bd flag

বাংলা

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

অভিশাপের আহ্বান (লিআন) (৩৬৩৬-৩৬৬২)

ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া ..... সাহল ইবন সা'দ সাইদী হতে বর্ণিত যে, উওয়াইমির আল-আজলানী আসিম ইবন আদী আনসারী এর কাছে এসে তাকে বললেন, হে আসিম! যদি কেউ তার স্ত্রীর সাথে অন্য কোন পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) পায়; তবে তোমার অভিমত কী? সে কি তাকে হত্যা করবে? আর তখন তো তোমরা তাকে (কিসাস হিসেবে) হত্যা করবে। যদি তা না হয় তবে সে কী করবে? হে আসিম! তুমি আমার জন্য এ বিষয়ে রসূলুল্লাহ (ﷺ) কে জিজ্ঞেস কর। তখন আসিম রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ (ﷺ) এ রকম প্রশ্ন করা অপছন্দ করলেন এবং এটি দূষণীয় মনে করলেন। আসিম রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট থেকে যা শুনলেন এতে বড়ই দুঃখিত হলেন। যখন আসিম ফিরে এলেন, তখন উওয়াইমির তার কাছে এসে বললেনঃ হে আসিম! রসূলুল্লাহ (ﷺ) তোমাকে কী বলেছেন? আসিম উওয়াইমিরকে বললেনঃ তুমি আমার কাছে ভাল কাজ নিয়ে আসনি। তুমি যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে বলেছ তা রসূলুল্লাহ (ﷺ) খুবই অপছন্দ করেছেন। উওয়াইমির বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস না করে ক্ষান্ত হব না। তখন উওয়াইমির গেলেন এবং লোক সমাবেশে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে গিয়ে তাকে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) দেখতে পায় তাহলে সে-কি তাকে হত্যা করে ফেলবে? এরপর তো (কিসাস হিসেবে) আপনারা তাকে হত্যা করে ফেলবেন। অথবা সে কী করবে? তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে (আল্লাহর) হুকুম নাযিল হয়েছে। তুমি যাও, তোমার স্ত্রীকে নিয়ে এসো। সাহল বললেনঃ এরপর তারা উভয়ে (স্বামী-স্ত্রী) লিআন করলো। আর আমিও তখন লোকজনদের সাথে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট হাযির ছিলাম। যখন তারা লিআন সমাধা করলেন তখন উওয়াইমির বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি তাকে আমার স্ত্রী হিসেবে রেখে দেই তাহলে তো আমি তার উপর মিথ্যারোপকারী হয়ে গেলাম। রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে নির্দেশ দেয়ার আগেই তিনি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিলেন। ইবন শিহাব বলেন, তখন থেকে লিআনকারীদের জন্য এটাই নিয়ম-বিধান হিসেবে পরিণত হল।

হারমালাহ্ ইবন ইয়াহইয়া .... সাহল ইবন সা'দ হতে বর্ণিত যে, আজলান গোত্রের উওয়াইমির আনসারী আসিম ইবন আদীর কাছে এলেন .... পরবর্তী অংশ মালিক বর্ণিত হাদীসের মত বর্ণনা করেন। তিনি তার হাদীসে এ কথাও বলেছেন, "উওয়াইমির তার স্ত্রীকে আলাদা করে দেয়াতে পরবর্তীতে লিআনকারীদ্বয়ের জন্য তা বিধানরূপে পরিগণিত হল।" তিনি তার বর্ণনায় আরও উল্লেখ করেছেন, "সাহল বলেছেন- সে মহিলাটি ছিল গর্ভবতী। সে গর্ভজাত সন্তানটিকে পরবর্তীতে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধ করে ডাকা হয়।" এরপর এ বিধান প্রবর্তিত হলো যে, সে তার মায়ের ওয়ারিস পাবে এবং তার মা আল্লাহর নির্ধারিত অংশ হিসেবে তার (সন্তান) থেকে মিরাসের অধিকারী হবে।

