর নায়েম দুর্গের নিকট উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ইহুদি নিহত হয়। অবশিষ্ট ইহুদিরাও হতোদ্যম হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ কয়েক দিন যাবৎ অব্যাহত ছিলো এবং মুসলমানদেরকে তীব্র প্রতিন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই দুর্গ থেকে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তারা নিরাশ হয়ে পড়েছিলো। এ কারণে অত্যন্ত সঙ্গোপনে তারা এই দুর্গ পরিত্যাগ করে সাব নামক দুর্গে চলে যায়। ফলে নায়েম দুর্গ মুসলমানদের দখলে চলে আসে।

সাব বিন মোয়ায দুর্গ বিজয়

অত্যন্ত সুরক্ষিত ও মজবুত দুর্গ হিসেবে নায়েম দুর্গের পরেই ছিলো সাব বিন মোয়ায দুর্গের স্থান। মুসলমানরা হোবার বিন মুনযির আনসারী (রা) এর নেতৃত্বাধীন উক্ত দুর্গের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং তিন দিন যাবৎ তারা অবরোধ করে রাখেন। তৃতীয় দিনে রাসূল উক্ত দুর্গের ওপর বিজয় লাভের জন্য বিশেষভাবে প্রার্থনা করেন।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে, আসলাম গোত্রের শাখা বনু সাহামের লোকজন রাসূলে করীম (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, আমরা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়েছি আমাদের সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই। নবী করীম (ﷺ) প্রার্থনা করলেন, "হে আল্লাহ! এদের অবস্থা সম্পর্কে আপনিই সবচাইতে বেশি জানেন। আপনি অবশ্যই অবগত রয়েছেন, তাঁদের সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই এবং আমার নিকটেও এমন কিছুই নেই, যা দিয়ে আমি তাঁদের সাহায্য করতে পারি। অতএব, ইহুদিদের এমন এক দুর্গের ওপর তাঁদেরকে বিজয় দান করুন, যা তাঁদের জন্য সকল দিক দিয়ে ফলপ্রসূ হয়। এরপর সাহাবায়ে কেরাম (রা) প্রবল পরাক্রমে আক্রমণ পরিচালনা করলেন এবং মহান আল্লাহ সাব বিন মোয়ায দুর্গের ওপর মুসলমানদের বিজয় প্রদান করলেন। এমন কোনো দুর্গ ছিলো না যেখানে উক্ত দুর্গের তুলনায় অধিক খাদ্য ও চর্বি ছিলো।

আল্লাহর দরবারে দু'আ করার পর নবী করীম (ﷺ) যখন উক্ত দুর্গে আক্রমণ পরিচালনার জন্য মুসলমানদের নির্দেশ প্রদান করলেন, তখন আক্রমণকারীদের মধ্যে বনু আসলামই অগ্রভাগে ছিলো। এখানেও দুর্গের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ হয়। অতঃপর সূর্যাস্ত হওয়ার পূর্বেই দুর্গটি মুসলমানদের দখলে আসে। উক্ত দূর্গের মধ্যে মুসলমানগণ কিছু মিনজানীক ও দাবাবা যন্ত্র প্রাপ্ত হন।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে সাহাবায়ে কিরামের যে কঠিন ক্ষুধার আলোচনা করা হয়েছে তার ফল ছিলো এই যে, লোকেরা (বিজয় অর্জিত হতেই) গাধা যবেহ করল এবং চুলায় চাপিয়ে দিয়ে তা রান্নার আয়োজন করল। রাসূল করীম যখন এই ব্যাপারটি অবগত হলেন তখন গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করে দিলেন।

যুবাইর দুর্গ বিজয়

মুসলমানদের নায়েম এবং সাব দুর্গ বিজয়ের পর নাযাতের দুর্গসমূহ থেকে বাহির হয়ে ইহুদিরা যুবাইর দুর্গে একত্রিত হলো। এটি ছিলো পর্বতের উঁচু চূড়ায় অবস্থিত একটি সুরক্ষিত দুর্গ। সেখানে যাওয়ার পথ এতই দুর্গম এবং কষ্টকর যে, অশ্বারোহী তো নয়ই পদাতিক বাহিনীর পক্ষেও তা ছিলো একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। এজন্য রাসূল নির্দেশ দিলেন এর চতুরপার্শ্ব অবরোধ সৃষ্টি করতে। তিনদিন পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত থাকল। এরপর একজন ইহুদি এসে বলল, "হে আবুল কাসেম! যদি তিনদিন পর্যন্ত এই অবরোধ অব্যাহত রাখেন তবুও তাদের কোনো ভয় থাকবে না। তবে সেখানে তাদের পানির সমস্যা রয়েছে। কারণ পানির ঝর্ণা রয়েছে নিচের জমিনে। রাতের বেলা তারা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে পানি পান করে এবং সংগ্রহ করে নিয়ে দুর্গে ফিরে যায়। কাজেই আপনার আক্রমণ থেকে তারা নিরাপদেই থাকছে। যদি আপনি তাদের পানি বন্ধ করে দেন তবে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইহুদিরা দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষে কয়েকজন মুসলমান শহীদ হন। এবং আনুমানিক দশজন ইহুদি নিহত হয়। কিন্তু দুর্গ মুসলমানদের দখলে এসে যায়।

উবাই দুর্গ বিজয়

যুবাইর দুর্গের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ইহুদিরা উবাই দুর্গে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। মুসমানগণ এ দুর্গে অবরোধ সৃষ্টি করেন। এই দুর্গের দুজন বীর ও পরিশ্রমী ইহুদি যোদ্ধা দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান দিয়ে একের পর এক ময়দানে অবতরণ করে। এরা দুজনেই মুসলিম বীরদের হাতে নিহত হয়। দ্বিতীয় ইহুদির হত্যাকারী ছিলেন লাল পট্টিধারী বিখ্যাত তেজস্বী বীর আবু দোজানা সাম্মাক বিন খারশাহ আনসারী (রা)। দ্বিতীয় ইহুদিকে হত্যা করার পর তিনি অত্যন্ত ক্ষিপ্ত গতিতে দুর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। তার সঙ্গে মুসলিম সৈন্যগণও দুর্গের অভ্যস্তরে প্রবেশ করেন। দুর্গের অভ্যন্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড সংঘর্ষ বেঁধে যায় এবং বেশ কিছুক্ষণ ধরে তা চলতে থাকে। কিন্তু ইহুদিরা মুসলিম বীরদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে নেযার দু'র্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেটি ছিলো এই অঞ্চলের শেষ দুর্গ।

নেযার দুর্গ বিজয়

এটি ছিলো অত্রাঞ্চলের সব চাইতে শক্ত ও মজবুত দুর্গ। ইহুদিদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও এই দুর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা মুসলমানদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এজন্য তাদের মহিলা ও শিশুদের নিয়ে তারা এই দুর্গে অবস্থান করছিলো। পূর্বোল্লিখিত চারটি দুর্গের কোনোটিতেই মহিলা ও শিশুদের রাখা হয়নি।

মুসলমানগণ এই দুর্গটিও অবরোধ করলেন এবং প্রবল চাপ সৃষ্টি করে চললেন। কিন্তু যেহেতু দুর্গটি একটি উঁচু পর্বত চূড়ায় অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় ছিলো সেহেতু দুর্গের মধ্যে প্রবেশ লাভের কোনো সুযোগ মুসলমান সৈন্যরা করে নিতে পারছিলেন না। এদিকে দুর্গের বাহিরে এসে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সাহস ইহুদিদের ছিলো না। তবে দুর্গের অভ্যন্তর ভাগ থেকেই তারা মুসলমানদের ওপর প্রবলভাবে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করে আসছিলো।

নেযার দুর্গ জয় করা যখন খুবই কষ্টসাধ্য মনে হলো, তখন রাসূল মিনজানীক যন্ত্রটি ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দিলেন। কয়েকটি কামানের গোলা আঘাত হানার ফলে তাদের দেয়ালে বেশ বড়ো আকারের ফাটল সৃষ্টি হয়ে যায়। সেই ফাটলের পথ ধরে মুসলমানেরা দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করতে সক্ষম হন এবং ইহুদিদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে ইহুদিরা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করার পর ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দুর্গ ছেড়ে পালিয়ে যায়।

তারা প্রাণ ভয়ে এতই ভীত হয়ে পড়ে যে, তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে পিছনে রেখেই পালিয়ে যায় এবং তাদেরকে মুসলমানদের দয়ার ওপর ছেড়ে যায়। সুরক্ষিত নেযার ঘাঁটি দখলের ফলে খায়বারের প্রথম অর্ধেক অর্থাৎ নাতাত ও শিক অঞ্চলের সকল অংশই মুসলমানদের দখলে চলে আসে। এতদঞ্চলে আরও কিছু ছোট ছোট দুর্গ ছিলো। কিন্তু অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো মুসলমানদের দখলে চলে আসার ফলে ইহুদিরা ছোট ছোট দুর্গগুলো পরিত্যাগ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে খায়বার শহর পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় অঞ্চলে অর্থাৎ কাতীবার দিকে পালিয়ে যায়।

খায়বারের দ্বিতীয়ার্ধের বিজয়

নাতাত ও শিক অঞ্চল বিজয়ের পর রাসূলে করীম কাতীবা, ওহীহ এবং সালাম অঞ্চলের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। সালামের বনু নাযীরের এক প্রসিদ্ধ ইহুদি আবুল হুকাইকের দুর্গ ছিলো। এদিকে নাতাত ও শিক অঞ্চলের পরাজিত ইহুদিরা এখানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো এবং এই দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অধিকতর শক্তিশালী এবং সুদৃঢ় করে তুলে।

এই তিনটির কোনোটিতে যুদ্ধ হয়েছিলো কিনা সে ব্যাপারে যুদ্ধ বিশারদদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনাসূত্রে জানা যায় যে, যুদ্ধের মাধ্যমেই এই দুর্গের ওপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। এই দুর্গ স্বেচ্ছায় সমর্পণের ব্যাপারে মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদিদের কোনো কথাবার্তা হয়নি।

কিন্তু ওয়াকেদী স্পষ্টভাবে দুটি শব্দে প্রকাশ করেছেন যে, উক্ত অঞ্চলের দুর্গ তিনটি আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করা হয়। সম্ভবতঃ কামূস দুর্গটি নিয়ে প্রথমাবস্থায় যুদ্ধ হয় এবং তারপর আলাপ আলোচনা শুরু হয়। তবে অন্য দুর্গ দুটি যুদ্ধ ছাড়াই মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করা হয়।

অতঃপর মুসলিম বাহিনী কাতীরা গিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবরোধ সৃষ্টি করেন। এই অবরোধ চৌদ্দ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অবরোধকালে ইহুদিগণ সেই সময় পর্যন্ত দুর্গ হতে বাহিরে আসেনি যে পর্যন্ত না রাসূলে করীম মিনজানীক যন্ত্র ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। উক্ত যন্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কায় এবং যখন তারা বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ল তখন সন্ধির মনোভাব ব্যক্ত করল।

সন্ধির কথাবার্তা

ইবনে আবিল হোকাইক সর্বপ্রথম রাসূলের নিকট এই বলে সংবাদ পাঠান যে, 'আমি কি আপনার নিকট এসে আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারি?' তিনি বললেন, "হ্যাঁ।"

রাসূলের হ্যাঁ সূচক উত্তর লাভের পর সে তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে এই শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি করল যে দুর্গের মধ্যে যে সকল সৈন্য অবস্থান করছে তাদের জীবিত ছেড়ে দিতে হবে, তাদের পরিবার বর্গকে তাদের সঙ্গে থাকতে দিতে হবে (অর্থাৎ তাদেরকে দাসদাসী বানানো যাবে না) পরিবার পরিজনসহ তাদের খায়বার ছেড়ে বাহিরে চলে যেতে দিতে হবে। তাদের সম্পদাদি, যথা- বাগ-বাগিচা, সোনাদানা, অশ্ব, যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য লৌহবর্ম ইত্যাদি রাসূল (ﷺ) এর নিকট সমপর্ণ করবে। শুধু সেই কাপড়গুলো তারা সঙ্গে নিতে পারবে, যা মানুষের লজ্জা নিবারণ ও জীবন ধারণের প্রয়োজন হবে।

ইহুদিগণ এই সকল শর্ত মেনে নেয়ার ফলে মুসলমানদের সঙ্গে তাদের সন্ধি হয়ে গেল।

রাসূলে করীম বললেন, "যদি তোমরা আমার নিকট থেকে কিছু গোপন কর তাহলে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল দায়িত্ব মুক্ত হবেন"।

উক্ত সন্ধির ফলশ্রুতিতে আলোচ্য দুর্গ তিনটি মুসলমানদের অধিকারে এসে যায় এবং এভাবে খায়বার বিজয় সম্পূর্ণ হয়।

আবুল হোকাইকের দুই ছেলের অঙ্গিকার ভঙ্গ এবং তাদের হত্যা

আবুল হোকাইকের দুই ছেলে উক্ত সন্ধি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে অনেক সম্পদ গোপনে সরিয়ে নেয়। তারা একটি চামড়ার ব্যাগও উধাও করে দেয়, যার মধ্যে অনেক সম্পদ এবং হুয়াই বিন আখতাবের অলঙ্কারাদি ছিলো। হুয়াই বিন আখতাব মদিনা হতে বনু নযিরের বিতাড়নের সময় এই সকল অলঙ্কার সঙ্গে এনেছিলো।

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা মতে, যখন কেনানা বিন আবিল হোকাইককে রাসূল (ﷺ) এর নিকট নিয়ে আসা হলো, তখন তার নিকট বানু নযিরের সম্পদ গচ্ছিত ছিলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন এই বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, তখন সে তার জানার ব্যাপারটি সরাসরি অস্বীকার করে বলল যে, উক্ত গচ্ছিত সম্পদের স্থান সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। এরপর একজন ইহুদি এসে বলল,"আমি কেনানাকে প্রতিদিন এই বিজন প্রান্তরের কোনো এক স্থানে ঘোরাফেরা করতে দেখি।"

ইহুদির উক্ত কথার প্রেক্ষিতে রাসূল কেনানাকে বললেন, "এ কথা বল যে, যদি এই গচ্ছিত সম্পদ আমরা তোমার নিকট থেকে পাওয়া যায়, তাহলে তোমাকে হত্যা করব কি না?" সে বলল, "জী হ্যাঁ।"

রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে সেই প্রান্তর খননের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে কিছু সম্পদ পাওয়া গেল।

অবশিষ্ট সম্পদ সম্পর্কে নবী করীম (ﷺ) তাকে জিজ্ঞাসা করলে আগের মতোই সে অস্বীকার করল। ফলে শাস্তির জন্য তাকে যুবাইরের হাতে সমর্পণ করা হলো এবং এ কথাও বলা হলো যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পদ আমাদের হস্তগত হবে না, ততক্ষণ শাস্তিদান অব্যাহত থাকবে।

যুবাইর (রা) চকমকি পাথর দ্বারা তাকে আঘাত করতে থাকেন যার ফলে তার জীবন মরণ সন্ধিক্ষণের অবস্থা সৃষ্টি হলো। অতঃপর রাসূল (ﷺ) মুহাম্মদ বিন মাসলামার হাতে সমর্পণ করেন। তিনি মাহমুদ বিন মাসলার হত্যার বদলাস্বরূপ তার গলা কর্তন করে তাকে হত্যা করেন। (মাহামুদ ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে নায়েম দুর্গের দেয়ালের পাশে বসেছিলেন। এমনি সময়ে এই ব্যক্তি তাঁর ওপর একটি চাক্কির পাট নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যা করে।)

গণীমতের মাল বন্টন

রাসূল ইচ্ছা করেছিলেন খায়বার হতে ইহুদিদের বিতাড়িত করতে এবং সেই শর্তেই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিলো। কিন্তু ইহুদিরা এই জমিনে তাদের থাকতে দেয়ার জন্য রাসূল এর নিকট নিবেদন করল। তারা বলল, "আমাদের এই জমীনে থাকতে দিন, আমরাও দেখাশোনা করব। কারণ, এই জমীন সম্পর্কে আপনাদের তুলনায় আমাদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। এদিকে রাসূল এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা) এর নিকট এমন দাস ছিলো না, যারা এই জমীন দেখাশোনা এবং চাষাবাদ ও বনুনের কাজকর্ম করতে পারবে। তাছাড়া, সাহাবা কেরামেরও (রা) এমন অবসর সময় ছিলো না যে, তাঁরা এ সকল কাজকর্ম করতে পারবেন। এ কারণে নবী করীম (ﷺ) এই শর্তে খায়বারের ভূমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দিলেন যে, সমস্ত ক্ষেত খামার ও বাগ-বাগিচার উৎপাদনের অংশ ইহুদিদের দেয়া হবে এবং তিনি যতদিন চাইবেন ততদিন এই ব্যবস্থা বজায় থাকবে (যখন প্রয়োজন বোধ করবেন তখন তাদের বিতাড়িত করা হবে) উৎপাদনের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) কে নিয়োজিত করা হয়।

খায়বারের লব্ধ সম্পদ ছত্রিশ (৩৬) অংশে বন্টনের ব্যবস্থা করা হয়। এর প্রতি অংশ পুনরায় এক শত (১০০) অংশে বিভাজন করে বন্টনের ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে মোট সম্পদ বন্টন করা হতো তিন হাজার ছয়শত (৩৬০০) অংশে। এর মধ্য হতে অর্ধেক অর্থাৎ এক হাজার আটশত (১৮০০) অংশ ছিলো রাসূল এবং সাহাবাগণের। সাধারণ মুসলমানদের মতোই রাসূল মাত্র একটি অংশই গ্রহণ করতেন। অবশিষ্ট অংশ রাসূল মুসলমানদের সামাজিক প্রয়োজন এবং আপদকালীন সময়ের জন্য পৃথক করে রাখতেন। খায়বারে লব্ধ সম্পদ এই কারণে আঠার শত অংশে বন্টনের ব্যবস্থা ছিলো যে, হুদায়বিয়ার অধিবাসীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এটা ছিলো এক বিশেষ দান। উপস্থিত অনুপস্থিত সকলের জন্যই এ অংশের ব্যবস্থা ছিলো। হুদায়বিয়ার অধিবাসীদের সংখ্যা ছিলো চৌদ্দশত।

খায়বারের যুদ্ধে লব্ধ সম্পদের আধিক্যের কথা সহিহ বুখারির আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, যে পর্যন্ত না খায়বার বিজয় করতে আমরা সক্ষম হয়েছিলাম সে পর্যন্ত পরিতৃপ্ত হতে পারিনি। অনুরূপ প্রমাণ আয়েশা (রা) বর্ণিত হাদীসেও এসেছে, এখন পেট ভরে খেজুর খেতে পারব।

খায়বার বিজয়ের পর নবী করীম (ﷺ) যখন মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন, তখন আনসারা মুহাজিরদের সাহায্যার্থে যে সকল খেজুর বৃক্ষ দিয়েছিলেন মুহাজিররা তা তাঁদের ফেরত দেন। কারণ, সেই সময় খায়বারে তাদের জন্য সম্পদ ও খেজুর বৃক্ষের ব্যবস্থা হয়েছিলো।

জাফর বিন আবু তালিব এবং আশয়ারী সাহাবাদের আগমন

সেই যুদ্ধের মধ্যে জাফর বিন আবু তালিব (রা) রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আশয়ারী মুসলমানগণ অর্থাৎ আবু মুসা (রা) এবং তাঁর বন্ধুরা।

আবু মুসা আশয়ারী (রা) বর্ণনা করেছেন, "আমরা যখন রাসূল আবির্ভাব সম্পর্কে অবগত হলাম, তখন আমাদের সম্প্রদায়ের পঞ্চাশজন লোকসহ আমার ভাই ও আমি হিজরতের উদ্দেশ্যে একটি নৌকা করে যাত্রা করলাম নববীতে পৌঁছার জন্য। কিন্তু আমাদের নৌকাটি নাজ্জাশীর দেশে নিয়ে আমাদের নামিয়ে দিল। জাফর (রা) এবং তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। তিনি বললেন, রাসূল আমাদের এখানে প্রেরণ করেছেন, আপনারাও আমাদের সঙ্গে অবস্থান করুন। উক্ত প্রেক্ষিতে আমরাও তাঁদের সঙ্গে অবস্থান করলাম এবং নববীতে সেই সময় পৌঁছতে পারলাম, যখন তিনি খায়বার বিজয় করেছেন। রাসূল জাফর ও তাঁর বন্ধুদের এবং আমাদের সঙ্গে আগত নৌকার আরোহীদের জন্যও গণীমতের অংশ নির্ধারণ করেছিলেন। এছাড়া যাঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তাঁদের জন্য কোনো হিসসা নির্ধারণ করা হয়নি।

জাফর যখন রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হলেন তখন তিনি তাঁকে স্বাগত জানিয়ে চুম্বন করলেন এবং বললেন, "আল্লাহর কসম! আমি জানি না যে, আমার অধিক আনন্দ কিসের খায়বার বিজয়ের না জাফরের আগমনের?"

এটা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এই সকল লোকজনকে নিয়ে আসার জন্য রাসূল আমর বিন উমাইয়া যামরী (রা) কে নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেছিলেন এবং তাঁকে বলে পাঠিয়েছিলেন, তিনি যেন ঐ সকল লোকজনকে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দেন। ফলে নাজ্জাশী দুটো নৌকা তাঁদের মদিনার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন। এঁরা ছিলেন সর্বমোট ষোলো (১৬) জন। অধিকন্তু কিছু সংখ্যক মহিলা এবং শিশুও ছিলেন সেই দলে আর অন্যান্য যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এর পূর্বেই মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

সাফিয়ার সঙ্গে বিয়ে

সাফিয়ার স্বামী কেনানা বিন আবুল হোকাইক খাইবার যুদ্ধে স্বীয় অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছিলো। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী সাফিয়াকে বন্দী মহিলাদের দলভুক্ত করা হয়। এরপর যখন এই বন্দী মহিলাদের একত্রিত করা হয়, তখন দাহয়াহ বিন খলিফা কালবী (রা) নবী করীম (ﷺ) আমার এর খিদমতে আবেদন করলেন, "হে আল্লাহর নবী! বন্দী মহিলাদের মধ্য থেকে আমাকে একটি দাসী প্রদান করুন।"

নবী করীম (ﷺ) বললেন, "তাদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করে নিয়ে যাও।" তিনি সেখানে গিয়ে তাদের মধ্য থেকে সাফিয়া বিনতে হোকাইককে মনোনীত করেন। এই প্রেক্ষিতে এক ব্যক্তি নবী করীমের নিকট নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর নবী! বনু কোরাইযা ও বনু নযীরের সাইয়্যোদা সাফিয়াকে আপনি দাহয়াহর হাতে সমর্পণ করলেন, অথচ সে শুধু আপনার জন্যই শোভনীয় ছিলো। রাসূল বললেন, "সাফিয়াসহ দাহয়াকে এখানে আসতে বল।"

দাহয়াহ যখন সাফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হলেন, তখন তিনি বললেন, "বন্দী মহিলাদের মধ্য থেকে তুমি অন্য একজনকে দাসী হিসেবে গ্রহণ কর।"

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) নিজে সাফিয়ার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন তখন তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। তাঁর এই মুক্ত করাকেই বিয়ের জন্য মোহর নির্ধারণ করা হয়।

মদিনা প্রত্যাবর্তনকালে 'সাদ্দে সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছলে সাফিয়া (রা) হালাল হয়ে গেলেন। তখন উম্মে সোলাইম (রা) নবী করীমের জন্য তাঁকে সাজিয়ে প্রস্তুত করে দিলেন এবং বাসর রাত্রি যাপনের জন্য প্রেরণ করলেন। নবী করীম (ﷺ) দুলহা হিসেবে তাঁর সঙ্গে সকাল পর্যন্ত অবস্থান করলেন। অতঃপর খেজুর, ঘি এবং ছাতু একত্রিত করে ওলিমা খাওয়ালেন এবং রাস্তায় দুলহা দুলহানের রাত্রি যাপন হিসেবে তিন দিন তাঁর সঙ্গে অবস্থান করলেন।

ঐ সময় নবী করীম (ﷺ) তাঁর মুখমগুলের ওপর শ্যামল চিহ্ন দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ওটা কী?

তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আপনার খায়বার আগমনের পূর্বে আমি স্বপ্নযোগে দেখেছিলাম, চাঁদ তার কক্ষচ্যুত হয়ে আমার কোলের ওপর। আল্লাহ জানেন, আপনার সম্পর্কে আমার কোনো কল্পনাও ছিলো না। কিন্তু আমার স্বামীর নিকট যখন এই স্বপ্ন বৃত্তান্ত বর্ণনা করলাম, তখন তিনি আমার মুখে এক চড় মেড়ে বললেন, "মদিনার বাদশাহর প্রতি তোমার মন আকৃষ্ট হয়েছে।

বিষাক্ত বকরির ঘটনা

খায়বার বিজয়ের পর যখন রাসূলে করীম নিরাপদ হলেন এবং তৃপ্তিবোধ করলেন, তখন সালাম বিন মুশরিকের স্ত্রী যয়নব বিনতে হারেস উপঢৌকন হিসেবে বকরির ভুনা গোশত তাঁর নিকট প্রেরণ করে। সে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছিলেন যে, রাসূল বকরির গোশতের কোন কোন অংশ অধিক পছন্দ করেন। তাকে বলা হয়েছিলো যে, তিনি রানের গোশত অধিক পছন্দ করেন। এজন্য সে রানের গোশতগুলো ভালোভাবে বিষ মিশ্রিত করেছিলো এবং অবশিষ্ট অংশগুলোতেও বিষ প্রয়োগ করেছিলো। অতঃপর সে গোশতগুলো নবী করীম (ﷺ) এর সামনে এনে রাখা হলে নবী করীম (ﷺ) গোশতের টুকরোটি উঠিয়ে তার কিছু অংশ চিবানোর পর মুখ থেকে বের করে তা ফেলে দিলেন এবং বললেন, "এই হাড্ডি আমাকে বলছে, এর সঙ্গে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে।"

এরপর নবী করীম (ﷺ) যয়নবকে ডেকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করলেন, তখন সে বিষ প্রয়োগের কথা স্বীকার করল। তিনি তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি এমন কাজ করলে কেন?"

সে উত্তরে বলল, "আমি চিন্তা করলাম, এই ব্যক্তি যদি বাদশাহ হন তাহলে আমরা তাঁর থেকে নিষ্কৃতি লাভ করব, আর যদি তিনি নবী হন তাহলে তাঁকে এই সংবাদ জানিয়ে দেয়া হবে এবং তিনি বেঁচে যাবেন। তার এ কথা শুনে তাকে ক্ষমা করলেন। এই সময় রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলেন বিশর বিন বারা' বিন মারুর (রা)। তিনি এক গ্রাসে তা গিলে ফেলে ছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো।

নবী করীম (ﷺ) প্রথমে মহিলাকে ক্ষমা করেছিলেন। কিন্তু যখন বিশর (রা) এর মৃত্যু হলো তখন তাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করা হলো।

খায়বার যুদ্ধে দুই দলের প্রাণহানি

খায়বারের বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বমোট শহীদ মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো ষোল জন। চারজন কুরাইশদের মধ্য হতে, একজন আশজা গোত্র হতে, একজন আসলাম গোত্র হতে, একজন খায়বার অধিবাসীদের মধ্য হতে এবং অবশিষ্ট আনসারদের মধ্য হতে।

ইহুদিদের মৃতের সংখ্যা ছিলো তিরানব্বাই।

ফেদাক

খায়বার পৌঁছে রাসূল (ﷺ) ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য মোহাইয়াসা বিন মাসউদকে ফেদাক অঞ্চলের ইহুদিদের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। ফেদাকবাশিরা মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে প্রথমতঃ ইসলাম গ্রহণের প্রতি তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনি! কিন্তু আল্লাহ যখন খায়বারের ইহুদিদের ওপর মুসলমানদের বিজয় দান করলেন, তখন তারা মনে-প্রাণে ভীত হয়ে পড়ল এবং রাসূলে করীমের নিকট লোক পাঠিয়ে খায়বারবাসীদের চুক্তির অনুরূপ ফেদাকের উৎপাদনের অর্ধেক দেয়ার প্রতিশ্রুতিসহ সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব করল। রাসূল (ﷺ) সানন্দে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করলেন যার ফলে অত্যন্ত সহজভাবে ফেদাকের ওপর মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানদের অশ্ব, উষ্ট কিংবা তরবারীর ব্যবহার করতে হয়নি।

ওয়াদিল কোরা

খায়বার বিজয়ের পর রাসূল যখন কিছুটা চিন্তা মুক্ত হলেন, তখন ওয়াদিল কোরা বা কোরা উপত্যকায় গমন করলেন। সেখানে ইহুদিদের একটি দলের বসবাস ছিলো। এক পর্যায়ে আরবদের একটি দল গিয়ে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলো।

মুসলমানরা যখন কোরা উপত্যকায় অবতরণ করলেন তখন ইহুদিরা তাঁদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে আক্রমণ শুরু করল। তারা পূর্ব হতেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো। অতঃপর রাসূল মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধের উপযোগী করে সুশৃঙ্খলভাবে সারিবদ্ধ করলেন। সমগ্র বাহিনীর পতাকা সা'দ বিন উবাদার হাতে সমর্পণ করলেন। দ্বিতীয় পতাকা দিলেন হোববান বিন মুনযিরকে এবং তৃতীয় পতাকা দিলেন উবাদাহ বিন বিশরকে। এরপর নবী করীম (ﷺ) ইহুদিদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। এই দাওয়াত গ্রহণ না করে তাদের এক ব্যক্তি যুদ্ধের জন্য ময়দানে অবতরণ করল। আল্লাহর নবীর পক্ষে যুবাযের বিন আওয়াম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তার পরিণতি সম্পূর্ণ করলেন। অতঃপর ইহুদিদের পক্ষ থেকে থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি ময়দানে অবতরণ করলেন। এর সঙ্গে মুকাবিলা করার জন্য আলী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে তাকে হত্যা করলেন। এভাবে একে একে তাদের ১১ ব্যক্তি নিহত হয়। যখন একজন নিহত হতো, তখন নবী করীম (ﷺ) অবশিষ্ট ইহুদিদেরকে ইসলামে দাওয়াত দিতেন।

ঐ দিন যখন নামাযের সময় হতো তখন সাহাবাদের নিয়ে নবী করীম (ﷺ) নামায পড়তেন। নামাযের পর পুনরায ইহুদিদের সামনে ফিরে যেতেন এবং তাঁদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন।

এভাবে যুদ্ধ করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দ্বিতীয় দিন সকালে পুনরায় গমন করলেন। তখনো সূর্য বর্শা বরাবর ওপরে ওঠেনি, এমন সময় নবী করীম (ﷺ) বিজয় অর্জন করেন এবং আল্লাহ তাদের সম্পদসমূহের সবটুকু সাহাবিদের হাতে গণীমত হিসেবে প্রদান করেন। সাজ-সরঞ্জামাদি সাহাবায়ে কেরাম (রা) এর হস্তগত হয়।

রাসূল ওয়াদিল কোরা নামক স্থানে চারদিন অবস্থান করেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সাহাবাদের মধ্যে বন্টন করে দেন। তবে জমিজমা খেজুরের বাগানগুলো নিয়ে ইহুদিদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন।

তাইমা

তাইমার ইহুদিরা যখন খায়বার, ফেদাক এবং ওয়াদিল কোরার অধিবাসীদের পরাস্ত হওয়ার খবর পেল, তখন তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে শক্তির মহড়া প্রদর্শন ছাড়াই সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে রাসূলের নিকট দূত প্রেরণ করল। রাসূল তাদের সন্ধি প্রস্তাব গ্রহণপূর্বক সম্পদাদিসহ বসবাসের অনুমতি দেন।

অতঃপর তাদের সঙ্গে সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করেন, যার পরিভাষা ছিলো নিম্নরূপ:

এই দলিল লিখিত হলো আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (ﷺ) এর পক্ষ থেকে বনু আদিয়ার জন্য। তাদের ওপর কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলো এবং মুসলমানেরা তাদের জিম্মাদার হলেন। তাদের ওপর কোনো প্রকার অন্যায় করা হবে না এবং দেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করা হবে না। রাত্রি হবে তাদের সাহায্যকারী এবং দিন হবে পূর্ণতা প্রদানকারী। এই চুক্তি লিপিবদ্ধ করেন খালিদ বিন সাঈদ (রা)।

মদিনা প্রত্যাবর্তন

তাইমায়াবাসীদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পর নবী করীম (ﷺ) মদিনা প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। প্রত্যাবর্তনকালে লোকজনেরা একটি উপত্যকার নিকট পৌঁছলে সকলেই উচ্চস্বরে বলতে থাকেন আল্লাহু আকবর, আল্লাহ আকবর, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু'

একথা শুনে রাসূল (ﷺ) বললেন-

স্বীয় আত্মার প্রতি কোমলতা প্রদর্শন কর। তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিতকে আহ্বান করছ না, বরং সেই সত্তাকে আহ্বান করছ, যিনি শ্রবণ করছেন এবং নিকটেই রয়েছেন।

পথ চলার সময় একবার রাত্রির শেষভাগে পথিমধ্যে কোনো এক জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন এবং শয্যা গ্রহণের সময় বেলাল (রা) কে এই বলে তাগাদা দিয়ে রাখলেন, "রাত্রিতে আমাদের প্রতি খোয়াল রাখিও (অর্থাৎ প্রত্যুষে আমাদের জাগিয়ে দিও)।"

কিন্তু বেলালও (রা) ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি পূর্ব দিকে মুখ করে নিজ সওয়ারীর ওপর হেলান দিয়ে বসেছিলেন এবং সেই ভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত্রি শেষে সকলের গায়ে রোদের আঁচ লাগলেও কেউই ঘুম থেকে জাগতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ সর্ব প্রথম ঘুম থেকে জেগে ওঠেন এবং সকলকে ঘুম থেকে জাগ্রত করেন। নবী করীম (ﷺ) সেই উপত্যকা হতে বাহির হয়ে সামনের দিকে কিছুদূর অগ্রসর হন। অতঃপর লোকজনদের ফজরের নামাযের ইমামতি করেন।

খায়বার সংঘর্ষের বিস্তারিত বিবরণাদি লক্ষ করলে জানা যায়, নবী করীম (ﷺ) এর মদিনা প্রত্যাবর্তন হয় ৭ম হিজরি সফর মাসের শেষ ভাগে কিংবা রবিউল আওয়াল মাসে।

সারিয়্যায়ে আবান বিন সাঈদ

নবী করীম (ﷺ) অধিক গুরুত্বের সঙ্গে একথা বলতেন, যে হারাম মাসগুলো শেষ হওয়ার পর মদীনাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রাখা কোনোক্রমেই দুরদর্শিতা কিংবা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। মদিনার আশপাশে এমন সব বেদুইনের অবস্থান ছিলো, যার লুটতরাজ এবং ডাকাতি করার জন্য সব সময় মুসলমানদের অমনোযোগিতার সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। এ কারণে তাঁরা খায়বার গমনের প্রাক্কালে বেদুইনদের ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আবান বিন সাঈদ (রা) এর নেতৃত্বে নাজদের দিকে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। আবান বিন সাঈদ তার ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালন শেষে প্রত্যাবর্তন করলে খায়বারে নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ঐ সময় খায়বার বিজয়পর্ব সম্পন্ন হয়েছিলো। অধিকতর বিশুদ্ধ তথ্য হচ্ছে এই যে, অভিযান ৭ম হিজরি সফর মাসে প্রেরণ করা হয়েছিলো। সহিহ বুখারীতে এর উল্লেখ রয়েছে।

যাতুর রেকা যুদ্ধ

৭ম হিজরির অবশিষ্ট সারিয়্যা ও যুদ্ধসমূহ

রাসূল যখন আহযাবের তিনটি অঙ্গের মধ্যে দুটি শক্তিশালী অঙ্গকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত ও স্বস্তিবোধ করলেন তখন তৃতীয় অঙ্গটির প্রতি পুরোপরি মনোযোগ দানে সুযোগ লাভ করলেন। এ অঙ্গটির সদস্য ছিলো ঐ সব বেদুইন যারা নযদের বালুকাময় প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে বসবাস করত এবং মাঝে মাঝে ডাকাতি ও লুটতরাজে লিপ্ত হতো।

যেহেতু এই বেদুইনরা স্থায়ী কোনো জনপদ কিংবা শহরের অধিবাসী ছিলো না এবং তাদের স্থায়ী কোনো দুর্গও ছিলো না সেহেতু মক্কা ও খায়বারের অধিবাসীদের ন্যায় তাদের বশীভূত করা কিংবা অন্যায় ও অনিষ্টতা থেকে তাদের বিরত রাখার ব্যাপারটি ছিলো অত্যন্ত কঠিন। কাজেই, তাদের শায়েস্তা করার জন্য তাদের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের অনুরূপ সন্ত্রাসমূলক ও শাস্তিমূলক কার্যকলাপকেই উপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

উক্ত প্রেক্ষিত বেদুইনদের মনে ভয়-ভীতির সঞ্চার, এবং মদিনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে একত্রিত বেদুইনদের বিক্ষিপ্ত করার লক্ষ্যে নবী করীম যে শাস্তিমূলক আক্রমণ পরিচালনা করেন তাই 'যাতুর রেকা যুদ্ধ' নামে প্রসিদ্ধ রয়েছে।

নবী করীম (ﷺ) আনমার অথবা বানু গাতফান গোত্রের দুটি শাখা বানু সা'লাবা এবং বানু মোহারেবের লোকজনদের সমবেত হওয়ার সংবাদ পেয়ে আবু যর কিংবা উসমান ইবনে আফফানের ওপর মদিনার তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং ৪০০ কিংবা ৭০০ সাহাবাকে সঙ্গে নিয়ে নাজদ অভিমুখে যাত্রা করেন। অতঃপর মদিনা হতে দুই দিনের দূরত্বে অবস্থিত 'নাখল' নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছেন। সেখানে বনু গাতফান গোত্রের মুখোমুখী হতে হয়, কিন্তু যুদ্ধ হয়নি। তবে রাসূল ঐ সময় খওফের নামায (যুদ্ধাবস্থায় নামায) পড়ান।

সহিহ বুখারিতে আবু মূসা আশয়ারী হতে বর্ণিত হয়েছে যে 'আমরা রাসূলের সঙ্গি হলাম। আমরা ছিলাম ছয়জন। আমাদের সঙ্গে ছিলো একটি মাত্র উট, যার ওপর আমরা পালাক্রমে সওয়ার হচ্ছিলাম। আমার পা দুটোই আহত হয়েছিলো এবং নখ ঝরে পড়েছিলো। কাজেই আমরা নিজ নিজ পায়ের ওপর ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পট্টি বেঁধেছিলাম। এ কারণে এ যুদ্ধের নাম দেয়া হয়েছিলো যাতুর রেকা (ছিন্ন বস্ত্রের যুদ্ধ)।

জাবের (রা) বলেছেন, "আমরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম এমন সময় এক মুশরিক এসে নবী করীম (ﷺ) এর তরবারী হাতে নিয়ে বলল, তুমি আমাকে ভয় করছ? রাসূল বললেন, না। সে বলল, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? নবী করীম (ﷺ) বললেন, আল্লাহ।" জাবের (রা) বলেছেন, "রাসূলে করীম (ﷺ) হঠাৎ আমাদের ডাক দিলেন। আমরা সেখানে পৌঁছে দেখলাম যে একজন বেদুইন রাসূল (ﷺ) এর নিকট বসে রয়েছেন।"

নবী করীম (ﷺ) বললেন, "আমি শুয়েছিলাম, এমন সময় এই ব্যক্তি আমার তরবারী টেনে হাতে নিলে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।" সে তরবারী হাতে নিয়ে বলল, "আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?" আমি বললাম, "আল্লাহ!" এই হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে বসে রয়েছে। অতঃপর রাসূল (ﷺ) তাকে কোনো প্রকার তিরস্কার করলেন না বা ধমক দিলেন না।

আবু আওয়ানা (রা) এর বর্ণনা সূত্রে আরও বিস্তারিত জানা যায় যে, নবী (ﷺ) যখন তার উত্তরে বললেন, আল্লাহ! তখন তরবারী তার হাত থেকে পড়ে গেল। অতঃপর রাসূল (ﷺ) তরবারি নিজ হাতে উঠিয়ে নিয়ে বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? সে বলল, "আপনি ভালো পাকড়াওকারী প্রামাণিত হলেন (অর্থাৎ দয়া করুন)।" রাসূল বললেন, "তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল?"

সে বলল, "আমি অঙ্গীকার করছি যে আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চায় তাদের সঙ্গেও থাকব না।"

জাবের (রা) এর বর্ণনায় রয়েছে যে, এরপর রাসূল (ﷺ) তাকে ছেড়ে দেন। অতঃপর সে নিজ সম্প্রদায়ের নিকট গিয়ে বলে, আমি সর্বোত্তম মানুষের নিকট থেকে তোমাদের এখানে আসছি।

সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় বিবৃত হয়েছে যে, নামাযের ইকামত বলা হলো এবং রাসূল (ﷺ) এক দলকে দুই রাকাত নামায পড়ালেন, অতঃপর তারা পিছনে চলে গেলেন এবং রাসূল (ﷺ) দ্বিতীয় দলকে দুই রাকাত নামায পড়ালেন। এমনিভাবে নবী করীম (ﷺ) চার রাকাত এবং সাহাবায়ে কিরামের দুই দুই রাকাত করে হলো।

সহিহ বুখারির বর্ণনায় মুসাদ্দাদ, আবু আওয়ানা হতে এবং তিনি আবু বিশর হতে বর্ণনা করেছেন যে, সেই লোকটির নাম ছিলো গোত্তরেস বিন হাসের।

ইবনে হাজার বলেছেন, ওয়াকেদীর নিকট উক্ত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে বলা হয়েছে, উক্ত বেদুইনের নাম ছিলো দাসুর এবং সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। আল্লাহই ভালো জানেন।

উক্ত যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনকালে সাহাবায়ে কেরাম (রা) একজন মুশরিকা মহিলাকে বন্দী করেন। এর প্রেক্ষিতে তাঁর স্বামী প্রতিজ্ঞা করল, সে মুহাম্মদ (ﷺ) এর সাহাবাদের মধ্যে থেকে একজনের রক্ত প্রবাহিত করবে। এতদুদ্দেশ্যে সে রাত্রিতে বাহির হলো।

শত্রুদের আক্রমণ ও অনিষ্ট থেকে মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আব্বাদ বিন বিশর ও আম্মার বিন ইয়াসিরকে পাহারায় নিয়োজিত করা হয়। বন্দী মহিলার স্বামী যে সময়ে সেখানে এসেছিলো সেই সময় আব্বাদ (রা) দাঁড়িয়ে নামায পড়ছিলেন। ওই ব্যক্তি সে অবস্থাতেই তাঁর প্রতি তীর নিক্ষেপ করে। কিন্তু তিনি নামায ভঙ্গ না করেই শেষ সালামের মাধ্যমে নামায সমাপ্ত করেন। অতঃপর স্বীয় সঙ্গীকে জাগ্রত করেন।

অবস্থা বুঝে সঙ্গী বলেন, আপনি আমাকে ডাকেননি কেন? তিনি বললেন, "আমি একটি সূরা পাঠ করছিলাম। তা সম্পূর্ণ করা থেকে বিরত হওয়াটা আমি পছন্দ করিনি।"

পাষাণ হৃদয় বেদুইনদের ভীত সন্ত্রস্ত করার ব্যাপারে উক্ত যুদ্ধের প্রভাব ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত যুদ্ধের পর গাতফানদের ঐ সমস্ত গোত্র মাথা উঁচু করার আর সাহস পায়নি। তাদের মনোবল ক্রমে ক্রমে শিথিল হতে হতে শেষ পর্যন্ত তাঁরা পরাভূত হলো এবং হুনাইন যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে তাদেরকে দেখা গিয়েছিলো। তাদেরকে হুনায়েন যুদ্ধের গণীমতের অংশও দেয়া হয়েছিলো। আবার মক্কা বিজয় হতে প্রত্যাবর্তনের পর তাদের সদকা গ্রহণের জন্য ইসলামি রাষ্ট্রের কর্মচারীদের প্রেরণ করা হয়েছিলো এবং তারা নিয়মিত সদকা ও যাকাত আদায় করেছিলো। মূলকথা হচ্ছে এই যে, উক্ত কৌশল অবলম্বনের ফলে ঐ তিনটি শক্তি ভেঙ্গে যায়, যারা খন্দকের যুদ্ধে মদিনার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলো এবং যার ফলে সমগ্র অঞ্চলের শক্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিলো।

এরপর কতগুলো গোত্র বিভিন্ন অঞ্চলে যে গন্ডগোল ও চক্রান্তমূলক কাজকর্ম আরম্ভ করেছিলো মুসলমানরা খুব সহজেই তাদের আয়ত্বে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। অধিকন্তু, উক্ত যুদ্ধের পর বড়ো বড়ো শহর ও বিভিন্ন দেশ বিজয়ের পথ প্রশস্ত হতে শুরু করে। কারণ, উক্ত যুদ্ধের পর দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ইসলাম ও মুসলমানদের নিরাপত্তা শান্তি ও স্বস্তির জন্য পুরোপরি অনুকূল হয়ে ওঠে।

সপ্তম হিজরির কয়েকটি অভিযান

উপরিউক্ত যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল্লাহ সপ্তম হিজরির শাওয়াল মাস পর্যন্ত মদিনায় অবস্থান করেন। এই মদিনায় অবস্থানকালে তিনি যে সকল অভিযান প্রেরণ করেন, তার বিবরণ নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো-

১. কোদাইদ অভিযান-৭ম হিজরি (সফর কিংবা রবিউল আউয়াল মাস): বনু মুলাওয়াহ্ গোত্রকে শায়েস্তার জন্য গালিব বিন আবদুল্লাহ লায়সীর পরিচালনাধীনে কোদাইদ নামক স্থানে এই অভিযান প্রেরিত হয়। বনু মলুহ বিশর বিন সোয়াইদের বন্ধুদেরকে হত্যা করেছিলো। এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এই অভিযান প্রেরিত হয়েছিলো। এই অভিযাত্রী দল রাত্রি বেলা আক্রমণ করে বনু গোত্রের অনেক লোককে হত্যা করেন এবং গবাদী পশু তাড়িয়ে নিয়ে আসেন। শত্রুপক্ষ একটি বড়ো আকারের বাহিনীসহ মুসলিম বাহিনীকে অনুসরণ করে অগ্রসর হতে থাকে। উদ্দেশ্যে ছিলো মুসলিম বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাত হানা। কিন্তু তারা যখন মুসলিম বাহিনীর কাছাকাছি এসে পড়ে তখন প্রবল বেগে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে প্লাবন দেখা দেয়। এই প্লাবন উভয় পক্ষের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী নিরাপত্তা শান্তির মধ্য দিয়ে অবশিষ্ট পথ অতিক্রম করেন।

২. হুসমা অভিযান (৭ম হিজরি, জুমাদাল উখরা): এই অভিযান সংক্রান্ত আলোচনা হেরাক্লিয়াসের নিকট পত্রলিখন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

৩. তুরবাহ অভিযান (৭ম হিজরি শাবান মাস): এই অভিযান প্রেরণ করা হয়েছিলো ওমর বিন খাত্তাব (রা) এর নেতৃত্বে। এই অভিযানে ত্রিশজন মুসলিম সৈন্য অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা রাত্রিবেলা সফর করতেন এবং দিবা ভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। এই অভিযানের লক্ষস্থল ছিলো বনু হাওয়াযিন। মুসলিম অগ্রাভিযানের খবর পেয়ে বনু হাওয়াযিন পলায়ন করে, যার ফলে মুসলিম বাহিনী কাউকে হত্যা বা গ্রেফতার করা ছাড়াই মদিনা প্রত্যাবর্তন করেন।

৪. ফেদাক অঞ্চল অভিমুখে অভিযান (৭ম হিজরির শা'বান মাস): এই অভিযান প্রেরণ করা হয় বশীর বিন সাদ আনসারী (রা) এর নেতৃত্বে বনু মুররার সংশোধন উপলক্ষে। এই অভিযাত্রী দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো ত্রিশজন। বশীর (রা) তাদের অঞ্চলে পৌঁছে ভেড়া বকরি এবং গবাদি পশু তাড়িয়ে নিয়ে মদিনার পথে অগ্রসর হন। কিন্তু রাত্রিতে শত্রুদল তাঁদের পশ্চাদানুসরণ করে। তারা তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তীর শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তারা নিরস্ত্র হয়ে পড়েন এবং অবশেষে সকলকেই শাহাদত বরণ করতে হয়। কেবলমাত্র বশীর (রা) আহত অবস্থায় জীবিত থাকেন। আহত অবস্থায় তাকে ফেদাকে আনা হয়। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইহুদিদের নিকট অবস্থান করেন। সুস্থতা লাভের পর তিনি মদিনায় ফিরে আসেন।

৫. মিফায়া অভিযান (৭ম হিজরি রমাযান মাস): এই অভিযান প্রেরণ করা হয় গালিব বিন আবদুল্লাহ লাইসীর নেতৃত্বে বনু ওয়াল ও বনু আবদ বিন সা'লাবার সংশোধন উপলক্ষে এবং বলা হয়েছে যে, জুহায়না গোত্রের শাখা হারাকাতকে শিক্ষা দিতে। অভিযাত্রী দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো একশত ত্রিশ। মুসলমান মুজাহিদরা সংঘবদ্ধভাবে শত্রুদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং যে-ই মাথা উঁচু করে আক্রমণ প্রতিহত করতে আসে তাকে হত্যা করেন। অতঃপর শত্রুপক্ষের গবাদি পশুগুলো তাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

উক্ত অভিযানকালে উসামা বিন যায়েদ নাহিক বিন মোর্দাসকে (লা ইলাহ ইল্লাল্লাহ বলা সত্ত্বেও) হত্যা করেছিলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) নিন্দা করে বলেছিলেন তুমি তার অন্তর চিরে কেন বুঝবার চেষ্টা করলে না? সে সত্যাবাদী কি মিথ্যাবাদী ছিলো?

৬. খায়বার অভিযান (৭ম হিজরি শাওয়াল মাস): এই অভিযানে ছিলো ত্রিশজন অশ্বারোহী সমস্বয়ে গঠিত একটি দল। আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)- এর নেতৃত্বে প্রেরিত হয়েছিলো এই অভিযান। এই অভিযানের কারণ ছিলো আসীর অথবা বশীর বিন যারাম মুসলমানদের ওপর আক্রমণ পরিচালনার জন্য যারা গাতফানকে একত্রিত করছিলো।

মুসলমানরা যথাস্থানে পৌঁছার পর আসীরকে এই মর্মে আশ্বাস দেন যে, রাসূল তাঁকে খায়বারের গভর্নর নিযুক্ত করবেন। তার ত্রিশজন বন্ধুসহ তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তাঁরা তাকে উদ্বুদ্ধ করলেন। কিন্তু কারকারা পৌছার পর দুদলের মধ্যে কিছুটা সন্দেহের সৃষ্টি হওয়ার ফলে আসীর ও তার ত্রিশ জন সাথি মুসলমানদের হাতে নিহত হয়।

৭. ইয়ামান ও জাবার অভিযান (৭ম হিজরি শাওয়াল মাস): জাবার হচ্ছে বনু গাতফান বনু ফায়ারা ও বনু উয়াকার একটি এলাকার নাম। সবীর বিন কা'ব আনসারী (রা) কে তিন শত মুসলিম সৈন্যের একটি দলসহ সেখানে প্রেরণ করা হয়। উদ্দেশ্যে ছিলো মদিনার ওপর আক্রমণ চালানোর লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণরত এক বিরাট বাহিনীকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়া। অভিযাত্রী মুসলিম বাহিনী রাত্রিবেলা পথ চলতেন এবং দিবাভাগের আত্মগোপন করে থাকতেন। শত্রুরা যখন বশীরের অগ্রাভিযানের সংবাদ অবগত হলো তখন তারা পলায়ন করল। বশীরের বাহিনী শত্রুপক্ষের দুই ব্যক্তিকে বন্দী করতে এবং অনেকগুলো গবাদি পশু আয়ত্বে নিতে সক্ষম হন। বন্দী দুজনকে খিদমতে নববীতে হাজির করা হলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে।

গাবা অভিযান

ইমাম ইবনে কাইয়্যুম এই অভিযানকে উমরায়ে কাযার পূর্বে ৭ম হিজরির অভিযান সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই অভিযানের মূল কথা হচ্ছে এই যে, জাশম বিন মোয়াবিয়া গোত্রের এক ব্যক্তি অনেক লোকজন নিয়ে গাবা নামক স্থানে আসে। তার উদ্দেশ্যে ছিলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বনু কায়স গোত্রের লোকজনদের একত্রিত করা। এই সংবাদ অবগত হয়ে নবী করীম (ﷺ) আবু হাদরাদ (রা) কে মাত্র দুজন সঙ্গীসহ তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। হাদরাদ (রা) এমন এক যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করেন যার ফলে শত্রুদল শোচনীয় ভাবে পরাজয় বরণ করে। মুসলিম বাহিনী অনেক উট, ভেড়া ও ছাগল তাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

কাযা উমরাহ

যখন যিলকাদের চাঁদ দেখা গিয়েছিলো তখন নবী করীম (ﷺ) সাহাবাদের প্রত্যেককেই কাযা হিসেবে নিজ নিজ উমরাহ আদায় করার নির্দেশ প্রদান করেন। যাঁরা হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সকলেই উমরাহ আদায়ে শরিক হবেন, কেউই পিছনে থাকবেন না। উক্ত প্রেক্ষিতে সেই সময় যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, তাঁরা ব্যতীত অবশিষ্ট সকলেই যাত্রা করেন। হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন না এমন কিছু সংখ্যক লোকও উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে একই সঙ্গে বের হন। এভাবে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে বের হওয়া লোকের সংখ্যা ছিলো দুই হাজার (২০০০) মহিলা ও শিশুরা ছিলো এই সংখ্যার বাহিরে।

রাসূলে করীম সে সময়ে আবু রহম গেফারী (রা) কে মদিনায় তাঁর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন ৬০টি উট এবং সে সব দেখাশোনার দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন নাজিয়া বিন জুন্দুব আসলামী (রা) কে। তারা যুল হুলাইফাতে উমরার জন্য ইহরাম বাঁধলেন এবং উচ্চস্বরে লাব্বায়েক ধ্বনি উচ্চারণ করলেন। রাসূলের সঙ্গে মুসলিমরাও লাব্বায়েক পড়লেন। মুশরিকদের অঙ্গীকার ভঙ্গের আশঙ্কায় কাফেলার লোকজনদের সাথে অস্ত্র শস্ত্র ছিলো এবং যুদ্ধ সম্পর্কে পারদর্শী লোকদেরও সঙ্গে নেয়া হয়েছিলো। পরে ইয়াজেজ নামক উত্যকায় পৌঁছার পর সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র অর্থাৎ বর্ম, ঢাল, তরবারী, তীর বর্শা সব কিছুই রেখে দেয়া হলো এবং এ গুলো তত্ত্বাবধানের জন্য আওস বিন খাওলী আনসারী (রা) কে ২০০ লোকসহ নিযুক্ত করা হলো। আরোহীরা কোষবদ্ধ তরবারী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন।

মক্কায় প্রবেশের সময় রাসূল তাঁর কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর পৃষ্ঠে আরোহিত ছিলেন। মুসলমানগণ তরবারীগুলো কাধে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং রাসূলেকে সকলের মধ্যস্থলে রেখে লাব্বায়েক ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন। মুশরিকরা মুসলমানদের এ অভিযানকে একটি তামাশাসুলভ ব্যাপার মনে করে তা দেখার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে কা'বা গৃহের উত্তর দিকে অবস্থিত কায়াইকায়ান নামক পাহাড়ে গিয়ে বসে ছিলো এবং তারা পরস্পর বলাবলি করছিলো যে, তোমাদের নিকট এমন একটি দল আসছে মদিনার জ্বর যাদের একদম নষ্ট করে দিয়েছে। এ কারণে নবী করীম (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে এই বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, প্রথম তিনটি চক্কর যেন তাঁরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করবে এবং তারপর রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থান স্বাভাবিক অবস্থায় অতিক্রম করবে। সাত চক্কর পালন করার নির্দেশ শুধুমাত্র রহমত ও মহত্ব প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দেননি; বরং উল্লিখিত নির্দেশ প্রদানের অভিপ্রায়ই ছিলো যে, মুশরিকরা নবীর ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করুক।

এ ছাড়া রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কেরামকে ইযতিবার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ইযতিবার অর্থ হচ্ছে ডান কাধ খোলা রাখা এবং গায়ের চাদরখানা ডান বগলের নিচ দিয়ে অতিক্রম করিয়ে অগ্র ও পশ্চাৎ উভয় দিক হতে তার দ্বিতীয় কোণাটি বাম কাধের ওপর দিয়ে নেয়া।

রাসূলে করীম (ﷺ) সেই গিরিপথ ধরে মক্কায় প্রবেশ করলেন যা হাজুনের দিকে বের হয়েছে। নবী করীম (ﷺ) কে দেখার জন্য মুশরিকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো। রাসূল (ﷺ) একটানা লাব্বায়েক ধ্বনি উচ্চারণ করে চলছিলেন। অতঃপর হারামে পৌঁছে তিনি প্রদক্ষিণ করলেন। মুসলমানরাও কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করলেন।

রাসূল এবং সাহাবারা দৌড় দিয়ে তিন চক্কর সম্পন্ন করলেন। তা প্রত্যক্ষ করে মুশরিকরা বলতে থাকল, "এই সকল লোক সম্পর্কে আমরা ধারণা করেছিলাম যে, মদিনার জ্বর এদেরকে নষ্ট করে ফেলেছে, তাতো সঠিক নয়; বরং এরা সাধারণ লোকজন হতেও অধিক শক্তিশালী।"

আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণ সমাপ্ত করে নবী করীম (ﷺ) সাফা-মারওয়ায় সায়ী' করলেন। ঐ সময়ে রাসূল কুরবানি পশু নিয়ে মারওয়া পর্বতের নিকটে দাঁড়িয়েছিলেন। সায়ী শেষে নবী করীম (ﷺ) বললেন এটা হচ্ছে কুরবানির জায়গা এবং মক্কার সমস্ত জায়গা কুরবানির স্থান। এরপর মারওয়ার নিকটেই পশুগুলোকে কুরবানী করে দিলেন। অতঃপর মাথা মুন্ডন করলেন। সাহাবারা (রা) ও অনুরূপ করলেন। এরপর কিছু সংখ্যক লোককে ইয়াজেজ পাঠিয়ে দেয়া হলো। উদ্দেশ্যে ছিলো এরা সেখানে গিয়ে অস্ত্রশস্ত্রগুলো তত্ত্বাবধান করবেন এবং যারা সংরক্ষণের কার্যে নিয়োজিত ছিলেন তাঁরা উমরাহ পালন করবেন।

মক্কায় তিনদিন অবস্থান করলেন। চতুর্থ দিনে যখন সকাল হলো তখন মুশরিকরা আলী (রা) এর নিকট এসে বলল, তোমাদের সঙ্গীকে বল, তিনি যেন এখান থেকে চলে যান। কারণ, সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এরপর রাসূল মক্কা থেকে বেরিয়ে এসে সারফ নামক স্থানে অবতরণ করলেন।

মক্কা থেকে বেরিয়ে আসার প্রাক্কালে নবী করীম (ﷺ) পিছনে পিছনে হামযা (রা) এর কন্যাও চাচা বলতে বলতে এসে পড়ল। আলী (রা) তাকে কোলে তুলে নিলেন। এপর তার সম্পর্কে আলী, জাফর এবং যায়েদ (রা) এর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেকেই দাবি করছিলো, তিনিই তার লালন পালনের জন্য অধিক দাবিদার। নবী করীম (ﷺ) জাফরের অনুকূলে সীমাংসা করলেন। কারণ জাফরের স্ত্রী ছিলেন উক্ত মেয়েটির খালা।

উল্লিখিত উমরাহ পালনকালে নবী করীম (ﷺ) মায়মুনা বিনতে হারেস আমেরিয়া কে বিয়ে করেন। উক্ত ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে মক্কায় পৌঁছবার পূর্বেই রাসূল (ﷺ) জাফর বিন আবু তালিবকে মায়মুনা (রা) এর নিকট প্রেরণ করেন এবং তিনি তাঁর সমস্ত দায়িত্ব আব্বাসকে সমর্পণ করেছিলেন। কারণ, মায়মুনার বোন উম্মুল ফযল ছিলেন তারই স্ত্রী। আব্বাস (রা) রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে মায়মুনার বিয়ে সম্পন্ন করে দেয়।

অতঃপর মক্কা হতে প্রত্যাবর্তনের সময় নবী করীম (ﷺ) আবু রাফেকে পিছনে রেখে যান। নবী করীম (ﷺ) মায়মুনা নামক স্থানে পৌঁছলে তিনি নবী পত্নীকে তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।

উল্লিখিত উমরাহকে উমরায়ে কাযা' এই কারণেই বলা হয়ে থাকে যে, তা উমরায়ে হুদায়বিয়ার কাযা হিসেবেই আদায় করা হয়েছিলো। প্রকাশ থাকে যে, উক্ত উমরাহ চারটি নামে পরিচিত আছ যা-উমরায়ে কাযা, উমরায়ে কাযিয়া, উমরায়ে কেসাস এবং উমরায়ে সুলাহ।

আরো কতগুলো অভিযান

১.আবুল আওজা' অভিযান (৭ম হিজরির যিলহাজ্জ মাসে সংঘটিত): বনু সোলাইমকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে রাসুলে করীম আবুল আওজার নেতৃত্বে ৫০ (পঞ্চাশ) জনের একটি দল প্রেরণ করেন। বনু সোলাইমকে যখন ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয় তখন তারা উত্তরে বলল, "তোমরা যে কথার দাওয়াত দিচ্ছ, আমাদের তার কোনোই প্রয়োজন নেই।' অতঃপর তারা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে আবুল আওজা' আহত হন। কিন্তু এতদসত্বেও মুসলমানরা শত্রুদলের দুজনকে বন্দী করতে সক্ষম হন।

২. গালিব বিন আবদুল্লাহর অভিযান (৮ হিজরির সফর মাসে সংঘটিত): দুইশত লোকের সমন্বয়ে গঠিত দলের সঙ্গে গালিব বিন আবদুল্লাহকে ফেদাক অঞ্চলে বশীর বিস সা'দের বন্ধুদের শাহাদত স্থলে প্রেরণ করা হয়। তাঁরা শত্রুদের গবাদি পশু হস্তগত করেন এবং একাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করেন।

৩. যাত-ই-আতলাহ অভিযান (৮ম হিজরি রবিউল আওয়াল মাসে সংঘটিত): বনু কোযায়াহ মুসলমানদের আক্রমণের উদ্দেশ্যে বড়ো একটি দলকে একত্রিত করেছিলো। নবী করীম (ﷺ) যখন এই ব্যাপারটি অবগত হলেন, তখন কা'ব বিন উমাইর (রা) এর নেতৃত্বে মাত্র পনেরজন সাহাবা (রা) এর একটি দলকে সেখানে প্রেরণ করেন। সাহাবায়ে কিরাম তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তা প্রত্যাখ্যানের পর তীর নিক্ষেপ করে সকলকে শহীদ করে। মাত্র একজন জীবিত ছিলেন, যাকে নিহতদের মধ্য থেকে উঠিয়ে আনা হয়।

৪. যাত-ই ইরক অভিযান (৮ম হিজরি রবিউল আওয়াল মাসে সংঘটিত): এই অভিযানের কারণ হচ্ছে এই যে, বনু হাওয়াযিন গোত্র বার বার শত্রুপক্ষকে সাহায্য করছিলো। তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য ৫০ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে শুজা' বিন ওয়াহাব আসদী (রা) এর নেতৃত্বে প্রেরণ করা হয়। এ অভিযানে মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুদের যুদ্ধ হয়নি। তবে শত্রুপক্ষের কিছু গবাদি পশু মুসলমানদের হস্তগত হয়।

মূতা যুদ্ধ

মূতা হচ্ছে উরদূন অঞ্চলে বালকা' নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি জনপদের নাম। সেখান হতে বায়তুল মুকাদ্দাস দুই মনযিল ভ্রমণপথের দূরত্বে অবস্থিত। আলোচ্য যুদ্ধ উক্ত স্থানে সংঘটিত হয়েছিলো। রাসূলের জীবদ্দশায় মুসলমানদের সাথে এটাই ছিলো সব চাইতে রক্তক্ষয়ী সংঘ। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো ৮ম হিজরির জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসে।

যুদ্ধের কারণ

উক্ত যুদ্ধের কারণ ছিলো এই যে, রাসূল (ﷺ) হারেস বিন উমায়ের আযদী (রা) কে একটি পত্রসহ বুসরার শাসকের নিকট প্রেরণ করেন। তখনকার রোম সম্রাটের গভর্নর শোরাহবিল বিন আমর গাসসানী যিনি বালকা' নামক স্থান নিযুক্ত ছিলেন; তাঁকে বন্দী করার পর শক্ত করে বেঁধে হত্যা করেন।

উল্লেখ্য রাষ্ট্রীয় দূত এবং সংবাদবাহকদের হত্যা করার ব্যাপারটি সব চাইতে নিকৃষ্ট কাজ এবং জঘন্যতম অপরাধ। এই ধরনের কাজ ছিলো যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বরং বলা যায় যে, তার চাইতেও ভয়ঙ্কর। রাসূল (ﷺ) যখন এই সংবাদ অবগত হলেন, তখন তাঁর সামনে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল। ফলে মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রইল না। এতদুদ্দেশ্যে ৩০০০ (তিন হাজার) সৈন্যের একটি বাহিনী তিনি প্রস্তুত করে নিলেন। এটাই ছিলো সব চাইতে বড়ো ইসলামি যোদ্ধা বাহিনী। এর পূর্বে আহযাব যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধে মুসলমানদের এত বড়ো বাহিনী সংঘঠিত হয়নি।

সেনাপতিদের ব্যাপারে রাসূল (ﷺ) এর ওসিয়ত

রাসূল যায়েদ বিন হারেসাকে উক্ত সৈনদলের সৈনাপতি নিযুক্ত করেন এবং ওসিয়ত করেন যে, যায়েদকে যদি শহীদ করা হয় তবে জা'ফর এবং জা'ফরকে শহীদ করা হলে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহ সেনাপতি হবে।

সৈন্যদলের জন্য রাসূল (ﷺ) সাদা পতাকা বেঁধে তা যায়েদের হাতে দিলেন।

যে জায়গায় হাসের বিন উমায়েরকে শহীদ করা হয়েছে সেখানে উপস্থিত হয়ে সেখানকার অধিবাসীদের নিকট প্রথমে ইসলামের দাওয়াত পেশ করবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে সেটাই হবে উত্তম। অন্যথায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার পর যুদ্ধে লিপ্ত হবে। তিনি আরও বললেন, আল্লাহর নামে আল্লাহর পথে, আল্লাহর পথে কুফরীকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। সাবধান! অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না, আমানতের খিয়ানত করো না। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ এবং গীর্জায় অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করো না। খেজুর কিংবা অন্য কোনো বৃক্ষ কর্তন করো না, বাড়ি ঘর দালানকোঠা বিনষ্ট করো না।

ইসলামি সৈন্যদলের যাত্রা এবং আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার ক্রন্দন

ইসলামি সৈন্যদল যখন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলো তখন লোকেরা এসে রাসূল কর্তৃক নিযুক্ত সেনাপতিদেরকে বিদায়ী সালাম জানালেন। ঐ সময় অন্যতম সেনাপতি আবদুল্লাহ রাওয়াহা কাঁদতে লাগলেন। জনগণ বললেন "আপনি কেন কাঁদছেন?"

উত্তরে তিনি বললেন: দেখ, আল্লাহর শপথ! এর কারণ পৃথিবীর মায়া কিংবা তোমাদের সঙ্গে আমার মধুর সম্পর্ক এজন্য নয়: বরং আমি রাসূলকে আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াত পড়তে শুনেছি, যাতে জাহান্নামের উল্লেখ আছে। আয়াতটি হচ্ছে-

"আর তোমাদের প্রত্যেককেই তা (জাহান্নাম) অতিক্রম করতে হবে, এটি তোমার রবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।" (সূরা মারইয়াম: আয়াত-৭১)

আমি জানি না, জাহান্নামের নিকট আগমনের পর কেমন করে ফিরে আসতে পারব?

অন্যেরা বললেন, "আল্লাহ আপনার সঙ্গী হয়ে নিরাপত্তা দান করবেন, আপনার পক্ষ হতে শত্রুদের প্রতিহত করবেন, আপনাকে সওয়াব দ্বারা পুরস্কৃত করবেন এবং প্রত্যাবর্তন করিয়ে গণীমত দান করেন। আবদুল্লাহর বিন রাওয়াহা আবৃত্তি করলেন-

কিন্তু আমি দয়ালু আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই এবং এমন প্রচন্ড আঘাত চাই যেন রক্ত ছুতে বের হয় অথবা রক্ত পিপাসু যোদ্ধার হাতের বর্শার এমন তীব্র আঘাত চাই যা নাড়িভুঁড়ি ও কলিজা ভেদ করে দিবে। আল্লাহর বান্দাদের মাঝে রাসূল পূর্ণিমার চাদের মাতা নিস্কলুষ ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়ে আছেন। আমাকে এমনভাবে অত্যাচার ও অবমাননা করে শহিদ করা হয়, যাতে লোকজনেরা যখন আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে তখন যেন তারা বলে কি আশ্চর্য এই শহীদ! যাকে আল্লাহ হেদায়াত দিয়েছিলেন এবং যিনি হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

এরপর সৈন্যদল যাত্রা শুরু করলেন। রাসূল এঁদের অনুসরণ করতে করতে সানয়াতুল অদা নামক স্থান পর্যন্ত গমন করেন এবং সেখান হতে তাদের বিদায় বলেন।

ইসলামি সৈন্যদলের গমন ও হঠাৎ ভয়ানক অবস্থার সম্মুখীন

ইসলামি সৈন্যদল উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মায়ান নামক স্থানে পৌঁছেন। এই স্থানটি উত্তর হেজাযের কাছে শামী (উরদুনী) অঞ্চলে অবস্থিত। মুসলিম বাহিনী এখানে শিবির স্থাপন করেন। মুসলিম বাহিনীর গোয়েন্দারা সংবাদ দিল যে, রোমান সম্রাট হিরাকল বালকা' নামক অঞ্চলের মাআব নামক স্থানে এক লক্ষ রোমক সৈন্যসহ অবস্থান করছেন এবং লাখম ও জোযাম বিলকিন ও বোহরা এবং বালা (আরবের বিভিন্ন গোত্র) গোত্রের অতিরিক্ত এক লক্ষাধিক সৈন্য তাদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে।

মায়ান নামক স্থানে পরামর্শ বৈঠক

মুসলমানদের ধারণায় এই চিন্তা মোটেই ছিলো না যে, যুদ্ধ প্রিয় এরূপ এক বিশাল বাহিনীর সম্মুখীন তাঁদের হতে হবে। এই দীর্ঘ এ দুর্গম পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ এই সমস্যার মুখোমুখী হয়ে তাঁরা চিন্তায় একদম জর্জরিত হয়ে পড়লেন। তাঁদের সামনে এখন যে প্রশ্নটি সবাচাইতে বড়ো হয়ে দেখা দিল তা হচ্ছে, এই দুই লক্ষ সৈন্যের সমুদ্র সমতুল্য এই বিশাল বাহিনীর সঙ্গে মাত্র তিন হাজার সৈন্য নিয়ে তাঁরা মুকাবিলা করবেন কি-না। চিন্তায় চিন্তায় তাঁরা যেন অস্থির ও দিশেহারা হয়ে পড়লেন এবং দারুণ দুশ্চিন্তা ও আলাপ আলোচনার মধ্যে- ভাবনা করছিলো যে, একটি পত্র লিখে শত্রু সৈন্যের সংখ্যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে অবহিত করা হোক। এর ফলে তাঁর নিকট থেকে সঠিক নির্দেশনা লাভ কিংবা অধিক সাহায্য লাভের সম্ভাবনা থাকবে।

কিন্তু আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) উক্ত মতের বিরোধিতা করে বললেন, "হে ভ্রাতৃবৃন্দ! আল্লাহর কসম! যে ব্যাপারটিকে আপনারা ভয় করছেন সেটির হচ্ছে সেই শাহাদাত, যার খোঁজে আপনারা বের হয়েছেন। এটা অবশ্যই স্মরণ রাখবেন যে, শত্রুর সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়ে সৈন্য সংখ্যা, শক্তি কিংবা সমরাস্ত্রের আধিক্যের ভিত্তিতে নয়; রবং তাদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সেই দ্বীনের খাতিরে যার দ্বারা আল্লাহ আমাদিগকে সম্মানিত করেছেন। কাজেই চলুন আমরা অগ্রসর হই। আল্লাহর দ্বীনের খাতিরে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ এবং অফুরন্ত নেআমত এর যে কোনো একটি আমরা পাবই। আমরা বিজয়ী হলে বিজয়ের সম্মান লাভ করব। আর যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে শাহাদতের মর্যাদা লাভ করব।" অবশেষে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার প্রস্তাবকৃত কথার ওপর সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।

শত্রুদের ওপর ইসলামি সৈন্যদলের আক্রমণ

মূলকথা ইসলামি সৈন্যদল 'মায়ান' নামক স্থানে দুই রাত্রি অতিবাহিত করার পর শত্রুদের আক্রমণ করেন এবং বালকা নামক জায়গার একটি বস্তিতে; যার নাম ছিলো শারিফ হিরাকলের সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হন। এরপর শত্রু সৈন্য আরও নিকটবর্তী হলে মুসলমান সৈন্যরা মুতা নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর সৈন্যদের শৃংখলা বিন্যাস করা হয়। ডানদিকে কুতবাহ বিন কাতাদা ওযরী (রা) কে এবং বামদিকে উবাদাহ বিন মালেক আনসারী (রা) কে নিযুক্ত করা হয়।

যুদ্ধারম্ভ এবং সেনাপতিদের পর পর শাহাদাত বরণ

এরপর দুই দলের মধ্যে মুখোমুখী সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। এক পক্ষে অত্যন্ত সাধারণ অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত মাত্র তিন হাজার মুসলিম সৈন্য, অন্যপক্ষে উন্নত সমরসাজে সজ্জিত দুই লক্ষ সৈন্য। এই যুদ্ধ ছিলো সৈন্য সংখ্যা এবং সাজ-সরঞ্জামের ব্যাপারে এক অকল্পনীয় অসম যুদ্ধ।

রাসূল (ﷺ) এর পরম প্রিয় যায়েদ বিন হারেসা (রা) সর্ব প্রথম পতাকা গ্রহণ করেন এবং উদ্দীপনা ও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। অতি-বিক্রমে তিনি যুদ্ধ করতে থাকেন কিন্তু তাঁর যুদ্ধর এক পর্যায়ে শত্রুপক্ষের বর্শা-বিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

এরপর পালা ছিলো জা'ফর (রা) এর। অনতিবিলম্বে তিনি পতাকা উঠিয়ে নিলেন এবং পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন। যুদ্ধ যখন পূর্ণ মাত্রায় পৌঁছল তখন তিনি তাঁর লাল-কালো ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নীচে নেমে পড়লেন। ঘোড়ার পাসমূহ কেটে দিলেন এবং আঘাতের পর আঘাত হেনে শত্রুদের বাধা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে শত্রুর আঘাতে তাঁর ডান হাতটি কেটে যায়। এরপর বাম হাত পতাকা ধারণপূর্বক তাতে ঊর্ধ্বে উত্তোলিত অবস্থায় রাখার জন্য অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। এক পর্যায়ে তাঁর বাম হাতও কেটে যায়। অতঃপর তিনি তাঁর উভয় হাতের অবশিষ্টাংশ দ্বারা বুকের সঙ্গে পতাকা জড়িয়ে ধরেন যতক্ষণ না শাহাদাত বরণ করেন, ততক্ষণ পতাকা সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেন।

বলা হয়, একজন রোমীয় তাঁকে এমনভাবে তরবারী দ্বারা আঘাত করেছিলো যে, তাতে তাঁর দেহ দ্বিখন্ডিত হয়ে গিয়েছিলো। আল্লাহ তাঁর দুই হাতের বিনিময়ে জান্নাতে তাঁকে দুইটি ডানা প্রদান করেছেন যার ফলে তিনি যেখানে খুশি সেখানে উড়ে বেড়াতে পারছেন। এ জন্য তাকে জা'ফর তাইয়ার এবং যুল জানাহাইন উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই পাখা বিশিষ্ট উড়ন্ত জা'ফর।

ইমাম বুখারি (রা) নাফে'র বরাতে ইবনে ওমর (রা) হতে বর্ণনা করেছেন যে, মূতা যুদ্ধের দিন জাফর (রা) এর শাহাদাতের পর তাঁর শরীরে বর্শা ও তরবারীর ৫০টি আঘাত গণনা করেছিলাম। এসবের মধ্যে একটি আঘাতও পিছন দিক থেকে লাগেনি।

অন্য এক সূত্রের ভিত্তিতে ইবনে ওমর (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, আমি সেই যুদ্ধে মুসলমানদের সঙ্গে ছিলাম। জা'ফর বিন আবু তালিবের খোঁজ করতে গিয়ে আমরা তাঁকে শাহাদতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পেলাম। আমরা তাঁর দেহে বর্শা এবং তীরের নব্বইটিরও অধিক আঘাতের চিহ্ন প্রত্যক্ষ করলাম।

এভাবে অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করার পর জা'ফর (রা) শাহাদত বরণ করেন। অতঃপর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) পতাকা ধারণপূর্বক স্বীয় অশ্বাপৃষ্ঠে আরোহণ করে সম্মুখ পানে অগ্রসর হতে থাকলেন এবং তাঁর সঙ্গে মুকালিবা করার জন্য আহ্বান জানিয়ে নিচের কবিতার চরণগুলো আবৃত্তি করতে থাকলেন-

হে আত্মা! আমি শপথ করছি, তুমি অনিচ্ছায় হলেও অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতরণ করবে- নচেৎ বশ্যতা স্বীকার করবে। মানুষেরা যদি যুদ্ধের দামামা বাজাতে থাকে তাহলে আমি তোমাকে জান্নাত হতে কেন পশ্চাদপসরণ করতে দেখছি?

এরপর তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতরণ করেন। এমতবস্থায় তাঁর চাচাত ভাই গোশত যুক্ত একটি হাড় নিয়ে আসেন এবং বলেন এ দ্বারা আপন পৃষ্ঠদেশ শক্ত করে নাও। কারণ, এই দিবসে তোমাকে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। তিনি হাড়টি নিয়ে একবার কামড়ালেন। তারপর তা ফেলে দিয়ে তরবারী ধরলেন এবং সম্মুখে অগ্রসর হয়ে যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করলেন।

আল্লাহর তলোয়ারসমূহের মধ্য হতে এক তলোয়ার, হাতে পতাকা

ঐ সময় বনু আজলান সাবেত বিন আরকাম নামক এক সাহাবি লাফ দিয়ে পতাকা উচিয়ে ধরে বললেন, হে মুসলিম ভ্রাতারা! আমাদের মধ্য হতে কোনো একজনকে সেনাপতি নির্বাচিত করে নাও।" সাহাবারা (রা) বললেন আপনি এই দায়িত্ব পালন করুন।"

এ কথা শুনে তিনি বললেন, "এই দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।" উক্ত প্রেক্ষিতে সাহাবা কেরাম (রা) খালিদ বিন ওয়ালীদকে সেনাপতি মনোনীত করেন। সেনাপতির দায়িত্ব ভার গ্রহণের পর পতাকা হাতে নিয়ে তিনি অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। সহিহ বুখারিতে খালিদ বিন ওয়ালীদ নিজেই বর্ণনা করেছেন, মুতা যুদ্ধের দিন আমার হাতে নয়টি তরবারী ভেঙ্গে যায় এবং মাত্র এক খানা ইয়োমেনী তরবারী অবশিষ্ট থাকে।"

এদিকে রাসূল (ﷺ) যুদ্ধের ময়দান থেকে কোনো খবর না পেয়েই অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত ছিলেন।

এমন সময় ওহীর মাধ্যমে তাঁকে খবর দেওয়া হয় যে, পতাকা হাতে যুদ্ধ করতে গিয়ে যায়েদ (রা) শহীদ হয়েছেন। অতঃপর জা'ফর (রা) পতাকা হাতে নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকেন এবং তিনিও শহীদ হয়ে যান। তাঁর শাহাদত বরণের পর আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা পতাকা হাতে নিয়ে যুদ্ধে করতে গিয়ে শহীদ যান। এই সংবাদ অবগত হয়ে রাসূল (ﷺ) এর চক্ষুযুগল অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। অতঃপর আল্লাহর তলোয়ারসমূহের মধ্য হতে এক তলোয়ার পতাকা হাতে নিয়ে অতি বিক্রমে এমনভাবে যুদ্ধ করতে থাকেন যে, আল্লাহ মুসলমানদের বিজয়ী করেন।

যুদ্ধের পরিসমাপ্তি

জীবনবাজী রেখে যতই বীরত্ব এবং সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করুক না, কেন, এটা অতীব আশ্চর্যের বিষয় ছিলো যে, অত্যন্ত রণপিপাসা ও রণ-কুশলী বিশাল রোমীয় বাহিনীর মুকাবিলায় মুসলমানদের ছোট একটি বাহিনী পর্বতের ন্যায় অটল থাকবে এবং তার চাইতেও আশ্চর্যের ব্যাপার ছিলো খালিদ বিন ওয়ালীদের রণ-প্রজ্ঞা রণ-নৈপুণ্য। মুতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে যুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকা থেকে সম্মানের সঙ্গে বের করে আনার ব্যাপারে তিনি যে রণ-কৌশল অবলম্বন করেছিলেন ইসলামের ইতিহাসে চিরদিনের জন্য তা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে এবং প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য তা গর্ব ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

যুদ্ধের প্রথম দিন খালিদ বিন ওয়ালীদ রোমীয়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বক্ষণই অটল থাকেন। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তিনি এমন এক রণ-কৌশল অবলম্বন করেন যা রোমীয়দের মনে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং ভীতির সঞ্চার করে এবং অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে মুসলিম বাহিনীকে পিছনে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন। তাঁর এই রণ-কৌশলের কারণেই রোমীয় বাহিনী মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করার সাহস পায়নি। সৈন্য সংখ্যার ব্যাপারে এই যুদ্ধ ছিলো দারুণ অসম দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ। কাজেই, মুসলমানদের সসম্মানে পশ্চাদপসরণ ছিলো অনিবার্য। কিন্তু পশ্চাদপসরণের ব্যাপারে এমন এক কৌশল অবলম্বন করেন যা শত্রুপক্ষকে পিছু ধাওয়া করা থেকে শুধু বিরত রেখেছিলো তা-ই নয় রবং তারা কিছুটা ভীত সন্ত্রস্তও হয়ে পড়েছিলো।

তাঁর পরিবর্তিত রণ-কৌশলের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় দিন সকালে তিনি নতুন এক ধারায় তাঁর বাহিনীকে বিন্যস্ত করে নেন। এই বিন্যাস করতে গিয়ে তিনি সম্মুখভাগের দলকে পশ্চাদ্ভাগে এবং পশ্চাদ্ভাগের দলকে সম্মুখ ভাগে, ডান পার্শ্বস্থ দলকে বাম পার্শ্বে এবং বাম পার্শ্বস্থ দলকে ডান পার্শ্বে স্থানান্তরিত করেন। পরিবর্তিত বিন্যাসধারা প্রত্যক্ষ করে শত্রু চমকিত হয়ে ভাবল যে, তাঁরা নতুনভাবে সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। এর ফলে তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়ে গেল। এরপর উভয় পক্ষের সেনারা যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) সুশৃংখলভাবে বিন্যস্ত মুসলিম বাহিনীকে ধীরে ধীরে পিছনের দিকে সরিয়ে নিতে শুরু করেন।

কিন্তু রোমীয়রা এই ভেবে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল না, যে মুসলমানরা হয়তো এমন এক কৌশল অবলম্বন করেছেন যার মাধ্যমে তাদেরকে মরু প্রান্তরে হয়ে যেতে পারে এবং তেমনটি যদি হয়ে যায়, তাহলে তাদেরকে দারুণ দূর্বিপাকে নিপতিত হতে হবে। এর ফলে রোমীয়গণ মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবন করার পরিবর্তে নিজ অঞ্চলে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারটিকেই প্রাধান্য দিয়ে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রস্থান করল। এ দিকে মুসলমানরা নিরাপদে পশ্চাদপসরণ পূর্বক মদিনায় প্রত্যাবর্তন করল।

উভয় পক্ষের নিহত সৈন্য সংখ্যা

এই যুদ্ধে ১২জন মর্দে মু'মেন শাহাদত বরণ করেন। কিন্তু কত জন রোমীয় সৈন্য নিহত হয়েছিলো, তা সঠিক জানা যায়নি। তবে যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ সূত্রে জানা যায় যে, তাদের বহু সৈন্য নিহত হয়েছিলো। অনুমান করা যেতে পারে যে, খালিদ (রা) একাই যখন নিজ হাতে ৯ (নয়) খানা তলোয়ার ভেঙ্গেছেন, তখন নিহত এবং আহতের সংখ্যা কতই না অধিক হতে পারে।

এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া

যে প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে উক্ত যুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে নিজেদের নিপতিত করা হয়েছিলো যদিও সেই প্রতিশোধ গ্রহণ সম্ভব হয় নাই। তবুও মুসলমানদের জন্য তার গুরুত্ব ছিলো অপরিসীম। মুসলমানেরা যে একটি অকুতোভয় জাতি এবং কোনো পার্থিব শক্তি তা যত বিশালই হোক না কেন তার কাছে যে তাঁরা মাথা নোয়াতে পারে না, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল। শুধু তাই নয়, মুসলমানদের শৌর্যবীর্যের কথাও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল। কারণ, এর ফলশ্রুতিতে সমগ্র আরব জাহান স্তম্ভিত ও হতচকিত হয়ে পড়ল। কারণ তখন রোমক শক্তি ছিলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎশক্তি। শত্রুভাবাপন্ন রা মনে করে ছিলো, রোমক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারটি হবে মুসলমানদের জন্য আত্মহত্যার শামিল। কিন্তু মাত্র তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ও সুদক্ষ দুই লক্ষ সৈন্যের সঙ্গে মুকাবিলা করে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদ পশ্চাদপসরণে সক্ষম হওয়ার ব্যাপারটি ছিলো একটি অচিন্তনীয় ব্যাপার। অধিকন্তু, আরব জাহানের নিকট এই সত্যটিও উৎঘাটিত হয়ে গেল যে, আবর ভূখন্ডের লোকজন সম্পর্কে তাদের যে ধরনের জানা ছিলো মুসলমানেরা সে সব হতে ভিন্নতর অনন্য সাধারণ একটি গোষ্ঠী। এঁরা হচ্ছেন আল্লাহর তরফ থেকে সাহায্য ও সহানুভূতিপ্রাপ্ত এবং তাঁদের পরিচালক প্রকৃতই আল্লাহর রাসূল।

এমনি এক অবস্থার প্রেক্ষাপটে আমরা দেখতে পাই, আরবের যে সকল গোত্র মুসলমানদের প্রতি বৈরিতা পোষণ করতো এবং কারণে-অকারণে যখন তখন তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতো, মুতা যুদ্ধের পর তারাও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো। এদের মধ্যে বনু সোলাইম, আশজা, গাতফান, যুবইয়ান এবং ফাযারাহ ও অন্য কিছু গোত্র ইসলাম গ্রহণ করল। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই রোমকদের সঙ্গে মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আরম্ভ হয়ে যায়, যার ফলে পরবর্তী সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশ বিজয় এবং দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর মুসলমানদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

যাতুস সালাসেল অভিযান

মূতা যুদ্ধের ব্যাপারে রাসূল যখন শামরাজ্যে বসবাসকারী আরব গোত্রসমূহের মনোভাব বুঝতে পারলেন যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তারা রোমকদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলো, তখন তিনি এমন এক কৌশল অবলম্বন প্রয়োজন অনুভব করলেন যার মাধ্যমে এক দিকে আরব গোত্রসমূহ ও রোমকদের ঐক্যবোধের ক্ষেত্রে ফাটল সৃষ্টি করা যায় এবং অন্যদিকে মুসলমানদের নিজেদেরকে আরব গোত্রসমূহের বন্ধু হিসেবে পরিচয় প্রদানের মাধ্যমে তাদের মনে বিশ্বাস ও আস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। এই রকম এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে তারা আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য রোমকদের সঙ্গে জোট বাঁধার প্রয়োজন বোধ করবে না।

উক্ত উদ্দেশ্যে সাধনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি অবলম্বনের জন্য নবী করীম (ﷺ) আল আমর বিন আস (রা) কে মনোনীত করেন। কারণ, উপত্যকার বালা গোত্রের সঙ্গে তিনি সম্পর্কিত ছিলেন। তাই মুতা যুদ্ধের পর পরই অর্থাৎ ৮ম হিজরির জুমাদাল আখেরাতে সেই সকল গোত্রে লোকদের সান্তনা দানের উদ্দেশ্যে রাসূলে করীম আমর বিন আস (রা) কে তাদের নিকট প্রেরণ করেন। বলা হয়েছে যে, গোয়েন্দারা এই খবরও দিয়েছিলো যে, বনু কোযায়া মদিনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ওপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে একটি সৈন্যদল সংগ্রহ করে রেখেছে। সম্ভবত এই দুটি উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখেই রাসূল আল আমর বিন আস (রা) কে তাদের নিকট প্রেরণ করেন।

যা হোক, আমর বিন আস (রা) এর হাতে একটি সাদা ও একটি কালো পতাকা ছিলো ও তাঁর অধীনে মুহাজেরীন ও সঙ্গে ত্রিশটি ঘোড়াও ছিলো। বিদায়কালে রাসূল বাহিনী প্রধানকে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, বালা, উযরা এবং বিলকীন গোত্রের নিকট দিয়ে যাবার সময় যেসকল লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তাদের সাহায্য কামনা করবে। মুসলিম বাহিনী রাতের অন্ধকারে ভ্রমণ করতেন এবং দিবাভাগে আত্মগোপন করে থাকতেন। তখন জানতে পারলেন যে, তাদের বাহিনীতে বহুগুণ বেশি সৈন্য রয়েছে। তাই আমর বিন আস (রা) সাহায্য পাঠানোর আরজিসহ রাফে' বিন মুকাইস জুহানী (রা) কে রাসূল (ﷺ) এর কাছে প্রেরণ করলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি আবু উবাইদাহ বিন জাররাহর (রা) হস্তে পতাকা প্রদানপূর্বক বা তাঁর নেতৃত্বাধীনে দুই শত সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনীতে মুহাজেরীনদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যেমন, আবু বকর সিদ্দীক এবং ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) এবং আনসার প্রধানরাও ছিলেন। আবু উবাইদাহকে এই নির্দেশ প্রদান করা হয় যে, তিনি যেন আমর বিন আসের সঙ্গে মিলিত হয়ে উভয়ে একত্রে মিলেমিশে কার্যাদি সম্পন্ন করেন, কোনো ব্যাপারেই যেন মতবিরোধের সৃষ্টি না হয়। আমর বিন আস (রা) সঙ্গে মিলিত হয়ে আবু উবাইদাহ (রা) ইমামতি করতে চাইলে আমর বিন আস (রা) বললেন, "আপনি তো এসেছেন আমার সাহায্যকারী হিসেবে, আর আমি এসেছি বাহিনীর পরিচালক হিসেবে। আবু উবাইদাহ (রা) সে কথা মেনে নিলেন। আমর বিন আস (রা) নামাযে ইমামতি করতে থাকলেন।"

সাহায্য আসার পর মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে কোযায়ার অঞ্চলে প্রবেশ করলেন এবং উক্ত অঞ্চলকে পদানত করার পর দূর-দূরান্তের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। অগ্রগমনের এক পর্যায়ে এক দল সৈন্যের সঙ্গে তাঁদের যুদ্ধ বেঁধে যায়। কিন্তু মুসলমানরা যখন তাদের আক্রমণ করল তখন তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে গেল।

এরপর আউফ বিন মালেক আশজায়ী (রা) কে সংবাদবাহক হিসেবে রাসূল (ﷺ) এর কাছে প্রেরণ করা হয়। তিনি মুসলিম বাহিনীর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং যুদ্ধের অন্যান্য খবরাদি রাসূল (ﷺ) এর কাছে পেশ করেন। সে দেশের একটি মাঠের নাম ওয়াদিউল কোরা হতে কিছুদূর অগ্রসর হন। এখান হতে মদিনার দূরত্ব দশ দিনের পথ। ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা সূত্রে জানা যায় যে, মুসলমানরা জোয়া গোত্রের দেশ 'সালাসাল' নামক স্থানে একটি ঝর্ণার নিটে অবতরণ করেছিলেন। এ কারণেই উক্ত যুদ্ধের নাম 'যাতুস সালাসেল' হয়েছিলো।

খাযিরাহ অভিযান ৮ম হিজরি শা'বান মাস

উক্ত অভিযানের কারণ ছিলো এই যে, নাজদের অন্তর্ভুক্ত মুহারির গোত্রের অঞ্চলে খাযেরা নামক এই জায়গায় বনু গাতফান সৈন্য একত্রিত করছিলো। উক্ত প্রেক্ষিতে তাদের সমুচিত শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে পনেরো জন মুজাহিদসহ আবু কাতাদা (রা) কে প্রেরণ করা হয়। তিনি শত্রুদের একাধিক ব্যক্তিকে হত্যা এবং বন্দী করেন। কিছু গণীমতও হস্তগত হয়। এ অভিযান তাঁরা পনেরো দিন বাহিরে অবস্থান করেন।

মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ:

৮ম হিজরি রমযান মাস: ইমাম ইবনে কাইয়্যুম মক্কা বিজয় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছেন এ সেই মহাবিজয় যার মাধ্যমে আল্লাহ স্বীয় দ্বীনকে স্বীয় রাসূলকে স্বীয় সৈন্য সম্পদকে এবং স্বীয় ঘরকে, যা বিশ্ববাশির জন্য হেদায়েতের কেন্দ্রের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। কাফির ও মুশরিকদের কবল থেকে মুক্ত করেছেন। উক্ত বিজয়ে আসমানবাশির অন্তরেও খুশির ঢল নেমেছিলো। যার ফলে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে লাগল এবং পৃথিবীর মুখমন্ডল আলোর ঝলকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠল।'

উক্ত যুদ্ধের কারণ

হুদায়বিয়ার সন্ধি সংক্রান্ত আলোচনায় এটা উল্লিখিত হয়েছে যে, উক্ত সন্ধি-চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিলো এই, কেউ যদি মুহাম্মদ (ﷺ) এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় তাহলে হতে পারে। পক্ষান্তরে কেউ যদি কুরাইশদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে চায় তাহলে তাকেও সে সুযোগ এবং স্বীকৃতি দিতে হবে। অধিকন্তু, এ রকম আশ্রিত কোনো ব্যক্তি কিংবা গোত্র যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে এই আক্রমণকে আশ্রয়দাতা পক্ষের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করা হবে।

উল্লিখিত শর্তের আওতায় বনু খোযায়াহ রাসূল (ﷺ) এর আশ্রিত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এভাবে আপাতদৃষ্টিতে উভয় গোত্র পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে নিস্কৃতি ও নিরাপত্তা লাভ করে। কিন্তু যেহেতু উল্লিখিত গোত্রদ্বয়ের মধ্যে জাহেলিয়াত যুগ হতে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিবাদ চলে আসছিলো। সেহেতু চুক্তিবদ্ধ দুটি পক্ষের আশ্রিত হয়েও প্রতিহিংসার প্রশ্নটি তাদের মন থেকে অপসৃত হয়নি। সেজন্য যখন ইসলাম প্রভাব বিস্তার আরম্ভ করল এবং হুদায়বিয়ার চুক্তি লিপিবদ্ধ হলো তখন কুরাইশদের পক্ষ অবলম্বন করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পূর্বাপেক্ষা শক্তিশালী মনে করে বনু বকর বনু খোযায়ার ওপর তাদের পুরাতন শত্রুতার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মোক্ষম সুযোগ বলে মনে করল। উক্ত ধারণার প্রেক্ষিতে নাওফাল বিন মুয়াবিয়া দাইলী ৮ম হিজরির শা'বান মাসে বনু বকরের একটি বাহিনী নিয়ে রাতের আঁধারে বনু খোয়ায়াকে আক্রমণ করে বসল। ঐ সময় বনু খোযায়াহ ওয়াতির নামক এক ঝর্ণার ধারে শিবির স্থাপন করে বসবাস করছিলো। এই আক্রমণে খোযায়াহ গোত্রের অনেকে নিহত হয়।

এই যুদ্ধে কুরাইশরা অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে বনু বকরকে সাহায্য করে। এমনকি রাতের অন্ধকারে কুরাইশ যোদ্ধারাও এই যুদ্ধে বনু বকরের পক্ষে অংশগ্রহণ করে। এই যুদ্ধে বনু খোযায়ার বহু লোক নিহত হয় এবং তাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে হারাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

হারামে পৌঁছে বকর বলল, হে নাওফাল! এখন তো আমরা হারামে প্রবেশ করেছি। তোমাদের উপাস্য! তোমাদের উপাস্য! এর উত্তরে নাওফাল একটি অত্যন্ত ও গুরুতর কথা বলল। সে বলল, হে বনু বকর! আজ কোনো উপাস্য নেই, প্রতিশোধ গ্রহণ করে নাও। আমার জীবনের কসম! তোমরা হারামে চুরি করছ, এতদসত্ত্বেও কি হারামে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবে না?"

আপনারা সন্তান ছিলেন এবং আমরা ছিলাম জন্মদাতা।

আমরা মুসলমান হবার পর থেকে কখনো সাহায্যের হাত গুটিয়ে নেইনি। আল্লাহ আপনাকে হেদায়েত করুন আপনি সর্বদা সাহায্য করুন এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে আহ্বান করুন। তাহলে তারা সাহায্যের জন্য আসবেন। তবে মুখমণ্ডল বিবর্ণ করে উঠবে। আপনি এক (যুদ্ধপ্রিয়) সৈন্যদলের মধ্যে আগমন করবেন যা হবে (রক্তের) ফেনায় পরিপূর্ণ সমুদ্রের ন্যায় তরঙ্গযুক্ত। কুরাইশরা অবশ্যই আপনার সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং আপনার পরিপক্ক অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তারা আমার জন্য 'কাদা' নামক স্থানে গোপনে অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং মনে করেছে যে সাহায্যের জন্য আমি কাউকে আহ্বান কবর না। অথচ তারা বড়োই নিকৃষ্ট এবং সংখ্যায় অল্প। তারা রাতে তাহাজ্জুদ অবস্থায় আমাদের ওপর ওয়াতিরে আক্রমণ চালিয়েছে এবং আমাদের রুকু ও সিদজারত অবস্থায় আমাদেরকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ আমরা ছিলাম মুসলমান এবং আমাদেরকে তাঁরা হত্যা করেছে।"

রাসূল (ﷺ) বললেন, হে আমর বিন সালেম! তোমাকে সাহায্য করা হয়েছে। এরপর আকাশে মেঘমালার একটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়। রাসূল বললেন, এই মেঘমালা বনু কাবের সাহায্যের শুভ সংবাদে চমকাচ্ছে।

এরপর বোদাইল বিন উকবা খোযায়ীর তত্ত্বাবধানে বনু খোযায়ার একদল মদিনায় আগমন করেন এবং রাসূল কে অবহিত করেন যে, কা'ব নিহত হয়েছেন এবং কিভাবে কুরাইশরা বনু বকরকে সাহায্য করেছে। এরপর এই লোক মক্কায় ফিরে গেলেন।

নতুনভাবে সন্ধিচুক্তির জন্য আবু সুফিয়ানের মদিনা আগমন

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুরাইশ এবং তার সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ দল যা করেছিলো, তা ছিলো প্রকাশ্য অঙ্গীকারভঙ্গ এবং সন্ধিচুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাদের এই ধরনের কাজকর্মকে কোনোক্রমেই সঠিক কিংবা সঙ্গত বলা যেতে পারে না। এ কারণে সঙ্গে সঙ্গে এটা অনুধাবন করল যে, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সত্যি সত্যিই তারা একটা অন্যায় করেছে এবং এর ফলাফল অত্যন্ত তিক্ত ও ভয়াবহ হতে পারে। এ আশংকায় তারা একটি পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করে। এই বৈঠকে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, চুক্তির পুনরুজ্জীবনের জন্য দলের পরিচালক আবু সুফিয়ানকে অনতিবিলম্বে মদিনায় প্রেরণ করা হোক।

সন্ধিচুক্তি ভঙ্গের পর কুরাইশরা কী করতে পারে সে সম্পর্কে রাসূল (ﷺ) সাহাবাদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। এ অবস্থায় প্রেক্ষাপটে তিনি তাঁদের বললেন, আমি যেন আবু সুফিয়ানকে দেখছি যে, অঙ্গীকারনামা পুনঃ দৃঢ় করা এবং সন্ধিচুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য সে মদিনায় এসে গিয়েছে।

এদিকে কুরাইশদের পরামর্শ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি আবু সুফিয়ান যখন উসফান নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন বোদাইলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়ে গেল। বোদাইল মদিনা হতে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছিলেন। আবু সুফিয়ান বুঝতে পারল যে, সে নবী করীম (ﷺ) এর নিকট থেকে ফিরে আসছে। সে তাকে জিজ্ঞেস করল, বোদাইল! কোথা থেকে আসছ?" বোদাইল বলল, "আমি খোযায়ীর সঙ্গে এই পার্শ্ববর্তী তীরে এবং ওয়াদী উপত্যকায় গিয়েছিলাম।" আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করল, তুমি কি মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট গিয়েছিলে? সে বলল, 'না'।

কিন্তু বোদাইল যখন মক্কার দিকে রওয়ানা হয়ে গেল তখন আবু সুফিয়ান বলল, সে যদি মদিনায় গিয়ে থাকে তাহলে সেখানে তার উটকে যে ফলের আটি খাইয়েছিলো, তা থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। অতঃপর সে বোদাইল যেখানে তার উটকে বসিয়েছিলো সেখানে গেল এবং উটের বিষ্ঠায় খেজুরের বীচি দেখতে পেল। খেজুরের বীচি পরখ করে সে বলল, 'আল্লাহর কসম করে বলছি যে, বোদাইল মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট গিয়েছিলো।'

যাহোক, আবু সুফিয়ান মদিনা গিয়ে পৌঁছল এবং নিজ কন্যা উম্মুল মু'মেনীন হাসীবী (রা) এর ঘরে গেল। সে যখন রাসূল (ﷺ) এর বিছানায় বসার ইচ্ছা করল, তখন তিনি বিছানা জড়িয়ে নিলেন। এই অবস্থা দেখে আবু সুফিয়ান বলল হে আমার কন্যা! তুমি কি মনে করছ যে এই বিছানা আমার জন্য উপযুক্ত নয়, না আমি এই বিছানার উপযুক্ত নই?

উম্মুল মু'মেনীন বললেন, এ হচ্ছে রাসূল (ﷺ) এর বিছানা, আর আপনি হচ্ছেন অপবিত্র মুশরিক।" এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান বলতে লাগল, "আল্লাহর কসম! আমার পরে তোমার অমঙ্গল রয়েছে।'

অতঃপর আবু সফিয়ান সেখান থেকে বাহির হয়ে রাসূলের নিকট গেল এবং কথাবার্তা বলল। রাসূল তার কোনো কথারই উত্তর দিলেন না। এরপর সে আবু বকর (রা) এর নিকট গিয়ে তাঁকে রাসূলের সঙ্গে কথা বলতে বলল। তিনি বললেন, আমি এমনটি করতে পারব না।"

এরপর সে ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) এর নিকট গেল এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলল। তিনি বললেন, "আমি তোমাদের জন্য কেন সুপারিশ করব? আল্লাহর কসম! আমি যদি একটি লাঠি ছাড়া অন্য কিছুই না পাই তাহলে তার দ্বারাই তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব! তবুও তোমাদের ক্ষমা করব না।"

অতঃপর সে আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এর নিকট গেল। সেখানে ফাতিমা এবং হাসান (রা) ও ছিলেন। হাসান (রা) তখনো ছোট ছিলেন এবং লাফালাফি করে বেড়াচ্ছিলেন। আবু সুফিয়ান বলল, হে আলী! অন্যদের তুলনায় তোমাদের সঙ্গে আমার গাঢ় বংশীয় সম্পর্ক আছে। আমি এখন একটি বিশেষ প্রয়োজনে এসেছি। এমনটি যেন না হয় যে, আমাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়। তুমি আমার জন্য মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট সুপারিশ কর। আলী (রা) বললেন, আবু সুফিয়ান তোমার ওপর দুঃখ, রাসূল (ﷺ) এর নিকট কোনো কথাই বলতে পারব না। এরপর সে ফাতিমা (রা) কে লক্ষ করে বলল, আপনি কি আমার জন্য এতটুকু করতে পারবেন যে, আপনার এই ছেলেকে নির্দেশ করবেন যেন সে লোকজনের মাঝে আমার আশ্রয়ের ব্যাপারে ঘোষণা দিয়ে সর্ব সময়ের জন্য আরবের নেতা হয়ে যাবে। ফাতিমা বললেন, "আল্লাহর কসম আমার এই ছেলে তেমন উপযুক্ত হয়নি যে সে লোকজনের মাঝে কারো আশ্রয়ের জন্য ঘোষণা করতে পারে। তাছাড়া রাসূলের উপস্থিতিতে অন্য কেউ ঘোষণা দিতেও পারবে না।"

উদ্দেশ্যে সাধনে ব্যর্থ হয়ে আবু সুফিয়ানের সামনে পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত চিন্তিত ও নৈরাশ্যজনক অবস্থায় সে বলল, হে হাসানের পিতা! আমি অনুধাবন করছি যে অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, আমাকে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ব্যাপারে কিছুটা ইঙ্গিত প্রদান কর।

আলী (রা) বললেন, আল্লাহর কসম! তোমার উপকারে আসতে পারে এমন কোনো পথ আমি দেখছি না। তবে যেহেতু বনু কেননার সর্দার সেহেতু জনগণের সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে আশ্রয়ের ঘোষণা করে নাও। তথঃপর আপন দেশে প্রত্যাবর্তন কর।

আবু সুফিয়ান বলল, তুমি কি মনে করছ যে, এটা আমার জন্য ফলপ্রসূ হবে।

আলি বললেন, 'না, আল্লাহর কসম তোমার জন্য এটা ফলপ্রসূ হবে আমি তা মনে করি না। কিন্তু এর বিকল্প অন্য কোনো কিছুই আমার মনে আসছে না। এরপর আবু সুফিয়ান মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, হে জনগণ! সকলের মাঝে আমি আশ্রয়ের ঘোষণা করছি।

অতঃপর সে যখন কুরাইশদের নিকট গিয়ে পৌঁছল, তখন কুরাইশরা তার পিছনের অবস্থা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল। আবু সুফিয়ান বলল, আমি মুহাম্মদ (ﷺ) এর নিকট গিয়ে কথাবার্তা বললাম, কিন্তু আল্লাহর কসম, তিনি কোনোই উত্তর দেননি। এরপর আবু কোহাফার ছেলের নিকট গেলাম। কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো মঙ্গল দেখতে পেলাম না। সেখান থেকে ওমর ইবনে খাত্তাব এর নিকট গেলাম। তাঁকে পেলাম সব চাইতে শক্ত শত্রুর ভূমিকায়। অতঃপর গেলাম আলীর নিকট। মন-মানসিকতার ক্ষেত্রে তাঁকে পেলাম সব চাইতে নরম অবস্থায়! সে আমাকে কিছু পরমর্শ দিল সেই মোতাবেক কাজ করলাম। কিন্তু কার্যকর হবে কি না তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। লোকেরা বলল, 'সে পরামর্শটা কী?

আবু সুফিয়ান বলল, 'তাঁর পরামর্শ ছিলো এই আমি জনগণের নিকট আশ্রয়ের ঘোষণা করে দিই। পরে আমি তাই করলাম।"
কুরাইশরা বলল, 'তাহলে কি মুহাম্মদ (ﷺ) তা বাস্তাবায়ন করে মেনে নিয়েছে।
আবু সুফিয়ান বলল, 'না'।
লোকেরা বলল, 'তুমি ধ্বংস হও। ঐ ব্যক্তি (আলী) তোমার সঙ্গে কেবল রহস্যই করেছে।
আবু সুফিয়ান বলল, 'আল্লাহর কসম! এ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ই ছিলো না।'

গোপনে যুদ্ধ প্রস্তুতি

ইমাম তাবারানীর বর্ণনা সূত্রে জানা যায়, অঙ্গীকার ভঙ্গের তিনদিন পূর্বেই রাসূল আয়েশা (রা) কে সফরের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় প্রস্তুতি গোপনে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু এই খবর কেউ জানতেন না। আয়েশা (রা) যখন প্রস্তুতি পর্বে ব্যাপৃত ছিলেন তখন আবু বকর (রা) সেখানে উপস্থিত হয়ে বললেন, "কন্যা! এ কিসের প্রস্তুতি?

উত্তরে তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম! আমি জানি না।'

আবু বকর (রা) বললেন, 'এ তো বনু আসফার অর্থাৎ রোমকদের সাথে যুদ্ধের সময় নয়। তাহলে রাসূল (ﷺ) এর ইচ্ছা আবার কিসের? আয়েশা (রা) বললেন, 'আল্লাহর কসম! আমার জানা নেই।'

তৃতীয় দিবসে প্রত্যুষে আমর বিন সালেম খোযায়ী ৪০ জন অশ্বারোহীসহ মদিনায় এসে উপস্থিত হলেন এবং এর পূর্বেকার কবিতাটি পড়লেন, শেষ পর্যন্ত। তখন সাধারণ লোকেরা জানতে পারলেন, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয়েছে। এরপর এল বোকাইল। অতঃপর আবু সফিয়ান এল। অবস্থার প্রেক্ষাপটে জনগণ পরিস্থিতির প্রকৃতি অনুধাবন করলেন। অতঃপর রাসূল প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'মক্কা যেতে হবে।' সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই প্রার্থনাও করলেন যে, 'হে আল্লাহ! 'গোয়েন্দাদের এবং কুরাইশদের নিকট এ সংবাদ পৌঁছতে বাধার সৃষ্টি করো এবং থামিয়ে দাও, যাতে আমরা তাদের অজান্তেই একেবারে তাদের মাথার ওপর গিয়ে পৌঁছতে পারি।'

অতঃপর অত্যন্ত গোপনে উদ্দেশ্যে সাধনের লক্ষ্যে ৮ম হিজরি রমযান মাসের প্রথম ভাগে আবু কাতামা বিন রিবয়ীর নেতৃত্বে আটজন মুজাহিদ সমন্বয়ে গঠিত একটি ছোট বাহিনীকে বাতনে আযামের দিকে প্রেরণ করেন। এই স্থানটি যী খাশাব এবং যিল মারওয়াহর মধ্যস্থলে মদিনা হতে প্রায় ৩৬ আরবি মাইল দূরত্বে অবস্থিত। উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে, এই অভিমুখী অভিযান প্রত্যক্ষ করে সাধারণ মানুষ যেন ধারণা না করে যে উক্ত অঞ্চল অভিমুখেই যাত্রা করবেন এবং শেষ পর্যন্ত খবরটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই দলটি যখন নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছল তখন তাঁরা জানতে পারলেন যে, রাসূল মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেছেন। অতঃপর তাঁরাও গিয়ে রাসূল সঙ্গে মিলিত হলেন।

এদিকে হাতিব বিন আবি বালতায়া কুরাইশদের নিকট এ পত্র লিখে এই সংবাদ প্রেরণ করেন যে, রাসূল মক্কা আক্রমণ করতে যাচ্ছেন। বিনিময় প্রদানের প্রতিশ্রুতি সাপেক্ষে তিনি এক মহিলার মাধ্যমে পত্রটি প্রেরণ করেন। মহিলা তাঁর চুলের খোঁপার মধ্যে পত্রটি রেখে পথ চলছিলো। কিন্তু রাসূল আসমান হতে ওহীর মাধ্যমে হাতিবের উক্ত ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে অবহিত হলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে তিনি আলী, মেকদাদ, যুবায়ের এবং আবু মুরশেদ গানাভীকে এই বলে প্রেরণ করলেন যে, 'তোমরা খাক নামক উদ্যানে গিয়ে একটি হাওদানশীন মহিলাকে দেখতে পাবে, ঐ মহিলার নিকট কুরাইশদের জন্য লিখিত ও প্রেরিত একটি পত্র আছে, সেই পত্রটি তার থেকে উদ্ধার করতে হবে। সাহাবাগণ অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মহিলার নাগাল পাওয়ার জন্য ছুটে চললেন। এক পর্যায়ে তাঁরা উষ্ট্রীর পৃষ্ঠে আরোহণকারিনী মহিলাটির নাগাল পেলেন। তাঁরা উট থেকে নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তার কাছে কোনো পত্র আছে কি না। কিন্তু সে তার নিকট পত্র থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করল। তার উটের হাওদা তল্লাশী করেও তাঁরা কোনো পত্র না পাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। অবশেষে আলী (রা) বললেন, 'আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, রাসূল (ﷺ) মিথ্যা বলেননি। কিংবা আমরাও মিথ্যা বলছি না। হয় তুমি পত্রখানা বের করে দেবে, নতুবা আমরা তোমাকে একদম উলঙ্গ করে তল্লাশী চালাব। সে যখন তাদের দৃঢ়তা অনুধাবন করল তখন বলল, 'আচ্ছা তাহলে তোমরা অন্য দিকে মুখ ফিরাও। তারা অন্য দিকে মুখ ফেরালে মহিলা তার খোঁপা থেকে পত্রটি বের করে তাদের নিকট সমর্পণ করল। তাঁরা পত্রখানা নিয়ে নবী করীম (ﷺ) এর নিকট পৌঁছালেন। পত্রে লেখা ছিলো-

হাতিম বিন বালতায়ার পক্ষ হতে কুরাইশদের প্রতি- অতঃপর কুরাইশগণকে রাসূল (ﷺ) এর মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সংবাদ দেয়া হয়েছিলো।

নবী করীম (ﷺ) হাতিবকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এমন কাজ করেছ। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এই ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে তাড়াতাড়ি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। আল্লাহর কসম! আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল এর ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। আমি স্বধর্মত্যাগী হইনি এবং আমার মধ্যে কোনো পরিবর্তনও আসেনি। কুরাইশদের সঙ্গে আমার কোনো রক্তের সম্পর্কও নেই। তবে কোনো কোনো ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আমরা সংশ্লিষ্ট ছিলাম এবং আমার পরিবারের সদস্য এবং সন্তান-সন্ততি সেখানেই আছে। তাদের সঙ্গে আমার এমন কোনো আত্মীয়তা বা সম্পর্ক নেই যে, তারা আমার পরিবারের লোকজনদের দেখাশোনা করবে। পক্ষান্তরে আপনার সঙ্গে যাঁরা রয়েছেন মক্কায় তাঁদের সকলেরই আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, যাঁরা তাঁদের দেখাশুনা করেন। যদিও সম্পূর্ণ বেআইনী ও অধিকার বহির্ভূত তবুও এ উদ্দেশ্যের প্রেক্ষাপটে আমি কুরাইশদের জন্য একটা উপকার করতে চেয়ে ছিলাম, যার বিনিময়ে তারা আমার আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি যত্নশীল হবে।

উক্ত কথাবার্তার প্রেক্ষিতে ওমর বিন খাত্তাব (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি তার মাথা কেটে ফেলি। কারণ, সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং সে মুনাফিক হয়ে গিয়েছে।" রাসূলে করীম (ﷺ) তখন বলেছেন, 'হে ওমর! তুমি জান না যে, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আর হতে পারে আল্লাহ উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রকাশ্যভাবে বলে দিয়েছে, "তোমরা যা চাও তা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।" একথা শুনে ওমরের চুক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে উঠল। অতঃপর বললেন, 'আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভালো জানেন।'

এভাবে আল্লাহ গোয়েন্দাদের গ্রেফতার করিয়ে দেন এবং মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সংক্রান্ত কোনো খবর কুরাইশদের নিকট পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে দেন।

ইসলামি সেনাবাহিনী মক্কার পথে

৮ম হিজরি ১০ই রমযান রাসূলে করীম মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর সাথে দশ হাজার মুসলমানের এক বাহিনী। এই সময় মদিনার প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা হয় আবু রাহাম গেফারীর (রা) এর ওপর।

জুহফা কিংবা তার কিছু অংশ আগে রাসূলের চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। ইসলাম গ্রহণপূর্বক স্বীয় পরিবার পরিজনসহ তিনি মদিনা হিজরত করে যাচ্ছিলেন। আবার আবওয়া নামক স্থানে রাসূলের চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান বিন হারেস এবং ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তাদের উভয়কে দেখে নবী করীম (ﷺ) মুখ ফিরিয়ে নেন। কারণ, এরা উভয়েই নবী করীম (ﷺ) কে দারুণ দুঃখ-কষ্ট দিয়েছিলো এবং তাঁর নামে কুৎসা রটনা করেছিলো। এই অবস্থা থেকে উম্মে সালমা (রা) নিবেদন করেন, এমনটি হওয়া উচিত নয় যে, আপনার চাচাতো এবং ফুফাতো ভাই আপনার নিকট সবচেয়ে বেশি হতভাগ্য হবে। এদিকে আলী (রা) আবু সুফিয়ান বিন হারেসকে শিখিয়ে দিলেন যে 'তুমি রাসূলের সামনে গিয়ে সেই কথা বল, যা ইউসুফের ভাইয়েরা ইউসুফকে বলেছিলেন,

'আল্লাহর কসম! আল্লাহর আপনাকে আমাদের ওপর সম্মানিত করেছেন এবং নিশ্চয়ই আমরা দোষী ছিলাম।' (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৯১)

কারণ, নবী করীম (ﷺ) এটা পছন্দ করবেন না যে, অন্য কারো উত্তর তাঁর চাইতে উত্তম ছিলো। অতএব, আবু সুফিয়ান তাই করল এবং উত্তরে রাসূল তাৎক্ষণিকভাবে বললেন:

"অদ্য তোমাদের উপর কোনো নিন্দা নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনি শ্রেষ্ঠ ও দয়ালু।" (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৯২)

উক্ত প্রেক্ষিতে আবু সুফিয়ান কবিতার নিম্নরূপ কয়েকটি চরণ আবৃত্তি করে শোনাল,

তোমার জীবনের কসম! সেই সময় আমি এরজন্যই পতাকা উত্তোলন করেছিলাম যে, কাফিরদের অশ্বারোহী মুহাম্মদের অশ্বারোহীর ওপর বিজয়ী হবে, তখন আমার অবস্থা সেই রাত্রিকালের প্রবাশির ন্যায় ছিলো, যে অন্ধকারে দিগ্বিদিক হারিয়ে ঘুরতে থাকে। কিন্তু এখন সময় এসে গেছে, আমাকে পথ দেখানো হবে এবং আমি হোদায়েত লাভ করব। আমাকে অন্য একজন পথ প্রদর্শক হেদায়েত করেছেন এবং সেই ব্যক্তিই আমাকে আল্লাহর পথের কথা বলেছেন যাকে আমি প্রতিটি স্থান থেকেই তিরস্কারের মাধ্যমে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

এই কবিতা শুনে আল্লাহর রাসূল তার বক্ষে একটি থাবা মারলেন এবং বললেন, 'প্রতি মুহূর্তেই তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলে।'

মাররাউয যাহরান নামক স্থানে ইসলামি সৈন্যদের শিবির স্থাপন

রাসূল নিজ সফর অব্যাহত রাখলেন। এই সফরকালে রাসূল এবং সাহাবাগাণ রোযাবস্থায় ছিলেন। কিন্তু উসফান এবং কোদাইদের মধ্যবর্তী একটি স্থানের নিকটে পৌঁছে রোযা ভঙ্গ করলেন।

সাহাবায়ে কিরামও রোযা ভঙ্গ করলেন। এরপর আবার সফর অব্যাহত রাখলেন। এভাবে রাত্রির পূর্বভাগ সফর করে মাররাউয় যাহরান পৌঁছে অবতরণ করলেন। সেখানে রাসূল নির্দেশক্রমে লোকেরা পৃথক পৃথক আগুন জ্বালাল। এভাবে দশ হাজার স্থানে আগুন জ্বালানো হয়। রাসূল ওমর বিন খাত্তাবকে (রা) প্রহরী নিযুক্ত করেন।

আবু সুফিয়ান নবীর দরবারে

মাররাউয যাহরানে শিবির স্থাপনের পর আব্বাস (রা) রাসূল (ﷺ) এর সাদা খচ্চরের ওপর আরোহণ করে বের হলেন। তাঁর উদ্দেশ্যে ছিলো যে, যদি উপযুক্ত কোনো লোক পাওয়া যায়, তাহলে তার মাধ্যমে কুরাইশদের নিকট এই খবরটি পাঠানো যে, রাসূল (ﷺ) এর মক্কা প্রবেশের পূর্বেই তারা যেন রাসূলের নিকট উপস্থিত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে।

এদিকে আল্লাহ কুরাইশদের নিকট খবর পাঠাবার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই কারণে এতদসংক্রান্ত কোনো খবরাখবরই তাদের নিকট পৌঁছায়নি। তবে তারা অত্যন্ত ভীত এবং আতঙ্কিত কালযাপন করছিলো এবং আবু সুফিয়ান বারবার বাহিরে খবরাখবর নেয়ার চেষ্টা করছিলো। ঐ সময় হাকীম বিন হেযাম এবং বোদাইল বিন ওয়ারকা খবর জানার জন্য বের হয়েছিলো।

আব্বাস (রা) বলেছেন, 'আল্লাহর কসম! আমি রাসূলের খচ্চরের ওপর সওয়ার হয়ে যাচ্ছিলাম এমন সময় আবু সুফিয়ান এবং বোদাইল বিন ওয়ারকার কথোপকথন আমার কর্ণগোচর হলো। আবু সুফিয়ান বলল, আল্লাহ কসম! এই রাত্রির মতো এত অধিক আগুন এবং সৈন্য আমি ইতোপূর্বে কখনো দেখিনি।

উত্তরে বোদাইল বলল, 'আল্লাহর কসম! এরা বনু খোযায়া। যুদ্ধ তাদের রাগান্বিত করেছে।'

আবু সুফিয়ান বলল, 'বনু খোযায়া সংখ্যায় কতই না অল্প এবং নিকৃষ্ট সৈন্যবাহিনীতে এত লোকজন এবং এত আগুন তারা পাবে কোথায়?'