মুহাম্মাদ ইবন রাফি .... ইবন জুরায়জ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমাকে ইবন শিহাব বানু সা'ইদাহ গোত্রের ইবন সা'দ বর্ণিত দু'জন লিআনকারী ও তার বিধান সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তিনি (সাহল) বলেনঃ জনৈক আনসারী নবী (ﷺ) এর কাছে এলেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি কোন লোক তার স্ত্রীর সঙ্গে (ব্যভিচাররত) অন্য কোন পুরুষকে দেখতে পায় তাহলে সে সম্পর্কে আপনার মতামত কী? এরপর পুরো ঘটনাসহ হাদীস বর্ণনা করেন। এতে বাড়তি বর্ণনা করেন যে, (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ে মসজিদের ভেতরে লিআন করল আর আমি উপস্থিত ছিলাম। আর তিনি এ হাদীসে বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে কোন নির্দেশ দেয়ার পুর্বেই তিনি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে নবী (ﷺ) এর সম্মুখেই তাকে আলাদা করে দেন। তখন নবী (ﷺ) বললেনঃ এ উভয় লিআনকারীর মাঝখানে বিচ্ছেদ।

মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ্ ইবনে নুমায়র ও আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ .... সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুসআবের স্ত্রীর ব্যাপারে আমাকে লিআনকারী দু'জনের মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, তাদের আলাদা করা হবে কি না। তিনি বলেনঃ তখন আমি কী বলব তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। এরপর আমি মক্কায় ইবন উমর এর বাসায় গেলাম। আমি তার গোলামকে বললাম, আমার জন্য অনুমতি নিয়ে এসো। সে বললঃ তিনি এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি আমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। তিনি বললেনঃ ইবন জুবায়র? আমি বললাম, হ্যা। তিনি বললেনঃ ভিতরে এসো। আল্লাহর কসম! বিশেষ প্রয়োজনই এ সময় তোমাকে নিয়ে এসেছে। আমি ভিতরে গিয়ে দেখতে পেলাম তিনি একটি কম্বল বিছিয়ে একটি বালিশের উপর হেলান দিয়ে আছেন। বালিশটি খেজুর ছোবড়ায় ভরা ছিল। আমি বললামঃ হে আবূ আবদুর রহমান দুজন লিআনকারী- এদের কি পৃথক করা হবে? তিনি বললেনঃ সুবহানাল্লাহ! হ্যা। সর্বপ্রথম এ বিষয়ে অমুকের পুত্র অমুক জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলেছিলঃ হে আল্লাহর রসূল! আপনি কী বলেন, যদি আমাদের মধ্যে কেউ তার স্ত্রীকে অপকর্মে লিপ্ত দেখতে পায় তাহলে সে কী করবে? যদি সে বলাবলি করে তাহলে তো গুরুতর আকার ধারণ করবে। যদি সে নীরব থাকে, তাহলে এমন সাংঘাতিক বিষয়ে কি করে নীরব থাকবে। তিনি বলেনঃ তখন নবী (ﷺ) চুপ রইলেন; কোন উত্তর দিলেন না। সে ব্যক্তি আবার তার কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! যে বিষয়টি সম্পর্কে ইতোপূর্বে আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার নিজের উপরই তা ঘটেছে। তখন আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নূর-এর এ আয়াতগুলো নাযিল করেন- "আর যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে অথচ তারা নিজেরা ছাড়া তাদের কোন সাক্ষী নেই- তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্যের পদ্ধতি হবে এই যে, সে চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে, সে অবশ্যই সত্যবাদী এবং পঞ্চমবারে বলবে, সে মিথ্যাবাদী হলে তার উপর আল্লাহর লানাত বর্ষিত হবে। আর স্ত্রীর শাস্তি বাতিল করা হবে যদি সে চারবার আল্লাহর নামে কসম করে সাক্ষ্য দেয় যে, তার স্বামীই মিথ্যাবাদী এবং পঞ্চমবারে বলবে, তার স্বামী যদি সত্যবাদী হয় তবে নিজের উপর নেমে আসবে আল্লাহর গযব"(আন-নূর ২৪ঃ ৬-৯)। তিনি তাকে এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনালেন। এরপর তাকে নসীহত করলেন এবং স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, দুনিয়ার শাস্তি আখিরাতের শাস্তির তুলনায় সহজ। সে বলল, না। সে মহান সত্তার কসম যিনি আপনাকে নবী হিসেবে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি তার (আমার স্ত্রীর) উপর কোন মিথ্যা আরোপ করিনি। এরপর তিনি মহিলাকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে উপদেশ দিলেন, তাকে আখিরাতের ভয় দেখালেন, সর্বোপরি তাকে জানিয়ে দিলেন যে, দুনিয়ার শাস্তি আখিরাতের শাস্তির তুলনায় সহজতর। সে বলল, না, সে মহান সত্তার কসম– যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই সে মিথ্যাবাদী। এরপর তিনি পুরুষ লোকটির দ্বারা লিআন বাক্য পাঠ করাতে শুরু করলেন। তখন সে চারবার আল্লাহর নামে কসম করে সাক্ষ্য দিল যে, সে তার কথায় সত্যবাদী। পঞ্চমবারে সে বলল, যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর আল্লাহর লানাত নেমে আসুক। এরপর তিনি (নবী (ﷺ)) স্ত্রীলোকটিকে ডেকে পাঠালেন। সেও আল্লাহর নামে শপথ করে চারবার সাক্ষ্য দিল যে, সে (স্বামী) মিথ্যাবাদী। পঞ্চমবারে সে বলল, যদি সে (তার স্বামী) সত্যবাদী হয় তাহলে তার (মহিলার) উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তখন নবী (ﷺ) তাদের উভয়কে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।