আব্বাস বলেছেন, 'আমি তাদের কথোপকথন শুনে সব কিছু বুঝে নিলাম এবং বললাম, 'আবু হানযালা না কি? সে আমার কন্ঠস্বর চিনতে পেরে বলল, 'আবুল ফযল না কি?
আমি বললাম, 'হ্যাঁ'।
সে বলল, 'কী ব্যাপার? আমার পিতামাতা তোমার জন্য উৎসর্গিত হোক।'
আমি বললাম, সেখানে লোকজনসহ রাসূল রয়েছেন। হায় কুরাইশদের ধ্বংস! আল্লাহর শপথ!'
সে বলল, 'এখন উপায় কী? আমার মাতা-পিতা তোমার জন্য উৎসর্গিত হোক।'

আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম! তিনি যদি তোমাদের পেয়ে যান তাহলে মাথা কেটে ফেলবেন। অতএব, এসো আমার এই খচ্চরের পেছনে বসে যাও। আমি তোমাদেরকে রাসূলের নিকট নিয়ে গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অতঃপর আবু সুফিয়ান আমার পিছনে উঠে বসল। তার অন্য দুই বন্ধু ফিরে চলে গেল।

আব্বাস (রা) বললেন, 'আমি আবু সুফিয়ানকে নিয়ে চললাম। যখনই কোনো উনুনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখনই সেখানকার লোকেরা বলছিলেন, কে যায়? কিন্তু পরক্ষণেই যখন দেখত যে, রাসূল (ﷺ) এর খচ্চর এবং আমি তার আরোহী তখনই বলত যে রাসূল (ﷺ) এর চাচা এবং তাঁর (নবীর) খচ্চর। এভাবে চলতে চলতে যখন আমরা ওমর বিন খাত্তাবের (রা) উনুনের নিকট গেলাম, তিনি বললেন, 'কে'? অতঃপর বিনয়ের সাথে আমার নিকট আসলেন এবং আমার পিছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে তিনি বললেন, 'আবু সুফিয়ান আল্লাহর দুশমন। আল্লাহর অশেষ প্রশংসা যে কোনো অঙ্গীকার কিংবা কৌশল ছাড়াই তাকে আমাদের মধ্যে পাওয়া গেছে।' একথা বলার পর সেখান থেকে বের হয়ে তিনি দ্রুতপদে রাসূল (ﷺ) এর অবস্থান স্থলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমিও খচ্চরকে তাড়া দিয়ে দ্রুত এগিয়ে চললাম।

আমি কিছুক্ষণ আগেই সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম এবং খচ্চর পৃষ্ঠ থেকে অবতরণ করে রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপবিষ্ট হলাম। ইতোমধ্যে ওমরও এসে পৌঁছলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইনি আবু সুফিয়ান! আমাকে নির্দেশ দেয়া হোক আমি তাঁর গর্দান কেটে ফেলি। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, 'আল্লাহর কসম! আমি ছাড়া অন্য কেউ আজ রাত্রে আপনার সাথে কানা-ঘুষা করবে না।' এদিকে আবু সুফিয়ান সম্পর্কে ওমর বার বার ওই কথা বলতে থাকলেন। তখন আমি বললাম, ওমর থাম। আল্লাহর কসম! এ আদী বিন কা'ব গোত্রের লোক হতো, তুমি এমন কথা বলতে না। ওমর বললেন, আব্বাস তুমি থাম। আল্লাহর কসম! তোমার সালাম গ্রহণ আমার নিকট খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় ছিলো। তার কারণ রাসূল (ﷺ) এর নিকট তোমার ইসলাম গ্রহণ খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চাইতে অধিক পছন্দনীয় ছিলো।

রাসূল বললেন, 'আব্বাস তাকে (আবু সুফিয়ানকে) তোমার নিজ তাঁবুতে নিয়ে যাও, প্রত্যুষে আমার নিকট নিয়ে এসো। নির্দেশ মুতাবিক তাকে তাঁবুতে নিয়ে যান এবং সকালে নবীর কাছে হাযির করেন। তাঁকে দেখে তিনি বললেন, হে আবু সুফিয়ান! তোমার ওপর দুঃখ হচ্ছে এই জন্য যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এই মহাসত্য উপলব্ধি করার সময় কি এখনো তোমার হয়নি? আবু সুফিয়ান বলল, 'আমার মাতা পিতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক। আপনি যে কত সহনশীল, কত সম্মানিত এবং স্বজনরক্ষক! আমি বুঝে নিয়েছি যে, যদি অন্য কোনো উপাস্য থাকত, তাহলে এতদিনে তা আমার কাজে আসতো।'

রাসূল বললেন, 'আবু সুফিয়ান! তোমার জন্য সত্যিই দুঃখ হয়। এখনো কি তোমার বুঝার সময় আসেনি যে আমি সত্যিই আল্লাহর রাসূল?

আবু সুফিয়ান বলল, "আমার মাতাপিতা আপনার ওপর উৎসর্গিত হোক। আপনি কতই না ধৈর্যশীল, কতই না দয়ালু ও আত্মীয়তা সম্পর্ক স্থাপনকারী। কিন্তু ঐ ব্যাপারে এখনো কিছু না কিছু সংশয় তো আছেই।" উক্ত প্রেক্ষিতে আব্বাস (রা) বললেন, "ওহে তোমার মাথা কাটার পূর্বেই ইসলাম কবুল করে নাও এবং এ কথা স্বীকার করে নাও যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।" আব্বাস (রা) এর এ কথার প্রেক্ষিতে আবু সুফিয়ান ইসলাম কবুল করলেন এবং সত্যের সাক্ষ্য প্রদানপূর্বক কালেমা পাঠ করলেন।

আব্বাস (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান সম্মান প্রিয় তাই তাঁকে কোনো সম্মান প্রদান করুন। নবী করীম (ﷺ) বললেন, ঠিক আছে। যে, ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে নিজ ঘরের দরজা ভেতর হতে বন্ধ করে নেবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থাকবে।

ইসলামি সৈন্য মাররাউয যাহরান হতে মক্কার দিকে

মঙ্গলবার সকাল ৮ম হিজরি ১৭ই রমযান রাসূল মাররাউয যাহরান হতে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তিনি আব্বাসকে এই বলে নির্দেশ প্রদান করলেন, সে 'আবু সুফিয়ানকে উপত্যকার সংকীর্ণতার ওপর পর্বত প্রান্তে থামিয়ে রাখবে যাতে ঐ পথ দিয়ে গমনকারী আল্লাহর সৈনিকদের সে স্বচক্ষে দেখতে পারে। আব্বাস রাসূলের নির্দেশ পালন করলেন। এদিকে গোত্রগুলো নিজ নিজ পতাকা বহন করছিলেন। সেখান দিয়ে যখন কোনো গোত্র গমন করত তখন আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করতেন, এসকল লোকজন এরা কারা? উত্তরে আব্বাস উদাহরণস্বরূপ হয়তো বলতেন, 'বনু সোলাইম'। আবু সুফিয়ান তখন বলতেন, সোলাইমের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?

অতঃপর পরবর্তী গোত্রের গমনের সময় আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? আব্বাস উত্তর দিলেন, 'মোযায়না'। আবু সুফিয়ান বললেন, 'মোযায়নার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?' এমনিভাবে গোত্রগুলো এক এক করে গমন করল। যখনই কোনো গোত্রের লোকজন গমন করত তখনই আবু সুফিয়ান হয়তো আব্বাসকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। যখন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেয়া হতো তখন তিনি গোত্রর নাম ধরে বলতেন, 'এর সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?'

অতঃপর রাসূল যখন তাঁর সবুজ দলের মাঝে অত্যন্ত জাঁকজমক অবস্থার মধ্য দিয়ে আগমন করলেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। এখানে মানুষ ব্যতিরেকে শুধু লোহার বেড়া দেখা যাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান বললেন, 'সুবহানাল্লাহ। হে আব্বাস! এরা কারা?'

তিনি বললেন, 'আনসার ও মুহাজেরীনদের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাসূল আগমন করছে।' আবু সুফিয়ান বললেন, 'এঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কি কারো কখনো হতে পারে?'

এরপর আরো বললেন, 'আবুল ফযল তোমার ভাতিজার রাজত্ব তো আল্লাহ বড়ো জবরদস্ত করে দিয়েছেন।
আব্বাস (রা) বললেন, 'আবু সুফিয়ান! এ হচ্ছে নবুয়াতি সম্মান।'
আবু সুফিয়ান বললেন, 'হ্যাঁ, এখন তো তাই বলতে হবে,
এই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে যায়। আনসারদের পতাকা ছিলো সা'দ বিন উবাদার নিকট। তিনি আবু সুফিয়ানের নিকট দিয়ে যেতে যেতে বললেন-

'আজ রক্তক্ষরণ এবং মারপিটের দিন, আজ হারামকে হালাল করা হবে।'

আজ আল্লাহ কুরাইশদের ভাগ্যে অপমান নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতঃপর যখন রাসূল সেখান দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন আবু সুফিয়ান বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কী সে কথা শুনেননি, যা সা'দ বলল। তিনি বললেন, সা'দ কী বলেছে? আবু সুফিয়ান বললেন, 'এই এই কথা বলেছে।'

এ কথা শুনে ওসমান এবং আব্দুল রহমান বিন আওফ নিবেদন করে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ভয় করছি, সাদ আবার না জানি কুরাইশদের মারধর শুরু করে দেয়।'

আল্লাহ রাসূল বলেন, 'না তা হবে না; রবং আজকের দিনটি হবে সেই দিন, যেদিন কাবা ঘরের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শিত হবে। আজকের দিনটি হবে সেই দিন, যে দিন আল্লাহ কুরাইশদের ইজ্জত প্রদান করবেন। এরপর নবী করীম (ﷺ) লোক পাঠিয়ে সাদের নিকট থেকে পতাকা নিয়ে তাঁর পুত্র কায়েসের হাতে প্রদান করেন। উদ্দেশ্যে ছিলো তাঁকে বুঝতে দেয়া যে, পতাকা তাঁর হাতেই রইল, তাঁর হাত থেকে বের হলো না। অবশ্য, একথাও বলা হয়েছে যে, নবী করীম (ﷺ) এ পতাকা নিয়ে জোবায়েরের হাতে প্রদান করেছিলেন।

আকস্মিকভাবে ইসলামি সৈন্য কুরাইশদের মাথার ওপর

রাসূলে করীম যখন আবু সুফিয়ানের নিকট থেকে চলে গেলেন তখন আব্বাস তাঁকে বললেন, 'শীঘ্রই এখন মক্কায় নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন কর।' আবু সুফিয়ান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে উচ্চকণ্ঠে এই বলে আহ্বান জানালেন, হে কুরাইশ! মুহাম্মদ (ﷺ) এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা আগমন করছেন যার সঙ্গে মুকাবিলা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কারো নেই। কিন্তু যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তারা নিরাপদ থাকবে। এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী হিন্দা বিনতে উৎবা এসে তাঁর মোচ ধরে বলল, মেরে ফেল এই চর্বিযুক্ত ও শক্ত গোশতধারীকে। এরূপ সংবাদ পরিবেশনকারী ও পূর্বাভাষদাতা বিনষ্ট হোক।

আবু সুফিয়ান বলল, তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখ, তোমাদের জীবন সম্পর্কে এই মহিলা যেন তোমাদের ধোকায় নিক্ষেপ না করে। কারণ মুহাম্মদ এত অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আগমন করেছেন যে, এর সঙ্গে মুকাবিলা করার সাধ্য কারো নেই। এমতাবস্থায় যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ থাকবে।

লোকেরা বলল, 'আল্লাহ যেন তোমাকে ধ্বংস করে। তোমার বাড়ি আমাদের কত জনের আশ্রয়স্থল হবে?'

আবু সুফিয়ান বললেন, 'আরো কথা আছে। যারা ভেতর থেকে নিজ নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে তারাও নিরাপদ থাকবে বলে গণ্য হবে। অধিকন্তু, যারা মসজিদে হারামে গিয়ে প্রবেশ করবে তারাও নিরাপদ থাকবে বলে গণ্য হবে। এ কথা শোনার পর লোকেরা সকলে নিজ নিজ ঘর ও মসজিদুল হারাম অভিমুখে পলায়ন করতে থাকল।

তবে কিছু সংখ্যক লম্পটকে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল এবং বলল, 'এদেরকে আমরা অগ্রভাগে রাখছি। যদি কুরাইশরা কৃতকার্য হয় তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হব, কিন্তু যদি তাদের খুব মারধর করা হয় তাহলে আমাদের নিকট হতে যা কিছু চাওয়া হবে আমরা মেনে নিব।

মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এই সকল নির্বোধ কুরাইশ ইকরামা বিন আবু জাহল, সাফওয়ান বিন উমাইমা এবং সোহাইল বিন আমররের পরিচালনায় খান্দামায় একত্রিত হলো।

তাদের মধ্যে বনু বকর গোত্রের হেমাস বিন কাইস নামক এক লোকও ছিলো যে ইতোপূর্বে অস্ত্র ঠিকঠাক করছিলো। উক্ত প্রেক্ষিতে তার স্ত্রী এক দিন বলেছিলো, 'আমি যা কিছু দেখছি তা কোথাকার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?

সে বলল, 'মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের সঙ্গে মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।'

স্ত্রী বলল, আল্লাহর কসম! আমার আশা যে, আমি মুহাম্মদ এর কোনো সঙ্গীকে তোমার খাদেম করে ছাড়ব।

তারপর সে বলল- তারা যদি আজ প্রতিদ্বন্ধীতায় আসে তবে আমার কোনোই প্রতিদ্ধন্ধী থাকবেন না। এ হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র, লম্বা ফলা-বিশিষ্ট বর্শা এবং দ্রুত আক্রমণাত্বক দুই ধার-বিশিষ্ট তরবারী। খান্দামার যুদ্ধে এই ব্যক্তিও এসেছিলো।

যুতাওয়া নামক স্থানে ইসলামি সৈন্য

অগ্রগমনের এক পর্যায়ে রাসূল (ﷺ) এর বাহিনী মাররাউয যাহরান হতে যুতাওয়ায় গিয়ে পৌঁছলেন। সে সময় আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ের অতি সম্মান দেখানোরা জন্য অত্যধিক বিনয়ের সঙ্গে নবী করীম (ﷺ) স্বীয় মস্তক এমন ভাবে অবনমিত রেখেছিলেন যে দাড়ির লোম সওয়ারীর সঙ্গে গিয়ে লাগছিলো। রাসূল যুতাওয়ায় গিয়ে সেনাবাহিনীর শৃংখলা বিধান ও বিন্যাস করে নিলেন। ডান পাশে নিযুক্ত করলেন খালিদ বিন ওলীদকে। সে স্থানে ছিলো আসলাম, সোলাইম, গেফার, মোযায়না, জোহামনা অন্য গোত্রসমূহ। খালিদ বিন ওলীদকে নির্দেশ দেয়া হলো নিচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে। কুরাইশরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের সকলকে হত্যা করতে। তারপরে সাফা পাহাড়ের ওপর নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।

যোবায়ের বিন আওয়াম (রা) ছিলেন বাম পাশে। তাঁর সঙ্গে ছিলো রাসূলের পতাকা। রাসূল তাঁকে নির্দেশ দিলেন মক্কার উপরিভাগ অর্থাৎ কোদা নাক স্থান দিয়ে প্রবেশ করতে এবং হাজুনে গিয়ে পতাকা উত্তোলনপূর্বক তথায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে।

পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবাইদা (রা)। তাঁকে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, বাতনে ওয়াদীর পথ দিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হতে, যাতে তিনি রাসূলের পূর্বেই মক্কায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।

মক্কায় ইসলামি সৈন্যের প্রবেশ

উপরিউক্ত নির্দেশ লাভের পর ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী নিজ নিজ নির্ধারিত পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকলেন। খালিদ বিন ওলীদের বাহিনীর সম্মুখে যে সকল মুশরিক এসেছিলো তাদের সকলকেই হত্যা করা হলো। অবশ্য, তাঁর বন্ধুদের মধ্য থেকে কুরযা মবিন জাবের ফাহরী এবং খোনাইস বিন খালিদ বিন রাবীয়া শাহাদাত বরন করেন। এর কারণ ছিলো তারা দুজন সেনাবাহিনী থেকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ভিন্ন পথ ধরে গমন করছিলেন। সেই অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়।

খান্দামায় পৌঁছানোর পর খালিদ (রা) এবং কুরাইশদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সামান্য সংঘর্ষে বারো জন মুশরিক নিহত হওয়ার পর তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। হেমাস বিন কাইসম যে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পূর্ব থেকেই অস্ত্রশস্ত্র ঠিক-ঠাক করে রেখেছিলো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার পর নিজ গৃহে প্রবেশ করল এবং তার স্ত্রীকে বলল, দরজা বন্ধ করে দাও। তার স্ত্রী বলল, 'ঐ কথাটি কোথায় গেল যা তুমি বলছিলে?"

উত্তরে সে বলল: তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে যখন সাফওয়ান ও ইকরামা পলায়ন করে আর যখন উন্মুক্ত তরবারী দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করা হয় যা হাতের কবজি এবং মাথার খুলিগুলোকে এমনভাবে কর্তন করছিলো যে, পিছনে তাদের গর্জন ও গোলামাল ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তাহলে তুমি নিন্দনীয় সামান্যতম কথাও বলতে পারতে না।

এরপর খালিদ (রা) দৃপ্ত পদে মক্কার গলি পথগুলো অতিক্রম করে সাফা পাহাড়ের ওপর রাসূলের সঙ্গে মিলিত হন।

এদিকে যোবায়ের (রা) অগ্রভাবে এগিয়ে হাজুন নামক স্থানে ফাতাহ মসজিদের নিকট রাসূল (ﷺ) এর পতাকা উত্তোলন এবং তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করেন। অতঃপর সেখানে একটানা অবস্থান করতে থাকলেন যতক্ষণ না রাসূল (ﷺ) সেখানে আগমন করলেন।

মসজিদে হারামে রাসূল (ﷺ) প্রবেশ এবং মূর্তি অপসারণ

এরপর রাসূল উঠলেন এবং সম্মুখ, পেছন ডান ও বাম পার্শ্বে মোতায়ন আনসার ও মুহাজেরীন পরিবেষ্টিত অবস্থায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে মসজিদে হারামে আগমন করলেন। মসজিদে হারামে আগমনের পর সর্বপ্রথম তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং তার পর আল্লাহর ঘর তওয়াফ করলেন। ঐ সময় রাসূলের হাতে একটি ধনুক ছিলো এবং আল্লাহর ঘরের আশপাশে ও ছাদের ৩৬০টি মূর্তি ছিলো। নবী করীম (ﷺ) সেই ধনুক দ্বারা মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে করতে বলছিলেন:

‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা ধ্বংস হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা সর্বদা ধ্বংস হওয়ারই ছিল।’ (সূরা ঈসরা: আয়াত -৮১)

‘সত্য এসেছে এবং বাতিল কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, আর কিছু পুনরাবৃত্তিও করতে পারে না।’ (সূরা সাবা: আয়াত-৪৯)

রাসূল (ﷺ) এর আঘাতে মূর্তিগুলো ভূপাতিত হচ্ছিল।

স্বীয় উষ্ট্রীর ওপর আরোহণপূর্বক তিনি তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। ইহরাম অবস্থায় না থাকার কারণে তিনি শুধু তাওয়াফ করাই যথেষ্ট মনে করেন। তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর ওসমান বিন তালহাকে ডেকে তাঁর কাছ থেকে কা'বা ঘরের চাবি গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশ ক্রমে কা'বা ঘর খোলা হয় এবং তিনি ভিতরে প্রবেশ করেন। এই সময় কাবা ঘরের অভ্যন্তরীণ ছবিগুলো তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। তার মধ্যে ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ) এর প্রতিকৃতিদ্বয়ও ছিলো। তাঁদের হাতে ভবিষ্যৎ কথন সম্পর্কিত তীর ছিলো। এই দৃশ্য দেখে বললেন, 'আল্লাহ ঐ সকল মুশরিককে ধ্বংস করুন, আল্লাহর কসম ঐ দুজন পয়গম্বর কখনই ভবিষ্যৎ জানার জন্য এই ধরনের তীর ব্যবহার করেননি। কাবা ঘরের অভ্যন্তরে কাঠের তৈরি একটি কবুতরীর প্রতিকৃতিও তাঁর চোখে পড়ে। উক্ত প্রতিকৃতিটি তিনি নিজ হাতে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলেন। অন্যন্যা মূর্তিগুলোকেও তাঁর নির্দেশে মুছে ফেলা হয়।

কাবা ঘরে রাসূলের নামায আদায় এবং কুরাইশদের নিকট ভাষণ প্রদান

এরপর নবী করীম (ﷺ) ভিতর থেকে কা'বা ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। উসামা ও বেলাল ভিতরেই ছিলেন। অতঃপর তিনি দরজার সামনে দেয়ালের অভিমুখী হন এবং দেয়াল থেকে মাত্র তিন হাত দূরত্বে থেমে যান। এই অবস্থায় রাসূল (ﷺ) এর বাম পাশে দুটো স্তম্ভ, ডান পাশে একটি এবং পেছনে তিনটি স্তম্ভ ছিলো। ঐ সময়ে কা'বা ঘরটি ছিলো ছয় স্বম্ভবিশিষ্ট। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) সেখানেই নামায আদায় করেন। নামাযান্তে আল্লাহর ঘরের ভেতরের অংশগুলো তিনি ঘুরে দেখতে এবং তাকবীর ও একত্ববাদের আয়াতগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। অতঃপর কা'বা ঘরের দরজা খুলে দেন। রাসূল কী করেন, তা দেখার জন্য বিপুল সংখ্যক কুরাইশ কা'বা ঘরের সম্মুখে কাতারবন্দী ছিলো। দরজার দুই অংশ ধারণ পূর্বক নিম্নভাবে দন্ডায়মান কুরাইশদের সম্ভোধন করে নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনোই উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করে দেখিয়েছেন। তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন এবং তিনি এককভাবেই সব দলকে পরাজিত করেছেন। শুনে রাখ, আল্লাহর ঘরের চাবি সংরক্ষণ এবং হাজীদের পানি পান করানো সম্মান ছাড়া সমস্ত সম্মান অথবা পুণ্যতা অথবা রক্ত প্রবাহিত করা আমার এই দুই পদতলে রইল। স্মরণ রেখ, ভুলবশতঃ হত্যা, যা লাঠিসোটা দ্বারা হয়ে থাকে, তা ইচ্ছাকৃত হত্যার অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এর জন্য রক্তপণ দিতে হবে। অর্থাৎ এক শত উট দিতে হবে, যার মধ্যে ৪০টি হবে গর্ভবতী।

হে কুরাইশ! আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহেলি যুগের অহংকার এবং পূর্ব পুরুষদের গৌরব খতম করে দিয়েছেন। সমস্ত মানুষ আদম (আ) এর সন্তান এবং তিনি ছিলেন মাটির তৈরি। এরপর নবী করীম (ﷺ) পরবর্তী পাঠ করেন-

হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা হুজরাত: আয়াত-১৩)

আজ কারো কোনো নিন্দা নেই

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, হে কুরাইশ জনগণ! তোমাদের কী ধারণা তোমাদের সঙ্গে আমি কিরূপ ব্যবহার করব বলে মনে করছ?

সকলে বলল, 'খুব ভালো। আপনি সদয় ভাই এবং সদয় ভাইয়ের পুত্র।' বললেন, 'তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, আমি তোমাদের সঙ্গে ঠিক সেরূপ কথাই বলছি। যেমনটি ইউসুফ (আ) তাঁর ভাইদের সঙ্গে বলেছিলেন, আজ তোমাদের জন্য কোনোই নিন্দা নেই।' যাও আজ তোমাদের সকলকে মুক্তি দেয়া হলো।

কা'বা ঘরের চাবি

এরপর রাসূল মসজিদে হারামে বসলেন। আলী (রা) বলেছেন, 'যার হাতে চাবি ছিলো তিনি নবীজির খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'রাসূল! আমাদের জন্য হাজীদের পানি পান করানোর সম্মানের সাথে কা'বা ঘরের চাবি সংরক্ষণের সম্মানও একই সঙ্গে প্রদান করুন। আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুক। অন্য এক বর্ণনা মতে এই আবেদনটি আব্বাস (রা) করেছিলেন। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, ওসমান বিন তালহা কোথায়? তাঁকে ডাকা হলে নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'ওসমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ পুণ্য এবং ওয়াদা পূরণের দিন। চাবি দেয়ার সময় নবী করীম (ﷺ) আরও বলেছিলেন, 'সংরক্ষণের জন্য তুমি এই চাবি গ্রহণ কর। তোমার নিকট থেকে চাবি সেই ছিনিয়ে নিবে যে অত্যাচারী হবে।'

ওসমান! আল্লাহ নিজ ঘরের জন্য তোমাকে বিশ্বাসভাজন করেছেন। অতএব, আল্লাহর এই ঘরে ন্যায়সঙ্গত উপায়ে তুমি যা পাবে, তা ভোগ করবে।'

কাবার ছাদে বেলাল (রা) এর আযান

তখন নামাযের সময় হয়েছিলো তাই রাসূল (ﷺ) বেলাল (রা) কে নির্দেশ প্রদান করলেন, কা'বার ছাদে উঠে আযান দিতে। সেই সময় কাবার বারান্দায় উপবিষ্ট ছিলো আবু সুফিয়ান বিন হারব, আত্তাব বিন আসীদ এবং হারেস বিন হিশাম।

আত্তাব বলল, 'আল্লাহ আসীদকে এই সম্মান প্রদান করেছেন যে, তিনি এই আযান ধ্বনি শুনেনি, নতুবা তাকে এক অপছন্দনীয় জিনিস শুনতে হতো। এর প্রেক্ষিতে হারেস বলল, 'আল্লাহর কসম! আমি যদি জানতে পারি যে, তা সত্য। তাহলে আমি তাদের অনুসারী হয়ে যাব।'

উক্ত প্রেক্ষিতে আবু সুফিয়ান বলল, "দেখ! আল্লাহর কসম! আমি কিছুই বলব না। কারণ, যদি আমি কিছু বলি তবে এই কঙ্করগুলোও আমার সম্পর্ক সংবাদ দেবে। এরপর নবী করীম (ﷺ) তাদের নিকট আগমন করলেন এবং বললেন, 'এখন তোমরা যে আলাপ করছো, তা আমাকে জানানো হয়েছে। অতঃপর তিনি তাদের আলাপের কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করলেন। উক্ত প্রেক্ষিতে হারেস এবং আত্তাব বলে উঠল, 'আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর কসম! আমাদের সঙ্গে এমন কেউই তো ছিলো না, যে আমাদের কথাবার্তা শুনতে পারে। এ রকম কিছু হলে আমরা বলতাম যে, সে ব্যক্তিই আমাদের কথাবার্তা রাসূল (ﷺ) এর নিকট পৌঁছিয়ে দিয়েছে (তা না হলে তিনি খবর পেলেন কি ভাবে?)

বিজয়োত্তর শোকরানা নামায

সেই দিনই রাসূল (ﷺ) উম্মে হানী বিনতে আবু তালিবের ঘরে গমন করেন। সেখানে গোসল করেন এবং তাঁর ঘরেই আট রাকাত নামায আদায় করেন। সূর্যোদয় ও দ্বিপ্রহরের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এই নামায আদায় করেন। এ কারণেই কেউ উক্ত নামাযকে চাশতের নামায বলে ধারণা করেছেন এবং কেউ কেউ বিজয়োত্তর শোকরানা নামায বলে ধারণা করেছেন। উম্মে হানী তাঁর দু'জন দেবরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছিলেন। রাসূল বলেন, 'হে উম্মে হানী! তুমি যাদেরকে আশ্রয় দিয়েছো আমিও তাদেরকে আশ্রয় দিলাম।' তাঁর এই ঘোষণার কারণ ছিলো যে, উম্মে হানীর ভাই আলী বিন আবু তালিব এই দুজনকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে উম্মে হানী এই দুজনকে ঘরে বন্ধ করে গোপনে রেখেছিলেন। নবী করীম (ﷺ) যখন সেখানে গমন করলেন, তখন তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং উপরিউক্ত ঘোষণা দিলেন।

বড়ো বড়ো পাপীদের রক্ত অনর্থক সাব্যস্ততা করা হলো

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল বড়ো বড়ো পাপীদের মধ্যে থেকে নয় ব্যক্তির রক্ত অনর্থক সাব্যস্ততা করে নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি তাদেরকে কাবার পর্দার নিচেও পাওয়া যায় তবুও তাদের হত্যা করা হবে। তাদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে

১. আবুল উযযা বিন খাত্তাল,
২. আব্দুল্লাহ বিন সাদ বিন আবিদ সারাহ,
৩. ইকরামা বিন আবু হাজেল,
৪. হারেস বিন নুফাইল বিন অহাব,
৫. মার্কীস বিন সাবাবা,
৬. হাব্বার বিন আসওয়াদ,
৭. ও ৮ ইবনে খাতালের দুই দাসী যারা কবিতার মাধ্যমে নবী করীম (ﷺ) এর বদনাম রটাত,
৯. সারাহ; যে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানদের মধ্যে কারো দাসী ছিলো, এর নিকটেই হাতেবের লিখিত পত্রখানা গিয়েছিলো।

ইবনে আবি সারার অবস্থা ছিলো, ওসমান ইবনে আফফান তাকে নিয়ে রাসূলের কাছে উপস্থিত হলেন এবং তার প্রাণ রক্ষার জন্য সুপারিশ করলেন। রাসূল তাঁকে ক্ষমা করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করলেন। কিন্তু এর পূর্বে নবী করীম (ﷺ) এই আশায় দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকলেন যে, কোনো সাহাবি উঠে এসে তাকে হত্যা করবে। কারণ এই ব্যক্তিই ইতোপূর্বে একবার ইসলাম গ্রহণ পূর্বক মদিনায় হিজরত করেছিলো। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে পুনরায় মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলো। তবুও তার পরবর্তী সময়ের কার্য কলাপ ইসলামের সৌন্দর্য বর্ধনে আয়নাস্বরূপ ছিলো। (আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হোন)।

ইকরামা বিন আবু জাহেল ইয়েমেনের পথ ধরে পালিয়ে চলে যায়। কিন্তু তার স্ত্রী নবীর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি তাকে আশ্রয় প্রদান করেন। এরপর সে ইকরামার প্রশ্চাদনুসরণ করে তাকে নিয়ে আসে। মক্কায় প্রত্যাবর্তনের পর সে ইসলাম গ্রহণ করে এবং একনিষ্ঠ মুসলমানে পরিণত হয়।

ইবনে খাত্তাল কাবা ঘরের পর্দা ধরে ঝুলছিলো। একজন সাহাবি নবী করীম (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে তার সম্পর্কে অবগত করালে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন। ফলে তাকে হত্যাকরা হয়।

মার্কীস বিন সাবাবাকে নুমায়লাহ বিন আবদুল্লাহ হত্যা করেন। মাকসির পূর্বে মুসলমান হয়েছিলো। কিন্তু পরে একজন আনাসারীকে হত্যা করে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলো।

হাব্বাব বিন আসওয়াদ হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে রাসূল (ﷺ) এর কন্যা যয়নব (রা) কে তাঁর হিযরতের প্রাক্কালে তীক্ষ্ণ অস্ত্রবিদ্ধ করেছিল। এর ফলে তিনি উটের হাওদা হতে একটি পাথরের ওপর পড়ে যান এবং তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের সময় এই ব্যক্তি পলায়ন করে। পরবর্তী সময়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে একনিষ্ট মুসলমানে পরিণত হয়।

ইবনে খাত্তালের দুই দাসীর মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয়জন আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাকে আশ্রয় দেয়া হয়। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করে।

অনুরূপভাবে সারাহর জন্য আশ্রয় চাওয়া হলে তাকে তা দেয়া হয় এবং পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে (মোট কথা নয় জনের মধ্যে চার জনকে হত্যা করা হয় এবং পাঁচজনকে ক্ষমা করা হয়। এরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে।)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী লিখেছেন, 'যাদের রক্ত অনর্থক সাব্যস্ত করা হয়, তাদের প্রসঙ্গে আবু মাশার হারেস বিন তালা তিল খোয়ায়ীর নামও উল্লেখ রয়েছে। আলী (রা) তাকে হত্যা করেন। ইমাম হাকেম উক্ত তালিকায় কা'ব বিন যোহাইরের নাম উল্লেখ করেছেন। কাবের ঘটনা প্রসিদ্ধ। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূল (ﷺ) এর প্রশংসা করেন। উক্ত তালিকাভুক্ত ছিলো ওয়াহশী বিন হারব এবং আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উৎবা, সা'দ তাদেরকে হত্যা করেছিলো। ইবনে ইসহাকও অনুরূপ উল্লেখ করেছেন। এভাবে পুরুষদের সংখ্যা দাঁড়ায় আট এবং মহিলাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়। পার্থক্যের কারণ হলো দুজন দাসী আরনাব এবং উম্মে সা'দ ছিলো এবং পার্থক্য ছিলো শুধু নাম উপনাম অথবা উপাধির।

সাফওয়ান বিন উমাইয়া এবং ফোয়ালা বিন উমাইরের ইসলাম গ্রহণ

সাফওয়ানের রক্ত অনর্থক সাব্যস্ততা করা হয়নি কিন্তু যেহেতু সে ছিলো কুরাইশদের একজন বড়ো নেতা, সেহেতু তার নিজ জীবনের ভয় ছিলো যথেষ্ট এ কারণে সেও পলায়ন করেছিলো। উমায়ের বিন ওয়াহাব জোমাহী রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে তার জন্য আশ্রয় প্রর্থনা করেন। নবী করীম (ﷺ) তাকে আশ্রয় প্রদান করেন এবং এর প্রতীক স্বরূপ তাকে তাঁর সেই পাগড়িটি প্রদান করেন, মক্কায় প্রবেশকালে যা তিনি নিজ মাথায় বেঁধে রেখেছিলেন।

ফোয়ালা একজন বীর পুরুষ ছিলো। রাসূল যখন তাওয়াফ করছিলেন, তখন সে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর নিকটে এসেছিলো। কিন্তু রাসূল তার গোপন কুমতলবের কথা বলে দিলে সে মুসলমান হয়ে যায়।

মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিন রাসূল (ﷺ) এর ভাষণ

বিজয়ের দ্বিতীয় দিন ভাষণ দেয়ার জন্য আল্লাহর নবী জনতার সম্মুখে দন্ডায়মান হলেন। ভাষণের প্রারম্ভে আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনার পর রাসূল বলেন, 'আল্লাহ যেদিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সে দিনই মক্কাকে হারাম (নিষিদ্ধ শহর) করে দিয়েছেন। এ কারণে কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম বা পবিত্র থাকবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাসী হবে তার এটা বৈধ হবে না যে সে এখানে রক্তপাত ঘটাবে অথবা এখানকার কোনো বৃক্ষ কর্তন করবে। কেউ যদি এ কারণে জায়েয মনে করে যে, রাসূল এখানে যুদ্ধ করেছেন তবে তাকে বলে দাও যে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূল কে অনুমতি প্রদান করেছিলেন। কিন্তু তোমাদেরকে অনুমতি দেননি এবং আমার জন্যও শুধুমাত্র দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। অতঃপর আজ তার পবিত্রতা অনুরূপভাবে ফিরে এসেছে যেমনটি গতকাল ছিলো। এখন এটা অপরিহার্য প্রয়োজন যে, যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের নিকট এ বাণী পৌঁছে দেবে।

অন্য এক বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে যে, এখানে কোনো গাছ কাঁটা বৈধ নয়, শিকার তাড়ানো ঠিক নয় এবং পড়ে থাকা কোনো জিনিস উঠানোও ঠিক নয়। তবে সেই ব্যক্তি নিতে পারবে যে, সে সম্পর্কে প্রচার করবে। তাছাড়া, কোনো প্রকার ঘাসও উপড়ানো যাবে না।

আব্বাস (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল। কিন্তু ইযখির ঘাসের অনুমতি দিন (আরবের প্রসিদ্ধ ঘাস, যা ঊর্মির ন্যায় হয় এবং চা ও ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। কারণ, এটা কর্মকার এবং বাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস)। রাসূল বললেন, বেশ ইযখিরের অনুমতি রইল।

ঐ দিন বনু খোযায়া বনু লাইসের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলো। কারণ, জাহেলি যুগে বনু লাইসের হাতে তাদের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলো। রাসূল সে সম্পর্কে বললেন, হে খোযায়া সম্প্রদায়! তোমরা নিজের হাতকে হত্যা ও খুন হতে নিবৃত রাখ। কারণ, হত্যায় যদি কোনো উপকার পাওয়া যেত তাহলে এ পর্যন্ত যত হত্যা সংঘটিত হয়েছে তা থেকে অনেক অনেক উপকার লাভ সম্ভব হতো। কিন্তু কোথায় সে লাভ? তোমরা এমন একজনকে হত্যা করেছে যার রক্তপণ অবশ্যই আমাকে দিতে হবে। অতঃপর এই স্থানে যদি কেউ কাউকেও হত্যা করে তবে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের দুটি বিষয়ের অধিকার থাকবে। হয় তারা নিহত ব্যক্তির বিনিময় হত্যাকারীকে হত্যা করবে, কিংবা রক্তপণ গ্রহণ করবে।

অন্য এক বর্ণনামতে, এরপর ইয়েমেনের আবু শাহ নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নিবেদন করল, 'হে আল্লাহর রাসূল আমার জন্য তা লিখে দিন। রাসূল বললেন, 'আবু শাহর জন্য লিখে দাও।

আনসারদের সন্দেহপরায়ণতা

রাসূল (ﷺ) যখন মক্কা বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করলেন এবং এটা সর্বজনবিদিত ব্যাপারে যে মক্কাই ছিলো রাসূল (ﷺ) এর আবাসস্থল এবং জন্মভূমি ও মাতৃভূমি- এই প্রসঙ্গে আনসাররা পরস্পর বলাবলি করতে থাকলেন যে, নিজ শহর ও জন্মভূমি বিজয়ের পর রাসূল কি মক্কাতেই অবস্থান করতে থাকবেন? ঐ সময় তিনি সাফা পাহাড়ের ওপর হস্তদ্বয় উত্তোলনপূর্বক প্রার্থনারত ছিলেন। প্রার্থনা শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বলাবলি করছিলে?' তাঁরা বললেন, 'তেমন কিছু নয় হে আল্লাহর রাসূল! কিন্তু আল্লাহর নবী তার বিষয়টি জানার ব্যাপারে জোর করায় তাঁরা তাঁদের আলোচনার বিষয়টি তাঁর নিকট প্রকাশ করলে তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ, এখন জীবন এবং মরণ তোমাদের সঙ্গেই হবে।'

ইসলামের স্বীকৃতির শপথ

আল্লাহ যখন রাসূল এবং মুসলমানদের মক্কা বিজয় দান করেন তখন মক্কাবাসীদের ওপর একটি অধিকার সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং তাদের বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, ইসলাম ছাড়া কৃতকার্যতার আর কোনো পথই নেই। এজন্যই তারা ইসলামের আনুগত্য ও স্বীকৃতির শপথ গ্রহণের জন্য একত্রিত হয়। সাফা পাহাড়ে উপবিষ্ট অবস্থায় রাসূল মক্কাবাসীদের স্বীকৃতির শপথ গ্রহণ শুরু করেন। ওমর বিন খাত্তাব নবী করীম (ﷺ) এর উপবেশ স্থানের নিচে বসে জনগণের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। লোকজন রাসূলের নিকট এই বলে ওয়াদা করেন যে 'আপনার কথা আমরা শুনবো এবং সাধ্যমত তা মেনে চলব।'

রাসূল যখন পুরুষদের বাইয়াত গ্রহণ সমাপ্ত করেন, তখন সাফা পাহাড়ের ওপরেই মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণ আরম্ভ করলেন। ওমর রাসূলের নিচে অবস্থান করে তাঁর নির্দেশ মত বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন এবং তাঁদের নিকট রাসূলের বাণী পৌঁছে দিচ্ছিলেন।

উল্লিখিত সময়ের মধ্য আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবাহু বেশভূষার পরিবর্তন সহকারে আগমন করল। প্রকৃতই হামযা (রা) এর লাশের সঙ্গে সে গর্হিত আচরণ করেছিলো সেই কারণেই ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলো যে, রাসূল যদি তাকে চিনে ফেলেন। এদিকে রাসূল বাইয়াত গ্রহণকালে ইরশাদ করলেন, আমি তোমাদের নিকট থেকে এই বলে অঙ্গীকার গ্রহণ করছি যে, আমরা কখনও আল্লাহর সঙ্গে কাউকেও শরীক করব না।'

ওমর (রা) ও ঐ কথার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে মহিলাদের বাইয়াত গ্রহণ করেন যে, তারা কখনও আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। অতঃপর রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেন, 'চুরি করবে না।' এই প্রেক্ষিতে হিন্দা বলে উঠল, 'আবু সফিয়ান কৃপণ ব্যক্তি। তার সম্পদ থেকে তার অজান্তে আমি যদি কিছু নিই তাহলে? আবু সুফিয়ান সেখানেই উপস্থিত ছিলেন, বললেন, 'আমার সম্পদ থেকে তুমি যা নিয়ে নেবে তা তোমার জন্য হালাল হবে।'

হিন্দাকে চিনতে পেরে রাসূল মৃদু হাসলেন এবং বললেন, 'তুমিই হিন্দা।'
হিন্দা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমিই হিন্দা। অতীতে যা কিছু হয়েছে, আমাকে ক্ষমা করে দিন।
নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'ব্যভিচার করবে না।
প্রত্যুত্তরে হিন্দা বলল, 'আচ্ছা, স্বাধীন মহিলারা কি কখনো যেনা করে?
বললেন, 'নিজ সন্তানদের হত্যা করবে না।'
হিন্দা বলল, "বাল্যকালে আমরাও তাদের লালন পালন করেছি, কিন্তু বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পর আপনারা তাদের হত্যা করেছেন। এজন্য তারা এবং আপনিই ভালো জানেন।'

প্রকাশ থাকে যে, হিন্দার আদরের সন্তান হানজালা বিন আবু সুফিয়ান বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিলো। হিন্দার মুখ থেকে এ কথা শুনে ওমর (রা) হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন এবং রাসূল ও মৃদু হাসলেন।

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, "কাউকেও মিথ্যা অপবাদ দেবে না। হিন্দা বলল, "আল্লাহর কসম! মিথ্যা অপবাদ অত্যন্ত খারাপ কথা। আপনি বাস্তবিকই হিদায়াত এবং উত্তম চরিত্রের নির্দেশ প্রদান করছেন।" এরপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, "কোনো সদুপদেশে রাসূলের অবাধ্য হবে না।" হিন্দা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা এমন মনোভাব নিয়ে এই বৈঠকে বসিনি যে আপনার অবাধ্য হব।"

অতঃপর রাসূলের কাছ থেকে প্রত্যাবর্তন করে হিন্দা তার উপাস্য মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলে। মূর্তি ভাঙ্গার সময় সে বলছিলো, 'আমরা তোমার সম্পর্কে ভ্রান্তিতে ছিলাম। আমাদের সে ভুল এখন ভেঙ্গে গেছে।'

রাসূল (ﷺ) এর মক্কায় অবস্থান

রাসূল মক্কায় উনিশ (১৯) দিন অবস্থান করেন। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তিনি ইসলামের পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ায় তৎপর থাকেন এবং মানুষকে হেদায়েত ও তাকওয়ায় আদেশ দিতে থাকেন। এই সময়ে নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশক্রমে আবু উসাইদ খোযায়ী (রা) নতুনভাবে হারামের সীমানার স্তম্ভ খাড়া করেন, ইসলামের দাওয়াত দেন এবং মক্কার পার্শ্ববর্তী স্থানসমূহের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলেন। অধিকন্তু, নবী করীম (ﷺ) এর পক্ষ থেকে ঘোষণাকারী মক্কায় ঘোষণা করতে থাকেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সে নিজ গৃহে কোনো মূর্তি রাখবে না। যদি ঘরে মূর্তি থাকে তাকে অবশ্যই তা ভেঙ্গে ফেলতে হবে।

বিভিন্ন অভিযান ও প্রতিনিধি প্রেরণ

মক্কা বিজয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজকর্ম সুসম্পন্ন করার পর যখন তিনি কিছুটা অবকাশ লাভ করলেন তখন ৮ম হিজরির ২৫ রমযান 'উযযা' নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওলীদ (রা) এর নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। উযযা মূর্তির মন্দিরটি ছিলো নাখলা নামক স্থানে। এটি ভেঙ্গে খালিদ প্রত্যাবর্তন করলেন, রাসূল (ﷺ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি কিছু দেখছিলে?" খালিদ বললেন, "না।" রাসূল বলেন, 'তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙনি। পুনরায় যাও এবং তা ভেঙে দাও। উত্তেজিত খালিদ কোষমুক্ত তরবারি হস্তে পুনরায় সেখানে গমন করলেন। এবারে বিক্ষিপ্ত ও বিবস্ত্র বিশিষ্ট এক মহিলা তাঁদের দিকে বেরিয়ে এল। মন্দির প্রহরী তাকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন সময় খালিদ (রা) তরবারি দ্বারা তাকে এতই জোরে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এরপর রাসূল কে তিনি উক্ত সংবাদ জানালে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ' সেটাই ছিলো উযযা। এখন তোমাদের দেশে তার পূজা অর্চনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে পড়েছে (অর্থাৎ কোনো দিন তার আর পূজা অর্চনা হবে না।)

এরপর নবী করীম (ﷺ) সেই মাসেই আমর বিন আস (রা) কে 'সোয়া' নামক দেবমূর্তি ভাঙার জন্য প্রেরণ করেন। এই মূর্তিটি ছিলো মক্কা হতে তিন মাইল দূরে রেহাত নামক স্থানে বনু হোয়াইলের একটি দেবমূর্তি। আমর যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন প্রহরী জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কী চাও?' তিনি বললেন, আল্লাহর নবী এই মূর্তি ভেঙে ফেলার জন্য আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন।

সে বলল, তোমরা এই মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে না।
আমর (রা) বললেন, "কেন"?
সে বলল, 'প্রাকৃতিক নিময়েই তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে।
আমর (রা) বললেন, তোমরা এখনও বাতিলের ওপরেই রয়েছো? তোমাদের ওপর দুঃখ, এই মূর্তিটির কি দেখে কিংবা শোনে?
অতঃপর মূর্তিটির নিকট গিয়ে তিনি তা ভেঙ্গে ফেললেন এবং সঙ্গীসাথীদের নির্দেশ প্রদান করলেন, ধন ভাণ্ডার গৃহটি ভেঙ্গে ফেলতে। কিন্তু ধন-ভান্ডার থেকে কিছুই পাওয়া গেল না।
অতঃপর তিনি প্রহরীকে বললেন, 'বল, কেমন হলো?'
সে বলল, 'আমি আল্লাহর দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করলাম।'

উক্ত মাসেই সা'দ বিন যায়েদ আশহালী (রা) এর নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহী সৈন্য প্রেরণ করেন 'মানাত' দেবমূর্তি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে। কোদাইদের নিকট মোশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য ছিলো, এই 'মানাত' মূর্তি। সা'দের বাহিনী যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, 'তোমরা কী চাও?'

তাঁরা বললেন, 'মানাত দেবমূর্তি ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে আমরা এখানে এসেছি।'
সে বলল, 'তোমরা জান এবং তোমাদের কার্য জানে।'

সা'দ মানাত মূর্তির দিকে অগ্রসর হলে একজন উলঙ্গ কালো ও বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন। সে স্বীয় বক্ষদেশ চাপড়াতে চাপড়াতে 'হায় হায়!' উচ্চারণ করছিলো। প্রহরী তাকে লক্ষ করে বলল, 'মানাত'। তুমি এই অবাধ্যদের ধ্বংস কর।

কিন্তু এমন সময় সা'দ তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। অতঃপর মূর্তিটিকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিলেন। ধন-ভান্ডারে ধন-দৌলত কিছুই পাওয়া যায়নি।

উযযা নামক দেবমূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার পর খালিদ বিন ওলীদ (রা) প্রত্যাবর্তন করেন। রাসূল ৮ম হিজরি শাওয়াল মাসেই বানু জাযীমাহর নিকট তাঁকে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্যে ছিলো আক্রমণ না করে ইসলাম প্রচার। খালিদ (রা) মুহাজেরীন, আনসার এবং বন্ধু সোলাইম গোত্রের সাড়ে তিন শত লোকসহ বনু জাযীমার নিকট গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করেছি বলার পরিবর্তে বললো আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি। এ কারণে খালিদ (রা) তাদের হত্যা এবং বন্দী করতে আদেশ দিলেন। তিনি সঙ্গী-সাথিদের এক একজনের হস্তে একজন বন্দীকে সম্পূর্ণ করলেন। অতঃপর এই বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে 'প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর নিকটে সমর্পিত বন্দীকে হত্যা করবে। কিন্তু ইবনে ওমর এবং তাঁর সঙ্গীরা এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃতি জানালেন। অতঃপর যখন তারা নবী করীম (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হলেন তখন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তিনি দুই হস্ত উত্তোলনপূর্বক দুবার বললেন, 'হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে আমি তা হতে তোমার দরবারে নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করছি।'

উক্ত পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র বনু সোলাইমের লোকজনই নিজ বন্দীদের হত্যা করেছিলো। আনসার ও মুহাজিরীনগণ হত্যা করেনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলীকে প্রেরণ করে তাদের নিহত ব্যক্তিদের শোণিত খেসারত এবং ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। এই ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে খালিদ (রা) ও আব্দুল রহমান বিন আউফ (রা) এর মাঝে কিছু উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং সম্পর্কের অবনতি হয়েছিলো। এই সংবাদ শোনার পর রাসূল বললেন, 'খালিদ থেমে যাও, আমার সহচরদের কিছু বলা থেকে বিরত থাক। আল্লাহর কসম! যদি ওহুদ পাহাড় সোনা হয়ে যায় এবং তার সমস্তই তোমরা আল্লাহর পথে খরচ করে দাও তবুও আমার সাহাবাদের মধ্য হতে কোনো একজনেরও এক সকাল কিংবা এক সন্ধ্যার ইবাদতের নেকী অর্জন করতে পারবে না।'

মক্কা বিজয়ের যুদ্ধই ছিলো প্রকৃত মীমাংসাকারী যুদ্ধ। এ বিজয়ই ছিলো প্রকৃত বিজয়, যা মুশরিকদের শক্তিমত্তা অহংকারকে এমনভাবে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়েছিলো যে, আরব উপদ্বীপে শিরক বা মূর্তিপূজার আর কোনো অবকাশই ছিলো না। কারণ, মুসলমান ও মুশরিক এই উভয় পক্ষ বহির্ভূত সাধারণ শ্রেণির মানুষ অত্যন্ত কৌতূহলের সঙ্গে ব্যাপারটি লক্ষ করে যাচ্ছিল যে, মুসলমান ও মুশরিকদের সংঘাতের পরিণতিটা কোন দিকে মোর নেয়। সাধারণ গোষ্ঠিভুক্ত মানুষ এটা ভালোভাবেই জেনেছিলেন, যে শক্তি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে কেবলমাত্র সেই শক্তিই কাবার ওপর স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাদের বিশ্বাসকে অধিক বলীয়ান করেছিলো অর্ধশতাব্দী পূর্বে সংঘটিত আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনীর ঘটনা। আল্লাহর ঘরের ওপর আক্রমণ চালানোর উদ্দেশ্যে অগ্রসরমান হস্তীবাহিনী কিভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিশ্চিহ্ন হয়েছিলো তা তৎকালীন আরববাসী চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলো।

প্রকাশ থাকে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তিই ছিলো এই বিরাট বিজয়ের চাবিকাঠি। এই সন্ধি-চুক্তির ফলে শান্তি ও নিরাপত্তার পথ প্রশস্ত হয়েছিলো, মানুষ প্রকাশ্যে একে অন্যের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে এবং ইসলাম সম্পর্কে মত-বিনিময় করতে সক্ষম হয়েছিলো। মক্কায় যারা গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এই চুক্তির ফলে তাঁরা স্বীয় দ্বীন সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথাবার্তা বার্তাবরণ সৃষ্টির ফলে বহু লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর ফলে ইসলামি সৈন্যের সংখ্যাও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতোপূর্বে যেক্ষেত্রের কোনো যুদ্ধেই তিন হাজার বেশি মুসলিম সৈন্যের সমাবেশ সম্ভব হয়নি, সেক্ষেত্রে মক্কা বিজয়ের অভিযানে দশ হাজার মুসলিম সৈন্য অংশগ্রহণ করেন।

উক্ত মীমাংসাকারী যুদ্ধই মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে সৃষ্ট পর্দা যা ইসলাম গ্রহণের পথে ছিলো একটি বিরাট অন্তরায়স্বরূপ উন্মোচিত করে দিয়েছিলো। উক্ত বিজয়ের পর সমগ্র আরব উপদ্বীপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গগণে প্রদীপ্ত সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলো। মক্কা বিজয়ের পর ধর্মীয় ও প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব মুসলমানদের হাতে এসেছিলো।

হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তির পর মুসলমানদের অনুকূলে পরিবর্তনের যে সহায়ক ধারা সূচিত হয়েছিলো, মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা লাভ করে। অধিকন্তু, এই বিজয়ের ফলে সমগ্র আরব উপদ্বীপে মুসলমানদের অধিকার ও আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। যার ফলে আরবের গোত্রসমূহের সামনে একটিই মাত্র পথ খোলা ছিলো যে, তারা বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধির আকারে রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে এবং ইসলামের বিস্তৃতির জন্য বিশ্বে বিভিন্ন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়বে।

রাসূল (ﷺ) এর জীবনে তৃতীয় স্তর

এই স্তর হচ্ছে রাসূল (ﷺ) এর নবুয়াত জীবনের শেষ স্তর, যা তাঁর ইসলামি দাওয়াতের ফলাফল সমূহের প্রতিনিধিত্ব করে, যা দীর্ঘ তেইশ বছরের কঠোর পরিশ্রম, অজস্র সমস্যা ও সংকট নিরসন, অসহনীয় দুঃখ-যন্ত্রণা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছিলেন। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন ছিলো অবিমিশ্র বিজয় ও কৃতকার্যতার অভূতপূর্ব ঘটনার সমাহার। তবে এসবের মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃতকার্যতা ছিলো মক্কা বিজয়। প্রকৃতপক্ষে এই বিজয় ছিলো বিজয়পূর্ব এবং বিজয়োত্তর দুই যুগের মধ্যে যুগসৃষ্টিকারী একটি ঘটনা এবং দুই বৈপরীত্যের সীমান্ত রেখা। আরব অধিবাসীদের দৃষ্টিতে কুরাইশরা ছিলো দ্বীনের সংরক্ষক এবং তত্ত্বাবধায়ক, কুরাইশদের পরাজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপের জনগণের মূর্তিপূজার ভিত চিরতরে উৎপাটিত হয়ে গেল এবং ইসলামের ভিত সুপ্রতিষ্ঠিত হলো।

এই শেষের স্তরকে দুই পর্যায়ের বিভক্ত করা যায়:
১. সাধনা এবং লড়াই ও
২. ইসলাম গ্রহণের জন্য জাতি এবং গোত্রসমূহের দৌড়।

এই দুই পরিস্থিতি একে অন্যের সঙ্গে বিজড়িত এবং এই স্তরের মধ্যে আগের পিছনের এবং একে অন্যের মাঝে সংঘঠিত হয়ে এসেছে। তবে এই পুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা একটি থেকে অন্যটিকে পৃথক ভাবে আলোচনা করব। কাজেই পিছনের আলোচনাগুলোতে যে, সংগ্রাম ও যুদ্ধের আলোচনা চলে এসেছে পরবর্তী যুদ্ধ তারই আনুষঙ্গিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত হবে।

হোনাইন যুদ্ধ

মুসলমানদের মক্কা বিজয় ছিলো এক আকস্মিক অভিযানের ফলশ্রুতি। যার ফলে আরব গোত্রসমূহ প্রায় হতভম্ব এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলো। তাদের এবং পার্শ্ববর্তী গোত্রসমূহের এতটুকু ক্ষমতা ছিলো না যে, তারা এই আকস্মিক অভিযানকে প্রতিহত করতে পারে। এ কারণে কিছু সখ্যাক জেদী অপরিণামদর্শী ও আত্মগর্বী গোত্র ব্যতীত অন্য সব গোত্রই রাসূল (ﷺ) এর নিকট আত্মসমর্পণ করেছিলো। এই জেদী ও আত্মগর্বী গোত্রগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলো হাওয়াযিন এবং সাকীফ গোত্র। এদের সঙ্গে ছিলো মুযার, জোশাম, সায়াদ বিন বকরের গোত্রসমূহ এবং বনু হেলালের কিছু সংখ্যক লোক। এই সব গোত্রের সম্পর্ক ছিলো কাইসে আইলানের সঙ্গে। পরাজয় স্বীকারপূর্বক মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করাকে তারা অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে করছিলো। এ কারণে ঐ সকল গোত্র মালেক বিন আওফ নাসরীর নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা মুসলমানদের আক্রমণ করবে।

শত্রুদের যাত্রা এবং আওতাস নামক স্থানে শিবির স্থাপন

উক্ত সিদ্ধান্তের পর মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক মালেক বিন আওফের নেতৃত্বে তারা যাত্রা করল। সম্পদাদি, গবাদি এবং শিশু সন্তানেরাও ছিলো তাদের সঙ্গে। সম্মুখ ভাগে অগ্রসর হয়ে তারা আওতার উপত্যকায় শিবির স্থাপন করল। এটি হোনাইনের নিকটে বনু হাওয়াযেনের অঞ্চলভুক্ত একটি উপত্যকা। কিন্তু এই উপত্যকাটি হোনাইন হতে পৃথক। হোনাইন হচ্ছে অন্য একটি উপত্যকা, যা ফুল মাজায় নামক স্থানের সন্নিকটে অবস্থিত। সেখান থেকে আরাফাতের পথ দিয়ে মক্কার দূরত্ব দশ মাইলের বেশি।

সমরবিদ্যায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক সেনাপতির ত্রুটি বর্ণনা

আওতাসে অবতরণের পর লোকজনেরা তাদের নেতার নিকট একত্রিত হলো। তাদের মধ্যে দোরাইদ বিন সেম্মাও ছিলো। এই ব্যক্তি অত্যন্ত বার্ধক্য ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলো। কাজেই, যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কিত তথ্যাদি অবগত হয়ে পরামর্শ দান ছাড়া আর কোনো কিছুই করার উপযুক্ততা তার ছিলোনা। কিন্তু প্রকৃতই সে ছিলো একজন বাহাদুর দাঙ্গাবাজ ও বিজ্ঞ যোদ্ধা। সে জিজ্ঞেস করল, "অশ্বারোহীদের জন্য উত্তম ভ্রমণ স্থান বটে। না কঙ্করময়, না খানা-খন্দক বিশিষ্ট না খারাপ নিম্নভূমি। কিন্তু ব্যাপারটি কি যে আমি উটের উচ্ছ্বাস ধ্বনি, গাধার চিৎকার শিশুদের ক্রন্দন এবং বকরির যাব্যা ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি?"

লোকজনেরা বলল, 'মালেক বিন আওফ সৈন্যদের সঙ্গে তাদের মহিলা, শিশু, গবাদি এবং সম্পদাদি নিয়ে এসেছেন। উক্ত প্রেক্ষিতে দোরাইদ মালেক ইবনে আওফকে ডেকে নিয়ে বললেন, 'তুমি কি ভেবে এমন কাজ করেছো?'

সে বলল, 'আমি চিন্তা করেছি যে প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিবার ও সম্পদাদি থাকবে, যাতে সেগুলোর নিরাপত্তা উত্তেজনা নিয়ে তারা যুদ্ধ করে।'

দোরাইদ বলল, 'আল্লাহর কসম! তুমি ভেড়ার রাখাল বটে। যদি যুদ্ধে পরাজিত হও তাহলে কোনো বস্তু কি তোমায় রক্ষা করতে পারবে? দেখ। আর যদি তুমি যুদ্ধে বিজয়ী হও, তাহলে তলোয়ার এবং বর্শা দ্বারাই তুমি উপকৃত হবে। আর যদি পরাজয় বরণ কর তাহলে তোমাদের পরিবার পরিজন এবং সহায় সম্পদ সর্ব ব্যাপারেই অপমানের শিকার হতে হবে।'

অতঃপর কতগুলো গোত্র এবং নেতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের পর দোরাইদ বলল, 'হে মালেক! তুমি বনু হাওয়াযিনের মহিলা এবং শিশুদেরকে অশ্বারোহীদের গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে এসে খুব একটি ভালো কাজ করনি। তাদেরকে তাদের অঞ্চলের উচ্চ ও সংরক্ষিত স্থানে পাঠিয়ে দাও। এরপর অশ্ব পৃষ্ঠে আরোহণপূর্বক বিধর্মীদের যুদ্ধে লিপ্ত হবে। আর যদি পরাজিত হও তাহলেও তোমাদের পরিবারবর্গ, ধন-সম্পদ এবং গবাদিগুলো সংরক্ষিত থাকবে।'

কিন্তু কমান্ডার মালেক এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করে বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি এমনটি করব না। তুমি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছ এবং তোমার বিচার বুদ্ধিও লোপ পেয়েছে। আল্লাহর শপথ! হয় হাওয়াযেন আমার আনুগত্য করবে, নতুবা আমি এই তলোয়ারের ওপর নির্ভর করব এবং তা আমার পিঠের এক দিক হতে অপর দিকে বেরিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে মালেক এটা সহ্য করতে পারল না যে, এই যুদ্ধে সে দোরাইদের আনুগত্য করবে। এর প্রেক্ষিতে দোরাইদ বলল, 'এ এমন যুদ্ধ যাতে আমি অংশগ্রহণ তো করবই না; রবং মনে করব যে আমার হস্তচ্যুত হয়েছে।'

হায়! দুঃখ আমি যদি এ সময় যুবক হতাম, তাহলে হেলে দুলে বীরের মতো গর্জন করে পদচারণা করতাম। পায়ের খুরের পেছনের লম্বা চুলবিশিষ্ট এবং মধ্যম প্রকারের বকরির মতো ঘোড়ার পরিচালনা করতাম।

শুক্র পক্ষের গোয়েন্দা

এরপর মালেকের ওই গোয়েন্দা আসলে যাদের প্রেরণ করা হয়েছিলো মুসলমানদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে; তারা প্রত্যাবর্তন করল। তাদের এমন এক অবস্থান সৃষ্টি হলো যে, তাদের হাত পা, এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সন্ধিস্থলে চিড় ধরে গিয়েছিলো। তাদের এই অবস্থা দেখে মালেক বলল, "তোমারা ধ্বংস হও, তোমাদের এ কি অবস্থা হয়েছে? তারা বলল 'আমরা যখন কিছু সংখ্যক সাদা-কালো মিশ্রিত ঘোড়ার ওপর সাদা মানুষ দেখেছি, আল্লাহ কসম! তখন থেকে আমাদের এই অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা তুমি প্রত্যক্ষ করছ।"

রাসূল (ﷺ) এর গোয়েন্দা

এদিকে রাসূল (ﷺ) শত্রুদের অবস্থানের খবরপ্রাপ্ত হয়ে আবু হাদরাদ আসলামি (রা) কে এই নির্দেশ প্রদানপূর্বক প্রেরণ করলেন যে, মানুষের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে অবস্থান করবে এবং তাদের সঠিক খোঁজ-খবর নিয়ে প্রত্যাবর্তনের পর তা তাঁকে অবহিত করবে। প্রাপ্ত নির্দেশ মোতাবেক তিনি তাই করলেন।

রাসূল (ﷺ) মক্কা হতে হোনাইনের পথে

৮ম হিজরির ৬ শাওয়াল রাসূল মক্কা হতে রাওয়ানা হলেন। এটি ছিলো নবী করীম (ﷺ) এর মক্কা আগমনের উনিশতম দিন। নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলো বারো হাজার সৈন্য। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি সঙ্গে এনেছিলেন দশ হাজার সৈন্য এবং মক্কার নও মুসলিমদের মধ্য হতে সংগ্রহ করেছিলেন আরো দুই হাজার সৈন্য। এই যুদ্ধের জন্য নবী করীম (ﷺ) সাফওয়ান বিন উমাইয়ার নিকট হতে একশত লৌহ বর্ম নিয়েছিলেন এবং আত্তাব বিন আসীসকে মক্কার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন।

দুপুরের পর এক অশ্বারোহী এসে খবর দিলেন যে, 'আমি অমুক অমুক পর্বতের ওপর আরোহণ করে প্রত্যক্ষ করলাম যে, বনু হাওয়াযিন গোত্র গাড়ি বোচকাসহ যুদ্ধের ময়দানে আগমন করেছে। মহিলা, শিশু গবাদি সব কিছুই তাদের সঙ্গে রয়েছে।' রাসূল মৃদু হাসির সঙ্গে বললেন, 'আল্লাহ চাহে তো এর সব কিছুই গণীমত হিসেবে কাল মুলমানদের হাতে এসে যাবে।' দিন শেষে রাতের বেলা আনাস বিন আবু মুর্শেদ গানাভী (রা) স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে নৈশ প্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন।

হোনাইন যাওয়ার পরে লোকজনেরা একটি বেশ বড়ো আকারের সতেজ কুলের গাছ দেখতে পেল। সেকালে এই গাছকে যাতো আনওয়াত বলা হতো। আরবের মুশরিকরা এর ওপর নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত, ওর নিকট পশু যবেহ করত, মন্দির তৈরি করত এবং মেলা বসাত। মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক সৈন্য রাসূল কে বললেন, 'আমাদের জন্য আপনি যাতো আনওয়াত তৈরি করে দিন, যেমনটি তাদের জন্য রয়েছে।

রাসূল বললেন, 'আল্লাহু আকবর! সেই সত্তার শপথ যার হাতে রয়েছে আমার জীবন তোমার ঠিক সেরূপ কথা বলেছো-

তাদের জন্য উপাস্য রয়েছে, আমাদের জন্য তেমন উপাস্য বানিয়ে দিন। (সূরা আ'রাফ: আয়াত-১৩৮)

এটাই ছিলো রীতি-নীতি। তোমারও পূর্বের রীতি-নীতির ওপর অবশ্যই আরোহণ করে বসবে।

পথিমধ্যে কিছু লোক সৈন্যের আধিক্যের কারণে বলেছিলেন যে, 'আমরা কখনও পরাজিত হবো না।' এ কথার জন্য রাসূল দারুণ মনঃক্ষুণ্ণ ও ব্যথিত হয়েছিলেন।

ইসলামি সৈন্যদের ওপর হঠাৎ তীর নিক্ষেপ

মঙ্গলবার ও বুধবার পথ চলার পর ১০ শাওয়াল মধ্য রাত্রে মুসলিম বাহিনী হোনাইনে গিয়ে পৌঁছল। কিন্তু মালেক বিন আওফ পূর্বেই তার বাহিনী নিয়ে সেখানে অবতরণ করে এবং রাতের অন্ধকারে সঙ্গোপনে তার বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে মোতায়েন করে দেয়। অধিকন্তু, তাদের এই নির্দেশও প্রদান করা হয় যে, মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় অবতরণ করা মাত্রই যেন প্রবলভাবে তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ করে তাদের হেস্তনেস্ত করে ফেলা হয় এবং একযোগে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়।

এদিকে সাহরির সময় রাসূল সৈনদের শ্রেণিবিন্যাস করে নিলেন এবং পতাকা বেঁধে লোকজনের মধ্যে বিতরণ করলেন। অতঃপর সকালে মুসলিম বাহিনী দ্রুততার সঙ্গে অগ্রসর হয়ে হোনাইন উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। শত্রুদের অবস্থান তাঁদের জানা ছিলো না। তাঁরা জানতেন না যে, শত্রুপক্ষের সাকীক ও হাওয়াযিন গোত্রের বীর সৈনিকরা উক্ত উপত্যকার সংকীর্ণ গিরিপথে অবস্থান গ্রহণ করেছে, অগ্রসরমান মুসলিম বাহিনীর ওপর অতর্কীত আঘাত হানার উদ্দেশ্যে। এ কারণে সম্পূর্ণ নিরুদ্বিগ্ন চিত্তেই তাঁরা সেখানে অবতরণ করছিলেন। এমন সময় আকস্মিকভাবে তাঁদের তীর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের মধেই শত্রুরা তাঁদের ওপর এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আকস্মিক এই আক্রমণের প্রচণ্ডতা সামলাতে না পেরে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ অবস্থায় এমনভাবে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকল যে, কেউই কারো প্রতি লক্ষ করল না।

যাহোক, যখন দৌড় ঝাঁপ আরম্ভ হয়ে গেল, তখন রাসূল ডান দিক থেকে উচ্চ ডাক দিলেন, হে লোকজনেরা! আমার দিকে এসো, আমি মুহাম্মদ বিন আবুদল্লাহ। ঐ সময় কিছু সংখ্যক মুহাজির ও আনসার এবং পরিবারের লোকজন ছাড়া অন্য কেউ তাঁর সঙ্গে ছিলেন না।

নববী বলেছেন যে, রাসূল এর সঙ্গে তখন ছিলেন বারো জন। হাকেম ইবনে মাসউদ হতে ইমাম আহমদ বর্ণনা করেছেন- 'হোনাইনের দিন আমি রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে ছিলাম। লোকজনেরা পলায়ন করছিলো। কিন্তু মুহাজির ও আনসারদের একটি দল রাসূল (ﷺ) এর নিকট অটল ছিলেন। আমরা ছিলাম পদাতিক এবং আমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি।

এই সংকটপূর্ণ সময়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে তেজোদীপ্ততা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন তার কোনো তুলনা মেলে না। মুসলিম বাহিনী ইতস্তত বিক্ষিপ্ততা এবং দৌড়-ঝাঁপের মুখেও তিনি ছিলেন অটল ও শত্রু অভিমুখী এবং সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার জন্য তাঁর খচ্চরকে উত্তেজিত করতে থাকেন। এই সময় তিনি বলেছিলেন-

আমি সত্য নবী আমি মিথ্যা নই, আমি আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর।

কিন্তু সেই সময় আবু সুফিয়ান বিন হারেস (রা) রাসূলের খচ্চরকে ধরে টেনে রেখেছিলেন এবং আব্বাস (রা) খচ্চরের রেকাব ধরে তাকে থামিয়ে রেখেছিলেন। এঁরা উভয়েই এই কারণে খচ্চরকে থামিয়েছিলেন যেন, তিনি দ্রুতগতিতে এগিয়ে না যায়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) চাচা আব্বাস (রা) কে নির্দেশ দিলেন সাহাবায়ে কিরাম (রা) কে উচ্চস্বরে আহ্বান জানাতে। তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ বিশিষ্ট। আব্বাস (রা) বলেছেন,' আমি অত্যন্ত উচ্চ কণ্ঠে আহ্বান জানালাম, হে বৃক্ষসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। বাইয়াতে রিযওয়ানে অংশ গ্রহণকারীরা কোথায় আছ? আল্লাহর কসম!

আমার কণ্ঠ শ্রবণ করা মাত্র তারা এমনভবে ফিরে এলো, বাচ্চার ডাক শুনে গাভী যেমনটি ফিরে আসে এবং উত্তরে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা আসছি। এভাবে সমবেত হয়ে যখন রাসূলের নিকট একশত লোকের সমবেশ ঘটল তখন তাঁরা শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন।

এরপর শুরু হলো আনসারদের প্রতি আহ্বান 'এসো, এসো আনসারের দল, দ্রুত এগিয়ে এসো। আনসারদের উদ্দেশ্যে উচ্চারিত এই আহ্বান বনু হারেস বিন খাযরাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। এ দিকেই মুসলমান সৈন্যরা যে গতিতে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে গিয়েছিলেন ঠিক সেই গতিতেই পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে থাকলেন। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাসূল যুদ্ধের ময়দানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, এখন চুলা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে তখন চরম উত্তপ্ত হয়েছিলো। অতঃপর তিনি জমিন থেকে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে তা শত্রুদের প্রতি নিক্ষেপ করে দিয়ে বললেন, "শাহাতিল উজুহ" (মুখমণ্ডল বিকৃত হোক)। এই এক মুষ্টি মাটি এমনভাবে বিস্তার লাভ করল যে, শত্রুপক্ষের এমন কোনো লোক ছিলো না, যার চক্ষু উক্ত মাটি দ্বারা পরিপূর্ণ হয়নি। এরপর থেকে তাদের যুদ্ধোন্মাদনা ক্রমে ক্রমে স্তিমিত হতে থাকে এবং তাদের অবস্থা পাল্টে যায়।

শত্রুদের শোচনীয় পরাজয়

রাসূল মাটি নিক্ষেপের কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুদের পরাজয়ের ধারা সূচিত হয়ে গেল এবং আরও কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে না হতেই তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। সাকীফের সত্তরজন লোক নিহত হলো এবং তাদের সঙ্গে যা কিছু সম্পদ অস্ত্রশস্ত্র, মহিলা, শিশু এবং গবাদি পশু ছিলো, সবই মুসলমানদের হস্তগত হলো। এটাই হচ্ছে সেই পরিবর্তন, যে সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত করেছেন-

অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে। তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন তাঁর রাসূলের উপর ও মুমিনদের উপর এবং নাযিল করলেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখনি, আর কাফিরদেরকে আযাব দিলেন। আর এটা কাফিরদের কর্মফল। (সূরা তাওবা: আয়াত ২৫-২৬)

পশ্চাদ্ধাবন

পরাজিত হওয়ার পর শত্রুদের একটি দল তায়েফ অভিমুখে চলে যায়। অন্য একটি দল নাখলার দিকে পলায়ন করে। আরেকটি দল আওতাসের পথ ধরে। রাসূল (ﷺ) আবু আমের আশয়ারীর (রা) নেতৃত্বে একটি পশ্চাদ্ধাবনকারী দল আওতাসের দিকে প্রেরণ করেন। উভয় দলের মধ্যে সামান্য সংঘর্ষের পর মুশরিক দল পলায়নে উদ্যত হয়। তবে উক্ত সংঘর্ষে দলনেতা আবু আমের আশয়ারী (রা) শহীদ হয়ে যান।

মুসলিম অশ্বারোহীদের একটি দল নাখলার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং দোরাইদ বিন সিম্মাকে পাকড়াও করেন, যাকে রাবিয়া বিন রাফী হত্যা করেন।

যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ একত্রিত করার পর রাসূল ও সাহাবাগণ পরাজিত মুশরিকদের তৃতীয় এবং সব চাইতে বড়ো দলটির পশ্চাদ্ধাবন করেন।

গণীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ

গণীমতের মধ্যে ছিলো যুদ্ধ বন্দী ছয় হাজার, উট বিশ হাজার, বকরি চল্লিশ হাজারেরও বেশি এবং রৌপ্য চার হাজার উকিয়া (অর্থাৎ এক লক্ষ ষাট হাজার দিরহাম), যার পরিমাণ ছয় কুইন্টালের কয়েক কেজি। রাসূল সকল সম্পদ একত্রিত করার নির্দেশ প্রদান করেন। অতঃপর সেগুলো জেয়েররানা নামক স্থানে জমা রেখে মাসউদ বিন আমর গেফারীকে তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। তায়েফ যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন এবং অবসর না হওয়া পর্যন্ত তিনি গণীমত বন্টন করেন নি। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে ছিলো রাসূল (ﷺ) এর দুধ বোন শায়মা বিনতে হারেস। রাসূল (ﷺ) এর নিকট তাকে আনা হলো। সে নিজ পরিচয় পেশ করলে তিনি তার একটি পরিচিত চিহ্নের মাধ্যমে তাকে সহজেই চিনতে পারলেন এবং চাদর বিছিয়ে তার ওপর সসম্মানে বসালেন। অতঃপর তাকে তার কওমের নিকট ফেরৎ পাঠালেন।

তায়েফ যুদ্ধ

প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ ছিলো হোনাইন যুদ্ধেরই বিস্তরণ। যেহেতু হাওয়াযিন ও সাকীফ গোত্রের অধিক সংখ্যক পরাস্ত ফৌজ মুশরিক বাহিনীর কমান্ডার মালিক বিন আওফ নাসরীর সঙ্গে পালিয়ে তায়েফে চলে গিয়েছিলো এবং সেখানেই দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো, সেহেতু রাসূল হোনাইনের ব্যস্ততা থেকে অবকাশ লাভের পর তায়েফের প্রতি মনোনিবেশ করলেন এবং ৮ম হিজরির শাওয়াল মাসেই তায়েফের উদ্দেশ্যে এক বাহিনী প্রেরণের মনস্থ করলেন।

প্রথমে খালিদ বিন ওলীদের নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যের এক তেজস্বী বাহিনী প্রেরণ করলেন। অতঃপর রাসূল নিজেই তায়েফ অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। পথিমধ্যে নাখলা ইয়ামানিয়া, কারণে মানাযেল, লিয়াহ প্রভৃতি স্থানের ওপর দিয়ে তিনি গমন করেন। লিয়াহ নামক স্থানে মালিক বিন আওফের একটি দুর্গ ছিলো। রাসূল সে দুর্গটি ভেঙ্গে ফেলেন। অতঃপর যাত্রা অব্যাহত রেখে তায়েফে গিয়ে পৌঁছেন এবং তায়েফের দুর্গের নিকটবর্তী স্থানে শিবির স্থাপন পূর্বক দুর্গ অবরোধ করে রাখলেন। অবরোধ ক্রমে ক্রমে দীর্ঘায়িত হতে থাকে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে আনাস (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই অবরোধ চল্লিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো।

অবরোধ চলাকালে উভয় পক্ষ হতে তীর নিক্ষেপ এবং প্রস্তর খণ্ড নিক্ষেপের মতো ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটতে থাকে। প্রথমাবস্থায় মুসলমানরা যখন অবরোধ শুরু করেন তখন দুর্গের মধ্য থেকে তাঁদের ওপর অধিক সংখ্যক তীর নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। এতে কিছু সংখ্যক মুসলমান আহত হন এবং বারো জন শহীদ হন। তাদেরকে সেখান থেকে বর্তমান তায়েফের মসজিদের নিকট নিয়ে যেতে হয়।

উক্ত পরিস্থিতি হতে নিষ্কৃতি লাভের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) তায়েফবাসীদের ওপর মিনজানিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক গোলা নিক্ষেপ করেন। যার ফলে দুর্গের গোয়ালে ছিদ্রের সৃষ্টি হয় এবং মুসলমানদের একটি দল দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করে আগুন জ্বালানোর জন্য দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যান। কিন্তু শত্রুরা তাঁদের ওপর লোহার উত্তপ্ত টুকরো নিক্ষেপ করতে থাকে। ফলে কিছু মুসলমান শহীদ হয়ে যান।

শত্রুদের ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) যুদ্ধের ভিন্নতর কৌশল হিসেবে আঙ্গুর গাছ কেটে ফেলার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু মুসলমানগণ অধিক সংখ্যক বৃক্ষ কেটে ফেললে সাকীফ গোত্র আল্লাহ এবং আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে গাছ কাটা বন্ধ করার জন্য আবেদন জানালে রাসূল তা মঞ্জুর করেন।

অবরোধ চলাকলে রাসূল (ﷺ) এর ঘোষক ঘোষণা দেন, যে গোলাম দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করবে সে মুক্ত বা স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে। উক্ত ঘোষণার প্রেক্ষিতে তেইশ ব্যক্তি দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলমানদের দলভুক্ত হয়।

এদের মধ্যেই ছিলেন আবু বাকরাহ (রা) তিনি দুর্গ হতে দেয়ালের ওপর উঠে চরকার সাহায্যে (যার মাধ্যমে কুয়া হতে পানি উত্তোলন করা হয়) ঝুলে নিচে নামতে সক্ষম হন। যেহেতু চরকাকে আরবি ভাষার বাকরাহ বলা হয়, সেহেতু নবী করীম (ﷺ) তাঁর নাম রেখেছিলেন আবু বাকরা। এই সকল গোলামকে রাসূল মুক্ত করে দিয়ে একেকজনকে একেকজন মুসলমানের নিকট সমর্পণ করেন। এরূপ করার উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে তারা তাদের প্রয়োজনের জিনিস পরস্পরকে পৌঁছে দেবে। এই ঘটনা ছিলো দুর্গওয়ালাদের জন্য বড়োই দুর্বলতার পরিচায়ক।

অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকলে দুর্গ আয়ত্ত করার কোনো সম্ভাবনাই দৃষ্টিগোচর হলো না। অথচ মুসলমানদের ওপর তীর এবং উত্তপ্ত লোহার আঘাত আসতে থাকল, দুর্গবাশী আগে থেকে এক বছরের জন্য পানীয় এবং খাদ্য মজুদ করে নিয়েছিলো। ফলে রাসূল 'নওফাল মোয়াবিয়া দোয়েলীর' পরামর্শ চাইলেন। তিনি বললেন, খেঁকশিয়াল নিজ গর্তে প্রবেশ করেছে। আপনি যদি এই অবস্থার ওপর অটল থাকেন তাহলে তাদের ধরে ফেলতে পারবেন, আর যদি ছেড়ে চলে যান তাহলেও তারা আপনাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না।

একথা শুনে রাসূল অবরোধ শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন এবং ওমর বিন খাত্তাব (রা) এর মাধ্যমে ঘোষণা করে দিলেন যে, আগামী কাল মক্কা প্রত্যাবর্তন করতে হবে। কিন্তু এই ঘোষণায় সাহাবায়ে কিরাম (রা) সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাঁরা বলতে লাগলেন, 'তায়েফ বিজয় না করেই আমরা কিভাবে প্রত্যাবর্তন করব?' রাসূল বললেন, 'তাহলে আগামীকাল সকালে যুদ্ধ শুরু করতে হবে।' কাজেই দ্বিতীয় দিন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের জন্য গেলেন। কিন্তু আঘাত খাওয়া ছাড়া কোনোই সুবিধা করা সম্ভব হলো না। তাই বললেন, 'ইনশাআল্লাহ আমরা আগামী কাল প্রত্যাবর্তন করব।'

নবী করীম (ﷺ) এর এই প্রস্তাবে সকলেই আনন্দিত হলেন এবং কোনো আলাপ আলোচনা ব্যতিরেকেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দিলেন। এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করে রাসূল মৃদু হাসতে থাকলেন। এরপর লোকজনেরা যখন তাঁবুর খুঁটি উঠিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন, তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন যে, তোমরা বলতে থাক-

আমরা প্রত্যাবর্তন, তওবাকারী, উপাসনাকারী এবং স্বীয় প্রতি পালকের প্রশংসাকারী।

বলা হলো যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সাকিফদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। রাসূল (ﷺ) বললেন, হে আল্লাহ! সাকিফদের হেদায়েত কর এবং তাদেরকে নিয়ে এসো।

জেয়েররানা নামক স্থানে গণীমত বণ্টন

তায়েফ অবরোধ পর্ব শেষে নবী করীম (ﷺ) প্রত্যাবর্তন করেন। গণীমত বণ্টন ব্যতিরেকেই জেয়েররানা নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন। বিলম্বের উদ্দেশ্যে ছিলো এই যে, হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধিদল ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকট আগমন করবে এবং তাদের সম্পদাদি ফেরৎ নিয়ে যাবে। কিন্তু এরকম সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের পক্ষের কেউই যখন আগমন করল না তখন রাসূল গণীমতের মাল বন্টন শুরু করে দিলেন। উদ্দেশ্যে ছিলো গণীমতের ব্যাপারে বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং মক্কার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের যারা সন্ধিগ্ধ চিত্ত ছিলো এবং অনর্থক কথাবার্তা বলাবলি করে বেড়াত তাদের মুখ বন্ধ করা। মোয়াল্লাফাতুল কলুব সর্বপ্রথম সাহায্যপ্রাপ্ত হলেন। তাঁদেরকে বড়ো বড়ো অংশ দেয়া হলো।

আবু সুফিয়ান বিন হরবকে চল্লিশ উকিয়া (ছয় কেজি হতে কিছু কম) রূপা এবং এক শত উট প্রদান করা হলো। তিনি বললেন, 'আমার ছেলে ইয়াযীদ?" নবী করীম (ﷺ) ইয়াযীদেরও অনুরূপ অংশ প্রদান করলেন। তিনি বললেন, 'আমার ছেলে মুয়াবিয়া?" রাসূল তাঁকেও অনুরূপ অংশ প্রদান করলেন (অর্থাৎ তাঁর ছেলেদেরসহ শুধু আবু সুফিয়ানকে আনুমানিক আঠার কেজি রৌপ্য এবং তিন শত উট দেয়া হয়েছিলো)।

হাকীম বিন হেযামকে একশত উট দেয়া হয়েছিলো। তিনি আরও একশত উটের জন্য আবেদন জানালে পুনরায় তাঁকে একশত উট দেয়া হয়েছিলো। অনুরূপভাবে সাফওয়ান বিন উমাইয়াকে একশত উট, দ্বিতীয় দফায় আরও একশত উট এবং তৃতীয় দফায় আবারও একশত উট (মোট তিনশত উট) দেয়া হয়েছিলো।

হারেস বিন কুলদাহকেও একশত উট দেয়া হয়েছিলো। অতিরিক্ত কুরাইশ এবং অন্যান্য নেতাদেরকেও শত শত উট দেয়া হয়েছিলো। অধিকন্তু, অন্যান্য কিছু সংখ্যক নেতাকেও পঞ্চাশ এবং চল্লিশ চল্লিশ করে উট দেয়া হয়েছিলো। এমনকি জনগণের মাঝে প্রচার হয়ে গেল যে, মুহাম্মদ (ﷺ) এমনভাবে দান খয়রাত করছেন যে, তাদের আর পরমুখাপেক্ষি হওয়ার কোনো ভয় নেই। কাজেই, অর্থ সাহায্য গ্রহণের জন্য বেদুইনদের দল নবী করীম (ﷺ) এর নিকট ভিড় জমাতে থাকল। অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে তিনি একটি বৃক্ষের দিকে সরে পড়তে তিনি বাধ্য হলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে তাঁর চাদরখানা বৃক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। তিনি বললেন, 'হে লোক সকল! আল্লাহর কসম! তোমাদের ফাই সম্পদের মধ্যে আমার জন্য কিছুই নেই। এমন কি এই লোমগুলোর পরিমাণও নেই। শুধু এক-পঞ্চমাংশ আছে এবং সেটুকুও তোমাদের হাতেই ফিরিয়ে দেয়া হবে।

মুওয়াল্লাফাতুল কুলুবকে দেয়ার পর রাসূল যায়েদ বিন সাবিতকে নির্দেশ দিলেন সৈন্যদের মধ্যে গণীমত বন্টনের জন্য হিসাব-কিতাব তৈরি করতে। তিনি যে হিসেব তৈরি করলেন, তাতে দেখা গেল যে, প্রত্যেক সাধারণ সৈনিকের অংশে এসেছে চারটি করে উট এবং চল্লিশটি করে বকরি। অশ্বারোহীদের প্রত্যেকের অংশে এসেছে বারোটি উট এবং এক শত বিশটি বকরি।

এই বন্টনের ভিত্তি ছিলো এক কৌশলময় রাজনীতি। কারণ, পৃথিবীতে এমন অনেক লোক আছে, যাদের সত্যের পথে আনা হয় বিবেক বুদ্ধির পথ ধরে নয়; বরং পেটের পথ ধরে।

আনসারদের বিমর্ষতা ও দুর্ভাবনা

রাসূলের এই প্রাজ্ঞ রাজনীতির ব্যাপারে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো কোনো লোকের মনে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় কিছু কিছু মৌখিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিলো। বিশেষ করে আনসারদের ওপর এর প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া ছিলো সব চাইতে বেশি। কারণ, হোনাইন যুদ্ধের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছিলেন। অথচ বিপদের সময় তাঁদেরকেই আহ্বান জানানো হয়েছিলো এবং সে আহ্বানে সর্বাগ্রে সাড়া দিয়ে তাঁরাই রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং এমন বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই কঠিন বিপর্যয় সুন্দর বিজয়ে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু তাঁরা তখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, পলায়নকারীদের হস্ত হলো পূর্ণ অথচ তাঁদের হস্তই রয়ে গেল শূন্য।

আবু সাঈদ খুদরি (রা) হতে ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল যখন কুরাইশ এবং অন্যান্য আরব গোত্র লোককে গণীমতের মালবণ্টন করে দিলেন, আনসারদের ভাগে কিছুই পড়ল না। তখন তাঁরা মনে মনে অত্যন্ত দুঃখিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁদের মনে এতদসংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের উদয় হলো। এমনকি তাদের মধ্য থেকে একজন বলেই বসলেন যে, 'আল্লাহর কসম! রাসূল (ﷺ) তাঁর নিজের কওমের সঙ্গে মিশে গেছেন, উক্ত প্রেক্ষিতে সা'দ (রা) রাসুলে করীমের নিকট উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল। ফাই বণ্টনের ব্যাপারে আপনি যে ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন তাতে আনসাররা আপনার প্রতি দুঃখিত এবং মনক্ষুন হয়েছেন। আপনি নিজ কওমের লোকজনদের মধ্যেই তা বন্টন করেছেন এবং তাঁদেরকে অনেক বেশি পরিমাণে দান করেছেন কিন্তু আনসারদের কিছুই দেননি।'

রাসূল বললেন, হে সা'দ! এই সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমিও তো আমার কওমের লোকজনদের মধ্যে একজন।' নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'আচ্ছা তাহলে তোমার কওমের লোকজনকে তুমি অমুক স্থানে একত্রিত কর।'

সা'দ (রা) তাঁর কওমের লোকজনদের নির্ধারিত স্থানে সমবেত করলেন। কিছু সংখ্যক মুহাজির আগমন করলে তাঁদেরকে সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলো। কিছু সংখ্যক ভিন্নলোক সেখানে আগমন করলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হলো। যখন সংশ্লিষ্ট লোকজনেরা সেখানে একত্রিত হলেন তখন সা'দ রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন, 'আনসাররা আপনার খেদমতে একত্রিত হয়েছেন।'

রাসূল তৎক্ষণাৎ সেখানে গমন করলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন, 'হে আনসার! কী কারণে তোমরা আমার প্রতি অসন্তুষ্টি পোষণ করেছো? আমি কি তোমাদের নিকট এমন অবস্থায় আসিনি যখন তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে? আল্লাহ তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন? তোমরা অসহায় ছিলে তোমাদেরকে সহায় সম্পদ দান করেছেন, তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু ছিলে, তিনি তোমাদের মধ্যে মহব্বতের বন্ধন সৃষ্টি করে দিয়েছেন।' তখন তারা বললেন, অবশ্যই, এসব কিছুই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর বড়োই অনুগ্রহ। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'আনসাররা! তোমরা আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন?

আনসাররা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কী উত্তর দেব? এসব তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) এর অনুগ্রহ। রাসূল বললেন, দেখ, আল্লাহর কসম! ইচ্ছা করলে তোমরা সত্য কথাই বলতে পার এবং তোমাদের কথা সত্য বলে ধরে নেয়া হবে। তারা বললো, "আপনি আমাদের নিকট এমন সময় এসেছিলেন যখন আপনাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করা হচ্ছিল। আমরা আপনাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। আপনি যখন ছিলেন বন্ধু-বান্ধব ও সহায়-সম্বলহীন, তখন আমরা আপনাকে সহায়তা দান করেছিলাম। আপনাকে যখন বিতাড়িত করা হয়েছিলো, তখন আমরা আপনাকে আশ্রয় দান করেছিলাম। আপনি যখন ছিলেন অভাবগ্রস্থ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমরা তখন দুশ্চিন্তামুক্ত হতে আপনাকে সাহায্য করেছিলাম।"

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'হে আনসাররা! একটি নিকৃষ্ট ঘাসের জন্য তোমরা নিজ নিজ অন্তরে অসন্তুষ্ট হয়েছ, অথচ এর মাধ্যমে আমি তোমাদের অন্তরকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা মুসলমান হয়ে ইসলামের প্রতি সমর্পিত হয়ে যাও। হে আনসার! তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে, সে সকল লোকেরা এক টুকরা বকরি নিয়ে ফিরে যাবে, আর তোমরা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল কে নিয়ে নিজ কওমের নিকট ফিরে যাবে? সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে রয়েছে আমার জীবন! যদি হিজরতের বিধান না হতো, তবে আমিও হতাম আনাসারদের মধ্যকার একজন। যদি লোকেরা এক পথে চলে এবং আনসাররা অন্য পথে চলে তাহলে আমিও আনসারদের পথেই চলব। হে আল্লাহ! আনসারদের, তাঁদের সন্তানদের এবং তাঁদের সন্তানদের (অর্থাৎ নাতিপুতিদের) প্রতি রহম করুন।

হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধির আগমন

যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদ বণ্টনের পর হাওয়াযিন গোত্রের এক প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণান্তে আগমন করলেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো চৌদ্দজন। এই দলের নেতা ছিলেন যোহাইর বিন সোরাদ। নবী করীম (ﷺ) এর দুধ-চাচা আবু বারকানও ছিলেন এই দলে। প্রতিনিধিদল নিবেদন করলেন, 'আপনি দয়া করে আটককৃতদের এবং তাদের অর্থ-সম্পদ ফেরৎ দিয়ে দিন।' তাঁদের কথাবার্তায় এমন ভাব প্রকাশ পেল যেন অন্তর গলে যাবে।

নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'আমার সঙ্গে যে সকল লোকজন আছে তোমরা তো তাদের দেখতেই পাচ্ছ এবং আমি সত্য কথা অধিক ভালবাসি।' সুতরাং তোমরা বল তোমাদের নিকট প্রিয় বস্তু কোনটি? সন্তান না সম্পত্তি? তারা বলল যে, 'আমাদের নিকট বংশগত মর্যাদার তুল্য আর কোনো কিছুই নাই।'

রাসূল বললেন, 'আচ্ছা আমি যখন যোহর নামায শেষ করব, তখন তোমরা দাঁড়িয়ে বলবে যে, আমরা রাসূল (ﷺ) কে মুমিনদের জন্য এবং মুমিনদেরকে রাসূল (ﷺ) এর জন্য সুপারিশকারী বানাচ্ছি। অতত্রব, আমাদের আটককৃতদের ফিরিয়ে দেন।'

অতঃপর রাসূল যখন নামায সমাপ্ত করলেন, তখন তারা তাই বলল, উত্তরে নবী করীম (ﷺ) বললেন, "এই অংশের সম্পর্কে যা আমার জন্য এবং বনু আব্দুল মুত্তালিবের জন্য আছে আমি সে সবই তোমাদের জন্য দিয়ে দিলাম এবং আমি এখনই লোকজনদের নিকট তা জেনে নিচ্ছি। এর প্রেক্ষিতে আনসার ও মুহাজিররা দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমাদের নিকট যা আছে, তাঁর সবই রাসূলের জন্য দিয়ে দিলাম। এরপর আকরা বিন হাবিস বললেন, 'আমার এবং বনু ফাজারাদের নিকট যা রয়েছে তা আপনার জন্য নয়।'

আব্বাস বিন মিরদাস বললেন, 'আমার এবং বনু সোলাইমের যা কিছু আছে তা আপনার জন্য নয়।' এর প্রেক্ষিতে বনু সোলাইম বললেন, 'জী না, আমাদের সঙ্গে যা কিছু আছে তার সবই রাসূলের জন্য।' সেহেতু আব্বাস বিন মিরদাস বললেন, তোমরা আমাকে বেইজ্জত করে দিলে।'

রাসূল বললেন, 'দেখ এই সকল লোক ইসলাম গ্রহণের পর এসেছে এবং (উক্ত উদ্দেশ্যেই) আমি তাদের আটককৃতদের বণ্টনে বিলম্ব করেছিলাম। এখন আমি তাদেরকে অধিকার প্রদান করলাম। তবে তারা অন্য কিছুকেই সন্তানাদির সমতুল্য মনে করেনি। অতত্রব, যার নিকট আটককৃত কোনো কিছু রয়েছে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে যদি সে তা ফেরৎ দেয়, তাহলে সেটাই হবে সব চাইতে ভালো ব্যবস্থা। আর কেউ যদি নিজ অধিকার আটকে রাখতে চায় তা হবে তাদেরই আটককৃত। অতত্রব, তাদেরকে সে সব ফিরিয়ে দেবে। আগামীতে সর্বাগ্রে যে সরকারি সম্পদ অর্জিত হবে, ওর মধ্য থেকে ফেরৎদানকারীকে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই একটির পরিবর্তে ছয়টি দেয়া হবে।

লোকজনেরা বললেন, 'রাসূলের জন্য আমরা সব কিছুই সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি।' রাসূল বললেন, 'আমি ঠিক বুঝতে পারছি না যে তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে এবং কে নেই। অতত্রব, তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের প্রধানরা তোমাদের ব্যাপার আমাদের সামনে উপস্থাপন করবেন। এরপর লোকজনেরা তাদের সন্তানাদি ফিরিয়ে দিলেন। শুধু উযায়না বিন হিসন অবশিষ্ট থাকলেন। তাঁর অংশে ছিলো এক বৃদ্ধা মহিলা। তিনি প্রথমে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করলেও পরে ফিরিয়ে দিলেন। রাসূল প্রত্যেক বন্দীকে মুক্তিদানের সময় একখানা করে কিবতী চাদর প্রদান করলেন।

ওমরাহ পালন এবং মদিনায় প্রত্যাবর্তন

গণীমত বিতরণের পর জেয়েরানা হতেই ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) ইহরাম বাঁধলেন এবং ওমরাহ পালন করলেন। অতঃপর আত্তাব বিন আসীদকে মক্কার অভিভাবক নিযুক্ত করে মদিনার দিকে রওয়ানা হলেন। ৮ম হিজরি ২৪ শে যিলকাদ তারিখে রাসূল মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

প্রথম যখন মদিনায় আগমন করেন তখন তিনি ছিলেন আশ্রয়প্রার্থী। তাঁকে হত্যা কিংবা বহিষ্কার করার এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের মুখেই তিনি মক্কা পরিত্যাগ করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছিলেন অপরিচিত, ভীত এবং নিরাপত্তা ও বন্ধুত্বের অন্বেষণকারী। মদিনাবাসীরা তাঁর সম্মান করলেন, আশ্রয় দিলেন, সর্ব ব্যাপারেই সাহায্য করলেন এবং যে আলোর দিশারী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলো তার অনুসরণ করে চললেন। অধিকন্তু, রাসূলের খাতিরে সমগ্র পৃথিবীর শত্রুতাকে তাঁরা সামান্য ব্যাপার মনে করলেন। সেদিন মদিনা একজন মুহাজির ধর্মপ্রচারক হিসেবে রাসূলকে স্বাগত জানিয়েছিলো।

কিন্তু আট বছর পর আজ সেই মদিনাই তাঁকে এভাবে স্বাগত জানাচ্ছে যে, মক্কা তাঁর অধীনস্ত হয়ে গেছে, মক্কাবাশিরা তাঁদের অহংকার ও অজ্ঞতাপ্রসূত অর্থহীন বড়ত্বকে তাঁর পদতলে নিক্ষেপ করে দিয়েছে এবং তাঁদের পূর্বের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়ে ইসলামের মাধ্যমে মক্কাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছে।

যে ব্যক্তি ন্যায়পরায়ণতা এবং ধৈর্য অবলম্বন করবে, নিশ্চয় আল্লাহ সদাচারীদের বিনিময় নষ্ট করেন না।

মক্কা বিজয়ের পর ছোটখাটো অভিযান এবং কর্মচারীদের যাত্রা

মক্কা বিজয় সংক্রান্ত সুদীর্ঘ ও সফল ভ্রমণ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল মদিনায় অবস্থানের মধ্য দিয়ে বেশ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। এর মাঝে তিনি মদিনা আগমনকারী প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান, প্রশাসনের কর্মচারীদেরকে প্রেরণ করতে থাকেন, দ্বীনের দাওয়াত প্রদানকারীকে প্রেরণ করতে থাকেন, যারা আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ এবং দ্বীনের সামনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করছিলো তাদের অধীনস্থ করতে থাকেন। উক্ত বিষয়াদি সংক্রান্ত বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

যাকাত আদায়কারীবৃন্দ

ইতোপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের পর ৮ম হিজরি শেষ ভাগে রাসূল মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর ৯ম হিজরির মুহাররমের চাঁদ উদিত হওয়ার পর পরই রাসূল বিভিন্ন গোত্রের মুসলমানদের নিকট থেকে সদকা ও যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে কর্মচারী প্রেরণ করেন। বিভিন্ন গোত্রে প্রেরিত কর্মচারীগণের নাম ও যে গোত্র থেকে যাকাত আদায় করতেন তার তালিকা নিম্নরূপ-

১. উয়াইনা ইবনে হিসন - বনু তামীন

২. ইয়াযীদ ইবনে হোসাইন - আসলাম এবং গিফার গোত্রে

৩. আব্বাদ ইবনে বাশির আশহালী - গোসাইম এবং মোয়াইনা গোত্র

৪. রাফে ইবনে মার্কীস - জোহাইনা গোত্র

৫. আমর ইবনে আস - বনু ফাযারা

৬. যাহহাক ইবনে সুফিয়ান - বনু কিলাব

৭. বাশীর ইবনে সুফিয়ান - বনু কা'ব

৮. মুহাজির লুতবিয়াহ আযদী - বনু যুবিয়ান

৯. মুহাজির ইবনে আবু উমাইয়া - সানয়া শহর

১০. যিয়াদ ইবনে লাবীদ - হাযরা মাওত অঞ্চল

১১. আদী ইবনে হাতেম - তায়ী এবং বনু সাদ গোত্র

১২. মালেক ইবনে নোওয়াইরাহ - বনু হানযাহ

১৩. যিবরিকান ইবনে বদর - বনু সাদের একটি শাখা

১৪. কাইস ইবনে আসেম - বনু সাদের অন্য একটি শাখা

১৫. আলা ইবনে হাযরামী - বাহরাইন অঞ্চল

১৬. আলি ইবনে আবু তালিব - নাজরান অঞ্চল

প্রকাশ থাকে যে, ৯ম হিজরির মুহাররম মাসেই এ সকল কর্মচারীকে প্রেরণ করা হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা বিলম্ব হয়েছিলো। সংশ্লিষ্ট গোত্রগুলোর বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের কারণে।

অভিযানসমূহ

বিভিন্ন গোত্রের নিকট থেকে যাকাত আদায়ের জন্য যেমন কর্মচারী প্রেরণ হয় তেমনিভাবে আরব উপদ্বীপের সাধারণ অঞ্চলমূহের মধ্যে নিরাপত্তা ও শান্তির পরিবেশ বজায় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে সৈনিক মহোদ্যমও গ্রহণ করা হয়। এই সকল অভিযানের বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ:

উয়াইনা বিন হিসন ফাযারীর অভিযান

৯ম হিজরি, মুহাররম: উওয়াইনার নেতৃত্বে ৫০ জন অশ্বারোহী সমন্বয়ে গঠিত এক বাহিনী বনু তামীম গোত্রের নিকট প্রেরণ করা হয়। অন্য গোত্রগুলোকে উত্তেজিত করে বুন তামীম গোত্র কর প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার কারণেই এই অভিযান প্রেরিত হয়েছিলো। উক্ত অভিযানে কোনো মুহাজির কিংবা আনসার ছিলেন না।

উয়াইনা বিন হিসন রাত্রিবেলা পথ চলতেন এবং দিবাভাগে অত্যন্ত সঙ্গোপনে অগ্রসর হতেন। এভাবে সাহারায় বনু তামিমের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। আকস্মিক আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বনু তামীম গোত্র পলায়ন করে। কিন্তু তাদের ১১জন পুরুষ, একুশজন মহিলা ও ত্রিশজন শিশু মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। তাদের মদিনায় আনয়ন পূর্বক রমলা বিনতে হারেসের বাড়িতে রাখা হয়।

অতঃপর বনু তামীমের দশজন নেতৃস্থানীয় বন্দীদের ব্যাপারে আলোচনা করতে মদিনায় আগমন করল এবং নবী করীম (ﷺ) এর দরজায় গিয়ে বলল, হে মুহাম্মদ! আমাদের নিকট এসো।' তাদের আহ্বানে রাসূল যখন বাইরে গমন করলেন তখন তারা তাঁকে জড়িয়ে ধরে আলোচনা চালাতে থাকল। অতঃপর রাসূল (ﷺ) তাদের সঙ্গে অবস্থান করতে থাকলেন এবং এই অবস্থার মাঝে যোহর নামাযের সময় হলে তিনি যোহর নাময পড়ালেন। নামাযের পর মসজিদে নববীর বারান্দায় গিয়ে বসে পড়লেন। তারাও তাদের বিন হাজেরকে দলের মুখপাত্র হিসেবে এগিয়ে দিয়ে অহমিকা ও আত্মগর্বের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক কথাবার্তা বলতে থাকল। এদিকে রাসূল ইসলামের বক্তা হিসেবে তাদের কথাবার্তার উপযুক্ত জবাব দানের জন্য সাবেত বিন কাইস বিন শাম্মাসকে নিযুক্ত করলেন। তিনি তাদের আলোচনার আলোকে যথোপযুক্ত বক্তব্য পেশ করলেন। এরপর তারা তাদের কবি যারকান বিন বদরকে অগ্রভাগে রাখলে সে তাদের গৌরবসূচক কিছু কবিতা আবৃত্তি করল। মুসলমান বিন বদরকে অগ্রভাগে রাখলে সে তাদের গৌরবসূচক কিছু কবিতা আবৃত্তি করল। মুসলমান কবি হাসসান বিন সাবেত (রা) তাদের জবাবে বক্তব্য পেশ করলেন।

যখন উভয় দলের বক্তা এবং কবিরা উপস্থাপনা শেষ করলেন তখন আকরা বিন হাবেস বলল, 'তাদের বক্তা আমাদের চাইতে অধিক শক্তিশালী এবং তাদের কবি আমাদের কবির তুলনায় অধিক শক্তিশালী বক্তব্য পেশ করেছেন। তাদের কথাবার্তা আমাদের কথাবার্তার তুলনায় অধিক জোরালো এবং তাদের আলোচনা আমাদের আলোচনার তুলনায় অধিক উন্নত মানের। এরপর তারা ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করল। রাসূল (ﷺ) তাদেরকে উত্তম উপঢৌকন প্রদানপূর্বক সম্মান প্রদর্শন করলেন এবং তাদের আটককৃত শিশু ও মহিলাদের ফিরিয়ে দিলেন।

কুতবাহ বিন আমেরের অভিযান (সফর ৯ম হিজরি)

তুরবার নিকটে তাবালার অঞ্চলে খাশআম গোত্রের একটি শাখার উদ্দেশ্যে এই অভিযান প্রেরণ করা হয়। বিশ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দল নিয়ে কুতবাহ এই অভিযানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই দলের বাহন ছিলো ১০টি উট যার ওপর তাঁরা পালাক্রমে আরোহণ করতেন।

মুসলিম বাহিনী রাত্রি বেলা লক্ষস্থলের ওপর আক্রমণ চালান। এর ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষেরই লোকজন হতাহত হয়। মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে কুতবাহ এবং আরও কয়েক জন নিহত হন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও মুসলমানরা কিছু ভেড়া, বকরি এবং শিশুদের মদিনায় নিয়ে আসতে সক্ষম হন।

যাহহাক বিন সুফিয়ান কিলাবীর অভিযান (৯ হিজরি, রবিউল আওয়াল মাস)

এই অভিযান প্রেরণ করা হয়েছিলো বনু কিলাব গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য। কিন্তু তারা অস্বীকার করে এবং যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মুসলিম বাহিনী তাদেরকে পরাজিত করেন এবং একজনকে হত্যা করেন।

আলকামা বিন মুজরেয মুদলেজীর অভিযান (৯ম হিজরি, রবিউল আখের)

তিনশত ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত বাহিনীর পরিচালক হিসেবে তাঁকে জেদ্দার তীরবর্তী অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। কিছু সংখ্যক হাবশী জেদ্দা তীরবর্তী অঞ্চলে একত্রিত হয়ে মক্কাবাসীদের ওপর এক ডাকাতির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো।

আলকামা সমুদ্রে অবতরণপূর্বক এক উপদ্বীপ পর্যন্ত অগ্রসর হন। হাবশীরা মুসলমানদের আগমনের সংবাদ অবগত হয়ে পলায়ন করে।

আলী বিন আবু তালিবের অভিযান (৯ম হিজরি, রবিউল আওয়াল মাস)

তাঁকে তাই গোত্রের কালস (কালিসা) নামক একটি মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার জন্য প্রেরণ করা হয়েছিলো। তাঁর পরিচালনাধীন এই বাহিনীতে ছিলো দেড়শত লোক এবং বাহন ছিলো একশত উট এবং পঞ্চাশটি ঘোড়া। রণ-পতাকাগুলো ছিলো কালো এবং নিশান ছিলো সাদা। এই বাহিনী ফজরের সময় হাতেম তাইয়ের মহল্লায় আক্রমণ চালিয়ে কালসকে ভেঙ্গে ফেলার পর অনেক লোককে বন্দী করে এবং মেষ ও বকরিসহ অনেক গবাদি সম্পদ হস্তগত করে। বন্দীদের মধ্যে হাতেম তাইয়ের কন্যাও ছিলো। হাতেম তাইয়ের পুত্র আদী শাম দেশে পলায়ন করে। মুসলমানরা কালস মূর্তির ধন-ভাণ্ডারে তিনটি তলোয়ার ও তিনটি যুদ্ধের লৌহবর্ম পেয়েছিলেন। পথিমধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন করে নেয়া হয়। অবশ্য কিছু পছন্দসই জিনিস রাসূল (ﷺ) এর জন্য পৃথক করে রাখা হয়। তবে হাতেম তাই এর পরিবারকে বন্টন করা হয়নি।

মদিনায় পৌঁছার পর হাতেম কন্যা এই বলে রাসূল (ﷺ) এর দরবারে নিবেদন করে, হে আল্লাহর রাসূল! এখানে আসা যার পক্ষে সম্ভব ছিলো, তার কোনো খবর নেই। পিতা বিগত এবং আমি বৃদ্ধা। সেবা করার ক্ষমতা আমার নেই। আপনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন, আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করবেন।

অথচ চরিতকারগণের বিবরণ রয়েছে যে, রাসূল স্বয়ং যখন হাওয়াযেন গোত্র বন্দীদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বললেন, তখন আকবা বিন হারেস নিজেই বললেন, যে আমি এবং বানু তামীম ফিরিয়ে দেব না। এ কথাই প্রমাণ করছে যে, আকরা বিন হাসের ৯ হিজরির মুহাররম মাসের পূর্বেই মুসলমান হয়েছিলেন।

নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'তোমার জন্য কার আসার সম্ভাবনা ছিলো? উত্তর দিল, 'আদি বিন হাতেম। সে আল্লাহর এবং আল্লাহর রাসূল এ থেকে পলায়ন করেছে।' অতঃপর নবী করীম (ﷺ) সেখান থেকে এগিয়ে গেলেন।

দ্বিতীয় দিবস আবার সে সেই কথাই পুনরাবৃত্তি করল এবং নবী করীম (ﷺ) আবার সেই কথাই বললেন যা গতকাল বলেছিলেন। তৃতীয় দিন আবারও সে সেই কথাই বললেন, রাসূল তাকে মুক্ত করে দিলেন। তখন রাসূল এ পাশেই একজন সাহাবী ছিলেন, সম্ভবত: আলী (রা) তিনি বললেন, 'নবী করীমের নিকট একটি সওয়ারীও চেয়ে নাও। সে একটি সওয়ারীর জন্য নিবেদন করলে নবী করীম (ﷺ) তাকে তা সরবরাহ করার জন্য নির্দেশ দিলেন।

মুক্তি লাভের পর হাতেম কন্যা শাম রাজ্যে নিজ ভাইয়ের নিকট ফিরে গেল। সেখানে সে তার ভাইয়ের নিকট সাক্ষাতের পর সব কিছু সবিস্তারে বর্ণনা করল। রাসূল সম্পর্কে বলতে গিয়ে সে বলল, তিনি এত সুন্দরভাবে কার্য সম্পদান করেছেন যে, তোমার পিতাও তেমনটি করতে পারতেন না। তাঁর নিকটে যাও ভরসা অথবা ভয়ের সঙ্গে।

কাজেই আশ্রয় প্রার্থনা কিংবা লিখিত আবেদন ছাড়াই আদী নবীর কাছে হাজির হলো। নবী করীম (ﷺ) তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সে যখন তার সামনে বসল, তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করলেন এবং বললেন, 'তোমরা কোন জিনিস হতে পলায়ন করছ? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বাণী হতে কি পলায়ন করছ? যদি সেটাই হয় তাহলে বল তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য আছে বলে কি তোমার মনে হয? সে উত্তর দিল, না। কিছুক্ষণ কথোপকথনের পর রাসূল (ﷺ) পুনরায় বললেন, 'আচ্ছা বলতো, তোমরা কি আল্লাহু আকবর বলা থেকে পলায়ন করছ? তবে কি আল্লাহ হতে কিছু বড়ো আছে বলে তোমরা মনে কর?' উত্তরে বলল, 'না। রাসূল বললেন, 'শোনো ইহুদিদের প্রতি আল্লাহর গজব পতিত হয়েছে এবং খ্রিস্টনেরা পথভ্রষ্ট।'

সে বলল, 'তবে আমি একনিষ্ট মুসলমান। তার মুখ থেকে এ কথা শোনার পর রাসূলের মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অতঃপর তাকে এক আনসারীর বাড়িতে রাখার জন্য নির্দেশ দিলেন। সে আনসারীর বাড়িতে থাকত এবং সকাল সন্ধ্যায় রাসূল (ﷺ) এর খেদমতে উপস্থিত হতো।

আদী হতে ইবনে ইসহাক একথাও বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) যখন তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসালেন তখন জিজ্ঞেস করলেন, 'ওহে আদী বিন হাতেম! তোমরা কি পুরোহিত ছিলে না? উত্তরে আদি বলল, 'অবশ্যই'। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) বললেন, তোমরা কি নিজ কওমের মধ্যে যুদ্ধ-লব্ধ সম্পদের এক-চতুর্থাংশ গ্রহণের রীতি অনুসরণ করে চলতে না? সে বলল, অবশ্যই। নবী বললেন, অথচ তোমাদের দ্বীনে এটা বৈধ নয়। সে বলল 'হ্যাঁ' আল্লাহর কসম! এবং তখনই আমি জেনেছি যে বাস্তবিকই আপনি আল্লাহর রাসূল, কারণ আপনি সে কথাও জানেন, যা জানা যায় না।

সহিহ বুখারিতে আদী হতে বর্ণিত আছে, 'আমি একদা খিদমতে নববীতে উপবিষ্ট ছিলাম। হঠাৎ এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হয়ে অভাব-অনটনের অভিযোগ পেশ করল। এর পর অন্য এক ব্যক্তি এসে ছিনতাইয়ের অভিযোগ পেশ করল। নবী করীম (ﷺ) বললেন,

আদি! তুমি কি হীরা দেখেছ? জীবন যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে দেখবে যে, পর্দানশীন মহিলাগণ হীরা হতে নিরাপদে চলে এসে কাবা ঘরের তাওয়াফ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তার আর কোনো কিছুরই ভয় থাকবে না। তোমার জীবন দীর্ঘায়িত হলে তোমরা কেসরার ধন-ভাণ্ডার জয় করবে এবং দেখবে যে লোকজনেরা হাত ভর্তি করে সোনা-রুপা বের করবে, কিন্তু তালাশ করেও সে সব গ্রহণ করার মতো লোকজন পাবে না।'

উক্ত বিষয় প্রসঙ্গে আদী বলেছেন, 'আমি দেখেছি যে পর্দানশীন মহিলারা হীরা হতে নিরাপদে এসে কা'বা ঘরের তওয়াফ করছে এবং আল্লাহ ছাড়া তাদের আর কোনো কিছুরই ভয় নেই। তিনি আরও বলেছেন, 'আমি নিজেই সেসব লোকজনের মধ্যে ছিলাম যারা কেসরা বিন হুরমুজের ধন-ভান্ডার জয় করেছিলো। তাছাড়া, তোমাদের জীবন দীর্ঘায়িত হয় তাহলে তোমরাও ঐ সব কিছু দেখে নিতে পারবে, যা নবী করীম (ﷺ) বলেছেন যে মানুষ হাত ভর্তি করে সোনারুপা বাহির করবে।

তাবুক যুদ্ধ, নবম হিজরির রজব মাসে

মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছিলো সত্য মিথ্যা এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্যকারী যুদ্ধ। উক্ত যুদ্ধের পর রাসূল রিসালাত সম্পর্কে আরববাসীদের মনে দ্বিধা দ্বন্দ্ব কিংবা সন্দেহের আর কোনো অবকাশই রইল না। উক্ত কারণে পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং মানুষ আল্লাহর দ্বীনের দলে দলে প্রবিষ্ট হতে থাকল। এ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ "প্রতিনিধি প্রেরণ" এ অধ্যায়ে উপস্থাপিত হবে এবং "বিদায় হজ্জ" সম্পর্কিত আলোচনায়ও এ সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা সম্ভব হবে। যাহোক, আলোচ্য সময়ে অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলতে আর তেমন কিছুই ছিলো না। ফলে মুসলমানেরা শরীয়তের শিক্ষা বিস্তার এবং ইসলামের প্রচার প্রসারে একনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

যুদ্ধের কারণ

ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এমনি এক পর্যায়েও মদিনার ওপর এক শাস্তির প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছিল কোনো কারণ ব্যতিরেকেই যারা মুসলমানদের হর- হামেশা বিরক্ত করে চলছিলো। ইতিহাসে এরা রোমক বা রোমীয় নামে পরিচিত। তদানীন্তন পৃথিবীতে এরা ছিলো সৈন্য সম্পদে সর্বাধিক সমৃদ্ধ। ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, উক্ত বিরক্তিকর কার্য আরম্ভ করে শোরাহবীল বিন আমর গাসসানী নবী করীমের দূত হাসের বিন উমাইর আযদী (রা) কে হত্যা করার কারণে। তাছাড়া উক্ত হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য রাসূল এ যায়েদ বিন হারিসা (রা) এর অধিনায়কত্বে যে সৈন্যদের প্রেরণ করেছিলেন এবং যাঁরা মৃতা নামক স্থানে রোমক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলেন, সে কথাও ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু এই সৈন্যদল সেই আত্মগর্বী অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম হননি। অবশ্য এর ফলে দূরের ও নিকটের আরব অধিবাসীদের ওপর মুসলমানদের প্রভাব প্রতিপত্তির একটি অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়।

বস্তুতঃ আরব গোত্রসমূহের ওপর মুসলমানদের প্রভাব প্রতিফলিত হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে সৃষ্ট সচেতনতা এবং রোমকদের নাগপাশ থেকে নিজেদের যুক্ত করার জন্য সৃষ্ট সংকল্পের ব্যাপারটিকে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব ছিলো না। এতদসংক্রান্ত ব্যাপারে রোমকদের যে ভয় ছিলো, তা ক্রমে ক্রমে সীমান্তের দিকে সম্প্রসারিত হচ্ছিল। বিশেষ করে আরব ভূখন্ডের সীমান্তবর্তী শাম রাজ্যের জন্য তা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিলো। এ কারণে রোমক বাহিনীর সঙ্গে মুকাবিলা করার মতো যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ের পূর্বেই ইসলামি শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে পিষ্ট করে দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলেন রোমক সম্রাট। যাতে রোম সাম্রাজ্যের সংলগ্ন আরব এলাকা থেকে ভবিষ্যতে কোনো ফেতনা কিংবা হাঙ্গামার সম্ভাবনা না থাকে।

উপরিউক্ত কারণসমূহের প্রেক্ষাপটে মূতার যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর একটি বছর পূর্ণ হতে না হতেই রোম সম্রাট রোম সাম্রাজ্যের আধিবাসীদের মধ্য থেকে এবং অধীনস্থ আরব গোত্রসমূহ অর্থাৎ গাসসান পরিবার ও অন্যান্য বিভিন্ন গোত্র থেকে সৈন্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিল এবং এক রক্তক্ষয়ী ও চূড়ান্ত ফয়সালাকারী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকল।

রোমক এবং গাসসানীদের প্রস্তুতির সাধারণ সংবাদ

এদিকে মদিনায় ক্রমে ক্রমে খবর আসতে থাকে যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত ও মীমাংসাকারী যুদ্ধের জন্য সম্রাট ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে চলেছেন। রোমক সম্রাটের এহেন সমর প্রস্তুতির সংবাদে স্বাভাবিকভাবে মুসলমানদের মনে কিছু অস্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছিলো এবং গ্রহণযোগ্য নয় এমন সব সংবাদ শোনার ব্যাপারেও তাঁরা উৎকর্ণ হয়ে থাকছিলেন।

তাঁদের মনে এ রকম একটি ধারণারও সৃষ্টি হয়েছিলো যে, না জানি কখন রোমক বাহিনীর স্রোত এসে আঘাত হানে। ৯ম হিজরির ঠিক এমনি সময়েই রাসূল (ﷺ) নিজ বিবিদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে এক মাসের ইলা তথা তাঁদের সঙ্গ পরিহারপূর্বক একটি ভিন্ন কক্ষে নির্জনতা অবলম্বন করেন।

প্রাথমিক অবস্থায় সাহাবায়ে কিরাম প্রকৃত সমস্যা অনুধাবন করতে সক্ষম হননি। তাঁরা ধারণা করেছিলেন যে, নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন এবং এ কারণে তাঁদের অন্তরে দারুণ দুঃখ-বেদনার সৃষ্টি হয়েছিলো। ওমর বিন খাত্তাব (রা) উক্ত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন যে, 'আমার একজন আনসারী বন্ধু ছিলো। আমি যখন খেদমতে নববীতে উপস্থিত না থাকতাম, তখন তিনি আমার নিকট সংবাদাদি পৌঁছে দিতো। আর সে যখন অনুপস্থিত থাকতো আমি তার নিকট তা পৌঁছে দিতাম। এঁরা উভয়েই মদিনার উপকন্ঠে বাস করতেন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের প্রতিবেশী ছিলেন এবং পালাক্রমে খিদমতে নববীতে উপস্থিত থাকতেন। ঐ সময়ে আমরা গাসসানী সম্রাটকে ভয় করতাম। কারণ আমাদের বলা হয়েছিলো যে, তারা আমাদের আক্রমণ করবে এবং এই ভয়ে আমরা সব সময় ভীত থাকতাম।

একদনি আমার এই আনসারী বন্ধু আকস্মিক দরজায় করাঘাত করতে করতে বলতে থাকলেন, 'খুলুন, খুলুন, আমি বললাম, গাসাসানীরা কি এসে গেল?' তিনি বললেন, 'না। বরং এর চাইতেও কঠিন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছেন।

ভিন্ন এক সূত্র থেকে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে; ওমর (রা) বললেন, আমাদের মাঝে ব্যাপকভাবে এ কথা প্রচার হয়েছিলো যে, গাসসান গোত্রের লোকজনেরা আমাদের আক্রমণ করার জন্য ঘোড়ার পায়ে নাল লাগাচ্ছে। এমতাবস্থায় একদিন আমার বন্ধু খিদমতে নববীতে হাজির হন। অতঃপর এশার নামাযের পর তিনি বাড়ি ফিরে এসে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে করতে বলতে থাকেন। এঁরা কি শুয়ে পড়েছেন? আতঙ্কিত অবস্থায় আমি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন তিনি বললেন, একটি বড়ো ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, 'গাসসানীরা কি এসে গেছে?' তিনি বললেন, 'না এবং এর চাইতেও কঠিন সমস্যা হচ্ছে এই যে, রাসূল তাঁর বিবিদের তালাক দিয়েছেন।