আলী ইবন হুজর সাদী .... সাঈদ ইবন জুবায়র বললেন, মুসআব ইবন যুবায়র এর শাসনামলে দু'জন লিআনকারী সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করা হলে আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না কী উত্তর দেব। তখন আবদুল্লাহ্ ইবন উমার এর কাছে এলাম এবং সে দু'জন লিআনকারী সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলামঃ তাদের বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে আপনার মত কী? এরপর তিনি ইবন নুমায়র এর হাদীসের মতই বর্ণনা করেন।

ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া, আবূ বকর ইবন শাইবাহ ও যুহায়র ইবন হারব .... ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ দুজন লিআনকারীর (লিআন বাক্য পাঠের ব্যাপারে) তোমাদের দু'জনের হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে। তোমাদের দু'জনের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। আর তোমার (স্ত্রীর) উপর তোমার কোন করণীয় নেই। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার অর্থের (প্রদত্ত মাহর) কী হবে। তিনি বললেনঃ তুমি তোমার অর্থ পাবে না। যদি তুমি তার ব্যাপারে সত্যবাদী হও তাহলে তোমার দেয়া সম্পদ ঐ বস্তুর বদলা বলে গণ্য হবে যা দ্বারা তুমি তার লজ্জাস্থান হালাল করেছ। আর যদি তুমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে থাক তাহলে তার থেকে মাল ফেরত পাওয়া দুরহ ব্যাপার। যুহায়র তার বর্ণনায় বলেছেন যে, সুফইয়ান সাঈদ ইবন জুবায়র এর সূত্রে ইবন উমার কে রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বলতে শুনেছি।

আবূর রাবী যাহরানী ... ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ বানী আজলান গোত্রের দু'জনকে (স্বামী-স্ত্রী) রসূলুল্লাহ (ﷺ) বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। এরপর তিনি বললেন। আল্লাহ ভালভাবেই জানেন যে, নিশ্চয়ই তোমাদের দু'জনের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব তোমাদের কেউ কি তওবা করতে আগ্রহী?

ইবন আবী উমার ..... সাঈদ ইবন জুবায়র বলেনঃ আমি লিআন সম্পর্কে ইবন উমার কে প্রশ্ন করলাম। তিনি নবী (ﷺ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করলেন।

আবূ গাসসান মিসমাঈ, মুহাম্মাদ ইবন মুসান্না ও ইবন বাশশার ... সাঈদ ইবন জুবায়র হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুসআব (ইবন যুবায়র) তার শাসনামলে লিআনকারীদের আলাদা করেননি। সাঈদ বলেনঃ এরপর বিষয়টি আমি আবদুল্লাহ ইবন উমার এর কাছে উঠলাম। তখন তিনি বললেনঃ নবী (ﷺ) বানু আজলান গোত্রের দু'জনকে (স্বামী-স্ত্রীকে) আলাদা করে দিয়েছিলেন।

সাঈদ ইবন মানসূর, কুতাইবাহ ইবন সাঈদ ও ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া .... ইবন উমার হতে বর্ণিত যে, কোন এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবদ্দশায় তার স্ত্রীর উপর লিআন করেছিল। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের দু'জনকে বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং সন্তানের বংশ পরিচিতি তার মায়ের সাথে জুড়ে দেন। রাবী ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া মালিককে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে কি নাফি এ হাদীস বর্ণনা করেছেন? তিনি (মালিক) বলেন, হ্যা।

আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ ও ইবন নুমায়র .... ইবন উমার হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) একজন আনসারী পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে লিআন করালেন এবং তাদের আলাদা করে দিলেন।

মুহাম্মাদ ইবন মুসান্না ও উবাইদুল্লাহ ইবন সাঈদ .... উবাইদুল্লাহ হতে উক্ত সানাদে বর্ণনা করেছেন।

যুহায়র ইবন হারব, উসমান ইবন আবী শাইবাহ ও ইসহাক, ইবন ইবরাহীম .... আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি একবার জুমুআর রাতে মসজিদে ছিলাম। তখন একজন আনসারী সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেনঃ যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে দেখতে পায়, সে যদি এ নিয়ে কথা বলে, তাহলে আপনারা তো তাকে (অপবাদদাতা হিসেবে) চাবুক লাগাবেন? অথবা সে যদি তাকে হত্যা করে ফেলে তাহলে তো আপনারা তাকে হত্যা করবেন (কিসাস হিসেবে)। যদি সে নীরব থাকে তাহলে তো তাকে সাংঘাতিক ক্রোধ (হযম) করে নীরব থাকতে হবে। আল্লাহর কসম! আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবই। পরদিন সে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এসে প্রশ্ন করল। সে বলল, যদি কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে (ব্যভিচারে লিপ্ত) দেখতে পায় এবং সে এ নিয়ে কথা বলে তাহলে আপনারা তাকে হত্যা করে ফেলবেন। আর যদি নীরব থাকে তবে তো তাকে রাগ চেপে নীরব থাকতে হবে। (সুতরাং তার উপায় কী?) তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) দোয়া করলেন ইয়া আল্লাহ! তুমি এর ফয়সালা দাও এবং তিনি দোয়া করতে লাগলেন। তখন লিআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো- "আর যারা তাদের স্ত্রীদের উপর অপবাদ দেয় অথচ তারা নিজেরা ছাড়া তাদের কোন সাক্ষী নেই"- এ আয়াতগুলো। (আন-নূর ৬-৯) এরপর সে ব্যক্তি লোকজনের সামনে লিআনের পরীক্ষার মুখোমুখি হলো। তারপর সে তার স্ত্রীসহ রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এল এবং তারা উভয়ে লিআন করল। লোকটি আল্লাহর নামে শপথ করে চারবার সাক্ষ্য দিল যে, সে সত্যবাদী। এরপর পঞ্চমবারে বলল, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপরে আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। এরপর মহিলাটি লিআনের জন্য এগিয়ে এলো। নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ থাম (যদি তোমার স্বামীর উক্তি সত্য হয়ে থাকে তাহলে তুমি তা স্বীকার করে নাও)। কিন্তু সে অস্বীকার করল এবং লিআন করে ফেলল। যখন তারা দু'জন ফিরে যাচ্ছিল তখন তিনি (নবী (ﷺ)) বললেনঃ সম্ভবত এ মহিলা কালো কোঁকড়া চুলবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করবে। অবশেষে তার গর্ভে একটি কালো কোকড়া চুলবিশিষ্ট সন্তানই জন্ম নিয়েছিল।