ওমর বিন খাত্তাব (রা) বর্ণিত ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান ও অনুধাবন করা যায় যে, রোমকদের যুদ্ধ প্রস্তুতি মুসলমানদেরকে কতটা চিন্তিত এবং বিচলিত করে তুলেছিলো। মদিনার মুনাফিকদের চক্রান্ত আরও প্রকট করে তুলেছিলো। অথচ মুনাফিকেরা একথাটি ভালো ভাবেই অবগত ছিলো যে, উদ্ভুত সমস্যার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিজয়ী হয়েছেন এবং পৃথিবীর কোনো শক্তিকেই তিনি কখনো ভয় করেন নি। অধিকন্তু, এ কথাটিও তারা ভালো ভাবেই অবগত ছিলো যে, যারা রাসূল (ﷺ) এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে তারা সকলেই পর্যদুস্ত এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। তবুও অন্তরে অন্তরে তারা একটি ক্ষীণ আশা পোষণ করে আসছিলো যে, যুগের আবর্তনের গতিধারায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের লালিত প্রতিহিংসার অগ্নি একদিন না একদিন প্রজ্জলিত হবেই এবং খুব সম্ভব এটাই হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত সময়। তাদের সেই কল্পিত সুযোগের প্রেক্ষপটে তারা একটি মসজিদের আকার আকৃতিতে ষড়যন্ত্রের আড্ডাখানা তৈরি করল। এর উদ্দেশ্যে ছিলো মুসলমানদের মধ্যে দলাদলির সৃষ্টি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কুফরি করা এবং মুসলমানদের সঙ্গে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে গোপনে তথ্য সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে তা ব্যবহার করা। তাদের এই অসদুদ্দেশ্যের পর্দাবৃত্ত রাখার কৌশলস্বরূপ সেখানে নামায আদায়ের জন্য তারা নবী করীম (ﷺ) কে অনুরোধ জানায়।

রাসূল কে সেখানে নামায পড়ানোর অনুরোধ জানানোর পেছনে তাদের উদ্দেশ্যে ছিলো মুসলমানরা কোনোক্রমেই যেন চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ না পায় যে, সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তাছাড়া উক্ত মসজিদে যাতায়াতকারীদের ব্যাপারে যেন কোনো সন্দেহের সৃষ্টি না হয়, এটাও ছিলো অন্যতম উদ্দেশ্যে। এমনিভাবে উক্ত মসজিদটি মুনাফিক ও তাদের দোসরদের নিরাপদ আড্ডা ও গোপন কার্য কলাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

কিন্তু রাসূল উক্ত মসজিদে নামায আদায় করার ব্যাপারটি যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত বিলম্বিত করেন। কারণ, যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য তাঁকে অতিমাত্রায় ব্যস্ততায় থাকতে হচ্ছিল। এর ফলে তাদের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে মুনাফিকরা কৃতকার্য হতে সক্ষম হলো না। অধিকন্তু, যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই আল্লাহ তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের যবনিকা উন্মোচন করে দিলেন। কাজেই, যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল উক্ত মসজিদে নামায আদায় না করে তা বিধ্বস্ত করে দেন।

রোমান ও গাসসানীদের যুদ্ধ প্রস্তুতির বিশেষ খবর

মুসলমানরা যখন ক্রমেই উপরোল্লিখিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছিলেন, এমন সময় শাম রাজ্য হতে আগমনকারী তৈল বাহনকারী দলের মাধ্যমে আকস্মিকভাবে জানা গেল যে হিরাকল ৪০ হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে এক যুদ্ধবাজ বাহিনী গঠন করেছেন এবং রোমের একজন প্রখ্যাত কমান্ডারের অধিনায়কত্বে এই বাহিনীকে ন্যস্ত করেছে। তাছাড়া, নিজ পতাকার আওতায় খ্রিস্টান গোত্রসমূহের মধ্যে লাখম, জোয়াম ও অন্যান্য গোত্রগুলোও একত্রিত করেছে এবং তাদের বাহিনীর অগ্রবর্তী দলটি বালকা নামক স্থানে পৌঁছেছে। এমনিভাবে এক ভয়াবহ বিপদ মুসলমানদের সামনে আত্মপ্রকাশ করেছে।

পরিস্থিতির নাজুকতা

এমনিতর এক নাজুক পরিস্থিতির মুখে আরও বিভিন্নমুখী সমস্যার ফলে অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং সঙ্গিন হয়ে উঠল। সময়টা ছিলো অত্যন্ত গরম। মানুষ ছিলো অসচ্ছলতা এবং দুর্ভিক্ষের কবলে। যান-বাহনের সংখ্যাও ছিলো খুবই সীমিত। বাগ-বাগিচার ফলমূলে পরিপক্কতা এসে গিয়েছিলো। ফলমূল সংগ্রহ এবং ছায়ার জন্য বাগ-বাগিচায় অবস্থান করাটা মানুষের অধিকতর পছন্দনীয় ছিলো। এসব কারণে যুদ্ধ যাত্রার জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো না। তদুপরি পথের দূরত্ব এবং সফরের ক্লেশকিষ্টতা তাদের মনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করছিলো।

রাসূল (ﷺ) এর পক্ষ হতে যুদ্ধযাত্রার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশ

রাসূল গভীর মনোনিবেশ সহকারে সমস্যা সংকুল পরিস্থিতি এবং বিভিন্নমুখী প্রতিকূলতা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। তিনি এটা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করছিলেন যে, এই চরম সংকটময় মুহূর্তে যদি রোমানদের সঙ্গে মোকাবিলা করার ব্যাপারে শৈথিল্য কিংবা গড়িমসি করা হয়, তাদের যদি বিনা বাধায় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। কিংবা আরও অগ্রসর হয়ে তারা যদি মদিনার দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হয় তাহলে ইসলামি দাওয়াত ও মুসলমানদের জন্য তা হবে অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং অবমাননাকর। এতে মুসলমানদের সামরিক মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং যে অজ্ঞতার কারণে হোনাইন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী প্রচন্ডভাবে আঘাত পেয়েছিলো তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। অধিকন্তু, যুগের আবর্তন-বিবর্তনের ধারায় মুনাফিকরা যে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে এবং ফাসেক আবু আমেরের মাধ্যমে রোম সম্রাটের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনের যে চেষ্টা চলছে তা হবে পিছন দিক থেকে মুসলমানদের পেটে খঞ্জর ঢুকিয়ে দেয়ার শামিল। আর সামনের দিক থেকে রোমীদের সৈনিক প্লাবন রক্তক্ষয়ী আঘাত হানবে তাদের ওপর। এমনিভাবে অর্থহীন হয়ে যাবে সেই সকল অসাধারণ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম, যা রাসূল ও তাঁর সাহাবারা ব্যয় করেছিলেন আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার কার্যে, অকৃতকার্যতায় পর্যবসিত হয়ে যাবে সেই সব দুর্লভ সাফল্য যা অর্জন করা হয়েছিলো অসামান্য ত্যাগ তিতিক্ষা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে।

ইসলাম ও মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা-পর্যালোচনার পর বিভিন্নমুখী সমস্যা সত্ত্বেও নবী করীম (ﷺ) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে রোমানদের প্রবেশের সুযোগ না দিয়ে তাদের আঞ্চলিক সীমানার মধ্যেই তাদের সঙ্গে এক চূড়ান্ত ফয়সালাকারী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধ প্রস্তুতির ঘোষণা

রোমকদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল উত্তম যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সাহাবায়ে কিরামকে নির্দেশ প্রদান করেন। তাছাড়া, মক্কার বিভিন্ন গোত্র এবং অধিবাসীদের নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য। এসব ব্যাপারে রাসূলের একটা নীতি ছিলো যে, তিনি যখনই কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন তখনই অন্য কোনো দিকের জন্য তাওরিয়া করতেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং প্রকট অভাব-অনটনের কারণে এবার তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে দিলেন যে, রোমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এর পেছনে উদ্দেশ্যে ছিলো যে, যোদ্ধাগণ যেন উত্তম প্রস্তুতি সহকারে যুদ্ধ যাত্রা করেন। যুদ্ধের জন্য তিনি সাহাবায়ে কেরামকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করতে থাকেন। এই সময়েই যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারেই সূরা তাওবার একটি অংশ অবতীর্ণ হয়। সঙ্গে সঙ্গে সদকা খয়রাত করার ফযীলত বর্ণনা করা হয় এবং আল্লাহর পথে নিজ নিজ উত্তম সম্পদ ব্যয় করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।

যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য মুসলমানদের দৌড় ঝাঁপ

রাসূলের জন্য এটি খুব কঠিন একটি সিদ্ধান্ত ছিল কারণ তাবুক শুধুমাত্র একটি খুব দীর্ঘ পথ নয়, এটি ফসল কাটার সময় এবং একটি বিশেষভাবে গরম বছরও ছিল। এর সাথে যোগ করা হয়েছিল যে শত্রুর একটি বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। এখন এই সময়ে মদীনায় এমন কিছু লোক বাস করত যারা প্রকৃত ঈমানদার ছিল না। তাদের 'ভন্ড' বলা হত কারণ তারা বিশ্বাস করার ভান করেছিল কিন্তু তাদের অন্তরে যা ছিল তা লুকিয়ে রেখেছিল। যখন মহানবী (ﷺ) সবাইকে যুদ্ধের জন্য ডাকলেন, তখন এই মুনাফিকরা মুসলমানদের মধ্যে ভীতি ও সংশয় সৃষ্টির চেষ্টা করে বলেছিল, 'আমরা কীভাবে রোমানদের পরাজিত করার আশা করতে পারি যাদের বিশাল সাম্রাজ্য বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তৃত? আর পারলেও আমরা সুযোগ পাব না কারণ লম্বা যাত্রা আর গরম আমাদেরকে প্রথমে হার মানাবে। যাই হোক না কেন, আমাদের ফসল এবং ফল কাটার কাটার সময় হয়েছে; আমরা কিভাবে তা ছেড়ে যেতে পারি? তা করলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব!'

মুনাফিকরা যা বলেছে তার সবই মুসলমানদের কঠোরভাবে পরীক্ষা করেছে। এমন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে কে তার ধর্মের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে? সৈন্যবাহিনীকে সজ্জিত করার জন্য তার সম্পদ দেওয়ার সাহস কার আছে? ঈমানের এই পরীক্ষা প্রকৃতপক্ষে দেখাবে প্রকৃত মুসলমান কারা। এ প্রশ্নে আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন:

"হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কী হল, যখন তোমাদের বলা হয়, আল্লাহর রাস্তায় [যুদ্ধে] বের হও, তখন তোমরা যমীনের প্রতি প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়? তবে কি তোমরা আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হলে? অথচ দুনিয়ার জীবনের ভোগ-সামগ্রী আখিরাতের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।" (আত-তাওবাহ -৩৮)

সাহাবায়ে কেরাম (রা) যখন জানলেন যে, রাসূল রোমীয়দের বিরুদ্ধে উত্তম যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তখনই তাঁরা পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন গোত্র এবং মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনেরা মদিনায় সমবেত হতে আরম্ভ করে দিলো। যাদের অন্তরে কপটতা ছিলো তারা ব্যতীত কোনো মুসলমানই এই যুদ্ধের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকার কথাটা মনে ঠাঁই দেন নি। তবে তিন জন মুসলমান এই নির্দেশের বাইরে ছিলেন। নিষ্ঠাবান ঈমানদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।

পক্ষান্তরে গরিব ও অসহায় ব্যক্তিরা রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে আবেদন করতেন যে, তাঁদের জন্য সওয়ারীর ব্যবস্থা করা হলে তাঁরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। রাসূল তখন তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন যে-

আমি তোমাদের জন্য আরোহণের যানবাহন পাচ্ছি না। এমতাবস্তায় তারা যখন ফিরে যান, তখন তাঁদের চক্ষু হতে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে তার কারণ হলো (আল্লার রাস্তায়) ব্যয় করার মতো কোনো কিছুই তাঁদের নেই। (সূরা তাওবা: আয়াত -৯২)

যুদ্ধ-প্রস্তুতিতে মুসলমানদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পরস্পর পরস্পরের তুলনায় আল্লাহর রাস্তায় কে কত বেশি সদকা এবং দান খয়রাত করতে পারে। সেই সময় ওসমান বিন আফফান শাম রাজ্যের উদ্দেশ্যে এমন একটি বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত করছিলেন যার মধ্যে ছিলো পালান ও গদিসহ দু'শ উট এবং দু'শ উকিয়া রৌপ্য (যার ওজন ছিলো প্রায় ঊনত্রিশ কেজি)। এর সব কিছুই তিনি সদকা করে দেন যুদ্ধের জন্য। এরপর তিনি হাওদাসহ আরও একশত উট দান করেন। এরপরও পুনরায় তিনি এক হাজার (আনুমানিক সাড়ে পাঁচ কেজি ওজনের) স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে এসে নবী করীম (ﷺ) এর কোলের ওপর ঢেলে দেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বর্ণমুদ্রাগুলো উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে বললেন, 'আজকের পর ওসমান যা কিছু করবে তার কোনো ক্ষতি হবে না। এরপরও ওসমান আবার দান করেন এবং আরও সদকা করেন। এমনকি তাঁর দানকৃত জিনিসের পরিমাণ নগদ অর্থ বাদে নয়শত উট এবং একশত ঘোড়া পর্যন্ত পৌঁছেছিলো।

অন্যদিকে আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) দুইশত উকিয়া রৌপ্য (যার ওজন ছিলো প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ কেজি) নিয়ে এলেন এবং আবু বকর তাঁর সমস্ত সম্পদ নবী করীম (ﷺ) এর খিদমতে এনে সমর্পণ করলেন। আল্লাহ এবং আল্লাহ রাসূল ছাড়া তাঁর পরিবারবর্গের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। তাঁর দানের পরিমাণ ছিলো চার হাজার দিরহাম এবং নবী করীম (ﷺ) এর সমীপে দান সামগ্রী আনার জন্য তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি। উমার বিন খাত্তাব (রা) দান করেন তাঁর অর্ধেক সম্পদ। আব্বাস (রা) অনেক সম্পদ নিয়ে আসেন। তালহা (রা) সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) ও মুহাম্মদ বিন মাসলামা যথেষ্ট অর্থ নিয়ে আসেন। আসেম বিন আদি নব্বই অসাক। (অর্থাৎ সাড়ে তেরো হাজার কেজি) খেজুর নিয়ে হাজির হন। অন্য সাহাবারাও কম বেশি বিভিন্ন দ্রব্য নিয়ে আসেন। এমনকি কেউ কেউ এক মুঠ দু'মুঠ যার নিকট যা ছিলো তাই দান করেন। কারণ, এর বেশি দান করার ক্ষমতা তাঁদের ছিলো না। মহিলারা গলার মালা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কেউই কৃপণতা করেননি এবং এমন কোনো হাত ছিলো না যে কিছুই দান করে নি। শুধু মুনাফিকগণ দান খয়রাতে অংশগ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, যে সকল মুসলমান দান খয়রাতে অগ্রণী ভূমকা পালন করেছেন, কথার তাঁদের খোঁচা দিতে তারা ছাড়েনি। যাঁদের শ্রম ছাড়া অন্য কিছুই দেবার মতো ছিলো না তাঁদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বলত, 'একটা দুটা খেজুর দিয়েই এরা রোম সাম্রাজ্য জয়ের স্বপ্ন দেখছে।'

মু'মিনদের মধ্যে যারা মুক্ত হস্তে দান করে, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে আর সীমাহীন কষ্টে দানকারীদেরকে যারা বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তাদেরকে বিদ্রূপ করেন আর তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।' (আত-তাওবাহ: ৭৯)।

তাবুকের পথে ইসলামি সৈন্য

উল্লিখিত তৎপরতা, উৎসাহ উদ্দীপনা দৌড় ঝাঁপের মধ্য দিয়ে মুসলিম বাহিনীর প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। অতঃপর রাসূল মুহাম্মদ বিন মাসলামাকে (মতান্তরে সেবা বিন আরাফাতকে) মদিনার গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং নিজ পরিবারের লোকজনদের দেখাশোনা করার জন্য আলী ইবনে আবু তালিবকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু মুনাফিকরা তাঁর প্রতি কটাক্ষ করে কিছু কথাবার্তা বলায় তিনি মদিনা হতে বের হয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকট চলে যান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) পুনরায় তাঁকে মদিনায় ফিরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন এবং বললেন, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার সঙ্গে তোমার সেই রূপই সম্পর্ক রয়েছে যেমনটি ছিলো হারুন (আ) এর সঙ্গে মূসা (আ) এর। তবে এটা জেনে রাখ যে আমার পরে কোনো নবী আসবে না।

যাহোক, উক্ত ব্যবস্থাদির পর রাসূল উত্তর দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। (নাসায়ীর বর্ণনা মতে দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার) গন্তব্যস্থল ছিলো তাবুক এবং সৈন্য সংখ্যা ছিলো ত্রিশ হাজার। এর পূর্বে মুসলমানরা আর কখনই এত বড়ো সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হননি। বিশাল এক বাহিনী এবং সাধ্যমত অর্থসম্পদ ব্যয় করা সত্ত্বেও সৈন্যদের পুরোপুরি প্রস্তুত করে নেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। খাদ্যসম্ভার এবং যান বাহনের যথেষ্ট অভাব ছিলো। আঠারো জনের প্রতি দলের জন্য ছিলো মাত্র একটি করে উট, যার ওপর তাঁরা আরোহণ করতেন পালাক্রমে। অনুরূপভাবে খাওয়ার জন্য প্রায়ই গাছের পাতা ব্যবহার করতে হতো, যার ফলে ওষ্ঠাধরে স্ফীতি সৃষ্টি হয়েছিলো। অধিকন্তু, উটের অভাব থাকা সত্ত্বেও উট যবেহ করতে হতো, যাতে পাকস্থলী এবং নাড়িভূড়ির মধ্যে সঞ্চিত পানি পিপাসার সময় পান করা যেতে পারে। এই কারণে এই বাহিনীর নাম রাখা হয়েছিলো 'জায়মে উসরাত' (অভাব-অনটনের বাহিনী)।

তাবুকের পথে মুসলিম বাহিনীর গমনাগমন চলল হিজর অর্থাৎ সামুদ সম্প্রদায়ের অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। সামুদ ছিলো সেই সম্প্রদায় যারা ওয়াদিউল কোরা নামক উপত্যকায় পাথর কেটে কেটে ঘরবাড়ি তৈরি করেছিলো। সাহাবায়ে কিরাম (রা) তথা কূপসমুহ হতে পানি সংগ্রহ করার পর যখন যাত্রা করলেন, তখন রাসূল বললেন, 'তোমরা এখানকার পানি পান করো না, এই পানি দ্বারা অযু করো না এবং এই পানির দ্বারা আটার যে তাল তৈরি করেছ তা পশুদের খাইয়ে দাও, নিজে খেয়ো না।'

তিনি এই নির্দেশও প্রদান করেন যে, সালেহ (আ) এর উষ্ট্রী যে কূপ থেকে পানি পান করেছিলো, তোমরা সেই কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করবে।'

সহিহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে ইবনে ওমর (রা) হতে বর্ণিত। নবী করীম (ﷺ) যখন হিজর (সামুদ সম্প্রদায়ের অঞ্চল) দিয়ে গমন করছিলেন তখন বলেন, 'সেই অত্যাচারী সামুদদের আবাসভূমিতে প্রবেশ করো না। যাতে তোমাদের উপর যেন সে মুসিবত নাযিল না হয়ে যায়, যা আল্লাহর পক্ষ হতে তাদের প্রতি নাযিল হয়েছিলো তবে যদি তাই হয় তোমাদের কাঁদতে কাঁদতে এ উপত্যকা অতিক্রম করতে হবে। অতঃপর তিনি তাঁর মস্তক আবৃত করে নিয়ে দ্রুতগতিতে সেই উপত্যকা অতিক্রম করে গেলেন।

পথিমধ্যে সৈন্যদের পানির তীব্র প্রয়োজন দেখা দিল। এমনকি লোকজনেরা পিপাসার কষ্ট সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট অভিযোগ পেশ করল। তিনি পানির জন্য দু'আ করলে আল্লাহ মেঘ সৃষ্টি করলেন এবং বৃষ্টি হয়ে গেল। লোকেরা পূর্ণ পরিতৃপ্তি সহকারে পানি পান করলেন এবং প্রয়োজনমত তা সংগ্রহ করে নিলেন।

সেই রাতে তারা দিনেরগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল, পানির দ্বারা সতেজ হয়ে এবং আত্মবিশ্বাসী ছিল যে বিলাল তাদের ভোরের প্রার্থনার জন্য যথারীতি জাগিয়ে তুলবে। কিন্তু বিলাল এত গভীরভাবে ঘুমিয়েছিলেন যে তিনি জাগেননি। এই প্রথম মুসলমানরা একটি নামাজ ত্যাগ করেছিল এবং তারা খুব বিরক্ত হয়েছিল। তবে নবী (ﷺ) বিলালের প্রতি রাগান্বিত হননি এবং মুসলমানদের বলেছিলেন যে তাদের মন খারাপ করার দরকার নেই কারণ তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করেনি।

অতঃপর যখন তাবুকের নিকট গিয়ে পৌঁছলেন তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'ইন-শা-আল্লাহ আগামীকাল আমরা তাবুকের ঝর্ণার নিকট গিয়ে পৌঁছব। কিন্তু আমার পৌঁছানোর পূর্বে কেউ যদি সেখানে গিয়ে পৌঁছে যায়, তাহলে আমি যতক্ষণ সেখানে গিয়ে না পৌঁছি, ততক্ষণ যেন তাঁরা সেখানকার পানিতে হাত না লাগায়। মুয়াজ (রা) বলেছেন, 'আমরা যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম, দেখলাম তার পূর্বেই দুইজন সেখানে গিয়ে পৌঁছে গেছে। ঝর্ণা দিয়ে অল্প অল্প পানি আসছিলো। রাসূল জিজ্ঞেস করলেন 'তোমরা কি এর পানিতে কেউ হাত লাগিয়েছো? তাঁরা উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। নবী করীম (ﷺ) সেই দুই ব্যক্তিকে আল্লাহ যা ইচ্ছা করলেন, তাই বললেন।

অতঃপর অঞ্জলির সাহায্যে ঝর্ণা থেকে অল্প অল্প পানি বের করলেন এবং এভাবে কিছুটা পানি সংগৃহীত হলো। এই পানির দ্বারা তিনি মুখমন্ডল ও হাত ধৌত করলেন এবং ঝর্ণার মধ্য হতে তা নিষ্কাষণ করে দিলেন। এরপর ঝর্ণায় ভালো পানির প্রবাহ সৃষ্টি হলো। সাহাবায়ে কিরাম (রা) পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে পানি পান করলেন। তখন রাসূল বললেন, 'হে মু'আয! যদি তোমার জীবন দীর্ঘ হয়, তাহলে এই স্থান তুমি বাগানে পরিপূর্ণ ও শ্যামল দেখবে।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, 'আজ রাতে তোমাদের ওপর দিয়ে প্রবল ঘূর্ণি-ধূলি ঝড় বয়ে যেতে পারে। কাজেই কেউ উঠবে না। অধিকন্তু যার নিকট উট আছে, সে তাকে মজবুত রশি দ্বারা শক্তভাবে বেঁধে রাখবে। হলোও ঠিক তাই, চলতে থাকল প্রবল থেকে প্রবলতর ধূলোবালি যুক্ত ঘূর্ণি বায়ু। এই সময় এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলো। ঘূর্ণি ঝড় তাকে উড়িয়ে নিয়ে তাই গোত্রের দুই পর্বতের নিকট নিক্ষেপ করল।

পথ চলার সময় নবী করীম (ﷺ) যোহর ও আসর এবং মাগরিবের ও এশার নামায একত্রে আদায় করতেন। তাছাড়া, তিনি জমা তাকদীমও করতেন এবং জমা তাখীরও করতেন (জমা তাকদীমের অর্থ হচ্ছে যোহর ও আসর এই দুই নামাযকে যোহরের সময় এবং মাগরিব ও এশা এই দুই নামাযকে মাগরিবের সময় আদায় করা এবং জমা তাখিরের অর্থ হচ্ছে যোহর ও আসর এই দুই নামাযকে আসরের সময়ে এবং মাগরিব ও এশা এবং দুই নামাযকে এশার সময়ে আদায় করা।)

ইসলামি সৈন্য তাবুকে

ইসলামের সৈন্যগণ তাবুকে অবতরণ করে শিবির স্থাপন করলেন। রোমকদের সঙ্গে দুই দুই হাত করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। অতঃপর রাসূল সৈন্যদের উদ্দেশ্যে করে এক ভাষণ প্রদান করেন। উক্ত ভাষণে তিনি তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশাবলি প্রদান করেন, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করেন, আল্লাহর শাস্তির ভয় প্রদর্শন এবং তাঁর রহমতের শুভ সংবাদ প্রদান করেন। নবী করীম (ﷺ) এর ভাষণ সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে যথেষ্ট সাহায্য করে। তাঁদের খাদ্য সম্ভার ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ঘাটতিজনিত যে অসুবিধা ছিলো এইভাবে মনস্তাত্বিক স্বস্তিবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে বহুলাংশে তা পূরণ করা সম্ভব হলো।

এতক্ষণে রোমানরা শুনেছিল যে, মুসলমানরা তাদের সাথে দেখা করতে বের হচ্ছে। এটা শুনে তারা বিজয়ের ব্যাপারে আরও নিশ্চিত বোধ করেছিল কারণ তারা বিশ্বাস করেছিল যে গ্রীষ্মের প্রখর রোদে পানিহীন মরুভূমি অতিক্রম করা সেনাবাহিনীর পক্ষে অসম্ভব। কোনো অলৌকিকভাবে মুসলমানরা সফল হলেও, তারা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়বে যে তাদের পরাজিত করা সহজ হবে। কিন্তু রাসূল ও মুসলিম বাহিনীর অলৌকিকভাবে মরুভূমি অতিক্রম করার কথা শুনে রোমান বাহিনী এবং তাদের মিত্র গোত্রমূহের মধ্যে এমন ভয় ভীতির সঞ্চার হলো যে, সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁদের মোকাবিলা করার সাহস তারা হারিয়ে ফেলল এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে দেশের অভ্যন্তরভাগেই বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ল। রোমীদের এই ভয়-ভীতিজনিত নিষ্ক্রিয়তা আরব উপদ্বীপের ভিতরে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করল যে, মুসলিম বাহিনীর জন্য তা এমন সব রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা লাভের ক্ষেত্র তৈরি করে দিল, যা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা মোটেই সহজ-সাধ্য ছিলো না। এ সবের বিস্তারিত বিবরণ হচ্ছে যথাক্রমে নিম্নরূপ:

আয়লার প্রশাসক ইয়াহনাহ বিন রুবা রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে কর দানের স্বীকৃতি জ্ঞাপন পূর্বক সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করল। জারবা এবং আজরুহর অধিবাশিরা খিদমতে নববীতে হাজির হয়ে কর দানের প্রতিশ্রুতিতে মাবদ্ধ হলো। রাসূল (ﷺ) তাদের লিখিত প্রমাণপত্র প্রদান করেন। যা তাদের একট সংরক্ষিত ছিলো। তিনি আয়লার প্রশাসকের নিকটও লিখিত একটি প্রমাণ পত্র প্রেরণ করেন, যার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপ:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম এ হচ্ছে শান্তির আদেশপত্র আল্লাহর এবং নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর পক্ষ হতে। ইয়াহনাহ বিন রুবা এবং আয়লার অধিবাসীদের জন্য। স্থল এবং সমুদ্র পথে তাদের নৌকা এবং ব্যবসায়ী দলের জিম্মা আল্লাহর এবং নবী মুহাম্মদ (ﷺ) এর ওপর রইল। তাছাড়া, এই দায়িত্ব সিরিয়া এবং ঐ সকল সমুদ্রের তীরবর্তী অধিবাসীদের জন্য রইল যারা ইয়াহনাহর সঙ্গে থাকে। হ্যাঁ, যদি তাদের কোনো ব্যক্তি কোনো প্রকার বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, তবে তার অর্থ তার জীবন রক্ষা করবে না এবং যে ব্যক্তি তার অর্থ নিয়ে নিবে তার জন্য তা বৈধ হবে। তাদেরকে কোনো ঝর্ণার নিকট অবতরণ করতে এবং স্থল কিংবা জলভাগের কোনো পথ অতিক্রম করতে বাধা দেয়া যাবে না।

এ ছাড়া রাসূল এ চারশত বিশ জন সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত এবং বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে খালিদ বিন ওলীদকে (রা) দুমাতুল জান্দালের শাসক উকায়দেরের নিকট প্রেরণ করেন। যাত্রাকালে তিনি তাঁকে বলেন, 'তোমরা তাকে নীল গাভী শিকার করার সময় দেখতে পাবে।

রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশ মোতাবিক খালিদ (রা) সেখানে গেলেন। মুসলিম বাহিনী যখন এতটুকু দূরত্বে অবস্থান করছিলেন যে দুর্গটি পরিষ্কার চোখে পড়ছিলো, তখন হঠাৎ একটি নীল গাভী বেরিয়ে এসে দুর্গের দরজার ওপর শিং দ্বারা গুঁতো দিতে থাকল। উকায়দ তাকে শিকার করার জন্য বের হলো। রাতের আকাশে তখন চাঁদের আলো শোভা পাচ্ছিল। এই সুযোগে খালিদ (রা) এবং তার অশ্বারোহী দল তাকে বন্দী করে ফেললেন এবং রাসূল এর খিদমতে প্রেরণ করলেন। রাসূল তাকে ক্ষমা করলেন এবং দুই হাজার উট, আট শত দাস, যুদ্ধের চারশত লৌহ বর্ম এবং চারশত বর্শা দেয়ার শর্ত সাপেক্ষে একটি সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন। এই সন্ধি চুক্তি কর প্রদানের শর্তও সংযোজিত হলো। সুতরাং তিনি তার সাথে ইয়াহনাহসহ দুমাহ, তাবুক, আয়লাহ্ এবং তাইমার শর্তানুযায়ী চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন।

যে সকল গোত্র তখনো রোমকগণের পক্ষে কাজ করছিলো পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যখন তারা অনুধাবন করল যে, পুরাতন ব্যবস্থাধীনে থাকার দিন শেষ হয়েছে, তখন তারা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মুসলমানদের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। এভাবে ইসলামি সাম্রাজ্যের সীমা বিস্তৃতি লাভ করে রোমক সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। ফলে যে সকল গোত্র রোমকদের শক্তি জোগাত, তারা একদম নিঃশেষ হয়ে গেল।

মদিনায় প্রত্যাবর্তন

সংঘর্ষ এবং রক্তক্ষয় লড়াই ছাড়াই মুসলিম বাহিনী বিজয়ী বেশে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করল। যুদ্ধের ব্যাপারে মুমিনদের আল্লাহই যথেষ্ট সাহায্য কারী হলেন। তবে পথিমধ্যে এক জায়গায় একটি গিরিপথের নিকট ১২জন মুনাফেক নবীকে হত্যার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা চলায়। সেই সময় রাসূল সেই গিরিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুধু আম্মার (রা) যিনি উষ্ট্রীর লাগাম ধরে ছিলেন এবং হোযায়ফা বিন ইয়ামান যিনি উষ্ট্রীকে তাড়িয়ে নিয়ে চলছিলেন। উক্ত কারণে মুনফিকরা তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তের জন্য এটিকে একটি মোক্ষম সুযোগ মনে করে রাসূল (ﷺ) এর দিকে অগ্রসর হতে থাকল।

এদিকে সঙ্গীদ্বয়সহ রাসূল যথারীতি সম্মুখ পানে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এমন সময় পেছন দিক থেকে অগ্রসরমান মুনাফিকদের পায়ের শব্দ তিনি শুনতে পান। এরা সকলে মুখোশ পরিহিতো ছিলো। তাদের আক্রমণের কালে রাসূল হোযায়ফাকে তাদের দিকে প্রেরণ করলেন। তিনি তাঁর ঢালের সাহায্যে মুনফিকদের বাহনগুলোর মুখের ওপর প্রবলভাবে আঘাত করতে থাকলেন। এর ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পলায়ন করতে গিয়ে লোকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে গেল, এরপর রাসূল তাদের নাম বলে দেন এবং তাদের অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন। এজন্য হোযায়ফাকে রাসূল 'রাযদান' রহস্যবিদ বলেছেন। উক্ত ঘটনা উপলক্ষে আল্লাহর এই ইরশাদ অবতীর্ণ হয়- "তারা ঐ কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলো, যা তারা পায় নি।" (সুরা-তাওবাহ: ৭৪)

সফর শেষে রাসূল যখন দূর হতে মদিনায় দৃশ্য দেখতে পেলেন, তখন তিনি বললেন, এই যে (তারা) এবং এই যে (উহুদ)-এ হচ্ছে সেই পর্বত, যা আমাদেরকে ভালোবাসে এবং আমরাও যাকে ভালোবাসি। এদিকে যখন মদিনায় রাসূলুল্লাহ এর আগমন সংবাদ পৌঁছে গেল, তখন মহিলা ও কিশোররা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবাদের (রা) স্বাগত জানিয়ে এই সঙ্গীতের গুঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ করল।

সানিয়াতুল ওয়াদা' নামক স্থান থেকে রমজান মাসের চৌদ্দ তারিখের চাঁদ আমাদের উপর উদিত হয়েছে। আহ্বানকারীরা যতক্ষণ আল্লাহকে আহ্বান করতে থাকবে ততক্ষণ আমাদের কর্তব্য হবে শোকর করা।

রাসূল (ﷺ) রজব মাসে তাবুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন এবং প্রত্যাবর্তন করছিলেন রমযান মাসে। উক্ত সফরে পূর্ণ পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত হয়েছিলো। বিশদিন তাবুকে এবং ত্রিশদিন পথে। তাবুকে অভিযান ছিলো তাঁর জীবনের শেষ যুদ্ধাভিযান, যাতে স্বশরীরে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

যারা যুদ্ধে পশ্চাতে ছিলেন

তাবুক যুদ্ধ ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক কঠিন পরীক্ষা, ঈমানদার ও অন্যদের মধ্যে প্রভেদের একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধি-বিধানও এইরূপ-

আল্লাহ এমন নন যে, তিনি মুমিনদেরকে [এমন অবস্থায়] ছেড়ে দেবেন যার উপর তোমরা আছ। যতক্ষণ না তিনি পৃথক করবেন খারাপকে ভালো থেকে। (আলে ইমরান: ১৭৯)

কাজেই, উক্ত যুদ্ধে মুমিন ও সত্যবাদীরা শরীক হন। যুদ্ধ হতে অনুপস্থিতি কপটতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সুতরাং তখন ঠিক এই রকম এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো যে, যদি কেউ পেছনে পড়ে থাকত, তার সম্পর্কে রাসূলের সামনে আলোচনা করা হলে তিনি বলতেন, "তাকে ছেড়ে যাও। যদি তার মধ্যে মঙ্গল নিহিত থাকে তাহলে আল্লাহর শীঘ্রই তাকে তোমাদের নিকটে পৌঁছে দেবেন। আর যদি তা না হয় তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের অনুপস্থিতির মাধ্যমে শান্তি প্রদান করবেন। আর দেখা গেলো, যে অনুপস্থিত ছিলো, তারা অপারগ অথবা মুনাফিক ছিলো। মুনাফিকরা আল্লাহ এবং রাসূল (ﷺ) এর ওপর ঈমানের মিথ্যা দাবি করত। কিন্তু যুদ্ধের ব্যাপারে তারা ছিলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। মিথ্যা অজুহাত দিয়ে তারা যুদ্ধরত সৈন্যদের পেছনে বসে থাকত। তিন ব্যক্তি এমন ছিলো যারা প্রকৃতই মুমিন ছিলো এবং কোনো কারণ ছাড়াই যুদ্ধের শরিক হওয়া থেকে বিরত ছিলো। আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষার মধ্যে নিপতিত করেন এবং পুনরায় তাদের তওবা কবুল করেন।

রাসূল (ﷺ) মদিনায় প্রবেশের পর সর্বপ্রথম মসজিদে নববীতের অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেখানে দুই রাকাত নামায আদায় করেন। অতঃপর লোকজনের জন্য সেখানে বসে পড়েন। এই সময় আশিজনেরও অধিক মুনাফিকের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়ে নানা ওজর আপত্তি পেশ করতে আরম্ভ করে দেয়। তারা শপথ করতে থাকে। রাসূল বাহ্যিকভাবে তাদের অজুহাত গ্রহণপূর্বক আজ্ঞানুবর্তী হওয়ার শপথ গ্রহণ করেন এবং ক্ষমা করেন। অতঃপর অন্তরের প্রশ্নটি আল্লাহর দরবারে সমর্পণ করে দেন।

অবশিষ্ট তিনজন মুমিন অর্থাৎ কা'ব বিন মালেক, মোরারাহ বিন রাবী এবং হেলাল বিন উমাইয়া সত্যবাদিতা অবলম্বনপূর্বক স্বীকার করে যে, কোনো রকম অসুবিধা ছাড়াই তারা যুদ্ধে শরিক হওয়া থেকে বিরত ছিলো। এই কারণে রাসূল আমার এদের সঙ্গে কথাবার্তা না বলার জন্য সাহাবায়ে কিরাম (রা)-দের নির্দেশ দেন।

সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে কঠিন বয়কট ব্যবস্থা কার্যকর হয়ে গেল। মানুষের মধ্যে পরিবর্তন এসে গেল, পৃথিবী ভয়ানক আকার ধারণ করল এবং প্রশস্ততা থাকা সত্ত্বেও পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে গেল। তাদের জীবনের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল। এমনি এই বিপদের মাঝে ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাদেরকে আপন স্ত্রী এবং পরিবার পরিজন থেকে পৃথক থাকার নির্দেশ দেয়া হলো। যখন বয়কট ৫০ দিন পূর্ণ হলো তখন আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করার সুসংবাদ প্রদানপূর্বক আয়াত নাযিল করলেন-

এবং সেই তিন ব্যক্তির তওবাও আল্লাহ গ্রহণ করলেন যাদের ব্যাপারাটি বিলম্বিত করা হয়েছিলো। এমনকি জমীন তার প্রশস্ততা সত্ত্বেও যখন তাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের জীবনও তাদের জন্য দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিলো এবং তাদের জন্য বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিলো যে, আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন না করলে আল্লাহ ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবা এজন্য কবুল করলেন যাতে তারা সঠিক পথে আসে। অবশ্যই আল্লাহ তওবা কবুলকারী এবং অত্যন্ত দয়াবান।' (সূরা তওবা: -১১৮)

মীমাংসা সম্পর্কিত উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হওয়ায় সাধারণ মুসলমানরা এবং ঐ তিনজন সাহাবা অত্যন্ত আনন্দিত হন। লোকেরা দৌড় দিয়ে এই শুভ সংবাদ প্রচার করতে থাকে। আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সকলের মুখমণ্ডলে উজ্জ্বলতা প্রকাশ পায় সকলে দান খয়রাত করতে থাকে। প্রকৃতই এই দিনটি ছিলো তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের দিন।

যারা অপারগতার কারণে যুদ্ধে শরিক হতে পারেননি, অনুরূপভাবে আল্লাহ তাদের জন্যেও বললেন-

দুর্বলের ওপর, অসুস্থদের ওপর এবং যারা ব্যয় করার সামর্থ্য রাখে না তাদের ওপর কোনো দোষ নেই, যদি তারা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের হিতাকাঙ্ক্ষী ও অনুসারী হয়, যারা সৎকর্ম পরায়ণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর তাদের জন্যে ও কোনো অভিযোগ নেই, যারা তোমার নিকট বাহনের জন্য প্রার্থনা করলে তুমি তাদের বলেছিলে, তোমাদের বলেছিলে, তোমাদের জন্য কোনো বাহনের ব্যবস্থা করতে পারছি না, ইহার অর্থব্যয়ে অসমর্থ্য জনিত কষ্টে অশ্রু বিগলিত চোখে ফিরে গেল। (সূরা তওবা: আয়াত-৯১, ৯২)

তাঁদের, সম্পর্কে নবী করীম (ﷺ) ও মদিনায় পৌঁছার পর বলেছেন, "মদিনায় এমন কিছু লোক আছে যে, তোমরা যেখানেই সফর করেছ এবং যে উপত্যকাতেই অতিক্রম করেছ, তারা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছে। তাদের অপরাগতা তাদেরকে বিরত রেখেছিলো। লোকেরা বলল, "হে আল্লাহর রাসূল! তারা মদিনায় অবস্থান করেও আমাদের সঙ্গে ছিলো? বললেন, 'হ্যাঁ' মদিনায় অবস্থান করেও তারা সঙ্গে ছিলো।

যুদ্ধের প্রভাব

আরব উপদ্বীপের ওপর মুসলমানদের প্রভাব বিস্তার এবং তাঁদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে এই যুদ্ধ ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলোৎপাদক ঘটনা। এই যুদ্ধের পর থেকে মানুষের নিকট এটি দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, আরব উপদ্বীপের মধ্যে ইসলামি শক্তিই হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠিত শক্তি। অন্য কোনো শক্তিরই আর তেমন কোনো কার্যকারিতা নেই। এর ফলে মুনাফিকদের সেই সকল অবাঞ্চিত কামনা বাসনা যে যুগের ধারায় মুসলমানরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা একদম নিঃশেষ হয়ে গেল। কারণ তাদের সকল আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো যে রোমক শক্তি তা যখন ইসলামি শক্তির মুকাবিলায় হেরে গেল, তখন তাদের লালিত আকাঙ্ক্ষা পূরণের আর কোনো পথই রইল না। তখন তাদের কাছে এটাও সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইসলামি শক্তির নিকট আত্মসমর্পণ করা ছাড়া নিষ্কৃতি লাভের আর কোনো পথই অবশিষ্ট রইল না।

কাজেই পরিবর্তিত এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তখন এ রকম কোনো প্রয়োজনও ছিলো না যে, মুসলমানরা মুনাফিকদের সঙ্গে নম্র ও ভদ্র ব্যবহার করবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানরা নির্দেশিত হলেন তাদের সঙ্গে শক্ত, সাহসিকতা ও শঙ্কাহীন আচরণ করতে। এমনকি তাদের সদকা গ্রহণ, তাদের জানাযায় অংশগ্রহণ, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাদের কবরের পাশে যাওয়ার ব্যাপারেও মুসলমানদের নিষেধ করে দেয়া হয়। অধিকন্তু, ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধির বশবর্তী হয়ে মসজিদ নামের যে ক্ষুদ্র কুটিরটি তারা তৈরি করেছিলো, তা ধ্বংস করে দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। এ সময় কার্যকলাপ জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তাদের শঠতা ও দুরভিসন্ধির ব্যাপারে সন্দেহের আর কোনো অবকাশই রইল না। মদিনাবাসীর জন্য উল্লিখিত আয়াতসমূহ যেন ছিলো ঐ মুনাফিকদের চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে সংকেত।

উক্ত যুদ্ধের ইতিবাচক প্রভাবসমূহের মধ্যে এ কথাটা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, মক্কা বিজয়ের পরে এমন কি পূর্বে যদিও আরবের প্রতিনিধিরা রাসূল (ﷺ) খিদমতে আসতে আরম্ভ করেছিলো, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের পরই যথোচিতভাবে শুরু হয়েছিলো।

উক্ত যুদ্ধ সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযিল

নিম্নোক্ত যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে সূরা 'তওবায়' অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়। কিছু যাত্রার পূর্বে, কিছু যাত্রার পরে কিছু কিছু ভ্রমণকালে এবং কিছু মদিনা প্রত্যাবর্তনের পর। উল্লিখিত আয়াত সমূহে মুনাফিকদের চক্রান্তের যবনিকা, উন্মোচন, যুদ্ধের অবস্থা ও মুখলেস মুজাহিদ মর্যাদা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। তাছাড়া, সিদ্দীকীন মুমিনদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধে শরীক হয়েছিলেন এবং যাঁরা হন নি তাদের তওবা কবুল ইত্যাদি ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে।

৯ম হিজরি সনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি

তাবুক হতে রাসূল (ﷺ) প্রত্যাবর্তনের পর উওয়ামের আজলানী ও তার স্ত্রীর মধ্যে লিআন হয়। (স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ দেয় আর তার সাক্ষী না থাকে তাহলে যে পদ্ধতির মাধ্যমে বিয়ে বিচ্ছেদ ঘটানো হয় তাকে লিআন বলা হয়।)

গামেদিয়া মহিলা, যে রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাজির হয়ে ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দিয়েছিলো তাকে প্রস্তারাঘাত করে মেরে ফেলা হয়েছিলো। উক্ত মহিলার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন শিশুটি দুগ্ধ পান থেকে বিরত হয়েছিলো তখন তাকে এ শাস্তি দেয়া হয়েছিলো।

সম্রাট আসাহামা নাজ্জাশি ইন্তিকাল করেন এবং রাসূল (ﷺ) তার জানাযা আদায় করেন।

নবী করীম (ﷺ) এর কন্যা উম্মে কুলসুম ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাসূল গভীরভাবে শোকাহত হন। তিনি ওসমানকে বলেন, 'আমার তৃতীয় কন্যা থাকলে তার বিয়ে তোমার সঙ্গে দিতাম।

রাসূল তাবুক হতে প্রত্যাবর্তনের পর মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই মৃত্যুবরণ করে। রাসূল তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ওমরের (রা) বাধা দান সত্ত্বেও তাঁর নামাযে জানাযা আদায় করেন। পরে কুরআনের আয়াত নাযিল হয় নবীকে মুনাফিকদের জানাযা আদায় করতে নিষেধ করা হয়।

নবম হিজরির হজ্জ

আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর নেতৃত্বে উক্ত সালের ৯ম হিজরির যিলকা'দ কিংবা যিল হজ্জ মাসে রাসূল মানাসেকে হজ্জ (হজ্জে বিধি-বিধি-বিধান) কায়েম করার উদ্দেশ্যে আবু বকর সিদ্দীক (রা) কে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে প্রেরণ করার পরই সূরা বারাআতের প্রথমাংশ অবতীর্ণ হয়, যাতে মুশরিকদের সঙ্গে স্পদিত চুক্তিনামা সমতার ভিত্তিতে শেষ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। উক্ত আয়াত নাযিল হওয়ার পর তাঁর পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে ঘোষণা প্রদানের জন্য রাসূল আলী বিন আবু তালিবকে প্রেরণ করেন। যেহেতু রক্ত এবং সম্পদ সংশ্লিষ্ট অঙ্গীকার বা চুক্তিনামার প্রশ্নে এটাই ছিলো আরবের নিয়ম, সেহেতু এমনটি করতে হয় (সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই ঘোষণা করবে কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যের মাধ্যমে তা করানো হবে। পরিবার বহির্ভূত কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে প্রদত্ত ঘোষণা স্বীকৃত হতো না। আবু বকরের সঙ্গে আলীর সাক্ষাৎ হয় আরাজ অথবা জাজনান নামক উপত্যকায়। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, নির্দেশদাতা না নির্দেশ প্রাপ্ত? আলী বললেন না, বরং আমি নির্দেশ প্রাপ্ত)।

অতঃপর দুজনই সমানের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। আবু বকর (রা) লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে হজ্জ পালন করেন। ১০ই যিলহজ্জ কুরবানির দিন আলী বিন আবু তালিব (রা) জামরার (কংকর নিক্ষেপের স্থান) নিকট দাঁড়িয়ে সমবেত জনতার মাঝে রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশিত বিষয়ে ঘোষণা প্রদান করেন। অর্থাৎ অঙ্গীকারকারীদের সকল অঙ্গীকারের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন এবং এই সকল বিষয় চূড়ান্ত করার জন্য চার মাস মেয়াদের সময় দেয়া হয়। তবে যে মুশরিকরা মুসলমানদের সঙ্গে অঙ্গীকার পালনে কোনো প্রকার ত্রুটি করেনি, কিংবা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করেনি। তাদের অঙ্গীকারনামা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়।

আবু বকর (রা) একদল সাহাবার মাধ্যমে ঘোষণা প্রদান করেন যে, আগামীতে কোনো মুশরিক কাবা ঘরের হজ্জ করতে পারবে না এবং কোনো উলঙ্গ ব্যক্তি কাবা ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না।

এই ঘোষণা ছিলো মূর্তিপূজার জন্য শেষ অশনি সংকেত। অর্থাৎ এরপর থেকে মূর্তি পূজার আর কোনো সুযোগই রইল না।

যুদ্ধ পরিক্রমা

রাসূল (ﷺ) এর পরিচালনায় সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধ, যুদ্ধাভিযান ও সৈনিক মহোদ্যম সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত হওয়ার পর যুদ্ধের পটভূমি, পরিবেশ, পরিচালনা, নিকট ও সুদূর-প্রসারী প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল সম্পর্কে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে যিনি বিচার-বিশ্লেষণ করবেন তাঁকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, নবী (ﷺ) ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সমর-বিশারদ এবং সমর নায়ক। শুধু তাই নয়, তাঁর সমরাদর্শও ছিলো সকল যুগের সকল সমর নায়কের অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর যুদ্ধ সম্পর্কিত উপলব্ধি ও অনুধাবন ছিলো সঠিক ও সময়োপযোগী, অন্তর্দৃষ্টি ছিলো অত্যন্ত গভীর এবং সিদ্ধান্ত ছিলো সুতীক্ষ্ণ প্রজ্ঞাপ্রসূত রিসালাত ও নবুয়তের বৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন সকল রাসূলের সর্দার। সৈন্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় এক ব্যক্তিত্ব এবং একক গুণের অধিকারী। যখনই কোনো যুদ্ধের জন্য তিনি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন তখনই দেখা গেছে যে, যুদ্ধের স্থান নির্বাচন, সেনাবাহিনীর বিন্যাস ব্যবস্থা, সমর-কৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার-বিধি, আক্রমণ, পশ্চাদাপসারণ ইত্যাদি সর্ব ব্যাপারেই তিনি সাহসিকতা, সতর্কতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর সময় পরিকল্পনা ও সময় কৌশলের ক্ষেত্রে কোনো দিনই কোথাও কোনো ত্রুটি কিংবা ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়নি এবং এ কারণেই মুসলিম বাহিনীকে কখনই কোনো যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে হয়নি।

অবশ্য উহুদ এবং হোনাইন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে সাময়িকভাবে কিছুটা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু সময়ের পরিকল্পনা কিংবা সমর কৌশলের ত্রুটি কিংবা ঘাটতির কারণে এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়নি। রাসূল নির্দেশিত কৌশল নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করলে এই বিপর্যয়ের কোনো প্রশ্নই আসত না। এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিলো কিছু সংখ্যক সৈন্যের ভুল ধারণা এবং দুর্বল মানসিকতা থেকে। উহুদ যুদ্ধে যে ইউনিটকে গিরিপথ পাহারার দায়িত্বে নিযুক্ত রাখা হয়েছিলো, তাঁদের ভুল বুঝাবুঝির কারণেই সেদিন কিছুটা বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিলো। হোনাইন যুদ্ধের দিন কিছুক্ষণের জন্য বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিলো কিছু সংখ্যক সৈন্যের কিছুটা মানসিক দুর্বলতা এবং শত্রুপক্ষের আকস্মিক আক্রমণে হতচকিত হয়ে পড়ার কারণে।

উল্লিখিত দুই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয়ের মুখে নবী করীম (ﷺ) যে অতুলনীয় সাহসিকতা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন, মানব জাতির যুদ্ধের ইতিহাসে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যুদ্ধের ভয়াবহ বিভীষিকার মুখেও পর্বতের ন্যায় অটল ও অবিচল থাকার কারণেই বিপর্যস্ত প্রায় মুসলিম বাহিনী ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়ের গৌরব।

ইতোপূর্বে যে আলোচনা করা হলো, তা ছিলো যুদ্ধ সম্পর্কিত। কাজেই, যুদ্ধের দৃষ্টিকোণ থেকেই সে সব বিষয় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়াও এমন কতকগুলো সমস্যা ছিলো যেগুলো সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিরলস প্রচেষ্টা দ্বারা সে সকল সমস্যা সমাধানে নবী করীম (ﷺ) তৎকালীন আরবসমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেন, অশান্তি ও অনিষ্টতার অগ্নী নির্বাপিত করেন, মূর্তিপূজার মূলোৎপাটনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন এবং আপোস ও সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে মুশরিকদের বৈরিতার অবসান ঘটান। তাছাড়া সেই সকল সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি প্রকৃত মুসলমান এবং মুনাফিকদের সম্পর্কে অবহিত হন এবং তাদের ষড়যন্ত্র এবং ক্ষতিকর কার্যকলাপ থেকে মুসলমানদের মুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

অধিকন্তু বিভিন্ন যুদ্ধে শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখি মুকাবিলায় লিপ্ত হয়ে বাস্তব দৃষ্টান্ত সৃষ্টির মাধ্যমে এত যুদ্ধবিজ্ঞ ও শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে মুসলিম বাহিনীকে তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন যে, পরবর্তী সময়ে এই বাহিনী ইরাক ও সিরিয়ার ময়দানে বিশাল পারস্য ও রোমক বাহিনী সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে তাদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করার পর তাদের বাড়ি ঘর, সহায়-সম্পদ, বাগ-বাগিচা, ঝর্ণা ও ক্ষেতখামার থেকে বিতাড়িত করেন এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই সকল যুদ্ধের মাধ্যমে হিজরতের কারণে ছিন্নমূল মুসলমানদের আবাসভূমি, চাষাবাদযোগ্য ভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা তাছাড়া, যুদ্ধাস্ত্র এবং যুদ্ধের উপযোগী সরঞ্জামাদি, ঘোড়া এবং যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ সম্পদ ইত্যাদিও সংগ্রহ করে দেন। এসব করতে গিয়ে কখনই তিনি বিধিবহির্ভূত কোনো ব্যবস্থা, অন্যায় কিংবা উৎপীড়নের পথ অবলম্বন করেননি।

যুদ্ধের লক্ষ ও উদ্দেশ্যে এবং নীতির ক্ষেত্রে রাসূল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেন। জাহেলী যুগের যুদ্ধের রূপ ছিলো লুটতরাজ, নির্বিচারে হত্যা, অত্যাচার ও উৎপীড়ন আর ধর্ষণ নির্যাতন কায়ক্লেশ ও কঠোরতা অবলম্বন এবং বিশৃংখলা সৃষ্টি। কিন্তু ইসলামে উৎপীড়ন, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠন-অপহরণ, অহেতুক হত্যা ইত্যাদি কোনো কিছুরই সামান্যতম অবকাশও ছিলো না। ইসলামে যুদ্ধ-সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরভাবে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান অনুসরণ করা হতো।

যুদ্ধ-বিগ্রহের ব্যাপারে রাসূল যে সকল মানবেচিত আইন-কানুন প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান কিংবা সাধারণ সৈনিকরা যাতে কোনোক্রমেই তার অপপ্রয়োগ না করেন কিংবা এড়িয়ে না যান তার প্রতি তিনি সর্বদাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন।

সোলায়মান বিন বোরাইদা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল যখন কোনো ব্যক্তিকে কোনো মুসলিম সেনাবাহিনীর অধিনায়ক কিংবা অভিযাত্রী দলের নেতা নির্বাচিত করতেন তখন, গন্তব্যস্থলে যাত্রার প্রাক্কালে তাকে তাঁর নিজের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করতে এবং তাঁর সঙ্গী-সাথিদের ভালো মন্দের ব্যাপারে খেয়াল রাখতে বিশেষভাবে উপদেশ প্রদান করতেন।

অতঃপর বলতেন "আল্লাহর নির্দেশিত পথে আল্লাহর নামে যুদ্ধ করবে, যারা আল্লাহর কুফরী করেছে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে যুদ্ধ করবে, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে না, শত্রুপক্ষের কোনো ব্যক্তির নাক, কান ইত্যাদি কর্তন করবে না। কোনো শিশুকে হত্যা করবে না"।

অনুরূপভাবে নবী করীম (ﷺ) সহজভাবে কাজকর্ম সম্পাদন করার জন্য নির্দেশ দিতেন এবং বলতেন 'সহজভাবে কাজ কর। কঠোরতা অবলম্বন করো না।’ মানুষকে অন্যায়ের শাস্তি দাও, ঘৃণা করো না। যখন তিনি আক্রমণের উদ্দেশ্যে কোনো বস্তির নিকট রাত্রে গমন করতেন, তখন সকাল হওয়ার পূর্বে কখনই তিনি আক্রমণ করতেন না। কোনো শত্রুকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার ব্যাপারে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। কোনো ব্যক্তিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হত্যা করতে এবং মহিলাদের মারধর এবং হত্যা করতেও নিষেধ করতেন। লুণ্ঠন কার্যকে তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতেন।

তাছাড়া ক্ষেতখামার নষ্ট করা, পশু হত্যা এবং অহেতুক গাছপালা কেটে ফেলতে তিনি নিষেধ করতেন। অবশ্য যুদ্ধের বিশেষ প্রয়োজনে গাছপালা কেটে ফেলার অনুমতি যে তিনি দিতেন না তা নয়, কিন্তু প্রয়োজননের অতিরিক্ত একটিও না।

মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালেও রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছিলেন, আহত ব্যক্তিদের আক্রমণ করবে না, কোনো পলাতকের পিছু ধাওয়া করবে না, কোনো বন্দীকে হত্যা করবে না, কোনো কওম কিংবা রাষ্ট্রের দূতকে হত্যা করবে না। অঙ্গীকারবদ্ধ অমুসলিম দেশের নাগরিকদেরও হত্যা করতে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কোনো অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিকে যে হত্যা করবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ তার সুগন্ধ চল্লিশ বছরেরও অধিক পথের দূরত্বে পাওয়া যাবে।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর বাইরে আরও অনেক উন্নত নিয়ম-কানুন তিনি প্রণয়ন ও প্রবর্তন করেছিলেন, যার ফলে তাঁর সময় কার্যক্রম জাহেলি যুগের পৈশাচিকতা ও অপবিত্রতার কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র জিহাদের রূপ লাভ করে।

আল্লাহর পথে দলে দলে প্রবেশ

ইতোপূর্বে যেমনটি আলোচিত হয়েছে যে, মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ ছিলো এমন একটি যুগান্তাকারী ঘটনা, যা মূর্তিপূজার মূলকে সম্পূর্ণরূপে উৎপাটিত করে এবং আরবে মিথ্যাকে অপসৃত করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। ইসলামের বিজয় গৌরবে আরবাসীদের মনের সর্বপ্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও সন্দেহ দূরীভূত হয়ে যায় এবং তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে। আমর বিন সালমা (রা) হতে বর্ণিত। 'আমরা এক ঝর্ণার ধারে বসবাস করতে ছিলাম। সে স্থানটি ছিলো বাণিজ্য কাফেলার গমনাগমনের পথ। বাণিজ্য কাফেলা যখন সে পথ দিয়ে গমনাগমন করত, তখন লোকজনদের জিজ্ঞেস করতাম, 'লোকজনেরা সব কেমন আছে? ঐ লোক অর্থাৎ নবী করীম (ﷺ) এর অবস্থা কেমন?' তাঁরা বলত, "তিনি মনে করেন যে, আল্লাহ তাঁকে নবী করেছেন এবং আল্লাহর তরফ থেকে তাঁর নিকট ওহী আসে। আল্লাহ তাঁর নিকট এই বিষয়ে ওহী নাযিল করেছেন।" আমি কথা এমনভাবে স্মরণ করে রাখতাম যে, তা আমার অন্তরে থাকতো।

ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় লাভের জন্য সমগ্র আরব জাহান মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিলো। তারা বলত 'তাঁকে এবং তাঁর দলকে পরীক্ষার জন্য ছেড়ে দাও। যদি তিনি কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের ওপর বিজয়ী হন, তাহলে বুঝতে হবে যে তিনি প্রকৃতই নবী।' কাজেই, যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা সংঘটিত হলো তখন বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের উন্মুখতা নিয়ে মদিনা অভিমুখে অগ্রসর হলো। আমার গোত্রের লোকজনদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আমার পিতাও গমন করলেন। অতঃপর যখন তিনি মসজিদে নববীতে আসলেন তখন নবী বললেন, "অমুক সময় অমুক নামায আদায় কর। যখন নামাযের সময় হবে তোমাদের হতে একজন আযান দেবে এবং কুরআন মজীদ যার ভালো জানা সে নামাযে ইমামতি করবে।"

এই হাদীস দ্বারা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয়, মক্কা বিজয়ের ঘটনা, প্রবাহের মোড় পবির্তনের ক্ষেত্রে, ইসলামকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে, আরব অধিবাসীদের নীতি-নির্ধারণের ব্যাপারে এবং তাদের বহুত্ববাদের ধারণাকে মন-মস্তিস্ক থেকে অপসারণ পূর্বক ইসলামের নিকট আত্মসমর্পণ করার ব্যাপারে কত ব্যাপাক ও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলো। বিশেষ করে তাবুক অভিযানের পর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এই অবস্থার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। এর প্রমাণ হিসেবেই এটা প্রত্যক্ষ করা যায় যে, ৯ম ও ১০ম হিজরিতে ইসলাম গ্রহণেচ্ছু বিভিন্ন দলের মদিনা আগমন একের পর এক অব্যাহত থাকে এবং তারা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকে।

এই সময় আরববাসী অধিক হারে ইসলামে দীক্ষিত হতে থাকেন। তার প্রমাণ হচ্ছে মুসলিম বাহিনী সৈন্য সংখ্যা উত্তীর্ণ হয় ত্রিশ হাজার। এর অল্পকাল পরেই বিদায় হজ্জের সময় এই বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা উন্নীত হয় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার অথবা এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজারে। শ্রবণ প্লাবনের ন্যায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে ইসলামের সৈন্যসংখ্যা। বিদায় হজ্জের সময় এই বিশাল বাহিনী নবী করীমের এ চারপাশে এমন ভাবে লাব্বায়িক, তাকরীব, হামদ ও তাসবীহ ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকেন যে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং আল্লাহর একত্ববাদের ঐক্যতা সমগ্র উপত্যকা মুখরিত হয়ে ওঠে।

প্রতিনিধিদলসমূহ

ধর্ম যুদ্ধ সম্পর্কে তথ্যাভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যে সকল প্রতিনিধি দলের কথা উল্লেখ করেছেন তার সংখ্যা ছিলো সত্তরের অধিক। কিন্তু এখানে সে সবের বিবরণ প্রমাণের অবকাশ নেই এবং তার কোনো প্রয়োজনও নেই। উক্ত প্রেক্ষিতে আমরা শুধু সেই সকল প্রতিনিধি দলের কথাই আলোচনা করব যেগুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে আরও যে বিষয়টির প্রতি পাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ প্রয়োজন তা হচ্ছে, যদিও সাধারণ গোত্র সমূহের প্রতিনিধি দলগুলো মক্কা বিজয়ের পর মসজিদে নববীতে উপস্থিত হতে আরম্ভ করেছিলো, কিন্তু কোনো কোনো গোত্র এমন যে, তাদের প্রতিনিধিদগুলো মক্কা বিজয়ের পূর্বেই মদিনাতে আগমন করেছিলো। এখানে আমরা তাদের কথাও উল্লেখ করছি।

আব্দুল কাইসের প্রতিনিধিদল: এই গোত্রের প্রতিনিধিদল দু'বার মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়েছিলো। প্রথম বার ৫ম হিজরিতে কিংবা তারও কিছু পূর্বে এবং দ্বিতীয় বার ৯ম হিজরিতে। প্রথম বার তাদের আগমনের কারণ ছিলো এই যে, ঐ গোত্রের মুনকেজ বিন হিব্বান নামক এক ব্যক্তি বাণিজ্য পণ্যাদি নিয়ে মদিনায় যাতায়াত করত। রাসূল - হিজরতের পর প্রথম বার যখন সে মদিনায় আগমন করল তখন ইসলাম সম্পর্কে অবহিত হয়ে মুসলমান হয়ে গেল। তৎপর রাসূলের একটি পত্রসহ নিজ গোত্রে প্রত্যাবর্তন করল। ইসলামের বিষয়াদি অবগত হয়ে সেই গোত্রের লোকজনেরাও ইসলাম গ্রহণ করল। ১৩ কিংবা ১৪ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল হারাম মাসগুলোর মধ্যে মসজিদে নববীতে গিয়ে হাজির হলো। সে সময় ঐ প্রতিনিধিদল নবী করীম (ﷺ) এর নিকট ঈমান এবং পানীয় দ্রব্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলো। এদের নেতা ছিলো আল আশাজ আল-আসরী।

যাদের সম্পর্কে রাসূল বলেছিলেন যে, তোমাদের মধ্যে এমন দুটো স্বভাব রয়েছে যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং তা হচ্ছে- দূরদর্শিতা ও ধৈর্য।

দাউস গোত্রের প্রতিনিধিদল: ৭ম হিজরির প্রথম ভাগে এই প্রতিনিধিদল মদিনায় আগমন করে। রাসূল (ﷺ) সেই সময় খায়বারে অবস্থান করছিলেন। ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, গোত্রের নেতা তোফায়েল বিন আমর দাউসী (রা) ঐ সময় ইসলামের পতাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন যখন নবী করীম (ﷺ) মক্কায় ছিলেন। অতঃপর তিনি নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে মনোনিবেশ পূর্বক অবিরামভাবে কাজ করে যেতে থাকেন। কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা নানা প্রকার ছলনার আশ্রয় নিয়ে বিলম্ব করতে থাকে। এভাবে অযথা সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে তোফায়েল তাদের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েন এবং মসজিদে নববীতে হাজির হয়ে দাউস গোত্রের লোকজনদের ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করলেন। ঘটনা শুনে বদ-দোয়ার পরিবর্তে রাসূল (ﷺ) এই বলে তাদের জন্য দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ! দাউস গোত্রের লোকজনদের হেদায়েত করুন।

রাসূল (ﷺ) এর দু'আর বরকতে দাইস গোত্রের লোকেরা মুসলমান হয়ে যায়। তোফায়েল দাউসী নিজ সম্প্রদায়ের ৭০ কিংবা ৮০টি পরিবারের একটি দলসহ ৭ম হিজরির প্রথম ভাগে মদিনায় আগমন করেন। ঐ সময় নবী করীম (ﷺ) খায়বার গিয়েছিলেন। এ কারণে তোফায়েল সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে খায়বারে রাসূল শহর সঙ্গে মিলিত হন।

ফাওয়াহ বিন আমর জোযামীর সংবাদ বহন: ফারওয়াহ ছিলেন রোমক সেনাবাহিনীতে একজন আরবীয় সেনাপতি। রুমীগণ তাঁকে রোমক সাম্রাজ্যের সীমান্তে আরব অঞ্চলসমূহের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর কেন্দ্র ছিলো মাযান (দক্ষিণ উরদুন) এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এর কার্যকারিতা ছিলো। মূতা যুদ্ধে (৮ম হি:) তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে তিনি মুসলমানদের বীরত্ব এবং সমর দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর একজন সংবাদ বাহকের মাধ্যমে তাঁর মুসলমান হওয়ার সংবাদ তিনি রাসূল (ﷺ) নিকট প্রেরণ করেন। উপঢৌকনের মধ্যে একটি সাদা খচ্চরও তিনি প্রেরণ করেন। রোমীয়গণ তাঁর মুসলমান হওয়ার সংবাদে তাঁকে বন্দী করে কয়েদখানার নিক্ষেপ করে। অতঃপর ইসলাম পরিত্যাগপূর্বক পুনরায় পূর্ব ধর্মে প্রবেশ করা নতুবা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তাঁকে বলা হয়। তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করার চাইতে মৃত্যুবরণ করাকেই প্রাধান্য দেন। কাজেই, ফিলিস্তিনের আফরা' নামক এক ঝর্ণার উপর শুলিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।

সাদা প্রতিনিধিদল: রাসূল (ﷺ) এর জিরানা হতে প্রত্যাবর্তনের পর ৮ম হিজরিতে এই প্রতিনিধিদল খিদমতে নববীতে উপস্থিত হয়। এর কারণ হলো, রাসূল ৪০০ শত মুজাহিদের সমন্বয়ে এক বাহিনী সংগঠনপূর্বক ইয়েমেনের 'সাদা' গোত্রে আবাসিক অঞ্চলে আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন। এই বাহিনী যখন কানাত উপত্যকায় স্থাপিত শিবিরে পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেন। এই বাহিনী যখন কানাত উপত্যকায় স্থাপিত শিবিরে অবস্থান করছিলো, তখন যিয়াদ বিন হারে সাদায়ী এই ব্যাপারটি অবগত হয়ে তৎক্ষণাৎ রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে হাজির হন এবং নিবেদন করেন যে, আমার পরে যারা আছেন তাদের প্রতিনিধি হিসেবে আমি উপস্থিত হয়েছি। অতত্রব, আপনি আপনার বাহিনী ফিরিয়ে নিন এবং আমি আমার সম্প্রদায়ের জন্য জামিন হচ্ছি। নবী করীম (ﷺ) কালবিলম্ব না করে উপত্যকা থেকে মুসলিম বাহিনীকে ফিরিয়ে আনেন। এরপর নিজে গোত্রে গিয়ে যিয়াদ রাসূল (ﷺ) এর দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য নিজ সম্পদ্রায়ের লোকজনদের উৎসাহিত করতে থাকেন। এর ফলে ১৫ জনের একটি দল খিদমতে নববীতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণে আজ্ঞানুবর্তী শপথ গ্রহণ করে। অতঃপর নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন করে। বিদায় হজ্জের সময় উক্ত সম্প্রদায়ের একশত ব্যক্তি রাসূল এর খিদমতে উপস্থিত হওয়ার সম্মান অর্জন করে।

কা'ব বিন যোহাইর বিন আবু সালমার আগমন: তিনি ছিলেন আরবের এক অভিজাত বংশোদ্ভূত একজন প্রখ্যাত কবি। তিনি কাফির ছিলেন এবং নবী করীম নামে কুৎসা রটনা করতেন। ইমাম হাকেমের বর্ণনা মতে তিনিও সেই অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে যাদের সম্পর্কে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো যে যদিও তাদেরকে কা'বার পর্দা ধরে আশ্রিত অবস্থায়ও পাওয়া যায়, তাহলেও যেন তাদের গলা কর্তন করা হয়। কিন্তু এই ব্যক্তি প্রাণে রক্ষা পেয়ে যায়। এ দিকে রাসূল (ﷺ) যখন তায়েফ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করেন, (৮ম হিজরি) তখন কাবের নিকট ভাই বোজাইর বিন যোহাইর এই মর্মে পত্র লিখেন যে, "রাসূল শখ মক্কার এমন কয়েক ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন, যারা তাঁর নামে কুৎসা রটনা করত এবং তাঁকে কষ্ট দিতো। কুরাইশদের ছোটখাটো কবিদের মধ্যে যার যে দিকে সুযোগ হয়েছে সে সেদিন পলায়ন করেছে। অতত্রব, যদি তুমি প্রাণে রক্ষা পেতে চাও তাহলে, রাসূল খিদমতে গিয়ে হাজির হয়ে যাও। কারণ, রাসূল (ﷺ) এর দরবারে গিয়ে কেউ তওবার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। তাকে হত্যা করেন না। যদি এ কথার ওপর তুমি আস্থাশীল না হও, তাহলে যেখানে খুশি গিয়ে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করতে পার।

এরপর দুই ভাইয়ের পত্রালাপ চলতে থাকে এবং ক্রমে ক্রমে কাবের নিকট পৃথিবীর পরিসর সংকীর্ণ মনে হতে থাকে। অবশেষে সে মদিনায় আগমন করল এবং যোহাইনা গোত্রের এক ব্যক্তির মেহমান হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করল। অতঃপর তার সঙ্গে ফজরের নামায আদায় করল। ফরয নামায হতে ফারেগ হওয়া মাত্রই যোহাইনা গোত্রের লোকটি তাঁকে ইঙ্গিত করলে তিনি উঠে গিয়ে রাসূল (ﷺ) এর নিকট উপবিষ্ট হলেন। রাসূল এ তাঁকে চিনতেন না। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কা'ব বিন যোহাইর তওবা করে মুসলমান হয়ে আপনার নিকট ক্ষমা ও আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি কি তাকে গ্রহণ করবেন? রাসূল বললেন, "হ্যাঁ।

অতঃপর তিনিই বললেন, "আমিই হচ্ছি কা'ব বিন যোহাইর'। একথা শুনে একজন আনসারী সাহাবী তাকে হত্যা করার জন্য লাফ দিয়ে ওঠেন এবং তাঁর গলা কর্তন করার জন্য অনুমতি চান। রাসূল বললেন, 'ক্ষান্ত হও, এই ব্যক্তি তওবা করেছে এবং তওবা করার কারণে সমস্ত দোষত্রুটি থেকে সে মুক্তি লাভ করেছে।'

এই সময়েই কা'ব বিন যোহাইর তাঁর একটি প্রসিদ্ধ কবিতা পাঠ করে রাসূল (ﷺ) কে শোনাল, যার প্রথম পংক্তিটি এখানে লিপিবদ্ধ করা হলো:

সুআদ চলে গিয়েছে, তাই আমার অন্তর বিরহ ব্যাথায় কাতর, আমার মন তার পেছনে ছুটছে (তাকে পেতে চায়) আমি বন্দী শৃঙ্খলাবদ্ধ আমার মুক্তিপণ দেয়া হয়নি।

উক্ত কবিতাতেই কা'ব রাসূল (ﷺ) এর প্রশংসাসহ তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে নিম্নোক্ত লাইনগুলো আবৃত্তি করেন।

আমাকে সংবাদ দেয়া হয়েছে যে রাসূল আমাকে ধমক দিয়েছেন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) এর নিকট ক্ষমার আশা করা হয়। আপনি অপেক্ষা করুন। যে আল্লাহ আপনাকে হোদায়েতপূর্ণ কুরআন দিয়েছেন, তিনি আপনাকে হেদায়েতের কাজে সাফল্য দান করুন। নিন্দুকদের কথায় কান দেবেন না, যদিও আমার সম্পর্কে অনেক কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমি এমন এক জায়গায় দন্ডায়মান আছি, আমি সেই কথাই শুনছি এবং দেখছি যে, হাতিও যদি সেখানে দাঁড়ায় এবং সেই কথাগুলো শুনে, তাহলে কম্পিত হবে। তবে তার ওপর আল্লাহর অনুমতিতে রাসূলের মেহেরবানী হলে ভিন্ন কথা। এমনকি আমি নিজ হাত এমন এক সম্মানিত ব্যক্তির হাতে রেখেছি যার থেকে আমি আমার গুটিয়ে (সরিয়ে) নিব না এবং যার প্রতিশোধ নেয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছিলো যার কথাই চূড়ান্ত কথা, যখন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, এমতাবস্থায় আমাকে বলো যে, "তুমি এই এই কথা বলেছ এবং তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তিনি তো আমার নিকট ক্ষতিকর স্থানের বনের সেই সিংহের চাইতেও ভয়ানক, যার থাকার স্থান এমন এক উপত্যকায় অবস্থিত যা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং যেখানে উপরে বিপদের বিপদ রয়েছে। নিশ্চয় রাসূল শ আলোক স্বরূপ, তাঁর দ্বারা অন্ধকার দূর হয়। তিনি আল্লাহর তলোয়ার সমূহের মধ্যে একটি কোষমুক্ত ধারালো তলোয়ার।

এরপর কা'ব বিন যোহাইর কুরাইশ মুহাজিরদের প্রশংসা করেন। কারণ, কাবের আগমনে তাদের কোনো ব্যক্তি ভালো উক্তি ছাড়া কোনো মন্তব্য করে নি এবং এ ধরনের কোনো ভঙ্গীও পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু তাদের প্রশংসাকালে আনসারদের প্রতি তিনি কটাক্ষ করেন। কারণ তাঁদের একজন তার গলা কর্তনে অনুমতি চেয়েছিলো।

উযরাহ প্রতিনিধদল: এই প্রতিনিধিদল ৯ম হিজরিতে মদিনায় আগমন করেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো বারোজন। এঁদের মধ্যে হামযাহ বিন নোমানও ছিলেন। তাঁদের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে দলনেতা বলেন যে, তাঁরা বনু উযারাহর অন্তর্ভুক্ত কুসাই গোত্রের বৈমাত্রেয় ভাই। আমরাই কুসাইরদের সমর্থন দান করে বনু বকর এবং বনু খোয়ায়াকে মক্কা হতে বহিষ্কার করেছিলাম।

এদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তারও সম্পর্ক আছে। উক্ত প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) তাঁদের স্বাগত জানালেন এবং শাম রাজ্য বিজয়ের শুভ সংবাদ প্রদান করলেন। ভবিষ্যদ্বক্তা মহিলাদের কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার ব্যাপারে তাঁদের নিষেধ করলেন এবং তাঁদেরকে সেই সব যবেহ থেকে নিষেধ করলেন যা তাঁরা (মুশরিক থাকাকালীন) যবেহ করতেন। উক্ত দলটি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কয়েকদিন অবস্থান করার পর নিজ গোত্রে ফিরে যান।

বালী প্রতিনিধিদল: ৯ম হিজরির রবিউল আওয়াল মাসে এই দলটি মদিনায় আগমন করেন এবং ইসলাম গ্রহণের পর ৩ দিন সেখানে অবস্থান করেন। মদিনায় অবস্থানকালে দলের নেতা আবু যবীর জিজ্ঞেস করেন যে, নিমন্ত্রণ করাতে কিরূপ সওয়াব আছে? উত্তরে রাসূল বললেন, 'ধানাঢ্য কিংবা মুখাপেক্ষীদের যে কোনো ভালো আচরণই সদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নিমন্ত্রণের সময়সীমা কত?

উত্তর দিলেন, 'তিনদিন'। তিনি আরও জিজ্ঞেস করলেন, 'মালিকবিহীন হারানো ভেড়া কিংবা বকরী পেলে তার হুকম কী? বললেন, 'তা তোমার কিংবা তোমাদের কিংবা তোমাদের ভাইয়ের জন্য হবে অথবা বাঘের খোরাক হবে।' এরপর তিনি হারানো উট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন রাসূল বললেন, এর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? তার মালিক না পাওয়া পর্যন্ত ওকে ছেড়ে দিতে হবে।

সাকীফ প্রতিনিধি দল: তাবুক হতে রাসূল এর প্রত্যাবর্তনের পর ৯ম হিজরির রমযান মাসে এই দল খিদমতে নববীতে উপস্থিত হন। উক্ত গোত্রের ইসলাম গ্রহণের পূর্বের ঘটনার গতি-প্রকৃতি ছিলো এই যে, ৮ম হিজরির যিলকাদ মাসে রাসূল যখন তায়েফ যুদ্ধ হতে প্রত্যাবর্তন করেন তখন তাঁরা মদিনায় পৌঁছবার পূর্বেই উক্ত গোত্রের সর্দার উরওয়াহ বিন মাসউদ সাকাফী মদিনায় আগমন করে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর নিজ কওমের নিকট ফিরে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। যেহেতু তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন এবং শুধু এটাই নয় যে, কওমের লোকেরা তাকে মান্য করে চলত; রবং তাঁকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের মেয়েদের এবং মহিলাদের চাইতেও বেশি প্রিয় ভাবত। এ কারণেই তাঁর ধারণা ছিলো যে, লোকেরা অবশ্যই তাঁকে অনুসরণ করে চলবে। কিন্তু যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন তখন সম্পূর্ণ উল্টো ফল হলো। লোকেরা তীরের আঘাতে আঘাতে তাঁকে হত্যা করে ফেলল।

তাঁকে হত্যার পর একই অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হতে থাকে। কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এটা তাদের নিকট সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন তাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার ক্ষমতা তাদের নেই। সুতরাং অবস্থার প্রেক্ষিতে আলাপ আলোচনা ও সলাপরামর্শের পর রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে একজন লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করল এবং এই কাজের জন্য আবদে ইয়ালিল বিন আমরকে মনোনীত করল। কিন্তু এই কাজের জন্য সে প্রথমাবস্থায় রাজি হলো না। আর আশঙ্কা ছিলো যে, তার সঙ্গেও সেই আচরণ করা হতে পারে যা উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফীর সঙ্গে করা হয়েছিলো। এ কারণে তিনি বললেন, 'আমার সঙ্গে আরও কিছু সংখ্যক লোক না পাঠালে আমার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়।'

লোকেরা তাঁর এই দাবি মেনে নিয়ে তাদের গোত্র হতে দুজনকে এবং বনু মালিকের মধ্য হতে তিনজনকে তাঁর সঙ্গে দিল। কাজেই, তাকে সহ মোট ছয়জনের সমন্বয়ে দলটি গঠিত হলো। উক্ত দলে ওসমান বিন আবিল আস সাকাফীও ছিলেন। যিনি ছিলেন বয়সে সর্বকনিষ্ঠ।

যখন তাঁরা খিদমতে নববীতে গিয়ে উপস্থিত হলেন, তখন রাসূল তাঁদের জন্য মসজিদের এক কোণে একটি তাঁবু টানিয়ে দিলেন। যাতে তাঁরা কুরআন শুনতে এবং সাহাবাদেরকে নামাযরত অবস্থায় দেখতে পারেন। অতঃপর তাঁরা নবী করীম (ﷺ) এর নিকট যাতায়াত করতে থাকেন এবং তিনি তাঁদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাতে থাকেন। অবশেষে তাঁদের নেতা প্রস্তাব করলেন যে, রাসূল তাঁর নিজের এবং সাকীফ গোত্রের মধ্যে এমন একটি সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করে দেবেন, যার মধ্যে ব্যভিচার, মদ্যপান এবং সুদ খাওয়ার অনুমতি থাকবে। অধিকন্তু তাদের উপাস্য লাত বিদ্যমান থাকবে, তাদের জন্য নামায মাফ করে দেয়া হবে এবং তাদের মূর্তিগুলোকে বিনষ্ট করবে না। কিন্তু রাসূল তাঁদের অযৌক্তিক দাবিসমূহের কোনোটিকেই মেনে নিতে পারলেন না। অতএব তাঁরা নির্জনে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকলেন, কিন্তু রাসূল (ﷺ) এর নিকট আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তাঁরা আর কোনো উপায় স্থির করতে পারলেন না। অবশেষে তাঁরা রাসূলের নিকট আত্মসমর্পণপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে তাঁরা একটি শর্ত আরোপ করলেন এবং তা হচ্ছে এই যে, তাঁদের মূর্তি লাতকে বিনষ্ট করার ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলকে ব্যবস্থা নিতে হবে। সাকীফ গোত্রের লোকেরা কখনই নিজ হাতে তা ধ্বংস করবে না। রাসূল এই শর্তটি মেনে নিলেন এবং একটি পত্র লিখে দিলেন। তিনি ওসমান বিন আবিল আস সাকাফীকে তাঁদের দলের নেতা মনোনীত করে দিলেন। কারণ, ইসলাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ এবং দ্বীন ও কুরআনের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সব চাইতেও উৎসাহী এবং অগ্রণী। এর কারণ ছিলো দলের সদস্যগণ প্রত্যহ সকালে যখন খিদমতে নববীতে উপস্থিত হতেন তখন ওসমান বিন আবিল আস শিবিরে থাকতেন। অতঃপর দলের লোকেরা যখন দুপুর বেলা শিবিরে ফিরে এসে বিশ্রাম গ্রহণ করতেন তখন ওসমান বিন আবিল আস রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে কুরআন পাঠ করতেন এবং দ্বীনের কথাবার্তা জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তিনি যখন রাসূল খানকে বিশ্রামের অবস্থায় পেতেন তখন আবু বকরের খিদমতে গিয়ে হাজির হতেন। ওসমান বিন আবিল আসের নেতৃত্বে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।

রাসূল (ﷺ) এর ইন্তিকালের পর আবু বকর (রা) খিলাফত কালে যখন নব্য মুসলমানদের মধ্যে ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়, তখন সাকীফ গোত্রের লোকেরা ধর্মত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন ওসমান বিন আবিল আস (রা) সকলকে সম্বোধন করে বলেন, হে সাকীফ গোত্রের লোকেরা! তোমরা সকলের শেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছ। এখন স্বধর্ম ত্যাগ করলে সকলের পূর্বেই তোমরা হবে স্বধর্ম ত্যাগকারী।' এ কথা শোনার পর ধর্মত্যাগের চিন্তা পরিহার করে তাঁরা ইসলামের ওপর সুদৃঢ় থাকেন।

যাহোক, দলের লোকেরা নিজ গোত্রীয় লোকজনদের নিকট ফিরে আসার পর তাঁদের প্রকৃত অবস্থা গোপন রেখে ভবিষ্যত লড়াইয়ের সম্ভাবনার কথা উল্লেখপূর্বক চিন্তান্বিত ও দুঃখিত হয়ে বলল যে, রাসূল বলেছেন, তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর এবং ব্যভিচার, মদ ও সুদ পরিত্যাগ কর, অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ করা হবে।' একথা শোনার পর প্রথমাবস্থায় সাকীফ গোত্রের লোকদের মধ্যে জাহেলি যুগের অহমিকা প্রাবল্য লাভ করে এবং দুই তিন দিন যাবৎ তাঁরা যুদ্ধের কথাই চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। কিন্তু এরপর আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করে দেন; যার ফলে পুনরায় রাসূল এর নিকট লোক প্রতিনিধি দল প্রকৃত বিষয় প্রকাশ করে এবং যে সকল কথার ওপর সন্ধি হয়েছিলো, তা সুস্পষ্টভাবে বলে। সবকিছু অবগত হওয়ার পর সাকীফ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেন।

এদিকে রাসূল মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলার উদ্দেশ্যে খালিদ বিন ওলীদের নেতৃত্বে, কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবীর সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে প্রেরণ করেন। মুগীরা বিন শোবা দাঁড়িয়ে লৌহ-নির্মিত গদা বিশেষ উত্তোলন করলেন এবং তাঁর সঙ্গীগণকে লক্ষ করে বললেন, 'আল্লাহর শপথ আমি আপনাদের জন্য সাকীফদের সম্পর্কে একটু হাসির ব্যবস্থা করব।

অতঃপর মূর্তির ওপর মুগুর দ্বারা আঘাত করলেন এবং নিজেই মাটির ওপর লুটিয়ে পড়লেন ও পায়ের গোড়ালি দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে থাকলেন। এই উদ্ভট দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তায়েফবাশির অন্তরে ভীতির সঞ্চার হলো। তারা বলতে লাগল 'আল্লাহ মুগীরাকে ধ্বংস করুক।' লাত দেবী তাকে হত্যা করেছে। এমন সময় মুগীরা লাফ দিয়ে উঠে বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের মন্দ করুন। এটা হচ্ছে মাটি এবং পাথরের তৈরি একটি মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়, সব চাইতে উঁচু দেয়ালে ওমর ওঠেন। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েক জন সাহাবিও ওঠেন। তারপর তারা মূর্তিটি ধ্বংস করলেন। সাকীফ গোত্রের লোকেরা শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় এ সব কাজকর্ম প্রত্যক্ষ করেন। খালিদ (রা) অলংকার ও পোশাকাদিসহ নিজ দলের সঙ্গে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। রাসূল (ﷺ) মন্দির থেকে আনীত দ্রব্যাদি বন্টন করে দেন এবং নবী (ﷺ) এর সাহায্য ও দ্বীনের সম্মানের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করেন।

ইয়েমেন সম্রাটের পত্র: তাবুক হতে নবী করীম (ﷺ) এর প্রত্যাবর্তনের পর হিমইয়ার সম্রাট অর্থাৎ হারেস বিন আবদে কালাল, নায়ীম বিন আবদে কালাল এবং রায়ীন হামদান ও মোয়াফেরের অধিনায়ক রেনামান কিন কীনের পত্র আসে। পত্র প্রেরণকারী হতে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বনের সংবাদপত্র প্রেরণ করেন। রাসূল তাদের পত্রের উত্তরে পত্র লিখে ইমানদারদের প্রাপ্য এবং দায়িত্ব সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন। উক্ত পত্রে রাসূল অঙ্গীকারাবদ্ধদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। এতে শর্ত ছিলো এই যে, তাঁরা যথারীতি কর পরিশোধ করবেন। তখন নবী করীম (ﷺ) কতিপয় সাহাবাকে ইয়েমেন প্রেরণ করেন। মু'আয বিন জাবালকে এই দলের আমীর নিযুক্ত করেন।

তাকে 'আদন' এর দিকে সাকুন ও 'সাকন ও সাকাসিক' নামক উঁচু অঞ্চলের দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি 'হুরূব' এর বিচারক এবং যাকাত ও যিযিয়াহ উসূলকারী ছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতেন।

হামদান প্রতিনিধি দল: তাবুক যুদ্ধ হতে রাসূল (ﷺ) এর প্রত্যাবর্তনের পর ৯ম হিজরিতে এই প্রতিনিধি দল খিদমতে নববীতে উপস্থিত হন। রাসূলের নিকট কিছু তথ্য জানতে চাওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি তাঁদের একটা পত্র দেন এবং মালেক বিন নামত (রা) কে তাঁদের নেতা এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের যাঁরা মুসলমান হয়েছিলেন তাঁদের গভর্নর নিযুক্ত করেন। অবশিষ্ট অন্যান্যদের নিকট ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য খালিদ (রা) কে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে ছয় মাস অবস্থান করেন এবং দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু সেখানকার লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে নি। অতঃপর নবী করীম (ﷺ) আলী বিন আবু তালিবকে সেখানে প্রেরণ করেন এবং খালিদকে মদিনায় ফেরৎ পাঠানোর পরামর্শ প্রদান করেন।

আলি (রা) হামদান গোত্রের লোকজনদের নিকট রাসূল (ﷺ) এর পত্র পাঠ করে শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। এর ফলে তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আলি (রা) নিকট থেকে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের সংবাদ প্রাপ্ত হয়ে রাসূল - সেজদায় পতিত হন। অতঃপর মাথা উঠিয়ে বলেন, "হামদানের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হামদানের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।"

বনু ফাযারার প্রতিনিধি দল: তাবুক হতে রাসূল (ﷺ) এর প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রতিনিধি দল ৯ম হিজরিতে মদিনায় আগমন করেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো দশজনের অধিক। এঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের কথা বলায় রাসূল মিম্বরে গিয়ে উঠলেন এবং দুই হাত তুলে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! তোমার রহমতের বৃষ্টিধারা বর্ষণ ও বিস্তৃত করে তোমার সৃষ্টিরাজিকে পরিতৃপ্ত করো এবং মৃতপ্রায় জনপদকে আনন্দদায়ক, কল্যাণকর ও আরামদায়ক হয় এবং বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে হয়, তা যেন বিলম্বে না হয়ে শীঘ্র হয়। হে আল্লাহ! এই বৃষ্টি যেন তোমার রহমতের বৃষ্টি হয়, শাস্তিমূলক কিংবা ধংসাত্মক না হয়, তা যেন আমাদের ভাসিয়ে না দেয় এবং নিশ্চিহ্ন করে না ফেলে। হে আল্লাহ! বৃষ্টি দ্বারা আমাদের পরিতৃপ্ত করো এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।

নাজরানের প্রতিনিধি দল: মক্কা হতে ইয়েমেনের দিকে যেতে সাত মাইল দূরত্বে একটি বড়ো অঞ্চল ছিলো। ঐ অঞ্চলটি ছিলো ৭৩ পল্লী বিশিষ্ট। দিনের কোনো দ্রুতগামী বাহন একদিনে পুরো অঞ্চল ভ্রমণ করতে সক্ষম হতো না। উক্ত অঞ্চলে এক লক্ষ পুরুষ যোদ্ধা ছিলো, সকলেই খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী।

নাজরানের প্রতিনিধি দল মদিনায় আগমন করেন ৯ম হিজরি সনে। এর সদস্য সংখ্যা ছিলো ষাট। ২৪জন ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ। যার মধ্যে ৩জন ছিলেন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এর মধ্যে একজনের নাম ছিলো আব্দুল মাসীহ। তিনি ছিলেন আকেব। তাঁর দায়িত্ব ছিলো অধিনায়কত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনা। দ্বিতীয় জনের নাম ছিলো আইহামা অথবা সোরাবিল। তিনি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন, উপাধি ছিলো সাইয়্যেদ। তৃতীয় হলেন, আবু হারেসা বিন আলকামা। তিনি ছিলেন ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক নেতা (লাট পদবী)।

মদিনায় পৌঁছার পর এই দলটি রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর রাসূল এবং এই প্রতিনিধি দলের মধ্যে উভয় পক্ষের কিছু প্রশ্ন নিয়ে কথাবার্তা হয়। এরপর নবী করীম (ﷺ) তাঁদের নিকট ইলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করে শোনান। কিন্তু তাঁরা ইসলাম গ্রহণ না করে পাল্টা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। 'আপনি মাসীহ (আ) সম্পর্কে কী বললেন, তাঁদের জবাবে কিছু না বলে রাসূল নিরুত্তর রইলেন। অতঃপর নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হলো-

অবশ্যই ঈসার উদাহরণ আল্লাহর নিকটে আদমের ন্যায়। তিনি তাঁকে মাটি দ্বারা তৈরি করেছেন। অতঃপর বলেছেন, 'হও' আর অমনি হয়ে গিয়েছেন। সত্য (প্রাকাশিত হয়) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। অতএব তুমি সন্দেহকারীদের দলভুক্ত হবে না। তোমার নিকট সঠিক জ্ঞান আসার পর কেউ যদি সে (ঈসা) সম্পর্কে মতবিরোধ করে তাহলে তুমি বল, এসো আমরা আমাদের সন্তানদেরকে, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে, আমরা আমাদের স্ত্রীদেরকে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে, আমরা নিজেদেরকে তোমরা তোমাদের নিজেরকে নিয়ে অনুনয়-বিনয় সহকারে প্রার্থনা করি এবং যারা মিথ্যুক তাদের ওপর আল্লাহ লা'নতের বদদোয়া করি। (সূরা আলে ইমরান; আয়াত: ৫৯-৬১)

সকাল হলে রাসূল উক্ত আয়াতসমূহের আলোকে ঈসা (আ) সম্পর্কে তাঁদের প্রশ্নের জবাব দেন এবং এরপর তারা সারা দিন যাবৎ এই ব্যাপারে কথাবার্তা মেনে নিতে অস্বীকার করলেন। যেহেতু তাঁদের দলের সদস্য ঈসা (আ) সম্পর্কিত রাসূলের কথাবার্তা মেনে নিতে এবং ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন, সেহেতু রাসূল (ﷺ) পরদিন সকালে তাঁদেরকে মুবাহালার (অনুনয়-বিনয় সহকারে প্রার্থনা) জন্য দাওয়াত দিলেন। হাসান ও হোসাইন (রা) একই চাদর পরিবেষ্টিত অবস্থায় আগমন করলেন। পিছনে পিছনে যাচ্ছিলেন ফাতেমা (রা)।

প্রতিনিধি দল যখন লক্ষ করলেন যে, প্রকৃতই রাসূল সম্পূর্ণ রূপে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছেন তখন নির্জনে গিয়ে তাঁরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলেন। আকের এবং সাইয়েদ একজন অপরজনকে বললেন, 'দেখ মুবাহালা করো না। আল্লাহর কসম, তিনি যদি সত্যিই নবী হন এবং আমরা তাঁর সঙ্গে মুবাহালা করি তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কখনই কৃতকার্য হবে না। পৃথিবীর উপরিভাগে আমাদের একটি লোম এবং নখও ধ্বংস হতে রক্ষা পাবে না। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, রাসূল কে এই ব্যাপারে বিচারক নির্ধারণ করা হোক।'

কাজেই তাঁরা রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলেন যে, 'আপনি যে দাবি করবেন আমরা তা মানার জন্য প্রস্তুত থাকব।' এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে রাসূল তাদের নিকট থেকে কর গ্রহণের স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং তাঁদের দুই হাজার জোড়া কাপড় প্রদান স্বীকৃতি সাপেক্ষে সন্ধিচুক্তি সম্পাদিত হয়। তাঁরা এই কাপড় প্রদান করবেন এক হাজার জোড়া রজব মাসে এবং এক হাজার জোড়া সফর মাসে। অধিকন্তু, এটাও স্বীকৃত হলো যে, প্রতি জোড়া কাপড়ের সঙ্গে এক উকিয়া রৌপ্য (এক শত বায়ান্ন গ্রাম) প্রদান করবে। এর ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করলেন। এ ব্যাপারে তাঁদের একটি লিখিত দলিল প্রদান করলেন, পক্ষান্তরে তাঁরা এ আরজি পেশ করলেন যে, তাঁদের নিকট হতে কর আদায়ের জন্য নবী করীম (ﷺ) যেন একজন আমানতদার প্রেরণ করেন। চুক্তি মোতাবিক উক্ত কার্যের জন্য রাসূল উম্মতের আমানতদার আবু উবাইদা বিন জাররাহকে প্রেরণ করেন।

বনু হানিফা প্রতিনিধি দল: এই প্রতিনিধি দল মদিনায় আগমন করেছিলেন ৯ম হিজরি সনে। মুসায়লামাতুল কাজ্জাবসহ এই দলের সদস্য সংখ্য ছিলো ১৭ জন।

মুসায়লামা বিন সুমামাহ বিন কাবীর বিন হারেসের এই দলটি একজন আনসারী সাহাবীর বাড়িতে আশ্রিত হন। অতঃপর খিদমতে নববীতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে মুসায়লামা কাজ্জাব সম্পর্কে ভিন্নমুখী বর্ণনা রয়েছে। সকল বর্ণনার সার-সংক্ষেপ সূত্রে বুঝা যায় যে, অধিনায়কত্বের বাসনা ও উৎকট অহংকারবোধের কারণে সে নবী করীম (ﷺ) এর খিদমতে হাজির হয়নি। নবী করীম (ﷺ) প্রথমাবস্থায় অত্যন্ত নম্র ও ভদ্রোচিত আচরণের মাধ্যমে তাঁর মনোতুষ্টির চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন তিনি অনুধাবন করেন ও ভদ্রোচিত আচরণ ফলোৎপাদক হবে না তখন তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, এর মধ্যে অনিষ্ঠতার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর পূর্বে নবী করীম (ﷺ) স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে পৃথিবীর ধনভাণ্ডার তাঁর নিকট এনে রাখা হয়েছে তার মধ্যে দুটি সোনার তৈরি বালা এসে তাঁর হাতে পড়েছে। এ দেখে রাসূল অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। কাজেই, ওহীর মাধ্যমে তাঁকে ঐ দুটিতে ফুক দেয়ার কথা বলা হলো। তিনি সেই মোতাবিক তাতে ফুঁক দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ তা উড়ে গেল। এ ভাবে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করলেন যে, তাঁরপরে দুই মিথ্যুকের (নিম্ন শ্রেণির মিথ্যুক) আবির্ভাব ঘটবে। কাজেই মুসায়লামা বললো যে, 'মুহাম্মদ যদি তাঁর পর আমার ওপর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাওয়ালা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে আমি তাঁর অনুসরণ করব।'

একথা শুনে রাসূল (ﷺ) তাঁর নিকট গেলেন। তখন তাঁর হাতে ছিলো একটি খেজুরের শাখা এবং তাঁর মুখপাত্র হিসেবে সঙ্গী ছিলেন সাবেত বিন কায়েস বিন শাম্মাস (রা)। মুসায়লামা নিজ সঙ্গীদের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। তাঁর মাথার ওপর গিয়ে দাঁড়ালেন এবং কথা বললেন।

এ সময় বললেন, 'আপনি যদি চান তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে আপনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেব। কিন্তু আপনার পরবর্তী অবস্থায় আমাকে নেতৃত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তখন রাসূল বললেন, '(একটি খেজুর শাখায় প্রতি ইঙ্গিত করে) যদি তুমি আমার নিকট হতে এই অংশটুকুও চাও তবুও আমি তোমাকে তা দেব না। অথচ তুমি নিজের ব্যাপারে আল্লাহর নির্ধারিত অংশের একটুও ব্যতিক্রম করতে পারবে না। যদি তুমি পশ্চাদমুখী হও, তুবও আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস করে ছাড়বেন। আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে সেই ব্যক্তিই মনে করছি, যার ব্যাপারে আমাকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। আমাকে স্বপ্নে যা দেখানো হয়েছে আমার পক্ষ থেকে সাবেত বিন আয়েস তার বিবরণ দেবেন। অতঃপর তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন।

রাসূল যা অনুধাবন করেছিলেন, ঠিক তাই হলো। মুসায়লামা কাযযাব ইয়ামামা ফিরে গিয়ে প্রথমে নিজ সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন। অতঃপর দাবি করেন যে, তাঁকে নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে নবুয়াতের কাজে শরীক করা হয়েছে। কাজেই সে নবুয়তের দাবি করতে থাকে এবং ছন্দের কবিতা রচনা করতে তাকে। নিজ সম্প্রদায়ের জন্য ব্যভিচার এবং মদ্যপান বৈধ করে দেয় এবং এসব কিছুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করে এই সাক্ষ্যও দিতে থাকে যে, মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর নবী। উক্ত ব্যক্তির প্রচারণার কারণে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে। তাঁর সম্প্রদায়ের লোকজনদের মধ্যে তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি ও মর্যাদা এত বেশি বাড়তে থাকে যে, তাকে ইয়ামামার রহমান বলা হতে থাকে।

অতঃপর রাসূলের নিকট তিনি এই মর্মে একটি পত্র লিখেন, যে আপনি যে কাজে রত আছেন আমাকে সেই কাজে আপনার শরীক করা হয়েছে, রাষ্ট্রের অর্ধেক আমাদের এবং অর্ধেক কুরাইশদের জন্য।' উত্তরে রাসূল বললেন, 'পৃথিবী আল্লাহর! নিজ বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা, তিনি তাকে তার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন এবং এর শেষ ফলাফল সমীহকারীদের জন্যই।'

ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত আছে যে, ইবনে নওয়াহা এবং ইবনে আসাল মুসায়লামার পত্র বাহক হিসেবে নবী করীম (ﷺ) নিকট আগমন করে। রাসূল তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসূল"? তারা বলল, 'আমরা সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুসায়লামা আল্লাহর রাসূল'। নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। যদি কোনো পত্র বাহককে হত্যা করা আমার নীতি হতো তাহলে তোমাদেরকেই হত্যা করতাম।'

মুসায়লামা কাযযাব ১০ম হিজরিতে নবুয়তের দাবি করেন। আবু বকরের খিলাফত আমলে ইয়ামামা যুদ্ধে দ্বাদশ হিজরি রবিউল আওয়ালে তাকে হত্যা করা হয়। তার হত্যাকারী ছিলো বীর ওয়াহশী যে অজ্ঞতার যুগে হামযাহ কে (রা) হত্যা করেছিলো।

নবুয়ওতের দাবিদার মুসায়লামা কাযযাবের পরিণতি হয়েছিলো এই। নবুয়তের দ্বিতীয় দাবিদার ছিলো আসওয়াদ আনাসী, সে ইয়েমেনে বিবাদ সৃষ্টি করে রেখেছিলো। রাসূলের ওফাত প্রাপ্তির মাত্র ২৪ ঘন্টা পূর্বে ফিরোয (রা) তাকে হত্যা করেন। অতঃপর তার সম্পর্কে নবী করীম (ﷺ) এর নিকট ওহী নাযিল হয় এবং তিনি সাহাবায়ে কিরাম (রা) কে তা অবহিত করেন। এরপর ইয়েমেন হতে আবু বকর (রা) এর নিকট নিয়মিত সংবাদ আসতে থাকে।

বনু আমের বিন সা'সাআর প্রতিনিধি দল: উক্ত প্রতিনিধি দলে আল্লাহর শত্রু আমের বিন তোফাইল, লাবীদের বৈমাত্রেয় ভাই আরবাদ বিন কায়েস, খালিদ বিন জাফর এবং জাব্বার বিন আসলাম অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এরা ছিলো নিজ নিজ কওমের নেতা এবং শয়তান প্রকৃতির লোক। আমের বিন তোফাইল ছিলো সেই ব্যক্তি যে 'বীরে মাউনায়' সত্তর জন সাহাবাকে শহীদ করিয়েছিলো। এরা যখন মদিনায় আসার ইচ্ছা করল তখন আমের এবং আরবাদ দুজনে মিলে ষড়যন্ত্র করল; প্রতারণার মাধ্যমে তারা নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে কথোপকথন আরম্ভ করল এবং আরবাদ পাশ কাটিয়ে তাঁর পিছনের দিকে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর সে তার তলোয়ার বের করে কোষমুক্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু কোষ হতে তলোয়ার এক আঙ্গুল পরিমাণ বাহির হলো না। এভাবে আল্লাহ তাঁর নবীকে হেফাযত করলেন।

নবী করীম (ﷺ) তাদের বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করলেন। যার ফলে তাদের প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে আল্লাহ আরবাদ এবং উটের ওপর বিজলী নিক্ষেপ করেন যাতে আরবাদ দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এদিকে আমের এক সরূলিয়া মহিলার নিকট অবতরণ করল। সেই সময় তার গ্রীবাদেশে একটি ফোঁড়া ওঠে এবং তার ফলে তার অবস্থার দারুণ অবনতি ঘটায় সে মৃত্যুবরণ করে। মৃত্যুর সময় সে বলতে থাকে 'আপসোস! উটের ফোঁড়ার ন্যায় ফোঁড়া এবং একজন সুলুলিয়ার মহিলার ঘরে মৃত্যু?

তোজাইব প্রতিনিধি দল: এই প্রতিনিধি দলটি নিজ কওমের সাদকার অর্থ যা ফকীরদের দেয়ার পর অতিরিক্ত ছিলো তা নিয়ে মদিনায় আগমন করেছিলো। এই দলে ১৩ (তেরো জন) লোক ছিলো, যারা কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত এবং শিক্ষা গ্রহণ করত। তারা রাসূলকে কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করে। তখন তিনি তাদেরকে সেগুলো লিখে দেন। মদিনায় স্বল্পকাল অবস্থান করে। যখন নবী করীম (ﷺ) তাদেরকে উপঢৌকন দ্বারা পুরস্কৃত করেন, তখন তারা নিজেদের এক যুবককে প্রেরণ করে। এই যুবককে তারা শিবিরে রেখে এসেছিলো। যুবক খিদমতে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করল, 'হুযুর আল্লাহর কসম! আমাকে আমার অঞ্চল থেকে এছাড়া অন্য কোনো বস্তু টেনে আনেনি যে, আপনি আমার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে দেন। রাসূল তার জন্য দু'আ করলেন। ফলশ্রুতিতে এই ব্যক্তি সব চাইতে অল্পে তুষ্ট হলো। এরা নিজ কওমের লোকজনদের নসীহত করতে থাকল এর ফলে তারাও ইসলামে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। অতঃপর এই দলভুক্ত লোকজনেরা ১০ম হিজরি বিদায় হজ্জের দ্বিতীয়বার রাসূল (ﷺ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে।

তাই প্রতিনিধি দল: এই দলের সঙ্গে আরবের প্রসিদ্ধ অশ্বারোহী যায়েদুল খাইলও ছিলেন। তাঁরা নবী করীম (ﷺ) এর সঙ্গে কথাবার্তা বলেন এবং নবী করীম তাঁদের সামনে ইসলাম উপস্থাপন করেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অনেকে খাঁটি মুসলমান হয়ে যান। রাসূল যায়েদের প্রশংসা করে বলেন, আমাকে আরবের যে কোনো লোকের প্রশংসা শুনানো হয়েছে এবং সে আমার নিকট এসেছে তখন আমি তাকে তার প্রচারকৃত প্রশংসা থেকে কম পেয়েছি। কিন্তু তার বিপরীত হচ্ছে যায়েদুল খাইল। কারণ, তাঁর খ্যাতি তাঁর প্রকৃত গুণের নিকটেই পৌঁছেনি।" অতঃপর তাঁর নাম রাখেন 'যায়েদুল খাইল'।

এমনিভাবে ৯ম ও ১০ম হিজরিতে বিভিন্ন প্রতিনিধি দল মদিনায় আগমন করতে থাকে। ইতিহাসবিদরা ইয়ামান, আযাদ, কোযায়ার বনু সা'দ, হোযাইম, বনু আমের বিন কায়েস, বনু আসাদ, বোহরা, খাওলান মুহারিব, মুযাইনাম মোরাদ, যাবীদ, কিন্দাহ, যীমারাহ, গাসসান, বনু আইশ এবং নাখ এর প্রতিনিধি দল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। নাখ এর দলই ছিলো শেষ দল, যা ১১শ হিজরির মুহাররম মাসের মধ্যে এসেছিলো। ঐ দলের সদস্য সংখ্যা ছিলো দুইশত। অবশিষ্ট অন্য দলগুলো আগমন করে ৯ম ও ১০ম হিজরিতে। অল্প কিছুসংখ্যক পরে একাদশ হিজরিতে আগমন করেছিলো।

ঐ সকল প্রতিনিধি দলের আগমন ধারা থেকেই বুঝা যায় যে, সেই সময় ইসলামি দাওয়াত কতটা বিস্তার লাভ করেছিলো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের কতটা স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছিলো। অধিকন্তু, এটাও অনুমান করা সম্ভব যে, আরববাশিরা মদিনাকে কী পরিমাণ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছিলো। এমনকি মদিনার নিকট মাথা নত করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিলো না। প্রকৃতই মদিনা সমগ্র আরব উপদ্বীপের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলো এবং মদিনাকে এড়িয়ে চলা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিলো না। অবশ্য আরব-বাশির অন্তর ইলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো এমনটি বলা হতো সঙ্গত হবে না। কারণ, তাদের মধ্যে তখনো এমন কিছু সখংক বেদুঈন ছিলো, যারা শুধুমাত্র তাদের নেতাদের অনুসরণে মুসলমান হয়েছিলো। মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের মধ্যে হত্যা এবং লুটতরাজের মনোভাব পূর্বের মতোই ছিলো। ইসলামি আদর্শের প্রভাবে তারা ততটা প্রভাবিত হয়নি। উক্ত প্রেক্ষিতে কুরআনুল কারীমের সূরা তাওবায় তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-

বেদুঈনরা কুফর ও কপটতায় কঠিনতর এবং আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর যা নাযিল করেছেন তার সীমারেখা না জানার অধিক উপযোগী। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। আর বেদুঈনদের কেউ কেউ যা [আল্লাহর পথে] ব্যয় করে, তা জরিমানা গণ্য করে এবং তোমাদের দুর্বিপাকের প্রতীক্ষায় থাকে। দুর্বিপাক তাদের উপরই এবং আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী। (সূরা তওবা: আয়াত ৯৭-৯৮)

আবার কিছু লোকের সুনামও করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে-

আর বেদুঈনদের কেউ কেউ আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং যা ব্যয় করে তাকে আল্লাহর নিকট নৈকট্য ও রাসূলের দো‘আর উপায় হিসেবে গণ্য করে। জেনে রাখ, নিশ্চয় তা তাদের জন্য নৈকট্যের মাধ্যম। অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে তাঁর রহমতে প্রবেশ করাবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা তওবা: আয়াত -৯৯)

যতদূর পর্যন্ত মক্কা, মদিনা, সাকীফ, ইয়েমেন ও বাহরাইন অধিকাংশ শহরের অধিবাসীদের সম্পর্ক বিস্তৃত ছিলো তাঁদের মধ্যে ইসলাম পূর্ণরূপে পরিপক্কতা লাভ করেছিলো এবং তাঁদের মধ্য হতেই প্রখ্যাত সাহাবা এবং নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের আর্বিভাব ঘটেছিলো।

দাওয়াতের সাফল্য ও প্রভাব

এখন আমরা রাসূল (ﷺ) এর পবিত্র জীবনের শেষ দিনগুলো আলোচনার পর্যায়ে পৌঁছেছি। কিন্তু উক্ত আলোচনার করার পূর্বে তাঁর সফল বৈচিত্র্য ও বিশিষ্ট জীবনধারা যা অন্যান্য নবী ও রাসূলদের তুলনায় তাঁকে বেশিষ্ট্যময় করে তুলেছিলো এবং প্রাধান্য প্রদান করেছিলো সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। আল্লাহ রাসূল (ﷺ) এর মাথার উপর পূর্বে ও পরের সকল নেতৃত্বের মুকুট স্থাপন করেছিলেন।

রাসূল কে বলা হলো- হে চাদর পরিধানকারী! কিছু অংশ বাদে রাত্রিতে (সালাতে) দণ্ডায়মান হও।

এবং আরো বলছেন- হে কম্বলধারী! ওঠো এবং লোকদেরকে (কঠিন পরিণতি সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শন করো।'

অতঃপর কি ছিলো? প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং এই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আমানতের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনবরত দন্ডায়মান রইলেন। অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ মান বিকাশের সুমহান দায়িত্ব, একত্ববাদে বিশ্বাসের গুরুদায়িত্ব এবং ঐশী আমানত বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিরাম সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গন্তব্যের পানে এগিয়ে চলা যা জাহেলি যুগের গাঢ় অন্ধকারে ছিলো, যা বস্তুবাদী ও বহুত্ব ভাবধারায় ছিলো দারণভাবে ভারাক্রান্ত। যা ছিলো পশু-প্রবৃত্তি ও লালসার বেড়াজালে আবদ্ধ। অতঃপর একদল অত্যন্ত বিবেক সম্পন্ন, বিশ্বস্ত ও নিবেদিত সাহাবার সহায়তায় সব কিছুকে পরাভূত ও ছিন্নভিন্ন করে ফেলে ঐশী ধ্যান-ধারণা ও আলোয় সমুজ্জ্বল এক প্রান্তরে গিয়ে যখন দন্ডায়মান হলেন তখন আরম্ভ হলো ভিন্নতর এক জীবন সংগ্রাম।

আরম্ভ হলো যুদ্ধের পর যুদ্ধ। সেই সকল শত্রুর বিরুদ্ধে যারা ইসলামের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করার পূর্বেই চেয়েছিলো তাকে ধ্বংস করে ফেলতে। দ্বীনের দাওয়াতে ঐ সকল শত্রুর সঙ্গে রাসূলকে অবিরামভাবে যুদ্ধ করতে হয়েছিলো। এবং আরব উপদ্বীপের মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই বিশাল রোমক বাহিনী এই নতুন উম্মতকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় সৈন্য মহড়া শুরু করে দেয়।

যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রসজ্জিত মুশরিক, মুনাফিক ও কাফিরদের সঙ্গেই যে তাঁকে অনবরত যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছিলো শুধু তাই নয়; রবং আরও এক ভয়ংকর এবং সার্বক্ষণিক শত্রুর সঙ্গে তাঁকে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। সেই শত্রুটি ছিলো মানব জাতির চিরশত্রু শয়তান। সে মানুষের শিরায় শিরায় বিচরণ করে মানুষকে এক গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করার জন্য সর্বত্র চক্রান্ত চালাতে থাকে। শয়তানের চক্রান্তের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে মুসলমানদের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হলেও রাসূল অত্যন্ত দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সে সবের মোকাবিলা করে সব কিছুকে নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়েছিলো। রাসূল এবং তাঁর সাহাবারা যে নিষ্ঠা, ত্যাগ, আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতার সঙ্গে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন মানব জাতির ঈতিহাসে তার কোনোই তুলনা মেলে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী করীম এর ওপর দ্বীনের দাওয়াতের যে মহাসম্মানজনক এবং মহা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন তা বাস্তবায়ন এবং প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তাঁরা এত বেশি সচেতন এবং চিন্তান্বিত থাকতেন যে আত্মচিন্তার কোনো সুযোগই থাকত না। এই ব্যাপারে জান এবং মালের কোনো ত্যাগকেই তাঁরা বড়ো করে দেখতেন না। দ্বীনের কাজে অকাতরে তাঁরা দিতেন প্রাণ এবং সর্বস্ব দিয়ে একদম নিঃস্ব হয়ে যেতে তাঁরা কখনই কুণ্ঠিত হতেন না। রাসূল (ﷺ) এর পদতলে যখন সঞ্চিত হতো সম্পদের পাহাড় সে সব আল্লাহর পথে খরচ না করে তিনি অবসর নিতেন না। তাঁর নিকট প্রাচুর্য ছিলো পরিত্যাজ্য, দারিদ্য ছিলো কাম্য। দিবাভাগে দ্বীনের দাওয়াত এবং রাষ্টীয় কর্মকান্ডে সর্বক্ষণ থাকতেন তিনি ব্যস্ত, রাত্রিবেলা দীর্ঘ সময় প্রভুর উদ্দেশ্যে থাকতেন নিবেদিত।

রাসূল এমনি ভাবে একের পর এক যুদ্ধ পরিচালনায় বিশ বছরের অধিক সময় অতিবাহিত করেন। উক্ত সময়ের মধ্যে কোনো একটি বিষয় তাঁকে অন্যান্য বিষয় হতে উদাসীন কিংবা গাফেল করতে পারেনি। আভ্যন্তরীণ এবং বহিস্থ বহু প্রতিকূলতা ও বিড়ম্বনা সত্ত্বেও স্বল্প কালের মধ্যেই ইসলামি দাওয়াতকে বিশালাতনে কৃতকার্যতা লাভ করেছিলো যে তা প্রত্যক্ষ করে বিশ্ব একেবারে স্তম্ভিত এবং হতোচকিত হয়ে পড়েছিলো। দেখতে দেখতে কয়েক বছরের মধ্যেই সমগ্র আরব ভূখন্ড থেকে জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিদূরিত হয়ে ঈমান-আমান, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, বিবেক এর আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং শিরক, কুফরী, মুনাফেকী ও মূর্তিপূজার মূল উৎপাটিত হয় এবং আরববাসীরা দাওয়াত গ্রহণপূর্বক রাসূল (ﷺ) এর অনুগত হয়ে পড়ে। আল্লাহর একত্ববাদের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং সর্বত্র মুয়াযযিনের সুরেলা কণ্ঠে দিগ্বিদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মদিনা অভিমুখী বিভিন্ন গোত্রের আনাগোনা, নব্য মুসলিমদের তাকবীর ধ্বনি এবং কুরআন তেলাওয়াতকারীদের কণ্ঠনিঃসৃত মধুর সুরে মরুপ্রান্তর মুখরিত হয়ে ওঠে।

ভিন্ন ও পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন বহুবিভক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ঐক্য সহৃদয়তা ও সমঝোতার প্লাবন প্রবাহিত হতে থাকে। মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করে মানুষ প্রবেশ করতে থাকে আল্লাহর দাসত্বে। দাসত্ব-অধীনস্থ, পরাধীন, না হাকেম না মাহকুম জালেম কিংবা মজলুম অবশিষ্ট ছিলো না। সব ভেদাভেদের হয়ে গেল অবসান। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো একমাত্র তাকওয়া। অন্যথায় সকল মানুষ আদম সন্তান এবং আদম (আ) মাটির সৃষ্টি। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো আরবি একাত্বতা, বিশ্ব মানবতার একাত্বতা এবং সামাজিক সুবিচার। পাওয়া গেল মানব জাতির সমস্যা-সংকুল পার্থির জীবনে চলার পথের সঠিক দিক নির্দেশনা এবং পরকালীন কল্যাণের মূলসূত্র। মানুষের জীবনধারায় সূচিত হলো আমূল পরিবর্তন রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রেই সূচিত হলো যুগান্তরকারী পরিবর্তন। মানব-সভ্যতা হলো মানবোচিত, ধ্যান-ধারণা, চিস্তা-চেতনা ও জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ও সৌন্দর্য-মণ্ডিত।

ইসলামি দাওয়াতের পূর্বে পৃথিবীতে ছিলো অন্ধকারের প্রাধ্যন্য পৃথিবীর পরিবেশ ছিলো দুর্গন্ধযুক্ত এবং তা ছড়িয়ে চলছিলো দুর্গন্ধ। মাপ ও পরিমাপ ছিলো অস্পষ্ট। সর্বত্র বিরাজিত ছিলো অন্যায়, দাসত্ব, শোষণ ও সন্ত্রাসের শাসন। অশান্তি, অশ্লীলতা এবং ধ্বংস-প্রবণতা পৃথিবীকে চরম অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত করছিলো। কুফর ও ভ্রষ্টতার ঘন পর্দায় ঢাকা পড়েছিলেন মানুষের সনাতন জীবনধারার শাশ্বত রূপ। অথচ আসামানি জীবন বিধান ছিলো তখনো বিদ্যমান। কিন্তু সে বিধান হয়ে পড়েছিলো বিকৃত এবং বিভ্রান্তিপূর্ণ। সে বিধানের গ্রহণীয় শক্তি গিয়েছিলো সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে। যার ফলে তা প্রাণহীন একটি লোকাচার বা রেওয়াজে পরিণত হয়েছিলো।

ইসলামি দাওয়াত যখন তার অসামান্য প্রকাশশক্তি, সর্ববাদীসম্মত ঐশী বিধি-বিধান, শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ ও আধ্যত্মিক চেতনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করল তখন প্রচলিত রেওয়াজ সর্বস্ব জীবন বিধানের অসারতা প্রমাণিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মের নামে যে অর্থহীন লোকাচার, শ্রেণীবিভেদ, অহমিকা, অস্থিরতা, শিরক ও বহুত্ববাদী, বিভ্রান্তিকর ধারণা প্রচলিত ছিলো তার অবসান ঘটল। এর ফলে আরব উপদ্বীপে এমন এক বরকতপূর্ণ পরিবেশ এবং উন্নত ও পরিচ্ছন্ন জীবনধারা সূচিত হলো ইতোপূর্বে কোনো কালেও যা দেখা যায় নি।

রাসূল (ﷺ) এর বিদায় হজ্জ

দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সম্পূর্ণ হলো এবং আল্লাহ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সার্বভৌমত্বের অস্বীকৃতি এবং মুহাম্মদ (ﷺ) এর পয়গম্বরত্বের ভিত্তির ওপর এক নতুন সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলো। অতঃপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল (ﷺ) এর নিকট আভাষ দেয়া হচ্ছিল। যে, পৃথিবীতে তাঁর অবস্থানের সময় ফুরিয়ে এসেছে। উক্তপ্রেক্ষিতে রাসূল মু'আয বিন জাবাল (রা) কে ইয়েমেনের গভর্ণর নিযুক্ত করে প্রেরণ করে দশম হিজরি সনে। তখন তাঁর বিদায় কালে অন্যান্য উপদেশাবলির সঙ্গে একথাও বললেন, 'হে মু'আয! এই বছরের পর তোমার সঙ্গে আমার হয়তো আর সাক্ষাৎ নাও হতে পারে তখন হয়তো বা আমার এই মসজিদ এবং আমার কবরের পাশ দিয়ে তোমরা যাতায়াত করবে। রাসূল (ﷺ) এর মুখ থেকে মু'আয (রা) এ কথা শুনে আসন্ন বিচ্ছেদের চিন্তায় অস্থির হয়ে কাঁদতে লাগলেন।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর নবী ইসলামি দাওয়াতের কার্যকারিতা এবং সুফল বাস্তবক্ষেত্রে দেখিয়ে দেবেন। এই দাওয়াতের কাজেই তারা অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন এবং অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বস্তুত: তাঁর এই অসাধারণ সাফল্যমন্ডিত কর্মকান্ডের অন্তিম পর্যায়ে এটাই সুসঙ্গত হবে যে, হজ্জের মৌসুমে যখন মক্কার পার্শ্ববর্তী আরব গোত্রসমূহের সদস্য ও প্রতিনিধিগণ একত্রিত হবেন তখন তাঁরা রাসূল (ﷺ) এর নিকট থেকে দ্বীনের আহ্বান এবং শরিয়তের বিধানসমূহ জেনে নেবেন এবং নবী করীম (ﷺ) তাঁদের নিকট থেকে এই সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন যে, তিনি তাঁদের নিকট আল্লাহর পবিত্র আমানত যথার্থভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, প্রভু প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন এবং উম্মতের কামনার প্রাপ্য আদায় করেছেন।

আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল যখন সেই ঐতিহাসিক হজ্জে মকবুলের জন্য তাঁর ইচ্ছা এবং কর্মসূচি ঘোষণা করলেন তখন আরবের মুসলমাসগণ দলে দলে সমবেত হতে আরম্ভ করে দিলেন। প্রত্যেকেরই ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিলো রাসূল (ﷺ) এর পদচিহ্নকে নিজ নিজ চলার পথে একমাত্র আকাক্ষিত ও অনুসরণযোগ্য দিক-দর্শন বা পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে নেবেন।