ইসহাক ইবন ইবরাহীম ও আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ .... আমাশ হতে এ একই সানাদে অনুরূপ বর্ণিত আছে।

মুহাম্মাদ ইবন মুসান্না .... মুহাম্মাদ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি একটি বিষয়ে আনাস ইবন মালিক কে জিজ্ঞেস করলাম। আমার ধারণা ছিল যে, আমি যা জানতে চাই সে বিষয়ের জ্ঞান তার কাছে আছে। আনাস বলেনঃ হিলাল ইবন উমাইয়্যাহ্ শারীক ইবন সাহমার সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্কে যিনার অভিযোগ আনলেন। তিনি ছিলেন বারা ইবন মালিকের বৈপিত্রেয় ভাই। ইসলামে ইনিই সর্বপ্রথম লিআন করেন। রাবী বলেনঃ তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে লিআন সমাধা করলেন। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা ঐ মহিলার প্রতি নযর রাখবে। যদি সে সোজা চুলধারী উজ্জ্বল বর্ণের লাল চোখ বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তাহলে সে হিলাল ইবন উমায়্যার ঔরষজাত সন্তান। আর যদি সে (মহিলা) সুরমা চোখ বিশিষ্ট কোঁকড়ানো চুল, পায়ের চিকন নলা বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তাহলে সে শারীক ইবন সাহমার সন্তান। রাবী আনাস বলেনঃ আমি জানতে পারলাম যে, ঐ মহিলাটি সুরমা চোখ বিশিষ্ট কুঞ্চিত কেশধারী সরু নলা বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করেছে।

মুহাম্মাদ ইবন রুমূহ ইবন মুহাজির ও ঈসা ইবন হাম্মাদ মিসরী .... ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট লিআনের বিষয়টি আলোচিত হল। তখন আসিম ইবন আদী ঐ বিষয়ে কিছু কথা বলে ফিরে গেলেন। তখন তার গোত্রের একজন লোক তার কাছে এসে অভিযোগ করল যে, সে তার স্ত্রীর সঙ্গে এক (অপরিচিত) লোককে দেখতে পেয়েছে। তখন আসিম বললেন, আমি আমার উক্তির (বক্তব্যের) কারণে এ বিপদে পড়লাম। তখন তিনি তাকে নিয়ে রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এলেন। এরপর সে তাকে (রসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে) সে ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করল যাকে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখতে পেয়েছিল। এ লোকটি (বর্ণনাদাতা) ছিল হলদে বর্ণ বিশিষ্ট হালকা-পাতলা ও সোজা চুলবিশিষ্ট। আর সে যাকে তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখতে পেয়েছিল সে ছিল সুঠাম দেহী, মোটা নলা ও বাদামী রং বিশিষ্ট। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ ইয়া আল্লাহ! তুমি বিষয়টি ফায়সালা করে দাও। সে মহিলা এমন একটি সন্তান প্রসব করল, যে ছিল ঐ লোকটির মত যাকে স্বামী তার সঙ্গে দেখতে পেয়েছে বলে উল্লেখ করেছিল। রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদের দু'জনের মধ্যে লিআন করালেন। তখন এক ব্যক্তি সে মজলিসেই ইবন আব্বাস কে বললঃ এ কি সে মহিলা যার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন, "যদি আমি বিনা দলীলে কাউকে 'রজম (পাথর নিক্ষেপ) করতাম তবে একেই রজম করতাম।" তখন ইবন আব্বাস বললেনঃ না- সে ছিল অপর এক মহিলা যার অপকর্ম মুসলিমদের মাঝে প্রকাশিত ছিল।