অতঃপর যিলকাদ মাসের ৪ দিন অবশিষ্ট থাকতে শনিবার দিবসে রাসূল (ﷺ) মক্কা অভিমুখে যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।

তিনি চুলে চিরুনী ব্যবহার করলেন, তেল মালিশ করলেন, পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করলেন, কুরবানির পশুগুলোকে মালার হার পরালেন এবং যোহরের নামাযের পর রওয়ানা হয়ে গেলেন। আসরের পূর্বে যুল হোলাইফা নামক স্থানে পৌঁছলেন। সেখানে আসরের দুই রাকাত নামায আদায় করলেন এবং শিবির স্থাপনপূর্বক সারারাত সেখানে অবস্থান করলেন। সকাল বেলা তিনি সাহাবা কিরামদের (রা) বললেন, 'আজ রাতে আমার প্রভুর পক্ষ হতে একজন আগন্তুক এসে বলেছেন, 'এই পবিত্র উপত্যকায় নামায আদায় করা এবং হজ্জের সঙ্গে ওমরা সংশ্লিষ্ট রয়েছে।

অতঃপর যোহরের নামাযের পূর্বে ইহরামের জন্য গোসল করলেন। এরপর আয়েশা (রা) রাসূল কে সুগন্ধি দ্রব্য মালিশ করে দিলেন। সুগন্ধির বেশ রাসূল (ﷺ) এর মাথার সিঁথী এবং দাড়িতে পরিলক্ষিত হলো, কিন্তু তিনি সেই সুগন্ধি ধৌত না করে তা স্থায়ীভাবে রেখে দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি পোশাক পরিধান করেন, চাদর গায়ে দেন এবং যোহরের নামায আদায় করেন।

এরপর নামাযের স্থানে একই সঙ্গে হজ্জ এবং ওমরার ইহরাম বেঁধে 'লাব্বায়িক' ধবনি উচ্চারণ দ্বিতীয়বার 'লাব্বায়িক ধ্বনি উচ্চারণ করেন। অতঃপর উষ্ট্রীরোহণে আরোহণ করেন এবং সেখানেও উচ্চকণ্ঠে 'লাব্বায়িক' ধ্বনি উচ্চারণ করেন।

অতঃপর মক্কা অভিমুখে ভ্রমণ অব্যাহত রাখেন। সপ্তাহকাল ব্যাপী পথ চলার পর সন্ধ্যার প্রাক্কালে রাসূল যখন মক্কার নিকটবর্তী যীতাওয়া নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন যাত্রা বিরতি করে সেখানে রাত্রি যাপন করলেন এবং ফজরের নামায আদায়ের পর গোসল করলেন। অতঃপর সকাল নাগাদ মক্কায় প্রবেশ করলেন। দিনটি ছিলো ১০ম হিজরির ৪ঠা যিলহজ্জ রবিবার। পথে তিনি দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য আট রাত কাটান।

মসজিদে হারামে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) প্রথমে কা'বা গৃহের তাওয়াফ সম্পন্ন করেন। অতঃপর সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সায়ী করেন। কিন্তু ইহরাম ভঙ্গ করেননি। কারণ হলো, হজ্জ এবং ওমরার জন্য তিনি একই সঙ্গে ইহরাম বেঁধে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে হাদী (কুরবানি পশু) ছিলো। তাওয়াফ ও সায়ী সম্পন্ন করার পর রাসূল তার মক্কার উপরিভাগে হাজুন নামক স্থানে পাশে অবস্থান করেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার হজ্জের তাওয়াফ ছাড়া আর অন্য কোনো তাওয়াফ করেননি।

সাহাবাদের মধ্যে যাঁরা কুরবানির পশু (হাদী) সঙ্গে নিয়ে আসেননি রাসূল (ﷺ) তাদেরকে নিজ নিজ ইহরাম ওমরায় পরিবর্তন করে নিতে এবং বায়তুল্লাহ তাওয়াফ ও সাফা মারওয়ান সায়ী সম্পন্ন করে নিয়ে হালাল হয়ে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু যেহেতু রাসূল নিজে হালাল হচ্ছিলেন না সেহেতু সাহাবাগণ এই ব্যাপারে ইতস্ততঃ করছিলেন রাসূল বললেন, 'আমি যা পরে জানলাম আমার ব্যাপারে আমি যদি তা আগেই জানতে পারতাম তাহলে আমি সঙ্গে হাদী আনতাম না। তাছাড়া, আমার সঙ্গে হাদী না থাকত তাহলে আমি হালাল হয়েও যেতাম। তাঁর একথা শ্রবণের পর যাঁদের সঙ্গে হাদী ছিলো না তাঁরা নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশ মেনে নিয়ে হালাল হয়ে গেলেন।

যিলহজ্জ মাসের ৮ম তারিখ তালবিয়ার দিন রাসূল মা মিনায় গমন করেন এবং তথায় ৯ই যিলহজ্জের সকাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। সেখানে যোহর, আসর, মাগরিব, এশার এবং ফজর এই পাঁচ ওয়াক্তের নামায আদায় করেন। অতঃপর সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। অতঃপর আরাফার দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং সেখানে যখন পৌঁছলেন তখন ওয়াদীয়ে নামিরায় তাঁবু প্রস্তুত হয়েছিলো। সেখানে তিনি অবতরণ করলেন। সূর্য যখন পশ্চিম দিকে চলে গেল তখন নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশে কাসওয়া নামক উষ্ট্রীয় পৃষ্টে হাওদা চাপানো হলো। এরপর তিনি বাতনে ওয়াদীতে গমন করলেন। ঐ সময় রাসূলের সঙ্গে ছিলেন এক লক্ষ চব্বিশ কিংবা এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজারের এক বিশাল জনতার ঢল। এই বিশাল জনতার উদ্দেশ্যে তিনি এক ঐতিহাসিক এবং মর্মস্পর্শী ভাষণ প্রদান করেন। সমবেত জনতাকে লক্ষ করে তিনি বলেন, 'হে সমবেত লোকরা! আমার কথা শোনো, কারণ আমি জানি না এরপর আর কোনো দিন তোমাদের সঙ্গে এই স্থানে মিলিত হতে পারব কিনা।

তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন সম্পদ অন্যদের জন্য এমনিভাবে হারাম যেমনটি তোমাদের আজকের দিন, চলতি মাস এবং এই বরকতপূর্ণ শহর হারাম রয়েছে। শুনে রাখো, অন্ধকার যুগের প্রত্যেকটি প্রথা আমার পদতলে পিস্ট হয়ে গেল। জাহেলি যুগের শোণিত প্রসঙ্গেরও পরিসমাপ্তি ঘটন। আমাদের রক্তের মধ্যে প্রথম রক্ত যা নিঃশেষ করা হয়েছে তা হচ্ছে রাবিয়া বিন হারেসের ছেলের রক্ত। এই সন্তান বনু সা'দ গোত্রে দুগ্ধ পান করছিলো এমন সময় হোজাই গোত্র তাকে হত্যা করে। অন্ধকার যুগের সুদ রহিত করা হলো, আমাদের সুদের মধ্যে প্রথম সুদ যা আমি বাজেয়াপ্ত করেছি তা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ। এখন থেকে সুদের সকল প্রকার কাজ কারবার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হলো।

তোমরা মহিলাদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে হালাল করে নিয়েছ। তাদের ওপর তোমাদের প্রাপ্য হলো তারা তোমাদের বিছানায় এমন কোনো ব্যক্তিকে আনতে দেবে না, যারা তোমাদের সহ্যের বাইরে। যদি তারা এরূপ কোনো অন্যায় করে বসে, তাহলে তাদেরকে তোমরা মারধর করতে পারবে। কিন্তু গুরুতরভাবে আঘাত করবে না। তোমাদের ওপর তাদের প্রাপ্য হলো তোমরা তাদের উত্তমরূপে খাওয়াবে ও পরাবে।

আমি তোমাদের মাঝে এমন জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা তা আকঁড়ে ধরো তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব।

হে লোকজন! স্মরণ রেখো আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না। কাজেই তোমাদের পরে অন্য উম্মতের প্রশ্নও থাকবে না। অতএব, তোমরা মহান আল্লাহর ইবাদত কর, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করো, রমযান মাসে রোযা রেখো, সন্তুষ্ট চিত্তে নিজ সম্পদের যাকাত প্রদান করো, নিজ প্রভুর ঘরে হজ্জ পালন করো এবং সৎ নেতৃত্বের অনুসরণ করো। নিষ্ঠার সঙ্গে এসব কাজ করলে ওয়াদা মোতাবিক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।

আমার সম্পর্কে যদি তোমাদের জিজ্ঞেস করা হয় তখন তোমরা কি উত্তর দেবে? সাহাবায়ে কিরাম বললেন, 'আমরা সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আপনার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আপনি যথাযথভাবে পালন করেছেন, ইসলামি দাওয়াতের যে আমানত আপনার ওপর অর্পণ করা হয়েছিলো তা যথাযথ ভাবে মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছেন এবং বান্দাদের জন্য কল্যাণ কামনার হক আদায় করেছেন।

সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর মুখ থেকে একথা শ্রবণের পর রাসূল শাহাদত আঙ্গুলটি আকাশের দিকে উত্তোলন করলেন এবং মানুষের দিকে তা নুইয়ে দিয়ে তিন বার বললেন, হে আল্লাহ! সাক্ষী থাক, হে আল্লাহ! সাক্ষী থাক।

রাসূল (ﷺ) এর বাণীসমূহকে রাবীয়া বিন উমায়া বিন খালফ উচ্চস্বরে লোকজনদের নিকট পৌঁছিয়ে দিচ্ছিলেন।

যখন তাঁর ভাষণ হতে ফারেগ হলেন তখন আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেন-

অদ্য আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম। (সূরা মায়িদা-আয়াত: ৩)

এই আয়াত শ্রবণ করা মাত্রই ওমর (রা) ক্রন্দন করতে লাগলেন। তাঁর ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, 'আমি এজন্য কাঁদছি যে, পূর্ণতার পর অসম্পূর্ণতাই তো থাকে।

নবী করীম (ﷺ) এর ভাষণের পর বেলাল (রা) প্রথমে আযান এবং পরে ইকামত বললেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যোহরের নামাযে ইমামতি করলেন। এরপর বেলাল (রা) আবারও ইকামত বললেন এবং নবী করীম (ﷺ) আসরের নামাযে ইমামতি করলেন। উক্ত দুই নামাযের মধ্যে আর কোনো নামায পড়লেন না। এর পর সওয়ারীতে আরোহণ করে রাসূল গমন করলেন। নিজ উষ্ট্রকে পাথরসমূহের দিকে করলেন এবং এবং কেবলামুখী হয়ে (একই অবস্থায়) অবস্থান করলেন। সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত এভাবে অবস্থান করলেন। সূর্যের অল্প অল্প হলুদ বর্ণ শেষ হলো, সূর্য অদৃশ্য হয়ে গেল। এরপর রাসূল উসমানকে পিছনে বসিয়ে নিয়ে এবং মুযদালেফায় গিয়ে উপস্থিত হলেন। মুযদালেফায় মাগরিব এবং এশার নামায এক বৈঠকে দুই একামতের সঙ্গে আদায় করলেন। মধ্যে কোনো নফল নামায পড়েননি। এর পর নবী করীম (ﷺ) ঘুমিয়ে পড়লেন এবং সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেন। তবে সকাল হওয়া মাত্র আযান এবং ইকামত দিয়ে ফজরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর কাসওয়ার উপর সওয়ার হয়ে মাশয়ারে হারামে গমন করলেন এবং কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর দরবারে দু'আ করলেন এবং তাকবীর, তাহলীল ও তৌহিদের বাণীসমূহ উচ্চারণ করলেন। অন্ধকার দূরীভূত হয়ে ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। অতঃপর সূর্যোদয়ের পূর্বেই মীনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এ সময় তাঁর পিছনে বসেছিলেন ফাযল বিন আব্বাস (রা)। বাতনে মোহাসসারে গিয়ে যখন পৌঁছলেন তখন সাওয়ারীকে একটু দ্রুত তাড়ালেন।

এরপর জামরায়ে কুবরার দিকে বের হয়ে সেই পথ ধরে জামরায়ে কুবরার নিকট গিয়ে পৌঁছেন। ঐ সময় সেখানে একটি বৃক্ষ ছিলো। উক্ত বৃক্ষটির জন্যও জামরায়ে কুবরা প্রসিদ্ধ ছিলো। তাছাড়া, জামরায়ে কুবরাকে জামরায়ে আকাবা এবং জামরায়ে উলাও বলা হয়। রাসূল (ﷺ) জামরায়ে কুবরায় ৭টি কংকর নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি কংকর নিক্ষেপের সময় তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন কংকরগুলো বাতনে ওয়াদী হতে দাঁড়িয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। অতঃপর রাসূল কুরবানি স্থানে গিয়ে তাঁর মুবারক হস্ত দ্বারা (৬৩) তেষট্টিটি উট যবেহ করেন। এভাবে রাসূল (ﷺ) এর নির্দেশক্রমে আলী (রা) ৩৭টি উট যবেহ করেন। এভাবে একশত উট কুরবানি করা হয়। রাসূল আলী (রা) কে তাঁর কুরবানিতে শরিক করে নেন। এরপর নবী করীম (ﷺ) এর নির্দেশে প্রত্যেকটি যবেহকৃত পশু হতে এক একটি অংশ কেটে নিয়ে রান্না করা হয়। রাসূল এবং আলী উক্ত গোশত খান ও ঝোল পান করেন।

অতঃপর নিজ সওয়ারীতে আরোহণ করে রাসূল মক্কা গমন করেন। মক্কা পৌঁছার পর তিনি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন। এই তাওয়াফকে 'তাওয়াফে ইফাযা' বলা হয়। তাওয়াফ শেষে যোহর নামায আদায় করেন। নামায শেষে জমজম কূপের নিকট বনু আব্দুল মুত্তালিবের পাশে গমন করেন, তাঁরা হাজীদেরকে জমজমের পানি পান করাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, 'বনু আব্দুল মুত্তালিব! তোমার পানি উত্তোলন কর। যদি এই আশঙ্কা না থাকত যে, পানি পান করানোর কাজে লোকজন তোমাদেরকে পরাজিত করে ফেলবে তবে আমিও তোমাদের সঙ্গে পানি উত্তোলন করতাম। অর্থাৎ, যদি সাহাবায়ে কিরাম রাসূল সমাহার কে পানি উত্তোলন করতে দেখতেন তাহলে সাহাবিগণ নিজেরাই পানি উত্তোলনের চেষ্টা করতেন। এভাবে হাজীদেরকে পানি পান করানোর মর্যাদা ও সৌভাগ্য বনু মুত্তালিবেরই রয়ে গেল। অন্যথায় এই ব্যবস্থা তাঁদের আয়ত্বে আর থাকত না। কাজেই বনু আব্দুল মোত্তালিব (রা) এক বালতি পানি উঠিয়ে দিলে তিনি তা হতে তৃপ্তিসহকারে পান করলেন।

দিনটি ছিলো যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ কুরবানির দিন উক্ত দিবস সূর্য কিছুটা ওপরে উঠলে (চাশতের সময়) রাসূল এক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণদান কালে তিনি খচ্চরের ওপর আরোহিত অবস্থায় ছিলেন এবং আলী (রা) তাঁর বাণীসমূহ সাহাবায়ে কিরাম (রা) কে শুনিয়ে দিচ্ছিলেন। কিছু সংখ্যক সাহাবা (রা) উপবিষ্ট অবস্থায় ছিলেন এবং কিছু সংখ্যক ছিলেন দণ্ডায়মান অবস্থায়। অদ্যকার ভাষণে নবী করীম (ﷺ) গত কালকের ভাষণের কিছু কিছু অংশের পুনরাবৃত্তি ১০ই যিলহজ্জ কুরবানির দিন রাসূল তাঁর ভাষণে আমাদের নিকট বললেন-

"আবর্তন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময় সেই দিনের প্রকৃতিতেই পৌঁছেছে যে দিন আসমান ও জমিনকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছিলেন। বারো মাসেই বছর হয় যার মধ্যে চারটি হলো হারাম মাস। পরস্পরাগতভাবে তিনটি অর্থাৎ যিলকদ, যিলহজ্জ এবং মুহাররম এবং একটি রজবে মুযার যা জুমাদা আখেরা এবং শাবানের মাঝে অবস্থিত।"

অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কোন মাস'? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভালো জানেন। উক্ত প্রেক্ষিতে রাসূল নীরব থাকেন। এমন কি আমরা ধারণা করলাম যে তিনি হয়তো এর নাম অন্য কিছু রাখবেন। কিন্তু তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, 'এই মাসটি কি যিলহজ্জ নয়? আমরা বললাম, 'তা কেন হবে না'? এরপর রাসূল বললেন, "এই শহরটি কোন শহর? আমরা বললাম, "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভালো জানেন'। রাসূল নীরব থাকলেন। এমন কি আমরা ধারণা করতে থাকলাম যে, এর নাম হয়তো অন্য কোনো কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, 'এই শহর কি মক্কা নয়'? আমরা বললাম তা কেন হবে না'? রাসূল আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা তবে এই দিবসটি কোন দিবস'? আমরা বললাম, "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভালো জানেন'। এতে তিনি নীরব থাকলেন। এমন কি ধারণা করতে থাকলাম যে, এর নাম হয়তো অন্য কিছু বলবেন। কিন্তু তিনি বললেন, এই দিনটি কি কুরবানির দিন নয়? ১০ই যিলহজ্জ নয়? আমরা বললাম, "অবশ্যই'। তিনি বললেন, 'তাহলে তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন সম্পদ এবং তোমদের মান-ইজ্জত পরস্পর পরস্পরের নিকট এমনভাবে হারাম যে, তোমাদের এই শহর এবং তোমাদের এই মাস, তোমাদের এই দিন তেমন হারাম।

তোমরা অতি শীঘ্রই স্বীয় প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি তোমাদের জিজ্ঞেস করবেন। অতত্রব স্মরণ রেখো, যেন আমার পরে পুনরায় পশ্চাদমুখীতা অবলম্বনের মাধ্যমে প্রথভ্রষ্ট হয়ে না যাও। অধিকন্তু তোমরা এমন কোনো কাজে লিপ্ত হবে না যার ফলে পরস্পর পরস্পরের গলা কর্তন করবে। বল; আমি কি তাবলীগের দায়িত্ব পালন করেছি? সাহাবাগণ বললেন, 'হ্যাঁ'। অতঃপর বললেন, 'হে আল্লাহ! সাক্ষী থাক' যারা এখানে উপস্থিত তাদের কর্তব্য হবে অপুনস্থিতদের নিকট এই কথাগুলো পৌঁছিয়ে দেয়া। কারণ ঐ অনুপস্থিতদের মধ্যে এমন কতকগুলো লোক থাকবে যারা এই উপস্থিত লোকদের কিছু সংখ্যকের তুলনায় আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে অধিক মাত্রায় উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।

অন্য এক বর্ণনা মতে, উক্ত ভাষণে রাসূল এ কথাও বলেছিলেন, স্মরণ রেখো! কোনো অপরাধী নিজ অপরাধের দোষ অন্যের ওপর আরোপ করতে পারবে না। (অর্থাৎ অপরাধের শাস্তি অপরাধীকে ভোগ করতে হবে। অপরাধের জন্য নিজকেই গ্রেফতার হতে হবে)। আরও স্মরণ রেখো! পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে কিংবা পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে না। স্মরণ রেখো! শয়তান নিরাশ হয়ে পড়বে কারণ এখন থেকে তোমরা খুব তুচ্ছ মনে করবে ওতেই তার অনুসরণ করা হবে এবং সে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।

এরপর রাসূল ১১, ১২, ১৩ই যিলহজ্জ (আইয়ামে তাশরীক) মীনায় অবস্থান করেন। উক্ত সময় তিনি হজ্জের নিময়-কানুন পালন করতে থাকেন এবং লোকজনকে শরীয়তের আহ্বানগুলো শিক্ষা দিতে থাকেন ও আল্লাহর যিকর করতে থাকেন। অধিকন্তু ইবরাহীমী রীতি-নীতির সুনানে হাদিসসমূহ প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন এবং শিরকের নিশানাগুলো নিশ্চিহ্ন করতে থাকেন। আইয়ামে তাশরিকের ভাষণ প্রদান করেন।

রাসূল (ﷺ) এর আজকের ভাষণও গতকালকের ভাষণের অনুরূপ ছিলো। এই ভাষণ দেয়া হয়েছিলো সূরা নাসর নাযিল হওয়ার পর। আইয়ামে তাশরীকের শেষে দ্বিতীয় ইয়াওমুন নাহারে অর্থাৎ ১৩ই জিলহজ্জ তারিখে নবী করীম (ﷺ) মীনা হতে রওয়ানা হয়ে যান এবং ওয়াদীয়ে আবতাহ এর খাইফে বনু কোনানায় অবস্থান করেন। দিবসের অবশিষ্ট সময় এবং রাত্রি তিনি তথায় অতিবাহিত করেন এবং যোহর, আসর, মাগরিব ও এশার নামায সেখানেই আদায় করেন।

এশার নামায শেষে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর সওয়ারীতে আরোহণ করে বায়তুল্লায় গমন করেন এবং তাওয়াফে বিদা' আদায় করেন। সকল মানাসেকে হজ্জ (হজ্জের নিয়ামবলি) হতে ফারেগ হয়ে রাসূল স্বীয় সওয়ারীকে মদিনা মনোয়ারাভিমুখী করলেন তাঁর মদিনামুখী হওয়ার উদ্দেশ্যে ছিলো সেখানে গিয়ে আরাম- আয়েশে গা ঢেলে দেয়া নয়; বরং উদ্দেশ্যে ছিলো আল্লাহ দ্বীনের প্রয়োজনে আর এক নব প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া।

শেষ সামরিক অভিযান: আত্মাভিমানী ও অহংকারী রোমক সম্রাটের পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব ছিলো না যে, তারা ইসলামের প্রতিষ্ঠা লাভ ও মুসলমানদের প্রাধান্য লাভকে বরদাশত করে নেবে। এ কারণে তাদের শাসনাধীন কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের জান-মাল সব কিছুই সাংঘাতিক ভাবে বিপদাপন্ন হয়ে পড়ত।

রোমক সম্রাটের এরকম সীমাহীন পক্ষপাতিত্ব এবং অর্থহীন অহংকারের প্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) ১১ হিজরি সফর মাসে বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেন এবং উসামার বিন যায়েদ বিন হাসেরা (রা) কে নেতৃত্ব প্রদান পূর্বক বালকা অঞ্চল এবং দারুমের ফিলিস্তিনি আবাসভূমিকে অশ্বারোহীদের দ্বারা পদদলিত করার নির্দেশ দিলেন। উক্ত কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে ছিলো রোমকদের মধ্যে যেন ভীতির সঞ্চার হয়ে যায়। তাদের অঞ্চলে বসবাসরত আরব গোত্রসমূহের স্থিতাবস্থান বহাল থাকে এবং কেউই যেন এই ধারণা করতে না পারে যে গীর্জা কর্তৃক অনুসৃত কঠোরতার ওপর কোনো অনুসন্ধানী নেই এবং ইসলাম কবুল করার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে দাওয়াত দেয়া।

ঐ সময় কিছু সংখ্যক লোক বাহিনী প্রধানের বয়সের স্বল্পতার কারণে তাঁর নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করে এবং উক্ত মহোদ্যমে অংশগ্রহণ করতে বিলম্ব করে। উক্ত প্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) বললেন, এর নেতৃত্বের ব্যাপারে আজ যেমন তোমরা প্রশ্ন উত্থাপন করছো ইতোপূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের ব্যাপারেও তোমাদের অনুরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলে। অথচ আল্লাহর কসম! সৈন্য পরিচালনার ব্যাপারে সে ছিলো খুবই উপযুক্ত এবং আমার প্রিয়তম ব্যক্তিদের অন্যতম।

যাহোক, সাহাবায়ে কিরাম (রা) উসামার (রা) আশে-পাশে একত্রিত হয়ে সৈন্যদলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন এবং অগ্রযাত্রার এক পর্যায়ে মদিনা হতে তিন মাইল দুরত্বে জুর্ফ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) এর অসুস্থতাজনিত কারণে অগ্রযাত্রা স্থগিত হয়ে যায় এবং আল্লাহর মীমাংসার জন্য বাহিনী অপেক্ষমান রইলেন। আল্লাহর মীমাংসায় এই বাহিনী আবু বকর (রা) এর খিলাফত আমলের প্রথম প্রেরিত সোনাবাহিনীর ভূমিকায় ভূষিত ও সম্মানিত হল।

পবিত্র জীবনের শেষ অধ্যায়, সর্বোচ্চ বন্ধুর দিকে ধাবমান

বিদায়ের লক্ষণসমূহ

যখন দীনের দাওয়াত পূর্ণতা লাভ করল, সমস্ত আরব মুসলমানদের আয়ত্বে এসে গেল, তখন রাসূল (ﷺ) এর আবেগ ও অনুভূতি, প্রবণতা ও প্রতিক্রিয়া এবং কথাবার্তা ও আচার-আচরণ হতে এমন কতগুলো লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকল, যাতে এটা ক্রমেই স্পষ্ট হতে লাগল যে, রাসূল (ﷺ) এই অস্থায়ী জীবন থেকে বিদায় নিতে এবং এই অস্থায়ী দুনিয়া অধিবাসীদেরকে বিদায় সম্ভাষণ জানাতে যাচ্ছেন। উদারহরণস্বরূপ এখানে তাঁর এতেকাফের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা যেতে পারে। সাধারণভাবে রমযান মাসে তিনি শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু ১০ হিজরিতে তিনি এতেকাফ করেন বিশ দিন।

অধিকন্তু জিবরাঈল (আ) এই বছর রাসূল কে দুবার কুরআন পুনঃপাঠ করিয়েছিলেন, যে ক্ষেত্রে অন্য বছরগুলোতে মাত্র একবার কুরআন পুনঃপাঠ করিয়েছিলেন। তাছাড়া রাসূল বিদায় হজ্জে বলেছিলেন 'আমি জানি না এই বছরের পর এই স্থানে তোমাদের সঙ্গে আর মিলিত হতে পারব কি না। জামরায়ে আকাবার নিকট বলেছিলেন, "আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়ম কানুন জেনে নাও। কারণ এবছর পর সম্ভবত আমার পক্ষে আর হজ্জ করা সম্ভব হবে না। আইয়ামের তাশরীকের মধ্যভাগে রাসূলের নিকট সূরা 'নাসর' অবতীর্ণ হয় এবং মাধ্যমে উপলব্ধি করেন যে, পৃথিবী থেকে তাঁর যাওয়ার সময় সমাগত প্রায়।

একাদশ হিজরির সফর মাসে প্রথম দিকে রাসূল ওহুদ প্রান্তে গমন করে আল্লাহর দরবারে শহীদের জন্য এমনভাবে দু'আ করেন, যেন তিনি জীবিত এবং মৃত সকলের নিকট থেকেই বিদায় গ্রহণ করছেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমি তোমাদের যাত্রীদলের প্রধান এবং তোমাদের ওপর সাক্ষী। আল্লাহর কসম! আমি এই "হাউযে কাওসার" দেখছি। আমাকে পৃথিবী এবং পৃথিবীর খাজানাসমূহের চাবি দেয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমার এই ভয় নেই যে, আমার পর তোমরা শিরক করবে। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে এই যে, পৃথিবী সম্পর্কে তোমরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।

এই সময় একদিন মধ্য রাত্রে তিনি 'জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়ে কবরবাশির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বললেন, হে কবরবাসী! তোমাদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক! দুনিয়ার মানুষ যে অবস্থায় আছে তার তুলনায় তোমাদের সেই অবস্থানই ধন্য হোক, যার মধ্যে তোমরা রয়েছো। অন্ধকার রাত্রি অংশের ন্যায় অনিষ্টতা একটির পর একটি চলে আসছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীত প্রজন্মের তুলনায় অধিক খারাপ।"

এরপর এই বলে- কবরবাসীদের সুসংবাদ প্রদান করলেন যে,"তোমাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আমরাও আসছি।"

অসুস্থতার সূচনা: একাদশ হিজরির ২৯ সফর সোমবার দিন রাসূল (ﷺ) একটি উদ্দেশ্যে জান্নাতুল বাকীতে গমন করেন। সেখান থেকে ফেরার পথেই তাঁর মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায় এবং তাঁর শরীরের তাপমাত্রা এতই বেড়ে যায় যেন মাথায় বাঁধা পট্রির ওপরেও তাপ অনুভূত হতে থাকে। এই অসুস্ততাই ছিলো তাঁর ওফাতকালীন রোগের সূচনা। এই অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি এগারো দিন পর্যন্ত নামাযে ইমামতি করেন। এই অসুস্থ অবস্থায় তিনি ১৩ কিংবা ১৪ দিন অতিবাহিত করেন।

শেষ সপ্তাহ

রাসূল (ﷺ) এর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে। উক্ত সময়ের মধ্যে তিনি তাঁর পত্নীদের জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, "আগামীকাল কোথায় থাকব?" উক্ত জিজ্ঞাসার কারণ অনুধাবন করতে পেরে বিবিগণ বললেন, "রাসূলের যেখানে ইচ্ছা সেখানে থাকতে পারবেন।" বিবিদের কথার প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) স্থান পরিবর্তন করে আয়েশার ঘরে গমন করেন। স্থান পরিবর্তনের সময় তিনি কাঁধে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিলো এবং পা মাটিতে হেঁচড়িয়ে তিনি চলছিলেন।

উক্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে নবী করীম (ﷺ) আয়েশা এর নিকট গমন করেন এবং জীবনের শেষ সপ্তাহটি সেখানেই অতিবাহিত করেন।

আয়েশা (রা) সূরা নাস ও ফালাক এবং রাসূল কর্তৃক মুখস্থকৃত দু'আ পড়ে রাসূল (ﷺ) কে ঝাঁড় ফুঁক করতে থাকেন এবং বরকতের আশায় রাসূল (ﷺ) এর শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন।

ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিন পূর্বে

ওফাত প্রাপ্তির পাঁচ দিন পূর্বে বুধবার দেহের উত্তাপ আরও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে যন্ত্রণাও আরো বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে থাকেন। এই অবস্থায় তিনি বললেন, 'আমার শরীরে বিভিন্ন কূপের সাত মশক পানি ঢাল যাতে আমি পরিস্কার হয়ে লোকজনদের নিকট গিয়ে উপদেশ দিতে পারি। উক্ত প্রেক্ষিতে রাসূল (ﷺ) কে একটি বড়ো পাত্রের মধ্যে বসিয়ে তাঁর ওপর, এত বেশি পরিমাণে পানি ঢালা হলো যে, তিনি নিজেই 'ক্ষান্ত হও' বলতে থাকলেন।

সেই সময় নবী করীম (ﷺ) এর রোগ-যন্ত্রণা কিছুটা উপশমিত হয় এবং তিনি মসজিদে গমন করেন। তখনো তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা ছিলো। তিনি মিম্বরের ওপর বসে বললেন যে, যারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে তাদের উপর অভিশাপ বর্ষিত হোক। অন্য এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, ইহুদী ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি এ কারণে যে, তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছিলো।

তিনি আরও বললেন, "তোমরা আমার কবরকে মূর্তি বানিও না এই কারণে যে, তার পূজা করা হবে।

অতঃপর রাসূল অন্যদের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করলেন এবং বললেন, 'আমি যদি কারো পিঠে কোঁড়া মেরে থাকি, তাহলে সে যেন এই পিঠে কোঁড়া মেরে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করে নেয়। আর যদি কারো ইজ্জতের ওপর কটাক্ষ করে থাকি, তাহলে আমি উপস্থিত আছি, সে যেন প্রতিশোধ নিয়ে নেয়।"

এরপর রাসূল মিম্বর হতে নিচে অবতরণ করলেন এবং যোহরের নামাযে ইমামতি করলেন। অতঃপর আবারও মিম্বরের ওপর আরোহণ করলেন এবং হিংসা ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে তাঁর পুরাতন কথাবার্তার পুনরাবৃত্তি করলেন। একজন বললেন, 'আপনার দায়িত্বে আমার তিন দিরহাম অবশিষ্ট আছে। রাসূল - ফজল বিন আব্বাস (রা) কে বললেন, 'তাঁকে পরিশোধ করে দাও'। এরপর আনসারদের সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, 'আমি তোমাদেরকে আনাসারদের সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছি। কারণ, তারা ছিলো আমার অন্তর এবং কলিজা। তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে, কিন্তু তাদের প্রাপ্যসমূহ অবশিষ্ট রয়ে গেছে, অতএব তাদের সৎ লোকদের হতে গ্রহণ করতে হবে এবং খারাপ লোকদের ক্ষমা করবে।

অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূল বললেন, 'মানুষ বৃদ্ধি পেতে থাকবে, কিন্তু আনসারগণ কমে যেতে থাকবে। এমন কি তারা হয়ে পড়বে খাবারের মধ্যে লবণের ন্যায়। অতএব তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি কোনো লাভ কিংবা ক্ষতি পৌঁছানোর কার্যে নিয়োজিত থাকবে, তখন সে যেন তাদের মধ্যকার সৎ ব্যক্তিদের নিকট থেকে গ্রহণ করে এবং অসৎ ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দেয়।

এপর রাসূল বললেন, 'এক ব্যক্তিকে আল্লাহ অধিকার প্রদান করেছেন যে, সে পৃথিবীর চাকচিক্য এবং জাঁকজমকের মধ্য থেকে যা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারে। তিনি তাকে তা প্রদান করবেন, অথবা সে আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে তাকে সে পছন্দ করবে, তখন সেই বান্দা আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে, তাই পছন্দ করে নিয়েছে।' আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনায় আছে যে, এ কথা শুনে আবু বকর (রা) কাঁদতে কাঁদতে বললেন, 'আপন পিতামাতাসহ আমরা আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত! তাঁর এই আচরণে আমরা আশ্চর্য হলাম।

লোকেরা বলল, 'এই বুড়োকে দেখ। রাসূল তো একজন বান্দা সম্পর্কে এ কথা বলেছেন যে, সে যা চাইবে তিনি তাকে তাই দেবেন অথবা আল্লাহর নিকট যা আছে, তা সে পছন্দ করে নেবে। অথচ এই বুড়ো বলেছেন যে আপন পিতামাতাসহ আমরা আপনার জন্য উৎসর্গীকৃত।' কিন্তু কয়েকদিন পর এটা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, যে বান্দাকে সেই অধিকার দেয়া হয়েছিলো তিনি স্বয়ং রাসূল, আর আবু বকর (রা) ছিলেন আমাদের মধ্যে সব চাইতে বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান।

অতঃপর রাসূল বললেন, 'স্বীয় সাহচর্য এবং ধন-সম্পদে আমার ওপর সর্বাধিক দয়া দাক্ষিণ্যের মালিক ছিলেন আবু বকর (রা) এবং আমি যদি আপন প্রভু ছাড়া অন্য কাউকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তাহলে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আছে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক। মসজিদের কোনো দরজাই অবশিষ্ট রাখা হবে না; রবং তা অবশ্যই বন্ধ করে দেয়া হবে একমাত্র আবু বকরের দরজা ছাড়া।

চার দিন পূর্বে

ওফাত প্রাপ্তির চার দিন পূর্বে বৃহস্পতিবারে যখন রাসূল কঠিন রোগযন্ত্রণার সম্মুখীন হলেন তখন বললেন, তোমরা আমার নিকট কাগজ-কলম নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য একটি নোট লিখে দিই, যাতে তোমরা আমার পরে কোনোদিনই পথ ভ্রষ্ট হবে না। ঐ সময় ঘরে কয়েক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ওমর (রা)। তিনি বললেন, আপনার ওপর রোগ যন্ত্রণার প্রাধান্য রয়েছে এবং আমাদের নিকট আল্লাহর কিতাব কুরআন রয়েছে। আল্লাহ কিতাব কুরআন আমাদের জন্য যথেষ্ট। উক্ত প্রেক্ষিতে ঘরে উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো এবং তাঁরা কথা কাটাকাটি করতে লাগলেন। কেউ কেউ বললেন 'কাগজ কলম আনা হোক এবং রাসূল যা বলবেন তা লিখে নেয়া হোক। অন্যরা ওমর (রা) এর মত সমর্থন করলেন। লোকজনদের মধ্যে যখন এভাবে কথা কাটাকাটি চলতে থাকল, তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন আমার নিকট থেকে তোমরা উঠে যাও।"

অতঃপর নবী করীম (ﷺ) সেই দিনই তিনটি উপদেশ প্রদান করলেন। এর প্রথমটি হচ্ছে, 'ইহুদী, নাসারা এবং মুশরিকদেরকে আরব উপদ্বীপ হতে বহিষ্কার করবে। দ্বিতীয়টি হলো, 'প্রতিনিধিদলকে সেভাবেই আপ্যায়ন করবে যেমনটি (আমার আমলে) করা হতো। তৃতীয় উপদেশটি বর্ণনাকারী ভুলে গিয়েছিলেন। তবে সম্ভবত সেটি ছিলো আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকার উপদেশ। অথবা তা ছিলো উসামা (রা) এর বাহিনীর কার্যক্রম বাস্তবায়নের উপদেশ। অথবা তা ছিলো, 'নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ অর্থাৎ দাসদাসীদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার উপদেশ। কঠিন অসুস্থতা সত্ত্বেও রাসূল ঐ দিন (অর্থাৎ ওফাত প্রাপ্তির চারদিন পূর্বের বহস্পতিবার) পর্যন্ত সকল নামাযেই ইমামতি করেন। উক্ত দিনে মাগরিবের নামাযেরও তিনি ইমামতি করেন এবং সূরা 'মুরসালাত' পাঠ করেন।

কিন্তু এশার নামাযের সময় অসুস্থতা এতই বৃদ্ধি পেল যে, মসজিদে যাওয়ার মতো শক্তি তার ছিলো না। আয়েশা (রা) বলেছেন, 'রাসূল (ﷺ) জিজ্ঞাসা করলেন, লোকজনেরা নামায আদায় করে নিয়েছে? আমি উত্তর দিলাম 'না, হে আল্লাহর রাসূল! তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।' রাসূল (ﷺ) বললেন, 'আমার জন্য বড়ো পাত্রে পানি দাও।' তাঁর চাহিদা মোতাবেক পানি দেয়া হলে তিনি গোসল করলেন। অতঃপর দাঁড়াতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না, অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরে পেলে তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা কিন নামায পড়ে নিয়েছে? উত্তর দিলাম, 'না, হে আল্লাহর রাসূল! তাঁরা আপনার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে।

অতঃপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারেও তিনি একই রূপ করলেন, যেমনটি প্রথমবার করেছিলেন। অবশেষে তিনি আবু বকর (রা) কে পাঠালেন নামাযে ইমামতি করার জন্য। উক্ত প্রেক্ষিতে আবু বকর (রা) ঐ দিনগুলোতে নামাযে ইমামতি করেন।

নবীর জীবদ্দশায় আবু বকর এর ইমামতিতে নামাযের সংখ্যা ছিলো সতের ওয়াক্ত।

আয়েশা (রা) তাঁর পিতা আবু বকরের পরিবর্তে অন্য কারো ওপর ইমামতির দায়িত্ব অর্পণের জন্য নবী করীম (ﷺ) এর নিকট তিন কিংবা চার বার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর এই অনুরোধের উদ্দেশ্যে ছিলো লোকেরা যেন তাঁর পিতা সম্পর্কে কোনো প্রকার খারাপ ধারণা পোষণের কোনো সুযোগ না পায়। কিন্তু নবী করীম (ﷺ) প্রত্যেকবারই তা অস্বীকার করে বললেন: তোমরা সকলেই ইউসুফ (আ) এর সঙ্গী সাথির মতই হয়ে গিয়েছো। নামাযে ইমামতি করার জন্য আবু বকরকে নির্দেশ দাও।

ওফাতের এক দিন অথবা দুই দিন পূর্বে

শনিবার কিংবা রবিবারে নবী করীম (ﷺ) কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন। কাজেই, দুই ব্যক্তির কাঁধে ভর দিয়ে যোহর নামাযের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করেন। সেই সময় আবু বকর (রা) সাহাবাদের নিয়ে নামাযের জামাতে ইমামতি করছিলেন। আবু বকর (রা) রাসূল (ﷺ) এর আগমনের আভাস পেয়ে পিছনের সারিতে আসার চেষ্টা করলে তিনি তাঁকে ইশরায় পিছে আসতে নিষেধ করে সামনেই থাকতে বললেন এবং নিজকে তাঁর ডান পাশে বসিয়ে দেয়ার জন্য সহকারীদ্বয়কে নির্দেশ দিলেন। তাই আবু বকর (রা) এর ডান পাশে তাঁকে বসিয়ে দেয়া হলো। এরপর আবু বকর (রা) রাসূল (ﷺ) এর নামাযের অনুকরণ করছিলেন এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা) কে তাকবীর শোনাচ্ছিলেন।

ওফাতের পূর্বে

ওফাত-প্রাপ্তির পূর্বের দিবস রবিবার তিনি তাঁর দাসদের মুক্ত করে দেন। তাঁর নিকটে সাতটি স্বর্ণমুদ্রা ছিলো তা সদকা করে দেন। নিজ অস্ত্রগুলো মুসলমানদের হেবা করে দেন। রাত্রি বেলা গৃহে বাতি জ্বালানের জন্য আয়েশা (আ) প্রতিবেশীর নিকট থেকে তেল ধার করে আনেন। রাসূল (ﷺ) এর একটি লৌহবর্ম ত্রিশ 'সা' (৭৫ কেজি) জবের পরিবর্তে এক ইহুদীর নিকট বন্ধক রাখা ছিলো।

পবিত্র জীবনের শেষ দিন

আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন, সোমবার দিন ফজর ওয়াক্তে আবু বকর (রা) এর ইমামতিতে সাহাবাগণ যখন নামাযে রত ছিলেন এমন সময় নবী করীম (ﷺ) আয়েশা (রা) এর ঘরের পর্দা সরিয়ে নামাযরত সাহাবাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর মৃদু হাসলেন। এদিকে আবু বকর (রা) নিজ পায়ের পিছনে ভর দিয়ে পিছনের দিকে সরে গেলেন এবং কাতারে শামিল হলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন যে রাসূল সে নামাযে শরীক হওয়ার জন্য ইচ্ছা করছেন। আনাস (রা) আরও বর্ণনা করছিলেন যে, নামাযের মাধ্যই একটি পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো (অর্থাৎ নবীকে তাঁর শারীরিক অবস্থাদি জিজ্ঞাসার জন্য নামায ভঙ্গ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছিলো।) কিন্তু রাসূল (ﷺ) হাতে ইশারায় নামায সম্পূর্ণ করে নিতে বলেন এবং ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে পর্দা নামিয়ে ফেলেন।

এরপর রাসূল (ﷺ) কোনো ওয়াক্তে নামাযের জামাতে শরীক হতে পারেননি। সকাল গড়িয়ে যখন চাশতের সময় হলো তখন নবী করীম (ﷺ) তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা) কে ডেকে তাঁর কানে কানে কিছু কথা বললেন। পিতার কথায় কন্যা এবার হাসতে লাগলেন। আয়েশা (রা) এর বর্ণনা মতে পরে আমাদের অনুরোধে ফাতেমা (রা) বললেন, নবী করীম (ﷺ) আমাকে প্রথম বার কানে কানে বললেন এই অসুখেই তাঁর ওফাত প্রাপ্তি ঘটবে। এই জন্যই আমি কাঁদলাম। দ্বিতীয় বার তিনি আমাকে কানে কানে বললেন, রাসূল মানারি এর পরিবারবর্গের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম আমিই তাঁর অনুসরণ করব। এ কারণে আমি হাসলাম।

অধিকন্তু নবী করীম (ﷺ) ফাতেমাকে এই শুভ সংবাদও প্রদান করেন, তুমি হবে মহিলা জগতের নেত্রী।

ঐ সময় রাসূল (ﷺ) যে কষ্টের সম্মুখীন তা দেখে ফাতেমা (রা) কোনো চিন্তা-ভাবনা না করেই চিৎকার করে উঠলেন 'হায় আব্বাজানের কষ্ট! নবী করীম (ﷺ) বললেন, আজকের পরে তোমার আব্বার আর কোনোই কষ্ট নেই।

নবী করীম (ﷺ) হাসান ও হোসাইন (রা) কে ডেকে নিয়ে চুম্বন করলেন এবং তাঁদের সম্পর্কে ভালো উপদেশ দিলেন। পবিত্র বিবিদেরকে আহ্বান জানালেন এবং নসীহত করলেন।

এদিকে প্রত্যেক মুহূর্তেই রোগ যন্ত্রণা বৃদ্ধি পেয়ে চলছিলো এবং সেই বিষের প্রতিক্রিয়াও পকাশ পেতে আরম্ভ করেছিলো, যা তাঁকে খায়বারে খাওয়ানো হয়েছিলো। সেই সময় তিনি বললেন হে আয়েশা! খায়বারে আমি যে খাদ্য খেয়েছিলাম এ যন্ত্রণা এখন আমি হারে হারে উপলব্ধি করছি। উক্ত বিষের প্রভাবে আমার শিরা উপশিরাসমূহের জীবন কর্তিত হচ্ছে।

অতঃপর রাসূল (ﷺ) সাহাবায়ে কিরামকে (রা) এ উপদেশ প্রদান করলেন। বললেন-

নামায, নামায এবং তোমাদের অধীনস্থ (অর্থাৎ দাসদাসী)! অর্থাৎ নামায ও দাস-দাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। এই শব্দগুলো নবী করীম (ﷺ) বারবার পুনরাবৃত্তি করেন।

অব্যাহত মৃত্যু-যন্ত্রণা

অতঃপর শুরু হলো মুত্যু-যন্ত্রণা। আয়েশা (রা) নবী করীম (ﷺ) কে নিজ দেহের ওপর ভর দিয়ে রাখলেন। তাঁর এক বর্ণনা সূত্রে জানা যায়, তিনি বলেছেন, 'আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এই যে, নবী করীম (ﷺ) আমার ঘরে, আমার বিছানায়, আমার গলা ও বুকের মাঝে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় আল্লাহ আমার লালা এবং তাঁর লালাকে একত্রিত করে দিয়েছেন। ঘটনাটি ছিলো, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর (রা) আমার শরীরে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। আমি দেখলাম যে, মিসওয়াকের প্রতি লক্ষ করছেন। অতএব, আমি বুঝে নিলাম যে তিনি মিসওয়াক চাচ্ছেন। আমি বললাম, আপনার জন্য কি মিসওয়াক নিব'? তিনি মাথা নেড়ে তা নেবার জন্য ইঙ্গিত করলেন। অতঃপর একটি মিসওয়াক নিয়ে তা রাসূল (ﷺ) কে দিলাম। তিনি তা শক্ত মনে করায় আমি বললাম, 'মিসওয়াকটি কি নরম করে দিব?' তিনি ইঙ্গিতে বললেন, 'হ্যাঁ'। আমি মিসওয়াক খানা নরম করে দিলে খুব সুন্দরভাবে তিনি মিসওয়াক করলেন। সম্মুখেই ছিলো পানি পাত্র। পানিতে দুই হাত ডুবিয়ে তিনি মুখমন্ডল মুছতে মুছতে বলছিলেন, "লা-ইলাহা-হা-ইল্লাল্লাহ" আল্লাহ ছাড়া কোনোই উপাস্য নেই। মুত্যু-যন্ত্রণা একটি অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।"

মিসওয়াক শেষে রাসূল হাত অথবা আঙ্গুল উত্তোলন করলেন এবং ছাদের দিকে দৃষ্টি তুলে ধরলেন। তাঁর ঠোট দুটো একটু নড়ে উঠল। আয়েশা (রা) কান পেতে শুনলেন, তিনি বলতেছিলেন, 'হে আল্লাহ! নবীরা, সিদ্দীকরা, শহীদরা এবং সৎ ব্যক্তিরা যাঁদের তুমি পুরস্কৃত করেছ, আমাকে তাদের দলভুক্ত কর এবং আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি তুমি অনুগ্রহণ কর। হে আল্লাহ! রফীক আ'লা।

শেষ কথাটি তিনি তিনবার পুনরাবৃত্তি করেন। সে সময় তাঁর হস্ত মুবারক অবশ হয়ে যায় এবং তাঁর একান্ত আকাঙ্ক্ষিত রফীকে আ'লার (আল্লাহর) সঙ্গে তিনি মিলিত হয়ে যান। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)।

এই ঘটনা সংঘটিত হয় একাদশ হিজরির ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার সূর্য উত্তপ্ত হওয়ার সময়। সেই সময় নবী করীম (ﷺ) এর বয়স হয়েছিলো তেষট্টি বছর চার দিন।

সীমাহীন দুঃখ বেদনা

হৃদয় বিদীর্ণকারী উক্ত দুর্ঘটনার সংবাদ তৎক্ষণাত চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। মদিনাবাসীর ওপর দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়ল। পৃথিবীর প্রান্ত এবং পার্শ্বস্থ সব কিছুই যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। আনাসের বর্ণনাতে তিনি বলেছেন যে, রাসূল যেদিন আমাদের নিকট আগমন করেছিলেন সে দিনের মতো উজ্জ্বলতম দিন আর কখনো দেখিনি এবং যে দিন তিনি মৃত্যবরণ করলেন, সে দিনের মতো এত নিকৃষ্ট এবং অন্ধকারাচ্ছান্ন দিন আর কখনো দেখিনি। রাসূল (ﷺ) এর মৃত্যুতে ফাতেমা (রা)-দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন:

হায় আব্বাজান! যিনি আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, হায় আব্বাজান! যাঁর ঠিকানা জান্নাতুল ফেরদাউস, হায় আব্বাজন! আমরা জিবরাঈলকে আপনার মৃত্যু সংবাদ জানাচ্ছি।

ওমরের অবস্থান

নবী করীম (ﷺ) এর মৃত্যু- সংবাদ শোনা মাত্র ওমর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেন, কিছু সংখ্যক মুনাফিক মনে করেছে, রাসূল মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারে হচ্ছে, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি; রবং আপন প্রতিপালকের নিকট গমন করেছেন। যেমন মূসা বিন ইমরান (আ) গমন করেছিলেন এবং নিজ সম্প্রদায়ের নিকট থেকে ৪০ রাত্রি অনুপস্থিত থাকার পর তাদের নিকট পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। অথচ প্রত্যাবর্তনের পূর্বে বলা হতো যে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহর কসম! রাসূল অবশ্যই ফিরে আসবেন এবং ঐ সকল লোকের হাত পা কেটে দেবেন, যারা মনে করছে যে প্রকৃতই তাঁর মৃত্য হয়েছে।

আবু বকরের অবস্থান

এদিকে আবু বকর (রা) সানাতে অবস্থিত নিজ বাড়ি হতে ঘোড়ায় চড়ে আগমনের পর মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন। অতঃপর লোকজনের সঙ্গে কোনো কথাবার্তা না বলে সরাসরি আয়েশা (রা) এর নিকট গমন করলেন। নবী করীম (ﷺ) এর দেহ মুবারক তখন জরীদার ইয়ামেনী চাদর দ্বারা আবৃত ছিলো। আবু বকর পবিত্র মুখমণ্ডল থেকে চাদর সরিয়ে তা চুম্বন করলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, 'আমার মাতাপিতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। আল্লাহ আপনার উপর দু'বার মৃত্যু একত্রিত করবেন না। যে মুত্যু আপনার ভাগ্যলিপি ছিলো সেটা এসে গেছে। এরপর তিনি সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। সেই সময় ওমর লোকজনদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। আবু বকর তাঁকে বললেন, ওমর বস। ওমর বসতে অস্বীকার করলেন। এদিকে সাহাবায়ে কিরাম ওমরকে ছেড়ে আবু বকরের প্রতি অধিক মনোযোগী হলেন। আবু বকর (রা) বললেন-

আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন।' (সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৪৪)

সাহাবায়ে কিরাম (রা) যাঁরা এতক্ষণ পর্যন্ত সীমাহীন দুঃখ-বেদনায় কাতর অবস্থায় নীরবতা অবলম্বন করেছিলেন, আবু বকর (রা) এর এই ভাষণ শুনার পর তাঁরা সুনিশ্চিত হলেন যে, রাসূল প্রকৃতই ওফাত প্রাপ্ত হয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, 'আল্লাহর কসম! এই ব্যাপারে এমনটি মনে হচ্ছিল যে, লোকজনেরা যেন জানতই না যে, আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। আবু বকর (রা) যখন এই আয়াত পাঠ করলেন তখন সকলেই এই আয়াত সম্পর্কে যেন নতুনভাবে ওয়াকেফহাল হলেন এবং সকলকেই এই আয়াত তেলাওয়াত করতে দেখা গেল।

সাঈদা বিন মুসায়ির (রা) বললেন, 'ওমর (রা) বলেছেন, "আল্লাহর কসম! আমি যখন আবু বকর (রা) কে এই আয়াত পাঠ করতে শুনলাম তখন আমি অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করলাম। এমনকি আমার দ্বারা আমার পা উঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। এমন কি আবু বকরকে এই আয়াত পাঠ করতে শুনে আমি মাটিতে গড়িয়ে পড়লাম। কারণ আমি তখন অনুধাবন করতে সক্ষম হলাম যে, নবী করীম (ﷺ) প্রকৃতই ইন্তিকাল করেছেন।

কাফন-দাফন

এদিকে নবী করীমের কাফন-দাফনের পূর্বেই রাসূল এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধে সৃষ্টি হলো 'সাকীফা বনু সায়েদার' মধ্যে, মুহাজেরীন ও আনসারদের মধ্যে আলোচনা বাদানুবাদ চলতে থাকল এবং দলিল প্রমাণাদি পেশ ও প্রশ্নোত্তর চলছিলো। অবশেষে আবু বকর (রা) এর প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। এর ফলে যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হয় এবং রাত্রি চলে আসে। লোকজনেরা নবী করীম (ﷺ) এর কাফন-দাফনের পরিবর্তে আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় সোমবার দিবাগত রাত্রি অতিবাহিত হয়ে সমাগত হয় মঙ্গলবার সকাল। এই সময় পর্যন্ত রাসূল এর দেহ মুবারক একটি ইয়েমেনী চাদর দ্বারা আবৃত্ত অবস্থায় বিছানায় শায়িত ছিলো। ঘরের মানুষেরা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ রেখেছিলো।

মঙ্গলবার দিন রাসূল কে কাপড়সহ গোসল দেয়া হয়। গোসল দেয়ার কাজে অংশগ্রহণ করেন আব্বাস, আলী, আববাসের দুই পুত্র ফযল এবং কুসাম, রাসূলে করীম এর আযাদকৃত গোলাম শাকরান, ওসমা বিন যায়েদ এবং আওস বিন খাওলী (রা)। আব্বাস, ফযল ও কুসাম রাসূল (ﷺ) এর পাশ পরিবর্তন করে দিচ্ছিলেন। উসামা এবং শুকরান পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন আলী ধৌত করছিলেন এবং আওস রাসূল এর দেহ মুবারককে আপন বক্ষের ওপর ভর করে নিয়ে রেখেছিলেন।

গোসলের পর তিনটি সাদা ইয়েমেনী চাদর দ্বারা রাসূল (ﷺ) এর কাফনের ব্যবস্থা করা হলো। এসবের মধ্যে জামা কিংবা পাগড়ি ছিলো না।

রাসূল (ﷺ) এর অন্তিম শয্যা সম্পর্কে সাহাবাদের (রা) মধ্যে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু আবু বকর (রা) বললেন, 'আমি নবী করীম (ﷺ) কে বলতে শুনেছি, "কোনো নবীকে পৃথিবী থেকে উঠানো হয়নি কিন্তু তাঁকে সেই স্থানে দাফন করা হয়েছে যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।" এই মীমাংসার পর রাসূল যে বিছানায় ইন্তেকাল করেছিলেন আবু তালহা তা উঠিয়ে নিলেন। অতঃপর তার নিচেই কবর খনন করা হলো।

এরপর সাহাবায়ে কিরাম (রা) পালাক্রমে দশ দশ জন করে ঘরের মধ্যে প্রবেশ পূর্বক নামাযে জানাযা আদায় করলেন। নির্ধারিত কোনো ইমামের ব্যবস্থা ছিলো না। সর্বপ্রথম নবী করীর এর পরিবার বনু হাশেমের লোকজন নামায আদায় করেন। অতঃপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য পুরুষ, মহিলা ও শিশু নামায আদায় করেন।

জানাযা আদায় করতে মঙ্গলবার দিন পুরোটাই অতিবাহিতো হয়ে যায়। মঙ্গলবার দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বুধবারের রাত্রে নবী করীম (ﷺ) এর দেহ মুবারককে সমাহিত করা হয়। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, পুরো দিনটাই নামাযের জানাযা চলার কারণে রাসূল এর দাফন সম্পর্কে আমাদের জানা ছিলো না। এই ভাবে সময় অতিবাহিত হতে থাকার পর বুধবার রাত্রের মধ্যভাগে দাফন কাফনের শব্দ কর্ণগোচর হয়।

নবী (ﷺ) এর পরিবার

নবী যে সকল মহিলার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তাঁদের সংখ্যা ছিলো এগারো। তাঁদের মধ্যে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত জীবিত ছিলেন নয় ৯ জন। নবী করীম (ﷺ) এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন দুজন। এই দুজন ছিলেন খাদীজা (রা) এবং উম্মুল মাসাকীন যয়নব বিনতে খোযায়ামা (রা)। অদিকন্তু, আরও দুই জন মহিলা সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কিনা সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। নবী করীম (ﷺ) এর পবিত্র বিবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী সম্পর্কে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা হলো।

১. খাদিজাহ বিনতে খুওয়াইলিদ (রা): হিজরতের পূর্বে মক্কায় নবী করীম (ﷺ) এর পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি এবং তাঁর প্রথমা পত্মী খাদীজা (রা)। বিয়ের সময় নবী করীম (ﷺ) এর বয়স ছিলো পঁচিশ বছর খাদীজা (রা) এর বয়স ছিলো চল্লিশ বছর। তাঁর জীবদ্দশায় রাসূল অন্য কাউকেও বিয়ে করেননি।

নবী করীম (ﷺ) এর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহীম ছাড়া পুত্র কন্যাদের সকলেই খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র সন্তানদের মধ্যে কেউই জীবিত ছিলেন না। কিন্তু কন্যা সন্তানগণ সকলেই জীবিত ছিলেন। তাঁদের নাম হচ্ছে যথাক্রমে যয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম এবং ফাতেমা (রা)। যয়নব (রা) এর বিয়ে সম্পন্ন হয় তাঁর ফুফাত ভাই আবুল আস রাবীর সঙ্গে হিজরতের পূর্বে। রোকাইয়া এবং উম্মে কুলসুম (রা) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ওসমান (রা) এর সাথে। এবং ফাতেমা (রা) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আলী বিন আবু তালিবের সঙ্গে বদর এবং উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে। ফাতেমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হাসান ও হোসাইন।

২. সাওদাহ বিনতে যাময়াহ (রা): খাদীজা (রা) এর মৃত্যুর কিছুদিন পর নবুয়তের দশম বর্ষ শাওয়াল মাসে রাসূল (ﷺ) সাওদা এর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। রাসূল সঙ্গে বিয়ের পূর্বে সাওদা (রা) তাঁর চাচাত ভাই সাকরান বিন আমরের সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর কারণে তাঁকে বিধবা হতে হয়।

৩. আয়েশা সিদ্দীকা বিনতে আবু বকর (রা): আয়েশা(রা) এর সঙ্গে নবী করীম (ﷺ) বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন নবুয়তের একাদশ বর্ষের শাওয়াল মাসে। অর্থাৎ সাওদার সঙ্গে বিয়ের এক বছর পর এবং হিজরতের দুই বছর পাঁচ মাস পূর্বে। ঐ সময় তাঁর বয়স ছিলো ছয় বছর। অতঃপর হিজরতের সাত মাস পর প্রথম হিজরির শাওয়াল মাসে তিনি স্বামীর গৃহে যান। সেই সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো নয় বছর। তিনি ছিলেন কুমারী। আয়েশা ছাড়া আর অন্য কোনো স্ত্রীকেই তিনি কুমারী অবস্থায় বিবাহ করেননি। আয়শা (রা) ছিলেন সব চাইতে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমতী।

৪. হাফসাহ বিনতে ওমর বিন খাত্তাব (রা): রাসূল তাঁর সঙ্গে তৃতীয় হিজরিতে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ছিলেন বিধবা। তাঁর পূর্ব স্বামীর নাম ছিলো খোনাইস বিন হোযাফা (রা)। বদর, উহুদ যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

৫. যয়নব বিনতে খোযায়মাহ (রা): এই মহিলার সম্পর্ক ছিলো বনু হেলাল বিন আমের বিন সা'সাহ গোত্রের সঙ্গে। মিসকিনদের প্রতি দয়া-দাক্ষিন্য, দানশীলতা ও সহানুভূতিশীল হওয়ার কারণে তার পদবী হয়েছিলো উম্মুল মাসাকীন। তার প্রথম স্বামী ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ। উহুদ যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর চতুর্থ হিজরতে রাসূল তার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে আট মাস সংসার জীবন যাত্রার পর তিনি ইন্তিকাল করেন।

৬. উম্মু সালামা বিনতে আবি উমাইয়া (রা): উম্মু সালামা বিনতে আবি উমাইয়া (রা) আবু সালামার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধা ছিলেন। আর সেখানে তার সন্তান-সন্ততিছিল। চতুর্থ হিজরির জুমাদাল আখেরা মাসে আবু সালামা মৃত্যুবরণ করলে সে বছরেই শাওয়াল মাসে রাসুল তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। বিবিগণের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি পাণ্ডিত্যের অধিকারী। ৫৯ হিজরীতে অন্যমতে ৬২ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করনে। তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৪ বছর।

৭. যয়নব বিনতে জাহাশ বিন রেয়াব (রা): এই মহিলা বনু আসাদ বিন খোয়াইমার (রা) সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন রাসূল (ﷺ) এর ফুফাতো বোন। পূর্বে তিনি যায়েদ বিন হারেসার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন, 'যাঁকে রাসূলে করীম (ﷺ) এর পুত্র মনে করা হতো। কিন্তু যায়েদের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব সৃষ্টি না হওয়ার কারণে তিনি তাঁকে তালাক দিয়েছিলেন। ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে সম্বোধন পূর্বক এই আয়াত নাযিল করেন-

আর স্মরণ কর, আল্লাহ যার উপর নিআমত দিয়েছিলেন এবং তুমিও যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে, তুমি যখন তাকে বলেছিলে ‘তোমার স্ত্রীকে নিজের কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর’। আর তুমি অন্তরে যা গোপন রাখছ আল্লাহ তা প্রকাশকারী এবং তুমি মানুষকে ভয় করছ অথচ আল্লাহই অধিকতর হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে; অতঃপর যায়েদ যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করল তখন আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম, যাতে পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে; যখন তারা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহসম্পর্ক ছিন্ন করে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকর হয়ে থাকে। (সূরা আহযাব: ৩৭)

পঞ্চম হিজরি যীলকা'দ মাসে কিংবা এর কিছু পূর্বে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে যয়নব (রা) এর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিলো।

৮. জুওয়ায়রিয়া বিনতে হারেস (রা): তাঁর পিতা ছিলেন খোযায়া গোত্রের শাখা বনু মুসতালিকের সর্দার। জুওয়ায়রিয়াকে বনু মুসতালিক গোত্রের বন্দীদের সঙ্গে ধরে আনা হয়েছিলো এবং সাবেত বিন কাইস বিন সাম্মাসের (রা) অংশ দেয়া হয়েছিলো। তিনি জুয়ায়বিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে স্বাধীন করে দেয়ার চুক্তি হয়েছিলো। উক্ত প্রেক্ষিতে চুক্তি মুতাবিক অর্থ প্রদানপূর্বক রাসূল তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিলো ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ হিজরির শাবান মাসে।

৯. উম্মে হাবীবা রামলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান (রা): প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন উবাইদুল্লাহ বিন জাহশের স্ত্রী। তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে হাবশে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে উবাইদুল্লাহ মুরতাদ হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু উম্মে হাবিবা ইসলামের মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত থাকেন। অতঃপর ৭ম হিজরির মুহাররম মাসে রাসূল যখন আমর বিন উমাইয়া যামরীকে একটি পত্রসহ সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করেন। তখন উম্মে হাবীবার সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর বিয়ের প্রস্তাবও পেশ করা হয়। উম্মে হাবীবার স্বীকৃতি গ্রহণের পর রাসূলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন করা হয় এবং শোরাহ বিন হাসানার সঙ্গে তাঁকে রাসূলের খিদমতে প্রেরণ করা হয়।

১০.সাফিয়া বিনতে হোওয়ায় বিন আখতাব (রা): এই মহিলা ছিলেন বনি ইসরাঈলের অন্তর্ভুক্ত। খায়বার যুদ্ধে তাঁকে বন্দী করা হয়। কিন্তু পত্মী হিসেবে গ্রহণের জন্য রাসূল তাঁকে মনোনিত করেন এবং তাঁকে মুক্তি প্রদানপূর্বক তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। এটি ছিলো ৭ম হিজরিতে খায়বার বিজয়ের পরের ঘটনা।

১১. মায়মুনা বিনতে হারেস (রা): তিনি ছিলেন উম্মুল ফযল লোবাবাহ বিনতে হারেসের বোন। রাসূল ৭ম হিজরিতে যিলকা'দ মাসের কাযা উমরাহ শেষ করার পর তাঁর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

উপরোক্ত এগারো জন মহিলা নবীর সাথে বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর সাহচর্য ও বন্ধুত্ব উপভোগ করেছিলেন। তাদের মধ্যে খাদিজা এবং উম্মুল মাসাকিন জয়নব (রা) নবী (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর নয়জন উম্মাহ আল-মুমিনীন জীবিত ছিলেন। এছাড়াও, আরও দুইজন মহিলার কথা জানা যায় যাদের সম্পর্কে ইতিহাসবিদদের মধ্যে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে যে নবীকে বিয়ে করেছিলেন কিনা এবং তাদের পরিচয় সম্পর্কেও।

রাসূল (ﷺ) তাঁর সংসারে দুজন দাসী রেখেছিলেন। এদের মধ্যে একজন হচ্ছে মারিয়া কিবতীয়া, যাকে মিশরের শাসক মুকাওকিস উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। এর গর্ভে রাসূল (ﷺ) এর পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন। নবী করীম (ﷺ) এর এই পুত্র ২৭ কিংবা ২৯ মে শাওয়াল ১৯তম হিজরি মোতাবিক ২৭ মে জানুয়ারি ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন।

দ্বিতীয় দাসী ছিলেন রায়হান বিনতে যায়েদ যিনি ইহুদী গোত্র বনু নাযীর কিংবা বনু কোরায়যার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ছিলেন বনু কোরায়যা যুদ্ধবন্দীদের দলভুক্ত। রাসূল তাকে নিজের জন্য মনোনীত করে নেন। তিনি রাসূল (ﷺ) এর তত্ত্বাবধানেই থাকেন। কিছু ইতিহাসবিদদের ধারণা মতে নবী করীম (ﷺ) তাঁকে মুক্ত করে দিয়ে তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন।

এই পর্যায়ে রাসূলের পবিত্র জীবনের প্রাসঙ্গিক একটি দিক সম্পর্ক চিন্তা ভাবনা এবং আলোচনার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। নবী করীম (ﷺ) তাঁর যৌবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রায় ত্রিশ বছর যাবৎ একমাত্র স্ত্রীর সাহচর্যে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর সে স্ত্রী অর্থাৎ খাদীজা (রা) ছিলেন প্রায় বিগত যৌবনা। এরপর তিনি বিয়ে করেন সওদাকে তিনিও ছিলেন বয়সী মহিলা। তবে কি এই ধারণা করা সঙ্গত কিংবা গ্রহণযোগ্য হবে যে, বার্ধ্যকের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে যৌন প্রয়োজনেই তাঁকে পরবর্তী সময়ে ৯টি স্ত্রী গ্রহণ করতে হয়? তা কখনোই হতে পারে না। রাসূলের জীবনের উভয় স্তর সম্পর্কে নিরপেক্ষতার সঙ্গে সমীক্ষা করে দেখলে কোনো বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তিই উক্ত মতকে যুক্তিযুক্ত মনে করতে পারেন না; বরং তাঁকে অবশ্যই এটা স্বীকার করতে হবে যে, নবী করীম (ﷺ) এর অধিক সংখ্যাক স্ত্রী গ্রহণের পেছনে ছিলো তাঁর নবুয়তী কার্যক্রমের মহান উদ্দেশ্যে যা ছিলো বিয়ের সাধারণ উদ্দেশ্যে থেকে অনেক মহান।

এই ব্যাখ্যাস্বরূপ এখানে উল্লেখ করা যায় যে, আয়েশা এবং হাফসা (রা) এর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে আবু বকর ও ওমর (রা) এর সঙ্গে নবী করীম (ﷺ) বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এভাবেই ওসমান (রা) কে দুই কন্যা (রোকেয়া এবং উম্মে কুলসুম) এবং আলী (রা) এর সঙ্গে কলিজার টুকরো ফাতেমা (রা) এর বিয়ে দিয়ে যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তার উদ্দেশ্যে ছিলো আল্লাহর দ্বীনের স্বার্থে এই চার জন সম্মানিত ব্যক্তির সঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা। কারণ, এই চার ব্যক্তিই ইসলামের চরম দুর্যোগপূর্ণ বিভিন্ন সময়ে কুরবানি ও আত্মত্যাগের অসামান্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন।

তৎকালীন আরবের প্রচলিত রীতি ছিলো বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব ও সম্মান প্রদান। তাদের নিকট জামাতা সম্পর্ক ছিলো অত্যন্ত সম্মানের ব্যাপার এবং জামাতার সঙ্গে যুদ্ধ করা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারটি ছিলো চরম লজ্জার ব্যাপার। প্রচলিত উক্ত পদ্ধতিতে এক মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ইসলামে বিরুদ্ধবাদী শক্তিকে সহায়ক শক্তিকে রূপান্তর করার লক্ষ্যে নবী করীম (ﷺ) একাধিক বিয়ে করেন। তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কৌশলটি ইসলামের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করে।

অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি একই নীতি অনুসরণ করেন: উম্মে সালমা (রা) ছিলেন বনী মাখযুমের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তা ছিলো আবু জাহেল এবং খালিদ বিন ওয়ালিদের গোত্র। ওহুদ যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) যে ভূমিকা ছিলো, আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবা (রা) কে যখন রাসূল বিয়ে করলেন, আবু সুফিয়ান আর তখন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেন না। অধিকন্তু, জুওয়ায়রিয়া তখন বনু মুস্তালিক এবং বনু নাযীর গোত্রের সাফিয়ান (রা) কে যখন পত্নীত্বে বরণ করে নিলেন, তখন বনু মস্তালিব এবং বনু নাযীর গোত্রের যুদ্ধভাব আর থাকলো না। এই বন্ধনের পর উক্ত গোত্রদ্বয়ের সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা অসন্তোষের তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না; বরং এই বিয়ের পর জুওয়ায়রিয়া (রা) স্বীয় সম্প্রদায়ের জন্য একজন অত্যন্ত মর্যাদা সম্পন্ন এবং বরকতময় মহিলা হিসেবে অভিহিত হন। কারণ, রাসূল (ﷺ) এর যখন তাঁর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হলেন তখন সাহাবায়ে কিরাম তাঁর পরিবারভুক্ত একজন বন্দীকে মুক্ত করে দিলেন এবং বললেন, এরা যেহেতু নবীর শ্বশুর বংশের লোক সেহেতু এদের মুক্তি দেয়া হলো। এই মুক্তি এবং বাণী তাদের অন্তরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিলো।

ঐ সকল ব্যাপারের চাইতেও যে বিষয়টি ছিলো সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, রাসূল এক বিশৃঙ্খল সম্প্রদায়ের লোকজনের শিক্ষাদীক্ষা, প্রবৃত্তিকে পবিত্র ও সুসংহত করা এবং সভ্যতা ও সামাজিক শিক্ষা দেয়ার জন্য নির্দেশিত ছিলেন। যারা ছিলো শালীনতা, সামাজিকতা ও নৈতিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত। অথচ ইসলামি সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের অবাধ সংমিশ্রণের কোনোই অবকাশ ছিলো না। যেহেতু তাদের শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ ছিলো অত্যন্ত সীমিত, সেহেতু তার প্রয়োজন ছিলো অপেক্ষাকৃত বেশি।

এই কারণে নবী করীম (ﷺ) এর সামনে একটি মাত্র পথ খোলা ছিলো, সেটি ছিলো বিভিন্ন বয়স এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এমন কতগুলো মহিলা মনোনীত করা, যাদের মাধ্যমে মহিলাদের পর তিনি তাঁদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করবেন, তাঁদের প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিকে পবিত্র করে নেবেন তাঁদেরকে শরীয়তের হুকুম-আহকাম শিক্ষা দিবেন এবং ইসলামি সভ্যতাকে সাজ-সজ্জায় এমনভাবে সজ্জিত করে তুলবেন, যাতে তাঁরা শহর এবং গ্রামের সর্বত্র গমন করে যুবতী, বৃদ্ধা সকল বয়সের নারীদের ইসলামের হুকুম আহকাম ও মাসআলা মাসায়েল শেখাতে পারেন। নবী করীম (ﷺ) এর দ্বীন প্রচার কার্যে তাঁর সুযোগ্য সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারেন। এই কারণে আমরা দেখতে পাই, মুসলিম সমাজের নারীদের নিকট ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষা ও নবীর সুন্নাত পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে উম্মাহতুল মুমিনীনদের ভূমিকা ছিলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্য থেকে যাঁরা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন এই ব্যাপারে তাঁদের ভূমিকা ছিলো অধিক গুরত্বপূর্ণ, যথা আয়েশা (রা) নবী করীম (ﷺ) এর কথা ও কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

নবী করীম (ﷺ) এর এক বিয়ে জাহেলি যুগের এমন এক প্রথার ভিত্তি মূলোৎপাটিত করেছিলো যা বহু পূর্ব থেকে চলে আসছিলো এবং একটি প্রতিষ্ঠিত সংস্কারে পরিণত হয়েছিলো। প্রথাটি ছিলো পোষ্য পুত্র সম্পর্কিত। জাহেলিয়াত যুগে পোষ্য পুত্রকে ঔরসজাত সন্তানের দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হয় এবং ঔরসজাত সন্তানের ন্যায় সে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান লাভ করত। এই প্রথার শিকড় আরব সমাজ-ব্যবস্থার অত্যন্ত গভীরে প্রেথিত ছিলো যার মূলোৎপাটন করা ছিলো অত্যন্ত দুরূহ। কিন্তু ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার উত্তরাধিকার, বিয়ে তালাক ইত্যাদি ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধনের ফলে জাহেলি যুগের সেই সকল সামাজিক ভিত্তিমূল শিথিল হতে হতে শেষ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে মূলোৎপাটিত হয়ে যায়।

এখানে এই কথাটি স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সমাজে যখন কোনো প্রথার ভিত্তি দৃঢ় হয়ে যায়, তখন শুধুমাত্র কথার দ্বারা তার মূলোৎপাটন কিংবা সংস্কার সাধন করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বস্তুত যে ব্যক্তি তার মূলোৎপাটন কিংবা পরিবর্তন সাধনে ব্রতী হন তাঁর বাস্তব কর্মপদ্ধতির নমুনা বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তির সময় মুসলমানদের পক্ষ হতে যে আচরণধারা এবং ভাবভঙ্গী প্রকাশিত হয় তা থেকে এই প্রকৃত সত্যটি মুশরিকদের দৃষ্টিপটে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই সময় মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের প্রতি উৎসর্গীকরণ এবং নবীর প্রতি যে পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয়, তাতে মুশরিকরা অভিভূত হয়ে পড়ে। উরওয়া বিন মাসউদ সাকাফী যখন প্রত্যক্ষ করল, রাসূল (ﷺ) মুখের থু থু এবং লালা সাহাবিরা গভীর আগ্রহ ভরে হাত পেতে গ্রহণ করছেন এবং রাসূল এর অযুর নিক্ষিপ্ত পানি গ্রহণের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছে, তখন তার মনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে যায়।

জী হ্যাঁ, এঁরা ছিলেন সেই সকল সাহাবা (রা) যাঁরা বৃক্ষের নিচে মৃত্যু অথবা পালিয়ে না যাবার শপথ গ্রহণের জন্য একজন অপর জনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এঁরা ছিলেন সেই সাহাবায়ে কিরাম (রা) যাঁদের মধ্যে আবু বকর ওমর (রা) এর মতো জীবন উৎসর্গকারীও বিদ্যমান ছিলেন। নবী করীম (ﷺ) এর জন্য অর্থাৎ ইসলামের স্বার্থে মৃত্যুবরণ করাকে যাঁরা চরম সৌভাগ্য এবং কামিয়াবি মনে করতেন। কিন্তু হুদায়বিয়া সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যখন তাঁদের কুরবানীর পশু যবেহ করার নির্দেশ দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নির্দেশ পালনে তাঁরা কোনো সাড়াই দিলেন না। তাঁদের এই মনোভাব প্রত্যক্ষ করে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালমা (রা) এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন কারো সঙ্গে কোনো বাক্যলাপ না করে নিজ কুরবানির পশু যবেহ করলেন, তখন তাঁর অনুসরণে নিজ নিজ কুরবানির পশু যবেহ করার জন্য সাহাবাগণ (রা) দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলেন এবং নিজ নিজ পশু যবেহ করলেন। উক্ত ঘটনা থেকেই এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। যে, প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রথার মুলোৎপাটন করার ক্ষেত্রে কথা ও কাজের প্রভাবের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু। এই কারণেই জাহেলি যুগের পৌষ্যপুত্র প্রথার বিলোপ সাধনের ব্যাপারটিকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পোষ্যপুত্রের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বিয়ের মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যম অবলম্বনের জন্য আল্লাহরর নির্দেশ প্রদান করলেন।

উক্ত বিয়ে সম্পর্ক কার্যে পরিণত হওয়া মাত্রই মুনাফিকরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বিরুদ্ধে খুব জোরে-শোরে মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু করে দিল। আর এসব প্রচার ও গুজবের ফলে কিছু সংখ্যক সরল প্রাণ মুসলমান কিছুটা প্রভাবিত হলো। আর এসব অপ-প্রচারের মূলসূত্র হিসেবে মুনাফিকরা শরিয়তের যে রীতিটি নিয়ে তোলপাড় শুরু করে দিল তা হচ্ছে, রাসূল - ৫ম বিবাহ। মুসলমানদের একই সঙ্গে চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ। যেহেতু এই বিয়ের ফলে যয়নব (রা) কে পঞ্চম স্ত্রী হিসেবে রাসূল (ﷺ) গ্রহণ করলেন, তখন তারা একটি মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল। তাছাড়া যেহেতু যায়েদকে রাসূল এর পুত্র হিসেবে গণ্য করা হতো, সেহেতু তিনি যখন যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হলেন, তখন অপ-প্রচারের জন্য তারা আরও একটি সুযোগ হাতে পেয়ে গেল। অবশেষে আল্লাহ সূরা আহযাবের কয়েকটি আয়াত নাযিল করে সমস্যার সমাধান করে দেন। এতে সাহাবায়ে কিরাম (রা) অবহিত হন যে, ইসলামে পোষ্যপুত্র সম্পর্কের কোনোই ভিত্তি কিংবা মর্যাদা নেই। অধিকন্তু এর ফলে তাঁরা এটাও উপলব্ধি করতে সক্ষম হল যে, জাহেলি যুগের একটি খারাপ রেওয়াজের মুলোৎপাটন কল্পেই একটি বিশেষ নবুয়তি ব্যবস্থা হিসেবেই আল্লাহ নবী করীম (ﷺ) এর এই বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। বিয়ের এই সংখ্যাও (৫ম) শুধু মাত্র নবী (ﷺ) এর জন্য, অন্য কারো জন্য নয়।

উম্মাহাতুল মু'মিনীনদের (রা) সঙ্গে রাসূল (ﷺ) এর বসবাসের ব্যাপারটি ছিলো অত্যন্ত ভদ্রোচিত, সুশোভন, সহৃদয়তাসম্পন্ন এবং সর্বোত্তম মর্যাদাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পবিত্র বিবিরাও (রা) ছিলেন ভদ্রতা, ধৈর্য্য-সহা, অল্পে তুষ্টি, বিনয় সেবা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার মূর্ত প্রতীক। অথচ রাসূলের জীবনযাত্রা ছিলো এমন এক স্বেচ্ছাবলম্বিত দরিদ্রতা, অভাব অনটনের, যা মেনে নেয়া কিংবা যে অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা কোনো সাধারণ মহিলাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আনাস (রা) বর্ণনা করেন, "মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যে কখনো ময়দার নরম রুটি খেয়েছেন আমার জানা নেই এবং তিনি যে কখনো স্বচক্ষে বকরির ভূনা গোস্ত দেখেছেন সে কথাও আমার জানা নেই।

আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, দুই মাস অতিবাহিত হয়ে গিয়ে তৃতীয় মাসের চাঁদ দেখা যেত অথচ রাসূলে করীম এর ঘরে আগুন জ্বলত না। উরওয়া জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আপনারা কী খেতেন?' তিনি বললেন, 'শুধু দুটি জিনিস, খেজুর এবং পানি।'

উল্লিখিত কষ্ট এবং অসচ্ছলতা সত্ত্বেও পবিত্র বিবিরা কখনই কোনো প্রকার অসন্তোষ প্রকাশ করেননি এবং এমন কোনো কথা কিংবা কাজ করেননি, যা রাসূলের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। শুধু একবার একটি ঘটনা ঘটেছিলো, যার ফলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কিছুটা বিব্রত বোধ করেছিলেন। কিন্তু সেটা মানব প্রকৃতির চাহিদার কারণেই হয়েছিলো না শরিয়তী বিধান চালু করার তাগিদে আল্লাহ অনুরূপ ক্ষেত্রে তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন তা বলা মুশকিল। উক্ত ঘটনার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ আয়াত নাযিল করেন-

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’। ‘আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’। (সূরা আহযাব: ২৮-২৯)

উক্ত আয়াতে কারীমার প্রেক্ষিতে নবী করীম (ﷺ) এর পবিত্র বিবিদের সম্পর্কে সহজেই ধারণা করা যায়, তাঁরা কতটা উন্নত রুচিসম্পন্ন এবং পদমর্যাদা সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন। পাশা পাশি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাঁরা কতটা ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন। তাঁদের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে তাঁরা পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম আয়েশের পরিবর্তে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল পারলৌকিক জীবনকেই প্রধান্য দান করেছেন। সাধারণ ক্ষেত্রে সতীনদের মধ্যে যে হিংসা-বিদ্বেষ বাদানুবাদ, কলহ কিংবা অযাচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে উম্মাহাতুল মুমেনিনদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও অনাকাঙ্ক্ষিত সেরূপ কোনো কিছু ঘটতে দেখা যায়নি। কদাচিৎ কখনো কোনো ব্যাপার ঘটলেও তারপর আর কখনো সে সবের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়নি। সূরা তাহরীমের প্রথম পাঁচটি আয়াতে সে সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে।

আচার-আচরণ ও গুণাবলি

নবী করীম (ﷺ) ছিলেন অসামান্য সৌন্দর্য মন্ডিত এবং পরিপূর্ণ স্বভাবের এমন এক ব্যক্তিত্ব, মানব সমাজে কোনো কালেও যাঁর তুলনা মেলে না। তিনি ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত এবং সর্বপ্রকার চরিত্র ভূষণে বিভূষিত এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর সংশ্রবে আসা ব্যক্তিমাত্রই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-সম্পদে হৃদয় মন পরিপূর্ণ না করে ফিরতে পারতেন না। তাঁর সাহচর্য প্রাপ্ত ব্যক্তিরাও তাঁর জানমালের হেফাজত, সেবা যত্ম এবং মান-মর্যাদা সমুন্নত রাখার ব্যাপারে এতই সচেতন ও তৎপর থাকতেন, মানব জাতির ইতহিাসে কোনো কালে এর কোনোই নজির মেলে না। শুধু তাই নয়, রাসূল দ্বীন ইসলামের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে কখনই কুণ্ঠাবোধ করতেন না।

রাসূল (ﷺ) এর বন্ধু ও সাহাবাগণও তাঁকে মহব্বত করতেন আত্মহারার সীমা পর্যন্ত। রাসূল (ﷺ) এর দেহ কিংবা মনে সামান্যতম আঁচড় লাগাটাও তাঁরা বরদাশত করতে পারতেন না। যদিও এই ব্যাপারে তাঁদের গলা কর্তন করার পর্যায়ে উপনীত হতে হতো। রাসূল (ﷺ) এর জন্য তাঁদের প্রাণাধিক এই ভক্তি ভালোবাসার কারণ ছিলো এই মানবতা বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁকে এত অধিক পূর্ণত্ব প্রদান করা হয়েছিল যা কোনো দিন কাউকেও দেয়া হয়নি। আমাদের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তিপূর্বক অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে এই পর্যায় উপরিউক্ত বিষয়সমূহের সার-সংক্ষেপ লিপিবদ্ধ করছি।

দৈহিক গঠন

হিজরতের সময় রাসূল উম্মে মা'বাদ খোযায়ীয়্যাহ নামক এক মহিলার তাঁবুর পাশ দিয়ে গমন করেন। রাসূল (ﷺ) এর গমনের পর সেই মহিলা স্বীয় স্বামীর নিকট তাঁর চেহারা মুবারকের যে বর্ণনা চিত্র তুলে ধরে ছিলেন তা হচ্ছে এইরূপ যে, ঝকঝকে গাত্রবর্ণ, সমুজ্জ্বল মুখমন্ডল, সুশোভন দেহ সৌষ্ঠব, লম্বোদর ও টেকো মাথা হতে ত্রুটিমুক্ত, সুমিষ্ট উজ্জ্বলতায় সুশোভন চিত্র, দীর্ঘ পলক বিশিষ্ট সুরম্য সুশোভিত চক্ষু, গাম্ভীর্য, নীরবতা অবলম্বন করলে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গাম্ভীর্য, অত্যন্ত আকার্ষণীয় কথার ভঙ্গি, সুমিষ্টভাষী, সুস্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন কথাবার্তা, না সংক্ষিপ্ত, না অতিরিক্ত, কথা বললে, মনে হয় কথা মালা থেকে মুক্ত ঝরছে, মানানসই মধ্যম উচ্চতা বিশিষ্ট দেহ; না অস্বাভাবিক দীর্ঘ, না খাটো, সুন্দর ও উজ্জ্বলতাপূর্ণ। বন্ধুগণ তাঁর চারপাশে গোলাকৃতি ধারণ করেন। তিনি যখন কোনো কিছু বলেন, তাঁরা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে তা শ্রবণ করেন। তাঁর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশপ্রাপ্ত হলে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করেন। আনুগত্যশীল, সম্মানিত, সুমিষ্ট ও স্বল্পভাষী।

রাসূল (ﷺ) এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে আলী (রা) বলেন, 'রাসূল বেমানান দীর্ঘকায় কিংবা হ্রস্বকায় কোনোটিই ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ দুয়ের সমন্বয়ে অত্যন্ত মানানসই মধ্যমদেহী পুরুষ। তাঁর চুলগুলো অতিরিক্ত কোঁকড়ানো ছিলো না, আবার একেবারে সোজা খাড়াও ছিলো না; রবং এ দুয়ের সমন্বয়ে ছিলো এক চমৎকার রূপভঙ্গী বিশিষ্ট। তাঁর মুখমন্ডল ছিলো গোলাকার, গাত্রবর্ণ ছিলো গোলাপী ও বাদামীর সংমিশ্রণ। চোখের পাতা ছিলো লম্বাটে গড়নের, সন্ধিসমূহ এবং স্কন্ধের হাড্ডিগুলো ছিলো বড়ো আকারের, বক্ষের উপরিভাগ থেকে নাভী পর্যন্ত ছিলো স্বল্প পশমবিশিষ্ট একটি হালকা বক্ষরেখা, শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিলো কেশ মুক্ত। হস্ত ও পদদ্বয় ছিলো মাংসল, পথ চলার সময় একটু সম্মুখভাগে ঝুঁকে পা ওঠাতেন এবং এমন ভাবে চলতেন, যা দেখে মনে হয় যেন কোনো ঢালু পথ। যখন কারো প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেন, তখন সে ব্যাপারে পুরোপুরি মনোযোগী হতেন। তাঁর পৃষ্ঠদেশে উভয় স্কন্ধের মধ্যভাগে ছিলো মোহরে নবুয়ত। রাসূল ছিলেন সর্বশেষ নবী। দানশীলতা, সাহসিকতা এবং সত্যবাদিতায় তিনি ছিলেন সকলের চাইতে অধিক। তিনি ছিলেন আমানতের সর্বাপেক্ষা অধিক হেফাজতকারী, অঙ্গীকার পালনকারী। তিনি ছিলেন সর্বাধিক কোমল স্বভাবের অধিকারী, সকলের চাইতে বিশ্বস্ত সহচর এবং নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।

কেউ আকস্মিকভাবে রাসূল (ﷺ) এর সাক্ষাৎপ্রাপ্ত হলে তার অন্তর ভয়ে কম্পিত হতো। কেউ তাঁর সঠিক পরিচয় লাভ করতে আন্তরিকতার সাথে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করত। রাসূল এর সীরাত বর্ণনাকারীরা শুধুমাত্র এটুকুই বলতে পারেন যে, তাঁর আগে এবং পরে অনুরূপ কোনো ব্যক্তিকেই তাঁর মতো দেখিনি।

আলী (রা) এর এক বর্ণনায় আছে, রাসূল এর মাথা ছিলো বড়ো, সন্ধির (জোড়ের) হাড্ডিগুলো ছিলো ভারী ভারী এবং বক্ষে ছিলো পশমের দীর্ঘ রেখা। পথ চলার সময় সামনের দিকে এমনভাবে একটু ঝুঁকে চলতেন, যাতে মনে হতো যে তিনি যেন কোনো ঢালু স্থান হতে অবতরণ করছেন।

জাবের বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) এর মুখমন্ডল ছিলো প্রশস্ত, চক্ষু ছিলো হালকা লাল বর্ণের এবং পায়ের গোড়ালি ছিলো পাতলা।

আবূ তোফায়েল বলেছেন, 'রাসূল (ﷺ) এর গাত্রবর্ণ ছিলো গৌরল, মুখমণ্ডল ছিলো অত্যন্ত সুশ্রী ও মাধুর্যমণ্ডিত এবং দেহ মুবারক ছিলো মাঝারি গড়নের।

আনাস বিন মালেক বলেছেন যে, রাসূল (ﷺ) এর হাতের তালু ছিলো প্রশস্ত, গাত্রবর্ণ ছিলো সাদা এবং বাদামীর মাঝামাঝি উজ্জ্বল। মৃত্যু পর্যন্ত চুল ও দাড়ি মুবারক তেমন সাদা হয়নি। শুধু কান এবং মাথার মধ্যবর্তী স্থানের চুলগুলো কিছুটা সাদা হয়েছিলো এবং মাথার উপরি ভাগে সাম্যন্য কিছু সংখ্যক চুল সাদা হয়েছিলো।

আবু হোযাইফা (রা) বলেছেন, 'আমি রাসূল (ﷺ) এর দাড়ির নিম্নভাগের কিছু সংখ্যক সাদা দাড়ি লক্ষ করেছি।

বারা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল এর দৈহিক গঠন ছিলো মধ্যম ধরনের। উভয় স্কন্ধের মধ্যে দূরত্ব ছিলো এবং কোশরাশি ছিলো দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত। আমি নবী সৌন্দর্যমন্ডিত পোশাকাদি পরিহিত অবস্থায় প্রত্যক্ষ করেছি। রাসূল এর চাইতে আমি সুন্দর কোনো কিছু আমি কখনো প্রত্যক্ষ করিনি।

বারা (রা) বলেছেন, 'নবী করীম (ﷺ) এর মুখ মুন্ডল ছিলো সর্বাধিক সুশ্রী এবং তাঁর আচার-আচরণ ছিলো সর্বোত্তম।

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী করীম (ﷺ) এর মুখমন্ডল কি তলোয়ারের মতো ছিলো? উত্তরে বলা হলো, 'না বরং পূর্ণ চন্দ্রের মতো ছিলো। এক বর্ণনায় আছে, রাসূল (ﷺ) এর মুখমন্ডল ছিলো গোলাকার।

রাবী বিনতে মুওয়াবে বলেছেন 'যদি তোমরা রাসূল (ﷺ) কে দেখতে তাহলে মনে হতো যে তোমরা উদিত সূর্য দেখছো।'

জাবের বিন সামুরাহ বলেছেন, 'আমি এক চাঁদনী রাতে রাসূল (ﷺ) কে দেখলাম। তাঁর ওপর লাল আভা ছড়ানো ছিলো। আমি তখন একবার রাসূল (ﷺ) এর দিকে এবং চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, চাঁদের চাইতেও তিনি অধিক সুন্দর।'

আবু হোরায়রা বর্ণনা করেছেন, "আমি রাসূলের চাইতে অধিক সুন্দর আর অন্য কোনো কিছুই দেখিনি। মনে হতো রাসূলের মুখমন্ডলে সূর্য বিরাজমান রয়েছে। অধিকন্তু আমি নবী করীম (ﷺ) এর চাইতে দ্রুত অন্য কোনো কিছুই দেখিনি। মনে হতো যে, পৃথিবীটা যেন রাসূলের জন্য গুছানো হচ্ছে। আমরা যখন নিজেরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তাম রাসূল কোনো চিন্তাই করতেন না।

কা'ব বিন মালেক বর্ণনা করেন, 'রাসূল (ﷺ) যখন প্রফুল্ল থাকতেন তখন তাঁর মুখমণ্ডল এরূপ চমকিত হতো যে, মনে হতো যেন তা চন্দ্রেরই একটি অংশ।

একদা রাসূল আয়েশা (রা) এর নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমতাবস্থায় যখন দেহ মুবারক ঘর্মাক্ত হলো তখন তাঁর মুখমন্ডল উজ্জলতায় ঝলমলিয়ে উঠল। এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আয়েশা (রা) এর নিকট আবু হোযালী এই কবিতা আবৃত্তি করলেন-

আমি যখন তাঁর মুখমণ্ডলের রেখার দিকে লক্ষ করতাম তখন তা এমনভাবে আলোকিত দেখতাম যেন দেখতাম মুষলধারে বৃষ্টির মধ্য থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

আবু বকর (রা) রাসূল (ﷺ) কে দেখে এই কবিতা আবৃত্তি করতেন-

নবী করীম (ﷺ) ছিলেন বিশ্বাসী, মনোনীত। ভালোর দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন, যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলো যা হতে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে গেছে।

ওমর (রা) কবি যোহাইয়েরের এই কবিতা আবৃত্তি করতেন-

যদি আপনি মানুষ ছাড়া অন্য কিছু হতেন, তবে আপনি স্বয়ং পূর্ণিমার রাত্রিকে আলোকিত করতেন।' অতঃপর ইরশাদ করতেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমনটিই ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন রাগান্বিত হতেন তখন তাঁর মুখমন্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ করত। মনে হতো যেন স্কন্ধদ্বয়ের ওপর ডালিমের রস সিঞ্চিত হয়েছে।

জাবের বিন সামুরাহ (রা) হতে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) এর পদদ্বয়ের গোড়ালি কিছুটা পাতলা ছিলো। তিনি যখন হাসতেন, তখন মৃদু মৃদু হাসতেন।

তাঁর চক্ষুদ্বয় ছিলো সুরমা বর্ণের। দেখে মনে হতো যেন তিনি সুরমা ব্যবহার করেছেন অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি তা ব্যবহার করেননি। ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন: রাসূল (ﷺ) এর মুখের সম্মুখ ভাগে দুটো দাঁতের মধ্যে কিছুটা ফাঁক ছিলো। তিনি যখন কথা বলতেন তখন তাঁর দাঁত দুটোর ফাঁক দিয়ে আলোর আভাস পাওয়া যেত।

রাসূল (ﷺ) এর গলা ছিলো যেন চন্দ্রের পরিচ্ছন্নতায় উজ্জ্বল একটি পুতুলের গলা। দাড়ি মুবারক ছিলো ঘন সন্নিবেশিত, ললাট প্রশস্ত, ভ্রূযুগল ছিলো বিজড়িত অথচ একটি হতে অন্যটি ছিলো পৃথক, নাসিকা সমুন্নত, গণ্ডদ্বয় ছিলো হালকা গড়নের, গর্দান থেকে নাভী পর্যন্ত ছড়ির ন্যায় বক্ষকেশের একটি সুশোভন রেখা বিদ্যমান ছিলো। সেই রেখার পশম ব্যতীত বক্ষ এবং পেটের অন্য কোথাও পশম ছিলো না। তবে হাতের কব্জি এবং স্কন্ধের ওপর পশম ছিলো। পেট এবং বক্ষের সম্মুখভাগের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বক্ষ সমতল ও প্রশস্ত প্রতীয়মান হতো। হাতের কব্জিদ্বয় কিছুটা বড়ো আকারের, হাতের তালুদ্বয় প্রশস্ত, পায়ের পাতা এবং আঙ্গুলগুলো কিছুটা বড়ো সড় আকারের ছিলো। চলার সময় সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে সহজভাবে চলতেন।

আনাস (রা) বলেছেন, 'রাসূল (ﷺ) এর হাতের তুলনায় অধিক কোমল এবং মোলায়েম রেশম কিংবা মকমল আমি স্পর্শ করিনি। অধিকন্তু, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর দেহ মুবারক নিঃসৃত সুগন্ধির তুলনায় অধিক সুগন্ধিযুক্ত কোনো আতর কিংবা মেশক আম্বরের সুগন্ধি আমি গ্রহণ করিনি।

জাবের বিন সামুরা (যিনি শিশু ছিলেন) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার গালের ওপর হাত বুলালেন তখন তাঁর হাত এত শীতল ও সুগন্ধিযুক্ত মনে হলো যে, আমার ধারণা হলো যেন কোনো আতরের দোকান হতে সবে মাত্র তিনি তাঁর হাত বের করলেন।

আনাস (রা) বলেছেন, 'নবী করীম (ﷺ) ঘর্মবিন্দু দেখতে মণিমুক্তার মতো মনে হতো এবং উম্মে সোলাইম (রা) বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঘর্মরাজি থেকে উত্তম সুগন্ধ বের হতো।

জাবের (রা) বলেছেন, 'রাসূল যখন কোনো পথ ধরে চলতেন এবং তার পর অন্য কেউ সেই পথ ধরে চলতো, 'তাঁরা (নবীর দেহ নিঃসৃত সুগন্ধি থেকে) বুঝতে পারতেন যে নবী করীম (ﷺ) এ পথে চলেছেন।

রাসূল (ﷺ) এর দুই স্কন্ধের মধ্যবর্তী স্থানে ছিলো 'মোহরে নবুয়ত'। আকার আকৃতি ছিলো কবুতরের ডিমের ন্যায় এবং তা ছিলো পবিত্র গাত্রবর্ণের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই মোহরের অবস্থিতি ছিলো বাম স্কন্ধের নরম হাড়ের নিকট। এই মোহরের ওপর ছিলো সবুজ রেখার ন্যায় তিলের সমাহার।

আত্মার পূর্ণত্ব ও আচার আচরণের আভিজাত্য

নবী করীম (ﷺ) বাগ্মীতার জন্য অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক বাকপটু ব্যক্তিত্ব। প্রয়োজনানুযায়ী সঠিক শব্দ চয়ন ও সংযোজনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বাক্যবিন্যাসের ক্ষমতা ছিলো তাঁর অসাধারণ। তৎকালীন আরবে নবী করীম (ﷺ) কে সর্বপ্রকার ভাষারীতি অনুধাবন এবং যে কোনো প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে তার যথাযথ প্রয়োগের এক দুর্লভ ক্ষমতা তাঁকে প্রদান করা হয়েছিলো। কাজেই, আরবের যে কোনো গোত্রের ভাষা অনুধাবন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে তা ব্যবহার করতে তিনি সক্ষম হতেন। একদিকে প্রত্যন্ত মুরু অঞ্চলের বেয়াড়া বেদুইনের সঙ্গে যেমন তিনি অত্যন্ত সঙ্গত পন্থায় ভাব বিনিময় করতে এবং বক্তব্য পেশ করতে সক্ষম হতেন, অন্যদিকে তেমনি আবার নগরবাসী আরবদের সঙ্গে অত্যন্ত উন্নত ও মার্জিত ভাষায় কথোপকথন ও বক্তব্য পেশ করতে সক্ষম হতেন। তাছাড়া তাঁর জন্য ছিলো ওহীর মাধ্যমে আসমানী সমর্থন।

নবী করীম (ﷺ) ছিলেন সর্বপ্রকার মানবিক গুণে গুণান্বিত এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। ধৈর্যশীলতা, সহনশীলতা, দয়ার্দ্রচিত্ততা, সংবেদন-শীলতা, পরহিতোব্রতা, ক্ষমাশীলতা ইত্যাদি। যাবতীয় মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটেছিলো তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায়। মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বহুবিধ গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিগণের মধ্যেও কোনো না কোনো দোষক্রটি পরিলক্ষিত হতো। কিন্তু রাসূলে করীম ছিলেন সকল রকম মানবিক গুণে গুণান্বিত এমন ব্যক্তিত্ব, যে ক্ষেত্রে কস্মিনকালেও কোনো ব্যাপারে সামান্যতম ত্রুটিবিচ্যুতিও পরিলক্ষিত হয়নি। এক্ষেত্রে সব চাইতে লক্ষণীয় ব্যাপার ছিলো এই যে, শত্রুদের শত্রুতা এবং দুষ্ট লোকদের দুষ্টুমির মাত্রা যতই বৃদ্ধি পেত, নবী করীমের সহনশক্তি এবং ধৈর্যশীলতা ততোধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেত।

আয়েশা (রা) বলেছেন, 'রাসূল কে যখনই দুটি কাজের অধিকার দেয়া হতো কিংবা দুটি কাজের সুযোগ তাঁর সম্মুখে উপস্থাপিত হতো, তখনই তিনি ভালে কাজ হলে সহজ ভাবে কাজটি গ্রহণ করতেন। কিন্তু কোনো প্রকার অন্যায় কিংবা পাপের কাজ হলে কখনই তা গ্রহণ করতেন না। অন্যায় কিংবা পাপের কাজ হলে সর্বপ্রথম তিনিই তা থেকেই বিরত হয়ে যেতেন। নবী করীম (ﷺ) ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি কৃত কোনো অন্যয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। কিন্তু আল্লাহর অবমাননাকর কোনো কাজ কিংবা কথার তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ক্রোধ এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করতেন।

ন্যায়সঙ্গত কোনো চুক্তি কিংবা বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে তিনিই সহজভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করতেন। সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রে তাঁর দয়া ও দানশীলতার কোনোই তুলনা মেলে না। নবী করীম (ﷺ) অভাব-অনটন এবং দরিদ্রতা বিমুক্ত মন নিয়েই সব সময় দান-খয়রাত করতেন। দান-খয়রাতের ব্যাপারে অভাব-অনটন দরিদ্রতা সম্পর্কে তাঁর মনে কখনই কোনো আশঙ্কার উদয় হতো না। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (ﷺ) ছিলেন সর্বাধিক দান-দক্ষিণার মূর্ত প্রতীক। দান দাক্ষিণার ব্যাপারে তিনি ছিলেন দরিয়ার ন্যায় উদার ও উন্মুক্ত।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর এই দানের হস্ত রমজানের মুবারকের সময় আরও অধিক প্রসারিত হতো যখন জিবরাঈল (আ) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে তাশরীফ আনয়ন করতেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যেমন রমযান মাসের প্রত্যেক রাত্রেই নবী করীম এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে জিবরাঈল (আ) আগমন করতেন এবং কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সদকা খায়রাতে অধিক অগ্রসর থাকতেন।

জাবের (রা) বলেছেন, 'এমনটি কখনোও হয়নি যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট কিছু চাওয়া হয়েছে, কিন্তু তিনি ভিক্ষুককে কোনো বস্তু দান করেননি কিংবা 'নাই' কথাটি বলেছেন।'

বীরত্ব এবং সাহসিকতায় নবী করীম (ﷺ) এর স্থান ছিলো সর্বাগ্রে। তিনি ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর পুরুষ। অত্যন্ত সংকটময় মূহূর্তে এবং সমস্যাকুল স্থানে যেক্ষেত্রে প্রখ্যাত বীর পুরুষদের পা স্থানচ্যুত হয়ে তাঁদের পশ্চাদপসরণ করতে দেখা গেছে সেরূপ ক্ষেত্রেও নবী করীম (ﷺ) স্বস্থানে অটল থেকে সম্মুখ পানে অগ্রসর হয়েছেন। সম্মুখ সমরে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অনেক বীর পুরুষদের পলায়নতা পরিলক্ষিত হয়েছে, কিন্তু নবী করীম (ﷺ) এর ক্ষেত্রে কখনই এমনটি পরিলক্ষিত হয়নি। আলী (রা) বলেছেন, 'সম্মুখ সমরে যখনই বিভীষিকাময় অবস্থার সৃষ্টি হয়ে যেত তখন আমরা রাসূল (ﷺ) আড়ালে আশ্রয় গ্রহণ করতাম। কোনো শত্রুই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকটবর্তী হওয়ার সাহস পেত না।'

আনাস (রা) বলেছেন, 'মদিনা বাশিরা বিকট এক শব্দ শুনে এক রাত্রে কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। শব্দ শোনার পর শব্দের উৎপত্তিস্থলের দিকে দৌড় দিয়ে যেতে থাকলেন। পরে রাসূল (ﷺ) এর সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হলো। শব্দ শুনে পূবাহ্নে তিনি লক্ষস্থলে গমন করেছিলেন, খোঁজ খবর নেয়ার উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ সময় আবু তালহা (রা) এর একটি পালনবিহীন ঘোড়ার ওপর আরোহিত ছিলেন। তাঁর স্কন্ধদেশে তরবারী কোষবদ্ধ অবস্থায় ছিলো। তিনি লোকজনদের বললেন, "ভয়ের কিছুই নেই, তোমরা নিশ্চিন্ত থাক।" এটি হচ্ছে তাঁর নির্ভিকচিত্ততার এক জ্বলন্ত প্রমান।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছিলেন সব চাইতে লজ্জাশীল এবং অবনত দৃষ্টিসম্পন্ন। আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেছেন যে, 'রাসূল পর্দানশীনা কুমারীর চাইতেও অধিক মাত্রার লজ্জাশীল ছিলেন। তিনি যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন কিংবা কোনো কিছু তাঁর অসহনীয় মনে হতো, তাঁর মুখমন্ডলেই তা প্রকাশ পেয়ে যেত।'

রাসূল কখনই নিজ দৃষ্টি অন্যের ওপর নিক্ষেপ করে অধিকক্ষণ ধরে রাখতেন না। তিনি সব সময়ই দৃষ্টি নিচের দিকে রাখতেন এবং আকাশের দিকে রাখার চাইতে মাটির দিকে দৃষ্টি রাখাটাই তিনি অধিক পছন্দ করতেন। সাধারণত দৃষ্টি নিম্নমুখী রেখেই তিনি কোনো কিছু দেখতেন। লজ্জাপ্রবলতা তাঁর মধ্যে এত অধিক ছিলো যে, কোনো অপছন্দনীয় কথা কাউকেও তিনি মুখোমুখি বলতেন না। তাছাড়া কারো কোনো অসহনীয় কথা রাসূল (ﷺ) এর কান পর্যন্ত পৌঁছতই না। তবে নাম উল্লেখ না করে এই ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করা হতো। বলা হতো, এ কেমন কথা যে, কিছু লোক এরূপ বলাবলি করছে। ফারাজদাকের নিম্নোক্ত কবিতার তুলনা বিশুদ্ধভাবে রাসূল নিজেই ছিলেন।

লজ্জাশীলতার কারণে তিনি নবী দৃষ্টি নিচু রাখতেন এবং তাঁর ভয়ে অন্যরা দৃষ্টি নিচু রাখতেন। তিনি যখন মৃদু হাসতেন, কেবলমাত্র তখনই তাঁর সঙ্গে কথোকপথন করা হতো।

রাসূল ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ন্যায়বিচারক, সর্বাধিক পবিত্র, সর্বাধিক সত্যাবাদী এবং সব চাইতে নির্ভরযোগ্য আমানতদার। তাঁর এই গুণাবলির কথা মুসলিমরাতো বটেই শত্রুরাও এক বাক্যে স্বীকার করে থাকেন। নবুয়াতের পূর্বে জাহেলি যুগে তাঁকে আমীন (বিশ্বাসী) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিলো। সেই যুগেও বিরোধের ন্যায়সঙ্গত মীমাংসার উদ্দেশ্যে লোকেরা তাঁর নিকট আসত। জামে তিরমিযীতে আলী (রা) হতে বর্ণিত। একবার রাসূল এর নিকট আবু জাহল এসে বলল, 'আমরা আপনাকে মিথ্যুক বলছি না, তবে আপনি যা এনেছেন, তাকে মিথ্যা বলছি। উক্ত প্রেক্ষিতে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন।

কেননা, এই লোকজনেরা আপনাকে মিথ্যা বলে না; বরং এই জালেমেরা আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করছে। (সূরা আল আনআম: আয়াত-৩৩)

রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, নবী সম্পর্কে তোমরা যে সব কথা বলছ, তার পূর্বে কি তোমরা তাঁকে মিথ্যাবাদী হিসেবে পেয়েছো? তখন আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, না'।

নবী করীম (ﷺ) ছিলেন সব চাইতে বিনয়ী। তাঁর আচার-আচরণে অহংকার কিংবা আত্মম্ভরিতার কোনোই ঠাঁই ছিলো না। শাসক বা সম্রাটগণ যেভাবে খাদেম বা সেবকদের সঙ্গে আচরণ করে থাকেন তিনি তাঁর সাহাবা কিংবা সেবকগণের সঙ্গে কখনোই সেরূপ আচরণ করতেন না। তিনি তাঁর সাহাবাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন এবং দাওয়াত কবুল করতেন। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে এবং সাধারণভাবেই তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন এবং তাঁর ও সাহাবাদের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যবধান থাকত না। আয়েশা (রা) বলেছেন, তিনি নিজেই জুতো সেলাই করতেন। জুতোয় পট্টি লাগাতেন এবং নিজের কাপড়-চোপড় নিজেই সেলাই করতেন। একজন সাধারণ মানুষের ন্যায় সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম তিনি নিজেই সম্পন্ন করতেন। তিনি হাতে ছাগী দোহন করতেন, কাপড় থেকে উকুন বেছে নিতেন এবং কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করতেন।

পথে চলতে গিয়ে কাউকেও তিনি পিছনে ফেলে যেতেন না। তাছাড়া, পানাহারের ব্যাপারে আপন দাসদাসীদের নিকট তিনি কখনই অহংকার করতেন না। স্বীয় সেবকদের উদ্দেশ্যে তিনি তাদের কাজ কর্মে সাহায্য করতেন। স্বীয় সেবকদের কাজকর্মের কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি কখনই 'উহ' শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি কিংবা নিন্দা করেননি। তিনি অনাথ ও অসহায়দের ভালোবাসতেন, তাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন এবং তাদের জানাযায় উপস্থিত থাকতেন। দরিদ্রতার কারণে কোনো দরিদ্রকে তিনি দীন-হীন মনে করতেন না।

একদা নবী করীম (ﷺ) এর সফরে থাকা অবস্থায় একটি ছাগল যবেহ করে তা রান্নাবান্নার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, একজন সাহাবী বললেন, 'যবেহ করার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাবে।' দ্বিতীয়জন বললেন, 'ওর চামড়া ছড়ানো আমার ওপর।' নবী করীম (ﷺ) বললেন, 'জ্বালানী সংগ্রহ আমার দায়িত্বে থাকবে।' সাহাবায়ে কিরাম (রা) নিবেদন করলেন, 'আপনার কাজটা আমরাই করে দিব।' তিনি বলেন, 'আমি জানি যে তোমরাই আমার কাজটা করে দেবে।'

কিন্তু আমি এটা পছন্দ করি না যে, আমার ও তোমাদের মাঝে কোনো পার্থক্য বা দূরত্ব শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে। অতঃপর তিনি জ্বালানী একত্রীকরণের কাজে রত হয়ে গেলেন।

হিন্দ বিন আলী হালহর বর্ণনা

হিন্দ এক দীর্ঘ বর্ণনায় বলেছেন, 'রাসূল (ﷺ) একের পর এক কতকগুলো দুশ্চিস্তায় ভূগছিলেন।

সর্বক্ষণ চিন্তাগ্রস্ত থাকার কারণে তাঁর মানসিক শান্তি স্বস্তির যথেষ্ট অভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তিনি কথাবার্তা তেমন বলতেন না। দীর্ঘক্ষণ যাবৎ নীরব থাকতেন। তবে কথা যা বলতেন, তা সম্পূর্ণ এবং সুস্পষ্ট ভাবেই বলতেন। তাঁর কথাবার্তার মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা অসম্পূর্ণ কোনো কথাবার্তা থাকত না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল স্বভাবের, মিষ্টভাষী এবং কৃতজ্ঞ ব্যক্তি। সামান্য অনুগ্রহেরও তিনি বড়োই কদর করতেন। কোনো ব্যাপারেই তিনি কারো নিন্দা করতেন না কিংবা অসাক্ষাতে কিছু বলতেন না।

নবী করীম (ﷺ) উঠতে বসতে সর্বক্ষণ আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন। সঙ্গী-সাথিদের প্রত্যেককেই ন্যায্য অংশ প্রদান করতেন। তিনি কখনোই কাউকেও এমনটি ধারণা করার সুযোগ দেননি যে, নবী করীম (ﷺ) এর নিকট অমুকের তুলনায় অমুক অধিক সম্মানিত।

কোনো খাদ্যদ্রব্যকে তিনি কখনো খারাপ বলতেন না। সত্য সম্পর্কিত প্রশংসায় কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে যতক্ষণ তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ না করতেন ততক্ষণ তাঁর ক্রোধ স্তিমিত হতো না। তবে, নিশ্চিতরূপে তিনি প্রশস্ত অন্তরের অধিকারী ছিলেন। ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারে তিনি ক্রোধান্বিত হতেন না, প্রতিশোধও গ্রহণ করতেন না। কোনো কিছুর জন্য যখন হাত দিয়ে ইশারা করতেন তখন পুরো হাত ব্যবহার করতেন। কোনো ব্যাপারে অবাক হওয়ার সময় হাত ফিরাতেন। যখন রাগান্বিত হতেন তখন চেহারা মুবারকের রঙ পরিবর্তিত হয়ে যেত। যখন সন্তুষ্ট হতেন তখন দৃষ্টি নিম্নমুখী হয়ে যেত। হাসির প্রয়োজনে রাসূল মৃদু হাসতেন। হাসির সময় দাঁতগুলো বরফের ন্যায় চমকাতে থাকত।

অনর্থক কথাবার্তার ক্ষেত্রে তিনি মুখ বন্ধ রাখতেন। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে তিনি সব সময় সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তিদের তিনি সম্মান করতেন এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করতেন। মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন সব কার্যকলাপ থেকে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এজন্য কারো নিকট তিনি নিজকে হেয় প্রতিপন্ন করতেন না।

রাসূল সঙ্গী-সাথিদের খবর রাখতেন এবং মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। ভালো জিনিসের প্রশংসা ভালো কাজের সুফল এবং খারাপ জিনিসের মন্দ প্রভাব ও খারাপ কাজের কুফল সম্পর্কে বলতেন এবং সর্বক্ষেত্রেই সততা ও সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করতেন। কোনো ব্যাপারেই তিনি অমনোযোগী থাকতেন না, যেন আল্লাহ না করুন লোকেরাও অমনোযোগী এবং আত্ম-সম্মোহিত হয়ে না পড়ে। যে কোনো প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে তৎপরতা অবলম্বনের জন্য তিনি সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকতেন। কোনো সত্যকেই তিনি ক্ষুদ্র ভাবতেন না। কোনো অসত্য, অন্যায় কিংবা অসুন্দরকে তিনি কখনই সমর্থন করতেন না। যাঁরা 'রাসূল (ﷺ) এর সংস্পর্শে থাকতেন, তাঁরা ছিলেন সর্বোত্তম শ্রেণীভুক্ত। এঁদের মধ্যে আবার তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, সকলের মঙ্গলকামী। 'রাসূলের নিকট তিনিই ছিলেন সর্বোচ্চ সম্মানে অধিকারী, যিনি সাহায্য ও সহানুভূতিতে ছিলেন সবার চাইতে অগ্রগামী।

যখন তাঁর নিকট কোনো লোক কোনো প্রয়োজনে বসতেন কিংবা দাঁড়াতেন তিনি ধৈর্য্য সহকারে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতেন যতক্ষণ না তারা নিজেরাই ফিরে না যায়। যখন তাঁর নিকট কোনো বস্তু চাওয়া হতো তিনি তা দিয়ে দিতেন অন্যথায় ভালো কথা বলে বিদায় করতেন। তিনি সহাস্য বদনে সকলকে আপ্যায়ন করতেন।

রাসূল ছিলেন সকলের জন্যই পিতৃসমতুল্য এবং সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন। তাঁর নিকট অন্যদের মর্যাদার ভিত্তি ছিলো তাকওয়া বা পরহেযগারী। তাঁর বৈঠক ছিলো ধৈর্য, লজ্জা, শিক্ষা এবং বিশ্বাসের বৈঠক। স্বাভাবিক কথোপকথন কিংবা আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্রে কখনই তিনি উচ্চ কণ্ঠ ব্যবহার করতেন না। কারো মান-মর্যাদার হানিকর কোনো কথাবার্তা তিনি কখনই বলতেন না। তাকওয়ার ভিত্তিতে অন্যদের সঙ্গে তিনি পারস্পরিক সম্পর্ক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বজায় রাখতেন। তিনি বয়স্ক ব্যক্তিদের মর্যাদা দান করতেন। ছোটদের প্রতি স্নেহশীল এবং দয়ার্দ্র থাকতেন। গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতেন এবং পরিচিত-অপিরিচিত সকলেরই সমাদর করতেন।

রাসূল মুখমণ্ডলে সব সময়ই প্রফুল্লতা বিরাজমান থাকত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল স্বভাবসম্পন্ন। অপ্রয়োজনীয় কাজ, কথা কিংবা বিষয় বস্তুর প্রতি তিনি মনোযোগ দিতেন না।

স্বীয় আত্মার পবিত্রতা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি তিনটি পন্থা অবলম্বন করতেন।

১. সাম্প্রদায়িক বাড়াবাড়ি বর্জন,
২. কোনো কিছুর আধিক্য পরিহার করে চলা,
৩. অনর্থক কথাবার্তা এড়িয়ে চলা।

তাছাড়া তিনটি অপ্রীতিকর বিষয় থেকে তিনি মনকে মুক্ত রেখেছিলেন-

১. গীবত বা পরনিন্দা,
২. অন্যকে লজ্জা দেয়া,
৩. অন্যের দোষত্রুটি অনুসন্ধান করা।

রাসূল সেই সকল কথা বেশি বলতেন, যে সকল কথায় পুণ্যের আশা থাকত। তিনি যখন কথাবার্তা বলতেন তখন তাঁর সাহাবাগণ এমনভাবে মস্তক অবনত করে নিতেন যে, মনে হতো যেন তাঁদের মাথার ওপর পাখি বসে রয়েছে। নবী করীম (ﷺ) যখন কথা বন্ধ করে দিতেন তখন সাহাবারা কথাবার্তা আরম্ভ করতেন। রাসূল (ﷺ) এর উপস্থিতিতে লোকজনেরা কখনই কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলতেন না। তাঁর উদ্দেশ্যে একজন কথা বললে অন্যেরা নীরবতা অবলম্বন করতেন এবং তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই কথাবার্তা বলতেন না। কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে সকলের মুখে হাসি দেখা দিলে তিনিও সেই হাসিতে অংশগ্রহণ করতেন। কোনো ব্যাপারে লোকজনেরা আশ্চর্য বোধ করলে তিনি তা প্রকাশ করতেন।

অপরিচিত ব্যক্তি বাচালতাজনিত অত্যাচারের মাধ্যমে কাজ হাসিল করতে চাইলে তিনি ধৈর্যাবলম্বন করতেন এবং বলতেন, 'যখন তোমরা অভাবগ্রস্তদের দেখবে যে তারা আপন প্রয়োজন পূরণের অন্বেষণে রয়েছে তখন তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য দান কর।' নবী করীম (ﷺ) ইহসানের প্ররিশ্রমিক দাতা ছাড়া অন্য কারো প্রশংসা করতেন না।

খারিজা বিন যাহের (রা) বলেছেন, নবী করীম (ﷺ) আপন আলোচনার বৈঠকে প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদা সহকারে কথাবার্তা বলতেন। স্বীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাপড়ের বাইরে প্রকাশ করতেন না। অযৌক্তিক কিংবা অপ্রয়োজনীয় কোনো কথাবার্তা বলতেন না, নীরবতা অবলম্বন করতেন, কেউ কোনো অযৌক্তিক কথা বললে তিনি তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। হাসির প্রয়োজনে তিনি মৃদু হাসতেন। অতিরঞ্জিত কথাবার্তা বলতেন না এবং বেশি কথা না বলে অল্প কথাতেই বক্তব্য পরিস্কারভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। হাসির প্রয়োজনে সাহাবাগণও নবী করীম (ﷺ) এর অনুসরণে মৃদু হাসতেন।

মোট কথা, 'রাসূল ছিলেন অতুলনীয় ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যে সুসজ্জিত ও সুশোভিত সর্বকালোপযোগী এক পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। বিশ্ব-জাহানের স্রষ্টা প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূল কে এক অতুলনীয় আদর্শবোধ, একাগ্রচিত্ততা এবং অতুলনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর সুমহান চরিত্র সম্পদ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ইরশাদ হয়েছে-

"নিশ্চয় আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী।" (সূরা আল-কলাম: ৪)

রাসূল (ﷺ) এতই বৈশিষ্ট্যময় ছিলো যে, তাঁর সংস্পর্শে আসা মাত্রই মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারত না।

রাসূলের প্রতি ভালোবাসায় জনগণের অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। অধিকন্তু, তাঁর অতুলনীয় নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞা পরিচালনাধীনে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের ফলে নবী করীম (ﷺ) এর ব্যক্তি বৈশিষ্ট্য, তাঁদের সমগ্র চেতনাকে আচ্ছন্ন রাখত। তাঁর এই ব্যক্তিমাধুর্যের প্রভাবেই রুক্ষ্ম প্রকৃতির মরুচারী আরবরা নম্রতাভূষণে ভূষিত হয়ে দ্বীনে ইলাহীতে দলে দলে প্রবিষ্ট হতে থাকেন।

যে বিষয়টি উল্লেখ না করলে নয় তা হচ্ছে, আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের চরিত্র সম্পূর্ণ বর্ণনা করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তা সে এই বিষয়ে যতই বিজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ হোন না কেন।

কবির ভাষায়: বাহিরে কুরআনের পাঠক, প্রকৃতপক্ষে নিজেই কুরআন।

হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপর আপনার অনুগ্রহ দান করুন যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারের উপর অনুগ্রহ দান করেছন, আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপর বরকত দান করুন যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারকে বরকত দান করেছন, আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।