আহমাদ ইবন ইউসুফ আযদী .... ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে দু'জন লিআনকারীর প্রসঙ্গে আলোচনা করা হলো। পরবর্তী অংশ লায়সের হাদীসের মতই। অবশ্য এতে মাংসল উল্লেখ করার পর তিনি অতিরিক্ত বলেছেন, "সে ছিল কোকড়া চুলধারী।"

আমর আন নাকিদ ও ইবন আবূ উমর .... আবদুল্লাহ ইবন শাদ্দাদ হতে বর্ণিত যে, ইবন আব্বাস এর নিকটে দু' লিআনকারীর বিষয় আলোচনা করা হলো। তখন ইবন শাদ্দাদ বললেনঃ এরা কি ঐ দুই ব্যক্তি যাদের সম্পর্কে নবী (ﷺ) বলেছিলেনঃ আমি যদি কাউকে বিনা দলীলে রজম করতাম তবে ঐ মহিলাকে রজম করতাম। তখন ইবন আব্বাস বললেনঃ না, এ মহিলা সে নয়। সে ছিল অপর এক মহিলা যার ব্যাপার প্রকাশ্য ছিল। ইবন আবী উমার তার বর্ণনায় কাসিম ইবন মুহাম্মদের সূত্রে বলেন, আমি ইবন আব্বাসের কাছে শুনেছি।

কুতাইবাহ ইবন সাঈদ .... আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, সা'দ ইবন উবাদাহ্ আনসারী বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! সে লোকটি সম্পর্কে আপনার মতামত কী যে তার স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে পায়? সে কি তাকে হত্যা করে ফেলবে? রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ না। সা'দ বললেন নিশ্চয় (সে তাকে হত্যা করবে), সে সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য দ্বারা সম্মানিত করেছেন। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা শোন; তোমাদের নেতা (সা'দ) কী বলছেন।

যুহায়র ইবন হারব .... আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত যে, সা'দ ইবন উবাদাহ্ বলেছেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি যদি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কাউকে দেখতে পাই তাহলে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করা পর্যন্ত আমি কি তাকে সুযোগ দেব? তিনি বললেনঃ হ্যা।

আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ .... আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সা'দ ইবন উবাদাহ্ বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোন পুরুষকে দেখতে পাই তবে চারজন সাক্ষী উপস্থিত না করা পর্যন্ত আমি কি তাকে ধরব না? রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ হ্যা, পারবে না। তিনি (সা'দ) বললেনঃ এমনটি কিছুতেই হতে পারে না, সে মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আবশ্য আমি তার (চারজন সাক্ষী উপস্থিত করার) আগেই কাল বিলম্ব না করে তার প্রতি তলোয়ার হানব। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমরা শোন, তোমাদের নেতা কী বলছেন। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় আত্মমর্যাদার অধিকারী। আর আমি তার চাইতেও অধিকতর আত্মমর্যাদাশীল এবং আল্লাহ আমার চাইতেও অধিক মর্যাদাবান।

উবাইদুল্লাহ ইবন উমার কাওয়ারীরী ও আবূ কামিল ফুযায়ল ইবন হুসায়ন জাহদারী .... মুগীরাহ শুবাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ সা'দ ইবন উবাদাহ্ বললেনঃ আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে অন্য কোন পুরুষকে দেখতে পাই তবে নিশ্চয়ই আমি তাকে আমার তরবারীর ধারালো দিক দিয়ে তার উপর আঘাত হানব- পার্শ্ব দিয়ে নয়। এ কথা নবী (ﷺ) এর কাছে পৌছল। তিনি বললেনঃ তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে আশ্চর্য হয়েছ? আল্লাহর কসম! আমি তার চাইতে অধিকতর আত্মমর্যাদাবান। আর আল্লাহ আমার তুলনায় অধিকতর মর্যাদাবান। আল্লাহ তার আত্মমর্যাদার কারণে প্রকাশ্য ও গোপন যাবতীয় অশ্লীল কর্ম হারাম করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর তুলনায় অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কেউ নেই এবং আল্লাহর চাইতে অধিকতর ওযর (স্থাপন) পছন্দকারী কেউ নেই। এ কারণেই আল্লাহ তার নবী-রসূলদের সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর চাইতে অধিকতর প্রশংসা পছন্দকারী কেউ নেই। এ কারণে তিনি জান্নাতের ওয়াদা করেছেন।

আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ্ .... আবদুল মালিক ইবন উমায়র সূত্রে এ সানাদে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। তবে তিনি তার বর্ণনার অনুরূপ 'তলোয়ারের পাশ দিয়ে নয়' শব্দটির উল্লেখ করেছেন এবং তিনি 'তাথেকে' শব্দটি বলেননি।

কুতাইবাহ ইবন সাঈদ, আবূ বকর ইবন আবূ শাইবাহ্, আমর আন্‌ নাকিদ ও যুহায়র ইবন হারব .... আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ বানু ফাযারাহ গোত্রের এক ব্যক্তি নবী (ﷺ) এর কাছে এলো। এরপর সে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে (আমি তো কালো নই)। তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমার নিকট কি কোন উট আছে? সে বলল: হ্যা, আমার উট আছে। তিনি বললেন: সেগুলোর রং কী রকম? সে বললঃ লাল রং এর। তিনি বললেনঃ তাতে মেটে রং-এরও কি আছে? সে বললঃ হ্যা, মেটে রং-এর আছে। তিনি বললেনঃ এই মেটে রং কোথেকে এলো? সে বললঃ সম্ভবত তা পূর্ববর্তী বংশধারা থেকে নিয়ে এসেছে। তখন তিনি বললেনঃ তোমার এ কালো সন্তানটিও সম্ভবত পূর্ববর্তী বংশধারা থেকে এসেছে।

ইসহাক ইবন ইবরাহীম, মুহাম্মাদ ইবন রাফি ও আবদ ইবন হুমায়দ .... যুহরী সূত্রে ইবন উয়াইনাহ্ এর হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে মা'মার বর্ণিত হাদীসে এতটুকু ব্যতিক্রম রয়েছে যে, "সে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে। এ উক্তি দ্বারা সে ঐ সময় তার পিতৃত্ব প্রত্যাখ্যানের দিকে ইঙ্গিত করেছিল। আর হাদীসের শেষ ভাগে এতটুকু বাড়িয়ে বলেছেন, তারপর তিনি তাকে ঐ সন্তানের পিতৃত্ব প্রত্যাখ্যানের সুযোগ দেননি।

আবূ তাহির ও হারমালাহ্ ইবন ইয়াহইয়া .... আবূ হুরাইরাহ্ হতে বর্ণিত যে, জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রসূল! আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে এবং তাকে আমি মেনে নিতে পারছি না। তখন নবী (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমার উট আছে কি? সে বলল, আছে। তিনি বললেনঃ সেগুলো কোন রঙের? সে বললঃ লাল। তিনি বললেনঃ সেগুলোর মধ্যে কি মেটে (কালো) রং-এরও আছে? সে বলল, হ্যা। তখন রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ এ রং কিভাবে এলো? সে বলল। সম্ভবত তার বংশধারার কোন শিকড় নিয়ে এসেছে। এরপর রসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে বললেনঃ তোমার এ কালো সন্তানের ক্ষেত্রেও হয়ত সে তার পূর্ব পুরুষের কোন শিকড় নিয়ে এসেছে।

মুহাম্মাদ ইবন রাফি .... ইবন শিহাব হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমাদের নিকট এ খবর পৌছেছে যে, আবূ হুরাইরাহ্ রসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে তাদের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।